Monday, July 14, 2025

গাজায় পানির খোঁজে যাওয়া ছয় শিশুকে হত্যা করল ইসরায়েল

গাজায় খাবার পানি সংগ্রহ করতে গিয়েও ইসরায়েলি নৃশংসতার শিকার হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। নির্বিচার গুলি ও বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে তাঁদের ওপর। আজ রোববার পানি সংগ্রহের সময় নতুন করে অন্তত ১০ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের মধ্যে অন্তত ৬ জন শিশু। গাজায় খাবার ও পানির তীব্র সংকটের মধ্যেই এ হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল।

ঘটনাটি ঘটেছে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে একটি পানি সরবরাহকেন্দ্রে। এই শিবিরে সরবরাহ করা পানি পানযোগ্য নয় বলে আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। আজকের হামলায় সেখানে আরও ১৬ জন আহত হয়েছেন। এ নিয়ে বিগত কয়েক মাসে প্রায় ১০ বার পানি সংগ্রহ করতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাল ইসরায়েল।

গাজার চিকিৎসা সূত্র থেকে জানা গেছে, পানি সংগ্রহ করতে যাওয়া ১০ জনসহ আজ ইসরায়েলের হামলায় উপত্যকাটিতে ৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আর আগের দিন শনিবার নিহত হয়েছেন অন্তত ১১০ জন। এর মধ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণকেন্দ্রে খাবারের আশায় গিয়ে হামলায় নিহত হন ৩৪ জন।

অনাহারে ৬৭ শিশুর মৃত্যু


ইসরায়েল টানা ১১ সপ্তাহ গাজা অবরোধ করে রাখার পর গত ২৬ মে উপত্যকাটিতে ত্রাণ সরবরাহ শুরু করে বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ। এর পর থেকে সংস্থাটির ত্রাণকেন্দ্রে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন আট শতাধিক ফিলিস্তিনি। জিএইচএফের ত্রাণ সরবরাহের পদ্ধতি ও খাবারের মান নিয়ে সমালোচনা করে আসছে জাতিসংঘও।

গাজা থেকে আল-জাজিরার সংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, জিএইচএফ থেকে একজনকে পুরো পরিবারের খাবারের একটি পার্সেল দেওয়া হচ্ছে। এই খাবার ক্ষুধার্ত শিশু ও পরিবারের সদস্যদের জন্য যথেষ্ট নয়।’ শনিবার গাজার জনসংযোগ কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে গাজায় অনাহারের কারণে অন্তত ৬৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

খাদ্য ও পানির অভাবে গত মার্চ থেকে গাজায় অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ। সে সময় থেকে উপত্যকাটি অবরোধ করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পর থেকে সেখানে বাইরে থেকে কোনো ত্রাণসহায়তা নিয়ে আসতে পারেনি ইউএনআরডব্লিউএ।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং ইসরায়েল থেকে প্রায় আড়াই শ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসা হয়। সেদিন থেকেই উপত্যকাটিতে নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত গাজায় ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ।

হামাসকে দোষারোপ ইসরায়েলের

গাজায় চলমান নৃশংসতার মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারীরা। এ লক্ষ্যে ৬ জুলাই থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় পরোক্ষ আলোচনায় বসেছিল হামাস ও ইসরায়েল। দুই পক্ষই ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছিল। তবে সূত্রের বরাতে এএফপি জানতে পেরেছে, ইসরায়েলের কারণে ওই আলোচনায় বাধা এসেছে।

সূত্র বলেছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার চায় হামাস। তবে আলোচনার সময় উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন নিয়ে কিছু মানচিত্র উপস্থাপন করেছে ইসরায়েল। হামাস মনে করছে, ওই মানচিত্র থেকে বোঝা গেছে যে সেগুলোর মাধ্যমে গাজায় উল্টো নতুন করে সেনা মোতায়েন করা হবে। তাই হামাস এটি মেনে নেবে না।

এমন পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে আলোচনা স্থগিত রাখতে বলেছে মধ্যস্থতাকারীরা। সূত্র জানিয়েছে, দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সফরের আগপর্যন্ত আলোচনা স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচনা থেমে যাওয়ার জন্য হামাসকে উল্টো দোষারোপ করেছে ইসরায়েল। তারা বলেছে, হামাস আলোচনায় ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না।

এএফপির কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচনায় নমনীয়তা দেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। তবে হামাস একগুঁয়ে আচরণ করছে। একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মধ্যস্থতাকারীরা যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা হামাসের অবস্থানের কারণে বাধার মুখে পড়ছে।

ইসরায়েলের হামলায় আহত এক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আজ রোববার মধ্য গাজার আল–আওদা হাসপাতালে
ইসরায়েলের হামলায় আহত এক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আজ রোববার মধ্য গাজার আল–আওদা হাসপাতালে। ছবি: এএফপি

ভারতকে যেভাবে ছাড়িয়ে যেতে পারে পাকিস্তান... by মোহাম্মাদ আমির রানা

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সেটি হঠাৎই পাকিস্তানের বৈশ্বিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এ ঘটনা পাকিস্তানের জন্য একধরনের বিরল কূটনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা নিয়ে এসেছে। এখন দেশটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে শুরু করেছে।

এই সংঘাত বিপজ্জনক হলেও পাকিস্তানের জন্য এটি এক অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে দিল্লির দীর্ঘদিনের যে প্রচারণা পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে আলাদা করে রাখার কাজে ব্যবহার করা হতো, এখন সেটি আর আগের মতো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে পেহেলগামে পাকিস্তানের সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিল বলে ভারতের তোলা অভিযোগের স্পষ্ট প্রমাণ না মেলায় সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ভারতের প্রচারণা এখন আর গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।

ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক জবাব ছিল নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু দৃঢ়। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া অনেক পর্যবেক্ষককে চমকে দিয়েছে। এটি এক নতুন কৌশলগত আত্মবিশ্বাসেরও বার্তা দিয়েছে। এই সময়েই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক আবারও গোপনে সক্রিয় হয়েছে। এটি পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে কিছু বিষয় বিশেষভাবে নজরে পড়ে। এখন চীন পাকিস্তানের প্রধান কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠেছে। আর চীনের পরই রয়েছে তুরস্ক। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ভূগর্ভস্থ বিশাল খনিজ সম্পদের দিকে আন্তর্জাতিক আগ্রহ নতুন করে বাড়ছে।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে অর্জিত সাফল্য দেশটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানও দেশটির কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো ঘটছে এমন একসময়, যখন মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে পুরো ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ত্বরিত রূপান্তর ঘটছে।

ভারতের প্রতি তার প্রতিবেশীদের অসন্তুষ্টি বাড়ছে। অন্যদিকে রাশিয়ার আঞ্চলিক ভূমিকাকে এ অঞ্চলের দেশগুলো আগের চেয়ে বেশি স্বার্থকেন্দ্রিক মনে করছে। ফলে পাকিস্তানের সামনে এখন নতুন জোট গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পাকিস্তান যদি তার নিজের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তাহলেই সেটি সম্ভব।

বাইরের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হলে পাকিস্তানের ভেতরের পরিস্থিতি মজবুত করা জরুরি। পাকিস্তান যদি তার নতুন পাওয়া আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাকে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা আনতে হবে। ভেতরে শক্ত ভিত না থাকলে তার কূটনৈতিক অর্জনগুলো দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে।

পাকিস্তান এখন এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছে যে সাম্প্রতিক কৌশলগত ও কূটনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে আরও কার্যকর ও আধুনিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।

গত সপ্তাহে সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এই বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। তারা বলেছে, সব ধরনের জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সব পর্যায়ে ‘সিদ্ধান্তমূলক ও সার্বিক পদক্ষেপ’ নেওয়া দরকার।

এই আহ্বানই দেখিয়ে দেয় ভবিষ্যতে যদি পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের গুরুত্ব ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাকে ভেতর থেকে শক্ত হতে হবে এবং জঙ্গিবাদ দমনে আরও কঠোর ও সমন্বিতভাবে এগোতে হবে।

এই মুহূর্তে পাকিস্তান বেলুচিস্তান ও আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহ দমনে অভিযান চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এ ধরনের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে এখনো একটি বড় দুর্বলতা থেকে গেছে। সেটি হলো, যেসব জঙ্গিগোষ্ঠী একসময় ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সক্রিয় ছিল, সেই লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জইশ-ই-মুহাম্মদ-এর কিছু সদস্য এখনো পাকিস্তানে সক্রিয় আছেন বলে অভিযোগ আছে। এই অভিযোগকে ভারত নিয়মিতভাবে কাজে লাগাচ্ছে।

গত কয়েক বছরে পাকিস্তান এসব নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে। মূলত অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা এফএটিএফ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক চাপের কারণে পাকিস্তান এসব পদক্ষেপ নেয়।

এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরও ভারত বলে আসছে, এসব জঙ্গি সংগঠনের কিছু অংশ এখনো পাকিস্তান ও আজাদ কাশ্মীরে সক্রিয়। ভারত এই বক্তব্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ভারত এখন পর্যন্ত তাদের এই কূটনৈতিক কৌশল থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

তবে এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু কথা বলে নয়, এই ধরনের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হলে বাস্তব প্রমাণ এবং নতুন যুক্তিও লাগবে।

যদি ভারতের এই দাবি প্রমাণ ছাড়া বারবার তোলা হয় এবং সেটি আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে, তাহলে ভারতকেও হয়তো তার কৌশল বদলাতে হবে।

এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পাকিস্তানের সঙ্গে আরও সমতার ভিত্তিতে আলোচনার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তান এফএটিএফে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে দেখা যায়, সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবিলায় দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন।

পাকিস্তানের প্রতিবেদন ছিল গঠনমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে তৈরি। অন্যদিকে, ভারতের রিপোর্ট ছিল অনেক বেশি বেছে বেছে সাজানো, যেন তা তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বক্তব্যকে সহায়তা করে।

এফএটিএফের প্রতিবেদনে ভারতের দেওয়া তথ্য মূলত ইন-কাইন্ড পদ্ধতি, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার, অনলাইন পেমেন্ট এবং ভিপিএনের মাধ্যমে একক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন—এই বিষয়গুলোর সঙ্গে এসেছে।

ভারত দুটি কেস স্টাডি দিয়েছে। একটি হলো ২০২২ সালের ৩ এপ্রিল গোরক্ষনাথ মন্দিরে হামলার চেষ্টা। আরেকটি হলো ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জন ভারতীয় নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এফএটিএফের প্রতিবেদনে কোথাও পেহেলগাম ঘটনার উল্লেখ করা হয়নি।

ভারতের কেস স্টাডিগুলোর তথ্য কোথা থেকে এসেছে, তা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। পক্ষান্তরে, পাকিস্তান তাদের রিপোর্টে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও ইসলামিক স্টেট খোরাসানের (আইএস-কে) কথা বলেছে।

এই সংগঠনগুলো কীভাবে হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক ব্যাংকিং পদ্ধতি ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করে, কিংবা মুক্তিপণ আদায়ের মতো কৌশল ব্যবহার করে অর্থায়ন করে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাকিস্তান এসব তথ্য জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কর্তৃপক্ষ (ন্যাকটা) সূত্রে দিয়েছে। ফলে এসব তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি।

এই দুই দেশের কৌশলের ভিন্নতা চোখে পড়ে। ভারত এখনো কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে তার বক্তব্যকেই মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিয়মকানুন মেনে চলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিবেশে এই ধরনের ধীর ও কাঠামোগত অগ্রগতি ভবিষ্যতে আরও টেকসই ফল দিতে পারে।

* মোহাম্মাদ আমির রানা, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক
- দ্য ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ছবি: রয়টার্স

বুলেট যেভাবে লিখে দেয় অন্যায্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘ডেথ রেফারেন্স’ by অনুপম দেবাশীষ রায়

কেবল জুলাই–আগস্ট মাসে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেই কি লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন? আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ জুলুমের ইতিহাস থেকে মানুষের মনে যে ক্ষত জন্ম নিয়েছিল, সেখান থেকেও অনেকে পথে নেমেছেন। একের পর এক আন্দোলন দমন, গুম, খুন, আয়নাঘর ইত্যাদি মানুষের মনে দাগ কেটেছে। জুলুমের ফলাফল হিসেবে যেভাবে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে, তা নিয়ে লিখেছেন অনুপম দেবাশীষ রায়

একটি বুলেট যখন বন্দুকের নল থেকে বের হয়, সেটার ওপর কারও নাম লেখা থাকে না। কিন্তু যখন সেটা একজন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রের বুক ভেদ করে, সেই বুলেটই লিখে ফেলে ইতিহাস, রচনা করে একটা অন্যায্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’।

যখন রাষ্ট্র কাউকে খুন করে, সেটাকে সব সময় জুলুম, বিশেষত অসহনীয় জুলুম হিসেবে আমরা দেখি না। অপরায়িত কোনো জনগোষ্ঠীর কাউকে মারলে অনেক সময় সেটা আমাদের মানসপটেও ধরা দেয় না।

কিন্তু যখন একজন নিরস্ত্র সাধারণ ছাত্রকে ঠান্ডা মাথায় খোলা রাজপথে হত্যা করা হয় আর সেটা মানুষ ক্যামেরাবন্দী করে ফেলেন, তখন সেই রাষ্ট্রের জুলুমকে আর অন্য কোনো নাম দেওয়া যায় না; যতই ‘ড্রাগ তত্ত্ব’ রাষ্ট্র হাজির করুক না কেন, হত্যার চেয়ে স্পষ্টতর জুলুম আর হয় না।

২.

আওয়ামী লীগের জুলুম মানুষের কাছে প্রকাশ্য হয়েছিল বহু আগেই। জুলাই কেবল ছিল দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ। কৌশলী ছাত্রনেতৃত্বের দক্ষতায় সেই ক্ষোভ পেয়েছিল একটা গতিমুখ। আর আওয়ামী লীগের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত তাদের পতনকে করেছিল অবশ্যম্ভাবী।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ডিফিল (পিএইচডি) গবেষণা মূলত জুলাই অভ্যুত্থান নিয়েই। আমার বিশ্লেষণ বিস্তৃত হলেও আমার কিছু তত্ত্ব আজ পাঠকের কাছে তুলে ধরতে চাই। আশাকরি এর মাধ্যমে কিছু প্রতিক্রিয়া পাব, যা আমার গবেষণা আরও ঋদ্ধ করবে। প্রাথমিকভাবে শুরু করি ইতিমধ্যে হাজির করা কিছু তত্ত্বকে।

‘ছাত্র’ পরিচয়টি জুলাইয়ের গতিপ্রকৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘ছাত্র’ পরিচয়টি একপ্রকার পবিত্রতার শামিল। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে ছাত্রদের সংগ্রামের বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই ছাত্রদের বুকে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকারই বেশি দিন টিকতে পারেনি।

‘ছাত্রখুনি’ তকমা লেগে গেলে সেটি কাজ করে একটি অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবে। শ্রমিক হত্যা আমাদের দেশে হরেদরে হয়। এমনকি অভ্যুত্থানের পরও পোশাকশ্রমিককে হত্যা করেছে পুলিশ। কিন্তু সমশ্রেণির না হওয়ায় আর শ্রেণি বিভাজনের তীব্রতায় শহুরে মধ্যবিত্ত তা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায়নি।

জুলাইয়েও বহু শ্রমিক বা ছিন্নমূল মানুষ জীবন দিয়েছেন। কিন্তু এখনো শহীদ বলতে মানুষ সবচেয়ে বেশি আবু সাঈদ আর মুগ্ধের নাম নেন। কেননা, তাঁরাই রূপান্তরকারী ঘটনা তৈরি করার জন্য মধ্যবিত্ত জনমানসে একেকজন ‘যোগ্য’ শহীদ, যে জায়গায় দলীয় রাজনীতি করা ওয়াসিমরাও পৌঁছাতে পারেননি। জুলাই আন্দোলনটি সফল হওয়ার একটি অন্যতম কারণ ছিল এর কৌশলগত ‘অরাজনৈতিকতা’; অর্থাৎ আন্দোলনকে দলীয় রাজনীতির কলুষমুক্ত হিসেবে উপস্থিত করা।

৩.

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড জুলাই আন্দোলনের অন্যতম রূপান্তরকারী ঘটনা হলেও নিঃসন্দেহে একমাত্র এমন ঘটনা নয়। আরও অনেক মুহূর্ত মিলেই জুলাই। গভীরতর সমীক্ষা ছাড়া জনতার কাছে কোন ঘটনাগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা পড়েছে, তা বলা মুশকিল, যেটি আসানের প্রচেষ্টা আমার পূর্ণ অভিসন্দর্ভে থাকবে।

প্রাথমিক ধারণা থেকে বলা যায় যে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়াটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কেননা তৎকালীন সরকারের এই মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তই লাখো মানুষকে পথে নিয়ে এসেছিল। যাঁরা হয়তো কেবল অনলাইনেই তাঁদের প্রতিবাদ সীমিত রাখতেন।

সরকারের বাসনা ছিল ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলনকে স্তিমিত করা। কিন্তু আদতে তা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালীই করেছে। যদিও এটি একমাত্র কারণ নয়, ইন্টারনেট শাটডাউন আন্দোলনকে অফলাইনে রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির জন্য।

৪.

কিন্তু লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসা কি কেবল ইন্টারনেট বন্ধ বা ছাত্রহত্যার জন্য? আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ জুলুমের ইতিহাস থেকে মানুষের মনে যে ক্ষত জন্মেছিল, সেখান থেকেও অনেকে পথে নেমেছেন। একের পর এক আন্দোলন দমন, গুম, খুন, আয়নাঘর ইত্যাদি মানুষের মনে দাগ কেটেছে। অনেকেই একেবারে সরাসরি আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

গবেষণার কাজে নেমে আমি এমন ১০০টির বেশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণের একটি ডেটাবেজ পেয়েছি, যেখানে স্পষ্টত ছাত্রলীগের নির্যাতনে মানুষের ভুক্তভোগী হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। এখন যদি তাঁদের সার্ভে করা হয়, আমার ধারণা, এ রকম দেখা যাবে যে এঁদের একটি বড় অংশই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো আন্দোলনে গেছে।

এসব গল্পের বাইরে আরও হাজার হাজার গল্প রয়েছে। এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসেছে। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে আওয়ামী লীগ আমলের শুরু থেকেই ছাত্রলীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ছিল; হাল আমলের সরকারি ঘোষণার বহু আগে থেকেই।

কেবল ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের কারণেই বহু ছাত্রছাত্রীর চোখে আওয়ামী লীগ ধরা দেয় একটা ‘দানব’ হিসেবে; এমন এক দানব, যাকে বধ করা একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতীয়মান হয়। সেই আবেগ থেকেই অনেকে আন্দোলনে এসেছেন বলে আমার বিশ্বাস, যেটি শিগগিরই আমি উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে যাচাই করব।

৫.

এ ছাড়া বড় বড় জুলুমের ঘটনা, যেমন গুম, খুন, আয়নাঘর, দুর্নীতি, অর্থ পাচার—এগুলোও শিক্ষার্থীদের ছাড়াও সাধারণ মানুষকে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তাতিয়ে তুলেছে। তাঁদের চোখেও আওয়ামী লীগ সরকার অন্যায্য বলে ধরা দিয়েছে। এই কারণেই ১৮ জুলাইয়ের পর ছাত্রসমাজের বাইরেও লাখ লাখ সাধারণ মানুষ কোটা আন্দোলনকে শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনের দিকে ধাবিত করেছেন।

আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের খবর জনগণের কাছে পৌঁছানোর পরই এই আন্দোলনের এক দফায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। যদিও অনেকে দাবি করছেন যে হাসিনাকে উৎখাত করা একটা দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল, আমার মনে হয় যে এই আন্দোলনের নিজস্ব একটি গতি ছিল, একটি ভরবেগ ছিল।

এই ভরবেগ তৈরি হয়েছে একের পর এক রূপান্তরকারী ঘটনা আর শাহাদাতের কারণে। সেই মুহূর্তের ভরবেগে আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। কোনো তরফ থেকে এক দফার ঘোষণা না এলেও, মানুষই এক দফার আন্দোলনের দিকেই যেতেন। আর সেই সময়ে এক দফার ঘোষণা দেওয়া ছাড়া নেতৃত্বের কাছে আর কোনো উপায়ও ছিল না।

৬.

এই যে মুহূর্তের ভরবেগ, তার পেছনের অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রতিটি মৃত্যু। আন্দোলনের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমার প্রাথমিক তত্ত্ব হলো, এই আন্দোলন প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে ঝিমিয়ে না পড়ে বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে।

আমার উপাত্ত বলছে, একই বিভাগে যেদিন হত্যা হয়েছে, তার সঙ্গে পরবর্তী দিনের আন্দোলনের সংখ্যার একটি পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে একই উপাত্তের আরও কিছু বিশ্লেষণ বলছে যে অপরাপর দমন বা জুলুমও বিশেষভাবে আন্দোলনকে বেগবান করেছে। যেমন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরবর্তী দিনে আন্দোলনের ঘটনা সংখ্যার বিশেষ এক পূর্বাভাসদানকারী।

অতএব, কেবল আন্দোলনের আগে ঘটে যাওয়া দীর্ঘ দেড় দশকের জুলুমই নয়; বরং চলমান জুলাইয়ের প্রত্যক্ষ জুলুম প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই ফলাফল সামাজিক আন্দোলন তত্ত্বের একটি বড় ধারণার বিরুদ্ধে যায়, যেটি বলে যে আন্দোলন চূড়ান্ত তীব্র হলে আন্দোলন কেবল বেগবান হয় না, বরং দমেও যায়। কিন্তু আমাদের জুলাই জুলুমে দমে যায়নি। সে জুলুমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছে যে সে এই জুলুমকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করবে।

৭.

এ বছরের বইমেলায় প্রকাশিত বিদ্রোহ থেকে বিপ্লব বইয়ে আমি দাবি করেছি যে জুলাইয়ের নাড়ি পোঁতা আছে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্যে। তবে এখন আমি বিশ্বাস করি যে জুলাইয়ের শুরু হয়েছে আরও অনেক আগেই, যা অনেকেই এখন বলছেন বা অন্তর্বর্তী সরকারের ফেসবুক পেজও তা দাবি করছে।

এসব জুলুমের একটি খতিয়ান ও মানুষের দৃষ্টিতে তার প্রভাব যাচাই করা গবেষকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হতে পারে। কোন জুলুম মানুষ মনে রাখে আর কোন জুলুম তাঁকে জীবন বাজি রেখে রাজপথে নিয়ে আসে, তার একটা সুলুক সন্ধান করতে পারলে সামাজিক আন্দোলন গবেষণার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ভূমিকা রাখতে পারে।

কেবল এ কারণেই নয়, বরং ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ; যেন ভবিষ্যতের কোনো সরকারও আওয়ামী কায়দার জুলুম ফিরিয়ে আনার কথা ভাবতে না পারে। কারণ, আওয়ামী জুলুম যেমন জুলাইকে জ্বালিয়েছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, যাঁরা কখনো কোনো জুলুমের অপমান ভোলেন না, তাঁরাও অন্য কোনো জুলুমবাজকে আবারও উৎখাত করতে পিছপা হবেন না।

৮.

জুলাই কেবল শিক্ষায়তনিক গবেষণার বিষয় নয়, এটি একটি জাতিগত উপলব্ধি ও মর্মবোধের সময়। এই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রসহ সমগ্র ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন একটি ন্যায্য সমাজ গড়ে তোলা।

সেই লক্ষ্য থেকে আমরা আজও অনেক দূরে। জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির এই সময়ে আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার একটি মোক্ষম সময় এসে উপস্থিত হয়েছে।

আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলোর মতো জুলাইও পরিপূর্ণভাবে একটি ‘বেহাত বিপ্লব’ না হয়ে যায়। সে জন্য আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতাসহ সাধারণ মানুষকে কাজ করতে হবে, যেন অন্তর্বর্তী সরকার বা তার পরবর্তী নির্বাচিত সরকার মৌলিক সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ করে আর একটি ন্যায্য রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত হয়। তা না হলে মানুষকে আবার পথে নামতে হবে, আবারও রক্ত দিতে হবে, জীবন দিতে হবে।

তবে আমি আশা করব যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা সক্রিয় করতে পারব, যাতে আর আমাদের সাধারণ মানুষকে রক্ত দিতে না হয়। সেই লক্ষ্যে কাজ করাই হোক আমাদের জুলাইয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গণশপথ।

* অনুপম দেবাশীষ রায়, মুক্তিপত্র–এর প্রধান সম্পাদক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ডিফিল (পিএইচডি) গবেষক।
- ই–মেইল: anupam.roy@sociology.ox.ac.uk
- মতামত লেখকের নিজস্ব

বুলেট যেভাবে লিখে দেয় অন্যায্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘ডেথ রেফারেন্স’

জুলাইয়ের ভাইরাল এই ছবির পেছনের গল্প

কদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে ছবিটা। পেছনে পুলিশ, সামনেই সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছেন দুজন। কারা তাঁরা? কেন লুকিয়ে আছেন? কী হয়েছিল সেদিন? ছবিটি তুলেছিলেন প্রথম আলোর আলোকচিত্রী খালেদ সরকার। এই ছবি তুলতে গিয়ে ছররা গুলিও বিঁধেছিল তাঁর শরীরে। সেদিনের অভিজ্ঞতা শুনুন তাঁর মুখে।

দিনটা ১৯ জুলাই

সেদিন আমার সাপ্তাহিক ছুটি। কিন্তু সারা দেশ তখন উত্তাল। সকাল থেকেই খবর পাচ্ছিলাম, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে শুরু করেছেন। একজন ফটোসাংবাদিক হয়ে এ সময় বাসায় বসে ছুটি কাটানোর কথা ভাবতেই পারি না। পরিবারের সদস্যরা অবশ্য মানতে পারছিলেন না। ছুটির দিনে বাসা থেকে বেরোতে হবে কেন? অনেক কষ্টে তাঁদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাস্তায় নামি।
উত্তরার বিএনএস টাওয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে তিন জায়গায় পুলিশের চেকপোস্ট পেরোতে হলো। তবে যাওয়ার পুরো পথটাই ছিল ফাঁকা। নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে দেখলাম, আন্দোলনকারীরা তখনো সংখ্যায় কম। স্কয়ার টাওয়ারের সামনে দেখলাম, বিআরটিসির একটি বাসে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ঝটপট কয়েকটা ক্লিক করলাম। চোখে পড়ল, পাশের বড় ভবনগুলোর সামনের কাচগুলো ভাঙা।

সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছেন দুজন
সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছেন দুজন। ছবি: খালেদ সরকার


যেভাবে গুলি লাগল

একটু এগিয়ে আজমপুর। উল্টো দিকেই উত্তরা পূর্ব থানা। চারদিক থেকে থানার সামনে এসে জড়ো হয়েছেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে তাঁরা থানা ঘেরাও করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। আমি তখন আজমপুর পদচারী-সেতুর ওপর থেকে ছবি তুলছি। এক সময় মনে হলো, এখান থেকে ভালো ছবি হবে না, নিচে নামতে হবে।

থানার উল্টো পাশে একটা মার্কেটের সিঁড়িতে অবস্থান নিলাম। হঠাৎই গুলি ছুড়তে শুরু করে পুলিশ। আমার তখন হিতাহিত ভাবার মতো অবস্থা নেই। একের পর ক্লিক করে যাচ্ছি। ছাত্র-জনতা যে যেদিকে পারছেন ছুটছেন। খেয়াল করলাম, সবাই সরে পড়লেও দুজন আটকা পড়েছেন (পরে জেনেছিলাম, তাঁদের একজনের নাম রায়হান মোল্লা)। আহত হয়ে সড়ক বিভাজকের আড়ালে কোনো রকম আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁরা। ওপাশে কী চলছে, দেখার উপায় তাঁদের ছিল না। পুলিশ গুলি ছুড়ছিল মূলত আমার চারপাশে থাকা আন্দোলনকারীদের দিকে। আটকে পড়া দুজনকে বাঁচাতে যে কেউ এগিয়ে যাবেন, সেই উপায়ও ছিল না।

চলছিল থানা ঘেরাও করার প্রস্তুতি
চলছিল থানা ঘেরাও করার প্রস্তুতি। ছবি: খালেদ সরকার

ক্যামেরায় একের পর এক আহত দুজনের ছবি তুলতে থাকি। হঠাৎই আমার হাতে এসে লাগে চারটি ছররা গুলি। রক্ত পড়তে শুরু করে। দুই হাতে ক্যামেরা ধরে রাখতে পারছিলাম না। এক হাতে ধরেই কয়েকটা ক্লিক করলাম।
হাতে রক্ত দেখে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা এক শিক্ষার্থী দৌড়ে এলেন। দ্বিতীয়বার না ভেবেই জামা খুলে বেঁধে দিলেন আমার হাত। বললাম, ‘আপনার গায়ে তো কিছু থাকছে না।’ ‘কোনো সমস্যা নেই। ব্যবস্থা করে নেব,’ বললেন তিনি। ‘কাছেই আমার বাসা। আপনি আগে নিজের হাত সামলান।’
হুড়োহুড়ির মধ্যে সেই তরুণের নামটাও জানা হয়নি। তাঁর জার্সি এখনো আমার কাছেই রয়ে গেছে।

আরও একটি ছবির গল্প

সেদিনই তোলা আরও একটা ছবি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন ফেলেছে। সেটার গল্পও বলি।

সকাল গড়িয়ে তখন দুপুর। জুমার নামাজের সময় সড়ক ছেড়ে দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে আমিও একটু প্রাথমিক চিকিৎসা নিলাম। নামাজের পর আবার সবাই জড়ো হতে শুরু করেন। মুখোমুখি পুলিশ। বিকেলজুড়ে চলে কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট আর ছররা গুলির বৃষ্টি।
পুলিশের এত প্রতিরোধ সত্ত্বেও ছাত্র-জনতা সেদিন পিছপা হননি। বিকেলে একসময় চোখে পড়ল, লাল টি–শার্ট পরা আন্দোলনকারীদের একজন পুলিশের সঙ্গে কথা বলার জন্য হাত উঁচু করে এগিয়ে আসছেন। উল্টো দিক থেকে এগিয়ে আসেন পুলিশের দুই সদস্য। কাছাকাছি এসে কথা বলতে বলতেই আচমকা গুলি করে বসেন পুলিশের এক সদস্য।

পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এসেছিলেন রাতুল
পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এসেছিলেন রাতুল। ছবি: খালেদ সরকার

পরে জেনেছি, লাল টি–শার্ট পরা তরুণের নাম রাতুল। সেদিন গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি।
সরকার–সমর্থকেরা সেদিন লাঠিসোঁটা, দেশি অস্ত্র, এমনকি প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়েও আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করেন। তখনো হাতে জার্সি বাঁধা অবস্থায় ছবি তুলে যাচ্ছি। একজন আমাকে দেখে ফেলে আমার ওপর চড়াও হন। হাঁটুতে বেশ ব্যথা পাই। হাঁটতে পারছিলাম না। তখন ইন্টারনেট বন্ধ। বাসায় গিয়ে যে ছবি পাঠাব, সে উপায় নেই। একজন ফটোসাংবাদিকের সহায়তায় অফিসে এসে ছবি দিয়ে তারপর বাসায় ফিরি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন: ‘মানবিক শহর’ ফিলিস্তিনিদের বন্দি শিবির: এহুদ ওলমার্ট by এমা গ্রাহাম-হ্যারিসন

ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট গার্ডিয়ানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাফার ধ্বংসাবশেষের ওপর যে ‘মানবিক শহর’ (হিউম্যানিটারিয়ান সিটি) গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন, তা আসলে একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দিশিবির হবে। ফিলিস্তিনিদের সেখানে বন্দি করে রাখা জাতিগত নিধন (এথনিক ক্লিনসিং) বলে গণ্য হবে। ওলমার্ট বলেন, ইসরাইল ইতিমধ্যে গাজা এবং পশ্চিমতীরে যুদ্ধাপরাধ করছে। আর এই ক্যাম্প নির্মাণ করলে পরিস্থিতির তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাতজের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে ওলমার্ট বলেন, এটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আমি দুঃখিত। একবার ওই ক্যাম্পে প্রবেশ করলে ফিলিস্তিনিদের বের হতে দেয়া হবে না। শুধু অন্য দেশে যেতে দেয়া হবে। উল্লেখ্য, ইসরাইল কাতজ সামরিক বাহিনীকে ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন দক্ষিণ গাজার ধ্বংসাবশেষের ওপর ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়নে। শুরুতে সেখানে ৬ লাখ মানুষ থাকবেন। পরে ধীরে ধীরে পুরো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে সেখানে ঢোকানো হবে। এরপর সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এ বিষয়ে ওলমার্ট বলেন, যদি ফিলিস্তিনিদেরকে সত্যি এই ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’তে ঢোকানো হয়, তাহলে একে বলা যাবে জাতিগত নিধনের অংশ। যদিও এখনো তা ঘটেনি। তার মতে, লাখ লাখ মানুষের জন্য এমন একটি ক্যাম্প তৈরি করার যে কোনো প্রয়াসকে এভাবেই দেখা হবে।

তিনি বর্তমান ইসরাইলি অভিযানকে জাতিগত নিধন মনে করেন না। কারণ তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যুদ্ধে বাঁচাতে নিরীহদের স্থানান্তর আইনসম্মত এবং ফিলিস্তিনিরা যে সব এলাকায় সামরিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে সেখানেও ফিরেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থন পাওয়া ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’ প্রকল্পের জন্য কাতজ যে এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরাতে চাইছেন, সেটি নিয়েই জোরালো বিরোধ চলছে। যা অস্ত্রবিরতি আলোচনার ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ইসরাইলি মিডিয়া উল্লেখ করেছে।

ওলমার্ট বলেন, কয়েক মাসের আক্রোশপূর্ণ বক্তব্যের পর মন্ত্রীরা গাজা ‘পরিষ্কার’ করার ডাক দিয়েছে। সেখানে ইসরাইলি বসতি নির্মাণের প্রকল্প চালু রেখেছে। এরপর সরকার দাবি করছে এই ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’ ফিলিস্তিনিদের রক্ষার জন্য করা হবে। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বলেন, যখন তারা এমন একটি ক্যাম্প নির্মাণ করে যেখানে গাজার অর্ধেকের বেশি মানুষকে ‘পরিষ্কার’ করার পরিকল্পনা থাকে, তখন এর স্ট্র্যাটেজির স্বাভাবিক ব্যাখ্যা হচ্ছে এটি ফিলিস্তিনিদের বাঁচানোর জন্য নয়। এটি তাদের বিতাড়িত করা, ঠেলে দেয়া এবং ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা। আমার পক্ষে অন্য কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ইসরাইলের মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ও গবেষকরা এই প্রকল্পকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা সতর্ক করেছেন, এটা বাস্তবায়িত হলে ‘কিছু শর্তে এটি গণহত্যার অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে’। অনেকে ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’কে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বলায় নাৎসী জার্মানির সঙ্গে তুলনা করার জন্য সমালোচিত হয়েছেন। ইসরাইলের হলোকাস্ট স্মারক কেন্দ্র ‘ইয়াদ ভাসেম’ এক সাংবাদিককে ‘হলোকাস্টের অর্থের গুরুতর ও অনুচিত বিকৃতি’ করার অভিযোগ করেছে। ওলমার্ট ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ইসরাইল শাসন করেন। তিনি গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলেন যখন দখলকৃত পশ্চিম তীরের দুটি ফিলিস্তিনি পুরুষের দাফন সম্পন্ন হচ্ছিল। এর মধ্যে একজন আমেরিকান নাগরিক। তারা ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন। ওলমার্ট বলেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলি যুদ্ধাপরাধ। (এসব) ক্ষমা করা যায় না। গ্রহণযোগ্য নয়। বড় একটি দল সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অপরাধমূলক পদ্ধতিতে এই কার্যক্রমগুলো সংগঠিত করছে।

যাদের ‘হিলটপ ইউথ’ বলা হয়, তারা ইসরাইলে সামান্য প্রান্তিক চরমপন্থি হিসেবে বিবেচিত। ওলমার্ট বলেন, তিনি তাদের কাজ বর্ণনা করতে ‘হিলটপ নৃশংসতা’ শব্দটিই পছন্দ করেন। এত বড় পরিসরে এত ধারাবাহিকভাবে তারা কাজ করতে পারে না, যদি তাদের জন্য কোনও সহায়তা ও সুরক্ষা না থাকে। যা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ থেকে আসে। যে কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা গাজা ও পশ্চিম তীরে সহিংসতার পক্ষে, যেখানে তারা বসতি সম্প্রসারণ অনুমোদন দিয়ে ও আইন প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য অভ্যন্তরীণ শত্রু বলে উল্লেখ করেছেন, তাদেরকে ‘দেশের ভিতরের শত্রু’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। গাজার ভয়াবহ অবস্থা ও পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের অত্যাচার ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের কারণ। যা সবকিছুই অ্যান্টিসেমিটিজম হিসেবে লেখা যাবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ওলমার্ট বলেন, আমেরিকায় ইসরাইলের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ দিন দিন বেড়েই চলছে। আমরা নিজেদের বলি ‘তারা অ্যান্টিসেমিট’। কিন্তু আমি মনে করি শুধু তাই নয়, অনেকেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে। কারণ তারা টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখছে তার জন্য। এটি যাদের জন্য বেদনাদায়ক, কিন্তু স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া যারা বলছেন,  ‘তোমরা সবরকম সীমা লঙ্ঘন করেছো।’ ইসরাইলের মধ্যে মনোভাব পরিবর্তন শুরু হবে যখন আন্তর্জাতিক চাপের বোঝা তারা অনুভব করবে। তিনি বলছেন, দেশটিতে রাজনৈতিক বিরোধের অভাবে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ জরুরি। এছাড়া তিনি ইসরাইলি মিডিয়াকেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার খবর প্রকাশে ব্যর্থতার জন্য সমালোচনা করেন। তিনি ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর হামাসের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযানকে সমর্থন করেন। কিন্তু এই বসন্তে ইসরাইল সরকার যখন ‘জনসমক্ষে এবং নির্মমভাবে’ যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির আলোচনা ত্যাগ করে, তখন তিনি বুঝতে পেরেছেন দেশটি যুদ্ধাপরাধ করছে। তিনি বলেন, নিজেকে লজ্জিত ও হৃদয়ভাঙা মনে হয় যখন আত্মরক্ষার যুদ্ধ অন্য কিছুতে পরিণত হয়। আমি কী করতে পারি, এই অশুভ বিষয়গুলো স্বীকার করা ও সমালোচনা করা ছাড়া, এবং আন্তর্জাতিক মতামতকে জানানো যে ইসরাইলে অনেক অন্য মতামত ও কণ্ঠস্বর রয়েছে?

তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ ছিল অবহেলা ও অগ্রহণযোগ্য মৃত্যুর মাত্রা সহ্য করার মানসিকতা, নির্মমতার পরিকল্পিত প্রচার নয়। (কমান্ডাররা) আদেশ দিয়েছে? কখনও না। বরং তিনি বিশ্বাস করেন সামরিক বাহিনী দৃষ্টিচ্যুত হয়েছে যখন এমন কাজ সংঘটিত হয়েছিল যা অবশ্যই নিরীহ মানুষকে হত্যা করবে। এই কারণেই আমি এই সরকারকে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী করতে বাধ্য।
গাজার ধ্বংসাবশেষের পরও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা চালানো শেষ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীরূপে, ওলমার্ট এখনও দুই রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা দেখেন। তিনি ফিলিস্তিনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের আল-কিদওয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে এ লক্ষ্যে কাজ করছেন এবং এমনকি বিশ্বাস করেন গাজার যুদ্ধ শেষ ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে ঐতিহাসিক চুক্তি হওয়া সম্ভব, যদি নেতানিয়াহু সক্ষম বা ইচ্ছুক থাকতেন। তা বদলে ওলমার্ট হতবাক যে, নেতানিয়াহু যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের জন্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, তিনিই কিনা ডনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন।

mzamin

হারেৎস পত্রিকার বিশ্লেষণ: গাজা আলোচনা বানচাল করে ট্রাম্প প্রশাসনকে অপমান করলেন নেতানিয়াহু by আমির টিবন

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের আগের সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা হামাসের হাতে বন্দি ইসরাইলি জিম্মিদের পরিবারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। যদিও সেই বৈঠকগুলোর বিস্তারিত তথ্য ফাঁস হয়নি। প্রশাসনের অনুমোদিত সংক্ষিপ্ত বিবৃতিগুলোতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে-গাজায় একটি চুক্তি অর্জন করা, যুদ্ধ শেষ করা এবং জিম্মিদের ঘরে ফিরিয়ে আনা ট্রাম্প ও তার দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিবৃতিগুলো স্পষ্ট বা নির্দিষ্ট না হলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উভয়ের মিডিয়া এটুকু বুঝে নেয় যে- এবার ট্রাম্প সত্যি কিছু করতে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছিল, নেতানিয়াহু যখন ওয়াশিংটনে পৌঁছাবেন, তখন তাকে যুদ্ধ শেষ করতে, জিম্মিদের মুক্ত করতে এবং আমেরিকার আরব মিত্রদের প্রস্তাবিত যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করতে বাস্তব চাপের মুখে পড়তে হবে।

এই বিশ্বাস ছিল যে ট্রাম্প সত্যিই একটি সমঝোতা চাইছেন। সেটাই ছিল নেতানিয়াহুর সফর ঘিরে আশাবাদের প্রধান উৎস। বিশেষ করে, এমন এক সময় যখন ট্রাম্প ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলার নির্দেশ দেয়ার মাত্র এক মাস পরে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তখন নেতানিয়াহু কীভাবে ‘না’ বলতে পারেন? কিন্তু সেই আশাবাদ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে প্রায় এক সপ্তাহ কাটিয়েছেন। এর মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে দু’টি দীর্ঘ বৈঠকও করেছেন। কিন্তু তিনি ওই শহর ছেড়ে আসার সময় যুদ্ধ শেষ করা কিংবা জিম্মিদের মুক্তির আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

নেতানিয়াহু এখনো এমন শর্তে অনড়, যা তিনি জানেন হামাস কখনোই মানবে না। এর ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে। জিম্মিরা আরও ভোগান্তিতে পড়ছেন। আর ট্রাম্প প্রশাসনকে অপমানিত দেখাচ্ছে-যারা যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থ। এই বাস্তবতাগুলো নতুন নয়। সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নেতানিয়াহু তার ডানপন্থি জোট টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনার সুযোগগুলো বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি এমন সব প্রস্তাব উপেক্ষা করেছেন, যেগুলো যুদ্ধের সমাপ্তির বিনিময়ে সকল জিম্মির মুক্তি দিতে পারত। পরিবর্তে তিনি আংশিক চুক্তি ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির পক্ষে থেকেছেন। এর চেয়েও খারাপ হলো তিনি ওই আংশিক চুক্তিগুলোকেও নিজ হাতে ধ্বংস করছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র তার অনুরোধ মেনে তৈরি করেছিল।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন নেতানিয়াহুর শর্ত মেনে আংশিক চুক্তিতে সম্মতি দিল- যেখানে বহু জিম্মি আরও কয়েক মাস হামাসের কাছে থেকে যাবে- ঠিক সেই সময় নেতানিয়াহু ইসরাইলি ও আমেরিকান মিডিয়ায় ব্রিফ করতে শুরু করলেন যে, যুদ্ধবিরতির পর তিনি আবার যুদ্ধ শুরু করবেন। তিনি জানতেন এমন ঘোষণায় হামাসের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে উঠবে এবং চুক্তির পথ আরও দীর্ঘ হবে। কারণ, হামাসের দৃষ্টিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ধাপে ধাপে যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তির দিকে এগোনো।

প্রশ্ন হলো- ট্রাম্প কেন, বাইডেনের মতোই নেতানিয়াহুর এই নাটক চালিয়ে যেতে দিচ্ছেন?
বাইডেনের প্রশাসনও বহু মাস ধরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে অকার্যকর আলোচনা চালিয়েছিল। তাদের দল নেতানিয়াহুর শর্ত মেনে নিতো। পরে অবাক হতো যখন হামাস তা প্রত্যাখ্যান করত। আর সেই ফাঁকে নেতানিয়াহু হামাসকে বোঝাতেন-তাদের চুক্তি করে কোনো লাভ নেই। কারণ সর্বশেষ জিম্মিকে ফেরত পেলেও ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করবে। এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গেও একই খেলা খেলছেন নেতানিয়াহু। তারা তার শর্তে রাজি হয়ে গেছে, অথচ ট্রাম্প নিজেই বারবার বলেছেন- তিনি চান সব জিম্মি ঘরে ফিরুক এবং গাজার ‘নৃশংস যুদ্ধ’ শেষ হোক। এমনকি ‘উইটকফ প্রস্তাব’ নামে যে আংশিক ও সাময়িক সমঝোতা পরিকল্পনা বিশেষভাবে নেতানিয়াহুর জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তাও তিনি সরাসরি বানচাল করছেন।

যতদিন না ট্রাম্প ও তার মধ্যস্থতাকারী দূত উইটকফ সিদ্ধান্ত নেন যে যথেষ্ট হয়েছে এবং এই রাজনৈতিক নাটক ও অপমানের ইতি টানেন-ততদিন জিম্মিরা টানেলের নিচে বন্দি অবস্থায় কষ্ট পাবেন। ইসরাইলি সেনারা এই অর্থহীন চিরস্থায়ী যুদ্ধে প্রাণ হারাবে। গাজা এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে থাকবে, যেখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। (অনলাইন হারেৎস পত্রিকায় প্রকাশিত বিশ্লেষণের অনুবাদ

mzamin

বিমান হামলার মধ্যে ত্রাণবাহী নতুন নৌযান রওনা দিল গাজার উদ্দেশে

ফ্লোটিলা ম্যাডলিনের পর এবার ত্রাণবাহী একটি নৌযান রোববার ইতালির সিসিলি থেকে যাত্রা শুরু করেছে গাজার উদ্দেশে। এতে ফিলিস্তিনপন্থি কর্মী ও মানবিক সহায়তা রয়েছে। এক মাস আগেই ইসরাইল একই রকম একটি নৌযান ম্যাডলিনের আরোহীদের আটক করে দেশে ফেরত পাঠায়। ওদিকে ২৪ ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ১৫০ বার হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর বেশিরভাগই সাধারণ নারী ও শিশু।

অন্যদিকে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন। এতে বলা হয়, নতুন এই নৌযানটির নাম হান্দালা। এটি পরিচালনা করছে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন। রোববার দুপুর ১২টার কিছু পর ইতালির সিরাকিউস বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। নৌযানটিতে রয়েছেন প্রায় ১৫ জন কর্মী। এর যাত্রার সময় ওই বন্দরে শতাধিক মানুষ জড়ো হন। কেউ কেউ ফিলিস্তিনের পতাকা উড়ান। অনেকে ‘কেফিয়া’ স্কার্ফ পরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দিয়ে নৌযানটিকে বিদায় জানান। নরওয়ের পুরনো একটি ট্রলারকে ব্যবহার করা এই নৌযানটিতে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাবার, শিশুদের জিনিসপত্র ও ওষুধ। এটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার (১১২০ মাইল) পথ অতিক্রম করে এক সপ্তাহের মধ্যে গাজার উপকূলে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে। নৌযানটি ইতালির দক্ষিণ-পূর্বের গ্যালিপলি শহরে বিরতি দেবে। সেখানে ফ্রান্সের বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ফ্রান্স আনবোউড’-এর দুই সদস্য যুক্ত হবেন বলে জানা গেছে।

এই উদ্যোগটি আসছে ছয় সপ্তাহ পর, যখন ম্যাডলিন নামের আরেকটি জাহাজ ইতালি থেকে গাজা অভিমুখে রওনা দিয়েছিল এবং তাতে পরিবেশবাদী গ্রেটা থানবার্গসহ কর্মীরা ছিলেন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ গাজার উপকূল থেকে প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার দূরে সেই জাহাজটিকে আটক করে। ফ্রান্স আনবোউডের একজন নেতা গ্যাব্রিয়েল ক্যাথালা বলেন, ‘তাদের নতুন হান্দালা বাহনটি গাজার শিশুদের জন্য মানবিক অবরোধ ভাঙার একটি মিশন। এই গ্রীষ্মে চলমান গণহত্যার নীরবতা ভাঙতেই এই যাত্রা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি গাজায় পৌঁছাতে পারবো। যদি না পারি, তবুও এটি ইসরাইলের আরেকটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দলিল হয়ে থাকবে।’

নারী ও শিশুসহ ৪০ জনের বেশি নিহত গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, ইসরাইলি বিমান হামলায় রোববার কমপক্ষে ৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। হামলাগুলো হয় একটি বাজার ও একটি পানির বিতরণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে। ইসরাইল ও হামাস এক সপ্তাহ ধরে কাতারের রাজধানী দোহায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে গেলেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, গাজা শহরের একটি বাজারে বিমান হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে একটি পানি বিতরণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলায় ৮ শিশু সহ মোট ১০ জন নিহত হন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা খালেদ রাইয়ান সাংবাদিকদের জানান, আমার ঘুম ভেঙে যায় দুটি প্রবল বিস্ফোরণের শব্দে। আমাদের প্রতিবেশী ও তার বাচ্চারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ২৪ ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ১৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। তারা একটি আকাশচিত্র প্রকাশ করেছে যেখানে যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে গাজার উত্তরের বেইত হানুন এলাকায় হামাসের অবস্থানে আঘাত হানার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বড় বড় বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা যায়। গাজার সাংবাদিকদের চলাচলে বাধা এবং কিছু এলাকায় পৌঁছানোর অসুবিধার কারণে বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং ইসরাইলি বন্দিদের মুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাও শনিবার কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। হামাস চায় গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। কিন্তু ইসরাইল গাজার ৪০ শতাংশেরও বেশি এলাকায় সেনা মোতায়েন রাখার পরিকল্পনা করছে। এক ফিলিস্তিনি সূত্র বলেছেন, ইসরাইল কয়েক লাখ ফিলিস্তিনিকে গাজার দক্ষিণে জড়ো করে সেখান থেকে জোরপূর্বক মিশর বা অন্য দেশে পাঠাতে চায়। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৫৭৮৮২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই নারী ও শিশু। জাতিসংঘ এই সংখ্যাগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচনা করে।

mzamin

ট্রাম্পের ফের যুদ্ধ শুরুর হুমকি, সৌদি আরব কী চায়

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ফের শুরু হতে পারে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা পুনরায় শুরুর কোনো উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা জনসমক্ষে বারবার আলোচনা পুনরায় শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছেন। মঙ্গলবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লিখেছেন, ‘পছন্দটা আমেরিকার- তারা কি কূটনীতিকে বেছে নেবে, না কি অন্য কারো যুদ্ধের ফাঁদে আটকে থাকবে?’ তার এ বক্তব্য স্পষ্টভাবে বোঝায় যে, ওয়াশিংটনের ইরান নীতিকে তিনি আমেরিকার নিজের সিদ্ধান্ত না বলে ইসরাইলের প্ররোচনা হিসেবে তুলে ধরছেন। আরাঘচির ভাষ্যমতে, মাত্র নয় সপ্তাহে পাঁচটি বৈঠকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে যতটা অগ্রগতি করেছি, তা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের চার বছরের ব্যর্থ পরমাণু আলোচনার চেয়েও বেশি।

এ বিষয়ে অনলাইন হারেৎজ পত্রিকা বিস্তারিত একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। তাতে আরও বলা হয়, আরাঘচি যখন এই প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, তিনি তখন সৌদি আরব সফরে ছিলেন। সেখানে তিনি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি মিডিয়ায় এই সফর ব্যাপকভাবে কভার করা হয়। সফর শেষে সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আলি রেজা আনাইয়াতি বলেন, সৌদি নেতৃত্ব কূটনৈতিক চ্যানেল চালু রাখায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। এ সব ঘটনা এমন সময় ঘটছে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার আঘাত হানার হুমকি দিচ্ছেন, যদি তারা আবার পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করে। কাতার, ওমান ও সৌদি আরব এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে সক্রিয় হয়েছে। কাতার, যেটি মার্কিন ঘাঁটি আল-উদেইদে ইরানের হামলাকে সমঝোতামূলক প্রতিশোধ হিসেবে মেনে নিয়েছিল, এখন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তত্ত্বাবধান পুনরায় চালু করতে চাইছে।

ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধায়ক এবং ক্যামেরা সরিয়ে নিয়েছে। ফলে বর্তমানে সাইটগুলোতে কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৪০৮ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী অবস্থা তার সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে নেই। আলোচনার যেকোনো পুনরারম্ভের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে তত্ত্বাবধান ফেরানো, পরিদর্শন চালানো, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ইউরেনিয়াম খোঁজা অপরিহার্য। তবে ইরানে একটি নতুন আইন পাস হয়েছে, যাতে  আইএইএর সঙ্গে কোনো সহযোগিতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তত্ত্বাবধানের অনুমতি শুধু ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর অনুমোদনে দেয়া যাবে।
এ মাসের মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ‘স্ন্যাপব্যাক ক্লজ’ চালু হতে পারে, যার ফলে ২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে প্রত্যাহার করা নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার ফিরিয়ে আনা হতে পারে। তবে আলোচনার অগ্রগতি ঘটলে এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে।

একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক হারেৎজকে বলেন, ট্রাম্প ও ইসরাইলের সামরিক হামলা ইরানের সব সমৃদ্ধকরণ সুবিধা ধ্বংস করতে পারেনি। অতএব, এখন খুব কঠোর তত্ত্বাবধান ও কূটনৈতিক চুক্তির বিকল্প নেই।

কাতার যখন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করে, সৌদি আরব তা বাস্তবায়নে কূটনৈতিক কাঠামো ও গ্যারান্টির প্রস্তাব দিতে চায়। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, ইরানের ওপর কোনো সামরিক আক্রমণ বরদাশত করবে না এবং তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতেও দেবে না। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা জোট বা নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়েও এখন আর মুখ খুলছে না। গাজা যুদ্ধের আগে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত হিসেবে সৌদি আরব দুটি শর্ত দিয়েছিল- নিজের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে না দেয়া। এখন তারা বলছে, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনই হবে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের নতুন ভিত্তি।
সৌদি আরব সম্ভবত বুঝতে পারছে, ইরান আক্রমণে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন বিপন্ন হতে পারে, তেমনি নতুন কোনো পরমাণু চুক্তি হলে ইরান তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে।

ওপেক+ দেশগুলো উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি ব্লুমবার্গের অনুমান সঠিক হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৬০-৬৫ ডলার থেকে কমে ৪০ ডলারে নেমে আসতে পারে। এর ফলে সৌদি আরবের ২০৩০ ভিশন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাইডেন প্রশাসনের সময়ে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হওয়ায় তারা প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত তেল বিক্রি করতে পেরেছে। নতুন চুক্তি হলে ইরান আরও তেল বাজারজাত করতে পারবে- যা সৌদি আরবের জন্য স্পষ্ট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

mzamin

ট্রাম্পের ফের যুদ্ধ শুরুর হুমকি, সৌদি আরব কী চায়

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ফের শুরু হতে পারে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা পুনরায় শুরুর কোনো উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা জনসমক্ষে বারবার আলোচনা পুনরায় শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছেন। মঙ্গলবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লিখেছেন, ‘পছন্দটা আমেরিকার- তারা কি কূটনীতিকে বেছে নেবে, না কি অন্য কারো যুদ্ধের ফাঁদে আটকে থাকবে?’ তার এ বক্তব্য স্পষ্টভাবে বোঝায় যে, ওয়াশিংটনের ইরান নীতিকে তিনি আমেরিকার নিজের সিদ্ধান্ত না বলে ইসরাইলের প্ররোচনা হিসেবে তুলে ধরছেন। আরাঘচির ভাষ্যমতে, মাত্র নয় সপ্তাহে পাঁচটি বৈঠকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে যতটা অগ্রগতি করেছি, তা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের চার বছরের ব্যর্থ পরমাণু আলোচনার চেয়েও বেশি।

এ বিষয়ে অনলাইন হারেৎজ পত্রিকা বিস্তারিত একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। তাতে আরও বলা হয়, আরাঘচি যখন এই প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, তিনি তখন সৌদি আরব সফরে ছিলেন। সেখানে তিনি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি মিডিয়ায় এই সফর ব্যাপকভাবে কভার করা হয়। সফর শেষে সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আলি রেজা আনাইয়াতি বলেন, সৌদি নেতৃত্ব কূটনৈতিক চ্যানেল চালু রাখায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। এ সব ঘটনা এমন সময় ঘটছে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার আঘাত হানার হুমকি দিচ্ছেন, যদি তারা আবার পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করে। কাতার, ওমান ও সৌদি আরব এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে সক্রিয় হয়েছে। কাতার, যেটি মার্কিন ঘাঁটি আল-উদেইদে ইরানের হামলাকে সমঝোতামূলক প্রতিশোধ হিসেবে মেনে নিয়েছিল, এখন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তত্ত্বাবধান পুনরায় চালু করতে চাইছে।

ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধায়ক এবং ক্যামেরা সরিয়ে নিয়েছে। ফলে বর্তমানে সাইটগুলোতে কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৪০৮ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী অবস্থা তার সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে নেই। আলোচনার যেকোনো পুনরারম্ভের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে তত্ত্বাবধান ফেরানো, পরিদর্শন চালানো, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ইউরেনিয়াম খোঁজা অপরিহার্য। তবে ইরানে একটি নতুন আইন পাস হয়েছে, যাতে  আইএইএর সঙ্গে কোনো সহযোগিতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তত্ত্বাবধানের অনুমতি শুধু ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর অনুমোদনে দেয়া যাবে।
এ মাসের মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ‘স্ন্যাপব্যাক ক্লজ’ চালু হতে পারে, যার ফলে ২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে প্রত্যাহার করা নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার ফিরিয়ে আনা হতে পারে। তবে আলোচনার অগ্রগতি ঘটলে এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে।

একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক হারেৎজকে বলেন, ট্রাম্প ও ইসরাইলের সামরিক হামলা ইরানের সব সমৃদ্ধকরণ সুবিধা ধ্বংস করতে পারেনি। অতএব, এখন খুব কঠোর তত্ত্বাবধান ও কূটনৈতিক চুক্তির বিকল্প নেই।

কাতার যখন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করে, সৌদি আরব তা বাস্তবায়নে কূটনৈতিক কাঠামো ও গ্যারান্টির প্রস্তাব দিতে চায়। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, ইরানের ওপর কোনো সামরিক আক্রমণ বরদাশত করবে না এবং তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতেও দেবে না। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা জোট বা নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়েও এখন আর মুখ খুলছে না। গাজা যুদ্ধের আগে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত হিসেবে সৌদি আরব দুটি শর্ত দিয়েছিল- নিজের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে না দেয়া। এখন তারা বলছে, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনই হবে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের নতুন ভিত্তি।
সৌদি আরব সম্ভবত বুঝতে পারছে, ইরান আক্রমণে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন বিপন্ন হতে পারে, তেমনি নতুন কোনো পরমাণু চুক্তি হলে ইরান তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে।

ওপেক+ দেশগুলো উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি ব্লুমবার্গের অনুমান সঠিক হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৬০-৬৫ ডলার থেকে কমে ৪০ ডলারে নেমে আসতে পারে। এর ফলে সৌদি আরবের ২০৩০ ভিশন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাইডেন প্রশাসনের সময়ে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হওয়ায় তারা প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত তেল বিক্রি করতে পেরেছে। নতুন চুক্তি হলে ইরান আরও তেল বাজারজাত করতে পারবে- যা সৌদি আরবের জন্য স্পষ্ট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

mzamin

সোহাগ কিলিং মিশন: রজনী বোস লেনে হত্যা, হাসপাতালের সামনে নিয়ে চলে বর্বরতা ভিডিও by শুভ্র দেব ও আফজাল হোসেন

মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ (৩৯)কে হত্যা করা হয়। সোহাগ নিহত হওয়ার পরও মারতে মারতে তাকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের ভেতরে প্রবেশ করে খুনিরা। সেখানে নিহত সোহাগের গায়ে কিল-ঘুষি মারা হয়, কোপানো হয়। পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয় ঘাতকরা। পরে তার মরদেহের উপর লাফিয়ে পা দিয়ে লাথি মেরে অবর্ণীয় নির্মম নৃশংস উল্লাস করা হয়। সোহাগকে বাঁচানোর জন্য তার দু’জন কর্মচারী পা ধরে আকুতি করেও তাকে বাঁচাতে পারেনি। ঘটনার সময় আশপাশে অনেক লোকজন ছিল। কিন্তু ঘাতকরা এমনভাবে আতঙ্ক ছড়ায় যা দেখে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। কিন্তু কেন সোহাগকে তার দোকানের গলিতে মারার পর মৃত জেনেও হাসপাতালের ভেতরে এনে আরও মারা হলো সেটি বলতে পারছি না। এভাবেই ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তব্ধ পুরো দেশ। নিন্দা প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন সর্বত্র। রাজনৈতিক দলও এ নিয়ে সরব হয়েছে। সব দলের তরফে বিবৃতি, মন্তব্য করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে। রজনী বোস লেনে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চিত করেছেন সোহাগকে ‘ধর ধর’ বলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মব সৃষ্টি করে তাকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে কেন নির্মমতা চালানো হয়েছে তার সঠিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভাষ্যমতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে সোহাগকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পরিবার বলছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদা না দিয়ে প্রতিবাদ করায় সোহাগের ওপর এত নৃশংসতা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বলছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যেভাবে তার ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে সেটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে করা হয়েছে। না হলে মরদেহের উপর কেউ এভাবে পাশবিকতা চালাতে পারে না। শুধুমাত্র চাঁদাবাজি, দোকান দখল বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জন্য এভাবে কারও ওপর নৃশংসতা চালানো যায় না। এদিকে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের যে স্থানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তার কয়েকহাত দূরে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ক্যাম্প। ঘটনার সময় অনেক আনসার সদস্য ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পাশাপাশি ওইদিন ঘটনাস্থলের আশেপাশে বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে নির্মমতা দেখেছে। কিন্তু তারাও কেউ আসেনি। এই সুযোগে সোহাগের মৃতদেহের ওপর বিভিন্নভাবে নৃশংসতা করেছে। নৃশংসতার ভিডিও দেখে আঁতকে উঠেছে মানুষ। তবে ঘটনার দুইদিন পর্যন্ত এই নির্মমতা জানতে পারেনি কেউ। দু’দিন পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আসল চিত্র সামনে আসে।

সরজমিন দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের মিটফোর্ড সড়কটি ডান দিকে ইসলামপুর, সদরঘাটের দিকে চলে গেছে। সামনের দিকের সড়কটি আরমানিটোলা ও বামপাশের সড়কটি লালবাগ মিটফোর্ড সড়ক নামে পরিচিত। এদিকেই রজনী বোস লেন। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। চোখের সামনে নির্মমতার পর কেন কোনো আনসার সদস্য এগিয়ে আসেনি এনিয়ে কথা হয় একাধিক আনসার সদস্যদের সঙ্গে। কিন্তু আনসার সদস্যরা জানিয়েছেন, ওই সময় এদিকে কারও ডিউটি ছিল না। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কিছু প্রত্যক্ষদর্শীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যারা সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারা এই এলাকার পরিচিত মুখ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নাই। কারণ ওই সময় কেউ এগিয়ে গিয়ে বাধা দিতে গেলে তার ওপরও নির্যাতন চালাতো খুনিরা।

নিহত সোহাগকে নিয়েও নানা সমালোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন সোহাগ আওয়ামী লীগের আমলে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাবেক এমপি হাজী সেলিমের চাঁদা তুলতেন তিনি। বেশ কিছু ছবিতে হাজী সেলিমের সঙ্গেও তাকে দেখা গেছে। এ ছাড়া মিটফোর্ড এলাকার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বলেছেন, পট পরিবর্তনের পরেও সোহাগ যুবদলের হয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। সোহাগ মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙাড়ি ব্যবসার সঙ্গে পুরনো বৈদ্যুতিক সাদা তার কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। সোহানা মেটাল নামে মিটফোর্ড এলাকার চায়নাপট্টি ও রজনী বোস লেনে তার দুটি দোকান রয়েছে। সোহাগ এবং মহিন পূর্বপরিচিত ছিলেন। ওই এলাকায় বিদ্যুতের তামার তার ও সাদা তারের ব্যবসার একটা সিন্ডিকেট রয়েছে। তামার তার ও সাদা তারের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিল মহিন, অপু, টিটু, যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টুসহ মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি চক্র। তারা অবৈধ বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল। তা না হলে নিয়মিত মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার দাবি জানিয়েছিল তারা। এই দ্বন্দ্বের জেরে সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলিও করে দুর্বৃত্তরা। এরপরে তিনদিন সোহাগ দোকান খুলেনি। পাশাপাশি সোহাগ হত্যায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার নেতৃত্বদানকারী যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা মাহমুদুল হাসান মহিন এবং একই থানা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতা অপু দাসের ছত্রছায়ায় মিটফোর্ড এলাকায় চাঁদাবাজির ভয়ঙ্কর এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী, ফুটপাথ, সব জায়গায় চাঁদাবাজি চলতো। তারা দু’জনের নেতৃত্বে ৫ই আগস্টের পর থেকে মিটফোর্ড ও পাশের এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করতো।

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল আসামিদের অদ্যাবধি গ্রেপ্তার না করা এবং মামলার এজাহার থেকে মূল তিন আসামিকে বাদ দেয়া রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না। বলেছেন, এই ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত যাদের সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে আশ্বর্যজনক তাদের মামলার প্রধান আসামি করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাতগুলো করেছে তারা অদ্যাবধি গ্রেপ্তারও হয়নি। এর কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার এজাহারে খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিন খুনিকে পুলিশ কৌশলে বাদ দিয়ে নিরপরাধ তিনজনকে আসামি করেছে।

নিহত সোহাগের মেয়ে মিম বলেন, এজাহার লেখার সময় পুলিশ তিনজন প্রকৃত আসামির (১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর) নাম বাদ দেয়। মামলার খসড়া দেখার সুযোগ পেলে তিনি ছবিও তুলে রাখেন এবং অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তিনি পুলিশকে প্রশ্ন করেন, সোহাগকে যেহেতু অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটি কেন এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশ তখন তাকে আশ্বস্ত করে, সংশোধন করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বাদীর অজান্তেই পূর্বে ঠিক থাকা খসড়া বাদ দিয়ে একটি নতুন নথিতে স্বাক্ষর নেয়া হয়, যেখানে প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ দেয়া হয়। মিমের দাবি, পরে তার মাকে (মামলার বাদী) একা রেখে ওসি মনিরুজ্জামান মনির ও অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কক্ষে কথা বলেন এবং মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে অন্য একটি নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ভাই মারা যাওয়ার কারণে আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিলাম। আমার মেয়েকে দেখিয়ে কপি চেক করিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যেটায় দেখেছি, সেটাতেই সই করছি। কিন্তু পরে বুঝি, অন্য কাগজে সই করানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এতে রাজনীতি হয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। পুলিশ বলেছে, বিষয়টি তারা ঠিক করে দেবে। আমি ঢাকা গিয়েও সরাসরি কথা বলে এসেছি। স্বজনদের অভিযোগ, মামলাটিকে ‘হালকা’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং শুরুতে পুলিশ মামলাও নিতে চাইছিল না। এজাহারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তন এনে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা ও নির্দোষদের জড়ানো হয়েছে বলে তাদের দাবি। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘এজাহার তো তারা দিয়েছে, এজাহার কি আমরা করছি? এজাহার চেঞ্জ করার কোনো সুযোগই নেই। তারা যেটা এজাহার দিয়েছে, আমরা সেটাই মামলায় রেকর্ড করেছি। তারা কি অশিক্ষিত? তারা কি মুর্খ? কিছুই নয়। আন্দাজে একটা কথা বলে। তারা শিক্ষিত, তারা ১০ জন, ২০ জন আসে একসঙ্গে দেখতে। এখন এটা বললে হবে? এমনতো নয় যে, তারা অশিক্ষিত মানুষ, পড়েনি, দেখেনি। তারা পড়ছে, দেখছে, সব জেনেশুনে তাদের বক্তব্য মতো সেটা এজাহার করছে। এখানে আমাদের কিছু বলার নাই।

এদিকে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কমেনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। সে বীভৎস ঘটনার ট্রমা থেকে তারা এখনো বের হতে পারেনি। হামলার ভয় আতঙ্কে কেউ মুখ খুলছেন না। অনেকে বলতে চাইলেও পরিবারের কথা বিবেচনা করে তথ্য দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। গতকাল পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কথা জানানো হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা মানতে নারাজ। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। তাদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কেউ এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলছেন না। ওইদিন ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতাল ভবন থেকে অনেকে ভিডিও করলেও ভয়ে এ নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন এ ঘটনা ঠিক আনসার ক্যম্পের সঙ্গে হলেও আনসার সদস্যরা এগিয়ে আসেননি।  গতকাল সকাল ১১টার দিকে পুলিশ এসে মিটফোর্ড এলাকায় রাস্তা দখল করে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে দেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনে ভাঙাড়ি ব্যবসার কেন্দ্র। সারা দেশ থেকে প্লাস্টিক, তামা, দস্তার পণ্য আসে এখানে। এ ছাড়া রয়েছে অবৈধ চোরাই তারের ব্যবসা। এ চোরাই তারের ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই সোহাগকে হত্যা করা হয়। একজন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী বলেন, এ হত্যাকাণ্ড সবার সামনেই ঘটেছে। যারা ঘটিয়েছে সবাই সবাইকে চিনে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কেউ মুখ খুলবে না। আমরা ব্যবসা করি, এখানে পুরো ঢাকা শহর থেকে ভাঙাড়ি মাল আসে আবার অন্য জায়গায় আমরা বিক্রি করে দেই। লাশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছি। দেশের পরিস্থিতি এখনো ভালো হয়নি আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। আরেক ব্যবসায়ী জানান, অস্ত্রসহ ২০-২৫ জনের একটি দল তাকে রজনী বোস লেন থেকে মারতে মারতে নিয়ে যায়। এখানে অনেক বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সেগুলোর ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করুন। এখানে যারা জড়িত সবাইকেই এলাকাবাসী চিনে কিন্তু কেউ বলবে না, কারণ সবারই জীবনের মায়া আছে।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বুধবার বিকাল বেলায় চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি সোহাগকে কয়েকজন বেধড়ক মারধর করছে। সবার চোখের সামনেই নৃশংসভাবে তারা নরপিশাচের মতো হত্যা করে। এখন শুনেছি তারা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত এবং সবাই সোহাগের পূর্বপরিচিত। শুনেছি এখানে রাস্তার উপর থাকা প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। প্রশাসন এর সবই জানে এতদিন ধরে এগুলো চলে আসছে তারা চুপ ছিল কেন এতদিন? হঠাৎ আজকে কেন উচ্ছেদ অভিযান চালালো। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কি এসব দোকান বসে? কেউ প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দিবে না কারণ প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সাংবাদিক, প্রশাসনকে দু’দিন পর এ এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না কিন্তু আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন জানান, এরা সবাই প্রভাবশালী তাই কারও সাহস হয়নি এগিয়ে আসার। আমরা এ এলাকার বাসিন্দা আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে। প্রশাসন সবকিছুই জানে কে বা কারা এ সকল ঘটনায় জড়িত। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অবুঝ শিশুও এ কথা বিশ্বাস করবে না। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে যদি এটি হতো তাহলে এত মানুষ কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়।

এদিকে, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বেলা ২টার দিকে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রতিবাদ জানান। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শুরু থেকেই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতো তাহলে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতো না। অপরাধী যেই হোক তার পরিচয় সে অপরাধীই, দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হওয়ার জরুরি। আমরা দেখতে পেয়েছি অপরাধী যদি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধের ব্যবস্থা নিতে চায় না ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তৃণমূল পর্যায়ে যারা রাজনীতি করেন তারা বহিষ্কারকে ভয় পায় না। সাংগঠনিক অ্যাকশন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এ আশায় থাকেন যে যখন তারা ক্ষমতায় আসবেন তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিবে। এ ধরনের মনমানসিকতা ঢালাওভাবে চর্চা হয়েছে বিধায় আজকে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটছে।

mzamin

বিএনপিকে কি কেউ দুর্বল করে দিতে চাইছে by মারুফ মল্লিক

একই দিনে তিনটি ঘটনা সারা দেশকে আলোড়িত করেছে। একটি ঘটনা বুধবারের। ওই দিন ঢাকার মিটফোর্ডে পৈশাচিক উপায়ে একজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শুধু হত্যাই করা হয়নি, হত্যার পর লাশের ওপর উঠে নাচানাচিও করেছে খুনিরা।

ভয়ংকর সব দৃশ্য। এই হত্যার দৃশ্য দেখা যায় না। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত যুবদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজনকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

এ ছাড়া শুক্রবার খুলনায় নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় যুবদলের বহিষ্কৃত এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। বাড়ির সামনে ৯টি গুলির পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে পায়ের রগ কেটে দিয়েছে খুনিরা।

চাঁদপুরে আরেকটি ঘটনায় মসজিদের এক খতিবকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই খতিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করেছেন।

জুমার নামাজে খতিব সাহেব বয়ান দেওয়ার পর চাপাতি নিয়ে হামলা করেন মুসল্লির বেশে আসা হামলাকারীরা। হত্যার উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

তিনটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। মিটফোর্ডের ঘটনার পেছনে রয়েছে এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি। নিহত ব্যক্তি নিজেই ২০০৬ সালে একজনকে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আছে, কিছুদিন হাজি সেলিমের সন্ত্রাসী বাহিনীতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। খুলনার হত্যার কারণ হতে পারে রাজনৈতিক রেষারেষি। কারণ, খুন হওয়া ব্যক্তি কুয়েটে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মারামারিতে রামদা নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন। আর চাঁদপুরের ধর্ম অবমাননার অভিযোগ।

পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন হলেও এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। সারা দেশে প্রতিনিয়তই খুন, জখমের বিবরণ আমরা শুনছি।

সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলাবিহীন এক অন্ধকার সময় অতিক্রম করছি আমরা। সরকার চরমভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরাধীরা মোটেই কাউকে তোয়াক্কা করছে না। সারা দেশে একধরনের অ্যানার্কি বা নৈরাজ্যবাদ চলছে। সবকিছু এখন নৈরাজ্যবাদীদের দখলে চলে গেছে।

আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নৈরাজ্যবাদী অপরাধীদের সরকারের আচরণও উসকে দিচ্ছে। সারা দেশে একধরনের ‘মবতন্ত্র’ কায়েম হয়েছে, এটা এখন আর অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু সরকার ‘মব’ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

সরকার খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণ করছে। মবকে সরকারের দায়িত্বশীলরা ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ কারণে মবতান্ত্রিকেরা আরও শক্তি অর্জন করছে।

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দায়িত্বশীলেরা মব, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রেশার গ্রুপের মধ্যে বিভাজন গুলিয়ে ফেলছেন। বরং দেশের মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, সরকারের একটি অংশ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে আড়াল থেকে মব, নৈরাজ্যবাদকে উসকানি দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে ঘোলাটে অবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে তারা।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানই বিষয়টি প্রমাণ করে। এই পরিসংখ্যান মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়; বরং ভয়ংকর এক হিমশীতল করা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তুলে ধরে।

পুলিশের হিসাব অনুসারে, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ঢাকায় ১৩৬ জন খুন হয়েছেন। এ সময়ে হত্যার শিকার হয়েছেন সারা দেশে ১ হাজার ২৪৪ জন। উল্লিখিত সময়ে ঢাকায় ২০২১ সালে ৫৫ জন, ২০২২ সালে ৫৪, ২০২৩ সালে ৫১ এবং ২০২৪ সালে ৪৭ জন খুন হয়েছিলেন। চলতি বছর সারা দেশে জানুয়ারিতে ২৯৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩০৮, মার্চে ৩১৬ ও এপ্রিলে ৩৩৬ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। কেবল জানুয়ারিতেই গত বছরের তুলনায় তিন গুণ মানুষ খুন হয়েছেন।

পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, হরেদরে মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে দেশে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ, আপনি অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে যে কেউ আপনাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে এবং আপনার পরিবার কোনো প্রতিকার পাবে না।

সরকার কেবল ব্যস্ত সংস্কার নিয়ে। এর সঙ্গে রয়েছে বিদেশিদের বন্দর প্রদান, করিডর দেওয়া, বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চাভিলাষী নীতি প্রণয়ন করা। মনে হচ্ছে, সংস্কার ও এসব ছাড়া সরকারের আর কোনো কাজ নেই। আইনশৃঙ্খলা, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরকার পুরোপুরি উদাসীন।

এই হত্যাযজ্ঞের শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে একজনকে পিটিয়ে মারার মধ্য দিয়ে। এরপর একে একে হত্যার শিকার হয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাম্য।

এখন এই হত্যাযজ্ঞ সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন আগে কুমিল্লায় মাদক ব্যবসায়ী অভিযোগে একই পরিবারের তিনজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

কেরানীগঞ্জে ভোরে নামাজের পর পুকুরপাড়ে হাঁটার সময় এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরও বেশ কয়েক দিন আগে কেরানীগঞ্জে একজনকে হত্যা করা হয়। পরিবারের লোকজন কী কারণে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে, তার হদিস করতে পারছেন না। মামলা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাও কারণ বের করতে হয়রান হচ্ছেন বলে ওই খুন হওয়া ব্যক্তির স্বজনেরা জানিয়েছেন।

থানা, পুলিশ কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। হত্যার ধরন কমবেশি একই। গুলি করার পর কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। রগও কাটা হয়।

ফলে সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। হত্যাকারী বা অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সরকারের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে।

রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় থাকুক। অনেকেই এসব হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে সুবিধা নিতে চাইবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও পাল্টা জবাব দেবে। কিন্তু সরকার কী করছে?

অভিযোগ রয়েছে, অনেক হত্যাকাণ্ড, মারামারির সঙ্গে বিএনপির নেতা–কর্মীরা জড়িত। বিএনপি দলীয়ভাবে এসব নেতা–কর্মীকে বহিষ্কারও করেছে। এ পর্যন্ত বিএনপি প্রায় চার হাজারের মতো নেতা–কর্মীকে শৃঙ্খলাবহির্ভূত কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার করেছে।

কিন্তু তারপরও বিএনপির থেমে থাকার সুযোগ নেই। কেবল বহিষ্কার করেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এতসংখ্যক নেতা–কর্মীকে বহিষ্কার করার পরও কেন তৃণমূলের নেতা–কর্মীরা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছেন, তা অনুসন্ধান করতে হবে দলটিকে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ে এসব উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীর বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার সতর্ক করার পরও কেন নেতা–কর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টি কানে তুলছেন না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

যাঁরা এসব অপরাধী নেতা-কর্মীদের আড়াল থেকে আশকারা দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে দলটির প্রতিপক্ষ ঘায়েল করার অস্ত্র হাতে পেয়ে যাবে।

বিএনপিকে আরও কঠোর হতে হবে। সারা দেশে বিশাল জনসমর্থন আছে। কিন্তু কিছু নেতা-কর্মীর এহেন কর্মকাণ্ড এই বিশাল জনসমর্থনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তাঁরা দলের কোনো উপকারেই আসছেন না, বরং ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। তাঁরা দলের বোঝা। অন্যদের সমালোচনার সুযোগ করে দিচ্ছেন। তাই গুটিকয়েক সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতাদের দল থেকে বের করে দিলে বিএনপির কোনো ক্ষতিই হবে না।

বরং জনসাধারণ আরও আশ্বস্ত হবে যে বিএনপি দুর্জনদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও কোনো দ্বিধা করছে না।

বিএনপির উচিত অতিদ্রুত একটি শক্তিশালী ডিসিপ্লিনারি ও লিগ্যাল টিম গঠন করা। ডিসিপ্লিনারি টিম উচ্ছৃঙ্খল নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর দলের এসব তথাকথিত নেতা–কর্মী দ্বারা কেউ ক্ষতির শিকার হলে লিগ্যাল টিম তাঁদের আইনি সহায়তা প্রদান করবে।

অপরাধের সঙ্গে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে। লিগ্যাল টিম ওই মামলা পরিচালনা করবে দলের পক্ষ থেকে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, তারা জনগণের দল। এই দল নিয়ে অন্যান্য দলের অপপ্রচার ও কুৎসা রটানোর পথ বন্ধ করে দিতে হবে।

আজকে সারা দেশের মানুষ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। বিএনপির সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িয়ে গেছে। বিএনপি যদি শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করতে পারে, তাহলে দেশের লাভ হবে। আর বিএনপি দুর্বল হলে দেশ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কেউ কেউ বিএনপিকে দুর্বল করতে চাইছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে দলের উচ্ছৃঙ্খল নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সরকারের ভেতরের একটি অংশ এটা করতেই পারে। তারা চাইতেই পারে বিএনপি দুর্বল হয়ে যাক।

এ ধরনের পরিকল্পনা রোধ করতে বিএনপির পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে এবং উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে।

পরিশেষে বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি দেশবাসীকে চরমভাবে হতাশ করেছে। শুধু বিএনপি বা অন্যদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না।

অপরাধী যে–ই হোক, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মিটফোর্ডের ঘটনার পর অপরাধীদের নিয়ে শুক্রবার সারা দেশে সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। মাঝের দুই দিন তাহলে পুলিশ কী করল?

বিষয়টি যদি জানাজানি না হতো, তাহলে কি আটক করা হতো না? নাকি ইচ্ছা করেই কালক্ষেপণ করা হয়েছে, যেন বিষয়টি একটি ইস্যু বানানো যায়। তাহলে বিএনপির অভিযোগের সত্যতা মেলে।

অভিযোগ করার পরও সরকার ইচ্ছা করেই ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাই এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। সরকার কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারবে না।

* মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

গত বুধবার সন্ধ্যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে
গত বুধবার সন্ধ্যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

পুরুষ ‘স্যারদের’ কি সব সময় স্যারই ডাকতে হবে by নিশাত সুলতানা

সম্প্রতি উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলার নির্দেশিকা বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনার ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করার জন্য একটি নিয়ম জারি ছিল। এই নির্দেশনা কার্যকর হবে অন্য উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও, যাঁদের সম্বোধনে এই রীতি প্রযোজ্য ছিল।

নারীদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ শব্দটির ব্যবহার বাতিলের নির্দেশনা এলেও পুরুষের সম্পর্কে যেহেতু কোনো নির্দেশনা নেই, তাই ধারণা করা যেতে পারে যে পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ শব্দটির ব্যবহার অপরিবর্তিত থাকবে। এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণটি স্পষ্ট করা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলার কোনো বিধান আছে বলে আমার জানা নেই। যদি এটা একধরনের চর্চা হয়ে থাকে, তাহলে শুধু নারীর ক্ষেত্রেই ‘স্যার’ বলার বিধান বাতিল করা হলো কেন? এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কি নারী কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়েছিল? নাকি স্যারদের সিদ্ধান্তে নারীদের জন্য এই নির্দেশনা এল?

আমি ব্যক্তিগতভাবে নারীদের ক্ষেত্রে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহারের পক্ষপাতী নই। ‘স্যার’ শব্দটিও এর ব্যতিক্রম নয়। আমি নিজে যে সীমিত সময় বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন ক্যাডারে কাজ করেছি, ‘স্যার’ সম্বোধনটি মেনে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছে আমার। মনে পড়ে অনেককেই আমি আমার ক্ষেত্রে ‘স্যার’ ডাকতে নিরুৎসাহিত করেছি। মনে রাখা প্রয়োজন ‘স্যার’ শব্দটি সাধারণ আর দশটি পুরুষবাচক শব্দের মতো নয়। এই শব্দটির সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে আছে ক্ষমতার রাজনীতি। তাই সম্বোধনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এ সম্বোধনটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার পক্ষে আমার অবস্থান।

‘স্যার’ শব্দটি ইংরেজি ভাষা থেকে প্রবেশ করেছে আমাদের শব্দভান্ডারে সেই ব্রিটিশ শাসনামলে। ‘স্যার’ মূলত একটি সম্মানসূচক উপাধি; যার উৎপত্তি ফরাসি শব্দ ‘সিয়ার’ থেকে যা ‘লর্ড’ ‘মাস্টার’ বা ‘প্রভু’কে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ইংরেজি ভাষার ইতিহাসে শব্দটিকে প্রথম খুঁজে পাওয়া যায় ১২৯৭ খ্রিষ্টাব্দে; যা প্রথমত নাইট উপাধি প্রাপ্ত এবং পরে ব্যারোনেটদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।

প্রায় ৭৫ বছর আগে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেলেও প্রভুত্বের গন্ধমাখা এই ‘স্যার’ শব্দটি আমাদের ভাষাচর্চায় প্রবলভাবে রয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার রাজনীতির মারপ্যাঁচ। ‘স্যার’ শব্দটির সঙ্গে যেহেতু ক্ষমতার ভীষণ বড় রকমের একটি সম্পর্ক আছে, তাই ক্ষমতা ধরে রাখাকে কেন্দ্র করে শব্দটি নিয়ে বারবার টানাহেঁচড়া করা হয়েছে।

শব্দটির রাজনীতিকরণ করা হয়েছে বারবার; এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আর ক্ষমতার লড়াইয়ে যেহেতু নারী পিছিয়ে, তাই তার ক্ষেত্রেই শব্দটির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা ঘুরেফিরে এসেছে, সিদ্ধান্তের পরিবর্তনও হয়েছে। ক্ষমতাকে প্রবলভাবে ধারণ করে এ রকম একটি শব্দ পুরুষদের সম্বোধনের ক্ষেত্রেই–বা কেন ব্যবহার করা হবে, সেই আলোচনাটি কখনো সামনে আসে না। প্রশ্ন হলো, নারীদের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ শব্দটি কেবল শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলের সিদ্ধান্ত ছিল বলেই বাতিল করা হলো, নাকি সেখানে কাজ করেছে নারীকে ক্ষমতায়িত দেখার সেই পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক হীনম্মন্যতা আর অস্বস্তি?

ভাষা কিন্তু নিছক শব্দসম্ভার নয়। আমাদের সম্বোধন করার শব্দগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। ভাষা যেমন একদিকে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম, ঠিক একইভাবে তা কিন্তু আবার শোষণ, বৈষম্য আর নির্যাতনেরও মাধ্যম। শব্দ নির্বাচন আর প্রয়োগের রাজনীতি যুগে যুগে নির্ধারণ করেছে মানুষের সামাজিক অবস্থান।

যেহেতু ভাষা সমাজের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়, তাই কোনো সমাজে নারীর অবস্থান কেমন, তা বোঝা যায় সেই সমাজে নারীর প্রতি ব্যবহার হওয়া ভাষার মাধ্যমে। অস্বীকার করার উপায় নেই, কাউকে ওপরে ওঠানোর কিংবা নিচে নামানোর অন্যতম বড় অস্ত্র হলো ভাষা। শুধু তা–ই নয়; পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার একটি বড় হাতিয়ার হলো বৈষম্যমূলক ভাষা আর শব্দের ব্যবহার। ভাষাতে সম্মান, আবার ভাষাতেই অপমান।

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শব্দচক্রে জর্জরিত নারীর জীবন। বাংলা শব্দসম্ভার কখনোই নারীবান্ধব নয়। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক শব্দের ব্যবহার নারীর অগ্রযাত্রাকে অনেকখানি থামিয়ে দেয়। নারীদের পথচলা এমনিতেই খুবই বন্ধুর। আমাদের পথ কখনোই খুব একটা মসৃণ ছিল না। বৈষম্যহীন দেশ গড়ার সংকল্প নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক।

কিন্তু এই শাসনামলেও নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, নির্যাতন, বৈষম্যমূলক নানা সিদ্ধান্ত, বিচারহীনতার ধারাবাহিক দৃষ্টান্ত কিছুতেই স্বস্তি দিচ্ছে না আমাদের। সাম্প্রতিক বৈষম্যমূলক এই নির্দেশনাটি নারীর আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমার মনে হয়।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ‘স্যার’ শব্দটি তাই সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য জোর দাবি জানাই। এ উদ্যোগটি একদিকে যেমন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সরকারি চাকুরেদের প্রভুসুলভ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে কিছুটা হলেও সহায়ক, অন্যদিকে তা আবার নারী-পুরুষের মধ্যে সম্বোধনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে দেবে।

একই বৈঠকে পুরুষকে ‘স্যার’ আর নারীকে ‘আপা’ সম্বোধন ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্ব কেবলই বাড়িয়ে দেবে। আমার প্রশ্ন, নারীদের ‘আপা’ ডাকা হলে পুরুষদের ‘ভাই’ ডাকা যাবে কি? স্যাররা কি দয়া করে এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন?

* নিশাত সুলতানা, লেখক ও উন্নয়নকর্মী
Purba_du@yahoo.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

পুরুষ ‘স্যারদের’ কি সব সময় স্যারই ডাকতে হবে