Showing posts with label ডিজিটাল বাংলাদেশ. Show all posts
Showing posts with label ডিজিটাল বাংলাদেশ. Show all posts

Monday, July 23, 2018

একনজরে সংবিধানের ১৭টি সংশোধনী by এমরান হোসাইন শেখ

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এ সময়কালে বসা ১০টি সংসদের মধ্যে সপ্তম সংসদ বাদে প্রতিটি সংসদেই সংবিধান সংশোধন হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদকালের সপ্তম সংসদে সংবিধানে কোনও সংশোধন হয়নি। অপরদিকে প্রথম সংসদের মেয়াদকালে সব থেকে বেশি ৪ বার সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে।
১৭টি সংশোধনীর মধ্যে সব থেকে বেশি ভোট পড়েছে ২০১৪ সালে আনা ষোড়শ সংশোধনীতে। ওই সময় ৩৫০টি ভোটের মধ্যে ৩২৭-০ ভোটে সংশোধন বিল পাস হয়। আর সংসদ নেতা হিসেবে শাহ আজিজুর রহমান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ও খালেদা জিয়া পৃথক পাঁচটি সংশোধনী বিল পাসের জন্য সংসদে তোলেন।  বাকি বিলগুলো সংশ্লিষ্ট সংসদের আইনমন্ত্রীরাই উত্থাপন করেন। একাদশ, দ্বাদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ সংশোধনীগুলো বিরোধী দলের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
প্রসঙ্গত: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে প্রথম সংবিধান পায় বাংলাদেশ। ওই বছরের ৪ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়।
এক নজরে সব সংশোধনী:
প্রথম সংশোধনী: সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বিল পাস হয় ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই। সংবিধানের প্রথম সংশোধনীটি ছিল যুদ্ধাপরাধীসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে এই সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হয়। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। ২৫৪-০ ভোটে বিলটি পাস হয়। তিনজন ভোটার ওই সময় ভোটদানে বিরত থাকেন। পরে এটি ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়।
দ্বিতীয় সংশোধনী: ১৯৭৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী বিল পাস হয়। এতে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে (২৬, ৬৩, ৭২ ও ১৪২) সংশোধন আনা হয়। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বহিরাক্রমণে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বাধাগ্রস্ত হলে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার বিধান চালু করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে ২৬৭-০ ভোটে তা পাস হয়। সংসদের তৎকালীন বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদেরা বিল পাসের সময় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। বিলটি পাসের দুইদিনের মাথায় ২২ সেপ্টেম্বর এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়।
তৃতীয় সংশোধনী: ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণী একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য ১৯৭৪ সালের ২৩ নভেম্বর এ সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন এবং চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় বিধান প্রণয়ন করা হয়।  আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর উত্থাপিত বিলটি ২৬১-৭ ভোটে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ১৯৭৪ সালের ২৭শে নভেম্বর।
চতুর্থ সংশোধনী: ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়। সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তনে এই সংশোধনীর মূল কথা। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর সংশোধনীর বিষয়টি উত্থাপন করেন। বিলটি ২৯৪-০ ভোটে পাস হয়। বিলটি পাসের সময় সরকারি দলের সদস্য এমএজি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মঈনুল ইসলাম সংসদ বর্জন করেন। বিলটি পাস হওয়ার দিন ২৫ জানুয়ারিই তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়।
পঞ্চম সংশোধনী: জাতীয় সংসদে এ সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দানসহ সংবিধানে এর মাধ্যমে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন করা হয়।  সংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান ‍উত্থাপিত বিলটি ২৪১-০ ভোটে পাস হয়। পরে এ সংশোধনীটি অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অবৈধ ঘোষিত হয়ে যায়।
ষষ্ঠ সংশোধনী: ১৯৮১ সালের ৮ জুলাই এ সংশোধনী আনা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময়ে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে তাদের প্রার্থী হিসেবে আব্দুস সাত্তারকে মনোনয়ন দেয়। ষষ্ঠ সংশোধনীতে সেই পথটাই নিশ্চিত করা হয়। উপ-রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের বিধান নিশ্চিত করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। সংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান  উত্থাপিত বিলটি ২৫২-০ ভোটে পাস হয়। এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ওই বছরের ১০ জুলাই।
সপ্তম সংশোধনী: ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সামরিক শাসন বহাল ছিল। ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে এরশাদের ওই সামরিক শাসনে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক আইন বলবৎ থাকাকালীন সময়ে প্রণীত সব ফরমান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, নির্দেশ ও অধ্যাদেশসহ অন্যান্য  আইন অনুমোদন দেওয়া হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। আইনমন্ত্রী বিচারপতি কে এম নুরুল ইসলাম উত্থাপিত সংবিধান সংশোধনী বিলটি ২২৩-০ ভোটে পাস হয়। ১০ নভেম্বরই এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়। ৫ম সংশোধনীর মত  ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট এ সংশোধনীকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করে।
অষ্টম সংশোধনী: ১৯৮৮ সালের ৭ জুন সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে (২, ৩, ৫, ৩০ ও ১০০) পরিবর্তন আনা হয়। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতিদান করা ও ঢাকার বাইরে ৬টি জেলায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করার বিধান চালু করা হয়। Dacca-এর নাম Dhaka এবং Bangali-এর নাম Bangladeshi-তে পরিবর্তন করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ উত্থাপিত এ বিলটি ২৫৪-০ ভোটে পাস হয়। এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় দু’দিন পর অর্থাৎ ৯ জুন। তবে পরবর্তীতে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি বাতিল করে দেন সর্বোচ্চ আদালত।
নবম সংশোধনী: নবম সংশোধনী আনা হয় ১৯৮৯ সালের ১০ জুলাই। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিকে নিয়ে কিছু বিধান সংযোজন করা হয়। এ সংশোধনীর আগে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি যতবার ইচ্ছা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচন করতে পারতেন। এ সংশোধনীর পর অবস্থার পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের সঙ্গে একই সময়ে উপরাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, রাষ্ট্রপতি পদে কোনও ব্যক্তির পর পর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন সীমাবদ্ধ রাখা হয়।  উত্থাপনকারী সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিলটি ২৭২-০ ভোটে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ১১ জুলাই। অবশ্য দ্বাদশ সংশোধনীর পর এ সংশোধনীর কার্যকারিতা আর নেই।
দশম সংশোধনী: এই বিলটি পাস হয়  ১৯৯০ সালের ১২ জুন । রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে ১৮০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যাপারে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদের বাংলা ভাষ্য সংশোধন ও সংসদে মহিলাদের ৩০টি আসন আরও ১০ বছর কালের জন্য সংরক্ষণ করার বিধান করা হয়। আইনমন্ত্রী হাবিবুল ইসলাম উত্থাপিত বিলটি ২২৬-০ ভোটে পাস হয়। এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ১৯৯০ সালের ২৩শে জুন।
একাদশ সংশোধনী: গণঅভ্যুত্থানে এইচ এম এরশাদের পতনের পর বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে ১৯৯১ সালে ৬ আগস্ট এ সংশোধনী পাস হয়। এর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগদান বৈধ ঘোষণা করা হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যাবার বিধান পাস করানো হয় এই সংশোধনীতে। আইনমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ উত্থাপিত বিলটি ২৭৮-০ ভোটে পাস হয়। এ বিলটি সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে পাস হয়। এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ১০ আগস্ট।
দ্বাদশ সংশোধনী: ১৯৯১ সালের ৬ আগস্টের এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭ বছর পর দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং  উপরাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করা হয়। সংশোধনীটি উত্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ৩০৭-০ ভোটে বিলটি পাস হয়। একাদশের মত  এ বিলটিও সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে পাস হয়। এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর।
ত্রয়োদশ সংশোধনী: ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষ-নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী জমির উদ্দিন সরকার এই সংশোধনীটি উত্থাপন করেন। এটি ২৬৮-০ ভোটি পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ২৮ মার্চ। উচ্চ আদালতের আদেশে ২০১১ সালে এই সংশোধনীটি বাতিল হয়।
চতুর্দশ সংশোধনী: ২০০৪ সালের ১৬ মে এ সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০ থেকে ৪৫টি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি এবং সরকারি ও আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি বা ছবি প্রদর্শনের বিধান করা হয়। আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ উত্থাপিত বিলটি ২২৬-১ ভোটে এটি পাস হয়। এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ১৭ মে।
পঞ্চদশ সংশোধনী: সংবিধান আইন ২০১১ (পঞ্চদশ সংশোধনী) পাস হয় ২০১১ সালের ৩০শে জুন এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ২০১১সালের ৩রা জুলাই। এই সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। সংবিধানে ৭ অনুচ্ছেদের পরে ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করা হয়। এই সংশোধনীর বিষয়টি উত্থাপন করেন সেই সময়ের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ। বিরোধী দল বিএনপির বর্জনের মধ্যে ২৯১-১ ভোটে বিলটি পাস হয়।
ষোড়শ সংশোধনী: ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে এই সংশোধনী আনা হয়। ৭২ এর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান পাস করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। এটি উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩২৭-০ জনের ভোটে সর্বসম্মতভাবে পাস হয় বিলটি। বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বিলটির পক্ষে ভোট দেয়। পরে হাইকোর্ট একে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। আপিল বিভাগও ওই রায় বহাল রাখে। তবে, বর্তমানে এই রায়টি রিভিউতে রয়েছে।
সপ্তদশ সংশোধনী: সর্বশেষ ৯জুলাই রবিবার সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিধি আরও ২৫ বছর বহাল রাখার প্রস্তাব সম্বলিত সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৯৮-০ ভোটে বিলটি পাস হয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। রাষ্ট্রপতি বিলটির অনুমোদন দিলে এটি আইনে পরিণত হবে।

Saturday, July 21, 2018

যে প্রক্রিয়ায় পাস হয় সংবিধান সংশোধনী বিল by এমরান হোসাইন শেখ

সংসদে আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনীতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য বিল পাসে যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে সংবিধান সংশোধনে সেসব প্রক্রিয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন পড়ে বিভক্তি ভোটের। সংবিধান সংশোধন করতে হলে অন্তত দুই দফা বিভক্তি ভোট লাগে।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে বলা রয়েছে, যেসব বিধান সংশোধনীর জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন রয়েছে সেখানেই বিভক্তি ভোটের প্রশ্ন রয়েছে। আর কেবল সংবিধান সংশোধনেই প্রয়োজন পড়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার। অন্যান্য আইন সংশোধনের সময় স্পিকার ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর ফলাফল মৌখিকভাবে উল্লেখ করলেও সংবিধান সংশোধনের সময় পক্ষে-বিপক্ষে কত ভোট পড়েছে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হয়।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি পর্যালোচনা ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, সংবিধানের ১৪২ ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৯৯ ধারায় সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানে ১৪২ (আ) ধারায় বলা আছে, ‘সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত না হইলে অনুরূপ কোন বিলে সম্মতিদানের জন্য তাহা রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থপিত হইবে না।’
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৯৯ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত না হইলে অনুরূপ কোন বিল বা তাহার অংশ গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইবে না এবং সম্মতিদানের জন্য তাহা রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে না।’
বিধির ৯৯ (গ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘অনুরূপ বিলের উপর ভোট গ্রহণ কেবল বিভক্তি ভোটের দ্বারা হইবে।’
প্রসঙ্গত, সংবিধান সংশোধনীর যে দফাগুলো সংশোধন করা হবে এবং সংশোধনী পাসের বিষয়টি বিভক্ত ভোটে দিতে হবে। তবে বিভক্তি ভোটের আগে এর বিষয়ে সংসদ কক্ষে কণ্ঠভোটে (‘হ্যাঁ‘- ‘না’) ভোটের আয়োজন করা হবে।
সংবিধান সংশোধনের সময় সাধারণ আইনের মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বিলটি প্রথমে বিবেচনার জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। পরে এই বিলটির বিষয়ে কোনও সদস্যদের যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব বা বিলের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব থাকলে সংসদ সদস্যরা তা উপস্থাপন করবেন। এই দুটি বিষয়ই সাধারণ আইন পাশের মতো ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটে নিষ্পত্তি হয়।
এরপর সংশোধনীর দফা বা তফশিলগুলো ভোটে দেওয়া হবে। এই দফাগুলো বিভক্তি ভোটে পাসের বিধান রয়েছে। তবে স্পিকার চাইলে প্রত্যেক দফা আলাদাভাবে ভোটের দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংসদ সদস্যদের সন্মেতিতে দফা বা তফসিলগুলো একত্রে ভোটে দিতে পারেন।
বিভক্তি ভোটে যাওয়ার আগে স্পিকার ভোট নেওয়ার জন্য সংসদের লবিগুলো নির্ধারণ করে তা হাউজকে জানিয়ে দেন। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের জন্য লবি পৃথক করা হয়। ভোটাররা তাদের নম্বর অনুসারে যে লবিতে গিয়ে ভোট দেবেন সেটাও জানিয়ে দেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের জাতীয় আসনের নম্বরকে তার নিজের ভোটার নম্বর হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়।
ভোট হওয়ার আগে স্পিকার লবিগুলো (ভোটের স্থান) খালি করার জন্য দুই মিনিট সময় ধরে ঘণ্টা বাজান। ঘণ্টা বাজানো শেষ হওয়ার পর স্পিকার বিলের দফা কণ্ঠ ভোটে দেন। কণ্ঠ ভোটের পর ‘হ্যাঁ’ পক্ষের সংসদ সদস্যদের ‘হ্যাঁ’ লবি এবং ‘না’ পক্ষের সংসদ সদস্যদের ‘না’ লবিতে যাওয়ার নির্দেশনা দেন। সবাই লবিতে প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে স্পিকারের দফতরে ভোটের ফলাফল পৌঁছালে দরজা খুলে দেওয়া হয়। এ সময় স্পিকার ভোটের ফলাফল প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। বিলের দফাগুলো সংশোধনীর পর বিল পাসের বিষয়ও একই প্রক্রিয়ায় শেষ হয়।

Monday, July 9, 2018

হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের এ কেমন প্রহসন! by হুমায়ুন মাসুদ

দুই মাস বয়সী শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা জেনিয়া। ঠাণ্ডাজনিত কারণে অসুস্থ শিশু সন্তানটিকে ভর্তি করতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসে হাজির হয়েছেন তিনি। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও ছেলেকে ভর্তি করাতে না পেরে কাঁদছেন এই নারী। চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে র্যা বের অভিযানে জরিমানার প্রতিবাদে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রামের বেসরকারি সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে রোগীরা।
জেনিয়া বলেন, ‘ঠাণ্ডাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে শিশু সন্তানকে নিয়ে স্থানীয় হাসপাতাল-ক্লিনিকে যাই। কিন্তু সেখানে (লোহাগাড়ায়) সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ থাকায় অনেক কষ্টে ছেলেকে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসি। এখানেও একই অবস্থা। নগরীর সব হাসপাতাল, ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে এসে ভিড় জমিয়েছি। কিন্তু এখানে যে ভিড় কখন সিরিয়াল পাবো, কখন সন্তানকে ডাক্তার দেখাতে পারবো আল্লাহই জানে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দ্রুত ডাক্তার দেখাতে না পারলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে চাই।’
ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিক কন্যা রাইফার মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে এসে ম্যাক্স হাসপাতালের নানা অনিয়ম খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি। এসব অনিয়মের অভিযোগে রবিবার (৮ জুলাই) ওই হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যা বের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে নগরীর বেসরকারি হপাসাতাল ক্লিনিকের মালিকরা চিকিৎসা সেবা বন্ধের ঘোষণা দেন। তাদের ঘোষণায় রবিবার বিকাল ৩টা থেকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে বন্ধ রয়েছে চিকিৎসা সেবা। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন রোগী ও তার স্বজনরা।
অন্যদিকে এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিন যেখানে চমেক হাসপাতালে ৪শ থেকে ৫শ রোগী ভর্তি হয়, সেখানে রবিবার দুপুর ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৭শ থেকে ৮শ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এতে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।
রাতে চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসকরা। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। রোগীর চাপে এদিন জরুরি বিভাগে বাড়ানো হয়েছে চিকিৎসকের সংখ্যা। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে একজন চিকিৎসক সেবা প্রদান করলেও এদিন দুইজন চিকিৎসককে জরুরি সেবা প্রদান করতে দেখা গেছে। অধিকাংশ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ধারণ ক্ষমতার দুই থেকে তিনগুণ বেশি রোগী।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. ফরিদ উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ জন রোগী ভর্তি হন। কিন্তু আজ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো বন্ধ থাকায় এর চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি রোগী হাসপাতালে আসছেন। অতিরিক্ত এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে আমরা ব্যাপক হিমশিম খাচ্ছি।’
বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ায় চিকিৎসকরা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষার পরও তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
সিট না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন নগরীর লালখান বাজার এলাকা বাসিন্দা সাজিয়া। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে এসেছি এক ঘণ্টার বেশি হয়েছে কিন্তু এখনও কোনও চিকিৎসা পাইনি, কখন পাবো বলতে পারছি না।
একই অভিযোগ জানিয়েছেন হালিশহর আবাসিক এলাকা থেকে আসা চম্পা দাশ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উন্নত চিকিৎসা সেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে ভর্তি না করায় বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু এখানে রোগীর যে ভিড় তাতে মনে হচ্ছে চিকিৎসা সেবার পরিবর্তে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বো।
এদিকে প্যাথলজিগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষাগুলো সম্পন্ন করতে পারছেন না রোগীরা।
সকালে নগরীর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা দিয়ে যান খাগড়াছড়ি জেলার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম। বিকেলে রিপোর্ট আনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন এই রোগী। ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি বন্ধ থাকায় তিনি রিপোর্ট সংগ্রহ করতে পারেননি।
ফাতেমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সকালে পরীক্ষার রক্তের নমুনা দিয়ে যায়, তারা রিপোর্টের জন্য সন্ধ্যায় আসতে বলেছিল। কিন্তু এখন এসে দেখি গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রিপোর্টটা পেলে ডাক্তার দেখিয়ে আমি আজই খাগড়াছড়ি চলে যেতে পারতাম কিন্তু রিপোর্ট না পাওয়ায় আমাকে আজ শহরে থাকতে হবে। শহরে থাকার টাকা কোথায় পাবো।
একই অবস্থা এপিক হেলথ কেয়ারেও। নুর জাহান নামে এক নারী বলেন, দাঁতের ব্যাথার জন্য ডাক্তার আমার নাতিকে এক্স-রে করার কথা বলেন। কিন্তু প্যাথলজি গুলো বন্ধ থাকায় এক্স-রে করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে যারা আগে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন তাদেরকে চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা।
হালিশহর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রসব বেদনা উঠলে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমার শ্যালিকাকে সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি করাই। কিন্তু বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ এসে জানান তাদের হাসপাতালে অপারেশন করার মতো কোনও ডাক্তার নেই, আমরা যেন রোগীকে অন্য কোথাও নিয়ে যাই।
ম্যাক্স হাসপাতাল থেকেও অনেক রোগীকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা বন্ধ করার বিষয়ে জানতে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করে কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে এ সম্পর্কে জানতে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ডা. মুজিবুল হকের সঙ্গে কথা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

থাইল্যান্ডে আবার শুরু রুদ্ধশ্বাস অভিযান

মানবজমিন  | ৯ জুলাই ২০১৮, সোমবার, ১১:১১>> রুদ্ধশ্বাস অভিযানে থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া ১২ টিনেজ ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় দিন আজ। গতকাল এ অভিযানে ৪টি বালককে উদ্ধার করা হয়। এরপর রাত হয়ে যাওয়ায় অভিযান স্থগিত করা হয়। আজ আবার সকালে তা নতুন করে শুরু হওয়ার কথা। উচ্চ মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানে বাকি আটটি বালক ও তাদের কোচকে উদ্ধার করার কথা। ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে তারা আটকে আছে চিয়াং রাই এলাকায় থাম লুয়াং গুহায়। গুহা মুখে তারা প্রবেশের পর ভারি বর্ষণে এর ভিতর ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তারা আটকে পড়ে অনেক গভীরে। নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর ওই গুহার ভিতর তাদের সন্ধান মেলে। এরপরই শুরু হয় উদ্ধারে বিশাল আয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ডুবুরিরা সেখানে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনির এক ডুবুরি মারা গেছেন। রোববার আটকে পড়া বালকদের মধ্য থেকে চারজনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। আজ আবার গুহার ভিতর এয়ার ট্যাঙ্ক বা বাতাস ভর্তি ট্যাংক বসানোর কথা। তারপরই সকালে উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার কথা। তবে এ অভিযান নিয়ে আশঙ্ক রয়েছে এখনও। সব বালককে ও তাদের কোচকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে আশঙ্কা। ওদিকে আবার প্রবল বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে গুহার ভিতরে পানি বৃদ্ধি পাবে। উদ্ধার অভিযান থমকে দাঁড়াবে। ফলে ত্বরিত গতিতে শুরু হয়েছে অভিযান। আজ সকালে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, বাকি বালকদেরকে উদ্ধার তৎপরতা চলছিল। যেকোনো সময় তা শুরু হতে পারে। গুহার মুখে এনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে কমপক্ষে সাতটি এম্বুলেন্স। প্রথম দফায় রোববার ডুবুরিরা অপ্রত্যাশিত অল্প সময়ের মধ্যে চারটি বালককে বের করে আনেন। উদ্ধার করা বালকদের স্বাস্থ্য ভাল রয়েছে বলে জানিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যেহেতু আবারও ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ তাই ডুবুরিরা দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করতে চাইছেন। গুহা থেকে ওই বালকদের উদ্ধারে ডুবুরিদের ৯০ জনের একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছেন। এর মধ্যে ৪০ জন থাইল্যান্ডের। ৫০ জন বিদেশী। তারা গুহার মধ্যে ওই বালকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন কিভাবে অন্ধকারে পানির ভিতর দিয়ে সাঁতরে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। এসব পথ সব স্থানে মসৃণ নয়। কোথাও কোথাও এতটা সরু যে তার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও গতকাল চারটি বালককে সফলতার সঙ্গে বের করে এনেছেন ডুবুরিরা। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে কিছুটা পথ হেঁটে আসা, হামাগুড়ি দেয়া, পর্বত আরোহনের মতো চলা এবং কিছুটা পথ ডুবুরিদের মতো সাঁতরে পাড়ি দেয়া। এক্ষেত্রে তাদের জন্য গাইড হিসেবে একটি রশি দেয়া হয়েছে। সেই রশি ধরে ধরে তারা গুহা মুখের দিকে অগ্রসর হয়। প্রতিজন বালককে বের করে আনতে সহায়তা করছেন দু’জন করে ডুবুরি। এক্ষেত্রে গুহার মধ্যবর্তী স্থানটি সবচেয়ে বিপদজনক। এ অংশটির নাম দেয়া হয়েছে ‘টি-জংশন’। এ ছাড়া রয়েছে একটি স্থান। এর নাম চেম্বার-৩। এটি হলো ডুবুরিদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বেস হিসেবে কাজ করছে।
যারা গুহার ভিতরে আটকে পড়েছিল:
চ্যানিন ভিবুলরুঙ্গরুয়াং (১১)। তার ডাকনাম টাইটান। সে সাত বছর বয়স থেকে ফুটবল খেলা শুরু করেছে।
পানুমাস স্যাংডি (১৩)। তার ডাকনাম মিগ। সে তার পিতামাতাকে লিখেছেÑ নেভি সিলের সদস্যরা আমাদের অনেক যতœ নিচ্ছেন।
দুগানপিত প্রোমটেপ (১৩)। তার ডাকনাম ডোম। সে উল্ড বোরসের ক্যাপ্টেন।
সামপোং জিয়াওং (১৩)। তার ডাকনাম পোং। সে থাইল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখে।
মঙকোল বুনিয়েম (১৩)। তার ডাকনাম মার্ক। তাকে তার শিক্ষকরা অত্যন্ত ভাল ছেলে হিসেবে অভিহিত করেছেন। সে বড়দের, শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে।
নাত্তাউট তাকামরোঙ (১৪)। তার ডাকনাম টার্ন। সে তার পিতামাতাকে তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে অনুরোধ করেছে।
ইকারাত ওয়সুকচান (১৪)। তার ডাকনাম বিউ। সে তার মার কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে একবার উদ্ধার হতে পারলে সে দোকানে তাকে সহায়তা করবে।
আদুল সাম-অন (১৪)। সে একটি ভলিবল টিমের সদস্য।
প্রজাক সুথাম (১৫)। তার ডাকনাম নোট। তার পরিবার তাকে স্মার্ট ও শান্ত বালক বলে অভিহিত করেছে।
পিপাট ফো (১৫)। তার ডাকনাম নিক। গুহার ভিতর থেকে সে তার পিতামাতাকে চিঠি লিখেছে। তাতে সে লিখেছে, গুহা থেকে বের হতে পারলে পিতামাতাকে সে একটি বারবিকিউতে খেতে নিয়ে যাবে।
পর্নচাই কামলুয়াং (১৬)। ডাকনাম টি। সে তার পিতামাতাকে বলেছে, ভয় পেয়ো না। আমরা ভাল আছি।
পিরাপাত সোমপিয়াংজাই (১৭)। তার ডাকনাম নাইট। যেদিন তারা নিখোঁজ হলো সেটা ছিল তার জন্মদিন। তার পিতামাতা তার জন্মদিন পালন করার জন্য এখনও অপেক্ষায় আছে।
কোচ ইকাপোল চানটাওং (২৫)। ডাকনাম আকি। তিনি এসব টিনেজ বাচ্চার পিতামাতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন তার কৃতকর্মের জন্য। কিন্তু অভিভাবকরা তাকে জানিয়ে দিয়েছেন তাকে তারা দায়ী করছেন না।
গুহা থেকে উদ্ধার ৪ শিশু, বাকি আরও ৮ শিশু ও কোচ
থাইল্যান্ডের ‘থাম লুয়াং নায় নন’ গুহা থেকে এ পর্যন্ত মোট চার শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে। রয়টার্সের খবরে প্রথমে অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে ছয়জনকে উদ্ধারের কথা বলা হলেও পরে সংশোধিত প্রতিবেদনে চারজনকে উদ্ধারের কথা বলা হয়। উদ্ধারকৃতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রাদেশিক গভর্নর জানিয়েছেন, ১০ ঘণ্টা পর পুনরায় উদ্ধার অভিযান শুরু হবে।
গার্ডিয়ানকে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, গুহার ভেতরে এখন পানি কম। এজন্য কিছুটা অংশ, যা সাঁতরে পার হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা হেঁটেই পার হতে পেরেছে শিশুরা। গুহার ভেতরে এখনও আট শিশু ও তাদের ২৫ বছর বয়সী ফুটবল কোচ রয়েছেন। তারা যে স্থানটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তা গুহার প্রবেশ মুখ থেকে ৪ কিলোমিটার ভেতরে। গুহাটি ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ।
ওই শিশুদের কেউ সাঁতার জানতো না। তাদের উদ্ধারে বিদেশ থেকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডুবুরিদের ডেকে আনা হয়েছিল। শিশুদের উদ্ধার প্রক্রিয়ায় থাই সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ডুবুরি প্রাণ হারিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার বসানোর কাজ করতে গিয়ে তিনি জ্ঞান হারান। পরে তার মৃত্যু হয়।
ছেলেরা গুহা থেকে যেভাবে সাঁতরে বের হবে
গুহা থেকে ছেলেদের সাঁতরেই বের হতে হবে। তাদের গুহা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর একটি ইলাস্ট্রেশন প্রকাশ করেছে থাই নিউজ এজেন্সি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক ডুবুরির সঙ্গে একটি ছেলেদের বেঁধে রাখা হয়েছে। আর ডুবুরির অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। ডুবুরিদের যাতে পথ ভুল না হয়ে যায় সেজন্য দড়ি বেঁধে রাখা হয়েছে। ওই দড়ি ধরে ধরে তারা সামনে এগোবেন।
২৩ জুন থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় বিকালে ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১২ ফুটবলার ও তাদের ২৫ বছর বয়সী কোচ থাইল্যান্ডের উত্তর অংশের প্রদেশ চিয়াং রাইয়ের ‘থাম লুয়াং নায় নন’ গুহায় প্রবেশ করেন। তাদের উদ্ধারে থাইল্যান্ডের স্থানীয় ডুবুরিরা ছাড়াও কাজ করছেন গুহার ভেতরে সাঁতারে বিশেষভাবে পারদর্শী বিদেশি সাঁতারুরা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উন্মুক্ত জলে সাঁতার কাটা আর গুহার অন্ধকারে ছোট পরিসরে সাঁতার কাটা এক বিষয় নয়। গুহার ভেতরে সাঁতরে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য তারা বিশেষভাবে দক্ষ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, আজ সকালে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। প্রতিবারের বৃষ্টিপাতে উদ্ধার তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চোখে-মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠতে দেখা গেছে। তবে আশার কথা বৃষ্টিপাত খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ঘন্টাখানেক ধরে বৃসটি হলেও তা মুশলধারে ছিল না। এখন উদ্ধার ওই পাহাড় ও তার আশেপাশের এলাকায় তেমন পানি নেই।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন ইসরায়েলি ডুবুরি রাফায়েল আরৌশ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, ‘মুখ্য বিষয় হচ্ছে গতি। উদ্ধার পরিকল্পনায় হঠাটি যেকোনও পরিবর্তন আনার দরকার হতে পারে। হয়তো আজকের মধ্যেই সবাইকে বের করে আনার সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া হবে।’
তার ভাষ্য, গুহাটি চুনাপাথরের। গুহার ভেতরে পানি ঢোকার অনেক পথ রয়েছে। বৃষ্টিপাতের কারণে তাই গুহার ভেতর পানি ঢুকতেই থাকবে, যা উধার তৎপরতার জন্য ভালো কিছু নয়।   এতে এমনকি পুরো উদ্ধার তৎপরতাই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

প্রথমে বের হবে কিশোর স্যাম, সবশেষে কোচ

গুহার ভেতরে অবস্থান করছে দেশি ও আন্তর্জাতিক দক্ষ ডুবুরি দল। গুহার বাইরে প্রস্তুত রয়েছে ট্রলি। উদ্ধারকৃতদের ওই ট্রলিতে করেই নেওয়া হবে নিকটস্থ হাসপাতালে। উদ্ধার তৎপরতায় সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, পৃথক কয়েকটি দলে ভাগ করে আটকে পড়াদের বের করে আনার চেষ্টা হবে। ১৪ বছরের কিশোর স্যামকে বের করে আনা হবে সবার আগে, সবশেষে বের হবেন কোচ একাপল চান্থাওং।
গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তারা আর বাইরে বের হতে পারেনি। এরপর থেকে টানা ৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২ জুলাই গুহার ভেতরে জীবিত অবস্থায় তাদেরকে শনাক্ত করে ডুবুরিরা। রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার তাদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
বিবিসির একজন প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ১৫ দিন ধরে গুহায় আটকে থাকা কিশোরদেরকে নিয়ে ফেরার পথে গুহার একটি জায়গায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হবে। পরে সেখান থেকে শেষ দফা যাত্রায় তাদেরকে বাইরে বের করে আনা হবে। বাইরে বের করে আনার পর সোজা হাসপাতালে পাঠানো হবে কিশোরদের। আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, অভিযানের শুরুতে পানির নিচ দিয়ে সংকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হবে কিশোরদের, যেটিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে কিশোরদের বের করে আনার সময় থেকে তাদের দীর্ঘ সময় অক্সিজেন মাস্ক পরে পানির নিচে ডুব দিতে হবে।
গুহার প্রবেশপথ থেকে ‘তৃতীয় চেম্বার’ বা অভিযান শুরুর এলাকার দিকে যেতে হলে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে উদ্ধারকারীদের। এ পুরো পথটুকু পুরোপুরি শুকনো নয়, তবে বেশিরভাগটাই হেঁটে পার হওয়া যাবে। আর ‘তৃতীয় চেম্বার’ থেকে শিশুদের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদেরকে যেতে হবে আরও ১.৭ কিলোমিটার। এক সূত্র ব্যাংকক পোস্টকে জানিয়েছে, আটকে পড়া ফুটবলারদের চারটি দলে ভাগ করা হবে। প্রথম দলে থাকবে চারজন। আর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দলটিতে থাকবে তিনজন করে। বের হয়ে আসার সময় প্রত্যেক শিশুকেই খুব কাছ দেখে পাহারা দেবে দুইজন করে ডুবুরি। উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে বের হতে যাওয়া চার শিশুর মধ্যে সবার আগে বের হবে ১৪ বছর বয়সী আদুল ‘দুল’ স্যাম। আটকে পড়া ফুটবল দলটির কোচ বের হবেন সবার শেষে।
থাই নেভি সিলস-এর ফেসবুক পেজে উদ্ধার প্রচেষ্টার একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীরা কিভাবে একত্রিত হয়ে গত ১৫ দিন ধরে আটকে পড়া শিশুদের উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সে চিত্রই ফুটে উঠেছে ছবিতে। থাই ভাষায় ছবির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গুগল ট্রান্সলেটে তা ভাষান্তর করলে দাঁড়ায়, ‘আমরা....থাই ও আন্তর্জাতিক দল মিলে যৌথভাবে ওয়াইল্ড বোয়ার ফুটবল দলকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে কাজ করছি।’ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আটকে পড়া শিশুদের উদ্ধারের পর তাদেরকে চিয়াংগ্রাই প্রাচানুকরোহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। গুহা থেকে হাসপাতালটির দূরত্ব প্রায় ৬০ মাইল। গুহার প্রধান প্রবেশপথের বাইরে কয়েকটি ট্রলি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গত ২ জুলাই দুজন ব্রিটিশ ডুবুরি গুহার বেশ কয়েক কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে আটকে পড়া কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে তাদেরকে খাবার ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ করা হচ্ছে অক্সিজেন।
গুহার ৪ কিলোমিটার ভেতরে যে কারণে গিয়েছিল ছেলেরা
থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া ফুটবল খেলোয়াড় ছেলেদের নিয়ে সবার কৌতূহল: তারা কেন গুহার অতটা ভেতরে গিয়েছিল? কানাডার সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউজ জানিয়েছে, অতটা ভেতরে তারা যেতে চায়নি। বৃষ্টির পানিতে গুহার বের হওয়ার পথ ডুবে যাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভেতরে দিকে যেতে বাধ্য হয়েছিল। যত গুহার ভেতরে পানি বেড়েছে তত তাদের সরে যেতে হয়েছে।
১০ কিলোমিটার দীর্ঘ থাম লুয়াং নাং নন গুহার ৪ কিলোমিটার ভেতরে এখন তাদের অবস্থান। গুহা থেকে বের হওয়ার অনেক স্থানে পানি জমে আছে। তাদের সাঁতরে বের হতে হবে সেখান থেকে। প্রথমে তাদের স্কুবা ডাইভিং শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে, ডুবুরিরা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে বের হবেন। থাই নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ইলাস্ট্রেশনে দেখানো হয়েছে, ডুবুরিদের অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে শিশুদের পানির নিচে অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে।
শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের ফুটবল কোচ অনুশীলনের পর কখনও তাদের সাঁতারের জন্য নিয়ে যেতেন, আবার কখনও ভ্রমণে। এমনই একদিন ছিল গত ২৩ জুন, যেদিন তারা গুহার ভেতরে ঢুকেছিল।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলেছেন, কোচের উচিত হয়নি ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী ওই শিশুদের নিয়ে থাম লুয়াং নাং নন গুহায় ঢোকা। কারণ, বর্ষাকালে যে গুহা পানিপূর্ণ হয়ে যায় সে বিষয়ে সতর্কতা জানিয়ে গুহার মুখে সাইনবোর্ড টানানো আছে। তবে শিশুদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে কোচকে অপরাধবোধে ভুগতে নিষেধ করা হয়েছে। তারা মনে করেন না এতে কোচের দোষ আছে।

Tuesday, April 27, 2010

প্রকৃত দিনবদলের সংস্কৃতি চাই by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বর্তমান সরকারের দিনবদল আর ডিজিটাল বাংলাদেশের ইশতেহার যুগ যুগ ধরে সুবিধাবঞ্চিত এবং আশ্বাসে প্রতারিত মানুষকেও নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে, বিপুল ভোটে ক্ষমতাসীন করেছে বর্তমান সরকারকে। বর্তমান সরকার এক বছরের অধিক ক্ষমতায়। আশ্বাস আর অঙ্গীকারের বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন আর খবরে কিন্তু দিনবদলের নিশানা দেখা যাচ্ছে না। আগের মতোই শক্তিশালী সাংসদেরা স্কুলের ছেলেমেয়েদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড় করিয়ে তাঁদের প্রতাপ দেখাচ্ছেন, সাত বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা সাংসদদের সোনার নৌকা উপহার দেওয়া অব্যাহত রয়েছে, সরকারদলীয় ছাত্র বাহিনীর চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজি থেকে দিনবদলের ধারা অনুমান করা যাচ্ছে না। সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতাদের মোটরসাইকেল বাহিনীর যেকোনো অনুষ্ঠানে বিনা আমন্ত্রণে অত্যাচার অব্যাহত রয়েছে। সরকারদলীয় ছাত্রদের প্রত্যাশিত প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে। দিনবদলের মতোই নিজস্ব এলাকায় সার্বক্ষণিক সাংসদদের অভিপ্রেত ও অনভিপ্রেত নজরদারি, খবরদারি চলছে স্কুল-কলেজে, মাঠে, মসজিদে কিংবা ক্লাবে। বিদ্যুৎ-বিভ্রাট আগের থেকে বেশি, ঠিক যেমনটি যানজট। সাধারণ মানুষ দিনবদলের আশা করেছিল উন্নতির দিকে। আগের মতো জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেলেই আন্তর্জাতিক বাজারের কারণ দেখানো হয়, নয়তো সিন্ডিকেটের। এমন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর যদি সিন্ডিকেট ভাঙা না যায়, তাহলে কিসের দিনবদলের সরকার আমরা পেলাম? চারদিকে নামবদলের হিড়িক, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, বিদ্যুৎ-বিভ্রাট, পানিসংকট কিংবা যানজট নিরসনের তেমন কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বিপণিবিতানগুলোর সময় পরিবর্তন যানজটে কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও এখনো যানজট গ্রহণযোগ্য মাত্রায় কমে আসেনি। স্কুলের ছাত্ররা স্কুলের ছাত্রদের মেরে ফেলছে—এ রকম একাধিক ঘটনা অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটেছে। তা ছাড়া রাজধানী ও এর বাইরে বিভিন্ন হত্যাসম্পর্কিত অপকর্ম ঘটে চলেছে। এসব কারণে অন্তত এ কথাটি বলা যায়, সরকার সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকারের কোনো রকম প্রশংসনীয় অর্জন নেই।
অতি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের এ দরিদ্র দেশটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস, প্রাকৃতিক সম্পদের সমৃদ্ধি সম্পর্কেও তেমন বলার কিছু নেই, গ্যাস-সংকটে বিপন্ন কলকারখানা। এই সপ্তম জনবহুল দেশে চাহিদা অনেক এবং তা মেটানোর জন্য সম্পদ অপ্রতুল। সুতরাং অচিরেই মানুষের বিদ্যুৎ, পানি কিংবা যাতায়াতের চাহিদা—খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের চাহিদা মেটানো যাবে, তা কেউ আশা করেন না। তবে এ খাতগুলোয় অনুভবযোগ্য পরিবর্তন হবে, তা দিনবদলের সরকারের কাছ থেকে সবার প্রত্যাশা। এমন একটি জনবহুল দেশের দিনবদল চাট্টিখানি কথা নয়। এ জন্য যে অঙ্গীকার ও প্রত্যয় থাকা দরকার তা কিন্তু অনুভূত হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে দিনবদল একটি স্লোগান না হয়ে উন্নয়ন-অনুকূল সংস্কৃতির সূচনা হতে পারে এবং তা-ই হওয়া উচিত। কয়েক দিন আগে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন পালন করলাম কেক কেটে এবং কাজ না করে। এখানে একটি সুস্থ সংস্কৃতির সূচনা হতে পারত। এ দিন আমরা রাস্তাঘাট পরিষ্কার কিংবা মেরামতে ব্যয় করতে পারতাম এবং এই কাজে বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা নেতৃত্ব দিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন। অবশ্য একই সঙ্গে দেখা যেত ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা আওয়ামী লীগে কতজন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক রয়েছেন। উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো কিছু উন্নয়ন-অনুকূল সংস্কৃতির সূচনা করলে নিশ্চয়ই আগামী বছর দেশবাসীও তাতে শামিল হতো। এমনটি তো হয়নি। দিনবদলের দিনে উন্নয়ন-প্রতিকূল ধারাবাহিকতা তো বজায় থাকল। শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, খোদ রাজধানীতে অকল্পনীয় বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত। তার চেয়েও আশঙ্কার বিষয় হলো, কলকারখানাগুলোর উৎপাদন বিদ্যুতের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দিনবদলের ইশতেহারে মানুষের যে প্রত্যাশা, তা মিটছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন সামান্য বাড়লেও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে আরও বেশি। চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তা অল্প সময়ে মেটানো সম্ভব নয়। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের বঞ্চিত হওয়ার অনুভূতিকে সামান্য হলেও কমানো যেতে পারে, মন্ত্রী ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় মানুষের এলাকায় বিদ্যুতের প্রথম লোডশেডিং করার মাধ্যমে। জনগণের নেতারা জনগণের দুর্ভোগ পোহাবেন না, অনুভব করবেন না—তা কী করে হয়? এমন সিদ্ধান্তে মানুষের কষ্টের অনুভূতি এক লাফে অর্ধেকে নেমে আসবে। এর থেকে ব্যয়সাশ্রয়ীভাবে মানুষের অভাবের অনুভূতি মেটানোর আর কোনো পদ্ধতি নেই। তা ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাশ্রয়ও নেতারা নিজেরা অনুশীলন করে আমাদের শেখাতে পারেন। একইভাবে যানজটের দুর্ভোগও আমাদের নেতাদের পোহানো উচিত। কারণ তাঁদের সুযোগ্য নেতৃত্বেই তো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়ায় উভয়ের প্রতি উভয়ের যে সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা তাঁদের ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়াটাকেও নিশ্চিত করবে। বিদ্যুতের সুষম ব্যবহারের জন্য সময় অনুসারে এর মূল্য পরিবর্তন করে জনগণকে তা র্যাশনালি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা উচিত। একইভাবে গ্যাসের ব্যবহারের জন্যও মিটার-ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শোনা যাচ্ছে, যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে যে ট্রান্সমিশন লাইন রয়েছে তা অব্যবহূত পড়ে আছে, আবার নতুন করে খাম্বা ক্রয়ের খবরও পত্রিকায় এসেছে। সীমিত সম্পদের দেশে অব্যবহূত বিনিয়োগ কোনো অবস্থাতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। যেখানে বর্তমানের জরুরি চাহিদাই মেটানো যাচ্ছে না, সেখানে ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ আগলে রাখার মানে হয় না।
হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে যমুনা সেতু তৈরি করা হলো। এলাকায় বসবাসরত মানুষ ও তাঁদের অধিগৃহীত জমির জন্য নিশ্চয়ই ফসলি জমি ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হয়েছে। এই হাজার হাজার লোকের জন্য অল্প জায়গায় পরিকল্পিত আবাসন তৈরি করে অপ্রতুল ভূমির দেশে একটি অনুকূল সংস্কৃতি তৈরি করা যেত।
ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকারের বড় বড় কর্মসূচিতে, প্রজেক্টে কম্পিউটারের ব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা দরকার। আমাদের মুদি দোকানদারেরা কম্পিউটার ব্যবহার করুক এই প্রত্যাশার পূর্বশর্ত হলো, বড় বড় প্রকল্পে কম্পিউটারের ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটা মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকার সহায়কের ভূমিকা যেমন পালন করবে, তেমনি উদ্যোগীর ভূমিকাও পালন করবে। জনগণকে প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নানাভাবে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করবে। তথ্যপ্রযুক্তির যে ভৌত অবকাঠামো ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার সাপেক্ষে অবকাঠামোগুলোর সম্প্রসারণ করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তির ভৌত অবকাঠামোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইন্টারনেটসহ অন্য সুবিধাদির নির্মিত ভৌত অবকাঠামোর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। দেশের কাজে দেশের সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমেও দিনবদলের সংস্কৃতির সূচনা হতে পারে।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট। ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স।