Monday, October 7, 2019

দেশে এখনও প্রতি চারজনে একজন দরিদ্র: -বিশ্বব্যাংক

বিশ্বব্যাংক মনে করে, গত এক দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এখনও প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। এছাড়া জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমাচ্ছে। তবে দারিদ্র্য কমছে তুলনামূলক কম গতিতে। ২০১০ সাল থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়লেও দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমেছে।
আজ রাজধানীর বনানীর হোটেল আমারিতে বিশ্বব্যাংক আয়োজিত ‘বাংলাদেশ  পোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। যার বেশিরভাগই সম্ভব হয়েছে শ্রম আয় বৃদ্ধির কারণে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সময় ৮০ লাখ বাংলাদেশি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এছাড়া দেশে অসমভাবে দারিদ্র্য কমেছে। ২০১০ সাল থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের বিভাগগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতি ঐতিহাসিক পার্থক্য আবার ফিরে এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পশ্চিমে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে এবং রাজশাহী ও খুলনায় একই জায়গায় রয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে দারিদ্র্য কমেছে পরিমিত হারে এবং বরিশাল, ঢাকা ও সিলেটে দারিদ্র্য কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, বিগত দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন দরিদ্র বাস করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছু করতে হবে। বিশেষ করে দারিদ্রের নতুন ক্ষেত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শহর এলাকায় দারিদ্র্য  মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের অর্ধেক শহরে বসবাস করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আরও বলেন, দারিদ্র বিমোচনের ৯০ শতাংশ কর্মসূচি গ্রামে রয়েছে। শহরে দারিদ্র্য কমেছে সীমিত হারে এবং অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শহরের লোকের অংশ একই রয়ে গেছে। ফলে জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমেছে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, বিশ্বব্যাংকের এই তথ্য অনেক পুরনো। গত ১০০ বছর আগে বাংলাদেশে কোথায় ছিল আর এখন কোথায় সেটা ভাবতে হবে। এই প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের আগের তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনের তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র অনেক ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমাদের সরকারের যেভাবে কাজ করছে সেটার আলোকে ২০৩০ সালের মাঝে আমাদের যে স্বপ্ন সেটা আমরা বাস্তবায়ন পারবো।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের টার্গেট ২০২৪ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করব। আমরা স্বাভাবিকভাবেই জিডিপিতে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, আমাদের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন এবং আমাদের তরুণ মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বাকি দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করব।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারবো। বাংলাদেশি একবার যারা দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে তারা আর গরিব হবে না, কারণ আমরা বিভিন্ন সেক্টরকে উন্নত করেছি।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, প্রতিবেদনে যেসব এলাকাকে দারিদ্র বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আপনারা দেখতে পাবেন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আমরা সেসব এলাকাকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনায় রেখেছি।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের সিনিয়র সেক্রেটারি ড. শামসুল আলম, পরিসংখ্যান ও তথ্য বিভাগের সচিব সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র ও নীতি বিভাগের পরিচালক ক্যারোলিনা সাইন্সেস পারামোসহ সরকারের নীতিনির্ধারক, বেসরকারিখাত ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

আমি পালাবো না: মানবজমিনকে ওমর ফারুক by কাজী সোহাগ

ক্যাসিনোকাণ্ডের ঝড় বইছে যুবলীগে। ঢাকা মহানগর যুবলীগের কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে ক্যাসিনোপাড়া গড়ে ওঠার চিত্র প্রকাশের পর থেকে চাপে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। ক্যাসিনো সম্রাজ্যের আয় যেতো তাদের পকেটেও। গ্রেপ্তার নেতাদের মুখে প্রকাশ পেয়েছে এমন তথ্য। এরপর থেকে নজরদারিতে শীর্ষ নেতারাও। যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, দেশ ছেড়ে পালাবেন না।
অপরাধ করলে প্রচলিত বিচারের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান।

তিনি বলেন যদি অপরাধ করে থাকি তাহলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করবে। আমার কাজ হবে বিচারিক আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা। ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, একেক সময় একেক খবর পাচ্ছি। আর বুকটা ভেঙ্গে ছয় টুকরো হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন মানুষের অনুকম্পা পাওয়ার চেয়ে ঈর্ষা পাওয়ায় শ্রেয় মনে হচ্ছে। এখন যে অবস্থা তাতে নিজেকে এখন ঘৃণিত ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে। অনেকের কাছে আমি এখন ঘৃণার পাত্র। এখন আসলে সবকিছুর উত্তর দেয়া বা তর্কের সময় নয়। এখন আমি হাজারো কথা বললেও তা মিথ্যায় পরিণত হবে। এদিকে গতকাল যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে কর্তৃপক্ষ। এজন্য  বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনে সর্বোচ্চ সর্তকতা জারি করা হয়েছে। বেনাপোল ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহাসিন খান পাঠান জানান, ঢাকা পুলিশের এসবি ( স্পেশাল ব্রাঞ্চ) থেকে তাদের কাছে মৌখিক নির্দেশনা এসেছে। যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও নেপালের নাগরিক যাতে কোনোভাবেই দেশ ত্যাগ করতে না পারেন তার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ক্যাসিনো কাণ্ডে যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতার নাম আসার পর থেকে আলোচনায় যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী।

গতকাল টেলিফোনে মানবজমিনকে সাক্ষাৎকার দেন ওমর ফারুক চৌধুরী। তিনি বলেন, যদি অপরাধীও হই তারপরও দেশ ছেড়ে আমাকে কেন পালাতে হবে? রাজনীতি করি। রাজনীতি করতে গেলে ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। এখন যে অভিযান চলছে তা আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত, দলের সিদ্ধান্ত। যদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাই তাহলে তো আমাকে শাস্তি দেয়া বিচারকের জন্য সহজ হয়ে যাবে। অপরাধ হচ্ছে প্রমাণের বিষয়। বিচারিক আদালতে নিরপরাধের জন্য লড়তে হবে। আপনি কি গ্রেপ্তার আতংকে আছেন-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি আতংকের নয়। বিষয়টি প্রক্রিয়ার। অপরাধ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করতেই পারে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতি করার কারণে দলের সাংগঠনিক কাজগুলো দেখভালের দায়িত্ব ছিলো আমার। দলীয় কর্মসূচি কে কিভাবে করছে, ভালোবেসে করছে কিনা সেগুলো দেখেছি। এর বাইরে কে টাকার পেছনে ছুটলো কিংবা অন্য কোন দিকে গেলো তা দেখার সুযোগ আমার ছিলো না। দলের মধ্যে অনেক ধরনের মতাবলম্বী নেতা-কর্মী থাকেন।

তাদের সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়ে। এখন অনেক কিছুই জানতে পারছি। মিডিয়ার মাধ্যমেও অনেক কিছু বেরিয়ে আসছে। আগে অজানা অনেক বিষয় ছিলো। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার প্রসঙ্গে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, সম্রাটের গ্রেপ্তারের বিষয়টি দল বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। সে অপরাধের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগ থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। এখন তার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী দেখছে। আর আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত আছে-যদি কেউ অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে বহিস্কার করা হবে। শুধু সম্রাট নয় আরও যদি কেউ একইভাবে আটক হন তাহলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে কি না প্রশ্নে তিনি বলেন, না উনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। তার পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই যে কেউ আটক হলে তাকে বহিষ্কার করতে হবে এটা তারই সিদ্ধান্ত। আমাদেরও সিদ্ধান্ত। চলমান অভিযানে যুবলীগে কি ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, অভিযানটা হচ্ছে দলের সিদ্ধান্তে। তাই এটা এখনই বলা যাবে না। সময়ই সবকিছু জানিয়ে দেবে।

নীল নদে বাঁধ সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রয়াস ব্যর্থ

নীল নদের ওপরে বাঁধ নির্মান ইস্যুতে ইথিওপিয়ার সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে গেছে বলে জানিয়েছে মিশর। এ জন্য আদ্দিস আবাবাকেই দায়ি করেছে কায়রো। এছাড়া, নীল নদ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছে দেশটি। এ খবর দিয়েছে আল-জাজিরা।
নীল নদের ওপর ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যায়ে একটি পানিবিদ্যুত কেন্দ্র তৈরি করছে ইথিওপিয়া। ফলে নীলের ভাটির দেশ মিশর আতঙ্কিত হয়ে পরছে। দেশটি আশংকা করছে এই বাঁধ চালু হলে তারা পানি সংকটে পরবে ও অর্থনীতি ব্যহত হবে। ২০১১ সালে দ্য গ্রান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসা ড্যামটির ঘোষণা দেয় ইথিওপিয়া।
পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র এই রাষ্ট্রটি এই বাধের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি পাল্টে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর। এখান থেকে ৬০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারবে দেশটি। ইথিওপিয়ার তিন ভাগের এক ভাগ জনগন বিদ্যুত সেবার বাইরে বাস করে। এই বিদ্যুতকেন্দ্রটি চালু হলে ইথিওপিয়া নিজ দেশের চাহিদা পূরণ করে হয়ে উঠবে আফ্রিকার সবথেকে বড় বিদ্যুত রপ্তানিকারক দেশ।
তবে মিশরের ভয় হচ্ছে এর ফলে তাদের পানিপ্রবাহে ভাটা পরবে। দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নীল নির্ভর। এছাড়া ক্ষতির আশংকা করছে সুদান ও ইথিওপিয়ারও একটি অংশ। বিশুদ্ধ পানির ৯০ শতাংশই মিশর পেয়ে থাকে নীল থেকে। এটি চায় ইথিওপিয়া আরো বেশি পানি দেক মিশরকে। তবে ইথিওপিয়ার সে দাবিতে সায় নেই। এ নিয়েই দুই দেশ কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে শনিবার মিশরের পানি সম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইথিওপিয়ার  অনুদারতার কারণে আলোচনা ভেস্তে গেছে। ফলে মিশর এখন আন্তর্জাতিক দেশগুলোকে আহবান জানিয়েছে এই সংকট সমাধানে মধ্যস্থতা করতে। দেশটি সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেছে, নীল নিয়ে তারা একটি ভারসম্যপূর্ন চুক্তি চায়। সুদানের রাজধানী খার্তুমে ৩ দেশের মধ্যে ওই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
মধ্যস্থতা কোন রাষ্ট্র করবে তার নাম উল্লেখ করেনি মিশর। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসবে বলে মনে হচ্ছে। শুক্রবার হোয়াইট হাউজ এক বিবৃতিতে বলে, নীল নদ নিয়ে চলমান দরকষাকষিকে তারা স্বাগত জানায়। এদিকে আলোচনায় মধ্যস্থতায় আন্তর্জাতিক দেশগুলোর সাহায্যের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইথিওপিয়ার মন্ত্রী সেলেশি বেকেলে। তিনি বলেন, কেনো আমাদের নতুন অংশীদার লাগবে? আপনি কী এই আলোচনা চিরদিন চালিয়ে যেতে চান?
এর আগে মিশর প্রস্তাব দিয়েছিলো তারা ওই বাঁধ নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে এ দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইথিওপিয়া। এখনো দেশটি ঠিক কী পরিমাণ পানি দেবে তাও নিশ্চিত করে বলছে না। তবে মিশর সেখান থেকে বছরে ৪০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি দাবি করেছে।

ভবিষ্যতের যুদ্ধ ঠেকাতে কল্পকাহিনী লেখক নিয়োগ দিচ্ছে ফরাসি আর্মি

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর লেখকদের নিয়ে 'রেড টিম' নামের একটি বাহিনী তৈরি করতে যাচ্ছে ফরাসি সেনাবাহিনী, যাদের কাজ হবে ভবিষ্যতে হুমকি হতে পারে, এমন নানা বিষয় কল্পনা করে বের করা।
ডিফেন্স ইনোভেশন এজেন্সি (ডিআইএ) নতুন একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই লেখকরা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি কল্পনা করে বের করে সামরিক কৌশল ঠিক করা, যা হয়তো এখনো কেউ চিন্তা করেনি।
এই দলের কর্মকাণ্ড হবে অত্যন্ত গোপনীয়। তারা নানা ধরণের বিষয় বিবেচনায় রেখে কাজ করবেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষায় ফরাসিদের নতুন ধরণের কলাকৌশল উদ্ভাবনের অংশ হিসাবে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
উদ্ভাবনী দলের একজন সদস্য বাস্তিল দিবসের সামরিক অনুষ্ঠানের সময় জনতার সামনে একটি জেট চালিত উড়ন্ত বোর্ডের প্রদর্শনী দেখান।
এরপর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো ওই অনুষ্ঠানের একটি ভিডিওতে মন্তব্য করেন, ''আমাদের সেনাবাহিনী নিয়ে গর্বিত, যারা আধুনিক এবং উদ্ভাবক।''

এই 'রেড টিমের' সদস্য কারা?

এই টিমের মধ্যে রয়েছেন চার থেকে পাঁচজন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক। এই লেখকদের কাজ হবে প্রচলিত সেনাবাহিনীর চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনা করা।
এসব কৌশলের মধ্যে তাদের ভেবে বের করতে হবে যে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এবং বিদেশী রাষ্ট্রগুলো কিভাবে নতুন ধরণের আধুনিক অস্ত্র বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। সেসব মোকাবেলার পরিকল্পনাও তাদের তৈরি করতে হবে।
ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লি বলেছেন, সামরিক উদ্ভাবনের সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে 'সবরকম উপায়' হাতে রাখতে চায়।
বাস্তিল উৎসবের ওই অনুষ্ঠানে আরো প্রদর্শন করা হয়েছিল নেওরোড এফফাইভ মাইক্রোওয়েভ জ্যামার, ড্রোন ধ্বংসে সক্ষম রাইফেলের মতো একটি অস্ত্র যা ওই ড্রোনটিকে পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।
এখন পরিকল্পনা করা হচ্ছে যে, মালিতে থাকা ফরাসি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য রোবট সেনা পাঠানো হবে। এই পরিকল্পনাটি এখন বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক সামরিক সরঞ্জাম আবিষ্কারের বহু বহু আগে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর লেখকরা বর্ণনা করে গিয়েছিলেন। তার অনেক পরে সেসবের আবিষ্কার হয়েছে।
যেমন পারমাণবিক বোমা। এইচ জি ওয়েলস ১৯১৪ সালে লেখা উপন্যাস 'দি ওয়ার্ল্ড সেট ফ্রি' আণবিক বোমার বর্ণনা করেছিলেন, যা প্রায় ত্রিশ বছর পরে আবিষ্কৃত হয়েছে। জুলভার্নের উপন্যাসে সাবমেরিনসহ এমন অনেক কল্পিত যানবাহনের বর্ণনা রয়েছে, যা সেই সময়ে ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয়েছে।
দলের একজন উদ্ভাবক বাস্তিল দিবসের সামরিক অনুষ্ঠানের সময় জনতার সামনে একটি জেট চালিত উড়ন্ত বোর্ডের প্রদর্শনী দেখান।

দৌলতদিয়ার যৌনপল্লি: কৈশোরে পা দেবার আগেই শুরু হয় অন্ধকার জীবন

বাংলাদেশের দৌলতদিয়ার যৌনপল্লিতে মাত্র সাত বছর বয়সী শিশুদেরও যৌন ব্যবসার জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে। বিবিসির সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে এই দৌলতদিয়ার যৌনপল্লিটি বাংলাদেশের লাইসেন্সধারী যৌনপল্লির মধ্যে একটি।
সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সের কোন নারী স্বেচ্ছায় যৌন ব্যবসা করতে চাইলে তাকে স্থানীয় বা আদালতের কাছে আবেদন জানিয়ে অনুমোদন নিতে হয়।
আদালতের হলফনামায় উল্লেখ করতে হয় যে তিনি এই পেশায় স্বেচ্ছায় এসেছেন, কারও চাপের মুখে পড়ে আসেননি।
কিন্তু দৌলতদিয়ার এই যৌনপল্লির অনেক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে তাদের শিশু বয়সেই যৌন পেশায় বাধ্য করা হয়েছিল।
বিবিসির শিক্ষা ও পরিবার প্রতিবেদক ফ্রাঙ্কি ম্যাকক্যামলে সম্প্রতি দৌলতদিয়ার ওই যৌনপল্লিটি ঘুরে দেখতে পান, পল্লির এমন পরিবেশে হাজার হাজার শিশু বেড়ে উঠছে।
যাদের বেশিরভাগ এক পর্যায়ে এই পেশাকেই জীবিকার জন্য বেছে নিচ্ছেন।
আবার অনেককে বাইরে থেকে পাচার করে এনে এই ব্যবসায় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
দৌলতদিয়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যৌনকর্মীকে কয়েক বছর আগে এখানে পাচার করে আনা হয়েছিল। এখন বলতে গেলে এটাই তার স্থায়ী ঠিকানা।
"এখানে যখন আমাকে আনা হয় তখন আমার বয়স ১৯ বছর ছিল। আমার এলাকার একজন আমাকে কাজের কথা বলে এখানে রেখে যায়। আমার পুরো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা এখানে থাকতে বাধ্য করে।" বলেন ওই নারী।
কৈশোরে পা দেয়ার আগে থেকেই যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন আরেক নারী।
এই যৌনপল্লিতেই তার জন্ম এবং নিজের মা'কে তিনি পতিতাবৃত্তি করতে দেখে বড় হয়েছেন।
মাত্র ১১ বছর বয়সে এই পেশায় যুক্ত হন তিনি এবং তার ঘরে প্রথম গ্রাহক ছিলেন মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর।
তিনি চাইলেই এই পল্লি থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু উপার্জনের তাড়নায় তাদেরকে ফিরতেই হয়।
"এখানে থাকতে কি আর ভাল লাগে? এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারলেই তো ভাল। আমি মাঝে মাঝে বাইরে যাই। কিন্তু ফিরে আসতে হয়। কারণ আমার টাকার প্রয়োজন, '' বিবিসিকে তিনি বলেন।

শিশুদের জন্য স্কুল

যৌনপল্লিতে বেড়ে ওঠা এই শিশুদের এমন পরিবেশ থেকে দূরে রাখতে দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে যৌনপল্লিতে বেড়ে ওঠা পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সন্ধ্যাকালীন ক্লাসও রয়েছে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য।
এই শিশুরা যেন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে সেজন্য স্কুলের শিক্ষকরাও কাজ করে যাচ্ছেন।
সেখানকার এক শিক্ষক জানান যে যৌনপল্লিতে জন্ম নেয়া শিশুদের ওপর আশেপাশের পরিবেশের প্রভাব থেকেই যায়। অনেক মেয়ে শিশুই তাদের মায়ের মতোই হতে চাইতো।
এজন্য এই শিক্ষকরা চেষ্টা করেন তাদের কাছে পড়তে আসা শিশুদের দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে।
"অনেক বাচ্চাকে দেখতাম শাড়ি পড়তো, আয়না নিয়ে চেহারা দেখত, মুখে লিপিস্টিক দিতো। তখন আমরা তাকে আদর দিয়ে ভালবাসা দিয়ে বলতাম। সোনা, এই কাজ করা যাবেনা। মা পঁচা কাজ করে। এগুলো কাজ তো আমরা করবো না।" বলেন এক শিক্ষিকা।

সেফ হোম

এছাড়া যাদের সামর্থ্য আছে তাদের তাদের জন্য একটি সেফ হোমের ব্যবস্থা করেছে সংস্থাটি।
সেখানে বর্তমানে ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী ২০জন মেয়ে রয়েছে।
এই সেফ হোমে থাকার প্রধান শর্ত হল, এখানে একবার আসলে তাদের কাউকে আর যৌনপল্লিতে ফিরে যেতে দেয়া হবেনা।
তবে বিবিসির সংবাদদাতা তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কেউই তাদের চেহারা দেখাতে বা পরিচয় প্রকাশে রাজী হননি।
কেননা এই অঞ্চলের নারীরা এখনও বিশ্বাস করেন যে, বাইরের কেউ যদি জানতে পারেন যে তারা এই এলাকায় জন্মেছেন বা বেড়ে উঠেছেন তাহলে তাদেরকে কেউ চাকরি দেবেনা, কেউ বিয়ে করবেনা।
এই সেফ হোমে থাকা একজন নারী এখানে এসেছিলেন যখন তার বয়স নয় বছর ছিল। এখানে তিনি পড়াশোনা শিখেছেন। এখন কাজ করছেন।
কিন্তু যখন তিনি যৌনপল্লি ছেড়ে এসেছিলেন তখন তাকে তার সব বন্ধু বান্ধব ও প্রিয়জনদেরও ফেলে আসতে হয়, যাদের কারও সঙ্গেই এখন তার কোন যোগাযোগ নেই।
কিন্তু তার মতো চাইলে সবাই এই স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ পান না। কেননা এই সেফ হোমে কেবল সীমিত সংখ্যক মেয়েদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বীথির দুর্ভাগ্য

সেফ হোমে জায়গা না পেয়ে বীথি নামে একটি মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছিল সেই বর্ণনাই দেন সেফ হোমে থাকা তার এক বান্ধবী।
"আমাদের পল্লিতে একটা মেয়ে ছিল। আমাদের চাইতে লম্বা আর অনেক সুন্দর দেখতে। তাকে প্রতিনিয়ত চাপ দেয়া হতো যৌনপল্লিতে কাজ করার জন্য,'' তিনি বিবিসিতে জানান।
''সে এগুলো চাইতো না, সেফ হোমে আসতে চাইতো। কিন্তু সেফ হোমে তখন বাচ্চা নেয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওর জায়গা হয়নি।"
"একদিন বীথির মা তার ঘরে জোর করে কাস্টমার ঢুকায় দেয়। এবং ওই রাতেই কাস্টমার বের হয়ে যাওয়ার পরে বীথি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে।" বলেন তিনি।
প্রতি শুক্রবারে এই সেফ হোমে থাকা মেয়েরা তাদের আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান।
অনেক মা-ই চান নিজের মেয়েদের ভবিষ্যত যেন তাদের মতো বিভীষিকাময় না হয়।
এজন্য অনেকেই স্বেচ্ছায় তাদের মেয়েকে এই সেফ হোমে রেখে যান।
"আমি চাই আমার মেয়ে পড়াশোনা করে বড় কিছু হোক, একটা সুন্দর জীবন পাক। তারা যতো উপরে উঠতে পারবে, আমার কাছে ততোই ভাল লাগবে। আমি চাই আমার বাচ্চা বড় হয়ে চাকরি বাকরি করুক। নিজের পায়ে দাঁড়াক, নিজে উপার্জন করুক। এটিই আমি চাই।" জানান একজন মা।
এই মেয়েরাও আশা করেন এই সেফ হোম থেকে পড়াশোনা শেষে চাকরি করে মা'কে নতুন কোন পরিবেশে নিয়ে যাবেন।
"আমি যদি চেষ্টা করে ভালভাবে পড়াশোনা করে নিচের পায়ে দাঁড়াতে পারি, টাকা ইনকাম করতে পারি তাহলে অবশ্যই আমি আমার মাকে বাইরে রাখতে পারবো।"
এই সেফ হোমে প্রতিটি মেয়েকে মাসে একটি খরচ দিতে হয়। এর একটি অংশ দাতব্য সংস্থাটি বহন করলেও বাকিটা আসে মেয়েটির মায়েদের যৌনপল্লির আয় থেকেই।
খদ্দেরের অপেক্ষায়: দৌলতদিয়ার যৌনপল্লির একজন যৌনকর্মী

বাংলাদেশের উপকূলে নজরদারি করবে ভারত

বাংলাদেশের উপকূলে নজরদারি করবে ভারত। এ জন্য ভারতকে উপকূল অঞ্চলে ২০টি নজরদারি রাডার স্থাপনে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এর ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিদ্যমান সম্পর্ক, তাতে আঘাত লাগতে পারে। ভারতীয় মিডিয়া ও স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নৌ-সীমানায় নজরদারি বাড়াতে এবং ভারত-বাংলাদেশ অভিন্ন উপকূলে দৃষ্টি রাখতে এসব রাডার স্থাপন করবে ভারত। বিশেষ করে এ অঞ্চলে চীনা যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতির কারণে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে ভারতীয় মিডিয়া। ভারত সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে শনিবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয় নয়াদিল্লিতে। এরপর দুই দেশের মধ্যে ৭টি চুক্তি ও স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তার মধ্যে অন্যতম উপকূলে নজরদারি বৃদ্ধির জন্য রাডার স্থাপন বিষয়ক চুক্তি।
তবে এখনো এ চুক্তিটির বিস্তারিত জানা যায়নি। ২০১৫ সাল থেকে ভারত মহাসাগরে নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ভারত ৬০০ কোটি রুপির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরই মধ্যে তারা রাডার স্টেশন বসিয়েছে মৌরিতিয়াস, সিসিলি, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে।
বাংলাদেশ উপকূলে ভারতের রাডার স্থাপন প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপ নয় বাংলাদেশ। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের খুবই ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান। এ নিয়ে চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেবে তা ভেবে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। ওদিকে সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন অর রশিদ বলেন, যেসব টার্মস এবং রেফারেন্সের ওপর নির্ভর করে চুক্তিটি করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে নজরদারি ব্যবস্থা। হতে পারে এর মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের চেক করা অথবা গোয়েন্দা কাজে ব্যবহার করা হবে ওই রাডার ব্যবস্থায়। তবে চুক্তিটির এখনো বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কী উপকার পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তিটির বিস্তারিত প্রকাশ করার পরে তা জানা যাবে।
ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত চীনের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে ভারত। কারণ, ওয়ান বেল্ট ওয়াল রোড ইনিশিয়েটিভ অতিক্রম করেছে পকিস্তান, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার মধ্যদিয়ে। আঞ্চলিক পর্যায়ে ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে চীনের ওই প্রকল্প। পারস্য মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারত যে তেল আমদানি করে তার শতকরা ৭০ ভাগের বেশি আসে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে। আর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলবর্তী উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোতে রয়েছে ভারতের শতকরা ৪০ ভাগ বাণিজ্য।
ওদিকে ২০১৩ সালে চীনা দুটি সাবমেরিন কিনেছে বাংলাদেশ। এর সমালোচনা করেছে ভারতীয় মিডিয়া। তারা একে বলেছে, ভারতের জন্য উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড। চীনা প্রযুক্তির সহযোগিতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ করছে। সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ হার্ডওয়্যারের উৎস চীন। তাই চীনের প্রভাব কমাতে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ প্রস্তাব করেছে ভারত। তাদের কাছ থেকে ২০১৭ সালে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সাপ্লাই ক্রেডিট সিস্টেমে সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য এই ঋণ দেয় ভারত। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখনো ওই ঋণ ব্যবহার করেনি।
আগস্টে ওই ঋণ ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই অনুরোধ করেন। সেপ্টেম্বরে ঢাকায় উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে বাংলাদেশকে তথ্য শেয়ার, সরঞ্জাম উৎপাদন ও শিপ বিল্ডিংয়ে আরো সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান ভারতের নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল করমবীর সিং। তিনি ওই সময় বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেন যে, ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য এই অঞ্চল হলো নৌ-সীমানায় যুক্ত থাকার প্রাণকেন্দ্র।

ক্যাসিনো বাদশাহর পতন

ইসমাঈল হোসেন চৌধুরী। রাজনীতিতে এসে নামের সঙ্গে যুক্ত করেন সম্রাট। সময়ের পরিক্রমায় গড়ে তোলেন নিজের সাম্রাজ্য। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জুয়ার আসর, চাঁদাবাজি ছিল তার নেশা আর পেশা। দলীয় তকমা ব্যবহার করে হেন কাজ নেই যা তিনি করতেন না। রাজধানীর ক্লাবে ক্লাবে ক্যাসিনো বাজার গড়ে তোলার নেপথ্য কারিগর এই সম্রাট। মাস খানেক আগে তার নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পেতেন সাধারণ মানুষ। সবসময় কর্মী-সমর্থক ঘেরা অবস্থায় থাকতেন তিনি।
যেখানেই যেতেন সঙ্গে থাকতো গাড়ির বিশাল বহর। দলীয় সভা-সমাবেশে দলীয় প্রধানের নামের পরেই তার নামে স্লোগান হতো। রাজধানীজুড়ে শোভা পেতো তার ব্যানার ফেস্টুন।

কাকরাইল, মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, মালিবাগ এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে গেলেই তাকে দিতে হতো মোটা অঙ্কের চাঁদা। সন্ধ্যার পর টাকার বস্তা নিয়ে সিন্ডিকেটের লোকজন হাজিরা দিতেন তার কাকরাইলের দরবারে। অপরাধ জগতের এই সম্রাটের সম্রাজ্য এখন পতনের পথে। রোববার ভোররাতে র‌্যাবের হাতে পাকড়াও হয়েছে এক সহযোগীসহ। গ্রেপ্তারের পর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়ে তাকে গতকাল রাতে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ও ক্যাসিনো কাণ্ডের অভিযোগে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র‌্যাব জানিয়েছে, সম্রাটের অপরাধ সাম্রাজের প্রতিটি বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। শিগগিরই সম্রাটের গড ফাদার ও পৃষ্ঠপোষকদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। র‌্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান জানান, রোববার ভোর ৫টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামে অভিযান চালায় র‌্যাব। এসময় গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমানকে। র‌্যাব জানিয়েছে, কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন সম্রাট। এরমধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাদের ঢাকায় আনা হয়। র‌্যাব সদর দপ্তরে জিজ্ঞাসাবাদের পর সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে তার কাকরাইলের অফিসে অভিযান চালানো হয়। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে ওই ভবন থেকে বিপুল মাদক, অস্ট্রেলিয়া থেকে অবৈধভাবে আমদানি দুটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া, অবৈধ অস্ত্র ও ছয় রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।

সম্রাটের কাকরাইলের কার্যালয়ে ক্যাঙ্গারুর দুটি চামড়া পাওয়ায় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। এছাড়া গ্রেপ্তারের সময় মদ্যপ থাকায় মাদক আইনে যুবলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। কাকরাইল মোড়ের রাজমনি সিনেমা হলের উল্টো পাশের বহুতল ভুঁইয়া ম্যানশনে সম্রাটের অফিসে পাওয়া গেছে ক্যাঙারুর দুটি চামড়া। এখানেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কার্যালয়। এই ভবনের চার তলাতেই বসেন সম্রাট। সম্রাটের দরবার হিসেবে পরিচিত এই ভবন। সন্ধ্যার পরে অবৈধ খাত থেকে উপার্জিত টাকা নিয়ে এই দরবারে হাজিরা দিতেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনেক কাউন্সিলর, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এই ভবনেই বসতেন সম্রাটের ঘনিষ্ট হিসেবে আলোচিত সংসদ সদস্য নুরুন্নবী  চৌধুরী শাওন। গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সম্রাটকে নিয়ে ওই ভবনে প্রবেশ করে র‌্যাব। র‌্যাবের হেলমেট পড়িয়ে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সম্রাটকে অভিযানে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় কাকরাইলের ওই রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। ভুঁইয়া ম্যানশন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে র‌্যাব, পুলিশ। সাদা পোশাকে অবস্থান নিয়েছিলেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও।

সরজমিনে ওই ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, এর প্রবশে পথে এক পাশে বড় আকারে টানানো রয়েছে যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর ছবি। অন্যপাশে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের ছবি। এর নিচে রয়েছে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ছবি। এছাড়াও দেয়ালজুড়ে যুবলীগ, মহানগর ছাত্রলীগের পোস্টার, ব্যানার। দেয়ালে সাটানো রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা  ও শেখ রেহানার ছবি। সেইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা রচিত বিভিন্ন বইয়ের ছবি রয়েছে দেয়ালে। ভেতরে রয়েছে তার বিশাল অফিস কক্ষ। পাশে একটি বেড রুম। ওই রুমেই বিছানার নিচে পাওয়া গেছে গুলিসহ একটি পিস্তল। বিভিন্ন সংবর্ধনায় তাকে দেয়া ক্রেস্ট, রাজনৈতিক বই ছিল সেখানে। ওই ভবনের চার ও পাঁচ তলা ব্যবহার করতেন সম্রাট। ওই ভবনেই একটি কক্ষ ব্যবহার করা হতো টর্সার সেল হিসেবে। অবাধ্য হলেই জোর করে ধরে এনে বেদম মারধর করা হতো এখানে। দেয়া হতো ইলেকট্রিক যন্ত্রের শক। এরকম দুটি যন্ত্রও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, ওই ভবনে সম্রাটকে নিয়ে প্রবেশের পরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কোথায় কি রেখেছেন এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভুলে গেছেন বলে জবাব দিয়েছেন।

এভাবে কালক্ষেপন করছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাবল দিয়ে কয়েকটি তালা ভেঙ্গে অভিযান চালায় র‌্যাব। কাকরাইলের কার্যালয় ঘিরে অভিযান চলাকাল সেখানে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। উৎসুক মানুষের ভিড়ে সম্রাটের কিছু নেতাকর্মীও সেখানে অবস্থান করেন। সন্ধ্যায় বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হ্যালমেট পড়িয়ে সম্রাটকে ওই কার্যালয় থেকে নামিয়ে আনা হয়। পরে গাড়িতে তুলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে। তাকে নামিয়ে আনার সময় সেখানে অবস্থানরত কিছু নেতাকর্মী স্লোগান দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে র‌্যাব সদস্যরা ধাওয়া দিলে তারা ওই এলাকা ছেড়ে যান। অভিযান শেষে র‌্যাব-১’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম জানান, সম্রাটের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, একটি ম্যাগাজিন, ছয় রাউন্ড গুলি, ১১৬০ পিস ইয়াবা, ১৯ বোতল বিদেশি মদ, বন্যপ্রাণীর দুটি চামড়া ও দুটি ইলেকট্রিক শক দেয়ার মেশিন জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে শান্তিনগরে ১৩৯/১ নম্বর বাড়ির ৫/সি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই বাসায় থাকেন সম্রাটের মা ও ভাইয়ের পরিবার। ওই বাসায় অভিযান চলাকালে কি উদ্ধার করা হয়েছে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। সেখানে অভিযান চল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। একই সময়ে মহাখালির ডিওএইচএস এলাকায় সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরীর বাসায়ও অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই বাসা থেকে কি উদ্ধার করা হয়েছে তাও র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।

ওদিকে সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানের মিরপুরের বাসায় টানা ৫ ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়েছে র‌্যাব। এসময় সম্পত্তির কিছু দলিল ও কয়েক ব্যাংকের চেক জব্দ করা হয়েছে। র‌্যাবের ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক জানান, মিরপুরের সি ব্লকের এই বাড়িতে আরমানের দ্বিতীয় স্ত্রী বিথী বেগম ও চার সন্তান মিলে থাকতেন। আরমান মাঝে মাঝে এখানে যাতায়াত করতেন। তার প্রথম স্ত্রীও এই বাড়িতে মাঝেমাঝে আসতেন। অভিযানকালে বাড়িতে আরমানের স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। সম্রাটের কাকরাইলের অফিসে অভিযান শেষে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, আমরা সম্রাটকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড চাইব। সম্রাট যে ক্যাসিনোর সম্রাট হয়ে উঠেছেন, তার পেছনের গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষক কারা, তাদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

সম্রাটকে ঘিরে কিছুদিন আগেও রমরমা ছিলো এই ভবনটি। ১৮ই সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু হলে গ্রেপ্তার করা হয় সম্রাটের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবলীগের দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। তারপর থেকেই  আতঙ্কে ছিলেন সম্রাট। প্রথম তিন দিন তার কর্মী-সমর্থকরা রাত-দিন ওই ভবন ঘেরাও করে গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করেন। তারপর ওই ভবন থেকে আত্মগোপনে যান সম্রাট। সূত্রমতে, আত্মগোপনে গিয়ে বনানী এলাকায় এক প্রভাবশালীর বাসায় ছিলেন তিনি। অবশেষে কুমিল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বাড়ি ফেনীর পরশুরামে। তার বাবা ফয়েজ আহমেদ ছিলেন রাজউকের কর্মচারী। তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্রাট মেজো। বড় ভাই ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বাদল ও তার ছোট ভাই ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ চৌধুরী। সম্রাটের ক্যাসিনো ব্যবসা দেখাশোনা করতেন তার বড় ভাই বাদল। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে কাকরাইলে সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন সম্রাট। ১৯৯১ সালে যুবলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে পা দেন। অল্পদিনেই প্রভাবশালী হয়ে উঠেন যুবলীগের রাজনীতিতে। ঢাকায় রয়েছে সম্রাটের দুই স্ত্রী। এক কন্যা সন্তান নিয়ে প্রথম স্ত্রী থাকেন বাড্ডায়। তবে সম্প্রতি তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী থাকেন মহাখালীর ডিওএইচএস-এ। দ্বিতীয় স্ত্রী গর্ভজাত তার এক পুত্র সন্তান রয়েছে। সম্রাটের ছেলে লেখাপড়া করেন মালয়েশিয়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সম্রাট ও আরমানকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার: অসামাজিক কার্যকলাপ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও সহসভাপতি এনামুল হক আরমানকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবলীগ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন। সংগঠনের কার্যনির্বাহী সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হারুন রশিদ। সম্রাটের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ছিল। রোববার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে আটক করা হয়। এরপরই তাদের যুবলীগ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

এমন কারণেও মানুষ খুন করা যায়! by সাজেদুল হক

ছেলেটার মুখের দিকে তাকানো যায় না। বিশ্বাস করা যায় না ওকে খুন করা হয়েছে। সত্যি ‍কি তাকে  খুন করা হয়েছে? নাকি আমরা কোন দুঃস্বপ্ন দেখছি। একটু পরেই ঘুম ভেঙে যাবে। জেগে দেখবো না আবরার ফাহাদ মরেনি। ও বেঁচে আছে। সকাল সকাল মায়ের সাথে কথা বলেছে। একটু পরেই ক্লাসে যাবে।
আমাদের দুঃস্বপ্ন কেটে যাবে। তা অবশ্য হওয়ার নয়।
সকালে ঘুম ভাঙতেই শুভ সকাল জানায় বাংলাদেশ। আবরার ফাহাদের হত্যার সংবাদের মধ্যদিয়ে। ছেলেটা নটরডেমের ছাত্র ছিল। পড়তো বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে। যে কোন বিচারেই বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের একজন। এখনও পর্যন্ত যতদূর জানা গেছে, হল ছাত্রলীগের ‘আদালতেই’ কার্যকর হয়েছে তার মৃত্যুদণ্ড! কী অবলীলাতেই না বলে ফেললাম! মুহুর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেলো একজন ছাত্র, একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যত, বর্তমান। সবকিছু শেষ হয়ে গেলো! কিছু অমানুষের হাতে। ভাবা যায় না ওরাও বুয়েটে পড়তো। কী দোষ ছিল ছেলেটির! ফেসবুকে তার একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। একবার দেখা যাক কী লিখেছে সে-১. ৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। ২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব। ৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব। হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
এই লেখার জন্য কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়??? আবরার কখনও দূর কল্পনাতেও ভেবেছিল এই লেখার জন্য তাকে মরতে হবে! একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। গণমাধ্যমে ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্যে যা বুঝা যায়, আবরারের অপরাধ সে শিবিরের পেইজে লাইক দিয়েছিল। তার কাছে তারা আপত্তিকর লেখা পেয়েছে! উপর্যুক্ত স্ট্যাটাসটিই কি তবে আপত্তিকর!
এতো ঠুনকো, সামান্য কারণে কেউ কাউকে হত্যা করতে পারে? অবিশ্বাস্য বললেওতো কম বলা হয়।কোথায় যাচ্ছে এই দেশ, কোথায় যাচ্ছি আমরা! ৫৬ হাজার বর্গমাইলেই অসহায় আবরাররা!ওরা খুন হবে! দুই একদিন হাউকাউ হবে! তারপর সব ঠান্ডা! আবরারকে হত্যার মাধ্যমে এরাতো আসলে সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করলো। অমানুষেরা মানবজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয়।
বুয়েটছাত্র আবরারকে পেটানো হয় ২০১১ নং কক্ষে, লাশ পাওয়া যায় সিঁড়িতে: অভিযোগ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে   -৭ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি আবাসিক হল থেকে আবরার ফাহাদ (২১) নামের এক ছাত্রের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ ভোর ৪টার দিকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নিহত ফাহাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা রোডে। বাবার নাম বরকত উল্লাহ। তিনি বুয়েটের ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিকস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন।
সহপাঠিদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাত ৮টার দিকে শেরে বাংলা হলের এক হাজার ১১ নম্বর কক্ষ থেকে আবরারকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর রাত দুইটা পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা বলছেন, ২ হাজার ১১ নম্বর রুমে নিয়ে তাকে পেটানো হয়।
মারধরের সময় ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু।
তিনি বলেন, আবরারকে শিবির সন্দেহে রাত ৮টার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়।  সেখানে আমরা তার মোবাইলে ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জার চেক করি।  ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেইজে তার লাইক দেয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই। আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুয়েট ছাত্রলীগের উপ দপ্তর সম্পাদক ও  কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজতবা রাফিদ, উপ সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ আইন সম্পাদক অমিত সাহা। পরবর্তীতে প্রমাণ পাওয়ার পরে চতুর্থ বর্ষের ভাইদের খবর  দেয়া হয়। খবর পেয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার সেখানে আসেন। একপর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি। এরপর হয়তো ওরা মারধর করে থাকতে পারে। পরে রাত তিনটার দিকে শুনি আবরার মারা গেছে।
বুয়েটের দায়িত্বরত চিকিৎসক মাসুক এলাহী জানান, রাত ৩ টার দিকে ছাত্রদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শেরেবাংলা হলের ১ম ও ২য় তলার মাঝামাঝি জায়গায় ফাহাদকে পড়ে থাকতে দেখি। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে তার স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে তাকে মৃত দেখা যায়। পরে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়।  সেখানে চিকিৎসকরা তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শেরে বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ বলেন, ডাক্তারের ফোন পেয়ে হলে আসি। এসে ছেলেটির লাশ পড়ে আছে। ডাক্তার জানান ছেলেটি আর নেই। পরে তাকে পুলিশের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। পুলিশ ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। হল প্রশাসনের পক্ষ  থেকে তাদেরকে সব ধরণের সহায়তা করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ফাহাদের এক রুমমেট ঘটনার বিষয়ে বলেন, টিউশনি শেষে রুমে রাত ৯টার দিকে আসি। তখন আবরার রুমে ছিলো না। অন্য রুমমেটদের কাছ থেকে জানতে পারি তাকে ছাত্রলীগের ভাইয়েরা ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে গেছে। পরে রাত আড়াইটার দিকে হলের একজন এসে আবরার আমাদের রুমমেট কিনা জানতে চান। আমি হ্যাঁ বললে সিড়ি রুমের দিকে যাওয়ার জন্য বলেন। পরে সিড়ি রুমের দিকে গিয়ে তোশকের ওপরে আবরার পড়ে আছে। পরে ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করে। 
চকবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন জানান, ভোরে সংবাদ পেয়ে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের উত্তর ব্লকের ২য় তলার সিঁড়ি থেকে ফাহাদের লাশ উদ্ধার করি। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন আছে। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো এক সময় তাকে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলে রাখা রেখেছে কেউ।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর তার মৃত্যুর বিষয়ে আরও ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানান এসআই দেলোয়ার।
লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার কামাল হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, হল প্রশাসনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। এসে ছেলেটির লাশ দেখতে পাই। পরে তা উদ্ধার করে ঢাকা  মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে ডিএমপি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যারা মৃতদেহ নামিয়েছে এবং যারা ফাহাদকে ডেকে নিয়ে গেছে তাদের ফুটেজ পুলিশ খতিয়ে দেখছে বলে জানান তিনি।
কৃষ্ণপদ রায় বলেন, এই ঘটনায় যে-ই জড়িত থাকুক, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে, আবরারের সহপাঠিদের অভিযোগ, বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। রোববার বিকালে তিনি এ ব্যাপারে তার নিজের ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন।
আবরার হত্যা: বুয়েট ছাত্রলীগের ২ নেতা গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে (২১) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ। এরা হলেন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের  সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতাসিম ফুয়াদ। তারা উভয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। আজ সকালে তাদেরকে আটক করা হয়।
এর আগে রোববার রাত তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আবরার ও আটককৃতরা ওই হলের ছাত্র।
তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চকবাজার থানায় নেয়া হয়েছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফুয়াদ ও রাসেল নামে দু’জনকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে।
পুলিশ ও আবরারের সহপাঠি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাতে হলের কক্ষে ছিলেন আবরার। রাত ৮টার দিকে তাকে ২০১১ নং কক্ষে ডেকে নেয় ছাত্রলীগ নেতারা। পরে গভীররাতে তার লাশ ওই হলের সিঁড়িতে পাওয়া যায়। 
সহপাঠিরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আবরার সক্রিয় ছিলেন। লেখালেখি করতেন। এ কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, আবরারের পায়ে ও ঊরুতে আঘাতের চিহ্ন ছিল। আমরা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছি। কারণ বুয়েট একটি সম্মানজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা তদন্ত করছি।
ফেসবুকে যা লিখেছিলেন নিহত বুয়েটছাত্র আবরার
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদের (২১) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ ভোরে ওই হলের সিড়ি থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রোববার গভীর রাতে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। হত্যার আগের দিন তিনি তার নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্ট করেছিলেন।
আবরারের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-
১. ৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল।
যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।
৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

সোনিয়া গান্ধী ও মনমোহনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক: প্রিয়াংকার আপ্লুত আলিঙ্গন

দিল্লি সফরের বিদায়ী দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন সর্ব-ভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ও ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। রোববার দিনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর হোটেল স্যুটে প্রায় আধ ঘণ্টা স্থায়ী ওই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেন তারা। বৈঠকে কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াংকা গান্ধী ভদ্র এবং দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা আনান্দ শর্মাও উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই’র বরাতে এনডিটিভিসহ দিল্লির বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বৈঠকের খবরটি প্রকাশ করেছে। তবে সেখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে স্থান পেয়েছে বৈঠকে উপস্থিত কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াংকা গান্ধি ভদ্রের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরার সচিত্র টুইটটি। ওই ছবিকে ‘পিকচার অব দ্য ডে’ হিসাবেও আখ্যা দিয়েছে অনেক সংবাদ মাধ্যম। পিটিআই’র খবরে বলা হয়েছে- ৬ই অক্টোবর কংগ্রেস নেতারা বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তারা উভয় দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি কথা বলেন।
শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে প্রিয়াংকার আবেগাপ্লুত আলিঙ্গন সংক্রান্ত টুইট বার্তাটি হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে প্রিয়াংকা লিখেন- ‘শেখ হাসিনাজির কাছ থেকে প্রতীক্ষিত আলিঙ্গন পেলাম। দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছিলাম। স্বজন হারানো ও প্রতিকূলতা মোকাবিলায় তার শক্তি এবং যা বিশ্বাস করেন তা অর্জনে সাহস ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে লড়াইয়ের কারণে তিনি আমার বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।’ দিল্লির সংবাদ মাধ্যম এআনআই’র খবরে কংগ্রেস দলের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে বলা হয়- পার্টি সূত্র এএনআইকে বলেছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও শেখ হাসিনার সঙ্গে কংগ্রেস নেতাদের আলোচনা হয়েছে। এএনআই’র রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়- বাংলাদেশে একটানা সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিত্ব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় যখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পান তখন ভারতে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীণ ইউপিএ জোটের সরকার। সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিন দিল্লি কাটিয়েছেন এক সরকারি সফরে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ভারতীয় চ্যাপ্টারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে অংশ নেয়া ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দিল্লিতে দ্বিপক্ষীয় সফর করেন তিনি। সফরের তৃতীয় দিনে গত শনিবার দিল্লির ঐতিহাসিক হায়দারাবাদ হাউজে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সেখানে দুই দেশের সম্পর্কের আগামীর ‘পথ নকশা’ সংক্রান্ত ৫৩ দফা যৌথ বিবৃতি, ৭টি চুক্তি-সমঝোতা এবং ৩টি উন্নয়ন প্রকল্পে যৌথ উদ্বোধন হয়।
শীর্র্ষ বৈঠকে বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি সইয়ের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের ফেডারেল সিস্টেমের প্রসঙ্গ টেনে তার সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এটি নিষ্পত্তির বিষয়ে ফের আশ্বস্ত করেন। বৈঠকে তিস্তার অগ্রগতি না হলেও নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরার সাবরুম এলাকার জন্য ভারত প্রত্যাহার করতে পারবে মর্মে চুক্তি সই হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য এই মুহুর্তের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় আসামের নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে কোন কথা হয়েছে কি-না? তা যৌথ বিবৃতি বা দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের তরফে প্রচারিত কোন বার্তায় স্পষ্ট হয়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব অবশ্য দিল্লিতে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তার ভাষ্য মতে, নিউইয়র্কের পর দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দিল্লির আশ্বাসে ভরসা রাখছে ঢাকা। তবে এনআরসি’র পরবর্র্তী ডেভেলপমেন্টের ওপরও নজর রাখবে বাংলাদেশ।

সম্রাটের ছিল জুয়ার নেশা: -স্ত্রী শারমিন

ক্যাসিনো বাদশাহ সম্রাটকে গ্রেপ্তার করায় খুশি তার স্ত্রী শারমিন চৌধুরী। গতকাল সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর তার ডিওএইচএস-এর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই বাসায় থাকেন শারমিন। অভিযান চলাকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্রাট সম্পর্কে কথা বলেন তিনি। শারমিন বলেন, আমি ওয়েলকাম জানাচ্ছি। কারণ তাকে এত বড় পর্যায়ের নেতা বানানোর পরও সে অপকর্মে কিভাবে জড়িত হয়। এই অভিযান আরো আগে শুরু করলে ভালো হত। আপা এটা আরো আগে করলো না কেন? তিনি বলেন, সম্রাটের বাবা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন।
সম্রাট হঠাৎ করে নেতা হয়নি। এটা আল্লাহ প্রদত্ত। গড গিফটেড। নেতৃত্ব দেয়া একটি গড গিফটেড বিষয়। আপনি আমি চাইলেই পাবো না। সম্রাট তার পদ পদবি সামাল দিতে পারেনি। হাতের মুঠো ভরে টাকা না দিলে এখন মাঠে নেতা কর্মীরা মিটিং মিছিলে আসে না। শারমিন চৌধুরী ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী।
শারমিন বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে উনিশ বছর। আমাদের একটি ছেলে আছে। সে বিবিএ সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে বিদেশে আছে। গত দুই বছর ধরে সম্রাটের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। সে যে গডফাদার এটাও আমি জানি না। আমি জানি সে যুবলীগের ভালো একজন নেতা। উত্তর দক্ষিণের সবাই জানে ও ভালো একজন নেতা। দুই বছর ধরে দূরত্ব থাকার কারণে আমি কিছুই জানি না। সে এত বড় একটি ক্যাসিনো চালায়! তার সম্পদ বলতে কিছুই নেই। ক্যাসিনো চালিয়ে সে যা আয় করে তা দলের জন্য খরচ করে। দল পালে। আর যেটা ওর কাছে থাকে সেটা দিয়ে সিঙ্গাপুর কিংবা এখানে জুয়া খেলে। তার জনপ্রিয়তা দেখে বোঝা যায় সে ক্যাসিনোর টাকা দিয়ে দলের ছেলেদের পালে। তার মতো এতো জনপ্রিয়তা কোন নেতার আছে? আর কোনো নেতার নেই। শুধু একমাত্র ইসমাইল হোসেন সম্রাটের আছে। উত্তরেও একজন নেতা আছে। তার তো এত জনপ্রিয়তা নেই। আমার সঙ্গে সম্রাটের বনিবনা কম ছিল। সে দলের ছেলেদের নিয়ে থাকতে বেশি পছন্দ করতো। ওর নেশা আছে জুয়া খেলার।
আমি সর্বপ্রথম প্রধানমন্ত্রীকে এই অভিযানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেক ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি যদি আরো আগে এই উদ্যোগটি নিতেন তাহলে আরো ভালো হত। সম্রাট সিঙ্গাপুর জুয়া খেলতে যেত। জুয়া খেলা তার নেশা। বাড়ি-গাড়ি, সম্পত্তি ইত্যাদি করা তার নেশা না। টাকা পয়সা যেটা জমাতো সেটা দিয়ে সিঙ্গাপুরে সে জুয়া খেলে শেষ করতো। গত দুই বছর ধরে সে আমাকে সিঙ্গাপুর নেয় না। সিঙ্গাপুরে চায়না এবং মালয়েশিয়া বংশদ্ভুত এক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। সেখানে গেলে ওই নারীর সঙ্গেই সে সময় কাটায়। গত তিন থেকে চার বছর ধরে মূলত ক্যাসিনো চালু করেছে। এর আগে ক্যাসিনো ছিল না। এর আগে সে ঠিকাদারি করতো। দলের সকল নেতাদের সঙ্গে তার কিন্তু ভালো সম্পর্ক আছে। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ক্যাসিনো খালেদকে মাঝে মধ্যে আমি সম্রাটের অফিসে দেখতাম। তবে সম্রাট পছন্দ করতো না আমি কোনো নেতা কর্মীর সঙ্গে প্রকাশ্যে পরিচিত নই। কিংবা রাজনীতি করি না। সে চাইতো আমি সাধারণ গৃহিনী হয়ে থাকি। বিয়ের অনেক পরে আমি তার জুয়া খেলা সম্পর্কে জেনেছি। জুয়া খেলার যে এত বড় বড় জায়গা আছে সেটা আমার মাথায় ছিল না। তাদের পারিবারিক অবস্থা সম্পদের দিক আগে যেমন ছিল এখনও ঠিক তেমনই। শারমিন বলেন, আমি সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী। আমার আগে যাকে বিয়ে করেছেন তার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে। তিনি বাড্ডা থাকতেন।
তিনি বলেন, কাকরাইলে যে ফ্লোরে তার অফিস সেটা তার নিজস্ব অফিস। পুরোটা দখল করা না। তার অফিসের গেটে চেকিং সিস্টেম থাকাতে কেউ ওই অফিসে উঠতে চায়নি। তাই পুরো অফিসটি খালি হয়ে গেছে। তবে যে ফ্লোরে তার অফিস সেটাই শুধু তার নিজের ক্রয় করা। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা হচ্ছে মাসে কয়েকবার কথা হয়। আর মাঝে মধ্যে আমি তার অফিসে যাই। এখানে সে আসে না। কারণ সে ওপেনহার্ট সার্জারির রোগী। তার সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা নিষেধ। তাই আমি কাকরাইলে যাই। ক্যাসিনোর অভিযান শুরু হওয়ার পরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কারণ সে ভাবে আমি বোকা। আমি হয়তো জানলে তার বিষয়ে সত্য কথা বলে দিবো। এটা নিয়ে তার একটা ভয় ছিল।

তিস্তা অধরাই, তবু কেন ভারতকে ফেনী নদীর পানি দিল বাংলাদেশ? by শুভজ্যোতি ঘোষ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান ভারত সফরে তিস্তা নদীর জল ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনও অগ্রগতি না-হলেও আর একটি অভিন্ন নদী ফেনী থেকে ভারতকে জল দিতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ।
দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে সরবরাহ করা হবে, যাতে সেখানে পানীয় জলের প্রয়োজন মেটানো যায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বিবিসিকে বলেছেন, সম্পূর্ণ মানবিক কারণেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভারতের বিতর্কিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি নিয়ে ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে গড়ায়, সে দিকেও বাংলাদেশ সতর্ক নজর রাখছে বলে তিনি জানান।
ফেনী নদীতে যখন বন্যা। ফাইল ছবি
বস্তুত শনিবার প্রায় দিনভর দিল্লিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ও প্রতিনিধিস্তরে যে সব বৈঠক হয়েছে, তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলেই দাবি করছে বাংলাদেশ।
তিস্তার জল ভাগাভাগি নিয়ে কোনও চুক্তি প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের দিল্লি সফরেও হল না, কিন্তু আরও সাতটি অভিন্ন নদীর পানিবন্টনের জন্য দুই দেশ যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করতে রাজি হয়েছে সেটাকে যথেষ্ঠ ইতিবাচক লক্ষণ বলে মনে করছে ঢাকা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব এম শহীদুল হক শনিবার রাতে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, যেহেতু দুদেশের যৌথ নদী কমিশন বা জেআরসি বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে তাই তিস্তা নিয়েও আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ঠ কারণ আছে।
তার কথায়, "যেহেতু যৌথ নদী কমিশন প্রায় ছবছর পর বৈঠকে বসেছে, আগামী বছর আবার বসবে - তাই আমরা কিন্তু আশা করতেই পারি। আর তারা সবগুলো কমন রিভার (অভিন্ন নদী) নিয়েই কাজ শুরু করেছে।"
শনিবার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী মোদী
"আর কমিশন শুধু এই অভিন্ন নদীগুলোর পানিবন্টন না, উন্নয়নের বন্টন নিয়েও ভাবছে। কারণ সারা বিশ্বেই জলসম্পদ এখন আলোচনার একেবারে ওপরের দিকে।"
"সেই পটভূমিতেই আমরা তিস্তা-সহ সব অভিন্ন নদীকেই একটা বৃহত্তর ফ্রেমওয়ার্কে ভাবছি, যেখানে শিপিং থেকে শুরু করে বেসিন ম্যানেজমেন্ট সব কিছু নিয়েই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।"
এদিকে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়াতে এর মধ্যেই অনেকে লেখালেখি শুরু করেছেন, "বাংলাদেশ যেখানে এবারেও তিস্তার পানি পেল না, সেখানে কেন আগ বাড়িয়ে ভারতকে ফেনী নদীর পানি দিয়ে আসা হল?"
বস্তুত ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি দক্ষিণ ত্রিপুরার যে সাব্রুম শহরে বাংলাদেশ পাঠাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেই অঞ্চলে পানীয় জলের সঙ্কট অতি তীব্র।
সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলা ফেনীর পানি পেলে ওই অঞ্চলের মানুষের জলকষ্ট মেটে, ভারতের এই অনুরোধের পটভূমিতেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সম্পূর্ণ মানবিক কারণে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন - জানাচ্ছেন শহীদুল হক।
তিনি বলছিলেন, "আমার মনে হয় মানবিক ইস্যুর সঙ্গে আর কোনও ইস্যুকে মেশানো কিছুতেই ঠিক নয়।
"দক্ষিণ ত্রিপুরার ওই অঞ্চলটাতে খাবার পানি নেই। আর সে কারণেই কিন্তু আমরা পানি দিয়েছি।"
"আর আমরা যদি পানি না-দিতাম, তাহলে কি কারবালার মতো হয়ে যেত না?", পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি।
সাব্রুমে বাংলাদেশ উদারতার পরিচয় দিলেও বিতর্কিত এনআরসি-র প্রশ্নে ভারতের কাছ থেকে পাল্টা কতটা উদারতার পরিচয় পাওয়া যাবে, সেই আশঙ্কা অবশ্য রয়েই গিয়েছে।
ফেনী নদীর বন্যা
বাংলাদেশ জানিয়েছে, এনআরসি-র বিষয়টি দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনাতেও উঠেছিল, এবং বাদ-পড়াদের প্রায় সবাই যে পর্যায়ক্রমে এই তালিকায় ঢোকার সুযোগ পাবেন সেটাও ভারতের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে।
কিন্তু শহীদুল হকের স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, একদিকে যখন ভারতের কোনও কোনও মন্ত্রী বলছেন অবৈধ বিদেশিদের বাংলাদেশেই ডিপোর্ট করা হবে - আর অন্যদিকে দিল্লি এটাকে সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করে, এই 'স্ববিরোধিতা' তাদের ধন্দে ফেলে।
তিনি বলছিলেন, "এই কন্ট্রাডিকশন যেহেতু আমরা তৈরি করিনি, তাই আমি এটাকে অ্যানালাইজ করতে রাজি না।"
"তবে আমি অপেক্ষা করতে রাজি। কী ঘটে দেখাই যাক না! আগে ব্রিজটা আসুক, তারপর আমরা অবশ্যই সেটা পেরেনোর কথা ভাবব", এনআরসি প্রসঙ্গে মন্তব্য করনে তিনি।
এনআরসি নিয়ে ভারতের ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে গড়ায়, সে দিকে তারা সতর্ক নজর রাখছেন বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।
তবে এই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের অস্বস্তি যে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরেও পুরোপুরি কাটল না, সেটাও কিন্তু গোপন নেই।
তিস্তা চুক্তি অধরা রয়ে গেল শেখ হাসিনার এবারের সফরেও

যেভাবে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন

যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্র্রাট। চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্যাসিনোকাণ্ড, মাদক ব্যবসাসহ অসংখ্য অভিযোগ তার নামের পাশে। সম্প্রতি ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে আলোচনায় তিনি। ক্যাসিনো ডনদের গ্রেপ্তারের পর তাদের মুখ থেকে গডফাদার হিসেবে আসে তার নাম। দুই যুগ আগে সাধারণ ওয়ার্ড নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে কাজ শুরু করেন সম্রাট। সম্রাটের বেড়ে ওঠা মতিঝিল আর রমনা এলাকায়। তার বাবা ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মচারী। তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্রাট দ্বিতীয়।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সম্রাটের রাজনৈতিক জীবন শুরু। সেটা ১৯৯০ সাল। সেই সময় তিনি ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রমনা অঞ্চলে সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন। এ কারণে তখন নির্যাতনসহ জেলও খাটতে হয় তাকে। এরপর থেকেই ‘সম্রাট’ খ্যাতি পান কর্মী সমর্থকদের কাছ থেকে। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটের পৈত্রিক নিবাস ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব সাহেবনগর গ্রামে। ১৯৯১ সালে ছাত্রলীগে থাকা অবস্থায় এরশাদের পতনের পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। সে আমলে সম্রাটের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুবলীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ১/১১-এর রাজনৈতিক  প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সময় সম্রাট যুবলীগের প্রথমসারির নেতা ছিলেন। ১৯৯৩ সালে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান সম্রাট।

ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সম্রাট। নিজের ওয়ার্ড সভাপতি লুৎফুর রহমানকে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। কিন্তু ওই ঘটনায় সম্রাটসহ তিনজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। তবে তারপর থেকে মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় সম্রাটের দাপট বেড়ে যায়। যুবলীগের এক নেতা জানান, ২০০৩ সালে যুবলীগের কাউন্সিলে জাহাঙ্গীর কবীর নানক ও মির্জা আজম দায়িত্ব পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্রাটের আসা-যাওয়া বেড়ে যায়। তখনই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান মহিউদ্দিন মহি এবং সাধারণ সম্পাদক হন নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন। সে সময় মহির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে শাওন নিজের হাত শক্ত করতে সম্রাটকে দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। শাওনের বিশ্বস্ত হিসেবেই সম্রাট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা সিটি কর্পোরশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০১২ সালে ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর সম্রাট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হন। সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর আরমানকে সহ-সভাপতি করে নেন তিনি। আরমান কখনোই আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। সম্রাটের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা আরমানও দীর্ঘদিন ধরে ক্যাসিনো কারবারে জড়িত। সূত্র জানায়, সম্রাটের চাঁদাবাজির হাতেখড়ি ২০০১ সালে। সংগঠন চালানোর নামেই চাঁদাবাজিতে নামে তিনি। এ সময় বিভিন্ন অফিসে, বিভিন্ন লোকের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।

ব্যবসায়ীক মহলের যোগাযোগ গড়ে ওঠে তার। এক এগারোর সময় আওয়ামী লীগের সিনিয়র অনেক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ট হন সম্রাট। এ সময় দল পরিচালনা করা, যুবলীগের ঢাকা মহানগরীকে ঠিক রাখার দায়িত্ব নেন সম্রাট। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে রাতারাতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট বড় ফ্যাক্টরে পরিণত হন। বিশেষ করে মতিঝিল পাড়ায় তার একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়। দ্রুতই মতিঝিল পাড়া তার দখলে চলে যায়। এই সময়েই তার সঙ্গে সিঙ্গাপুরের কানেকশন হয়। সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো বাণিজ্য এবং নানারকম ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। একদিকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির কাঁচা টাকা অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের হাতছানি দুইয়ে দুই মিলিয়ে সম্রাট নগরীতে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। সম্রাট সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে অর্থ উপার্জনের দিকেই বেশি মন দেন। এজন্য গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী।

কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর: বিশ্বকে কী বার্তা দিতে চায় চীন? by এডওয়ার্ড অং

মাও সেতুংয়ের প্রকাণ্ড প্রতিকৃতির উপরে বানানো হয়েছে বিরাট মঞ্চ। সেখান থেকেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিচের রাজপথে তাকিয়ে দেখছেন, মহড়ায় প্রদর্শনের জন্য একের পর এক ভয়ালদর্শন সব সমরাস্ত্র আসছে। চীনে কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর উপলক্ষে এ ছিল যেন পেশী শক্তির মহড়া। কী ছিল না সেখানে? আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যাতে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র বহন করা যাবে। ছিল ড্রোন যেটি হামলা চালাতে পারবে নিখুঁতভাবে। সবুজ ইউনিফর্মধারী সৈন্যদের বহনকারী অজস্র ট্যাংক ও আর্মার্ড পারসনেল ক্যারিয়ার। বর্তমান যুগে বৈশ্বিক মঞ্চে চীনের উপস্থিতি ব্যাপক। ফলে ওয়াশিংটন, মস্কো বা হ্যানয়, বিদেশিরা খুবই সতর্কভাবে এ ধরনের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করেন।
তারা জানতে চান শি জিনপিংয়ের  প্রকৃত উদ্দেশ্য আসলে কী। তারা বুঝতে চান, অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে চীন রাজনৈতিক ও সামরিক হুমকি কিনা। মঙ্গলবার যে উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হলো কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর তার মধ্য দিয়ে চীন কিন্তু স্পষ্ট এক বার্তা দিয়েছে।
এই মহড়ার পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিকায়নের মধ্য দিয়ে শি জিনপিং ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বিশ্বকে বলতে চান- আমরা লড়াই করতে প্রস্তুত, যা কিছু আমাদের, তা দখলে নিতে বা রক্ষা করতে আমরা প্রস্তুত। তারা দেখাতে চায় যে, উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপিয়ান শক্তিধর দেশগুলো ও জাপান যে চীনকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে, আজকের চীন তা নয়। তবে চীনের নেতারা তাদের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সীমারেখাও কিছুটা বুঝতে পারছেন। বিশ্বজুড়ে চীনের শীর্ষ কূটনীতিকরা উত্তেজনা নিরসনের চেষ্টা করছেন। স্বাগতিক দেশকে তারা বোঝাতে চান যে চীন কোনো আগ্রাসনকারী নয়।
উত্তেজনা নিরসন হলেই প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধ সমাপ্তির পথে সহায়ক হবে। চীনের বৈশ্বিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে নেয়া বিভিন্ন নীতি দমানো সম্ভব হবে। হংকং, শিনজিয়াং ও তিব্বতে চীনের অবস্থানের সমালোচনা করেছে যেসব সরকার, তাদের শান্ত করা যাবে।
চীনা নেতৃত্ব স্থানীয় ও কূটনৈতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে মরিয়া। দ্বিমুখী বার্তা দেয়া হলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা মাঠে মারা যাবে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে দুর্বল হিসেবে আবির্ভূত হলে, স্থানীয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে নিজের ভাবমূর্তি পোক্ত করার যেই প্রচেষ্টা, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ এশিয়া পরিচালক ইভান এস মেডেইরস বলেন, ‘চীনের কূটনীতি হলো নানাবিধ পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্যের মধ্যে সার্বক্ষণিক ভারসাম্য রক্ষা। কিন্তু সঠিক ভারসাম্য অর্জনে অতটা সফল নয় তারা।’
শি জিনপিংয়ের ৪ বছরের শাসনামলে এটি দ্বিতীয় সামরিক মহড়া। অথচ, মাও সেতুংয়ের পর কোনো দলীয় নেতা এই মহড়া দেখানোর চেষ্টা করেন নি। তিনি মঙ্গলবার নিজের বক্তব্যে, মাও সেতুংয়ের বিখ্যাত একটি উদ্ধৃতি পুনরাবৃত্তি করেন- ‘চীনের জনগণ উঠে দাঁড়িয়েছে।’ কিন্তু এই উদ্ধৃতিকেই যেন তিনি একধাপ এগিয়ে নিলেন- ‘এই মহান জাতির মর্যাদা নড়বড়ে করতে পারে এমন কোনো শক্তির অস্তিত্ব নেই। কোনো শক্তিই চীনের জনগণ ও জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আটকাতে পারবে না।’
এই সামরিক মহড়ার তাবৎ আয়োজন চীনা জনগণকে ঘিরে। কিন্তু এই অনুষ্ঠান থেকে বাইরের বিশ্বের জন্যও আছে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অন্তত বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর চায়না’র উপ-পরিচালক অধ্যাপক চেং শিয়াওহে এমনটাই মনে করেন। তার মতে মূল বার্তা হলো- ‘যদি চীনকে কোনো যুদ্ধে যেতেই হয়, সেজন্য চীন প্রস্তুত। চীনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ যারা চ্যালেঞ্জ করবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে চীন পিছপা হবে না।’
বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডংফেং-৪১ যেভাবে উন্মোচন করা হয় এই মহড়ায়, তাতে এই বক্তব্যই ফুটে উঠে। চীনের রাষ্ট্র-মালিকানাধীন জাতীয়তাবাদী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রধান সম্পাদক হু শিজিন নিজেও তার গর্বের কথা লুকাতে পারেন নি। ডংফেং-৪১ মিশাইলের পাশ দিয়ে কালো সেডানে চড়ছেন শি জিনপিং, এমন একটি ছবি শেয়ার দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘৪ বছর আগে যখন এটি তৈরি হচ্ছিল, তখন আমি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি ছুঁয়ে দেখেছিলাম। এটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্রেফ একে শ্রদ্ধা করুন। শ্রদ্ধা রাখুন চীনের প্রতি যারা এর মালিক।’
পরের টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘এগুলো থেকে বার্তা হলো, চীনা জনগণের সঙ্গে ঝামেলা করো না বা ভয় দেখিও না। কিন্তু চীনা জনগণ তোমাদের উস্কানি দেবে না।’
এই মহড়া থেকে যেন ওয়াশিংটনের উদ্বেগের প্রতিধ্বনিই উঠে এলো। ট্রাম্প প্রশাসনের মন্ত্রিসভার সদস্যরা, বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইতিমধ্যেই বলছেন যে, চীন পশ্চিমের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর আধিপত্য করতে চায়। শি জিনপিংয়ের ঘোষণা এবং হংকং, শিনজিয়াং ও তিব্বতে তার সরকারের কড়া নীতি পশ্চিমের এই ধারণাই জোরদার করে যে, পশ্চিমা কাঠামো ও মূল্যবোধের প্রতি চীন আক্রমণাত্মক এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
কিন্তু গত সপ্তাহেও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে এক নৈশভোজে ভিন্ন বার্তাই দিতে চাইলেন। তিনি বলেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ফের একটি কঠিন জায়গায় এসে হাজির হয়েছে। কিছু মানুষ আছে যারা যেকোনো উপায়ে চীনকে বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখাতে চায়। নিজেদের ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করে বড়াচ্ছে যে, এই সম্পর্ক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কিন্তু সত্য হলো যে, গত ৪০ বছরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশই ভীষণ লাভবান হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে গেম অব থ্রোন্স খেলার কোনো ইচ্ছা চীনের নেই।’
নিজের বক্তব্যে ‘থুসিডাডস ফাঁদ’ নামে একটি তত্ত্বের কথাও উল্লেখ করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই তত্ত্ব্ব মূলত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাহাম অ্যালিসনের, যার মূল কথা হলো, উদীয়মান শক্তি ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে যুদ্ধ অনেকটা অবশ্যম্ভাবী। শি জিনপিং নিজেও এই তত্ত্বের কথা নিজের বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন ও জোর দিয়ে বলেছেন এই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে চান তিনি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেডেইরোস অবশ্য বলছেন, ‘চীন এখনো ভালো করে বুঝতে পারছে না যে অন্যান্য দেশ তাকে কীভাবে দেখে। কেবল ভালো সংবাদ পেতেই চীন অভ্যস্ত, খারাপ সংবাদ নয়। অথচ, দেশটির আচরণ থেকে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে প্রচুর। নিজের রাজনৈতিক কাঠামোর কারণেই হয়তো চীন কৌশলগত সংযমের নীতি গ্রহণে অপারগ।’
তবে নব্বইয়ের দশকেও চীনা নেতারা এমন ছিলেন না। যেসব বিদেশি কর্মকর্তা ‘চীনা হুমকি তত্ত্ব’ প্রচার করতেন, তাদের কাছে চীনা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলতেন যে, চীন স্রেফ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি চায়না সেন্টারের চেয়ার সুসান এল শার্ক বলেন, ‘এরপর অবশ্য তারা বুঝতে পেরেছে যে, কেবল তাদের মুখের কথা শুনেই সবাই তাদের বিশ্বাস করবে না। তাদেরকে বন্ধুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য প্রমাণ করে এমন কাজ করে দেখাতে হবে।’
অন্তত ২০০৮ সাল পর্যন্ত চীন আশ্বস্ত ও সংযমের নীতিতে চলে। তখন দক্ষিণ চীন সাগরে কী নিয়ম মেনে চলা হবে, সেই সম্পর্কিত একটি বিধিতে সই করে চীন। আমেরিকান নেতৃত্বকে বিঘ্নিত না করে বহুদেশীয় বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দেয়। এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব দেয়। সুসান শার্ক বলেন, এখন অবশ্য শি জিনপিং সব ধরনের সংযম প্রদর্শনের পথ পরিত্যাগ করেছেন। তারা এখনো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের কথা বলে। কিন্তু বেইজিংয়ের কর্মকাণ্ড মোটেই আশ্বস্ত করার মতো নয়। ফলে ‘চীনা হুমকি তত্ত্ব’ ফের ফিরে এসেছে আলোচনায়।’
সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টারের করা এক জরিপে দেখা গেছে, বহু পশ্চিমা ও এশিয়ান দেশে চীন নিয়ে বৈশ্বিক মতামত ক্রমেই খারাপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ মানুষই চীনকে নেতিবাচকভাবে দেখে। ২০১৮ সালে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ।
তবে কিছু চীনা কর্মকর্তা এখনো চান মতপার্থক্য গুছিয়ে নিতে। যেমন, মার্কিন বিলয়নিয়ার মাইকেল ব্লুমবার্গ এবার চীনে নিজের নিউ ইকোনমি ফোরাম আয়োজন করার অনুমতি পেয়েছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে তাকে চীন থেকে সরিয়ে সিঙ্গাপুরে করতে হয়েছিল এই আয়োজন।
প্রশ্ন রয়েই গেছে আদৌ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কিনা। আগামী সপ্তাহেই ওয়াশিংটনে বসছে দুই দেশের কর্মকর্তারা। বিদেশি কর্মকর্তারা এ নিয়েও উদ্বিগ্ন যে, সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হবে চীন।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেসিকা চেন ওয়েইস বলেন, ‘চীনা সরকার প্রকৃতপক্ষে বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে স্থানীয় জনগণকে মুগ্ধ করতেই বেশি আগ্রহী। কিন্তু জাতীয় শক্তিমত্তা ও উত্তেজনাকর বাগাড়াম্বর যদি জনগণ বেশি গ্রহণ করে, তাহলে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে যদি বিদেশি প্রতিপক্ষরাও উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।’ তার মতে, ‘চীন সরকার আসলে খুব সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। ঘরে তারা শক্তিমত্তার জানান দিতে চায়। আবার বিদেশি শক্তিতে আশ্বস্ত করতে চায় যে, চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি কোনো হুমকির কারণ নয়।’

(নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত)

বাংলাদেশ উপকূলে ভারতের নজরদারি, চীনের সঙ্গে সম্পর্কে আঘাতের আশঙ্কা

বাংলাদেশের উপকূলে নজরদারি করবে ভারত। এ জন্য ভারতকে উপকূল অঞ্চলে ২০টি নজরদারি রাডার স্থাপনে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এর ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিদ্যমান সম্পর্ক আছে, তাতে আঘাত লাগতে পারে। ভারতীয় মিডিয়া ও স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নৌসীমানায় নজরদারি বাড়াতে এবং ভারত-বাংলাদেশ অভিন্ন উপকূলে দৃষ্টি রাখতে এসব রাডার স্থাপন করবে ভারত। বিশেষ করে এ অঞ্চলে চীনা যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতির কারণে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে ভারতীয় মিডিয়া।
ভারত সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে শনিবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয় নয়া দিল্লিতে। এরপর দুই দেশের মধ্যে ৭টি চুক্তি ও স্বারক স্বাক্ষরিত হয়। তার মধ্যে অন্যতম উপকূলে নজরদারি বৃদ্ধির জন্য রাডার স্থাপন বিষয়ক চুক্তি।
তবে এখনও এ চুক্তিটির বিস্তারিত জানা যায় নি। ২০১৫ সাল থেকে ভারত মহাসাগরে নৌ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ভারত ৬০০ কোটি রুপির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরই মধ্যে তারা রাডার স্টেশন বসিয়েছে মৌরিতিয়াস, সিসিলি, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে।
বাংলাদেশ উপকূলে ভারতের রাডার স্থাপন প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপ নয় বাংলাদেশ। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের খুবই ভাল সম্পর্ক বিদ্যমান। এ নিয়ে চীন কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেবে তা ভেবে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। ওদিকে সাবেক সেনাপ্রধান এম হারুন অর রশিদ বলেন, যেসব টার্মস এবং রেফারেন্সের ওপর নির্ভর করে চুক্তিটি করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে নজরদারি ব্যবস্থা। হতে পারে এর মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের চেক করা অথবা গোয়েন্দা কাজে ব্যবহার করা হবে ওই রাডার ব্যবস্থা। তবে চুক্তিটির এখনও বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কি উপকার পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তিটির বিস্তারিত প্রকাশ করার পরে তা জানা যাবে।
ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত চীনের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে ভারত। কারণ, ওয়ান বেল্ট ওয়াল রোড ইনিশিয়েটিভ অতিক্রম করেছে পকিস্তান, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার মধ্য দিয়ে। আঞ্চলিক পর্যায়ে ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে চীনের ওই প্রকল্প। পারস্য মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারত যে তেল আমদানি করে তার শতকরা ৭০ ভাগের বেশি আসে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে। আর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলবর্তী উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোতে রয়েছে ভারতের শতকরা ৪০ ভাগ বাণিজ্য।
ওদিকে ২০১৩ সালে চীনা দুটি সাবমেরিন কিনেছে বাংলাদেশ। এর সমালোচনা করেছে ভারতীয় মিডিয়া। তারা একে বলেছে, ভারতের জন্য উস্কানিমূলক কর্মকান্ড। চীনা প্রযুক্তির সহযোগিতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ করছে। সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ হার্ডওয়্যারের উৎস চীন। তাই চীনের প্রভাব কমাতে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ প্রস্তাব করেছে ভারত। তাদের কাছ থেকে ২০১৭ সালে সম্পাদিত সমঝোতা স্বারক অনুযায়ী সাপ্লাই ক্রেডিট সিস্টেমে সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য এই ঋণ দেয় ভারত। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখনও ওই ঋণ ব্যবহার করে নি।
আগস্টে ওই ঋণ ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই অনুরোধ করেন। সেপ্টেম্বরে ঢাকায় উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে বাংলাদেশকে তথ্য শেয়ার, সরঞ্জাম উৎপাদন ও শিপ বিল্ডিংয়ে আরো সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান ভারতের নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল করমবীর সিং। তিনি ওই সময় বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেন যে, ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য এই অঞ্চল হলো নৌসীমানায় যুক্ত থাকার প্রাণকেন্দ্র।

যেভাবে সুন্দরবনে বাঘগণনা by চৌধুরী আকবর হোসেন

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘ রয়েছে ১১৪টি। (ছবি: রয়টার্স)
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এই ম্যানগ্রোভ বনে বর্তমানে বাঘ রয়েছে ১১৪টি। ২০১৫ সালের জরিপে এ সংখ্যা ১০৬ বলা হয়েছিল। বন অধিদফতরের সঙ্গে যৌথভাবে জরিপ করেছে ওয়াইল্ড টিম, যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়াম কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউট। তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রশ্ন হলো, ভয়ংকর এই বন্যপ্রাণী কীভাবে গোনা হয়?
গতবারের মতো এবারও ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ গোনা হয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিং কী, কীভাবে এটি কাজ করে কিংবা এ কাজে সময়ই বা লাগে কত দিন?
বন অধিদফতর জানিয়েছে, ইউএস এইডের আর্থিক সহযোগিতায় Bengal Tiger Conservation Activity (BAGH) প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং-এর মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ শুরু করা হয় ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত চারটি ধাপে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা, খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জের তিনটি ব্লকের ১ হাজার ৬৫৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ পরিচালনা করা হয়। মোট ২৪৯ দিন জরিপ পরিচালনা করা হয়।
গণনার কাজে ৪৯১টি Cudde back ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।
গণনার কাজে ৪৯১টি Cudde back ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।
বাঘ জরিপের সময় ওয়াইল্ড টিমের ওয়াইল্ড লাইফ টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেন মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘গণনার কাজে ৪৯১টি Cudde back ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। চার ধাপে ২৪৯ দিন সময় নিয়ে এই জরিপ হয়েছে। সুন্দরবনে জরিপে কাজ করছেন ৮৫ জন। জরিপে বাঘের ২ হাজার ৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়।’
শামসুদ্দোহা বলেন, ‘বাঘ যেসব এলাকায় থাকে, যেসব স্থান দিয়ে চলাচল করতে পারে সম্ভাব্য সেসব স্থানে ক্যামেরা বসানো হয়। ক্যামেরাগুলো টানা ৪৫ দিন সচল থাকে। ১০-১৫ দিন পরপর আমরা ক্যামেরার মেমোরি কার্ড, ব্যাটারি পরিবর্তন করা হতো।’
ছবি দেখে কীভাবে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় করা হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে শামসুদ্দোহা বলেন, ‘মানুষের হাতের আঙুলের ছাপ যেমন সবার ভিন্ন ভিন্ন হয়, সেরকম বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগও আলাদা হয়।’
বাঘের ডোরাকাটা ছাপের বিশ্লেষণ করে তাদের পৃথক করা সম্ভব মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘Spatially explicit capture recapture (SECR) পদ্ধতিতে ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে প্রতিটি বাঘ শনাক্ত করা হয়। এরপর প্রতিটি বাঘ কতগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্যামেরায় কতবার ধরা পড়ছে তার ওপর ভিত্তি করে একটা তালিকা তৈরি করা হয়। সেই তালিকা ব্যবহার করে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
জরিপে বাঘের ২ হাজার ৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়। (ছবি: রয়টার্স)
জরিপে বাঘের ২ হাজার ৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়। (ছবি: রয়টার্স)
সুন্দরবনে বাঘের মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে শামসুদ্দোহা বলেন, ‘বেশ কয়েকবারই বাঘের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল, বাঘকে আতংকিত না করলে কোনও ক্ষতি হবে না। ফলে বাঘের খুব কাছাকাছি আসলেও বিপদ হয়নি।’
জরিপের কাজে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ক্যামেরা চুরি হয়েছিল বলে জানান শামসুদ্দোহা। বলেন, ‘কারা নিয়েছে সেটি আমরা ধরতে পারিনি। তবে কয়েকটি ক্যামেরা চুরি হয়।’
সুন্দরবনের ডাকাতের উৎপাত বা অন্য কোনও ঝামেলায় পড়েছিলেন কিনা, জানতে চাইলে শামসুদ্দোহা বলেন, ‘প্রথমেই আমরা একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, আমাদের কাজ বাঘগণনা, অন্যকিছু নয়। ফলে ডাকাত বা জলদস্যু আমাদের কোনও টার্গেট নয়। সে কারণে খুব বেশি একটা বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়নি।’
জরিপে রিসার্চ অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন আবু সাঈদ নিশান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমে আমাদের কাজ ছিল বাঘের পায়ের ছাপ, মলমূত্র দেখে শনাক্ত করা। পরে যেসব পথে বাঘের চলাচলের বেশি সম্ভাবনা, সেসব স্থানে ক্যামেরা বসানো হয়। বসানোর সময় মাথায় রাখতে হয়েছিল, ক্যামেরা এমনভাবে বসানো হয় যাতে সাইড থেকে পুরো ভাগের ছবি যেন আসে। কারণ শরীরের পুরো অংশে ডোরাকাটা ছাপের ছবি না আসলে কোনও ফলাফল পাওয়া যাবে না।’
বাঘের পায়ের ছাপ
বাঘের পায়ের ছাপ
আবু সাঈদ নিশান বলেন, ‘আমরা সুন্দরবনে বড় একটি লঞ্চে সবাই থাকতাম। বনের ভেতরে যেতাম ছোট ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে। কাজ শেষে আবার লঞ্চে ফিরতাম। আমাদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষজনও ছিলেন, তারা আমাদের বনের ভেতরে পথ চিনতে সহায়তা করেছেন।’
বন অধিদফতর জানিয়েছে, জরিপে ক্যামেরা ট্র্যাপিং-এ ৬৩টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ, ৪টি জুভেনাইল বাঘ এবং ৫টি অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাঘের সর্বমোট ২ হাজার ৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়। SECR মডেলে তথ্য বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বাঘের আপেক্ষিক ঘনত্ব পাওয়া যায় ২.৫৫+০.৩২। সুন্দরবনে বাঘের বিচরণক্ষেত্র ৪ হাজার ৪৬৪ কিলোমিটার এলাকাকে আপেক্ষিক ঘনত্ব দিয়ে গুণ করে বাঘের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে ১১৪টি। এ হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৮টি বেড়েছে। ব্লক অনুযায়ী বাঘের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শরণখোলা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি (৩.৩৩ বাঘ/১০০ বর্গ কিলোমিটার) এবং খুলনা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে কম (১.২১ বাঘ/১০০ বর্গ কিলোমিটার)। ২০১৫ সালে সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং-এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাঘ গণনার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। সে হিসাব অনুযায়ী বাঘের ঘনত্ব ছিল প্রতি ১০০ বর্গ কিলোমিটারে ২.১৭টি এবং মোট বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি।

অপরূপ জলজ নিসর্গ আড়িয়াল বিল by তানজিল হাসান

নৌকা বা ট্রলারে খাল ধরে সামনে এগোচ্ছেন। দু’পাশে গ্রাম। যেতে যেতে চলে এলেন বিশাল জলরাশির বুকে। যেন মিঠা পানির এক সমুদ্র! কোথাও ভেসে আছে কচুরিপানা। কোথাও রাশি রাশি সাদা শাপলা। কিছুক্ষণ পরপর চোখে পড়বে ভেসাল জাল দিয়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। কখনও পাশ দিয়ে ঢেউ তুলে চলে যেতে পারে মালবাহী ছোটবড় ট্রলার।
জলরাশির দিকে তাকালে পানির রঙ কখনও নীল, কখনও সাদা, কখনওবা কালো মনে হবে। শ্রাবণের আকাশের সঙ্গে রঙ বদলায় জল। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি নামে, আবার রোদ ঝকঝক করে ওঠে। কালো মেঘের ছোটবড় ভেলা চেনা পরিবেশের বাইরে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কল্পনার জগতে। আড়িয়াল বিলের এই অপার সৌন্দর্য তুলনাহীন। এ যেন অপরূপ জলজ নিসর্গ।
মূহূর্তে বদলে যাওয়া চারপাশের প্রকৃতির রঙ মনে দোলা দেয়। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য দু’চোখ ভরে উপভোগ না করলে বোঝা যায় না। ঢাকার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলা এবং মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও সিরাজদিখান জুড়ে বিস্তৃত আড়িয়াল বিল। এখানে এলেই ভ্রমণপ্রেমীরা হারিয়ে যান প্রকৃতির মাঝে। দূরের কোনও গ্রামের প্রতিচ্ছায়ায় আটকে থাকে দৃষ্টি।
জলরাশিতে ভাসতে ভাসতে চোখ মেলে তাকালে আকাশটা বিশাল লাগে। মনে হতে পারে, এত বড় আকাশ কতদিন দেখা হয়নি! নৌকা থেকে নেমে ডেঙ্গায় হেঁটে বেড়ালে মন্দ লাগবে না। আড়িয়াল বিলে রয়েছে অনেক ডেঙ্গা। এগুলো মূলত বিশাল আকৃতির দীঘি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো সাগরদীঘি। এগুলো প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।
মাছের মধ্যে আড়িয়াল বিলের সরপুঁটি ও কই বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। এছাড়া শিং, মাগুর, রুই, কাতলা, বোয়াল, পুঁটি ও টেংরা মাছসহ প্রায় সব দেশি মাছ পাওয়া যায় এতে। এখানকার প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন মাছের পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে ডেঙ্গায় মাছ চাষ হয়। সংগৃহীত মাছ সরবরাহ হয় ঢাকাসহ আশেপাশের জেলাগুলোতে। দীঘির পাড়ে আছে বৃক্ষরাজি।
হিজল, নারিকেল, বরুণ, মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছ দেখা যায়। বিলে মাঝে মধ্যে উড়ে বেড়ায় কানিবক, মাছরাঙা, পাতিহাঁস, শঙ্খচিল, ডাহুক পাখি। বিলের পাশের গ্রামে বাবুই পাখিরও দেখা মিলবে। শোনা যায়, অতীতে আড়িয়াল বিলে কালিম পাখি দেখা যেতো। তবে অতিথি পাখি খুব একটা দেখা যায় না।
সবজি হিসেবে বাজারে আড়িয়াল বিলের শাপলা কেনাবেচা হয়। স্থানীয়দের অনেকে বিল থেকে এটি তোলে। ঢাকা থেকে ব্যবসায়ীরা সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। বিলে এলেই চোখে পড়বে স্থানীয় অনেকে শাপলা তুলছেন। কেউ একমনে শাপলা গোছাতে ব্যস্ত। মূলত তারা কৃষক। বর্ষা মৌসুমে ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত তারা শাপলা তোলেন।
অম্বিকাচরণ ঘোষ ও যোগেন্দ্র নাথ গুপ্ত রচিত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থে আড়িয়াল বিলের দৈর্ঘ্য পূর্ব-পশ্চিমে ১২ মাইল ও প্রস্থ দক্ষিণে ৭-৮ মাইল উল্লেখ করা হয়েছে। আড়িয়াল বিলের দক্ষিণ প্রান্তে মইজপাড়া ও কোলাপাড়া, উত্তরে শ্রীধরখোলা, বারুইখালি ও শেখেরনগর। পশ্চিমে নারিশা গ্রাম, পূর্বে দয়হাটা, হাসাড়া গাদিঘাট ও প্রাণীমণ্ডল বা পরানিমণ্ডল প্রভৃতি গ্রাম।
ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় ও বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আড়িয়াল বিল। অনেকের অনুমান, রাজশাহীর চলনবিল ও ঢাকা-মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলেই অতি প্রাচীনকালে গঙ্গা ও ব্রক্ষপুত্রের সঙ্গম হয়েছিল। পরে উভয় নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের কারণে এই স্থান শুকিয়ে বিলে পরিণত হয়। আড়িয়াল বিলের আরেক নাম ‘চূড়াইন বিল’। একসময় বর্ষায় এতে কুমির দেখা যেতো।
বিলের মধ্যে এখানে-সেখানে উঁচু মাটির ঢিবিতে ঘরবাড়ি দেখা যায়। বর্ষাকালে বিলে পানি টইটম্বুর থাকলে মনে হয়, বাড়িগুলো দ্বীপের মতো ভেসে আছে! তখন যাতায়াতের একমাত্র উপায় হয়ে ওঠে কোষা নৌকা। বর্ষার আগে ধান কেটে ঘরে তোলেন কৃষক। বিলের পাশের গ্রামগুলোতে খড়ের গাদা দেখা যায়– কারও বাড়ির উঠানে, কোথাও রাস্তার পাশে, আবার কোথাও বিলের পাশের উঁচু জমিতে।
আড়িয়াল বিলের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বর্ষায় অনেক পর্যটক সমাগম হয়। বর্ষায় দেখতে বেশি মনোমুগ্ধকর হলেও এই বিলের সৌন্দর্য শীতেও কম নয়। আড়িয়াল বিলে ধান চাষ বেশি হয়। তবে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ঢেঁড়স, পটলসহ বিভিন্ন রকম সবজি উৎপন্ন হয়। ফলে বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলের মাঠ নিশ্চিতভাবে সবার মন কাড়ে।
যেভাবে আসবেন
ঢাকার গুলিস্তান থেকে মাওয়াগামী বিআরটিসি ও ইলিশ পরিবহনসহ বেশকিছু বাস রয়েছে। ভাড়া নেবে ৯০-১২০ টাকা। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের শ্রীনগরের ছনবাড়ি চৌরাস্তায় বাস থেকে নেমে অটোরিকশা নিয়ে যেতে হবে গাদিঘাট গ্রাম। সেখান থেকে বিল দেখা যায়। অথবা শ্রীনগর বাজার থেকে ট্রলার ভাড়া নিয়ে বিল ঘুরে দেখা যাবে। ঢাকা থেকে সকালে রওনা দিয়ে আড়িয়াল বিলে বেড়িয়ে আবার বিকালের মধ্যে ঢাকায় ফেরা যায়। দুপুরে খাবারের উদ্দেশে মাওয়াতেও বেড়িয়ে আসতে পারেন। শিমুলিয়া ঘাটে নিতে পারেন তাজা ইলিশের স্বাদ।
>>>ছবি: বাংলা ট্রিবিউন