Thursday, May 2, 2019

আইলার বীভৎসতা ছাপিয়ে যেতে পারে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ফণী

দশ বছর আগে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে প্রাণ হারান প্রায় ৩৩৯ জন মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয় দেশের উপকূলীয় এলাকা। ভারতের আবহাওয়া দফতর বলছে, আয়লার বীভত্সতা ছাপিয়ে যেতে পারে প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে ক্রমশ ওড়িশার দিকে অগ্রসর হতে থাকা ঘূর্ণিঝড় ফণী।
বৃহস্পতিবার সকালে ওড়িশা উপকূল থেকে ঘূর্ণিঝড়টি ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। শক্তি বাড়িয়ে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার করে এগিয়ে আসছে মারাত্মক এই ঘূর্ণিঝড়। বুধবার সন্ধ্যায় পুরী থেকে এর দূরত্ব ছিল ৬১০ কিলোমিটার। আর কলকাতা এবং দিঘা থেকে এর দূরত্ব ছিল যথাক্রমে এক হাজার এবং ৮শ কিলোমিটার।
ভারতের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ওড়িশার ১৯টি জেলায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়তে পারে। প্রভাব পড়বে পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের তিন জেলায়ও। ১ মে থেকে ৫ মে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করেছে আবহাওয়া দফতর।
ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ইতোমধ্যেই সব পর্যটককে হোটেল ছেড়ে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ওড়িশা সরকার। বাঙালি পর্যটকদের জন্য পুরী-কলকাতা বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করেছে ওড়িশা সরকার। এছাড়া ১০৩ ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডবে পশ্চিমবঙ্গে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। কলকাতা আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড় ফণী চূড়ান্ত রূপে আছড়ে পড়বে উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে। যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। উপকূলবর্তী এলাকার কাঁচা ও বেড়ার বাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হতে পারে।
২০০৯ সালে যেভাবে ঘূর্ণিঝড় আইলা বাংলাদেশে এবং ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল, ঠিক সে ধরনের পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে এবার। ওই বছর আইলার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১১২ কিলোমিটার। তবে ফণীর গতিবেগ আরো অনেক বেশি।
ওই বছরের ২৫ মে আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দেশের উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতা বেগের জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকূলীয় কয়েকটি জেলায়। ঝড়ের আঘাতে বাংলাদেশ এবং ভারতে প্রাণ যায় অন্তত ৩৩৯ জনের। জনজীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। রাস্তা-ঘাট ভেঙে যায়, হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যায় হাজার হাজার গবাদি পশু। সেই আয়লার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন উপকূলীয় জনপদের লাখ লাখ মানুষ।
ভারতের আবহাওয়া দফতর বলছে, ওড়িশায় ২০৫ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানতে পারে ফণী। পরে সেখান থেকে গতিপথ বদলে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ফণী। ইতোমধ্যে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত এবং কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর।

‘ফণী’ ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী!

ধীরে এগিয়ে এলেও ফণী বেশ শক্তিশালী হয়ে গেছে। এখন তার গতি বেড়ে গেছে। তাই ফণী ৪ মের আগেও বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। বাংলাদেশে আছড়ে পড়ার আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশা রাজ্যের উপকূলে আঘাত করতে পারে। তাই কিছুটা দুর্বল অবস্থায় ফণী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার দিকে আসবে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ এক সপ্তাহ আগে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। নাম হয় ফণী। এ কারণে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এদিকে ১৯৭৬ সালের পর ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে এত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়নি ভারত।
ভারতের দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ফণী আগামীকাল শুক্রবার ভারতের ওডিশা রাজ্য উপকূলে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আছড়ে পড়ার সময় ঘণ্টায় প্রায় ২০৫ কিলোমিটার গতি থাকবে এই ঘূর্ণিঝড়ের। গত চার দশকেরও (৪৩ বছর) বেশি সময়, অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের পর ভারত মহাসাগরে এত শক্তিশালী ঝড়ের মুখোমুখি হয়নি দেশটি। ঘূর্ণিঝড় ফণী বর্তমানে তামিলনাড়ুর বিশাখাপট্টনমের পূর্ব উপকূল থেকে ৬০০ কিলোমিটার ও পুরী থেকে ৮০০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। ১৯৭৬ সালের (গত ৪৩ বছরে) পর এখন পর্যন্ত এপ্রিলে বঙ্গোপসাগরে যত ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, তার কোনোটি কখনই এত শক্তিশালী আকার ধারণ করেনি।
ঘূর্ণিঝড় ফণীর বিষয়ে সতর্কতা জারি করে রেখেছে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর। ওডিশায় এরই মধ্যে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও অন্ধ্র প্রদেশের উত্তর উপকূল দিয়েও বয়ে যেতে পারে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণী। এ ঘূর্ণিঝড়কে সামাল দিতে এরই মধ্যে অন্ধ্র প্রদেশ, ওডিশা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ১ হাজার ৮৬ কোটি রুপি আগাম বরাদ্দ দিয়েছে। কাল দুপুরে ঘণ্টায় ১৭৫ থেকে ২০৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় বইবে বলে জানিয়েছে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের ঘূর্ণিঝড়সংক্রান্ত তথ্য দেখা গেছে, ১৯৬৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে ৪৬টি ‘প্রবল ঘূর্ণিঝড়’ হয়েছে। এর মধ্য ২৮টি হয়েছে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্য। সাতটি ছিল মে মাসে। দুটি ছিল এপ্রিলে। এ দুটি ঘূর্ণিঝড় ১৯৬৬ ও ১৯৭৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে হয়েছে।
৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার গতির ঝড় হলে তা শক্তিশালী ঝড় এবং ২২১ কিলোমিটার গতির হলে ‘সুপার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলে। প্রবল ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতও চলবে এই ফণীর কারণে। ভারতীয় কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীর জাহাজ ও হেলিকপ্টার সাহায্যের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরাও প্রস্তুত। পাশাপাশি ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স ৪১ টিমকেও প্রস্তুত রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে আরও ১৩ টিম এবং অন্ধ্র প্রদেশের রয়েছে ১০ টিম।
ফণী আজ বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়টি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। স্বল্প সময়ের নোটিশে তারা যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে, সে জন্য সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

কিশোরীকে খুন করে ঘরেই লুকিয়ে ছিল খুনি! by আসাদুজ্জামান

বারো বছরের কিশোরী সাগরিকা তৃপ্তি খুন হয় নিজ বাসায়। খুনি আলম বিশ্বাস ঘরে ঢুকে সাগরিকাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে সেই ঘরের মধ্যেই প্রায় দুই ঘণ্টা লুকিয়ে ছিল। সাগরিকার মা খুনিকে দেখে ফেলায় তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর এক বছরের বেশি সময় পার হলেও আসামিকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
তৃপ্তি খুনের মামলা তদন্ত করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা-পুলিশ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতকে (সিএমএম) এই তথ্য জানিয়েছে। তৃপ্তিকে ধর্ষণের পর হত্যা করার দায়ে আলমকে অভিযুক্ত করে গত ৮ এপ্রিল ঢাকার সিএমএম আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান প্রথম আলোকে এ কথা জানিয়েছেন।
তৃপ্তির পরিবার ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত তৃপ্তি। বাবা-মায়ের সঙ্গে তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ির তিনতলা বাসার দ্বিতীয় তলায় থাকত সে। একই বাড়ির নিচতলায় থাকতেন তার বড় বোন কুলসুম। সেদিন ভোর ছয়টায় কুলসুম তৃপ্তিদের বাসায় আসেন। দেখেন, বাবা হাসান আলী নামাজ পড়তে বাইরে গেছেন। মা রওশন আরা গেছেন কারওয়ান বাজারে। তখন কুলসুম তৃপ্তিকে বলেছিলেন, ‘তৃপ্তি, স্কুলে যাবি না?’ জবাবে তৃপ্তি আটটার সময় স্কুলে যাবে বলে জানায়। এরপর বড় বোন কুলসুম নিজের বাসায় আসেন। কিন্তু ঘুমন্ত বোনকে না জাগিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেবল দরজা টেনে রেখে যান।
সকাল ৭টা ২০ মিনিটে বাইরে থেকে বাসার সামনে আসেন বাবা হাসান আলী। দেখেন, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। লোহার দরজায় বারবার ধাক্কা দিতে থাকেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। নিরুপায় হয়ে হাসান আলী কুলসুমের স্বামী জুলফিকারকে ডেকে আনেন। জুলফিকারও জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন তাঁরা বাড়িওয়ালার কাছে যান। ঘটনার কথা খুলে বলেন। বাড়িওয়ালা তখন বাসার ভেন্টিলেটর ভাঙার অনুমতি দেন। দরজার ওপরের ভেন্টিলেটর ভেঙে ঘরে ঢুকে জুলফিকার দেখেন, তৃপ্তি ফ্লোরে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। এরপর তৃপ্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় শমরিতা হাসপাতালে। যাওয়ার সময় দরজা বন্ধ করে যান হাসান আলী।
হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তৃপ্তিকে মৃত ঘোষণা করেন। মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রওশন আরা বাসায় আসেন। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে রওশন আরা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আলমকে দেখতে পান। তিনি চিৎকার দিলে আলম তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, গার্মেন্টস শ্রমিক আলমই ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে তৃপ্তিকে হত্যা করে। অভিযুক্ত আসামি আলম থাকত তৃপ্তিদের বাসার সামনের একটি কক্ষে। পুলিশের ধারণা, বড় বোন ঘরের দরজা খুলে রাখার সুযোগে ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে তৃপ্তিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে আলম। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার আগেই তৃপ্তির বাবা বাসায় চলে আসে। ফলে আলম আর ঘর থেকে বের হতে পারেনি।
অভিযোগপত্র বলছে, চারজন লোক তৃপ্তিদের বাসার সামনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। ঘটনার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে আসামি আলমের গলায় সমস্যা দেখা দেয়। কাজে না গিয়ে সে বাসায় ছিল। তৃপ্তি সাধারণত স্কুল শেষে দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে বাসায় ফিরত। ওই সময় লোকজন কম থাকত। এই সুযোগে আসামি আলম তৃপ্তিকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করত। বিষয়টি তৃপ্তি তার বাবা-মাকেও জানায়। আসামি আলমকে সতর্কও করে দেয়।
তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন তৃপ্তির মা রওশন আরা যান কারওয়ান বাজার। আর বাবা হাসান আলীও যান নামাজ পড়তে। এরপর তৃপ্তির বোন কুলসুম তৃপ্তির কক্ষে আসেন। তৃপ্তি তখন শুয়ে ছিল। কুলসুম ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে নিজের বাসায় যান। তখন আসামি আলম ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। সে তৃপ্তিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে।
পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান আরও বলেন, ধর্ষণ করে হত্যা করার পর আসামি আলম ঘরের ভেতর লুকিয়ে ছিল। তৃপ্তির মা রওশন আরাই প্রথম ঘরের ভেতর দেখে আসামি আলমকে। চিৎকার দিলে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয় আলম। মেডিকেল পরীক্ষার ফরেনসিক প্রতিবেদন বলছে, তৃপ্তিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
শনিবার কথা হয় রওশন আরার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আলম তাঁর মেয়েকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। এত দিন হয়ে গেল, পুলিশ আলমকে ধরতে পারল না। আলমের ফাঁসি চান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান বলেন, আলমকে ধরার জন্য চেষ্টার কমতি রাখা হয়নি। তাঁর গ্রামের বাড়িতে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে।

রাজনীতিতে ‘ফনি’

বহুকাল পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই একটি নতুন ঘটনা ঘটেছে। এটা ঘটলো যখন বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নামকরণ করা ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি’ তীব্রতা পাচ্ছিল। ফনি উড়িষ্যার দিকে লণ্ডভণ্ড করলেও বাংলাদেশে ততটা রুদ্রমূর্তি বা উথালপাথাল আবহাওয়া তৈরি করেনি। কিন্তু বিএনপি যেন সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করলো ‘ফনি’ হয়ে।
বিএনপির জাহিদুল ইসলামের চুপিসারে হঠাৎ যোগদান, দ্রুততম সময়ে সিনিয়র নেতা ড. মোশাররফ হোসেনের ভাষায় ‘ঝরা পাতা’ ঝেড়ে  ফেলা অর্থাৎ জাহিদুলকে বহিষ্কার করা, সেটাই ছিল নাটক। কিন্তু জাহিদুল ঘোর না কাটতেই মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি চার জনের একত্রে শপথ পাঠ ছিল দ্বিতীয় চমক। আবার সেখানে সবাই যখন আশা করছিল যে, এবারে এই চার জনও যথারীতি জাহিদুল হবেন, তখন আবার নাটক। এবারে শপথ গ্রহণকারীদের একজন ক্ষীণস্বরে দাবি করেছেন, তারেক রহমানের এবং দলের সম্মতিতে তারা শপথ নিয়েছেন। তখন প্রথমে মনে হয়েছে, তিনি কথার কথা বলেছেন।
তাদের বহিষ্কারের খড়গ এই নামলো বলে। কিন্তু মির্জা ফখরুল হঠাৎ রুপালি পর্দার কোনো রুদ্ধশ্বাস উপাখ্যানের মতো আবির্ভূত হলেন। সাংবাদিকরা শশব্যস্ত ছুটলেন মির্জার বয়ান শোনার জন্য। কিন্তু তারা যা শুনলেন, তা শোনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। মির্জার পাশে কেউ ছিলেন না। সবাই ভাবলেন, নিশ্চয়  জ্যেষ্ঠরা ক্ষুব্ধ। মির্জা রাজনীতিতে কম ঝানু নন। তার পরিবার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার। সাংবাদিকদের কাছে তিনি রহস্য রেখে দিলেন। কবে শপথ নেবেন? ইতিমধ্যে খবর রটলো তিনি স্পিকারের কাছে চিঠি লিখেছেন।
আসলে সংবিধান অনুযায়ী ৯০ কার্যদিবস লেখা আছে। তাই গত পরশু ছিল শেষ দিন। তিনি শপথ নেননি মানে তার তো আর শপথ নেয়ার সুযোগ নেই। সেই দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ সাংবাদিকরা সেটা ধরতে পারেনি। তাদের কেউ কেউ খবর দিয়েছে, স্পিকারের কাছে তিনি চিঠি লিখেছেন। আসলে তো চিঠি লেখার সুযোগ ছিল না। স্পিকারের সময় বাড়ানোর এখতিয়ার ছিল না। জীবনে শিক্ষকতা করেছেন মির্জা। তাই হয়তো পরিহাস করেছেন। বলেছেন, আপনারা সময় হলে জানতে পারবেন। গতকাল প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দলের কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপির অন্য নির্বাচিতরা শপথ নিয়েছেন। কিন্তু তিনি নেননি। নেবেন না। অবশ্য প্রশ্ন মুছে যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে বিএনপি কি বেগম খালেদা জিয়ার আসনটি ছেড়ে দিলো। ওই আসনটিতে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচন হলে বিএনপি বয়কট করবে। আর সেখানে এবারে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবে নাকি, ওই আসনটিতে জাতীয় পার্টিকে দেয়া হবে। সেটা একটা দেখার বিষয়। গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে মির্জার কাছে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হেরে গেছে। 
তবে নাটকীয়তা এবং নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে হলেও বিএনপি একটি অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। খোদ বিএনপি মহাসচিবই বলছেন, এটা চমক। এটা একটি ইউ টার্ন।
কারণ দুর্বল হয়ে পড়া বিএনপি এবং বিএনপির নির্বাসিত নেতা তারেক রহমান এবং কারাবন্দি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সামনে রেখে বিএনপির পক্ষে এর চেয়ে বেশি ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব ছিল না বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিশ্লেষণ করছেন।
যদিও মির্জার ঘনিষ্ঠসূত্রগুলোর ইঙ্গিত হলো, দুই কারণে এই সিদ্ধান্ত। দলের স্থায়ী কমিটির অস্বস্তি ও বিরক্তি প্রশমিত করা। এবং মহাসচিবের কিছুটা নাজুক স্বাস্থ্য।
তবে পর্যবেক্ষকরা দেখেছেন যে বিএনপির সামনে বিকল্পগুলো অত্যন্ত সীমিত এবং কণ্টকিত। দেখা যাচ্ছিল যে শাসক দল সংসদ ও সরকারকে এতটাই নিরঙ্কুশ করে ফেলেছে যে তাদের পক্ষে তাদেরকে এড়িয়ে আর কিছুই করার উপায় নেই।  বিএনপির পক্ষে বড় কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না সুতরাং বিএনপি এক ঢিলে অনেক পাখি মেরেছে।
প্রথমত বিএনপি সম্পর্কে সরকারি দলের পক্ষে আর বলা সম্ভব হবে না যে বিএনপি নেতিবাচক রাজনীতি করছে। একই কারণে বিফল হবে জেনেও তারা গণভবনে গিয়েছিল।  বিএনপিকে আর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে খোঁচা দেয়া কঠিন হবে। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে জামায়াতে ইসলামের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয় এবং ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো বলেছে, জামায়াত কোনো ভূমিকা রাখেনি। এতে তাদের কোনো অবদান ছিল না।  সুতরাং বিএনপি এই প্রথম ওদেরকে পুরো বাদ দিয়ে একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে বলে দাবি করা যাবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি সংসদে যেতেন তাহলে বাস্তবতা এটাই হতো যে তার সতীর্থ, যারা সংসদে যেতে পারেন নি, যেমন মওদুদ আহমেদ প্রমুখ, তারা কোনো অবস্থাতেই মির্জার সংসদে যাওয়ার ‘কৌশলকে’ মেনে নিতেন না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্য আন্দোলনের কৌশল হিসেবে পার্লামেন্টে যাওয়া, না যাওয়া, বর্জন করা, বয়কট করা, সব উদাহরণ আছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একটি ঘটনা ঘটলো, যেখানে পর্যবেক্ষকরা সবাই স্তম্ভিত হয়েছেন।
অনেকে একটা ঠাণ্ডা মাথায় পাকা রাজনৈতিক চাল হিসেবেই দেখছেন। অনেকে বলছেন,  বিএনপির রাজনৈতিক চালটি এমন একটা সময় এসেছে যখন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি এবং তাকে জামিন দেয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে বিভিন্ন সূত্রে আভাস দেয়া হচ্ছিল যে তিনি যদি প্যারোলে দরখাস্ত করেন, তাহলে সরকার সেটা বিবেচনা করতে পারেন।
বেগম খালেদাকে এমন একটা অবস্থায় ঠেলে দেয়া হয়েছে যখন তার দরকষাকষি করার আর কোনো জায়গা ছিল না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন বিএনপির যেসব সংসদ সদস্য পার্লামেন্টে গিয়েছেন, তারা যদি ভালোভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে তারা একটা বড় চাপ তৈরি করতে পারবেন। কারণ তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারেন। এবং তাদেরকে বিরোধী দলের বেঞ্চে বসাতে হবে এবং  বিরোধীদলের জায়গা থেকেই তারা বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা সামনে আনতে পারবেন। এটা নির্ভর করবে যারা গেছেন, তারা কতটা কি করতে পারেন, বা করতে চান, তার ওপর। তবে প্রশ্ন থাকছে, এই কৌশল না নিলেও তারা নিবৃত্ত হতেন কিনা। তাই এই ইউ টার্ন কৌশল নাকি আত্মসমর্পণ, সেটা সময় বলে দেবে। 
খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তি দেয়ার বিষয়টিতে দলটি কোনোভাবেই সুবিধা করতে পারছিল না। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধানের আওতায় একটা বিশেষ সুবিধা নিতে পারেন।
সেটা বাকস্বাধীনতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে। কারণ পার্লামেন্টে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো বক্তব্য সাধারণভাবে স্বাধীনভাবেই দেয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সংবিধান বলেছে, সংসদের কার্যধারার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। সুতরাং মনে করা হচ্ছে যে বিএনপি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ নিয়েছে বটে কিন্তু সংসদে সরকারি দলের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মুখে দাঁড়িয়ে এই পাঁচ-সাত জন বিশেষ করে, যখন তার মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেই, তারা কি ঝড়ের মুখে খড়কুটো হবে না তো? তবে এও ঠিক যে বিএনপির বর্তমান অবস্থান থেকে এর থেকে ভালো আর কোন বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। যদিও  অনেকেই বিশ্বাস করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে যদি সংসদে যেতে দেয়া হতো, তাহলে তিনি অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারতেন। অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতেন।
এ বিষয়টি কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স, সেটাকে বজায় রাখার জন্য এর দরকার ছিল। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন এই সিদ্ধান্তের ফলে বিএনপির নির্বাসিত নেতা তারেক রহমানই ব্যক্তিগতভাবে সব থেকে বেশি সুবিধায় থাকবেন। কারণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি পার্লামেন্টে যেতেন, তাহলে তার পক্ষে যে ধরনের সংসদীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ হতো, সেখানে তারেক রহমানের শূন্যস্থান ভরাট হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হতো কিনা কে জানে। সেটা এখন আর অতটা থাকবে না। সুতরাং সব দিক বিবেচনায় বিএনপি একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি দল যে ধরনের সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সেটা লক্ষণীয়। তারা তাৎক্ষণিকভাবে বলেছে তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না। সুতরাং এটা দেখার বিষয় যে সামনের বাংলাদেশ রাজনীতি যা এখন ডামাডোলপূর্ণ নয়, আবার স্বস্তিকরও নয়, সেটা কিভাবে এগিয়ে যায়, কিভাবে কি মেরুকরণ ঘটায়।

কাতারে আবার তালেবান-মার্কিন আলোচনা শুরু

আফগানিস্তানের তালেবান ও মার্কিন সরকারের প্রতিনিধিরা কাতারের রাজধানী দোহায় আবার নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন। তবে এবারের আলোচনায়ও আফগান সরকারকে বাদ দেয়া হয়েছে।
তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বুধবার বলেন, কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠেয় ৬ষ্ঠ রাউন্ড আলোচনায় আফগান সরকারকে যোগ দেয়ার অনুমতি দেয়া হয় নি। তিনি বলেন, এ আলোচনায় তালেবান ও মার্কিন সরকার ছাড়া অন্য কোনো পক্ষ থাকতে পারবে না। তবে স্বাগতিক হিসেবে কাতারের কয়েকজন কর্মকর্তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। আফগান সরকারকে অবৈধ সরকার মনে করে তালেবান।
আফগানিস্তানে মার্কিন দূতাবাস এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করে নি। দোহা আলোচনায় আফগান বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খালিলজাদ উপস্থিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আফগানিস্তানের টোলো নিউজ চ্যানেলকে বলেন, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধ অবসানের প্রতিশ্রুতি দিলেই কেবল শান্তি চুক্তি হবে। তিনি জানান, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে তালেবান যোদ্ধারা।

ভেনিজুয়েলায় আবার আমেরিকার অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ

ল্যাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় সেনাবাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সদস্যকে দিয়ে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা আবার ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকার উসকানিতে বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। গত মঙ্গলবার দিনভর গুয়াইদোর সমর্থক, সেনাবাহিনীর দলছুট কিছু সদস্য এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জন আহত হন।
দিনশেষে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো শীর্ষস্থানীয় সেনা কমান্ডারদের পাশে নিয়ে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেন, সেনাবাহিনীকে তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার যে চেষ্টা গুয়াইদো করেছিলেন তা ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে। সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদেরকে ‘গুরুতর অপরাধ’ করার দায়ে অভিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট গুয়াইদো বলেন, এই অপরাধীদের শাস্তি পেতে হবে।  এ ছাড়া, ভেনিজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ অ্যারিয়াজা বলেছেন, সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও সরকার বিরোধীদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রেসিডেন্ট মাদুরো দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৩৫ বছর বয়সি সরকার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো মঙ্গলবার রাজধানী কারাকাসের উপকণ্ঠে ‘লা কারলোতা’ বিমান ঘাঁটিতে কয়েকজন সেনা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ঘোষণা করেন, দেশের সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিনি তার ভাষায় ‘ভেনিজুয়েলাকে মুক্ত করার অভিযান’ শুরু হয়েছে বলেও দাবি করেন। কিন্তু দিনের শেষে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীদের ধরাশায়ী করে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অনুকূলে দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির প্যাদরিনো লোপেজ বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ়তার সঙ্গে দেশের সংবিধান ও বৈধ সরকারকে রক্ষা করেছে।
ভেনিজুয়েলায় অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ব্যর্থতা স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন সরকারকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন হুমকি দিয়ে বলেছেন, ভেনিজুয়েলার ব্যাপারে সব পন্থা অবলম্বনের পথ খোলা রেখেছে ওয়াশিংটন। তিনি দাবি করেছেন, মাদুরো সরকারের প্রতি রাশিয়া ও কিউবা’সহ আরো কিছু দেশের সমর্থনের কারণে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
মার্কিন সরকার এমন সময় ভেনিজুয়েলায় তার ভাষায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় সমর্থন দিচ্ছে এবং দেশটিতে ত্রাণসাহায্য পাঠানোর চেষ্টা করছে যখন মাদুরো সরকার সেদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আমেরিকাকে দায়ী বলে মনে করছে। কারাকাস বলছে, আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ভেনিজুয়েলা সরকার মনে করছে, তেলসমৃদ্ধ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লোভে ওয়াশিংটন সেদেশে সরাসরি হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করেছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভেনিজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় নাজুক অবস্থায় রয়েছে। একদিকে সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি আনুগত্যের শপথ পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং সরকার সমর্থকরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সামনে অবস্থান গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গুয়াইদো আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে নিজ সমর্থকদেরকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।  ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা ক্ষুদ্ধ ও মর্মাহত অবস্থায় ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। শেষ পর্যন্ত ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে নিতে মার্কিন কর্মকর্তারা হয়তো সামরিক হস্তক্ষেপ করতেও দ্বিধা করবে না। কিন্তু সে মার্কিন প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হবে তা নির্ভর করছে ল্যাতিন আমেরিকার দেশটির জনগণ ও সেনাবাহিনী মার্কিন হস্তক্ষেপকে কীভাবে নেবে তার ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের নগ্ন করে শরীর চেক, বিক্ষোভ

তারা সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তাদেরকে নগ্ন করে শরীর চেক করা হয়েছে। দেখা হয়েছে, কার ঋতুচক্র চলছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে পাঞ্জাবের বাথিন্ডার তালওয়ান্ডি সাবোতে অবস্থিত আকাল ইউনিভার্সিটি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আকাল ইউনিভার্সিটি। এর এক ডজন বা তারও বেশি ছাত্রী অবস্থান করেন ক্যাম্পাসের একটি হোস্টেলে। সম্প্রতি সেখানকার টয়লেটে কেউ একজন ফেলে আসেন ব্যবহৃত স্যানেটারি প্যাড।
কে এ কাজ করেছেন তা সনাক্ত করতে ওই হোস্টেলের রক্ষণাবেক্ষণকারীরা ছাত্রীদের নগ্ন করেছেন। চেক করে দেখেছেন কার ঋতুচক্র চলছে।
এ ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর সেখানে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন প্রায় ৬০০-৭০০ শিক্ষার্থী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ দু’জন নারী রক্ষাণাবেক্ষণকারী ও দু’জন নারী নিরাপত্তারক্ষীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে।  প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঘটনাটিকে একটি ছোট ভুল বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। ফলে কোনো আইনগত পদক্ষেপে না গিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই চার কর্মচারীকে বরখাস্ত করে। কর্তৃপক্ষ বিলম্বে এ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে অভিযোগ এনেছেন শিক্ষার্থীরা।
তারা আরো অভিযোগ করেছেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অতিমাত্রায় রক্ষণশীল। এমন কি সেখানে মেয়ে ও ছেলেদের মধ্যে কথা বলাও অনুমোদিত নয় বলে তাদের দাবি। বিক্ষোভে যোগ দেয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, আমরা ওইসব ওয়ার্ডেন ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত বছর নভেম্বরে একই রকম ঘটনা ঘটেছিল একটি স্কুলে। সেখানকার টয়লেটে স্যানিটারি প্যাড পাওয়ার পর শিক্ষিকারা প্রায় ১৫ জন ছাত্রীকে নগ্ন করে চেক করেছিলেন। এ ঘটনা ভারতের একটি গ্রামে ঘটেছিল। সেই একই ঘটনা যেন এবার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলো। আকাল ইউনিভার্সিটিতে দু’জন নারী নিরাপত্তারক্ষী কমপক্ষে ১২ জন ছাত্রীকে নগ্ন করে তাদের শরীর চেক করেন।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যারা ভালো চেয়েছিল তারাই ভোগান্তিতে : শাহদীন মালিক

গত জুলাই মাসে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়, প্রথম আলো বলছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ৬০টি মামলা হয়। কিছু মামলা ভয়ংকর—মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঙ্গাহাঙ্গামা করা, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর আক্রমণ, পুলিশের সরকারি যানবাহনে ভাঙচুর, বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা ইত্যদি।
গুরুতর সব অপরাধের অভিযোগ। আন্দোলনকারী ২২ ছাত্রকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা জামিন পেয়ে যান। এখন মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্ত করার কাজটা পুলিশের। কোন ছাত্র মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঙ্গাহাঙ্গামা করেছিল, কে থানায় আগুন লাগাবার চেষ্টা করেছিল, এবং একইভাবে অন্য অপরাধগুলোর সঙ্গে কে বা কারা কীভাবে জড়িত ছিল, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব পুলিশের। এখন প্রতি মাসে মামলাগুলো তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির জন্য আদালতে আসে; পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয় যে তদন্ত এখনো চলছে এবং পরবর্তী মাসে আরেকটা ‘তারিখ’ পড়ে। অভিযুক্ত ছাত্রদের প্রতি তারিখে আদালতে হাজির হতে হয়; অন্যথায় জামিন বাতিলের আশঙ্কা থাকে। পুলিশ বলছে, ছাত্রদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ তারা খুঁজে পাচ্ছে না কিন্তু তদন্ত চলছে। যত দিন তদন্ত চলবে, মাসে মাসে মামলার তারিখ পড়বে, তত দিন ছাত্রদের আদালতে হাজির থাকতে হবে। তাঁদের জীবন থমকে গেছে এবং আরও কত মাস বা বছর যে থমকে থাকে, তা বলা অসম্ভব।
২. বহুদিন ধরেই বলছি, আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভিন্নমত দমনে ও সমালোচকদের টুঁটি চেপে ধরার প্রধান অস্ত্র এখন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা। প্রায় সব সময় সব দেশেই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাটা রাষ্ট্রের একটা মারাত্মক অস্ত্র। এই অস্ত্রটা রাষ্ট্র প্রায়শই ভালো কাজে ব্যবহার করে। অর্থাৎ, অপরাধীদের নিবৃত্ত রাখতে, কেউ অপরাধ করলে তাকে খুঁজে বের করতে, এবং তদন্ত করে অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে হাজির করে শাস্তি নির্ধারণে সহায়তা করতে অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। মাঝে ২-৪ বার এই ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ হয়ে যায়। নিরপরাধ ব্যক্তিও আটক হয়। সরকারের সমালোচকেরাই নিগ্রহের শিকার হয় কিন্তু এইসব থেকে যায় ব্যতিক্রম হিসেবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে এই ব্যতিক্রমটাই প্রধান রীতি হয়ে গেছে বহু বছর ধরে, যার শুরুর সময়টা, অধমের হিসাবে অক্টোবর ২০০২ থেকে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীরা অন্যের অনিষ্ট করতে চায়নি। তারা চেয়েছিল সমাজের অন্তত একটা দিন যাতে ভালো হয় সেই চেষ্টা করতে। সড়কে যাতে বেঘোরে প্রাণনাশ না হয়, সড়ক যাতে নিরাপদ থাকে, সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে অক্ষত অবস্থায় সন্ধ্যায় বা রাতে ঘরে ফেরা যায়, সেটা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ছাত্রছাত্রীরা। তাদের এই দাবিদাওয়া ও আন্দোলনে কেউ কোনো অপরাধ খুঁজে পায়নি। কিন্তু যা কিছু ভালো, সেটাকে নষ্ট করাই আজকাল আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাজ। তাই যারা সমাজের ভালো চেয়েছিল, এখন তদন্তের নামে তাদের ভোগান্তি চরমে।
৩. রাষ্ট্রের ন্যূনতম কিছু ভালো গুণ থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা—বলা বাহুল্য, সাক্ষ্য প্রমাণ সাপেক্ষে—এই উপসংহারে উপনীত হতেন যে যাঁদের অভিযুক্ত করে মামলার তদন্ত শুরু হয়েছিল, ৮-১০ মাস খোঁজাখুঁজি করে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, এই ২২ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি। অতএব, তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করতে পারেন, যাতে এই ২২ জন ছাত্রকে মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু সে আশাটি হবে আকাশকুসুম। কারণ, সভ্য রাষ্ট্রে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, ন্যায়বিচারের রাষ্ট্রে নাগরিকদের হেনস্তা করা, ভোগান্তি নিশ্চিত করা, হয়রানি করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য ও কাজ না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এখন আর সভ্য, গণতান্ত্রিক, বিচার আর ন্যায়বিচারের দেশ না। অতএব, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের এই ২২ জন অভিযুক্ত তরুণ ছাত্র আরও বহুদিন রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে থাকবেন। কারণ, অত্যাচার করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী