Tuesday, September 15, 2015

মানুষ পরিচয়ই প্রধান পরিচয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাংলার মাটিতে যেকোনো ব্যাপারে একটা ভজকট বাধবেই। সরলরেখার মতো সোজা এখানে কিছুই নয়, সবকিছুতেই জিলাপির প্যাঁচ। তা ছাড়া কে আসল আর কে নকল আর কে ভুয়া, তা নির্ণয় করার সাধ্য বিধাতা ছাড়া কারও নেই। আমরা এত দিন শুনে এসেছি চাকরি পেতে ঘুষ খুবই ভালো উপায়, এখন শুরু হয়েছে ঘুষের তহবিল গঠন। চাকরি পাইয়ে দিতে ঘুষ নিয়ে তহবিল গঠন করে শেষ মুহূর্তে মিডিয়ার কারণে ধরা পড়ে এক পুলিশ অফিসারের চাকরি খোয়ানোর ব্যবস্থা হয়েছে। তবে তাঁর বা তাঁদের কারও চাকরিই যাবে না বলে দেশের পনেরো আনা মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস। এ মাটিতে ঘুষ-দুর্নীতি করলেই এবং তা ধরা পড়লেই যদি শাস্তি হতো, তাহলে রাষ্ট্রের তিন বিভাগের হাজার হাজার পদস্থ কর্মকর্তা নিজেদের প্রকাণ্ড বাড়িতে অথবা সরকারি কোয়ার্টারে থাকতে পারতেন না। তাঁদের বাস করতে হতো নাজিমুদ্দিন রোড অথবা কাশিমপুরের পাঁচিলঘেরা বাড়িতে। খেতে হতো সকালে পচা গমের পুষ্টিকর রুটি এবং দুপুরে কাঁকর মেশানো মোটা চালের ভাত ও লেগুনে চাষ করা পাঙাশ মাছের ঝোল।
হিজড়াদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার দাবি সমাজসেবীরা করে আসছেন অনেক দিন ধরে। তা নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমিও হিজড়াদের প্রশ্নে মানববন্ধন, সমাবেশ বা সেমিনারে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। কয়েকটি এনজিও তাঁদের নিয়ে কাজ করছে। সেই সব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে ২০১৪-তে। যোগ্যতা অনুযায়ী হিজড়াদের সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। ‘সমাজসেবা অধিদপ্তর হিজড়াদের পুনর্বাসন চায়। সে জন্যই দরখাস্ত আহ্বান করা হলো। সব প্রক্রিয়া শেষে ১২ জন মনোনয়নও পেলেন। কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেল, এঁরা আসলে হিজড়া নন। ১২ জনই পুরোদস্তুর পুরুষ। হিজড়া সেজে এসেছিলেন।’ [প্রথম আলো, ২ জুলাই] ‘ঢাকার সিভিল সার্জনের দপ্তর তাদের পরীক্ষার রিপোর্টে বলেছে, ওই ১২ জন “পূর্ণাঙ্গ পুরুষ” বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’ [কালের কণ্ঠ]
মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়োগ-প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। এবং সেটাই স্বাভাবিক। যেকোনো সরকারি চাকরিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা আবশ্যকীয় এবং বাধ্যতামূলক। চোখ, কান, এমনকি যৌনাঙ্গ পর্যন্ত পরীক্ষা করার নিয়ম। হিজড়ার কোটায় চাকরি পেতে হলে আবেদনকারী যে হিজড়া, তার প্রমাণ তো দিতেই হবে। হিজড়াদের ডাক্তারি পরীক্ষা করতে গিয়ে সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ শুরুতেই হোঁচট খেল। বিষয়টি একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল।
বাংলাদেশে কোন শ্রেণি-পেশায় ভুয়া নেই? ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিবি পুলিশের কথা পত্রিকায় আসে। ভুয়া সাংবাদিক ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়। সম্ভবত এখনো ও রকম অনেক ভুয়া সাংবাদিক, ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট, ভুয়া পুলিশ, ভুয়া পরীক্ষার্থী জেলের ভাত খাচ্ছে। ভুয়া ডাক্তারে আজ দেশ সয়লাব।
প্রতারণা যখন জাতীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন যে কেউ যেকোনো কিছু সাজতে পারে। তবে চাকরিবাকরির ক্ষেত্রেই ভুয়াত্বের প্রয়োজন পড়ে বেশি। বেকার যুবক হিজড়া সেজে চাকরি চাইতে গেছেন, সেটা অবশ্যই অন্যায়: কিন্তু ততটা অন্যায় নিশ্চয়ই নয়, যতটা অন্যায় ও অপরাধ মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট কিনে সচিবদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো। তফাত হলো এই যে, ধরা পড়ে হিজড়াবেশী যুবকদের চাকরি হয়নি, ওই সচিবেরা প্রতারণা ধরা পড়েও চাকরিতে বহাল ছিলেন বা আছেন। যে দেশে তামা বা পিতলকে খাঁটি সোনা বলে চালালো হয়, সেখানে নকল হিজড়া থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাস্তবতা হলো এই যে পূর্ণাঙ্গ যুবকেরা হিজড়া সেজে চাকরি চাইতে গিয়েছিলেন, কারণ তাঁদের চাকরিটা দরকার।
কোনো প্রাণীই তার জন্মের জন্য নিজে দায়ী নয়। কোনো মানুষও নয়। মাতৃগর্ভ থেকে কে নারী আর কে পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করবে, সেটা বিধাতার বিষয়। এমনকি কারও মা-বাবারও হাত নেই। প্রকৃতির মর্জিমতোই কেউ পুরুষ, কেউ নারী, কেউ-বা উভলিঙ্গ বা হিজড়া। কেউবা অটিস্টিক। কেউ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। কেউ আইনস্টাইনের মতো বুদ্ধিমান। কেউ গ্রিক-রোমান পৌরাণিক বীর হারকিউলিসের মতো শারীরিক শক্তির অধিকারী।
আমার একটি বিনীত প্রস্তাব। সরকার যেমন উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনি এনজিও ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও হিজড়াদের নিয়োগ দিয়ে তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সমাজে তাঁদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসবে।
যতটুকু শুনেছি, হিজড়ারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ। তাঁদের কারও শরীরে নারী হরমোন বেশি, কারও শরীরে পুরুষের হরমোন বেশি। তাতে কারও শারীরিক সুস্থতার হেরফের হয় না। হিজড়াদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার একটি সর্বশেষ দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। কিছুদিন আগে তেজগাঁও এলাকায় এক ব্লগারকে দুর্বৃত্তরা খুন করে পালিয়ে যাচ্ছিল। আশপাশে ‘পুরুষ মানুষ’ ছিল অনেকেই। কিন্তু দুজন হিজড়া দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করে পাকড়াও করেন। অতি সাহসী ও সুনাগরিকের কাজ। তাঁদের রাষ্ট্র পুরস্কৃত করেছে, সে খবর পাইনি। ওই কাজটিই যদি গুলশান-বারিধারার বড়লোকদের কোনো ছেলে করতেন, বহু টিভি চ্যানেলের টক শোতে তাঁদের ডাক পড়ত তাঁদের বীরত্বের কাহিনি শোনানোর জন্য। ওই দিন যদি হিজড়াদের সঙ্গে আশপাশের ‘পুরুষেরাও’ যোগ দিত, সব খুনিকে হাতেনাতে ধরা যেত।
বিভিন্ন দেশে আজ হিজড়ারা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত। বেশ অনেক দিন আগে একটি খবরে দেখেছি, ভারতের উত্তর প্রদেশের বা মধ্যপ্রদেশের কোনো শহরের পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন একজন হিজড়া। পরবর্তীকালে ভারতে আরও অনেক জনপ্রতিনিধি হিজড়াদের থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ভারতে হিজড়ারা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন।
উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিলে হিজড়ারা সমাজের যেকোনো মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। খুব দরকার তাঁদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসা। যদি তাঁদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাঁদের দিয়ে জাতি উপকৃত হতে পারে। তাঁদের অবহেলা করা চলবে না। তাঁদের জীবিকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করে দিলে তাঁরা আর সমাজের বোঝা হয়ে থাকবেন না। কেন তাঁরা ট্রাফিক সিগন্যালে যানবাহনের যাত্রী ও পথচারীদের কাছে সাহায্য চাইবেন?
একটি প্রশ্ন অনেকে করেন না, হিজড়ারা কি শুধু নিম্ন আয়ের বাবা-মায়ের ঘরেই জন্ম নেন? উচ্চবিত্ত পরিবারে হিজড়া নেই কেন? ধনী পরিবারে কোনো হিজড়া জন্ম নিলে বাবা-মা তাঁদের সেই সন্তানকে কোনো গরিবকে লালন-পালনের জন্য দিয়ে দেন কি না, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।
একজন হিজড়া যদি স্বাভাবিক মানুষের পরিচয়ে পরিচিত হতেন, বলার কিছু থাকত না। তাই তো হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কয়েকজন ‘পূর্ণাঙ্গ পুরুষ’ যখন হিজড়া সেজে চাকরি নিতে গেছেন, তখন সমাজের সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন জাগে। সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ শুরুতেই অশুভ তৎপরতায় বিনষ্ট হয়ে গেল। এরপর শক্তিশালী মেডিকেল বোর্ড দ্বারা হিজড়াদের ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া কোনো নিয়োগই হবে না।
আমার একটি বিনীত প্রস্তাব। সরকার যেমন উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনি এনজিও ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও হিজড়াদের নিয়োগ দিয়ে তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সমাজে তাঁদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসবে।
জীবনই আসল। কেউ নারী, কেউ পুরুষ, কেউ হিজড়া—সেটা গৌণ। নাগরিক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হিজড়াদের ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নারী ও পুরুষ, অহিজড়া ও হিজড়া—সবারই প্রধান ও একমাত্র পরিচয় হোক তাঁরা মানুষ। মানুষের অধিকার সব মানবসন্তানকেই ভোগ করতে দিতে হবে। সে অধিকার থেকে কোনো নারী, পুরুষ বা হিজড়াকেই বঞ্চিত করা যাবে না। মানুষের মর্যাদা নারী, পুরুষ, হিজড়ার সমান প্রাপ্য।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ইরানি চলচ্চিত্র মুহাম্মদ (সা.)- আকাশ থেকে যেন ভেসে আসে ঐশী বাণী by সিরাজুল ইসলাম

খ্যাতনামা সিনেমা পরিচালক মাজিদ মাজিদির ইতিহাসনির্ভর সিনেমা ‘মুহাম্মদ (সা.)’ সগৌরবে চলছে ইরানের সিনেমা হলগুলোতে। দিন যত যাচ্ছে ততই যেন সিনেমা হলগুলোতে দর্শক সমাগম বাড়ছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ কয়েকবার করে সিনেমাটি দেখেছেন। এ সিনেমার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের সময়কালের চিত্রটা একেবারে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিচালক, অভিনয় শিল্পী এবং কলাকুশলীরা তাদের দক্ষতা ও সুনিপুণ অভিনয় দিয়ে দর্শকদের সেই দেড় হাজার বছর আগের আরবের পরিবেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এ সিনেমায় দেড় হাজার বছর আগের আরবের চিত্র অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিটি যে বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে তা বলার অপেক্ষাই রাখে না।
সিনেমার ঘটনাপ্রবাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তার চরিত্রে অভিনয়কারী শিশুটির মুখমণ্ডল দেখানো হয়নি। এমনকি যে শিশুটি মুহাম্মদ (সা.)-এর চরিত্রে অভিনয় করেছে তার নামও দেখানো হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সিনেমাটি দেখার সময় রাসূল (সা.)-কে দেখার একটা অদম্য বাসনা জাগে। তার দুনিয়াতে আসা, মা আমিনার কোলে ধারণ, দুধ মা হালিমার কাছে দেয়া, দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিবিড় স্নেহ, আরবের খেজুর বাগানে ছাগল চরানো, চাচা আবু তালিবের সঙ্গে বাণিজ্য কাফেলায় তখনকার শ্যাম দেশে (আজকের সিরিয়া) গমন- এসবই যেন বাস্তব হয়ে ফুটে ওঠে। রাসূল (সা.)-এর বাল্যবেলার বেশকিছু মোজেজাও দেখানো হয়েছে এ ছবিতে। ছবির কিছু কিছু দৃশ্য এমন জীবনঘনিষ্ঠ করে তুলেছেন শিল্পীরা তাতে বারবার দর্শকের চোখ ভিজে যায়। সিনেমার কোথাও কোথাও অভিনয় শিল্পীদের চরিত্রগুলো এমনভাবে ফুটে উঠছে তাতে আবেগ-আপ্লুত না হয়ে উপায় নেই। মুহাম্মদ (সা.) ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে অসম্ভব নিপুণভাবে শিল্পীরা দর্শকদের নিয়ে গেছেন সেই আরব সমাজে যেখানে জাহেলিয়াত জেঁকে বসেছিল ভয়াবহভাবে। আর কথায় কথায় আরব লোকজনের তলোয়ার বেরিয়ে আসত খাপ থেকে। আবরাহার হস্তিবাহিনীর চরম পরাজয় আলাদা উৎসাহের উদ্রেক করে বটে।
এ সিনেমায় রাসূল (সা.) চরিত্রে অভিনয়কারী শিশুর মুখমণ্ডল দেখানো হয়নি। তবে তার হাত, পা দেখানো হয়েছে। এছাড়া পূর্ণাঙ্গভাবে দেখানোর সময় পেছন থেকে কিংবা পাশ থেকে  দেখানো হয়েছে; কোথায়ও মুখ দেখা যায়নি। তবে সিনেমাতে আবদুল মোত্তালিব, আবু তালিব, রাসূল (সা.) এর মা আমিনা, দুধ মা হালিমা, আবু সুফিয়ান এবং আবু লাহাবসহ তৎকালীন কুরাইশ ও আরব নেতাদের চরিত্রে অভিনয়কারী ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে দেখানো হয়েছে।
মুহাম্মদ (সা.) ছবিতে রাসূল (সা.)-এর বাল্যবেলার ১৩ বছর সময়কালের ঘটনাবলি ফুটে উঠছে। পাঠকদের হয়ত জানতে ইচ্ছে করছে কেমন হয়েছে রাসূল (সা.) চরিত্রে শিশু শিল্পীর অভিনয়? সত্যি বলতে কী- সিনেমাটি দেখলে মনে হবে যেন সত্যিকারের রাসূল (সা.)কে দেখছি। বারবার তার মুখটি দেখতে ইচ্ছে করবে।
রাসূল (সা.)-এর মা অর্থাৎ আমিনার চরিত্রে অভিনয়কারী মিনা সাদাতিকে মনে হবে তিনিই যেন সত্যিকারের মা। দাদা আবদুল মুত্তালিব আর চাচা আবু তালিবের অফুরন্ত স্নেহ-ভালবাসা রাসূল (সা.) কে সর্বক্ষণ ঘিরে রাখে।
মুহাম্মদ (সা.) সিনেমাটি দেখলে দেড় হাজার বছর আগের কাবা ঘর কেমন ছিল তারও একটা রূপকল্প পাওয়া যায়। খানিকটা এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে দেয়ালে তৈরি কাবা ঘর। ভেতরে এবং বাইরে বহুসংখ্যক মূর্তি। আশপাশে কাঠের খুঁটিতে নির্মিত ছোট ছোট ঘর। হজের সময় তখনও কাবা ঘর ধোয়ামোছার কাজ চলতো তা দেখানো হয়েছে। রাসূল (সা.) নিজেও দাদা আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গে কাজে অংশ নেন। হজের তাওয়াফ করতে গিয়েই একপর্যায়ে আবদুল মুত্তালিব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে ইন্তিকাল করেন। শিশু মুহাম্মদ (সা.)কে তুলে দিয়ে যান ছেলে আবু তালিবের কাছে। আবু লাহাব রাসূল (সা.)-এর দায়িত্ব নিতে চাইলেও তা দেননি আবদুল মুত্তালিব। ছবিতে দেখা যায় কয়েক বছরের মধ্যে কাবা ঘরের ডিজাইন কিছুটা পাল্টেছে। পাথরের এবড়ো-থেবড়ো দেয়ালের পরিবর্তে মসৃণ কালো পাথরের দেয়াল।
ছবিতে দুধ মা হালিমার কাছে তুলে দেয়া, আবার মায়ের কাছে ফিরে আসা, মা আমিনার সঙ্গে ইয়াসরিব বা মদিনায় নানাবাড়ি যাওয়া, রাসূল (রা.) এবং আমিনাকে সেখানে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ, ফেরার পথে মাকে হারানো, অসুস্থ রাসূল  (সা.)কে হত্যার জন্য ইহুদিদের হামলা এবং সেখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ- সবই ফুটে উঠেছে অসম্ভব নিপুণতায়। 
সিনেমার শুরুটা হয় ‘শোয়াবে আবু তালিব উপত্যকা’য় মুসলমানদের অবরুদ্ধ জীবনের দুঃখ-কষ্টের চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে। কুরাইশদের নির্যাতনমূলক চুক্তির ফলে মুসলমানরা নিদারুণ কষ্টে জীবনযাপন করে আবু তালিব উপত্যকায়। সে সময় বিবি খাদিজা বিভিন্নভাবে মুসলমানদের সহযোগিতা করেছেন। তবে এ সিনেমায় হযরত খাদিজাকে (রা.) অবশ্য কখনও দেখানো হয়নি।
শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনাপ্রবাহ ২০ মিনিট দেখানো হলেও রাসূল (সা.)কে একবারও দেখানো হয়নি। একপর্যায়ে পবিত্র কুরআনের সূরা ফিলে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ দেখানো হয়। আবিসিনিয়ার বাদশাহ আবরাহার হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ ও আবাবিল পাখি দিয়ে পাথর মারার মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিরোধ চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আবরাহার পতনের প্রায় দুমাস পর রাসূল (সা.)-এর জন্ম হয়। জন্মের সময়কার কিছু অলৌকিক ঘটনা, মুহাম্মদ (সা.)এর বিরুদ্ধে ইহুদিদের চক্রান্ত ও হত্যাপ্রচেষ্টা, তখনকার আরবে কন্যাশিশুকে জীবন্ত হত্যা, শিশু বলিদানের বিরুদ্ধে শিশু মুহাম্মদ (সা.) এর অবস্থান, দাস প্রথা, দাস মুক্তির বিষয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর ভূমিকা, খ্রিষ্টান পাদ্রী বুহাইরার সঙ্গে রাসূল (সা.) এর সাক্ষাৎ, বুহাইরা কর্তৃক রাসূল (সা.)কে শনাক্ত করা, বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার দৃশ্য এবং রাসূল (সা.) এর ওপর মেঘের আবরণ এসব ঘটনাই আবিষ্ট করে তোলে দর্শককে। মাঝে মাঝেই নেপথ্য কণ্ঠে পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াত- মনে হয় যেন আসমান থেকে নেমে আসছে ঐশী গ্রন্থ আল-কুরআন।
সিনেমার শেষাংশে আবারো শোয়াবে আবু তালিবের ঘটনা দেখানো হয়েছে যেখানে দেখা যায়, মক্কার কুরাইশরা বনু হাশিম গোত্রের সঙ্গে যে নির্যাতনমূলক চুক্তি করেছিল সেই চুক্তির দলিল পোকায় খেয়ে ফেলেছে। ফলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায় এবং নির্বাসিত বা অবরুদ্ধ মুসলমানরা মুক্তি পায়। মুভিটি শেষ হয়েছে অস্কার পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় সুরকার এ আর রহমানের কম্পোজ করা একটি নাতে রসূল দিয়ে।
চলচ্চিত্র মুহাম্মদ (সা.) হচ্ছে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে নির্মিতব্য ট্রাইলজি বা তিনখণ্ডের ছায়াছবির প্রথম খণ্ড। এতে মহানবী  (সা.)-এর মক্কার জীবনালেখ্য তুলে ধরা হয়েছে। ১৭১ মিনিটের এ ছায়াছবি নির্মাণে সাত বছর সময় লেগেছে। ইরানের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ ছবি নির্মাণে সাড়ে পাঁচ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। মোহাম্মদ মাহদি হায়দারিয়ান প্রযোজিত এ ছবির চিত্র ধারণ করা হয়েছে ইরান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শহর বেলা-বেলাতে।
ছায়াছবিতে মহানবী (সা.)-কে তুলে ধরার জন্য বিশেষভাবে তৈরি স্টেডিক্যাম ব্যবহার করা হয়। চলচ্চিত্রটির যে দৃশ্যেই রাসূল (সা.)-কে দেখানো হয়েছে সেখানেই দৃশ্যটি নবীর দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ চলচ্চিত্রের ভাষায় ক্যারেক্টারস পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখানো হয়েছে। এমনকি নবীজির শৈশবের দৃশ্যও এভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। কানাডার মন্ট্রিল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তিন ঘণ্টার পূর্ণদৈর্ঘ্য এ ছায়াছবি দেখানো হয়েছে। 
ছবিটি নির্মাণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা সহযোগিতা করেছেন। এতে কাজ করেছেন ইতালির তিনবারের অস্কারজয়ী সিনেমাটোগ্রাফার ভিত্তোরিও স্তোরারো, ইতালির ফিল্ম এডিটর রোবাতো পেরপিগানি, মার্কিন স্পেশাল এফেক্ট শিল্পী স্কট ই অ্যান্ডারসন, ইতালির মেকআপ আর্টিস্ট গিয়ানেত্তো ডি রোসি এবং ভারতীয় প্রখ্যাত সুরকার আল্লা রাখা রহমান (এ আর রহমান)।
মুহাম্মদ (সা.) চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনটি শিশু। ছয় বছর বয়সে অভিনয় করেছেন আলী রেজা জালিলি, আট বছর বয়সে হোসেইন জালালি এবং ১৩ বছর বয়সে অভিনয় করেছেন আমির হায়দারি।
এছাড়া, মা আমিনার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মিনা সাদাতি, দাদা আবদুল মুত্তালিব-আলী রেজা সুজা নুরি, চাচা আবু তালিব- মাহদি পাকদেল, আবু লাহাব- মুহাম্মাদ আসগরী, আবু লাহাবের স্ত্রী জামিলা- রানা আজাদিভার এবং হামযা চরিত্রে অভিনয় করেছেন হামিদ রেজা দৌলতি। এছাড়া হালিমা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সারেহ বাইয়াত।

৮ দিনেও খোঁজ মেলেনি এনজিওকর্মী রেজাউলের by ওয়েছ খছরু

সিলেটে এনজিওকর্মী রেজাউল করিমের খোঁজ মিলছে না। কিস্তির টাকা তুলতে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। এরপর থেকে তার কোন খবর মিলছে না। এ ঘটনায় গোয়াইনঘাট থানায় জিডি করা হয়েছে। র‌্যাবের কাছে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কিংবা র‌্যাব ৮ দিনেও তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন এলাকার মানুষ। নেমেছেন আন্দোলনে। রেজাউলের সন্ধান দাবিতে শহরতলির সাহেববাজারে বিক্ষোভ হয়েছে। এ বিক্ষোভের পর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। এ কারণে রেজাউলের সন্ধান দাবিতে তারা ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে। বলেছে, এই সময়ের মধ্যে রেজাউল উদ্ধার না হলে সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। রেজাউল নিখোঁজের ঘটনায় প্রভাবশালী মহলের জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছে না এলাকাবাসী। রেজাউল করিমের বয়স ৩১ বছর। বাড়ি সিলেট শহরতলির সাহেববাজারে। পিতা তারা মিয়া। রেজাউল কাজ করতো এফআইভিডিবিতে। সালুটিকর অফিসের মাঠকর্মী ছিলেন তিনি। এ কারণে তাকে চষে বেড়াতে হতো গোয়াইনঘাটের গ্রামে গ্রামে। ঋণের কিস্তি তুলতে তিনি ছুটে যেতেন গ্রাহকের বাড়ি বাড়ি। এরপর টাকা তুলে বিকালে ফিরতেন এফআইভিডিবির সালুটিকর কার্যালয়ে। সিলেটের গোয়াইনঘাট থানায় দায়ের করা জিডিতে অফিসের সহকর্মী ফরিদ আহমদ জানিয়েছেন, ৬ই সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের মতো কিস্তির টাকা তুলতে গোয়াইনঘাটের পাইকরাজ গ্রামে যান তিনি। সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর সিলেট র‌্যাব-৯-এর কমান্ডিং অফিসারের কাছেও এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এদিকে, ৮ দিন ধরে নিখোঁজ এনজিও কর্মী রেজাউল করিমের সন্ধানের দাবিতে রোবববার বিকেলে সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে স্থানীয় সাহেববাজারে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। খাদিমনগর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম তারা মিয়ার সভাপতিত্বে ও ডা. আমির আলীর পরিচালনায় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ৩নং খাদিমনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসাইন। সভায় বক্তারা বলেন, ৬ই সেপ্টেম্বর এনজিও কর্মী রেজাউল করিম নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করা হয়। কিন্তু পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও সাত দিনে এর কোন রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ফলে জনমনে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বিরাজ করছে সর্বমহলে আতঙ্ক। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। পুলিশ প্রশাসনকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে রেজাউলের উদ্ধারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন ইউনিয়নবাসী। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১৬ই সেপ্টেম্বর নগরীর শারদা হলের সামনে মানববন্ধন ও ১৭ তারিখ ডিআইজি বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান। কিন্তু এরপরও কোন ফল না হলে বিমানবন্দর বাইপাস সড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। প্রতিবাদ সমাবেশে নিখোঁজ রেজাউলের বাবা তালেব আলী ছেলের সন্ধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এফআইবিডি এসিসটেন্ট ডাইরেক্টর মো. সমিক শহীদ জাহান। এতে আরও বক্তব্য রাখেন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নাজিম উদ্দিন ইমরান, শ্রমিক নেতা এম এ নুরুল ইসলাম, ইয়াংস্টার সমাজ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি মো. আতাউর রহমান, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা আনছার আলী, আব্দুল বাছিত, যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান, জাহিদ আহমদ প্রমুখ। এদিকে, রেজাউলকে খুঁজে বের করতে গতকালও গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। এর আগে পুলিশ একাধিকবারও অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না গ্রামীণ উদ্যোক্তারা by আশরাফুল ইসলাম

কমে যাচ্ছে কর্মসংস্থান, চাপ বাড়ছে শহরের ওপর
ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ভাটা পড়েছে ঋণ বিতরণেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) এ খাতে (নন-ফার্ম রুরাল ক্রেডিট) ঋণ আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৫২ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রথম মাসে ঋণ আদায় হয়েছিল ১৬৪ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে তা কমে হয়েছে ৭৮ কোটি টাকা। শুধু ঋণ আদায়ই কমছে না, বিতরণও কমে গেছে। গেল বছরের জুলাইয়ে যেখানে বিতরণ হয়েছিল প্রায় ৯৩ কোটি টাকা, সেখানে চলতি মাসের জুলাইয়ে এসে কমে হয়েছে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা। এটাতো এক মাসের হিসাব। গেল অর্থবছরেও আগের বছরের চেয়ে ঋণ আদায় ও বিতরণ কমে গিয়েছিল। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঙ্কটে জাতীয়পর্যায়ের মতো পল্লী এলাকায়ও এর প্রভাব পড়েছে। এতে কমে যাচ্ছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান। চাপ বাড়ছে শহরের ওপর।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, শহরের চেয়ে গ্রামে অবকাঠামোর সুবিধা কম। শহরে যে হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়, গ্রামে ওই হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয় না। এমনও এলাকা আছে যেসব এলাকায় দিনে-রাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় না। এর সাথে আস্থার সঙ্কটতো রয়েছেই।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে ুদ্র উদ্যোক্তারাও লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। এতে তাদের ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে গেছে। এসবেরই প্রভাব পড়েছে ঋণ আদায়ে।
পল্লী এলাকার ঋণ বিতরণ ও আদায়ে ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেছেন, পল্লী এলাকায় ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার অন্যতম কারণ হলো অবকাঠামো ও আস্থার সঙ্কট। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা গ্রেফতার ও জেলের ভয়ে পলাতক ছিলেন। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের টানা আন্দোলনের সময় তারা স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতে পারেননি। অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এসব কারণে তারা নতুন বিনিয়োগে যেতে পারেননি, পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখায় নিয়মিত ব্যাংকঋণও পরিশোধ করতে পারেননি। এ কারণে অনেকেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের ওপর।
প্রথম প্রজন্মের অপর এক ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের এমনিতেই একটা অনীহা থাকে, এরওপর বিনিয়োগস্থবিরতার মাসে বিনিয়োগকারীরাও এগিয়ে আসছেন না। অনেকেই বছরের প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। ওই সময় যারা ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছিলেন তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। আর ঋণখেলাপি হলে ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নিতে পারেন না। ফলে অনেকেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ ছাড়া শহরের মতো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সুবিধা পান না। সব মিলেই নতুন উদ্যোক্তাও আসছেন না। আবার পল্লী এলাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ভালো উদ্যোক্তার অভাব। যাকে ঋণ দেয়া হবে, তার কাছ থেকে ঋণ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে পুরো ঋণই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। এসব বিবেচনায় পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণে ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে।
পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। পল্লী এলাকায় কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হওয়ায় মানুষ কর্মের সংস্থানে শহরমুখী হচ্ছে। এতে শহরের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়াতে কর মওকুফসহ সরকারি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে গ্রামমুখী বিনিয়োগ বাড়বে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরো চাঙ্গা হবে বলে তারা মনে করেন। এতে বেকারত্বের হারও কমে যাবে।

মালয়েশিয়ায় জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মী যাবে: মঙ্গলবার সমঝোতা স্বাক্ষর

আপাতত মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে যাওয়ার পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও যাতে শ্রমিক যেতে পারে, এমন সুযোগ রেখে জি টু জিতে (সরকার টু সরকার) সংস্কার এনে ‘জি টু জি প্লাস’ পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানো হবে। এনিয়ে মঙ্গলবার একটি সমঝোতা স্বাক্ষর চুক্তি হচ্ছে। সোমবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি মালয়েশিয়া প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক শেষে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের একথা জানান।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সোয়া ১১টা পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে আসা প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থাণ মন্ত্রী বলেন, বিজনেস টু বিজনেস (বি টু বি) পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। উভয় দেশের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক করতেই তারা (মালয়েশিয়ান প্রতিনিধি) ঢাকা সফরে এসেছেন। এখন জি টু জিতে কর্মী যাচ্ছে। এ পদ্ধতিতেই কর্মী যাবে। তবে সরকার চাইলে বায়রাকে সম্পৃত্ত করতে পারবে। এজন্য আগামীকাল (মঙ্গলবার) মালয়েশিয়া প্রতিনিধি দলের সাথে ‘জি টু জি প্লাস’ নিয়ে একটি সমঝোতা সই হবে। তিনি বলেন, ‘জি টু জি প্লাস’ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া যেতে একজন শ্রমিকের সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা খরচ হবে।
নতুন এ পদ্ধতিতে কবে নাগাদ কর্মী পাঠানো শুরু হতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ‘আশা করছি মাসখানেকের মধ্যেই এটা শুরু হয়ে যাবে। এবার শুধু প্লানটেশন নয়, কনস্ট্রাকশন, ফ্যাক্টরি, শিক্ষক ও চিকিৎসকসহ সবখাতেই লোক যাবে মালয়েশিয়াতে।
ঢাকায় সফররত মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল শারফুদ্দিন বিন এইচজে কাসিমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার নরলিন ওথমানও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ছাড়াও বাংলাদেশের পক্ষে মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক বেগম শামসুন নাহারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে ষষ্ঠ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার ও মালয়েশিয়ার পক্ষে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল শারফুদ্দিন বিন এইচজে কাসিম নেতৃত্ব দেন।

বৃদ্ধ বয়সের জীবন : পাকিস্তান, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ ভালো

বুড়ো বয়সের অনেক জ্বালা। বাংলাদেশের বুড়ো মানুষেরা ভালো নেই। তবে পাকিস্তান আর ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের প্রবীণ মানুষেরা ভালো আছেন। ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অফ সাদাম্পটন এবং হেল্প এজ ইন্টারন‌্যাশনালের যৌথ সমীক্ষার রিপোর্ট সে রকমই বলছে।
এতে বলা হয়েছে, সুইত্জারল‌্যান্ডে বার্ধক‌্য সবচেয়ে মনোরম। নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানিসহ আরও বেশ কয়েকটি পাশ্চাত‌্য দেশ এই গ্লোবাল এজ ওয়াচ ইনডেক্সে প্রথম দশে ঠাঁই পেয়েছে। রয়েছে আমেরিকাও। কিন্তু, জাপান ছাড়া এশিয়ার আর প্রায় সব দেশেই বার্ধক‌্য কষ্টদায়ক বলে দাবি করছেন সমীক্ষকরা।
৯৬টি দেশে সমীক্ষা চালিয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ সাদাম্পটন এবং হেল্প এজ ইন্টারন‌্যাশনালের যৌথ দল। সেই তালিকায় বাংলাদেশের স্থান ৬৭। ভারতের স্থান হয়েছে ৭১ নম্বরে। ৯৬টি দেশের তালিকায় পাকিস্তানের ঠাঁই হয়েছে ৯২ নম্বরে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মধ‌্যে শ্রীলঙ্কায় প্রবীণদের সমস‌্যা সবচেয়ে কম। তাই তালিকায় তারা ৪৬ নম্বরে।
গ্লোবাল এজ ওয়াচ ইনডেক্স বলছে, সুইত্জারল‌্যান্ড বার্ধক‌্যের সবচেয়ে ভালো স্থান। সেখানে, বয়স বেড়ে গেলে সমস‌্যা বা বৈষম‌্যের শিকার হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। সে দেশের নাগরিক জীবনে আট-আশির তেমন ফারাক নেই। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে নরওয়ে, তৃতীয় স্থানে সুইডেন, চতুর্থ জার্মানি এবং পঞ্চম কানাডা। প্রথম দশের একমাত্র এশীয় প্রতিনিধি জাপান অষ্টম স্থানে। মার্কিন মুলুক নয়ে আর ব্রিটেন দশে। চীন রয়েছে ৫২-তে।

তার কথা কইতেও দেরি নাই ক্ষমা চাইতেও দেরি নাই : অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে সুরঞ্জিত

টিউশন ফির ওপর আরোপিত ভ্যাট এবং শিক্ষকদের নিয়ে অর্থমন্ত্রীর অবস্থানের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘তিনি মুরুব্বি মানুষ। কী কয় না কয় ঠিক নাই। তার কথা কইতেও দেরি নাই, আবার ক্ষমা চাইতেও দেরি নাই।’
আজ সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অর্পিত সম্পত্তি আইন নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি একথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, খুশি কবীর, বাংলাদেশের সামজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, সাংবাদিক অজয় দাস গুপ্ত প্রমুখ।
অর্পিত সম্পত্তি আইন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘১৯৫০ সাল থেকে হিন্দুদের নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। পাকিস্তান শত্রু সম্পত্তি আইন করে তাদের জায়গা ফেরত দেয়নি। বাংলাদেশ হওয়ার ৪৪ বছরেও এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ায় এ দেশে ৩৭ শতাংশ থেকে এখন ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এই ৯ শতাংশকে ধরে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ। এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এক সময় শূন্যতে নেমে আসবে। আগেই সাধু সাবধান। যদি এমনটা হয় তাহলে এ দেশ হবে আফগানিস্তানের মতো এবং আমরা বৈচিত্র্যময় গণতন্ত্রকে হারাবো।’
‘ভূমিতে যে কোনো কাজের জন্য টাকা চায়’ আলোচকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘আমাকে একটা জায়গা দেখান যেখানে টাকা চায় না। টাকা চায় না কে?

বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে পাট রফতানি বন্ধ

বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট ও পাটজাতদ্রব্য রফতানি ওপর ভারতের জুট কমিশন নতুন করে শর্তারোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করায় আজ শনিবার সকাল থেকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে পাট রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। বেনাপোল বন্দর এলাকায় শতশত পাট ও পাটজাত দ্রব্য বোঝাই ট্রাক আটকা পড়ে আছে। দুর্ভোগে পড়েছে পাট রফতানিকারক ও ট্রাকচালকরা।
জুট কমিশনের জারি করা প্রজ্ঞাপনের সাথে ভারতীয় আমদানিকারকদের নতুন ফরমেট করা ফরম দেয়া হয়েছে সেটি পূরণ করে নতুনভাবে রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়েছে। যদিও সেদেশের সকল আমদানিকারকের আগে থেকেই আমদানি-রফতানি লাইসেন্স রয়েছে। এই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, প্রতি চালান আমদানির পূর্বে কমিশন থেকে চালান হিসেবে এনওসি নিতে হবে।
বিশ হাজার বেল এলসির পাট ২/৩ শত প্রাকের চালান ভারতে রফতানি হয়। এখন প্রতি চালানে এনওসি আনতে গেলে এলসির সময়সীমা পার হয়ে যাবে। একইভাবে বলা হয়েছে, ভারতে আমদানি করা পাট দিয়ে বস্তা তৈরি করা যাবে না। অথচ বাংলাদেশ থেকে ভারতে যে পাট রফতানি হয় তা দিয়ে সে দেশের জুটমিলগুলিতে বেশিরভাগই বস্তা তৈরি করে থাকে।
বাংলাদেশের পাট রফতানিকারকদের অভিমত, এই প্রজ্ঞাপনের কারণে বাংলাদেশে পাট মিলগুলো বন্ধ হয়ে কাঁচাপাটের বাজারে ধস নেমে আসবে। বেকার হয়ে পড়বে লক্ষাধিক শ্রমিক।
ভারত সরকারের পাট মন্ত্রণালয় না থাকায় টেক্সটাইল মন্ত্রণালয়ের জুট কমিশন সে দেশের পাট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যার প্রধান কার্যালয় কলকাতার সল্টলেকে। বেনাপোল বন্দরের ওপারে ভারতের পেট্রাপোল কাস্টম কতৃপক্ষ পাটের ট্রাক প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ লাখ বেল পাট রফতানি হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে চীন, পাকিস্তান, ইউরোপ পাট আমদানি না করায় তা নেমে আসে ৮/৯ লাখ বেলে। যার ৮০-৯০ ভাগই ভারতে রফতানি হতো। এই পাট দিয়ে ভারতের জুট মিলগুলো বস্তা তৈরি করে থাকে। এই পাট রফতানি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শুধু খুলনায় প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। পাট রফতানিতে ধস নামলে সে খাতেও অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে।
এ ব্যাপারে বেনাপোল বন্দরের উপ পরিচালক আব্দুল জলিল জানান, ভারত সরকার হঠাৎ করে প্রজ্ঞাপন জারি করায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পাট রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। পাট রফতানি বন্ধ হওয়ার কারণে বেনাপোল বন্দর এলাকায় শত শত পাট বোঝাই ট্রাক আটকা পড়েছে।

নেপাল আর হিন্দু রাষ্ট্র নয়

একসময়ের হিন্দু রাষ্ট্র নেপাল এবার পেতে চলেছে এক নতুন পরিচয়। নেপালের বিধানসভা নাকচ করে দিয়েছে নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্রের পরিচিতি ফিরিয়ে দিতে। বহু অপেক্ষিত নতুন সংবিধান সংশোধনের সময়ে সোমবার নিজেদের এই মত উঠে এসেছে। এতেই বিভিন্ন মহলে উঠেছে বিতর্কের ঝড়। আগে নেপাল হিন্দু রাষ্ট্র হলেও ২০০৬ সালে রাজা জ্ঞানেন্দ্রের সিংহাসন থেকে নেমে আসার কারণে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে নেপালে। তখনই নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বলে ঘোষণা করা হয়। বিধানসভার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করার বিরুদ্ধেই ভোট দিয়েছে।
নেপালকে ফের হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করার পাশাপাশি রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি রাখে রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি নেপাল। নেপালের একটি বৃহত্‍‌ জনসংখ্যা হিন্দু। তারা চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছেন রাজারা বিষ্ণুরই প্রতিরূপ। সোমবার ভোটের এই ফলাফলে কয়েক শ' হিন্দু আন্দলোনকারী বিধানসভার বাইরে বিক্ষোভ দেখায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে জল কামান চালাতে হয়। দেশের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

মোটাসোটা মুরগি খাওয়ার আগে দু’বার ভাবুন!

রেস্তোঁরায় বা বাসায় খাবার টেবিলি বসে আপনি যে মুরগির ঠ্যাং-এ কামড় দিচ্ছেন, তাতে কি মনে হচ্ছে মুরগিটা ছিল বেশ পুষ্ট?
বাজার থেকে মুরগি কিনে বাড়ি ফেরার সময় মাংসটা কি অনেক বেশি গোলাপি লাগছে ?
আহ্লাদে আট খানা হয়ে গিয়েছেন?
একটু সবুর করুন।
আপনার চিন্তা একটু বাড়ারই কথা। আপনি কিন্তু বিষ খাচ্ছেন। আপনার শরীরে ঢুকছে আর্সেনিক। আর আপনি ‘নীলকণ্ঠ’ হয়ে পড়তে চলেছেন।
কেন? কী ভাবে?
আসলে ব্রয়লার মুরগিকে তড়িঘড়ি মোটাসোটা করে তোলার জন্য আর সেই গোশতকে আরো বেশি গোলাপি করার জন্য মুরগির খাদ্যে আর্সেনিক মেশানো হয়। এই তথ্যটি খোদ আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন(এফডিএ)-এর। এ দেশের খাদ্য বিজ্ঞানীরাও তা মেনে নিয়েছেন। আমেরিকার জন হপকিন্স সেন্টারের একটি সমীক্ষা ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পার্সপেক্টিভ’ নামে একটি বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর মুরগির খাদ্যে যে আর্সেনিক মেশানো হয়, তা মেনে নেয় এফডিএ।
এফডিএ বলেছে, ‘জেনেটিক্যালি মডিফায়েড’ মুরগির শরীরে বাইরে থেকে জিন ঢোকানো ছাড়াও আর্সেনিক, হরমোন, কারসিনোজেন্স (ক্যান্সার-সৃষ্টির ক্ষমতা সম্পন্ন পদার্থ) এবং নানা রকমের ওষুধ ঢোকানো হয়। যাতে তারা তড়িঘড়ি মোটাসোটা হয়ে ওঠে। এই ধরনের মুরগিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে, জিএমসি বা ‘জেনেটিক্যালি মডিফায়েড চিকেন’। মার্কিন সংস্থাটি এও বলেছে, এই ধরনের মুরগির ওজন এত বেশি হয়ে যায় যে, তারা ঠিক ভাবে দাঁড়াতে পারে না। তাই বেশির ভাগ সময়েই তাদের বসে থাকতে দেখা যায়।
ব্রয়লার মুরগি বাঁচে বড়জোর ছয় সপ্তাহ। এই সময়ে তাদের যে খাবারদাবার দেওয়া হয়, তাতে মুরগির শরীরে ব্রংকাইটিস, শ্বাসকষ্টের রোগ বাসা বাঁধে। তাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। বাজারে ওই অসুস্থ মুরগিদেরই কেটে বিক্রি করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেকোনো খাবারে আর্সেনিক মেশানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে ১৯৯৫ সালেই। জাপান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আরব দেশগুলিও ‘জিএম-চিকেন’ নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এখানে কিছুই হয়নি। ওয়েস্টবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অফ অ্যানিম্যাল অ্যান্ড ফিশারি সায়েন্স-এর এক বিশেষ সূত্র জানান, জার্মানির একটি সংস্থা বহু বছর আগে রক্সারসোন যৌগ ব্যবহার করে ওই নাম দিয়েই একটি ওষুধ তৈরি করে। কিন্তু অনেক পরে দেশে-দেশে প্রতিবাদ তুঙ্গে ওঠায় ওই সংস্থাই ওষুধটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। মজার কথা, এখনো সেই ওষুধ ভারতের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ‘থ্রি-নাইট্রো’ নাম দিয়ে ভদোদরা, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরুর কয়েকটি সংস্থা ওই ‘রক্সারসোন’ ওষুধ এখনও বাজারে বিক্রি করে চলেছে। পোলট্রিগুলিতে এই সব ওষুধের চাহিদা খুব বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্সেনিকের কিন্তু একটা ভালো দিকও আছে। সীমিত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ করে আর্সেনিক। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকে না। ফলে প্রচুর ক্ষতি হয়। বেশি মাত্রায় আর্সেনিক মুরগির শরীরে ঢুকলে তারা তড়িঘড়ি মোটা হয়ে ওঠে বটে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই মুরগি খেলে খাদকের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। মুরগির মাংস খেয়ে, প্রয়োজন না-থাকলেও শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক ঢোকে। ফলে, সত্যি-সত্যিই যখন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়, তখন আমাদের শরীরে তা আর কাজে আসে না।
প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি নিউট্রিশন বিষয়ের শিক্ষক বরুণ রায়ের বক্তব্য অবশ্য একটু অন্য রকম। তার কথায়, ‘‘এ দেশে ব্রয়লার মুরগির খাবারে যতটা না আর্সেনিক মেশানো হয়, তার চেয়ে কয়েক শ' গুণ বেশি মেশানো হয় অ্যান্টিবায়োটিক। যাঁরা এই মুরগি খান, তাদের জন্য তা মোটেই নিরাপদ নয়। দীর্ঘ দিন এই মুরগি খাওয়ার ফলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর কোনও কাজই করতে পারে না। অথচ, অ্যান্টিবায়োটিকই হল আমাদের শরীর থেকে জীবাণু মেরে ফেলার শেষ উপায়।’’
ভারতের ফুড-সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটির (এফএসএসএ) কর্মকর্তারা ব্রয়লার মুরগির বিষয়টি জানেন। তাদের বক্তব্য, ‘‘রাজ্য সরকারগুলি নিজেরা ব্যবস্থা নিলে, তবেই এফএসএসএ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে পারবে।’’
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা।

হাওরে ঐতিহ্যের নৌকাবাইচ by মো: আল আমিন

কিশোরগঞ্জ সদরের চাঁদেরহাসি গ্রামের
হাওরে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় : নয়া দিগন্ত
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ভাদ্রের তালপাকা গরম কিছুটা কমে সহনীয় হয়ে এসেছে। বইছে মৃদুমন্দ হাওয়া হাওরের বুকে তুলছে ছোট ছোট ঢেউ। যেন হাওরজুড়ে ছন্দের দুলুনি! এ দুলুনির মধ্যেই পানি কেটে কেটে ছিপছিপে দীঘল সব নৌকার সে কী ছুটে চলা! কে কাকে পেছনে ফেলবে এ নিয়ে প্রতিযোগিতা। নৌকায় দুই পাশে সারি বেঁধে বসা মাঝিরা গানের তালে তালে টেনে চলছেন বৈঠা। নৌকার গলুইয়ে বসা গায়েনের কণ্ঠে দরাজ সুর, ...‘আল্লাহ বলিয়া নাও খোলরে ভাই সক্কলি। আল্লাহ বলিয়া খোল। ওরে আল্লাহ বলিয়া নাও খোল, শয়তান যাবে দূরে...’। একেকটা কলি শেষ হতেই মাঝিদের সমস্বরে চিৎকার ‘হই হই’। পেছনের নৌকা কাছাকাছি চলে আসছে! গায়েন কাঁসির শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেন। সেই সাথে গানের গতিও বাড়িয়ে দেন। অসম্ভব দ্রুততায় ছুটে চলেছে নৌকা! হাওরপাড়ের হাজারো মানুষ সে দৃশ্য দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ছেন। উত্তেজনায় তারাও চিৎকার করছেন ‘হই হই... হই হই, আ¹য়া যাও আ¹য়া যাও’ (এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও)।
কিশোরগঞ্জের বড় হাওর এলাকায় এমনই একটি উৎসবমুখর ও নৌকাবাইচ হয়ে গেল গত শনিবার। সদরের দানাপাটুলি ইউনিয়নের চাঁদের হাসি গ্রামের ‘বড় হাওরে’ এমন নৌকাবাইচের আয়োজন করে উপজেলা পরিষদ।
নৌকাবাইচ দেখতে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হন। এবারই প্রথম এ গ্রামের সামনে নৌকাবাইচ হলো। তবে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে একাধিক নৌকাবাইচ হয়ে থাকে। এর মধ্যে নিকলীর সোয়াইজনি নদীর নৌকাবাইচ অন্যতম।
নৌকাবাইচের ইতিহাস : আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ নৌকাবাইচ। তবে কবে এ দেশে গণবিনোদন হিসেবে নৌকাবাইচের প্রচলন সে সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না।
বাইচ শব্দটি ফারসি। এটি ‘বাজি’ শব্দজাত। যার বিবর্তন এরূপ : বাজি>বাইজ>বাইচ। এর অর্থ খেলা। মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকাবাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। এ কারণে অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকে এ দেশে নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রার অন্যতম কৌশল ছিল নৌশক্তি। বাংলার বারো ভূঁইয়ারা নৌ বলেই মোগলদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ জলদস্যুদের দমনে নৌশক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব রণবহর বা নৌবহরে দীর্ঘাকৃতির ছিপ জাতীয় নৌকা থাকত। বর্তমানে নৌকাবাইচে নৌকার আকৃতিও ওই রকমই।
বাংলাদেশের নৌকাবাইচের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। তবে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এক ধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করতেন বলে জানা যায়। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীলনদে নৌকা প্রতিযোগিতা শুরু। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে নৌকাবাইচ। তবে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ এখনো তুমুল জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩৫টি ফাইনাল হয়েছে।
বাইচের নৌকার গঠন : বাইচের নৌকার গঠনও শৈল্পিক। এ নৌকা হয় ছিপছিপে। সরু ও বেশ লম্বাটে। ফলে নদীর পানি কেটে তরতরিয়ে দ্রুত লয়ে চলে। নৌকার সামনের গলুই খুব সুন্দরভাবে সাজানো থাকে। তাতে কখনো করা হয় ময়ূরের মুখ, কখনো বা রাজহাঁস অথবা অন্য কোনো পাখির মুখাবয়ব। এসব নৌকা উজ্জ্বল রঙের কারুকাজে বিভিন্ন নকশায় তৈরি। এসব নৌকাকে দর্শকের সামনে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা থাকে। একেকটা নৌকা লম্বায় ১০০-২০০ ফুট হয়। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে নৌকার কিছুটা পার্থক্যও দেখা যায়।
ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাইচের জন্য সাধারণত কোশা আকৃতির নৌকা ব্যবহৃত হয়। এ নৌকার সামনের ও পেছনের অংশ থাকে সোজা। কোশা নৌকা তৈরিতে শাল, শীল কড়াই, চাম্বুল কাঠ ব্যবহার করা হয়। টাঙ্গাইল ও পাবনার বাইচের নৌকার সামনের দিকটা পানির সাথে মিশে থাকে। পেছনের অংশটি পানি থেকে প্রায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এ নৌকায় সামনের ও পেছনের মাথায় চুমকির বিভিন্ন কারুকাজ থাকে। নৌকাগুলো তৈরিতে সাধারণত শাল, গর্জন, শীল কড়ই, চাম্বুল কাঠ ব্যবহৃত হয়।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেটে বাইচের জন্য সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর আকারও কোশা ও ছিপ জাতীয় নৌকার মতোই সরু। লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট। তবে প্রস্থ একটু বেশি। এ অঞ্চলের নৌকার সামনের ও পেছনের দিকটা পানি থেকে দুই-তিন ফুট উঁচু থাকে। মুখটা হাঁসের মুখের মতো চ্যাপ্টা। চট্টগ্রাম, নোয়াখালীর নিন্মাঞ্চল ও সনদ্বীপে বাইচে সাম্পান ব্যবহৃত হয়। এটি জাহাজের মতো। ঢাকা ও ফরিদপুরে ব্যবহৃত হয় গয়নার নৌকা। বাইচের নৌকার নামও বাহারি। যেমনÑ অগ্রদূত, ঝরের পাখি, পঙ্খিরাজ, ময়ূরপঙ্খী, সাইমুম, তুফান মেল, সোনার তরী, দ্বীপরাজ ইত্যাদি।
বাইচের নিয়ম বা আনুষ্ঠানিকতা : নৌকাবাইচের আনুষ্ঠানিকতাও চমৎকার। নৌকায় ওঠার আগে সবাই পবিত্র হয়ে গেঞ্জি গায়ে মাথায় একই রঙের রুমাল জড়িয়ে নেন। সবার মাঝে থাকেন নৌকার নির্দেশক। দাঁড়িয়ে থেকে নৌকা চালান পেছনের মাঝিরা। অন্য মাঝিরা নৌকার দুই পাশে সারি বেঁধে বসে একত্রে জয়ধ্বনিসহ বৈঠা টানেন। প্রতিটি নৌকায় ২৫, ৫০ বা ১০০ মাঝি থাকতে পারেন।
মাঝিদের বৈঠা টানাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে একজন পরিচালক থাকেন। যাকে বলা হয় গায়েন। তিনি বসেন নৌকার গলুইয়ে। গায়েনের নির্দেশে মাঝিরা একত্রে গান গাইতে আরম্ভ করেন। গানের তালে তালে বৈঠা টানেন; ফলে কারো বৈঠা ঠোকাঠুকি না লেগে এক সাথে পানিতে অভিঘাত তৈরি করে। গায়েন কাঁসির শব্দে এ বৈঠার এবং গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করেন। অন্য সব নৌকা পেছনে ফেলে নিজেদের সবার আগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় প্রয়োজনে কাঁসির শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়। সেই সাথে গানের গতিও বেড়ে চলে। বাইচের নৌকায় সারিবদ্ধভাবে বসে মাঝিরা গান করেন বলে একে সারিগান বলা হয়।
আবহমানকাল থেকে বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ বিভিন্নভাবে নদী দখল ও কারখানার বর্জ্যে নদ-নদী মেরে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে নদীর পানি। নদী হারাচ্ছে স্বাভাবিক গতি। ফলে পানি শুকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে নদী। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকাবাইচ।
তবে এখনো হাওরাঞ্চলে আয়োজন করতে দেখা যায় নৌকাবাইচ। শনিবার কিশোরগঞ্জের নৌকাবাইচে বিভিন্ন এলাকার নয়টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে নিকলীর গোবিন্দপুরের আলী হোসেনর নৌকা। দ্বিতীয় হয়েছে নিকলীর ফজলুর রহমানের নৌকা। তৃতীয় হয়েছে নিকলীর কারার বোরহান উদ্দিনের নৌকা।
নৌকাবাইচে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি এস এম জাফর উল্লাহ প্রধান অতিথি থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।

পানি সমস্যার সমাধান হতে হবে দুই দেশের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে : পঙ্কজ শরন

ভারতের হাই কমিশনার পঙ্কজ শরন বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের সন্তুষ্টির ভিত্তিতেই পানিসম্পদ ইস্যুর সমাধান করতে হবে। কেননা এতে দুই দেশেরই অংশীদারিত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তির পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা প্রক্রিয়া চলছে। এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরিতে সহায়ক হবে, যেমনটা হয়েছে স্থল সীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে।
আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কে পঙ্কজ শরন বলেন, ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় নেয়া হবে না। এখন এই নিশ্চয়তার ওপর আস্থা রাখা বা না রাখাটা বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করে।
আজ সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিসের (বিআইআইএসএস) উদ্যোগে নিজস্ব মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হাই কমিশনার বক্তব্য রাখছিলেন। ‘বাংলাদেশ-ভারত সাম্প্রতিক সম্পর্কের অগ্রগতি ও প্রত্যাশা’ বিষয়ক অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইআইএসএস মহাসচিব মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ।
পঙ্কজ শরন বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমুদ্রসীমার পর স্থল সীমানার নিষ্পত্তি হওয়া গর্ব করার মত একটি অর্জন। এই অর্জন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানী সহযোগিতা, কানেক্টিভিটি, উন্নয়ন সহায়তা ও জনগনের মাঝে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে সহায়ক হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালের মে মাসে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারতে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের প্রতি অনুসৃত নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে।
পররাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান সরকার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি অনুসরন করছে। বাংলাদেশেরও ইচ্ছা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই সম্পর্ক এগিয়ে গেছে। আর নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে দুই দেশের মধ্যে যে ২২টি দলিল সই হয়েছে, তার নেতিবাচক কোনো প্রভাব বাংলাদেশে দেখা যায়নি। তাই নির্দ্বিধায় বলা হয়, সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাটা প্রবল।
আঞ্চলিক ট্রানজিটের ওপর গুরুত্বারোপ করে পঙ্কজ শরন বলেন, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে ট্রানজিট প্রটোকল চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিবিআইএন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের বৈঠকে চার দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী যান চলাচলের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে ট্রানজিট ফি’র বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওযায় পণ্যবাহী যান চলাচলের ক্ষেত্রে ততটা অগ্রগতি হয়নি। আগামী ৯ অক্টোবর চার দেশের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে যানবাহন চালানো হবে। আর অক্টোবরে হবে কার র‌্যালি।
তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ এখন কেবল সড়ক বা রেলপথেই সীমাবদ্ধ নয়। তা সমুদ্রপথেও বিস্তৃত হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি হয়েছে। খুলনা-কলকাতা সরাসরি ট্রেন চলাচল নিয়ে আলোচনা চলছে। সীমান্তের শুল্ক স্টেশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ চলছে।
কিশোরী ফেলানী হত্যাকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি দু:খজনক অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত করে হাই কমিশনার বলেন, গত কয়েক বছরে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এতে সীমান্ত হত্যার সংখ্যা কমে এসেছে। তবে আমাদের লক্ষ্য তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
তিনি বলেন, সীমান্তে মানুষ পারাপার হওয়া প্রয়োজন বৈধ চ্যানেলে। গরু চোরাচালান একটি বড় সমস্যা। একে কেন্দ্র করে জাল টাকা, মাদক, এমনকি অস্ত্র চোরাচালানও হয়। তাই অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যকে আইনগত ভিত্তি বা প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে টেলিফোন সংলাপ দুই দেশের সম্পর্কে একটি নতুন মাত্রা। এই আলাপ কেবল যে সঙ্কটের সময়ে হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় বিভিন্ন ইস্যুতে শীর্ষ পর্যায়ে এই আলোচনা হতে পারে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লি সফরের জন্য নরেন্দ্র মোদি বেশ আগেই আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন।

২২০টি চা বাগানে একযোগে শ্রমিকদের কর্মবিরতি by মো: মোস্তাাফিজুর রহমান

দাবি আদায়ে চা শ্রমিকরা রাস্তায়
সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মজুরি প্রদানসহ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি দ্রুত নবায়ন করার দাবিতে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের ২২০টি চাবাগানে দুই ঘন্টা কর্মবিরতি পালন করেছে চা শ্রমিকরা। সোমবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলে। এ সময় বাগানগুলোতে কোন পাতা উত্তোলন বা কারখানায় কোন কাজ হয়নি। মনু-ধলাই-লংলা-জুড়ি-লস্করপুর-বালিশিরা-সিলেট-চট্টগ্রামভ্যালী ও বাগান পঞ্চায়েত কমিটির উদ্যোগে এ কর্মবিরতি পালন করা হয়।
জানা যায়, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন গঠিত হলেও সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন না করায় দীর্ঘদিন ধরে বাগানগুলোর পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। চুক্তিতে থাকা সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মজুরীসহ নানা শর্ত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন প্রতিটি ভ্যালীর চা শ্রমিকরা। দাবিগুলো বাস্তবায়নে গড়িমসি করায় নতুন করে আন্দোলনে নেমেছেন তারা।
আজ সোমবার সারা দেশের চা বাগানগুলোতে একযোগে দুই ঘন্টা কর্মবিরতি পালনের কর্মসূচি ছিল। এরই অংশ হিসেবে কমলগঞ্জের ২২টি চা বাগানেও পালন করা হয়েছে কর্মবিরতি। কমলগঞ্জের দেওয়াছড়া, আলীনগর, শমসেরনগর, ধলাই, মৃত্তিঙ্গা ,মনু, পাত্রখোলা, মাধবপুর, শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা, নুরজাহান, হোসেনাবাদ, লস্কপুর, লংলা, জুড়িসহ প্রায় ২২০টি বা বাগানে সকাল ৯টা হতে ১১টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হয়।
সকাল থেকেই চা শ্রমিকরা বাগানে কাজে যোগদান না করে কারখানার সামনে সারিবদ্ধ হয়ে বসে কর্মবিরতি পালন করে। এরপর তারা নেমে আসেন রাস্তায়। তারা বিভিন্ন ধরনের প্লেকার্ড নিয়ে তাদের দাবি পূরণে শ্লোগান দেয়। এ সময় বাগানে কোন ধরনে কাজকর্ম হয়নি। কর্মবিরতি চলাকালে বাগানগুলোতে অবস্থানরত চা শ্রমিকদের উদ্যেশ্যে বক্তব্য রাখেন ভ্যালী ও পঞ্চায়েত কমিটির নেতৃবৃন্দ।
কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা বাগানে দেখা যায়, চা শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বাগানের কারখানার সামনে অবস্থান নেন। তাদের হাতে নানা প্লেকার্ড। কর্মবিরতিকালে এখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন আলীনগর চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি গনেশ পাত্র, চা ছাত্র যুব পরিষদের আহবায়ক সজল কৈরীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। বক্তরা ছুটির দিনে মজুরি প্রদান, বিভিন্ন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবি জানান। তা নাহলে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর পর থেকে বাগান বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হবে বলে বক্তারা হুশিয়ার করেন।
অপর দিকে একই সময় হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চলের চা বাগানগুলোতেই একই সময় কর্ম বিরতি পালন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

‘মোটাসোটা’ বিমানসেবিকাদের বাদ দিচ্ছে এয়ার ইন্ডিয়া

ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া তাদের প্রায় সোয়াশো কেবিন ক্রু বা ‘এয়ার হোস্টেস’কে অতিরিক্ত ওজনের কারণে গ্রাউন্ড-ডিউটিতে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে যে সব কেবিন ক্রু বা বিমানসেবিকার ‘বডি মাস ইনডেক্স’ একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের চেয়ে বেশি, তারা আর ফ্লাইটে ডিউটি করতে পারবেন না। শ্রমিক সংগঠনগুলো এয়ার ইন্ডিয়া-র এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করলেও বেসামরিক পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এয়ার ইন্ডিয়ার ব্র্যান্ডকে আধুনিক করে তুলতে ‘মোটাসোটা’ এয়ারহোস্টেসদের সরিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই।
ভারতে এখন আধুনিক মানের অন্তত ছ-সাতটি ঝাঁ-চকচকে বেসরকারি এয়ারলাইনের সঙ্গে নিয়মিত পাল্লা দিতে হয় সরকারি সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়াকে। কিন্তু দেশের একটি বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ার আশিস ধরের অভিজ্ঞতা বলে, এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে উঠলেই বেশির ভাগ সময় মোটাসোটা, বয়স্ক ও ভারিক্কি এয়ারহোস্টেসরাই কেবিনে তাদের স্বাগত জানিয়ে থাকেন।
যাত্রীদের মধ্যে এই ধরনের ক্ষোভ সামাল দিতেই এয়ার ইন্ডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সোয়াশোরও বেশি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ও এয়ারহোস্টেসকে তারা অন্য কাজে সরিয়ে দেবে।
আশিস ধরের মতে সিদ্ধান্তটা সঠিক, কারণ প্লেনের ভেতর আসলে নড়াচড়ার জায়গাও যে খুব অল্প। তার কথায়, ‘সরু আইলের মধ্যে অনেক সময় যাত্রীদের সাহায্য করতে এয়ারহোস্টেসদের বেশ বেগ পেতে হয়। সেখানে তারা নিজেরাই যদি বিশালবপু হন, তাহলে সেটা তো মুশকিল বটেই!’
কিন্তু দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই এয়ার ইন্ডিয়ার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। এর আগে তারা একটা বয়সের বেশি এয়ারহোস্টেসের বসিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, এখন তাদের বক্তব্য এয়ার ইন্ডিয়া ওজনের অজুহাতেও বৈষম্য করতে চাইছে।
জাতীয় শ্রমিক নেতা ও পার্লামেন্টারিয়ান তপন সেন বিবিসিকে বলছিলেন, ‘এয়ার ইন্ডিয়ার সার্ভিস রুলে ওজনের কারণে কোনও কর্মীর সাথে বৈষম্য করার কোনও সুযোগ নেই। তারপরেও যদি ফিটনেসের প্রশ্ন থাকে, সেখানেও নির্বাচিত ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে নির্দিষ্ট বিধিমালা তৈরি করে তবেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এই বক্তব্যকে বিন্দুমাত্র আমল না-দিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকসানে ধুঁকতে থাকা এয়ার ইন্ডিয়াকে চাঙ্গা করতে হলে এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হবে – কারণ এয়ারলাইন ইন্ডাস্ট্রিতে এটাই রেওয়াজ।
সেন্টার ফর এশিয়া প্যাসিফিক এভিয়েশনের ডিরেক্টর কপিল কাউলের কথায়, ‘গ্রাহক-পরিষেবা নির্ভর এই শিল্পে বেশি ওজনের কেবিন ক্রু রাখাই যায় না। বেশি ওজনের একজন কেবিন ক্রু পুরো এয়ারলাইনের ফিটনেস বা স্বাস্থ্য সম্পর্কেও মোটেই ভাল বিজ্ঞাপন নয়।’
তিনি আরও বলছেন, ‘ক্রু-দের হতে হবে চটপটে, সপ্রতিভ, সুন্দর দেখতে – আর তা না-হলে সেই এয়ারলাইনকে নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবেই। ফলে মোটাদের সরিয়ে দেওয়া নিয়ে এত হইচইয়ের কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।’
তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর, এটা অনুধাবন করে এয়ার ইন্ডিয়া এখনও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও বিবৃতি দেয়নি।
তবে সংস্থার সূত্রগুলো বলছে – বিষয়টা ঠিক ওজনের নয়, বরং বডি মাস ইন্ডেক্সের – এবং এয়ারলাইন শিল্পে কেবিন ক্রু অনেক ধরনের আপদকালীন পরিস্থিতি সামলাতে হয় বলেই তাদের ফিটনেসের সঙ্গে কোনও আপস করা সম্ভব নয়।

মাটির নিচে গণতন্ত্র খুঁজছেন এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ৯০-এর কাছাকাছি বয়সে তিনি এখনও প্রাণবন্ত। যদিও তিনি নিজে মনে করেন তার বয়স ৪০। প্রতিনিয়ত ছুটছেন এরশাদ। এখান থেকে সেখানে। ইতিহাস তাকে স্বৈরাচার বললেও কথিত গণতান্ত্রিক জমানায় তিনি রাজনীতি করছেন দাপটের সঙ্গেই। সবসময়ই তিনি লাইমলাইটে। যদিও ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন তার জন্য কিছুটা হলেও ভাগ্যবিপর্যয় নিয়ে আসে। সেসময় হঠাৎ করেই নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। পরে অবশ্য তাকে ‘আধুনিক কারাগারে ‘যেতে হয়। তার স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি চলে যায় নির্বাচনে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি সরকার ও মন্ত্রিসভায়- দু’জায়গাতেই ঠাঁই পায়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্ব পান। মন্ত্রিসভায় জাপার থাকা না থাকা নিয়ে প্রতিদিনই শোনা যায় নতুন নতুন কথা। যদিও এরশাদের ছোটভাই সাবেক মন্ত্রী জিএম কাদেরই হয়তো সত্যি কথাটি বলেছেন- জাপার মন্ত্রীদের নিয়ন্ত্রণ এরশাদ বা রওশনের হাতে নেই।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ ধরে রেখেই এরশাদ মাঝে মাঝে সরকারের সমালোচনা করেন। যদিও আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউই তার সমালোচনা থেকে বাদ যায় না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এরশাদ চিহ্নিত হয়েছেন অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে। তার নয় বছরের শাসনামলে গণতন্ত্র মুক্তির জন্য আন্দোলন হয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃতেই। যে আন্দোলনে নূর হোসেন, ডা. মিলনসহ অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। সেই এরশাদ রোববার যশোরে জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলনে বলেছেন, গণতন্ত্র অনেক আগেই ১০০ হাত মাটির নিচে চলে গেছে। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় এলে আবার গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। এরশাদ মাটির নিচে যেমন গণতন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন তেমনি শেয়ালের গর্তে খুঁজে পেয়েছেন বিএনপিকে। বলেছেন, বিএনপি এখন শেয়ালের গর্তে। মাঝে-মধ্যে মাথা উঁচু করে বিবৃতি দিয়ে আবার ভয়ে লুকায়। আর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আপনারা জানেন। আমরাই একমাত্র দল। যারা মানুষের পাশে থেকে সব ভাল কাজ করছি। আমাকে মানুষ ভুলতে পারবে না। এখন আবার আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। সর্বশেষ গতকালও গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলেছেন এরশাদ। এদিন তিনি বলেছেন, সংবিধানের পাতায় গণতন্ত্র থাকলেও দেশে নেই। দখলবাজ ও টেন্ডারবাজদের দখলে চলে গেছে দেশ। সুশাসন নেই, সবার কাছে আছে বন্দুক-পিস্তল।
যার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নয় বছর আন্দোলন করেছে বাংলাদেশের জনগণ সেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গণতন্ত্র অনুসন্ধান অনেক পর্যবেক্ষকের মধ্যেই বিস্ময় তৈরি করেছে। তিনি আসলে কোন গণতন্ত্র খঁজছেন তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। এটা সত্য যে- এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেলেও গণতন্ত্রের বেশির ভাগ মৌল উপাদানই পাননি। ভোটাধিকার গণতন্ত্রের প্রধানতম উপাদান তবে একমাত্র উপাদান নয়। কেউ কেউ যখন গণতন্ত্র বনাম উন্নয়ন তত্ত্ব হাজির করছেন তখন এরশাদের গণতন্ত্র খোঁজা কৌতূহল উদ্দীপকতো বটেই। তবে তার এই অনুসন্ধান গণতন্ত্র মুক্তি আন্দোলনের শহীদদের আত্মাকে কতটা শান্তি দিতে পারবে সে প্রশ্ন রয়েই যাবে। আদৌ বাংলাদেশের গণতন্ত্র দেখে সেসব আত্মা শান্তি পেয়েছে কি-না সে প্রশ্নের সমাধানও অবশ্য এখনও হয়নি।
এরশাদ যখন গণতন্ত্র খুঁজছেন তখন প্রবীণ রাজনীতিবিদ হায়দার আকবার খান রনো একটি সহযোগী দৈনিকে ‘গণতন্ত্রই রক্ষাকবচ’ শীর্ষক এক লেখায় অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের একটি বক্তব্যের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার লেখা নতুন বই  ‘ফ্রম টু ইকোনমি টু টু নেশন: মাই জার্নি টু বাংলাদেশ’ গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন: ‘ওই সব দিনে ফিরে গেলে (অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে), এটা ভাবি, কিভাবে এসব কথা সেদিন বলতাম। এসব কথা বলার সময় ডান-বাম চিন্তা করতাম না।...কিন্তু এখন কোন  লেখা লিখতে গেলে এটি প্রকাশের আগে এক সপ্তাহ লেগে যায় এবং পাঁচবার পড়ে মত দেন রওনক (তাঁর স্ত্রী)। স্বাধীন বাংলাদেশে অন্য সবার মতো আমাকে আজকাল প্রতিটি শব্দ নিয়ে ভাবতে হয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসনের আমলে আমরা টেবিলে বসেই দুই ঘণ্টায় যে কোন কিছু লিখতে পারতাম।’
কয়দিন আগে অন্য একটি সভায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের এখন বাক স্বাধীনতা নেই। যদিও ঠাট্টাছলে এক বিশ্লেষক বলেন, বাক স্বাধীনতা না থাকলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এ কথা বলছেন কিভাবে?

ফুরিয়ে যাচ্ছে সাপের বিষ নিরাময়ের ওষুধ

সাপের বিষের অন্যতম কার্যকর প্রতিষেধক শেষ হয়ে আসছে। এর ফলে হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। ডক্টর উইদাউট বর্ডারসের প থেকে বলা হয়েছে, সাব-সাহারান আফ্রিকার ১০ ধরনের বিষাক্ত সাপের বিষ নিরাময়ে ওষুধ বা প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ফাভ-আফ্রিকির নতুন মজুদ গড়ে তোলা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
ফাভ-আফ্রিকির সর্বশেষ মজুদ ২০১৬ সালের জুন নাগাদ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিষেধকটির কার্যকর কোনো বিকল্পের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। বিশ্ব সংস্থা জানিয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০ লাখ লোককে সাপে কাটে। এর মধ্যে এক লাখ লোকের মৃত্যু ও চার লাখ লোক স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সাব-সাহারান অঞ্চলে সাপে কাটার শিকার হয়ে প্রতি বছর অন্তত ৩০ হাজার লোক প্রতিষেধকটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সানোফি পাস্তুর জানিয়েছে, বাজারে প্রতিষেধকটি এখন আর সহজলভ্য নয়। এর বিকল্প কয়েকটি প্রতিষেধক থাকলেও সেগুলো তেমন কার্যকর নয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিভিন্ন জাতের সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবে ফাভ-আফ্রিকি নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত। সানোফি আরো জানিয়েছে, নতুন প্রতিষেধক তৈরিতে তারা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে এর উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবে। তবে ২০১৬ সাল শেষের আগে এ আলোচনা সমাপ্ত হবে না বলে ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় সাপে কাটার বিষয়টিকে অবহেলার চোখে দেখা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে আরো মনোযোগ ও বিনিয়োগ দরকার।

শিক্ষার্থীদের ওপর তিতুমীর ছাত্রলীগের হামলা : আহত ২৯

বনানীতে গতকাল আন্দোলনরত
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় আহত কয়েক ছাত্র
(নিচে)। ওপরে সশস্ত্র হামলাকারীরা : নয়া দিগন্ত
ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর বনানীতে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন ছাত্রলীগ এই হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ২৯ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও প্রত্যদর্শীরা জানান, কাকলী মোড়ে দুপুরে তিতুমীর কলেজের দু’টি বাস আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবরোধ উপো করে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। তাতে বাধা দেয় আন্দোলনকারীরা। এ নিয়ে বাসে থাকা শিক্ষার্থী ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাই বাস দু’টি যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। পরে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। এ সময় দুই পরে মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিেেপর ঘটনা ঘটে। কিছু সময় পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী কিসমত হায়দার বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করে। তাদের বাস যেতে দেয়ার পর পরই আরেকটি প হামলা চালিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। অতর্কিত হামলায় ২৯ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান। একজনের মাথা ফেটে যাওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। অন্যদের আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে চারজন ছাত্রীও রয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরে ছুরিকাঘাত রয়েছে বলে জানা যায়। আন্দোলনকারীদের কয়েকজন বলেছেন, তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।

কর্মীদের রক্ত শুষে বাড়ছে অ্যামাজন!

অ্যামাজন, ভারতের তথা বিশ্বের বহু চাকরি প্রার্থীর কাছে সোনার চামচের সমান। নিজের ব্যবসায় আকাশ ছোঁয়া সাফল্য ছুঁয়েছে বিশ্বের অন্যতম এই রিটেল সংস্থাটি। প্রতিযোগিতায় ভারতের বাজারে ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিলের মতো সংস্থাকে কোণঠাসা করতে বারবার একের পর এক অফার দেওয়ার পথে হাঁটছে তারা। আকাশ ছোঁয়া এই সাফল্যের পিছনেই রয়েছে বড় অন্ধকার। এই বহুজাতিক রিটেলার সংস্থায় কাজ ছাড়ছেন বহু কর্মীরা। ফলে গত সোমবার সকালেই বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে অ্যামাজন।
কী এমন ঘটল ওই সংস্থায়? চাকরি ছেড়ে দেয়া এমন বহু কর্মীই জানিয়েছেন, নরকে পরিণত হয়েছে অ্যামাজন। চাকরি নয় সেখানে আসলে চলে হত্যাযজ্ঞ। কোম্পানির মিটিংয়ে একজনের কথা অন্যকেউ শোনে না। প্রকাশ্যে একের বক্তব্য অন্যজনকে খণ্ডন করতে ইন্ধন দেওয়া হয়। সঙ্গে মাঝরাতে আসে কোম্পানির মেসেজ ও ইমেল। তার উত্তর না পেলে পরের দিন কোম্পানিতে সেই কর্মীকে ডেকে রীতিমতো অপমান করা হয়। চাকরি থেকে বরখাস্ত করারও হুমকি দেয়া হয়। সব শেষে উঠেছে কোম্পানির মধ্যে সাদা চামরা, কালো চামরা সংক্রান্ত ফারাক। সোমবারের চাকরি প্রার্থীরা কোম্পানিতে নিয়োগ হওয়ার পরে কয়েক দিন থাকবেন সে সম্পর্কেও সন্দিহান অনেকে।
অ্যামাজন কোম্পানির প্রধান এইচআর অফিসার সুসান হারকার জানিয়েছেন, "আমাদের কোম্পানি শ্রেষ্ঠ। এখানে প্রফেশনাল পরিবেশের সঙ্গে অনেকেই মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে ছেড়ে যায়। সেই কারণেই নতুনদের নিয়োগ করার জন্য ডাকা হয়েছে।" সুসানের মতে এখানে কিছুই খারাপ নেই।

ফরিদপুরে মহাসড়কের ভোগান্তি এবারের ঈদুল আজহায়ও by হারুন আনসারী

ফরিদপুর-খুলনা মহাসড়কের বেহাল দশা। ছবিটি
সদর উপজেলার কানাইপুর থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত
ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুর অংশে দীর্ঘ দিন সংস্কার না করায় দু’টি মহাসড়কেরই পরিস্থিতি নাজুক আকার ধারণ করেছে। সড়কগুলোর বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে ছোট, বড় ও মাঝারি আকারের গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের বেশির ভাগ স্থানে ওপরের বিটুমিন প্রলেপ উঠে গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বাখুণ্ডা, জোড়া সেতু, মহিলা রোড, তালমার মোড়, শংকরপাশা, কাজী কুড়িয়াল, ভুবুক দিয়া, সদরদী, নওপাড়া ও টেকেরহাট গোলচক্কর এলাকায় খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে খুলনার দিকে গঙ্গাবর্দী, কানাইপুর বাজার, পরীতিপুর, মধুখালী রেলগেট ও বাজারসংলগ্ন এলাকা, বাগাট বাজার এলাকার পরিস্থিতি নাজুক। এই মহাসড়কের ঢাকার দিকে বাহিরদিয়া, ধুলদী রেলগেট এলাকা ও বসন্তপুরের অবস্থাও নাজুক।
ফরিদপুর সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মাগুরার ওয়াপদা থেকে রাজবাড়ীর বসন্তপুর পর্যন্ত ফরিদপুর সড়ক বিভাগের মধ্যে পড়েছে ৪৯ কিলোমিটার অংশ। অন্য দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে শহরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকা পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার পড়েছে এ সড়ক বিভাগের অধীনে।
ওই সব জায়গায়, পুরো সড়কজুড়ে মহাসড়কের মধ্যে হাজার হাজার ছোটবড় ও মাঝারি আকারের গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে এ দু’টি পথে চলাচল করা দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। এর ফলে বাসের চাকা ফেটে গিয়ে বাস উল্টে পড়ে মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা- বরিশাল মহাসড়কের প্রায় সর্বত্র ছোটবড় খানখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই কাদামাটিতে আটকে যায় গাড়ি। সৃষ্টি হয় যানজটের। প্রতিদিনই গাড়ির ইঞ্জিন ফেসে যাচ্ছে। জনগণের দুর্ভোগের শেষ নেই। সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের মধ্যে প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে। রাস্তা খারাপ থাকায় গাড়িতে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। ফরিদপুর-বরিশাল পথে চলাচলকারী বিকাশ পরিবহনের চালক ফরিদপুর শহরের গৌরাঙ্গ সিকদার বলেন, মহা সড়কটির পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। গাড়ি চালানোর সময় শরীরের কিছু থাকে না। আবার যাত্রীদের গালাগাল, সব মিলিয়ে মহা বিপদে আছি।
ঢাকা-মাদারীপুর পথে চলাচলকারী সার্বিব পরিবহনের চালক মাদারীপুরের আবুল হোসেন জানান, সাধুর সেতুর কাজের ধীরগতির কারণে আমাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে বিকল্প সড়কটি সংস্কার না করায় প্রায়ই গাড়ি দেবে যায়। তিনি বলেন, এ রাস্তার কারণে প্রায় প্রতিদিনই গাড়ির পাতি ও বেয়ারিং ভেঙে যাচ্ছে, খসে পড়ছে সাইড গ্লাস। দেরী হওয়ায় ডাউন ট্রিপ ধরতে পারছি না।
যশোর থেকে ঢাকাগামী কাভার্ডভ্যান চালক যশোরের চুড়িপট্টি এলাকার বাসিন্দা মো: শাহাবুদ্দিন বলেন, যশোর থেকে মাগুরা পর্যন্ত সড়কটি তত খারাপ নয়। কিন্তু কামারখালী সেতু পার হলেই আর জান থাকে না। রাস্তা বুড়া মাইনসের দাঁতের মতো হয়ে গেছে। খালি নড়বড় করে। সড়ক বিভাগ ঠিক মতো সংস্কার কাজ করে না। পিচ কম দেয়। ফলে দু’দিনের মধ্যেই রাস্তা নষ্ট হয়ে যায়।
ওই পথে চলাচলকারী ট্রাক চালক ইকবাল হোসেন বলেন, আগে খুলনা থেকে ঢাকা যেতে ১২ ঘণ্টা লাগত। এখন দেড় দিনেও পৌঁছাতে পারি না রাস্তা খারাপের কারণে।
ফরিদপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি গত বৃহস্পতিবার কাজে যোগ দেয়ার পর দু’দিন সরেজমিন মহাসড়ক দু’টি পরিদর্শন করেছি। তিনি বলেন, এরই মধ্যে আমরা খানাখন্দ ভরাট করাসহ সড়ক দু’টি চলাচলের উপযোগী করে তোলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ঈদুল আজহার আগেই এ কাজ শেষ করা হবে। মাদারীপুর সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভুরঘাটা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার।
মাদারীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, সড়কটির বেশির ভাগ জায়গা ভালো তবে দু’টি জায়গার কিছু রাস্তার অবস্থা খারাপ। আমরা সড়কটি চলাচলের উপযুক্ত করতে গত দুই মাস ধরে কাজ করছি। বৃষ্টির জন্য সমস্যা হলেও আমরা আশাবাদী ঈদের আগে কাজ শেষ করা যাবে। তিনি বলেন, সাধুর সেতু নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে না। শিডিউল অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি শেষ হওয়ার কথা।

ভারত বুলেটের জবাব দেবে বুলেট দিয়েই

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি গুলি চলতেই থাকে তাহলে তার দেশ জবাব দিতে মোটেই দ্বিধা করবে না। সরাসরি কোনো দেশের নাম না নিলেও পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনাথ সিং বলেছেন, “ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং কাউকে বিরক্ত না করার নীতি মেনে চলবে। তবে কেউ যদি প্রথমে আমাদের দিকে গুলি চালায় তাহলে বিনা হিসাবে পাল্টা গুলি চালাব।”
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নয়াদিল্লি কাশ্মির নিয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে তবে সে আলোচনা শুধু আযাদ কাশ্মির নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে।
রাজনাথ সিং বলেন, “পাকিস্তানের রেঞ্জার্সের সঙ্গে বৈঠকে আমি পরিষ্কার করে বলেছি যে, কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে। এরপরও যদি পাকিস্তান কাশ্মির নিয়ে কথা বলতে চায় তাহলে তা হবে শুধুমাত্র পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মির নিয়ে।”
সূত্র : রেডিও তেহরান

ভেজাল ‘রিন পাউডার’ ও ‘সার্ফ এক্সেল’ আটক করে ধ্বংস

ভেজাল ‘রিন ওয়াশিং পাউডার’ এবং ‘সার্ফ এক্সেল’
পাউডার আটক করে ধ্বংস করে ফেলছে ভ্রাম্যমাণ
আদালত। শাপলা কসমেটিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান
এসব ভেজাল পণ্য আটক করে। ছবি: সংগৃহীত।
শাপলা কসমেটিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ইউনিলিভার লিমিটেডের পণ্য ‘রিন ওয়াশিং পাউডার’ এবং ‘সার্ফ এক্সেল’এর নাম ব্যবহার করে ভেজাল পণ্য প্রস্তুত করে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিএসটিআই যৌথভাবে পরিচালিত একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত বাদালদী ও তুরাগ এলাকায় শাপলা কসমেটিকের কারখানায় এ অভিযান চালায়। অভিযান চালিয়ে ‘রিন ওয়াশিং পাউডার’ এবং ‘সার্ফ এক্সেল-এর নাম ব্যবহার করে উৎপাদিত প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের বিএসটিআইয়ের অনুমোদনহীন এসব ভেজাল পাউডার আটক করে ধ্বংস করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ইউনিলিভারের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। অবৈধ ও নকল পণ্য প্রস্তুত ও বিপণনের অভিযোগে ‘শাপলা কসমেটিকের’ মালিককে বিএসটিআই অ্যাক্ট-১৯৮৫ এবং ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী দুই লাখ বিশ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদ এলাহী। বিএসটিআইয়ের এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদ এলাহী।
ইউনিলিভারের পণ্য ‘রিন ওয়াশিং পাউডার’ এবং ‘সার্ফ এক্সেল’-এর নাম ব্যবহার করে আটক ভেজাল পণ্য। ছবি: সংগৃহীত।

শিক্ষায় ভ্যাট: কে দেবে, কেন দেবে? by সোহরাব হাসান

রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রম বৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়: (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫তম অনুচ্ছেদ
একটি গণতান্ত্রিক দেশে শিক্ষা নাগরিকের সুযোগ নয়, অধিকার। যেমন তার অধিকার আছে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার। কিন্তু আমাদের পূর্বাপর সরকারগুলো সেই অধিকার রক্ষায় কখনোই আন্তরিক ছিল বলে মনে হয় না। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের যতই গণবান্ধব ও শিক্ষাবান্ধব বলে দাবি করুন না কেন, তাদের কথা, কাজ ও আচরণে তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরে।
গত সপ্তাহে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নির্ধারিত ব্যাংকে তাঁর সন্তানের টিউশন ফি দিতে গিয়ে দেখেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া পে স্লিপে যে অঙ্ক লেখা আছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত পে স্লিপে ভ্যাট নামে একটি সিল মারা আছে। কিন্তু তিনি পে স্লিপে নির্ধারিত টাকাই নিয়ে এসেছেন। ফলে ভদ্রলোক সেদিন টিউশন ফি না দিয়েই চলে যান। বাকি টাকা জোগাড় করে আসবেন। ধরুন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিস্টারের টিউশন ফি ৫০ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে তাঁকে আরও ৩ হাজার ৭৫০ টাকা বেশি দিতে হবে।
সেটি কজন অভিভাবকের পক্ষে সম্ভব হবে? আমাদের মন্ত্রী বাহাদুরদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু বড়লোকের সন্তানেরাই পড়েন। আসলে তাঁদের সেই ধারণা ভুল।
বুধ ও বৃহস্পতিবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী রাজপথে বিক্ষোভ করছিলেন, তাঁেদর অধিকাংশই বিত্তবান ঘরের সন্তান নন। এঁদের পোশাক-আশাক সাধারণ। চেহারা পোড়খাওয়া। এক ছাত্রী ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আন্দোলন করে যদি আমরা মরেও যাই, দুঃখ থাকবে না। আমাদের সতীর্থরা ভ্যাট ছাড়াই পড়ার সুযোগ পাবে।’ আরেক ছাত্রের হাতে ধরা পোস্টারে লেখা ছিল: ‘কিল মি, নো ভ্যাট।’ এসব রাজনৈতিক মঞ্চে শেখানো কথা নয়। অন্তর থেকে আসা। আরেকটি বিষয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন করলেও বাড়াবাড়ি করেননি। গাড়িতে আগুন দেননি বা ভাঙচুর করেননি। বুধবার পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে বাড়াবাড়ি না করলে আন্দোলনটি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণই থাকত বলে ধারণা করি।
কিন্তু এই বেসরকারি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে ঢাকা শহর অনেকটা নিশ্চল হয়ে পড়ল, মানুষ সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ল—তার দায় কে নেবে? আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, না সরকার? সরকারের একটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণেই এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। অতএব, এর দায়ও তাদের নিতে হবে।
অতি সম্প্রতি শিক্ষাঙ্গনে যেসব অঘটন ঘটেছে, তার মূলেও কাজ করছে সরকারের ভুল নীতি ও সিদ্ধান্ত। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মাঠে নামলেন বেতনবৈষম্য নিরসন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে। সেই আন্দোলন এখনো চলছে। এরপর গত বুধ ও বৃহস্পতিবারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেন তাঁদের ওপর আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) প্রত্যাহারের দাবিতে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে কেউ আলোচনার প্রয়োজন বোধ করলেন না। মন্ত্রী মহোদয় সাফ জানিয়ে দিলেন যে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে না। তবে সেই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে।
সরকারের এই বক্তব্যই বা কতটা যুক্তিসংগত? বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভ্যাট আরোপ কি অপরিহার্য ছিল? এই খাত থেকে সরকার যে পরিমাণ অর্থ পাবে বলে আশা করছে, সেটি কি অন্য কোনো খাত থেকে আদায় করা যেত না? কিংবা ২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বাজেটে অনুৎপাদনশীল খাতের বরাদ্দ কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ভর্তুকি কমিয়ে হলেও সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে পারত। ইতিমধ্যে ভ্যাটের বিরুদ্ধে একাধিক রিট হয়েছে এবং উচ্চ আদালত রুলও জারি করেছেন।
এনবিআর বলেছে, ভ্যাটের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়বে না, কারণ এটি শোধ করবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের এই যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন প্রথমে বলেছিলেন, এনবিআর যেভাবেই ব্যাখ্যা দিক, এই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের ওপরই বর্তাবে। এনবিআরের যুক্তি হলো, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবার বিনিময়ে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে; শিক্ষার্থীদের ওপর নয়। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শেখ কবির হোসেন আগের অবস্থান থেকে সরে এনবিআরের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। এর পেছনের রহস্যটা কী?
এখানে শুভংকরের ফাঁকিটা হলো, সেবার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বর্তমানে যে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, ভ্যাট আরোপের পর সেই অর্থ বাদ দিয়ে তারা সেবা দেবে। অর্থাৎ এখন যদি শিক্ষার্থীদের পেছনে তারা ১০০ টাকা ব্যয় করে থাকে, তখন সাড়ে ৭ টাকা কম ব্যয় করবে। আর শিক্ষার্থীরা আগের মতো সেবা পেতে চাইলে তাঁদের সেই সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ বেশি দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট নামে না হলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই অতিরিক্ত টিউশন ফি নেবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি যে এর বেশি নেওয়া যাবে না। শেষ বিচারে ক্ষতি হবে শিক্ষার্থীদেরই।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামের কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, শিক্ষায় ভ্যাট একটি অযৌক্তিক ও অমানবিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষা হচ্ছে সামাজিক সেবা। একে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। তবে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টিউশন ফি না নিতে পারে, সে জন্য একটি সিলিং বেঁধে দেওয়ার পক্ষপাতী। তিনিও মনে করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা পড়াশোনা করছেন, তাঁরা সবাই বড়লোকের সন্তান নন। অনেক সাধারণ মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হন। অনেকে টিউশনি কিংবা খণ্ডকালীন চাকরি করেও পড়াশোনা করছেন। অনেক অভিভাবক জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ধারকর্জ করে সন্তানকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান এই আশায় যে পাস করার পর একটি চাকরি পাবেন।
সরকার অবশ্য বলতে পারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনেক কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স আছে, তাঁরা সেখানে গিয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু সেসব কলেজে যেসব বিষয় পড়ানো হয়, চাকরির বাজারে তার কোনো চাহিদা নেই। তাহলে কেন পড়বেন? এ ছাড়া এসব কলেজের চার বছরে অনার্স শেষ করতে সাত বছর ও এক বছরের মাস্টার্স শেষ করতে দুই বছর লেগে যায়।
ভ্যাট আরোপ করা হয় সাধারণত পণ্যের ওপর। ভোক্তা কোনো পণ্য ভোগ বা গ্রহণ করলে নির্দিষ্ট হারে তাঁকে ভ্যাট দিতে হয়। কিন্তু শিক্ষা তো পণ্য নয়; ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। সামাজিক সেবা। দ্বিতীয় কথা হলো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে পড়াশোনা করেন, তাঁদের ওপর ভ্যাট না ধরে, যাঁরা বেশি অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা নিচ্ছেন, তাঁদের ওপর ভ্যাট চাপিয়ে দেওয়ার যুক্তি কী?
২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই ভ্যাট আরোপ করা হলেও এটি স্পষ্ট ছিল না যে কে ভ্যাট পরিশোধ করবেন। অর্থমন্ত্রী বাজেট পাসের সময় বলেছিলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। এ ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবাদ করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাদের সঙ্গে আলোচনা করারও প্রয়োজন বোধ করেনি। সব ক্ষেত্রেই সরকার মনে করে, যা করেছি, ঠিক করেছি, যারা সমালোচনা করছে, তারা হয় বিএনপি–জামায়াতের দোসর অথবা ষড়যন্ত্রকারী।
সরকার ভালো করেই জানে যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের উৎস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। তাই তাদের বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করতে হেল শিক্ষার্থীদের ওপরই চাপ বাড়বে। আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুনাফা করতে পারবে না। বর্ধিত আয় শিক্ষার উন্নয়নেই ব্যয় করতে হবে। কিন্তু ভ্যাট দিতে হলে তাদের সেই শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমও কমে যাবে।
বরং সরকার এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ না করে, উচ্চশিক্ষার নামে যারা প্রতারণা ও সনদ ব্যবসা করছে, যদি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিত, তাহলে লাখ লাখ শিক্ষার্থী উপকৃত হতো। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায়ও শৃঙ্খলা ফিরে আসত। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। কিন্তু দুধ দেওয়া গরুকে না খাইয়ে মারার নীতি কোনো দেশের জন্যই ভালো হতে পারে না।
গত বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিটি কেন শান্তিপূর্ণ থাকতে পারল না? রাতের অন্ধকারে রাজপথে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের ওপর একদল দুর্বৃত্ত লাঠিসেঁাটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এরা কারা? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না? এভাবে আর যাই হোক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
সবশেষে আমাদের প্রত্যাশা, সরকার পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করে নেবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com