Thursday, March 12, 2015

উপহার দিয়ে যায় কাক

কাকের কাছ থেকে পাওয়া উপহারসামগ্রী দিয়ে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছে
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের আট বছর বয়সী গাবি মান। ছবি: বিবিসি ম্যাগাজিন
চেহারা ও কণ্ঠ খারাপ হলেও কাকের স্বভাব কিন্তু মন্দ নয়। মানুষের সঙ্গে কাকের
বন্ধুত্ব ও কৃতজ্ঞতার বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছবি: বিবিসি ম্যাগাজিন
কাকের কদর্য চেহারা ও কর্কশ কণ্ঠে অনেকেই বিরক্ত হয়। কাককে তাড়াতে লাঠি হাতে তেড়ে আসে কেউ কেউ। চেহারা ও কণ্ঠ খারাপ হলেও কাকের স্বভাব কিন্তু মন্দ নয়। বন্ধুবৎসল ও দারুণ কৃতজ্ঞ এই পাখি। মানুষের সঙ্গে কাকের বন্ধুত্ব ও কৃতজ্ঞতার বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি বিবিসি সাময়িকীতে কাকের সঙ্গে এক মার্কিন শিশুর বন্ধুত্বের কাহিনি প্রকাশ করা হয়েছে। সিয়াটলের আট বছর বয়সী গাবি মানের সঙ্গে ২০১১ সাল থেকে কাকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কাককে নিয়মিত খাবার দেয় সে। বিনিময়ে কৃতজ্ঞ কাকের দল নিয়মিত তাকে নানা উপহারসামগ্রী দেয়। কাকের কাছ থেকে পাওয়া উপহারসামগ্রী দিয়ে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছে গাবি। এর মধ্যে রয়েছে সুদৃশ্য পাথর, রঙিন কাচ, বোতাম, গয়না, গুটি, ফোম, কাগজ, জেমস ক্লিপ, স্ক্রুসহ নানা ধরনের জিনিস।
এসব জিনিস হয়তো অনেকের কাছেই মূল্যহীন। কিন্তু গাবির কাছে তা সোনার চেয়েও মূল্যবান। কারণ কাকেরা তাকে এগুলো উপহার দিয়েছে। তাই এই উপহার সংরক্ষণের ব্যাপারে বেশ রক্ষণশীল গাবি। সারা বিশ্বে বিবিসির পাঠকদের মধ্যে কাকের সঙ্গে মার্কিন শিশু গাবির সম্পর্কের কাহিনি সাড়া ফেলে দেয়। এ খবরে উৎসাহিত হয়ে অনেকেই কাকের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের অজানা কাহিনির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ওই বিবরণ অনুসারে শুধু গাবি একা নয়, আরও অনেকেই কাকের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা হিসেবে নানা উপহার পান।
সিয়াটলের অ্যালিসন অ্যালকোবার ভাষ্য, তাঁর কাছেও কাকের কাছ থেকে পাওয়া উপহারের সংগ্রহশালা আছে। উপহারের অধিকাংশই খেলনা। তিনি কাকদের চীনাবাদাম খেতে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের লাইন হুইটির ভাষ্য, কাকের একটি আহত বাচ্চাকে যত্ন করে বড় করেন তিনি। উড়তে শেখার পর কাকটি তাঁকে নানা উপহার এনে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে—বোতলের মুখ, স্ক্রু, মাছ ধরার টোপ, পাখির পালক ইত্যাদি।
ওয়াশিংটনের ক্যাটি রসের ভাষ্য, তিনি প্রতিদিন তাঁদের উঠানে কাকদের খাবার দেন। খাবার পেয়ে কাকেরা খুব আনন্দিত হয়। কাকদের কাছ থেকে প্রায়ই উপহার পান তিনি।
নিউ ম্যাক্সিকোর আলেক্স ফিশার দাবি করেন, কয়েক বছর আগে তিনি নিয়মিত একটি দাঁড়কাককে খাবার দিতেন। একদিন কাকটি একটি কাঠের বাটালি নিয়ে আসে। বাটালিটি এখনো রেখে দিয়েছেন তিনি।
জার্মানির গুন্থার লেনস্কের ভাষ্য, ২০১৩ সালের মে থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটি কাকের বাচ্চাকে বড় করেন তিনি। কাকটির পাখার পালক ভাঙা ছিল। প্রায় এক বছরে পাখা ঠিক হয়। চলে যাওয়ার আগে শোবার কক্ষে কিছু পাথর রেখে যায় কাকটি।
নেপালের কিম্বারলি নিমাসেকের ভাষ্য, একদল কাকের বাচ্চা তাঁর বারান্দায় আসত। তিনি সময় সময় তাদের খাবার দিতেন। একসময় এটা নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়। একদিন সকালে কাকের কাছ থেকে একটি কাচের চুড়ির অংশবিশেষ পান তিনি।
জার্মানির এডনা কিংয়ের ভাষ্য, এক সময় তাঁর সবজির বাগান করার শখ ছিল। সেখানে আসা একটি বড় কাককে খাবার দিতেন তিনি। এক সময় কাকটি তাঁর কাজে সাহায্য করতে শুরু করে।

সুযোগ এখনও ফুরিয়ে যায়নি -ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

চলমান সঙ্কট নিরসনে আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে এ সমস্যার সুরাহা করতে হবে। কিন্তু  সে বসাটাই হয়ে উঠেছে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। আসলে আলাপ-আলোচনা করা কঠিন ছিল না। উভয়পক্ষের জেদাজেদির মধ্যে কাঠিন্যতার জন্ম। সময় বয়ে যাচ্ছে কিন্তু সুযোগ ফুরিয়ে যায়নি। অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পিঠে চড়ে আসতে পারে আনুষ্ঠানিক আলোচনা। ধরুন, উভয় দলের তৃতীয় কিংবা চতুর্থ সারির নেতারা গল্পচ্ছলে একে অপরকে প্রস্তাব করবে আলাপ-আলোচনা কখন কিভাবে কোথায় করা যায়। অখ্যাতদের উদ্যোগ সফল হলে আসবে প্রখ্যাত কিংবা বিখ্যাতরা। অর্থাৎ দ্বিতীয় ও প্রথম সারির নেতারা। যেখানে বিভেদের পর্দা দু’দিক থেকে এসে মিলে যাবে। মিটে যাবে ঝগড়া-ফ্যাসাদ। গুছে যাবে দুঃখ-দুর্দশা। কথাগুলো মানবজমিনকে বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অর্থনৈতিক রিপোর্টার হামিদ বিশ্বাস।
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সমঝোতার বিষয়ে সদিচ্ছার অভাব আছে। সব দল এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষত সরকারি দলকে আগে এগিয়ে আসতে হবে। টানা হরতাল-অবরোধে অর্থনীতির ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, একেকজন একেকভাবে ক্ষতির কথা বলছে। এটা যে বলছে হয়তো তাকে ঘিরে অথবা তার পরিচালিত সংগঠনের ক্ষতির কথা উঠে আসছে। যা বলছে তা আসল নয়, ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। আবার কমও হতে পারে। তবে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা অনেক কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। ইতিমধ্যে দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। সাধারণত অর্থনীতির উন্নয়নে দরকার দেশে সুষ্ঠু পরিবেশ। যা বর্তমানে অনুপস্থিত। এভাবে চলতে থাকলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। যা জনবহুল রাষ্ট্রের জন্য কিছুতে কাম্য নয় বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে তারা নিজেরা যা পারে করে। কারও অপেক্ষায় থাকে না। ছোট ও মাঝারি ধরনের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো একক চেষ্টায় বিভিন্ন শিল্প গড়ে। আর অসুস্থ রাজনীতি ও ক্ষমতাসীনরা তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। এখনও তার ব্যত্যয় ঘটছে না। এসব রাজনৈতিক অস্থিরতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি বেড়ে যায়। ক্রমশই দুর্বল হতে থাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এভাবে চলতে থাকলে অভাবী লোকের সংখ্যা বাড়বে। সমাজে অসমতা, বৈষম্য, হাহাকার সৃষ্টি হবে। মানুষের সব ধরনের উদ্বৃত্তে টান পড়বে। দিনে এনে দিনে খাওয়ার অবস্থায় নেমে আসবে। সব দলের প্রতি সমঝোতার আহ্বান জানিয়ে ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে। চলার পথ আলাদা হতে পারে। কিন্তু সমাধানের পথ এক ও অভিন্ন হওয়া চাই। আলোচনার দরজা বন্ধ করে দিলে ক্ষতি হবে দেশ ও দেশের মানুষের। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে সমাধানের পথে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ।

পোড়া শরীরেই চলে গেল ফুটফুটে মরিয়ম

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পেট্রলবোমায় দগ্ধ ৪৩ জন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তাদের পোড়া ক্ষতগুলোর কোনো একটি স্থান একটু শুকাতে না শুকাতেই অন্য স্থানগুলো পচে উঠছে। টান পড়ছে চামড়া, কুঁচকে যাচ্ছে হাত-পা। এ অবস্থায় দগ্ধদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের মধ্যে ভয়-আতংকের সৃষ্টি হচ্ছে। সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের কাউকে কাউকে মুহূর্তেই আইসিইউতে নিতে হচ্ছে। বর্তমানে আইসিইউতে ৫ জনসহ পুরো ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন ৪৩ রোগী। ইতিমধ্যে চিকিৎসাধীন ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে বুধবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে শিশু মরিয়ম (৬)।
দগ্ধদের কোনো অবস্থাতেই আশংকামুক্ত বলা যায় না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, বেশির ভাগের শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাদের বাঁচা এখন অনিশ্চয়তায়। কোনো কোনো রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পরও মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আইসিইউতে নেয়া হয়েছে ট্রাক হেলপার মাসুদ মিয়াকে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন। বুধবার দুপুরে আইসিইউতে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করছিলেন শাপলা। কখনও আবার দৌড়ঝাঁপ করছিলেন এদিক-ওদিক। বারান্দায় কোনো ডাক্তার পেলেই অসহায় কণ্ঠে বলছেন, ‘স্যার যেমনে পারেন আমার স্বামীকে বাঁচান, আমার ভাইও এখানে (আইসিইউ) ঢুকার পর, অনেকদিন সেবা পেয়েও মারা গেছে।’
শাপলা জানান, ২৩ জানুয়ারি বগুড়া চারমাথা এলাকায় ট্রাকে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন স্বামী মাসুদ মিয়া ও তার আপন ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম। ভোরে দু’জনকেই ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ওই দিনই ভাই জাহাঙ্গীর আলমকে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়েছিল। আর তার স্বামীকে ভর্তি করানো হয় এইচডিইউ ইউনিটে। স্বামী এখনও বেঁচে রয়েছে উল্লেখ করে জানান, ২৭ ফেব্রুয়ারি তার ভাই আইসিইউতে মারা যান। এখন তার স্বামীর অবস্থা খুবই খারাপ। আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়েছে। বার্ন প্লাস্টিক সার্জারি ও বার্ন বিভাগ প্রধান প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ খোন্দকার জানান, মাসুদ সুস্থ হয়ে উঠছিল, কিন্তু তার শ্বাসনালি পোড়া থাকায় দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। মাসুদসহ আইসিইউতে থাকা বাকি ৪ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন জানিয়ে তিনি বলেন, তারা দিন-রাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রোগীদের সুস্থ করে তুলতে। হকার শফিকুল ইসলামকেও আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। শফিকুল ৩ জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন। তিনি কক্সবাজার সৈকতের পাড়ে ফেরি করে মুড়ি-চানাচুর বিক্রি করতেন।
বার্ন ইউনিট প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম জানান, বর্তমানে দগ্ধ রোগীদের অপারেশন করা হচ্ছে বেশি। যাদের চামড়া টান পড়ছে তাদের অপারেশন কয়েকদিন পরপরই করতে হচ্ছে। অনেকের শরীর পুরোটা পুড়ে যাওয়ায় চামড়া কেটে চামড়া প্রতিস্থাপনও করা যাচ্ছে না।
বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রফেসর ডা. সামন্ত লাল সেন যুগান্তরকে বলেন, রোগীরা যতক্ষণ না সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকেই আশংকামুক্ত বলা যাচ্ছে না।
মারা গেছে শিশু মরিয়ম : বুধবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশু মরিয়ম। শিশু মরিয়ম ৪ ফেব্রুয়ারি অগ্নিদগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়। ভর্তির দিন থেকেই মরিয়ম আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। শিশু মরিয়ম পেট্রলবোমায় দগ্ধ রোগী হিসেবেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৭ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদ হয়, শিশু মরিয়ম পেট্রলবোমায় নয়, গ্যাসের চুলায় দগ্ধ হয়। এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মরিয়ম পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছে এমনটাই জেনে চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা প্রদান করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পাওয়া ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্রও মরিয়মের নামে করা হয়। মরিয়মের মা নার্গিস আক্তার শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, তিনি গার্মেন্টে চাকরি করেন। ময়িরম যে সময় দগ্ধ হয়, সে সময় তিনি গার্মেন্টে ছিলেন। রাত ১০টার দিকে সংবাদ পেয়ে তিনি গাজীপুর মেডিকেলে যান। তার কিছুক্ষণ পরই অ্যাম্বুলেন্সে করে মরিয়মসহ আরও পেট্রলবোমায় দগ্ধ ৩ জনকে ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। মা নার্গিস আক্তার জানান, শিশু মরিয়ম তার মায়ের (নানির) সঙ্গে বাসে করে খালার বাড়িতে যাচ্ছিল। ওই বাসেই পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়।
বার্ন ইউনিটের প্রফেসর ডা. সামন্ত লাল সেন, প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ ও প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ খোন্দকার জানিয়েছেন, মরিয়ম এতদিন পেট্রলবোমায় দগ্ধ হিসেবেই চিকিৎসাধীন ছিল।
আমাদের গাজীপুর যুগান্তর প্রতিনিধি মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, মরিয়ম গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বরুদা এলাকায় একটি বাসায় গ্যাসের চুলার আগুনে দগ্ধ হলেও ৪ ফেব্র“য়ারি একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রচার হয়। পরে মরিয়মের খালু আবুল কালামের কাছ থেকে জানা যায়, মরিয়ম পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়নি, গ্যাসের চুলার আগুনে দগ্ধ হয়েছে।

সিসিইউতে মান্না- ফোনকারী সেই ব্যক্তিকে চিনেন না by রুদ্র মিজান

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তিনি। আগে থেকেই ছিল পিঠের ব্যথা। ডিবি পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে মঙ্গলবার রাতে তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন তিনি। হাসপাতালে ভর্তির পর ইসিজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনজেকশন দেয়া হয়েছে মান্নাকে। তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে জানান তিনি।
রিমান্ডে থাকা মাহমুদুর রহমান মান্নার অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা মঙ্গলবার রাতেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। তারা তার সঙ্গেও কথা বলেন। তার সঙ্গে দেখা করা একটি সূত্র জানিয়েছে, মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করার মতো কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নেই। অযথাই তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। ১৪ দিনের রিমান্ডে তাকে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে- কোন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে তার কোন বৈঠক হয়েছে কি-না? এছাড়াও বিএনপিসহ সরকারের বাইরে থাকা অন্যান্য দলের নেতৃবৃন্দের বিশেষ কোন পরিকল্পনা আছে কি-না এসব বিষয়েও তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে। মান্না বলেছেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার কোন বৈঠক দূরে থাক, কোন কথা হয়নি। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে ফোনে কথা বলেন। তারা জানতে চান, এই অচলাবস্থার অবসান হবে কবে, শিগগিরই এর সমাধান হবে কি-না? ঠিক সেভাবেই একজন লোক তাকে ফোন দিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি কে মান্না তা জানেন না। ওই ব্যক্তিই সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন। নিজেই নানা প্রস্তাব দিয়েছেন। সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করিয়ে দেয়ার কথা বলেছেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে মান্না তার কথাগুলো শুনেছেন। এ বিষয়ে তিনি ডিবি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সবার সঙ্গেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনীর কোন কোন কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হলে, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলবো কিনা সে সম্পর্কে অজ্ঞাত ব্যক্তি জানতে চাইলে আমি বলেছি, কথা বলতে রাজি আছি। আমি রাজনীতি করি। তাই সবার সঙ্গেই আমাকে কথা বলতে হয়। এটা থেকে সামরিক ক্যু-এর ষড়যন্ত্রের আবিষ্কার হয় কীভাবে? প্রশ্ন রেখে তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার এ সবই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ। সর্বশেষ ঢাকা সিটি করপোরেশন আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেয়ায় এই ষড়যন্ত্র ডাল-পালা বিস্তার করে। ডিবি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বারবার বলেছেন, সেনাবাহিনীর কারও সঙ্গে তার কোন বৈঠক হয়নি। এমনকি টেলিফোনেও কথা হয়নি। এই বাহিনীর সঙ্গে তার কোন যোগাযোগ নেই। যে কোন সময় টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মান্না। মান্না তার ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন, টিএফআই সেল কি? কেন তারা সেখানে আমাকে নেবে আমি জানি না। তার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
গত ২৪শে ফেব্রয়ারি রাজধানীর বনানীতে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে মান্নাকে আটক করা হয়। পরদিন গভীর রাতে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহে উস্কানি ও প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের করা গুলশান থানার একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার  দেখানো হয়। ওই রাতে তাকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তারের পর গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি প্রথম দফা ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় মান্নাকে। গত ৭ই মার্চ দ্বিতীয় দফা ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হলে তিনি মঙ্গলবার রাতে অসুস্থ হয়ে যান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মান্নাকে মানসিক বা শারীরিক কোন নির্যাতন করা হয়নি। আইনানুগভাবে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় সে প্রক্রিয়াতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে মাহমুদুর রহমান মান্নার রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আজ এ আবেদনের ওপর শুনানি হবে।
‘মান্না রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার’
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুুদুর রহমান মান্না রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা। তারা বলেছেন, মান্না তার কথোপকথনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। সুতরাং তাকে রিমান্ডে নিয়ে নতুন করে আর কোন তথ্য বের করার প্রয়োজন নেই। রিমান্ডের নামে তার ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। যে কথপোকথনের জন্য তাকে আটক করা হয়েছে এতে কোন প্রকার বেআইনি কিছু নেই। বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে মাহমুদুর রহমান মান্নার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। সমাবেশ সংহতি প্রকাশ করে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ভিন্ন চিন্তা করতে পারে। কিন্তু সেটা মঙ্গলজনক হবে না। দেশে গণতন্ত্রই থাকতে হবে।  মানবাধিকার কমিশন ও আইন কমিশনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কিভাবে মানুষের বুকে গুলি করতে বলে। তারা কিভাবে একজন মানুষকে দিনের পর দিন রিমান্ডে নেয়ার জন্য উৎসাহ দেয়। এজন্য সাধারণ মানুষকে মানবাধিকার কমিশন ঘেরাওয়ের আহ্বান জানান তিনি। মান্নাকে ২০ ঘণ্টা কোথায় রাখা হয়েছিল- প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, হাইকোর্টের উচিত সুয়োমটো দিয়ে এ রহস্যের উদঘাটন করা। বৃটিশ আমলেও পুলিশ রাতে কারও বাসায় ঢুকে গ্রেপ্তার করত না। সারা রাত বাসা ঘিরে রাখত। সকালে   গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত। জনগণকে রাষ্ট্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত না জনগণ ন্যূনতম সাহস অর্জন করতে পারবে ততদিন সরকার যা খুশি তাই করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ-র‌্যাব কেউ অন্যায় করলে রেহাই পাবে না। জনগণ একদিন সকল অনাচারের প্রতিশোধ নেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, মান্না পরিষ্কার ইমেজের মানুষ। তাকে গ্রেপ্তারের আগে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করতে দেয়নি। মান্নার কথোপকথনে বেআইনি কিছু নেই দাবি করে তিনি বলেন, মান্না ক্যাম্পাসে ছাত্রদের আন্দোলন জোরদার করতে বিএনপি নেতা খোকাকে পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হলে তা করতে বলেছেন। এটা রাজনীতিবিদরা হরহামেশাই বলে থাকেন। মিডিয়া তার বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করেছে। উনি লাশ চাননি। সরকার তাকে গ্রেপ্তারের পথ প্রশস্ত করার জন্য মিডিয়া ট্রায়াল করেছে। সরকার একতরফা ৪৮ ঘণ্টা মান্নার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে। তার সঙ্গে অজ্ঞাতনামা যে ব্যক্তি কথা বলেছেন তাকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে সরকারের কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। যারা সরকারের কাজের সমালোচনা করেন তাদের কথা বলতে দেয়া হয়নি। মান্না রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার দাবি করে আসিফ নজরুল বলেন, তিন মাস থেকে তার ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে। মান্না ফোনে কথা বলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। সরকার সবই জানে অথচ তাকে আটকের পর ২০ ঘণ্টার জন্য উধাও করে দেয়া হয়েছিল। এখন টানা ২০দিন রিমান্ডে রেখে তাকে বিপর্যস্ত করা হচ্ছে। ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, দেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য  সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। যারা বছরের পর বছর ক্যাম্পাসে হল দখল করে রেখেছে, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে লাশ ফেলছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করতে সরকার এ কৌশল নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল  মালেক রতন সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বলেন, দেশ আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। ক্রসফায়ারে মানুষ মারা যাচ্ছে। মান্না এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার কণ্ঠরোধ করতেই মামলা দেয়া হয়েছে। মান্নার বিরুদ্ধে এ মামলা ষড়যন্ত্রমূলক। মান্নার মুক্তি দাবি করে নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এসএম আকরাম বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশকে নষ্ট করার জন্য সরকার মান্নার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মান্না রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বললে এতে সরকারের সমস্যা কোথায়। মান্না ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে ঘোষণা দেন তিনি। এজন্য মান্নার বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুল হক সরকারের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সদস্য আবু বকর সিদ্দিক, শহীদুল্লাহ কায়সার, ইফতেখার আহমেদ বাবু, নাগরিক ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান প্রমুখ।

ভাঙনের দ্বীপে সাফল্যের আলো by মাসুদ মিলাদ

এক খামারেই মুরগি পালন, মাছ চাষ ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। প্রতিটি ক্ষেত্রেই
সাফল্য। সন্দ্বীপের যুবকদের এখন পথ দেখাচ্ছে ফেরদৌস আহমেদের
বহুমুখী খামার (বাঁয়ে)। খামারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে
সরবরাহ করা গ্যাসে জ্বলছে ঘরের চুলা (ডানে) l জুয়েল শীল
২০০৭ সালে মুরগির খামার (লেয়ার জাত) দিয়ে শুরু। পুঁজি এক লাখ টাকা। পরের বছর মুনাফার টাকায় পুকুর খনন, শুরু মাছ চাষ। এবার বছর গড়াতে যুক্ত হলো গরু পালন। দিনে দিনে বাড়ল পরিধি। এদিকে বিপত্তিও কম নয়। মুরগির খামারের বিষ্ঠা নিয়ে পড়লেন বিপদে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সেটাও ফেলনা হতে দিলেন না। গড়ে তুললেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। এত কিছু ঘটে গেল আট বছরের মধ্যে। আর আট বছরে এক লাখ টাকার বিনিয়োগ গিয়ে দাঁড়াল চার কোটিতে। এই সাফল্যের গল্প সন্দ্বীপ উপজেলার পৌর এলাকার বাসিন্দা যুবক ফেরদৌস আহমেদের। দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের আর্থসামাজিক অবস্থা একটু ভিন্ন। এখানে প্রতি বাড়িতে আছে প্রবাসী। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় চলে সিংহভাগ পরিবারের সংসার। উদ্যোক্তা হিসেবে যাঁরা আছেন, তাঁদের বিনিয়োগ প্রবাসে কিংবা সন্দ্বীপের বাইরে। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা না থাকা এবং দ্বীপে ভাঙনের কারণে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের হারও খুব কম। ফলে এলাকাকেন্দ্রিক নতুন উদ্যোক্তা চোখে পড়ে না। এখানেই ব্যতিক্রম ফেরদৌস।
ফেরদৌসের পরিবারেরও সিংহভাগ সদস্য থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁরও যাওয়ার সুযোগ আছে। তবে সেখানে থাকার আগ্রহ নেই তাঁর; বরং জন্মস্থানে নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলে পথ দেখাতে চান উদ্যমী যুবকদের। তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতিমধ্যে অনেকে বাড়ির আশপাশে এ ধরনের খামার গড়ে তুলছেন। এমনই একজন আবুল হাশেম। পড়াশোনার পাশাপাশি হারামিয়া ইউনিয়নের কাছিয়াপাড় গ্রামে নিজের বাড়ির পাশে গড়ে তুলেছেন খামার।
হাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেরদৌসের সাফল্য দেখে আগ্রহী হই। খামার শুরু করেছি ব্রয়লার মুরগি দিয়ে। পুকুর খনন করে মাছ চাষও করছি। পর্যায়ক্রমে বহুমুখী খামারে পরিণত করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
সন্দ্বীপে নিজের এলাকায় কিছু একটা করার ভাবনা থেকে ফেরদৌস মুরগির খামার গড়ে তুলেছিলেন। প্রথমে সন্দ্বীপ, এরপর চট্টগ্রাম এবং সবশেষে ঢাকায় কলেজের পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ২০০৬ সালে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে চলে আসেন সন্দ্বীপে। ২০০৭ সালে খামার গড়ে তোলার পর মুনাফার সব টাকা থেকে লাভ নিতেন না। সব টাকাই বিনিয়োগ করতে থাকেন। খামারে মুরগির সংখ্যা বাড়ার পর এই বিপুল পরিমাণ বিষ্ঠা কোথায় রাখা হবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। এর পরই কয়েকজনের পরামর্শে এই বিষ্ঠা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট।
মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করতে হয় কাঠ। এখন এ চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রেও পথপ্রদর্শক ফেরদৌস। পরিবেশসম্মত সবুজ জ্বালানি হিসেবে পরিচিত তাঁর বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের কল্যাণে উপজেলার অনেক পরিবারের চুলা জ্বলছে।
সন্দ্বীপের এনাম নাহার মোড়ে একটি বাড়িতে দেখা যায়, বায়োগ্যাসে রান্না হচ্ছে। বাড়ির গৃহবধূ অনিমা রানী রায় প্রথম আলোকে জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। তাই আগে মাটির চুলায় রান্না করতে কষ্ট হতো। এখন যখন ইচ্ছে তখন রান্না করা যায়। ময়লা লাগে না। ফলে এখন মোটামুটি ঝামেলামুক্ত।
ফেরদৌস জানান, গত বছরের অক্টোবর থেকে প্রায় চার হাজার ফুট লম্বা পাইপের সাহায্যে আশপাশের এলাকায় তাঁর প্ল্যান্ট থেকে এই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এখন ৭০টি পরিবারের চুলা জ্বলছে বায়োগ্যাসে। বায়োগ্যাসের উপজাত প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া চলছে।
সন্দ্বীপ উপজেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় মূল সড়কের পাশে চোখে পড়ে সাদা ফটক। ফটকে লেখা মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ। তিনতলা মুরগির খামার। খামারে মুরগির বিষ্ঠা পাইপের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হচ্ছে বায়োগ্যাস স্থাপনার মূল ট্যাংকে। এরপর একটি চেম্বারে গ্যাস জমা হয়। পাইপলাইনের সাহায্যে এই গ্যাস নেওয়া হয়েছে অন্তত চার হাজার ফুট এলাকায় বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। বায়োগ্যাস সরবরাহ করার তিন মাসের মাথায় আরও অন্তত ৩০০ পরিবার থেকে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব পেয়েছেন ফেরদৌস। প্রস্তাব পাওয়ার পর খামার সম্প্রসারণের উদ্যোগও নিচ্ছেন তিনি।
মুরগির খামার করে বসে থাকেননি এই তরুণ উদ্যোক্তা। পালাক্রমে গড়ে তুলেছেন ডেইরি ফার্ম। এখন ফার্মে ২৪টি গরু আছে। আবার খামার এলাকায় এ পর্যন্ত ১১ পুকুর খনন করেছেন। এসব পুকুরে চলছে মাছের চাষ।
ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় দুই হাজার শতক জমিতে খামার গড়ে তোলা হয়েছে। এক ইঞ্চি জায়গাও অব্যবহৃত রাখতে চাইনি। তাই এক খামারেই এত আয়োজন। এখন অনেকেই আমার খামার দেখতে আসছেন। পরামর্শ নিচ্ছেন অনেকে। যাঁরাই আসছেন তাঁদের সহযোগিতা করছি।’
ফেরদৌসের খামার শুরুর আগে চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে সন্দ্বীপে ফার্মের ডিম এনে চাহিদা মেটাতে হতো। এখন এই খামার থেকে দিনে গড়ে ২০ হাজার ডিম পাওয়া যায়। তাঁর এক খামার থেকেই উপজেলার ব্রয়লার মুরগির ডিমের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে। ফেরদৌস আশা করছেন, আরও কিছুদিন পর এক খামার থেকেই সন্দ্বীপে ব্রয়লার মুরগির ডিমের চাহিদা পুরোপুরি মেটানো যাবে।

সঙ্কট সমাধানে সংলাপ শুরুর আহ্বান -অ্যালায়েন্সের উদ্বেগ

তৈরী পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, উত্তেজনাকর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তাদের কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় যেসব পক্ষ একটি গতিশীল ও সফল বাংলাদেশ গড়তে চায় তাদের সহিংসতা পরিহার করে সঙ্কট সমাধানের জন্য সংলাপ শুরু করতে হবে। পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে- এমন বিশ্বের ২৬টি বড় ক্রেতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ সংগঠনটি শ্রমিকদের নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেছে। এ গ্রুপে যারা কাজ করছে তাদের বেশির ভাগই উত্তর আমেরিকার। সাত শতাধিক কারখানায় তাদের পোশাক তৈরি হয়। ১১ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে সংগঠনটির তরফে বলা হয়েছে, শ্রম আইনের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখনও চূড়ান্ত করে নি বাংলাদেশ সরকার। ফলে এ আইনের বাস্তবায়ন হচ্ছে ধীরগতিতে। সম্প্রতি অ্যাকর্ডের সঙ্গে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অ্যালায়েন্স আহ্বান জানিয়েছে ওই ধারাগুলো চূড়ান্ত করতে ও তা প্রচার করতে, যাতে অ্যালায়েন্স ও অ্যাকর্ড তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে তা অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার মান উন্নত করার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অ্যালায়েন্স। তারা এ খাতে শ্রমিকদের জন্য এমন একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে চায়, যেখানে শ্রমিকদের সম্মান দেয়া হবে এবং কারখানার মালিকদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা। অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটির পরিচালনা পরিষদের স্বতন্ত্র চেয়ার ইলেন ও. তুশার বলেন, আমরা আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, কারখানা আধুনিকায়ন, তৈরী পোশাক খাতকে স্থিতিশীল ও নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলাও আমাদের অব্যাহত লক্ষ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লাখ লাখ মানুষকে অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনের পথ দেখিয়েছে পোশাকশিল্প। এটা শুধু তাদের উপার্জনের পথ দেখায় নি, একই সঙ্গে তাদের পরিবার ও দেশকে দিয়েছে অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা। এ খাতে নারী ও পুরুষ মিলে যে কাজ করছেন তাতে অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এসেছে বাংলাদেশে। দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার জন্য এ প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। নানা ট্র্যাজেডির ফলে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতে যে পরিবর্তন এসেছে তার প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী তৈরী পোশাকশিল্পে। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে গঠন করা হয় অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি (অ্যালায়েন্স)। তারা ওই প্রতিবেদনে বলেছে, অ্যালায়েন্স সদস্যরা যেসব গার্মেন্ট থেকে তাদের পোশাক তৈরি করে তার সবকটিতে অনুসন্ধান সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে নিরাপত্তার মান উন্নত করার ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে কি করণীয় তা নির্ধারণ করা হয়েছে। চিহ্নিত করা হয়েছে ১৯টি ঝুঁকি। অনুসন্ধানকারী প্যানেল ৫টি কারখানাকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার জন্য বাছাই করেছে। আংশিক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ১২টি কারখানা। দুটি কারখানাকে কাজের চাপ কম নিয়ে সচল রাখতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ বছরের ১লা জানুয়ারি অ্যালায়েন্স আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব-অনুমোদন বিষয়ক একটি পলিসি চালু করেছে। এর অধীনে সব নতুন কারখানাকে নিবন্ধিত হতে হবে। তাতে অনুসন্ধান করা হবে। ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলতে হবে। এ বছরের ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ কারখানা চূড়ান্ত অনুসন্ধান করা হবে। তবে ২০১৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে শতকরা ১০০ ভাগ কারখানা চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন করা হবে। বাংলাদেশে কোন কোন কারখানা মালিক বা সরবরাহকারীর কারখানা মেরামতের মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই। এ ক্ষেত্রে অ্যালায়েন্স সদস্যদের অনেকে একটি দ্বিপক্ষীয় আর্থিক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর অধীনে তারা স্বল্পসুদে আর্থিক সহায়তা দেবে সংশ্লিষ্টদের। এরই মধ্যে অনেক কারখানা এ খাত থেকে ঋণ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অ্যালায়েন্স একটি নতুন ঋণ সুবিধার সুযোগ সৃষ্টি করছে। স্থানীয় ৫টি ব্যাংকের মাধ্যমে অ্যালায়েন্স ২ থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঋণ সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ ক্ষেত্রে সুদের হার থাকবে একেবারেই অল্প। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ও জরুরি ভিত্তিতে শ্রমিকদের সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক, সুপারভাইজার, ম্যানেজার ও নিরাপত্তারক্ষীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য অ্যালায়েন্স বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা করছে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস-অস্টিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর ফল প্রকাশ করা হবে শিগগিরই। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশে শ্রম আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এতে সব কারখানাকে নাটকীয়ভাবে অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ কমিটি গঠন করতে হয়। এতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতায় শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। ইলেন ওই প্রতিবেদনে বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো অ্যালায়েন্সভুক্ত সব কারখানায় কার্যকর ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এতে বলা হয়, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে চলেছে অ্যালায়েন্স। ইলেন বলেন, আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে। অ্যালায়েন্স, অ্যাকর্ড ও জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কর্মপরিকল্পনায় কাজের স্থিতিশীলতার জন্য আমরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছি বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
ওদিকে বিবিসি জানায়, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের ফোরাম অ্যালায়েন্স। সংগঠনটি বলছে, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ এখন থেমে গেছে। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, বিদেশী ক্রেতারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ সহায়তা না দেয়ায়, কারখানায় শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার কাজে সমস্যা হচ্ছে। অ্যালায়েন্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রবিন মেসবাহ বলছিলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাদের উদ্বেগের বিষয় বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, এ সময়সীমার মধ্যে যে পরিমাণ সংস্কার হয়ে যাবে বলে আশা করেছিলাম, ততটা হয়নি। এটাই আমাদের উদ্বেগের কারণ। গত বছর ৫৮৭টি কারখানায় আমরা প্রাথমিক পরিদর্শন শেষ করি। যেসব ঘাটতি বা ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছিল, তার মধ্যে সংস্কার কাজের জন্য সময়সীমা দেড় মাস থেকে শুরু করে নয় মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। সেখানের মধ্যে ১২৪টি কারখানায় আমরা আবার পরিদর্শন করেছি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২৪ শতাংস সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম এ সময়ের মধ্যে ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হবে। তবে তা হয়নি। অন্যদিকে বিজেএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেছেন, অনেক কারখানায় ছোট সমস্যা বা ত্রুটিগুলো সারিয়ে ফেলা হয়েছে। বড় ধরনের ত্রুটি বা সমস্যা সমাধানের কাজ বন্ধ রয়েছে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিদেশী ক্রেতারা এখনও অর্থ সহায়তা না দেয়ায়।

সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং : শীর্ষ স্থানে...

টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড রেপুটেশন র‌্যাঙ্কিং-এর তরফে বিশ্বের সেরা ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে শীর্ষ স্থানে রয়েছে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে রয়েছে ব্রিটেনের কেমব্রিজ ও অক্সফর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। কেমব্রিজ এবং অক্সফর্ডের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে উঠে আসার ফলে এক পা করে পিছিয়ে যেতে হয়েছে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনলজি (চতুর্থ স্থানে) এবং স্যানফর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে। এই সমীক্ষায় দেখাগিয়েছে লন্ডন এবং প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই এখানে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এশিয়া থেকে এই তালিকায় রয়েছে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়।
কোথাও জায়গা হয়নি ভারতেরএকটিও প্রতিষ্ঠানের! ভারতের এই অবস্থায় চিন্তা প্রাকাশ করেছেন টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিং-এর সম্পাদক ফিল ব্যাটি। তাঁর মতে, 'ভারতের এমন অবস্থা সত্যিই চিন্তার উদ্রেক করে। ভারতের মতো এমন প্রগতীশিলএবং অসাধারণ বুদ্ধিজীবী ইতিহাস সমৃদ্ধ দেশের কোনও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও কেন এই তালিকায় জায়গা করে নিতে পারল না, তা নিঃসন্দেহে ভাবার বিষয়।' তিনি আরও বলেন যেখানে ব্রাজিল, রাশিয়া এবং চিনের মতো দেশের অন্তত একটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই তালিকায় রয়েছে, সেখানে ভারতের এই অবস্থা কেন হল তা নিয়ে চিন্তার করার সময় এসে গিয়েছে ভারতের।

অপেক্ষা শুধু সময়ের by মাসুদ মজুমদার

অধিকার আদায়ের লড়াই সব সময় নিয়মতান্ত্রিক পথে এগোয় না। সময় মেপে কিংবা দিনক্ষণ নির্ধারণ করে এর সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক মেলানো যায় না। পৃথিবীতে বহু আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কখনো কোথাও সাফল্য-ব্যর্থতা নিরূপণের মানদণ্ডের একক কোনো ধারণা ছিল না। আজো নেই। মাঝে মধ্যে স্বপ্নভঙ্গের কারণও ঘটে। তবে বিজয়ীর পক্ষে ইতিহাস চর্চার ধারা এখনো সক্রিয়; কিন্তু জনগণের বিজয় অবশ্যম্ভাবী- তা দু’দিন আগে কিংবা পরে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পক্ষে জনগণের লড়াইয়ের ইতিহাস একেবারে সংক্ষিপ্ত নয়। স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গের প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক মওলানা ভাসানী, জাসদ, জাতীয় লীগ, চৈনিক ধারার বামপন্থী দলসহ সব বিরোধী দল গণতন্ত্রের দাবিটি সামনে নিয়ে আসে। সেই সময় জাতীয় সরকার গঠনের দাবিটিও উপেক্ষিত হয়েছিল। এর প্রথম পর্বটি ছিল তেয়াত্তর থেকে পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন পর্যন্ত। রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার প্রাক্কালে সেই আন্দোলনের ধরন ছিল ভিন্ন মেজাজের। আওয়ামী লীগ রক্ত মাড়িয়ে ক্ষমতা পেয়েছে বা অর্জন করেছে এটা সর্বজনস্বীকৃত। আবার রক্ত ঝরিয়ে বিদায় নিয়েছে এটাও মিথ্যা নয়। এরশাদবিরোধী গণতন্ত্রের লড়াইয়ের আগে বাকশাল থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের সময়টার স্বরূপ আলাদা। সময়টাও অনেক দীর্ঘ নয়। জিয়ার বিরুদ্ধেও ক্ষমতার লড়াই ছিল, সেটা ছিল সামরিক ছাউনিকেন্দ্রিক, জনগণকেন্দ্রিক নয়। তিয়াত্তর-চুয়াত্তরের পর রাজপথের গণ-আন্দোলন কার্যত শুরু হয়েছিল বিরাশি সাল থেকে। যেদিন এরশাদ নির্বাচিত বিচারপতি সাত্তার সরকারকে বন্দুকের জোরে উপড়ে ফেলে ক্ষমতা দখল করেছিল, কার্যত প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল সেদিন থেকে। ছিয়াশি সালে এসে সেই আন্দোলন নতুন গতি পায়। আবার কিছু দিনের মাথায় আওয়ামী লীগ-জামায়াতের নির্বাচনী ডিগবাজির কারণে হোঁচটও খায়। কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন আন্দোলনের ফলাফল নির্ণয় ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সুফল ঘরে তোলার ব্যাপারে আপসহীন। তিনি আপস মানেননি বলেই সেদিন গণতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব হয়েছিল। তার সেই আপসহীন অবস্থানের সুফল জনগণ হাতে পায় নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পথ ধরে। গণনন্দিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বাস্তব ভ্রুণটিরও জন্ম নেয় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সরকারের দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার প্রেক্ষিতে। এখন এরশাদও বলতে বাধ্য হচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার চেয়েও বড় স্বৈরাচার।
প্রথমবার ক্ষমতাচর্চায় শেখ হাসিনা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেননি। তখনো ভুলে যাননি জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েই তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। হিজাব পরা মুনাজাতরত ছবিটি জনগণ আস্থায় নিয়েছিল। যদিও সেই আমলে সৃষ্ট গডফাদারদের দায় তারও ছিল। সে সময় বিরোধী দলও সরকার পদত্যাগের আন্দোলন করেনি। দ্বিতীয়বার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর প্রথম দু’বছরও কোনো আন্দোলন ছিল না। তৃতীয় বর্ষে ঠাণ্ডামাথায় তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা উপড়ে ফেলার পর বিরোধী দলের বোধোদয় ঘটে। তারা হঠাৎ টের পেয়ে যায় সরকার গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। তার পরও আবেদন নিবেদনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থার পক্ষে পুনঃ জনমত গঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। দাবি মানার আলটিমেটাম দেয় কমপক্ষে তিনবার। সে আন্দোলনও কোনোভাবেই সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও জননন্দিত তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিলের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন ছিল ষোলোআনা নিয়মতান্ত্রিক। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ ছিল, ইস্যুভিত্তিক বক্তব্যও ছিল। কিন্তু পদত্যাগের দাবিটি ছিল দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টির কৌশল মাত্র। সরকার সেই আবেদন-নিবেদন উপেক্ষা করেছে, বিএনপি জোটও লগি-বৈঠার মতো কোনো তাণ্ডব সৃষ্টি করেনি। গানপাউডার দিয়ে মানুষ মারেনি।
সব বিরোধী দলের দাবি উপেক্ষা করে সংবিধান ও আদালতের রায়ের বরাতে জনমত উপেক্ষা করে নতুন জাতীয় নির্বাচন যখন ঘোষণা করা হলো, তখন তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি পুরোপুরি উপেক্ষিত হলো। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করার গণদাবিটিও বিবেচনায় নেয়া হলো না। বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে অনুরোধ জানাল- তত্ত্বাবধায়ক নামে না হোক, নিরপেক্ষ অবয়বের একটি গ্রহণযোগ্য ধারণা অন্তত গ্রহণ করা যায়। বুদ্ধিজীবীরা বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়ার ফর্মুলাও দিয়েছিলেন। জাতিসঙ্ঘ প্রতিনিধি তারানকোর কয়েকটি ফর্মুলাও ছিল, যা বিরোধী দল ইতিবাচকভাবে দেখেছে, কিন্তু সরকার কারো কোনো কথায় ও পরামর্শে সামান্যতমও ছাড় দিতে রাজি হয়নি। একটি টেলিফোন ও তাৎক্ষণিক একটি আমন্ত্রণ রক্ষা করতে না পারার বিষয়টি সংলাপ না করার অজুহাত বানানো হলো। সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে নির্বাচন পেছানোর একটা ধারণাও জনসমক্ষে ছিল, সরকার কিছুই মানেনি। জোর করে ভোটারবিহীন নির্বাচনের পথ ধরে ক্ষমতা দখল করেছে।
এটা স্পষ্ট, বিশ্বসম্প্রদায় ও জনগণ কর্তৃক উপেক্ষিত হলেও আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতা দখলে রাখার বল-ভরসা পেয়েছিল ভারতীয় কংগ্রেসের কাছ থেকে। তাই বিরোধী দলকে এবং জনগণকে আমলে নেয়ার কোনো পরোয়াই করল না। বরং সব কূটনৈতিক মধ্যস্থতা উপেক্ষা করে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের দিয়ে জাতীয় পার্টিকে পোষ মানানো হলো, রওশন ও এরশাদকে ডামি বিরোধী দল বানানো হলো। যেনতেন একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পথে পা বাড়াল- এ জন্য ভারতের কংগ্রেস সরকারকে উকিলও নিয়োগ করল। সুজাতা সিং এলেন সরকারের সব অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানাতে। পঙ্কজ শরণরা খোলা ময়দানে দালালি শুরু করলেন। একতরফা নির্বাচনে বৈধতা দেয়ার আশ্বাসও দিয়ে গেলেন ভারতীয় কূটনীতিক সুজাতা সিং। তিনি এখন পতিত কূটনীতিক। আজ বিণা সিক্রিরা একেক দেশে একেক গণতন্ত্রের ফেরি করছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যায় এই বিণা সিক্রির দ্বৈতনীতি সবার চোখ খুলে দেয়ার কথা। বিণা সিক্রিরা কি ভারতের একেক রাজ্যের জন্য একেক ধরনের গণতন্ত্র চান? হিন্দুপ্রধান ভারতকে নিয়ে তারা আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সবক দেন। জাত-পাতে পিষ্ট ভারতীয় সমাজে নমশূদ্ররা বঞ্চিত শ্রেণী। মুসলমানকে প্রায়ই কচুকাটা করা হয়। শিখরা ড্রাইভার ও সৈনিক হয়ে বাঁচতে চাইছে। খ্রিষ্টানদেরও পুড়িয়ে মারা হয়। এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ভারত আমাদের গেলাতে চায়। সংখ্যানুপাত বিবেচনায় নিলে কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীরাই শুধু নয়, বাংলাদেশে কথিত সব সংখ্যালঘু স্বর্গে আছেন। তাদের ধর্মকর্ম পাহারা দেয় এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও প্রকৃত আলেম ওলামারা। যাদের জঙ্গি কিংবা অন্য নামে চিহ্নিত করে তারা খুশি হয়। ভোটব্যাংক সৃষ্টিকারী গুণ্ডারা কোনো ধর্মাবলম্বীর জন্য নিরাপদ নয়। বিণা সিক্রিরা হয়তো ভাবেন বাংলাদেশ তাদের করদরাজ্য, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভারতীয় প্রেসক্রিপশন উপেক্ষা করেই সে সময় জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দল মত নির্বিশেষে সব বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। তাতেও আওয়ামী লীগ কর্ণপাত করেনি বরং সবাইকে অপমান করেছে। সুদখোর, কার খালু বলে ব্যঙ্গ করেছে। দুই আনার মন্ত্রী, কাজের বুয়া মর্জিনা বলে বিদ্রুsপ করেছে। তারা গুরুত্ব দেয়নি জাতিসঙ্ঘ দূত তারানকোর দূতিয়ালি এবং মধ্যস্থতা করার প্রস্তাবকেও। ফলে জনগণের পক্ষে বিএনপি জোট এবং অন্যান্য বিরোধী দল একতরফা নির্বাচন বয়কট করে ও জনগণকে বয়কটের আহ্বান জানায়। সেই বয়কট শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়। ফলে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও বাস্তবে ভোটারবিহীন অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মহড়া দেয়া হয়। তাতে বৈধতার দৃষ্টিতে সরকার হয়ে দাঁড়াল আগাগোড়া প্রশ্নবিদ্ধ।
সে সময় জনপ্রতিরোধ ও রোষের মুখে আওয়ামী লীগ নেত্রী বলতে বাধ্য হয়েছিলেন একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন শেষে সব দলের সাথে আলোচনা করে পরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। বিএনপি জোট আন্দোলন থেকে সরে এসে অপেক্ষায় থাকে। নাগরিক, সুশীল ও পেশাজীবী সমাজও প্রহর গুনতে থাকে। এই দুর্বলতার ফাঁক দিয়েই সরকার উল্টো ছোবল মারা শুরু করে। প্রশ্নবিদ্ধ সরকার নিজেদের অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি দুটোই ভুলে যেতে চেষ্টা করে। উপরন্তু বিরোধী দলকে একেবারে নিশ্চিহ্ন ও নাই করে দেয়ার জন্য ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা সাজায়। এর মাধ্যমে অবশিষ্ট গণতন্ত্রটুকুও বধ করে বসে। ফলে বিএনপি জোট এক বছর অপেক্ষার পর রাজপথে প্রতিবাদী হতে গিয়ে হামলা, মামলা, গ্রেফতার, গুলি, গুমসহ সব ধরনের জুলুম-পীড়নের মুখে পড়ে। দলীয় অফিস বন্ধ করে দেয়া শুরু হয়। বাসায় বাসায় তল্লাশি চালানো ও গণগ্রেফতার চলে। রাজপথে মিছিল এবং মাঠে জনসভা করার অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়। আপসহীন খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন। বালির ট্রাকের প্রাচীর, মরিচের গুঁড়া এবং কার্যত গৃহবন্দী অবস্থান থেকেও প্রমাণ করেন গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি শেষ পর্যন্তও ছাড় দেয়ার মতো নেত্রী নন।
চৌদ্দ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা ও দলীয় নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার একক কৃতিত্ব না হলেও খালেদা জিয়ার অর্জনটাই মুখ্য। একইভাবে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে নজিরবিহীন প্রতিরোধ ও জুলুম-পীড়ন অগ্রাহ্য করে তিনি আবার গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এটা তার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার উল্লেখযোগ্য তৃতীয়বারের মতো দৃঢ় অবস্থান। তার আপসহীন অবস্থানের প্রথম অর্জন ছিল নব্বই সালে। কালো মানুষের নেতা, সাদা মানুষের প্রেরণা ও বাদামি মানুষের জন্য উপমা ইতিহাসে কৃষ্ণ সুন্দর নেলসন ম্যান্ডেলা ছাড়া আর কোনো রাজনীতিবিদ এত দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে প্রতিবাদী অবস্থানে থাকেননি। আমরা খালেদা জিয়ার রাজনীতির অনুগত কর্মী নই। তার রাজনৈতিক কর্মকৌশল ও সাফল্য-ব্যর্থতা সমালোচনার ঊর্র্ধ্বে নয়। তাই বলে তাকে জঙ্গি, তালেবান নেত্রী, আলকায়েদার প্রতিনিধি বলা শুধু নির্লজ্জ মিথ্যাচার নয়, নায়কের বিরুদ্ধে খলনায়কের একধরনের হুঙ্কার মাত্র। অনেক দ্বিমত নিয়েও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মহাসড়কে থাকা একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমরা সময়ের সাক্ষ্যদাতা মাত্র। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা দুই নেত্রীর পক্ষে কলম যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এক-এগারোর সরকার দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র শুরু করলে আমরাই প্রতিবাদী হয়ে বাঁক ঘুরে দাঁড়াই। অথচ আমরা না বিএনপি, না আওয়ামী লীগ। আমরা খালেদা জিয়াকে লেনসন ম্যান্ডেলার সাথে এক মাপে তুলছি না। তবে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে আপসহীন নেত্রী এবং তার আন্দোলনের সময়টাও কম দীর্ঘ নয়। তার দল পরিচালনা ও রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যাপারে সবার প্রশ্ন থাকতে পারে। তার অনেক কৌশলও সমালোচিত হতে পারে কিন্তু এ দেশে গণতন্ত্রের জন্য তার অবদান অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
একে একে সব ক’টি প্রতিবাদী এবং যুক্তিবাদী কণ্ঠকেও যখন সরকার নানাভাবে আড়ষ্ট করে দিয়েছে। মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অদৃশ্য কালো হাতে। ভিন্ন মত পদদলিত। বুদ্ধিজীবীরাও যখন খামোশ হয়ে গেছেন। রাষ্ট্রশক্তি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও যখন দলকানা, পেশাজীবীরাও যখন সত্যের পথে দৃঢ়তা দেখাতে সক্ষমতা হারিয়ে বসেছেন, তখনো খালেদা জিয়া মাথা নত করেননি। আজ রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট চিহ্নিত। সঙ্কট নিরসনে কূটনৈতিক চাপও দৃষ্টিগ্রাহ্য। সরকার যে সঙ্কট স্বীকার করতে চায়নি, সে সঙ্কট এখন তাদের তাড়া করছে। সেই সঙ্কটকে দেশের জনগণ ও বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সব মহল অংশীদারিত্বমূলক কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। তবে মুখ্য ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানি ও পরোয়ানা মাথায় বেগম জিয়া অনড় অবস্থানে স্থির না থাকলে গণতন্ত্রের স্বপ্ন, জনগণের ভোটের অধিকার ক্ষমতার পদপিষ্ট হয়ে ধুলায় গড়াগড়ি খেতেই থাকবে। সেই অবস্থা অব্যাহত রাখার সরকারি চেষ্টার এখনো অন্ত নেই। কিন্তু পাহারাদারের ভূমিকায় খালেদা জিয়ার অবস্থানও দুর্বল নয়। প্রধানমন্ত্রী আর কঠোর হবেন কোথায়! দেশের কারাগারগুলোতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশের আশি শতাংশের বেশি মানুষ পরিবর্তনকামী হয়ে উঠেছে- এরা সবাই বিএনপি জোটভুক্ত নয়। সবার ধারণা, আপনি অনৈতিকভাবে ক্ষমতার জোর খাটাচ্ছেন, দেশের এত মানুষকে বিগড়ে যেতে দিয়ে আপনি ক্ষমতাচর্চা করবেন কিভাবে। কত দিনই বা সেটা সম্ভব। আপনার প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়াও তো সব কিছু দিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে আছেন। চার্চিল তার জাতিকে মেধা, শারীরিক যোগ্যতা ও প্রাণটাও দিতে চেয়েছিলেন। খালেদা জিয়া আজ যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছেন, তাতে রসিকতা করেও বলা যায়, গণতন্ত্রের স্বার্থে বাংলাদেশে পৌরুষ নিয়ে আপসহীন অবস্থানে আছেন একজন, তার নাম খালেদা জিয়া। তাই আজকের দিনটা অঙ্ক মিলাবার নয়, সাফল্য-ব্যর্থতা পরিমাপের নয়- সঙ্কটের অর্থবহ উত্তরণ ঘটিয়ে গণতন্ত্রকে বিকশিত করার প্রতিশ্রুতিটি আরো শাণিত করার দিন।
সবশেষে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর ভাষায় বলতে চাই- ‘জেদের ভাত কুত্তা দিয়ে আর কত খাওয়াবেন’, নথ খসাতেই হবে। তাহলে লোক হাসাচ্ছেন কেন। জনগণের সময় গোনার মধ্যে প্রতিহিংসার দাউ দাউ জ্বলা আগুন নেভান। নয়তো সবাইকে পুড়ে মরতে হবে।

কে বড় স্বৈরাচার? by এম আবদুল্লাহ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার চেয়েও বড় স্বৈরাচার বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখনকার প্রধানমন্ত্রী আমার চেয়েও বড় স্বৈরাচার। আমি গুলি করে মানুষ মারি নাই, মানুষ হত্যা করি নাই। এখন প্রতিদিন নূর হোসেন, বিশ্বজিৎ মরছে। কিন্তু আমাদের চোখে পানি আসে না।’ গত ৮ মার্চ রোববার দুপুরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে দলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের যৌথ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এরশাদ বলেন, ‘গণতন্ত্র এখন কবরে, নির্বাসনে’। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতির এক আলোচিত চরিত্র। তার স্ববিরোধী বক্তব্য, রাজনৈতিক ডিগবাজি, সকাল-বিকেল রূপ পরিবর্তন বাংলাদেশের মানুষকে যুগপৎভাবে বিস্মিত করে এবং আনন্দ দেয়। এটা বোধ করি তিনিও জানেন। এরশাদের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সম্ভবত তার সহধর্মিণী রওশন এরশাদ থেকে শুরু করে ঘনিষ্ঠ আপনজন এবং আশপাশের রাজনৈতিক সহকর্মীসহ সবারই সম্যক ধারণা রয়েছে। কিন্তু গত রোববারের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনার ঝড় বইছে, যেভাবে লিংক শেয়ারের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অনেকেই ‘আনপ্রেডিক্টেবল খেলোয়াড়’ এরশাদের বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করছেন। যার নামের সাথে ‘স্বৈরাচার’ শব্দটি একরকম একাকার হয়ে গেছে, তিনি যখন তার নেত্রীকে নিজের চেয়ে বড় ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে সার্টিফাই করেন; তখন অনেকেই তা আমলে নেন। তার নেত্রী বলছি এ জন্য যে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে এখনো দায়িত্বে আছেন এবং সব রকম প্রটোকল ও সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন।
স্বৈরাচার হিসেবে কে বড়, কে ছোট তা পরিমাপ করার জন্য এখনো ব্যারোমিটার আবিষ্কার হয়নি। তবে কিছু মাপকাঠি এবং সূচক বিশ্লেষণে এরশাদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা যেতে পারে। তার আগে জেনে নেয়া যাক ‘স্বৈরাচার’-এর গুণাগুণ কী?
অভিধানের সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বৈরাচারী হলো এমন শাসনব্যবস্থা, যাতে রাষ্ট্রের সার্বভৌম মতা একজন ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত থাকে। স্বৈরশাসন বা একনায়কতন্ত্রকে সামাজিকভাবে নিকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। এই শাসনব্যবস্থায় কার্যত আইনসভার অস্তিত্ব নেই বলে শাসনকর্তা তার খেয়াল-খুশিমতো দেশ পরিচালনা করেন। এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে দেখা যায়। এ শাসনব্যবস্থা মূলত স্বেচ্ছাচারমূলক।
গ্রিক মনীষী অ্যারিস্টটলের ভাষায়- ‘স্বৈরশাসনে একজন একনায়ক সব শাসনকাজ পরিচালনা করে থাকেন। একনায়ক রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা এবং চরম মতার উৎস, মতা প্রয়োগে কেউ তাকে বাধা দিতে পারে না। এক দেশ, এক জাতি, এক নেতা মানসিকতা নিয়ে তিনি ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন। তার কাজকর্মের জন্য তাকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। তার আদেশ-নির্দেশ সবাই মেনে চলতে বাধ্য হয়। স্বৈরশাসন ব্যবস্থায় একটি মাত্র রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়। বহু মত, বহু দলকে অগ্রাহ্য করা হয়। একনায়ক তার পছন্দমতো উপদেষ্টাদের নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। উপদেষ্টামণ্ডলী তার কাছে দায়ী থাকেন ও তার সন্তুষ্টির ওপর তাদের কার্যকাল নির্ভর করে।’
অ্যারিস্টটল স্বৈরশাসনের সংজ্ঞায় আরো বলেন, ‘এ ধরনের শাসনে জনসাধারণের স্বাতন্ত্র্য থাকে না। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরোধী। এই শাসনব্যবস্থার কোনো সমালোচনা কেউ করতে পারে না। বিভিন্ন মতবাদ জোরপূর্বক দমন করা হয়। একনায়কতন্ত্র উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামরিক শক্তির বিকাশ ঘটায়। এ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকতা-বিরোধী। একটি স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থা। এই শাসনব্যবস্থা অস্থায়ী। কারণ, একনায়কের মৃত্যুর সাথে সাথে এ শাসনও শেষ হয়ে যায়।’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার চেয়ে বড় স্বৈরাচারী হিসেবে তকমা দেয়ার ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলের এ সংজ্ঞার সাথে মিলিয়ে দেখেছেন কি না তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। স্বৈরতন্ত্রের বিপরীত শাসনব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র। কোন সরকার কতটা গণতন্ত্রী আর কোন মাত্রার স্বৈরতন্ত্রী তা বোঝার জন্য সাধারণত সেই সরকারের সময় রাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে তার দিকে নজর দেয়া হয়। আইনসভা, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ- তিনটির বাইরে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে আমলে নেয়া হয়। এগুলো কতটা গণপ্রতিনিধিত্বমূলক বা কোন মাত্রায় নিয়ন্ত্রিত তা পর্যবেক্ষণ করলেই ওই সময়কার রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার স্বরূপ ফুটে ওঠে।
সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণে গেলে দেখা যাবে, এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছেন রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ১৯৮২ সালের ২৩ মার্চ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। সেই ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে দেশে একজন মানুষও মরেনি। যদিও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের যোগসূত্র রয়েছে বলে প্রবল ধারণা রয়েছে। জিয়ার হত্যা এবং প্রতিহত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাদ দিলে এরশাদের ক্ষমতা দখল ছিল রক্তপাতহীন। পক্ষান্তরে বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যে সরকার রয়েছে তার জন্য রক্ত ঝরেছে প্রচুর। জীবন গেছে শতাধিক মানুষের। কেবল ৫ জানুয়ারির একতরফা ভাগাভাগি আর তামাশার নির্বাচনের দিনই নিহত হয়েছে ২৫ জন। আর ওই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন করা আর প্রতিহত করার সঙ্ঘাতে নিহতের সংখ্যা শতাধিক। বিশ্বগণমাধ্যম ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে আরো অনেক বিশেষণের সাথে ‘প্রাণঘাতী নির্বাচন’ হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। এ বিবেচনায় এরশাদের দাবি সমর্থনযোগ্য বৈকি।
দ্বিতীয় মাপকাঠি যদি ধরা হয় রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিরোধী আন্দোলন দমন, তাতে দেখা যায় এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর জারি করেন সামরিক আইন। তার পর দল গঠন করে আন্দেলনরতদের বর্জনের মুখে দু’টি নির্বাচন করে ৯ বছর দেশ শাসন করেন। এই ৯ বছরে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও বামদলগুলোসহ পুরনো সব রাজনৈতিক দল আন্দোলন করে অবশেষে ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এই দীর্ঘ আন্দোলনের সময় বহু বিরোধী কর্মী হতাহত হয়েছে। তবে বড় ধরনের হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ’৯০-এর নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর, এ দুই মাসে।
’৯০-এর ২ ডিসেম্বর ‘আন্দোলনের বুলেটিন’ নামে এক প্রকাশনায় দেয়া তথ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই বছরের ২৭ নভেম্বর জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্দোলনরতদের ওপর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর গুলিতে ২৫ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই বুলেটিনে তাদের নাম ছিল। সর্বশেষ আলোচিত হত্যাকাণ্ড ছিল নূর হোসেন ও ডা: শামসুল আলম মিলন। তার আগে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসহ নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
প্রকারান্তরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ দফায় দ্বিতীয় মেয়াদের বর্তমান সরকারের সময়ে প্রথম এক বছর কোনো আন্দোলন হয়নি। দ্বিতীয় বছরের প্রথম দু’মাসের আন্দোলন শেষে তৃতীয় মাস চলছে। নব্বইয়ের নভেম্বর-ডিসেম্বরের সাথে যদি বর্তমান সরকারের গেল জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির তুলনা করা হয় তাতেও দেখা যাবে সরকারি বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা এরশাদের সময়ের তিন গুণ। সম্প্রতি সংবাদপত্রে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর হাতে বিরোধী নেতাকর্মী হত্যা ও গুমের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় দু’মাসে ৭৯ জনের হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এদের সুনির্দিষ্ট তালিকা ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রথম আলো ১০ মার্চ ২০১৫ মঙ্গলবার ৬৪ দিনের অবরোধ হরতালের যে রক্ষণশীল পরিসংখ্যান দিয়েছে তাতে দেখা যায়, মোট ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। তন্মধ্যে ৬৩ জন নিহত হয়েছেন পেট্রলবোমায়। বাকিরা কথিত বন্দুকযুদ্ধ, সংঘর্ষ ও গুলিতে নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানও এরশাদের দাবিকে সমর্থন করে। অন্তত সরকারি বাহিনীর হাতে লাশ পড়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার এরশাদের চেয়ে বেশ এগিয়ে রয়েছে।
এর বাইরে গণমাধ্যম ও বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতার মাপকাঠিতে যদি বিবেচনা করা হয় তা-ও এরশাদের দাবিকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ কম। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা যে, এরশাদ আমলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছিল। কিন্তু মাত্রা বর্তমান সময়ের চেয়ে কোনোমতেই বেশি ছিল না। সে সময় সংবাদপত্রের সংখ্যা অনেক কম ছিল এবং বেসরকারি টেলিভিশন ছিল না। ফলে টেলিভিশনের ওপর চলমান নগ্ন হস্তক্ষেপের বিষয়টি এ পর্যালোচনায় বাদ রাখছি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব, বন্ধ করে দেয়া, সাংবাদিকদের কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া, গণমাধ্যমজুড়ে ত্রাস সৃষ্টির ক্ষেত্রে এরশাদ শাসনের দৃষ্টান্তগুলোকে অনেকখানি ম্লান করে দেয়ার কৃতিত্ব দাবি করতে পারে বর্তমান সরকার। এরশাদ আমলে দৈনিক ইনকিলাব বন্ধ হয়েছিল, এবারো দু’দফা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু ওই সময় পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ও সাংবাদিককে কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া, দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, কম্পিউটারসহ মুদ্রণ সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া, প্রেসে তালা লাগিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি, যা এবার ঘটেছে। এরশাদের সময় সাপ্তাহিক যায়যায়দিন বন্ধ করে দেয়া হলেও পত্রিকার সম্পাদক অন্তত দেশ ছেড়ে মুক্ত আলোবাতাসে ছিলেন। এবার আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে সম্পাদককে কমান্ডো স্টাইলে গ্রেফতার করে দু’দফায় বছরের পর বছর জেলে পুরে রাখা হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদকে বিনা মামলায় ধরে নিয়ে রিমান্ডে হয়রানি করা হয়েছে। দুর্নীতির রিপোর্ট করায় জনপ্রিয় অনলাইন শীর্ষনিউজ.কম ও শীর্ষকাগজের সম্পাদক একরামুল হককে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার ও রিমান্ডের ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। গণমাধ্যমে এ ধরনের আরো অনেক নিপীড়নমূলক উদাহরণ বর্তমান সরকার সৃষ্টি করেছে যা এ স্বল্প পরিসরে বর্ণনার সুযোগ কম।
এরশাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত নানা রকম ব্যঙ্গচিত্র, প্রচারপত্র বিলি হতে দেখা যায়। একটি প্রচারপত্রের এক দিকে ছাপা হয়েছিল একটি কবিতা। কবি শামসুর রাহমানের লেখা কবিতার শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ চায় না তোমাকে’। ওই প্রচারপত্রের অন্য দিকে ছিল কামরুল হাসানের সেই বিখ্যাত কার্টুন ‘বিশ্ব বেহায়া’। সংবাদপত্রগুলোতেও কিছু সময় বাদ দিলে বেশির ভাগ সময় এরশাদ সরকারের সমালোচনা করা গেছে।
এখন প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করলে, তার ছবি বিকৃত করলে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে সাত বছর পর্যন্ত জেল দেয়ার নতুন নজির দেখা যাচ্ছে। এরশাদ তেমনটা করলে ‘বাংলাদেশ চায় না তোমাকে’ শিরোনামে আক্রমণাত্মক ভাষার কবিতার জন্য কবি শামসুর রাহমানকে এবং ‘বিশ্ব বেহায়া’ ব্যঙ্গচিত্রের জন্য শিল্পী কামরুল হাসানের কী পরিণতি ভোগ করতে হতো তা আল্লাহ মালুম।
রাজনৈতিক অধিকারের দিকে তাকালে দেখা যাবে এরশাদ সরকার প্রধান কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় বছরের পর বছর তালা দিয়ে রাখেনি। মিছিল, সমাবেশ হয়েছে হররোজ। মাঝে মধ্যে বাধা এসেছে এরশাদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে। বাধার ক্ষেত্রে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ করেছে, তার পর টিয়ারগ্যাস ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথমে ফাঁকা গুলি এবং পরে গুলি করলেও তা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে খুবই সীমিত আকারে। আর এখন? স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় নিষিদ্ধ।
প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রধান কার্যালয় তালাবদ্ধ। যত দিন ওই অফিসে দলীয় নেতাদের যাওয়ার সুযোগ ছিল তত দিনও পুলিশ বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ ছিল। আর মিছিল দেখলে গুলি দিয়ে পুলিশি অ্যাকশন শুরু হয়। আগে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া, যথেষ্ট যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া গুলি ছুড়লে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হতো। এখন উল্টো। গণমাধ্যমে কোনো সরকারবিরোধী মিছিলের খবর এলে ওই এলাকার কর্তব্যরত পুলিশকে জবাবদিহি করতে হয়- কেন দেখামাত্র গুলি করে ওদের খুলি উড়িয়ে দেয়া হয়নি। রাজনৈতিক নেতাদের নির্বিচারে গ্রেফতার আর রিমান্ডে নির্যাতনের ক্ষেত্রেও শুধু এরশাদ আমল নয়, সর্বকালের সর্বযুগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বর্তমান সরকার। ফলে এরশাদের মুখে ‘বড় স্বৈরাচার’-এর তকমা বর্তমান সরকারপ্রধানকে দেয়া অন্যায্য মনে করছেন না অনেকেই।
এর বাইরে প্রশাসনকে দলীয়করণ, বিচারব্যবস্থাকে কব্জা করাসহ অন্য সব ক্ষেত্রে বিশদ আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় এরশাদকে ছাড়িয়ে গেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে তার বিশেষ দূত তার প্রতি কোনো অবিচার করেছেন বলে অন্তত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপর বিশাল জনগোষ্ঠী মনে করছেন না। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে বা তার দলের কেউ এ লেখা পর্যন্ত এরশাদের সাথে দ্বিমত করতে দেখিনি। ফলে ধরেই নেয়া যায় যে, এরশাদের নতুন সার্টিফিকেট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাদরে গ্রহণ করবেন এবং তার সরকার ও দল তা কবুল করে নেবে। তাহলে অন্তত প্রথমবারের মতো এরশাদ একটি সত্য উচ্চারণ করেছেন বলে যারা মতামত দিচ্ছেন তাদের প্রতি সুবিচার করা হবে।
লেখক : সিনিয়র সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে

এবার ইসরাইলি চর হত্যার ভিডিও প্রকাশ

ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে চরবৃত্তির অভিযোগে মুহাম্মদ মুসাল্লাম (১৯) নামের এক ইসরাইলি-আরব তরুণকে হত্যার ভিডিও প্রকাশ করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এতে দেখা যায়, এক বালক (যার বয়স কোনোভাবেই ১০ বছরের বেশি হবে না) তাকে গুলি করে হত্যা করছে। মঙ্গলবার নিজেদের অনলাইন গণমাধ্যম ‘ফুরকান’ এ ভিডিওটি প্রকাশ করেছে আইএস। এতে বলা হয়েছে, বিদেশী যোদ্ধা হিসেবে সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যোগদানের জন্য জাহির করে মুসাল্লাম।
যোদ্ধা হিসেবে নেয়ার পর সে মোসাদের চর হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ১৩ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কমলা রঙয়ের জাম্পস্যুট পরা মুসাল্লাম একটি ঘরে বসে মোসাদ তাকে কীভাবে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তার বর্ণনা দিচ্ছেন। বক্তব্য শেষে মুসাল্লামকে পাহারা দিয়ে একটি খোলা মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে এক বালক তার মাথায় গুলি করে। এই বালককে ‘খিলাফতের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন আইএসের এক ফরাসিভাষী সদস্য। ওই সদস্য ফরাসি ভাষায় মুসাল্লামকে দেয়া দণ্ড পড়ে শোনান, এ সময় সে (মুসাল্লাম) মাটিতে হাঁটু গেড়ে ছিলেন। শাস্তি পড়ে শোনানোর পর সামরিক পোশাক পরিহিত পিস্তলধারী এক বালক এসে মুসাল্লামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার কপালে একটি গুলি করে। মুসাল্লাম পড়ে যাওয়ার পর বালকটি তাকে লক্ষ্য করে আরও তিনটি গুলি করে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে ধ্বনি তোলে।

পাকিস্তানে মুত্তাহিদ পার্টির কার্যালয় সিলগালা

পাকিস্তানের আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের (এমকিউএম) করাচির প্রধান কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে সিলগালা করে দিয়েছে। বুধবার ভোরে এ তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে দলীয় এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এমকিউএম করাচির সবচেয়ে বড় একটি রাজনৈতিক দল। পাকিস্তান রেঞ্জার্সের মুখপাত্র কর্নেল তাহির বলেন, অভিযানে এমকিউএমের কার্যালয় থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং তালিকাভুক্ত অপরাধীদের আটক করা হয়েছে। দুই ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালানো হয়। এ অভিযানের প্রতিবাদে এমকিউএম দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। দলটির সমর্থক এবং কর্মীরা এর মধ্যে প্রধান দলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ করছে। এমকিউএমের জ্যেষ্ঠ নেতা ফারুক সাত্তার বলেন,
অন্যায় ও অবিবেচক একটি অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা সবসময় সন্ত্রাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করি। করাচির আজিজাবাদ এলাকায় এমকিউএমের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। বুধবার সকালে সশস্ত্র সেনারা কার্যালয়ের চারপাশে অবস্থান নিতে শুরু করে। বুধবারেই দলটির একটি বিশেষ আন্দোলন কর্মসূচি ধার্য করা হয়েছিল, যার নাম- ‘শান্তিপূর্ণ সকাল’ বা পিসফুল মর্নিং। এমকিউএমের প্রধান নির্বাহী কমিটির নাম রাবিতা। রাবিতার অন্যতম সদস্য আমির খান কার্যালয় ঘেরাওয়ের সময় ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি ছাড়াও দলীয় আরও নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে সশস্ত্রবাহিনী যাদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। রেঞ্জার্সের সদস্যরা দলীয় এক নেতাকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছেন দলের ঊর্ধ্বতন মুখপাত্র ওয়াসি জলিল। নিহত সদস্যের নাম ওয়াক্বাস আলি শাহ। সশস্ত্রবাহিনী জানায়, কেন্দ্রীয় কার্যালয় নাইন-জিরো থেকে তারা বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। আগ্নেয়াস্ত্রসমূহ ন্যাটোর কন্টেইনার থেকে চুরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। ঘটনা প্রচারিত হওয়ার পর থেকে করাচির দলীয় সদর দফতরে নেতাকর্মীরা ভিড় করতে শুরু করেন। কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
একনজরে এমকিউএম
১৯৮৪ : দেশ বিভাগের সময় (১৯৪৭) ভারত থেকে আগত উর্দুভাষী মুহাজিরদের নিয়ে এমকিউএম প্রতিষ্ঠা করা হয়
১৯৮৮ : করাচির সব আসনে বিজয়ী হয়ে পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়
১৯৯২ : দলের প্রধান আলতাফ হোসাইনের বিরুদ্ধে খুনের মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে তিনি দেশত্যাগ করেন
২০০৪ : সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের বড় মিত্রজোট হিসেবে আবির্ভাব
২০১৪ : আলতাফ হোসেনের বাসায় লন্ডন পুলিশের অভিযান। অর্থ পাচার ও হত্যা মামলার তদন্ত

ভারতের ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক

ভারতের আদিত্য কুমার পেশায় একজন শিক্ষক। শুধু বস্তির শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি প্রতিদিন সাইকেলে পাড়ি দেন ৪০ মাইল পথ। শুধু তাই নয়, শিশুদের জন্য পুরোনো সাইকেলটি বোঝাই থাকে বইয়ে। আদিত্য প্রায় দুই দশক ধরে তার ভ্রাম্যমাণ স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এই স্কুলে নির্দিষ্ট কোনো কারিকুলাম ও মানসম্মত কোনো পাঠ্যবই নেই। তার বয়স ৪০ এর কোঠায়। ভ্রাম্যমাল স্কুল চালায় বলে স্থানীয়দের কাছে তিনি ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক বলেও সুপরিচিত। আদিত্যর অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর বয়স ১০ বছরের কম।
তিনি তাদের ইংরেজি ও অংক শিক্ষা দেন। বলা যায়, লক্ষ্ণৌর বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। বিজ্ঞানে স্নাতক মহান এই শিক্ষক বস্তির দরিদ্র শিশুদের পড়ালেখার কোনো অর্থ নেন না। তিনি বিনামূল্যে তাদের পাঠ দান করে যাচ্ছেন। নগরীর কোথাও তার প্রয়োজন হলে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখানে গিয়ে হাজির হন এবং ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান শুরু করেন। আদিত্য বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘স্কুলের ক্লাসরুমগুলো কেমন এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা তা জানে না।’ এ সময় একদল শিশু তার কাছে লেখাপড়া শিখছিল। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করে ২০০৯ সালে ভারতে রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট পাস হয়। কিন্তু শিক্ষাকর্মীরা জানান, স্কুলগুলোতে প্রায়ই ছাত্রছাত্রীদের স্থান সংকুলান হয় না। একজন দরিদ্র শ্রমিকের ছেলে হিসেবে কুমারকে স্কুলে যাওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার বাবা চাইতেন যে তার সন্তানরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অর্থ উপার্জন করুক।
তিনি একটি সরকারি স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পান। তবে লেখাপড়া শেখার জন্য কিশোর বয়সেই তাকে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসতে হয়। কারণ তার দরিদ্র মা-বাবা তার পড়ালেখা বন্ধ করে উপার্জনশীল কাজে লাগাতে চাইতেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি রাস্তায় বাস করেন। এরপর একজন শিক্ষকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি তার ভেতর সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করতে সহায়তা করেন। স্কুলে শিক্ষকতা করার কোনো ইচ্ছে আদিত্যের ছিল না। তিনি বিশ্বাস করেন তার ভ্রাম্যমাণ স্কুলের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার আলো ছড়ানোর ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখতে পারবেন। দিনে প্রায় ২০০ শিশুকে পাঠদান করেন আদিত্য।

ভারত ফেলনা নয় by কুলদীপ নায়ার

চীন যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তার জন্য তাকে পুরো নম্বরই দেওয়া উচিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অরুণাচল প্রদেশ সফর নিয়ে চীন তার অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। বেইজিংয়ে নিযুক্ত ভারতের বিশেষ বার্তাবাহককে ডেকে চীন এই বার্তা দিয়েছে। এই অঞ্চল ভারতের অংশ। চীন আজকের সামরিক সক্ষমতা অর্জনের আগ পর্যন্ত এই অঞ্চল কখনোই নিজের বলে দাবি করেনি। বেইজিং ভারতের রাষ্ট্রদূত অশোক কান্তাকে জানিয়েছে, মোদির অরুণাচল সফর ‘চীনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে’। বেশি দিন আগের কথা নয়, বেইজিং অরুণাচল প্রদেশের যে মানুষেরা চীন সফরে যেত তাদের ভিসায় স্টেপলার মারা শুরু করে। ভাবখানা এমন যে তারা ভিন্ন ‘ভূখণ্ডের’ মানুষ, যে ভূখণ্ড ঠিক ভারতের অংশ নয়।
নয়াদিল্লি সে সময় এই অবমাননা নীরবে মেনে নিয়েছিল। এই প্রথমবার বেইজিং প্রকাশ্যে তার অসন্তোষ জানাল। ইতিপূর্বে ভারত তার মানচিত্রে অরুণাচলকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে দেখালেও চীন তাতে আপত্তি জানায়নি। আসলে বিতর্কটা শুরু হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ ও চীন সীমান্তের মধ্যকার ছোট একটি ভূখণ্ড নিয়ে। কিন্তু অরুণাচলের মর্যাদা নিয়ে কদাচিৎই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
যখন গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি চীনা উপ–পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিউ ঝেনমিনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তখন সেটা আসলে ঔদ্ধত্যেরই অংশ। তিনি বলেছেন, ‘মোদির সফর চীনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব, অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে। এমন কাজের কারণে দেশ দুটির মধ্যে বিরাজমান সীমান্তবিষয়ক মতদ্বৈধতা কৃত্রিমভাবে বেড়ে যাবে। দেশ দুটি যে বিষয়টি যথাযথভাবে মোকাবিলার ব্যাপারে নীতিগত মতৈক্যে পৌঁছেছে, এ সফর সেই মতৈক্যের বিরোধী।’
এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লি চীনের আপত্তির ব্যাপারে শক্ত অবস্থানেই আছে। নয়াদিল্লি যে বলেছে, প্রধানমন্ত্রী আবারও অরুণাচল সফল করবেন, তা সে সঠিকভাবেই বলেছে। নয়াদিল্লি সেই সফরের তারিখ ঘোষণা করলে বার্তাটি আরও পরিষ্কার হতো। এটা সত্য যে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত। প্রয়োজন হলে তাতে পরিবর্তনও আনা যায়। তারিখ দেওয়া হলে বার্তাটি আরও পরিষ্কার হতো।
বস্তুত, সরকার না করলেও বিজেপির উচিত হচ্ছে, আগামী মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতের উদ্বেগ ও অসন্তোষ জানাতে চীন সফর করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তোলা। ভারত যে ফেলনা নয়, চীনকে সেটা বুঝতে হবে।
সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর পিছিয়ে দেওয়া হলে নয়াদিল্লির তেমন কোনো সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে না। সফর বাতিল করাটা অবশ্য ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু চীন যে পরিমাণে উসকানি দিচ্ছে, তাতে ভারতের এই সফর নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত। চীনের এই ঔদ্ধত্য এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যায় না, এটা খণ্ডন করতে হবে।
ভূখণ্ডগত ব্যাপার যদি ভারতের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রীর উচিত, শুরুতেই চীনকে বলে দেওয়া যে ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। বস্তুত, ব্যাপারটা উল্টো। উভয়ের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে সংবেদনশীলতার ব্যাপারে মতৈক্য থাকলে চীন-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। চীন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের বেশ কিছু ভূমি দখল করে আছে।
চীনের পেশি ফোলানোর ব্যাপারে নয়াদিল্লির সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, ভারত অতীতেও বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে এক চিঠিতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘দুনিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত অর্থে শান্তি ও সহযোগিতার সম্পর্ক না থাকলেও তাদের অন্তত বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ এড়ানো উচিত। যাতে করে পরবর্তীকালে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো যায়।
‘যদি যুদ্ধ লেগেও যায়, তাহলেও আমাদের এর বাইরে থাকতে হবে। দুনিয়ার কিছু অঞ্চলও যদি পরাশক্তির বিবাদের বাইরে থাকে, তাহলেও কিছু লাভ আছে। সে কারণেই আমরা দুই পরাশক্তির একটির সঙ্গেও জোট বাঁধিনি। একইভাবে আমরা মিডল ইস্ট ডিফেন্স অর্গানাইজেশন ও সাউথইস্ট এশিয়ায়ও যোগ দিইনি...সামনের দিনে আমাদের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হবে।’
তখন নেহরুই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দ্বন্দ্ব এড়াতে পারতেন। তিনি তা করেছিলেনও বটে। মোদির সেই মর্যাদা নেই, তাঁর সেই লক্ষ্যও নেই। তার পরও তিনি যুদ্ধ থামাতে পারেন, বিশেষ করে তঁার নতুন বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাহায্যে। দুনিয়ায় প্রভুত্ব করার বেইজিংয়ের আকাঙ্ক্ষা নতুন ব্যাপার নয়। তারা সব সময়ই সুলতান হতে চেয়েছে, দুনিয়াকে দরবার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে।
চীন এখনো ভারতের ভূমি দখল করে রেখেছে, চীনের এই বৈঠকে এ কথা বলার পর আমি চীনা জেনারেলদের যে রাগান্বিত চেহারা দেখেছি, সেটা আমার এখনো মনে আছে। তাদের উত্তরের মধ্যে সামরিকতার ঝাঁজ ছিল। তারা বলেছিল, ‘১৯৬২ সালে আপনাদের যে শিক্ষা দিয়েছিলাম, সেটা আপনারা ভুলে গেছেন।’
নেহরু তিব্বতকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভুল করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করবেন বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এর মধ্য দিয়ে শুধু নেহরুর আন্তর্জাতিক যোগাযোগগুলো ব্যবহার করেছেন। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে তাঁর আসল চেহারা প্রকাশ পায়।
ভারতের উচিত সর্বতোভাবে চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা, কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই ভূখণ্ডের বিনিময়ে নয়। চীন যদি অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দিতে না চায়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চীন সফর কী কাজে লাগবে? অরুণাচল প্রদেশকে স্বীকৃতি না দিয়ে চীন ভারতের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে যে পার পাবে না, তাকে সেটা বোঝানোর সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
এই অঞ্চলের শান্তির জন্য চীন ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। কিন্তু চীনকে এ ক্ষেত্রে ভারতের মতো আন্তরিকতা দেখাতে হবে। কিন্তু চীনের হাবভাব দেখে মনে হয়, তারা অসম ক্ষমতা সম্পর্কের জায়গা থেকে কথা বলতে চায়। তারা ভারতকে ঘিরেও ফেলতে চায়। চীন নেপালকে উদারভাবে সহযোগিতা করেছে। তারা শ্রীলঙ্কায় বন্দরও নির্মাণ করছে। আবার সে মিয়ানমারকেও নিজের দলে টানতে চায়।
চীন যদি ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়, তাহলে নয়াদিল্লি মোটেও আপত্তি করবে না। কিন্তু সেটা যদি তাকে চাপ প্রয়োগের জন্য হয়, তাহলে সেখানে দুরভিসন্ধি আছে। এটা বন্ধুত্বের নিদর্শন নয়, ভারত সেই বন্ধুত্বই চাষ করতে চায়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

ভারতের ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক

(বয়স ৪০ এর কোঠায়। প্রতিদিন ৪০ মাইল পথ পাড়ি দেন সাইকেলে। পুরনো সাইকেল বোঝাই থাকে বইয়ে। দিনে প্রায় ২০০ শিশুকে পাঠদান করেন তিনি) ভারতের আদিত্য কুমার পেশায় একজন শিক্ষক। শুধু বস্তির শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি প্রতিদিন সাইকেলে পাড়ি দেন ৪০ মাইল পথ। শুধু তাই নয়, শিশুদের জন্য পুরোনো সাইকেলটি বোঝাই থাকে বইয়ে। আদিত্য প্রায় দুই দশক ধরে তার ভ্রাম্যমাণ স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এই স্কুলে নির্দিষ্ট কোনো কারিকুলাম ও মানসম্মত কোনো পাঠ্যবই নেই। তার বয়স ৪০ এর কোঠায়। ভ্রাম্যমাল স্কুল চালায় বলে স্থানীয়দের কাছে তিনি ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক বলেও সুপরিচিত। আদিত্যর অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর বয়স ১০ বছরের কম। তিনি তাদের ইংরেজি ও অংক শিক্ষা দেন।
বলা যায়, লক্ষ্ণৌর বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। বিজ্ঞানে স্নাতক মহান এই শিক্ষক বস্তির দরিদ্র শিশুদের পড়ালেখার কোনো অর্থ নেন না। তিনি বিনামূল্যে তাদের পাঠ দান করে যাচ্ছেন। নগরীর কোথাও তার প্রয়োজন হলে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখানে গিয়ে হাজির হন এবং ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান শুরু করেন।
আদিত্য বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘স্কুলের ক্লাসরুমগুলো কেমন এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা তা জানে না।’ এ সময় একদল শিশু তার কাছে লেখাপড়া শিখছিল।
৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করে ২০০৯ সালে ভারতে রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট পাস হয়। কিন্তু শিক্ষাকর্মীরা জানান, স্কুলগুলোতে প্রায়ই ছাত্রছাত্রীদের স্থান সংকুলান হয় না।
একজন দরিদ্র শ্রমিকের ছেলে হিসেবে কুমারকে স্কুলে যাওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার বাবা চাইতেন যে তার সন্তানরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অর্থ উপার্জন করুক। তিনি একটি সরকারি স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পান। তবে লেখাপড়া শেখার জন্য কিশোর বয়সেই তাকে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসতে হয়। কারণ তার দরিদ্র মা-বাবা তার পড়ালেখা বন্ধ করে উপার্জনশীল কাজে লাগাতে চাইতেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি রাস্তায় বাস করেন। এরপর একজন শিক্ষকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি তার ভেতর সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করতে সহায়তা করেন। স্কুলে শিক্ষকতা করার কোনো ইচ্ছে আদিত্যের ছিল না।
তিনি বিশ্বাস করেন তার ভ্রাম্যমাণ স্কুলের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার আলো ছড়ানোর ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখতে পারবেন। দিনে প্রায় ২০০ শিশুকে পাঠদান করেন আদিত্য।

সোহরাওয়ার্দীতে অন্য রকম চিত্র by মাহমুদ মানজুর

টানা দুই মাসের হরতাল-অবরোধ-সহিংসতার জের ধরে পঙ্গুতে (জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল) গুলিবিদ্ধ আর ঢামেক (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ঝলসানো রোগী-স্বজনের উপচে পড়া ভিড়। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার বলি এসব রোগীকে কেন্দ্র করে দুই হাসপাতালে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর মিডিয়াকর্মীদের সরব উপস্থিতিও। অথচ একই সময়ে রাজধানীর অন্যতম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল শহীদ সোহরাওয়ার্দীতে রোগীর সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। নেই পুলিশ কিংবা গণমাধ্যমকর্মীদের তৎপরতা। সোহরাওয়ার্দীর অত্যাধুনিক বার্ন ইউনিটসহ মেডিসিন, ডেন্টাল, শিশু বিকাশ কেন্দ্র, অর্থোপেডিক ও ট্রমা সার্জন, চর্ম ও যৌন রোগ, শিশু, গাইনি, এজমা সেন্টার, নিউরোলজি ও কার্ডিওলজি বিভাগসহ ১১টি বিভাগে রয়েছে রোগী-স্বল্পতায়। মঙ্গলবার ৮৭৫ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে গিয়ে এমনটাই দেখা যায়। জরুরি বিভাগের রোগী ভর্তির রেজিস্ট্রি খাতা থেকে জানা যায়, রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকে সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত এখানে রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৪ জন। অন্যদিকে হাসপাতালটির বহির্বিভাগ খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। মঙ্গলবার এ সময়ে শ’খানিক রোগী এলেও ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা মাত্র ২১ জন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তির কর্তব্যরত রেজিস্ট্রার খোরশেদ জানান, হরতাল-অবরোধের কারণে এখন রোগীদের আগমন এবং ভর্তির সংখ্যা অনেক কমেছে। গত ১৫ ঘণ্টায় রোগী এসেছে মাত্র ২৪ জন। অথচ দুই মাস আগে প্রতিদিন গড়ে জরুরি বিভাগে রোগী আসতেন ন্যূনতম ৫০ থেকে ৬০, বহির্বিভাগে আসতেন শতাধিক। সত্যি বলতে, আগে রোগীদের চাপে আমাদের হিমশিম খেতে হতো। আর এখন অলস বসে সময় কাটাতে হয়। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে অসংখ্য রোগী এখন গ্রাম থেকে ঢাকার হাসপাতালে আসার সাহস পাচ্ছেন না। তা ছাড়া বাসে-ট্রেনে ভয় পেট্রলবোমার। অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াও এখন দ্বিগুণ। এসব কারণেই রোগীর সংখ্যা গত দুই মাসে ক্রমেই কমেছে। অন্যদিকে একই কথা স্বীকার করে ৫ নম্বর পুরুষ ওয়ার্ডের কর্তব্যরত নার্স বলেন, হাসপাতালের পরিবেশ এখন বেশ স্বাভাবিক। বেডের অভাবে কোন রোগীকে মাটিতে অথবা বারান্দায় কষ্ট করতে হচ্ছে না। আমাদের ওপর চাপও কম। ঠাণ্ডা মাথায় রোগীদের সেবা করতে পারছি। হরতাল-অবরোধ উঠে গেলে রোগীদের চাপ বেড়ে যাবে। এদিকে পুরো হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতি ওয়ার্ডেই বেশ কয়েকটি করে বিছানা খালি। টাঙ্গাইল থেকে আসা খন্দকার মিজান জানান, তৃতীয় শ্রেণীপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালে আসার কথা ছিল তার। কারণ ছেলের ডান পায়ের পোড়া অংশে ক্ষত দেখা দিয়েছে। বাড়িতে আগুন নিয়ে খেলতে গিয়ে চার বছর আগে পুড়েছে ছেলের ডান পা। মাস দুয়েক হলো সেই পোড়ায় ক্ষত দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ডাক্তার বলেছেন, দ্রুত ঢাকায় নিয়ে আসতে। হরতাল-অবরোধের কারণে দুই মাস অপেক্ষা করেছি। কিন্তু এ অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় এক রকম বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন এই কৃষক। ভর্তি করিয়েছেন সোহরাওয়ার্দীর বার্ন ইউনিটে। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধে আতঙ্ক নিয়েই ঢাকা এসেছি। তবে এখানে এসে ভালই আছি। রোগীর চাপ খুব কম। এ হাসপাতালে আমার কানের চিকিৎসার জন্য ছয় মাস আগেও এসেছি। তখন দেখেছি রোগীরা রাত-দিন গিজগিজ করতেন। তখন ডাক্তার-নার্স-দারোয়ানরাও চরম দুর্ব্যবহার করতেন। আর এখন সবাই বেশ আন্তরিক। মনে হয় এখন তানাদের মাথা ঠাণ্ডা, রোগীর চাপ নাই তো, তাই। এদিকে হরতাল-অবরোধ-সহিংসতায় দগ্ধদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের দোতলায় ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আট শয্যার একটি পৃথক ইউনিট খোলা হয়েছে। বার্ন ইউনিটের পাঁচটি শয্যাও খালি করে রাখা হয়েছে। পেট্রলবোমায় দগ্ধদের সু-চিকিৎসার আশায় আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষ, অটোক্লেভ কক্ষ, ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে সব চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং চিকিৎসক-নার্স সবাইকে প্রস্তুত রেখেছে কর্তৃপক্ষ। দগ্ধ রোগীদের জন্য এ ধরনের প্রস্তুতি থাকলেও রোগী পাচ্ছে না এ হাসপাতালের আধুনিক বার্ন ইউনিট। এ ইউনিটে কর্তব্যরত একজন নার্স বলেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলবোমায় দগ্ধরা চিকিৎসা নিতে শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ছুটে যান। কারণ ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনায় কেউ দগ্ধ হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করার পর সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রোগীদের রেফার করা হয়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সমৃদ্ধ বার্ন ইউনিট থাকার পরও রোগীদের রেফার করা হয় না। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাব্যবস্থা থাকার পরও দগ্ধ রোগীদের এ হাসপাতালে সচরাচর আসতে দেখা যায় না। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম মুজিবুর রহমান বলেন, হরতাল-অবরোধ না থাকার সময়ে অস্বাভাবিক চাপে থাকি। তখন সারা দেশ থেকে হাজার হাজার রোগী ও স্বজন প্রতিদিন আমাদের কাছে আসেন। তখন চাপ সামাল দিতে আমরা হাঁপিয়ে উঠি। সেই তুলনায় এখন রোগীর সংখ্যা কমেছে, যেটাকে আমি কম না বলে স্বাভাবিক বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

বিনিয়োগে ধস by হামিদ বিশ্বাস

দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা অবরোধে দেশের অর্থনীতির প্রাণ ওষ্ঠাগত। কোথাও কোন বিনিয়োগ নেই। না ক্ষুদ্র, না বৃহৎ। সংকোচিত হয়ে আসছে অর্থনীতির সীমা। কমিয়ে আনা হচ্ছে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা। কাটছাঁট করা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প। একদিকে ক্ষতির ফিরিস্তি, অন্যদিকে টাকার স্তূপ। বিভিন্ন সংগঠন পৃথক ক্ষতির খতিয়ান দেখাচ্ছে মুমূর্ষু অর্থনীতির। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বলছে, ইতিমধ্যে ক্ষতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যরাও ক্ষতির পরিমাণ ১ থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার মতো বলছে। তবে দুটো জিনিস চরম সত্য। অবরোধে হচ্ছে ক্ষতি, বিনিয়োগ না হওয়ায় জমছে টাকা।
জানা গেছে, সব ধরনের বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার মতো উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল। বর্তমানে তার সঙ্গে আরও সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। এর মধ্যে একেবারে অলস পড়ে আছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছে, একেবারে অলস পড়ে থাকার পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার একটু বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৮ই জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে একেবারে অলস পড়ে থাকা টাকার পরিমাণ ২ হাজার ৯৫২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হলেও ১২ই ফেব্রুয়ারিতে তা গিয়ে ঠেকে ৩ হাজার ৩৭৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকায়। ধারণা করা হচ্ছে মার্চে ওই পরিমাণ আরও অনেক বেড়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিনিয়োগ না থাকায় ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করে বেকায়দায় পড়েছে। প্রচুর পরিমাণ অর্থ কোথায় খাটাবে কিংবা গ্রাহককে লাভ দেবে কিভাবে এসব দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেতে তারা ঝুঁকছে সরকারি বিল বন্ডের দিকে। সুযোগটি কাজে লাগাতে সরকারও এগিয়ে আসে। বর্তমানে দেশে কয়েক ধরনের বিল ও বন্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ড, ৩ মাস, ৬ মাস ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল এবং ৩০ দিন মেয়াদি বাংলাদেশ ব্যাংক বিল। বর্তমানে ৫.২৫% ও ১২% নামমাত্র সুদের বিল-বন্ডে আটকে আছে ব্যাংকিং খাতের ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্যের বেশির ভাগই। বিল-বন্ডে বিনিয়োগের প্রচুর এ অর্থকে অল্প কিছু দিন আগেও বলা হতো অলস টাকা। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়। বিষয়টিকে সরকার ভাল চোখে দেখেনি। সে কারণে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকেও যে এক লাখ কোটি টাকাকে বলা হতো অলস ২০১৪ সালের সীমানা পেরিয়ে ২০১৫ সালে প্রবেশ করেই ওই বিশাল অলসই হয়ে গেল বিনিয়োগ। বলা হচ্ছে, এটাও এক ধরনের বিনিয়োগ। যদিও এ বিনিয়োগের সুফল দৃশ্যমান নয়। যোগাযোগ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম জানান, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নেই বলে বাধ্য হয়ে সরকারি খাতে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। বিনিয়োগের দিক থেকে মোট অর্থনীতির ৮০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি খাত। যেহেতু এ খাত এখন বিনিয়োগশূন্য। সেহেতু বলা যায় অলস টাকা জমছে। অন্যদিকে যেভাবে হোক সরকারি খাতে বিনিয়োগ থাকায় প্রচুর পরিমাণের এ অর্থকে অলস বলতে নারাজ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নগদ আছে ৩ হাজার কোটি টাকা। সেগুলোকে তারা বলছে অলস। তবে মূল কথা হচ্ছে দেশে বিনিয়োগ নেই। অলস টাকা জমছে। সার্বিক ব্যাখ্যায় এটাই প্রমাণ হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভাল না, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে; তার সাক্ষ্য খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বোর্ডও দিচ্ছে। দীর্ঘ দিন থেকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে চরম খরা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষত টানা হরতাল-অবরোধে তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ সময় কর্মসংস্থান, প্রকল্প ও বিনিয়োগে ব্যাপক ধস নেমেছে। এর মধ্যে খুব শোচনীয় অবস্থানে রয়েছে বিদেশী খাত। এ খাতের সব সূচক-ই নিম্নমুখী। এ ছাড়া দেশী খাতেরও বেশ কিছু সূচক নেতিবাচক ও সমানে সমান। বিনিয়োগ বোর্ডের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী গেল জানুয়ারিতে দেশে মোট কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৩৫৭ জনের। যা আগের মাস ডিসেম্বরে ছিল ১৮ হাজার ৭৭৩ জনের। সে হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে দেশে কর্মসংস্থান কমেছে ৩ হাজার ৪১৬ জনের। একইভাবে নিবন্ধিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে। এ সময় দেশী-বিদেশী প্রকল্প নিবন্ধিত হয়েছে ১১৬টি। যা আগের মাসে ছিল ১২১টি। সে হিসেবে প্রকল্প নিবন্ধিতের সংখ্যা কমেছে ৫টি।
এ প্রসঙ্গে বিনিয়োগ বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের পরিস্থিতি খারাপ থাকায় বিদেশী বিনিয়োগের অবস্থা খুবই নাজুক। কর্মসংস্থানসহ সার্বিক সূচক কমার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে বিরোধী জোটের হরতাল-অবরোধ চলছে। বিদেশীরা ভয়ে আসছে না। এর মধ্যে কর্মসংস্থান-বিনিয়োগ আশা করাটাই ভুল। তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে হচ্ছে। এটা কম কিসের, প্রশ্ন তার।
বিনিয়োগ বোর্ডের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে বিদেশী কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৮৯ জনের। যা ডিসেম্বরে ছিল এক হাজার ৪২২ জন। সে হিসাবে বিদেশী কর্মসংস্থান কমেছে ৫৩৩ জনের। একই সঙ্গে কমেছে অপর দুই সূচকও। এ সময় বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩২১ কোটি টাকা। যা আগের মাসে ছিল ৩৩৪৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে বিদেশী খাতে বিনিয়োগ কমেছে ৩০২৭ কোটি টাকা। এ খাতের প্রকল্প নিবন্ধিত হয়েছে ৯টি। যা আগের মাসে ছিল ১৫টি। কমেছে ৬টি। বিওআই প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, জানুয়ারিতে দেশি প্রকল্পের নিবন্ধন হয়েছে ১০৭টি। যা আগের মাসে ছিল ১০৬টি। এ সূচকে কিছুটা বাড়লেও ব্যাপক কমেছে কর্মসংস্থানে। এ সময় দেশী কর্মসংস্থান হয় ১৪ হাজার ৪৬৮টি জনের। যা আগের মাসে ছিল ১৭ হাজার ৩৫১ জনের। সে হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে দেশী কর্মসংস্থান কমে ২ হাজার ৮৮৩ জনের।
সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের হচ্ছে না। আর এটি না হওয়ারও কারণ দৃশ্যমান। দেশের অনিশ্চয়তা না কাটলে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ অর্জন করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ নেই। সে কারণে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঝুঁকছে সরকারি খাতে। এতে অর্থনীতি পিছিয়ে পড়বে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।

শিক্ষাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার -সাক্ষাৎকারে : বিয়ন লোমবোর্গ by এ কে এম জাকারিয়া

ড. বিয়ন লোমবোর্গ টাইম ম্যাগাজিন–এর চোখে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন। তিনি বিশ্বের প্রথম সারির থিঙ্কট্যাংক কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট। জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি)–পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে এখন কাজ করছেন। বাংলাদেশে এসেছিলেন এখানকার উন্নয়নের মূল লক্ষ্যগুলো নিয়ে কাজ শুরুর সূচনা করতে। এ সময় কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো : জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের (এমডিজি) সাফল্যের পর নতুন বৈশ্বিক লক্ষ্য ঠিক করার প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় আপনার সংগঠন কোপেনহেগেন কনসেনসাস কীভাবে ভূমিকা রাখাতে চাইছে?
বিয়োন লোমবোর্গ : এমডিজির সাফল্যের পর জাতিসংঘ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদি উন্নয়নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে। নতুন এই লক্ষ্য নির্ধারণে জাতিসংঘ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্র যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এবার জাতিসংঘ বিভিন্ন মহল থেকে প্রায় চৌদ্দ শ লক্ষ্যের একটি তালিকা পেয়েছে। এর মধ্য থেকে জাতিসংঘ ১৬৯টি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেছে। এমডিজিতে যেখানে মাত্র নয়টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সে তুলনায় এবারের লক্ষ্যের সংখ্যা চিন্তা করে দেখুন। এটা হয়তো সবার জন্য ও সবকিছু ভালো করার লক্ষ্য থেকে করা হচ্ছে, কিন্তু এর সবগুলো কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, সেটা বড় বিবেচনার বিষয়। আমরা এই লক্ষ্যগুলো আরও সুনির্দিষ্ট করার কাজটি করছি।
প্রথম আলো : আমরা জেনেছি যে কোপেনহেগেন কনসেনসাস কস্ট-বেনিফিট বা খরচ এবং সে তুলনায় প্রাপ্তি বিবেচনায় নিয়ে লক্ষ্যগুলো ঠিক করার কৌশল নিয়েছে। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?
বিয়োন লোমবোর্গ : দেখুন, আগামী ১৫ বছরের জন্য যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হবে, সেখানে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার উন্নয়ন–সহায়তা হিসেবে ব্যয় হবে। ফলে লক্ষ্যগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার বা টাকার সদ্ব্যবহার হয়। কোপেনহেগেন কনসেনসাসের পক্ষ থেকে আমরা বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সবচেয়ে কার্যকর লক্ষ্যগুলো নির্ধারণের কাজ করে যাচ্ছি। আমরা এ জন্য ১২১ জন একাডেমিশিয়ান, যাঁদের মধ্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীও রয়েছেন এবং বেশির ভাগই অর্থনীতিবিদ, তাঁদের দিয়ে লক্ষ্যগুলো পর্যালোচনা করিয়েছি। সব লক্ষ্য বিবেচনায় নিয়ে আমরা ঠিক করেছি যে কোনগুলোয় নজর দেওয়া উচিত, তাতে খরচের পরিমাণ কত এবং কোনগুলোয় সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে। মূলত আমরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় নিয়ে লক্ষ্যগুলো ঠিক করেছি।
প্রথম আলো : জাতিসংঘ প্রাথমিক পর্যায়ে ১৬৯টি লক্ষ্য বাছাই করেছে। আপনারা সবচেয়ে কার্যকর ও কস্ট-বেনিফিট বিবেচনায় নিয়ে কতগুলো লক্ষ্য বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন?
বিয়োন লোমবোর্গ : বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য কার্যকর ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণে আমরা ইনডেপথ পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্য দিয়ে কস্ট-বেনিফিট পর্যালোচনা করে আমরা উন্নয়নের জন্য ২২টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও জেন্ডার ইস্যু থেকে শুরু করে জ্বালানি—সবই রয়েছে। আগেই বলেছি, জাতিসংঘ যে ১৬৯টি লক্ষ্য বাছাই করেছে, তার সবগুলোর মধ্যে হয়তো সদিচ্ছার পরিচয় রয়েছে, কিন্তু এর অনেকগুলোই ফলদায়ক নয়। আমি আপনাদের আমার দ্য নোবেল লরিয়েটস গাইড টু দ্য স্মার্টেস্ট টার্গেটস ফর দ্য ওয়ার্ল্ড বইটি দিয়েছি। সেখানে আমি পরিষ্কার করেছি যে এমন অনেক লক্ষ্যের কথা আমরা শুনেছি, যেগুলো সদিচ্ছা হিসেবে হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু আমরা জানি না কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে। যেমন, শুধু কর্মসংস্থানের কথা বলে লাভ নেই। আমরা যদি ভালো শিক্ষা, খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারি, তবে সেটাই যোগ্য কর্মী তৈরির নিশ্চয়তা দেবে, যা কর্মসংস্থানের সহায়ক হবে। ফলে উন্নয়নের সেই স্মার্ট দিকগুলোই আগে নির্ধারণ করতে হবে, যেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য এবং যা কাজে দেবে।
প্রথম আলো : আপনি যে স্মার্ট টার্গেটের কথা বললেন, সেটা আরেকটু ব্যাখ্যা করবেন কি?
বিয়োন লোমবোর্গ : একটি উদাহরণ দিই, আমরা যেমন সব সময়ই শিক্ষা ও এর মান নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কীভাবে শিক্ষা ও এর মান বাড়ানো সম্ভব, সেটা আমরা বিবেচনার বাইরে রেখেছি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার উন্নয়ন বলতে বুঝে এসেছি চেয়ার, টেবিল ও শ্রেণিকক্ষ। নব্বইয়ের দশকে ইন্দোনেশিয়ায় এসব অবকাঠামো প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। অর্থাৎ শতভাগ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। আমরা মনে করি, শিক্ষারই সবচেয়ে বেশি প্রধান্য পাওয়া উচিত, কিন্তু সে জন্য এর বাইরেও কিছু দিকে নজর দেওয়া জরুরি। যেমন পুষ্টি, একটি শিশুকে যদি ভালো পুষ্টি দেওয়া যায়, তবে তার মস্তিষ্কের বিকাশ ভালো হবে, লেখাপড়ায় স্বাভাবিকভাবেই সে ভালো করবে, সে অনেক বেশি কর্মক্ষম হবে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে পুষ্টির পেছনে এক টাকা খরচ করলে ৪০ টাকার ফল পাওয়া যায়। সুতরাং লক্ষ্যগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো ও কার্যকর ফল পাওয়া যাবে।
প্রথম আলো : আপনারা যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো কি সব দেশের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য?
বিয়োন লোমবোর্গ : আমরা বৈশ্বিক বিবেচনা থেকেই লক্ষ্যগুলো ঠিক করেছি। তবে এর মধ্য থেকে কোন দেশের জন্য কোনগুলো বেশি প্রধান্য পাওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করা যায়। যেমন, আমরা এখন বাংলাদেশ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। আমরা বাংলাদেশের জন্য ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ বা লক্ষ্য ঠিক করতে চাই এবং এ নিয়ে সব মহলের মধ্যে মতৈক্যে আসতে চাই। আন্তর্জাতিকভাবে আমরা বিভিন্ন তরুণ ফোরাম করে কী করা উচিত এবং কোন ইস্যুতে জোর দেওয়া উচিত, সে ব্যাপারে তাঁদের পরামর্শ নিয়েছি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা এ ধরনের তরুণদের ফোরাম থেকে তাঁদের চাওয়াগুলো জানতে চাইব।
প্রথম আলো : বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি ১০টি লক্ষ্য ঠিক করার ক্ষেত্রে আপনারা কী প্রক্রিয়া অবলম্বন করবেন?
বিয়োন লোমবোর্গ : দেখুন, বৈশ্বিকভাবে উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর লক্ষ্যগুলো আমরা ইতিমধ্যে ঠিক করেছি। আমরা বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের পরামর্শ নিয়ে কাজটি করেছি। তাঁরাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে স্মার্ট টার্গেটগুলো কী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা ১০টি সবচেয়ে জরুরি লক্ষ্য ঠিক করতে চাই। প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব চাওয়া থাকে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কাজটি মূলত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরাই করবেন, তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও সঙ্গে কাজ করবেন। তাঁরা ঠিক করবেন যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কী করা যায়। জ্বালানির ক্ষেত্রে করণীয় কী বা পরিবেশ রক্ষায় কী করা উচিত। একই সঙ্গে আমরা হিসাব করে দেখাতে চাই যে কোন খাতে কী পরিমাণ খরচ হবে এবং তার বিপরীতে যে সুফল পাওয়া যাবে, তার দাম কত। এভাবেই সবচেয়ে জরুরি ১০টি লক্ষ্য ঠিক করা হবে। এ জন্য সব মহলের মধ্যে মতৈক্য বা ‘বাংলাদেশ কনসেনসাস’ তৈরি করা জরুরি। আমরা সেটাই করতে চাই।
প্রথম আলো : সব দেশের জন্যই কি আপনারা এভাবে কাজ শুরু করেছেন?
বিয়োন লোমবোর্গ : না, আমরা প্রথম কাজটি শুরু করেছি বাংলাদেশ নিয়ে। সামনে অন্য দেশ নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা আছে, তবে এটা নির্ভর করবে এ ধরনের কাজ করার জন্য তহবিল পাওয়ার ওপর। আমরা বাংলাদেশের ওপর বছর দেড়েক কাজ করব। এ সময় আমরা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্যগুলো ঠিক করব। বাংলাদেশের জন্য প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের বাজেট রয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এখানে বছরে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার খরচ করে। আমরা বাংলাদেশের সরকার, রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, ইউএসএআইডি বা ডিএফআইডির মতো বিভিন্ন দাতা সংস্থা বা স্থানীয় এনজিওগুলোর সামনে এটাই তুলে ধরব যে কোন লক্ষ্যগুলো সবচেয়ে জরুরি এবং কোথায় অর্থ খরচ করে সবচেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে।
প্রথম আলো : বৈশ্বিক উষ্ণতা ও কার্বন নিঃসরণ প্রশ্নে কিয়োটে প্রোটকলের অবস্থান নিয়ে আপনার ভিন্নমত রয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে আপনার ভিন্নমতের যুক্তি কী?
বিয়োন লোমবোর্গ : বৈশ্বিক উষ্ণতা অবশ্যই একটি গুরুতর ইস্যু। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই বড় উদ্বেগের। কিয়েটো প্রোটকলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা কার্যকর করার যা খরচ বা মূল্য, সে তুলনায় প্রাপ্তি খুবই সামান্য। এই প্রটোকল সফল করতে হলে, যদিও তা সফল হওয়ার সুযোগ কম, বছরে খরচ করতে হবে ২৮০ বিলিয়ন ডলার। এর বিনিময়ে ১০ থেকে ১৫ বছরে যে ফল পাওয়া যাবে, তা খুবই সামান্য। সে কারণেই আমি বলি যে কিয়েটো প্রোটকল একটি দুর্বল ও অদক্ষ পরিকল্পনা। আসলে যত দিন গ্রিন এনার্জি সস্তা করা না যাবে, তত দিন এ ক্ষেত্রে কার্যকর কিছুই হবে না।
প্রথম আলো : উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ বিপর্যয়ের একটি সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চমূল্যের কারণে গ্রিন এনার্জি বিষয়টি ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাংলাদেশে এখন বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, তাতে কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার মতো ক্ষতিকর জ্বালানি ছাড়া পথ নেই। অথচ এ নিয়ে পরিবেশবাদীদের প্রবল আপত্তি রয়েছে। এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করবে?
বিয়োন লোমবোর্গ : গ্রিন এনার্জি বিষয়টি এখনো বড়লোকের সন্তুষ্টির একটি বিষয় ছাড়া আর কিছু নয়। বেশি দামের গ্রিন এনার্জি ব্যবহার করে তাঁরা সন্তুষ্টি পেতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের কয়লা বা এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহার ছাড়া কোনো পথ নেই। চীনের মতো দেশ কয়লা ব্যবহার করছে, বিশ্বের আরও অনেক দেশ একই কাজ করছে। জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি নির্ভর করে দামের ওপর। যে জ্বালানির দাম কম, সেটাই ব্যবহৃত হবে। ফলে আমরা যদি পরিবেশ নিয়ে সচেতন হতে চাই, তবে গ্রিন এনার্জি কীভাবে সস্তা করা যায়, সে জন্য সেই খাতে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
বিয়োন লোমবোর্গ : ধন্যবাদ।