Thursday, April 14, 2011

তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ



এ মাসেই আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি। এই ৪০ বছর দেশটাকে আমরা কতটা এগিয়ে নিলাম, কতটা নিতে পারতাম তার হিসাব-নিকাশ, বিচার-বিশ্লেষণ করে শ্রেয়তর পথে, অগ্রগতির পথে ধাবিত হতে হবে। এই কলামে আমরা বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের দূরদর্শিতার সুবাদে পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটারটি ঢাকায় স্থাপিত হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তখনো শুরু হয়নি। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার স্নাতকেরা নিজেদের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে কম্পিউটারকে তাঁদের বোঝা হিসেবে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তখন আইবিএম নানা বিষয়ের ছাত্রদের বুদ্ধঙ্কের পরীক্ষার মাধ্যমে স্নাতকদের বাছাই করত। তখনো মাইক্রোপ্রসেসর, মাইক্রো কম্পিউটারের যুগ আসেনি। চতুর্থ প্রজন্মের ভাষা নয়, অ্যাসেম্বলি কিংবা মেশিনের ভাষায় প্রোগ্রাম লেখার মতো দুরূহ চ্যালেঞ্জ তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন। এরপর পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হলো—কম্পিউটার এখন শুধু বিজ্ঞানীরা নয়, সাধারণ মানুষও ব্যবহার করা শুরু করল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্নাতকোত্তর পড়ালেখা শুরু হলো। নানা বিষয়ের স্নাতক যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহারে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সখ্য অর্জন করেছেন, তাঁদের জ্ঞান-দক্ষতাকে কম্পিউটারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্পর্শে সমৃদ্ধ করার সুযোগ। এই সুযোগ যে পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করা হয়েছে, তা বলার সুযোগ নেই। অনেকেই তাঁদের আহূত জ্ঞান ও দক্ষতাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার কষ্টিপাথরে যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেননি এবং তাতে পেশাজীবন ক্ষতিগ্রস্তও হয়নি।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সে ছাত্র ভর্তি করা হলো, তখন সারা দেশের শ্রেষ্ঠ ছাত্ররা ভর্তি হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে, যেখানে শিক্ষকস্বল্পতা ছিল উল্লেখ করার মতো। তারপর ১০-১২ বছর বাংলাদেশের মেধাবীতম ছাত্রছাত্রীরা এই বিভাগে পড়ালেখা পছন্দ করে এসেছেন। সীমিত ভৌত অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তাঁরা যে প্রশংসনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, তার প্রমাণ পেশাজীবনে তাঁদের সাফল্য ও স্বীকৃতি। আমাদের এ বিভাগটি ইতিমধ্যে সিকি শতাব্দী পার করেছে, আমাদের স্নাতকেরা এখন রীতিমতো অভিজ্ঞ, দক্ষ, বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যেও কিন্তু অন্যান্য বিষয় থেকে আসা স্নাতকদের সংখ্যা কমেনি। তাঁরাও গণিত, পরিসংখ্যান, পদার্থবিদ্যা, ফলিত পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে এসে পেশাজীবী হচ্ছেন, চাকরিতে উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন। দেশে আমরা অনেকটা ধরেই নিয়েছি, কম্পিউটারে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই।
একসময় আমাদের দেশে ওঝা, বৈদ্যরা গ্রামে অপচিকিৎসা চালাত, মানুষ অসহায়ের মতো যেকোনো পরিণতিই মেনে নিত। এখনো তাদের উপস্থিতি আছে কিন্তু সংখ্যায় নগণ্য। এখন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে জটিল রোগের চিকিৎসায় এমবিবিএস ডাক্তারে হবে না, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লাগবে। বড় বড় সেতু কিংবা গগনচুম্বী ইমারত তৈরিতে যে পুরকৌশলীদের প্রয়োজন হয়, তাও আমরা জানি, সার কারখানা কিংবা সিমেন্টের কারখানায় চাই কেমিকৌশলীদের, ওকালতি করতে চাই আইনের ডিগ্রি, তবে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হতে হলে কম্পিউটার বিজ্ঞান জানতেই হবে কিংবা ডিগ্রিধারী হতে হবে—এটা আমরা মেনে নিতে নারাজ। আবার এর সমর্থনে রয়েছে উজ্জ্বল উদাহরণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই রবিঠাকুর সাহিত্যে গোটা এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী, কবি নজরুলের সাহিত্যপ্রতিভাতেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আশীর্বাদ নেই, তবে স্বীকৃতি বিস্তর। সুতরাং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুর্বোধ্য ব্যাকরণে পিষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই, স্বশিক্ষিত হয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে চড়ে বেড়াতে পারলে ক্ষতি কী? তবে এ কথাও ঠিক, যখন-তখন যে কেউ রবিঠাকুর ও কবি নজরুল হতে পারে না। উপরন্তু তাঁদের সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতি কিন্তু পদার্থবিদ কিংবা প্রাণিবিদ্যা বিশারদ থেকে আসেনি। বাংলার অধ্যাপকেরাই তাঁদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তাঁদের সাহিত্যপ্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন। যুগে যুগে অনেক মনীষীই এক বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করে নানা বিষয়ে অবদান রেখেছেন। হার্ভার্ড সায়মন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ ও পিএইচডি ডিগ্রি করলেও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কম্পিউটার বিজ্ঞানের টুরিং পুরস্কার পেয়েছেন, মনোবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছেন, ন্যাশনাল মেডাল অব সায়েন্স পেয়েছেন। নানা বিষয়ে অত্যন্ত উঁচুমানের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছেন হাজারেরও বেশি, যার ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও কম্পিউটার বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে যাঁরা নানা ক্ষেত্র থেকে তথ্যপ্রযুক্তির পেশাজীবী হয়েছেন, তাঁরা কিন্তু কখনো তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেননি। তাঁদের গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও ছিল না, কারণ পদোন্নতি কিংবা লোভনীয় বেতনের তথ্যপ্রযুক্তির চাকরিদাতারা কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করেননি; যদিও ডিগ্রিবিহীন চিকিৎসকের চিকিৎসাসেবা তাঁরা নেবেন না, পুরকৌশলী না হলে বহুতল ভবন কিংবা বড় সেতু নির্মাণও করতে দেবেন না কিংবা গ্যাস কারখানা নির্মাণে কেমিকৌশলী ছাড়া নেবেন না।
তাও যদি তথাকথিত অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই আমাদের জাতীয় জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য মিলত, সে ক্ষেত্রেও বলা যদি অন্তত কাজটি হচ্ছে তো। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে শত উদ্যোগ নেওয়ার পরে সাফল্যের মাপকাঠি দেখাতে হয় এই খাতে কত টাকা খরচ করা গেল, তা-ই দিয়ে। ভারতের বছরের ৭০ বিলিয়ন ডলার আয়ের বিপরীতে আমাদের ৩৩ মিলিয়ন শুধু এটাই বলে, আমরা এই খাতকে যথাযথভাবে এগিয়ে নিতে পারছি না। আর এই না পারার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ খাতটির নেতৃত্বে তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের অভাব। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক সংস্থাগুলোর অবদান অসামান্য। তাঁরা মোটা অঙ্কের বেতন দেন আর বিশেষজ্ঞ কিংবা উপদেষ্টা হিসেবে যাঁদের রাখেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের না আছে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা, না আছে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন সংস্থায় সাক্ষাৎকারে দেখি, বিকম পাস কিন্তু ডেটাবেইস অ্যাডমিনিস্ট্রের, সিস্টেম এনালিস্ট কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ হিসেবে উচ্চ বেতনে বিদেশি কোনো সংস্থায় চাকরি করেছেন। আবার বিশেষজ্ঞ যদি বিদেশি হন, তা হলে শুধু চামড়ার গুণে কোনো প্রশ্নও করা যাচ্ছে না। একবার এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের দামি চাকরিতে এ রকম একটি অখ্যাত কলেজের বিএ পাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাকে নাকি মহা উচ্চ বেতনে চাকরি দিয়ে ধন্য হয়েছিলাম আমরা, আর প্রকল্পটি যে সাফল্যের মুখ দেখেনি, তা বলাই বাহুল্য। আরেকবার আমাদের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবাসী বাঙালির আট হাজার ডলার মাসিক বেতনের চাকরিতে নিয়োগের জন্য আবেদনকারীর পড়ার যোগ্য একটি সনদও পাওয়া গেল না। বছর পঁচিশেক আগে বিদেশি উপদেষ্টা আর বিশেষজ্ঞদের মান নিয়ে গবেষণাকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই দুর্ভাগা দেশে বিদেশি বিশেষজ্ঞ, যাঁদের আমরা উচ্চ বেতনে রেখে ধন্য, তাঁরা কিন্তু স্বীয় দেশে দুর্ভাগা—শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে তাঁরা নিজেদের দেশে চাকরি পান না, যদিও আমাদের দেশে অকল্পনীয় বেতন সুবিধাদি ভোগ করেন।
আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শদাতাদের নিয়ে যথাশিগগির সম্ভব জরিপ চালানো উচিত, তাঁদের তথ্যপ্রযুক্তির গ্রহণযোগ্য মাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে কি না। আমার অনুমান অন্তত ৯০ শতাংশের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, যদিও আমাদের বিভাগের বয়স ২৫ পেরিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলে যে তথ্যপ্রযুক্তির সংশ্লিষ্ট কর্মতৎপরতায় অপারগ হবে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। যথাযোগ্য অভিজ্ঞ পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের অভাব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কম্পিউটার শিক্ষা মোটামুটি ভালোই চলছে। শুধু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নয়, ঢাকা, শাহজালাল কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকেরা আমাদের ডিগ্রি পাওয়ার আগেই মাইক্রোসফট গ্রহণ কিংবা ফেসবুকের মতো সুবিখ্যাত কোম্পানিতে চাকরি পাচ্ছেন। আমাদের ছাত্রদের প্রোগ্রামিং দক্ষতাও ঈর্ষণীয় স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা পরপর চৌদ্দবার এসিএমএর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্টওয়েস্ট, এআইইউবি ও নর্থ সাউথের ছেলেরাও এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছেন। আমাদের সাফল্যও প্রশংসনীয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে দুই হাজার গুণ বেশি আয় করা ভারতের ছাত্রদের থেকে শ্রেয়তর সাফল্য আমরা নিয়মিতভাবে অর্জন করছি। ২০০৯ সালে আমরা আইসিপিসি চ্যালেঞ্জে রানারআপ হয়েছি, ২০০০ সালে বুয়েটের ছাত্ররা এমআইটি, হার্ভার্ড, স্টামফোর্ড বার্কলের দলগুলোকে পেছনে ফেলে একাদশ হয়েছেন। সারা পৃথিবীর লাখো ছাত্র থেকে বাছাই করে ২০০৬ সালে যে ১০০ জন ছাত্র টপকোডার প্রতিযোগিতায় নিউইয়র্কে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাতে আমাদের ইশতিয়াক আহমেদ ডলার ছিলেন। শুধু ছাত্রদের পর্যায়ে বলি কেন, আমাদের স্নাতক শাহরিয়ার মঞ্জুর অনেক বছর ধরে মর্যাদাকর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের একজন সম্মানিত বিচারক। প্রোগ্রামিং দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা আমেরিকা-কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোচিংয়ের দায়িত্বও পাচ্ছেন। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সারা দেশে আমরা এমন একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে আমাদের ছাত্ররা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করছে। সুতরাং এ রকম ভাবার কোনো অবকাশই নেই যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যতীত অন্য সব বিষয়ের জ্ঞান বিতরণেই আমরা ভালো করছি। আমাদের ছাত্ররা নিয়মিতভাবে ফুলব্রাইটের মতো মর্যাদাকর স্কলারশিপ পাচ্ছেন, পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছেন, শিক্ষকতা করছেন, নামকরা কোম্পানিগুলোতে চাকরি করছেন। স্বীকৃতিতে আমাদের শিক্ষক সম্প্রদায়ও পিছিয়ে নেই। আমাদের অধ্যাপক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক হাশেম, ড. আশিকুর রহমানের লেখা বই খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
সুতরাং বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা ঠিকমতো চলছে না, তা ভাবার কারণ নেই। বরং তথ্যপ্রযুক্তির অন্যান্য কিছুই ঠিকমতো চলছে না। আমাদের মেধাবী স্নাতকেরা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডক্টরেট করে দেশে ফিরে যখন দেখেন, ১০-১২ বছর কম্পিউটার বিজ্ঞান শিখে চর্চা করে তিনি বিশেষজ্ঞ হননি বরং যিনি এই বিজ্ঞান পড়েননি, এই বিজ্ঞানে যাঁর দক্ষতা, জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি (শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেই নয়, নিজের দক্ষতা, নতুন সৃষ্টি স্বীকৃত গবেষণা জার্নালে প্রকাশ করেও সেই স্বীকৃতি অর্জন করা যায়) তাঁরাই দেশের তথ্যপ্রযুক্তির বড় বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং তাঁর আহূত জ্ঞান অবহেলিত হচ্ছে, তখন তিনি আবার ঠিকই বিদেশ চলে যাচ্ছেন কোনো খারাপ চাকরি নিয়ে নয়, রীতিমতো লোভনীয় চাকরি নিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিশেষ করে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন গোটা জাতিকে দেখাচ্ছেন, এই দুরূহ ও বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষের প্রয়োজন। নৌকা গাঁথার মিস্ত্রি দিয়ে এই বিশাল জাহাজ তৈরির কাজ করা যাবে না। সীমিত সম্পদের এ দেশে তথ্যপ্রযুক্তির জুতসই ও উদ্ভাবনী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারি, অপচয় কমাতে পারি। এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিংবা স্বীকৃত দক্ষ মেধাবীদের দায়িত্ব দিতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কর্মকাণ্ডে ওঝা এবং হাতুড়ে ডাক্তারদের নেতৃত্বে যে সফল হবে না, তা আমাদের বিগত ২৫ বছরের নানা উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতার বর্ণহীন ফলাফলই বলে দেয়। আশা করি, ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবায়নের স্বার্থে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যথাযথ গুরুত্ব পাবে।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

দুদক আইন নিয়ে কিছু নাগরিক ভাবনা by মাহবুবুর রহমান

বাংলাদেশের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র আমাকে সাংঘাতিকভাবে উদ্বিগ্ন করে, উৎকণ্ঠিত রাখে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দুর্নীতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) বাংলাদেশকে মাত্র কয়েক বছর আগে পৌনঃপুনিকভাবে পাঁচবার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। হালেও সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি, বরং এর ভয়াবহতা শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত হয়েছে।
ভাবলে অবাক হই, এই জাতিই অস্ত্র হাতে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল, রক্ত ঝরিয়েছিল। কঠিন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এক সাগর রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। এত ত্যাগ, এত বিসর্জনের বাংলাদেশ মাত্র ৪০ বছরে এ কী দশা! কী শোনার ছিল, কী শুনছি? কী দেখার ছিল, কী দেখছি? মুক্তিযুদ্ধের মহান গৌরব ধুলায় লুণ্ঠিত।
কিন্তু এ বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতি সব পেশাজীবী-শ্রমজীবী মানুষ, আপামর জনগণ দুর্নীতির সঙ্গে কতটুকু জড়িত? তারা তো মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে। তাদের প্রশ্ন, হিমালয়প্রমাণ এত বড় দুর্নীতির, কলঙ্কের তারা কেন অংশীদার হবে? তারা কেন সহ্য করবে, এত বড় জাতীয় গ্লানি, এত বড় অপমান। তারা তো দুনম্বরি করে না। তারা অস্ত্র ব্যবসা করে না। নারী ও শিশু রপ্তানি করে না। মানি লন্ডারিং করে না। শেয়ারবাজারে ধস নামিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে না। লাইসেন্স জাল করে না। দেশের সম্পদ পাচার করে না। বহুজাতিক কোম্পানিদের সঙ্গে অসম চুক্তি করে মহামূল্যবান তেল, গ্যাস, কয়লা বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না।
দারিদ্র্যই এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় সমস্যা। এটি জাতীয় সংকট, মহামানবিক দুর্যোগ। তাই দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধায় অন্ন জোগাড়, রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থাই জাতির জন্য আজ সবচেয়ে বড় কাজ। বেকার কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। মানুষের মৌলিক পাঁচটি চাহিদার (অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থান) একটিরও ন্যূনতম সমাধান দিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে, স্বাবলম্বী ও উন্নয়নশীল হতে আমাদের চলার পথে বাধার বিন্ধ্যাচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুর্নীতি। এটি একটি মারাত্মক ব্যাধি, সমাজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জাতীয় জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে সংক্রামক রোগের মতো বিস্তারিত। দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশাসন। আর সুশাসন তখনই সম্ভব, যখন শাসনযন্ত্রে বিশ্বস্ততা ও সততা সম্বন্ধে জনগণ আস্থাবান হবে, শ্রদ্ধাশীল হবে। গণতন্ত্রের দুই প্রধান নিয়ামক শক্তি স্বচ্ছতা আর জবাবদিহি। দুর্নীতির অবাধ বিস্তার সমাজের স্বচ্ছতা আর জবাবদিহির দৈন্যই নগ্নভাবে প্রকাশ করে। প্রকাশ করে, আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর, আমাদের শাসনযন্ত্রের অসারতা ও দীনতা। ব্যক্তিগত সুবিধা লাভের জন্য সরকারি অবস্থানের অপব্যবহারই দুর্নীতি। দুর্নীতির মধ্যে স্বভাবতই জড়িত শাসনযন্ত্রের উঁচু মহলের নীতিনির্ধারকেরা। জড়িত জ্যেষ্ঠ আমলা, বড় বড় মুনাফাখোর, অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি, কর প্রতারক ও ব্যাংক ঋণ খেলাফিরা। সমাজের যে যত বিত্তবান, তার বিত্তের সঙ্গে সঙ্গে তত বেশি অপরাধ জড়িয়ে আছে। ধনাঢ্য ব্যক্তির কাপবোর্ডেই মানুষের কঙ্কাল লুকানো থাকে। দুর্নীতি অন্যায়-অপরাধ-অনৈতিকতারই অপর নাম। মাছের পচন যেমন শুরু হয় মাথা থেকে, দুর্নীতির বাসও তেমনি অতি উঁচু মহলে। পানি যেমন ওপর থেকে নিচে গড়ায়, দুর্নীতিও তেমনি সব সময় অধোগামী।
জাতীয় সংসদ একটি মহান প্রতিষ্ঠান। জাতির সবচেয়ে পবিত্র স্থান, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাদপীঠ। জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, জাতির সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। জাতির কল্যাণে নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই জাতীয় সংসদের দায়িত্ব। যাঁরা জনপ্রতিনিধি, তাঁদের স্কন্ধেই এই মহান দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনে আমরা কতটুকু আন্তরিক প্রয়াস নিয়েছি, সংসদকে কার্যকর করার জন্য কতটুকু একনিষ্ঠ থেকেছি? গণতন্ত্রকে সত্যিকার প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে, তার শেকড়কে গভীরে প্রোথিত করতে কতটুকু সফল হয়েছি? জাতীয় জীবনে ও প্রশাসনে কতটুকু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পেরেছি? আমরা কখনো আমলাদের দিকে, কখনো বা অসাধু ব্যবসায়ীদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছি। কিন্তু কখনো ভালো করে দেখিনি যে এক অঙ্গুলি দ্বারা অন্যকে যখন নির্দেশ করছি, তখন আমার হাতেরই অপর অঙ্গুলিগুলো আমার নিজের দিকেই নির্দেশ করছে। আমরা সংসদেরা নির্বাচন-পরবর্তীকালে প্রথম যে কাজটি করি তা হলো, এক মিথ্যা স্বাক্ষরিত পত্রে নির্বাচনী ব্যয়ের ঘোষণা দেওয়া। আমাদের যানবাহনের সুবিধার্থে সরকারপ্রদত্ত শুল্কমুক্ত মোটরগাড়ির পারমিট লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু টাকার বিনিময়ে সরকারের লক্ষ-কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে হস্তান্তর করি।
ওয়ান-ইলেভেনের পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন অধ্যাদেশ জারি করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সারা দেশে কঠোর অভিযান পরিচালনা করে। এই নিয়ে কিছু ভুলভ্রান্তি থাকলেও সাঁড়াশি অভিযানে জড়সড় হয়ে পড়েছিল মহাপরাক্রান্ত বড় দুর্নীতিবাজেরা। সারা দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের জারি করা অধ্যাদেশটি স্বীকৃতি না দিয়ে তা বাতিল করে দেয়। এর পর থেকে মন্থর হয়ে পড়ে, স্থিমিত হয়ে যায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এতে অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েন। ওই সময় কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সরকারের এহেন কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘দুদক এখন দন্তহীন এক ব্যাঘ্র। এর থাবার নখরগুলো ছেঁটে ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও দুর্বল ও ক্ষমতাহীন করার চেষ্টা হচ্ছে।’ টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও নতুন নতুন আইন পাস করে এর ক্ষমতা আরও খর্ব করা হচ্ছে।’ হালে আইন করা হচ্ছে, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। এ ছাড়া দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা নিজেদের পদমর্যাদার চেয়ে উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন না। নতুন আইনে আরও সংযোজিত থাকছে, মিথ্যা অভিযোগের জন্য অভিযোগকারীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান। পাশাপাশি কমিশনের যেকোনো কাজের জবাবদিহি থাকছে রাষ্ট্রপতির কাছে।
উল্লেখ্য, নির্বাচিত সরকারের দুই বছরেও দুর্নীতি মোটেই কমেনি। অভিযান জোরদার হওয়ার পরিবর্তে দুর্নীতির তদন্ত কার্যক্রম আশঙ্কাজনকভাবে ঝিমিয়ে পড়েছে। দুর্নীতি-অভিযোগসংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। দুর্নীতির দায়ে দায়ের করা মামলাগুলো সবই রাজনৈতিক মামলা বলে (শুধু সরকারি দলের) খারিজ করা হচ্ছে। মামলাগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিচারালয়ে নিষ্পত্তির প্রয়োজন ছিল। আইনি বিষয়কে আইনি-প্রক্রিয়ায় চলতে দেওয়া উচিত ছিল। বিচার বিভাগকে এভাবে রাজনৈতিকীকরণ, দলীয়করণ নিশ্চয়ই বিচারের নামে প্রহসন। এটা অনৈতিক, এটা অন্যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই বলেছিলেন, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। পরিতাপের বিষয়, সরকারের প্রাক-নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ ছিল, দেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতি উচ্ছেদ করা হবে। প্রস্তাবিত আইন তাঁর পরিপন্থী। দুর্নীতি রোধে আমাদের নির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে:
১. দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকারভাবে শক্তিশালী ও কার্যকর হতে হবে। গজদন্তের পরিবর্তে আমরা ব্যাঘ্র দন্ত চাই। চাই ব্যাঘ্রের শক্তিশালী থাবা। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আমরা দেখতে চাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে। দেখতে চাই, এটি হবে প্রশাসনিকভাবে সুসংগঠিত, পেশাগতভাবে সুদক্ষ, নেতৃত্বের মাপকাঠিতে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, সুদৃঢ় এবং সুকঠোর।
২. সব মন্ত্রী, সাংসদ, নির্বাচন প্রাক ও নির্বাচনোত্তর এবং প্রতিবছর তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পদের পূর্ণ বিবরণ দাখিল করবেন এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় উপস্থাপন করবেন। এ বিষয়টি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক মনিটরিংয়ের আওতায় থাকবে।
৩. প্রশাসনে জড়িত সব সিনিয়র আমলার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিতে হবে এবং তা প্রতিবছর বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করতে হবে। বিষয়টি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক মনিটরিংয়ের আওতায় থাকবে।
৪. ব্যাংক ঋণখেলাপি, কর প্রতারকদের শক্ত হাতে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তাদের নামের তালিকা নিয়মিত পৌনঃপুনিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। জনগণের কাছে তাদের নগ্নভাবে উন্মোচিত করতে হবে।
৫. এনজিও ও সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকেও সরকারের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন রাখতে হবে।
৭. তথ্যের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের কাছে তথ্যপ্রাপ্তি আবশ্যকীয়ভাবে জটিলতামুক্ত, অবাধ ও সহজলভ্য করতে হবে।
৮. সংবিধান বর্ণিত ন্যায়পালের শূন্যপদে একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয়, প্রশ্নাতীতভাবে সৎ, নির্ভীক ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে অতিসত্বর নিয়োগ দিতে হবে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.): সাবেক সেনাপ্রধান ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে থাইল্যান্ডের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আপিসিত ভেজ্জাজিওয়া গতকাল শুক্রবার বলেছেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে। ২০০৮ সালের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ভেজ্জাজিওয়ার জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই নির্বাচন হবে তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তার প্রথম পরীক্ষা।
সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে যেকোনো রোববার নির্বাচন হতে হবে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে জুনের ১৯, ২৬ অথবা জুলাইয়ের ৩ তারিখে ভোট গ্রহণ হবে।
অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাবিত তারিখ রাজার কাছে উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী ভেজ্জাজিওয়া।

এলটিটিইর প্রশিক্ষণ শিবির থাকার অভিযোগ অস্বীকার ভারতের

ভারতে তামিল গেরিলাদের প্রশিক্ষণ শিবির থাকার অভিযোগ গত বৃহস্পতিবার জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে নয়াদিল্লি। অনুমাননির্ভর ও অসমর্থিত সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ ধরনের অভিযোগ আনা থেকে বিরত থাকতে শ্রীলঙ্কার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ভারত।
শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ডি এম জয়ারত্নে গত বুধবার অভিযোগ করেন, দেশে ফিরে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তামিল গেরিলারা ভারতের তামিলনাড়ু প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সেখানে লিবারেশন টাইগার অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) অজ্ঞাতসংখ্যক গেরিলা অবস্থান করছে। কিন্তু ভারতের সরকারি মুখপাত্র বিষ্ণু প্রকাশ এ ধরনের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, ‘আমাদের দেশের মাটিতে এ ধরনের কোনো শিবির নেই।’

মুগাবের ঐকমত্যের সরকার ছাড়তে চান চেঙ্গারাই

জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের জাতীয় ঐকমত্যের সরকার থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মরগান চেঙ্গারাই। একজন মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার এবং নিজ দলের চেয়ারম্যানকে সুপ্রিম কোর্ট পার্লামেন্টের স্পিকার হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার পর গত বৃহস্পতিবার চেঙ্গারাই এ ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
বৃহস্পতিবার চেঙ্গারাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জ্বালানিমন্ত্রী এলটন ম্যাঙ্গোমাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে চেঙ্গারাই বলেন, ‘আমরা এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি, যেখানে আমাদের আর একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। আমাদের ঐকমত্য নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।’
চেঙ্গারাই বলেন, একজন দম্পতির জীবনে যখন নানা ধরনের মতৈক্য ও বিভেদ চরম পর্যায়ে পৌঁছে, তখন তারা বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হয়। একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে আমাদের জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের।

কংগ্রেস-তৃণমূলের যৌথ ঘোষণা হতে পারে আজ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন নিয়ে এখনো সমঝোতা হয়নি। এ ব্যাপারে দুই দলের নেতারা আলোচনা করছেন। তাঁদের সমঝোতার ব্যাপারে আজ শনিবার যৌথ ঘোষণা হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস দাবি করেছে ৯৮টি আসন। কিন্তু তৃণমূল দিতে চাইছে ৬০টি আসন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত আরও পাঁচটি আসন দিতে রাজি হতে পারে।
আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা করতে আজ কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় কলকাতা যাচ্ছেন। একই সঙ্গে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি শাকিল আহমেদ। জানা গেছে, এই দুই নেতা আজ আসন নিয়ে সমঝোতার ব্যাপারে চূড়ান্ত বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন।
১০৬ প্রার্থীর নাম ঘোষণা বিজেপির: পশ্চিমবঙ্গে সর্বপ্রথম প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। গত বৃহস্পতিবার বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রথম দফায় ১০৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। বিজেপি সব আসনেই প্রার্থী দিচ্ছে। ১৮ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত ছয় পর্বে ভোট গ্রহণ চলবে। ১৩ মে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

সৌদি আরবে আন্দোলন জোরদার, পুলিশের গুলিতে আহত ৩

সৌদি আরবে গতকাল শুক্রবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ আরও জোরদার হয়েছে। ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা দিনটিকে ‘বিক্ষোভ দিবস’ এবং ‘সৌদি মার্চ ১১ বিপ্লব’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। এর আগের দিন গত বৃহস্পতিবার পুলিশের গুলিতে তিন বিক্ষোভকারী আহত হয়।
গতকাল জুমার নামাজের পর অনলাইন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা দেশবাসীর প্রতি তাদের সঙ্গে শামিল হতে আহ্বান জানায়।
গত বৃহস্পতিবার আল-কাতিফ শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি ছুড়লে তিনজন আহত হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী এ তথ্য জানান। বিক্ষোভে কয়েক শ মানুষ অংশ নিয়েছিল।
সৌদি সরকারের হাতে আটক দেশটির শিয়া ধর্মীয় নেতা শেখ তৌফিক আল-আমিরসহ অন্যদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ হয়। সৌদি সরকার দেশটিতে সব ধরনের বিক্ষোভ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

আফগানিস্তান নিয়ে ৫০ দেশের মন্ত্রীর বৈঠক

আফগানিস্তান পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার জন্য বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গতকাল শুক্রবার বৈঠকে করেছেন বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা। আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর অধীনে নিজেদের সেনা মোতায়েন আছে এমন প্রায় ৫০ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা এতে যোগ দেন।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার আত্মঘাতী হামলায় আফগানিস্তানের এক প্রাদেশিক পুলিশ-প্রধান ও ন্যাটো বাহিনীর হাতে হামিদ কারজাইয়ের এক অত্মীয় নিহত হয়েছেন।
ন্যাটো সদর দপ্তরে মন্ত্রীদের ওই বৈঠকে একটি ন্যাটো-আফগান যৌথ বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। এই বোর্ড আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব বিদেশি বাহিনীর কাছ থেকে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সুপারিশ করবে। আফগানিস্তান থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের ভূমিকা গুটিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা দায়িত্ব হস্তান্তরই পশ্চিমাদের প্রধান পদক্ষেপ।
বিদেশি ও আফগান কর্তকর্তারা আশা করছেন, আগামী ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ আফগান বাহিনী নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে। ইতিমধ্যে তারা অনেক এলাকার দায়িত্ব নিয়েছে।
পুলিশ-প্রধান নিহত: এদিকে, আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় কন্দুজ প্রদেশে আত্মঘাতী বোমা হামালায় প্রাদেশিক পুলিশের প্রধানসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। কন্দুজ শহরে গত বৃহস্পতিবার ওই হামলা হয়।
হামিদ কারজাইয়ের আত্মীয় নিহত: কান্দাহারে ন্যাটো বাহিনীর হামলায় প্রেসিডেন্ট কারজাইয়ের এক আত্মীয় নিহত হয়েছেন। কান্দাহারের দান্দ জেলায় বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালায় ন্যাটো বাহিনী। কারজাইয়ের আত্মীয় ইয়ার মোহাম্মদ খান তাঁর বাড়িতে গুলিতে নিহত হন। ন্যাটো বলেছে, দুর্ঘটনাক্রমে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষ মাওবাদী নেতা শশধর নিহত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জঙ্গলমহলের শীর্ষ মাওবাদী নেতা শশধর মাহাত গত বৃহস্পতিবার যৌথ বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমার জামবনী থানার চনসরো গ্রামের জঙ্গলে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। শশধরের কাছ থেকে একটি একে-৪৭ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় অপর এক মাওবাদী নেতা আহত হন। তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শশধরের স্ত্রী ও মাওবাদী মহিলা স্কোয়াডের শীর্ষস্থানীয় নেত্রী সূচিত্রা মাহাত সহযোগীদের নিয়ে পালিয়ে যান।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে যৌথ বাহিনীর একটি দল চনসরো গ্রামের জঙ্গল ঘিরে ফেলে। সহযোগীদের নিয়ে শশধর তখন ওই জঙ্গলে অবস্থান করছিলেন। মাওবাদীরা যৌথ বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে তারা পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই পক্ষের এই বন্দুকযুদ্ধ চলে। একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শশধর নিহত হন।
শশধর মাহাতকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার ভারতীয় মুদ্রায় দুই লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। শালবনীতে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের গাড়িবহরে মাইন বিস্ফোরণ, পুলিশ ক্যাম্পে হামলা ও জ্ঞানেশ্বরী ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটানোর পেছনে শশধরের হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইভরি কোস্টে আবার সংঘর্ষ ওয়াতারাকে এইউর স্বীকৃতি

আইভরি কোস্টে গত বৃহস্পতিবার নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ) দেশটির বিরোধী নেতা আলাসেন ওয়াতারাকে নির্বাচিত বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসিবে স্বীকৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সংঘর্ষ শুরু হয়।
আইভরি কোস্টের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট লরা বাগবো এইউর এই সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জাতিসংঘ ও ফ্রান্সের বিমান তাঁর দেশের ওপর দিয়ে যাওয়া বা অবতরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
বিদ্রোহীদের ও সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝামাঝি অবস্থিত তাইবিসউ শহর ও ইয়ামোসোকরোর কাছে বৃহস্পতিবার ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
ওই এলাকার এক বাসিন্দা সাংবাদিকদের বলেন, রাত আটটার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গুলিবিনিময় শুরু হয়। রাতভর তা চলে। অপর একজন জানান, কালাশনিকভ রাইফেল থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে।
এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে এইউ ঘোষণা করে, গত নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওয়াতারাই বৈধভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। আদ্দিস আবাবা থেকে ওয়াতারা বলেন, এ ঘোষণা বাগবোকে মানতেই হবে। শিগগিরই তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে।
ওয়াতারা বলেন, এইউ তাঁকে সরকার গঠন করতে বলেছে এবং একই সঙ্গে বাগবোকে সম্মানজনক অপসারণের সুযোগ দিতে বলেছে। তিনি বলেন, ‘শান্তির স্বার্থে আমি তাঁদের কথা মেনে নিয়েছি।’
বাগবোর সরকার এইউর এই ঘোষণা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আবিদজান থেকে বাগবোর মুখপাত্র আহোয়া ডন মেল্লো বলেন, যেখানে ক্ষমতা ভাগাভাগির কথা হচ্ছে, সেখানে এই ঘোষণা মেনে নেওয়া যায় না।
আদ্দিস আবাবায় এইউর বৈঠক শেষে ওয়াতারা গতকাল শুক্রবার নাইজেরিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সেখানে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট গুডলাক জোনাথনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
জাতিসংঘ ও ফ্রান্সের বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আবিদজান থেকে বিবিসির সাংবাদিক জন জেমস জানান, ওয়াতারার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করতে সম্ভবত এই পদক্ষেপ নিয়েছেন বাগবো। গত নভেম্বরের নির্বাচনের পর থেকে ওয়াতারা আবিদজানের গলফ হোটেলে ছিলেন। সেখানে তাঁর নিরাপত্তা দিচ্ছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীরা।

ভালোবাসার ‘অত্যাচার

ভারতকে বলা হয় ক্রিকেট-পাগল দেশ। সে দেশের মানুষ নাকি ক্রিকেটে খায়, ক্রিকেটে নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষও যে কম যায় না, তা দেখাল কাল চট্টগ্রাম। সমর্থকদের ভালোবাসার ‘অত্যাচারে’ অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ড দল কাল খেলা শেষ হওয়ার পরও তিন ঘণ্টা আটকে ছিল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে।
বাংলাদেশের বিজয়ী খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানাতে স্টেডিয়ামের সামনে অপেক্ষায় ছিল হাজারো ক্রিকেটভক্ত। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও তাদের সরাতে না পেরে করে বসে লাঠিপেটা। আহত হয় অনেকে। হিতে হয় বিপরীত। উত্তেজিত জনতা পুলিশের দিকে ইট-পাথর ছুড়ে মারে। শুরু হয় লঙ্কাকাণ্ড। ওদিকে খবর আসে, দুদলের খেলোয়াড়েরা উঠেছেন যে হোটেলে, সেই পেনিনসুলা হোটেলের সামনেও ভিড় করে ছিল হাজার হাজার উৎসাহী সমর্থক। ওই কারণেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। এই দুয়ে মিলেই বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড দুদলের খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিশিয়াল ও সাংবাদিকদের স্টেডিয়ামে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত হলে দুদলের বাস ছাড়ে রাত দেড়টায়।
আশা ছিল, ঢাকায় বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের পরে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার রেশ থাকবে না চট্টগ্রামে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হলো না। মানুষের আবেগের স্রোত কিংবা ভালোবাসার অত্যাচার ক্রিকেটকে কোথায় নিয়ে যাবে, কে জানে!

পোলার্ড-স্মিথের দিন

ডেভন স্মিথের কি মন খারাপ? সেঞ্চুরি করেছেন। দলও জিতেছে ৪৪ রানে। মন খারাপের প্রশ্ন আসছে কেন?
প্রশ্নটা আসছে তাঁর সেঞ্চুরিতে দল জিতেছে বলেই। ৩৬তম ম্যাচে এসে স্মিথ পেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় বিষ ছিটিয়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও কোয়ার্টার ফাইনালের পথে এগিয়ে গেল আরেক ধাপ। কিন্তু ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারটি স্মিথের হাতে উঠল না। এই আফসোস? মোটেই না। আফসোস থাকবে কেন? ম্যাচসেরার পুরস্কারটি তো অন্য কেউ নন, পেয়েছেন সতীর্থ কাইরন পোলার্ড।
আর স্মিথ নিজে বিচারক থাকলেও কি ম্যাচসেরার পুরস্কারটি সন্তুষ্ট মনে সতীর্থ পোলার্ডের হাতেই তুলে দিতেন না? সকালে আভাস-ইঙ্গিত দিয়েও যে কাল মোহালিতে আরেকটি আইরিশ রূপকথা হলো না, তার প্রধানতম কারণ তো পোলার্ডই।
কাল সকালেই একটা দুঃসংবাদ সঙ্গী হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের। তলপেটের সমস্যার কারণে খেলতে পারলেন না ওপেনার ক্রিস গেইল। গেইলের অনুপস্থিতিতে ডেভন স্মিথের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন শিবনারায়ণ চন্দরপল। গেইলকে হারানোর ভয় হোক কিংবা আয়ারল্যান্ডের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং, ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার শুরুটা করেন খুবই ধীরগতিতে। প্রথম ১০ ওভারে রান মাত্র ২৮! আরেকটি আইরিশ রূপকথা রচনার আভাস।
এই আভাস পোলার্ড মাঠে নামার আগ পর্যন্তই ছিল। স্মিথ-চন্দরপলের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে ৮৯ রানে গিয়ে। ৬২ বলে ৩৫ চন্দরপলকে দিয়ে এই জুটি ভাঙেন কেভিন ও’ব্রায়েন। তিন বল পর লারার ‘ক্লোন’ ড্যারেন ব্রাভোও আউট (০)। সারওয়ানও ফিরে যান দ্রুতই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩২ ওভারে ১৩০/৩! কত দূর আর যেতে পারত ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বড়জোর ২২০-২৩০!
এরপরই পোলার্ড-ঝড়। আর তাতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেল ২৭৫ রানের পুঁজি। ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ল আয়ারল্যান্ড! ব্যাটিং-অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে পাঁচে নামা পোলার্ড হাফ সেঞ্চুরি করেন ৩৫ বলে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৫ বলে ৯৪। ৫ ছক্কা, ৮ চার।
পোলার্ড-প্রতাপে শুরুতে ঝিমানো স্মিথের ব্যাটও দুরন্ত হয়ে ওঠে। চতুর্থ উইকেটে তাঁরা মাত্র ১০.৩ ওভারে গড়েন ৮৮ রানের জুটি। এর ৫৪-ই পোলার্ডের।
১০৭ রান করা স্মিথের আফসোস না থাকতে পারে, পোলার্ডের নিশ্চয়ই আছে। আর একটা ছক্কা হলে তো জয় ও ম্যাচসেরার পুরস্কারের সঙ্গে পেতেন ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির তৃপ্তিও।
২৭৬ রানের চ্যালেঞ্জের পথেও অবশ্য ভালোই লড়ে যাচ্ছিল আয়ারল্যান্ড। ৮৬ রানে ৩ উইকেট হারানোর পরও তাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল এড জয়েস ও উইলসন জুটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি তাঁরা। পারেনি আয়ারল্যান্ড। আটকে যায় ২৩১ রানে। ২০০৭ বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা জয়েস ৮৪ আর উইলসন করেন ৬১ রান।

চট্টগ্রামেও লাল-সবুজের মেলা

হোটেল পেনিনসুলা থেকে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম পর্যন্ত সড়ক একেবারে সুনসান! নাগরিক যান, টেম্পো ইত্যাদি চলাচল নিষিদ্ধ। অন্যদিনের মতো তাই কাল আর এ দিকটায় নাগরিক জীবনে ভোগান্তি নেই। অল্প যে গাড়ি চলেছে, সবই বিশ্বকাপ ভেন্যুমুখী। তার মধ্যে ছিল দুই দলের ক্রিকেটারদের বহনকারী বাসও।
সড়কের দুই পাশে লাল-সবুজের যেন সমাহার। বৈদ্যুতিক বাতিতে লাল-সবুজ, সিএনজি অটোরিকশায় লাল-সবুজ। রোদ থেকে বাঁচতে দেওয়া পানদোকানির আচ্ছাদনও স্বদেশের পতাকার রঙে রাঙানো। লাল-সবুজ জার্সি গায়ে মানুষের মিছিল তো ছিলই।
এভাবে স্টেডিয়ামপাড়া হয়ে উঠেছিল রঙিন। এ যেন মিরপুর স্টেডিয়ামপাড়া। ঢাকায় যেমন বাংলাদেশের ম্যাচে লাল-সবুজের স্রোত ছিল, চট্টগ্রামেও তাই। চট্টগ্রামের এই ম্যাচ দেখতে তো যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিবার নিয়ে দেশে এসেছেন মোস্তফা জামান। তাঁর ২০ মাসের শিশুসন্তান রিদোয়ান হোসাইনের শরীরও লাল-সবুজে মোড়ানো। ‘আমি শুধু বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে দেশে এসেছি। আমেরিকায় থাকতেই অনলাইনে সাতটি টিকিট কেটেছি’—পশ্চিম গ্যালারিতে বসা মোস্তফা জামান বলে যান।
ইংল্যান্ডদের ২২৫ রানে অলআউট করে ফেলল বাংলাদেশ। এরপর জয় দেখতে নড়েচড়ে বসল দর্শকেরা। বাংলাদেশের প্রতিটি রানেই নেচে উঠল গ্যালারি। ইংলিশদের উইকেট পতনেও ছিল একই রকম আনন্দ। ভুভুজেলা বাজিয়ে, নানাভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে গেল দর্শকেরা। চার-ছক্কা হলে তো গ্যালারি হয়ে উঠেছে উন্মাতাল। প্রায় ১৭ হাজার দর্শক ছিল গ্যালারিতে। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য।
এই ম্যাচ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে গেল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম। এই মাঠে ফ্লাডলাইটে এটিই প্রথম ম্যাচ। মাঠে জায়ান্ট স্ক্রিনে নিজেদের দেখল দর্শকেরা। সত্যিই এই ম্যাচ দিয়ে অনেক কিছুই পেল চট্টগ্রামের দর্শকেরা।
ম্যাচ দেখার জন্য এক থেকে দেড় কিলোমিটার হেঁটে আসার পর লাইনে দাঁড়ানোর পরিশ্রমটা এই গর্বের কাছে ম্লান। তবে যারা আগেভাগে গাড়ির পাস পেয়েছিল তাদের এই কষ্ট পেতে হয়নি। ট্রান্সটেল গেট দিয়ে মাঠে প্রবেশ করতেও কিছুটা সময় লেগেছে। এ নিয়ে কারও কারও মুখে ক্ষোভ ছিল। তবে মাঠে ঢুকে বাংলাদেশের বোলিং-ফিল্ডিং দেখে সব ভুলে গেছে নিমিষেই।
শুধু চট্টগ্রাম কেন? বিশ্বকাপে চট্টগ্রামের অভিষেক দেখতে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ছুটে এসেছেন অনেকে। ঢাকার গুলশান থেকে মামার সঙ্গে চট্টগ্রামের দুটি ম্যাচ দেখার জন্য এসেছে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র রাফায়েল চৌধুরী। মিরপুরের ৫৮ রানের দুঃস্বপ্নের সাক্ষী এই রাফায়েল। তার পরও গায়ে লাল-সবুজ জার্সি চাপিয়ে দেশকে মাঠে বসে সমর্থন দিতে এল এই কিশোর। ছোট্ট রাফায়েল বলল, ‘দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ বারবার হবে না। তাই সুযোগটা নষ্ট করিনি।’
পূর্ব গ্যালারিতে সারাক্ষণ বিশাল পাতাকা হাতে একদল তরুণ এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে বেড়াল। ম্যাচের শেষ বলটি না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকার প্রত্যয় তাঁদের। প্রত্যয় বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার।

সেই শফিউল আবারও

১৬৯ রানে ৮ উইকেট নেই। অনেকেই ধরে নিল, দিগন্তে সোনালি ঝিলিক দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে আরেকটা জয়। গ্যালারি ছেড়ে বাড়ির পথ ধরেছে তখন অনেকেই। আর জয়ের সুবাস পেয়ে চনমনে হয়ে উঠেছে ইংল্যান্ড দল।
অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের দল হয়তো ভুলেই গিয়েছিল, বাংলাদেশের একজন শফিউল ইসলাম আছেন! যে শফিউলের টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম স্কোরিং শটটিই ছিল ছক্কা। যে শফিউল গত বছর এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই টেস্টে করেছিলেন হাফ সেঞ্চুরি।
নাটক শেষ হতে এখনো অনেক বাকি—এই বলে ১৬৯/৮ থেকেই ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে গেলেন বোলার শফিউল। বোলার পরিচয়টা তখন হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন। ইংলিশদের চোখ হতভম্ব করে দিয়ে মারলেন ৪টি চার, বিশাল ১টি ছয়। ২৪ বলে অপরাজিত ২৪ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে এনে দিলেন স্বপ্নের এক জয়। যে জয় কোয়ার্টার ফাইনালের সম্ভাবনারেখা এঁকে দিয়েছে। যে জয় ইংলিশদের বুঝিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশও পারে।
যাঁর ব্যাটে এত কিছু বলা, ম্যাচ অ্যাজুডিকেটরদের চোখে সেই শফিউল কিন্তু ম্যাচের সেরা নন। ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে ১০০ বলে ৬০ রান করা ইমরুল কায়েসের হাতে। কিন্তু নায়ক এই শফিউলও। তাঁর ব্যাট অমন চওড়া না হলে ইংল্যান্ড-বধ কাব্য রচিত হয় না।
এর আগে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়েও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন শফিউল। সেই ম্যাচে শফিউল জেগে উঠেছিলেন বিজয়ীর চেহারায়। বল হাতে তুলে নিয়েছিলেন আয়ারল্যান্ডের ৪ উইকেট। সেই ম্যাচেও ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠেনি শফিউলের হাতে। সেই পুরস্কার পেয়েছিলেন তামিম ইকবাল।
এমন কীর্তি গড়েও ম্যাচসেরার স্বীকৃতি না পাওয়ার একটা আক্ষেপ শফিউলের থাকতেই পারে। প্রকৃত বীরকে ট্র্যাজেডিও খুব টানে। বগুড়ার এই ছেলেটি আবার হয়তো দল আর দেশকে জেতানোর মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নেবেন।

‘পীযূষ চাওলার বদলে অশ্বিনকে চাই’

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই স্পিনার নিয়ে খেলার পক্ষাপাতি সৌরভ গাঙ্গুলি। পীযূষ চাওলার পারফরম্যান্স নিয়ে সবার মধ্যে যে প্রশ্ন, তাতে সায় দিয়ে ভারতের সবচেয়ে সফল এই অধিনায়ক বলেছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চাওলা খেলুক, তা আমি চাই না। বরং, আমি রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেই নাগপুরে একাদশে দেখতে চাইব।’
সৌরভ বলেছেন, মহেন্দ্র সিং ধোনির উচিত দু’জন পেসারের সঙ্গে দু’জন স্পিনারকে খেলানো। সেক্ষেত্রে হরভজন সিংয়ের সঙ্গে যদি অশ্বিন খেলে, সেটাই ভালো হবে।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে ভারতীয় স্পিনারদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্নটা উঠে গেছে। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছেন অভিজ্ঞ হরভজন সিং। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ভারতের ম্যাচগুলোর একটিতেও বলার মতো কোনো পারফরম্যান্স নেই হরভজনের। ব্যাপারটি সৌরভের কাছেও ভালো লাগছে না। তবে তাঁর মতে, হরভজন সবসময়ই বড় ম্যাচে পারফর্ম করে। তাই সে অবশ্যই স্বয়ংক্রিয় পছন্দ।’
ভারতের শক্তিধর দিক ব্যাটিং নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই সৌরভের। তাই, আজকের ম্যাচে বোলিংটা নিয়ে একটু বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ তাঁর। তাঁর মতে, ‘ধোনি অবশ্যই আজ আগে ব্যাট করতে চাইবেন। আগে ব্যাট করে একটা ভালো সংগ্রহ যদি দাঁড় করানো যায়, তাহলেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে ফেলা যাবে।’ সৌরভের মতে, দুই পেসার ও দুই স্পিনারকে মোকাবিলা করা দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।’
ডেল স্টেইন, মরকেল, বোথা, ইমরান তাহিরদের নিয়ে গড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিংয়ের ওপর দারুণ শ্রদ্ধা সৌরভের। তাঁর মতে, এই বোলিংয়ের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানদের সতর্ক হয়ে খেলতে হবে, না হলে উল্টো ভারতই চাপে পড়ে যাবে। সৌরভ আজকের ম্যাচে শেবাগ অথবা শচীনের কাছ থেকে অন্তত একটি ভালো ইনিংস চান।

স্ট্রাউসের কাঠগড়ায় উইকেট

শফিউল ইসলামের বীরত্ব, নবম উইকেটে মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে তাঁর অসমাপ্ত ৫৮ রানের দুর্দান্ত জুটি, বাংলাদেশের সুশৃঙ্খল বোলিং—এর কোনো মূল্য নেই? কাল বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচে যা ঘটেছে, তার সব দায় জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেটের?
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ড অধিনায়কের কথার একটা অংশ শুনলে অনেকেরই মনে হতে পারে এ রকম। ‘বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্ট দিয়ে কোনো মাঠের দিবা-রাত্রির ম্যাচের যাত্রা শুরুটা একটু আশ্চর্যজনকই’—অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস কি পরাজয়ের দায় চাপাতে চাইলেন না জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেটের ওপর?
শুধু উইকেটই তো নয়, কাল প্রকৃতিকেও দুষতে চাইলেন স্ট্রাউস। পরাজয়ের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়ক টেনে আনলেন শিশির-তত্ত্বকেও, ‘আমরা যখন বোলিং করেছি, তখন প্রথম ২০ ওভার পর্যন্ত অবস্থা খুবই বাজে ছিল। গ্রায়েম (গ্রায়েম সোয়ান) তো বলই গ্রিপ করতে পারছিল না। স্পিন যেখানে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেখানে একজন স্পিনারের বল গ্রিপ করতে না পারাটা একটু কেমনই যেন।’
কিন্তু মাঠ আর প্রকৃতির ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই তো আর হয় না। কিছু দোষ নিজেদের ঘাড়েও নিতে হয়। ম্যাচের পরের অংশে নাহয় শিশিরের সমস্যা ছিল, কিন্তু ইংল্যান্ডের ব্যাটিংটা এত খারাপ হলো কেন? অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস বললেন, ‘এই উইকেটে প্রথমে ব্যাট করা খুব কঠিন। স্লো ও লো উইকেট এটা। তবু আমি ভেবেছিলাম, ২২০ রানই যথেষ্ট। তবে এটা ঠিক যে আমরা এর চেয়েও বেশি রান করতে পারতাম।’
শেষ পর্যন্ত অবশ্য স্ট্রাউস স্বীকার করেছেন, ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংটাও ভালো হয়নি ইংল্যান্ডের, ‘নতুন বলে যতটা ভালো করা উচিত ছিল, ততটা ভালো আমরা করতে পারিনি। অনেক বেশি ওয়াইড দিয়ে ফেলেছি। ম্যাচটা জেতার মতো দারুণ জায়গায় গিয়েও আমরা জিততে পারিনি।’
এ জায়গাতে এসেই ইংল্যান্ড অধিনায়ককে বলতে হলো শফিউল আর মাহমুদউল্লাহর কথা। এ দুজনই ইংল্যান্ডের প্রায় জিতে যাওয়া ম্যাচটি ছিনিয়ে নিয়েছেন। স্ট্রাউস তাই নিজের বোলারদের ব্যর্থতার কথা বলতে গিয়ে পরোক্ষে প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশের জয়ের এই দুই নায়ককে, ‘বাংলাদেশের শেষ দুই ব্যাটসম্যান খুব ভালো খেলেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচটিতে তারাই বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত জায়গায়। আর এটাই ওয়ানডে ক্রিকেট।’
ওয়ানডে ক্রিকেট যেমন অনিশ্চিত, তেমনি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। স্ট্রাউসরা কি পারবেন স্বপ্নের দৌড়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে? ইংলিশদের চিরকালীন একটি আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের বাসনা নিয়েই তো উপমহাদেশে এসেছে স্ট্রাউসের দল। সেই আকাঙ্ক্ষা কি পূরণ হবে? তবে হাল ছাড়ছেন না স্ট্রাউস, ‘আমরা এখনো বিশ্বকাপ জিততে পারি।’
এখান থেকে বিশ্বকাপ জিততে হলে কী করতে হবে, স্ট্রাউসের তা বিলক্ষণ জানা। তাই বললেন, ‘আমাদের বাতিল করে দেওয়া যাবে না। সমস্যা হচ্ছে, আমরা ধারাবাহিক নই। আর ব্যাটিং ও বোলিংয়ে এখনো একসঙ্গে জ্বলে উঠতে পারিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে আমাদের সেটাই করতে হবে।’

এ কী আচরণ সোয়ানের

বাংলাদেশের কাছে হেরে নানারকম অজুহাত খুঁজছেন ইংলিশ খেলোয়াড়েরা। অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস গতকালই ম্যাচ উত্তর সংবাদ সম্মেলনে বারবারই সন্ধ্যার শিশিরের প্রসঙ্গ টেনে আনছিলেন। যেন শিশিরই সব নষ্টের মূলে। এই ‘শিশির’ ‘শিশির’ রবটা অবশ্য কাল প্রথম তুলেছেন ইংলিশ অফ-স্পিনার গ্রায়েম সোয়ান। টেলিভিশনে যাঁরা খেলাটি দেখেছেন, তাঁরা বেশ ভালো ভাবেই ‘উপভোগ’ করেছেন গ্রায়েম সোয়ানের হতাশাটি। এক পর্যায়ে বল পরিবর্তন নিয়ে তো অস্ট্রেলীয় আম্পায়ার ড্যারেল হার্পারের সঙ্গে রীতিমতো বচসায় চলে গেলেন তিনি। বল পরিবর্তনে হার্পারকে বাধ্য করতে না পেরে মুখ দিয়ে ‘খিস্তি’ বর্ষণই করে ফেললেন। টেলিভিশন সম্প্রচার ও পিচ মাইক্রোফোনের কল্যাণে সোয়ানের সেই খিস্তি কানে চলে গেল বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ দর্শকের কানে। সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, বিস্ময়ে বিমূঢ় হলেন ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের ‘ভদ্রলোকেদের’ আচরণে।
ব্রিটিশ টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার ডেভিড লয়েড নিখাঁদ ভালো মানুষ। আর তাই, সোয়ানের আচরণ তাঁকে লজ্জা দিয়েছে। টেলিভিশন ধারাভাষ্যের মাধ্যমে সব দর্শকদের কাছে তিনি সোয়ানের হয়ে ক্ষমা চাইলেন।
ম্যাচ শেষে ইংলিশ অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে, তিনি এটাকে সোয়ানের ‘হতাশা’ বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। তবে, তিনি স্বীকার করেছেন যে আম্পায়ার হার্পারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার সময় তিনি সোয়ানকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সোয়ান রাগান্বিত হয়ে কি শব্দ উচ্চারণ করেছেন, তা তিনি শোনেন নি বলেই জানিয়েছেন।
আইসিসির আচরণবিধিতে এমন আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়েই পড়ে। কোনো খেলোয়াড় আম্পায়ারের সঙ্গে বচসায় গিয়েছেন-এমন দৃশ্য অনেকদিনই ক্রিকেটে কেউ দেখেনি। তবে, বিশ্বকাপের মঞ্চে কাল চট্টগ্রামের মাটিতে অনেকদিন পরই ক্রিকেট দেখল, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া দলের খেলোয়াড়দের অভব্যতা।

শচীন, শেবাগের কাছে ধোনির দাবি

একটি করে সেঞ্চুরি করেছেন দুজনেই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শচীন টেন্ডুলকার করেন ১২০ রান। আর বাংলাদেশের বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে বীরেন্দর শেবাগ খেলেন ১৭৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস। তার পরও মহেন্দ্র সিং ধোনির আক্ষেপ কমছে না। একই ম্যাচে জ্বলে উঠে এখনো যে বড় কোনো জুটি গড়তে পারেননি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর এ দুই ব্যাটসম্যান!
প্রথম চার ম্যাচে শচীন-শেবাগের উদ্বোধনী জুটির সংগ্রহ যথাক্রমে ৬৯, ৪৬, ৯ ও ৬৯। মোটেও খুশি হওয়ার মতো নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আজকের ‘বড়’ ম্যাচে তাই বড় উদ্বোধনী জুটির দাবি ধোনির, ‘যদি আমাদের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানরা আরও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট করতে পারে, এটি আমাদের জন্য ভালো হবে। কারণ, আমরা দেখেছি, শচীন ও বীরু একবার শুরু করলে তাঁদেরকে থামানো কঠিন।