Friday, February 27, 2015

বান কি মুনের চিঠির জবাব দিয়েছেন খালেদা জিয়া

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের দেয়া চিঠির জবাব দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সঙ্কট নিরসনে সংলাপে বসার কথা ব্যক্ত করে বিএনপি চেয়ারপারসন এ ব্যাপারে সরকারি দলের নেতিবাচক মন্তব্যের কথাও তুলে ধরেন চিঠিতে।
জানা গেছে, কয়েকদিন আগে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক সদস্য, যিনি বিএনপির কূটনৈতিক বিষয়টি দেখছেন, ওই নেতা চিঠিটি বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির কার্যালয়ে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে চিঠি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিঠি দেয়ার বিষয়টি প্রকাশ হয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। যদিও চিঠিটি জাতিসংঘ থেকে তার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পাঠানো হয়।
চিঠিতে চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংলাপে বসার আহ্বান জানান বান কি মুন। তবে সংলাপের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে সরকার। বিএনপি সংলাপে বসার ব্যাপারে আন্তরিকতার কথা জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের মানবাধিকার সাব-কমিটির শুনানির পর বাংলাদেশ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জাতিসংঘে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, সেখানে বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে করণীয় নিয়ে তাদের প্রস্তাব পাঠানো হয়।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, ওসমান ফারুকের সাথে জাতিসংঘ কর্মকর্তার বৈঠকে বাংলাদেশে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থান, বিএনপির চিঠির জবাব এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশসমূহ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের শুনানির বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় বিএনপি নেতা তার দলের সংলাপে বসার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সংলাপে বসতে তাদের আপত্তি নেই। তারা মনে করেন, সংলাপের মাধ্যমে নতুন নির্বাচনই সঙ্কটের সমাধান করতে পারে।
জানা গেছে, বান কি মুনের চিঠির পরও দুই দলের মধ্যে সমঝোতার আভাস না পাওয়া যাওয়ায়, জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তা ঢাকা সফর করবেন। সফরে দুই নেত্রীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো এক যুক্ত বিবৃতিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এম ওসমান ফারুক বলেছেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মুখে সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে। তা না করে কোন ছলচাতুরি কিংবা কূটকৌশলের আশ্রয় নিলে শেষ পর্যন্ত তাদের করুণ পরিণতি ডেকে আনবে। গণবিচ্ছিন্ন এই সরকারকে এক ভয়াবহ বিদায়ী দৃশ্যপটের মুখোমুখি করবে।
বিবৃতিতে তারা বলেন, সরকারের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা জুলুমবাজ স্বৈরশাসকের কবল থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করতে বিএনপি চেয়ারপারসন নিজ অফিসের ছোট একটি কক্ষে কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তিনি যেভাবে সেখান থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চলছেন, তাতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক স্বর্ণজ্জল অধ্যায় হিসাবেই স্থান পাবে। আমরা অবিলম্বে খালেদা জিয়ার দায়ের হওয়া সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে বলা হয়, দেশজুড়ে চলমান গণআন্দোলনের মুখে পতনম্মুখ ‘অবৈধ’ সরকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আন্দোলন থেকে নিস্ক্রিয় করার অপকৌশল হিসাবে সাজানো মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নগ্নভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে বর্বোরচিত কায়দায় বিরোধী নেতা-কর্মীদের গুলি চালিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ও নির্যাতনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এভাবে সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পর্যটন জাহাজ চালাতে চায় ভারত by জাহাঙ্গীর শাহ

নৌ-প্রটোকলের আওতায় বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে পর্যটন জাহাজ চালাতে চায় ভারত। কয়েক মাস আগে এ প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিবেশী দেশটি। প্রস্তাব অনুযায়ী, এমভি সুকাপা নামে একটি পর্যটন জাহাজ কলকাতা থেকে বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে আসামের গুয়াহাটিতে যাবে। তাতে যাত্রী পরিবহন করা হবে। কিন্তু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবে এখনো সাড়া দেয়নি।
তবে ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রটোকল-সংক্রান্ত যৌথ স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় পর্যটন জাহাজ নেওয়ার দাবিটি জোরেশোরে তোলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে যায়। যদিও বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুন মাসে এমভি সুকাপা নামের পর্যটন জাহাজটি চলাচলের অনুমতি পেতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিও) কাছে আবেদন করা হয়। জাহাজটি আসাম বেঙ্গল নেভিগেশন ও বাংলাদেশের জার্নি প্লাস নামের একটি টুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে পরিচালনা করছে। জার্নি প্লাস বিআইডব্লিউটিএতে এ আবেদনটি করেছে।
প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত এক দফা যাত্রী আনা হবে। ঢাকায় যাত্রী নেমে গেলে আবার যাত্রী নিয়ে আসামে যাবে জাহাজটি। পরীক্ষামূলকভাবে এ নৌপথে একবার চলার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এর অভিজ্ঞতা থেকে পরে নিয়মিত চলাচলের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করা হবে এমন পরিকল্পনা রয়েছে।
এ প্রস্তাব পাওয়ার পরপরই স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মত চায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কিন্তু ইমিগ্রেশনসহ অন্যান্য জটিলতার কারণে আপত্তি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উদ্যোগটি সেখানেই থেমে আছে।
জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিক রহমান প্রথম আলোকে জানান, এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য নৌ-ভ্রমণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া সড়ক ও রেলপথে বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ থাকলে নৌপথেও যাত্রী পরিবহন থাকা উচিত। এ যুগে সব পথই খুলে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে জার্নি প্লাসের এ আবেদনের পাশাপাশি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় নৌ-প্রটোকলের আওতায় পর্যটন জাহাজ পরিচালনার প্রস্তাবও করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপত্তি করে বলা হয়, প্রটোকলের ১(৩) ধারা অনুযায়ী, এর আওতায় শুধু পণ্য পরিবহন করা যাবে। যাত্রী পরিবহন করার বিধান নেই। তবে ইতিবাচকভাবে বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রফিকুল ইসলাম। আর ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সে দেশের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা সি ভি সিং।
রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পর্যটন জাহাজ আসতে দেওয়া না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর নির্ভর করে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্ট্যান্ডিং কমিটির নেই। আমরা শুধু বিদ্যমান আইনটির মধ্যে যেসব বিষয় আছে তা মূল্যায়ন করে থাকি।’
অন্য দাবি: স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় প্রটোকলের আওতায় আশুগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথে, আর বাকিটা সড়কপথে আখাউড়া হয়ে আগরতলা পর্যন্ত পথটি নিয়মিত করার দাবি করেছে ভারত। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ২০১১ সালে এ পথে পরীক্ষামূলক লোহাজাতীয় পণ্যের চালানটি সফলভাবে আগরতলায় গেছে।
কিন্তু আশুগঞ্জ নৌবন্দরে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি। বাংলাদেশ বলেছে, পৃথক বিবেচনায় এক-দুটি করে পণ্যের গুরুত্ব বুঝে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
উল্লেখ্য, এ পথে ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া মানবিক কারণে ত্রিপুরায় এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার টন চাল নেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে ভারতকে।
এদিকে ভারতের পক্ষ থেকে প্রটোকলের নবায়ন মেয়াদকাল তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশ বলেছে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তির আওতায় এ প্রটোকল পরিচালিত হচ্ছে। নবায়নযোগ্য বাণিজ্যচুক্তির মেয়াদ তিন বছর হওয়ায় প্রটোকলের মেয়াদ পাঁচ বছর করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, আগামী ৩১ মার্চ প্রটোকল নবায়নের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
১৯৭২ সালে দুই দেশের মধ্যে নৌ-প্রটোকলটি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ১৯৮০ সালের ৪ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর পর থেকে এ প্রটোকলটি বাণিজ্যচুক্তির অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
ব্রিটিশ আমল থেকেই কলকাতার সঙ্গে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নৌপথে বাণিজ্য হতো। কিন্তু পাকিস্তান আমলে দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের কারণে এ নৌপথটি বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও প্রটোকল করে এ বাণিজ্যপথটি খোলা হয়। মোট আটটি পথে (আসা-যাওয়াসহ) এ প্রটোকলটি পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রটোকলের আওতায় নৌপথে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য নেওয়া যায়। তবে কলকাতা থেকে ফ্লাই অ্যাশ আমদানি করতেই প্রটোকলের নৌপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য খুব একটা যায় না। পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরায় পণ্য পাঠাতে ট্রানজিট হিসেবে নৌপথ ব্যবহারে বেশি আগ্রহী ভারত।

রাজনৈতিক অচলাবস্থায় উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ সঙ্কট অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে সংঘাতের রাজনৈতিক কোন স্থান নেই। বিরোধীদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ আর নাগরিক সমাজ, গনমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আজ বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে বারোটায় ওয়াশিংটনের ফরেইন প্রেস সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের আগে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সহিংস জঙ্গিবাদ প্রতিহত করার বিষয়ে গত সপ্তাহে একটি বৈশ্বিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। ওই কনফারেন্সে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অনেকগুলো দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই কনফারেন্সে এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় জবাবদিহিমূলক শাসন, রাজনৈতিক সুযোগ, নাগরিক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। এতে দেশটির রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে আলোচনায় এসব নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। মি. কেরি এ পরিস্থিতিতে আমাদের উদ্বেগ এবং পরিস্থিতি উন্নতির প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন। তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা সহিংস কৌশলের কোন স্থান নেই। একইসঙ্গে এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে, সরকার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দেবে। প্রয়োজন একটি অংশগ্রহনমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। আর গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দেন নিশা দেশাই।
প্রশ্ন: এ সপ্তাহে বিরোধী নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এটাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করে কিনা? এবং যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে; বিরোধী দলের সহিংসতাসহ। এক বছর আগের নির্বাচন থেকে শুরু হওয়া অচলাবস্থা নিরসনে আপনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কোন ভূমিকা দেখছেন কিনা?
উত্তর: প্রথমত আমি আরোপিত (খালেদা জিয়ার ওপর) অভিযোগগুলো নিয়ে কোন জল্পনা কল্পনা করতে চাইনা; শুধু এটুকু বলতে চাই আমরা প্রত্যাশা করি কোন প্রকার অভিযোগ দাখিলের ক্ষেত্রে, কোন প্রকার আইনি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। আমরা মনে করি, গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সক্ষম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা নিয়ে আমাদের ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। সকল রাজনৈতিক দলের সহিংসতা পরিহার করা প্রয়োজন। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সক্রিয় থাকার সুযোগ নিশ্চিত করা। ফলশ্রুতিতে, অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। এসব বিষয়গুলো অভ্যন্তরীণভাবে মোকাবেলা করতে হবে। জন কেরি জানিয়েছেন, সঙ্কট নিরসনে যে কোন প্রকার সহায়তা দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। বাংলাদেশের সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজের সকল বিষয় নিয়ে আমরা নিয়মিত অবগত রয়েছি। তবে এসব মৌলিক ইস্যুগুলোর আভ্যন্তরীণ সমাধান হওয়া দরকার।
প্রশ্ন: শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র  বজায় রাখতে আপনারা বর্তমান সরকারকে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সহ সরকার বলেছে যে তারা কোন বিদেশী চাপ মেনে নেবে না। আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এটা প্রভাব ফেলবে কিনা? খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়েও আপনার মন্তব্য জানতে চাই?
উত্তর: আগের প্রশ্নে আপনার শেষ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছি। আমি এটুকু বলবো- আমরা মৌলিকভাবে বিশ্বাস করি এগুলো অভ্যন্তরীণ ইস্যু যেগুলো বাংলাদেশের মানুষের সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের এটা করতে হবে। বিরাজমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সহিংসতা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি সরকার ও বিরোধী নেতারা এসব ইস্যু অ্যাড্রেস করতে পারবে এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা উত্তরণ করবে। সকল রাজনৈতিক পক্ষকে সহিংসতা পরিহার করতে হবে বলে আমরা আমাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছি। একইসঙ্গে আমরা বিশ্বাস করে গণতন্ত্রে  অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং বিরোধী দলের সক্রিয় থাকার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: সম্প্রতি মাহমুদুর রহমান মান্না নামক এক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিউইয়র্কে অবস্থান কারী এক বিরোধী নেতার সঙ্গে তিনি ফোনালাপ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি সামরিক অভ্থ্যত্থানে উস্কানিমূলক আলোচনা করেছেন। এছাড়া অন্যান্য রাজণৈতিক বিষয় আলোচনা করেছেন। আপনি কি মনে করেন এ ধরণের গ্রেপ্তার বৈধ?
উত্তর: আমি সুনির্দিষ্ট কোন ঘটনা নিয়ে কোন মন্তব্য করব না। এসব বিষয়ে মন্তব্য করার মতো আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য প্রমাণ নেই। তবে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক একটি দেশে নাগরিক সমাজের জন্য স্পেস ও গণমাধ্যমের জন্য মৌলিক স্বাধীনতা থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আমরা আশা করি তেমনটাই হবে।

হুমায়ুন আজাদের পর অভিজিৎ রায়

১১ বছরের ব্যবধানে যেন ভয়ঙ্কর সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর যেভাবে হামলা হয়, একই কায়দার হামলায় নিহত হয়েছেন মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রগতিশীল লেখক ড. অভিজিৎ রায়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তখন ওই এলাকায় ছিল বহু মানুষের উপস্থিতি। তার মধ্যেই দুর্বৃত্তরা অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যাকে কুপিয়ে চলে যায়। বন্যাও শঙ্কামুক্ত নন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এ দম্পতি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশে আসেন। বুয়েটের সাবেক শিক্ষক অভিজিৎ পেশায় প্রকৌশলী আর বন্যা চিকিৎসক। তারা আট বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। কারা তাদের ওপর এ হামলা চালিয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে ধর্মীয় উগ্রপন্থি গোষ্ঠী এতে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখালেখির জন্য অভিজিৎ রায়কে অনেক দিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছিল প্রতিক্রিয়াশীল একটি চক্র।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার আবদুল বাতেন সমকালকে বলেন, 'প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যমতে, তিন থেকে চার অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত তাদের ওপর হামলা চালায়। তবে কেন ও কারা এ হামলা চালায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।' তার প্রগতিশীল মতবাদের বিরোধীরা এ হামলা চালায় কি-না জানতে চাইলে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, 'সে বিষয়টিসহ তিন-চারটি সম্ভাবনাকে ধরে কাজ শুরু করেছে পুলিশ।'
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাফিদা আহমেদ বন্যা সাংবাদিকদের জানান, বইমেলায় একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তারা ফিরছিলেন। পথে টিএসসি মোড়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপালে অভিজিৎ মাথায় গুরুতর জখম হন। আঙুল বিচ্ছিন্ন হয় বন্যার। তারা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে গেলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে একটি অনলাইন নিউজপোর্টালের ফটোসাংবাদিক জীবন আহম্মেদসহ আশপাশের লোকজন তাদের উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা রাত সাড়ে ১০টায় অভিজিৎকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢামেকের চিকিৎসক সোহেল আহমেদ সমকালকে জানান, গুরুতর জখমের কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় অভিজিতের। চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেন; কিন্তু হাসপাতালে যখন আনা হয়, তখনই তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অভিজিৎ রায়ের নতুন বই 'শূন্য থেকে মহাবিশ্ব : উৎপত্তি ও অস্তিত্বের সাম্প্রতিকতম ধারণা' এবারের একুশের বইমেলায় প্রকাশ করেছে শুদ্ধস্বর। এটির প্রকাশনা উৎসবে যোগ দিতেই তিনি দেশে আসেন। শুদ্ধস্বর-এর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ সমকালকে জানান, সন্ধ্যা ৭টার দিকে বইমেলায় তাদের স্টলে একটি অনাড়ম্বর প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। এ সময় শুদ্ধস্বরের অন্যান্য বইয়েরও মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অভিজিৎ ও বন্যা ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তারা স্টল থেকে বেরিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়ান। মেলা শেষ হওয়ার পর তারা বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে টিএসসির দিকে যান। প্রগতিশীল লেখালেখির জন্য অভিজিৎকে অনেকদিন ধরেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল একটি চক্র।
অভিজিৎ রায়ের অন্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে_ অবিশ্বাসের দর্শন, ভালোবাসা কারে কয়, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে, স্বতন্ত্র ভাবনা :মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, সমকামিতা :বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্তি্বক অনুসন্ধান, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো : এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে, বিশ্বাসের ভাইরাস, বিশ্বাস ও বিজ্ঞান (সম্পাদনা গ্রন্থ) ও স্বতন্ত্র ভাবনা (সম্পাদনা গ্রন্থ)। তার স্ত্রী বন্যা আহমেদের বই 'বিবর্তনের পথ ধরে' প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে।
অভিজিৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে। তিনি রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় থাকেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে এ বাসাতেই অবস্থান করছিলেন অভিজিৎ ও তার স্ত্রী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা জানান, প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়েও ঘটনার রহস্য অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে। ঘটনার সময় ওই এলাকায় সন্দেহজনক অবস্থান ছিল কাদের, তাদের কথোপকথনে কী ছিল, তা বের করার চেষ্টা চলছে।
শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মতাদর্শিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের কোনো কারণে অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে দুটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাবির প্রক্টর অধ্যাপক এএম আমজাদ সমকালকে বলেন, অভিজিৎ রায় দেশে আসার আগে একটি প্রতিক্রিয়াশীল মহল তাকে হত্যার হুমকি দেয় বলে শুনেছি। তারা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গে এই হামলার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তদন্তে জানা যায়, জঙ্গিরা এই হত্যায় জড়িত ছিল। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে রাজধানীর মিরপুরে তার বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকা েও জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

সমাধানের পথ সরকারকেই বের করতে হবে -ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

সরকারের একটি উদ্যোগেই চলমান সঙ্কট নিরসন সম্ভব। তা না করে উল্টোপথে হাঁটছে সরকার। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা গ্রেপ্তার- এ সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করবে। তখন বিএনপি পুরো পৃথিবীকে বলবে এই হলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নমুনা। তাই এটা না করে সমাধান বের করতে হবে এবং এটি করতে হবে দ্রুতই। সঙ্কট সমাধানের পথ সরকারকেই বের করতে হবে। এটিকে জিইয়ে রাখার মধ্যে কোন ফায়দা নেই। গায়ের জোরে কোন সমাধান হয়নি। দমন-নিপীড়ন করে সাময়িক সমাধান সম্ভব। কিন্তু সদূরপ্রসারী সমাধানের জন্য একটি ফলপ্রসূ সংলাপ দরকার। যদিও সংলাপ করে এখন পর্যন্ত কোন সমাধান হয়নি। তার পরও যদি একটি কার্যকর সংলাপ হয় সেখান থেকে একটি সমাধানের পথ বের হবে। তার আগে জাতীয় কনভেশনের মাধ্যমে সমস্যার মূল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। দ্রুত সমাধানের জন্য দুই পক্ষকে দুটি করে কাজ করতে হবে। সরকারের উচিত নির্যাতন-নিপীড়ন কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দেয়া। বিএনপিকে সহিংসতার পথ পরিহার করা এবং জনসম্পৃক্ততা অর্জন করা।
সরকারের ভাষায়, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন ছিল সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। তাহলে সরকার কেন সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের পদ্ধতি বের করছে না। আগামীতে কোন পদ্ধতিতে সব দলের অংশগ্রহণের আরেকটি নির্বাচন করা যায় তা সরকারের খুঁজে বের করতে হবে। সেখানে বিএনপি এবং সুশীলসমাজের সহায়তা নিতে পারে সরকার। কিন্তু কাজের কাজ সরকারকেই করতে হবে। সরকার না চাইলে পক্ষগুলো যতই দাবি দাবি করুক, লাভ হবে না। তাই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
নোট: প্রতিক্রিয়াটি দিয়েছেন অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি-বিশ্লেষক

অভিজিৎ হত্যার দায় সরকারকে নিতে হবে

লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করার দায় সরকারকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা। শুক্রবার সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে তারা এ মন্তব্য করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় এতে বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক এম এম আকাশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক এজেএম শফিউল আলম ভূইয়া, সাংবাদিক কামাল লোহানী, লেখক ও কলামনিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রাণা দাশ গুপ্ত, মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির, হামিদা হোসেনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
বক্তারা বলেন, ভাইভার, মোবাইল ফোনে কথা বললে সরকার জানতে পারে, কিন্তু গত এক বছর যাবত ফেসবুকে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দেয়ার ঘটনা সরকারের নজরে আসে নি তা হতে পারে না। এছাড়া যেখানে হত্যা করা হয়েছে তার চারপাশে পুলিশের অবস্থান ছিলো, ২০০ গজ দূরেই ছিলো শাহবাগ থানা। হত্যাকা-ের সময় পুলিশের কি কাজ ছিলো তার জবাব পুলিশকে দিতে হবে। গোয়েন্দাদের জবাব দিতে হবে। বক্তারা অবিলম্বে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান। একই সঙ্গে এই হত্যাকান্ডের জন্য তারা ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করেন। এদিকে আজ সকালে অভিজিৎ এর বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অজয় রায় বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামী করা হয়েছে। তবে এখনও কাউকে আটক করা হয়নি। এসময় অজয় রায় বলেন, জামায়াতের উস্কানিতেই আমার ছেলেকে হত্যা করেছে ধর্মান্ধরা। এর সুষ্ঠু বিচার চাই। এদিকে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে সকাল থেকে শাহবাগে অবস্থান নিয়েছে গণজাগরণ  মঞ্চের ইমরান এইচ সরকারের সর্মথকরা। জড়িতদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করবেন বলে জানা গেছে।

‘দেশদ্রোহিতার অভিযোগ পরোয়া করি না’ -ড. কামাল হোসেন

সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, দেশদ্রোহিতার অভিযোগের হুমকি পরোয়া করিনা। এর আগে পাকিস্তান আমলেও আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এরশাদ ও বিএনপি সরকারের আমলেও আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছিল। আজ ২০১৫ সালে এসে একথা শুনতে হবে এটা দুঃখজনক। যিনি এটা বলছেন তার জন্য লজ্জাজনক।  ড. কামালের গ্রেপ্তার দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তিনি না বুঝে ছেলে মানুষের মত এসব কথা বলেছেন। বিষয়টা দুর্ভাগ্যজনক। আজ সকালে গণফোরাম কার্যালয়ে সংগঠনটির বর্ধিত সভা চলাকালীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল এসব কথা বলেন। সম্প্রতি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুুদুর রহমান মান্নার ফোনালাপের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা হয়। মান্নার ফোনালাপের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনকে জড়িয়ে বক্তব্য রাখেন সরকারি দলের নেতারা। এছাড়া গতকাল সজীব ওয়াজেদ জয় ড. কামালের গ্রেপ্তার দাবি করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গণফোরাম সভাপতি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানান।

পাঠকের মনে প্রভাব ফেলবে

মাহবুব কামালের দুটি সত্তা- একটি রাজনৈতিক, অন্যটি সৃজনশীল। প্রথমটি তিনি আড়াল করেছেন, পরেরটি করেননি। কারণ লেখকসত্তাকে তিনি লালন করছেন। তিনি বুঝেছেন লেখকসত্তাকে বাদ দিয়ে তিনি আর মাহবুব কামাল থাকবেন না, হয়ে যাবেন অন্য মানুষ। লেখক পরিচয়টা তার বেঁচে থাকার জন্য মুখ্য ও জরুরি, অন্য সব গৌণ; এ কারণেই তিনি এই পরিচয়কেই তুলে ধরতে চান পাঠকের সামনে। এতেই তার আনন্দ। সাংবাদিকতা তার পেশা। রাজনীতির কলামিস্ট হিসেবে তার পরিচয় তিনি স্পষ্ট করেছেন। লিখছেন প্রতিনিয়ত। পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করছেন তার ভাবনা, পর্যবেক্ষণ। এবারের একুশে বইমেলায় তার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সাতাশটি কলাম সংবলিত এ গ্রন্থের নাম ‘জাত নিমের পাতা’। যুগান্তরে তার নিয়মিত প্রকাশিত কলামের নামানুসারেই এ গ্রন্থের নামকরণ। তার পাঠকমাত্রই এ কথা জেনে থাকবেন। মাহবুব কামালের গ্রন্থভুক্ত কলামগুলো সাম্প্রতিক সময়কে ঘিরেই রচিত হয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশের পর এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে সঙ্গত কারণেই। কারণ আগেই বলেছি তার কলাম বিশ্লেষণমূলক। তার কলামের নাম ‘জাত নিমের পাতা’, বোঝাই যায়, তিনি ঝাঁক পালানো পাখি। সংবাদপত্রে অনেকেই লিখছেন; কিন্তু নাড়া দিতে পারছেন কই? যারা পারছেন তাদের মধ্যে মাহবুব কামাল অন্যতম। কারণ বিষয়, ভাবনা এবং ভাষা যদি আকর্ষণীয় হয়, তাহলে তা পাঠককে টানবেই। বলতে দ্বিধা নেই, মাহবুব কামাল পূর্ণমাত্রায় তা পেরেছেন। বুদ্ধিমান পাঠকমাত্রই ভালো লেখা বেছে নিতে ভুল করেন না। ‘জাত নিমের পাতা’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত কলামগুলো বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। আবার লেখক সচেতনভাবে তার লেখার বিষয় নির্ধারণ করেছেন। তিনি শুধু রাজনীতির সে াতে গা ভাসাতে চাননি, এর বাইরেও যে লেখার অনেক ক্যানভাস আছে, সে ভাবনাও তাকে তাড়িত করেছে। আলোচ্য গ্রন্থের একটি কলামের শিরোনাম- ‘ওই বৃদ্ধা জাতিসংঘ জরিপের স্যাম্পল, কম কথা নয়।’ এ কলামে তিনি যেভাবে চামটা নামের এক অজ পাড়াগাঁয়ের দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিহীন অশীতিপর বৃদ্ধার বেঁচে থাকার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। এ কারণে যে, এর মধ্যে কিছু মৌলিক চিন্তার উপাদান আছে। বৃদ্ধার বেঁচে থাকার মানে কী? বোঝাতে লিখেছেন- ‘ভ্যান চালনা শেষ করে রাতে ফিরে ছেলে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেন তার শরীরে, নাতি-নাতনি তাকে জড়িয়ে ধরে ডাকে- দাদী! জীবনের এ কি কম বড় তাৎপর্য?’ সত্যিই তো, এ এক নিবিড় বন্ধন, সম্পর্কের এ মূল্য অসীম। একই লেখায় তিনি প্রশ্ন করেছেন- এই গ্রাম, এই নিস্তব্ধ-নিঝুম সন্ধ্যা, বৃক্ষশোভিত মনোরম পরিবেশ, এর আয়ু আর কত দিন? উত্তর সাজিয়েছেন নিজের মতো করেই। নগরায়নের কল্পিত রূপের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হতে হয় বৈকি!
‘ক্লে-শচীন-বুবকা ও তিন চান্সেও ছিপি খুলতে না পারার ব্যর্থতা’ কলামে তিনি আইনস্টাইনের উদাহরণ দিয়ে শুরু করে শেষও করেছেন তাকে নিয়ে একটি জোকস্ দিয়ে। কিন্তু মাঝখানে কখন কীভাবে থামতে হয়, সরে যেতে হয় নেতৃত্ব-অবস্থান থেকে, তা বোঝাতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি কিছু উপায় নির্দেশ করেছেন। পারফরমেন্স উন্নত করতে বা ধরে রাখতে না পারলে কারোরই যে স্বীয় অবস্থান বা পদ আঁকড়ে থাকা বাঞ্ছনীয় নয়, এটাই তিনি তার লেখায় বোঝাতে চেয়েছেন।
জাসদ নিয়ে তার যে মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ তা তিনি তুলে ধরেছেন এ গ্রন্থের তিনটি কলামে- ‘অনাবশ্যক সৃষ্টির অনিবার্য বিলুপ্তি’, ‘কথাগুলো সত্য হয়ে থাকলে তা মুহূর্তের অনুপ্রেরণা’, ‘ওইসব হঠকারিতা না করলে শেয়ারের রিকশায় চাপাচাপি করে বসতে হতো না।’ শিরোনামই বলে দেয় তিনি কী বলতে ও বোঝাতে চেয়েছেন। ছাপা হওয়ার পরে অনেকে এ লেখা পড়ে রুষ্ট হয়েছেন, অনেকে প্রশংসা করেছেন। কিন্তু তিনি যে সাহস করে নির্মোহভাবে সময়ের বাস্তবতা বোঝাতে চেয়েছেন এখানেই তার সার্থকতা। নিজে জাসদ-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, তবুও বলতে দ্বিধা করেননি- এক সময় জাসদ-রাজনীতি করেছি বটে, তবে অতীত নিয়ে আমার কোনো গ্লানি নেই..... নিজেকে শোধরাতে পেরেছি কিনা সেটাই বড় কথা। এই যে তার আত্মোপলব্ধি, ভুল-ত্র“টি শোধরানোর মানসিকতা তা বুঝতে পারি লেখা পাঠের মধ্য দিয়েই। মাহবুব কামাল কোনো বদ্ধ ধারণার ভেতর থাকেন না। তিনি উচিত-অনুচিত, ঠিক-বেঠিকের হিসাবটা খুব ভালোভাবেই নিরূপণ করতে সক্ষম। তার মধ্যে গোঁড়ামি নেই। নিজেকে নিরন্তর, নির্মাণ-পুনঃনির্মাণের মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে নেন। অর্থাৎ তার ভেতরে আত্মশোধনের প্রয়াস লক্ষণীয়, আছে সত্যানুসন্ধানের তাড়নাও।
এ গ্রন্থে মাহবুব কামালের লেখার বিশেষত্ব হচ্ছে তার চমৎকার হিউমার। ‘ময়লা’ কলামে তার এই হিউমারের যথার্থ পরিচয় মেলে। চিন্তার ময়লা, রাজনীতির ময়লা কিভাবে আমাদের শিক্ষা, রুচি, ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যতকে নষ্ট করছে, কিভাবে ডুবিয়ে দিচ্ছে এই ‘ময়লা’ অতল অন্ধকারে, তা খুব নিপুণভাবে তিনি তুলে ধরেছেন যা আমাদের ভাবনা আর উপলব্ধির দৈন্যকে স্পষ্ট করে। জোনাকী প্রকাশনী থেকে গ্রন্থটি প্রকাশ হয়েছে। মূল্য ধরা হয়েছে তিনশত টাকা। বইটি সংগ্রহে থাকলে পাঠকমাত্রই যে উপকৃত হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঠিকঠাক মতো খবর পৌঁছালে বইটি দ্রুতই নিকেশ হয়ে যাওয়ার কথা। দিদার হাসান

পিটার মের হারিয়ে যাওয়া যৌবনে ফিরে আসা by মেজবাহ উদদীন

লেখক পিটার মে, বিশ্বসাহিত্যর খোঁজ যারা নিয়মিত রাখেন তাদের কাছে একটি পরিচিত নাম। আর বিশ্বসাহিত্যর অনিয়মিত পাঠকদের জন্য একটু ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ প্রয়োজন। মে’র জন্ম ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো। তিনি একই সঙ্গে অপরাধবিষয়ক লেখক, চিত্রনাট্যকার এবং ঔপন্যাসিক। তিনি ‘দি লুইস ট্রাইলজী’র লেখক হিসেবে বেশি পরিচিত। শুধুমাত্র ইংল্যান্ডেই ‘দি লুইস ট্রাইলজী’ এর ১০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে! আপনার চা তৈরি, এবার কাপে নেয়া যাক।
পিটার মে’র সর্বষেশ প্রকাশিত উপন্যাস ‘রানঅ্যাওয়ে’ নিয়ে পিটার মে’র উপলব্ধিই এখানে বিষয়বস্তু। ‘রানঅ্যাওয়ে’ মে’র পলাতক কৈশরের আত্মজীবনীমূলক রচনা, যেখানে প্রায় চার দশক আগে লেখক গ্লাসগোর স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে লন্ডন পালিয়ে আসার গল্পের সঙ্গে কল্পিত কাহিনীরও মিশ্রণ ঘটিয়েছেন পরিমিত মাত্রায়। আত্মজীবনী এবং অপরাধবিষয়ক লেখা প্রায়ই একত্রে যায় না অথচ ‘রানঅ্যাওয়ে’তে তেমনটাই দেখা যায়। মে বলেন, তার নতুন উপন্যাসের লক্ষ্য অপরাধমূলক গল্পের দৃঢ় দেয়ালে ধাক্কা দেয়া। যার মাধ্যমে তিনি হয়তো সাহিত্যের একটি নতুন ধারার জন্ম দিলেন!
ঘড়ির কাঁটায় যারা সমর্পণ করেছেন নিজেদের, স্কুলের ধরাবাধা সিলেবাস তাদের জন্য। আর বই থেকে যাদের মন পালাই পালাই করে পিটার মে প্রকৃতির সেসব খেয়ালি সন্তানদেরই একজন। লেখাপড়ার চেয়ে ব্যান্ড সঙ্গীতের সুরই তাকে বেশি অভীষ্ট করে রাখত। মে’র ভাষায় ‘১১ বছর বয়স থেকেই আমি একটি ব্যান্ড দলের সঙ্গে ছিলাম যেটা আমার স্কুলের জন্য অনেক সমস্যার সৃষ্টি করছিল। লম্বা চুল আর অদ্ভুত পোশাকে আমি স্কুলে যেতাম। একদিন আমার প্রধান শিক্ষক আমাকে ধরে ফেললেন এবং বললেন, ‘মে, তুমি তোমার লম্বা চুল আর অদ্ভুত পোশাক নিয়ে বাড়ি চলে যাও এবং আর কখনও ফিরে আসবে না’। আমার স্কুল জীবনের সমাপ্তি সেখানেই’।
‘রানঅ্যাওয়ে’তে দেখা যায় ১৭ বছর বয়সের পাঁচ বন্ধু মিউজিশিয়ান হওয়ার আশায় বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে স্বপ্নের শহর লন্ডনে, শুধুমাত্র সঙ্গীতের কিছু সরঞ্জাম নিয়ে। স্বপ্নের শহর লন্ডন যখন বাস্তবের পৃথিবী, শুরু হয় একটি মাত্র সুযোগের আশায় মিউজিক এজেন্টদের দরজায় কড়া নাড়া। কিন্তু কাক্সিক্ষত সুযোগ আর আসে না। উল্টো এক ভয়ংকর খুনির পাল্লায় পরে যায়। প্রায় মাস খানেক একই পোশাকে থাকা এবং খাবারের জন্য গান শোনানোর পর বাড়ির পথ ধরে পরাজিত হয়ে। সেই ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা কিশোর বয়সের ভুল উত্তেজনার সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। আর সেই ব্যর্থতা ছিল মে’র জীবনের একটি সন্ধিক্ষণ। মে বলন, ‘এটা আমার জন্য একটি গঠনমূলক অভিজ্ঞতা। এটা ছিল এমন একটি সময়ের সন্ধিক্ষণ যখন একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে এবং এটা বুঝতে পারে যে, ছোট থেকে একটি শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে যে পৃথিবীকে সে দেখে এসেছে এটা তার বিপরীত! এটাই ‘রানঅ্যাওয়ে’র মূল ভিত্তি। মে বলেন’ ‘আমি জানি না কীভাবে, কিন্তু যখনই আমি কিছু লিখতে যেতাম এটা সবসময় আমার মাথায় কাজ করত’।
‘রানঅ্যাওয়ে’তে একই সঙ্গে ১৯৬৫ এবং ২০১৫ দুটি সময়কে তুলে ধরা হয়েছে। পিটার মে’র শৈশবের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি ‘রানঅ্যাওয়ে’তে দেখা যায় প্রায় ৬০ বছর বয়সী তিনজন লোক কয়েক দশক আগের এক খুনের রহস্য উন্মোচন করার জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে আসে। এ স্কটিস লেখক তার ‘রানঅ্যাওয়ে’ নিয়ে প্রচলিত অপরাধমূলক গল্পের চেয়ে বেশি আশাবাদী, কেননা এখানে গুপ্তচরভিত্তি এবং পুলিশি তদন্ত পরিমাণে কম।
মে বলেন, ‘রানঅ্যাওয়ে’তে শুধুমাত্র একজন খুনির সম্পর্কেই বলা হয়নি বরং আমি চাই এ উপন্যাস হবে সেই পরীক্ষার উপায় যেখানে মানুষ জীবনের মুখোমুখি’। মে আরও বলেন, ‘তুমি তোমার চারদিকে দেখ আর তুমি দেখবে তোমার চারদিকে অনেক বেদনা। এটা তোমাকে আরও গভীরভাবে ভাবতে শেখাবে বেঁচে থাকা এবং জীবন ও এর অর্জন সম্পর্কে’। ‘রানঅ্যাওয়ে’ এমন চিন্তারই একটি ফল।
মে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে, পালিয়ে যাওয়ার মৌলিক আকাক্সক্ষা এবং মুক্তির ইচ্ছা যুবক বা বৃদ্ধ কিছুটা সবার ভেতরেই থাকে’। ৬৩ বছর বয়েস আসতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে কোটি কোটি সেকেন্ডের সমুদ্র। তবুও নির্বাসিত শৈশব তার স্মৃতিতে এখনও অর্নিবাপিত।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৩ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

রাজা রামমোহন রায়
রামমোহন রায় আরবি ও ফারসি ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার প্রথম পাণ্ডুলিপির নাম ‘মনযারাতুল আধিয়ান’। এতে তিনি বিভিন্ন ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করেন। এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। মুর্শিদাবাদে থাকাকালীন ছোট কলেবরে তার লেখা একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির নাম ‘তুহফাত উল মুওয়াহিদ্দীন’। গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় লেখা হলেও এর শিরোনাম ও মুখবন্ধ ছিল আরবিতে।
রামমোহন রায় লক্ষ্য করেন আধুনিক বিশেষত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বাংলার হিন্দুদের অনীহা। গোঁড়া হিন্দুরা মনে করে, ইংরেজদের সংস্পর্শে এলে এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করলে ধর্মহানি ঘটবে। এই বাস্তবতাটি রামমোহন রায়কে ব্যথিত করে। তিনি মনে করেন, বহু দেবতাবাদ ও মূর্তিপূজায় আচ্ছন্ন থাকায় হিন্দু সমাজের মানুষ মুক্তচিন্তা নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এসব কারণে তিনি মূর্তিপূজাবিরোধী তার মনোভাব প্রকাশ করতে থাকেন।
রামমোহন রায় ১৮১৫ সালে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে কলকাতায় আসেন। এ সময় থেকে তিনি সমাজ সংস্কারে নিবেদিত হন। সেখানে তিনি সমমনা বন্ধুদের একত্রিত করে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এর নাম হয় ‘আত্মীয়সভা’। ধর্মীয় ও সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হতো সেখানে। এই সভায় দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্নকুমার ঠাকুরের মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন।
সাধারণ হিন্দুদের ভেতর মুক্তচিন্তা ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে রামমোহন রায় সংবাদপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে ১৮২১ সালে প্রকাশ করেন ‘সংবাদ কৌমুদী’ নামে একটি বাংলা সংবাদপত্র। পরের বছর ফারসি ভাষায় আরেকটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। এর নাম ছিল ‘মিরাত উল আখবার’।
উপনিষদে বহু দেবদেবির পরিবর্তে নিরাকার ব্রহ্মার উপাসনার কথা রয়েছে। এ সূত্রেই রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ‘ব্রাহ্মসভা’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম দেন। এখানে নিরাকার ব্রহ্মার স্মরণে ধর্মসঙ্গীত গেয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করা হয়। পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ব্রাহ্মসভা ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
বহুকাল আগে থেকেই হিন্দু সমাজে অনেক কুপ্রথা প্রচলিত ছিল। এর অন্যতম সতীদাহ প্রথা। এ প্রথা অনুসারে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পেড়ানো হতো। গোঁড়া হিন্দুদের প্রবল প্রতিরোধের মধ্যেও রামমোহন রায় সতীদাহের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে থাকেন। তিনি প্রভাবিত করতে থাকেন কোম্পানির শাসকদের। এই সূত্রে ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংয়ের অনুমোদনে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে আইন পাস হয়।
রামমোহন রায় ও তার সমমনা বন্ধুরা ইংরেজ শাসকদের সহযোগিতা প্রদানে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ভারতবাসী ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করতে পারবে। পাশাপাশি তিনি ভারতীয়দের প্রতি সরকারের কোনো কোনো বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন।
১৮২৩ সালে গভর্নর জেনারেল জন এডাম ভারতীয় সংবাদপত্রের ওপর কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করেন। রামমোহন রায় ও সমমনা বন্ধুরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে স্মারকলিপি প্রদান করেন। ভারতে তখন রাজনৈতিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকায় এ স্মারকলিপি গৃহীত হয়নি। পরবর্তী সময়ে রামমোহন রায় ও তার বন্ধু দ্বারকানাথ ঠাকুর ‘ইন্ডিয়ান জুরি অ্যাক্ট ১৮২৬’-এর ভেতরকার কয়েকটি বৈষম্যমূলক ধারা বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদলিপি পেশ করেন। এই পত্রে কলকাতার হিন্দু-মুসলমান নাগরিকদের স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়েছিল।
রামমোহন রায় ও তার বন্ধুরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জমিদারদের পক্ষ থেকে ১৮২৯ সালে আরেকটি আবেদনপত্র জমা দেন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংয়ের কাছে। এতে জমিদারদের জন্য ক্ষতিকর সরকারের রাজস্ব নীতি পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়।

ড. কামাল ও মাহ্ফুজ আনামকে গ্রেপ্তার দাবি -ফেসবুকে জয়ের স্ট্যাটাস

প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর অফিশিয়াল ফেসবুক পাতায় দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বলেছেন, ড. কামাল হোসেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম ও সুশীল সমাজের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাকে (গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে পুলিশি রিমান্ডে) গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
গতকাল বৃহস্পতিবার জয় তাঁর ফেসবুক পাতায় এই স্ট্যাটাস দেন। জয় বলেন, ‘সুশীল সমাজের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না একটি ফোনালাপে বিরোধীপক্ষকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে মানুষ হত্যা করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।’
‘ডেইলি স্টার পত্রিকা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর-এর একটি পোস্টার আধা পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপিয়েছে, যেখানে সরকার উৎখাত ও ক্ষমতা দখল করতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এসবই হচ্ছে আমাদের তথাকথিত “সুশীল সমাজ”-এর ক্ষমতা দখলের আরেকটি ষড়যন্ত্র।’
জয়ের বক্তব্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনবিদ কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন, অনভিপ্রেত বক্তব্য তাঁর (জয়ের) মুখে শোভা পায় না।
স্ট্যাটাসে সজীব ওয়াজেদ জয় আরও বলেন, ‘মান্না তাঁর ফোনালাপে চক্রান্তের অংশ হিসেবে কামাল হোসেনের নামও উল্লেখ করেছেন। মান্না, কামাল হোসেন ও মাহ্ফুজ আনামরা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যাঁরা ১/১১-এর পর সামরিক শক্তিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই লোকগুলো আমাকে বিরক্ত করছে। এরা ক্ষমতা চায়। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ছাড়া একটি আসনেও কখনো জয়লাভ করতে পারেনি। দুই মাস ধরে সাধারণ মানুষের ওপর বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসংযোগ আক্রমণের সুযোগ নিয়ে এই লোকগুলো সম্পূর্ণ অসত্যভাবে দুই দলকেই দায়ী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
জয় বলেন, ‘ছাত্রলীগ সদস্যদের ভুয়া বোমা হামলাকারী বানিয়ে ডেইলি স্টার একের পর এক গল্প ছাপিয়ে যাচ্ছে, যেগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কেউই বিএনপি-জামায়াতের কাছে সহিংসতা বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন না। এখন আমরা জানি যে তাঁরা চায় এই সহিংসতা চলুক এবং তাঁরা আসলে আরও মানুষ হত্যায় বিএনপি-জামায়াতকে সহযোগিতা করতে চান। ব্যাপার যা-ই হোক তাঁরা আওয়ামী লীগ সরকারকে দোষ দেন, যাতে করে তাঁরা ১/১১-এর মতো আবারও সেনাবাহিনীর পিঠে চড়ে ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারেন। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তাঁদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।’
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। সে জন্য আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে তিনি আদৌ ডেইলি স্টার পড়েন কি না।’
এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, ‘জয় প্রকৃতপক্ষে কী বলেছেন, তা তো আমি জানি না। বিষয়টি তাঁর কাছ থেকে জেনে নিয়ে তারপর এ বিষয়ে কথা বলা ভালো হবে।’ তিনি মান্না প্রসঙ্গে বলেন, তাঁর বিষয়টি এখন বিচারাধীন। এরপর তদন্তে যা কিছু বের হবে, সে অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমি তাঁর (জয়) মতামতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মান্নার কথোপকথনে অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে। কামাল হোসেন ও মান্নার কর্মসূচির লোকবল ও অর্থ দিয়েছে বিএনপি। সুতরাং কামাল হোসেন দায়ভার এড়াতে পারেন না।’
রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা শোনানো লজ্জার: ড. কামাল
গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘২০১৫ সালে এসে আমাকে দেশদ্রোহিতার কথা শোনানো হলে, এটা আমার জন্য লজ্জার। দেশের জন্য লজ্জার, যিনি বলেন তাঁর জন্যও লজ্জার।’
আজ শুক্রবার রাজধানীর আরামবাগে গণফোরাম কার্যালয়ে দলটির বর্ধিত সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল এ কথা বলেন।
ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘একজন বলেছে দেশদ্রোহিতার জন্য আমার বিচার করা হোক। পাকিস্তানও আমার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার বিচার করেছিল, বিএনপিও করেছিল কেয়ারটেকার সরকারের দাবি করায়। এরশাদও করেছিল। দেশদ্রোহিতার কথা শোনানোকে আমি পরোয়া করি না। কে এ ধরনের হুমকি দেখাবে?’
প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তাঁর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে ড. কামাল বলেন, ‘এ ধরনের কথা যারা বলে, তাদের ব্যাপারে আমার বলার কিছু নেই। ওনার মতো মানুষের এ ধরনের কথা বলা শোভা পায় না। এটা ছেলেমানুষের কথা। কিছু না জেনে, না বুঝে বলেছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।’
মাহমুদুর রহমান মান্নার টেলিফোন আলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘টেলিফোন আলাপ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমি দেশেও ছিলাম না। দেশে ফিরে পত্রিকা দেখে জেনেছি। পরে আমাকে মিছিলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমি বলেছি, এসব জিনিস পরিষ্কার না হলে মিছিলে যাওয়া যাবে না।’
দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে কেউ অস্বাভাবিক ব্যবস্থায় রাখতে পারে না। দেশে যা হচ্ছে, তাকে সুস্থ রাজনীতি বলা যাবে না। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা সুস্থ রাজনীতি নয়। এটি এক ধরনের রোগ। গুম-হত্যা করে রক্ষা পাওয়া যাবে না।’
ড. কামাল বলেন, পেট্রলবোমাসহ সব ধরনের নৃশংসতার বিরুদ্ধেই তাঁর দল কথা বলে। বোমা মেরে গুটিকয়েক মানুষকে মেরে ফেলা যায়। ১৬ কোটি মানুষকে মারা যায় না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংলাপের বিকল্প নেই, উল্লেখ করে ড. কামাল বলেন, সভ্য সমাজে আলাপ আলোচনা করেই সমাধান করা হয়। আর আলোচনা শুধু বড় দুটি দলের মধ্যে নয়, সব রাজনৈতিক দল এবং মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গেও করতে হবে।
সভায় অন্যদের মধ্যে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি মফিদুল ইসলাম খান, সুব্রত চৌধুরী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুল আজিজ ও তবারক হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্র ও ভাষা by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’ একবার পড়লে রামমাণিক্যকে ভোলা মুশকিল। রামমাণিক্য বাঙাল। তার পরিচয় লিপিতে বলা আছে সে কথা; সে লিপি না থাকলেও অবশ্য চলত, কেননা মুখ খুললেই আর রক্ষা নাই, হা হা করে ওঠে তার বাঙালপনা। পদ্মাপারের! খাঁটি বিক্রমপুরীর। তার অনেক স্মরণীয় মনিমাণিক্যের মধ্যে একটি, ‘এত করাও কলকাতার মতো হবার পারলাম না, তবে এ পাপ দেহতে আর আজ কি, আমি জলে ঝাঁপ দিই, আমাকে হাঙ্গোরে কুমিরে বক্কোন করুক।
ওই যে বক্কোন ওই আওয়াজ কে দিতে পারবে এ সংসারে, খাঁটি বাঙাল ছাড়া? টেলিভিশনে হঠাৎ সেদিন ওই ভক্ষণের আওয়াজ যেন আবার শুনলাম। নিজ কানে। যিনি বলছিলেন, তার পরিচয়টা ঠিক ধরতে পারিনি, কিন্তু আগ্রহ নিয়ে শুনছিলাম, কেননা তিনি মাছের কথা বলছিলেন। মাছের ব্যাপারে আশ্বস্ত করবেন আশা করছিলাম; ভরসা দেবেন, ভ্রান্ত ধারণার নিরসন করে দেবেন, বলবেন, মাছ খাওয়া যাবে। না, উল্টো বললেন কথা, বললেন মাছ ভক্ষণ করবেন না। তা তো বুঝলাম, কিন্তু কি যে ভক্ষণ করব, তা তো বুঝলাম না, জনাব। সেটা তো কেউ বলে না, বলে দেয় না।
তবে অত দুঃখের মধ্যেও ভক্ষণ দেখি আমাকে ছাড়ে না। বেড়ে বলেছেন, ভাই, ভক্ষণ করবেন না। আসলে তো আমরা ভক্ষণ করি। বিশেষ করে মাছ, বাঙালির ভেতরে একটা বিড়াল আছে, মাছ দেখলে চাঞ্চল্যকে শাসন করা কঠিন হয়ে পড়ে। লম্ফঝম্প দিতে থাকে। কিন্তু মাছ পেলে বিড়ালের মতো ভদ্রভাবে খাই না, গপাগপ গিলতে চাই। রাক্ষসের মতো ভক্ষণ করি। কেবল মাছ বলে নয়, এমন-কি কোন খাবার আছে যা পেলে ভক্ষণ করি না? শান্তভাবে খাই?
তবে মাছের এখন সত্যি সত্যি দুর্দিন। সহকর্মীর ভাগ্নে গিয়েছিল দেশে। ভাটি অঞ্চলে দেশ তার। ভাগ্নের বাবা বাজারে খুঁজে ঢুকে জিয়ল শিং মাছ নিয়ে এসেছে দশটা। পরের দিন সকালে উঠে দেখেন মরে ভেসে রয়েছে সবক’টিই। গায়ে তাদের ফোস্কা। বসন্ত হয়েছে। পানির মাছের গায়ে পানি বসন্ত। কে কবে শুনেছিল অমন অলুক্ষণে কথা। একি তবে প্রকৃতির প্রতিশোধ? বসন্তকে দেশ ছাড়া করব বলে আস্ফালন করেছি, তাই কি প্রতিশোধ নিল বসন্তু; মাছের গায়ে ফুটে ওঠে? এরপরে কি তরকারির বসন্ত হবে? তারপরে চাল-ডালের? কলিকালের মনে হয় খুব আর বিলম্ব নেই।
অনেকে আছেন এমনিতেই হতাশাবাদী; তাদের ঈমান আরো পোক্ত হয় এসব দেখে। তারা বলেন, সব শেষ হয়ে যাবে। দেখছ না লক্ষণ?
কেমন খরা পড়েছে। মরুভূমি হয়ে যাবে সারা দেশ। খেজুর গাছ দেখবে চারদিকে। তার নিচে হয়তো খাওয়া যাবে তরল সোনা, অর্থাৎ খনিজ তেল, কিন্তু তাতে তোমার আমার কি লাভ ব্রাদার, তুমি আমি তো ততদিন টিকব না। আমি অবশ্য হতাশাবাদী নই। বিলোপবাদ পোষায় না আমার। যদি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই-ই তবে জৈব সার হিসেবে তো অন্তত একটা ভূমিকা থাকবে। আবার আসিব ফিরে। সার হয়ে ভূমিকে উর্বর করতে পারব। তাতে গাছ হবে। গাছ হলে বৃষ্টি হবে, বৃষ্টি হলে আর পায় কে, সোনার বাংলা তখন আবার শ্যামল হয়ে উঠবে। কিন্তু ওই যে প্রশ্ন, তাতে তোমার কি, আমার কি? ও বড় মারাত্মক প্রশ্ন, সত্যি সত্যি, আমি গেলে রইল কি?
ভক্ষণ বড়ই সত্য হয়ে উঠেছে, কেবল আমরা যে ভক্ষণ করি তা নয়, আমাদেরকে ভক্ষণ করা হয়। দারিদ্র্য আমাদেরকে ভক্ষণ করে, হতাশা খুবলে খুবলে খায়। মহানন্দে মশারাও ছাড়ে না। কারো ইচ্ছা ধর্মীয় রাষ্ট্র করা হোক বাংলাদেশকে, ওদিকে মানুষের ধর্মকর্ম করবার স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত যে বিপন্ন তা তো দেখছে না কেউ। পরিচ্ছিন্ন থাকার মতো বাড়তি কাপড় নেই, সম্ভ্রম রক্ষা করার মতো আড়ালটুকু অবলুপ্ত, অজু করবার পানি নেই। বাংলাদেশের মেয়েরা বিশ্বের বাজারে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি মধ্যবিত্ত ঘরেও শবেবরাতে দেখলাম খাওয়া-দাওয়া কমে এসেছে। যে দুটো চাকরি করে, সে তিনটে চাকরি খুঁজছে। ওদিকে বেকার মানুষ কি খায়, কোথায় ঘুমায় হদিস নেই। আমরা ভক্ষণ করব না তো ভক্ষণ করবে কে? হয় ভক্ষণ করব, নয় তো ভুক্ত হব। আমাদের দেশ ক্ষুধার দেশ। কেবল মানুষ নয়, মশা, মাছি, রোগ, শোক, কুকুর, শৃগাল, সকলেই এখানে বিলক্ষণ ক্ষুধার্ত। ভক্ষণ, শুধু ভক্ষণ।
মনুষ্যত্ব তো বিপন্ন হচ্ছেই, এমনকি বাঙালিত্বও খাবি খাচ্ছে, দেখতেই পাই। দুধ ছিল, দুধ গেছে। সেই যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মাছ খেয়ে আসছি আমরা, বিকাশ যেটুকু ওই মৎস্য-কল্যাণেই, তাও কি যাবে চলে শেষ পর্যন্ত? নিষিদ্ধ হয়ে গেল মিঠা পানির মাছ, সমুদ্রের মাছই বা পাই কোথায়? সে তো শুনি হাঙ্গোরে কুমিরেই বক্কোন করে, নয়তো ধরে নিয়ে যায় জলদস্যুরা।
ওদিকে বাংলা ভাষা চলে না। যারা চালু করবেন বলেন তারাই ইংরেজি ব্যবহার করেন বেশি। খোঁজ নেওয়া মাত্র জানা যায় দেশের ভবিষ্যৎ কর্তারা সবাই কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের কারখানায় উপন্ন হচ্ছেন। দেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে তারাই পড়ে যাদের সুযোগ নেই বিদেশে যাবার। তবে কি-? তবে কি বাঙালিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে? বিদেশী শাসন পারেনি; আর্যরা ফেল করল, মুঘল-পাঠান হদ্দ হলো, ব্যর্থ হলো ইংরেজ, হেরে গেল পাঞ্জাবি, তবে কি শেষ পর্যন্ত নিজেদের হাতে ও বৈরী পরিবেশের হস্তক্ষেপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব আমরা? না, আমি মনে করি না। আমি মনে করি আমরা না থাকলেও আমাদের বাংলা ভাষা থাকবে। এমনকি যদি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হয়েও হয় তবু টিকে থাকবে। একদিন হয়তো ভাষাবিদরা সামাজিক ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে এ ভাষার ইট-কড়ি-বর্গা টেনে টেনে বের করবেন এবং বলবেন এর অনেক বৈশিষ্ট্য ছিল। ভাষার যখন বৈশিষ্ট্য ছিল তখন ভাষা যারা ব্যবহার করত তাদেরও নিশ্চয়ই তা ছিল, জীবন থেকেই তো ভাষায় আসে, উল্টো পথ বন্ধ।
ভাষার কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা এখনি বলে রাখতে পারি। বিশেষ্য, বিশেষণ নয়, ক্রিয়া দিয়েই ভাষাকে চেনা সহজ। ক্রিয়ার জগৎ বড় বিচিত্র, বহু বহু দূর পর্যন্ত প্রসারিত। যেমন এই যে বললাম, ভক্ষণ। ওই ক্রিয়া দিয়ে বাঙালিকে চেনা খুবই সহজ এবং সঙ্গত। ভক্ষণ অর্থ খেয়ে ফেলা তো, ওই ফেলাতেও বাংলা ভাষার অতিসুন্দর নিজস্বতা ফুটে রয়েছে। এত বেশি ফেলতে বোধ করি কাউকে দেখা যাবে না এবং এমন নির্বিকারভাবে ফেলে দিতে। খেয়ে ফেলা বোঝা যায়, খাব যখন নিঃশেষ করেই খাব, চেটেপুটে নিঃশেষ করে দেব, চিহ্নটি যেন না থাকে, সার্থক হবে বুভুক্ষা। কিন্তু দিয়ে ফেলা? সেটাও না হয় বুঝলাম, দেওয়া মানেই ফেলা, ফেলে দেওয়া, যদি ফেলে দিতে না চাও তবে রেখে দাও, দেওয়া ও ফেলা সমান কাজ বটে। কিন্তু নিয়ে ফেলার ব্যাখ্যা কি? নিলামই যদি, তবে ফেলব কেন? বলে ফেলার অর্থ কি? বলা মানেই কি ফেলে দেওয়া? করে ফেলা? ধরে ফেলা? এনে ফেলার অর্থ অবশ্য বুঝতে পারি- আনো, নিয়ে এসো, এনে নিজের গোলায় ফেল, ভরে ফেল আঙিনা। মেরে ফেলাও ঠিক আছে, ওই মারা সে মারা নয়, শেষ মারা যে; কিন্তু হেসে ফেলা? হাসিতে আবার ফেলবার কি আছে? ফেল না কিসে?
আমাদের ক্ষুধা আছে, আমরা সবকিছু খাব, ভাত, হাওয়া, চুমু, পানি, সিগারেট সমস্ত কিছুই খাই আমরা- এ বৈশিষ্ট্য বিদেশীদের নাড়া দিয়েছে, চোখ বড় করে তারা জিজ্ঞাসু হয়েছে; তারপরে অবশ্য মাথা নেড়েছে তারা, যেন বুঝে ফেলেছে রহস্য আমাদের- ধরে ফেলেছে সেই আদিম দারিদ্র্য আমাদের যার জন্য সব সময়ে ওই খাই খাই আমাদের, বাছবিচার করি না, যাই পাই তাই খাই, ভক্ষণ করি। কিন্তু ফেলার রহস্যটা কি? দেখতে পাচ্ছি ওই ওপরের বাক্যেই আমি একবার নয়, দু’বার ফেলেছি- বুঝে ফেলার কথা বলেছি, বলেছি ধরে ফেলার কথাও। ব্যাখ্যা হয়তো এই যে; আমরা সবকিছুই ফেলে দিতে চাই, থুতু, জঞ্জাল, কথা, কাজ, বোধ-বুদ্ধি কিছুই বাদ থাকে না ফেলে দেওয়ার লম্বা হাত থেকে। বড় নির্দয়, হৃদয়হীন, দয়া নেই, মায়াও নেই। ফেল, ফেলে দাও। না ফেললে বাঁচব কি করে? না ফেললে বাঁচা নেই, ওঠার তো কথাই ওঠে না। কিন্তু ফেলব কোথায়? সেই একটা সমস্যা। ফেলার জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত স্থান পাওয়া ভার হয়, যে জন্য আঁস্তাকুড় গড়ে ওঠে চতুর্দিকে। দুর্গন্ধ ছড়ায়। সমাজ হয়ে ওঠে বসবাসের অযোগ্য।
তবে কেবল ফেলি না তো, রাখিও। দু’য়েকটা ফেলা আবার রাখার মতোই। ‘ফালাইয়া থো’- বলি যখন বাঙাল ভাষায়, তখন রাইখ্যা দের সঙ্গে তার তফাৎ থাকে না। কিন্তু না, অনেক রকম রাখা আছে বৈকি। আমরা ধরে রাখি, বলে রাখি, করে রাখি, জেনে রাখি। মনে রাখা-রাখি আছে আমাদের। তুলে রাখি, ফেলেও রাখি এবং দাবিয়ে রাখি পরস্পরকে। জমা রাখা, শুনে রাখা, লিখে রাখা, মান রাখা, মন রাখা-এসব রয়েছে। মোটকথা ভারি একটা রক্ষণশীলতা যে রয়েছে তা অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই। কেবল একটা জিনিস রাখার ভয়ংকর অভাব দেখা যায়, কথা রাখা এবং প্রাণ রাখাও কঠিন বৈকি। হয়তো বা ওখান থেকেই উদ্ভব সমস্ত ব্যাপারটার- প্রাণ রাখার ওই দুরূহতা থেকেই। আর রাখার জন্যই তো ফেলা, রাখার স্বার্থেই ফেলে দেওয়া।
বলতে দ্বিধা নেই যে, বড় কষ্টে প্রাণ রাখি। আত্মসমর্পণ করতে হয় নানান ক্ষেত্রে, দেখা যায় সেই বাঁচে, যে আপস করে, বিদ্রোহীদের বাঁচোয়া নেই। আমাদের ভাষাতেই তো রয়েছে প্রবাদ- ঘৃণা, লজ্জা, ভয় তিন থাকতে নয়। এই তিন থাকতে সিদ্ধি নেই, বাঁচাও নেই। ঘৃণাহীন মহাপুরুষ হতে হবে, লজ্জাবিহীন এবং নির্ভয়। একেবারে দিগম্বর।
পতনের ধ্বনি কি শুনতে পান না? কেবল বই পড়াই যা একটু ভিন্ন রকম, নইলে অসংখ্য পতন আমাদের। শুয়ে পড়া বুঝলাম, ঘুমিয়ে পড়া আরো স্পষ্ট এই জন্য যে, খাট ছোট, গড়িয়ে পড়ার ভয় থাকে। কিন্তু উঠে পড়া? উঠলেনই যদি তবে আবার পড়বেন কেন? দাঁড়িয়ে পড়ার মধ্যে কি আছে? পতনের ভয়? ঝুলে পড়া? প্রেমে পড়াতেও কি তাই? বৃষ্টি পড়বে সেটা স্বাভাবিক; আকাল, শীত, গরম, এদের পড়াও মেনে নিতে পারি, একবারে গায়ের ওপর এসে পড়ে যে, খুবই গায়ে-পড়া ভাব ওদের; চুল, পাতা, মায়া, এরাও পড়ুক; পায়ে পড়তে থাকুক, কিন্তু কেটে পড়া অথবা এসে পড়া, কিংবা লেগে পড়া? বোঝা যাচ্ছে যে ভয়টা বড় গভীরে ঢুকে বসে আছে, পতনের ভয়। জীবন এখানে অনিশ্চিত, শত্র“ চতুর্দিকে, পতন ঘটতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। ওই পতনের ভয় থেকেই বুঝি সংরক্ষণে আগ্রহ এবং নিক্ষেপে উৎসাহ। একই সূত্রে গ্রথিত সবাই। জীবন ওপরে ওঠে না, বিচ্ছিন্নতা ঘোচে না, নেত্রীরা এক হন না, দলগুলো ভেঙে যায়, অসম্ভব হয়ে পড়ে যৌথ কর্ম। সত্য হয়ে থাকে ভক্ষণ। রক্ষকরা ভক্ষক হয়- দেখা গেছে চিরকাল এ দেশে। আমরাও ভক্ষক প্রত্যেকে, কিংবা ভুক্ত।
খোদা না করুন, আমরা চলে গেলেও আমাদের ভাষা তার এই সমস্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে থাকবে এবং জানিয়ে দেবে ভবিষ্যতের মানুষকে- আমরা কারা ছিলাম, কেমন ছিলাম। মার্কসবাদের একজন সমালোচক সেদিন আমাকে বলেছিলেন, বেচারা মার্কস, সত্যকে ধরবেন কি করে, জন্মছিলেন দেড়শ বছর আগে যখন জেনেটিকসের জ্ঞান এখনকার মতো বিকশিত হয়ে ওঠেনি। তাই পরিবেশ ও আবেষ্টনী বুঝলেন বটে, কিন্তু বংশানুক্রমের ব্যাপারটা বুঝলেন না। আমি বলি ভাগ্যিস বোঝেননি তাই কিছু আশার কথা শোনাতে পেরেছেন এবং তার পথ ধরে কোথাও কোথাও বিপ্লবও ঘটে গেছে, নইলে বংশানুক্রমের ক্রীতদাস হয়ে থাকতে হতো এবং ওই যে আমাদের আত্মরক্ষার জন্য অন্য সবাইকে ফেলে দেওয়া, পতন ঘটানো তার এবং ভক্ষণের আওয়াজ ভিন্ন কিছু পাওয়া যেত না। কোনো আশাও থাকত না। সেটা সহ্য করা কঠিন হতো বৈকি। আশা চলে গেলে থাকে কি? অনেকে বলেন, আমাদের চরিত্র খারাপ, আমরা ভোগলিপ্সু এবং কর্মবিমুখ। ভোগলিপ্সা অসত্য নয়, ভক্ষণ রয়েছে, তবে আমাদের তুলনায় অনেক বেশি খায় এমন লোকের বিপুল সমাবেশ পৃথিবীর যেখানে-সেখানে পাবেন এই চরিত্রবাদীরা, যদি দেখতে চান। কর্মবিমুখতা মোটেই সত্য নয়। লোকে কাজ করে, তবে কাজের মূল্য পায় না। সে জন্য ডবল ডবল কাজ আমাদের, আমরা উঠে পড়ে লাগি, দৌড়ে দৌড়ে চলি, ছুটতে ছুটতে আসি, ঘামাতে ঘামাতে সিক্ত হই, ঘুরে ঘুরে দেখি, হেসে হেসে কথা বলি, পড়ে পড়ে ঘুমাই, জেগে জেগে শুনি। একেবারে কুলায় না, দুবার করি। তারপরেও বলা হয়, কাজ করি না। কাজ করি ঠিকই। কিন্তু কাজ তার মূল্য পায় না। কেননা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে অকাজের লোকেরা।

প্রথম বই প্রকাশের গল্প by হাসান আজিজুল হক

আমার প্রথম গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় সমুদ্রের স্বপ্ন, শীতের অরণ্য। এটি ছিল গল্পগ্রন্থ, তাতে গল্প আছে দশটি- ‘শকুন’, ‘তৃষ্ণা’, ‘একটি চরিত্রহীনের সপক্ষে’, ‘উত্তর বসন্তে’, ‘বিষণ্ন রাত্রি : প্রথম প্রহর’, ‘মন তার শঙ্খিনী’, ‘সীমানা’, ‘একটি আত্মরক্ষার কাহিনী’, ‘আবর্তের সম্মুক্ষে’, ‘গুনীন’। আমার তখনকার ভালোলাগার বিষয়টা তো ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিলই। খুবই ভালো লাগছিল তখন। কথাক্রমেই বলতে হয়, আমি যে গল্প লিখেছি, বা এ পথে চলেছি, তাতে আমার কোনো দীক্ষাগুরু নেই। প্রচুর গল্প পড়েছি আমি, রবীন্দ্রনাথ তো পড়েইছি। কিন্তু আমার কাজটা আমিই করেছি। আমি প্রথম গল্প লিখি ‘শকুন’। তা এ গ্রন্থেরও একেবারে প্রথম গল্প। এ গল্পে আমার সরাসরি পার্টিসিপেশনও আছে। এখানে একটা স্কুল বালক আছে, সেই হচ্ছি আমি, আর আছে কয়েকজন রাখাল। আমার সামনেই ঘটনা ঘটল। এটা শকুন নিয়ে গল্প। সেটা হঠাৎ তাদের সামনে এসে পড়ল। শকুনটা তো শেষ পর্যন্ত মারাই গেল। এ গল্প নিয়ে তখন খুব আলোচনা হয়েছিল। আমার তো মনে হয় এ গল্পটিই এ গ্রন্থটিকে টেনে নিয়ে গেছে। গ্রন্থটির এডিশন নানাভাবে হয়েছে। এ গল্পটি ছাপা হয় আবু জাফর শামসুদ্দীন সম্পাদিত সমকাল নামের সাহিত্য পত্রিকায়। এটি তখনকার অত্যন্ত নামকরা সাহিত্য পত্রিকা ছিল। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। এখনকার মুক্তধারার প্রচ্ছদে একটা মেয়ে যে ঢেউয়ের দিকে যাচ্ছে, একটা পুরুষের অবয়ব দেখা যায়, তখন তা ছিল না। তাতে ছিল এক নারীর মুখ। একটানে আঁকা, হালকা বেগুনির ওপর শাদা টান ছিল তাতে। এখনও আমার চোখের সামনে তা একেবারে ভাসছে। সে কি উত্তেজনা আমার। খুবই ভালো লাগছিল তখন।
আমি তো আর কোনো প্রকাশকের কাছে যাইনি, বা যেতে হয়নি। তখন ছিল পাকিস্তান লেখক সংঘ। পূর্ব পাকিস্তানে এর একটা শাখা ছিল। তাদের একটা সাহিত্য পত্রিকাও ছিল, নাম পরিক্রমা। তাতে আমার তিন-চারটা গল্পও ছাপা হয়, ‘মন তার শঙ্খিনী’, ‘উত্তর বসন্তে’, ‘তৃষ্ণা’ নামের গল্পসমূহ সেখানে ছাপা হয়েছিল বলে মনে হয়। এর প্রকাশনার সঙ্গে মুনীর চৌধুরী, রফিকুল ইসলামরা জড়িত ছিল। আমায় একদিন রফিকুল ইসলামই বললেন ছড়ানো-ছিটানো গল্পগুলো দিয়ে একটা গল্পগ্রন্থ করে ফেলতে। তখন আমি পাণ্ডুুলিপি জমা দিলাম। সেটা সিলেক্টও হল। মুনীর চৌধুরী আমার লেখা খুব পছন্দ করতেন। তিনিই টিভিতে আলোচনাও করলেন। তখন এসব প্রচারণার মূল্য ছিল। রেডিওতে কিছুটা প্রচার হতো। তবে তা নিয়ে তখনও কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি। টিভিতে প্রচারণা নিয়ে কেউ কেউ কানাঘুষাও করল। তারা বলল যে, লেখক সংঘ এমন একটা বই বের করে একে জাস্টিফাই করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সাহিত্যিক দলাদলি, ঝগড়াঝাঁটি, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, সেই ষাট দশকেও ছিল। কিন্তু মুনীর চৌধুরীই যেন আমায় উদ্ধার করলেন। তিনি কথাও বলতেন চমৎকার- তখনকার সেই মধ্যবয়সের মানুষটা কথা বলতেন অনবরত। আবু হেনা মোস্তফা কামালের মতো চৌকস কথাওয়ালাও তার কথা শুনতেন। আবু হেনা মোস্তফা কামালের মতো জানাশোনা নাক-উঁচু লোকের এ ধরনের ব্যবহার তো একটা ঘটনা বটে।
আমার এ বইটা পরবর্তী সময়ে মুক্তধারাও বের করেছে, সাহিত্য প্রকাশও বের করেছে। মুক্তধারা তখন তাদের পুঁথিঘরের পাঠ্যপুস্তকের ব্যবসার সঙ্গে সৃজনশীল আর মননশীল গ্রন্থও বের করত। এটা আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে মুক্তধারার মালিক চিত্তরঞ্জন বাবু আমার লেখা বেশ পছন্দ করতেন। তিনি লেখাপড়া তেমন জানতেন না, কিন্তু চমৎকার কাজ করতে চাইতেন- তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তার ভাগ্নে সব করত। তিনি কিন্তু অনেক টাকা-পয়সার মালিক ছিলেন। প্রকাশনার অনেক কাজই হতো, লেখকদের টাকা-পয়সাও দিতেন তিনি। প্রকাশনা জগতে তিনি তো একটা দৃষ্টান্ত। এখনকার গ্রন্থমেলায় তার বিরাট অবদান। তিনিই প্রথম বাংলা একাডেমিতে যাওয়ার পথে বই বিছিয়ে ফেব্র“য়ারিতে বই বিক্রি শুরু করেছিলেন। তার আগ্রহ-উৎসাহ আমাদের প্রকাশনা শিল্পের এক অন্যতম ঘটনা। তখন নওরোজ কিতাবিস্তানও পাঠবইয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৃজনশীল গ্রন্থও করতে থাকলেন। তখন প্রকাশনার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। কে কার বই বের করবে? প্রকাশনা শিল্প তো তখনও আধুনিকতার স্পর্শ পায়নি।
তখনকার দিনে গল্পের চর্চা কিন্তু ভালোই হতো। আলাউদ্দীন আল আজাদ ছিলেন আমাদের প্রধান গল্পকার। গাফফ্ার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলীরা লিখতেন। সর্দার জয়েন উদ্দীন, আবু ইসহাকরা গল্প লিখেছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তখন অনেক গল্প লিখেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এরপর, মান্নান সৈয়দ আর কায়েস আহমেদ তো তারও পর গল্প লেখা শুরু করল। প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুবোধ ষোষ, মানিক তারও আগে গল্প লিখেছেন। তবে তখনকার সময়টা গল্পের জন্যই ভালোই ছিল। আমার কথাসাহিত্যের কথকতার প্রথম দিকে তা নিয়ে লিখেছি।
আমি তো ৫০-এর শেষ দিক থেকেই পলিটিক্স করি। আমার দুলাভাই-আপার দৌলতপুরের বাসাটা তো ছাত্র ইউনিয়নের অফিসই বানিয়ে ফেললাম। তখন রাজনীতি করতে গিয়ে মারও খেয়েছি। একসময় ভাসানীর দল করতাম। লেখক শিবির করেছি। আমার আর বদরুদ্দীন উমরের প্রভাবেই বলা যায় ইলিয়াস একসময় রাজনীতি করা শুরু করল। তার প্রথম দিকের লেখায় রাজনীতির কমিটমেন্ট বিষয়টা তেমন ছিল না। তবে সেই সময় সাহিত্য মুভমেন্ট হয়েছে। স্যুররিয়েলিজমরে নামে কী যে লিখত তারা- সামাজিক দায়বোধ, কমিটমেন্ট ইত্যাদি কিছুই ছিল না। বাস্তবকে তারা কেয়ার করত না, তারা সমানে কাফকা, কামু, ব্যোদলেয়ার নিয়ে মেতে থাকত। তাদের পত্রিকার নামও ছিল না। তাদের ভেতর অন্যতম বলা যেতে পারে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসদা চৌধুরীকে। আমার তো ঢাকায় তেমন কেউ ছিল না, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গেই থাকতাম। সেই এক সময় গেছে তখন।
তবে আমার এ গল্পগ্রন্থেরও আগে শামুক নামের একটা উপন্যাস লিখে ফেলি, আমার বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর, তা ছাপা হয় পূর্বমেঘ-এ। এটা দিয়ে তো আমি কমপিটিশনেও অংশ নিই। কলকাতায় তখন ‘মানিক স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হতো। প্রেমেন্দ্র মিত্ররা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। আমি তাতে অংশ নিই, ২৮ থেকে ৫টার একটা লিস্টও করা হয়। ২৮টার লিস্টে এর নাম ছিল। এটি এবার গ্রন্থাকারে আসবে ইত্যাদি থেকে। ভূমিকাতে এসব কথা আছে।
তবে লেখা সম্পর্কীয় অনুভূতিটা আমি আমার এ গ্রন্থ থেকেই খানিকটা স্মরণও করানো যেতে পারে- ‘লেখা হয়ে গেলেই তা আর পড়তে ভালো লাগে না। নিজের পুরনো লেখার ব্যাপারে তো কথাই নেই। কাগজে-কলমে লেখাটা যা দাঁড়ায়, তা রচনার মানস পরিকল্পনার একটা কংকাল ছাড়া আর কি।’
আবারও গ্রন্থকথায় ফেরা যাক,- ‘শকুন’ তো আলোচনার ভিতর ছিলই, তা ছাড়া অন্য গল্পগুলো নিয়েও নানা মহলে কথাবার্তা হয়। ‘মন তার শঙ্খিনী’ নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। ‘গুনীন’ নামের যে গল্পটি আছে তা আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বা দেখা কোনো গল্প নয়। তবে এতে অনেক বৃদ্ধ অনেক ভাবে এতে যুক্ত আছেন। বরং বলা যায়, অনেক বৃদ্ধই তাতে নানা ভাবে আছেন। ‘উত্তর বসন্তে’ নামের গল্পে গৃহাহারার যন্ত্রণা, মানুষের অন্তর্গত আকুতি আছে। ‘তৃষ্ণা’ নামের গল্পে যে ছেলেটির নাম বাসেত, এমনটা একটা চরিত্র আমি পেয়েছি। সেই হঠাৎ লম্বা হয়ে যাওয়া ছেলের একটা অবয়ব এখানে আছে। এভাবে অনেক চরিত্র অনেক ভাবে আমার প্রথম গ্রন্থে এসেছে। সবই আমার দেখা জীবন, দেখা ছাড়া তো আমি লিখতে পারি না। তবে অনেক গ্রন্থ তো বের হল, এর পরের গ্রন্থ আত্মজা এ একটি করবী গাছ লিখে বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেলাম, তবে প্রথম বইয়ের প্রকাশের আনন্দ বা অনুভূতি তো অন্য কোথাও নেই।
গ্রন্থনা : কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায় কেন? by এরশাদ মজুমদার

চলমান অবস্থায় নয়া দিগন্তের সম্পাদকীয় পাতায় আমি অনুপস্থিত। দেহটা অসুস্থ, তাই। পুরো দেহ নয়। বেশ কিছু দিন হলো হাতের কব্জি ও আঙুল রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিজে আক্রান্ত। চব্বিশ ঘণ্টা ব্যথা। হাতের কাজগুলো করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু মনটা ছটফট করছে। দেশের এমন দুর্দিনে আমার হাতের এমন অবস্থা আমাকে কাতর করে ফেলেছে। অপর দিকে আমার বিবিজান খুবই খুশি। বন্ধুদের বলছেন, সাহেব লিখতে পারছেন না, আমি খুবই খুশি। তা না হলে আরেক জ্বালা হতো। সরকার বাহাদুর কখন গোস্সা হয়ে যান, এই চিন্তায় থাকতে হতো।
আমি তো সারা জীবন দেশ ( রাষ্ট্র নয়) ও দেশের মানুষের জন্য ভেবেছি আর কিছু করার চেষ্টা করেছি। আমার স্বপ্নের দেশকে আজো দেখিনি। সব সময় দেখেছি রাষ্ট্র নামের এ যন্ত্রটি কখনোই দেশের মানুষের কল্যাণ চায়নি। এ কারণেই পাকিস্তান টেকেনি। মাত্র ২৩ বছরে পাকিস্তানি পতাকা নেমে গেল এই ভূখণ্ডে। পুরো পাকিস্তান এখন অর্ধেক।
ষোলোআনা ভেজালহীন খাঁটি বাঙালি হওয়ার জন্য ’৭১ সালে বাঙালিদের জন্য নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন রাষ্ট্র এখন জাতিসঙ্ঘের সদস্য, জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকা আছে। ৪৩ বছর পার হয়ে গেছে, আমরা নাকি ষোলোআনা বাঙালি হতে পারিনি। জগতের মালিক আল্লাহ তায়ালা, কিন্তু বাংলাদেশের মালিক শুধুই বাঙালিরা। এখানে খোদাকে সার্বভৌম বলা যাবে না। তাহলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে। জেল জুলুম ফাঁসি হতে পারে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণের ওপর অত্যাচার করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি টিকে থাকতে চেয়েছিল। শক্তি প্রয়োগ করে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে পাকিস্তান টিকতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি।
আমি অবাক হয়ে সারা জীবন দেখেছি, রাষ্ট্র ও সরকার দেশে ও জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেকে রা করার চেষ্টা করে আসছে। কারণ সরকার ও সংবিধান মনে করে মানুষের চেয়ে রাষ্ট্র বড়। মানুষের চেয়ে আইন ও আদালত বড়। মোঘল, ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আইন প্রায় একই। ল্য মানুষকে কঠোরভাবে দমন করা। মনে হয়, মানুষের চেয়ে রাষ্ট্র ও সরকার বড়। অথচ জনগণের নামেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় আর সেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এক ধরনের সংবিধানের মাধ্যমে যেনতেনভাবে নির্বাচিত সরকার দিয়ে। এর নাম নাকি গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্র আর সরকারকে রার জন্য বিভিন্ন ধরনের বাহিনী লাগে। বিভিন্ন বাহিনী পালনের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়।
এ বিষয়ে আমি এর আগেও বহুবার লিখেছি। মূল বিষয়টি হচ্ছে, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক বা জনগণকে সম্মান করতে কোনো আইন আমাদের দেশে নেই। আমাদের আইন প্রণেতারা নাগরিক অধিকারের কথা চিন্তা না করে রাষ্ট্রের অধিকারের কথা বেশি চিন্তা করেছেন। ফলে রাষ্ট্র নির্দয় হয়ে যাওয়ার সুযোগ সব সময় থেকে যায়। আর অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রে সরকার ছাড়া আর কারো অধিকার থাকে না। আমেরিকায় ‘সিটিজেনস চার্টার অব রাইটস’, যা আমেরিকার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রা করে। আমেরিকার সংবিধান এই চার্টারকে অতিক্রম করতে পারে না।
বাংলাদেশের চলমান অবস্থাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে গণতান্ত্রিক মনে করি না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন এক নির্বাচনে চলমান সরকার মতায় এসেছেন। চলমান গণতন্ত্রের প্রথম ও প্রধান কথা হলো, যেভাবেই হোক নির্বাচিত হও আর জনগণের নামে মতা দখল করো। তার পরে রাষ্ট্রযন্ত্র নামক অমানবিক সংস্থা সরকারকে রা করে। আমি এভাবেই রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান ও নির্বাচন নিয়ে ভাবি। জানি না, আমার এ চিন্তা নিয়ে আপনারা কতটুকু ভাবেন।
এখন জাতীয় সনদ তৈরির যে দাবি উঠেছে তাতে সবারই একমত হওয়া উচিত। আমি আগেই বলেছি, আমাদের আইনগুলো মানুষের ঊর্ধ্বে। এখানে মানুষের অধিকার, মর্যাদা, আইন সরকার রাষ্ট্রের অনেক নিচে। এখানে মানুষ অমানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রধান শিকার। তথাকথিত গণতন্ত্র ও নির্বাচনের নামে ২০১৩ সালে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, দেশের সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। অপর দিকে, সরকার খুবই খুশি। কারণ এরা নাকি জনগণের অধিকার রা করে রাষ্ট্রকে রা করেছে। একই কারণে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে দেশের গোলযোগ শুরু হয়েছে। সরকার বলছে এবং বিশ্ববাসীকে বোঝাবার চেষ্টা করছে সরকারবিরোধী শক্তি জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। তাই জঙ্গিবাদ উৎরাতে সরকারকে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করতে হয়েছে। সন্ত্রাসীদের শাস্তি দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হচ্ছে।
চলমান অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচনব্যবস্থা ও পদ্ধতি। বিরোধী পক্ষ বলছে, তারা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। সরকার মনে করে, নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সংসদে মেজরিটির জোরে সরকার সংবিধান পরিবর্তন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের আগে সরকার বলেছিল, এটি সংবিধান রার নির্বাচন। এখন বলছে, এরা ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে। এটা কি রাজনৈতিক কৌশল, না মিথ্যাচার? আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একটি ব্যর্থ নির্বাচন। জোর করে নির্বাচন করা আর জোর করে মতায় থাকার স্বেচ্ছাচারী মনোভাব থেকেই চলমান সঙ্কটের জন্ম। আর সঙ্কট মোকাবেলা করতে গিয়েই সরকার চলমান দমননীতি গ্রহণ করেছে। রাখাল আর বাঘের গল্পের মতো চিৎকার চলেছে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জঙ্গিবাদী হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্ববাসী কেউ বিশ্বাস করছে না। সমস্যা হচ্ছে নির্বাচন, আর সরকার বলছে জঙ্গিবাদ। আইএস নাকি এর সাথে জড়িত হয়ে গেছে।
সত্তরের একচ্ছত্র জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মতায় এসে একদলীয় অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু করেছিলেন। সব খবরের কাগজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সরকারি কর্মচারীদের রাজনীতিতে সংযুক্ত করেছিলেন। বায়াত্তরে সমাজতন্ত্রের নামে ভারত ও রাশিয়ার প্ররোচনায় বেসরকারি সব সম্পদ সরকারের অধীনে নিয়ে এসেছিলেন। ফলে চোয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। আমি নিজেও লাইনে দাঁড়িয়ে শিশুর দুধ সংগ্রহ করেছি। ভারত থেকে আমদানী করা জালের মতো শাড়ি দেখেছি। জাল পরা বাসন্তীর ছবির কথা আপনারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। বঙ্গবন্ধুর পতনের পর দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসে। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়।
বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা এখন সেই পথেই চলতে শুরু করেছেন, অতি সাবধানী ও কৌশলী পদক্ষেপ। ২০০৬ সালে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক মতবাদ ও শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে। তারই আন্দোলনের ফসল হিসেবে এক-এগারোর সেনাবাহিনীর সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আসলে মতায় ছিল ভারত। জেনারেল মঈন ছিলেন ভারতের সমর্থিত জেনারেল। এই সরকারের ল্য ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা এবং তার প্রতিপক্ষকে রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় করা। সেই ধারা এখনো চলছে। এর মানে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের চাবিও ছিল দিল্লিতে। ওই আন্দোলনের ল্য ছিল অনির্বাচিত সেনা সমর্থক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। খালেদা জিয়াই জেনারেল মঈনকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। কিন্তু তিনি হয়তো জানতেন না জেনারেল মঈন ততণে দিল্লির অধীনে চলে গেছেন। সেই ভুলের খেসারতে খালেদা জিয়াকে এখনো ভুগতে হচ্ছে। আর কতদিন ভুগতে হবে তা আমরা জানি না। ২০০৬ থেকে ২০০১৫-এর জানুয়ারি নাগাদ বাংলাদেশ দিল্লির প্রভাবেই রয়েছে। আর দিল্লি চায় বাংলাদেশ ভারতের অনুগত বন্ধুতে পরিণত হোক। তাই তারা বাংলাদেশে একটি স্থায়ী অনুগত রাজনৈতিক দল চায়।
সাতচল্লিশ থেকেই দিল্লির লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে ধ্বংস করার, যা একাত্তরে করেছে। মাওলানা আজাদও বলেছিলেন পাকিস্তান টিকবে না। নেহরুজী নিজেও বলেছেন, পাকিস্তান একটি অবাস্তব কল্পনা। একাত্তরে বিজয়ের পর ইন্দিরাজী বলেছিলেন ‘হাজার বছরের বদলা নিলাম’। কিসের বদলা, কেন এই বদলা তা আমাদের নেতাদের বোঝার মতা নেই। আর ওভাবে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরাও চিন্তা করেননি। মমতাজী এসেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে ভারতের একটি রাজ্য বা প্রদেশের সাথে সাংস্কৃতিক চুক্তি করতে। অর্থাৎ পরাধীন বাঙালিদের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশীদের একই মর্যাদায় চুক্তি করা। লোকে বলে বাংলাদেশ এ হচ্ছে স্বাধীন আর পরাধীন বাঙালির মেলবন্ধন। শুরুতেই বলেছি, দিল্লি চায় বাংলাদেশের মুসলমানেরা কম মুসলমান হোক আর বেশি বাঙালি হলে মেলবন্ধনটা ভালো হবে। মুসলমান শব্দটাকে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী সাম্প্রদায়িক শব্দ বলে প্রচার করেন। এরা নিজেদের মুসলমান বাঙালি বলতেও লজ্জাবোধ করে। সাতচল্লিশে যাদের বাপ-দাদারা হিন্দু ভারত ত্যাগ করে পূর্বপাকিস্তান চলে এসেছে এবং যাবতীয় সুখ আনন্দ ভোগ করেছে, এরাও এখন দিল্লির দাস হতে চায়। এরা জ্ঞানপাপী এবং অন্ধ।
শাসক হিসেবে ইংরেজদের আসার আগে ভারতে বা অখণ্ড বাংলায় শাসন ও সামাজিকতায় হিন্দু মুসলমান বলে কিছুই ছিল না। এ ধারণা বা আলোচনাটা আসতে শুরু করেছে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও শোষণের কারণে। ইংরেজ আমলে মুসলমানেরা সীমাহীন নির্যাতন ও শোষণের শিকার হয়েছে। আর ইংরেজদের সহযোগিতা করে আনুকূল্য লাভ করেছে হিন্দুসমাজ। জিন্নাহসহ অনেক বড় বড় মুসলমান নেতা অখণ্ড ভারত চেয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু নেতারা মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করায় খণ্ড ভারতের চিন্তা সামনে আসতে থাকে। তারই ফল হলো পাকিস্তান। অপর দিকে, অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে গান্ধীজী ও নেহরুজী এর বিরোধিতা করেন। কারণ, অখণ্ড বাংলায় মুসলমানেরা মেজরিটি ছিলেন।
১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হলে হিন্দু নেতারা এর বিরোধিতা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত হিন্দু নেতাদের আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। পূর্ববঙ্গ আবার কলকাতার অধীনে চলে যায়। ১৯৪৭ সালে অখণ্ড বাংলার দাবি হিন্দু নেতারা গ্রহণ করেননি। এর কারণ ও রহস্য বোঝার মতো ধ্যানজ্ঞান-চিন্তা আমাদের রাজনীতিক ও তরুণ সমাজের নেই। কারণ এরা নিজেদের বাপ-দাদার ইতিহাস ঐতিহ্যকে ত্যাগ করেছে বা করতে চায়। জানতে হবে কারা তাদের বিপথে পরিচালিত করছে। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের রহস্য লুকিয়ে আছে দিল্লির আগ্রাসী নীতির ভেতর।
আপনাদের অবশ্যই বুঝতে হবে কেন হিন্দু নেতারা ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ নামে নতুন প্রদেশ গঠনের বিরোধিতা করে এক বাংলা চেয়েছিলেন। আবার কেনইবা ’৪৭ সালে খণ্ডিত বাংলা চাইলেন? আপনারা ইতিহাসসচেতন হন। নিজেদের ঐতিহ্য ও বায়া দলিলের খোঁজ নিন। আবার ’৭১-এ দিল্লি কেন আমাদের সমর্থন করেছে। আমি জানি আমাদের তরুণ সমাজ এখন বিভ্রান্ত ও ভুল পথে পরিচালিত। বারবার বলে চলেছি দিল্লি বাংলাদেশে একটি খাঁটি বাঙালির রাষ্ট্র চায়, যার ভেতর ইসলাম বা মুসলমানিত্বের কোনো ছাপ থাকবে না। অথবা শুধু নামের মুসলমানের একটি দেশ চায়। যাদের আরবি নাম থাকবে; কিন্তু মুসলমান নয়। যারা শুধুই বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করবে, যা ভারতীয় বাঙালিরা চর্চা করে। আপনারা কি জানেন, একসময় অফিস-আদালতে মুসলমানেরা ধুতি পরত। ১৭৫৭ সালের পর বাংলার মুসলমানের অবস্থা কী হয়েছিল তা জানার জন্য হান্টারের ‘দ্য মুসলমান’ বইটি পড়ুন।
এতণ ইতিহাসের পেছনের কথা বলেছি। তাহলে বাংলাদেশের চলমান সঙ্কটের সাথে ইতিহাসের কী সম্পর্ক আছে? তা হলো ভারত বাংলাদেশে এমন একটি সরকার চায়, যা ভারতের স্বার্থে কাজ করবে। যে সরকার অনুগত বন্ধু হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশকে ভারতের বাজার হিসেবে গড়ে তুলবে। যে মুসলমানিত্বের কারণে তারা পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল তা চিরতরে মুছে দিতে হবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে। আপনারা কি ল করেছেন, মমতা ব্যানার্জির সাথে নাগরিক নামে যারা কথা বলেছেন, তারা এরা? এরা বাংলা ও আরবি নামধারী কিছু বাঙালি। এদের কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব মানে ভারতের অনুগত বন্ধুত্ব। এদের পাসপোর্টে বাংলাদেশী কথাটা লেখা থাকলেও তা মানে না।
চলমান সরকার ভারতের সেবা করার ব্যাপরে সবচেয়ে বেশি পরীতি। ভারতে পাঁচ বছর থাকাকালে তিনি ওই পরীক্ষায় ডাবল প্লাস পেয়েছেন। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থক সরকার এক তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে চলমান সরকারকে মতায় বসিয়েছে। ৫ জানুয়ারির ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে জোর করে শেখ হাসিনাকে মতায় বসিয়েছে। সেই ভুয়া নির্বাচনের কারণেই চলমান সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের আগে দু-তিন শ’ মানুষ মারা গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আর এখন ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। নির্বাচনের দাবিকে দাবিয়ে রেখে সরকার বলছে এটা জঙ্গি ও সন্ত্রাসী। মিডিয়া সরকারি বক্তব্যকে উদারভাবে প্রচার করছে, আর বিরোধী দলকে দমনের জন্য সরকারকে উদ্ধার করছে। বিদেশী বা জাতিসঙ্ঘকে দলে টানার জন্য সরকার প্রচার করছে বিরোধী দলের আন্দোলন গণতন্ত্রের জন্য নয়, বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য।
আমি সব সময় বলে থাকি, জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহের বাইরে বা উপরে কোনো আইন থাকতে পারে না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এখন জনআকাঙ্ক্ষা বিরোধী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে কেয়ার টেকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তখনো বহু মানুষ মারা গেছে। আপনরাই প্রশ্ন করুন সে সময়ে আওয়ামী লীগ কেন কেয়ার টেকার সরকার চেয়েছিল? তাদের লক্ষ্য কী ছিল? পরে কেনইবা আওয়ামী লীগ কেয়ার টেকার ব্যবস্থা বাতিল করল? এ ব্যাপারে আমাদের সাংবাদিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা প্রশ্ন তোলেন না। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, জনআকাক্সাবিরোধী কোনো আইনই আইন নয়। সমস্যাটা এতই সহজ যে, তা সমাধানের জন্য রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে লাভ হবে না। সবাই এটা বোঝেন। কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্রশক্তির ভয়ে একমঞ্চে একবাক্যে কথা বলতে পারছেন না।

লেখক : এরশাদ মজুমদার।কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com

বিদেশি সমর্থন আদায়ের প্রতিযোগিতা by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশের বিবদমান রাজনীতিকেরা নিজ নিজ স্বার্থের পক্ষে বিদেশিদের সহানুভূতি ও সমর্থনের আশায় উন্মুখ হয়ে কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হতে পারেন, তার নতুন নতুন নজির সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অতীতেও বিদেশিদের আশীর্বাদের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকার অভিযোগ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের উদ্দেশ্যে বিদেশিদের মতামত ও মূল্যায়নের খণ্ডিত বিবরণ প্রচারের প্রবণতা এতটাই প্রকট হয়েছে যে অতিথিরা এখন ক্ষুব্ধ এবং বিব্রতবোধ করছেন।
ইউরোপীয় অতিথিদের একটি দল এ জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে তাদের হতাশার কথা প্রকাশ করে দিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া এতটা কূটনৈতিক বিড়ম্বনার জন্ম দিয়েছিল যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে একটি সম্মত সংশোধনী জারি করতে হয়েছিল। এ ধরনের সংশোধনী জারির আর কোনো নজির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আছে বলে মনে হয় না। গত ২২ জুলাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের বিবরণী নিয়েও এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আলাদা এক বিবৃতিতে তাদের বক্তব্য প্রকাশ করেছিল।
২৩ জুলাই, ২০১৪-তে প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী লন্ডন থেকে টেলিফোনে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ব্রিটেন বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চায়। তিনি বলেছেন যে নির্বাচন শেষ হয়েছে, এটা অতীত। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই। আগামী দিনে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই। কিন্তু, পরদিন ২৪ জুলাই ডাউনিং স্ট্রিটের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে মি. ক্যামেরন ২০১৪-এর জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়ে তাঁর হতাশার কথা জানিয়েছেন, যাতে অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না। তিনি মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথাও বলেছিলেন বলে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল।
সেবার অবশ্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের তরফে কোনো সংশোধনী জারি করতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার (এনগেজ) আহ্বান এবং রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সব ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আমাদের সরকারি ভাষ্যে দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা কোনো সংলাপের আহ্বান জানাননি। ইংরেজি শব্দ এনগেজ কথাটিকে সরকার কি তাহলে সামরিক পরিভাষার অর্থে গ্রহণ করেছে? সামরিক বাহিনীতে এনগেজ কথাটির মানে ধরা হয় শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া। ক্রসফায়ার বৃদ্ধির প্রবণতায় সে রকমটি ইঙ্গিতই তো মেলে!
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত এক প্রস্তাবে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার পাশাপাশি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সমঝোতা, র্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, মানবাধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর প্রতিকারসহ অনেকগুলো বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান ছিল। কিন্তু সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ওই প্রস্তাবের শুধু একটি অংশ বিএনপি কেন শুনছে না তা নিয়ে অনুযোগ জানিয়ে আসছেন। তাঁরা ওই কাজটি করতে বাধ্য করার জন্য বিএনপির ওপর যাতে বিদেশিরা আরও চাপ দেয় সে জন্যও নানা মহলে অনুরোধ-উপরোধ অব্যাহত রেখেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর ‘সাম্প্রতিক খাদের প্রান্তে বাংলাদেশ’ শিরোনামের সম্পাদকীয়টিও এ রকম আরেকটি দৃষ্টান্ত। ওই সম্পাদকীয়তে সরকারের দমন–পীড়ন বন্ধ ও বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে আহ্বান রয়েছে, সেটুকু সরকার ঠিকই উপেক্ষা করছে। অথচ কোনো কোনো মন্ত্রী বলছেন যে বিএনপির উচিত পত্রিকাটির সুপারিশ অনুযায়ী জামায়াতের সঙ্গ ছাড়া।
বিদেশিদের সহানুভূতি আদায়ে বিএনপি-জামায়াতও যে কতটা বেপরোয়া তার নজির যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন কংগ্রেস সদস্যের বিবৃতি জাল করা এবং ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহর টেলিফোন বিতর্কের ঘটনা। একইভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে দুনিয়ার নানা প্রান্তে জামায়াতের লবিংয়ের কথাও এখন সবার জানা। ২০০৬-০৭ কিংবা ১৯৯৫-৯৬-এর রাজনৈতিক সংকটেও এসব দলকে বিদেশিদের সহানুভূতি পেতে হয়রান হতে দেখার কথা আমাদের কারোরই স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। তবে একটা পার্থক্য লক্ষণীয়। আর সেটা হলো, বিদেশিদের মতামতকে বিকৃত বা খণ্ডিতভাবে প্রচারের কুপ্রবণতায় আমরা এখন বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
প্রধানমন্ত্রীকে লেখা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের চিঠির জবাব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তবে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের চেষ্টায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপের আহ্বানে সরকার ইতিবাচক সাড়া দেবে কি না, সে রকম কোনো তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানাননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ক্ষণস্থায়ী তাঁর এক পূর্বসূরি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ অবশ্য বলেছেন যে বান কি মুনের উচিত হবে খালেদা জিয়াকে হত্যা-খুনের রাজনীতি বন্ধ করার অনুরোধ জানানো।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে বান কি মুনকে যে জবাব দেওয়া হবে, তাতে দেশের চলমান সহিংসতা এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকারের ভূমিকা তুলে ধরা হবে। দেড় মাস ধরে বিএনপি-জামায়াত দেশজুড়ে সরকারের ভাষায় যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা ওই চিঠিতে গুরুত্ব পাবে। প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বানের চিঠি সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় বুধবার বলেছেন যে সরকার বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবে না। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীদের রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতিতে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা প্রত্যাখ্যানের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আরও বলেছেন, সংলাপের জন্য বিদেশিদের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর কোনো চাপ নেই। তাঁর কথা এই অর্থে ঠিক যে সংলাপের পথে না হাঁটলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকুচিত হওয়ার কোনো হুমকি এখনো আসেনি। যে জাল হুমকি এক-এগারোর পটপরিবর্তনে কাজ করেছিল।
প্রতিমন্ত্রী ও অন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতিতে মনে হয় যে বানের চিঠিতে সংলাপের আহ্বান এবং ঢাকায় নিয়োজিত বিদেশি কূটনীতিকদের সমঝোতার কথাগুলো উপেক্ষা করাই শ্রেয়। আমাদের বিষয়ে বিদেশিরা নাক গলাক, সেটা আমরা কেউই চাই না। কিন্তু বিবদমান রাজনীতিকদের অনমনীয়তার পরিণতিতে সাধারণ মানুষ যে সীমাহীন দুর্ভোগের সম্মুখীন, সে কথা তো অস্বীকার করা চলে না। ব্যবসায়ীদের প্রধান সংগঠন এফবিসিসিআইও সম্প্রতি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের অসহায়ত্বের কথা বিদেশিদের কাছে তুলে ধরেছে। সেখানেও প্রভাবশালী দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) উদ্বিগ্ন দূতেরা সহিংসতা বন্ধ এবং সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের প্রচার উপকমিটি ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় জাদুঘরে পেট্রলবোমায় হতাহতদের করুণ পরিণতি এবং তাঁদের পরিবারগুলোর অব্যাহত ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরার এক সুসংগঠিত অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যাতে বিদেশি কূটনীতিকেরাও আমন্ত্রিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কান্নার ছবি আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। পুরো অনুষ্ঠানেই ছিল বিএনপির আহূত অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচিকে ঘিরে ঘটতে থাকা সহিংসতার মর্মস্পর্শী বিবরণ এবং এই সন্ত্রাসকে জঙ্গিবাদ হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস। এখানেও উদ্দেশ্যটা রাজনৈতিক এবং লক্ষ্য বহির্বিশ্ব। বিএনপিকে জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা সফল হলে চলমান বিরোধের উৎস যে বিতর্কিত নির্বাচন, সেই প্রহসনের কলঙ্ক ঢেকে রাখা যাবে। ইউরোপ-আমেরিকায় আওয়ামী লীগের যেসব শাখা-প্রশাখা রয়েছে, তারাও নানা ধরনের আয়োজনে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে যে তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের জোট রাষ্ট্রের শত্রু, দেশের অনিষ্টকারী। পেট্রলবোমায় দগ্ধদের ওপর তথ্যচিত্র তৈরি করে এবং পুস্তিকা প্রকাশ করে সেগুলোও বিশ্বব্যাপী বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের অনুসারীরাও তাঁদের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের বিবরণী নিয়ে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।
ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাজনীতিকদের সাহায্য-সহানুভূতি লাভের এই বিদেশমুখী রাজনীতি যে কতটা বিব্রতকর হতে পারে, তার একটা দৃষ্টান্ত হচ্ছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের বিগত দুটো বাংলাদেশবিষয়ক সেমিনার। দুবারই ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি গ্রুপ অন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন অ্যান মেইন এবং অন্য কয়েকজন বাংলাদেশি রাজনীতিকদের বলেছেন যে আপনারা সবাই চান আমরা যেন আপনাদের যার যার পক্ষ সমর্থনে এগিয়ে যাই। আমরা আপনাদের রাজনীতিতে জড়াতে চাই না, আমরা শুধু সুশাসন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে সহায়তা করতে চাই। তবে সর্বসাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, ব্রিটিশ রাজনীতিকদের মধ্যেও আমরা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে সংক্রমিত করতে পেরেছি। একই লেবার পার্টির একাধিক এমপি যেমন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থকদের সমাবেশে হাজির হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, তেমনই তাঁদের অন্য কয়েকজন সহকর্মী বিএনপিপন্থীদের সমাবেশে হাজির হয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
বিশ্বায়নের কালে আমরাই ছুটছি বিদেশিদের কাছে, আবার আমরাই তাদের পরামর্শে বিরূপ হচ্ছি। এ ধরনের দ্বিচারিতায় রাজনীতিকদের কেউ কোনো আত্মপীড়ায় ভোগেন বলে মনে হয় না।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

এশীয় নেতাদের রাজনৈতিক গ্রেপ্তার-কারাভোগ

বুধবার বাংলাদেশের একটি আদালত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়াজুড়ে ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সিরিজ আইনি মামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। এসব মামলার কিছু বৈধ, কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গতকাল ‘লিডার্স ইন এশিয়া ফেস জেল, অ্যারেস্টস- অফেন ডিউ টু পলিটিকস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব বলেছে বার্তা সংস্থা এপি। এতে বলা হয়, মামলার শিকার রাজনীতিকদের মধ্যে আছেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রা। তিনি এখন নির্বাসনে। কারারুদ্ধ রয়েছেন মালয়েশিয়ার বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম। এ তালিকায় চলতি সপ্তাহে যোগ হয়েছেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর রয়েছেন বাংলাদেশের ‘দুই নারী’। তাদের দুজনকেই অতীতে নানা অভিযোগে কারান্তরীণ করা হয়েছে। পরিশেষে সেসব অভিযোগ কখনই প্রমাণিত হয় নি। কখনও কখনও এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রায়ই আবার তা পরিষ্কার হয় না। প্রতিবেদনে এশিয়ার শীর্ষ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারের নানা সাম্প্রতিক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রসঙ্গ।
এতে বলা হয়, দুটি দুর্নীতি মামলায় চারবার আদালতে হাজির হতে ব্যর্থ হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তার আইনজীবীরা বলছেন, তিনি অসুস্থ। আর তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ডাকা দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচিতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় তিনি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ৬৯ বছরের খালেদা জিয়ার দাবি, তার প্রয়াত স্বামীর নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো রাজনৈতিক ভয়ভীতি প্রদর্শনে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকার তা অস্বীকার করে। খালেদা জিয়াকে কখন বা আদৌ গ্রেপ্তার করা হবে কিনা তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায় নি।
এতে থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রা প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। বলা হয়, প্রায় এক দশক ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কটে দ্বিধাবিভক্ত থাইল্যান্ড। ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত হন থাকসিন। তিনি গ্রামাঞ্চলের দরিদ্রদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় থাকলেও ব্যাংককের সম্ভ্রান্ত শ্রেণী আর রাজপন্থিদের সুনজরে ছিলেন না। তৎকালীন একটি দুর্নীতি মামলায় কারারুদ্ধ হওয়া এড়াতে তিনি বছরের পর বছর ধরে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে রয়েছেন। ওই মামলাটি তার বিরুদ্ধে আনিত অনেকগুলো মামলার একটি যেটাকে থাকসিন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দেখা হয়ে থাকে। তার বোন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক শিনাওয়াত্রা ২০১১ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু গত মে মাসে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ইংলাককে উচ্ছেদের পর দ্রুতই আরেক সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এতে সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চান-ওচা অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেন। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সংস্কার করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রায়ুথ। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য, রাজনীতিতে সিনাওয়াত্রা পরিবারের প্রভাবমুক্ত করার জন্যই এসব সংস্কার তৈরি করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া: দেশটিতে সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম ১০ই ফেব্রুয়ারি থেকে তার ৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করা শুরু করেছেন। ২০০৮ সালে এক পুরুষ সহকারীকে বলাৎকারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে এ দণ্ড দেয়া হয়। আনোয়ার নিরপরাধ বলে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার দাবি তিনি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধীদের অসাধারণ অর্জনে নেতৃত্ব দেয়ার পর থেকে তাকে সরকারের জন্য সব থেকে জোরালো হুমকি হিসেবে দেখা হয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি আরও অগ্রগতি করেছিলেন। এ নিয়ে দু’বারের মতো তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগে কারারুদ্ধ করা হলো। ১৯৯৮ সালে সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণের পর প্রথমবার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ২০০৪ সালে শীর্ষ আদালত ওই রায় বাতিল করার পর তিনি মুক্তি পান।
চীন: দেশটির সাবেক এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ঝাউ ইয়ংক্যাং’কে ডিসেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধ তদন্তের মুখোমুখি করা হয়েছে। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চরম-ক্ষমতাধর পলিট ব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করা হয় নি। তার অতীত সহকর্মীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা তেল শিল্প থেকে শুরু করে পুলিশ ও প্রাদেশিক সরকারে কর্মরত ছিলেন। প্রসিকিউটররা ব্যাপক দুর্নীতি কর্মকাণ্ডের তদন্ত করছেন বলে এতে ইঙ্গিত মেলে। এক সময় চরম ক্ষমতাধর এক নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো ঝাউকে। এখন তিনি বিচারের কাঠগড়ায়। ১৯৮১ সালের পর বিচারের আওতায় আসা তিনিই সব থেকে উচ্চপদস্থ চীনা কর্মকর্তা। আর বর্তমান শীর্ষ নেতা ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করার পর ফাঁদে পড়া সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাও তিনি। সরকারি গণমাধ্যমে এটাকে পদমর্যাদা নির্বিশেষে দুর্নীতি সমূলে নির্মূল করতে কমিউনিস্ট পার্টির দৃঢ় সঙ্কল্পের উদাহরণ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। অবশ্য, অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, নিজের ক্ষমতা সংহত করার জন্য ঝাউকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন শি। এমনও ইঙ্গিত রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ ক্ষমতার স্তরে পর্দার আড়ালে দলাদলির কারণেই পতন হয়েছে ঝাউয়ের।
তাইওয়ান: দু’বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট চেন শুই বিয়ান’কে ২০০৯ সালে ঘুষ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরবর্তীতে আপিলে তা কমিয়ে ২০ বছর করা হয়। স্নায়ুবিক অসুস্থতার কারণে চলাচলের ক্ষমতা হুইল চেয়ারে সীমিত হওয়ার পর ৫ই জানুয়ারি তাকে মেডিক্যাল প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। ২০০০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে চেন তাইওয়ানে ন্যাশনালিস্ট পার্টির অর্ধশতকের শাসনের অবসান ঘটান। এর পাশাপাশি চীনের কাছ থেকে তাইওয়ানের ‘ডি ফ্যাক্টো’ স্বাধীনতা সুদৃঢ় করতে তার প্রচেষ্টার ফলে চেনের প্রতি চরম বিরূপ হন অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা ও চীনের রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা। পারিবারিক স্ক্যান্ডাল আর তাকে উচ্ছেদ করতে বার বার প্রচেষ্টা থেকে সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে, তার বিরুদ্ধে আদালতের দণ্ড ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মালদ্বীপ: দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী নেতা মোহাম্মদ নাশিদকে  রোববার গ্রেপ্তার করা হয়। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন শীর্ষ এক বিচারককে গ্রেপ্তারের আদেশ দেয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়, নাশিদ ওই বিচারককে গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাকে মুক্ত করতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ উপেক্ষা করেছিলেন। সরকারের জোর দাবি নাশিদের গ্রেপ্তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। আর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেননা, তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এদিকে নাশিদের দল বলছে, তাকে গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ার মূলে রয়েছে রাজনীতি। ২০০৮ সালে মামুন আব্দুল গাইয়ুমের ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন নাশিদ। ২০১২ সালে ওই বিচারককে গ্রেপ্তারের আদেশ দেয়াকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদের মুখে পদত্যাগ করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সৎভাই ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুমের কাছে হেরে যান নাশিদ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম- এমন আমলারা দেশকে কোথায় নিতে চান? by এ কে এম জাকারিয়া

সময়ের হিসাবে গত (২০১৪ সাল) ডিসেম্বরে পার্বত্য চুক্তির ১৭ বছর পার হয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালে যখন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। মাঝে বিরতির পর এখন তারা আবারও ক্ষমতায়। চুক্তির পর এর বাস্তবায়ন কখনো স্বাভাবিক গতিতে চলেনি, কখনো থেমেই ছিল (বিএনপি-জামায়াত জোটের সময়ে), আর বাকি সময় চলেছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
চুক্তির পর এর ‘বাস্তবায়নের’ দাবিতে পাহাড়িদের আন্দোলন করতে হচ্ছে সেই শুরু থেকেই। এত সময় পরও চুক্তির ‘পূর্ণ’ বাস্তবায়নের দাবি এবং সে জন্য কঠোর কর্মসূচি পালনের কথা ভাবতে হচ্ছে পাহাড়িদের। কোনো একদিন চুক্তির পুরো বাস্তবায়ন হবে, এমন আশা হয়তো অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। এভাবেই চলছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন তো দূরের বিষয়, চুক্তি স্বাক্ষরকারী সরকার যেন চুক্তির আগের অবস্থায় ফিরে যেতেই উৎসাহী হয়ে উঠেছে। গত ৭ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে এমন মনে হওয়াই স্বাভাবিক। ‘শান্তিচুক্তি-পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়’ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তির মন্তব্য, আলোচনা ও শেষে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর, উদ্বেগজনক, এমনকি হাস্যকরও।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সরকারের কর্তাব্যক্তিরা কী ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, সে সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়ার জন্য কয়েকজনের বক্তব্য সভার কার্যবিবরণী থেকে পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সচিব বলেছেন, পার্বত্য চুক্তির চারটি অধ্যায়ে ৭২টি ধারা রয়েছে। অধিকাংশ চুক্তি ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা তা স্বীকার করেন না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্য হচ্ছে, বিদেশি নাগরিকদের পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণে কোড অব কনডাক্ট প্রণয়ন করা দরকার। অনেক সময় বিদেশি নাগরিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে শুধু জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারকে জানিয়ে পার্বত্য অঞ্চল ভ্রমণে যান। এটা সঠিক নয়। বৈঠকে উপস্থিত ডিজিএফআইয়ের প্রতিনিধি বলেন, সিএইচটি কমিশনসহ কিছু সংস্থা স্থানীয় উপজাতীয় নেতাদের সঙ্গে প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছাড়া বৈঠক ও আলাপ-আলোচনা বেশি পছন্দ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
এসব বক্তব্যের সূত্রে কিছু প্রশ্ন তোলা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সচিব কিসের ভিত্তিতে চুক্তির ৭২টি ধারার অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন? পার্বত্য চুক্তির একটি পক্ষ যেমন সরকার, অন্য পক্ষটি জনসংহতি সমিতি। চুক্তি নিয়ে তাদের মূল্যায়ন নিশ্চয়ই একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছে, এ পর্যন্ত মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। অবাস্তবায়িত রয়েছে ৩৪টি আর আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে ১৩টি। তাদের হিসাব হচ্ছে, চুক্তির ধারাগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। গত বছরের ২ ডিসেম্বর চুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে জনসংহতি সমিতি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে’ শিরোনামে একটি প্রকাশনা প্রকাশ করেছে। সেখানে ৭২টি ধারা তুলে ধরে কোন ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, সরকার কী দাবি করছে এবং বাস্তবে কী হয়েছে ও কী হয়নি, তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। জনসংহতি সমিতি যেভাবে ধরে ধরে দেখিয়েছে কী বাস্তবায়ন হয়েছে আর কী হয়নি, তা একইভাবে খণ্ডন না করে ‘চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে’ বলাটা দায়িত্বহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তা ছাড়া যেসব ধারা পার্বত্য চুক্তির মূল লক্ষ্য অর্জনে অপরিহার্য, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে? বিশেষ করে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি তো দূরে থাক, বরং ধারাবাহিকভাবে অবনতিই হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চল থেকে চুক্তি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারের যে অঙ্গীকার রয়েছে, সে ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।
একইভাবে ‘শুধু জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারকে জানিয়ে’ বিদেশি নাগরিকদের পার্বত্য অঞ্চল ভ্রমণের নিয়ম ‘ঠিক নয়’ বলে যে মন্তব্য পররাষ্ট্রসচিব করলেন, তা তিনি কিসের ভিত্তিতে করলেন? কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু করার থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ বিদেশি নাগরিকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে যেতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কেন জানাতে হবে?
আর ডিজিএফআই প্রতিনিধির বক্তব্য অনুযায়ী, সিএইচটি কমিশন বা এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান কেন প্রশাসন বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে পাহাড়িদের সঙ্গে কথা বলবে? তাদের কাজ হচ্ছে পাহাড়িদের নানা সমস্যা নিয়ে কাজ করা, সেখানকার ভুক্তভোগী বা নির্যাতন-বৈষম্যের শিকার পাহাড়িদের বক্তব্য শোনা। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের সামনে বসিয়ে রেখে সিএইচটি কমিশন পাহাড়িদের সঙ্গে কথা বলবে—এ ধরনের দাবিকে হাস্যকর ছাড়া আর কীই-বা বলা যায়?
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বেসামরিক ও সামরিক আমলাদের এসব মন্তব্যে একধরনের পুরোনো ও ঔপনিবেশিক মনমানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। সভ্য দুনিয়ায় যেখানে আদিবাসী কোনো গোষ্ঠী ও জনসমাজের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো হয়, আদিবাসীসহ সব জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করা হয়, সেখানে আমাদের আমলাদের বক্তব্যের মধ্যে বিদ্বেষের ভাবটি স্পষ্ট। অনেকটা বর্ণবাদীও।
এ ধরনের আলোচনার পর সেদিনের সভায় ১১টি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি সিদ্ধান্ত খুবই আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য। এ নিয়ে এরই মধ্যে গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তগুলো পার্বত্য চুক্তির আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। সচেতন নাগরিক ও মানবাধিকার গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ ও তা প্রত্যাহারের দাবি তোলা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত দুটি অনেক পাঠকেরই জানা, এর পরও কারও জানার বাইরে থাকতে পারে, সেই বিবেচনা থেকে সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। সভায় নেওয়া ৫ নম্বর সিদ্ধান্তটি হচ্ছে, কূটনীতিক ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিকের পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘুরতে যেতে হলে অন্তত এক মাস আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দেবে। অনুমতি পেলে জেলা প্রশাসন বা পুলিশ সুপারের কাছে ভ্রমণসূচি দিয়ে তবেই ভ্রমণ করতে হবে। ৬ নম্বর সিদ্ধান্তটি হচ্ছে, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থার কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘উপজাতীয়দের’ সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী বা বিজিবির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কি দেশের বাইরের কোনো এলাকা? সেখানে যেতে হলে বিদেশি নাগরিককে কেন এক মাস আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে? পার্বত্য চুক্তির আগে যখন সেখানে সশস্ত্র আন্দোলন চলছিল, তখন বিদেশিদের সেখানে ভ্রমণে এ ধরনের বিধিবিধান ছিল। চুক্তির পর উঠে যাওয়া এ ধরনের বিধান আবার চালু করার কী যুক্তি থাকতে পারে? পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সচিব তবে কিসের ভিত্তিতে দাবি করলেন যে পার্বত্য চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে? আর ১৭ বছরে ‘অধিকাংশ’ কেন, পুরোটাই তো বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।
আর ৬ নম্বর সিদ্ধান্তটি তো বাংলাদেশের পাহাড়ি বা বাঙালি সবার নাগরিক অধিকারের বারোটা বাজানোর জন্য যথেষ্ট। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার যেমন ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, তেমনি নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে এবং আমাদের সংবিধানে দেওয়া সব নাগরিকের সমান অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে পাহাড়ি বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় কি আমাদের সেনাবাহিনী বা বিজিবির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে? ঢাকা বা বাংলাদেশের আর কোনো জায়গায় যদি তা করতে না হয়, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন তা করতে হবে? আর বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে একজন পাহাড়িকে কেন তাঁর দেশেরই অন্য অঞ্চলের একজন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে?
এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বাইরের নাগরিকদের বাকস্বাবাধীনতাসহ মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারকে যেমন ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, তেমনি সেখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে স্পষ্টতই ছোট করার চেষ্টা হয়েছে। সংবিধানের সঙ্গে বেমানান এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অবৈধ। দেশের আইনকানুন বা সংবিধান সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ সরকার ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতেই এ ধরনের একটি অবৈধ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আমলারা দেশটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান?
লেখাটি শেষ করছি পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন ব্যবসায় নিবেদিত একজনের কথা দিয়ে। বাংলাদেশে পর্যটন, বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে তিনি শুরুর দিকের যোদ্ধা। দ্য গাইড টুরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মনসুর বান্দরবানের মিলনছড়িতে একটি রিসোর্ট প্রতিষ্ঠা করে শেষ বয়সে এসে সেখানেই থিতু হয়েছেন। বিদেশিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আসতে এক মাস আগে অনুমতি নিতে হবে, এই সিদ্ধান্তে তিনি রীতিমতো ভেঙে পড়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের পর তিনি একটি চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
‘পর পর তিন বছর ধরে ঠিক পর্যটনের মৌসুমেই সহিংস পরিস্থিতির কারণে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কোমর ভেঙে গেছে।... এত দিন বিদেশি পর্যটকের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি ও ভ্রমণসূচি জমা দেওয়ার যে বিধান ছিল, তার বদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি এই অনুমোদন সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য মাস খানেক সময় লেগে যাবে। বিদেশি নাগরিকদের জন্য এ ধরনের একটি নিয়ম বহু আগে প্রচলিত ছিল।... যেসব বিদেশি পর্যটক পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে যেতে আগ্রহী, তাঁরা এই অনুমোদন-সংক্রান্ত সয়মসাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চাইবেন না।’ চিঠিটির শেষে তিনি লিখেছেন, বিদেশি পর্যটকদের অনুমতি নেওয়ার নতুন নিয়মটি অদূরদর্শী ও আত্মঘাতী। এতে দীর্ঘ সময় ধরে অর্জিত সব অর্জন ও পরিশ্রম বৃথা যাবে। বিদেশিদের কাছেও আমাদের সীমাহীন লজ্জায় পড়তে হবে।
আমাদের দেশে কিছু আমলা আগপিছ না ভেবে কত সহজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারেন! দেশ, দেশের সংবিধান, নাগরিক অধিকার বা আইনকানুন—কিছুই যেন তাঁদের বিবেচনায় নেওয়ার নেই। এ ধরনের আমলাদের দিয়ে দেশের সামনে এগোনো তো দূরে থাক, বরং পেছনযাত্রাই জোরদার হবে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com