Wednesday, June 4, 2025

ঈদের দিনে কোরবানি নয়, গাজায় চলবে ক্ষুধা আর কান্নার উৎসব

ঈদ মানেই খুশি, উৎসব আর ত্যাগের মহিমা। কিন্তু ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ঈদুল আজহা এবার আসছে শুধুই কান্না, ক্ষুধা আর রক্তের স্মৃতি বয়ে। ইসরায়েলের প্রায় দুই বছর ধরে চলা অব্যাহত হামলা ও অবরোধে বিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে ঈদের ছোঁয়াও যেন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।

গাজার আকাশজুড়ে এখনও ধোঁয়া। বাতাসে এখনও বারুদের গন্ধ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর পর থেকে ইসরায়েলের লাগাতার বোমাবর্ষণে নিহত হয়েছে ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সোয়া লাখ। শুধু হামলাই নয়, গাজায় প্রবেশ করা সব ধরনের ত্রাণ, খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আটকে দিয়ে এক বিভীষিকাময় অবরোধ সৃষ্টি করেছে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি।

এই নিষ্ঠুরতা ঈদের খুশিতেও ছায়া ফেলেছে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ বছর গাজায় কোরবানির পশু প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। গাজার প্রাণী ব্যবসায়ী ও খামারিরা বলছেন, সীমিত সংখ্যক পশু থাকলেও সেগুলোর দাম এত বেশি যে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

গাজার বাসিন্দা আবু হাতিম আল-জারকা জানান, গত বছরের অক্টোবর থেকে কোনো পশু গাজায় আসেনি। যে কয়টি পশু আছে, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পর্যন্ত জোগাড় করতে পারছেন না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই এলাকায় পশুপালনও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

ফলে এবারের ঈদে কোরবানির তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং অধিকাংশ ফিলিস্তিনি পরিবার হয়তো একটি টুকরো মাংস দেখার স্বপ্নটুকুও দেখতে পারবে না। বাস্তুচ্যুত বহু ফিলিস্তিনি জানিয়েছেন, তারা ঈদের কোনো প্রস্তুতি নিতে পারেননি। খোলা আকাশের নিচে, খাদ্যবিহীন অবস্থায় ঈদের নামাজ পড়ার পর দিনের বাকি সময়টুকু কাটবে অনাহারে।

গাজার বাজারগুলোতেও নেই কোনো উৎসবের আমেজ। ইসরায়েলের আরোপিত দুর্ভিক্ষের বাস্তবতায় খাদ্য ও সবজির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। অনেকেই মাসের পর মাস মাংসের মুখ দেখেননি।

এই বাস্তবতায় গাজার মানুষের কাছে ঈদ মানে শুধু একটুখানি বেঁচে থাকার চেষ্টা। কোরবানির পশুর বদলে তারা ত্যাগ করছেন আর্তনাদ, উৎসবের বদলে শুনছেন শোকের সুর। এ যেন ঈদের দিনেও মৃত্যু আর ক্ষুধার সঙ্গে এক অসহায় জনগোষ্ঠীর নীরব যুদ্ধ।

রান্না করা একটুখানি খাবারের আশায় অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনি শিশুরা- গাজায় মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। ছবি : সংগৃহীত
রান্না করা একটুখানি খাবারের আশায় অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনি শিশুরা- গাজায় মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। ছবি : সংগৃহীত


নির্বাসনে থেকেও কীভাবে ইরানে বিপ্লব সফল করলেন রুহুল্লাহ খোমেনি by জাভেদ হুসেন

সৈয়দ রুহুল্লাহ মুসাবি খোমেনি (১৯০২–১৯৮৯) ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি চিন্তাবিদ, রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর জীবন ও চিন্তাধারা শুধু ইরান নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

খোমেনি ১৯০২ সালে ইরানের খোমেন শহরে জন্মগ্রহণ করেন একটি ধর্মপরায়ণ শিয়া পরিবারে। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর তিনি কোম শহরে গিয়ে ইসলামি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। ফিকহ (ইসলামি আইন), দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার গভীর অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে তিনি একজন মুজতাহিদ বা স্বাধীন ধর্মীয় ব্যাখ্যাদানের যোগ্য আলেম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৬০-এর দশকে সৈয়দ রুহুল্লাহ ইরানের রাজতন্ত্র, বিশেষত মোহাম্মদ রেজা শাহ পহলভির পশ্চিমঘেঁষা ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। ১৯৬৩ সালের ৫ জুন তাঁর নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ, যা ‘১৫ খরদাদ বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। সরকারের বিরুদ্ধে এই অবস্থানের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার ও পরে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

১৯৬৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খোমেনি তুরস্ক, ইরাক ও পরে ফ্রান্সে নির্বাসনে ছিলেন। এই সময়ে তিনি ‘বিলায়াত-এ-ফকীহ’ (ধার্মিক শাসকের অভিভাবকত্ব) মতবাদ প্রকাশ করেন, যেখানে বলা হয় একজন যোগ্য আলেম রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার রাখেন। এ ধারণা পরে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৯৭৯ সালে বিপ্লব চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং শাহ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। খোমেনি স্বদেশে ফিরে এসে বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন এবং গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ‘সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা ধারণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ইরান ইসলামি আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

খোমেনির প্রভাব বহুস্তরীয়। একদিকে তিনি একজন ধর্মীয় সংস্কারক, যিনি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ও ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে একত্র করতে চেয়েছেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রভাববিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর ভাষণ ও লেখাগুলো বিশ্বের বহু ইসলামি আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

খোমেনি ১৯৮৯ সালে মারা যান। তাঁর জানাজায় অংশ নেয় প্রায় এক কোটি মানুষ—এটা ছিল ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজাগুলোর একটি। তাঁর জীবন ও মৃত্যু ঘিরে ইরানে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্রতীকের রাজনীতি। সেই রাজনীতি আজও ইরানের ভবিষ্যৎকে নির্ধারিত করে। তিনি একদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক, অন্যদিকে এক স্বপ্নভঙ্গের কেন্দ্র।

১৯৭৯ সালে ইরানে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, সেটি শুধু ইসলামিক আন্দোলন ছিল না। ছিল এক বহুমাত্রিক গণ–অভ্যুত্থান। সেখানে মেহনতি শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, নারীবাদী ও বামপন্থী নানা শক্তি মিলেছিল রাজতন্ত্র ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এবং সেই সময় ইরানে তাদের সংখ্যা ও প্রভাব ছিল বিপুল। ফলে ইরান বিপ্লব শেষে যে রূপ নেয়, তা অনেকের কাছেই ছিল হতাশাজনক।

একটি জাগরণের স্বপ্ন

১৯৭০-এর দশকে ইরান ছিল মার্কিনপন্থী এক স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। সম্রাট ছিলেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনে। ইরানে ছিল বিপুল তেলসম্পদ। তবুও দেশের সাধারণ মানুষ ছিল দারিদ্র্যপীড়িত ও রাজনৈতিকভাবে অবদমিত। গ্রামাঞ্চলের কৃষক ও শহরের শ্রমজীবীদের অবস্থা ছিল মর্মান্তিক।

শাহ ‘সাদা বিপ্লব’ নামে পরিচিত তথাকথিত আধুনিকায়ন প্রকল্প নিয়েছিলেন। সেই প্রকল্প মূলত ভূস্বামীদের ক্ষমতা আরও বাড়িয়েছিল। সেই সঙ্গে একপ্রকার পুঁজিবাদের আওতায় এনে কৃষকেরা হয়েছিলেন আরও নিঃস্ব। এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৮-৭৯ সালে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নামেন। ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি বামপন্থী সংগঠন, বিশেষ করে তুদেহ পার্টি ও খালক ওয়ারি বিপ্লবের অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল।

শ্রমিকশ্রেণির সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবের এক পর্যায়ে দেশজুড়ে শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়। দেশের অর্থনীতির প্রাণ তেলক্ষেত্রের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা শোরার (শ্রমিক পরিষদ) মাধ্যমে স্বশাসন কায়েম করে। এটা ছিল একধরনের শ্রমিক-জনতান্ত্রিক কল্পনার বাস্তবায়ন। এই শোরা ছিল রাশিয়ার সোভিয়েত আদলের। রুশ বিপ্লবের পর এত বিশাল পরিসরে সাধারণ মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা আর দেখা যায়নি।

খোমেনির উত্থান

এই সময়েই প্যারিসে নির্বাসিত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাম মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। ধর্মীয় ভাষায় উচ্চারিত তাঁর রাজনৈতিক বার্তাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য এবং প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তিনি পশ্চিমা আধিপত্য, শাহের দমননীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু তিনি কখনো খোলাখুলি একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কৌশলগত কাঠামো তুলে ধরেননি। তাঁর বয়ানে বিপ্লব ছিল ‘স্রষ্টাভিত্তিক ইনসাফের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো এই সময় ইরানে এসে বিপ্লবী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। পশ্চিমা জগতে বিপ্লব মানে ছিল মার্ক্সবাদ, শ্রেণি সংগ্রাম, পুঁজিবিরোধী তত্ত্ব। কিন্তু ফুকো খোমেনির নেতৃত্বে উদীয়মান ধর্মীয় বিপ্লবকে একধরনের ‘আত্মিক রাজনৈতিক জাগরণ’ বলে মনে করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, পশ্চিমের ক্ষমতা-কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে ইরান একটি নতুন প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করছে। সেই ভাষা আত্মা, স্রষ্টা, সমাজ ও ন্যায়বিচারকে একসূত্রে বেঁধে দেয়।

কিন্তু বিপ্লবের কয়েক বছরের মধ্যে যখন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠে, নারী প্রশ্ন ভিন্নভাবে দেখা হয়, বামপন্থীদের গণহারে গ্রেপ্তার ও হত্যা শুরু হয়—তখন ফুকো তাঁর অবস্থান নিয়ে নীরব থাকেন। পরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেন, তিনি পরিস্থিতির গভীরতা বোঝেননি। ফুকো তখনো ধর্ম ও মুক্তির সংমিশ্রণের বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেননি। অবশ্য এখনো তা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেননি।

খোমেনি কেন সফল হয়েছিলেন

খোমেনি কেন সফল হয়েছিলেন—এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দেখতে হবে তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, সময়ের বাস্তবতা, সমাজের অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভ এবং ধর্মীয় ভাষার শক্তিকে কীভাবে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। তাঁর সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমার কারণে নয়, বরং একটি সমাজব্যবস্থার ভেতর জমে থাকা গভীর অস্থিরতা ও আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্য দিয়ে এসেছে।

খোমেনির সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল—ধর্মকে নিছক ব্যক্তিগত আচারের জায়গা থেকে টেনে এনে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা। তিনি ইসলামের ভাষায় এমন এক ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজের ভাবনা নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে ধনী-গরিবের ব্যবধান থাকবে না, দুর্নীতিবাজ আমলারা থাকবে না এবং সমাজ হবে ধর্মভিত্তিক ন্যায়পরায়ণ। তাঁর বক্তৃতা ও লেখায় বারবার ‘মোস্তাজাফিন বা নিপীড়িতদের পক্ষে কথা এসেছে। এই আখ্যান ইরানের দরিদ্র, গ্রামীণ, প্রান্তে বাস করা মানুষদের কাছে আবেদন রেখেছিল।

খোমেনির সাফল্যের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর মোর্চা গঠনের কৌশল। ১৯৭০-এর দশকে ইরানে ইসলামপন্থী, বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী, শ্রমিক, ছাত্র ও পেশাজীবী—সবাই–ই শাহবিরোধী ছিল, কিন্তু তাদের কোনো ঐক্য ছিল না। খোমেনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, যিনি সবাইকে এক কেন্দ্রে টানতে পেরেছিলেন। যদিও এই ঐক্য ছিল সাময়িক এবং দ্ব্যর্থতাপূর্ণ। কিন্তু শাহবিরোধী শক্তির কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবের একটি মৌলিক আদর্শিক কাঠামো দাঁড়ায়, যেখানে ‘শাহবিরোধিতা’ এবং ‘ইসলামিক ন্যায়ের রাষ্ট্র’ এক হয়ে যায়।

খোমেনি যখন ইরান ছেড়ে ইরাক, পরে প্যারিসে নির্বাসিত অবস্থায় ছিলেন, তখনো তিনি অত্যন্ত সংগঠিতভাবে তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে প্রচার চালিয়েছেন। ক্যাসেট টেপ, লিফলেট, হুজরা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে তিনি একটি শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এই প্রযুক্তিগত কৌশল ছিল বিপ্লবের নতুন দিগন্ত। তাঁর বক্তৃতা ও বার্তা ক্যাসেট টেপের মাধ্যমে দেশের গ্রামেগঞ্জে, মসজিদে মসজিদে ছড়িয়ে পড়ে—একটি অদৃশ্য কিন্তু সুসংগঠিত বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে ওঠে।

খোমেনি তাঁর বয়ানে আবেগ, শোক ও নৈতিক উচ্চতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ আনতে পেরেছিলেন। তিনি ‘কারবালা’ বা ‘হুসাইনি আত্মত্যাগ’-এর বয়ানকে রাজনীতির ভাষায় রূপ দেন। তিনি বলতেন, শাহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আসলে হকের পক্ষে বাতিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই তাত্ত্বিক কাঠামো ইরানিদের ঐতিহাসিক শোক ও আত্মপরিচয়ের বোধের সঙ্গে মিলে যায়। ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ভাষায় অনুবাদ করতে তাঁর জুড়ি ছিল না।

খোমেনি নিজে একটি প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে গভীর ধর্মীয় পণ্ডিত, অথচ রাজনৈতিকভাবে কৌশলী, ধৈর্যশীল, নির্লোভ। এই ভাবমূর্তিই তাঁকে সাধারণ নেতার বাইরে তুলে দেয়। শাহ যখন বিলাসিতায় আকণ্ঠ ডুবে, তখন খোমেনির জীবনের সাদাসিধে ভঙ্গিমা মানুষের মধ্যে গভীর আস্থা জাগায়।

শ্রমিক, কৃষক ও নারীর স্বপ্নভঙ্গ

ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর বিপ্লবী চেতনার নানা অংশ ধ্বংস করা হয়। শ্রমিকদের স্বশাসিত শোরাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। ধর্মীয় নজরদারির আওতায় নিষিদ্ধ হয় শ্রমিক ইউনিয়ন। কৃষকদের স্বপ্ন ছিল জমির মালিকানা। কিন্তু ইসলামি শাসনে ‘ওয়াক্‌ফ’ ও ধর্মীয় ট্রাস্টের নামে জমি আবার নতুন একধরনের শোষণ কাঠামোয় ফিরে যায়।

নারীদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ। যারা বিপ্লবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে, তারাই ‘হিজাববিরোধী’, ‘অবাধ্য’ ইত্যাদি নানা অপবাদে নিপীড়নের শিকার হয়। নারীদের শিক্ষা, পোশাক, কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়।

তুদেহ পার্টি প্রথম দিকে খোমেনির সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল। তারা বিশ্বাস করেছিল ইসলামিক বিপ্লবের ভেতর দিয়েই হয়তো সমাজতান্ত্রিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। কিন্তু ১৯৮৩ সালের মধ্যে তুদেহ নিষিদ্ধ হয়, হাজারো বামপন্থীকে কারারুদ্ধ করা হয়, অনেককে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। ১৯৮৮ সালে কারাগারে ৪০০০-৫০০০ রাজনৈতিক বন্দীকে একসঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়।

খোমেনি জীবদ্দশায় একদলীয় ইসলামি তত্ত্বের কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন—ভিলায়েতে ফকিহ অর্থাৎ শাসক আলেমের আধিপত্য তত্ত্বের মাধ্যমে। এই কাঠামো আজও ইরানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত অনুশাসনের মধ্যে রাখেননি, বরং তা দিয়ে রাষ্ট্র, আইন, বিচার ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিলেন।

তাঁর এই উত্তরাধিকার একদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধের প্রতীক। তবে অন্যদিকে দেশের ভেতরে ভিন্ন চিন্তার, নারী স্বাধীনতার, শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্র হয়েছে কঠোর।

বিপ্লব কি পথ হারিয়েছিল

প্রতিটি বিপ্লবই একটি শূন্যতার ওপর গড়ে ওঠে। একটা পুরোনো ব্যবস্থার পতনের পর নতুন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ থাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে লুকিয়ে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে সেই শূন্যতা পূরণ করেছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের শক্তি। যদিও সেই শক্তি শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রে রূপ নিয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন আছে। তবে খোমেনি সেই বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মৃত্যুদিনে তাঁকে মনে করাটা এক প্রশ্নকে সামনে আনার সুযোগ দেয়। ইরানের জনগণ যে গণতান্ত্রিক, শ্রমিকবান্ধব, নারীবান্ধব ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল—সেটি আসলে ঠিক কোন পথে অর্জন সম্ভব? সেই আশা এখন খোদ ইরানে কি এখনো জীবিত?

জাভেদ হুসেন প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পোস্টার নিয়ে ইরানে শাহবিরোধী বিশাল বিক্ষোভ
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পোস্টার নিয়ে ইরানে শাহবিরোধী বিশাল বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: এএফপি

যে বিজ্ঞানীকে বহিষ্কার করে কপাল চাপড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, উচ্ছ্বসিত হয়েছে চীন

১৯৫০ সাল। তখনো কেউ জানত না, যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই ছিল স্নায়ুযুদ্ধ জয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। সেই চাবিকাঠির নাম শিয়ান শ্যুসেন। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান একজন চীনা রকেটবিজ্ঞানী, যিনি এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও অস্ত্রপ্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক) ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) কর্মরত অবস্থায় শিয়ান জেটচালনার (জেট প্রপালশন) জটিল ধাঁধার সমাধান করেন। তাঁর গবেষণার ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম গাইডেড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়। তাঁকে কর্নেল পদে উন্নীত করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে যুক্ত করা হয়।

এখানেই শিয়ান থেমে থাকেননি। তিনি গোপন ‘ম্যানহাটান প্রকল্পে’ কাজ করেছিলেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁকে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল নাৎসি বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে। শিয়ানের স্বপ্ন ছিল, মহাকাশে প্রথম পা রাখবেন একজন আমেরিকান। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি তখন একটি রকেট তৈরির কাজ করছিলেন।

ঠিক তখনই থেমে গেল শিয়ানের উত্থানের পথ। ক্যারিয়ারের চূড়ায় পৌঁছানোর মুহূর্তে একদিন তাঁর দরজায় কড়া নাড়ে এফবিআই। স্ত্রী ও শিশুসন্তানের চোখের সামনে তাঁকে হাতকড়া পরানো হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ থেকে তাঁকে মুক্তি দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে আর ফিরিয়ে নেয়নি। ১৯৫৫ সালে এক ডজন মার্কিন যুদ্ধবন্দীর বিনিময়ে ড. শিয়ান শ্যুসেনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কমিউনিস্ট–শাসিত বেইজিংয়ে।

এই একজন মাত্র ব্যক্তির নির্বাসনের পরিণতি ছিল বিপর্যয়কর। চীনে ফিরে শিয়ান শ্যুসেন সরাসরি মাও সে–তুংকে রাজি করান, তাঁকে কাজে লাগিয়ে যেন আধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তি কর্মসূচি গড়ে তোলা হয়। তার ঠিক এক দশক পর চীন তাদের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায়।

আর ১৯৮০ সাল নাগাদ দেশটি এমন শক্তি অর্জন করে, যা দিয়ে চাইলেই ক্যালিফোর্নিয়া কিংবা মস্কোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো যায়। ড. শিয়ান শুধু চীনের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ কর্মসূচির জনকই নন, চীনে প্রযুক্তিগত বিপ্লবও তাঁর হাত ধরে শুরু হয়। একসময় যা চীনকে পরাশক্তিতে পরিণত করে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদক উল্লেখ করেছেন, শিয়ানের জীবনের গল্প বারবার তাঁর মনে দাগ কেটেছে। তিনি বলেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি জীবনী লিখছি। এ সময়ে আমরা দেখেছি, ট্রাম্প প্রশাসন কতটা কঠোরভাবে বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে।’

গত বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা দিলেন, প্রশাসন চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা ‘শিগগিরই বাতিল’ করার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে যাঁরা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত বা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, তাঁদের ওপর এ নিয়ম জারি করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী আছেন, যাঁদের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি চীনা নাগরিক।

শিয়ান শ্যুসেনের নির্বাসনের গল্পটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কবার্তা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া এ সিদ্ধান্ত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিদেশিদের প্রতি একধরনের ভীতি ও সন্দেহ থেকে যার সূত্রপাত ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে যেটা বিশ্বশক্তির ভারসাম্য চিরতরে বদলে দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতির মতো, তখনো শিয়ান শ্যুসেন সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির ‘বাম ভীতি’র (রেড স্কয়ার) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এর কারণ একটাই, তিনি একজন চীনা নাগরিক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। নিরাপত্তা অনুমোদন বাতিল হওয়ায় তিনি গভীরভাবে অপমানিত হন। ড. শিয়ানকে বাদ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্র মানববাহী মহাকাশ অভিযানে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পেছনে ফেলার সুযোগ হারিয়েছিল। শুধু তা–ই নয়, একই সঙ্গে চীনারা এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব-প্রতিপত্তিকে চ্যালেঞ্জ করারও একটা সুযোগ পেয়ে যায়। শিয়ানের বদৌলতে চীনের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান ঘোচানোর পাশাপাশি ড. শিয়ানের দেশে প্রত্যাবর্তন চীনে বহু প্রজন্ম ধরে দেশীয় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও অগ্রগতির সূত্রপাত ঘটিয়েছে। আজও ওয়াশিংটন কোটি কোটি ডলার খরচ করে পারমাণবিক প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদেশগুলোকে তার প্রযুক্তিগত অর্জন থেকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।

সাবেক নৌবাহিনী সচিব ড্যান কিমবল ড. শিয়ানকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘এটা ছিল এই দেশের করা সবচেয়ে বোকামির কাজ।’

১৯৬০-এর দশকে এই দর্শনের বাস্তব রূপ দেখা যায়। চীনের শীর্ষস্থানীয় ২০০ বিজ্ঞানীর তিন-চতুর্থাংশই তখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে নোবেল পুরস্কারও পান। এই শিক্ষাগত সেতুবন্ধের পেছনে ড. জেমসের বৃত্তি কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ড. শিয়ান মাত্র ২৩ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তিনি যে বৃত্তি নিয়ে পড়তে এসেছিলেন, সেটি আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে অতীতের মানসিকতার প্রতীক বলেই মনে হয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিনিময় কার্যক্রম মার্কিন মূল্যবোধ প্রচারে সহায়ক হবে এবং বিশ্বশান্তি গঠনে ভূমিকা রাখবে—এমন বিশ্বাস থেকে এ বৃত্তি দেওয়া হতো।

এই বৃত্তি তহবিল গড়ে তুলেছিলেন বেইজিংয়ে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এডমন্ড জেমস। তাঁর উদ্যোগে ড. শিয়ানসহ আরও অনেক চীনা শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার সুযোগ পান। প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টকে লেখা এক চিঠিতে ড. জেমস লিখেছিলেন, ‘যে জাতি বর্তমান প্রজন্মের চীনা তরুণদের শিক্ষিত করতে সফল হবে, সে জাতিই সবচেয়ে কম খরচে নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারে সর্বোচ্চ ফল পাবে।’

ড. শিয়ান ক্যালিফোর্নিয়ায় কিছু তরুণ, উদ্যমী ও প্রতিশ্রুতিশীল বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তাঁরা নিজেদের মজা করে ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ বলে ডাকতেন। কারণ, রকেট পরীক্ষণের সময় অন্তত একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাব উড়ে গিয়েছিল।

প্রকৌশলীদের এক বার্ষিক সভায় ‘সুইসাইড স্কোয়াড’-এর দুই সদস্য ঘোষণা করেন, তাঁরা এমন একটি রকেট বানানোর পথ বাতলেছেন, যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে এক হাজার মাইল উঁচুতে সোজাসুজি উড়তে পারে। এরপর দ্রুতই তাঁদের দলকে আরেকটি আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়, ‘দ্য জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি’।

১৯৪৯ সালে ড. শিয়ানকে ওই ল্যাবরেটরির প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এটি তখন নাসার প্রাথমিক সংস্করণ হিসেবে পরিচিত ছিল। তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে চাননি, বরং রকেট প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত বিমানযাত্রার পরিকল্পনাও সামনে এনেছিলেন। যার মাধ্যমে যাত্রীরা নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে এক ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছাতে পারবেন।

ড. শিয়ান কি গুপ্তচর ছিলেন? তিনি কি কমিউনিস্ট ছিলেন? এই দাবি দুটির কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল না। তবে মার্কিন সরকার আদৌ এসব নিয়ে ভেবেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ম্যানহাটান প্রকল্পে ড. শিয়ানের সঙ্গে কর্মরত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জে রবার্ট ওপেনহেইমারসহ উচ্চপদস্থ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এবং অনেক শিক্ষাবিদ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ফল মেলেনি। পাঁচ বছর গৃহবন্দী থাকার পর ড. শিয়ান যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হওয়ার জন্য চীনা সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত গোপন নথিপত্র থেকে জানা যায়, একপর্যায়ে আইজেনহাওয়ার প্রশাসনের চোখে ড. শিয়ান শ্যুসেন অবমূল্যায়িত এক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছিলেন। শেষমেশ তাঁকে কয়েকজন মার্কিন পাইলটের বিনিময়ে চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই বিনিময় নিয়ে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বিজয়ের উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা শিয়ান শ্যুসেনকে ফিরিয়ে এনেছি, এই একটি অর্জনই পুরো আলোচনাকে সার্থক করেছে।’

ড. শিয়ান আর কোনো দিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাননি। জীবনের বাকি সময় তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন খ্যাতিমান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চীনে তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে দেখা হয়, এমনকি তাঁর নামে একটি জাদুঘরও নির্মিত হয়েছে।

জীবনের শেষভাগে শিয়ানের মন্তব্যগুলোর বেশির ভাগ ছিল প্রযুক্তিগত নথিপত্র কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দলীয় প্রচার নিয়ে। তবে ১৯৬৬ সালে ক্যালটেকের এক পুরোনো সহকর্মী একটি পোস্টকার্ড পান। বেইজিং থেকে পাঠানো সে পোস্টকার্ডের ওপর ছিল ঐতিহ্যবাহী চীনা ফুলের একটি নকশা। সেখানে ড. শিয়ান একটিমাত্র বাক্যই লিখেছিলেন—‘এটি সেই ফুল, যা প্রতিকূল পরিবেশেও ফোটে।’

যদিও মার্কো রুবিওর ঘোষণায় বিস্তারিত তেমন কিছু ছিল না, তবু এটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ল্যাবগুলোর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও তাঁদের সহকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ কারণে সবাই আশঙ্কা করছেন, সামনে আরও অস্থিরতা আসতে পারে।

তবে শুধু উদ্বেগ নয়, এর মাধ্যমে আরও একটি বড় কিছু হারিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র একসময় বিশ্বাস করত, বিশ্বের মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণদের শিক্ষাদান এই দেশের শক্তি ও মর্যাদা বাড়ায়। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত সুবিধা। বিশ্বের সেরা চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী ও ভবিষ্যৎ নেতারা যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসতেন। এখানকার গণতন্ত্র ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতেন। এই সুযোগটাই এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

চীনের জন্য ড. শিয়ান শ্যুসেনের অর্জিত সাফল্যগুলো দেখিয়ে দেয়, যদি আমরা বিশ্বের মেধাবীদের স্বাগত না জানিয়ে দূরে সরিয়ে দিই, তাহলে বড় সুযোগ হারিয়ে ফেলব। এমনকি ওই মেধা একদিন আমাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা হতে পারে। তাই এটা একটা বড় ঝুঁকি, যা ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

শিয়ান শ্যুসেন
শিয়ান শ্যুসেন। ছবি: লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ফটোগ্রাফিক আর্কাইভ/ইউসিএলএ লাইব্রেরি স্পেশাল কালেকশনস।

গাজায় ত্রাণকেন্দ্রের কাছে ইসরাইলের গুলি, জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তের আহ্বান

গাজার অভুক্ত মানুষের ওপর গুলি করে কমপক্ষে ৩১ জনকে হত্যা করেছে ইসরাইল। এ খবরে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইসরাইল যে অস্ত্র দিয়ে নীরিহ সাধারণ ও অভুক্ত মানুষকে গুলি করে হত্যা করছে, সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার ডাক উঠেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ওই গুলিবর্ষণের ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘটনাটিকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

রোববার সকালে রাফার আল-আলামের কাছে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের সামনে হাজারো ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি জড়ো হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ ইসরাইলি ট্যাঙ্ক ও সেনারা তাদের দিকে গুলি ছুঁড়তে থাকে। হামাস-পরিচালিত সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানায়, এতে ৩১ জন নিহত ও ১৭৬ জন আহত হয়েছেন। রেড ক্রস জানায়, তাদের হাসপাতালে ১৭৯ জন আহত ও ২১ জন নিহত ব্যক্তিকে নেয়া হয়।  এর মধ্যে নারী, শিশুও রয়েছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে, তারা ত্রাণকেন্দ্র বা তার আশপাশে কোনো বেসামরিক নাগরিকের দিকে গুলি চালায়নি। সব রিপোর্ট মিথ্যা। তাদের দাবি সেনারা কেবল সন্দেহভাজন কিছু ব্যক্তিকে প্রতিরোধ করেছে এবং কিছু সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। আইডিএফ জানায়, ঘটনাস্থলে কেউ হতাহত হয়নি। ত্রাণ কার্যক্রম পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল। প্রচারিত খবরগুলো সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন।

ন্যদিকে ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) জানায়, তাদের চিকিৎসা কেন্দ্রে গুলিবিদ্ধ ও ছররা গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত বহু মানুষ গিয়েছেন। রোগীরা জানান, তাদের ওপর ড্রোন, হেলিকপ্টার, নৌযান ও ট্যাঙ্ক থেকে গুলি চালানো হয়। একজন সাংবাদিকের দাবি, ত্রাণকেন্দ্রের কাছে যখন লোকজন দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ইসরাইলি ট্যাঙ্কগুলো সামনে এগিয়ে এসে গুলি চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, খোলা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা মানুষ গুলির শব্দ শুনে আতঙ্কে লুকাচ্ছে। যদিও ভিডিওর সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায়নি। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস বলেন, আমি হতবাক যে ক্ষুধার্ত মানুষ ত্রাণ নিতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি। জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, বর্তমানে গাজায় যেভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, তা অমানবিক ও অবমাননাকর। তিন মাস ধরে খাদ্য ও ওষুধহীন মানুষগুলো এমন বিপদে পড়ে যাচ্ছে। এটি এক নিদারুণ উদাসীনতার চিত্র।

ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুতেরেসের মন্তব্যকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করে এবং কেন তিনি হামাসের নাম উল্লেখ করেননি তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আইডিএফ ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি অভিযোগ করেন, এগুলো সব হামাসের প্রচার। কেউ নিহত বা আহত হয়নি। মিডিয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ‘হামাসের সূত্রে’ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

সোমবার সকালে রাফার তাল আল-সুলতান এলাকায় একই ত্রাণকেন্দ্রের কাছে আরও তিন ফিলিস্তিনি নিহত হন। রেড ক্রস ও নাসের হাসপাতাল জানায়, তাদের কাছে ৫০ জন আহত, তিন মৃতদেহ পৌঁছায়। সিভিল ডিফেন্স জানায়, উত্তর গাজার জাবালিয়ায় একটি ঘরে ইসরাইলি বিমান হামলায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। 

mzamin

গাজায় ত্রাণকেন্দ্রে ফের হামলা চালালো ইসরাইল, নিহত ২৭: ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আহ্বান পেন ইন্টারন্যাশনালের

গাজায় ত্রাণকেন্দ্র লক্ষ্য করে আবারও হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ২৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা কয়েক ডজন। মঙ্গলবার উপত্যকাটির দক্ষিণাঞ্চলে রাফা শহরের একটি ত্রাণকেন্দ্রে ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন নৃশংস হামলা চালায় ইসরাইল। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, এ নিয়ে তৃতীয় বারের মতো ত্রাণকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালালো ইসরাইলি বাহিনী। গুলি চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে ইসরাইল। দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে রাফার একটি ত্রাণকেন্দ্রে কার্যক্রম পরিচালনার সময় একদল মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে তাদের বাহিনী। তাদের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় লোকগুলোকে গুলি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে আইডিএফ। তবে এ বিষয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছে ইসরাইল। গাজার উত্তরাঞ্চলে তিন সেনা নিহতের খবরের পরপরই ত্রানকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব হতাহতের বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। ত্রাণকেন্দ্রে এমন হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার এমন হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধের সামিল বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব মানবাধিকার এই সংস্থা। তারা বলেছে, গাজায় খাদ্য সংগ্রহ করতে আসা নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যা কখনই মেনে নেয়ার মত না। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতারেসের পক্ষে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক। 
ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আহ্বান পেন ইন্টারন্যাশনালের
রাইটার্স সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনাল সোমবার এক খোলা চিঠিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গাজা যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত সকল পক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিতে। বিশেষত ইসরাইলের ওপর। কারণ তারা দখল করে নেয়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলায় ওইসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। লন্ডন-ভিত্তিক এই সংগঠনটি খোলা চিঠিতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গাজায় চলমান ‘গণহত্যার’ জন্য ইসরাইলকে দায়বদ্ধ না রাখায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের ব্যর্থতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ।

চিঠিতে প্রতিদিনের বেসামরিক হত্যা ও দীর্ঘ অবরোধের নিন্দা জানানো হয়েছে, এই আক্রমণ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, দখল করে নেয়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি লেখকদের মর্মস্পর্শী সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছেন- ইসরাইলের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনি জনগণ এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার জন্য পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত প্রচেষ্টার প্রমাণ রয়েছে, বিশেষত গাজায়। সংগঠনটি জানিয়েছে, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তাদের অভিন্ন মত হলো, গাজায় বিভিন্ন উপায়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে।

পেন ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরাইলি বোমাবর্ষণে অন্তত ২৩ জন লেখক নিহত হয়েছেন (শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী ছাড়া)। পেন ইন্টারন্যাশনাল এই সময়টিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লেখকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময় বলে আখ্যায়িত করেছে। তারা বলেছে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস, সাংস্কৃতিক স্থান ধ্বংস, লেখক ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা- সবই ফিলিস্তিনি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার একটি ‘ইচ্ছাকৃত কৌশল’।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অসংখ্য সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদরা মনে করছেন গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল। তার সঙ্গে যুক্ত হলো পেন ইন্টারন্যাশনাল। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) গত বছর বলেছে, ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার যৌক্তিক ঝুঁকি রয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, মানবিক সংস্থা ও শত শত আইনি বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যা গবেষক এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। এমনকি ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট হারেৎজ পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে এই অভিযানকে ‘বিনাশযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও তিনি ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার থেকে বিরত ছিলেন।

পেন ইন্টারন্যাশনালের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গাজার অনেক মৌলিক ও অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপরিবর্তনযোগ্য ক্ষতি হয়েছে- স্বাধীন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ও সাহিত্যকর্ম, যেগুলো কঠিন শর্তে গড়ে উঠেছিল এবং পরে যুদ্ধের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।

২০২৫ সালের মে মাসের শেষ পর্যন্ত ইউনেস্কো নিশ্চিত করেছে, গাজায় ১১০টি সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় নিদর্শন, ঐতিহাসিক ভবন, জাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।

পেন ইন্টারন্যাশনালের সংগৃহীত সাক্ষ্য ফিলিস্তিনি লেখকদের প্রতিদিনকার জীবন-মরণ পরিস্থিতি তুলে ধরে। চিঠিতে তারা বলেছে, নিরবচ্ছিন্ন ইসরাইলি সামরিক অভিযান, তথাকথিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’-এও উচ্চ বিস্ফোরক দিয়ে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, বেসামরিকদের লক্ষ্য করে স্নাইপার হামলা এবং মানবিক সহায়তার ওপর অব্যাহত বিধিনিষেধ- এই সবই দৈনন্দিন এক কঠোর বাস্তবতা। প্রত্যেক লেখকই বারবার জোর দিয়ে বলেছেন: গাজায় নিরাপদ কোনও স্থান নেই।

১৯২১ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত পেন ইন্টারন্যাশনাল এখন একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংগঠনটি একটি প্রস্তাব পাস করে, যেখানে ৭ অক্টোবর হামলার পর ফিলিস্তিন ও ইসরাইলে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা, নির্বিচার আটক এবং তথ্যপ্রবাহে বাধার নিন্দা জানানো হয়। এইসব লঙ্ঘনের জন্য প্রস্তাবে মূল দায়িত্ব চাপানো হয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের ওপর।
mzamin

‘দ. এশিয়া চিরস্থায়ী সংঘাত সহ্য করতে পারে না’ ভারত-পাকিস্তান অন্যরকম ‘যুদ্ধ’ চালাচ্ছে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অন্যরকম এক যুদ্ধে লিপ্ত ভারত ও পাকিস্তান। পেহেলগাম হামলা ও তার ফলশ্রুতিতে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে, তদবির করতে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে উভয় দেশ। কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বে ভারতের প্রতিনিধি দল তার দেশের পক্ষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা বিদেশ সফর করছেন।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় এই প্রতিনিধি দল এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে মার্কিন প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যে, দক্ষিণ এশিয়া চিরস্থায়ী সংঘাত সহ্য করতে পারে না। টেকসই শান্তির জন্য প্রয়োজন সংলাপ, সহযোগিতা এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক কূটনীতি।

অনলাইন জিও নিউজ এ খবর দিয়ে বলছে, পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির নেতৃত্বে নয় সদস্যের এই প্রতিনিধি দল সম্প্রতি দুই দিনের সফরে নিউইয়র্কে পৌঁছায়। সফরের মূল উদ্দেশ্য ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরা এবং ভারতের প্রচারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চ্যালেঞ্জ করা। দলটি জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি অ্যাম্বাসাডর ডরোথি শিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে তারা দক্ষিণ এশিয়ার ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করেন।

বিলাওয়াল বলেন, আমরা শান্তির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আমাদের সার্বভৌমত্বে হামলার জবাবে আমরা সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। পাকিস্তানি দলটি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে। সেখানে তারা ভারতের ইসলামবিদ্বেষ, দখলীকৃত কাশ্মীরে দমন-পীড়ন, মিথ্যা প্রচারণা ও কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নস্যাৎ করার প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে।

তারা বলেন, মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে। জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি ফু কং-এর সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তান-চীন যৌথভাবে ভারতের একতরফা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি রক্ষার ওপর জোর দেন। চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের সঙ্গেও পাকিস্তানি সংসদীয় দল বৈঠক করে। তারা ভারতের পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, বেসামরিক জনগণের উপর হামলা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ জানান।

তারা রাশিয়াকে আহ্বান জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও আইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা নিতে। পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে। এর মধ্যে আছে ডেনমার্ক, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্লোভেনিয়া, আলজেরিয়া, সোমালিয়া ও গায়ানা। পাকিস্তান ভারতের ‘অসত্য প্রচার’ খণ্ডন করে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয় এবং জানায় যে, সিন্ধু নদের পানিচুক্তি স্থগিত করা হলে পাকিস্তানে পানির সংকট, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং একটি পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তারা বলেন, এই অঞ্চল আর কোনো সংঘাত সামাল দিতে পারবে না। এখন সময় এসেছে সংঘাত ব্যবস্থাপনা নয়, বরং সংঘাত নিরসনের পথে হাঁটার।

প্রতিনিধি দলটি সকল আলোচনায় বারবার কাশ্মীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে জানায়, টেকসই শান্তির জন্য জাতিসংঘের প্রস্তাব এবং কাশ্মীরি জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান অত্যাবশ্যক। তারা জানান, ভারতের তরফে চালানো অপারেশন সিঁদুরের মতো আগ্রাসী পদক্ষেপগুলো শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ভারতও পাল্টা কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ৩৩টি দেশে সাতটি বহুদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। তারা পাকিস্তানকে জঙ্গি সংগঠনের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এবং অপারেশন সিঁদুুরকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। উল্লেখ্য, এই অভিযানে বহু নিরীহ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান।

mzamin

অপারেশন সিঁদুর থেকে আমরা যা বুঝলাম by শশী থারুর

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে যে সামরিক অভিযানটি চালিয়েছে, তাতে পাকিস্তানের ভেতরে থাকা ৯টি জঙ্গিঘাঁটি ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এই অভিযান কেমন ছিল, তা বিশ্লেষণ করলে কিছু বিষয় স্পষ্ট হতে পারে।

প্রথমেই বলা যায়, ভারত জোরালোভাবে আঘাত করলেও সবকিছু খুব হিসাব করে করা হয়েছিল। হামলাগুলো ছিল নির্দিষ্ট জায়গায়, শুধু টার্গেট করা স্থাপনায়। যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতি না হয়, সে জন্য রাতের বেলা অভিযান চালানো হয়। অপারেশন সিঁদুর ছিল সামরিক দিক থেকে এক বড় সাফল্য।

পাকিস্তান হামলার সময় পুরোপুরি সজাগ ছিল। তারপরও ভারত তাদের প্রতিরক্ষা ভেঙে নির্দিষ্ট জায়গায় আঘাত হানে এবং কয়েকজন পরিচিত জঙ্গিকে হত্যা করে। পরে এই জঙ্গিদের জানাজায় পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তারাও অংশ নেন।

এই অভিযানে ভারত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জায়গায় হামলা চালিয়েছে। তবে শুরুতে ভারত ইচ্ছা করেই পাকিস্তানের সেনাঘাঁটি বা সরকারি কোনো স্থানে হামলা করেনি। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে, এটি যুদ্ধ নয়; বরং এটি জঙ্গি হামলার জবাব। কিন্তু পরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিলে ভারতকেও আরও কঠোর হতে হয়।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি পরিষ্কার তা হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ধরন এখন বদলে গেছে। আগে ভারত সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করত, কিন্তু এখন সেই দ্বিধা আর নেই।

এত দিন ধরে কাশ্মীর ইস্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার ভয়েই ভারত শুধু কূটনৈতিক পথে এগোচ্ছিল—নানা তথ্য-প্রমাণ পেশ করছিল, কিন্তু ফল মিলছিল খুব সামান্য। এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী কমিটিও পাকিস্তানকে রক্ষা করত। কারণ, তাদের পক্ষে দাঁড়াত পরিষদের এক স্থায়ী সদস্য। ভারত এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর নির্ভর করবে না। কূটনীতি চালু থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়াও থাকবে।

তৃতীয় বিষয় হলো, ভারত আর পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকিতে ভীত থাকবে না। পাকিস্তান অনেক দিন ধরেই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবেশী ও বিশ্বকে চাপে রাখত। কিন্তু ২০১৬ সালের সীমান্ত পেরিয়ে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, ২০১৯ সালে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া অঞ্চলে বিমান হামলা এবং সর্বশেষ অভিযান—সব মিলিয়ে ভারত দেখিয়েছে, তারা এখন নিয়ন্ত্রণরেখা বা আন্তর্জাতিক সীমানা মানছে না। এবার তো পাকিস্তানের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশেও আঘাত হেনেছে।

এভাবে ভারত প্রমাণ করেছে, পাকিস্তানের ভয় দেখানো আসলে ফাঁকা বুলি। ভারত বুঝতে পারছে, সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে জঙ্গিবাদের জবাব দেওয়া সম্ভব। তাতে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধবেই, এমন ভাবনার কোনো ভিত্তি নেই। এখন থেকে যদি পাকিস্তান আবার কোনো জঙ্গি হামলা ঘটায়, তাহলে ভারত তার জবাবে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালাবে। অপারেশন সিঁদুরের মধ্য দিয়ে ভারতের দিক থেকে এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে।

এখন থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখনই তাদের মদদপুষ্ট জঙ্গিদের কাশ্মীর বা ভারতের অন্য কোথাও হামলার জন্য পাঠানোর কথা ভাববে, তখনই তাদের ভাবতে হবে, এই হামলার জন্য ভারতের শক্তিশালী সামরিক পাল্টা আঘাত তারা মোকাবিলা করতে পারবে কি না।

এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, ভারত এবার পানি নিয়েও বার্তা দিয়েছে। অপারেশন সিঁদুর শুরুর ঠিক আগেই ভারত জানিয়ে দেয়, তারা এখন সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত রাখবে। যদিও ভারত এখনো সেই পানির ধারা সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো বাঁধ বা জলাধার বানায়নি, তবু এই ঘোষণা উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

ভারত এখন আর শান্তির বিনিময়ে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে রাজি নয়। তারা স্পষ্ট বলছে, যদি সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হয়, তাহলে পানি সরবরাহও প্রশ্নের মুখে পড়বে। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য এই পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সেই বিষয়কেই এখন ভারত কৌশলগতভাবে সামনে এনেছে।

এই অভিযানের আরেকটা বড় উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে দেখানো যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চলাফেরা করতে চায়। সামনে হয়তো যুদ্ধবিরতি কীভাবে হলো, তা নিয়ে অনেক তথ্য বের হবে। কিন্তু এখনই একটা জিনিস স্পষ্ট—ভারত যদি সামরিকভাবে চাপ না দিত, তাহলে এই যুদ্ধবিরতি হতো না। আর পাকিস্তান যখন হামলা থামিয়েছে, তখনই ভারতও তাদের অভিযান বন্ধ করেছে। এতে বোঝা যায়, ভারত যুদ্ধ করতে চায় না, কিন্তু কেউ জঙ্গি হামলা করলে তার জবাব দিতে দিল্লি পিছপা হবে না।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক শিগগিরই বদলে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আলোচনার সুযোগ এখন অনেক দূরের বিষয়। আসলে কাশ্মীরই যে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মূল কারণ বা সমাধান—এটি একটি ভুল ধারণা।

এই ধারণা মূলত পাকিস্তান উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়িয়ে থাকে, যাতে ভারতের একটি অংশের ওপর অধিকার দাবি করা তাদের জন্য সহজ হয়। আসলে এই ধারণা একধরনের ধর্মভিত্তিক চিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও বলেছেন, মুসলমানরা নাকি অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে থাকতে পারে না।

পাকিস্তান এই মানসিকতা না বদলালে ভারতকে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদিও ভারত মূলত যুদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার দিকেই মন দিয়েছে। তবু নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যাবে না, পাকিস্তানে শুভবুদ্ধি কাজ করে যাবে।

ভারত এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে, পাকিস্তানের উসকানির জবাব দিতে তারা প্রস্তুত। তবে সামনে ভারতকে আরও প্রস্তুতি নিতে হবে। সামরিক শক্তি বাড়াতে হবে। কূটনৈতিক দুর্বলতা দূর করতে হবে। দেশের ভেতরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে। নাগরিকদেরও মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে।

স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের তুলনায় ভারত অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। ভারতের মোট অর্থনীতি পাকিস্তানের চেয়ে ১১ গুণ বড়। সামরিক শক্তিও অনেক বেশি। কিন্তু পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির ভেতরে খুব প্রভাবশালী। তারা নিজেদের মতো করে বাজেট ঠিক করে। বড় বড় দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের পুরোনো সম্পর্ক আছে।

চীন ও তুরস্কের সঙ্গে তাদের সামরিক জোটও রয়েছে। এই জোটের কারণে পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। এখনো তারা তুরস্কের ড্রোন আর চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান (যেমন জে-১০ সি) এবং গাইডেড মিসাইল (যেমন পিএল-১৫) দিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে এবং ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই যদি যুদ্ধ হয়, তাহলে ভারত শেষ পর্যন্ত জিতবে ঠিকই, কিন্তু পাকিস্তানও বড় ক্ষতি করতে পারে।

শশী থারুর ভারতের লোকসভায় কংগ্রেস পার্টির এমপি ও দেশটির সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানের একটি স্থাপনা
ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানের একটি স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স

প্রাচীন মিশরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়া ধসে পড়ছে কেন?

পৃথিবীর অন্যতম ঐতিহাসিক বন্দরনগরী আলেকজান্দ্রিয়া ভয়াবহ সংকটের মুখে। বিখ্যাত ক্লিওপেট্রার জন্মস্থান এবং প্রাচীন লাইব্রেরির জন্য খ্যাত এই শহর ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পড়ছে। এর জন্য মূলত দায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলের ক্ষয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় (আর্থ ফিউচার) দেখা গেছে, গত ২০ বছরে ২৮০টি ভবন সম্পূর্ণরূপে ধসে পড়েছে। বর্তমানে আরও ৭,০০০-এর বেশি ভবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষকরা আলেকজান্দ্রিয়ার এই সংকটের জন্য সমুদ্রের পানির কারণে ক্ষয় ও লবণাক্ত পানির প্রবেশকে দায়ী করেছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ত পানি উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে প্রবেশ করছে, যা ভবনগুলোর নিচের মাটি ক্ষয় করে ফেলছে এবং ভবনগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮৬টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, ২০১টি ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়েছে, ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুরনো মানচিত্র (১৮৮৭, ১৯৫৯, ২০০১) ও স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে দেখা গেছে, শহরের উপকূল দ্রুতই ভিতরের দিকে সরছে। মাটির নমুনায় আইসোটোপ বিশ্লেষণ (যেমন বি৭) করে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় আইসোটোপের মাত্রা কম, সেসব জায়গার মাটি অনেক বেশি ক্ষয়প্রবণ। গবেষণার সহ-লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার পানি বিষয়ক বিজ্ঞানী ড. এসসাম হেগগি বলেন- এই ক্ষতির পরিমাণ শুধু ভবনের ইট বা সিমেন্টে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ক্ষতি। আমরা প্রত্যক্ষ করছি কীভাবে উপকূলীয় ঐতিহাসিক শহরগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন ভবিষ্যতের নয়- এটা এখনই বাস্তব। গবেষকরা প্রাকৃতিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেমন- উপকূল বরাবর বালুর ঢিবি ও গাছপালা দিয়ে প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার তৈরি, যা সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ ঠেকাতে সাহায্য করবে। এতে ভবনের নিচে পানির স্তর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না, ফলে ভবনের ভিত্তিও রক্ষা পাবে। আলেকজান্দ্রিয়ার অবস্থা শুধু মিশরের জন্যই নয়, বরং সমুদ্রতটবর্তী ঐতিহাসিক শহরগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আমরা শুধু ভবন নয়, সভ্যতার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেই চিরতরে হারাতে পারি।

mzamin