Wednesday, March 14, 2018

থ্রেট দেবেন না : প্রধান বিচারপতি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনাদেশ স্থগিতের আবেদনের ওপর আপিল বিভাগে শুনানিকালে এক আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, ‘থ্রেট দেবেন না।’ বুধবার (১৪ মার্চ) সকালে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি এ মন্তব্য করেন।
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুদকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, এজে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ প্রমুখ।
শুনানির শুরুতেই দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান আদালতকে বলেন, ‘হাইকোর্ট চারটি কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন। আমরা এখনও সে আদেশের সার্টিফায়েড কপি পাইনি। আদেশের কপি পেলে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করবো।’
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সিপি (লিভ টু আপিল) ফাইল করে আসেন।’
তখন দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘সিপি ফাইল করতে রবিবার-সোমবার পর্যন্ত আমাদের সময় দেওয়া হোক। সে পর্যন্ত জামিন স্থগিত রাখা হোক।’
এরপর আদালত বলেন, ‘ঠিক আছে সিপি ফাইল করে আসেন রবিবারের মধ্যে। এ পর্যন্ত জামিন স্টে থাকবে।’
তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও খালেদার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, ‘আমাদের কথা আগে শোনেন। আমাদের বক্তব্য (আসামিপক্ষের) তো শুনেন নাই। আমাদের না শুনে এভাবে আদেশ দিতে পারেন না।’ এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘শুনতে হবে না। রবিবার পর্যন্ত তো স্থগিত দিয়েছি। ওই দিন আসেন। তখন শুনবো।’
জয়নুল আবেদীন তখন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি একতরফাভাবে শুনানি করে আদেশ দিলে এতে আদালতের প্রতি পাবলিক পারসেপশন খারাপ হবে।’
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা পাবলিক পারসেপশনের দিকে তাকাই না। কোর্টকে কোর্টের মতো চলতে দিন।’
এরপর জয়নুল আবেদীন ও এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘না শুনেই তো আদেশ দিলেন।’
আদালত বলেন, ‘আমরা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছি। আমাদের শোনার দরকার নেই।’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এই মামলায় চেম্বার আদালত তো স্টে দেয়নি। এই সময়ের মধ্যে আসামিও বের হবে না। তাই স্টের প্রয়োজন নেই।’ এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা তো শুনানির সুযোগ পেলাম না।’
এরপরই আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকা থেকে অন্য মামলার শুনানি শুরু করেন আদালত।
সে মামলার শুনানির একপর্যায়ে খালেদা জিয়ার পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে আদালতকে বলেন, ‘আপনি তো না শুনেই একতরফা আদেশ দিলেন। আমাদের কথা শুনতে হবে। কেন শুনবেন না?’
তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘কার কথা শুনবো, কার কথা শুনবো না তা কি আপনার কাছে শুনতে হবে?’
গিয়াস উদ্দিন আবারও একটু উত্তেজিত হয়ে একই কথা বললে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি কি আদালতকে থ্রেট করছেন?’ জবাবে গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘শুনে তারপর আদেশ দিতে হবে।’ তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘থ্রেট দেবেন না।’
একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আপনি তো কোর্টকে শেষ করে দিলেন।’ তখন অ্যাটর্নি কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় একদল আইনজীবী ‘দালাল দালাল’ বলতে বলতে আদালত কক্ষ ত্যাগ করেন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়ে কারাগারে আটক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ আগামী রবিবার (১৮ মার্চ) পর্যন্ত স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আপিল আবেদনের শুনানি শেষে বুধবার আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত অস্থায়ী পঞ্চম বিশেষ জজ আদালত। রায় ঘোষণার পরপরই তাকে ওই দিন বিকালে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি এখনও সেখানেই আছেন।

আমাদের বক্তব্য না শুনেই খালেদা জিয়ার জামিনাদেশ স্থগিত করেছেন আদালত: জয়নুল আবেদীন

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার জামিনাদেশ বিষয়ে আপিল বিভাগের শুনানি প্রসঙ্গে তার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, ‘আমাদের বক্তব্য না শুনেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই ধরনের আদেশ দিয়েছেন। এই আদেশে আমরা ব্যথিত। আদালতের এই আদেশের বিষয়ে কী ভাষায় আপনাদের কাছে বর্ণনা করবো, তা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।’
বুধবার (১৪ মার্চ) সকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সভাপতি কক্ষের সামনে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, চিরাচরিতভাবে আপিল বিভাগ যেটা করেন, উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনেন, তারপর আদেশ দেন। আজকের বিষয়টি হলো, আপিলটি দুদকের আইনজীবী উপস্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে আদালত বললেন যে আগামী রবিবার সিপি (লিভ টু আপিল বা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) ফাইল করেন। জামিন আগামী রবিবার পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। আমাদের কোনও বক্তব্য তিনি (প্রধান বিচারপতি) শুনলেন না। কোনও রকম আইনগতভাবে এই মামলাটি মোকাবেলা করার জন্য ন্যূনতম সুযোগ আমাদের দিলেন না। না দিয়ে স্টে অর্ডার অনুমোদন করলেন।’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমরা এই আদেশে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছি। আজ যে কাজটি হলো বিচার বিভাগে এর আগে এভাবে কখনও ছিল না। আজকের বিচার বিভাগের কাছ থেকে এটা আশা করিনি। তার কারণ আপনারা জানেন, এই ধরনের শর্ট সেন্টেন্সে (স্বল্প সাজা) দেশের সর্বোচ্চ আদালত কখনও হস্তক্ষেপ করেননি। চেম্বারে (চেম্বার আদালত) স্টে না থাকার পরেও সেই মামলায় স্টে দিলেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি আদালতকে একটি কথা বলতে চেয়েছিলাম, আপনি যদি স্টে নাও দেন, তাহলেও খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না। সরকার তাকে বের হতে দেবেন না। ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারের পরিকল্পনা করে রেখেছে। এই অবস্থার মধ্যে যদি আপনারা স্টে দেন তাহলে মানুষের মনোভাবের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এরপরও আদালত আমাদের কথা শুনলেন না।’
খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আশা করি রবিবার দিন আদালত উভয়পক্ষকে শুনবেন। অতীতের নজিরগুলো লক্ষ্য রেখেই আজ যে আদেশটি দিলেন তা ভ্যাকেট (বাতিল) করবেন। বেগম জিয়া জনসম্মখে বের হয়ে আসবেন।’

‘আপনি কি আদালতকে থ্রেট করছেন’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানিতে আসামি পক্ষের এক আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, আপনি কি আদালতকে থ্রেট দিচ্ছেন। আজ বুধবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানিকালে এ কথা বলেন তিনি। এর আগে বেঞ্চ খালেদা জিয়ার জামিন আগামী রোববার পর্যন্ত স্থগিত করে। শুনানির শুরুতে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতকে বলেন, হাইকোর্ট চারটি কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন। আমরা এখনো সে আদেশের সার্টিফায়েড কপি পাইনি। আদেশের কপি পেলে লিভ টু আপিল করব।
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনারা  লিভ টু আপিল করে আসেন। তখন দুদকের আইনজীবী বলেন, মাই লর্ড, হাইকোর্টের আদেশের কপি বের হয়েছে গতকাল বিকেল ৫টার পর। এ কারণে আমরা লিভ টু আপিল করতে পারিনি। লিভ টু আপিল করতে হলে আগামী রোববার-সোমবার পর্যন্ত আমাদের সময় দেয়া হোক। এ পর্যন্ত জামিন স্থগিত রাখা হোক।
এরপর আদালত বলেন, ঠিক আছে সিপি ফাইল করে আসেন রোববারের মধ্যে। এ পর্যন্ত জামিন স্টে থাকবে।
তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, আমাদের আগে শোনেন। আমাদের বক্তব্য তো শোনেন নাই। আমাদের না শুনে এভাবে আদেশ দিতে পারেন না।
আদালত বলেন, শুনতে হবে না। রোববার পর্যন্ত তো স্থগিত দিয়েছি। ওই দিন আসেন, তখন শুনব।
অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, আপনি যে একতরফাভাবে শুনানি করে আদেশ দিলেন, এতে আদালতের প্রতি পাবলিক পারসেপশন খারাপ হবে।
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা পাবলিক পারসেপশনের দিকে তাকাই না। কোর্টকে কোর্টের মতো চলতে দিন।
এরপর জয়নুল আবেদীন ও এ জে মোহাম্মদ আলী কিছুটা আওয়াজ করে আদালতে বলেন, মাই লর্ড, না শুনেই তো আদেশ দিলেন।
জবাবে আদালত বলেন, আমরা অন্তর্বতীকালীন আদেশ দিয়েছি। আমাদের শোনার দরকার নেই।
জয়নুল আবেদীন বলেন, এ মামলায় চেম্বার আদালত তো স্টে (জামিন স্থগিত) দেয়নি। এ সময়ের মধ্যে আসামিও বের হবেন  না। তাই স্টে (স্থগিত) প্রয়োজন নেই।
খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী  আদালতকে বলেন, আমরা তো শুনানির সুযোগ পেলাম না। এসময় প্রধান বিচারপতি কার্যতালিকা থেকে অন্য মামলা শুনানি শুরু  করতে বলেন। পরে খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে আদালতকে বলেন, আপনি তো না শুনেই একতরফা আদেশ দিলেন। আমাদের কথা শুনতে হবে। কেন শুনবেন না?
তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, কার কথা শুনব, কার কথা শুনব না তা কি আপনার কাছে শুনতে হবে? এ সময় আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনি আমাদের না শুনে একতরফা শুনানি করে আদেশ দিতে পারেন না। এটা নজিরবিহীন। জবাবে আদালত বলেন, আপনি কি আদালতকে থ্রেট করছেন? গিয়াস উদ্দিন বলেন, শুনে তারপর আদেশ দিতে হবে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, থ্রেট দেবেন না। এরপর আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন বলেন, আপনি আমাদের শুনে অর্ডার দেন, প্লিজ? এরপর বিএনপির অর্ধশতাধিক আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে হৈচৈ শুরু করেন।

কীভাবে করা হয় বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত

কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলা ফ্লাইটের দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে, কিন্তু বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত কিভাবে হয়? কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সাথে দুর্ঘটনা কবলিত ফ্লাইটের পাইলটের কথোপকথনের একটি রেকর্ড ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ার পর দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোমবারের এই দুর্ঘটনার তদন্তে এই কথোপকথন ছাড়াও নানা দিক খুঁটিয়ে দেখা হবে।
ভারতের এক্সিউটিভ পাইলট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ভি কে ভাল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দুর্ঘটনার পর প্রধানত দুটো দিক দেখা হয় - যন্ত্র বিকল হয়েছিল, নাকি মানুষের ভুল হয়েছিল। "সাধারণত যন্ত্রের কারণেই অধিকাংশ বিমান দুর্ঘটনা হয়"।
মি ভাল্লাহ বলেন, তদন্ত শুরু করা হয় বিমান টেক-অফ করারও অনেক আগের ঘটনাপ্রবাহ থেকে।
"ফ্লাইটের আগে পাইলটকে কী ব্রিফ করা হয়েছিলো, আগের দিনগুলোতে ঐ বিমানে কোনো ত্রুটি কখনো ধরা পড়েছিলো কিনা। ধরা পড়লে সেটা শোধরানো হয়েছিলো কিনা। বিমান ওভারলোড ছিলো কিনা...ইত্যাদি বহু কিছু। সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের সাথে কথা বলা হয়"।
কিন্তু তদন্তের প্রধান দুটো সূত্র- ব্লাক বক্স এবং ফ্লাইই ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর)। ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত ফ্লাইটের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রই উদ্ধার করা হয়েছে।বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর ইকবাল হোসেন বিবিসিকে বলেন, দুর্ঘটনার আগের সমস্ত কথোপকথন বা যান্ত্রিক গোলমালের সমস্ত তথ্য জমা থাকে এই দুটিতে।
"আগুনে পুড়লেও এগুলো নষ্ট হয়না, এবং প্রধানত এই দুটো যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে বিমান দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করা হয়"।
মি হোসেন জানান, ব্লাক বক্স থেকে তথ্য বের করার সক্ষমতা অধিকাংশ দেশের এখনও নেই। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাউ)সহায়তা নিয়ে থাকে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বিমান চলাচল সংস্থা এফএএ এসব ব্যাপারে সাহায্য করে থাকে।
কমোডর ইকবাল বলেন, যেহেতু বাংলাদেশ এবং নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সক্ষমতা নেই, সুতরাং তারা হয়তো ব্লাক বক্স আইকাও বা এফএএ'র কাছে নিয়ে যাবে।
তদন্তের দায়িত্ব কার?
কমোডর ইকবাল বলেন, দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ের প্রধান দায়িত্ব যে দেশে দুর্ঘটনা ঘটে এবং যে দেশের বিমান সেই দুই দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের। সংশ্লিষ্ট সবার সাথে কথা বলার এবং ব্লাক বক্স বা এফডিআরের তথ্য জানার অধিকার প্রধানত তাদেরই থাকে।
তিনি জানান, প্রতিটি দেশের বেসামরিক চলাচল কর্তৃপক্ষেরই বিশেষ একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকে যাদের প্রধান দায়িত্ব দুর্ঘটনা হলে তার তদন্ত করা।
পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট বিমান পরিবহন সংস্থা, বিমান নির্মান প্রতিষ্ঠান বা বীমা কোম্পানীগুলো নিজেরাও দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে।
কিন্তু দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের প্রধান দায়িত্ব স্ব স্ব দেশের বিমান পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
সূত্রঃ বিবিসি

সবাইকে আপন করে নিয়েছিলেন নেপালি শিক্ষার্থীরা by জাহিদ হাসান

মানবসেবার স্বপ্ন নিয়ে ‘হিমালয় কন্যা’ নেপাল থেকে ছয় বছর আগে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে এসেছিলেন তারা। ভর্তি হয়েছিলেন সিলেটের বেসরকারি রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজে। এমবিবিএস কোর্সের ফাইনাল প্রুফও শেষ হয় ১১ মার্চ। মাসদুয়েক পর রেজাল্ট হলেই সার্টিফিকেট পেয়ে যেতেন। তার আগে শেষ পরীক্ষার পরদিন ১২ মার্চ (সোমবার) তাদের মধ্যে ১৩ জন একসঙ্গে দেশে ফিরছিলেন। কিন্তু নেপালের কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরে তাদের বহনকারী বিমানটি বিধ্বস্ত হলে আরও অনেকের সঙ্গে জীবনপ্রদীপ নিভে যায় এই শিক্ষার্থীদের ১১ জনের। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দুজন।
রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের ১৯তম ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলেন ৪০ জন নেপালি। তাদের মধ্যে ১৩ জন ওইদিন দেশে ফিরছিলেন। এ ঘটনায় কলেজটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিষন্ন শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণ করছেন প্রয়াত সহপাঠীদের। তারা বলছেন, দ্রুত বাংলা ভাষা বুঝতে ও বলতে শিখে যাওয়ার কারণে নেপালিরা সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। সহজেই আপন করে নিতে পারতেন সবাইকে।
তাদের এক সহপাঠী তীর্থ তাপস সাহা রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‌‌ঘটনাটি আমাদের জন্য অনেক বেদনার ও মর্মান্তিক। আমরা ১১ মার্চ শেষ পরীক্ষা দেই। পরদিন সকালে ওরা ১৩ জন একসঙ্গে বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। এরপরই ঘটে দুর্ঘটনাটি। আমরা আমাদের নেপালি বন্ধু-বান্ধবীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা  করছি। আমি ইতোমধ্যে শামিরা বেনজারখার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি। কিন্তু কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই আমাদের।’
কলেজের নেপালি শিক্ষার্থী ইতিশ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, রবিবার একসঙ্গে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ব্যাচের নেপালি ৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন সোমবার ইউএস বাংলার ফ্লাইটে নেপালে যান।  পরেই আমরা জানতে পারলাম এই দুঃসংবাদ। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বলেও জানান তিনি।
পান্ডে নামের আরেক নেপালি শিক্ষার্থী জানান, স্বদেশি ওই সহপাঠীদের তিনি নিজে তুলে দিয়ে এসেছেন। তারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ থাকায় তার আর যাওয়া হয়নি। এ ঘটনায় নেপালে তাদের স্বজনরাও ভেঙে পড়েছেন বলে জানান তিনি।
ইসরাত জাহান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘নেপালি শিক্ষার্থীরা খুব কম সময়েই বাংলা ভাষা বুঝতে ও বলতে শিখে যেতেন। ফলে সহজেই তারা সবার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেন।’ নিহত ওই নেপালি শিক্ষার্থীরা তার সিনিয়র ছিলেন বলে জানান ইসরাত।
ওই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীরা হলেন, সঞ্জয় পৌডেল, সঞ্জয়া মহারজন, নেগা মহারজন, অঞ্জলি শ্রেষ্ঠ, পূর্ণিমা  লোহানি, শ্রোতা থাপা, মিলি মহারজন, শর্মা শ্রেষ্ঠ, আলজিরা বারাল, চুরু বারাল ও আশ্রা শখিয়া। এছাড়া, শামিরা বেনজারখার ও প্রিঞ্চি ধনি নামের দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনার পর কলেজ ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একসঙ্গে এত শিক্ষার্থীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান সবাই। ভেঙে পড়েছেন নেপালি শিক্ষার্থীরাও। দেখা হলেও কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন না তারা। তবে তাদের সহপাঠীরা জানান, পুরো কলেজ ক্যাম্পাস হাসিখুশিতে মাতিয়ে রাখতেন নেপালি এই শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার আনন্দে বেশ উৎফুল্লও ছিলেন তারা।
কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবেদ  হোসেন বলেন, ‘চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা শেষ হওয়ায় ছুটি কাটাতে নিজ দেশে যাচ্ছিলেন মেডিক্যল কলেজের নেপালি ১৩ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রিঞ্চি ধনি ও শামিরা বেনজারখার সেখানকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।’
রেজাল্ট হলেই তাদের এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের কথা ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা শেষে ফল প্রকাশের জন্য দুই মাসের মতো সময় লাগে। সাধারণত রেজাল্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনও অ্যাসাইনমেন্ট থাকে না। তাই ওই সময়ে সবাই নিজেদের বাড়িতে চলে যায়। গত রবিবার রাতে গ্রিনলাইন পরিবহনের বাসে করে সিলেট থেকে ঢাকা যান ওই ১৩ শিক্ষার্থী। কলেজের গাড়িতে করে তাদের বাসে তুলে দেওয়া হয়।’
রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এ কলেজে বর্তমানে ২৫০ জন নেপালি শিক্ষার্থী রয়েছেন। সদ্য চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হওয়া ১৯তম ব্যাচে ১৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন ছিলেন নেপালি।
সোমবার (১৩ মার্চ) নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটিতে চার ক্রুসহ ৩৬ জন বাংলাদেশের। ওই ফ্লাইটের মোট ৭১ জন আরোহীর মধ্যে ৩৩ জন নেপালের এবং একজন করে মালদ্বীপ ও চীনের নাগরিক ছিলেন।

অস্ত্রটা বাসায় রেখে আসো, শুনতে চাই কেন তোমার এত কষ্ট: -মুক্তমঞ্চে জাফর ইকবাল

অধ্যাপক জাফর ইকবাল তার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা দেখিয়েছ ম্যাচিউরড ছেলেমেয়ে হলে কী করতে হয়। এখানেই বসেছিলাম আমরা, যখন আমাকে আঘাত করা হয়েছিল। তার জন্য আমার বিন্দুমাত্র রাগ নাই। মায়া আছে, করুণা আছে। কেন এটা করেছে? বেহেশতে যাবে বলে। এটা তার মাথায় ঢুকানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে কথা বলতে আসো। অস্ত্রটা বাসায় রেখে আসো। আমি শুনতে চাই, কেন তোমার এত কষ্ট।’
বুধবার (১৪ মার্চ) বিকালে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন।
জাফর ইকবাল বলেন, ‘একজন মানুষ কত দুঃখী হতে পারে, যার মনে হয় একজনকে মেরে বেহেশতে যাবে। পৃথিবীতে তাকিয়ে দেখো। কী সুন্দর। এ সুন্দর পৃথিবীর কিছুই সে দেখে না, জানে না। কেবল জানে একজনকে মারলে বেহেশতে যাবো। 
তিনি বলেন, ‘এখানেও একজন  হয়তো আছে। যে ভাবছে, পারলাম না, আরেকবার অ্যাটেম নিতে হবে। তার উদ্দেশে বলছি, আমার সঙ্গে কথা বলতে আসো। অস্ত্রটা বাসায় রেখে আসো। আমি শুনতে চাই, কেন তোমার এত কষ্ট।’
জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমাকে নাস্তিক বলো? আমি কোরআন শরিফ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পড়েছি। সেখানে একটি আয়াত আছে, তুমি যদি একজনকে মারো, তুমি সারা মানবজাতিকে হত্যা করছো। কেমন করে তারা এত বড় দায়িত্ব ঘাড়ে নেয়। কে তোমাদের এসব বুঝিয়েছে। যারা বুঝিয়েছে তারা নিশ্চিন্তে আছে। আর তুমি, যে কিনা রিমান্ডে আছো, তোমার মা, ভাই, বাবা রিমান্ডে। যারা এসব কথা বলো, তারা আসো, আমার সঙ্গে কথা বলো।’
এর আগে বুধবার (১৪ মার্চ) দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে জাফর ইকবালকে বহনকারী নভোএয়ারের একটি বিমান সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তাকে বরণ করে নিতে শাবিপ্রবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দরে সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ৩ মার্চ ছুরিকাহত হওয়ার পর ওই দিন রাতেই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে আসা হয় ড. জাফর ইকবালকে। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদফতরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম শাম্মী বাংলা ট্রিবিউনকে একথা জানান। তিনি জানান, ড. জাফর ইকবাল এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। তবে আগামী সাতদিন তাকে পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বলা হয়েছে।

এই নির্মমতার জবাব কী by উদিসা ইসলাম

বরিশালে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের ক্যামেরাপারসন সুমন হাসানকে নির্যাতনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন তোলপাড়, তখন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের আট সদস্যকে ক্লোজড করে দায়িত্ব সেরেছে বিএমপি (বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ)। প্রশ্ন উঠছে, এ ধরনের নির্মমতার সমাধান কেবলমাত্র ক্লোজড-এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় কিনা।
ভুক্তভোগী সুমনের কর্মস্থলের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলছেন, পুলিশ কোনও অপরাধে জড়িয়ে গেলে এবং প্রাথমিকভাবে সেটির সত্যতা পাওয়া গেলে, তখন ক্লোজডের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এটি ‘আইওয়াশ’ ছাড়া কিছু নয়। সাংবাদিক নেতারা বলছেন, কেবল ক্লোজড নয়, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশ সদস্যরা সুমনকে যে নির্বিচার নির্যাতন করেছেন, সেটা সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না।
তদন্ত কমিটি গঠন করে রিপোর্ট অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে মঙ্গলবারই (১৩ মার্চ) জানিয়েছেন বরিশাল মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) গোলাম রউফ। বুধবার (১৪ মার্চ) বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) সহকারী কমিশনার নাসির উদ্দিন মল্লিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কনস্টেবল মাসুদকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। আরও কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছেন, সেটা জানার জন্য আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করছি।’
মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) দুপুরে বরিশাল মহানগরীর দক্ষিণ চকবাজারের পুরনো বিউটি হলের সামনে ডিবি পুলিশ একটি বাসায় মাদকের অভিযান চালালে ডিবিসি নিউজের সাংবাদিক সুমন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। অভিযানের বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আট পুলিশ সদস্য মিলে সুমনের ওপর চড়াও হন। এ সময় তারা সুমনকে বেধড়ক মারধর করলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। পরবর্তীতে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর সেখানে সুমনের জ্ঞান ফিরে এলে, পুনরায় তাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করা হয়।
পরে খবর পেয়ে বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিকরা উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম রউফকে বিষয়টি জানালে তিনি সমাধানের জন্য সবাইকে তার কক্ষে নিয়ে আসেন। এ সময় সুমনের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে এবং সুমনের কাছে নির্যাতনের কথা শুনে উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম রউফ ও উত্তম কুমার পাল দুঃখ প্রকাশ করেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের উভয় পক্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে রাষ্ট্র উপকৃত হয়। পুলিশের নানা উগ্র আচরণের কারণে সাংবাদিকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকরা যখন দায়িত্ব পালন করতে যান, তখন তারা বাধা দেয়, এটা কখনও আশা করি না। পুলিশের যান্ত্রিক ক্ষেত্রে যে আধুনিকায়ন ঘটেছে, মানসিক ক্ষেত্রেও সেই আধুনিকতা আসতে হবে।’
সাংবাদিক সুমনের ওপর নির্মমতার জবাব কি আট জনের ক্লোজড-এ সীমাবদ্ধ থাকবে, প্রশ্নে ডিবিসি টেলিভিশনের সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশ কোনও অপরাধে জড়িয়ে গেলে এবং প্রাথমিকভাবে যদি সেটির সত্যতা পায়, তখন ক্লোজড এর সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এটি ‘আইওয়াশ’ ছাড়া কিছু নয়। এটা কোনও শাস্তি না। বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এটি করা হয়। আইনে স্পষ্ট করেই বলা আছে— এ ধরনের কোনও অভিযোগ পাওয়ার পর নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩, ৭ উপ-ধারা (১) অনুযায়ী পুলিশ সুপার অথবা তার চেয়ে ঊধ্বর্তন পদমর্যাদার কোনও অফিসার তাৎক্ষণিক একটি মামলা দায়ের ও অভিযোগকারীর বক্তব্য রেকর্ড করবেন। মামলার নম্বরসহ এই অভিযোগের ব্যাপারে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, তা অভিযোগকারীকে অবহিত করবেন এবং (৩) উপরে বর্ণিত উপ-ধারা (২) অনুযায়ী অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণকারী পুলিশ সুপার অথবা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দায়রা জজ আদালতে একটি রিপোর্ট পেশ করবেন।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা রেকর্ড করার কথা। কোনও ক্ষেত্রেই আমরা সেটার প্রয়োগ দেখি না। যদি সদিচ্ছা থাকতো, তাহলে পুলিশ সেটি করতো। তারা কখনও এটা করে না।’
জায়েদুল আহসান পিন্টু আরও বলেন, ‘আমরা এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। কেবল ক্লোজড নয়, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশ সদস্যরা সুমনকে যে নির্বিচার নির্যাতন করেছেন, সেটা সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না।’
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী পরিষদের সদস্য গোলাম মুজতবা ধ্রুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাংবাদিকদের অধিকার আদায়, মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই। এজন্য সম্মিলিত প্রতিবাদ করা প্রয়োজন।’ আমরা সেটি করবো। আজকের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সবাইকে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, এর আগে যশোরের কোতোয়ালি থানায় এক যুবককে নির্যাতনের ঘটনায় কেন জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে নির্যাতনের অভিযোগে এসআই নাজমুল ও এসআই হাবিবকে আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে যশোরের এসপিকে এ বিষয়ে তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের কথা

মা বাবার সঙ্গে আহত নেপালি সানম শাকিয়া
নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে সোমবার (১২ মার্চ) ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৭১ আরোহীর মধ্যে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সংখ্যা হাতেগোনা। শরীরে আঘাত আর দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরালেও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন তারা। এ যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আহতরা জানিয়েছেন তাদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষক শাহরিন আহমেদ বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন। কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। কান্নাভেজা চোখে শাহরিন নেপালি সংবাদমাধ্যম হিমালয়ান টাইমসকে বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে বিমানে ছিলাম। বিমানটি যখন অবতরণ করতে গেলো তখন এটি বামদিকে মোড় নিতে শুরু করে। লোকজন চিৎকার করতে লাগলো। আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বিমানে আগুন ধরে গেছে। আমার বন্ধু আমাকে বললো তার আগে আগে দৌড়াতে। কিন্তু যখন আমরা দৌড়াতে লাগলাম আগুনের শিখা তাকে ঘিরে ফেললো। ও পড়ে গেলো। লোকজন আগুনে ঝলসে যাচ্ছিলো, চিৎকার করছিলো আর পড়ে যাচ্ছিলো। তিন ব্যক্তি জ্বলন্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়লো। খুব ভয়াবহ ছিল এ দৃশ্য। ভাগ্যক্রমে কেউ একজন আমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসেন।’
শাহরিন আহমেদ বিবিসি নেপালিকে বলেন, ‘বাইরে প্রচণ্ড রকমের আগুন ছিল এবং আমাদের কেবিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। এরপর সেখানে একটি বিস্ফোরণ হয়। পরে আগুন নিভিয়ে উদ্ধার করা হয় আমাদের।’
চিকিৎসক নাজির খান জানান, শাহরিন ডান পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তার সার্জারি করতে হবে। পিঠও ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেপালি বসন্ত বহরা

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি মেহেদি হাসান। প্রথমবারের মতো বিমান ভ্রমণ করছিলেন তিনি। তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং ওই আত্মীয়ের মেয়ে সঙ্গে ছিল। মেহেদি বলেন, ‘আমার সিটটি পেছনে ছিল। আমি আগুন দেখে পরিবারকে খুঁজতে শুরু করলাম। আমরা জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। আমাদের উদ্ধার করতে পারে এমন মানুষকে খুঁজছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু আত্মীয়দের পাওয়া গেলো না।’
কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড টিচিং হসপিটালটিতে শাহরিন ও মেহেদিসহ ১২ আহতের চিকিৎসা চলছে। অপর চারজনকে এ হাসপাতালে আনা হলেও পরে তাদের গ্রান্ডে ইন্টারন্যাশনাল, নিউরো এবং নেপাল মেডিসিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বিবিসি নেপালিকে কেশব পান্ডে নামের আহত এক নেপালের নাগরিক জানান আগুনের কথা। কিন্তু কীভাবে বিমান থেকে বের হয়ে এলেন তা মনে করতে পারছেন না তিনি। কেশব বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আমি বিমান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। কারণ, বিমানটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। কিন্তু আমি বের হতে পারছিলাম না। আমার হাত-পা আটকে গিয়েছিল। আমি জরুরি বহির্গমন দরজার পাশের একটি সিটে বসেছিলাম। সম্ভবত উদ্ধারকারীরা দরজা খোলার পর আমি বাইরে পড়ে যাই। এরপর আর কিছু মনে নেই। আমি অজ্ঞান ছিলাম।’
দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক নেপালি সানম শাকিয়া। বিধ্বস্ত বিমানের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে সানম জানান, ‘মাটি স্পর্শ না করা পর্যন্ত বিমানটিতে কোনও ঝামেলা হচ্ছে বলে তিনি বুঝতে পারেননি। ‘বিমানটি উপর-নিচ, ডান-বাম আবার উপর-নিচ করছিলো। সে কারণে আমি ভাবলাম এটি বিমান চলাচল সংক্রান্ত কিছু। কিন্তু বিমানটির যে সমস্যা আছে সেটা কেবল জোরপূর্বক অবতরণের পরই বুঝতে পারলাম’- বলেন সানম।
ওই বিমান দুর্ঘটনায় আহত নেপালি বসন্ত বহরা বর্তমানে থাপাথালিভিত্তিক নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টকে তিনি জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। বসন্ত জানান, ঢাকা থেকে উড্ডয়নের সময় স্বাভাবিক ছিল বিমানটি। কিন্তু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ই সংকট তৈরি হয়।

রোহিঙ্গা নিধনের অস্ত্র হয়েছে ফেসবুক!

মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের ভয়াবহ ভূমিকা শনাক্ত করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্ত দল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাবিদ্বেষী প্রচারণার মধ্য দিয়েই সেখানে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার পাটাতন সৃষ্টি করা হয়। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলছেন, ওই প্রচারণার কাজে ফেসবুকই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের বিপুল পরিমাণ মানুষ প্রতিদিনের একটা বড় অংশ যাপন করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর সেখানকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলতেই ফেসবুক। তবে ফেসবুক ব্রিটিশ বিবিসির কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলা হলেও জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সব পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই রোহিঙ্গাবিদ্বেষী প্রচারণার মধ্য দিয়ে পরিকল্পিত সেনা-অভিযান শুরু হয়েছিল। সরেজমিন কক্সবাজার পরিদর্শন করে জাতিসংঘের সেই প্রতিবেদনের যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সেখানকার শরণার্থী শিবিরে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনও নিশ্চিত হয়, রাখাইনে সেনাবাহিনীর তাণ্ডব শুরু হয়েছিল ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চেকপোস্টে হামলার অন্তত ৩ সপ্তাহ আগে থেকে। আর তারও আগে শুরু হয়েছিল গ্রামে গ্রামে সেনা প্রচারণা। অ্যামনেস্টির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও ‘রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের সামরিক প্রচারণা’কে সেখানকার সংকটের জন্য দায়ী করা হয়েছে।
রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য গণহত্যা তদন্তে নিয়োজিত সংস্থাটির মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিদ্বেষী প্রচারণায় ফেসবুক ভয়াবহ ভূমিকা রেখেছে। মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত বলেছেন, রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা সংকটে গণহত্যার আভাস পাওয়া গেছে।
মিয়ানমারের জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধান মিশনের চেয়ারম্যান মারজুকি দারুসমান সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গা নিধনে সামাজিক মাধ্যম ‘নির্ধারণী ভূমিকা’ পালন করেছে। তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের মধ্যে বিরোধ, অশান্তি ও দ্বন্দ্বের মাত্রা বাড়িয়েছে বিপুল পরিমাণে। নিশ্চিতভাবেই বিদ্বেষী প্রচারণা সেই দ্বন্দ্ব-বিরোধ-অশান্তির একটা অংশ।’ মিয়ানমারে ফেসবুকের জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় সামাজিক মাধ্যম হলো ফেসবুক। আর ফেসবুক মানে হলো সামাজিক মাধ্যম।
তদন্তকারী ইয়াংহি লি জানান, মিয়ানমারে ফেসবুক সরকারি, বেসামরিক ও ব্যক্তিগত জীবনের বিশাল অংশ। সরকার জনগণের মধ্যে তথ্য প্রচার করার জন্য এটা ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে যা কিছু করা হয়, তার সবই হয় ফেসবুকে।’ তার মন্তব্য, ফেসবুক দরিদ্র দেশটিকে সাহায্যও করেছে আবার বিদ্বেষী প্রচারণা ছড়াতেও ব্যবহার করা হয়েছে।
ইয়াংহি লি আরও বলেন, ‘ফেসবুক সরকারি বার্তা সরবরাহ করতো কিন্তু আমরা জানি কট্টর বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদেরও নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তারা রোহিঙ্গা অথবা অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অর্থেই প্রচুর সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়িয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভীত যে ফেসবুক এখন একটি জন্তুতে পরিণত হচ্ছে আর এটা আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে।
গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে ফেসবুক বলছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষী প্রচারণার কোনও স্থান নেই।

উপনির্বাচনে বিজেপি’র পরাজয়কে 'মহান জয়' বললেন মমতা

ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারে উপনির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হওয়ায় বিরোধীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। 
পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি’র পরাজয় সম্পর্কে বলেছেন, এটা মহান জয়। মায়াবতী ও অখিলেশকে শুভেচ্ছা। এই জয় আসলে বিজেপি’র শেষের শুরু। মমতা বিহারের জয় সম্পর্কে আরজেডি প্রধান লালুপ্রসাদ যাদবকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
সমাজবাদী পার্টির নেতা আবু আজমী বলেছেন, এটা সেমিফাইনাল, ২০১৯ সালে ফাইনাল নির্বাচন হবে। আমি নিশ্চিত যে ২০১৯ সালে আরো ভালো ফল হবে।
গত ১১ মার্চ বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর এবং ফুলপুর লোকসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। এছাড়া, জেডিইউ-বিজেপি শাসিত বিহারের অররিয়া লোকসভা কেন্দ্র ও ভবুয়া এবং জাহানাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়।
রাজ্য বিধানসভায় নির্বাচিত হওয়ার পর উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ গোরক্ষপুর আসন ও উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ মৌর্য লোকসভা আসনে পদত্যাগ করায় ওই আসন দুটি শূন্য হয়। অন্যদিকে, বিহারের আরারিয়া আসনে আরজেডি এমপি মুহাম্মদ তাসলিমুদ্দিনের মৃত্যুতে ওই আসনটি শূন্য হয়। 
উত্তর প্রদেশে উপনির্বাচন হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একে মর্যাদার লড়াই হিসেবে অভিহিত করে বিজেপি আগের চেয়েও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবে বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বিপরীত ফল হয়েছে।  
উত্তর প্রদেশের দুটি কেন্দ্রেই অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টিকে সমর্থন জানিয়েছিল বহুজন সমাজ পার্টির মায়াবতী।
আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত বেসরকারি ফলে প্রকাশ, উত্তর প্রদেশের ফুলপুর আসনে সমাজবাদী প্রার্থী বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন। গোরক্ষপুর আসনে বিজেপি পিছিয়ে রয়েছেন।
বিহারের আরারিয়া লোকসভা আসনে আরজেডি প্রাথী সরফরাজ আলম বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ সিংকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন।
অন্যদিকে, বিহারের জাহানাবাদ বিধানসভা আসনে আরজেডি প্রার্থী জেডিইউ প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। ভবুয়া বিধানসভা আসনে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী।

বিজেপিকে আটকাতে সোনিয়ার নৈশভোজে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ

ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসা আটকাতে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর দেয়া নৈশভোজে বিরোধী দলগুলো একজোট হয়েছেন। গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে সোনিয়ার ‘ডিনার ডিপ্লোম্যাসি’তে ২০টি দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
২০১৯ সালে ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এখন থেকেই দেশের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিজেপিবিরোধী জোট গড়ার কাজ শুরু  হয়েছে।
নৈশভোজ শেষে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার বার্তায় বলেন, ‘অসাধারণ নৈশভোজ! বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে ঘরোয়া স্তরে  ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সুযোগ। অনেক রাজনৈতিক কথা হল। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক শক্তি, উষ্ণতা ও অকৃত্রিম স্নেহ।’
সোনিয়ার ওই নৈশভোজ শেষে কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সূর্যেওয়ালা বলেন, দেশের সামনে আজ গভীর সঙ্কট। সরকারের নাকের ডগা দিয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। বেকারত্ব ও দুর্নীতি বেড়ে চলেছে। এরকম অবস্থায় বিরোধীদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে এসব ইস্যুতে সকলেই উদ্বিগ্ন।
সম্প্রতি মুম্বাইয়ে এক অনুষ্ঠানে সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, ‘জাতীয় স্তরে কোনো কোনো  ইস্যুতে আমরা হাত মিলিয়েছি। কিন্তু, তৃণমূলস্তরে আমরা একে অপরের প্রতিপক্ষ। প্রত্যেক দলেরই কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। কাজটা কঠিন। কিন্তু আমরা যদি বৃহত্তর  স্বার্থ ও দেশের কথা ভাবি, তাহলে স্থানীয় স্তরের বিভেদ ভুলে আমাদের একসঙ্গে আসতেই হবে।’
'বিজেপি ফিনিশের আশায় আছি'
এ প্রসঙ্গে কোলকাতার ‘সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ফর উইমেন’-এর অধ্যাপিকা  ড. আফরোজা খাতুন আজ (বুধবার) রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘বিরোধী শক্তি যদি জোটবদ্ধ হয় তাহলে অবশ্যই সরকারের পতন হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি এবং হওয়াটা প্রয়োজন। বিরোধী কংগ্রেসের মধ্যে যে অরাজকতা, দুর্নীতি এসব প্রসঙ্গ বাদ দিয়েই বলতে চাই, এই মুহূর্তে দেশ থেকে হিন্দুত্ববাদী সরকারকে নামানো দরকার। এজন্য যতটা শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার সেই শক্তি জোট বাঁধুক তা আমরা চাই। গতকাল দেখলাম সোনিয়া গান্ধীর আহ্বানে একসঙ্গে ২০ টা দল একসঙ্গে তারা ডিনারে গেছেন, উদ্দেশ্য জোট বাঁধা। এটি যদি আরো শক্তিশালী হয় তাহলে ভালো কিন্তু বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে গেলে তাতে ক্ষতি হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে বাম-ডান যদি সকলে মিলে ওই উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হয় এবং মমতা যেটা বলেছেন, ‘দু’হাজার উনিশ-বিজেপি ফিনিশ’, সেই ফিনিশের আশায় আমরা আছি। কিন্তু যে সরকার ক্ষমতায় আসুক, গণতান্ত্রিক সরকার দরকার।’ 
অধ্যাপিকা ড. আফরোজা খাতুন বলেন, ‘এই মুহূর্তে অবশ্যই বিজেপি সরকারকে সরানো সবচেয়ে প্রধান জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি শুধু সংখ্যালঘুরা নয়, মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, নারীসহ সকলেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সংখ্যালঘু মুসলিম ছাড়াও আমরা সকলেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে বিজেপিকে হটাতে হবে এটাই আমাদের আশা।
নৈশভোজে অংশ নেয়া নেতাদের মাঝে সোনিয়া গান্ধী

সরকারি ডিসপেনসারিতেই মানা হয় না অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার নিয়ম! by তাসকিনা ইয়াসমিন

জয়নাব বিবির (৭০) গ্যাসের সমস্যা। তাই তিনি এসেছেন চিকিৎসকের কাছে। তাকে তিনদিনের ওষুধ দিয়ে আবার তিনদিন পর আসার জন্য বলেছেন সংশ্লিষ্ট ওষুধদাতা। জয়নব বিবি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমারে কইসে তিনদিন পর আবার আইতে, আইলে আবার দেবে।’
রাজধানীর আজিমপুর, হাজারীবাগ, জনসন রোড, মিরপুরসহ ১৭টি সরকারি ডিসপেনসারিতে সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সব দিনে নিয়মিতভাবে সকাল আটটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত এমবিবিএস চিকিৎসকরা (বিসিএস স্বাস্থ্য) রোগী দেখেন। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী এখান থেকে রোগীদের সব ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ওষুধের পরিমাণ কম থাকায় সবসময় অ্যান্টিবায়োটিকসহ সব ওষুধের পুরো ডোজ পূরণ করে দেওয়া হয় না। পরে রোগীদের আসতে বলা হলেও সব রোগীরা না আসায় তারা অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো ডোজ পূরণ হচ্ছে না।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রোগীদের যথেচ্ছাচার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে বডিতে ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা চালাচ্ছে। আর এক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও খোদ সরকারি ডিসপেনসারিতেই উল্টো চিত্র দেখা গেছে।
তেজগাঁও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘আমরা যে কাজটা করি, সাতদিনের না দিয়ে দুই বা তিন দিনের দিচ্ছি। এটা পুরোটা না দিতে পারলে আমরা বলে দিই যে তিনদিন পর আপনি আবার এসে নিয়ে যাবেন। আমাদের এখানে যারা আসে তারা ওয়ার্কিং ডিসট্যান্সের মধ্যেই আসে। যারা দূর থেকে আসে তাদের সবগুলো ওষুধ দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।’
তিনি বলেন, ‘সব রোগীতো কথা শোনেন না। তবে অনেক রোগীই কথা শোনেন। আমরা স্পষ্ট লিখে দিই সাতদিন খেতে হবে। পাঁচদিন হলে পাঁচদিন খেতে হবে। যাওয়ার সময় বলে দেই আপনার ওষুধ শেষ হলে এসে নিয়ে যাবেন।’
অনিয়মিত ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, ‘কিছু অ্যান্টিবায়োটিক আছে দিনে একবার খেলেই হয়। কিছু আছে দিনে দু’বার খেতে হয়। কিন্তু আমাদের পক্ষে সবসময় সব ওষুধ একদিনে প্রোভাইড করা সম্ভব হয় না।’
তবে অ্যান্টিবায়োটিক ফুলকোর্সের ওষুধ দিয়ে দেন বলে জানান মিরপুর-১০ সরকারি বহির্বিভাগ চিকিৎসালয়ের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মাহবুবা আফসারী। তিনি বলেন, ‘হয়তো কোনও ওষুধ কম থাকলে কম দিতে পারে, কিন্তু সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ফুলকোর্সই দেওয়া হয়। ভেঙে ভেঙে দেওয়া হয় না।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. মাহবুব কবীর বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের উল্টাপাল্টা ব্যবহার হচ্ছে, হাউডোজ ব্যবহার হচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিকের মান খারাপ, ইনগ্রেডিয়েন্টস খারাপ, ভিতরে ইনগ্রেডিয়েন্টস কম দেওয়া হচ্ছে, ৫০০ মিলিগ্রামের যায়গায় ৩০০-৩৫০ মিলিগ্রাম দেওয়া হচ্ছে। এগুলো খেয়ে খেয়েই তো মানুষের বডি রেজিস্ট্যান্স নষ্ট হচ্ছে। আমরা চিঠি দিয়েছি এ ব্যাপারে।’
ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. এহসানুল করিম বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক আসলে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিক্রি করতে হবে এটা আইনেও আছে। বেশিরভাগ ওষুধের দোকানের তো লাইসেন্সই নেই। কারণ লাইসেন্স নিতে গেলে একজন করে ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। এটা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের দেখার কথা। কিন্তু তারা সেভাবে দেখে বলে মনে হয় না। তাদের ১৫ জন ডিস্ট্রিক্ট অফিসার আছে তাদের অধীনে কর্মী নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সরকারি ডিসপেনসারিগুলোতে পুরোপুরি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারে না। যেখানে লাগবে যা তার চেয়ে কম দিলাম। এটা টোটাল সরকারি ব্যবস্থার কারণে দেওয়া সম্ভব হয় না। আমাদের বরাদ্দের অবস্থা যে খারাপ এটা তো সবাই জানে। আমরা তো সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই যেন আমাদের বরাদ্দ বাড়ানো হয়। আমাদের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দশমিক ছয় শতাংশ। এটা তো বেশি হওয়া উচিত। আসলে এই পরিসংখ্যান দেখেই তো বোঝা যায়, স্বাস্থ্যখাতের কি অবস্থা।’

হিজাব বিপ্লব এবং বাংলাদেশি রাজনীতি by মতিউর রহমান চৌধুরী

এক সময় বাইরের দুনিয়ায় অন্তত দুটো বিষয়ে বাংলাদেশের সুনাম ছিল। এক, উদার গণতন্ত্র। অন্যটি হচ্ছে প্রাণবন্ত গণমাধ্যম। এখন দুটোই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি। দুই বেগমের ভারসাম্য রক্ষার গণতন্ত্র। পশ্চিমা দুনিয়ায়ও ছিল বেশ আলোচিত। একবার খালেদা জেতেন। অন্যবার হাসিনা। মাঝখানে দূরত্ব তৈরি হয়। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে। হরতাল-অবরোধে কাবু হয় খালেদার শাসন। তবুও তিনি অনড়। তত্ত্বাবধায়কে যাবেন না। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত সদস্যরা সংসদ থেকে ইস্তফা দেন। সৃষ্টি হয় শূন্যতা। সব আসনে উপনির্বাচন দেয়া সম্ভব নয়। তাই খালেদা জিয়ার পরামর্শদাতারা এক সকালে সিদ্ধান্ত নিলেন সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দেবেন। যথারীতি তাই হলো। বিরোধীরা এলেন না। যাই হোক, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে সংসদের বিলুপ্তি ঘটলো। এর আগে স্যার নিনিয়ান এসেও ঝগড়া থামাতে পারেননি। মিজানুর রহমান চৌধুরীর সেই মুচলেকা শব্দটি সমঝোতা ভেঙে দিয়েছিল। বিএনপি নেতারা সেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানতে কতিপয় শর্ত দিয়েছিলেন। মিজান চৌধুরী সেদিন বলেছিলেন শর্ত দিয়ে রাজনীতি হয় না। সেদিন কুশলী হননি বিএনপি নেতারা। এর মূল্য তাদের দিতে হয়েছে। নানা সমালোচনা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক গণতন্ত্র এগিয়ে যাচ্ছিলো। ২০০৬-এ এসে আবার হোঁচট। কে হবেন তত্ত্বাবধায়ক প্রধান এ নিয়ে অযথা বিএনপি নেতারা পানি ঘোলা করতে থাকেন। বিচারপতি কে এম হাসানকে মাথায় রেখে কৌশল ঠিক করেন। যা কিনা বিরোধীদের তখনই রাজপথে ঠেলে দেয়। কাজের কাজ কিছু না হলেও বিতর্কিত হন কে এম হাসান। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি কে এম হাসান অন্য যে কোনো বিচারকের তুলনায় এখানে দায়িত্বের প্রতি সৎ হতেন। অযথা তার গায়ে কলঙ্ক লেগে গেল। বিদায় নিলেন তিনি। এরপরের খেলাও অস্বচ্ছ, বাড়তি সুবিধা নেয়ার অপকৌশল। রাজপথ উত্তপ্ত হলো। বিদেশিরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন। লগি-বৈঠায় প্রাণ গেল ১১ জনের। তাও রাজপথে। এই দেখে বিদেশিরা ভাবলেন এই তো সময়। সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলেন। জেনারেল মইনের সম্মতি, জেনারেল মাসুদ এক পায়ে খাড়া। জেনারেল আমিন সুযোগের অপেক্ষায়। এখানে রসদ যোগান ব্রিগেডিয়ার বারী। পরিণতিতে এলো ওয়ান ইলেভেন।
নানা খেলা শুরু হলো পর্দার আড়ালে। জেনারেলরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। বিশেষ করে জেনারেল আমিন কৌশলে জেনারেল মইনকে হটিয়ে ক্ষমতা নেয়ার ফন্দি আঁটেন। কিন্তু বিধিবাম। মইন এটা টের পেয়ে অন্য খেলা খেলে দেন। এ দ্বন্দ্বে শিকার হন ব্রিগেডিয়ার বারী। তাকে সরিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়। জেনারেল মইন উপায়ান্তর না দেখে পতিত রাজনীতির কাছেই আত্মসমর্পণ করেন।
সংঘাতময় রাজনীতির অবসান হবে এটা ভেবে জনগণ নির্ভেজাল সমর্থন দিতে শুরু করলো। বড় দুই দলেই সংস্কারবাদীদের উত্থান ঘটলো। জেনারেলরা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হলেন। বাংলাদেশের জনগণকে তারা চেনেন না। এ দেশের জনগণের ভালোবাসা কচুপাতায় পানি রাখার মতো। এই ভালো এই খারাপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের একটি তুচ্ছ ঘটনা জেনারেলদের ভাবিয়ে তুললো। রাজনীতিবিদদের গায়ে দুর্নীতির কলঙ্ক লেপে দিলেন জেনারেলরা। নিজেরাও দুর্নীতিতে ডুবে গেলেন। ভেস্তে গেল মাইনাস টু-এর কথিত ফর্মুলা। দুই নেত্রীকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার কৌশলও ব্যর্থ হলো। দুই নেত্রী যখন জেলে তখন সংলাপ শুরু হলো রাতের অন্ধকারে। শেখ হাসিনা বিদেশ চলে গেলেন। ফিরতে চাইলে হিথ্রো বিমানবন্দরে গতি রোধ। অনেক নাটকীয়তার পর দেশে ফিরলেন। খালেদা তখনও জেলে। সংলাপ চলতে থাকলো নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে। খালেদাকে রাজি করতে সাব-জেলে নানামুখী চেষ্টা চললো। সৌদি আরবে পাঠানোর উদ্যোগ এর আগেই ব্যর্থ হয়েছে।
এক পর্যায়ে খালেদা রাজি হলেন। জেল থেকে মুক্তি পেলেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন। শেখ হাসিনা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেলেন। খালেদা চাপে। সারা দেশ সফর করে এসে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অর্থাৎ অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান হলেন। আর এর অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। যে কমিশন তার দল ভাঙার চেষ্টা করেছে সে কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ হবে সেটা নিয়ে ভাবতে থাকলেন। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তাকে কোনো একটা জায়গা থেকে বলা হলো দল এক রাখার স্বার্থে নির্বাচনে যান। ফলাফল আপনার পক্ষে যাবে না- এমনটাই বলাবলি হচ্ছে। খালেদা উভয় সংকটে। এই অবস্থায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এসে সব উল্টে দিলেন। বললেন ম্যাডাম ফল নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমাদের কাছে খবর আছে আমরাই জিতবো। জেনারেলদের মনোভাবের কথাও তুলে ধরলেন। খালেদা নির্বাচন বর্জনের পথ থেকে সরে দাঁড়ালেন।
নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেলো আওয়ামী লীগ। জামায়াতকে দুষতে শুরু করলেন খালেদা। নির্বাচন বর্জনই শ্রেয় ছিল তখন বিএনপির অনেকেই বলতে থাকলেন। সম্পর্কের অবনতি ঘটলো দু’দলের মধ্যে। এখনো সেটা মেরামত হয়নি। বরং দূরত্ব আরো বেড়েছে। খালেদা যখন জেলখানায় জামায়াত তখন ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অংশ নেয়ার চিন্তায় বিভোর। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকছে না- এমনটা চাউর হয়ে গেছে রাজনৈতিক বৈঠকখানায়, মিডিয়ায়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে ২০০৮-এর নির্বাচনের পর থেকে। খালেদা তার বাড়ি হারান। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়। যার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ১৭২ দিন হরতাল পালন করেছিল। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে তারা হেরে যায়। আগুন সন্ত্রাসের কলঙ্ক লাগে গায়ে। নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক না দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে লাভ হতো কি-না তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, এতটা বিপর্যয় হতো না। সংলাপে অংশ নেয়াও ছিল জরুরি। এখানে অবশ্য বলতে হবে বিএনপির ভেতরে রয়েছে আওয়ামী লীগের অনেক শেয়ার হোল্ডার। তারাই খালেদা জিয়াকে বলেছে সরকারের পতন হয়ে যাবে। নির্বাচনে গিয়ে কি লাভ। ভুল বৈদেশিক নীতিও এখানে ভূমিকা রেখেছে। রাজনীতিতে একটি ভুল হাজারো ভুলের জন্ম দেয়। বদলে গেল রাজনীতির দৃশ্যপট। নতুন নতুন কৌশল নিতে থাকে সরকার। মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত হয়ে পড়ে বিএনপি। খালেদা নিজেও চাপের মধ্যে পড়েন। রাজনীতির কৌশল পরিবর্তন করেও শেষ রক্ষা হয়নি। শাসকদল খালেদাকে মাইনাস করে নির্বাচনে যেতে চায়। খালেদা কারাগারে এক দুর্নীতি মামলায়। তার মুক্তির দাবি নিয়ে বিএনপি এখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে মাঠেই নামতে পারছে না। সরকার হার্ডলাইনে। শান্তিবাবু মারা গেছেন। তারা আর বিএনপিকে দাঁড়াতেই দেবে না। বিএনপিকে কঠিন চাপে রেখে নির্বাচনে যেতে চায় দলটি। বিএনপি কি করবে? নির্বাচন বর্জন করলে দল টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। আবার নির্বাচনে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। খালেদা জিয়া বাইরে থাকলে অন্যরকম হতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার কারো কথা শুনবে না। বিদেশিরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলবে। নানামুখী চাপ আসবে। ক’দিন পর এই খবর মিডিয়াতেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন হয়ে গেল রাজনীতি। শুরুতে যেটা বলেছিলাম পাশ্চাত্য দুনিয়ায় আলোচিত ছিল দুই বেগমের রাজনীতি। বলা হতো একমাত্র মুসলিম দেশ যেখানে পাশ্চাত্য ধারায় গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে। গর্ব করার বিষয় ছিল। নারীর ক্ষমতায়ন বলে কথা। এখন তা বিদায় নিতে চলেছে। একমুখী চিন্তার দিকে নজর বেশি। এই অবস্থায় আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কি হবে এটা অস্পষ্ট। সংঘাতের দিকে যাবে না এটাই বা কে বলবে?
দুই, বাংলাদেশের গণমাধ্যম নব্বইয়ের পর ছিল উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। অনেক কিছুই বলা যেতো। লেখা যেতো। সময় বদলে যোগ হয়েছে সেলফ সেন্সরশিপ। এটা নতুন ধরনের সাংবাদিকতা। ট্রাম্পের ফেইক নিউজের ঢেউ বাংলাদেশেও। কোন্‌টি সঠিক, কোন্‌টি বেঠিক এটা বাছাই করা বড় কঠিন। সাংবাদিকতা হয়ে গেছে প্রাপ্তিনির্ভর। সংবাদ সম্মেলনের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। দলীয় রাজনীতির প্রভাবে সাংবাদিকরা এখন আসল ছেড়ে নকল নিয়েই ব্যস্ত। এর ফলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসও মানুষ ভুলে যাবে। মুক্ত চিন্তা আর কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না হলে এক সময় দেশটা ইরানের পথ ধরতে পারে। এমনিতেই ‘হিজাব বিপ্লবে’ বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কাবু হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার মোহে বিভোর ছিলেন ইরানের শাহ। ফল কি দাঁড়িয়েছিল তা সবার জানা।

নারীর অলঙ্কার এবং... by শামীমুল হক

এক দেশে এক রাজা ছিলেন। তার সাত রানি। কিন্তু রাজা ছোট রানিকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। এতে অন্য ছয় রানি ক্ষেপে যান। তারা ছোট রানিকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করতে থাকেন। কিন্তু রাজা বাড়িতে থাকতে এটা কখনোই সম্ভব নয়। তাই তাদের অপেক্ষা রাজা বেড়াতে যাওয়ার। কয়েকদিন পর রাজা অন্য রাজ্যের অতিথি হয়ে বেশ কদিনের জন্য নিজ রাজ্য ত্যাগ করেন। এদিকে রাজাবিহীন ছয় রানি তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। কি করা যায়? একেক রানির একেক পরামর্শ। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন ছোট রানিকে বিশ্রি বানিয়ে দিতে হবে। রাজা ফিরে এসে যেন তার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেই কথা সেই কাজ। ছয় রানি মিলে ছোট রানির নাক, কান ছিদ্র করে সেখানে মোটা লোহার রিং পরিয়ে দেয়। ছোট রানি অসহায়। ওদিকে অন্য রাজ্য সফর শেষে রাজা নিজ রাজ্যে ফেরেন। এসেই ছোট রানিকে ডাকেন। অপর ছয় রানি মহা খুশি। রাজা এবার ঝেটিয়ে বিদায় করবেন ছোট রানিকে। ছয় রানি আড়ালে বসে আছেন। ছোট রানি সামনে গেলে রাজা কিভাবে তাকে বিদায় করে সে দৃশ্য দেখার জন্য। রাজার ডাক পেয়ে ছোট রানি ভয়ে ভয়ে রাজার সামনে হাজির হন। রাজাতো তাকে দেখে অবাক। এত সুন্দর করে কে সাজিয়েছে রানিকে? মুখে বলে উঠলেন বাহ্ চমৎকারতো। এত সুন্দর কেন লাগছে তোমাকে। কাছে ডেকে নেন। জড়িয়ে ধরেন। নাক ও কানে রিং দেয়ায় রানিকে এত সুন্দর লাগছে। কিন্তু এগুলো যে লোহার। সঙ্গে সঙ্গে উজিরকে ডাকেন। নির্দেশ দেন রানির জন্য হীরার রিং বানাতে। যাতে থাকবে কারুকাজ। নির্দেশ মতো দ্রুত তা তৈরি করে আনা হয়। রানিকে পরানো হয়। আরে ছোট রানিতো সত্যিই আগের চেয়ে অনেক সুন্দর। অলঙ্কার তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। এসব দেখে হতাশ ছয় রানি। তারাও এখন নাক ও কান ছিদ্র করে অলঙ্কার পরেছে। সেই থেকে অলঙ্কারের যাত্রা শুরু। অলঙ্কার মানে হলো সৌন্দর্য বাড়ানো। নারীর সৌন্দর্য যেমন তার অলঙ্কার গহনা। তেমনি রাষ্ট্রের অলঙ্কার হলো প্রেসিডেন্ট। এখনো ব্রিটেনে রানির যুগ রয়েছে অলঙ্কার হিসেবে। বিভিন্ন দেশে রাজা রয়েছে অলঙ্কারস্বরূপ।
এ মুহূর্তে শিল্পীর মুখের সেই গানটি খুব মনে পড়ছে- যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কি দোষ? কবির এ বয়ান শিল্পীর কণ্ঠে সুমধুর হয়ে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। একসময় এ গানটি দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। আসলেই পুতুলকে কে না ভালোবাসে? শিশুরাতো পুতুল নিয়ে খেলা নয় শুধু, ঘুমানোর সময় পাশে নিয়ে ঘুমায়। কারো কারো ঘরে পুতুল শোপিস হিসেবে সাজানো রয়েছে। বর্তমান বাজারে এই পুতুলের মাধ্যমে গান বলানো হচ্ছে। কথা বলছে অনর্গল। শুধু প্রয়োজন ব্যাটারির। ব্যাটারি ফিট করলে এই পুতুল তার কার্যক্রম শুরু করে। পুতুল হলো সৌন্দর্যের অলঙ্কার। এরকমই রাষ্ট্রের অলঙ্কার হলেন প্রেসিডেন্ট। যিনি মহামান্য। কিন্তু তার পাওয়ার বা ক্ষমতা সেই পুতুলের মতোই। রাষ্ট্রপ্রধান হলেও প্রেসিডেন্ট সরকারের বাইরে যেতে পারেন না। অনেক কিছুই তিনি করতে পারবেন, তবে তা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। মূল কথা- প্রেসিডেন্টের ব্যাটারি হলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি যা বলবেন, যেভাবে বলবেন তিনি সেভাবেই চলবেন। হাঁটবেন। দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ সুন্দর করে বিষয়টিকে বিভন্ন সভা-সমাবেশে উপস্থাপন করেন। তার যে ক্ষমতা নেই সেটা তিনি নিজেই মজা করে কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশ করেন। এই রসিকতা দিয়েই প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। দেখতে দেখতে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ তার পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করে ফেলেছেন। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এ নির্বাচন নিয়ে তেমন তোড়জোড় হয় না দেশে। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতারও প্রয়োজন নেই। সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট বানান বলে সরকারি দল অনায়াসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈতরণী পার হন। তবে যেভাবেই নির্বাচিত হোক প্রেসিডেন্ট তিনি যে শুধু অলঙ্কার, কিংবা পুতুল তা সবাইকে স্বীকার করে নিতে হবে। এ জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, প্রেসিডেন্ট তারা ভোট দিয়ে বানান না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন সংসদ। সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। বাংলাদেশে সাধারণত সরকারে যে দল থাকে, সে দল যাকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেন তিনিই হন প্রেসিডেন্ট। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো পরিবেশও নেই। তারপরও সচেতন মানুষ দৃষ্টি রাখেন সেদিকে। দেশে দেশে এমন অলঙ্কারিক পদ হিসেবে রাজা, রাষ্ট্রপতি, প্রেসিডেন্ট কিংবা রানি রয়েছেন। তারা রাষ্ট্রের শোভা বর্ধন করেন।
দুই: পৃথিবীতে হায়? সে বেশি চায়/ আছে যার ভূরি ভূরি/ রাজার হস্ত/ করে সমস্ত/ কাঙ্গালের ধন চুরি। যথার্থই বলেছেন কবি। চলার পথে কবির এ কাব্য কত যে মধুর তা সবাই উপলব্ধি করছেন। বাস্তবেও দেখছেন প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। রাস্তায় বেরুলে ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, ব্লেড পার্টি, পকেটমার এমনকি থাবা পার্টির ভয়। যেকোনো সময় তারা তাদের কৌশল প্রয়োগ করে হস্তগত করতে পারে অন্যের ধন, অর্থ। কেউ কেউ এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। আবার রাজপথে, ফুটপাথে অনেক ভিক্ষুক আছেন যারা কোটিপতি। ঢাকায় তাদের একাধিক বাড়ি রয়েছে। ভবন রয়েছে। কারো কারো সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। কারো সন্তান সম্মানজনক চাকরি করছেন। কেউ কেউ মেয়ে বিয়ে দিয়েছে লাখ লাখ টাকা খরচ করে। এত কিছুর পরও ওইসব ভিক্ষুক এখনো রাজপথে থালা নিয়ে বসেন। ভিক্ষা করেন। বাসায় থাকতে নাকি তাদের ভালো লাগে না। ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে বলে ওঠেন- ‘মাগো কিছু দিয়া যান।’ দীর্ঘদিনের অভ্যাস ত্যাগ করা খুব কঠিন। ওই ছেলের মতো। ওই ছেলে বিয়ে করেছে। ঘরে নতুন বউ। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রাতে বাড়ি ফেরে। একদিন বউ তাকে বলছে, তুমি কি কর। ছেলে জবাব দেয় চাকরি করি। বড় চাকরি। ওগো বলো না কি চাকরি? ছেলে কোনো জবাব দেয় না। এভাবে দিন চলতে থাকে। বেশ কিছু দিন পর একরাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দু’জন। হঠাৎ চিৎকারে বউ ঘুম থেকে জেগে উঠেন। দেখেন স্বামী তার চিৎকার করে বলছেন- ওই লাগেনি জুতা পালিশ...। লাগেনি জুতা পালিশ...। বউয়ের আর বুঝতে বাকি রইলো না তার স্বামী কি করেন। দিনে যা করেন রাতে স্বপ্নের মধ্যেও স্বামী বেচারা তা দেখছেন। তাই ডাকছেন ‘ওই লাগেনি জুতা পালিশ...।’ আসলে অভ্যাস কখনও পরিবর্তন হয় না। এমনকি তা আপনজনের কাছে লুকাতে গেলেও তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। কখনো স্বপ্নে কিংবা কখনো মনের অজান্তেই তা প্রকাশ করেন। রাজধানী ঢাকার অলিগলিতে এখন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের ছড়াছড়ি। সব কেন্দ্রই চলছে বেশ ভালোভাবেই। অথচ একসময় সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ছিল একটি। তা তেজগাঁওয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এসব কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসক্তরা কি সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন। না। বেশির ভাগই সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারেননি। কারণ, এসব কেন্দ্রে মাস কয়েক থাকার পর বাইরে বেরিয়ে এসে ফের তারা অন্ধকার জগতে পা বাড়ান। এমনও শোনা যায়, কোনো কোনো নিরাময় কেন্দ্রে নিজেরাই আসক্তদের নেশা সরবরাহ করে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। পুরনো অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেন না তারা। নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা করিয়েও সন্তানদের সুস্থ করতে পারছেন না অভিভাবকরা। এমন কত অভ্যাস যে গড়ে তোলে মানুষ। ঘুষখোর অফিসার জীবনে কোটি কোটি টাকা ঘুষ খেয়েও তার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেন না। বাড়ি-গাড়ি, ধন-দৌলত করেও তাদের আফসোস থেকে যায়। তাইতো বনখেকোর বাসার চালের ড্রাম, বালিশের ভেতর থেকে পাওয়া যায় অর্থ আর অর্থ। যে টাকা দেখে সারাদেশ হয় হতবাক। মিডিয়া খবর নিয়ে দেখেছে এত টাকার মালিক হলেও বনখেকো তার মাকে ভরণপোষণ করতো না। ভাঙা ঘরেই বসবাস করতে হয়েছে তাকে। এ কাহিনী শুনেই সারা দেশ ছিঃ ছিঃ করেছে। দেশের মানুষ যতই ছিঃ ছিঃ করুক এতে তাদের কিছুই যায় আসে না। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ফোকলা করে হাজার হাজার কোটি টাকা গিলে খেয়েছে। কখনো ভুয়া এলসি, কখনো নকল কাগজ সরবরাহ করে একের পর এক টাকা তুলে নিয়েছে তারা। বাসের কন্ডাক্টরও নাকি সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। ব্যাংকের কর্ণধাররা পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে ব্যাংকগুলোকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করেছে। এইতো গতকাল এক ব্যাংকারের সঙ্গে দেখা। তিনি দুঃখ করে বললেন, ব্যাংক থেকে প্রচ- চাপ। একেকজনকে কোটি টাকা টার্গেট দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এফডিআর, মোটা অঙ্কের টাকা জমা রাখাসহ নানা সিস্টেমে ব্যাংকে গচ্ছিত রাখতে গ্রাহকদের উদ্বুব্ধ করতে। কি করব বুঝে পাচ্ছি না। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। অনেকে এ অবস্থায় ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। রাজনীতিও উত্তপ্ত। কি হয় দেশে তা নিয়ে চিন্তিত মানুষ। কিন্তু কেউতো অভ্যাস বদলায় না। বদলাতে চায় না। সবাই মনে করে তিনি যা করছেন, তা-ই ভালো। এ কারণেই হয়তো ‘কয়লা যায় না ধুলে, অভ্যাস যায় না মরলে’ প্রবাদ বাক্যটি সমাজে প্রচলিত। আর তাইতো কারো কারো জীবনে অভ্যাস পরিণত হয় বদ অভ্যাসে।

অভিযান শুরুর আগেই বাজারের নাম ফাঁস

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরুর আগে বাজারের নাম ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। এই অভিযোগ উঠে এসেছে বাজার তদারকি জোরদার করা নিয়ে আয়োজিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সভায়। সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, আগে বাজারে অভিযানের দিন রিজার্ভ পুলিশের সদস্যদের পাওয়া যেত। এখন সংশ্লিষ্ট থানা থেকে সদস্যদের নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হয়। এতে বাজারের নাম আগেই প্রকাশ হয়ে যায়। বৈঠকে আগের মতো রিজার্ভ পুলিশ সদস্যদের নিয়ে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য পুলিশ সদস্যদের মোতায়েনের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে (ডিএমপি) অনুরোধ জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অভিযানের আগে বাজারের নাম ফাঁস হয়ে গেলে তদারকিতে কোনো লাভ হয় না। ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যান। অনেক সময় দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত যাওয়ার পরই বেশির ভাগ দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সভায় বাজার তদারকির ক্ষেত্রে নানা দুর্বলতা উঠে আসে। সভায় এখন থেকে বাজারে অভিযানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতিকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বাজার তদারকি দলের কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয় গত ২৩ জানুয়ারি। এতে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যসচিব শুভাশীষ বসু। সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পবিত্র রমজান মাসসহ বিভিন্ন সময়ে বাজারে তদারকি দল পাঠিয়ে থাকে। এসব তদারকি দল নানা অভিযোগে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে। অবশ্য ধারাবাহিকভাবে না করে মাঝে মাঝে এসব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় বিশেষ কোনো সুফল পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যসচিব গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে যেসব অভিযান পরিচালনা করা হয়, তা ধারাবাহিক নয়। আবার একাধিক সংস্থা অভিযান চালায়, তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকে না। সমন্বয় করে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হলে এর সুফল পাওয়া যেত। তিনি বলেন, অভিযানের আগে বাজারের নাম ফাঁস হওয়া উচিত নয়। অভিযান আকস্মিক হওয়া উচিত। সভায় কর্মকর্তাদের আলোচনায় উঠে আসে, অভিযানের দিন তদারকি দলের সদস্যরা যথাসময়ে উপস্থিত হন না। এ কারণে অভিযান শুরু করতে দেরি হয়। তা ছাড়া অভিযানের দলনেতা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করেন না। এতে অভিযান সম্পর্কে মতামত ও সমস্যা সমাধানে সুপারিশ থাকে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব অভিযোগ করেন, বাজারে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের জন্য প্রবেশ করা যায় না। তিনি সিটি করপোরেশনকে বাজারগুলো পরিচ্ছন্ন করার তাগিদ দেন। পাইকারি বাজারে পণ্যের আমদানি ও বিক্রয়মূল্য পর্যবেক্ষণ, প্রতিদিন পরিদর্শন শেষে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল ও পর্যবেক্ষণ দলের সবাইকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয় সভায়। এতে বাজারে সিটি করপোরেশনের পণ্যমূল্যের তালিকা চক দিয়ে বোর্ডে না লিখে ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন করা যায় কি না, তা যাচাই করে দেখার অনুরোধ করা হয় সিটি করপোরেশনকে। সভায় বাণিজ্যসচিব বলেন, বাজার পর্যবেক্ষণে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য জরিমানা নয়, ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি উৎসাহিত করতে হবে। তিনি বাজার পর্যবেক্ষণ দলকে পাইকারি ও খুচরা মূল্য যাচাই করে দেখা, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ঠিক রাখার পরামর্শ দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ভিয়েতনামের পর বাংলাদেশ

তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে অবশেষে ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশ। দীর্ঘ ১৫ মাস ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির পর গত জানুয়ারিতে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় আড়াই শতাংশ প্রবৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ। এর আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪৯ কোটি ডলার বা ৪ হাজার ১৮ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছরের জানুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছিল ৪৮ কোটি ডলারের পোশাক। ২০১৭ সালে ৫০৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস (অটেক্সা) যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেখা যায়, গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে ৭০৫ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। প্রবৃদ্ধি মাত্র দশমিক ৯২ শতাংশ। অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ১৮ কোটি ৮৬ লাখ বর্গমিটারের সমপরিমাণ কাপড়ের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক রপ্তানির ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে গেছে। গত ডিসেম্বরে সেটি ছিল ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। তার মানে যুক্তরাষ্ট্রে বাজার হিস্যা সামান্য বেড়েছে বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বরাবরের মতো শীর্ষে আছে চীন। তবে দেশটির রপ্তানি অনেক কমে গেছে। গত জানুয়ারিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ২৩৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এটি গত বছরের জানুয়ারিতে রপ্তানি হওয়া ২৫২ কোটি ডলারের চেয়ে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মোট পোশাক রপ্তানির ৩৩ দশমিক ৪১ শতাংশই চীনের দখলে। গত বছর শেষে সেটি ছিল ৩৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম। গত জানুয়ারিতে ১১০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ০৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের বাজার হিস্যা ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে গত জানুয়ারিতে চতুর্থ সর্বোচ্চ ৪১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে ইন্দোনেশিয়া। পঞ্চম সর্বোচ্চ ৩৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে ভারত। ভারতের বাজার হিস্যা বর্তমানে ৪.৬০ শতাংশ।

চলে গেলেন আমাদের কালের নায়ক by মুনির হাসান

চলে গেলেন আমাদের কালের নায়ক স্যার স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। সকাল বেলায় খবরটা প্রথম শুনেছি প্রথম আলোর সম্পাদক (বিদেশ সংস্করণ) সেলিম খানের মুখে। তিনি ফোন করে বললেন, আপনার গুরু চলে গেছেন! প্রথমেই আমার মনে হলো, আরে, আমার তো আগেই ভাবা উচিত ছিল স্টিফেন হকিং পৃথিবীতে আসার জন্য যেমন অন্য একটি দিন বেছে নিয়েছেন, তেমনি যাবেনও অনন্য দিনে। সেই হিসাবে আজকের দিনটা আমার হিসাবে থাকা দরকার ছিল। কারণ, আজ মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন! আইনস্টাইনের জানানো দুনিয়ার সবচেয়ে সফল লোকটা যে এদিনকেই তাঁর মহাপ্রস্থানের দিন হিসেবে বেছে নেবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! আমাদের জানা দুনিয়ায় দুটি শক্তিশালী তত্ত্ব হলো আইনস্টাইনের আপেক্ষিতার বিশেষ ও সাধারণ তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। প্রায় ১০০ বছরের অধিক কাল ধরে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন এই দুটিকে ছাঁদনাতলায় নিয়ে জোড় বাঁধতে। সেই সাফল্যের প্রথম কাজটি করেছেন হকিং। এবং তাঁর কারণেই আমরা এখন জানি কৃষ্ণবিবর আসলে ‘কৃষ্ণ’ নয়, বরং সেখান থেকে বের হয়ে আসছে কণা স্রোত। আর ওই কণাস্রোতের নাম দেওয়া হয়েছে হকিং বিকিরণ! হকিং জন্মেছেন ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি, গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যুর ৩০০ বছর পর, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড শহরে। ওই দিনের কি কোনো মাহাত্ম্য আছে? না, দিনের মাহাত্ম্য বা এ রকম কোনো অলৌকিকতার ধার ধারতেন না হকিং। তাঁর সোজাসাপ্টা জবাব হলো, খোদ লন্ডনেই কমপক্ষে আরও ২০০ শিশুর জন্ম হয়েছে ওই দিন! ডাক্তার পিতার খায়েশ ছিল স্টিফেনকেও তিনি ডাক্তার বানাবেন। তাই হকিং যখন ঘোষণা করলেন, তিনি পড়তে চান পদার্থবিদ্যা কিংবা গণিত, তখন পুত্রের ভবিষ্যৎ ভেবে আতঙ্কিত হলেন ফ্রাঙ্ক। তাঁর ধারণা ছিল, ওই সব পড়লে স্টিফেনকে আজীবন বেকার থাকতে হবে। স্বভাবের দিক থেকে ছোটবেলা থেকেই হকিং ছিলেন খুব দুরন্ত। ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করাটা রীতিমতো অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। হকিং রেডিও খুলে তার ভেতরটা দেখতেন বোঝার জন্য নয়। হকিং আসলে আর সব বাচ্চার মতোই কাজটি করতেন। স্কুলের শিক্ষকেরা তাঁকে সাধারণের ওপরে স্থান দিতেন। আর দশজনের সঙ্গে তাঁর একটি পার্থক্য সে সময় ছিল, হকিং কেন জানি উচ্চাঙ্গসংগীত পছন্দ করতেন! সেন্ট অ্যালবা থেকে অক্সফোর্ডে পড়তে এসে হকিং মোটামুটি জনপ্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। স্বভাবের কারণে। ছাত্রটি বাচাল ও দুষ্ট, কিন্তু পড়াশোনায় ভালো। কাজেই শিক্ষকেরাও তাঁকে পছন্দ করতেন। ইচ্ছে ছিল অনার্স শেষে কেমব্রিজে যাবেন। শেষ পরীক্ষায় ভাইভা বোর্ডে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে গিয়ে হকিং বললেন, ‘আমি যদি প্রথম শ্রেণি পাই, তাহলে কেমব্রিজে চলে যাব। নতুবা কিন্তু এখানেই থাকব।’ ভাবখানা এমন, অক্সফোর্ডে থেকে মাস্টারদের অনেক জ্বালাব! অতএব একটা প্রথম শ্রেণি ও কেমব্রিজ। আজ হকিংয়ের জন্য এই লেখা লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে হচ্ছে, আর দুই-তিন বছর বাঁচলে কী ক্ষতি হতো? এমনিতে মোটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার পর ৫৪ বছর বেঁচে থাকাটাই একটা রেকর্ড। এমনকি ১৯৬৪ সালে জেন ওয়াইল্ডের সঙ্গে তাঁর প্রথম বিবাহের সময় বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। কারণ, দুই পরিবারের সবাই জানতেই লাঠিতে ভর দিয়ে বরের পোশাক পরা ২২ বছরের যুবকটি আর কিছুদিন বাঁচবেন। কিন্তু প্রকৃতির চিন্তা ছিল ভিন্ন। কারণ, এর কদিন আগেই রেজার পেনরোজের সঙ্গে মিলে হকিং দেখিয়েছেন তাঁর মেধার প্রথম স্বাক্ষর।
ঈশ্বর যখন নরক বানাচ্ছিলেন
১৯১৬ সালে আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব প্রকাশ করেন। ১৯২২ সালে ফ্রিডম্যান আপেক্ষিতার সমীকরণের সমাধান করেন। তাতে দেখা যায়, এই দুনিয়া ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। নিউটনের স্থির দুনিয়া তত্ত্বের লোকজন এতে আঁতকে ওঠেন, খোদ আইনস্টাইনও এই সমাধান নাকচ করেন। কিন্তু ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দুরবিন দিয়ে সত্যটা দেখে ফেলেন, দুনিয়া আসলেই সম্প্রসারিত হচ্ছে! গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর পরস্পর থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি আপনি পেছনে যান, তাহলে একসময় দেখা যাবে, এই দুনিয়ায় সবকিছু এক বিন্দুতে ছিল। কোনো এক সন্ত্রাসী ঘটনায় সবাই দিগ্‌বিদিক হয়ে ছুটে চলেছে। এ থেকে উদ্ভব বিগ ব্যাং তত্ত্বের, যা আজকের কসমোলজির প্রাণ। বিগ ব্যাংয়ের সমস্যা অন্যত্র। দুনিয়ার সবকিছুকে এক জায়গায় জড়ো করলে যা হয়, তাতে বিজ্ঞান একটু অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ, এক বিন্দুর দুনিয়ার নাম সিঙ্গুলারিটি, যাতে জানা সমীকরণগুলোর ভগ্নদশা। ষাটের দশকে রজার পেনরোজের সঙ্গে হকিং দেখালেন তাঁর প্রথম খেল। বললেন, যতই আপত্তি থাকুক সিঙ্গুলারিটি থেকেই দুনিয়ার শুরু। শুধু তা–ই নয়, বিগ ব্যাং থেকেই সময়ের শুরু। অর্থাৎ, বিগ ব্যাংয়ের আগে বলে কিছু নেই। খ্যাপা, লোকজনের অনেকে হকিংয়ের কাছে জানতে চাইত বিগ ব্যাংয়ের আগে ঈশ্বর কী করেছিলেন? মুচকি হেসে হকিং বলতেন, অবিশ্বাসীদের জন্য নরক বানাচ্ছিলেন!
ঈশ্বর কি পাশা খেলেন?
সময়ের শুরুর ধারণা জেনে হকিং এগোলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। এরই মধ্যে জানা হয়েছে, বস্তুজগতে এমন বস্তু সম্ভব, যার থেকে দুনিয়ায় সবচেয়ে দ্রুতযান আলোও বের হতে পারে না—ব্ল্যাকহোল, কৃষ্ণবিবর। ব্ল্যাকহোল কি আসলেই ব্ল্যাক? কিছুই কি সেখান থেকে বের হতে পারে না? হুইলচেয়ারের বিজ্ঞানী ভাবেন। ভাবেন কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের অনিশ্চয়তার তত্ত্ব নিয়ে। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দুটো কোয়ান্টাম রাশির যুগপৎ নিশ্চয়তা নেই। শূন্যস্থানে এই তত্ত্বের প্রয়োগ এরই মধ্যে বলে ফেলেছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। সেখানে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে কণা ও প্রতিকণা, আবার তা লয়ও পাচ্ছে। হকিং এই ঘটনাকে প্রয়োগ করলেন ব্ল্যাকহোলের আশপাশে এবং আশ্চর্য হয়ে দেখলেন ব্ল্যাকহোল থেকেও বের হয়ে আসছে অবিরল কণাস্রোত। ১৯৭৩ সালে হকিং প্রকাশ করলেন তাঁর ধারণা এবং অচিরেই তা গৃহীত হলো। বিজ্ঞানজগৎ ওই বিকিরণকে অভিহিত করল হকিংয়ের নামে—হকিং রেডিয়েশন। তত দিনে স্টিফেন হকিং কোনোমতে লিখতে পারেন। হুইলচেয়ারেই আসীন। আর তাই ১৯৭৪ সালের রাজকীয় বিজ্ঞান সমিতির শত বছরের নিয়ম ভেঙে সভাপতি খাতা হাতে নিয়ে হাজির হন নতুন সভ্যর সামনে। আর হুইলচেয়ারের সভ্যটি অনেক কষ্টে নিজের নাম স্বাক্ষর করেন-স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। এরপর থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত হকিং পেয়েছেন ছয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যার মধ্যে রয়েছে তত্ত্বীয় পদার্থবিদদের সর্বোচ্চ সম্মান আলবার্ট আইনস্টাইন পদক। ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে, তাঁর পুরোনো অক্সফোর্ডসহ। রানি এলিজাবেথ তাঁর নাম ঘোষণা করেছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একজন কমান্ডার (Commander of the British Empire) হিসেবে। আর ১৯৭৯ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হকিংকে বানাল গণিতের লুকাসিয়ান প্রফেসর, একসময় যে পদ অলংকৃত করেছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। ২০০৯ সালে আবারও এই পদে আসীন হোন তিনি। সর্বশেষ এখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রের গবেষণা পরিচালক।
ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম
১৯৮৮ সালে স্টিফেন হকিংয়ের ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম—ফরম দ্য বিগ ব্যাং টু ব্ল্যাকহোলস’ প্রকাশিত হয়। বিশ্বজুড়ে আজ পর্যন্ত এক কোটি কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে। এখনো প্রতি মাসে সারা বিশ্বে এর প্রায় ৫ হাজার কপি বিক্রি হয়। প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমেরিকায় ৪০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। ফলে দুটো উল্টো ছাপানো ছবিসহ ওই মার্কিন সংস্করণ সংশোধনের আগেই বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়! বিজ্ঞানের দুরূহতম বিষয়ের এমন সহজবোধ্য বই এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি বলে ধারণা করা হয়। যদিও জটিল বিষয়বস্তুর কারণে অনেকেই বেশি দূর এগোতে পারেন না। এই বইয়ের শেষে হকিং তিনজন বিজ্ঞানী সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। গ্যালিলিও, নিউটন ও আইনস্টাইন। দুর্জনেরা বলেন, আগামী দিনের ব্রিফ হিস্ট্রিতে থাকবে চারটি জীবনী। চতুর্থটি হবে হকিংয়ের।
ঈশ্বরের মন
হকিংয়ের কাছে কেউ যদি জানতে চাইত, বিজ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? হকিং বলতেন, ঈশ্বরের মন বুঝতে পারা। কীভাবে? এই বস্তুজগতের নিয়মাবলির সাধারণ, সহজ ও সরল সূত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে। এই তত্ত্ব হবে সব পেয়েছিল তত্ত্ব। এই যে হকিং কদিন আগেও বেশি মাথা ঘামিয়েছেন কাল্পনিক সময়, ওয়ার্মহোল প্রভৃতি নিয়ে—এ সবকিছুর লক্ষ্যও কিন্তু এক। নিছক কোনো কাগুজে সমীকরণ নয়, এ হচ্ছে সব পেয়েছিল চাবি। এর সাহায্যে মানুষ যেমন পারবে বস্তুজগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মৌলিক কণার খবর জানতে, তেমনি সক্ষম হবে দূর মহাকাশের বিশালাকার কৃষ্ণবিবরের আচরণ ব্যাখ্যা করতে। বস্তুজগতে মোট চার ধরনের বল ও তাদের মিথস্ক্রিয়া আমরা অনুভব করছি প্রতিনিয়ত। মহাকর্ষ, বিদ্যুৎ-চৌম্বক, ক্ষীণ ও সবল পারমাণবিক বল। প্রকৃতি জগতের এই চারটি বলকে একত্র করে একটি সমন্বিত তত্ত্ব দাঁড় করানোই হলো এখনকার তত্ত্বীয় পদার্থবিদদের চ্যালেঞ্জ। ইতিমধ্যে সবল, ক্ষীণ ও তড়িৎ-চৌম্বকত্বের এককত্ব প্রমাণিত। বাকি রয়েছে মহাকর্ষ। মহাকর্ষ সম্পর্কে সবচেয়ে সুন্দর তত্ত্বটি হলো আইনস্টাইনের সাধারণ তত্ত্ব। অন্যদিকে মাইক্রোওয়ার্ল্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতের কণারা মেনে চলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কাজেই মেলাতে হবে এই দুই তত্ত্বকে, পেতে হবে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির সন্ধান। পরিণয়ের আগে পরিচয়ের পালাটি করিয়ে দিয়েছেন হকিং। ব্ল্যাকহোলের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহাকাশে সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এই জোড় মেলানোর কাজে ব্যস্ত। জ্যামিতিক চিত্রের মাধ্যমে তিনি নিজের চিন্তাকে বিকশিত করতেন, মাত্র দুই আঙুল নাচিয়ে তিনি কম্পিউটারের মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশ করতেন। ছুটে যাচ্ছেন দেশ থেকে দেশে, লোকেদের শোনান বিজ্ঞানের কথা। বলেন, বিজ্ঞান আর গবেষণাকে ভালোবাসতে, যাতে মানবজাতি এগোতে পারে। কেবল বক্তৃতা নয়, লিখে ফেলেছেন বিজ্ঞানকে সহজ করে বলা বই। ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’–এর কথা আগেই বলেছি। এর বাইরে ‘ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল’, ‘ব্রিফার হিস্টরি অব টাইম’, ‘ব্ল্যাকহোল অ্যান্ড বেবি ইউনিভার্স’, ‘গড ক্রিয়েটেড দ্য ইন্টিজার’, ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’ প্রভৃতি বই। মেয়ে লুসির সঙ্গে লিখেছেন, ‘জর্জ’স সিক্রেট কি টু ইউনিভার্স’, যেখানে হ্যারি পটারের স্টাইলে বিজ্ঞানের জটিল বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। হকিং অভিনয় করেছেন স্টারট্রেকের ডিসেন্ট এপিসোডে। পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘ডিভিশন বেল’ অ্যালবামের ‘কিপ টকিং’ গানে হকিংয়ের সিনথেসাইজড শব্দ আছে, সেখানে তাঁর সিনথেসাইজড ভয়েস ব্যবহার করা হয়েছে। উজ্জ্বল চোখের অধিকারী গ্যালিলিও-আইনস্টাইনের দুনিয়ার এই মানুষটি হুইলচেয়ারে বসে দীর্ঘদিন পদার্থবিজ্ঞানের জগৎটাকে শাসন করেছেন। মৃত্যুর পরও তাঁকে সেই আসনেই রেখে দেবেন বিজ্ঞানীরা। স্টিফেন হকিং বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর চিন্তা ও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসায়।

হকিংয়ের স্মৃতি, মেরেলিন মনরো ও মহাবিশ্ব by তীব্র আলী

আমি তখন কেমব্রিজ বিশ্বিবদ্যালয়ের এক নাদান পিএইচডি ছাত্র। সেখানকার এক পুরানা বইয়ের দোকানে একদিন পেয়ে গেলাম স্টিফেন হকিংয়ের অধ্যাপক জীবনের সূচনা বক্তৃতা, ‘তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার সমাপ্তি কি সমুখেই?’ (Is the end in sight for theoritical physice?'। জন্মের বইপোকা আমি, তখনই বুঝতে পারলাম কী বিরল একটা বইয়ের সামনে পড়েছি। স্টিফেন হকিং মর্যাদাকর লুকাসিয়ান অধ্যাপক পদে যোগ দেয়ার আরম্ভ ছিল এই বক্তৃতা। (লুকাসিয়ান অধ্যাপকের পদটি একসময় অধিকার করে ছিলেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন এবং প্রখ্যাত কোয়ান্টাম পদার্থবিদ পল ডিরাক।) তাঁর ওই বক্তৃতার প্রথম সংস্করণ ছিল বইটা এবং পরে আর তা আর ছাপা হয়নি। কারও একটা বিশেষ বক্তৃতার মাধ্যমে কারও অধ্যাপনার ‘উদ্বোধন’ করা ছিল কেমব্রিজের বহুদিনের ঐতিহ্য। হকিং ওই বক্তৃতা দিয়েছিলেন ১৯৮০ সালে। তিনি সেখানে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, সুপারগ্র্যাভিট নামের এগার-মাত্রার তত্ত্বটি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার বনিয়াদি সমস্যার সমাধান এনে দেবে। বক্তৃতাটি বিশেষ রকম উশকানিমূলক ছিল। পরে দেখা গেল তাঁর ওই আশাবাদ ছিল একটু আনাড়ির মতোই। বেশ কয়েক বছর পর আমি যখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন তিনি তাঁর ওই চিন্তার দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে আবার একটা বক্তৃতা দিলেন। আমার স্ট্রিং থিওরির শিক্ষক ম্যালকম পেরি ছিলেন হকিংয়ের প্রথম দিকের অন্যতম পিএইচডি ছাত্র। আর আমার পিএইচডির সুপারভাইজরও ছিলেন পেরি। সুতরাং হকিং হলেন আমার বিদ্যায়তনিক দাদা (যেহেতু তাঁর পিএইচডি ছাত্র ছিলেন আমার সুপারভাইজর)। যাহোক, আমার গল্পে ফিরে আসি। বইটার দামি ছিল ১০ পাউন্ড বা ওরকম কিছু। আমার গরিব পকেটের জন্য এটা ছিল একটু বেশিই। তারপরও বইটা আমি কিনলাম এবং আমার জিনিসপত্রের মধ্যে খুব যত্নে প্যাকেট করে আলাদা রেখে দিলাম। কেমব্রিজে যে গবেষণা গ্রুপটিতে আমি কাজ করতাম, হকিং ছিলেন সেটার প্রধান। প্রায়ই তাঁকে আমরা দেখতে পেতাম। তিনি হয়তো শুক্রবারে আমাদের গবেষক গ্রুপের সেমিনারে আসা সবার দুপুরের খাবারের বিল দিতেন। মজাই হতো। মাগনা পিজা আর মুরগি খাবার লোভে বিভাগের অনেক ছাত্রছাত্রীই ওইসব সেমিনারে আসতো। বছরে একবার তিনি আমাদের নিয়ে যেতেন তাঁর প্রিয় থাই রেস্টুরেন্টে। বিভাগী পার্টিগুলোতে ডাকাবুকো লোকদের সঙ্গে বকবকানিতে ক্লান্ত হয়ে চলে আসতেন ছাত্রছাত্রীদের আড্ডায়। ২০০২ সালে, কেমব্রিজ থেকে স্নাতক করে বেরিয়ে আসার ঠিক আগে আমার সাহস হলো। এক পার্টির মধ্যে আমি তাঁর সামনে গেলাম এবং ধন্যবাদ জানালাম। তিনি মৃদু হাসলেন এবং তাঁর তখনকার স্ত্রীর সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বলে চলে আসলাম। সেসময়ই এক পর্যায়ে আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, তিনি আমাকে তাঁর সেই প্রথম বক্তৃতার একটা কপিতে অটোগ্রাফ দেবেন কি না।
তিনি রাজি হলেন এবং দুই কি এক দিনের মধ্যে আমি বইটি পেলাম। সেটাই ছিল আমার সবচেয়ে দামি পুরস্কার এবং মহামূল্যবান সংগ্রহ। শুধু তা-ই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত সচিব বইটার সঙ্গে কপিরাইট কাগজে ছাপা তাঁর এক হাসিমুখ ছবিও দিয়ে দিয়েছিলেন। মেরেলিন মনরো’র আত্মজীবনী হাতে হকিংয়ের দুষ্টুমিভরা হাসির ওই ছবিটি আমার খুব পছন্দের। স্টিফেন মেরেলিন মনরোকে সত্যিই খুব ভালবাসতেন। কৃষ্ণগহ্বর বিষয়ে স্টিফেনের বৈপ্লবিক তত্ত্বই সম্ভবত পদার্থবিদ্যায় তাঁর মহত্তম অবদান। ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর বিষয়ে তাঁর প্রথম দিকের কাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে, মহাবিশ্বের অন্যান্য বৃহত বস্তগত ব্যবস্থার মতোই ব্ল্যাকহোলও তাপগতিবিদ্যার সূত্র মেনে চলে। ব্ল্যাকহোল বিষয়ে গতানুগতিক বোঝাপড়া ছিল এই, বিপুল মধ্যাকর্ষের জন্য তারা সবকিছু শুষে নেয় কিন্তু কিছুই নিঃসরণ করে না। ব্ল্যাকহোল ঘিরে থাকে এমন এক দিগন্ত, যে কাল্পনিক সীমা থেকে কিছুই ফিরে আসে না। একপর্যায়ে ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি জায়গায় কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে হকিং দেখালেন, ব্ল্যাকহোল তাপ বা আলোর বিকীরণ নিঃসরণ করে। এবং এক পর্যায়ে এই বিকীরণের কারণে কৃষ্ণগহ্বর উবে গিয়ে নাই হয়ে যাবে। তাহলেও, আমাদের মহাবিশ্বের বাস্তব ব্ল্যাকহোলগুলি সম্পূর্ণভাবে উবে যেত যত সময় লাগবে ততদিনে মহাবিশ্বই ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনকি, কোনো ব্ল্যাকহোলকেও কাছাকাছি সময়ে উবে যেতে দেখার কথা না। হকিংয়ের এই তত্ত্ব পদার্থবিদ্যার জগতে এক শোরগোল তুলে ফেলল। কারণ হলো, হকিং একইসঙ্গে দেখিয়েছেন, ব্ল্যাকহোল যখন বিকীরণ করে তখন ওই বিকীরিত শক্তির (Energy) মধ্যে কোনো গুণ বা তথ্য থাকে না। এটা তখন নিছক তাপই, আর কিছু না। ফলে কোনো ব্ল্যাকহোল চূড়ান্তভাবে নাই হয়ে যাওয়া মানে তার ভেতরে থাকা সব তথ্যেরও সম্পূর্ণভাবে মহাবিশ্ব থেকে হারিয়ে যাওয়া। এই চিন্তা কোয়ান্টাম থিওরির জগতে একটা কূটাভাসের (Paradox) জন্ম দেয়। হকিং এই কূটাভাসের প্রস্তাবনা এনেছিলেন ১৯৭০ এর দশকে। এখন পর্যন্ত এই সমস্যার মীমাংসা করা যায়নি। তখন থেকেই তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার এই শাখা সক্রিয় গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। পিএইচডি গবেষণায় হকিং দেখিয়েছেন, পদার্থবিদ্যার যে নিয়মগুলি আমরা জানি সেসবকে পেছনের দিকে চালিয়ে গেলে দেখা যায়, মহাবিশ্ব অবশ্যই এক মহাবিষ্ফোরণের (Big Bang) অনন্য মুহূর্তে সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে তিনি মহাবিষ্ফোরণের তত্ত্বকে প্রথম শক্ত গাণিতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করালেন। তাহলেও বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু যন্ত্রণাকর সমস্যা রয়ে গিয়েছিল এবং এখনো আছে। ১৯৮০’র দশকে হকিং (অন্যান্য পদার্থবিদের সঙ্গে মিলে) প্রসারমাণ মহাবিশ্বের মডেল সামনে নিয়ে আসায় বড় ভূমিকা পালন করেন। এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বভাবনার প্যারাডাইম সেটাই আছে। স্টিফেন হকিং এক মহান পদার্থবিদ। মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন তিনি। তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল, মজাদার এবং নিজের দৈহিক অক্ষমতাকে জয়কারী এক মানুষ। কখনোই শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে তিনি সীমিত হননি। আমরা যারা পদার্থবিদ্যা ভালবাসি, তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করতেন এবং অনেককাল ধরে সেটাই করে যাবেন।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
ড. তীব্র আলী: তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। অ্যালামনাই ঢাকা ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউট অব থিওরিটিকাল ফিজিক্সে গবেষণারত।

কাঠমান্ডু ট্র্যাজেডি

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ও ৫০ জনের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউএস-বাংলার ড্যাশ—৮কিউ ৪০০ মডেলের উড়োজাহাজটি ৭১ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে সোমবার বিকেলে নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। বাংলাদেশি, নেপালিসহ দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত সবার পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি। নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুগামী উড়োজাহাজটিতে মূলত বাংলাদেশ ও নেপালের যাত্রীরাই ছিলেন। এ দুর্ঘটনা ও এতসংখ্যক যাত্রীর করুণ মৃত্যু দুটি দেশকেই শোকার্ত করেছে। ঘটনা তদন্তে নেপালের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি করেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনায় বহুপক্ষীয় সংশ্লিষ্টতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পক্ষগুলোর তরফে আরও কিছু তদন্ত উদ্যোগ নেওয়া হবে। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর উড়োজাহাজ ওঠা-নামার জন্য একটি জটিল বিমানবন্দর হিসেবেই বিবেচিত। দুর্ঘটনার পেছনের কারণ নিয়ে নানা প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে কিন্তু দুর্ঘটনাটি প্রকৃতই কেন ঘটেছে, তা নিশ্চিত হতে সময় লাগবে বলেই মনে হচ্ছে। আমরা আশা করব, বাংলাদেশ সরকারের তরফেও এর যথাযথ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে যঁারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, তাঁদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা–সুবিধা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বাংলাদেশি যঁারা নিহত হয়েছেন তঁাদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবার ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা। এ ব্যাপারে সরকারের তরফে যেমন উদ্যোগ প্রয়োজন, তেমনি ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে নেপালে চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার খরচ বহনের কথা ঘোষণা করেছে।
আমরা মনে করি, উন্নত চিকিৎসার জন্য কাউকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা বা তৃতীয় কোনো দেশে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে সেই উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাণহানির ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। নিহত যাত্রীদের স্মৃতি হয়ে যাওয়া যে ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলো দেশবাসীকে কাঁদাচ্ছে। কেউ হারিয়েছেন স্বামীকে, কেউ স্ত্রী, মা-বাবা বা বোনকে। পুরো পরিবারও মারা গেছে এ দুর্ঘটনায়। কোনো কিছুই পরিবারগুলো যা হারিয়েছে, তা পূরণ করতে পারবে না। এরপরও যঁারা নিহত হয়েছেন তঁাদের পরিবারগুলো যাতে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পায়, ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কাঠমান্ডুর ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে এখন সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য। উড়োজাহাজ পরিচালনায় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো ধরনের ফাঁকফোকরের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী জিরো টলারেন্সের নীতি নেওয়া হয়। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিমান দুর্ঘটনার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু। কাঠমান্ডু দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট মহলে কঠোর আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি। বর্তমানে দেশে যেভাবে বিভিন্ন বেসরকারি এয়ারলাইনসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে উড়োজাহাজ পরিচালনার নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি আছে কি না, তা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে যাচাই–বাছাই করে দেখতে হবে। প্রয়োজনে বর্তমান বিধিবিধান আরও কঠোর করতে হবে অথবা বিধিবিধান যাতে কার্যকর হয়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। কাঠমান্ডু দুর্ঘটনার তদন্তের ফলাফলে আমাদের কোনো দুর্বলতা উদ্‌ঘাটিত হলে, সেগুলো আমলে আনতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহ কিছু এড়াতে হলে সেই দিকগুলোতে নজর দিতে হবে।

অবিশ্বাস্য দুর্বৃত্তপনা

আপনি আপনার নিজের বাড়িতে সপরিবার বাস করেন। এক সকালে হঠাৎ ১০-১২ জন অপরিচিত লোক আপনার বাড়িতে ঢুকে পড়ল; তারা আপনাকেসহ বাড়ির সবাইকে ধরে-বেঁধে মারতে মারতে বাড়ির বাইরে বের করে এনে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। আপনাদের মুঠোফোনগুলো তারা কেড়ে নিল। তারপর অ্যাম্বুলেন্সটি চলতে শুরু করল। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে আপনাদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ঘুরে বেড়াল। তারপর আপনার বাড়ি থেকে দূরে অন্য এক পাড়ার রাস্তায় দুর্বৃত্তরা আপনাদের সবাইকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আপনি স্বজনদের নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখতে পেলেন, বাড়ি ফাঁকা। শুধু দরজার কাছে পড়ে আছে একটা ভাঙা হারমোনিয়াম, দেয়ালঘড়ি, বইপত্র, কাপড়চোপড় ইত্যাদি। বাড়িটিতে মূল্যবান যা কিছু ছিল, সব লোপাট হয়ে গেছে। প্রিয় পাঠক, অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ ঘটনা ঘটেছে। দিনের আলোয়, খোদ রাজধানী ঢাকায়, শ্যামলীর ২ নম্বর সড়কে। মিহির নামে এক ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের এই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বিবরণ সোমবারের প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে। আসলে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে ওই বাড়ির সাড়ে আট কাঠা জমি জবরদখল করার উদ্দেশ্যে। দুর্বৃত্তরা মিহির বিশ্বাস ও তাঁর স্বজনদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানোর সময়টাতে জিনিসপত্র লুট করে বাড়ির সামনে জমির মালিক হিসেবে জনৈক নুরুজ্জামানসহ কজন ব্যক্তির নাম লেখা একটা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে গেছে।
এ ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাঁদের একজন, ঢাকার মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তৌফিক উর রেজাসহ দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক কামরান শাহিদ প্রিন্স মোহাব্বতকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। বলা হচ্ছে তিনি পলাতক। ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনগুলোর নাম, পদ, প্রভাব ইত্যাদির অপব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিরা এতই হিংস্র আচরণ করে থাকে যে তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে, এমনকি কিছু বলতেও লোকজন ভয় পায়। এ রকম একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে যে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় যেকোনো অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। এ কারণে পেশাদার অপরাধীরা যে ধরনের গুরুতর অপরাধ করার সাহস সহজে পায় না, ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা সেগুলো অবলীলায় করে যেতে পারে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিস্তার ঘটার এটাও একটা বড় কারণ। মিহির বিশ্বাসের পরিবারের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিতে হবে। কামরান শাহিদ প্রিন্স মোহাব্বতকে যুবলীগ বহিষ্কার করেছে, এটা ভালো কথা। এখন সব অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা হোক। বিশেষভাবে নিশ্চিত করতে হবে মিহির বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা।

হারাধন ট্রাম্পের দশটি ছেলেই চলে যাচ্ছে একে একে by ফজলুল কবির

‘ইউ আর ফায়ারড’। এই বাক্যটি যেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের জন্যই তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পও এই বাক্যকে ভীষণ ভালোবাসেন। আর তাই ‘দ্য অ্যাপ্রেনটিস’–এর বিচারকের আসনটি থেকে তিনি ওভাল অফিসের সর্বোচ্চ আসনে গিয়ে বসলেও বাক্যটি ঠিক ছাড়তে পারছেন না। শুরু হয়েছিল স্যালি ইয়েটসকে দিয়ে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মাথায় তাঁকে এই বাক্য শুনতে হয়েছিল। আর সর্বশেষ ১৩ মার্চ বাক্যটি শুনলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। আমেরিকানদের জানা থাকলে তারা নিশ্চয় এখন যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হারাধনের দশটি ছেলে’ কবিতাটি আওড়ে যেত। কারণ, রেক্স টিলারসনের মধ্য দিয়ে হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্প প্রশাসনের ২৬ জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিদায় ঘটল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ১৩ মার্চ হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সিআইএর বর্তমান পরিচালক মাইক পম্পেও-এর নাম প্রস্তাবের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মোটাদাগে এটুকুই খবর। কিন্তু এই খবরই অনেক আলোচনাকে উসকে দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রেক্স টিলারসনের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এই দুজনের প্রকাশ্য মতপার্থক্য ছিল। বিভিন্ন সফরে প্রেসিডেন্টের আচরণ ও বক্তব্য নিয়ে টিলারসনের মধ্যে বিরক্তিরও জন্ম হয়েছিল। আর এর মাত্রা যে ভয়াবহ, তা প্রথম সামনে আসে গত বছরের শেষার্ধে। সেই সময় পেন্টাগনে একটি সভা শেষে বের হওয়ার সময় প্রশাসন ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সামনে ট্রাম্পকে ‘গাড়ল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন টিলারসন। সেই সময় এই নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছিল। টিলারসন পরে ট্রাম্পের পক্ষে সাফাই গেয়ে বিষয়টি সহজ করারও চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই যে পররাষ্ট্রনীতি, সেখানে দুজনের সহমত হওয়াটা সম্ভবত কখনোই সম্ভব ছিল না। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত ইরান ইস্যুতে দুজনের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ঠিক একইভাবে নাফটা, ন্যাটো ইত্যাদি ক্ষেত্রেও দুজন পৃথক বৃত্তেই অবস্থান করছিলেন। আর সর্বশেষ উত্তর কোরীয় নেতার সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে টিলারসন শুরুতে কিছুটা রাখঢাক দিয়ে কথা বললেও পরে তাঁর অবস্থান প্রকাশ পেয়ে যায়। ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, শুক্রবারই টিলারসনকে সরে দাঁড়াতে বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তাতে সাড়া না দিলেও আফ্রিকা সফর সংক্ষিপ্ত করে সোমবারেই আমেরিকা ফেরেন টিলারসন। আর তার পরদিনই তাঁকে বরখাস্ত করা হলো। পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ট্রাম্পের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন সিআইএ–প্রধান মাইক পম্পেও ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ। আর পম্পেওর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য তিনি সিআইএর উপপরিচালক গিনা হাসপেলের নাম বলেছেন প্রাথমিকভাবে। সে রকম কিছু হলে হাসপেলই হবেন আমেরিকার শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রথম নারী পরিচালক।এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে ট্রাম্প পম্পেও ও হাসপেলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে টিলারসনেরও প্রশংসা করেছেন তিনি। মুখে যা–ই বলুন, সবাই জানে টিলারসনের দিক থেকে ‘গাড়ল’ আখ্যা পাওয়ার বিষয়টি তিনি কোনোভাবেই ভুলতে পারেননি। একই সঙ্গে তিনি টিলারসনের সঙ্গে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক দ্বন্দ্বটিও আর মানতে নারাজ। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে টিলারসন পররাষ্ট্রনীতিগত জায়গায় খুবই পুরোনো ধারণাপন্থী। অন্যদিকে টিলারসন কোনোভাবেই ট্রাম্পের নীতির প্রতি আস্থাশীল নন। সর্বশেষ উত্তর কোরীয় নেতার বৈঠকের প্রস্তাবে ট্রাম্পের হঠাৎ করে সায় দেওয়ার বিষয়টিও তিনি মানতে পারেননি। যেমন মানতে পারেননি কিম উনের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিন ধরে চলা কথার লড়াইকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মাথায় টিলারসন চলে যেতে হতে পারে এমন কানাঘুষা চলছিল। বলা হচ্ছিল ট্রাম্প যেকোনো সময় তাঁকে বরখাস্ত করতে পারেন। কিন্তু সেটি বাস্তবে রূপ নিতে আরও আট মাস সময় লাগল। টিলারসনকে ভাগ্যবানই বলতে হবে। ট্রাম্প সাধারণত অস্বস্তিকর কাউকে ‘ইউ আর ফায়ারড’ বাক্যটি শুনিয়ে দিতে এত লম্বা সময় নেন না।স্যালি ইয়েটসের কথাই ধরা যাক। ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় তাঁকে এই কথা শুনতে হয়েছিল। অপরাধ? ছয় মুসলিম দেশের নাগরিকদের ওপর আমেরিকা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেওয়া ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত করার জন্য বিচার বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন স্যালি। ফলে ২০ জানুয়ারি নেওয়া দায়িত্ব তাঁকে ৩০ জানুয়ারিই ছাড়তে হয়।
ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে যেন মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা চলছে। যে কেউ যেকোনো সময় আলোয় আসতে পারে। আবার উল্টোটাও সত্য। এই ক্ষেত্রে অ্যান্থনি স্ক্যারামুচ্চির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ৭৪ দিন দায়িত্ব পালন করে মাইক ডুবকে পদত্যাগ করার পর গত বছরের ২১ জুলাই হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালকের দায়িত্ব নেন তিনি। মাত্র ছয় দিন স্থায়ী হয়েছিলেন তিনি এই পদে। এর মধ্যেই অবশ্য অনেক কিছু তিনি ওলটপালট করেছিলেন। সে অন্য প্রসঙ্গ। স্ক্যারামুচ্চির পর এই পদের দায়িত্ব নেন হোপ হিকস। তিনিও চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই মাসে। মিউজিক্যাল চেয়ারের যথার্থ উদাহরণ বলা যায় হোয়াইট হাউসের এই পদকে। শুরু থেকেই টালমাটাল ট্রাম্প প্রশাসন যেন সম্প্রতি আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে রক্ষণশীল শুল্ক আরোপ নিয়ে মতবিরোধকে কেন্দ্র করে এই তো কদিন আগেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক ও প্রেসিডেন্টের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ ছাড়লেন গ্যারি কোহন। হোয়াইট হাউসে তিনি ছিলেন ৪১১ দিন। যথেষ্ট ভাগ্যবান বলতে হবে তাঁকে। কারণ চলে যাওয়ার ঘোষণার পরও ট্রাম্প তাঁর প্রশংসা করেছেন। এর কিছুদিন আগেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক হোপ হিকস। একই মাসের শুরুতে কেলেঙ্কারি সঙ্গী করে পদত্যাগ করেন হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি রব পোর্টার। তার আগের মাসে হোয়াইট হাউস ছেড়ে যান পাবলিক লিয়াজোঁ অফিসের যোগাযোগ পরিচালক ওমারোসা ম্যানিগোল্ট-নিউম্যান। যদিও তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন ১৩ ডিসেম্বর। ৮ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউস ছাড়েন উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডিনা পাওয়েল। মার্কিন প্রশাসনে এক বছর সময়ের মধ্যে এত বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা এর আগে কখনো পদত্যাগ বা বরখাস্ত হননি। কে নেই এই তালিকায়? ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলী ও উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন, এফবিআই–প্রধান জেমস কোমি, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ রেইন্স প্রিবাস, প্রেসসচিব শন স্পাইসার, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন, হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিস মন্ত্রী টম প্রাইস, প্রেসিডেন্টের উপসহকারী সেবাস্তিয়ান গোরকা—এঁদের সবাইকে হয় চাপের মুখে পদত্যাগ করতে হয়েছে, নয়তো বরখাস্ত হতে হয়েছে, যেমনটা হলেন রেক্স টিলারসন, সরে দাঁড়ানোর প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায়। হারাধনের সংসারের মতো ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রস্থানই একমাত্র সত্য। আসা-যাওয়ার খেলা চলছে অবিরত। এই খেলা কোথায় থামে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

হেফাজতে মৃত্যু কি এখন ‘স্বাভাবিক’? by আলী রীয়াজ

উচ্চ আদালতের দেওয়া ৩৯৬ পৃষ্ঠার একটি রায়ে অন্তর্ভুক্ত নির্দেশনা যখন এক সপ্তাহের মধ্যেই দুই দফা লঙ্ঘিত হয় এবং একজন তরুণের প্রাণহানি ঘটে, অথচ এ নিয়ে আলোচনার কোনো লক্ষণ দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় না, তখন তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। শুধু তা-ই নয়, এর একটি ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে দেশে বিরাজমান একটি আইনের বরখেলাপের আশঙ্কাও সুস্পষ্ট। তারপরও না গণমাধ্যমের আলোচনায়, না মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এ নিয়ে উৎকণ্ঠা দেখতে পাই; মানবাধিকার কমিশনের কাছে এ খবর পৌঁছেছে এমন লক্ষণ নেই।
অথচ এই ঘটনাগুলো ঘটেছে তখন, যখন প্রায় প্রতিদিনই আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষদের কথা শোনা যায়; আইনের স্বাভাবিক গতির কথা না হয় না-ই বললাম। ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রায়ের পূর্ণ ভাষ্যের বিষয় ছিল ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারার বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল খারিজ। হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন তার ১৩ বছর আগে, প্রধান বিচারপতিসহ চারজনের বেঞ্চ হাইকোর্টের সেই রায় বহাল রেখে কিছু বিষয়ে সংশোধনী যুক্ত করে রায় দিয়েছিলেন ২৪ মে। আদালতের যেসব নির্দেশনা ছিল, তার মধ্যে ১৬৪ ধারার বিষয়ে সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল যে সরকারের হেফাজতে থাকার সময় কারও ওপর নির্যাতন করা যাবে না। নবম সংসদের শেষ দিনগুলোতে পাস করা ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) বিল, ২০১৩’ -এও সুস্পষ্টভাবেই সরকারের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারও ওপর নির্যাতন চালানোকে অপরাধ বলে বর্ণনা করে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির বিধান করা হয়েছে। অথচ গত ৬ মার্চ পুলিশ নিজেদের পরিচয় না দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারীকে আটক করে, যা সুস্পষ্টভাবেই ছিল ৫৪ ধারার বিষয়ে ওই রায়ে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার বরখেলাপ (মিজানুর রহমান খান, ‘আদালতের দিকনির্দেশনার লঙ্ঘন ঘটেছে’ প্রথম আলো, ১০ মার্চ ২০১৮)। ওই দিন মানববন্ধন থেকে ফেরার পথে ছাত্রদলের একজন নেতা জাকির হোসেনকে রমনা থানার পুলিশ আটক করে। তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
শনিবার রিমান্ড শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। সোমবার সকালে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে আনা নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগকে আমাদের বিবেচনায় নেওয়া দরকার। কেননা, ঘটনাপরম্পরা অবশ্যই এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে ইঙ্গিত দেয় না। ২০১৩ সালের আইনে হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন বিষয়ে যা বলা হয়েছে, তা আমরা স্মরণ করতে পারি। ‘হেফাজতে মৃত্যু’র ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু, অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গ্রেপ্তারের সময় কারও মৃত্যু, কোনো মামলায় সাক্ষী হোক বা না হোক জিজ্ঞাসাবাদের সময় মৃত্যু। আর ‘নির্যাতন’ বলতে বোঝানো হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। জাকির হোসেনের ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে এ দুইয়ের প্রাসঙ্গিকতা আছে। এসব বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নীরবতা সে কারণেই আমাকে বিস্মিত করে। হেফাজতে মৃত্যুর বিষয় নিয়ে আদালতের নির্দেশনার সূচনা সেই ১৯৯৮ সালেই। এর সূচনা হয়েছিল মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কারণেই। ওই বছরের ২৯ নভেম্বর হাইকোর্ট সন্দেহবশত কাউকে গ্রেপ্তার ও তদন্তের নামে রিমান্ডে এনে আসামিকে শারীরিক নির্যাতন করা থেকে নিবৃত্ত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না মর্মে সরকারের ওপর রুল জারি করেছিলেন। এই আইনগুলো নিয়ে আইনি লড়াইয়ের পটভূমি ও ইতিহাস সম্প্রতি ৫৪ ধারার লঙ্ঘন নিয়ে মিজানুর রহমান খানের আলোচনায়ই আছে, আমি তার পুনরুক্তি করতে চাই না। মনে রাখা দরকার যে আদালত ১৮৯৮ সালের তৈরি করা এই আইন ছয় মাসের মধ্যে সংশোধনের জন্যই বলেছিলেন; আর সংশোধনের আগ পর্যন্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার জন্য ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলের এই আইন ভারতে বদলে গেছে ১৯৭২ সালে, কিন্তু বাংলাদেশে তা শুধু বহালই আছে তা নয়, এর ব্যবহার এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কতটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, সেটা প্রতিবছর হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার বছরে ২৬০ জন হেফাজতে মারা গেছেন; ২০১৬ সালে এক বছরেই মারা গেছেন ৭৮ জন। নিয়মিতভাবে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ নিয়ে আদালতে মামলা হয় একেবারে নগণ্য। তার দুটি কারণ আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি। এর একটি হচ্ছে অভিজ্ঞতা। যাঁরা এ বিষয়ে খবর রাখেন, তাঁরা নিশ্চয় জানেন যে ২০১৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় র‍্যাবের হেফাজতে নিহত শাহনূর আলমকে কেন্দ্র করে কী ঘটেছিল। নবীনগরের বগডহর গ্রামের বাসিন্দা শাহনূর আলমকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগে র‍্যাব ভৈরব ক্যাম্পের অধিনায়কের বিরুদ্ধে থানায় মামলার দায়ের করার চেষ্টা করেন তাঁর ভাই মেহেদী হাসান৷
থানা মামলা না নেওয়ায় ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) বিল, ২০১৩’ আইনের আওতায় মামলা করতে আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নাজমুন নাহার শুনানি শেষে র‍্যাবের ওই অফিসারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত ৷ এই নির্দেশ দেওয়ার পর ওই বিচারককেই ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে বদলি করে দেওয়া হয়। এরপর এই মামলার অগ্রগতি সহজেই অনুমেয়। এই অভিজ্ঞতা খুব উৎসাহব্যঞ্জক বলে ভুল করার কারণ নেই। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই আইন বিষয়ে পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি। ২০১৫ সালে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই আইনের ১৪টি ধারা ও উপধারা সংশোধনী চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যাতে আইনের ৭টি ধারা বিলুপ্ত করার সুপারিশ আছে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও ‘পুলিশ সপ্তাহে’ পুলিশের যেসব দাবিদাওয়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়েছে, তাতে এই আইনের ‘সংশোধনী’র কথাও আছে। ফলে এ নিয়ে সাধারণ মানুষ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সাহস পান না। কিন্তু আমার কাছে যে বিষয়টি বেদনাদায়ক বলে মনে হয় তা হচ্ছে, এ বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একধরনের নীরবতা। যদিও এ নিয়ে তাদের চেষ্টায় সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল, এখন তাদের দ্বিধা বা নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী? গত এক দশকে আমরা দেখেছি কী করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘স্বাভাবিক’ বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে, কী করে গুমের ঘটনাকে বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। হেফাজতে হত্যার ক্ষেত্রেও এখন প্রায় সেই অবস্থাই তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসবের পেছনে কাজ করেছে এই ধারণা যে যাঁরা হেফাজতে মারা যাচ্ছেন, যাঁরা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন, যাঁরা গুম হয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা আমার কেউ নন, কিংবা তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে আমি একমত নই। কিন্তু বেঁচে থাকার অধিকার, নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেবল এক দলের জন্য প্রযোজ্য, অন্যের জন্য নয়-এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক নয়। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর