Showing posts with label ঝড় ও দুর্যোগ. Show all posts
Showing posts with label ঝড় ও দুর্যোগ. Show all posts

Friday, August 28, 2026

নেপালে বিপর্যয়: ‘নিমেষেই চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল আমার গ্রাম’

কাঠমান্ডুতে কান্তিপুর পাবলিকেশনসের কার্যালয়ে গত বুধবার সকালে যাচ্ছিলেন সাংবাদিক অর্জুন পৌডেল। এমন সময় তাঁর স্ত্রীর ফোন এল। ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,‘ত্রিশূলী নদীতে হঠাৎ বন্যা এসেছে। সোলে বাজার আর বেত্রাবতীতে কী যেন একটা ঘটে গেছে। সবাই বলছে, সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। লোকজন রাস্তায় নেমে এসেছে। তাঁদের আতঙ্কের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে।’

স্ত্রীর কথা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি অর্জুন। কারণ, সোলে তাঁর নিজের গ্রাম। এই গ্রামের অলিগলিতে খেলতে খেলতে বড় হয়েছেন তিনি। এখানকার মাঠে কাজ করেছেন। বছরের পর বছর এই পথ ধরে হেঁটে স্কুলে গেছেন। এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকলে সবার আগে তো তাঁরই জানার কথা।

এ ছাড়া অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির কোনো খবরও অর্জুন শোনেননি। তীব্র বর্ষাতেও ত্রিশূলী নদীর পানি কখনো এই জনপদ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তাই খবরটিকে তেমন গুরুত্ব দেননি অর্জুন। বেলা ১১টায় নিউজের মিটিং থাকায় দ্রুত অফিসের দিকে পা বাড়ালেন তিনি।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের এক নিবন্ধে অর্জুন বলেছেন, বেত্রাবতী বাজারেই তাঁরা কেনাকাটা করেন। এখান থেকেই বাস ছাড়ে, সরাসরি কাঠমান্ডু যাওয়া যায়। বাড়ি ফেরার পথে মা-বাবা তাঁর জন্য এ বাজারেই অপেক্ষা করতেন। এলাকাটির প্রাণকেন্দ্র ছিল এটি।

বেত্রাবতী বাজারে আছে রামমন্দির ও কৃষ্ণমন্দির। রামনবমী ও জন্মাষ্টমীতে মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। এটি প্রাচীন নেওয়ার সম্প্রদায়ের জনপদ। তাই এখানে গাইযাত্রার মতো উৎসবও হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাঘসংক্রান্তির ষাঁড়ের লড়াই দেখতে কাঠমান্ডু থেকেও মানুষ আসতেন।

অর্জুন বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম, স্মৃতিঘেরা সেই জায়গাগুলোর অনেক কিছুই আর নেই। স্ত্রীর কথার সত্যতা যাচাই করতে একটি নিউজ পোর্টালে ঢুকলাম। ভেবেছিলাম, তেমন কিছু নয়। কিন্তু শিরোনাম দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল—ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা।

এ খবর দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনকে ফোন করেন অর্জুন। নিরঞ্জনের পরিবার সোলে বাজারে থাকে। বাজার বড় হওয়ার পর তাঁরা গ্রাম থেকে সেখানে এসে বসতি গড়েছিল। তার কাকার বাড়ি ছিল নদীর আরও কাছে।

‘এক নিশ্বাসে সে বলল, “দাই (বড় ভাই), আমিও এইমাত্র শুনলাম। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। মা, বাবা, কাকা, কাকি—কারও ফোনেই রিং হচ্ছে না।”’

অফিসে যাওয়ার পুরো পথে তাঁরা দুজন বারবার একে অপরকে ফোন করতে লাগলেন। এলাকার পরিচিত যত নম্বর মনে পড়ল, একে একে সব কটিতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনো সংযোগ মিলল না। শেষ পর্যন্ত পরিচিত এক বড় ভাইয়ের বাড়ির নম্বরে ফোন ঢুকল। তাঁর স্ত্রী ফোন ধরে একবাক্যে বললেন, ‘গ্রামে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অধিকাংশ মানুষই ভেসে গেছে।’

কথাটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অর্জুন। কারণ নদীগর্ভ থেকে সোলে ও টুপচে গ্রামের উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার। কয়েক শতকের ইতিহাসে এমন উচ্চতায় কোনো বন্যা আসার নজির নেই। তাঁর বয়স এখন ৪৪ বছর। এই জীবনে কখনো তিনি নদীর পানি এত দূর উঠে আসতে দেখেননি।

অর্জুন বলেন, ‘গ্রামে আমার ভাই, প্রতিবেশী ও শৈশবের বন্ধুরা থাকেন। পরিচিত ও ভালোবাসার প্রায় সব মানুষই ওই গ্রামের। একে একে সবাইকে ফোন দিতে লাগলাম। সোলের মতো জায়গায় সবাই সবার আত্মীয়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বয়সের সূত্রে অপরিচিত মানুষও হয়ে ওঠেন “দাই” (ভাই) কিংবা “দিদি” (বোন)। সেখানকার সংস্কৃতিটাই এমন। সবাই আমার আপন, আমিও সবার।’

‘ধীরে ধীরে আমার ফোনে ভিডিও ও ছবি আসতে শুরু করল। সেখানে যা দেখলাম, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।’ এভাবেই জানিয়েছেন অর্জুন।

এই সাংবাদিক বলেছেন, ‘বানের জলে আমার বড় খালা ভেসে গেছেন। তাঁর ছেলে মধু ভাই ও তাঁর স্ত্রীও রক্ষা পাননি। শুনলাম আরেক খালাও বেঁচে নেই। খালার নাতি সিজন ও তাঁর স্ত্রীও ভেসে গেছেন। সিজনের ছেলে ও ছেলের বউয়ের কোনো খোঁজ নেই। সকালে গরু-ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে বের হয়েছিলেন আমার মামা। তিনিও আর ফেরেননি।’

এভাবে অর্জুনের ফোনে একটার পর একটা শুধু দুঃসংবাদই আসছিল। অবশেষে স্থানীয় ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালকে ফোন দেন তিনি। ওই চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘ভাই, সকালে পৌরসভা অফিসে এসেছিলাম। এখন এখানেই আটকে পড়েছি। গ্রামে আর কিচ্ছু নেই। বাকিটা আপনি নিজেই বুঝে নেন। কিছু মানুষ কোনোমতে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে প্রাণে বেঁচেছেন।’

এরপর স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অর্জুন। ওই শিক্ষক বলেছেন, ‘ভাই, নিজের পরিবারের লোকজনেরই কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। বেত্রাবতীর ৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। স্কুলের ভ্যানটিও ভেসে গেছে। আমার পাশে একটি ছেলের পা ভেঙে পড়ে আছে। আরেকজন মানুষের পা ভাঙা, চোখ মারাত্মক জখম। পারলে একটা হেলিকপ্টার পাঠানোর ব্যবস্থা করো, ভাই।’

এর কিছুক্ষণ পর নিরঞ্জনের কাকা ফোন করে অর্জুনকে জানিয়েছে, নিরঞ্জনের বাবা, মা, কাকা, কাকি ও ছোট বোন হিমানী—সবাইকে নদী ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘অর্জুন, আমরা শেষ হয়ে গেলাম। ফোন রাখছি।’ এরপরই তিনি ফোন রেখে দেন।

স্মৃতির বেত্রাবতী এখন ধ্বংসস্তূপ

বেত্রাবতী শুধু সাধারণ কোনো বাজার এলাকা ছিল না। যুদ্ধের পর এখানেই নেপাল ও তিব্বতের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল। এখানেই রয়েছে পবিত্র ‘উত্তর গঙ্গা ধাম’। পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির কামনায় প্রতিবছর পৌষ অমাবস্যায় হাজারো পুণ্যার্থী এখানে আসেন। সেই মন্দির, ঐতিহাসিক চুক্তির স্থান ও তীর্থক্ষেত্র—সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।

এখন আর কোনো রাস্তা অবশিষ্ট নেই। বিদ্যুৎ নেই, মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেটও বন্ধ। নদীর ভাটিতে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের হেডগেট ও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঢল। এসব দেখে অর্জুনের ২০১০-১১ সালের কথা মনে পড়ে। তখন দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং চললেও তাঁদের গ্রামে কখনো বিদ্যুৎ যেত না।

অর্জুন বলেন, ‘আজ গোটা জেলাই অন্ধকারে নিমজ্জিত। বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে জেলা সদরে যাওয়ার পথে নিজের চোখেই তা দেখেছি। শুধু আমার গ্রাম নয়, পুরো জেলাই যেন আঁধারে ডুবে গেছে।’

সকালে কাজে যাঁরা জেলা সদরে এসেছিলেন, তাঁরা সেখানেই আটকা পড়েছেন। বাড়ি ফেরার কোনো পথ নেই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও আর বাড়ি ফিরতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাট্টারের সেনা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের দিকে যাওয়া একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের কাছে এক প্রতিবেশীকে দেখেছেন অর্জুন। তিনি হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমার কাকা-কাকি ভেসে গেছেন। ফোন বন্ধ। নিজের বাড়ির কী অবস্থা, তা–ও জানি না।’

স্বজন হারানোর শোক করার সময়ও নেই

অর্জুনের বড় খালার বড় ছেলে কাঠমান্ডুতে থাকেন। এত দূর থেকে তাঁর কিছুই করার নেই। আর ছোট ছেলেটি মাত্রই বিদেশ থেকে কাজ করে দেশে ফিরেছেন। গ্রামে পৌঁছানোর আগেই আকস্মিক ঢল সব কেড়ে নিয়েছে।

ফোনে পরিচিত লোকজন অর্জুনকে জানিয়েছেন, দৌড়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিশুদেরও বের করে আনা যাচ্ছে না। স্বজন হারানোর শোক প্রকাশ করার সময়টুকুও কারও নেই। মা, ভাই বা ভাবির মৃত্যুর জন্য কাঁদার চেয়ে গ্রামে আটকে পড়া মানুষদের আগে উদ্ধার করাই এখন বড় লড়াই।

অর্জুন বলেছেন, বন্যা (আকস্মিক ঢল) শুধু গ্রামকেই ভাসিয়ে নেয়নি, জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাও মুছে দিয়েছে। ফলে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যে বাজার থেকে মানুষ রসদ কিনত, সেটিও বিলীন হয়ে গেছে। এখন কেনাকাটার কোনো জায়গা নেই।

ফসলি জমিগুলো তলিয়ে গেছে। বাড়িতে যেটুকু খাদ্যশস্য জমা আছে, তা-ও ধান বা আটা ভাঙানোর উপায় নেই। কারণ, এলাকার সব মিল নদীতে চলে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ধাঙ্গে থেকে ত্রিশূলী বাজারকে যুক্ত করা ১৯৬৭ সালের পুরোনো সেতুটি নদী গিলে খেয়েছে। কয়েক বছর আগে তৈরি হওয়া নতুন সেতুটিও ভেসে গেছে। ভৈঁসে সেতুসহ নদীর ওপরের সব ঝুলন্ত সেতু ভেঙে পড়েছে। ফলে জেলা সদরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। বাঘতারের জেলা হাসপাতালটি এত কাছে হয়েও এখন সম্পূর্ণ নাগালের বাইরে।

ভৈরামকোট, সামারি, টোকসার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালচে, সালমে ও ধাদিঙের থার্পুসহ দূরের গ্রামগুলোও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পুরো রসুয়া জেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

গ্রামের একজন বাসিন্দা ভারী কণ্ঠে অর্জুনকে বলেছেন, ‘এখন কেউ অসুস্থ হলে ঘরেই মারা যাবে। হাসপাতালে কীভাবে নেবেন? কোনো রাস্তা নেই, ব্রিজ নেই, কোনো গাড়িও চলছে না। এমনকি একটু লবণ কেনার মতো দোকানও খোলা নেই।’

অর্জুন বলেন, ‘এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে মনে হয় না, দ্রুত এসব আবার আগের মতো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

সামনে শুধু অনিশ্চয়তা

অর্জুন বলেছেন, অসংখ্য মানুষ গৃহহীন। বহু মানুষ নিখোঁজ। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী—কেউ জানে না।

গ্রামে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে প্রায় দেড় দিন আগে রওনা হয়েছিলেন অর্জুন। অথচ এখনো জেলা সদর বিদুরেই আটকে আছেন তিনি। কিছুতেই সামনে এগোতে পারছেন না।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদক আরও বলেন, ‘বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছি, এই গ্রাম কবে আবার আগের চেহারা ফিরে পাবে? কারও কাছে এর উত্তর নেই। আমাদের কেউই জীবনে এমন দুর্যোগ দেখেনি। এত সবুজ আর সুন্দর একটি গ্রাম চোখের পলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। জায়গাটি কি আর কখনো আগের মতো হবে!’

দুর্যোগের আগে ও পরে নেপালের নুয়াকোটের বেত্রাবতী বাজার
দুর্যোগের আগে ও পরে নেপালের নুয়াকোটের বেত্রাবতী বাজার। ছবি: দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের নিবন্ধ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

Thursday, May 21, 2026

’৭০–এর সাইক্লোনের ভয়াবহতা কেন আমরা ভুলে গেলাম by এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী

‘মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই; জল থই থই তীরে কিছু নেই নেই; ভাঙনের যে নেই পারাপার; তুমি আমি সব একাকার; মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই।’

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সীমানা পেরিয়ে’ নামক বাংলাদেশি একটি চলচ্চিত্রে গাওয়া ভূপেন হাজারিকার গানের অংশবিশেষ। চলচ্চিত্রটি একই বছরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতাসহ মোট চারটি বিভাগে এবং দুটি বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছিল। এ ছাড়া ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থানও লাভ করেছিল ছবিটি।

১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার প্রায় তিন মাস পর একজোড়া মানব-মানবীকে বরিশালের দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে আদিম পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিল; তৎকালীন ঢাকার সংবাদপত্রে এমন খবর প্রকাশিত হয়।

চরে একজোড়া নারী-পুরুষের বেঁচে থাকা ও বসবাসের বিষয়টি পরিচালক আলমগীর কবিরের দৃষ্টিতে সবার থেকে আলাদা মনে হয়। সেই থেকে তিনি এ ঘটনাটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার কথা ভাবেন এবং ১৯৭৫ সালে তিনি এটির নির্মাণকাজ শুরু করেন।

আজ চলচ্চিত্রটি একটি ইতিহাস। এই ইতিহাসের পেছনে রয়েছে নির্মম আরেক ইতিহাস। সেটি ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর, শুক্রবার। উপকূলের জীবন ইতিহাসের এক ভয়াবহ কালরাত। এদিন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাগর, নদী, খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য লাশ আর এক কোটি মৃত গবাদিপশু। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়বিধ্বস্ত মনপুরা ঘুরে ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে ২৮ ফুট লম্বা ‘মনপুরা ৭০’ নামে একটি শিল্পকর্ম চিত্রিত করেন। জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘মনপুরায় আমরা যখন থার্ড ডেতে নামলাম, সি-প্লেনে আমি আর আমার বন্ধু একা ঘুরতাছি সারা দিন। কয়টা লোক বাঁইচা আছে দেখলাম। দৌড়ায় আসল। দেখলাম জখমওয়ালা। তারা কানতে আরম্ভ করল। আমরাও কানতে আরম্ভ করলাম। আপনারা বিশ্বাস করেন, আমার পেছনে...সমুদ্র...ঠিক সমুদ্র না সমুদ্রের খাঁড়ি, যেখানে যান, খালি গরু-মানুষ শুইয়া রইছে।’

সাগর-নদী-খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য মৃতদেহ। এসব মৃতদেহের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। এই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা শুনলে আজও অনেকে শিউরে ওঠেন। প্রবীণেরা বর্ণনা দিতে গিয়ে জয়নুল আবেদিনের মতো হু হু করে কেঁদে ওঠেন। এ রকম হাজারো মর্মস্পর্শী ইতিহাস রয়েছে উপকূলের এ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ঘিরে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উপকূলে যে ভয়াবহতা হয়েছে, তা এই প্রজন্মের মানুষ জানে না। এই দিন দিবস হিসেবে পালন করলে হয়তো এ প্রজন্মের মানুষ মনে রাখত। প্রাথমিকভাবে উপকূল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’-এর দাবি ওঠে। আমরা চাই একটি দিবস, যার নাম হবে ‘উপকূল দিবস’। বাংলাদেশে ‘উপকূল দিবস’ শুরু হলে বিশ্বে প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি দিবস পালন করা হবে। বর্তমান সময়; আগামী দিনের ইতিহাস। আর বিশেষ কোনো ‘দিবস’ মানেই যার মাধ্যমে প্রতিবছর আগের ইতিহাসকে স্মরণ করা। তেমনি একটি দিবস হোক ‘উপকূল দিবস’।

উপকূল দিবসের প্রাসঙ্গিকতাই–বা কেন? দেশের ৭১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝড়ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জনপদের নামই ‘উপকূল’। উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯টি জেলা ও ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বৈরী প্রতিকূলতা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্যচাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে দেশে; যার সিংহভাগই উপকূলে। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূল জিডিপির কমবেশি প্রায় ২৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সমুদ্রের মৎস্য সেক্টর পুরোপুরি উপকূলকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের কলকারখানার পাশাপাশি উপকূলের মৎস্য সেক্টর এবং উপকূলের জনশক্তি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের ভূমিকাও কম নয়। আর এসব খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বিবেচনা করে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা, এনজিও, গণমাধ্যমসহ সবাই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রত্যাশা করবেন নিশ্চয়ই। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা ও জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য। ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ ও ‘বিশ্ব উপকূল দিবস’ দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে আরও একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব আমরা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

ভূপেন হাজারিকার ‘দূরের আর্তনাদের নদীর, ক্রন্দন কোনো ঘাটের, ভ্রুক্ষেপ নেই, পেয়েছি আমি, আলিঙ্গনের সাগর। সেই সাগরের স্রোতেই আছে, নিশ্বাসেরই ছোঁয়া, আছে ভালোবাসা, আদর।’ উপকূলের অবস্থা ঠিক তা–ই। সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। ’৭০-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় স্রোতের নিশ্বাসের ছোঁয়া, ভালোবাসা ও আদর যুগ যুগ ধরে অবহেলিত। গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রভাব মোকাবিলা না করা হলে, জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে। ৫৬ বছর পর এই দিনটিকেই ‘উপকূল দিবস’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন সূচনা হোক।

* এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী, উপকূল গবেষক এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন। ই-মেইল: ahcparvezdu@gmail.com

ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০
ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০ ফাইল ছবি

Saturday, December 13, 2025

ঝড়-বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত গাজা, ১০ জনের বেশি নিহত

ক্রমাগত ইসরাইলি আগ্রাসনের মধ্যে এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনের গাজা। উপত্যকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় বায়রন ঝড়ে ১০ জনের বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। তীব্র বৃষ্টিপাতে বহু শরণার্থী শিবির ভেসে গেছে। ঝড়ে উড়ে গেছে তাঁবু। শীতের মধ্যে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাজাবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।  

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকায় ঝড় ও ভূমি ধসে অনেক তাঁবু হুমকির মুখে পড়েছে। এসব এলাকায় অন্তত ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ৭৬১টি সাইটে আশ্রিত আছে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় সবাই ঝুঁকিতে রয়েছে।
টানা যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে থাকা অসহায় ফিলিস্তিনিদের দুর্যোগ মোকাবিলার মতো কোনো প্রস্তুতি বা সামর্থ্য নেই। টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকা পরিবারগুলো এখন মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে। গাজা সিটির শাতি শরণার্থী শিবিরে শুক্রবার সকালেই তীব্র ঠান্ডায় এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় কমপক্ষে ৭০ হাজার ৩৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৯ জন আহত হয়েছেন।

mzamin

Friday, July 12, 2019

বজ্রপাতে দুই মাসেই নিহত ১২৬ জন: করণীয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত

বাংলাদেশে চলতি বছরের মে এবং জুন মাসে বজ্রপাতে ১২৬ জন নিহত হয়েছেন। ঝড়-বৃষ্টির এ দুই মাসে বজ্রাঘাতে আহত হয়েছেন আরও ৫৩ জন। গত ৬ জুলাই শনিবার সেভ দা সোসাইটি অ্যান্ড থাণ্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গবেষণা সংস্থাটির হিসাব মতে, গত মে-জুন -দুই মাসে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন মোট ১১৮ জন। নিহতদের মধ্যে ২১ জন নারী এবং ৭ জন শিশুও রয়েছে। এছাড়া জুন মাসে বজ্রাঘাতে মোট ২৫ জন আহত হয়েছেন।
বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জ জেলায়। এ জেলায় গত দুই মাসে বজ্রপাতে নিহত হয়েছে ১৬ জন। এছাড়া, সুনামগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও সাতক্ষীরা জেলায় বজ্রপাতে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
বজ্রপাত বিষয়ে গবেষণারত সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণে দেখতে পেয়েছে, খোলা মাঠে  ধান কাটার সময় সবচেয়ে বেশি বজ্রাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এরপর বেশি ঘটেছে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় নদীতে বা বিলে মাছ ধরতে গিয়ে। মাঠে গরু আনতে গিয়ে বা  টিনের  ঘরে অবস্থানকালেও  বজ্রাঘাতে অনেক মানুষ মারা গেছে।
তাছাড়া, অজ্ঞতাবসত বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময়  বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে অনেকে বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছেন। এসব বড় গাছ বজ্র-বিদ্যুতকে আকর্ষণ করায় তা  বিপদের  কারন হয়ে থাকে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তন, আকাশে কালো মেঘের পরিমাণ ও মেঘে মেঘে ঘর্ষণের পরিমান বৃদ্ধির কারণে  সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্র দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু  নাসের খান রেডিও তেহরানকে বলেন, লোকালয়ে যে সব উঁচু গাছ যেমন তাল, বট, কড়াই, রেন্ট্রী এসব কেটে সাফ করার ফলে আকাশের মেঘের বজ্র-বিদ্যূত এখন সড়াসড়ি বাড়ি ঘরে বা খোলা মাঠে এসে আঘাত করছে। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। তাছাড়া, বিদ্যূত ও মোবাইল ফোনের টাওয়ারগুলি বজ্রপাতের সময় আকাশে বিদ্যুতকে আকর্ষণ করে বলে বজ্রাঘাতে মৃত্যুও বাড়ছে।
তবে মোবাইল ফোনের  টাওয়ারের সাথে বজ্র-নিরোধক দন্ড স্থাপিত থাকার কারনে যে সব বজ্র টাওয়ারে আঘাত করে সেগুলি সড়াসড়ি মাটিতে চলে যায় বলে টাওয়ারের কোন ক্ষতি হয় না।
এ প্রসঙ্গে, সেভ দা সোসাইটি অ্যান্ড থাণ্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম এর  গবেষণা সেলের নির্বাহী প্রধান জনাব আবদুল আলিম রেডিও তেহরানকে জানিয়েছেন, তারা কয়েকবছর আগেই সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল, যেন  মোবাইলফোনের টাওয়ারগুলিতে আরো শক্তিশালি বজ্র-নিরোধক দন্ড স্থাপন করা হয়,  যাতে অন্তত: চারিদিকে এক বর্গকিলেমিটার এলাকা পর্যন্ত বজ্রপাত নিরোধ করা যায়।
তাছাড়া বিশাল একা জুড়ে খোলা ফসলের মাঠ এবং হাওর বা বিলের আশেপাশে এরকম বজ্র-নিরোধক টাওয়ার স্থাপন করে মানুষের জীবন রক্ষার উদ্যাগ নেবার দাবী জানিয়েছে  সেভ দা সোসাইটি অ্যান্ড থাণ্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম।

Friday, May 3, 2019

ঘূর্ণিঝড়ের আগে যেসব খাবার সংরক্ষণ করবেন

ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার আগে কিছুটা সময় পাওয়া যায় নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করার জন্য। কারণ ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে ও ধেয়ে আসতে কিছুটা সময় নেয়। আবহাওয়াবার্তার বদৌলতে আমরা তা আগেভাগেই জানতে পারি। তাই আগে থেকে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করা যায়।
ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে বিভিন্নরকম সংকট দেখা দিতে পারে। খাদ্য সংকট তার মধ্যে অন্যতম। আমরা সচেতন হলেই এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার পর বেশকিছু শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করে রাখতে পারলে এই সংকট কাটানো সম্ভব-
khabar
মুড়ি
শুকনো খাবারের মধ্যে মুড়ি সহজলভ্য তাই এটি সহজেই সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। তাই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পেলে পর্যাপ্ত পরিমাণ মুড়ি সংরক্ষণ করুন।
khabar
চিড়া
মুড়ির মতো চিড়াও বেশ সহজলভ্য এবং এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরিয়ে রাখতে সক্ষম। তাই ঘূর্ণিঝড়ের আগে শুকনো খাবার হিসেবে চিড়া সংরক্ষণ করুন।
khabar
খই
মুড়ি-চিড়ার পাশাপাশি সংরক্ষণ করতে পারেন খই। একটি বাষ্পরুদ্ধ জারে বা মুখ আটকানো পলিথিনে খই সংরক্ষণ করুন।
khabar
খেজুর
শুকনো ফলের মধ্যে খেজুর সংরক্ষণ করতে পারেন। এটি সহজে নষ্ট হবে না এবং আপনাকে দ্রুত শক্তি দেবে।
khabar
বিস্কুট
বিভিন্নরকম বিস্কুট সংরক্ষণ করতে পারেন। তবে বিস্কটু কেনার আগে দেখে নিন তার মেয়াদ আছে কি না এবং মানসম্মত কি না। নয়তো মানহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট খেলে পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
khabar
গুড়
শুধু মুড়ি বা চিড়া খেতে ভালো নাও লাগতে পারে। তাই সংরক্ষণ করতে পারেন গুড়। গুড়ের শরবত খেলেও তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি সতেজ থাকা যাবে। গুড়ের পাশাপাশি চিনিও রাখতে পারেন।
khabar
বাদাম
আরেকটি শুকনো ফল বাদাম রাখতে পারেন। যেসব বাদাম সহজলভ্য সেগুলোই সংরক্ষণ করুন। বিপদে কাজে লাগবে।
khabar
বিশুদ্ধ পানি
শুকনো খাবারের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণও জরুরি। কারণ ঘূর্ণিঝরের পড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় করণীয়

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ফণী। বলা হচ্ছে চল্লিশ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্নিঝড়। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলীয় এলাকার সাড়ে তিন হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তত রাখার পাশাপাশি সতর্কতামূলক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জরুরি করণীয় কি? আবহাওয়াবিদদের কথায় জেনে নিন:
১. ঝড়-জ্বলোচ্ছ্বাস প্রবণ বাংলাদেশে মূলত এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে।
২. এ সময়ে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ঝড় ও প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে পারে। ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢল, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিধস ঘটতে পারে।
৩. ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি ও গতিপথ অনুযায়ী বন্দরগুলোতে জারি করা হয় বিপদ সংকেত। সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়।
৪. ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় উপকূলের নিচু এলাকা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বসে প্লাবিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিচু এলাকায় পাকা দালানে থেকেও বিপদ ঘটতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষের পরামর্শ মেনে দেরি না করে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়া উচিৎ।
৫. উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের আগে পাঠাতে হবে।
৬. আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সময় টর্চ লাইট, দেশলাইসহ মোমবাতি, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৭. ঘূর্ণিঝড়ের ‘চোখ’ বা কেন্দ্র উপকূলীয় এলাকা দিয়ে অতিক্রমের সময় কিছুটা সময় সব শান্ত হয়ে আসে।
তখন ঝড় শেষ ভেবে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়া চলবে না, কারণ ‘চোখ’ পেরিয়ে গেলে আবারও আগের শক্তি নিয়ে তাণ্ডব চালায় ঝড়। সুতরাং ঝড় সরে যাওয়ার বা থেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্র ত্যাগ করা উচিৎ হবে না।
৮. দুর্যোগের সময় কোন এলাকার লোক কোন আশ্রয়ে যাবে, গবাদিপশু কোথায় থাকবে, তা আগে ঠিক করে রাখুন।
৯. যথাসম্ভব উঁচু স্থানে শক্ত করে ঘর তৈরি করুন। পাকা ভিত্তির ওপর লোহার বা কাঠের পিলার এবং ফ্রেম দিয়ে তার ওপর ছাউনি দিন। ছাউনিতে টিন ব্যবহার না করা ভালো। কারণ ঝড়ের সময় টিন উড়ে মানুষ ও গবাদিপশু আহত করতে পারে। তবে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরুত্ববিশিষ্ট টিন ও জেহুক ব্যবহার করা যেতে পারে।
১০. জেলে নৌকা, লঞ্চ ও ট্রলারে রেডিও রাখুন। সকাল, দুপুর ও বিকেলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনার অভ্যাস করুন।
১১. ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বা অন্য আশ্রয়ে যাওয়ার সময় কী কী জরুরি জিনিস সঙ্গে নেওয়া যাবে এবং কী কী জিনিস মাটিতে পুঁতে রাখা হবে, তা ঠিক করে সেই অনুসারে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
১২. ঘূর্ণিঝড়ের মাসগুলোতে বাড়িতে মুড়ি, চিড়া, বিস্কুটজাতীয় শুকনো খাবার রাখা ভালো।

Thursday, May 2, 2019

আইলার বীভৎসতা ছাপিয়ে যেতে পারে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ফণী

দশ বছর আগে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে প্রাণ হারান প্রায় ৩৩৯ জন মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয় দেশের উপকূলীয় এলাকা। ভারতের আবহাওয়া দফতর বলছে, আয়লার বীভত্সতা ছাপিয়ে যেতে পারে প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে ক্রমশ ওড়িশার দিকে অগ্রসর হতে থাকা ঘূর্ণিঝড় ফণী।
বৃহস্পতিবার সকালে ওড়িশা উপকূল থেকে ঘূর্ণিঝড়টি ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। শক্তি বাড়িয়ে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার করে এগিয়ে আসছে মারাত্মক এই ঘূর্ণিঝড়। বুধবার সন্ধ্যায় পুরী থেকে এর দূরত্ব ছিল ৬১০ কিলোমিটার। আর কলকাতা এবং দিঘা থেকে এর দূরত্ব ছিল যথাক্রমে এক হাজার এবং ৮শ কিলোমিটার।
ভারতের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ওড়িশার ১৯টি জেলায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়তে পারে। প্রভাব পড়বে পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের তিন জেলায়ও। ১ মে থেকে ৫ মে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করেছে আবহাওয়া দফতর।
ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ইতোমধ্যেই সব পর্যটককে হোটেল ছেড়ে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ওড়িশা সরকার। বাঙালি পর্যটকদের জন্য পুরী-কলকাতা বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করেছে ওড়িশা সরকার। এছাড়া ১০৩ ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডবে পশ্চিমবঙ্গে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। কলকাতা আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড় ফণী চূড়ান্ত রূপে আছড়ে পড়বে উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে। যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। উপকূলবর্তী এলাকার কাঁচা ও বেড়ার বাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হতে পারে।
২০০৯ সালে যেভাবে ঘূর্ণিঝড় আইলা বাংলাদেশে এবং ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল, ঠিক সে ধরনের পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে এবার। ওই বছর আইলার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১১২ কিলোমিটার। তবে ফণীর গতিবেগ আরো অনেক বেশি।
ওই বছরের ২৫ মে আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দেশের উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতা বেগের জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকূলীয় কয়েকটি জেলায়। ঝড়ের আঘাতে বাংলাদেশ এবং ভারতে প্রাণ যায় অন্তত ৩৩৯ জনের। জনজীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। রাস্তা-ঘাট ভেঙে যায়, হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যায় হাজার হাজার গবাদি পশু। সেই আয়লার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন উপকূলীয় জনপদের লাখ লাখ মানুষ।
ভারতের আবহাওয়া দফতর বলছে, ওড়িশায় ২০৫ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানতে পারে ফণী। পরে সেখান থেকে গতিপথ বদলে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ফণী। ইতোমধ্যে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত এবং কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর।

‘ফণী’ ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী!

ধীরে এগিয়ে এলেও ফণী বেশ শক্তিশালী হয়ে গেছে। এখন তার গতি বেড়ে গেছে। তাই ফণী ৪ মের আগেও বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। বাংলাদেশে আছড়ে পড়ার আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশা রাজ্যের উপকূলে আঘাত করতে পারে। তাই কিছুটা দুর্বল অবস্থায় ফণী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার দিকে আসবে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ এক সপ্তাহ আগে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। নাম হয় ফণী। এ কারণে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এদিকে ১৯৭৬ সালের পর ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে এত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়নি ভারত।
ভারতের দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ফণী আগামীকাল শুক্রবার ভারতের ওডিশা রাজ্য উপকূলে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আছড়ে পড়ার সময় ঘণ্টায় প্রায় ২০৫ কিলোমিটার গতি থাকবে এই ঘূর্ণিঝড়ের। গত চার দশকেরও (৪৩ বছর) বেশি সময়, অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের পর ভারত মহাসাগরে এত শক্তিশালী ঝড়ের মুখোমুখি হয়নি দেশটি। ঘূর্ণিঝড় ফণী বর্তমানে তামিলনাড়ুর বিশাখাপট্টনমের পূর্ব উপকূল থেকে ৬০০ কিলোমিটার ও পুরী থেকে ৮০০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। ১৯৭৬ সালের (গত ৪৩ বছরে) পর এখন পর্যন্ত এপ্রিলে বঙ্গোপসাগরে যত ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, তার কোনোটি কখনই এত শক্তিশালী আকার ধারণ করেনি।
ঘূর্ণিঝড় ফণীর বিষয়ে সতর্কতা জারি করে রেখেছে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর। ওডিশায় এরই মধ্যে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও অন্ধ্র প্রদেশের উত্তর উপকূল দিয়েও বয়ে যেতে পারে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণী। এ ঘূর্ণিঝড়কে সামাল দিতে এরই মধ্যে অন্ধ্র প্রদেশ, ওডিশা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ১ হাজার ৮৬ কোটি রুপি আগাম বরাদ্দ দিয়েছে। কাল দুপুরে ঘণ্টায় ১৭৫ থেকে ২০৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় বইবে বলে জানিয়েছে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের ঘূর্ণিঝড়সংক্রান্ত তথ্য দেখা গেছে, ১৯৬৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে ৪৬টি ‘প্রবল ঘূর্ণিঝড়’ হয়েছে। এর মধ্য ২৮টি হয়েছে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্য। সাতটি ছিল মে মাসে। দুটি ছিল এপ্রিলে। এ দুটি ঘূর্ণিঝড় ১৯৬৬ ও ১৯৭৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে হয়েছে।
৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার গতির ঝড় হলে তা শক্তিশালী ঝড় এবং ২২১ কিলোমিটার গতির হলে ‘সুপার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলে। প্রবল ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতও চলবে এই ফণীর কারণে। ভারতীয় কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীর জাহাজ ও হেলিকপ্টার সাহায্যের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরাও প্রস্তুত। পাশাপাশি ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স ৪১ টিমকেও প্রস্তুত রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে আরও ১৩ টিম এবং অন্ধ্র প্রদেশের রয়েছে ১০ টিম।
ফণী আজ বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়টি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। স্বল্প সময়ের নোটিশে তারা যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে, সে জন্য সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

Thursday, February 14, 2019

অচল কানাডা: মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সতর্কতা

আলবার্টা থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্টারিও পর্যন্ত তুষারঝড়ে অচল কানাডা। যেন বরফের নিচে ঢাকা পড়ে আছে সব। মঙ্গলবার এমন ভয়াবহ আবহাওয়া বিরাজ করেছে দেশটির বেশির ভাগ এলাকায়। বিমানবন্দরগুলো যেন পরেছে বিধবা পোশাক। তুষারে সাদা হয়ে আছে সব। সঙ্গে তুষারসহ ঝড়ো বাতাস। রাস্তাঘাট তার নিচে ঢেকে আছে। কোনটা রাস্তা আর কোনটা খাদ বোঝার কোনো উপায় নেই।
বিমানবন্দরগুলোতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বিমান। চলছে তুষার সরানোর কাজ। তাতেও কাজ হচ্ছে না। একপাশ থেকে সরানো হচ্ছে বরফ। অন্যপাশ থেকে আবার ঢেকে আসছে। এমন বিরূপ পরিবেশে বন্ধ রাখা হয়েছে অনেক স্কুল, কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মানুষ একটু উষ্ণতার খোঁজে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখছেন নিজেকে। অন্তত এ সময়টাতে তো প্রিয়জনকে একটু সান্নিধ্য দিতে পারছেন! এতেই যেন শান্তনা।
অনলাইন গ্লোব অ্যান্ড মেইলের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকালে গ্রেটার টরোন্টো এলাকায় ঘন্টা ৮০ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হচ্ছিল শক্তিশালী ঝড়ো হাওয়া। এর আগেই শহরটি ২০ সেন্টিমিটার বরফে ঢেকে যায়। সঙ্গে বৃষ্টি আর তুষারপাত তো ছিলই। সন্ধ্যায় পরিবেশ আরো খারাপ আকার ধারণ করে। টরোন্টোজুড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা ছিল অচল। দৃষ্টিসীমা ছিল একেবারে সীমিত। বিমানগুলোর উড্ডয়ন বিলম্বিত বা বাতিল করা হয়েছে।  
ওই শহরের বাসিন্দা স্কট মিলরয় বলেছে, কুইনস কুয়ে’তে কোনো গাড়িই নেই রাস্তায়। তিনি ডাউনটাউনে তার বাসায় অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। সঙ্গে ছিল তার নিজের সন্তান ও অন্য ৩০টি বাচ্চা। এসব বাচ্চাকে তার কাছে রেখে যান পিতামাতারা। কানাডায় বাচ্চা রাখার জন্য একশ্রেণির মানুষ আছেন। তাদেরকে বলা হয় বেবিসিটার। মিলরয় তেমনই একজন।
এই মৌসুমে এরই মধ্যে ওই শহরের ওপর দিয়ে কয়েক দফা শীতকালীন ঝড় বয়ে গেছে। জানুয়ারিতে টরোনোতে দেখা গেছে ৬৩ সেন্টিমিটার তুষার। ডিসেম্বরে তা ছিল ৫ সেন্টিমিটার। এনভায়রনমেন্ট কানাডার আবহাওয়াবিদ জেরাল্ড চেং বলেছেন, এবারের শীতকালটা অস্বাভাবিকভাবে কঠিন। কারণ, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া শুরু হয়েছে বিলম্বে। গত বছর ডিসেম্বরে যে ঝড় শুরু হয়েছে তা এখন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, মঙ্গলবারের ঝড় সৃষ্টি হয়েছে ‘কলোরাডো লো’ থেকে। সেখান থেকেই আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাতাস প্রবাহিত হয় শক্তিশালী। পড়ে বিপুল পরিমাণে তুষার। আর পড়ে খন্ড খন্ড বরফ। সঙ্গে ‘ফ্রিজিং’ বৃষ্টিপাত।
টরোন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড সহ অনেক স্থানে সব ক্লাস ও বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় মঙ্গলবার। অন্য যেসব বোর্ড স্কুলে ক্লাস বাতিল করেছে তার মধ্যে রয়েছে টেমস ভ্যালি ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড, হ্যামিলটন-ওয়েন্টওয়ার্থ ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড, পিল রিজিয়নের বোর্ডগুলো ও ওয়াটারলু এলাকার বোর্ডগুলো। এর পাশাপাশি টরোন্টোর লাইব্রেরি, চিত্তবিনোদন কেন্দ্রগুলোও বন্ধ রয়েছে। গ্রেট টরন্টো এরিয়ার অধীনস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সব বন্ধ রয়েছে। টরন্টো শহরের পরিবহন সার্ভিসের সুপারভাইজার মার্ক মিলস বলেছেন, তাদের স্টাফরা সার্বক্ষণিক সড়কগুলো পরিষ্কার করার কাজ করে যাচ্ছেন। তারা রাস্তায় লবণ ছিটিয়ে তা পরিষ্কার করার কাজ করছেন।
বিদ্যুতের সঙ্কট দেখা দিয়েছে স্কারবরো, নর্থ ইয়র্ক, ইতেবিকোকে। টরন্টো হাইড্রোর মুখপাত্র টোরি গাস বলেছেন, এসব এলাকায় বিশাল বিশাল গাছ আছে। সেগুলো পড়ে গিয়ে তার ছিড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে।
অন্টারিও প্রভিন্সিয়াল পুলিশ রিপোর্ট করেছে যে, মঙ্গলবার বিকাল ৪টা নাগাদ গ্রেট টরন্টো এলাকায় ৬০টি গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সার্জেন্ট কেরি শমিডট বলেছেন, এই সংখ্যা স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে কিছুটা বেশি। রাস্তায় যদি আরো গাড়ি থাকতো তাহলে এ অবস্থা আরো খারাপ হতে পারতো। 
কাছাকাছির শহর যেমন হ্যামিলটনেও বিভিন্ন  খাতে সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তীব্র বিরূপ আবহাওয়া শহরের প্রশাসনিক অফিস বিকেলের মধ্যে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে। অন্যান্য সেবাখাত বন্ধ রয়েছে।
দেশের পশ্চিমাঞ্চলে এনভায়রনমেন্ট কানাডা এক্সট্রিম কোল্ড সতর্কতা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আলবার্তার কিছু এলাকা। আবহাওয়া বিষয়ক এজেন্সিগুলো বলেছে, বাতাসে হিমেল ছোঁয়া নেমে যেতে পারে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এ অবস্থা বিরাজ করতে পারে পুরো সপ্তাহ। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে এবং সকালে এ অবস্থা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

Saturday, February 9, 2019

ওয়াশিংটনে জরুরি অবস্থা: শীতকালীন তুষারঝড়ের পূর্বাভাষ

তুষারঝড়ের কারণে ওয়াশিংটনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজ্যের ওপর দিয়ে শীতকালীন প্রচ- তুষারঝড় প্রবাহিত হয়। এর ফলে সিয়াটলে ২০০ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। লোকজনকে রাস্তায় বের হতে বারণ করা হয়। তাদেরকে ঘরের ভিতরে আশ্রয় গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
শুক্রবার সিয়াটলের উত্তরে ভারি তুষারপাগ শুরু হয়। কোথাও কোথাও ৮ ইঞ্চি তুষার পড়ে।
এতে শহরের অনেক এলাকা ঢেকে যায়। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কর্মচারীদের বাসায় ফিরে যেতে বলা হয়। এ অবস্থায় গভর্নর জে ইনস্লি রাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি রাজ্যের সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি ঝড়ে রূপ নিতে পারে, যা অনেক বছরে আমরা একবার দেখে থাকি।
ওদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অবকাশযাপন কেন্দ্রে ৫ দিন ধরে তুষারের কারণে আটকে পড়েছিলেন কমপক্ষে ১২০ জন পর্যটক ও বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা। তাদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে। ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের মুখপাত্র অ্যালিসিয়া এমব্রে বলেছেন, কিংস ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের মন্টিসিটো সিকুওইয়া লজে রোববার থেকে আটকা পড়েন অতিথিরা ও স্টাফরা। সেভানে ৭ ফুট পর্যন্ত তুষারপাত হয়েছে। তাতে আটকা পড়েন তারা। ফ্রেসনোর পূর্বদিকে পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা ¯েœামোবাইলে চড়ে পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে তাদের কাছে পৌঁছেন। তারপর তারা পথের ওপর পথে থাকা ২০টিরও বেশি গাছ সরান। ৮ মাইল এলাকায় রাস্তার ওপর থেকে তুষার পরিষ্কার করেন, যাতে অতিথিরা ও স্টাফরা বৃহস্পতিবার রাতে ফিরে যেতে পারেন।
পূর্বাভাষে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলের ওপর দিয়ে আরেকটি শীতকালীন তুষারঝড় আসতে পারে। ওদিকে ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্কে তুষারপাতের ফলে ঘরের ওপর গাছ পড়ে হাফ ডোম ভিলেজের ৫০টি আবাসিক ভবনের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১৬০ জনেরও বেশি ত্রাণকর্মী। তারা বিভিন্ন জনকে খাদ্য, আশ্রয় ও সেবা দিতেন।
মিশিগানে এক লাখ ৪৮ হাজারের বেশি কাস্টমার বিদ্যুতবিহিন রয়েছেন। কারণ, সেখানে ফ্রিজিং রেইন হচ্ছে কয়েক দিন ধরেই। তবে কনজুমার এনার্জি থেকে বরা হয়েছে, রোববার শেষের দিকে বিদ্যুত সংযোগ স্থাপন করা হতে পারে। সিয়াটলে কর্মকর্তারা লোকজনকে রাস্তায় বেরুতে অনুৎসাহিত করেছেন। বলা হয়েছে, তুষারপাতের ফলে অনেক স্থানে ট্রাফিক ধীর গতির হয়েছে। তুষারঝড়ে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি তুষারপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা করে সব স্কুল, কলেজের ক্লাস বাতিল করা হয়েছে। সিয়াটল-টাকোমা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বহু ফ্লাইট বাতিল অথবা বিলম্বিত করা হয়েছে। রোববার ও সোমবারও একই অবস্থা থাকতে পারে। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে চলে যেতে পারে। ওদিকে সিয়াটল রেল স্টেশনে বৃহস্পতিবার ৫৯ বছর বয়সী একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শহরে অতিরিক্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

Monday, May 7, 2018

বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করতে ৮ জেলায় ‘লাইটেনিং সেন্সর’ by দীন ইসলাম

দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করতে আট জেলায় নতুন প্রযুক্তি ‘লাইটেনিং সেন্সর’ লাগিয়েছে সরকার। ঝড়-বৃষ্টির সময় কোনো জেলায় কখন বজ্রপাত হয়েছে বা কতবার বিদ্যুৎ চমকিয়েছে তার হিসাব নিতে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসানো হয়েছে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করার পর লাগানো হবে বজ্রপাত নিরোধক ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’। অ্যারেস্টারের মাধ্যমে বজ্রপাত টেনে মাটির নিচে পাঠিয়ে দেয়া যাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া, নওগাঁর বদলগাছি, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনার কয়রা এবং পটুয়াখালীতে লাইটেনিং সেন্সর লাগানো হয়েছে। আটটি সেন্সরে পুরো দেশের চিত্র উঠে আসবে। একেকটি সেন্সরের রেঞ্জ ২৫০ কিলোমিটার। প্রতিটি সেন্সর থেকে এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত মনিটরিং করা যাবে। এক মৌসুমে (এপ্রিল থেকে জুন) দেশে কতবার বিদ্যুৎ চমকায় এবং বজ্রপাত হয় সেটি সংরক্ষণ করা হবে। তবে এখন পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হবে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে রেডিও, টেলিভিশন, ওয়েবসাইটে এখনো তাঁরা বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেন। তবে সেটি রাডার থেকে নেয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেয়া হয়, যাতে বজ্রপাতের চিত্র সুস্পষ্টভাবে আসে না। এ ছাড়া এখন বজ্রপাতের তথ্য দেয়া হয় জেলাওয়ারি। কিন্তু ডিটেকটিভ সেন্সরের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট এলাকার নাম বলা যাবে। এর আগে বজ্রপাতের প্রতি নজর ছিল কম। বর্তমানে গুরুত্ব অনুধাবন করে এখন এর প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। এজন্য প্রথম ধাপে এলাকা চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ১৩টি নদীবন্দরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতের সংকেত ও সংখ্যা নিরূপণের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৬২ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আটটি ডিকেটটিভ সেন্সরের যন্ত্রপাতি কেনায় খরচ হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারা বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে কম লোক মারা গেছে জাপানে। ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে মাত্র ২৪ জন বজ্রপাতে মারা গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৩১৯ জন মারা গেছে। তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও সচেতনতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রেও বজ্রপাতে মৃত্যু হার কমছে। সিঙ্গাপুর, জাপান, কানাডা এমনকি পাশের দেশ ভারতেও বজ্রপাত রোধ করতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি লাগানো হয়েছে। উল্টোদিকে বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। এতে সরকার ২০১৬ সালে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এ বছর পহেলা বৈশাখ থেকে এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে ১০৫ জন মারা গেছে। এর আগে ২০১৬ সালের মে মাসে বজ্রপাতে চার দিনে ৮১ জন মারা যায়। এরপর ২০১৬ সালে ৩৮০ জন ও ২০১৭ সালে ৩০৭ জন মারা গেছে। দিন দিন বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এটা প্রতিরোধে তৎপর হয়েছে আবহাওয়া অফিস। এজন্য প্রথম ধাপে ‘লাইটেনিং সেন্সর’ লাগানো হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ লাগানো হবে। সহসাই অ্যারেস্টার লাগানোর কাজ শুরু হবে বলে মনে করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

Wednesday, July 12, 2017

বন্যায় ১৩ জেলার সাড়ে ছয় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, বন্যা-কবলিত দেশের ১৩ জেলার ৪৫ উপজেলায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৩ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৪ হাজার টন চাল, ১ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার আর্থিক বরাদ্দ ও নয়টি আইটেম-সমৃদ্ধ ১৮ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ত্রাণসামগ্রীর অভাব নেই জানিয়ে তিনি ‘বন্যা নিয়ে রাজনীতি’ না করে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেছেন।
আজ বুধবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বন্যা পরিস্থিতি ও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে এক প্রেস বিফ্রিংয়ে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। এসময় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামাল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, গত মার্চ মাসে আগাম বন্যায় ফসলহানির কারণে এর বাইরে সিলেট অঞ্চলের জেলাসমূহে প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার পরিবারকে ভিজিএফ দেয়া হয়েছে যা চলমান রয়েছে। জেলা প্রশাসকদের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য ও আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হবে। একজন লোকও যাতে খাবারের কারণে কষ্ট না পায়, সেজন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে জেলা প্রশাসনকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সিলেট, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। উত্তরের পানি মধ্যাঞ্চলে নেমে আসলে আরও নতুন জেলা প্লাবিত হতে পারে।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, উজানের দেশ চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানে এবার বন্যা হয়েছে। ভাটির দেশ হিসেবে উজানের প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে। এর আলোকে আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি ও মানুষের জন্য সহনশীল অবস্থায় রাখতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত বন্যা ও ত্রাণ কার্যক্রমের খোঁজখবর নিচ্ছেন। মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
মায়া বলেন, পানিবাহিত রোগ থেকে দুর্গত মানুষদের রক্ষা করতে হবে। কোন বেড়িবাঁধ যাতে নতুন করে ভাঙ্গা না যায় তার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে। পশুখাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বন্যা প্লাবিত এলাকার টিউবওয়েলগুলো উঁচু করে দিয়ে, পানি বিশুদ্ধকরণ টেবলেট দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি মেডিক্যাল টিমগুলোকে প্রতিদিন বন্যাকবলিত এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করে সেবাকার্য চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। মন্ত্রী বলেন, প্রতিদিন প্রত্যেক জেলার ক্ষয়ক্ষতি, ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম, আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ১১ জুলাই পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতির ৯০টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে ১২টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ৫৫টি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, বন্যা নিয়ে রাজনীতি না করে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানাব- আসুন আমরা বন্যা প্লাবিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের মানবিক কর্তব্য পালন করি। শুক্রবার থেকে তিনি উত্তরাঞ্চলের প্রত্যেকটি বন্যা প্লাবিত জেলা সফর করে ত্রাণ বিতরণ করবেন। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকা সফর করে বন্যাপ্লাবিত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের অনুরোধ করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মায়া বলেন, সিলেট ও মৌলভীবাজারে ৩২টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলেও আশ্রয়কেন্দ্র খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবার বন্যা হবে ধরে নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি ছিল। প্রত্যেক জেলায় প্রচুর ত্রাণ সামগ্রী মজুদ রয়েছে। এবার ৯৮ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট তৈরি করে রেখেছি। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠলে যেন তাৎক্ষণিকভাবে খাবারের চিন্তা করতে না হয়।

Saturday, February 13, 2016

বিপন্ন মানুষের বন্ধু by এ এইচ এম বজলুর রহমান

আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে পঞ্চম বিশ্ব বেতার দিবস। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় মডেল। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব বেতার দিবস পালিত হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিও অংশগ্রহণ করছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে রেডিও স্টেশনগুলো পালন করছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
সরকার ইতিমধ্যে ২৮টি প্রাইভেট এফএম এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও এফএম অনুমোদন দিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ বেতার ১২টি আঞ্চলিক বেতারকেন্দ্র এবং ৩৫টি এফএম পরিচালনা করছে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা তথা সাধারণ মানুষকে অপরিসীম শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আজও সেই স্মৃতি আমাদের নাড়া দেয়। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, স্বাধীনতার পর দেশের উন্নয়নেও শক্তিশালী বাহন হিসেবে স্বীকৃত। গুটিবসন্ত প্রতিরোধ, ম্যালেরিয়ামুক্ত অভিযান, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা, জাতীয় টিকাদান, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, গণসাক্ষরতা, কৃষি উন্নয়ন, ডায়রিয়া প্রতিরোধ, শিশু ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী পাচার রোধ, এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ, মাদকাসক্তি রোধে রেডিও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে এখনো মানুষ বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার অনুষ্ঠান শোনার জন্য উদ্গ্রীব থাকে।
রেডিও এখন শাখা-প্রশাখায় অনেক বিস্তৃত। মূলত চারটি ধারায় রেডিও সম্প্রচার করে থাকে, যথা: পাবলিক সার্ভিস, আন্তর্জাতিক রেডিও, বাণিজ্যিক রেডিও এবং কমিউনিটি রেডিও।
পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ বেতার যেমন অনুষ্ঠান ও খবর সম্প্রচার করছে; তেমনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, ভয়েস অব আমেরিকা, এন এইচ কে, রেডিও তেহরান, রেডিও চায়না ও অন্যান্য বিদেশি মাধ্যমেও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারছি। আবার দেশে সাম্প্রতিক কালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সম্প্রচার করছে শহরভিত্তিক বেসরকারি এফএম রেডিও। সব মিলিয়ে রেডিওর প্রচার দিনে দিনে প্রসারিত হচ্ছে।
পাবলিক রেডিও, আন্তর্জাতিক রেডিও কিংবা বাণিজ্যিক রেডিও যেভাবে সম্প্রচার করে, তাতে সমাজের সব মানুষ সুষমভাবে প্রচারের সুযোগ পায় না। এসব রেডিও প্রকৃতিগতভাবে শহরকেন্দ্রিক ও মুনাফানির্ভর। গ্রামীণ মানুষের কথা তারা তেমন প্রচার করে না। এতে গড়ে ওঠে কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে তথ্য বিভাজন; যা জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায়। এ বাস্তবতা মাথায় রেখে সারা বিশ্বে কমিউনিটি রেডিওর ধারণা বিকশিত হয়।
কমিউনিটি রেডিও হচ্ছে কমিউনিটিভিত্তিক রেডিও। এখানে সাধারণভাবে সীমিত প্রযুক্তিগত স্থাপনার মাধ্যমে অল্পসংখ্যক মানুষ কাজ করে। ভৌগোলিকভাবে এর প্রচার এলাকা ছোট। হতে পারে একটি গ্রাম বা শহরতলি। সম্প্রচারে এফএম ট্রান্সমিটার ব্যবহৃত হয়। অলাভজনকভাবে পরিচালিত এ রেডিওতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। শুধু জানা নয়, নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কমিউনিটি রেডিও সমাজের প্রান্তীয় মানুষকে জায়গা করে দেয়। স্থানীয় সমস্যার কথা জানানোর পাশাপাশি সমাধানের পথও দেখায় কমিউনিটি রেডিও।
বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) ২০০০ থেকে বাংলাদেশে গ্রামীণ জনপদে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে উন্নয়নমূলক তথ্য ও জ্ঞানবিনিময়ের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সেবা তথ্যসমূহসহ জীবনঘনিষ্ঠ তথ্য জনগণের মাঝে সহজবোধ্য ভাষায় প্রচারের লক্ষ্যে কমিউনিটি রেডিও চালু করার জন্য সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় তথ্য মন্ত্রণালয় কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওবিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ১৬টি কমিউনিটি রেডিও প্রতিদিন ১২৫ ঘণ্টার বেশি সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। এক হাজার জন যুব নারী ও যুবকের অংশগ্রহণে নতুন ধারার এ গণমাধ্যমটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ১৪টি জেলায় সর্বমোট ৬৮টি উপজেলার বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ জনগোষ্ঠী কমিউনিটি রেডিওর সুবিধা ভোগ করছে।
কমিউনিটি রেডিও স্টেশন পর্যায়ে সর্বমোট পাঁচ হাজারটি শ্রোতাক্লাব শ্রোতাদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো স্থাপিত কমিউনিটি রেডিওগুলোর অর্জন ইতিমধ্যে সব মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আরও ১৬টি কমিউনিটি রেডিও অনুমোদন পেয়েছে। আমরা আশা করছি আগামী ডিসেম্বর ২০১৬ সালের মধ্যে ওই ১৬টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের কাজ শুরু করবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি রেডিওগুলোর মূল প্রভাব হলো জনগণের দোরগোড়ায় স্থাপিত এই গণমাধ্যম দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের কথা সরাসরিভাবে বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর সোচ্চার হওয়া ও শোনার সুযোগ। এই নয়া গণমাধ্যম সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশের ক্ষেত্রে পল্লি অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে তথ্য এবং যোগাযোগের অধিকার এনে দিয়েছে। সুশাসন নিশ্চিতকরণে জনপ্রতিনিধি, সরকারি এবং বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনসাধারণের সংলাপ আদান-প্রদানের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান খাতগুলোর সঙ্গে জনসাধারণের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
দুর্যোগকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সংঘটিত হওয়ার আগে, পরে ও দুর্যোগকালীন রেডিও একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়াদান অধিকতর স্বচ্ছ ও সহজতর হতে পারে, যখন থাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকেরা নিরাপদ পরিবেশে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। রেডিও দুর্যোগে বেঁচে যাওয়া ও এমনকি আশ্রয়শিবিরে অবস্থানকারী বিপদাপন্ন ব্যক্তিদের মর্যাদা জুগিয়ে সহায়তা করে।
সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ এবং কমেনের সময় উপকূলীয় অঞ্চলে স্থাপিত কমিউনিটি রেডিওগুলোর ভূমিকা সব মহলে প্রশংসিত হয়। বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সর্বশেষ খবর জানার ক্ষেত্রে উপকূলের মানুষের প্রধান উৎস ছিল কমিউনিটি রেডিও।
দুর্যোগ ও জরুরি অবস্থায় আঘাতপূর্ব, আঘাতকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ের জন্য রেডিও খুবই শক্তিশালী। রেডিও শ্রোতাদের সক্ষম করে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ জনসাধারণকে সুরক্ষা দিতে মানবাধিকার ও উদ্ধারকর্মীদের এগিয়ে আসতে উদ্যমী করে তোলে।
দুর্যোগ ও কোনো জরুরি অবস্থায় রেডিওর ভূমিকা খুবই শক্তিশালী। সম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে রেডিওর সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে এ ক্ষেত্রে সামাজিক গণমাধ্যমেরও সক্ষমতা রয়েছে, তবে সামাজিক গণমাধ্যমগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্ভরযোগ্য রেডিওর সঙ্গে সংযুক্ত হলে এর প্রভাব আরও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
এ মুহূর্তে আরও অন্তত ৫০-৬০টি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন প্রদান করলে সুবিধাবঞ্চিত তথা মিডিয়া ডার্ক এলাকাগুলো কমিউনিটি রেডিওর আওতায় আসবে।
এতে কণ্ঠস্বর ভেসে উঠবে দেশের প্রান্তীয় মানুষের। সবাই সুযোগ পাবে তার কথা নিজের মতো করে বলার। সব জনগোষ্ঠীর ভাবনা জানতে পারবেন দেশের নীতিনির্ধারকেরা। স্থানীয় সরকারি এবং বেসরকারি কর্তৃপক্ষ সরাসরি জানবে তাদের উদ্দিষ্ট মানুষের চাওয়া-পাওয়া।
এ এইচ এম বজলুর রহমান: বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন।

Sunday, February 7, 2016

ভূমিকম্পে কাঁপল তাইওয়ান- ধসে পড়েছে একাধিক বহুতল ভবন, নিহত কমপক্ষে ১৩, বহু নিখোঁজ

শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে গতকাল তাইওয়ানের
তাইনান শহরে ধসে পড়া ১৬ তলা ভবনটির সামনে
নিরাপত্তা ও উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতা l ছবি: রয়টার্স
তাইওয়ানের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর তাইনানে গতকাল শনিবার সকালে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। একটি ১৬ তলাসহ মোট ১১টি ভবন ধসে পড়েছে। এতে সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে আছে আরও অনেকে। তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে বলছে, ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৬ দশমিক ৪। খবর এএফপির।
তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চেন উই জেন বলেন, নতুন চান্দ্রবর্ষের ছুটির কারণে অন্যান্য সময়ের তুলনায় ১৬ তলা ভবনে অনেক বেশি বাসিন্দা ছিল। তবে বিধ্বস্ত হওয়ার সময় কতজন বাসিন্দা ছিল তা নিশ্চিত নয়। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, ভবনে ৯৬টি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। তাইনানের অগ্নিনির্বাপক বিভাগের তথ্য কর্মকর্তা লি পো মিন বলেন, ওই ভবনে ২৪০ জনের মতো বাসিন্দা ছিল। তবে কতজন আটকা পড়ে আছে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভোরের দিকে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। উদ্ধারকর্মীরা মই বেয়ে ১৬ তলা ভবনের জানালা দিয়ে আটকে পড়া ব্যক্তিদের টেনে বের করে আনার চেষ্টা করেন। ক্রেন ও খননযন্ত্র দিয়ে কংক্রিটের দেয়ালগুলো ভাঙা হয়। উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা করতে আরও ৪০০ সেনা সেখানে গেছে।
জাতীয় দুর্যোগ সংস্থার মুখপাত্র লিন কুয়ান চেং বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ মাসের শিশু, একজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তাঁরা তাঁদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। ৩০ জনের বেশি এখনো ধ্বংসস্তূপে আটকে আছে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
ধসে পড়া ১৬ তলা ভবনটির ভেতর থেকে একটি শিশুকে
উদ্ধার করে আনছেন উদ্ধারকর্মীরা l ছবি: রয়টার্স
বহুতল ভবনটি ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত আরেকটি সাততলা ভবন থেকে ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাইনান শহরের ধসে যাওয়া ভবনগুলো থেকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। শতাধিক জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা।
খবরে জানানো হয়, ধসে পড়া ১৬ তলা ভবনের উল্টোদিকে থাকতেন চ্যাং নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় টিভি দেখছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি শুরু হয়। কিছু একটা পতনের শব্দ শুনতে পান। দরজা খুলে দেখেন, উল্টোদিকের ভবনটি ধসে পড়েছে। তিনি মই ও কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ধসে পড়া ভবনের জানালায় এক নারী কাঁদছিলেন। তিনি তাঁর স্বামী ও শিশুকে উদ্ধারের জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু গ্যাস বিস্ফোরণের ভয়ে চ্যাং ধসে যাওয়া ভবনের ভেতরে যাননি। ধসে যাওয়া ভবনের অনেকে উদ্ধারের জন্য ডাকাডাকি করছিলেন। মই ছোট হওয়ায় চ্যাং তাঁদের উদ্ধার করতে পারেননি।
বহুতল ভবনের এক বাসিন্দা স্থানীয় টিভি চ্যানেল সেট টিভিকে বলেন, তিনি দেখলেন ভবনটি ঝুঁকছে। বাঁয়ে, ডানে দুলতে দুলতে ভবনটি নিচের দিকে দেবে যায়। দোতলা ও তিনতলা ধসে পড়ার পর তিনি গ্যাসের গন্ধ পান।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া ব্যুরো বলছে, ভূমিকম্পের পর তাইনানে বেশ কয়েকটি পরাঘাত হয়। প্রেসিডেন্ট মা ইং জউ বলেছেন, আটকে পড়াদের উদ্ধারে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। ভূমিকম্পের পর তাইনানে ১ লাখ ৬৮ হাজার বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
তাইওয়ানে এর আগেও ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ২০১৩ সালে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশটিতে চারজনের মৃত্যু হয় ও ব্যাপক ভূমিধস হয়। ১৯৯৯ সালে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশটিতে ২ হাজার ৪০০ জন প্রাণ হারায়।
নেপালে ভূমিকম্প: নেপালে শুক্রবার রাতে ভূমিকম্প হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার এই ভূমিকম্প নেপালে আঘাত হানে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর মেলেনি।

Wednesday, January 6, 2016

ভূমিকম্প সম্পর্কে ভয়াবহ কিছু তথ্য

সোমবার ভোরে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল বিশাল এলাকা। ভূমিকম্পে আতঙ্কিত শহরের মানুষ। আসুন এমন সময় জেনে নিই ভূমিকম্প নিয়ে দশটা জানা অজানা তথ্য-
১) প্রতি ৩০ সেকেন্ডে দুনিয়ার কোথাও না কোথাও ভূমিকম্প হচ্ছে। এটা আলাদা কথা কী মানুষ সেগুলোর সব টের পাচ্ছে না।
২) ভূমিকম্পের ফলে আগ্নেয়গিরি জেগে উঠে অগ্ন্যুত্‍পাত হতে পারে
৩) দুই মাত্রার কম ভূমিকম্প আমরা টের পাই না। রিখটার স্কেলে ৩ মাত্রার থেকে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে মাটি কেঁপে ওঠে।
৪) সাত বা তার থেকে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে গোটা একটা শহর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
৫) বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল চিলিতে ১৯৬০ সালে। রিখটার স্কেলে চিলির সেই ভূমিকম্পের মাত্র ছিল ৯.৫।
৬) দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল চীনে। ১৫৫৬ সালে। ৮ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল এই ভূমিকম্পে।
৭) ১৯৮৫ সালে মেক্সিকো সিটিতে ৮ মাত্রার ভয়ানক ভূমিকম্প হয়। সেই ভূমিকম্পে মেক্সিকোর এক হাসপাতাল ভেঙে পড়ে। এক সপ্তাহ সেই হাসপাতালের ভিতর কেউ ঢুকতে পারেননি। দিন আটেক পর উদ্ধারকারী দল গিয়ে বেশ কয়েকজন সদ্যোজাতকে উদ্ধার করে। এক সপ্তাহ ধরে সেইসব সদ্যোজাত শিশুদের কোনো পানি বা খাবার, বা কোনো মানুষের সান্নিধ্য পায়নি। এরপরেও কীভাবে শিশুরা বেঁচে ছিল সেটাই আশ্চর্যের।
৮) হিন্দু পুরাণমতে আটটি বিশালকায় হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে আছে পৃথিবী। ওই সব হাতি আবার দাঁড়িয়ে আছে কচ্ছপের পিঠের ওপর। কচ্ছপগুলো আবার নিজেদের সামলে রেখেছে কুণ্ডলি পাকানো সাপের ওপর দাঁড়িয়ে। এসব প্রাণীর কোনো একটা একটু নড়লেই নড়ে ওঠে পৃথিবী।
৯) ১৮৮১ সালে ১৬ ডিসেম্বর এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মিসিসিপি নদীর একটা অংশ পিছন দিকে বইতে শুরু করে।
১০) বিশ্বে প্রতি বছর ৫ লক্ষ ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে ধরা পড়ে। তাদের মধ্যে মাত্র এক লক্ষ আমরা অনুভব করতে পারি। তাদের মধ্যে ১০০টা ভূমিকম্প ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ি থাকে।
১১) কিছু কিছু প্রাণী নাকি ভূমিকম্প আগেই টের পায়। তবে সম্প্রতি গবেষণায় জানা যায়, মানুষও আগে থেকে ভূমিকম্প টের পেতে পারে। এর টের পাওয়ার কারণ হচ্ছে মাটির তলার
কিছু গ্যাস পুকুর বা জলাশয়ের পানির মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। মানুষ সে অস্বাভাবিক গন্ধ থেকেই ভূমিকম্পের বিষয়টি টের পায়।
১২) আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার পার্কফিল্ডকে বলা হয় 'পৃথিবীর ভূমিকম্পের রাজধানী'। এখানে একটি ব্রিজ আছে, যেটি দুটি টেকটনিক প্লেটের ওপর অবস্থিত ভূমিকম্প নিরূপক যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল দুই হাজার বছর আগে। তৈরি করেছিলেন চিনের বিজ্ঞানী ঝ্যাং হ্যাং।
১৩) প্রাচীন গ্রিকরা মনে করত ভূমিকম্প হয় তাদের সমুদ্র দেবতা পসিডনের কারণে। রেগে গেলে মাটি ধরে ঝাঁকি দেয় সমুদ্র দেবতা। আবার জাপানি পুরাণে আছে, ন্যামাজু নামের
একটি ক্যাটফিশের কারণেই ভূমিকম্প হয়।
১৪) প্রতিবছর ভূমিকম্পে প্রায় আট হাজার মানুষ মারা যায়। গত চার হাজার বছরে এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ মারা গেছে ভূমিকম্পে।
১৫) দক্ষিণ গোলার্ধের চেয়ে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে ভূমিকম্প বেশি হয়।
১৬) প্রতি বছর জাপানে দেড় হাজার বার ভূমিকম্প হয়
১৭) ইনকা সভ্যতার ভাস্কর্য এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যা যেকোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারে। সেই স্থাপত্য, ভাস্কর্যগুলো বেশ কয়েকবার মাঝারি মাপের ভূমিকম্পের মুখে পড়লেও কোনও ক্ষতি হয়নি।
১৮) যেমন 'আর্থ কোয়েক হয় তেমন 'মুন কোয়েক'ও হয়। মানে ভূমিকম্পের মত চন্দ্রকম্পও হয়। চাঁদেও পৃথিবীর মতও ভূমিকম্প হয়। তবে পৃথিবীর থেকে কম মাত্রার ভূ কম্প হয়ে চাঁদে। পৃথিবীর মতো অত ঘনঘন কেঁপে ওঠে না চাঁদ।

এবার কি দুর্যোগের বছর? by ইফতেখার মাহমুদ

এবার কি দুর্যোগের বছর?
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ পার না হতেই হানা দিল দুর্যোগ। ভূমিকম্প আঘাত হানল ঢাকা থেকে মাত্র ৩৫১ কিলোমিটার দূরে, ভারতের মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে। এতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল বাংলাদেশ, মিয়ানমার আর ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রায় পুরোটাই।
জনজীবনের ওপরে প্রকৃতির এই বৈরিতা শুধু বাংলাদেশেই দেখা যায়নি। গত ১১ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ছয়টি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। দরিদ্র দেশ আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য সবাই দুর্যোগের ওই আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছে।
আর এ বছরটা যে আবহাওয়া ও দুর্যোগজনিত নানা ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাবে, সেই পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিল বিশ্বের আবহাওয়াবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সংস্থাগুলো। ফলে একদিকে ভৌগোলিক বিপদ ভূমিকম্প, অন্যদিকে আবহাওয়ার বৈরী আচরণের মধ্য দিয়ে বছরটা যাবে বলে আশঙ্কা করছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বের বেশির ভাগ আবহাওয়াবিষয়ক গবেষণা সংস্থা বলছে, ২০১৬-এর আবহাওয়া হবে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর। ২০১৫ সালটিও আবহাওয়াবিদেরা এর আগের যেকোনো বছরের তুলনায় উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এখন তাঁরা বলছেন, ২০১৬-তে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে আবহাওয়ার বিশেষ অবস্থা এল নিনো সৃষ্টি হয়েছে। এটি গত জুন থেকে উত্তপ্ত হওয়া শুরু হয়েছে এবং ২০১৬-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত থাকবে।
এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা নোয়ার প্যাসিফিক এনসো অ্যাপ্লিকেশন ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী রাশেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর এল নিনো মারাত্মক শক্তিশালী অবস্থায় বিরাজ করছে। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকছে। এর প্রভাবে বাতাসের গতিবেগ, বৃষ্টিপাত এবং ঋতুচক্রের স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যাঘাত ঘটতে শুরু করেছে।
বিশ্বজুড়ে দুর্যোগের এই ঘনঘটা অবশ্য ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই শুরু হয়েছে।
২৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে টর্নেডোর আঘাতে মারা যায় ছয়জন। ২৬ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানেও ওই তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ২৭ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কশায়ার ও ইয়র্কশায়ার তীব্র বন্যায় ভেসে যায়। ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের গারল্যান্ড ও টেক্সাসে আঘাত হানে ভয়ংকর টর্নেডো। আর পয়লা জানুয়ারি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র টোগোকে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সইতে হয়েছে। দুর্যোগ পর্যবেক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা রিলিফ ওয়ার্ল্ডয়ের পর্যবেক্ষণে এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইউএসজিএ-এর পর্যবেক্ষণ মতে, ২০১৫ সালে ৭ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার মোট ১৯টি ভূমিকম্প পৃথিবীতে আঘাত হানে। যা গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক তীব্র ভূমিকম্প।
এ ব্যপারে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহেদি হাসান আনসারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণি থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি বিস্তৃত ফাটল রেখা সম্প্রতি ধরা পড়েছে। ওই ফাটল রেখার মধ্যে বাংলাদেশও পড়েছে। ওই এলাকায় গত কয়েক বছরে ১০টি তীব্র ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে আগামী দিনগুলোতে আরও ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। এ ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষায় আমাদের ভবনগুলোকে ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করাই সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি ও সমাধান।’
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা এনসো প্রেডিকশন সেন্টার থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া বিভাগ, সবাই এল নিনোর ভয়ংকর চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হওয়ায় শঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদন করেছে। তারা বলছে, এল নিনোর কারণে আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাত কম হবে। জাতিসংঘের কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফাম থেকে বলা হয়েছে, এল নিনোর কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে খরা ও খাদ্যাভাব দেখা দেবে। ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের রক্ষায় এখনই ধনী দেশগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলেছে সংস্থা দুটি। একই কারণে এশিয়ায় বন্যা হবে।
এদিকে তিন সপ্তাহজুড়ে দেশের আবহাওয়াতেও দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক গরম। পৌষ মাস যাই যাই করছে। অথচ শীতের দেখা নেই। ঋতুচক্রের আবর্তে মাঘ যত কাছে আসছে, শীত না বেড়ে বরং কমছে। গতকাল সোমবার রাজধানীতে দিনের বেলায় তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা তো ২৭ দশমিক সাত ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বৈরী প্রকৃতি বছরজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। সেই আশঙ্কারই জানান দিচ্ছে প্রকৃতি। ফলে সরকারকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জোর প্রস্তুতি নিতে হবে।
জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বেড়েছে। ২০১৬ সালে সেই প্রবণতা বাড়তে পারে। দুর্যোগের ঘনঘটার কারণে ২০১৫ সালে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সব সম্মেলনেই দুর্যোগ মোকাবিলাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইনুন নিশাত আরও বলেন, জাপানের সেন্দাই শহরে বিশ্ব দুর্যোগ সম্মেলন, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক (এসডিজি) সম্মেলন এবং সর্বশেষ প্যারিসে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২১-এ দুর্যোগ মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রগুলো অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ সরকার দেশের জনগণের কাছে তো বটেই, বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তার জনগণকে দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে টেকসই উন্নয়নের জন্য অঙ্গীকার করেছে। ফলে সরকারকে সব উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টিকে যুক্ত করতে হবে।

Thursday, October 29, 2015

শক্তিশালী যত ভূমিকম্প

গত ২৫ এপ্রিল নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে
কমপক্ষে ৮ হাজার ৯০০ মানুষ নিহত হয়। ছবি: এএফপি
সাড়ে সাত মাত্রার একটি ভূমিকম্প আজ সোমবার আঘাত হেনেছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে। বাংলাদেশেও ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ অঞ্চলে। এ কারণে আফগানিস্তান ও পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ দুটি দেশে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি গত ৩০ বছরের শক্তিশালী কয়েকটি ভূমিকম্পের কথা তুলে ধরেছে, যেসব ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
-২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে কমপক্ষে ৮ হাজার ৯০০ মানুষ নিহত হয়। পাঁচ লাখ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই বছরের মে মাসে সেখানে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পেও কয়েকজন মানুষ মারা যায়।
-২০১২ সালের ১১ আগস্ট ইরানের তাবরিজ শহরে ৬ দশমিক ৩ ও ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩০৬ জন নিহত এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়।
-২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ও সে কারণে সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ মারা যায়।
-২০১১ সালের ২৩ অক্টোবর তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে ছয় শতাধিক মানুষ নিহত হয়। আহত হয় ৪ হাজার ১৫০ জন।
-২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
-২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল চীনের কুইনঘাই প্রদেশে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে তিন হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়।
-২০০৮ সালের ১২ মে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৮৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়।
-২০০৬ সালের ২৭ মে ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী এক ভূমিকম্পে ছয় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
-২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর পাকিস্তান-শাসিত আজাদ কাশ্মীরে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।
-২০০৫ সালের ২৮ মার্চ ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৯০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
-২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও তার কারণে সৃষ্ট সুনামিতে ইন্দোনেশিয়াসহ ভারত মহাসাগরের কাছাকাছি অঞ্চলে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
-২০০৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ইরানের বাম শহরে কমপক্ষে ৩১ হাজার ৮৮৪ মানুষ প্রাণ হারায়।
-২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের গুজরাটে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।
-১৯৯৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে ভারতের মহারাষ্ট্রে ৭ হাজার ৬০১ জন মানুষ প্রাণ হারায়।
-১৯৯১ সালের ২০ অক্টোবর ভারতের উত্তর প্রদেশে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭৬৮ জন মারা যায়।
-১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট নেপালে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭২১ জনের প্রাণহানি ঘটে।
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প ও তার কারণে সৃষ্ট সুনামিতে ইন্দোনেশিয়াসহ ভারত মহাসাগরের কাছাকাছি অঞ্চলে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ছবি: এএফপি

Sunday, October 25, 2015

দুনিয়াজুড়ে দুর্যোগের ঘনঘটা by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

চীন ও তাইওয়ানে গত আগস্টে টাইফুন ‘সুডেলর’
আঘাত হানে। চীনের উপকূল থেকে ছবিটি তোলা
দুনিয়াজুড়ে এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা চলছে। কোথাও ঝড়, কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, কোথাও দাবানল, কোথাও শৈত্যপ্রবাহ—এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় লেগেই আছে। প্রকৃতির দোষ দিয়ে অবশ্য লাভ নেই। কারণ মানুষেরই অপকর্মের জের টানছে প্রকৃতি। মানুষ প্রকৃতিবিরোধী কাজ করে। প্রকৃতিও ফুঁসতে থাকে সম্পদ ও ভারসাম্য হারানোর ক্ষোভে। ফুঁসতে ফুঁসতে একসময় রুদ্ররোষে থাবা মেরে বসে। লন্ডভন্ড করে দেয় জনপদ।
সবুজ পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন রোধে সভা-সম্মেলন যতই হোক না কেন, বাস্তবে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। বড় বড় উন্নত দেশ যারা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানির বিপক্ষে কথা বলছে, তারাই ধুমসে ব্যবহার করছে এ জ্বালানি। এতে ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন বেড়েই চলেছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রক্ষাকবচ ওজোন স্তর। বাড়ছে খরা, অতিবৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও শৈত্যপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যার মাশুল গুনতে গিয়ে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য। হুমকির মুখে বাস্তুসংস্থান। পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো যে পরিবেশবাদীরাও যেন ইদানীং হাল ছেড়ে দিয়েছেন। দূষণ রোধে আগের মতো তাঁদের রা-টা নেই। আমরা যেন পৃথিবীর ক্ষয় দেখার নীরব দর্শক। কারও যেন কিচ্ছু করার নেই।
অক্টোবরে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ। ভারতের
উপকূলীয় এলাকা থেকে ছবিটি তোলা। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের কথা যদি বলি, তাহলে সে দেশে পদে পদে রয়েছে দুর্যোগের কোপ। বিশাল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় একটানা খরা চলছে তো চলছেই। গনগনে রোদে পুড়ে তামা হয়ে গেছে মাটি। দিগন্তজোড়া মাঠে ফসলের দেখা নেই। পানি নিয়ে কৃচ্ছ্র সাধন করেও এ খরার ধকল কাটানো যাচ্ছে না। বরং খরার কারণে কয়েক দফায় দেখা দেওয়া দাবানলে পুড়ে বিরান হয়েছে বেশ কিছু মানব বসতি। এদিকে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে টেক্সাস আর ওকলাহোমায়। এতে খরার মন্দা কাটলেও আকস্মিক বন্যায় বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হিউস্টন ও টেক্সাস হিল কাউন্টিতে। দেশটির পূর্বাঞ্চলে শীতের জাঁতাকলে পড়ে ক্ষতির পরিমাণ ২৯০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার যে হানা দিয়েছে, তা রীতিমতো দানবীয় তাণ্ডব। এ মাসের (অক্টোবর) প্রথম দিকে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঝড় আর বন্যায় ১৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ইউরোপের মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি দেশে এখন ভয়াবহ বন্যা। অতিবৃষ্টিতে দানিউব নদের পানি ফুঁসে ওঠে তীরবর্তী দেশগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকা ভাসিয়ে দিয়েছে। এনবিসি নিউজ ডটকমসহ বিভিন্ন বার্তা সংস্থার খবরে জানানো হয়, গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই বন্যা। ইউরোপে বন্যার কারণে প্রাণহানি ইতিমধ্যে এক শ জন ছাড়িয়ে গেছে। হাঙ্গেরিতে দানিউব নদের পানির উচ্চতা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অস্ট্রিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রেও বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে হাজারো মানুষ।
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়
‘কোমেন -এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয়
এলাকা প্লাবিত হয়। ছবি: প্রথম আলো
এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় এ বছর বেশ কয়েকবার সামুদ্রিক ঝড় ও আকস্মিক বন্যা সীমাহীন দুর্ভোগ বয়ে আনে। এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ফিলিপাইনে ‘কোপ্পু’ নামের টাইফুনটি আঘাত হানে। এতে খুব বেশি প্রাণহানি না ঘটলেও ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। এর জের এখনো টানছে দেশটি।
এর আগে গত আগস্টে চীন ও তাইওয়ানে টাইফুন ‘সুডেলর’ আঘাত হানে। এতে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। একই মাসে টাইফুন ‘গোনি’ জাপানে আঘাত হানে। এমনই আরও কিছু ঝড়ঝঞ্ঝা ওই এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।
গত শুক্রবার মেক্সিকোর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সামুদ্রিক ঝড় প্যাট্রিসিয়া। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, এর আগে এমন হারিকেন কখনো আঘাত করেনি সে দেশে। শক্তির ধরন অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতি সেরকম না হলেও তা একেবারে কম ছিল না।
ইন্দোনেশিয়ায় কৃষিজমি তৈরির জন্য বিশাল এলাকাজুড়ে বনজঙ্গল সাফ করে গাছ পোড়ানো হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্রিন হাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়াচ্ছে। মাস দুয়েক ধরে মানব-সৃষ্ট এই দুর্যোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে এখন ধোঁয়াশা বিরাজ করছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক এলাকায় লোকজন ঠিকমতো শ্বাস টানতে পারছে না। দেখা দিয়েছে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যা। মালয়েশিয়ায় এর মধ্যে কয়েক দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ পর্যবেক্ষকেরা এর মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গ্রিন হাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত নির্গমনে ওজোন স্তর ক্ষয়ে গিয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। গলে যাচ্ছে মেরু অঞ্চল ও সুউচ্চ পর্বতমালায় জমে থাকা হিমবাহ ও বরফের স্তর।
মেক্সিকোতে গত শুক্রবার আঘাত হানে শক্তিশালী
সামুদ্রিক ঝড় (হারিকেন) প্যাট্রিসিয়া। ছবি: রয়টার্স
পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের তথ্যের বরাত দিয়ে সম্প্রতি এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত এক শতাব্দীতে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু পাকিস্তান নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। ঘটছে ভূমিধস ও ভূমিকম্পের মতো প্রলয়ংকরী ঘটনা। গত এপ্রিলে নেপালে বড় ধরনের ভূমিকম্পে নয় হাজারের বেশি লোক প্রাণ হারায়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে ‘সিডর’ ও ‘আইলার’ ক্ষত এখনো মুছে যায়নি। নদীদূষণ কোন পর্যায়ে রয়েছে, এক বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধময় কালো জলই তা বলে দেয়। বায়ু ও পরিবেশদূষণ নিয়ে অনেক দিন ধরেই হইচই, লেখাজোখা চলছে। কিন্তু নদী আর খালে কারখানার রাসায়নিক পদার্থের বর্জ্যের স্রোতোধারার গতিপথ বদলায়নি।
আগামী ডিসেম্বরে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন। এই সম্মেলনে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াও যোগ দেবে। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে এ দেশটি বরাবরই পরিবেশবাদীদের কঠোর সমালোচনার মুখে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এ কারণে এ ধরনের সম্মেলন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতেন। অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলকে নিয়ে অনেকে আশাবাদী। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলে তিনি কথা দিয়েছেন। তাঁর মতো উন্নত দেশগুলোর নেতারা কথাকে কাজে পরিণত করলে এই ধরণির উত্তপ্ত হওয়ার পথ কিছুটা হলেও ধীর হবে।

Monday, October 19, 2015

আসছে বড় ভূমিকম্প, প্রাণ যেতে পারে ৪ কোটি মানুষের

মাস ছয়েক আগে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ছবি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ছোট্ট পাহাড়ি দেশে মৃত্যু মিছিল দেখে অনুভব করা গিয়েছিল, প্রকৃতির শক্তির কাছে আমরা কতটা অসহায়, কতটা দুর্বল। সেটি যে বড় ধরনের ভূমিকম্প ছিল তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে আগামী এক বছরের মধ্যে যে কোনও দিন যে ভূমিকম্প আসতে চলেছে তার কাছে আগে ঘটে যাওয়া যে কোনও ভূমিকম্প শিশুর তকমা পেতে পারে। শুধু তাই নয়, সঙ্গে ধেয়ে আসতে পারে বড় ধরনের সুনামি। বৈজ্ঞানিকদের অনুমান এতে কমপক্ষে ৪ কোটি মানুষ মারা যেতে পারেন।
বৈজ্ঞানিক এবং নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার ড. মেহরান কেশে এ কথা জানিয়েছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, এই মেগা ভূমিকম্পের ফলে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা ভেঙে টুকরো হয়ে যাবে। সব থেকে বেশি ক্ষতি হবে এই দুই মহাদেশের পশ্চিম উপকূল জুড়ে। এখানে কমপক্ষে ২ কোটি মানুষ প্রাণ হারাতে পারেন। এর আগাম প্রস্তুতি হিসাবে আমেরিকা এবং কানাডার বড় শহরগুলিতে আপত্‍কালীন পরিস্থিতিতে কী কী করণীয় তা নিয়ে মক ড্রিল করা হচ্ছে নিয়মিত।
ড. কেশে বলেন, আমরা জানি ৬ থেকে ৮.৩ মাত্রার যে কোনও ভূমিকম্প বেশ বড় কম্পন হিসাবে ধরা হয়ে থাকে। কিন্তু মেগাকোয়েক-এ এই মাত্রা থেকে কম্পন শুরু হবে। তা গিয়ে পৌঁছবে ১০-১৬ কম্পন মাত্রায়। সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ আঞ্চল। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, আগামী দিনে মধ্যেই উত্তর চিন এবং জাপানে পর পর বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হবে। তাতেও প্রচুর মানুষ প্রাণ হারাবেন। বলে ধারণা। ক্যারিবায়ান দ্বীপপুঞ্জও বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিশ্বের গোটা অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। আমি চাই যেন এমনটা না হয়, তবে এটা এড়ানো যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস।

Wednesday, August 26, 2015

নেপালের অভিজ্ঞতা, আমাদের বাস্তবতা by মো. মাহবুব জাহান খান

ঘটনা অনেকগুলোই বলতে হবে, তবে একটি দুর্ঘটনা দিয়েই শুরু করি। ৪ মার্চ ২০১৫-এর শীতের কুয়াশাঘন সকাল সাতটা বেজে পনেরো মিনিট। কাঠমান্ডুর একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণের চেষ্টা করছে ‘টার্কিশ এয়ারলাইনস’-এর ফ্লাইট টিকে ৭২৬। মোট ২২৪ জন যাত্রী নিয়ে এয়ারবাস ৩৩০ প্রথমবার অবতরণে ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে পিচ্ছিল রানওয়েতে অবতরণের পরপরই বিমানের সামনের চাকা ভেঙে গিয়ে বিমানটি রানওয়ের ডান পাশে নরম ভেজা ঘাসের মাটিতে আটকে যায়। পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশে এ ঘটনা ঘটলে গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু নেপালের ক্ষেত্রে তা হলো না। উদ্ধার সরঞ্জামাদির অপ্রতুলতার কারণে চার দিনের জন্য রানওয়ে বন্ধ রাখতে হলো।
কথায় আছে নেপালের মানুষ কখনো কখনো রসিকতা করে বলে থাকে, ‘আমরা আগুন দেখার পর পানির জন্য কূপ খনন শুরু করি’। চার দিন বিমান ওঠা–নামা বন্ধ থাকায় প্রায় ৮০ হাজার যাত্রী বিভিন্ন স্থানে আটকে থাকেন। ভারত থেকে সে দেশের বিমানবাহিনীর সি-১৩০জে হারকিউলিস বিমান (যা ছোট রানওয়েতে ওঠা–নামা করতে পারে) প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম ও জনবল এনে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করে। এর পরের মাসের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনা আমাদের সবারই জানা। আমরা অনেকে হয়তো এটা জানি না যে সেই একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখন আর বড় রিলিফ বিমান ওঠা–নামা করতে পারছে না এবং যে জন্য দুর্যোগ-পরবর্তী রিলিফ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাহায্য বা বিমানের অভাব হচ্ছে না, অভাব হচ্ছে শুধু রানওয়েতে অবতরণের সুযোগ পাওয়ার। বিকল্প একটি যথাযোগ্য রানওয়ে থাকলে নেপালের উদ্ধারকাজ ও পুনর্বাসনকাজে আরও অনেক গতি আসত, এটা বলা যায় নিঃসন্দেহ। দু-চারটা ঘটনার উল্লেখ করলে বোঝা যাবে একাধিক রানওয়ে কিংবা বিকল্প বিমানবন্দর থাকার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু।
ভূমিকম্পের ঘটনার পর ২৭ এপ্রিল রিপাবলিক অব সিঙ্গাপুর বিমানবাহিনীর তিনটি সি-১৩০ বিমান প্রচুর ত্রাণসামগ্রী, চারটি কুকুরসহ উদ্ধারকারী দল অবতরণের সুযোগ না পেয়ে দুটি ভারতের কলকাতায় ও একটি পাটনায় অবতরণ করতে বাধ্য হয়। একই দিন থাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট (টিজি-৩১৯) সকালে উদ্ধারকর্মী ও সাংবাদিকসহ নেপালের উদ্দেশে থাইল্যান্ড ছাড়ে। কিন্তু সেখানে অবতরণের সুযোগ না পেয়ে কলকাতা এসে জ্বালানি নিয়ে পুনরায় নেপালে যায় এবং এবারও অবতরণের সুযোগ না পেয়ে কলকাতায় ফিরে আসে। কিন্তু কলকাতার সব হোটেল পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বিমানটি পরদিন রাত আটটায় আবার থাইল্যান্ডেই ফিরে যায়। ২৯ এপ্রিল অস্ট্রেলীয় ডিফেন্স ফোর্সের দুটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার বিমান প্রচুর তাঁবু, মেডিকেল টিম ইত্যাদি নিয়ে নেপালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয় কিন্তু অবতরণের অনুমতি না পেয়ে সেটিকেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।
একই রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল নেপালে বাংলাদেশের রিলিফ মিশন নিয়ে। ত্রাণসামগ্রী বিমানে ওঠানো আছে, বিমান এবং বৈমানিকসহ অন্যান্য ক্রু প্রস্তুত আছে, তবে নেই শুধু কাঠমান্ডুতে অবতরণের একটু সুযোগ। ফলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সি-১৩০ বিমান দিয়ে যে ছয়টি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে তার মধ্যে তিনটিরই সময় পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এ ছাড়া প্রচুর বিমান ওঠা–নামার কারণে রানওয়ের অবস্থা বেশ কিছুটা খারাপ হয়ে যাওয়ায় কানাডার তিনটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের চারটি সামরিক বিমানকে নেপালে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এমন ঘটনা আরও অনেক ঘটেছে, তবে সর্বশেষ আমরা দেখলাম, ৩ মে ২০১৫ থেকে কোনো ধরনের বড় বিমানকে কাঠমান্ডুতে ওঠা–নামার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না এবং সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব নেপাল (সিএএএন) সব দেশকেই জানিয়ে দিয়েছে যে ১৯৬ টনের অধিক ওজনের বিমান নিয়ে ত্রাণসামগ্রী না পাঠাতে। নেপালের জন্য এ বাস্তবতা খুবই কঠিন এবং খুবই হতাশাব্যঞ্জক। এতে বিদেশ থেকে আসা ত্রাণ কিংবা জনবলের মাত্রা কমে যাচ্ছে, যা উদ্ধার ও পুনর্বাসনকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে এই মাত্রার ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি কী দঁাড়াবে তা অনুমান করাও কঠিন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতির দেশ আমাদের এই বাংলাদেশের নির্মাণকৌশল, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান, ভবনগুলোর বয়স, অপ্রশস্ত রাস্তা—ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। সে মহাঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি আমাদের নিতেই হবে।
নেপালের বিমানবন্দরে রানওয়ের অপ্রতুলতা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, রানওয়ে দিয়েই এটি শেষ করতে চাই। রানওয়ে বিবেচনায় বাংলাদেশ নেপালের চেয়ে বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থানে আছে। আমাদের কমপক্ষে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে, যেগুলোর ক্ষমতাও বেশ ভালো। কিন্তু নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি সামনে কেটে যাবে। কারণ, সেখানে চীন সরকারের অর্থায়নে ভারত নেপাল সীমান্তের কাছে ভাইরাহাওয়া নামক স্থানে আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণাধীন। ভারত-নেপাল সীমান্তের নিজগাধ নামক স্থানে তৃতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনুমোদনের অপেক্ষায় এবং রিসোর্ট শহর পোখারায় আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মিত হবে।
ঢাকার একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি যদি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা কী? চট্টগ্রাম বা সিলেট বিমানবন্দরকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই দুটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সে নিশ্চয়তা কোথায়? তা ছাড়া চট্টগ্রাম বা সিলেটে ত্রাণসামগ্রী বা উদ্ধারকারী দল নামলে তা ঢাকায় পৌঁছাবে কেমন করে? এত দীর্ঘ সড়কের কোথাও যে বড় ফাটল হবে না, সে নিশ্চয়তা কে দেবে? সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ত্রাণসামগ্রী বা উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে যে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হবে, তাতে ক্ষয়ক্ষতি শুধু বেড়েই চলবে।
ঢাকার দ্বিতীয় বিমানবন্দর, যেটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আছে সেটি অর্থাৎ তেজগাঁও বিমানবন্দরকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করলে তা উত্তম বিকল্প হিসেবে এ ধরনের দুর্যোগে কাজে লাগানো যাবে। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের সিডর ও অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য ত্রাণ কার্যক্রম তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকেই অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পরিচালিত হয়। কাজেই দুর্যোগ ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে এ বিমানবন্দরটিকে তার অবস্থানগত সুবিধার কারণে ব্যবহার করা যথাযথ হবে। এমনিতেও তেজগাঁও বিমানবন্দরকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ‘জরুরি বিকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে আট হাজার ফুট দীর্ঘ ও ১৫০ ফুট প্রশস্ত সুবিশাল রানওয়ে রয়েছে। মাঝারি ক্যাটাগরির বিমান যেমন: সি-১৩০, এন-৩২, এফ-২৮, বোয়িং-৭৩৭ ইত্যাদি এখানে সহজেই ওঠা–নামা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে পার্কিংয়ের জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে, যেখানে ছোট-বড় ২০-২৫টি বিমানকে দুর্যোগকালে পার্কিং করা যাবে।
আশার কথা, সম্প্রতি (২৭-০৫-২০১৫) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমানবাহিনীর এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমানের অন্তর্ভুক্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এল-৪১০ বিমানগুলো বর্তমানে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। হয়তোবা অচিরেই এ বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় মেরামত ও সংস্কারকাজও হাতে নেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ভূমিকম্পজনিত কোনো দুর্যোগে এ বিমানবন্দরের আশপাশের খোলা এলাকা দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য প্রয়োজনে তাঁবু খাটানোর জন্যও ব্যবহার করা যাবে। ঢাকা শহরের যতটুকু জায়গা খোলা আছে, তা বড় ধরনের ভূমিকম্পে তাঁবু খাটানোর জন্য যে খুবই অপ্রতুল সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে রাখতে হবে যে প্রচুর খোলা জায়গা দরকার হবে বিদেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী রাখার জন্য, উদ্ধারকর্মী ও উদ্ধার সরঞ্জাম রাখার জন্য, ফিল্ড হাসপাতাল চালু করার জন্য এবং জরুরি অন্যান্য কাজে। কাজেই আমাদের উচিত হবে সরকারি সব খোলা জায়গা যেমন: পার্ক, খেলার মাঠ ইত্যাদি যথাযথ সংরক্ষণ করা এবং নতুন খোলা জায়গা সৃষ্টি করা।
বিমানবন্দরের কথা বলছিলাম। ঢাকার অদূরবর্তী আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ), সরারচর, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ), কুমিল্লা এবং টাঙ্গাইলে বিদ্যমান এয়ার স্ট্রিপ বা রানওয়েগুলো কিছুটা সংস্কার করে জরুরি রিলিফ অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। আমাদের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে বিদ্যমান বিমানবন্দরটিকে অর্থাৎ তেজগাঁও বিমানবন্দরটিকে অবশ্যই এ ধরনের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহার করার প্রয়োজনে সংরক্ষণ করা অতি জরুরি এবং সেটিই হবে আমাদের সবার প্রত্যাশা।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. মাহবুব জাহান খান, বিপিপি, পিএসসি: ভূমিকম্প–পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আইবিএ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল প্রোগ্রামে গবেষণারত।