Showing posts with label সেলিম জাহিদ. Show all posts
Showing posts with label সেলিম জাহিদ. Show all posts

Saturday, January 24, 2026

প্রচারের শুরুতেই উত্তাপ, বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি by সেলিম জাহিদ

প্রায় ১৭ বছর পর দেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ এক পরিবেশে এই ভোট যাত্রা শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। কিন্তু প্রচারের প্রথম দিন থেকেই প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পর আক্রণাত্মক বক্তব্য শুরু করেছে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর মাত্র দুদিন হলো। গতকাল শুক্রবার ও আগের দিন বৃহস্পতিবার—এ দুই দিনে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে যে স্পষ্টত ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো সামনের দিনগুলোতে পরস্পর আক্রমণের ধার আরও বাড়তে পরে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগেই আঁচ করা যাচ্ছিল যে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরবিরোধী শক্ত অবস্থানের দিকে যাবে। এখন পরিস্থিতি সেদিকেই গড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপির দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা, ধর্মের অপব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ ষড়যন্ত্র করার অভিযোগগুলো সামনে আনা হচ্ছে।

পাল্টাপাল্টি আক্রমণ

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত দুই দিনে রাজধানী ঢাকার ভাষানটেকসহ সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার মিলে আটটি জনসভায় বক্তৃতা করেন। আর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ঢাকার মিরপুরসহ উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও রংপুরে পাঁচটি জনসভায় বক্তব্য দেন। দুই নেতার বক্তব্যগুলো তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়।

তারেক রহমান জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে ১৯৭১ সালে তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করেন এবং ধর্মকে ব্যবহার করে ‘বেহেশতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে ‘শিরক’ ও ‘কুফরি’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, প্রতিপক্ষ দল সৎ মানুষের শাসনের কথা বলে নিজেরাই অসৎ কাজ করছে এবং ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে মানুষকে ঠকাচ্ছে। তিনি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পোস্টাল ব্যালট ছিনতাই এবং এনআইডি ও মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট চুরির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেন।

গতকাল শুক্রবার এই বাগ্‌যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। খুলনায় নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনকে আখ্যা দেন ‘দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ’ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘আগে যুদ্ধ হতো তরবারি, তির-ধনুক ও কামান দিয়ে। এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালট দিয়ে।’ তারেক রহমানের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কোনো মুসলমান আরেক মুসলমানকে কাফের বলতে পারেন না…তিনি এটা বড় অপরাধ করেছেন।’ আরও বলেন, ‘উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন…বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের।’

বিপরীতে জামায়াতের দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দলটির নেতাদের অতীত দুর্নীতি, নেতা–কর্মীদের অতীত–সাম্প্রতিক দখল–চাঁদাবাজি এবং তাঁদের ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ হয়ে ওঠার অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

এর সঙ্গে দুই পক্ষ থেকেই একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বসহকারে সামনে আনা হচ্ছে, সেটি হলো ‘বিদেশি আধিপত্য’। বিএনপির দিক থেকে জামায়াতকে লক্ষ্য করে পিন্ডি, অর্থাৎ পাকিস্তান। আর জামায়াতের দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দিল্লির আধিপত্যবাদ চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার ভোটের মাঠে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি নতুন এক মুখোমুখি লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ, বিদেশি আধিপত্য, ধর্মের ব্যবহার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’—এই কয়েকটি ইস্যু ঘিরে ভোটের মাঠে শুরু হয়েছে দুই পক্ষের বাগ্‌যুদ্ধ।

এটাকে দল দুটির ‘রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থান’ বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা দেখাতে হলে তো এগুলোকে তারা সামনে আনবেই। এখন উদ্বেগের জায়গাটা হচ্ছে, এগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়ে যায় কি না। সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া ভালো।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘দেশের জন্য সলিউশনটা হচ্ছে নির্বাচনটা হওয়া এবং সেটা শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক গতিতে হওয়া। রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক, পারস্পরিক সমালোচনা এগুলো থাকবে—এটা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়।’

বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে শুরু করে হবিগঞ্জসহ সাত জেলায় জনসভা করে বিএনপির চেয়ারম্যান সরাসরি জামায়াত ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডিও নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, কেউ দিল্লিতে পালায়, কেউ পিন্ডিতে পালায়, কিন্তু বিএনপি দেশের মানুষের পাশেই থাকে।

তারেক রহমান প্রতিটি বক্তৃতার শুরুর দিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের গুম, খুন, নির্যাতন, ভোটাধিকার হরণ এবং দেশের টাকা পাচারের সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা খুব তীব্র ছিল, কিন্তু তিনি এতে খুব বেশি সময় ব্যয় না করে দ্রুতই বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিপক্ষের বর্তমান ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তারেক রহমান তাঁর সাতটি জনসভায় জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি প্রতিটি জেলার স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়েও কথা বলেছেন।

বক্তৃতায় তারেক রহমান উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও খাল খনন, বেকারদের প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিটি জনসভায় উপস্থিত জনতার সমর্থন চেয়েছেন।

গত দুদিনে তারেক রহমানের নির্বাচনী জনসভায় একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয়। সেটি হচ্ছে মঞ্চ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সরাসরি তাঁর কথোপকথন। গতকাল ভাষানটেকের জনসভায় এই কথোপকথন ছিল বেশ চমকপ্রদ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এটি বেশ অভিনব এবং নাটকীয়। এর মধ্য দিয়ে কার্যত জনসভাকে জীবন্ত করে তোলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটা সম্পর্ক জোরদারের প্রয়াস রয়েছে, যা ভোটের মাঠে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিপরীতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতিকে ‘খয়রাতি’ অনুদান বলে কটাক্ষ করেন এবং এটি চাঁদাবাজি ও লুটপাটের উৎস হতে পারে বলে বৃহস্পতিবার মিরপুরের জনসভায় ইঙ্গিত দেন।

এ প্রসঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দুই হাজার টাকার অনুদানের উল্লেখ করে জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেন, ‘তাদের হাতে খয়রাতি কোনো অনুদান আমরা তুলে দিয়ে তাদের অপমান করতে চাই না।’

অবশ্য গতকাল পঞ্চগড়ের জনসভায় শফিকুর রহমান বিএনপির প্রতিশ্রুত আটটি সামাজিক উন্নয়ন কার্ডের পরিকল্পনার বিপরীতে ভিন্ন চিন্তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ভাই, আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই ভাইবোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড চাই।’

জামায়াতের আমির নির্বাচনকে সরাসরি ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি নির্মূলের ওপর জোর দেন। নারীর সম্মানের ক্ষেত্রে তারেক রহমান অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করার কথা বলেন। আর শফিকুর রহমান তাঁদের নিরাপত্তা ও ইজ্জত রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তারেক রহমান পররাষ্ট্রনীতিতে ‘দিল্লি, পিন্ডি বা অন্য কোনো দেশের’ নির্ভরতার সমালোচনা করলেও শফিকুর রহমান ‘আধিপত্যবাদ’-এর বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেন।

গত দুদিনে শফিকুর রহমানের পাঁচটি জনসভার বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাঁর বক্তব্যে জাতীয় রাজনীতি বা স্থানীয় সমস্যাগুলো বেশ বলিষ্ঠ ও স্পষ্টভাবে এসেছে। মিরপুরে তিনি এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং গ্যাস–সংকট নিয়ে সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো তুলে ধরে এর সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। আর গতকাল পঞ্চগড়ের জনসভায় জামায়াতের আমির উত্তরবঙ্গকে ‘কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী’ বানানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে থেকেই বিএনপির দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে দলটির মহিলা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের বিভ্রান্ত করছেন। তাঁরা এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করছেন, মোবাইল ফোন নম্বর নিচ্ছেন। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী কর্মীদের অবরুদ্ধ করা, কোথাও কোথাও হামলার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগের দিন বুধবার মিরপুরে জামায়াত আমিরের নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের একটি অভিযোগে দলের কয়েকজন নারী কর্মীকে আটক করা হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সারা দেশে এ বিষয়টিতে জামায়াত যে কতটা ক্ষুব্ধ, তার প্রকাশ ঘটে জামায়াত আমিরের মিরপুরের বক্তব্যে। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কিছু বন্ধুদের বলতে চাই, মেহেরবানি করে মায়েদের ইজ্জত নিয়ে কখনো টান দেবেন না, তাহলে আগুন জ্বলবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমিরের গত দুদিনের নির্বাচনী জনসভার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ধরা পড়ে। সেটি হলো, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রশ্নে। জামায়াতের আমির ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রসঙ্গে বলেন, যাঁরা গত ৫৪ বছরের পচে যাওয়া রাজনীতি চান না, রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন চান, তাঁরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন বলে আশা করছেন। অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

প্রচারের প্রথম দুই দিনেই যে চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল লড়াই এখন দুই বিরোধী শিবিরে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে। আর জামায়াত, এনসপিসহ ১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ধর্মীয় ভাষ্য, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ যাত্রার কথা বলে সেই নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।

অবশ্য দুই দলের পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে এ দেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য বলে মন্তব্য করেন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্যই হলো ভিন্নমত বা প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদ্‌গার। নির্বাচনের সময় এলে এটা বেড়ে যায়। অনেক সময় শোভনীয়তার মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়।’

মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা ও ধর্মের ব্যবহারের অভিযোগ বিষয়ে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আগে জামায়াত সম্পর্কে এ কথাগুলো আওয়ামী লীগ বলত, তখন জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির পার্টনারশিপ ছিল। এখন আওয়ামী লীগ নেই, এখন বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কাজেই জামায়াতকে ওইভাবে আইডেনটিফাই করা হচ্ছে, এটা আগেও করা হয়েছে। এটা বিএনপি করে নাই, যেহেতু বিএনপি এর আগে ওইভাবে জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এবার যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বী, তারা এ প্রশ্নগুলো তুলছে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-24%2Few3cli74%2FCombo.jpg?rect=0%2C0%2C915%2C610&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমান (বাঁয়ে) ও শফিকুর রহমান (ডানে) ছবি: কোলাজ

Sunday, July 13, 2025

পুরান ঢাকায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড: বিএনপির ১৬ বছরের ‘ত্যাগ’ কি ধুলায় মিশছে by সেলিম জাহিদ

পুরান ঢাকায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীদের সম্পৃক্ততার ঘটনায় ব্যাপকভাবে চাপে পড়েছে দলটি। এ ঘটনায় জড়িত যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পাঁচ নেতা–কর্মীকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলেও বিএনপি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা, খুন, দখল, অর্থ দাবি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, দলীয় পদপদবি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় এমনিতেই বিব্রত দলটির নেতারা।

এরই মধ্যে গত বুধবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, জুলাই ঘোষণাপত্রসহ কয়েকটি বিষয়ে যখন অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির মতবিরোধ চলছিল; সে সময়ে পুরান ঢাকার এ হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বেশ বেকায়দায় ফেলেছে। এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলনের ছাত্র ও যুব সংগঠন রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দল ও সংগঠন।

বিএনপি নিজেও এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছে। শুক্রবার রাতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতিতে বলেছেন, জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এই নির্মম ঘটনাটি (লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ড) দেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।

দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের দায় দল নেবে না—বিএনপির নেতারা আগে এ কথা বলে এলেও একশ্রেণির নেতা–কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দলটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যার কারণে লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ–বিক্ষোভ ও নিন্দা–প্রতিবাদ বাড়ছে। এর আগে ৩ জুলাই আসামি ছিনিয়ে নিতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় হামলা চালান বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পুলিশের আটজন আহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

৭ হাজার নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তবু থামছে না

এত বহিষ্কার, অব্যাহতি, পদাবনতি ও কমিটি বাতিল করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও কেন নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বিএনপি—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, হয়তো অনেক অপরাধী, সন্ত্রাসী নানা ছিদ্রপথে সংগঠনে ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু তাদের দুষ্কর্মের দায় তো বিএনপি নেবে না। বরং এ ব্যাপারে দল খড়্গহস্ত। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জেলা, মহানগর, থানা এবং কেন্দ্র মিলে প্রায় সাত হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিএনপি শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। অপরাধ যে-ই করবে, তাঁকে চরম শাস্তি দিতে দল বদ্ধপরিকর।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল দল বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়েছে। যেসব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অতীতে খারাপ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে বা যাঁদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি তো দায় এড়াচ্ছে না; বরং দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ পাওয়ামাত্র বহিষ্কার করছে, প্রশাসনকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করছে। এরপরও বিভিন্ন মহল এটা নিয়ে হীন রাজনীতির চেষ্টা করছে। তা না হলে তারেক রহমান জবাব দাও, এই মিছিল কেন। তারেক রহমান কি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন? বিএনপি যদি অপরাধীদের রক্ষা করার চেষ্টা করত, সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিত, তাহলে দোষ দিতে পারত।’

চাঁদাবাজির আরেক ধরন

বিএনপির নেতারা বলছেন, আল ইবাদত নামের এক ব্যক্তি ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ব্যবসায়ী দল’ নামের একটি ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে তোলেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে হোটেল ভিক্টোরিতে তিনি কার্যালয় খোলেন। বিএনপির অঙ্গসংগঠন পরিচয় দিয়ে এই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াসহ চাঁদা দাবি করেন। এ খবর জানতে পেরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (দপ্তরে সংযুক্ত) আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী গতকাল শনিবার পল্টন থানায় মামলা করেন।

জানা গেছে, এ ব্যাপারে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর দলীয় প্যাডে একটি চিঠিও দেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে আল ইবাদতকে গ্রেপ্তার করে।

নেতা-কর্মীরা কেন এত বেপরোয়া

একশ্রেণির নেতা-কর্মী বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়ে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত দলের বড় একটি অংশ রাতারাতি টাকা বানানোর ধান্দায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে অনেকে উৎসাহী। তাই যার যেখানে প্রভাব আছে, সে সেখানে অবৈধ অর্থের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এ জন্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ—এমন কর্মকাণ্ড চলছে। যেখানেই এসব কাজে বাধা আসছে, সেখানেই অঘটন ঘটছে এবং ঘটনাক্রমে কিছু কিছু প্রকাশ পাচ্ছে।

এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দীর্ঘ অপশাসন ও দুর্বৃত্তায়ন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এগুলোর রেশ এখনো কাটছে না। এর জন্য মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম এবং শুদ্ধি অভিযানের বিকল্প নেই।’

তবে বিএনপির নেতাদের কারও কারও অভিমত হচ্ছে, যেসব এলাকায় দলের ভালো নেতৃত্ব নেই, বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অস্পষ্টতা আছে, সেসব এলাকায় নেতা-কর্মীরা বেশি বেপরোয়া। কারণ, ওই সব এলাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাঁরা দল ভারী করতে যাচাই–বাছাই না করে অনেককে দলে ভেড়াচ্ছেন।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা বিএনপির নামে নানা অপরাধ করছেন, তাঁরা দলের উল্লেখযোগ্য কেউ নন। হয়তো কোনো একটা কমিটিতে কোনো পদে আছেন বা ছিলেন। কিন্তু তাঁদের দায় পুরো দলকে নিতে হচ্ছে। তাঁদের কারণে বিএনপির ১৬ বছরের ত্যাগ, লড়াই–সংগ্রাম সবকিছু ধুলায় মিশে যাচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।’

Thursday, March 6, 2025

‘গণপরিষদ’ ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ সামনে আসছে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর মতভিন্নতা by সেলিম জাহিদ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের সঙ্গে অনেক বিষয়েই ঐকমত্য দেখা গেছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ মূলধারার ইসলামপন্থী দলগুলোর। তবে সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘গণপরিষদ’ গঠন ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠায় ছাত্র-তরুণদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যে রাজনৈতিক লক্ষ্য প্রকাশ করেছে, তাতে সবাই একমত নয়।

জামায়াত মনে করে, ‘গণপরিষদ’ ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ কীভাবে হবে, সেটার কোনো ব্যাখ্যা আসেনি। এই পদক্ষেপ বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

ইসলামী আন্দোলন মনে করে, সংবিধানের ব্যাপক সংস্কার অনুমোদনে ‘গণপরিষদ’ হতে পারে। ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠায়ও তাদের আপত্তি নেই। তবে এসব করতে গিয়ে যাতে কোনোভাবেই জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের সঙ্গে জামায়াতসহ ইসলামপন্থীদের কোনো বিষয়ে তেমন মতবিরোধ দেখা যায়নি। এখন ‘গণপরিষদ’ ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ নিয়ে বিতর্কে কিছুটা মতভিন্নতা সামনে আসছে।

ছাত্র-তরুণদের নতুন দল এনসিপির নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন করে আর কোনো ফ্যাসিস্ট যাতে তৈরি হতে না পারে, সে জন্য সংবিধানসহ রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। সংবিধানের ব্যাপক সংশোধনের লক্ষ্যে গণপরিষদ নির্বাচন করতে হবে। এ লক্ষ্যে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে হবে। তাঁদের মতে, প্রথম রিপাবলিক হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের পর যে সংবিধান প্রণীত হয়েছে, সেই সংবিধানে কাঠামোগত ত্রুটির কারণে সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃত্বপরায়ণ ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে। এই কাঠামো বারবার সংশোধন করা হয়েছে বিদ্যমান সংবিধানের ভিত্তিতে। এখন মৌলিক পরিবর্তনগুলো করতে হলে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। এটিকেই তারা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বলছেন।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা কিছু শব্দ (গণপরিষদ, সেকেন্ড রিপাবলিক) বলেছে, কিন্তু এগুলো কীভাবে হবে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে এখনকার পরিস্থিতিতে এসব বিষয় নতুন করে বিতর্ক তৈরি করবে, নির্বাচনকে বিলম্বিত করবে এবং দেশকে কিছুটা অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যেতে পারে।’ জামায়াতের এই নেতা মনে করেন, এমন পরিস্থিতির উদ্ভব এড়াতে জরুরি কিছু সংস্কার শেষ করে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাধানের উত্তম পন্থা হতে পারে।

‘গণপরিষদ’ গঠন ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড রিপাবলিকের নজির আছে। সুতরাং এটা হতে পারে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন সংবিধান সংশোধনের যে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে তারা সংবিধানের আমূল পরিবর্তন চেয়েছে। সেটা করতে হলেও ‘গণপরিষদ’ বা ‘গণভোট’ প্রয়োজন হবে। সে বিবেচনায় তারা এ বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত। তবে এসব করতে গিয়ে যাতে নতুন করে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সে ব্যাপারেও তারা সতর্ক। দলটির অবস্থান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণহত্যাকারীদের বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন; তিনটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি যা চায়, তার বাইরে কিছুই হয় না। আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে চাইলাম, বিএনপির এর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরা সংস্কার চাইলাম, বিএনপি চায় দ্রুত নির্বাচন। এখন সংস্কার আলোচনাতেই নেই। আমরা দেখছি, সবকিছুতে বিএনপির চিন্তাই প্রতিফলিত হচ্ছে।’

ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ‘এ জন্যই আমরা বারবার বলছি, সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো পরিবেশ হয়নি। প্রশাসন নিরপেক্ষ হয়নি। তার জন্যই সংস্কার দরকার।’

জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের বাইরে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটি ছাত্রদের ‘গণপরিষদ’ ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’-এর মতো তাত্ত্বিক বিষয়ে সম্পৃক্ত হতে চায় না। জমিয়তের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, তাঁদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। তাঁরা প্রয়োজনীয় সংস্কার করে ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান চান। বরং দলটি ছাত্রদের সাম্প্রতিক তৎপরতার বিষয়ে সতর্ক।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা নতুন দল আত্মপ্রকাশ করেছে। আমরা তাদের স্বাগত জানাই। তবে আমরা তাদের দলীয় অবস্থানে রাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা চাই না। অন্যান্য দল যেভাবে দল পরিচালনা করে, তারাও সেভাবে করবে। তাদের জাতি গ্রহণ করলে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এক নয়। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের আলাদা স্বকীয়তা আছে। এখানে (ছাত্রদের) রাষ্ট্র যাতে পৃষ্ঠপোষকতা না করে।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২২ অক্টোবর ‘সেকেন্ড রিপাবলিকের’ বিষয়টি প্রথম আলোচনায় এনেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। সেদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা ও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে ‘বিপ্লবী ছাত্র-জনতার গণজমায়েত’ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল জুলাই বিপ্লবের চেতনার আলোকে ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন করে প্রক্লেমেশন অব রিপাবলিক ঘোষণা।

জুলাই-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা নতুন দল গঠন করে গণপরিষদ গঠন ও সেকেন্ড রিপাবলিকের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গণপরিষদ ও সেকেন্ড রিপাবলিকের চিন্তাকে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করার চেষ্টা বলেও মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতা। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র আছে বলেও সন্দেহ করছেন দলটির নেতারা।

অবশ্য এ ক্ষেত্র ভিন্নমত জানান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, ‘এসব কাজ (গণপরিষদ ও সেকেন্ড রিপাবলিক) করতে গিয়ে নির্বাচন প্রলম্বিত হওয়ার আশঙ্কার যে বিষয়টা, সেটাকে আমি বড় ধরনের কোনো সমস্যা মনে করি না। সমস্যা যেটা, সেটা হলো বর্তমান সরকারের নানা দুর্বলতা দৃশ্যমান। এটা দূরে করে আমূল সংস্কারের মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনার হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে গিয়ে নির্বাচন যদি একটু বিলম্বিতও হয়, সেটাকে দেশের স্বার্থে মেনে নিতে আমরা প্রস্তুত।’

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলটির নেতারা গণপরিষদ নির্বাচন ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবেন বলে ঘোষণা দেন
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলটির নেতারা গণপরিষদ নির্বাচন ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবেন বলে ঘোষণা দেন। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Thursday, February 4, 2016

জাপাকে আলোচনায় রাখতেই এরশাদ–রওশন বিরোধ by সেলিম জাহিদ

জাতীয় পার্টিতে (জাপা) এরশাদ-রওশনের দৃশ্যমান বিরোধ অনেকটাই কৌশলগত। দুই পক্ষের কেউই সরকারকে চটাতে চায় না; বরং সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই জাপাকে আলোচনায় জিইয়ে রাখতে চায় তারা। এ জন্যই কিছুদিন পরপর দলের সাংসদদের মন্ত্রিসভা ছাড়ার আলোচনা তোলা হয় বলে দলটির দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেছে।
সর্বশেষ কো-চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং মহাসচিব বদল নিয়ে দলের ভেতর সৃষ্ট অস্থিরতাও শেষমেশ সরকারে থাকা না-থাকার আলোচনায় গিয়ে ঠেকেছে। যদিও এরশাদ নিজে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত পদে বহাল আছেন। বলছেন, বিশেষ দূত বানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সম্মান দিয়েছেন, তাই প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া তিনি এ পদ ছাড়বেন না।
জাপায় সাম্প্রতিক বিরোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা যে পরিকল্পিত, ঠিক তা নয়। তবে এটা ঠিক যে, ম্যাডাম (রওশন) এরশাদ সাহেবের পদক্ষেপের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি। কিছু লোক পানি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। তিনি (রওশন) চট করে মুখ খোলেন না। এটা তাঁর স্বভাব। তাই বলে এটা সাজানো খেলা বলা যাবে না।’
কিছুদিন পরপর মন্ত্রিসভা ছাড়ার আওয়াজ তোলা, মহাসচিব পদে দুই বছরে দুই দফা রদবদল এবং সর্বশেষ এরশাদ ছোট ভাই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ও রওশনপন্থীদের বিপরীতমুখী তৎপরতা—এসবের পেছনে উভয় পক্ষের নেতাদের ছোট ছোট নানা স্বার্থ কাজ করছে। তবে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাসহ মোটা দাগের নীতিগত কিছু বিষয়ে এরশাদ ও রওশনের মধ্যে বোঝাপড়া আছে বলেও উভয় পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা মনে করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব নেতা বলেন, সরকারও এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। কারণ, গত কিছুদিন জাপা যেভাবে গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে, তাতে বিএনপি আলোচনা থেকে কিছুটা আড়ালে চলে গেছে।
গত রোববার জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সভায় দলের নবনিযুক্ত কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, সরকার অস্থিতিশীল হয় এমন কোনো পদক্ষেপ তাঁরা নেবেন না। তাঁরা চান, সরকার বাকি তিন বছর ক্ষমতায় থাকুক। পরে তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা মত দিয়েছেন যে জাপার সাংসদদের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। তবে, এ বিষয়ে দলের চেয়ারম্যান সময়মতো পদক্ষেপ নেবেন।
জাপার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সংসদে বিরোধী দলের নেতা রওশনের সঙ্গে কথা বলেই এরশাদ গত ১৭ জানুয়ারি জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান এবং নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। আর মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব পদ থেকে সরান তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে। মহাসচিব পদে হঠাৎ পরিবর্তন এবং কো-চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে রওশন প্রশ্ন তুললেও শেষ পর্যন্ত তিনি তা মেনে নিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা চাচ্ছিলেন দলকে এরশাদের প্রভাবমুক্ত করতে। এ লক্ষ্যে তাঁরা রওশনকে সামনে রেখে দলে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা দলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন বলে এরশাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, যা তিনি রওশনকে বোঝাতে সক্ষম হন। যার কারণে দলের ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচন এবং মহাসচিব বদলের প্রক্রিয়া নিয়ে রওশন প্রশ্ন তুললেও এর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত শক্ত কোনো অবস্থান নেননি। বরং দুই কূল রক্ষার মতো ‘কৌশলী’ অবস্থান নিয়ে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার পাল্টা ঘোষণাও নাকচ করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জি এম কাদের গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে কো-চেয়ারম্যান করার আগে এরশাদ সাহেব ভাবির (রওশন) সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। আমার সঙ্গেও উনার (রওশন) কথা হয়েছে। এখন দু-তিনজন লোক উনাকে নানাভাবে উত্তেজিত করছেন। তাঁকে বোঝাচ্ছেন, তিনি কো-চেয়ারম্যান না হলে জিরো হয়ে যাবেন।’
জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এরশাদ-রওশন ৬০ বছর ধরে সংসার করছেন। এত কিছুর পরও তাঁদের সংসার ভাঙেনি। তাঁরা এক আছেন। এখন কেউ যদি তাঁদের নিয়ে খেলেন, তাঁরাই বিপদে পড়বেন। আমি কোনো দলাদলিতে নেই।’
এদিকে দলের তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সরকার ছাড়ার বিষয়ে গত কয়েক দিন কিছুটা নমনীয় এরশাদ। এরই মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে জি এম কাদেরসহ দলের আরও তিনজনকে মন্ত্রী করার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাব করেছেন এরশাদ। এ বিষয়ে জি এম কাদের বলেন, ‘আমি কথাটি শুনে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন বোগাস কথা। আর আমার পক্ষে মন্ত্রী হওয়া এখন বিশ্রী ব্যাপার হবে।’
রওশনপন্থী নেতাদের একটি সূত্র জানায়, রওশন এরশাদের কৌশলী ভূমিকায় তাঁর অনুসারীদের অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছেন। এখন তাঁরা রওশনকে এড়িয়ে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়া, মহাসচিব পদ থেকে সম্প্রতি বাদ পড়া জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মন্ত্রী করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা এরশাদ ও রওশনের বাইরে জাপায় আরেকটি পক্ষ তৈরির চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জাপার পাঁচজন প্রভাবশালী সাংসদ এ চিন্তা-চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত আছেন বলে দলের একাধিক সূত্র জানায়।
তবে জি এম কাদের কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘এটুকু জানি যে জাতীয় পার্টিকে বেহাত করার একটা তৎপরতা আছে। তাঁরা তাঁকে (রওশন) ব্যবহার করতে চাচ্ছেন।’

Friday, October 30, 2015

হঠাৎ বাড়তি চাপে বিএনপি by সেলিম জাহিদ

অনেক দিন চুপচাপ থেকে হঠাৎ করেই গতকাল বৃহস্পতিবার রাজনীতি থেকে অবসর নিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরী। দুই বিদেশি নাগরিক হত্যায় অভিযোগ উঠেছে বিএনপির দুই নেতা হাবিব-উন-নবী খান ও এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া কথিত ‘বড় ভাই’ হিসেবে সন্দেহের তালিকায় আরও অনেকে আছেন বলে সরকারের পক্ষ বক্তব্য দেওয়ায় আরও কোনো কোনো নেতাকে জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া সম্প্রতি স্থানীয়পর্যায়ে ধরপাকড়ও বেড়েছে। এসব ঘটনায় হঠাৎ করেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বিএনপিতে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেছেন, দেড় মাস হলো বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের বাইরে আছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা অবসরে গেলেন। অন্য দুই নেতাকে বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত করার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। এই তিনটি ঘটনায় দলে দুশ্চিন্তা আছে। এরই মধ্যে যোগ হয়েছে জিয়া পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনায় রাজধানী ঢাকায় ঘটা করে একটি মিলাদ মাহফিলের আয়োজন, যার আয়োজক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ছোট ভাই আহমেদ কামাল।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলছেন, এই মিলাদের আয়োজন নিয়েও কিছুটা সন্দেহ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বিএনপির ভেতরে। বিরাজমান ঘোলাটে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের নেতা-কর্মীরা অস্বস্তিতে পড়েছেন। তাঁরা এসব ঘটনার একটির সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে সমশের মবিনের অবসরের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শাসক দলের পক্ষ থেকে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তাতে জল্পনা বেড়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, বিএনপির মধ্যে এখনো যাঁরা বিবেকবান মানুষ আছেন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, তাঁরা প্রত্যেকেই এই দল থেকে বেরিয়ে আসবেন। খালেদা জিয়া-তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে ঢেলে সাজাবেন।’
হানিফের এ বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সমশের মবিন এটা ‘ঝুঁকিপূর্ণ বক্তব্য’ বলে মন্তব্য করেন। বিএনপিকে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। আমি কখনো ষড়যন্ত্রের শিকার হইনি, হবও না। সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণে অবসরে গেছি।’ তিনি প্রোস্টেট, মাথা ঘোরা, পায়ে ও চোখের জটিল সমস্যায় ভুগছেন বলে জানান।
অবসরে যাওয়ার বিষয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত হয়নি। জানা গেছে, সমশের মবিন কিছুদিন ধরেই বন্ধুবান্ধব ও ঘনিষ্ঠদের কাছে রাজনীতি থেকে সরে আসার কথা বলছিলেন। তবে সমশের মবিন এও বলেন, অনেকের মতো তাঁর মনেও প্রশ্ন জাগে জিয়াউর রহমানের গঠিত বিএনপি এখন কি সেই নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী চলছে?
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সমশের মবিন সরাসরি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের উত্তরার বাসায় গিয়ে চিঠিটি গ্রহণ করিয়ে আনেন। সামরিক কর্মকর্তা থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা, পরে বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই নেতার হঠাৎ অবসর স্বাভাবিক মনে করছেন না বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকে। তাঁদের ধারণা, কারাগারে থাকতে তাঁকে বিএনপি ভেঙে নতুন দলে যেতে নানাভাবে চাপ দেওয়া হয়। সরকারের ইচ্ছানুযায়ী তা করা সম্ভব হবে না জেনে সমশের মবিন শেষ পর্যন্ত রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সমশের মবিন চৌধুরীকে তাঁর বনানীর ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা আছে। তিন মাস কারাভোগের পর গত ২২ মে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকে সমশের মবিনকে বিএনপির কোনো কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। এমনকি তিনি জামিনে মুক্তির পর রেওয়াজ অনুযায়ী দলীয় প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেননি। তখন থেকে নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে নানা গুঞ্জন ওঠে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এটাকে ‘অপ্রত্যাশিত কিছু নয়’ বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দলে থাকলে ভালো হতো, থাকতে না পারলে কী করা যাবে। তিনি তো আমাদের মতো তৃণমূল রাজনীতি করেননি। অসুস্থ হলেও আমাদের মতো পারবেন না। জেলে ছিলেন, বের হয়ে আসার পর যোগাযোগও রাখতেন না। নেতা-কর্মীরা এর জন্য প্রস্তুত ছিল।’
নজরুল ইসলাম খান মনে করেন, সমশের মবিন চৌধুরী মিথ্যা মামলায় জেলে মানসিক চাপে ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য হয়তো এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এর মধ্যে ‘অন্য কোনো চিন্তা’ আছে বলে তিনি মনে করেন না।
এদিকে ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা ও জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি খুনে দলের নেতা হাবিব-উন-নবী খান ও এম এ কাইয়ুমকে জড়ানোর ঘটনাকে সরকারের এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল বলে মনে করছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির একজন নেতা বলেন, এর মাধ্যমে সরকার বিএনপিকে বহির্বিশ্বে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। অপরদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখার ছক থেকেই মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে। হাবিব-উন-নবী খান ও এম এ কাইয়ুম—দুজনেই আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী বলে জানান ওই নেতা।
মিলাদ নিয়ে গুঞ্জন: আগামী ৪ নভেম্বর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে একটি মিলাদ মাহফিলের আয়োজন চলছে। এ নিয়ে বিএনপিতে নানা গুঞ্জন রয়েছে।
সূত্র জানায়, মিলাদে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও কার্ড পাঠানো হবে। জিয়াউর রহমানের একমাত্র জীবিত ভাই আহমেদ কামাল এই মিলাদের আয়োজক হলেও মূল পৃষ্ঠপোষকতা করছেন খালেদা জিয়ার দূরসম্পর্কের এক ভাগনে শরীফুল আলম (এস আলম ডন)।
আহমেদ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা (এস আলম) বলল, জিয়াউর রহমানসহ সবার জন্য করেন। আমি বললাম, ঠিক আছে, আমার দ্বিমত নেই।’
ওরা কারা-জানতে চাইলে আহমেদ কামাল এই প্রতিবেদককে শরীফুল আলমের মুঠোফোন নম্বর দেন।
এ বিষয়ে শরীফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনি (আহমেদ কামাল) খুব অসুস্থ ছিলেন। হাসপাতাল থেকে এসে আমাকে বললেন, মৃত্যুর আগে বাবা-মায়ের জন্য একটা মিলাদ দিতে চাই। আমি বললাম, তা হলে জিয়াউর রহমানসহ পরিবারের সবার জন্য করেন। বিএনপির সবাইকে দাওয়াত করেন।’ দাওয়াতি মেহমানের সংখ্যা পাঁচ-ছয় শ হতে পারে বলে তিনি ধারণা দেন।
শরীফুল আলম বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) খালা লিলিমন বিবি আমার দাদি। সেই সূত্রে আমি ওনার ভাগনে। কামাল সাহেবকে আমি চাচা ডাকি, তিনি আমাকে ভাতিজা ডাকেন।’ জানা গেছে, শরীফ একজন ফল ব্যবসায়ী। বিদেশ থেকে ফল আমদানি করেন। তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম টোটাল মার্কেটিং।
আহমেদ কামাল বলেন, তাঁরা পাঁচ ভাই। তিনি সবার ছোট। সবার বড় রেজাউর রহমান, এরপর জিয়াউর রহমান, মিজানুর রহমান ও খলিলুর রহমান। চারজনই মারা গেছেন। তার আগে মারা গেছেন বাবা মনসুর রহমান ও মা জাহানারা খাতুন। মেজো ভাইয়ের ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও সম্প্রতি মারা গেছেন।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অবসরে যাওয়া আহমেদ কামাল অবিবাহিত। সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর গণমাধ্যমকে দেওয়া তাঁর কিছু মন্তব্য জিয়া পরিবারের সদস্যদের অস্বস্তিতে ফিলেছিল। এরশাদ সরকারের সময়ে একবার তাঁকে সামনে এনে নতুন দল গঠন করার চেষ্টা হয়েছিল বলে বিএনপির নেতারা বলছেন।
হঠাৎ এ ধরনের আয়োজনের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, জানতে চাইলে আহমেদ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘না, না। এখনো সে পর্যায়ে আসিনি। ভবিষ্যতে দেখা যাক।’ তা হলে কি সে ধরনের সম্ভাবনা আছে? জবাবে তিনি বলেন, ‘শরীর ঠিক থাকলে ভবিষ্যতে দেখা যাবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান মিলাদের দাওয়াত পাননি বলে জানান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কথা নেই, বার্তা নেই, এত দিন পর মিলাদের দরকার হলো কেন? তাও আবার হল ভাড়া করে। সরকার তো অনেক কিছুই করার চেষ্টা করছে। এর পেছনে কারা আছে, নেতা-কর্মীদের সন্দেহ তো হতেই পারে।’

Friday, August 28, 2015

চুপসে গেছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো by সেলিম জাহিদ

অনৈক্য, দলাদলি, মামলার ভয় ও পারিপার্শ্বিক নানা চাপে চুপসে গেছে ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলো।
কয়েকটি দলের দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, ইসলামপন্থী দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কড়া নজরদারি ও সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পারিপার্শ্বিক চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠের কার্যক্রম গুটিয়ে তারা এখন অনেকটাই ঘরবন্দী হয়ে পড়েছে।
দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাতটি ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠন হলো জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।
এর মধ্যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে নানা ফৌজদারি মামলায় কাবু হয়ে পড়েছে জামায়াত।
দলটির একাধিক সূত্র বলছে, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় অনেকে কারাগারে, বাকিরা গা ঢাকা দিয়ে চলছেন। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরসহ অধিকাংশ জেলায় দলীয় কার্যালয় বন্ধ রয়েছে।
এ অবস্থায় গোপনে ও নানা কৌশল অবলম্বন করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানান ঢাকা মহানগর জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কারাবন্দী ১০ নেতার মধ্যে ইতিমধ্যে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বাইরে থেকে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত আমির, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারিসহ ঢাকা মহানগরের নেতারাও গত কয়েক বছরের বিভিন্ন সহিংসতা ও নাশকতার মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
জামায়াতের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা দাবি করেন, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক, জামায়াত কখনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করে না। এখন পরিস্থিতির আলোকে সতর্কতার সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে, এটুকুই।
প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই কয়েক বছর ধরে। গত রোজায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ রাজনীতিকদের সম্মানে ইফতার অনুষ্ঠান এবং সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর গ্রেপ্তারের দাবিতে দুই শুক্রবার লালবাগে মিছিল করা ছাড়া চলতি বছর ইসলামী ঐক্যজোটের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি ছিল না।
দলটির সহকারী মহাসচিব আহলুল্লাহ ওয়াছেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে অনেকটা ফোনে ফোনে। জেলার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগটা রক্ষা করছি।’
দলটির অপর একটি সূত্র জানায়, ইসলামী ঐক্যজোটে সম্প্রতি অনৈক্য দেখা দিয়েছে। আমিনীর ছেলে আবুল হাসানাত ও তাঁর ভগ্নিপতি সাখাওয়াত হোসাইনের সঙ্গে মতবিরোধ চলছে দলের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লার সঙ্গে। আবুল হাসানাত দলের মহাসচিব হতে আগ্রহী। এ বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত রমজানে জাতীয় ইসলামী পরিষদ নামে একটি নতুন সংগঠন করেন হাসানাত। সংগঠনটির প্রথম অনুষ্ঠানে পানিসম্পদমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে প্রধান অতিথি করা হয়।
চরমোনাইপীর সৈয়দ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনে প্রকাশ্যে দলাদলি নেই। তবে যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানসহ একটি অংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্তৃত্ব খাটান বলে অভিযোগ আছে। এ অংশকে ডিঙিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
গাজী আতাউর রহমান দাবি করেন, ‘কর্তৃত্ব খাটানোর অভিযোগ ঠিক না। তবে এটা ঠিক যে আমি ছাত্রজীবন থেকেই দলে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছি।’
মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছিল। হাফেজ্জী হুজুরের বড় ছেলে আহমদুল্লাহ আশরাফ খেলাফত আন্দোলনের আমির ছিলেন। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ায় সম্প্রতি ভোটাভুটিতে তাঁরই ভাই আতাউল্লাহ দলের আমির নির্বাচিত হন। আর জাফরুল্লাহ খান পুনরায় মহাসচিব হন। যদিও আহমদুল্লাহ আশরাফের বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ মিয়াজি মহাসচিব হতে চেয়েছিলেন। তা হতে না পেরে তিনি নতুন এ কমিটির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান এবং নিজের বাবাকে দলের আমির বলে দাবি করেন। এসব দলাদলিতে দলীয় কার্যক্রম অনেকটা বন্ধ হয়ে পড়ে।
খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মুজিবুর রহমান হামিদী দাবি করেন, কমিটি নিয়ে সম্প্রতি বিরোধের মীমাংসা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক কাজ চলছে। তবে প্রশাসনের বাধা ও হয়রানির কারণে মিছিল-মিটিং করা যাচ্ছে না। ঘরোয়া বৈঠকের কথা শুনলেও পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এসে উপস্থিত হন।’
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ভেঙে যায়। দলটির অবস্থা এখন অনেকটাই ছন্নছাড়া বলে একাধিক নেতা মন্তব্য করেছেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে দলের অগোচরে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিলেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব হুমায়ুন কবির। এরপর তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে শায়খুল হাদিসের এক ছেলে মাহফুজুল হককে মহাসচিব করা হয়। এ নিয়ে বিবাদে দলটির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা আবদুর রব ইউসুফী ও তাফাজ্জল হক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগ দেন।
এখন খেলাফত মজলিসের আমির সিলেটের মাওলানা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে দলের মহাসচিবসহ মূলধারার নেতাদের নানা বিষয়ে বিরোধ চলছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানো ছাড়া দলটির সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম নেই।
এ দেশে ধর্মভিত্তিক সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির নায়েবে আমির নূর হোসাইন কাসেমী ও মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাছের মধ্যে বিরোধ চলছে। সম্প্রতি আবদুর রব ইউসুফী ও তাফাজ্জল হক এবং ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা জুনায়েদ আল হাবিবকে এ দলে যোগদান করিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার পর থেকে এ বিরোধের সৃষ্টি বলে দলীয় একাধিক সূত্র বলছে।
অবশ্য মুফতি ওয়াক্কাছ এ বিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এসব বাজে কথা। লোকজন খালি খালি কথা ওঠায়।’ তিনি সাংগঠনিক স্থবিরতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এখন তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সময় হলে জাগবে। আমরা নভেম্বরে কাউন্সিল করব।’
জমিয়তের প্রচার সম্পাদক ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, এটা ঠিক যে ২০১৩ সালের ৫ মের আগ পর্যন্ত রাজপথে ইসলামি দলগুলোর যে ভূমিকা ছিল, এখন আর তা নেই। নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং নানা প্রশাসনিক চাপ আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
রাতারাতি গড়ে ওঠা কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক কাঠামো প্রায় ভেঙে গেছে। ২০১২ সালে গঠিত এ সংগঠনটি পরের বছর ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করে দেশ-বিদেশে হইচই ফেলে দিয়েছিল। এখন এটি অনেকটাই কাগুজে সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নানামুখী চাপ, বিভক্তি, হতাশায় সংগঠনটির নেতারা চুপ মেরে গেছেন। এখন মাঝেমধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেন সংগঠনটির নেতারা।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাঈনউদ্দিন রুহী দাবি করেন, হেফাজত একেবারে বিনাশ হয়ে গেছে, তা নয়। তবে সরকারি-বেসরকারি চাপ, নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও সংগঠনের ভেতরে ষড়যন্ত্রের কারণে যতটা দরকার ছিল, ততটা সক্রিয় থাকা সম্ভব হয়নি।

Saturday, August 22, 2015

বিএনপির সঙ্গে লড়ছে বিএনপি by সেলিম জাহিদ ও রিয়াদুল করিম

আবদুস সালাম আজাদ ও তাইফুল ইসলাম (টিপু) ১৯ মে বিএনপিতে সম্পাদকীয় পদ পান। ২৫ দিনের মাথায় দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরেই মারধরে রক্তাক্ত হন সালাম। আতঙ্কে তাইফুল দপ্তর এড়িয়ে চলেন প্রায় এক মাস। এটি বিএনপিতে অন্তর্ঘাতের একটি খণ্ডচিত্র।
একইভাবে দলের প্রধান তিন অঙ্গসংগঠনেও অভ্যন্তরীণ বিরোধ আছে। ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ, ককটেল হামলা, ভাঙচুর ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া হয়েছে প্রায় এক মাস। অন্তর্দ্বন্দ্বে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কথা বন্ধ দুই বছর। শ্রমিক দলের বিরোধ এখন শ্রম আদালতে বিচারাধীন। আর বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে দলের নীতি-কৌশল নিয়ে মতবিরোধ ও অসন্তোষ অনেকটা প্রকাশ্য। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া তিন নেতার ফোনালাপে এর প্রকাশ পেয়েছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, সরকারের দমন-পীড়নের মুখে তাঁরা মাঠে দাঁড়াতে পারছেন না। এ অবস্থায় দলের উচ্চপর্যায় থেকে মাঠ পর্যন্ত চেপে বসা দ্বন্দ্ব, অন্তর্ঘাত ও অবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। সম্প্রতি দল পুনর্গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা-ও বিফল হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পাওয়া আবদুস সালাম আজাদ গত ১৪ জুন রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মারধর ও ছুরিকাঘাতে আহত হন। ঘটনা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, যুবদলের ভেতর থেকেই এ অন্তর্ঘাত হয়। নতুন পদ প্রাপ্তির আগে থেকেই সালাম যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি পদে আছেন। আর তাইফুল ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক, পরে যুবদলের সদস্য। অনেকটা চমক দিয়ে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদকের পদ পান। একই পদে আরও তিনজন কাজ করছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক নেতাদের অনেকে নানা চেষ্টা-তদবির করেও বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনে পদ পাননি। সেখানে আনকোরা এক নেতাকে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে নিযুক্তি এবং আরেক নেতাকে দুই পদের দায়িত্ব দেওয়া পদবঞ্চিতদের ক্ষুব্ধ করে।
দলটির নেতা-কর্মীরা বলছেন, নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যতটা না সক্রিয়, তার চেয়ে বেশি তৎপর নিজেদের মধ্যে অন্তর্ঘাত ও রেষারেষিতে।
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধ-অবিশ্বাস: দলটির নেতারা বলছেন, বার্ধক্য ও অসুস্থতার পাশাপাশি সরকারের কঠোর অবস্থানে ১৯ সদস্যের বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এটাকে পুরোদমে সক্রিয় করাটাই এখন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মতবিরোধ ও আস্থাহীনতা স্থায়ী কমিটিকে আরও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। যদিও নিষ্ক্রিয় হওয়ার জন্য দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত না করাকে একটি বড় কারণ বলে জানান নেতারা।
এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়কার একটি ঘটনার উল্লেখ করে বিএনপির দায়িত্বশীল একজন নেতা বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য খালেদা জিয়াকে মোদির সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে ব্রিফ করেন। কিন্তু চেয়ারপারসন তাঁকে বৈঠকে রাখেননি। পরে ওই নেতা সহকর্মীদের কাছে মনোবেদনা প্রকাশ করেন। এরপর চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন দলের এমন একজন নেতাকে বাদ দিয়ে চীনে বিএনপির প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়। এর আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে নেতাদের মুঠোফোন নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন এখন আর সেভাবে তাঁদের সঙ্গে কোনো কিছু আলোচনা করেন না। হয়তো তিনি সবার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগরে মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার দ্বন্দ্ব; চট্টগ্রামে আবদুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও শাহাদাত হোসেনের ত্রিমাত্রিক বিরোধ; কেরানীগঞ্জে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমান উল্লাহ আমানের মধ্যে পুরোনো বিরোধ তো রয়েছেই।
অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার দাবি করেন, ‘টপ লিডারশিপ, বিশেষ করে দলের স্থায়ী কমিটি বা নির্বাহী কমিটিতে কোনো কোন্দল বা অবিশ্বাস নেই। চেয়ারপারসন স্থায়ী কমিটি বা নির্বাহী কমিটিতে যাঁদের আনবেন, তাঁদের নিয়েও কোনো কোন্দল হবে বলে মনে করি না।’
গুলশানের ‘বলয়’: বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, তাঁরা চাইলেই দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। কারণ, খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয়কেন্দ্রিক একটি ‘বলয়’ বন্দী করে রেখেছে।
গত ১৫ জুন ময়মনসিংহ জেলার আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক এইচ এম মাসুদুল আলম খান বলেন, ‘ম্যাডাম, আমি যখন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের জিএস ছিলাম, তখন আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হতো। কিন্তু এখন আপনার সঙ্গে দেখাও হয় না, আপনার গুলশান কার্যালয়ে ঢুকতে পারি না। আর নয়াপল্টনের কার্যালয়ে কমিটি বিক্রি হয়।’
তারও আগে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের কনভেনশনে হেলেন জেরিন খান বলেন, তিন বছরেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। অথচ প্রায় ৫০ জনের মতো লোক প্রতিনিয়ত খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
আলাপকালে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাঁরা এ-ও বলেন, চেয়ারপারসন না ডাকলে তাঁরা গুলশান কার্যালয়ে যান না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গুলশান কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, বিশেষ সহকারী, প্রেস সচিব ও মিডিয়া উইংয়ের সদস্যদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। সেখান থেকে তথ্য ফাঁস হওয়া বা খালেদা জিয়ার কক্ষ থেকে কথা রেকর্ড করার যন্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আছে।
যুবদলের সভাপতি-সম্পাদকের কথা বলা বন্ধ: বিএনপির যুব সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এমন পর্যায়ে গেছে যে সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (আলাল) ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলমের (নীরব) মধ্যে প্রায় দুই বছর কথা বলা বন্ধ, মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত নেই। এ অবস্থায় সংগঠনের সহসভাপতি আবদুস সালাম আজাদ পরস্পর বৈরি দুই নেতার মধ্যে কথা চালাচালি করে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
অবশ্য আলাল দাবি করেন, ‘একদম যে কথা হয় না, তা ঠিক না। ঈদের দিনও কথাবার্তা হয়েছে। দরকার হলে দায়িত্বশীলদের মাধ্যমেও যোগাযোগ হয়।’
নেতা-কর্মীরা জানান, শীর্ষ নেতৃত্বের বিরোধে বিগত আন্দোলনে যুবদল এতটাই নিষ্ক্রিয় ছিল যে সংগঠনটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল বিএনপিতে। এ অবস্থায় যুবদলের পুনর্গঠন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম সভাপতি হতে চান। বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ ছাত্রদলের সাবেক নেতা খায়রুল কবির (খোকন), শহীদ উদ্দিন চৌধুরী (এ্যানি), কামরুজ্জামান রতন, সুলতান সালাহউদ্দিনকে (টুকু) যুবদলের নেতৃত্বে আনতে ঢাকায় ও লন্ডনে চেষ্টা-তদবির করছেন। আবার দলের আরেকটি অংশ ছাত্রদলের সাবেক নেতা সানাউল হককে (নীরু) ফিরিয়ে এনে যুবদল সংগঠিত করতে আগ্রহী। কিন্তু নীরুর আসা ঠেকাতে এককাট্টা হয়ে নেমেছেন নীরুর সময়কার ছাত্রদল নেতাদের কয়েকজন।
এ অবস্থায় এ সপ্তাহ, ওই সপ্তাহ, এ মাস, পরের মাস বলেও যুবদলের কমিটি ঘোষণা করা যায়নি। অবশ্য আলাল এ প্রতিবেদককে জানান, বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন।
ছাত্রদল আছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে: মাইদুল হাসানকে (হিরু) সভাপতি ও মাসুদ পারভেজকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি দিয়েছিল ছাত্রদল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিরোধে এ কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজই করতে পারেনি। কমিটিও পূর্ণাঙ্গ হয়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, মাইদুল হাসান ও মাসুদ পারভেজকে ব্যর্থ করতে তখন মরিয়া হয়ে নামেন ছাত্রদলের ওই সময়কার কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান ও তাঁর অনুগতরা। এখন আকরামুল হাসানদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ওই অংশটি।
মাইদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলেই কমিটি দাঁড় করিয়েছিলাম। কিন্তু ছাত্রদলের তৎকালীন (জুয়েল-হাবিব) কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেয়নি। তারা চেয়েছে আমরা যেন ব্যর্থ হই।’
ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষোভ, ককটেল হামলা, ভাঙচুর ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া হয়েছে প্রায় এক মাস। অন্তর্দ্বন্দ্বে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কথা বন্ধ দুই বছর, শ্রমিক দলের বিরোধ এখন শ্রম আদালতে বিচারাধীন
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, পছন্দের লোকদের দিয়ে কমিটি করতে গিয়ে ছাত্রদলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চরমে উঠেছে। এ জন্য নেতারা দলের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী ও সহসম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিনকে দুষছেন।
গত বছরের ১৪ অক্টোবর রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কমিটি করা হয়। গত ১০ মাসেও তাঁরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি। এই কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষুব্ধ ও পদবঞ্চিতরা বিদ্রোহ করেন। তাঁরা একজোট হয়ে কমিটির বিরুদ্ধে লাগাতার বিক্ষোভ করেন। পরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আশ্বাসে পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ থামান। কিন্তু বিক্ষুব্ধ ও পদবঞ্চিতরা এখনো কমিটির বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
শ্রমিক দল শ্রম আদালতে: গত বছরের মে মাসে আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক করে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া কমিটির অনুমোদন দেন। কিন্তু শ্রমিক দলের একটি অংশ কমিটি মানেনি। তারা পাল্টা কমিটি দেয় এবং কেন্দ্র ঘোষিত কমিটির বিরুদ্ধে ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করে।
বিদ্রোহী অংশের নেতারা জানান, মামলায় শ্রম পরিচালক ও কমিটি গঠনের সঙ্গে যুক্ত বিএনপির তিন নেতা নজরুল ইসলাম খান, জাফরুল হাসান ও আবদুল্লাহ আল নোমানকেও বিবাদী করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, শ্রমিক দলের আগের কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সহসাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন এমন সক্রিয় নেতাদেরও কমিটিতে রাখা হয়নি।
আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের খাজা বলেন, ‘আমি শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলাম। আমার অপরাধ হলো কেন নির্বাচন চাইলাম। সে জন্য কমিটিতেই রাখা হয়নি। অথচ গত ১০ বছরে শ্রমিক দলের কার্যক্রমে সক্রিয়দের মধ্যে আমি অন্যতম।’
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী নূরে আরা সাফা ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তারের মধ্যেও সম্প্রীতি নেই। নারী নেত্রীদের মধ্যে এ নিয়ে বিভক্তি আছে।
মাঠপর্যায়ের রাজনীতির ওপর জেলাভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে প্রথম আলো। এ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলায় দলীয় বিরোধ চরম পর্যায়ে। কমিটি নিয়ে রেষারেষিতে একাধিক জেলায় আলাদা কার্যালয় খোলা হয়েছে, দলীয় কর্মসূচিও পালিত হয় পৃথকভাবে। সম্প্রতি জেলা পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের বিষয়ে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাতেও এই কোন্দলের কথা উল্লেখ আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার বলেন, বড় দলে কোন্দল থাকবে। ম্যাচিউরড নেতৃত্ব অথবা সমান যোগ্যতার একাধিক নেতা থাকলে সেখানে প্রতিযোগিতা বা কোন্দল থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে নির্বাচনের সময় এর প্রভাব পড়ে না, নেতা-কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন।

Friday, July 31, 2015

‘আইজ বাংলাদেশ উদ্বোধন হইব’ by সেলিম জাহিদ ও সফি খান

৬৮ বছরের আকাঙ্ক্ষার অবসান হবে আজ শুক্রবার রাত ১২টা
১ মিনিটে। ছিটমহলগুলোতে এই আনন্দে দিনভর চলছে নানান
অনুষ্ঠান। শিশুরা বেড়ে উঠবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে,
তাই ওদের আনন্দ যেন একটু বেশি। ছবিটি আজ শুক্রবার
বিকেলে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার লতামারী
ছিট থেকে তোলা। ছবি: মঈনুল ইসলাম, রংপুর
‘আইজ বাংলাদেশ উদ্বোধন হইব’—দাশিয়ার ছড়ার কালীহাটের চা দোকানে বসে হরিয়ানা রাজ্যে মেয়ে মোসলেমাকে এ খবর দিচ্ছিলেন বাবা মোফাজ্জল হক। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মুঠোফোনে যখন বাবা-মেয়ের কথা হচ্ছিল, মোফাজ্জলের মুখে তখন সূর্যের হাসির বিজ্ঞাপনের কার্টুনটির মতোই মুখ জোড়া হাসি। এমন হাসি আর আনন্দ এখন পুরো ছিটমহল জুড়ে।
হাসি-আনন্দের পাশাপাশি আলোকসজ্জা, হাডুডু, লাঠিখেলা, নৌকা বাইচসহ নানান আয়োজন চলছে ছিটমহলগুলোতে।
৬৮ বছর পর ভারত-বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিট পর দুই দেশের ভূখণ্ডের অংশ হচ্ছে। এত দিন দেশহীন থাকা ছিটমহলগুলোর ৫০ হাজারের বেশি মানুষ কাল থেকে দেশ পাচ্ছে। তাই ছিটমহলের সর্বত্র যেন বিজয় অর্জনের আনন্দ। চলছে উৎসবের নানা আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতা।
দাশিয়ার ছড়ার ছিটমহলে বসে মোফাজ্জল উৎসবের খবর দিচ্ছিলেন মেয়েকে। তিনি জানালেন, চার মেয়ে তাঁর। মোসলেমা ও মফিজাকে বিয়ে দিয়েছেন। স্বামীদের নিয়ে তাঁরা ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের মেওয়াত এলাকায় থাকেন। বাকি দুই মেয়ে ও তাঁদের মাকে নিয়ে দাশিয়ার ছড়ায় থাকেন।
মোফাজ্জল জানান, আট বছর হলো কালীরহাটে চা দোকান করছেন। এত দিন এ হাটের কোনো ঠিকানা ছিল না, নাম বলা যেত না। এখন কালীরহাট স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ। তিনি বলেন, ‘খুশি লাগছে, আমি সে হাটের একজন দোকানদার।’
মোফাজ্জলের চা দোকানের ২০০ গজ দূরে কালীরহাটের টিনের চাউনির ছোট্ট কালী মন্দিরটিও আজ অন্যদিনের চেয়ে ব্যতিক্রম বলে জানালেন পুরোহিত সুশীল চন্দ্র। সকাল থেকেই দল বেঁধে পূজা অর্চনা করেন ছিটমহলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। একইভাবে শুক্রবারের জুমাবার পেয়ে নামাজের পর ছিটমহলের মুসল্লিরা মসজিদে মসজিদে দোয়া ও শোকরানা আদায় করেন।
শুক্রবার দুপুরে কালীরহাটে কথা হয় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘৬৮ বছর পর মুক্ত জীবন পাচ্ছি। কাল থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের নতুন জীবন। এ আনন্দ ভাষায় বর্ণনার মতো নয়।’
মুক্তির ঐতিহাসিক দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে সমন্বয় কমিটি দাশিয়ার ছড়ার বিভিন্ন প্রান্তে ২৫টি তোরণ বানিয়েছে। রাতে ১১টি স্থানে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিকেলে কালীরহাটের পাশে হাডুডু, লাঠিখেলা এবং ছিটমহলের পাশ দিয়ে যাওয়া নীল কমল নদীতে নৌকা বাইচ হয়।
ছিটমহলের বিনিময় উপলক্ষে হাডুডু খেলায় মেতেছে এরা
আয়োজকেরা জানান, ৬৮ বছরের অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে যাত্রার লক্ষ্যে রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতি জ্বালানো হবে কালীরহাটে। এর পর ৬৮টি পটকা ফুটিয়ে তোপধ্বনি করা হবে। রাতে ছিটমহলের সদর রাস্তায় মশাল মিছিলে অংশ নেবেন বাসিন্দারা।
ছিটমহলের এই আনন্দ উৎসব দেখতে বিকেলে কালীরহাটে জড়ো হয় হাজারও মানুষ। এত মানুষ এ হাটে কখন একত্র হয়নি। দূর-দূরান্ত থেকে দাশিয়ার ছড়া এসেছেন অনেকে। সুরুজ্জামান ও মিজানুর রহমান এসেছেন ভূরুঙ্গামারীর সিলকুড়ি থেকে। উৎসবে যোগ দেওয়া পশ্চিমটারীর নুরুন্নাহার বলেন, ‘ছিট বাংলা হইলো, তাই দেখপার আসছি।’
ছিটমহলের উৎসব আয়োজন এবং সেখানকার মানুষের জীবন-সংগ্রামের খবর সংগ্রহে গণমাধ্যমের কর্মীরা চষে বেড়াচ্ছেন দাশিয়ার ছড়ার বিভিন্ন প্রান্তে। সরাসরি সংবাদ সম্প্রচারে ছিটমহলের কাচা রাস্তার ধারে, জমিতে বসেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ভ্রাম্যমাণ স্টেশন। জটলা বেধে তা দেখছেন ছিটমহলের বাসিন্দারা। এ ছাড়া কালীহাট বাজারে বিজয় উৎসব দেখতে জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আসা হাজার খানেক মানুষের সমাবেশ হয়।
লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা হবে
আয়োজক ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, কাল শনিবার সকাল নয়টায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন। বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কালীরহাট জামে মসজিদের পাশেই পতাকার জন্য পাকা স্ট্যান্ড তৈরি করা হচ্ছে। কাল ১ আগস্ট সকালে কেক কাটা হবে। এরপর মিষ্টিমুখ করে আনন্দ মিছিল বের করার কর্মসূচি ঠিক করা হয়েছে। সকাল ১০টায় নির্মাণাধীন দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসা মাঠে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে আয়োজক কমিটি ও কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
উৎসব ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগ করেছে। ফুলবাড়ী থানার ১৪ জন পুলিশ সদস্য, কুড়িগ্রাম পুলিশ লাইন থেকে ১২ জন পুলিশ কনস্টেবল সকাল থেকে কালীরহাটে অবস্থান নিয়েছেন। এ ছাড়া বিকেল সাড়ে ৪টায় গংগারহাট সীমান্ত ফাঁড়ির বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) চারজন সদস্যও নিরাপত্তায় অংশ নেন।
হঠাৎ উৎসবে ছেদ
দাশিয়ার ছড়ায় বিজয় উৎসবের আয়োজন চলছিল অনেক দিন থেকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে হঠাৎ উৎসব আয়োজনে যেন ছেদ পড়ে। ছিটমহলের বাসিন্দা এবং উৎসব আয়োজনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম-২ (কুড়িগ্রাম সদর-রাজারহাট ও ফুলবাড়ি) আসনের সাংসদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে নিয়ে আয়োজকেরা কিছুটা ইতস্তত ও দ্বিধায় পড়েছেন।
সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তাফা বলেন, তাজুল ইসলাম চৌধুরী হঠাৎ করে আসতে চেয়েছেন। তিনি মতবিনিময় করবেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিয়ম সমন্বয় কমিটি ৩১ জুলাই মধ্যরাত ঘিরে উৎসবের জন্য কালীরহাটের পাশে দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসা (প্রস্তাবিত) মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু করে। এই উৎসব কর্মসূচির সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ মো. জাফর আলীসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা সম্পৃক্ত।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খবর আসে সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় পার্টির (জাপা) সাংসদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে যোগ দেবেন। এতে ছিটমহল বিনিয়ম সমন্বয় কমিটি অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ আওয়ামী লীগের সাংসদ ও নেতারা জাপার সাংসদ তাজুল ইসলামকে একই মঞ্চে রাখতে আগ্রহী না। কিন্তু ফুলবাড়ী জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. মঈনুল হক দাশিয়ার ছড়া ছিটমহল বিনিয়ম সমন্বয় কমিটির সভাপতি। কাল থেকে দাশিয়ার ছড়া বাংলাদেশের অংশ হওয়ার পর তা এই আসনের অন্তর্ভুক্ত হবে বিধায় তিনি দলীয় সাংসদকে উৎসবে অতিথি করতে আগ্রহী। এ অবস্থায় আজ শুক্রবার দুপুরের দিকে মাদ্রাসার মূল মঞ্চের দুই জমি দূরত্বে ‘তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’ এর ব্যানারে আরেকটি মঞ্চ বানানো হয়। বিকেলে সেই মঞ্চে তাজুল ইসলাম বক্তব্য দেন। রাতের অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত মঞ্চে থাকবেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
তাজুল ইসলাম চৌধুরীর আকস্মিক আগমনে ‘ঝামেলায় পড়ে গেলাম’ বলে মন্তব্য করেন ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নূর ইসলাম।
অবশ্য জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম চৌধুরী বিকেলে প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁর সফরটা সরকারি। তাই সফরসূচি ঠিক করতে সময় লেগে গেছে।

মেরিনা-সরোয়ারের বাঁধন ছিঁড়ে গেল! by সেলিম জাহিদ ও সফি খান

পেছনে ঘরগৃহস্থালি। চলে যাবেন ভারতে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী
থাকতে চান বাংলাদেশে। এক ছেলে নিয়ে তিনি এখন
বাবার বাড়িতে। আরেক ছেলেকে কোলে নিয়ে দাশিয়ার
ছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা সরোয়ার l সফি খান
ভারত, না বাংলাদেশ। একমত হতে পারলেন না দুজন। স্বামীর সিদ্ধান্ত ভারত, স্ত্রীর বাংলাদেশ। ভূখণ্ড বেছে নিতে দুই নাড়ির দুই টান। অবশেষে ভারত-বাংলাদেশে ভাগ হয়ে ছিঁড়ে গেল সরোয়ার আলম ও মেরিনা বেগমের দাম্পত্যের বাঁধন। এই দম্পতি ভারতের ১১১ ছিটমহলের একটি দাশিয়ার ছড়ার বাসিন্দা।
১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ কমিশন ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা ভাগ করেছিল। দেশভাগের ৬৮ বছর পর সেই সীমানা আর থাকছে না। আজ ৩১ জুলাই মধ্যরাতের পর ১৬২টি ছিটমহল দুই দেশের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।
দাশিয়ার ছড়া ছিটমহলটি ভারতের। এর অবস্থান বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার যে ১৬২টি ছিটমহল আছে, তার মধ্যে আয়তন ও লোকসংখ্যার দিক থেকে এটি সবচেয়ে বড়। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী, এর আয়তন ১ হাজার ৬৪৩ একর। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে লোকসংখ্যা ৭ হাজার ১২৩ জন। অবশ্য ছিটমহলের বাসিন্দাদের দাবি, লোকসংখ্যা ১০ হাজার ২৭৮ জন। হেড কাউন্টিং বা জনগণনার সময় অনেকে ভয়ে নাম তোলেননি। মেরিনা ও সরোয়ার দাশিয়ার ছড়ার তিন নম্বর মৌজার বাসিন্দা।
কথা বলে জানা গেল, সরোয়ারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দাশিয়ার ছড়ায়। আর মেরিনার জন্ম বাংলাদেশে, কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুরে। ২০১১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে আছে দুই সন্তান মোস্তাফিজুর রহমান হিমেল ও আবদুল্লাহ আল মুয়াদ।
গত বুধবার বিকেলে দাশিয়ার ছড়ায় বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কথা হয় সরোয়ার আলমের সঙ্গে। কোলে দুই বছরের ছেলে হিমেল। সরোয়ার জানান, তাঁদের চার ভাইয়ের দুজন পরিবার নিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশের খড়িবাড়ি বাজারের গত হাটে নিজের দুটি গরু ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। নিজের ভাগের কিছু গাছগাছড়া বেচে দিয়েছেন ২৮ হাজার টাকায়।
সরোয়ার বলেন, দুই ছেলে আর স্ত্রীসহ ৯ জুলাই ফুলবাড়ী উপজেলায় গিয়ে ভারতের অধিবাসী হওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পরে স্ত্রী মত পাল্টান। ২২ জুলাই স্ত্রী মেরিনা ছোট ছেলে মুয়াদকে নিয়ে বাবার বাড়ি ফুলবাড়ীর কাশিপুরে চলে যান।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য, দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে স্ত্রীকে জোর করে রাজি করিয়েছিলেন সরোয়ার। তাই বিদায় নিতে যাওয়ার কথা বলে ছয় মাসের শিশুসন্তান মুয়াদকে নিয়ে বাবার বাড়ি যান। সেখান থেকে তিনি আত্মগোপন করেন। এর মধ্যে সরোয়ার জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী ২৭ জুলাই উপজেলায় গিয়ে নিজের ও দুই সন্তানের ভারতের যাওয়ার তালিকা থেকে নাম কাটিয়ে এসেছেন। সরোয়ার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে স্ত্রী-সন্তানের খোঁজ পাননি।
ভারত, না বাংলাদেশ—ভিটেমাটি ছেড়ে ভূখণ্ড বেছে নেওয়ার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে এমন অনেক খণ্ড খণ্ড কষ্ট-যন্ত্রণা জমাট বেঁধেছে ছিটমহলগুলোতে। আবার এর ভেতরেই ঘুরে ফিরছে ৬৮ বছরের দীর্ঘ বঞ্চনা অবসানের আনন্দ। আজ শুক্রবার মধ্যরাতে ছিটমহলে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার অর্জনের মাহেন্দ্রক্ষণ। এই রাত ঘিরে চলছে উৎসবের নানা আয়োজন। যদিও ছিটমহলের বাইরে এ নিয়ে তেমন উৎসাহ বা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দাশিয়ার ছড়াসহ কুড়িগ্রাম জেলার ১২টি ছিটমহলের (একটিতে মানুষ নেই) জনসংখ্যা ৭ হাজার ১৩৬। এঁদের ৩১৭ জন ভারতে চলে যাওয়ার আবেদন করেছেন। এঁদের ১৫৮ জন হিন্দু, ১৫৯ জন মুসলমান। হিসাবে দেখা যায়, দাশিয়ার ছড়া থেকেই ২৮৪ জন ভারতে যাওয়ার আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫৮ জন হিন্দু, ১২৬ জন মুসলমান।
লক্ষ্মীবালা যাচ্ছেন, থাকছেন মধূসুদনরা: দাশিয়ার ছড়ার দুই নম্বর মৌজায় পাশাপাশি ঘর দুই ভাইবোন লক্ষ্মীবালা মোহন্ত ও মধূসুদন মোহন্তর। ৩৫ বছর ধরে এক বাড়িতে বসবাস তাঁদের। আরেক ভাই হরেকৃষ্ণ মোহন্তর বাড়ি তিন জমি পর। লক্ষ্মীবালার ছোট বোন যমুনা মোহন্ত আছেন সীমান্তের ওই পাড়ে ভারতের কোচবিহার জেলার নয়ারহাটে। সেখানেই তাঁর বিয়ে হয়েছে।
লক্ষ্মীবালার সিদ্ধান্ত, দুই ছেলে হরিচরণ ও বিষ্ণু মোহন্ত, ছেলের বউ আর পাঁচ নাতনিকে নিয়ে বোন যমুনার কাছাকাছি থাকবেন। মধূসুদন ও হরেকৃষ্ণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে থাকার।
ভারতের ছিটমহলের বাসিন্দা হলেও দুই ভাই আত্মীয়তা গড়েছেন বাংলাদেশিদের সঙ্গে। এর মধ্যে মধূসুদনের মেয়ে কৃষ্ণা রানীর বিয়ে দিয়েছেন লালমনিরহাটের বড়বাড়ি এলাকায়। ছেলে নরেশ ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন।এত দিন পাশাপাশি থাকা বোন-ভাগনেরা ভিটে খালি করে চলে যাচ্ছেন ভারতে।
মধূসুদন মোহন্ত বলেন, ‘বাপ-দাদার জন্ম এই বাড়িতেই। ভিটা ছাড়ি কোটে যাম। বোনকে অনেক বুঝাইলাম, তারা থাইকবার চায় না। তাই যদি না থাকে, তাক আটকে রাখারÿক্ষমতা তো আমার নাই। আমি ছাওয়া পাওয়া ছাড়ি যাবার পারব না।’
বুধবার দাশিয়ার ছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বোন লক্ষ্মীবালার ঘরে চলছে বিদায়ের প্রস্তুতি। ছয়টি গাছ তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। সেটি কাটাকুটি চলছে। ঘরে দুটি ছাগল ছিল। একটি জেঠাসের মেয়ে আঙ্গুরিকে, আরেকটি সম্বন্ধীর মেয়ে অনন্যাকে দিয়ে দিয়েছেন। এখন কাপড়চোপড়, কাঁথাবালিশ, ঘটিবাটি আর নিজে যে রিকশা-সাইকেলের মেকারি করতেন, সেই হাতিয়ারগুলো গোছগাছ বাকি—জানালেন হরিচন্দ্র মোহন্ত। দুই ভাই হরি ও বিষ্ণুর নামে ঘরভিটেসহ ৪১ শতক জমি আছে। সেগুলোর কোনো বন্দোবস্ত হয়নি।
ভিটেবাড়ি ছেড়ে কেন যাচ্ছেন? জবাবে হরিচন্দ্রের মা লক্ষ্মীবালা বলেন, ‘এটে দুই ভাই। ওখানে (ভারত) দুই মেয়ে, ননদ, কাকারা থাকে। ইন্ডিয়া গেলে ওই দেশের সরকার দুই বছর পুইষবে, পাঁচ লাখ টাকা, থাকবার ঘর করি দিবে, তাই যাবার চাই।’
বুধবার লক্ষ্মীবালার ঘরের পেছনের গাছ দুটি যখন কাটা হচ্ছিল, ঠিক তখন কানে আসছিল ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির মঞ্চ নির্মাণের হাতুড়ির ঠুকঠাক আওয়াজ। লক্ষ্মীবালার বাড়ির কয়েক জমি পরেই বানানো হচ্ছিল উৎসব মঞ্চ। এর পাশ ঘেঁষেই সিমেন্টের পিলার পুঁতে দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসার সাইনবোর্ড টানিয়ে চলছে ঘর বানানোর কাজ।
ছিটমহলের বাসিন্দারা জানান, বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির পর দাশিয়ার ছড়ায় স্কুল-মাদ্রাসা স্থাপনের হিড়িক পড়েছে। ১ হাজার ৬৪৩ একরের ছিটমহলের বিভিন্ন প্রান্তে¯ইতিমধ্যে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ (একটি বালিকা) ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছে। এর কয়েকটিতে বাঁশ দিয়ে ঘরের কাঠামো খাড়া করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসার জন্য চার জমিদাতার একজন আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় নির্মাণাধীন মাদ্রাসার সামনে। তিনি বলেন, ছিটমহলের মানুষ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন শিক্ষায়। এরপর স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতায়নের দিকে। তিনি জানান, দাশিয়ার ছড়াকে ‘শেখ হাসিনা নগর’ নামকরণ করে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে সেখানকার বাসিন্দারা। এ ছাড়া একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং দাশিয়ার ছড়ার মাঝের চরে ইন্দিরা-মুজিব নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখছেন ছিটমহলের লোকজন।
এত স্কুলঘর নির্মাণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ছিটমহলের বোর্ড অফিস এলাকার বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার এখনো অর্ডার দেয়নি। পাবলিক আশায় আশায় ঘর তুইলবার লাইগছে। সরকার যখন বইসবে, তখন স্কুল সরকারি অইবে।’
স্থানীয় লোকজন জানান, ভুয়া ঠিকানা দিয়ে ছিটমহলের বাসিন্দারা এত দিন বাংলাদেশে পড়ালেখা করেছেন। এঁদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাঁদের একজন নূর ইসলাম রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে লেখাপড়া শেষ করেছেন। এখন তিনি ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে।
নূর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভুয়া ঠিকানা দিয়ে আমরা লেখাপড়া করেছি, এটা সত্য। এখন সরকার যেন আমাদের অর্জিত শিক্ষাসনদের স্বীকৃতি দেয়।’
কিন্তু মেরিনা ও সরোয়ার আলমদের কী হবে? ’৪৮-এর দেশভাগের মতো নাড়ির টানে দ্বিখণ্ড হওয়া মেরিনার সংসারের কী হবে?
সরোয়ারের বড় ভাই মিজানুর রহমানও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মিজান ২০১৪ সালে গঠিত দাশিয়ার ছড়ায় ইউনাইটেড কাউন্সিল নামে একটি সংগঠনের সভাপতি। এটি ছিটমহলে ভারতপন্থী বলে পরিচিত। কারণ, সংগঠনটির উদ্যোক্তা এবং সমর্থকেরা ছিটমহল বিনিময় না করে ভারতের সঙ্গে করিডোর চেয়েছিলেন। এ কারণে দাশিয়ার ছড়ায় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির সঙ্গে ইউনাইটে কাউন্সিলের বিরোধ আছে। ইউনাইটেড সমর্থকদের কমসংখ্যকই বাংলাদেশে থাকছেন।
মিজানের সঙ্গে বুধবার সন্ধ্যায় কথা হয় ছিটমহলের কালীরহাটে। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির লোকজনের বৈরিতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করিডোর চেয়েছিলাম বলে আমরা নাকি রাজাকার। তাহলে কীভাবে বাংলাদেশে থাকব?’ ভাই সরোয়ারের স্ত্রী মেরিনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলে ও চলে গেছে। এখন পলাতক।’ তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘মা-বাবা মিলেই তো বাচ্চা। মা কীভাবে একা বাচ্চাদের বাংলাদেশের বাসিন্দা করে?’
এ অবস্থায় কী করবেন, জানতে চাইলে মিজানুর বলেন, ‘ও (ভাইয়ের বউ) না গেলে থাকবে। ভাই (সরোয়ার) যাবে।’
দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন, এমন প্রশ্নে সরোয়ার আলম জানান দুটি কারণ। এক, বাংলাদেশে কর্মের অভাব। দুই, এখানে আইনের শাসন নেই। যে প্রশাসন আছে তাদের টাকা দিলে কেনা যায়।
দেশ ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে না? সরোয়ারের জবাব, ‘দেশ ছেড়ে কই যাচ্ছি। জন্মগতভাবে আমরা ভারতের বাসিন্দা। যে দেশের মানুষ, সে দেশেই তো যাচ্ছি। কষ্টের মধ্যে এটাই, যে জায়গার মধ্যে নাড়ি পোঁতা, সে জায়গাটা ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমার।’

Tuesday, July 28, 2015

বিএনপিতে যাচ্ছে না বিকল্পধারা ও এলডিপি by সেলিম জাহিদ

সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) বিএনপিতে একীভূত হওয়ার গুঞ্জন নাকচ করে দিয়েছেন দলটি দুটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের দুজন উপদেষ্টা ও দুজন যুগ্ম মহাসচিবসহ ছয়জন নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, এলডিপি ও বিকল্পধারার বিএনপিতে একীভূত হওয়ার বিষয়ে তাঁরাও কিছু জানেন না।
এসব নেতা বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের আন্দোলনের প্রতি জোটের বাইরে আরও কিছু দলের নৈতিক সমর্থন আছে। কিন্তু নানা মতপার্থক্যের কারণে জোটে সরাসরি যুক্ত হতে চাচ্ছে না। এমন কয়েকটি দলের সঙ্গে আন্দোলন-নির্বাচন, প্রয়োজনবোধে ভবিষ্যতে সরকার গঠন নিয়েও একটি বোঝাপড়ায় আসার আগ্রহ আছে বিএনপির। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক মঞ্চ বা ফ্রন্ট গড়াই দলটির মূল লক্ষ্য।
এদিকে বি চৌধুরী, অলি আহমদসহ পুরোনো নেতারা বিএনপিতে ফিরছেন, ঈদের আগে-পরে এমন কিছু খবর বের হওয়ায় দলের নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। দলের একটা অংশ মনে করছে, এতে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে চাঙা হবে। আবার এ নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশের মধ্যে খটকা আছে। এর কারণ হিসেবে এ অংশের একাধিক নেতা বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া জেলে গেলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ অবস্থায় দলের পুরোনো নেতাদের কারও যোগদানের নেপথ্যে সরকারের ওই পরিকল্পনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে খটকা আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বি চৌধুরী ও অলি আহমদ বিএনপিতে ছিলেন। তাঁরা দলে ফিরলে আমরা স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। কিন্তু এর পেছনে যদি কোনো ষড়যন্ত্র থাকে, তা হবে দুঃখজনক।’
তবে দলীয় অপর একটি সূত্র জানায়, বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীদের একটি অংশ চায় দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ফিরে আসুক। এঁদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসনকে বলেছিলাম, বিএনপির সব দরজা-জানালা খুলে দিতে। তিনি তা করেছেন। তারই অংশ হিসেবে বি চৌধুরী, অলি আহমদসহ আরও অনেককে বিএনপিতে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, তাঁকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত তিনি বি চৌধুরী বা অলি আহমদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেননি।
বি চৌধুরী ও অলি আহমদ দুজনেই বর্তমানে ব্যাংককে আছেন। সপরিবারে বেড়াতে যাওয়া বি চৌধুরী ৩১ জুলাই দেশে ফিরবেন। আর অলি আহমদ ফিরবেন ২ আগস্ট।
গতকাল মুঠোফোনে অলি আহমদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, এলডিপি বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার খবর ঠিক নয়। বিএনপিও এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দেয়নি। এ বিষয়ে কারও সঙ্গে আলোচনাও হয়নি।
এ বিষয়ে বি চৌধুরীর বক্তব্যও নেতিবাচক বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রেস সচিব জাহাঙ্গীর আলম। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, স্যার বলে গেছেন, সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে বলবে, বিএনপিতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তবে এলডিপির দায়িত্বশীল দুটি সূত্র জানায়, বিএনপি চাইলে দলটিতে একীভূত হওয়ার বিষয়ে এলডিপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বিবেচনা করবে। রমজান মাসে দলের ইফতার অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়াকে দাওয়াত দিতে গিয়ে এলডিপির দুজন নেতা বিএনপিতে একীভূত হওয়ার আগ্রহের কথা জানান। এ কথা শুনে খালেদা জিয়া স্মিত হাসেন, কিন্তু কিছু বলেননি।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র জানায়, এলডিপির ব্যাপারে বিএনপির চেয়ারপারসনের একটা আন্তরিক মনোভাব আছে। সূত্রটি আরও জানায়, ২০-দলীয় জোটের ভেতরে বা বাইরের সমমনা ছোট-বড় কোনো নেতাকে এখনই দলে ভেড়াতে চাইছে না বিএনপি। দলটি চায়, ২০-দলের শরিক হয়ে অথবা এই জোটের বাইরে থেকে এসব নেতা জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় ও সোচ্চার হোক। কারণ, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, বিকল্পধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা বিএনপিতে যোগ না দিয়ে বাইরে থাকাই ভালো। জোটের বাইরে এসব নেতার নিজস্ব অবস্থান ও বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব আছে।
এর আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা) ছেড়ে নতুন দল গড়ার আগে কাজী জাফর আহমদ জাপার একাংশ নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন বলে গুঞ্জন উঠেছিল। কাজী জাফর আহমদ গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বি চৌধুরী ও অলি আহমদের বিএনপিতে যোগদানের সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি। তা নির্ভর করছে বিএনপির প্রধানের ইচ্ছা বা নীতিকৌশলের ওপর।’ তিনি বলেন, জোটের কোনো শরিক দল বিএনপিতে যোগদান করুক, এটা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব চাইলে তাঁরাও সর্বোচ্চ বিবেচনা করবেন।
অবশ্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, এলডিপি, বিকল্পধারাকে বিএনপিতে একীভূত করার বিষয়ে কোনো কিছু তাঁর জানা নেই। তবে এক-এগারোর প্রক্রিয়ায় পড়ে যেসব নেতা বিএনপি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছেন বা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন, তাঁদের ফেরাতে দলের ভেতরে বিচ্ছিন্ন একটি উদ্যোগ আছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের বাইরে গণতন্ত্রমনা অন্যান্য দলের সঙ্গে সমন্বয় ও রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার চেষ্টা আছে।

Thursday, June 25, 2015

আগাম নির্বাচনের অঙ্ক কষছে সরকার? by সেলিম জাহিদ

আগাম নির্বাচনের কথা নাকচ করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মন্ত্রীরা মাঠে বক্তব্য দিলেও ভেতরে ভেতরে সরকার একটি আগাম নির্বাচনের অঙ্ক কষছে বলে জানা গেছে।
সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, আগামী বছরের শেষের দিকে অথবা ২০১৭ সালের শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এ রাজনৈতিক অঙ্ক কষা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ছোট ছোট কিছু রাজনৈতিক দলকে দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তোলানোর চিন্তা রয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কিছু যোগাযোগও হয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, তাঁরাও আগামী দেড় বছরের মধ্যে একটা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছেন। তার আগে বিএনপিতে ভাঙন ধরানোসহ বড় ধরনের ঝড়ের আশঙ্কাও করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নেতাদের ফোনালাপ ফাঁস, দল ভাঙার তৎপরতা নতুন করে জোরদার এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিভিন্ন মামলার দ্রুতগতি সে ঝড়েরই আলামত হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতারা।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা ও দলটির কয়েকজন চিন্তকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও এসব কথা এসেছে। এ মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দেওয়া হয়েছে।
সরকারের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গত বছরের ৫ জানুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার দেশে-বিদেশে সমালোচনার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ১৫৩ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় এ সরকার নৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থার মধ্যে আছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তা করা হচ্ছে। এতে বিএনপির একাংশসহ অন্য দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রভাবশালী একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য আগামী বছরের শেষের দিককে সুবিধাজনক সময় মনে করা হচ্ছে। কারণ, তাঁরা আশা করছেন, চলতি বছরের মধ্যে অন্তত দুটি মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজা হয়ে যাবে। তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হয়ে পড়লে বিএনপি আরও চাপে পড়বে। ওই অবস্থায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হবেন না। তখন দলটির একটি অংশকে নির্বাচনে আনা সহজ হবে। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কিছু তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে এ চিন্তা ও পরিকল্পনার কথা কৌশলগত কারণে এখনই প্রকাশ করতে রাজি নন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
যদিও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মধ্যবর্তী বা আগাম জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে তাঁদের সরকার বা দলের কোনো ভাবনা নেই। এ বিষয়ে দলে ও সরকারের কোনো ফোরামে আলোচনা হয়নি।
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছেন। তিনি এ-ও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে সরকার আরও কিছু সময় কাটাতে চাইবে। কিন্তু আমরা মনে করি, সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।’
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, সরকার আগামী বছরের শেষ দিকে বা ২০১৭ সালের শুরুর দিকে নির্বাচন দেওয়ার চিন্তা করছে বলে তাঁরা খবর পাচ্ছেন। তার আগে সরকার বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাজা দিয়ে তাঁদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং দলকে ভাঙার চেষ্টা করবে। বিএনপির চেয়ারপারসনের কাছে পাঠানো মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
বিএনপির মূল্যায়নে বলা হয়, আগাম নির্বাচন দেওয়ার আগে সরকার বিএনপিকে চারটি ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা করবে। এক. যাঁরা মামলার কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হবেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো চাইবেন না বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক। দুই. অন্যরা চাইবেন নির্বাচনে অংশ নিতে। তিন. আরেকটি উপদল করার চেষ্টা চলবে, যাঁরা চাইবেন জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দেওয়া হোক। চার. বিএনপিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে যাঁদের মূলধারা থেকে দূরে রাখা হয়েছে, তাঁদের নিয়ে আরেকটি উপদল করা হতে পারে। এঁদের সঙ্গে আবার এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও নাজমুল হুদার সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা হবে।
বিএনপির এই মূল্যায়নের সঙ্গে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল একটি বড় দলের মহাসচিবের বক্তব্যের বেশ মিল পাওয়া যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা সম্পর্কে আলাপকালে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বিএনপিকে ভাঙার আগে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো সুযোগ দেখি না।’
এ বিষয়ে বিএনপি-সমর্থিত নাগরিক সংগঠন শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের প্রধান নেতাদের জেলে পাঠিয়ে, তারপর ফাঁকা মাঠে নির্বাচনের কথা যদি কেউ চিন্তা করে, তবে তা ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মতোই গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। তিনি বলেন, অগ্রহণযোগ্য নীতি নিয়ে কেউ টেকেনি। কাউকে ফাঁসিয়ে নির্বাচন করার প্রক্রিয়া শুভ হবে না।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগেও বিএনপিকে ভেঙে দলটির একাংশকে নির্বাচনে আনার নানা চেষ্টা করেছিল সরকার। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি। তবে এখন সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তাঁরা আঁচ করতে পারছেন যে দল ভাঙার পুরোনো তৎপরতা আবার শুরু হয়েছে।
এ অবস্থায় দলছুট বা সংস্কারপন্থীদের নিয়ে সরকার যাতে নতুন করে কিছু করতে না পারে, সে জন্য তাঁদের দলে ফেরানোর চিন্তা করছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছেন—এমন একজন নেতার দাবি, সংস্কারপন্থীরাও দলে ফিরতে আগ্রহী। এ ব্যাপারে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মনোভাবও ইতিবাচক। কারণ, দলে ফিরতে ইতিমধ্যে একাধিক নেতা অতীতে ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে লিখিত আবেদনও করেছেন। কিন্তু সংস্কারপন্থী নেতাদের নির্বাচনী এলাকার স্থানীয় নেতাদের বাধার কারণে তাঁদের দলে ফেরার কার্যক্রম এগোয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলনে আমরা জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছি। আদর্শিক বিরোধ থাকার পরও অনেকের সঙ্গে জোট করেছি। ভুলভ্রান্তির কারণে যাঁরা দল থেকে বিচ্যুত, এখন তাঁদের ফেরানোর বিষয়টি দলের ভাবা উচিত, যদি তাঁরা ভুলের জন্য অনুতপ্ত হন।’
সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র বলছে, সরকারের ছক অনুযায়ী বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীসহ ২০-দলীয় জোটের অন্য শরিকদেরও পরবর্তী নির্বাচনে নিতে সরকারের চেষ্টা থাকবে। এরই মধ্যে এই জোটের শরিক ছোট ছোট একাধিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে প্রভাবশালী একটি সংস্থার কর্মকর্তারা আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া কয়েক মাস আগে বিএনপির সাবেক দুই সাংসদ আবু হেনা ও শহীদুল হক জামালকে দিয়ে বিএনপিকে ভেঙে ‘নতুন বিএনপি’ গড়ার লক্ষ্যে কিছু তৎপরতা শুরু হয়। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সেটা এখনো অব্যাহত আছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, চতুরতার মাধ্যমে মধ্যবর্তী একটা নির্বাচন দিলে তাতে বিদ্যমান সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে না। দল ভাঙা, দমন-পীড়ন বা কর্তৃত্ববাদিতা কোনো সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পথ বের করতে হবে।

Sunday, May 31, 2015

‘এই বিএনপি দিয়ে হবে না’ by সেলিম জাহিদ ও রিয়াদুল করিম

‘শোনাে বলি, এই বিএনপি দিয়ে হবে না। এটুকু জেনে রাখো।...জিয়াউর রহমানের বিএনপি যদি করতে পারো...।’ এটি সম্প্রতি ইউটিউবে ফাঁস হওয়া বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতার ফোনালাপের অংশবিশেষ।
দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থক ও হিতাকাঙ্ক্ষীরা বলছেন, ১৬ শব্দের এই তিনটি বাক্যে কার্যত ৩৭ বছরের বিএনপির ভেতরকার হালচিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তিন মাস পর আগামী ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছর পূর্ণ হবে দলটির। আর কাল ৩০ মে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার কিছুদিন আগে একান্ত আলাপে ‘এই বিএনপি দিয়ে হবে না’ বলে মন্তব্য করলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মওদুদ আহমদ।
দলটির নেতা-কর্মীরা মনে করেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর তিন যুগের মাথায় এসে দলটি এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে। বিশেষ করে গত জানুয়ারি থেকে টানা চার মাসের আন্দোলন এবং তিন সিটি নির্বাচনে প্রায় খালি হাতেই ঘরে ফিরেছে বিএনপি। এর মধ্যে দীর্ঘ সময়ের আন্দোলনের ক্লান্তির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলা-মামলা, খুন, গুম-আতঙ্ক নেতা-কর্মীদের ছন্নছাড়া করে দিয়েছে। এমন নাজুক অবস্থা থেকে বিএনপি শিগগির সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে কি না, রাজনৈতিক মহলে সে প্রশ্ন আছে। এ নিয়ে সংশয়-সন্দেহ আছে বিএনপির ভেতরেও।
কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী (আবেদ) মুঠোফোনে আন্দোলনোত্তর বিএনপির নীতি-কৌশল নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে মওদুদ ওই মন্তব্য করেন। ফোনালাপটি হয় ৪ মে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশার বিএনপি আর বর্তমান বিএনপির মধ্যে অনেকগুলো বিষয়ে ঘাটতি আছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান তরুণ ও যুবকদের ফ্রন্ট লাইনে রেখে দূরদর্শিতার সঙ্গে দলকে সংগঠিত করেছেন। কিন্তু বর্তমানে তরুণদের সংগঠিত করা সম্ভব হয়নি। ছাত্র ও শ্রমিক সমাজ যেন দল থেকে আলগা হয়ে গেছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, দলের নীতি-কৌশলের ‘ভুল-শুদ্ধ’ নিয়ে নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা অন্য কোনো স্তরে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ কমে যাওয়ায় নেতারা ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া আলাপে এ ধরনের কথা বলছেন। ওই সূত্রগুলো বলছে, টানা তিন মাসের অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি, এরপর সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ, এর কোনোটিই দলীয় ফোরামে আলোচনার ভিত্তিতে হয়নি। আবার চার মাসের আন্দোলন-নির্বাচনে নিষ্ফল ঘরে ফেরার পর এক মাস পার হলো। এখন পর্যন্ত দলের স্থায়ী কমিটি বা অন্য কোনো পর্যায়ের সভা হয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন ও নির্বাচনে দলের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা তো অনেক দূরের কথা।
এদিকে গতকাল ঢাকায় বিএনপির এক আলোচনা সভায় জিয়াউর রহমানের কাজ, নীতি ও জীবনাদর্শ থেকে বিএনপির বিস্মৃত হওয়ার অনুযোগ করেন জিয়ার রাজনৈতিক সহকর্মী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ‘বিএনপির আত্ম-অনুসন্ধান প্রয়োজন’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান। গত রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের ব্যক্তি চরিত্র, তাঁর আদর্শ, চেতনা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতা আমরা ঠিক ওভাবে অনুসরণ করতে পারিনি। তাঁর চিন্তা-চেতনা থেকে আমরা দূরে সরে গেছি, এটা তো ঠিক। আন্দোলনে বিফলতাও এর জন্য দায়ী।’
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর এই বক্তব্যকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের আলোচনা আগে থেকেই হওয়া উচিত ছিল। কারণ, সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দলকে আরও বেশি গণতান্ত্রিক হতে হয়। না হলে জনগণ তার দিকে ভিড়বে না। এখন বিএনপির গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। তাদের মাথায় যদি আগের পরিবারতান্ত্রিক চিন্তা ও দুর্নীতি থাকে এবং তারা যদি ভাবে যে নেতিবাচক ভোটে তারা জিতে যাবে, তাহলে জনগণ তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না।
এখন দলের ভেতরে আত্মসমালোচনা শুরু হওয়ায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দল পুনর্গঠনের কথা বলছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের চিন্তা মাথায় রেখে তার আগে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ‘ইচ্ছানুযায়ী’ কমিটি গঠনের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু নানামুখী হস্তক্ষেপে অতীতের মতো এবারের উদ্যোগও এগোবে না বলে মনে করছে নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ। দলটির তিনজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ আসলে কথার কথা। অন্য দুজন বলেছেন, দলে শুদ্ধি অভিযান চালানো গেলে পরিস্থিতি ঘুরে যাবে। তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত যে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নীতি-আদর্শ থেকে বিএনপি সরে গেছে। এ কারণেই দলের এই বিপর্যয়, নেতাদের এত বিপদ। এর সঙ্গে আন্দোলনে বিএনপির নীতি-কৌশলেও ‘ভুল’ ছিল।
জানতে চাইলে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে বিএনপি কিছুটা বিপর্যয়ের মুখে আছে’ বলে স্বীকার করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তবে তিনি বলেন, এটা সাময়িক। ছয় দফার আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগেরও এমন অবস্থা ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল। কিন্তু এখন দেশে-বিদেশের অনেকে মনে করে, বিএনপি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল। প্রতিষ্ঠাকালে দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সব মতের সম্মিলন ঘটানো, সে অবস্থান এখন একেবারেই দুর্বল। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জোট এর জন্য দায়ী। নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলনে থাকায় আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে বিএনপির আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচারে সুবিধা পেয়ে আসছে। এর পাশাপাশি বিএনপি আমলে জঙ্গিবাদের উত্থান, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, পরে প্রকাশ্যে হেফাজতে ইসলামকে সমর্থন দেওয়া—এ বিষয়গুলো বিএনপির রাজনীতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে বিএনপি অবস্থান স্পষ্ট করেনি। অথচ এ দলের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশও মুক্তিযোদ্ধা।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠাকালে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল বিএনপির ভিত্তি। এখন দল সেগুলোও যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। নেতা-কর্মীদের অনেকে ১৯ দফা সম্পূর্ণভাবে জানেনও না। আবার যুগের সঙ্গে মিলিয়ে জনগণের সামনে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিও উপস্থাপন করতে পারছে না দল।
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে যে বিচ্যুতি হয়নি, তা বলব না। তবে বিএনপি জিয়ার আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ওনার সময়ে নেতাদের ত্যাগ, দেশপ্রেম, সততা যে পর্যায়ে ছিল, এখন তাতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কমিটমেন্টের জায়গায় দুর্বলতা আছে।’ এর জন্য তিনি সমাজব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘বৈষয়িক’ পরিবর্তনকে দায়ী করেন।
ব্যক্তি জিয়াউর রহমানের একটি ঘটনা উদ্ধৃত করে এক নেতা বলেন, তাঁর কাছে চাটুকারিতা খুব একটা জায়গা পেত না। একদিন একটি অনুষ্ঠান শেষে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়ার হাতে কফি তুলে দিতে গিয়েছিলেন। জিয়া তা না নিয়ে ওই কর্মকর্তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, ‘ওয়েটার্স আর দিয়ার, ইটস নট ইউর জব’। ওই নেতা বলেন, জিয়াউর রহমান যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মিলনের চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন দলে সে অবস্থা নেই। এখন চাটুকারেরাই খালেদা জিয়াকে ঘিরে রেখেছেন। এ জন্য খালেদা জিয়াকেই দায়ী করেন আরেক নেতা। তাঁর মতে, খালেদা জিয়া সুযোগ দিচ্ছেন বলেই এমনটি হচ্ছে। এখন বেশির ভাগ প্রবীণ নেতা নিজে থেকে খালেদা জিয়ার কাছে যেতে চান না।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একটি অংশ মনে করে, কয়েক বছর ধরে বিএনপির মূল দাবি হচ্ছে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। অর্থাৎ বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, তা প্রমাণ করা গেছে।
এ মুহূর্তে দলটির ৮০ শতাংশ ভোট আছে বলে বিএনপি দাবি করলেও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওই অংশটি মনে করে, ভোট থাকা, ভোটে জেতা আর রাজনীতি এক কথা নয়। তাই বিএনপিকে ক্ষমতায় নিতে মানুষ রাস্তায় নামছে না। কারণ, এতে জনগণের কী লাভ? মানুষ মনে করে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হবে না। বিএনপি কতটুকু গণতন্ত্র ও আইনের শাসন দেবে, কীভাবে দেবে, এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে পারছে না।
এ ছাড়াও শুরুতে বিএনপির নীতি ছিল বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধিতা নয়। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু পরে দেখা গেছে, বিএনপির রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত বিরোধিতা। এ অবস্থানের জন্য দলকে মূল্য দিতে হচ্ছে। যদিও এখন দলের ভারত বিরোধিতা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও সেসব জায়গা থেকে কার্যত এখন পর্যন্ত আশানুরূপ কিছু পায়নি বিএনপি।
নীতিগত এসব বিষয়ের পাশাপাশি আছে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও আস্থার সংকট। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব প্রকট। এমনকি দলের স্থায়ী কমিটির সভায় মোবাইল ফোন নিয়ে যেতে বারণ করা হয়েছিল। এতে অনেকে ক্ষুব্ধ হন। সম্প্রতি ২০-দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একটি সভায় খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সভাকক্ষে জুতা খুলে ঢুকতে বলা হয়। এতে অনেকে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন বলে একটি শরিক দলের প্রধান প্রথম আলোকে জানান।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, দলের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থায়ী কমিটির কোনো ভূমিকা থাকে না। চেয়ারপারসন নিজে অথবা ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেন। এসব সিদ্ধান্ত জানা যায় গণমাধ্যমের বদৌলতে। বিএনপির তরুণদের মধ্যে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি বড় অংশ তাঁকে মন থেকে মানতে পারে না। কেউ কেউ মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনের যে কৌশল ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা তারেক রহমানের ইচ্ছার প্রতিফলন। ফলে জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে দায়িত্ববোধ উপলব্ধি করেন না।

Saturday, May 23, 2015

শিলংয়ে সালাহ উদ্দিনের বিষয়ে বিএনপি চুপ কেন by সেলিম জাহিদ

দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে পাওয়া গেছে ১০ দিন আগে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো ‘চুপ’ রয়েছে বিএনপি। এতে বিভিন্ন মহলে কৌতূহল ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
১২ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে সালাহ উদ্দিন আহমদের খোঁজ পাওয়া যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ বিষয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন বা বিবৃতি দিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দলীয়ভাবে কোনো কূটনৈতিক তৎপরতাও নেই। যদিও গত ১০ মার্চ রাতে সালাহ উদ্দিন আহমদ নিখোঁজ হওয়ার পরদিন বিএনপি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, পুলিশ-ডিবি-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২০-৩০ জনের একটি দল সালাহ উদ্দিনকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। একই দাবি করে আসছিল তাঁর পরিবারও।
‘সালাহ উদ্দিনের কিছু হলে পরিণতি ভালো হবে না’ বলে হুঁশিয়ারিও জানিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সন্ধান পাওয়ার ঠিক দুই দিন আগে এক সভায় খালেদা জিয়া বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমদ র্যাবের কাছে আছে। অবিলম্বে তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। না হয় যেখান থেকে তুলে নিয়েছেন, সেখানেই রেখে আসুন।’
সালাহ উদ্দিনের খোঁজ পাওয়ার এক দিন পর ১২ মে গুলশানের কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সঙ্গে মতবিনিময় করেন খালেদা জিয়া। সেদিনও সালাহ উদ্দিনের বিষয়ে খালেদা জিয়া কোনো কথা বলেননি। এরপর দলের কারাবন্দী অসুস্থ নেতাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন। তাতেও সালাহ উদ্দিনের বিষয়টি ছিল না। এমনকি ১২ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত নানা বিষয়ে পাঁচ দিন সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। তাতেও সালাহ উদ্দিনের প্রসঙ্গ ছিল না।
সর্বশেষ ১৪ মের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা জানতে চান, সালাহ উদ্দিনের ব্যাপারে বিএনপি চুপ কেন? জবাবে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, সালাহ উদ্দিনের প্রকৃত অবস্থা জানা দরকার। তাঁর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত মেঘালয়ে যাবেন। তখন তাঁর প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে। এরপর বিএনপি বক্তব্য দেবে।
এ বিষয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, দলের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েই এ বিষয়ে চুপ রয়েছে বিএনপি। বিষয়টিকে তাঁরা রাজনৈতিক ঘুঁটি চালাচালির কৌশল হিসেবে না নিয়ে একান্তই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। এ ক্ষেত্রে সালাহ উদ্দিনের পরিবারের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিচ্ছে দল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সালাহ উদ্দিনের বিষয়টি দেখভাল করার জন্য অপ্রকাশ্যে বিএনপির পররাষ্ট্র শাখার দুজন নেতা কাজ করছেন। তাঁরা বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপি দলীয়ভাবে কোনো প্রতিনিধিদল বা নেতাকে পাঠায়নি। দলের কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ ব্যক্তিগতভাবে শিলং গেছেন। তিনি এখনো সেখানে আছেন।
বিএনপির এই চুপ থাকার কারণ জানতে চাইলে দলের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমদ বিএনপির নেতা। এর বাইরে তিনি কারও স্বামী, কারও পিতা। আমরা এখন তাঁর ওই সম্পর্ককেই বড় করে দেখছি। কারণ, দলের জন্য পরিবারের ক্ষতি হোক চাই না।’
বিএনপির সূত্র জানায়, সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমদ মেঘালয় যাওয়ার আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। তখন তিনি সালাহ উদ্দিনের বিষয়ে এখনই দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য না দিতে অনুরোধ জানান। এতে স্বামীর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এরপর খালেদা জিয়া দলের নেতাদের এ বিষয়ে আপাতত ‘চুপ’ থাকার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, সালাহ উদ্দিন আহমদের পরিবার চাচ্ছেন এ বিষয়ে দল কথা না বলুক। দলের চেয়ারপারসনও মনে করছেন, পরিবারের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

Wednesday, May 20, 2015

২০০ কোটি টাকার ঋণ ফেরত নিচ্ছে জাইকা by সেলিম জাহিদ

রাষ্ট্রায়ত্ত বিটিসিএলের ২০০ কোটি টাকার নিরবচ্ছিন্ন অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প (লট-বি) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল জাপানের উন্নয়ন সহযোগী-সংস্থা জাইকা। শুধু তা-ই নয়, এর থেকে শিক্ষা নিতেও বলেছে সংস্থাটি।
৭ মে অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সিনিয়র সচিবকে এক চিঠিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রধান মিকিও হাতাইদা জানান, বারবার অনুরোধের পরও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) লট-বি বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জাপান সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্পে ঋণের টাকা ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
চিঠিতে ক্ষুব্ধ জাইকা ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, তার জন্য এই সিদ্ধান্ত থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও বিটিসিএলকে শিক্ষা নিতে’ বলেছে। আগামী ২ জুন ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
ইআরডি ও বিটিসিএল সূত্র জানায়, সরকার-স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তি এবং জাইকার নির্দেশনা ভঙ্গ করে বিভিন্ন অনিয়ম থেকে সৃষ্ট দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে জাইকা বিটিসিএলকে নিয়ম মেনে চলতে গত পাঁচ মাস ধরে তাগিদ দিয়ে আসছিল। এরপরও যোগ্য ও সর্বনিম্ন প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দিয়ে তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বানের চেষ্টায় জাইকা গত ১৮ জানুয়ারি বিটিসিএল, ২২ জানুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি ইআরডির সচিবকে চিঠি দেয়। তাতেও বিহিত না হওয়ায় ঋণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিল জাইকা।
এই চিঠির অনুলিপি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিবকেও দেওয়া হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এই বিভাগের সচিব ফাইজুর রহমান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিঠিটি দেখে বলতে হবে।’ তাহলে কি চিঠি পাননি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চিঠি পাইনি, তা বলছি না। জাইকার চিঠি আগেও পেয়েছি, আজকেও (গতকাল রোববার) তিনটা চিঠি পেয়েছি। আপনি যে বিষয়ে বলছেন, তা দেখে বলতে হবে।’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে গত শনিবার সন্ধ্যায় বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহফুজ উদ্দিন আহমদকে তাঁর মুঠোফোনে ফোন করলে তিনি ধরেননি। এরপর নাম-পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।
এরপর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য পেতে রাত আটটায় বিটিসিএলের পরিচালক (জনসংযোগ) মীর মোহাম্মদ মোরশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রতিবেদক। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে রোববার সাক্ষাতের সময় দেন। ১৫ মিনিট পর জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রতিবেদককে ফোন করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে সাক্ষাতের বিষয় ‘কী’ জানতে চান। প্রতিবেদক জাইকার ঋণ ফেরত নেওয়ার চিঠির বিষয় সম্পর্কে জানালে রোববার বিকেলে সাক্ষাতের সময় দেন। গত রোববার বেলা আড়াইটায় ফোন করলে জনসংযোগ কর্মকর্তা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
সমস্যার শুরু: দেশের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক প্রবেশ পথগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পটি (লট-বি) নেওয়া হয়েছিল, যাতে এক বা একাধিক কেব্ল কাটা গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকল্প পথে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ৩০ বছরে পরিশোধযোগ্য অতি সহজ ঋণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি করে দিতে সাহায্য দিয়েছিল জাইকা।
২০১১ সালের মাঝামাঝি লট-বি প্রকল্পের প্রাক্যোগ্যতার দরপত্র হয়। পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে উচ্চ মূল্যে কাজ দেওয়ার চেষ্টায় দরপত্রে নেটাস নামে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্যোগ্যতা যাচায়ের পর্যায়েই বাদ দেয় বিটিসিএল। আর এর থেকেই সমস্যার শুরু।
নথিপত্র পর্যালোচনা ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাক্যোগ্যতায় নেটাসকে বাদ দেওয়ার পর রিভিউ প্যানেলের রায়, এই নিয়ে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট হয়ে পুনঃ দরপত্র আহ্বানে সময় গেছে তিন বছর। এরপর নেটাসকে কারিগরিভাবে অযোগ্য করার চেষ্টায় ছয় মাস, তারপর প্রাক্কলিত ব্যয়ের থেকে সর্বনিম্ন দর বেশি দেখিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দেওয়ার চেষ্টায় কেটেছে আরও পাঁচ মাস।
অনিয়মের যাত্রা: বিটিসিএল প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ঠিক করেছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার বা ১১১ কোটি টাকা। নেটাসকে প্রাক্যোগ্যতায় বাদ দিয়েই তড়িঘড়ি প্রকল্পের ব্যয় ১ কোটি ১১ লাখ ৭ হাজার ডলার বাড়িয়ে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার (২০০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা) করে বিটিসিএল। এরপর জাপানের এনইসি ও কোরিয়ান কেটির মধ্যে দরপত্র ডাকে বিটিসিএল।
এদিকে, প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দেয় যে, নেটাসকে বাদ দেওয়া এবং আকস্মিক প্রাক্কলন বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের শত কোটি টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে। এতে প্রকল্প পরিচালকসহ বিটিসিএলের কিছু কর্মকর্তা, বিদেশি পরামর্শক ও দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার আর্থিক সুবিধার সংশ্লিষ্টতা পায় সংস্থাটি। প্রমাণ হিসেবে কথোপকথনের রেকর্ডও প্রতিবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া হয়।
প্রাক্যোগ্যতায় বাদ পড়ায় নেটাস সরকার-গঠিত রিভিউ প্যানেলের কাছে এর প্রতিকার চায়। বিচারে রিভিউ প্যানেল নেটাসকে প্রাক্যোগ্য ঘোষণা করে আদেশ দেয়। তথ্য পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তদন্ত শুরু করে।
সূত্র জানায়, দুদকের তদন্ত এড়াতে বিটিসিএল রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট ও পরে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। বিচারাধীন বিষয় বলে দুদকের তদন্তও থেমে যায়। বিচারে হাইকোর্ট রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্ত সঠিক বলে রায় দেন। পরে সুপ্রিম কোর্টও আপিল খারিজ করে দিয়ে নেটাসকে প্রাক্যোগ্য ঘোষণা করে পুনঃ দরপত্রের নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশে নেটাস, এনইসি ও কেটিকে প্রাক্যোগ্য করে পুনঃ দরপত্র হলে মূল্যায়ন কমিটি নেটাসকে কারিগরিভাবে যোগ্য ঘোষণা করে। এরপরেও বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতামত চান প্রকল্পের জাপানি পরামর্শক কাওয়াবাতার। পরামর্শক নেটাসকে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ করেন। কিন্তু বিটিসিএলের পাঠানো প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে জাইকা প্রশ্ন তুললে নেটাসকে কারিগরিভাবে যোগ্য বলে স্বীকৃতিপত্র দেওয়া হয়।
এরপর দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হলে দেখা যায়, নেটাস সর্বনিম্ন দরদাতা। এই পর্যায়ে কারিগরি উপকমিটি নেটাসকে সফল দরদাতা বলে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবারও পরিচালনা পর্ষদকে এড়িয়ে জাপানি পরামর্শকের মতামত চান। তবে যে পরামর্শক কারিগরি উপকমিটির সদস্য হিসেবে ইতিপূর্বে নেটাসকে সফল দরদাতা ঘোষণা দিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন, তিনি এবার নেটাসকে অযোগ্য বলে পুনঃ দরপত্রের সুপারিশ করেন। বিটিসিএল ওই সুপারিশ আগের মতো জাইকায় পাঠায়। কিন্তু জাইকা এ বিষয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর অনাপত্তিপত্র দেয়।
এরপরেও বিটিসিএলের গত ২২ ডিসেম্বরের পরিচালনা পর্ষদের ১০৮তম সভায় জাইকার অনাপত্তিপত্রের তথ্য গোপন করা হয়। ওই সভায় উল্টো জাইকার কাছে পুনঃ দরপত্র এবং ঋণচুক্তির মেয়াদ বাড়াতে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পাঁচ মাস পরে ঋণ ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাইকা।