Friday, July 31, 2015

‘আইজ বাংলাদেশ উদ্বোধন হইব’ by সেলিম জাহিদ ও সফি খান

৬৮ বছরের আকাঙ্ক্ষার অবসান হবে আজ শুক্রবার রাত ১২টা
১ মিনিটে। ছিটমহলগুলোতে এই আনন্দে দিনভর চলছে নানান
অনুষ্ঠান। শিশুরা বেড়ে উঠবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে,
তাই ওদের আনন্দ যেন একটু বেশি। ছবিটি আজ শুক্রবার
বিকেলে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার লতামারী
ছিট থেকে তোলা। ছবি: মঈনুল ইসলাম, রংপুর
‘আইজ বাংলাদেশ উদ্বোধন হইব’—দাশিয়ার ছড়ার কালীহাটের চা দোকানে বসে হরিয়ানা রাজ্যে মেয়ে মোসলেমাকে এ খবর দিচ্ছিলেন বাবা মোফাজ্জল হক। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মুঠোফোনে যখন বাবা-মেয়ের কথা হচ্ছিল, মোফাজ্জলের মুখে তখন সূর্যের হাসির বিজ্ঞাপনের কার্টুনটির মতোই মুখ জোড়া হাসি। এমন হাসি আর আনন্দ এখন পুরো ছিটমহল জুড়ে।
হাসি-আনন্দের পাশাপাশি আলোকসজ্জা, হাডুডু, লাঠিখেলা, নৌকা বাইচসহ নানান আয়োজন চলছে ছিটমহলগুলোতে।
৬৮ বছর পর ভারত-বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিট পর দুই দেশের ভূখণ্ডের অংশ হচ্ছে। এত দিন দেশহীন থাকা ছিটমহলগুলোর ৫০ হাজারের বেশি মানুষ কাল থেকে দেশ পাচ্ছে। তাই ছিটমহলের সর্বত্র যেন বিজয় অর্জনের আনন্দ। চলছে উৎসবের নানা আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতা।
দাশিয়ার ছড়ার ছিটমহলে বসে মোফাজ্জল উৎসবের খবর দিচ্ছিলেন মেয়েকে। তিনি জানালেন, চার মেয়ে তাঁর। মোসলেমা ও মফিজাকে বিয়ে দিয়েছেন। স্বামীদের নিয়ে তাঁরা ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের মেওয়াত এলাকায় থাকেন। বাকি দুই মেয়ে ও তাঁদের মাকে নিয়ে দাশিয়ার ছড়ায় থাকেন।
মোফাজ্জল জানান, আট বছর হলো কালীরহাটে চা দোকান করছেন। এত দিন এ হাটের কোনো ঠিকানা ছিল না, নাম বলা যেত না। এখন কালীরহাট স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ। তিনি বলেন, ‘খুশি লাগছে, আমি সে হাটের একজন দোকানদার।’
মোফাজ্জলের চা দোকানের ২০০ গজ দূরে কালীরহাটের টিনের চাউনির ছোট্ট কালী মন্দিরটিও আজ অন্যদিনের চেয়ে ব্যতিক্রম বলে জানালেন পুরোহিত সুশীল চন্দ্র। সকাল থেকেই দল বেঁধে পূজা অর্চনা করেন ছিটমহলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। একইভাবে শুক্রবারের জুমাবার পেয়ে নামাজের পর ছিটমহলের মুসল্লিরা মসজিদে মসজিদে দোয়া ও শোকরানা আদায় করেন।
শুক্রবার দুপুরে কালীরহাটে কথা হয় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘৬৮ বছর পর মুক্ত জীবন পাচ্ছি। কাল থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের নতুন জীবন। এ আনন্দ ভাষায় বর্ণনার মতো নয়।’
মুক্তির ঐতিহাসিক দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে সমন্বয় কমিটি দাশিয়ার ছড়ার বিভিন্ন প্রান্তে ২৫টি তোরণ বানিয়েছে। রাতে ১১টি স্থানে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিকেলে কালীরহাটের পাশে হাডুডু, লাঠিখেলা এবং ছিটমহলের পাশ দিয়ে যাওয়া নীল কমল নদীতে নৌকা বাইচ হয়।
ছিটমহলের বিনিময় উপলক্ষে হাডুডু খেলায় মেতেছে এরা
আয়োজকেরা জানান, ৬৮ বছরের অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে যাত্রার লক্ষ্যে রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতি জ্বালানো হবে কালীরহাটে। এর পর ৬৮টি পটকা ফুটিয়ে তোপধ্বনি করা হবে। রাতে ছিটমহলের সদর রাস্তায় মশাল মিছিলে অংশ নেবেন বাসিন্দারা।
ছিটমহলের এই আনন্দ উৎসব দেখতে বিকেলে কালীরহাটে জড়ো হয় হাজারও মানুষ। এত মানুষ এ হাটে কখন একত্র হয়নি। দূর-দূরান্ত থেকে দাশিয়ার ছড়া এসেছেন অনেকে। সুরুজ্জামান ও মিজানুর রহমান এসেছেন ভূরুঙ্গামারীর সিলকুড়ি থেকে। উৎসবে যোগ দেওয়া পশ্চিমটারীর নুরুন্নাহার বলেন, ‘ছিট বাংলা হইলো, তাই দেখপার আসছি।’
ছিটমহলের উৎসব আয়োজন এবং সেখানকার মানুষের জীবন-সংগ্রামের খবর সংগ্রহে গণমাধ্যমের কর্মীরা চষে বেড়াচ্ছেন দাশিয়ার ছড়ার বিভিন্ন প্রান্তে। সরাসরি সংবাদ সম্প্রচারে ছিটমহলের কাচা রাস্তার ধারে, জমিতে বসেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ভ্রাম্যমাণ স্টেশন। জটলা বেধে তা দেখছেন ছিটমহলের বাসিন্দারা। এ ছাড়া কালীহাট বাজারে বিজয় উৎসব দেখতে জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আসা হাজার খানেক মানুষের সমাবেশ হয়।
লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা হবে
আয়োজক ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, কাল শনিবার সকাল নয়টায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন। বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কালীরহাট জামে মসজিদের পাশেই পতাকার জন্য পাকা স্ট্যান্ড তৈরি করা হচ্ছে। কাল ১ আগস্ট সকালে কেক কাটা হবে। এরপর মিষ্টিমুখ করে আনন্দ মিছিল বের করার কর্মসূচি ঠিক করা হয়েছে। সকাল ১০টায় নির্মাণাধীন দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসা মাঠে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে আয়োজক কমিটি ও কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
উৎসব ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগ করেছে। ফুলবাড়ী থানার ১৪ জন পুলিশ সদস্য, কুড়িগ্রাম পুলিশ লাইন থেকে ১২ জন পুলিশ কনস্টেবল সকাল থেকে কালীরহাটে অবস্থান নিয়েছেন। এ ছাড়া বিকেল সাড়ে ৪টায় গংগারহাট সীমান্ত ফাঁড়ির বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) চারজন সদস্যও নিরাপত্তায় অংশ নেন।
হঠাৎ উৎসবে ছেদ
দাশিয়ার ছড়ায় বিজয় উৎসবের আয়োজন চলছিল অনেক দিন থেকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে হঠাৎ উৎসব আয়োজনে যেন ছেদ পড়ে। ছিটমহলের বাসিন্দা এবং উৎসব আয়োজনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম-২ (কুড়িগ্রাম সদর-রাজারহাট ও ফুলবাড়ি) আসনের সাংসদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে নিয়ে আয়োজকেরা কিছুটা ইতস্তত ও দ্বিধায় পড়েছেন।
সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তাফা বলেন, তাজুল ইসলাম চৌধুরী হঠাৎ করে আসতে চেয়েছেন। তিনি মতবিনিময় করবেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিয়ম সমন্বয় কমিটি ৩১ জুলাই মধ্যরাত ঘিরে উৎসবের জন্য কালীরহাটের পাশে দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসা (প্রস্তাবিত) মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু করে। এই উৎসব কর্মসূচির সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ মো. জাফর আলীসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা সম্পৃক্ত।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খবর আসে সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় পার্টির (জাপা) সাংসদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে যোগ দেবেন। এতে ছিটমহল বিনিয়ম সমন্বয় কমিটি অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ আওয়ামী লীগের সাংসদ ও নেতারা জাপার সাংসদ তাজুল ইসলামকে একই মঞ্চে রাখতে আগ্রহী না। কিন্তু ফুলবাড়ী জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. মঈনুল হক দাশিয়ার ছড়া ছিটমহল বিনিয়ম সমন্বয় কমিটির সভাপতি। কাল থেকে দাশিয়ার ছড়া বাংলাদেশের অংশ হওয়ার পর তা এই আসনের অন্তর্ভুক্ত হবে বিধায় তিনি দলীয় সাংসদকে উৎসবে অতিথি করতে আগ্রহী। এ অবস্থায় আজ শুক্রবার দুপুরের দিকে মাদ্রাসার মূল মঞ্চের দুই জমি দূরত্বে ‘তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’ এর ব্যানারে আরেকটি মঞ্চ বানানো হয়। বিকেলে সেই মঞ্চে তাজুল ইসলাম বক্তব্য দেন। রাতের অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত মঞ্চে থাকবেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
তাজুল ইসলাম চৌধুরীর আকস্মিক আগমনে ‘ঝামেলায় পড়ে গেলাম’ বলে মন্তব্য করেন ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নূর ইসলাম।
অবশ্য জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম চৌধুরী বিকেলে প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁর সফরটা সরকারি। তাই সফরসূচি ঠিক করতে সময় লেগে গেছে।

সন্ধ্যা থেকে উৎসবে মাতবে ছিটমহলবাসী by অমর সাহা

কোচবিহারের বাত্রিগাছ ছিটমহলবাসীর অপেক্ষা। -ভাস্কর মুখার্জি
অপেক্ষার পালা ফুরিয়ে এসেছে ছিটমহলবাসীর। পরিচয়হীনতার গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকার পালা শেষ হচ্ছে অবশেষে। আজ শুক্রবার মধ্যরাতে ভারতের ভেতর থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে। এতে বাংলাদেশের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসী পাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আর ভারতের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসীরা পাবে ভারতের নাগরিকত্ব।
আজ সন্ধ্যা থেকে ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলে শুরু হবে বিজয় উৎসব। সন্ধ্যায় ছিটমহলের প্রতিটি বাড়িতে জ্বালানো হবে ৬৮টি করে মোমবাতি। রাত ১২টায় ছিটমহলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের ঘোষণা দেওয়ার পর শুরু হবে বিজয় উৎসব। ঢাকঢোল পিটিয়ে, বাজি ফুটিয়ে, শঙ্খ বাজিয়ে, মিছিল করে, ভারতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিজয় উৎসবে মেতে উঠবে গোটা ছিটমহলবাসী। আলোক মালায় সাজবে বাড়িঘর। চলবে মশাল মিছিল। ওড়ানো হবে আকাশপ্রদীপ। মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহলে দেখানো হবে ছিটমহলবাসীদের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্রও। ওই তথ্যচিত্রে থাকবে ছিটমহলবাসীদের সুদীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা, যন্ত্রণা ও ভিনদেশের ভেতর পরগাছা হয়ে থাকার দুঃসহ দিনগুলোর কথা।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সহসম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, এখন ছিটমহলজুড়ে আনন্দের বন্যা বইছে। রাজ্য প্রশাসনও ছিটমহল বিনিময়ের লক্ষ্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ছিটমহলের পাড়ায় পাড়ায় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার জন্য বিভিন্ন ছিটমহলে মঞ্চ বানিয়ে ইতিমধ্যে গানবাজনা শুরুও করেছে ছিটমহলের তরুণ-তরুণী আর শিশু-কিশোররা। শুরু করেছে মিষ্টি বিতরণও।
২০১১ সালের দুই দেশের ছিটমহলের যৌথ জনগণনা অনুযায়ী এই ভারতে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের জনসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ২১৫ জন। সেই জনসংখ্যা ৬৪১ জন বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৮৫৬ জন। বাংলাদেশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের জনসংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৩৬৯ জন। এ মাসের ৬ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জনগণনায় সেই সংখ্যা বেড়ে ৪০ হাজার হয়েছে বলে জানিয়েছেন দীপ্তিমান সেনগুপ্ত। তবে প্রকৃত সংখ্যা কত, তা তিনি জানাতে পারেননি। আজ মধ্য রাতের পর থেকে তাঁরা সবাই পাবেন নিজ নিজ দেশের নাগরিকত্ব।

দেশে ফেরানোর প্রস্তুতিও চলছে? by রাহীদ এজাজ

সালাহ উদ্দিন আহমদ
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশ মামলার শুনানি গতকাল বৃহস্পতিবার শিলংয়ের আদালতে শুরু হয়েছে। শুনানিতে দুই সাক্ষীর মধ্যে পুলিশ কনস্টেবল এন সাংমা উপস্থিত ছিলেন, যিনি গত ১১ মে সালাহ উদ্দিনকে গলফ লিংক এলাকা থেকে পুলিশ ফাঁড়িতে এনেছিলেন।
এ মামলায় সরকারপক্ষের কৌঁসুলি আই সি ঝা গতকাল প্রথম আলোকে মুঠোফোনে জানান, শিলংয়ের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মুখ্য বিচারক কে এম লিংদো নংব্রি আগামী ১৯ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অনুপ্রবেশের প্রায় আড়াই মাস পর সালাহ উদ্দিন আহমদের বিচার শুরু হলো। ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, বিনা পাসপোর্টে অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন কয়েক দিন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়ে থাকে।
পুলিশ কনস্টেবল এন সাংমা শুনানিতে বলেন, ১১ মে ভোরে টহল দেওয়ার সময় শিলং গলফ লিংক এলাকা থেকে ফোন পেয়ে উপপরিদর্শক কে সাবাং তাঁকে ও অন্য এক পুলিশ কনস্টেবলকে নিয়ে সেখানে যান। গিয়ে দেখেন, স্থানীয় তিন-চারজন লোকের সঙ্গে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। পরিচয় জানতে চাইলে ওই লোক তাঁর নাম সালাহ উদ্দিন আহমদ এবং বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানান। সেখান থেকে তাঁকে প্রথমে পুলিশ ফাঁড়িতে, পরে শিলংয়ের সিভিল হাসপাতাল, শিলং সদর পুলিশ থানা ও মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক জেরায় তিনি বলেন, তাঁকে ঢাকার উত্তরা থেকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে তাঁকে অপহরণকারীরা শিলংয়ে রেখে গেছে।
এদিকে এই বিএনপি নেতার বিচার শুরু হওয়ার পাশাপাশি তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতিপর্বও থেমে নেই। আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আগের দিন তাঁর কাছ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) একটি ফরমে সই করানো হয় বলে উভয় দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। তবে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর দেশে ফেরাটা দীর্ঘায়িত হতে পারে। আবার ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের বোঝাপড়ায় তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, গত ১১ মে তাঁকে শিলংয়ে খুঁজে পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তালিকাসহ পূর্ণ বৃত্তান্ত দ্রুত ভারতে পাঠায় বাংলাদেশ সরকার। আবার মামলায় সাক্ষী ১১ জন হওয়ায় কয়েক মাসের মধ্যে বিচারকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সম্প্রতি শিলং সফরের সময় রাজ্য সরকারের কর্মকর্তা, পুলিশ, আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, সালাহ উদ্দিন আহমদের দেশে ফেরাটা দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা দ্রুত হওয়া—দুই সম্ভাবনাই থাকছে।
গত ১১ মে সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কথা বলা হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটি জোরেশোরে দাবি করা হয়েছিল। ওই সময় শিলং পুলিশও বলেছিল, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ বার্তা পাঠিয়েছে। সম্প্রতি শিলংয়ে সালাহ উদ্দিনের মামলায় সরকারপক্ষের আইনজীবী আই সি ঝার সঙ্গে কথা বলে ইন্টারপোলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে পাওয়া গেছে চমকপ্রদ তথ্য। তাঁর দাবি, ইন্টারপোলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। এমন কিছু থাকলে সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে তিনি সেটা জানতেন।
মেঘালয়ে পৌঁছানোর পর পুলিশ ফাঁড়ি, দুই দফায় সিভিল হাসপাতাল, মানসিক হাসপাতাল মিমহানস, নেগ্রিমস হয়ে এখন শহরের বিষ্ণুপুরের একটি রেস্ট হাউসে থাকছেন সালাহ উদ্দিন আহমদ। শিলং না ছাড়ার শর্তে গত ৫ জুন তিনি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। জামিন পাওয়ার পর থেকেই তিনি ওই রেস্ট হাউসে থাকছেন। বিচারকাজ থাকলে তিনি আদালতে যান। তা না হলে রেস্ট হাউসেই সময় কাটান। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও দলের সহকর্মীরা দেশ থেকে সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন।
২২ জুলাই অভিযোগপত্র গঠনের শুনানিতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করায় সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আটকের পর থেকে সালাহ উদ্দিনের অধিকাংশ সময় কেটেছে হাসপাতালে। অসুস্থ থাকায় পুলিশ সেভাবে তাঁকে জেরা করতে পারেনি। তারপরও ঢাকা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনকে বিবেচনায় নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় বলে জানা গেছে। তিনি শিলং পৌঁছানোর এক সপ্তাহের মাথায় ঢাকা থেকে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। আর স্থানীয় পুলিশ এটিকে বিবেচনায় নিয়েছে বলে সালাহ উদ্দিনের আইনজীবীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
১১ জন সাক্ষীর মধ্যে আছেন তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের উপপরিদর্শক পি লামারেসহ পাঁচজন পুলিশ ও ছয়জন চিকিৎসক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারপক্ষের আইনজীবী আই সি ঝা ২২ জুলাই তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া তাঁকে ভারতের ভূখণ্ডে পাওয়া গেছে। অনুপ্রবেশের মামলায় সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী কিংবা নির্দোষের সপক্ষে বলার সুযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগপত্র দাখিল করেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় না। কেউ দোষ স্বীকার করলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়টি সামনে চলে আসে। কেউ যদি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন, তাহলে সাক্ষীর উপস্থিতিতে তাঁকে আদালতে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সেটি প্রমাণ করতে হবে।
অনুপ্রবেশের মামলায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের শাস্তির যে বিধান রয়েছে, সেই শাস্তি সব মামলায় দেওয়া হয়েছে তা কিন্তু নয়। শিলংয়ে অনুপ্রবেশের মামলা পরিচালনা করেছেন এমন তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে এ ধারণা পাওয়া গেছে যে বিচারিক প্রক্রিয়াতেই বেশি সময় গড়িয়ে যায়। মামলার অভিযোগপত্র গঠন, সাক্ষীদের যুক্তি, পাল্টা যুক্তি নিয়ে শুনানি ইত্যাদি প্রক্রিয়াতেই বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তি অনুপ্রবেশের দোষ স্বীকার করার পর আদালত লঘু শাস্তি দিয়েছেন। যথারীতি শাস্তি ভোগের পর নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে সালাহ উদ্দিন আহমদ শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। তবে তিনি আর দশজন সাধারণ নাগরিকের মতো নন। ফলে তাঁর পরিণতি অন্যদের মতো না-ও হতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর শুরুর এক দিন আগে, অর্থাৎ ৫ জুন সালাহ উদ্দিন আহমদের জামিন পাওয়াটা এ ইঙ্গিত দেয়। তা ছাড়া নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে সালাহ উদ্দিন আহমদের শিলংয়ে অবস্থানের আড়াই মাস পরও স্পষ্ট নয়, তিনি কীভাবে সেখানে গেলেন। শুরু থেকেই তিনি যেটা বলছেন, সেই দাবিতেই তিনি অটল আছেন। শিলং পৌঁছানোর পর থেকেই সালাহ উদ্দিন আহমদ বলছেন, তিনি শিলংয়ে স্বেচ্ছায় যাননি। ঢাকার উত্তরা থেকে মার্চে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। এরপর নানা জায়গা ঘুরিয়ে অপহরণকারীরা তাঁকে ১১ মে মেঘালয়ে রেখে যায়। উত্তরা থেকে শিলংয়ে পৌঁছানোর মাঝখানের সময়টা কোথায় ছিলেন, তা বলছেন না তিনি। ফলে ৬২ দিনের রহস্যের জট এখনো খোলেনি, শিগগির খুলবে এমন আভাসও মিলছে না।
অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরুর আগে আদালত চত্বরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। ঢাকা থেকে শিলং, মাঝখানের দিনগুলো সম্পর্কে এ প্রতিবেদক জানতে চাইলে বিএনপির নেতা কথা বলতে অপারগতা জানান। তবে তিনি বলেন, ১১ মে শিলং গলফ লিংক এলাকায় পৌঁছানোর পর তিনিই স্থানীয় লোকজনকে পুলিশে খবর দিতে অনুরোধ জানান। পরে টহল পুলিশ এসে তাঁকে ফাঁড়িতে নেয়। এরপর হাসপাতালে। মিমহানস নামের মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পর নিয়মানুযায়ী তাঁর দাড়ি-গোঁফ (৬২ দিনের) কামানো হয়েছিল। শুরু থেকেই পুলিশ ও হাসপাতালের লোকজন বিশ্বাস করতে চাননি, তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রতিমন্ত্রী। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক এ কে রায় তাঁর সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারেন বর্ণনা কিছুটা অসংলগ্ন হলেও তিনি মানসিক রোগী নন। পরে ওই চিকিৎসকের মাধ্যমেই ১২ মে স্ত্রী হাসিনা আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় সালাহ উদ্দিনের।

প্রভু! বিচারককে ক্ষমা কর সে জানে না কী করেছে

২২ বছরের প্রলম্বিত তর্ক-বিতর্ক, সাজা মওকুফের আবেদন আর টানাহিঁচড়ার অবসান ঘটলো বৃহস্পতিবার। ৫৪তম জন্মদিনেই ফাঁসির দড়িতে ঝুলল ১৯৯৩ সালের ভারতের ইতিহাসে ভয়াবহ মুম্বাই হামলার অন্যতম অভিযুক্ত ইয়াকুব মেমন। ফাঁসি হবে কি হবে না তা নিয়ে রাতভর নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে সকাল সাড়ে ৬টায় মহারাষ্ট্রের নাগপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ভারতে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের ঘটনা খুবই কম। দেশটিতে ২০০৪ সাল থেকে মাত্র তিন জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ভারতের কয়েকশ’ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সিপিএম-এনসিপি-বিজেপিসহ বিভিন্ন দলের এমপিরা সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লিখে বলেছেন, তার ফাঁসির সাজা মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় সুপ্রিমকোর্ট ফাঁসি স্থগিত করতে ইয়াকুবের শেষ মুহূর্তের আবেদন নাকচ করেন। ইয়াকুবের শেষ মুহূর্তের আবেদন নিয়ে শুনানির জন্য নজিরবিহীনভাবে গভীর রাতে সুপ্রিমকোর্ট খোলা হয়। সর্বোচ্চ আদালত শুনানি শেষে তার আবেদন খারিজ করেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বুধবার ইয়াকুবের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দেন এবং তার আগে তার ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিমকোর্ট।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে পরপর বিস্ফোরণে তৎকালীন বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরে ২৫৭ জন নিহত ও ৭০০ জন আহত হয়েছিল। তদন্তে প্রমাণিত, বিস্ফোরণের পুরো পরিকল্পনাই করেছিল মেমন পরিবার। ঘটনার আগে পরিবারের অধিকাংশই দেশ ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ইয়াকুব আত্মসমর্পণ করে। সেই আত্মসমর্পণ শর্তাধীন ছিল কি-না (অর্থাৎ ইয়াকুবকে প্রাণদণ্ড দেয়া হবে না), এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০০৬ সালে প্রথম ফাঁসির রায় শুনে ইয়াকুব চিৎকার করে বলেন, হে প্রভু! বিচারককে ক্ষমা কর, সে জানে না- কী করেছে।’ সর্বশেষ তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হলে ইয়াকুব বলেন, ‘নিরপরাধ মানুষদের সন্ত্রাসী বানানো হচ্ছে।
শেষ ইচ্ছে মেয়ের সঙ্গে কথা
বুধবার রাতেই নাগপুরে পৌঁছে গিয়েছিলেন ইয়াকুব মেমনের দুই ভাই সুলেইমান এবং উসমান। তারা রাতে হোটেলে ছিলেন। মুম্বাইয়ের মাহিমের বাড়িতে ছিলেন ইয়াকুবের স্ত্রী ও কন্যা। জানা গেছে, ফাঁসির আগে শেষ ইচ্ছে হিসেবে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চায় ইয়াকুব। সেই ইচ্ছা মঞ্জুর হয়। টেলিফোনে দুই মিনিট মেয়ের সঙ্গে কথা হয় তার। এভাবেই টেলিফোনে কথা বলে শেষ ইচ্ছা পূরণ হয় মেমনের।

মেরিনা-সরোয়ারের বাঁধন ছিঁড়ে গেল! by সেলিম জাহিদ ও সফি খান

পেছনে ঘরগৃহস্থালি। চলে যাবেন ভারতে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী
থাকতে চান বাংলাদেশে। এক ছেলে নিয়ে তিনি এখন
বাবার বাড়িতে। আরেক ছেলেকে কোলে নিয়ে দাশিয়ার
ছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা সরোয়ার l সফি খান
ভারত, না বাংলাদেশ। একমত হতে পারলেন না দুজন। স্বামীর সিদ্ধান্ত ভারত, স্ত্রীর বাংলাদেশ। ভূখণ্ড বেছে নিতে দুই নাড়ির দুই টান। অবশেষে ভারত-বাংলাদেশে ভাগ হয়ে ছিঁড়ে গেল সরোয়ার আলম ও মেরিনা বেগমের দাম্পত্যের বাঁধন। এই দম্পতি ভারতের ১১১ ছিটমহলের একটি দাশিয়ার ছড়ার বাসিন্দা।
১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ কমিশন ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা ভাগ করেছিল। দেশভাগের ৬৮ বছর পর সেই সীমানা আর থাকছে না। আজ ৩১ জুলাই মধ্যরাতের পর ১৬২টি ছিটমহল দুই দেশের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।
দাশিয়ার ছড়া ছিটমহলটি ভারতের। এর অবস্থান বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার যে ১৬২টি ছিটমহল আছে, তার মধ্যে আয়তন ও লোকসংখ্যার দিক থেকে এটি সবচেয়ে বড়। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী, এর আয়তন ১ হাজার ৬৪৩ একর। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে লোকসংখ্যা ৭ হাজার ১২৩ জন। অবশ্য ছিটমহলের বাসিন্দাদের দাবি, লোকসংখ্যা ১০ হাজার ২৭৮ জন। হেড কাউন্টিং বা জনগণনার সময় অনেকে ভয়ে নাম তোলেননি। মেরিনা ও সরোয়ার দাশিয়ার ছড়ার তিন নম্বর মৌজার বাসিন্দা।
কথা বলে জানা গেল, সরোয়ারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দাশিয়ার ছড়ায়। আর মেরিনার জন্ম বাংলাদেশে, কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুরে। ২০১১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে আছে দুই সন্তান মোস্তাফিজুর রহমান হিমেল ও আবদুল্লাহ আল মুয়াদ।
গত বুধবার বিকেলে দাশিয়ার ছড়ায় বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কথা হয় সরোয়ার আলমের সঙ্গে। কোলে দুই বছরের ছেলে হিমেল। সরোয়ার জানান, তাঁদের চার ভাইয়ের দুজন পরিবার নিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশের খড়িবাড়ি বাজারের গত হাটে নিজের দুটি গরু ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। নিজের ভাগের কিছু গাছগাছড়া বেচে দিয়েছেন ২৮ হাজার টাকায়।
সরোয়ার বলেন, দুই ছেলে আর স্ত্রীসহ ৯ জুলাই ফুলবাড়ী উপজেলায় গিয়ে ভারতের অধিবাসী হওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পরে স্ত্রী মত পাল্টান। ২২ জুলাই স্ত্রী মেরিনা ছোট ছেলে মুয়াদকে নিয়ে বাবার বাড়ি ফুলবাড়ীর কাশিপুরে চলে যান।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য, দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে স্ত্রীকে জোর করে রাজি করিয়েছিলেন সরোয়ার। তাই বিদায় নিতে যাওয়ার কথা বলে ছয় মাসের শিশুসন্তান মুয়াদকে নিয়ে বাবার বাড়ি যান। সেখান থেকে তিনি আত্মগোপন করেন। এর মধ্যে সরোয়ার জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী ২৭ জুলাই উপজেলায় গিয়ে নিজের ও দুই সন্তানের ভারতের যাওয়ার তালিকা থেকে নাম কাটিয়ে এসেছেন। সরোয়ার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে স্ত্রী-সন্তানের খোঁজ পাননি।
ভারত, না বাংলাদেশ—ভিটেমাটি ছেড়ে ভূখণ্ড বেছে নেওয়ার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে এমন অনেক খণ্ড খণ্ড কষ্ট-যন্ত্রণা জমাট বেঁধেছে ছিটমহলগুলোতে। আবার এর ভেতরেই ঘুরে ফিরছে ৬৮ বছরের দীর্ঘ বঞ্চনা অবসানের আনন্দ। আজ শুক্রবার মধ্যরাতে ছিটমহলে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার অর্জনের মাহেন্দ্রক্ষণ। এই রাত ঘিরে চলছে উৎসবের নানা আয়োজন। যদিও ছিটমহলের বাইরে এ নিয়ে তেমন উৎসাহ বা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দাশিয়ার ছড়াসহ কুড়িগ্রাম জেলার ১২টি ছিটমহলের (একটিতে মানুষ নেই) জনসংখ্যা ৭ হাজার ১৩৬। এঁদের ৩১৭ জন ভারতে চলে যাওয়ার আবেদন করেছেন। এঁদের ১৫৮ জন হিন্দু, ১৫৯ জন মুসলমান। হিসাবে দেখা যায়, দাশিয়ার ছড়া থেকেই ২৮৪ জন ভারতে যাওয়ার আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫৮ জন হিন্দু, ১২৬ জন মুসলমান।
লক্ষ্মীবালা যাচ্ছেন, থাকছেন মধূসুদনরা: দাশিয়ার ছড়ার দুই নম্বর মৌজায় পাশাপাশি ঘর দুই ভাইবোন লক্ষ্মীবালা মোহন্ত ও মধূসুদন মোহন্তর। ৩৫ বছর ধরে এক বাড়িতে বসবাস তাঁদের। আরেক ভাই হরেকৃষ্ণ মোহন্তর বাড়ি তিন জমি পর। লক্ষ্মীবালার ছোট বোন যমুনা মোহন্ত আছেন সীমান্তের ওই পাড়ে ভারতের কোচবিহার জেলার নয়ারহাটে। সেখানেই তাঁর বিয়ে হয়েছে।
লক্ষ্মীবালার সিদ্ধান্ত, দুই ছেলে হরিচরণ ও বিষ্ণু মোহন্ত, ছেলের বউ আর পাঁচ নাতনিকে নিয়ে বোন যমুনার কাছাকাছি থাকবেন। মধূসুদন ও হরেকৃষ্ণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে থাকার।
ভারতের ছিটমহলের বাসিন্দা হলেও দুই ভাই আত্মীয়তা গড়েছেন বাংলাদেশিদের সঙ্গে। এর মধ্যে মধূসুদনের মেয়ে কৃষ্ণা রানীর বিয়ে দিয়েছেন লালমনিরহাটের বড়বাড়ি এলাকায়। ছেলে নরেশ ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন।এত দিন পাশাপাশি থাকা বোন-ভাগনেরা ভিটে খালি করে চলে যাচ্ছেন ভারতে।
মধূসুদন মোহন্ত বলেন, ‘বাপ-দাদার জন্ম এই বাড়িতেই। ভিটা ছাড়ি কোটে যাম। বোনকে অনেক বুঝাইলাম, তারা থাইকবার চায় না। তাই যদি না থাকে, তাক আটকে রাখারÿক্ষমতা তো আমার নাই। আমি ছাওয়া পাওয়া ছাড়ি যাবার পারব না।’
বুধবার দাশিয়ার ছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বোন লক্ষ্মীবালার ঘরে চলছে বিদায়ের প্রস্তুতি। ছয়টি গাছ তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। সেটি কাটাকুটি চলছে। ঘরে দুটি ছাগল ছিল। একটি জেঠাসের মেয়ে আঙ্গুরিকে, আরেকটি সম্বন্ধীর মেয়ে অনন্যাকে দিয়ে দিয়েছেন। এখন কাপড়চোপড়, কাঁথাবালিশ, ঘটিবাটি আর নিজে যে রিকশা-সাইকেলের মেকারি করতেন, সেই হাতিয়ারগুলো গোছগাছ বাকি—জানালেন হরিচন্দ্র মোহন্ত। দুই ভাই হরি ও বিষ্ণুর নামে ঘরভিটেসহ ৪১ শতক জমি আছে। সেগুলোর কোনো বন্দোবস্ত হয়নি।
ভিটেবাড়ি ছেড়ে কেন যাচ্ছেন? জবাবে হরিচন্দ্রের মা লক্ষ্মীবালা বলেন, ‘এটে দুই ভাই। ওখানে (ভারত) দুই মেয়ে, ননদ, কাকারা থাকে। ইন্ডিয়া গেলে ওই দেশের সরকার দুই বছর পুইষবে, পাঁচ লাখ টাকা, থাকবার ঘর করি দিবে, তাই যাবার চাই।’
বুধবার লক্ষ্মীবালার ঘরের পেছনের গাছ দুটি যখন কাটা হচ্ছিল, ঠিক তখন কানে আসছিল ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির মঞ্চ নির্মাণের হাতুড়ির ঠুকঠাক আওয়াজ। লক্ষ্মীবালার বাড়ির কয়েক জমি পরেই বানানো হচ্ছিল উৎসব মঞ্চ। এর পাশ ঘেঁষেই সিমেন্টের পিলার পুঁতে দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসার সাইনবোর্ড টানিয়ে চলছে ঘর বানানোর কাজ।
ছিটমহলের বাসিন্দারা জানান, বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির পর দাশিয়ার ছড়ায় স্কুল-মাদ্রাসা স্থাপনের হিড়িক পড়েছে। ১ হাজার ৬৪৩ একরের ছিটমহলের বিভিন্ন প্রান্তে¯ইতিমধ্যে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ (একটি বালিকা) ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছে। এর কয়েকটিতে বাঁশ দিয়ে ঘরের কাঠামো খাড়া করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে দাশিয়ার ছড়া দাখিল মাদ্রাসার জন্য চার জমিদাতার একজন আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় নির্মাণাধীন মাদ্রাসার সামনে। তিনি বলেন, ছিটমহলের মানুষ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন শিক্ষায়। এরপর স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতায়নের দিকে। তিনি জানান, দাশিয়ার ছড়াকে ‘শেখ হাসিনা নগর’ নামকরণ করে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে সেখানকার বাসিন্দারা। এ ছাড়া একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং দাশিয়ার ছড়ার মাঝের চরে ইন্দিরা-মুজিব নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখছেন ছিটমহলের লোকজন।
এত স্কুলঘর নির্মাণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ছিটমহলের বোর্ড অফিস এলাকার বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার এখনো অর্ডার দেয়নি। পাবলিক আশায় আশায় ঘর তুইলবার লাইগছে। সরকার যখন বইসবে, তখন স্কুল সরকারি অইবে।’
স্থানীয় লোকজন জানান, ভুয়া ঠিকানা দিয়ে ছিটমহলের বাসিন্দারা এত দিন বাংলাদেশে পড়ালেখা করেছেন। এঁদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাঁদের একজন নূর ইসলাম রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে লেখাপড়া শেষ করেছেন। এখন তিনি ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে।
নূর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভুয়া ঠিকানা দিয়ে আমরা লেখাপড়া করেছি, এটা সত্য। এখন সরকার যেন আমাদের অর্জিত শিক্ষাসনদের স্বীকৃতি দেয়।’
কিন্তু মেরিনা ও সরোয়ার আলমদের কী হবে? ’৪৮-এর দেশভাগের মতো নাড়ির টানে দ্বিখণ্ড হওয়া মেরিনার সংসারের কী হবে?
সরোয়ারের বড় ভাই মিজানুর রহমানও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মিজান ২০১৪ সালে গঠিত দাশিয়ার ছড়ায় ইউনাইটেড কাউন্সিল নামে একটি সংগঠনের সভাপতি। এটি ছিটমহলে ভারতপন্থী বলে পরিচিত। কারণ, সংগঠনটির উদ্যোক্তা এবং সমর্থকেরা ছিটমহল বিনিময় না করে ভারতের সঙ্গে করিডোর চেয়েছিলেন। এ কারণে দাশিয়ার ছড়ায় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির সঙ্গে ইউনাইটে কাউন্সিলের বিরোধ আছে। ইউনাইটেড সমর্থকদের কমসংখ্যকই বাংলাদেশে থাকছেন।
মিজানের সঙ্গে বুধবার সন্ধ্যায় কথা হয় ছিটমহলের কালীরহাটে। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটির লোকজনের বৈরিতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করিডোর চেয়েছিলাম বলে আমরা নাকি রাজাকার। তাহলে কীভাবে বাংলাদেশে থাকব?’ ভাই সরোয়ারের স্ত্রী মেরিনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলে ও চলে গেছে। এখন পলাতক।’ তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘মা-বাবা মিলেই তো বাচ্চা। মা কীভাবে একা বাচ্চাদের বাংলাদেশের বাসিন্দা করে?’
এ অবস্থায় কী করবেন, জানতে চাইলে মিজানুর বলেন, ‘ও (ভাইয়ের বউ) না গেলে থাকবে। ভাই (সরোয়ার) যাবে।’
দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন, এমন প্রশ্নে সরোয়ার আলম জানান দুটি কারণ। এক, বাংলাদেশে কর্মের অভাব। দুই, এখানে আইনের শাসন নেই। যে প্রশাসন আছে তাদের টাকা দিলে কেনা যায়।
দেশ ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে না? সরোয়ারের জবাব, ‘দেশ ছেড়ে কই যাচ্ছি। জন্মগতভাবে আমরা ভারতের বাসিন্দা। যে দেশের মানুষ, সে দেশেই তো যাচ্ছি। কষ্টের মধ্যে এটাই, যে জায়গার মধ্যে নাড়ি পোঁতা, সে জায়গাটা ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমার।’

অনাবৃতা by উম্মে মুসলিমা

একটা টেলিফোন কল। রুবিতার রক্ত ঠান্ডা হয়ে আসে।
আজ শুক্রবারের সকালেই একটা দৈনিকের সাময়িকীতে ওর একটা কবিতা এসেছে। কবিতাটা ও পাঠিয়েছিল মাস কয়েক আগে। প্রথম তিন সপ্তাহ যখন প্রকাশিত হলো না, তখন ভেবেই নিয়েছিল, ওটা আর বেরোবে না। ভাবছিল, এ সপ্তাহেই অন্য একটা দৈনিকে পাঠিয়ে দেবে। পত্রিকা হাতে পেয়েই আগে সাময়িকীর পাতাটা বের করে নিয়েছিল, তবে কবিতাটি দেখেনি। হতাশ হতে হতে সে ভুলেই গেছে যে আজ শুক্রবার। বর টুরে যাবে। তার ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিল। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে আবৃত্তি, ‘অতল অতল বলে কাঁদে মন অগভীরে বাস/ রোমশ বুকের বন, হিরে খুঁজে বেতফল পাস’।
রুবিতা ঝটিতে হাতের কাপড় মেঝের ওপর ছুড়ে ফেলে নাফিসের হাত থেকে পাতাটা কেড়ে নেয়। ‘এসেছে এত দিনে!’ হ্যাঁ, রুবিতার প্রকাশিত কবিতা থেকেই নাফিস মানে ওর বর আবৃত্তি করছিল।
‘কে সেই হতভাগা অগভীর? এ বুকেও তো জঙ্গল’—বলে নিজের রোমশ বুকে হাত বোলায় নাফিস।
‘তোমার এই এক স্বভাব। এ জন্যই তো তোমাকে কবিতা দেখাই না।’
‘কবিতা তো আর আসমান থেকে নাজিল হয় না। এ মাটির মানুষ আর প্রকৃতি বাদ দিয়ে তুমি কত দূর যাবে?’
‘কবিতা বুঝলে আর এ কথা বলতে না। মানুষ উপলক্ষ, বেদনা-ই বিধেয়।’
‘ওরেব্বাস! মহাকবি কালিদাস। এবার আমার ব্যাগটা দয়া করে গুছিয়ে দাও। দেখো, গতবারের মতো যেন আন্ডারওয়্যার না দিয়েই পাঠিয়ে দিয়ো না। কবিকে নিয়ে ঘরসংসার! বহুত ঝামেলায় আছি।’
‘বেশ তো, টুরে টুরেই কাটিয়ে দাও। ঝামেলায় জড়ানোর দরকার কী?’
‘এ যে আমার মধুর ঝামেলা’—রুবিতাকে বুকে শক্ত করে চেপে ধরে নাফিস। রুবিতা নাফিসের রোমশ বুকে নাক ঘষে।
নাফিস চলে গেলে বিছানায় উপুড় হয়ে পত্রিকা খোলে রুবিতা। এ সময়টা একান্তই ওর। ছেলে স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে সেই বিকেল। দুপুরটা পুরোপুরিই ওর। সত্যি বলতে কি, নাফিস টুরে গেলে ওর ভালোই লাগে। একা থাকার মজাই আলাদা। পুরো বিছানাটাই ওর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেমন-তেমন করে যখন ইচ্ছে শোয়া যায়। ইচ্ছে না হলেও স্বামীকে শরীর বিছিয়ে দেওয়ার ভান করতে হয় না। কিন্তু সে-ও তো বড়জোর তিন দিন। চার দিনের দিন নাফিসের গন্ধ না পেলে ওর অসহ্য লাগে সবকিছু। যদিও নাফিস একটু সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত কিন্তু সেটাও ইতিবাচক হিসেবেই মেনে নিয়েছে রুবিতা। আরে বাবা, ভালোবাসে বলেই তো সন্দেহ করে। বিয়ের প্রথম প্রথম অবশ্য ওর খুব কষ্ট হতো। একা একা শপিংয়ে যেতে দিত না, বাসার বারান্দায় দাঁড়াতে নিষেধ করত, এমনকি ফোনেও আড়ি পাতত। যখনই ভালোবাসায় নিবিড় হতো তখনই ওই এক প্রশ্ন, ‘সত্যি করে বলো তো কজনকে ভালোবাসতে?’ এ ষোলো-সতের বছরে স্বাভাবিক নিয়মেই ওসব কমে এসেছে। তবু রুবিতার কবিতার ‘তুমি’টা কে, তা জিজ্ঞাসা করতে এখনো কম যায় না। খোঁচা দেয় কিন্তু মনে মনে ভেবে পুলকিত হয় যে বউ তার প্রতিই বিশ্বস্ত। রুবিতাও নাফিসের এসব ছোটখাটো দোষত্রুটি এক পাল্লায় আর ভালো গুণগুলো আরেক পাল্লায় রেখে মাপজোক করে দেখেছে যে গুণের পাল্লাই বেশি ভারী। ওরকম সৎ আর কর্মঠ অফিসার আজকাল খুবই দুর্লভ।
ছেলেটা পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী। সামনেই ওর এসএসসি পরীক্ষা। নিজের ঘর বন্ধ করে রাখে। প্রায়ই রুবিতার ইচ্ছে করে ছেলের সঙ্গে একটু আড্ডা দিতে। দরজা নক করে সে—‘কী করছ আব্বু?’
‘কী আবার? পড়ছি।’
‘খোলো একটু।’
‘কী, হাবি নেই তাই মন খারাপ?’—বলে দরজা খোলে অরূপ।
ছেলের দূর্বাঘাসের মতো কেবল গজিয়ে ওঠা নরম গোঁফে আঙুল ছুঁয়ে ওর বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ে সে।
‘তা একটু খারাপ বৈকি। তুই-ও তো সময় দিস না।’
‘সময় দিলে হাবির মতো ব্রিলিয়ান্ট চাকুরে হতে পারব? সিভিল সার্ভিসে বাবার রেজাল্ট ভালো ছিল বলে কেমন সবার আগে আগে প্রমোশন পেয়ে যাচ্ছে। তুমি বড় চাকুরের বউ। তোমার তো রমরমা!’
‘বারে, আমার বুঝি নিজের কোনো পরিচয় নেই?’
‘ওহো, তুমি তো আবার কবি রুবিতা হোসেন। দেশের প্রথম সারির কবি। এ সপ্তাহে এসছে নাকি একটা?’
‘তুই-ও তো লিখতিস। আর লিখিস না কেন?’
‘এবার কেটে পড়ো তো কবি। আমার মেলা পড়া আছে। বসে বসে কবিতা লেখো গে, যাও’—বলে মায়ের কপালে চুমো খেয়ে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে মাকে বের করে দেয় অরূপ।
যেদিন রুবিতার কবিতা আসে পত্রিকায়, সেদিন ওর সব গুমোট কেটে যায়। আকাশ সেদিন মেঘলা হলে ঝিরিঝিরি মেঘকণায় ভিজতে ইচ্ছে হয় ওর। একবার এক রাতে নীলগিরিতে ও মেঘ মেখেছিল। মেঘে ভেজা আর বৃষ্টিতে ভেজা কত আলাদা! মেঘ তো বৃষ্টিরই রেণু। অথচ একটুও গা ভেজে না। মুখে হাত ঘষলে মনে হয় যেন বৃষ্টির ছাট লাগা বন্ধ কাচের জানালার ভেতরের ভিজে ভাব। আর্দ্র আর কোমল। আবার যেদিন সকালে তেজি রোদ, সেদিনও ওর চোখধাঁধানো ঝিলিক নেচে যায় সাদা করগেট টিনের চালে। মুহূর্তে ও ফিরে যায় ওদের গ্রামের বাড়ি। ঘরের দেয়ালের তেকোনা ছায়ায় ঘাসের পাটিতে বসে থাকে আঁটো বিনুনির কিশোরী। কারণ, কৈশোর আর যৌবনের শুরুর কাল ছাড়া ওর কবিতার কাল বয়সী হতে জানে না। রুবিতা বারবার—দশবার পড়ল নিজের কবিতা। কবিতাটা আসলেই ভালো হয়েছে। ওর কবিতার ওপরেই দেশের স্বনামধন্য আরও দুজন পুরুষ কবির কবিতা। ওঁদের কবিতাও একবার করে পড়ল। ভাবল, তাঁরা নিশ্চয় ভাবছেন, কে এই রুবিতা হোসেন? এত পরিপক্ব হাত মেয়েটির? কেউ না কেউ নিশ্চয় টেলিফোন করবে। এর আগেও কবিতা এলে দু-চারটে ফোন সে পেয়েছে। প্রশংসা শুনতে ভালোই তো লাগে। ভাবতে ভাবতেই একটা ফোনকল। সারা শরীর হিম হয়ে আসে রুবিতার।
২. ছাত্রজীবনে ভালো ছাত্রী হিসেবে পরিচিতি ছিল রুবিতার। আসল নাম ছিল মোছাম্মৎ রাবেয়া খাতুন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় খুব ডাটিশ এক মেয়ে এসে ভর্তি হলো ওদের মফস্বলের স্কুলে—রুমকি রহমান। বাবার নাম জামিল রহমান। তখন গ্রামের মেয়েদের নামের শেষে বেগম, খানম বা খাতুন আর শুরুতে মোছাম্মৎ। রুমকির খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠল রাবেয়া। রুমকি গড়পড়তা ছাত্রী। ওর চুলের স্টাইল, স্কুলের ব্যাগ, ছাতা—সবই চমক লাগানো। রাবেয়া দেখতে ভালো, ছাত্রী ভালো কিন্তু কিছুতেই রুমকির মতো দেখায় না। ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফরমফিলাপের সময় রুমকি পরামর্শ দিল, ‘শোন রাবেয়া, তোর নাম পাল্টে দে। নাম দে রুবিতা হোসেন। বড্ড সেকেলে নাম তোর।’
‘কিন্তু আব্বা জানলে যে আস্ত রাখবে না।’
‘দিয়ে দে, একবার হয়ে গেলে রাগ করে কোনো লাভ হবে না।’
‘কিন্তু আমার আব্বার নাম তো আইনউদ্দিন, হোসেন কেন?’
‘শোন, আমিও ভেবেছি। রুবিতা আইন বা রুবিতা উদ্দিন ঠিক মিলছে না। হোসেনটা ভালো যায়।’
‘কিন্তু...’
কোনো কিন্তুই ধোপে টিকল না। রুমকির জবরদস্তিতে মোছাম্মৎ রাবেয়া খাতুন হয়ে গেল রুবিতা হোসেন। ম্যাট্রিকের প্রবেশপত্র হাতে নিয়ে ওর আব্বা তো থ। রুবিতা বাথরুমে গোসল করতে ঢুকে আর বেরোতে পারছিল না। বাইরে ওর আব্বার চিল্লাপাল্লা।
‘আমার মায়ের নামে ওর নাম রেখেছিল আমার বাপজান। আমার মৃত পিতাকে অপমান করার সাহস ওকে কে দিল?’
মা গাঁইগুঁই করে মেয়েকে বাঁচানোর জন্য যা বলছিল, বাথরুম থেকে সবই শুনল রুবিতা—‘আজকালকার মেয়েদের নাম অমন পুরোনো ধাঁচের হলে চলে? আমার তো বেশ লাগছে।’
‘এই তোমার আস্কারা পেয়ে পেয়েই মেয়েটা বখে যাবে, আমি বলে রাখলাম। আবার পদ্য লেখে! মেয়েদের এত বাড়াবাড়ি ভালো না।’
যেদিন ম্যাট্রিকের রেজাল্টে রুবিতা হোসেন প্রথম বিভাগ পেল, কেবল সেদিনই ওর আব্বার রাগ পড়ল। তিনি খুশি হয়ে মেয়েকে রুবিতা বলে ডাকলেন। কাছে বসিয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়া রেশমের মতো লম্বা চুলে কয়েকবার হাত বোলালেন। বিকেলে স্থানীয় সাহিত্য পত্রিকা চর্যার হরিণী থেকে শুভেচ্ছাসহ এক তোড়া ফুল এল। রুবিতা লুকিয়ে সে ফুল বুকে রাখল। কারণ, সে ফুলে যে তার প্রেমাস্পদের ছোঁয়া লাগানো! পত্রিকার সম্পাদক জুনায়েদ কবির তার প্রাণের কবি। কিশোরীর প্রথম প্রেম। ইতিমধ্যে ওর দুটো কবিতা ছেপেছে চর্যা। ওদের মফস্বল শহরের গণগ্রন্থাগারে তিনবার দেখা হয়েছে সম্পাদকের সঙ্গে। প্রথমবার কেবল কবিতার কথা। কীভাবে অন্ত্যমিল না রেখেও ছন্দ রাখতে হবে, কবিতার বিষয়বস্তু কী হবে, চিত্রকল্পের ব্যবহার কীভাবে আনতে হবে কবিতায় ইত্যাদি। রুবিতা মানুষটিকে দেখছিল। লম্বা, একহারা, মুখে লেপ্টে থাকা পাতলা দাড়ি। গোঁফ কিন্তু ঘন ও ঠোঁটছোঁয়া। পাঞ্জাবির হাতা ভাঁজ করে খানিকটা গুটানো। বয়স ত্রিশের কম তো নয়ই। কী কণ্ঠস্বর! একবার শুধু রুবিতার কড়ে আঙুলে একটুকু ছোঁয়া। ওর পদনখ থেকে কেশাগ্র পর্যন্ত সেকি ঝড়!
রুবিতা বাড়ি ফিরে ঘুমুতে পারে না। এঘর-ওঘর, কুয়োতলা, খিড়কি দরজা, পেছনের বারান্দার শেওলাজমা সিঁড়িতে গিয়ে বসে। একটুও খেতে ইচ্ছে করে না। এই অস্থিরতার মানে কী? এটা কোন অসুখ? মা ভাবছিল, মেয়েটার হঠাৎ কী হলো! রুমকির সঙ্গে দেখা করল একদিন বিকেলে। দু-এক দিনের মধ্যেই রুমকিরা চলে যাবে ঢাকায়। গোজগাছ চলছে। রুমকি স্ট্রেটকাট রুবিতাকে বলল, ‘তুই প্রেমে পড়েছিস।’
‘ধ্যাৎ, ওরকম বয়স্ক লোক।’
‘আমার মাথা ছুঁয়ে বল তো, ওকে দেখার জন্য তোর জান ছটফট করে না?’
‘আমি জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না’—রুবিতা কেঁদে ফেলল।
‘শোন, প্রথম প্রেম তো তাই অমন লাগছে। মফস্বলে প্রেম করার অনেক ঝক্কি। চিঠি লিখবি কিন্তু সাবধান—ধরা পড়া যাবে না। যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তো আরও কেলেঙ্কারি। বিবাহিত লোকরা কিন্তু খুব শয়তান। বেশি কাছে ভিড়তে দিবি না।’
‘তুই এত সব জানলি কীভাবে? ’
‘আমার বড় আপু। ও বলে দিয়েছে, দুলাভাইদের সঙ্গে বেশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করবি না। ওরা শুধু সুযোগ খোঁজে।’
চিঠিতে মন ভরছিল না কারুরই। গ্রন্থাগারে আবার দেখা। একটু ছুঁতে মন চায়। সুযোগ বুঝে একে অন্যের হাত ধরে। রুবিতার হাতের তালু ঘেমে নেয়ে ওঠে। সারা শরীর কাঁপতে থাকে। ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। গ্রন্থাগার খানিক ফাঁকা হতেই আলমারির আড়ালে দাঁড়িয়ে রুবিতাকে বুকে টেনে নেয় জুনায়েদ। গভীর চুম্বনে ওর অনাঘ্রাতা পুষ্পের কোমল পাপড়ি-ঠোঁট দংশনে দলিত করে এক লহমায়। রুবিতা ভীরু হরিণীর মতো বুকে বই চেপে পালিয়ে যায়।
জুনায়েদ কবির বিবাহিত। একটা বছর চার-পাঁচের ছেলেও আছে। রুবিতা যে জানে না তা নয়। কিন্তু জুনায়েদের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ ওকে ‘ন্যায়-অন্যায় জানিনে জানিনে জানিনে শুধু তোমারে জানি’ বলে প্রতিনিয়ত তুমুল আন্দোলিত করত। জুনায়েদ লিখেওছিল, ‘প্রিয়তমা আমার, তোমার জন্যে আমার প্রথা ভাঙতে ইচ্ছে করে। গদ্যে বসবাস করতে করতে আমার জীবন ঊষর মরু। কবিতার ঝরনাতলায় অবিরল ভিজতে চাই। তুমি কি নিয়মভাঙা ঝরনা হতে পারো না?’
নিয়ম ভাঙতে পারেনি রুবিতা। সে কি আর সম্ভব ছিল? ভালো কলেজে পড়ার ইচ্ছা, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, মর্যাদাপূর্ণ চাকরি রুবিতাকে কাব্যকলার অধিক টানত। তা ছাড়া একজন বিবাহিত সংসারী মানুষকে সংসারবিচ্ছিন্ন করে এলাকায় মুখরোচক খবর জন্ম দেওয়ার সাহসও ওর ছিল না। একদিন জুনায়েদের পাঠানো সব চিঠি ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ঠোঁটে প্রথম প্রেমের অমোচনীয় স্পর্শ সঙ্গে নিয়েই চলে গিয়েছিল দূরে। তারপর পড়াশোনা, বিয়ে। চাকরি করারও ইচ্ছে ছিল ওর। নাফিস তেমন গা করেনি। তবে কবিতা ছাড়েনি রুবিতা। বিয়ের পরপর ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা পাঠাত। অনেক দিন কেউ ছাপেনি। মাত্র পাঁচ-ছয় বছর হলো ওর কবিতা বেরোচ্ছে। ইতিমধ্যে নাফিসের উদ্যোগে দুটো বইও বের হয়েছে। ইদানীং পত্রিকাআলারা যখন ওর কাছে ফোন করে কবিতার জন্য অনুরোধ করে, তখন নিজেকে পৃথিবীর সেরা সুখী মানুষ মনে হয় রুবিতার।
৩. টিভিতে একটা প্রিয় সিনেমা দেখতে দেখতে যান্ত্রিক গোলযোগে যেমন হঠাৎ ছবি স্থির হয়ে যায়, তেমনি ফোনকলটার পর নিজের কবিতার প্রথম লাইনের ওপর রুবিতার চোখ স্থির হয়ে যায়।
‘হ্যালো’।
‘হ্যালো, কে?’—রুবিতা ভেবেছিল নিশ্চয় বন্ধুরা কেউ তার কবিতাটা পড়েই উচ্ছ্বসিত।
‘রাবেয়া? আমি জুনায়েদ কবির।’
সেই মুগ্ধ করা কণ্ঠস্বর। কবে যেন রুবিতা কোনো এক পত্রিকায় পড়েছিল, এলিজাবেথ টেইলর তার প্রেমিক ও স্বামী রিচার্ড বার্টন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিল, ‘কেবল তার কণ্ঠস্বরই আমাকে যৌন উত্তেজনার শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ প্রায় পঁচিশ বছর পর সেই কণ্ঠস্বর! রুবিতার নিজের বুকের শব্দ কানে এসে লাগছে। কিন্তু রাবেয়া নাম জানলেও জুনায়েদ তো ওকে সব সময় রুবিতা নামেই ডেকেছে। আজ আবার রাবেয়া কেন? রাগ হচ্ছিল ওর।
‘কী খবর? কেমন আছেন?’
‘এই তো। তোমার কবিতা পড়লাম।’
‘হুম। ফোন নম্বর পেলেন কোথায়?’
‘ওই পত্রিকা অফিস থেকে। ভালো হয়েছে কবিতাটা।’
‘আপনি আর লেখেন না তো।’
‘কবিদের বেঁচে থাকার জন্য অনুপ্রেরণা চাই।’
‘তাই’,—বলে কিছুক্ষণ দু-প্রান্তই চুপচাপ। রুবিতা চাচ্ছিল দ্রুত কথা শেষ হোক।
‘তোমার সব খবরই রাখি। তুমি ভালো আছ জেনে ভালো লাগে। আমারও তো একটু ভালো থাকতে ইচ্ছে করে।’
‘থাকুন না।’
‘থাকাটা এ মুহূর্তে অনেকটাই তোমার ওপর।’
‘কীভাবে?’—রুবিতার হাতের তালু পায়ের তালু ঘেমে একাকার। প্রথম দিনের ঘাম নয়, এ ঘাম যেন কালঘাম। ‘তোমার স্বামী বড় চাকুরে। ওদের মন্ত্রণালয় থেকে একটা চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। আমার ছেলে আবেদন করেছে। এবারই ওর চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে। তেমন মেধাবী নয়। এত দিনে কিছুই করতে পারেনি। তোমার স্বামীকে বলে যেভাবেই হোক আমার ছেলের চাকরিটা পাইয়ে দিতে হবে।’
‘কিন্তু ও তো একটু অন্য টাইপের। ওকে এ সব বলা যায় না। যোগ্যতা থাকলে নিশ্চয় হবে।’
‘আমলারা কী টাইপের হয়, তা সবাই জানে। কাজটা তুমি করে দেবে।’—জুনায়েদের কণ্ঠে আদেশের সুর।
‘কিন্তু...’—রুবিতা আবারও নাফিসের সৎ গুণ নিয়ে বলার চেষ্টা করে।
‘তুমি ছিঁড়ে ফেললেও আমি কিন্তু তোমার সব চিঠিই রেখে দিয়েছি।’—খানিক বাদে জুনায়েদ বলে, ‘পরে আবার ফোন করব।’ ফোন লাইনটি কেটে দেয় এরপর।
বাইরে অনেক বাতাস। যেদিন পত্রিকায় রুবিতার কবিতা আসে, সেদিন ওর প্রকৃতি হয়ে ওঠে সদ্য নেয়ে ওঠা নতুন ষোড়শী। ঝলমলে, টানটান আর ভীরু ভীরু। যেন ওর নিজের যৌবনেরই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আজ জোর বাতাসের এই সকালে ও যেন অশুভ সাইক্লোনের পদধ্বনি শুনতে পেল। দমকা বাতাসে ওর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাতের মুঠো থেকে অনায়াসে উড়ে গেল সাময়িকীর পাতাটা।
রুবিতার বুকের ওপর থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিয়ে ওকে প্রায় অনাবৃত করে দিচ্ছে বাতাস।

সড়ক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে by আনোয়ার হোসেন

পেশাদার মোটরগাড়ি চালকদের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে আইনের কোনো শর্তই মানছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। শর্ত না মেনে বা যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই গত ছয় মাসে প্রায় ৩২ হাজার পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ যানবাহন চলছে ফিটনেস সনদ ছাড়া।
এই অবস্থায় দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। ১৫ জুলাই থেকে গত শনিবার পর্যন্ত ঈদকালীন ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫২ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ঈদের পরদিন সিরাজগঞ্জে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ১৭ জনের। এর মধ্যে একটি বাসের ফিটনেস সনদ ছিল না। গত বছরের অক্টোবরে নাটোরে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৬ জন প্রাণ হারায়। ওই বাসের ফিটনেস সনদ ছিল না। এ জন্য তদন্ত কমিটি মালিকদের দায়ী করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালাচ্ছি। এরপরও পরিস্থিতি আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না।’ এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিকদের দিক থেকে বাধা বা চাপ আছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, কঠোর অবস্থানে গেলে জনগণকে জিম্মি করে মালিক-শ্রমিক ধর্মঘট ডেকে বসে। তখন জনগণের কথা ভেবে নমনীয় হতে হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৪ সালে মারা গেছে সাড়ে আট হাজার মানুষ। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ২ হাজার ৬৭। সড়ক নিরাপত্তার মূল পাঁচটি বিষয় হচ্ছে—ত্রুটিমুক্ত যান ও সড়ক, যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া লাইসেন্সধারী দক্ষ চালক, সড়কের পরিবেশ এবং আইনের প্রয়োগ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো উপেক্ষিত।
দেশে ত্রুটিমুক্ত সড়ক ও যানবাহন এবং যথাযথ পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। মোটরযান-সংক্রান্ত আইন হালনাগাদ করাও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু কোনোটাই সঠিকভাবে হচ্ছে না। বরং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে আরেক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠনের চাপ ও সুপারিশে।
সড়কে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তও নেন তিনি। সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয় না। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইন মানা এবং সড়ক ত্রুটিমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণাতেই থেকে গেছে। মোটরযান আইন পরিবর্তনের জন্য করা খসড়াটিও দুই বছর ধরে ঝুলে আছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ত্রুটিপূর্ণ যান ও যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে চালক নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। বর্তমানে শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এর কার্যকরী সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। শাজাহান খানের পরিবারের বাসের ব্যবসাও আছে। আর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান। সমিতির নেতাদের বেশির ভাগই সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
গত জানুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলন শুরু হলে এর বিরুদ্ধে পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের নিয়ে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেন শাজাহান খান। এর আগে ২০১১ সালে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরকে চাপা দেওয়া বাসের চালককে গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে ঢাকায় সমাবেশ করে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। এরপর বাসচালক ছাড়া পেয়ে যান।
শাজাহান খানের শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার পেশাদার চালককে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিয়েছে বিআরটিএ। এরপর ২০১০-১১ সালেও একইভাবে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন শাহজাহান খান ও তাঁর সংগঠন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দিতে বলিনি। আমরা বলেছি, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ঠিকভাবে নেওয়া হোক। লিখিত পরীক্ষাটা একটু শিথিল করা হোক। বিআরটিএ যদি তাদের লোকবলের অভাবে এটি করতে না পারে, সেটি তাদের সমস্যা। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই।’ তিনি দাবি করেন, একসময় ফিটনেস ও লাইসেন্সের ব্যাপারে মালিক-শ্রমিকদের প্রভাব থাকত, এখন তা নেই।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন খাতের সুবিধাভোগী হচ্ছেন রাজনীতিকেরা। আর এই খাতের এক নম্বর সমস্যা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
ছয় মাসে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ৩২ হাজার পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন। শাজাহান খানের ফেডারেশনের তালিকা ধরে ১৯৯০ সাল থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার লাইসেন্স প্রদান মোটরযান আইন মানলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অদক্ষ চালক—কোনোটারই সড়কেই থাকার কথা নয়। আর দায়ী চালকদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য মোটরযান আইন যুগোপযোগী করার ব্যাপারেও সরকারের আগ্রহ নেই বললেই চলে। সড়কের পরিবেশ ঠিক করার জন্য অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইক এক যুগ আগে নিষিদ্ধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।
মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দেশের বাইরে থাকায় এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কোনোমতে লাইসেন্স নবায়ন: মোটরযান আইনে তিন বছর পরপর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন করার কথা বলা আছে। লাইসেন্স সংগ্রহ করার সময় যেমন শারীরিক ও কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি বোর্ডের’ মাধ্যমে তা নিতে হয়। নবায়নের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম মানতে হবে। আর বোর্ডের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের।
আইনে কারিগরি ও শারীরিক সক্ষমতার অন্তত ২৪টি শর্ত পূরণ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে কীভাবে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেতুর ওপর দিয়ে কীভাবে যানবাহন চালানো যাবে, সড়কের সংকেতব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিসীমার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখার নিয়ম।
কিন্তু বিআরটিএ গত ফেব্রুয়ারি মাসে ওই বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে একজন মোটরযান পরিদর্শককে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন দীর্ঘদিন ধরেই পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের শর্ত শিথিলের এই দাবি জানিয়ে আসছিল।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, একজন মোটরযান পরিদর্শকের পক্ষে এসব পরীক্ষা যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবের কথা চিন্তা করে মোটরযান পরিদর্শকও পরীক্ষা না নিয়েই লাইসেন্স নবায়ন করে দেন।
বিআরটিএর হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে গত রোববার পর্যন্ত সারা দেশে পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ৩২ হাজার ৭১টি। মাসে গড়ে ২৫ দিন কর্মদিবস ধরলে দৈনিক গড়ে লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ২১৪টি। নবায়ন হওয়া লাইসেন্সের প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে বিআরটিএর মিরপুর ও ইকুরিয়া কার্যালয় থেকে। বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে যথাযথ পরীক্ষা নিয়ে বিপুলসংখ্যক এই লাইসেন্স নবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
পরীক্ষা ছাড়া ছয় মাসে ৩২ হাজার পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্বাভাবিক এই সংখ্যাটা বিবেচনায় নিলাম। অচিরেই সভা ডেকে এটি পর্যালোচনা করা হবে।’
কম্পিটেন্সি বোর্ড কার্যকর নয়: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মোটরযান আইনে সব ধরনের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য যে কম্পিটেন্সি বোর্ডের কথা বলা হয়েছে, তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ঢাকায় সপ্তাহে দুই দিন একসঙ্গে তিনটি স্থানে এ ধরনের বোর্ড বসে। ঢাকার বাইরে বসে সুবিধাজনক সময়ে। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তা বলে বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যই নিজেরা না এসে অধস্তন প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে দেন। অনেকের প্রতিনিধিও আসেন না।
বোর্ড ঠিকভাবে না বসা এবং যথাযথ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকার অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো মোটরযান পরিদর্শকের মাধ্যমে লাইসেন্স নবায়নের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে চালকের লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ। এর মধ্যে পেশাদার চালকের লাইসেন্স প্রায় আট লাখ। বাকিরা অপেশাদার।
ফিটনেস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: দেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে এক লাখ ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা-অটোটেম্পো চলাচল করছে। এরপরই ট্রাকের সংখ্যা—প্রায় ৪১ হাজার। এমন বাস-মিনিবাস রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। বাকিগুলো অন্যান্য যানবাহন।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল এবং এগুলোর ফিটনেস সনদ নিতে হয় না। আর কিছু যানবাহন অকেজো হয়ে গেছে।
অবশ্য ফিটনেস সনদ থাকা না-থাকা প্রায় সমানই। বাস-ট্রাকের যেগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, এগুলোর বেশির ভাগই বিআরটিএ কার্যালয়ে না গিয়েই সনদ নিয়ে থাকে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন একদিকে যেমন সড়ক নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তেমনি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একটা যানবাহনের ফিটনেস দিতে ৪২টি পরীক্ষা করার নিয়ম। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিতেও ঘাটতি আছে। ফলে দেশে এখনো প্রায় আট লাখ চালকের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরা এই কাজ পারছে না। তাই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোটরযান আইনটিও দায়ী। এটি যুগোপযোগী করার উদ্যোগও গতি পাচ্ছে না ওই প্রভাবের কারণে। এই অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনের সংস্কার ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

‘কোমেন’ বিপর্যয়- উপকূলজুড়ে আতঙ্ক, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, নিহত ৬, আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ লাখ মানুষ

সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ ও কক্সবাজারে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় কোমেন। ধীরে ধীরে চট্টগ্রামের দিকে এগুচ্ছে ঘূর্ণিঝড়টি। গতকাল ভোরে কোমেন নামের ওই ঘূর্ণিঝড়টি সেন্ট মার্টিনে আঘাত হানে। একই সময়ে এটি টেকনাফেও আঘাত হানে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত  ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’-এর প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে ৩ জন ও আশ্রয়ণ কেন্দ্রে উঠার সময় হুড়াহুড়িতে ১ জনসহ মোট ৬ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কোমেনের আঘাতে প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ। সারা দেশের নৌ-চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঘ?ূর্ণিঝড়ের কবল থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল থেকে প্রায় বিশ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আবাহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কোমেন একই স্থানে স্থির রয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাতে দুর্বল হয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. অনুপম সাহা জানান, সকাল ১০টার দিকে কক্সবাজারে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় কোমেন। এরপর থেকে কক্সবাজার শহর ও আশপাশে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। তীব্র বাতাস বয়ে যাচ্ছে। এর আগে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছিল, গতকাল দুপুর নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূল হয়ে বরিশাল উপকূল অতিক্রম করতে পারে। আবহাওয়া অফিস কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ৭ নম্বর, পায়রা ও মংলা বন্দরকে ৫ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ আতঙ্কে সকাল থেকে স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরীর জীবনযাত্রা। বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করবে ঘূর্ণিঝড় কোমেন আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রয়েছে জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা। কয়েকদিন ধরে টানা বর্ষণ চলছিল এমনিতেই। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বুধবার রাত থেকে বৃষ্টির সঙ্গে বইছে দমকা বাতাস। তাই আতঙ্ক একটু বেশিই ছিল নগরবাসীর। বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ ছিল একই চিত্র। সকাল থেকে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ কিছুক্ষণ পর পরই আসা-যাওয়া করছিল। তাই দিনের বেলাতেও অনেকটা অন্ধকারে দিন কাটাতে হচ্ছে নগরবাসীর। এদিকে জেলা প্রশাসন থেকে নগরীর স্কুল-কলেজগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বুধবার রাতেই। তাই বৃহস্পতিবার কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু নগরীর সরকারি অফিস, আদালত , ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকায় নগরবাসীকে সকাল থেকে তাদের কর্মস্থলে ঠিকই যাত্রা করতে হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় রাস্তায় যানবাহন চলছে স্বাভাবিকের চেয়ে কম। তাই যানবাহন সঙ্কটে কোথাও কোথাও রাস্তায় লোকজনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে দুর্যোগের ঘনঘটার মধ্যে রাস্তা-ঘাটে লোকজনের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। অনেকেই বাসায় থেকে বের হননি। ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত আশঙ্কামুক্ত হতে পাছেন না কেউই। নগরীর পাহাড়তলী এলাকার গৃহিণী আমেনা বেগম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় নিয়ে আতঙ্কে আছি। তবে বাচ্চাদের স্কুল ছুটি দিয়ে দেয়ায় ভাল হয়েছে। কাউকে বাইরে যেতে হচ্ছে না।’ এদিকে এমন পরিস্থিতির মাঝেও অফিসে যেতে হচ্ছে বলে জিইসি মোড়ে গাড়ির অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকা নূর চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বৃষ্টি বাদলের মাঝেও অফিস করতে হচ্ছে। তার ওপর আবার ‘কোমেন’ আসছে। অথচ অফিস বাদ দেয়ার উপায় নেই।
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’-এর প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে মো. ইসলাম (৫০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোরের দিকে এই ঘটনা ঘটে। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান খন্দকার এই মৃত্যু ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্তের খবর নিশ্চিত করে বলেছেন, ঝড়ো বাতাসে দ্বীপের বেশ কিছুসংখ্যক নারকেলগাছ উপড়ে পড়েছে। তবে আর কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঝড়ে গাছপালা উপড়ে পড়ার পাশাপাশি শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রকৃতির নিষ্ঠুর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে প্রায় ৩০০০ ঘর-বাড়ি, পাহাড়ী সড়কের গাছ। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে গাছ চাপায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। উপকূলীয় ইউয়িনের সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে ৭০০০ লোক আশ্রয় নিয়েছে।  মঙ্গলবার রাত থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ।
সূত্র জানায়, নিহত পশ্চিম পাড়ার অলি আহমদের ছেলে মো. ইসলাম (৫৫)। হ্নীলা লেচুয়াপ্রাং এলাকার মৃত হাজত আলীর ছেলে মোহাম্মদ ইসমাঈলের উঠানে থাকা বিরাট তুলা গাছ গোয়াল ঘরে পড়ে ৩টি গরু মারা গেছে। এ ছাড়া প্রবল বাতাসে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৫-৬ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে শাহপরীরদ্বীপবাসীসহ নিম্নাঞ্চল এলাকার মানুষগুলো পানিবন্দি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে শাহপরীরদ্বীপবাসী।   সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রচুর পরিমাণ নারিকেল গাছ ভেঙ্গে বাড়িতে পড়ে বাড়ি ঘর, হোটেল মোটেল বিধ্বস্ত হয়েছে। শতাধিক ফিশিং ও সার্ভিস বোট বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙ্গে গেছে। দ্বীপের পশ্চিম পাড়া, ডেইল পাড়া, পূর্ব পাড়া, মাজের পাড়া, কোনার পাড়া, নজরুল পাড়া, দক্ষিণ পাড়ার বিভিন্ন ঘর  বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙ্গে যায় বাড়িয়ারী বাঁধ। সেন্টমার্টিন সার্ভিস বোট মালিক সমিতির সভাপতি আবু তালেব জানান, কয়েকটি সার্ভিস বোট বঙ্গোপসাগরে  নোঙ্গর অবস্থায় হারিয়ে গেছে। তার মালিকানাধীন সার্ভিস বোটটিও হারিয়ে গেছে। সাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৫-৬ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। কোস্টগার্ড ভবনসহ, স্কুল, সাইক্লোন শেল্টার, হাসপাতালে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে দ্বীপবাসী। ফলে আতঙ্কে রয়েছে গোটা সেন্টমার্টিনবাসী। নিরাপদে আশ্রয়ের জন্য মাইকিং অব্যাহত রেখেছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। হ্নীলায় বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে নাফ নদীর পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে দমদমিয়া, হোয়াব্রাং, চৌধুরীপাড়া, রঙ্গিখালী নিম্নাঞ্চল। একই অবস্থা হোয়াইক্যং ইউনিয়নেও। সেখানেও গাছচাপা পড়ে ও বাতাসে ঘর-বাড়ি এবং ঘেরা বেড়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে উনছিপ্রাংসহ নিম্নাঞ্চল। পানিতে তলিয়ে গেছে চিংড়ি ঘের। সড়কের উপর গাছ পড়ায় সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও দ্রুত সরিয়ে ফেলায় যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সাগর ও নদী উত্তাল থাকায় টেকনাফ-মিয়ানমার ট্রানজিটের যাত্রী ও সেন্টমার্টিনে পারাপারের নৌ-চলাচল ৪ দিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে। চলাচল বন্ধ রয়েছে স্থলবন্দরের সকল প্রকার মালামাল বহনের ট্রলার। নিরাপদের অবস্থান করছে বন্দরে অবস্থানরত সকল ট্রলার । ভারি বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ায় সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মোজাহিদ উদ্দিন জানান, গতকাল বুধবার থেকে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং উপকূলীয় ইউনিয়ন সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপে ৩টি করে পৃথক ৬টি টিম গঠন করা হয়েছে। টিমগুলো সেন্টমার্টিন ও সাবরাংয়ে সর্বশেষ খবরাখবর তদারকি করছে। এ ছাড়া উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগ নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার জন্য প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে এবং শুকনো খাবার মজুদ রাখা হয়েছে। ৬০টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৭০০০ লোক নিরাপদে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হোটেলসহ অস্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’-এর প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে জেলার গলাচিপায় এক ব্য?ক্তি মারা গেছেন। তার নাম মো. নুরুল ইসলাম ফকির (৫২)।
সূত্র জানায়, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যাণ কলস গ্রামে বেলা ১১টার দিকে গাছের নিচে চাপা পড়েন নুরুল ইসলাম। দুপুর ১২টার দিকে তাকে উদ্ধার করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার আগেই তিনি মারা যান। গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুব আলম এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী কালাম খান জানান বেলা ১১.৩০ মি. সময় বৃষ্টি ও হালকা বাতাস হচ্ছিল। এ সময় স্থানীয় একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল নুরুল ইসলাম ফকির। হঠাৎ  সেখানে পার্শ্ববর্তী একটি চাম্বল গাছ ভেঙ্গে পড়লে ঐ গাছের চাপায় নুরুল ইসলাম ফকির নিহত হয় ।
এদিকে বন্ধ রয়েছে সকল  প্রকার লঞ্চ চলাচল। ঘূর্ণিঝড় কোমেন মোকাবিলায় পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন গতকাল সকাল দশটায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলায় দুইশটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ৫০ জন যুব রেড ক্রিসেন্ট কর্মী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিপিপির ২৭৫ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যরা তাদের লোকজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার প্রসু্ততি নিয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জিআর ১শ মেট্রিক টন চাল ও পর্যাপ্ত নগদ টাকা জমা আছে বলেও জানান। এ ছাড়া উপকূলের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে দুর্যোগকালীন মানুষ আশ্রয় নিতে পারে সেজন্য খোলা রাখা হয়েছে। সভায় জেলা দুর্যোগ ব্যস্থাপনা কমিটির সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে: ঘূর্ণিঝড় কোমেন ধেয়ে আসায় চট্টগ্রামে যে যেদিকে পারছে  আশ্রয় নিচ্ছে । এরই মধ্যে গাছ চাপায় একজন মারা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে নিহতের নাম জানা যায়নি। এ নিয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছে চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা বাঁশখালী, আনোয়ারা , সন্দ্বীপ, মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড এলাকার মানুষ ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে জেলা প্রসাশনের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি ২৭৮টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ২৩৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে সন্দ্বীপ উপজেলায় ৬২টি,বাঁশখালীতে ১০০টি ,আনোয়ারাতে ২০টি, সীতাকুণ্ডে ২০টি, মিরসরাইতে ২৭টি এবং মহানগরে ৪টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাশ জানিয়েছেন, যে যেই দিকে পারছে আশ্রয় নিচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষরা গতরাত থেকে সরে যাওয়া শুরু করেছে।
উপজেলার ছনুয়া, গন্ডামারা শেখের খিল ও গন্ডামারা ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, এসব ইউনিয়নের সমুদ্র নিকটে বসবাসকারীদের প্রায় সবাই নিজদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে, জানান তিনি।
সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানিয়েছেন, দ্বীপের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো খুলে দেয়া হয়েছে, অনেকেই এসব সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছে, আরও অনেকে আশ্রয় নেয়ার জন্য এখনও আসছে।
সমুদ্র তীরবর্তী আনোয়ারা উপজেলার ও একই পরিস্থিতি বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ।
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে জানান, আশ্রয়ণ কেন্দ্রে উঠার তাড়াহুড়াতে তানজিনা বেগম নামে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে । শিশুটির বাড়ি হাতিয়া উপজেলার পশ্চিম সোনাদিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে। হতভাগ্য শিশুর পিতা আজমীর হোসেন ও মাতা মর্জিনা বেগম।
এদিকে, রেডক্রিসেন্ট ৫শ ১৩টি আশ্রয়ণ কেন্দ্রের জন্য ৫ হাজার লোক মোতায়েন করেছে।  নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ২৫’হাজার লোক। গতকাল মীরওয়ারিশপুর ইউনিয়নের ৫ গ্রামে ২৫ কিলোমিটার কাঁচা ও ১৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও ৫০০টি মাছের খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার জন্য এখানে ত্রাণ এসেছে মাত্র দেড় টন টাউল ও আড়াই হাজার টাকা সরকারি ত্রাণ পৌঁছায় এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় কোমেন। এর প্রভাবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সূবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত রয়েছে। সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলসমূহকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার চরএলাহি, চরফকিরা, মুছাপুর ইউনিয়ন, কবিরহাট উপজেলার ঘোষবাগ, ধানশালিক, ধানসিঁড়ি উপজেলা, সূবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর, চরবাটা, চরক্লার্ক, চরওয়াপদা, চরজুবলী, আমানউল্লাহ, পূর্ব চরবাটা, মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন এবং হাতিয়া উপজেলার সবগুলো ইউনিয়ন ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিমধ্যে এসব উপজেলা গুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য, কোম্পানীগঞ্জে ৩৩টি আশ্রয়কেন্দ্র, ১৩টি মেডিক্যাল টিম, কবিরহাটে ২২টি আশ্রয়কেন্দ্র, ১২টি মেডিক্যাল টিম, সূবর্ণচরে ৯৪টি আশ্রয়কেন্দ্র, ৭টি মেডিক্যাল টিম, হাতিয়া ১৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্র ও ৪টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়াও উপজেলাগুলোর সকল সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু হাসনাত মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, মঙ্গলবার রাত থেকে উপজেলার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে অন্তত ২৫ হাজার লোকজনকে নিরাপদে ৩০টি আশ্রয়ণ কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছে। সাগরে রেডএলার্ট জারি করে সকল মাছ ধরার নৌকাসহ জেলেদের নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। নোয়াখালী জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) অনুপম বড়ুয়া জানান, জেলার ৪টি উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের নিরাপত্তার জন্য সবধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও দুইজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দুটি উপজেলা করে ৪টি উপজেলায় দায়িত্ব পালন করবেন।
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড় কোমেন কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল অতিক্রম করছে। এর ফলে আতঙ্ক কাটছে না জেলাবাসীর। তবে থেমে থেমে ধমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ড. অনুপম সাহা জানান, জেলার ৯৬টি আশ্রয়ণকেন্দ্রে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রিত লোকদের শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুর্গত এলাকার মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। তিনি বলেন, জেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ছুটি ঘোষণা করে আশ্রয়ণ কেন্দ্রের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি ছুটি বাতিল করেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মওসুমী নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল রয়েছে। বাতাসের গতিবেগ সর্বোচ্চ ৫৪ থেকে ৬২ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবাহিত হচ্ছে। যা দমকা হাওয়া অথবা ঝড়ো হাওয়া আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় কোমেন আতঙ্কে সময় পার করে মানুষ। আতঙ্কিত লোকজন রাত থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া শুরু করে। জেলা প্রশাসন কার্যালয়, পৌরসভা ভবন, বিভিন্ন স্কুল কলেজ ভবন হয় তাদের আশ্রয়স্থল। ৭ নম্বর মহা বিপদ সংকেত ঘোষণা পর থেকে (রাত ১১টা) উপকূলীয় এলাকায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাইকিং শুরু হয়। প্রথম দিকে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে না আসলে ও শেষ রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা শুরু করে।
ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে কক্সবাজারে ৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। এতে জেলার ৮ উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে এ জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুর রহমান জানান, বাঁকখালী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে ৩৪ সেন্টিমিটারে প্রবাহিত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই পানির স্তর থাকে এরও ১০ সেন্টিমিটারের নিচে। তবে মাতামুহুরী পানির উচ্চতা রয়েছে স্বাভাবিক। যদি ভারী বর্ষণ হয় তাহলে অতিরিক্ত বেড়ে যাবে পানির উচ্চতা।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জলোচ্ছ্বাসে সদর উপজেলার ৬টি, রামুর ১টি, চকরিয়ার ৪টি, পেকুয়ার টি, কুতুবদিয়ার ৭টি, মহেশখালির ৩টি, উখিয়ার ১টি ও টেকনাফের ২টি ইউনিয়ন কোমেনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিজিবি-বিজিপি পতাকা বৈঠক বাতিল: এদিকে গতকাল মিয়ানমারের জলসীমা থেকে উদ্ধার হওয়া অভিবাসী প্রত্যাশীদের মধ্যে বাংলাদেশী হিসেবে শনাক্ত হওয়া ১৫৯ জনকে পতাকা বৈঠকের মধ্যে ফেরত আনার কথা থাকলে ও দুর্যোগ এর কারণে তা বাতিল করা হয়েছে বলে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার এম এম আনিছুর রহমান জানিয়েছেন।
বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ: সম্ভাব্য ঝড়ো হওয়া, জলোচ্ছ্বাস ও বিরূপ আবহাওয়াজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে সবধরনের বিমান অবতরণ ও উড্ডয়ন বন্ধ ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ। সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি কক্সবাজারের কাছাকাছি চলে আসায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বুধবার রাত ১১টায় এ ঘোষণা দেয়া হয়। গতকাল সকালে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সাধন কুমার মোহন্ত জানান, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিমানবন্দরের যাবতীয় উপকরণ ও যন্ত্রপাতি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ও রানওয়ের লাইটিং সিস্টেম ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিমান বন্দরে থাকবে। সমুদ্র থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরত্বে অবস্থিত কক্সবাজার বিমানবন্দরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস জনিত ক্ষতি এড়াতে আরও নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ৭নং বিপদ সংকেত বলবত থাকায় কক্সবাজার থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী ইতিপূর্বের নির্ধারিত সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক বেসরকারি এয়ার লাইন্সের কর্মকর্তারা।
মংলা প্রতিনিধি  জানান,  ঘূর্ণিঝড় কোমেনেরে প্রভাবে মংলা বন্দরে ৫নং বিপদ সংকেত বহাল রাখায় বন্দরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর পণ্য খালাস বোঝাই কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে । দুর্যোগ মোকাবিলায় মংলা উপজেলা প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে ৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে। এর মধ্যে একটি খাদ্যবাহী জাহাজ (গম) রয়েছে। নিরাপদ অবস্থানে রাখা হয়েছে বন্দরে অবস্থানরত দেশী-বিদেশী সকল বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে। বঙ্গোপসাগর উত্তাল, সাগর ও নদী পথে চলাচলকৃত মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাসহ সকল ধরনের নৌযান নিরাপদে অবস্থান নিয়েছে। বুধবার রাতে ৫নং বিপদ সংকেত জারির পর থেকে পৌর এলাকাসহ সকল ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি),উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সচেতন করতে মাইকিং করা হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা উপজেলার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মংলা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেনের’ জন্য কন্টোল রুম খোলা, মেডিক্যাল টিম গঠন,ডাক্তারদের ছুটি বাতিল করা,ফায়ার সার্ভিসকে প্রস্তুত রাখা,শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা এবং পৌরসভাসহ সকল জায়গায় মাইকিং করে পানি বেড়ে গেলে তাদের মালামাল দ্রুত সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। সকল মুদি ব্যবসায়ীদের দোকানে শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদিকে দুপুর ১টার পর থেকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় এখানকার ইউনিয়নগুলোর ৩৯টি সাইক্লোন শেল্টার খুলে রাখা ও দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষের আশ্রয়ের জন্য সকল বহুতল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুপুর ১টার পর থেকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড়ের কোমেন মোকাবিলায় বাতিল করা হয়েছে জেলার সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জেলার অভ্যন্তরীণ ও ঢাকাগামী সব ধরনের লঞ্চসহ নৌ-চলাচল। সুন্দরবনে জারি করা হয়েছে রেড এলার্ড। জেলার ২০৭টি সাইক্লোন শেল্টার খুলে দেয়ায় সকাল থেকে সেখানে আতঙ্কিত হাজার-হাজার মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে। গতকাল  সকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টায় সভা শেষে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সার্বক্ষণিক দুর্যোগ প্রস্তুতি মনিটরিং এর জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। মাইকিং করে জেলা উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল ও মংলা এলাকায় জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে একাধিক মেডিক্যাল টিম ও স্বেচ্ছাসেবকদের। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে তাদের কর্মস্থলে থাকতে বলা হয়েছে। কোমেনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘রেড এলার্ড’ জারি করেছে সুন্দরবন বিভাগ।
স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেনের’ কারণে শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-রুটের বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যাত্রী পারাপারে লঞ্চ, সিবোট ও ট্রলারসহ ছোট ছোট সব ধরনের নৌ-যান। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এসব নৌযান। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এ রুটে চলাচলরত সাধারণ যাত্রীদের। শিমুলিয়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ’র উপপরির্দশক তোফাজ্জল হোসেন পাটোয়ারি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় কোমেনের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় এসব নৌযান বন্ধ রাখা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে আসলে ওইসব নৌযান পুনরায় চালু করে দেয়া হবে।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর কারণে চট্টগ্রামে বুধবার রাতে ৭নং বিপদ সংকেত ও গতকাল ৮নং বিপদ সংকেত থাকায় সীতাকুণ্ডে মহাসড়ক ও বাজারগুলো ছিল প্রায় মানবশূন্য।
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান,  নোয়াখালীর বিছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলায় নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়া প্রচণ্ড দমকা বাতাস, ঝড়ো হাওয়া, ভারি বর্ষণে উপজেলা নিঝুমদ্বীপ,নঙ্গলিয়া,নলেরচর.কেয়ারিংচর নলচিরা, সুখচর, তমরদ্দি, চরঈশ্বর, চরকিং, সোনাদিয়া ও হাতিয়া পৌরসভার অর্ধশতাধিক গ্রাম জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। দমকা বাতাস,ঝড়ো হাওয়া ও ভারি বর্ষণে কাঁচা ঘরবাড়ি গাছপালা বিদ্যুৎ লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন সড়কে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ১ শত কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ৫ হাজার গাছপালা ভেঙ্গে ও উপড়ে যায়। নলচিরা ইউনিয়নের ৩টি স্থানে বেড়িবাঁধ ছিড়ে যাওয়ায়,ভাঙা বেড়ি মেরামত না করা ও নিঝুমদ্বীপসহ চরাঞ্চলে বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করার কারণে জোয়ারে এসব এলাকা দিয়ে প্রতিদিন পানি ঢুকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
কুয়াকাটা প্রতিনিধি জানান,  কুয়াকাটায় উপকূলীয় অঞ্চলে ৫ নং নাম্বার বিপদ সংকেত জারি। প্রশাসনের নেই কোন উদ্যোগ। আবহাওয়া অফিস থেকে উপকূলীয় এলাকাগুলোকে ৭ নাম্বার বিপদ সংকেত জারিতে স্থানীয় প্রশাসনের কোন ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। নিম্নাঞ্চলের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার কোন সংকেত পাচ্ছে না এ অঞ্চলের সাগর পারের বঙ্গোপসাগরের “কোমেন” আঘাত হানতে পারে।

মালয়েশীয় গ্রামে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের কবরের সারিঃ নাম–পরিচয় নেই আছে কেবল নম্বর by শরিফুল হাসান

বৃষ্টিতে ভেজা মাটি। সারি সারি কবর। প্রতিটি কবরের ওপর একটি করে ফলক। ফলকগুলোতে কোনো নাম-পরিচয় নেই, খোদাই করা আছে কেবল একেকটি নম্বর। মালয়েশিয়ার থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী কেদাহ রাজ্যের পকোকাসেনা জেলার কামপাং তুলাং গ্রামের রাবার বাগানের পাশে রয়েছে এসব কবর। প্রায় ৫০ বছর আগে পরিত্যক্ত এই কবরস্থানে ১০৬ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে। নতুন এই কবরগুলো মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের। তাদের নাম-পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। কখনো হবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে কামপাং তুলাং গ্রামের দূরত্ব ৪৩৫ কিলোমিটার। মালয়েশিয়ার ডেইলি মেইল পত্রিকার উত্তরাঞ্চলের বিশেষ প্রতিনিধি অরুলদাশকে সঙ্গে নিয়ে কয়েক দিন আগে গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায় কবরগুলো, কথা হয় স্থানীয় লোকদের সঙ্গে।
গত ১ মে থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশের গভীর জঙ্গলে প্রথম গণকবর আবিষ্কৃত হয়। মালয়েশিয়ায়ও এমন গণকবর থাকার অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে। তবে সাংবাদিক অরুলদাশের একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২৪ মে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ অনেক কবর পাওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর থাইল্যান্ড সীমান্ত-সংলগ্ন পারলিস রাজ্যের ওয়াংকিলিয়া থেকে ১০৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আশপাশে বড় কোনো সরকারি হাসপাতাল না থাকায় কেদাহ রাজ্যের সুলতানিয়া বাহিয়া হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর মরদেহগুলো কামপাং তুলাং গ্রামে দাফন করা হয়।
গ্রামটির রাবার বাগানের পাশের ওই কবরস্থানে গিয়ে মাটি দেখেই বোঝা গেল কবরগুলো নতুন। চারপাশে পড়ে ছিল পুলিশের ‘পুলিশ লাইন, ডোন্ট ক্রস’ লেখা প্লাস্টিকের ফিতা। নতুন কবরগুলোর ফলকে স্টিলের পাতে নম্বর দেওয়া। এই নম্বরই পরিচয় না পাওয়া মানুষগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করার সূত্র। তবে কোন মরদেহ কার—এ প্রশ্নের জবাব কখনো মিলবে কি না, সেটি জানা নেই কারও।
কবরস্থানের কাছে আছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর কবরস্থানের পাশে মাঠের শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট নামাজঘর। সেখানে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্থানীয় ৩০ থেকে ৩৫ জন। বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অরুলদাশের মাধ্যমে কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। এঁদের একজন বয়সে প্রবীণ জোহারি দেশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত এই কবরস্থানে সর্বশেষ ৫০ বছর আগে কারও লাশ দাফন করা হয়েছিল। পরে গাছপালা গজায়। বর্তমানে এটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি। সপ্তাহ তিনেক আগে শুনলাম, সীমান্তের কবরগুলো থেকে উদ্ধার করা অনেক লাশ এখানে দাফন করা হবে, যারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মুসলমান। তাই গ্রামের কেউ আপত্তি করেনি। জানাজার সময় পুলিশ, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ অনেক গ্রামবাসী এসেছিল।’
এখানে কবর দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে জোহারি দেশা, মহিউদ্দিন জুশো, আবু রায়হান, আহমেদ শাহাবুদ্দিন, গালাউদ্দিন, শামসুদ্দিনসহ উপস্থিত সবাই বললেন, আশপাশে আর কোথাও এত বড় জায়গা না পাওয়ায় এখানে গাছপালা কেটে জায়গা পরিষ্কার করে কবর দেওয়া হয়। বেওয়ারিশ লাশ পেলে এখানে দাফন করা হবে।
ময়নাতদন্ত হলেও হতভাগ্য এই ১০৬ জনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি পুলিশ বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে কেদাহ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মুকরিজ তুন মাহাথির সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, নির্যাতন ও দিনের পর দিন না খেতে পেয়েই এই মানুষগুলো মারা গেছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
মৃত্যুর কারণ শুনেছেন কি না—এ প্রশ্নে ওই গ্রামের বর্ষীয়ান বাহরাম জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি, এই মানুষগুলোকে নির্যাতন করা হয়েছিল। অনেকে না খেয়ে মারা গেছে। এটা চরম বর্বরতা। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা উচিত।’ শেখ মো. জহির নামের একজন বললেন, ‘মিয়ানমার তো রোহিঙ্গাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কিন্তু বাংলাদেশের যারা আছে, তাদের পরিচয় উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কী উদ্যোগ নিচ্ছে, জানতে চাইলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর সায়েদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাদের দাফন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি আছে কি না, সেটি জানার সুযোগ নেই। কারণ, এদের কারও পরিচয় জানা নেই। তবে প্রত্যেকের মরদেহের ডিএনএ নমুনা হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কোনো পরিবার যদি কখনো দাবি করে, এখানে তাদের স্বজন আছে, তবে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হবে। তা মরদেহের ডিএনএর সঙ্গে মিললে হয়তো পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
যেভাবে কবর আবিষ্কার: সাংবাদিক অরুলদাশ বলেন, গত মার্চে তিনি গণকবরের সন্ধানে প্রথম ওয়াংকিলিয়ায় গিয়েছিলেন, কিন্তু তখন কিছু খুঁজে পাননি। থাইল্যান্ডে গণকবর পাওয়ার পর তিনি নিশ্চিত হন, মালয়েশিয়ায়ও একই ধরনের কবর ও নির্যাতন ক্যাম্প আছে। থাইল্যান্ডের পুলিশপ্রধান ৯ মে সংবাদ সম্মেলন করে এমন অভিযোগও করেন। কিন্তু মালয়েশিয়া তা অস্বীকার করে। একদিন দুজন লোক তাঁর কাছে এসে পাহাড়ের ওপর গণকবর থাকার কথা জানান। তিনি তখন স্থানীয় দুজন লোকের সহায়তায় পাদংবাসার থাইল্যান্ড সীমান্তে আবার খোঁজ করেন। এরপর তিনি অনেক বন্দিশিবির আবিষ্কার করেন। পরে তিনি ধারাবাহিকভাবে এ নিয়ে প্রতিবেদন করলে মালয়েশিয়ার পুলিশ ও সেনাবাহিনী আবার অভিযান শুরু করে। ২৪ মে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কবর ও বন্দিশিবিরের কথা জানান।
ওয়াংকিলিয়া থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী মালয়েশিয়ার সর্বশেষ গ্রাম। ওয়াংকিলিয়ার যে পাহাড় দিয়ে মরদেহগুলো নামানো হয়েছে, সেটি দেখিয়ে অরুলদাশ বলেন, ‘সাগরপথে থাইল্যান্ডে আনার পর পাহাড়ের এই ক্যাম্পগুলোতে রাখা হতো মানুষদের। পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে এলেই মালয়েশিয়া। যারা মুক্তিপণ দিত, তাদের মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হতো। কেউ কেউ অবশ্য এই নির্যাতন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়া সীমান্তে চলে আসতে পেরেছে।’
ওয়াংকিলিয়া পাহাড়ি ছোট্ট গ্রাম। ২৫০ জনেরও কম মানুষের বসবাস। ওয়াংকিলিয়ার পাহাড়ের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা মানুষ প্রায় সময়ই গ্রামের মসজিদে আশ্রয় নিত বলে জানান গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আদনান ও জুনায়েদ। আদনান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই-আড়াই বছর ধরে আমরা এই দৃশ্য দেখছি। পালিয়ে আসা লোকজনের শরীরে থাকে আঘাতের চিহ্ন। আমরা তাদের চিকিৎসা দিতাম, খাবার দিতাম। গত ঈদের দিন আমরা পাঁচজন বাংলাদেশিকে পেয়েছিলাম।’
ওয়াংকিলিয়া গ্রাম থেকে কামপাং তুলাং গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। অরুলদাশ প্রতিবেদন না করলে হয়তো এসব কবর আবিষ্কৃত হতো না। কামপাং তুলাং গ্রামে দাফন হওয়া এসব মানুষের স্বজনেরা হয়তো এখনো জানে না, তারা পরিচয়হীন হয়ে এখানে আছে। আর কবরগুলো সাক্ষী হয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর দাসপ্রথা ও চরম বর্বরতার।
সারি সারি কবর ১০৬টি। কবরগুলো মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের। নাম–পরিচয় না জানা এই ১০৬ জনের কবর রয়েছে মালয়েশিয়ার থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী কামপাং তুলাং গ্রামে। সীমান্তবর্তী ওয়া​ংকিলিয়া থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল l ছবি: প্রথম আলো

পূর্ণতার পথে মানচিত্র- আজ মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময়

’৭৪-এর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে। ফলে এই অংশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ড এবং ওই অংশে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের ভূখণ্ড হয়ে হবে। এটি দুই দেশেরই মানচিত্র পূর্ণতা পাওয়ার পথে একধাপ অগ্রগতি।
এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪১ বছর পর ’৭৪ সালের দুই দেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। অবসান ঘটতে যাচ্ছে দীর্ঘ ৬৮ বছরের এক মানবিক সমস্যার। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির এক বছর পর এবার স্থলসীমান্ত সমস্যাও মিটতে চলেছে। গত বছরের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে সমুদ্রসীমার বিরোধ মিটে যাওয়ার পর সমুদ্র এলাকার ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এবার ছিটমহল বিনিময়ের পর স্থলভাগেও বাংলাদেশের ভূখণ্ড বাড়বে। এর সঙ্গে বাড়বে জনসংখ্যাও।
স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বৃহস্পতিবার পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত জমি সংযুক্ত করে এবং বহির্ভূত জমি বাদ দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে। ভারতে একইভাবে প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক গতকাল তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ছিটমহল বিনিময় ৩১ জুলাই শেষ হচ্ছে।
ছিটমহল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর অন্য দুই উপাদান অপদখলীয় ভূমি বিনিময় ও সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিত করার কাজও চলছে। পর্যায়ক্রমে এগুলো শেষ হওয়ার মাধ্যমে শেষ হবে স্থলসীমান্ত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন।
এর ফলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ১১১টি ছিটমহলের মধ্যে যাঁরা ভারতে ফিরে যেতে চান (তালিকায় নাম দেওয়া ৯৭৯ জন), তাঁরা ছাড়া বাকি সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ৫১টি ছিটমহলের লোকজন পাবেন ভারতীয় নাগরিকত্ব। ১ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত ভারতের পূর্ববর্তী ১১১টি ছিটমহলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়বে।
বাংলাদেশে ভারতের ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। ভারতে সবগুলো ছিটমহল পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় অবস্থিত। বাংলাদেশে ছিটমহলগুলো পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায় অবস্থিত।
এই ছিটমহলগুলোতে ২০১১ সালে একটি যৌথ জরিপ চালানো হয় এবং ১৬২ ছিটমহলে ৫১ হাজার ৫৪৯ অধিবাসীকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন ভারতীয় বাংলাদেশে অবস্থিত ছিটমহলগুলোতে বাস করে এবং ১৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি ভারতের ছিটমহলগুলোতে বাস করে।
চলতি মাসে আরেকটি যৌথ জরিপ চালানো হয়। এর ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশ ভারতকে ২ হাজার ৭৭৭ একর অপদখলীয় জমি হস্তান্তর করবে এবং ভারত বাংলাদেশকে ২ হাজার ২৬৭ একর অপদখলীয় জমি হস্তান্তর করবে।
এদিকে দুই দেশ যখন আজ মধ্যরাত থেকে ছিটমহল বিনিময় করছে, তার আগে গতকাল ঢাকায় দুই দেশের হাইকমিশনাররা ৩০টি গুচ্ছ মানচিত্রে সই করেন। এর মাধ্যমে এখন দুই দেশের ১ হাজার ১৪৫টি মানচিত্রের মধ্যে একটি ছাড়া সবগুলো সই শেষ হলো। মুহুরির চর নিয়ে অবশিষ্ট গুচ্ছ মানচিত্রে ভূমির পরিমাণ দুই কিলোমিটার। ২০১১ সালে দুই দেশ ১ হাজার ১১৪টি গুচ্ছ মানচিত্রে সই করে।
প্রসঙ্গত, দুই দেশের স্থলসীমান্ত সুরাহার জন্য ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্থলসীমান্ত চুক্তিতে সই করেন। বাংলাদেশ ওই বছরই চুক্তিটি সংসদে অনুসমর্থন করলেও ভারত সেটি করেনি। ফলে দুই নিকট প্রতিবেশী উপমহাদেশের বিভক্তির সময় থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যা মেটাতে ব্যর্থ হয়। চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রটোকলে সই করেন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ভারতের সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে ব্যর্থ হয়। এবার নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত মে মাসে সর্বসম্মতভাবে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। অবসান ঘটে দীর্ঘ ৪১ বছরের অপেক্ষার।

দুর্বল কোমেনের রাতে সন্দ্বীপ উপকূল অতিক্রম- নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত নিহত ৩

ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে গতকাল সকালে টেকনাফের শাহপরীর
দ্বীপের লোকালয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। ছবি-গিয়াসউদ্দিন
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’-এর প্রভাবে ঝোড়ো বাতাসে দেশের উপকূলীয় এলাকায় গাছ চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন তিনজন। বিধ্বস্ত হয়েছে বহু কাঁচা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়েছে গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা টেকনাফ ও চকরিয়ার কয়েক শ গ্রাম।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে সন্দ্বীপের পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঝড়ের কারণে সাগর উত্তাল রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ছিল ৬৮ কিলোমিটার; যা দমকা ও ঝোড়ো হাওয়ার বেগে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘অ্যালার্ট-৩’ জারি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. জাফর আলম প্রথম আলোকে জানান, ‘অ্যালার্ট-৩’ জারি করার পর বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানো ও বন্দর চত্বর থেকে পণ্য খালাসের কাজ সীমিত আকারে হয়েছে।
গত রাত সাড়ে ১২টায় সন্দ্বীপে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল বলে প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিস জানায়। তবে তখন ঝোড়ো হাওয়া ছিল না। দিনে ঝোড়ো হাওয়ায় চট্টগ্রাম নগরের বেশ কিছু এলাকায় অসংখ্য গাছ উপড়ে যায়। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় দুপুর পর্যন্ত নগরের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। গত রাত পৌনে একটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় চট্টগ্রাম শহরে বৃষ্টি ছিল না।
ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আশঙ্কায় গতকাল কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় ব্যাপক সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রশাসনের সহযোগিতায় অনেক লোককে সরিয়ে নেওয়া হয় আশ্রয়কেন্দ্রে। মাইকিং করে লোকজনকে সতর্ক করা হয়। জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো জরুরি বৈঠক করে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। নৌপথে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন জেলায় গাছচাপায় তিনজনের মৃত্যু এবং কক্সবাজারে সাড়ে পাঁচ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া এবং গাছ উপড়ে পড়া ছাড়া আর কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কয়েকটি জেলায় নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারের ফলে কিছু বেড়িবাঁধে ভাঙন ও কয়েক শ গ্রাম প্লাবিত হয়।
গতকাল রাত নয়টার দিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, ভোলা এবং এসব জেলা-সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী চর ও দ্বীপগুলোকে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। এসব এলাকার উপকূল ও চরগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। এ ছাড়া পায়রা ও মংলা বন্দরকে ৫ নম্বর বিপৎসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়।
উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং এসব জেলার কাছাকাছি থাকা দ্বীপ ও চরগুলো ৫ নম্বর বিপৎসংকেতের আওতায় থাকবে।
আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
গাছচাপায় তিনজনের মৃত্যু: কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) অনুপম সাহা জানান, সেন্ট মার্টিনে গাছচাপায় মো. ইসলাম (৫০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
গাছের নিচে চাপা পড়ে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কল্যাণকলস গ্রামে মো. নুরুল ইসলাম ফকির (৫২) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
গাছচাপায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে ভোলার লালমোহনে। উপজেলার চর কচুয়া গ্রামের সোবহান মোল্লার স্ত্রী মঞ্জুমা বেগম (৫৫) মারা যান বুধবার রাতে। এ ছাড়া মনপুরা উপজেলার চৌধুরী বাজার এলাকায় চর গোয়ালিয়ার মো. ইসমাইল (৫০) ও চর ফয়জুদ্দিন এলাকার হাফেজ মামুন (৩৪) নামের দুই মোটরসাইকেল আরোহী গতকাল দুপুরে গাছ চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন।
চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এনামুল হক ও জেলেরা জানান, গতকাল সাগরে দুটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মনুরা ঘাটের আড়তদার আবদুর রহিম গতকাল বিকেলে বলেন, দুই ট্রলারডুবির ঘটনায় ২০ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন।
ক্ষয়ক্ষতি: ‘কোমেন’-এর প্রভাবে ঝোড়ো হাওয়ায় কক্সবাজারে ৫ হাজার ৭০০ কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং আরও ১৬ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা মোস্তফা কামাল। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে ঘরবাড়ির পাশাপাশি হাজার হাজার গাছপালা, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। এ কারণে কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচ শতাধিক চিংড়ি ও মাছের ঘের বিলীন হয়ে গেছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ২৩টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এ সময় ৫০টি কাঁচাবাড়ির দেয়াল ধসে পড়ে। আর জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে দুই শতাধিক চিংড়িঘেরের মাছ। এ ছাড়া চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় চারটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে অন্তত ১১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়।
টেকনাফ উপজেলার সেন্ট মার্টিন লন্ডভন্ড হয়। নাফ নদীর বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে উপজেলার ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়।
চট্টগ্রাম নগরের বাইরের পাঁচটি উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয় বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের কারণে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সৈকত লাগোয়া জাতীয় উদ্যানের ঝাউগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল জোয়ারের কারণে কুয়াকাটা সৈকতের বালু ও মাটি ধুয়ে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে। সৈকতে যাওয়ার প্রধান সড়কটির দক্ষিণ অংশ থেকে অন্তত ১০ ফুট জোয়ারে বিলীন হয়ে গেছে।
ভোলার লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, ঝড়-বৃষ্টিতে লক্ষাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে। পাশাপাশি ৩০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের জানান, চালিতাবুনিয়া, চর আন্ডা, বৌবাজার, চর বেষ্টিন পয়েন্টে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া চর লতা ও গঙ্গাচরা পয়েন্টে ক্লোজার দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
নদ-নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারে বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলার ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানির তোড়ে তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০০ মিটার বাঁধ ভেঙে ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নলচিরা এলাকায় প্রবল জোয়ারের তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে নলচিরা ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় দেড় কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নৌপথ বন্ধ: গতকাল সকাল ছয়টা থেকে ঢাকা-বরিশাল রুটে সব ধরনের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপপরিচালক মো. আবুল বাশার মজুমদার বলেন, গত তিন দিন পর্যন্ত শুধু ৫৬ ফুটের কম দৈর্ঘ্যের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিল। গতকাল ৩ নম্বর সতর্কসংকেত থাকায় ছোট-বড় সব ধরনের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।
চাঁদপুর নদীবন্দরে ৪ নম্বর নৌ বিপৎসংকেত জারি করায় গতকাল সকাল সাতটায় চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ রুটের ছোট বড় সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয় বিআইডব্লিউটিএ।
সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরিচা লঞ্চমালিক সমিতির দৌলতদিয়া ঘাট তত্ত্বাবধায়ক নুরুল আনোয়ার বলেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

তেলের যন্ত্রণা কত সইবে কর্ণফুলী? by পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ
তেলে আর জলে মিশ খায় না। তার পরও দেশের মুমূর্ষু নদীগুলোকে বারবার তেলে যন্ত্রণা সামাল দিতে হয়। কোনো বিচার নেই। কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। যেন গায়ের জোরে, রাজনৈতিক দরবার দিয়ে তেলের সঙ্গে জলকে মিশিয়ে দেয়া যাবে। যেন কিছুই হবে না। মরুক মাছ, মরুক কাঁকড়া, মরুক শামুক, মরুক শ্যাওলা, মরুক মাটি, মরুক প্রবাহ। একটিবার এটিও ভাবা জরুরি মাছ না থাকলে মানুষও বেশিদিন বাঁচবে না। শামুক কি কাঁকড়া না থাকলে মানুষের সংসারও ওলটপালট হয়ে যাবে। শ্যাওলা কি মাটি মরে গেলে মানুষও মরে যাবে একদিন। মাটি, জল, শামুক, শ্যাওলা প্রকৃতির এই মালা এমনভাবে গাঁথা আছে গায়ের জোরে কি একতরফা বাণিজ্যিক বাহাদুরিতে এই মালা তছনছ করে ফেলা যায়। কিন্তু এতে সকলেই টিকে থাকবার শর্ত ও রসদ হারিয়ে ফেলে। বারবার কর্ণফুলী নদীর ওপর এলোপাতাড়ি আক্রমণ চলছে। কখনো বাঁধ, কখনো বন্দর, কখনো পণ্য পরিবহন, কখনো তেল-দূষণ।
ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনন্য এক নদী কর্ণফুলী। পাহাড় ও সমতলের ভেতর বয়ে যাওয়া ৩২০ কি.মি. দীর্ঘ এ নদীটিকে মারমা আদিবাসীরা ডাকেন কানসা খিয়ং। ১৯৬০ সনে ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের’ নামে বাঁধ দিয়ে এ নদীর গলা টিপে ধরা হয়। তারপর প্রতিনিয়ত নগরায়ন, কলকারখানা সম্প্রসারণ, দখল ও দূষণে এ নদী কাতর আর রক্তাক্ত। তার ওপর আবার চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে রেললাইন ভেঙে তেলবাহী ওয়াগন থেকে ফার্নেস তেলের যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ নদীটির বুকে। কিন্তু রাষ্ট্র নদীটিকে আগলে ধরেনি। এর আগেও ২০১৩ সালের ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের দোহাজারীর কালুরঘাটে তেলবাহী ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে কর্ণফুলীসহ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে ফার্নেস তেল। ওই তেল দোহাজারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নেয়া হচ্ছিল, এমনকি বোয়ালখালীর ওয়াগন ভেঙে পড়া এই তেলও চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীর ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যই নেয়া হচ্ছিল। ২০১৪ সালের সুন্দরবনের তেল-বিপর্যয় ঘটনারও নেপথ্য কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেটিও গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রর জন্য নেয়া হচ্ছিল। দেখা যাচ্ছে বারবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য তেল-পরিবহন থেকেই বড় তেল-বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো ঘটছে। কী নদীপথে, কী রেলপথে। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি, জরুরি জবাবহিদিমূলক তেল-পরিবহন ব্যবস্থাপনা। আশা করি বোয়ালখালী তেল-বিপর্যয় থেকে কর্ণফুলী নদীসহ সামগ্রিক বাস্তু সংস্থান সুরক্ষায় রাষ্ট্র ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দিতে সাহসী হবে।
১৯ জুন ২০১৫ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের খিতাপচর এলাকায় শাইরাপুলে এ বিপর্যয় ঘটে। বোয়ালখালীর বেঙ্গুরা ও পটিয়ার ধলঘাট এলাকার মাঝামাঝি রেলপথের ২৪ নং সেতু ভেঙে ইঞ্জিনসহ তিনটি তেলবাহী ওয়াগন হারগেজি খালে পড়ে যায়। হারগেজি খালকে বোয়ালখালী খালও বলেন অনেকে। তেলবাহী ওয়াগন থেকে হাজার হাজার লিটার (গণমাধ্যম সূত্রগুলো ৫২ থেকে ৮০ হাজার লিটার লিখছে) ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়ে এই খালে। বোয়ালখালী খালের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর সংযোগ। কর্ণফুলী নদী থেকে দূরত্ব মাত্র ১০ কি.মি.। তাই জোয়ার-ভাটার স্রোতে এ তেল ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী কর্ণফুলীর পানির স্রোতে এবং আশপাশের আবাদি জমিগুলোতেও। এ পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ কি.মি.-এর বেশি তেলের বিস্তার ও দূষণ ঘটেছে। হারগেজি খাল থেকে তেলের বিস্তার পানির ধাক্কায় আশপাশের পাড়ের মাটিতে আছড়ে কালো আস্তরণ তৈরি করছে। পাশাপাশি মিলিটারি পুল এলাকা দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে মিশছে এই ফার্নেস তেল। রেল কর্তৃপক্ষ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রথম থেকেই নিশ্চুপ থাকায় এ বিস্তার কর্ণফুলী পর্যন্ত পৌঁছেছে। পরিবেশ অধিদফতর নিজ থেকে এ তেল অপসারণে স্থানীয়দের নিয়ে স্থানীয় পদ্ধতিতে কাজ শুরু করেছে। তেল-বিপর্যয় থেকে বোয়ালখালী খাল ও কর্ণফুলী নদীর সুরক্ষায় এখনো কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সুন্দরবনের সর্বশেষ তেল-বিপর্যয়কে স্থানীয় জনগণ যেভাবে জান দিয়ে সামাল দিয়েছিল সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বোয়ালখালী খালের তেল-বিপর্যয় ঘটনায়। তেল সংগ্রহ থেকে শুরু করে স্থানীয় পদ্ধতিতে তেলের বিস্তার রোধ সবকিছুই। তবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। যদিও স্থানীয় মানুষ জীবনবাজি রেখে পাটের দড়ি, রশি, কাপড়, কলাগাছ দিয়ে বোয়ালখালী খাল থেকে তেল অপসারণ শুরু করেছে। কিন্তু পায়ের চাপে বা অন্য কোনোভাবে তেল মাটির নিচে দেবে না যায় বিষয়টি খেয়াল রাখা জরুরি। বোয়ালখালীতে সাম্প্রতিক এই তেল-বিপর্যয়ের দীর্ঘ ক্ষতি তৈরি হবে কর্ণফুলী অববাহিকায়। ইতোমধ্যেই হারগেজি খাল থেকে তেলের আবরণ আশপাশের আবাদি জমিতে বিস্তার লাভ করেছে। খিতাপচর ও খালপাড়ে লাগানো কচু, ঢেঁড়স ও সবজি ক্ষেতগুলো তেলের কালো আবরণে ঢেকে গেছে। নদীতীরের ঘাস-গুল্মতৃণলতা সব তেলে আক্রান্ত। নদীর কাদায় তেলের আবরণ পড়ায় শামুক ও ছোট কাঁকড়া কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, তেলের বিস্তারের পর মাছের বিচরণও হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। খালপাড়ের বাসিন্দা যাদের এই তেল-মিশ্রিত পানি গায়ে লাগছে তাদের চুলকানি ও পেটের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সুন্দরবনের সর্বশেষ তেল-বিপর্যয়েও এই ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু তার পরও রাষ্ট্র সুন্দরবেনর ভেতর দিয়ে সর্বনাশা নৌপথ অব্যাহত রেখেছে, গায়ের জোরে। আবারো ডুবেছে সিমেন্টভর্তি জাহাজ। বোয়ালখালীর তেল-বিপর্যয়ে দুটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। যদিও এসব তদন্ত প্রতিবেদন কখনোই প্রকাশিত হবে না, আর হলেও নিজেদের যাবতীয় দায় দায়িত্ব ঢাকতে এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রলায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ২০০৪ সালে পতেঙ্গা মোহনায় ‘বাংলার সৌরভ’ নামের এক জাহাজ থেকে কর্ণফুলী নদীতে তেল-দূষণ ঘটে। তখন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তিও দেয়া হয়, কিন্তু জোয়ার-ভাটায় তেলের দূষণ তিন মাস তীব্র হয়েছিল। তখনো স্থানীয় জেলেরাই স্থানীয় পদ্ধতিতে জীবন দিয়ে কর্ণফুলীর বুক থেকে টেনে তুলেছে তেল। একই সনে এক বিদেশি জাহাজ কুতুবদিয়া উপকূলে নোঙর করে গভীর রাতে বর্জ্য তেল ফেলে রেখে যায়, যদিও তাদের ধরা যায়নি। তখনো তেলের যন্ত্রণায় কাতর হয় কর্ণফুলী। ২০১১ সালের ৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটি-৫ এ ১৮০ মেট্রিক টন তেল নিয়ে ‘ওটি মুন’ নামের একটি তেলের বার্জ ডুবে গিয়েছিল। ওটি মুনকে জব্দ করে পরিবেশ অধিদফতর ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে। যদিও নদীদূষণের ক্ষতিপূরণ কোনোভাবেই কোনো মুদ্রার মান দিয়ে যাচাই বা পরিশোধযোগ্য নয়। তার পরও দেশের বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দ্রুত বোয়ালখালী ঘটনার তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুক রাষ্ট্র।
পানির শরীর ও জল-দুনিয়ায় বসবাসরত প্রাণের জন্য এই তেলের বিস্তার দুঃসহ। কারণ এতে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা পরিবর্তিত হয়ে যায়। পানির ভেতরে বসবাসরত মাছ, শামুক, কাঁকড়া, কুমির, ঘড়িয়াল, ডলফিন, শুশুক এরা শ্বাস নিতে পারে না। তেল পানিতে মিশে না বলে পানির উপরিভাগে একটি দীর্ঘস্থায়ী আস্তর তৈরি করে। এই আর সূর্যের আলো পানিতে প্রবেশে বাঁধা দেয়। ফলে পানিতে বসবাসকারী শৈবাল ও অণুজীবের খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শৈবাল আর অণুজীব হলো কোনো জলজ বাস্তু সংস্থানের প্রাথমিক স্তরের খাদ্য উৎপাদক। যখন কোনো এলাকার প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদক সমস্যায় পড়ে তখন এর জ্বালা পোহাতে হয় সকল স্তরের প্রাণসত্তাকেই। এভাবেই এক এক স্তরে খাদ্যাভাব দেখা দেয়, অসুখ-বিসুখ বাড়ে। মড়ক লাগে এবং প্রাণ নিশ্চিহ্ন হতে থাকে। ভেঙে পড়ে খাদ্যশৃঙ্খল আর জীবনের টিকে থাকবার সূত্র। এই ভোগান্তি জল থেকে ক্রমান্বয়ে মাটিতে বসবাসকারী মানুষসহ সকল প্রাণের ওপরও চড়াও হয়। মাছ কমে যাওয়া মানে মাছের ওপর নির্ভরশীল মানুষের খাদ্যতালিকা ওলটপালট হয়ে যাওয়া। পানির এই দুর্বিষহ আকাল সরাসরি প্রভাবিত করে জলের ওপর নির্ভরশীল পেশাজীবীদের। জেলে, মাঝি, বেদে, পাটনি সম্প্রদায়কে। পানির দেশে পানিতে তেলের সব প্রশ্নহীন দূষণ ও যখন তখন ছড়িয়ে পড়া সমূলে বন্ধ হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। বারবার তেলে-আক্রান্ত কর্ণফুলী নদীটির পাশে একবার কলিজা মেলে দাঁড়াক রাষ্ট্র। তেলের যন্ত্রণা সহ্য করার একটা মাত্রা নদীরও আছে। কর্ণফুলীও তার বাইরে নয়। আসুন আমরা আমাদের প্রিয় নদীটিকে তেলের যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে আগলে দাঁড়াই।
লেখক : গবেষক ও লেখক