Tuesday, December 10, 2019

গ্রিন টি’র বাজার বড় হচ্ছে by মাসুদ মিলাদ

*গত বছর সবুজ চায়ের ব্যবহার হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার কেজি।
*বাংলাদেশে বছরে ৩ লাখ কেজির মতো সবুজ চা উৎপাদিত হয়।
*দিন দিন চাহিদা বাড়তে থাকায় নতুন কারখানা স্থাপন হয়েছে।

দুধ-চিনি মেশানো চায়ের স্বাদে অনেকেরই এখন অরুচি। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে এই পানীয় পানের ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের অনেকেই এখন সকালটা শুরু করতে চান দুধ-চিনিবিহীন চা দিয়ে। আরেকটু সচেতন মানুষ আরও এক ধাপ এগিয়ে বেছে নিচ্ছেন ‘গ্রিন টি’ বা সবুজ চা।
চা ব্যবসায়ীদের মতে, সময়ের হিসাবে কয়েক বছরের মধ্যে এই পরিবর্তন এসেছে চা পানে। ওজন নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর মতো নানা উপকারের কথা ভেবে এই চা পানে ঝুঁকছেন সচেতন মানুষেরা। সাধারণ চায়ের চেয়ে অধিকতর স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের চায়ের কাপে জায়গা করে নিয়েছে সবুজ চা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড ও সবুজ চা বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর তথ্যে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরে দেশে সবুজ চায়ের ব্যবহার বাড়ছে। বছরে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫ শতাংশ। অথচ সাধারণ চায়ের চাহিদা বৃদ্ধির হার কমবেশি ৫ শতাংশ।
চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সবুজ চা বিপণন ও উৎপাদনে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন কোম্পানি। পাঁচ বছর আগেও দেশে সবুজ চা বাজারজাত করত দুটি কোম্পানি। এখন নিজস্ব বাগানের উৎপাদন ও আমদানি করে সবুজ চা বাজারজাত করছে ছয়টি কোম্পানি। এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান।
চা বোর্ড ও ব্যবসায়ীদের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৩ সালে দেশে প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার কেজি সবুজ চা ব্যবহৃত হয়। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮ হাজার কেজিতে। গত দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার কেজিতে উন্নীত হয়েছে।
ফিনলে দিয়ে শুরু
উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশে সবুজ চায়ের যাত্রা শুরুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফিনলে গ্রুপের নাম। স্কটল্যান্ডভিত্তিক এই চা কোম্পানি বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় আকারে সবুজ চা উৎপাদন শুরু করে ১৯৮৩ সালে। শুরুতে শতভাগ সবুজ চা রপ্তানি করত তারা। তবে কয়েক বছর ধরে দেশে চাহিদা বাড়তে থাকায় বাজারজাত শুরু করে এই কোম্পানি।
ফিনলের পর কাজী অ্যান্ড কাজী টি কোম্পানি ২০০৬ সালে যুক্ত হয় সবুজ চা উৎপাদনে। কাজী অ্যান্ড কাজী উৎপাদিত সবুজ চা শুরুতে সিংহভাগই রপ্তানি করত। তবে দেশে চাহিদা বাড়তে থাকায় মোড়কজাত করে বাজারজাত করছে তারা। জানতে চাইলে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শোয়েব আহমেদ কোম্পানির সবুজ চায়ের বাজার নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী হননি।
পেডরোলো গ্রুপের হালদা ভ্যালি চা-বাগানে চার বছর আগে সবুজ চা উৎপাদন শুরু হয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অবস্থিত এই বাগানে চীন থেকে এনে চারা লাগানো হয়। চা-পাতা সংগ্রহ থেকে উৎপাদনের প্রক্রিয়া তদারকিও করছেন চীনের চা বিশেষজ্ঞরা। সবচেয়ে দামি ও উন্নত মানের ‘ড্রাগনওয়েল গ্রিন টি’ দেশেও বাজারজাত শুরু করেছে এই গ্রুপ। পেডরোলো গ্রুপের চেয়ারম্যান নাদের খান প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাজ্য, চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের বাজারে এই চা রপ্তানি হয়েছে। দেশীয় বাজারেও সবুজ চায়ের চাহিদা বাড়তে থাকায় ড্রাগনওয়েল এগুলো বাজারজাত করছে।
স্কয়ার গ্রুপ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মৌলভীবাজারের বড়লেখা ইউনিয়নে বছরে ২৫ হাজার কেজি উৎপাদনক্ষমতার সবুজ চায়ের কারখানা চালু করেছে। শাহবাজপুর চা-বাগানের কুঁড়ি ও পাতা অর্গানিক সবুজ চা তৈরিতে ব্যবহার করছে তারা। তবে স্কয়ার গ্রুপ প্রাথমিকভাবে নিজেদের ৬০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নিজস্ব প্রয়োজনে পুরোটাই ব্যবহার করছে। তবে ভবিষ্যতে এর বাজারজাত করবে তারা।
নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ
চাহিদা বাড়তে থাকায় সবুজ চা উৎপাদনে নতুন কারখানা স্থাপন করেছে চা বোর্ডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। শ্রীমঙ্গলে ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে নতুন এই কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, বছরে ৪০ হাজার কেজি উৎপাদনক্ষমতার নতুন কারখানাটি এ মাসের শেষে চালু হতে পারে। ফিনলেও এ বছর জুন বা জুলাইয়ে কারখানা সম্প্রসারণ করবে।
আমদানি-রপ্তানির চিত্র
সবুজ চায়ের যে বাজার বাড়ছে, তা আমদানির চিত্রেও উঠে এসেছে। কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সবুজ চা আমদানি হয় ৩ হাজার ১৭০ কেজি। গত অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫১০ কেজিতে। তবে সবুজ চা রপ্তানির সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রগুলো জানায়, রপ্তানির পরিমাণ এক লাখ কেজির বেশি।
বৈশ্বিক বাজার
আন্তর্জাতিক টি কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে মোট চা উৎপাদিত হয় ৫৫০ কোটি ৩০ লাখ কেজি। এর মধ্যে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ সবুজ চা। এর পরিমাণ ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ কেজি। এর মধ্যে এক চীনেই উৎপাদিত হয় ১৫৫ কোটি কেজি। এ ছাড়া ভিয়েতনামে ৯ কোটি কেজি, জাপানে ৭ কোটি ৬৯ লাখ কেজি, ভারতে ১ কোটি ৮৬ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়। একই সময়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় ২ লাখ ৭০ হাজার কেজি। সবুজ চাসহ গত বছর বাংলাদেশে মোট চা উৎপাদিত হয় ৮ কোটি ২১ লাখ কেজি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে ৩৬ কোটি ১৭ লাখ কেজি সবুজ চা রপ্তানি হয়। এর মধ্যে চীন একাই রপ্তানি করে ২৭ কোটি কেজি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের রপ্তানি ৬ কোটি ৩৫ লাখ কেজি। আর ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ১ কোটি ২৮ লাখ কেজি।

তেঁতুলিয়ায় চোখজুড়ানো চা বাগান by নাকিবুল আহসান নিশাদ

চা বাগানের কথা এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু-নিচু সবুজময় অপরূপ দৃশ্য। মূলত সিলেট বা শ্রীমঙ্গল অঞ্চলেই ভ্রমণপ্রেমীরা এগুলো বেশি দেখেন। তবে পঞ্চগড়ে দেশের একমাত্র সমতল ভূমির চা বাগান রয়েছে। আর্গনিক পদ্ধতির এই চাষাবাদ দেশে শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।
তেঁতুলিয়ায় চা বাগান
বিশাল চা বাগানের মধ্য দিয়ে চলে গেছে মসৃণ পাকা রাস্তা। যতই ভেতরে যাবেন ততই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। মাঝে চা বাগান রেখে বাংলাদেশ সীমান্তে দাঁড়িয়েই দেখা যায় ভারতের ছোট ছোট গ্রাম।
নারী শ্রমিকরা মাথায় ঝুড়ি বেঁধে চা পাতা সংগ্রহ করেন। চা বাগানের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে ছোট ছোট নদী। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এককথায় নয়নাভিরাম।
চা বাগানে বাহারি গাছও দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বহেরা, অর্জুন, তেজপাতা, আম ইত্যাদি। চারদিকে সবুজে ঘেরা এই মনোরম পরিবেশে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে সবারই!
তেঁতুলিয়ায় চা বাগান
নব্বইয়ের দশকে পঞ্চগড় জেলায় প্রথম ক্ষুদ্র পরিসরে সমতলে চা চাষ শুরু হয়। এখন তা বিশাল আকার ধারণ করেছে। একসময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি ও অনুন্নত জেলা পঞ্চগড় এখন সবুজ চা বাগানে ভরে উঠেছে।
স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব কাজী শাহেদ আহমদ প্রথম এই অঞ্চলে চা চাষ শুরু করেন। এই অঞ্চলের বৃহৎ চা বাগান কাজী টি এস্টেট নামে পরিচিত। দেশের অন্য কোথাও সমতল চা বাগান না থাকায় এগুলো আলাদাভাবে প্রাধান্য পেয়ে থাকে।
তেঁতুলিয়ায় চা বাগান
বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলাটিতে এ পর্যন্ত ২ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। জেলায় স্টেট পর্যায়ে আটটি (২০ একরের ওপর), ক্ষুদ্রায়তন (স্মল হোল্ডার) ১৫টি (৫ থেকে ২০ একর) ও ২৮০ জন ক্ষুদ্র চা চাষী (শূন্য থেকে ৫ একর) পঞ্চগড় চা বোর্ডে নিবন্ধিত। এর বাইরে প্রায় দুই হাজার ক্ষুদ্র পর্যায়ের চা বাগান রয়েছে। ২০১৭ সালে ৪২০ দশমিক ২৩ হেক্টর জমি নতুনভাবে চা চাষের আওতায় এসেছে।
তেঁতুলিয়ায় চা বাগান
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ে কম খরচে যেতে হানিফ কিংবা নাবিল পরিবহনের বাস রয়েছে। গাবতলী ও আসাদ গেট থেকে এগুলো ছেড়ে যায়। ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের মধ্যে গ্রিন লাইন, আগমনী কিংবা টিআর ট্রাভেলসের ভাড়া ৭৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। তবে এসব বাস রংপুর পর্যন্ত যায়। এ কারণে রংপুর থেকে পঞ্চগড়ে আলাদা পরিবহনে যেতে হবে। পঞ্চগড়ে এসে নামার পর তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধাগামী লোকাল বাসে ৪৫ টাকা ভাড়া নেবে। একঘণ্টায় তেঁতুলিয়া পৌঁছানো যায়।
তেঁতুলিয়ায় চা বাগান
কোথায় থাকবেন
পঞ্চগড় শহরে বিভিন্ন মানের বেশকিছু আবাসিক হোটেল আছে। এগুলোতে কক্ষভেদে প্রতি রাতের ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। তেঁতুলিয়ায় অবশ্য কোনও আবাসিক হোটেল নেই। তবে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে প্রাচীনকালের একটি ডাকবাংলো রয়েছে।
>>>ছবি: লেখক

কফিনের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন ‘হ্যাঁ’ by ইজাজ আহ্মেদ মিলন

কোনোভাবেই হিসেবটা মেলাতে পারছিলেন না সৈকত চৌধুরী। মেনে নিতেও কষ্ট হচ্ছে। নানা রকম ভাবনা ভিড় করছে মস্তিষ্কে। কেন এমনটা হলো! আনিকা শেলীর এমন আচরণে খ্যাতিমান লেখক সৈকত চৌধুরী শুধু ভেঙেই পড়েননি- চরম অপমানবোধও কাজ করছে তার ভেতরে। ‘খাঁটো’ উপন্যাসটির জন্য বেসরকারি একটি ব্যাংক প্রবর্তিত সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কথাশিল্পী সৈকত চৌধুরী। পুরস্কার হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়েছেন। সেই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানেও গিয়েছিলেন আনিকা শেলী। ক্ষোভ আর অভিমানে পুরস্কার পাওয়ার খবরটিও শৈলীকে জানায়নি সৈকত। পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি দেখে আনন্দে শেলী সেদিন কেঁদেছিলেন। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে নীরবে ফিরে আসেন শেলী। সৈকতের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু দেখা করেননি। ভালোবাসার মানুষের এমন প্রাপ্তি শেলীকে সব সময় আনন্দ দেয়-খুশি করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই শেলীর প্রেমে পড়েন সৈকত। গভীর প্রেম। সৈকত চৌধুরী জাতীয় দৈনিকগুলোর সাহিত্য পাতায় নিয়মিত গল্প লেখেন। সৈকতের প্রথম উপন্যাসের নাম ‘ খাঁটো’। বইটি তাকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়। ‘খাঁটো’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করেন আনিকা শৈলীকে। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন- ‘আমার ছন্দহীন একটি জীবনকে ছন্দময় করেছে, জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে সহযোগিতা করেছে- প্রিয়তমা আনিকা শেলীকে।’ সৈকত চৌধুরীর লেখালেখি মোটেও পছন্দের ছিল না শেলীর। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে বহুবার মান অভিমান হয়েছে। এক পর্যায়ে সম্পর্ক ভেঙেও যায়। সৈকত চৌধুরী লেখালেখি ছাড়তে পারেননি। শেলীর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তিনি লেখেন ‘খাঁটো’ উপন্যাস।
নীলক্ষেত এলাকার পুরনো বইয়ের দোকান থেকে প্রায় সময়ই প্রয়োজনীয় বই কিনে আনেন সৈকত। কখনো কখনো পল্টন এলাকায়ও যান। সত্যজিৎ রায়ের ‘অ্যাবস্ট্রাকশান’ নামের গল্পের বইটি কেনার জন্য সেদিন নীলক্ষেতের পরিমল বককর্ণারে পুরনো বইগুলো উল্টোচ্ছিলেন সৈকত চৌধুরী। হঠাৎ করেই চোখে পড়ে নিজের লেখা ‘খাঁটো’ উপন্যাস। চমকে উঠেন সৈকত চৌধুরী। বইটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে থাকেন। বলপয়েন্টে নিজের হাতের লেখা ‘প্রিয়তমা, আনিকা শেলীকে। তোমাকে এখনো আপনজন ভাবি, স্বপ্ন দেখি-সংসার গড়ার স্বপ্ন। বইটা পড়লে খুশি হবো। -সৈকত চৌধুরী। কপাল ঘেমে উঠছে। হাত কাঁপছে। এই বই এখানে? বিড় বিড় করে নিজেকে প্রশ্ন করেন সৈকত। বছরখানেক আগে সুকৌশলে পুরান ঢাকার বাসায় গিয়ে বইটা তিনি শেলীর হাতে দিয়ে এসেছিলেন। সেই বই এখানে? বইটা কিনে নিলেন তিনি। আটশ টাকা মূল্য। তিনশ দিয়ে কিনলেন। পাশের একটি চা-স্টলে বসে সিগারেট ধরানোর সময় সৈকতের মনে হলো- আমার সঙ্গে বিশ্বনন্দিত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ এর সঙ্গে দারুণ একটি মিল পেলাম। জর্জ বার্নার্ড শ এর জীবনেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করছিলেন চা-স্টলে বসে। জর্জ বার্নার্ড শ তার লেখা একটি নাটকের বই একবার প্রিয় এক অভিনেত্রীকে উপহার দিয়েছিলেন। বইয়ে নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন ‘নাট্যকারের ভালোবাসাসহ- জর্জ বার্নার্ড শ।’ এরপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে।
জর্জ বার্নার্ড শ’রও অভ্যাস ছিল পুরনো বইয়ের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় বই খুঁজে বের করে সেটা কিনে আনার। একদিন পুরনো বইয়ের দোকানে গিয়েছেন জর্জ বার্নার্ড শ। দুষ্প্রাপ্য কোনো বই খোঁজছিলেন। এমন সময় হঠাৎ তার হাতে উঠে এলো সেই বই, যেটা তিনি প্রিয় অভিনেত্রীকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। জর্জ বার্নার্ড শ’র বোঝতে আর বাকি রইলো না বইটি প্রিয় অভিনেত্রী বিক্রি করে দিয়েছেন। পুরনো দোকান থেকে নিজের লেখা নাটকের বইটি কিনে নিলেন জর্জ বার্নার্ড শ । বইটি আবার পাঠালেন প্রিয় অভিনেত্রীর কাছে। উপহার পেয়ে অভিনেত্রী এবার লজ্জা পান। কারণ, প্রথমবারের লেখার নিচেই জর্জ বার্নার্ড শ এবার লিখেছেন ‘আবার নতুন করে ভালোবাসা জানিয়ে’। জর্জ বার্নার্ড শ’র এই ঘটনা মনে করে সৈকত চৌধুরী খানিকটা হাসলেন। চা বিক্রেতা সৈকতের হাসির দৃশ্য দেখে ফেলেন। জানতে চান- স্যার, আফনে হাসলে ক্যান? আমার লুঙ্গিটা ছেঁড়া দেইখ্যা? সৈকত সাহেব তো হতবম্ব ! চা বিক্রেতার লুঙ্গির দিকে তো দৃষ্টিই পড়েনি। বললেন, আরে না! আমি তো আপনার লুঙ্গির দিকে তাকাই-ই নি। তাকালেই কি ছেঁড়া লুঙ্গি দেখে আমি হাসবো! এমনিতেই হাসলাম। একটা কথা মনে পড়েছে তো !
সৈকত চৌধুরী এবার হাঁটতে থাকলেন। নানা রকম প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মানে শেলী বইটি খুলেওনি? উপহার দেয়ার পরদিনই হয়তো ফেরিওয়ালার কাছে পুরনো পত্রিকার সাথে হয়তো বিক্রি করে ফেলেছে। বইটা তো অন্তত খুলে দেখা উচিৎ ছিল! ভাঁজও খুলেনি- সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। কী করা যায়! জর্জ বার্নার্ড শ’র মতো আবার কি বইটি শেলীর কাছে পাঠাবেন? নাকি অপমান বুকে জিইয়েই রাখবেন? এমন সব চিন্তা করতে করতে আজিমপুর বাসায় পৌঁছে যান সৈকত চৌধুরী। লেখালেখির কারণে শেলীর সাথে সম্পর্কই টেকেনি। সেই শেলীকে বই দিয়ে আসা এক ধরণে অপরাধ হয়েছিল, আবার পাঠাবো? প্রশ্ন করে নিজেকে। উত্তর আসে- ‘না’।
দুপুরের ঠিক পর বাসায় পৌঁছে ফ্যানটা অন করে বিছানায় গা এলিয়ে ক্লান্ত সৈকত চৌধুরী শুয়ে পড়েন। বের হওয়ার সময় টিভিটা অব করতে খেয়াল ছিল না। শুয়েই টিভির দিকে চোখ রাখেন সৈকত সাহেব। টিভিতে স্ক্রল যাচ্ছে ‘পুরান ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড : বহু হতাহতের আশঙ্কা’। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে শেলীর নাম্বারে কল করলেন। ফোন বন্ধ। আনিকা শেলী পুরানা ঢাকাতেই জরাজীর্ণ একটি ভবনে থাকেন। বাবা মারা গেছেন দশ বারো বছর আগে। মা আর ভাই থাকেন নওগাঁর রানীনগরের গ্রামের বাড়িত। একমাত্র ছোট ভাই সেলিম সবজির ব্যবসা করে শেলীর পড়াশোনার খবর দেন। পড়াশোনা শেষ হয়েছে কেবল। একটি চাকরি জন্য দৌড়াদৌড়ি করছেন শেলী। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ভাইভার জন্য অপেক্ষা। তার সব কিছুই ভালো লাগে- শুধু লেখালেখি ছাড়া। ছোট বেলায় স্কুলে এক শিক্ষক তার মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছেন- লেখকরা ছন্নছাড়া হয়, তারা বেখেয়ালি হয়, জীবনে অনেক কষ্ট করতে হয় তাদের, লেখকরা সংসারী হয় না। সংসার গড়লেও টেকাতে পারে না- এ সব নানা নেগেটিভ ধারণা। শিক্ষকের সেই কথা এখনো মনে আছে শেলীর। এ কারণে ভালোবাসার মানুষ লেখক হবে এবং তার সঙ্গে সংসার হবে এমনটা শেলী কখনো চায়নি। তার চাওয়াই পূরণ হয়েছে। সৈকত চৌধুরীর সঙ্গে তার ছেদ ঘটে।
চৌধুরী সাহেব টিভি চ্যানেলে লাইভে দেখছিলেন সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য। বারবার শিউরে উঠছিলেন। শেলী জীর্ণ ভবনটিতে বাস করতেন সেই ভবনেই আগুন। তার মোবাইলটাও বন্ধ। ওই অবস্থাতেই দ্রুত বের হয়ে পুরান ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন সৈকত। ভবনের সামনে হাজার হাজার মানুষ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন আগুন নেভাতে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক। স্বজনদের খোঁজছেন কেউ কেউ। সময় যতোই যাচ্ছে ততোই সেখানকার আকাশ ভারি হচ্ছে। পোড়া মানুষের গন্ধ বেরোচ্ছে। সৈকত খোঁজছেন তার প্রিয়তমা শেলীকে। অভিমান বুকে জমা থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। রাত ৩টা দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা একটার পর একটা লাশ বের করে আনতে থাকেন। ইতোমধ্যে শেলীর গ্রামের বাড়িতে টেলিফোন করে ওই ভবনে আগুন লাগার খবরটি জানিয়ে দেন। নওগাঁ থেকে শেলীর মা আর ভাই ঢাকা আসার জন্য গাড়িতে চড়েছেন। শেলীর সঙ্গে থাকতো তার এক প্রতিবেশী। নাম রুবী আক্তার। অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। রুমী টেলিফোন করে তার ভাইকে জানিয়ে দিয়েছে শেলী পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। আগুন লাগার সময় রুবী বাইরে ছিলেন বলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। সৈকত চৌধুরী খোঁজছেন শেলীকে।এরই মধ্যে রুমী তাকেও ফোন দিয়ে জানায় শেলী আর নেই। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশগুলো বাইরে এনে রাখা হচ্ছে। সারিবদ্ধ লাশের দিকে তাকানো যায় না। তবুও সৈকত প্রিয়তমাকে খোঁজছিলেন মানুষের ভিড়ে, কখনো আবার লাশের সারিতে। বাম হাতে একটা কাটা দাগ ছিল শেলীর। গলায় ছিল সোনার চেইন। চেইনটা খুব পরিচিত সৈকতের। এটা দেখে শেলীর অঙ্গার হয়ে যাওয়া নিথর দেহ শনাক্ত করেন তিনি। রাত কেটে যায় বীভিষিকাময় ভবনের সামনে। ভয়াবহ সে আগুনের ঘটনায় ৫১ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়।
ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে সৈকত চৌধুরী বাসায় ফেরেন। শেলীর নম্বর থেকে আসা ক্ষুদে বার্তাগুলো দেখতে থাকেন। তিনদিন আগে সর্বশেষ ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন শেলী। ক্ষুদে বার্তাটি তার চোখে পড়েনি। বেখেয়ালীপনার কারণেই হয়তো। সেখানে শেলী লিখেছেন ‘মাফ করে দিও। আমি তোমার বইটা ধরেও দেখিনি। অভিমান আর ক্ষোভে। তুমি আমার সঙ্গে জেদ করে লেখক হয়েছো। বিখ্যাতও হয়েছো। আমি খুব আনন্দিত। ভুলটা বোঝতে পেরেছি। আমি আবার তোমার ভালোবাসার আঁচলে জড়াত চাই। তোমার সঙ্গেই সংসার গড়তে চাই। ঠাঁই দিবে তো? বিসিএসে চূড়ান্তভাবে টেকার পরপরই বিয়ে করে ফেলবো।’ এরই মধ্যে শেলীর মায়ের ফোন আসে তার মোবাইলে। ফোন রিসিভ করতেই কান্নার শব্দ ভেসে আসে। কথা বলতে পারছিলেন না কন্যা হারা মা। নির্বাক সৈকত চৌধুরীও। ফোন কেটে দেয়ার পর শেলীর ক্ষুদে বার্তার উত্তর কী লিখবেন ভাবছিলেন। শুধু লিখলেন ‘হ্যাঁ’। কিন্তু এই বার্তা শেলী পাবে কী করে? তার মোবাইল তো পুড়ে গেছে- শেলীও তো অঙ্গার। এক টুকরো কাগজে সৈকত চৌধুরী লিখলেন ‘হ্যাঁ’। এবার মর্গে গিয়ে শৈলীর কফিনের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন সেই কাগজ। কাগজে লেখা শুধু ‘হ্যাঁ’। অ্যাম্বুলেন্সে উঠানো হলো কফিন। সৈকত চৌধুরী অপলক তাকিয়ে রইলেন অ্যাম্বুলেন্সের দিকে। সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে…।

বছরের সবচেয়ে বড় খবরের দাবি করলেন কঙ্গোর চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের একটি দল

ইবোলা নিয়ে কাজ করছে মেডিকেল টীম
আপডেট- ১৪ অগাস্ট ২০১৯: কয়েক দশক ধরে ইবোলা আবির্ভূত হয়েছে মানুষের জন্য বড় আতঙ্ক হিসেবে। কারণ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গেছেন এমন লোকের সংখ্যা খুব বেশি নয়।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টাতে শুরু করেছে, কারণ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বিজ্ঞানীরা ইবোলার চিকিৎসায় সাফল্য পাবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
তাদের গবেষণা বলছে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে ৯০ শতাংশ আক্রান্ত রোগীই বেঁচে যেতে পারেন।
কঙ্গোতে ইবোলা রেসপন্স এর সমন্বয়ক প্রফেসর জিয়ান জ্যাকুয়াস মুয়েম্বে আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলেছেন এই রোগ হয়তো খুব শিগগিরই 'প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য' হবে এবং তিনি এ পরীক্ষাকে 'বছরের সবচেয়ে বড় খবর' হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
"আমি অত্যন্ত খুশী এটা নিয়ে", তিনি বলছিলেন বিবিসিকে।
"ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা কীভাবে হতে পারে তা নিয়ে আমি চার দশক চিন্তা করেছি। তাই এটা আমার জীবনের বড় অর্জন।"
এই গবেষণাটি কঙ্গোতে হয়েছে, যেখানে গত অগাস্ট ২০১৮ থেকে ইবোলায় মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত এক হাজার আটশ।
চারটি ঔষধ ব্যবহার করে পরীক্ষাটি শুরু হয় গত নভেম্বরে।
সাতশ ব্যক্তিকে বাছাই করা হয় চিকিৎসার পরীক্ষার জন্য।
এর মধ্যে প্রথম ৪৯৯ জন যে ঔষধ দিয়ে আরোগ্য লাভ করেছেন তা এখন নিশ্চিত।
ড: মুয়েম্বে বলছেন দুটি ঔষধ যেগুলো ল্যাবরেটরিতে আরইজিএন-ইবি৩ ও এমএবি১১৪ নামে পরিচিত -সেগুলো ইবোলার বিরুদ্ধে খুবই সক্রিয়।
পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ইবোলায় আক্রান্তরা শুরুতেই চিকিৎসা নিলে সুস্থ হতে পারবেন
মূলত চিকিৎসার ধরণটা হলো এমন, যেখানে ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
আরইজিএন-ইবি৩ যেসব রোগীদের প্রয়োগ করা হয়েছে তাদের মৃত্যুর হার কমে ২৯ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে চিকিৎসা না করলে মৃতের হার ৬০-৭০ শতাংশ।
"এটা বড় ধরণের আবিষ্কার। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইবোলার কোনো চিকিৎসা নেই, কোনো টিকা নেই। তাই এটাই বছরের সবচেয়ে বড় খবর,"বলছিলেন ড: মুয়েম্বে।
বিবিসিকে তিনি বলেন যে যাদের এন্টিবডিসহ ইনজেকশন দেয়া হয়েছে তারা এক ঘণ্টার মধ্যেই ভালো বোধ করতে শুরু করেন।
কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বলেন যে মনে রাখতে হবে এটি চিকিৎসা, প্রতিরোধ নয়।
এটা ইবোলাকে রক্ত থেকে দু সপ্তাহের মধ্যেই সরিয়ে দেবে।
"এটা ভাইরাসটির বিরুদ্ধে একটি চিকিৎসা। কিন্তু এটা কোনো টিকা নয় এবং রোগীরাও সারা জীবনের জন্য সুরক্ষিত নয়।"
তার আশা আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে এই পরীক্ষা নিরীক্ষার চূড়ান্ত ফল জানা যাবে।
মিস্টার মুয়েম্বে ১৯৭৬ সালে যে দলটি ইবোলা চিহ্নিত করেছিলো সেই দলের একজন সদস্য। তিনি বলছেন নতুন আবিষ্কার রোগটির বিস্তার বন্ধ করতে ভূমিকা রাখবে।
"এর প্রভাব হবে অসাধারণ। কারণ মানুষজন ইবোলার প্রতিরোধে চিকিৎসাই নিচ্ছিলোনা। মানুষ চিকিৎসা কেন্দ্রকে মৃত্যুকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছিলো।"
আশা করা হচ্ছে নতুন আবিষ্কার ইবোলার বিস্তার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে
"এখন যদি দেখে যে মানুষ চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে ও সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরছে তাহলে তারা আর রোগীকে লুকিয়ে রাখবেনা। বরং হাসপাতালে নিয়ে আসবে। তাই রোগটির বিস্তার বন্ধ করার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।"
আশা...
মঙ্গলবার একজন মা ও এক সন্তান ইবোলার চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
৪২ বছর বয়সী ওই মা ও তার এক বছর বয়সী সন্তান দু সপ্তাহ আগে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার স্বামী ইবোলায় মারা গেছেন।
"আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই," আরও নয় সন্তানের জননী ওই নারী বলছিলেন সাংবাদিকদের।
"আমি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। এখন আমি সুস্থ যদিও আমার স্বামী মারা গেছেন। কারণ তাকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিতে দেরী হয়েছিলো।"
তিনি বলেন ইবোলা আছে ও এতে মানুষ মরছে কিন্তু আশার কথা আপনি দ্রুত সুস্থও হতে পারেন।

ইবোলা কী?

  • •ইবোলা একটি ভাইরাস যেখানে শুরুতে জ্বর হয়ে শরীর প্রচণ্ড দুর্বল ও প্রচণ্ড ব্যথা হয়। গলায় সমস্যা দেখা দেয়।
  • •এরপর বমি, ডায়রিয়া ও শরীরে রক্তক্ষরণ দেখা দেয়
  • •আক্রান্ত ব্যক্তির কেটে যাওয়া ত্বক, তার মুখ, নাক, বমি, রক্ত, মল বা শরীরের অন্য ধরনের তরল কোন পদার্থের সংস্পর্শে এলে নতুন করে কেউ আক্রান্ত হতে পারে
  • •পানিশূন্য হয়ে রোগীর মৃত্যু হয় বা শরীরে কয়েকটি অঙ্গ অকার্যকর হয়েও মৃত্যু হতে পারে।
১৯৭৬ সালে ইবোলা সনাক্তকারী দলের সদস্য ছিলেন ড: মুয়েম্বে

হাতে-পায়ে অসহ্য জ্বালাপোড়া? জেনে নিন কারণ ও প্রতিকার

হাত পায়ে জ্বালাপোড়া খুবই অস্বস্তিকর একটি রোগ। বিশেষ করে গরমের সময়ে এটি আরো অসহনীয় হয়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগটির নাম পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি । নানা কারণে, এমনকি মানসিক বিপর্যয় থেকেও এই রোগ হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাত-পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলেই এমন ঘটে। এর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে পুরো পোস্টটি পড়ুন।
এ রোগের প্রধাণ উপসর্গ হলো হাত বা পায়ের পাতা দুটি মাঝেমধ্যে জ্বলে উঠবে। কখনো সুই ফোটার মতো বিঁধে। ঝিম ঝিম বা অবশও লাগে। অনেকেরই এ ধরনের অনুভূতি হয়।
এই রোগের কারণ
* হাত-পায়ে জ্বালাপোড়ার বড় কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস। রক্তে শর্করার আধিক্য ধীরে ধীরে হাত-পায়ের স্নায়ুকে ধ্বংস করে এ ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করে।
* কিডনি ও থাইরয়েড সমস্যা থাকলে।
* শরীরে ভিটামিন বি ১২ ও বি ১-এর অভাব হলে।
* মদ্যপান, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি রোগ থাকলে।
* ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পায়ে জ্বালাপোড়া হতে পারে, যেমন যক্ষ্মা রোগে ব্যবহৃত আইসোনিয়াজিড, হৃদরোগে ব্যবহৃত অ্যামিওড্যারোন, কেমোথেরাপি ইত্যাদি।
* ছত্রাক সংক্রমণ।
* রক্ত চলাচলে সমস্যা।
* মহিলাদের মেনোপোজের পর।
* অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ।
এক্ষেত্রে করণীয়
* ডায়াবেটিসের রোগীরা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন, হাত-পায়ের যত্ন নিন।
* যাঁদের স্নায়ু সমস্যা আছে, তাঁরা হাত-পায়ের যেকোনো ক্ষতের দ্রুত চিকিৎসা নিন।
* পায়ে গরম সেঁক নিন। নখ কাটা ও জুতা নির্বাচনে সাবধান হোন।
* পায়ের সমস্যার জন্য সব সময় যে ভিটামিনের অভাবই দায়ী, তা নয়। তাই সব ধরনের সমস্যায় ভিটামিন বি খেয়ে উপকার পাওয়া যাবে না।
* দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমান।
* নিউরোপ্যাথি আছে প্রমাণিত হলে স্নায়ুর যন্ত্রণা লাঘব করে এমন কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে সেগুলো সেবন করতে পারেন।
কখন যাবেন ডাক্তারের কাছে
* জ্বালাপোড়া হঠাৎ শুরু হয়ে আর কমছে না।
* আঙুল বা পাতায় অনুভূতি কমে যাচ্ছে, অবশ মনে হচ্ছে।
* আপনার পায়ের স্নায়ু ঠিক আছে কি না, বোঝার জন্য অনেক সময় কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষারও প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি একটি আলপিন বা একটি টিউনিং ফর্ক ব্যবহার করেই হাতপায়ের অনুভূতি যাচাই করে নিতে পারবেন।
কৃতজ্ঞতা: ডাক্তার সানজিদা আজাদ
তথ্যসূত্র: কালেরকণ্ঠ

দক্ষিণ এশিয়া : ভ্রমণবিলাসীদের স্বপ্নপুরী

ভ্রমণবিলাসীদের জন্য দক্ষিণ এশিয়া স্বপ্নপুরী বিবেচিত হতে পারে। কেবল তাজমহল বা হিমালয় নয়, এর পরতে পরতে রয়ে গেছে শত শত অবিশ্বাস্য পর্যটন স্পট। কেবল দেখার জন্য চোখ দুটি খোলা রাখতে হবে। এসব স্পটের কোনো কোনোটি প্রত্যন্ত এলাকায় এবং তেমন পরিচিত নয়। আবার কোনো কোনোটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম নগরীগুলোর চাকচিক্যে আড়াল হয়ে আছে।
এখানে কয়েকটি অনেকটা অখ্যাত কিন্তু অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন স্পটের কথা আলোচনা করা হলো।
মাজুলি (ভারত)
দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের আসামে এর ঠিকানা। পর্যটকদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয় আসাম। অথচ এখানেই আছে ভারতের বৃহত্তম নদী-দ্বীপ মাজুলি। একবার দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছা হবে। আসামীয়দের কাছে এটা তাদের সাংস্কৃতিক রাজধানী। অনেক হিন্দু মন্দির আছে এখানে। ৪৫০ বর্গ কিলোমিটারের দ্বীপটি পাখি-দর্শকদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
স্বপ্ন-উদ্যান (নেপাল)
দি গার্ডেন অব ড্রিমসকে নেপালিরা কেশর মহলও বলে। ফায়ার ও আইস পিজেরিয়া দিয়ে থামেলে ঢোকার মুখে পড়ে স্থানটি। কাঠমান্ডু যাওয়ার পথে থামেল হয় সাধারণ পর্যটকদের প্রথম গন্তব্য। অত্যন্ত সুন্দর স্পট। তবে খুব কম পর্যটকই ভালো মতো তাকান এর দিকে। চমৎকার বৃক্ষরাজি, ইউরোপিয়ান-প্রভাবিত নেপালি প্যাভিলিয়ন ও বাগান এবং সেইসাথে রেস্তোরাঁ ও বার-সংবলিত জায়গাটি আয়েস করার জন্য সেরা স্থান হতে পারে। বাগান দিয়ে পায়চারী করার সময় যেকোনো মানুষই আবিষ্কারকে পরিণত হতে পারে। তাদের চোখে নিত্যনতুন প্রজাতি ধরা পড়ে।
সান্দুর পোলো টুর্নামেন্ট (পাকিস্তান)
পাকিস্তানের সান্দুর পাসে প্রতি বছর জুলাই মাসে হয় এই টুর্নামেন্ট। সমুদ্র স্তর থেকে প্রায় ৩,৭০০ মিটার উঁচুতে থাকা এই স্থানটিতে চিত্রল থেকে লাগে প্রায় ৯ ঘণ্টা। গিলগিট দিয়ে গেলে দরকার হয় ১৩ ঘণ্টা। ছয়টি অশ্বারোহী দল নিয়ে হয় আসরটি। সেই ১৯৩৬ সাল থেকে হয়ে আসছে এই টুর্নামেন্ট। যাতায়াত পথ বেশ দুর্গম। কিন্তু তবুও দর্শকের অভাব হয় না। এমনকি প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীরা পর্যন্ত হাজির হন মনোমুগ্ধকর এই প্রদর্শনী দেখতে।
হাপুতালে (শ্রীলঙ্কা)
সকালের মিঠে আলোতে শ্রীলঙ্কার হাপুতালে নগরী দেখেছেন? ১,৫৭৯ মিটার উঁচুতে থাকা নগরীটি শ্রীলঙ্কার মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমলের ছোঁয়া এখনো সজীব আছে এখানে। নগরীর চারপাশে আছে চা-বাগান। উল্লেখযোগ্য চা-বাগান হলো ডামবাতিন টি এস্টেট। এখনো এখানে ভিক্টোরিয়ান আমলের মেশিন দিয়ে চা পাতা প্রক্রিয়াকরণ করা হয়।
অনুবাদঃমোহাম্মদ হাসান শরীফ

নগ্ন জারোয়া দেখানোর ‘হিউমেন সফারি’ by পরিতোষ পাল

দেশে বিদেশে ‘হিউমেন সফারি’র কথাটা প্রবল আলোড়ন তৈরি করেছে। আন্দামানে পর্যটকদের নাকি বিজ্ঞাপন দিয়ে এই ‘হিউমেন সফারি’তে নিয়ে যাওয়া হয়। আসলে জঙ্গলে বন্যপ্রাণী দেখার চেষ্টা থাকে, এক্ষেত্রে প্রাণী নয়, সভ্যতার আলো থেকে যোজন দূরে থাকা বিশ্বের আদিমতম নগ্ন মানুষগুলিকে দেখার আকাঙ্ক্ষা থাকে বলেই একে বলা হচ্ছে হিউমেন সফারি।
বিদেশি পর্যটকরাই ব্যাপারে আগ্রহী বেশি। কয়েক বছর আগে বৃটেনে প্রচারিত একটি ফুটেজে দেখানো হয়েছে বিদেশি পর্যটকদের সামনে এক জারোয়া যুবতীকে নাচতে বাধ্য করা হচ্ছে। এরপরই প্রবল বিতর্কের ঝড় ওঠে।
তবে অভিযোগ শোনা গেছে, পর্যটকদের এই আকাঙক্ষা তৈরি করেছে আন্দামান প্রশাসনের তৈরি একটি সিদ্ধান্ত। বিতর্ক সত্ত্বেও প্রশাসন জারোয়াদের সংরক্ষিত অঞ্চল ফুঁড়ে নিয়ে গিয়েছে আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড নামের হাইওয়েকে। সড়ক পথে দক্ষিণ আন্দামান থেকে মধ্য হয়ে উত্তর আন্দামানে যাওয়ার এই হাইওয়ের ফলে জারোয়ারা অনেকটাই বেআব্রু হয়ে পড়েছে। ফলে তারা মাঝে মধ্যেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চলে আসছে হাইওয়ের উপরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভ্য মানুষের স্পর্শ পেয়ে তাদের চাহিদাও বেড়েছে নানা কিছুর।
এই প্রতিবেদক কিছুদিন আগে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে রওনা হয়েছিল উত্তর আন্দামানের দিগলিপুরের বাঙালিরা কেমন আছে তা অনুসন্ধান করতে। পথেই জারোয়া সংরক্ষিত অঞ্চলের প্রবেশ পথে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ‘হিউমেন সফারি’ নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রবল বিতর্কের পর এখন আইনের কড়াকড়ি যথেষ্ট। কোনও গাড়িকেই এই সংরক্ষিত এলাকায় সকাল নটা থেকে বিকেল তিনটের পর আর যেতে দেওয়া হয় না। ফলে সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশের মুখে চেকপোস্টে আটকে পড়েছিলাম। বিশাল গাড়ির লাইন। তখনও নটা বাজেনি।
ঠিক নটায় চেকপোস্টে নথিবদ্ধ করে গাড়ির কনভয় রওনা দিল। সঙ্গে তিনটি মোটর সাইকেলে মোবাইল পুলিশ। গোটা সংরক্ষিত আঞ্চলের পথ এরা পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তবে চেকপোস্টেই কঠোরভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সংরক্ষিত অঞ্চলে কোনও গাড়ি থামানো চলবে না। গতিও ৪০ কিলোমিটারের নীচে রাখা চলবে না। আর ছবি তোলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে বিশাল জরিমানা। সঙ্গে হুজ্জোতি।
রওনা দেবার পর কয়েক কিলোমিটার যাবার পরই হঠাৎ আমাদের সঙ্গের নজরদারি পুলিশ মোটর সাইকেলটি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়তেই দেখি একটি জারোয়া পরিবার উঠে এসেছে রাস্তায়। স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। সকলেই নগ্ন। মহিলার উর্দ্ধাঙ্গে কোনও কিছু নেই। নীচে লজ্জা নিবারণের জন্য সামান্য কিছু লতা-পাতা। তবে গলায় সামুদ্রিক জিনিষ দিয়ে তৈরি হার। পুরুষটির হাতে তীর, ধনুক।
পুলিশ এগিয়ে গিয়ে তাদের জঙ্গলে ফিরে যেতে ধমক দেওয়া মাত্র পুরুষ জারোয়াটি পুলিশের প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে কি যেন খুঁজতে লাগল। আমাদের গাড়ির চালক রাকেশ জানালো, কাঁচা সুপারি জাতীয় জিনিষের খোঁজ করছে। আন্দামানের অধিকাংশ মানুষই কাঁচা সুপারির খুব ভক্ত। আর এদের কাছ থেকেই এই নেশার হদিস পেয়ে জারোয়াদেরও এর চাহিদা বেড়েছে।
গাড়ি এগিয়ে চলল, এবার দেখা এক ষোল-সতের বছরের জারোয়া যুবকের সঙ্গে। রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে। এর পরণে অবশ্য একটি হাফফ্যান্ট। হাতে তীর, ধনুক। ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে যুবকটি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এর খানিক পরেই ফের মোবাইল পুলিশের তৎপরতা দেখে সচকিত হয়ে তাকাতেই দেখি উল্টোদিক থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে একটি গাড়ি বোঝাই পুরুষ ও মহিলা জারোয়াদের একটি দলকে। বেশ কয়েকজন মেয়ে জারোয়া গাড়িতে জায়গা না পেয়ে পেছনে ঝুলছে। পরণে কিছু না থাকলেও গলায় ও কোমরে সামুদ্রিক জিনিষের তৈরি অলঙ্কারের বাহার দেখার মত।
আমাদের গাড়ির চালকই জানালো, জঙ্গল থেকে এরা বেরিয়ে আসায় প্রশাসন এদের নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসছে। এটা নাকি মাঝে মাঝেই করা হয়। এর খানিক পরে ফের দেখা একজোড়া জারোয়া যুবকেরও । এদেরও হাতে তীরধনুক। তবে পরণে হাফ প্যান্ট। এই ভাবেই কথিত ‘হিউমেন সফারি’ পেরিয়ে আমরা পৌঁছে যাই বারাটাং।
সেখান থেকে কমলাপুরে আরেকটি জারোয়া সংরক্ষিত অঞ্চল পেরিয়ে যেতে হবে আমাদের। এখানে পুলিশের পাহারা না থাকলেও সংরক্ষিত অঞ্চলের প্রবেশ পথে সতর্কতার বিধি-নিষেধ একই রকম।
তবে আমরা এখানেও একজোড়া বয়স্ক জারোয়া রমণীর দেখা পেয়েছিলাম। এইভাবে জারোয়া দেখানোর কৃতীত্বটাকেই পুঁজি করে অনেক ভ্রমণ সংস্থা। তবে বিদেশিদেরই এই প্রলোভন দেখানো হয় বেশি করে। এমন অভিযোগ আদিবাসীদের নিযে যারা কাজ করেন তাদের।
আসলে একুশ শতকে পৌঁছেও আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আদি বাসিন্দা জারোয়া, সম্পেন, ওঙ্গি, সেন্টিনেল প্রভৃতি উপজাতির মানুষরা সভ্যতাকে বরণ করে নেয়নি। বরং সভ্য মানুষকে ঘৃণাই করে। জঙ্গলে তাদের বাসস্থান। আর নগ্নতাই আশ্রয়। হাতে লড়াইয়ের অস্ত্র তীর ধনুক। খাবার বলতে ফলমূল, বুনো শূয়র আর সামুদ্রিক মাছ।
তবে আন্দামানে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে জারোয়া দেখানোর কথা প্রচার করার একটা প্রবণতা দেখতে পেয়েছি। এ ব্যাপারে পর্যটকরাও যথেষ্ট আগ্রহ দেখান।
জারোয়া ছাড়া অন্য আদিম বাসিন্দরা থাকে প্রত্যন্ত দ্বীপগুলিতে, যার অধিকাংশতেই পর্যটকদের যাওয়া বারণ। নৃতত্বের এক অধ্যাপক জানিয়েছেন, কয়েক শ বছর আগে এই সব মানুষ আফ্রিকা থেকে আন্দামানে এসেছিল। এদের চেহারায় নিগ্রোদের প্রভাব স্পষ্ট। তবে একটি অংশের মধ্যে স্পষ্ট মঙ্গোলয়েড প্রভাব। এখনও তারা যেসব জায়গায় থাকে সেখানে মানুষকে প্রবেশ করতে দেয় না তারা। এদের তীরের বিষ স্পর্শে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে এরা এক একটি আলাদা অঞ্চলে বা দ্বীপে থাকে।
অন্যান্য উপজাতির মধ্যে হিংস্রতা এখনও প্রবল হলেও জারোয়াদের একাংশ সভ্যতার ছোঁয়া পেতে আগ্রহী হয়েছে। তবে গভীর জঙ্গলে যেসব জারোয়া থাকে তাদের কাছে পৌঁছানো এখনও সম্ভব হয়নি। তেমনি সম্ভব হয়নি সেন্টিনেলদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। নৃতত্ত্ববিদদের চিন্তার কারণ হল এদের সংখ্যা কমতির দিকে।
সাম্প্রতিক এক তথ্য থেকে জানা গেছে, জারোয়ারা সংখ্যায় মাত্র তিনশোর কাছাকাছি। ওঙ্গিদের সংখ্যা ১০৫, সেন্টিনেলদের সংখ্যা ২৫০, সোম্পেনদের সংখ্যা ২০০ থেকে ২৫০। সবচেয়ে কম হল গ্রেট আন্দামানিজরা। এদের সংখ্যা সাকুল্যে ৪৫ জন। এই সব আদিমতম মানুষগুলিকে টিকিয়ে রাখাই একটা বড় চ্যালেঞ্চ হয়ে উঠেছে।
তবে ১৯৯৮ সাল থেকে জারোয়ারা গভীর জঙ্গল ছেড়ে বাইরে আসা শুরু করে। এর পেছনে অবশ্য রয়েছে একটি ছোট্ট ঘটনা। এনমাই নামে এক জারোয়া যুবক পা ভেঙ্গে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। প্রশাসন খবর জানতে পেরে তাকে বুঝিয়ে নিয়ে এসেছিল পোর্ট ব্লেয়ারে। সেখানে তার দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। জারোয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সূত্র খুঁজে যায় প্রশাসনও। এনমাইকে সভ্য সমাজের মাঝে বেশ কিছুদিন রেখে পরে ফেরত পাঠানো হয়েছিল জঙ্গলে। সে জঙ্গলে গিয়েই প্রথম প্রবল উৎসাহে সভ্য সমাজের কথা, আর তার সুফলের কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিল তার সমাজকে। তখন থেকেই বাইরের জগতের মানুষ সম্পর্কে বিদ্বেষ ছেড়ে জারোয়াদের একটি অংশ আসতে শুরু করে হাইওয়েতে নানা জিনিষ পাবার আকর্ষনে।
প্রশাসনের কর্তারাও এটিকে সভ্য সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে করলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে ধরা পড়ে যে, জারোয়ারা ক্রমশ বিভিন্ন নেশা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তেমনি বর্হিজগতের সংস্পর্শে এসে জারোয়ারা মিজলস, মামস, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি নানা রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করে। যেসব রোগ আগে তাদের মধ্যে দেখা যায়নি।
অভিযোগ উঠেছে, জারোয়া যুবতীদের নিয়ে যৌনতায় উৎসাহ দিচ্ছে একশ্রেণীর অসাধু মানুষ। তাই বর্তমানে আদিবাসীদের কল্যাণের কাজে যুক্তরা মনে করছেন, জারোয়াদের মত আদিম মানুষগুলিকে যতদিন সভ্য সমাজের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা যাবে ততই ভাল।
এনথ্রোপলোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার আন্দামান শাখার প্রধানের মতে, জারোয়াদের মত আদিমতম মানুষগুলোকে জোর করে সভ্য সমাজের সঙ্গে সহাবস্থানের চেষ্টা করা হলে তা হবে তাদের গণহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া।

ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার কোনো সমাধান নয় by ইব্রাহিম কালিন

গত ৫ জুন এক বিরল বিদেশ সফরে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি হাঙ্গেরি যান এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর হাঙ্গেরির সরকারের প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুই নেতা বর্তমানে তাঁদের উভয়ের দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—অভিবাসনের ওপর আলোকপাত করেছেন। তাঁরা উল্লেখ করেছেন, মুসলমান অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে তাঁরা এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।’
এটা আসলেই বিস্ময়কর যে অং সান সু চি ও অরবান উভয়েই তাঁদের দেশে ‘মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির’ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যে সমস্যাটি তাঁদের দেশে আদৌ নেই। হাঙ্গেরিতে মাত্র পাঁচ হাজার মুসলমান রয়েছে, যদিও গত কয়েক বছরে যে কয়েক লাখ শরণার্থী সে দেশ অতিক্রম করে পশ্চিমে গিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই মুসলমান। তাদের মাত্র কয়েকজন হাঙ্গেরিতে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং দেশটির সরকার তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মিয়ানমারেও ‘মুসলিম অভিবাসন বৃদ্ধির’ সমস্যা নেই। প্রকৃতপক্ষে, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে হাজার হাজার মুসলমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যে রাজ্যটি কিনা কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলমান সম্প্রদায়ের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। তবে বার্মিজ ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দাবি হচ্ছে, মুসলমানরা সাম্প্রতিক ‘অভিবাসী’। তাদের এই দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন। বাস্তব কোনো ভিত্তি না থাকলেও অং সান সু চি ও ভিক্টর অরবান উভয়েই এই বলে জোর দিচ্ছেন যে তাঁদের দেশ ‘মুসলিম অভিবাসনের’ হুমকির সম্মুখীন।
মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের সমর্থক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত অং সান সু চি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন, যারা কিনা মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নির্যাতন চালিয়েছে। তারা হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ও প্রাণ বাঁচাতে ২০১৬ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এদিকে মিয়ানমারে এখনো যেসব মুসলমান রয়ে গেছে, তারা সহিংসতার হুমকিতে রয়েছে এবং নানাভাবে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ১০ হাজারের বেশি নাগরিককে ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য করা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক পরিদর্শক এবং গণমাধ্যমের প্রবেশের অনুমোদন নেই।
অং সান সু চি অবশ্য সামরিক বাহিনীর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের খুব সামান্যই সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। ২০১৭ সালে যখন রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের নৃশংস নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা বলেছেন, ‘মনে রাখতে হবে যে এ পরিস্থিতিতেই বুদ্ধ নিশ্চয়ই সেই দরিদ্র মুসলমানদের সাহায্য করেছেন। তারপরও আমি তাদের জন্য খুব বেদনা অনুভব করছি।’ এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত থাকলেও দালাই লামা এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলেননি।
মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নির্যাতন বন্ধে কারও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এদিকে সিরিয়ার সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করার ব্যাপারেও কোনো উদ্যোগ নেই। আট বছর ধরে সেখানে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালে ইউরোপে অভিবাসী এবং শরণার্থীদের স্রোত ঠেকানোর জন্য ইউরোপীয় নেতারা তুরস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ইইউর সদস্যপদ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে তারা তুরস্কের ঘাড়ে ৩৫ লাখ সিরীয় শরণার্থীর বোঝা চাপিয়ে দেয়। বাইরের বিশ্ব থেকে এই শরণার্থীরা খুব কম সাহায্যই পেয়ে থাকে।
সিরিয়ার যুদ্ধে এ পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকে এখনো একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে। তাদের অনেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছে। তবু ইউরোপীয়রা সিরিয়ার যুদ্ধ অবসানে খুব সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের উদ্বেগ কেবল মুসলিম অভিবাসন নিয়ে।
অবশ্যই মুসলমান অভিবাসন মিয়ানমার ও হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। আসল সমস্যা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ধাবিত করার জন্য মুসলমান অভিবাসনকে তাদের হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছে দুটি দেশ। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, লোকরঞ্জনবাদের উত্থান ও ডানপন্থীদের আন্দোলন, ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের ক্ষয়, মূলধারার রাজনীতির ব্যর্থতা ইত্যাদি তাদের দেশের আসল সমস্যা, মুসলমান বা অন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যার কার্যত কোনো সম্পর্ক নেই।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করলেই ইউরোপ বা এশিয়ার সমস্যার সমাধান হবে না। প্রায় ১৫০ বছর আগে কার্ল মার্ক্স একেবারে ঠিক বলেছিলেন যে ইউরোপের স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টি ইহুদিদের অন্তর্ভুক্তির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে আজ ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য কোথাও, এটা মুসলমানদের সমান মানুষ এবং সহ-নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার ওপর নির্ভর করছে।
>>>আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত। ইব্রাহিম কালিন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র।

ফারহানা হোসেনের বারো গলি তেরো জাত

কবি ফারহানা হোসেনের বারো গলি তেরো জাত উপন্যাস গত অমর একুশে বইমেলা ২০১৯এ প্রকাশিত হয়েছে। এটি লেখিকার প্রথম উপন্যাস। এ উপন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছায়া উঠে এসেছে। লেখিকার আগেও দুটি বই নিষুপ্ত নিষাদ ও উত্তরী হাওয়া নামে কাব্য প্রকাশিত হয়েছে।
উপন্যাস সম্পর্কে ফারহানা হোসেন বলেন, জীবনের অলিতে গলিতে নয়নতারার মতো ফুটে থাকে যে অসংখ্য জীবন তারই বয়ান এই বারো গলি তের জাত। মাত্র একটি দিনের বিবৃতিতে যেন ক্যানভাসে আঁকা হলো অনেকগুলো রঙের অনেকগুলো চরিত্র। কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। আবার ঘুরে ফিরে একই গলিতে বসতবাটি বলে প্রত্যেকেই পারস্পরিক সম্পর্কে সংযুক্ত। সেই সংযোগের সূত্র ধরে এগিয়ে চলে গোটা একটা দিনের কাহিনী যা শেষমেশ বাঁক নিয়েছে এক চমক। যেখানে কাহিনীর ঝোপঝাড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে শেষদৃশ্যে পাঠক থমকে যাবেন।
উপন্যাসটি জাগৃতি প্রকাশনী প্রকাশ করেছে। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। বইটির মূল্য ১৫০ টাকা।
ফারহানা হোসেনের জন্ম ৩১ অক্টোবর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে "আন্তর্জাতিক সম্পর্ক " বিভাগ থেকে এম এস এস ডিগ্রী অর্জন করেন ফারহানা হোসেন। দীর্ঘদিন কর্মরত আছেন "হোপ একাডেমি" নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ পরিচালক পদে। এক পুত্র ও এক কন্যার জননী। স্বামী মোস্তাক হোসেন সেনাবাহিনীতে মেজর পদে কর্মরত।
মেধার বিকাশ সাধনে পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই, এই মতাদর্শে বিশ্বাসী তিনি। বইপড়া তার প্রিয় শখ। শরৎচন্দ্রের লেখার ভক্ত ফারহানা সামাজিক বিপ্লব ঘটাবার ক্ষেত্রে লেখাকেই প্রাধান্য দেন বেশি। তাই লেখালেখিতে যুক্ত থাকতে চান আজীবন

কাশ্মীরে মন্দির পুনর্নির্মাণে একসাথে কাজ করছে মুসলিম আর পন্ডিতেরা by আমির আলী ভাট

নির্মাণাধিন মন্দির
দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামার সামরিক অধ্যুষিত আচান গ্রামে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির স্থাপন করেছে স্থানীয় অধিবাসীরা। প্রতিবেশী মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায় মিলে সেখানে একটি মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ করছে।
স্বামী জাগ্গারনাথ আস্থাপান নামে এই মন্দিরটি হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রার্থনার জন্য খুলে দেয়া হবে। আশি বছরের পুরো মন্দিরটির কাঠামো একই রকম থাকবে – গম্বুজাকৃতির ছাদ, সিলিং থেকে ঝুলন্ত একটি ঘন্টা এবং শিব লিঙ্গ ঘিরে রঙিন দেয়াল।
পুলওয়ামা হামলার পর সারা দেশে কাশ্মীরী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা শুরু হলে এই মন্দিরের পুনর্নির্মাণ থমকে যায়। সপ্তাহ খানিক আগে কাজ আবার শুরু হয়েছে।
মন্দিরে যারা কাজ করছে, তাদের চা খাওয়ানো ছাড়াও মুসলিম প্রতিবেশীরা প্রতিদিন মন্দিরের জায়গাটিতে সফর করেছে এবং কাজের তত্ত্বাবধান করছে।
নব্বই দশকের আগে প্রায় ৬০টি পণ্ডিত পরিবার আচানে এসে বসতি স্থাপন করে। সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থান হলে অন্যান্য গ্রাম আর শহরের মতো এখানকার পন্ডিত পরিবারগুলোও অন্য জায়গায় চলে যায়। শুধুমাত্র ভুষণলালের পরিবার এখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ভুষণের বাড়ি মন্দির থেকে কয়েক গজ মাত্র দূরে। তিন ভাই সঞ্জয় কুমার, দিপ কুমার এবং অশোক কুমারের সাথে সেখানে বাস করছেন তিনি।
ভুষণ দ্য ওয়্যারকে বলেন, “আমি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিজের গ্রাম কেন ছেড়ে যাবো? এমনকি নব্বইয়ের দশকের সময়েও আমি প্রতিদিন মন্দিরে প্রার্থনার জন্য যেতাম। কিন্তু এটার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল”।
গত বছর ভুষণ মসজিদ আওকাফ কমিটির সাথে কথা বলে তাদেরকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করে। ভুষণ বলেন, “সব সময়ের মতো এবারও মুসলিম ভাইদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাই আমি। এক সাথে মিলে আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করি। প্রতিটি পদক্ষেপ মুসলিম ভাইয়েরা আমাকে সাহায্য করেছে”।
যদিও গ্রামে একটি মাত্র পন্ডিত পরিবার বাস করছে, কিন্তু গ্রামবাসীরা মন্দিরটি পুনর্নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়।
গত মাসে সরকার যখন তহবিল ছাড় দেয়, মুসলিম প্রতিবেশীদের সহায়তা নিয়ে মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করে ভুষণ।
ভুষণ লাল
রঙের কাজ করেন শাবির আহমেদ মির। এখন তিনি মন্দিরে কাজ করছেন। শাবির বলেন, “ভুষণলাল যখন আমাকে মন্দির নির্মাণের কথা বললো, তখন আমি আমার সব কাজ বাতিল করেছি। মন্দিরের কাজটা সবার আগে করতে চেয়েছি আমি। ভুষণ লাল একাকি অনুভব করুক, এটা আমি চাইনি। আমরা মসজিদকে যেভাবে সম্মান করি, সেভাবে মন্দিরকেও সম্মান করা উচিত। এখানে কাজের সময়, সবকিছুরই দেখভাল করি আমরা”।
আরও যারা মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ করছে, তাদের মধ্যে রয়েছে গুলাম নবী শেখ, মুশতাক আহমেদ মালিক, তানভির আহমেদ মালিক এবং ভুষণের ছোট ভাই অশোক কুমার।
ভুষণ বলেন, দক্ষিণ কাশ্মীরে যে সব মন্দিরকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেখানো হয়, তার মধ্যে এটা একটা। নব্বইয়ের দশকের আগে অন্যান্য গ্রাম থেকে এখানে হাজার হাজার পন্ডিত সফরে আসতো।
ভুষণ বলেন, “নব্বই দশকের আগে প্রতি বছর আমরা এই মন্দিরে রাজি কাঠ (বকরি উৎসর্গ উৎসব) উদযাপন করতাম। বকরি জবাইয়ের পর আমরা সেটা রান্না করে উপস্থিত মানুষদের মধ্যে বন্টন করতাম”।
মন্দিরের কাছেই রয়েছে একটা মসজিদ। দুইয়ে মিলে গ্রামের ধর্মীয় চেহারাটাকে অনন্য করে তুলেছে। একই পথ দিয়ে মসজিদ ও মন্দিরে যাতায়াত করতে হয়।
গ্রামের একজন গোলাম নবী বললেন, “নব্বই দশকের আগে মুসলিম হিন্দু তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে ঢোকার আগে এক রাস্তা দিয়েই হাঁটতো, একে অন্যের সাথে গল্প করতো। আমরা চাই সেই দিনগুলো ফিরে আসুক”।
নিজের বাবা কাশি নাথের মতো ভুষণ নিজেও একজন হিন্দু পুরোহিত। পাঁচ বছর আগে কাশি যখন মারা যান, তখন শত শত মুসলিমরাও শোক করেছিল। তার শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিল।
মন্দিরে স্থাপিত শিবলিঙ্গ। পেছনে শাবির আহমদ মীর
ভুষণ বলেন, “এই গ্রামে কখনও নিজেকে একা মনে করিনি। আমি এমনকি জানিও না কিভাবে আমার বাবার দাহ করার ব্যবস্থা হয়েছিল। কে তার মরদেহ সেখানে বহন করে নিয়ে গিয়েছিল”।
আচানের অধিকাংশ পন্ডিতই উচ্চ শিক্ষিত। তাদের একজন ছিলেন চামান লাল চামান। একসময় তিনি ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি এই গ্রাম থেকে চলে যান। গ্রামের লোকজন তার ভালো কাজের কথা এখনও স্মরণ করে।
রঙমিস্ত্রি শাবির বলেন, “চামানজি ছিলেন একজন সৎ মানুষ। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যাতে রোডগুলো নির্মিত হয়। তার চেষ্টাতেই সরকারী স্কুল এবং দরকারী সরকারী সুবিধাগুলো গ্রামে এসেছিল”।
শাবিরের পাশে বসে আরেক গ্রামবাসী জাভেদ আহমেদ নিজের পন্ডিত শিক্ষকের কথা বললেন। “আমার শিক্ষক অশোক স্যারের কথা কখনও ভুলব না। আমাদের গ্রামের সবচেয়ে ভালো শিক্ষক ছিলেন তিনি”।
মন্দিরের কাজ কবে শেষ হবে, তার অপেক্ষায় আছে গ্রামবাসীরা। তারা আশা করছেন, মন্দিরের কাজ শেষ হলে, হাজার হাজার পন্ডিত আবারও এখানে আসতে শুরু করবে।
শাবির বলেন, “ধর্ম আমাদেরকে ঘৃণা শেখায় না। এটা আসে আমাদের নোংরা মানসিকতা থেকে। পন্ডিত ভাইদের ছাড়া আমাদের গ্রামটি অসম্পূর্ণ। আমরা খুবই খুশি হবো যদি তারা আবার এখানে ফিরে এসে বসবাস শুরু করেন”।
আচান গ্রামে পরিত্যক্ত পন্ডিত বাড়ি