Saturday, August 4, 2018

মডেল কন্যার লিভ টুগেদার: এতিম ৩ সন্তান by বিল্লাল হোসেন রবিন

মডেল কন্যা মাহমুদার বয়ফ্রেন্ড সাগর ইসলাম বাপ্পি। মাহমুদার স্বামী ও এক সন্তান আর বাপ্পির স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। মাহমুদার বাসা নারায়ণগঞ্জে হলেও বাপ্পির স্ত্রী-সন্তান থাকতো মুন্সীগঞ্জে। তবে সাগর কাজ করতো নারায়ণগঞ্জে। একটি মেগাশপে কাজের সূত্র ধরে মাহমুদার সঙ্গে বাপ্পির পরিচয়।  এক সময় তারা পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। ভেঙে যায় মাহমুদার সংসার। তার একমাত্র কন্যা নানীর বাড়িতে  থেকে যায়। অন্যদিকে বাপ্পি পরিবারের অগোচরে নারায়ণগঞ্জে মাহমুদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়। এরই সূত্রধরে মাহমুদা ও বাপ্পি দুই পরিবারের অজান্তে গোপনে নারায়ণগঞ্জের গোগনগরে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। সেখানে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে লিভ টুগেদার করে। কিন্তু বেশিদিন তাদের সুখ স্থায়ী হয়নি। মাত্র এক মাস ২০ দিনের মাথায় ৩০শে জুলাই রাতে তালাবব্ধ ওই ফ্ল্যাট থেকে মাহমুদার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অন্যদিকে ৩১শে জুলাই মারা যায় বাপ্পি। তাদের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে দুই পরিবারের অবুঝ তিন সন্তান এতিম হয়ে গেছে। নিহত মাহমুদা নারায়ণগঞ্জ শহরের নাগবাড়ী এলাকার আক্কাস মিয়ার মেয়ে এবং বাপ্পি মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার রিকাবীবাজার পূর্বপাড়া এলাকার জহিরুল ইসলামের ছেলে।
সূত্রমতে, ২০১৬ সালের মাহমুদা আক্তার শহরের উকিলপাড়ায় মেগাশপ ‘টপটেন’ এ কাজ নেয়।  সে ছিল ওই সময়ে টপটেন শাখার প্রথম নারী বিক্রয়কর্মী। এর ক’মাস পর সেখানে চাকরি নেয় সাগর ইসলাম বাপ্পি। এক সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়। এক সময় এই ঘনিষ্ঠা পরকীয়া প্রেমে রূপ নেয়। দু’জনের মধ্যে মন দেয়া নেয়া চলে। ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অবস্থাই মডেলিং ও অভিনয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠে মাহমুদা। তাকে মানিসক সাপোর্ট দেয় বাপ্পি। এরই মধ্যে  ২০১৭ সালের প্রথম কয়েক মাস কাজ করেই নিজেই রিজাইন করে মাহমুদা।
মাহমুদা টপটেনের আন্ডার গার্মেন্টস বিভাগে কাজ করত। সেখান থেকে রিজাইন করার পর আর ওখানের কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। এমনকি কাজের সহকর্মীদের ফেসবুকও ব্লক করে দেয়। উচ্চাবিলাসী মাহমুদার সঙ্গে অল্পদিনেই অনেক ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। শুটিংয়ের বদৌলতে সে দেশের বিভিন্ন লোকেশনে ঘুরে বেড়ায় এবং আড্ডা দেয়। এদিকে মাহমুদা তার সন্তানেরও তেমন একটা খোঁজ নিতো না। স্বামী হাফিজুর রহমানের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তার শিশুকন্যা জারা নানীর বাসায় বড় হতে থাকে। সাগর ইসলাম বাপ্পি মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার রিকাবীবাজারের পূর্বগ্রামে স্ত্রী-সন্তানদের রেখে নারায়ণগঞ্জে চাকরির সুবাদে মাহমুদার সঙ্গে রঙ্গলীলায় মেতে উঠে। যা তার পরিবার জানতো না। সবশেষ সে গত রমজান মাসে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া বালুর মাঠে ‘ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড’ এ এক মাস সেলসম্যানের চাকরি করে। ঈদের পর দুই পরিবারের অজান্তে মাহমুদা ও বাপ্পি গোগনগরে গোপনে ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। এবং স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস শুরু করে। তাদের রঙ্গলীলা একসময় দু’জনের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাহমুদাকে খুন করে ঘাতক ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে সটকে পড়ে।
হায়রে পরকীয়া, হায়রে প্রেম! রঙ্গলীলা মানুষকে এতো অমানুষ করে তোলে তা দেখা গেছে শহরের গোগনগরে মডেল মাহমুদা আক্তার ও তার বয়ফ্রেন্ডের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে মাহমুদার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আর মাহমুদার লাশ উদ্ধারের একদিন পর মারা যায় তার বয়ফ্রেন্ড সাগর ইসলাম বাপ্পি। যদিও পরিবার দাবি করছে বাপ্পি স্ট্রোক করে মারা গেছে। তবে কেউ কেউ বলছে সে আত্মহত্যা করেছে। আবার কারো মতে, মাহমুদার লাশ উদ্ধারের খবর হয়তো তাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল, যা সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোক করেছে। সে যা-ই হোক। পুলিশের তদন্তে সব পরিষ্কার হবে। নিহত মাহমুদার পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটি মেয়ে। নাম- রিয়ানা রহমান জারা। অন্যদিকে তার বয়ফ্রেন্ড সাগর ইসলাম বাপ্পির দুই ছেলে। একজনের নাম মাসরিফ ইসলাম। বয়স সাত।
ছোট ছেলের নাম ফারদিন ইসলাম। তার বয়স পাঁচ। দুই পরিবারের অবুঝ তিন সন্তান আজ এতিম। জারার বাবা থেকেও নাই। সে মাকেও হারিয়েছে। আর মাসরিফরা দুই ভাই বাবাকে হারিয়েছে। তবে জারা জানে না তার মা বেঁেচ নেই। কিন্তু মাসরিফরা বুঝে গেছে তাদের বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এদিকে মাহমুদার লাশ উদ্ধারের একদিন পরই ৩১শে জুলাই বাপ্পির মৃত্যুর বিষয়টি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সর্বত্র। কিন্তু প্রশ্ন যা-ই হোক মাহমুদা ও বাপ্পির পরকীয়ায় তাদের তিন সন্তান আজ এতিম। তাদের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকার। হয়তো আদরে-অনাদরে তারা একদিন বড় হবে। কিন্তু একজন ফিরে পাবে না তার মাকে আর দুইজন ফিরে পাবে না তাদের বাবাকে। নিষ্পাপ এই শিশুদের কোন অপরাধ ছিল না। শুধু বাবা-মায়ের পাপের প্রায়শ্চিত্তের শিকার হয়েছে তারা।

আসামে মানবতা বিপর্যয়ের আয়োজন by বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

আসামকে যখন ব্রিটিশরা পৃথক রাজ্যের মর্যাদা প্রদান করছিলেন তখন কাচাড়, গোয়ালপাড়া ও সিলেট জেলাকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছিলেন। একটা রাজ্যে যে রাজস্ব আয় থাকলে রাজ্যের মর্যাদা পায় তা আসামের ছিল না। তাই ব্রিটিশরা অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এ তিন জেলার লোকেরাই বাঙালি এবং বাংলা ভাষী।
দীর্ঘদিন এক রাজ্যের অধিবাসী হওয়ার কারণে এ তিন জেলার বহু লোক রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, অনাবাদি এলাকা আবাদ করলে জমি পাওয়া যায় এ কারণেই গণবসতিপূর্ণ এ তিন জেলার লোকজন জমি পাওয়ার আশায় অনাবাদি আসামকে আবাদও করেছে আবার সর্বত্র ছড়িয়েও পড়েছে এবং জমির মালিকও হয়েছে।
শুধু এ তিন জেলা থেকে নয়, পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে লর্ড কার্জন যখন ১৯০৫ সালে প্রদেশ গঠন করেছিলেন তখনও প্রচুর পূর্ব-বাংলার মুসলমান একই কারণে আসামে গিয়ে জঙ্গল আবাদ করেছেন, জমির মালিক হয়েছেন এবং বসতি স্থাপন করেছেন। শত বছর পরে গিয়ে কে বাঙালি কে আসামীয় নির্ণয় করতে গেলে যে বিভ্রান্তির উদ্ভব হয়, এখন আসামেও অনুরূপ এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
আসামীয়রা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির সময় থেকে সর্তক ছিল যেন বাঙালিরা আসামে সংখ্যাগরিষ্ঠ না হয়। ১৯৪৭ সালের সিলেটে গণভোটের সময় আসামের মুখ্যমন্ত্রী বারদুলই আর কংগ্রেস নেতা বিষ্ণুরাম নানাভাবে সাহায্য করেছিলো যেন গণভোটে পাকিস্তান জিতে যায় আর সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। না হয় আসামে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায় এ ছিল তাদের ভয়।
১৯৩৫ সালে আসাম ও উড়িষ্যায় যখন ভাষা গঠন, অক্ষর উদ্ভব ও সাহিত্য সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল তখন কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ উভয় জাতির সঙ্গে মিলে মিশে চেষ্টা করলে তারাও বাংলাভাষী হয়ে যেত। কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা এ পরিশ্রমটুকু করেননি। উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী জানকী বল্লভ পট্টনায়েকরা বাংলা ভাষা জানতেন এবং জানকীর বাংলা সাহিত্যে কিছু অবদানও আছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী বরদুলুই তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও সাংস্কৃতিক সাহিত্যে লেখাপড়া করেছিলেন। যাক নিজের খেয়ে পরের মহিষ চরানোর অভ্যাস কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজের ছিল না। তাদের সম্মিলিত বিরোধিতার কারণে ড. শহীদুল্লাহ সংস্কৃতিক কলেজে সংস্কৃতিক বিভাগে ভর্তি হতে পারেননি। পরে তিনি স্যার আশুতোষের পরামর্শে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সংস্কৃতিক সাহিত্যে লেখাপড়া করেছিলেন। ড. শহীদুল্লাহর অপরাধ ছিল তিনি ছিলেন মুসলমান।
যাক, আসামে জাত্যভিমানের কারণে “বাঙালি খেদাও” অভিযান পরিচালিত হয়েছে বহুবার। কখনও এসবে জড়িত ছিল অহমিয়া জনগোষ্ঠী, কখনও রাজ্য সরকার, কখনও উভয়ে সম্মিলিতভাবে। ছয় দশকে রাজ্য সরকার অহমিয়া ভাষাকে দাফতরিক ভাষার মর্যাদা প্রদান করলে বারাক উপত্যাকায় বাংলা ভাষাকেও সমমর্যাদা প্রদানের জন্য বাঙালিরা ভাষা আন্দোলন করেছিল। ১৯৬১ সালের ১৯ শে মে শিলচরে পুলিশের গুলিতে ১১ জন বাঙালি শহীদ হয়েছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারির পর ১৯শে মে  বাঙালিরা দ্বিতীয়বার ভাষার দাবিতে রক্ত দিয়েছিলেন।
অসমিরা বলে বাঙালিরা অভিবাসী। এ নিয়ে বহুবার দাঙ্গা হয়েছে। এবারের সমস্যার উদ্ভব হয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটা বিতর্কিত নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে। আদালত নাগরিক নিবন্ধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। নিবন্ধনের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে ৪০ লক্ষ লোক তাদের বসতি সম্পর্কীয় কোনও কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। অথচ এ ৪০ লক্ষ লোকের মাঝে এমনও লক্ষ লক্ষ লোক আছে যারা ৪/৫ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন। একশত বছর আগে যারা বসতি গড়েছিলেন এবং লাইন প্রথা আন্দোলনে যাদের আসামের লোক বলে স্বীকার করা হয়েছে তারা আজ এক নবসৃষ্ট দুর্ভোগের শিকার হলেন।
নাগরিকত্ববিহীন ৪০ লক্ষ লোক সহজ কথা নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, আসামে মানবতা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বাদপড়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশী নয়। ভারত সরকার অ-আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) নিয়ে তারা এমন কিছু করবেন না, যাতে বাংলাদেশের কোনও সমস্যা হয়। ভারত সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি তাদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এখনও কিছু চিন্তা করেনি।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, পুনরায় আবেদন গ্রহণ করা হবে। যাচাই বাছাই করা হবে। একটা কথা ভারত সরকারকে মনে রাখতে হবে, একশত বছর আগে সমগ্র ভারত ছিল ব্রিটিশদের একটা একক রাষ্ট্র। যার যেখানে ইচ্ছে সেখানে বসতি করা সম্ভব ছিল। কোনও অনুমতি লাগতো না। সুতরাং নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনও কাগজপত্র এই ৪০ লক্ষ লোক দেখাতে পারবে না। আমরা শঙ্কিত এ কারণে যে ৪০ লক্ষ লোক নাগরিকত্বহারা, আবার তারা মুসলমান।
আসামের রাজ্য সরকার বিজেপির। যেকোনও মুহুর্তে যেকোনও অমানবিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তারা ‘ঘরওয়াপসি” অর্থাৎ ঘরে ফের বলে ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা বলে। আবার বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রের পরিণত করার জন্য লোকগুলোকে পুশইন করার উদ্যোগও নিতে পারে। সুতরাং সর্ব অবস্থায় আমরা ভারত সরকারকে অনুরোধ করবো বিষয়টা ঝুলিয়ে না রেখে যেন ৪০ লক্ষ লোককে নাগরিকত্ব প্রদানে কেন্দ্রীয় সরকার সহানুভূতির সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার যা বলেছে তা দেখতে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু অতীতের যা নজির রয়েছে তাতে শঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারে যারা রয়েছেন তাদের কারও কারও বক্তব্য ভারসাম্যমূলক নয়। জাত্যভিমানের কথা তুলে দাঙ্গা হাঙ্গামা বাধানোও বিচিত্র নয়। বাংলাদেশ সরকার বলেছে এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা কূটনীতির ভাষা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে আসামে গোলযোগ হলেই মানুষের স্রোত নামবে বাংলাদেশের দিকে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের একের পর এক মিথ্যাচারের স্বরূপ: পর্ব-দুই

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮মে ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর চুক্তিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহুবার পরমাণু সমঝোতাকে এক ধরনের মিথ্যাচার ও সবচেয়ে খারাপ চুক্তি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি শুধু যে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গেছেন তাই নয় একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধেও নানা অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতাকে 'বিপর্যয়' অভিহিত করে বলেছেন, "এ চুক্তির কল্যাণে ইরান এ পর্যন্ত কোটি কোটি নগদ ডলার ফিরে পেয়েছে।" এটা ঠিক যে পরমাণু সমঝোতার কারণে ইরানের হাতে এসব অর্থ হস্তগত হয়েছে। তবে এসব অর্থ ইরানের নিজস্ব এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব ডলার এতদিন বিদেশে আটকে ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, পরমাণু সমঝোতার পর ইরান ১৫ হাজার কোটি ডলার ফেরত পেয়েছে অথচ তার এ সংক্রান্ত বক্তব্য ভিত্তিহীন। কারণ পরমাণু সমঝোতা অনুযায়ী বিদেশের ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা অর্থের মধ্যে ইরান প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার দেশে ফেরত আনতে পারবে। ইরান এ পর্যন্ত তিন হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার ৫০০ কোটি ডলার ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে। এসব অর্থ ছিল ইরানের তেল বিক্রি বাবদ পাওনা টাকা। এ ছাড়া, ইরানে ইসলামি বিপ্লবের আগে রেজা শাহের শাসনামলে আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য ৪০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর আমেরিকা সেই অর্থ আর ইরানকে ফেরত দেয়নি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ২০০৯ সালের মার্চে বলেছিলেন, "সাবেক স্বৈরাচারী শাহ সরকার আমেরিকার কাছ থেকে বিমান, হেলিকপ্টারসহ অন্যান্য অস্ত্রসস্ত্র কেনার জন্য অগ্রিম প্রচুর অর্থ দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর অর্ডার দেয়া ওইসব অস্ত্রের বেশ কিছু অংশ তৈরি হলেও আমেরিকা তা ইরানকে হস্তান্তর করেনি, অর্থও ফেরত দেয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে প্রস্তুতকৃত এসব অস্ত্র গুদামে সংরক্ষণের ব্যয়ভারও ইরানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়।"
যাইহোক, ওই ঘটনার বহু বছর পর পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন ও ইরানের পক্ষ থেকে আস্থা অর্জনের জন্য তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এক বিবৃতিতে ইরানের সঙ্গে এ সংক্রান্ত বিতর্ক নিরসনের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছে। কথা ছিল আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কেনা বাবদ পরিশোধকৃত ৪০ কোটি ডলার সুদসহ ইরানকে ফেরত দেয়া হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মিথ্যাচারিতার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, তিনি দাবি করেছেন, ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে পরমাণু সমঝোতার পর ইরান সরকার সামরিক খাতে বাজেট ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে। গত ৮মে পরমাণু সমঝোতা থেকে তিনি যেদিন বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন সেদিনই ইরানের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তোলেন। এরপর ১২ তারিখে এক টুইট বার্তায় তিনি একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন। অথচ স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ সেন্টার সংক্ষেপে 'সিপ্রি'র এক প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সংক্রান্ত দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। সিপ্রি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা বাজেটের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য সঠিক নয়। গত তিন বছরে অর্থাৎ ২০১৫ সালে পরমাণু সমঝোতা হওয়ার পর ইরানের সামরিক বাজেট মাত্র ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অথচ প্রতিবেশী অন্য আরব দেশের সামরিক বাজেটের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে সামরিক খাতে ইরানের বাজেটের পরিমাণ অনেক কম। আরব দেশগুলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্রের ক্রেতা। সৌদি আরব গত বছর আমেরিকার সঙ্গে ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি সেনাদের সামরিক অস্ত্র ব্যবহারের যোগ্যতা খুব একটা নেই।
রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভিক্টোর মোরাকোভস্কি মনে করেন, "সৌদি সেনাবাহিনী বহু বছর আগে থেকে আমেরিকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হলেও স্থল যুদ্ধ করার মতো প্রস্তুতি তাদের নেই আর বিমান কিংবা সমুদ্র পথে যুদ্ধতো দূরের কথা। কারণ এ দুই যুদ্ধের কারিগরি জ্ঞান ও প্রস্তুতি কোনটিই তাদের নেই।"
এর বিপরীতে ইরান সামরিক ক্ষেত্রে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং কোনো দিক দিয়েই ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের তুলনা চলে না। অথচ সৌদি আরবের তুলনায় সামরিক খাতে ইরানের ব্যয় খুবই কম। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটস্‌ এ ব্যাপারে বলেছেন, "নিঃসন্দেহে ইরান সামরিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।"  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যাচারিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদের প্রতি ইরানের সমর্থনের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, "ইরান সন্ত্রাসীদের প্রতি সমর্থন দেয়া ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকবলিত এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।" তিনি বলেন, "হিজবুল্লাহ, হামাস, তালেবান ও আল কায়দার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন রয়েছে।"
বাস্তবতা হচ্ছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেই বড় ধরণের সন্ত্রাসবাদের শিকার। ১৯৮০'র দশকের শুরু থেকে আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো ইরান বিরোধী সন্ত্রাসী মোনাফেকিন গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছে। সন্ত্রাসী মোনাফেকিনরা ইরানের বহু কর্মকর্তাসহ ১৫ হাজারের বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। এখনো ইরানবিরোধী সন্ত্রাসী এই গোষ্ঠীর সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্যের স্বার্থে তারা কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে করে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসীদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এর আগে আমেরিকা আফগানিস্তানে আল কায়দা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে গড়ে তুলেছিল। আমেরিকা ও তাদের আরব মিত্ররা ইরাক ও সিরিয়ায় উগ্র সন্ত্রাসীদের মোকাবেলার পরিবর্তে তাদের প্রতি সমর্থন যোগাচ্ছে। এইসব সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে এ দুই দেশের লাখ লাখ মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হয়েছে। অথচ ইরান বিশ্বের নির্যাতিত জনগোষ্ঠী ও মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো প্রতিরোধকামী শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমেরিকা ইরানকে সন্ত্রাসীদের সমর্থক বলে প্রচার চালাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মিথ্যাচারিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে তিনি ইরানের জনগণের প্রতি সমর্থন ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, "মার্কিন জনগণ ইরানের জনগণের পাশে রয়েছে।" অথচ এর আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি ইরানের জনগণকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ২০১৭ সালে হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের জনগণকে সন্ত্রাসী জাতি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি ইরানের জনগণের পাশে থাকার যে দাবি করেছেন তা ডাহা মিথ্যা।

কেমন আছেন বাসচাপায় আহতরা by নূর মোহাম্মদ

বড় হয়ে সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্নটি শৈশব থেকে লালন করতো মেহেদী হাসান সাগর। স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল মেহেদী। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ভর্তি হয়েছিল ঢাকা সেনানিবাস এলাকার অবস্থিত শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় চুরমার হয়ে গেছে তার সব স্বপ্ন। বিমানবন্দর রোডে দুর্ঘটনায় হারাতে বসেছে বাম চোখ। তার স্বজনরা জানিয়েছে, হাসপাতালের বেডে শুধু একটি কথাই বলছে সাগর। ‘আমি আর্মি অফিসার হতে পারবো তো?’ ডাক্তারদের কাছে একই কথা জানতে চাইছে বারবার। একই কলেজের শিক্ষার্থী নাইম রহমানের স্বপ্ন ছিল বিমানের পাইলট হওয়ার। দুর্ঘটনায় নাইমের স্বপ্নও চুরমার হওয়ার পথে। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে সে। অতীতের অনেক কিছু মনে করতে পারছে না নাইম। তার বাবা জানান, ওই দিনের ঘটনার পর অতীতের অনেক কিছু মনে করতে পারছে না তার ছেলে। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকে বিমানের পাইলট হওয়ার স্বপ্ন লালন করতো নাঈম। ছেলে স্বাভাবিক হবে কী নাÑ তা নিয়েই এখন আমি শঙ্কিত। সড়ক দুর্ঘটনার পর শুধু সাগর বা নাইমই নয়, আহত ১০ জন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এখন অধরা। অনেকেরই হাত ভেঙে গেছে, চোখ নষ্টসহ শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ওই দিনের ঘটনায় রমিজ উদ্দিন কলেজের ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আরো উন্নত চিকিৎসার কথা ভাবা হচ্ছে। তিনজনকে বাসায় পাঠানো হলেও বাকিদের অবস্থা স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগবে। ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, আহত দশজনের মধ্যে অন্যতম একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী রুবাইয়া আক্তার। দুর্ঘটনায় তার বাম কাঁধ ভেঙে গেছে। আঘাত লেগেছে পাঁজরে। তার অবস্থা গুরুতর না হলেও সিএমএইচে চিকিৎসাধীন। আরেকজন শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী দাস। ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির এ ছাত্রীর বাসা ভাটারা। কলেজ শেষে প্রতিদিন জাবালে নূর বাসেই আসা-যাওয়া করতো। তার বড় ভাই রাজন মানবজমিনকে বলেন, ওই দিন বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল তৃষ্ণা। বাস যখন ফুটপাথে উঠে যায় তখন তৃষ্ণা ছিল সবার সামনে। বাসের ধাক্কায় তার ডান হাত ভেঙে গেছে। হাতে অপারেশন হলেও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছে না। তার ভাই জানান, গতকাল আবার এক্স-রে করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অবস্থা উন্নতি হলে তাকে রিলিজ দেয়া হবে। একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নাইম রহমানের অবস্থা খুবই গুরুতর। গুরুতর আঘাত লেগেছে তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে। প্রথম দিকে প্রতিদিন বমি করতো। এখন একটু স্বাভাবিক হলেও অতীতের অনেক কথা মনে করতে পারছে না নাইম। তার বাবা বদরুল আলম মানবজমিনকে বলেন, নাইম খুবই মেধাবী। ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে মেধা কোটায় বৃত্তি পেয়েছে। আর এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। বিমানের পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। এ আঘাতের পর এ স্বপ্ন অনেকটা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। নাইম ছোট বেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রচুর মনযোগী ছিল। কোরআনের হাফেজ হওয়ার পর ৫ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় নাইম। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ভর্তি হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। তার বাবা বলেন, ভাটারা আসার জন্য ঘটনার দিন এমইএস বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। এরপর কি হয়েছে তা এখন আর বলতে পারছে না। প্রথম দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতো। এখন কথা বললেও ওইদিন কী হয়েছিল তা বলতে পারছে না। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তার স্মৃতিশক্তি লোপ হয়েছে কী তা এখন আমরা বলতে পারছি না। বদরুল আলম বলেন, আমি স্থানীয় একটি মসজিদে মাত্র ৭ হাজার টাকার বেতনে চাকরি করি। এ অল্প টাকায় বেতন দিয়ে ৫ সন্তানের লালন পালন, সংসার চালাই। পড়াশোনায় ভালো বলে কষ্ট করে হলেও চালিয়ে যেতে বলেছি। এখন এ দুর্ঘটনায় তার স্বপ্ন মাঠিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম।
একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান সাগর। ওই দিন ক্লাস শেষে আশকোনা বাসায় ফেরার জন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার ভাই মো. সোলায়মান বলেন, বাসটি যখন গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সামনে গ্লাস ভেঙে সাগরের মুখের মধ্যে পড়ে। তাৎক্ষণিক মুখের অনেক অংশ কেটে যায়। এরপর চোখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। হাসপাতাল নেয়ার পর তার চোখে গ্লাস ঢুকেছে বলে ডাক্তাররা জানান। ডান চোখ শঙ্কামুক্ত হলেও তার বাম চোখের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাম চোখের ইতিমধ্যে অপারেশন করা হয়েছে। ৮টি সেলাই লেগেছে। সে শঙ্কামুক্ত নয় বলেও জানিয়েছেন ডাক্তাররা। ২০ দিন পর্যবেক্ষণের পর তার সেলাই কাটা হবে। তারপর বুঝা যাবে তার চোখের কী অবস্থা। সাগরের ভাই জানান, ছোটবেলা থেকে সাগরের সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সে বাবা মার কাছে প্রায়ই এ স্বপ্নের কথা বলতো। এমনকি হাসপাতালে বেডেও ডাক্তারদের কাছে তার স্বপ্নের কথা বলেছে। চোখের অপারেশন হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে চাকরি পাওয়া যাবে কী ডাক্তারদের কাছে বারবার জানতে চাইছিল।
সিএমএইচে চিকিৎসাধীন জয়ন্তী রানী দাস ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তার অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস। তার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সে সিএমএইচের এইডিও-তে আছে। তার মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর রক্ত বের হচ্ছিল। তার মাথায় অপারেশন করা হলেও এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। একাদশ শ্রেণির ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের ছাত্র সজিব শেখের বাসা রাজধানীর ভাটারা। বাসের ধাক্কায় ভেঙে গেছে তার বাম হাত। সেও সিএমএইচে চিকিৎসাধীন আছে। তার বাম হাতে অপারেশন হয়েছে। একই বিভাগের ছাত্র রাহাতের বাম হাত ভেঙে গেছে। তার হাতে ব্যান্ডেজ দেয়া হয়েছে। মানবিক বিভাগের ছাত্র ইমন চৌধুরী শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পেয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেয়া হয়েছে। একই বিভাগের ছাত্র সোহেল রানাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার সার্বিক অবস্থা নিয়ে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের অধ্যক্ষ নূর নাহার ইয়াসমিন মানবজমিনকে বলেন, ওই দিনের ঘটনার পর ১০ জন গুরুতর আহত হওয়ার পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। এরমধ্যে ৩ জনকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। বাকি ৭ জনের মধ্যে তিনজনের অপারেশন হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছে, সবাই এখন আশঙ্কামুক্ত, কিছুদিনের মধ্যে বাকিরা বাসায় ফিরে যেতে পারবে।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাসপোর্ট, শীর্ষে জাপান-সিঙ্গাপুর

দেশের বাইরে বেড়াতে বা অন্য কোনও উদ্দেশে গেলে প্রথমেই দরকার হয় পাসপোর্ট। এক দেশের নাগরিকের অন্য দেশে যাওয়ার বেলায় এটাই সবচেয়ে জরুরি জিনিস। পাসপোর্টে নাগরিকের সংক্ষিপ্ত তথ্যগুলো থাকে। এতেই যুক্ত করে দেওয়া হয় ভ্রমণের অনুমতি অর্থাৎ ভিসা। তবে কিছু দেশের পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন অনেক দেশে।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাসপোর্ট কোন কোন দেশের, সেই তালিকা দেখা যায় হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের র‌্যাংকিংয়ে। এটি তৈরি করেছে হেনলি অ্যান্ড পার্টনারস নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব দেশের পাসপোর্ট অন্যান্য দেশের চেয়ে ভ্রমণে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেয়।
২০১৮ সালে এশিয়ার জাপান ও সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষমতাধর পাসপোর্টের স্বীকৃতি পেয়েছে। এ দুটি দেশের পাসপোর্টধারীরা ১৮০টি দেশে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন অনায়াসে। শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে এ দুটি দেশের পরিচিতি দুনিয়াজোড়া।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাপান ও সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভিসার প্রয়োজনীয়তা তুলে নিয়েছে উজবেকিস্তান। গত বছর প্যারাগুয়েও সিঙ্গাপুরের পাসপোর্টধারীদের জন্য সেই দেশে ভ্রমণ উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
জাপান ও সিঙ্গাপুরের কাছে হেরে র‌্যাংকিংয়ে দুই নম্বরে আছে জার্মানি। এই দেশের পাসপোর্টধারীরা ১৭৯টি দেশে অবাধে যেতে পারেন।
র‌্যাংকিংয়ে তিন নম্বরে ইউরোপের ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও সুইডেনের পাশাপাশি রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা ১৭৮টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াও উন্নতি করেছে। ২০১৮ সালের তালিকায় এই দেশ আছে ১১ নম্বরে। তাদের পাসপোর্টধারীরা ১৬৯টি দেশে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন।
সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে র‌্যাংকিংয়ে পাঁচ নম্বরে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা ১৭৬টি দেশে যেতে পারেন ভিসা ছাড়া। যদিও সম্প্রতি তুরস্ক মার্কিন নাগরিকদের বেলায় ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। র‌্যাংকিংয়ে তিন ধাপ ওপরে উঠে রাশিয়া ৪৫তম, ইউক্রেন ৪২তম ও জর্জিয়া ৫৪ নম্বরে রয়েছে।
র‌্যাংকিংয়ে সবচেয়ে নিচে আছে আফগানিস্তান (২৪)। কম গতিশীল পাসপোর্টের মধ্যে রয়েছে ইরাক (২৭), সিরিয়া (২৮), পাকিস্তান (৩০) ও সোমালিয়া (৩২)।
হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের র‌্যাংকিং
১. জাপান, সিঙ্গাপুর (১৮০টি দেশ ভিসামুক্ত)
২. জার্মানি (১৭৯টি দেশ ভিসামুক্ত)
৩. ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া (১৭৮টি দেশ ভিসামুক্ত)
৪. নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, লুক্সেমবুর্গ, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল (১৭৭টি দেশ ভিসামুক্ত)
৫. সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা (১৭৬টি দেশ ভিসামুক্ত)
৬. বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস (১৭৪টি দেশ ভিসামুক্ত)
৭. নিউজিল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, মাল্টা (১৭৩টি দেশ ভিসামুক্ত)
৮. আইসল্যান্ড (১৭২টি দেশ ভিসামুক্ত)
৯. হাঙ্গেরি (১৭১টি দেশ ভিসামুক্ত)
১০. লাটভিয়া (১৭০টি দেশ ভিসামুক্ত)
সূত্র: সিএনএন

ইরানের বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধে ট্রামেপর সাবধান হওয়া দরকার

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার টুইটবার্তায় ক্রমাগত ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে আক্রমণ করে যাচ্ছেন। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এখন যেকোনো সময়ের থেকে খারাপ। তার মধ্যে তিনি এ অবস্থাকে একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কেউ কেউ হয়ত বলছেন, এটা ডনাল্ড ট্রাম্পের স্বাভাবিক তর্জন-গর্জন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যেরকম যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তার শেষটা কিন্তু ততটাই শান্তিপূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সাবধান হওয়া উচিত। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উস্কে দেয়া হতে পারে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সব থেকে বড় ভুল।
ডনাল্ড ট্রাম্প প্রথমেই ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিলে তার পরিণাম ভালো হবে না। কিন্তু এরপরই বরাবরের মতো তার বিদেশনীতি অনুসরণ করে তিনি উল্টো পথে চলতে শুরু করলেন। এখন তিনি রুহানির সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাচ্ছেন। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে তিনি যে গেইম খেলেছেন, একই গেইম ইরানের সঙ্গেও খেলতে চান। কিন্তু উত্তর কোরিয়া ও ইরানকে একইরকম ভাবলে ভুল করবেন তিনি। ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে যা হয়েছে সেটা ইরানের সঙ্গে বাকযুদ্ধ থেকে একেবারেই আলাদা।
প্রথমত, ১৯৭৯ সালে ইরানের শাহের পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক সবসময়ই খারাপ ছিল। ইরানের বর্তমান ইসলামপন্থি সরকার সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূল হয়ে ছিল। ইরান নিজেকে যুদ্ধের জন্য এক প্রকার প্রস্তুত করেই রেখেছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র অন্যসব দেশের থেকে ইরানের প্রতি দীর্ঘকাল ধরেই অধিক নজর রেখে আসছে। বর্তমানে দেশটি ইরানের উপর চাপ বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তারই অংশ হিসেবে মে মাসে ইরানের সঙ্গে থাকা পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে অবরোধ আরোপ করেছে ইরানের উপর এবং আরো অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। ইরানকে কোণঠাসা করে ফেললে তারাও যেকোনো উপায়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালাবেই। তা ছাড়া, উত্তর কোরিয়াকে কটাক্ষ করে যেসব টুইট ট্রাম্প করেছেন তা ছিল নিছক এক বাকযুদ্ধ। কিন্তু ইরানকে উদ্দেশ্য করে লেখা টুইট বার্তাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের উপর নতুন করে চাপ বাড়াতেই ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হয়ত ওবামার সময়ের থেকেও ইরানের সঙ্গে একটি ভালো চুক্তি করতে চাচ্ছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র অধিক লাভবান হবে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের এরকম একটা পদক্ষেপের বিপরীতে ইরান তখন খুবই মৃদু প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। একইসঙ্গে, দেশটি এখনো চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে চাইছে।  যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত ইসরাইল ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করছে। এ দেশ দুটি ইরানকে নিজেদের জন্য সবথেকে বড় হুমকি মনে করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হুমকি ইরানকেও এ বাকযুদ্ধে টেনে এনেছে। ইরানও পালটা জবাবে বলেছে, সিংহের লেজ নিয়ে খেলবেন না। ইতিমধ্যে দেশটি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান বলেছে, ইরান যদি তেল রপ্তানি করতে না পারে তাহলে অন্য কেউও পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে থামাতে এক ধরনের পরিকল্পিত প্রতিরোধের পথে আগাচ্ছে ইরান। এখানেই উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মধ্যে আসল পার্থক্য। কিন্তু এত কিছুর পরেও ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায়? ট্রাম্প যথেষ্ট বুদ্ধিমান হলে কখনোই এ ভুল করবেন না। এর কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এখন একদম একা। এ যুদ্ধে কাউকেই পাশে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই দেশটির।
ইউরোপের উপর নির্ভর করার সুযোগ নেই
বুশ জুনিয়র যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন শুধু টেবিলে বসে আলোচনা করেই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। কিন্তু দিনদিন এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধেই ইউরোপ নিশ্চিতভাবে নিজেকে জড়াবে না। ইরানকে থামাতে শুধু অবরোধই যথেষ্ট না এটা যুক্তরাষ্ট্র কিছু দিনের মধ্যেই বুঝবে। যদি যুদ্ধের প্রয়োজন হয় তখন তাকে একাই এ যুদ্ধটা করতে হবে। ইরান চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয়ান মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে খারাপ প্রভাব পড়েছে।
এদিকে, বৈঠকে বসার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানের পরেও রুহানি ইউরোপীয় দেশগুলোকে বলছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোও যেন প্রচার করে যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে ইরানচুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। এরকম অবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই আশা করতে পারে না ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলো তাকে সাহায্য করবে। এর পরিবর্তে ট্রাম্প সরকার সৌদি আরব ও ইসরাইলের সহযোগিতা চাচ্ছে। বর্তমানে এ দেশ দুটিই তার সবথেকে বড় মিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।
রাশিয়ার অনাগ্রহ
এ অঞ্চলের কোনো যুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রহ না থাকার কোনো কারণ নেই। কিন্তু একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গেইম খেলার কোনো ইচ্ছে যে রাশিয়ার নেই তা স্পষ্ট। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি সেনাদের অবস্থানকে বৈধ প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছেন। সেখানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া-ইরান সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করছে। ইরান এখন রাশিয়ার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের একটি। তাছাড়া নিজের দক্ষিণ সীমান্তে যুদ্ধ দেখার কোনো ইচ্ছে রাশিয়ার নেই। দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানের সঙ্গে চমৎকার কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে রাশিয়ার। রাশিয়া ভালো করেই জানে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন কোনো যুদ্ধ এ অঞ্চলে তার প্রভাবকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপে রাশিয়া ইরানের পক্ষেই অবস্থান নেবে সেটা নিশ্চিত।
সিরিয়াতে ট্রাম্প রাশিয়ার উপরে নির্ভরশীল
গত কয়েকদিনে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে সিরিয়াতে রাশিয়ার উপর নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে তারা সেখানে ইসলামিক স্টেটকে ছেড়ে ইরানকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ইরানি সেনাবাহিনীকে গোলান হাইটস তথা সিরিয়ার দক্ষিণ থেকে দূরে রাখতে রাশিয়ার সাহায্য চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যাতে ইরান ও লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হেজবুল্লাহর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ সৃষ্টি না হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ক্ষেত্রেই রাশিয়ার সঙ্গে আপস  করতে হচ্ছে। রাশিয়াও এ অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। ইসরাইলসহ সিরিয়া যুদ্ধের সব পক্ষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছে। রাশিয়ার এ ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য বেশ অসুবিধাজনক হবে। কিন্তু এতসব সমস্যার মানে এই না যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হুমকি দেয়া বন্ধ করবে। যদিও ইতিমধ্যে তারা নিঃশর্তভাবে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছে। ডনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টারা সবাই দীর্ঘকাল ধরেই ইরানবিরোধী আমলা। একইসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরাইল ও সৌদি আরব উভয়ই ইরানকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সবথেকে বড় হুমকি মনে করে। কিন্তু এসবের বাইরেও ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করায় আগ্রহ রয়েছে ডনাল্ড ট্রাম্পের। গণমাধ্যমে নিজের প্রচারণা চালানোটাও তার আগ্রহের বাইরে নয়। ইরানের বিরুদ্ধে দেয়া হুমকিগুলো যদি যুদ্ধে রূপান্তরিত হয় তাহলে ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য নোবেল জয় অসম্ভব হয়ে উঠবে। তিনি হুমকি ও সমালোচনায় পটু। তবে ইতিমধ্যে তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে বাকযুদ্ধ তীব্র রূপ ধারণ করলেও সফলভাবে শান্তি আলোচনা করতে পারেন তিনি। উত্তর কোরিয়া কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান জিন ক্লাউডি জানকারের সঙ্গে বৈঠকই তার সবথেকে বড় প্রমাণ। তাই, ইরানের সঙ্গেও তিনি শান্তি আলোচনায় সমর্থ হবেন, তার এরকম ভাবনার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কিন্তু ভয়টা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে বাকযুদ্ধ ইতিমধ্যে অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে। অন্য সমস্যাগুলোর মত ইরান এত সহজ পক্ষ না। আলোচনায় বসার আগে ইরানের পূর্বশর্ত রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার একাধিক সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ ইরানকে ভেতর থেকে অনেক আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু সবকিছুর পূর্বে ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের কথা শুনতে হবে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আগে অবশ্যই সাবধান হওয়া দরকার তার।
(আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)

ইয়েমেনে সৌদি জোটের বিমান হামলায় নিহত ৫৫

সৌদি আরব ও আরব আমিরাত জোটের বিমান হামলায় ইয়েমেনে নারী ও শিশুসহ কমপক্ষে ৫৫ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১২৪ জন। হুতি বিদ্রোহী পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা।
খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের হোদেইদাহ নামক শহরের লোহিত সাগরের একটি সমুদ্রবন্দরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। শহরটির আল-থাওরা হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য পরিবহন বন্দরকে লক্ষ্য করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালালে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। তবে চীনের বার্তা সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, হামলায় মৃতের সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়েছে।
হুতি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাহা আল-মুতাওয়াকিল জানিয়েছেন, আহতের সংখ্যা এত বেশি যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সকলের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। পুনরায় বিমান হামলার ভয়ে অ্যাম্বুলেন্সগুলো আহতের রাজধানী সানা কিংবা আশেপাশের কোনো শহরে নিয়ে যেতে পারছে না। আন্তর্জাতিক রেডক্রস পরিচালিত আল-থাওরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের পক্ষে ৫০ জনের বেশি চিকিৎসা দেয়া সম্ভব না। শুধুমাত্র গুরুতর আহতদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অন্যদের দ্রুত রাজধানী সানায় নিয়ে যেতে হবে। হুতি পরিচালিত সংবাদ সংস্থা সাবাকে মুতাওয়াকিল বলেছেন, হোদেইদা হতে আরব জোট যা করেছে তা জঘন্যতম অপরাধ। এ হত্যাকাণ্ডের দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রকেও নিতে হবে।
২০১৫ সালের মার্চ থেকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসছে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। তারা ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবু-রাব্বু মনসুর হাদিকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে দেশ দুটিকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের হামলায় ইয়েমেনে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ১০,০০০ জন। একই সঙ্গে, সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের কারণে অনাহারে আরো লক্ষাধিক শিশু মারা গেছে।

মানববন্ধনে পুরো পরিবার: সড়ক দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো মায়ের আকুতি

আমার ছেলে ঘরে ফিরবে। মা বলে ডাক দিয়ে বলবে খাবার দাও। বায়না ধরবে মোটরসাইকেল কিনে না দিলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব না। আমি এখনো সেই অপেক্ষায় আছি। আমার ছেলে কখন ফিরবে। কান্না করতে করতে এখন আর আমার চোখে পানি নাই সব শুকিয়ে গেছে। চোখে শুধুই অন্ধকার দেখি। আমার যেন সব শেষ হয়ে গেছে। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব। অশ্রুসজল কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক সন্তানের মা। চলতি বছরের ২রা জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস টেকনোলজি (বিইউবিটি) বিবিএ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সৈয়দ মাসুদ রানাকে (২৫) মিরপুর ঈদগাহ ময়দানের পুলিশ বক্সের সামনে একটি বাসচাপা দেয়। পরে মাসুদ ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যখন দেশ উত্তাল তখন গণদাবি হিসেবে অনেকেই বাসচাপায় সন্তান হারানোর বিচার চাইছে। তারই ধারাবাহিকতায় 
ছেলে হত্যার বিচারের দাবিতে গতকাল মাসুদের মা-বাবা ও স্বজনরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন।
মানববন্ধনে নিহত মাসুদের মা সৈয়দা খোরশেদা বেগম বলেন, আজ আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাইতে এখানে এসেছি। আমার ছেলেকে বাসচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমার বুকটাকে যারা খালি করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমার মতো যেন আর কারো বুক খালি না হয়। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অনুরোধ জানাই আমার ছেলে হত্যার যেন বিচার হয়। খোরশেদা বেগম বলেন,  ঘটনার দিন আমি ঘুমে ছিলাম। আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। দুপুরের দিকে খবর পাই আমার ছেলে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। আমার বিশ্বাস হয়নি সে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। কারণ তার কোনো মোটরসাইকেল নাই। সে অ্যাক্সিডেন্ট করতে পারে না। তখন ছোট ছেলেকে নিয়ে আমি হাসপাতালে যাই। গিয়ে দেখি আমার কলিজার টুকরার মরদেহ সেখানে পড়ে আছে। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনি সে মরে গেছে। তখন মনে হয়েছিল আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কথা না বলে আমার ছেলে চলে যাবে এটা কখনো ভাবতে পারি নাই। তরতাজা ছেলেকে হারানোর শোক আমি কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছি না। বার বার মনে হচ্ছে মাসুদ ফিরে আসবে। এসে বলবে মা আমাকে খাবার দাও। আমাকে মোটরসাইকেল কিনে দাও। খোরশেদা বলেন, একটি মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার জন্য সে আমাকে অনেক অনুরোধ করতো। অ্যাক্সিডেন্ট করবে ভেবে কিনে দিতাম না। এজন্য সে অনেক রাগ করতো। দুর্ঘটনার আগের দিন তার এক বন্ধুকে বলেছিল। আম্মুকে না বলে ভার্সিটি চলে যাব। এসে বলব আমি ভার্সিটি থেকে এসেছি। এজন্য সত্যিই সত্যিই ওইদিন আর আমাকে বলে যায়নি।
খোরশেদা বেগম আরো বলেন, অনেক কষ্ট করেও যখন শোক কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না তখন শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে সেই শোক আরো বেশি প্রখর হয়ে গেল। হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে তখন আর ঘরে থাকতে পারলাম না। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আমার ছেলের বিচার চাইতে আজ মানববন্ধনে এসেছি। আমি চাই আমার ছেলেসহ বাসচাপায় নিহত সব মানুষের বিচার হোক। তিনি বলেন আমার স্বামী সৈয়দ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর একজন ব্যবসায়ী আর ছেলে গোলাম রাব্বী নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি শিক্ষার্থী ও মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস দুলন আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী। ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে আমার সুখের সংসার ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সব এলোমেলো হয়ে গেল।

বাস চালান কারা?

ঢাকার রাস্তায় বা দূরপাল্লার রুটে বাস যারা চালান, তারা কারা? কতটুকু তাদের প্রশিক্ষণ, কি তাদের মানসিকতা? তাদের অবস্থান থেকে বাস চালানোর অভিজ্ঞতা. ঝুঁকি, সুবিধা-অসুবিধাগুলোই বা কেমন?
একটা ধারণা পেতে সকাল নয়টায় গেলাম আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড। এই বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকায় অন্তত আটটি রুটে ৩০টিরও বেশি বাস চলাচল করে।
অফিস এবং স্কুল কলেজের সময়, তাই সবারই তাড়া, সবাই চান বাসে একটি কাঙ্ক্ষিত আসন পেতে, না পেলে দাঁড়িয়েই যেতে হবে। বাসের চালক এবং সহকারী - প্রচলিত ভাষায় যাদের হেল্পার বলা হয় - তারা সমানে চেষ্টা করছে গাড়ীতে যত বেশি পারা যায় তত যাত্রী ওঠানোর।
আমি একটি বাসে উঠলাম। গন্তব্য মিরপুর ১৪ নম্বর - যেখানে বাসগুলো সব যেয়ে থামে এবং সেখানে আছে ঢাকার আরেকটি বড় বাসস্ট্যান্ড।
মিরপুর ১৪ নম্বর পৌঁছাতে লেগে গেল দু' ঘণ্টার বেশি সময় । বাস থামার পর দেখলাম ছাড়ার অপেক্ষায় আছে আরো কিছু বাস, যাদের চালকরা বসে আছেন।
তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কেউ কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না।
'অনেক সময় ভুল হইয়া যায়, মাথা ঠিক থাকে না'
অবশেষে একজন চালক আমার সাথে কথা বলতে রাজি হলেন। গত ১২ বছর ধরে তিনি এই ঢাকা শহরে বিভিন্ন রুটে বাস চালাচ্ছেন।
"রাস্তার অবস্থাতো ভয়ংকর খারাপ, রাস্তা ভাঙা, তার পর আছে যানজট" - শুরুতেই তার কথা।
প্রশ্ন করলাম, এসব কারণেই কি অ্যাকসিডেন্ট হয়?
"অনেক সময় অন্য গাড়ী চাপায়া দেয়, অনেক সময় ভুল হইয়া যায় গা" - স্বীকার করলেন তিনি
কী ধরণের ভুল হয়? জানতে চাইলাম।
"একদিকে গাড়ী আসলে আরেকদিক চাপায় দেয়, আবার আরেকদিক দিয়ে গাড়ী চলে, মাথা ঠিক থাকে না ।"
চালকদের আরো নানা সমস্যার কথা বললেন তিনি।
"অনেক জন আছে, সিগনাল মানে না। নতুন আইছে ঢাকা শহরে, বেতাল হয়ে চলে।"
জানতে চাইলাম, "সিগনাল মানে না বলছেন, কিন্তু তারা কি বাস চালানো শিখে আসে না?"
তিনি বললেন, "প্যাসেঞ্জারের চাপ থাকে, প্যাসেঞ্জার বলে এমনে যা, অমনে যা।"
প্যাসেঞ্জার কেন বলবে? সব গাড়ীর একটা নির্দিষ্ট রুট তো আছে - জানতে চাই।
তার জবাব - "প্যাসেঞ্জারের সাথে ঝামেলা হয়। মারধর করে। আবার অনেক রকম ডিস্টার্ব আছে। ওস্তাদের কাছ খেকে শিখে আসে। কোন ভদ্রতা জানে না, রাস্তার নিয়ম কানুন অনেক সময় জানে না।"
এই চালকের সাথে কথা বলতে বলতেই তার গাড়ী যাত্রীতে ভরে গেল। আর কথা বাড়ানোর সুযোগ থাকলো না।
বাসচালকদের মনে কাজ করে 'যত বেশি সম্ভব ট্রিপ মারার' চাপ
বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে গড়ে প্রায় প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, কিন্তু কিছু ঘটনা থেকে রীতিমত চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় মিলছে।
সব ছাপিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে: যে চালকরা রাস্তায় নানা ধরণের পরিবহন-যান চালাচ্ছেন তাদের মনোজাগতিক অবস্থা নিয়ে।
বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট বলছে, "বাস চালকরা ট্রিপ ভিত্তিক গাড়ী চালায়। অর্থাৎ যত বেশি ট্রিপ তত বেশি টাকা। এটা তাদের ওপর মানসিক একটা চাপ তৈরি করে।"
"কারণ, দিন শেষে ঐসব মালিকদের সাথে চুক্তিমত নির্দিষ্ট অংকের টাকা তাকে বুঝিয়ে দিতেই হয়। সেক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসেবটা আসে পরে।"
শুধু রাজধানী ঢাকা শহরে ৩০০ রুটে যানবাহন চলাচল করছে। এসব গণ-পরিবহনের সংখ্যা ৫ হাজার, তার মালিকের সংখ্যা ৪ হাজার। এসব মালিকদের মধ্যে আবার ভাগ রয়েছে।
বিশ্রামহীনতা, ক্লান্তি, চাপ, মানসিক অসুস্থতা
অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের শিক্ষক কাজী মো.সাইফুন নেওয়াজ বলছিলেন, দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন একজন বাসচালকের ওপর কতটা চাপ থাকে।
একজন চালকের মানসিক অবস্থাকে এভাবে বিশ্লেষণ করছিলেন তিনি। বলছিলেন- "গাড়ীতে ওঠার আগে দেখা যায় তার পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেই, ১৪/১৫ ঘণ্টা একটানা গাড়ী চালিয়েছে সে আগের দিন। আবার মালিক বলে দিচ্ছে 'জমার' এত টাকা দিতে হবে।"
"অর্থাৎ, গাড়ী স্টার্ট করার আগেই সে একটা প্রেশারের মধ্যে পড়ে যায়। এরপর একটানা গাড়ী চালানোর ফলে তারমধ্যে 'ফেটিগ' বা ক্লান্তি চলে আসে, ফলে তারমধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই দেখা দেয় মানসিক অসুস্থতা ।"
চালকদের মাদকাসক্তি বড় রকমের সমস্যা
ঢাকার মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড। এখানে একটি মুদি দোকান চালান মো. সোলাইমান। প্রায় ১৫ বছর বাস চালিয়েছেন।
কিন্তু এখন তিনি আর চালকের বসতে চাননা। কারণ কী?
তিনি বলছিলেন "দেখেন, এরা সকাল বেলা 'নেশা করে' গাড়ী চালানো শুরু করে। কোন নিয়ম-কানুন জানে না, শুধু প্রতিযোগিতা। কাউকে ছাড় দেবে না, ভদ্রতা নেই। কেউ যদি ইমার্জেন্সি লাইট দেয় তাহলেও তাকে সাইড দেয় না।"
"এরা হেল্পার থেকে ড্রাইভার হচ্ছে। বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ী চালাচ্ছে টাকা দিয়ে। ওদের মনমানসিকতাই নেই কারণ ওরা যে পরিবেশে থাকে সব ড্রাইভার, হেলপারদের সাথে।"
"আমি এখন এই সেক্টর থেকে চলে আইছি, কারণ আমি পারি না আর এসব সহ্য করতে" - বললেন তিনি।
গত মে মাসে ঢাকায় পরিবহন মালিকদের সংগঠন বলেছিল, ঢাকা শহরের পরিবহন শ্রমিকদের প্রায় ৫০% মাদক সেবন করে।
এর মধ্যে বেশির ভাগই আবার ইয়াবা খাচ্ছে। এই তথ্যের সাথে একমত হয়েছে অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটও। এটাও তাদের মানসিক বিকাশে চরম বাধাগ্রস্ত করছে বলে তারা জানাচ্ছে।
অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট বলছে, "যখন রাস্তায় গাড়ী কোন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে - তখন নেশার কারণে কয়েক মুহূর্তের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে না এসব চালকদের। এর পরিণতি অবধারিত দুর্ঘটনা।"
'পাবলিকেরও একটু সতর্ক থাকতে হবে'
আমি কথা বলেছি দুইজন চালকের সাথে যারা প্রাইভেট কার চালান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা তাদের সমস্যগুলোর কথা বলছিলেন।
"আমি ড্রাইভিং করতেছি, জ্যামের মধ্যে আছি আমার মালিক বলছে 'এই তুই এখনো আসিস নাই কেন। তুই কই।' তখন আমি একটা মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে যাই। কাউকে কেউ সাহায্য করবে তা এই মন-মানসিকতায় নেই"।
আরেকজন ড্রাইভার বলছিলেন - "প্রত্যেকটা সিগন্যাল ছেড়ে দিলেই দেখা যায়, মানুষ এলোপাথাড়ি দৌড় দিচ্ছে, এটা কিন্তু উচিত না। কারণ সিগনাল ছাড়ার পর একটা গাড়ী টান দিলেই ২০/৩০ মাইল গতি উঠে যায়। ঐ মুহূর্তে যদি ব্রেক করি, তাহলে কিন্তু ম্যানেজ করা যায় না। তখন অন্য গাড়ী বা পথচারীর সাথে লেগে যাচ্ছে, অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাচ্ছে।"
"আমার মনে হয় পাবলিকেরও একটু সতর্ক থাকতে হবে।"
যারা ব্যক্তিগত গাড়ী, সিএনজিসহ অন্য যানবাহন চালান তারা কেন রাস্তায় পাল্লা দিয়ে চালান এবং দুর্ঘটনা ঘটে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইন্সটিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলছেন, চালকদের মানসিক বিকাশে আর্থ-সামাজিক অবস্থা একটা বড় কারণ।
তিনি বলছিলেন, "এটা যে একটা সম্মানজনক পেশা - সেটাই আমরা আমাদের দেশে সামাজিক ভাবে তৈরি করতে পারিনি। তার অধিকার, তার জীবনবোধ, তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হলেই কিন্তু একজন ব্যক্তির পেশাগত জীবনে সুস্থতা তৈরি করে। কিন্তু এই বিষয়গুলোর অনুপস্থিতি একজন পরিবহন শ্রমিক বা যেকোন পেশার মানুষের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা এবং অস্বাভাবিকতা তৈরি করতে পারে। "
"একজন পরিবহন শ্রমিক- সব সময় সে তটস্থ থাকে তার সামাজিক পরিচয় নিয়ে, হীনমন্যতায় থাকে তার আর্থিক অনিশ্চয়তা নিয়ে। এই যদি হয় তার সামাজিক এবং মনজাগতিক অবস্থা, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক কারণ সে সব সময় একটা অস্থিরতার মধ্যে থাকে।"
'ওস্তাদের কাছে শেখা'
বাংলাদেশ গণ-পরিবহণের চালক হিসেবে প্রশিক্ষণের প্রচলিত ব্যবস্থা হল 'ওস্তাদের' কাছ থেকে শেখা।
অর্থাৎ ড্রাইভারের কাছ থেকে হেল্পাররা শেখে এবং এক সময় বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালায়।
সেখানে একজন চালক হিসেবে তার শারীরিক সুস্থতা এবং যে গুটিকয়েক বিষয় দেখা হয় - যেটা মোটেও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তারা মনে করছেন, এক্ষেত্রে একজন চালক মানসিক ভাবে স্বাভাবিক কিনা, রাস্তার গাড়ী চালানোর সাধারণ নিয়ম-কানুন বা সহনশীলতা এবং অন্যের জরুরি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতা সম্পর্কে আদৌ কোন জ্ঞান আছে কিনা - সেটা পরীক্ষা করা হয় না।
আমি এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ এর রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মো. মাহবুবে রাব্বানীর কাছে।
তিনি স্বীকার করলেন এত খুঁটিনাটি বিষয় দেখার মত ক্যাপাসিটি তাদের নেই। তবে তারা সাধ্যমত চেষ্টা করছেন।
তিনি বলছিলেন "যারা এই পেশায় আসছে তাদের রুটটা ভালো না। তাদের পড়াশোনা নেই আবার থাকে বস্তিতে। তাই তাদের কাছ থেকে সেই আচরণ আশা করা যায় না। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় তাদের মানসিক বিকাশ সম্ভব না। তবে আমরা এখন জেলা পর্যায়ে শক্তিশালী কমিটি করে দিয়েছি। তাদের সুপারিশ নিয়ে আমরা লাইসেন্স দেয়। তবে তাদের মানসিক বিকাশের এইসব দিক গুলো খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ আমাদের নেই"।
বিআরটিএ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যারা বলছে বিদেশে যে প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেয়া হয় বাংলাদেশে সেটা হয় না।
আর এদেশে ড্রাইভিং পেশাটাকে সম্মানজনক করা যায় নি সামাজিক কারণে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী সারা দেশে গত জানুয়ারি মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় তিন হাজার ২৬ জন মানুষ নিহত হয়েছে।
আবার শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বলছে, ২০১৭ সালে পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গেছে, যার সংখ্যা ৩০৭ জন।
চালকদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে যাত্রীদের ভাবনা কি?
আজিমপুর থেকে মিরপুরগামী সেই বাসে কথা বলেছিলাম একজন নারী যাত্রীর সাথে।
তিনি বলছিলেন, "তারাতো এভাবে নিজেদের ইচ্ছামত চালাতে পারে না। আমি আমার মত করে চালাবো, অন্যদের আমার দেখার বিষয় না - এই মেন্টালিটিটা চেঞ্জ করতে হবে, তাহলে রাস্তায় একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এসব কাজে একজন দায়িত্বশীল মানুষকে রাখা উচিত, এমন কোন র‍্যান্ডম মানুষকে রাখা উচিত না যারা কেয়ারলেস।"
তাহলে কি তারা ঝুঁকি নিয়েই উঠছেন এসব গণ-পরিবহনে?
"কোন উপায় নেই। আমার কাজে যেতে হয় প্রতিদিন" - বললেন তিনি, "এখন সিএনজি বা অন্য পরিবহনের যে খরচ সেটা আমি দিতে পারবো না। ঝুঁকি নিয়ে আমাকে বাধ্য হয়ে এসব চালকের পরিবহনের উঠতে বাধ্য হচ্ছি রোজই।"
সূত্র- বিবিসি বাংলা

জনপ্রতিক্রিয়া: ছোটরা পথ দেখিয়েছে by মরিয়ম চম্পা

ছোটরা পথ দেখিয়েছে। ওরা দেখিয়েছে শৃঙ্খলা আনা কঠিন কোনো কাজ নয়। সদিচ্ছাই যথেষ্ট। নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসা শিশু শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অহিংস আন্দোলন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা এরকমই। তাইতো গত ক’দিনের আন্দোলনে দেশবাসীর সমর্থন পেয়েছে তারা। দেশজুড়ে আলোচনায়ও এখন এসব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর আগে দেশে এমন আন্দোলন দেখা যায় নি। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে অব্যাহত মৃত্যুর একটি বিহিত হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ।
ওদিকে পরিবহন শ্রমিকরা হঠাৎ করেই ধর্মঘট ডেকে সকল প্রকার দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় রাজধানী ছিল মূলত গণপরিবহনশূন্য। দু-একটি গাড়ি রাস্তায় বেরুলেও তাতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। পান্থপথের চায়ের দোকানি দেলোয়ার, ডাব বিক্রেতা আব্দুল আজিজ, পান বিক্রেতা নূর মোহাম্মদ, রিকশাচালক শাহ আলম, ফয়সাল ও শওকত বলেন, যেটা সরকার বা পুলিশ প্রশাসন পারেনি সেটা ছোটরা করে দেখিয়েছে। তারা বলেন, যার সন্তান গেছে সেই বুঝে সন্তান হারানোর কষ্ট। আজ আমার সন্তান গেছে। কাল আপনার সন্তান যে যাবে না এমনটা কেউ বলতে পারে না। কাজেই ছাত্ররা যেটা করছে একদম ঠিক কাজ করেছে। আমরা চাই সব কিছু একটা সিস্টেমের মধ্যে আসুক। পুলিশ এতদিনে ঢাকার শহরের রিকশাকে একটা লাইনে আনতে পারেনি। যানজট লেগেই থাকতো। আজ ছাত্র সমাজ রিকশাকে একটা লাইনে নিয়ে এসেছে।
কাওরান বাজার আম্বরশাহ মাদরাসার ছাত্র রাজীব, কামরুজ্জামান, সাদিকুর, মুসফিক, তৌহিদুল ও সোহেল বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাস্তায় আন্দোলনে না থাকতে পারলেও তাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করছি। এটা তারা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করছে। আমরা চাই রাস্তার সকল অরাজকতা ও মানুষ খুন বন্ধ হোক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিথুন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইলাহি, ইমু, হোসেইন, রাব্বি, বাবু ও সুলতানা বলেন, যে কাজগুলো সরকারের করার কথা, সেগুলো স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা করছে। লাইসেন্স না থাকায় ছাত্ররা পুলিশের গাড়িকেও মামলা দিয়েছে। মন্ত্রী-এমপিদের গাড়ি আটকে দিয়ে হেঁটে যেতে বাধ্য করেছে। ইমার্জেন্সি লেন, রিকশার জন্য আলাদ লেন তৈরি করেছে। তারা যেন ৫২, ৬৯ এর উত্তরসূরি। এর মধ্য দিয়ে সরকার তথা গোটা সমাজকে একটাই ম্যাসেজ দিয়েছে। আর তা হলো ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। একই সঙ্গে আরেকটি ম্যাসেজ হলো চাইলেই সংঘবদ্ধভাবে সামাজিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ থেকে প্রশাসনের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছু আছে।
ব্যাংকার, রোডর্স অ্যান্ড হাইওয়ে কর্মকর্তা, পরিবহন মালিক, বেসরকারি চাকরিজীবী, আইনজীবী নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বলেন, এই ক্ষোভ সড়ক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। দেখা গেছে যে মা সন্তানকে নিজে স্কুলে দিয়ে আসতো তারাও আজ সন্তানকে রাজপথে পাঠাচ্ছে। তারা বলেন, কঠিন আইন করতে হবে। মানুষকে বাঁচাতে হবে। বাস মালিকদের শাস্তি দিতে হবে। পুরাতন সব গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে নতুন ফিটনেস সম্পন্ন গাড়ি ও সকল চালকদের লাইসেন্স নিশ্চিত করতে হবে। যে আইন আছে তার যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। ঢাকা সিটির সব গাড়িগুলোকে একটি কোম্পানির আন্ডারে নিয়ে আসতে হবে। লাইসেন্সের সহজলভ্যতা বন্ধ করতে হবে। বাসের পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া বাস চালকদের বাসের মালিকরা যে দৈনিক টার্গেট দিয়ে থাকে এটা বন্ধ করতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চালক আব্দুল আউয়াল, মুন্সি, নিয়াজি, মোতাহের, সঞ্চয়, রমিজ বলেন, গত ১০-১২ বছর ধরে গাড়ি চালাই। অনেক অন্যায় অনিয়ম চোখের সামনে দেখেছি। কিন্তু চাকরি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে মুখ খুলে প্রতিবাদ করতে পারিনি। সম্প্রতি যে বাস দুর্ঘটনা ঘটেছে তাতে আমাদের এক সহকর্মী বাস চালকের মেয়েও রয়েছে। কিন্তু কাকে কি দোষ দিবো। আমরা নিজেরাইতো দোষী। যখন কোনো ব্যক্তি আমাদের এই পেশা তুলে গালি দেয় তখন কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। তাদের কিছু বলতে পারি না। কারণ এই পেশায় আমরা পড়ালেখা করে একাধিকবার বিআরটিএ পরীক্ষা দিয়ে একটি হেবিচুয়াল লাইসেন্স নিতে হয়েছে। অথচ মুষ্টিমেয় কিছু অপেশাদার চালক যাদের নাই কোনো প্রশিক্ষণ, নাই কোনো লাইসেন্স। তারা এসে পেশাটাকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। কারণ এই পেশায় আসা খুবই সহজ। যে কেউ চাইলে দুই দিন স্টিয়ারিং ধরে তিন দিনের দিন চালক হয়ে যেতে পারে। এর পর সামান্য কিছু ঘুষ দিলেই মিলবে একটা লাইসেন্স। ছাত্ররা যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটাকে সরকার যদি বাস্তবতায় রূপ দেয় তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য চালকদের জন্য আলাদা একটি ইনস্টিটিউট করতে হবে। এবং প্রত্যেক চালককেই শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। এতে করে অনেক শিক্ষিত লোক এই পেশায় আসতে আগ্রহী হবে। আর শিক্ষিত ও আদব কায়দা জানা চালকের হাতে দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ ছাড়া সকল গাড়ি কাউন্টার ও কোম্পানি সিস্টেমে চলতে হবে। মালিক ও পুলিশের খাই খাই স্বভাবটা বন্ধ করতে হবে। চালকদের কোনো টার্গেট দেয়া যাবে না। রোড খরচ বা পুলিশকে দৈনিক ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ফলে মালিকরা গাড়ির ফিটনেস, লাইট, রং কোনোটাই ঠিক করছে না। এ ছাড়া মাঝারি সাইজের বাসগুলোর যাত্রী ধারণক্ষমতা ২৫-২৬ জন। সেখানে ৩০-৩৫টা পর্যন্ত সিট বাড়ায়। এটা বন্ধ করতে হবে।
আচার বিক্রেতা টিটোন, ঝালমুড়িওয়ালা সগীর, সিএনজি চালক রহমতউল্লাহ বলেন, যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে মালিক সমিতি অনেক বাড়াবাড়ি ও খারাপ কাজ করছে। ছাত্ররা যেটা করছে সেটা খুব ভালো একটি উদ্যোগ। ওদের আন্দোলনে আমাদের সপ্তাহখানিক ধরে যাতায়াতে সমস্যা হলেও আমরা চাই এটা চলুক। সকালে গাবতলী থেকে অনেক কষ্ট করে একটু বেশি ভাড়া দিয়ে কাজে আসছি। তাতে কোনো দুঃখ নেই। আমরা চাই আইনের সঠিক প্রয়োগ হোক। মালিক-শ্রমিক, পুলিশ সিন্ডিকেট ভেঙ্গে সব সমান করা হোক।
আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীর মা, শিক্ষিকা, গৃহিণী, চাকরিজীবী ৪ নারী বলেন, আমার মেয়ে আন্দোলনে আছে। গত কয়েকদিন ধরে আমি নিজেই তাকে আন্দোলনে দিয়ে আসছি। ওকে আমি একা কখনো কলেজে পাঠাইনি। ও একা কোথাও যেতে পারে না। কিন্তু গত কয়েক দিনে আমার মেয়েটা অনেক বড় হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের তৃতীয় দিন দুপুরে মেয়ে ফোন করে বলে মা খুব ক্ষুধা লাগছে কিছু খাবার নিয়া আসো। আমি মেয়ের ক্ষুধার কথা শুনে ওর জন্য সামান্য পানি, কেক ও মুড়ি নিয়ে যাই। কিন্তু নেয়ার পর মনে হলো আমার এতগুলো সন্তানের মধ্যে কাকে রেখে কাকে খাওয়াই। পরে মেয়ের সামনে আর খাবার বের করিনি। মেয়ে বললো মা কিছু আননি। আমি অনেক কষ্টে চোখের পানি আটকে বললাম না মা বাসায় গিয়ে খেয়। গৃহিণী লিপি বলেন, গত ১৭ দিন আগে আমার কলিজার টুকরাকে ঘাতক বাস চাপা দিয়েছে। বাইক এক্সিডেন্ট করে টানা ৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আমার ছেলেটা চলে যায়। আমার যদি সুযোগ থাকতো আমিও ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলন করতাম। বাচ্চাদের সঙ্গে লাইসেন্স চেক করতাম। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হাফসা বেগম বলেন, ওরা ক্ষমার অযোগ্য। গত ৭ মাস আগে আমাকে একটা বাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে যায়। কেউ আমাকে হাসপাতালে নেয়নি। সবাই চেয়ে চেয়ে দেখেছে। পরে নিজেই কোনোভাবে উঠে স্থানীয় একটি হাসপাতালে গিয়ে বাড়ির ঠিকানা বলার পর আমাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। আমার অনেকগুলো দাঁত ভেঙ্গে যায়। আমি তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যেতে পারছি না। কিন্তু আন্দোলনরত ছেলে মেয়ের জন্য আমি দোয়া করছি।

মালিক-শ্রমিকদের অঘোষিত ধর্মঘটে জনভোগান্তি: নোংরা কৌশল

এটা নতুন কিছু নয়। পুরনো এবং নোংরা। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা অতীতে বহুবারই এ কৌশল অবলম্বন করেছেন। নিষ্পাপ শিশুরা রাজপথে। নিরাপদ সড়ক আর ন্যায় বিচারের দাবিতে তাদের আন্দোলন হৃদয় জয় করেছে বহু মানুষের। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের তাতে কিছু আসে-যায়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই গতকাল সারা দেশে বাস বন্ধ করে দেন তারা। আর এতে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। রাজধানীর সড়কে
গণপরিবহন না থাকায় গত তিন দিন থেকে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কিছু ছোট যান চলাচল করলেও গতকাল তাও বন্ধ করে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা। পরিবহন মালিকরা বলছেন, সড়ক নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত তারা বাস চালাবেন না। গতকাল সড়কে বড় কোনো কর্মসূচি না থাকলেও কেন বাস চালানো হয়নি এ প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলেনি তাদের কাছ থেকে। শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সড়কে যাত্রীদের ভিড়।
তবে বিআরটিসির কয়েকটি বাস ছাড়া কোনো যাত্রীবাহী বাস নেই। জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়ে পরিবহন সঙ্কটে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। বাধ্য হয়ে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউবা সিএনজি চালিত অটোরিকশায় বা রিকশায় গন্তব্যে রওয়ানা দেন। গণপরিবহন সংকটে তাদের গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়াও। মিরপুরের দুই নম্বর এলাকায় থাকেন ব্যবসায়ী উজ্জ্বল। সকাল ১০টার দিকে এই যাত্রী সদরঘাট যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হলেও কোনো গণপরিবহন রাস্তায় পাননি। এত দূরের রাস্তা হেঁটে যাওয়াও কষ্টকর বলে তিনি মন্তব্য করেন। ফলে বাধ্য হয়ে সিএনজি অটোরিকশায় ৫০০ টাকায় প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে সদরঘাট গিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তার বিরক্তি নেই। ফার্মগেটে কথা হয় যাত্রী সবুজ মিয়ার সঙ্গে। গাবতলী যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো বাস মিলছে না। সিএনজি চালক এইটুকু দূরত্বের জন্য ৩০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছিল তার কাছে। তিনি বলেন, অপেক্ষা করছি, যদি কোনো কিছুতে উঠতে পারি।
বিকাল তিনটা। ফার্মগেট মোড়। শত শত মানুষের কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। কখন আসবে একটি বাস? কারও চোখ কাওরান বাজারের দিকে। কারো বিজয় সরণি পানে। তাদের দূরদৃষ্টি হতাশ হয়ে ফিরছিল বার বার। যতদূর চোখ যায় এই ব্যস্ততম সড়কটিতে বাসের দেখা নেই। শেষ হয় না যাত্রীদের প্রতীক্ষাও। মাঝে মাঝে দু-একটি বিআরটিসির বাস আসলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন যাত্রীরা। কিন্তু প্রাণপণ যুদ্ধেও তাতে ঠাঁই মিলছিল না অধিকাংশের। আবার সেগুলোর বেশিরভাগ একই রুটের হওয়ায় অপেক্ষমাণদের অধিকাংশকেই টানছিল না বাসগুলো। বাস না পেয়ে অনেককে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দিতে দেখা গেছে। কেউ কেউ রিকশা বা অটোরিকশার সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে ফিরছিলেন।
উজ্জ্বল দাস, তার স্ত্রী শিশু-সন্তান নিয়ে মতিঝিলের শামীবাগের এক মন্দিরে পূজা দিতে যাচ্ছিলেন। বাসা থেকে বের হন দুপুর দু’টার আগে। গাড়ির অপেক্ষায় উজ্জ্বল দাস মানবজমিনকে জানান, শুভ কাজে বের হয়েছি। চেষ্টা না করে তো ফিরে যেতে পারি না। বাসের আশা ছেড়ে দিয়েছি। এখন রিকশা বা অটোরিকশাও পাচ্ছি না।
দু’হাতে ভারি ব্যাগ ও বস্তা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন ৫৩ বছরের বৃদ্ধা রওশন আরা। তিনি ট্রেনে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসেন। কমলাপুরে দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি বিআরটিসি বাসে কোনোমতে জায়গা করে নিয়ে ফার্মগেট পৌঁছেন। কিন্তু সেখান থেকে মোহাম্মদপুর যাওয়ার কোনো বাস না পেয়ে আটকা পড়েন।
তিনি বলেন, দু’ঘণ্টা ধরে মোহাম্মদপুরে যাওয়ার একটি বাসও দেখতে পাইনি। বাস না থাকার সুযোগে কয়েকটি রিকশাকে মিরপুরের যাত্রী বহনের জন্য লাইন দিতে দেখা গেছে। তাদের একজন মো. আলহাছ। তিনি বলেন, হাতেগোনা সরকারি বাস ছাড়া সকাল থেকে রাস্তায় পাবলিকের বাস দেখিনি। আমি মিরপুর ১০ নম্বরে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছি। প্রতিজন ১০০ টাকা ভাড়ায় দু’জন করে দু’বার নিয়ে গেছি।
তার পাশেই পাঠাও-এর মোটরসাইকেল চালক মো. ইউসুফ। তিনি বলেন, আমি বহু জায়গায় গেছি। আজ কোথাও বেসরকারি গণপরিবহন দেখিনি। রাস্তায় রাস্তায়, মোড়ে মোড়ে মানুষ গাড়ির জন্য ভোগান্তিতে পড়েছেন। কয়েক স্থানে ছাত্ররা মাঠে নেমেছে। তারা গাড়ির লাইসেন্স চেক এবং লাইন ধরে গাড়ি চলতে বাধ্য করছে। তাকেও বেলা ১২টার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড় মোড়ে ও সকালে ফকিরাপুল মোড়ে গাড়ির লাইসেন্স দেখাতে হয়েছে বলে জানান।
গতকাল সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, একদিকে বিভিন্ন বয়সী শত শত নারী, পুরুষ বাসের অপেক্ষায়। ব্যাগ, লাগেজ, ট্রলি ব্যাগ নিয়ে ঘণ্টার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও বিকাল পর্যন্ত কোনো বাস ছাড়েনি। অন্যদিকে, পরিবহন শ্রমিকেরা অলস সময় পার করছেন। সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে দিনরাত বাস ছেড়ে যায়। গত তিন দিন ছিল ছাত্রদের আন্দোলন। অনেকেই আশায় ছিলেন শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় তারা নিজেদের গন্তব্যে যাবেন। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের অঘোষিত ধর্মঘটে সে সুযোগ আর মেলেনি। বাস না ছাড়ায় অনেকেই মনোকষ্টে ফিরে যান।
কুমিল্লার হোমনায় যাবার উদ্দেশ্যে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন তাপস সূত্রধর (৩০)। তিনি বলেন, গাড়ির চালকেরা বলছেন তারা যাবেন না। সমস্যা আছে। কিন্তু কি সমস্যা সেটি বলছেন না। আসলে মাঝে মাঝেই তারা নানা অজুহাতে এমন কষ্ট দেন। এর কোনো মানে হয় না। সিলেটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে এসেছেন শিব্বির আহমেদ (২৭)। যাবেন সিলেটে। সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাস ছাড়তে দেখেননি তিনি। দুপুর ১টার দিকে তিনি বলেন, যদি জানতাম আজ (গতকাল) কোনো বাস ছাড়বে না তাহলে এতদূর থেকে ব্যাগ লাগেজ নিয়ে আসতাম না। তিনি বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে পড়েছি। প্রায় সময়ই তারা (পরিবহন সংশ্লিষ্টরা) এ ধরনের আচরণ করেন। এর কি কোনো বিহিত নেই? কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর যাওয়ার উদ্দেশ্যে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে এসেছিলেন কলেজ শিক্ষার্থী প্রশান্ত রায় (২৬)। এসেই জানতে পারলেন কোনো বাস ছাড়বে না। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, চালকেরা বলছে, তারা নিরাপত্তাহীনতার কারণে গাড়ি চালাবেন না। কিন্তু আসলে কলকাটি নাড়ছে পরিবহন মালিক ও নেতারা। তাদের অপকৌশলের কারণেই চালকেরা গাড়ি ছাড়ছেন না। তারাই চালকদের নিষেধ করেছেন। অঘোষিত ধর্মঘটের মাধ্যমে মানুষকে জিম্মি করেছেন। এভাবে মানুষকে জিম্মি করার কোনো মানে হয় না। আমিনা বেগম (৬০) যাবেন সিলেটে। সকাল থেকে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় তিনি। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাস ছাড়ার নাম নেই। অসুস্থ শরীরে ক্ষুধায় কাতর আমিনা বেগম ঝালমুড়ি খেতে খেতে বলেন, আমারে কইছে ২টার পরে গাড়ি ছাড়তে পারে। হেই আশায় আছি। মগবাজারের ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আল আমিন যাবেন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। শুক্রবার হওয়ায় বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি খুব আশা নিয়ে।
কিন্তু বিধিবাম। সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে এসে জানতে পারলেন অঘোষিত ধর্মঘট চলছে পরিবহন শ্রমিকদের। তারা বাস চালাবেন না। হতাশায় বাসায় ফিরে যাচ্ছেন আল আমিন। তিনি বলেন, ছাত্রদের আন্দোলন যৌক্তিক। তারা ভুয়া ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। নিরাপদ সড়কের নামে আন্দোলন করছে। কিন্তু পরিবহন সংশ্লিষ্টরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে চাইছেন। এর আগেও তারা বিভিন্ন সময়ে নানা অজুহাতে এমন করেছেন। এর কি কোন প্রতিকার নেই?
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে কথা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ‘সি ডি এম’ পরিবহনের চালক মো. জামাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, যেখানে সেখানে ছাত্ররা লাইসেন্স দেখতে চাইছে। গাড়ি ভাঙছে। পরিবহন চালক ও তাদের সহকারীদের উপর হামলা করছে। আমরা একপ্রকার নিরাপত্তাহীনতায় আছি। আমাদের জীবনের ভয় আছে। তাছাড়া দুর্ঘটনা ঘটলেই চালকদের ফাঁসির দাবি করা হয়। যে কারণে চালকেরা ভয়ে আছেন। গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন। জামাল হোসেন বলেন, আমরা কোনো ধর্মঘট, হরতাল করছি না। পরিস্থিতির কারণে ‘কর্মবিরতি’ পালন করছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আবারো গাড়ি চলবে। ঢাকা টু দৌলখাঁর রুটে চলাচলকারী একটি বাসের চালক মোতালেব হোসেন বলেন, ছাত্রছাত্রীদের দাবি যৌক্তিক। তাদের মতো আমরাও নিরাপদ সড়ক চাই। কিন্তু আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও যৌক্তিক। আর দুর্ঘটনা ঘটলেই চালকদের ফাঁসির দাবি করা হচ্ছে। আমাদেরও তো ভয় আছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় আছি আমরা। বাস না চালানোর বিষয়ে পরিবহন মালিকদের কোনো নির্দেশনা আছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মালিকদের কোনো নির্দেশনা নেই। আমরাই নিরাপত্তার কারণে বাস চালাচ্ছি না। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী সেলিম সরোয়ার মানবজমিনকে বলেন, বিভিন্ন জায়গায় বাস ভাঙচুর করা হচ্ছে। চালক শ্রমিকদের উপর হামলা হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে চালকেরা যদি গাড়ি না চালান তাহলে আমরা কি করবো? শ্রমিকেরা যদি আশ্বস্ত হন যে রাস্তায় কোথাও কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না, তাহলে তারা গাড়ি চালাবেন। তিনি বলেন, মূলত ছাত্ররা কোনো গাড়িতে হামলা করে না। কিছু দুরভিসন্ধি ও সুযোগ সন্ধানী লোক হামলা করছে। যে কারণে শ্রমিকেরা আতঙ্কিত। তবে, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। আজ (গতকাল) সন্ধ্যা থেকে বাস চলাচল করবে।
এদিকে, সায়েদাবাদ থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে চিটাগাং কাঁচপুর রোড পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে গতকাল সকাল থেকেই অবস্থান নেয় পরিবহন শ্রমিকরা। এ সময় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দূরপাল্লার কোনো গাড়িকে ঢাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। আবার ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন পরিবহনকেও আটকে দেয়া হয়েছে সড়কে। এ সময় সড়কের দু’পাশেই চরম ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষ। অসুস্থ ভাইকে দেখতে কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে মোস্তাফিজুর রহমান (৩১) রওয়ানা হন ভোর ৫টায়। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ সয়ে নানা উপায়ে দুপুর ১১টায় এসে পৌঁছান কাঁচপুর ব্রিজের ওপাড়ে। কিন্তু নিস্তার মেলেনি। যাত্রাবাড়ী কিংবা ফার্মগেট আসার মতো কোনো গণপরিবহনই নেই। অগত্যা কয়েকগুণ বেশি ভাড়ার চুক্তিতে উঠেন রিকশায়। মোস্তাফিজের সঙ্গে কথা হয় চিটাগাং রোড এলাকায়। তিনি বলেন, সাভারের একটি হাসপাতালে যাবেন তিনি। কিন্তু সোয়া এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যাত্রাবাড়ী যাবার মতো কোনো গাড়ি পাইনি। এখন রিকশাই ভরসা। প্রায় জোর করে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে একটি রিকশায় উঠেছি। মোস্তাফিজ বলেন, শুনেছি গাড়ি ভাঙচুরের অজুহাতে মালিক, চালকেরা গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন। কিন্তু এগুলো আসলে ঠুনকো অজুহাত। এক ধরনের অপকৌশল। মানুষকে কষ্ট দিয়ে মালিক, চালকেরা কি আনন্দ পান তা তারাই জানেন।
নাারয়ণগঞ্জ থেকে সাইনবোর্ড এলাকায় বেলা ১১টায় এসে উত্তরা যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষায় ছিলেন কাওসার হোসেন (৪০)। তিনি বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বাসের অপেক্ষায় তিনি। কিন্তু কাঁচপুরের দিক থেকে কোনো গাড়ি আসছে না। শনিরা আখড়ায় মো. টিটু মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, রামপুরা যাবেন তিনি। কিন্তু কাঁচপুরের দিক থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে কোনো গাড়ি আসছে না। তেমনি যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকেও কাঁচপুর বা অন্য রুট অভিমুখী কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একপর্যায়ে রিকশা ভ্যানে চেপে বসেন টিটু। তিনি বলেন, অসহ্য ভোগান্তি। এর কোনো মানে হয় না।
দুপুর পৌনে ১টায় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় দেখা যায়, বাসের জন্য শত শত যাত্রীরা অপেক্ষায়। কিন্তু যে জন্য এত অপেক্ষা, সেই কাঙ্ক্ষিত কোনো গণপরিবহন একেবারেই নেই। কয়েকজন যাত্রী জানান, এখানে দিনরাত বাসের সারি থাকতো। কিন্তু শুক্রবার ছিল একেবারেই ভিন্ন চিত্র। আর বাস না থাকায় গুলিস্তান, শাহবাগ, ফার্মগেট অভিমুখী রিকশা ভাড়া এত বেশি ছিল যে অনেকেই হেঁটে গন্তব্যে রওয়ানা হন। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় কথা হয় জুবায়ের আহমেদের সঙ্গে। মা ও স্ত্রীকে নিয়ে টঙ্গী যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন তিনি। জুবায়ের বলেন, এক ঘণ্টার উপর বসে আছি। সিএনজি ভাড়া চায় ১২শ’ টাকা। তাই অপেক্ষায় আছি। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সাভারের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আত্মীয়কে দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রবাড়ী চৌরাস্তায় বাসের অপেক্ষায় ছিলেন ষাটোর্ধ্ব সরবানু। কিন্তু দুপুর ১টা পর্যন্ত কোনো বাস না পেয়ে কাজলার বাসায় ফিরে যান তিনি।
রাজশাহীর দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধে দুর্ভোগে যাত্রীরা
রাজশাহী থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার সব রুটে সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে রাজশাহীর কোনো রূটে বাস ছাড়েনি পরিবহন মালিক-শ্রমিক ইউনিয়ন। তবে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে সন্ধ্যার পর থেকে পুনরায় বাস চলাচল শুরু হবে জানিয়েছেন রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর রহমান পিটার।
এদিকে হঠাৎ করেই পরিবহন শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে আন্তঃজেলা রুটের যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বিআরটিসির বাসগুলো নিয়মিত শিডিউল অনুযায়ী চলাচল করছে।
বাস চলাচল বন্ধের বিষয়ে মঞ্জুর রহমান পিটার জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি তাদেরও সমর্থন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিটি দাবিই যৌক্তিক। আমরা শিক্ষার্থীদের মতো নিরাপদ সড়ক চাই। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাদের যৌক্তিক আন্দোলনের মধ্যে একটি গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়েছে এবং তারা ছাত্রদের আন্দোলনের ওপর ভর করে ঘটনাটি ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা শুরু করেছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভিড়ে ঢুকে যানবাহন ভাঙচুরসহ রাষ্ট্রী সম্পদ ধ্বংসের অপচেষ্টা শুরু করেছে গোষ্ঠীটি। তাই ‘নিরাপত্তাহীনতার’ বিষয়টি চিন্তা করে দিনের বেলায় আপাতত বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সন্ধ্যা থেকে বাস চলাচল করবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে জানান পিটার।
হবিগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট
নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অর্নিদিষ্টকালের জন্য হবিগঞ্জের সকল সড়কে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে মোটর মালিক গ্রুপ। গতকাল ভোর থেকে স্থানীয় ও দূরপাল্লার সকল বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সকাল থেকে হবিগঞ্জ পৌরবাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায়নি সিলেট ও ঢাকাসহ দূরপাল্লার কোন যানবাহন। এছাড়াও ৯টি অভ্যন্তরীণ রুটেও বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত যাত্রী। হবিগঞ্জ জেলা মোটরমালিক গ্রুপ জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় তারা বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন। সরকার কর্তৃক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেই তারা বাস চলাচল স্বাভাবিক করবেন। হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক শঙ্ক শুভ্র রায় জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় পরিবহন ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার কারণে আমরা সারা জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছি। এতে যাত্রীদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত। কেন্দ্রের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ থাকবে।
খুলনায় হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘটে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি
হঠাৎ করে খুলনা থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দূরপাল্লার বাস চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করেছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। যানবাহন ভাঙচুর ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবিতে গতকাল সকাল ১০টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এ ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। এতে দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারীযাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
সোনাডাঙ্গা বাসটার্মিনালে আসা আবদুল্লাহ নামের এক যাত্রী বলেন, বাস না চলার এমন সিদ্ধান্তের কথা অনেকেই জানেন না। আমার মতো অনেক যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন। সোনাডাঙ্গা বাসটার্মিনাল, রয়্যালের মোড় ও শিববাড়ির মোড়ের অনেক কাউন্টার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যেগুলো খোলা আছে সেখানে অলস সময় পার করছেন কর্মচারীরা।
পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানান, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল একটি গোষ্ঠী ঢুকে পড়েছে। তারা বাসে ভাঙচুর চালাচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে বাস না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
খুলনাবাস-মিনিবাস কোচ মালিক সমিতির সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজানের মোবাইল ফোনে একাধিবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে, সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সোনা ধর্মঘটে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, খুলনা জেলার অভ্যন্তরের লোকাল বাস চলাচল করলেও দূরপাল্লার কোনো পরিবহন ছেড়ে যাচ্ছে না।
গাজীপুরে শিক্ষার্থীরা নামেনি, শ্রমিক অবরোধে দুর্ভোগ চরমে 
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে না থাকলেও যানবাহন ভাঙচুরের প্রতিবাদ, কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ও চালকদের সর্বোচ্চ সাজার আইন না করার দাবিতে গাজীপুরে মহাসড়কে নেমেছে পরিবহন শ্রমিকরা। শুক্রবার সকাল থেকে শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বড়বাড়ি, টঙ্গী এবং ঢাকা-গাজীপুর সড়কের শিববাড়ি মোড় ও জয়দেবপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্ষোভ করে তারা সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। স্বল্পসংখ্যক লোকাল বাস চলাচল করলেও আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। সড়কে মহাসড়কে গণপরিবহন না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন নানা শ্রেণি পেশার লোকজন। পায়ে হেঁটে অথবা হালকা যানবাহনে চড়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের। এই সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকরা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে ৪-৫ গুণ অধিক ভাড়া আদায় করছেন বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
অবরোধকারী শ্রমিকরা জানায়, কারণে অকারণে সড়কে যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। সরকার সড়ক দুর্ঘটনায় চালকদের ফাঁসির সাজা এবং এক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ রেখে আইন করছে বলে আমরা শুনেছি। এমন হলে কয়জন চালক গাড়ি চালাতে চাইবে। এসব কারণে এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সিদ্ধান্তে আমরা গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখেছি।
নওগাঁয় আভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার রুটে বাস চলাচল বন্ধ’
নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোনের মুখে নওগাঁ থেকে দূরপাল্লার ও অভ্যন্তরীণ সকল রুটে বৃহস্পতিবার রাত থেকে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতকারী যাত্রীদের পড়তে হয়েছে দুর্ভোগের মুখে।
দূরপাল্লার রুটের শ্যামলী পরিবহনের নওগাঁর কাউন্টার ম্যানেজার মামুন জানান, পরিবহনের মালিক কর্তৃপক্ষ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত টিকিট বিক্রয় বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে বাস শ্রমিকরা বাস চালাতে চাইছেন না। এদিকে জেলা মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি অলিউল রাজি আশিক জানান নিরাপত্তার কারনে শ্রমিক অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন। এ কারণে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরেও চলছে পরিবহন ধর্মঘট
লক্ষ্মীপুরে অনির্দিষ্টকালের জন্য সকাল পরিবহন ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছে। বন্ধ রাখা হয়েছে দূরপাল্লাগামী ছোট বড় যাত্রীবাহী বাস। শুক্রবার সকাল থেকেই এ কর্মসূচি পালন করছেন পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা। এদিকে বাস বন্ধ থাকায় টার্মিনাল এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এ রুটে যাতায়াতরত শত শত যাত্রী।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানায়, আন্দোলনের নামে সারা দেশে গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। এতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রতিবাদে সারা দেশের ন্যায় লক্ষ্মীপুরেও দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে জকসিন ইকোনো কাউন্টারের মালিক আবদুল মালেক জানান, নিরাপত্তার কারণে সকাল থেকে দূরপাল্লার ইকোনো চেয়ারকোচসহ কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। যানবাহন চলাচল না করায় দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।
ফেনী থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বাস চলাচল বন্ধ
ফেনী থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। শুক্রবার ভোর থেকে ওইসব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ফেনী আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি জাফর উদ্দিন জানান, স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও গাড়ি ভাঙচুরের কারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সিদ্ধান্তের আলোকে তারা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে চালকরা। পরিবহন শ্রমিকরাও বাস চালাতে অপারগতা প্রকাশ করায় শুক্রবার ভোর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্টার লাইন পরিবহনসহ সব বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
যশোরসহ ১৮টি রুটে বাস চলাচল বন্ধ
সড়কে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে যশোরসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের ১০ জেলা পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। ফলে গতকাল সকাল থেকে যশোরসহ এই অঞ্চলের ১৮টি রুটে সব ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিবহন বন্ধ সম্পর্কে মালিক আর শ্রমিকদের বক্তব্যে কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশীদ বাচ্চু বলেন, রাস্তায় বাস নামালে হামলা হচ্ছে, ভাঙচুর হচ্ছে। চালক ও শ্রমিকদের মারপিট করছে ছাত্ররা। রাস্তায় পরিবহন ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণে মালিকদের নির্দেশে সকাল থেকে যশোরসহ এই অঞ্চলের ১৮টি রুটে সব ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই অবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে এই শ্রমিক নেতা দাবি করেন। এদিকে যশোর জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আলী আকবর বলেন, শ্রমিকরা বাস চালাতে অপারগতা প্রকাশ করার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে বাস মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইন্টারডিস্ট্রিক্ট বাস সিন্ডিকেটের সভাপতি ও ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া এই প্রসঙ্গে বলেন, শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
রাস্তায় নানা অঘটন ঘটছে। সরকার নিরাপত্তা দিচ্ছে না। বাস দেখলেই তাতে হামলা চালানো হচ্ছে। ইট-পাটকেল মারা হচ্ছে। ছাত্ররা ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে রাস্তায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এই অবস্থায় শ্রমিকরা বাস নিয়ে রাস্তায় নামতে সাহস পাচ্ছে না। যার কারণে শুক্রবার সকাল থেকে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জসহ দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সব রুটে সকল ধরনের বাস বা পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে শিক্ষার্থীদের অহিংস নিরাপদ সড়ক চাই- আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই পরিবহন মালিক শ্রমিকরা এই নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেশবাসীকে জিম্মি করতে চাই বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন যশোরের যুগ্ম আহ্বায়ক এসএম শফি। তিনি বলেন, এভাবে পরিবহন বন্ধ রেখে শিক্ষার্থী তথা দেশবাসীকে জিম্মি করে তাদের দাবিকে পাশ কাটানো সম্ভব নয়। দ্রুত এই অবস্থার অবসান না হলে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দেন নিরাপদক সড়ক আন্দোলনের এই নেতা।
মৌলভীবাজার থেকে ঢাকার পথে কোনো বাস ছাড়েনি
মৌলভীবাজার থেকে গতকাল ঢাকাগামী দূরপাল্লার কোনো বাস সকাল থেকে ছাড়েনি। শহরের কোদালীপাড়ে অবস্থিত ঢাকাগামী সব বাসের কাউন্টার বন্ধ ছিল। বিকালের দিকে কাউন্টার ২/১ টি খোলা হলেও টিকেট কাটা হয়নি। হবিগঞ্জ-সিলেট লাইনের কোনো বাসও চলেনি। হবিগঞ্জ বাস মালিক সমিতির মৌলভীবাজার কার্যালয় বন্ধ ছিল সারাদিন। বিভিন্ন বাস কাউন্টারে কর্মরত কর্মচারীরা জানিয়েছেন চলমান ছাত্র আন্দোলনের কারণে সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন মালিক পক্ষ। গতকাল বিকাল ৫ টায় গিয়ে দেখা গেছে ঢাকা-সিলেট সড়ক পথের শ্যামলী, হানিফ, রূপসী বাংলা, সৌদিয়া বাস কাউন্টার প্রায় বন্ধ। রূপসী বাংলার কাউন্টারের সামনে ৪ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন এ সময়। কাউন্টারের কর্মচারী জানান ঢাকা অফিস না বললে বাস ছাড়া হবে না। এই কর্মচারী জানান, সকালে ঢাকার উদ্দেশে একটি গাড়ি ছেড়ে গেলে পরে পথ থেকে ফিরে আসে। এই সময় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী জাকির জানান- রাস্তায় গাড়ি বদলিয়ে কেউ কেউ যাচ্ছেন। হানিফের কাউন্টার মাস্টার আবদুুর রহমান জানান, সারাদিন কাউন্টার বন্ধ ছিল। কোনো বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়েনি। ঢাকা থেকে গ্রীন সিগন্যাল না পেলে গাড়ি ছাড়া হবে না। এদিকে অভ্যন্তরীণ পথেও গতকাল গাড়ি কম ছিল। এক পরিবহন শ্রমিক নেতা জানিয়েছেন ধর্মঘট না হলেও নিরাপত্তার জন্য অনেকে গাড়ি সড়কে নামাননি।

ছুটির দিনেও রাজপথে শিক্ষার্থীরা

‘নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়ানো এক একজন শিক্ষার্থী। গলায় ঝুলানো নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র। হাত উঁচিয়ে যানবাহনকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। লেন ধরে চলতে সহযোগিতা করছে। কেউ আবার বুকে প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাথে বা ফুটওভারব্রিজের কাছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা দয়া করে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটুন। ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হোন।’ শুক্রবার ছুটির দিন রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে এমন চিত্র। নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ষষ্ঠ দিন গতকালও বিভিন্ন সড়কে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে। যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষায় ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতার পাশাপাশি তারা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও কাজ করে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের জমায়েত থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দিতেও দেখা গেছে। গতকালের এসব জমায়েতে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবি উঠেছে জোরালোভাবে। বৃহস্পতিবার মিরপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও দুর্বৃত্তদের একযোগে হামলার প্রতিবাদে গতকাল মানববন্ধনও করেছেন ওই এলাকার সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি-২৭ নম্বর ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জড়ো হতে শুরু করে ধানমিন্ড বয়েজ স্কুল, নিউ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজধানী সরকারি বিদ্যালয়সহ আশেপাশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। পরে এতে যোগ দেয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। তাদের কাছে ছিল বিভিন্ন হাতে লেখা ব্যানার-ফেস্টুন। মাথায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ লেখা সংবলিত ফিতা। এ সময় তারা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে; হয় মরবো, না হয় নিরাপদ সড়ক গড়বো; উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকে। শিক্ষার্থীদের এক দল রাস্তায় চলমান হাতেগোনা ব্যক্তিগত গাড়িরগুলোকে এক সারিতে চলতে বাধ্য করে। কেউ কেউ আবার গাড়ির কাগজপত্র দেখে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বেলা ১টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পর সরে পড়ে তারা।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেছে, অনেকেই আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বিশৃঙ্খলায় পরিণত করার অপচেষ্টা করছে।
কিন্তু আমরা সেটা হতে দেবো না। তারা যত চেষ্টা করুন না কেন, আমরা আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবো। একই সময় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে আসাদগেট পর্যন্ত পুরো রাস্তা নিজেদের দখলে নেয় সেন্ট জোসেফ স্কুল, গভর্মেন্ট মোহাম্মদপুর কলেজ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রিকশা, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহন আলাদা আলাদা লেনে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকেও তার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গাড়ির ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে। তবে ঢাকা সিটি কলেজ থেকে সাইন্স ল্যাব মোড়, নিউ মার্কেট এলাকা, জিগাতলা, পান্থপথ মোড়, কলাবাগান মোড়সহ ধানমন্ডির অন্যান্য এলাকার রাস্তাগুলোতে শিক্ষার্থীদের দেখা যায়নি।
এদিকে সকাল থেকে শাহবাগ চত্বরে বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি ছিল। ১১টার দিকে শাহবাগ এলাকায় বেশকিছু শিক্ষার্থী জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। সন্দেহজনক উল্লেখ করে পুলিশ তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রদত্ত পরিচয়পত্র দেখতে চায়। তখন অনেকেই তাদের পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি। পরে পুলিশ তাদের চলে যেতে বলে। সন্দেহভাজন উল্লেখ করে পুলিশ তাদের শাহবাগে দাঁড়াতে দেয়নি। কিন্তু বিকাল ৩টা থেকে আবার ১০-১৫ জন শিক্ষার্থী সেখানে জড়ে হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘আমিই বাংলাদেশ; নিরাপদ সড়ক চাই’ ইত্যাদি নানা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। এ সময় জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা প্রাইভেটকারের যাত্রীদের সিটবেল্ট বেঁধে চলাচলের জন্য অনুরোধ করে। অন্যদিনের ব্যস্ততম শাহবাগ দিয়ে তখন যানবাহন চলাচল ছিল একেবারে কম। শুধু বিআরটিসির দু’একটি বাস দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় আর কোনো গণপরিবহন চোখে পড়েনি।
এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে এতাত্মতা প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক। গতকাল সকালে মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে ‘মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়’ ৯৫ ব্যাচ’ আয়োজিত এক মানববন্ধনে যোগ দেন আশেপাশের এলাকার অভিভাবকরা। এ সময় তারা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন করেন। তাতে সরকারের কাছে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে ছাত্র সমাজের দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানান।
সারোয়ার আলম নামে এক অভিভাবক বলেন, সড়কে দুর্ঘটনা বন্ধ এবং নিরাপত্তার জন্য কিছুদিন ধরে ছাত্রদের যে আন্দোলন চলে আসছে তা যেন সরকার দ্রুত মেনে নেয়। আমরা লক্ষ্য করেছি এই আন্দোলনে সরকারের লোকজন অন্য একটি রাজনৈতিক দলের নাম জড়ানোর চেষ্টা করছে। আমরা সরকারকে বলবো আপনারা এটা না করে প্লিজ ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দাবি মেনে নেন। এটা শুধু ওদের দাবি নয়, এটা আমাদের সবার দাবি।
শারমিন আরা নিপা নামে অন্য এক অভিভাবক বলেন, আমরা চাই আমাদের বাচ্চারা নিরাপদে স্কুলে যাক এবং বাসায় ফিরে আসুক। কিন্তু গতকাল পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা যে নির্মমভাবে আমাদের বাচ্চাদের মারধর করছে তার দ্রুত বিচার করে ওদের দাবি মেনে নিতে হবে। ছাত্রসমাজের এই আন্দোলনে আমরা পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে সরকারের কাছে ওদের ৯ দফা দাবি মেনে নিয়ে কার্যকরের আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্ররা গতকালও মিরপুর দুই নম্বর এবং মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে নেমে আসে। দুপুরের বিরতি ছাড়া বাকি সময় তারা রাস্তায় অবস্থান করে। এ সময় যানবাহনকে নিজ নিজ সিগন্যাল মানতে সচেতনতা তৈরি এবং নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্ররা। মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন গাড়ির এবং চালকদের লাইসেন্স না থাকায় পুলিশের হাতে তুলে দিতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বাদ যায়নি পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের গাড়িও। লাইসেন্স না থাকায় সে গাড়িগুলোর বিরুদ্ধেও মামলা নিতে বাধ্য করা হয় ট্রাফিক পুলিশকে। দুপুরের বিরতির পর ছাত্ররা পুনরায় জড়ো হয়ে নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। ছাত্রদের পক্ষে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিবিএর এক শিক্ষার্থী বলেছে, আমাদের সব দাবির মূল হলো নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ। তিনি আমাদের ভাই-বোনের হত্যা নিয়ে তাচ্ছিল্য করে হেসেছেন। এটা কোনোভাবে মেনে নেয়ার নয়। এছাড়া সরকার নিহত দু’ভাইবোনের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েছে। একটা জীবনের মূল্য কি ২০ লাখ টাকা? আমরা চাই সড়কে যেন আর একটি প্রাণও না যায়। আগামীকাল সকাল ১০টায় পার্শ্ববর্তী সব স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে একই স্থানে বিক্ষোভ এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এই শিক্ষার্থী।
সকাল থেকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের অন্যতম মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। সকাল থেকে বাসের চালক ও হেলপারদের টার্মিনালের মধ্যে আড্ডা দিতে দেখা গেছে। কাউকে আবার লাঠি হাতে বসে থাকতে দেখা যায়। টার্মিনাল থেকে কোনো বাস যাতে বের না হতে পারে সেদিকে তাদের কড়া দৃষ্টি ছিল। এনা পরিবহনের একটি বাস গ্যারেজে নেয়ার জন্য বের হলে শ্রমিকরা বাধা দেয়। চালক বাধ্য হয়ে টার্মিনালে রেখে দেন। পরিবহন শ্রমিকদের একটি দলকে মহাখালীর চৌরাস্তার মোড়ে মহড়া দিতে দেখা যায়।
গতকাল বিকাল ৩টার দিকে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান মহাখালী বাস টার্মিনালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অফিসে গেলেও উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।