Friday, November 6, 2015

সংকট উত্তরণে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসার আহবান বিশিষ্টজনদের

দেশে গণতন্ত্র না থাকায় জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন দেশের বিশিষ্টজন ও রাজনীতিকরা। আজ শুক্রবার এক আলোচনা সভায় তারা বলেন, এটা দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তারা এ ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে নরম হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসুন। দলমতের সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসুন। একটি জাতীয় সরকার গঠন করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।
আজ রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউশন মিলনায়তনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদের নাগরিক স্মরণসভায় তারা এ কথা বলেন। এতে স্মরণসভার আহবায়ক সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও নজরুল ইসলাম খান, সাবেক মন্ত্রী ড. মিজানুর রহমান শেলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কলামিস্ট ড. তারেক শামসুর রহমান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, বিএনপির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সৈয়দ সফিউল্লাহ, জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. ফজলে রাব্বী মিয়া, ভাসানী অনুসারী পরিষদের নির্বাহী চেয়ারম্যান অধ্যাপক জসিম উদ্দিন প্রমুখ।
স্মরণসভা কমিটির সদস্য সচিব সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও সাবেকমন্ত্রী মোস্তাফা জামাল হায়দার। কাজী জাফর আহমদের মেয়ে কাজী জয়া তার বাবার জন্য সবার দোয়া কামনা করেন। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, লেবারপার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদী, ন্যাপ-ভাসানীর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গোলাম মোস্তফা আকন, উপদেষ্টা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু, এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান, বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তাফা ভুঁইয়া, বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি আহসান হাবীব লিংকন, ইয়ার আহমেদ সেলিম, মাওলানা রুহুল আমিন, অ্যাডভোকেট শফিউদ্দিন ভুঁইয়া, লুৎফর রহমান চৌধুরী, জাফর উল্লাহ চৌধুরী, খালেকুজ্জামান চৌধুরী, ভাইস-চেয়ারম্যান কাজী মোহাম্মদ ইকবাল, যুগ্ম-মহাসচিব এ এস এম শামীম, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ নজরুল প্রমুখ।
বি. চৌধুরী বলেন, একটি তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিলো এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। কিন্তু সেটি আর শুদ্ধ করা হয়নি। এটা দেশের জন্য শুভ হয়নি। দেশে একের পর এক অঘটন ঘটছে। তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ঐক্যবদ্ধ জাতির বিকল্প নেই। তিনি সরকারকে নরম হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, জনগণের কাছে ফিরে আসুন, মাটিতে নেমে আসুন। সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসে একটি জাতীয় সরকার গঠন করে সঠিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। তিনি কাজী জাফর আহমদের বনার্ঢ্য জীবন তুলে ধরে বলেন, তিনি বেঁচে থাকলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন।
এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, দেশের রাজনীতি এখন অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে চলে গেছে। যারা ক্ষমতায় আছেন তারা নিজেদের জনগনের প্রতিনিধি বলে মনে করেননা। রাষ্ট্রের সুবিধা নেয়াই তাদের লক্ষ্য। নীতিনৈতিকতা তাদের নেই। এভাবে আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা একটু একটু করে হারাতে বসেছি। তিনি আরো বলেন, দেশে রাজনীতি না থাকলে জঙ্গিবাদের উত্থান হবেই। এটি হলে দেশ ক্রমান্বয়ে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে যাবে। কিন্তু আমরা এটি চাইনা। তিনি কাজী জাফর আহমদকে একটি বটবৃক্ষ উল্লেখ করে বলেন, তিনি এমন এক সময় চলে গেছেন যখন তাকে খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, রাজনীতি দিন দিন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাত থেকে চলে যাচ্ছে। গণতন্ত্র না থাকলে জঙ্গীবাদ হবেই। কিন্তু আমরা এটা চাই না।
তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা একা জঙ্গিবাদ দমন করতে পারবেন না। কারণ আওয়ামী লীগের মধ্যেও জঙ্গি রয়েছে। এ থেকে বাঁচতে হলে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনুন। রাজনীতি করার সুযোগ দিন। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি আলোচনার ব্যবস্থা করুন। দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিয়ে আসুন একসাথে মিলে জঙ্গিবাদ দমন করি।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশের মানুষের আজ কোনো অধিকার নেই। গণতন্ত্র নেই।
তিনি আরো বলেন, আশুলিয়ায় মাত্র দুজন লোক পাঁচজন পুলিশের উপর হামলা করলো। তাদের কাছে নাকি অস্ত্র থাকলেও গুলি ছিল না। অথচ পুলিশ বিএনপির মিছিলে নির্বিচারে গুলি করতে থাকে। পুলিশের কাছে গুলি কেন ছিল না সেজন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হবে।
ড. মিজানুর রহমান শেলী বলেন, কাজী জাফর আহমদ পরিশিলিত রাজনীতি করতেন। কিন্তু বর্তমানে সংকীর্ণমনাদের হাতে চলে গেছে রাজনীতি। এ থেকে উত্তরণ ছাড়া দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ করা যাবে না।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশকে পরিকল্পিতভাবে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে শেষ করে দেয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। এটা জাতীর জন্য অশনিসংকেত। জঙ্গিবাদ হানাহানি বন্ধে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় বক্তারা আরো বলেন, কাজী জাফর আহমদ একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। তিনি সহজেই জনগনের মাঝে মিশে যেতে পারতেন। জনগণ ও দেশের জন্য তার ভালোবাসা ছিলো প্রবল। দেশে গণতন্ত্র না থাকায় তার মতো রাজনীতিবিদ গড়ে ওঠার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পনের দিনের আল্টিমেটাম গণজাগরণ মঞ্চের -সব হত্যার বিচার চাই : অজয় রায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত লেখক অভিজিৎ রায়ের পিতা অধ্যাপক ড. অজয় রায় বলেছেন, একের পর এক ব্লগার লেখক খুন হচ্ছে। যার সর্বশেষ শিকার দীপন। সন্তান হারানোর বেদনা উপলব্ধি করতে পারি। তার পিতা বলেছেন আমি বিচার চাই না। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটা দার্শনিক কথা। আমি দৃঢ়কণ্ঠে সরকারের কাছে ব্লগার, লেখকসহ দেশের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। অভিজিৎ, দীপনসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার যতদিন না হবে ততদিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।
জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন হত্যা ও শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদ রশীদ টুটুল, কবি তারেক রহিম ও ব্লগার রণদীপম বসুকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে, দোষীদের গ্রেফতার এবং শাস্তির দাবিতে আজ শুক্রবার বিকেলে শাহবাগের জাতীয় যাদুঘরের সামনে মুক্তবুদ্ধির সংহতি সমাবেশের আয়োজন করে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ। সেখানে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক অজয় রায় একথা বলেন।
সমাবেশে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার সরকারকে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
অজয় রায় বলেন, অধিকার কিভাবে আদায় করতে হয় তা জানা আছে। সবাইকে সম্মিলিতভাবে রাস্তায় নামতে হবে। সংগ্রাম ছাড়া অধিকায় আদায় হয় না। সারাদেশের মানুষের মধ্যে সংগ্রাম ছড়িয়ে দিতে হবে। এ সংগ্রামে জয়ী হওয়ার মাধ্যমেই যুদ্ধাপরাধী এবং নব্য রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ অর্জিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরকারকে ১৫ দিনের সময় বেধে দিয়ে ইমরান এইচ সরকার বলেন, চলতি বছরে গণজাগরণ মঞ্চের পাঁচজন কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। হত্যা হলে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলেও প্রতিকার কিছুই হচ্ছে না। বরং নানাভাবে হত্যাকারীদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সবকিছু উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার জঙ্গিবাদ দমনের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে। অথচ এখন তারা উল্টোটা করছে। একই কলের গান তারা বার বার বাজাচ্ছে। তারা আগের সরকারের পুরনো হত্যার কথা বলছে আর আমরা একে একে লাশ হয়ে ঘরে ফিরছি। সরকারের কাছে অনুরোধ, ভিন্নমত দমন নয় জঙ্গিবাদ দমন করুন। অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। তিনি অবিলম্বে জঙ্গিবাদের লাগাম টেনে ধরার আহবান জানান।
সমাবেশে ঘোষিত নতুন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আগামী ৯ নভেম্বর শাহবাগ থেকে শহীদ মিনার অভিমূখে আলোর মিছিল ও সমাবেশ, ১৩ নভেম্বর শুক্রবার শাহবাগে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ, ২০ নভেম্বর সব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সমাবেশ। এছাড়া ডিসেম্বর মাসজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেমিনারের আয়োজন করবে গণজাগরণ মঞ্চ। দীপন, অভিজিৎসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আগামী ২০ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দেন ইমরান এইচ সরকার।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, উদীচীর সহ সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম, মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির, ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফূজা খানম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, নাট্য ব্যক্তিত্ব আজাদ আবুল কালাম, কলামিস্ট মমতাজ লতিফ, মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম, ভাস্কর রাসা প্রমুখ।
খুশি কবির বলেন, জণগণের ওপর আস্থা রাখা উচিৎ, সরকার সেটা ভুলে যায়। স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে দেব না। আপনারা ব্যর্থ হলে বলেন, আমরা সহযোগিতা করব।
মাহফূজা খানম বলেন, আজ লেখকদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। কাল হয়ত পাঠকদেরকে হত্যা করা হবে। অর্থ্যাৎ মুক্তবুদ্ধি থাকবে না। তারা আধুনিক ধ্যান ধারণার কাউকে রাখবে না। তিনি বলেন, মুক্ত চিন্তার বিশ্বাসীরা পিছপা হবে না। যত চেষ্টাই তারা করুক সত্য অবিনশ্বর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
খালেকুজ্জামান বলেন, যেসব ব্লগার লেখককে হত্যা করা হচ্ছে তাদেরকে জাতীয় বীর হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। কোন ধর্মগ্রন্থে বিসমিল্লাহ নাই, অথচ সংবিধানের শুরুতেই বিসমিল্লাহ দিয়ে রাখা হয়েছে বলে এসময় তিনি মন্তব্য করেন।
আয়েশা খানম বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শুধু পরিবারগুলোতেই নয়, গণতন্ত্রেই এক ধরনের ক্ষত তৈরি করেছে।
মমতাজ লতিফ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সব লেখক-ব্লগারের নিকট প্রয়োজনে লাইসেন্স করা পিস্তল, রাইফেল রাখার আহবান জানান।

নেতার অভ্যর্থনায় তীব্র যানজট

মোটর শোভাযাত্রার কারণে বগুড়া শহরের সাতমাথায়
গতকাল দুপুরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়l ছবি: প্রথম আলো
দেড় শতাধিক প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাসের বহর। বহরের সামনে শত শত মোটরসাইকেল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিশাল এ মোটর শোভাযাত্রা প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা বগুড়া শহর দাপিয়ে যোগ দেয় যুবলীগের প্রতিনিধি সভায়। এ সময় শহরে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়।
সংগঠনের প্রতিনিধি সভায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদকে অভ্যর্থনা জানাতে ওই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ১২ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বগুড়ায় আগমন উপলক্ষে আয়োজিত জনসভা সফল করতে জেলা যুবলীগ শহরের শহীদ টিটু মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করে।
জেলা যুবলীগের দুজন নেতা বলেন, জেলা যুবলীগ এ প্রতিনিধি সভার আয়োজন করলেও তাতে যোগ দেন রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার নেতা-কর্মীরা। সভায় প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
শহরের উপকণ্ঠ বনানী এলাকায় শোভাযাত্রা l প্রথম আলো
রিকশাচালক বৃন্দাবনপাড়ার মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘মন্ত্রী-এমপি আসিচ্চে ভালো কতা, তাই বলে পুলিশ রিকশা আটকে হামাকেরে প্যাটত লাত্তি মারবি? পরধানমন্ত্রী কি লেতাগরক হামাকেরে প্যাটত লাত্তি দিবার কচ্চে।’ রিকশাযাত্রী জহির উদ্দিন বলেন, ব্যস্ততম শহরে এভাবে গাড়িবহর আর মোটরসাইকেল দাপিয়ে নেতাকে বরণ করে মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে ঠেলে দেওয়া চরম অমানবিক।
আয়োজকদের অন্যতম জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, বহরে দেড় শতাধিক গাড়ি এবং দেড় হাজার মোটরসাইকেল ছিল। যানজট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গাড়িবহর ও শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জেলার নেতারা অংশ নিয়েছিলেন। সম্ভবত রাস্তা ভুল করে তাঁরা আবাসিক এলাকা, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাতমাথা হয়ে সভাস্থলে পৌঁছেছেন। যানজট ও দুর্ভোগের জন্য আমি আয়োজকদের পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী।’
বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক বিকর্ণ কুমার চৌধুরী বলেন, শোভাযাত্রা শহরের জ্বলেশ্বরীতলা-সার্কিট হাউস মোড়-সাতমাথা ঘুরে শহীদ টিটু মিলনায়তনে যাওয়ার ব্যাপারে আয়োজকেরা কোনো অনুমতি নেননি। গাড়িবহর শহরের দিকে রওনা দেওয়ার পর আয়োজকেরা ওই পথ হয়ে ঘুরে যাওয়ার বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন।প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে জেলা যুবলীগ শত শত মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রার আয়োজন করে। দুপুরের দিকে দুই নেতা শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে বগুড়া জেলা সীমানায় এলে সেখান থেকে মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রা গাড়িবহরকে নিয়ে সামনে এগোতে থাকে। বেলা একটার দিকে বহর পর্যটন মোটেল থেকে রওনা দেয় শহীদ টিটু মিলনায়তন অভিমুখে। এ সময় শেরপুর সড়কে যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিকট শব্দে ভেঁপু বাজিয়ে এগিয়ে চলা মোটর শোভাযাত্রা সরাসরি সাতমাথায় না গিয়ে ইয়াকুবিয়া মোড় হয়ে ব্যস্ততম ও আবাসিক এলাকা জ্বলেশ্বরীতলা কালীবাড়ি মোড়ে যায়। সেখান থেকে জেলা জজ আদালত ভবন, সরকারি বালিকা বিদ্যালয় এবং সার্কিট হাউসের সামনে দিয়ে সাতমাথা হয়ে গোহাইল সড়ক ধরে পৌনে দুইটায় শহীদ টিটু মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় সাতমাথা ছাড়াও স্টেশন সড়ক, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, শেরপুর সড়ক, মেরিনা রোড, টেম্পল রোড, নওয়াববাড়ী সড়কে এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ রাখে ট্রাফিক পুলিশ। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। স্থবির হয়ে পড়ে গোটা শহর। পথচারী-রিকশাসহ অন্যান্য বাহনের যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহান। যানজটে সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও জিলা স্কুলের জেএসসি পরীক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে।

দীপন হত্যার দায়ে মাদরাসা শিক্ষক আটক

প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যাকাণ্ডের ছয় দিন পরে ফেনীর ফুলগাজী থেকে মুফতি জাহিদ হাসান মারুফ নামের এক মাদরাসা শিক্ষককে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
আজ শুক্রবার ভোররাতে উত্তর তারাকুচা গ্রাম থেকে তাকে আটক করে ঢাকায় আনা হয়।
মুফতি জাহিদ বর্তমানে মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে আছেন বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে ফুলগাজী থানা পুলিশ আটকের বিষটি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীপন হত্যার রহস্য উম্মোচনে সন্দেহভাজন আটজনের একটি গ্রুপকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করে অভিযানে নেমেছে গোয়েন্দারা। এছাড়া শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলহ তিনজনকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি গোয়েন্দারা। অপরাধীদের গ্রেফতার এবং নেপথ্যের নায়কদের সন্ধানে একাধিক টিম অভিযানে নেমেছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এদিকে আহমেদুর রশীদ টুটুল আজ সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জানালেন, মুক্তবুদ্ধির লড়াইয়ে পিছু হটবেন না তিনি। এর আগে দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হওয়ার পর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, বই প্রকাশ বন্ধ হবে না। মুক্তবুদ্ধির চর্চা বন্ধ হবে না।
মারুফের বাবা মুফতি হাবিব উল্লাহর বরাত দিয়ে ফেনী অফিস ও ছাগলনাইয়া সংবাদদাতা জানান, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও দীপন হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য রয়েছে মর্মে বৃহস্পতিবার ভোররাত ৩টার দিকে একদল পুলিশ অভিযান চালায়। তারা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে তার বাড়ি ও মাদরাসায় অভিযান চালিয়ে মুফতি মারুফকে আটক করে নিয়ে যায়। মুফতি হাবিব উল্লার দাবি, তার ছেলে এসব কোনো কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়।
আমজাদ হাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, বিষয়টি তিনি মারুফের বাবার কাছ থেকে শুনেছেন। একই কথা জানান ফুলগাজি থানার পরিদর্শক মাইন উদ্দিনের।
তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযানের আগে স্থানীয় থানাকে জানানো হয়। কিন্তু এ সম্পর্কে কোনো তথ্য তাদেরকে জানানো হয়নি। তবে তিনি গ্রেফতারের বিষয়টি শুনেছেন।
মারুফ এধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নয় বলে দাবি করেন মুফতি হাবিব উল্লাহ।
তিনি বলেন, নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকেই ছেলে মারুফ প্রাথমিক শিক্ষার পর ছাগলনাইয়া মাদরাসা থেকে দাওরা (টাইটেল) পাশ করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসা থেকে ইসলামি আইন শাস্ত্রে (মুফতি) দুই বছরের পড়ালেখা করেন। সেখান থেকে আবার গ্রামের বাড়িতে এসে ওই মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব নেন। তার মাদরাসাটি প্রাথমিক পর্যায়ের। আটটি ক্লাস রয়েছে মাদরাসাটিতে। জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করেন বলেও দাবি করেন তিনি। ছেলে আটকের ঘটনাটি তিনি স্থানীয় আমজাদ হাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইব্রাহিমসহ স্থানীয় নেতাদের জানিয়েছেন। এছাড়া ফুলগাজী থানার ওসি মাইন উদ্দিন মারুফ নামের এক মাদরাসা শিক্ষককে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আটক করার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে দীপন হত্যার ঘটনায় মুফতি জাহিদ হাসান মারুফকে আটকের কথা স্বীকার করেননি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দীপন হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মাসরুকুর রহমান খালেদ সাংবাদিকদের বলেন, কেউ আটক হওয়ার তথ্য তার কাছে নেই। তবে হয়তো অন্য কোনো মামলায় কেউ আটক হতে পারে।
অবশ্য তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রযুক্তির সহায়তা ও সোর্সের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তারা আরো ৭-৮ জনের সাথে মুফতি মারুফকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন।
মাসরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ভিডিও ফুটেজগুলো এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অনেক মানুষের সমাগম রয়েছে। তার মধ্যে থেকে কাদের সন্দেহজনক গতিবিধি ছিল তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। সন্দেহভাজনদের অবস্থান ও তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিশ্চিত হয়েই গ্রেফতার অভিযান চালানো হবে।
তিনি বলেন, খুনিরা ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে দীপনকে হত্যা করেছে। যে কারণে অপরাধের কোনো নমুনা রেখে যায়নি খুনিরা। তাই ক্লুলেস এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কিছুটা সময় লাগছে।
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিসহ আজিজ সুপার মার্কেটে এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কললিস্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। এতো বেশি কললিস্ট যে তার মধ্য থেকে এখন শর্ট আউট করা হচ্ছে। যা খুবই কষ্টসাধ্য।
তিনি বলেন, লেখক-ব্লাগার-প্রকাশক এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ড একই ধরণের। এতে নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) হত্যা মিশনের মিল রয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চলছে।
তবে একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দীপন হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদের প্রাথমিক একটি তালিকা তৈরি করে অভিযান শুরু করেছে ডিবি।
মাশরুকুর রহমান খালেদ জানান, ভিডিও ফুটেজ ছাড়াও আরো সন্দেহভাজন রয়েছে। যাদের বিষয়ে গোয়েন্দারা খোঁজ খবর নিচ্ছে। একাধিক টিম কাজ করছে।
এদিকে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল শুক্রবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জানান, মুক্তবুদ্ধির লড়াইয়ে পিছু হটবেন না তিনি। এর আগে দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হওয়ার পর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, বই প্রকাশ বন্ধ হবে না। মুক্তবুদ্ধির চর্চা বন্ধ হবে না। সেই কথাই আবারও যেন পুনর্ব্যক্ত করলেন তিনি।
সকাল ৯টার দিকে ফেসবুকে টুটুল লেখেন, শুভ সকাল বাংলাদেশ। শুভ সকাল মহাপৃথিবী। আবারো আঙ্গুল ছোঁয়া পেলো কী-বোর্ডের। এ যেন ঠিক বন্ধুদের সাথে হ্যান্ডশেক করার আনন্দ। বুদ্ধির মুক্তির লড়াইয়ে, মুক্তবুদ্ধির লড়াইয়ে আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব। সাথে থেকো বাংলাদেশ।
আহমেদুর রশীদ টুটুল, রণদীপম বসু ও তারেক রহিম বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। টুটুল ও রণদীপন বসুর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তারেক রহিমের দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে এই তিনজনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় দুর্বৃত্তরা গুলিও করে। এতে শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, তারেক রহিম, রণদীপম গুরুতর আহত হন। একই দিন শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় তার প্রকাশনীর অফিসে ঢুকে দীপনকে নির্মমভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যা নিশ্চিত করতে তাকে কুপিয়ে ভেতরে ফেলে রেখে অটোলক দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। দীপনের খোঁজ নেয়ার জন্য তার বাবা কয়েকবার ছেলেকে ফোন করেন। কিন্তু ছেলে ফোন ধরেননি। বিকের ৪টার দিকে তিনি ওই মার্কেটে ছেলের অফিসের সামনে যান। ওই সময় তিনি অফিসের দরজা খুলতে গিয়ে বন্ধ পান। এ সময় কাচের দরজা দিয়ে ভেতরে আলো জ্বলতে দেখেন। ছেলে বাইরে গেছে ভেবে তখন তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরবর্তীতে লালমাটিয়া শুদ্ধস্বরে হামলার কথা শুনে বিকেল ৫টার দিকে লোকজন নিয়ে আবার ছেলের অফিসে গিয়ে দরজা ভেঙে দেখেন, দীপন রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ওই অবস্থায় ফয়সল আরেফিন দীপনকেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক সন্ধ্যা সাতটার দিকে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরের দিন রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিহতের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রী মসজিদে নিহতের জানাজা শেষে আজিমপুরে লাশ দাফন করা হয়। গত মঙ্গলবার মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মনের দরজা খোলা রাখা চাই by মতিউর রহমান

সমাবর্তন বক্তা প্রথম আলোর সম্পাদক
মতিউর রহমান l ছবি: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌজন্যে
গতকাল (৫ নভেম্বর, ২০১৫) ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম সমাবর্তন উৎসবে দেওয়া সমাবর্তন-বক্তৃতা
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি ও সদস্যবৃন্দ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর, কর্মকর্তাগণ, শিক্ষকমণ্ডলী, সমাবর্তনে উপস্থিত অভিভাবকমণ্ডলী, অতিথিগণ এবং ছাত্রছাত্রীবৃন্দ:
আপনারা সকলে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দশম সমাবর্তন উৎসবে সমাবর্তন-বক্তৃতা দিতে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় আমার মতো একজন সাধারণ সংবাদকর্মীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে যে সম্মান ও স্বীকৃতি দিল, সে জন্য আমি ও আমার সহকর্মীরা অভিভূত হয়েছি।
আমি ও আমার সহপাঠীরা ছাত্রজীবন শেষে কিংবা কর্মজীবনের সূচনাকালে আজকের মতো আনন্দময় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারিনি। আমার বিএ (অনার্স) এবং এমএ ডিগ্রি লাভের বছর ছিল ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সাল। সেই বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সমাবর্তন উৎসব হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র।
আজকে আমি আপনাদের সামনে আমার ব্যর্থ শিক্ষাজীবনের কথা বলতে এসেছি।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পুরান ঢাকার বংশাল রোড থেকে প্রতিদিন হেঁটে নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়েছি। আমার স্কুলজীবনের হইচইমুখর দিনগুলোর বড় সময় কেটেছে ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা ধরনের খেলা দেখে। স্কুলের দশম শ্রেণি থেকে ঢাকার প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলতে শুরু করি। ওই সময় বিশ্বের সেরা ক্রিকেট দলগুলো—ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান আর নিউজিল্যান্ডের সেরা খেলোয়াড়দের খেলা দেখে আনন্দিত হয়েছি। একই সঙ্গে সেরা ক্রীড়াবিদ ও সাঁতারুদেরও খোঁজখবর রাখতাম। ১৯৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের বিশ্ব অলিম্পিক গেমসের অনেক স্বর্ণজয়ীর নাম ও রেকর্ড এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় (১৯৫৩-১৯৬১ সাল) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে পাস করি। ১৯৬১ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ি। তারপর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স বিল্ডিং, আর্টস বিল্ডিং, আমতলা আর মধুর ক্যানটিন—পুরো এলাকাটিই ছিল আমাদের বিচরণকেন্দ্র।
একই সঙ্গে ছিল কবিতা ও গানের প্রতি ভালোবাসা। তখনো ক্রিকেট খেলি। এত কিছু করে লেখাপড়া আর কি হয়! তারপরও পাস করলাম সময়মতো—উচ্চমাধ্যমিক বিজ্ঞান শাখায় দ্বিতীয় বিভাগে।
১৯৬৩ সালে আমাদের অতিপরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। সঙ্গে অতিরিক্ত বিষয় ছিল অর্থনীতি আর গণিত। তখন দুই বছর পর অতিরিক্ত দুটি বিষয়ে পাস করতে হতো। তারপরের বছর অনার্স পরীক্ষা। তার আরও এক বছর পর এমএ পরীক্ষা। বুঝতেই পারছেন আমার অবস্থা!
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে বক্তৃতা-বিবৃতি লেখা, দেয়ালে পোস্টার লাগানো থেকে শুরু করে বড় বড় সভা আর মিছিল সংগঠিত করেছি, অংশ নিয়েছি। হল ও সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুধু নয়, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে বড় অনুষ্ঠান এবং আরও অনেক বড় বড় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছি। একই সঙ্গে চলেছে সংকলন ও বই প্রকাশনা এবং কবিতা লেখা। তখনো ক্রিকেট খেলছি।
এসবের মধ্যেই দেশ-বিদেশের অসামান্য সব গল্প-উপন্যাস আর অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী আত্মজীবনী পড়েছি। দেশে তৈরি সিনেমা দেখার পাশাপাশি কলকাতা, মুম্বাই, হলিউড, ফ্রান্স, ইতালি আর রুশ দেশের সেরা পরিচালক আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সিনেমা দেখেছি। বাংলা গানের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত, গণসংগীত—এসবের পাশাপাশি বিশ্বের সেরা সংগীতশিল্পীদের গান শুনেছি। সেরা নাটক দেখেছি, সেরা শিল্পীদের প্রদর্শনী উপভোগ করেছি। দেশের সেরা কবি, লেখক, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি।
তখন আমার প্রধান কাজ ও জীবনের লক্ষ্য ছাত্ররাজনীতি এবং রাজনীতি দিয়ে দেশে পরিবর্তন নিয়ে আসা। একই সঙ্গে ছিল হইহুল্লোড়, আড্ডা, গল্প আর আনন্দ করা। আর ছিল নানা রকমের লেখালেখি। আবার এর মধ্যে জীবনসঙ্গিনীকে খুঁজে পাই। এত সব করে কি আর পড়াশোনার মতো কঠিন কাজ হয়! অনার্স আর মাস্টার্স পরীক্ষার সময় মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। ঘুম আসে না। ঘুমের ওষুধ খাই। আম্মাকে বসিয়ে রাখি সারা রাত। সেই আতঙ্ক এখনো মাঝেমধ্যে স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে।
এত সবকিছুর পর সময়মতোই অনার্স আর মাস্টার্স পাস করলাম দ্বিতীয় শ্রেণিতে। কিন্তু এখনো সেই দিনগুলোর কথা মনে করে ভীষণ কষ্ট পাই—কেন স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে ভালো করে পড়াশোনা করলাম না। এখন প্রতিদিন বেদনা হয়—কেন ভালো করে বাংলা আর ইংরেজি ভাষা শিখলাম না। এরই মধ্যে আমার ক্রিকেটীয় জীবনও শেষ; হয়ে গেছি এক ব্যর্থ কবি!
ঢাকার স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনেই দেশের ও বিশ্বের যা কিছু সেরা, তার স্বাদ গ্রহণ করেছি; গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছি, অনুপ্রাণিত বোধ করেছি। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের জীবনের যাত্রাপথের যা কিছু ভালো, তার সন্ধান পেয়েছি। ষাটের দশকের সেই ঝড়ের উত্তাল তরঙ্গমালার দিনগুলোতে আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সেরা নায়কদের সম্পর্কে জেনেছি, তাঁদের সঙ্গ পেয়েছি। তাঁদের কাছ থেকে কত কিছু যে জেনেছি আর পেয়েছি, তার হিসাব-নিকাশ কোনো দিন শেষ হবে না। যাঁরা বেঁচে নেই এবং যাঁরা এখনো সক্রিয় আছেন, তাঁদের কাছ থেকে বাংলাদেশ আর সারা বিশ্বের যা কিছু সেরা, সেই শিক্ষা নেওয়া এখনো আমার শেষ হয়নি।
ষাটের দশকে আমার ছাত্রত্ব আর ছাত্র আন্দোলনের শেষ প্রান্তে বাংলাদেশের মানুষ তখন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে, উত্তেজনায় কাঁপছে এবং চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই সময় জীবনের এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে সক্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি পুরোপুরি সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে যাই। ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে সাপ্তাহিক একতার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নিলাম।
তারপর ১৯৭১ সালে আমাদের জীবনের এক মহত্তম সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতা আর সরাসরি রাজনীতিতে নতুন করে জড়িয়ে পড়ি। চোখের সামনে দেখলাম কীভাবে নতুন বাংলাদেশ জেগে উঠছে। এভাবে সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরু পর্যন্ত বামপন্থার রাজনীতিতে গভীরভাবে যুক্ত থাকাকালেই গণতন্ত্র থেকে একদলীয় শাসন, সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র এবং নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের কত-না রূপ দেখলাম। আমি বুঝতে পারলাম যে রাজনীতির এ পথে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারব না। তখন সাংবাদিকতাতেই সবটুকু সময় ঢেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
সেই দিনগুলোতে নিজেকে প্রস্তুত করতে সাপ্তাহিক একতার পাশাপাশি দৈনিক সংবাদসহ আরও চারটি কাগজে কাজ করেছি। ১৯৯২ সালে দৈনিক ভোরের কাগজ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হই। ভোরের কাগজ অনেকটা সফলও হয়েছিল। কিন্তু একপর্যায়ে নতুন আরেকটি দৈনিক পত্রিকার স্বপ্ন আমার মধ্যে জেগে ওঠে। ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলো প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি।
গতকাল ৪ নভেম্বর প্রথম আলো ১৭ বছর পূর্ণ করেছে। প্রথম আলো দেশের এখন সবচেয়ে বড় পত্রিকা। অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে প্রতিদিন এখন এর পাঠক ৫৫ লাখ। দেশের ভেতরে ছাপা কাগজে প্রথম আলো পড়েন ৪৩ লাখ পাঠক। আর দেশে ও দেশের বাইরে অনলাইনে প্রথম আলো পড়েন আরও ১২ লাখ পাঠক। আর ফেসবুকে ৬৮ লাখ এবং টুইটারে দুই লাখ পাঠক প্রথম আলো অনুসরণ করেন। বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চল থেকে এই পাঠক প্রথম আলো পড়েন। এটি পৃথিবীর এক নম্বর বাংলা ওয়েবসাইট। কাতারে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক প্রথম আলো। কাতার থেকে যায় বাহরাইন ও ওমানে। আমাদের আরও আছে একাধিক প্রকাশনা।
প্রথম আলোর মধ্য দিয়ে দেখতে পাই বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের সকল দেশ ও অঞ্চলে পৌঁছে গেছেন। আর তাঁরা যে যেখানে থাকুন না কেন, প্রতিদিন বাংলাদেশের সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকছেন গভীর ভালোবাসা নিয়ে। একই সঙ্গে আমরা তাঁদের প্রতিদিনের জীবনের সকল ভালো-মন্দ আর আনন্দ-বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছি। জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কী পাওয়ার আছে?
আবার এটাও সত্য যে প্রথম আলোর স্বাধীন ভূমিকার জন্য অনেক গালমন্দ শুনি। আমরা চাপে থাকি। মামলা-মোকদ্দমায় হাজিরা দিতে জেলায় জেলায় যেতে হয়। আবার অনেক সম্মান আর স্বীকৃতিও পাই মানুষের কাছ থেকে। পুরস্কারও পাই। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? একজন ‘অর্ধশিক্ষিত’ মানুষ হয়েও এর চেয়ে বেশি আর কী চাই এক জীবনে?
আমাদের প্রথম আলোর এই সাফল্য কেন? কারণ, ১. প্রথম আলো স্বাধীনভাবে সাহস নিয়ে চলে; ২. প্রথম আলো সততার সঙ্গে পরিশ্রম করে; আর ৩. প্রথম আলো বিনীত থাকে তার পাঠকদের কাছে, মানুষের কাছে।
আমরা কাগজ করতে গিয়ে রোজ দেশে ও দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের মানুষের, তরুণদের, নারীদের নানা উদ্যোগ আর সাফল্যের খবর পাই। সেই সব খবর আমরা আপনাদের কাছে যখন পৌঁছে দিই, তখন কিন্তু নিজেরাও অনুপ্রাণিত হই। আমাদের এই জীবনের সকল ব্যর্থতা-সফলতার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বারবার বলি, গভীর ভালোবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে বলি, বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে। আজ বিশ্বজুড়ে প্রবল পরিবর্তনের ঝড়। বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের সেই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করছে। বাংলাদেশের মানুষ অদম্য সৃজনশীলতায় তার ভালোটুকু আহরণ করছে।
আজকের বাংলাদেশ তরুণদের বাংলাদেশ। তরুণেরা দেখিয়ে দিচ্ছে, সবকিছুই সম্ভব। ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে মোটরসাইকেলে চড়ে সাতক্ষীরার ক্রিকেট একাডেমিতে খেলতে আসত যে কিশোর মুস্তাফিজ, উদ্বোধনী খেলাতেই তার নাম বিশ্ব রেকর্ডের খাতায়। বাংলাদেশের দুজন তরুণ এভারেস্টে উঠল; উঠে পড়ল দুজন তরুণীও। এত অল্প পরিমাণ কৃষিজমি নিয়েও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের ছাত্র এম জাহিদ হাসান বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন, তারপর প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক দলের নেতৃত্ব দিলেন, আবিষ্কার করলেন ভাইলফার্মিয়ন কণা, যে কণা ৮৫ বছর ধরে খুঁজছিলেন বিশ্বের খ্যাতিমান বিজ্ঞানীরা।
তার মানে, আপনি পারবেন। আপনারাই পারবেন। বাংলাদেশ পারবে। এই বিশ্বাস আপনাকে অদম্য করুক।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই সব নয়। মনের দরজা খোলা রাখা চাই। দেশের আর বিশ্বের যা কিছু ভালো, যা কিছু সৃজনশীল—কবিতা-সাহিত্য-চিত্রকলা-সংগীত-নাটক-সিনেমা প্রভৃতি এবং জীবন থেকে প্রেরণা নিতে হবে। স্বপ্ন দেখতে হবে। নিজের স্বপ্নকে বহু মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে যূথবদ্ধ করতে হবে। মানুষের অফুরন্ত সম্ভাবনায় আস্থাবান থেকে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে।
আপনি আলোকিত হবেন। আপনার মাধ্যমে আলোকিত হবে চারপাশ—এই দেশ, এই সমাজ এবং এই বিশ্ব। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, মানুষের ভালোর জন্য যদি আপনি কাজ করেন, তা আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। আর আমরা জানি, আপনি ভুলবেন না আপনার মাকে এবং আপনার জন্মভূমিকে­—প্রিয় এই বাংলাদেশকে।
মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো।

আমদানি নীতিতে নেই, তারপরও আসছে ড্রোন by কমল জোহা খান

বিমানবন্দরে তিন মাসে ৩৮টি আটক
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত তিন মাসে ৩৮টি চালকবিহীন ছোট উড়ন্ত যান বা ড্রোন আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিমানবন্দরের কার্গো গুদাম থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি এবং ৩ নভেম্বর নয়টি ড্রোন আটক করা হয়। বিমানবন্দর শুল্ক কর্তৃপক্ষ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আমদানি নীতিমালায় ড্রোন আমদানির সুযোগ না থাকায় এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (সদস্য শুল্কনীতি) কোনো নির্দেশনা নেই। তবু ড্রোন আমদানি হচ্ছে। এ অবস্থায় আমদানি এবং আমদানির ক্ষেত্রে বিমানবাহিনী বা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অথবা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে কি না, সে বিষয়ে নির্দেশনা চেয়েছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ।
৩ নভেম্বর আটক নয়টি ড্রোন খেলনা হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আমদানি করেছে ডেইজ ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সাতটি ড্রোন চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে। এগুলো বনানীর জনৈক গোলাম মাশকুর রহমান নামে এসেছে। চীনের ডিজেআই বাইওয়াং টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান এগুলো পাঠিয়েছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে ড্রোন আনার কারণ জানতে চাইলে মাশকুর রহমান কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।
ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, গত তিন মাসে আটক ড্রোনগুলো নিতে ঢাকা কাস্টম হাউসের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। কোনো আবেদনও করা হয়নি। সর্বশেষ আটক ড্রোনগুলো চীনের তৈরি। শুল্ক গোয়েন্দারা গত সেপ্টেম্বর মাসে গার্মেন্টসের আমদানি করা কাপড়ের ভেতরে লুকিয়ে আনা পাঁচটি ড্রোন উদ্ধার করেছিলেন। বিমানবন্দরে কুরিয়ার গেট দিয়ে খালাসের সময় এগুলো জব্দ করা হয়। ওই কাপড় ও ড্রোন কারা এনেছে, তা জানাতে পারেনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ড্রোনগুলো রিমোট কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রিত। এসব ড্রোন ৪০০ ফুট বা ৪০ তলা ভবনের সমান উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। ওড়ার সময় কোনো শব্দ হয় না। পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে এ ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কাস্টমস ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, আটক ড্রোনের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একাধিক গোয়েন্দা সদস্য গত বুধবার কাস্টম হাউসে সংশ্লিষ্ট শুল্ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব ড্রোন কী কাজে ব্যবহারের জন্য আনা হচ্ছে, তা খুঁজে দেখার বিষয়ে কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শুল্ক কর্মকর্তা বলেন, তিন মাসে ৩৮টি ড্রোন ধরা পড়া এবং যে প্রক্রিয়ায় এগুলো আসছে, তাতে মনে হচ্ছে আরও ড্রোন বিমানবন্দর দিয়ে বাইরে চলে যেতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতি ২০১২-১৫ তে ড্রোন আমদানির বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তারপরও দেশে ড্রোন আমদানি হচ্ছে।
দেশে পদ্মা সেতুর কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ ড্রোন ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। আর তথ্য সংগ্রহের জন্য কৃষি খেতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো কাজে ড্রোন ব্যবহারের তথ্য জানা যায়নি।
তবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম ড্রোন দিয়ে নাশকতা ঘটানো সম্ভব বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। গ্রেপ্তার তানজিল হোসেন ও গোলাম মওলা ড্রোন নিয়ে গবেষণা করছেন জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের তৈরি ড্রোন ভারী বোমা নিয়ে ২০-৩০ তলা পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে।
দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন তৈরি করছেন। গত বছরের ২৯ জানুয়ারি সিলেটে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রোন উড়িয়েছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরদিন ৩০ জানুয়ারি আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ অধিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, ‘ড্রোন বা রিমোট কন্ট্রোল চালিত বিমান বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন সক্ষমতা নিরীক্ষণের লক্ষ্যে কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই পরীক্ষামূলকভাবে উড্ডয়ন করা হচ্ছে, যা উড্ডয়ন নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিস্বরূপ।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘নির্ধারিত আকাশপথগুলো ছাড়া অন্যান্য স্থানে যেকোনো ধরনের বিমান (বেসামরিক, সামরিক ড্রোন, রিমোট কন্ট্রোল-চালিত হালকা বিমান/হেলিকপ্টার) উড্ডয়নের জন্য বিমানবাহিনী কর্তৃক মতামত ও পূর্ব অনুমোদন প্রয়োজন।’
আইএসপিআরের এই বিজ্ঞপ্তির বিষয়টি উল্লেখ করে ড্রোন আমদানির ক্ষেত্রে নির্দেশনা চেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (সদস্য শুল্ক নীতি) চিঠি দিয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস। কমিশনার লুৎফর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ড্রোন আমদানি করার ক্ষেত্রে বিমানবাহিনী বা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অথবা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে কি না, সে বিষয়ে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ করা হয়।
ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার লুৎফর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের চেয়ে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। ড্রোন নিয়ে যদি খারাপ কিছু ঘটে, তার দায়দায়িত্ব কে নেবে? সবকিছু বিবেচনা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন
** ড্রোনগুলো রিমোট কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রিত। ওড়ার সময় কোনো শব্দ হয় না
** ৪০০ ফুট বা ৪০ তলা ভবনের সমান উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে এ ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা যায়
** পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য কৃষি খেতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ড্রোন দিয়ে নাশকতা ঘটানোর আশঙ্কাও রয়েছে

বিজয়ী হলে ক্ষমতার চাবি থাকবে আমার হাতে: সু চি

সংবাদ সম্মেলনে সু চি
মিয়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চি বলেছেন, ৮ নভেম্বরের (রোববার) নির্বাচনে তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিজয়ী হলে মূল ক্ষমতা তাঁর হাতেই থাকবে। নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগে গতকাল বৃহস্পতিবার ইয়াঙ্গুনে সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে সু চি এ কথা বলেন। খবর বিবিসির।
মিয়ানমারে ২৫ বছরের মধ্যে এটাই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ৯০টির বেশি দল অংশ নিচ্ছে এই নির্বাচনে। নির্বাচনে এনএলডি ভালো ফল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সংবিধান অনুসারে, এনএলডি বিজয়ী হলেও প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না সু চি। সংবিধানের একটি ধারায় বলা হয়েছে, যাঁর স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানেরা বিদেশি, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না। সু চির স্বামী ও দুই সন্তান ব্রিটিশ নাগরিক। অভিযোগ রয়েছে, সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতেই জান্তা সমর্থনপুষ্ট সরকার সংবিধানে এই ধারা যুক্ত করেছে।
ইয়াঙ্গুনে বিবিসির প্রতিবেদক জোনাহ ফিশার বলছেন, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সু চি যেকোনো উপায়ে সরকার পরিচালনায় তাঁর আগ্রহের কথা প্রকাশ করলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সু চি বলেন, ‘আমার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি থাকবে। এটা খুবই সাধারণ বার্তা।’
যদিও মিয়ানমারের সংবিধানের ৫৮ ধারায় বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হবেন দেশটির সব নাগরিকের চেয়ে অগ্রগণ্য ব্যক্তি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে সু চি বলেন, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করতে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। যে পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাকে অবাধ ও মুক্ত বলা চলে না।
সু চির বক্তব্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রসঙ্গও সংক্ষিপ্তভাবে আসে। তবে পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করা ঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক মনে করা হয় না। তাদের ভোটাধিকার নেই। রোহিঙ্গাদের বিষয় ঠিকমতো তুলে না আনায় সু চির সমালোচনা রয়েছে।
বর্তমান সংবিধান অনুসারে, মিয়ানমারের পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য বরাদ্দ। সরকার গঠন করতে হলে এনএলডি বা অন্য কোনো দলকে বাকি আসনগুলোর অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ পেতে হবে।

কুনদুজে হাসপাতাল কর্মীদের ওপরও গুলি ছোড়ার অভিযোগ

কুনদুজ শহরে এমএসএফ পরিচালিত হাসপাতালে
মার্কিন হামলায় আহত এক ব্যক্তি। ছবি: এএফপি
আফগানিস্তানের কুনদুজ শহরে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা এমএসএফ পরিচালিত হাসপাতালের পলায়নরত কর্মীদের ওপর মার্কিন বিমান থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
গত মাসে ওই হাসপাতালে মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত এবং বেশ কিছু মানুষ আহত হন। ওই হামলায় হাসপাতালটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এক প্রতিবেদনে এমএসএফ বলেছে, হামলার আগে ওই হাসপাতালের ভেতরে কোনো অস্ত্রশস্ত্র বা যুদ্ধ ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে দাবি করেছিল, সেখানে তাদের বাহিনী হামলার মুখে পড়েছিল। পরে তাদের বক্তব্য ছিল, তালেবান হামলার মুখে আফগান বাহিনীর অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র ওই বিমান হামলা চালায়।
প্রতিবেদনে এমএসএফ অবশ্য স্বীকার করেছে, হামলার সময় হাসপাতালে থাকা শতাধিক রোগীর মধ্যে অন্তত ২০ জন ছিলেন আহত তালেবান। আর সেটা যুদ্ধ-আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
ঘটনার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, ওই হামলার সময় হাসপাতাল থেকে পলায়নরত লোকজনের ওপর আকাশ থেকে গুলি ছোড়া হয়। যে বিমান থেকে হামলা হয়েছে, সেখান থেকেই সম্ভবত গুলি ছোড়া হয়েছে।
এমএসএফ বলছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জন রোগী, ১৩ জন হাসপাতাল-কর্মী এবং বাকি সাতজনের লাশ শনাক্ত করা যায়নি।
এমএসএফ বলছে, হাসপাতালটি সম্পর্কে সবার জানাশোনা ছিল। হামলার তিন দিন আগেও সব পক্ষকে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও হাসপাতালটির ওপর এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হামলা হয়েছে।
এমএসএফের মহাপরিচালক ক্রিস্টোফার স্টোকস বলেছেন, সব তথ্য দেওয়ার পরও কারও ‘ভুল’ হওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া বা বিশ্বাস করা কঠিন। যুদ্ধ-আইন অনুযায়ী ওই হামলা ছিল অবৈধ।
এদিকে হামলার ঘটনাটি এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।

মান্নার মুক্তি চেয়েছে নারী ঐক্য

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মাহমুদুর রহমান মান্নার
মুক্তি দাবিতে মানববন্ধনে নেতা-কর্মীরা। ছবি: প্রখম আলো
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মুক্তি দাবি করেছেন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নারী ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম বলেন, সরকার মান্নার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। মান্না একজন শান্তি প্রিয় ও সুশৃঙ্খল রাজনীতিবিদ। তিনি কোনো দিন কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করতে পারে, তা আমরা বিশ্বাসই করি না। আমরা তাঁর মুক্তি দাবি করছি।
মানববন্ধনে অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, মান্নাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আটক রাখা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, এর প্রমাণ এখনো সরকার দিতে পারেনি। তাকে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছে।
ব্লগার লেখক ও প্রকাশক হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম বলেন, সরকার বলছে কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তারা জানে। তাহলে আমাদের প্রশ্ন, সরকার যদি জানে, তাহলে তাদের ধরছে না কেন? ধরে বিচারের সম্মুখীন করে না কেন? লোকজন জানুক, কারা কোনো গ্রুপ, কোন শ্রেণি এই ঘটনা ঘটাচ্ছে।
মানববন্ধনে নাগরিক ঐক্যের নেতা শহীদুল্লাহ কায়সার, আবু বকর সিদ্দিক, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতউল্লাহ, আইনজীবী ফজলুল হকসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী অংশ নেন।

পুলিশের রাইফেলে গুলি ছিল না by গোলাম মর্তুজা ও অরূপ রায়

আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় কর্তব্যরত পাঁচ পুলিশ সদস্যের কারও রাইফেলেই গুলি ছিল না। তাই হামলার শিকার হওয়ার পরে তাঁরা কোনো পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। তিনজন পুলিশ সদস্য তো শালবনের দিকে দৌড়ে পালিয়েই গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার আশুলিয়া ও ঢাকা জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত বুধবার সকালে রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় পুলিশের একটি তল্লাশিচৌকিতে হামলা চালায় দুই ব্যক্তি। তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কনস্টেবল মুকুল হোসেন নিহত এবং কনস্টেবল নূরে আলম সিদ্দিকী গুরুতর আহত হন। নূরে আলমকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে আগের হামলাগুলোর মতো বুধবারের পুলিশের ওপর হামলার দায়ও আইএস স্বীকার করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে।
ওই হামলা ও হত্যার ঘটনায় আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আজাহারুল ইসলাম বাদী হয়ে বুধবার রাতে একটি মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা দুজনসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ধরতে পারেনি পুলিশ। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহাকে। এর বাইরেও পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সফিকুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সাহায্য করতে একটি বিশেষ দল গঠন করেছে পুলিশ। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহসিনুল কাদির বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরের সাত কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। তাঁরা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সহায়তা করবেন। ওই দলের দায়িত্বে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের।
ঢাকা জেলা ও আশুলিয়া থানার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে কর্তব্যরত পাঁচ পুলিশ সদস্যের কাছে চায়নিজ রাইফেল থাকলেও তাঁরা সেগুলোর ব্যবহার করেননি। পরে পালিয়ে যাওয়া তিন সদস্য কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তাঁদের কারও রাইফেলেই গুলি ছিল না। কর্মকর্তারা জানান, রাইফেল ও গুলি পুলিশ সদস্যদের কাছে আলাদাভাবে ছিল। ওসব রাইফেলে গুলি ভরা খুব ঝক্কির নয়, তবে কিছু সময় লাগে। গুলি ভরা না থাকায় তাঁরা গুলি চালাতে পারেননি। তবে প্রতিরোধ না করে তিনজন কেন পালিয়ে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ওসি মোহসিনুল কাদির বলেন, অস্ত্র থাকলেও তাঁদের অস্ত্রে¿গুলি ভরা ছিল না। এটা নিশ্চিত। তবে কী জন্য তাঁরা পালিয়ে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল বিবিসিকে বলেন, ওই তল্লাশিচৌকিতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বয়সে নবীন ছিলেন।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাড়ইপাড়ার তল্লাশিচৌকিতে কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। সেখানকার পাঁচটি খাবার হোটেল এবং একটি দোকান বন্ধ রয়েছে। লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম। ঘটনাস্থলের উল্টো দিকে নন্দন পার্কের সামনে বিআরটিসির বাস ডিপোতে তিনটি বাস আর কয়েকজন পরিবহনশ্রমিক ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি।
গতকালও ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় বাসচালক কনক দাসকে। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে সশস্ত্র পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বুধবার হামলার সময় তিনি ঘটনাস্থলের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হামলার পরে দুই হামলাকারীকে তিনি ছাই রঙের একটি মোটরসাইকেলে করে চন্দ্রার দিকে চলে যেতে দেখেন। ঘটনা সম্পর্কে জানতে পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর আবার ছেড়ে দিয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
গতকালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কনকের বরাত দিয়ে ঘটনার বিবরণ ছাপার পর থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাঁর মুঠোফোনে কল করে তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে চাচ্ছে। এসব নিয়ে তিনি আতঙ্কে রয়েছেন। একই এলাকার মিলন রহমান বলেন, ‘যেখানে পুলিশই নিরাপদ নয়, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা দেবে কে?’
তবে এই হত্যা-হামলাও পুলিশের মধ্যে সতর্কতা আনতে পারেনি। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের সিঅ্যান্ডবি এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে একজন সশস্ত্র এএসআইসহ চার কনস্টেবলকে গা ছাড়াভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। ওই চৌকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার এসআই কামরুজ্জামান তখন চৌকিতে ছিলেন না। এএসআই মুন্নু শেখ, কনস্টেবল জয়ন্ত মণ্ডল, গোপাল সাহা ও উজ্জ্বল খান সিঅ্যান্ডবির সাখাওয়াত শেখের দোকানে বসে গল্প করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আলাপে যোগ দিলে এএসআই মন্নু শেখ বলেন, ‘আমরাও আতঙ্কের মধ্যে আছি। সতর্কও আছি। তবে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।’ জয়ন্ত মণ্ডল বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছি ভাই।’
মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তল্লাশিচৌকিতে না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কিছু সময় আগে খাওয়ার জন্য তিনি থানায় যান।
সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নূরে আলমের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, সাময়িকভাবে বাড়ইপাড়ার তল্লাশিচৌকি বন্ধ রাখা হলেও দুপুরের পর তা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশকে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা আর যাতে হামলার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ হতাহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। গতকাল রাজধানীর গাবতলী-আশুলিয়া সড়কের একটি চৌকিতে পুলিশ সদস্যরা। (ইনসেটে) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পুলিশি তল্লাশি l ছবি: প্রথম আলো

‘মানুষ কেমনে করে এই কাজ?’ by মানসুরা হোসাইন

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে
চিকিৎ​সাধীন গৃহবধূ শিউলি খাতুন। ছবি: জাহিদুল করিম
গৃহবধূ শিউলি খাতুনের (৩৬) দু চোখ সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে বাঁধা। স্বামী জুয়েল হাসান চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁর দু চোখ তুলে ফেলেছেন। প্রতিবেশীরা তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। আজ শুক্রবার সকালে হাসপাতালে চোখের ওই সাদা ব্যান্ডেজ খুলতেই আঁতকে ওঠেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের একজন বলে ওঠেন, ‘মানুষ কেমনে করে এই কাজ?’
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে টঙ্গীর জামাইবাজার এলাকার ভাড়া বাসায় স্বামী জুয়েল চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চোখ তুলে তাঁর স্ত্রীকে ভেতরে রেখেই বাসা তালাবদ্ধ করে চলে যান। চিৎকার শুনে পরে প্রতিবেশীরা পুলিশের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙে শিউলিকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাঁকে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। পথে দীর্ঘ যানজটের কারণে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। পরে রাত পৌনে একটার দিকে তাঁকে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়।
গৃহবধূ শিউলি আজ প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ বছর আগে তিনি জুয়েলকে বিয়ে করেন। এটি তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই দেখছেন স্বামী নেশা করে। আগের স্বামীর কাছ থেকে যে সম্পত্তি পাবেন, তা এনে দেওয়ার জন্য প্রায়ই তাঁকে মারধর করতেন জুয়েল। আর নেশার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রায়ই সন্দেহ করতেন জুয়েল।
শিউলি বলেন, ‘ও ইয়াবা না কি জানি একটা খায়। ওই দিন নেশার পরিমাণ বেশি হইছিল। স্বামী সারাক্ষণই ঘর, বাইর করে। তারপরও আমারে সন্দেহ করে। বলে ঘরে কে আসছিল? বলতে বলতেই আমার মুখে স্কচটেপ মারে। দুই হাত পেছন দিকে বাইন্ধ্যা ফালায়। দুই পা বান্ধে। এক সময় খালি বুঝি আমার এক চোখ নাই। তারপর বেহুঁশ হইয়া যাই। এক সময় একটু একটু জ্ঞান ফিরলে চারপাশে খালি অন্ধকার দেখি। হাতের বান্ধা একটু আলগা মনে হয়। মুখ থেইক্যা স্কচটেপ টাইন্যা একটু খুইল্যা চিৎকার দেই। আর কিছু মনে নাই।’
চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী রেজিস্ট্রার আতিকুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিউলির দুই চোখের ভেতরে আর কিছু নেই। এখন শুধু চোখের অবয়ব আছে। অবস্থা খুব ভয়াবহ। চোখের নার্ভের সঙ্গে মস্তিষ্কের নিবিড় সম্পর্ক আছে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ মিলে এই রোগীর ব্যবস্থা নিতে হবে। আজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগগুলো বন্ধ। আমি অন্য বিভাগের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কাল শনিবার রোগীর চোখে অস্ত্রোপচার হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
শিউলির ভাই রনি ঢাকায় গাড়ি চালান। তিনি বলেন, এর আগে শিউলির আরেকবার বিয়ে হয়েছিল। ওই ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। মেয়েটা এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। বড় ছেলেও পড়াশোনা করছে। তারা তাদের দাদার বাড়িতে থাকে। শিউলির আগের স্বামী ২০০৯ সালে খুন হন। এর এক বছরের মাথায় শিউলি তাঁর স্বামীর চাচাতো ভাই জুয়েলকে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে শিউলির বাবার পরিবার ও ছেলে-মেয়েরা রাজি ছিল না। তাই সবার সঙ্গে তাঁর একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
তবে শিউলির দ্বিতীয় বিয়ে হলেও জুয়েলের এটি প্রথম বিয়ে। জুয়েল টঙ্গীতে ইট-বালুর ব্যবসা করেন। ঘটনার পর পরিবারের পক্ষÿথেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। জুয়েল ঘটনার পর থেকেই পলাতক।
একই বাসার আরেক ভাড়াটে ও পুলিশের সহায়তায় শিউলিকে উদ্ধারকারী আলী আহমেদ হাসপাতালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানবিক কারণে আমি ও অন্য ভাড়াটেরা তাঁকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে দৌঁড়াচ্ছি।’
আলী আহমেদ বলেন, শিউলি বাসায় আসার পর থেকেই তাঁদের স্বামী-স্ত্রী ঝগড়াঝাঁটির কারণে বাড়িওয়ালা ও অন্য ভাড়াটেরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এ কারণে ঘটনার দিন (বৃহস্পতিবার) বিকেল পাঁচটার মধ্যে জুয়েলকে বাসা ছেড়ে দিতে বলা হয়। জুয়েল বিকেল চারটার দিকে ঘটনা ঘটিয়ে বাইরে থেকে দরজা তালা মেরে বেরিয়ে যান। এরপর থেকেই জুয়েল পলাতক।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নেশা নিজেই একটি মানসিক রোগ। নেশার ফলে রোগীর মধ্যে অন্যান্য মানসিক রোগ তৈরি হয়। ইয়াবা সেবনকারীদের মধ্যে বিভিন্ন সন্দেহবাতিকতা দেখা দেয়। কেউ তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে বলেও অনেকে মনে করতে থাকে। তবে ইয়াবা সেবনকারীদের মধ্যে স্ত্রীর চরিত্র বা সতীত্ব নিয়ে সন্দেহের মাত্রা বেড়ে যায়। একে বলা হয় ‘ওথেলো সিনড্রোম’। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কিত অতীত ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই মাদকাসক্তদের চিকিৎসাটি গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হলে সমাজ থেকে এ ধরনের ঘটনা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহায়ক হবে না

নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক গত দেড় বছরে শক্তিশালী হয়েছে। বাস্তবায়িত হয়েছে ঐতিহাসিক ইন্দো-বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি। ভারতের পূর্বের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে এ চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পার্লামেন্টে তৎকালীন বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি ও পশ্চিম বঙ্গ সরকারের বিরোধীতার কারণে তা আর হয়নি। সৌভাগ্যবশত, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বিলটি এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে হাজার হাজার নাগরিক স্বাভাবিক অঞ্চলে বসবাস করতে পারছেন, কোনো ছিটমহলে নয়। ঢাকা ও দিল্লি ট্রান্সশিপমেন্টের সম্পর্ক নিয়ে সামনে এগিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করিডোর বা নতুন আন্তঃসীমান্ত পরিবহণ চুক্তি।
কিন্তু ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিপর্যয় ও সন্ত্রাসী হামলার ফলে ইতিবাচক অগ্রগতি সাথে হয়ে যেতে পারে। গত বসন্তে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের হত্যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল প্রথম। সেপ্টেম্বরের শেষে ও অক্টোবরের প্রথমে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বিদেশী খুন হয়। ২৪ই অক্টোবর ঢাকায় শিয়া মিছিলে বোমা বিস্ফোরিত হয়। স্বঘোষিত ইসলামি স্টেট বা আইএস এর দায় স্বীকার করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে। বরং জানিয়ে দেয়, সহিংসতা অবশ্যই ঘরোয়া বিরোধী দলের কাজ। গত সপ্তাহান্তে বাংলাদেশী প্রকাশকদের হত্যাকা- উদ্বেগের পরিবেশ আরও ভারী করে তোলে।
তবে এ হত্যাকা- ব্যবসা-বাণিজ্যকে কতটা ক্ষতিগ্রস্থ করবে, তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এসব সহায়ক হবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির বদলে বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়।
(কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশন্স ও ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

পরি by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

শিরিন কী করে জানত যে আমার এ রকমই কিছু একটা হবে? কী করে আগেভাগে বুঝে নিল একটা রুজিরোজগারের চেষ্টায় শহরে গেলে কাজের কাজ কতটা হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা তো নেই-ই, বরং কোনো না কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে লেজেগোবরে অবস্থা হবে আমার?
বলতে গেলে আমার পরিবারে সবচেয়ে বেশি পড়াশোনা জানা মানুষ আমিই। টেনেটুনে বিএ পাস করেছি। জমি-জিরেত, চাষ-বাস, গঞ্জের হাটে একটা মুদির দোকান চালিয়ে যে পরিবারটি মোটের ওপর ভালোই চলে যাচ্ছে, সেই পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ছেলেটি শহরে গেলে করে-কম্মে খেতে পারবে না, এই ধারণা বাড়ির লোকজনের কেন হলো, এই কথাটা মাথায় ঢোকে না আমার। আমি একটু বোকাসোকা ধরনের, এমনকি ভালো মানুষও—পরিবারের লোকজনের এই ধারণা। আমার আব্বা যত দিন বেঁচে ছিলেন, তিনিও বিশ্বাস করতেন এ কথা, বলতেনও কথায় কথায়। সে কথায় হয়তো সস্নেহ প্রশ্রয় ছিল, কিন্তু আমার এই সর্বনাশটাও তো করে দিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই। খুব রাগ-অভিমান হয়, বড় দুই ভাই ক-অক্ষর গোমাংস, সে তুলনায় আমি মোটের ওপর স্কুল পাস দিলাম, কলেজে ভর্তি হলাম, কিন্তু আব্বার কাছে আস্থার জায়গাটা পেলাম না। আর উচ্চমাধ্যমিকের বেড়াটা যখন পেরিয়ে গেলাম, তখন তো তিনি ছিলেন না। তবে আম্মা আর বড় দুই ভাই-ভাবি খুব খুশি, বংশের মুখ উজ্জ্বল করার কথাও কে জানি বলেছিল। রোখ চেপে বসেছিল মাথায়। গ্রাম থেকে একটু দূরে একটা কলেজে গিয়ে বিএ পড়তে গিয়েছিলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৃতীয় শ্রেণিতে বিএ পাস করে যখন বাড়িতে ফিরেছি, তখন এই দিিগ্বজয়ের সংবাদে যেন উচ্ছ্বসিত হয়েছিল পুরো বাড়ি, এমনকি আশপাশের পাড়া পর্যন্ত। কিন্তু আমি যে একজন বোকা টাইপের ভালো মানুষ এবং বিষয়বুদ্ধির অভাবে আমার সে ধরনের উন্নতি হওয়ার সুযোগ বিশেষ নেই, এ ব্যাপারে মোটামুটি একমত ছিল সবাই। বরং গঞ্জের হাটটার ক্রেতাসমাগম ক্রমেই বাড়ছে, আর আমাদের চাল-ডাল-নুনের দোকানটার অবস্থাও বেশ জমজমাট, তার পাশেই একটা বইপত্র, খাতা-কলম আর মেয়েদের প্রসাধনসামগ্রীর দোকান করার ব্যাপারে আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল আমার দুই ভাই। খুব মনঃকষ্ট পেয়েছিলাম। অবশেষে ক্লাস সিক্সের রুলটানা খাতা আর মেয়েদের ত্বক ফরসা করার ক্রিম বিক্রি করে শেষ হয়ে যাবে একজন বিএ পাস যুবকের সব সম্ভাবনা!
আমার মনঃকষ্টের ব্যাপারটা বুঝে শহরে গিয়ে নাইট শিফটে আইন কলেজে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছিলেন আমার স্বপন মামা। নিজে তিনি পেশায় উকিল, বললেন, ‘ল-কলেজে ভর্তি অইয়া যা, দিনের বেলা কয়েকটা দিন কোর্টবিল্ডিংয়ে ঘোরাঘুরি কর আমার লগে...তারপর দেখা যাক, কিছু একটা অইয়া যাইব...।’ আমিও ভেবেছিলাম, দেখা যাক। সবাই আমার সম্পর্কে কী ভাবে আর আমি আসলে কী—এটা প্রমাণ করার একটা দায় নিয়েছিলাম নিজের কাঁধে। কিন্তু শিরিন, আমার বড় ভাবির ছোট বোন, ভ্রু নাচিয়ে দুচোখে শয়তানি হাসি খেলিয়ে বলেছিল, ‘বেহুদা শহরে যাইতাছ আকবর ভাই, তুমি সোজা মানুষ, ওইহানে তোমার অইব না কিছু...।’
‘ক্যান অইব না ক্যান, আমি লেহাপড়া শিখি নাই?’
‘আরে লেহাপড়া দিয়া সব অয় না। উল্টা শহরে কুনো চাল্লু মাইয়ার হাতে পড়লে জীবনডা ছ্যাড়াবেড়া...।’ মেজাজটা বিগড়ে গিয়েছিল, খেঁকিয়ে উঠে বলেছি, ‘কিয়ের সাথে কী, পান্তা ভাতে ঘি, আমি যাইতাছি কোরিয়ারের লাইগা...শহরের মাইয়ার লগে এইডার সম্পর্ক কী?’
বাচাল মেয়েটা তবু ছাড়ে না, বলল, ‘তোমার তো মাশাল্লাহ টমেটোর লাহান চেহারা, সিনেমায় কত দেখছ না গ্রামের পোলা শহরের মাইয়া, আবার শহরের পোলা গ্রামের মাইয়া...।’ দেখেছি অনেক দেখেছি। আমি পূরবী সিনেমা হলে মাঝে মাঝে বাংলা সিনেমা দেখতে যাই। তাতে শিরিনের বর্ণনামতো শহর-গ্রামের প্রেমের সম্পর্কও দেখেছি। এই শিরিনই তো কতবার আমার কাছে আবদার করেছে তাকে একবার সিনেমা হলে নিয়ে যেতে, নিইনি। সে ঘরে বসে টেলিভিশনেই দেখে। আমি গায়ে-পড়া মেয়েটার ঠাট্টার জবাবে শিক্ষিত মানুষের মতো গাম্ভীর্যে বলেছিলাম, ‘সবকিছু নিয়ে ফাইজলামি কইরো না শিরিন, সিনেমা আর বাস্তব জীবন এক জিনিস না।’ ‘স্বপন মামারও একটা মাইয়া আছে কলেজে পড়ে, হেব্বি সুন্দরী, এট্টু সাবধানে থাইকো।’—বলে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে হেসে শিরিন সরে পড়েছিল সামনে থেকে। না, স্বপন মামার মেয়ের প্রেমে পড়িনি আমি। আমার ব্যাপারটা আরও জটিল। স্বপন মামার বাসাতেই থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে লজিং মাস্টারের দায়িত্ব পেলাম। তাঁর বিচ্ছু টাইপের ক্লাস সিক্সের ছেলে দীপনকে পড়াই, রাতে বঙ্গবন্ধু ল টেম্পলে নিজে পড়তে যাই, আর সকালের দিকে যাই কোর্টবিল্ডিংয়ে। স্বপন মামার কলেজপড়ুয়া মেয়েটা শিরিনের বর্ণনামতো তত সুন্দরী না হলেও স্মার্ট। হাঁটুর ওপর স্কার্ট পরে ঘুরে বেড়ায় ঘরে। তবে আমার দিকে কখনো আলাদা করে তাকায়নি। সামনাসামনি দু-একবার পড়েছে, তাতে তার চেহারায় উটকো লোকটাকে নিয়ে তেমন বিরক্তি যেমন দেখা যায়নি, আবার বাড়তি একটু মনোযোগের ব্যাপারও নেই। মেয়েটার নাম ঝুম্পা, সে প্রায় সারা দিন কানে হেডফোন লাগিয়ে রাখে আর লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে। শিরিনবর্ণিত আমার ‘টমেটোর লাহান চেহারা’ যে তাকে মোটেও বিচলিত করেনি, এটা বুঝতে পেরে আমার মনে সামান্য একটু উপেক্ষার বোধ জেগেছে বটে, তবে স্বস্তিও পেয়েছি।কোর্টবিল্ডিংয়ে কাজ তেমন নেই, স্বপন মামার ফাইলপত্র গুছিয়ে রাখি, তিনি আদালতে যাওয়ার সময় পেছনে হাঁটি। মনে মনে ভাবি, কখন স্বপন মামার মতো সাদা শার্ট-প্যান্টের ওপর কালো কোর্ট পরে এজলাসে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। আসল কাজ শিখতে আরও বহুদিন সময় যে লেগে যাবে, সেটা বেশ বুঝতে পারি। চট্টগ্রামের কোর্টবিল্ডিংটা পাহাড়ের ওপর। কেউ বলে, কাছারির পাহাড়, কেউ বলে পরির পাহাড়।
একসময় যখন এই পাহাড়ে কোর্টবিল্ডিংটা হয়নি, কিংবা হলেও এত লোকজনের আনাগোনা ছিল না, তখন নাকি পরিরা নেমে আসত এই পাহাড়ে, তাই পরির পাহাড়। লোকজন এ কথা বিশ্বাস করে কি না জানি না, কিন্তু মুখে মুখে গল্পটা বেশ চালু আছে। নতুন কোনো লোককে এই গল্প বিশ্বাস করাতে অনেকে প্রবীণ লোকজনকে সাক্ষী রাখে। বছর বিশ-পঁচিশ আগেও এই প্রবীণদের অনেকে দূর থেকে পরিদের দেখেছে স্বচক্ষে। গায়ে পরির বাতাস লেগে পাগল হয়ে বাকি জীবন কাটিয়েছে এমন লোকও নাকি ছিল অনেক। এই পাহাড়ে এখন অজস্র মানুষের আনাগোনা। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের কত অভিযোগ! মামলা-মোকদ্দমার শেষ নেই, কত বিচার হচ্ছে প্রতিদিন, অবিচারও হচ্ছে আকছার। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, উকিল-ব্যারিস্টার, চোর-বাটপার, দালাল—নানা কিসিমের মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলে নিজের যেন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠে গেলে লাল ইটের দালান। দালানের আদল দেখলেই বোঝা যায় ব্রিটিশ আমলে তৈরি। আশপাশে অবশ্য নতুন ভবনও তৈরি হয়েছে অনেক।
সেই পাহাড়ের চড়াই বেয়ে হেঁটে ওঠার সময় একদিন প্রথম দেখেছিলাম তাকে। ভিড়-কোলাহলের মধ্যে বেমানান, ব্যস্ততাহীন নিরুদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। এত সুন্দর মুখ, দেখলে বুকের ভেতর কেন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। ইহজীবনে এমন সুন্দর মুখ আমি দেখিনি। শ্যামলা মেয়ে একটু সাজগোজ করেছে, মুখে পাউডার, চোখে কাজল, ঠোঁটে রং, পিঠ ছাপিয়ে প্রায় কোমরে নেমে আসা সাপের মতো একটা লম্বা বেণি, তার আগায় একগোছা বেলি ফুল। ব্যস্ত-সমস্ত মানুষের সময় নেই, তারা তেমন ফিরেও তাকায় না। কিন্তু আমি থমকে যাই, আরেকবার ফিরে তাকাতেই হয়। দৃষ্টিবিনিময় হতেই কালো মেঘ দুফালি করে বিজলি চমকাল যেন সেই চোখে, ঠোঁটে চাপা একটু হাসি। আমি বোকা মানুষ, বোকার মতো কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকি। তারপর ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সরে আসি, ধীর-পায়ে পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠতে থাকি আদালত ভবনের দিকে। বড় একটা শিমুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। আসা-যাওয়ার পথে আমার মতো কতশত মানুষ তাকে দেখেছে। কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু আমাকেই শুধু রাতে ঘুমছাড়া করে রাখল মেয়েটি। চোখ বুজলে তার ঠোঁট-চাপা হাসি মনে পড়ে, মাথায় বাজপড়া মানুষের মতো নিঃসাড় হয়ে থাকি আমি, তার চুলের বেণি আমার কপালে দু-ভ্রুর মাঝখানে সাপের ফণা দোলায়। কোর্টবিল্ডিংয়ের পাহাড়ে কী কাজ তার জানি না, আরও দু-একবার দেখেছি, সেই শিমুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আড়চোখে একবার তাকিয়ে আমি দ্রুত সরে গেছি। কিন্তু মাথা থেকে তো সরাতে পারি না, রাতে ঘুম হয় না বলে দিনের কাজকর্মে মন বসাতে পারি না। ছাত্রকে পাঠদান আর আইন কলেজে নিজের পাঠগ্রহণ—সব কাজই এলোমেলো হয়ে যায়। আমার এ অবস্থার কথা জানাব যে এমন কাউকেও তো পাই না। শিরিন থাকলে নাহয় বুদ্ধিমতী মেয়েটার সঙ্গে আলাপ-পরামর্শ করা যেত। সেদিন হনহন করে উঠে যাচ্ছিলাম আদালত ভবনের দিকে। সেই একই শিমুলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। ঝলমলে শাড়ি-ব্লাউজ পরেছে প্রায় নব-বিবাহিতা নারীর মতো। পা আটকে গেল। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আরও একটি মেয়ে। তবে আমার চোখ থেকে তখন এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লোকারণ্যই হারিয়ে গেছে, পাশের মেয়েটাকে আলাদা করে লক্ষ করার সময় কোথায়। দৃষ্টি বিনিময় হলো, আর তার চোখে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ। দৃষ্টি ফেরাতে পারি না। এবার ঠোঁট-চাপা হাসিটা একটু বিস্তৃত হলো। অবশেষে আমাকে হাত তুলে ডাকল। বেদেনীর ইশারাকে যেমন অনুসরণ করে সাপ, সেভাবেই যেন সুরসুর করে পৌঁছে গেলাম শিমুলগাছের নিচে। কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতেই বলল, ‘যাইবেন?’
গলাটা কর্কশ, তার মুখশ্রীর সঙ্গে বেমানান।
বললাম, ‘কোথায়?’
‘আরে মিয়া, যাইবেন কি না কন?’
প্রায় ধমকের সুরে এই প্রশ্ন শুনে কোথায় যাব, কেন যাব—এসব নিয়ে কৌতূহল প্রকাশের সাহস হারিয়ে ফেলেছি, বললাম, ‘যাব।’
পাশের দাঁড়ানো মেয়েটাকে বলল, ‘তুই থাক, আমি আসতাছি।’
সে ইঙ্গিতে হাসল।
গন্তব্য জানি না, আমি পিছু নিলাম। কোর্টবিল্ডিং থেকে হেঁটে লালদীঘির পাড় এলাকায় একটি হোটেলের ভেতর ঢুকে রিসেপশন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চাবি দ্যান...।’
রিসেপশনের লোকটা নিশ্চয় পূর্বপরিচিত, আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা চাবি দিয়ে বলল, ‘দোতলা, ২১৯ নম্বর...।’
অপরিচ্ছন্ন আলো-অন্ধকার ছোট একটি ঘর। একটি সিঙ্গেল খাট, একপাশে টেবিলের সঙ্গে একটি চেয়ার, এক কোণে একটি টেলিভিশনও আছে।
সুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বালিয়ে মেয়েটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘সাত শ টাকা দ্যান।’
আমি একটু অবাক হয়ে তাকাতেই বলল, ‘রুম ভাড়া দুই শ টাকা, আমার পাঁচ শ।’
বুঝে না বুঝে বাধ্য ছেলের মতো আমি গুনে গুনে ওর হাতে সাত শ টাকা তুলে দিলাম। টাকাটা নিয়ে অদ্ভুত করে হাসল। তারপর একটানে পরনের শাড়িটা খুলে ছুড়ে দিল খাটের ওপর। শাড়ি-সায়া পরা মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। কেমন বিভ্রান্ত বোধ করলাম। আমি বোকা মানুষ, কিন্তু এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো যেন। বললাম, ‘না না, আমি এই জন্য আসি নাই...।’
বিস্ফারিত চোখ, বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তাইলে কী কামে আসছেন? আমার লগে আপনের কামডা কী?’
‘না, আমি মানে...।’
‘আমি মানে কী? আমার লগে লাভ-মেরিজ করতে আসছেন? কোথ্থাইকা জানি আসে এইসব মাল। হালার দিনডা বরবাদ গেল আইজ...।’
গজগজ করতে করতে খাট থেকে তুলে শাড়িটা জড়িয়ে নিতে শুরু করল শরীরে।
খুবই বিব্রত কণ্ঠে বললাম, ‘তুমার নাম কী?’
‘আমার নাম দিয়া আপনের কাম কী? আমার নাম পরি।’
‘পরি!’—চমকে উঠি আমি। পরির পাহাড়ে শিমুলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে, তার নাম পরি!
‘আপনের কী নাম?’—গলায় তখনো প্রচণ্ড বিরক্তি।
‘আকবর।’
‘আকবর!’—এবার হেসে ফেলল পরি, রসিকতার সুরেই বলল, ‘তো বাদশা আকবর, আমার কাছে আপনার কী দরকার কন তো?’
কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে, আমার কী দরকারের কথা জানাব পরিকে। আমি মনে মনে নানা কথা আওড়াই, কিন্তু কোনো কথাই জুতসই মনে হয় না। এই নিরুপায় অবস্থায় হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে বলে বসি, ‘আমি তোমারে, মানে...তোমারে ভালোবাসি।’—কী করে যে এ কথা বেরিয়ে গেল আমারই মুখ দিয়ে!
এবার হাঁ হয়ে গেল পরির মুখ। ওকে এ রকম বিহ্বল অবস্থায় দেখে সাহস বেড়ে গেল যেন, মুখের ওপর বলে ফেললাম, ‘তোমারে বিয়া করতে চাই আমি।’
নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে। এবার কাচভাঙা শব্দে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল পরি, ধপ করে বসে পড়ল খাটের ওপর, ‘এত্ত বড় দুনিয়ায় আপনে আর মাইয়া মানুষ খুঁইজা পাইলেন না বাদশা আকবর। গেরাম থিকা নতুন আসছেন মনে অয়। যান বাইত যান, গিয়া বড় ভাবির ছোট বইনরে বিয়া কইরা সুখে-শান্তিতে দিন কাটান গিয়া...দুনিয়ায় ভালোবাসার কুনো অভাব নাই।’
আশ্চর্য! ভাবির বোনের কথা বলল কেন? পরি কী করে জানল আমার বড় ভাবির বোন শিরিন আমার প্রতি দুর্বল।
‘ভাবির বইনের কথা বললা ক্যান?’
‘ক্যান আবার, গেরামে খালাতো বইন, তালতো বইনের লগেই তো যত ভাব-ভালোবাসা। শেফালী ঘোষের গান শোনেন নাই—“অ পরানের তালতো ভাই...”।’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি পরির দিকে।
পাঁচ শ টাকা ফেরত দিয়ে পরি বলল, ‘নেন, আপনার ট্যাকা ফিরায়া দিলাম, হোটেলের ভাড়া দুই শ ট্যাকা কিন্তু দেওন লাগব।’
‘ট্যাকা আমার লাগব না, তুমি রাইখা দাও।’
‘কাজ-কাম ছাড়া টাকা লই না আমি, আমাগোর কুনো নীতি নাই মনে করছেন?’
টাকা ফিরিয়ে নিই। কেন জানি দুচোখ ভিজে আসে আমার। দেখে করুণা হলো পরির, কাছে এসে আমার মাথাটা টেনে নিল বুকের কাছে। সস্তা দামের পাউডার আর ঘামের গন্ধটা আমাকে কী এক ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়। বেশ কিছুটা সময় মুখ ডুবিয়ে রাখি পরির বুকে।
পরি বলল, ‘আমরা বাজারি মাইয়া বাদশা আকবর, আমার কাছে ভালোবাসা আছেনি পাগল? যাও বাড়ি ফিইরা যাও, তুমার কথা কইলাম আমার অনেক দিন মনে থাকব।’
আমি করুণ চোখে তাকিয়ে থাকি পরির দিকে। সে আনমনে বিড়বিড় করে, ‘এই বাজারে আল্লা কত পাগলের দেহা পাই!’
দুই. আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন আমার সফল হওয়ার নয়—এ কথা বুঝতে পেরে শহরের পাট চুকিয়ে আবার ফিরে এসেছি গ্রামের বাড়িতে। আমার উলাঝুলা চেহারা দেখে শিরিন বলেছে, ‘কইছিলাম না ছ্যাড়াবেড়া অইয়া যাইব। তোমারে আমার চেয়ে বেশি আর চিনছে কে?’
আমাকে এতই যখন চেনে শিরিন, ভাবলাম তাকেই বিয়ে করি। এ কথা বাড়িতে জানাতেই ভাই-ভাবি সবাই খুশি। শিরিন তো লজ্জায়-আনন্দে মুখে ওড়না চাপা দিয়ে কেঁদেই ফেলে। বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমি বাজারে মনিহারি দোকান খোলার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। শিরিনকে পরির সব কথা খুলে বলেছি। সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, বলে, ‘কইছিলাম না ধরা খাইবা তুমি।’
কত কথা বলেছি, কিন্তু এত যে বোকা মানুষ আমি, তা-ও একটা কথা গোপন রাখতে পেরেছি। কাউকে বলিনি, এমনকি শিরিনকেও না যে, সস্তা পাউডার আর ঘামের গন্ধটা নাকে লেগে আছে আমার। কেউ জানে না, একা একা খালপাড়ে বসে পরির কাছে ফোন করি আমি। কোনো দিন ফোন ধরেই পরি বলে, ‘এহন না পরে, ঘরে এহন কাস্টমার আছে।’ আবার কোনো দিন বলে, ‘সারা দিন শিমুলগাছের তলায় দাঁড়ায়া আছি, কাস্টমারের দেহা নাই। তুমি কেমুন আছ বাদশা আকবর?’
বুকের ভেতর বর্ষার ভরা খালের খলবল জলের শব্দ শুনতে পাই তখন। আমি আকুল হয়ে বলি, ‘তুমার জন্য বড় মন পোড়ে, পরি।’ পরি বলে, ‘মনের হিসাব তো আমি বুঝি না বাদশা আকবর, শরীর ছাড়া আমার আর কিছু নাই।’ পরি আমার আম্মা, ভাই-ভাবির কথা জানতে চায়, শিরিনের কথাও জানতে চায়। আমি সব বলি। কিন্তু পরি বলে না। তার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘জানি না।’ ঘর-বাড়ি কোথায়, তার ঠিকানাও নাকি জানে না। তাহলে পরি কোথা থেকে এল?
এককালে কোর্টবিল্ডিংয়ের জনবিরল পাহাড়ে পরিরা নেমে আসত। আকাশে উজ্জ্বল আলো ফুটে ওঠার আগে, অথবা খুব ভোরে; হয়তো গাছে গাছে যখন সূর্যাস্তের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত, সেই শেষ বিকেলে। আমার কেন জানি মনে হয়, সেই পরিদের কেউ একজন ভুলে তার ছোট্ট শিশুটিকে ফেলে রেখে গিয়েছিল। সেই পরিই এখন বড় হয়ে কাস্টমারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে শিমুলগাছের ছায়ায়।

মিশরে বিধ্বস্ত রাশিয়ান বিমানটিতে বোমা?

মিশরের সিনাই উপত্যকায় বিধ্বস্ত হওয়া রাশিয়ার বিমানটিতে বোমা রাখা ছিল বলে মনে করছেন বৃটিশ গোয়েন্দারা। তবে মিশর ও রাশিয়া এ দাবির তীব্র সমালোচনা করেছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। খবরে বলা হয়েছে, ২২৪ জন যাত্রী নিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করেছেন বৃটিশ কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, উড্ডয়নের আগে বিমানের কার্গো হোল্ডে একটি বোমা রাখা হয়েছিল। বৃটিশ গোয়েন্দারা বলছেন, সিনাইয়ের কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর গোপন আলাপ থেকে তারা এ ধারণা পেয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও বলেছেন, কার্গোতে বোমা থাকার বিষয়টিকে তারাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন। তবে মিশরের দাবি, এ ধরণের উপসংহারে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। শুধু ধারণা করেই খ্রান্ত দেয়নি বৃটেন। মিশরের শার্ম আল শেইখে ভ্রমণের বিষয়ে নিজ নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়েছে দেশটি। এছাড়া নিজেদের হাজার হাজার পর্যটককে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনছে বৃটেন। শুধু তাই নয়, পর্যটকদের দেশে ফেরার সময় কেবল হ্যান্ডব্যাগ সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে। তাদের বাকি মালামাল পরে আলাদা বিমানে নিয়ে যাওয়া হবে।  বৃটেনের পাশাপাশি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামও পরে নিজ নিজ নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। এর আগে এমিরেটস সহ বেশ কয়েকটি বিখ্যাত বিমান পরিবহণ সংস্থা ওই এলাকা দিয়ে বিমান না উড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে এরপরও বিমান দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ধুম্রজাল। রাশিয়া বলছে, সঠিক কারণ জানতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন সহ আরো অনেকেই বলছে যে, সন্ত্রাসী হামলার কারণেই ওই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। জঙ্গিগোষ্ঠি আইএস-এর সঙ্গে স¤পর্কিত একটি গোষ্ঠী বিমান ধসিয়ে দেয়ার দায় নিয়েছে। কিন্তু মিশর বলছে যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিমানের অভ্যন্তরীণ কোনো গোলযোগের কারণেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, কোনো সন্ত্রাসী হামলার দরুণ নয়।

ইরাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৫৮ জনের মৃত্যু

ইরাকে প্রবল বর্ষণ ও বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৫৮ ইরাকি প্রাণ হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একথা জানিয়েছে।
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে এই প্রাণহানির ঘটনাগুলো দেশটির জীর্ণ, ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর ফলে সৃষ্ট বিপদের বিষয়টি তুলে ধরেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আহমেদ আল-রিদাইনি বলেন, ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৫৮ জন ব্যক্তি মারা গেছেন।’
টানা কয়েকদিন ধরে চলা বৃষ্টিপাতের কারণে দেশটির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। এতে বাগদাদসহ ইরাকের অন্যান্য স্থানেও ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার কয়েকদিন পরও কোন কোন এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে যায়নি।
বৃহস্পতিবারও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় নাগরিকদের প্রতি একটি সতর্কতা বার্তা জারি করেছে।
এতে নাগরিকদেরকে ‘বিদ্যুৎ বিতরণকারী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বৈদ্যুতিক তার, বিদ্যুতের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার এর অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।’
সরকার চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। ফলে জনসাধারণ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে জেনারেট ব্যবহার করে। বাড়িঘর দোকানপাটের জেনারেটরের তারগুলো রাস্তায় মাকড়সার জালের মতো জট পাকিয়ে থাকে।
ইরাকে যে কয়েকটি কারণে জনমণে অসন্তোষ বিরাজ করছে তার মধ্যে বিদ্যুতের অপ্রতুলতা অন্যতম। সরকার চাহিদা অনুপাতে বিদ্যুৎ প্রদান করতে পারে না।
ইরাকে গ্রীষ্মকালে দিনে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী লোডশেডিং থাকে। ওই সময় দেশটিতে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে । তখন তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও এখাতে দুর্নীতির কারণে চলতি বছরের গোড়ার দিকে জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংস্কারের ঘোষণা দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত সামান্যই সংস্কার করা হয়েছে।

পারস্য উপসাগরে আবার মোতায়েন হচ্ছে ফরাসি রণতরী

ইরাক ও সিরিয়ার ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তার জন্য পারস্য উপসাগরে একটি রণতরী মোতায়েন করতে যাচ্ছে ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়াঁ ওঁলাদ বৃহস্পতিবার এ ঘোষণা দিয়েছেন।
প্যারিসে দেশটির নতুন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা ভবন উদ্বোধনকালে ওঁলাদ জানান, দেশটির একমাত্র রণতরী চার্লস দা গল মোতায়েন করা হবে এবং এতে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই আরো গতি পাবে। তবে রণতরীটি কখন ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরের তৌলন বন্দর থেকে যাত্রা করবে তা জানানটি তিনি।
ফ্রান্সের একমাত্র এই রণতরীটি এর আগে গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পারস্য উপসাগরে মোতায়েন ছিল। এ সময় রণতরীটি থেকে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ দফা বিমান হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ফরাসি সামরিক বাহিনী।
এছাড়া আইএস বিরোধী অভিযানে ফ্রান্সের ১২টি জঙ্গি বিমান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে মোতায়েন রয়েছে।
ফ্রান্সের নতুন প্রতিরক্ষা ভবনটি নির্মাণের উদ্দেশ্য সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীর সদর দপ্তরকে একই ছাদের নীচে নিয়ে এসে বিদেশে ফ্রান্সের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সহজতর করা। এর আগে সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরে কর্মরত ৯৩০০ সদস্য বিভিন্ন স্থানে বহু ভবনে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিলেন। নতুন ভবনটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৪৬০ কোটি ডলার। এক বলা হচ্ছে ‘ফরাসি পেন্টাগন’।

কোনো ষড়যন্ত্রই অগ্রগতি ঠেকাতে পারবে না: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোনো ষড়যন্ত্র বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডই বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। তিনি বলেন, তাঁর সরকারের সঠিক নির্দেশনা ও পরামর্শ, জনগণের অদম্য কাজের স্পৃহা এবং প্রবাসীদের অব্যাহত সমর্থন ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ২০২১ সালের আগেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।
নেদারল্যান্ডসে তিন দিনের সরকারি সফরের শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কুরহাউস হোটেলে তাঁকে দেওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সংবর্ধনা সভায় তিনি বক্তব্য দেন। খবর বাসসের।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রে অগ্রগতির সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে এখন আর কেউ উপেক্ষা করতে পারছে না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়ন লাভের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে কোনো ষড়যন্ত্রই দেশকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সামরিক স্বৈরশাসকেরা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এসব সত্ত্বেও, বাংলাদেশের জনগণ যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন, সব ষড়যন্ত্র কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁরা দেশের সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাফল্য অর্জনে অবদান রেখেছেন। প্রবাসীরা বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এবং চলতি বছর প্রায় ২৭.২ বিলিয়ন (২,৭২০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে লড়াই করার জন্য প্রবাসীরা সে সময় স্যার টমাস উইলিয়ামকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকালে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সুইডেন ও ব্রিটেনে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, প্রবাসীরা জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড তদন্ত করার জন্য টমাস উইলিয়ামকে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান তাঁকে বাংলাদেশে আসতে দেননি।
নেদারল্যান্ডসকে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশটি সব সময় প্রয়োজনে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাই, দুই দেশের এই সম্পর্ককে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে নেদারল্যান্ডসে প্রথম এই সরকারি সফর করছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশ কোনো ক্ষেত্রে অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। বরং হত্যা ও ক্যুর রাজনীতি দীর্ঘায়িত হয়েছিল এবং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসন বিস্মৃত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি হত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করেন। তিনি ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে জেল থেকে মুক্তি দেন এবং বিদেশে নিয়োগ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেন।
বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি লাভের বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর তাঁর সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারি অফিসগুলোর জন্য কম্পিউটার সংগ্রহ করার বিষয়ে একটি ডাচ কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত একটি চুক্তি বাতিল করে দেওয়ার জন্য বিএনপির সমালোচনা করেন। ১৯৯৬-২০০১ সালের মেয়াদে বাংলাদেশ সরকার ডাচ কম্পিউটার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান টিউলিপ কম্পিউটার্স এনভির কাছ থেকে কম্পিউটার ক্রয় করার জন্য চুক্তি করেছিল।
বর্তমানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য শেখ হাসিনার বোনের মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকীর নামের সঙ্গে মিল থাকায় বিএনপি সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই চুক্তিটি বাতিল করে দিয়েছিল এই ধারণার ভিত্তিতে যে, টিউলিপ কম্পিউটার্স কোম্পানির মালিক টিউলিপ সিদ্দিকী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে তখন চুক্তি বাতিল করায় বাংলাদেশ সরকারের ৩২ কোটি টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল। দুর্নীতি ও অসৎ লোকদের জোট বিএনপি সব সময় অন্যদেরও একইভাবে বিচার করে।’
বিগত বছরগুলোতে বিএনপি-জামায়াত জোটের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া আবার ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছেন এবং তার প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড, নৈরাজ্য ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে তাঁরা রয়েছেন।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার বিদেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম, অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি অনীল দাশ গুপ্ত, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফ, নেদারল্যান্ডস আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহিদ ফারুক প্রমুখ।

‘সংলাপে বসতে যোগ্যতা লাগে’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ)
সাগর-রুনী মিলনায়তনে ডিআরইউয়ের
সদস্য লেখকদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে
ওবায়দুল কাদের। ছবি: ফোকাস বাংলা
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আজকের পৃথিবীতে সংলাপে বসতে হলে যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা ছাড়া সংলাপ হয় না। আন্দোলন করার যাদের শক্তি নেই, তারাই এখন ঘন ঘন সংলাপের কথা বলে।
আজ শুক্রবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে ডিআরইউয়ের সদস্য লেখকদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বক্তব্য দেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জাতীয় সংলাপ করার যে আহ্বান জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের তাও নাকচ করে দেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত কথার ঢিল ছুড়ছি। প্রতিনিয়ত শব্দবোমা নিক্ষেপ করছি। এ শব্দবোমা কিন্তু অনেক সময় আত্মঘাতী বোমা। আজকে সবাই ঢিল ছুড়ছেন, কেউ কাছে থেকে, কেউ দূরে থেকে। কেউ আটলান্টিকের কাছ থেকে, কেউ টেমস নদীর পাড় থেকে।’
খালেদা জিয়ার দেশে ফেরায় বিলম্বকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যাই যাই করে যাওয়া হয় না, আসি আসি করে, আসা হয় না। এখন দেশে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন, কবে আসবেন? কিন্তু ঢিল ছোড়া বন্ধ হয়নি। বিদেশের মাটিতে বসে বিক্ষিপ্ত ঢিল ছুড়ে, দেশে কি সরকার পরিবর্তন সম্ভব?’
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘এ দেশটা তো আফগানিস্তান, পাকিস্তান নয়। এটা বীরের দেশ। আমরা রক্ত দিয়ে, বিক্রম দিয়ে, বীরত্ব দিয়ে এ দেশকে অর্জন করেছি। আফগানিস্তানের স্বাধীনতার ইতিহাস বীরত্বপূর্ণ নয়। পাকিস্তানও স্বাধীন হয়নি বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করে, রক্ত দিয়ে। সুতরাং কেউ যদি মনে করেন, চোরাগোপ্তা হামলা করে এ দেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো অকার্যকর করবেন, তাহলে তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। যাঁরা এমন অপচেষ্টা করবেন, তাঁরা নিজেরাই অকার্যকর হয়ে যাবেন।’
সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে টেমস নদীর পাড় থেকে শব্দবোমা নিক্ষেপ করে সরকার পরিবর্তন হবে না। জাতীয় কোনো ঐক্য হবে না। জাতীয় সংলাপও হবে না। জাতীয় সংলাপ করতে হলে, সংলাপের যেমন পরিবেশ দরকার। সেই পরিবেশ কারা নষ্ট করছে? তারা লেখকদের ওপর হামলা করছে। প্রকাশকদের ওপর হামলা করছে। তারা বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা করছে। তারা পুলিশের ওপর হামলা করছে। তারা রাজনীতিকদের, লেখকদের টার্গেট করেছে। এই পরিবেশ কি সংলাপের পরিবেশ?’
আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘সংলাপ করতে পরিবেশের যেমন দরকার, যোগ্যতারও দরকার। সংলাপ করারও একটা যোগ্যতা আছে। যে দল আন্দোলনে বিজয়ী হতে পারে না, তারা নির্বাচনেও বিজয়ী হতে পারে না। এটা আমাদের ইতিহাস। কারণ সংলাপে বসার জন্য নিজের যুক্তি, শক্তি, যোগ্যতা ও সাহসেরও প্রমাণ রাখতে হবে। তা না হলে শুধু আমি কার সঙ্গে সংলাপ করব। সে কি সংলাপ করার জন্য এমন কোনো কর্তৃপক্ষ? সে কি এমন কোনো কর্তৃপক্ষ, যে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি বসব। সে যোগ্যতার প্রমাণ তো তারা রাখতে পারেনি। তারা আজকে জাতীয় সংলাপের কথা বলছে। সংলাপ করতেও যোগ্যতা লাগে, সাহস লাগে, সামর্থ্য লাগে। তার প্রমাণও রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আজকে দেখতাম বাংলাদেশে ঊনসত্তরের মতো আন্দোলন, নিদেনপক্ষে নব্বইয়ের মতো আন্দোলন। তখন আমরা বুঝতাম, না এটা সব থেকে বড় ব্যাপার। এখানে একটা শক্তি আছে। আজকের পৃথিবীতে সংলাপে বসতে হলে যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা ছাড়া সংলাপ হয় না। বিদেশে বসে ঢিল মেরে সংলাপ করা যায় না। এই মাটিতেই সে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সরকার পরিবর্তন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হবে। সরকার পরিবর্তন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হবে। সেই আন্দোলন করার শক্তি যাদের নেই। তারা এখন ঘন ঘন সংলাপের কথা বলে। সরকার পরিবর্তনের কথা বলছে।’
ডিআরইউয়ের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশার সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম, ডিআরইউয়ের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন, সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ডিআরইউয়ের কল্যাণ সম্পাদক শাহনাজ শারমিন।
এ বছর ডিআরইউয়ের ২২ সদস্য লেখককে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন—বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার শামসুল আলম বেলাল, ভোরের কাগজের ঝর্ণা মনি ও শামসুজ্জামান শামস, আজকের পত্রিকার এম. উমর ফারুক, ইনকিলাবের মিজান মাহমুদ, আমার দেশের হাসান হাফিজ, অবজারভারের জীবন ইসলাম, মানবজমিনের কাফি কামাল, জনকণ্ঠের কাওসার রহমান, মাই টিভির আমিরুল মোমেনিন মানিক, উত্তরবঙ্গ সংবাদের নির্মল চক্রবর্তী, এবি নিউজের শাহীন চৌধুরী, দি ইকোনমি টুডের শেখ মাহমুদ এ রিয়াত, এটিএন নিউজের ইশরাত জাহান, ইত্তেফাকের পিনাকি দাশগুপ্ত ও দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, সংগ্রামের শাহেদ মতিউর রহমান, আরটিভির আকতার হোসেন, কালের কণ্ঠের ওমর ফারুক, সমকালের আলতাব হোসেন ও ইন্দ্রজিৎ সরকার এবং চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের আমীন আল রশীদ।