Wednesday, January 29, 2025

বিশ্লেষণ: বায়ুদূষণের ভয়াবহতা বনাম আমাদের অপারগতা by খলিলউল্লাহ্

বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণের ভয়াবহতা এবং এ বিষয়ে আমাদের অপারগতা নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্

বায়ুমানের স্কোর ৩০০ পার হলে সেটাকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ ধরা হয়। কিন্তু ৫ জানুয়ারি সকালে ঢাকার স্কোর ৪৯৩ পর্যন্ত উঠেছিল। হরহামেশাই এখন ঢাকায় বায়ুর মানের স্কোর ৩০০ পার হচ্ছে। সারা বিশ্বের মধ্যে বায়ুদূষণে আমরা ঘুরেফিরেই শীর্ষে উঠে আসছি। বিগত ৯ বছরের ডিসেম্বর মাসগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ডিসেম্বর ছিল ঢাকায় সবচেয়ে দূষিত মাস। তা ছাড়া ২০১৬-২৪ সময়ের মধ্যে গত বছর ছিল সবচেয়ে দূষিত বছর।

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বলছে, কতটা ভয়ানক হুমকির মুখে আমরা রয়েছি। এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১৩ কোটি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আবহাওয়ার ধরনের কারণে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের রোগের সঙ্গে ক্যানসারজনিত মৃত্যু ১৪ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।

অন্যদিকে স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বব্যাপী শুধু ২০২১ সালেই ৮০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আর বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। অথচ করোনার মতো অতিমারিতেও বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার ৪৯৯। একটা দেশের এত বিপুল মানুষের মৃত্যু যদি হয় বায়ুদূষণের কারণে, তাহলে এটাকে জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে আশু পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না?

সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, বায়ুদূষণে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। পৃথিবীতে কেবল ২০২১ সালেই বায়ুদূষণে ৫ বছরের কম বয়সী ৭ লাখ শিশু মারা গেছে। মানবশিশুর জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হলো মায়ের গর্ভ। কিন্তু শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে, যার প্রভাব সারা জীবন এসব শিশুকে বয়ে বেড়াতে হতে পারে।

তা ছাড়া সাধারণত শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি দূষণের শিকার হয়। কারণ, তাদের শরীর, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক যখন গঠিত হতে থাকে, তখন তাদের বড়দের চেয়ে বেশি বায়ু গ্রহণ করতে হয়। ফলে বায়ু যদি দূষিত হয়, তাহলে দূষিত উপাদানও তারা বেশি গ্রহণ করে; অর্থাৎ আমরা শুরুতেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামর্থ্য নষ্ট করে দিচ্ছি।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অবস্থা এতটাই নাজুক যে এ কারণে মানুষের গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ৯ বছর। অথচ তামাকদ্রব্যের কারণে আয়ু কমেছে এর চেয়েও কম, ১ দশমিক ৬ বছর। বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান পিএম ২ দশমিক ৫ আয়তনে মানুষের চুলের চেয়ে ৩০ গুণ ছোট। তাই সহজেই এগুলো মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর এটাই ভয়াবহতার অন্যতম কারণ।

বায়ুদূষণ কি নতুন

এটা ঠিক যে বায়ুদূষণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রাচীন মিসর, পেরু ও গ্রেট ব্রিটেনে মানবদেহের মমি থেকে দূষণে কালো হয়ে যাওয়া টিস্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন রোমের বাসিন্দারা বায়ুদূষণের শিকার হয়েছিলেন বলে ধারণা করা যায়। তৎকালীন রোমের বিচারক অ্যারিস্টো এক রায়ে চিজের দোকানের ধোঁয়া ভবনের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন।

মধ্যযুগে বায়ুদূষণের মূল উৎস ছিল ধাতু গলিয়ে অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি। কিন্তু সব রেকর্ড ভেঙে শিল্পবিপ্লবের পর দূষণের নতুন যুগে প্রবেশ করে পৃথিবী, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ কার্ল পোলানি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন: দ্য পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক অরিজিনস অব আওয়ার টাইম গ্রন্থে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট বাজার অর্থনীতি কীভাবে আমাদের সমাজ ও পরিবেশ—দুটিরই অস্বাভাবিক ধ্বংস করেছে। এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের জীবনসহ অমূল্য সব বনজঙ্গল, উদ্ভিদ, প্রাণী ইত্যাদি প্রাকৃতিক পরিবেশের সবকিছুকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়। মুনাফার লক্ষ্যে চলে এসবের যথেচ্ছ ব্যবহার। আর এটিই হলো আমাদের সময়ের সামাজিক ও পরিবেশগত দুর্যোগের মূল কারণ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে, সন্দেহ নেই। আর তাই এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মতো ধারণা এসেছে। ভুটানের মতো দেশ তো প্রবৃদ্ধির ধারণা থেকেই বের হয়ে এসেছে।

তা ছাড়া জিডিপির ধারণার বাইরে মানব উন্নয়ন সূচক ব্যবহারের পক্ষেও মতো জোরালো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সামগ্রিক কল্যাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে পরিবেশগত মূল্যায়ন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়সারাভাবে করা হয়। জিডিপির বিকল্প ভাবনাগুলো নিয়েও জোরালো কোনো আলাপ নেই।

দূষণের উৎস বন্ধে অগ্রগতি নেই

ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য দায়ী শহরের আশপাশের ইটভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানালেও বহু ইটাভাটা অনুমোদনবিহীনভাবে চলছে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা হলেও এর প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ সরকার চাইলে সরকারি প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পারে। দেশে নির্মাণকাজের বেশির ভাগই সরকারি প্রকল্প। নির্মাণকাজে বায়ুদূষণের সরকারি হিস্যাও তাই বেশি। পরিবেশবান্ধব ইট যদি সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার শুরু হতো, তাহলে বেসরকারিভাবেও এর প্রচলন বাড়ত।

২০১৫ সালে গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর পার হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। ইটভাটায় মাটির উপরিভাগ কেটে পোড়ানো হচ্ছে। মাটির পুষ্টি উপাদানের কারণেই ফসল উৎপাদন হয়। আর পুষ্টি থাকে এই উপরিভাগেই, যা গঠনে হাজার বছর সময়ও লাগতে পারে। অথচ কি অবলীলায় নিমেষেই আমরা মাটির উপরিভাগ নষ্ট করছি ইটভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে! জাতিসংঘের হিসাবমতে, বর্তমান হারে মাটির উপরিভাগ ধ্বংস হতে থাকলে আর ৪৫ থেকে ৬০ বছর পর তা শেষ হয়ে যাবে; অর্থাৎ আমরা আর ফসল ফলাতে পারব না।

অথচ বালু-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ব্লক ইটের বিস্তার ঘটাতে পারলে কৃষিজমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি বায়ুদূষণও কমবে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী থেকে বালু তুলে এসব ইট বানালে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও উত্তোলিত বালু ব্যবহার করা যাবে। এই পদ্ধতির প্রচলন ঘটাতে পারলে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজার ব্যবহার করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে। অবৈধ বালু উত্তোলনে বর্তমানে নদীর প্রতিবেশ নষ্ট হয়ে জলজ প্রাণীরা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি নদীভাঙনের শিকার হয়ে অসংখ্য মানুষ হচ্ছে বাস্তুহারা।

অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। শহর এলাকার বায়ুদূষণ রোধে মেক্সিকো আর চীনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে যানবাহনের লাইসেন্সের নম্বর অনুযায়ী এক দিন পরপর এগুলোকে রাস্তায় নামার অনুমতি দিয়ে বায়ুদূষণ কমানো হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

প্রতিদিন চলতে-ফিরতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে পড়ে আছে নির্মাণকাজের ইট-বালু-সুরকির স্তূপ। সেগুলো গড়িয়ে পড়ছে রাস্তার ওপর। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও স্তূপ করে রাখা মাটিও বায়ুদূষণের বড় উৎস। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি সরকারি সংস্থাগুলো যদি সমন্বয় করে কাজ করত, তাহলে শহরের রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ যেমন কমত, তেমনি এসব উৎস থেকে দূষণ কমানোও সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ক্ষেত্রে কাউকেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতে দেখা যায় না। আইন প্রয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কোনো উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হয় না।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করে বায়ুমানের উন্নতির পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা। বায়ুদূষণ রোধে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস গত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। এদিকে বায়ুদূষণজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের মতো সংস্থা, যারা বায়ুদূষণের উৎসগুলো ঠেকানোর দায়িত্বে রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময় বলেছে যে তাদের যথেষ্ট জনবল নেই। এত বড় একটা জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান যদি জনবলের ঘাটতির কারণে আটকে থাকে, তাহলে জনবল কেন বাড়ানো হচ্ছে না? প্রয়োজনে বছরের যে মাসগুলোয় বায়ুদূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, সে সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়েও এর সমাধান করা যায়।

আইন-আদালতের দুর্বলতা

পরিবেশ রক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ অন্য যেসব আইন ও বিধিমালা রয়েছে, সেগুলো আবার জাতীয় স্বার্থে ‘বরখেলাপ’ করা যায়। যেমন পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট বা রাস্তা বানাতে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আইনে দেওয়া হয়নি। ফলে গোড়াতেই একটা গলদ রয়ে গেছে। তা ছাড়া যা-ও আইন আছে, তা প্রয়োগের ঘাটতি তো রয়েছেই। জাতিসংঘের পরিবেশ–সংক্রান্ত সংস্থা ইউএনইপির হিসাব (২০১৯) অনুযায়ী, পরিবেশ বিষয়ে অনেক আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই যেসব দেশে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা সদরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাইরে পরিবেশ আদালত নেই। তা ছাড়া এই আইনের সীমাবদ্ধতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি এই আইনে মামলা করতে পারেন না, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে করতে হয়। আবার এসব আদালতে পরিবেশ–সংক্রান্ত মামলার চেয়ে অন্যান্য মামলাই বেশি।

২০২১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকার পরিবেশ আদালতে মোট মামলার মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায়। চট্টগ্রামে এই হার কিছুটা বেশি, ১৩ শতাংশ। এর ব্যাখ্যায় দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বলে থাকেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তাই পরিবেশ আদালতে মামলা কম যায়।

২০২১ সালের ১৩ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, পরিবেশ আদালত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত—দুটিতেই অপরাধীদের কারাদণ্ডের চেয়ে অর্থদণ্ড বেশি দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর সেই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ বছরে নিষ্পন্ন হওয়া ২০০ মামলার মধ্যে ১৪৭টি মামলায় পরিবেশ আদালত অর্থদণ্ড দিয়েছেন। আর পরিবেশ অধিদপ্তর পাঁচ বছরে ৪ হাজার ৪৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাত্র ১৬৬ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আপিল করে ছাড়াও পেয়ে যান। বাংলাদেশ আইন কমিশনের একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৯৮ শতাংশ মামলার রায় আপিল আদালতে বাতিল হয়ে যায়।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির সৃষ্টি না হলে পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড থামবে না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রশ্ন রেখেছিলেন, শহরের কতজন ছিঁচকে চোর ধর্ম বা নৈতিকতার ভয়ে চুরি থেকে বিরত থাকে আর কতজন রাষ্ট্রের ডান্ডাবাড়ি খাওয়ার ভয়ে বিরত থাকে?

আমাদের মতো দেশের আরেকটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দেশে আইন-বিচার-রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি অপরাধের বিরুদ্ধে একধরনের সামাজিক প্রতিরোধও আছে। সাধারণ মানুষই সম্মিলিতভাবে অনেক অপরাধ ঠেকিয়ে দেন। মানুষের ভূমিকার কারণে অপরাধীদের বিরত থাকার অনেক নজিরও আছে। কিন্তু পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা কম থাকায় এ-সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সামাজিক এমন প্রতিরোধ জোরালোভাবে কাজ করে না। পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।

-খলিলউল্লাহ্ প্রথম আলোর জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক

বায়ুদূষণ
বায়ুদূষণ। অলংকরণ: আরাফাত করিম

বাস্তুহীন হিটলার যেভাবে জার্মানির সর্বোচ্চ নেতা হলেন by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

অ্যাডলফ হিটলারকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার জন্যই মানুষ হয়তো বেশি মনে রেখেছে। হিটলার নামটি ফ্যাসিবাদী রাজনীতির আইকন হয়ে উঠেছে। অনেকেই এ জন্য তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতা ও সাম্রাজ্যবাদী খায়েশকে দায়ী করেন। কিন্তু এইটুকুতেই ইতি টানলে হিটলারের উত্থানের গোড়ার অনেক কিছুই আড়ালে চলে যায়। লোকজনের ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করা বাস্তুহীন একজন মানুষের ‘হিটলার’ হয়ে ওঠার যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে অনেকাংশে অস্বীকারও করা হয়।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেন, হিটলারের উত্থানের পেছনে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তির চাপিয়ে দেওয়া এক অসম ও নিপীড়কমূলক চুক্তি। আর ওই চুক্তিই হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনে। হিটলার ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছিলেন।

চিত্রশিল্পী থেকে যোদ্ধা

অস্ট্রিয়ার ব্রাউনাউ শহরে ১৮৮৯ শহরে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাডলফ হিটলার। তিনি হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী। ভিয়েনার আর্ট কলেজে ভর্তি হতে দুবার আবেদন করেও ব্যর্থ হন। জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। আশ্রয় নিয়েছিলেন বাস্তুহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রে। আয়ের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মানুষের ছবি আঁকা।

হিটলার ১৯১৩ সালে জার্মানির মিউনিখে চলে যান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। এ যুদ্ধে দুবার আহত হন হিটলার। কৃতিত্বের জন্য একাধিক পদকও পান। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে ‘মাস্টার্ড গ্যাসে’ আক্রান্ত হয়ে কিছু সময়ের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারান। হাসপাতালের থাকতেই জার্মানির আত্মসমর্পণের খবর শোনেন। পরে হিটলার দাবি করেন, এ খবর শুনে তিনি অনেক কেঁদেছেন। তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হন। তাঁর মনে হয়েছিল, সরকার জার্মান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

যে চুক্তির কারণে হিটলারের উত্থান

জার্মানির নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তি অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ও ওসমানী খেলাফতের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। পরাজিত জার্মানির ওপর বিজয়ী মিত্রশক্তি প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে শান্তিচুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়। চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে জার্মানিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাদের সামনে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়—হয় চুক্তিতে সই করো, না হয় জার্মানিতে আগ্রাসন মেনে নাও। বিগত কয়েক বছরের রক্তপাতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯১৯ সালের জুনে ‘ভার্সাই চুক্তি’ নামে মিত্রশক্তির চাপিয়ে দেওয়া শর্ত মেনে নিতে রাজি হয় জার্মানি।

কিন্তু শুরু থেকেই চুক্তির শর্তগুলো জার্মান সমাজে ক্রোধ, ঘৃণা ও বিদ্রোহের সৃষ্টি করে। ভার্সাই চুক্তিকে আরোপিত শান্তিচুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই চুক্তির অধীনে জার্মান সাম্রাজ্য ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায়, সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিপুল পরিমাণের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়।

এই চুক্তি নবগঠিত ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে আরও চাপে ফেলে দেয়, যদিও ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তা ঠিকে ছিল। ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ রবার্ট ওয়াইল্ড বলেন, ভার্সাই চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা যে হিটলারের উত্থানে অবদান রেখেছে, তা বলা যায়।

কয়েকটি কারণে এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল জার্মানি জন্য অবমাননাকর ও ক্ষতিকর। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ভূখণ্ড কেড়ে নেওয়া হয়। দেশটিকে প্রয়োজনীয় শিল্প আয় থেকে বঞ্চিত করা হয়। চুক্তির ‘ওয়ার গিল্ট ক্লজের’ মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর দায় জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা অনেক জার্মান অবমাননাকর মনে করেন এবং ক্ষুব্ধ হন।

চুক্তির সময় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয়নি। পরে মিত্রশক্তি নিজেদের মতো করে একটি অঙ্ক চাপিয়ে দেয়। জার্মানিকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তৎকালীন সময়ে ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে বলা হয়। এই পরিমাণ অর্থ শোধ করতে না পারায় পরে তা কমিয়ে ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নামিয়ে আনা হয়। এই ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির অর্থনীতি যাতে আর ঘুরে দাঁড়াতে না পারে।

চুক্তির কারণে জার্মান সশস্ত্র বাহিনীর আকার অনেক ছোট করে ফেলতে হয়। বলে দেওয়া হয়, কোনো বিমানবাহিনী রাখা যাবে না। নৌবাহিনীর আকারও ছোট করতে হবে। সশস্ত্র বাহিনীতে সর্বোচ্চ ১ লাখ সেনা রাখা যাবে।

ভার্সাই চুক্তির মারাত্মক প্রভাব পড়ে ভাইমার সরকারের ওপর। এই চুক্তিতে রাজি হওয়ার কারণে জার্মান জাতীয়তাবাদীরা সরকারকে ‘নভেম্বর ক্রিমিনাল’ আখ্যা দেয় এবং এটাকে ‘পিঠে ছুরি মারা’ তথা বিশ্বাসঘাতকতা সঙ্গে সঙ্গে তুলনা করে। ভাইমার সরকারকে কোণঠাসা করতে হিটলার সভা-সমাবেশে প্রায়ই এ ভাষায় আক্রমণ করতেন।

সুবক্তা থেকে চ্যান্সেলর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উদীয়মান রাজনৈতিক দল হিসেবে আলোচনায় আসে ‘জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’। দলটির ওপর নজরদারি করতে হিটলারকে মিউনিখে পাঠিয়েছিল সেনাবাহিনী। হিটলার দলটির কিছু সভায় অংশ নেন এবং তাদের অনেক চিন্তাভাবনার সঙ্গে একমত হন। ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি দলটিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

হিটলার সুবক্তা ছিলেন। তিনি ছোট দলটির সমর্থক বাড়াতে সাহায্য করেন। ১৯২০ সালে দলের নাম পরিবর্তন করে ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’ করা হয়, যা পরে নাৎসি পার্টি নামে পরিচিতি পায়। ১৯২১ সালে নাৎসি পার্টির নেতৃত্ব নেন হিটলার এবং ২৫ দফা ঘোষণা করেন। এসব দফার মধ্যে অন্যতম ছিল ভার্সাই চুক্তি বাতিল করা।

১৯২৩ সাল নাগাদ নাৎসি পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এ সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা এবং ভার্সাই চুক্তির চাপিয়ে দেওয়া শর্তের চাপ কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছিল জার্মানি। হিটলার মনে করলেন, এ অবস্থায় অভ্যুত্থানের ডাক দিলে জনগণ তাতে সায় দেবে এবং সরকারের পতন ঘটাবে।

মিউনিখের একটি বিয়ার হলে ১৯২৩ সালের ৮ নভেম্বর বাভারিয়া অঙ্গরাজ্যের নেতা গুস্তাভ কারের নেতৃত্বে একটি বৈঠক হচ্ছিল। হিটলারের সেখানে ঢুকে পড়েন। তাঁর প্রতি জার্মান যুদ্ধের বীর জেনারেল লুডেনডর্ফের সমর্থন ছিল এবং তাঁকে অভ্যুত্থানে সমর্থন দিতে গুস্তাভকে প্ররোচিত করেন হিটলার। এটি ‘মিউনিখ অভ্যুত্থান’ বা ‘বিয়ার হল অভ্যুত্থান’ হিসেবে পরিচিত।

পরদিন সমর্থকদের নিয়ে বার্লিনের রাস্তায় মার্চ শুরু করেন হিটলার। খবর পেয়ে পুলিশ চড়াও হলে পালিয়ে যান তিনি। ১১ নভেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হিটলারের পাঁচ বছরের সাজা হয়। অবশ্য ৯ মাস পরেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। কারাগারে থাকতেই হিটলার লিখেন তাঁর আলোচিত বই ‘মাইন কাম্ফ (আমার সংগ্রাম)’।
হিটলার মুক্তি পেলেও নাৎসি পার্টি ধুঁকতে থাকে। নির্বাচনে বাজে ফল করে। দলটির চিন্তাধারা জনগণের মধ্যে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। এর মধ্যে ১৯২৯ সালের মহামন্দা বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেয়। এতে হিটলারের সামনে সুযোগ চলে আসে। জার্মানিতে ওই সময় ছিল ৬০ লাখ বেকার। এ জন্য তিনি সরকারকে দায়ী করেন এবং ভার্সাই চুক্তি ও বিদেশি শক্তিগুলোকে দুষতে থাকেন।

নাৎসি পার্টির এই প্রচার কৌশল জনপ্রিয়তা পায়। দলটি জার্মান পার্লামেন্টে আসনও পেতে থাকে। হিটলার এই প্রচারের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তিনি একের পর সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দিতে থাকেন এবং সারা দেশে সফর করেন। তিনি জার্মানির জনগণের সঙ্গে মিশতে থাকেন এবং তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা তিনি বোঝেন।

১৯৩২ সালের গ্রীষ্ম নাগাদ নাৎসি পার্টি জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এমন প্রেক্ষাপটে জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে চ্যান্সেলরের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও তিনি হিটলারকে অতটা পছন্দ করতেন না। হিন্ডেনবার্গ এই ভেবে ভুল করেছিলেন যে হিটলারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর হিটলারকে ক্ষমতায় দেখে তাঁর চিন্তা-ভাবনার জন্য জার্মান জনগণ শেষ পর্যন্ত তাঁকে মেনে নেবে না। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি চ্যান্সেলর হন হিটলার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও একনায়ক হিটলারের পতন

চ্যান্সেলর হয়ে পার্লামেন্টে জোর করে আইন পাস করিয়ে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করে নেন হিটলার। ১৯৩৪ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ মারা যান। এর পর থেকে চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব একাই পালন করতে শুরু করেন হিটলার। নিজেকে জার্মানির ‘ফুয়েরার বা সর্বোচ্চ নেতা’ ঘোষণা করেন। এভাবে চ্যান্সেলর থেকে একনায়ক হয়ে ওঠেন হিটলার।

নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত হওয়ার পর হিটলার তাঁর সাম্রাজ্যবাদী খায়েশ পূরণে একের পর পদক্ষেপ নিতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করে জার্মান বাহিনী। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইতালি, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা চলেছিল।

যুদ্ধের শেষ দিকে একের পর এক এলাকা থেকে জার্মান বাহিনীর পরাজয়ের খবর আসতে থাকে। শেষরক্ষা হচ্ছে না বুঝতে পেরে আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন হিটলার। ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বাংকারে নিজের কপালের ডান পাশে গুলি করে আত্মহত্যা করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ইভা ব্রাউনও বিষ পান করে মৃত্যুকে বেছে নেন।

হিটলারের মৃত্যুর আট দিন পর ১৯৪৫ সালের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সব ফ্রন্টে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে জার্মানির নাৎসি বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আনুষ্ঠানিক পরাজয় ঘটে। শেষ হয় ইতিহাসের চরম রক্তাক্ত এক অধ্যায়ের।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ভার্সাই চুক্তিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ নিহিত ছিল। ওই চুক্তি সই হওয়ার সময় বিজয়ী পক্ষের কেউ কেউ চুক্তিটির সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের একজন অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কিনস। তখন কেউ কেউ দাবি করেছিল, ওই চুক্তি কেবল কয়েক দশকের জন্য যুদ্ধটা পিছিয়ে দেবে। হিটলার চ্যান্সেলর হয়ে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে যান, তাঁদের ওই ভবিষ্যদ্বাণীই ফলে যায়।

সূত্র: বিবিসি, থটকো ডটকম ও ইজে–সোশ্যাল

নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার
নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার। ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রথমে হজ, পরে দুনিয়া দেখার নেশা ঘরছাড়া করেছিল ইবনে বতুতাকে by ওয়ালিদ বদরান

দুনিয়া দেখার নেশার সেদিন ঘর ছাড়েন তরুণ এক মরোক্কান। দিনটা ছিল ১৩২৫ সালের ১৩ই জুন। তরুণের নাম আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-লাওয়াতি আল-তানজি ইবনে বতুতা। শুধু ইবনে বতুতা নামেই যিনি অনেকের কাছে পরিচিত।

প্রায় তিন দশক ধরে তিনি বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেছেন। উত্তর আফ্রিকার বিস্তৃত এলাকা থেকে চীন পর্যন্ত ঘুরেছেন তিনি। তার পর্যটনের অভিজ্ঞতা শুধু ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাই দখল করে নেই, বিশেষ করে চতুর্দশ শতাব্দিতে মধ্যযুগীয় বিশ্ব কেমন ছিল তা বুঝতেও সহায়তা করেছে।

তিনি এক লাখ ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন এবং একটা বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। প্রায় সব মুসলিমপ্রধান দেশও ভ্রমণ করেছেন তিনি। মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম অভিযাত্রী বলা হয় তাকে।

ভ্রমণের সূচনা

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে, ১৩০৪ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি মরক্কোর উপকূলীয় শহর তানজেরে জন্ম ইবনে বতুতার। তার পরিবারের সদস্যরা ইসলাম ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তবে ঘরবন্দি জীবন তাকে টানতো না। কৌতুহল তাকে তাড়া করে ফিরতো।

জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে মরিয়া ইবনে বতুতা হজ করার সংকল্প করেন। ২১ বছর বয়সে হজ পালনের উদ্দেশ্যে তানজের ছেড়ে যান।

তখনও তিনি জানতেন না তার জীবন ভ্রমণ করেই কাটবে।

তার প্রাথমিক গন্তব্য ছিল পবিত্র নগরী মক্কা। কিন্তু তার ধর্মীয় ভক্তি, বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ এবং ভ্রমণের নেশা তাকে আরো বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যায়।

ভ্রমণের শুরুতেই বিপদের মুখে পড়েন ইবনে বতুতা। উত্তর আফ্রিকার মরুভূমির প্রখর উত্তাপ ও বিপদশঙ্কুল পরিবেশ এবং ডাকাত দলের হামলা মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন তিনি। আলজেরিয়ার তেমসেন ও বেজাইয়া, তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিস এবং লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিও ছিল এই তলিকায়।

মিশরে পৌঁছে ইবনে বতুতা কায়রো শহরের জাঁকজমক দেখে হতবাক হয়ে যান। মধ্যযুগের অন্যতম বড় ও প্রাণচঞ্চল শহর ছিল কায়রো।

সেখানে তিনি মামলুক সাম্রাজ্যের বিখ্যাত মসজিদ, ব্যস্ত বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন। তিনি আলেকজান্দ্রিয়াতেও যান।

ইবনে বতুতার প্রথম লক্ষ্য ছিল হজ পালন। এরপর মিশর, সিরিয়া ও হেজাজের (বর্তমানে সৌদি আরবের অন্তর্গত) ধর্মীয় বিশারদ ও সুফি সাধকদের কাছ থেকে দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন।

এই জ্ঞান তাকে বিচারিক পদের জন্য যোগ্য করে তোলে। এছাড়াও তিনি ইসলামের নানা বিষয়ে একজন প্রাজ্ঞ ছাত্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছিলেন। এগুলো অনেক শাসকের দরবারে তাকে সম্মানিত অতিথি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

মিশরে থাকা অবস্থায়ই তিনি ভ্রমণের জন্য আরো তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠেন। বিশ্বের যত বেশি জায়গা সম্ভব ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তার সঙ্গীরা সেখানে বাণিজ্য, তীর্থযাত্রী অথবা শিক্ষার উদ্দেশ্যেই সচরাচর ভ্রমণ করতেন, কিন্তু ইবনে বতুতার নতুন দেশ এবং নতুন মানুষ সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল।

অনেক সুলতান, শাসক ও গভর্নর তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং সাহায্য করেছিলেন, যে কারণে ভ্রমণ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন তিনি।

বং সাহায্য করেছিলেন। যে কারণে তিনি তার ভ্রমণ অভিযান চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।

হজের পরের যাত্রা

কায়রো থেকে ফেরার পর ইবনে বতুতা মিশরের অন্যান্য অঞ্চলে পরিভ্রমণ করেন এবং পরে লোহিত সাগর থেকে সিরিয়ায় ফিরে আসেন। সেখানে তিনি মক্কার একটি কাফেলার সঙ্গে যোগ দেন।

১৩২৬ সালে হজ পালনের পর তিনি উত্তর ইরাকে যান। সেখানে তিনি আব্বাসীয় খিলাফতের সাবেক রাজধানী বাগদাদ পরিদর্শন করেন।

ইরানে তিনি 'মোঙ্গল' বংশের শেষ শাসক (যারা 'খান' হিসেবে পরিচিত ছিলেন) আবু সাঈদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। ইবন বতুতা ইস্ফাহান ও সিরাজ শহর পরিদর্শন করে সেগুলোর সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতায় ভীষণভাবে প্রভাবিত হন।

১৩২৭ থেকে ১৩৩০ সাল পর্যন্ত ইবনে বতুতা মক্কা ও মদিনায় ধর্মীয় নিষ্ঠাপূর্ণ জীবনযাপন করেন। কিন্তু কোনো এক জায়গায় এতোদিন অবস্থান তার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যাচ্ছিলো না।

হজ তার জন্য আধ্যাত্মিক সফর ছিল। এই সময়ে তিনি ইসলামি বিশ্বের নানা সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন যা তাকে পর্যটনের প্রতি আরো আগ্রহী করে তোলে।

জেদ্দা থেকে একটি জাহাজে ওঠেন তিনি। লোহিত সাগরের পথ ধরে ইয়েমেন সফর করেন। দেশটি ঘুরে দেখে এডেন বন্দর থেকে আবারও যাত্রা শুরু করেন।

তিনি আফ্রিকার পূর্ব উপকূল ধরে যেতে থাকেন। কিলওয়ারের (তানজানিয়া) মতো বাণিজ্যিক নগরী ছাড়াও আরব উপত্যাকার দক্ষিণাঞ্চল, ওমান, হরমুজ, পারস্যের দক্ষিণ অংশ ঘুরে ১৩৩২ সালে তাকে মক্কায় ফিরে যান।

ভারত সফর

মক্কায় পৌঁছার পর নতুন পরিকল্পনা আসে ইবনে বতুতার মাথায়। দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক (যিনি ক্ষমতা ছিলেন ১৩২৫ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত) এবং মুসলিম পণ্ডিতদের প্রতি তার উদারতার কথা শুনে তিনি এই দরবারে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

অপ্রচলিত একটি পথ নিয়ে উত্তরের দিকে যাত্রা করেন ইবনে বতুতা। পথে মিশর ও সিরিয়া অতিক্রম করেন। আবার একটি জাহাজ নিয়ে এশিয়া মাইনরের (আনাতোলিয়া) দিকে যান।

ইতিহাসের বইগুলিতে সেলজুক সাম্রাজ্যের পতন এবং অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের নির্ভরযোগ্য সূত্র হয়ে ওঠে ইবনে বতুতার সেই সময়কার পরিস্থিতির বর্ণনা।

তুরস্ক তখন ছোট ছোট অনেক রাজত্বে বিভক্ত। তবে সেখানকার সব রাজ্যের শাসকরাই ইবনে বতুতাকে উদারভাবে স্বাগত জানান।

এরপর তিনি কৃষ্ণ সাগর হয়ে ক্রিমিয়া, উত্তর ককেশাস, ভলগার ভাটি অঞ্চল, উজবেকিস্তানের রাজধানী ভ্রমণ করেন। এক বাইজেনটাইন রানীর আতিথেয়তায় তিনি কনস্টানটিনোপলেও (যা বর্তমানে ইস্তানবুল নামে পরিচিত) কিছুদিন অবস্থান করেন।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, বাইজেন্টাইন রাজধানী (কনস্টানটিনোপল) নিয়ে ইবনে বতুতার রেফারেন্স খুবই স্বচ্ছ ও সঠিক। তিনি এটিকে 'দ্বিতীয় রোম' হিসেবে বর্ণনা করেন। অমুসলিমদের মতামতের প্রতি সহনশীলতা দেখালেও তিনি মূলত মুসলিম বিশ্বে বসবাস করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।

কনস্টান্টিনোপল থেকে ফিরে তিনি তার ভারত অভিমুখে যাত্রা অব্যাহত রাখেন।

একটি কাফেলার সাথে তিনি মধ্য এশিয়া সফর করেন। যেখানে তিনি বুখারা, সামারখন্দ ও বাল্খের মতো প্রাচীন নগরী পরিদর্শন করেন। সবগুলো শহরই মোঙ্গলদের আক্রমণের ক্ষত বহন করছিল।

খোরাসান ও আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে জটিল পথ ধরে তারা হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রম করে দিল্লির সাম্রাজ্যে পৌঁছান তিনি।

সেখানে তিনি সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গে সেখা করেন এবং তিনি তাকে কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। ইবনে বতুতা ভারতে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি সেখানকার সমাজের জটিলতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেন।

তবে ইবনে বতুতা উপলব্ধি করলেন, ভারতে তার অবস্থান নিরাপদ নয়। উদারতা ও নিষ্ঠুরতার এক অসাধারণ মিশেলে ভারতে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক মুসলিম ও হিন্দুদের ওপর একই রকম কঠোর শাসন চালাতেন।

সুলতান ও তার শাসনের সব গৌরব ও ব্যর্থতার সাক্ষী হন ইবনে বতুতা। অনেকে মিত্রকে নৃশংসতার শিকার হতে দেখে প্রতিদিনই নিজের জীবন নিয়েও শঙ্কিত হতেন তিনি।

ইবনে বতুতা যেভাবে সুলতান মুহাম্মদ ইবনে তুঘলকের চরিত্রের চিত্রায়ন করেছেন সেটি মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টির একটি অসাধারণ উদাহরণ। যাতে তার ভয় ও করুণা উভয়ই প্রতীয়মান ছিল। ১৩৪২ সালে সুলতান ইবনে বতুতাকে চীনা শাসকের কাছে তার দূত হিসেবে নিয়োগ দেন।

ইবনে বতুতা কোনো অনুতাপ ছাড়াই দিল্লি ত্যাগ করেন। কিন্তু তার এ যাত্রা ছিল আরো বিপদশঙ্কুল।

এরই মধ্যে হিন্দু বিদ্রোহীরা তার দূতাবাস আক্রমণ করে। কোনোমতে জীবন নিয়ে পালিয়ে যান তিনি।

সেখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের মালাবার উপকূলে গিয়ে স্থানীয় যুদ্ধের মধ্যে পড়ে যান ইবনে বতুতা।

কালিকটের (বর্তমান কোঝিকোড) কাছে তার জাহাজটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। চীনের সম্রাটকে দেয়ার জন্য সঙ্গে আনা মূল্যবান সামগ্রী ও উপহার হারিয়ে ফেলেন তিনি। সুলতানের ক্রোধানল থেকে বাঁচার জন্য ইবনে বতুতা মালদ্বীপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে তিনি বিচারক হিসেবে দুই বছর কাজ করেছেন।

মালদ্বীপ থেকে তিনি শ্রীলঙ্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন করেন।

যাত্রাপথে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের করোমানদেল উপকূলে তার জাহাজ ধ্বংস হওয়ার পর আবার তিনি মালদ্বীপে যান।

এরপর বাংলা ও আসামে যান ইবনে বতুতা। সেই সময় তিনি চীনে তার মিশন আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সুমাত্রা অভিমুখে যাত্রা করেন।

সুমাত্রার মুসলিম সুলতান তাকে নতুন একটি জাহাজ দিলে তিনি চীনের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

ইবনে বতুতা যেখানেই গিয়েছেন, তিনি সেখানকার বিভিন্ন স্থান, জনগণ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত রেকর্ড করে রেখেছেন।

চীন সফর এবং ফেরা

পর্যটক হিসেবে ইবনে বতুতার অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যায় তার চীন সফর। ১৩৪৫ সালে তিনি চীনের ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র কোয়ানঝোও-এ গিয়ে পৌঁছান।

ইউরোপীয় বা আরবরা দেখেননি, চীন সম্পর্কে এমন অনেক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ইবনে বতুতা।

বেইজিং এর জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় আদালত, পরিশীলিত চীনা সভ্যতা এবং শাসনের ধরন দেখে তিনি চমৎকৃত হন। তিনি চীন থেকে বিস্তৃত বাণিজ্যের বিস্তারিত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তার লেখায় বর্ণনা করেছেন।

চীনের সমাজের অনবদ্য জীবনযাপন পদ্ধতি ও রীতিনীতি নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ লিখে রাখেন তিনি।

ইবনে বতুতার চীন সফর মধ্যযুগের বাণিজ্য ও কূটনীতির মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে জানার সুযোগ করে দেয়।

দূর প্রাচ্যে তার লম্বা সফর শেষে ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সালে সুমাত্রা, মালাবার ও পারস্য উপকূল পার হয়ে, বাগদাদ ও সিরিয়া হয়ে মরক্বো ফিরে যান।

১৩৪৮ সালে তিনি আবারও সিরিয়া সফরে গেলে প্লেগ রোগের মহামারি চাক্ষুষ করেন। এই সফরে তিনি মিশরের অনেক শহরেও যান।

একই বছর তিনি মক্কায় যান এবং তার শেষ হজ করেন। সেখান থেকে মিশর যান, পরে আলেকজান্দ্রিয়া, তিউনিসিয়া, সারদিনিয়া ও আলজেরিয়া যান। ১৩৪৯ সালের নভেম্বরে মরক্কোর ফেজে পৌঁছান তিনি।

সেখানে এমন দুটি মুসলিম শাসিত রাজ্য ছিল যার সম্পর্কে এর আগে জানতেন না ইবনে বতুতা। স্পেনে মুর শাসনামলের সর্বশেষ চিহ্ন গ্রানাডায় যান তিনি, দুই বছর পর ১৯৫২ সালে পশ্চিম সুদান সফর করেন।

জীবনের শেষ সফরটি স্বেচ্ছায় করেননি ইবনে বতুতা। সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করার পর তিনি মালিতে এক বছরের মতো ছিলেন।

মালিতে তখন চলছে মানসা সুলায়মানের রাজত্ব। সাম্রাজ্যটি তখন ক্ষমতার শীর্ষে ছিল। তার লেখায় মানসা সুলাইমানের সময়কালকে আফিকা অঞ্চলের ওই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল বিবেচনা করা হয়।

১৩৫৩ সালের শেষে ইবনে বতুতা মরক্কো ফিরে আসেন। সেখানকার সুলতানের অনুরোধে তিনি তার সফরের স্মৃতিকথা লেখক ইবনে জুঝির হাতে তুলে দেন, যিনি ইবনে বতুতার সহজভাবে লেখা গল্পকে কাব্যিক ঢঙয়ে রূপান্তর করেন।

এরপর ইবনে বতুতা একরকম দৃষ্টির আন্তরালে চলে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মরক্কোর একটি শহরে কাজী হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে জানা যায়।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে, সম্ভবত ১৩৬৮, ১৩৬৯ অথবা ১৩৭৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এবং নিজের শহর তানজেরে তাকে সমাহিত করা হয়।

বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি

ইবনে বতুতা আনুমানিক এক লাখ ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা ভ্রমণ করেছিলেন। এই হিসাবে তিনি খ্যাতনামা ইতালিয়ান অভিযাত্রী মার্কো পোলোকে ছাড়িয়ে গেছেন।

তার বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ এবং বর্ণনা ১৪ শতকের বিশ্ব সম্পর্কে একটা অনন্য ধারণা দেয়। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগোল, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

তার লেখায় মধ্যযুগের ইসলামিক বিশ্বের স্বর্ণযুগের বর্ণনা রয়েছে।

এতে বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক, বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগের বিশেষ তথ্য রয়েছে।

ইবনে বতুতার মতে, হজ এমন একটি তৎপর্যপূর্ণ বিষয় যা বিশ্বের মুসলিমদের একত্রিত করে এবং তারা এর মধ্য দিয়ে একাত্মতা অনুভব করে।

ইবনে বতুতার ভ্রমণযাত্রা ভূগোল, ইতিহাস এবং নৃ-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছিল। কারণ তিনি পশ্চিমের কাছে অজানা বিভিন্ন স্থান এবং সংস্কৃতির বর্ণনা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের জন্য অনেক তথ্য তুলে ধরেছিলেন।

তার বই অনেক ভাষায় অনুদিত হয়েছে। এখনও পুরো বিশ্বের গবেষকরা বইটি পড়েন এবং রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেন।

বিভিন্ন এলাকা ভ্রমণের সময় অন্তত ৬০ জন শাসক, অনেক মন্ত্রী, গভর্নর ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন ইবনে বতুতা।

তিনি তার বইয়ে দুই হাজারের বেশি লোকের নাম উল্লেখ করেছেন যাদের তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন অথবা কবর পরিদর্শন করেছিলেন। স্বাধীন উৎস থেকে এসব ব্যক্তিদের বেশিরভাগকেই চিহ্নিত করা যেতে পারে।

তবে আশ্চর্যজনক হলো ইবনে বতুতার লেখায় এসব ব্যক্তিদের কারো কারো নাম অথবা ঘটনার দিন-তারিখে অল্প কিছু ভুল চিহ্নিত হয়েছে।

বইয়ের আরো একটি চমকপ্রদ বিষয় ইবনে বতুতা নিজেই প্রকাশ করেছেন। পড়ার আগে পাঠকের মনে হতে পারে, বইটিতে তারা শরিয়া ও সুফিবাদের মধ্যে দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত এক মুসলমানের বয়ান পড়বেন।

কিন্তু দেখা যায়, ইবনে বতুতা বইয়ে গভীর কোনো দর্শন প্রকাশ করেননি, বরং জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতাকেই তিনি মেনে নিয়েছেন।

বর্ণনোর মধ্য দিয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কের কাছে স্বচ্ছ একটি ধারণা তুলে ধরেছেন তিনি।

জ্ঞানের তৃষ্ণা একজন মানুষকে যে কোন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে তা ইবনে বতুতার অসাধারণ ভ্রমণই প্রমাণ করে। শুধু ব্যক্তিগত বিনোদন তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

ইবনে বতুতাকে আজও একজন মহান অভিযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয় যিনি তার ভ্রমণের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছেন, মানব সভ্যতার নানাবিধ দিক নিয়ে ভাবতে অনেককেই প্রভাবিত করেছেন।

ইবনে বতুতা
শিল্পীর তুলিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইবনে বতুতার অবয়ব

স্বামীর একাধিক বিয়ে নিয়ে মাথাব্যথা নেই ফারাহ ইকরারের

যেসব পুরুষের একজন স্ত্রী থাকেন, সাধারণত তারা অন্য কারও সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ান বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপক ফারাহ ইকরার। এ ক্ষেত্রে ওই পুরুষদের স্ত্রীরাও অনুমতি দেন বলে দাবি করেন তিনি।

সম্প্রতি রাবি পীরজাদার ‘এক নয়া জাবিয়া’ পডকাস্টে অংশ নিয়ে ফারাহ ইকরার তার স্বামী ও পুরুষের একাধিক বিয়ে নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।

স্বামীর আরও দুটি বিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েছে বলে মনে করেন না তিনি। এমন ধারণাকে ভুল ও নেতিবাচক চিন্তা বলে মনে করেন এই সংবাদ উপস্থাপক।

ফারাহ ইকরার জানান, তার স্বামী বর্তমানে দুই স্ত্রী ও ছেলে নিয়ে বিদেশে ভ্রমণ করছেন, এতে তার কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই। তিনি বলেন, টিভি উপস্থাপক ইকরার-উল-হাসানকে যখন তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন, তখন তার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর হয়তো খারাপ লেগেছিল। তবে স্বামীর তৃতীয় বিয়ে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।

তিনি জানান, এর আগেও তিনি বলেছিলেন, স্বামীর একাধিক বিয়েতে তার কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহ যখন একজন মানুষকে একাধিক বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন, তখন কে এটিকে বাধা দিতে পারে?

ফারাহ ইকরার স্বামীর অন্য দুই স্ত্রীও তার বিরুদ্ধে, এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করে জানান যে তার স্বামী যদি চতুর্থ বিয়েও করতে চান, তাহলে তার কোনো সমস্যা হবে না।

একাধিক বিয়ের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ধারণা ভুল যে যার টাকা আছে, সে পুরুষই একাধিক বিয়ে করে। একাধিক বিয়ের সঙ্গে অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই।

এই উপস্থাপকের মতে, একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে চান এবং তিনি চান নারীরা তার আশপাশে থাকুক। তিনি বলেন, যেসব পুরুষের কেবল একজন স্ত্রী থাকে, তাদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকে এবং তাদের স্ত্রীরাই এ সম্পর্ক রাখার অনুমতি দেন।

তিনি বলেন, এটা বাস্তব যে অনেকের কাছেই তার এসব কথা খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু সত্য হলো যাদের এক স্ত্রী রয়েছে, তাদের অধিকাংশই সম্পর্কে জড়িয়ে যায়।

ফারাহ ইকরারের মতে, স্ত্রীরা তাদের স্বামীকে বলে গার্লফ্রেন্ড রাখতে, পরকীয়া করতে কিন্তু ঘরে অন্য স্ত্রী আনতে নিষেধ করে।

উল্লেখ্য, ফারাহ ইকরারের স্বামী, টিভি উপস্থাপক ইকরার-উল-হাসান তিনটি বিয়ে করেছেন। তার এসব বিয়ে প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়।

সূত্র : ডন উর্দু 

সংবাদ উপস্থাপক ফারাহ ইকরার ও তার স্বামী ইকরার-উল-হাসান। ছবি : ফেসবুক থেকে নেওয়া
সংবাদ উপস্থাপক ফারাহ ইকরার ও তার স্বামী ইকরার-উল-হাসান। ছবি : ফেসবুক থেকে নেওয়া

ট্রাম্প কি তালেবানদের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের পরিত্যক্ত মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন?

প্রেসিডেন্ট পদে অভিষেকের প্রাক্কালে ডনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের জনসভায় একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ২০২১ সালে মার্কিন সেনা যখন আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায় সেই সময় আমেরিকার সেনাবাহিনী যে বিপুল পরিমাণ সামরিক পরিকাঠামো ও সরঞ্জাম এশিয়ার এই দেশে ছেড়ে গিয়েছিল তা তিনি ফেরানোর বন্দোবস্ত করবেন। যদিও প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের জন্য তালেবানের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, কিন্তু পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যেভাবে গোটা প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছিলেন তার  কড়া সমালোচনা করেছেন এই রিপাবলিকান নেতা। তার মতে, ‘ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট আমাদের সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ কাবুলে শত্রুদের দিয়ে এসেছে।’

এ প্রসঙ্গে মানবিক সাহায্যের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যদি বছরে তাদের (তালেবান) বিলিয়ন ডলার দিই, তাহলে তাদের বলুন আমাদের সামরিক সরঞ্জাম ফেরত দিতে। না হলে আমরা তাদের অর্থ দেব না। সুতরাং, আমরা তাদের টাকা দেব, পরিবর্তে আমরা সামরিক সরঞ্জাম ফেরত চাই।’

২০২২ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম রেখে গেছে। এর বেশিরভাগই ন্যাটো-সমর্থিত আফগান সেনাবাহিনীর। এই অস্ত্র তালেবান যোদ্ধারা দ্রুত জব্দ করে। মার্কিন বাহিনী ২০ বছরের যুদ্ধের শেষ সপ্তাহগুলোতে বিমান থেকে কম্পিউটার সিস্টেম পর্যন্ত যতটা সম্ভব সরঞ্জাম ভেঙে ফেলার বা ধ্বংস করে দেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০২১ সালের আগস্টে যখন মার্কিন-প্রশিক্ষিত আফগান সামরিক বাহিনী ভেঙে পড়ে এবং ইসলামপন্থী যোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তখনও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তালেবানের হাতে পড়ে। সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান, আকাশ থেকে স্থলে নিক্ষেপ করার  যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক যান, যুদ্ধের ট্যাঙ্ক, ইউএস ট্র্যাক, অস্ত্র, বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, ছদ্মবেশী ইউনিফর্ম, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং অন্যান্য উপকরণ যা গত প্রায় চার বছরে শুধু খারাপ হয়েছে তা নয়, তালেবান যোদ্ধাদের দ্বারা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফগানিস্তানে রেখে যাওয়া মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম পুনরুদ্ধার করা বেশ সহজ।ওয়াশিংটনের RAND থিঙ্ক ট্যাঙ্কের একজন সিনিয়র নীতি গবেষক, জেসন ক্যাম্পবেল মনে করিয়ে দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে  একক বৃহত্তম দাতা দেশ। এই নগদ চালানগুলো জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচালনা করা হয় যাতে লক্ষ লক্ষ আফগানকে সাহায্যের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং পরিষেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তালেবানদের ওপর বিধি নিষেধ আছে।

ক্যাম্পবেল দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, ‘ট্রাম্প  ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মাসে তালেবানদের কোষাগারে ৪০ মিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছে। এখন তারা যা খুশি তা করতে পারে।’ তবে ট্রাম্পকে আমেরিকান সামরিক সরঞ্জাম ফিরিয়ে আনার জন্য তালেবানের সাথে যদি আলোচনায় বসতে হয় , তবে প্রক্রিয়াটি যতটা সহজ মনে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হবে। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা সচিবের অফিসে প্রাক্তন কান্ট্রি ডিরেক্টর রান্ডাল বলছেন, ‘এমন সরঞ্জামগুলো বিশ্লেষণ এবং যাচাই করার জন্য তাকে (ট্রাম্প )একটি দল পাঠাতে হবে। তার দলকে চুক্তিগুলো সুরক্ষিত করতে হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনি কীভাবে আফগানিস্তানের বাইরে আমেরিকান সরঞ্জাম আনতে পারেন।’

২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তার পদচারণা কমানোর চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র তার সাঁজোয়া মাইন-প্রতিরোধী অ্যাম্বুশ প্রোটেক্টেড ভেহিকেল (MRAPV) ধ্বংস করে দিয়েছিলো। কারণ সেগুলো দেশে ফেরানো অনেক ব্যয়বহুল ছিল। মঙ্গলবার তালেবানরা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের দেয়া পরামর্শটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা অবশিষ্ট মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ফেরত দিতে রাজি হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেছেন যে, এই অস্ত্রগুলো ফেরত দেওয়ার দাবি করার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএসকেপি) গ্রুপসহ ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তালেবানদের আরও উন্নত অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত  করা।

আফগান জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা আহমেদ সুজা জামাল ট্রাম্পের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।  সুজা বলেছেন, 'ট্রাম্পের কাছে তার অনুসারী এবং ভোটারদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পালনের সময় এসেছে, তাই তিনি বাইডেন প্রশাসনের ক্ষতি পূরণ করতে চান। ট্রাম্প বিলক্ষণ জানেন, তালেবানদের হাত আমেরিকান সামরিক হার্ডওয়্যারে পৌঁছে গেছে।

সাবেক আফগান বেসামরিক কর্মচারী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে তালেবানের সাথে যে কোনো আলোচনা বেশ জটিল হবে। ২০২০ সালের প্রত্যাহার চুক্তির পর থেকে এর সমর্থন কেবল চীন, রাশিয়া এবং না ইরান সহ দেশগুলোর অক্ষের মধ্যে রয়েছে। কাবুলে গিয়ে আমেরিকান সম্পদ ফেরত চাওয়াকে দুর্বলতা বলে মনে করেন সুজা।  তিনি বলেন, তালেবানরা  আমেরিকার এই পদক্ষেপকে সম্মান করে না।

সূত্র : ইন্ডিপেন্ডেন্ট

mzamin

১৬ বছর কারাগারে: মেলেনি মায়ের জানাজায় অংশ নেয়ার অনুমতি, হারিয়েছেন ২৬ স্বজন

একটানা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কারাভোগের পর নিজ বাড়িতে ফিরেছেন পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলায় জামিন পাওয়া বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাবেক ল্যান্স নায়েক বরগুনার আলতাফ হোসেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি হারিয়েছেন মাসহ পরিবারের ২৬ জন স্বজনকে। এমনকি মায়ের জানাজায় উপস্থিত থাকতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলেও মেলেনি অনুমতি। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে মুক্তির পর এখন চাকরি পুনর্বহালের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন আলতাফ ও তার পরিবারের সদস্যরা।

আলতাফ হোসেনের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাওয়ালকার এলাকায়। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে ১৯৯২ সালের ১৭ই জানুয়ারি তিনি বিডিআরে যোগদান করেন।

পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশনায় ২০০৯ সালের ৩রা মার্চ বিডিআর ১৩ ব্যাটালিয়নে ল্যান্স নায়েক হিসেবে পিলখানায় যোগদান করেন আলতাফ হোসেন। এরপর মর্মান্তিক পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই বছরের ২৩শে মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় ২ বছর বয়সী এক ছেলে এবং ৪ বছর বয়সী এক মেয়েকে রেখে কারাবন্দি হতে হয় আলতাফ হোসেনকে। পরবর্তীতে আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরসহ হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়। এরমধ্যে বিভাগীয় মামলায় তার সাত বছরের কারাদণ্ড এবং দায়েরকৃত হত্যা মামলায় তিনি খালাস পান। এ ছাড়া বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে গত ১৯শে জানুয়ারি জামিন পেয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২৩শে জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৬ বছর পর বরগুনার নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন আলতাফ হোসেন। তবে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ২৬ জন স্বজনের সঙ্গে ২০২২ সালে মৃত্যু হয় তার মা আমেনা বেগমের।

এতগুলো বছর ধরে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কারাগারে থাকায় ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণসহ পরিবারের হাল ধরেন আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা। একদিকে স্বামীর মামলা পরিচালনার খরচ, অপরদিকে দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে অমানবিক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। বুঝতে শেখার আগে বাবা দূরে আছেন জানিয়ে বুকে কষ্ট চাপিয়ে বড় করতে হয়েছে ছেলে-মেয়েকে। টাকার অভাবে অনেক সময় তিনবেলা ঠিকভাবে খাবার যোগাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে শিরীন সুলতানাকে।
আলতাফের বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ বছর পর আলতাফ জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে ফেরায় আনন্দের জোয়ার বইছে বাড়ি জুড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনরা ছুটে এসেছেন আলতাফের সঙ্গে দেখা করতে। ১৬ বছর পর স্ত্রী-সন্তানদের কাছে পেয়ে আনন্দের অশ্রুও ঝরছে আলতাফের। ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতি বিজড়িত স্থানসহ বিভিন্ন স্বজন ও মায়ের কবর দেখতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। তবে সবকিছু কাছে পেয়েও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো বরগুনার আরও দু’জন কারাগারে থাকায় পরিপূর্ণ আনন্দ নেই আলতাফ হোসেনের মনে। খুব দ্রুতই তাদেরও মুক্তি মিলবে এমনটাই আশা করছেন তিনি।

mzamin


আযমীকে হত্যার পরামর্শ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা -হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট

ক্ষমতায় থাকাকালে কিছু ক্ষেত্রে গুম অথবা হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমনকি এক পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল্লাহ আমান আযমীকেও হত্যার পরামর্শও দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এসব বিষয়ে জানেন এমন কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটসকে জানিয়েছেন ভয়াবহ এ তথ্য। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সোমবার প্রকাশ করেছে ৫৫ পৃষ্ঠার রিপোর্ট ‘আফটার দ্য মুনসুন  রেভ্যুলুশন- এ রোডম্যাপ টু লার্স্টি সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম ইন বাংলাদেশ’। এই রিপোর্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে র‌্যাবকে বিলুপ্ত করার জন্য দাবি জানানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লিখেছে, র‌্যাব-পুলিশসহ নিরাপত্তাভিত্তিক সব প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের সুপারিশ করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে পুলিশ-র‌্যাবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হয় বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি বিচার বিভাগের সংস্কারের সুপারিশের কথাও জানিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে আগামী মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক অধিবেশনে সংস্কারকে দীর্ঘমেয়াদি করতে প্রস্তাব উত্থাপনেরও পরামর্শ দিয়েছে এইচআরডব্লিউ। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, কমপক্ষে গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনার নিষ্পেষণমূলক হাতিয়ারের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা পর্যায়ক্রমে বিরোধীদলীয় সদস্য, সমালোচক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীদের টার্গেট করেছে। এক্ষেত্রে বানোয়াট মামলা দেয়া হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার এবং জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে।

একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বাহিনীকে রাজনীতিকরণ করার মধ্যদিয়ে জনগণের সামনে পুলিশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং র‌্যাবে (যারা হলো পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি বাহিনী) পছন্দের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পুরস্কার দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তারা বলেছেন, বাহিনীতে একটি সিস্টেম দাঁড় করা হয়েছিল। এর ওপর নির্ভর করতো রাজনৈতিক স্পন্সরশিপ এবং ঘুষের বিষয়। নিষ্পেষণের প্রণোদনা হিসেবে পুলিশকে পুরস্কার দেয়া হতো। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে ব্যবহার করা হতো নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার কুক্ষিগত নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর পদ্ধতিগত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আইনের মাধ্যমে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার যে পদ্ধতি রয়েছে তা বাতিল করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, সংস্কারের মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস, পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে আলাদা করা উচিত। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহায়তা নেয়া উচিত বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেন পিয়ারসন বলেন, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে গিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার বাংলাদেশি প্রাণ দিয়েছেন। তারা বাংলাদেশে মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি যুগান্তকারী সুযোগ এনে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার যদি দ্রুত এবং কাঠামোগত সংস্কার না করে তাহলে ভবিষ্যতের সরকারগুলো যেকোনো সময় দমন-পীড়নের পথে পরিচালিত হতে পারে। যদি এমনটা হয় তাহলে কষ্টার্জিত অভূতপূর্ব এই সুযোগ সম্পূর্ণরূপে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০ বছরের বেশি গবেষণা এবং নথিপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী, অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য, বর্তমান ও সাবেক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বর্তমান সুপারিশমালা তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থা। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, নিজ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে হাসিনা বিচার বিভাগ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পাশাপাশি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, উচ্চ পদের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে হাসিনা সরকার। যার ফলে পুলিশ ক্রমশ পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে। তারা বছরের পর বছর ধরে দলীয় ক্যাডারদের মতো আচরণ করেছে।

ইতিমধ্যেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ছাত্রদের ডাকে সাড়া দেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের আগে এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু সংস্কারের প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তিনি বেশ কয়েকটি কমিশনও গঠন করেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের বাইরেও সংস্কার প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘ হয় সে বিষয়ে ২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের অধিবেশনে একটি প্রস্তাবনা উত্থাপন করা উচিত। কেননা, বাংলাদেশে পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা খাতের সংস্কারে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরও বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে পুলিশ। তারা এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করছে। পুলিশ আগের মতোই মানুষকে নির্বিচারে আটক করছে। অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গণ ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করছে তারা। ফলত পুলিশ যে কাউকেই গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে হুমকি দিতে পারছে এখনো। হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই ‘আয়নাঘর’ খ্যাত হাসিনার গোপন কারাগার থেকে তিনজনকে মুক্তি দেয়া হয়। যাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে আইনপ্রয়োগের তত্ত্বাবধানে থাকা কর্মীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাঠামোগত সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এ ছাড়া প্রসিকিউশন এবং বিচার বিভাগ যাতে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত থাকে তা নিশ্চিত করার জন্যও সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থা।

নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহার অংশে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য ২০২৪ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে একটি কমিশন। তারা প্রথম যে রিপোর্ট দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে কমপক্ষে ৩ হাজার ৫০০ মানুষকে গুম করা হয়েছে। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, একটি ‘কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামোর অধীনে গুম করা হতো। গুমের ঘটনা দেখাশোনা করতেন স্বয়ং শেখ হাসিনা এবং তার শীর্ষ কর্মকর্তারা। তার মধ্যে আছেন মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। তারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গুমের সঙ্গে জড়িত থাকা কর্মকর্তারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, আটকের বিষয়ে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সিনিয়র সদস্যরা জানতেন। তবে এটা প্রকাশ করা হতো না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুম এবং হত্যাকাণ্ডের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। একজন সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, ব্রিগেডিয়ার আযমীকে আটকের বিষয়ে সরাসরি জানতেন হাসিনা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যেহেতু আযমী একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, তাই শেখ হাসিনার কাছে তিনি মুক্তি দেয়ার আবেদন জানাতে থাকেন। কিন্তু প্রতিবারই তার আবেদন নাকচ করেন হাসিনা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা পরামর্শ দেন আযমীকে মেরে ফেলতে।

ওই কর্মকর্তার ভাষায়- ‘আমি সেটা করতে পারিনি। আমি থেমে গিয়ে তাকে মুক্তির বিষয়ে কথা বলেছি’। আযমীকে যখন মুক্তি দেয়া হয় তার আগেই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ওই রিপোর্টে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের নিয়ম লঙ্ঘনের বিশদ বর্ণনা দিয়েছে। বলা হয়, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর মাইকেল চাকমা, মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) ও আবদুল্লাহ আমান আযমীকে মুক্তি দেয়া হয়। তিনজনের ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ তাদের হেফাজতে থাকা এসব ব্যক্তির বিষয় অস্বীকার করেছে। তারা সবাই সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের নিঃসঙ্গ কারাবাসে রাখা হয়েছিল। একই বন্দিশিবিরে তারা অন্য বন্দিদের কথা শুনতে পেতেন। হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে আটক করা হয় ২০১৬ সালের আগস্টে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে আযমী ও আরমানকেও আটক করা হয়। তারা তিনজনই বিরোধীদলীয় নেতাদের ছেলে। এসব বিরোধীদলীয় নেতা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযুক্ত হয়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। হুম্মাম হলেন বিএনপি’র প্রয়াত নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে। বেআইনিভাবে আটকে রাখার বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখবেন এই শর্তে তাকে ২০১৭ সালের মার্চে মুক্তি দেয়া হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরেই শুধু তিনি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে মুখ খুলতে সক্ষম হয়েছেন। ওদিকে মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) তার পিতা মীর কাসেম আলীর আইনি টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মীর কাসেমকেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়। ২০১৬ সালের ৯ই আগস্ট সাত থেকে আট সদস্যের একদল অফিসার তার বাড়ি থেকে স্ত্রী, বোন ও সন্তানের সামনে থেকে আরমানকে তুলে নিয়ে যায়।

একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি গ্রেপ্তারের পরোয়ানা দেখতে চান। কিন্তু কর্মকর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করে তাকে বাসার  ভেতর থেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যান। তাকে একটি ভ্যানে তোলে এবং চোখ বেঁধে ফেলে। তিনি এর প্রতিবাদ করলে একজন কর্মকর্তা তাকে বলেন- আমাদেরকে নিষ্ঠুর হতে বলবেন না। ওদিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন কর্মকর্তা তাকে আটক করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। আরমানের গুমের বিষয়ে দেখাশোনা করেছেন এমন সাবেক আরেকজন উচ্চ পর্যায়ের কমান্ডিং অফিসার বলেছেন, এ ধরনের আটকের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, যখন তিনি জিজ্ঞাসাবাদ টিমে যোগ দেন তখন তাকে বলা হয় আরমান, আযমী ও চৌধুরী হলেন বিরোধী দলের প্রথম সারির তিন নেতার সন্তান। তাদের মুক্তি দেয়ার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলের তিন নেতার এই তিন ছেলেকে কীভাবে তুলে নেয়া হয় এবং তাদের সঙ্গে কি নির্যাতন করা হয়েছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওই রিপোর্ট। এতে বলা হয়, একজন কর্মকর্তা বলেছেন, র‌্যাব, ডিবি এবং ওই সময়ের বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা অনেক মানুষকে হত্যা করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা অংশে বলেছে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার রিপোর্ট আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে সমর্থন করতেন এমন হিন্দু এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ব্যক্তিরা আক্রান্ত হয়েছেন। পাবনার একজন সাংবাদিক বলেছেন, যেসব মানুষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারাই টার্গেট হয়েছেন। ওই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায় আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এ জন্যই সেখানে হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছেন। এমন হামলার কিছু রিপোর্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থি গ্রুপ এবং ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি’র সমর্থকরা অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যদিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার খবর সত্য। হিন্দুত্ববাদী গ্রুপগুলো দাবি করেছে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও উপাসনালয় টার্গেট করে শত শত হামলা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার নিশ্চিত করেছে কমপক্ষে ৮৮টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মামলা হয়েছে ৫ই আগস্ট থেকে ২২শে অক্টোবরের মধ্যে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭০ জনকে। এ বিষয়ে দোয়ারাবাজারের ২৯ বছর বয়সী ব্যবসায়ী চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুরা দ্বিমুখী সমস্যায়। একদিকে ভারতীয় মিডিয়া মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করছে, যার কিছুই কখনো ঘটেনি। এর ফলে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়ছে। ফলে তাতে হিন্দুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে বার্তা সংস্থা পিটিআই’কে একটি সাক্ষাৎকার দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ক্যাডারদেরকে প্রহার করতে গিয়ে লোকজন হিন্দু সম্প্রদায়ের কাউকে কাউকে প্রহার করেছে। তারা মনে করেছে, বাংলাদেশে অবস্থানরত হিন্দুরা আওয়ামী লীগের সমর্থক।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে লিখেছে, ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলনে ১৫ই জুলাই সহিংসতা দেখা দেয়। এ সময় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। তারা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর বৈষম্যমূলকভাবে সরাসরি গুলি করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের পেছন থেকে গুলি করা হয়েছে। পরে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন- আমি দেখেছি কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে গুলি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি, কর্মকর্তাদের জীবন বিপজ্জনক অবস্থায় না থাকলেও তারা সরাসরি গুলি করছেন। ১৮ই জুলাই সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। বন্ধ করে দেয় সব রকম যোগাযোগ। বন্ধ করে দেয় তথ্য পাওয়ার সব পথ। তা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা সংগঠিত হতে থাকেন। পুলিশ তাদের পিছু নেয় এবং গুলি করে। ১৮ বছর বয়সী আমির হোসেন বলেন, তিনি ১৯শে জুলাই পুলিশের হামলার সময় এক ভিড়ের মধ্যে পড়ে যান। তিনি কীভাবে নিজের জীবন রক্ষার চেষ্টা করছিলেন তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। বিক্ষোভকারীরা একটি জেলে নিরাপত্তা ভেঙে প্রবেশ করার পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনের অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় ২০শে জুলাই সরকার সারা দেশে কারফিউ জারি করে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়।

গ্রেপ্তার করে কয়েক হাজার মানুষকে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার কলেজপড়ুয়া ছেলে ইমান হোসেন তায়েম ২০শে জুলাই তার দুই বন্ধুকে নিয়ে একটি চায়ের দোকানে অবস্থান করছিলেন। এ সময় তাদের দিকে গুলি শুরু করে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। তাদের একজন বুলেটবিদ্ধ হওয়ার পর দোকানের ভেতরে লুকিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তারা। নামিয়ে দেন দোকানের শাটার। তাদের এক বন্ধু মোহাম্মদ রাহাত হোসেন বলেন, ১০-১৫ জন পুলিশ সদস্য দোকানের ভেতর প্রবেশ করে। তারা আমাদের দিকে বন্দুক ধরে। আমাদেরকে বুট ও তাদের অস্ত্র দিয়ে শারীরিকভাবে আঘাত করতে থাকে। কোনো কোনো কর্মকর্তা বলতে থাকেন, আমাদেরকে গুলি করা উচিত। অন্যরা পরামর্শ দেন আমাদের পায়ে গুলি করা উচিত। তায়েম ও আমি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আমাদেরকে অশ্লীল ভাষায় গালি দেয় পুলিশ। বলে দৌড়ে পালাতে। এ নির্দেশ পেয়ে তায়েম দুই থেকে তিন পা সামনে যেতেই আমি ওকে অনুসরণ করার কথা ভাবি। কিন্তু আমি যাইনি। ও দৌড় দেয়ার পর পেছন থেকে ওকে দু’টি বুলেট মারা হয়। তার একটি তার বুক ভেদ করে চলে যায়। দ্বিতীয় বুলেটটি লাগে তার পায়ে। এমনতরো বিভিন্ন ব্যক্তিকে হত্যা করে পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র‌্যাব সম্পর্কে লিখেছে, এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালে, তখন ক্ষমতায় ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তারপর থেকে বছরের পর বছর পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলো এই বাহিনীকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়েছে। ফলে তারা ডেথ স্কোয়াড হিসেবে কাজ করেছে।  একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গুম, হত্যাকাণ্ড এবং ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো ঘটানোর জন্য র‌্যাবে আছে একটি আলাদা টিম। বেশির ভাগ কাজ করে এই টিম। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে র‌্যাবে যোগ দেয়ার পর হতাশ হয়েছি। আমি কর্মকর্তাদের নাম জানি না। প্রশিক্ষণের সময় তিনি এলেন ক্লাস করাতে। সেখানে প্রায় ৩৫ জন ইন্সপেক্টর উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি প্রকাশ্যে বলছেন, ১৬৯টি ক্রসফায়ার সম্পন্ন করেছেন তিনি। আমার একজন ব্যাচমেটের কথা স্মরণে আছে। তিনি বলেছিলেন, সবার সামনে ১৬৯টি ক্রসফায়ারের বিষয় স্বীকার করা কতোটা ক্রেজি এই কর্মকর্তা। ক্ষমতার বাইরে গেলেই রাজনৈতিক নেতারা একমত হন যে, র‌্যাবকে নিষিদ্ধ করা উচিত।

লেহি অ্যামেন্ডমেন্টের অধীনে র‌্যাবকে প্রশিক্ষণ দেয়া থেকে নিষিদ্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃটিশ সরকার র‌্যাবকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ দেয় উইকিলিকস-এ তথ্য প্রকাশ করার পর ব্যাপক সমালোচনা হয়। এরপর র‌্যাবের প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দেয় বৃটেন। ২০২১ সালের ১০ই ডিসেম্বর র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। একই নিষেধাজ্ঞায় পড়েন তাদের সাত কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। গুম তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটি ১৪ই ডিসেম্বর একটি রিপোর্ট দিয়েছে। এতে র‌্যাবকে ভেঙে দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এসব তথ্য সামনে আসার পর র‌্যাবের প্রধান একেএম শাহিদুর রহমান স্বীকার করেন র‌্যাবের গোপন বন্দিশিবিরের কথা। বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি র‌্যাবকে ভেঙে দেন তাহলে তারা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। এর প্রেক্ষিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কিছু সুপারিশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে শুধু নির্যাতন বন্ধের জন্যই শুধু র‌্যাবকে বিলুপ্ত করা উচিত নয়, একই সঙ্গে এর মধ্যদিয়ে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা যাবে যে, তাদের পরবর্তী সরকারগুলো নিষ্পেষণের হাতিয়ার হিসেবে আর ব্যবহার করতে পারবে না। জাতিসংঘ এবং দাতারা অনুরোধ জানিয়েছে র‌্যাবে থাকা সব কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে র‌্যাবকে বিলুপ্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই রিপোর্টে ৫৫ পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টের পুরোটা তুলে ধরা সম্ভব নয়।

mzamin

চীনের ডিপসিকের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বড়সড় ধাক্কা

ডিপসিক হলো একটি চীনা এআইচালিত চ্যাটবট সংস্থা। জানুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করার পর অ্যাপল স্টোর থেকে ব্যাপক হারে এটি ডাউনলোড হয়েছে। এর অন্যতম কারণ মার্কিন মুলুক চালিত এআই সংস্থাগুলোর তুলনায় ডিপসিকের ক্ষেত্রে খরচ অনেক কম। চলতি সপ্তাহের শুরুতে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল আর ১-এর প্রকাশ করেছে ডিপসিক। এই মডেলের কার্যক্ষমতা ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির মতো হলেও এটি পরিচালনার খরচ অনেক কম। ডিপসিক দাবি করেছে তাদের এআই মডেল তৈরিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, যা তুলনামূলকভাবে ওপেনএআই, গুগল বা মেটার মডেলগুলোর তুলনায় অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে 'ডিপসিক। সোমবার মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা যায় । প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোর মধ্যে বিশ্বের প্রথম সারির এআই চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থা আমেরিকার ‘এনভিডিয়া কোম্পানি প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়েছে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এ ভাবে চলতে থাকলে শীঘ্রই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্যে থাবা বসাবে চীন । চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি ডিপসিক দক্ষিণ-পূর্ব চীনের একটি শহর হ্যাংজুতে গড়ে ওঠে। কোম্পানিটি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে লঞ্চ করা হয়েছিল, কিন্তু সেন্সর টাওয়ার অনুসারে এর জনপ্রিয় এআই সহকারী অ্যাপটি ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়নি।

লিয়াং ওয়েনফেং চালু করেছিলেন ডিপসিক। ৪০ বছর বয়সী লিয়াং ইনফরমেশন এবং ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক। তিনি  Nvidia A100 চিপসের একটি স্টোর তৈরি করেছিলেন, যা এখন চীনে রপ্তানি নিষিদ্ধ।

চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি নতুন ‘ওপেন সোর্স রিজনিং মডেল’ বা বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি চালু করেছে চীনা  সংস্থা ‘ডিপসিক’। এরই নাম দেয়া হয়েছে ‘ডিপসিক-আর১’। একই ধাঁচের আর একটি বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি হল ওপেনএআইয়ের ‘চ্যাটজিপিটি’। তবে, চ্যাটজিপিটি তৈরি করতে আমেরিকার তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাটির যত খরচ হয়েছে, তার চেয়ে অনেক কম টাকায় ‘ডিপসিক-আর১’ বানিয়ে ফেলেছে চীন। তাই অনেকেই মনে করছেন, এআইয়ের প্রতিযোগিতার বাজারে অদূর ভবিষ্যতে শীঘ্রই আমেরিকাকে টেক্কা দেবে চীন।

গত সপ্তাহে মেটা ঘোষণা করেছে যে, তারা এ বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নের জন্য ৬৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করবে। ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান গত বছর বলেছেন যে, এআই শিল্পকে সমর্থন করতে এবং ডেটা সেন্টার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিপ তৈরির জন্য এই খাতে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের একজন মার্ক অ্যান্ড্রিসন বলেন, ‘আমার দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এবং চিত্তাকর্ষক সাফল্যগুলোর মধ্যে একটি হলো ডিপসিক।’

ডিপসিকের এই সাফল্য পুরো বিশ্বকে অবাক করেছে। কারণ জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা বলে কয়েক বছর ধরে চীনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এআই চিপের সরবরাহ সীমিত করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ, কম ক্ষমতাসম্পন্ন এআই চিপ ব্যবহার করেই নতুন মডেলটি তৈরি করেছে ডিপসিক।
সূত্র : বিবিসি

mzamin