Monday, July 5, 2010

এমপিওভুক্তির ত্রুটিগুলো দূর করতে হলে by সৈয়দা শামসে আরা হোসেন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিভুক্তি সম্পর্কে সম্প্রতি অনেক লেখালেখি হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী পদে প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অর্থ স্থানান্তর করার পদ্ধতির নামকরণ হয়েছে ‘মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার’, সংক্ষেপে এমপিও। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস) শ্রেণীর শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অর্থ প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মচারীর নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এমপিও-সুবিধার আওতায় শিক্ষক-কর্মচারী পদে কল্যাণ তহবিল, অবসর-ভাতা তহবিল গঠনের জন্য সরকারি অর্থসংশ্লিষ্ট তহবিলের বিধি অনুসারে প্রতি মাসে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দেশের সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমপিও-সুবিধার অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও-সুবিধা পান না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতি অর্থবছর এমপিও-সুবিধা খাতে সরকারের অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা নির্ধারণ করে।
২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক হাজার ২২টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়ন সম্পন্ন করে গত মে মাসে। ১০ মে মন্ত্রিপরিষদ সভায় এই তালিকা বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নতুন তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, শিক্ষা উপদেষ্টার সক্রিয় ভূমিকা এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিধি-নীতিভিত্তিক কর্মোদ্যোগ সবার চিন্তাকে নাড়া দিয়েছে। এ পর্যন্ত এমপিও-সুবিধার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
এই অঞ্চল ঐতিহাসিক কিছু কারণ ও অবস্থার প্রভাবে শিক্ষায় পশ্চাৎপদ। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দেশ বিভাগ হওয়ার পরও শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সে সময় থেকে সমাজসচেতন মানুষ স্থানীয়ভাবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে শুরু করে। এভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের সহায়তা ছিল খুবই সীমিত ও অনিয়মিত।
স্বাধীনতার পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় সরকারের বিবেচনায় আসে। সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৭৪ সালে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস) শ্রেণীর শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় বেতন স্কেলের সমপর্যায়ভুক্ত করে বেতন নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত বেতনের প্রারম্ভিক অংশের অর্ধেক অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী পদে অর্থসহায়তা হিসেবে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হিসাব অনুসারে শিক্ষক-কর্মচারীদের হস্তান্তরের জন্য প্রেরণ করা হতো। এই অর্থ যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং অর্থের হিসাব সংরক্ষণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের প্রাপ্যতা অনুসারে বেতন-ভাতা বাবদ অর্থ সরাসরি প্রদানের ব্যবস্থা হিসেবে ১৯৮৪ সালে ‘মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার’ বা এমপিও-সুবিধা পদ্ধতি সরকার প্রবর্তন করে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত দুই হাজার ৩৮৬টি কলেজ, ১৫ হাজার ৫১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাত হাজার ৩৪৪টি মাদ্রাসা, এক হাজার ৯৫টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও-সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারপর গত ছয় বছর নতুন এমপিওভুক্তি স্থগিত রাখা হয়। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে এমপিওভুক্তি নতুন করে আবার শুরু করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে।
এমপিও-সুবিধা পাওয়া কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। সরকারি অর্থ অপব্যবহার করা হচ্ছে বলেও শোনা যায়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিও-সুবিধা প্রবর্তনের মাধ্যমে শুধু শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা খাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এর ফলে শিক্ষার মান অর্জন ব্যাহত হচ্ছে।
এমপিও-সুবিধা প্রবর্তনের মাধ্যমে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে কিছু শিক্ষকের মানসিক যন্ত্রণা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। শিক্ষা কর্তৃপক্ষের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, এমপিও-সুবিধার অনুরূপ প্রদানের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ করে সে বিষয়ে পরামর্শ দান ও বাস্তবায়ন বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
স্নাতক (সম্মান) মাস্টার্স কোর্সের পাঠদানকারী শিক্ষকদের সরকার এমপিও-সুবিধা দেয় না, এর ফলে দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের অর্থসহায়তা অনুপস্থিত।
এমপিও-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকের মান, মেধা যাচাই, দক্ষতার মূল্যায়ন করার কোনো বিধিব্যবস্থা নেই। জ্যেষ্ঠতার কারণে এই সুবিধা লাভ ঘটে, এ সত্ত্বে এমপিও-সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বলে বিবেচিত হন। সে শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ত্রুটি-অনিয়মের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তথ্যবিবরণী ফরমে শিক্ষকের মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা যাচাই বা তুলনামূলক বিবেচনার কোনো পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত নেই। নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিও-সুবিধার জন্য শিক্ষক-কর্মচারীর পদসংখ্যা নির্ধারিত থাকায় কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও-সুবিধাভুক্ত হন না। এমপিও বিধির মধ্যে এই দুর্বল ক্ষেত্রসমূহ দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
এমপিও-সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে কোনো অর্থ নেবেন না এই মর্মে অঙ্গীকারপত্র জমা দিলেও এই শর্ত লঙ্ঘন করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক সুবিধা এসব শিক্ষককে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নামকরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণের বিষয় জানা যায়। এসব আর্থিক অনিয়মের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাশ্রয় ঘটানোর যে উদ্দেশ্য এমপিও-সুবিধা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার প্রস্তাব ছিল, তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
এমপিও-সুবিধায় বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি করা হয় না। শিক্ষকের পদোন্নতির বিধিও সীমিত, এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও-বহির্ভূত শিক্ষক পদে এসব সুবিধা প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্দোলন আর দাবি নিয়ে সোচ্চার হলে এমপিও-সুবিধা পাওয়া যাবে, এ ধারণা অমূলক প্রমাণ করার পদক্ষেপ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেওয়া আবশ্যক। এমপিও-বিধি ভঙ্গ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক যে অনিয়ম হচ্ছে তা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা এবং এই অনিয়ম শাস্তিযোগ্য করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এমপিও-সুবিধা প্রয়োগ ন্যায়ভিত্তিক বিধির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। এমপিও পদ্ধতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন নিশ্চিতির সহায়ক করে তোলা প্রয়োজন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও সব শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রাপ্তির সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
সৈয়দা শামসে আরা হোসেন: সাবেক অধ্যক্ষ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, ঢাকা।

নজরুলদের নীরব মৃত্যু by মশিউল আলম

১১ জুন ‘বার্ন ইউনিটের পোড়া কপাল’ শিরোনামের লেখায় একজন নজরুলের কথা উল্লেখ করেছিলাম। ২৫ বছর বয়সী তরুণ। দরিদ্র নির্মাণশ্রমিক। তাকে প্রথম দেখেছিলাম জুনের ৬ তারিখে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে; নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের শিকার হওয়া রোগীদের দেখতে গিয়ে। নজরুল অবশ্য নিমতলীর রোগী ছিল না। ঢাকার মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় একটি বাড়ি নির্মাণের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সে ভর্তি হয়েছিল বার্ন ইউনিটে।
৬ জুনের পর থেকে প্রতিদিন টেলিফোনে নজরুলের খোঁজ নিয়েছি তার খালাতো ভাই জাহাঙ্গীরের কাছে। ভোলার লালমোহন থেকে আসা নজরুলের এই এক খালাতো ভাই ছাড়া ঢাকায় তার আর কেউ নেই। জাহাঙ্গীর জানাচ্ছিলেন, নজরুলের অবস্থার ক্রমেই অবনতি ঘটছে। ৯ জুন তিনি জানালেন, তাকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছে। ১০ জুন দুপুরে বার্ন ইউনিটে আবার গিয়েছিলাম; তখন আইসিইউতে নজরুলকে দেখেছি দুই চোখ বন্ধ। ঘুমাচ্ছিল সে। ১২ তারিখ বিকেল তিনটায় জাহাঙ্গীরকে ফোন করে জানতে চাই, ‘নজরুলের অবস্থা কী?’ জাহাঙ্গীর বললেন, ‘ভালো না, মারা গেছে। ডেড।’
বিস্ময় প্রকাশ করেছিলাম জাহাঙ্গীরের কাছে। তাঁর কণ্ঠে অবশ্য বিস্ময় ছিল না, তিনি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিলেন, দিনরাত অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগে তিলে তিলে মারা যাচ্ছে তাঁর খালাতো ভাইটি, যার বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর, যার সামনে পড়ে ছিল জীবনের দীর্ঘ পথ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে যেসব পোড়া রোগী চিকিৎসা নিতে আসে, তাদের মধ্যে ১৪ শতাংশ নজরুলের মতো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট রোগী। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা বিভিন্ন রকম। নজরুল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিল একটি বাড়ি তৈরির কাজ করতে করতে। ভূমি থেকে লোহার রড তিনতলার ছাদে তোলার সময় ৪৪০ কেভি বিদ্যুতের লাইনের সঙ্গে রডের স্পর্শের ফলে তার পরনের জামা-লুঙ্গি তো বটেই, গায়ের চামড়াও পুড়ে গিয়েছিল। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল সে। তাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করিয়েছিলেন সেই বাড়ির মালিক। ৬ জুন বার্ন ইউনিটের এইচডিইউতে তার সংজ্ঞা ছিল, সে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। তখন ধারণা করতে পারিনি, সে বাঁচবে না। কিন্তু সে সময় এইচডিইউতে কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স তপন কুমার আমাকে বলেছিলেন, নজরুলের পোড়া ৪১ শতাংশ, তাও ফ্লেম বার্ন বা আগুনে পোড়া নয়, ইলেকট্রিক বার্ন। এমন রোগীকে বাঁচানো খুব কঠিন।
তার পাঁচ দিনের মাথায় নজরুল বিদায় নিল। অকুল পাথারে ভাসিয়ে দিয়ে গেল এক বছর ১০ দিন বয়সী একটি শিশুসন্তান আর তার অসহায় মাকে। নজরুল চলে গেল নীরবে, কোনো সংবাদ শিরোনাম হলো না সে। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের শিকার জীবিত, চিকিৎসারত রোগীদের চেয়ে নজরুল অনেক অভাগা। কারণ, নিমতলীর রোগীরা কেমন আছেন সে খবর এখনো নেওয়া হচ্ছে। নজরুলের খবর কেউ নিতে যায়নি। যেসব মানুষ নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত, তাদের অনেকেই এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। কেবল তখনই তারা সংবাদ শিরোনাম হতে পারে, যখন একসঙ্গে অনেকে দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণ হারায়। কিন্তু যদি সারা দেশে গড়ে দৈনিক একজন করেও মারা যায়, তাহলে এক বছরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬৫। নিমতলীর মৃতের তালিকার (এ পর্যন্ত ১২৩) চেয়ে কিন্তু ঢের লম্বা হয়ে যায় এই ভাবে মৃতদের তালিকা। কিন্তু নিমতলীর মতো দুর্ঘটনা ঘটে খুব কদাচিৎ, নজরুলের মতো নীরব মৃত্যু ঘটছে প্রতিদিন।
১৩ জুন বেলা ১১টায় বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক সামন্তলাল সেনের সঙ্গে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখার পর তাঁর কক্ষে বসে আলাপের একপর্যায়ে তিনি মন্তব্য করলেন, পোড়া রোগীদের চিকিৎসা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রিভেনশান—পোড়া ঠেকানো। কারণ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে, আগুনে বা এসিডে পুড়লে কেউ যদি মারা না-ও যায়, পুরোপুরি সুস্থ আর সে কখনোই হয় না। একটি অ্যালবাম খুলে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অনেক রোগীর ছবি দেখালেন, যাদের চিকিৎসা দিয়ে, অস্ত্রোপচার করে তিনি প্রাণে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু তাদের কারও হাত নেই, কারও পা নেই। আগুনে ও এসিডে পোড়া রোগীদেরও বেশির ভাগই আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায় না। সারা জীবন যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়; কর্মক্ষমতা হারিয়ে তারা বেঁচে থাকে পরিবারের ওপর একটা বোঝার মতো।
তাই দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ডা. সামন্তলাল সেন। তিনি দেখেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শ্রমিকেরা খালি হাতে, বিপজ্জনক উচ্চতায় উঠে প্রয়োজনীয় প্রিকশান বা সতর্কতাপূর্ণ ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করেন; এবং শুধু শ্রমিকেরা নয়, প্রকৌশলীদেরও অনেকে হাতে গ্লাভস না পরেই কাজ করেন। ডা. সেন আরও জানালেন, বিভিন্ন কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের শিকার হয়ে অনেক শ্রমিক বার্ন ইউনিটে আসেন। অর্থাৎ যেসব কারখানায় বয়লার থাকে, সেগুলোতে শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। বয়লার নির্মাণে ও ব্যবহারেও নিশ্চয়ই ত্রুটি থাকে, নইলে কেন সেগুলো বিস্ফোরিত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু ডেকে আনবে, তাঁদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহীন করে দেবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে মাঝেমধ্যেই বার্ন ইউনিটে যেতে হয়। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। সেখানকার শ্রমিকেরা প্রায়ই কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে (প্রাণ না হারালে) বার্ন ইউনিটে আসেন চিকিৎসা নিতে। জাহাজভাঙা শিল্প কেবল সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে না; প্রতিবছর অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি, অঙ্গহানি ও স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে। কারণ, সেখানেও শ্রমিকদের কাজ করতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই। সেখানকার শ্রমিকেরা বিষাক্ত পুরোনো জাহাজের লোহা কাটেন মুখে মুখোশ না পরে, হাতে গ্লাভস না পরে, খালি পায়ে, খালি গায়ে। বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের নীরব বিষক্রিয়া তো আছেই, সরবে ট্যাংকার বিস্ফোরণে একসঙ্গে অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও সেখানে মাঝেমধ্যেই ঘটে।
ডা. সামন্তলাল সেন জোর দিয়ে বলেন: দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে মনোযোগী হওয়া দরকার। বাংলাদেশে যত ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশা রয়েছে, সেগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তা নিয়মিত মনিটর করার জন্য সরকারের একটি সংস্থা থাকা উচিত। তৈরি পোশাকশিল্পের মতো আনুষ্ঠানিক শিল্পখাত ছাড়াও অনেক পেশা রয়েছে যেগুলো ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। নজরুলের মতো নির্মাণশ্রমিকেরা বাঁশ-দড়ির সাহায্যে বহুতল ভবনের অনেক উঁচুতে উঠে দেয়াল প্লাস্টার করেন, রং লাগান। তাঁদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই নেই। এই শ্রমিকেরা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন কেবল সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে (একজন তরুণ শ্রমিকের ভাষ্য: আল্লাহ আছে, কিছু হইব না)।
নজরুলের খালাতো ভাই বাংলাদেশ বিমানে মোটর ট্রান্সপোর্ট অপারেটর হিসেবে কর্মরত জাহাঙ্গীরকে আবার যখন ফোন করি (১৫ জুন), সেদিন নজরুলের মিলাদ। তার লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রামে, ভোলার লালমোহনে। সেখানে নজরুলের মা আছেন। লাশ পাঠানোর খরচ বাবদ ১৪ হাজার টাকা দিয়েছেন নজরুল যে বাড়ি নির্মাণের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন, তার মালিক ১০২ মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার সঞ্জয় রায় বাবু। তিনি নজরুলের চিকিৎসার সময় ১৩ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর জানালেন, চিকিৎসা বাবদ মোট খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা, এ টাকা গেছে তাঁর (জাহাঙ্গীরের) নিজের পকেট থেকে। সঞ্জয় রায়ের আরও টাকা দেওয়া উচিত বলে জাহাঙ্গীর মনে করেন। সঞ্জয় রায় অবশ্য মনে করেন, দুর্ঘটনার দায় তাঁর নিয়োজিত ঠিকাদার ইউনুস মিয়ার; ক্ষতিপূরণও তাঁরই দেওয়া উচিত। কিন্তু জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, ঠিকাদার আগাগোড়াই দূরে দূরে থেকেছেন। জাহাঙ্গীর তাঁর নাগাল পাননি। আমি অনেকবার মুঠোফোনে সঞ্জয় রায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি, তাঁর নাম্বারটি বন্ধ। ইউনুস মিয়ার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে মনে হলো, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে নিয়োগকারীর জন্য বাধ্যতামূলক—এ বিষয়টি তাঁর জানাই নেই।
নজরুলের অকালমৃত্যু একটি দুর্ঘটনা বটে, কিন্তু সে দুর্ঘটনা ঘটেছে তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার ফলে। এর দায় অবশ্যই নিতে হবে বাড়ির মালিক বা তাঁর নিয়োজিত ঠিকাদারকে। আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা বাধ্য। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য-ঝুঁকি সংক্রান্ত বিধান মেনে চলার গাফিলতির কারণে শ্রমিকের মৃত্যু হলে নিয়োগকারীর চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। কিন্তু নজরুলের জন্য এখন মামলা-মোকদ্দমা করতে যাবে কে? তার চেয়েও বড় কথা, নজরুলের তরুণী স্ত্রী (২২) ও দুধের বাচ্চাটির (এক বছর ১০ দিন) ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার হয়ে গেল, এর জবাব কী?
এবং আরও বড় জিজ্ঞাসা: সারা দেশে এভাবে প্রতিদিন কতজন নজরুল ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে মজুরি বিক্রি করতে করতে প্রাণ হারায়, কিন্তু সংবাদ শিরোনাম হয় না?
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

‘পরের জায়গা পরের জমি...’- স্কুলের জমিতে মার্কেট বানানোর ‘সদ্ব্যবহার’ বন্ধ করুন

জায়গাটি স্কুলের, কিন্তু তাতে বিএনপি করেছিল দলীয় কার্যালয় আর এখন আওয়ামী লীগ করেছে মার্কেট। মরমি গানের কথায়, ‘পরের জায়গা পরের জমি, ঘর বানাইয়া আমি রই/ আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।’ দেখেশুনে মনে হয়, মালিকানা কার সেটা বড় নয়, বড় হলো কে দখলে রাখতে পারে! দলিল বড় নয়, দখলদারির প্রতিপত্তিই যে আসল কথা, সেটাই প্রমাণ করেছেন ঝিনাইদহের মহেশপুরের কাজীরবেড়ের আওয়ামী লীগের নেতা আবুল কাশেম।
নেতার দখলের কৌশলটিও উঠতি দখলদারদের জন্য শিক্ষণীয়। চারদলীয় জোট সরকারের সময় স্থানীয় বিএনপি কাজীরবেড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খোলা জায়গায় দলীয় অফিস করলে আওয়ামী লীগের এক নেতা তার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু এখন তো দিন বদল হয়েছে। এখন তাঁর দলের সরকার ক্ষমতায়। অতএব, তিনি মার্কেট বানিয়ে জায়গাটির ‘সদ্ব্যবহার’ করলেন। বিএনপির কর্মীরা সে সময় এই অফিসে সারাক্ষণ গানবাজনা চালিয়ে শিশুদের পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটাতেন, আর এখন আওয়ামী লীগের নেতা সেখানে মার্কেট বানিয়ে বিত্তের কারবারের কাছে বিদ্যার পরিবেশকে বলি বানিয়েছেন। কেউ কারও থেকে কম যাননি! কিন্তু সরকারি ওই বিদ্যালয়টির কী হবে? কী হবে তার ছাত্রছাত্রীদের। সরকারি জমি চাইলেই সবার সামনে দলীয় ক্ষমতায় আত্মসাৎ করা যায়? একসময় জনপ্রতিনিধিরা স্কুল, কলেজ, মসজিদ প্রভৃতির জন্য জমি ও সম্পদ দান করতেন, কিন্তু এখন উল্টোটা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরাই বরং এজমালি সম্পত্তি বা সরকারি জমি দখল করে সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ করছেন।
এই ধারার অপরাধ সারা দেশেই হয়ে চলেছে। ছোট দখল থেকে বড় দখল—কিছুই বাদ যাচ্ছে না। বন-নদী-অরণ্য, হাট-বাজার-মাঠ, পদ ও প্রতিষ্ঠান—কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এবং সেই সব দখল কীভাবে দলের পর দল, সরকারের পর সরকারের আমলে চলতেই থাকে, বিএনপির অফিস করা আর আওয়ামী লীগের মার্কেট করা তারই উদাহরণ। দখলের এই চাপে জনস্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ কোণঠাসা অবস্থায়, ঠিক যেমন দখলের মার্কেটের চাপে কোণঠাসা হয়ে চলছে কাজীরবেড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এভাবে চলতে পারে না। আশা করি, সরকার শিগগিরই ঝিনাইদহের কাজীরবেড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি উদ্ধার করবে এবং দখলদারকে শাস্তি দেবে।

অ্যামনেস্টির আহ্বান -সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে

গত ২৭ জুন হরতালের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছেন বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যে অভিযোগ করেছে, তা নাকচ করার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও ক্ষমতাসীন দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা ও মন্ত্রীর কথায় তার সত্যতা পাওয়া গেছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও হরতাল আহ্বানকারী—দুই পক্ষই বাড়াবাড়ি করেছে। হরতালের আগের রাতে বিরোধী দলের কর্মীরা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে ফারুক নামের এক ট্যাক্সিচালক মারা যান। অন্যদিকে বিএনপি নেতার বাড়িসহ কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলায় একজন সাংসদসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। সে ক্ষেত্রে হরতালকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষই যে বাড়াবাড়ি করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। র‌্যাব দাবি করেছে, বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাসের বাড়ি থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
যারা আইন হাতে তুলে নেবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। কিন্তু তাই বলে অশীতিপর বৃদ্ধার গায়ে হাত দেওয়ার মতো কাজ তারা করতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বরাবরই ছিল। সাম্প্রতিক কালে তাদের বেপরোয়া আচরণ জনমনে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রাজধানীতে পুলিশি হেফাজতে বা বন্দুকযুদ্ধে তিনজনের মৃত্যুর খবরও উদ্বেগজনক। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মির্জা আব্বাসের বাড়ির ঘটনা তদন্তের যে দাবি জানিয়েছে, তা অযৌক্তিক নয়। সেই সঙ্গে হরতালের আগের রাতে গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং সাংসদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনাও তদন্ত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যেমন জনজীবনকে জিম্মি করা ঠিক নয়, তেমনি তা প্রতিহত করার নামে দমন-পীড়ন চলতে পারে না।
আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হতে হবে। সে ক্ষেত্রে জবরদস্তির সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হরতাল-অবরোধে সরকারের পরিবর্তন ঘটে না, বরং তা দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। এ কারণেই আমরা হরতাল-অবরোধ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের কথা বলে আসছি। সংসদকে কার্যকর করা এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ন্যূনতম কার্যসম্পর্ক থাকাও জরুরি।
সরকারি দলের সবকিছু দখল করা কিংবা বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। সামনে বিএনপির মানববন্ধন কর্মসূচি। এ কর্মসূচি যাতে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়, সে ব্যাপারে দলীয় নেতা-কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে সংযত আচরণই কাম্য। কোনো পক্ষের বাড়াবাড়ি যেন ২৭ জুনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

মিয়ানমারে আরও ৩টি নতুন পত্রিকা আসছে

মিয়ানমারে চলতি মাসে বেসরকারি মালিকানাধীন আরও তিনটি নতুন পত্রিকা আসছে। এসব পত্রিকায় মূলত আসন্ন নির্বাচন নিয়ে খবর প্রকাশিত হবে।
ভয়েস জার্নাল নামে একটি পত্রিকা জানায়, পিযু কিউ , হট নিউজ ও মডার্ন টাইমস নামে তিনটি পত্রিকা প্রকাশিত হবে। এতে আন্তর্জাতিক বিষয় বিশেষ করে সামরিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনীতি নিয়েও খবর প্রকাশিত হবে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রেস স্ক্রুটিনি অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন বোর্ড সম্প্রতি এই তিনটি পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের আরও ১৫০টি পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেসব পত্রিকা প্রকাশ করা হবে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে খেলাধুলা বিষয়ক পত্রিকার চাহিদা বেশি।

তিব্বতি পরিবেশবাদীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন চীনা আদালত

জাতিকে বিভক্ত করতে উসকানি দেওয়ার দায়ে গতকাল শনিবার একজন তিব্বতি পরিবেশবাদীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন একটি চীনা আদালত। আবর্জনা অপসারণ ও গাছের চারা রোপণের জন্য গ্রামবাসীকে সংগঠিত করেছিলেন রিনচেন স্যামড্রাপ নামে ওই পরিবেশবাদী।
কারাদণ্ডপ্রাপ্ত রিনচেন স্যামড্রাপ সিচুয়ান প্রদেশের নিকটবর্তী তিব্বতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গোনজো কাউন্টিতে একটি পরিবেশবাদী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) পরিচালনা করেন।
এলাকায় বনায়নের জন্য প্রায় এক হাজার ৭০০ গ্রামবাসীকে জড়ো করেছিল উন্নয়ন সংস্থাটি। এ সংস্থা একটি ছোট সাময়িকী প্রকাশ করে থাকে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করে থাকে এনজিওটি। চীনা গণমাধ্যমে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাটির কর্মকাণ্ড প্রশংসিত হয়েছে।
আইনজীবী ঝিয়া জুন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, দেশকে বিভক্ত করতে উসকানি দেওয়ার দায়ে রিনচেন স্যামড্রাপকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ওই পরিবেশবাদী আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। আইনজীবীরা জানান, দালাই লামাপন্থী একটি নিবন্ধ ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্যও তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য রিনচেন স্যামড্রাপের হাতে ১০ দিন সময় রয়েছে।

কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ ওতুনবায়েভার

পেশাদার কূটনীতিক রোজা ওতুনবায়েভা গতকাল শনিবার দাঙ্গা-বিধ্বস্ত কিরগিজস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। মধ্য এশিয়ায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত কোনো দেশে তিনিই প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।
রাজধানী বিশকেকে সোভিয়েত যুগে নির্মিত কনসার্ট হলে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে শপথ নেন ওতুনবায়েভা। ভিড়ে ঠাসা ওই হলে এক হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠানে ওতুনবায়েভা অস্থিতিশীল দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলার প্রতি আমি কঠোরভাবে অনুগত থাকব এবং কোনো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি সৃষ্টির চেষ্টাকে প্রশ্রয় দেব না। সরকারের সব শাখার দাবি পূরণে আমি নীতিগতভাবে অটল থাকব। কাল্পনিক ও অলীক কিছুর ওপর ভিত্তি করে নতুন নীতি তৈরি হবে না। তা হবে অবশ্যই বাস্তব ও কার্যকর।’
ওতুনবায়েভা কিরগিজস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এক নাজুক সময়ে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। গত এপ্রিলে দেশের রাস্তায় রাস্তায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এর জের ধরে সাবেক প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পরই ওতুনবায়েভার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্ব নেয়।
ওতুনবায়েভা শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে সে দেশে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে নতুন সংবিধান অনুমোদিত হয়। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে গেছে।

সৌরবাতির উদ্ভাবকেরা সম্মানজনক পরিবেশ পদক পেয়েছেন

উন্নয়নশীল দেশ-গুলোতে ব্যবহূত কেরোসিনের বাতির বিকল্প হিসেবে সৌরবাতির উদ্ভা-বকেরা সম্মানজনক পরিবেশ পদক ‘অ্যাশডেন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। সৌর-শক্তিসম্পন্ন পণ্যের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডিলাইট ডিজাইনের গবেষকেরা এ পুরস্কার পেয়েছেন। ডিলাইট ডিজাইন জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবিত সৌরবাতি ‘কিরণ’ কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। প্রতিটি সৌরবাতি ১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
অ্যাশডেন অ্যাওয়ার্ড কমিটির বিচারকেরা বলেন, কেরোসিনের বাতি ব্যবহারের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশদূষণগত যেসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি ভীষণ আগ্রহ ও একাগ্রতার পরিচয় দিয়েছে।
ভারতীয় উদ্যোক্তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি জানায়, কেরোসিনের ধোঁয়ার ফলে সৃষ্ট দূষণে প্রতিবছর ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়।
এক বিবৃতিতে অ্যাশডেন অ্যাওয়ার্ড কমিটি বলেছে, ‘সৌরবাতি বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে ডিলাইট ডিজাইনের অত্যন্ত কার্যকরী নীতি আমাদের মুগ্ধ করেছে। তাদের এমন নীতির কারণেই তারা ৩২টি দেশের ১০ লক্ষাধিক মানুষের কাছে এই বাতি পৌঁছে দিতে পেরেছে।’ কমিটি জানায়, পদকজয়ী আরেকটি প্রতিষ্ঠান রুরাল এনার্জি ফাউন্ডেশন আফ্রিকার নয়টি দেশের তিন লাখ মানুষকে সৌরবাতি সরবারহ করেছে। উল্লেখ্য, আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের ৭০ শতাংশের বেশি এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।

দুটি সৌর জ্বালানি কোম্পানিকে ২০০ কোটি ডলার দেবে যুক্তরা

যুক্তরাষ্ট্র দুটি সৌর জ্বালানি কোম্পানিকে প্রায় ২০০ কোটি ডলার অনুদান দেবে। এই কোম্পানিগুলো সে দেশে নতুন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা তৈরিতে রাজি হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। গতকাল শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর সাপ্তাহিক বেতার ভাষণে এই অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
বেতার ভাষণে ওবামা বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানার সঠিকভাবে শেকড় গাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমাদের প্রতিযোগিতা চলছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানান, সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর একটি হচ্ছে অ্যাবেনগোয়া সোলার। অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর স্থাপনাগুলোর একটি গড়তে রাজি হয়েছে। এই কোম্পানির মাধ্যমে এক হাজার ৬০০ নির্মাণশ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। স্থাপনাটির নির্মাণকাজ শেষ হলে ৭০ হাজার বাড়িতে যথেষ্ট পরিমাণে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অপর কোম্পানি হচ্ছে অ্যাবাউন্ড সোলার ম্যানুফ্যাকচারিং। দুটি স্থাপনা তৈরি করছে এটি—একটি কলোরাডোয়, অন্যটি ইন্ডিয়ানায়। এসব প্রকল্পের নির্মাণকাজে দুই হাজারের বেশি লোকের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব স্থাপনায় দেড় হাজারের বেশি লোক স্থায়ীভাবে চাকরি পাবেন। স্থাপনাগুলোতে প্রতিবছর লাখ লাখ সোলার প্যানেল তৈরি হবে।
ওবামা বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমরা এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি। তবে সত্যি বলতে কি, আমরা রাতারাতি যেসব চাকরি হারিয়েছি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তা পূরণ করা সম্ভব হবে। চাকরির জন্য লোকজন যে কী কষ্ট করছে তা আমি জানি।’ তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

সন্দেহভাজন দুই গুপ্তচর স্বীকার করলেন তাঁরা রুশ নাগরিক

রাশিয়ার পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন ভার্জিনিয়ার একটি আদালত। বিদেশি সংস্থার হয়ে গোয়েন্দাগিরি করার কথা স্বীকার করায় আদালত গত শুক্রবার তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এঁদের মধ্যে দুজন স্বীকার করেছেন তাঁরা রুশ নাগরিক। এর আগে নিউইয়র্কের একটি আদালতে সন্দেহভাজন অপর ছয় গুপ্তচরের জামিন অবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়।
আইনজীবীরা বলেছেন, মাইকেল জোট্টোলি ও প্যাট্রিসিয়া মিলস স্বীকার করেছেন, তাঁদের প্রকৃত নাম হচ্ছে মিখাইল কুতজিক ও নাতালিয়া পেরেভের্জেভা। তাঁদের উভয়ের পরিবার রাশিয়ায় বসবাস করছে। মিখাইল সেমেনকো নামে অপর সন্দেহভাজন গুপ্তচরও প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছেন। তাঁর আসল নাম হচ্ছে জুয়ান লাজারো। রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গত রোববার ১০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাঁরা রাশিয়ার ফরেন ইনটেলিজেন্স সার্ভিসের (এসভিআর) সদস্য।
কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া এই ১০ জনের বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারের অবৈধ এজেন্ট হিসেবে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও গুপ্তচরবৃত্তির চেয়ে এ অভিযোগ লঘু। তবে এর জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
সন্দেহভাজন গুপ্তচরদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে সম্প্রতি ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠা সম্পর্ক আবার শীতল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এই আশঙ্কাকে পাত্তা দেননি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
মস্কো প্রথমে এ গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেও পরে বলেছে, বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে মস্কো স্বীকার করেছে, গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে কয়েকজন রাশিয়ার নাগরিক। এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানায়নি তারা।
আইনজীবীরা জানান, মাইকেল জোট্টোলি ও প্যাট্রিসিয়া মিলস দম্পতি ছদ্মনামে ভার্জিনিয়ায় বসবাস করতেন। তাঁদের পাসপোর্ট ছিল জাল এবং তাঁদের কাছে নগদ প্রায় এক লাখ ডলার ছিল। তাঁদের দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। আইনজীবীরা জানান, এই দম্পতির সন্তানদের রাশিয়ায় তাঁদের আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। কৌঁসুলিরা বলেন, সেমেনকো একটি স্থানীয় রুশ ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়নি।
আদালত আগামী বুধবার মাইকেল জোট্টোলি, প্যাট্রিসিয়া মিলস ও মিখাইল সেমেনকোর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার প্রাথমিক শুনানির দিন হিসেবে ধার্য করেছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের একটি আদালত সাংবাদিক ভিকি পেলেজের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। বিচারক রোনাল্ড এলিস বলেন, পেলেজ একজন মার্কিন নাগরিক এবং তিনি গুপ্তচরবৃত্তির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে মনে হয় না। তবে তাঁর স্বামী জুয়ান লাজারোকে জামিন দেওয়া যাবে না। কেননা তিনি রাশিয়ার পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার কথা স্বীকার করেছেন।
এই ১০ জনকে সম্ভাব্য অর্থপ্রদানকারী হিসেবে চিহ্নিত ক্রিস্টোফার মেটসোস গত বুধবার সাইপ্রাসে পালিয়ে যান বলে খবর বেরিয়েছে। তবে সাইপ্রাসের বিচারমন্ত্রী বলেছেন, মেটসোস সেখান থেকেও পালিয়ে গেছেন।

পেট্রোপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে কাল ভারত বন্ধ্

ভারতে চারটি বামদলসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল পেট্রোপণ্যসহ জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা বন্ধ্ ডেকেছে ।
সিপিএম, সিপিআই, ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি এই বনেধর ডাক দেয়। আর এই বন্ধেক সমর্থন জানিয়েছে অজিত সিংয়ের আরএলডি, ওমপ্রকাশ চৌতালার আইএনএলডি, লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। প্রসঙ্গত, পেট্রোপণ্য সহ দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২৭ এপ্রিল সকাল-সন্ধ্যা ভারত বন্ধ পালিত হয়েছিল।

মেক্সিকো উপসাগরের তেল শুষে নিচ্ছে সুপার ট্যাংকার

তাইওয়ানের একটি সুপার ট্যাংকার গত শুক্রবার থেকে পরীক্ষামূলকভাবে মেক্সিকো উপসাগরে নিঃসৃত তেল শোষণ শুরু করেছে। বিপির মুখপাত্র টবি ওডন এএফপিকে জানান, ‘এটি দানবের মতো একটি ট্যাংকার, যার দুই ধারে তেল শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।’
এটি তেল ও তেলমিশ্রিত পানি শুষে নেয় এবং তেলটুকু আলাদা করে রেখে পানি ফেলে দেয়। ট্যাংকারটি লম্বায় প্রায় ৯০০ ফুট এবং প্রতিদিন ২১ মিলিয়ন গ্যালন পানিমিশ্রিত তেল শোষণ করতে পারবে।
অন্যদিকে ১০ সপ্তাহ ধরে ছোট তেল শোষার বোটগুলো এ পর্যন্ত মাত্র ২৮ দশমিক ২ মিলিয়ন গ্যালন তেল শোষণ করতে পেরেছে, যা সুপার ট্যাংকারটি প্রায় এক দিনেই পারবে।
২২ এপ্রিল লুইজিয়ানা উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে (৮০ কিলোমিটার) সাগরের গভীরে বিপি নিয়ন্ত্রিত একটি তেলকূপের রিগে বিস্ফোরণ ঘটলে সেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৬০ হাজার ব্যারেল তেল সাগরের পানিতে মিশছে।

কমনওয়েলথ গেমসে ভারতে জঙ্গি হামলা হতে পারে



যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ভারতকে এই মর্মে একটি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আসন্ন কমনওয়েলথ গেমস চলার সময় জঙ্গিরা হামলা চালাতে পারে। শুক্রবার ভারতের সংবাদ সংস্থার কাছে এ কথা জানিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা স্টাটফোরের কর্মকর্তা স্কট স্টুয়ার্ট। তিনি জানান, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখে পুনে বিস্ফোরণের ঠিক দুই দিন পর জঙ্গিগোষ্ঠী লস্কর-ই-তাইয়েবা বিশ্বকাপ হকি, আইপিএল এবং কমনওয়েলথ গেমসের সময় হামলা চালাবে বলে হুমকি দিয়েছিল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতেই স্টুয়ার্ট জানিয়েছেন, অক্টোবরে শুরু হওয়া কমনওয়েলথ গেমসে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। তিনি এ কথাও বলেছেন, লস্কর ছাড়াও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনও হামলা চালাতে পারে।
আগামী ৩ অক্টোবর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বসছে কমনওয়েলথ গেমসের আসর। এতে যোগ দেবে ৭০টি দেশ।

কঙ্গোতে ট্যাংকার বিস্ফোরণে ২০০ জন নিহত

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর কিভু প্রদেশে একটি তেলবাহী ট্যাংকারের বিস্ফোরণে কমপক্ষে ২০০ ব্যক্তি নিহত ও আরও ১০০ আহত হয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে ট্যাংকারটি বিস্ফোরণের পর একটি গ্রামে আগুন ছড়িয়ে পড়লে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কিভুর প্রাদেশিক সরকারের মুখপাত্র ভিনসেন্ট কাবাঙ্গা জানান, তাঞ্জানিয়া থেকে আসা দ্রুতগামী ট্যাংকারটি উল্টে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। পরে বিস্ফোরণের আগুন সেইঞ্জ গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কমপক্ষে ২০০ ব্যক্তি নিহত ও ১০০ আহত হন। তিনি আরও জানান, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে কঙ্গোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত জাতিসংঘের মোনাক ফোর্সের একজন মুখপাত্র জানান, দুর্ঘটনায় ২২৩ জন নিহত ও ১১০ আহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা তিনটি হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন। আহতদের উভিরা ও কিভুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মাটি ও খড়কুটা দিয়ে তৈরি সেইঞ্জের কয়েক ডজন বাড়িঘর আগুনে পুড়ে গেছে। বিস্ফোরণের অগে ট্যাংকারটির পাশে অনেক শিশু খেলাধুলা করছিল।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তেলচুরি করতে গিয়ে কিছু মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু বেশিরভাগই মারা গেছেন যাঁরা ঘরের ভেতরে বিশ্বকাপ ফুটবলখেলা দেখছিলেন।শোকে পুরো গ্রাম কাঁদছে।

আফগান যুদ্ধ অবসানে ঐক্যের ডাক দিলেন জেনারেল পেট্রাউস

আফগান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সে দেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস। রাজধানী কাবুলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে গত শুক্রবার আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো জোট ও আফগানিস্তানের এক হাজার ৭০০ জনের বেশি ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নয় বছর ধরে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এ চারতারকা জেনারেল। সমবেতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য এ যুদ্ধ করছি। এতে সাফল্য লাভ করতে হলে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা চালাতে হবে। সামরিক, বেসামরিক, আফগান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করতে হবে।’
জেনারেল পেট্রাউস বলেন, তাঁরা এক কঠিন মিশনে মাঠে নেমেছেন। এখানে কোনো কিছু সহজ নেই। পদে পদে জটিলতা। তাই একযোগে কাজ করার বিকল্প তাঁদের কাছে নেই। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে তাঁরা অবশ্যই সফল হবেন। এ গুরুত্বপূর্ণ কাজে পারস্পরিক সহযোগিতারও কোনো বিকল্প নেই।
জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস তাঁর পূর্বসূরি জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালের স্থলাভিষিক্ত হলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তাঁর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপহাস এবং সমালোচনা করায় ওবামা কিছুদিন আগে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।
পেট্রাউস অত্যন্ত কঠিন এক সময়ে আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক সময়ে তালেবানের হামলা বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাহিনীর ওপর হামলা। এসব হামলায় গেল জুন মাসেই নিহত হয়েছেন ১০২ জন বিদেশি সেনা।
এদিকে আফগান পার্লামেন্টের সদস্য আহমেদ বেহজাদ বলেছেন, তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হতে হলে পেট্রাউসকে যুদ্ধকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। অবশ্য পেট্রাউস ইতিমধ্যেই কিছু পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তিনি বলেছেন, যুদ্ধে বেসামরিক আফগানদের যাতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কম হয়, সেদিকে তিনি সর্বোচ্চ নজর দেবেন। মার্কিন বাহিনীর বেপরোয়া বিমান হামলায় সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রাণহানিতে ইতিমধ্যে আফগানদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া তালেবান-বিরোধী এ যুদ্ধে বেসামরিক প্রশাসনের সহযোগিতার বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেও তিনি সমরকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে করছেন সমর-বিশেষজ্ঞরা।

আত্মঘাতী হামলার প্রতিবাদে লাহোরে সর্বাত্মক ধর্মঘট

সুফি সাধকের মাজারে আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাহোরে ধর্মঘট পালিত হয়েছে। দিনব্যাপী ধর্মঘটে দোকানপাট ও অফিস-আদালত ছিল বন্ধ। বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলার প্রতিবাদে পাঞ্জাব সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে।
সুন্নি মুসলিম কাউন্সিলের ডাকে এ ধর্মঘট পালিত হয়। কাউন্সিলের নেতা রাগিব নাঈম বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা ‘শাহবাজ শরিফ নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দেয়। তারা বলে, সন্ত্রাসীদের দমনে তিনি বারবার যে প্রতিজ্ঞা করেছেন, তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।
সুফি সাধক হজরত সৈয়দ আলী বিন উসমান হাজবেরির মাজারে গত বৃহস্পতিবার রাতে পর পর দুটি আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ৪৩ জন নিহত হয়। আহত হয় কমপক্ষে ১৭৫ জন।
মাজারে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এ হামলার ঘটনাকে নৃশংস অভিহিত করে বলেছেন, পাকিস্তানে জঙ্গিবাদ দমনে সব ধরনের সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে পুলিশ এ হামলার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটক করলেও কাউকেই গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।
লাহোরে দায়িত্ব পালনকারী এএফপির সাংবাদিক জানিয়েছেন, ধর্মঘটে ব্যস্ত সড়কগুলো ছিল একেবারেই ফাঁকা। গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে স্কুলগুলো ছিল আগে থেকেই বন্ধ। শনি ও রোববার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কর্মজীবীরা ঘর থেকে বের হননি। দোকানপাটও ছিল বন্ধ।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এ হামলার দায়দায়িত্ব এখন পর্যন্ত কেউ স্বীকার করেনি। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা খণ্ডিত দুটি মস্তকের পরিচয়ও পাওয়া যায়নি। তাদের পরিচয় উদ্ঘাটনে সময় লাগবে বলে তাঁরা জানান।
তবে তদন্তকারী দলের এক সদস্য বলেছেন, ‘আত্মঘাতী হামলায় নিহত একজনের লাশ আমরা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি। আমাদের ধারণা, নিহত এই ব্যক্তি দুই হামলাকারীর একজন। আমরা তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছি।’
এ হামলার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা গত শুক্রবারও রাজপথে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা গাড়ির টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ হামলার জন্য উগ্রপন্থী তালেবানদের দায়ী করে তারা।

সাংবাদিকদের সঙ্গে সেনাদের মতবিনিময়ে কড়াকড়ি

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সেনাবাহিনীর মতবিনিময়-বিষয়ক আইনে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। গত শুক্রবার পেন্টাগনে পাঠানো তিন পৃষ্ঠার এক স্মারকে তিনি এ নির্দেশ দেন। রোলিং স্টোন সাময়িকীতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্টসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য আফগানিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন সেনা কমান্ডার জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালকে বরখাস্ত করার ঘটনার পর তিনি এই কঠোর পদক্ষেপ নিলেন।
ওই সাক্ষাৎকারে ম্যাকক্রিস্টাল ও তাঁর সহযোগীরা শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেন। পেন্টাগনের প্রধান সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক স্মারকে এই অসতর্ক মন্তব্যের পাল্টা সমালোচনা করেন গেটস।
মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, ম্যাকক্রিস্টালকে বরখাস্ত করার ঘটনার অনেক আগেই এই কড়াকড়ি আরোপের বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ম্যাকক্রিস্টালের ঘটনার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। এই সিদ্ধান্তের মানে এই নয় যে পেন্টাগনের মুখে কুলুপ আঁটা হলো।
পেন্টাগনে পাঠানো এই স্মারকের শিরোনাম হচ্ছে—‘ইন্টার‌্যাকশন উইথ দ্য মিডিয়া (সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে মত বিনিময়)’। এতে গেটস বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ে এ বিভাগের অসতর্ক আচরণে আমি উদ্বিগ্ন।’
এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা দপ্তরের গণবিষয়ক নতুন সহকারীমন্ত্রী ডগলাস উইলসন বলেন, রোলিং স্টোন-এর সাক্ষাৎকার পর্বের সঙ্গে গেটসের স্মারকের কোনো যোগসূত্র নেই। তিনি বলেন, স্মারকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী গেটসের অনেক দিনের উদ্বেগের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি প্রকাশ্যে ও গোপনে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে পেন্টাগনের আলাপের বিষয়ে কথা বলে আসছেন। তাঁর কথা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে পেন্টাগন যখন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে, পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের পুরোপুরি সচেতন থাকা দরকার। তারা কী বলছে, এ ব্যাপারেও পুরোপুরি অবগত থাকা দরকার।
এর মানে কি এই যে যুদ্ধের ময়দানে থাকা একজন সেনার কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ? মোটেও না। এটি এই স্মারকের লক্ষ্য নয়।
স্মারকে গেটস বলেন, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করাটা আইনবিরোধী। এমন কাজ বরদাস্ত করা হবে না। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
পেন্টাগনের গণমাধ্যমসচিব জিওফ মোরেল বলেন, ‘যাঁরা শত্রু নয়, এমন সাংবাদিকদের সঙ্গে এখনও খোলাখুলি মতপ্রকাশে অঙ্গীকারবদ্ধ গেটস। আমাদের বিভাগকে আরও বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

আসছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী চালকদের জন্য গাড়ি

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য আসছে বিশেষ ধরনের গাড়ি। আগামী বছরই রাস্তায় নামবে এই গাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ পত্রিকা এ তথ্য জানিয়েছে।
ন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ব্লাইন্ড এবং ভার্জিনিয়া টেক-এর গবেষকেরা যৌথভাবে গাড়িটির মূল নমুনা ও বিশেষ প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। এ প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘নন-ভিজ্যুয়াল ইন্টারফেইসেস’। এ প্রযুক্তির সুবাদে একজন অন্ধ-গাড়িচালক নানা দিকনির্দেশনা পাবেন। বিশেষভাবে তৈরি এই গাড়ি নিজেই এর চালককে আশপাশের গাড়ি কিংবা অন্যান্য বস্তু সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করবে। অন্য গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে এবং কোথায় মোড় ঘোরাতে হবে, এ-সম্পর্কিত সব তথ্য চালককে পাঠাবে। গতি কমানো-বাড়ানোর ব্যাপারেও সহায়ক তথ্য পাঠাবে গাড়িটির ভাইব্রেশন সিস্টেম। আর এভাবে চোখে না দেখেও ঠিক ঠিক নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন গাড়িটির চালক।
নতুন এই গাড়ি উদ্ভাবনের এ প্রকল্পকে ইতিমধ্যে মানুষের চন্দ্র বিজয়ের অভিযানের সঙ্গেই তুলনা করা হচ্ছে। ন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ব্লাইন্ডের সভাপতি মার্ক মুরার বলেছেন, ‘আমরা এখন এমন সব এলাকা জয়ে নেমেছি, যেসব এলাকা জয়ে আগে কেউ কল্পনাই করেনি, অভিযানে নামেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্ধত্ব মানবকল্যাণের অন্তরায়—এই আপ্তবাক্য আজ ভুল প্রমাণ করে, পিছে ফেলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছি।’
মুরার জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য এ ধরনের বিশেষ গাড়ি উদ্ভাবনের স্বপ্ন আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে থেকে দেখতে শুরু করেন তিনি। স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে তখন তাঁর সংগঠনে গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্বোধন করেন। মুরার বলেন, ‘শুরুতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। একদল বলেছে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা গাড়ি হাঁকাবেন, এও কি সম্ভব! এটা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এ লক্ষ্যে তহবিল সংগ্রহের কোনো মানেই হয় না। অবশ্য অন্য একদল মানুষ তখন পাশে দাঁড়িয়েছে। সাহস জুগিয়েছে তারা। নানা রকম সহায়তা দিয়েছে।’
গাড়িটি আগামী জানুয়ারিতেই আনুষ্ঠানিকভাবে চলা শুরু করবে।

গোপালগঞ্জে সিটিসেলের জুম আল্ট্রা সেবা চালু

গোপালগঞ্জে সিটিসেলের দ্রুতগতির ডেটা সার্ভিস জুম আল্ট্রার যাত্রা শুরু হয়েছে।
এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার মোসলেম প্লাজায় সিটিসেলের স্থানীয় পরিবেশকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সিটিসেলের কাস্টমার কেয়ার সুপারভাইজার মনিরুল ইসলাম, টেরিটরি এক্সিকিউটিভ মৃত্যুঞ্জয় বণিক ও স্থানীয় পরিবেশক মো. জাহিদুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সিটিসেলের এই জুম আল্ট্রার নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরেন।

ভোমরা স্থলবন্দর আবার সচল

সাতক্ষীরা জেলায় ভারতের সীমান্তসংলগ্ন ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি তিন দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল শনিবার থেকে আবার চালু হয়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুর জেলার হাকিমপুরে অবস্থিত হিলি স্থলবন্দরে গতকাল দুপুর থেকে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
ভোমরা: ভোমরা বন্দরের কাস্টমস সুপার হাসান মোর্শেদকে উদ্ধৃত করে সাতক্ষীরা থেকে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল ২৮৮ ট্রাক পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়েছে।
আমদানি করা পণ্য বিডিআর আটক করার প্রতিবাদে বুধবার থেকে ভোমরা বন্দরে কর্মরত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ সব সংগঠন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী নওশেদ দেলোয়ার জানান, মঙ্গলবার রাতে ভারত থেকে আমদানি করা ২১২ কার্টন সিনথেটিক্স থ্রিপিস ও ফেব্রিক্স প্রাথমিকভাবে ছাড় করে নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমস এলাকার মধ্যে একটি গুদামে মজুদ রাখা হয়।
কিন্তু রাতেই ওই গুদাম থেকে এসব পণ্য আটক করে বিডিআর সাতক্ষীরা ৪১ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে নিয়ে যায়।
এর প্রতিবাদে ও আটক পণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো বুধ ও বৃহস্পতিবার বন্দরে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মবিরতি পালন করে।
পরে আটক পণ্য ছেড়ে দেয় বিডিআর।
হিলি: দিনাজপুরের হাকিমপুর থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধি জানান, স্থলবন্দরের বেসরকারি অপারেটর পানামা পোর্টে ঢুকে একদল বহিরাগত শ্রমিক কার্যালয়ে ভাঙচুর করেছেন। এ সময় তাঁরা পোর্টে কর্মরত শ্রমিকদের মারধর করলে কমপক্ষে ২০ জন শ্রমিক আহত হন।
এ ঘটনায় দুপুর দুইটা থেকে পানামা পোর্টে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুর দুইটায় এ ঘটনা ঘটে।
পানামা হিলি পোর্টে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মী, শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগ হিলি স্থলবন্দর শাখার সভাপতি নওশাদ ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান লাবুর নেতৃত্বে ২৫-৩০ জন শ্রমিক একটি মিছিল নিয়ে পানামা পোর্টের কার্যালয়ে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিলে তারা ভাঙচুর চালান ও মারধর করেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে পানামা কর্তৃপক্ষ এবং স্থদলবন্দরে কর্মরত ১২টি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা দুপুর দুইটা থেকে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখেন।
পানামা হিলি পোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রী অনন্ত কুমার চক্রবর্তী জানান, ‘শ্রমিক নামধারী সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
তবে অভিযুক্ত মনিরুজ্জামান লাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অনেক শ্রমিকের মজুরি বকেয়া রয়েছে। পানামা কর্তৃপক্ষ তা শোধ করেনি। তাই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা হামলা করতে পারেন। আমরা কোনো ভাঙচুর বা শ্রমিককে মারধর করিনি।’ সন্ধ্যা ছয়টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

বাংলালিংক ও ইউসিবিএলের মধ্যে চুক্তি সই

ব্যাংকিংসেবা বিনিময়ের লক্ষ্যে বাংলালিংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) সম্প্রতি একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
এই চুক্তির আওতায় বাংলালিংকের পরিবেশকেরা তাঁদের নিকটস্থ ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের যেকোনো শাখার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলালিংক অ্যাকাউন্টে ফান্ড স্থানান্তর করতে পারবেন। এই সেবার মাধ্যমে পরিবেশকেরা নগদ অর্থ, ইউসিবিএল চেক, পে-অর্ডারের মাধ্যমে দেনা পরিশোধ করা সাপেক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ওয়্যার হাউস থেকে বাংলালিংকের পণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলালিংকের আর্থিক লেনদেন-প্রক্রিয়া অনেক সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ আবু দোমা এবং ইউসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শাহজাহান ভূঞা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই সময় উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থবছরের শেষ সপ্তাহে গড় লেনদেন বেড়েছে

অর্ধবার্ষিক আর্থিক হিসাব সমাপনীর কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গত বৃহস্পতিবার লেনদেন বন্ধ ছিল। ফলে লেনদেন হয়নি শেয়ারবাজারেরও। তাই শেয়ারবাজারে সাপ্তাহিক লেনদেন পাঁচ দিনের পরিবর্তে হয়েছে চার দিন।
মূলত এ কারণেই দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আগের সপ্তাহের চেয়ে লেনদেন কমেছে ৭৩৮ কোটি টাকা বা প্রায় ১০ শতাংশ। সপ্তাহটিতে শেয়ারবাজারে মোট লেনদেন হয়েছে ছয় হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।
তবে মোট লেনদেন কমলেও গত সপ্তাহের দৈনিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের চেয়ে বেড়েছে। গত সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে প্রায় এক হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ১৮৫ কোটি টাকার মতো বেশি।
আগের সপ্তাহে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহের শুরুর দিনটা ছিল একটু ব্যতিক্রম। জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালের মধ্যেই এদিন ডিএসইতে লেনদেন সম্পন্ন হয়। তা সত্ত্বেও ওই দিন ডিএসইতে লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ শেয়ারের দাম বেড়েছে। ফলে বেড়েছে সাধারণ মূল্যসূচকও।
তবে পুরো সপ্তাহটি কেটেছে সূচকের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে। অবশ্য এ সময় ব্যাংক ও অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ছিল বেশ শক্ত অবস্থানে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে মূল্য আয়ের অনুপাতের দিক থেকে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। এসব খাতের পিই অন্যান্য খাতের তুলনায় কম।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) শেয়ারের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা ৪০ পিই পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছে। ফলে স্বাভাবিক কারণেই অনেক বিনিয়োগকারী এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে। আর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধবার্ষিক পরিচালন মুনাফার বিষয়টি। এ খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির পরিচালন মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে।
বাজার পরিস্থিতি: ডিএসইতে গত সপ্তাহের সাধারণ সূচক ৩৬ পয়েন্ট কমে ৬ হাজার ১৫৩ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এর প্রভাবে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় এক হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সপ্তাহের মোট লেনদেনের ৯৩ শতাংশই ছিল তুলনামূলক ভালো মৌলভিত্তি ‘এ’ শ্রেণীর কোম্পানির। আর্থিক হিসাবে যার পরিমাণ ছয় হাজার ২১২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ‘বি’ শ্রেণীর কোম্পানির ২৯ কোটি, ‘এন’ শ্রেণীর ৮৭ কোটি ও দুর্বল মৌলভিত্তির ‘জেড’ শ্রেণীর কোম্পানির ৩২৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ২৫৩টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১০৩টির, কমেছে ১৪৯টির ও অপরিবর্তিত ছিল একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম।

বাংলাদেশসহ ৩৩টি স্বল্পোন্নত দেশ চীনে ৪৭৬২ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পেল

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৩টি স্বল্পোন্নত দেশকে চীন তাদের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এর ফলে এসব দেশ থেকে আমদানিযোগ্য চার হাজার ৭৬২টি পণ্য চীনে শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
১ জুলাই থেকে এই সুযোগ কার্যকর করা হয়েছে। চীন সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনের বিষয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চীন সরকার এলডিসিগুলোর জন্য বাজারসুবিধা দেওয়ার যে ঘোষণা করেছিল, চার হাজার ৭৬২টি পণ্যে এই শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন করা হলো।
এই চার হাজার ৭৬২টি পণ্য বর্তমানে চীনের আমদানিকৃত কিন্তু শুল্কারোপযোগ্য মোট পণ্যের ৬০ শতাংশ।
এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, কাঠ, পোলট্রি, ওষুধসামগ্রী প্রভৃতি। আর এই চার হাজার ৭৬২টি পণ্য চীনের বাজারে এলডিসিগুলোর মোট রপ্তানির প্রায় ৯৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
২০০৮ সালে এলডিসিগুলো সমন্বিতভাবে তাদের মোট রপ্তানির ২৩ শতাংশ প্রেরণ করেছে চীনের বাজারে। তার মানে চীন এলডিসিগুলোর সবচেয়ে বড় বাজার হয়ে উঠছে।
বস্তুত ২০০১ সাল থেকে চীন এলডিসিগুলোকে ক্রমান্বয়ে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ও বিভিন্ন পণ্যে শুল্কছাড় সুবিধা দিয়ে আসছে। এবারের এই সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে চীন এলডিসিগুলোকে বড় ধরনের সুবিধা দিল।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হংকং ঘোষণা অনুসারে, উন্নত ও সামর্থ্যবান উন্নয়নশীল দেশগুলো এলডিসিগুলোকে তাদের মোট রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কিন্তু হংকং ঘোষণার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে বিভিন্ন উন্নত ও কিছু উন্নয়নশীল দেশ এলডিসিগুলোকে ব্যাপকভিত্তিক বাজারসুবিধা দিয়েছে, যার মধ্যে চীন অন্যতম।
যে ৩৩টি দেশ বাজারসুবিধা পাবে তার মধ্যে ২৬টি হলো আফ্রিকার এলডিসি। বাকিগুলো হলো বাংলাদেশ, ইয়েমেন, পূর্ব তিমুর, সামোয়া, ভানুয়াতু, আফগানিস্তান ও নেপাল।
বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে চীনের বাজারে পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য আমদানি করায় দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্যে বিরাট বড় ঘাটতি রয়েছে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে নয় কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে চীন থেকে ২৬৬ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫৬ কোটি ডলার।
অবশ্য ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। বিপরীতে সে বছরই প্রথম চীন থেকে পণ্য আমদানি ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকে।
তবে চীন যে এবার চার হাজার ৭৬২টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দিল, তা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, পাট, চামড়াসহ প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলো চীনের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবে।
৩৩টি এলডিসির মধ্যে সক্ষমতার বিচারে বাংলাদেশই সবচেয়ে এগিয়ে আছে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাই এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে চীনে পণ্য রপ্তানি বাড়বে বলেও আশাবাদী তারা।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, এতগুলো পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা একটা বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
চীনের বাংলাদেশি পোশাকের প্রদর্শনী আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে ফজলুল হক বলেন, চীনা ভোক্তারা বাংলাদেশি পোশাকের বিষয়ে আগ্রহী। কাজেই শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ দীর্ঘ মেয়াদে লাভবান হবে। বিশেষ করে চীনের নিম্ন ও মধ্য আয়ের ভোক্তাশ্রেণীর জন্য দামে-মানে উপযোগী পোশাক তৈরির ক্ষমতা বাংলাদেশের আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফজলুল হক অবশ্য পণ্য জাহাজীকরণ তথা পরিবহনকে একটা বড় বাধা বলে মনে করেন। তাঁর মতে, সাংহাই বন্দর দিয়ে চীনের ভেতরে পণ্য পাঠাতে বেশ সময় লেগে যায়।

এবার দুঙ্গা সত্যিই কাঠগড়ায়

‘সাউদাদে’ বলে পর্তুগিজ ভাষায় বহুল প্রচলিত একটা শব্দ আছে। শব্দটার হুবহু অর্থ করা কঠিন। বলা যায়, হারিয়ে যাওয়া সুযোগের জন্য হাহাকার করা। ১৯৮২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলের ক্ষেত্রে শব্দটার প্রয়োগ চলে।
নিশ্চিত করে বলা যায়, এবার আর ব্রাজিলের কোনো সংবাদমাধ্যম, কোনো বিশেষজ্ঞ এই শব্দটা উচ্চারণ করবেন না। গতকাল বিকেল নাগাদ ব্রাজিল দল যখন দেশে ফিরেছে, তখন নিশ্চিত করেই তাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল শুধু দুয়োধ্বনি।
১৮ বিশ্বকাপের ১৩টিতেই তো ব্রাজিল শিরোপা জেতেনি। কিন্তু এমন আওয়াজ সব সময়ই উঠেছে, তা নয়। ব্রাজিলের এই দলটা নিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের অভিযোগের অন্ত নেই। প্রধান এবং প্রথম অভিযোগ, তারা সুন্দর ফুটবল খেলে না। এতকাল সাফল্যের নেশায় অনেকে কার্লোস দুঙ্গার এই ‘অন্যায়’ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সুন্দর ফুটবলও খেলবে না, ট্রফিও আসবে না; দুই বঞ্চনা ব্রাজিলিয়ানরা সহ্য করার কথা নয়!
আসলে সাফল্যই একটা হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল দুঙ্গার। নতুবা খেলোয়াড়ি জীবনের মতো কোচিং জীবনের শুরু থেকেই অসুন্দর ফুটবল খেলার জন্য দারুণ সমালোচিত হচ্ছিলেন তিনি। ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো, কিংবদন্তি পেলে কিংবা সক্রেটিস; দুঙ্গার এই ফুটবলকে কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না।
সমালোচনা শুধু সুন্দর ফুটবলকে বিসর্জন দেওয়া নিয়েই ছিল না। সমালোচনা ছিল দুঙ্গার দল নির্বাচন নিয়েও। বিশেষ করে দলে সৃজনশীল মিডফিল্ডার নিয়ে সমালোচনা চলছিল। দুঙ্গা তাঁর ২৩ সদস্যের দলে আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নিয়েছিলেন মাত্র চারজন। সৃজনশীল মিডফিল্ডার বলতেও দুজনের বেশি ছিলেন না। মূলত সৃজনশীল খেলার জন্য দুঙ্গার মাঝমাঠ নির্ভর করেছিল শুধু কাকার ওপর। সেই কাকা আবার চোট-আঘাতের জের বয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
ফর্মে থাকা রোনালদিনহোকে বাদ দিয়ে ম্যানইউ মিডফিল্ডার ক্লেবারসনকে নেওয়া বা সান্তোসের তরুণ তুর্কি পাউলো হেরিকে গানসোকে উপেক্ষা করাটা কেউ সহজভাবে নিতে পারেননি। এই বিশ্বকাপে দারুণ ব্যর্থতার পর ১৯৭০ বিশ্বকাপের বিজয়ী অধিনায়ক ‘ক্যাপ্টেন’ কার্লোস আলবার্তো আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দুঙ্গার এই দল নির্বাচন নিয়ে ত্রুটির কথা, ‘সে বিশ্বকাপে দল নিয়ে যাওয়ার সময় শুধু একটা একতাবদ্ধ, একমতের খেলোয়াড়ের কথাই ভাবল। এটা একটা নির্বোধের মতো কাজ। জাতীয় দল সেরাদের জায়গা। ওর এই দর্শনের কারণে, ও সান্তোসের ওই ছেলেটাকে, যে এখন খুব ভালো ফর্মে আছে, তাকে নিল না। সঙ্গে বিশ্বকাপের মতো আসরে খুব প্রয়োজন, এমন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দেরও নিল না।’
আলবার্তোর বলা এই কথাগুলোই এত দিন ধরে বলে আসছে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম। দুঙ্গার এই নির্বাচন-নীতি, খেলার ধরন নিয়ে সে দেশের সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার কারণে কোচের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও চরম খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি অনুশীলনে সাংবাদিকদের নিষিদ্ধও করেছিলেন দুঙ্গা।
তবে সবকিছুর পরও দুঙ্গাই জিতছিলেন। অন্তত দুটো ট্রফি দুঙ্গার কেশাগ্র স্পর্শ করার সুযোগ দিচ্ছিল না। খেলা যা-ই হোক, দুঙ্গা তো এনে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা ও কনফেডারেশনস কাপ।
তবে দুঙ্গাও জানতেন, বিশ্বকাপটা জিততে না পারলে তীরবিদ্ধ হতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেও অভিযোগ করেছেন, ব্রাজিল থেকে সাংবাদিকেরা নাকি এসেছেন দুঙ্গার পরাজয়ে আনন্দ করার জন্য।
সেই ‘আনন্দ’ করার সুযোগটা এবার পেয়ে গেলেন সাংবাদিকেরা। পদত্যাগ করেছেন দুঙ্গা। কিন্তু রেহাই মিলবে বলে মনে হয় না। সুন্দর ফুটবল মেরে ফেলার জন্য তাঁর গায়ে তীর বিঁধবে, সবচেয়ে বেশি তীর এসে বিঁধবে ব্রাজিলকে বদলে ফেলেও খালি হাতে ফেরার অপরাধে।

জার্মানি জুড়ে আনন্দের লহর

রোববারের পর শনিবার—ক্যালেন্ডারের পাতার পরপর দুটি দিন অমর হয়ে থাকল জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে। গত রোববার তারা ৪৪ বছর পর ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপে হারিয়ে মধুর প্রতিশোধ নিল। আর গতকাল শনিবার তাদের সামনে উড়ে গেল ‘ফুটবল-ঈশ্বর’ ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। এই জয়ের আনন্দে ভাসছে গোটা জার্মানি। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়েছে উৎসব, চলবে সারা রাত। আজকের রাতটা অন্তত কেউ ঘরে কাটাতে রাজি নয়।
এবারের বিশ্বকাপে জার্মানিকে কেউ গণনার মধ্যে আনেননি। কিন্তু দলের কোচ জোয়াকিম লো ছিলেন, আছেন নিজের লক্ষ্যে অবিচল। জার্মান ভাষায় ‘লো’ শব্দটির অর্থ সিংহ হলেও আপাদমস্তক ভদ্রলোক জোয়াকিম লো এখন জার্মানির অন্যতম নায়ক। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় বসে তিনি তা অনুভব করছেন। তাঁকে ও তাঁর দলকে উৎসাহিত করতে মাঠে উড়ে গেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেল।
গতকাল সকাল থেকেই জার্মানি জুড়ে আট কোটি মানুষ বসেছিল প্রার্থনায়, বসেছিল দলের জয় কামনায়। স্থানীয় সময় বিকেল চারটা থেকে পথঘাট, স্টেশন, দোকানপাট—সবই সুনসান হয়ে পড়ে। আসলে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশাল জয় জার্মানদের প্রত্যাশাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বহু গুণে। তার পরও ভয় ছিল, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম আর্জেন্টিনা। যে দলে আবার মেসির মতো বিশ্বসেরা তারকা আছেন। কিন্তু জার্মানির এই তরুণ দলটি তাদের সাফল্যের পতাকা এভাবে উঁচিয়ে রাখবে, তা কেউ ভাবেননি। সে জন্য বোধহয় জার্মানি জুড়ে আনন্দের মাত্রাটা তীব্রতর।
গতকালকের রৌদ্রোজ্জ্বল বিরল দিনটি কেউ ঘরে বসে নষ্ট করতে রাজি ছিল না। অসংখ্য মানুষ দলে দলে বেরিয়ে ছিল রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে একসঙ্গে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখতে। বিফলে যায়নি তাদের সে উদ্যোগ। প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির এমন যোগ বোধহয় খুব কম ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। হ্যানোভারের বড় পর্দায় খেলা দেখতে দেখতে বারবার মনে হয়েছে, ঈশ্বর বোধহয় জার্মানদের প্রার্থনা শুনেছেন। তাই তাদের বিমুখ করেননি। খেলার ৯০ মিনিটই তারা আনন্দে মেতে থাকতে পেরেছে।
খেলার খেলা শুরুর এক ঘণ্টা আগেই জার্মানির সবচেয়ে বড় পাবলিক ভিউ বার্লিনের বার্লিন গেট প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিল সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষ। একই অবস্থা হামবুর্গ, হ্যানোভার, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ, স্টুটগার্ড, কোলন, হাইডেলবার্গ আর ছোট-বড় সব শহরে। গতকাল দিনে যথেষ্ট গরম থাকায় ছিল ঠান্ডা পানীয়র ব্যবস্থা। বিভিন্ন শহর কর্তৃপক্ষ পাবলিক প্লেসে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করেছিল।
খেলা শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা পর যখন এই লেখা লিখছি, তখন জার্মানি জুড়ে রাস্তাঘাট, ফাঁকা প্রাঙ্গণে ভাসছে কালো-লাল-সোনালি রঙের জার্মানির জাতীয় পতাকা। বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা মানুষ রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের মতো আনন্দের রাতটাও ঘরের বাইরেই কাটাবে। কারণ, ঈশ্বর যে গতকাল ‘ফুটবল-ঈশ্বর’ নন, তাদের প্রার্থনাই শুনেছেন।

‘আমি সত্যিই চেষ্টা করেছি’

ভুল সময়। সম্ভবত ভুল সময়ে পৃথিবীতে এসে পড়েছেন তিনি। নইলে পায়ে যার ফুল ফোটে, যার এই বিশ্ব জয় করার কথা, বিশ্বসেরার খেতাবও উঠেছিল যার মাথায়; সেই কাকা কেন মাথা নিচু করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবেন!
অনেকে অনেক কিছুকে দায় দেবেন। কেউ বলবেন দুঙ্গার দোষ, কেউ বলবেন খেলোয়াড়দের এলোমেলো হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কাউকে কোনো দায় দিলেন না তিনি। বিদায়ের সময় শুধু বলে গেলেন কষ্টের কথা।
শুধু বলে গেলেন বিশ্বকাপের, ফুটবলের অনিশ্চয়তার কথা, ‘এই পরাজয়ে আমরা বড়ই কষ্ট পাচ্ছি। আমাদের খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি কষ্ট তো কেউ পাচ্ছে না। কিন্তু এটাই তো বিশ্বকাপ, যেখানে বিশাল সব অঘটন ঘটে।’
অঘটন বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া চলে, কিন্তু দুঃখ ভোলা যায় না। কাকার দুঃখের তো সীমা-পরিসীমা থাকার কথা না। ‘ব্রাজিলের ফুটবল’ বললে লোকে যে ব্যাপারটার কথা বোঝে, এক দশক ধরে সেই কাজটি করার দায় যেন তার ওপরই আছে।
২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যও ছিলেন। কিন্তু মাত্র ২৫ মিনিট মাঠে ছিলেন। গত বিশ্বকাপে একটি ম্যাচে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হলেও শেষ পর্যন্ত দল হেরেছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে, কোয়ার্টার ফাইনালে। তারপর দিন দিন কাকা আরও পরিণত হয়েছেন, ব্রাজিলের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
২০০৭ সালে ফিফার বর্ষসেরা হয়েছেন, ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। সেরা খেলোয়াড় হয়ে দলকে গত বছরই জিতিয়েছেন কনফেডারেশনস কাপ। ফলে এবারের বিশ্বকাপটা তাঁর জাদু দেখার জন্যই অপেক্ষা করছিল। একটু সংশয় ছিল ইনজুরি আর সর্বশেষ ক্লাবের হয়ে সামান্য ফর্মের ওঠানামা নিয়ে।
বিশ্বকাপের শুরু থেকে ব্রাজিল অপ্রতিরোধ্য থাকলেও কাকাকে ঠিক পাওয়া যাচ্ছিল না। যে ম্যাচে ফিরলেন ছন্দে, সেই ম্যাচেই লাল কার্ড। নিয়তির কী এক পরিহাস। পরশু হল্যান্ডের বিপক্ষে যখন মনে হচ্ছিল, আবার সেই ছন্দে ফিরেছেন, সেই ম্যাচেই মাথা নিচু করতে হলো কাকাকে।
কিন্তু কাকা তো চেষ্টা করেছেন। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বলছেন, চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না তাঁর। ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্নে সবকিছু করেছেন, ‘আমি যা যা পারতাম, সব করেছি। আমি লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি, আমি সত্যিই চেষ্টা করেছি। আমি জানি, লোকে আমার এই লড়াইয়ের কথা মনে রাখবে না। আমি আরও বেশি কিছু নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। আমি ষষ্ঠ শিরোপা নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। অনেকবার ভেবেছি, ইনজুরির জন্য বোধ হয় বিশ্বকাপটা খেলা হবে না। কিন্তু আমার সতীর্থরা আমাকে লড়াই করায় সাহস জুগিয়ে গেছে।’
ব্রাজিলের পতাকার জন্য, হলুদ জার্সির জন্য লড়াই করেছেন কাকা। লড়াই করে জিততে না পারার বেদনাটা কাকা বোঝেন, ‘সেলেসাওয়ের সঙ্গে আমার অসাধারণ একটা সম্পর্ক। সেলেসাওয়ের হয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের মুহূর্ত। চার বছর আগে এটা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেছিলাম। এই সেই মুহূর্ত যা আমার ক্যারিয়ার ও জীবনকে প্রতিফলিত করছে। আমি জানি, এখন সমর্থকেরা কেমন কষ্ট পাচ্ছেন।’
কষ্ট তো আছেই। কিন্তু দুনিয়ার তো এখানে শেষ নয়। কাকা কি আরেকবার লড়াইটা করতে চেষ্টা করবেন না? চেষ্টা করবেন। কিন্তু বয়স এখন ২৮। আরেকবার পারবেন কি না তাই নিয়ে সন্দিহান কাকা, ‘আরেকটা বিশ্বকাপের জন্য আমাদের চার বছর অপেক্ষা করতে হবে। আমি জানি না, তখন কী হবে। আমি জানি না, আরেকটা বিশ্বকাপে আমি থাকব কি না।’
থাকলে সেটা সুবিচারই হওয়ার কথা।

জিতেই ব্রাজিলকে আক্রমণ

১৯৯৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপ। দুবারই হল্যান্ডের শিরোপা-স্বপ্ন ধাক্কা খেয়েছে ব্রাজিলের কাছে। ১৯৯৮-এর ফ্রান্স বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। হল্যান্ডকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ব্রাজিল উঠে যায় ফাইনালে। এক যুগ পর, সেই ব্রাজিলকে হারিয়েই আরেকবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হল্যান্ড। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বসেরা দল ব্রাজিলকে হারিয়ে স্বপ্নপথে আরেক ধাপ, দিন তো ডাচদের উৎসবেরই। খেলোয়াড়, কোচ, সমর্থক, সংবাদমাধ্যম—জয় উচ্ছ্বাসে মিলেমিশে একাকার।
১-১ গোলে সমতার পর জয়সূচক গোলটি করেছেন ইন্টার মিলানের তারকা ওয়েসলি স্নাইডার। ডাচ সংবাদমাধ্যমও যেন একজোট হয়ে গিয়েছে স্নাইডার-বন্দনায়। তবে অবিস্মরণীয় জয়ের এই দিনে হল্যান্ড কোচ বার্ট ফন মারউইক হেঁটেছেন একটু আলাদা পথেই। ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েই ‘ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের জন্য আপনি লজ্জিতই হবেন’ বলে ব্রাজিলের কাটা গায়ে দিয়েছেন নুনের ছিটা।
যে ব্রাজিলের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নামলেন মাঠে, ম্যাচ শেষে সেই ব্রাজিলকেই আক্রমণ, হায় রে নিষ্ঠুর ফুটবল! ফেলিপে মেলোর আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে হল্যান্ড। তবে যে ফ্রি-কিকের সূত্রে ওই গোল, গুরুত্বপূর্ণ ওই ফ্রি-কিক আদায়ে আরিয়েন রোবেন ‘প্রতারণা’ করেছেন কি না, কোনো এক সাংবাদিকের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে যান ডাচ কোচ। রাগত সুরে ওই সাংবাদিককে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এ তো অন্ধ ভক্তের মতো কথা।’
মাঠে দুই দলের খেলোয়াড়েরাই প্রতিপক্ষকে চটানোর চেষ্টা করেছেন। ডাচ কোচ মনে করেন এই কাজে এগিয়ে ছিল প্রতিপক্ষই, ‘আপনি হয়তো এটা শুরু থেকেই দেখে থাকবেন যে আমরা তাদের যতটা চটানোর চেষ্টা করেছি, তারা তার চেয়েও অনেক বেশি চটানোর চেষ্টা করেছে আমাদের।’ আরিয়েন রোবেনকে ফাউল করা এবং ফেলিপ মেলোর লাল কার্ড প্রসঙ্গ টেনে তাঁর কথা, ‘লাল কার্ডের দৃশ্যটি আমি দেখেছি। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের জন্য লজ্জিত, হ্যাঁ, লজ্জিতই হবেন আপনি।’
সংবাদমাধ্যমে কোনো তর্ক-বিতর্ক নেই। সেখানে কেবলই স্নাইডারকে নায়ক বানিয়ে জয়বন্দনা। আমস্টারডাম-ভিত্তিক পত্রিকা হেট প্যারোল তাদের অনলাইন সংস্করণে লিখেছে, ‘স্নাইডারের নেতৃত্বে অরেঞ্জদের ঐতিহাসিক জয়।’ জনপ্রিয় দৈনিক অ্যালজেমিন ডাগব্ল্যাড (এডি) লিখেছে, ‘দিনটি স্নাইডারের।’ পত্রিকাটি আরও লিখেছে, ‘সে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল, ম্যাচকে প্রভাবিত করতে সেটাই করেছে ইন্টার তারকা। অরেঞ্জরা শিরোপা জিততে বিশ্বাসী হতে পারে!’ টেলিগ্রাফ লিখেছে, ‘ঐশ্বরিক গুজব থেকে অরেঞ্জরা বেরিয়ে এসেছে।’
১৯৭৪ ও ১৯৭৮—দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে টোটাল ফুটবলের রূপকাররা। কিন্তু ইয়োহান ক্রুইফরা ডাচদের শেষ হাসিটা হাসাতে পারেননি। ব্রাজিলকে হারিয়ে এবার হল্যান্ড পা রাখল সেমিফাইনালে। ৩২ বছর বছর পর তৃতীয় বারের মতো ফাইনালে উঠে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। শেষ চারে ডাচদের প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে, যারা অনেক আগেই নিজেদের সোনালি দিন ফেলে এসেছে।

ব্রাজিলের কান্নাভেজা বিদায়

জোগো বনিতো! দ্য বিউটিফুল গেম!! প্রথমার্ধের ৩০ মিনিটের মাথায় রবিনহোর দুর্দান্ত ড্রিবলিং, দুই ডিফেন্ডারকে ধরাশায়ী করে পাস বাড়িয়ে দেন ফ্যাবিয়ানোকে, ফ্যাবিয়ানোর ওয়ান-টাচে বল কাকার পায়ে, কাকার দুর্দান্ত শট...না গোল হয়নি। তবে টিভি দর্শক-ভাষ্যকারদের রোমাঞ্চিত করেছে মুহূর্তটি। ভাষ্যকার তো চিৎকারই করে উঠলেন ‘এই তো জোগো বনিতো!’
প্রথমার্ধে সত্যিই চোখ-ধাঁধানো কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছে ব্রাজিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কোথায় সেই ব্রাজিল? যেন নীল-সাদা জার্সিতে দুই অর্ধে খেলল ভিন্ন দুটো দল। ব্রাজিলের কোচ থেকে শুরু করে ফুটবলাররা সবাই পরাজয়ের কারণ মানছেন দলের দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্সকেই।
‘প্রথমার্ধটা ছিল অসাধারণ। কিন্তু ফালতু দুটো মুহূর্তে আমাদের বিশ্বকাপটাই শেষ হয়ে গেল’—একরাশ হতাশা নিয়ে বলেছেন রবিনহো। এই রবিনহোর ১০ মিনিটের গোলেই এগিয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল। পুরো টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ফুটবলারও ছিলেন এই স্ট্রাইকার। দ্বিতীয় রাউন্ডে চিলির বিপক্ষে তাঁর গোলে দলের জয় নিশ্চিত হয়েছিল, কিন্তু পরশুর গোলটি পারল না দলকে জেতাতে। সান্টোস স্ট্রাইকার আর যা বললেন, তাতে পাওয়া গেল অতি আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত, ‘প্রথমার্ধে ভেবেছিলাম আমরা বড় ব্যবধানেই জিতে যাব। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আমরা মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
মনোযোগ যে হারিয়ে ফেলেছেন, দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের খেলায় এটা পরিষ্কার ফুটে উঠেছিল। হল্যান্ড সমতা ফেরানোর পর থেকে এলোমেলো ফুটবল খেলেছে ব্রাজিল, খেলায় না ছিল কোনো ছন্দ, না কোনো পরিকল্পনা। গোল খাওয়ার পর এলোমেলো হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেন লেফটব্যাক মিশেল বাস্তোসও, ‘খেলাটা শুরু করেছিলাম আমরা দারুণভাবে, অনেক সুযোগ সৃষ্টি করেছি। কিন্তু ওরা সমতা ফেরানোর পর আমরা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম।’
এলোমেলো ফুটবলের প্রতীক ছিলেন এই বাস্তোসও। ক্রমাগত মাথা গরম করে খেলছিলেন, হলুদ কার্ড পাওয়ার পর তো তাঁকে তুলেই নিলেন কোচ দুঙ্গা। বাদ পড়াটাকে মেনে নিতে পারছেন না বাস্তোস, সাংবাদিকদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছেন, ‘এমন বিদায় দুঃখজনক ও কষ্টকর।’
কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন গোলকিপার হুলিও সিজারও, ফেলিপে মেলোর সমতা ফেরানো আত্মঘাতী গোলে কিছুটা দায় এড়াতে পারবেন না যিনি। ৩০ বছর বয়সী গোলকিপার স্বীকার করেছেন, ওই মুহূর্তে করণীয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি, ‘প্রথম গোলটায় আমরা নিজেদের কাজটা ঠিকভাবে করতে পারিনি। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, মেলোর পাশে গিয়ে বলটাকে আমি কীভাবে সামলাব। আমরা সবাই কষ্ট পাচ্ছি, ড্রেসিংরুম রীতিমতো বিধ্বস্ত। আমরা হেরেছি, কারণ দ্বিতীয়ার্ধে আমরা এমন খেলেছি, যেমনটা আমরা সাধারণত খেলি না।’
লুইস ফ্যাবিয়ানো আবার সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন দার্শনিক মতবাদে, ‘দ্বিতীয়ার্ধে ওরা আমাদের চমকে দিয়েছে। আমরা কিছু ভুল করেছি, ফুটবলে যা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের মাথা উঁচুই রাখতে হবে, কারণ আমরা একটা জয়ী দল। জীবন থেমে থাকে না। ফুটবলটাও এমনই।’
এই পরাজয়ের জন্য কোচ দুঙ্গাকে দায়ী করছেন যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে ঠিক একমত নন ফ্যাবিয়ানো। বরং খানিকটা দায় দিচ্ছেন রেফারিকে, ‘দ্বিতীয়ার্ধে ওরা খুব আগ্রাসী খেলেছে, আর রেফারি খুব বেশি খেলা থামিয়েছে। আমি দুঙ্গাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, কারণ আমার দেখা সেরা কোচ তিনি। আমার প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল সবচেয়ে বেশি।’ পরাজয়ের পর পরই সব দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দুঙ্গা। আর সবার মতো ব্রাজিল কোচেরও আক্ষেপ দ্বিতীয়ার্ধ নিয়েই, ‘আমরা জানতাম ম্যাচটি খুব কঠিন হবে। প্রথমার্ধে আমরা ভালো খেলেছি, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সেই ছন্দটা আর ধরে রাখতে পারিনি। ধরে রাখতে পারিনি মনোযোগ। একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ ৯০ মিনিটের, ছোট ছোট ব্যাপারই এখানে ব্যবধান গড়ে দেয়।’

হাওয়ার্ডের পাশে ওয়াহ

খেলোয়াড়ি জীবনে জন হাওয়ার্ডকে সব সময় পাশেই পেয়েছেন স্টিভ ওয়াহ। এবার এর কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক। আইসিসির সহসভাপতির পদ থেকে হাওয়ার্ডের মনোনয়ন প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা ‘লজ্জাজনক’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন ওয়াহ।
হাওয়ার্ডের মতো একজন সংগঠক আইসিসির খুব প্রয়োজন বলেই মনে করেন ওয়াহ, ‘আমার মনে হয়, বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য দারুণ এক লোক হতেন তিনি। খেলাটির প্রতি ভালোবাসা আছে তাঁর। আবার ভালো একজন কূটনীতিকও তিনি।’
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে হাওয়ার্ডকে মনোনয়ন দিয়েছিল আইসিসির সহসভাপতির আসনে। সঙ্গে সমর্থন ছিল ইংল্যান্ডেরও। হাওয়ার্ডের মনোনয়ন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় ক্রিকেটে একটু রাজনীতিও ঢুকে গেল মনে হয়। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জন কি বিষয়টিকে দেখছেন ‘দুঃখজনক’ হিসেবে।
কির এই কথার পরই অনেকে বলতে শুরু করেন, আইসিসি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ওয়াহও কথা বলেছেন সেই সুরে। বিশ্ব ক্রিকেটের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সংগঠনটিতে ভাঙন দেখছেন। আফ্রো-এশিয়ান দেশগুলো হাওয়ার্ডকে চায়নি বলেই এমনটা হয়েছে বলে মনে করেন ওয়াহ। আইসিসির নতুন সভাপতি শারদ পাওয়ার অবশ্য বলেছেন, আইসিসি ঠিকই আছে, ‘বেশির ভাগ সদস্যই তাঁকে সমর্থন করেনি। তবে আমার মনে হয় না, আইসিসি বিভক্ত হয়ে পড়েছে।’
তবে আইসিসি থেকে তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এই পদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মার্ক টেলরকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। হাওয়ার্ড অবশ্য বলছেন, তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন না।
এবার সহসভাপতি হতে পারলে দুই বছর পর পাওয়ারের মেয়াদ শেষে হয়তো সভাপতির পদটিই পেয়ে যেতেন হাওয়ার্ড। এ কারণেই আক্ষেপটা বেশি হাওয়ার্ড এবং তাঁর গ্রুপের।

উইম্বলডন রইল সেরেনারই

ব্যাপারটা যেন তাদের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে গেছে। উইম্বলডনে মেয়েদের এককের চ্যাম্পিয়ন মানে যেন শুধুই এই দুজন—হয় বড় বোন ভেনাস উইলিয়ামস, নয়তো সেরেনা। গত ১০ বছরে ৮টিই তো গেল তাদের ঘরেই! কালও যেমন জিতলেন সেরেনা। প্রথমবারের মতো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে ওঠা ভেরা জভোনারোভা পাত্তাই পেলেন না, সেরেনা তাঁকে উড়িয়ে দিলেন ৬-৩, ৬-২ গেমে। সেরেনার ট্রেডমার্ক সার্ভিস আর গতির কাছে বলতে গেলে অসহায় আত্মসমর্পণই করলেন ২৫ বছর বয়সী রুশ তরুণী। তবে সান্ত্বনা আগামী র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে দেখবেন নিজের নামটা।
কাল গ্যালারিতে একই সারিতে বসা ছিলেন বাবা রিচার্ড উইলিয়ামস ও মা ওরাসিন উইলিয়ামস। সেন্টার কোর্টের রয়্যাল বক্সে বসে খেলা দেখছিলেন—সাবেক উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন বিলি জিন কিংও। সেরেনা উইলিয়ামসের জয়ে বাবা-মায়ের চেয়ে কম খুশি হননি তিনিও। নিজের চতুর্থ উইম্বলডন জেতা সেরেনা ক্যারিয়ারের ১৩তম গ্র্যান্ড স্লাম জিতে কাল ছাড়িয়ে গেলেন তাঁকেও। জয়ের পর গ্যালারিতে দাঁড়ানো কিংয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘এই ট্রফিটা আমার জন্য বিশেষ কিছু। হেই বিলি, আমি এখন আপনাকেও ছাড়িয়ে গেলাম। এটা সত্যি বিস্ময়কর যে এদের মতো বড় মাপের খেলোয়াড়ের সঙ্গে নিজেও জড়িয়ে গেলাম।’

বিশ্বকাপই শেষ সুয়ারেজের

এমন আত্মোৎসর্গ গল্প-উপন্যাসে দেখা যায়। বাস্তবেই ব্যাপারটা করে দেখালেন লুইস সুয়ারেজ। দল যখন নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে, তখন নিজের বিশ্বকাপটাই উৎসর্গ করে দিলেন সুয়ারেজ। গোলকিপারের মতো হাত দিয়ে নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিলেন।
পেনাল্টিতে উরুগুয়ের গোলরক্ষক সুযোগ কী কাজে লাগাবেন, শট নিতে এসে ঘানার আসামোয়া জিয়ান বল ক্রসবারে লাগিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়াল, সেখানে উরুগুয়েরই জয়। বাজিটা জিতে গেলেন সুয়ারেজ। কিন্তু ওই যে, নিজেকে উৎসর্গ করে দেওয়া!
সেমিফাইনালে নিশ্চিতভাবেই খেলা হচ্ছে না সুয়ারেজের। এখন ফিফা বলছে, নিষেধাজ্ঞা বাড়তেও পারে। গোললাইনে দাঁড়িয়ে এমন ইচ্ছাকৃতভাবে বল ঠেকিয়ে ফেলার শাস্তিটা আরও বড় হতে পারে। ফিফা মুখপাত্র পিকা ওড্রিওজোলা বলেন, ‘সরাসরি লাল কার্ড দেখলে এমনিতেই এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে ডিসিপ্লিনারি কমিটি এখন এ ব্যাপারে একটা কেসও খুলেছে। তারা এখন ব্যাপারটা খতিয়ে দেখবে এবং সিদ্ধান্ত নেবে।’
যদিও সুয়ারেজ আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে বল ঠেকানোর কোনো বিকল্প ছিল না তাঁর কাছে। তিনি দলকে আরেকটা সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুয়ারেজের কোচ অস্কার তাবারেজ বলছিলেন, ‘পাপ’টা এত বড় কিছু না।
সুয়ারেজ ‘সহজাত প্রবণতা’ থেকেই বলটা হাত দিয়ে ঠেকিয়েছেন বলে দাবি তাবারেজের। এবং সে শাস্তি তো সুয়ারেজ পেয়েই গেছেন। তাবারেজের দাবি, সুয়ারেজকে অবশ্যই ফাইনালে খেলতে দেওয়া উচিত, যদি উরুগুয়ে ফাইনালে যায়। এখন যদি বাড়তি নিষেধাজ্ঞা পান, তাহলে ফাইনাল অথবা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচও মিস হয়ে যাবে উরুগুয়ে স্ট্রাইকারের। মানে, তাঁর বিশ্বকাপই শেষ!
তা হলেও সুয়ারেজ নিশ্চয়ই দুঃখ করবেন না। কারণ ডিয়েগো ফোরলান তো বলেই দিয়েছেন, সুয়ারেজের কারণে তারা সেমিফাইনালে উঠেছে। বাকি কাজটা তারাই করার চেষ্টা করবে।

মাঠে ফেরার অপেক্ষায় বেকহাম

অ্যাকিলিস ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ দলেই জায়গা হয়নি। তবুও কোচ ক্যাপেলোর ডাকে দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর কাজ ছিল ‘থ্রি লায়ন্স’দের মানসিকভাবে উজ্জীবিত করা। এ কাজে যে বেকহাম সফল নন, দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংলিশদের বিদায়ই তার প্রমাণ।
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ শেষ। ‘থ্রি লায়ন্স’ দলে বেকহামের ওই ভূমিকাও শেষ। বেকহাম এখন স্বপ্ন দেখছেন আবার ইংল্যান্ড দলের জার্সি গায়ে তুলে মাঠ মাতাবেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেকহাম বলেছেন, ‘দেশের হয়ে খেলার জন্য আমি সব সময়ই প্রস্তুত। যখনই ডাকা হোক না কেন আমি আসব। এখনো আমি নিজেকে একজন ফুটবলার হিসেবেই দেখি।’ দলে ফেরার একটা আনুমানিক সময়ও ঠিক করেছেন গত মাসে ৩৫ পূর্ণ করা এই মিডফিল্ডার। ২০১২ ইউরোর বাছাইপর্ব শুরু হবে আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে। তাতে ইংল্যান্ডের প্রথম ম্যাচ ৩ সেপ্টেম্বর, বুলগেরিয়ার বিপক্ষে। বেকহামের লক্ষ্য ইউরো বাছাইপর্বেই ফেরার। মাঠে ফেরার দিন-তারিখ ঠিক করতে পারছেন, কারণ, তাঁর অ্যাকিলিস ইনজুরিও এখন ভালোর দিকে।
সমন্বয়ক হিসেবে বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে ছিলেন, সাবেক অধিনায়ককে কথা বলতে হয়েছে ইংল্যান্ডের ব্যর্থতা নিয়েও, ‘জার্মানি আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে এবং যোগ্য দল হিসেবেই শেষ আটে গিয়েছে। আসলে চার ম্যাচেই আমরা যথেষ্ট ভালো খেলতে পারিনি। অনুশীলনে সবাইকে দেখে মনে হয়েছিল স্পিরিটটা দুর্দান্ত, সবার মনোবল ছিল উঁচুতে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাঠে আমরা এটাকে অনূদিত করতে পারিনি।’

যে কারণে ব্রাজিলের হার

‘আর যা-ই করো, মেজাজ হারাবে না মাঠে’—বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ফুটবলের এই পুরোনো আপ্তবাক্যটাই ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশি মনে হওয়ার কথা।
হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ভিডিওটা নিশ্চয়ই দেখবে ব্রাজিল টিম ম্যানেজমেন্ট। কী দেখা যাবে তাতে? সেটা তারাই বের করুক। আমার কী মনে হয়েছে, সেটা আমি বলি। ব্রাজিলিয়ানরা নিজেরাই নিজেদের খেলাটা নষ্ট করেছে। টিভি ক্যামেরা যখন ব্রাজিলিয়ানদের মুখগুলো ধরছিল, মনে হচ্ছিল, দুই-একজন ছাড়া বাকি সবাই যেন পারলে মারপিট করে!
ডাচ খেলোয়াড়েরা কোনো বাজে ভাষা ব্যবহার করে ব্রাজিলিয়ানদের উত্ত্যক্ত করার চেষ্ট করেছে কি না, বলতে পারব না। ফুটবল মাঠে বেশির ভাগ দলই প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করতে চায়, কিন্তু এত অভিজ্ঞ দল হয়েও ব্রাজিল সেই ফাঁদে পা দেবে কেন? তা দিয়েই ব্রাজিলের সর্বনাশটা হয়েছে। মেজাজ ঠিক না থাকলে কোনো কিছুই করা যায় না। এই মেজাজ হারানোটা সংক্রামক রোগের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ব্রাজিল দলে।
২৩-২৪ মিনিট পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল ব্রাজিলের। গোল পেল শুরুতেই। এরপর সুন্দর কিছু করে গোল বাড়ানোর কথা যেখানে, সেখানে ব্রাজিলিয়ানরা মনে হলো পায়ের বদলে যেন হাত দিয়ে খেলতে চাইছে। মুখে থাকল গালাগালও!
এর পর আর কোনো বিভাগেই ব্রাজিলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এবারের ব্রাজিলের ডিফেন্সকে বলা হচ্ছিল খুবই শক্তিশালী। কিন্তু সেই রক্ষণই এদিন শোচনীয় ব্যর্থ। প্রথম গোলটা হলো গোলরক্ষক সিজারের ভুলে। পোস্ট থেকে বেরিয়ে এসে বলে হাত লাগানো উচিত ছিল তার। সিজারের ভুলের বিপরীতে দেখুন হল্যান্ড গোলরক্ষক কী করেছে! কাকার অসাধারণ শটটা দারুণভাবে উড়ে গিয়ে সেভ করল।
ব্রাজিলের খেলা বলতে আমরা বুঝি বল পজেশনে রেখে আক্রমণে যাওয়া। এদিন প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে সেটি অমাবস্যার চাঁদ। মাঝমাঠ থেকে সৃজনশীল কিছু হলো না। এদিন আবার মাঝখান দিয়েই ওরা বারবার আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করল কেন, বুঝলাম না। মাঝখানে তো প্রতিপক্ষ আপনাকে বেশি জায়গা দেবে না। উইং থেকে ক্রস তেমন হলো না। প্রচুর ভুল পাস হলো। এলোমেলো শট। দূর থেকে ধুমধাম মারতে দেখলাম, যা ব্রাজিলের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এই পর্যায়ে হারের জন্য যা যা দরকার, সবই করেছে ব্রাজিল।
এর সঙ্গে মেলোর লাল কার্ডটা যোগ করুন। ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ। স্নাইডারের শট মেলোর মাথায় লেগে জালে গেল। এর পর থেকে তার স্বাভাবিক খেলাটা উধাও। একটা পাসও সঠিক হলো না। একটা বল দখলের লড়াইয়েও জিতল না। উপরন্তু মাথা গরম করে অবিবেচকের মতো লাল কার্ড দেখল। চাপটা বাকি খেলোয়াড়দের ওপর দিয়ে সে বেরিয়ে গেল।
হল্যান্ড কৃতিত্ব পাবে। ব্রাজিলকে স্বাভাবিক খেলতে দেয়নি বলেই নয়, দুই দলের দৌড় তুলনা করলে হল্যান্ড বেশি দৌড়েছে, বেশি পরিশ্রম করেছে, বল দখলের লড়াইয়েও বেশি জিতেছে। মাঝমাঠ থেকে শুরু করে অ্যাটাকিং থার্ডে বেশি সঠিক পাস খেলেছে হল্যান্ড। তবে এত কিছুর পরও বলতে হবে, ব্রাজিলই ব্রাজিলের পরাজয় ডেকে এনেছে।

যে কারণে হল্যান্ডের জয়

হল্যান্ড ফুটবলের খুব বড় একজন ভক্ত আমি। তার পরও হল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলকেই এগিয়ে রেখেছিলাম। শতকরা হিসাবে ব্রাজিল ৬৫, হল্যান্ড ৩৫। এটি হল্যান্ডের সেরা দল নয় বলেই আমি ব্রাজিলের জয় নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে, হল্যান্ড জিতেছে!
হল্যান্ডকে খাটো করছি না। তবে ব্রাজিল ব্রাজিলের রূপে মাঠে দেখা দিলে ফল কী হতো অনুমান করা কঠিন নয়। কিন্তু সবকিছু তো হিসাব মেনে চলে না। হল্যান্ডের এই জয়টাই এর উদাহরণ।
হল্যান্ড জিতল বেশ কিছু বিষয় তাদের অনুকূলে থাকায়। প্রথমেই বলব, কাকার অসাধারণ শটটা ডাচ গোলরক্ষক সেভ করে দেওয়াই ম্যাচের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। এই বিশ্বকাপে এর চেয়ে ভালো সেভ আমি এখনো দেখিনি। এর চেয়ে ভালো শটও নেওয়া সম্ভব নয়। এই সেভই হল্যান্ডকে ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছে বলব না, তবে এগিয়ে দিয়েছে অনেকটা।
এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগটা যদি লক্ষ করে থাকেন, ইন্টার মিলানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে স্নাইডারের বড় ভূমিকাটা আপনার চোখ এড়ানোর কথা নয়। অসাধারণ এক খেলোয়াড়। জাতীয় দলে রোবেন তার যোগ্য সহযোগী। দুজনই দুর্দান্ত খেলে দিনটা নিজেদের করে নিল। স্নাইডার তো দুটি গোলই করল। প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, এক-দুজন খেলোয়াড় এমন জ্বলে উঠলে জয় ধরা দেবেই। এই দুজন ছাড়া হল্যান্ডের এই দলে বড় তারকা নেই। না থাকলেই কী, দুজনই তো আসল কাজটা করে দিল।
হল্যান্ড ম্যাচটা হাতের মুঠোয় নিয়েছে ১-১ হওয়ার পর। যখন ২-১ করল, আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যাই হল্যান্ডই জিতবে। ইউরোপিয়ানরা রক্ষণকাজে খুবই ভালো। ওরা জানে, এগিয়ে গিয়ে কীভাবে তা ধরে রাখতে হয়। এদিন রক্ষণভাগটা জমাট রেখে খেলেছে। শুরুতেই গোল খেলেও এরপর ব্রাজিলকে কোনো ফাঁকফোকরই দেয়নি, যা তাদের নিয়ে গেছে জয়ের পথে।
হল্যান্ডকে নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি দলে কোনো মেগা তারকা না থাকায়। কিন্তু দলটি খুব সাবলীলভাবে এগিয়ে এসেছে। কোনো সমস্যায় পড়েনি। ‘টোটাল ফুটবলের’ ধারকেরা অতীতের ছায়া হয়ে থাকলেও এই দলটার কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। মনোবল, হার না-মানা মানসিকতা আর অঙ্ক কষে খেলা। ব্রাজিলের মতো বড় বাধা টপকে যেতে পেরেছে খুব ঠান্ডা মাথায় নিজেদের কাজটা করতে পারায়।
সুযোগের ব্যবহার কীভাবে করতে হয়, সেটিও দেখিয়েছে হল্যান্ড। এটিই হচ্ছে এখনকার ফুটবল। সুযোগ পেয়ে কাজে লাগিয়ে রক্ষণ করে যাও। ব্রাজিল যখনই এগোতে চেয়েছে, তখনই তাদের থামিয়ে দিয়েছে হল্যান্ড। এমন আহামরি ফুটবল তো খেলেনি ডাচরা। ‘প্রতিপক্ষকে খেলতে দেব না’—মানসিকতারই ফল তাদের হাতে উঠেছে শেষ পর্যন্ত।
হল্যান্ড জিতেছে বলেই তাদের ওপর আলো পড়ছে এখন। কিন্তু এটাও ঠিক, ব্রাজিল দারুণভাবে শুরু করার পর গতিটা ধরে রাখতে পারলে হল্যান্ড আর দাঁড়াতেই পারত না। আরেকটি গোলই শেষ করে দিতে পারত ম্যাচটা।
শেষ হয়নি, এর কারণ ব্রাজিলের চিরন্তন সমস্যা। প্রতিবারই ওরা ফেবারিট তকমা নিয়ে বিশ্বকাপে আসে। কিন্তু প্রতিবার জেতে না, একটা জায়গায় স্তিমিত হয়ে যায় বলে। হল্যান্ডের বিপক্ষে ঠিক তা-ই হলো। সেই সুযোগই কাজে লাগাল স্নাইডাররা।

স্বপ্ন হারিয়ে কাঁদছে ব্রাজিল

হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল রিও ডি জেনিরো। একটু আগেও প্রচণ্ড শব্দ তুলে বাজতে থাকা ভুভুজেলার আওয়াজ থেমে গেল, থেমে গেল সব কোলাহল। কী এক অভিশপ্ত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন কোপাকাবানা সৈকত। হাজার পঞ্চাশেক মানুষ মাথা নিচু করে হেঁটে চলেছে কোথায়। কারও মুখে কথা নেই, শুধু কান্না।
হ্যাঁ, কান্না। ব্রাজিলের জন্য দিনটা কান্না নিয়েই এসেছিল। রাস্তার ভবঘুরে থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি লুলা ডা সিলভা, উন্মাতাল সমর্থক থেকে শুরু করে নিরাবেগ সাংবাদিক—সব ব্রাজিলিয়ানের জন্য এক কান্নার উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছিল কার্লোস দুঙ্গার দল।
টেলিভিশন ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে সেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন ‘টিভি গ্লোবো’র নামকরা ধারাভাষ্যকার গ্যালভাও। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে শুধু বললেন, ‘সত্যিকারের এক দুঃস্বপ্ন’! এই দুঃস্বপ্নটা ব্রাজিলের কোটি কোটি মানুষের মতো টেলিভিশনের সামনে বসে দেখেছেন দেশের রাষ্ট্রপতি লুলা ডা সিলভা।
কত স্বপ্ন নিয়ে দলকে বিশ্বকাপের আগে বিদায় জানিয়েছিলেন। হলুদ জার্সি পরে, ভুভুজেলা বাজিয়ে নিজের সমর্থন জানিয়েছেন। ‘হেক্সা’র স্বপ্নের কথা বলেছেন বারবার। হল্যান্ডের বিপক্ষে হারের পর আর সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজে কথা বলতে এলেনই না।
তবে তাঁর সঙ্গে বসে খেলা দেখা ব্রাজিল প্রেসিডেন্টের ক্যাবিনেট-বিষয়ক প্রধান জিলবার্তো কারভালহো জানিয়েছেন, লুলা একদম ভেঙে পড়েছেন, বিস্মিত হয়ে গেছেন, ‘দ্বিতীয়ার্ধে দলের এ রকম ধসে পড়া দেখে উনি মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছেন। খেলোয়াড়েরা কীভাবে এমন মানসিকভাবে এলোমেলো হয়ে গেল সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। উনি বলছিলেন, কিছু খেলোয়াড় প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ খেলেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে আমরা ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছি না।’
কে বিশ্বাস করতে পারছে? ব্রাজিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন, এমন বিদায় অবিশ্বাস করার একমাত্র কারণ তো এটা না। কার্লোস দুঙ্গার এই ব্রাজিল কী করে হল্যান্ডের কাছে হারে! দুঙ্গার দল তো হারতেই ভুলে গিয়েছিল, তারা কেন মাথা নিচু করে ফিরবে!
কোপাকাবানা বিচে প্রতিদিনের মতোই হাজার পঞ্চাশেক লোক জড়ো হয়েছিল বিশাল পর্দায় খেলা দেখার জন্য। উৎসবের সব প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু উৎসব থেমে গেল ওয়েসলি স্নাইডারের দ্বিতীয় গোলের পরই। খেলা শেষে শুরু হলো কান্না।
নিরাবেগ সাংবাদিকেরা চেষ্টা করছিলেন কাঁদতে থাকা এই জনসমুদ্রের মুখের কথা শুনতে। কিন্তু বেশির ভাগই কথা বলতে পারছিল না। দু-একজন যা মুখ খুলল, সে মুখে শুধু দুঙ্গা আর মেলোর প্রতি শাপশাপান্ত। ‘সব দোষ দুঙ্গার’—এমন সমালোচনাও করছে দেশটির সাধারণ মানুষ। সমালোচনা হচ্ছে রোনালদিনহো আর নেইমারকে দলে না নেওয়ায়।
শাপশাপান্ত না করলেও দলের এলোমেলো অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন সাবেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ওয়াল্টার কাসাগ্রান্দে জুনিয়র, ‘খেলায় সমতা আসার পর থেকে দলটা যেমন করে মানসিকভাবে পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেল, সেটা দেখে আমি স্রেফ হতভম্ব হয়ে গেছি।’
এখন থেকে ১১ জুলাই ফাইনাল পর্যন্ত হল্যান্ডকেই সমর্থন দিয়ে যাবেন বলে জানালেন আরেক ব্রাজিল সমর্থক। কেন? ‘কারণ সেটি হবে আমাদের জন্য সান্ত্বনা যে আমরা চ্যাম্পিয়ন দলটার কাছেই হেরেছি’—আদ্রিয়ানো আন্তোনিও নামের পেশায় আইনজীবী আর নেশায় ফুটবল-সমর্থকের ব্যাখ্যা।
কিন্তু এটাও কি সান্ত্বনা হতে পারে আসলে? কান্না তাই এত সহজে ব্রাজিলের পিছু ছাড়ছে না। পরপর দুটো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ফেরার শোক ভুলতে সময় লাগবে। তার পরও আশায় দিন যায়। আশায় দিন কাটানোর সান্ত্বনাই নিজেকে দিচ্ছেন অনেক ব্রাজিলিয়ান।
ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেলসো আমোরিম ভেঙে পড়েছেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বসে খেলা দেখা আমোরিম তার পরও স্বপ্ন দেখতে চান, ‘ব্রাজিলের প্রতিটি মানুষের মতো আমাদেরও মন খুব খারাপ। কিন্তু এই হারে সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। আমরা আগামীবার জিতব।’
আগামীবারের জন্য আসলে স্বপ্ন বুনছে পুরো ব্রাজিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ যে হবে তাদেরই দেশে। আন্তোনিও যেমন বলছিলেন, ‘এরপর আমরা নিজেদের মাঠে খেলব, শিরোপা জিততে আমরা বাধ্য। আমি নিশ্চিত ২০১৪ সালের আমাদের আকাঙ্ক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা আমরা ঘরে তুলব।’

ব্রাজিলের জন্য নয়, আসুন, আমরা ঘানার জন্য শোক করি

‘বড় প্রয়োজন সামনে এসেছে,
ছোটো প্রয়োজন ছাড়তে হবে।
জীবন হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র—,
ভুল করলে হারতে হবে।’
(ইস্ক্রা: পদ্যসংখ্যা ২৫)

ব্রাজিলের অভাবিত পরাজয়ের ভিতর দিয়ে লাতিন আমেরিকান ফুটবলের বিজয়রথ কি তবে থেমে গেল? ঔপনিবেশিকতার আফ্রিকা-সিন্ড্রোম কাটিয়ে উঠে ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধে কি ফিরে দাঁড়াল বিধ্বস্ত ইউরোপ?
মনে পড়ছে মহাভারতের কাহিনি। অশ্বত্থামা হত ইতি গজ। অশ্বত্থামা ছিলেন মহাভারতবর্ণিত কুরুপক্ষীয় যুদ্ধবিদ্যা বিশারদ দ্রোণাচার্যের পুত্র। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলাকালে কৌরবদলে অশ্বত্থামা নামে একটি বলবান হস্তীও ছিল। পাণ্ডবদলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের একপর্যায়ে সেই হস্তীটি নিহত হলে দ্রোণাচার্যের কাছে দুঃসংবাদটি এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যাতে দ্রোণাচার্য পুত্রশোকে কাতর হয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় ভুল করেন। মিথ্যা বলার দায় থেকে মুক্ত থাকার জন্য সংবাদদাতা শেষের ‘ইতি গজ’ কথাটা খুব ক্ষীণকণ্ঠে বলেছিলেন বটে। কিন্তু তা অস্পষ্ট থাকার কারণে সংবাদ প্রদানকারীর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, পুত্রের মৃত্যুসংবাদ ভেবে দ্রোণাচার্য মুষড়ে পড়েন এবং পরবর্তী যুদ্ধ পরিচালনায় ঘটনাটির বিরূপ প্রভাব পড়ে।
লাতিন আমেরিকান ফুটবলের অশ্বত্থামা হচ্ছে ব্রাজিল। কাল (২ জুলাই, বাংলাদেশ সময় রাত ১০ ঘটিকায়) নেদারল্যান্ডের সঙ্গে খেলায় প্রথমার্ধে এক গোলে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বজোড়া কোটি কোটি ভক্তের চোখের জল ঝরিয়ে বিশ্বকাপের আসর থেকে ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে। লাতিন আমেরিকান ফুটবলের জয়জয়কার প্রত্যক্ষ করে, আর্জেন্টিনার সঙ্গে ব্রাজিলের স্বপ্নের ফাইনাল দেখার জন্য যাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তাঁরা এখন মুহ্যমান। বাংলাদেশের স্বপ্নভ্রষ্ট অগণিত ব্রাজিল-ভক্তের পাশে আমি আছি। ব্রাজিলের গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারের মধ্যে উড়ন্ত সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট জটলার মধ্যে প্রায় মধ্যমাঠ থেকে উড়িয়ে মারা জাবুলানি বলটি ব্রাজিলের গোলের ভিতরে প্রবেশ করে। নেদারল্যান্ড এর বেনিফিসিয়ারি হলেও এই গোল শোধের কৃতিত্ব তো ব্রাজিলেরই প্রাপ্য।
আরেকটি কথা বলতে হয়। ব্রাজিল জার্সি বদল করে খেলেছে এদিন। তাতে সমর্থকদের যেমন তাদের চিনতে সমস্যা হয়েছে, মনে হয়েছে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রাও যেন নিজেদেরই চিনতে পারছিলেন না। এই পরিবর্তনের কী দরকার ছিল—এ প্রশ্ন অনেকের মনেই জেগেছে।
উরুগুয়ের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে আফ্রিকার স্বপ্ন ঘানা যেভাবে পরাজিত হয়েছে, ব্রাজিলের খেলায় আমরা তেমন মরণপণ লড়াইও দেখিনি। হয় জয়ের জন্য মরণপণ লড়াই করাটাকে ব্রাজিল তাদের আত্মসম্মানবোধের পরিপন্থী বলে মনে করে, অথবা বিশ্বকাপজয়ক্লান্ত ব্রাজিলের সেই শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। সুতরাং ব্রাজিলের জন্য নয়, আসুন, আমরা বরং ঘানার জন্য শোক করি।
ঘানার পিছু নিয়েছিল দুর্ভাগ্য। তা না হলে পেনাল্টি শটে বিশেষ কৃতীর পরিচয় দিয়ে আমার চিত্ত জয় করা ঘানার অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার আসামোয়া জিয়ান (আমি যার নাম রেখেছিলাম ওসমান গনি বা জ্ঞানী বলে) অতিরিক্ত তিরিশ মিনিটের প্রায় শেষ মুহূর্তে পাওয়া পেনাল্টি শটটি এ রকম ক্রসবারে মারবেন কেন? জিয়ানের একটি নির্ভুল পেনাল্টি শট ঘানাকে নিয়ে যেতে পারত বিশ্ব-ফুটবলের ইতিহাসের নতুন সিঁড়িতে। যাঁর নির্ভুল পদাঘাতে ঘানা বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে এসেছিল, সেই মানুষটিই কিনা শেষ মুহূর্তে ঘানার স্বপ্নভঙ্গের কারণ হলেন।
প্যারাগুয়ের সঙ্গে জাপানের মতো, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ঘানাও যে পেনাল্টি শটে কুলিয়ে উঠতে পারবে না, সে আমি বুঝে গিয়েছিলাম। কী আর করা, খেলা তো এ রকমই। ভুল করলে হারতে হবেই। তবে, হ্যাঁ, ক্রিকেটের মতো ফুটবলে ‘হক আই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করার নিয়ম থাকলে কাল রাতের খেলায় ঘানাই জয়ী হতো। নিয়মিত গোলরক্ষক পরাভূত হওয়ার পর, অনিবার্য গোল ঠেকানোর জন্য কোনো ডিফেন্ডার যদি দ্বিতীয় গোলরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাঁর যুক্তিসংগত শাস্তি পেনাল্টি বা লালকার্ড নয়, গোলই। ফিফা যাই বলুক, আমি কিন্তু কালকের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানাকেই বিজয়ী ঘোষণা করছি।
আবার ব্রাজিলের প্রসঙ্গে আসি। ব্রাজিলের অভাবিত পরাজয়ের এই অঘটনকে লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় পরাশক্তি আর্জেন্টিনার দ্রোণাচার্য ডিয়েগো ম্যারাডোনা কীভাবে বিশ্লেষণ করেন, তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী জার্মানির বিরুদ্ধে কী রণকৌশল গ্রহণ করেন, তার দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ব-ফুটবলের কোটি দর্শক। ম্যারাডোনা কি পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে কুরুক্ষেত্রের মহারণে জয়ী হতে পারবেন? নাকি ব্রাজিলরূপী অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদে তিনিও মুষড়ে পড়বেন দ্রোণাচার্যের মতো? এটাই দেখার বিষয়। ব্রাজিলের পরাজয়ে বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ কেঁদেছে। বাকি অর্ধেক তাকিয়ে আছে আর্জেন্টিনার দিকে। হে ফুটবলের ঈশ্বর, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে দণ্ড ঘোষণার আগে তুমি বাংলাদেশের মানুষের কথা মনে রেখো, প্রভু।
‘অপরের মুখ ম্লান করে’ দেওয়ার মধ্যে মানুষ অপার আনন্দ লাভ করে। মানব-চরিত্রের এই গূঢ়-গোপন কদর্য-নিষ্ঠুর দিকটি কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যে খুব চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে। তারই সত্যতা দেখতে পাচ্ছি ব্রাজিলের পরাজয়ের সংবাদে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থক ও তার কিছুসংখ্যক ভক্তের মধ্যে সৃষ্ট বিকৃত-উল্লাসের মধ্যে। আসুন, বিকৃতির মহামারীর এই রাহুগ্রাস থেকে আমরা আমাদের পবিত্র আত্মাকে মুক্ত করি। মুক্ত রাখি।
কামরাঙ্গীর চর
৩ জুলাই ২০১০ / বিকাল ৫টা

সালাউদ্দিন-টিপু দুজনই অবাক



‘আর্জেন্টিনাকে কোনো দলই মনে হয়নি জার্মানির বিপক্ষে।’
‘আর্জেন্টিনার এমন পরাজয় কল্পনা করিনি।’
প্রথম কথাটি কাজী সালাউদ্দিনের। দ্বিতীয়টি গোলাম সারোয়ার টিপুর। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য বিশ্বকাপের ম্যাচ বিশ্লেষণ করে আসছেন তাঁরা দুজন। বাংলাদেশের সেরা দুই ফুটবল-বিশ্লেষক বিশ্বকাপ থেকে এভাবে আর্জেন্টিনার বিদায় দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
জার্মানির বিপক্ষে সম্ভাব্য জয়ী হিসেবে আর্জেন্টিনাকেই এগিয়ে রেখেছিলেন দুজন। জার্মানির কাছে আর্জেন্টিনা হারতেই পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে ম্যারাডোনা-মেসির আর্জেন্টিনার চার গোলে বিধ্বস্ত হওয়াটা আর সবার মতো বিস্মিত করেছে দুজনকেই।
সালাউদ্দিন বলছেন, ‘আর্জেন্টিনার এত বড় পরাজয় ভাবতে পারিনি। এক-দুই গোলে হারলে বলার কিছু ছিল না। তাই বলে চার গোল!’ গোলাম সারোয়ার টিপুর কথাও প্রায় একই, ‘চার গোল বেশি হয়ে গেছে। ভাবা যায়, এই সময়ে এসে আর্জেন্টিনার মতো দল চার গোল খাবে!’
কেন এভাবে উড়ে গেল ম্যারাডোনার দল? সালাউদ্দিনের চোখে এই ম্যাচই ছিল আর্জেন্টিনার আসল পরীক্ষা, ‘আগের চারটি ম্যাচে তো আর্জেন্টিনাকে সে অর্থে তেমন কোনো পরীক্ষাই দিতে হয়নি। জার্মানির মতো পেশাদার দলের সামনে পড়লেই দিতে হয় স্নায়ুর পরীক্ষা।’ গোলাম সারোয়ার টিপু পুরো কৃতিত্ব দিলেন জার্মানিকে, ‘এটাই হচ্ছে জার্মান ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। পরিপূর্ণ পেশাদার পারফরম্যান্স দেখাল প্রয়োজনের সময়।’
যত যাই হোক, চার গোল হজম করা তো একটু অপ্রত্যাশিত ব্যাপারই। আর্জেন্টিনার সমস্যা ছিল কেথায়? ‘ম্যাচের প্রথম থেকে শেষ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। তারা কোনো ফুটবলই খেলেনি। প্রতিটি বিভাগেই আর্জেন্টিনাকে পরিষ্কার ব্যবধানে হারিয়েছে জার্মানি’—বলছেন সালাউদ্দিন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘মেসি-তেভেজদের জোকারের মতো লাগল। দিগ্ভ্রান্ত দৌড়াদৌড়িই করে গেল শুধু।’
গোলাম সারোয়ার টিপুর সার কথা প্রায় একই। তিনি একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলেন, ‘আর্জেন্টিনা ম্যাচে আছে, সেভাবে বোঝাই যায়নি। মাঝমাঠ থেকে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি জার্মানরা। জায়গাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। মাঝমাঠে আর্জেন্টিনা গুছিয়েই উঠতে পারল না। বলা ভালো, আর্জেন্টিনাকে মাঝমাঠে কাজ করতে দেয়নি জার্মানরা। মেসির পায়ে বল গেলে তাকে ঘিরে ধরেছে চার-পাঁচজন। তেভেজকে ফাঁদে ফেলে অকার্যকর করে রেখেছে।’
এই জার্মানিতে মুগ্ধ সালাউদ্দিন, ‘আমি আগেও বলেছি, ১১ জন জার্মান একসঙ্গে দাঁড় করালে একটা ফুটবল দল হয়ে যায়। এই দেশের ফুটবল দল তো ভয়ংকরই হবে। ওদের শারীরিক সামর্থ্য অনেক বেশি। অবিরাম পরিশ্রম করে যেতে পারে। সেটারই প্রামাণ্য ছবি হয়ে থাকল এই ম্যাচ। এদিন যা ইচ্ছা, তা-ই করেছে জার্মানি।’
টিপুর চোখে জার্মানির রক্ষণের কাজ ছিল অসাধারণ, ‘ওরা সবাই মিলে রক্ষণ সামলেছে। আর আর্জেন্টিনার রক্ষণ দেখুন। পুরো উল্টো। ক্লোসা গোল করল, আবার রক্ষণকাজে এসে সাহায্য করল। কী বলব, অসাধারণ।’
সালাউদ্দিন বলছেন, ‘গোলরক্ষকের ভুল থেকে শুরু করে এমন ভুল নেই, যেটা করেনি আর্জেন্টিনা।’ ভুলগুলো কী? সেই ব্যাখ্যাতেই যেতে রাজি নন সালাউদ্দিন, ‘আর্জেন্টিনা একটা দল হয়ে খেললেই তো ভুল ধরার প্রশ্ন আছে। এই আর্জেন্টিনা তো আদতে একটা দলই ছিল না। কাজেই আলাদাভাবে ভুল বের করার দরকার মনে করছি না।’
আর্জেন্টিনার এই পরাজয়ের পর সালাউদ্দিনের মনে হচ্ছে, ‘ফুটবলে ইউরোপের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হলো। আগের বার ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এবারও ইউরোপেই শিরোপা থাকার সম্ভাবনা বেশি। লাতিন আধিপত্যের দিক শেষ হয়ে গেল কি না, এ নিয়ে তর্ক শুরু হতে পারে।’
টিপুর কথা, ‘আর্জেন্টিনাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে জার্মানরা প্রমাণ করল, তারা সত্যিই আলাদা এক দল। তা ছাড়া এদিন ফিনিশিং ভালো হয়ে যাওয়ায় জার্মানরা উজ্জীবিত হয়ে খেলেছে আরও। ফিনিশিং বাজে হলে, গোল না পেলে এই বিশ্লেষণটাই অন্যরকম হতে পারত।’
সবশেষে সালাউদ্দিন একটা কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘এর আগে আমি সব সময়ই বলেছি, আর্জেন্টিনা ভালো করবে। তবে বেশিদূর যেতে পারবে না। এই দলের শিরোপা জেতার মতো ধার নেই। আমার কথায় অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থকই মন খারাপ করেছেন। জানি, তাঁদের এখন মন খারাপ। আর্জেন্টিনার এই বিদায় আমি চাইনি। তবে সত্যিটা হলো এই, আর্জেন্টিনা পারল না।’

মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরছে প্যারাগুয়ে

ইউরোপিয়ান ফুটবলের কাছে একে একে ধরাশায়ী হচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। নেদারল্যান্ডের কাছে হেরে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাত্ হয়ে গেছে ব্রাজিলের। জার্মানির কাছে ৪-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হেরে মাথা নুয়ে গেছে মেসি-ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা দেশে ফিরবে মাথা হেঁট করে। তবে স্পেনের সঙ্গে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মতো সমালোচনার বোঝা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরতে হবে না প্যারাগুয়েকে। বরং প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোর সাফল্য নিয়েই দেশে ফিরে যাবে তারা।
স্পেন-প্যারাগুয়ের ম্যাচে নিঃসন্দেহেই ফেবারিট ছিল ইউরোপিয়ান শিরোপাজয়ী স্পেন। কিন্তু প্যারাগুয়ের সঙ্গে জিততে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়েছে জাভি-ভিলাদের। উরুগুয়ের কোচ জেরার্ডো মার্টিনো বলেছেন, ‘স্পেনের সঙ্গে সমান তালেই খেলে গেছি আমরা, কিন্তু শেষটা ভালোভাবে করতে পারিনি’। প্যারাগুয়ের স্ট্রাইকার অস্কার কার্দোজো পেনাল্টিটা মিস না করলে হয়তো সেমিফাইনালেও পৌঁছে যেতে পারত তারা। এ জন্য কিছুটা অনুতপ্ত হলেও নিজেদের খেলা নিয়ে সন্তুষ্ট কার্দোজো। ‘পেনাল্টিটা মিস করে কিছুটা অপরাধবোধে ভুগছি আমি। যদি গোলটা করতে পারতাম, তাহলে পরিস্থিতিটা অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু আমরা খুবই ভালো খেলেছি, প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছি। এখন মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরতে পারব আমরা’, বলেছেন কার্দোজো।