Monday, November 30, 2015

ভারতে জাতীয় সংগীতে উঠে না-দাঁড়ানোয় রোষের শিকার মুসলিম পরিবার

ভারতের মুম্বাইতে একটি সিনেমা হলের ভেতর যখন জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছিল – তখন উঠে না দাঁড়ানোয় একটি মুসলিম পরিবারকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। সিনেমা হলের অন্য দর্শকরা ওই পরিবারটিকে ঘিরে ধরে শাসানি দিতে থাকেন – তারপর তারা যখন বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তখন হলভর্তি দর্শক হাততালি দিয়ে ওঠে। মোবাইল ফোনে ধারণ করা এই গোটা ঘটনার ভিডিও পরে সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর রীতি চালু থাকলেও কেউ যদি না-ওঠেন তবে তার জন্য কোনও শাস্তির বিধান নেই। কি ঘটেছিল? এই ঘটনাটি মুম্বইয়ের কুরলা অঞ্চলে বিলাসবহুল পিভিআর মাল্টিপ্লেক্সের ভেতরে ঘটেছে এই সপ্তাহান্তে। চার সদস্যের একটি মুসলিম পরিবার ওই থিয়েটারে দেখতে এসেছিলেন সদ্য মুক্তি পাওয়া বলিউড ব্লকবাস্টার ‘তামাশা’। রণবীর কাপুর ও দীপিকা পাডুকোনে অভিনীত ওই ছবিটি শুরু হওয়ার আগে হলে বাজানো হচ্ছিল ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জনগণ মন অধিনায়ক – তখন কোনও কারণে ওই পরিবারটি উঠে দাঁড়ায়নি। কিন্তু তার পরই তাদের ওপর যা শুরু হয় – সেটাও এক করুণ তামাশা ছাড়া কিছুই নয়! হলের বেশ কয়েকজন দর্শক উত্তেজিতভাবে ঘিরে ধরে তাদের কৈফিয়ত তলব করতে থাকেন। একজনকে স্পষ্ট থাপ্পড় মারার হুমকি দিতেও শোনা যায়। দু’চার মিনিট ধরে এই শাসানি চলার সময় ওই পরিবারটি বসে বসেই কিছু জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তবে তাদের কথা রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়নি। শেষে মাল্টিপ্লেক্সের কর্মীরাও এসে তাদের উঠে যেতে বললে চারজন হল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাকি হল তখন একসঙ্গে করতালি দিয়ে ওঠে। পক্ষে ও বিপক্ষে এই ঘটনার ভিডিও ফেসবুক-ইউটিউবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরই ওই পরিবারটির পক্ষে ও বিপক্ষে ভারতীয়রা কার্যত দু’ভাগ হয়ে গেছেন। কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় সঙ্গীতের অমর্যাদা করার অধিকার কারও নেই। পাশাপাশি অনেকেই আবার যুক্তি দিচ্ছেন, তারা দাঁড়ান বা না-দাঁড়ান, হল থেকে তাদের বের করে দেওয়াটা কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। ভারতে অসহিষ্ণুতা নিয়ে এই মুহূর্তে যে বিতর্ক চলছে, তাতেও এই ঘটনাটা আলাদা মাত্রা পেয়ে গেছে। বিজেপি-র মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি বলেছেন তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে না জেনে কোনও মন্তব্য করবেন না, তবে জাতীয় সঙ্গীতের যারা অবমাননা করেন তাদের ভারতে থাকারই অধিকার নেই। আইন কী বলে? তবে ভারতের ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় উঠে না দাঁড়ালে কোনও শাস্তির উল্লেখ নেই – যদিও আদালতের বিভিন্ন রায়ে নানা সময়ে বলা হয়েছে জাতীয় সঙ্গীতকে মর্যাদা দেয়াটা নাগরিকদের নৈতিক কর্তব্য। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মীরা ভাটিয়া বিবিসিকে বলছিলেন এই ঘটনায় আসলে ‘দুটো অন্যায়’ হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘‘জাতীয় সঙ্গীতের সময় উঠে দাঁড়ানোটা খুব স্বাস্থ্যকর একটা প্রথা। কিন্তু যারা সেটা করেননি, তাদের যদি কেউ হেনস্থা করে বা শাসানি দেয়, সেটাও তো একটা অপরাধ। ইচ্ছেমতো আইনের ব্যাখ্যা করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকারও কিন্তু কারও নেই।’’ তবে মুম্বইয়ের পুলিশ জানিয়েছে, হেনস্থা হওয়া পরিবারটি বা হলের অন্য দর্শকদের কেউই তাদের কাছে কোনও অভিযোগ জানায়নি, ফলে তারা এর কোনও তদন্তও করছে না। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় উঠে দাঁড়ানোর বিষয়টি যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে, এই ঘটনায় তা আরও একবার প্রমাণ হলো।  -বিবিসি

তেজগাঁওয়ে হামলাকারীদের খবর হয়ে যাবে : আনিসুল হক

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকালে যেসব নেতাদের উস্কানিতে হামলা হয়েছে তাদের খবর হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। তিনি বলেন, তেজগাঁওয়ের রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে, সেখানে আর কখনো ট্রাক থাকবে না। কেউ বাধা দিতে আসলে তাকে হেভি পেটানো হবে।
আজ রাজধানীর কারওয়ানবাজারের একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র এ কথা বলেন। এ সময় স্থানীয় কাউন্সিলর শামীম হাসান, সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শামীমা রহমান, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হকসহ ডিএনসিসির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আনিসুল হক বলেন, প্রভাবশালী নেতাদের কারণে তেজগাঁওয়ে ঝামেলা হয়েছে। যারা ওখানকার দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত তারাই রোববার অভিযানে ঢিল ছুড়েছে।
যারা হামলা করেছে তাদের ধরার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশকে অনুরোধ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ ছাড় পাবে না। যারা এখন শক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে, তাদের শক্তি থাকবে না।
মেয়র বলেন, দখলদাররা তার সাথে পলিটিকস খেলছে। তিনি তাদের কিছু বলেননি। সেখানে পুলিশ ছিল, তারা কিছুই করেনি। চাইলে অনেক কিছু করা যেত। কারণ, তার সাথে অনেক ফোর্স ছিল, তারা নীরব থেকেছে।
মেয়র আরো বলেন, শ্রমিকদের কারা ভুল বুঝিয়েছে তিনি জানেন। তিনি কোনো রাস্তা জবরদখল হতে দেবেন না। রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে দেবেন না।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, কার সাথে নেগোসিয়েশন হবে? কারো সাথে হয়নি। আমরা একটা মডার্ন ট্রাক স্ট্যান্ড করব। সেজন্য ঢাকার বাইরে জমি খুঁজছি।
রোববারের সহিংসতায় সিটি করপোরেশনের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে মেয়র বলেন, আমাদের সাতটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। এতে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া করপোরেশনের চালক, হেলপার ও উচ্ছেদকর্মী সহ পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এ সময় মেয়র সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে ২০ হাজার বিলবোর্ড অপসারণ করেছি। ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সব বিলবোর্ড অপসারণ করা হবে। আগামী জুনের মধ্যে গুলশান বনানী বারিধারায় আরো এক হাজার সিসি ক্যামেরা বসবে। এর পর অন্যান্য এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসবে।
আনিসুল হক বলেন, আমি রাজধানীর পরিবহন মালিকদের সাথে বসেছি। তারা আমাকে কমিটমেন্ট দিয়েছেন, তিনশ’ কোম্পানির মধ্য থেকে ৫-৭টি কোম্পানিতে নামিয়ে আনবেন। এদের মাধ্যমে আমরা করপোরেশনের সহায়তায় তিন হাজার নতুন গাড়ি নামাব।
কারওয়ানবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ৩৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে এদের জন্য একটি মার্কেট তৈরি করেছি। এদের সেখানে সরিয়ে নেয়া হবে। ফলে এ এলাকায় আর কোনো যানজট থাকবে না।

অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন: পাঠকের ওপর ছেড়ে দিন by শরিফুজ্জামান

কমবেশি ১০ হাজার অনলাইন পত্রিকা! সংখ্যাটা শুনলেই চমকে উঠতে হয়। উপজেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত এসব পত্রিকার ছড়াছড়ি। সংখ্যাটি ১০ হাজার তা কেউ গুনে বলেছেন, এমনটি নয়। এ নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছেও কোনো হিসাব নেই। তবে এটি একটি ধারণা, যা অনেকেই বিশ্বাস করেন, কেউবা করেন না। সরকারের দৃষ্টিতে এসব পত্রিকার অধিকাংশতেই অপসাংবাদিকতা হচ্ছে। তাই নিয়মনীতির আওতায় আনতে এবং এগুলোকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে নিবন্ধন করতে হবে।
এগুলোর পাশাপাশি সরকার ছাপা পত্রিকার অনলাইন সংস্করণেরও নিবন্ধন চায়। এ নিয়ে এক নতুন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন পত্রিকার প্রকাশকেরা। তাঁরা সরকারের সব ধরনের নিয়ম মেনেই পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি পেয়েছেন। এসব পত্রিকা নিয়মকানুনের মধ্যে চলছে কি না, তথ্য মন্ত্রণালয় মাঝেমধ্যে তা দেখভাল করে।
এখন সরকারের যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন করতে হবে, সেহেতু ছাপা পত্রিকাগুলোকেও তাদের অনলাইন সংস্করণের নিবন্ধন নিতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বোঝার চেষ্টা করেছি। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, এর আদৌ প্রয়োজন নেই। তবে যেহেতু ‘ওপরের’ নির্দেশ, তাই অপ্রয়োজন মনে করলেও তাঁরা এটা বাস্তবায়ন করতে চান।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছাপা পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা, টিভি ও রেডিওর জন্য অভিন্ন সম্প্রচার নীতিমালা রয়েছে। পাকিস্তানে ছাপা পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকার জন্য একটি এবং রেডিও-টিভির জন্য আরেকটি নীতিমালা রয়েছে। আর আমাদের দেশে রেডিও, টিভি ও পত্রিকার জন্য যতগুলো আইন ও নীতি আছে, সেগুলো একত্র করলে এক ডজনের বেশি হবে। অনেক আওয়াজ দিয়ে একটি সম্প্রচার নীতিমালা তৈরি এবং তার আলোকে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চললেও বিতর্কের মুখে পড়ে এটি এখন কচ্ছপের গতিতে হাঁটছে।
অনলাইন নীতিমালা করার উদ্যোগটি ২০১১ সালের। ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা (খসড়া) নীতিমালা ঘোষণা করা হয়। এরপর ফেসবুক, বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে এর কঠোর সমালোচনা হয়। পাশাপাশি শুরু হয় গোলটেবিল বৈঠক, মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষরের মতো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। প্রাথমিক সেই খসড়া ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বাতিল করে ১৩ সদস্যের একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি অনলাইন নীতিমালার খসড়া ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। সেই খসড়া নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময় শেষে নীতিমালাটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু তথ্য অধিদপ্তর গত ৯ নভেম্বর অনেকটা আকস্মিকভাবে সংবাদমাধ্যমে তথ্যবিবরণী পাঠিয়ে অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে এই নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর ঘোষণাকে স্ববিরোধী ও উদ্দেশ্যমূলক বলে মন্তব্য করেছে সংবাদপত্রের প্রকাশক ও মালিকদের সংগঠন নোয়াব। প্রস্তাবিত নীতিমালায় কমিশন গঠন করলেও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওপরই ওই কমিশনকে নির্ভর করতে হতো। কারণ, ওই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকায় ওটা এমনিতেই দুর্বল থাকত। এখন সেই কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া থেকেও মন্ত্রণালয় সরে গেল।
এর ফলে কী হতে পারে, সেই আভাস দিয়ে নোয়াব জানিয়েছে, সরকার অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন বা পরিচালনার বিষয়গুলো নিজ এখতিয়ারে রাখলে এ ধরনের সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কঠোর হবে, যা মুক্ত সাংবাদিকতার অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। তা ছাড়া এই নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে দলীয় পরিচয় দেখা, হয়রানি বা আর্থিক লেনদেনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ ওঠাও দেশে আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অসম্ভব ব্যাপার নয় বলে মত দিয়েছেন তাঁরা।
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ দেশেও ছাপা পত্রিকাগুলোর অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে দেশের পাঠকই শুধু নয়, প্রবাসী বাংলাভাষীরাও দেশের তাৎক্ষণিক খবরাখবর জানতে পারছেন। প্রচলিত সব নিয়মকানুন মেনে যাঁরা ছাপা পত্রিকা প্রকাশ করছেন, তাঁদের অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা নিবন্ধন কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোরও অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। বিবিসি বাংলাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোরও অনলাইন সংস্করণ আছে। কয়েকটি ইন্টারনেট টেলিভিশন চালু হয়েছে, যেগুলোর সংখ্যা তথ্য মন্ত্রণালয়ও জানে না। এমনকি বিভিন্ন জেলা ও থানা সমিতির ওয়েবসাইট আছে, ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ওয়েবসাইটে খবরাখবর প্রকাশ করে। প্রশ্ন উঠেছে, এসব অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন করতে হবে কি না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেউ দেশের বাইরে ওয়েবসাইট খুলে সেখানে নিউজ আপলোড করলে তা সরকার ঠেকাতে পারবে কি না। এমন অনেক ওয়েবসাইটও আছে, যেগুলো বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়।
অনলাইন পত্রিকা নিবন্ধনের হলফনামায় কমপক্ষে ১০ ধরনের তথ্য দিতে হবে, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যেমন চাওয়া হয়েছে; তেমনি চাওয়া হয়েছে চারিত্রিক সনদ, পেশাসম্পর্কিত সনদ, অভিজ্ঞতার সনদ, আর্থিক সচ্ছলতার সনদ, টিআইএন সনদ ইত্যাদি। ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাবসহ টুকিটাকি আরও অনেক বিষয় থাকবে নিবন্ধন ফরম পূরণের ক্ষেত্রে। নতুন নিবন্ধন যাঁরা নেবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এগুলো প্রযোজ্য ধরা হলেও যাঁরা পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি নিয়েছেন, তাঁরা এগুলো ছাড়াও গোয়েন্দা ছাড়পত্র পেয়েছেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতিও তাঁদের নিতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনে (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) ৪১টি ধারা ও কয়েক শ উপধারায় পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক কঠিন বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ৪২ বছর ধরে এই শিল্প চলছে। কেবল ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়, যার ফলে সরকার যখন-তখন পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করতে পারে না।
ছাপা পত্রিকার সঙ্গে একই প্রকাশক ও মালিক অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছেন বিধায় তাঁকে আবার নিবন্ধন করতে বলা রীতিমতো হয়রানি। ছাপা পত্রিকার জন্য কঠিন যেসব নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়, তারপর অনলাইনের জন্য আবারও নতুন শর্ত আরোপ করা কার্যত একধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা ছাড়া অন্যকিছু নয়। এমনকি, ছাপা পত্রিকাগুলোর অনলাইন চালুর বিষয়টি যদি কেবল অবগতির জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে জানানোর কথা বলা হয়, সেটিও পত্রিকাগুলোর ওপর বাড়তি ঝামেলা চাপিয়ে দেবে। এটা না জানালে যে সরকারের ক্ষতি হয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়।
গত কয়েক মাসে অনলাইন পত্রিকা বিষয়ে সরকারের প্রথম সমালোচনার বিষয় ছিল এগুলোর সংখ্যা নিয়ে, দ্বিতীয় সমালোচনা এ ধরনের পত্রিকার অপসাংবাদিকতা নিয়ে। কিন্তু সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের কারণ দেখি না। ২৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, দেশে দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ বিভিন্ন পত্রিকার সংখ্যা ২ হাজার ৮১০টি। এ ছাড়া দেশে টেলিভিশন, বেতার, এফএম রেডিও ও কমিউনিটি রেডিওর সংখ্যা প্রায় ১৫০। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এবং যে দেশের অর্ধেক মানুষ শিক্ষিত, সেখানে এতো গণমাধ্যমের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে জোরেশোরে। ফকিরাপুলে একই ঠিকানায় একাধিক পত্রিকার কার্যালয় যেমন আছে, তেমনি একই ছাপাখানায় অনেকগুলো পত্রিকাও ছাপা হচ্ছে। দেয়ালপত্রিকা নামে পরিচিত এসব ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকা যদি টিকে থাকতে ও সরকারের সুবিধা পেতে পারে, তাহলে অনলাইন পত্রিকাগুলোর সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখি না।
সরকার নিবন্ধন করার যুক্তি হিসেবে যেচে অনলাইন পত্রিকাগুলোকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটিও রক্ষার সক্ষমতা ও বাস্তবতা কতটা রয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টন যেমন নেই, তেমনি সরকারি বিজ্ঞাপনের বাজারও ছোট। এর মধ্যে কয়েক হাজার অনলাইন পত্রিকাকে নিবন্ধন দিয়ে তাদের কী ধরনের সুবিধা এবং কতটুকু দেওয়া যাবে, সেটি সহজেই আন্দাজ করা যায়।
আবার অনলাইন পত্রিকায় অপসাংবাদিকতা যে হচ্ছে না, এমনটি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নিবন্ধিত বা অনুমতি পাওয়া গণমাধ্যমগুলো কি হলুদ সাংবাদিকতা করছে না? তবে কেউ এটা করলেও তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান প্রচলিত আইনে রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন অনলাইন পত্রিকাগুলোর জন্য একধরনের হুমকি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
২৭ নভেম্বর সংসদে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো অনলাইন পত্রিকা অপসাংবাদিকতা করলে অথবা সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। মন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট যে অপসাংবাদিকতা রোধ করার শক্ত আইন আছে।
নোয়াব ২৩ নভেম্বরের বিবৃতিতে বলেছে, অনলাইন পত্রিকা প্রকাশ করলেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যদি কেউ নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সব রকম সুযোগ রয়েছে।
পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, অনলাইন পত্রিকাগুলো গণমাধ্যমের কুটির শিল্প হিসেবে কাজ করছে। এ ধরনের পত্রিকাগুলো যে স্বাধীন মত প্রকাশে কাজ করে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর দেশে অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা থাকায় রাষ্ট্র, সরকার বা জনগণের ক্ষতি হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
ছাপা পত্রিকার জগৎ দুনিয়াজুড়ে একদিকে ছোট হয়ে আসছে, অন্যদিকে এ ধরনের পত্রিকায় প্রতি কপিতে আয়ের চেয়ে ব্যয় হয় কয়েক গুণ। সে ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলোর টিকে থাকার অন্যতম উপায় বেসরকারি বিজ্ঞাপন। আর বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতা ওই প্রতিষ্ঠানকেই বিজ্ঞাপন দেবে, যার পাঠকপ্রিয়তা আছে। তাই চূড়ান্ত বিচারে পাঠক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর যেকোনো পত্রিকার অস্তিত্ব নির্ভর করবে এবং সেই বিচারের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।
তথ্য মন্ত্রণালয় অনলাইন পত্রিকার বিষয়গুলো এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, যাতে মনে হয়, এটা বড় কোনো জাতীয় সমস্যা। যে প্রশ্ন চেপে রাখতে পারি না, তা হলো মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তিনটি সংবাদমাধ্যমের অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন কি এসেছে? বরং বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এগুলোর আয় কমছে, মানও পড়ছে। এটা প্রমাণের জন্য কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ওই সব প্রতিষ্ঠানের মান ও আয় যেখানে ধরে রাখা যাচ্ছে না, সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগের খুদে এসব অনলাইন প্রতিষ্ঠানের ওপর অহেতুক নজরদারির প্রয়োজন আছে কি?
শেষে একটি কথাই বলব, আইন মেনে যার যা ইচ্ছা করার সুযোগ দেওয়া হোক। নিবন্ধন, নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ—কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই। পাঠকই বিচার করবে কোনটি টিকে থাকবে বা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
শরিফুজ্জামান: সাংবাদিক।
pintu.dhaka@gmail.com

উন্নয়নে স্বাধীন গণমাধ্যম-নাগরিক সমাজ জরুরি: জার্মান রাষ্ট্রদূত

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে
মতবিনিময় করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত
জার্মানির রাষ্ট্রদূত টমাস প্রিনজ। সোমবার
প্রথম আলোর পঞ্চম তলার সভাকক্ষে
ওই মতবিনিময় সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর
সম্পাদক মতিউর রহমান। ছবি: মনিরুল আলম
ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত টমাস প্রিনজ বলেছেন, একটি দেশের উন্নয়নের স্বার্থে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ জরুরি। কারণ গণমাধ্যম অবাধ ও শক্তিশালী হলে তা সরকারকে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও বেসরকারি সাহায্য সংস্থার ওপর সরকারের চাপ নিয়ে দেশটি উদ্বিগ্ন।
আজ সোমবার প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় টমাস প্রিনজ এ মন্তব্য করেন। প্রথম আলোর পঞ্চম তলার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ওই মতবিনিময় সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। মতবিনিময়ের শুরুতে ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির এই রাষ্ট্রদূত সূচনা বক্তব্যে দেন। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সূচনা বক্তব্যে টমাস প্রিনজ বলেন, ‘আমি মনে করি, একটি দেশের জন্য স্বাধীন ও সরকারের কাজের ইতিবাচক সমালোচক গণমাধ্যম থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমাজের রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোথায় কী করা দরকার, সেটি গণমাধ্যমই আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়। একটি অবাধ ও শক্তিশালী গণমাধ্যম থাকলে তা সরকারকে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।’
টমাস প্রিনজ বলেন, ‘দুই দেশের চমৎকার সম্পর্কের পরও বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া আমাদের কিছুটা উদ্বিগ্ন করছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমের ওপর চাপ, কার্যত কোনো বিরোধী দল না থাকা, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি সংস্থা বিষয়গুলো আমাদের উদ্বিগ্ন করে। আমরা আশা করব সরকার এ বিষয়গুলোর নেতিবাচক দিকটিকে বিবেচনায় নেবে।’
জার্মানিতে আইএসের ঝুঁকি কতটা, জানতে চাইলে টমাস প্রিনজ বলেন, ‘আমাদের দেশেও আইএসের ঝুঁকি আছে। প্যারিসের হামলার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জার্মানির সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ ছিল। সুখকর ব্যাপার হচ্ছে, আমরা তাদের প্রতিহত করতে পেরেছি। আইএস এখন শুধু পশ্চিমা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং সব মুসলিম দেশে অবস্থান করছে। তাই এদের বিরুদ্ধে লড়াইতে আমাদের শক্তি সমবেত করার বিকল্প নেই।’
ঢাকায় ঘুরতে ঝুঁকি বোধ করেন কি না, জানতে চাইলে জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বিদেশিদের ওপর হামলার আগে ঢাকায় চলাফেরার ক্ষেত্রে আমি বেশ স্বাভাবিক ছিলাম। এখন আমি বেশ সতর্ক। তবে সরকার নিরাপত্তা জোরদার করার পর গুলশান-বারিধারায় আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।’
জার্মান রাষ্ট্রদূত জানান, তিন দশক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় ১৯৮৩ সালে শিক্ষানবিশ হিসেবে তিন মাসের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। ওই সময় তিনি ঢাকা ও টাঙ্গাইলে তৎকালীন জিটিজেডে (জার্মানির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা) শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেছেন।

ধর্ষণের জন্য পোশাকই দায়ী!

মুম্বইয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে ধর্ষণের কারণ নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিমত জানতে চাইল বম্বে হাইকোর্ট। সেই সাধারণ মানুষ চন্দ্রকান্ত পালভ দাবি করলেন, ধর্ষণের জন্য মেয়েদের আঁটসাঁট পোশাকই দায়ী!
মুম্বইয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে একগুচ্ছ মামলার শুনানি হাইকোর্টে চলছিল শনিবার। বর্ষীয়ান চন্দ্রকান্ত একটি মামলার আবেদনকারী। বিচারপতি নরেশ পাটিল এবং বিচারপতি এস বি সুক্রের ডিভিশন বেঞ্চে তিনি জানান, মেয়েদের পোশাকই ধর্ষণের জন্য দায়ী। তাঁর কথায়, ইদানীং মেয়েরা জিনস, কুর্তা বা শর্ট স্কার্টের মতো আঁটসাঁট পোশাক পরে বাইরে বেরোন। সে কারণেই ধর্ষণের ঘটনা এত বেড়ে যাচ্ছে।
চন্দ্রকান্তের বক্তব্য শোনামাত্র প্রতিবাদ করেন আইনজীবীরা। সরকারপক্ষের দুই আইনজীবী তো বটেই, এমনকী, চন্দ্রকান্তের আইনজীবী রাজীব চহ্বাণও বলেন, একজন মহিলার পোশাকের সঙ্গে তাঁর উপর অত্যাচারের সম্পর্ক কী? এই যুক্তির প্রতিবাদ করছি আমরা। যিনি অত্যাচারের শিকার, এর ফলে তাঁর উপরেই দোষ চাপানো হচ্ছে।  তাঁদের থামিয়ে দিয়ে বিচারপতি পাটিল বলেন, ওঁকে থামাবেন না। আমরা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।  তারপর এ বিষয়ে তাঁর মতামত বিস্তারিত জানান চন্দ্রকান্ত। 
চন্দ্রকান্তের বক্তব্য জানার পরে রাজীবই তাঁর মক্কেলের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, ধর্ষণের জন্য যদি পোশাকই দায়ী হয়, তাহলে তিন-চার বছরের শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে কেন? এর পরে শুনানি স্থগিত রাখেন বিচারপতি।
ধর্ষণের জন্য মেয়েদের পোশাক এবং আচরণকে দায়ী করে এর আগে বিতর্কে জড়িয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। এবার জানা গেল এক সাধারণ মানুষের একই দৃষ্টিভঙ্গি’র কথাও। প্রসঙ্গত, ওই সাধারণ চন্দ্রকান্ত মুম্বইয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা চেয়ে বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। সেইসঙ্গে দাবি করেছিলেন, মেয়েদের পোশাকবিধি চালু করার জন্য নির্দেশ দিক আদালত।

প্যারিস এবং আইসিস by হামিদ মীর

খুব বেশি দিন হয়নি। ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর পক্ষ থেকে ফ্রান্সের ১২টি মহাসড়কের নাম এমন সাংবাদিকদের নামে নামকরণ করা হয়েছে, যাদের গত কয়েক বছরে হত্যা করা হয়েছে বা কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। প্যারিসের একটি স্ট্রিটের নাম দেয়া হয়েছে সালিম শাহজাদ স্ট্রিট। এটি ওই স্ট্রিট যেখানে পাকিস্তানি দূতাবাস অবস্থিত। সালিম শাহজাদকে ২০১১ সালে ইসলামাবাদ থেকে অপহরণ করা হয় এবং ঝিলামের একটি শাখা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার হত্যাকারী আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সালিম শাহজাদসহ ১২ জন সাংবাদিকের নামকে প্যারিসের ইতিহাস ও ভূগোলের অংশ বানিয়ে সাংবাদিকদের অন্য সংগঠনকে জোরালো ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও ব্রাজিলের কিছু সাংবাদিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ২৭ নভেম্বর প্যারিসে একটি বৈঠক ডাকা হবে। ৩০ নভেম্বর থেকে প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হবে এবং সারা বিশ্বের সাংবাদিক প্যারিসে সমবেত হবেন। ২৭ নভেম্বর বৈঠকের উদ্দেশ্য ওই সম্মেলন উপলক্ষে আগত সাংবাদিকদের এ কথা জানানো যে, সোমালিয়া, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও মেক্সিকোর পর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও ব্রাজিলেও সাংবাদিকদের হত্যা করা হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের হত্যা বন্ধের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকা খুবই প্রয়োজন। ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসকে ধন্যবাদ দেয়ার কথা ছিল, কেননা এ সংগঠনের কেন্দ্রীয় দফতর প্যারিসে। ওই প্রতিনিধিদলে আমাকেও রাখা হয়েছিল। ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় কলম্বো থেকে এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে ফোনে অবহিত করলেন, ২৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। ৩০ নভেম্বর প্যারিসের আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে আনুষঙ্গিক আরো অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৪ নভেম্বর প্যারিসে ঘটিত হামলার পর কিছু অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
১৪ নভেম্বরের হামলা ফ্রান্সের নাইন-ইলেভেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা মুসলমানদের জন্য সঙ্কট তৈরি করেছিল। ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বরের হামলাও মুসলমানদের জন্য ইউরোপের ভেতর ও বাইরে বেশ জটিলতা সৃষ্টি করবে। নাইন-ইলেভেনে একজন পাকিস্তানিও জড়িত ছিলেন না। তারপরও নাইন-ইলেভেনের ধ্বংসযজ্ঞে পাকিস্তানের উপজাতীয় গোত্রীয় অঞ্চলগুলো ও খায়বারপাখতুনখাওয়া তছনছ হয়ে যায়। প্যারিসে ১৪ নভেম্বরের হামলাতেও কোনো পাকিস্তানি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, হামলাকে পুঁজি করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক নতুন অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আলজাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রামাণ্য চিত্রে আফগান সেনাবাহিনী ও আফগান তালেবানের প্রতিনিধিদের বলতে দেখা গেছে যে, আফগানিস্তানে দাঈশ বা আইসিস বা আইএসের তৎপরতা এমন লোকেরা শুরু করেছে, যারা অতীতে নামসর্বস্ব লস্করে তইয়েবার সাথে যুক্ত ছিল। আশ্চর্য কাহিনী। পাশ্চাত্য শক্তিগুলো আগে ইরাক ও সিরিয়াতে আইএসকে নিজেদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এখন তালেবান ও ইরানবিরোধীদের বিরুদ্ধে আইএসকে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। একটা সময় পশ্চিমারা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করেছে। এরপর সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটিয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলায়। সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। সাদ্দাম হোসেন ও উসামা বিন লাদেনের শরীরী অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এখন আইসিসের অস্তিত্ব দাঁড় করানো হয়েছে। যাদের উগ্রতায় আলকায়েদার চেয়ে দশ কদম অগ্রসর দেখা যাচ্ছে।
আইএস প্যারিস হামলার দায় স্বীকার করে পাশ্চাত্য শক্তিগুলোকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর হামলার বৈধতা তৈরি করে দিয়েছে। প্যারিস হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। পাকিস্তানের উচিত মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোকে এক যৌথ কর্মসূচি গ্রহণে আকৃষ্ট করা।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১৬ নভেম্বর, ২০১৫ হতে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

তাঁর চলে যাওয়ার পর by মইনুল ইসলাম জাবের

কাইয়ুম চৌধুরী। ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম
বাবা ‘না’ বলতে পারতেন না। এ নিয়ে বিপদের অন্ত ছিল না। প্রায়ই নানা মানুষ আমাদের বাড়ির দরজায় টোকা দিতেন, টেলিফোনে রিং দিতেন আর রাস্তাঘাটে দেখা হলে পথ আগলাতেন—‘কাইয়ুম ভাই, এই কাজটি কিন্তু পরশুর মধ্যে চাই।’ কিংবা ‘আমাদের এই অনুষ্ঠানে কিন্তু আপনি প্রধান অতিথি।’ বাবা স্বভাবসুলভ হ্যাঁ বাচক উত্তর দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত খেটে সবার মন রক্ষার চেষ্টায় প্রায় ব্যর্থ হয়ে অনেককেই শেষমেশ বলতে বাধ্য হতেন, ‘আজ নয়, কাল।’ বাবার কাছ থেকে কাজ পেতে অনেককেই তাই বেগ পেতে হয়েছে। কেউ বুঝেশুনে ‘কাইয়ুম ভাইকে’ সময় দিয়েছেন, কেউ কেউ আবার দ্বারস্থ হয়েছেন অন্য কোনো শিল্পীর। তবে যাঁরা থেকেছেন, তাঁরা বুঝেছেন কাইয়ুম চৌধুরীকে সময় দিলে কী অসাধারণ কাজ তিনি করে দিতে পারেন। আর যাঁরা এই সময়টুকু দিতে পারতেন না, পরবর্তী সময়ে তাঁরা আফসোস করেছেন কি না, জানি না।
বাবা তড়িঘড়ি কাজ করার লোক ছিলেন না। একটি কাজ তা গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা পেইন্টিং কিংবা চারু ও কারুকলায় অন্য যেকোনো মাধ্যমেরই হোক—সে কাজে হাত দেওয়ার আগে অসংখ্য ‘লে আউট’ করা তাঁর প্রথম কাজ ছিল। এই ‘লে আউট’গুলো মূল কাজের আসল রূপ তৈরির কাজটি করত। একেকটি লে আউট মাঝে মাঝে একেকটি দিনের কাজ হতো। আর চিন্তার সাগরে ভাসতে ভাসতে এই ‘লে আউট’গুলোকে নিয়েই বাবা মূল কাজের দ্বীপটিতে তরি ভেড়াতেন। তাই সময় তো লাগতই। ছবি আঁকার প্রায় পুরোটাই যে ‘ভাববার’ বিষয়, আর কিছুটা ‘করবার’—এমন মতের শিল্পী ছিলেন বাবা। ছয় দশকের শিল্পসম্ভার আর গ্রাফিক ডিজাইনের প্রায় প্রতিটি শাখার কাজকে একবারে যদি বিশ্লেষণ করতে হয়, তবে বলতেই হবে—কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্প সৃষ্টির সম্পূর্ণটাই ছিল ভাবনার, একটি বিষয়কে বারবার নানাভাবে দেখার, বোঝার এবং তারপর দেখানোর। শিল্প সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এই দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তিনি জীবনভর। শেষ মুহূর্তের বক্তৃতায়ও এই দর্শনেরই দিশা দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে বিদায় দিয়ে চলে গেছেন পৃথিবীর পাট চুকিয়ে। বাবার প্রস্থান হয়েছে, তবে তাঁর দর্শনের প্রস্থান হলে এ দেশের শিল্পকলার মহা বিপদ হবে। ভাববার লোক এ দেশ থেকে বিদায় নিচ্ছেন অতি দ্রুত।
দশকওয়ারি শিল্প সাজালে বুঝতে পারা যায় কাইয়ুম চৌধুরী কীভাবে প্রায় প্রতি দশকেই নতুন করে নিজেকে, নিজের শিল্পকে এবং শিল্পদর্শনকে বদলেছেন। আমার আর বাবার শিল্পসংক্রান্ত আলোচনার প্রায় একটা বড় অংশই জুড়ে থাকত বাবার অতৃপ্তিবোধের কথা। অসম্ভব পরিবর্তনপ্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি। সেই ষাটের দশক থেকে বাংলার রং, রূপ আর চারপাশের প্রকৃতি থেকে নানা কিছু নিয়ে তিনি যে নকশাময়ী নৌকা, সূর্য, গাছ, পশু-পাখি, নদী, মানুষের রূপ তৈরি করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই প্রতি দশকেই বদলেছে। আর এই বদলের মধ্য দিয়েই যেন তাঁর সৃষ্টি এই মোটিফগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমার ছোট্ট রোহিনা বলে, আকাশে আমার সূয্যি মামা আর ছবিতে দাদার সূয্যি মামা! স্টাইলাইজড যে সূর্য, যে গাছ, যে লতাগুল্ম বাবা সৃষ্টি করেছেন, এসব তো একান্ত এই বাংলার। বাবার শেষ জীবনের পেইন্টিংগুলো বাংলার লোকজ সম্ভারের দিকে এমনভাবে শিল্পালোক ছাড়াচ্ছিল, যেন তিনি চাইছিলেন বাংলার বুননশিল্পের, বাংলার নকশিকাঁথার প্রতিটি ‘সেলাই’কে ছুঁয়ে দেখবেন, তাঁর ক্যানভাসে ছেঁকে তুলবেন। ষাটের দশকের শুরু থেকেই লোকজ কলাকে আধুনিক দৃষ্টিতে দেখার যে দর্শন তিনি লালন করেছেন, শেষকালের কাজে তারই পূর্ণাঙ্গ রূপ তিনি দিয়েছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের শিল্পকলা যদি এর গণ্ডির ভেতর থেকে বিশ্বে কিছু দিতে চায়, তবে তাকে কাইয়ুম চৌধুরীরই কাছে ফিরতে হবে।
বাবার গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে যদি কিছু বলা হয়, তবে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের গ্রাফিক ডিজাইনেরই ইতিহাস বলা হবে। তাঁর আগে কী ছিল, আর তিনি কী করেছেন—এ বয়ান অনেকগুলো বিশ্লেষণধর্মী বইয়ের উপাদান। ইলাস্ট্রেটেড প্রচ্ছদের চলকে ভেঙে প্রথমে ইলাস্ট্রেটেড ও ক্যালিগ্রাফিক প্রচ্ছদের দিকে চোখ ফেরান এবং তারপর ক্যালিগ্রাফি আর টাইপোগ্রাফির খেলায় আমাদের চোখকে নাচিয়ে তোলার কাজটি কী সন্তর্পণে তিনি করেছেন। পোস্টার চিত্রে বাবা যে অসাধারণ আধুনিকতার কাজটি করেছেন, তার রূপ খুঁজতে কষ্ট করার প্রয়োজন হবে না—‘এশিয়ান বিয়েনাল’-এর পোস্টারগুলো দেখলেই তা বোঝা যাবে। যখন যেমন দরকার, তখন তেমনভাবে টাইপ, রং, ছবি কিংবা অলংকরণের মধ্য দিয়ে ‘কমিউনিকেটিভ’ পোস্টারে বাংলাদেশের গ্রাফিক ডিজাইনকে মাতিয়েছেন তিনি। এরপর লোগো কিংবা পত্রিকার নামলিপি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ম্যাগাজিন এবং দৈনিকের ‘মেকআপ’ পর্যন্ত করেছেন বাবা। প্রতিটি কাজে তিনি নিজেই ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। বারবার বদলে নিয়েছেন অতীতের করা কাজ। ছোট একটা উদাহরণ দিই, প্রথম আলোর সহযোগী ‘প্রতিচিন্তা’ জার্নালটির প্রতিটি সংখ্যার নামফলকের প্রতিবর্তন ঘটিয়ে প্রচ্ছদ করেছেন বাবা। হাতে নিয়ে দেখলে অবাক হতে হয়, মাত্র চারটি অক্ষরকেই কী করে একজন মানুষ এতভাবে দেখতে পারেন? দেখাতে পারেন? আমাদের শহীদ মিনারটিকে প্রচ্ছদে, পোস্টারে, ক্যানভাসে বাবা এমনই অসংখ্যবার অসংখ্যভাবে দেখিয়েছেন। দেখার চোখ তাঁর ছিল, দেখানোর হাতটাও ছিল অসাধারণ। তবে দেখার লোকেরা তা কেমন দেখেছে, তা বলা দুষ্কর।
বাংলাদেশের শিল্পজগতে বাবার এত যে বিস্তর অবদান, এ সবকিছুই কিন্তু হয়েছে তাঁর সেই অকৃত্রিম ‘না’ বলতে না পারার কারণেই। নানা মানুষের নানা কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে তিনি শিখেছেন, পরোক্ষভাবে সবাইকে শেখাতে চেয়েছেন। জোর করে পড়িয়ে শেখানোর মানুষ তিনি ছিলেন না। কাজ করে যেতেন। বুদ্ধিমানেরা সেখান থেকেই শিখে নেবে—সেটাই ভাবতেন। এ দেশে এমন শিল্পীকে কেবল শিল্পের মাঝেই আবদ্ধ থাকলে তো চলে না; নানা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কাজেও জড়াতে হয়। বাবাও তেমনভাবে জড়িয়েছিলেন। কখনো ইচ্ছায়, কখনো অনিচ্ছায়। সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে শিল্পীসমাজের একজন নেতা কাইয়ুম চৌধুরী হলেও সাংগঠনিক কাজের ঘোরপ্যাঁচ বোঝার মানুষ তিনি ছিলেন না। শেষ জীবনে সে জন্য বেশ মানসিক কষ্টে ভুগতে হয়েছে তাঁকে। তবু দেশকে এবং মানুষকে ভালোবাসার যে দর্শন তিনি লালন করেছিলেন, সেই তরুণ জীবনে তা থেকে একচুলও নড়েননি। শেষকালের বক্তৃতায় এই ভালোবাসার কথা আশাভরা বুকে বলে গেছেন তিনি।
লেখাটির শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছি। বাবা যে নেই, সেটি এখনো মানতে পারি, তা নয়। নিজের কর্মক্ষেত্রে দেশে কিংবা বিদেশে যত কিছুই করি, শেষমেশ মানুষ আমার বাবার জন্যই আমাকে ভালোবাসে। কিছুদিন আগে ইউরোপের এক দেশে কিছু বিজ্ঞানীর মাঝে যখন একজন পরিচিত আমার বাবার কথা ওঠালেন, তখন সবার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দেখেছি; শিল্প ও শিল্পীকে ওরা কতটা মর্যাদা দিতে শিখেছে। বাংলাদেশে তার রেশমাত্র যদি দেখতে পেতাম, তবে বেশ ভালোই লাগত। এখানে শিল্পীর সামাজিক মর্যাদা হয়তো আছে। তবে শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এখনো নেই। শিল্পের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই জনে জনে ‘শৈল্পিক চোখ’ খুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমার বাবা তাঁর ‘শেষ মুহূর্ত’ পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন। জনমানুষের বিশাল আড্ডায় শিল্পীকে নয়, বরং শিল্পকে বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েই চিরবিদায় নিয়েছেন কাইয়ুম চৌধুরী। আজ ৩০ নভেম্বর, বাবার চলে যাওয়ার একটি বছর পর এই রইল কামনা—এ দেশ যেন তাঁর শিল্পকলাকে ভালোবাসতে শেখে।
মইনুল ইসলাম জাবের: প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর ছেলে।

আমাদের কাইয়ুম ভাই: প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা by মতিউর রহমান

জীবনের শেষ ছবি। গত বছর ৩০ নভেম্বর
আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গসংগীতের মঞ্চে
কী যেন বলার ছিল তাঁর। বক্তৃতা শেষ করে মাইকের সামনে থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর আসনে। তারপরেই মনে পড়েছিল কথাটি। ‘আমার আরেকটি কথা আছে’ বলে ফিরে এসেছিলেন মঞ্চে। কথাটি আর বলা হলো না। ঢলে পড়লেন দেশের সেরা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। গত বছর এই দিনে, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের চতুর্থ দিনের আসরে।
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল একটি বছর। আবার সেই আর্মি স্টেডিয়ামে জমে উঠেছে রাগ-রাগিণীর আসর। শিল্পী ও শ্রোতায় উৎসবমুখর হেমন্তের রাত। না থেকেও তিনি আছেন। উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে।
সে রাতে আমি উৎসব প্রাঙ্গণে ছিলাম না। কাইয়ুম ভাইয়ের দুঃসহ মৃত্যুসংবাদ পাই পরদিন সকালে ব্যাংকক বিমানবন্দরে। ঢাকায় ফিরে এসে এক গভীর শূন্যতায় বারবার তাঁর কথা মনে পড়েছে। এখনো প্রতিদিন তাঁকে স্মরণ করি। আগামী দিনগুলোতেও তিনি এভাবেই আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, আমাদের প্রিয় ‘কাইয়ুম ভাই’ তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ের শিল্পসাধনায় দেশের চারুকলার জগৎকেই সমৃদ্ধ করেননি, দেশের সংস্কৃতি ও জনজীবনকেও রাঙিয়ে দিয়েছেন। জনরুচির নির্মাণে রেখেছেন তাৎপর্যপূর্ণ অবদান। ক্যানভাসে, কাগজে, হাজার পাঁচেক বইয়ের প্রচ্ছদে, অগণিত পোস্টার, নিমন্ত্রণপত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংবাদপত্রের লোগো, অলংকরণের ভেতর দিয়ে তিনি এক আশ্চর্য সুন্দর জগতের দরজা উন্মোচন করেছেন আমাদের জন্য। সেখানে আমরা অভিভূত হয়ে দেখি লাল, নীল, সবুজ, হলুদের চোখজুড়ানো সন্নিবেশ। লতাপাতা, ফুল, পাখি, নৌকা, মাছ, তালপাতার পাখা, দিগন্তবিস্তৃত মাঠের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী, অবারিত আকাশ, বাংলার চিরশ্যামল প্রকৃতি। কবি জীবনানন্দ দাশ যেমন তাঁর পঙ্ক্তিমালায় তুলে এনেছেন রূপসী বাংলার প্রকৃতি, তেমনি করে রংতুলিতে বাংলার লাবণ্যমাধুরী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্লান্তভাবে তুলে ধরেছেন কাইয়ুম চৌধুরী। তাই বিদগ্ধজনেরা তাঁকে বলেছেন রংতুলির জীবনানন্দ। ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীনালায় ঘুরে বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। এখান থেকে আমি ছবির বিষয়বস্তু আহরণ করি।’
কাইয়ুম ভাইয়ের সত্তর বছরে পা রাখা উপলক্ষে ২০০৪ সালের ৬ মার্চ বেঙ্গল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাঁর চতুর্থ একক চিত্র প্রদর্শনী। নাম ছিল ‘আবহমান’। সে সময়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার ঐতিহ্য, আমার শিল্পের পশ্চাদ্ভূমি আমাকে জানতে হয়েছে। এ অঞ্চলের পাল যুগের শিল্পকর্ম, সেন যুগের ভাস্কর্য ও লোকশিল্পের যে আবহমান ধারা আমরা দেখি, সেটিই আমাদের ঐতিহ্য।’ এই শিল্পবোধ নিয়েই কাজ করেছেন তিনি। একসময় সুদিন ছিল এই দেশে। আঁকতে চেয়েছেন সেই সময়ের ছবি। তেলরং, জলরং, গোয়াশ, প্যাস্টেল, অ্যাক্রেলিক, কালি-কলম, ছাপচিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক পরিশীলিত নিজস্ব শিল্পভাষা বিনির্মাণ করেছিলেন তিনি।
ছবি আঁকার বাইরে সুকুমার শিল্পকলার প্রতিটি ক্ষেত্রেই গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। নেশা ছিল বই পড়া ও গান শোনার। সিনেমার প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। বই, গানের রেকর্ড ও ভিডিওর বিপুল সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সারা জীবনের চেষ্টায়। সুকুমারকলার প্রতি এই অনুরাগ অনেকটা উত্তরাধিকারসূত্রেই পেয়েছিলেন। বাবার কলের গান ছিল। গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রহও ছিল ভালো। বাবার কোলে বসে দেখেছিলেন প্রথম সিনেমা। সেই অনুরাগ আমৃত্যু লালন করে গেছেন কাইয়ুম চৌধুরী।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন সমাজ ও সমকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্পচর্চার বিপরীত মেরুতে। ছিলেন অত্যন্ত সমাজ-সচেতন, রাজনীতি-সচেতন মানুষ। ১৯৩৩ সালে তাঁর জন্ম নোয়াখালীতে। ১৯৪৯ সালে এসএসসি পাস করে তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত ঢাকা আর্ট কলেজে দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়েছিলেন। পাস করে বের হন ১৯৫৪ সালে। ছাত্রজীবনের সময়টি কেটেছে গৌরবময় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনে। সে সময় দেশের প্রধান কবি-সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে জহির রায়হানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নিবিড়। তাঁর প্রথম বই শেষ বিকেলের মেয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন। পরে তাঁর সিনেমার পোস্টারও এঁকেছেন। প্রবন্ধ, কবিতা, শিশুতোষ ছড়া লিখেছেন। তাঁর ছড়ার বই প্রকাশিত হয়েছে তিনটি।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার। সে বছর ফেব্রুয়ারির এক সকালে বন্ধু আসাদুজ্জামান নূরকে সঙ্গে নিয়ে আজিমপুরে কাইয়ুম ভাইয়ের বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদের একুশের কবিতা সংকলনের প্রচ্ছদ আঁকিয়ে নেওয়ার জন্য। বজ্রে বাজে বাঁশী নামের সেই সংকলনের তিনরঙা প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন তিনি। অভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোতে কাইয়ুম ভাইকে দেখেছি ছাত্র-শিক্ষক-শিল্পীদের মিছিলে অংশ নিতে। মুক্তিযুদ্ধের আগে চারু ও কারুশিল্পীদের যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন তিনি ও শিল্পী মুর্তজা বশীর।
কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে সেই যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল। অটুট ছিল তাঁর মৃত্যু অবধি। তাঁকে সেই ১৯৬৯-৭০ সালে যেমন উদ্যমী দেখেছি, যেমন অনুপ্রেরণা পেয়েছি তাও অব্যাহত ছিল বরাবর। বিশেষ করে প্রথম আলোর সঙ্গে তাঁর বন্ধন ছিল নিবিড়। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি আমরা যখন প্রথম আলো বের করার উদ্যোগ নিই, তখন প্রতিটি কাজে কাইয়ুম ভাইয়ের পরামর্শ নিয়েছি। অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে তিনি প্রথম আলোর লোগো, বিভিন্ন পৃষ্ঠাসজ্জা, ক্রোড়পত্রের লোগো—সবকিছুই করে দিয়েছেন। পরেও তাঁর পরামর্শ ছাড়া আমরা এসবের কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করিনি। এখনো তাঁর অভাব বোধ করি প্রতিদিন, তাঁকে অনুভব করি সকল কাজে।
কাইয়ুম চৌধুরীর অপ্রকাশিত কবিতা
অনেক কথা বলার ছিল
অনেক স্বপ্ন জমিয়ে রেখেছি
আঁকব বলে দু’জনে মিলে
চিত্রপটও সাজিয়ে তুলেছি।

সময় তোমার হয় না যখন
শুনবে কখন আমার কথা
স্বপ্ন আমায় দেখবে কখন
রং ছড়ানো যাবেই বৃথা?

এসো না আজ শুরু করি
রঙের খেলা চিত্রপটে
হাত বাড়িয়ে দাও না তুমি
নকশা করি শূন্য ঘটে।

রুশ যুদ্ধবিমানের নিহত পাইলটের লাশ তুরস্কে

রাশিয়ার যে যুদ্ধবিমানটিকে গত সপ্তাহে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের কাছে গুলি করে ভূপাতিত করেছে - তার একজন পাইলটের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তুর্কী প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতুলু বলেছেন, নিহত রুশ পাইলট লে. কর্নেল ওলেগ পেশকফের মৃতদেহ তাদের কাছে রয়েছে। সিরিয়ার সাথে সীমান্তের একটি প্রদেশ হাতাইয়ে মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়েছে। এখন তা রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে প্রস্তুতি চলছে। তিনি জানান, তুরস্কের একজন সামরিক কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে রাশিয়ার একজন কর্মকর্তা খুব শীঘ্রই সেখানে যাবেন এবং ওই পাইলটের মৃতদেহ গ্রহণ করবেন।
তুর্কী মিসাইলের আঘাতে বিমানটি বিধ্বস্ত হলেও পাইলট প্যারাশুট দিয়ে নেমে আসার সময় সিরিয়ার বিদ্রোহীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে মস্কোর কর্তৃপক্ষ গত শুক্রবার থেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
শুরু থেকেই আঙ্কারা বলে আসছে, তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ার পরেই সামরিক বাহিনী রুশ বিমানটিকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মাটিতে নামিয়ে আনে। এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে রাশিয়া। বিমান থেকে দু'জন পাইলট প্যারাশ্যুটের মাধ্যমে বাঁচার চেষ্টা করলে তাদের একজন সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরোধী বিদ্রোহীদের গুলিতে প্রাণ হারান। তুরস্ক এই বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করছে।
গত সপ্তাহের এই ঘটনার পর থেকেই তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে বড়ো ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দু'দেশের নেতারাই পরস্পরের বিরুদ্ধে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করছেন। এর মধ্যে তুরস্কের বিরুদ্ধে রাশিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও ঘোষণা করেছে।
বেঁচে যাওয়া আরেকজন রুশ পাইলটকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে উদ্ধারের পর ইতোমধ্যেই তাকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি সিরিয়ায় তার কাজে ফিরে যেতে চান। কারণ হত্যাকারীদেরকে তার সহকর্মীর জীবনের মূল্য ফেরত দিতে হবে।
এই ঘটনায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান প্রথমে রাশিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান। বরং তার অভিযোগ- আগুন নিয়ে খেলছে রাশিয়া। এই খেলা বন্ধ করার জন্যে তিনি প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি আহবান জানান। কিন্তু একদিন পরেই এরদোয়ান রুশ বিমানটি ভূপাতিত করার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
সূত্র : বিবিসি

কাইয়ুম চৌধুরী: একজন আনন্দময় মানুষ by সাজ্জাদ শরিফ

আত্মপ্রতিকৃতি: কাইয়ুম চৌধুরী
একটি বছর চলে গেল, কাইয়ুম চৌধুরী আমাদের মধ্যে নেই—এ কথা কেমন অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়! গত বছরের এই দিনটিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের মঞ্চে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে!
শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁর প্রধান পরিচয়ই এই যে তিনি রূপের অনুসন্ধানী ছিলেন। এই দেশ, দেশের মানুষ—তাদের যাপনের প্রহর, বেঁচে থাকার আনন্দ ও স্বপ্ন নিজের কল্পনায় রঞ্জিত করে রঙে ও রেখায় তিনি আজীবন রূপ দিয়ে এসেছেন। কিন্তু এটুকুই তাঁর সবটা নয়। শিল্পী হিসেবে কাইয়ুম চৌধুরীর বিচিত্র কৌতূহল ও সক্রিয়তা কেবলই চারুশিল্পের সীমানার মধ্যে আটকে থাকেনি। সেই সুনির্দিষ্ট সীমানাটি ছাপিয়ে তা বেরিয়ে এসেছিল মানুষের জীবন যাপনের আঙিনার ভেতরে। গ্রন্থসজ্জা, পোস্টার-পরিকল্পনা, লোগো বা নেমোনিক রচনা, কোনো সাংস্কৃতিক মেলার পরিসর-ভাবনা বা স্টল নির্মাণ, পরিধেয়-পরিকল্পনা ইত্যাদি ব্যবহারিক জীবনের নানা দৃশ্যবস্তু তাঁর হাতের ছোঁয়ায় রুচিময় হয়ে উঠত। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে কাইয়ুম চৌধুরীর ছিল প্রত্যক্ষ অবদান। বলতে গেলে, বাংলাদেশের নাগরিক দৃশ্য রুচির বিকাশে তাঁর ভূমিকাই ছিল প্রধান।
রঙিন মুদ্রণযন্ত্র প্রসারের আগে, সেই ব্লক তৈরি করে প্রচ্ছদ ছাপানোর যুগে, শুধু সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তির জোরে সীমিত উপকরণ ও আয়োজনের মধ্যেও অপূর্ব সব মার্জিত পুস্তক তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়েছে। বাংলা অক্ষর চিত্রণে তাঁর পটুত্ব ছিল অসামান্য। শুধু অক্ষর চিত্রণের বৈচিত্র্যেই তিনি একেকটি প্রচ্ছদের আলাদা আলাদা চরিত্র গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু বই তাঁর কাছে প্রচ্ছদমাত্র ছিল না, ছিল একটা সমগ্র। ফলে প্রচ্ছদের পাশাপাশি বইয়ের বাঁধাই, পুস্তানি, পুট বা মেরুদণ্ড, ইনার বা প্রারম্ভিক কয়েকটি পৃষ্ঠা, তাতে হরফের ধরন, আকার, সজ্জা—সবই ছিল তাঁর বিশেষ মনোযোগের বিষয়।
কাইয়ুম চৌধুরী রূপ অনুসন্ধান করেছেন এবং বিচিত্র রূপবন্ধ রচনা করেছেন। রূপের এই অন্বেষণের পেছনে ছিল তাঁর রসের জন্য তৃষ্ণার্ত একটি মন। রূপের সাধক ছিলেন বলে এই রস তিনি কেবল চারুশিল্প থেকে আহরণ করেননি। এ ক্ষেত্রে তাঁর মন ছিল একেবারে উন্মুক্ত। সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র—প্রতিটি বিষয়েই তিনি ছিলেন তীব্রভাবে উন্মুখ।
শিল্প-সাহিত্যের কল্পনামুখর জগতের দিকে কাইয়ুম চৌধুরীর কৈশোর উন্মিলিত হওয়ার পেছনে তাঁর বাবা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। কলকাতা থেকে তাঁদের বাড়িতে আসত বিচিত্র পত্রপত্রিকা এবং সিগনেট প্রেস, দেবসাহিত্য কুটিরসহ অন্যান্য রুচিশীল প্রকাশনীর বই। সেসব বইপত্রের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ হিসেবে মুদ্রিত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সমর দে বা প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি তাঁর মধ্যে শিল্পী হওয়ার বাসনা জাগিয়ে তোলে। এগুলোতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, হেমেন্দ্রকুমার রায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বা বুদ্ধদেব বসুর মতো লেখকের গল্প-উপন্যাসও তাঁর চিত্তের উদ্বোধনে মোটেই কম ভূমিকা রাখেনি।
সংগীতের প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ছিল দুর্বার। ১৯২১-২২ সালে কাইয়ুম চৌধুরীর বাবা যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র, তখন ত্রিপুরার জমিদার-নন্দন ও বাংলা গানের প্রবাদপুরুষ শচীন দেববর্মন ছিলেন তাঁর সহপাঠী। সেই সূত্রে বালক বয়স থেকেই শচীনকর্তার গানের পথ ধরে ধীরে ধীরে বিচিত্র ধরনের গানে কাইয়ুম চৌধুরীর আগ্রহ গভীর হয়ে ওঠে। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ছিল গানের এক বিচিত্র ও বিপুল সম্ভার। গানের প্রতি এই তীব্র আবেগ বাংলাদেশে সংগীতের নানা উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁকে গভীরভাবে যুক্ত করেছিল।
বাংলা অক্ষর চিত্রণে তাঁর পটুত্ব ছিল অসামান্য। শুধু অক্ষর চিত্রণের বৈচিত্র্যেই তিনি একেকটি প্রচ্ছদের আলাদা আলাদা চরিত্র গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু বই তাঁর কাছে প্রচ্ছদমাত্র ছিল না, ছিল একটা সমগ্র চলচ্চিত্রের প্রতিও তাঁর ছিল দারুণ টান। ছবি দেখতেন বিচিত্র রকমের। হলিউডের ১৯৫০-৬০ দশকের স্বর্ণযুগের ছবি খুবই ভালোবাসতেন। পশ্চিমের চিত্রশিল্পীদের জীবন অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্র সংগ্রহ করতেন আগ্রহ নিয়ে। তাই বলে চলচ্চিত্রের নিছক দর্শক তিনি ছিলেন না। ঢাকায় চিত্রনির্মাণের প্রায় আদিপর্ব থেকেই—সেই মাটির পাহাড়-এর চিত্রায়ণের সময়—তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। কাজও করেছেন চিত্রনির্মাণের নানা অংশে—সহকারী পরিচালক হিসেবে, শিল্পনির্দেশনায়, এমনকি চিত্রনাট্য রচনার প্রক্রিয়াতেও।
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সূচিত ১৯৫০-এর দশক ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখার অমোচনীয় চিহ্নটি আঁকতে শুরু করে। এ সময় থেকে আমাদের আত্মপরিচয় হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে চরিত্রটি রূপায়িত হতে শুরু করে, দ্রুতই তা বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠবে। চিত্রকর, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্রকার হিসেবে এই দশকের যে তরুণ দলের হাতে আত্মপরিচয়ের এ চিহ্ন আঁকা হচ্ছিল, কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন তাঁদের একজন।
মুক্তিযুদ্ধ ও তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয়ের সেই রাজনৈতিক লড়াই একটি ঐতিহাসিক পরিণতি পায়। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তার এক সফল পরিণাম। কিন্তু সাংস্কৃতিক নির্মাণের তো সফল পরিণতি বলে কিছু নেই। এ এক অন্তহীন প্রবাহ। সেই সজীব প্রবাহের সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরীর যোগ কখনোই শিথিল হয়নি।
নানা শিল্পমাধ্যমের প্রতি কাইয়ুম চৌধুরীর আগ্রহ তাঁকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর আর যে গুণের কথাটি বলা দরকার, সে তাঁর লেখালেখি। শেষ জীবনে, খেলাচ্ছলে প্রায় যেন বা পাবলো পিকাসোর মতো, নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেছিলেন কবিতায় ও ছড়ায়। কাইয়ুম চৌধুরী সে অর্থে কখনো সাহিত্যিক হওয়ার সাধনা করেননি। কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে তিনি লিখে গেছেন আজীবন। নানা প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা সেই সব গদ্যের বিষয়, এককথায় বলতে গেলে, তাঁর বিচিত্র শিল্প উপভোগ। তিনি লিখেছেন চিত্রকলা, সাহিত্য, গান, চলচ্চিত্র নিয়ে; লিখেছেন এসব শিল্পমাধ্যমে যাঁরা আমাদের মন গড়ে তুলেছেন, আমাদের সাংস্কৃতিক আকুতিকে ভাষা দিয়েছেন, যাঁরা আমাদের নায়ক, তাঁদের নিয়ে; লিখেছেন আমাদের নানা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, আয়োজন ও সংগ্রামের মর্ম নিয়ে।
এসব লেখায় কাইয়ুম চৌধুরীর গদ্য কেবল অনুপম নয়, বিষয় ছাপিয়ে সে গদ্য পড়ারও একটা আলাদা আনন্দ আছে। এ গদ্যের স্বাদ আলাদা। সেখানে তিনি নিজের একটি স্বাতন্ত্র্য পরিচয় রেখেছেন।
প্রকাশনার শুরু থেকে প্রথম আলো আর কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন অবিচ্ছেদ্য। প্রথম আলোর তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এর পাতায় পাতায় তাঁর সৃষ্টিশীল হাতের স্পর্শ লেগে আছে। তিনি এর মূল লোগো এঁকেছেন, পৃষ্ঠাসজ্জার টেম্পলেট তৈরি করেছেন, এর অজস্র লোগো ও নেমোনিক তাঁর হাতে গড়া। তাঁকে ছাড়া প্রথম আলোর কোনো ঈদসংখ্যার প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসজ্জার কথা কল্পনাও করা যেত না। প্রথম আলো ও প্রথমা প্রকাশনের নানা প্রচ্ছদ, স্টল, নিমন্ত্রণপত্র, স্টিকার, প্রচারপত্র ইত্যাদিতে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা।
কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে প্রথম আলোর ঋণ কখনোই শোধ হওয়ার নয়। আজ তাঁর মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে তাঁকে জানাই অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।
সাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷

ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রচার করছেন মোদি : অরুন্ধতী

ভারতে নরেন্দ্র মোদির সরকার ‘ব্রাহ্মণ্যবাদে’র প্রচার করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বুকার জয়ী লেখিকা ও মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতী রায়। তিনি বলেন, ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে রকম আতঙ্কের পরিবেশে রয়েছে, তার জন্য ‘অসহিষ্ণুতা’ শব্দটি যথেষ্ট নয়। মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে সমতা পরিষদের ‘ফুলে সমতা পুরস্কার’ নেওয়ার সময় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে এমনই মন্তব্য করলেন তিনি৷
তাঁর অভিযোগ, মোদি সরকার হিন্দুত্ববাদের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রচার করছে৷ তিনি আরও বলেন, সমাজ সংস্কারকদের ‘মহান হিন্দু’ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে৷ যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডঃ বিআর আম্বেদকর৷ যদিও হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন তিনি৷ অরুন্ধতীর এই মন্তব্যের পরেই শুরু হয় কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভ৷ অরুন্ধতী দেশবিরোধী ও দেশের মানুষের জাতীয় চেতনায় আঘাত করেছেন বলে অভিযোগ তুলে সভাস্থলের বাইরেই প্রতিবাদ করতে শুরু করে বিজেপি’র ছাত্র সংগঠন এবিভিপি’র ছাত্ররা৷ তবে পুলিশি তৎপরতায় বড় কোনও ঘটনা ঘটেনি৷

সংঘর্ষ-গুলি অবরুদ্ধ মেয়র

তেজগাঁওয়ে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদে গিয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ সময় পার করে বিকালে এলাকা ত্যাগ করেন তিনি। অভিযানের শুরুতে পুলিশের সঙ্গে ট্রাকশ্রমিকদের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। শ্রমিকরা অভিযান পরিচালনাকারীদের ওপর ইটপাটকেল ছুড়ে চড়াও হয়। এ সময় পুলিশ পালটা ছররা গুলি ছুড়ে বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা। এতে অন্তত তিনজন আহত হন। এরপর শ্রমিকরা পুরো এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা মেয়রের প্রটোকলে থাকা একটি গাড়িও ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় উচ্ছেদ অভিযান। বেলা দেড়টা থেকে বিকাল ৪টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের অফিসে আটকে থাকতে হয়। বিকালে উপস্থিত শ্রমিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন মেয়র। তিনি একটি উন্নত ট্রাক টার্মিনাল স্থাপনের আশ্বাস দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রহরায় এলাকা ত্যাগ করেন। পরে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। গত মে মাসে দায়িত্ব নেয়ার পরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গতকালই বড় অভিযানে নামেন আনিসুল হক। তেজগাঁও সাতরাস্তা এলাকা থেকে কাওরান বাজার  রেলক্রসিং পর্যন্ত টার্মিনালের বাইরে অবৈধভাবে ফেলে রাখা পুরনো ট্রাক ও বিভিন্ন স্থাপনা সরাতে বেশ কিছুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। গত ৮ই নভেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত পাঠিয়ে অভিযান চালানোর পর অবশিষ্ট স্থাপনা সরাতে ২৭শে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেন তিনি। ওই সময়  পেরিয়ে যাওয়ায় রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে সঙ্গে নিয়ে বেলা ১টার দিকে সাতরাস্তা এলাকায় যান আনিসুল হক। র‌্যাব ও পুলিশের প্রহরার মধ্যে সিটি করপোরেশনের বুলডোজার অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে। ট্রাক শ্রমিকরা বেলা দেড়টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। অল্প সময়ের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে মেয়র আনিসুল হক ও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। কিছুক্ষণ পর রেলমন্ত্রী চলে গেলেও মেয়র সেখানেই অবস্থান করেন। যদিও আগের দিন সিটি করপোরেশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে ছিল অভিযানে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল উপস্থিত থাকবেন। তবে অভিযান শুরুর সময় এ দুই মন্ত্রী ছিলেন না।
এদিকে শ্রমিকদের রোষে পড়লেও মেয়র দৃঢ়ভাবে বলেন, কয়েকজন মানুষের স্লোগানে ভয় পেয়ে যাবো- এমন ভাবার কিছু নেই। নগরবাসী যাতে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারেন সেই কাজ করছি। কেউ উত্তেজিত করলেন আর আমি আমার লোক নিয়ে দৌঁড়ে চলে গেলাম; না এটা হবে না। এদিকে জসিম উদ্দিন নামে এক শ্রমিক মারা গেছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা রাস্তায় কভার্ডভ্যান দাঁড় করিয়ে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। বাইরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলার মাঝেই পাশের একটি মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা আসে- ‘মেয়র শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়েছেন। মাইকের ঘোষণায় বলা হয়, পুলিশের গুলিতে আহত শ্রমিকের চিকিৎসার ভার নেবেন মেয়র। পাশাপাশি বিকল্প ট্রাকস্ট্যান্ড না হওয়ার আগে বর্তমান স্ট্যান্ড থেকে ট্রাক সরাতে চাপও দেয়া হবে না। এই ঘোষণার পর শ্রমিকরা অনেকটা শান্ত হয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর চালক সমিতির কার্যালয় থেকে  বেরিয়ে এসে হ্যান্ডমাইকে শ্রমিকদের উদ্দেশে কথা বলতে শুরু করেন মেয়র। তিনি বলেন, নিজের জন্য তিনি এই ট্রাকস্ট্যান্ড সরানোর কাজ করছেন না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে জনগণের চলাফেরা নির্বিঘ্ন করতে। এ বিষয়ে তিনি ভোটার ও সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মেয়রের বক্তব্য চলাকালে শ্রমিকদের মধ্যে আবারও উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আনিসুল হক বার বার বলেন- ‘আমার কথা শুনুন, আমার কথা শুনতে হবে’। এই এলাকায় আজ যে সমস্যা সেটা ছোট্ট একটা সমস্যা। রাস্তায় ট্রাক পার্কিং না করে ভেতরে টার্মিনাল বানাব আমরা। চারজন মন্ত্রী আমার এই উদ্যোগের সঙ্গে ছিলেন। রাস্তাটা ভালোভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। দুইমাস ধরে আমি এটা নিয়ে কথা বলছি। মলিকপক্ষ আমাকে বলেছে টার্মিনালের ভেতরের অংশটা যাতে তাদের পরিষ্কার করে দেয়া হয়। সেজন্যই ভেতরের নষ্ট অকেজো ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন সরানো হচ্ছে।
যারা এই জায়গা অবৈধভাবে দখল করে আছেন, আপনাদের সবার সুবিধার জন্য টার্মিনালের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা গাড়িগুলো সরানো হচ্ছে, আমার সুবিধার জন্য নয়। বক্তব্য শেষ করার আগে মেয়র বলেন, তাহলে আমরা ঠিক করলাম এই জায়গায় যেসব গাড়ি আছে এগুলো ভেতরে থাকবে। আপনাদের আমরা একটা ভালো ট্রাক স্ট্যান্ড উপহার দেবো। বেলা পৌনে ৫টার দিকে র‌্যাব ও পুলিশ বেষ্টিত হয়ে গাড়িতে ওঠে ফার্মগেইটের দিকে চলে যান মেয়র। পরে রাস্তা আটকে থাকা শ্রমিকদেরও পুলিশ সরিয়ে দেয়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে তিন প্লাটুন পুলিশ, রায়টকার, জলকামান ও র‌্যাব’র সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির কারণে শ্রমিকরা রাস্তা ছেড়ে দেন। এদিকে সংঘর্ষের সময় আহত জসিম উদ্দীন (৪০), মো. বদরুদ্দোজা (৫৫) ও মাসুম বিল্লাহ (২৫)কে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কার্ভাড ভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়নের সদস্য ট্রাক চালক সাগর হোসেন জানান, ১৫ দিন আগে মেয়র আনিসুল হক আমাদের অফিসে আসেন। তিনি বাংলাদেশ ট্রাক মালিক সমিতি ও ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করেন। তিনি আরও জানান, ওই মিটিং তেজগাঁও টার্মিনালের আশপাশের সকল অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদের করা হবে বলে তিনি জানান। প্রতিশ্রুতি দেন, অফিসের পেছনের রেলের সম্পত্তি ৩৯ একর জমিতে তিনি আধুনিক একটি ট্রাক টার্মিনাল করে দিবেন।
আরেক সদস্য মানিক নিয়াজী দাবি করে জানান,  ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে টার্মিনালে কোন স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়নি। ওই বৈঠকে ইউনিয়নের নেতারা মেয়রকে জানিয়েছিলেন যে, একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে তারা বৈঠক করে বিষয়টি জানাবেন। কিন্তু, তিনি তাদের সিদ্ধান্ত না মেনে সকাল বেলায় স্থাপনা উচ্ছেদ করতে এলে মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার জানান, পুলিশ ও শ্রমিকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিতে ওই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ কোন গুলি ছুড়েনি। ইটের আঘাতে তিনজন আহত হয়েছেন। মেয়রের আশ্বাসের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। শ্রমিকরা একপর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও ধৈর্যের পরিচয় দেয়া হয়েছে।