Thursday, February 4, 2016

ক্যামেরনের চাওয়া কতটা পূরণ হলো?

ডেভিড ক্যামেরন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বহুল আলোচিত খসড়া চুক্তি প্রকাশিত হলো গত মঙ্গলবার। কিন্তু এই চুক্তি থেকে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কী পেলেন, এখন সেটাই প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন গত নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দেন, ২০১৭ সালের মধ্যেই তিনি ইইউতে যুক্তরাজ্যের থাকা না-থাকা নিয়ে গণভোট দেবেন। তার আগে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণে চুক্তি নবায়নের চেষ্টা করবেন। তা সফল হলে তিনি ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালাবেন। তাঁর দাবির মুখে ইইউ গত মঙ্গলবার একটি চুক্তির খসড়া প্রকাশ করে।
যুক্তরাজ্যের হরেক রকম দাবি থেকে সরে ক্যামেরন শেষ পর্যন্ত চারটি দাবি নিয়ে তুলেছিলেন। প্রথম দাবিটি ছিল, যুক্তরাজ্যে আসা ইইউভুক্ত দেশের নাগরিকদের আবাসন ও বেকার ভাতার মতো (ইন ওয়ার্ক বেনিফিট) রাষ্ট্রীয় কল্যাণসুবিধা দেওয়া চার বছর বন্ধ রাখতে যুক্তরাজ্যকে ক্ষমতা দেওয়া। এর বিপরীতে ইইউ বলেছে, ওই ব্যয়ের ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ছে মনে হলে ইইউ নাগরিকদের কল্যাণসুবিধায় ‘জরুরি বিরতি’ আনা যাবে। কিন্তু এ সুবিধা ইইউভুক্ত সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকবে ইইউর হাতে।
ক্যামেরনের দ্বিতীয় দাবি ছিল, ইইউর আরোপিত আইন গ্রহণ না করার স্বাধীনতা দেওয়া। এর জবাবে ইইউ একটি ‘রেড কার্ড’ প্রথা চালু করবে। এর আওতায় ইইউর ৫৫ শতাংশ সদস্যরাষ্ট্র যদি মনে করে, সংশ্লিষ্ট আইনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া উচিত, তাহলে বিষয়টি আরও ব্যাপক আলোচনার জন্য ইইউ কাউন্সিলে যাবে। ফলে এখানেও সুস্পষ্ট প্রাপ্তি ক্যামেরনের নেই।
ক্যামেরনের তৃতীয় চাওয়া ছিল, ইউরোকে একমাত্র মুদ্রা হিসেবে মনে না করে, অর্থনৈতিক জোটের বাইরের দেশগুলোর (যারা ইউরো ব্যবহার করে না) মুদ্রাকেও স্বীকৃতি দেওয়া। পাশাপাশি ইইউভুক্ত কোনো দেশ দেউলিয়া হলে তাদের উদ্ধারে (বেইল আউট) অর্থ ঢালা থেকে যুক্তরাজ্যকে মুক্তি দেওয়া। মুদ্রার বিষয়ে ইতিবাচক থাকলেও ইইউ যুক্তরাজ্যকে বেইলআউটের দায় থেকে ছাড় দেয়নি।

খালেদার সঙ্গে স্পেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত এডুয়ার্ডো ডি লেইগ্লেসিয়া ওয়াই ডেল রোসাল। রাত সাড়ে ৮টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

সু চির গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা by মাসুমুর রহমান খলিলী

মিয়ানমারে বহুলপ্রতিক্ষীত গণতান্ত্রিক সরকারের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে। নবনির্বাচিত সংসদের নিম্ন কক্ষের প্রথম অধিবেশন ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে। এই সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নিজ দল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) নেতৃত্ব দিচ্ছেন অং সান সু চি। সাংবিধানিক বাধা থাকায় সু চি সরকারের নির্বাহী প্রধান প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তবে সংসদের উচ্চ ও নিম্ন এই উভয় কক্ষে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তিনি অর্জন করেছেন, তাতে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টসহ সব পদে তার মনোনীত ব্যক্তিই জয়ী হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে দুই সংসদেরই স্পিকার মনোনীত করেছেন তিনি।
এর মধ্যে মিয়ানমারে প্রেসিডেন্ট কে হতে যাচ্ছেন তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। এনএলডির একজন সিনিয়র নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু নারী নেত্রী টিন মার অং অথবা অশীতিপর সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল অব: উ থিন ওকে প্রেসিডেন্ট পদে সু চি মনোনয়ন দিতে পারেন বলে খবর বেরিয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেনারেল থান শোয়ের মেয়াদ আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত। ফলে ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন হতে পারে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
একসময় ধারণা করা হয়েছিল, অং সান সু চি প্রেসিডেন্ট পদে এমন এক জেনারেলকে বসাবেন, যার ব্যাপারে সেনাবাহিনী এবং বিদায়ী ক্ষমতাসীন দলও একমত হবে। কিন্তু নির্বাচনে এনএলডি যে ধরনের আশাতীত সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, তাতে সে ধরনের কোনো সমঝোতার প্রত্যাশা আর করা হচ্ছে না। তবে অং সান সু চি ’৯০-এর পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কামনা করছেন না বলে প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছেন সতর্কভাবে।
এর মধ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান সেনাবাহিনী ও প্রেসিডেন্টের সাথে তিনি বৈঠক করেছেন। সংবিধান সংশোধনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার থাকলেও সে পথে দ্রুত তিনি এগোতে চাচ্ছেন না। রাষ্ট্র পরিচালনা ও পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছেন না, যাতে সেনাবাহিনী আবার ক্ষমতা দখলের মতো পদক্ষেপ নিয়ে বসে। প্রেসিডেন্ট থান শোয়ে অবশ্য সিনহুয়ার সাথে সাক্ষাৎকারে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেছেন।
মিয়ানমারের সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্ট হলেন নির্বাহী প্রধান। দু’জন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকেন তাকে সহায়তা করতে। মন্ত্রি পরিষদ প্রেসিডেন্ট গঠন করেন, কিন্তু এই মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন পেতে হয় সংসদে। ফলে ধারণা করা যায়, প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট সু চি তার দল থেকেই নির্বাচন করবেন। অন্য একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট পছন্দ করার বিষয় তিনি সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে দিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর মতো একটি পদ সৃষ্টির বিষয় একসময় বিবেচনা করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী এতে সম্মত হলে একটি সংশোধনী করে সু চিকে সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত করার একটি সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা যদি নাও হয় তবুও যত দিন বর্তমান সংসদ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকবে তত দিন রাষ্ট্র পরিচালনায় সু চির ভূমিকা থাকবে মুখ্য। ইতোমধ্যে তার অবস্থান রাষ্ট্রের সবার ওপরে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন সু চি নিজে।
জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণসহ সংবিধানে যে ক’টি মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে দেয়া হয়েছে, তাতে কোনো ব্যত্যয় সু চি সম্ভবত করবেন না। তবে বছর দুয়েক সরকার পরিচালনা করতে পারলে অনেক কিছুই এনএলডি এবং সু চির নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে। তখন তিনি বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্ব আরো সংহত করার চেষ্টা করতে পারেন।
এ কথা ঠিক যে, সু চির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর যথাসম্ভব তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদারীকরণের চলমান সংস্কার কর্মসূচিকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নেয়া। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে তাকে ভারসাম্যপূর্ণ সতর্ক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে। তিনি পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের জন্য তার দেশের দ্বার উন্মুক্ত করতে পারবেন। তবে শক্তিমান প্রতিবেশী চীনকে তিনি উপেক্ষা করতে পারবেন না। নির্বাচনের আগেই সপ্তাহব্যাপী চীন সফরে গিয়ে বেইজিংকে এ ব্যাপারে সু চি আশ্বস্ত করেছেন।
সু চির পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মিয়ানমারের কাঠামো শক্তিমান করার ব্যাপারে জোর দেবে বেশি। ইতোমধ্যে সময় নিয়ে দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কারের যে কর্মসূচি কার্যকর করা শুরু হয়েছে, তার সাথে মিয়ানমারের সামরিক-বেসামরিক আমলা ও শক্তিমান ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর বাস্তবতা সু চি অস্বীকার করবেন না। সংসদের উভয় কক্ষে তাদের ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকায় যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের ব্যাপারে তাদের সাথে সমঝোতায় আসতে হবে। এ জন্য ৮৯ বছর বয়স হওয়ার পরও জেনারেল উ থিন ওকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি সাবেক স্পিকার শোয়ে মানকেও প্রেসিডেন্ট করা হতে পারে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, যিনি বিদায়ী সরকারি দল ইউএসডিপি থেকে এক প্রকার ছিটকে পড়েছিলেন নির্বাচনের আগমুহূর্তে।
মিয়ানমারে যিনিই প্রেসিডেন্ট হোন না কেন, তিনি পূর্ণ মেয়াদে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপ্রধান সম্ভবত থাকবেন না। সু চি সংবিধান থেকে তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে বাধা ৫৯(এক) অনুচ্ছেদটি বাদ দেয়ার জন্য এক বা দুই বছর সময় নিতে পারেন। এ সময় পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন নবনির্বাচিত ব্যক্তি। এ হিসেবে একজন সাবেক জেনারেলই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও রাষ্ট্র চালানোর মূল চাবিটি থাকবে সু চির হাতে।
mrkmmb@gmail.com

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে ‘অবৈধভাবে আটক করেছে’ বৃটেন: জাতিসংঘ প্যানেল

মার্কিন গোপন তথ্য ফাঁস করে সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে ‘অবৈধভাবে আটক করেছে’ বৃটেন। জাতিসংঘের একটি প্যানেল এ রায় দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি অনলাইন। খবরে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে যৌন নির্যাতনের মামলায় সুইডেনে প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে লন্ডনে ইকুয়েডোরিয়ান দূতাবাসে আশ্রয় গ্রহণ করেন অ্যাসাঞ্জ। তবে অ্যাসাঞ্জ ওই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
রায়ের পূর্বে এক বিবৃতিতে অ্যাসাঞ্জ বলেন, জাতিসংঘ প্যানেল যদি তার বিরুদ্ধে রায় দেয়, তবে লন্ডন পুলিশের কাছে নিজেকে সমর্পন করবেন তিনি। তবে রায় তার পক্ষে গেলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে তিনি বৃটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর রয়েছে। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের কাছে এক অভিযোগে তিনি বলেন, তাকে ‘অনির্দিষ্টভাবে আটক’ রাখা হয়েছে। কেননা, তিনি গ্রেপ্তার হওয়া ব্যতিত দূতাবাস ত্যাগ করতে পারছিলেন না। অবশেষে জাতিসংঘের আদালত তার পক্ষে রায় দিয়েছে।
রায়ের বিষয়ে সুইডেন, বৃটেন কিংবা জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে কোন বিবৃতি আসেনি। যদিও গত বছরের ডিসেম্বরেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আর্বিট্রেরি ডিটেনশন। সিদ্ধান্তের কথা সুইডেন ও বৃটেনকে জানিয়েও দেয়া হয়।

ট্রাফিক পুলিশ বেশে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ৪০ লাখ টাকা ছিনতাই

গাজীপুরের টঙ্গীতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে একটি পোশাক কারখানার ৪০ লাখ টাকা ছিনতাই হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে টঙ্গীর মিলগেট এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে। এ সময় তিনজন আহত হন। পুলিশ জানায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের খালকৈর এলাকার ওয়েসিস সোয়েটার কারখানার কর্মকর্তারা আইএফআইসি ব্যাংকের উত্তরা শাখা থেকে শ্রমিকদের বেতনের টাকা উত্তোলন করে একটি মাইক্রোবাসে (ঢাকা মেট্রো-চ-১৬-১৬৭৫) কারখানায় ফিরছিলেন। মাইক্রোবাসটিতে কারখানার ৫ জন কর্মকর্তা ছিলেন। তারা বেলা দেড়টায় টঙ্গী মিলগেট এলাকায় পৌঁছলে ট্রাফিক পুলিশের বেশে একটি মোটরসাইকেল তাদের গাড়ির গতিরোধ করে। এসময় আরো ৩টি মোটরসাইকেল তাদেরকে ঘিরে ধরে। ছিনতাইকারীরা গুলি করে এবং গাড়িতে হামলা চালিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে ত্রুত পালিয়ে যায়। ছিনতাইকারীদের হামলায় গাড়ীর কাঁচের আঘাতে চালক শহীদুল হক, কারখানার হিসাব রক্ষক পারভেজ ও আজাদ আহত হয়। তাদেরকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

‘কিছু পুলিশ সদস্য পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে’

বর্তমানে দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে, দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে। ঠিক সেই মুহুর্তে কিছু পুলিশ সদস্য পরিস্থিতিটাকে ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এই পুলিশ সদস্য কারা। এদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানতে চেয়েছেন জাতীয় পার্টির সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি পীর ফজলুর রহমান। আজ সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করেন। পীর ফজলুর রহমান বলেন, কিছু পুলিশ সদস্যের কারণে, পুরো পুলিশ বাহিনীর ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। এরা দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিঘœ করার চেষ্টা করছে। এদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে, কি ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে। ঠিক সেই মুহুর্তে কিছু পলিশ সদস্য তাদের কর্মকান্ডের কারণে সমগ্র পুলিশ বাহিনীর ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। বুধবার রাজধানীর মিরপুরে একটি চায়ের দোকানে চাঁদা না পেয়ে চা দোকানী বাবুল মাতুব্বারের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি রোববার আদাবরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে হেনস্থা করলো আদাবর থানার এক এসআই, এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা রাব্বী এবং সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তার নির্যাতন করা হলো। যেসব পুলিশ সদস্য এধরনের অপরাধের সঙ্গে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পুলিশ এখন নিজেই সন্ত্রাস করছে

পুলিশ এখন নিজেই সন্ত্রাস করছে বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। মিরপুরে চাঁদা না পেয়ে কেরোসিনের আগুনে চা বিক্রেতাকে হত্যায় ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে দেয়া এক বিবৃতিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন,  দেশবাসী আওয়ামী লীগের দুঃশাসকদের নির্মম, পৈশাচিক ও দুর্ধর্ষ সব সন্ত্রাসী তা-ব দেখে আতঙ্কিত। পুলিশ এখন নিজেই সন্ত্রাসী কর্মকা- করছে।
তা আরেকবার প্রমাণিত হলো- চা বিক্রেতা বাবুল মাতব্বরের কাছে থেকে চাঁদা না পেয়ে নির্দয়ভাবে কেরোসিনের চুলার আগুন দিয়ে তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে। মির্জা আলমগীর বলেন, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন পুলিশের কর্তব্য হলেও তা অনুরসরণ করাকে তারা ঘৃণা করছে। দুষ্টকে দমন না করে বরং পুলিশই এখন চাঁদাবাজির মতো কর্মকা-ে লিপ্ত হয়ে দুষ্টদের উৎসাহিত করছে। গরিব মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের মতো অমানবিক ও নির্দয় কর্মকা- দেখে দেশবাসী এখন হতবাক ও বিস্মিত। গরিব মানুষদের কাছ থেকে পুলিশের চাঁদা আদায়, জুলুমবাজি ও পৈশাচিক কর্মকা- দেশকে চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে গরিব চা বিক্রেতা বাবুল মাতব্বরের হত্যাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

জিকা ভাইরাস ঠেকাতে বিমানবন্দরসহ প্রবেশ পথে কড়াকড়ির নির্দেশ

জিকা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক আবুল খায়ের মো. শামসুজ্জামান। কুর্মিটোলা হাসপাতালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উদ্যোগে আয়োজিত জিকা ভাইরাস সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, বৈঠকে জিকা ভাইরাসের প্রতিরোধ, সংক্রামক রোধ বিষয়ে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেছেন। জিকা ভাইরাস যুক্ত দেশের কোন রোগীকে বাংলাদেশের প্রবেশের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে কড়াকড়ি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া দেশে কোনো রোগীকে সন্দেহ হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষারও নির্দেশ দেয়া হয়। মশা নিধনে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি আরও বলেন, এটা মারাত্মক অসুখ তৈরি করে না। সাধারণ সর্দি-কাশির মতো জ্বর হয়। দুই থেকে পাঁচদিনে ভালো হয়ে যায়। জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সতর্কতা জারির পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল এই বৈঠক করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচাল অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হকের সভাপতিত্বে বিশেষজ্ঞরা এতে মতামত তুলে ধরেন।
গত সোমবার বিশ্বব্যাপী সতর্কতা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোয় জিকা ভাইরাসের সংক্রমণের শুরু হয়েছে এবং তা ছড়াচ্ছে দ্রুতগতিতে। সংক্রমণটির মোকাবিলায় গোটা বিশ্বকে এক হতে হবে। গত বছর ইবোলার সংক্রমণ ঠেকাতে ডব্লিউএইচও যে সতর্কতা জারি করেছিল, এবার সেই একই মাত্রার সতর্কতা জারি করেছে। এর মানে হলো, সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় খুঁজতে গবেষণার গতি বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। অবশ্য বাংলাদেশে এ মুহূর্তে জিকা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের এখানে ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। হলে একধরনের প্রস্তুতি, না হলে আরেক ধরনের প্রস্তুতি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এখন পর্যন্ত জিকার সংক্রমণ প্রতিরোধী কোনো টিকা বা ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। মশা থেকে দূরে থাকা ছাড়া এখন পর্যন্ত নিরাপদ আর কোনো পন্থা নেই মানুষের হাতে। বিশ্বের  ২৩টি দেশে এখন পর্যন্ত জিকার সংক্রমণ ঘটেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ডেঙ্গুর মতো লক্ষণ দেখা দেয়। দিনের বেলায় এডিস ইজিপ্ট মশার কামড়ে এ রোগ ছড়ায়। ডেঙ্গুর মতো এ রোগটি তীব্র ও প্রাণঘাতী নয়। চিকিৎসা না করালেও জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে রোগটি গর্ভস্থ শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

শিশু শান্তকে ফিরিয়ে দিতে চান মা! by কাজী আনিছ

মায়ের কোলে রবিউলl ফাইল ছবি
ধরে নিয়ে কেটে ফেলা হয়েছিল নয় বছরের শিশু রবিউল ইসলাম শান্তর দুই হাত। দেশে চিকিৎসা শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা রুকসানা কামার তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। তার দুই হাতে সংযোজন করা হয় কৃত্রিম হাত। ওই কর্মকর্তা দেশে ফিরে তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু কিছুদিন পর পরিবার তাকে নিয়ে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করাতে থাকে। এ নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর আদালত শিশুটির ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। এখন শান্তর মা সেই কর্মকর্তার কাছে শান্তকে ফিরিয়ে দিতে চান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই কর্মকর্তা রুকসানা কামার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ৩১ জানুয়ারি রাতে ফোন করে নাসিমা বেগম তাঁর ছেলে শান্তকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শান্তর মা চান, তাঁর ছেলে আবার লেখাপড়া শুরু করুক।’
যোগাযোগ করা হলে নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমি বাসা বাড়িতে কাজ কইরা খাই। আমার তিন ছেলে এক মেয়ে। শান্তর লেখাপড়া হইতেছে না। তাই তার লেখাপড়ার জন্য ওনার (রুকসানা কামার) কাছে শান্তকে দিমু কইছি।’
পরিবারের সঙ্গে গুলশানের কড়াইল বস্তিতে থাকত শান্ত। ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সে নিখোঁজ হয়। কয়েক দিন পর দুই হাত কাটা অবস্থায় কে বা কারা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পালিয়ে যায়। নাসিমা বেগমের অভিযোগ, শান্তর সৎ বাবা মো. জাহাঙ্গীর এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তখন পুলিশেরও ধারণা ছিল, ভিক্ষাবৃত্তি করানোর উদ্দেশ্যে বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে জাহাঙ্গীর এমন নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় বনানী থানায় একটি মামলা করেন নাসিমা। পুলিশ জাহাঙ্গীরসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এ নিয়ে ২০১৩ সালের ২২ মার্চ ‘এ কেমন নির্মমতা’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়৷
দেশে কিছুদিন চিকিৎসার পর বেশ কয়েকজনের সহায়তায় কর্মকর্তা রুকসানা রবিউলকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে রবিউলের শরীরে কৃত্রিম দুটি হাত সংযোজন করা হয়। দেশে ফিরে ফরিদপুরের সদরের বাখুন্ডায় রুকসানার নিজ গ্রামে একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে রবিউলকে ভর্তি করা হয়। ২০১৪ সালের ৩০ মে প্রথম আলোয় এ নিয়ে ‘আমি এখন লিখতে পারি’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। লেখাপড়ার একপর্যায়ে পরিবার শান্তকে নিয়ে যায়। তাকে দিয়ে পরিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি করাতে থাকে। এ নিয়ে গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণে ‘শিশু রবিউলের এ পরিণতি!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরদিন ‘শিশু রবিউলকে দিয়ে ভিক্ষা করাচ্ছে পরিবার’ শিরোনামে প্রথম আলোর প্রিন্ট সংস্করণে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং আদালতে শান্তর পরিবারকে হাজির করার নির্দেশ দেন। পরে আদালত শান্তকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি না করানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করেন। এরপর থেকে শান্তকে দিয়ে ভিক্ষা করানো বন্ধ রাখে পরিবার।
ফরিদপুরের বাখুন্ডা গ্রামের ‘শরীফ আবদুল মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল শান্ত। জানতে চাইলে ওই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিতারা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘রুকসানা কামার শিশু শান্তকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও আমরা শান্তর লেখাপড়ার বিশেষ যত্ন নিয়েছিলাম। পড়ার দক্ষতাও আস্তে আস্তে বাড়ছিল। কৃত্রিম হাতে সে লেখাও রপ্ত করেছিল। পরীক্ষায়ও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম, পরিবার তাকে নিয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি চাই, শান্ত লেখাপড়ার অন্তত সুযোগটা পাক।
শান্তকে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ বিষয়ে জানতে চাইলে মা নাসিমা কিছুক্ষণ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আবার কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে কথা বলতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এইখানে থাইক্কা শান্তর লেখাপড়া নষ্ট হইয়া গেছে। আমি চাই সে লেখাপড়া করে মাইনষের মতো মানুষ হোক। তয় আমি দশজনরে সাক্ষী রাইখা ছেলেরে দিতে চাই।’
জানতে চাইলে রুকসানা কামার বলেন, ‘আমি শান্তর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিতে এখনো রাজি। তবে তার মাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি আদালতের মাধ্যমেই তাকে নিতে চাই। শান্ত অনেক মেধাবী। তার জীবনটা নষ্ট হোক তা চাই না। আমি তাকে সুশিক্ষিত করতে চাই। দীর্ঘদিন আমার কাছে থাকার কারণে তার প্রতি আমার বড্ড মায়াও পড়ে গেছে।’

চা-দোকানি বাবুলের মৃত্যু, চার পুলিশ প্রত্যাহার

বুধবার রাতে মিরপুরে চাঁদা না পেয়ে পুলিশের
ছোড়া তেলের চুলার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে
চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান
চা-দোকানি বাবুল মাতুব্বর। বাবুলের মৃত্যুতে
স্বজনের আহাজারি। ছবি: ফোকাস বাংলা
চা-দোকানি বাবুল মাতুব্বরের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর শাহ আলী থানার চার পুলিশ সদস্যকে আজ বৃহস্পতিবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন উপপরিদর্শক (এসআই), একজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এবং একজন কনস্টেবল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার জানান, এসআই মমিনুর রহমান খান, নিয়াজউদ্দিন মোল্লা, এএসআই দেবেন্দ্রনাথ ও কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আজ বেলা সোয়া একটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে বাবুল মারা যান। হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল কালাম প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল বুধবার রাতে রাজধানীর মিরপুরে চাঁদা না পেয়ে পুলিশের ছোড়া তেলের চুলার বিস্ফোরণে চা-দোকানি বাবুল মাতুব্বর দগ্ধ হন বলে অভিযোগ ওঠে। দগ্ধ বাবুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাঁর শরীরের ৯৫ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল।
এর আগে গত রোববার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে আদাবর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রতন কুমারের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে করা মামলার বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে দুই এসআইয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র দাসকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে।

পাকিস্তানের সঙ্গে তিক্ততা বাড়ছেই by রাহীদ এজাজ

ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম।
গতকাল তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তিক্ততা বাড়ছে। গত নভেম্বরে সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসিকে ঘিরে পাকিস্তান অযাচিতভাবে নাক গলানোয় দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত করে তোলে। আর গত সোমবার দুই দেশের হাইকমিশনের কর্মীদের আটক করার ঘটনায় তা আরও প্রকট হয়েছে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আপাতত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করার কথা বললেও ইসলামাবাদে সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া এখনো নিশ্চিত নয়। এমনকি ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল মঙ্গলবার সংসদে এও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ‘জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূল্যায়ন করি এবং পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য হবে। ভবিষ্যৎই বলে দেবে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে।’
সরকারের জ্যেষ্ঠ এক নীতিনির্ধারক গতকাল সকালে প্রথম আলোকে বলেন, সরকার এখনই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে না চাইলেও সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান যা করছে, তাতে সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হচ্ছে। এমনটা চলতে থাকলে সম্পর্ক কোন পথে যাবে, সেটা বলা মুশকিল।
২০০৯-এ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর সঙ্গে জাল মুদ্রা পাচার ও জঙ্গি অর্থায়নে পাকিস্তানের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর সম্পর্কে দূরত্ব আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায় কার্যকরের পর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দেওয়া সে দেশের রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সম্পর্ককে আরও খারাপ করেছে। এর জেরে দুই দেশের কূটনীতিক প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে যোগ দিতে পারেননি পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার ও জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী।
সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর গত ২২ নভেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এর প্রতিবাদে ২৩ নভেম্বর সুজা আলমকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। এর পাল্টা হিসেবে ৩০ নভেম্বর ইসলামাবাদে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমি রহমানকে তলব করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আবার জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর ইসলামাবাদে ফেরত নেওয়া হয় ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক) ফারিনা আরশাদকে। এর পাল্টা হিসেবে পাকিস্তান গত ৫ জানুয়ারি ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর মৌসুমি রহমানকে ফিরিয়ে নিতে বলে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৬ জানুয়ারি মৌসুমি রহমানকে পর্তুগালে বদলি করে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সমশের মবিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন সেটা থামছেই না, বরং পাল্টাপাল্টি পর্যায়ে চলে গেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর একাত্তরের নৃশংস ঘটনা অস্বীকার থেকে সম্পর্কের যে টানাপোড়েনের শুরু, তা রীতিমতো সাংঘর্ষিক পর্যায়ে চলে গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে সে দেশের রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে তাদের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। কাজেই সম্পর্কোন্নয়নের জন্য পাকিস্তানকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে পাল্টাপাল্টি চলতেই থাকবে।
তলব করে যা বলা হলো: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম তাঁর দপ্তরে সুজা আলমকে তলব করে ঢাকায় আবরার আহমেদ খানের সন্দেহজনক গতিবিধি এবং ইসলামাবাদে জাহাঙ্গীর হোসেনের নিখোঁজের ঘটনায় বাংলাদেশের অসন্তোষ জানান। সম্প্রতি গুলশানের-২-এ একটি বিশেষ এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে গত সোমবার গোয়েন্দারা পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রেস বিভাগের কর্মী আবরারকে আটক করেন। এ সময় তাঁর কাছে পরিচয়পত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। কূটনৈতিক মিশনের কর্মী হয়েও মোটরসাইকেলে কূটনৈতিক নম্বরপ্লেট কেন নেই, তারও কোনো সদুত্তর গোয়েন্দাদের দিতে পারেননি তিনি। পরে সন্ধ্যায় পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব জামিল আক্তার খানের জিম্মায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, আবরার আহমেদ গোয়েন্দাদের হাতে আটক থাকা অবস্থায় গত সোমবার দুপুরে তাঁকে ছাড়ানোর জন্য ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিবের কাছে অনুরোধ করেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম। এ সময় ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব তাঁকে ইতিবাচক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আবরারকে ছেড়ে দেওয়ার পর ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিটি নিয়ে গতকাল প্রশ্ন তোলেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব। ওই বিজ্ঞপ্তিতে কিসের ভিত্তিতে তাঁকে আটকের ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি টাকার ঘুষ ও ক্রসফায়ারের অভিযোগ তুলছে? অন্যদিকে, আবরারকে ঢাকায় ছেড়ে দেওয়ার পর ইসলামাবাদে সাদাপোশাকের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস শাখার কর্মী জাহাঙ্গীর হোসেনকে আটক করেন। এ সময় জাহাঙ্গীর নিজেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস কাউন্সেলরের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার পরিচয় দেওয়ার পরও তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জানান, আফগানিস্তান দূতাবাসের এক কর্মী জাহাঙ্গীরের কাছে থাকা ওই পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন। তাই এটি যাচাই করার জন্য তাঁকে তাঁদের সঙ্গে যেতে হবে। এটা বলে তিন-চারজন লোক তাঁকে গাড়িতে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান। কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এসব বিষয় যে সম্পর্কের জন্য সহায়ক হচ্ছে না, সেটি গতকাল সুজা আলমকে বেশ জোরালোভাবে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে দেখা করার পর পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসলামাবাদে গতকালের ঘটনা সম্পর্কে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। সেখানে কী ঘটেছে আমরা খুঁজে বের করব। তবে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক কালে দুই দেশের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছে, তা অব্যাহত থাকলে সম্পর্কের জন্য ভালো হবে না। কাজেই পাকিস্তানকে সম্পর্কের স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। দুই দেশ সম্পর্কের স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করবে, এটাই কাম্য।
যেসব বৈঠকে পাকিস্তান আসেনি: দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার স্পিকারদের সম্মেলন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক এবং স্যানিটেশন বিষয়ক দক্ষিণ এশিয়ার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক মন্ত্রী জাহিদ হামিদ যোগ দেননি। অবশ্য ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যথাসময়ে ভিসা না পাওয়ায় গত রোববার ঢাকায় শেষ হওয়া স্পিকার সম্মেলনে যোগ দিতে পারেননি সরদার আইয়াজ সাদিক।
ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারত মহাসাগরীয় নেভাল সিম্পোজিয়ামে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ জাকাউল্লাহর যোগদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। শেষ মুহূর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে তিনি সিম্পোজিয়ামে যোগ দেন।

বুধ গ্রহে মহাকাশযান অভিযান by আশরাফুল আলম পিনটু

বুধ গ্রহ নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের আগ্রহের শেষ নেই। সূর্যের সবচেয়ে কাছের এ গ্রহটির অনেক চমকপ্রদ তথ্য জানতে পেরেছেন গবেষকরা। চেষ্টা চলছে আরও নতুন কিছু আবিষ্কারের। বুধ গ্রহে বিজ্ঞানীদের মহাকাশযান অভিযান ও আবিষ্কার সম্পর্কে ইন্টারনেট অবলম্বনে লিখেছেন-
পাথুরে গ্রহগুলোর মধ্যে মার্কারি বা বুধ একটি অন্যতম গ্রহ। এ গ্রহটি সূর্যের সবচেয়ে কাছের। এ ধরনের গ্রহগুলোর বিবর্তন বুঝতে সম্প্রতি বুধের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এ ব্যাপারে তাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এ জন্যে একের পর এক মহাকাশযান পাঠানো হচ্ছে। এসব মহাকাশ যান আবিষ্কার করে চলেছে চমকপ্রদ সব তথ্য। শুধু বুধগ্রহেই এক ধরনের গহ্বর বা গর্ত দেখা গেছে, যেগুলোকে গবেষকরা ‘হলোস’ বলেন। পৃথিবীর ভূমিতে রাসায়নিক পদার্থ সরে গেলে এবং বাষ্পে পরিণত হলে এমন গর্ত সৃষ্টি হয়। বুধগ্রহেও এমন বিশেষত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এ তথ্য তারা পেয়েছেন মার্কিন মহাকাশযান মেসেঞ্জারের কাছ থেকে। এ মহাকাশযানটি ২০০৮ সালে বুধগ্রহে পৌঁছে। পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের তিন গুণ কাছে রয়েছে এ গ্রহ। মহাকাশযান মেসেঞ্জার পৌঁছার আগ পর্যন্ত বুধগ্রহের অর্ধেকেরও বেশি অংশ মানুষের কাছে অজানাই ছিল।সূর্যের সবচেয়ে কাছের এ গ্রহটিকে কয়েক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছে মহাকাশযান মেসেঞ্জার। এ পর্যবেক্ষণে মেসেঞ্জার সাতটি যন্ত্র ব্যবহার করেছে। গ্রহের বিকিরণ পরিমাপ করা হয়েছে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে। উচ্চমানের ছবি তোলা হয়েছে খুব কাছ থেকে। মেসেঞ্জারের উন্নত ক্যামেরার মাধ্যমে বুধগ্রহের ধরন ও কাঠামো সম্পর্কে জানা গেছে। জানা গেছে এ গ্রহের মাটিতে ধাতু ও বায়ুমণ্ডলে গ্যাসের অনুপাত। বিজ্ঞানীরা বুধ গ্রহের পাতলা বায়ুমণ্ডলের নাম দিয়েছেন ‘এক্সোস্ফিয়ার’। বর্তমানে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা মূলত যা জানতে চান তা হল কিভাবে বুধ গ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল আর কেমন করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল গ্রহটির পরিবেশ?
গবেষকরা জানাচ্ছেন, সত্যি এক অভিনব গ্রহ বুধ। পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের তিন গুণ কাছে এটির অবস্থান বলে পৃথিবীর তুলনায় দশ গুণ বেশি সূর্যের আলো পড়ে এ গ্রহের উপর। সূর্যের দিকের অংশের তাপমাত্রা প্রায় ৪৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। ছায়াময় ঠাণ্ডা অংশের তাপমাত্রা ১৭০ ডিগ্রি। মজার ব্যাপার হল, বুধগ্রহের একটি দিনের ব্যাপ্তী পৃথিবীর ১৭৬ দিনের সমান। তবে সূর্যের কাছে থাকায় বুধগ্রহের এক বছর পৃথিবীর তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এর আয়তনও পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম। চাঁদের তুলনায় সামান্য বড়। গবেষকরা টুকরো টুকরো ছবি সাজিয়ে ভৌগোলিক মানচিত্র গড়ে তুলেছেন। মেসেঞ্জার থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধ গ্রহের এ পাথরের মানচিত্র সৃষ্টি হয়েছে। এ মানচিত্র দেখে গবেষকরা জানতে পারছেন, কিভাবে এমন পাথুরে গ্রহগুলো তাদের বর্তমান রূপ পেয়েছে। তারা এক ঝলকেই চিনতে পারছেন সেই গ্রহের ধাতুগুলো। গবেষকরা বলছেন, ‘বুধের যে পরিবর্তন তা পৃথিবীর বিবর্তন দিয়ে আর বোঝা সম্ভব নয়। কারণ পৃথিবীতে যে পরিবেশ রয়েছে, গাছপালা, বাতাস ও পানি রয়েছে সেগুলোর অনেক ক্ষয় হয়েছে। পৃথিবীর শুরুতে যা ছিল তার পরিবর্তন ঘটেছে বার বার। বুধ গ্রহে সেটা ঘটেনি। সেখানে মৌলিক পদার্থ সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেছে, তা থেকেই পাথুরে গ্রহগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এমন ধারণা মিললেও গবেষকরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছেন, অন্যান্য পাথুরে গ্রহের সঙ্গে বুধ গ্রহের পার্থক্য রয়েছে। গন্ধক ও ক্লোরিনের মতো অনেক তরল পদার্থ রয়েছে এ গ্রহে। এসব কারণে এতদিন গবেষকদের মনে প্রশ্ন ছিল, বুধ গ্রহে আগ্নেয়গিরি আছে কিনা। এবার তার উত্তর পেয়েছেন তারা। মহাকাশযান মেসেঞ্জার শুধু আগ্নেয়গিরির অস্তিত্বই নয়, এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও দিয়েছে। বুধের মসৃণ উপত্যকা সূর্যের গরম ও লাভার প্রবাহের কারণে তৈরি হয়েছে। মহাকাশযান মেসেঞ্জার আরেকটি চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছে বুধ গ্রহের উত্তর মেরুতে। ২০১২ সালে ছায়াময় ঠাণ্ডা অংশের আড়ালে বরফ খুঁজে পেয়েছে। এ বরফ ছায়াচ্ছন্ন আড়ালে থাকা গর্তের ভেতরে ছিল।
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন ২০১৬ সালে বুধ গ্রহ সোলার ডিস্কের উপর দিয়ে যাবে। শতাব্দীতে এমনটা ঘটনা ঘটে তের থেকে চৌদ্দ বার।
বুধগ্রহের তথ্য জানতে বিজ্ঞানীরা তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপ ও জাপানের এক যৌথ মহাকাশযান বুধগ্রহে পৌঁছবে ২০১৭ সালে। এ মহাকাশযান থেকে দুটি স্যাটেলাইট বেরিয়ে মেসেঞ্জারের চেয়ে আরও গভীর পর্যবেক্ষণ চালাবে। গবেষকরা আশা করছেন, তখন হয়তো আরও অনেক চমকপ্রদ তথ্য জানা যাবে এ গ্রহটি সম্পর্কে।

জনগণের সমর্থন ছাড়া পুলিশ বাহিনীর পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয় : মুহাম্মদ নুরুল হুদা by মোকাম্মেল হোসেন

পুলিশের সাবেক আইজি মুহাম্মদ নুরুল হুদার জন্ম ১৯৪৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে মাস্টার্স শেষ করে সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৭০ সালে তিনি পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। সম্প্রতি সমাপ্ত পুলিশ সপ্তাহ এবং পুলিশ বিভাগের সমস্যা, সম্ভাবনাসহ অন্যান্য বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি খোলামেলা মত প্রদান করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-
যুগান্তর : সম্প্রতি শেষ হওয়া পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে জনগণের সেবক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো দাঁড়াতে বলেছেন। দেশের পুলিশ বাহিনী প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানের মর্যাদা রাখতে সক্ষম হবে?

মুহাম্মদ নুরুল হুদা : না রাখতে পারার কোনো কারণ দেখি না। পুলিশের যে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য আছে, তার আলোকে বিচার করলে উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল- যে দেশই হোক, জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছাড়া পুলিশ বাহিনীর পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়; পুলিশ বিভাগ যে আইন-কানুন দ্বারা চলে, বিশেষ করে ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনের প্রথমদিকেই পরিষ্কার করে বলা আছে, পুলিশ বাহিনীকে সফল হতে হলে জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পেতে হবে। এটাই যদি মাপকাঠি হয় সাফল্যের, তাহলে জনগণের জন্য কাজ করা তো অবশ্যই দরকার। স্বাধীন দেশে পুলিশ তো আর অন্য কারও প্রতিনিধি নয়; জনগণের প্রতিনিধি। আমাদের শাসনতন্ত্রে তো বলাই আছে- সব ক্ষমতা জনগণের কাছে আছে। তো জনগণের জন্য কাজ করলে পুলিশের পেশাগত উৎকর্ষসাধনে কোনো বাধা আসে না। এটা বরং ভালো হয় এবং সেখানে জনগণের সমর্থন থাকে। দেশের সমগ্র জনগণের মধ্যে পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা তো একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। সমগ্র জনগণের আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি যখন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তখন তাদের সমর্থন থাকলেই তো আপনি ভালো করবেন।

যুগান্তর : পুলিশ সপ্তাহে প্যারেডের ইতিহাসে এই প্রথম একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা অধিনায়ক হিসেবে প্যারেডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মু. নু. হুদা : এজন্য সরকার যথেষ্ট বাহবা পেতে পারে। অতীতের দিকে তাকালে দেখব- বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়, সম্ভবত ১৯৭৪-৭৫ সালে প্রথম মহিলা পুলিশ নিয়োগ দেয়া হয়। এটা তারই ধারাবাহিকতা। মাঝখানে একটা সময় ছিল, তখন অদ্ভুত কিছু কারণে মহিলা পুলিশ থাকলেও তাদের দৃশ্যমান করা হতো না। আমরা সে সময়টা পার হয়ে এসেছি। এখন প্রচুর মহিলা পুলিশ আছে এবং মহিলা পুলিশের যে ইন্টারন্যাশনাল বডি আছে, সেখানেও তাদের একটা উজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। আইইউএন কন্টিনজেন্টে মহিলা পুলিশরা প্রশংসনীয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশে এখন এডিশনাল আইজি অর্থাৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদেও মহিলা কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন। সেই আলোকে বিচার করলে এবারের প্যারেড কন্টিনজেন্টে একজন মহিলা থাকার বিষয়টি নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

যুগান্তর : পুলিশ সপ্তাহে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১৮টি দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল পুলিশের প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। এ দাবি পূরণ হওয়া কতটা জরুরি?

মু. নু. হুদা : এটা তো দাবি করা লাগে না। পুলিশ বাহিনী একটা আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বাহিনী। দেশে যেসব প্রতিষ্ঠিত আইন-কানুন আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আইন হচ্ছে শাসনতন্ত্র অর্থাৎ আমাদের সংবিধানে নির্দেশনা দেয়া আছে- কীভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু আইন, পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল ও স্থানীয় আইন আছে। অপরাধের ব্যাপারে সাবজেক্টিভ ল’ হচ্ছে বাংলাদেশ পেনাল কোড। আর অ্যাডজেক্টিভ বা প্রসিডিউরাল ল’ হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড। এগুলোকে সাহায্য করার জন্য বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে অ্যাভিডেন্স অ্যাক্ট। এগুলোর আলোকেই পুলিশকে কাজ করতে হবে। যদি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকে, অবাঞ্ছিত ও বেআইনি হস্তক্ষেপ থেকে থাকে, এটা তো বলেই দেয়া হয়ছে, কীভাবে কাজ করতে হবে? আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে কারও যদি মনে হয়, তিনি অন্যায়ভাবে অ্যাফেক্টেড হচ্ছেন, আর যদি আপনার অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তাহলে তাকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য সুপিরিয়র অফিসাররা আছেন। বিভাগীয় প্রধান আছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আছে। এছাড়া বিচারিক পর্যায়েও তাকে সুরক্ষা দেয়ার বিধান রয়েছে।

যুগান্তর : পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যত অভিযোগ ওঠে, তার বেশির ভাগই সংঘটিত হয় পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ফলে- এ অভিযোগ কতটা সত্য?

মু. নু. হুদা : এর পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল নই। যদি কারও কাছে থাকে, তিনি ভালো বলতে পারবেন। তবে আপাতদৃষ্টিতে আমার কাছে মনে হয়, এটা এক ধরনের সুইপিং কমেন্ট। এ রকম গুরুতর একটা ব্যাপারে সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কথা হবে।

যুগান্তর : সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের কথা বলা হয়।

মু. নু. হুদা : না, স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বললে হবে না। আপনি যখন দেশব্যাপী কোনো বিষয়ে কথা বলবেন, তার একটা ভিত্তি থাকা জরুরি। ভিত্তিটা হচ্ছে পরিসংখ্যান বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে জরিপ হতে পারে। এনজিও, রাইট বডি কিংবা সরকার জরিপ করতে পারে। কোনো থিংক ট্যাংকও করতে পারে। কিন্তু তা না হয়ে শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে এ ধরনের মতামত দেয়া সঙ্গত নয়। রাজনৈতিক ছাড়া কি কারও অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে না? বিভিন্ন গ্রুপের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে না? এটা তো সত্য- যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে ক্ষমতা অপব্যবহারের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

যুগান্তর : গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও পুলিশ সপ্তাহে পুলিশ বহিনীর জন্য স্বতন্ত্র পুলিশ ডিভিশন গঠনের দাবি তোলা হয়েছিল, যা পূরণ হয়নি। এ দাবি পূরণ হওয়া উচিত মনে করেন?

মু. নু. হুদা : এর একটা আপাত যৌক্তিকতা আছে। পৃথিবীর বেশকিছু দেশে পুলিশ মন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করে। সেখানে প্রফেশনালরা থাকে; অন্যরাও থাকে। তবে বাংলাদেশে আমি মনে করি, এটা আলোচনা করে করা উচিত। যে জন্য আমরা পুলিশ ডিভিশন চাচ্ছি, সেটা যদি অধিকতর জনবল দিয়ে এবং বেশ কয়েকজন সচিব দিয়ে করা যায়, যার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তাহলেও হতে পারে। পুলিশ ডিভিশন হলে সুবিধা হল- পুলিশের পেশাগত কাজকর্ম, তার জনবল ঠিক করা, আর্থিক দিকটি নিরূপণ করা ও অপারেশনাল রিকয়্যারমেন্ট কী হবে, ইত্যাদি বিষয়গুলো সাধারণত যারা প্রফেশনাল, তারাই ভালো বুঝবেন এবং এতে অটোনমিও অনেকখানি থাকে। তবে পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক যে কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক যে নির্বাহী, তার নিয়ন্ত্রণেই কাজ করতে হবে। সব জায়গায় এটাই প্রতিষ্ঠিত। ইংল্যান্ডে বিভিন্ন ফোর্স আছে; তাদের একটা ফান্ড দিয়ে দেয়া হলেও তাকে একটা নিয়ম-কানুনের মধ্যে কাজ করতে হয়। কাজেই এখানে একচ্ছত্রভাবে বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কোনো বিষয় নয়। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কখনোই বাঞ্ছনীয় নয়। তবে হ্যাঁ, আমাদের দেশে যেহেতু আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন আছে, এর আলোকে অনেকে তো বলতে পারে- ডিফেন্স মিনিস্ট্রি আছে, তার ওপরে আর্মড ফোর্সেস কেন লাগে? এ বিষয়টি যেহেতু আমাদের চলছে, কাজেই এর নিশ্চয়ই যৌক্তিকতা আছে। আমি বলব- এগুলো হল সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তার আগে স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে একটা নির্মোহ আলোচনা হওয়া উচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং এর সঙ্গে পাবলিক থিংকট্যাংকও থাকতে পারে। সবার সঙ্গে একটা নির্মোহ আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে অবজারভেশন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ বাহিনীর যে চাহিদা ও প্রয়োজন আছে, সেগুলো পূরণ করার জন্য কয়েকজন সেক্রেটারি এবং মন্ত্রণালয়ের কলেবর বৃদ্ধি করে যদি কাজ করা যায়, সুফল পাওয়া যাবে। এখানে প্রফেশনাল লোকজন বেশি আসা উচিত।

যুগান্তর : পুলিশের ইন্সপেক্টর থেকে আইজিপি পর্যন্ত কোনো ঝুঁকি-ভাতা পান না। পুলিশের সব সদস্যের জন্য ঝুঁকি-ভাতা চালু করা উচিত কি?

মু. নু. হুদা : ঝুঁকি তো চাকরিতে সবারই আছে। তবে মনে হয়, বেশি ঝুঁকি কার- সেই ভিত্তিতে বিচার করলে এখন যে পদ্ধতি বা যে বন্দোবস্ত চালু আছে, সেটা যথেষ্ট যৌক্তিক। একজন ইন্সপেক্টর কিন্তু আগের মতো তত্ত্বাবধানকারী নন, একজন নির্বাহী। কাজেই ইন্সপেক্টর পর্যায়ে নিশ্চয়ই হতে পারে। তবে ওপরেরগুলো হবে কিনা, সেটা আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়। পুলিশের চাকরিতে ঝুঁকি যে আছে, এটা জেনেই তো তারা এসেছেন।

যুগান্তর : বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যে ২৯টি ক্যাডার রয়েছে, এগুলোয় কোনো কর্মকর্তা অপরাধ করলে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করার আইন নেই। অথচ পুলিশের অপরাধ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা করতে পারেন। এ আইন বাতিল করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

মু. নু. হুদা : পুলিশের কোনো কাজ যখন ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তখন সেখানে কোন ক্যাডারের লোকজন কাজ করছে- বিষয়টা আমি এভাবে দেখতে চাই না। আমি দেখতে চাই- তার পরিচয়টা কী? যিনি কাজটা করছেন, তার বিচারিক ক্ষমতা আছে কিনা। ক্ষমতার চেয়েও বড় জিনিস, তার অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা আছে কিনা। তবে পুলিশের ব্যাপারে একটা আলাদা ইন্ডিপেনডেন্ট কমপ্লায়েন্স বডি থাকলেই ভালো- যারা এটা দেখবেন। অন্য কারও নয়, মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি করবেন- এমন বডি থাকতে পারে।

যুগান্তর : এবারের পুলিশ সপ্তাহে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণের হাত থেকে রক্ষা পেতে পুলিশের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ খরচের ক্ষমতা আইজিপির ওপর ন্যস্ত করার দাবি তোলা হয়েছে। এ দাবি যৌক্তিক মনে করেন?

মু. নু. হুদা : যৌক্তিকতা তো অবশ্যই আছে। বর্তমান ব্যবস্থায় আইজিপিকে অন্যান্য বিভাগের সার্বোচ্চ পদের মতোই মর্যাদা দেয়া হয়। আপনি ১৬ কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য প্রধানতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাকে চিহ্নিত করেছেন এবং দায়িত্ব দিয়েছেন, তার তো আর্থিক ক্ষমতা থাকা উচিত। আর্থিক ক্ষমতা দিলেই তো আর এটার অপব্যবহার হচ্ছে না। তাকে কাজগুলো করতে হবে রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন্সের মধ্য দিয়েই। অতএব, আইজিপির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়া এবং তাকে অন্যান্য বিভাগের ওপর স্থাপন করা কোনো অযৌক্তিক ব্যাপার নয়। সাধারণত যে ধরনের দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি আইজিপি হন- সেই আলোকে বিচার করলে এ দাবির যৌক্তিতা আছে। আইজিপির ক্ষমতা অবশ্যই বাড়ানো দরকার, যাতে তাকে দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়। আইজিপির কাজের মধ্যে একটা তাৎক্ষণিকতা আছে। অনেক কিছুর ব্যাপারেই তিনি দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে পারেন না।

যুগান্তর : পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে সচিব পদমর্যাদায় ২টি গ্রেড-১ পদ রয়েছে। পুলিশের জন্য আরও ৩টি গ্রেড-১ পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়েছে। এ দাবি পূরণ হওয়া উচিত?

মু. নু. হুদা : হ্যাঁ, এটা অবশ্যই পূরণ হওয়া উচিত। এটা এখন ১ লাখ ৭০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একটা অঙ্গ হচ্ছে পুলিশ। অতএব তাকে তো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার উপায় নেই। অন্যদিকে পুলিশ ক্যাডারে এখন তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের অফিসাররা আসেন। উন্নতমানের অফিসারদের যদি এখানে আকৃষ্ট করতে হয় এবং লিডারশিপটা যদি উন্নত করতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজের স্বীকৃতি ও সমতা রাখার জন্য, সর্বোপরি ভালো অফিসারদের আকৃষ্ট করার জন্য এখানে সচিব পর্যায়ের পদ অন্তত ১০টি হওয়া উচিত।

যুগান্তর : পুলিশ বিভাগে আর ৫০ হাজার পদ সৃষ্টির বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মু. নু. হুদা : এটা তো দরকার। পুলিশ ও জনসংখ্যায় যে অনুপাত থাকে- কোনো বেঞ্চমার্ক হয় তো ওভাবে নেই, তবে আমরা দেখতে পারি, অন্যান্য জায়গায় কীভাবে আছে? আমাদের দেশ যেহেতু অত্যন্ত জনবহুল। এখানে আপনি ক্যাপিটেল এক্সপেনডিচার তো খুব বেশি করতে পারবেন না। অনেক কাজ, যেগুলো মেশিন করতে পারে না, এর মধ্যে ইন্টেলিজেন্স কালেকশনসহ অন্যান্য কাজ ‘হিউম্যান আই’ দিয়ে করা সম্ভব হয়। তাছাড়া কর্মসংস্থানের দিকটা যদি দেখি, বহুলোকের কর্মসংস্থান তো হচ্ছে। আমাদের দেশে অপরাধ ও শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা মোকাবেলায় অনেক লোক লাগে। যেখানে লাখ লাখ লোকের প্রশ্ন, সেখানে আইনশৃঙ্খলা যারা রক্ষা করেন, তাদের সংখ্যাটাও সাইজেবল হওয়া দরকার। পুলিশ লোকবল এখনও তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিকূলই বলা যায়। এ প্রেক্ষাপটে বিচার করলে পুলিশের জনবল বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক।

যুগান্তর : প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে কোনোরকম তদবির না শুনতে এবং দলীয় নেতাদের চাপের বিষয়ে সরাসরি তাকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এটা পুলিশের মনোবল বাড়াবে বলে মনে করেন?

মু. নু. হুদা : এটা সদার্থক একটা ইঙ্গিত। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে এরকম আশ্বাস পাওয়ায় নিশ্চয়ই পুলিশের মনোবল বাড়বে। তবে পুলিশের যে আইন-কানুন রয়েছে, সেখানে কিন্তু বলাই আছে- ‘উইদাউট ফেয়ার অ্যান্ড ফেভার’ কাজ করার জন্য। আইনে এরকম কোনো বিধান নেই যে, বিশেষ কাউকে খাতির করতে হবে।

যুগান্তর : পুলিশ ও অধীনস্থ বিভাগগুলো নিয়ে একাধিক ডিভিশন গঠন করার ইঙ্গিত সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে পাওয়া গেছে। ডিভিশন গঠনকে সময়ের দাবি মনে করেন?

মু. নু. হুদা : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কাজ পুলিশেরই। ডিভিশনগুলো যদি কাজ ওরিয়েন্টেড ও ফাংশন ওরিয়েন্টেড হয়, তাহলে সুফল পাওয়া যাবে। একজন সেক্রেটারি যে কাজগুলো দেখেন, সেটা যদি ভাগ ভাগ হয়ে যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে সুবিধা হবে। প্রশাসনে দুটি কথা প্রচলিত আছে। একটা হল, ফাংশনাল হোমোজিনিটি অর্থাৎ এক ধরনের কাজ। আরেকটা হল, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনিয়েন্স। এ দুটো বিষয় চিন্তায় রাখলে অধিকতর ডিভিশন আমার মনে হয় একটা সুফল দেবে।

যুগান্তর : অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের পুলিশ বাহিনী গঠন করতে হলে কোন কোন বিষয়ে নজর দেয়া জরুরি?

মু. নু. হুদা : প্রথমে হল নিয়োগ প্রক্রিয়া, যাতে নিরপেক্ষভাবে, কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের শিক্ষিত লোকজন এ বিভাগে আসে- এটা নিশ্চিত করা। এরপর আসবে প্রশিক্ষণের বিষয়। প্রশিক্ষণটা আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। এছাড়া প্রচুর ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট হতে হবে। বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থাকতে হবে। পুলিশের বড় কাজ দুটি- একটা ক্রাইম প্রিভেনশন অ্যান্ড ডিটেকশন, আরেকটা হচ্ছে অর্ডার মেইনটেন্স। এসব জায়গায় প্রচুর ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট হতে পারে। মনে রাখা দরকার- দুটো জিনিস একসঙ্গে হতে হবে। অ্যাপ্রোপ্রিয়েট রিক্রুটমেন্ট, ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাপ্রোপ্রিয়েট ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট। এগুলো একসঙ্গে চললে পুলিশের পেশাগত উন্নতি ও উৎকর্ষ সম্ভব হবে।

যুগান্তর : আইজিপি র‌্যাংক ব্যাজ প্রসঙ্গে বলুন।

মু. নু. হুদা : আইজিপি র‌্যাংক ব্যাজ তো আগে ছিল। সামরিক শাসনের আমলে এক সময় উইথড্র করা হয়- যা ঠিক ছিল না। পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার। এখানে র‌্যাংক থাকা তো খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এটা পুলিশ বাহিনীর ব্যাপার। এর সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করা উচিত নয়। পৃথিবীর অন্য পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে এর তুলনা হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, অন্য বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। বাস্তবে, মাঠপর্যায়ে বা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের আলোকে বিচার করলে পুলিশ একটা সিভিল বাহিনী। তাকে তুলনা করা উচিত আরেকটা সিভিল বাহিনীর সঙ্গে।

যুগান্তর : বিভিন্ন ঘটনায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দুই কর্মকর্তাকে নির্যাতনের পর মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের আচরণগত ও অপরাধ প্রবণতা চিহ্নিত করতে পুলিশ সুপার, স্ব স্ব ইউনিট ও সংস্থাপ্রধানকে পর্যবেক্ষণ টিম গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ফলে অপরাধ প্রবণতা ও পুলিশের আচরণে গুণগত পরিবর্তন আসবে?

মু. নু. হুদা : এটা অতিরিক্ত একটা বন্দোবস্ত। অফিসাররা কী করছেন, তাদের কাজকর্মে বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিনা, ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন কিনা, জেলা পর্যায়ে যিনি সুপারিনটেন্ডেন্ট অব পুলিশ, তার কাজই হল এটা। এখন নতুন করে কমিটি করলে বাড়তি একটা রেসপনসিবিলিটি তৈরি হবে এবং এর ফলে তারা মনে করবে, এ কাজটা তাদের করতে হবে। মাসওয়ারি বা ত্রৈমাসিক একটা রিপোর্ট দিতে হবে।

যুগান্তর : ১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বিপরীতে ১ লাখ ৭০ হাজার পুলিশ কি যথেষ্ট?

মু. নু. হুদা : এটা যথেষ্ট মনে নাও হতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, মূলত পুলিশ বাহিনীর টাকাটা আসে রাজস্ব খাত থেকে। দেশের অর্থনীতি উন্নত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু রেভিনিউ তো আশ্চর্যরকমভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। অর্থনীতি যখন সক্ষম হবে, তখন এ বাহিনীর জন্য খরচ বাড়ানোও সম্ভব হবে। আর একটি বিষয়, পুলিশ বাহিনী যদি কাজের মাধ্যমে নিজেদের গুরুত্ব প্রমাণ করতে পারে, তখন জনবল বাড়ানোর দাবি করতে হবে না, সমাজের ভেতর থেকেই একটা চাহিদা আসবে, জনগণ বলবে- আমাদের একটা উন্নত পুলিশ বাহিনী দরকার। এজন্য যে সম্পদ বিনিয়োগ করা দরকার, আমরা তা বিনিয়োগ করতে রাজি আছি।

যুগান্তর : থানার ওসি পদে ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগে কতটা সুফল পাওয়া যাবে?

মু. নু. হুদা : কাজটা না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। থানার অফিসার-ইনচার্জ পদের সঙ্গে কিন্তু দু’রকমের সম্পর্ক আছে। একটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপার, আরেকটা অপরাধ তদন্তের ব্যাপার। এখন অপরাধ তদন্তের ব্যাপারে যদি কারও পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকে, তিনি যদি নিচের লেবেল থেকে কাজটা না করে আসনে, তাহলে অসুবিধা হওয়ার কথা। তারপরও এটা চালু হওয়ার পর দেখা যাক, কী দাঁড়ায়? সাধারণত ১২ থেকে ১৫ বছরের অপরাধ তদন্তের অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন থানার অফিসার-ইনচার্জ হন। এ ব্যবস্থায় অপরাধ তদন্তের অভিজ্ঞতাটা তার থাকবে না। সরাসরি নিযুক্ত অফিসাররা ইনচার্জ হলে একটা ব্যত্যয় থেকে যাবে। এটা অতিক্রমের প্রক্রিয়া কী হবে, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।

যুগান্তর : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্যালাপ পোল বিদায়ী বছরের বৈশ্বিক আইনশৃঙ্খলার জরিপে বাংলাদেশ ৭৮ পয়েন্ট পেয়েছে। তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ও অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট ৭৭, ফ্রান্সের ৭৫ এবং ভারতের ৬৭। এটাকে দেশের পুলিশ বাহিনীর অর্জন মনে করা হচ্ছে। মন্তব্য করুন।

মু. নু. হুদা : হ্যাঁ, এটাকে আমি আমাদের পুলিশ বাহিনীর অর্জন বলব। যেহেতু আন্তর্জাতিক একটা সংস্থার মতামত- এটাকে গুরুত্ব দিতেই হবে। আমাদের দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, প্রকারান্তরে গণতন্ত্রের ভিত শক্ত করতে পুলিশ বাহিনীর যথেষ্ট অবদান এবং আত্মত্যাগ রয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ পরিস্থিতি যুক্তিসঙ্গত বলব না, তবে এটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। প্রচুর জনসংখ্যার একটা দেশে, যেখানে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জঙ্গিবাদ দমন- এসব বিবেচনায় রাখলে নিশ্চয়ই সন্তুষ্টির অবকাশ রয়েছে। তবে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হব। তবে রাজনৈতিক নির্বাহী যারা, তাদের প্রজ্ঞার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। মনে রাখতে হবে, দেশে একটা ভালো পুলিশ বাহিনী থাকা সরকারেরই সুনামের বিষয়। সবাই বলবে- সরকার দেশ ভালোভাবে চালাচ্ছে। আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভালো এবং দক্ষ পুলিশ বাহিনী দরকার। দক্ষ ও ভালো পুলিশ বাহিনীর অর্জনগুলো রাজনৈতিক সরকারের অর্জনের পাল্লা ভারি করে- এই বোধটা যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখনই দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ লক্ষণ আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
মু. নু. হুদা : আপনাকেও ধন্যবাদ।

নির্মোহ ইতিহাস রচনা কতটা কঠিন by ড. মাহবুব উল্লাহ

প্রফেসর রেহমান সোবহান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের কাছাকাছি হয়ে গেছে। এখনও আমরা একেক জনের গল্প নিয়ে বই পাচ্ছি, যারা ওই সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের ‘ডেফিনিটিভ’ ইতিহাস নিয়ে একটি বই পাচ্ছি না। যেটি তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে দিতে পারি, যাতে তারা বুঝতে পারে আমরা কোথা থেকে এসেছি। এটা আমারও ব্যর্থতা।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩১ জানুয়ারি ২০১৬)। গত ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘দ্য স্ট্রাগল ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রফেসর রেহমান সোবহান। তার লেখা নতুন বই ‘আনট্রাঙ্কুইল রিকালেকশনস- দ্য ইয়ারস অব ফুলফিলমেন্ট’ নিয়ে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রফেসর রেহমান সোবহানের এ মন্তব্যটি খুবই প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের ইতিহাসের ওপর গবেষণাধর্মী এবং সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ না হওয়া আমাদের সবার জন্য খুবই বেদনার বিষয়। স্বাধীনতার পরবর্তী বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে আমাদের ইতিহাসবিদরা বাংলাদেশের ডেফিনিটিভ ইতিহাস রচনায় হাত না দেয়ার ফলে ইতিহাস এখন রাজনীতির ডামাডোলে পড়ে নতুন প্রজন্মের জন্য বিভ্রান্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ আসছে। যদি ডেফিনিটিভ কোনো ইতিহাস না থাকে, তাহলে কি বিকৃতি করা হল? রাজনৈতিক নেতারা দলীয় অবস্থান থেকে ইতিহাস সম্পর্কে মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক কথাই বলতে পারেন এবং এসব কথায় কথা বাড়তে পারে, উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু তা আর যাই হোক ইতিহাস নয়। বাংলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন- যা অত্যন্ত যথার্থ। কিন্তু ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল মানুষের পক্ষ থেকে তেমন কোনো আপত্তি না ওঠার ব্যাপারটি খুবই হতাশাজনক।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় একদা লিখেছিলেন, ‘বাঙালির ইতিহাস নেই।’ এটি ছিল তার খেদের কথা। প্রফেসর রেহমান সোবহান যখন বলেন, বাংলাদেশের ডেফিনিটিভ ইতিহাস নিয়ে একটা বই পাচ্ছি না- তখনও একই ধরনের খেদ বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই। তিনি আরও কবুল করে নিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়ার মতো কিছু তিনিও সৃষ্টি করতে পারেননি। এটাকে সাফ নিজের ব্যর্থতা বলে স্বীকার করেছেন। চেষ্টা করলে তিনিও হয়তো একটি পিরিয়ডের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের অধ্যায় তুলে ধরতে পারতেন। বিশেষ করে ১৯৬৬ সালে ছয় দফা উত্থাপিত হওয়ার পর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্যন্ত।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশ কয়েকজন বেশ কটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর বেশিরভাগই স্মৃতিকথানির্ভর। যেগুলো সম্পর্কে রেহমান সোবহান বলেছেন, এখনও আমরা একেক জনের গল্প নিয়ে বই পাচ্ছি, যারা ওই সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। স্মৃতিকথাগুলো নিঃসন্দেহে মূল্যবান। তবে সমস্যা হল, স্মৃতি আমাদের অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। অনেকদিন পর অতীতের কথা লিখতে বসে দিন, তারিখ এবং প্রেক্ষাপট ঝাপসা হয়ে আসে। ফলে বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়। যদি কোনো লেখক ডায়েরি লিখতে অভ্যস্ত থাকেন, তাহলে তার স্মৃতিকথা মামুলি স্মৃতিকথার চেয়েও মূল্যবান বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশ সংগ্রামের নেতাদের মধ্যে একমাত্র তাজউদ্দীন আহমদই ডায়েরি লিখতেন। নিঃসন্দেহে তার ডায়েরি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান। যারা স্মৃতিকথা লিখেছেন তাদের কাজগুলোকে কোনোক্রমেই মূল্যহীন বলা যায় না। তবে সমস্যা হল, এ ধরনের স্মৃতিকথায় লেখকের নিজের ভূমিকা অনেক সময় বাড়াবাড়ি রকমের বেশি করে দেখানোর প্রয়াস থাকে। ফলে ইতিহাসের সত্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পেশাদার ইতিহাসবিদরা স্মৃতিকথাগুলোকে ব্যবহার করতে পারেন ঘটনাবলীর প্রামাণ্যকরণের জন্য। বাংলাদেশে এ কাজটি হয়নি বললেই চলে।
পৃথিবীর অনেক দেশে বিশেষ করে, কমিউনিস্ট দেশগুলোয় অফিসিয়াল হিস্ট্রি বা সরকারি ইতিহাস রচনার ঐতিহ্য আছে। এসব ইতিহাসের সমস্যা হল এটি সরকারি অবস্থানের বাইরে যেতে পারে না। ফলে এ ধরনের ইতিহাসে তথ্য বিকৃতির আশংকা থাকে। যোসেফ স্ট্যালিনের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির (বলশেভিক) ইতিহাস রচনা করা হয়। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেসে নিকিতা ক্রশ্চেভ স্ট্যালিনের নিন্দা ভাষণ করেন। তিনি বলেছিলেন, স্ট্যালিন আইভান দি টেরিবলের চেয়েও অত্যাচারী ছিলেন। ক্রুশ্চেভের ভাষণের পরর্তীকালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির যে সরকারি ইতিহাস প্রকাশ করা হয়, সেটি ছিল স্ট্যালিনের আমলে রচিত ইতিহাস থেকে বেশ ভিন্ন। সময়ের ব্যবধানে একই রাষ্ট্রের, সরকার প্রকাশিত ইতিহাস ভিন্ন হয়ে গেল। উপমহাদেশের স্ট্যালিনপন্থী কমিউনিস্টরা স্ট্যালিন পরবর্তীকালে প্রকাশিত ইতিহাসকে কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না। তাদের দৃষ্টিতে এ ইতিহাস ছিল সংশোধনবাদী বিকৃতিতে ভরপুর অর্থাৎ ইতিহাস আইডিয়োলজির ভিক্টিম হয়ে গেল। সত্যিকারের ইতিহাস আইডিয়োলজির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে না। আবার এ কথাও সত্য, সম্পূর্ণভাবে আইডিয়োলজিমুক্ত হয়ে ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। ইতিহাস রচনার জন্য হিস্টোরিওগ্রাফি বা ইতিহাসবিদ্যাকে ভালো করে রপ্ত করতে হয়। ইতিহাস রচনায় ব্যবহৃত হিস্টোরিওগ্রাফি একটি নয়, একাধিক। সুতরাং অনুসৃত হিস্টোরিওগ্রাফির কারণে ইতিহাসের মেজাজ ভিন্ন হয়ে যায়। প্রতিবেশী ভারতে কংগ্রসে দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করেছে। ভারতীয় ইতিহাসবিদদের মধ্যে অনেক নামকরা ইতিহাসবিদই কংগ্রেসের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজমের হিস্টোরিওগ্রাফি অনুসরণ করেছেন। এদের মধ্যে জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপাণ চন্দ্র অন্যতম। এর বিপরীতে গত কয়েক দশক ধরে ভারতের একটি ভিন্নপন্থী ইতিহাস চর্চার স্কুল গড়ে উঠেছে। এরা সাবালটার্ন স্কুল বা নিুবর্গের ইতিহাস রচয়িতা হিসেবে পরিচিত। বিশ্ব পরিসরে সাবালটার্নদের অনেক অনুসারী তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক রণজিৎ গুহ ইতিহাস বিদ্যায় এ মতবাদের প্রাণপুরুষ হিসেবে খ্যাত। কিন্তু হিস্টোরিওগ্রাফি যাই হোক কোনো ইতিহাসবিদই ঘটনার সত্যতাকে বিকৃত করতে পারে না। তাদের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকতে পারে না। গজনীর সুলতান মাহমুদ ভারতের সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেছিলেন। বলা হয়, সোমনাথ থেকে অনেক মূল্যবান রত্নরাজি সুলতান মাহমুদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যান। ব্রিটিশ আমলে স্কুলের ইতিহাস বইতে সুলতান মাহমুদকে একজন প্রচণ্ড হিন্দুবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক মুসলমান সুলতান হিসেবে তুলে ধরা হতো। এটা ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দূরত্ব সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক বছর আগে প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার ‘সোমনাথ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেই গ্রন্থে রমিলা থাপার দেখিয়েছেন, সুলতান মাহমুদ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে বিদ্বিষ্ট ছিলেন না। সোমনাথের মূল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি স্থানীয় ছোটখাটো অনেক রাজার সমর্থন পেয়েছিলেন। এরাও ছিল হিন্দু। সুতরাং বিষয়টি সাম্প্রদায়িক ছিল না, ছিল রাজনৈতিক। এভাবে আমরা সোমনাথ মন্দির আক্রমণের ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা পেলাম। কালের প্রবাহে নতুন তথ্য ও ঘটনাবলী উন্মোচিত হয়ে ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধি করে তোলে। সুতরাং ইতিহাস কোনো স্থির চিত্র নয়। যারা ইতিহাসকে স্থিরচিত্রে পরিণত করতে চান তারা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করছেন না।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার কাজটি হবে মূলত সমসাময়িক ইতিহাস রচনার কাজ। সমসাময়িক ইতিহাস খুবই দাহ্য একটি বিষয়। কারণ সমসাময়িক ইতিহাসের বহু কুশীলব জীবিত থাকেন, অথবা তাদের অতি সন্নিকটবর্তী প্রজন্ম জীবিত থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই এদের মধ্যে প্রচণ্ড আবেগ কাজ করে। কিন্তু আবেগে আচ্ছন্ন অবস্থায় নির্মোহ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। এ কারণেই বাংলাদেশে আমরা আবেগ আপ্লুত হয়ে অনেককেই ইতিহাসের নামে বিতর্কে লিপ্ত হতে দেখি। যার ভিত্তিতে কোনো ডেফিনিটিভ ইতিহাস নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসের উপাদানস্বরূপ দুটি দলিল সংকলন আমরা দেখতে পাই। এর একটি হল বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত পনেরো খণ্ডে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র। দ্বিতীয়টি হল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস্।’ এর বাইরে দলিলপত্রের সন্ধান করতে হলে আমাদের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভগুলো অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। দেখতে হবে বিভিন্ন দেশের অবমুক্তকৃত দলিল-দস্তাবেজ এবং যেসব দলিল এখনও অবমুক্ত হয়নি সেগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। দেখা যেতে পারে উইকিলিকস থেকে আর কী জানা যায়! বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার জন্য মুজিবনগর সরকারের দলিল-দস্তাবেজ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান সরকারের দলিলপত্রও মূল্যবান উপাদান হিসেবে কাজে লাগবে। ’৭১-পূর্ববর্তী সময়ে যারা স্বাধীন পূর্ব বাংলা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেছেন বা কাজ করেছেন তাদের তথ্যগুলোও আমাদের ইতিহাস রচনার অন্যতম উপাদান। এগুলো বাদ দিয়ে প্রকৃত ইতিহাস রচিত হতে পারে না। লন্ডনের ইস্ট পাকিস্তান হাউস একসময় প্রবাসে স্বাধীন পূর্ব বাংলার পক্ষে জনমত ও মনোভাব গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। সেসব তথ্যও সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এককথায় বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার কাজটি বহু শ্রম, সাধনা ও অধ্যবসারের মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। ইতিহাসকে রাজনীতির ফুটবলে পরিণত করার প্রয়াস খুবই দুঃখজনক এবং তা জাতির জন্য কোনোক্রমেই মঙ্গলজনক নয়। এখন যা ঘটছে সেটি হল সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে আবেগ উত্তেজনার ধোঁয়াশা। ধোঁয়াশায় মানুষের দৃষ্টিশক্তি সংকুচিত হয়ে যায়। সমসাময়িক ইতিহাসের বিপদ সম্পর্কে রজনি পাম দত্ত তার মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণ ‘প্রবলেমস অব কনটেম্পোরারি হিস্ট্রি’ গ্রন্থে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন। এ মুহূর্তে যারা বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে কোনো গবেষণা করবেন তাদের জন্য এ গ্রন্থটি দিকনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করতে পারে।
যদি কোনো জলাশয়ে পানি কর্দমাক্ত হয়ে ঘোলা হয়ে যায় সেই জলাশয়ের গভীরে কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু সময় পার হলে পানির কাদা তলানি হিসেবে জমে গেলে সেই স্ফটিক স্বচ্ছ পানিতে গভীরের অনেক কিছুই দেখা যায়। সুতরাং অপেক্ষা করতে হবে। পানির কাদাগুলো থিতু হওয়ার জন্য কবি লিখেছিলেন, ‘গোষ্পদে বিম্বিত যথা অনন্ত আকাশ।’ শরতের দৃষ্টির পর গরুর পালগুলো যখন হেঁটে যায় তখন তাদের ক্ষুরাঘাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্তের সৃষ্টি হয়। সেই গর্তে জমা পানি প্রথম দিকে ঘোলাটেই থাকে। তারপর থিতু হয়ে স্বচ্ছ হয়ে যায়। গরুর ক্ষুরাঘাতে সৃষ্টি গর্তের স্বচ্ছ পানিতে অনন্ত আকাশও বিম্বিত হয়। ইতিহাস কখনও ঘোলাটে পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে ইতিহাস বিকৃতির কথা বলে হাঁক-ডাক দেয়াটাও নিরর্থক। ইতিহাস কারও চোখ রাঙানি বা ধমকে রচিত হতে পারে না। প্রকৃত ইতিহাসের জন্য আমাদের সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যখন কর্দমাক্ত পানি স্বচ্ছ পানিতে পরিণত হয়।
স্মৃতিকথা হোক বা অন্য যা কিছু হোক, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে যে কটি বই প্রকাশিত হয়েছে তার তুলনায় অনেক বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানে। তবে সেসব বইয়ের মূল লক্ষ্য হল ’৭১-এর যুদ্ধটিকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে দেখানো। ভারতের জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকালীন আমি অনেক ভারতীয় স্কলারদের বলতে শুনেছি, ’৭১-এর যুদ্ধ করেছে ভাতরীয় সৈনিকরা। তোমরা বাংলাদেশীরা আমরা না দাঁড়ালে পাকিস্তানিদের কিছুই করতে পারতে না। অন্যদিকে পাকিস্তানি লেখকদের, যাদের অধিকাংশই ’৭১-এর সামরিক কর্মকর্তা তাদের অভিমত হল গোটা যুদ্ধটাই ভারতের সৃষ্টি। এভাবে স্পষ্টত দেখা যায় ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশী জনযোদ্ধাদের কোনো আসন নেই। অথচ প্রকৃত ঘটনা হল লাখ লাখ জনযোদ্ধার অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ ছাড়া এবং কোটি কোটি বাংলাদেশীর সক্রিয় সমর্থন ছাড়া অন্য কোনো শক্তির ক্ষমতা ছিল না বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। ’৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান ছিল আমাদের শত্র“পক্ষ এবং ভারত ছিল সহায়কের ভূমিকায়। কিন্তু ইতিহাসের নির্ধারণকারী ভূমিকাটি পালন করেছে বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

সড়ক দুর্ঘটনায় রাজধানীতে পথচারীদের মৃত্যুই বেশি by প্রীতি রাহা

মাত্র আট ঘণ্টার ব্যবধানে মায়ের কোল খালি করে না ফেরার দেশে চলে গেছে দুই সন্তান। ১৬ জানুয়ারি রাজধানীতে দুটি পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এই দুই স্কুলছাত্রী প্রাণ হারান। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজধানীতে যে পরিমাণ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন, তাদের বেশির ভাগই পথচারী। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা মতে, ঢাকায় বছরে ৪০০ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, যার মধ্যে ৮৫ ভাগ দুর্ঘটনার শিকার হন পথচারীরা। এর মধ্যে ২৬ ভাগ পথচারী রাস্তা পারাপারের সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। অপরদিকে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়েন ৫০ ভাগ পথচারী। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে চালকের জেব্রা ক্রসিং সম্পর্কে ধারণার অভাবকে দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা। অপরদিকে অনেক ক্ষেত্রে পথচারীরা সময় বাঁচানোর জন্য ফুটপাত, ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস ব্যবহার না করে এবং ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে রাস্তার মাঝ দিয়ে হঠাৎ দৌড় দেয়, যা দুর্ঘটনা ঘটায়। পথচারীদের একটু অসাবধানতা তার জীবননাশের কারণ হতে পারে।
পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুসারে, রাজধানীতে বর্তমানে দুই সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ৮৩টি ফুটওভার ব্রিজ আছে। এর মধ্যে ৪৩টি উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এবং ৪০টি দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের। অপরদিকে রাজধানীতে আন্ডারপাস রয়েছে মোট তিনটি, যার দুটি ব্যবহারের অনুপযোগী। ফলে যে উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল, তা মূলত কোনো কাজেই আসছে না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুসারে, ২০১৫ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮ হাজার ৬৪২ জন, আহত হন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। অপরদিকে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ২ হাজার ৬২৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৫ হাজার মানুষ। সংগঠনটির মতে, ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে নিহতের সংখ্যা দেড় হাজার কমেছে। গত বছর ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি মানুষ দুর্ঘটনায় নিহত হন, যার সংখ্যা ৩৫৯। এর মধ্যে রাজধানীতেই নিহত হন ২২৭ জন। অপরদিকে, সবচেয়ে কম নিহত হয়েছে কুষ্টিয়া জেলায়, ২৮ জন।
দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউট ঢাকা নগরীর ৫১টি পয়েন্টকে দুর্ঘটনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ২০০৯ সালে একটি তালিকা পাঠায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় সাত বছরের বেশি সময়। অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এসব পয়েন্টের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, মতিঝিল, মৎস্যভবন, সোনারগাঁও, বিজয় সরণি, শনির আখড়া, জসিমউদ্দীন রোড ক্রসিং, শাহবাগ, সায়েদাবাদ ও জিপিও মোড়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ঢাকায় দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ ফিটনেসহীন যানবাহন ও প্রশিক্ষণহীন গাড়িচালক।
একটি মৃত্যু আর একটি পরিবারের খণ্ডিত হয়ে যাওয়া আমাদের দেশের এখন প্রতিদিনের ঘটনা। সাধারণ মানুষ এসব দেখতে দেখতে পাষাণ হয়ে গেছে। তবুও এখনও এমন অনেকে আছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় যাদের হৃদয় কেঁদে ওঠে। যারা পথে চলাফেরা করছেন, তাদেরও একটু সচেতন হতে অনুরোধ করছি। রাস্তা পারাপারের আগে ডানে-বাঁয়ে দেখে নিন। ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে সচেতন হোন এবং মেনে চলুন। রাস্তায় চলাফেরার সময় কানে হেডফোন ব্যবহার করবেন না। বাস্তবতা থেকে দেখা যায়, দায়ী চালকের অপরাধের তেমন কোনো সাজা হয় না, কিন্তু যার প্রাণটা যায়, তা আর ফিরে আসে না। সময় বাঁচানো কিংবা কষ্ট লাঘবের জন্য শর্টকাট পথ বেছে নেবেন না। মনে রাখবেন, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
preetiraha@ymail.com

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি by মো. নিজাম উদ্দিন

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? শুরু হল চেতনা, গৌরব, আত্মত্যাগ ও ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসে জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে ভাষা শহীদদের। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগ করেছিল বাংলার সাহসী সন্তানরা। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগ করেছিল বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। ভাষা সৈনিক সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউলসহ অজানা অনেকের ওপর গুলি ছুঁড়েছিল পাকিস্তানি দোসররা। কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা- এ ঘোষণায় সারা বাংলায় স্লোগান ওঠে- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ডাকে ঢাকার নবাবপুরে মিছিল বের হয়। সেখানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার মর্যাদার দাবি তুলে ধরা হয়। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলি চালায়। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র), রফিকউদ্দিন আহমদ এবং আবদুল জব্বার মৃত্যুবরণ করেন। এরকম মিছিল আর মৃত্যু দিয়েই মাতৃভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল বাংলার মায়ের দামাল ছেলেরা। পৃথিবীতে মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়ে বিরল এক ইতিহাস তৈরি করেছে বাঙালি জাতি। এজন্য বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব দেশেই ২১ ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা অঙ্গীকার করব- সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহারের।
শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

জীবন বাঁচাতে চাই বিশুদ্ধ রক্ত by ডা. মাওলানা লোকমান হেকিম

জীবনের জন্য প্রয়োজন রক্ত। রক্তের বিকল্প শুধু রক্ত। অপারেশনের জন্য, হিমোফেলিয়া, থ্যালাসেমিয়া বা দুর্ঘটনার কারণে রক্তক্ষরণ হলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন প্রয়োজন হয়। শুধু রক্ত হলেই হবে না, জীবনের জন্য চাই বিশুদ্ধ রক্ত। রক্ত দিন জীবন বাঁচান। রক্ত দিতে আপনার সদিচ্ছাই যথেষ্ট। রক্ত দিতে ৫-৭ মিনিট সময় লাগে। মুমূর্ষু রোগীর জন্য প্রায় সময়ই রক্তের প্রয়োজন হয়। তবে রক্ত গ্রহণ করার আগে জানা দরকার, তা কতটুকু নিরাপদ। আসুন জেনে নিই রক্ত গ্রহণ সম্পর্কিত কিছু তথ্য-
১. রক্তদাতার যোগ্যতা : রক্তদাতার বয়স হতে হবে ১৮-৫২ বছর।
২. রক্তদাতার ওজন : পুরুষ অন্যূন ৪৮ ও মহিলা ৪৫ কেজি। তবে বিশেষ উপাদানের ক্ষেত্রে ওজন ন্যূনতম ৫৫ কেজি।
৩. রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেও কোনো অ্যান্টিবায়োটিক না নিলে রক্ত দেয়া যাবে। মোট কথা, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেই কেবল রক্ত দেয়া যাবে।
রক্তদানের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখুন, জ্বর-ভাইরাস জ্বর থেকে সুস্থ হওয়ার ৭ দিন পর রক্ত দেয়া উচিত। ডেঙ্গুজ্বর হওয়ার কমপক্ষে ৬ মাস পর। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে সুস্থ হওয়ার কমপক্ষে ১২ মাস পর। টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে সুস্থ হওয়ার কমপক্ষে ৬ মাস পর। ডায়রিয়ার ৩ সপ্তাহ পর। বসন্তের ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার কমপক্ষে ৬ মাস পর। যক্ষ্মার ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রার ওষুধ সেবনের ২ বছর পর। চর্মরোগজনিত সমস্যায় রক্তনালী আক্রান্ত না হলে রক্ত দেয়া যাবে। কারও হাঁপানি হলে সে যদি ইনহেলার নেয় বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করে, তবে রক্ত দিতে পারবে। ডায়াবেটিস হলে ওষুধ চলা অবস্থায় রক্ত দিতে পারবে না। তবে খাবার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলে দিতে পারবে। রক্তস্বল্পতায় কেউ রক্ত দিতে পারবে না। মৃগীরোগী হলে না দেয়াই উচিত। অ্যাকজিমা থাকলে রক্ত দেয়া যাবে না। কান বা নাক ফোঁড়ালে আগে স্ক্রিনিং করে নিতে হবে। রক্তদানের আগে ধূমপান করা উচিত নয় এবং রক্তদানের পর কমপক্ষে ১ ঘণ্টা ধূমপান করা যাবে না। অ্যালকোহল পানের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রক্তদান করা উচিত নয়। অপারেশন করলে সুস্থ হওয়ার ১ বছর পর। রক্তগ্রহণ করলে কমপক্ষে ১ বছর পর। দাঁতের চিকিৎসা যেমন ফিলিংয়ের একদিন ও রুটক্যানেলের তিনদিন পর। হেপাটাইটিস থেকে সুস্থ হওয়ার ৬ মাস পর। তবে হেপাটাইটিস বি ও সি আক্রান্তরা কখনও রক্তদান করতে পারবেন না। ইনফ্লুয়েঞ্জা, টিটেনাস, জ্বর ও কোনো উপসর্গ না থাকলে একজন মানুষ রক্ত দিতে পারবে। বসন্ত, পোলিও, হেপাটাইটিস, মেনিনজাইটিস হলে ৪ সপ্তাহ পর। নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভবতী মহিলারা রক্ত দিতে পারবেন না। সন্তান জন্মদানের ৬ মাস পর দিতে পারলেও বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো অবস্থায় দিতে পারবে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঋতুস্রাব চলা অবস্থায় রক্ত না দেয়াই ভালো। তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া অবস্থায় রক্ত দিতে বাধা নেই।
৪. যারা কখনোই রক্ত দিতে পারবেন না : এইচআইভি পজিটিভ রোগী, সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী, ক্যান্সার, হৃদরোগ, বাতজ্বর, সিফিলিস (যৌন রোগ) ও কুষ্ঠ বা শ্বেতী রোগীরা রক্ত দিতে পারবেন না। জেনে রাখা ভালো- রক্ত দিলে প্রাণ বাঁচে, তাই জীবনের জন্য চাই রক্ত। তবে সেটা বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের পরীক্ষিত রক্তই হতে পারে এর একমাত্র সমাধান।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়।
চিকিৎসক, সিলেট

তামাক চাষের খেসারত আমাদেরই দিতে হবে by আর কে চৌধুরী

বৃহত্তর রংপুর জেলায় তামাকের চাষ ব্যাপক আকার ধারণ করছে। ধান, পাট, ভুট্টা, সরিষার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকরা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি জেনেও তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। অপরদিকে দেশী-বিদেশী তামাক বণিকরা চাষীদের ব্যাপক হারে ঋণ দিয়ে এতে উৎসাহ জোগাচ্ছেন। এমনকি তামাকের অধিক মূল্য দেয়ার লোভ দেখিয়েও তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অধিক মুনাফার জন্য কৃষকরা ধান, পাট, ভুট্টা ও গম আবাদযোগ্য জমিতে নতুন করে তামাকের আবাদ শুরু করছেন। ফলে প্রতি বছর রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে তামাক চাষ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক শুধু নেশাজাতীয় পণ্য নয়। এর ব্যবহারে মানুষের বহুবিধ স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ নানা ধরনের জীবন বিনাশী রোগ সৃষ্টি হয় তামাক ব্যবহারের ফলে। অনেক ক্ষেত্রে তামাক হেরোইন, ইয়াবা, আফিম প্রভৃতির চেয়েও মারাত্মক নেশাজাতীয় পণ্য। এর ধোঁয়া ফুসফুস, কিডনি, লিভার প্রভৃতি অকেজো করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় মানুষকে। শুধু তাই নয়, জীবনীশক্তিসহ যৌনশক্তিও হ্রাস পায় তামাকের ব্যবহারে। এমনকি অনেকে সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে প্রতি বছর শুধু ধূমপানের শিকার হয়ে কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। শুধু বাংলাদেশেই প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ ধূমপানজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। এরপরও একশ্রেণীর অপরিণামদর্শী মানুষ ধূমপান করে থাকেন। ফলে কেবল সরাসরি ধূমপানকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, পরোক্ষ ধূমপানেও অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। বেখেয়াল ধূমপায়ীরা নিজেদের শিশু-সন্তানদেরও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন অবহেলায়। উন্নত বিশ্বে যখন ধূমপান বা তামাকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে, তখন আমাদের দেশে তা বেড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। সরকারি তরফ থেকে ঢিলেঢালাভাবে তামাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। রাস্তাঘাটে, বাজার-হাটে তামাক ব্যবহার এখনও চলছেই। তবে যানবাহনে ধূমপান অনেকাংশে কমে গেছে বলে প্রত্যক্ষ করা যায়। তামাকের ধোঁয়া সেবনকারীদের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশেরও ক্ষতি করে। নানা রোগজীবাণু ছড়াতে সহায়তা করে। ধূমপান যেমন ক্ষতিকর, তেমনই ক্ষতিকর জর্দা, গুল, সাদাপাতা প্রভৃতিও। অপরদিকে যে মাটিতে তামাক চাষ হয়, সে মাটিতে অন্য ফসল ভালো হয় না। এমনকি আশপাশের জমিও তামাকের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তামাকের চাষ ও এর নানাবিধ ব্যবহারজনিত ক্ষতির কারণগুলো সম্প্রচার মাধ্যম, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট ও ফেসবুক প্রভৃতিতে ব্যাপকভাবে প্রচার করা উচিত, যাতে মানুষ সচেতন হয়। দেশী-বিদেশী স্বার্থপর তামাক বণিকদের অসৎ উদ্দেশ্য নস্যাৎ করার জন্য এটা জরুরি।
সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক, ঢাকা

প্রফেসর ড. কে. মউদুদ ইলাহী আবার স্টামফোর্ডের প্রো-ভিসি

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আব্দুল হামিদ স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রো-ভিসি হিসেবে প্রফেসর ড. কে. মউদুদ ইলাহীকে ৪ বছরের জন্য আবার নিয়োগ দিয়েছেন। ড. ইলাহী ২০০৭ সালের ১ অক্টোবর থেকে স্টামফোর্ডে প্রো-ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রফেসর ড. কে. মউদুদ ইলাহী ২০০০-২০০১ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন একাডেমিক ও বিধিবদ্ধ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ড. ইলাহী তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আদমশুমারি শাখার উপদেষ্টা সদস্য, বাংলাদেশ সরকারের বন্যা নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্সের সদস্যসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেশাগত সংগঠনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রফেসর ড. কে. মউদুদ ইলাহী ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭১ সালে ইউ.কের ডারহাম ইউনিভার্সিটি থেকে সোশ্যাল সায়েন্সে পি.এইচডি. ডিগ্রি লাভ করেন। প্রফেসর ড. কে. মউদুদ ইলাহী ব্রিটিশ কাউন্সিল-ওভারসিস ডেভেলপমেন্ট এডমিন্সিট্রেশনের (ইউ.কে.) অর্থায়নে পরিচালিত জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে জি.আই.এস. সম্পর্কীয় প্রজেক্টে লিংক কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি তার উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে UGC-HEQAP প্রোগ্রামের আওতায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে ২টি ল্যাবরেটরি তৈরি হয়েছে। তিনি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগবিষয়ক অনেক গবেষণাকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

বাল্টিমোরের মসজিদে ওবামা

‘আপনারা শুধু মুসলিম নন বা শুধু আমেরিকান নন, আপনারা একই সঙ্গে মুসলিম ও আমেরিকান।’ গতকাল বুধবার বাল্টিমোর কাউন্টির একটি মসজিদে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বললেন এ কথা। সেখানে এ সময় প্রায় ২০০ মার্কিন মুসলিম প্রতিনিধি ছিলেন। ওবামা তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি বলছি, আপনারা এ দেশের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত।’
ওবামা গতকাল প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মসজিদে গেলেন। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সন্ত্রাসী ঘটনা ও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের ইসলামবিরোধী মনোভাবের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষ নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ওবামার মসজিদে যাওয়ার ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
মুসলিম প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় ওবামা তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘মুসলিমরা অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীদের মতোই মার্কিন পরিবারের সদস্য। কোনো রিপাবলিকান রাজনীতিকের নাম না উল্লেখ করে ওবামা বলেন, যারা আমাদের বিভক্ত করতে চায়, আমাদের উচিত হবে তাদের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা।’
মার্কিন ইতিহাস থেকে উদাহরণ দিয়ে ওবামা বলেন, একদম শুরু থেকেই মুসলিমরা এ দেশ গড়ায় অংশ নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, কোনো সন্ত্রাসী হামলার পরই আমেরিকার মানুষ মুসলিমদের নাম শুনতে পায়। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার।
ওবামা বলেন, মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ইতিবাচক মুসলিম চরিত্র দেখানো উচিত। তিনি মনে করিয়ে দেন, একটা সময় ছিল যখন এ দেশের টিভিতে কালো মানুষদেরও দেখা যেত না।
বাল্টিমোরের যে মসজিদে ওবামা ভাষণ দেন, সেটি আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মসজিদ। হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, তাঁর আনুষ্ঠানিক ভাষণের আগে ওবামা মসজিদের ইমাম ইয়াসিন শেখ ও মার্কিন অসি চালনা দলের একমাত্র নারী মুসলিম সদস্য ইবতিহাজ মোহাম্মদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেন।
বারাক ওবামার এই আগমন নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। কোনো কোনো রক্ষণশীল ভাষ্যকার ওবামার মসজিদে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। ওবামার ভাষণের সময় মসজিদের বাইরে কয়েকজনকে ইসলামবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
ওবামার মসজিদে যাওয়া নিয়ে প্রশংসাও রয়েছে। এক ই-মেইল বার্তায় ওবামার অন্যতম সহকারী বাংলাদে​শি বংশোদ্ভূত রুমানা আহমেদ বলেছেন, নাইন-ইলেভেনের আক্রমণের পর অনেক মুসলিমের মতো তাঁকেও বিদ্বেষ ও বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু তিনি নিজের মাথা আবৃত করে হোয়াইট হাউসে কাজ করেন এবং একজন মুসলিম-আমেরিকান হিসেবে সে দেশের সেবা করেন।

যুগান্তরের ১৬ বছর ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা by তারেক শামসুর রেহমান

যুগান্তর ১৬ বছর পার করল। সময়টা একেবারে কম নয়। এ দীর্ঘ ১৬ বছর আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে যুগান্তরের সঙ্গে থেকেছি। কোনো একটি দিনের জন্যও আমি যুগান্তর থেকে নিজেকে সরিয়ে নেইনি। এ ১৬ বছরে আমরা গণমাধ্যমে নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এ পরিবর্তন যুগান্তরকে তার লক্ষ্যপথ থেকে এতটুকুও বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে যুগান্তরের ভূমিকা ছিল সত্য ও ন্যায়ের পথে। সংবাদ পরিবেশনায়, মূল্যায়নে যুগান্তর আমাকে সাহসী করেছে। সত্য উচ্চারণে সাহসী সৈনিক হয়ে যুগান্তরের পাশে থেকে আমি আশ্রয় খুঁজেছি সত্যের কাছে। যুগান্তর আমাকে বারবার ইতিহাসবিদ তকিউভিলের (Alexis de Tocqueville) একটি উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তকিউভিলে বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রগুলো খুবই অবিবেচক সাধারণ কর্মকাণ্ডের দিকে নাগরিকদের চালিত করে, এটি আমি জোর দিয়ে অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু সংবাদপত্র ছাড়া সাধারণ কর্মকাণ্ড বলতে কিছুই থাকে না। ফলে তারা যত ক্ষত তৈরি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সারায়। যুগান্তর গত ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের সমাজের ‘ক্ষত’ সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছে অবিচলভাবে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। প্রায় ক্ষেত্রেই বলা হয়- বাংলাদেশের গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া স্বাধীন নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’র কথা বলা হয়েছে। ৩৯(১)-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ ৩৯(১)(ক)-তে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার এবং ৩৯(২)(খ)-তে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তবে এখানে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃংখলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে অথবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংগঠনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষেই’ এ অধিকার নিশ্চিত হবে। তবে সংবাদপত্রগুলো এ স্বাধীনতা কতটুকু ভোগ করে এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সাংবাদিক নেতারা এবং দেশের শ্রেষ্ঠ আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে একাধিক মামলায় এই ৩৯ ধারাটি উল্লেখ করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে বারবার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক, সে প্রশ্ন আছেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে Special Power Act 1974 প্রবর্তন করা হয়েছিল। অভিযোগ আছে, ওই আইনের আওতায় সংবাদপত্র ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ বিশেষ আইনটি দীর্ঘদিন চালু ছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে যে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই সরকার Special Power Act 1974-এর কিছু ধারায় পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে ওই আইনের ১৬, ১৭ ও ১৮ ধারা বাতিল করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথ কিছুটা প্রশস্ত করে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের পরিধি বেশ সম্প্রসারিত হয়েছে। একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশন ছিল দেশের একমাত্র টিভি স্টেশন। কিন্তু এখন বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু টিভি চ্যানেল চালু রয়েছে। যেখানে অনেকটা নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবেই সরকারকে সমালোচনা করে অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। টিভি প্রতিবেদনেও ব্যাপক বৈচিত্র্য এসেছে। টক-শোগুলোও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসব টক-শো স্পন্সর করছে। শুধু তাই নয়, Private Program Production policy in BTV 2001-এর আওতায় সরকারি বিটিভিতে বেসরকারি প্রোগ্রামও সম্প্রচার হচ্ছে, যার ফলে বিটিভির মান কিছুটা বেড়েছে। স্বাধীন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, সন্দেহ নেই। তবে সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪ নিয়ে নতুন করে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক নেতারা মনে করছেন, এ নীতিমালা গ্রহণ করে সরকার তাদের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইংরেজি দৈনিক Dhaka Tribune তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, Information Ministry has issued the gazette notification of the National Broadcasting Policy 2014 in August 2014, though there has been a roar over the broadcasting policy. The Journalists leaders have claimed that they have been betrayed with the policy. BNP has called upon the Govt. to cancel the policy. সম্প্রচার নীতিমালায় একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করার প্রস্তাব করা হলেও এখন অব্দি এ কমিশন গঠন করা হয়নি। কাদের নিয়ে এ কমিশন গঠিত হবে, তাও স্পষ্ট নয়। কমিশনের কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কার্যাবলী দেখাশোনা এবং এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা। কমিশন গঠনের এ সিদ্ধান্তকে গণমাধ্যমের কর্মীরা স্বাগত জানিয়েছেন। গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা 'Article 19'-এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান তাহমিনা রহমান এ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তার মতে, 'This would be a significant attempt toward distancing the government from functions of the electronic Press through this independent commission'। সম্প্রচার নীতিমালায় মিডিয়া কর্মীদের কী করণীয়, কোনটা করা ঠিক নয়- এসব বিষয়ে কিছু কথা বলা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে- Under the policy, broadcast outlets are prohibited from disseminating any news, photos or videos that could tarnish the image of law enforcing agencies and armed forces. It prohibits any broadcasts that directly or through advertisement, run counter to the government or public interest, and forbids the broadcasting of news that could cause 'communal discord' or impede National Security. সুতরাং সম্প্রচার নীতিমালাটি যে কিছুটা ‘নির্দেশনামূলক’ তা অস্বীকার করা যাবে না। স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য এ নীতিমালাটি আদৌ ক্ষতিকর কিনা, ক্ষতিকর হলে কতটুকু ক্ষতিকর- এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। ইতিমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটিও বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার নিরাপত্তাবোধ থেকে কার্টুন, ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মতো বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। উদ্বেগের জায়গাটা এখানেই।
যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, সত্যের সন্ধানে যুগান্তর কখনও পিছপা হবে না। এ সাহসী উচ্চারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একদিকে যেমন একটি উৎসাহব্যঞ্জক অনুপ্রেরণার উৎস, অন্যদিকে আমাদের জন্যও একটি আশার আলো। যুগান্তর ‘সত্যের সন্ধানে নির্ভীক’ এ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। আজও তাতে এতটুকু ‘ক্লান্তি’ আসেনি। যুগান্তরের এ স্লোগানের সঙ্গেই থাকতে চাই বাকি দিনগুলো।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক