Friday, July 17, 2026
হাতির জন্য কান্না by পল্লব মোহাইমেন
![]() |
| নিথর বঙ্গ বাহাদুর। ছবি: শফিকুল ইসলাম |
মো. মুকুল হোসেনের আবেগও থামে না। কামরাবাদ ইউনিয়নের সাবেক এই সদস্য বললেন, ‘মনে হলো আমার কোনো আত্মীয় মারা গেছে।’
ভারতের আসাম থেকে ভেসে আসা বন্য হাতিটির মৃত্যু সত্যিই কাঁদিয়েছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার মানুষকে। মুকুল ও আশরাফের কথা তো আলাদাই। ১১ আগস্ট প্রথম দফা যখন হাতিটিকে অজ্ঞান করা হয়, তখন সেটি কয়রা গ্রামের ডোবায় নেমে গিয়েছিল। প্রায় অচেতন হাতিটি তলিয়ে যাচ্ছিল। ভেটেনারি চিকিৎসক তপন কুমার দে হ্যান্ডমাইকে আহ্বান জানান এলাকার মানুষজনকে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যান মুকুল ও আশরাফুল।
সেদিনের কথা বলতে থাকেন মুকুল হোসেন, ‘হাতিটা যখন পড়ে গেল পানিতে, তখন প্রথমে নৌকা নিয়ে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। তারপর কলার ভেলা। কিন্তু কচুরিপানার কারণে কাছাকাছি যেতে পারি না। এরপর পানিতে নেমে পড়ি।’
প্রায় একই সময় পানিতে ঝাঁপ দেন আশরাফুল ইসলামও। ‘হাতিটি তখন অচেতন হলেও শুঁড় নাড়াতে পারছিল। একটা বাঁশের লাঠির (স্থানীয়ভাবে কোটা নামে পরিচিত) আগায় বড়শির মতো লোহা লাগিয়ে আমরা হাতির কান টানতে থাকি। শুঁড় যেহেতু নাড়াছিল, তাই ভয়ও করছিল। তারপরও আমি ডুব দিয়ে হাতির পায়ের নিচ দিয়ে দড়ি ঢুকিয়ে বুক আটকে ফেলি।’ দড়ি হাতির পিঠের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠানো হলে শতাধিক মানুষ হাতিকে ডাঙায় তুলে দড়ি টানা শুরু করে। একপর্যায়ে হাতিটিকে ডাঙায় তোলা হয়। এরপর আমগাছের সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা তখন হাতিটির নাম দেন ‘বঙ্গ বাহাদুর’।
পানিতে ডুব দিয়ে প্রায় অচেতন হাতিটির পায়ে রশি পরানোর কাজটা কিন্তু বেশ ঝুঁকিপূর্ণই ছিল। তারপরও কেন সেই ঝুঁকি নিলেন? আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘হাতিটির ওপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। সরিষাবাড়ীতে ঢোকার পর থেকেই এই হাতির পেছনে রয়েছি। যখন দেখলাম হাতিটি তলিয়ে যাচ্ছে তখন আমি আর আমার মধ্যে ছিলাম না। আমি আর মুকুল মেম্বার সাঁতার দিলাম। ভয় ছিল শুঁড় দিয়ে যদি পানির নিচে জড়িয়ে ধরে! তারপরও আমাদের মনে হয়েছে যে করেই হোক হাতিটাকে বাঁচাতে হবে।’
শেষ পর্যন্ত অবশ্য মুকুল-আশরাফুলসহ শত শত গ্রামবাসী এবং বন বিভাগের উদ্ধারকর্মীরা মিলেও বাঁচাতে পারেনি বঙ্গ বাহাদুরকে। ১৬ আগস্ট ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে মারা যায় হাতিটি। প্রথম আলোর সরিষাবাড়ী প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম জানান, সেদিন সত্যিই শোকের গ্রামে পরিণত হয়েছিল কয়রা এলাকাটা। বরকত হাজী নামে এক ব্যক্তির জমিতে পড়েছিল, সেখানেই সমাহিত করা হয়েছে হাতিটিকে।
কিছুটা আক্ষেপের সুরে মুকুল হোসেন বললেন, ‘আমাদের কথা তো কেউ শোনে না। হাতির দুই পা একসঙ্গে চেপে বাঁধতে না করেছিলাম। আর ডিপ টিউবওয়েল থেকে পানি ছিটাতে চেয়েছিলাম হাতির ওপর।’ আশরাফুল বলেন, ‘বন বিভাগের কর্মকর্তাদের চেষ্টা ছিল, আন্তরিকতাও ছিল কিন্তু তাঁদের দক্ষতার অভাবটাই ছিল বেশি।’
২৮ জুন এই বুনো হাতিটি ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে ভেসে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। এরপর ২৭ জুলাই হাতিটি সরিষাবাড়ী উপজেলায় আসে। ৮ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় প্রতিনিধিদল ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হাতিটিকে চেতনানাশক প্রয়োগ করে উদ্ধারের উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেন। ৯ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছিল উদ্ধার অভিযান। প্রায় ২০ দিন বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করায়, স্থানীয় মানুষদের মনে দাগ কেটেছিল বঙ্গ বাহাদুর। জীবন বাজি ধরে হাতি উদ্ধারেও নেমেছিলেন মুকুল-আশরাফুলের মতো মানুষেরা। আর তাই আজ হাতির জন্য কান্না এলাকাজুড়েই।
Monday, June 15, 2026
গল্প- ফুলি

পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?
দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।
তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের মতো।
ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।
পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।
একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।
গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?
ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?
তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।
একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।
ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।
ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।
গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?
দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?
বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।
হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।
হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।
বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।
পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।
ঠিকাসে, ফজলু বলল।
শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।
খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।
না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।
খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?
ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।
মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।
সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।
বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?
ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।
বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।
তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।
ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।
পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।
খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।
বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।
জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।
সগির শোনেনি।
পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।
তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।
অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।
হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।
আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।
দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।
টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?
হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।
দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।
আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।
দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।
দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।
খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?
ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।
ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।
-----দুই-----
হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।
ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।
যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।
ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।
বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।
বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।
চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।
জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।
ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?
অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?
এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?
আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।
দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।
-----তিন-----
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?
খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।
ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।
তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।
ফজলু হাঁটা দিলো।
কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।
কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।
-----চার-----
বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।
খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?
ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।
কী কাজ?
পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।
ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।
তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।
থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।
উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।
কেন?
সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।
উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।
এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।
তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।
খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।
ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।
কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড় দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।
চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।
ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?
সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।
পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।
মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।
পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?
চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।
এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।
বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।
-----পাঁচ----
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।
গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে কবে শুনেছে?
মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।
দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।
বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।
ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।
Sunday, May 10, 2026
গল্প- মা তোমাকে ভালোবাসি by রোমেন রায়হান

‘চিঁচিঁ’ করে ডাকে মাকে! আজ রোববার মা দিবস। তাই আজ মাকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন।
পাশে যে ছবিটা দেখছ, এটা এঁকেছে আবির শেখ। সে নাটোর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে
রুহামদের বাসায় পাঁচটা পিঁপড়া থাকে। মা পিঁপড়া, তার দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। বাচ্চা পিঁপড়ারা খুব লক্ষ্মী। সব সময় মায়ের কথা শোনে। এই যেমন মা পিঁপড়া বলে দিয়েছে, ‘রুহামকে কখনো কামড় দিয়ো না।’
ওরা মায়ের কথা শুনেছে। এক বছর ধরে ওরা রুহামদের বাসায় থাকছে, এক দিনও রুহামকে কামড় দেয়নি।
রুহামদের বাসায় আজকে বড় অনুষ্ঠান হলো। অনেক মেহমান এসেছিল। একটা কেক আনা হয়েছিল। রুহাম সেই কেক কাটল। রুহামের জন্মদিন ছিল যে!
পিঁপড়ারাও কেকের ভাগ পেল। মা পিঁপড়া পেট পুরে খেয়ে ঘুমাতে গেল। ওদিকে চার ভাইবোন পিঁপড়া বসে বসে গল্প করছিল। সবচেয়ে ছোট পিঁপড়া বোনটা বলল, ‘আমার মন খারাপ।’
বাকি তিন ভাইবোন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘কেন, কেন?’
‘এই যে আমরা মোটে তিন-চার বছর বাঁচি!
ছোট ভাই পিঁপড়া বলল, ‘তাতে কী?’
‘আমরা তো চাইলেও দুই-তিনটার বেশি জন্মদিন পালন করতে পারব না।’
বড় বোন বলল, ‘আচ্ছা আমরা জন্মদিন পালন করি না কেন?’
জবাবটা কেউ দিতে পারল না। হঠাৎ সবার মন খারাপ হলো। মায়ের একটার বেশি জন্মদিন পালন করতে পারবে না।
সবাই ঠিক করল মায়ের জন্মদিন পালন করবে। তবে আগে থেকে মাকে কিছুই জানাবে না। চমকে দেবে।
পিঁপড়া মায়ের জন্মদিন ১১ মে। নানু পিঁপড়ার কাছ থেকে ওরা শুনেছিল।
মে মাস তো চলেই এল। সারা দিন চার ভাইবোন ফিসফিস করে। জন্মদিনে কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা।
মে মাসের ১০ তারিখ এসে পড়ল। অনুষ্ঠান করার জন্য ড্রয়িংরুমের একটা কোনাকে বেছে নিল ওরা। এই ঘরে মা পিঁপড়া সাধারণত আসে না। তাই আগে থেকেই মায়ের চোখে পড়বে না। পিঁপড়া ভাইবোনেরা একেকজন একেক কাজে লেগে পড়ল।
বড় ভাই পিঁপড়া বাগানে গেল একটা ফুল আনতে। এত দূর থেকে কাঁধে করে একটা ফুল নিয়ে আসা তো সহজ কাজ না! কিন্তু মায়ের জন্য আনছে বলে তার একটুও কষ্ট লাগল না।
বড় বোন পিঁপড়া গেল রুহামের পড়ার ঘরে। পড়তে বসলেই রুহামের শুধু খিদে পায়। তাই রুহামের আম্মু ওর পড়ার টেবিলে সব সময় কিছু না কিছু খাবার রেখে দেয়। টেবিলের কাছাকাছি গিয়ে দেখল রুহাম পড়া ফেলে বিস্কুট খাচ্ছে। টেবিলের নিচে কার্পেটের ওপর একটা বিস্কুট পড়ে আছে। রুহাম এভাবে খাবার-দাবার গুছিয়ে খায় না বলে অন্য দিন পিঁপড়ারা বিরক্ত হতো। আজকে হলো না। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পিঁপড়া বড় বোন বিস্কুটটা নিয়ে রওনা হলো। আরেকটু হলে রুহামের পায়ের নিচে চাপা পড়ছিল!
রুহামের বাবা গতকাল বাজার থেকে স্ট্রবেরি এনেছিল। ছোট ভাই পিঁপড়াটা গেল রান্নাঘরে। গিয়ে দেখে ফ্লোরে এক টুকরো স্ট্রবেরি পড়ে আছে। সে ওই টুকরোটা নিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে রওনা হলো।
জিনিস জোগাড় হয়ে গেছে। পিঁপড়া ছোট বোনটা এবার বসল কেক বানাতে। সব ভাইবোন মিলে ক্রিম দিয়ে জোড়া দেওয়া দুই বিস্কুট আলাদা করে ফেলল। তারপর ক্রিম লাগানো অংশটার ওপর বসাল স্ট্রবেরির কাটা টুকরো। ছোট বোন বলল, ‘এই নাও, হয়ে গেল জন্মদিনের কেক!’ কেক দেখে সবাই খুশি। আনন্দে হাততালি দিল।
আয়োজন শেষ করতে করতে দেখে রাত ১১টা বেজে গেছে। তার মানে মা ঘুমিয়ে গেছে।
রাত ১২টা বাজার একটু আগে সব ভাইবোন গেল মায়ের কাছে। গভীর ঘুম থেকে ডেকে তোলায় মা পিঁপড়া প্রথমে ঘাবড়ে গেল। চোখ কচলে বলল, ‘কী হয়েছে?’
বড় ছেলে মুখ হাসি হাসি করে বলল, ‘কিছু না।’
‘তাহলে এত রাতে ডাকতে এলি কেন?’
ছোট মেয়ে মায়ের হাত টেনে বলল, ‘চলো তো, মা।’
‘কোথায়?’
‘ড্রয়িংরুমে। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’
ড্রয়িংরুমে এসে মা তো অবাক। কেক! ফুল! জিজ্ঞেস করল, ‘এগুলো কী রে?’
বড় মেয়েটা কিছু বলবে বলে মুখ খুলতে যাচ্ছিল। অমনি রুহামদের বাসার দেয়াল ঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে উঠল। মানে রাত ১২টা বেজে গেছে। সব ছেলেমেয়ে একসঙ্গে সুর করে গেয়ে উঠল:
‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...হ্যাপি বার্থ ডে ডিয়ার মা...হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।’
মা পিঁপড়া ভ্যাবাচ্যাকা খেল। এটা দেখে ছোট ছেলে বলল, ‘মা, আজকে মে মাসের ১১ তারিখ! আজকে তোমার জন্মদিন।’
বড় ছেলে মায়ের হাতে ফুল তুলে দিল। মা ফুল হাতে নিল। সবাই মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, তোমাকে ভালোবাসি।’
‘আমিও তোদের অনেক ভালোবাসি।’
সবাই দেখল মায়ের চোখ ভেজা। চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সব ছেলেমেয়ের চোখও ঝাপসা হয়ে আসছে।
তারপর সবাই মিলে গোল হয়ে বসল। কেক খেল। খেতে খেতে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করল। গল্প শেষ করে ছেলেমেয়েরা অনে-এ-এ-ক দিন পর ছোটবেলার মতো মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে গেল।

Sunday, November 23, 2025
ছোট গল্প- হায়েনা by নিজাম কুতুবী
একবার একটি হায়েনার ইচ্ছে হয়েছিল মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে। হায়েনাটি মানুষের মত করে মানুষের রূপে মানুষের শহরে বসবাস পাততে চেয়েছিল। হায়েনাটি সেই উদ্দেশ্যে পাতাল পুরি থেকে হাজার মাইল পথ-ঘাট-নদী মাঠ পেরিয়ে হাজির হলো একটি মানুষের শহরে।এই শহরে এসে সে দেখতে পেলো, কিছু মানুষ একজন মানুষের পদার্পনের অপেক্ষা করছে। লোকটির আগমনের বার্তায় ফুলের পাঁপড়ি ছিটাচ্ছে তার পদপ্রান্তে। ঠিক এমুহুর্তে হাজির হলো একটি লাল মোটর কার। চারদিক থেকে চারজন ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। লাল মোট গাড়ি থেকে বের হলো লাল পোশাকে আচ্ছাদিত একটা লাল মানুষ। হায়েনাটির মনে হলো, মানুষটির পরনে কোন কাপড় নেই। তার কোন হৃদয়ও নেই। হয়ত মানুষটি কোন দিন সূর্যের আলো দেখেনি। জোøারাতও তার নজর কাড়েনি। চাঁদের আলোয় ভেজেনি তার শরীর। মানুষটি হেঁটে হেঁটে একটি বিরাট অট্টালিকায় প্রবেশ করলো যা আকাশ ছুঁয়েছে। মানুষটা একটা উঁচু আসনে বসলো যা মানুষের হাড় আর খুলি দিয়ে তৈরী।
আরো একটু পরে হায়েনাটি একটা রোমহর্ষক দৃশ্য দেখল। অট্টালিকার ভেতর একটা খুঁটিতে একজন মানুষ বাঁধা আর পাশেই রাম-দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা মানুষ। মানুষটা রাম-দার এক কোঁপে বাঁধা লোকটার একটা হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো তার আর্তচিৎকারে। কাটা হাতের দিকে তাকিয়ে লাল মানুষটা তা কামড়াতে শুরু করল। হায়েনাটি ভয়ার্ত চোখে দৃশ্যটি দেখে নিজের মনে বলে উঠল, “আমার অনেকদিন মাংস খাওয়া হয়নি, আর এখানে মানুষ মানুষের মাংস খাচ্ছে...।”
হায়েনাটি অস্থির হয়ে ছুঁটতে লাগল। ছুঁটতে ছুঁটতে থমকে দাঁড়ালো মাঝপথে-কতগুলো মানুষ একজন লম্বা চুলের মানুষকে রাস্তা দিয়ে টেনে হিচঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। লম্বা চুলের মানুষটার বসন আলগা হয়ে পড়েছে। কালো পিচের রাস্তায় বয়ে গেছে রক্তের চোপ। লম্বা চুলের মানুষটার আর্তনাদ ঢেকে গেলো মানুষগুলোর আদিম উল্লাসে। হায়েনাটির প্রাণ হাঁসহাঁস করতে লাগল। সে প্রাণপণে ছুঁটতে লাগল। তার চোখে বিস্ময় ও প্রশ্নের চিহ্ন। শহরের শেষ প্রান্তে এসে হায়েনাটি নিজের দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। এবং একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমার স্বজাতি অনেক উত্তম ছিল। এসব দানব মানুষদের র্কীতিকলাপ দেখে বেঁচে থাকতে লজ্জা হচ্ছে...। তাই কবর খুঁড়ছি।”
Monday, September 15, 2025
গল্প- ঠান্ডা রক্ত বা এনআরসির দিনে প্রেম by মিথিলেশ ভট্টাচার্য

যতীনের লাল রঙের সেকেন্ডহ্যান্ড ফিয়াট গলিমুখে পড়ে রোজকার মতো ক-মুহূর্ত স্থির ও সতর্ক, রাস্তার দুপাশের পথচারী ও ছোট-বড় গাড়ির সম্ভাব্য আনাগোনার ব্যস্ততায়, আর সে-সময় ওর দৃষ্টি পড়ে সিক্তার ওপর বা গলিমুখে সিক্তার খানিক ফুটে ওঠা তার চাতকদৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে নেয়। আর ওদিকেও, সিক্তার লম্বাটে ফেসিয়াল করা মসৃণ চেহারায়, রক্তরাঙা ঠোঁটে স্মিত হাসির ঝিলিক -।
গাড়িটা রাস্তার ওপাশে নিয়ে গিয়ে চালক সাজু সিক্তার সামনে দাঁড় করায়। ওকে নিতে হবে বিলক্ষণ জানে সে। যতীন দরজা খুলে যথারীতি সিক্তাকে আহ্বান করে : এসো! আজ আবার ওর সঙ্গে একটু জরুরি দরকারও আছে তার। তবে এক্ষুনি কথাটা বলে আবহাওয়াকে ভারী করতে চায় না সে।
এই যে সিক্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, তা কিন্তু রোজ রোজ ঘটে না। মাঝেমধ্যে সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় সিক্তার সঙ্গে গলিমুখে বা রাস্তার পাশে দেখা হলে যতীন অবশ্যই তাকে তুলে নেয় গাড়িতে। যে-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে সিক্তা, তা বড়জোর দুই কিলোমিটার দূর এবং এটুকু পথ তাকে প্রায়ই দশ টাকা অটোভাড়া খরচ করে পাড়ি দিতে হয়। মাসের মধ্যে দু-চারদিন যতীন গাড়িতে লিফট দেয় তাকে।
ওদের দুজনের পরিচয় দেখতে দেখতে বেশ কবছর হয়ে গেল। মুখোমুখি গলির বাসিন্দা হলেও দুজনের মধ্যে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা কিছুই হয়তো হতো না। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই তো বছরের পর বছর পরিচিত মুখ হয়েও অপরিচিত থেকে যায়। যতীন আর সিক্তার মধ্যেও ওরকম সম্পর্কই হতো যদি না এক নেমন্তন্নবাড়িতে সিক্তার তার প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠা, পাশে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ আচরণভঙ্গি, স্মিত হাসির বাক্সময় দৃষ্টি ওসব চোখে না পড়ত। এখন যতীনের মনে হয়, হঠাৎ করে তার প্রতি ওরকম মনোযোগী হয়ে ওঠেনি সিক্তা। ব্যাপারটি নিশ্চয় বহুদিন থেকেই ওর মনের কোনো অতল কোণে জন্মেছিল, যার প্রকাশ ঘটে নেমন্তন্নবাড়ির খোলা পরিবেশে।
নেমন্তন্নবাড়িতে খাবার পর মুখ ধোয়ার জায়গা করা হয়েছিল মেইন রোডের পাশে। দু-তিনটি বালতিতে জল ও কয়েকটি মগ রাখা ছিল। যতীন যখন মগ নিয়ে হাতে জল ঢালতে যাবে, তখন একটু চমকে দেখতে পেয়েছিল পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো সিক্তাও তার সুডৌল হাতটি ধারার নিচে পেতে দিয়েছে। ওর শ্যামলা চেহারায় স্মিত হাসির ঝিলিক।
তারপর থেকে পথে কোথাও দেখা হলে বা হঠাৎ করে দুজন মুখোমুখি পড়ে গেলে সিক্তার হাসিমাখা ঝলমলে চেহারা ও কৌতূহলী দৃষ্টি যতীনকে সবিশেষ আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে দিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পথচলতি অন্যমনস্ক তার দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টির সিক্তাকে হঠাৎ লক্ষ করে অবাক যতীন খুব উৎফুল্লও বোধ করেছে।
এবং তারপরের ঘটনাক্রম দিয়েই আজকের এই কাহিনির শরীর তৈরি হয়েছে।
গলিপথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে এসে তেল নেওয়ার জন্য সাজু গাড়ি ঢোকাল সত্যম পেট্রল পাম্পের প্রশস্ত চত্বরে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পাম্পের এপাশ-ওপাশ একপলক চেয়ে দেখে সিক্তা যতীনকে বলে, এনআরসির ফরম ফিলাপ করেছেন?
না। করিনি এখনো। অবহেলা-মেশানো উদাস সুরে বলে যতীন।
আমাদেরটা হয়ে গেছে -। ভারমুক্ত কণ্ঠে বলে সিক্তা।
তাই, কে করেছে? এবার একটু আগ্রহের গলায় জানতে চায় যতীন।
কে আবার, বাবা নিজেই করেছে।
তোমার বাবা ওসব জানেন?
জানে তো। পাড়ার বেশকজনকে হেল্পও করেছে।
কিন্তু ফরমের অনেক কলম তো আমার কাছে বেশ কনফিউজিং লেগেছে, – দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে যতীন।
তাহলে বাবার কাছে চলে আসুন!
বলছ – ? যতীন সিক্তার চোখে চোখ রাখে।
হ্যাঁ। বাবা বুঝিয়ে দেবে আপনাকে – উৎসাহের সুরে বলে সিক্তা।
ঠিক আছে যাব। তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও তো, – প্যান্টের পকেটে হাত ভরে নিজের মোবাইল বের করে আনে যতীন। অনেকদিন থেকেই একান্তে কথা বলার অভিপ্রায়ে সিক্তার মোবাইল নম্বরটা জানার সুতীব্র কৌতূহল তার। কিন্তু সেরকম সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হাতের কাছে সুযোগ এসেছে। ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করে যতীন।
হাতের মুঠোয় ধরা নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সিক্তা বলে, আমারটা কেন, ঘরের ল্যান্ড নম্বর দিচ্ছি, পাশে আমার নামটা লিখে রাখবেন – !
এ-কথা শুনে একটু দমে যায় যতীন। ওর নম্বরটি দিতে চাইছে না কেন। ঠিক আছে, বলো, – মিয়ানো কণ্ঠে বলে যতীন।
আচ্ছা, সিক্তা নিজের মোবাইল নম্বরটি দিতে চায় না কেন, ওর কি যতীনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ইচ্ছা করে না? তবে তাকে দেখতে পেলে কেন হাসিমুখে সাড়া দেয়, নির্বিবাদে চড়ে বসে গাড়িতে? যত দুর্বলতা তো ও-ই দেখিয়েছিল প্রথমে। তবে কি যতীনের মতো মধ্যবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে সিক্তার ওরকম আচরণ? সুঠামদেহী, সুদর্শন যতীনের রূপই ওকে শুরু থেকে পতঙ্গের মতো আকর্ষণ করেছে, এখন হয়তো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হয়ে ক্রমে মোহভঙ্গ হচ্ছে ওর!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীনের ঘন শিহরণ ফড়িঙের ডানার মতো চঞ্চল মনে সহসা কিম্ভূত সব শব্দ ও ভাষায় আকীর্ণ এনআরসি ফরমের কথা মনে পড়ে। কারো সঙ্গে ভাগ করতে ইচ্ছা করে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা সব চিন্তা ও প্রশ্নের আঘাতকে। পাশে বসে থাকা সিক্তার দিকে একপলক তাকায় যতীন। ও কি ওসব চিন্তা ও প্রশ্নের সুবিচার করতে পারবে?
পিতৃ-মাতৃ কেন, মুরব্বি কেন? কী ধরনের বাংলা শব্দ ওগুলো? পিতৃ-মাতৃর মতো তৎসম শব্দ তো বাংলায় ব্যবহার হয় না। আর আঞ্চলিক সিলেটি শব্দ ‘মুরব্বি’ তো শিষ্ট ভাষায় কেউ লেখে না। ‘প্রাতিষ্ঠানিক মুুরব্বি’, ‘আইনি অভিভাবক’, ওরকম ক্লিশে শব্দবন্ধ কেন? কথাগুলো ভেবে মনে মনে বেদনাবোধ করেছে যতীন। এনআরসি নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত যে, ওসব কথা নিয়ে ভাবনার, কথা বলার অবকাশ কারো নেই!
বলবে কি সে-কথাগুলো সিক্তাকে, ও কি বুঝতে পারবে তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও বেদনার গূঢ় কারণ? সিক্তা তো একশভাগ বাঙালি। ও কি খবরের কাগজ পড়ে, নিজের ভাষা নিয়ে ভাবে? ওকে দেখলে কিন্তু ওরকম মনে হয় না। দেখেছে সে বর্তমান প্রজন্মকে, সবাই জীবিকা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে তাকানোর মতো অবকাশ নেই যেন। আসন্ন অস্তিত্ব-সংকট যে কত গভীর ও ব্যাপক সে-সম্পর্কে সবাই কেমন অজ্ঞান, উদাসীন!
পাম্প ছেড়ে পথে বেরোতেই ওপারের একটি দোকানের শোকেস আড়াল বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ে যতীনের : এখানে এনআরসির জন্য ফটো তোলা হয়। শুধু এই দোকানটিই নয়, শহরের যত্রতত্র এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। যতীনের নিজের পাড়ায় নিজামের দোকানের একটি বিজ্ঞাপন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : এখানে বিনামূল্যে এনআরসির ফরম ফিলাপ করা হয়। সৌজন্যে, হরেকেষ্ট দাস। অতিপরিচিত রাজনৈতিক পার্টির সক্রিয় সদস্য!
এনআরসির ফরম সংগ্রহের দিনের একটি ঘটনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে যতীনের। সেদিন দুপুরবেলা সেও অন্যদের মতো পাড়ার ক্লাবঘরে গিয়েছিল ফরম আনতে। নানা বয়সের পরিচিত মহিলা ও পুরুষে ক্লাবঘর গমগম করছিল। ভিড়ের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, পাড়ার সম্মানিত বাসিন্দা উমাপদবাবুও লাঠিহাতে হাজির ছিলেন। সরকারি কর্মচারী যারা টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কাজ করছিল, তিনি সেখানে ফরম হাতে নিয়ে সহসা কাঁপা-গলায় আবেগভরা সুরে অতিবিখ্যাত কবিতার দুটি লাইনের একটি শব্দ বদল করে আবৃত্তি করে উঠেছিলেন :
কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে
কভু পার্টিশন-বিষে (আশী বিষে) দংশেনি যারে!
ভেতরের সুতীব্র মর্মবেদনার এমন মোক্ষম বহিঃপ্রকাশ যতীনকে আমর্ম কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি, সাপের বিষ যেমন লহমায় গোটা শরীরে ছড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়; পার্টিশন বিষও তো তেমনি লাখো কোটি লোকের এমনই দশা করেছে। যে ভয়ংকর কূটাঘাত ছিন্নমূল মানুষকে শুধু শুধু তাড়িয়ে মারছে – !
লক্ষ করেছে যতীন, এনআরসি নিয়ে শহর-গ্রামে তুমুল উথালপাথাল, হইহই কা-, আতঙ্ক, এমনকি আত্মহননের মতো চরম দুঃখজনক ঘটনা! জীবন-জীবিকা নির্বাহের রক্ত জল করা-বিবিধ কাজকামের ভেতরে, অবকাশ যাপনের স্বল্প অবসরে উচ্চ-নিচ সবার একমাত্র চর্চা এনআরসি। এই ভূম-লে লাখো মানুষের বর্তমান অস্তিত্বের অমোঘ নিয়ন্তা হয়ে যেন দেখা দিয়েছে এনআরসি। বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া সবাই আগপাশতলা তটস্থ ওই একটিমাত্র বজ্রনির্ঘোষের দোর্দ-প্রতাপে!
ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রি করা পাটভাঙা জামাকাপড় পরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটছে এনআরসির জন্য ফটো তোলার তাগিদে, ফরম ফিলাপের জন্য হন্যে হয়ে একে-তাকে অনুনয়-বিনয় করতে বা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বাংলায় ছাপা ফরম দেখে বিরক্ত। ইংরেজিতে হলেই যেন ভালো ছিল – এরকম মনোভাব। নিজের মাতৃভাষা যে-লোক ভালো জানে না, সে আবার ইংরেজিতে কেমন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, ভেবে পায় না যতীন!
এনআরসির জন্য ফটো উঠিয়েছেন যতীনদা? সিক্তা কৌতূহলী সুরে যতীনকে শুধায়।
না। এখনো উঠাইনি। তুমি – তোমরা?
আমি এখনো ফটো তুলিনি। বাবা আর মা একসঙ্গে গিয়ে ফটো উঠিয়ে এসেছে গতকাল।
সিক্তা এখনো ফটো তোলেনি জেনে হঠাৎ করে যতীনের মনে একঝলক রোমান্টিক হাওয়া ওঠে। সে সিক্তার দিকে তাকিয়ে ঝটিতি প্রস্তাব দেয়, এখন ফটো ওঠাবে নাকি?
এখন? একটু বিস্ময়ের কণ্ঠে বলে সিক্তা।
হ্যাঁ, এখন! উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে যতীন। তাদের যৌবন-বয়সে তো ওরকম ছিল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে যুগলে ফটো তোলা। সিনেমাহলের অন্ধকারে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখা, হাতে হাত রাখা, কখনো-বা প্রেমিকার উন্নত বুকে কনুই দিয়ে চকিত সুখস্পর্শ, – কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীন আড়চোখে সিক্তার সুডৌল স্তনের দিকে তাকায়। ক্লিভেজের আলো-আঁধারে মুখ গুঁজতে বড্ড সাধ হয় মুহূর্তে।
এখন তো অফিসে যাব, পরে ওঠাব। সিক্তা যতীনের প্রস্তাব এড়ানোর চেষ্টা করে।
এখন হলেই তো ভালো ছিল, দুজনে একসঙ্গে ফটো ওঠাতাম।
ফটো তো সিঙ্গল ওঠাতে হবে -। সিক্তা সামান্য হেসে বলে।
জানি। তবে তোমার সঙ্গে একটা ফটো ওঠানোর বড্ড ইচ্ছা। এরকম সুযোগ তো সবসময় হবে না।
কেউ যদি দেখে ফেলে?
দেখবে কেন, নিজের কাছে রেখে দিলেই হবে।
না না। মা সবসময় আমার ব্যাগ খুলে দেখে, আপনার সঙ্গে ফটো দেখতে পেলে হাজারটা প্রশ্ন করবে! একটু ভীতু সুরে বলে সিক্তা।
ঠিক আছে, ফটোটা না হয় আমার কাছেই থাকবে। যতীন নাছোড়বান্দা।
আপনার ঘরেও তো লোক আছে দেখার, তখন? সিক্তা যতীনের স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে কথাটা বলে।
তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব। যতীন প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে।
ঠিক আছে, তবে আজ না, আরেকদিন -।
আরেকদিন কবে হবে। যতীন ঈষৎ হতাশ গলায় বলে।
খুউব শিগগির – সিক্তা হালকা হাসে।
সত্যি বলছ তো? সন্দিগ্ধ সুরে যতীন প্রশ্ন করে।
আরে বাবা বললাম তো, – আচ্ছা, আপনি লিগ্যাসি ডাটা জোগাড় করেছেন – ? সিক্তা দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যায়।
ওসব জোগাড় হয়ে গেছে। লিগ্যাসি ডাটা, পুরনো ভোটার লিস্ট, মাইগ্রেশন কার্ড – শেষের দুটি নথির কথা উচ্চারণ করেই বেশ ক-মুহূর্তের জন্য দূরমনস্ক হয়ে পড়ে যতীন।
ভোটার লিস্টে কত পুরনো পরিচিত সব নাম! নামগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে যতীনের স্মৃতিতে বহুকালের পুরনো পাড়ার শান্ত-সুন্দর ছবি ভেসে উঠেছিল। সে-সময়ের কত কত নামিদামি নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, খেলোয়াড়, সমাজসেবকের নাম পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল যতীন। সেই সোনার দিনকাল আর সহজ-সরল লোকেরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিল সে ‘উদ্বাস্তু তালিকাভুক্ত ফরম’ নামক সেই পোকায় কাটা কাগজখানা দেখে। কী যে মায়া হচ্ছিল তার! বাবার নাম, মায়ের নাম, দিদি ও দাদার নাম, ছোটভাইয়ের নাম – সব মৃত মানুষ মুহূর্তের তরে জেগে উঠেছিল যতীনের চোখের সামনে। পরম মমতায় নামগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছিল সে, যেন একদার ফেলে আসা দেশ-বাড়ির শরীর হাতড়াচ্ছিল। এক দেশের মাটিতেই এপার-ওপার – লাখো কোটি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল; আজো ওই ছোটা বিরামহীন – !
----দুই----
আর অল্পদূর এগোলেই সিক্তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওখানে সে নেমে যাবে। কিন্তু যতীন ওর সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। কেন জানি আজ ওর পাশে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। যদিও সিক্তার মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। যতীনের দেখা পেলে, সঙ্গ পেলে সিক্তা বেশ উৎফুল্ল হয়, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। তবে শুধু ওটুকুই, এর বেশি গণ্ডি পেরোতে চায় না সিক্তা। অথচ আগল ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই ছিল উপযুক্ত সময় – ভাবে যতীন। চারদিক এনআরসির ঝড়ে ল-ভ-। বিভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষ। কোনোদিকে দৃষ্টি স্থির করে তাকানোর অবসর নেই কারো। সে আর সিক্তা এই উথালপাথাল সময়েই তো ভেসে যেতে পারে উন্মাদ প্রেমের জোয়ারে। যদিও এ-মুহূর্তে ভাবনাটা খুবই স্বার্থপরের মতো, তবু ভেতরে জেগে ওঠা বিপুল প্রেমের আবেগকে কীভাবে বাগ মানাবে যতীন – !
আমি আজ তোমার ওখানে যাব ভাবছি – সহসা বলে ওঠে যতীন।
কেন – ? সিক্তা সপ্রশ্ন-দৃষ্টিতে তাকায় যতীনের মুখের দিকে।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে যতীন সিক্তার দিকে দুদ- স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু সুরে বলে, জানো, ইদানীং আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছে – !
কী রকম?
কাউকে কথাটা বলিনি এখনো। একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে যতীন।
আমাকে বলতে পারেন, যদি আপত্তি না থাকে।
আপত্তি কেন হবে, আমার কাজটা যে তোমার ওখানেই, শুধু ভাবছি কথাটা তুমি বিশ্বাস করবে কি না – !
বলেই দেখুন, বিশ্বাস করা না করা তো পরের ব্যাপার -।
জানো, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি আমার শরীরের কোথাও কেটে গেলে যে-রক্ত বেরোয় তা বেশ ঠান্ডা – !
ঠান্ডা? প্রশ্নের ঢংয়ে ঈষৎ চমকের সঙ্গে শব্দটা উচ্চারণ করে সিক্তা।
ভাবছি শরীরের ভেতরে কোনো বড় রোগ বেঁধে গেল কি না! ভয় ও চিন্তা-মেশানো সুরে বলে যতীন।
এ-কথার পিঠে চট করে কোনো কথা না বলে সিক্তা যতীনের বিষণœ ও গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছুদিন আগে নারকেল কাটতে বসে হঠাৎই দায়ের কোপ পড়ে যায় আমার বাঁহাতের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। আমি ডানহাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরি। আর তখনই টের পাই রক্তটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা – ! শুধু ওই হাতই নয়, আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা হোঁচট লেগে ফেটে যায়, তখনো লক্ষ করেছি রক্তটা বেশ ঠান্ডা – !
সিক্তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। সে নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে যতীনের দিকে।
এতদিন তো জানতাম ব্যাঙের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের শরীরের রক্ত তো সবসময়ই গরম আর এখন তো পরিস্থিতির চাপে আরো বেশি গরম, আমার শরীরের রক্তও তো বেশি গরম হওয়া উচিত, কী বলো – । জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে – !
থামে যতীন। গাড়ির জানালাপথে বাইরে তাকায়।
তারপর আবার সিক্তার দিকে ফিরে সামান্য উত্তেজিত গলায় বলে, মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয় জানো সিক্তা, ওই যে লোকগুলো সব এনআরসির জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে, ওদের রক্তও কি আমার মতো ঠান্ডা, সবাইকে ধরে ধরে পরীক্ষা করলে কেমন হয় – !
Wednesday, July 30, 2025
চারুশিল্প- রশীদ আমিনের রং-রাগ by শামসেত তাবরেজী
সাধারণত আমরা যখন গ্যালারিতে ছবি দেখি, আমাদের চোখের ডগায় মগজ বেঁধে নিতে হয়, কিছুটা বুদ্ধি খরচের ক্লেশ হয়, যদিও তার স্বাদ আরেক মাত্রার। আমিনের ‘মেঘমল্লার’ শিরোনামের এই সিরিজের ছবিগুলোতে বুদ্ধি-ব্যায়াম না করে শুধু নজরভ্রমণ করেই বর্ষাযাত্রার আনন্দ উপভোগ করা যায়। তবে মেঘমল্লার রাগের মিড়, ঘাটগুলো মনের অজানায় চালান করে দেওয়ার জন্য একটু দাঁড়িয়ে থাকার দাবি রাখে। ছবিগুলো যেমন শান্ত, তেমনি দর্শকও যদি শান্ত হয়ে ছবিগুলো দেখেন, তা আরও বেশি উপভোগ্য হবে।
আমি যতবার ছবিগুলো দেখেছি, ততবারই তীব্র এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি। জলরঙের ছবিগুলোর উৎসভূমি আমিনের জীবনেরই অংশ—টাঙ্গাইলে তাঁর বাড়িটি। এ বাড়ির সঙ্গে সংগত কারণে আমার পরিচয় রয়েছে। ঘন বাঁশবন, ভেতর দিয়ে নানা মাত্রার জ্যামিতি করা বোঝা যায়, বোঝা যায় না এমতো ফাঁকফোকর, অথচ পটভূমির অধিকাংশ জায়গাজুড়েই ঘনবদ্ধ পীতাভ সবুজ, কখনো আবার হঠাৎ হলুদ লাগা নরম আলো, নীল ঢেউয়ের সহজ গতির উচ্ছ্বাস।
আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, আর্দ্রতাঘন জমিনের সারল্যকে সহজ রেখা দিয়ে বিভেদরঞ্জিত করেছেন আমিন। ছবির জমিনের ওপর মূল রেখাগুলোর বেশির ভাগ রেখাই এঁকেছেন উল্লম্ব। এতে বর্ষার প্রকৃতি আরও গাঢ় হয়ে ধরা পড়েছে। যখন আমরা দেখি এই উল্লম্বতা ভেঙে ছবিকে ছন্দ দিতে এবং দৃশ্যব্যঞ্জনাময় করার তাগিদে মোটা তুলিতে দৈগন্তিক রেখা টেনে ছবির জ্যামিতিকে সুবিন্যস্ত করেছেন, তখন আনন্দ আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। বৃষ্টিসিক্ত বাংলার এই প্রকৃতিরূপ দেখার সৌভাগ্য হলো অনেক দিন পর।
প্রিন্ট মাধ্যমটি মনে হয় এই আর্দ্রতাস্বভাবকে খুব গ্রাহ্য করে না, কিন্তু শিল্পীর দক্ষতায় সবুজের সঙ্গে মিল খাওয়া অন্যান্য রং বা রঙের স্তরপরম্পরার এই ছবিগুলোও বর্ষাকে ধারণ করে রোমান্টিকতায়, যদিও তা অত পেলব নয়, বরং দার্ঢ্য, যেন বেশ কয়েক দিন বিরামহীন বৃষ্টির পর সামান্য সময়ের বিরতি পেয়েছে। জলরঙের ছবিগুলো ঠিক যে কথা বলতে চায়, প্রিন্টগুলো ঠিক তা-ই বলে না। ফলে, আমরা বর্ষার বৈচিত্র্য বা দ্বন্দ্বও খানিকটা ছুঁয়ে ফেলতে পারি। এই দ্বন্দ্ব ঠিক বিরোধ নয়, বরং সহোদরার মতো, দুই বোনের চেহারা নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে আলাদা। এখন এই বিষয়টা নির্ভর করবে গ্যালারিতে একাধিক মাধ্যমের ছবিগুলো কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হবে বা হয়েছে, তার ওপর।
আমিন তাঁর ছবিতে বহুবিচিত্র রং ব্যবহার করেননি। গাঢ় বঙ্গীয় সবুজ, কদম-আভাষিত হলুদ, নরম রোদের কমলা, স্মৃতিকাতর নীল—মোটামুটি এই তাঁর রংবাহার। সেসব রং প্রযুক্ত হয়েছে খুব যে নিপুণ ড্রয়িংয়ে, তা নয়, আমার বিবেচনায় বর্ষার শুদ্ধ মূর্ততাকে তিনি হাজির করেননি ইচ্ছা করেই। বরং রোমান্টিক থরথরতা, বিনয়ী অপটুতা বরং ছবিগুলোকে এবং বর্ষাকে অধিকতর প্রকাশসম্ভব করে তুলেছেন এক বিরল বিমূর্ত শর্তে। দরকার শুধু দর্শকের চিদ্মুহূর্তের জন্য ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য সময় দেওয়া। অনেকটা আলোকচিত্রী কার্তিয়ার ব্রেসঁ যেমন বলেন ‘নির্ধারক মুহূর্ত’, তার জন্য অপেক্ষা করা। কেননা, নিবিড় সময়-বিরতিই রতিসংক্রমণের মুহূর্তটি এনে দেয়, যেহেতু আমিনের ছবি শুধু দেখার নয়, শোনারও। যেন ভীমসেন জোসির কম্বুকণ্ঠে মেঘমল্লারের সুর: গরজে ঘটা ঘন কারে রি...।
![]() |
| ‘মেঘমল্লার ১’,শিল্পী: রশীদ আমিন |
Sunday, June 15, 2025
গল্প- তুমি মরো আমি বাঁচি by মঞ্জু সরকার

এতো কাছে থেকে মানুষকে আগে মরতে দেখেনি রহিমা। শাশুড়ি সাড়া না দেওয়ায় গায়ে হাত দেয়, নাকের ওপর হাত রেখে নিশ্চিত হয়, বুড়ির প্রাণপাখি এইমাত্র তার চোখের সামনেই উড়ে গেল! আর এমন এক সময়ে শাশুড়ির অন্তরাত্মা দেহছাড়া হলো, বাড়িতে যখন সে ছাড়া উপস্থিত নেই কেউ। এখন তার কী করা উচিত? রহিমা মৃতার চোখদুটি বুজিয়ে দেয় আলতো স্পর্শে।
বড়বাড়ির মুরবিব মরবে, বয়স হয়েছে, রোগে-দুর্ভোগে বিছানায় পড়ে থাকার বদলে এখন মরলেই তার শান্তি। সবাই জানত এবং এরকম বলাবলি করত। কিন্তু আজ সকালেও তো লাঠি ঠুকঠাক করে উঠানে হেঁটে বেড়িয়েছে মানুষটা। বাথরুমেও গেছে একা। রহিমা যথারীতি তার ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। মিষ্টিকুমড়ার ঘ্যাঁটে স্বাদ বাড়াতে কয়েক টুকরা বাসি মাংস দিয়েছিল সে। বেছে বেছে বুড়ির জন্য এক টুকরা হাড় দিয়েছিল আজ । দাঁতে অসমর্থ মানুষটাকে শক্ত হাড্ডি দেওয়ার সময় ফোকলা মুখে-গলায় হাড় আটকে তার মরণ কামনাও মনে উঁকি দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু রহিমার মনে শুধু হিংসের বিষ নয়, হাড্ডিটা পেঁচিয়ে এক পোঁচ মাংসও ছিল এবং দেখেশুনেই দিয়েছে রহিমা, বুড়ি যাতে খেতে পারে। জোহরের নামাজ পড়ে ভাতও খেয়েছে বুড়ি। খাওয়ার পর বিছানায় যেমন গড়ায়, আজো শুয়ে ছিল।
শাশুড়ির এঁটো থালাবাটি আনার জন্য ঘরে ঢুকে রহিমা হিক্কার আওয়াজ শুনে তার বিছানার দিকে এগিয়ে এসেছে, শেষ কথাটি শোনার জন্য তার মুখের ওপর ঝুঁকেও ছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজগুবি মরে গেল মানুষটা! চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মরণ দেখে বুকের ভেতরে নিজের আত্মাটাও ধকধক করছে। এখন রহিমা কী করবে? নির্জন বাড়িতে শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী হতে চায় না সে। লোকে বলবে, ছোটবউ খোঁজখবর নেয়নি, যত্নআত্তি করেনি ঠিকমতো। খাবারে বিষ মিশিয়ে হাড়-জ্বালানি শাশুড়িকে মারার চিন্তা যেহেতু তার মনেও এসেছিল, সন্দেহটা জাগতে পারে বুড়ির সন্তানদের মনেও। শকুনিবুড়ির জান নিতে আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার ফরিয়াদ জানিয়েছিল রহিমা। তার নীরব প্রার্থনা আল্লাহ না শুনুক, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বুড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের কানে না যাক, মনের খবর বুড়ির ছোট ছেলে তথা রহিমার গুণধর স্বামী ঠিকই জানে এবং সমর্থনও করেছে অনেক সময়, বউয়ের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সুখ নিষ্কণ্টক রাখার গরজে। কিন্তু এখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেলে স্বামী আজ খুশি হওয়ার বদলে নির্ঘাৎ অভিযোগ করবে, মায়ের শরীর খারাপ তো আমাকে ফোন দাওনি কেন?
রহিমা এক ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্বামীর নম্বর টেপে। সাধারণত স্বামীকে প্রতিটি ফোনকলে কানে পাওয়ার সময় শহরে তার অবস্থান নিয়ে মনে নানারকম সন্দেহ জাগে; কিন্তু আজ ফোন ধরতে বিলম্বের মুহূর্তগুলোতে মোটরসাইকেলে স্বামীর কোমরজড়ানো সন্দেহজনক নারীকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পায় এবং ভয়কাঁপা কণ্ঠে খবরটা জানায় সে, ‘আম্মাজান কেমন যেন করছে! একজন ডাক্তার নিয়া জলদি আসো বাড়িতে।’
‘মা কেমন মানে কী করছে? আমি তো সকালেও ভালো দেখে আসলাম। শবরি কলা আর গ্যাসের ঔষধ নিতে কইছে, রাতে নিয়া যাবখন।’
মায়ের কলা খাওয়ার দিন শেষ হওয়ার খবরটা চেপে রাখায়, অব্যক্ত সত্যের ভারে স্বামীকে দেওয়া ধমকটাও এবার ভারি হয়ে ওঠে, ‘যা বললাম তাই করো আগে, আমি দেখি এদিকে।’
বজ্রপাতের মতো খবরটা গোপন রেখে নির্জন বাড়িতে একা স্বাভাবিক থাকতে পারে না রহিমা। মৃত্যুর অসহ্য চাপ এড়াতে জীবন্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে বালকপুত্রকে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও রুম্মান, বাবা রুম্মান! খেলতে কোথায় মরতে গেছিস হারামজাদা?’ রুম্মানকে খুঁজতে খুঁজতে রহিমা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার দিকে যায়। ছেলের বদলে রাস্তায় বুড়ির সেবায় নিযুক্ত কাজের মেয়ে পড়শি জামেনাকে দেখতে পায়। জামেনা রোজ তিন-চার বেলা আসে এ-বাড়িতে। আজ সকালেও এসেছিল, বুড়ির গোসলের পানি রেডি করে দিয়েছে, কাপড় কেচে দিয়ে পানসুপারিও পিষে দিয়ে গেছে।
‘ও জামেনা, জলদি আয় তো বাড়িতে। আম্মাজানের কী হইল, দেখ তো আসি।’
‘খানিক আগেই না বুড়ির জন্য পানসুপারি পিষে দিয়া গেইনু চাচি!’
হামানদিস্তায় বুড়ির পানসুপারি বেটে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে জামেনার নিজেরও পানটা খাওয়া চলে। কিন্তু আজ একটাও সুপারি অবশিষ্ট ছিল না বলে বুড়ির পেশা সুপারি একটু মুখে দিয়েছে। বুড়ো মানুষের পেশা সুপারি খেয়ে মোটেও তৃপ্তি হয় না। এখন সাবান কেনার পয়সার সঙ্গে একটা পান খাওয়ারও মতলব নিয়ে দোকানের দিকে যাচ্ছিল সে, বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছাতেও বড়বাড়িতে ঢোকে আবার।
বুড়ির ঘরে ঢোকার আগেই, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে জামেনা, ‘ও দাদি, গুয়াপান খায়া মন ভরে নাই? তোর লাঠির ঠুকঠকানি আর উড়ুনগাইনের ঢকঢকানি না শুনলে ছোটবউয়ের খালি মরার চিন্তা আইসে।’
অতঃপর ঘরে ঢুকে বিছানায় মৃতাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে পানের গন্ধও পায় জামেনা, মুখের কোণে রক্ত-পিত্তের মতো লোল গড়িয়েছে, ওই দুর্গন্ধ রসটুকু ছাড়া বুড়ির শরীরে প্রাণের কোনো সাড়া না পেয়ে জামেনাই প্রথম বিস্ময়কাঁপা গলায় ঘোষণা করে, ‘ও আল্লা রে, বুড়ি না মরি গেইছে! মুখ থাকি এলাও মোর পেশা গুয়ার গন্ধ বারায়! হায় আল্লা, কোনবেলা কেমনে মরল চাচি? ও আল্লা রে!’
টেবিলের ওপর ভাতের পেস্নটবাটি দেখে জামেনা আবারো মৃতার জ্যান্ত দশা সম্পর্কে আগ্রহ দেখায়, ‘ভাত খায় নাই এলাও?’
ছোটবউয়ের রান্না খাওয়ার পরই ভালো মানুষটা আজ মরে গেল কেন? এমন প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রহিমা দিশেহারা শোকের মাঝেও অনুভব করে জামেনার ওপর পালটা অভিযোগ চাপায়, ‘তোর জর্দা দেওয়া পানসুপারি মুখে নিয়া আম্মাজান আইজ মরি গেল ক্যানে?’
শোকের আবেগে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো স্বামীর কানে খবরটা কোনোমতে ছুড়ে দেয় সে, ‘আম্মাজান আর নাই!’
স্বামীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা উঠানে ছুড়ে দেয় রহিমা, তারপর শাশুড়ির আত্মা যে আসমানে উড়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে, ‘ও আল্লাহ রে! বড়বাড়ি ধুয়া করিয়া হামার আম্মাজান মরি গেল রে!’
এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এটাই রহিমার প্রত্যাশিত প্রথম মৃত্যুশোক যাপন। এখন তার অনেক কাঁদা উচিত, গলা ছেড়ে কাঁদতে না পারলেও শোকের আবেগে দাঁতকপাটি লেগে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত। স্বজনপড়শি সবাই দেখার জন্য ছুটে আসতে শুরু করবে। রহিমার আগে তার মোবাইল ফোনটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মনে হয়, খবরটা অন্তত বড় ননদকে তারই জানানো উচিত। মায়ের খবর নিয়মিত নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনটা ননদই তাকে গিফট দিয়েছে। বুড়ি ফোন চালাতে পারত না, তার ওপর কানেও শোনে কম, এ-কারণে ফোনের সঙ্গে মায়ের পক্ষে মোবাইল-অপারেটরের চাকরিটাও দিয়েছিল ননদ। গরিব পড়শি জামেনাকেও টাকা দিয়ে মায়ের সেবায় নিযুক্ত করেছে সে-ই। জামেনা ননদকে ফোন করার আগে তারই ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে শরীর-উথলানো কান্নাসহ বড় ননদকে কোনোমতে জানায় শুধু, ‘ও আপা, আম্মাজান আর নাই।’ খবরটা দিয়েই সে ফোন হাতে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবার।
ততক্ষণে জামেনাও গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে এবং প্রতিবেশীরাও সরব কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবাই জানে এবং জামেনাও সেদিন ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘বুড়ি মরলে বড়বাড়ির আসল রানি হইবে ছোটচাচি। মাথার উপরে খ্যাচম্যাচ করার জন্য কেউ থাকপে না, ছোটবউয়ের হুকুমেই চলবে সব।’ শোকের মাঝেও এসব কথা মনে করে রহিমার শোকের আবেগ দ্বিগুণ বেগে উথলে ওঠে।
-----দুই-----
মানুষের মরণ যতই নীরবে-নিভৃতে ঘটুক, টাটকা মৃত্যুকে নিয়ে জীবিতদের প্রতিক্রিয়া জীবন্ত হয় তৎক্ষণাৎ। জনবহুল এ-গ্রামটাতে সব বাড়ির নবজাতকের ক্ষীণকণ্ঠের কান্না সবার কানে যায় না, গর্ভবতী মেয়েরা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখে পেটের খবর, কিন্তু কোনো বাড়িতে কেউ মরে গেলে স্বজনদের মড়াকান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গাঁয়ের বাতাস। দিশেহারা গ্রামবাসীও নিজেদের অন্তিম গন্তব্য স্মরণে এলে বিহবল হয়, পরিচিত একজন সেই গন্তব্যে যাত্রা করেছে শুনলেই ছুটে আসে দেখতে।
মড়াকান্না ছাড়াও গ্রামসমাজকে নাড়া দিয়ে ইদানীং ভিড় তৈরির দায়িত্ব পালন করে গাঁয়ের মসজিদের মাইকটি। ঘড়ির টাইম মেনে রোজ পাঁচবার আজান শুনেও শোনে না বে-নামাজিরা, বড়জোর বেলা সম্পর্কে সচেতন হয়; কিন্তু সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করে মাইকটি কারো মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করলেই কান খাড়া করে সবাই। চেনা মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে দেশি ভাষায় মৃতের পরিচয় জেনে মাইকের ইন্নালিল্লাহি রাজিউন দোয়ার সঙ্গেও কণ্ঠ মেলায়।
আজান ছাড়াও মাইকে গ্রামবাসীর ইমেত্মকাল-সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব পালন করে যে মুয়াজ্জিন হামিদুল, সে আসরের আজান দিতে মসজিদে যাওয়ার মুখে বড়বাড়িতে ক্রন্দনরোল শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। বড়বাড়ির বড় অভিভাবক ও গাঁয়ের মুরবিব বৃদ্ধার মৃত্যু-আশঙ্কাটি মনে আসতেই জীবিত বেশে সামনে দাঁড়ায় সে। আজ সকালেও হামিদুল এ-বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ি হাতের লাঠি উঁচিয়ে তাকে ডেকেছিল, ‘আল্লাহর ঘরে আজান দিস, একটা সত্য কথা বল তো আমাকে। এ-বাড়ির সয়-সম্পত্তি উড়িয়া যায় কোথায় রে?’
বুড়ি আসলে মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া জায়গা-জমির বেহাল দশা ও বখাটে ছেলে কাফির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল, ‘শুনলাম, তোর বেটার কাছেও নাকি কাফি ভুঁই বন্ধক থুইয়া দুই লাখ টাকা নিছে, কথা কি সত্য?’
হামিদুল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সমস্যায় পড়েছিল। কারণ টাকা নেওয়ার সময় কাফি সতর্ক করেছে খবরটা মাকে না জানাতে। অথচ গ্রামবাসী সবাই জানে, বড়ভাইদের অনুপস্থিতি এবং বুড়ি মায়ের পক্ষপাতের সুযোগ নিয়ে কাফি একাই পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি যাচ্ছেতাই ভোগ করছে। চাষাবাদ করে বড়বাড়ির গোলাঘর ভরলে কারো কিছু বলার ছিল না, কাফি একের পর এক জমি বন্ধক রেখে নিজের ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড় করেছে। মোটরসাইকেল দাবড়ে রোজ শহরে যায়। শহরে সে কি ব্যবসা করে, নাকি নেশাফুর্তি করে টাকা ওড়ায়, সঠিক কেউ জানে না। তবে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, টাউনে সম্প্রতি সে আরেকটা বিয়েও করেছে, তার মোটরসাইকেলের পেছনে সে-বউকে দেখেছে গাঁয়েরই দুজন শহরবাসী।
বাঁকা কোমর নিয়ে লাঠিভর মেয়েমানুষের পক্ষে বখাটে ছেলের কা-কীর্তি কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তবে কালা কানেও সব খবর বাজে। শাসন করার জন্য ছেলেকে হাতের নাগালে না পেয়ে বউয়ের সঙ্গেও গজগজ করে সারাদিন। হামিদুল সত্যি বললে কাফি রেগে যাবে, আবার মিথ্যে বললে তার বন্ধকের টাকা মার যাওয়ার ভয়। উভয় সংকটে পড়ে জবাব দিয়েছিল সে, ‘আম্মা, এই বয়সে জায়গাজমির খোঁজ নিয়া আর কী করেন। চোখ বুজলে তো বেটারাই খাইবে সব।’
‘হ্যাঁ, বুড়ি চোখ মুদলে ভূঁইয়ার জায়গাজমিও কাগজের মতো বাতাসে উড়ি যাবে রে। বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চোখে দেখবি তোরা, কয়া রাখলাম কথাটা, দেখিস।’
সকালে বুড়িকে দেখার জীবন্ত স্মৃতি মাথায় নিয়ে হামিদুল আজ বড়বাড়ির ভেতরে ঢোকে, আঙিনায় কাফির বউ ও জামেনাসহ পড়শি মেয়েদের কান্নার প্রতিযোগিতা দেখে বৃদ্ধার ঘরেও যায়। বিছানায় শায়িত কাঁথা-মোড়ানো লাশ দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ইন্নালিল্লাহি দোয়া পড়ে হামিদুল, তারপর ছুটে যায় মসজিদে। আজ দেড় মিনিট বিলম্বে আসরের আজানটা দেয়, এবং আজান শেষ হলে মাইকের সুইচ অফ করার আগেই সে দুটি ফুঁ দিয়ে একটি শোকসংবাদ ঘোষণা করতে থাকে : ‘ভূঁইয়া বাড়ির মুরবিব, মরহুম নাসির ভূঁইয়ার স্ত্রী ও কাফি ভূঁইয়ার মাতা এইমাত্র ইমেত্মকাল ফরমাইলেন।’ ইন্নালিল্লাহি পড়ার পর মনে হয়, গ্রামের অনেকেই তার কণ্ঠে খবরটা জানছে ঠিক, কিন্তু বুড়ির প্রবাসী ও শহরবাসী ছেলেমেয়েরা খবর পায়নি এখনো। ছেলেরা সবাই বাড়িতে না এলে মৃতার জানাজা ও কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ জানানো সম্ভব নয়। শুধু শোকসংবাদটি আবারো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করে সে নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত ছয় মুসলিস্নর কাতারে শরিক হয়।
মুয়াজ্জিনের মৃত্যুঘোষণার রেশ এবং মৃতাকে ঘিরে বড়বাড়ির সাড়ম্বর স্মৃতি মাথায় নিয়ে গাঁয়ের নামাজি লোক কয়েকটি আজ আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছে। যেহেতু বড়বাড়ি মসজিদের নিটকবর্তী বাড়ি এবং মেয়েমানুষরা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর জন্য কান্নার আওয়াজ সপ্তমে তুলতে পারে বটে, নামাজে দাঁড়িয়েও বড়বাড়ির মড়াকান্নার আওয়াজ শুনতে পায় মুসলিস্নরা এবং হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও আজ আকুল ও একাগ্র করে তুলতে সচেষ্ট হয়।
মোনাজাতশেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মুসলিস্নরা সবাই আজ বড়বাড়ির দিকে হাঁটে। গাঁয়ের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই ছুটে আসছে বড়বাড়িতে। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম মুখর করে তুলেছে মূলত গাঁয়ের মেয়েরাই। উৎসবের আনন্দে পালাপার্বণে গীত গাওয়ার সুযোগ পায় না তারা, কিন্তু আত্মীয়স্বজনকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়ার সময় কেউ কারো চেয়ে কম কাঁদে না, কান্নাও সুরেলা গীত হয়ে ওঠে অনেকের কণ্ঠে। বাড়িতে মৃতার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির অনুপস্থিতিও পড়শিদের শোক ও কান্নার দায়িত্ব খানিকটা বাড়িয়ে তোলে বটে।
শোকের ঝড়ে সমবেত গাঁয়ের পুরুষরা মেয়েদের মতো কাঁদতে পারে না, ক্রন্দনরত মেয়েদের এড়িয়ে তারা আলাদা ভিড় তৈরি করে। পাথারের ক্ষেতের কাজ ফেলেও ছুটে এসেছে কয়েকজন কামলা। মৃত্যুকে ঘিরে গ্রামসমাজ ত্বরিত সংঘবদ্ধ হওয়ার মূলে মৃত্যুকে ঠেকানোর এবং শোক-সহানুভূতি প্রকাশের আদিম প্রবৃত্তি তো আছেই, সেইসঙ্গে বড়বাড়িতে চটজলদি গ্রামবাসীর ছুটে আসার মূলে তাদের কৌতূহলও কম দায়ী নয়। গ্রামবাসী জানে, নিজের এক ইঞ্চি আবাদি জমি নেই, এমন চাষিমজুরের সংখ্যা গ্রামদেশে নেহায়েত কম নয়। নিজেরা চাষবাস না করেও বড়বাড়ির ভূঁইয়াদের অন্তত পাঁচ হালের জমি এখনো। এমন নিয়ম আইনে টিকলেও আল্লাহর ন্যায়বিচারে টিকবে? স্বয়ং ভূঁইয়ার বিধবা স্ত্রীও বড়বাড়ির সম্পত্তি কাগজের মতো আসমানে উড়ে যাওয়ার কথা বলে গেছে। বুড়ি মরলেই বড়বাড়ি ভেঙে অন্তত বারো টুকরা হবে। নদীতে ভাঙবে না, বানে ডুববে না; কিন্তু এ-বাড়ির সমস্ত জমি গিলে খাবে ওয়ারিশরাই। ছোটছেলে কাফির কা-কীর্তিও যে গ্রামসমাজে নানা গল্প ও প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল, মৃতাকে ঘিরে নানারকম মন্তব্যের মধ্যেও তা ধরা পড়ে।
‘আহা রে, স্বামী মরি যাওয়ার পরও এতকাল লাঠি ঠুকঠুক করিয়া সবাইকে শাসন করছে। বুড়িমা ছিল বলিয়াই এই বাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা হইছে। কিন্তু এখন কে রক্ষা করবে? রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা বুড়িমায়ের সেবাযত্ন দূরে থাউক, খোঁজটাও নেয় নাই ঠিকমতো। আর একজন তো বাড়িতে থাকিয়াও মৃত্যুকালে মায়ের মুখ দেখতে পাইল না! মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়িতে আসতে কতক্ষণ লাগে?’
কাফি ও তার বড়ভাইদের সঙ্গে যাদের ফোন-যোগাযোগ হওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আছে, তারা আগাম সহানুভূতি জানাতে মোবাইল বের করে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর মুয়াজ্জিন হামিদুল সকালে বুড়ির সাক্ষাতের স্মৃতি স্মরণ করে তার শেষ কথাটি সবাইকে শোনায় – ‘আজ সকালেই লাঠি হাঁকে ডাকল মোকে, কানের মধ্যে এলাও বাজে তার গলা, হামদুরে আল্লাহর ঘরে আজান দিস, তোকেও কয়া গেনু শেষ কথাটা। মুই মরতে না মরতে বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চক্ষক্ষ দেখপেন সগাই।’
বৃদ্ধার শেষ কথার সমর্থনে উপস্থিত মানুষগুলো যুক্তি দেওয়ার আগে, মেয়েদের ভিড় থেকে ছুটে আসা এক বালক পুরুষ ভিড়ে উপস্থিত তার বাবাকে খবর জানায়, ‘রুম্মানের মা কাঁদতে কাঁদতে নিজেও মনে হয় মরি গেইছে।’
রুম্মানের মা তথা কাফির বউকে দেখতে পুরুষ ভিড়ের অনেকেই উঠানে কান্নাকুল মেয়েদের দিকে এগোয়।
আঙিনায় রহিমার কান্নায় ততক্ষণে শরিক হয়েছে অন্তত পনেরোজন মহিলা ও শিশু। কান্নার চেয়ে কিছু শিশুর কৌতূহলই প্রবল। তারা ঘরে ঢুকে মৃতাকে দেখে, মৃতাকে ঘিরে একটা মাছি উড়তে দেখেও ভয় পায়। আরেকটি বালক ক্রন্দসী ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে সহাস্য মন্তব্য করে, ‘কাঁদতে কাঁদতে কাঁয়বা পাদি ফেলাইছে রে।’
অন্যরা গলা ছেড়ে কাঁদছে বলে রহিমাকে চেঁচিয়ে কাঁদতে হয় না আর। নিজের কান্নাবিকৃত শরীর আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে, মাটিতে মুখ লুকিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভাবারও সুযোগ পায়। মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেলেই তাকে আবার কান্না শুরু করতে হবে, শোকের তীব্রতায় আবারো দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাতে হবে। কান্না ছাড়া আগামী তিনদিন তার কাজ নেই। গাঁয়ের নিয়মে মৃতের বাড়িতে তিনদিন চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনই রান্না করা খাবার দিয়ে যাবে। বুড়ি কবরে ঢুকতে না ঢুকতে একে একে তার রক্তসম্পর্কের স্বজনরা বাড়িতে আসবে। বড় ননদ হয়তো ফোনে এতক্ষণে সবাইকে জানিয়েছে খবরটা। কিন্তু বুড়ি কবরে আড়াল হলেই কি বড়বাড়ির মাটির ওপরে খাড়া হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন সংসার ফিরে পাবে রহিমা?
বিধ্বস্ত দেহে চোখ বুজে চুপচাপ এসব কথাই ভাবছিল রহিমা। হঠাৎ চেনা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এবং সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জন্য মনকে ভাবনাশূন্য করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে সে।
------তিন-----
বুড়ির দাফন হওয়ার পরও তার কাঁচা কবর ঘিরে বড়বাড়িতে শোকপালন যেন অনেকটা উৎসবে রূপ নেয়। একে একে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়ে। ছোট কাফি ছাড়া বড় চার ভাইয়ের দুজন ঢাকায়, একজন নীলফামারীতে এবং অস্ট্রেলিয়াতেও আছে একজন। মেয়েরাও নানা ঠিকানায় নিজ নিজ স্বামী-সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সপরিবার এসেছে সবাই। দাফন হয়ে যাওয়ার পরও এসেছে এক মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে একা এসেছে কুলখানির দিনে। বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি মাকে না দেখে ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে সবাই, অন্য ভাইবোনরাও শরিক হয়েছে সেই কান্নায়; কিন্তু কান্না ও শোকের পরিবেশ জমাট বাঁধতে দেয় না তাদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই। মৃত্যুশোকে শরিক হয়েও দাদুবাড়ি কি নানাবাড়িতে বেড়াতে আসার মজা লুটতে ছোটাছুটি, খেলাধুলা ও হাসিতামাশাও করে তারা। তিনদিন রান্নাঘর থেকে মুক্ত থাকার কথা ভাবলেও আতিথেয়তার দায় মেটাতে রহিমাকে শাশুড়ির দাফনের পরপরই চুলা জ্বেলে রান্নাঘরেই অনেকটা সময় কাটাতে হয়।
তিনদিন পর মায়ের কুলখানিতে একটি গরু ও চারটি খাসি জবাই করা হয়। পেশাদার মৌলবি-সংকটে বিশজন মাদ্রাসাছাত্র এসে কোরান খতম দেয়। মিলাদ, কবর জিয়ারত ও দোয়া-খায়েরে শরিক হয় গাঁয়ের বয়স্ক সব পুরুষ মানুষ। ভোজনপর্বে শরিক হয় আরো বেশি সংখ্যক। মড়ার বাড়ির মজলিসি খাওয়া-দাওয়ার ভিড় কোলাহল থেমে যাওয়ার পরও বাড়িটির দিকে গ্রামবাসীর মনোযোগ ও কৌতূহল কমে না। কারণ মরে গিয়ে বুড়ি তার ছেলেমেয়েদের বাড়িতে জড়ো করেছে, তার উদ্দেশ্যটা বেঁচে থাকতেই ছোটবউ-ছেলেকে ঝগড়া করে অনেকবার জানিয়ে রেখেছে, সবাই এলে এবার বিষয়-সম্পত্তির ভাগাভাগি হবে অবশ্যই।
মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে যে-ঝগড়াটা অনিবার্য ছিল, ভূসম্পত্তি ঘিরে স্বাভাবিক ঝগড়াঝাঁটি দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল যারা, তাদের অনেকটা হতাশ করে দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঝগড়াটা শুরু হয় আসলে ভাইবোনের পুনর্মিলনীর আদলে। বড়ভাইয়ের আহবানে মায়ের ঘরে জড়ো হয় সব ভাইবোন। বিছানায় ও চেয়ার টেনে বসে সবাই। পরকালযাত্রার শোক ও মাথায় টুপি রেখেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে বড়ভাই, ‘মা নাই। কিন্তু আমরা রক্তসম্পর্কের ভাইবোনরা আছি, এই বাড়ি ও পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। স্বয়ং আল্লাহ এ-বিষয়ে কোরানে আইন করে দিয়েছে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর এক যুগের মধ্যেও আমরা ভাগাভাগির ওপর জোর দেইনি। কারণ মা বেঁচে ছিল এবং ছোট কাফি তেমন লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করেনি। তাকে বিয়েও করানো হয়েছে গ্রামের ঘরগেরস্থালি দেখার উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে। আমরা চেয়েছি বড়বাড়ির সংসার ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করে কাফি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিক। কিন্তু সে দশ বছরে কী করেছে, কমবেশি তোমরা সবাই শুনেছো, গ্রামবাসীও সবাই জানে।’ কাফিই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে শোকসভায় প্রতিবাদ করে, ‘কী করেছি আমি? তোমাদের ভাগের জমি গিলে খেয়েছি, নাকি নিজের নামে করে নিয়েছি?’
বড়বোন শাসনের গলায় বলে, ‘মা বেঁচে থাকতে তুই আর তোর বউয়ের কীর্তিকলাপের খবর আমাদের জানিয়েছে। এত বছর বাড়ি থেকে যে আয়-উন্নতি হয়েছে, তার ভাগ কি তুই আমাদের দিয়েছিস?’
কাফির সব যুক্তি তো জমাট ক্ষোভ হয়ে ছিল, বিস্ফোরণ ঘটলে তা আর থামতে চায় না, ‘আমি চাকরের মতো তোমাদের বাড়িসম্পত্তি পাহারা দিয়েছি। বড়বাড়ির চাষাড়ি কাজ করাতে আমাকে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছো, আমার বউ দাসিবাঁদির মতো খেটেছে। মা আমার সংসারেই ছিল দশ বছর, কিন্তু তোমাদের সবার এতো সচ্ছল অবস্থা, আমার জন্য কি কেউ এক কানাকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছো? বরং আমি যাতে মানুষ হতে না পারি, এজমালি জায়গাজমিতে সারাজীবন খেটে মরি, সেটাই চেয়েছো সবাই।’
এক ভাই জানতে চায়, ‘মানুষ হওয়া মানে কি মোটরসাইকেল দাবড়ে প্রতিদিন শহরে যাওয়া, ব্যবসায়ের নামে বদনেশা করে টাকা অপচয় করা? রোজ কী করিস তুই টাউনে গিয়ে?’
মেজোভাই জানতে চায়, ‘সংসারের কৃষিকাজ থেকে যে-আয় হয়েছে, তার ভাগ কেউ চায়নি, চাইবেও না। কিন্তু ভাগাভাগির আগে তুই বহু জমি বন্ধক রেখে কেউ বলে বিশ লাখ, কেউ বলে ত্রিশ লাখ, এতো টাকা নিয়ে টাউনে কী ব্যবসা ফেঁদেছিস? ব্যবসা করবি ভালো কথা, কিন্তু বন্ধক খুলবে কে?’
কাফি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, ‘সময়মতো আমি খুলে দেব। ভাগাভাগি করে দাও, আমার ভাগ বেচে দিয়ে বউ নিয়ে শহরে আলাদা বাসা করে স্থায়ীভাবে থাকব আমি। তোমাদের বারোয়ারি সম্পত্তি পাহারা দেওয়া আমার কাজ না। তোমরা যেভাবে ভাগাভাগি করো আমার আপত্তি নেই। আমি এখন চলি, চারদিন আমার ব্যবসা দেখিনি, জরুরি ফোন এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।’
বড়দের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কাফিই প্রথম সভাস্থল ত্যাগ করে। উঠানে নেমেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয় সে, একাধিক ভাইবোনের ধমক ও স্নেহমেশানো হাঁকডাকও তাকে আর ফেরাতে পারে না। কাফির মোটরসাইকেলের গর্জন মিলিয়ে যাওয়ার পরও বড়বাড়ির পারিবারিক সভার উত্তাপ-উত্তেজনা থেমে যায় না। বড়ভাইদের অনুপস্থিতিতে কাফি রক্ষক হয়ে শুধু ভক্ষক নয়, দুর্বৃত্ত-দস্যুর মতো আচরণ করেছে, তার প্রমাণ দিতে থাকে। মাকে কীরকম মানসিক কষ্ট দিয়েছে, সে-কথাও জোর গলায় বলে কেউ কেউ। কিন্তু কাফির বউ রহিমা কী ভূমিকা রেখেছে?
কাফিকে না পেয়ে তার স্ত্রী তথা রুম্মানের মা তথা রহিমাকেই ডাকে সবাই।
শাশুড়ির দাফন হওয়ার পরও বাড়িতে মেহমান হয়ে আসা স্বামীর ভাইবোনদের সেবায় এতটা ব্যস্ত যে, রহিমা দম ফেলারও সময় পায় না। ঘরে সভা বসলে রান্নাঘরে সবার জন্য চা করছিল সে। জামেনার কাছে সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে ভাসুর-ননদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে আসে এবং দাঁড়িয়েই থাকে।
বড়ভাইয়েরা তার কাছে জানতে চায়, কত জমি বন্ধক রেখেছে কাফি? কীভাবে ল-ভ- করেছে সংসার? রহিমা কি জানত না? স্বামীকে শাসন করার চেষ্টা করেনি? শহরে কিসের দোকান দিয়েছে? কী ব্যবসা করে? অনেকে বলেছে টাউনে যায়, সেখানে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে সে?
ভাসুর-ননদের নানারকম প্রশ্নের মুখে রহিমা নতমুখে একই জবাব দেয়, ‘আমি কিছুই জানি না। আমাকে তো টাউনে নিয়ে গিয়ে কিছুই দেখায়নি।’
বড়ভাই এবার সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আমি মাকেও কথা দিয়েছিলাম, রিটায়ার করার পর বাড়িতেই পাকাপোক্ত থাকব। আর মোটে বছরখানেক বাকি। রফিকও রিটায়ারমেন্টের পর বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকবে বলছে। এবারে তো সম্ভব হবে না, তোমরা একটা ডেট ঠিক করে আসো, যার যেটা পাওনা, শান্তিপূর্ণ এবং আইনসংগতভাবে বাটোয়ারা করে দেব আমি। এলাকার চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উকিল সবাইকে ডাকব। ভাগের পর তোমরা যদি কেউ নিজেদের ভাগ কাফিলকে দিয়ে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’
এক বোন প্রতিবাদ করে, ‘ওকে দেবো কেন? এ-বাড়িতে আমাদের অধিকার নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?’
রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘আমি আপনাদের জন্য চা করছি, নিয়ে আসি।’
-----চার-----
মায়ের পারলৌকিক শান্তি এবং নিজেদের ইহকালীন স্বার্থ রক্ষায় ভাগবাটোয়ারার বিষয়টা পাকা করে ওয়ারিশগণ একে একে চলে যায়। বড়বাড়ি হঠাৎ বেশ ফাঁকা এবং অচেনা লাগে রহিমার কাছে। আগে দিনভর শাশুড়ির খ্যানখ্যানে গলা ও লাঠি-ঠুকঠুক মাতবরি অসহ্য লাগত, এখন তার বদলে নানারকম ভুতুড়ে ভয়। শাশুড়ি মরলে রহিমা বড়বাড়ির মালিক হবে বলেছিল যারা, তারা এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো রহিমাকে দেখে মজা পায়। ওয়ারিশরাই ব্যবস্থা করে গেছে, মৃতা মায়ের ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে জামেনাও। জামেনা তার মেয়েকে নিয়ে রাতে এখন বড়বাড়িতে থাকে। এছাড়া যে বাঁধা কামলা করমালি চাষাড়ি কাজকাম তত্ত্বাবধান করে, সেও যেন বড়বাড়ির মালিক হয়ে উঠেছে একজন। জোরগলায় হাসিমুখে রহিমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ও ছোটভাবি, বড়ভাই অর্ডার দিছে, ভাগাভাগির পর তার ভাগের জমি হামাকেই দেখাশুনা করা লাগবে। মেজোভাই তার ভাগ আধি দেবে মনে হয় হাকিমুদ্দিকে। আর তোমার জন তো টাউনে বাসা করার কথা ডিক্লেয়ার দিছে। আমি এখন কোন দিকে যাই, কন দেখি কী জ্বালা!’
এসব জ্বালার কথা বলার সময় করমালির মুখে হাসি ধরে না। শাশুড়ি মরতে না মরতেই শহরে রহিমার সতিনের সংসার কল্পনা করে কিংবা বড়বাড়িতে তার আসন্ন ফকিরনি দশা জানতেও সম্ভবত, লোকজন তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। রহিমা কোনো জবাব দেয় না। বিয়ের আগে থেকেই জানত সে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে বড়বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হবেই। এ শুধু হিংসুক গ্রামবাসীর কামনা নয়, শাশুড়িও রহিমাকে প্রায় রোজই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছে।
রহিমাও তো গাঁয়ের গেরস্তঘরের মেয়ে, জমির মায়া যে কী সাংঘাতিক জিনিস, নিজের বাপ-চাচার ঝগড়া দেখে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে। সেই বাবা মেয়েকে বড়বাড়ির বউ করে পাঠানোর সময় বেকার ও নেশাখোর জামাইকেও মেনে নিয়েছিল তাদের বিস্তর জায়গাজমি দেখেই। ভাইয়েরা সবাই দেশ-বিদেশে চাকরি করে, বাড়ির আবাদি ফসলের ভাগ নেওয়া দূরে থাক, নিজেদের জমিটাও পর্যন্ত চেনে না। বাড়ির কৃষি থেকে ম্যালা আয় হয় বলেই ছোটছেলে চাকরিতে ঢোকেনি। এই সুযোগে রহিমা যদি নিজের সংসার গুছিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো অভাব থাকবে না তার। বিয়ের পর থেকে রহিমা সেই চেষ্টাই করে গেছে। শহরবাসী ভাসুর-ননদের মতো নিজেও শহরে ঝামেলামুক্ত সংসার গড়ে ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নপূরণের পথে শাশুড়ি ছিল বড় বাধা, শাশুড়ি মরে যেতে না যেতেই অচেনা সতিন মস্ত বাধা হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি সে।
বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পরও কাফি ব্যবসায়ের কাজের দোহাই দিয়ে টানা তিনদিন বাড়িতে ফেরেনি। ফোনে রহিমাকে জানিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে ঢাকায় যাবে। ভাগ নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গেও প্রাইভেট কথা বলবে। মা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন রাতে বাড়িতে ফিরত না সে। মাত্র এক ঘণ্টায় মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরা যায়, কিন্তু তারপরও কী এমন কাজের ব্যস্ততা যে রাতেও স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার গরজ থাকে না। সন্দেহ অবশ্য আগেও জেগেছিল, রাতে বাড়িতে ফিরলেও স্বামীর ভালোবাসার উত্তাপ খুঁজে পায়নি। তারপরও শহরে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নটা আঁকড়ে রেখেছিল রহিমা। কাফি ভাইদের কাছে শহরে বাসা নিয়ে থাকার ঘোষণা দিলে স্বপ্নপূরণের আশাও জেগেছিল।
তিনদিন পর রাতে বাড়িতে ফেরে কাফি। দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করে রহিমা। স্বামীকে রাতের খাবার দিয়ে সরাসরি কথা তোলে, ‘আম্মাজানের মৃত্যুর পর এ-বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। রুম্মানকে টাউনের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তুমি এ-মাসেই আমাদের নিয়ে টাউনের বাসায় উঠবে।’
যুদ্ধ করার জন্য কাফির প্রস্ত্ততি তো দীর্ঘদিনের, জবাব দেয় সে, ‘আমার রক্তসম্পর্কের শত্রুরা, গ্রামের হিংসুক শয়তানরা তোমাকে জানায় নাই, টাউনে আর একটা বিয়া করব আমি?’
‘আমি বিশ্বাস করি নাই।’
‘অবিশ্বাস করার কী আছে? আমার বাপ ও দাদারও ছিল দুই পরিবার। মুসলমানের ছেলে আমি, চারটা না হোক, প্রয়োজনে দুই বউ রাখা আমার আইনি অধিকার। বড়বাড়ির গেরস্থালি কাম সামলানোর জন্য তুমি এ-বাড়িতে এসেছ, তুমি সেই কাজই করবে।’
খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে কাফি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সান্তবনা দেয়, ‘ভাগাভাগির পর রুম্মানকে নিয়ে এ-বাড়িতেই থাকবে তুমি। এ-বাড়ির গেরস্তি কামকাজ করলে ভাতের অভাব হবে না তোমার।’
বুড়ি শাশুড়ি মরে যাওয়ার পর রহিমা কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে গ্রামের মানুষ জড়ো করেছিল, কিন্তু নিজের জীবনের এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখেও টুঁ-শব্দটি করতে পারে না আজ। মনে হয় স্বামী সর্বশক্তি দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেছে দমবন্ধ করে মারার জন্য।
বউকে সারারাত নির্ঘুম, পাথরের মতো স্তব্ধ এবং একা রেখে, সকালে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে কাফি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
বাপের মতো ছেলে রুম্মানও যথারীতি খেলার নেশায় বাড়ির বাইরে ছুটে বেড়ায় দিনমান। বাড়িতে একা হয়েও কোনো কাজেই মন বসে না রহিমার। বিয়ের পর থেকে কাজই তো করে গেছে রহিমা। নিজের হবে না জেনেও বাড়ির উঠান ঘরদুয়ার ঝাঁট দিয়েছে। শাশুড়ির সেবাযত্ন ছাড়াও তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রান্নাবাড়া করে খাইয়েছে। গোলায় ধান তোলা, ধান উঠানো, রোদে শুকানো এবং ভিটায় মাচান বেঁধে এন্তার লাউ-শিম-কুমড়া ফলানো – এসব করে চাষিবাপের নাম ফাটিয়েছে। পোষা গাইটি ও মুরগিগুলোর তত্ত্বতালাশ করেছে। এতো কাজের পরও এ-সংসারে স্বামীর প্রাপ্য গালমন্দ মুখ বুজে হজম করেছে নিজের সুখের সংসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা মরলেই আলাদা হয়ে শহরের বাসায় ভালো চলবে তাদের, স্বামীও আশ্বাস দিয়েছিল এরকম।
শাশুড়ির মৃত্যুতে বাড়িতে লোকদেখানো এত কান্নাকাটির পরও, শাশুড়ির কথা ভেবে রহিমার সত্যি কান্না পায় আজ। বেঁচে থাকলে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনলে বুড়ি আজ রহিমার পক্ষে থাকত অবশ্যই। ছেলেবউয়ের সঙ্গে যতই খ্যাচম্যাচ করুক, চোখের সামনে একমাত্র নাতি রুম্মান ছিল বলে তার ওপর টানটাও ছিল বেশি বুড়ির। রুম্মান দাদির হাতের লাঠি নিয়েও খেলত। মরার দুদিন আগেও খেলার জন্য দাদিকে কানা বুড়ি সাজিয়েছিল। অন্ধ সেজে বুড়ি লাঠি ধরলে, অন্য প্রান্ত ধরে রুম্মান উঠানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চেয়েছিল, ‘কানা ফকিরকে ভিক্ষা দেন মা-সকল।’ এই দৃশ্য দেখে হাসি লুকাতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়েছিল রহিমা। সেই হাসির কথা স্মরণ করেও আজ চোখের জল ফেলে। শহরে ব্যবসা করার নামে কাফি পিরিতের সংসার ফেঁদেছে জানলে লম্পট ছেলেকে বাড়িছাড়া করে, বুড়ি নিশ্চয় ছোটছেলের প্রাপ্য ভাগের জমি ছোটবউ ও নাতির নামে দেওয়ার সুপারিশ করত বড়ছেলেদের কাছে। করত নাকি?
রহিমা এখন শাশুড়ির ফোনটা থেকে ভাসুর-ননদকে কল দিয়ে জরুরি কথা বলতে চাইলে, শুনবে তারা। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে? প্রতারক ভাইয়ের বদমায়েশি ও শহরে ব্যবসায়ের নামে দ্বিতীয় সংসার ফাঁদার খবরটা তারা রহিমার আগেই জেনেছে। কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বামীকে কৃষিকাজে ধরে রাখতে পারেনি রহিমা, উলটো নিজেও শহরে সংসার ফাঁদার স্বপ্ন দেখেছে। ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড়ে স্বামীকে এজমালি জমি বন্ধক রাখতে এবং গোলার ধান ও ভিটার গাছপালা বেচতেও উৎসাহ দিয়েছে। যার জন্য এত করেছে রহিমা, সে-ই হয়তো ভাইদের কাছে ছোটলোক বউয়ের হাজারটা গিবত গেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিও জোগাড় করেছে ভাইদের কাছে। রহিমা বিয়ের পর শহরে এক ননদের বাসায় বেড়াতে গেলে সে তার কাজের বুয়ার কাছে পরিচয় দিয়েছিল, আমাদের গ্রামের বাড়ির সব কাজ এই মেয়ে একাই সামলায়। তার মানে কী? রহিমাও তাদের কাছে তুচ্ছ কাজের লোক ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও বড় ননদের কাছে ফোন করে শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা হওয়ার কান্না নিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা জানায় রহিমা। ননদ সহানুভূতি দেখাবে কী, উলটো রহিমাকেই ধমক দিয়ে বলে, ‘কেমন মেয়ে রে তুই, স্বামী শহরে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়, আর তুই এতদিন মুখ বুজে ছিলি! থাক, তুই বড়বাড়ির কাজকর্ম নিয়েই থাক।’ ননদের কথার প্রতিবাদে এই মুহূর্তেই এ-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে রহিমা। কিন্তু গরিব বাপ জমি বেচে বড়ঘরের জামাইকে মোটরসাইকেল যৌতুক দিয়েছিল। সংসার-ভাঙা মেয়েকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সংগতি নেই তার। রহিমার ভাইয়েরাও বলে দিয়েছে, ভাগাভাগিতে পৈতৃক জমির কড়াক্রান্তিও পাবে না সে। না, বাপের বাড়িতে ফিরবে না রহিমা। তারচেয়ে বিষ খেয়েই বড়বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ঘুচাবে। রহিমার আপন খালাতো বোন প্রেমিককে বিয়ে করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়বাড়ির কৃষিতেও কীটনাশকের ব্যবহার দেখলে কথাটা মনে পড়ত রহিমার। নিজে লাউ-শিমের মাচায় স্প্রে করার জন্য করমালিকে দিয়ে বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনিয়ে ছিল, সেই বিষ দেখেও মনে পড়েছিল আত্মঘাতী বোনটির কথা। তাই বলে নিজে তার অনুগামী হওয়ার কথা বিয়ের আগে বা পরে কোনোদিন ভাবেনি রহিমা। নির্দোষ বোনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী প্রেমিক ছেলেটির কোনো শাস্তি হয়নি, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করছে এখন। রহিমাও বিষ খেয়ে মরলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে স্বামীর সুখের সংসার আরো নিষ্কণ্টক হবে। বিষ হাতে নিয়েও রহিমা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা কল্পিত যুবতীকে স্বামীর আলিঙ্গনে সুখের হাসি হাসতে দেখে। সতিনের সুখ দেখে রহিমা যদি আজই মরে, তার অনাথ সন্তান কোথায় ঘুরে বেড়াবে? আপাতত বিষ রেখে রুম্মানকে খোঁজার জন্য রহিমা বাড়ির বাইরে বেরোয়।
নিজের মৃত্যুকামনা নিয়ে রহিমা অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীর মৃত্যুর কথাও ভাবে। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। আবারো যদি সেরকম কোনো দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয় দয়াময় আল্লাহ, স্বামীশোকে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না রহিমা। স্বামী মরলেই বরং বড়বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে রুম্মান এবং স্ত্রী হিসেবে রহিমাও পাবে দুই আনা অংশ। স্বামীর ভাগ পেলে বড়বাড়িতেও নিজের আলাদা সংসার এবং পিতৃহারা ছেলের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিতে পারবে সে একাই। বিধবা শাশুড়ি যেমন বড়বাড়িকে একান্ত নিজের ভেবে দেখেশুনে রেখেছে আজীবন, নিজে বিধবা হলে রহিমাও স্বামীর সম্পদ আরো ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু স্বামী বেঁচে থাকলে নিজের ভাগ বেচে দিয়ে শহরে সতিনের সংসারে ঢালবে অবশ্যই। তালাক দিয়ে রহিমাকে বড়বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মিনিটও সময় লাগবে না তার। তখন কোথায় যাবে রহিমা? অসহায় এক নারীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আল্লাহ যদি নেশাখোর দুশ্চরিত্র এক পুরুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সেটা কি অবিচার হবে? সুবিচার পাওয়ার জন্য রহিমা গোপনে চোখের জলের সঙ্গে আল্লাহর কাছে জরুরি আবেদন-নিবেদন জানাতেই থাকে।
মরা-বাঁচার সংকটে তার স্বামী অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুমানোর সময়ে রাতে বাড়িতে ফেরে আজ। বাড়িতে এসেও অকারণে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজায়। সাধারণত বাড়িতে ফিরলে এরকম রাতেই ফেরে সে, কিন্তু আসবে না মনে করে রহিমা তার জন্য ভাত রাখেনি। কী মনে করে কে জানে ছেলের জন্য আজ একটা খেলনা কার এনেছে কাফি। খেলনা কার পেয়ে রুম্মান মহাখুশি, ঘুমানো স্থগিত রেখে বিছানাতেও কার চালায়। আর রহিমাকে ধমকের গলায় হুকুম দেয় কাফি, ‘ভাত দে। খিদে লেগেছে।’
রহিমা বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে যায়। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজের তরকারি ও ভাত গরম করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেয়। স্বামীর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে বিছানায় ছেলের পাশে গিয়ে শোয় আবার। মানুষটা খাচ্ছে খাক, রহিমা ঘুমন্ত ছেলের পাশে মৃতা শাশুড়ির মতো অসাড় পড়ে থাকে।
আরো আধঘণ্টা পরে স্বামীর বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার শুনে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হয় রহিমা। যন্ত্রণাবিকৃত গলায় চেঁচিয়ে বলছে মানুষটা, ‘হারামজাদি খাবারের মধ্যে বিষ মিশায় দিছিস নাকি? আমার এতো বুক জ্বলে কেন? এতো পেট জ্বলে কেন?’
আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ার মতো স্বামী ফোনটা হাতে নিয়ে যন্ত্রণায় মৃত মাকে ডেকে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকলে রহিমা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে এবার আল্লাহকেই ডাকে, ‘হায় আল্লা! রুম্মানের আববার কী হইল? টাউন থাকি কী বিষ খায়া আসছে আজ? বিছানায় গড়াগড়ি দেয় ক্যানে? ও জামেনা, ও উমেদভাই, আমার কপালে ফের কী আগুন লাগল!’
মধ্যরাতে বড়বাড়িতে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে একজন-দুজন করে প্রতিবেশী ছুটে আসতে থাকে। পাড়ার দোকানে টিভি দেখছিল যারা, তাদের কয়েকজনও টিভি দেখা বাদ দিয়ে ছুটে আসে বড়বাড়িতে। অসুস্থ কাফির আর তখন কথা বলারও শক্তি নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে শারীরিক যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উঠানে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে রহিমা।
কান্না কোলাহলের মাঝেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার জন্য কাফিই তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল। কাফিকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। এদিকে আঙিনায় গড়াগড়ি দিতে থাকা রহিমার কান্নার আওয়াজ তীব্রতর হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার চিরে ছুটে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সখানা লাল আলো চটকে আর পোঁ-পোঁ সাইরেন বাজিয়ে কার মরণ কামনা করে, রহিমা বুঝতেও পারে না।
Friday, April 18, 2025
গল্প- মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর by সায়ন্তনী ত্বিষা
গোসলের পর নানুকে পরানো হলো একটা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হলো ছায়ানটে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পালিয়ে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু প্রকৃতি (নানুর আরেক নাতনি, পার্থ তানভীরের মেয়ে) টেনেটুনে সামনে নিয়ে গেল। তারপর লিসা (নানুর পুত্রবধূ) ঠেলে দিল একেবারে নানুর কাছে; কারণ, আমার সঙ্গে আছে তুলা, যে তুলা দিয়ে একটু পরপর নানুর মুখ মুছে দিতে হবে আর তাড়াতে হবে মাছি। আমার সারা শরীর ভেঙে কান্না আসছিল, কিন্তু শত শত মানুষের ভিড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেও পারছিলাম না। এর মধ্যে একের পর এক গান হয়েই যাচ্ছে, ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা…’। ‘আগুনের পরশমণি’ যখন শুরু হলো, তখন আর কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। চেষ্টা করলাম মাথা নিচু করে যতটুকু মানুষের চোখ এড়িয়ে কাঁদা যায়। এরপরই জাতীয় সংগীত। মনে হচ্ছিল আমার সুন্দর করে সাজানো–গোছানো পৃথিবীটা কেউ হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ভেঙে দিচ্ছে। এত দুঃখ কেন আসে জীবনে?
আমি নানু বা মায়ের মতো শক্ত মনের মানুষ নই। কেউ একটু চোখ রাঙিয়ে তাকালেই বুক ভেঙে কান্না পায়। যখনই মন খারাপ হতো, তখনই চলে যেতাম নানুর কাছে নালিশ করতে। নানু সব সময় উৎসাহ দিত আমাকে, যেন মনের কথাগুলো লিখে ফেলি। লিখে ফেললে মনটা হালকা লাগবে। এই কৌশল যে কতবার আমার জীবনে কাজে এসেছে, তা গুণে শেষ করতে পারব না।
জীবনের চাপে, সমাজের চাপে, মানুষের চাপে অনেকবারই মন ভেঙে গেছে। যখনই ভগ্ন হৃদয়ে নানুর কাছে যেতাম, নানু বলত গান করতে। অবশ্যই আমি নানুর কথা শুনতাম না। সুতরাং আমাকে ধরেবেঁধে নতুন গান শেখাতে শুরু করত নানু।
এভাবেই জীবনের বড় দুটো দুঃসময়ে নানুর কাছে শিখেছিলাম ‘বেলা গেল তোমার
পথ চেয়ে/ শূন্য ঘাটে একা আমি, পার ক’রে লও খেয়ার নেয়ে’ আর ‘মধুর মধুর
ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে’—এই দুটি গান।
যেহেতু আমি নাচ শিখেছি জীবনের বড় একটা সময়, নাচটা ভালোই দখলে ছিল। নানু ছোটবেলা থেকেই বলত নাচতে। নিজের মতো করে নিজের জন্য নাচতে। আমি বুঝেই পেতাম না কেন আমি নিজের জন্য নাচব! নাচ তো একটা পারফর্মিং আর্ট। এর মানেই হলো নাচতে হবে মানুষকে দেখানোর জন্য, মানুষের সামনে পারফর্ম করার জন্য। একা একা কেউ নাচে নাকি? নানু বলেছিল, নাচ এমন একটা জিনিস, যেটা সুদিনে মন আরও ভালো করে দেয় আর দুর্দিনে মনের ভার কমায়। ছোটবেলায় বেশি পাত্তা দিইনি কথাগুলো। তবে যত বড় হয়েছি, যত জীবনের ভারে জর্জরিত হয়েছি, ততই বুঝতে পেরেছি নানু আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল। মন খারাপ থাকলে বিছানা থেকেও উঠতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু একটু কষ্ট করে বিছানা থেকে উঠে আধা ঘণ্টা নেচে ফেলতে পারলে মনে যে প্রশান্তি আসে, তা অতুলনীয়।
মা মারা যাওয়ার পর কিছুই ভালো লাগত না, খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না, হাসতে পারতাম না। জগৎ–সংসারের সবকিছুর ওপর জেগে উঠেছিল পরম অভিমান আর চরম রাগ। নানু তখন কোথা থেকে যেন ৩৬ হাজার টাকার অল-ইনক্লুসিভ ট্রাভেল প্যাকেজ জোগাড় করল ভুটান যাওয়ার জন্য। একরকম নিমরাজি হয়েই নানুর সঙ্গে রওনা দিলাম ভুটানের উদ্দেশে। অনেক বছর লেগেছিল বুঝতে যে সেটা কোনো আনন্দভ্রমণ ছিল না, সেটা ছিল বিষাদভ্রমণ।
ভুটানের রাজধানী থিম্পু হিমালয়ে ঘেরা একটা উপত্যকা, আর হিমালয়ের পারো নদীর তীরে পারো শহর—এই দুই জায়গায় আমরা ঘুরেছিলাম সেবার। হিমালয়ের বিশালতার মধ্যে বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম আবার খুঁজেও পাচ্ছিলাম অন্য এক আমাকে। সেখান থেকেই মায়ের মৃত্যুর শোক পরিক্রম করার প্রক্রিয়া শুরু হয় আমার। তখন থেকেই জানি, মন খারাপ হলেই চলে যেতে হয় দূর কোন পাহাড়ে বা হ্রদের ধারে। পৃথিবীর বিশালতার কাছে উজাড় করে দিতে হয় মনের যত দুঃখ, আর সেখান থেকেই শুরু হয় বিষাদ থেকে উত্তরণের পথযাত্রা।
নানু আর আমি ছিলাম বিপরীত মেরুর দুটি মানুষ। আমার সঙ্গে তার এমন বন্ধুত্ব হওয়াটা খুবই রহস্যজনক। একেই কি বলে ‘বিপরীত মেরুর প্রতি আকর্ষণ’?
নানুর প্রায় কোনো গুণই পাইনি আমি। কিন্তু যা পেয়েছি তা হলো, স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বাঁচার অসীম স্পৃহা, নির্ভয়ে অকপটে নিজের মতটা প্রকাশ করতে পারার, আর ভিন্ন মতটা যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে শোনার চেষ্টা এবং মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসার শক্তি।
নানু ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়। এই আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, নানু আসলে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোর জন্যই সারা জীবন ধরে আমাকে প্রস্তুত করেছে। নানুর মৃত্যু আমার জন্য ছিল কঠিনতম পরীক্ষা এবং এ পরীক্ষা পার হওয়ার পথও সে-ই দেখিয়ে দিয়ে গেছে।
যত্ন করে তুলে রাখলাম দুঃখগুলো। কোনো একদিন চলে যাব কোনো এক পাহাড়চূড়ায়, সেখানে একলা বসে নানুর শেখানো গানগুলো গুনগুন করব, একটু হয়তো নাচব বা লেখার চেষ্টা করব নানুকে না বলা কথাগুলো আর মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর।
| সন্জীদা খাতুনের (মাঝে) সঙ্গে তাঁর তিন সন্তান—রুচিরা তাবাসসুম নভেদ্, পার্থ তানভীর নভেদ্ ও অপালা ফরহত নবেদ। ছবি: সন্জীদা খাতুনের অ্যালবাম থেকে |
Friday, March 28, 2025
গল্প- জনৈক অপদার্থ পিতা by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আজাদ কাজলকে বুকে চেপে ধরে বাসের অন্য সবার সাথে চুপ করে বসে থাকে। কাজলের বয়স চার, যদিও তাকে দেখে আরো কম মনে হয়। গত কয়েক মাস দৌড়াদৌড়িতে তার চেহারার মাঝে আতঙ্কের একটা ছাপ পাকাপাকিভাবে পড়ে গেছে। ছেলেটার শরীর ভাল নয়। গত কয়েকদিন থেকে কেঁপে কেঁপে জ্বর উঠছে। রোগ শোক সম্পর্কে আজাদের ভাল ধারণা নেই, কিন্তু দেখেশুনে মনে হয় ম্যালেরিয়া। যে গ্রামে গত কয়েক মাস থেকে লুকিয়ে আছে সেখানে কোন ডাক্তার নেই। ডাক্তারের খোঁজে সে ময়মনসিংহ শহরে যাচ্ছে।
কাজল আজাদের বুক থেকে মুখ তুলে বলল, আব্বা আমরা কখন যাব?
এই তো একটু পরে।
মিলিটারি আমাদের থামিয়েছে?
হ্যাঁ।
কেন বাবা?
জানি না, মনে হয় চেক করবে।
কী চেক করবে?
জানি না বাবা।
জয় বাংলা আছে কি না দেখবে?
আজাদ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, শ-স-স-স, বলে না এখন।
কাজল চুপ করে গেল। কখন জয় বাংলার কথা বলা যাবে এবং কখন বলা যাবে না ব্যাপারটা সে এখনো পরিষ্কার ধরতে পারেনি।
আজাদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সামনে আরো কয়েকটি বাস থামানো হয়েছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাসগুলো, ভেতরে শঙ্কিত মুখে যাত্রীরা নিঃশব্দে বসে আছে। বাসগুলোর কাছাকাছি কালো কাপড় পরা কিছু মিলিশিয়া। খানিকটা দূরে একটা বটগাছের নিচে বেশ কিছু মিলিটারি রাস্তার পাশে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। বাসের ভেতরে মানুষজন কেউ কোন কথা বলছে না। আজাদ চাপা স্বরে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, সব সময় কি এখানে থামায়?
ড্রাইভার দরদর করে ঘামছে, আজাদের প্রশ্নটা ঠিক শুনতে পেল না। আজাদ আবার জিজ্ঞেস করল, ড্রাইভার সাহেব, সব সময় কি এখানে থামায়?
না। কিছু একটা গোলমাল আছে আজ।
কী গোলমাল?
জানি না। আল্লাহরে ডাকেন।
ড্রাইভার এইমাত্র দেখতে পেয়েছে মিলিশিয়ারা সামনের একটা বাস থেকে সব যাত্রীদের সারি বেঁধে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে একটা ছোট ডোবা আছে সবাই হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে সেদিকে। কান খাড়া করে রাখবে সে, গুলির শব্দ শোনা গেলে বুঝতে হবে রোজ কেয়ামতো আজ।
আজাদ কাজলের মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটা দেখতে নাকি বাবার মতো হয়েছে। আজাদের অবশ্যি সেরকম মনে হয় না, তার ধারণা মায়ের মতোই হয়েছে। বিশেষ করে চোখ এবং ঠোঁটের অংশটুকু হুবহু শিরীনের মতোন। শিরীন এখন কী করছে কে জানে, ডাক্তারকে দেখিয়ে বাসায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত বেচারি স্বস্তি পাবে না। আজাদকে এসব ব্যাপারে একেবারে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এখন যে অবস্থা শিরীনের ঘর থেকে বের হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। ডাক্তারকে কী জিজ্ঞেস করতে হবে, কী বলতে হবে সবকিছু বারবার করে আজাদকে বলে দিয়েছে। আজাদ যে নিজের দায়িত্বে ডাক্তারকে দেখাতে পারে সেটা তার পক্ষে বিশ্বাস করাই সম্ভব নয়!
শিরীনের ধারণা, আজাদ একজন অপদার্থ বাবা। কেন তার এই ধারণাটি হয়েছে বলা মুশকিল। যে কোন ব্যাপারেই স্পষ্ট একটা ধারণা না হওয়া পর্যন্ত শিরীন স্বস্তি বোধ করে না। জীবনের নানা জটিল ব্যাপারে বড় বড় চিন্তাবিদেরাও যখন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি সেখানেও শিরীন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকে। ধর্ম, রাজনীতি, সমাজনীতি এ ধরনের বড় বড় ব্যাপার থেকে শুরু করে নিউ মার্কেটের কোন দরজি সবচেয়ে কম খরচে নিখুঁত ব্লাউজ তৈরি করে দেয়—সব ব্যাপারে তার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। শিরীন এবং আজাদের একমাত্র ছেলে কাজলের বয়স মাত্র চার এবং বাবার দায়িত্ব পালন করার জন্যে আজাদের পুরো জীবনটাই পড়ে রয়েছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আজাদ জীবনপণ করে যত চেষ্টাই করুক এই জন্মে শিরীন তার ধারণাটি পাল্টাতে রাজি নয়।
ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল কাজলের জন্মের সময়। ডাক্তার কাজলের জন্ম তারিখ দিয়েছিল মার্চের মাঝামাঝি। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে আজাদের রাজশাহী যাওয়ার প্রয়োজন হলো। ঢাকা শহরে আজাদ এবং শিরীন দু’জনের পরিবারের সবাই থাকে। যে ডাক্তার শিরীনকে দেখছে সে কিভাবে কিভাবে শিরীনদের আত্মীয়া হয় হঠাৎ করে ক্লিনিকে যেতে হলেও কোন অসুবিধে নেই। সাত পাঁচ ভেবে আজাদ রাজশাহী চলে গেল। তার দু’দিনের ভেতর শিরীনকে ক্লিনিকে নিয়ে যেতে হলো। প্রথমে সবাই ভেবেছিল সবকিছু বুঝি স্বাভাবিক। শেষ মুহূর্তে দেখা গেল সিজারিয়ান প্রয়োজন। শিরীনের এক মামা আজাদের হয়ে কাগজপত্র সই করল। আজাদ যখন ফিরে এসেছে কাজলের বয়স তখন আট দিন। যে বাবা তার সন্তানকে আট দিনের আগে দেখার সুযোগ পায়নি শিরীনের পক্ষে তাকে ক্ষমা করা সহজ নয়। এর থেকে আরো অনেক কম অপরাধের জন্য শিরীন তার এক খালাতো বোনের সাথে গত নয় বছর কোন কথা বলেনি!
অপদার্থ বাবা হিসেবে আজাদ দ্বিতীয়বার সুপ্রতিষ্ঠিত হলো যখন কাজলের বয়স সাত মাস। একদিন আজাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে শিরীন কোন এক জায়গায় গিয়েছে। যাবার আগে কাজলকে নিয়ে কী করতে হবে আজাদকে সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। আজাদের সদিচ্ছার কোন অভাব ছিল না, কিন্তু দুধ খাবার সময় কী কারণে কাজল কিছুতেই দুধের বোতল মুখে নিয়ে দুধ খেতে রাজি হলো না সে বুঝে উঠতে পারল না। মধ্যরাতে শিরীন ফিরে এসে আবিষ্কার করে কাজল চিৎকার করে কেঁদে ঘরবাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে—আজাদ তাকে নিয়ে সম্ভাব্য সব রকমভাবে শান্ত করে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। শিরীন দুধের বোতলের দিকে এক নজর তাকিয়েই সমস্যাটা বুঝে ফেলল, নিপলটিতে কোন ফুটো নেই। ফুটোবিহীন একটি নিপল কোন বাসায় তার জন্যে রাখা হবে তার কোন ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু তার সমস্ত অপরাধের গ্লানি এখনো আজাদকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
আজাদ বাবা হিসেবে মোটামুটি অপদার্থ—এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়ে যাবার পর যতই দিন যাচ্ছে ততই শিরীনের ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে। কাজলের অসুখের সময় আজাদ সারারাত জেগে তাকে বুকে নিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছে এই ঘটনাটি শিরীনের চোখে পড়ে না, কিন্তু একদিন গরম চা চলকে পড়ে হাতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল সেই ঘটনাটি সে কিছুতেই ভুলতে পারে না। কেউ যদি কোন ব্যাপারে সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে তাহলে তার স্বপক্ষে যুক্তি এবং উদাহরণ খুঁজে বের করা কঠিন কোন ব্যাপার নয়—বিশেষ করে এ ধরনের ব্যাপারে।
আজাদ প্রথম প্রথম শিরীনের এই ধারণা পাল্টানোর চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছে। প্রথমতো, শিরীন একবার কোন একটা জিনিস বিশ্বাস করে নিলে সে ব্যাপারে তার মতো পাল্টানো প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, শিরীন তার জীবনে যতগুলো ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ধারণা করছে তার বেশিরভাগই ভুল বের হয়েছে।
যেমন তার ধারণা ছিল তাদের প্রথম বাচ্চা হবে মেয়ে। ব্যাপারটিতে সে প্রায় নিশ্চিত হয়ে মেয়ের জন্যে একটি নাম পর্যন্ত ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু দেখা গেল তাদের প্রথম বাচ্চাটি হলো ছেলে। শিরীনের ধারণা ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের চেহারা যত কুৎসিতই হোক মানুষটি নির্বাচনের রায়কে অক্ষুণ্ন রাখবে। মার্চ মাসে তার এই ধারণাটিও ভুল প্রমাণিত হলো। শিরীনের তৃতীয় ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হলো পঁচিশে মার্চের রাতে, সে মোটামুটি নিঃসন্দেহ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর জুলফিকার আলী ভুট্টো একটা রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছে যাবেন, পাকিস্তানি মিলিটারিরা কিছুতেই বাঙালিদের গায়ে হাত তোলার সাহস পাবে না। পঁচিশে মার্চের রাতে গোলাগুলিতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে তার সেই ধারণাটিও পুরোপুরি ভেস্তে গেল। শিরীনের শেষ ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হলো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। শিরীন একেবারে নিঃসন্দেহ ছিল বাইরের পৃথিবী যখন খবর পাবে পাকিস্তানি মিলিটারিরা কিভাবে এ দেশের মানুষকে মারছে তখন পৃথিবীর বড় বড় দেশ এসে হস্তক্ষেপ করবে। এপ্রিলের মাঝামাঝি শিরীন কাজলকে বুকে চেপে আজাদের পিছু পিছু এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বাইরের পৃথিবী ততদিনে খবর পেয়ে গেছে, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান নামে ছোট একটি দেশের জন্যে পৃথিবীর কোন দেশের এতটুকু মাথাব্যথা দেখা যায়নি।
আজাদ এবং শিরীন আগে কখনো দীর্ঘ সময়ের জন্যে গ্রামে থাকেনি। ব্যাপারটি যত দুঃসহ হবে বলে ধারণা করেছিল কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সেটি তত খারাপ নয়। গ্রামের জীবনে নতুন এক ধরনের বৈচিত্র্য আছে এবং খুব তাড়াতাড়ি তারা সেটিতে অভ্যস্ত হয়ে গেল। আজাদ কখনো কল্পনা করেনি সে কোনদিন লুঙ্গির সাথে একটা বুশ শার্ট পরে জনসমক্ষে যাবে, কিন্তু দেখা গেল গ্রামের বাজারে চা খাবার জন্যে সে শুধু যে লুঙ্গির সাথে বুশ শার্ট পরে রওনা দিয়েছে তা নয়, সে পায়ে পরে নিয়েছে রবারের এক ধরনের ধূসর জুতো এবং সেই জুতো কাদায় আটকে গেলে সেগুলো হাতে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। আজকেও সে এসেছে লুঙ্গি পরে, গায়ে ঢিলেঢালা একটা পাঞ্জাবি এবং পায়ে এক জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল। ছয় মাস আগেও সে কোন্ প্যান্টের সাথে কোন্ জুতো জোড়া পরবে সেটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছে। সেই সব দিনগুলো এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।
আজাদ হঠাৎ বাসের মাঝে একটা উত্তেজনা অনুভব করে। মাথা ঘুরিয়ে দেখে কালো পোশাক পরা একজন মিলিশিয়া উঠে এসেছে। অল্পবয়সী কিশোরের মতো চেহারা, কিন্তু তাকে দেখে হঠাৎ আজাদের পেটের মাঝে কেমন যেন পাক দিয়ে ওঠে। দেশে যদি যুদ্ধ না চলতে থাকত আর রাস্তায় হঠাৎ যদি অল্পবয়সী এই ছেলেটার সাথে কোথাও দেখা হত আজাদ কি তাকে দেখে এত ভয় পেত?
মিলিশিয়াটি তাদের বাস থেকে নেমে যেতে বলল, ভাষাটি উর্দু নয়, অন্য কোন ভাষা হবে। পাঞ্জাবি বা পশতু, কিন্তু তবু সে কী বলছে বুঝতে কোন অসুবিধা হলো না। বাস থেকে নামতে নামতে বুড়ো মতোন একজন মানুষ মিলিশিয়াটিকে বাবা ডেকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল, কিন্তু মিলিশিয়াটি তার দিকে কোন উৎসাহ দেখাল না, পুরোপুরি নিস্পৃহভাবে সে বুড়ো মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। বুড়োর কথা সে বোঝে না, বোঝার কোন কৌতূহলও নেই।
বাস থেকে নামার সময় আজাদ হঠাৎ এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করে, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের আতঙ্ক। এই আতঙ্কের সাথে তার কোন পরিচয় নেই, সমস্ত শরীর হঠাৎ অবশ হয়ে আসে, মাথা কেমন ঝিম ঝিম করতে থাকে। কাজল হঠাৎ আজাদের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, এখন চেক করবে আব্বু?
আজাদ নিচু গলায় বলল, হ্যাঁ বাবা।
কেমন করে চেক করে আব্বু?
এই তো এরকম করে।
কাজল কী বুঝল কে জানে, বলল, ও।
নিচে আরো কয়েকজন মিলিশিয়া দাঁড়িয়ে ছিল। তারা দুই পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বাসের সবাইকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে বাঁশঝাড়ের পিছনে ডোবাটির কাছে নিয়ে যেতে থাকে। আজাদের সাথে হেঁটে যেতে যেতে মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ শুকনো গলায় বলল, গুলির বাক্স টানাবে আমাদের দিয়ে।
গুলির বাক্স?
হ্যাঁ। যখন গুলির বাক্স টানার দরকার হয় তখন লোকজন জড়ো করে।
সত্যি?
হ্যাঁ। গত সপ্তাহে আমার ছোটভাই টেনেছে।
ও।
নিশ্চয়ই গুলির বাক্স। কী বলেন?
লোকটি কেমন এক ধরনের ব্যাকুল চোখে আজাদের দিকে তাকাল। আজাদ বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই গুলির বাক্স।
ডোবার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আজাদ তাকাবে না তাকাবে না করেও ডোবাটার ভেতরে তাকাল। অনেক কয়েকজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে আছে। কারো পা পানিতে ডুবে আছে কারো হাত। এমনকি কারো মাথা—কিন্তু সেটা নিয়ে কেউ কোন আপত্তি করছে বলে মনে হলো না। আজাদ দ্বিতীয়বার তাকাল এবং বুঝতে পারল মানুষগুলো মৃত। গুলি করে মারা হয়েছে। তাদের আগের বাসের যাত্রীরা, একটু আগে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে আনা হয়েছে।
একেবারে ডান পাশে একটা শিশুও রয়েছে, এক হাত দিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে এখনো। টুকটুকে লাল শার্ট গায়ে। শার্টটা কী লাল ছিল নাকি রক্ত লাল হয়েছে?
কাজল জিজ্ঞেস করল, আব্বু এরা কারা?
আজাদ বলল, এদিকে তাকায় না বাবা।
কাজল চোখ সরিয়ে বলল, কেন আব্বু
পরে বলব। ঠিক আছে?
কাজল মাথা নাড়ল, ঠিক আছে। তারপর হঠাৎ একটু হাসল তার দিকে তাকিয়ে। কেন হাসল কে জানে।
আজাদ কাজলের দিকে তাকিয়ে থাকে মাথার মাঝে তার সবকিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কেন জানি সে আর কিছু চিন্তা করতে পারছে না। মনে হচ্ছে প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে রয়েছে, আশপাশে মানুষজনেরা কি কাঁদছে? কেউ কি চিৎকার করছে? কেউ কি কিছু বলছে? সে কেন আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। কাজল ঘাড় উঁচিয়ে দেখতে চেষ্টা করছে কিছু। কী দেখছে?
আজাদ ফিস ফিস করে বলল, কাজল।
কি আব্বু?
আমাকে শক্ত করে ধরবি। খুব শক্ত করে।
কাজল কী একটা বলল সে শুনতে পেল না। চারজন মিলিশিয়া তাদের দিকে রাইফেল উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে আরো একজন মিলিশিয়া হেঁটে হেঁটে আসছে। কাজল আবার ডাকল তাকে, আব্বু।
কী বাবা?
চেক কি করছে?
হ্যাঁ বাবা।
কখন শেষ হবে?
এই তো একটু পরে।
তখন আমরা যাব?
হ্যাঁ বাবা।
আম্মুর কাছে যাব?
আম্মুর কাছে যাব।
কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারিটা কিছু একটা বলল, তারপর দাঁড়িয়ে গেল। কেমন যেন বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। চেহারায় কেমন যেন এক ধরনের দুঃখের ছাপ।
রাইফেল হাতে মিলিশিয়াগুলো হঠাৎ রাইফেলগুলো উপরে তুলে। আজাদ ফিসফিস করে বলল, কাজল—
কী আব্বু?
তুমি কি সেই বোকা রাজার গল্পটা শুনতে চাও? সেই যে একটা বোকা রাজা ছিল—
হ্যাঁ আব্বু হ্যাঁ। কাজল হঠাৎ আনন্দে ছটফট করে ওঠে।
তাহলে আমার দিকে তাকাও—
কাজল তার বাবাকে ধরে তার দিকে তাকাল।
এক ছিল রাজা। সে ছিল ভারি বোকা—
কাজলের মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়। বোকা রাজার গল্প তার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। অনেক বার শুনেছে সে, প্রতিবার হেসে কুটি কুটি হয়েছে। আশপাশের মানুষেরা কেন জানি কাঁদছে সে জানে না। সে জানতেও চায় না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারিগুলোকে দেখতে কেমন যেন ভয় করে। সে সেদিকে তাকাবে না। আব্বুকে শক্ত করে ধরে রাখবে তার কোন ভয় নাই। ভয় থাকলে কি তার আব্বু কখনো বোকা রাজার গল্প বলত।
বলত না।
কাজল হাসিমুখে আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইল, গল্পটা শোনার জন্যে। অনেকবার শুনেছে সে গল্পটি। আজাদ জানে, পুরোটা শুনতে না পারলেও ক্ষতি নেই।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

