Wednesday, January 14, 2026

চীন কেন ইরান, ভেনেজুয়েলার পাশে নেই by আলতাফ পারভেজ

ভেনেজুয়েলা ও ইরান মডেল স্পষ্ট দেখাচ্ছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সরকারকে খোলামেলা আগ্রাসনের মাধ্যমে সরাতে চাইছে। এরপরও চীন কেন ভূরাজনৈতিক ‘বন্ধু’দের পাশে নেই, তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলব’ (পরম সমাধানের খোঁজে অভিযান) এর পর মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরান। এই উভয় দেশ থেকে চীন প্রচুর জ্বালানি তেল কেনে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সম্ভাব্য পুতুল সরকার বসিয়ে ট্রাম্প চীনকেও জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সংকটে ফেলতে চাইছেন। বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য চীনকে অর্থনৈতিকভাবে কাবু করা। এবার সেটা নতুন চেহারা নিচ্ছে—তার অর্থনৈতিক সহযোগীদের কাবু করে। ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোর বিপদের মুখে গণচীন এখন কী করবে? সি চিন পিং কি পারবেন ট্রাম্পকে থামাতে? কীভাবে সেটা? আদৌ কি চীন এ রকম ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক?

বেছে বেছে চীনের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসন যে মূলত দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য, সেটা এখন প্রায় সবাই বলছেন। ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ও ভোক্তা চীন। ২০২৪–এর ডিসেম্বর নাগাদ চীনের দৈনিক জ্বালানি তেলের ক্ষুধা ছিল প্রায় ১৬ মিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্ব তেলের বাজারে চাহিদার উত্থান মূলত চীনের মাধ্যমে। ২০১৩ থেকে ২০২৩–এ বিশ্ব তেল বাজারের চাহিদা বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ কারণ ছিল চীন।

কিন্তু দেশটি জ্বালানির বিকল্প উপায় খুঁজে পেতে শুরু করায় অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়াতেও খনিজ তেল নির্ভরতা কমাচ্ছিল চীন। পণ্য তৈরির বদলে সেবা খাতের প্রসার ঘটায়ও জ্বালানি চাহিদায় রকমফের ঘটছে তাদের।

তবে এখনো চীন খনিজ তেলের প্রধান বিশ্বভোক্তা। নিজস্ব চাহিদার ৫০-৬০ শতাংশ খনিজ তেল তারা আমদানি করে। বাকিটা উত্তোলন করে। তেল মজুতে তারা বিশ্বে ১৪তম হয়েও ভোক্তা হিসেবে দ্বিতীয়। ফলে এই খাতে এখনো তারা বড় আমদানিকারক। ভেনেজুয়েলা থেকে চাহিদার কিছু পরিমাণ খনিজ তেল কিনত চীন।

বেইজিংয়ের জন্য ভেনেজুয়েলা তেলের বড় উৎস না হলেও দরকারি উৎস। কিন্তু ভেনেজুয়েলার দিক থেকে চীন তেলের বড় ক্রেতা। চীন তাদের বড় এক আর্থিক ভরসাও ছিল। তেলের আগাম দাম হিসেবে চীন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে চীনের জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাতের পাশাপাশি ওই ঋণও আটকে গেল।

যদিও বিশ্বে খনিজ তেলের বড় এক ভান্ডার ভেনেজুয়েলা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে তারা বেশি তেল উত্তোলন ও বিক্রি করতে পারত না। যে কারণে তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা চলছিল। চীন ঋণের বিনিময়ে তাদের তেল নিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় চীনের ১৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও রয়েছে। সেটাও এখন ঝুঁকিতে। ভেনেজুয়েলা থেকে আনা অপরিশোধিত তেলের বিশেষ খনিজ ধরনের কারণে চীনে অনেক বিশেষায়িত রিফাইনারি গড়ে উঠেছিল। সেগুলোও এখন কারিগরি ও আর্থিক সংকটে পড়ল।

ভেনেজুয়েলার মতো রাশিয়া ও ইরান থেকেও তেল নেয় চীন। ওই দুই দেশের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলছে। ভেনেজুয়েলার মতো ইরান যেসব দেশে তেল বেশি পরিমাণে রপ্তানি করে, সেই তালিকার প্রথমে আছে চীন। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার বড় এক কারণ চীনও। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমস্যা তৈরিও এসব দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ ও যাবতীয় আগ্রাসনের একটা লক্ষ্য। তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি বন্ধুদেশগুলোকে দেওয়া ঋণ আটকে দেওয়া এবং বিশ্বের নানা দিকে চীনের বাণিজ্য ভিত্তিকে নতুন করে মুশকিলে ফেলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে পিছু হটতে হবে চীনকে?

বিগত দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব বাড়ানোর দুটি হাতিয়ার ছিল পণ্যবাণিজ্য ও ঋণবাণিজ্য। গত দুই দশকে চীন দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছিল। এখানকার অধিকাংশ দেশে তার বিপুল বিনিয়োগ আছে। গত বছরই দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সম্মেলন হলো চীনের রাজধানীতে। সেখানে সি চিন পিং নতুন করে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর সূত্রে ব্রাজিল, কিউবা, প্যারাগুয়ে, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় চীনা নাগরিকের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। এই অঞ্চলে ২০০৫ সালে চীন থেকে যে পরিমাণ পণ্যবোঝাই কার্গো গিয়েছিল, ২০২৪ সালে সেটা পাঁচ গুণ বেড়েছে। একই সময় আমদানি বেড়েছে ছয় গুণ।

২০২৪–এ বেইজিং চিলি, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া ও পেরুর সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করেছে। এই অঞ্চলের অন্তত ২০টি দেশ চীনের ‘সিল্করুট উদ্যোগে’ যুক্ত। ২০০৫ থেকে এই দেশগুলোতে চীনের বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ দিয়েছে অন্তত ১২০ বিলিয়ন ডলার। এসব দেখেই যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি আমূল বদলে ফেলেছে বলা যায়।

অতীতে নানা অজুহাতে দক্ষিণ আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্বে ওয়াশিংটন গোপন বা আধা গোপন প্রক্রিয়ায় স্বাধীনভাবে চলতে ইচ্ছুক সরকারগুলোকে উৎখাত করেছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরান মডেল স্পষ্ট দেখাচ্ছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সরকারকে খোলামেলা আগ্রাসনের মাধ্যমে সরাতে চাইছে এখন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা ইতিমধ্যে জানাচ্ছে, পশ্চিম গোলার্ধে তারা চীনের কোনো উপস্থিতি দেখতে চায় না। অর্থাৎ পুরো অঞ্চল তাদের কাছে আত্মসমর্পিত থাকতে হবে। ২০২৫ সালে ঘোষিত তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ও সেই আলোকে তৈরি। অন্যদিকে ইসরায়েলকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যকেও তারা একইভাবে দেখতে চায়। এসব অঞ্চলের যেসব দেশের সরকারকে ‘আমেরিকার স্বার্থের বিরোধী’ মনে হবে, সেখানেই তারা সিআইএ ও ডেল্টা ফোর্সের মতো সংস্থাগুলোকে পাঠিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা একে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো ‘মনরো মতবাদ’–এর একালের নবায়িত রূপ। প্রায় দুই শতাব্দী আগের প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো দক্ষিণ আমেরিকাকে উপনিবেশতুল্য গণ্য করার এ রকম লক্ষ্যের কথা বলতেন। ট্রাম্পের হাত ধরে দেশটির সেই নয়া উপনিবেশবাদী বাসনা এবার পুরোদস্তুর নতুন এক বিশ্বব্যাবস্থার চেহারা নিচ্ছে।

সে রকম লক্ষ্যের অংশ হিসেবেই ভেনেজুয়েলার পর ইরানকে টার্গেট করা হলো। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের কারণে ইরানের শহরাঞ্চলে অনেক দিন ধরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে এবং ইসরায়েলের গত বছরের হামলায় ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। স্থানীয় মুদ্রার মান অনেক পড়ে গেছে। এসব নিয়ে সেখানে জন–অসন্তোষ তীব্র। রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ চলছে এ সপ্তাহে।

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেখানে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহ’র বংশধরদের প্রবাস থেকে এনে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহে দেশটিতে এরই মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার মতোই ইরানের তেল সম্পদের দখল নিতে ইচ্ছুক। এর মানে দাঁড়াবে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল মজুত আছে এমন তিনটি দেশের দুটিকে নিয়ন্ত্রণে পাওয়া। অপর দেশ সৌদি আরবে ওয়াশিংটনের বহুকালের পুরোনো মিত্ররা শাসক হিসেবে রয়েছে। এখন ইরান অধ্যায়ে সফল হলে তেলের বাজার, দাম ও বিপণনকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

চীন এখন কী করবে

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, চীন এখন কী করবে? বিশ্ব দেখছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের গত জুনের হামলায় (অপারেশন মিডনাইট হ্যামার) চীন শক্তভাবে তেহরানের পাশে ছিল না। সিরিয়া-লিবিয়া-ভেনেজুয়েলায় মার্কিনদের গোপন ও প্রকাশ্য কোনো হস্তক্ষেপে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বেইজিং কার্যকর প্রতিরোধ গড়েনি বা গড়তে পারেনি বা চায়ওনি। রাশিয়ার ভূমিকাও তদ্রূপ। তাহলে ট্রাম্পের চলমান আগ্রাসী সামরিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো কি চলতেই থাকবে? আগামী অনিরাপদ বিশ্বে ছোট দেশগুলোর তাহলে সুরক্ষা কী?

আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, চীন কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়ানো এড়িয়ে পুরো মনোযোগ দিতে চাইছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দিকে। তারা মনে করছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনের বিশ্বকে অচিন্তনীয় মাত্রায় পাল্টে দেবে। এতদিনকার গড়া সামরিক ও আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী যেভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থায় রয়েছে, চীন মুখ্যত শান্তিপূর্ণ পথে প্রযুক্তিজ্ঞানের মাধ্যমে তার অবসান ঘটাতে চায়। তারা মনে করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সামরিকভাবে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে তুলবে শিগগির।

গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে চীনের এই অনুমানের সমর্থনে বাস্তব কিছু প্রমাণ মেলে। এই যুদ্ধে ফ্রান্স থেকে সংগৃহীত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের বিপরীতে চীন থেকে পাওয়া পাকিস্তানের স্যাটেলাইট জ্যামিং প্রযুক্তির সফল ব্যবহার পাশ্চাত্যকে চমকে দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় জল-স্থল-আকাশ মিলিয়ে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে অপহরণ করতে পারল, সেটা এখনো তার সামরিক ও গোয়েন্দা সামর্থ্যের বড় সাক্ষ্য। এভাবেই ডেল্টা ফোর্স ইরানের জেনারেল সোলাইমানি এবং আল-কায়েদার প্রধান লাদেনকে হত্যা করেছিল।

ওয়াশিংটনের সামরিক ও গোয়েন্দা যোগ্যতা একই সঙ্গে বিশ্বের অনেক স্থানে অনেক শক্তির বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকায় সক্রিয় থাকতে সক্ষম। তবে এসব অভিযান যতটা একটা দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে, ততটা বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করে না এবং চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান থামাতেও তা সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখছে না। গত বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কযুদ্ধও চীনকে বেশি কাবু করতে পারেনি।

ঠিক এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এখন আরও খোলামেলাভাবে চীনের কৌশলগত জায়গাগুলো ক্ষতবিক্ষত করার নীতি নিয়েছে। কিন্তু চীনের বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র বিগত বছরগুলোতে যত দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানকার সংঘাত থেকে তার পক্ষে সফলতার ইমেজ নিয়ে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি সংঘাতে তাকে প্রতিনিয়ত নিজস্ব ‘এজেন্ট’দের সহায়তা দিয়ে যেতে হচ্ছে। এখন হয়তো ওই সব দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সে রকম ‘সহায়তা’র খরচ তুলবে তারা।

যুদ্ধ বা আগ্রাসন শুরু করা সহজ হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসা যে দুরূহ হয়ে পড়তে পারে, তার নজির হিসেবে রাশিয়ার চার বছর পুরোনো ইউক্রেন অভিযানের কথাও বলা যায়। চীন হয়তো এসব অভিজ্ঞতার সারসংকলন হিসেবে সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে চরম রক্ষণশীল। কিন্তু চীনের নীতি স্বাধীনভাবে চলতে ইচ্ছুক ছোট দেশগুলোকে মার্কিন আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সমর্থ কি না, বা কোনো ব্যবহারিক ভরসা তৈরি করছে কি না?

সিরিয়া, ইরান, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতায় এই প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। চীন বা এখনকার রাশিয়া এমন কোনো আদর্শিক অঙ্গীকারে নেই যে ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোকে আগ্রাসনের মুখে পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা দেবে। কড়া ভাষার ‘নিন্দা’ এবং বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের প্রকাশ্য অবস্থান। চীন বিশেষভাবে তার পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার না হারানোর বিষয়েও সদা সতর্ক। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাজার সম্প্রসারণ এবং সম্পদ সংগ্রহের দ্বন্দ্ব যতটা বড় দেখায়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আদর্শে ফারাক তত ব্যাপক নয়। মাদুরোর অপহরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে বেইজিং নিশ্চিতভাবে আগামী এপ্রিলে ট্রাম্পের চীন সফর বন্ধ করতে চাইছে না।

ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলব’ নিশ্চিতভাবে অনেক দিনের গোপন পরিকল্পনার ফসল। কিন্তু প্রতিপক্ষের এসব পরিকল্পনার বিষয়ে চীন ওয়াকিবহাল ছিল কি না বা থাকলেও ভেনেজুয়েলাকে আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছিল কি না বা ভবিষ্যতে তাদের দিক থেকে ‘বন্ধু’দেশগুলো সে রকম কোনো সহযোগিতা পাবে কি না, সেসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ এমনও বলছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটাবে এই মনস্তত্ত্বও ওয়াশিংটনেরই তৈরি। এর মাধ্যমে তারা স্বদেশে নিজেদের আগ্রাসী নীতির একটা বৈধতা তৈরি করতে চায়।

এ রকম পরিস্থিতিতে, বিশ্ব যখন নব্য এক বর্বর ভবিষ্যতে প্রবেশ করছে, তখন ক্ষুদ্র দেশগুলোর মানুষদের সামনে সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে করণীয় কী? দেশে দেশে এ রকম দেশগুলোর নাগরিকদের নতুন এক গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী এবং অপর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিভিত্তিক বৈশ্বিক জোটবদ্ধতা ছাড়া ট্রাম্পের মতো আগ্রাসী শক্তিকে রুখে দেওয়া কঠিন। কিন্তু আপাতত সে রকম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্বসংহতি নেই। এটা সেই অবস্থা, যা ধ্বনিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী মুসোলিনির কারাগারে গ্রামসির কথায়: ‘পুরোনোর মৃত্যু ঘটছে, কিন্তু নতুনের জন্ম হতে পারছে না, সময়টা দানবের।’

সর্বত্র আজ ‘দানব’ নিজে অভিযোগকারী, বিচারক এবং পুলিশ। এটা প্রকৃতই এক অনিশ্চিত যুগসন্ধিক্ষণ। গ্রিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ইন্টাররেগনাম’। ৩৫ বছর আগে বিশ্ব থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাড়াতে আমেরিকার প্রচার আন্দোলনে কে কোথায় কীভাবে জ্বালানি জুগিয়েছিল তার কার্যকারণ-উৎসাহদাতাদের নিয়ে তত্ত্বতালাশেরও সময় এটা।

* আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

চীন কেন ইরান, ভেনেজুয়েলার পাশে নেই

জম্মু–কাশ্মীরের মসজিদের খুঁটিনাটি পুলিশকে জানাতে হবে, নতুন আদেশ

জম্মু–কাশ্মীরের মসজিদগুলোর খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহে পুলিশি তৎপরতা বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে। এমন তৎপরতা এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আগে দেখা যায়নি।

সমালোচনা শুরু হয়েছে কারণ, পুলিশ এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মসজিদগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে। তারা জানতে চায়, কোন মসজিদ কবে তৈরি হয়েছে, কাঠামোর বিবরণ, মসজিদ তৈরিতে কত খরচ হয়েছে, কারা টাকা দিয়েছে, মসজিদ চালাতে কত খরচ অথবা বার্ষিক আয়ই–বা কত। শুধু এটুকুই নয়, জানতে চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মসজিদের সঙ্গে কারা যুক্ত, তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেমন, পাসপোর্ট, ব্যাংক খাতা, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের বিবরণও।

পুলিশের এই অতি তৎপরতা উপত্যকায় ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। প্রশাসনও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিভিন্ন মহলে এই পদক্ষেপের সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

মিরওয়াইজ উমর ফারুখের সংগঠন মুত্তাহিদা মজলিস উলেমা (এমএমইউ) এই পুলিশি তৎপরতাকে ‘আক্রমণাত্মক তথ্য সংগ্রহ কর্মসূচি’ বলে বর্ণনা করেছে। জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের সংসদ সদস্য আগা রুহুল্লাহ মেহেদি বলেছেন, দক্ষিণপন্থী যে আদর্শ এখন দেশ চালাচ্ছে তা এখন ধর্মকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণপন্থী আদর্শের সঙ্গে যারা সহমত নয় তাদেরকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

এই উদ্যোগ ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ জানিয়ে রুহুল্লাহর প্রশ্ন, নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর কাছে সব তথ্য যখন রয়েছে তখন এই বাড়তি তৎপরতার প্রয়োজন কোথায়? তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে প্রশাসন ভিন ধর্মাবলম্বীদের ভয় দেখাতে চাইছে। এর পর হয়তো দেখা যাবে, আরএসএস ও বিজেপি মসজিদের ইমামদের হুকুম করবে, প্রতি শুক্রবার তাদের লিখে দেওয়া ধর্মোপদেশই পাঠ করতে হবে।

সমালোচনা করেছে আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টিও (এআইপি)। এই দলের ব্যানারে গত লোকসভা ভোটে জিতেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। জেলে বন্দী থেকেও নির্বাচনে জিতে তিনি সংসদ সদস্য হন। এআইপি বলেছে, পুলিশ যা যা জানতে চাইছে তাতে স্পষ্ট তারা ধর্মাচরণকেও নজরবন্দি করতে চায়। দলের প্রধান মুখপাত্র ইনাম উন নবি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যা হচ্ছে তা প্রশাসন নয়, নিরাপত্তা রক্ষাও নয়। মানুষকে স্রেফ ভয় দেখানো হচ্ছে। প্রশাসন যদি প্রতিটি ধর্মস্থলকে বিপদ বলে চিহ্নিত করে তাহলে ক্ষোভ বেড়ে যাবে। মানুষের আস্থাও হারাবে।

বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে এই তৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। প্রত্যেকেই মনে করে, এতে সর্বত্র ভুল বার্তা যাবে। প্রশাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হবে। ভয় বাসা বাঁধবে মনে। সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হবে।

এমএমইউ মনে করে, নির্বাচিত সরকারের উচিত অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। তারা উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহাকে অনুরোধ করেছে, দেরি না করে এই পুলিশি উদ্যোগ বন্ধ করতে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদক্ষেপের বিষয়টি স্বীকার করেনি। যদিও পুলিশের এক সূত্র তাদের জানিয়েছে, এই কাজ কিছুদিন ধরেই চলছে। প্রতিটি মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ফর্ম ভর্তি করে জমা দিতে বলা হয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। সেখানকার নির্বাচিত সরকার পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী নয়। বিশেষ করে পুলিশ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে। কেন্দ্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন উপরাজ্যপাল। তাঁর সম্মতি ছাড়া নির্বাচিত সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বলবৎ হয় না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2022-12%2Fca564205-757b-4376-aac6-e0b35d23fd99%2FUntitled_5.jpg?rect=0%2C0%2C1296%2C864&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে আঘাত হানবে ইরান, আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানা হবে। এই মর্মে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক করেছে তেহরান। বুধবার রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। ওদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। বিভিন্ন মিডিয়ার তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৬০০। তবে নিরপেক্ষ বা সরকারি মাধ্যম থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, ইরানে চলমান অস্থিরতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২৬০০ দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটি দেশটিতে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে এবারের আন্দোলন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা জানান, ইসরাইলের গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্রাম্প হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদিও এর সময় ও পরিসর স্পষ্ট নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানি ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরান আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের অনুরোধ করেছে যেন তারা ওয়াশিংটনকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানানো হয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে, তাহলে ওই দেশগুলোর মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হবে। তিনি আরও জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থগিত করা হয়েছে, যা উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

একজন দ্বিতীয় ইসরাইলি সরকারি সূত্র জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে ইরানে সরকার পতনের সম্ভাবনা অথবা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। গত বছর ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়েছিল। মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তাহলে আমরা খুবই শক্ত পদক্ষেপ নেবো। যদি তারা ঝুলিয়ে দেয়, তাহলে কিছু জিনিস আপনারা দেখতে পাবেন। উল্লেখ্য, গতকালই ইরানে আটক প্রথম বিক্ষোভকারী এরফানকে ফাঁসি দেয়ার কথা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, তাকে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে শেষবার ১০ মিনিট সময় দেয়া হয়।

ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেয় এবং ঘোষণা করেন- ‘সহায়তা আসছে’। যদিও কী ধরনের সহায়তা, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।  বাহরাইনে আছে মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিটের সদর দপ্তর। কাতারে আছে আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর। গত বছর ইরান তার পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বিমান হামলার জবাবে আল উদেইদ ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।

ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। পাশাপাশি আরাঘচি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। এই তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। আরাঘচি আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদের কাছে বলেন, পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ়।

https://mzamin.com/uploads/news/main/198694_Abul-10.webp

কে এই এরফান, ইরানে মাত্র ২ দিনের বিচারে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হলো তাঁর

এরফান সোলতানি ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে। আজ বুধবার সেই সাজা কার্যকর করার কথা। এ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।

২৬ বছর বয়সী এরফানের গ্রেপ্তার হয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজার খবর গত সোমবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রথম প্রকাশ করেছে নরওয়েভিত্তিক হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস। প্রতিষ্ঠানটি ইরান ও কুর্দিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করে।

প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, এত দ্রুত কোনো মামলার বিচার হতে তাঁরা আগে কখনো দেখেননি।

এরফানের বাড়ি ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তর–পশ্চিমের শহর কারাজের ফারদিসে। গত বৃহস্পতিবার বাড়ি থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার আগে তখন শহরটিতে বিক্ষোভ তুঙ্গে ছিল।

হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসসহ বিভিন্ন অধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া এরফানের পরিবারের সদস্যদের গত রোববার জানানো হয়, বিচার শেষ হয়ে গেছে। এরফান মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ফাঁসির সাজা কার্যকর করা হবে।

এ বিষয়ে এরফানের এক স্বজন বিবিসি ফারসিকে বলেন, একটি আদালত ‘অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে’ এরফানের বিচার করেছেন। মাত্র দুই দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে ওই স্বজনের নাম–পরিচয় প্রকাশ করেনি বিবিসি।

সাজা ঘোষণার পর এরফানের সঙ্গে শেষবারের জন্য দেখা করতে পরিবারের সদস্যদের মাত্র ১০ মিনিট সময় দিয়েছে ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এরফানের বোন নিজেও ইরানের একজন নিবন্ধিত আইনজীবী। তিনি ভাইয়ের হয়ে আইনি লড়াই চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে এ মামলার নথিপত্র পেতে বাধা দিয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র আওয়ার শেখি বলেন, এ মামলা প্রমাণ করছে, ‘ইরানের সরকার দেশটির মানুষকে দমন করতে ও ভয় ছড়িয়ে দিতে তাদের জানা প্রতিটি কৌশল ব্যবহার করছে।’

২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে ইরানে। মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ এরই মধ্যে দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২ হাজার ৫৭১ দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ও ১২ শিশু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ আজ ভোরে নিহতের এ সংখ্যা জানায়।

বিক্ষোভে উত্তাল ইরানে প্রায় পাঁচ দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে ইরানের বিক্ষোভের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিক্ষোভে ‘অস্থিরতা উসকে দেওয়ার’ জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে ইরান সরকার।

বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়া নিয়ে ইরানকে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিতে শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা’ নেবে। তবে সেই ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে কী হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

এরফান সোলতানি
এরফান সোলতানি। ছবি: হেনগো অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের ওয়েবসাইট

শিয়াল কি প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে নিল by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

পদ্মা নদীর চরের বাথানে একদল শিয়াল গরু-মহিষের ওপরে হামলা করেছে। হামলায় ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। শিয়ালের দল শুধু গরু-মহিষকে জখম করেই ক্ষান্ত হয়নি, দুই কৃষকের ওপরও হামলা করেছে। এ ছাড়া চারজনকে তাড়া করে নদীতে নামিয়েছে।

এ ঘটনা শুনে শৈশবে পড়া শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতি নামের একটি চটি বইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ওই বইতে পড়েছিলাম, বাঘের ওপর প্রতিশোধ নিতে শিয়াল একবার বাঘের সঙ্গে সন্ধি করেছিল। শর্ত ছিল, তারা কেউ আর মুরগি খাবে না। এ কথা সব মুরগিকে জানিয়ে দেওয়া হলো। মুরগিরাও খুশি। রাতে শিয়ালের দল গৃহস্থের বাড়িতে গিয়ে স্লোগান দেয়, ‘শিয়াল-মুরগা ভাই ভাই, খোপ খোলো মুরগা ভাই।’

মুরগিরা আনন্দের সঙ্গে খোপ খুলে বের হলো, অমনি শিয়ালের দল খপাখপ মুরগি ধরতে লাগল। আর বলতে লাগল আমরা বাঘ। রাতে শিয়ালেরা তাদের ডেরায় মুরগির হাড় চিবোতে লাগল। তখন শব্দ পেয়ে পাশের গুহা থেকে বাঘ জানতে চাইল, কী চিবাচ্ছ তোমরা? শিয়ালেরা বলল, নিজের পা চিবাচ্ছি, মামা। আপনিও চিবাতে পারেন। কাল সকালে আবার নতুন পা গজাবে।

শিয়ালের রাজনীতি বুঝতে না পেরে বাঘ নিজের পা চিবিয়ে খেল আর সারা রাত যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। সকালে বাঘ বলল, কই আমার পা তো গজায়নি। শিয়ালেরা গিয়ে বলল, কী বলো মামা? আমাদের তো গজিয়েছে। এই তো দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছি!’

গত ২০ ডিসেম্বর রাতে রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা একটি চর ষাটবিঘায় অবিশ্বাস্য এ ঘটনা ঘটেছে। এই চরে পাশের খানপুরের লোকজন গরুর বাথান করেছেন। সেখানে সারা দিন চরের মাঠে গরু চরে বেড়ায়। রাতের বেলায় বাথানে রেখে গৃহস্থরা বাড়িতে যান। ২১ ডিসেম্বর ভোরে লোকজনের মাধ্যমে তাঁরা খবর পান, তাঁদের গরু বাথানের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে চরের মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা এসে দেখেন, গরুর নাক-মুখ কান ছিঁড়ে ফেলা। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। বাথানে ছয় শতাধিক গরু ছিল।

কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা দেখেই বুঝতে পেরেছেন, এটা শিয়ালের কাজ। রাতে হামলার পর সকালেও ছয়টি শিয়াল বাথানের পাশে মহড়া দিচ্ছিল। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এসেও সেই শিয়াল দেখতে পেয়েছেন।

শুধু তা–ই নয়, একটি শিয়াল চরের ফেরিওয়ালা আফসার আলী ও তাঁর চাচাশ্বশুর আক্কাস আলীর ওপরে হামলা চালিয়েছে। আফসার আলীর ঠোঁট ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর আক্কাস আলীর হাতের এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে গেছে।

কৃষক আবুল কালামের কাছে গিয়ে মাটিতে রক্তাক্ত মুখ মুছেছে। আবুল কালাম বললেন, তাকে দেখে শিয়াল কিছুই মনে করছে না। মাটিতে মুখ মুছে চলে গেল। তারপরই চারজন চাষিকে তাড়া করেছে। তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচেছেন।

চাষি মাহমুদ সুজন আলী বলেছেন, গরুর ওপরে হামলার ঘটনার তিন দিন আগে মাঠে তাঁর একটি গরুর বাছুর হয়েছিল, সেই গরুকে তিনটি শিয়াল ঘিরে রেখেছিল। পরে তিনি গিয়ে গরু ও বাছুর উদ্ধার করেন। এখন লাঠি ছাড়া কেউ শিয়ালের ভয়ে মাঠে নামতে পারছেন না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খবর নিয়ে জানলাম, এ বছর হাসপাতালে শিয়ালের কামড়ে আহত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর শিয়ালের কামড়ে আহত ১৭৬ জন রোগী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

সবাই যখন ভাবছেন, শিয়াল কেন বাঘের মতো আচরণ করছে, তখন চর মাঝারদিয়াড় এলাকার কৃষক আবদুল হান্নান বলেন, শিয়ালের তো কোনো দোষ নেই। হামলার ঘটনার আগের দিন চরখানপুরে দুই রাখাল একটি শিয়াল মেরে ফেলে। চারটি শিয়াল দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে। ওই দিন রাতেই শিয়ালের দল এসে বাথানে হামলা করেছে। শিয়ালের তো দোষ নেই।

পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, ‘ঘটনা সত্য কি না, জানি না। শিয়ালের হামলার ঘটনার আগের দিন লোকজন বন মহিষ মারতে এসেছিল। তারা নাকি একটি শিয়ালের বাচ্চাও মেরে নিয়ে গেছে। এই ক্ষোভে শিয়াল হামলা চালাতে পারে।’

এসব কাণ্ড দেখে ভাবছি, শিয়াল কি মানুষকে দেখে দেখে প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে নিল? কেননা, শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতির বইয়ে গল্পকে আমরা রূপকথাই বলব; কিন্তু গরুর বাথানে ঢুকে ২০০ গরুর ওপরে হামলা চালানোর ঘটনাকেও কি আমরা রূপকথা বলব? এ ঘটনা বোধ হয় রূপকথাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কারণ, প্রকৃতিতে সবকিছুই যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। শিয়ালও তো প্রকৃতির সন্তান। সে তার বাইরে যেতে পারবে কেন।

রাজশাহী বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবিরের কথা আমাদের একটি বার্তা দেয়,‘শিয়ালের খাবারের অভাব হলে শিয়াল এ রকম করতে পারে। আবার কেউ বিরক্ত করলে বা তাদের প্রজনন মৌসুমে ওরা এ রকম আচরণ করে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি তাদের প্রজনন মৌসুম।

ভাবলাম, খাবার তো দূরের কথা,আমরা তো শিয়ালের আবাস্থলই ধ্বংস করে ফেলেছি। শিয়াল এখন কী করবে। শিয়াল পণ্ডিতের গল্পে মুরগি ধরতে গিয়ে শিয়াল নিজেদের বাঘ বলে পরিচয় দিয়েছে। এখানে ‘ঠোঁট ছেঁড়া আফসার আলী’ বলেন, শিয়াল একেবারে বাঘের মতন, কোনো ভয় করছে না। আমাদের বোধ হয় সতর্ক হওয়ার সময় এসে গেছে। তা ছাড়া প্রকৃতি হয়তো এমন অনেক ঘটনা ঘটাবে, যা রূপকথাকে হার মানাবে। অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের ভাষায় তখন হয়তো আমরা বলব, ‘এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ।’

* আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
- নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

পদ্মা নদীর চরে শিয়ালের হামলায়  ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে।
পদ্মা নদীর চরে শিয়ালের হামলায় ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। গ্রাফিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

পশতুন কাফেলায় বাংলাদেশি: টিটিপি কি নতুন আঞ্চলিক টানাপোড়েন তৈরি করছে by আলতাফ পারভেজ

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে বলা হয় টিটিপি। ‘তেহরিক’ মানে সক্রিয়তা বা আন্দোলন। তালেবান অর্থ শিক্ষার্থীরা। বাংলায় টিটিপির অর্থ দাঁড়ায় পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।

আফগানিস্তানে বহু সংগ্রাম শেষে পশতু তালেবান এখন ক্ষমতায়। পাকিস্তানের পশতু এলাকার টিটিপি তাদেরই উপশাখা। তবে আফগান বা পাকিস্তান কোনো দেশের তেহরিক-ই-তালেবান আগের মতো ‘ছাত্রদের আন্দোলনে’ নেই; একটা বিশেষ আদর্শের সব বয়সীর উদ্যোগে পরিণত হয়েছে এবং এটা কেবল পশতু এলাকাতেও সীমিত নেই।

পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে একাধিক বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর বের হওয়ার পর এত দিনকার অনিচ্ছুক অনেকে মানছেন, তালেবদের এ আন্দোলন ইতিমধ্যে আঞ্চলিক চেহারা নিচ্ছে। শত্রু-মিত্রের ধরনও পাল্টাচ্ছে তাদের।

টিটিপি ‘পশতুনিস্তান’কে নতুন অবয়ব দিয়েছে

পশতুভাষীরা আফগানিস্তানের প্রধান জাতি। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ সেখানে তারা। পাকিস্তানে পশতুনরা সংখ্যায় দ্বিতীয় প্রধান জাতি। খাইবার পাখতুনখাওয়া (সাবেক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) এবং বেলুচিস্তানে তাদের বড় বসতি হলেও করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ শহরেও সংখ্যায় অনেক আছে। সব মিলে সংখ্যায় প্রায় সাত কোটির মতো হবে পশতুভাষীরা। এ জাতির পুরোনো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে। ওই সব অঞ্চলেও অল্পবিস্তর আছে তারা।

বিভিন্ন রাষ্ট্রের সীমান্তে বিভক্ত হয়ে পড়লেও পশতুনদের মধ্যে পশতুনিস্তান বলে এক হারিয়ে ফেলা জনপদের কল্পনা আছে। যে জনপদ ভাগ করে গেছেন স্যার মার্টিমার ডুরান্ট ১৮৯৩ সালে। তাঁর কলমের দাগই আজকের ‘ডুরান্ট লাইন’।

পশতুনরা মনে করে, কৃত্রিম ওই রেখা তাদের জাতিসত্তাকে বিভক্ত করেছে। সেই ক্ষোভের দানা বাঁধা ঠেকাতে আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ সীমান্তে পাকিস্তান এখন কাঁটাতার বসাচ্ছে। কিন্তু কৃত্রিম সীমান্তের মতোই কাঁটাতার পশতুনদের যে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত রাখতে পারছে না, তার এখনকার প্রমাণ কল্পনার পশতুনিস্তানজুড়ে তালেবান আদর্শবাদের উত্থান।

‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত গাফফার খানের (১৮৯০-১৯৮৮) নেতৃত্বের আমলে এবং তার পরে বহুকাল পশতুনদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ধারাই ছিল প্রবল। এখন ডুরান্ট লাইনের দুই দিকে প্রাধান্য চলছে ইসলামপন্থী দাবিদার ‘তালেব’দের। আফগানিস্তানে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। পাকিস্তান সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী সেই রাজনৈতিক সুনামি থেকে পাঞ্জাব ও সিন্ধুকে বাঁচাতে চাইছে। এর মধ্যে কল্পনার পুরোনো পশতুনিস্তান অনেকটাই ধর্মতান্ত্রিক সামাজিক চেহারা নিয়ে ফেলেছে।

যেভাবে তালেবান আন্দোলনের বিস্তার

তালেবান আন্দোলনের জন্ম প্রায় ৩০ বছর আগে ডুরান্ট লাইনের উভয় দিক মিলে। সীমান্তের দুই দিকের মাদ্রাসগুলোয় পশতুভাষী শিক্ষার্থীদের যোদ্ধা-জনবল বানাতে পাকিস্তানের বিভিন্ন সংস্থা অনেক পরিশ্রম করেছে। ১৯৯৬ সালে এসে তারা প্রথম কাবুলে ক্ষমতা দখলে সক্ষম হয়। চার-পাঁচ বছর পর ক্ষমতা থেকে তারা উৎখাত হয় এবং পাকিস্তানের পশতু এলাকায় আশ্রয় নেয়।

নতুন করে সংগঠিত হয়ে প্রায় দুই দশক পর ন্যাটো বাহিনীকে তাড়িয়ে আবার কাবুলে ক্ষমতায় আসে ২০২১ সালের আগস্টে। এরপর ডুরান্ট লাইনের পাকিস্তান অংশে শুরু তালেবান সশস্ত্রতার তৃতীয় তরঙ্গ। তেহরিক–ই–তালেবান এখানে ২০০৭ থেকেই ছিল। কাবুল জয় শেষে তারা ‘পাকিস্তান জয়’ করতে নেমেছে কেবল।

আফগান টিটিএর মতো পাকিস্তানের টিটিপিও দেশটির অনেকগুলো সশস্ত্র সংগঠনের একটি জোট বা নেটওয়ার্ক। অন্তত ১৫টি গ্রুপ আছে এই নেটওয়ার্কে। দুটি গ্রুপ চীনের উইঘুর এলাকা ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছে। সর্বশেষ বাংলাদেশিদের যুক্ত থাকারও খবর এল। সমগ্র জোটের সমন্বয় কীভাবে হচ্ছে, সেটা বলা মুশকিল। তবে আফগান পাখতিয়ারে আত্মগোপনে থাকা নুর ওয়ালি মেহসুদকে টিটিপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনে করে খুঁজছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানে টিটিপির পরিসর

পাকিস্তানের টিটিপিবিরোধী যুদ্ধের ভরকেন্দ্র খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি)। বলা বাহুল্য, এখানকার সবাই টিটিপির সমর্থক বা সদস্য নয়। তবে সংখ্যায় তারা অনেক, সর্বত্র আছে অল্পবিস্তর এবং বাড়ছেও।

পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এখানকার যুদ্ধক্ষেত্রটা বিশাল ও জটিল। তাদের এখানে লড়তে হচ্ছে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর অন্তত ১৫ শতাংশ সদস্য পশতুভাষী। ফলে পশতুভাষী সেনা ও গেরিলারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে পড়ছেন।

টিটিপি দমন করতে যখনই হঠাৎ কোনো অভিযান চালানো হয়, তখন বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে খেপে ওঠে। আবার সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বে অবহিত করে অভিযান চালালে সেটা সফল হয় না। এ মুহূর্তে কেপিতে চলছে ‘অপারেশন সর্বাকফ’। সর্বাকফ ফারসি শব্দ। যার অর্থ, জান দিতে প্রস্তুত যারা।

নাম থেকেই স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় সৈনিকেরা মৃত্যুপণ করে টিটিপি দমনে নেমেছেন। গত বছর জুনে ‘আজম-ই-ইসতেখাম’ (স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে সমাধান) নামে আরেকটা অভিযান চালিয়েছিলেন তাঁরা। তবে এসব অভিযানে টিটিপি দুর্বল হয়েছে বলে সাক্ষ্য মেলে না।

পাকিস্তানের তালেবান কেবল নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে না, পশতু এলাকার পুরোনো রাজনেতিক দল আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির কর্মীদেরও আক্রমণ করছে। ইসলামাবাদের নির্বাহী শক্তির বিপরীতে এ এলাকায় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চায় না। এএনপি পশতু এলাকায় বামপন্থী আদর্শের পরম্পরা লালন করছে, যা তালেবান দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত।

টিটিপির সব উপদল একই আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে লড়ছে এমন নয়। কেউ কেউ কেপি এলাকায় শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করতে পারলেই খুশি। অনেকে পাকিস্তান সরকারকে ‘তাগুদ’ হিসেবে অভিহিত করে উৎখাত করতে চায়। কেউ কেউ চায় পশতুনিস্তানকে এক করতে। আবার বিদেশি যোদ্ধারা ‘হিজরত’ করছে সুন্নি হানাফি মাজহাবের ধর্মীয় একটা মুক্তাঞ্চলের স্বপ্ন নিয়ে।

পশতুনিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালিরা

পশতুনদের সঙ্গে বাংলাভাষীদের রাজনৈতিক সম্পর্কের বহু অধ্যায় রয়েছে ইতিহাসে। পশতুনদের পুরোনো দল এএনপির প্রতিষ্ঠাতা ওয়ালি খানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু বাংলাদেশের মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপে। পাকিস্তানের উভয় অংশজুড়ে এটাই সবচেয়ে বড় দল ছিল।

আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রচারকৌশল নিয়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে মস্কো-পিকিং আদর্শিক টানাপোড়েনে ১৯৬৫ সাল থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে এবং ১৯৬৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাপ ভেঙ্গে গেলে গাফফার খান ও ওয়ালি খানের অনুসারীরা পরবর্তীতে এএনপি নাম নিয়ে কেপি ও বেলুচিস্তানে কাজ করতে থাকে।

ভাসানীর পাশাপাশি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সূত্রেও পশতুন জাতীয়তাবাদীরা বাংলাভাষীদের খুব ভক্ত ছিল। ভারত ভাগের পরপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রী কাইয়ুম খান যখন পশতুন খুদাই খিদমতগার আন্দোলন কর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করেন, তখন তাদের পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে ছুটে গিয়েছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পশতুন জাতীয়তাবাদীদের অতীতে মৈত্রীর সঙ্গে এখনকার কেপিতে বাংলাদেশিরা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে আলোচনায় এলেন। অনেক দিন থেকে টিটিপিকে অনুসরণকারী পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকেরা সেখানে বাংলাদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি ও মাঝেমধ্যে নিহত হওয়ার উল্লেখ করলেও ঢাকায় সেসব তথ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি কেবল ফেরত আসা কয়েকজনকে আটক করা ছাড়া।

সম্প্রতি ‘দ্য ডিসেন্ট’ নামে একটা মিডিয়ার সূত্রে মাদারীপুরের ফয়সালের মৃত্য বেশ প্রচার পেয়ে গেলে বিষয়টা আর আড়ালে রাখার উপায় থাকেনি। ফয়সাল মারা যায় কেপির করক জেলায়। কেপি থেকে বহুদূরে বাংলাদেশের একটা জেলায় ফয়সালের রিক্রুটমেন্ট—এ রকম খবরের প্রতিও অনেকের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করছে। কেউ কেউ বলছেন, টিটিপিতে অনেক বাংলাদেশি মুজাহিদ রয়েছেন। অনেকে আফগানিস্তানেও আছেন।

টিটিপি ও আঞ্চলিক টানাপোড়েন

পাকিস্তান-আফগানিস্তান প্রতিবেশী হলেও সম্পর্ক কখনো স্থায়ীভাবে ভালো ছিল না। ১৯৪৭ সালে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান জাতিসংঘভুক্ত হতে গেলে একটি মাত্র দেশ বিরোধিতা করে, সেটা আফগানিস্তান। আফগানরা মনে করে, তাদের অনেক এলাকা নিয়ে পাকিস্তান গড়ে উঠেছে।

আবার এই আফগান পশতুনদের সংগঠন টিটিএ–কে (তেহরিক-ই-তালেবান আফগানিস্তান) এবং তারও আগে আফগান মুজাহিদদের পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীই আরও দুটি দেশের সঙ্গে মিলে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কাবুলে ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে। তখন উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের দিকে সাম্যবাদী রাজনীতির আগমন ঠেকানো। এটাও প্রত্যাশা ছিল, কাবুলে ক্ষমতা পেয়ে তালেবান অগ্রযাত্রা সেখানেই থিতু থাকবে এবং পাকিস্তানে এ মতাদর্শের বিস্তার রোধ ইসলামাবাদকে সাহায্য করবে।

কিন্তু ইতিহাসের কৌতুক বলতে হয়, নিজেদের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়া টিটিপির রাজনীতির জন্য ইসলামাবাদের সরকার কাবুলের পশতুন শাসকদেরই দায়ী করছে এখন। আফগান শাসকেরা প্রতিনিয়ত বলছেন, টিটিপি একান্তই পাকিস্তানভিত্তিক, এতে কাবুলের হাত নেই। পারস্পরিক এ ঝগড়া কেবল মুখে সীমাবদ্ধ নেই। উভয় দেশ কয়েকবার গোলাবারুদও ছোড়াছুড়ি করেছে।

টিটিপি নিয়ে আফগান সরকারকে চাপ দিতে পাকিস্তান তার এলাকায় থাকা লাখ লাখ পশতুন শরণার্থীকে অমানবিকভাবে তাড়িয়েছে সম্প্রতি। কাবুলের কাছে পাকিস্তানের চাওয়া একটাই, ‘হয় পাকিস্তান, না হয় টিটিপি’—যেকোনো একটা বেছে নাও। কিন্তু যেসব পাকিস্তানি মুজাহিদ প্রথমে রাশিয়া এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে আফগানদের সঙ্গে লড়েছে, তাদের কীভাবে ‘ইসলামিক আমিরাত’ ছেড়ে চলে যেতে বলবে তালেবান সরকার?

টিটিপি আফগানিস্তানের মতো নিজ দেশেও যদি ‘ইসলামি শাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে আফগান তালেবান কোন যুক্তিতে এর বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখবে?কেবল ভাবাদর্শ নয়, টিটিপির জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি যে আফগানিস্তান হয়ে আসছে, সে বিষয়ে পাকিস্তান নিশ্চিত। এটা বন্ধ করার তেমন উপায় নেই তাদের হাতে। প্রথমত এই আদর্শবাদী শক্তিকে কাঠামোগতভাবে তাদেরই বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করেছিল। আবার টিটিপিকে নির্মূলে আফগান সরকারের ওপর জবরদস্তি করলে সম্পর্ক খারাপের ঝুঁকি নিতে হবে।

ভূরাজনীতিতে আফগানিস্তানকে খুব প্রয়োজন পাকিস্তানের। পশতুন আফগানরা যাতে ডুরান্ট লাইন নিয়ে পুরোনো দাবিতে সোচ্চার না হয়, সে জন্যও নমনীয় এক আফগান সরকার প্রয়োজন ইসলামাবাদের। কিন্তু টিটিপির দিক থেকে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষরাও চায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। কেপি যদি বিদেশি যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে, সেটাও আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়াবে। টিটিপির উত্থান দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগেও একধরনের বাধা হিসেবে আছে।

সরকারের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ ইমরান খান। কেপিতে তাঁর দলের জনপ্রিয়তা ব্যাপক এবং এই দল সেনা অভিযানের বিপক্ষে। তারা চায় টিটিপিকে নির্মূল না করে সরকার আলোচনায় বসুক। অতীতে এ রকম কৌশল অবশ্য তেমন ইতিবাচক ফল দেয়নি। মূলত রাজনৈতিক স্বার্থে সেনাবাহিনীবিরোধী অবস্থান থেকে ইমরানের দল এ রকম বলছে। জটিল এ পরিবেশে সেনাবাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সাধারণ পশতুন ও আফগান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অতি খারাপ না করে পরিস্থিতি সামলাতে।

সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সম্ভাব্য নতুন সংকট হবে যদি টিটিপি ও বালুচ জাতীয়তাবাদীরা পরস্পরকে সহায়তায় এগিয়ে আসে। ইসলামাবাদ বহুবার অভিযোগ করেছে, বালুচদের ভারত সহযোগিতা দেয়। বালুচ গেরিলারা যদিও আদর্শিকভাবে ধর্মতান্ত্রিক নয়, কিন্তু ‘শত্রুর শত্রু মিত্র’ কৌশলের অংশ হিসেবে কখনো টিটিপির সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে যাবে না, এমন বলা যায় না।

বালুচদের সঙ্গে টিটিপির সম্পর্ক বাড়লে সেটা চীনের জন্য বাড়তি উদ্বেগের হবে। বেলুচিস্তানে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। তখন একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেটা বলা মুশকিল। তবে আপাতত ওয়াশিংটন টিটিপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখছে এবং এর মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারকে সাহায্য করছে।

সামগ্রিক এসব বিষয় একান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গ মনে হতে পারে। কিন্তু এই কাফেলায় বাংলাদেশিরা ইতোমধ্যে যুক্ত হয়ে গেছেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে বাংলাদেশমুখী আরও তথ্য-উপাত্ত আসতে পারে। হয়তো তখন প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশ সরকার টিটিপিতে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে কী ভাবছে এবং ওই জনবল বাংলাদেশ নিয়ে কী ভাবছে?

* আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

টিটিপির কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য
টিটিপির কয়েকজন সশস্ত্র সদস্যরয়টার্স। ফাইল ছবি

রাজশাহীতে আলু বেচে হিমাগার ভাড়াও উঠছে না, কমেছে আবাদ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

মৌসুমে আলুর দাম এতটাই কম ছিল যে অনেক চাষির উৎপাদন খরচ উঠছিল না। তাই লোকসান এড়ানোর আশায় অনেক চাষি আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পরে সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর কেজি ২২ টাকা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করেও বিপাকে পড়ছেন চাষিরা। হিমাগার ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে তাঁদের এখন ঘর থেকে টাকা এনে দিতে হচ্ছে।

এদিকে গত মৌসুমের আলু বিক্রিতে লোকসানের কারণে এবার রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এই জেলায় যেখানে ৩৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল, সেখানে এবার তা কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে নেমেছে। জেলার সবচেয়ে বেশি ও ভালো জাতের আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। সেখানকার চাষিরাও এবার আলু চাষ কমিয়েছেন। গত বছর তানোরে ১৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এবার হয়েছে ১২ হাজার ২৬৫ হেক্টরে।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে আলু নিয়ে শুধু হতাশার গল্পই শোনা গেল। তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের চাষি মো. মইদুল ইসলাম জানান, তিনি হিমাগারে ১২১ বস্তা আলু রেখেছিলেন। সেই আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ঘর থেকে ১৬ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে।

একই উপজেলার তালন্দ গ্রামের আলুচাষি সাফায়েত হোসেন জানান, তিনি হিমাগারে দেড় হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ায় তিনি আশা করেছিলেন ডিসেম্বরের শেষে আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এতে হিমাগারের ঋণ শোধ করতে ঘর থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে। গত বছর তিনি ২৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন, এবার সর্বস্বান্ত হওয়ায় মাত্র আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।

তালন্দ গ্রামের আরেক চাষি আসাদুজ্জামান সুমন জানান, গত বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আলু বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। হিমাগারে রাখা তিন হাজার বস্তা আলু থেকে তিনি একটি টাকাও পাননি। আলু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার কারণে এবার তিনি মাত্র পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।

একই গ্রামের সৈকত কুমার দাস নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি করে তাঁর লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তিনি এজেন্টের মাধ্যমে হিমাগারে ২৭৮ বস্তা আলু রেখেছিলেন। আলু বিক্রির পরও এজেন্টের কাছে তাঁর প্রায় ১৬ হাজার টাকা দেনা রয়েছে।

তানোরের চাষি মাহবুব আলম জানান, গত বছর তিনি ৩২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি শেষে তাঁর লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ টাকা। হিমাগারে রাখা ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু বিক্রি করার পরও হিমাগারের মালিকের কাছে তাঁর ৩৫ হাজার টাকা দেনা রয়েছে। এবার তিনি অর্ধেক জমিতে অর্থাৎ ১৭ বিঘায় আলু চাষ করেছেন।

তালন্দ গ্রামের চাষি কলিমুদ্দিন জানান, গত বছর ২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর ৯ লাখ টাকা লোকসান হয়। হিমাগারে রাখা এক হাজার বস্তা আলু বিক্রি করেও হিমাগারের কাছে তাঁর দেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা। নিজের ঘর থেকেই এই টাকা পরিশোধ করেছেন।

এই হতাশার মধ্যেও ব্যতিক্রমী এক চাষির দেখা মিলেছে। তিনি চোরখৈর গ্রামের রানা চৌধুরী, যিনি গত বছর ২৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। হিমাগারে ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু রেখে তাঁকে ঘর থেকে ২২ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। তবু তিনি এবার ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ভাষায়, যেখানে টাকা হারিয়েছে সেখানেই খুঁজতে হবে—এই ভাবনা থেকেই তিনি এবার বেশি করে আলু চাষ করেছেন।

রহমান কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক আবদুল হালিম জানান, তাঁদের পাঁচটি হিমাগারে এখনো প্রায় ৪২ হাজার বস্তা আলু রয়ে গেছে। সরকারি দামে আলু বিক্রি না হওয়ায় ক্ষোভে তিনি ২২ টাকা কেজির ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত আলু চাষের কারণে চাষিরা লোকসানে পড়েছেন। তাই সরকার ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতিতে চাষের একটি লক্ষ্য নির্ধারণের চেষ্টা করছে। পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন হলে চাষিরা এ ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

প্রসঙ্গত, যে এলাকায় যে মাটিতে যে ফসল ভালো হয়, সেখানে সেটির আবাদ করাকেই ক্রপ জোনিং।

রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে এবার চাষিরা আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। শুধু তানোরেই এক হাজার হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গতকাল উপজেলার চোরখৈর গ্রামে একজন চাষি আলুখেতে সেচ দিচ্ছেন
রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে এবার চাষিরা আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। শুধু তানোরেই এক হাজার হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি ২০২৬ উপজেলার চোরখৈর গ্রামে একজন চাষি আলুখেতে সেচ দিচ্ছেন। ছবি: প্রথম আলো

ইরানে হস্তক্ষেপ প্রশ্নে দ্বিধায় ট্রাম্প

দ্য গার্ডিয়ানঃ ইরানের সরকারবিরোধীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে বিক্ষোভকারীদের বাঁচানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা রক্ষায় দেরি করলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন তাঁর উপদেষ্টাদের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী পরামর্শ পাচ্ছেন।

কেউ কেউ বলছেন, ওয়াশিংটন এখন বড় কোনো পদক্ষেপ নিলে ইরান সরকার এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো ‘ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচার করে বিক্ষোভ দমনের সুযোগ নেবে।

ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন, ইরানি বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালালে তিনি ইরানে ‘গুলি চালাবেন’। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি এত দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ট্রাম্পের দলের কাছে কোনো গোছানো পরিকল্পনা নেই। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বড়

কোনো নড়াচড়া এখনো দেখা যায়নি। কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বন্ধুদেশ ট্রাম্পকে আপাতত শান্ত থাকতে বলছে।

নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের সামনে এখন সামরিক শক্তিপ্রয়োগ এবং অন্যান্য বিকল্প তুলে ধরা হচ্ছে। গত শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ নিয়ে কথাও বলেছেন।

তেহরানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিমান হামলা চালানো বেশ কঠিন। কারণ, এতে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সেটির প্রমাণ দেখা গিয়েছিল। সে সময় এক হাজারের বেশি সাধারণ ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সাময়িকভাবে জাতীয়তাবোধ জেগে উঠেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিশানা হতে পারেন বিপ্লবী গার্ডের বড় নেতারা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। কিন্তু তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা অনেক বাড়িয়েছেন। তাই তাঁদের আঘাত করা এখন কঠিন। তবে দক্ষিণ তেহরানে বিপ্লবী গার্ডের ঘাঁটি ও পুলিশের ব্যারাকগুলোতে হামলা চালানো কিছুটা সহজ হতে পারে।

গত সপ্তাহান্তে ইরানের বিরোধী নেতারা ওয়াশিংটনে বলেছেন, সরকার যে হারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে, তা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’। সরকার যেভাবে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, তাতে তাঁরা হয়তো আর মাত্র দুই দিন টিকে থাকতে পারবেন।

ইরানের সাত বিশিষ্ট ব্যক্তি এক চিঠিতে এই দমন–পীড়নের ভয়াবহতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে ট্রাম্পের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ধর্মীয় গবেষক ও সাংবাদিক জাভাদ আকবারিন, লন্ডনের কায়হান পত্রিকার পরিচালক নাজানিন আনসারি, ট্রানজিশন কাউন্সিলের মুখপাত্র ইয়াজদান শোহাদাই, নোবেলজয়ী আইনজীবী শিরিন এবাদি, লেখক মহসেন মাখমালবাফ ও কুর্দিস্তান কোমলা পার্টির আবদুল্লাহ মোহতাদি।

ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া ইরানের সাবেক শাহর ছেলে রেজা পাহলভিও ট্রাম্পকে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। এ বিক্ষোভে তাঁর অনুসারীরাও অংশ নিচ্ছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের সাবধানে থাকতে বলেছেন। তিনি তাঁদের বলেছেন, ‘বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে বড় দলে মিলে প্রধান সড়কে যান, একা বের হবেন না এবং ছোট সরু গলিতে ঢুকবেন না। সেখানে আপনাদের জীবনের ঝুঁকি থাকতে পারে।’

তবে বাইরের অনেক পর্যবেক্ষক ট্রাম্পকে সাবধান করে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ বোমাবর্ষণ উল্টো ফল দিতে পারে।

ইরান–বিষয়ক সাবেক শীর্ষ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, আসল প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প যদি উত্তেজনা এড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে তা কি বিক্ষোভ দমনে সরকারকে থামাতে পারবে? নাকি উল্টো ফল দেবে। কারণ, ইরানের বিরোধী শিবিরের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের আরও গভীর ও দৃঢ় হস্তক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন।

চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল মনে করেন, মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলে ইরান সরকারের ভেতরের বিভেদ দূর হয়ে তারা সবাই এক হয়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিশেষজ্ঞ ইসফান্দিয়ার বাতমানঘেলিদজ বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন, গাজা বা ভেনিজুয়েলায় শান্তি ফেরাতে পারেনি। তাই তাদের হাতে শক্ত কোনো কৌশল নেই।

যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকায়ার বলেছেন, মার্কিন হামলা হয়তো মানুষের প্রত্যাশা মতো কাজ করবে না। তাঁর মতে, ট্রাম্পের কথা ও কাজের মধ্যে একটা বড় ফাঁক তৈরি হতে যাচ্ছে।

ম্যাকায়ার আরও বলেন, ইরান সরকার মানুষের জীবন ভালো করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তারা তা করতে পারেনি। অর্থনৈতিক সমস্যা, দুর্নীতি ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে তারা দিশাহারা। তারা জানে না, কীভাবে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ কমাবে। আবার এমন কেউ নেই যে বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষমতায় বসবে।

ইরান সরকার মানুষকে বোঝাতে চাইছে, বিদেশিরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। গত রোববার টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। তিনি বলেন, বাইরের শত্রুরা দাঙ্গাবাজদের উসকে দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের মতে, ৮০ শতাংশ বিক্ষোভকারীর অভাব-অভিযোগ সঠিক থাকলেও যারা মসজিদ বা দোকানে আগুন দিচ্ছে, তারা সন্ত্রাসী। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতিকে অস্ত্র বানিয়ে ইরানকে নতজানু করতে চায়। তিনি দেশবাসীকে সরকারের পাশে থাকার আহ্বান জানান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ডানে)
ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ডানে) ফাইল ছবি

রাষ্ট্র থাকে অনেক দূরে, কে দাঁড়াবে ম্রোদের পাশে by সঞ্জীব দ্রং

প্রকাশ ০৭ জানুয়ারি ২০২৩ঃ ‘ম্রো’ শব্দের অর্থ হয় ‘মানুষ’, আমি জেনেছি অনেক পরে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়েও এই মানুষদের কাছ থেকে রাষ্ট্র থাকে অনেক দূরে। তাঁদের ওপর বারবার আক্রমণ হয়, কোনো বিচার হয় না।

কোনো প্রতিকার নেই। ম্রোরা বলছেন, তাঁরা হয়তো এই ভূমিতে আর থাকতে পারবেন না। নতুন বছরের শুরুতে তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে তছনছ করে দেওয়া হলো। এখনো কোনো মামলা হলো না। কেউ গ্রেপ্তার হলো না। প্রথম আলো ২ জানুয়ারি প্রতিবেদন করেছে, লামায় ম্রোদের পাড়ায় আবার হামলা, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। বাড়িঘরে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের ছবি ছাপিয়েছে পত্রিকায়। একটি ছবিতে দেখলাম, অসহায় ম্রো মা কোলে একটি শিশু বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সামনে আরও দুটি শিশু আর স্বামী। পেছনে নিশ্চিহ্ন ঘর আর সামনে ছড়িয়ে আছে থালাবাসন। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকায় এই ছবি ও প্রতিবেদন দেখলাম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এই ছবি ও খবর। পাহাড়ে ম্রোদের নতুন বছর শুরু হলো হামলা, লুণ্ঠন আর নিষ্ঠুরতা দেখে। এই ম্রোদের ওপর বিরামহীন আক্রমণ চলছে। ২০২২ সালে বহুবার তাঁদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। তাঁরা যে উৎস থেকে পানি পান, সেই পানিতে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

কলা চাষ করেছিলেন ম্রো কৃষক, কলার বাগান কেটে ফেলা হয়েছে। জুমের ফসল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে এসব খবর ছাপা হয়েছে। ঢাকা শহরের নাগরিক সমাজ বিবৃতিও দিয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও তদন্ত করেছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে।

পত্রিকায় দেখলাম, বান্দরবান জেলা পরিষদ রাবারবাগানের ইজারা বাতিলের সুপারিশ করেছে (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০২২)। জেলা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরের মধ্যে রাবারবাগান সৃজন করার শর্তে ১৯৯৬ সালে এই জমি ইজারা দেওয়া হয়। ২৫ বছরেও এখানে রাবারবাগান হয়নি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রথাগত মালিকানা বিবেচনায় এসব ইজারা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে।

২.

ম্রোদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড় থেকে ফিরে পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতে গিয়ে, নব্বই দশকের শুরুতে। আমরা গারোরা নিজেদের মান্দি বলি। মান্দি অর্থও মানুষ। এভাবে সাঁওতালেরা নিজেদের হড় বলে। হড় শব্দের অর্থও মানুষ। অনেক পরে জেনেছি, বম জাতি নিজেদের লাই বা লাইমি বলে। লাইমি মানেও মানুষ। আমাদের দেশে এই ‘মানুষদের’ মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো নয়। নতুন বছরের শুরুতে লামায় ম্রোদের ওপর আক্রমণ নতুন করে এই বারতা দিয়ে চলেছে।

২০২২ সালের লোকগণনায় ম্রো জনসংখ্যা ৫২ হাজার ৪৫৫। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষেরদেশে ম্রো জাতি আজ অসহায়।

আমরা যতই উন্নয়নের কথা বলি; পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা মেট্রোরেলের কথা বলি না কেন, ২ হাজার ৮৪৭ মার্কিন ডলার মাথাপিছু আয়ের গল্প বলি না কেন, আমাদের এই রাষ্ট্র, এই সমাজ কতখানি সভ্য ও মানবিক, কতখানি উন্নত, দিন শেষে এসবের বিচার্য বিষয় হবে দেশে সংখ্যালঘু জাতির মানুষেরা কেমন আছেন, তার ওপর। যদি প্রান্তিক মানুষ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষ নিরাপদে না থাকতে পারেন, তবে বুঝতে হবে, আমাদের দেশটি আসলে ঠিকমতো চলছে না। এই উন্নয়নের সব গল্পই অসার বলে বিবেচিত হবে। আমি যখন এই ম্রো, হাজং বা সাঁওতাল জাতির কথা ভাবি, আর ২ হাজার ৮৪৭ ডলার মাথাপিছু আয়ের হিসাব দেখি সরকারি কাগজে, তখন মনে হয়, রাষ্ট্র যেন তার নাগরিকদের সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা করছে।

পৃথিবীর সভ্য রাষ্ট্রের বড় কাজ হলো সমাজের সবচেয়ে অসহায়, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু মানুষের পাশে থাকা, প্রভাবশালী ও শক্তিমানদের আক্রমণ থেকে তাদের রক্ষা করা।

দয়া করে একবার কুলাউড়ার একজন খাসিয়াকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কেমন আছেন? তাঁর ভূমিতে আক্রমণ হয়েছিল, কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। একটু সৎ হোন আর জিজ্ঞাসা করুন, গাইবান্ধার সাঁওতাল দ্বিজেন টুডুকে, মহাদেবপুরে আলফ্রেড সরেনের কন্যাকে, মধুপুরে পীরেন স্নালের স্ত্রীকে, চলেশ রিছিলের মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে, বাঘাইছড়ির কল্পনা চাকমার ভাইকে, গোমস্তাপুরের বিচিত্রা তির্কিকে কিংবা সুন্দরবনের পাশে শ্যামনগরে নরেন্দ্র মুন্ডার পরিবারকে। তারা কেমন আছেন? এমন আরও অসংখ্য ঘটনার কথা বলতে পারি। যদি জবাব পান, তাঁরা ভালো আছেন, তবে খুশি হব। কিন্তু সত্য হলো, এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনোটারই সুষ্ঠু প্রতিকার মেলেনি। তবু আমরা তরতর করে এগিয়ে চলেছি বটে!

৩.

আমরা আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বোঝাতে পারি না যে দেশটা সবার। অন্তত কথা ছিল, দেশটা হবে সবার। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আমরা বলেছিলাম, এখানে সবার জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করব। সেই ঘোষণার কত দূরে চলে গেছে দেশটা। তবু আমাদের মানতে হবে, এখানে বাঙালি ছাড়াও নানা জাতির মানুষ আছে। এখন আমি একটি তথ্য দিতে চাই। সেটা সরকারি তথ্য। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের ২৩ মার্চের গেজেট অনুযায়ী, ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আছে বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষায় প্রকাশ করেছে, দেশে মাতৃভাষা আছে ৪১টি। এখানে বাংলা ও উর্দু ভাষা বাদ দিলে বাকি ৩৯টি ভাষাই হলো আমাদের ভাষা।

এই সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজে বলেছে, এখানে ১৪টি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা হারিয়ে গেছে। আরও অনেক ভাষা বিপন্ন। এই হলো আমাদের দেশে সংখ্যালঘু জাতির মানুষের অবস্থা।

২০১৮ সালের ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বলেছিল, নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করলে একটি সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করবে তারা। গত চার বছরে কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। আমি চাই দ্রুত ভূমি কমিশন কাজ করুক। আলোচনায় বসে ঠিক করুক ভূমি সমস্যা সমাধানের। ম্রোদের পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াক। বিরাজমান পরিস্থিতিতে খুব আশাবাদী হতে পারি না।

বছরের শুরুতে আশা বেঁধে রাখতে হয়। আমরাও আশা রাখি, একদিন রাষ্ট্র অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও মানবিক হবে। দেশে একটি সংবেদনশীল আদিবাসী নীতি থাকবে। সে নীতির মূল কথা হবে, ইনডিজিনাস টাচ। অসীম নম্রতা, শুদ্ধতা ও উদারতা নিয়ে লেখা হবে সেই নীতিমালার বাক্যগুলো।

আমাদের সবাইকে মিলেমিশে রাষ্ট্রকে তার সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। দেশে মানুষে মানুষে যোগাযোগের সংবাহন বিন্দু গড়ে উঠবে। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই অথবা আকাশসীমার এক পৃথিবী রক্ত সবার লাল—কথাগুলো সত্যি হবে। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমার সঙ্গে সাঙ্গু-মাইনী-বুগাই-সোমেশ্বরী নদীকে মেলানোর আয়োজন শুরু হবে, জীবনে জীবন যোগ হবে—এই হোক আমাদের চিরকালের আকাঙ্ক্ষা।

* সঞ্জীব দ্রং, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী
- ই-মেইল: sanjeebdrong@gmail.com

ম্রোদের গোটা বসতি এভাবে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ম্রোদের গোটা বসতি এভাবে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

এক বাসায় অনেক পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও ভাইরাল, ব্যবস্থা চায় বিএনপি

একটি বাসায় কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনছেন, এমন একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টাল ব্যালটের খামে ঠিকানা লেখা রয়েছে বাহরাইনের।

আজ মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে বিষয়টি নিয়ে আইনি ব্যবস্থা দাবি করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি ‘বিশেষ রাজনৈতিক দলের’ নেতারা কাজটি করছিলেন।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ৭ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের। সেখানে কয়েকজন ব্যক্তিকে পোস্টাল ব্যালট গুনতে দেখা যায়।

ভিডিওতে শোনা যায়, একজন ব্যক্তি ভিডিওকারীকে বাধা দিয়ে বলছেন, ‘এই দাঁড়ান, আপনি ভিডিও করছেন কিসের জন্য? এখানে উনারা মেইন ভিডিও করছে। কেন আপনারা আরও ভিডিও করছেন। আপনারা এখান থেকে যেগুলা আছে সব লইয়া যানগা। আমরার দরকার নাই। কিন্তু ভিডিও কইরেন না। ফেসবুকে ছাড়িয়েন না।’

অপর দিক থেকে একজন বলছেন, ‘ডিস্টার্ব কইরো না, কেউ ফেসবুকে ছাড়বে না।’

তখন ভিডিও ধারণে বাধাদানকারী ব্যক্তি বলছেন, ‘আমরা এগুলো (পোস্টাল ব্যালট) যাচ্ছি আর আনছি না। এগুলো আমাদের দিয়ে গেছে। এখানে আমার দাদিরা ছিল। আপনারা এখানে যা আছে সব লইয়া যানগা।’

একপর্যায়ে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, একাধিক জন ভিডিও করলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে যাবে। তখন ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে। বাহরাইনে প্রবাসীদের দেওয়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

যাচাই বা ফ্যাক্ট চেক করে দেখা যায়, পোস্টাল ব্যালটের ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি নয়।

এমন আরও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যেটি ২৭ সেকেন্ডের। সেখানেও অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনতে দেখা যায়। জুনায়েন বিন সাদ নামের এক ব্যক্তি ভিডিওটি ফেসবুকে দিয়ে লিখেছেন, এটা ওমানে জামায়াতের এক ব্যক্তির বাসার ভিডিও।

উল্লেখ্য, অন্য ভিডিওটিও বাহরাইনে জামায়াতের একজনের বাসার বলে দাবি করছেন কেউ কেউ।

২৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে চট্টগ্রাম–৩ আসনের কথা বলতে শোনা যায়। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৩ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চটগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রাতেই বিষয়টির খবর পেয়েছি। এটি দেশের বাইরে। তবে কোন দেশের, সেটি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।’

ব্যবস্থার দাবি বিএনপির

আজ শনিবার বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগারগাঁও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম খানসহ বিএনপির চারজন প্রতিনিধি। বিকেল পাঁচটায় শুরু হওয়া বৈঠক শেষ হয় সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায়।

বিএনপি বৈঠকে নানা বিষয়ের সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টি তোলে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান পরে সাংবাদিকদের বলেন, বাহরাইনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতারা অনেকগুলো ব্যালট পেপার ‘হ্যান্ডেল’ করছেন। এটার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, এটা তাদের নজরে এসেছে এবং তারা বাহরাইনে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, নির্বাচন কমিশন তাঁদের আশ্বস্ত করেছে যে এ ব্যাপারে আরও তদন্ত করে তারা প্রতিবেদন দেবে এবং সে অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যদি কেউ এই ভোটে কোনো রকমের কারচুপির চেষ্টা করে, তাহলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ভোটার তালিকায় ব্লক করা হবে।

‘আমরা মনে করি যারাই এই নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার জন্য কারচুপি করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে যেন আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়’, বলেন নজরুল ইসলাম খান।

বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং কারাবন্দীদের পাশাপাশি এবারই প্রথম প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

আগে আইন থাকলেও সুযোগ ছিল সীমিত। এবার ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য নির্বাচনী আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন শেষ হয়।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ৩০০ সংসদীয় আসনে আগামী নির্বাচনের জন্য মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটারের পোস্টাল ভোট নিবন্ধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৬০ হাজারের কিছু বেশি। বাকিরা দেশ থেকে নিবন্ধন করেছেন। তাঁদের মধ্যে পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তা, ১০ হাজার আনসার-ভিডিপির সদস্য এবং ৬ হাজারের কিছু বেশি কারাবন্দী।

পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া দুটি ভিডিও থেকে ছবি দুটি নেওয়া হয়েছে
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া দুটি ভিডিও থেকে ছবি দুটি নেওয়া হয়েছে

নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না: সুশীলা কারকি

নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

কারকি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ও জেন-জি প্রজন্মের একাংশ প্রতিনিয়ত সরকারকে লক্ষ্য করে সমালোচনা ও কটূক্তি করছে এবং প্রায় প্রতিদিনই সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, নানা মহল থেকে আসা মৌখিক আক্রমণ সত্ত্বেও তার নেতৃত্বাধীন সরকার ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।

তিনি বলেন, মনে হচ্ছে আমরা যেন এক হঠাৎ ঝড়ের মতো পরিস্থিতিতে আছি। রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের তীব্র সমালোচনা করছে, কেউ কেউ প্রতিদিন সরকার ছাড়ার হুমকিও দিচ্ছে। জেন-জি তরুণরাও বলছে- আজ ছাড়ো, কাল ছাড়ো, পরশু ছাড়ো। কিন্তু ‘ছাড়া’ বলতে তারা কী বোঝে? আমরা যদি ছেড়েও দিই, পরদিনই আবার আমাদের গালমন্দ করা হয়। তারা বলে, তোমরা সুযোগ পেয়েছিলে, এখন পালিয়ে যাচ্ছ। আমরা যেন দোলকের মতো অবস্থায় আছি। কঠোর পরিশ্রম করছি, সব কষ্ট ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করছি।

তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশার কথাও তুলে ধরেন কারকি। তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে- নির্বাচনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বাইরে কোথাও গেলেও আনন্দ খুঁজে পাই না। আমাদের কথাও লিখুন। এখানে ২৫ থেকে ৩০ জন জেন-জি তরুণ রয়েছে, প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছে।

সুশীলা কারকি জোর দিয়ে বলেন, আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না। আমরা বাংলাদেশ চাই না। বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় তারা এমন এক অবস্থার মধ্যে রয়েছেন, যেখানে কোথাও গেলেই স্বস্তি বা আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

mzamin

দ্বিতীয় বিয়েতে কার অনুমতি নিতে হয়, হাইকোর্টে কী রায় হয়েছে, আইনে কী আছে by মহিউদ্দিন ফারুক

প্রথম আলো এক্সপ্লেইনারঃ হাইকোর্টের এক রায় নিয়ে ‘দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি’—এমন শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে এসেছে আলোচনায়। বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় অর্থাৎ স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের ক্ষেত্রে কার অনুমতি নিতে হয়? আইনের কোন বিধান নিয়ে রিট আবেদনটি হয়েছিল, হাইকোর্টের রায় কী হয়েছে, আইনেই বা কী বলা হয়েছে—চলুন খুঁজি তার উত্তর।

রিট আবেদনের বিষয়বস্তু কী ছিল

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বহুবিবাহ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা আছে। বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় আরবিট্রেশন কাউন্সিলের (সালিস পরিষদ) লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া আবার বিয়ে করতে পারবেন না বা এমন অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইনের অধীনে রেজিস্ট্রি হবে না।

৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান ২০২১ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আবেদনকারীর ভাষ্য, একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী রাখার স্বীকৃতি মুসলিম পারিবারিক আইনে দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার নিশ্চিত না করেই আইনে বহুবিবাহের অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে। বিয়ে বলবৎ অবস্থায় সালিস কাউন্সিলের (আরবিট্রেশন কাউন্সিলের) অনুমতি নিয়ে একাধিক বিয়ে করা যায়। তবে স্ত্রীর ভরণপোষণসহ অন্য প্রমাণাদি যাচাই ও খোরপোশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সালিসি কাউন্সিলের নেই। এতে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।

কী রুল হয়েছিল

রিট আবদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল দিয়েছিলেন। স্ত্রীদের মধ্যে সম-অধিকার নিশ্চিত ছাড়া বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। পারিবারিক জীবনের বৃহত্তর সুরক্ষায় বহুবিবাহ আইনের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা–ও জানতে চাওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্টের রায় কী বলা হয়েছে

চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত ডিসেম্বর মাসে হাতে পান রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ অধীন আরেকটি বিয়ের অনুমতির প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক কিংবা স্বেচ্ছাচারী নয় বলে হাইকোর্টের রায়ে এসেছে। রায়ে বলা হয়, আইনটি কোনো পক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ই) অধিকার খর্ব করে না বা কেড়ে নেয় না। এমনকি এটি বহুবিবাহের জন্য সালিস পরিষদের অনুমতি দিতে অথবা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে না। সালিস পরিষদ বিবাহের জন্য কোনো পক্ষের ওপর একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।

রায়ের শেষাংশে বলা হয়, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা বহুবিবাহের অনুমতি প্রক্রিয়ায় দেশের নারী নাগরিকদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না। রুল সমর্থন করে উত্থাপিত যুক্তির সারবত্তা নেই। রুল ডিসচার্জ করা হলো।

তাহলে আবার বিয়েতে কার অনুমতি নিতে হবে

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় তিনি আরবিট্রেশন কাউন্সিল (সালিস পরিষদ) লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না বা এমন অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।

(২) ১ উপধারা অনুযায়ী, অনুমতির ও দরখাস্ত নির্ধারিত ফিসসহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দপ্তরে দাখিল করতে হবে ও তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণগুলো এবং এই বিবাহের বিষয়ে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ থাকবে।

(৩) ২ উপধারা অনুযায়ী, দরখাস্ত গ্রহণ করার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীদের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। ওইরূপ গঠিত সালিস কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত বলে মনে করলে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে—এমন সব শর্ত থাকলে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।

(৪) উপধারা অনুযায়ী, দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করার জন্য সালিসি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেকোনো পক্ষ নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নির্দিষ্ট দপ্তরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনা চেয়ে দরখাস্ত দাখিল করতে পারে; তাঁর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে ও কোনো আদালতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

যদি কোনো ব্যক্তি সালিসি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে তা আইনের ৬ (৫) উপধারায় বলা হয়েছে। ৫ (ক) অনুসারে, বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে। এই টাকা ওইরূপ পরিশোধ না করা হলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে; এবং ৫ (খ) অনুসারে, অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা (দশ হাজার টাকা পর্যন্ত) বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

রায়ের পর কী হলো

আইনজীবী ইশরাত হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুসারে আরেকটি বিয়ে করার অপরাধ প্রমাণ হলে স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ হয়। অধ্যাদেশে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে তার এক বছর পর্যন্ত সাজা এবং দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কীভাবে অনুমতি নেবে, তাও আইনে বলা আছে। নির্ধারিত ফরম থাকবে, ফি থাকবে—এগুলো দিয়ে তিনি অনুমতি চাইবেন।

চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্য নিয়ে সালিস পরিষদ গঠিত হয় উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, আরবিট্রেশন কাউন্সিল ব্যক্তির স্ত্রী বা স্ত্রীদের শুনবেন। তারপর আরবিট্রেশন কাউন্সিল অনুমতি দিতেও পারেন, আবার নাও দিতে পারেন। এটি আইনে আগে থেকেই ছিল। নতুন করে হাইকোর্ট দেননি। বহুবিবাহের বিধান (আইনের ৬ ধারা) চ্যালেঞ্জ করেই রিট আবেদনটি করা হয়। কেননা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের কাছে এই ক্ষমতাটা থাকা সমীচীন নয়, চেয়ারম্যান পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন। তাই আমরা চাচ্ছিলাম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া হবে না, নতুন করে একটি নীতিমালা হোক। শুধু তাই নয়, স্ত্রীদের সম–অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। উপরন্তু একজন ব্যক্তি একাধিক বিয়ের জন্য শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম কি না, তা যাচাইয়ের সক্ষমতা কাউন্সিলের নেই।

ইশরাত হাসান বলেন, ‘বহু বছর ধরে অনেকে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন যে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে। আসলে আইনের কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি বাধ্যতামূলক আগে থেকেই ছিল না। আগে থেকেই ছিল, আরবিট্রেশন কাউন্সিল। গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে দেন। ফলে আইনের বিধানটি বহাল থাকল। অর্থাৎ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি পেলে তারপরে দ্বিতীয় বিয়ে; যেটি আগেও ছিল, এখনো সেটিই আছে।’

তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের নির্বাচন হবে গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা by গ্রেস করকোরান

দ্য ইন্টারপ্রিটারের নিবন্ধঃ এ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে ঢাকায়। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই বর্ষা বিপ্লবের সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ যুবনেতা শরিফ ওসমান হাদিকেও রাজধানী ঢাকায় হত্যা করা হয়। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি। সারাদেশে ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ভোট দেয়ার যোগ্য হবেন। এক দশকেরও বেশি সময় পর এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। একই সঙ্গে এই নির্বাচনের সঙ্গে হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে একটি গণভোট।

এই সনদটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক ভোটব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতার ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সনদটি পাস হলে এটি বহু দশক ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র ভেঙে দিতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুটি বড় দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তা হলো আওয়ামী লীগ। এর নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্টের কন্যা শেখ হাসিনা। অন্যটি হলো বিএনপি। এর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার ছেলে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে যুব নেতৃত্বাধীন বর্ষা বিপ্লব দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। এ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি ওঠে। বিক্ষোভকারীরা আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নীতি, বৈষম্য এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই বছরের আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে চলে যান নয়াদিল্লিতে। এরপর আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে।

বিপ্লবের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের গত মাসে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি এবং তাদের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল এবং অতীতে বিএনপির মিত্র ছিল। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আদালতের রায়ে ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে নির্বাচন করার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় দলটি নিষিদ্ধ হয়। তবে দুই সপ্তাহ আগে জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দেয় যে, তারা জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি একটি মধ্যপন্থী, বহুত্ববাদী ও ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল। এই জোটে আরও সাতটি দল যুক্ত হয়েছে।

বিপ্লব ও শেখ হাসিনার দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতির দিকে গেছে। শেখ হাসিনার সমর্থক হিসেবে বিবেচিত অনেকের ওপর পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাদিকে হত্যার পর এই ধরনের হামলা আরও বেড়েছে। আশঙ্কা বাড়ছে যে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরের উগ্র ও ডানপন্থী শক্তিগুলো এই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।
নির্বাচনের পরেও ভারতবিরোধী মনোভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। এখন ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। এই সম্পর্কগুলো কীভাবে বিকশিত হয়, তা ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। চীন ও পাকিস্তান সমর্থিত একটি বাংলাদেশ নয়াদিল্লির জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ নিজেকে এ অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ঢাকা আসিয়ানে যোগদানের চেষ্টা করছে এবং পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সার্ক পুনর্জীবিত করার কথাও ভাবছে- যা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলবে। স্বল্পমেয়াদে আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া কঠিন হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ সক্রিয় উদ্যোগ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার বাংলাদেশের আসিয়ান সদস্যপদে বাধা দিতে পারে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ঢাকা এই সংকট মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় ও পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী একটি স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে- যা তারা নাকি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো চরমপন্থী ও ডানপন্থী মতাদর্শের উত্থান, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রশ্নে। দেশে ধর্মীয় অনুশীলন ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রবণতা বেড়েছে এবং আরও রক্ষণশীল ইসলামি ব্যাখ্যা জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও খারাপ হলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট বাংলাদেশের জন্য এক সন্ধিক্ষণ। এই প্রক্রিয়া যদি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে, নাকি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোকেই টিকিয়ে রাখে- তা নির্ধারণ করবে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ। এই নির্বাচনের ফলাফল দেখাবে, গণআন্দোলন সত্যিই টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে রূপ নিতে পারে কি না।
(অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দ্য ইন্টারপ্রেটার থেকে অনুবাদ)

mzamin