Tuesday, April 9, 2019

ছত্তিশগড়ে বিজেপির গাড়ি বহরে হামলা, বিধায়কসহ নিহত ৫

ভারতের ছত্তিশগড়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী প্রচারণার গাড়ি বহরে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এতে  বিজেপির বিধায়ক ভীমা মানদাভিসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছে। গতকাল বিকালে ছত্তিশগড়েরর দন্তেওয়াড়া অঞ্চলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। অঞ্চলটি মাওবাদীদের শক্ত ঘাটি বলে পরিচিত। তাই বলা হচ্ছে মাওবাদীরাই বিজেপির ওপর এই বোমা হামলা চালিয়েছে। এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি ও আনন্দবাজার।
খবরে বলা হয়েছে, ছত্তীসগঢ়ে মোট ১১টি আসনের মধ্যে বৃহ¯পতিবার প্রথম দফায় মাত্র একটি আসন দন্তেওয়াড়ায় ভোট। দন্তেওয়াড়া আসনের প্রায় পুরো এলাকাই মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি।
তাই ভোটের আগে নিরাপত্তার জালে মুড়ে ফেলা হয়েছিল গোটা এলাকা। কিন্তু এর পরেও মাওবাদীদের হামলা এড়ানো গেলো না। গতকাল নির্বাচনী প্রচারণা শেষে বিজেপি’র বিধায়ক ভিমা মানদাভি তার গাড়িবহর নিয়ে ওই এলাকা অতিক্রম করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ রাস্তার পাশে পুতে রাখা একটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ভীমার গাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। বিস্ফোরণের পরেও যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, বিধ্বস্ত গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন, পাশেই লুকিয়ে থাকা মাওবাদীরা তাদের গুলি করে হত্যা করে। ভীমা ছাড়া বাকী নিহত অন্যরা তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মী। ঘটনার পরে নিরাপত্তা কর্মীদের অস্ত্র লুঠ করে পালিয়ে যায় মাওবাদীরা। একটি সূত্র বলছে, মাওবাদীদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গুলির লড়াই হয়েছে নিরাপত্তারক্ষীদের।

গরুর মাংস ইস্যুতে এবার আসামে আরেক মুসলিমকে নির্যাতন, হত্যার হুমকি

গরুর মাংস ভক্ষণ ও সংরক্ষণের দায়ে ২০১৫ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে দাঙ্গাবাজরা পিটিয়ে হত্যা করে মোহাম্মদ আখলাক নামে এক মুসলিমকে। তার ছেলে মোহাম্মদ দানেশকে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করে। এবার সেই ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি ঘটেছে আসামে। সেখানে বিশ্বনাথ জেলার একজন বাসিন্দা শওকত আলী। তাকে রোববার টার্গেট করে দাঙ্গাবাজরা। তাদের অভিযোগ তিনি গরুর মাংস বিক্রি করেছেন। এ জন্য তাকে মৌখিক প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়েছে। অবমাননা করা হয়েছে।
নির্যাতন করা হয়েছে। হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে তার মুখের ভিতর কাঁচা মাংস ঢুকিয়ে দেয় কিছু লোক। এ ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাতে শোনা যায় কিছু লোক শওকত আলীকে জিজ্ঞেস করছেন, কেন তুমি এখানে এই মাংস বিক্রি করতে এনেছ? আরেকজন তাকে প্রশ্ন করছেন, তুমি কি বাংলাদেশী? এনআরসিতে (নাগরিকপঞ্জি) কি তোমার নাম আছে? এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
শওকত আলীকে এভাবে নির্যাতনের বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। তাতে দাবি করা হয়েছে, শওকত আলীকে জোর করে কাঁচা মাংস খাওয়ানো হয়েছে তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় শওকত আলী মাটিতে বসে আছেন। এ সময় তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছে কিছু মানুষ। মৌখিক নির্যাতন করছেন। নির্যাতনও করা হচ্ছে। এক পর্যায়ে তাদের একজনকে দেখা যায় এক টুকরো মাংস নিয়ে জোর করে খাওয়াচ্ছেন শওকত আলীকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বিশ্বনাথের এসপি রাকেশ রোউশন বলেছেন, এই ভিডিওটি জেনুইন মনে হচ্ছে। শওকত আলীর পরিবারের পক্ষ থেকে করা একটি এফআইআর গ্রহণ করেছি। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছি। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।
বিশ্বনাথের ডিসি পবিত্র রাম খাউন্ড বলেছেন, আমরা আগেভাগেই সতর্কতামূলক সব ব্যবস্থা নিয়েছি। শান্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখতে স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। ঘটনার তদন্ত চলছে।
পরিবারের মতে, শওকত আলী খাদ্যপণ্য চাল ও মাংস বিক্রির একটি ছোট্ট দোকান চালান। সপ্তাহে রোববার ও বৃহস্পতিবার দুদিন তিনি সেখানে বেচাবিক্রি করেন। সপ্তাহের অন্যদিনে তিনি বিক্রি করেন বোরকা ও ধর্মীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র।
শওকত আলীর ছোটভাই আবদুল রেহমান। তিনি স্থানীয় একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, এখন থেকে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আমার পরিবার চাল ও মাংস বিক্রির ওই দোকান পরিচালনা করে আসছে। ওই এলাকায় এমন চারটি দোকান আছে। এসব দোকানের খদ্দের হলেন মুসলিমরা ও ছোটখাট ক্রেতারা। ঘটনার দিন সম্ভবত আমাদের দোকানে ছিল মহিষের মাংস। রাতে দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সামান্য আগে একদল দাঙ্গাবাজ সেখানে হানা দেয়। তারা শওকত আলীর ওপর হামলা করে। রড দিয়ে তাকে প্রহার করে। ছোট্ট দোকানটি ভাঙচুর করে। এমনকি শওকত আলী কাঁচা মাংস ভক্ষণ না করলে তাকে হত্যার হুমকি দেয় তারা।
আবদুল রেহমানের ভাষায়, আমার ভাই এখন হাসপাতালে। এই অঞ্চলে এর আগে আমরা এমন সাম্প্রদায়িকতা দেখি নি কখনো।
একই কথা বলেছেন, অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সিনিয়র নেতা সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনিও বলেছেন, এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। হামলাকারীরা শওকতকে প্রহার করেছে। তাকে হুমকি দিয়েছে। টেনেহিঁচড়ে বের করেছে। তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। পুলিশের কাছে অভিযোগে আমরা বলেছি তাকে নির্যাতন করা হয়েছে।

ভারত-ইসরাইলের নেতারা নৈতিকভাবে দেউলিয়া -ইমরান খান

ভারত ও ইসরাইলের নেতারা নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এই দুটি দেশের নেতারা আন্তর্জাতিক আইন ও নিজেদের সংবিধানকে অবজ্ঞা করে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন কাশ্মির ও  ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর। এর কারণ একটাই। তাহলো তারা ভোটের জন্য এসব করছেন। মঙ্গলবার সরাসরি এ দুটি দেশের নেতাদের আক্রমণ করে এমন কথা বলেছেন ইমরান। এ খবর দিয়েছে পাকিস্তানের অনলাইন ডন।
ইমরান খান প্রশ্ন রাখেন, আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজ্যুলুশন, এমন কি নিজেদের সংবিধানের তোয়াক্কা না করে যখন ইসরাইল ও ভারতের নেতারা পশ্চিম তীর ও ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে তাদের দখলদারিত্ব সম্প্রসারণ করার জন্য প্রস্তুত থাকেন, তখন তারা তাদের নৈতিক দেউলিয়াপনা প্রদর্শন করেন। ইমরান খান প্রশ্ন রাখেন, তাদের জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি কি তারা অনুভব করেন না? বিস্ময় লাগে এমন একটি নির্বাচনে স্রেফ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে এসব নেতা কতদূর যেতে পারবেন?
উল্লেখ্য, আজ মঙ্গলবার ইসরাইলে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে।
এতে নির্ধারণ হবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পঞ্চম দফায় ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কিনা।
যদি তিনি এটা নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে তিনিই হবেন ইসরাইলে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিক। তিনি আজ কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ে মুখোমুখি অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজ-এর। গান্টজ-এর ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির থেকে এগিয়ে আছে। 
ইসরাইলে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ দুর্নীতির ধারাবাহিক অভিযোগ আছে। এতে তার জেতার সম্ভাবনা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বলে জানিয়েছে জনমত জরিপ। কিন্তু সম্প্রতি গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এতে তার নির্বাচনে জেতার সুযোগ আলোকিত হতে পারে। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করে ইসরাইল। তারপর থেকে ওই ভূমির ওপর দখলদারিত্ব বহাল রেখেছে তারা। কয়েকদিন আগে ওই গোলান মালভূমিতে ইসরাইলি সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। কিন্তু আন্তর্জাতিক দুনিয়া কখনোই গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের বলে স্বীকৃতি দেয় নি। ট্রাম্পের দেয়া ওই স্বীকৃতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এখানেই শেষ নয়। নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে দখলীকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ করবেন। কিন্তু এই পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনিরা দেখে থাকে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্র হিসেবে। এ সপ্তাহের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুকে এক সাক্ষাতকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল এ নিয়ে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ইসরাইল যেমন দখলীকৃত গোলান উপত্যাকা ও পূর্ব জেরুজালেমে তাদের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছে, পশ্চিম তীরে কেন তা করা হয় নি? জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, আমি ইসরাইলি সার্বভৌমত্বকে সম্প্রসারিত করতে যাচ্ছি। আমি বসতি স্থাপনকারী ব্লক এবং বসতি নেই এমন এলাকাকে আলাদা করে দেখি না।
তার এ বক্তব্যকে কা-জ্ঞানহীনের মতো কথাবার্তা বলে আখ্যায়িত করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ভোট লুফে নেয়ার জন্য এমন মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু। জেনেভা কনভেনশনের অধীনে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করছে ফিলিস্তিন ও অন্য অনেক দেশ। এমন বিরোধের তোয়াক্কাই করে না ইসরাইল। 
অন্যদিকে ভারতে লোকসভার নির্বাচন শুরু হচ্ছে ১১ই এপ্রিল। এ নির্বাচনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই করছে। এ নির্বাচনে ভোট দেবেন প্রায় ৯০ কোটি বৈধ ভোটার। নির্বাচন উপলক্ষে মোতায়েন হচ্ছে হাজার হাজার নিরাপত্তা রক্ষী। কিন্তু সোমবার দলটি তাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে।
এতে কয়েক দশক ধরে দখলীকৃত কাশ্মিরের জনগণকে দেয়া বিশেষ অধিকার কেড়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনী এমন প্রতিশ্রুতিতে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মিরে ভিন্ন ফল আনতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এ বিষয়ে জম্মু-কাশ্মিরে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি দিল্লিকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর অধীনে জম্মু ও কাশ্মির ভারতের সঙ্গে থাকতে বাধ্য এবং এটা একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। যখন এই সেতু ধ্বংস করে দেয়া হবে, তখন কাশ্মিরে ভারতের নিয়ন্ত্রণ অবৈধ হয়ে যাবে। তখন ভারত হবে একটি দখলদার দেশ।

ভারতের দাবি আবারও প্রত্যাখ্যান পাকিস্তানের আইএসপিআরের

ভারতের অভিযোগ আরো একবার প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। সম্প্রতি পুলওয়ামা হামলার জের ধরে দেশ দুটির মধ্যে আকাশপথে যে ‘ডগফাইট’ হয় এ সময় ভারত দাবি করে, তারা পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান তা অস্বীকার করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকায় বলা হয়, ভারতের ওই দাবির পক্ষে কোনো সত্যতা নেই। এর প্রেক্ষিতে ভারত আবারও একই দাবি করে। সোমবার এর জবাব দিয়েছেন পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্সের (আইএসপিআর) প্রধান মেজর জেনারেল আসিফ গফুর। তিনি বলেছেন, যতবারই বলা হোক মিথ্যা কখনো আর সত্য হয় না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
মেজর গফুর আরো বলেন, ভারত শুধুই মিথ্যা অভিযোগ করছে। তারা যে দাবি করছে বিশ্বের সামনে এর স্বপক্ষে তাদের কাছে কোনোই প্রমাণ নেই। আইএসপিআরের মহাপরিচালক গফুর এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। ভারতের বিমান বাহিনী প্রধান সোমবার নয়া দিল্লিতে তাদের দাবি তুলে ধরেন। সেখানে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল আর.জি. কে কাপুর ‘অকাট্য প্রমাণ’ হাজির করেন। এতে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে আকাশপথের যুদ্ধে পাকিস্তানি একটি যুদ্ধবিমানকে তারা ভূপাতিত করেছেন।
এর জবাব দেন পাকিস্তান আইএসপিআরের মহাপরিচালক। তিনি বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের যে ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে মুখ বন্ধ রেখেছিল পাকিস্তান। তিনি বলেন, আমাদের এই নীরবতাকে ভাঙাবেন না। আমরা সত্য নিয়ে ঢোল বাজাই না। প্রকৃত সত্য হলো, পাকিস্তান বিমান বাহিনী ভারতীয় দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। প্রত্যেকেই ভারতীয় ওই যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখেছেন।
এখানে উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন ভারতের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ম্যাগাজিনটি তাদের ওয়েবসাইটে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ভারত দাবি করেছে আকাশপথের যুদ্ধের সময় তাদের পাইলটরা পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছেন।  কিন্তু ভারতের এই দাবি মিথ্যা বলেই দৃশ্যমান।
এই ম্যাগাজিনটি এমন রিপোর্ট প্রকাশ করার পর একই কথা বলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনিও বলেন, ভারতের নেতারা মিথ্যা দাবি করছেন। তিনি বলেছেন, সত্য সব সময়ই বেরিয়ে আসবে। এটাই উত্তম।  ডন লিখেছে, যুদ্ধের জিকির তুলে এবং পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার মিথ্যা দাবি তুলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনে বিজয়ী হতে চাইছেন।

ভারতের স্টার ওয়ার্স শুরু, সমান জবাব দেয়া উচিত পাকিস্তানের by জমির আকরাম

২৭ শে মার্চ ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র মহাকাশে একটি স্যাটেলাইটকে ধ্বংস করেছে। এর মধ্য দিয়ে ভারত তার স্যাটেলাইট বিরোধী অর্থাৎ এস্যাট সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জোর দিয়ে বলেছেন, ভারত এ বিষয়ক সুপার লিগে যোগ দিয়েছে। এস্যাট সক্ষমতা আছে এমন সুপারপাওয়ারের গ্রুপের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। এ গ্রুপে আছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। তবে যে সময়ে ভারত ওই পরীক্ষা চালিয়েছে তাতে নরেন্দ্র মোদি তার রাজনৈতিক সুবিধাকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, তিনি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে জটিল নির্বাচনের মুখোমুখি।
এখন দেখার বিষয়ে, তার এই কৌশল জনগণের মত তার পক্ষে আনতে সহায়তা করে কিনা।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতে এখনও দারিদ্র্য রয়েছে উল্লেখযোগ হারে। শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ বসবাস করছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। কয়েক কাজার হতদরিদ্র্য কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। ২০ কোটির বেশি মানুষ উন্নত টয়লেট সুবিধা পায় না। এখন কাকে বেছে নেবেন সেটা ভারতের জনগণের বিষয়। তবে প্রকৃত সত্য হলো, ‘ইন্ডিয়ার স্টার ওয়ার্স’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হতে চাইছেন দার্থ ভাদের (স্টার ওয়ার্সের ফিকশনাল চরিত্র)। তার এ কর্মসূচিতে মহাকাশে সামরিকীকরণ বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত স্থিতিশীলতা আরো খর্ব হবে।
ভারতের ওই পরীক্ষাকে তাদের প্রযুুক্তিগত অগ্রগতি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এমন কর্মসূচির মাধ্যমে কাউকে হুমকি দেয়ার কোনো ইচ্ছে নেই ভারতের। এমনটা দাবি করেছেন মোদি। তিনি আরো বলেছেন, মহাকাশে অস্ত্রায়ন, মহাশূন্যে অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় সব সময়ই বিরোধিতা করা হচ্ছে। এই পরীক্ষা এই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করবে না।
এটা হলো ওরওয়েলিয়ানের উভমুখি বক্তব্যের মতো। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো একটু এগিয়ে গিয়ে বলেছে, এই পরীক্ষা আমাদের মহাকাশভিত্তিক ক্রমবর্ধমান সম্পদের বিরুদ্ধে যেসব হুমকি, তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য একটি উদ্যোগ।
যেহেতু ভারতের এমন পারমাণবিক পরীক্ষা পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর তাই এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত পাকিস্তানের। এস্যাট পরীক্ষা হলো ভারতের কৌশলগত সামরিক ‘বিল্ডআপ’। মহাকাশে তারা এর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কথা বলেছে। এতে সহযোগিতা রয়েছে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের। ফলে এর মধ্য দিয়ে ভারত অর্জন করেছে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, যা তাদের কৌশলগত সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করেছে। সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, এস্যাট পরীক্ষা মহাকাশে বিরোধী পক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করে দেয়ার ভারতীয় সক্ষমতারই প্রদর্শন। সঙ্কটের সময়ে, দেশের যোগযোগ বিষয়ক স্যাটেলাইট, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, এমন কি ক্ষেপণাস্ত্রও ধ্বংস করে দিতে পারে তারা। এর ফলে ভারত সামরিক দিক থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেতে পারে।
এ ছাড়া তাদের দিকে ধেয়ে আসা বিরোধীদের ক্ষেপণাস্ত্রকে টার্গেট করার মাধ্যমে ভারত তার ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে ব্যবহার করতে পারে মহাকাশের সক্ষমতা। একই সময়ে ভারতের এই সক্ষমতা শত্রুপক্ষের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টার্গেট করতে সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। উপরন্তু মহাকাশ বিষয়ক প্রযুক্তির পর্যাপ্ততা ও ভারতের ভূমি থেকে সাগর ভিত্তিক ইন্টার-কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এক্ষেত্রে তারা মহাকাশে টার্গেট এবং নতুন করে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি ব্যবহার করতে পারে।
সার্বিক কৌশলগত সক্ষমতার সমন্বয়ে ভারতের স্টার ওয়ার্স কর্মসূচি শুধু পাকিস্তানের মহাকাশের স্যালেটাইট ধ্বংসেই ব্যবহার হতে পারে এমন নয়, একই সঙ্গে তারা পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় ‘প্রিএম্পটিভ ফার্স্ট স্ট্রাইক’ চালাতে পারে। ভারতের এ বিষয়ক কৌশল নির্ধারণকারী সম্প্রদায় হয়তো এমনই একটি অপশন নিয়ে কাজ করেছেন। এতে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকার, স্ট্রাটেজিক ফোর্সেসের কমান্ডার বিএস নাগাল সহ সাবেক ও বর্তমান প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষকরা। তারা পরামর্শ দিয়েছেন, পাকিস্তান সম্পর্কিত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতির গুণগত মান উন্নত করা উচিত ভারতের। প্রথমত, হামলায় পাকিস্তানের সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে দিয়ে তাদেরকে নিরস্ত্র করে দেয়ার সক্ষমতা লাভ করতে হবে ভারতকে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের জবাব দেয়ার ক্ষমতাকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে, যদি পাকিস্তানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকেও। এমন কৌশল বাস্তবায়ন করতে গেলে, আক্রমণাত্মক এই সক্ষমতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ভারতের মহাকাশ বিষয়ক সম্পদ একটি মূল দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের জবাব দেয়ার ক্ষমতাকে খর্ব করে দেয়া হবে। এমনটা হলে ভারতের মহাকাশ বিষয়ক কর্মসুচি দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা আছে তা খর্ব করে দেবে। আর তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহত্তর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দেবে।
তবে এখন পর্যন্ত ভারতের এমন সব বিষয়ের বেশির ভাগই হলো ছলনা ও তর্জন গর্জন। কারণ, তাদের প্রথম হামলা চালানোর বিষয়ে যে সক্ষমতা আছে, তা নিয়ে রয়েছে গুরুত্বর সংশয়। তবে এক্ষেত্রে সরাসরি ভারতের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
উপরন্তু ভারতের এমন স্থুলবুদ্ধির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান। প্রথমত, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ও ডেভিভারি সিস্টেম ভারতের প্রথম হামলায় অতোটা বিপন্ন হওয়ার অবস্থায় নেই। দ্বিতীয়ত, ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। তা পাকিস্তানের ক্রুজ ও এমআইআরভি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করা সম্ভব। তৃতীয়ত, উচ্চাকাঙ্খা ও সক্ষমতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে ভারতের।
তা সত্ত্বেও ভারতের ক্রমবর্ধমনা মহাকাশ বিষয়ক সক্ষমতার বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে দৃষ্টিতে রাখা উচিত পাকিস্তানের। ভারতের মহাকাশ সক্ষমতা হলো তাদের ভবিষ্যত সামরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্য নেয়া পদক্ষেপ।  এটা স্পষ্ট যে, পাকিস্তানি স্যাটেলাইটে ভারতের যেকোনো হামলা এর যোগাযোগ ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ  এবং আগেভাগে সতর্কতা বিষয়ক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেবে। এর ফলে ভারতের সঙ্গে যেকোনো সঙ্কটে বড় বিপদে পড়বে পাকিস্তান। এ অবস্থায় ভারত যেহেতু ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে তার সক্ষমতা বাড়িয়েছে তাই পাকিস্তানেরও উচিত তার এস্যাট সক্ষমতা বাড়িয়ে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ভারতকে নিবৃত করা বা ভয় দেখানো। এ জন্য আমদের যেসব ক্ষেপণাস্ত্র আছে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে সারা ভারত এর পাল্লার মধ্যে আসে। ভারত যেমনটি করেছে তেমনিভাবে আমাদেরও সামরিক উদ্দেশে মহাকাশে আরো স্যাটেলাইট বসানো উচিত।
এস্যাট পরীক্ষার পরে আন্তর্জাতিক যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে তা পাকিস্তানের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয। ভারত মহাকাশে এসব অস্ত্রের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু মহাকাশে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা প্রতিরোধ করার যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছে তা একটি লজ্জার বিষয়, পুরোপুরিই বিশ্বাসযোগ্যতা নেই এর। এ ছাড়া মহাকাশকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং করানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো মেকানিজম নেই। উপরন্তু ভারতের কৌশলগত অংশীদার হলো যুক্তরাষ্ট্র। তাই তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি মহাকাশ বিষয়ক সহযোগিতাই শুধু পাবে এমন নয়। একই সঙ্গে তারা মহাকাশ কর্মসূচিতে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ছায়া পাবে।
এই অবস্থায়, ভারত যেহেতু স্টার ওয়ার্স শুরু করেছে, একই সমান জবাব দেয়া উচিত পাকিস্তানেরও।
(যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাকিস্তানি সংস্করণ একপ্রেস ট্রিবিউনে প্রকাশিত মতামত কলামের অনুবাদ)

আতঙ্কের খেরবাড়িতে ভোটের উত্তাপ নেই by তরুণ চক্রবর্তী

ভোটের কোনো উত্তাপ নেই খেরবাড়িতে। শোক আর ক্ষোভের মধ্যে আছে আতঙ্কও। পাঁচ মাস পরেও আতঙ্ক কাটেনি আসামের বাঙালি প্রধান গ্রামটি থেকে। ক্ষোভ রয়েছে বিচার না পাওয়ার। কারা খুন করলেন? সে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই গ্রামবাসীর। তাঁরা শুধু জানেন, বাঙালি হওয়ার কারণেই দিতে হয়েছে প্রাণ।
আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে ৫১৮ কিলোমিটার দূরে জেলা সদর তিনসুকিয়া। খনিজ তেল, চা–বাগান ও কয়লার খনি সমৃদ্ধ এই জেলা আসামের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র। তিনসুকিয়া শহর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে, চীন সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সড়ক থেকে কিছুটা গেলে হাতের বাঁদিকে খেরবাড়ি গ্রাম। বর্ধিষ্ণু কৃষিপ্রধান এলাকা। গ্রামের মানুষ আশপাশের শহরবাসীদের বারো মাস সবজি সরবরাহ করে থাকেন। চাষবাস করে চলে তাঁদের সংসার। প্রতিবছর বন্যা এখানকার মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু গত বছর বন্যার পানি ঢোকেনি গ্রামে। হয়েছিল ‘গুলি বৃষ্টি।’
১ নভেম্বর, ২০১৮। গোটা অসম উত্তপ্ত নাগরিক নিবন্ধীকরণ (এনআরসি) নিয়ে। সন্ধ্যায় জনাসাতেক সশস্ত্র ব্যক্তি গ্রামের ছয়জনকে ডেকে নিয়ে যান সইখুয়া নালার ধারে। বলেন, কথা আছে। ছয়জনকেই পেছন ফিরে বসতে বলেন। তারপর কথা বলে তাঁদের বন্দুক। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন অবিনাশ বিশ্বাস (২২) ও তাঁর ভাই অনন্ত (১৮), কাকা শ্যামলাল (৫২)। মারা যান খেরিবাড়িরই ধনঞ্জয় নমশূদ্র (২২) ও সুবল দাস (৫৫)। বরাত গুণে বেঁচে যান সহদেব নমশূদ্র। সহদেবের মাথার চুল পুড়িয়ে গুলি বেরিয়ে যায়। ভয়ে অন্ধকারে অজ্ঞান হয়ে নালায় পড়ে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন সহদেব। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী।
খেরবাড়ি এখনো ভুলতে পারেনি শোক। গ্রামের ভেতর কোনো রাজনৈতিক দলেরই পতাকা নেই। গ্রামবাসী সমর বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বাঙালি। রাজনীতিই খেয়েছে আমাদের গ্রামের পাঁচটি প্রাণ।’ দুই ছেলে আর দেবর হারানো শ্যামলী বলছেন, ‘বাবা, বড় দুঃখী আমি। বিচার পাব না! শাস্তি হবে না দোষীদের!’ তাঁর পুত্রবধূ ঊর্মিলা। কোলে দুই বছরের কন্যাসন্তান। মাটির ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। বললেন, ‘সরকার পাঁচ লাখ টাকা (রুপি) করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই বাপ মরা বাচ্চাটাকে নিয়ে কী করব! কোথায় যাব!’ শুধু তাঁরা নন, গোটা গ্রামে এখনো শ্মশানের স্তব্ধতা। তাঁরা এখনো যেন বিশ্বাস করেই উঠতে পারছেন না সেই দুঃসহ রাত্রির ঘটনা।
গ্রামবাসী প্রথম খবর পান সহদেবের কাছ থেকে। প্রথম আলোকে সহদেব বলছিলেন, ‘ভালো ভালো বন্দুক’ হাতে ফৌজি পোশাক পরা জনাসাতেক লোক তাঁদের হিন্দিতে বলে, সঙ্গে যেতে। কথা আছে। তবে তাঁরা নিজেরা কথা বলে অসমিয়াতেই। সবার মুখ ছিল কালো কাপড়ে ঢাকা। তারপর নালার পারে বসতে বলা হয় তাঁদের।
সহদেব বলছিলেন, ‘হঠাৎ শুনি গুলির আওয়াজ। ভয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাই নালায়। ওরা আমায় দেখতে পায়নি।’
তারপর পাঁচ মাস কেটে গেলেও আতঙ্ক যায়নি সহদেবের। বাড়ির বাইরে বলতে শুধু নিজেদের চাষের জমিতেই যান এখন। সন্ধ্যার পর ঘর থেকেই বের হন না তিনি।
কারা এসেছিল সেদিন? আসাম সরকার বলছে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন উলফার স্বাধীন গোষ্ঠী। কিন্তু উলফা অস্বীকার করেছে। গ্রামবাসীও বিশ্বাস করছেন না সে কথা। দুই সন্তান ও ভাইকে হারানো মোহনলালও মানতে নারাজ। তিনি বলেন এই গ্রামে কখনো হামলা করেনি উলফা। বর্ষার মৌসুমে তাঁদের কাছ থেকে মাছ কিনেছে কখনো কখনো। তবে সেটা পয়সা দিয়ে।
উলফার আলোচনাপন্থীদের চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়ার দাবি, এই কাজ তাঁরা করতেই পারেন না। কারণ, তাঁরা তো সবাই আসামের বাসিন্দা। বাংলায় কথা বললেও তাঁরা অসমিয়াই।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেছিলেন, দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পাবে। কিন্তু এখনো কেউ গ্রেপ্তারই হয়নি। একজন ‘লিঙ্কম্যান’ আটক হয়েছিল বটে, এখন সেও মুক্ত।
বাঙালি গ্রামটির বাসিন্দাদের সবারই রয়েছে এনআরসি তালিকায় নাম। সবাই বহু বছর ধরে বসবাস করছেন। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো ভাবতেই পারছেন না তাঁরাও হতে পারেন ‘রাজনীতি’র শিকার। ঘটনার পর বসেছিল আধা সেনার অস্থায়ী ছাউনি। এখন সেটাও নেই। তাই ভোট মৌসুমে আসামের লখিমপুর লোকসভা কেন্দ্রে খেরবাড়ি আতঙ্কের প্রহর গুনছে।

ধর্ষিতাকে আশ্রয় দিয়ে ধর্ষণ

ধর্ষিতা এক তরুণীকে সাহায্য করার কথা বলে সহকর্মীর বাসায় নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে পুলিশ কনস্টেবল বাদল হোসেনের বিরুদ্ধে। তিনি ডিএমপির প্রটেকশন শাখায় কাজ করেন। ওই তরুণী ওই দিনই অর্ক ঘোষ জয় নামের এক যুবকের ধর্ষণের শিকার হন। ঘটনার শিকার এ তরুণীর পরিবার ধর্ষণের অভিযোগ এনে বাদল হোসেন, জয় ঘোষ অর্ক ও তার সহযোগী জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে   দুটি মামলা করেছেন ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও শাহবাগ থানায়। পুলিশ অভিযুক্ত এই তিন জনকেই গ্রেপ্তার করেছে। ধর্ষিতা ওই তরুণী জানিয়েছেন, সৌদি প্রবাসী জয় ঘোষের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় তার। দীর্ঘদিন মেসেঞ্জারে কথা বলাতে তাদের মধ্যে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠে। এ সম্পর্ক রূপ নেয় ভালবাসায়।
কিছু দিন পর জয়ের বিভিন্ন খারাপ আচরণে তার কাছ থেকে দুরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। আর এতেই তার প্রতি ক্ষিপ্ত হন জয়।
মারামারির ঘটনায় জরিমানা দিয়ে সে সৌদি থেকে দেশে ফিরে কৌশলে তার সঙ্গে দেখা করে। প্রথম দেখাতেই জয় ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি। তারপর সে চলে যায় কলকাতায়। তিন মাস পরে সেখান থেকে এসে ভয়ভীতি দেখিয়ে আবার তাকে দেখা করতে বাধ্য করে। ওই দেখাতেই জয় তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে কৌশলে ভিডিও করে। পরে ওই ভিডিও দেখিয়ে জয় তাকে ব্ল্যাকমেইলিং করতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ফকিরাপুলের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক করে। ধর্ষক জয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজের ফোন নম্বরটি বন্ধ করে দেন ওই তরুণী। পরে কৌশলে আবারও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অর্ক। এক পর্যায়ে তার ফোন কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়। গুলিস্তান এলাকায় ফেলে যাওয়ার সময় ওই পুলিশ কনস্টেবল নিজে থেকেই তাকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। এক পর্যায়ে দুই সহকর্মীর বাসায় নিয়ে গিয়ে রাতভর ধর্ষণ করেন।
ধষর্ণের অভিযোগে থানায় করা মামলার এজাহারে তরুণীর বাবা উল্লেখ করেছেন, আমার মেয়েকে জয় মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সড়কের বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদের ভবনের পেছনের সিঁড়ির গোড়ায় টিনশেড রুমে দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণের এই দৃশ্য সে আমার মেয়ের মোবাইল ফোনে ধারণ করে। পরে সেই মোবাইল তাকে ফেরত না দিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরাতে থাকে। এক পর্যায়ে মোবাইল ফোন ফেরত দেয়ার কথা বলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাদে নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা বলতে থাকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে জয় আমার মেয়েকে রিকশা করে গুলিস্তান মাজারের পশ্চিম পাশে একা রেখে যায়। ওই সময় পুলিশ কনস্টেবল বাদল হোসেন এসে আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করে সে কোন বিপদে পড়েছে কিনা। তখন তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জয় নিয়ে গেছে বললে তিনি তাকে সাহায্য করার আশ্বাস দেন। এসময় বৃষ্টি শুরু হলে তারা গোলাপশাহ মাজারের পাশের এটিএম বুথে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বৃষ্টি থামার পর জয়ের সঙ্গে তার ঝামেলা মিটিয়ে দিয়ে মোবাইল এনে দেয়ার কথা বলে বাদল হোসেন তার পরিচিত বন্ধুর যাত্রাবাড়ি থানাধীন ৩৩১ দনিয়ার ৬ তলা বাসার একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পর রাত গভীর হয়।
এজাহারে ধর্ষিতার বাবা আরো বলেছেন, ওই বাসায় আমার মেয়েকে রাতের খাবার খাওয়ানোর পর জয়ের সঙ্গে কথা বলবে বলে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এর মধ্যে ওই বাসার লোকজন ঘুমিয়ে গেলে বাদল হোসেন জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। সকাল বেলা বাদল হোসেন জয়ের সঙ্গে কথা বলে গুলিস্তানের রাজধানী হোটেলের সামনে আমার মেয়েকে রেখে চলে যায়। তখন জয় আমাদের ফোন করে রাজধানী হোটেলের সামনে যেতে বলে। কিছুক্ষণ পর আমি ও আমার স্ত্রী সেখানে গেলে জয়ও সেখানে এসে পৌঁছায়। তখন আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই সচিবালয়ে উল্টো পাশের একটি ভবনের সামনে। জয়ের কাছে তার মোবাইল ফোন ফেরত চাইলে তার সঙ্গে আমার মেয়ের কথাকাটি হয়। এক পর্যায়ে সেখানে শাহবাগ থানা পুলিশ এসে ঘটনার বিষয়ে জানতে চায়। বিস্তারিত জানার পর তারা আমাদেরকে নিয়ে শাহবাগ থানায় নিয়ে যান।
এজাহার সূত্রে আরো জানা গেছে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য বাদল হোসেনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের গোপালপুরে। তিনি ওই এলাকার জসিম উদ্দিন ও সায়েরা বেগমের ছেলে। এছাড়া আরেক অভিযুক্ত অর্ক ঘোষ জয়ের বাড়িও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার রাধানগরে। সে ওই এলাকার সুভাষ চন্দ্র ঘোষ ও মমতা রানী ঘোষের ছেলে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা  যাত্রাবাড়ী থানার এসআই সুব্রত বিশ্বাস বলেন, জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা হয়েছে। তার জবানবন্দিও নেয়া হয়েছে।

বেপরোয়া রেসিং গ্যাং by শুভ্র দেব

অত্যাধুনিক মডেলের মোটরবাইক-রেসিং কার। হিন্দি-ইংরেজী গানের বিটের তালে তালে বাড়ে গতি। তোয়াক্কা নাই ট্রাফিক পুলিশ-সিগন্যালের। আশে পাশে কি আছে দেখার সময়ও নেই। গাড়ির সাইলেন্সার দিয়ে   বের হওয়া ধোয়ার সঙ্গে তৈরি হয় ভয়স্কর শব্দ। বেপরোয়া গতিতে কেঁপে উঠে রাতের ঢাকার নিস্তব্ধ সড়ক। এ গতির লড়াই কখনও কখন দিনেও দেখা যায় উড়াল সড়ক বা যানবাহন কম চলে এমন সড়কে।
নানা উদ্যেগ নিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যখন প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে তখন রেসিং গ্যাংরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সম্প্রতি উঠতি বয়সী ছেলেদের জন্য অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে বাইক বা কার রেসিং।
এই রেসিং গ্যাং সদস্যরা কেউ কেউ মাধ্যমিকের গন্ডিও পেরুয়নি। আবার কেউ সদ্য পা দিয়েছে কলেজের বারান্দায়। কিন্তু এ বয়সেই তারা বেছে নিয়েছে উশৃঙ্খল-বেপরোয়া জীবন। স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে তারা মেতে উঠে গতির নেশায়।
সরজমিন দেখা গেছে, ঢাকার, মানিক মিয়া এভিনিউ, বিজয় সরনী সড়ক, ৩০০ফিট সড়ক, বিমানবন্দর সড়ক, ধানমন্ডি-মিরপুর সড়ক, গাবতলী সাভার সড়ক, মহাখালী-বিশ্বরোড, বছিলা, গুলশান-বারিধারা, হাতিরঝিল চক্রাকার সড়ক, রামপুরা-যমুনা ফিউচার পার্ক, ঢাকার বাইরের বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়ক, ঢাকা-চিটাগাং সড়কে গতির মহড়ায় নামে রেসিং গ্যাং এর সদস্যরা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে এসব রেসিংয়ের সঙ্গে সক্রিয় আছে অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রুপ। তাদের মধ্যে রয়েছে, ক্লাব ৬৯, ক্লাব বাংলাদেশ, কেবি রাইডার্স, এমএসবি রাইডার্স, বাংলাদেশ রেসিং ক্লাব, বিডি ঘোস্ট রাইডার্স, ফেরোশাস ফ্লাশ, হান্ট রাইডার্স, অল অ্যাবাউট রোড রাইডার্স, এক্সাইল রাইডার্স, বিডি রাইডার্স ক্লাব, ব্লাইন্ডেড হুইলম্যানস অব রংপুর, বগুড়া স্ট্রিট রাইডার্স, সৈয়দপুর ক্রেজি রাইডার্স, পটুয়াখালী রাইডার্স।
শুক্রবার ঢাকার খিলগাঁও ফ্লাইওভারে বাইক রেসিং করতে গিয়ে প্রাণ যায় পূর্ব বাসাবো কদমতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর শিক্ষার্থী তাজ হোসেন তুহিন (১৬) ও বনশ্রী ইস্টার্ন স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল আল নোমান শেখের (১৭)। তারা দুজন সুবজবাগ থানা এলাকার ওহাব কলোনীতে থাকতো। তুহিন ও নোমান বাল্য বন্ধু। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় চালকের আসনে ছিল নোমান।
বাইকের গতি ছিল একশর উপরে। তাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফ্লাইওভারের রেলিংয়ের সঙ্গে আঘাত লেগে ঘটনাস্থলেই তারা মারা যায়। ফ্লাইওভারের উপরে পড়ে থাকে তাদের ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত নিথর দেহ। পুলিশ জানিয়েছে, বেপরোয়া গতিতে রেসিং করতে গিয়ে তাদের এই অবস্থা হয়েছে। ২রা এপ্রিল গাজীপুরে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল প্রাণ কেড়ে নেয় কালীগঞ্জ থানার পুলিশ সদস্য  ৪৮ বয়সী আব্দুল মোতালেবের। ওই দিন কালীগঞ্জের একতা এলাকার শীতলক্ষ্যা নদীর চরসিন্দুর সেতুতে দায়িত্ব পালন করছিলেন এই পুলিশ সদস্য। তখন বেপরোয়া গতির ওই মোটরসাইকেলটি তার ওপর দিয়ে উঠে যায়। এর আগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর হাতিরঝিল মহানগর সেতুর ওপর বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে ছিটকে নিহত হন রেদোয়ানুল কবির শুভ (৩২)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন: কার ও বাইক রেসাররা সাধারনত গভীর রাতে বের হন। ওই সময় সড়কে যানবাহন ও মানুষ চলাচল কম থাকে। আর এই সুযোগটাকেই তারা বেছে নেয়। কিন্তু তারপরও জরুরি কাজে বা দায়িত্ব পালনে কিছু মানুষ গভীর রাতে সড়কে থাকেন। তাদের বয়ানে উঠে এসেছে রাতের ফাঁকা ঢাকায় বেপরোয়া গতির মহড়ার বর্ণনা। বনানী সড়কের ডাচ বাংলা বুথের নিরাপত্তাকর্মী শাহজাহান মিয়া বলেন, এমনিতে নিস্তব্ধ রাস্তাতে মালবাহী ও অল্প কিছু যানবাহনের চলাচল থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ বিকট শব্দে ৭/৮টি কার এত গতিতে যায় যে আশে পাশের ঘুমন্ত মানুষগুলো তখন জেগে উঠে। কোন সিগন্যাল মানে না উচ্চ শব্দে বিরতিহীন হর্ণ বাজিয়ে বেপরোয়া গতিতে তারা আসা যাওয়া করে। খিলক্ষেত এলাকার চা দোকানি সিয়াব হোসেন বলেন, বিমানবন্দর ও ৩০০ফিট এলাকায় প্রতিদিনই মহড়া হয়।
এই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এক আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। আমার দোকানে এসে অনেক চালক চা খায়। তারা অনেক সময় বলে যারা এসব বেপরোয়া রেসিং করে তাদের জন্য সড়কের অন্য যানবাহনকে আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য বলেন, আমরা কি করব। ধনী ঘরের ছেলেরা। যে ভয়ঙ্করভাবে ছুটে চলে পুরো সড়ক কেঁপে উঠে। এদের আটকানোর কোন উপায় নাই। যারা এসব করে তাদের অনেকে নেশার সঙ্গেও জড়িত। রাতে তাদের আটকাতে গেলে উল্টো মেরে চলে যাবে। গভীর রাতে আটকানোর মত কেউ থাকবে না। তাই তাদের অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। তা না হলে বিপদগামী এসব ছেলেদের থামানো যাবে না। রেসিংয়ের সঙ্গে জড়িতরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সড়কগুলো রেসিংয়ের জন্য উপযোগী নয়। পাশপাশি এ দেশে রেসিং কার ও বাইক নেই বললেই চলে। দামে বেশী হওয়াতে ব্যবসায়ীরা সেটা আমদানি করেন না। তাই আমাদের দেশে সাধারণ কারকে রেসিং কারে পরিণত করা হয়। এক্ষেত্রে ইঞ্জিনের ও বডির কিছু যন্ত্রাংশ সংযোজন, বিয়োজন করা হয়। গাড়ির বডি নিচে নামানো হয় ও শব্দ বাড়ানো হয়।
ভয়ঙ্কর বাইক স্ট্যান্ট: শুধু বাইক-কার রেসিং নয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাইক স্ট্যান্ট। যারা বাইক স্ট্যান্ট করেন তাদের মতে এটা বিশেষ ধরনের খেলা। বাইক রেসিং যারা করেন তারা বাইক স্ট্যান্টও করেন। এর মাধ্যমে বাইক দিয়ে বিভিন্ন কসরত দেখানো হয়। যারা স্ট্যান্ট করেন তারা অনেক সাহসী। তাদের স্ট্যান্ট বয় বলা হয়। দ্রত গতিতে বাইক চালিয়ে এসে সামনের চাকা ওপরে উঠিয়ে, অথবা পেছনের চাকা ওপরে উঠানো হয়। আবার চলন্ত বাইকের ওপরে দুই পা উঠিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে দর্শকদের আনন্দ দেন স্ট্যান্ট বয়রা। তিন বছর ধরে বাইক স্ট্যান্ট করেন উত্তরার আবিদ হাসান। তিনি বলেন, এটা সাধারণ মানুষের কাছে বিপদজ্জনক মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কারণ এটা অনেক ভয়ঙ্কর এক খেলা। সবার পক্ষে এটা খেলা সম্ভব না। যাদের সাহস আছে তারাই এটা করে। কারন এই খেলা মৃত্যু হাতে নিয়েই করতে হয়।
তিনি বলেন, বাইক স্ট্যান্ট করার জন্য স্ট্যান্ট বয়রা তাদের বাইককে আগে থেকে তৈরি করে নেয়। এর সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদেরকেও তৈরি করে নেয়। স্ট্যান্ট করার সময় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়। আর স্ট্যান্ট করা হয় ঢাকার প্রশস্ত সড়কগুলোতে। একাধিক স্ট্যান্ট বয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের উঠতি বয়সী ছেলেরা মুলত ইউটিউবে বিভিন্ন দেশের যুবকদের স্ট্যান্ট করার ভিডিও দেখে উৎসাহী হয়েছে। এসব ভিডিওতে নানা ভঙ্গিতে বাইক নিয়ে কসরত দেখানো হয়। আর এসব দেখে দেখে অন্যরা সেটা আয়ত্ব করে নেয়। বিশেষ করে ঢাকার কিশোর, যুবক ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। ঢাকার অলিগলিতে এখন স্ট্যান্ট বয়দের গ্রুপ তৈরি হয়েছে।
যারা শহরের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে খেলা দেখায়। একজন খেলা দেখায় আর তার সহপাঠিরা এসব দৃশ্য ভিডিও করে তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে আপলোড করে। ঢাকা মেট্রো পলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা যতক্ষণ মাঠে থাকেন ততক্ষণ এসব বাইক বা কারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হয়। তবে তারা গভীর রাতটাকেই বেছে নেয়। যে সময় ট্রাফিকের সদস্যরা সড়কে থাকে না বা যানবাহন চলাচল কম থাকে। তিনি বলেন, হাইড্রলিক হর্ন ইদানিং বেশ সমস্যার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। আমরা সবগুলো বিষয় নিয়ে ভাবছি।

নারীদের একটি দিন, ওয়াও!

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মীম আক্তারের বাবা নেই। মা থাকেন দুবাইয়ে। মোহাম্মদপুরের একটি সেফ হোমে থেকে পড়াশোনা করছে সে। হোমের অন্য মেয়েদের সঙ্গে বাংলা একাডেমিতে এসেছে। ঘুরতে ঘুরতে হুট করে দাঁড়িয়ে এক জায়গায় গেল। আরও নারীদের সঙ্গে মিলে শুরু করল আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করা।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গতকাল শনিবার শেষ হয়েছে দুই দিনের ওয়াও উৎসব। ছোট-বড় মিলিয়ে গোটা পঞ্চাশেক স্টলে ছিল নানা আয়োজন। এমনি একটি স্টলে নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো হয় গতকাল। আর সেখানেই প্রশিক্ষণার্থী বনে গেল মীম। সে জানায়, আত্মরক্ষার কৌশলগুলো শেখার পরে রাস্তায় একা চলার ভয় অনেকটা কেটে গেছে। সব মেয়েরই কৌশল জানা উচিত।
বাংলা একাডেমিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ওয়াও ফাউন্ডেশনের অংশীদারত্বে প্রথমবারের মতো ‘উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড-ওয়াও’ উৎসবের আয়োজন করেছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। নারীর সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ খুঁজে বের করতে এবং সমস্যাগুলো নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরিতে ও সমাধান পেতে ২০১০ সালে ওয়াও উৎসব শুরু হয়। উৎসবটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ২০১৮ সালে ওয়াও ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়।
গতকাল শেষ দিন মেলায় ঘুরে দেখা যায়, কোনো স্টলে বসে নারীরা নিজের জীবনের সংগ্রামের গল্প বলছেন, কোনো স্টলে মিলছে মাদ্রাসার ছাত্রীদের আঁকা চিত্রকর্ম, নানান মুখরোচক খাবার কিংবা গয়না।
একাডেমি প্রাঙ্গণজুড়ে বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড়। তবে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দৃষ্টি কাড়ে। তাঁরা বিভিন্ন স্টলে ঘুরছেন, জিনিসপত্র কিনছেন, বিভিন্ন খাবার চেখে দেখছেন, সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন। চাকরিজীবী বর্ষা রহমান বলেন, ‘এখানে উৎসবের মধ্য দিয়ে বর্তমানে সমাজে নারীদের অবস্থা, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রতিবন্ধকতা এবং এর উত্তরণের উপায় তুলে আনা হয়েছে। বিষয়টি দারুণ।’ ছেলে, ছেলের বউ আর নাতিকে নিয়ে উত্তরা থেকে উৎসবে এসেছেন শর্মিলী হাসান। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক নাতিকে বাসা থেকে আনা খাবার খাওয়াচ্ছেন। বাকিরা স্টল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। শর্মিলী বলেন, নারীরা এখন আগের তুলনায় সাহসী, দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু সমাজে সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে।
ঘুরতে ঘুরতেই একাডেমির বর্ধমান হাউসের কাছে চোখ আটকে যায়। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জয়দেব রোয়াজা সেখানে কলার মোচা, কচু, বেগুনসহ নানান পদ রান্না করছেন। উৎসবে আগত দর্শনার্থীরা বিনা মূল্যে সেসব খাবার চেখে দেখছেন।
জয়দেব বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বাসায় শুধু মাকে রান্না করতে দেখেছি। ফলে আমার ধারণা ছিল, রান্নাটা মেয়েদের কাজ। বড় হয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাসায় রান্নার কাজটি আমিই করি। রান্না নারীদের কাজ নয়, যে কেউ করতে পারে—এই বার্তা দেওয়ার জন্যই রান্নার আয়োজন।’
উৎসবের ২০টি বিষয়ের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা, গল্প বলাসহ নারী দলের বিভিন্ন পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে ‘ভালো মেয়ের সংজ্ঞা’ শিরোনামে প্যানেল আলোচনা হয়। সেখানে উঠে আসে বিভিন্ন প্রশ্ন—সমাজে ভালো মেয়ে কে? নারী কি নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্যায়ন করতে পারবে না? ভালো মেয়ের সংজ্ঞা কী যুগ যুগ ধরে একইভাবে চলতে থাকবে? সংজ্ঞা কি শ্রেণিভেদে বদলে যায়?
আলোচক ও নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত বলেন, ‘স্কলারশিপ পেয়ে জার্মানিতে পিএইচডি করতে না গিয়ে যখন নৃত্যকলা নিয়ে স্নাতকোত্তর করতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, তখন পরিবার থেকে শুরু করে কেউ সেই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেনি। ছোটবেলা থেকে পাওয়া ভালো মেয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে যায়। নারীকে নিজেকে ভালো মেয়ে বা নারী হওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নিজের জন্য কাজ করতে হবে।’
ওয়াও ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জুড কেলি বলেন, একজন নারী কী রকম আচরণ করবে, সেটা সমাজ থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এ কারণে নারী যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে হীনম্মন্যতায় ভোগে, অপরাধবোধে ভোগে। পুরুষদের এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। এ জন্য নারীকে কখনো একা এবং কখনো সম্মিলিতভাবে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বাকি দুই আলোচক ছিলেন নেপালের সংগীতশিল্পী সারিনা রাই, বাংলাদেশের সাংবাদিক সুপ্রভা তাসকিন। দুই দিনের উৎসবে বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, নেপাল ও ভারতের অনেক প্রতিনিধি অংশ নেন। এর পাশাপাশি দেশীয় ১০টি বেসরকারি সংস্থাও অংশ নিয়েছে। মেলায় তাদের স্টলও ছিল। জানা গেছে, নারীদের এই প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করতে দেশের কয়েকটি বিভাগীয় শহরে পর্যায়ক্রমে ওয়াও চ্যাপটার নামে একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

হাসপাতাল নেই সুন্দরবন এলাকায় by সুমেল সারাফাত

সুন্দরবন ঘিরে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ লক্ষাধিক বনজীবীর জীবিকা। তাঁদের চিকিৎসাসেবায় সুন্দরবন এলাকায় নেই কোনো হাসপাতাল। ২০১০ সালে বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দুটি ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব পাঠালেও আজ পর্যন্ত তার কোনো অগ্রগতি নেই।
মৎস্যজীবী সমিতির নেতা ও জেলে এবং মহাজনেরা ফেব্রুয়ারি মাসে সুন্দরবনের দুবলার চরে জেলেদের এক সমাবেশে দুবলার চর–সংলগ্ন এলাকায় দুটি ভাসমান হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারও ওই হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত হাসপাতাল নির্মাণের কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের আওতাধীন চারটি রেঞ্জে ও সাগর উপকূলে সাধারণত মৌসুমভিত্তিক বনজীবীদের আগমন ঘটে। এর মধ্যে ইলিশ, শুঁটকি, গোলপাতা, মধু ও মোম আহরণ মৌসুম উল্লেখযোগ্য। সুন্দরবন ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছরের অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুঁটকি মৌসুম, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ইলিশ, মধু ও মোমের মৌসুম এবং বছরের অন্য সময় গোলপাতা আহরণ মৌসুম। তাই প্রায় বছরজুড়েই জীবিকার টানে ছুটে আসেন জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ নানা পেশার লোকজন। সুন্দরবনে এসে বিশুদ্ধ পানি, প্রাণীর আক্রমণ ও অন্যান্য কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। মোংলা থেকে নদীপথে দুবলা জেলেপল্লির দূরত্ব প্রায় ৯০ নটিক্যাল মাইল। প্রত্যন্ত এসব স্থান থেকে আহত বা অসুস্থ বনজীবীদের ট্রলারে করে হাসপাতালে নিতে প্রায় ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। এ কারণে অনেকে পথেই মারা যান।
বন বিভাগ সূত্র আরও জানায়, এসব অবহেলিত মানুষের কথা চিন্তা করে ১৯৯৩ সালে আন্তমন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত এক বৈঠকে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় তিনটি মিনি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়। তবে তা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরেও এ নিয়ে বন বিভাগ বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন বিভাগ সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে দুটি ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠায়। ৯ বছর পার হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতির খবর জানাতে পারেনি বন বিভাগ।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি এ প্রতিবেদক সুন্দরবনের দুবলার চরে গিয়ে প্রায় ৩০ জন জেলের সঙ্গে কথা বলেন। জেলেরা জানান, মেহের আলীর চর, আলোর কোল, অফিস কিল্লা, মাঝের কিল্লা, শেলার চর, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া, বড় আমবাড়িয়া, মানিকখালী, কবরখালী, ছাপড়াখালীর চর, কোকিলমণি ও হলদেখালী চরে কোনো চিকিৎসক নেই। শুধু পাঁচ-ছয়টি ফার্মেসি আছে। সেখানে জ্বর বা ডায়রিয়ার ওষুধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। ফলে কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় থাকে না।
শরণখোলা মৎস্যজীবী ও মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, ‘সারা বছর বিভিন্ন মৌসুমে লক্ষাধিক বনজীবী সুন্দরবনে আসেন। কিন্তুÍতাঁদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। বহু আগে শুনেছিলাম হাসপাতাল হবে। কিন্তু তা যে কবে হবে, কেউ তা বলতে পারে না।’
দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবন থেকে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এই অবহেলিত বনজীবীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাঁদের স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দেওয়া সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে এলেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
শুধু বনজীবীরা নন, চিকিৎসাসেবা পেতে দুর্ভোগে পড়তে হয় বনরক্ষীদেরও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বন কর্মকর্তা বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য বনরক্ষীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। নৌকা বা ট্রলার
ছাড়া যাতায়াতের অন্য কোনো পথ না থাকায় তাঁদের নিদারুণ দুর্ভোগে পড়তে হয়। সুন্দরবনে ভাসমান হাসপাতাল হলে আমরাও খুব উপকৃত হতাম।’
এ ব্যাপারে সুন্দরবনের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু বনজীবী নয়, সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় যেসব বনরক্ষী কাজ করেন, তাঁদের চিকিৎসাসেবায়ও হাসপাতালের খুব প্রয়োজন। মাননীয় উপমন্ত্রী মহোদয়কে আমরা বিষয়টি জানিয়েছি। এ ছাড়া বেসরকারি ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা চলছে। আশা করছি, সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের জন্য মৌসুমভিত্তিক দুটি ভাসমান হাসপাতালের ব্যবস্থা তাঁরা করবেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বন বিভাগ দেবে।