Showing posts with label হংকং. Show all posts
Showing posts with label হংকং. Show all posts

Wednesday, August 19, 2026

নার্সের ভুলে ‘ব্রুস লি’, রাস্তায় মার খাওয়া ছেলেটিই কুংফুর রাজা

১৯৪০ সালের ২৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর চায়নাটাউনের এক হাসপাতালে জন্ম নেয় এক হালকা-পাতলা শিশু। জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে যায় এক কাকতাল—মা গ্রেস ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘ইউমেন ক্যাম’; কিন্তু হাসপাতালের নার্স নামটি ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারায় বার্থ সার্টিফিকেটে লিখে ফেলেন অন্য এক নাম ‘ব্রুস লি’। মা–বাবা আপত্তি করেননি, নাম বদলানোর কথাও আর ওঠেনি। তখন কি ভেবেছিলেন, এই নামই একদিন হয়ে উঠবে বিশ্ব চলচ্চিত্র ও মার্শাল আর্টের ইতিহাসের প্রতীক—পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক দূরত্ব ভাঙার এক নীরবকিন্তু প্রবল শরীরী ভাষা!

যদিও জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে, তবে ব্রুস লির পারিবারিক শিকড় ছিল হংকংয়ে। জন্মের এক বছরের মধ্যেই ক্যান্টনিজ অপেরার জনপ্রিয় শিল্পী বাবা লি হুই চোয়েন পরিবার নিয়ে ফিরে যান হংকংয়ে। সেখানেই মঞ্চ, আলো ও ক্যামেরা আর অভিনয়ের আবহে বেড়ে ওঠে এই শিশু, যাঁর জীবন মাত্র ৩২ বছরেই থেমে গেলেও প্রভাব রেখে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আজও ব্রুসলিকে নিয়ে চর্চা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ও পোস্টার শেয়ার হয়।

শিশুশিল্পী থেকে আত্মগঠনের কঠিন পথ
ফিল্ম স্টুডিওই ছিল ব্রুস লির প্রথম খেলার মাঠ। বাবার হাত ধরে ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরা, আলো, সেট—সবই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে স্বাভাবিক পরিবেশ । মাত্র ছয় বছর বয়সে ‘দ্য বিগিনিং অব আ বয়’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা । সমালোচকদের মতে, সাত বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিস্ময়করভাবে স্বচ্ছন্দ—চোখের দৃষ্টি স্থির, শরীরী ভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত, যেন বয়সের আগেই তিনি বুঝে ফেলেছিলেন ফ্রেমের ভাষা।

কিন্তু পর্দার এই শান্ত শিশুটির বাস্তব জীবন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। কৈশোরে পা রাখার আগেই হংকংয়ের রাস্তায় ব্রুস লি পরিচিত হয়ে ওঠেন ঝগড়া আর মারামারির জন্য। সমবয়সীদের নিয়ে ছোটখাটো একটি ‘গ্যাং’ তৈরি করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া আর জমে থাকা আগ্রাসী মানসিকতা তাঁকে বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে ফেলে।
সমস্যা ছিল একটাই—শরীর। ছিলেন হালকা-পাতলা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে বহুবার মার খেতে হয়েছে তাঁকে। এই অপমান, ক্ষত আর ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে ঠেলে দেয় মার্শাল আর্টের দিকে। কুংফু তাঁর জীবনে আসে সমাধান হিসেবে নয়; বরং আত্মরক্ষার জরুরি প্রয়োজন হিসেবে। এরপর যুক্ত হয় উইং-চুন-চীনা আত্মরক্ষার এক সূক্ষ্ম, নিয়ন্ত্রণনির্ভর শৈলী, যেখানে শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সময়জ্ঞান, দূরত্ব আর প্রতিক্রিয়ার বুদ্ধিমত্তা। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা কঠোর অনুশীলনই ব্রুস লিকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়।

রিং, ছন্দ আর ‘খুদে ড্রাগন’
সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুলে পড়ার সময় একটি ঘটনাই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়—ব্রুস লি সাধারণ ছাত্র নন । দুর্বিনীত আচরণে বিরক্ত হয়ে এক শিক্ষক, ব্রাদার এডওয়ার্ড, তাঁকে শাস্তি দিতে স্কুলের বক্সিং রুমে নিয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। শিক্ষক তাঁকে রিংয়ে নামতে বলেন।
বাস্তবতা হলো, সে সময় ব্রুসের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্সিং প্রশিক্ষণ ছিল না; কিন্তু রিংয়ের ভেতরে দাঁড়িয়েই তিনি নির্ভর করেন নিজের শেখা উইং-চুন কৌশল, দ্রুত পা চালনা আর আত্মবিশ্বাসের ওপর । কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিজ্ঞ শিক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। শাস্তির বদলে সেখানে জন্ম নেয় বিস্ময়। ব্রাদার এডওয়ার্ড রাগ না করে মুগ্ধ হন এবং ব্রুসকে স্কুল বক্সিং দলে নেন। সেই বছরই আন্তবিদ্যালয় টুর্নামেন্টে তিন বছর ধরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নকে হারান ব্রুস লি।

এ সময়েই তাঁর মার্শাল আর্টে যুক্ত হয় আরেক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা—নৃত্য । খুব কম মানুষই জানেন, ব্রুস লি ছিলেন দক্ষ চা-চা নৃত্যশিল্পী এবং কিশোর বয়সেই হংকংয়ে চা-চা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। নাচ থেকে পাওয়া ভারসাম্য, পায়ের সূক্ষ্ম কাজ, শরীরের ঘূর্ণন পরে এসে মিশে যায় তাঁর মার্শাল আর্টে। ফলে তাঁর লড়াই হয়ে ওঠে শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং গতি ও ছন্দে গড়া এক জীবন্ত কোরিওগ্রাফি। ১৮ বছর হওয়ার আগেই তিনি অভিনয় করেন ২০টির বেশি হংকং চলচ্চিত্রে। দর্শকের কাছে তাঁর নাম হয়ে ওঠে ‘লি সিউ লুং’ বা খুদে ড্রাগন।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় নির্বাসন
একটি মারামারির ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগ চরমে পৌঁছায়। মা বুঝে যান, এই পরিবেশে ছেলেকে রাখা আর নিরাপদ নয়। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই ব্রুস লিকে পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ষাটের দশকের শুরুতে সিয়াটলে শুরু হয় নতুন অধ্যায়—যা ছিল নির্বাসনের মতো।

পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ, বাসা ভাড়া, দৈনন্দিন ব্যয়—সব মিলিয়ে অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী । খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। এই সংগ্রামের মধ্যেই ব্রুস নতুন করে নিজেকে গড়তে শুরু করেন। সিয়াটলেই তিনি কুংফু শেখানো শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে মার্শাল আর্ট স্কুল গড়ে তোলেন। এখানেই তাঁর জীবনে আসে লিন্ডা এমেরি। ছাত্রী থেকে ভালোবাসা, ভালোবাসা থেকে বিয়ে, ১৯৬৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয় । ১৯৬৫ সালে জন্ম নেয় তাঁদের ছেলে ব্র্যান্ডন লি।

এ সময়েই জন্ম নেয় ব্রুস লির চিন্তার সবচেয়ে বড় অবদান—জিৎ কুনে দো । কুংফু, বক্সিং, ফেন্সিং আর বাস্তব স্ট্রিট ফাইটের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তিনি বোঝেন, কোনো একক স্টাইলে আটকে থাকা অর্থহীন। জিৎ কুনে দো কোনো নির্দিষ্ট ধারা নয়, এটি ‘ফর্মহীনতার দর্শন’। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে পারাই প্রকৃত শক্তি—এই উপলব্ধিই তাঁকে একজন দার্শনিক শিল্পীতে রূপ দেয় ।

হলিউডে প্রশিক্ষক
হলিউডে ব্রুস লি তখন পরিচিত নাম; কিন্তু অভিনয়ের জন্য নয়। তিনি ছিলেন তারকাদের প্রশিক্ষক। স্টিভ ম্যাককুইন, জেমস কোবার্ন, করিম আবদুল জব্বার নিয়মিত তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। সে সময় এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণের পারিশ্রমিক ছিল ২৫০ ডলার—অস্বাভাবিক বড় অঙ্ক ।

কিন্তু অভিনয়ের জগতে তিনি ছিলেন অবহেলিত। কারণ একটাই—তিনি এশিয়ান। ১৯৬৬ সালে এবিসির সিরিজ ‘দ্য গ্রিন হর্নেট’-এ ‘কেটো’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়লেও মূল নায়কের স্বীকৃতি পাননি তিনি। এরপর ‘কুং ফু’ সিরিজে এশীয় চরিত্র দেওয়া হয় শ্বেতাঙ্গ অভিনেতা ডেভিড ক্যারাডাইনকে । তখনই ব্রুস বুঝে যান, নিজের পথ নিজেরই তৈরি করতে হবে ।

হংকংয়ে ফিরে ইতিহাস লেখা
হংকংয়ে প্রত্যাবর্তন হলিউডে বারবার ঠেকে গিয়ে ১৯৭০ সালের শেষ দিকে ব্রুস লি যখন হংকংয়ে ফেরেন, তখন তিনি আর কেবল একজন প্রতিভাবান মার্শাল আর্টিস্ট নন, তিনি ভেতরে–ভেতরে এক গভীর ক্ষোভ আর দৃঢ়সংকল্প বয়ে আনছিলেন। এ সময়েই তার দেখা হয় প্রযোজক রেমন্ড চোয়ের সঙ্গে, যিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওকে দিয়ে হংকং চলচ্চিত্রে নতুন এক ধারা গড়তে চাইছিলেন। ব্রুস লি ও রেমন্ড চোয়ের এই হাত মেলানোই পরবর্তী কয়েক বছরে কুংফু চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেয়। ১৯৭১ সালে মুক্তি পায় প্রথম ছবি ‘দ্য বিগ বস’ (চীনা নাম: তাং শান দা শিওং)। থাইল্যান্ডের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটি প্রথমে খুব বড় প্রত্যাশা নিয়ে মুক্তি পায়নি; কিন্তু হলঘরে বসে দর্শকেরা যা দেখলেন, তা তাঁদের পূর্বপরিচিত কুংফু নায়কের চেনা ছক ভেঙে দিল। ব্রুস লির শরীরী ভাষা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—অস্বাভাবিক গতি, আকস্মিক বিস্ফোরণ আর চোখেমুখে জমে থাকা আগুন। প্রথম ফ্লাইং কিকের পর থেকেই দর্শকের উচ্ছ্বাস থামেনি। বক্স অফিসে ‘দ্য বিগ বস’ হংকংয়ের আগের সব আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয় এবং এক রাতেই ব্রুস লিকে সুপারস্টার বানিয়ে ফেলে।

এর ঠিক পরের বছর ১৯৭২ সালে আসে ‘দ্য চায়নিজ কানেকশন’—আন্তর্জাতিকভাবে বেশি পরিচিত ‘ফিস্ট অব ফিউরি’ নামে। জাপানি দখলযুগে সাংহাইয়ের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে ব্রুস লির চরিত্র চেন ঝেন হয়ে ওঠে অপমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক। ছবিটি কেবল বক্স অফিসে সফল নয়, সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণও ঘটায়। মুক্তির পর হংকং ও তাইওয়ানে আগের আয়ের রেকর্ড ভেঙে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে ছবিটি। চেন ঝেনের চরিত্র এশীয় দর্শকদের মধ্যে এক অবদমিত গর্ববোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে, যা ব্রুস লিকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। একই বছর ব্রুস লি নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেন ‘ওয়ে অব দ্য ড্রাগন’-এ। এই ছবির বিশেষত্ব ছিল—এখানে তিনি শুধু অভিনয় করেননি, নিজেই ছিলেন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। পশ্চিমা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে যাওয়ার লক্ষ্যে ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ রোমে শুট করা হয়। রোমান কলোসিয়ামে মার্কিন কারাতে চ্যাম্পিয়ন চাক নরিসের সঙ্গে ব্রুস লির চূড়ান্ত লড়াই আজও অ্যাকশন চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক ক্ল্যাসিক দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত। এই লড়াইয়ে কোনো অতিরিক্ত কাট, কোনো বাহুল্য কৌশল নেই—শুধু শরীর, সময় আর মানসিক দৃঢ়তার দ্বন্দ্ব। চাক নরিস নিজেই পরে বলেছেন, ব্রুসের লড়াইয়ের স্টাইল কারও পক্ষে নকল করা সম্ভব নয়, ওটা একান্তই তাঁর নিজের।

এই ধারাবাহিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে ব্রুস লি আর কেবল হংকং বা এশিয়ার নায়ক থাকেননি। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে তাঁর ছবিগুলো ডাবিং ও পুনর্মুক্তির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক দর্শক টানে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন এশীয় অভিনেতা হয়ে উঠলেন সত্যিকারের বৈশ্বিক অ্যাকশন তারকা—যাঁর উপস্থিতি বক্স অফিসের গ্যারান্টি। এ সময়েই ব্রুস লির পারিশ্রমিক আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। সমকালীন এশীয় সিনেমায় যা ছিল কল্পনাতীত, ব্রুস লি সেখানে চলচ্চিত্রপ্রতি নজিরবিহীন অঙ্কের পারিশ্রমিক দাবি ও আদায় করতে সক্ষম হন।

অনেক গবেষকের মতে, তিনিই প্রথম এশীয় অভিনেতা, যাঁর চলচ্চিত্রমূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে মিলিয়ন ডলার পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করে—যা পরবর্তীকালে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’-এর মাধ্যমে বাস্তবেই নিশ্চিত হওয়ার পথে ছিল। হংকংয়ে ফিরে এসে মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যেই ব্রুস লি প্রমাণ করে দেন নায়ক হতে হলে কারও অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয় না। নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব শরীর আর নিজস্ব দর্শন দিয়েও ইতিহাস লেখা যায়। এই অধ্যায়ই তাঁকে একজন সফল অভিনেতার সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যায় বিশ্ব সংস্কৃতির এক স্থায়ী প্রতীকে।

অকালে চলে যাওয়া
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে হংকং ও আন্তর্জাতিক সিনেমায় অভাবনীয় সাফল্য পেলেও ব্রুস লির জীবন তখন চরম চাপে ভারাক্রান্ত। একদিকে একের পর এক ছবির শুটিং, অন্যদিকে চিত্রনাট্য লেখা, ফাইট কোরিওগ্রাফির পরিকল্পনা, প্রতিদিনের দীর্ঘ শরীরচর্চা ও নতুন কৌশলের পরীক্ষা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল প্রায় নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের এক চক্রে বাঁধা। অনিদ্রা তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। নিজের শরীর আর মনের সীমা তিনি বারবার ঠেলে দিচ্ছিলেন আরও সামনে। ঠিক এ সময়েই তাঁর সামনে ছিল সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—হলিউডের মূলধারার বাজারে পূর্ণ শক্তিতে প্রবেশ। সেই স্বপ্নের নাম ছিল ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’—ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত প্রথম বড় কুংফু চলচ্চিত্র, যা ব্রুস লিকে একযোগে এশিয়া ও পশ্চিমের বাজারে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল।

এই চাপের মধ্যেই ১৯৭৩ সালের মে মাসে একবার ডাবিংয়ের সময় ব্রুস লি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা তাঁর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল এডিমা—মস্তিষ্কে পানি জমে ফুলে ওঠার গুরুতর লক্ষণ শনাক্ত করেন। দ্রুত চিকিৎসায় সেই বার তিনি ফিরে আসেন; কিন্তু সেই ঘটনা ছিল ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ সতর্কসংকেত। এর মাত্র দুই মাস পর, ২০ জুলাই ১৯৭৩ সালে হংকংয়ের কাউলুন টং এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ব্রুস লির মাথাব্যথা শুরু হয়। বিশ্রামের আগে একটি ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করেন ও শুয়ে পড়েন; কিন্তু আর ওঠেননি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর।
এই অতর্কিত মৃত্যু বিশ্বজুড়ে নেমে আনে শোকের ঢেউ। হংকংয়ে তাঁর মরদেহ একনজর দেখার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। শোকাহত জনতাকে সামলাতে পুলিশকে ব্যারিকেড দিতে হয়।

ব্রুস লির মৃত্যুর পরপরই মুক্তি পায় ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’। ছবিটি সেই স্বপ্নই বাস্তবে পরিণত করে, যা তিনি দেখে যেতে পারেননি। বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে যায় অভূতপূর্ব কুংফু উন্মাদনা। পশ্চিমা দর্শকের কাছে মার্শাল আর্ট প্রথমবারের মতো মূলধারার বিনোদনে পরিণত হয়, আর ব্রুস লি হয়ে ওঠেন এমন এক কিংবদন্তি, যিনি মৃত্যুর পরও তারকাখ্যাতির শিখরে উঠতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে ব্রুস লির প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল সিনেমা বা বক্স অফিস সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ব্রুস লির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি মার্শাল আর্টকে দেখিয়েছেন আত্ম-অন্বেষণের ভাষা হিসেবে, যেখানে শরীর কেবল শক্তির মাধ্যম নয়; বরং চিন্তা, প্রতিবাদ আর মুক্তির প্রকাশ। একজন এশীয় হিসেবে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরকেই তিনি বানিয়েছিলেন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম।

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2017%2F09%2F25%2F51d71c7a13fb58aad77ce070f66ddd78-59c8e9bc86860.jpg?rect=0%2C0%2C553%2C369&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ব্রুস লি। আইএমডিবি

Tuesday, February 10, 2026

হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া মোগল জিমি লাইকে ২০ বছরের জেল

হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া মোগল ও অ্যাপল ডেইলির প্রতিষ্ঠাতা জিমি লাইকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। চীনের আরোপিত বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর শাস্তি। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।

এতে বলা হয়, ৭৮ বছর বয়সী বৃটিশ নাগরিক জিমি লাইয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তার পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এ রায়কে কার্যত মৃত্যুদণ্ডের শামিল বলে অভিহিত করেছেন তারা। তবে হংকংয়ের প্রশাসন বলছে, এই রায় শহরের আইনের শাসনেরই প্রমাণ।

২০১৯ সালে গণতন্ত্র ও অধিক স্বাধীনতার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভের পর চীন হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করে। বেইজিংয়ের দাবি, শহরের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আইনটি অপরিহার্য। সমালোচকদের মতে, এই আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছে।

জিমি লাই এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া শত শত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চীনা সরকারের কট্টর সমালোচক ছিলেন এবং তার পত্রিকা অ্যাপল ডেইলিকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন।

রায়ের পর জিমি লাইয়ের ছেলে সেবাস্তিয়ান লাই বিবিসিকে বলেন, এটা ভীষণ হৃদয়বিদারক। আমরা বারবার বৃটিশ সরকারের কাছে বিষয়টি তুলেছি, কিন্তু আমার বাবা এখনও কারাগারে। তিনি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাম্প্রতিক চীন সফরকেও একটি হারানো সুযোগ বলে সমালোচনা করেন।
আদালতে সাজা ঘোষণার সময় বিচারকরা লাইয়ের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেন। সোমবার সকালে আদালত চত্বরে ছিল কড়া পুলিশি নিরাপত্তা। একই সঙ্গে বহু সমর্থক দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে রায় শোনার আশায় আদালতে উপস্থিত হন।

mzamin

Friday, November 28, 2025

হংকংয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু বেড়ে ৭৫, কেন এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ল

হংকংয়ের বেশ কয়েকটি সুউচ্চ ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৬০ বছরের মধ্যে শহরটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। খবর অনুযায়ী, এ ঘটনায় ২৭০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। হাজার হাজার বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখনো বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন জ্বলছে। ঘন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে চীনা ভূখণ্ডের আকাশসীমা ছেয়ে ফেলেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এ ঘটনায় হতাহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে ‘দায়িত্ব পালনকালে নিহত একজন ফায়ার ফাইটারও’ রয়েছেন।

আগুন লাগার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এ পর্যন্ত যা জানা গেল, সেটা দেখে নেওয়া যাক।

কোথায় এবং কখন আগুন লাগে

বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ২টা ৫১ মিনিটে হংকংয়ের তাই পো এলাকায় বৃহৎ আবাসন কমপ্লেক্স ওয়াং ফুক কোর্টে আগুন লাগে।

ওয়াং ফুক কোর্ট ৩১ তলা উচ্চতার আটটি ভবন নিয়ে গঠিত। তাই পো এলাকার কাউন্সিলর মুই সিউ-ফাং বিবিসি চায়নিজকে জানিয়েছেন, এর মধ্যে সাতটি ব্লক আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে নির্মিত এসব ভবনে সংস্কারকাজ চলাকালে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।

তাই পো হলো হংকংয়ের উত্তর অংশে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা, যা মূল চীনের শেনজেন শহরের কাছাকাছি।

২০২১ সালের সরকারি শুমারি অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৯৮৪টি অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বাসিন্দা বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ৬৫ বা এর বেশি।

আগুন লাগার কারণ কী

আগুন লাগার কারণ অজানা। তবে হংকংয়ের নিরাপত্তা সচিব বৃহস্পতিবার ভোরে জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আগুন অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনের বাইরে জালযুক্ত কাপড় এবং প্লাস্টিকের শিট পাওয়া গেছে—যার কোনোটিই অগ্নিপ্রতিরোধী বলে মনে হচ্ছে না।

ভবনের জানালায় স্টাইরোফোমও পাওয়া গেছে। পুলিশ বলেছে, এসব নির্মাণসামগ্রীর কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ থেকে ৬৮ বছর বয়সী তিন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন একটি নির্মাণ সংস্থার পরিচালক এবং অন্যজন প্রকৌশল পরামর্শদাতা।

পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, তদন্তকারীরা নির্মাণ সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা খতিয়ে দেখছেন। মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের এমন বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে কোম্পানির কর্মকর্তারা দায়িত্বে গুরুতরভাবে অবহেলা করেছেন। এর ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি।

অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা কতটুকু

হংকংয়ে কমপক্ষে ৬৩ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এটিকে লেভেল ফাইভ অ্যালার্মে (সর্বোচ্চ স্তর) শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

খবর পাওয়ার ৪০ মিনিটের মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ডকে লেভেল ফোর অ্যালার্ম ঘোষণা করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে স্তরটি আবারও বাড়ানো হয়।

স্থানীয় গণমাধ্যম এর আগে জানিয়েছিল, ভবনের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার হোসগুলো উঁচু স্তরে পৌঁছাতে পারছিল না।

অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবার উপপরিচালক ডেরেক আর্মস্ট্রং চ্যান গণমাধ্যমকে বলেন, আগুনের তীব্র তাপের কারণে ফায়ার ফাইটাররা উদ্ধার অভিযান চালাতে ভবনের ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না।

ঘটনাস্থলে ৭৬৭ জন ফায়ার ফাইটার, ১২৮টি ফায়ার ইঞ্জিন, ৫৭টি অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রায় ৪০০ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল।

ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে কী জানা যায়

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ বছর বয়সী অগ্নিনির্বাপণকর্মী হো ওয়াই-হো রয়েছেন, যিনি শা টিন ফায়ার স্টেশনে ৯ বছর ধরে কাজ করছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ওয়াই–হোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

হংকং ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অন্তত আরও একজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে বাসিন্দাদের তাঁদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে সহায়তা করছেন।

কী কারণে আগুনের তীব্রতা বেড়েছে

ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো বাঁশের মাচা এবং সবুজ নির্মাণ জাল দিয়ে ছাদ পর্যন্ত ঢাকা ছিল। কারণ, সেখানে সংস্কারকাজ চলছিল।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য সংস্কারকাজে ব্যবহৃত জাল, প্লাস্টিকের শিট ও স্টাইরোফোমের মতো উপকরণকে দায়ী করেছে।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না মনিটরের চেয়ারম্যান জেসন পুন সংবাদমাধ্যম ইনিশিয়াম মিডিয়াকে বলেছেন, আগুনের কারণ যা–ই হোক না কেন, ভবনের বাইরে সঠিক জাল ব্যবহার করা আগুন ছড়ানো রোধে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি যোগ করেন, নিম্নমানের জাল দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।

আরেক প্রকৌশলী বলেন, তাঁর বিশ্বাস, হংকংজুড়ে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জালই অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান দিয়ে তৈরি নয়।

এ ছাড়া মাচার ওপর প্রায়ই কার্ডবোর্ড, ধ্বংসাবশেষ এবং পেইন্ট থিনার পাওয়া যায়, যা শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে মিলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।

অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ আগে বলেছিলেন, সংস্কারকাজে ব্যবহৃত বাঁশের মাচা আগুনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সরকার নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাঁশের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে ধাতব মাচা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে চাইছিল।

হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিয়াং লিমিং উল্লেখ করেন, ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো ছিল ‘তুলনামূলকভাবে পুরোনো’। তাই ‘জানালার কাচগুলো ততটা অগ্নিপ্রতিরোধী নয়’।

লিমিং আরও বলেন, আধুনিক ভবনে ডবল পেনের কাচের জানালা থাকে। কিন্তু এর জন্য সম্ভবত তারা শুধু একক পেনের কাচ ব্যবহার করেছিল, যা আগুনের তাপে খুব সহজে ভেঙে যেতে পারে এবং আগুন তখন বাইরের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-27%2Fygvvsnvk%2Fhongkong.JPG?rect=0%2C1%2C5500%2C3667&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ২৭ নভেম্বর ২০২৫, হংকং। ছবি: রয়টার্স

Thursday, November 27, 2025

হংকংয়ে ভয়াবহ আগুনে পুড়লো ৩১ তলা ভবন, নিহত কমপক্ষে ১৩

হংকংয়ের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা তাই পোর বহুতল একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের প্রাণহানীর কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে একজন দমকলকর্মীও রয়েছেন। এখনও বহু মানুষ ভবনের ভেতরে আটক আছেন বলে জানানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, বুধবার বিকেলে ওয়াং ফুক কোর্ট আবাসিক কমপ্লেক্সে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ৩১ তলা বিশিষ্ট আটটি ব্লকের এই কমপ্লেক্সে মোট দুই হাজার ফ্ল্যাট রয়েছে। এদিন বিকেল ২টা ৫১ মিনিটে আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রবল বেগের হাওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই আগুন ভবনের সাতটি ব্লক পর্যন্ত ছড়িয়েছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে দমকল বাহিনীর। ঘন কালো ধোঁয়া ও দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে আকাশ লাল হয়ে ওঠে। অনেক ভবনের বাইরের অংশে যে বাঁশের স্ক্যাফোল্ডিং ছিল, আগুনের তাপে সেগুলো ভেঙে পড়তে দেখা যায়। অসংখ্য ফায়ার ইঞ্জিন ও অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে।

৭১ বছর বয়সী এক বাসিন্দা ওয়ং কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আগুন লাগার সময় তার স্ত্রী ভবনের ভেতরে আটকে পড়েন। আরেক বাসিন্দা হ্যারি চিউং (৬৬) বলেন, বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে তিনি একটি বিকট শব্দ শুনতে পান। পরে দেখতে পান যে পাশের ব্লকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চিউং বলেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘরে গিয়ে জরুরি জিনিসপত্র গুছিয়ে বের হয়েছি। তবে এখন কোথায় ঘুমাব, সেটাই ভাবছি।

ঘটনাস্থলের ওপরের ফুটওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে অনেকেই আগুনের দৃশ্য দেখেন এবং ছবি তুলতে থাকেন। সামাজিক মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভবনগুলো প্রায় এক বছর ধরে সংস্কারের কাজ চলছিল। আগুনের কারণে তাই পো রোডের একটি বড় অংশ বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন বিভাগ। বাসসহ অন্যান্য যানবাহন বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ওয়াং ফুক কোর্ট সরকারি ভর্তুকিযুক্ত হাউজিং স্কিমের আওতায় নির্মিত একটি ভবন। হংকংয়ের মতো জনবহুল শহরে এ ধরনের বহু উচ্চাভিলাষী আবাসিক প্রকল্প রয়েছে, যেখানে বাড়ি কেনা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব স্বপ্ন।

গত বছর এপ্রিলেও জনবহুল কাউলুন জেলায় এক আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজন প্রাণ হারান। ৬৮ বছর বয়সী আরেক বাসিন্দা ওয়াই ওয়াই চ্যান ঘটনার পর বাইরে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার ব্লকে আগুন নেভানো হলেও চারপাশে আগুন জ্বলতে দেখে মনটা ভেঙে যাচ্ছে।

mzamin

Friday, February 21, 2025

ভেঙে যাচ্ছে হংকংয়ের প্রধান বিরোধী দল

ভেঙ্গে যাচ্ছে হংকংয়ের সর্ববৃহৎ বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটির নেতারাই এ কথা জানিয়েছেন। হংকংয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো সংকুচিত হওয়ায় পদত্যাগ করার কথা জানিয়েছেন দলটির বহু নেতা। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে ৩১ বছর পুরনো দলটির চেয়ারম্যান লো কিন হেই। তিনি বলেছেন, দল ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে শীঘ্রই সদস্যদের ভোট নেবেন তারা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ২০১৯ সালে বিক্ষোভ করার পর থেকে দলটির ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে চীন সরকার।

মূলত এরপর থেকেই টিকে থাকতে লড়াই করছে দলটি। তবে বেইজিং এবং হংকং সরকারের যুক্তি হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিক্ষোভকারী দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে হংকংয়ের ভোটদান ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে বেইজিং। সেখানে আগে বৃটিশ উপনেশবাদী ভোট ব্যবস্থা চালু ছিল। ২০২১ সালে হংকংয়ে তথাকথিত ‘দেশপ্রেম আইন’ বাস্তবায়ন করা হয়। মূলত এর মাধ্যমে বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট শাসনের প্রতি অনুগত করতে বাধ্য করা হয় হংকংয়ের জনগণকে। এরপর থেকে হংকং আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ওই আইনের পর সেখানের প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়।

মঙ্গলবার সার্বিক বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছে দলটির নেতারা। এরপর লো কিন হেই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দলের নেতারা পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন। হংকংয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সবসময়ই বেশ কঠিন বলেও মন্তব্য করেছেন ওই নেতা। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছর সেখানের গণতান্ত্রিক চর্চা বেশ ভেঙে পড়েছে। তবে রাজনৈতিক কোনো চাপের ফলে তারা দল ভাঙার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কিনা- এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। 

mzamin

Wednesday, November 20, 2024

হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী শীর্ষ নেতাদের কারাদণ্ড দিল আদালত

চীনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ল (এনএসএল) লঙ্ঘনের অপরাধে এক বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী শীর্ষ নেতাদের কারাদণ্ড দিয়েছে সেখানের একটি আদালত। সাজাপ্রাপ্ত নেতারা হচ্ছেন বেনি তাই এবং জোশুয়া ওং। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তারা স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী বাছাইয়ে বিদ্রোহী দলের কর্মী এবং আইন প্রণেতাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কথিত এই অপরাধে বেনি তাইকে ১০ বছর এবং জোশুয়া ওংকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, বিক্ষোভে অংশ নেয়া গণতন্ত্রপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে চীনের চাপিয়ে দেয়া এনএসএল লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্তদের মাত্র দুই জনকে খালাস দিয়েছে আদালত। ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ দমনে এনএসএল আইন প্রণয়ন করে চীন।

মূলত হংকংয়ে নিজেদের শাসন বলবৎ করতেই এই আইন করেছে চীন। তবে চীনের চাপিয়ে দেয়া এই আইন থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করছে গণতন্ত্রকামী নেতারা। তাদের বিক্ষোভে হংকংয়ের রাস্তায় নেমে আসে সেখানের কয়েক হাজার জনগণ। এর মধ্য দিয়ে হংকংয়ের জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক অভিলাষ ফুটে উঠেছে।

আদালতের এই রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, এনএসএল আইনের ভিত্তিতে এই বিচারিক ফলাফল হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করে তুলেছে। অন্যদিকে আইনটির মাধ্যমে চীন এই শহরে তাদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেছে। গণতন্ত্রকামী নেতাদের সাজা দেয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। যুক্তরাষ্ট্র বলছে এই রায় ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া বলছে হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী জনগণের বিরুদ্ধে এমন বিচারিক কার্যক্রমে ‘কঠিনভাবে আপত্তিকর’। যদিও বেইজিংয়ের যুক্তি হচ্ছে হংকংয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই তারা জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, নিজেদের শাসন মজবুত করতেই এমন আইন করেছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য এই বিচার কঠোর হুঁশিয়ারি হিসেবে কাজ করবে। গণতন্ত্রপন্থীদের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ল লঙ্ঘনের অভিযোগে যে মামলা হয়েছে তা অনেকের মধ্যেই বেশ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। তারা রায়ের সময় আদালতের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। মঙ্গলবার অভিযুক্তদের চার থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

বেনি তাই সাবেক আইন বিশেষজ্ঞ। গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে তাকে দীর্ঘতম সাজা দেয়া হয়েছে। জোশুয়া ওং দোষ স্বীকার করার পর তার সাজা কমিয়ে চার বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যান্য অভিযুক্তদের দাবি হচ্ছে বিচারকরা ওংকে একজন খারাপ মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে হংকংয়ের স্থানীয় প্রশাসন। জোশুয়া ওংকে আগেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, হংকং চীনের আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। আগে অঞ্চলটি যুক্তরাজ্যের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৯৯৭ সালে চুক্তির মাধ্যমে হংকংকে চীনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই চুক্তিতে হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। যার দাবিতেই বিক্ষোভ শুরু করেছেন গণতন্ত্রপন্থী এই নেতারা।

mzamin