Monday, May 26, 2025

সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন

চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বান্ধবী নিয়ে বেড়াতে গিয়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে চিকিৎসাধীন সন্ত্রাসী আলী আকবর প্রকাশ ঢাকাইয়া আকবর (৩২) মারা গেছে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার পশ্চিম পয়েন্টের ২৮ নম্বর দোকানের সামনে আড্ডারত অবস্থায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গত ৫ই আগস্টের পর চট্টগ্রামের আলোচনায় আসা সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের কয়েকটি সূত্র। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন দর্শনার্থী জান্নাতুল বাকী (৩০) এবং শিশু মহিম ইসলাম রাতুল (৮)। সে নগরের দক্ষিণ পতেঙ্গার ফুলছড়িপাড়ার শওকত হোসেনের ছেলে। আর জান্নাতুল বাকী ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কর্মরত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি ঢাকা থেকে আটক হওয়া সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের লোকজন এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আর ঘটনার কলকাঠি নেড়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। যিনি ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ‘গুরু’। গুলিবিদ্ধ ঢাকাইয়া আকবরও একসময় বড় সাজ্জাদের শিষ্য ছিল। কিন্তু বছরখানেক আগে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। ঘটনার শুরু থেকেই আকবরের সঙ্গে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবকের বর্ণনা অনুযায়ী, নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণীর সঙ্গে আকবরের ফেসবুকে পরিচয় হয় মাত্র পাঁচদিন আগে। কথাবার্তার একপর্যায়ে দেখা করার প্রস্তাব দেয় আকবর। ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পতেঙ্গা সৈকতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সে অনুযায়ী নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন মোড় এলাকায় এক ছোট ভাইকে দিয়ে প্রাইভেটকার পাঠায় আকবর। কিন্তু সেদিন ওই তরুণী আসেনি। পরদিন বিকালে তরুণীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে আবারো একইস্থানে গাড়ি পাঠানো হয়। শুক্রবার বিকাল ৩টার পর অক্সিজেন মোড় জামান হোটেলের বিপরীতের প্রাইম ব্যাংকের সামনে দাঁড়ায় প্রাইভেটকারটি। কিছুক্ষণ পর নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণী ঘটনাস্থলে যান বোরকা ও মাস্ক পরে। গাড়িতে ওঠার আগে তরুণী জানান, তার এক বান্ধবী ও বয়ফ্রেন্ডও সঙ্গে যাবে। পাঁচ মিনিটের মাথায় ওই তরুণী মুঠোফোনে ওই দু’জনকে সরাসরি পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে প্রাইভেটকারে চড়ে। তরুণীকে নিয়ে এরপর যাওয়া হয় একই থানাধীন চালতাতলী পূর্ব মসজিদ এলাকায় আকবরের বাড়ির সামনে। সেখান থেকেই আকবর গাড়িতে চড়ে। গাড়ি গিয়ে থামে জিইসি মোড় এলাকায়। একটি কাপড়ের শো-রুম থেকে কয়েকটি শার্ট কেনে আকবর।

এরপর গাড়িটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সরাসরি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে রওয়ানা হয়। গাড়িতে থাকা অবস্থায় আকবর পতেঙ্গা এলাকার কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে। বিকাল আনুমানিক পাঁচটায় গাড়ি পতেঙ্গায় পৌঁছায়। আকবর তার বন্ধুদের ফোন করলে তারা আসতে দেরি হবে বলে জানায়। তখন ওই তরুণীসহ কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারা পারকির সমুদ্র সৈকতে যায়। সেখানে প্রায় আধাঘণ্টা তরুণীর সঙ্গে সময় কাটায় আকবর। একপর্যায়ে অচেনা কয়েকজন ছেলে আকবরকে সালাম দিয়ে জানায়, ফেসবুকে আকবরের ভিডিও তারা দেখে। আকবর তাদের চিনতে না পেরে সন্দেহবশত তড়িঘড়ি করে আবারো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ফেরে। পতেঙ্গা সৈকতে ফেরার পর আকবরের পূর্বপরিচিত পতেঙ্গা এলাকার বন্ধুরা কল দেয় এবং সৈকতে তাদের দেখা হয়। যাদের মধ্যে তিনজন আকবরের সমবয়সী ছিল, বাকি একজন বড় ভাই। এরপর প্রাইভেটকার পার্কিং করে তারা সবাই মিলে সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ তারা গল্প করে দোকানিকে ডেকে নাশতা অর্ডার করে। এরই মধ্যে দোকানি পিয়াজু নিয়ে আসেন। আকবর এক প্লেট পিয়াজুসহ ওই তরুণীকে নিয়ে একটু দূরে আরেকটি টেবিলে গিয়ে বসে। প্রায় ১০ মিনিট পর হঠাৎ চার যুবক এসে আকবরকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। চারদিক ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ আকবর প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রের দিকে দৌড়াতে থাকে এবং একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আকবরের সঙ্গে থাকা সবাই এ সময় ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালায়।
আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই আকবরকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও ২ জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী।

mzamin

তাজমহলের সুরক্ষায় বসছে অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম

ভারত-পাক সংঘাতের আবহে এবার তাজমহলের নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে।  ভারত সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য আকাশ হুমকি মোকাবেলায় একটি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক তাজমহলের নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী (CISF) এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশ দ্বারা সুরক্ষিত এই স্মৃতিসৌধটিতে শীঘ্রই উন্নত ড্রোন নিরপেক্ষকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষার একটি অতিরিক্ত স্তর সংযুক্ত করা হবে। পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে ৭ মে পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে নয়টি ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে’ ভারত অপারেশন সিঁদুরের অধীনে সুনির্দিষ্ট হামলা চালানোর কয়েকদিন পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হল। পাল্টা হিসেবে পাকিস্তান থেকে  ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক এই ধরণের সমস্ত বিমান হুমকি প্রতিহত করা হয়েছিল, সেইসঙ্গে  সংবেদনশীল স্থানে ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিল। সহকারী পুলিশ কমিশনার (তাজ নিরাপত্তা) সৈয়দ আরিব আহমেদ বলেন, তাজমহলের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কার্যকর থাকবে এই সিস্টেম। ২০০ মিটার দূর থেকেই ড্রোনকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে নতুন সিস্টেম । আহমেদ আরও বলেন, পুলিশ কর্মীদের এই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং একটি টিম  গঠন করা হচ্ছে। এই টিম ড্রোনটির উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করবে এবং যেখানে এটি নামানো হয়েছে সেই এলাকাটি সুরক্ষিত করবে। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সিস্টেমটি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় তাজমহল ভারতের উল্লেখযোগ্য একটি স্মৃতিসৌধ এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক। যার ফলে এর নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় বলে মনে করছে মোদি সরকার।

সূত্র :  এনডিটিভি

mzamin

ইসরায়েলের চেষ্টায় থামবে না ইরানের পারমাণু কর্মসূচি : সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে ইসরায়েলের একক সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।

ইসরায়েলকে সতর্ক করে সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসরায়েল যদি একা ইরানে হামলার চেষ্টা করে, তবে তা এ অঞ্চলে ভয়াবহ পরিণতির সূচনা করতে পারে।

শনিবার (২৪ মে) ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেরি এসব কথা বলেন। তিনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান পারমাণবিক আলোচনা ও তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার হুমকি নিয়ে ইসরায়েলের ভূমিকার বিষয়ে নিজের মত তুলে ধরেন।

সাক্ষাৎকারে জন কেরি বলেন, ট্রাম্প সম্ভাব্য সর্বোত্তম চুক্তি করতে পারবেন। আমি বিশ্বাস করি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটা সমাধান অবশ্যই বের করবেন। আমি খুশি যে, প্রেসিডেন্ট এটি অনুসরণ করছেন। আমি মনে করি এটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে ইসরায়েল একা কিছুই করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া তেহরানে হামলা চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

কেরি আরও বলেন, তারা (ইসরায়েল) হয়তো ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে পারবে, কিছু ক্ষতি করতেও সক্ষম হবে। কিন্তু এর ফলে গোটা অঞ্চলে একটি বিপজ্জনক সংকটের সূচনা হবে, যার ফলাফল হবে ভয়াবহ।

এদিকে শুক্রবার (২৩ মে) ইতালির রাজধানী রোমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পঞ্চম দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান জানিয়েছে, এবারের বৈঠকে কিছু নতুন প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়েছে। এগুলো এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনে মূল্যায়নের পর পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, এই জটিল সমস্যার সমাধান দুই-তিনটি বৈঠকে সম্ভব নয়। তিনি রোমে ওমানি দূতাবাসে অনুষ্ঠিত আলোচনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যতম পেশাদার বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জানান, ইরান তার অবস্থান স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের কঠোর অবস্থানে অনড় রয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও সীমিত করতে হবে।

ইরান বলছে, তারা পরমাণু চুক্তি মেনে চলতে চায়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি ছাড়া তারা কোনো চুক্তিতে অগ্রসর হবে না। বিশেষ করে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা চুক্তি প্রত্যাহারের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে- এটাই তাদের প্রধান শর্ত।

এ প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের একক হুমকি বা পদক্ষেপ যে তেহরানকে দমাতে পারবে না, জন কেরির বক্তব্যে সে বার্তাই উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই বার্তা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পাক-ভারতের দুই হায়দরাবাদ, দুই বেকারি, দুই রকম ভাগ্য

এই গল্পটি দুটি শহরের— দুটিই নামকরণে এক, হায়দরাবাদ। একটি ভারতের দক্ষিণে, অন্ধ্রপ্রদেশে। অপরটি পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে। কিন্তু এই দুটি হায়দরাবাদ শহরের ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই বেকারির নিয়তিকে দাঁড় করিয়েছে দুই বিপরীত মেরুতে।

একদিকে ভারতের হায়দরাবাদের ঐতিহ্যবাহী ‘করাচি বেকারি’, অন্যদিকে পাকিস্তানের হায়দরাবাদের ‘বোম্বে বেকারি’। দুটি প্রতিষ্ঠানই শুধু ব্যবসা নয়, উপমহাদেশের বিভক্ত ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক।

ভারতের হায়দরাবাদে ১৯৪৭ সালে গঠিত হয় করাচি বেকারি। দেশভাগের সময় করাচি থেকে ভারতে পাড়ি জমানো এক হিন্দু শরণার্থী পরিবার এটি প্রতিষ্ঠা করে। পূর্বপুরুষদের শহরের প্রতি ভালোবাসা ও স্মৃতিকে ধারণ করেই বেকারির নাম রাখা হয় ‘করাচি’।

দীর্ঘ সাত দশক ধরে এটি কেবল বেকারি নয়, হয়ে উঠেছে স্থানীয় ও প্রবাসী ভারতীয়দের এক ধরনের আবেগ, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অংশ। তাদের ফল কেক, প্লাম কেক, বিস্কুট ভারতের নানা প্রান্তে সুপরিচিত।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সীমান্ত সংঘর্ষের পর ‘করাচি’ নামটি হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদীর টার্গেটে। হিন্দু উগ্রবাদীরা করাচি বেকারির বিভিন্ন শাখায় হামলা চালায়, পাকিস্তানের পতাকা পোড়ায়, এমনকি সাইনবোর্ডে ‘করাচি’ লেখা ঢেকে ফেলতে বাধ্য করে।

২০১৯ সালে বেঙ্গালুরুর শাখাও একই ধরনের বিদ্বেষের শিকার হয়। একজন গ্রাহক টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেন, ঘৃণায় এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে মানুষ, যে বোঝার চেষ্টাও করছে না— কে এই বেকারির মালিক, কী তার উদ্দেশ্য।

তবে হায়দরাবাদের অনেকেই এখনো এই ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসছেন। একজন স্থানীয়, হরিশ জানান, আমরা ভালোবাসা দিয়ে প্রতিবাদ করব। আরও কেক কিনব, আরও সমর্থন জানাব।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের হায়দরাবাদের বোম্বে বেকারি এক শান্ত ও গর্বিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯১১ সালে হিন্দু ব্যবসায়ী পহলাজরাই গঙ্গারাম থাদানি এই বেকারির সূচনা করেন। দেশভাগের পরও পরিবারটি এই প্রতিষ্ঠান ধরে রাখে।

পরবর্তী প্রজন্মের একজন সদস্য ইসলাম গ্রহণ করে হন সালমান শেখ। বর্তমানে বেকারিটি পরিচালিত হচ্ছে পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের মাধ্যমে। এক সময়ের কর্মচারী আজিজ ভাই আজিজ, যিনি ১৯৬১ সালে কাজ শুরু করেন, এখনো প্রতিষ্ঠানটির অংশ। তিনি বলেন, পাক-ভারত উত্তেজনা যতই বাড়ুক, আমাদের এই গলিতে কখনো আতঙ্ক দেখিনি।

বোম্বে বেকারির নাম নিয়ে কখনোই আপত্তি ওঠেনি পাকিস্তানে। বরং তাদের বাদাম কেক, চকলেট কেক, কফি কেক দেশের নানা প্রান্তে পরিচিত। অতিথি আপ্যায়ন, উৎসব বা পরিবারের মুহূর্ত— সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বেকারির নাম।

স্থানীয় এক বাসিন্দা রাফায় খান বলেন, আমরা করাচি বেকারিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। বোম্বে বেকারি শুধু একটি দোকান নয়, এটি হায়দরাবাদের আত্মা।

এই দুই বেকারির ভিন্ন ভাগ্য আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তোলে—আমরা কি শুধু নাম দেখে মানুষ বা প্রতিষ্ঠানকে বিচার করব, নাকি তাদের ইতিহাস, অবদান ও মানবিক মূল্যবোধকে বিবেচনায় নেব?

করাচি বেকারি ও বোম্বে বেকারি— দুটিই এক অভিন্ন অতীতের উত্তরসূরি। কিন্তু একটিকে আজ ঘৃণা গ্রাস করছে, আরেকটি রয়ে গেছে ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের আশ্রয়ে। এটাই দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা— যেখানে ইতিহাসের কিছু অংশ সংরক্ষিত থাকে, আর কিছু হারিয়ে যায় রাজনীতির কুয়াশায়।

সূত্র : টিআরটি ওয়াল্ড, ডন নিউজ

করাচি বেকারি ও বোম্বে বেকারি— দুটিই ভারত-পাকিস্তানের এক অভিন্ন অতীতের উত্তরসূরি। ছবি : সংগৃহীত
করাচি বেকারি ও বোম্বে বেকারি— দুটিই ভারত-পাকিস্তানের এক অভিন্ন অতীতের উত্তরসূরি। ছবি : সংগৃহীত



আরও অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলো ইসরাইল: গাজায় নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা এখন ২২০

গাজা উপত্যকায় আরও অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল বাহিনী। শনিবার দিনভর হামলা চালিয়ে এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায় দখলদার বাহিনী।

ওয়াফা সংবাদ সংস্থার বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শনিবার গাজা জুড়ে ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৫২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর আগে শুক্রবার অন্তত ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। শনিবার এক বিবৃতিতে একথা জানায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
ওই বিবৃতিতে বলা হয়,  গাজা জুড়ে ইসরাইলি এসব হামলায় ৭০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এসব হামলায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের পাশাপাশি তাদের ব্যবহৃত টানেল এবং অবকাঠামো এবং অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছিল। 

গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা এখন ২২০

ইসরাইলি বিমান হামলায় গাজায় আরেক সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ২২০ জনে দাঁড়িয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু। এতে বলা হয়, নিহত সাংবাদিকের নাম হাসান মাজদি আবু ওয়ার্দা। স্থানীয় সংবাদ সংস্থা বারক গাজার পরিচালক ছিলেন তিনি। উপত্যকাটির উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়ার নাজলা এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্দার বসতবাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে তার সঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় মিডিয়া। ইসরাইলের এমন হামলাকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেছে তারা। এছাড়া বিশ্বের মানবাধিকার ও গণমাধ্যম সংগঠনগুলোর প্রতি ইসরাইলের এমন ইচ্ছাকৃত অপরাধের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। গাজায় ইসরাইলি হামলার মধ্যে শুরু থেকেই জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন সাংবাদিকরা। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও তারা নিয়মিত তথ্য ও চিত্র সরবরাহ করে আসছেন। যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু ইসরাইলের টার্গেটেড হামলায় একের পর এক সংবাদকর্মী প্রাণ হারাচ্ছেন। যা বেশ উদ্বেগের। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরাইল সংঘাত শুরুর পর থেকে গাজায় যে নারকীয় তাণ্ডব শুরু করেছে নেতানিয়াহুর বাহিনী, তাতে এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৯০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। ব্যাপক বোমা হামলায় গাজার হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্রসহ নাগরিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

mzamin

অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা, না দেশের ব্যর্থতা by জিয়াউদ্দিন চৌধুরী

একটি বাংলা গানের প্রথম কলি এ রকম, ‘আমার বয়স বাড়ে কিন্তু আমি বাড়ি না’। এককথায়, আমার বয়স হলেও আমি অপরিণত থেকে যাই।

বিখ্যাত স্কটিশ লেখক উইলিয়াম ব্যারি তাঁর উপন্যাসে ‘পিটার প্যান’ নামের একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। সেই চরিত্র সব সময় শিশুর মতো ব্যবহার করত। তার আশপাশের সবাই পরিপক্ব হলেও সে চিরকাল বালখিল্য ব্যবহার করে মানুষকে আমোদ দিত।

‘পিটার প্যান’ চরিত্রটি পরে ইংরেজি ভাষায় ব্যবহার করা হয় এমন একজন ব্যক্তির বর্ণনা দিতে, যিনি পরিপক্বতাতেও বড় হতে চায় না। মানুষটি চিরকাল অপরিপক্ব থেকে যায়, যে দুই বছরের শিশুর মতো আচরণ করে। এই মানুষগুলো কখনোই শৈশবের অহংকেন্দ্রিক, আত্মকেন্দ্রিক, অপরিণত পর্যায় অতিক্রম করতে পারে না।

আমি এই উপসর্গকে একটি দেশ বা জাতিকে বর্ণনা করার জন্য প্রসারিত করতে পারি, যদি এটি বর্ণনার সঙ্গে খাপ খায়।

আমি আমার প্রিয় দেশ বাংলাদেশের জন্য এই উপমা টানতে বাধ্য হচ্ছি। সমাজের অবস্থা দেখে মনে হয় না কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি দেশে আছে। যে যার খুশিমতো আন্দোলন চালাচ্ছে। তার দাবি নিয়ে হয় অফিস ঘেরাও করছে কিংবা রাস্তা অবরোধ করছে, তার অধিকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অপসারণ চাইছে। তাদের কাছে নিজের চাওয়া সবচেয়ে জরুরি, যা এখনই সমাধান করতে হবে। তা না হলে সে ঘেরাও ছাড়বে না, রাস্তায় কাউকে চলতে দেবে না, দরকার হলে আমৃত্যু অনশন করতেও রাজি।

মানুষের আচরণ থেকে বোঝা যায় না যে এটি এমন একটি দেশ, যার বয়স ৫৫ পার হতে চলেছে আর দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক মধ্যবয়স পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের আচরণ সেই ‘পিটার প্যান’ চরিত্রের মতো, তারা এত বছরেও বদলাতে পারেনি। প্রতিটি দাবির জন্য তারা তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি চায়। এ দাবির ব্যাপারে কেউ কম যায় না।
ছাত্র, সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক এবং তারপর রাজনীতিবিদেরা যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছেন, তার উদাহরণ নিন।

দেশ একটি বিশাল আন্দোলনের ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি গোষ্ঠী নিয়ত বিক্ষোভ জানাচ্ছে আর তাদের নালিশের তাৎক্ষণিক সমাধান চাইছে। তারা তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত নতিস্বীকার করবে না। এটা হয়তো থামত, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে তারা জয়ী হয়েছে এবং তারপর অন্যান্য অসন্তুষ্ট অংশের কাছ থেকে নতুন দাবি উত্থাপিত হচ্ছে। এ এক অন্তহীন চক্র। কিন্তু কীভাবে এবং কখন এটি শুরু হয়েছিল?

৯ মাস আগে ছাত্রদের দ্বারা শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভ আমাদের ইতিহাসের এক অন্যতম রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল, যার ফলে একটি অত্যন্ত অজনপ্রিয় সরকার এবং এর সমানভাবে অজনপ্রিয় নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। কিন্তু ৯ মাস আগের অস্থিরতা এখনো শেষ হয়নি। দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারী শাসনের পতনে যে গণস্বস্তি ও আনন্দ উদ্‌যাপন করা হয়েছিল, তা হয়ে গেল ক্ষণস্থায়ী।

দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে থাকা জনগণের আশা ছিল, দেশ এক নতুন পথে যাবে। এর পাশাপাশি আরও একটি আশা ছিল, স্বৈরাচারী শাসনের শিকার জনগণ দেশে ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনার যত্ন নেবে।

নিজেদের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে অন্যের অধিকারের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হবে।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সরকারি ও বেসরকারি ক্যাডারদের মতো নতুন কোনো জুলুমবাজ দল গড়তে দেবে না। অন্তত আন্দোলনের প্রথম দিকে মানুষের আশা তা–ই ছিল।

কিন্তু আমাদের তরুণদের আন্দোলনের পর দেশ ও জনগণের আচরণে পরিবর্তন আশা করা গেলেও শেষ পর্যন্ত সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত না করতে পারলে দেশকে আইনের শাসন ও শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।

এর মূল কারণ, এ পর্যন্ত আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার—যার সঙ্গে কিছু তরুণ আন্দোলনকারীও জড়িত—তারা দেশের অস্থিরতাকে এখনো দূর করতে পারছে না। তা নিজেদের মধ্যে মতবিভেদের জন্য হোক কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতবিরোধের জন্য হোক।

এটা ঠিক যে আগস্টের সরকার পরিবর্তন কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে ছিল না, বরং এটা ছিল একটা গণ-আন্দোলনের পরিবর্তন। যেহেতু এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রথমে বিক্ষিপ্ত থাকে, তাই আইনশৃঙ্খলা স্থাপনে সরকারকে বেগ পেতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জরুরি কাজ প্রথম দিকে বিঘ্নিত হয়। কিন্তু যখন একটি সরকার নিয়মমাফিক গঠিত হয় ও অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশ আশা করে যে এই নতুন সরকার জনসাধারণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে তৎপর হবে যত দিন তারা এ দায়িত্বে আছে।

এই মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম দেশে আইনশৃঙ্খলা স্থাপন, মানুষের মৌলিক অধিকার, অর্থাৎ জানমালের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং নিজের অধিকারের সঙ্গে অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর নিশ্চিত করা।

কিন্তু কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও এই মৌলিক অধিকারগুলো সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েনি।  আমরা বুঝতে পারি, বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অভিযোগগুলো ভুক্তভোগী গোষ্ঠী থেকে হঠাৎ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে এবং আমরা জুলাই আন্দোলনের পরে প্রথম কয়েক সপ্তাহে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা দেখেছি।

এই জড়তা এমন একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে এসেছিল, যা এত দিন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের অধীন কাজ করে আসছিল। তবে আমরা আশা করেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার স্থিতিশীল হলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে।

দুর্ভাগ্যবশত আগের সরকার চলে যাওয়ার প্রায় ৯ মাস পরও সেই স্থিতিশীলতার মুহূর্ত দেখা যাচ্ছে না। এই অস্থিতিশীলতায় অবদান রাখছে এমন ঘটনা বা যেসব গোষ্ঠী, যাদের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অপসারণের জন্য চিৎকার করে এবং দাবি পূরণের জন্য সামান্যতম অজুহাতে তাদের রাস্তায় নেমে যায়।

চাকরিচ্যুত কর্মচারীরা চাকরি ফিরে পেতে চান বা রাস্তা অবরোধ করে তাঁদের ওপরওয়ালাকে অফিস থেকে সরিয়ে দিতে চান। অতি সম্প্রতি তরুণদের দ্বারা গঠিত একটি রাজনৈতিক দল তাদের দাবির তাৎক্ষণিক সমাধানের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে।

সর্বশেষ উদাহরণ, সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ কাজ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে (এটিকে কলমবিরতি বলছে), কারণ তারা একটি সরকারি সংস্থাকে দ্বিখণ্ডিত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করে না।

আমরা আমাদের কিছু জনগণের কর্মকাণ্ডকে শিশুসুলভ বলতে পারি, কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণ করার এবং এ ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নেই সরকারে?
সমস্যার মূলে আমি এখন যা দেখছি, বর্তমান সরকারের কোনো আদেশ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী (ইংরেজিতে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল) নেই। সরকারের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা হয়তো রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নন, কিন্তু তাঁরা খ্যাতিমান সংগঠন পরিচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তাঁদের জানা উচিত, সরকার পরিচালনা করা সবাইকে খুশি করা নয়।

প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা ও আইনের প্রয়োগ। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য দায়িত্ব নেওয়াও প্রয়োজন। এই দায়িত্বের ব্যর্থতা শুধু সরকারপ্রধানের ওপর বর্তায় না, যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি আছেন, প্রথমত তাঁর ওপর বর্তায়। সরকারপ্রধান সেই ব্যক্তি নন, যাঁর কাছে সব বিক্ষোভকারীকে প্রতিটি দাবি আদায়ের জন্য দৌড়াতে হবে। একইভাবে সব প্রতিবাদ রাস্তা অবরোধ ও অফিসের কার্যক্রম বন্ধের মাধ্যমে প্রদর্শন করার জন্য নয়। মানুষের অভিযোগ প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু তা অন্যের চলাফেরার অধিকারে বাধা সৃষ্টি করার লাইসেন্স দেয় না।

দুর্ভাগ্যবশত দেশের বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় না যে এগুলো শিগগিরই শেষ হতে চলেছে। কারণ, এখন পর্যন্ত সব মহলে বিরাজ করা বিভ্রান্তি নিরসনে সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো নজির আমরা দেখিনি। আমরা জানি, সচেতন জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না সরকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতা দেশকে নৈরাজ্যে পরিণত করুক, এটা কেউ চায় না। এ স্বাধীনতা ক্রমেই মানবাধিকারের প্রথম নীতি, যা অন্যের অধিকারের আনুগত্য এবং সম্মান করাকে লঙ্ঘন করছে।

আমাদের যুবকেরা একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ভূমিকায় ছিল। কিন্তু দেশকে আইনের শাসন দিতে ব্যর্থ একটি সরকারকে অপসারণের তাদের আন্দোলনের সাফল্য অচিরেই বাষ্পীভূত হয়ে যাবে, যদি বর্তমান অচলাবস্থা শিগগিরই শক্ত হাতে শেষ করা না যায়। বিক্ষোভ ও সমাবেশ শুরু হওয়ার আগে যাঁরা সেই সংস্থাগুলো পরিচালনা করছেন, তাঁরা থামাতে পারতেন বা পারেন, যদি তাঁরা এ সংস্থাগুলোর সমস্যা আগে থেকে চিহ্নিত করতে পারেন এবং তা সুরাহার জন্য প্রথমে নিজেরা এবং না পারলে তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে যান। সরকারের উচিত এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাকে দায়িত্ব দেওয়া। তাদের রাস্তায় নামার দরকার নেই। যদি তারা সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারে, তবে সে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা দরকার।

এসব প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দরকার। রাস্তাঘাট নিরাপদ করা দরকার, এগুলো সমাবেশের জায়গা নয়। পরিশেষে প্রত্যেক আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা দরকার। সরকারি–বেসরকারি যে–ই হোক।

শুধু আইন প্রয়োগ করে হয়তো আমরা একশ্রেণির মানুষের বালখিল্য ব্যবহার বন্ধ করতে পারব না। তবে দেশের মানুষের সার্বিকভাবে মানসিক পরিপক্বতার জন্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সামগ্রিকভাবে মানসিক পরিবর্তন দরকার। তাদেরও পরিপক্বতার প্রয়োজন। চাইলেই আজ ক্ষমতা হাতে আসবে, সেটা ঠিক নয়। জনগণ সেটা দেবে, যখন আপনাদের তারা উপযুক্ত মনে করবে। আশা করছি, আমাদের শিশুসুলভতা দূর হবে সবার ইচ্ছা থাকলে।

* জিয়াউদ্দিন চৌধুরী সিভিল সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা

দেশ একটি বিশাল আন্দোলনের ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি গোষ্ঠী নিয়ত বিক্ষোভ জানাচ্ছে আর তাদের নালিশের তাৎক্ষণিক সমাধান চাইছে।
দেশ একটি বিশাল আন্দোলনের ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি গোষ্ঠী নিয়ত বিক্ষোভ জানাচ্ছে আর তাদের নালিশের তাৎক্ষণিক সমাধান চাইছে। ছবি : প্রথম আলো

গাজার ৭৭ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণের’ যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে দেশটির সামরিক বাহিনী। উপত্যকাটির ৭৭ শতাংশ ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে গাজার ক্ষুদ্র একটি অংশের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন ফিলিস্তিনিরা। অবিরাম হামলা ও অনাহার তাঁদের দুর্দশা আরও বাড়িয়েছে।

আজ রোববার গাজার জনসংযোগ কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক ও আবাসিক এলাকায় সরাসরি স্থল অভিযান ও দখলদার বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে গাজার ৭৭ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েল। এসব এলাকা থেকে হয় ফিলিস্তিনিদের চলে যেতে বলা হয়েছে, না হয় গুলি চালানো হচ্ছে। এতে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না তাঁরা।

দখলদারি বন্ধে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে গাজার জনসংযোগ কার্যালয়। তারা বলেছে, উপত্যকাটির বেশির ভাগ এলাকায় চলমান জাতিগত নিধন, উপনিবেশবাদ, আগ্রাসন ও দখলদারি এটাই দেখাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক সব আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে শক্তি খাটিয়ে একটি ‘চূড়ান্ত সমাধান’ চাপিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক ইচ্ছা রয়েছে ইসরায়েলের।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। মাস দুয়েকের যুদ্ধবিরতির সময় ছাড়া উপত্যকাটিতে নির্বিচার চলছে মানুষ হত্যা। গতকালও গাজায় অন্তত ২৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ দিন দক্ষিণের খান ইউনিস, উত্তরের জাবালিয়া ও মধ্য গাজার নুসেইরাতে হামলা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আশরাফ আবু নার মানের এক সাংবাদিক রয়েছেন।

গাজার জনসংযোগ কার্যালয়ের হিসাবে, এ নিয়ে সংঘাত শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে প্রায় ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। এ সময় আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ২২০ সাংবাদিক নিহত

গাজায় ১৯ মাস ধরে চলমান হামলায় মোট ২২০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। গাজার জনসংযোগ কার্যালয় এ হিসাব দিয়েছে। এই সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন আশরাফ আবু নার নামের একজন। আজ রোববারই ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। মাস দুয়েকের যুদ্ধবিরতির সময় ছাড়া উপত্যকাটিতে নির্বিচার চলছে মানুষ হত্যা। আজও গাজায় অন্তত ২৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ দিন দক্ষিণের খান ইউনিস, উত্তরের জাবালিয়া ও মধ্য গাজার নুসেইরাতে হামলা হয়েছে।

গাজার জনসংযোগ কার্যালয়ের হিসাবে, গাজায় ১৯ মাস ধরে চলমান হামলায় এখন পর্যন্ত ২২০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে সংঘাত শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে প্রায় ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। এ সময় আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।

উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে গাজায় হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে উপত্যকাটির সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। আজ সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আল-মুগাইর বলেন, ‘আমাদের তথ্য অনুযায়ী আমরা সহায়তা করতে না পারার কারণে ৯ হাজার ৭০০ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।’

গাজায় ইসরায়েলের ওপর পাল্টা আঘাত হানার কথা বলেছে হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসেম ব্রিগেডস। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০ মে খান ইউনিসের আল-কারারা এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি সেনাদের একটি দল অবস্থান করছিল। সেখানে হামাস যোদ্ধারা বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ‘শত্রু’ সেনারা হতাহত হন।

অনাহারে শিশুর মৃত্যু

এদিকে ইসরায়েল গাজায় দিনে ১০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিলেও তার অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে উপত্যকাটির কর্তৃপক্ষ। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার পর সেখানে ৩০০টি ত্রাণের ট্রাক প্রবেশ করেছে। তবে ফিলিস্তিনের একজন কর্মকর্তার অভিযোগ, মাত্র ৯২ ট্রাক হাতে পেয়েছেন তাঁরা।

এমন পরিস্থিতিতে খাবারসহ জরুরি পণ্যের অভাবে অনাহার-অর্ধাহারে রয়েছেন গাজার বাসিন্দারা। অনেক ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে খাবারের মজুত শেষ হয়ে গেছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছে, গাজায় প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রয়োজন। উপত্যকাটির বাসিন্দাদের আর অপেক্ষা করার অবস্থা নেই।

খাবারের অভাবে অনাহারে গাজায় চার বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তাঁর নাম মোহাম্মদ ইয়াসিন। এর মধ্য দিয়ে গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ শুরুর পর থেকে অনাহারে মৃত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৫৮-তে দাঁড়াল।

৭ অক্টোবর থেকে গাজাকে অবরুদ্ধ করে নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। পাশাপাশি তারা গাজায় স্থল অভিযানও চালাচ্ছে
৭ অক্টোবর থেকে গাজাকে অবরুদ্ধ করে নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। পাশাপাশি তারা গাজায় স্থল অভিযানও চালাচ্ছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আমেরিকাকে বাদ দিয়েই ইউরোপকে চলতে হবে by জোশকা ফিশার

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় দুনিয়ায় বড় রকমের পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল (আর যা ১৯৮৯ সালে শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আরও দৃঢ় হয়েছিল), সেই সম্পর্ক ট্রাম্পের নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের কারণে এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বড় পরিবর্তন এমনভাবে শুরু হয়েছে, যার জন্য আগে থেকে কারও কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। আর এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে ইউরোপ। ইউরোপ আবার যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে—ইউক্রেনে যে যুদ্ধ চলছে, সেটিই তার স্পষ্ট প্রমাণ। অথচ এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপে থাকা মার্কিন সেনাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, ইউরোপকে এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আমাদের কী হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের ইউরোপীয়দের নিজেদেরই দিতে হবে; পুরোপুরি নিজেদের দায়িত্বেই দিতে হবে।

ভুল বুঝবেন না, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে সরে যাচ্ছে। তারা হয়তো পুরোপুরি বিদায়ের সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি, কিন্তু সব ইঙ্গিত সেই দিকেই যাচ্ছে। তাই ইউরোপীয়দের এমনভাবে কাজ করা উচিত, যেন যুক্তরাষ্ট্রের পুরোপুরি সরে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র শুধু দূরে সরে যাচ্ছে না, বরং এটি একটি গ্যারান্টার শক্তি হিসেবে এবং বৈশ্বিক মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থার প্রধান বাজার হিসেবে তাদের ভূমিকা থেকেও সরে আসছে।

এখনই তারা বন্ধু ও বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে অর্থনৈতিক আগ্রাসন শুরু করেছে, যা কিনা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। মুক্তবাণিজ্যের জায়গায় এসেছে সুরক্ষাবাদ (প্রটেকশনিজম) এবং এর ফলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

বিশ্ব এখন এমন একটি অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে শুল্কনির্ভর বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে নতুন ভূরাজনৈতিক জোটগুলোর প্রতিফলন ঘটবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পশ্চিম ইউরোপ আমেরিকার নিরাপত্তাছায়ার নিচে বসবাস করেছে। এই অঞ্চলগুলো এমন মূল্যবোধ শেয়ার করত, যা গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করত। শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই মূল্যবোধ পুরো ইউরোপজুড়েই গৃহীত হয়েছিল।

কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রত্যাহার ইউরোপীয়দের সামনে একেবারে ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করছে। ইউরোপীয়দের সামনে নতুন বাস্তবতা হলো: নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ তাদের নিজেদেরই গড়ে তুলতে হবে। এখন আর পুরোনো ছায়ার নিচে বসে থাকলে চলবে না।

আমাদের এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, যেখানে একদিকে থাকবে সাম্রাজ্যবাদী ও আগ্রাসী রাশিয়া, আর অন্যদিকে থাকবে এমন একটি আমেরিকা—যার ওপর আর ভরসা করা যাবে না। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরছে: আমরা কি সত্যিই নিজেদের এমন একটি শক্তিতে রূপান্তরিত করতে প্রস্তুত, যে নিজে টিকে থাকতে ও নেতৃত্ব দিতে পারে?

যদি ইউরোপের জনগণ এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়, তাহলে ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সব কাঠামোকে (সামরিক, রাজনৈতিক, আর্থিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক) সামনে আনতেই হবে। প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌম হওয়ার মানে হলো নিজের শক্তি ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ওপর আস্থা রাখা।

আমরা এখন শুধু একটি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, বরং একই সঙ্গে এক বিশাল প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছি। ডিজিটাল বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান সব অর্থনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে এবং তাদের মধ্যে জটিল সম্পর্কগুলোকেও নতুনভাবে রূপ দেবে।

এই বিশাল পরিবর্তনের মুখে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় রাষ্ট্রগুলো কেবল তখনই টিকে থাকতে পারবে, যদি তারা একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রকাশ করতে পারে। প্রত্যেকে আলাদাভাবে (এমনকি সবচেয়ে বড় দেশ জার্মানিও) এ কাজের জন্য খুবই ছোট ভূমিকা রাখতে পারবে।

আমাদের সামনে যেসব বাইরের চাপ আছে, সেগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেখার সুযোগ নেই। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং পূর্ব ইউরোপের অন্য দেশগুলোকে হুমকি দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ তো করেইনি, বরং বরাবরই ইউরোপকে অবজ্ঞা করে এসেছে। শুধু তা–ই নয়, এখন তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে আমেরিকা নিজেও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবু তারা সে পথেই এগোচ্ছে। এ অবস্থায় ইউরোপসহ আমেরিকার অন্য বাণিজ্য অংশীদারেরাও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়ছে।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই চীন তাদের শক্তি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়নে খুব দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ফলে বিশ্বরাজনীতির ভারসাম্য এখন বড় রকমের পরিবর্তনের মুখে।

এসব চাপ আগামী মাস ও বছরগুলোতে আরও বাড়বে। কিন্তু ইউরোপীয়দের হাতে এখনো সুযোগ আছে। আমরা চাইলে বর্তমান সংকটকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক সুযোগ হিসেবে নিতে পারি। আমাদের চ্যালেঞ্জ শুধু অভ্যন্তরীণ ও বাইরের বাধাগুলো পেরোনো নয়, বরং নিজেদের বৈচিত্র্যময় পরিচয়ও রক্ষা করা।

সময়টা ইউরোপের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগটা যদি এখন হারিয়ে যায়, তাহলে হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ট্রাম্প আর পুতিন হয়তো এমন নেতা নন, যাঁদের আমরা এ মুহূর্তে নেতৃত্বে দেখতে চাই, কিন্তু বাস্তবতা হলো—এখন তাঁরা বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব রাখছেন। তাই ইউরোপের আর অপেক্ষা করার সময় নেই। আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। আমাদের এমন একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ইউরোপ গড়তে হবে, যে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না। অন্যথায় আমাদের ভবিষ্যৎ হবে একটা দুর্বল, ভীত, অন্যের দয়ানির্ভর জীবন।

এই লক্ষ্য পূরণে আমাদের প্রথমত, ইউরোপকে মিলিয়ে এমন একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে, যেন কেউ সহজে চোখ রাঙাতে না পারে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে থাকতে হবে, যেন আমাদের অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে। তৃতীয়ত, একটি অভিন্ন পুঁজিবাজার তৈরি করতে হবে, যাতে অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপ আরও সংহত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সব দেশ মিলে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও একে বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে।

জোশকা ফিশার জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

সময়টা ইউরোপের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ
সময়টা ইউরোপের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছবি: এএফপি

ভারতের মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া নতুন ‘যুদ্ধ’ by নাবিয়া খান

কাশ্মীরে গত মাসে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পর ভারতজুড়ে মুসলমানদের উদ্দেশ করে ঘৃণামূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে অস্ত্রধারীদের গুলিতে ২৬ জন নিহত হন। নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা

দিল্লিভিত্তিক প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস জানাচ্ছে, পেহেলগাম হামলার পর ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা ১৮৪টি ঘৃণামূলক কর্মকাণ্ড নথিভুক্ত করেছে।

প্রায় অর্ধেক ঘটনাই হলো ঘৃণাব্যঞ্জক ভাষার ব্যবহার। বাকিগুলোর মধ্যে ভয় দেখানো, হয়রানি, হামলা, ভাঙচুর, হুমকি ও কটূক্তির মতো ঘটনা রয়েছে। তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, অন্তত ১০০টি ঘটনার পেছনে পেহেলগাম হামলা ‘উদ্দীপক’ হিসেবে কাজ করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাসকে রাজনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং ভারতে মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকার সংজ্ঞাকে নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে।

পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ার ভারত সরকার ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে পাকিস্তানের কিছু স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ভারত সরকার অভিযোগ করে পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল। যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগকে অস্বীকার করে।

ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য হলো, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তারা এই অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু এটি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনা বৃদ্ধির একটি সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ভারতের সমাজেও বড় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জনপরিসর ও রাজনৈতিক পরিসরে ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে যে ধরনের ধারণা দেওয়া হচ্ছে এবং যেসব আচরণ করা হচ্ছে, সেখানেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী অ্যাকাউন্ট থেকে ভারতীয় মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অপারেশন সিঁদুর-বিষয়ক আলাপ-আলোচনায় ভারত সরকারের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে ভারতীয় মুসলমানদের দেশপ্রেমের পরীক্ষা চলছে। অথচ  বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতজুড়ে মুসলমানেরা পেহেলগাম হামলার নিন্দা করেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ভারত-পাকিস্তান যখনই সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনায় জড়ায়, তখন সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভারতের মুসলমানদের তার মাশুল দিতে হয়।

লেখক হুসেইন হায়দরি ‘মিডলইস্ট আই’-কে যেমনটা বলেছেন, ‘দশকের পর দশক ধরে ভারতের বহু মানুষ দেশটির মুসলমানদের “পাকিস্তানি” হিসেবে দেখে আসছে। তাঁদের বস্তিগুলোকে ডাকা হয় “মিনি পাকিস্তান” নামে। দুই দেশের ক্রিকেট ম্যাচ হলে তাদের পাকিস্তানের সমর্থক বলে বিদ্রূপ করা হয়। এমনকি “পাকিস্তানে চলে যাও” বলেও লাঞ্ছিত করা হয়।’

হুসেইন হায়দরি আরও বলেন, ‘সে কারণে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় যদি সংখ্যাগরিষ্ঠরা মুসলমানদের ক্ষতি করে তাতে নতুন করে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এই বৈষম্য ও সহিংসতার সাংস্কৃতিক কাঠামো বহু আগে থেকেই রয়ে গেছে।’

এবারে হরিয়ানার আম্বালায় দেখা গেল, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে দিতে একদল লোক মুসলমানদের মালিকানাধীন দোকানে আগুন দিচ্ছে। এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটা কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়। বরং ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর খোলাখুলি ও সুসংগঠিত সহিংসতা।

বাস্তবে যা ঘটেছে তার চেয়েও এখানে ট্র্যাজেডিটা বড়। অবিশ্বাসকে মূলস্রোতের রাজনীতিতে নিয়ে আসা হলো। এর অর্থ হচ্ছে, ভারতের মুসলমানদের নাগরিকত্বকে শর্তাধীন করে তোলা।

এই পরিস্থিতি হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পাঠ্যবই, টেলিভিশন বিতর্ক, রাজনৈতিক বক্তব্য, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও অনলাইন প্রচারের মাধ্যমে একটি মতাদর্শিক ভূমি প্রস্তুত করা হয়েছে। পেহেলগাম হামলা কেবল একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উত্তপ্ত হলেই ভারতের মুসলমানদের অনানুষ্ঠানিকভাবে আনুগত্যের পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু এখন সেই পরীক্ষাটি আরও স্পষ্ট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষক সারা আথার যেমনটা বলেছেন, ‘মুসলমানদের শুধু ভারতকে সমর্থন করলেই হবে না, তাদের পাকিস্তানকে জোরালোভাবে নিন্দাও জানাতে হবে। সাংবাদিকদের আমরা যেভাবে দেখছি, কাশ্মীরি ও মুসলমানদের মুখের সামনে মাইক্রোফোন ধরে সংঘাত সম্পর্কে তার মতামত জানতে চাওয়া হচ্ছে। এটা দেশপ্রেম নয়, এটা অপমান।’

সারা আথার আরও বলেন, ‘জাতীয়তাবাদ এখন বাদ দিয়ে দেওয়ার একটি হাতিয়ার হয়ে গেছে। গ্রহণযোগ্য মুসলমানের সংজ্ঞা কী হবে তার মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এখানে বার্তাটি পরিষ্কার। তুমি যদি ভারতের সমাজের একজন হিসেবে থাকতে চাও তাহলে তোমাকে অবশ্যই একটা সীমারেখা মেনে চলতে হবে। নাহলে তোমাকে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল, একজন সন্ত্রাসবাদী অথবা এর চেয়েও খারাপ একজন হিসেবে দেখা হবে।’

এটা জবরদস্তি করে সম্মতি আদায়, এটা আত্তীকরণ নয়। এর ঝুঁকির মাত্রাটাও বেশি। এখানে অস্বীকৃতি আর দ্বিধার মানেই হচ্ছে নজরদারি, সামাজিক বয়কট, হয়রানি ও সহিংসতা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—ভারতের মূলধারার রাজনীতিবিদেরা এ প্রশ্নে প্রায় নীরব। বিরোধী দলগুলো এই ঘৃণার ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে চাইছে না। তার কারণ হলো, তাতে জনসাধারণ বা রাষ্ট্রের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিবেশেই ঘৃণার চর্চা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আইনের শাসন প্রান্তিক হয়ে যায়। আর দায়মুক্তি পাওয়ায় মব তাদের কর্মকাণ্ড অবাধে করে যায়। সবকিছুই হয় দেশপ্রেমের আড়ালে।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে গোলাগুলি থেমে গেলেও ভারতীয় মুসলমানদের পরিচয়কে ঘিরে যে যুদ্ধ, সেটা অব্যাহত রয়েছে। সেই যুদ্ধটা চলছে নীরবতা আর অধিকার সংকোচনের বিরুদ্ধে।

একটি গণতন্ত্র যখন ধর্মের ভিত্তিতে দেশপ্রেমের পরীক্ষা নেয়, সেটা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। এটি একটি বাদমূলক, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থা। এই অবস্থার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ভারতের মুসলমানদের এমন একটা যুদ্ধে মূল্য চুকিয়ে যেতেই হবে, যেটা তারা নিজেরা শুরু করেনি। সেই যুদ্ধটা নিজেদের জীবন, নিরাপত্তা ও সম্মানের জন্য।

* নাবিয়া খান ভারতের কবি ও গবেষক
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলমানদের উদ্দেশ করে ঘৃণামূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে।
ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলমানদের উদ্দেশ করে ঘৃণামূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। ছবি : রয়টার্স