Friday, February 7, 2025

হাসিনার বক্তৃতা নিয়ে ক্ষোভ: গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৩২ নম্বরের বাড়ি

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটির অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গত বুধবার রাত ৮টা থেকে গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র), ক্রেন ও বুলডোজার দিয়ে বাড়িটির অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর ভাঙার কাজ বন্ধ থাকলেও দিনভর ওই বাড়ি ঘিরে ছিল বিক্ষুব্ধ ও উৎসুক জনতার ভিড়।

ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তৃতা প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গত বুধবার রাতে ধানমন্ডির ওই বাড়ি ঘিরে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে বাড়িটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বুধবার রাতেই ক্রেন, এক্সকাভেটর এনে বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়। রাতে যুক্ত হয় একটি বুলডোজার।

বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিক্ষোভ-ভাঙচুরের পর রাত পৌনে ১১টার দিকে একটি ক্রেন আনা হয়। এরপর সেখানে আনা হয় একটি এক্সকাভেটর। মাঝরাত থেকে শুরু হয় বাড়ি ভাঙার কাজ। পরে রাত পৌনে দুইটার দিকে বাড়ি ভাঙার কাজে একটি বুলডোজারও যুক্ত হয়। রাত সাড়ে তিনটার দিকে আরেকটি এক্সকাভেটর আনা হলে আগের এক্সকাভেটর ও বুলডোজার সরিয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত নীল রঙের ওই এক্সকাভেটর দিয়েই ভাঙার কাজ করা হয়।

গতকাল সকাল আটটার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এক্সকাভেটর দিয়ে ভাঙা হচ্ছে বাড়ির পূর্ব অংশ। সকালে সেখানে হাজারখানেক বিক্ষুব্ধ ও উৎসুক জনতার ভিড় ছিল। তাঁদের কেউ কেউ জটলা পাকিয়ে শেখ হাসিনা ও স্বৈরাচারবিরোধী নানা স্লোগান দেন। কাউকে কাউকে নিজেদের মুঠোফোনে ভাঙা বাড়ির ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করতে দেখা গেছে।

গতকাল ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভাঙার কাজ যখন চলছিল, তখন ওই বাড়ির পেছনে (উত্তর পাশে) থাকা ছয়তলা একটি ভবনেও ভাঙচুর চালান বিক্ষুব্ধ মানুষ। ওই সময় ভবন থেকে যে যাঁর মতো বইপত্রের পাশাপাশি স্টিল, রড, লোহা ও কাঠের জিনিসপত্র নিয়ে যেতে থাকেন। কেউ কেউ শেখ মুজিব ও তাঁর

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রকাশিত বইপত্র আগুনে পুড়িয়ে দেন। সকাল ১০টার দিকে স্টিল ও লোহার কাঠামো ভবন থেকে ভেঙে ভেঙে কয়েকজনকে নিচে ফেলতে দেখা যায়। নিচে থাকা কয়েকজন এগুলো রিকশায় করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। তাঁদের অনেকেই নিম্ন আয়ের মানুষ।

আল আমিন নামের এক ব্যক্তি লোহার কিছু কাঠামো নিচ্ছিলেন। এসব নিয়ে কী করবেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘বিক্রি করে দিমু। সেই টাকায় ভালোমন্দ খামু। মুরগি পাইলে মুরগি, গরুর মাংস পাইলে গরুর মাংস কিনে খামু। এ ছাড়া আর কিছুই না।’

সকাল ১০টার দিকে এক্সকাভেটর দিয়ে বাড়ির সামনের একটি নারকেলগাছ উপড়ে ফেলা হয়। তখন সেখানে উপস্থিত লোকজনের অনেকেই গাছ থেকে ডাব ছিঁড়তে হুড়োহুড়ি করেন। এক্সকাভেটর দিয়ে বাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধ থাকলেও দুপুরের দিকে রিকশায় করে সেখানে মাইক নেওয়া হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা ওই মাইকে স্বৈরাচারবিরোধী নানা স্লোগান দেন। স্লোগানের ফাঁকে ফাঁকে কেউ কেউ বক্তব্যও দেন।

দুজনকে গণপিটুনি ও গরু জবাই

শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে আওয়ামী লীগ কর্মী সন্দেহে নারীসহ দুজনকে পিটুনি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ জনতা। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় ও আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলায় তাঁদের পিটুনি দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে এক ব্যক্তি ৩২ নম্বরের ওই বাড়ির সামনে গিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিলেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা ওই ব্যক্তিকে পেটাতে থাকলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে আহত অবস্থায় রিকশায় তুলে দেওয়া হয়।

এর কিছুক্ষণ পরে সালোয়ার-কামিজ পরা মধ্যবয়সী এক নারী ভাঙা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে নানা কথা বলতে থাকেন। ওই নারী বাড়িটিকে ‘আপার বাড়ি’ বলছিলেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে ওই নারীর বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে ক্ষুব্ধ জনতা ওই নারীকে পিটুনি দেন ও লাঞ্ছিত করেন।

বিকেল সোয়া চারটার দিকে ওই বাড়ির সামনে একটি গরু জবাই করা হয়। ‘জুলাই ঐক্যজোট’ নামের একটি সংগঠন গরুটি জবাই করে। সংগঠনটির মুখপাত্র সাঈদ আহমেদ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ফ্যাসিবাদের আইকনিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর উৎসব উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে মুজিবের বাড়ির সামনে গরু জবাই করা হয়েছে।

সুধা সদনের চিত্র

ধানমন্ডি-৫ এ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদনে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। ‘নিরাপত্তা না থাকায়’ সেই আগুন নেভাতে যায়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল সকালে ভবনটি থেকে যে যেভাবে পারে, জিনিসপত্র নিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যকেও সেখানে দেখা যায়নি।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে ভবনের দোতলায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। নিচতলার কক্ষের সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তোশক, লেপ এসব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কাচের টুকরা পড়ে আছে অনেক স্থানে। বিভিন্ন তলার জানালার কাচ পড়ে যাচ্ছে। বাড়িটির বিভিন্ন স্থানে বই পড়ে আছে। অনেক বই পুড়ে গেছে। বাড়িটির সামনে ফ্রিজ, খাট, সোফাসহ নানা সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নিচতলা থেকে চারতলার বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে আগুন ও ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা গেছে। কোথাও কোথাও টাইলস খুলে ফেলা হয়েছে। পোড়া গন্ধ চারদিকে।

ওই এলাকায় দায়িত্বরত ধানমন্ডি সোসাইটির নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, রাত সাড়ে ১০টার পর ১০-১২ জন এসে সুধা সদনে আগুন দেন। আগুন ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লোকেরা এসে এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে আশপাশের ভবনের বাসিন্দারা এসে পানি দিয়ে নিচতলার আগুন কিছুটা কমিয়েছেন।

রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার রাতে বাড়িটির সামনে জড়ো হন বিক্ষুব্ধ জনতা। তাঁরা ভাঙচুর শুরু করেন এবং আগুন দেন। গতকালও বাড়িটিতে ভাঙচুর চলে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায়
রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার রাতে বাড়িটির সামনে জড়ো হন বিক্ষুব্ধ জনতা। তাঁরা ভাঙচুর শুরু করেন এবং আগুন দেন। গতকালও বাড়িটিতে ভাঙচুর চলে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায়। ছবি: সাজিদ হোসেন

ট্রাম্পের গাজা ‘খালি’ করার পরিকল্পনায় লাভবান কে by সাইমন টিসডাল

মূর্খতাকে অনেক সময় সহজেই প্রতিভা বলে ভুল হয়। কখনো কখনো সহানুভূতির ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে অনুভূতিশূন্য নির্বুদ্ধিতা। ডোনাল্ড ট্রাম্প হাজির হয়েছেন গাজাকে পুরোপুরি খালি করে ফেলে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষকে জোর করে একটি কল্পিত ‘ভালো, সুন্দর, উর্বর ভূমিতে’ পুনর্বাসনের ধারণা নিয়ে। তাঁর এই পরিকল্পনা শুধু বোকা লোকেরাই বিশ্বাস করবে। এটি কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নয়। এ হচ্ছে ট্রাম্পের সীমাহীন আত্মম্ভরিতার প্রকাশ।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের অসংলগ্ন কথাবার্তাকে যুগান্তকারী চিন্তাভাবনা বলে প্রশংসা করেছেন। তা আদতে কোনো পরিকল্পনাই নয়। এ বরং মদের আসরে বড় গলায় বলা প্রলাপের মতো। অথচ কথাগুলো ভয়ানকভাবে বিপজ্জনক। ট্রাম্পের কথিত সহানুভূতির আড়ালে মৌলবাদী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। তাঁর কথার আসল মানে হলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া।

এ কারণেই কট্টরপন্থী ইহুদি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা উল্লাস করছে। এ কারণেই জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আজ কঠোর ভাষায় ‘জাতিগত নির্মূলের’ বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এ কারণেই ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, যদি এমন কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে ঘি ঢালার শামিল হবে।

ট্রাম্পের মূল কথাটি ধরুন। তাঁর দাবি, গাজা এক ধ্বংসস্তূপ, যেখানে মানুষের বসবাস অসম্ভব। তাঁর ভাষায়, ‘গাজা মানুষের থাকার যোগ্য জায়গা নয়। যারা সেখানে ফিরে যেতে চায়, তারা আসলে বিকল্পের অভাবে বাধ্য হয়ে তা চায়।’ কিন্তু গাজাকে এমন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করল কে? গত ১৫ মাসের অবিরাম হত্যাযজ্ঞে যেখানে অন্তত ৪৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। সেই ধ্বংসের জন্য দায়ী কে? দায়ী ট্রাম্পের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই নেতানিয়াহুই হাজার হাজার শিশু হত্যার মূল হোতা।

গাজাকে ‘পরিষ্কার’ করার এই পরিকল্পনায় কে লাভবান হবে? নিশ্চিতভাবেই আরব প্রতিবেশী দেশ মিসর ও জর্ডান নয়। যদি ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে বিতাড়িত করা হয়, তাহলে তাদের দেশে প্রায় ২০ লাখ শরণার্থী ঢুকে পড়বে। সৌদি আরবও ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় কোনো আগ্রহ দেখায়নি। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সৌদি আরব তাঁর সঙ্গে আছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদিরা পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে না।

ট্রাম্পের এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজল্যুশন দ্বারা স্বীকৃত ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে। এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের দ্বিরাষ্ট্র নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

ট্রাম্পের এই ফন্দি উভয় পক্ষের উগ্রপন্থীদের আরও উসকে দেবে। ট্রাম্প কি সত্যিই মনে করেন যে গাজার বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হামাস বিনা প্রতিরোধে ছেড়ে দেবে? গাজার জনগণকে স্থায়ীভাবে বিতাড়নের যেকোনো চেষ্টা ইসরায়েলের শত্রুদের জন্য নতুন সংগ্রামের ইস্যু হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে এটি কট্টর ইহুদি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকেও আরও সাহসী করে তুলবে। এরা গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।

ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে গাজায় দীর্ঘ মেয়াদে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন করতে হবে। আরব দেশগুলো, ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য সবাই এককাট্টা হয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এরা কেউই গাজা দখলে সহায়তা করবে না। কিন্তু যদি মার্কিন সেনারা সেখানে প্রবেশ করেন, তাহলে তাঁরা অবধারিতভাবে ইসলামি জঙ্গিদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। গাজা তখন ট্রাম্পের জন্য আরেকটি ইরাক হয়ে উঠবে।

এই বিপর্যয় ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ জোটের’ জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাক ও ইয়েমেনের বিভিন্ন মিলিশিয়া হামাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও পশ্চিমাবিরোধী লড়াই শুরু করতে পারে। এমনকি সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন মরুভূমিতে নতুন করে সংগঠিত হওয়া ইসলামিক স্টেটও নিশ্চুপ থাকবে না। এই বিশৃঙ্খলা রাশিয়ার জন্যও উপকারী হবে। কারণ, তা পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেবে। বিশ্বরাজনীতিতে তৈরি হবে আরও বিশৃঙ্খলা।

নেতানিয়াহু প্রতিনিয়ত হোয়াইট হাউসকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য ইরান হুমকি। সুযোগ পেলে তিনি ইরানে হামলা চালাতে  চাইবেন। ট্রাম্প কোন দিক বেছে নেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপ নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন করতে চায়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র চায় যুদ্ধবিরতি এবং জীবিত সব বন্দীর মুক্তি। কিন্তু এখন, ট্রাম্পের কাছ থেকে নেতানিয়াহু এই চাপ থেকে মুক্তির পথ পেয়ে গেছেন। তিনি যদি যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দেন, তাহলে তাঁর বিরোধীদের পক্ষে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো আরও কঠিন হবে। আর নেতানিয়াহু সম্ভবত তা–ই করতে যাচ্ছেন।

হামাসও এখন যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে এগোতে না চাওয়ার নতুন কারণ খুঁজে পেয়েছে। প্রতিটি বন্দী বিনিময়ের পর তারা বারবার নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বার্তা দিচ্ছে। লেবাননেও যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। একটি বোমা বিস্ফোরণ, একটি গুপ্তহত্যা বা একটি বিমান হামলাই নতুন যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।

ট্রাম্পের এই বাস্তবতাবিবর্জিত, অন্যায় ও অবৈধ গাজা পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। বরাবরের মতো তাঁর এই আত্মম্ভরিতাপূর্ণ উন্মাদনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।

ধূর্ত রাজনীতিবিদেরা ফন্দিফিকির, তথ্যবিকৃতি ও বাস্তবতা অবজ্ঞা করে ন্যায্য সমাধান এড়িয়ে চলতে চায়। ট্রাম্প হচ্ছেন তার এক ক্ল্যাসিক উদাহরণ। অথচ এই সংকটের একমাত্র প্রকৃত সমাধান খুবই স্পষ্ট—ফিলিস্তিনের ভূমিতে একটি সার্বভৌম, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যা ইসরায়েলের পাশে শান্তিপূর্ণভাবে টিকে থাকবে।

কিন্তু এই ধূর্ত রাজনীতিবিদেরা সেটি কখনোই করতে চায় না।

*সাইমন টিসডাল অবজারভার-এর আন্তর্জাতিক বিষয়ের ধারাভাষ্যকার

*গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ জাভেদ হুসেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

গুড্ডুবুড়াদের বাড়িতে আর চোর আসে না by আনিসুল হক

অলংকরণ: নাইমুর রহমান
গুড্ডুবুড়াকে কি তোমরা চেন?
ও একটা ছোট্ট ছেলে। ও কিছুতেই খেতে চায় না। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করলে কী হয়? বুদ্ধি কমে যায়, গায়ের জোর কমে যায়।
ওর বোকামির কাণ্ড শুনলে তোমরা হাসতে হাসতে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
এমনিতে কিছু খায় না। একদিন দেখা গেল, ও বসে বসে টি-ব্যাগ চিবোচ্ছে। পানে চা-পাতার ব্যাগ।
ওর মা বলল, ওই তুই কী খাস? তোর মুখে কী?
আমি? চা খাই।
দেখি দেখি মুখ খোল।
মা ওর মুখ খোলালেন। দেখা গেল, মুখের মধ্যে টি-ব্যাগ ঢুকিয়ে সে বেশ করে চিবোচ্ছে?
তুই এটা খাচ্ছিস কেন?
আমি চা খাচ্ছি।
চা খাচ্ছিস কেন?
আমি বড় হয়ে গেছি।
বড় হলেই চা খেতে হবে?
হুম।
তা চা যদি খাবি, কাপে করে ভালোভাবে বানানো চা খা। এটা খাচ্ছিস কেন?
সেটা কি আর গুড্ডুবুড়া মাকে বলবে? একদিন তাদের টেবিলে দুই কাপ চা বানিয়ে রাখা হয়েছে, মেহমান এসেছেন বাড়িতে, তাদেরকে দেওয়া হবে।
গুড্ডুবুড়া এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, মা রান্নাঘরে। বাবা মেহমানদের সামনে। এই সুযোগ। সে চায়ের কাপে মুখ দিল। অমনি তার মুখ গেল পুড়ে। বাবা গো মা গো...কিন্তু সেই কথা তো সে মাকে বলতে পারে না।

গুড্ডুবুড়াকে একদিন দেখা গেল, মশামাছি মারার স্প্রে নিয়ে ছুটছে। কেন?
পিঁপড়া উঠেছে চিনির বয়ামে।
সে বয়ামের মধ্যে মশা মারা ওষুধ স্প্রে করতে লাগল।
মা বললেন, গুড্ডুবুড়া কী করিস?
পিঁপড়া মারি মা।
সর্বনাশ। এতো বিষ। এই চিনি খেলে আমরা তো সবাই মারা যাব।

ওদের বাড়িতে মুরগি ডিম দিল। তারপর সেই মুরগি বাচ্চা ফোটাল। ৮টা বাচ্চা।
একদিন খুব গরম পড়েছে। গুড্ডুবুড়া ঘেমে একাকার। বিকাল তিনটার মতো বাজে। স্কুল থেকে ফিরে এসে সে দুপুরের খাবার খেয়ে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিল। মা দিব্যি ঘুমাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ চলে গেছে। ফ্যান বন্ধ।
গুড্ডুবুড়া বিছানা ছাড়ল। উফ। কী গরম। সে গেল বারান্দায়। গিয়ে দেখে, মুরগিটা ঝিমোচ্ছে। মুরগির বাচ্চাগুলো পানি খাওয়ার জন্য বাটিতে ঠোঁট নামিয়েছে।
আহা, গরমে কষ্ট পাচ্ছ। বলে গুড্ডুবুড়া একটা মুরগির বাচ্চা ধরে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রেখে দিল। আরও নেবে বলে আসতেই মা মুরগি ওর হাতে দিল ঠোকর। ও ভয়ে পালিয়ে এল।
মুরগির বাচ্চাটা মারা গেল ফ্রিজে। তাই নিয়ে গুড্ডুবুড়ার কী কান্না। সে তো ভালো করতে চেয়েছিল। খারাপ হয়ে গেল যে।
আরেকদিন তার মা শিং মাছ কিনে এনে জিয়ল রেখেছেন। দুটো মাছ মরে গেছে। তাদেরকে রাখা হয়েছে ফ্রিজে।
গুড্ডুবুড়া ভাবল, সর্বনাশ। মাছ কেন ফ্রিজে রেখেছে। মাছ তো মারা যাবে। সে মাছ নিয়ে গিয়ে পানিভরা পাতিলে ভাসিয়ে দিল।
মাছ পচে পুরো বাড়িতে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
তখন সে আবার হাত ডোবাল শিং মাছের হাঁড়িতে। শিং মাছের কাঁটায় ভীষণ বিষ।
গুড্ডুবুড়ার হাতে শিং মাছের কাঁটা ফুটেছে। ব্যথায় সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
আর তো পারা যায় না। গুড্ডুবুড়াকে ওর বাবা-মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন।
বললেন, ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলের সমস্যাটা কী?
ডাক্তার সাহেব সব দেখেশুনে বললেন, গুড্ডুবুড়ার সব ঠিক আছে। শুধু বুদ্ধিটা খুলছে না। বুদ্ধি খুলছে না, কারণ সে কিছু খায় না। ওকে ভাত খেতে হবে, রুটি খেতে হবে, মাছ খেতে হবে, মাংস খেতে হবে, দুধ খেতে হবে, ডিম খেতে হবে, শাক খেতে হবে, সবজি খেতে হবে, ফল খেতে হবে, মূল খেতে হবে।
গুড্ডুবুড়া ঠিকঠাক খাওয়া শুরু করল।
তখন ওর মাথায় বুদ্ধি এসে গেল। এখন গুড্ডুবুড়ার জোরও বেশি, সারাক্ষণ খেলাধুলা করে। পড়াশোনা করতেও ওর ভালো লাগে।
এখন ও ক্লাসে ফার্স্ট হয়।

ওদের বাড়িতে কোনো পাহারাদার নেই। ওরা একটা চারতলা বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকে।
গরমের দিন। জানালা না খুলে ঘুমোনো যায় না।
কিন্তু জানালা খুলে ঘুমালে প্রায়ই ওদের বাড়িতে চোর আসে। জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়। হাতের কাছে যা পায় নিয়ে যায়। একবার তো ওর দাদিমার কানে হাত দিয়ে কানের দুল পর্যন্ত খুলে নিয়ে গিয়েছিল।
কী করা যায়।
চোরটাকে তো ধরতে হবে।
গুড্ডুবুড়া একটা ইঁদুর ধরা কল জানালার কাছে টেবিলের ওপরে রেখে দিল। বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে এখানে যা থাকে, চোরটা প্রায়ই তাতে হাত দেয়। একবার তো মায়ের ইমিটেশনের গয়নার বাটিটা নিয়ে প্রত্যেকটা গয়না চোরটা কামড়ে কামড়ে দেখে পরখ করেছিল। তারপর সব রেখে গিয়েছিল।
রাতের বেলা ফল ফলল মারাত্মক। জানালায় চোর এসে যেই-না হাত দিয়েছে, অমনি ইঁদুরের কল তার হাত ধরল কামড়ে। চোরটা ওরে বাবা, ওরে মা বলে চিৎকার করছে। কিন্তু পালাতে পারছে না। হাত আর জানালার শিক গলে বেরোতে পারছে না। চোরটা হাত টানতেই আরও ব্যথা লাগছে।
ততক্ষণে বাড়ির সবাই জেগে উঠেছে। চিৎকার চেঁচামেচিতে রাস্তার পাহারাদারেরা ছুটে এল। ৯৯৯-এ কল করল গুড্ডুবুড়া।
অমনি পুলিশও ছুটে এল তাদের বাড়িতে।
চোরটাকে জানালাতেই পাওয়া গেল।
পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল।
এরপর থেকে গুড্ডুবুড়াদের বাড়িতে আর চোর আসে না।

যে মিছিল ইসরায়েলের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে এনেছে by হিচাম সাফিইদ্দিন

দুই সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ লেবাননের মানুষ হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কোনো পক্ষই ইসরায়েলকে দখল করা অঞ্চল থেকে সরাতে পারেনি। এরপর লেবাননের সাধারণ মানুষই এ উদ্যোগ নেন।

২৬ জানুয়ারি রোববার প্রথম ইসরায়েলি বাহিনী নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলি চালায়। এতে অন্তত ২২ জন নিহত হন এবং ১২০ জনের বেশি আহত হন। কিন্তু জনগণের অটল সংকল্প ও আত্মত্যাগে ইসরায়েলি বাহিনী অধিকাংশ সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এই প্রতিরোধ করতে গিয়ে লেবাননের মানুষকে কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। তবে এটি আবারও প্রমাণ করেছে—ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

নভেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালায়নি এবং তাদের কোনো সামরিক উপস্থিতিও দেখা যায়নি। কিন্তু এর বিপরীতে ইসরায়েল লেবাননের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি শত শতবার লঙ্ঘন করেছে। তারা লেবাননের আকাশে ড্রোন উড়িয়েছে, সাধারণ মানুষকে অপহরণ ও হত্যা করেছে এবং বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করেছে। এখনো তারা এসব অন্যায় কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করছে না।

ইসরায়েলের এই উসকানিমূলক আচরণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। লেবাননে মোতায়েন জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন বাহিনী (ইউনিফিল), যারা ইসরায়েলের হামলা থেকে লেবাননকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা বরং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ইউনিফিল এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতির সময় দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর এক শরও বেশি গোপন অস্ত্র কেন্দ্র পাওয়া গেছে।

এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে সাহায্য করা দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স ইসরায়েলকে তার জবাবদিহি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফ্রান্স অন্তত লেবাননের সার্বভৌমত্বের কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র তা–ও বলছে না। তারা উল্টো লেবাননের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তারা ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি দখলদারির ভয় দেখিয়ে লেবাননে দ্রুত নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য চাপ দিয়েছে, যাতে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।

এই চাপের ফলে দ্রুত একজন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এখনো থমকে আছে, কারণ বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দল মন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। নতুন সরকার সশস্ত্র প্রতিরোধের বিষয়ে কী অবস্থান নেবে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ১৭০১ কার্যকর হবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত লেবানন ফোর্সেস দলের নেতারা দ্রুত জাতিসংঘের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের পক্ষপাতদুষ্ট মার্কিন ব্যাখ্যা মেনে নেয়। তারা চেয়েছিল শুধু লিতানি নদীর দক্ষিণেই নয়, বরং লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা হোক।

এদিকে হিজবুল্লাহ যখন লেবাননের সাবেক সেনাপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনের দাবি মেনে নেয়, তখন অনেকে মনে করতে থাকে, সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমনকি এ গুজবও ছড়িয়ে পড়ে যে ইসরায়েল ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও লেবানন দখল করে রাখতে চায়।

কিন্তু সপ্তাহান্তে পরিস্থিতি বদলে যায়। সাধারণ মানুষ হঠাৎ করে সংগঠিত হয়ে দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের ঘরে ফিরে যেতে শুরু করে। এটি ইসরায়েলের পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়।

লেবাননের সেনাবাহিনী (যাদের ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্ষাকর্তা হিসেবে মনে করা হতো) এবার সাধারণ মানুষের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। নিরস্ত্র নারী-পুরুষদের ইসরায়েলি ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য অনেককে ২০০০ সালের মুক্তির সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

এখন এই ঘটনাকে লেবাননের ‘তৃতীয় মুক্তি’ বলা হচ্ছে (২০০০ ও ২০০৬ সালের পর)। তবে এই ফিরে আসা স্থায়ী হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

মানুষ ফেরার মাত্র দুই দিন পর ইসরায়েল নাবাতিয়েহ শহরে বিমান হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে আহত করেছে। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো কিছু সীমান্তবর্তী গ্রামে অবস্থান করছে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকার অনুমতি দিয়েছে।

এই পরিস্থিতি লেবাননের দক্ষিণ অংশকে সব সময় যুদ্ধের আতঙ্কে রাখছে। ওয়াশিংটন সম্ভবত এই অনিশ্চয়তাকে কূটনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করবে, যাতে তারা লেবাননের নতুন সরকার ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই সহায়তাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে চায়, যাতে লেবাননের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের ধারণাকে আলাদা করা যায়।

এদিকে দেশীয় ব্যবসায়ী চক্রগুলোও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের নামে অতিরিক্ত অর্থ কামিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

সম্প্রতি হিজবুল্লাহর নতুন সেক্রেটারি জেনারেল নায়েম কাসিম তাঁর দলের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, যত দিন দখলদারি থাকবে, তত দিন প্রতিরোধের অধিকার থাকবে। তবে তিনি নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার কথা বলেননি।

এর পরিবর্তে তিনি সব দায় লেবাননের সরকার এবং সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেন। এটি একটি দ্বিধাগ্রস্ত নীতি।

লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে দখলদারি শেষ না করার ব্যর্থতা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরবে। তবে হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রতিরোধহীনতা তার সক্ষমতার প্রতি আস্থা আরও কমিয়ে দেবে।

এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সবাই জনগণের প্রতিরোধের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

হিচাম সাফিইদ্দিন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া লেবাননের লোকেরা তঁাদের বসতিতে মিছিল নিয়ে ফিরছেন
ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া লেবাননের লোকেরা তঁাদের বসতিতে মিছিল নিয়ে ফিরছেন ছবি: রয়টার্স

সাবেক ‘র’ কর্মকর্তার চোখে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান

৫ই আগস্ট, ২০২৪। কার ভুল, কার ক্ষতি। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেছেন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর সাবেক স্পেশাল সেক্রেটারি অমিতাভ মাথুর। তিনি ইন্ডিয়া’স ওয়ার্ল্ড নামের আউটলেটকে দেয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। ইন্ডিয়া’স ওয়ার্ল্ডের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান সুপরিচিত কলামনিস্ট, সাংবাদিক সি রাজা মোহন। ইন্ডিয়া’স ওয়ার্ল্ডের মালিকানা দিল্লিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্যাক্সএনালাইসিস (ওপিসি) প্রাইভেট লিমিটেড। ‘র’ কর্মকর্তা অমিতাভ মাথুরের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে ইন্ডিয়া’স ওয়ার্ল্ডে। এখানে পাঠকের সুবিধার জন্য তা প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলাদেশে যে কথিত নতুন বাস্তবতা, তাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
অমিতাভ মাথুর: আগেও দেখা গেছে এমন এক অনুভূতি। ১৯৭৫ সালে আমরা এমনটা দেখেছি। তখন শেখ মুজিবের সাক্ষ্য বহন করতো এমন সবকিছুকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল। আর এখন ২০২৪ সালে এসে সেটা দেখেছি। এটা শুধু শেখ হাসিনাকে প্রত্যাখ্যানই নয়। আরও একবার শেখ মুজিবকে প্রত্যাখ্যান করা। আপনি দেখেছেন বাংলাদেশে সম্ভবত দু’টি বড় পরিচয় আছে। এর উৎস কেউ খুঁজে পেতে পারেন ১৯৪৭ সালে। যদিও উত্তর দিকে আমাদের বিভক্তির ইতিহাস সুপরিচিত। তবে বৃটিশরা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে পূর্বদিকটাকে ভাগ করেছিল। তার আগে উত্তর থেকে যে ভয়াবহতা ঘটেছিল তা উত্তরের খুব কম মানুষেরই জানা বা পড়া। ১৯০৫ সালে ঢাকায় গঠন করা হয় মুসলিম লীগ। ১৯৪০-এর দশকে এ অঞ্চলে বার বার দাঙ্গার সঙ্গে মিশে যায় দুর্ভিক্ষ। ১৯৪১, ’৪৬, ’৪৭ (দেশভাগ), ’৪৮ এবং ’৫০। মহাত্মা গান্ধী কলকাতা ও নোয়াখালীতে অনশন করেন। এই নোয়াখালী এখন বাংলাদেশে। সাম্প্রদায়িকতাকে আরও বাড়িয়ে তোলা হয়েছিল। কারণ, পূর্ব বাংলায় (বা পূর্ব পাকিস্তানে) শতকরা ৯৫ ভাগ জমিদার ছিলেন হিন্দু। তাদের অধীনে যেসব মানুষ ছিলেন তারা ছিলেন মুসলিম। ফলে দেশভাগ থেকে একটি পরিচয় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।
এরপর আমরা ১৯৭১ সালে বাঙালি পরিচয় পাই। এটা ছিল পাকিস্তানের ভেতরে ভাষা আন্দোলনের ফল। এর মধ্যদিয়ে ইসলামিক পরিচয়কে অস্বীকার করা হয়নি। কিন্তু প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এটাকে তাদের বাঙালি পরিচয় হিসেবে দেখা হয়। বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গর্বভরে জোর দেয়। দীর্ঘ সময় এই দু’টি পরিচয়ের মধ্যে সংঘাত চলছে। আমরা ওইসব ঘটনা এমনকি ১৯৭১ সালে যা ঘটেছিল তা ভুলে যেতে চাই। ওই সময় পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন শতকরা ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ বাংলাদেশি। তাই কয়েক দফা পটপরিবর্তনের পর বিএনপিকে দেখা যেতে পারে সম্ভবত তাদের উত্তরসূরি হিসেবে। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের বাঙালি পরিচয়টা জটিল হয়ে পড়ে (আওয়ামী লীগের সুবিধার বাইরে)। হ্যাঁ, এর মধ্যে আছেন ধর্মনিরপেক্ষ (সেক্যুলার) মুসলিম ও হিন্দুরা। এর মধ্যে আরও আছেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মতো সামরিক মুক্তিযোদ্ধা। ফলে ২০২৪ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর আমরা নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। আমি এটাকে দেখি পরিচয়ের অব্যাহত পরিবর্তন ও সংঘাত হিসেবে। এটা বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে চলছে এবং সম্ভবত তা অব্যাহত থাকবে।

প্রশ্ন: তাৎক্ষণিক সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি, অনুঘটকের মতো, যেটাকে বিগত প্রশাসনের অধীনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা বলা যায়?
উত্তর: আপনি একদম ঠিক। ১৯৭৫ সালে মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটেছিল তার অপশাসনের কারণে। অনেক বিষয় ছিল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু বহু সমস্যা তিনি নিজে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তার স্বৈরাচারী ধারা- তিনি সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ব্যবহার করেছিলেন মিলিশিয়াদের।
তার (মুজিব) ভুল পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি করেন শেখ হাসিনা। তার সময়ে আপনি ঠিকই বলেছেন- ২০১৯ সাল পর্যন্ত সবকিছু ভালোই চলছিল। তারপর কোভিড হলো। যখন আমরা তা থেকে মুক্তি পেলাম, তখন ইউক্রেন ঘটলো। তারপর মধ্যপ্রাচ্য ঘটলো। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সব কিছু ভালো চলছিল মানে হলো তিনি ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভালো চালাতে পেরেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে তা আর ধরে রাখতে সক্ষম হননি।
প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলাদেশে যে অবস্থার উদ্ভব ঘটছে তাতে ভারতের জন্য বাস্তবে নিরাপত্তা উদ্বেগ কি?
উত্তর: মিলিট্যান্টস অথবা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীরা সেখানে (বাংলাদেশে) পা রাখার বিষয়ে আলোচনা করেন সবাই। অবশ্যই এটা একটা বাস্তবতা। যদি ঢাকায় শত্রুভাবাপন্ন সরকার থাকে, তাহলে (ওইসব মিলিট্যান্টদের) জন্য সহায়ক হতে পারে তারা। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে। জিয়ার সময়ে হয়েছে। এরশাদের সময়ে হয়েছে। এমনকি বিএনপি’র দ্বিতীয় প্রশাসনিক মেয়াদের সময়ে হয়েছে। যাহোক সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে সাম্প্রদায়িক সমস্যা, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডাকে কাজে লাগায়। বাংলাদেশের হিন্দুদের সঙ্গে যদি অসদাচরণ করা হয়, তাহলে এখানে (ভারত) উত্তেজনা দেখা দেয়। সাম্প্রদায়িকতা আসলে আরেকটা সাম্প্রদায়িকতাকে রসদ যোগায়। অন্য কথায় আমাদের রাজনৈতিক গতিবিধিতে বিঘ্ন ঘটানোও একটি বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি। উপরন্তু, বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিকভাবে ভালো পারফর্ম করতে না পারে, তাহলে ভারতে অভিবাসীরা ছুটে আসবেন। আমাদের দেশে আর কোনো মানুষকে আমরা নিতে পারি না। আমাদের নিজেদের জন্যই পর্যাপ্ত সম্পদ নেই। এটা একটা নিরাপত্তা উদ্বেগ।
প্রশ্ন: চীন এবং পাকিস্তানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা অথবা ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশের অংশ হিসেবে কীভাবে দেখেন এবং বাংলাদেশে বর্তমানে যে জটিল পরিস্থিতি, তাতে তারা কীভাবে সুবিধা নেয়ার সক্ষমতা রাখে?
উত্তর: ভালো কথা। আমি মনে করি চীন একটি ‘নিট’ সুবিধাবাদী। কারণ, তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু তারা টানটান করে বাঁধা একটি রশির উপর দিয়ে হাঁটছে। এই রশি পরিচালিত হচ্ছে রাডারের অধীনে। নেপাল, বাংলাদেশে তারা ধীরে ধীরে সম্পদ গড়ছে। তা শুধু অর্থনৈতিকই নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পদও বৃদ্ধি করছে।  সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আছে। কারণ তারা অস্ত্রের একটি বড় সরবরাহকারী এবং তারা এমন সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হতে বঙ্গোপসাগরে একটি অবস্থান পাওয়ার চেষ্টা করছে চীন। তাদের এই কর্মকাণ্ডে আমাদের অবশ্যই উদ্বিগ্ন হতে হবে। তারা এক্ষেত্রে কতোটা এগুতে পারবে তা নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপর। পাকিস্তান যতটা সচেতন, গত কয়েক দশকে তারা ভারতের গোয়েন্দা নীতিকে কড়া নজরে রেখেছে। বর্তমানে তারা আর্থিক ও সামরিক দিক থেকে যখন কঠিন সংকটে পড়েছে, তারা যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, তখন আমাদের বিরুদ্ধে কোনো বড় অ্যাডভেঞ্চার চালাতে পারবে না পাকিস্তান। এমনকি কাশ্মীরে অনুপ্রবেশের বিষয়েও তারা সুর নরম করতে পারে। বাংলাদেশের দেয়া সুযোগ ছেড়ে দেবে না পাকিস্তান এবং তারা হবে একটি বিঘ্ন সৃষ্টিকারী শক্তি। আমি আশা করি- ঢাকা এটা বুঝতে পারে যে, কোনো সুনির্দিষ্ট রেড লাইন অতিক্রমকে সহ্য করবে না ভারত। তবে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী লোকের অভাব নেই। এটা বড় একটি সমস্যা, যা আমরা মোকাবিলা করছি।
প্রশ্ন: কথিত বিপ্লবকে ফিরিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আছে বলে ভীষণ আলোচনা আছে। এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন?
উত্তর: আমি তেমনটা মনে করি না। বাংলাদেশে এই পরিবর্তন আনার পেছনে আমেরিকানদের যদি কোনো ভূমিকা থাকতো, তাহলে উপদেষ্টা পরিষদকে চকচকে দেখানোর জন্য তারা অধিক পরিমাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতো। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের সেই চকচকে ভাব দ্রুততার সঙ্গে হারিয়েছে। আমি মনে করি আমেরিকার প্রত্যাশাকে অযথাই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবেই আমেরিকানরা এর সুবিধা নিচ্ছে, অন্য যে কারও মতোই।
প্রশ্ন: কীভাবে?
উত্তর: আমি সবসময় অনুভব করেছি যে, বাংলাদেশে কোনোভাবে পা রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৮ সালে তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অজুহাতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করে। এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদেরকে ভিসামুক্তভাবে বাংলাদেশে আসার সুযোগ দেয়া হয়। এমনকি তাদের সঙ্গে আনা সরঞ্জাম চেক করা হতো না। বাংলাদেশি আইনে তাদেরকে দেয়া হয় দায়মুক্তি। তাদের কথা শোনা হোক এমন কোনো পোস্ট কি তারা খুঁজছিলেন? ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সব সময়ই আছে। এ সময়ে সম্ভবত  একটু বেশিই প্রকাশ্যে এসেছে।
২০১৯ সালে আমি ভেবেছি (বাংলাদেশে) তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাওয়ার বিষয়ে খুবই সক্রিয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তা ঘটেনি। আবারো তারা ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে আরও বেশিভাবে জড়িত হতে চাইলো। কিন্তু এবারো তা ঘটলো না। কিন্তু বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের ফলে দ্রুততার সঙ্গে তারা স্বাগত জানিয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক পরিষদের কাছে তাদের লোক পাঠিয়েছে। এই মন্ত্রিপরিষদের বেশ কয়েকজন এনজিও’র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক আছে। এর মধ্যদিয়ে এমন একটি আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে যে, মার্কিনিরা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তারা গাইড দিচ্ছে। কিন্তু এখনো আমি মনে করি না যে, এ কথা সত্য।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে বর্তমানে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তার প্রেক্ষাপটে ভারতের নীতি কী হওয়া উচিত?
উত্তর: প্রথমত, আমরা জানি না কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কার নিয়ন্ত্রণে আছে। তারা কি শিক্ষার্থী? আমরা কি সব ছাত্রনেতার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেছি? আমি মনে করি তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি ঝুঁকে ছিল। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্যায় থেকে তারা এসেছেন। আমরা কি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবো, যাদের কিছু সদস্য এনজিও থেকে এসেছেন? আমরা কি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলবো? আমরা কি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কথা বলবো? সুতরাং, আমার মনে হয় প্রথম সমস্যা হলো সেটা খুঁজে বের করা।
দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতি দ্রুত উন্মোচিত হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদের প্রতি আস্থা প্রতিদিনই কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেকারত্ব ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে। দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সামনেই পবিত্র রমজান। ফলে পরিস্থিতি খুব উত্তেজনার মধ্যে আছে। এর ফলে ঢাকার সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ পুরোপুরি কঠিন করে তুলছে।
আমি মনে করি গুরুতর ভুল করছে অন্তর্বর্তী সরকার। শুরুতেই প্রতিহিংসাকে নিয়ন্ত্রণে তারা সক্ষম হয়নি। এর ফল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত এমন সবার পেছনে লেগেছে তারা। এর মধ্যে আছে বেক্সিমকো, গাজী গ্রুপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বহু কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অথবা ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিণামে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। প্রতিটি দিনই বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীরা ধর্মঘট করেন। সব ট্রেন ছিল ঠাঁয় দাঁড়ানো। আপনি প্রতিদিনই খবর পড়ছেন তৈরি পোশাক রপ্তানি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাদের কর্মীরা, যারা বেতন পাননি, তারা রাস্তা অবরোধ করছেন। ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অর্ডার পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন না। এতে অর্ডার কমে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের আয়ের প্রাথমিক এই উৎসটির আয় কমেছে ৪০০ কোটি ডলার। এ দেশের জন্য এটি খুব ছোট অঙ্ক নয়। রেমিট্যান্স বাড়ছে। কিন্তু ব্যাংকের বাইরে এবং ভেতরে ডলার বিনিময়ের হারে অনেক বেশি পার্থক্য। এ জন্য মানুষজন হাওলা রুটের মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন দেশে। ফলে সেখানে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন: তাহলে ভারতের জবাব হওয়া উচিত...?
উত্তর: আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং নজর রাখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতরের সমস্যার সমাধান না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য যোগাযোগ অব্যাহত রাখা উচিত আমাদের। যেকোনো সম্ভাব্য ফলাফল থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে যদি এ বছরের শেষের দিকে নির্বাচন হয়, তাহলে আমরা এমন একটি পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি- যেখানে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বিএনপি। এসব পক্ষ থেকে ভারতবিরোধী বক্তব্য আসা সত্ত্বেও কি এই নতুন সরকারের সঙ্গে সর্বান্তকরণে কাজ করা উচিত হবে ভারতের?
উত্তর: নির্লজ্জভাবে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ অথবা পূর্ব নির্ধারিত নির্বাচন করা না হলে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমাদের উচিত হবে তাকে স্বাগত জানানো। আমি মনে করি যেকোনো সরকারকে মোকাবিলা করতে যথেষ্ট শক্তিশালী এখন ভারত। যদিও তারা কিছু ইস্যুতে চোখে চোখ রাখে না। আমার মনে হয় না যে, বিএনপি বিপর্যস্ত হবে। আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারবো। অতীতে তাদের সঙ্গে আমরা কাজ করেছি। তবে তা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কিন্তু আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আমি নিশ্চিত তারাও অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। বাংলাদেশে যদি পরিবর্তন ঘটে, তা একটি ভালো বিষয় হবে- যদি তা একটি নির্বাচিত বডির অধীনে হয়। তাদের প্রতি জনগণের ম্যান্ডেট থাকে, বৈধতা থাকে। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদ, নিজেরাই নিজেদেরকে নিয়োগ করেছে। তাদের সেই ম্যান্ডেট নেই। বৈধতা নেই।
ইন্ডিয়া’স ওয়ার্ল্ড: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, স্যার।

mzamin

ধ্বংসস্তূপ ৩২ নম্বর, সুধাসদন: সারা দেশে সিরিজ ভাঙচুর, আগুন

ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের জেরে গতকালও সিরিজ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ভাঙচুর বৃহস্পতিবারও চলে। এস্কেভেটর দিয়ে ভবনের সামনের অংশ ভেঙে দেয়ার পর স্থানীয় লোকজন নিজেরাই হাতুড়ি-শাবল দিয়ে ভবন ভেঙে লোহার জিনিসপত্র নিয়ে যান। রাতে ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে গরু জবাই করে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। ওই ভবনের সামনে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলায় নারীসহ দু’জনকে মারধর করেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর গুঁড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি, দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতাদের ম্যুরালও  ভেঙে ফেলা হয়।

ধানমণ্ডি-৫ নম্বরের লেক পাড়ে অবস্থিত শেখ হাসিনার এক সময়ের বাসভবন সুধাসদনে বুধবার রাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। গতকালও ওই ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। লুটপাট করা হয় বিভিন্ন জিনিসপত্র। খুলনায় শেখ হাসিনার চাচাতো ভাইদের ‘শেখ বাড়ি, বরিশালে আমীর হোসেন আমুর বাসভবন, সাদিক আব্দুল্লাহ’র বাড়ি, নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বাড়ি, কুষ্টিয়ায় মাহবুব-উল আলম হানিফের বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানদের পুরনো বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হয়। শেখ হাসিনা পরিবারের নামে করা স্থাপনার নাম মুছে দেয়া হয়।
ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যা দেখা গেল: বুধবার রাতে শেখ হাসিনা দলের ফেসবুক পেজে বক্তব্য  দেবেন এই ঘোষণার পর বুধবার সন্ধ্যার পর থেকেই ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে জড়ো হতে থাকে ছাত্র-জনতা। শুরু হয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। রাত ৯টায় শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা হয়। এরপরই মানুষের বিক্ষোভ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে সেখানে ক্রেন এবং এস্কেভেটর আনা হয়। রাতেই এস্কেভেটর দিয়ে ভবন ভাঙা শুরু হয়, চলে গতকাল দুপুর পর্যন্ত।

দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা ধরে ভেকু দিয়ে ভেঙে ফেলা হয় বাড়িটির সামনের পুরো অংশ। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ভাঙচুরের কাজ চললেও উৎসুক জনতার ভিড় ছিল পুরো সময় জুড়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্লোগান দেয়- ‘মুজিববাদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘মুজিববাদের আস্তানা বাংলাদেশে হবে না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’। মোহাম্মদপুর থেকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে আসা লুনা খাতুন বলেন, সকালে বাসার নাস্তা প্রস্তুত করে সবাইকে অফিসে পাঠিয়ে তারপর এসেছি। ফেরদৌসী নামে আরেক নারী বলেন, বুধবার রাত ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আমি এখানে ছিলাম। বৃহস্পতিবার সকালে আবার এসেছি ইতিহাসের সাক্ষী হতেই। লিটন মোল্লা নামে একজন বলেন, আমরা হাসিনার মতো স্বৈরাচার আর বাংলার জমিনে দেখতে চাই না। রায়হান নামে এক যুবক বলেন, আমি শুধু একা আসিনি। ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসেছি। দুইদিন ধরে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় এমন ধ্বংসযজ্ঞ চললেও সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। বৃহস্পতিবার দুই দফায় এক যুবক ও এক নারীকে গণপিটুনি দেয়া হয় আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার অভিযোগে। দুপুরের পর একদল লোক সেখানে একটি গরু নিয়ে আসেন। বিকালে সেটি জবাই করে রান্নার আয়োজন করা হয়।

এদিকে বুধবার রাতেই ধানমণ্ডি ৫ নম্বর রোডের মাথায় লেকপাড়ের ৫৪ নম্বর বাড়ি সুধাসদনে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। আগের দিন রাতে শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার মালিকানার এই সুধাসদনে লাগানো আগুন পরেরদিন বিকাল পর্যন্ত জ্বলছিল। আগুন লাগা ভবনের মধ্য থেকে  যে যা পাচ্ছে লুটে নিয়ে যায় মানুষ।

শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ঘিরে ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হাসিনার পাঁচ চাচাতো ভাইয়ের খুলনার আলোচিত শেখ বাড়িতেও বুধবার রাতে অগ্নিসংযোগ ও বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুরের পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাড়ির ইট ও রড খুলে নিয়ে গেছে লোকজন। প্রায় দেড় দশক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভাঙা বাড়িটি দেখতে ভিড় করছেন উৎসুক জনতা। বুধবার রাত ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ভোলা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। বুধবার রাতে বুলডোজার দিয়ে বরিশাল নগরীতে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমুর ডুপ্লেস বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়েছে। এর আগে বুধবার রাত দেড়টার দিকে বরিশালের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আবদুল্লাহ’র কালীবাড়ি রোডের বাড়ির নিচতলা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।  বুধবার রাত ১টার দিকে কুমিল্লায় সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের গ্রামের বাড়িতেও অগ্নিসংযোগের পর ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের এই তিনতলা বাড়িটি বুধবার রাত ১০টার দিকে ভেকু দিয়ে ভাঙা শুরু হয়। প্রথমে বাড়ির প্রধান ফটক ও সীমানাপ্রাচীর গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। একইসঙ্গে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল থেকে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম মুছে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

বুধবার রাত ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরে শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের চারটি ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে মাগুরা স্টেডিয়ামের সামনে লাগানো শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালেও কালি লেপে ভাঙচুর করা হয়েছে। যশোরে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার সাতটি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও নামফলক ভাঙচুর করা হয়েছে।
সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকসিংগা মহল্লায় অবস্থিত সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।  একইসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সব নামফলক, গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন মুছে দিতে বিক্ষোভ করছেন একদল শিক্ষার্থী। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে নাটোর শহরে সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলামের (শিমুল) জান্নাতি প্যালেসে আবার আগুন ধরিয়ে  দেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গতকাল দুপুরে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। পিরোজপুরে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল এবং তার ভাই সাবেক মেয়র হাবিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। বুধবার রাত ১০টার দিকে সিলেটে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাঙচুর হওয়া ম্যুরালটি এক্সাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচটি ম্যুরাল এবং শহরের একটি পাড়ায় থাকা একটি মাজার ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভেঙে দেয়া হয়েছে। ভেকু দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতা। বুধবার রাতে ময়মনসিংহ নগরের সার্কিট হাউস মাঠসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুর করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। একই রাত ১০টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও নগরের জামালখান এলাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হয়।
উল্লেখ করা যায়, বুধবার রাত নয়টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য দলের ফেসবুক পেজে প্রচার করা হয়। বক্তব্যে আগের মতোই তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমি কী দোষ করেছি।

তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা কয়েকজন বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলবে এই শক্তি তাদের হয়নি। তারা একটি দালান ভেঙে ফেলতে পারবে, কিন্তু ইতিহাস মুছতে পারবে না। পুরো বক্তব্যে জুলাই-আগস্টে হওয়া গণহত্যার বিষয়ে তার কোনো অনুশোচনা ছিল না।
গুঁড়িয়ে দেয়া হলো সেরনিয়াবাত ভবন, আমুর বাড়িতে ভাঙচুর
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, অগ্নিসংযোগ ও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বরিশালের কালীবাড়ী রোডস্থ ‘সেরনিয়াবাত ভবন’। বুধবার রাত সাড়ে ১২টায় ব্যাপক ভাঙচুরের পর গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এ বাড়িতে আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাতের ছেলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ থাকতেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিয়েও ছাত্র-জনতাকে রুখতে পারেনি। এরপর ছাত্র-জনতা হামলা চালায় বগুড়া রোডস্থ আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর বাড়িতে। তবে বাড়ির তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও বৈঠকখানা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হামলার চিহ্ন রয়েছে ভবনের জানালা ও দরজায়।

বুধবার রাতে প্রথমে ফেসবুকে ঘোষণা দেয়া হয় সেরনিয়াবাত ভবনে হামলা করার বিষয়ে। সাড়ে ১২টার দিকে ছাত্র-জনতা সেরনিয়াবাত ভবন নামের ওই বাড়িতে হামলা চালায় এবং ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন ধরিয়ে দেয়।

স্থানীয়রা জানান, সাদিক আব্দুল্লাহ এই ভবনকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। আওয়ামী লীগ-বিরোধী অনেককে এখানে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও এই ভবনে হামলা হয়েছে। গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উত্তেজিত জনতা এই ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়রসহ ৩ জন নিহত হন।
এরপর উত্তেজিত জনতা হামলা চালায় এক কিলোমিটার দূরে আমুর বাড়িতে। সেখানে গেট ভেঙে কাঠের তৈরি একতলা উঠান ঘরে আগুন দেয়া দেয়া হয়। চারতলা ভবনের কয়েকটি দরজা জানালা ভাঙচুর করা হয়।

পাকুন্দিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভেঙে দিল ছাত্র-জনতা
পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভেঙে দিয়েছে ছাত্র-জনতা। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসংলগ্ন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের এ ম্যুারালটি ভেঙে ফেলেন উত্তেজিত ছাত্র-জনতা।
বছরখানেক আগে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের এ ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ভবনটি এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। কমপ্লেক্সের মূল গেটের পাশেই টাইলস দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপন করা ছিল।
খুলনায় শেখ বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলো ছাত্র-জনতা
স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, গণ-অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচার খুলনার ‘শেখ বাড়ি’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ছাত্র-জনতা। বুধবার রাত ৯টার দি?কে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ-বিরোধী স্লোগান দিয়ে বাড়িটি ভাঙচুর শুরু করে ছাত্র-জনতা। গতকাল দুপুর পর্যন্ত চলে এ ভাঙচুর।

গত বছরের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের আগের দিন ৪ঠা আগস্টই খুলনায় তার চাচা মরহুম শেখ আবু নাসেরর এই শেখ বাড়িতে হামলা চালায় ছাত্র-জনতা। সেদিন দফায় দফায় ভাঙচুরের পর আগুন দেয়া হয় বাড়িটিতে। ওইদিন খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

ওদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও সরকারি বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিজ্ঞান ভবনের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুর করেছে ছাত্র-জনতা। বুধবার মধ্যরাতে বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এ সময় ছাত্র-জনতা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এর আগে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে। মধ্যরাত পর্যন্ত এ ভাঙচুর চলে। এদিকে গতকাল সকাল ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বিএল কলেজের বিজ্ঞান ভবনের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুর করে।

রাতে খুবি’র মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বঙ্গবন্ধু হলের সামনে পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সেখানে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে জুতা নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করে।

কুমিল্লায় বাহারের বাড়িতে ভাঙচুর, আগুন
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, কুমিল্লায় সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। বুধবার রাত ১টার দিকে বিক্ষুব্ধরা পেট্রল ঢেলে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাত ১টার দিকে কুমিল্লা নগরের মুন্সেফবাড়ী এলাকায় অবস্থিত বাহাউদ্দিনের বাড়ির জানালার গ্রিল ভাঙার চেষ্টা করেন বিক্ষুব্ধরা। অনেকে বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে বাড়িটিতে ভাঙচুর চালান। পরে পেট্রল ঢেলে বাড়ির কয়েকটি কক্ষে এবং ভবনের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এর আগে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ওই বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছিল।
রাত ২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লা মহানগরের আহ্বায়ক আবু রায়হান বলেন, ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক হাসিনা দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন। হাসিনা দেশ থেকে পালানোর পরও আবার কখনো ভিডিও বার্তা, কখনো অডিও বার্তার মাধ্যমে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার এসব অপতৎপরতা দেশের ছাত্র-জনতা মেনে নেবে না। তাই বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা আওয়ামী লীগের অফিস ভাঙচুর শেষে বাহারের বাড়িতে ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে। সাবেক এমপি বাহার বছরের পর বছর ধরে কুমিল্লার মানুষের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছেন।

ঈশ্বরদীতে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো আওয়ামী লীগের কার্যালয়
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আলহাজ মোড়ে বিজয় স্তম্ভের পাশে নির্মিত ‘ঘৃণা স্তম্ভ’ও ভাঙচুর করা হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঈশ্বরদী পৌর শহরের স্টেশন রোডে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয় কিছু মানুষ। তারা ‘স্বৈরাচারের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই কার্যালয়টি ভাঙা শুরু হয়।
গতকাল সকালে সরজমিন দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও আশপাশের এলাকা একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাবনা জেলার আহ্বায়ক বরকত উল্লাহ ফাহাদ বলেন, দেশের কোথাও ফ্যাসিবাদের চিহ্ন থাকবে না ইনশাআল্লাহ্‌। ফ্যাসিবাদের শেষ পরিণতি দেখে কেউ যাতে আর ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে সাহস না পায়।
নাটোরে এমপি শিমুলের বাড়িতে আবারো আগুন দিলো ছাত্র-জনতা
নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোর সদর আসনের আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম শিমুলের বাসভবন জান্নাতি প্যালেসে পুনরায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা।
বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে একটি মিছিল গিয়ে শহরের কান্দিভিটুয়াস্থ তার বাসভবনে আগুন দেয়। এর আগে গত ৫ই আগস্ট সরকারের পতনের পরেই আলোচিত জান্নাতি প্যালেসে আগুন জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এর পরদিন বাড়িটি থেকে আগুনে পোড়া ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শাবিতে ডাস্টবিনে হাসিনার ছবি
শাবি প্রতিনিধি জানান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ময়লার ডাস্টবিনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের ছবি লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুধবার রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাস্টবিনগুলোতে শেখ হাসিনার ছবি লাগিয়ে ‘হাসিনা বিন’ হিসেবে নামকরণ করেছেন শিক্ষার্থীরা। হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে এই কর্মসূচি পালন করেন বলে জানিয়েছেন তারা।
সরজমিন দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিল্ডিং ‘সি’, ‘ডি’, চেতনা একাত্তরের সামনে, ক্যাফেটেরিয়ায় ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টের ময়লার ডাস্টবিনে এসব ছবি সাঁটানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জে শেখ মুজিবের ম্যুরাল-মাজার ভাঙচুর
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে শেখ হাসিনার ভাষণের প্রতিবাদে গভীর রাতে শহরের বিভিন্ন স্পটে বিক্ষোভ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী-জনতা। এ সময় সুনামগঞ্জ পৌরসভা, ঐতিহ্য জাদুঘর, মুক্তিযোদ্ধা ভবন, জেলা পরিষদ এবং সদর উপজেলা প্রাঙ্গণে থাকা শেখ মুজিবের ম্যুরাল ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। একই সময়ে শহরের হাছননগরের ডংকা শাহ্‌’র মাজারের স্থাপনা ভেঙে দেয়া হয়।
জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমনদ্দোজ্জা জানান, দেশে ফ্যাসিবাদীদের সব কিছু আমরা ভেঙে দিতে চাই। যেন দেশের কেউ আর এই ফ্যাসিবাদের দিকে অনুপ্রাণিত না হয়।
খুলনায় শেখ বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলো ছাত্র-জনতা
স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, গণ-অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচার খুলনার ‘শেখ বাড়ি’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ছাত্র-জনতা। বুধবার রাত ৯টার দি?কে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ-বিরোধী স্লোগান দিয়ে বাড়িটি ভাঙচুর শুরু করে ছাত্র-জনতা। গতকাল দুপুর পর্যন্ত চলে এ ভাঙচুর।

গত বছরের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের আগের দিন ৪ঠা আগস্টই খুলনায় তার চাচা মরহুম শেখ আবু নাসেরর এই শেখ বাড়িতে হামলা চালায় ছাত্র-জনতা। সেদিন দফায় দফায় ভাঙচুরের পর আগুন দেয়া হয় বাড়িটিতে। ওইদিন খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

mzamin

নতুন বন্দোবস্তে আমরা ভাঙার চেয়ে গড়ায় গুরুত্ব দিতে চাই

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ‘আমরা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করছি। নিছক কিছু মূর্তি বা দালান নয়।’ বুধবার রাত আড়াইটার দিকে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘গড়ার তাকত আছে আমাদের?’ শিরোনামে এক স্ট্যাটাসে এ কথা বলেন তিনি। নতুন বন্দোবস্তে আমরা ভাঙার চেয়ে গড়ার দিকে গুরুত্ব দিতে চাই।

মাহফুজ আলম বলেন, ‘মূর্তি  না ভেঙে আমাদের উচিত আমাদের শত্রুদের শক্তির বিপরীতে পাল্টা চিন্তা, শক্তি ও হেজেমনি গড়ে তোলা। ভাঙার প্রকল্প থেকে সরে এসে দিনকে দিন আমাদের গড়ার প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত। লীগ বা হাসিনা সে অর্থে কিছুই না, বরং আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের এক্সটেনশন। আর, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ তার হেজেমনি তৈরি করছে বাস্তবধর্মী রাষ্ট্রকল্পনা, দেশে এবং ডায়াসপোরায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করে। আমাদের পাল্টা হেজেমনিও এ তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। ভাঙার পরে গড়ার সুযোগ এসেছে, কিন্তু অনন্ত ভাঙা প্রকল্প আমাদের জন্য ভালো ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবহ না। গড়ার প্রকল্পগুলো খুব দ্রুতই শুরু ও বাস্তবায়ন হবে। আপনারা গড়ার কাজে সক্রিয় হোন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন শিগগিরই শুরু হবে। আহত ও নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন ও জুলাই গণহত্যার বিচারের কাজও চলমান। এ মাসেই এ কাজগুলো আরও গতি পাবে।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ নিছক ভাঙা নয়, বরং বিকল্প গড়ারও লড়াই।
পুনশ্চ: খুনি হাসিনার বক্তব্য প্রচার এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য দায়ী থাকবে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ। এজন্যই আমাদের উচিত, সৃজনশীল শক্তির বিকাশ ঘটানো এবং সার্বিকভাবে এ আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দূরদর্শী পদ্ধতি নেয়া। কারণ, এ লড়াই মাত্র শুরু হলো। অন্তত, এক দশক পরে এ লড়াইয়ের একটা মীমাংসা হয়তো হবে। অথচ, সেজন্য আমাদের প্রস্তুতি সামান্যই।

তিনি বলেন, ‘রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা-নেতিবাচক এনার্জি, কিন্তু অভ্যুত্থানের পর আমাদের এ সকল এনার্জিকে ইতিবাচক রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এখনো সে সুযোগ হারিয়ে যায়নি। আগামী অন্তত এক দশকব্যাপী দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ও আধিপত্যবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের জন্য আমাদের সৃজনশীল  শক্তিকে কাজে লাগানো দরকার। ভবিষ্যৎ পানে তাকান, ইতিহাস আমাদের সুযোগ দিয়েছে। আমাদের এবার জিততেই হবে আর জেতার উপায় একটাই-রাষ্ট্রকল্প, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও  দক্ষ এবং মর্যাদাবান মানবসম্পদ গড়ে তোলা। আল্লাহ আমাদের ফেরাসত তথা দূরদৃষ্টি দিক।’

mzamin

৩২ নম্বরে হামলা: এগুলো আগামী দিনে গণতন্ত্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমরা ধারণা করছি, এগুলো গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য, আগামী দিনে গণতন্ত্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেজন্য কেউ কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে কিনা তা জানার চেষ্টা করবো। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ফোরামের উদ্যোগে ‘বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বুধবার যে ঘটনা ঘটেছে, এটি কারা করেছে- এই তথ্য আমাদের কাছে নেই। এতে সরকারের কী ভূমিকা ছিল, সেই তথ্যও আমাদের কাছে নেই। সুতরাং আমরা অল্প কিছু সময় আশা করবো, সব কিছু পরিষ্কার হয়ে হবে, কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, কারা এজন্য দায়ী- সকল পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেলে আমরা এই সম্পর্কে বিএনপি’র পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া মিডিয়ার সামনে, জনগণের সামনে প্রকাশিত করবো। অপূর্ণ তথ্য নিয়ে কোনো মন্তব্য করা সঠিক নয়।

তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে বসে এদেশকে আনস্টেবল সিচ্যুয়েশনে নেয়ার জন্য, এদেশকে ধ্বংস করতে যেটুকু তিনি বাকি রেখেছেন, সেটি পূর্ণ করার জন্য নতুনভাবে এই ফ্যাসিস্ট দলকে (আওয়ামী লীগ) নিয়ে মাঠে নামতে চান। অবিলম্বে এখন প্রয়োজন বাংলাদেশে সকল দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে থাকতে চাই। বিশেষ করে যে ছাত্রসমাজ অংশগ্রহণ করেছে, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে তাদের এবং হাসিনাবিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য আমরা গড়ে তুলতে চাই।
ওদিকে ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার এক প্রতিক্রিয়ায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই ঘটনায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুবই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে এই বুলডোজার কোথা থেকে এলো? সরকার যদি এভাবে এটাতে ইনভলভ হয়ে যায়, সেটা খুবই দুঃখজনক এবং খুবই উদ্বগের কারণ। এরকম পথ থেকে সরকারকে অবিলম্বে সরে আসা উচিত।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বিবিসিকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এখানে মনে হয় সরকারের ভেতর থেকে সমর্থন রয়েছে। তা না হলে তো এভাবে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে এই পদক্ষেপ নেয়া কিংবা এই কর্মযজ্ঞে পাবলিককে উত্তেজিত করে অস্থিরতা তৈরি করা, এটা তো সরকারের ভেতরের সমর্থন ছাড়া হওয়ার কথা নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দিকেও আঙ্গুল তুলে নুর বলেন, আমরা তো দেখি নাই সরকারের ভেতর থেকে এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বরং সরকারের উপদেষ্টাদের কারও কারও ফেসবুকে লেখাতেও আমরা দেখেছি যে, এটাতে সমর্থন রয়েছে।
ওদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনায় মেজর হাফিজ বলেন, একাত্তর সালে অনেক যুদ্ধের পর আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। কিন্ত স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে আমাদের স্বপ্ন  ভেঙে দেয়া হলো। যে লক্ষ্য ধারণ করে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার- ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্থাপিত হলো একটি একদলীয় রাষ্ট্র। যেখানে সংবাদপত্র থাকবে না, রাজনৈতিক দল থাকবে না, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে না, এমন একটি রাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এদেশে ১৯৭৫ সালে কায়েম হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, এর নাম হলো আওয়ামী লীগ। এদের কাছে কোনো দেশ নাই। এদের কাছে নিজের দল, নিজের পরিবার, নিজের স্বার্থ, নিজের সম্পদ আহরণ মূল কাজ। আজকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাদের কতো সম্পত্তি জানি না। আমরা মিডিয়াতে মাঝে মধ্যে খবর দেখি, আগে তো জানতাম না যে, শেখ পরিবারেই ৮টি বাগান বাড়ি রয়েছে গাজীপুর এলাকাতে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিয়ন সেখানে ৪ শ’ কোটি টাকা আয় করেছে, হেলিকপ্টারে ঘুরে বেড়ায় অকল্পনীয়। কী ধরনের গণতন্ত্র তারা প্রতিষ্ঠা করেছে।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা আশা করবো, এখন অতি দ্রুত এদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। কারণ গণতন্ত্র না থাকার ফলেই নানা ধরনের ঘটনা ঘটে। এদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য অনেক আত্মত্যাগ করেছে। বিশেষ করে আমাদের দল বিএনপি, গত ১৫টি বছর কতো মানুষ জীবন দিয়েছে, কতো মানুষের জীবন কারা অন্তরালে গিয়েছে, আমাদের যুবকেরা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে ত্যাগের মাধ্যমে, কিন্তু প্রত্যাশিত গণতন্ত্র এখনো দেখা পাওয়া যায়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে কারা দাঁড়ায়?

তিনি বলেন, একটি মহল চেষ্টা করে এখন নির্বাচন হলে বিএনপি বিজয়ী হবে। সুতরাং এই নির্বাচনকে যত দীর্ঘায়িত করা যায়। বিএনপি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, এটা তো অপরাধ হতে পারে না। বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার জন্য কেন নির্বাচন দীর্ঘায়িত করা হবে-এটি আমরা বুঝতে অক্ষম। আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি অনুরোধ রাখবো, আপনি দ্রুত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নিন। নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রধান অনুষঙ্গ। এই নির্বাচনকে ঠুনকো অজুহাতের কারণে আর দূরে ঠেলে দেবেন না।

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ’র সভাপতিত্বে সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

mzamin