Tuesday, December 8, 2015

যুদ্ধের ধকল ও উত্তরাধিকারের মনস্তত্ত্ব by আবুল মোমেন

মুক্তিযুদ্ধে জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম। বাঙালির এ অভূতপূর্ব ঐক্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অবিস্মরণীয় কীর্তি। কেবল কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র সংগঠন সেদিন দখলদার এবং হানাদার পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিল। তাদের মধ্যেই অনেকে আবার মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল।
আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, দেশপ্রেমও ছিল গভীর, এসব নিয়ে অঙ্গীকার ছিল দৃঢ়। সেদিন রূপান্তরিত বাঙালি যেমন অকুতোভয় বীরত্বে যুদ্ধ করেছে, তেমনি নিঃস্বার্থভাবে সর্বোচ্চ ত্যাগেও পিছিয়ে থাকেনি। তবু আমরা জানি যুদ্ধে আক্রমণ, হানাহানি, আঘাত, হত্যা, ধ্বংস, রক্তপাতের মতো অস্বাভাবিকতাও স্বাভাবিক। এর উপজাত হয়ে ব্যক্তি ও সমষ্টির মনস্তত্ত্বে ঘৃণা, আক্রোশ, হিংসা, জিঘাংসার মতো তীব্র নেতিবাচক প্রবণতাও প্রবলভাবে সক্রিয় থাকে। এদিকে যুদ্ধের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতাগুলো উভয় বা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ব্যক্তি ও সমষ্টির জন্য তীব্র মানসিক ধকলের (trauma) অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। পেছনে যদি ঘৃণা-আক্রোশ ইত্যাদির মনস্তাত্ত্বিক ইন্ধন কার্যকর থাকে, তাহলে মানসিক ধকল থেকে বেরিয়ে আসা হয়ে পড়ে কঠিন।
স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রত্যাঘাতের শিকার হই আমরা। তারপর টানা ২০ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও লক্ষ্য, আদর্শকে সরিয়ে দেশকে পাকিস্তানি ধারায় চালানো হয়েছিল। সেই ২০ বছরে এ ধারার রাজনীতি এবং ধর্মান্ধ রাজনীতি, সংগঠন, সংস্কৃতি সমাজে শিকড় বিস্তার করেছে। এটি ঘটেছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। বিএনপি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দলের ভূমিকা পালন করতে চাইলেও তার আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনীতি কেবল ধর্মীয় জাতীয়তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে এই রাজনীতি দাঁড় করাতে গিয়ে দলটি ধর্মীয় চরমপন্থী রাজনীতির আশ্রয়দাতা বটবৃক্ষের ভূমিকাও নিয়েছে।
গণতন্ত্রে বহু দল ও বহু মত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক এবং কাম্য। কিন্তু সব দলের জন্য ন্যূনতম আদর্শিক চেতনায় ঐকমত্য থাকা জরুরি। সব উন্নত দেশেই এটি আছে, স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য জাতিকে এটি অর্জন করে নিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের উন্নত দেশগুলো এই জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে দীর্ঘদিন বিস্তর যুদ্ধবিগ্রহ করেছে ও রক্তপাত ঘটিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধকালীন যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তাতেই বুঝি বাংলাদেশের আদর্শিক সহমতের পক্ষে সবার অবস্থানের রায় ঘোষিত হয়ে গেল। আমরা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা, ধর্মীয় গোঁড়ামির চেতনা সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের ঐতিহ্যকে অঙ্গীকার করেছিলাম। কিন্তু মানুষের অন্তরের বহুমুখী পক্ষপাত, আগ্রহ, অঙ্গীকার কি যুদ্ধের দামামার মধ্যে আদৌ বিবেচনায় এসেছিল? আমরা তো সমাজে, যেসব বিষয়ে দ্বন্দ্ব এবং বিভ্রান্ত ও বিতর্ক চলমান ছিল, যেমন ইসলাম ও বাঙালি সংস্কৃতি, ইসলাম ও বিজ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় চেতনা ও যুক্তিবাদ, এসব নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করিনি। এমনকি আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তো এসব নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হয় না। সাধারণত আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সমাজে যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে, তাতে জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ মোটামুটি গণতন্ত্রচর্চার জন্য মৌলিক বিষয়ে মোটা দাগে ঐকমত্যে পৌঁছে যায়। সমাজ স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আমরা সে জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।
আমাদের বিতর্কটি যুগপৎ ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং আদর্শভিত্তিক। যেহেতু আলোচনা ও বিতর্কচর্চার মাধ্যমে যুক্তির পথে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারা তৈরি হয়নি, অন্ধ আবেগই বহুলাংশে ঘটনার নিয়ন্তা, তাই বিতর্ক ও দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তিহীনভাবে চলমান। আর বিতর্ক এভাবে অমীমাংসিত চলতে থাকলে উভয় পক্ষের তৎপরতার ফলে দ্বন্দ্বের আদিম এক আঁচ ও পরিধি বাড়তে থাকে, ক্ষেত্রবিশেষে বিরোধিতা আদিম রূপেই ফিরে যেতে চাইবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, তার কিছু লক্ষণ আমরা সমাজে দেখতে পাচ্ছি।
তথ্যপ্রযুক্তির রথে চেপে যে কালান্তর এসে দুয়ারে কড়া নাড়ছে, তার বারতা যদি আমাদের বুদ্ধিজীবীসমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে না পারেন বা বুঝতে দেরি করেন, তাহলে তাঁরাই তামাদি আর অকেজো হয়ে পড়বেন জাতি যুদ্ধের পরে যুদ্ধসংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের (Legacy) বোঝা নামানোর ফুরসত পায়নি কিংবা এ বিষয়ে নেতৃত্ব তেমন সজাগ ছিল না। বরং দ্রুত প্রত্যাঘাত আমাদের পুনরায় প্রতিরোধ ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ক্রমেই বাস্তবতা এ রকম হয়ে উঠেছিল যে বাংলাদেশ যেন বায়ান্ন থেকে একাত্তরের চেতনাগত সব অর্জনকে অস্বীকার করে পাকিস্তানকেই অনুকরণ করতে চলেছে। যাঁরা এসব অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন, যাঁরা পরবর্তীকালে এই চেতনায় বিশ্বাস করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন এবং যাঁরা রণাঙ্গনের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, তাঁদের জন্য এ ছিল সম্পূর্ণ উল্টোযাত্রা। তদুপরি ২০ বছর ধরে তা চলমান থাকবে তেমন বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছিল কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন তাঁদের জন্য পবিত্র দায়িত্ব হয়ে ওঠে। বিরোধ যখন মৌলিক এবং চরম রূপে দেখা দেয়, তখন উভয় দিকেই সম্ভাব্য শক্ত চরম অবস্থান নেওয়ার ঝোঁক বাড়ে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ যেমন, তেমনি এর মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের বোঝা বহনও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অপর পক্ষে ইসলামের যেসব জঙ্গিরূপ বিশ্বের নানা মুসলিম দেশে তৈরি হচ্ছে, তা আমদানি ও প্রয়োগের ঝোঁকও বেড়েছে। এর অনুকূলে আরও অনেক কার্যকারণ কাজ করেছে। যেমন মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম দেশের প্রতি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের আচরণ ও ভূমিকা।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে এ দেশে কোনো সময়ই, কি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কি বুদ্ধিজীবী সমাজ, কেউই এমন কোনো পথ দেখাতে পারেননি বা এমনভাবে পরিকল্পনা করে কাজ করেননি, যাতে নিরস্ত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিংসা-ঘৃণার বৃত্ত থেকে বাইরে থাকে। বরং বিভক্তি ক্রমেই চরম রূপ নিয়েছে এবং যেন দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতি ক্রমেই ঘৃণা-হিংসার ক্ষুদ্র বৃত্তে আটকে পড়ছে। মনে হয় এখন এ বিষয়ে ভাবা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইতিহাসের দায় পালনের পাশাপাশি আইনের দায় মেটানোও জরুরি। এবং সমান জরুরি হিংসা-ঘৃণা ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের বোঝা থেকে জাতিকে মুক্ত করা। এ তিনটি কাজ কীভাবে একসঙ্গে করা সম্ভব, সে প্রজ্ঞাই আজ পথ দেখাতে পারে আমাদের। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায়ের আগে গণমাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফাঁস লাগানো ছবি প্রকাশ বা রায়ের পর আনন্দ মিছিল বা মিষ্টি খাওয়া নিশ্চয় পরিণত বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ নয়। প্রতিটি প্রাণই প্রাণ, প্রতিটি মৃত্যুই মৃত্যু। তাকে ন্যায়বিচারের অমোঘ বিধান হিসেবেই দেখতে হবে, এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু আক্রোশ ও উল্লাসের মনস্তত্ত্বটা আমি বুঝি। যুদ্ধাপরাধীরা জীবৎকালে কখনো তাঁদের ভুল স্বীকার করেননি, মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নেননি, উল্টো এ মনোভাব নিয়েই ক্ষমতায় বসেছেন, জাতীয় পতাকা উড়িয়ে গাড়িতে চলেছেন এবং সুযোগ পেলে আত্মপক্ষে যে দম্ভোক্তি করেছেন ও অপর পক্ষের প্রতি যেসব বক্রোক্তি করতে ছাড়েননি, তার মধ্যকার প্রতিশোধ চরিতার্থ করার আনন্দ ঢাকা থাকে না। এর মধ্যে অবশ্যই অন্যায় ও উসকানি আছে। এও বুঝি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই ভাবা স্বাভাবিক যে কোনো কারণে ক্ষমতার রদবদল হলে যুদ্ধাপরাধীরা ছাড়া পেয়ে পুনরায় ক্ষমতাবান হয়ে ফিরে আসবেন। তাঁরা বা তাঁদের দলবল হয়তো প্রতিহিংসার পথে চলবে, এমন আশঙ্কাও কাজ করে। কিন্তু আমরা তো মানুষ এবং যাঁরা জানেন যে তাঁরাই মূলধারা, তাঁরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবেন, তাঁদের তো চলমান বর্তমানের পাশাপাশি, বরং তার চেয়েও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের অর্জনই যেন ভবিষ্যতের মূলধারা হিসেবে টিকে থাকে সে জন্য কাজ করতে হবে। তাতে ঘাটতি থেকে গেলে অতীতের মহৎ অর্জনকে ডিঙিয়ে এই এক অনভিপ্রেত বর্তমান আমাদের পিছু ছাড়বে না।
আমরা সবাই লক্ষ করছি একবিংশ শতাব্দীতে একটা কালান্তর চলছে। মানুষের বিকাশ ও উন্নতির নানা নতুন পথ ও বিকল্প তৈরি হয়েছে। দেশের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ মাঠপর্যায় থেকে চমকপ্রদ সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাফল্যের অর্জনে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষার বিষয়ে সরকার ও জনগণ সচেতন হয়েছে, এমনকি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের পথেও সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। মাদকের সর্বনাশা ছোবল বা জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটতে দেখেও বলতে চাই, মানুষের মধ্যে শুভবোধ জাগানোর মতো
আবহ বিরাজ করছে, যা যেকোনো গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী শুভ কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিতে সক্ষম। অর্থাৎ নতুন কিছু কথা বলার, নতুনভাবে ভাবার এটাই বোধ হয় সময়।
আমরা জানি, কালান্তরের হাওয়া বইতে শুরু করলে তাকে ঠেকানো যায় না। ইংরেজের সংস্পর্শে আসার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় যে কালান্তর ঘটেছে বাংলায় ও ভারতে, তাতে মুসলিম ও হিন্দু গোঁড়া সমাজ রক্ষণশীলতার কারণে অংশ নিতে চায়নি, বিলম্বের কারণে তারাও কিন্তু পিছিয়ে পড়েছিল। আমাদের অনেকের অপছন্দ সত্ত্বেও আজকে বিশ্বায়ন ও বাজার অর্থনীতি ব্যাপক পরিবর্তনের চাপ তৈরি করেছে। তার পিছু পিছু তথ্যপ্রযুক্তির রথে চেপে যে কালান্তর এসে দুয়ারে কড়া নাড়ছে, তার বারতা যদি আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে না পারেন বা বুঝতে দেরি করেন, তাহলে তাঁরাই তামাদি আর অকেজো হয়ে পড়বেন। কেননা, সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের সে বারতা পেয়েছে। তারা জেগেও উঠেছে, এগিয়ে চলেছে, নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে এরা দেশকেও এগিয়ে নিচ্ছে, এগিয়ে নেবে। কিন্তু তারপরেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ এগিয়ে না এলে এ অগ্রগতি অসম্পূর্ণ হবে, কাঠামোগতভাবে দুর্বল থাকবে এবং যখন-তখন সমাজ নৈরাজ্যে ডুবে গিয়ে খেটে-খাওয়া মানুষের, যাদের অধিকাংশই তরুণ উদ্যোক্তা-স্বপ্নযাত্রার ভরাডুবি ঘটাবে। এই বিপর্যয়ের জন্য কে হবেন দায়ী?
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

মেঘের ওজন কত?

মেঘ তো রোজ মাথার উপর ভাসে। দিব্যি দেখেন। বৃষ্টির অপেক্ষাও করেন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, মেঘের ওজন কেমন?
মেঘ থাকে তো আপনার মাথার উপরে। কিন্তু সে কি আদৌ হালকা নাকি তারও বেশ ওজন রয়েছে।
আসলে মেঘ দেখতে যতটা ছিপছিপে লাগে, বিষয়টা কিন্তু মোটেই তেমন নয়। বরং, ধোকা।
আবার এটাও তো ঠিক, যে মেঘের মধ্যে আসলে জমে রয়েছে পানি। আর পানির তো ওজন অনেক। তাহলে অত ভারী জিনিসটা আকাশে ভেসে থাকে কীভাবে!
আসলে প্রতি কিউবিক মিটার মেঘে ০.৫ থেকে ১ গ্রাম পানি থাকে। অর্থাৎ যদি কোনো মেঘ লম্বায় ১ কিমি, চওড়ায় ১ কিমি আর পুরু ১ কিমি হয়, তাহলে তাতে পানি থাকবে ৫০০ মিলিয়ন গ্রাম। অর্থাৎ ৫৫১ টন পানি!
বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, ৫৫১ টন পানি মানে ঠিক কতটা ওজন?
তাহলে উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। ৫৫১ টন ওজন মানে প্রায় ১০০টা হাতির সমান ওজন। তার বেশিও হতে পারে, কিন্তু কম হবে না।
এবার আপনার প্রশ্ন হতে পারে, যদি ১০০টা হাতির সমান ওজন হয়, তাহলে সেগুলো মাথার উপর ভাসে কীভাবে?
খুব সহজে। কারণ, মেঘ অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে থাকে।

মুলতানের মাদ্রাসায় পড়তে গিয়েছিলেন তাশফিন মালিক

তাশফিন মালিক
ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান বার্নার্দিনোয় হামলাকারী তাশফিয়া মালিক (২৯) পাকিস্তানের মুলতানের নামী মাদ্রাসা আল হুদা ইনস্টিটিউটে ২০১৩ সালে পড়তে গিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার এ তথ্য দিয়েছে। খবর এএফপির।
তাশফিন ও তাঁর স্বামী সৈয়দ রিজওয়ান ফারুক (২৮) গত বুধবার স্যান বার্নার্দিনোয় হামলা চালান। এতে ১৪ জন নিহত ও ২১ জন আহত হন। আল হুদা ইনস্টিটিউটে মধ্যবিত্ত নারীদের ইসলামি শিক্ষা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির শাখা রয়েছে। জঙ্গিদের সঙ্গে মাদ্রাসাটির কোনো সম্পর্ক আছে বলে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। তবে সেখান থেকে তালেবান মতাদর্শ প্রচার করা হয় বলে কেউ কেউ সমালোচনা করেন।
তাশফিন কীভাবে কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকলেন, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। মুলতানের ওই মাদ্রাসায় তাঁর উপস্থিতির তথ্যটি এ ব্যাপারে নতুন মাত্রা যোগ করল। সৌদি আরবে বড় হয়েছিলেন তিনি। তারপর পাকিস্তানে পড়তে গিয়ে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে। আইএস এক বিবৃতিতে রিজওয়ান-তাশফিন দম্পতিকে তাঁদের অনুসারী বলে দাবি করেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, তাশফিনই তাঁর স্বামীকে কট্টরপন্থার দিকে নিয়ে যান।
আল হুদা ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমরান আমির এএফপিকে বলেন, তাশফিন ২০১৩ সালে ক্লাস শুরু করলেও ওই পাঠ শেষ করেননি। অল্পদিনই সেখানে যাতায়াত করেন তিনি।
দুই বছরের একটি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন তাশফিন। তবে তিনি শেষ করেননি বলে নিশ্চিত করেছেন আল হুদা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মুকাদাস। তিনি বলেন, ‘ভালো মেয়ে ছিল। জানি না, কী কারণে সে পড়া শেষ করল না।’
২০১৪ সালে স্বামীর সঙ্গে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে যান তাশফিন। মুলতানের বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭-২০১২ পর্যন্ত ফার্মাকোলজি পড়েন তিনি। সেখানকার ক্লাস শেষ করেই মাদ্রাসায় যেতেন।
এদিকে, রিজওয়ান ফারুকের বাবা সৈয়দ ফারুক ইতালির লা স্তাম্পা পত্রিকার সঙ্গে আলাপকালে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর ছেলে আইএসের আদর্শ মেনে নিয়েছিলেন এবং তিনি কট্টর ইসরায়েলবিরোধী ছিলেন।

আমার সব সময়ের শিক্ষক by আবুল মাল আবদুল মুহিত

খান সারওয়ার মুরশিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫১ সালে আমি ইংরেজি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) কোর্সে ভর্তি হই। শিক্ষকদের মধ্যে কতিপয় আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অন্তত তিনজনের নাম আমাকে বলতেই হবে। অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী।
খান সারওয়ার মুরশিদ আমাদের ক্লাসে মাত্র বছর দেড়েক পড়িয়েছিলেন। তিনি সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজি সাহিত্য আমাদের পড়াতেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য সম্ভবত ১৯৫২ সালেই বিলেত চলে যান। তাঁর ক্লাস সম্বন্ধে সামান্য কিছুই মনে আছে। আমাদের ধারণা, তাঁর ক্লাসে আমরা বুদ্ধিবৃত্তির একটি উচ্চ মার্গে চলে যেতাম। আমরা আরও ভাবতাম, তিনি বোধ হয় ছাত্রদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে আমরা বুঝতে পারলাম, তিনি অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেলাম প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও সংস্কৃতি সংসদ এবং এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন তিনি।
তারপরে জানলাম এবং দেখলাম, নিউ ভ্যালুজ নামক একটি অত্যন্ত উঁচুমানের ইংরেজি জার্নালের তিনি সম্পাদক। এই ত্রৈমাসিক প্রায় ১৭ বছর টিকে থাকে এবং তা সম্ভব হয় স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং নিবেদনের ফলে। নিউ ভ্যালুজ-এ স্যারের উন্নত চিন্তাভাবনা, প্রগতিশীল সমাজচিন্তা, আধুনিকতা ও সংস্কারমুক্ত অবস্থানের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রায় চার যুগ পরে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ সংকলন কালের কথাতেও সেই চিন্তাশীল ব্যক্তির আরও পরিশীলিত মতামত ও জীবনদর্শনের পরিচয় মেলে।
১৯৫১ সালের শেষ মাসে স্যারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সূচনা হয়। উপলক্ষ ছিল আমাদের বিভাগের বার্ষিক বনভোজন। আমরা মুন্সিগঞ্জ হয়ে ঐতিহাসিক সোনারগাঁ ভ্রমণ করি। মুন্সিগঞ্জ থেকে সোনারগাঁ আমরা রওনা হই তিন দল। এক দলে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক টার্নার, আরেক দলের খান সারওয়ার মুরশিদ এবং অন্য দলে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা।
খান সারওয়ার মুরশিদের স্ত্রী নূরজাহান মুরশিদ রাজনীতি করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন এবং সাহিত্যসেবা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় তিনি প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। স্যার কিন্তু চিরদিনই শিক্ষক ছিলেন। আমার ধারণা, তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, শিক্ষক যদি সার্থকভাবে শিক্ষার্থীর মনে জ্ঞানস্পৃহা সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলেই তাঁর কর্তব্য সম্পাদন হবে। নিজের জীবনে তিনি মনে হয় তা-ই করে গেছেন এবং সে জন্য আমি আজীবন তাঁর একজন ছাত্র।
তাঁর সম্পর্কে অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ খুব চমৎকার একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার কিছুদিনের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ স্থাপন করলেন। সেখানে নামকরা পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতেন, তাঁদের বক্তব্য শুনতেন এবং তাঁদের শিক্ষক ও ছাত্রমহলে পরিচয় করিয়ে দিতেন। এই উদ্যোগ গোলাম মুরশিদকে খুবই অভিভূত ও প্রভাবিত করে। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে স্যার শিক্ষক এবং ছাত্রদের যুগপৎ চিন্তার বাতায়ন উন্মুক্ত করে দিতেন এবং অনেককেই গবেষণার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেন। গোলাম মুরশিদ তাঁর প্রবন্ধে বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের বৃহত্তর পৃথিবীতে সেতুবন্ধে স্যার সফল উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি নিজে তাঁর চিন্তার দিগন্ত বিস্তৃত করেন এবং গবেষণার ক্ষেত্রে আগ্রহ পান।
ষাটের দশকের প্রথমার্ধে স্যার যখন হার্ভার্ডে কিছুদিন গবেষণায় রত ছিলেন, তখন আমিও সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতাম। স্যার সেখানে সপরিবারে অবস্থান নেন এবং আমি ও আমার স্ত্রী তাঁদের সান্নিধ্য ও সখ্য অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করি। তাঁর সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে সত্তরের দশকে বাংলাদেশে। পরবর্তীকালে নব্বইয়ের দশক থেকে স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেক বেশি হয়। তাঁর একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি কঠোর সত্যকথনে কখনো পিছপা হন না। এ জন্য হয়তো অনেক সময় এবং অনেকের কাছে তিনি নির্বিবাদে গ্রহণযোগ্য নন।
রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬১ সালে স্যার একটি সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আমি এই ভূমিকা সম্বন্ধে প্রতিপক্ষ হিসেবে অবহিত ছিলাম এবং গভীরভাবে তাঁকে শ্রদ্ধা করতে শিখি। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের জন্য ঢাকায় ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অনুষ্ঠানটি যাতে না হয়, সে জন্য তদানীন্তন সরকার সচেষ্ট ছিল। আমি সেই সরকারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাপারটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাই। জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠান করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে। তখন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে কোনো অনুষ্ঠান করার জন্য সরকারের সম্মতি লাগত। সেই সম্মতি আমি তাঁদের প্রদান করি। কিন্তু পরবর্তীকালে আমার দেওয়া এই অনুমতিপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়। ২০১১ সালে আমরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রবীন্দ্র সার্ধশতবার্ষিকী উদ্যাপন করেছি। আমি নিশ্চিত জানি, অধ্যাপক মুরশিদ তখন বয়সের ভারে গৃহবন্দী হলেও এতে খুবই আনন্দ উপভোগ করেছেন।
খান সারওয়ার মুরশিদ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন, মাঝখানে ১৯৭২ সালে রাজশাহীতে উপাচার্য হন এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করে আবার শিক্ষকতায় প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৮২ সালে। ১৯৮৪ সালে অবসর নেওয়ার পর ২০০৩ সাল পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষক হিসেবেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। আমরা জানি, খান সারওয়ার মুরশিদ মুক্তিযুদ্ধের সময় মূল্যবান অবদান রাখেন। ১৯৭১-এর উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধু যেসব বুদ্ধিজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। মুক্তিযুদ্ধে মুরশিদ দম্পতি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। স্যার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে যখন একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে, তখন তিনি হন সেই কমিশনের অন্যতম সদস্য।
আইউবের সামরিক শাসন আমল তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন শিক্ষক সমিতির সম্পাদক হিসেবে। এহেন ব্যক্তি যে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখবেন, তা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। ১৯৭১ সালে তিনি সপরিবারে সীমানা অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। অধ্যাপক মুরশিদ চেহারায় যেমন ছিলেন সুশ্রী, তেমনি ব্যবহারে অমায়িক। শিক্ষার প্রতি যেমন নিবেদিত, তেমনি ছিলেন একজন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জীবনের অধিকারী।
তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি রইল একজন বিমোহিত ছাত্রের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী। সংসদ সদস্য।

রামপাল নিয়ে উদ্বেগ কেন? by আসিফ নজরুল

রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। বিশেষত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কিছুদিন আগে বলেছিলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তাঁর মতে, ‘আলট্রাসুপার থারমাল প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হবে বলে এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পর স্বয়ং পরিবেশমন্ত্রীও ১৮ নভেম্বর একটি সেমিনারে দাবি করেছেন যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো ক্ষতিকর প্রভাব মানুষ ও পরিবেশের ওপর পড়বে না। কোনো ক্ষতি হবে না, এই দাবি রামপাল প্রকল্পের ক্ষেত্রে কতটা বস্তুনিষ্ঠ তা নিয়ে অবশ্য অন্য অনেকের প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রকল্পের ক্ষতিকর দিক নিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদেরা বহু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্পর্কে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদনও রয়েছে। রামপাল-বিরোধীদের বক্তব্য যদি বাদও দিই, এই সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়নের পদ্ধতি এবং তার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বহু কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে এই প্রকল্পের বড় অংশীদার ভারতের প্রতিষ্ঠানটির ট্র্যাক রেকর্ড নিয়েও।
রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি। এটি ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনটিপিসি) এবং বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের একটি যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি। এখানে দুই দেশের কোম্পানির মধ্যে যে শর্তাবলির ভিত্তিতে কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা অর্থনৈতিকভাবে কতটা বাংলাদেশের বাস্তবানুগ তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আমি এই নিবন্ধে শুধু প্রকল্পটির মারাত্মক পরিবেশ-ঝুঁকির বিষয়টি আলোচনা করব।
২.
কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র সারা বিশ্বে সবচেয়ে দূষণকারী একটি শিল্প হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ পরিবেশ বিধিমালাতেও এটিকে রেড বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে বর্ণনা করা আছে। সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর বনের কাছে (১৪ কিলোমিটারের মধ্যে) এই ঝুঁকি আরও বেশি।
রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি শুরুই হয় বাংলাদেশের পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে। রামপাল কোল পাওয়ার প্ল্যান্ট–সম্পর্কিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি, অথচ জমি অধিগ্রহণ শুরু হয় ২৩ আগস্ট ২০১১ সাল থেকে। অন্যদিকে এ–সম্পর্কিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষাটি (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট) পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমোদন করে ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট। এই অনুমোদনের আগেই চুক্তিস্বাক্ষর এবং জমি অধিগ্রহণ পরিবেশ আইনের মৌলিক বিধানের লঙ্ঘন।
পরিবেশ সমীক্ষাটি সম্পন্ন হয় প্রশ্নবিদ্ধভাবে। সরকার যেহেতু এই প্রকল্পের অংশীদার, তাই বস্তুনিষ্ঠতার স্বার্থে এটি সম্পন্ন করা উচিত ছিল কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু পরিবেশ সমীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্টটি তৈরি করে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস), যা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, সিইজিআইএস নিজেই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে বিভিন্ন সরকারি অফিস ও সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের ‘ইনস্ট্রাকশন ও গাইডেন্স’ গ্রহণ করে বলে জানায়, যাঁদের কেউ কেউ শুরু থেকেই এ প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
পরিবেশ সমীক্ষাটি পরিচালিত হয় নানা অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে। এই সমীক্ষা নিয়ে সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (সাহার) ২০১৫ সালের একটি মিশন রিপোর্টে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায় যে সমীক্ষায় বায়ু, পানি, মাটি ও প্রািণবৈচিত্র্য-সম্পর্কিত প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য যথাযথ স্থান ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। সমীক্ষাটি আগস্ট ২০১০ থেকে আগস্ট ২০১১ সালে চালানো হলেও এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২০১০ সালের আগের সেকেন্ডারি ডেটা ব্যবহার করে। ফলে এতে হালনাগাদ তথ্য ছিল না। এয়ার স্যাম্পল মাত্র একবার তিনটি লোকেশন থেকে অ্যাসেস (বিশ্লেষণ) করা হয়, প্রজেক্ট সাইট সুন্দরবন বা মংলা সম্পর্কে কোনো তথ্য সেখানে নেই।
পরিবেশ সমীক্ষার প্রতিবেদনে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা হয়। আমি শুধু কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রতিবেদনের ২৭৮ নম্বর পৃষ্ঠা অনুসারে রামপাল প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন এসওটু (সালফার ডাইঅক্সাইড) নামক বায়ুদূষণকারী গ্যাস নির্গত হবে। এর ফলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি কিউবিক মিটার অঞ্চলে এসওটুর পরিমাণ ৮ মাইক্রোগ্রাম থেকে ৫৩ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম বেড়ে যাবে। পরিবেশ বিধিমালা ১৯৯৭ সাল অনুসারে সুন্দরবনের মতো পরিবেশগতভাবে বিপন্ন অঞ্চলে এর পরিমাণ ৩০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া ক্ষতিকর। এই বাস্তবতা এড়াতে প্রতিবেদনে পরিবেশ নীতিমালায় আবাসিক এলাকার জন্য অনুমোদনযোগ্য এসওটুর পরিমাণ ৮০ মাইক্রোগ্রাম এটি উদ্ধৃত করে প্রকল্পটির প্রভাব সুন্দরবনের বাতাসের মানের ওপর খুব অনুল্লেখ্য বলা হয়েছে!
প্রতিবেদনের ২৮৪ পৃষ্ঠায় প্ল্যান্টটিতে সুপারক্রিটিক্যাল বয়লার টেকনোলজি ব্যবহারের কারণে পুরোনো বা প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় এ থেকের প্রায় ১০ শতাংশ কম কার্বন নিসঃরণ (এমিশন) হবে বলে বলা হয়েছে (প্রতিবছর প্রায় ৭৯ লাখ টন)। নির্দিষ্টভাবে সুন্দরবনের ওপর এর মারাত্মক প্রভাবের কথা এড়ানোর জন্য পরিবেশ সমীক্ষায় পুরো দেশের ওপর (ন্যাশনাল পার ক্যাপিটা এমিশন) এই কার্বন নিঃসরণের প্রভাব খুবই কম বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ২৮৫ পৃষ্ঠায় রামপাল প্ল্যান্টের জন্য প্রতি ঘণ্টায় পশুর নদের ৯ হাজার ১৫০ কিউবিক মিটার পানি প্রত্যাহার করা হবে এবং প্ল্যান্টটিতে ব্যবহারের পর ৫ হাজার ১৫০ কিউবিক মিটার পানি নদে ফেরত দেওয়া হবে বলা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় ৪ হাজার কিউবিক মিটার পানি হারানোর কী প্রভাব পশুর নদের প্রতিবেশ এবং এর প্রািণবৈচিত্র্যের ওপর পড়বে, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর প্রতিবেদনে নেই।
সমীক্ষা প্রতিবেদনে বিস্ময়করভাবে আরও কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে সুন্দরবনের ওপর প্রভাবের কথা এড়িয়ে যাওয়া হয়। যেমন এতে বলা হয়েছে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্ল্যান্টের এলাকার জমি ও পানিসম্পদের ওপর ছাই ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু বলা হয়েছে, ঘন জনবসতি দুই কিলোমিটার দূরে বলে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি হবে কম (পৃষ্ঠা ২৭১)। সুন্দরবন এলাকা জনবসতি নয়, বরং বিভিন্ন নদী ও জলপথে সংযুক্ত একটি খুবই স্পর্শকাতর ইকোসিস্টেম হিসেবে পরিচিত। অথচ দুর্ঘটনা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে শিল্পজাত ছাই বা বর্জ্য ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবনের প্রাণী ও বৃক্ষসম্পদের ওপর কতটা প্রভাব পড়তে পারে, সেটি যথাযথ গুরুত্বই পায়নি প্রতিবেদনে।
এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি করা হবে সম্ভবত ভারত বা অন্য কোনো দেশ থেকে। কোন দেশ থেকে কয়লা আমদানি করা হবে, তা এখনো ঠিক করা হয়নি বলে কয়লার মান এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কী হবে তা সমীক্ষা প্রতিবেদনে নিশ্চিতভাবে বলার উপায় নেই। সমীক্ষা প্রতিবেদনে সাধারণভাবে বলা হয়েছে যে রামপাল প্রকল্পটিতে ব্যবহারের জন্য যে কয়লা লাগবে, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত এর পরিবহনের রুটে শব্দ, তেলদূষণ, ব্যালাস্ট ওয়াটার ডিসচার্জ এবং কয়লার পতনজনিত দূষণ হতে পারে। বলা হয়েছে যে এগুলো রোধে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে পরিদর্শন ও তদারকি করতে হবে (পৃষ্ঠা ৪৩৫)। আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশে এসব কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও তদারকির ক্ষমতা ও দক্ষতার ওপর ভরসা করে এত ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রকল্প গ্রহণ করা যায় কি?
প্রতিবেদনের ২৬৮ পৃষ্ঠায় এও বলা হয়েছে যে রামপাল প্ল্যান্টটির নির্মাণসামগ্রী বহনের সময় নৌপরিবহন যানের চলাচল বেড়ে যাওয়ার কারণে যদি নেভিগেশন, স্পিলেজ, নয়েজ, স্পিড, লাইটিং ও ওয়েস্ট ডিসপোজাল আইন ও বিধিগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে এর প্রভাব সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, কুমির, ডলফিন, বনসহ সুন্দরবনের গোটা ইকোসিস্টেমের ওপর পড়তে পারে। প্রশ্ন আসে, ঢাকা শহরের মধ্যে বুড়িগঙ্গা বা গুলশান লেকের মতো এলাকায় যখন আমরা পরিবেশ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হই, তখন সুন্দরবনের মতো একটি দূরবর্তী এলাকায় এসব আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হবে, এটি নিশ্চিত করার সামর্থ্য এবং দক্ষতা আমাদের আদৌ রয়েছে কি?
পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদপ্তর ৫৭টি শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছিল। এগুলো পালন করতে হলে প্ল্যান্টটির সার্বিক নির্মাণ, পরিচালনা ব্যবস্থাপনা খুবই উন্নত ও দক্ষভাবে করতে হবে। সাহােরর মিশনের মতে, এগুলো করা হলে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে আর টেকসই (ভায়াবল) থাকবে না। মিশন এসব শর্তাবলি পালন করা হচ্ছে এ ধরনের কোনো সাক্ষ্য–প্রমাণও লক্ষ করতে পারেনি।
৩.
পরিবেশ সমীক্ষা ও রামপাল প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। নরওয়ের একটি দাতা সংস্থা জিপিএফজির প্রতিবেদনে রামপাল প্রকল্পের পরিবেশ সমীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া ও অস্পষ্ট ব্যাখ্যার অভিযোগ করা হয় এবং প্রকল্পটিতে কনটিনজেন্সি প্ল্যান ও পরিবেশদূষণ রোধ ব্যবস্থার অভাবের কথা বলা হয়।
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের ওপর ২০১৪ সালে পরিচালিত ইউনেসকোর সমীক্ষায় সুন্দরবনের অসাধারণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশদূষণের উচ্চ ঝুঁকির কথা বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রেরণে বাংলাদেশ সরকারের অনীহায় হতাশা প্রকাশ করা হয়। আইইউসিএনের প্রতিবেদনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি আরও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানোর সুপারিশ করা হয়।
রামপাল প্রকল্পটি বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে ভারতের একটি প্রবল সমালোচিত কোম্পানির সঙ্গে। ভারতেরই বিজ্ঞান ও পরিবেশ সেন্টারের ‘হিট অন পাওয়ার’ নামক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক মানদণ্ডে ভারতের কয়লা বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর পরিবেশদূষণ রোধের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমানের। প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আবার নিম্নতর মানের একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এনটিপিসি এবং ভারতেই সবচেয়ে পরিবেশদূষণকারী বদরপুর প্রকল্পটি ছিল এদেরই।
৪.
পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে খুবই দুর্বল একটি দেশের খুবই স্পর্শকাতর একটি জায়গায় চারিত্রিকভাবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রকল্প খুব বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করলে যেকোনো মানুষের উদ্বিগ্নই হওয়া উচিত।
সরকারের উচিত ঢালাওভাবে এসব উদ্বেগকে নাকচ না করে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি অবিলম্বে সুন্দরবন থেকে আরও অনেক দূরে কোথাও সরিয়ে নেওয়া। উচিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সর্বোচ্চ পর্যায়ের হবে এটি নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের মানুষকে এ সম্পর্কে তথ্য–প্রমাণ দিয়ে আশ্বস্ত করা।
মনে রাখতে হবে যে সুন্দরবন সরকারের না, এটি রাষ্ট্রের। সুন্দরবন শুধু এই প্রজন্ম বা এই অঞ্চলের মানুষের না, এটি সবার ও সব সময়ের একটি অমূল্য সম্পদ বা হেরিটেজ।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সিরিয়ার সেনাঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সিরিয়ার একটি সেনাঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিমান হামলায় প্রেসিডেন্ট আসাদ সরকারের অন্তত চার সেনা নিহত হয়েছে। সোমবার দেশটির পূর্বাঞ্চলে দার আয যহর প্রদেশের ওই হামলায় আহত হয়েছে ১০ জনেরও বেশি সৈন্য। সিরিয়ার সরকার এই অভিযানের নিন্দা করে বলেছে, এটা তাদের দেশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আগ্রাসন। খবর এএফপি, আল জাজিরাও বিবিসির। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, চারটি যুদ্ধবিমান থেকে একটি সেনা ক্যাম্পের ওপর রোববার সন্ধ্যায় ৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এই হামলায় তিনটি সামরিক যান, ভারী মেশিনগান এবং বহু গোলাবারুদ ধ্বংস হয়ে গেছে। ব্রিটেনভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে,
দার আয যহর প্রদেশের আয়াশ শহরে অবস্থিত সায়েকা সেনা ক্যাম্পে এ হামলা চালানো হয়। হামলায় আরও ১৩ জন সিরীয় সৈন্য আহত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট বলছে, তাদের কোনো জঙ্গি বিমান কোনো সামরিক ঘাঁটিতেই আক্রমণ করেনি। জোটের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ওই এলাকাতেই তাদের বিমান হামলা করেনি। এই প্রদেশের বড় অংশই তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের দখলে। পশ্চিমা জোট গত বছর থেকে প্রেসিডেন্ট আসাদ সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় ছাড়াই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। গত সপ্তাহে সামরিক অভিযান শুরু করেছে ব্রিটেন। আর সবশেষ জার্মানিও তাদের জঙ্গি বিমান, যুদ্ধ জাহাজ ও বারোশ সৈন্য পাঠাতে যাচ্ছে। বিমান হামলায় সন্ত্রাসীদের মদদ
দিচ্ছে ব্রিটেন : আসাদ আইএস দমনের জন্য সিরিয়ায় ব্রিটেনের বিমান হামলায় নিন্দা প্রকাশ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে সিরিয়ায় বিমান হামলা ‘ইন্ধন’ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া এরই মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে ব্রিটেন। উগ্রপন্থিদের দমনে রাশিয়ার এ হামলায় সন্ত্রাস তো দমন হবেই না, বরং তা সন্ত্রাস বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। রোববার টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বাশার আরও বলেন, এ হামলা অবৈধ এবং এক সময় তা অবশ্যই ব্যর্থ হবে।

পিয়ন থেকে স্বৈরশাসক

কাঁধে ব্যাগ, হাতে চিঠির বান্ডেল, দেশী ধাঁচের এক জোড়া সাধারণ চপ্পল পায়ে বার্মার এক মুল্লুক থেকে আরেক মুল্লুকে ছুটে বেড়িয়েছেন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করে বেড়াতেন মিয়ানমারের এক সময়ের স্বৈরশাসক থান শোয়ে। যার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ‘ডাক পিয়ন’ পেশার মাধ্যমে। ১৯৫৩ সালের কথা। অভাবের তাড়নায় তখনকার আমলের ‘রানার’ পদে পোস্ট অফিসের চাকরিতে যোগ দেন থান শোয়ে। ২০০৬ সালে ‘দেশকাঁপানো’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার এক মেয়ের বিয়ের সময় ‘বর্তমান থান ও পিয়ন জীবন’ নামে ইউটিউবে একটি ভিডিও চিত্র ফাঁস হয়, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। একজন দেশ শাসকের কেতাদুরস্ত জীবন ও পোড় খাওয়া এক সাধারণ ‘ডাক পিয়ন জীবনে’র মধ্যে কতটা তফাত সেটাই তুলে ধরা হয়েছিল ওই ভিডিও চিত্রে। ভিডিওটিতে দেখা গেছে, একটি রাজকীয় প্লেটে কেক খাচ্ছেন সাবেক স্বৈরশাসক থান শোয়ে। তারপরই তুলে ধরা হয়েছে তার ডাকপিয়ন জীবনের প্রামাণ্য চিত্র।
থান শোয়ে ১৯৩৩ সালে বার্মার মিনজু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে ডাক পিয়ন হিসেবে পেশা জীবন শুরু করেন তিনি। মাত্র ২০ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ক্যারিয়ারের ১০ বছর পরেই তাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ ‘শিক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক বিভাগে’ বদলি করা হয়। কায়িন গেরিলা গ্রুপকে হটিয়ে দিতে সমর্থ হলে তাকে ‘ক্যাপটেন’ পদমর্যাদা দেয়া হয়। ১৯৬২ সালে জেনারেল নি উইন ক্ষমতায় এলে শোয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেলের মর্যাদা পান। এরপর তিনি ‘ভাইস কমান্ডার ইন চিফ’ হন। ৪ বছর পরে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শ মং স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলে শোয়ে সিনিয়র জেনারেল এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফের মর্যাদা পান। ২৩ এপ্রিল ১৯৯২ সাল থেকে ৩০ মার্চ ২০১১ পর্যন্ত মিয়ানমারের স্বৈরশাসক ছিলেন থান শোয়ে। খবর মিয়ানমার টাইমস অনলাইন।

ভেনিজুয়েলায় বাম শাসনের অবসান

ভেনিজুয়েলায় ১৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সমাজতন্ত্রীদের প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে হারিয়ে জয়ী হয়েছে দেশটির ডানপন্থী বিরোধী জোট। সোমবার নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে বিরোধী জোট ডেমোক্রেটিক ইউনিটি ৯৯টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশে হুগো শ্যাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতারোহণের মধ্য দিয়ে যে সমাজতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছিল তার অবসান হতে চলেছে। এএফপি ও সিএনএনের। জাতীয় নির্বাচন কাউন্সিলের (সিএনই) প্রধান টিবিসে লুসিনা জানান, নির্বাচনে মধ্য-ডানপন্থী এমইউডি জোট ১৬৭টি আসনের মধ্যে ৯৯টি আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনিজুয়েলা ৪৬টি আসনে জয়ী হয়েছে। এ ঘোষণার পরই বিরোধী প্রধান জেলা কারাকাসে আতশবাজি করে উল্লাস করে নির্বাচনে বিজয়ীরা। এমইউডি’র এক জ্যেষ্ঠ নেতা এক টুইটার বার্তায় বলেন, ‘ভেনিজুয়েলা জয়ী হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময়ই বলেছি, এটাই পথ- নম্রতা, পরিপক্বতা এবং আন্তরিকতা।’ চলতি বছরের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা লিওপোলদো লোপেজকে ১৩ বছরের জেল দেয়া হয়। সহিংসতায় প্ররোচনার অভিযোগে তাকে এ দণ্ড দেয় আদালত। এদিকে, সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এক টেলিভিশন বার্তায় জানান, তিনি এই পরাজয়কে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের নীতি-নৈতিকতা অনুসারেই নির্বাচনের এই ফলকে গ্রহণ করেছি এবং আমরা দেশবাসীকে বলতে চাই, এখানে সংবিধান এবং গণতন্ত্রের জয় হয়েছে।’ বিরোধী পক্ষের সমালোচনায় তিনি বলেন, ‘আজ আমরা এক যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি। কিন্তু এক নতুন সমাজ গড়ার সংগ্রাম তো মাত্র শুরু হলো। এক প্রতিবিপ্লবী শক্তি জয়ী হয়েছে। যা তার পথ এবং তার যুদ্ধকে উন্মোচিত করেছে।’ ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া ‘শ্যাভেজমো’ আন্দোলনের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হিসেবে নির্বাচনে পরাজয়কে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। এ পরাজয়কে তার বিরুদ্ধে দেশে ও দেশের বাইরে অর্থনৈতিক যুদ্ধের ফল হিসেবে দাবি করেন তিনি।

টিআইবির নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ ও বাস্তবতা by আলী ইমাম মজুমদার

জাতীয় সংসদকে ‘পুতুলনাচের নাট্যশালা’ উল্লেখ করে ‘বিরূপ ও অবমাননাকর’ মন্তব্য করার অভিযোগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নামক প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। স্থায়ী কমিটির সভাপতির মতে, এ বক্তব্য অশালীন। তদুপরি তিনি এ–ও বলেছেন, ক্ষমা চাওয়ার জন্য টিআইবিকে তিন দিনের সময় দেওয়া হলেও তারা তা করেনি। তারা সংসদকে জনগণের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
টিআইবি বাংলাদেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর কাছে একটি সুপরিচিত নাম। তারা মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ করে। দুর্নীতির সঙ্গে সুশাসন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম নিয়ে তারা গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রধানত সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম তাদের গবেষণার আওতায় আসে। তবে এর বাইরেও রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ দুটি অঙ্গ বিচার বিভাগ ও সংসদ নিয়েও মাঝেমধ্যে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি মূলত বিদেশি অনুদাননির্ভর এবং বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক স্বীকৃত। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশিত তথ্যমতে, এটি বেসরকারি, নির্দলীয় ও অমুনাফাভিত্তিক একটি সংগঠন। বাংলাদেশের সরকার, রাজনীতি, ব্যবসা, সুশীল সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রচেষ্টা চালানো তাদের রূপকল্প। আর অভিলক্ষ্য হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং আইনকানুন সংস্কার করে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা, রাজনীতি ও ব্যবসাক্ষেত্রকে দুর্নীতিমুক্ত করা। এ রূপকল্প সামনে রেখে অভিলক্ষ্য অর্জনের কিছু প্রচেষ্টাও তারা চালিয়ে যাচ্ছে। টিআইবি এনজিওবিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক নিবন্ধিত। নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষ তাদের বাজেট অনুমোদন করে এবং কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা–ও দেখে থাকে। নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতাও তাদের।
টিআইবির গত কয়েক বছরে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা একইভাবে সমাদৃত হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। তবে এগুলোতে সমাজে চলমান দুর্নীতি, অব্যবস্থা ও সুশাসনের ঘাটতির দিকটি খণ্ডিতভাবে হলেও উঠে আসছে। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্ষেত্রবিশেষে তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। এতে প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্কও হয়। এটাই স্বাভাবিক। তবে এ ধরনের একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠান থাকার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা যায় না। প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে এসেছে পুলিশ, ভূমি, বিচার বিভাগসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে। এটা যাদের বিরুদ্ধে যায়, তারা স্বাভাবিকভাবে খুশি হওয়ার কথা নয়। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ তথ্যের জন্যও টিআইবি সমালোচিত হয়েছে। প্রতিবেদন যেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করে, তেমনি প্রতিবেদন নিয়েও সমালোচনা হয়। এ রকম পাল্টাপাল্টি সমালোচনা এক দিকে সমাজকে সচেতন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উৎকর্ষ লাভে সহায়তা আর টিআইবিকেও সমৃদ্ধ করতে পারে। তা হচ্ছেও। তবে এর নিবন্ধন বাতিলের মতো সুপারিশ কোনো গুরুত্বপূর্ণ মহল থেকে এর আগে আসেনি।
‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ নামক প্রতিবেদনটি তারা প্রায় নিয়মিতই প্রকাশ করছে বেশ কয়েক বছর ধরে। সর্বশেষ প্রতিবেদনটি দশম জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর দ্বিতীয়। প্রকাশিত হয় চলতি ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর। প্রতিবেদনের সূচনায় সংসদীয় গণতন্ত্রে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জাতীয় সংসদকে মৌলিক স্তম্ভের একটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন, সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদের ভূমিকা অতিগুরুত্বপূর্ণ বলেও এতে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে সংসদ অধিবেশনে সদস্যদের উপস্থিতি, কোরাম-সংকট, বিভিন্ন বিষয়ে কতটা সময় ব্যয় হয়, কমিটিগুলোর কার্যক্রম, বিরোধী দলের ভূমিকাসহ অনেক কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্য নেওয়া হয়েছে সংসদের কার্যবিবরণী, সংসদ অধিবেশন পর্যবেক্ষণসহ সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরাদি থেকে।
প্রতিবেদনে ইতিবাচক তথ্যও বেশ কিছু এসেছে। সংসদের অধিবেশনে সদস্যদের গড় উপস্থিতি ৬৮ শতাংশ আর ৪২ শতাংশ সাংসদ ৭৫ শতাংশের অধিক কার্যদিবসে সংসদে উপস্থিত থাকেন। এটা অবশ্যই ইতিবাচক। আর মোট সময়ের ৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয় আইন প্রণয়নে। এটাকে হতাশাজনক বললে অসত্য হবে না। বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা–ও অবাস্তব বলার সুযোগ নেই। সংসদের বিরোধী দলটির তিনজন সদস্য মন্ত্রিসভায় আছেন। দলের সভাপতি মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আর যে কজন আছেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে কিছু সমালোচনা ও বিরোধিতা করেন না, এমন নয়। তবে তা অত্যন্ত ক্ষীণকণ্ঠে। সরকারের সবকিছুতেই বিরোধী দল বিরোধিতা করবে এমনটা নয়। তবে দেশের শাসনব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরতে তারা সচেষ্ট বা সফল হয়েছে এমন মনে হয় না। অবশ্য এর আগে চারটি সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলেও তারা সংসদীয় ভূমিকা পালন করেছে খুব কম। সংসদ বর্জন করেছে দিনের পর দিন। এখন কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে এমনটাই ধরে নেওয়া যায়।
সংসদে অনুষ্ঠিত বিতর্কের দিকে টিআইবিও দৃষ্টি দিতে পারে। আর সংসদের জন্য টিআইবিকে বার্তাবাহক হিসেবে ধরে নেওয়া সংগত। বার্তায় পরিবেশিত ভাষার কিছু অংশ সম্পর্কে আপত্তি থাকলেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত বার্তাগুলোর ওপর একানব্বইয়ে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর কিছুটা সময় সংসদে বিরোধী দল উপস্থিত থাকলেও পরের সংসদগুলোতে তারা অনুপস্থিত থেকেছে যতটা সম্ভব। সদস্য পদ ধরে রাখতে একসময় এসে আবার কোনো অজুহাতে চলে গেছেন। সেই সংসদগুলোর বিরোধী দলের সাংসদেরা সংসদীয় দায়িত্ব তেমন পালন করেছেন এমনটাও নয়। আর এখন বিরোধী দল সংসদে থাকে বটে, কিন্তু তাদের উপস্থিতি অনুভব করার মতো নয়। সংসদীয় কমিটির মাননীয় সভাপতি ১৯৭২-এর গণপরিষদে নগণ্যসংখ্যক সদস্যসংবলিত বিরোধী দলের একজন তরুণ সদস্য ছিলেন। তিনি সেই গণপরিষদে সংবিধান বিলের ওপর কত দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, কত সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন, প্রতিটি প্রস্তাবের সপক্ষে কী ক্ষুরধার যুক্তি দিয়েছেন, তা কিন্তু আমরা ভুলিনি। আর তখন থেকেই তিনি তাঁর অবস্থান জানান দিয়েছেন সংসদীয় গণতন্ত্রে। এটার সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান বিরোধী দল সম্পর্কে মন্তব্যগুলো কি যথার্থ নয়? তবে এ প্রতিবেদনে তাদের ভূমিকা আর সংসদের হাল অবস্থা সম্পর্কে উল্লেখিত কিছু ভাষা যথোচিত হয়নি এমনটি মনে করা অসংগত হবে না। জাতীয় সংসদের মতো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশে এ বিষয়ে যে সতর্কতা নেওয়ার আবশ্যকতা ছিল, প্রতিবেদন প্রণেতারা তা নেননি।
তবে এটা নিয়ে তো সংসদে দুই দিন ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সমালোচিত হয়েছে টিআইবি। তিরস্কারও করা হয়েছে। এভাবে বিষয়টা মিটে যেতে পারত। কিন্তু বলা হচ্ছে, কোনো এনজিও যদি রাষ্ট্র বা সংবিধান সম্পর্কে এমন কিছু বলে, তবে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা যাবে। বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন বিল, ২০১৫–তে এ রকম বিধান সংযোজন করা হয়েছে বা হবে। মনে হয়, সংসদীয় কমিটি কোনো এনজিও কর্তৃক সংসদের কার্যক্রম নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন না বলে বিবেচনা করে। এমনটাও হওয়ার কথা নয়। এ এনজিওটি যাঁরা করেন, তাঁরা এ দেশের নাগরিক। সুশীল সমাজের অংশ। সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। সে ক্ষেত্রে জনগণের কোনো অংশ বা এককভাবে যে কেউ তাঁদের কার্যক্রমের সমালোচনা করার অধিকার রাখেন। এটা তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা। সাংসদেরা রাজনীতি করেন। তাঁরা অন্য পক্ষ কর্তৃক সমালোচিত হন নিত্য। নিজ দলেও একে অপরের সমালোচনা করেন। গণমাধ্যম তো তা করেই থাকে। টিআইবি কিছু তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সংসদকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাওয়ার কথা। ত্রুটি-বিচ্যুতি শোধরানো যায়। আর সেখানে পরিবেশনার ভাষায় অশোভন এমনকি তথ্যের অসংগতি থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া চলে। তবে একেবারেই রেজিস্ট্রেশন বাতিল!
এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নিলে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়বে সরকার। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের একটি সহায়ক শক্তিকে এভাবে কোণঠাসা করার উদ্যোগ কতটা সংগত হবে, তা নতুনভাবে ভাবা দরকার। বিএনপি সরকারের শাসনামলে টিআইবি প্রকাশিত দুর্নীতির তথ্য বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক স্বার্থে। সংসদের কাজের মূল্যায়ন ও সমালোচনা কোনো এনজিও করতে পারবে না—এ ধরনের ধারণা পোষণ করাও তো অসংগত। সমাজে বা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে। এগুলো যাঁরা তুলে ধরেন, তাঁদের শত্রু ভাবা তো ঠিক নয়। সংসদে অনুষ্ঠিত বিতর্কের দিকে টিআইবিও দৃষ্টি দিতে পারে। আর সংসদের জন্য টিআইবিকে বার্তাবাহক হিসেবে ধরে নেওয়া সংগত। বার্তায় পরিবেশিত ভাষার কিছু অংশ সম্পর্কে আপত্তি থাকলেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত বার্তাগুলোর ওপর।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

জঙ্গি নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিপদ by বদিউল আলম মজুমদার

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি হত্যাসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটে গেছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এসব ঘটনার দায় স্বীকার করলেও আমাদের সরকার তা অস্বীকার করছে। বরং সরকারি দলের নেতারা এসব ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করছেন। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও একই বক্তব্য দিচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপি নেতা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের এক সাবেক কমিশনারের ভাইসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘোষণা দিয়েছে যে শিগগিরই এ হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে। দুর্ভাগ্যবশত হত্যার রহস্য এখনো উদ্‌ঘাটিত তো হয়নিই, বরং এসব ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের সময়কাল ও তাঁদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি বিএনপি-জামায়াতের কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে সরকার গ্রেপ্তার করেছে।
এরই মধ্যে ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সে আইএসের সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৩০ জন নিহত ও চার শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। প্রতিবেশী ভারতও সম্প্রতি আইএসের সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে সতর্কবাণী প্রকাশ করেছে। শোনা যায়, বাংলাদেশকেও নাকি আইএস টার্গেট করে ঘোষণা দিয়েছে। তবু আমাদের সরকার অনড়। বরং প্রধানমন্ত্রী আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে পশ্চিমারা অসৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব স্বীকার করার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে।
তবে গত এক বছরে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে, তারা আইএসের সমন্বয়ক বলে নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করেছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যেই অস্ত্রশস্ত্র ও জিহাদি বইসহ কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে মিডিয়ার সামনে হাজির করছে। ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে এবং জঙ্গিদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানান। পরে ফেসবুক, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও মৌখিকভাবে দেশে জঙ্গির অস্তিত্ব অস্বীকার করছে, তবে সরকারের কার্যক্রমে পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতারই ইঙ্গিত বহন করে।
আমাদের দেশে সত্যিকারার্থে জঙ্গি আছে কি না, তা নিয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বস্তুত আমরা বিভ্রান্ত। সরকারের পক্ষ থেকে দেশে জঙ্গি নেই বলে দাবি করা হলেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জঙ্গিরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন (৮ নভেম্বর ২০১৫) অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ৪৯২ জন জঙ্গি—হিযবুত তাহ্‌রীরের ৪২১, জেএমবির ৪২, হুজির ১৫ ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের চারজন জামিনে বেরিয়ে এসে নানা অপরাধ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
আর যদি জঙ্গি থেকেই থাকে, থাকলে তারা কারা, কী তাদের পরিচয়, তারা কী চায়, কী তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, কী কারণে তারা এত নৃশংস—এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। কত তাদের সংখ্যা, কী তাদের শক্তির উৎস, সে সম্পর্কেও আমাদের কোনো ধারণা নেই। সাধারণত কোনো উৎসাহী অনুসন্ধানী সাংবাদিক বা গবেষক এ ধরনের বিদ্রোহী বা জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে তাদের সম্পর্কে বাইরের দুনিয়াকে অবগত করে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে এ কাজটি কেউ করেননি।
এমনি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে জঙ্গিদের অস্তিত্ব ও তাদের শক্তি সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। এমনকি আমরা নিশ্চিত নই আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও জঙ্গিদের সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে কি না। যদি না থাকে, তাহলে তাদের পুরো কার্যক্রমই অনুমানভিত্তিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এমতাবস্থায় আমাদের শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ড ও ‘সাফল্য’ নিয়ে স্বস্তি বোধ করা দুরূহ।
বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় অনেকেই এখন মনে করেন যে আমাদের বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও সহিংসতার পেছনে দুটি কারণ বিরাজমান। এর একটি হলো, একটি ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতা, আরেকটি হলো গুরুতর রাজনৈতিক বিরোধ ও জনগণের বঞ্চনা। তবে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, বঞ্চিত ও রাজনৈতিকভাবে চরম ক্ষুব্ধ এবং চরম উগ্রবাদী শক্তিসমূহ এখনো একাকার হয়ে যায়নি, তারা তাদের স্বতন্ত্র অবস্থান থেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছে ও সহিংসতা চালাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে তাদের একীভূত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা অনেক দেশেই ঘটেছে।
এই প্রসঙ্গে আফগানিস্তানের উদাহরণ টানা যায়। মার্কিন গবেষক সারাহ চেইস তাঁর থিবস অব স্টেট্‌স গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে আফগানিস্তানের জনগণের ক্রমাগত ধর্মাশ্রয়ী হওয়ার এবং তালেবানের ব্যাপক উত্থানের পেছনে রয়েছে কারচুপির নির্বাচন ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, যা আফগানদের ক্রমাগতভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে অন্য অনেক দেশেও ধর্মীয় উগ্রবাদের ক্রমবিস্তারের পেছনে রয়েছে একই ধরনের কারণ এবং মানুষের ব্যাপক বঞ্চনা।
এ ছাড়া অনেক বিশ্লেষকের মতে, আমাদের দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মধ্যেও ব্যাপক বিভাজন বিরাজমান। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সম্পর্ক চরম শত্রুতামূলক। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সহনশীলতা ও সমঝোতার পরিস্থিতি না থাকলে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় দমন–নিপীড়ন চললে, এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা হয়ে যেতে পারে। প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে পৃথিবীর সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে এবং লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করেও ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন করা সম্ভব হয়নি; বরং এর মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদের ভয়াবহ বিস্তারই ঘটেছে। তাই শুধু অন্ধভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদ নির্মূলের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে আমাদের সাবধান হতে হবে।
একইভাবে আমাদের সাবধান হতে হবে চলমান সহিংসতাকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে। যদি সহিংসতার দায় অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়, তাহলে চরম ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে একটি ভয়াবহ সংমিশ্রণ ঘটে যেতে পারে। বস্তুত, ফ্রান্সে দুর্ধর্ষ হামলা চালিয়ে আইএস যেমন চাইছে পশ্চিমা বিশ্ব নাশকতার হোতাদের পরিবর্তে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’-এর সূচনা করুক, তেমনিভাবে আমাদের সন্ত্রাসীরাও চাইছে সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নে লিপ্ত হোক। কারণ, সরকার যদি সত্যিকারের অপরাধীদের খুঁজে বের করার পরিবর্তে অন্যায়ভাবে দমন-পীড়নে লিপ্ত হয়, তাহলে সন্ত্রাসীরাই শক্তিশালী হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, যদি সরকারের চাপের কারণে, বিএনপির মতো বড় দলের একটি বড় অংশ পুরোপুরি ধর্মাশ্রয়ী হয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের দেশে জঙ্গিবাদ ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রসঙ্গত, আইএসের ভয়াবহ উত্থানের পেছনেও রয়েছে চরম নিগ্রহের শিকার কিছু ইরাকি সুন্নি বা বাথ পার্টির অনেক সদস্যের সেই অপশক্তির সঙ্গে হাত মেলানো। অনেকেই মনে করেন, আইএসের ব্যাপক সফলতার পেছনে রয়েছে সাদ্দাম হোসেনের অনেক সাবেক উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা ও সেনা কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক সহযোগীর এতে যোগদান।
তাই অনেকেই আজ মনে করেন জঙ্গিবাদের বিপদ মোকাবিলায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য দরকার। সরকার প্রতিপক্ষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলকে কোণঠাসা করার যে কৌশল নিয়েছে, তা থেকে সরে আসতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় নিয়োজিত এবং সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা উগ্রবাদকে প্রতিহত করতে পারি। কারণ, উগ্রবাদ শুধু ক্ষমতাসীন দলেরই সমস্যা নয়, এটি দলমত-নির্বিশেষে সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জন্যই হুমকিস্বরূপ। আর সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ালেই এ অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা সফল হতে পারব।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

বর্তমান আমলে পৌর নির্বাচন by ডক্টর তুহিন মালিক

ডক্টর তুহিন মালিক
এক. বর্তমান আমলে নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে বিজয়ীর নাম কার্যত ভোটের আগেই জেনে যাওয়া। হোক না সেটা জাতীয় নির্বাচন বা কোনো উপনির্বাচন। সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, এমনকি নিজ দলের কাউন্সিলে পর্যন্ত আগেই বিজয়ীর নাম অনেকেরই জানা হয়ে যায়। শুধু কি নির্বাচনে? দেশের যতসব পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও পরীক্ষার আগের রাতেই জানা হয়ে যায় কিভাবে? এমনকি কোর্ট-কাচারিতে মামলা-মোকদ্দমায় পর্যন্ত মন্ত্রী-নেতারা বলে দিচ্ছেন কে কে জেলে যাচ্ছে, আর কার কার ফাঁসি হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন হওয়ার অনেক আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জন করার মতো, ১৫৩ আসনে ভোট ছাড়াই সরকার গঠিত হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীর ছাড়া বাকি সব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের যত কলাকৌশল আছে, সবই প্রয়োগ করা হয়। ফাঁকফোক দিয়ে কোনোভাবে বিরোধীদলীয় কেউ পাস করে বসলে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় এমনকি নাশকতার মামলাও। মামলার কারণে পদ থেকে বরখাস্ত হতে হলো দুই শতাধিক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে। সেই চেয়ারে বসানো হয় নিজেদের পছন্দমতো লোক। তাই বিরোধী দলের কেউ এখন কোনো নির্র্বাচনে পাস করা মানেই যেন জেলজীবন আর পদ থেকে বরখাস্ত। তা ছাড়া সরকারের সুবিধামতো যখন তখন আইন করে যেভাবে খুশি নির্বাচন দেয়ার সুযোগ তো রয়েছেই। সুবিধামতো না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায় যেকোনো নির্বাচন। তখন আর আইনের সময়সীমার সীমাবদ্ধতার প্রয়োজন পড়ে না। আবার বিরোধী পক্ষ নির্বাচনে আসার ঘোষণা দেয়ামাত্রই দিনক্ষণ নড়চড় করা অসাধ্য হয়ে যায়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে কর্মকর্তারা তখন বীরপুরুষ সেজে বসেন। অথচ এই বীরপুরুষেরা আবার নির্বাচনের দিন মেরুদণ্ডহীন প্রাণী হয়ে যায়। তবে ৫ শতাংশ ভোটকে ৪০ শতাংশ বানিয়ে দেয়ার মতো সক্ষমতা কিন্তু ঠিকই ধরে রাখেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের যত রকম উপাধিতে ভূষিত করুক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। চেয়ার থেকে সোজা দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রমাণ করে বসেন, তাদের মেরুদণ্ড ঠিকই আছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারুন আর না পারুন, তারা তাদের নিয়োগকর্তার প্রতি সবসময়ই চরম অনুগত, বিশ্বস্ত ও চিরকৃতজ্ঞ।
দুই. এবার আমাদের নির্বাচন কমিশন অদ্ভুত এক পদ্ধতিতে সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচন করতে যাচ্ছে। একই নির্বাচনে মেয়ররা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আর কাউন্সিলরেরা করবেন স্বতন্ত্র প্রতীকে। বিশ্বে এটা একটা বিরল ঘটনা বটে। নির্বাচনী সভা সমাবেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা। এমনকি ঘরে বসেও কেউ সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সভা করতে পারবে না। এটা তো দেখছি, মাসাল ল’ আমলকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় দেশে জনসভা, শোভাযাত্রা, পথসভা বা ঘরোয়া মিটিং নিষিদ্ধ থাকে সত্য। কিন্তু দেশে কোনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। তবু এখন কেন এগুলোর ওপর এত নিষেধাজ্ঞা? এ অবস্থায় নির্বাচনে আসা বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবেন কি না, তাও সন্দেহ। ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের ভাগ্যেই বা কী লেখা আছে কে জানে? কারণ গত উপজেলা ও সিটি নির্বাচনে বেশির ভাগ এলাকায় সে এজেন্টদের খুঁজেও পাওয়া যায়নি। আর এখন তো অবস্থা আরো উদ্বেগজনক। দলের প্রার্থী থেকে শুরু করে পোলিং ও নির্বাচনী এজেন্টরা বেশিরভাগই এখন জেলে। নির্বাচনী প্রচারণার কর্মী-সমর্থকেরাও শত শত মামলার আসামি। এলাকাতে ঢুকতেই সাহস করছেন না ‘মামলা খাওয়া’ পলাতক কর্মী-সমর্থকেরা। তা ছাড়া প্রশাসনের পাশাপাশি সরকারদলীয় ক্যাডাররা সার্বক্ষণিক মনিটর করছে বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের। ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত নির্ভয়ে পৌঁছাতে পারাটাই এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাচন কিংবা ঢাকা সিটি নির্বাচনে বর্তমান ইসি তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। তাই আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনেও ইসি তাদের চিরাচরিত চরিত্রেই আবির্ভূত হবে। তার প্রমাণ, পৌর নির্বাচন সামান্য পেছানো থেকে শুরু করে বিএনপির কিছু পর্যবেক্ষণ ও দাবি নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টাও করা হয়নি।
তিন. তা হলে প্রশ্ন জাগতে পারে, এ অবস্থায় বিএনপি পৌর নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো কেন? কারণ স্বাভাবিক রাজনীতি করার সুযোগ থেকে প্রায় বঞ্চিত হয়ে থাকা বিএনপির কাছে এই পৌর নির্বাচন দল গোছানো ও প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তারা নিশ্চিত জানে ছক কাটা এই নির্বাচনের বাস্তবতা। তার পরও যেন নির্ধারিত হার মেনে নিয়েই বিএনপি তৃণমূলের নেতৃত্বকে চাঙ্গা করতে এই নির্বাচনের সুযোগটিকে হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না। এই সুবাদে মাঠপর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসার সাথে সাথে নেতাকর্মীরা দীর্ঘ দিনের অচলায়তন ভেঙে ধানের শীষ নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন। আর নির্বাচনের হারজিত, এ দুটোতেই বিএনপির লাভ। জিতলে প্রমাণিত হবে তাদের প্রবল জনসমর্থন। আর হারলে প্রমাণিত হবে, আওয়ামী আমলে কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। দুই ক্ষেত্রেই আন্দোলন করার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। সে কারণেই হয়তো বিএনপি প্রথমে বিরোধিতা করলেও পরে এ নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সরকার চেয়েছিল, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারো বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসে। কিন্তু রাজনীতির পাশা খেলায় লাভ বিএনপিরই হয়েছে বেশি। খুন-গুম-হামলা-হামলায় বির্পযস্ত নেতাকর্মীরা এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগই পেয়ে গেলো। বিএনপি জানে, তাদের দলীয় প্রার্থীদের প্রার্থিতা গণহারে বাতিল করে দেয়া হতে পারে। এজন্য এবার তারা বিকল্প প্রার্থীও রেখেছেন। ধানের শীষের মনোনয়ন বাতিল হলে বিকল্প প্রার্থীরা তখন স্বতন্ত্র মার্কা নিয়েই লড়াই করবেন। তা ছাড়া জনগণের কাছে তো এটা স্পষ্ট যে, এই নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না। কারণ গত নভেম্বর মাসের ৫ তারিখ থেকে বিএনপি-জামায়াতের ‘ঘাঁটি’ হিসাবে পরিচিত ৩২ জেলায় র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এই দুই দলের হাজারো নেতাকর্মীকে গণগ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ, অভিযানের আগে প্রতিটি জেলার এসপিকে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের লিস্ট হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা সেই তালিকা ধরে বিএনপি-জামায়াত নির্মূল অভিযানে নেমেছে। কোথাও কোথাও ঘরের মা-বোনদের পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক বলে কোমরে দড়ি বেঁধে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছে। আবার জামিনে মুক্তি মিললেও কারাফটক থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকার গণগ্রেফতারের পাশাপাশি গণহারে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও চার্জশিট দিয়ে এলাকাছাড়া করে রেখেছে। কোথাও বা বাড়িতে বাড়িতে চলছে পুলিশি অভিযান। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রেফতার থেকে রক্ষা, তাদের জামিনের সুযোগ থাকা এবং পলাতকদের প্রকাশ্যে এসে ভোট চাওয়ার ব্যবস্থা যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয়, তা যেন ইসির কাছে একটা মামাবাড়ির আবদারের মতো মনে হচ্ছে।
চার. এদিকে বিএনপির পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণে সরকার দেখাতে চাইছে, বিএনপি বর্তমান সরকারকে অবৈধ বললেও তাদের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে;’ কিন্তু বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলেও সবগুলো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেই অংশ নিয়েছে। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ কোনো সরকারের অধীনে হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান চালু থাকা অবস্থাতেও দলীয় সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হতো। বিএনপি এ ক্ষেত্রে তার কৌশল থেকে এবারো সরে আসেনি। তা ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপি হলেও বিএনপি কিন্তু প্রথম দিকে বেশ সফলতাও পেয়েছিল। তাই এবার এই কৌশলের সাথে দলের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনী মাঠে অবাধ বিচরণের ক্ষেত্রটা পেয়ে বিএনপি অখুশি হওয়ার কথা নয়। সাথে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি দল গোছানোর সুযোগও পাওয়া গেল। সরকারের স্বেচ্ছাচারী শাসনে এমনিতেই দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ অবস্থায় যেকোনো নির্বাচনেই জনগণ স্বাধীনভাবে ভোটদানের সুযোগ পেলে সরকারের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেবে। পৌর নির্বাচনের মতো স্থানীয়ভাবে একে অন্যকে চেনাজানার এরকম নির্বাচনে সরকার কারচুপি করলে তৃণমূলের জনমত আরো ব্যাপকভাবে সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাবে। এতে নতুন করে গণআন্দোলনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে বিএনপি এটিকে কাজে লাগাতে পারবে কি না, সেটাও কোটি টাকার প্রশ্ন।
পাঁচ. কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ সরকার আসলেই কি স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে? কারণ কোনো নির্বাচন না দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে জেলা পরিষদগুলো চালানো হচ্ছে। সরকার যাদের এমপি-মন্ত্রী করতে পারেনি, এমন ব্যক্তিদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্যই জেলা পরিষদগুলোতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পত্রিকায় দেখলাম ঢাকার জেলা পরিষদের প্রশাসকের বিরুদ্ধেই ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। অন্য দিকে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারেও সরকার সংবিধানের মূল জায়গায় আঘাত হেনেছে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার সম্পর্কে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার দেয়া হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এতদিন এনিয়ে কিছুই করেনি। তার বদলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের প্রত্যেকটি কাঠামো অকেজো করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জেলে দিয়ে আর গণবরখাস্ত করে নিজেদের লোকজনকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। মন্ত্রীদের ওপরে খবরদারির জন্য অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের দিয়ে কেন মন্ত্রণালয়গুলো চালানো হচ্ছে? স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট জেলার মন্ত্রী-এমপিদের হাতে এতটা অসহায় কেন? নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন কেন হচ্ছে না? আসলে কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে নারাজ। আশঙ্কা হয়, দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের মুঠোয় পুরোপুরি নিয়ে নেয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হলো।
ছয়. এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় নেতাদের স্ত্রী-শ্যালকদের দেখে বেজায় ক্ষুব্ধ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কোটি টাকার বিনিময়ে মাদারিপুরের কালকিনি পৌরসভায় মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী। তারপরও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছড়াছড়ি, কোন্দল, হানাহানিতে শাসক দল চরম বিশৃঙ্খলা। দীর্ঘ দিন ক্ষমতার স্বাদ নেয়া আওয়ামী লীগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ পৌর নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়া। সারা দেশে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠ দখল করে রেখেছেন। দলের পক্ষ থেকে যতই বলা হচ্ছে, তৃণমূলের নেতারাই মনোনয়ন পাবেন; কিন্তু প্রকৃত অবস্থাটা উল্টো। স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিদের গুণগ্রাহীদের বাদ দিয়ে তৃণমূলের সুপারিশ কতটা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে, বলা মুশকিল। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, পৌরসভা নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ নির্বাচন করলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু আইন সংশোধন করে দলীয় মনোনয়ন আর প্রতীক দিলেই কি এসব হানাহানি আর দলীয় কোন্দল বন্ধ হবে? দল থেকে বহিষ্কার করেও কি বিদ্রোহীদের ঠেকানো সম্ভব? এতে দল আরো বিভক্ত ও দুর্বলই হবে। নির্বাচনী মনোনয়নের দৌড়ে হেরে যাওয়া নেতাকর্মীরা গ্রুপ ও পাল্টা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অসংখ্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্ম দেবেন। তখন দলের ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে বিভিন্ন জনের মাঝে। দলের প্রার্থীর জন্য তখন পাস করা দূরের কথা, সম্মানজনক ভোট পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়েই বরাবরের মতো কারচুপির আশ্রয় নিয়ে দলীয় প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়বে। আর সহিংসতার সাথে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বেড়ে যাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক মামলার সংখ্যাও। যে এলাকায় আওয়ামী লীগের যে গ্র“প বেশি শক্তিশালী, সেখানকার ব্যালট তার হাতে থাকবে। তাদের সামাল দিতে প্রশাসন পড়বে তখন মহাবিপদে। দলের চেইন অব কমান্ডের সাথে সাথে প্রশাসনের কমান্ডও ভেঙে যেতে পারে।র হানাহানিতে পটু আওয়ামী লীগের দলীয় সহিংসতার দায় হয়তো বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। নতুন করে আবারো হবে শত শত মামলা আর চার্জশিট। কেউ জেলে, কেউ পলাতক, কেউবা নির্বাচনের তাণ্ডবের শিকার হতে পারে।
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

পুতুলনাচের রঙ্গশালার ভাবসম্প্রসারণ! by গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি
সম্প্রতি কে বা কারা যেন হঠাৎ করেই পুতুলনাচের রঙ্গশালা বা নাট্যশালা-জাতীয় একটি শব্দমালা জাতির সামনে উপস্থাপন করলেন। তেমনি শুরু হয়ে গেল মহা তর্ক-বিতর্ক, হুমকি-ধমকি এবং সমযোগ নাচন-কুর্দন। যাদেরকে বলা হলো তারা সরাসরি বললেন না যে, আমরা পুতুল নই এবং আমরা পুতুলের মতো নাচি না। অথবা আমাদের স্থানটি রঙ্গশালা বা নাট্যশালা নয়। আমরা মানুষ এবং এখানে বসে মানুষের মতো মানবিক কর্ম করি। এসব না বলে তারা ভীষণ অভিমানী হয়ে পড়লেন- অনেকে ভীষণ ক্ষুব্ধ এবং উত্তেজিত হয়ে নানা রকম হুমকি-ধমকি দেয়া শুরু করলেন। কেউ কেউ মারাত্মক চরমপন্থা অবলম্বনের জন্য সুপারিশ পর্যন্ত করলেন। হতাশা ও নিরাশার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া লোকজন অল্প সময়ের জন্য হলেও উদ্ভূত তর্ক-বিতর্কের কারণে মজা পেলেন। তারা বাংলা অভিধান বের করে পুতুলনাচ, রঙ্গশালা, নাট্যশালা ইত্যাদি শব্দের অর্থ খুঁজতে আরম্ভ করলেন এবং মাধ্যমিক স্তরের স্কুলবালকের মতো শব্দমালার ভাবসম্প্রসারণ করে শব্দসমষ্টির অন্তর্নিহিত আদিরসের সম্মান করতে আরম্ভ করলেন।
আজকের নিবন্ধের শুরুতে আমরা প্রথমে শব্দগুলোর অর্থ, বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোকপাত করব। এরপর শব্দগুলো দিয়ে যে বাক্য রচিত হয়েছে, সেই বাক্যের ভাবসম্প্রসারণ করে বুঝতে চেষ্টা করব, কেন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অন্য একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এমনতরো বাক্যের বাণ মারল! তারপর দৃশ্যায়ন করা বাক্যবাণের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কিছু ঘটনাবলি। প্রথমে পুতুল সম্পর্কে কিছু বলে নেই। অভিধানে পুতুল সম্পর্কে বলা হয়েছে- প্রাণহীন বস্তু, যা কিনা নির্মিত হয় অদ্ভুত অদ্ভুত আকৃতি, রঙ ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে। সাধারণত ক্রীড়নকরূপে অর্থাৎ খেলাধুলার সামগ্রী হিসেবে পুতুল ব্যবহৃত হয়। প্রধানত শিশুতোষ ক্রীড়া কৌতুক এবং যুদ্ধবিগ্রহ, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত, খেলাধুলা ইত্যাদির ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের নিশানা হিসেবে পুতুলগুলোকে কাজে লাগানো হয়। তীর-ধনুক, তলোয়ার চালানো; মুষ্টিযুদ্ধ; বন্দুকের গুলিবর্ষণের নিশানা নিখুঁত করার ক্ষেত্রে পুতুলের ব্যবহার সেই অনাদিকাল থেকেই হয়ে আসছে।
বাংলা অভিধানে পুতুল-পুতুলি এবং প্রতিমা শব্দেরও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ, পুতুল বলতে সাধারণত জীবজন্তু, জানোয়ার, রাক্ষস, খোক্ষস, পাখি, মাছ, সাপ, ব্যাঙ প্রভৃতির মূর্তিকে বুঝায়। অন্য দিকে সাধারণ মানুষ আকৃতির প্রতিমূর্তিকে বলে পুত্তলি। প্রতিমা বলতে সাধারণত সেই সব নারীমূর্তিকে বুঝায়, যাকে কেউ গভীরভাবে ভালোবাসত, শ্রদ্ধা করত এবং স্মরণ করত। আদিকালে মাটি, পাথর, চুন, কাঠ, বাঁশ, গোবর-কুড়া-কুটা প্রভৃতির মিশ্রণ দিয়ে পুতুল বানানো হতো এবং এখনো হচ্ছে। তবে ইদানীং প্লাস্টিকের পুতুলের যন্ত্রণাই বেশি। তিন ধরনের প্লাস্টিকের পুতুল আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে ম্যানুয়াল, ব্যাটারিচালিত আধা যান্ত্রিক এবং বিদ্যুৎ চালিত সর্বাংশ যান্ত্রিক। আধা যান্ত্রিক কিংবা সর্বাংশ যান্ত্রিক পুতুলেরা মানুষের সেখানো বুলি আওড়ায়, টুকটাক লাফালাফি করে এবং বাচ্চাকাচ্চা, বুড়োবুড়ি ও পাগলা রোগে আক্রান্ত লোকদের ব্যাপক আনন্দ দেয়।
উপরোল্লিখিত শ্রেণীর পুতুল ছাড়াও আরো দুই শ্রেণীর পুতুল রয়েছে। একটিকে বলা হয় ভার্চুয়াল বা অ্যানিমেটেড পুতুল। সোজা বাংলায় এগুলোকে বলে কার্টুন। কার্টুন নিয়ে নাটক, সিনেমা, গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি রচিত হচ্ছে। কার্টুন অভিনীত নাটক-সিনেমার খরচ যেমন বেশি, তেমনি এগুলোর দর্শক-স্রোতার সংখ্যা দিনকে দিন মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কার্টুনের ব্যবসায়ীরা রাতারাতি আঙুল ফুলে তালগাছ বনে যাচ্ছেন। কার্টুন ছাড়া আরেক শ্রেণীর পুতুল ইদানীং মহামারী আকারে মানুষ্যসমাজকে আক্রান্ত করছে। এগুলোকে বলা হয় সেক্সডল। বিভিন্ন পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, বাংলাদেশের বাজারগুলোতে অত্যাধুনিক সেক্সডলের রমরমা ব্যবসা চলছে এবং একশ্রেণীর বিকৃত রুচির নারী-পুরুষ সেসব পুতুল কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন পতিতালয় এবং ভ্রাম্যমাণ পতিতারা খদ্দের সঙ্কটে পড়েছে। পতিতা ও পতিতালয় থেকে সমাজের প্রভাবশালী যে চক্রটি নিয়মিত চাঁদা আদায় করে, সাম্প্রতিক সময়ে সেই চাঁদার পরিমাণ কমে যাওয়ায় চক্রটি কারণ খুঁজতে গিয়ে সেক্সডল নামক পুতুলের কাহিনী বের করে ফেলে।
এবার আমরা নাচ সম্পর্কে দু-একটি কথা বলার চেষ্টা করব। প্রমিত বাংলায় নাচের অপর নাম নৃত্য। শব্দ, ছন্দ, সুর, তাল ও লয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অঙ্গভঙ্গি করার নাম নৃত্য। শুধু মানুষই নৃত্য করে না- প্রকৃতির সব প্রাণী, বৃক্ষলতা, মেঘমালা, সমুদ্র, নদনদী ও আলোকবর্তিকাগুলো মনের আনন্দে কিংবা বিষাদে নৃত্য করে। নাচের অন্য অর্থও রয়েছে। হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি, লাফালাফি, অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত, যুদ্ধ ইত্যাদিকেও নাচ বলা হয়। নাচের ধরন দুই প্রকার। যথা- নিজের ইচ্ছায় নাচ এবং অন্যের ইচ্ছায় নাচ। নাচের ধরন দুই প্রকার- হর্ষনৃত্য ও বিষাদনৃত্য। নাচের উদ্দেশ্য কয়েক ধরনের। যথা- নিজেকে আনন্দ দেয়া, অপরকে তুষ্ট করা, পয়সা উপার্জন, লোকজনকে বিরক্ত করা, ক্ষেপিয়ে দেয়া, দর্শকদের প্রলুব্ধ করা ইত্যাদি। মানুষ এবং অন্যান্য ইতর প্রাণী নিজের ইচ্ছা কিংবা অন্যের হুকুমে নাচানাচি করে। প্রকৃতির অন্য সব উপাদান নাচে প্রকৃতির ইচ্ছা ও চিরায়ত নিয়মে।
নাচের উল্লিখিত প্রকারভেদের মধ্যে পুতুলনাচ পড়ে না। আধুনিক কালের কার্টুন কিংবা রোবটের নৃত্য সম্পর্কে লিখতে গেলে নিবন্ধের পরিধি ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হয়ে যাবে। তাই ওই দিকে না গিয়ে আমরা কেবল আবহমান বাংলার পুতুলনাচ নিয়ে আলোচনা করব। যেসব পুতুল দিয়ে নাচ দেখানো হয়, সেগুলো সাধারণত বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। সবার আগে তৈরি করা হয় একটি গল্প বা কাহিনী। তারপর স্থিরনাট্যের জন্য তৈরি হয় সংলাপ। চিত্রনাট্যের বিভিন্ন চরিত্রের আদলে পুতুলগুলো বানানো হয়। সেই সব পুতুলের হাত, পা, মাথা, কোমর, বুক, গলা, চোখ প্রভৃতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চিকন সুতায় বাঁধা হয়। তারপর সুতাগুলোর মাথা বা অপর প্রান্ত থাকে একজন নিয়ন্ত্রকের হাতে। পর্দার অন্তরাল থেকে একজন মানুষ বা মানুষের রেকর্ডকৃত কণ্ঠে বাজানো হয় চিত্রনাট্যের সংলাপ। অন্য দিকে পুতুলের হাত-পা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুতার বন্ধন দিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি পুতুলগুলোর সংলাপের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নাচাতে থাকেন।
পুতুলনাচ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা রীতিমতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বাংলার পথেঘাটে, প্রান্তরে যেসব পুতুলনাচ প্রদর্শিত হয় সেগুলোর আকার-আকৃতি, পোশাক এবং নাচের ধরন ও সংলাপ দর্শকদের খুবই আনন্দ দেয় বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের। যিনি বা যারা পুতুলগুলোকে নাচান, তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা উল্লেখ করার মতো। তারা একটি পুতুলের শরীরের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দোলাতে পারেন। অন্য দিকে, পুতুলনাচের মাধ্যমে পুতুলের মুখ দিয়ে এমন সব সংলাপ বের করে আনা হয়, যা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই আমাদের সমাজের ব্যক্তিত্বহীন, রুচিহীন, মেরুদণ্ডহীন দাসদাসীরা যখন তাদের নিয়োগকর্তার কথামতো অন্ধের মতো বিবেকহীন কর্মকাণ্ড করে এবং নিয়োগকর্তার শিখিয়ে দেয়া বুলি আওড়াতে থাকে, তখন লোকজন তাদের পুতুল এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে পুতুলনাচ বলে আখ্যা দেয়।
রঙ্গশালা বলতে এমন একটি ঘর বা স্থানকে বোঝায়, যেখানে বসে মানুষ রঙ-তামাশা করে। রঙ্গশালায় নাটক হয়, বাঈজীরা নাচে এবং কেউ বা গান করে। অনেকে তাস-পাশা খেলে। কেউ কেউ মদ-গাঁজা ইত্যাদি সেবন করে। তিন ধরনের রঙ্গশালায় রঙ্গিলা নাগরদের বাহারি কর্মকাণ্ড নিয়ে কত যে রঙ-তামাশার গল্প প্রচলিত রয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। এমনটিকে বলা হয় গণরঙ্গশালা। গণরঙ্গশালা আবার তিন ধরনের, যথা- নিষিদ্ধ, অসিদ্ধ ও সাধারণ। নিষিদ্ধ রঙ্গশালাগুলো সাধারণত নিষিদ্ধ পল্লীতে হয়ে থাকে। সমাজের নীচু জাতের বিকৃত মানসিকতার রঙ্গপ্রিয় দুরাচাররা এসব রঙ্গশালার খদ্দের। এখানে হয় না এমন কুকর্ম নেই। অন্য দিকে, অসিদ্ধ রঙ্গশালাগুলো বিভিন্ন নামধাম ধারণ করে লোকালয়ে অবস্থান করে অতি গোপনে। এসব করে খদ্দের ও রঙ্গ-তামাশার উপকরণ বিশেষায়িত হওয়ার কারণে এগুলো নিষিদ্ধ পল্লীর রঙ্গশালা থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন। সাধারণ রঙ্গশালায় যৌনাচার ছাড়া সব কিছুই প্রকাশ্যে হয়ে থাকে। এগুলো আইনত সিদ্ধ। আধুনিক কালের ক্লাব সংস্কৃতি, ডিসকো, ক্যাবারে, হাউজি, বার, ক্লাব ইত্যাদিকে সাধারণ রঙ্গশালা বলা যেতে পারে।
গণরঙ্গশালার বাইরে আরেক ধরনের ব্যক্তিগত রঙ্গশালার গল্প কম-বেশি সবাই জানেন। আগেকার দিনের রাজা-বাদশাদের বাঈজী মহল, জমিদারদের বাগানবাড়ি এবং হাল আমলের ধনীদের মিসট্রেস হাউজকে ব্যক্তিগত রঙ্গশালা বলা হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত রঙ্গশালা একজন ব্যক্তি কিংবা তার পরিবার-পরিজনের জন্য পতন, অসম্মান ও সীমাহীন দুর্ভোগ-রোগ-জরা-দারিদ্র্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্য দিকে গণরঙ্গশালার আধিক্যের কারণে সমাজ সংসার ও রাষ্ট্রে পচন ধরে। এগুলোর দুর্গন্ধ পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে। কত বড় বড় রাজবংশ, জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি এবং ক্ষমতাধররা রঙ্গশালার কবলে পড়ে কিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছেন- তা আমরা কম-বেশি সবাই জানি।
এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে আসা যাক। পুতুলনাচের রঙ্গশালা বলতে এমন একটি স্থানকে বুঝায়, যেখানে পুতুলেরা রঙ-তামাশা করে। এটি পুতুলনাচের চিরায়ত মঞ্চ নয়। এটি পুতুলনাচের রঙ্গমঞ্চ। এখানকার নির্জীব পুতুলেরা শুধু রঙ-তামাশা করার জন্য জীবনীশক্তিপ্রাপ্ত হয়। রঙ্গমঞ্চের পুতুলেরা যাত্রামঞ্চের পুতুলের মতো দর্শক-শ্রোতাকে বিনোদন দেয় না, বরং নিজেরা বিনোদিত হয়। পুতুলের আকার-আয়তন, গঠনপ্রণালী ইত্যাদির সাথে তার মালিকের ইচ্ছাশক্তির ওপর রঙ-তামাশার ধরন ও প্রকৃতি নির্ভর করে। পুতুলনাচের রঙ্গশালা আধুনিক চিন্তা-চেতনার নতুন এক ফিউশন। কারণ, ইতঃপূর্বে পুতুলেরা কেবল অন্যকে বিনোদন জোগাত। নিজেরা বিনোদন করার, নির্জীব থেকে জীব, নিষ্প্রণ থেকে প্রাণ লাভ এবং বাহারি রঙ-তামাশার মাধ্যমে আনন্দফুর্তি করার চিন্তা-চেতনা তাদের ডিকশনারিতে ছিল না। নতুন যুগে এসে এসব খেলনা পুতুলের যুগান্তকারী সফলতায় হয়তো তাদের মালিক যারপরনাই খুশি। তারা ঘাটে-মাঠে-বাটে নেচেগেয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে শুধু বিনোদিত করেনি- তামাম বিশ্বের পুতুলনাচের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে। ফলে তাদের মালিক তাদের একটি রঙ্গশালায় ঢুকিয়ে এজাজত দিয়েছেন- নাও বাপু! রঙ্গ করো- যা ইচ্ছে বলো- যা মনে চায় করো এবং যা ইচ্ছে খাও।
আমরা আজকের নিবন্ধের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। শিরোনামের শব্দমালার অর্থ এবং বাক্যটির সংক্ষিপ্ত ভাবসম্প্রসারণ করার পর সম্মানিত পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, পুতুলনাচের রঙ্গশালার তাৎপর্য কত বিস্তৃত ও গভীর। আপনারা এ কথাও বুঝতে পেরেছেন যে, কাদেরকে ওই নামে সম্বোধন করা হয়েছে এবং সেই সম্বোধনের মাধ্যমে উপাধিধারীদের কতটা বিশেষায়িত করা হয়েছে। অন্য দিকে, বিশেষায়িত পুতুল সম্প্রদায় বলে অভিযুক্ত লোকেরা কেন যে অস্থির প্রতিক্রিয়ায় নৃত্য করছে, তাও সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন। আজকের এই নিবন্ধে আমি নিজের থেকে কাউকে কিছু বলিনি- কোনো মন্তব্য করিনি বা মতামত প্রদান করিনি। আমি শুধু বাংলা অভিধান মতে, একটি বাক্যের ভাবসম্প্রসারণ করেছি মাত্র।

ফেসবুক বন্ধের উপকারিতা by আনিসুল হক

সরকার দেশে ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছে। দেশে নাকি ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেড় কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ একদিন হঠাৎ করে দেখল, তাদের হাতে অঢেল সময়। দিন আগে ছিল ২৪ ঘণ্টার, সেই ২৪ ঘণ্টায় ২৪০ বার চেক ইন দিতে হতো, নোটিফিকেশন চেক করতে হতো, স্ট্যাটাস হালনাগাদ করতে হতো, লাইক দিতে হতো, সেলফি তুলতে হতো আর সেটা প্রকাশ করতে হতো,
ইনবক্স চেক করতে হতো, বার্তা আদান-প্রদান করতে হতো—লিখে, বলে, ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে। আর এখন? কোনো কাজ নেই। নদী যদি হয় রে ভরাট, কানায় কানায়, হয়ে গেলে শূন্য হঠাৎ তাকে কি মানায়? সব শূন্য, সব ফাঁকা। এখন দিন যেন আর কাটতেই চায় না। দিন যেন হয়ে পড়েছে ৪৮ ঘণ্টার।
ফেসবুক বন্ধ থাকার ফলে কী কী উপকার পাওয়া যাচ্ছে:
১. ঘাড়ে ব্যথার রোগী কমে গেছে। মাথা গুঁজে স্মার্টফোন কিংবা ল্যাপটপে ঝুঁকে থাকতে হয় না বলে স্পাইনাল কর্ডে ব্যথা নিয়ে আর আগের মতো রোগী আসছে না!
২. কলেজে-ইউনিভার্সিটিতে সকালবেলার ক্লাসগুলোতে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার উপস্থিতি বেড়ে গেছে। আর আগের মতো তাদের চোখ লাল, চুল উষ্কখুষ্ক নয়।
৩. বিবাহবিচ্ছেদের মামলা কমে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের কাছেও বিবদমান দম্পতিদের আগমনের হার আগের চেয়ে কম।
৪. হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের রোগীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। কারণ, সম্ভাব্য রোগীরা আর স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে উবু হয়ে নেই, তাঁদের হাতে এখন অগাধ সময়, ফলে তাঁরা হাঁটছেন, দৌড়াচ্ছেন, খেলাধুলা করছেন, বাগান করছেন, ঘর মুছছেন, টেবিল গোছাচ্ছেন। তাঁদের শরীর ও স্বাস্থ্য তাই আগের চেয়ে ঢের ভালো।
৫. পরিবারে পরিবারে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য দেখা যাচ্ছে। ছেলে মায়ের কপালে হাত দিয়ে বলছে, মা, তোমার গা তো বেশ গরম, কাজ করতে হবে না, বিশ্রাম নাও। মা ছেলের হাত ধরে কেঁদে ফেলছেন। তুই কত মাস পরে আমার মুখের দিকে তাকালি, বলতে পারিস?
৬. পাড়ার মাঠে আবার ছেলেপুলেদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠছে।
৭. বইয়ের দোকানে, পাঠাগারে আবার লোকজন আসতে শুরু করেছে। বিক্রি বেড়েছে পত্রিকার হার্ড কপির।
৮. ফটো স্টুডিওতে ফটোর প্রিন্ট নেওয়ার লোক আস্তে আস্তে আসতে শুরু করেছে।
৯. টেবিলের খাবারদাবারের আয়োজন দেখে লোকে আর বলছে না, ভাবি, খুব সুন্দর রান্না হয়েছে, ছবি তুলি; বরং বলছে, বাহ্, দারুণ টেস্টি হয়েছে তো! আরেকটু নিই!
ফেসবুক বন্ধ থাকার ফলে কী কী অসুবিধা হচ্ছে?
১. যাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে ব্যবসা করতেন, তাঁদের ব্যবসা মাঠে মারা যাচ্ছে। অনেকেই অনলাইন শপ চালান, চুড়ি, ফিতা, গয়নাগাটি, শাড়ি থেকে শুরু করে প্লট, গাড়ি, বাড়ি বিক্রি করার জন্য ফেসবুকে প্রচারের সুবিধা গ্রহণ করেন, তাঁদের ব্যবসা কার্যত বন্ধের উপক্রম।
২. কেউ কেউ আছেন, আউটসোর্সিং করতেন ফেসবুকে, লাইক কেনাবেচাও করতেন, তাঁদেরও ব্যবসা বন্ধ।
৩. কেউ কেউ আছেন ফেসবুকজীবী, ফেসবুক আছে তো তিনি আছেন, ফেসবুক নাই তো, তিনিও নাই, তাঁদের অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখীন।
৪. স্মার্টফোনের বিক্রি কমে গেছে।
সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, ফেসবুক বন্ধের উপকারিতাই বেশি।
তবে আসল কথা হলো নিরাপত্তা। বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য আমরা যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত আছি। সরকার যদি নাগরিকদের বোঝাতে পারে, ফেসবুক বন্ধের ফলে তারা কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে, তাহলে সবাই সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে। অন্যদিকে, যারা রাষ্ট্রের ও নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য আসলে হুমকি, তারা সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের চেয়ে দক্ষ। বিকল্প পদ্ধতিতে বাংলাদেশে বন্ধ সাইটগুলো যদি সাধারণ নাগরিকেরাই ব্যবহার করতে পারে, এসব দক্ষ ব্যক্তি পারবে না, তা হওয়ার কারণ নেই।
সে ক্ষেত্রে আমাদের স্মরণ করতে হবে দুটো গল্প।
১. রোমের জ্ঞানী ব্যক্তিরা একবার ঠিক করলেন পাখি পুষবেন। তাঁরা বাগানের চারদিকে উঁচু দেয়াল তুলে ভেতরে পাখি রাখলেন। সব পাখি উড়ে চলে গেল। জ্ঞানী ব্যক্তিরা আবার সেমিনার করে পাখির উড়াল দেওয়ার কারণ আবিষ্কার করলেন, আমরা আমাদের দেয়াল যথেষ্ট উঁচু করিনি।
২. রবীন্দ্রনাথের জুতা আবিষ্কারের গল্প। ধুলা দূর করতে ঝাড়ু দেওয়া হলো জগৎজুড়ে। রাজা বললেন, জগৎ হতে করিতে ধুলা দূর, জগৎ হলো ধুলায় ভরপুর। তখন আবার পানি সেচা হলো। রাজা বললেন, এমনি সব গাধা, ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা। তারপর ঠিক হলো, পুরো পৃথিবী চামড়া দিয়ে মোড়া হবে। এক বৃদ্ধ মুচি এসে বলল, নিজের দুটি চরণ ঢাকো তবে, ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।
দুষ্কৃতকারীদের চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি স্মার্ট হতে হবে। আমাদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের বুদ্ধিমান, দক্ষ, সুসজ্জিত ও সুপ্রশিক্ষিত হতে হবে। তাঁদের লোকবল দরকার হবে, যন্ত্রবল দরকার হবে, দরকার হবে প্রযুক্তিবল।
আর নাগরিকদেরও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন মূল্যবান, নিরাপত্তা হলো প্রথম অগ্রাধিকার।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

জামায়াত ঘিরে নতুন তৎপরতা

বিপর্যয় কাটছে না জামায়াতের। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলটির শীর্ষ পর্যায়ের তিন নেতার মৃত্যুদণ্ড এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। বাকিদের বিচারও শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না। তবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে কিনা কোনো সূত্রই তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা কোথায় ভিড়বেন তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নন জামায়াতের এমন নেতারা দলটিকে সংগঠিত করেন কিনা অথবা নতুন কোন দল গড়ে তোলেন কিনা সে ব্যাপারে এখন নজর দেয়া হয়েছে। দলটির তরুণ প্রজন্মের নেতাদের একটি বড় অংশ এখনও কারাগারে রয়েছেন। একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে তাদের মুক্তি মিলছে না। তবে বাইরে থেকে যারা দলকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা করছেন তাদের বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। জামায়াতের কোন কোন নেতা মনে করেন, একটি মহল দলটিতে ভাঙন সৃষ্টির তৎপরতা চালাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের এক নেতা বলেন, ওই মহলটি জানে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে বিভক্তি সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাই তারা এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে দলে কট্টরপন্থি এবং সংস্কারপন্থি এমন দুটি ভাগ দেখানোর চেষ্টা চলছে। যেন দলটির নেতাকর্মীদের ভেতরে এক ধরনের সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি করা যায়। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কিছু তৎপরতা দৃশ্যমান বলে তিনি জানান।
এদিকে, আগামী বছর শুরুর দিকে জামায়াতের বিচার সংক্রান্ত আইনের সংশোধনী মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে। তবে এ নিয়ে সরকারি দলে নানা মত রয়েছে। কোন কোন পর্যবেক্ষক মনে করেন, জামায়াত নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে তা বিএনপিকে শক্তিশালী করতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে জামায়াতকে জোটে রাখা নিয়ে যে সমালোচনা সে সমালোচনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জামায়াতের ভোটব্যাংক বিএনপিরই থাকতে পারে। তবে জামায়াত-শিবিরের একটি অংশ উগ্রপন্থায় জড়িয়ে যেতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

রাষ্ট্রে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও অন্যান্য উপলক্ষে প্রথম আলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। একেক ক্রোড়পত্রের লেখার জন্য নির্বাচন করা হয় একেকটি থিম বা বিষয়বস্তু। কোনোটিতে থাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা সমাজে অবদান রেখেছেন, তাঁদের কাজ সম্পর্কে, যাতে আরও অনেকে তাঁদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। এক ক্রোড়পত্রে বিভিন্ন সময় যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পদক-পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কে লেখা ছিল। ফিলিপাইনের ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এশিয়ার নোবেল পুরস্কার বলে খ্যাত। প্রথম বাংলাদেশি, যিনি ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত হন, তিনি তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ। সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁর ওপর একটি লেখা ছিল। তিনি বলেছিলেন:
‘আমার মতো অজানা-অচেনা একটি মেয়ে ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেল, তা অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেনি। ফলে একসময় কাজ করার পরিবেশটি হারিয়ে যায়। তাই অনেক কিছু করার পরিকল্পনা ছিল, তা করতে পারিনি। কুমিল্লা একাডেমির কাজ থেকেই ইস্তফা নিতে হয়।’
আজ উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নারী রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। ৫০ বছর আগে তা সম্ভব ছিল না। কর্মক্ষেত্রে উঁচু পদে নারীর দেখা পাওয়া ছিল বিরল দৃশ্য। তাহেরুন্নেসা ১৯৬৩ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’-এ ভারপ্রাপ্ত ইনস্ট্রাক্টর পদে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর এর নাম হয় বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট, সংক্ষেপে বার্ড। কুমিল্লা একাডেমি নামেই বেশি পরিচিত। এটি যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত এবং যিনি এর প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর নাম আখতার হামিদ খান। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অফিসার, অসামান্য কর্মী। স্বাধীনতার পর কুমিল্লা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন তাহেরুন্নেসা। সেই ষাটের দশকে নারীশিক্ষা, বাসস্থান উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া, কুটিরশিল্প গড়ে তুলে গ্রামীণ দারিদ্র্যমোচন প্রভৃতি কাজ তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ ‘কমিউনিটি লিডারশিপ’ বিভাগে ১৯৭৮ সালে তাঁকে ম্যাগসাইসাই পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি আরও এগিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সমাজের সহযোগিতা তো দূরের কথা, কোনো রকম আনুকূল্যই পাননি; বরং শিকার হয়েছেন ঈর্ষার। তারপরও তিনি বলেছেন:
‘চারপাশে অনেক হতাশা। তবে অনেক আশাও আছে। দল বেঁধে মেয়েরা কারখানায় যাচ্ছে, বড় বড় জায়গায় চাকরি করছে, মায়েদের আর সাত-আটটি সন্তানের জন্ম দিতে হচ্ছে না—এ ধরনের দৃশ্য আমি জীবিত অবস্থাতেই দেখে যেতে পারছি, তা অনেক বড় পাওয়া।’
সেই বড় প্রাপ্তির পেছনে যে দীর্ঘ যাত্রা, সেই পথ যাঁরা তৈরি করেন, তাহেরুন্নেসাও তাঁদের একজন। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তবে তাঁর পরিবারের অনেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের পরিবার অবিভক্ত বাংলার আলোকিত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারগুলোর একটি। তাঁরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক ও উদার। তাঁর নানা খান বাহাদুর তাসাদ্দুক আহমদ ছিলেন বিশের দশকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সবচেয়ে খ্যাতিমান প্রধান শিক্ষক। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত, কবি-কথাশিল্পী বুদ্ধদেব বসুর মতো তাঁর বিখ্যাত ছাত্ররা তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা সব সময় করতেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে সম্মান করতেন। তাসাদ্দুক আহমদের অন্যান্য ভাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুখ্যাত ছিলেন। তাহেরুন্নেসার স্বামী ভূতত্ত্ববিদ এস কে এম আবদুল্লাহ ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। স্ত্রীকে অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়েছেন।
শুরুতে উদ্ধৃত মিসেস আবদুল্লাহর সোজা কথাটি আমার মনে একটি ধারণার জন্ম দেয়। তাঁর বক্তব্যটি নিয়ে চিন্তা করি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল নতুন স্বাধীন দেশ। শুধু সরকারি উদ্যোগ ও তৎপরতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। কোনো দেশের এক-তৃতীয়াংশ কাজের বেশি সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের সরকারের আর্থিক সংগতি কম। ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগ দরকার। বাংলাদেশ আজ যে আর্থসামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার পেছনে বহু ব্যক্তি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবদানই বারো আনা।
আমাদের বাঙালি সমাজ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজ কোনো শক্ত দার্শনিক ও নৈতিক আদর্শিক পাটাতনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। না ধর্মীয়, না ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ সমাজের চালিকাশক্তি। এ সমাজে অতীতে উঁচু আদর্শবান ও নীতিমান মানুষ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের নির্মাণ করেছিলেন—সমাজ নয়। যে সমাজের দার্শনিক ভিত্তি দুর্বল, সেখানে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রে উন্নত রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে পারে না। তবে কিছু কিছু আদর্শ সব সমাজেই স্বীকৃত। তার মধ্যে সত্য, প্রেম, ন্যায়বিচার প্রভৃতি রয়েছে। সত্য হলো নিরপেক্ষ সত্য ইমপারশিয়াল ট্রুথ; এবং প্রেমও নর-নারীর দেহঘনিষ্ঠ প্রেম নয়—মানুষে মানুষের প্রেম। সে প্রেম অনেক বড় প্রেম। মানবপ্রেম। আমাদের সমাজে যে হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, তা দার্শনিক ভিত্তি না থাকারই ফল। সে জন্য বহু রক্তে অর্জিত রাষ্ট্রকেও মানবিক করা সম্ভব হয়নি।
সমাজে উঁচু দার্শনিক চিন্তা ও নৈতিকতার অতি বড় ব্যাপার। রাষ্ট্রে গঠনমূলক কাজে যত বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন, তত সমাজ দ্রুত এগিয়ে যায়। উপমহাদেশের দুই বড় মনীষী রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। তাঁরা ব্যক্তির সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক কাজের ওপর জোর দিয়েছেন। তরুণদের অনেকেই মনে করেন একটা বিপ্লবই সব সমস্যার সমাধান। বস্তুত তা ঠিক নয়। তবে প্রগতিশীল নেতৃত্বে বড় ধাক্কায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
একবার শান্তিনিকেতনে সাবেক বিপ্লববাদী এবং পরে গান্ধীবাদী ও রবীন্দ্রপ্রেমিক পান্নালাল দাশগুপ্তের সঙ্গে কথা হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদ ও আমি গিয়েছিলাম দেখা করতে। দাশগুপ্ত অতি খাঁটি মানুষ। আশির ওপরে বয়স তখন। তিনি বোলপুর অঞ্চলের গ্রামের মানুষের সমস্যা সমাধানে অনশন করছিলেন তাঁর বন্ধুর গুরুপল্লির বাড়িতে। একবার স্বাধীনতার পরেও তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়। তাঁর একটি কথা আমার সব সময় মনে পড়ে। গান্ধীবাদী দাশগুপ্ত বলতেন, রাষ্ট্রের ওপর সব ব্যাপারে নির্ভর করা যায় না। তা কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—যা-ই হোক না কেন! বিকল্প কৃষিব্যবস্থা, বিকল্প শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা করতে হবে। আমার মনে হয়েছে, তা করতে হলে সমাজেরও পূর্ণ আনুকূল্য ও সহযোগিতা দরকার। ঈর্ষাবশত যেকোনো বেসরকারি ও বিকল্প উদ্যোগ থামিয়ে দিলে সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
গত সপ্তাহে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য ড. বালচন্দ্র মুঙ্গেকার ঢাকায় এসেছিলেন এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে। তিনি ভারতের সংবিধানপ্রণেতা বি আর আম্বেদকরের অনুসারী এবং গান্ধীবাদীও। গান্ধীজিকে নিয়ে কাজও করছেন। তাঁর বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনে আলোচনা করতে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেন। প্রফেসর মুঙ্গেকার আগে ছিলেন মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং পরে সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডিজের চেয়ারম্যান। তিনি রাষ্ট্রপতি মনোনীত পার্লামেন্টের মেম্বার। আম্বেদকর নিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা হলো। আম্বেদকর বলেছেন, শুধু আইনের দ্বারা মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমাজের ভেতরের চেতনা জাগ্রত থাকতে হবে।
সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি হয় অতি অল্পসংখ্যক সচেতন ও সংক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে। একটি ভালো রাষ্ট্র তা-ই, যা ওই সংক্ষুব্ধ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের উদারভাবে সহ্য করে এবং তাঁদের উন্নত আদর্শ ও চিন্তা মেনে নেয়। মানুষের কল্যাণে অল্প কিছু বিক্ষুব্ধ মানুষের আন্দোলনকে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত। সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা ক্ষতিকর। যেকোনো উন্নত চিন্তাকে শ্রদ্ধা জানানো উচিত। সে চিন্তা বা মত যদি আপাতত সরকার বা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হয় তবু।
সরকার তার প্রশাসনযন্ত্র দিয়ে যে কাজ করে, তা নাগরিকদের প্রত্যাশার তুলনায় অতি অল্প। আধুনিক শিল্পকারখানা থেকেও মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি। কিন্তু শিল্পকারখানারও চাকরি দেওয়া বা কর্মসংস্থান করার ক্ষমতা সীমাহীন নয়। নতুন ডিগ্রিপ্রাপ্তরা চাকরির সন্ধানে সরকার ও শিল্পমালিকদের কাছে ছুটছেন, কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশের আশা পূরণ হচ্ছে না। ফলে, যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। সেই হতাশাকে নানাভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে উগ্রবাদীরা। জঙ্গিগোষ্ঠী পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব। যাদের সৎ পথে উপার্জনের পথ বন্ধ, তারা সমাজবিরোধী কাজে যেতে পারে। সে জন্য বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা জরুরি।
বেকারত্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে যুবসমাজে সন্ত্রাসী প্রবণতা দেখা দেয়। তারা সংগতভাবেই একটি পরিবর্তন চায়। আজ গ্রামীণ জীবনে শান্তি নেই, শহরেও অশান্তি। ফলে, গোটা সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অনাচারেই মানুষ অতিষ্ঠ। বর্তমান ব্যবস্থায় সে রকম শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, যাতে গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা নিয়ে গ্রামেও জীবিকা উপার্জন করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি, যে কথা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী বলেছেন। ছেলেমেয়েদের হাতে একটা সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিলেই আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এখন ডিগ্রির সার্টিফিকেটের একটি কাগজের চোতা পনেরো আনা শিক্ষার্থীরই কাজে লাগছে না। যুগের ও সমাজের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া উগ্রবাদী প্রবণতার মোকাবিলা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের অতিরিক্ত কর্তৃত্ব একটি অস্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেয়। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ উভয়ই তার বিরোধিতা করেছেন। সমাজের ওপর রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী আচরণ ও নিপীড়ন নাগরিকদের সৃষ্টিশীলতাকে দুর্বল করে। একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীলতাও মানুষকে স্বাবলম্বী হতে দেয় না। দাতাদের অর্থনির্ভর এনজিও সমাজের সমবায়ী ও স্বেচ্ছাশ্রমের তৎপরতাকেও খর্ব করে। দলীয় রাজনীতির অন্ধ আনুগত্য মানুষের ন্যায়বিচারের প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে। এবং মানবিক সহানুভূতি, সহযোগিতা ও গঠনমূলক কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ নষ্ট করে দেয়। সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ব্যক্তির উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং গঠনমূলক কাজকে বাধাগ্রস্ত না করে বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় কেন পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন?

উনিশ্শো একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর, বিশেষ করে চাকমাদের ভূমিকা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। চাকমাদের তৎকালীন রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।   পিয়জীত দেবসরকার: 'ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তার রাজত্ব হারিয়েছেন' কিন্তু ত্রিদিব রায়-এর সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল বা কী ধরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল, সে বিষয়ে গবেষণা খুব বেশি হয়নি। সম্প্রতি সেই কাজটি করেছেন লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার, যার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান’ গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইতে লেখক উপমহাদেশের বিশাল ক্যানভাসের মধ্যে চাকমাদের ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতার একটি জীবন্ত চিত্র এঁকেছেন। সেই চিত্রে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন কীভাবে একের পর এক চাকমা রাজা নিজেদের রাজত্ব এবং স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা চাকমা জাতিগোষ্ঠীকে তাদের প্রতিবেশী বাঙ্গালীদের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছিল। রাজা ত্রিদিব রায়-এর রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা ব্যাখ্যা করার জন্যই প্রিয়জীত দেবসরকার তার বই-এর নামে তাকে ‘পশ্চিম পাকিস্তানের শেষ রাজা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। দেবসরকারের মতে, ১৯৫৩ সালে সিংহাসনে আরোহণ থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ত্রিদিব রায় নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের এক জাতিগোষ্ঠীর রাজা হিসেবে দেখেছেন। রাজা ত্রিদিব রায় খুব চিন্তা-ভাবনা করেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। রাজা ত্রিদিব রায়: সিংহাসনে আরোহণের দিন। দেবসরকারের গবেষণা মতে, ত্রিদিব রায়-এর সিদ্ধান্ত ছিল আত্মস্বার্থ-কেন্দ্রিক। নিজের রাজত্ব এবং স্বায়ত্তশাসন টিকিয়ে রাখতেই ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। “উনি চাইছিলেন তার রাজত্ব এবং রাজ পরিবারের শাসন যেন বজায় থাকে, যদিও অনেক সাধারণ চাকমা তার নীতির বিপক্ষে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন”, দেবসরকার বলেন। বইটির ভিত্তি হচ্ছে দালিলিক গবেষণা, অর্থাৎ প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত দলিল ছিল বইটির মৌলিক উপাদান। গবেষণার কাজ হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে – বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, তারপর শ্রীলংকা এবং থাইল্যান্ড হয়ে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্স। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক খেলার মাঠে চাকমা রাজাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখেছেন লেখক। বইটির মূল লক্ষ্য ছিল সেই বিশ্লেষণের আলোকে রাজা ত্রিদিব রায়-এর কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা এবং ব্যাখ্যা করা। বই-এর শুরুতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষ করে আরাকান এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমাদের আগমন এবং প্রভাব বিস্তারের ইতিহাস। এর পরে এসেছে, দিল্লিতে মোগল বাদশাহদের সাথে চাকমা রাজাদের সম্পর্ক এবং ব্রিটিশ শাসন শেষে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধীনস্থ করার সিদ্ধান্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও এলাকাটি পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত করা হয়। স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ-এর এই সিদ্ধান্ত অনেককে অবাক করলেও, তৎকালীন চাকমা রাজা নালিনক্সা রায় খুশিই হয়েছিলেন। ভারতীয় কংগ্রেসের নীতি বেশ সোজা-সাপটা ছিল, বলছেন দেবসরকার। তারা স্বাধীন ভারতে কোনো ধরনের স্থানীয় রাজা-রাজকুমার বা রাজকীয় ক্ষুদ্র রাজ্য বরদাশত করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিল। কাজেই, চাকমা রাজার পক্ষে ভারতে যোগ দিয়ে রাজত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হতো। “আপনি যদি একটু পেছনে যান, আপনি দেখবেন চাকমারা ব্রিটিশ ভারতে সব সময় স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করে আসছে। তাদের কিন্তু সব সময় একটি আলাদা রাজত্ব, আলাদা পরিচয় ছিল,” দেবসরকার বলেন। রাজা ত্রিদিব রায় মনে করেছিলেন পাকিস্তানের সামরিক শাসনই পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করবে। শুরু থেকেই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক এবং বেসামরিক আমলাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানের উদীয়মান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনকে তিনি কম গুরুত্ব দেন। এমনকি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা শেখ মুজিবের ব্যাপক বিজয়-এর পরেও তিনি তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেন নি। দেবসরকার বলছেন, ত্রিদিব রায় ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করলে তিনি তাকে আওয়ামী লীগ-এর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবার অনুরোধ জানান। মুজিব ত্রিদিব রায়কে আশ্বাস দেন, যে তার দল বিজয়ী হলে পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে তিনি সহায়তা করবেন। “কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়-এর মূল লক্ষ্য ছিল তার রাজত্বের স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা রক্ষা করা এবং আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, সে বিষয়ে হয়তো কোন সমস্যা ছিল”, দেবসরকার বলেন। তবে দেবসরকার মনে করছেন, ত্রিদিব রায় ভেবেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের ফলাফলকে কোনো না কোনো ভাবে নাকচ করে দিতে পারবেন। “উনি যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাদের অনেক উন্নত মানের বাহিনী মনে করতেন, তিনি ভেবেছিলেন যে তাদের বিরুদ্ধে বিদেশী কোন হুমকি কাজ করবে না এবং তারা সব কিছু সামলে নিতে পারবে,” তিনি বলেন। লেখক তার কাজ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই শেষ করে দেননি, কারণ ত্রিদিব রায়-এর রাজনৈতিক জীবন ১৯৭১-এর পর থেমে থাকে নি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭৩ সালে রাজা ত্রিদিব রায়কে দেশের প্রেসিডেন্ট হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হতে চাননি বলে পদ গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু তারপরও, দেবসরকার তার উপসংহারে লিখছেন, “ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তার রাজত্ব হারিয়েছেন”। চাকমাদের ৫০তম রাজা ত্রিদিব রায়-এর নাম ১৯৭২ সালের দালাল আইনে অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি সেই অভিযোগ মোকাবেলা করার জন্য কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসেননি এবং ৭৯ বছর বয়সে ২০১২ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নির্বাসনে ছিলেন। দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান, ১৬১ পৃষ্ঠা। প্রকাশক: কুইনটাস।