Saturday, June 9, 2018

লেবুর গ্রাম বালিয়াখোড়া by রিপন আনসারী

যে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনা ও তার চারপাশে শোভা পাচ্ছে শুধুই লেবু বাগান। আর এই বাগানের  তরতাজা কাঁচা লেবুর সুগন্ধ বইছে সেখানকার বাতাসে। লেবু চাষের দ্বারা গ্রামের অনেক পরিবারই অর্থ-বিত্তে হয়েছেন স্বাবলম্বী।  সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত গ্রামটি হচ্ছে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া।
সরজমিন বালিয়াখোড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার দুই ধারে, বাড়ির আঙ্গিনা ও তার চার পাশে চোখ জুড়ানো লেবু বাগান। এমন কোন বাড়ি নেই যেখানে লেবুগাছ নেই। প্রায় ৩০০ পরিবার এ গ্রামে লেবু চাষ করে আসছে। লেবুর ভরা মওসুমে বাগান থেকে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা লেবু তোলা হচ্ছে। আর এই এখানকার লেবুর বড় চালান যাচ্ছে ঢাকার কাওরান বাজারে। শুধু কাওরান বারই নয় প্রতিদিন পাইকার ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে লেবু ক্রয় করে ট্রাক ভর্তি নিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এলাচি, কাগজি ও কলম্বো জাতের লেবু এখানে বেশি উৎপাদন করা হয়। তবে সারা বছরের চাইতে রমজান মাসে এখানকার লেবুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
এছাড়া বালিয়াখোড়া গ্রামের লেবু শুধু দেশেই নয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরব, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হয়।  চলতি মৌসুমে প্রায় ১৫ টন লেবু রপ্তানি করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। কথা হয় বালিয়াখোড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন লেবু চাষির সঙ্গে।
গ্রামের প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক নারয়ণ চন্দ্র বলেন, আমাদের গ্রামটি লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। এলাকার এমন কোনো বাসাবাড়ি নেই যেখানে লেবু চাষ হয় না। আমি নিজেই ১৫০ শতাংশ জমির ওপর চারটি লেবুর বাগান করেছি। প্রথম আমার পিতা পার্শ্ববর্তী গ্রামের আলী হোসেনের বাড়ি থেকে ১০টি লেবুর চারা নিয়ে লেবু চাষ শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর  বাবার সখের লেবু বাগানগুলো পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছি। আমার বাগানগুলোতে এলাচি, কাগজি ও কলম্বো- এই তিন জাতের লেবুর চাষ করছি। লেবু চাষ করে আমার প্রতি বছর লক্ষাধিক টাকা আয় হচ্ছে। বালিয়াখোড়া গ্রামের ব্যাংকার কামরুল হাসান জনি বলেন, আমার বাবা চাচারা প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে লেবু চাষ করে আসছেন। এক সময় এ গ্রামের আমরা ৩-৪ পরিবার লেবু বাগান করেছি। তা বেড়ে এখন ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবার লেবু চাষ করে আসছে। আমাদের চার বিঘা বাগানে শুধু কলম্ব জাতের লেবু চাষ করেছি। আগে দাম ভালো পাওয়া গেলেও এখন বাজার একটু মন্দা। প্রতি বছর লক্ষাধিক টাকায় বাগান বিক্রি করে দেই। এলাকার যুবক আতাউর রহমান তোহা বলেন, বালিয়াখোড়া গ্রামটিকে আমরা লেবুর গ্রাম হিসেবে চিনি।  গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনা, রাস্তার ধার ও তার আশপাশে দেখা যায় শুধু লেবু আর লেবুর বাগান। বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কাঁচা লেবুর  গন্ধে ম’ম’ করে। লেবু চাষি মফিজুল ইসলাম দীপন বলেন, আমার বাবা প্রয়াত ৩৫ বছর আগে লেবুর বাগান করেন। বাবার মৃত্যুর পর আমরা ভাইয়েরা মিলে এই লেবুর চাষ করে আসছি। বর্তমানে আমার ২৪০ শতাংশ জমিতে লেবুর চাষ হচ্ছে। লেবু চাষ করেই আজ আমরা মোটামুটি স্বাবলম্বী। আমাদের বাগানের লেবু ঢাকার কাওরান বাজার, শ্যামবাজার, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় বড় আড়তে পাইকাররা নিয়ে বিক্রি করেন। রমজান মাসের প্রথম দিকে লেবুর দাম অনেক ভালো পেয়েছি। বর্তমানে দাম একটু কম। তারপরও ভালোই লাভ পাচ্ছি।
লেবু চাষি বিলু মিয়া জানান, এখন লেবুর ভরা মওসুম। ঢাকার পাইকাররা আমাদের বাগান থেকে কম দামে লেবু কিনে সেখানে চড়া দামে বিক্রি করেন। শুধু তাই নয়, আমাদের গ্রামের লেবু বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। বর্তমানে ১শ’ লেবু ২৫০-৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোজার প্রথম দিকে এক হালি লেবু বিক্রি হয়েছে ৩৫-৪০ টাকা পর্যন্ত।
বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল খান বলেন, আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে লেবু চাষ করে আসছি। এখন আমার প্রায় ৮ বিঘা জমিতে লেবু আবাদ হচ্ছে। লেবু চাষ অত্যন্ত লাভজনক বলেই সেই বাবার আমল থেকে চাষ করে আসছি। বছরে বেশ ভালোই লাভ পাচ্ছি। আমার গ্রামে ছোট বড় প্রায় ১৫০টি লেবু বাগান রয়েছে। এলাকার প্রত্যেক বাড়িতেই কমবেশি লেবুর বাগান রয়েছে। অনেক পরিবার লেবু চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। আবার অনেকেই সারা বছর লেবু চাষ করেই সংসার চালাচ্ছেন। এক কথায় আমার ইউনিয়নটি লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানকার লেবু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছে পাইকাররা। 
বিদেশে বিভিন্ন সবজিজাত পণ্য রপ্তানিকারক ঢাকার ব্যবসায়ী মো. ফারুক খান বলেন, চলতি মৌসুমে সৌদি আরব, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫ টন লেবু রপ্তানি করা হয়েছে। বেশিরভাগ লেবুই তিনি সংগ্রহ করেন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া গ্রাম থেকে।
ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ উজ্জামান খান জানান, ঘিওরের বালিয়াখোড়া ও সোদঘাটা গ্রামের লেবু চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক চাষি। এ অঞ্চলের লেবুর কদর রয়েছে সারা দেশে। শুধু তাই নয়, বিদেশেও যাচ্ছে এখানকার লেবু। কৃষি বিভাগ থেকে ওই এলাকার লেবুচাষিদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

‘ইসরাইল একটি ক্যান্সার, মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হলে ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার সম্ভব’

ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী
‘ইহুদিবাদি ইসরাইল মুসলিম বিশ্বে একটি ক্যান্সার সদৃশ্য। আমেরিকা, ব্রিটেনসহ সাম্রাজ্যবাদীরা ইসরাইল নামের এই অপশক্তির বীজ বপন করেছে। মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হলে ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।’ বিশ্ব কুদস দিবস উপলক্ষে ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেছেন বক্তারা।
গতকাল (শুক্রবার) বিকেলে সাড়ে তিনটায় আল কুদস কমিটি বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোস্তফা লুৎফুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী এবং সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ন ম মেশকাত উদ্দীন। স্বাগত ভাষণ দেন আল কুদস কমিটি বাংলাদেশের সহসভাপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ কে এম বদরুদ্দোজা। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দৈনিক আজকের ভোলা পত্রিকার সম্পাদক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শওকাত হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন মাসিক মদীনা পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা আহমদ বদরুদ্দীন ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ আফতাব হোসেন নাকাভি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন 'আল কুদস কমিটি বাংলাদেশ'-এর সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তফা আবুলউলায়ী। অ্যাডভোকেট মোস্তফা লুৎফুল্লাহ এমপি
‘আমেরিকা শোষণের রাজত্ব কায়েম করতে চায়’
‘আল কুদ্স ও ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলি দখলদারিত্বের ৭০ বছর : মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট লুৎফুল্লাহ এমপি ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, ‘‘যেখানেই জুলুম নির্যাতন, যেখানেই সাম্রাজ্যবাদের হিংস্র থাবা, যেখানেই মানবতার পতন সেখানেই আমরা আছি এবং আমরা থাকব। আজকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা আরব মুসলমান ও গণমানুষের উপর জুলুম করছে। মানবিক ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে আরব ও মুসলিম সমাজকে বিভক্ত করে শোষণের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। সেজন্যেই তারা ইসরাইল নামের কঠিন অপশক্তির বীজ বপন করেছে। ইহুদি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা যারা লালন করেন দল-মত নির্বিশেষে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতাম তবে ইহুদি মার্কিন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা দুনিয়ার কোথাও বিপর্যয় ঘটাতে পারত না। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হই তবেই আমাদের ভূখণ্ড, আমাদের অধিকার, আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, আমাদের যা কিছু আছে সবই আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারব।”
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন  দৈনিক আজকের ভোলা পত্রিকার সম্পাদক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শওকাত হোসেন
‘ইসরাইল মুসলিম বিশ্বে একটি ক্যান্সার সদৃশ্য’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মাননীয় রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাবী বলেন, “৭০ বছর আগে একটি শয়তানি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যায়নবাদী ইসরাইলের স্বপ্ন ছিল নীল থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত এক ইহুদি রাজ কায়েম করা। কিন্তু প্রকৃত মুসলমানদের আত্মজাগৃতির এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ সংগ্রামের ফলেই সেটা সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনের মানুষ বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত।”
সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথিদের একাংশ
রাষ্ট্রদূত পবিত্র কালামে পাক থেকে উদ্ধৃতি পেশ করে বলেন, ‘তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না অসহায় নারী,পুরুষ ও শিশুদের রক্ষার জন্যে? যারা বলে হে আমাদের প্রতিপালক! জালেমের এই জনপদ থেকে আমাদেরকে উদ্ধার কর। তোমার কাছ থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার কাছ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী পাঠাও।’ (৪:৭৫) আর আল্লাহর রাসুল (স) হাদীসে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের সমস্যা যদি অন্য মুসলমানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে না হয় তবে সে মুমিনই নয়।’ আজকে ফিলিস্তিনের জনগণের চেয়ে আর কে বেশী নির্যাতিত?
তিনি আরও বলেন, “ইসরাইল রাষ্ট্রটি মুসলিম বিশ্বে একটি ক্যান্সার সদৃশ্য। এর বিস্তৃতি ঘটেছে সাম্রাজ্যবাদীদের সহায়তায় যায়নবাদী ইহুদিদের দ্বারা। এ সমস্যা শুধু ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয় গোটা মুসলমানদের সমস্যা। কেবল মুসলমানদেরই নয় সমগ্র বিশ্ব মানবতার সমস্যা এটি। এখানে মুসলিম গণমানুষের উপর অমানবিক নির্যাতন হচ্ছে। কাজেই এটি কেবল ইসলামী ইস্যুই নয় মানবিক ইস্যুও বটে। খ্রিস্ট সমাজের অনেক মানবতাবাদীও এর প্রতিবাদ করছে এমনকি নির্দোষ কিছু ইহুদিও যায়নবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সেখানে নিষ্পাপ নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু তৌরাতে বা ইঞ্জিলেতো কোথাও নেই নির্দোষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে হবে। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণচেতনা ও বিশ্বব্যাপী গণজোয়ার সৃষ্টির জন্যেই ইমাম খোমেনী (র) মাহে রমজানের শেষ শুক্রবারকে কুদস দিবস ঘোষণা করেন। অনেক দেশ এটাকে স্বাগত জানায়। অনেক দেশের সরকার স্বাগত না জানালেও জনগণ এর সাথে একাত্ম হয়েছে। আবার অনেক মুসলিম দেশের শাসক কুদস দিবসের চেতনার সাথে একাত্ম না হয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলকে সহযোগিতা করছে। সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের সহযোগী এসব শাসকরা শিয়া-সুন্নি ইস্যু তুলে মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করেছে ও করছে। তারা দায়েশ, আল কায়দা ও তালেবান নামের সন্ত্রাসী তৈরি করে মুসলমানদের দিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস করছে। এই বিভক্তির ফলে ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরই লাভবান হচ্ছে।”
অধ্যাপক মেশকাত উদ্দীন
‘ইসরাইলের প্রধান মদদদাতা হচ্ছে আমেরিকা’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেশকাত উদ্দীন বলেন, “৭০ বছরের অধিক সময় ধরে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার চলছে একমাত্র মানবিক ঐক্যের জোয়ার দ্বারাই একে প্রতিহত করা সম্ভব। মুসলিম হোক, অমুসলিম হোক কোনো মানুষের প্রতিই কোনো প্রকার অত্যাচার মেনে নেয়া যায় না। ইসরাইলের প্রধান মদদদাতা হচ্ছে আমেরিকা। এরপর রয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। শুধু ফিলিস্তিনেই নয় মিয়ানমার, ইয়ামেন, ইরাক, আফগানিস্তান, কাশ্মির, চেচনিয়া, সিরিয়া সবখানেই মুসলমানরা নানা বিপর্যয়ের সম্মুখীন। একসময় বসনিয়ায় নির্যাতন হয়েছে। বাবরী মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতের শিব সেনারা। এখনো সে দেশে মুসলিম নির্যাতন হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আমাদেরকে দাঁড়াতে হলে ইসলামি ঐক্যের সাথে সাথে প্রকৃত সমস্যাকে চিহ্ণিত করতে হবে। আমাদের নিজেদেরকে বৈজ্ঞানিক ও সামরিক শক্তিতে যেমন বলীয়ান হয়ে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও প্রতিহত করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।”
মাওলানা আহমদ বদরুদ্দীন
‘ইহুদিরা পৃথিবীতে বড় বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে’
মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা আহমদ বদরুদ্দীন আরবের কবি আহমদ সাওকির একটি লাইন উচ্চারণ করে এর অর্থ করেন যে, ‘আল কুদস মুসলমানের কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদই শুধু নয় আল কুদস হচ্ছে মুসলমানদের ঈমানের স্তম্ভ। মুসলমানের ঈমান এবং অস্তিত্বের জন্যে মক্কা, মদীনা এবং আল কুদস অবিনাশী অংশ রূপে অপরিহার্য। এর কোনো একটি মুসলমানের হাতছাড়া হয়ে গেলে মুসলমানদের বিপর্যয়ের সীমা থাকবে না। এটি একসময় ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু এরা এক অভিশপ্ত জাতিরূপে আল কুদসের অধিকার হারিয়েছে। আল্লাহপাক আল কুদস মুসলমানেরকে দিয়েই তাদের মর্যাদাকে বর্ধিত করেছেন। ইহুদিরা হচ্ছে সেই অভিশপ্ত জাতি যারা তাদের নবীদেরকে হত্যা করেছে। যারা আল্লাহকে গালি দেয়। আর যারা তাদের ধর্মগ্রন্থকে বিকৃত করেছে। আজ কোনটা যে তাদের আসল তাওরাত তা বোঝা দায়। তারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পৃথিবীতে বড় বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এ কথা কুরআনেও রয়েছে।”
হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ আফতাব নাকাভী
‘ফিলিস্তিনিদের নির্যাতনের দিন অচিরেই শেষ হয়ে যাবে’
হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ আফতাব নাকাভী বলেন, “রমজান মাসের ২১ তারিখে হযরত আলী শাহাদাত বরণ করেছিলেন যিনি ছিলেন রাসুলের (সা)-এর আহলে বাইত এবং রাসুলের (সা)-এর প্রজ্ঞাবান সহচর এবং অলি মহাপুরুষ। এই মহাপুরুষকে হত্যার পর ৭০ বছর উমাইয়া শাসকদের প্ররোচনায় বিভিন্ন মসজিদে তাঁর বদনাম করে গালাগালি করা হতো। কিন্তু ৭০ বছর পর মুসলমানের ভুল ভাঙে। ওমর বিন আবদুল আজিজ সেই সব গালাগালি বন্ধ করে দেন্। কাজেই ৭০ বছর যাবত ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হলেও ইনশাআল্লাহ এই নির্যাতনের দিন অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। সারা দুনিয়ায় একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম খোমেনী (র)-এর নেতৃত্বে আল কুদসের ঘোষণার পর সেটি বিশ্বের মুসলমানরা গ্রহণ করেছে। এখন আমাদের শুধু দরকার কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের প্রতিবন্ধক সকল বিষয় দূর করতে হবে। মুসলমানদের মাঝে সঠিক দ্বীনি চেতনা যা আহলে বাইতের মাঝে ছিল সেটার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। শিয়া ও সুন্নি মাজহাবের ভেতর সমন্বয় ঘটাতে হবে। তরুণদেরকে সজাগ করতে হবে ও তাদেরকে দ্বীনি বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে যাতে অপসংস্কৃতি তাদেরকে গ্রাস করতে না পারে। তাদেরকে মুসলমানদের প্রকৃত ইতিহাস শেখাতে হবে ও তাদের ভৌগোলিক, ঐতিহ্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। ফিলিস্তিন মিয়ানমার সহ যেকোনো জায়গায় মুসলমান নির্যাতিত হলে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে ও তাদের প্রতি অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে বূলন্দ করতে হবে।”
আইনজীবী এ কে এম বদরুদ্দোজা
‘যায়নবাদী ইসরাইল নৈতিকভাবে পরাজিত হচ্ছে’
স্বাগত ভাষণে আল কুদস কমিটি বাংলাদেশের সহসভাপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ কে এম বদরুদ্দোজা বলেন, ‘‘ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি গণহত্যা যেন আজ সেখানকার জনগণের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন সেখানে কোনো না কোনো স্থানে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। বিশ্বের নানা স্থানে মুসলমানদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। ইমাম খোমেনী (র)- কর্তৃক আল কুদস দিবসের যুগান্তকারী ঘোষণা বিশ্বে সত্যিকার অর্থেই একটা প্রভাব ফেলেছে। যত নির্যাতনই চালাক না কেন যায়নবাদী ইসরাইল নৈতিকভাবে পরাজিত হচ্ছে। এর বাস্তব প্রমাণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল টিম কর্তৃক ইসরাইলি টিমের সাথে ফুটবল চ্যারেটি ম্যাচ বয়কট করে দেয়া। শুধু মুসলমানই নয় ফিলিস্তিনি মানবতার উপর ইসরাইলি বর্বরতা সকল মানবতাবাদী মানুষেরই ঘৃণা কুড়িয়েছে। আর ইমামের ঘোষিত আল কুদস দিবস সারা বিশ্বে সত্যিকার অর্থেই একটা জাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই নেতানিয়াহুর টেলিফোনে অনুরোধ সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা টিম লিডার মেসিসহ পুরো দলের মন গলানো যায়নি আর্জেন্টিনা-ইসরাইল চ্যারেটি ম্যাচে। কারণ এর ভেতর এক ইসরাইলি রাজনৈতিক প্রতারণা লুকায়িত ছিল তার তারা বুঝতে পেরেছে। আমরা ধন্যবাদ জানাই মেসিসহ সমগ্র টিমকে।”
তিনি বলেন, “আজকে ট্রাম্প-এর প্রচেষ্টায় জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থাপনের চেষ্টায় একটা ধাক্কা খেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেউ জেরুজালেমে তাদের দুতাবাস স্থানান্তর করেনি। পৃথিবীর মানবতাবাদীরা বিবেকের বিচারের ডাকে সাড়া দিয়েছে। সেটি এই আল কুদসের চেতনা সম্প্রসারণেরই ফল।”
অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তফা আবুল উলায়ী
‘আল কুদস মুক্তির বিপ্লবী আওয়াজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে’
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তফা আবুলউলায়ী বলেন, ‘‘ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মোকাদ্দাসকে পুনরুদ্ধারের জন্যে পবিত্র জুমাতুল বিদাকে ‘আল কুদস দিবস’ ঘোষণা করে দল-মত-মাজহাব-তরিকা নির্বিশেষে সকল মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেই প্রচেষ্টা তার আহ্বানে সাড়া দেয়া মুসলমানেরা এখনো অব্যাহত রেখেছে। আজকে প্রতিবছর মাহে রমজানের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বে দিবসটি একযোগে পালিত হচ্ছে। কিন্ত্র মুসলিম ঐক্য বিনষ্টকারীরা শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব তৈরির জন্যে চালাচ্ছে ভয়ানক ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা। আমাদেরকে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই। ফিলিস্তিনসহ সব দেশের মুসলমানরা আমাদেরই ভাই-বোন। তাদের উপর নির্মম নির্যাতন হচ্ছে অথচ ফিলিস্তিনের পাশেরই কোনো কোনো দেশ ইসরাইলের সাথে সখ্যতা স্থাপন করে চলেছে। ন্যূনতম ইমান থাকলেওতো কোনো মুসলমান এটা করতে পারে না।“”
তিনি আরো বলেন, “বিশ্ব আল কুদস দিবস পালনের মধ্যে দিয়ে আল কুদস মুক্তির বিপ্লবী আওয়াজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা প্রতিবছর দিবসটি পালন করছি। এর নেপথ্যে রয়েছে অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অবদান।”
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন লেখক, গবেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান। পবিত্র কালামে পাক থেকে তেলাওয়াত করেন ক্বারী সাইয়েদ মোহাম্মদ রেজা রাজাভি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আল্লাতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’ শীর্ষক ঈমানী চেতনা জাগানিয়া গানটি গেয়ে শোনান কবি ও মর্সিয়া লেখক শাহনেওয়াজ তাবিব।
ইসরাইলের পতাকায় অগ্নিসংযোগ
ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদে মানববন্ধন
সেমিনারের আগে জুমার নামাজের পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আল কুদস দিবস উপলক্ষে মানবতার দুশমন ইহুদিবাদী ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদ করে ও ফিলিস্তিনি জনতার সংগ্রামের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এক মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আজকের ভোলা সম্পাদক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শওকত হোসাইন। মানববন্ধনে বক্তৃতা দেন আল কুদস কমিটি বাংলাদেশের সেক্রেটারী জেনারেল মোস্তফা তারেকুল হাসান, মাওলানা শাখাওয়াত হোসেন, আবু বকর সিদ্দিক, কবি আমিন আল আসাদ ও মাওলানা মুহিবুল্লাহ প্রমুখ।

দেড় মাসে সাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন অপেক্ষায় এক ডজন by নূর মোহাম্মদ

সরকারের শেষ বছরে মন্ত্রী-এমপিদের খুশি করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের হিড়িক পড়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ‘বাণিজ্য’ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেও সরকার একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় চরম অরাজকতার মধ্যেই গতকাল গোপনে নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত দেড় মাসে এনিয়ে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলো। আরো অন্তত ডজনখানেক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম-সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়-১) মো. বেলায়েত হোসেন তালুকদার বলেন, নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দিতে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেছে। দুদিন আগে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় দুটির একটি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি। এটি বরিশাল শহরের নবগ্রাম রোডে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এর উদ্যোক্তা কাজী সফিকুল ইসলাম। নেপথ্যে রয়েছেন বরিশাল-২ আসনের এমপি তালুকদার মো. ইউনুস। অপরটি হলো ইউনিভার্সিটি অব স্ট্যান্ডার্ড। এটি রাজধানীর মহাখালীর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাবে। এর উদ্যোক্তা ইঞ্জিনিয়ার একেএম মোশাররফ হুসাইন। এ নিয়ে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৩টি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে সরকারের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন। তারা এতটাই প্রভাবশালী যে, একদিনের মধ্যে ফাইল উঠিয়ে অনুমোদন নিয়েছেন। অথচ সরকারের অনেক মন্ত্রীও বছরের পর বছর ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা অন্যদের দেখানো হলেও পেছনে রয়েছে মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী ২৩ শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় দুটির সাময়িক অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আইনের ৭-এর ১ ও ২ ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের নিজস্ব বা ভাড়া করা ভবন, অন্তত তিনটি অনুষদ ও ছয়টি বিভাগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, ছাত্রছাত্রীদের জন্য কমনরুম, সেমিনার কক্ষসহ পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকতে হবে। সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া বিভাগ খোলা যাবে না। শর্তানুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক থাকতে হবে। চ্যান্সেলরের (প্রেসিডেন্ট) পূর্ব অনুমোদন ছাড়া বিদেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা যাবে না। আরোপিত শর্তগুলোর ওপর ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত বছর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়নি সরকার। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ‘আনোয়ার খান মর্ডান ইউনিভার্সিটি’র অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তখন ঢাকায় আর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না দেয়ার ব্যাপারে সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। তা লঙ্ঘন করে গত ২৯শে জানুয়ারি ‘জেড এন আর এফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়’-এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গুলশানে এটি স্থাপন করা হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ড. এম জুবায়দুর রহমান। এছাড়া গত ২৫শে এপ্রিল রাজশাহী ও বান্দরবানে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যথাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় দুটি হলো- ‘শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনির্ভাসিটি’ ও ‘বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়’। গত ১৬ই এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ‘খুলনা খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘আহছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’র অনুমোদন দিয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় দুটি যথাক্রমে খুলনা ও রাজশাহীতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটির উদ্যোক্তা ঢাকা আহছানিয়া মিশনের প্রেসিডেন্ট কাজী রফিকুল আলম। এর আগে তিনি ‘আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র অনুমোদন নিয়ে পরিচালনা করছেন। ইউজিসির এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি আবেদন করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গ্রিন সিগন্যাল আসায় ইতিমধ্যে ইউজিসি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে বিরোধীদলীয় নেতার নামে ‘রওশন এরশাদ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ’ উদ্যোক্তা আবুল হোসেন নামে একজন শিক্ষা ব্যবসায়ী রয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিলে সনদ ব্যাণিজ্যের আশঙ্কা থাকায় ইউজিসি নেতিবাচক পরিদর্শন প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফের প্রতিবেদন পাঠাতে গত মার্চ মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। এটিও যেকোনো সময় অনুমোদন পেতে পারে।

কানাডায় বাংলাদেশি ডলির জয়

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কানাডার প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন ডলি বেগম।  বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে স্কারবোরো-সাউথইস্ট আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পেয়ে এমপিপি মেম্বার অব প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ওই অঞ্চলটিতে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কর্তৃত্ব করছিল লিবারেল পার্টি। কিন্তু এবার নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি জয় লাভ করেছে। আর তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগম। কানাডার দৈনিক টরোন্টো স্টারের খবরে এসব কথা বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার কানাডায় প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অংশ নেয়া একমাত্র বাংলাদেশি প্রার্থী ছিলেন ডলি বেগম। এ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। স্কারবোরো-সাউথইস্ট আসনের ৬৩টি ভোটকেন্দ্রের ফলাফলে দেখা গেছে, ডলি বেগম তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থেকে ৬ হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১৯ হাজার ৭৫১ ভোট। বিপরীতে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পিসি পার্টির প্রার্থী গ্যারি এলিস পেয়েছেন ১৩ হাজার ৫৯২ ভোট। এই অঞ্চলটিতে ২০০৩ সাল থেকে নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিল লিবারেল পার্টি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হয়েছে।
ডলি বেগম স্কারবোরোতে ‘কমিউনিটি ওয়ার্কার’ হিসেবেই বেশি  পরিচিত। তার এই পরিচিতি নির্বাচনে জয়লাভ করতে ভূমিকা রেখেছে। তিনি স্থানীয় ‘হাইড্রো পাবলিক ক্যাম্পেইন’ এর কো-অর্ডিনেটর। পাশাপাশি স্কারবোরো হেলথ কোয়ালিশনের কো-চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ডেন উডস কমিউনিটি সেন্টারের ভাইস-চেয়ারম্যান। বাল্যকালেই তিনি বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। যোগ দেন নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টিতে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ডলির জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলায়। ১১ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে তিনি কানাডায় যান।

সাত বছরে মাদকের মামলা ৭২ হাজার, নিষ্পত্তি ২০ হাজার by আমানুর রহমান রনি

২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ৭২ হাজার ৫৩০টি মামলা করেছে। একই সময় আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ৩৪৯টি। মামলা তদন্তে ধীরগতি, মাদক শনাক্তের পরীক্ষা নিরীক্ষায় বিলম্ব এবং সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রমে এই ধীরগতি হচ্ছে। এমনকি সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বেশিরভাগ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। এ কারণে মাদকসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা আদালতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে সারাদেশে এই প্রতিষ্ঠানটি ৮ হাজার ৭৪৯টি মামলা দায়ের করে। একই বছর আদালতের মাধ্যমে অধিদফতরের দায়ের করা মামলার মাত্র ২ হাজার ৩৩৫টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১২ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি মামলা দায়ের করে ১০ হাজার ১৪টি, ওই বছর আদালতে তাদের মামলা নিষ্পত্তি হয় ৩ হাজার ৪৯৪টি। একইভাবে ২০১৩ সালে তারা মামলা করে ১০ হাজার ১১১টি আর আদালতে তাদের পুরনো মামলা নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ৬৬টি। ২০১৪ সালে দায়ের হওয়া ১১ হাজার ৭২৩টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬৮৯টির। ২০১৫ সালে দায়ের করা মামলার সংখ্যা হচ্ছে ১০ হাজার ৫৪৮টি, এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৮৭৩টির। ২০১৬ সালে মামলা হয় ৯ হাজার ৭৭৩টি, এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৫ হাজার ৩৪৮টি। ২০১৭ সালে মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে মোট ১১ হাজার ৬১২টি এব‌ং গত বছর তাদের পুরনো মামলা নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ৫৩৯টি।
অর্থাৎ ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ৭২ হাজার ৫৩০টি মাদকসংক্রান্ত মামলা করেছে। তবে এই সাত বছরে দেশের আদালতে এই প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা পুরনো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২০ হাজার ৩৪৯টি। আবার নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৯ হাজার ৯৫২টি মামলার ১১ হাজার ৬৩৪ জন আসামি খালাস পেয়েছে, যা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মোট মামলার ৫২ ভাগ আসামি।
গত বছরের ডিসেম্বরে পুলিশ সদর দফতরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে পুলিশের দায়ের করা মাদকসংক্রান্ত মামলার প্রায় ৬৪ ভাগ আসামি খালাস পেয়েছে।
বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণ বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন উপপরিচালক বলেন, ‌ ‘মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় নির্দিষ্ট সময়েই। তবে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় মামলার কার্যক্রমে ধীরগতি আসে।’
তিনি বলেন, ‌ ‘মাদক মামলার জন্য স্পেশাল কোর্ট না হলে মাদক মামলা কমবে না, বাড়তেই থাকবে। দ্রুত আলাদা কোর্ট করে মামলা নিষ্পত্তি করা গেলে এই হাজার হাজার মামলা কমে আসবে।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন বলেন, ‘‌আমরা অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। প্রতিবছরই মাদকের মামলা বাড়ছে। নিষ্পত্তিও হচ্ছে। মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সঙ্গে অনেক কিছু সম্পৃক্ত, তদন্ত, সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করা এবং মাদকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এসব কারণে হয়তো মামলাগুলোর রায় হতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে নিষ্পত্তি হচ্ছে।’
মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে আইনজীবী আরিফুর রহমান আরিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‌‘মামলার বিচারিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে হতে হলে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়কেই দায়িত্বশীল হতে হবে। তাহলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হওয়া সম্ভব। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু আমাদের আদালতে সবক্ষেত্রে এই সহযোগিতা থাকে না। কখনও কখনও অকারণেই সময় চেয়ে আবেদন, নিয়মিত সাক্ষী না আসা, প্রতিবেদন দাখিলে দেরি ইত্যাদি কারণে মামলা বিচারিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‌আদালতে মামলার জটের কারণেও একেকটি মামলার তারিখ ধার্য হয় অনেক দিন পরপর। এতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

সিলেটের পথের দুঃখ: টাকা উড়ে রেকারে by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী যানবাহন বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা প্রয়োজনীয় কাগজবিহীন গাড়ি, কিংবা বিকল হয়ে পড়া কোনো গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়াটাই এর কাজ। কিন্তু এসব কিছুই করতে হয় না। ‘নির্বিষ’ সাপের মতো এক কোণে পড়ে রয় এটি। তবে নিরীহদর্শন এ বাহনটি কোন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে দেখলেই আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠে সিলেট নগরীর গাড়িচালকদের। বিশেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের তো এ বাহনটি দেখলে কলজে শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। ‘রেকার বা টো ট্রাক’ নামের এ বাহনটির ফাঁদে পড়লে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে তো হয়ই পাশাপাশি নষ্ট হয়ে যায় আরো দু-একদিনের রোজগার।
রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালানো, রুট পারমিট না থাকা, গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা বা গাড়ির ফিটনেস না থাকাসহ নানা কারণে রেকারিং করা হয়ে থাকে। তবে সিলেটে সবচেয়ে বেশি রেকারিং হয় ‘রং পার্কিং’এর অভিযোগে। কারণ এর জন্য খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না ট্রাফিক সদস্যদের। সিলেট নগরীতে পার্কিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। তাই যেকোনো জায়গায় গাড়ি রাখলেই রং পার্কিংয়ের দোহাই দিতে পারেন ট্রাফিক সদস্যরা। রেকারে তোলার বিল হিসেবে বাড়তি জরিমানা নেয়া হলেও কোনো গাড়িই রেকারে তোলেন না। ট্রাফিকের একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে দিয়ে গাড়িচালককে দিয়েই গাড়ি পাঠানো হয় ট্রাফিক অফিসে। আর রেকারটি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকে শোভা হিসেবে, আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য।
গাড়িচালকদের জন্য আতঙ্কের কারণ হলেও সিলেটে রেকারিং ট্রাফিক বিভাগের টাকা আয়ের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন রেকার বাবদ বিশাল অঙ্কের টাকা জমা হচ্ছে ট্রাফিক বিভাগে। অভিযোগ রয়েছে, এ টাকার কোনো অংশই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। পুরোটাই ভাগাভাগি হয়ে যায় নিজেদের মাঝে। রেকার ব্যবসা জমজমাট হওয়ায় দ্রুতই ফুরিয়ে যায় রেকার বিলের রশিদ বইও। সামাল দিতে তাই স্থানীয়ভাবেই ছাপানো হয় বইগুলো। সরকারি ছাপাখানা (বিজি প্রেস) থেকে এ ধরনের রশিদ বই ছাপিয়ে আনার কথা থাকলেও একটি সূত্রে জানা গেছে নগরীর লামাবাজারের একটি প্রেস থেকেই ছাপানো হচ্ছে রশিদ বই। রেকারিংয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন যানবাহনের জন্য হার নির্ধারিত থাকলেও এক্ষেত্রেও কোনো নিয়মনীতিই মানা হচ্ছে না।
এসএমপির ট্রাফিক বিভাগসূত্রে জানা গেছে, তিন চাকার অটো রিকশার জন্য রেকার বিলের হার হচ্ছে ৬শ’ টাকা, টেম্পো বা হিউম্যান হলারের জন্য বিল হচ্ছে ৯শ’ টাকা, মোটরসাইকেল, কার, মাইক্রোবাস, পিকআপের জন্য বিল হচ্ছে ১২শ’ টাকা, ট্রাকের জন্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা আদায় করা হচ্ছে। তা না হলে গাড়ি আটকে রাখা হয় দিনের পর দিন।
প্রাইভেট কার বা বড় গাড়ি সাধারণত রেকারিংয়ের (রেকারের আওতায় আনা) শিকার হয় না। কারণ এ সকল গাড়ির মালিকরা প্রায়ই প্রভাবশালী হয়ে থাকেন। এদের ছুঁয়ে ঝামেলা বাড়াতে চান না রেকারের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা। তাই যা ঝড় যায়, তা তিন চাকার অটোরিকশার উপর দিয়েই যায়। প্রতিদিনই পয়েন্টে পয়েন্টে রেকারিং নিয়ে ঝামেলা হয় ট্রাফিক সদস্যদের সঙ্গে দরিদ্র অটোরিকশাচালকদের। রেকারিং থেকে বাঁচতে তারা হাতে-পায়েও ধরেন ট্রাফিক সদস্যদের। কিন্তু কাজ হয় না কিছুতেই। কান্নাকাটি করেও মন গলাতে পারেন না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল অঙ্কের এক বাণিজ্যের সুতো। তাই ছাড় দেয়ার উপায় থাকে না রাস্তায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সদস্যদের। উপর থেকেই তাদের কাছে রেকারিংয়ের নির্দেশনা রয়েছে। অলিখিত একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে প্রতিদিন নগরীতে অন্তত ৫০টি গাড়ি রেকারে তুলতেই হবে। এর মধ্যে বিভিন্ন পয়েন্টের জন্য সর্বনিম্ন টার্গেটও বেঁধে দেয়া আছে। নগরী বন্দরবাজারে অন্তত ১০টি, আম্বরখানায় ১০টি, হুমায়ূন রশীদ স্কয়ারে ৪টি, চণ্ডিপুলে ৪টি, রিকাবীবাজারে ২টি সুবিদবাজারে ২টি, টিলাগড়ে ২টি গাড়িকে রেকারিং করতে হয়। রাস্তায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবেই এ টার্গেট পূরণ করতে হয়। রেকারিংয়ের চাপ সইতে না পেরে অনেক ট্রাফিক সার্জেন্টই ইতোমধ্যে সিলেটে ছেড়ে বদলি নিয়ে চলে গেছেন। এমনই এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বললেন, উপরের নির্দেশে রেকারিং করতে গেলে কোনো মানবিক গুণই বাঁচানো সম্ভব নয়। সিলেট থেকে সরে গিয়ে বেঁচেছেন বলে মনে করেন এ সার্জেন্ট।
এসএমপিতে সব মিলিয়ে রেকার আছে ৩টি। এর মধ্যে একটির মালিকানা নিজেদের হলেও বাকি দুটো ভাড়ায় এনে কাজ সারা হচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ভাড়ায় আনা দুটো রেকারই মাঠে সক্রিয় রয়েছে। কভাড়ার হিসেবটাও কোনো নিয়মনীতির আওতায় নেই। এখানেও রয়েছে ভাগাভাগির হিসাব। একটি সূত্রে জানা গেছে, রেকার বিল হিসেবে যা আদায় হয় তা ভাগাভাগি হয় ‘ফিফটি-ফিফটি’ হিসেবে।
রেকারিং নিয়ে নানা অভিযোগের বিপরীতে কথা হয় এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) নিকুলিন চাকমার সঙ্গে। রশিদ বই ছাপানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে নিজস্ব ইউনিট থেকে রশিদ ছাপাতে সমস্যা নেই। রেকারিং বাবদ আদায়কৃত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আদায়কৃত টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়। প্রায় চার বছর ধরে ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব সামলালেও অনেক প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারেননি পুলিশের এ কর্মকর্তা। অনেক তথ্যই জানা নেই বলে, উপকমিশনারের (ট্রাফিক) কাছ থেকে জেনে নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। নিকুলিন চাকমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো গত ৬ মাসে বা এক মাসে কতটা গাড়ি রেকারিং করা হয়। রেকারিং বাবদ গড়ে মাসে কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়-এমন প্রশ্নে তিনি উপকমিশনারকেই দেখিয়ে দেন। নিকুলিন চাকমার দেখানো পথে তথ্য পাওয়ার আপাতত সুযোগ নেই। কারণ ট্রাফিক বিভাগের মূল দায়িত্ব যিনি সামলাচ্ছেন তিনি বর্তমানে অন্যের উপস্থিতিতে শুধু রুটিন কাজই করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত উপকমিশনার তোফায়েল আহমদ প্রশিক্ষণের জন্য গত ২২শে মে চীনে গেছেন। ফিরবেন আরো দিন দশেক পর।

যেভাবে জোগাড় ও ব্যয় হবে বাজেটের টাকা

জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নির্বাচনের বছরে ঘোষণা করা এই বাজেটের আয় ও ব্যয় কীভাবে হবে তারও একটি সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন তিনি। বাজেটের টাকা জোগাড় ও টাকা ব্যয়ের সেই চিত্রটি নিচে বর্ণনা করা হলো।
টাকা জোগাড় হবে যেভাবে:
যেভাবে জোগাড় হবে বাজেটের টাকা
আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা জোগাড় করতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। এরপরেও ঘাটতি থেকে যাবে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা—যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন কর বাবদ আদায় করা হবে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর বাইরের বিভিন্ন খাত থেকে কর বাবদ আদায় হবে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। কর ছাড়া অন্য খাত থেকে রাজস্ব আদায় হবে ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। এভাবে মোট রাজস্ব আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী,বাজেটে ঘাটতি থাকা ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা জোগাড় করা হবে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে। এরমধ্যে বৈদেশিক নিট ঋণ বাবদ নেওয়া হবে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যাবে ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ অর্থাৎ ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হবে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ১০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা।
টাকা ব্যয় হবে যেভাবে:
যেভাবে ব্যয় হবে বাজেটের টাকা
আসন্ন বাজেটে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। আবর্তক ব্যয় নামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকের সুদ পরিশোধ করতে হবে ৪৮ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ হবে ২ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা রয়েছে। উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে কাজের বিনিময় খাদ্য কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা।

জমে উঠেছে ফুটপাথে ঈদ কেনাকাটা by মরিয়ম চম্পা

ঈদুল ফিতরের বাকি আর ক’দিন। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের জন্য কিছু একটা কিনতে হবে। প্রিয়জনকে দিতে হবে সাধ্যমতো উপহার। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই জমজমাট হয়ে উঠছে কেনাকাটা। আর ঈদের কেনাকাটায় স্বল্প আয়ের মানুষদের ভরসা ফুটপাথের দোকান। তেমনি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও অন্যতম ভরসা ফুটপাথের দোকানগুলো। ঈদকে কেন্দ্র ছুটির দিনে ফুটপাথের দোকানগুলোতে ভিড় করছেন বেশিরভাগ মানুষ। আর ঈদ যত কাছাকাছি চলে আসছে ভিড় ততই বাড়ছে। তেমনি রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো ছাপিয়ে অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে মৌসুমি হকারদের ঈদ আয়োজন।
ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর ফুটপাথ যেন একেকটি হাট। যদিও এখানে ক্রেতা আকর্ষণে নেই র‌্যাফেল ড্রর ব্যবস্থা। তবে তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা এই অস্থায়ী দোকানগুলো। অপেক্ষাকৃত কম দামে ভালো জিনিস কিনতে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, গৃহিণী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষেরা আসছেন এসব দোকানে। রাজধানীর নিউমার্কেট, ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন, বায়তুল মোকাররম, মালিবাগ মৌচাক, গুলিস্তানসহ রাজধানীর বেশকিছু এলাকা ঘুরে ফুটপাথের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়।
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় দেখা যায়, ফার্মভিউ সুপার মার্কেটের সামনে থেকে শুরু করে তেজগাঁও কলেজ গলির শেষ মাথা পর্যন্ত ফুটপাথের দোকানগুলোতে ভিড়। ওয়ান পিস,  থ্রিপিস, ওড়না, স্যালোয়ার, এ্যান্টিকের অর্নামেন্টের দোকান, ব্যাগ, জুতা, কসমেটিকস থেকে শুরু করে নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পসরা বসেছে ফুটপাথে। সর্বত্রই মানুষের  উপচেপড়া ভিড়। নারায়ণগঞ্জ থেকে পুরো পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে এসেছেন চাঁদনী রহমান ও তার স্বামী মো. সাগর হোসেন। চাঁদনী বলেন, এ বছর আমরা নতুন বিয়ে করেছি। শ্বশুরবাড়িতে আমার প্রথম ঈদ। আমার স্বামীর নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই ঈদের আগে শপিং করার আর সময় পাবো না। তাছাড়া যাত্রাবাড়ী হয়ে নারায়ণগঞ্জ যেতে কয়েক ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকতে হবে। তাই খুব সকালে কেনাকাটা করতে এসেছি। তিনি জানান, রাজধানীর একটি নামকরা শপিং কমপ্লেক্স থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষ করলেও আরো কিছু কেনার জন্য ফুটপাথে চলে এসছেন। চাঁদনী বলেন, ফুটপাথের দোকানগুলোতে সবই সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়।
প্রতি বছরের মতো এবছর নিউমার্কেটের ফুটপাথ হকারশূন্য হলেও ইডেন কলেজের সামনে রীতিমতো ঈদের হাট বসেছে। জুতা সেলাই থেকে শুরু করে সব উপকরণই আছে এখানে। ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা মজা করে এই এলাকার নাম দিয়েছেন ‘ইডেন প্লাজা’। এখানে ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যামফোর্ড, ইউল্যাব, সিটি কলেজসহ বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেনাকাটা করতে আসেন। মেয়েদের পোশাকসামগ্রী শাড়ি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক, থান কাপড়ের দোকান, জুয়েলারি শপ, ব্যাগ, স্যান্ডেল-জুতা, শিশুদের খেলনাসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য পণ্যের সমাহার। ইডেন প্লাজার দোকানিরা জানান, এবার বেশি বিক্রি হচ্ছে জর্জেটের ওপর কাজ করা থ্রি-পিস, হাতাকাটা লং গাউন, হাতাওয়ালা ফ্লোর টাচ গাউন, ভারতীয় বুটিকস আইটেমের থ্রি-পিস, লন, ভয়েল থ্রি-পিস। এ ছাড়া দেশীয় থ্রি পিসের কাপড়ের মধ্যে প্রিন্টের থ্রি-পিস, ব্লক ও বাটিকের বিভিন্ন ডিজাইন করা থ্রি পিস। পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কার, গহনা, স্যান্ডেল ও ব্যাগ, সেই সাথে প্রসাধনীও বিক্রি হচ্ছে।
নিউমার্কেটের দুই নং গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দোকানের সামনের ফুটপাথের দোকানগুলোতে জুতা থেকে শুরু করে শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, শাড়ি, থ্রি-পিস, কসমেটিকস, কী নেই এখানে! বরাবরই নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাথগুলো থাকে লোকে লোকারণ্য। ঈদ উপলক্ষে তা আরো অনেক বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাথ ঘুরে দেখা গেছে, ছেলেদের শার্ট মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা করে, জিনস প্যান্ট ৩৫০ থেকে শুরু ১ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, এছাড়া টি-শার্ট ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, মেয়েদের থ্রি-পিস ৪৫০ থেকে ১৫০০ টাকা, শাড়ি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা, শিশুদের জিনস প্যান্ট ৩০০ টাকা, গেঞ্জির সেট ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, ফ্রক ও টপস ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।