Sunday, October 12, 2025

গাজার যুদ্ধবিরতি নিয়ে মিশরে আন্তর্জাতিক সম্মেলন সোমবার

সোমবার মিশরে লোহিত সাগরের তীরে শারম আল শেখে গাজা যুদ্ধ অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই হামাসের হাতে থাকা প্রায় ২০ জিম্মিকে মুক্তি দেয়ার কথা। বিনিময়ে ২০০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়ার কথা ইসরাইলের। সোমবারের এই সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

মিশরের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ২০টিরও বেশি দেশের নেতা এই বৈঠকে অংশ নেবেন। এ সম্মেলনের লক্ষ্য হলো, গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের নতুন যুগের সূচনা করা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং স্পেনের পেদ্রো সানচেজ উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনও অংশগ্রহণ করবেন।

তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বা ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের কোনো প্রতিনিধি যোগ দেবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। ওদিকে মার্কিন মধ্যস্থতায় সম্পাদিত চুক্তির প্রথম ধাপে ইসরাইলি বাহিনী গাজার কিছু অংশ থেকে আংশিক সরে গেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজায় কমপক্ষে ৬৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। গোটা গাজা এখন দুর্ভিক্ষ ও ধ্বংসের মুখে। 

গাজা শান্তি সম্মেলনে ইরানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে মিশরে সোমবারের উচ্চপর্যায়ের শান্তি সম্মেলনে ইরানকে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনটা জানিয়েছে অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদন। সম্মেলনটি সোমবার মিসরের রেড সি উপকূলীয় শহর শার্ম আল-শেখে হবে। এর সহ-সভাপতিত্ব করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।

মিসরের প্রেসিডেন্সি জানিয়েছে, সম্মেলনে বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের নেতা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গাজা যুদ্ধবিরতির পর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি কাঠামো গড়ে তোলাই এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
mzamin

যেন আরেকটি নাকবা

এ যেন আরেকটা নাকবা। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে যেমন করে নিধন করা হয়েছিল, গত দু’বছরে যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। জাতিসংঘের ‘যথাযথ আবাসনের অধিকার’ বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বালাকৃষ্ণন রাজাগোপাল গাজা পরিস্থিতিকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, গত দুই বছরে যা ঘটেছে, তা ইতিহাসে দ্বিতীয় নাকবার মতোই মনে থাকবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

ইসরাইলকে অবিলম্বে গাজা উপত্যকায় তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র (ক্যারাভান) পাঠানোর অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ। কারণ, উত্তর গাজার যে অংশগুলো থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে গেছে, সেখানে ফিরে আসা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা দেখছেন- তাদের ঘরবাড়ি ও পাড়াগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

বালাকৃষ্ণন রাজাগোপাল আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, উত্তর গাজায় মানুষ এখন শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখতে পাচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও মানসিক আঘাত অত্যন্ত গভীর। আর আমরা এখন সেটাই প্রত্যক্ষ করছি।

শুক্রবার ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে দুই বছরের সংঘাত স্থগিত রাখার একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরাইলি সেনারা উত্তর গাজা থেকে সরে যায়। এরপর থেকেই হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিজেদের এলাকায় ফিরে যেতে শুরু করেছেন। ফিলিস্তিনজুড়ে মানুষ ইসরাইলি বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ আবাসিক ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি বাধ্য হয়ে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।

রাজাগোপাল জানান, এ বছরে শুরু হওয়া এক যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় তাঁবু ও ক্যারাভান পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইসরাইলের কঠোর অবরোধের কারণে ‘প্রায় কিছুই ঢুকতে পারেনি।’ তিনি বলেন, এটাই এখন মূল সমস্যা। যতক্ষণ না ইসরাইল প্রবেশপথগুলোর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ গাজার মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক ত্রাণ বা সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটি একেবারেই অপরিহার্য। রাজাগোপাল গাজাজুড়ে গৃহধ্বংসকে বর্ণনা করতে ‘ডোমিসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, গাজায় ঘরবাড়ি ধ্বংস করা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের গণহত্যার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। তার ভাষায়, মানুষের ঘর ধ্বংস করা, তাদের এলাকা থেকে উৎখাত করা এবং সেই অঞ্চলকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা- এই কাজগুলিই গণহত্যার প্রধান উপায়গুলোর একটি।

তিনি আরও বলেন, গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রজন্ম লেগে যাবে। রাজাগোপাল আরও বলেন, এটা যেন আরেকটি নাকবা। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ কথা বলেন।

mzamin

গাজায় যুদ্ধবিরতির পর নেতানিয়াহুর সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ by সাইমন স্পিকম্যান কর্ডাল

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি সমাজে প্রায় একই রকম আনন্দের প্রকাশ দেখা গেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় যারা বন্দী হয়েছিলেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা চুক্তি ঘোষণার পর তেল আবিবে উল্লাস করেছেন।

তবে গাজায় দুই বছরের যুদ্ধ ইসরায়েলি সমাজে ফাটল ধরিয়েছে। গাজায় গণহত্যার বিরোধিতাকারী ইসরায়েলিরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন এবং তারা এক প্রকার সমাজচ্যুত। অন্যদিকে, এই যুদ্ধকে সমর্থনকারীরা ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান নিন্দার ঝড় উঠায় বেশ ক্ষুব্ধ।

বার্লিন থেকে ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিম্রোড ফ্ল্যাশেনবার্গ বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির খবরটা পাওয়ার পর আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। এটা সত্যিই বিশাল ঘটনা। এটা ইসরায়েলজুড়ে এমন এক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, যেন মানুষ চাপমুক্ত হচ্ছে। এটা বিশাল এক স্বস্তি।’

সাবধানী আশাবাদ ও নেতানিয়াহুকে নিয়ে সন্দেহ

কারও কারও কাছে যুদ্ধবিরতির খবরটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। অনেকের উদ্বেগ চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে যেতে পারে, যেমনটা এই বছরের শুরুতে একটি চুক্তি বাতিল হয়ে গিয়েছিল। বামপন্থী হাদাশ-তা'আল পার্টির সংসদ সদস্য আইদা তোউমা-সুলেইমান বলেন, ‘সবাই খুশি। দুই বছর ধরে আমরা এর জন্যই আহ্বান জানাচ্ছিলাম। আমি গাজার ভিডিও দেখছি, তেল আবিবের টেলিভিশনগুলিতে জিম্মিদের পরিবারদের দেখছি, সবাই খুশি।’

তবে তিনি সতর্ক করে যোগ করেন, ‘এখনও সতর্কতা আছে। এমন একটা অনুভূতি কাজ করছে যে কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও আবার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার অজুহাত খুঁজে নেবে। মানুষ এই সরকারকে বিশ্বাস করে না—শুধু গাজায় নয়, ইসরায়েলেও নয়।’

এই সন্দেহের একটি বড় অংশ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে। তিনি এর আগে বারবার যুদ্ধ শেষ করার আহ্বানে প্রতিরোধ করেছেন। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বন্দীদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ ছিল যে তিনি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে—তার জোট ধরে রাখার জন্য—সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও এমনটা ইঙ্গিত করেছিলেন।

আজকের এই যুদ্ধবিরতি সেই সন্দেহ দূর করতে পারেনি। নেতানিয়াহু এখনও তার দীর্ঘদিনের দুর্নীতি মামলার রায়, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে তার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত, পাশাপাশি তার সরকারি জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের সামরিক নিয়োগের বিতর্ক—এই সবকিছুর মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। গাজায় যুদ্ধ চলার সময় এই ইস্যুগুলো পেছনে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু গাজায় যুদ্ধ বন্ধ হলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।

তবে, আগামী বছরের মধ্যে বা তার আগেও নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, নেতানিয়াহু তার কিছু সাফল্য তুলে ধরতে পারেন, বিশেষত বৃহত্তর অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত  ‘প্রতিরোধী শক্তিকে’ দুর্বল করার ক্ষেত্রে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো গত জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং গত বছর লেবাননের হেজবুল্লাহ গোষ্ঠীর নেতৃত্বের বড় অংশকে নির্মূল করা।

নেতানিয়াহুর সাবেক সহকারী ও রাজনৈতিক জরিপকারী মিচেল বারাক আল জাজিরাকে পশ্চিম জেরুজালেম থেকে বলেন, ‘নেতানিয়াহু এটাকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরবেন। তিনি বলতে পারবেন যে যুদ্ধের শুরুতে তিনি যা যা চেয়েছিলেন, তার সবকিছুই অর্জন করেছেন। তিনি বন্দীদের ফিরিয়ে এনেছেন, হামাসকে ধ্বংস করেছেন। এর পাশাপাশি, তিনি দাবি করবেন যে এই সুযোগ ব্যবহার করে তিনি হেজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করেছেন, ইরানকে দুর্বল করেছেন এবং সিরিয়ার শাসনের পতন দেখেছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠিত করেছেন এবং ইসরায়েলের মুখোমুখি প্রধান হুমকিগুলোর প্রায় সবকটিই সরিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করবেন।’

নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী জোটের অন্যরা অবশ্য এই চুক্তির বিরোধিতা করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির যুদ্ধবিরতির প্রতি বৈরী মনোভাব দেখিয়েছেন এবং সরকার থেকে বেরিয়ে যাবেন বলে দিয়েছেন। তবে, বিরোধী দল চুক্তি সুরক্ষিত করার জন্য সরকারকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ডানপন্থীরা চুক্তিবিরোধী অবস্থান কতটা ধরে রাখতে পারবেন তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের হাত

যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলি জনতা নেতানিয়াহুকে কতটা কৃতিত্ব দেবে, নাকি ট্রাম্পকে, তা স্পষ্ট নয়। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র ছিল। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্টের এই সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রই মূলত গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং অঞ্চল জুড়ে তার হামলাগুলোর অর্থায়ন করেছে।

তবে, অনেক ইসরায়েলি মনে করেন কাতারে হামাস নেতাদের উপর ইসরায়েলের ব্যর্থ হামলা এবং আরব রাষ্ট্রগুলির ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া মার্কিন প্রশাসনের অগ্রাধিকারকে পরিবর্তন করেছে এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে চুক্তিতে সম্মত হতে ও যুদ্ধ শেষ করার কথা বলতে বাধ্য করেছে।

ফ্ল্যাশেনবার্গ বলেন, ‘আমি মনে করি ট্রাম্প, তুরস্ক ও কাতারের মতো মুসলিম ও আরব রাষ্ট্রগুলোর জোটের সাথে মিলে সম্ভবত ইসরায়েলি সরকারকে বাধ্য করতে সফল হয়েছেন। এটা আরও আগেই অর্জন করা যেত, যা থেকে বোঝা যায় ট্রাম্পই এটি চাপিয়ে দিয়েছেন।’

ভবিষ্যত অনিশ্চিত

তোউমা-সুলেইমান এই শিথিলভাবে লিখিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায় নিয়ে বলেন, ‘নেতানিয়াহুকে প্রথম পর্যায়টি শেষ করতে হবে। আমরা সেটা জানি, তবে দ্বিতীয় পর্যায় সম্পর্কে আমাদের এখনও অনেক কিছু অজানা।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেটা এখনও আলোচনার বিষয়—এবং ইসরায়েলের পক্ষে, সেই আলোচনা এমন একটি সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে যা সম্ভবত আবার যুদ্ধ শুরু করতে চাইছে।’

তবে, যুদ্ধবিরতির আলোচনার জন্য বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারকে পাঠানো একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের (যিনি কী না এই প্রক্রিয়ার সাথে গভীরভাবে জড়িত) বিরুদ্ধে পুনরায় বিরোধে যাওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠিন হবে।

বারাক বলেন, ‘এটা কতদিন চলবে তা ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করে। তিনি দেখিয়েছেন যে  নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত, কারণ তিনি নতুন নিয়ম দিয়ে নিজের খেলার নিয়ম তৈরি করেন।’

বারাক আরও বলেন, ‘ইসরায়েল সবসময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। কিন্তু ট্রাম্প বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এমনকি সাধারণভাবে বিদেশী মিত্রদের নিয়ে চিন্তা করেন কিনা তা আর স্পষ্ট নয়। তিনি শান্তি চান, আর নেতানিয়াহু তা জানেন। তিনি জানেন যে ট্রাম্প সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন—এবং সেটা হবে একটি বিপর্যয়।’

* সাইমন স্পিকম্যান কর্ডাল, তিউনিসিয়ার সাংবাদিক ও আলজাজিরার কলামলেখক

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আনন্দে নিজ দেশের জাতীয় পতাকা জড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনের এক শিশু। ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলে, ৯ অক্টোবর ২০২৫
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আনন্দে নিজ দেশের জাতীয় পতাকা জড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনের এক শিশু। ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলে, ৯ অক্টোবর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

‘হাসিনার আমলই ভালো ছিল’—এটা কোন ঘরানার গান by খাজা মাঈন উদ্দিন

ইদানীং কিছু ভদ্রলোক ইনিয়ে-বিনিয়ে, এমনকি সুযোগ বুঝে সরাসরিও বলে ফেলছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চেয়ে শেখ হাসিনার শাসনেই দেশ ভালো চলছিল। দু–একজন এ-ও বলছেন, গত ৪০ বছরে এখনকার মতো খারাপ অবস্থা নাকি তাঁরা দেখেননি।

এই ‘মহামানবদের’ কথা মান্য করলে প্রশ্ন এসেই যায়, কী লাভ হলো গণ–অভ্যুত্থান করে, এত জীবন বিসর্জন দিয়ে, এত রক্ত ঝরিয়ে?

আওয়ামী লীগের শত্রুরা উত্তর দিক: সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে হাসিনা পতনের এক দফা দাবিতে রূপান্তরের কী প্রয়োজন ছিল? গণবিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেড় দশকে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী ব্যবস্থাকে ভেঙে খান খান করে ফেলার কী এমন প্রয়োজন ছিল?

হাসিনা-পরবর্তী এই ‘ভগ্ন হৃদয়ের’ যুগে ভারতীয় শিল্পী কবির সুমনের সে গানটি ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই...শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই’ শুনি আর ভাবি, ২০২৪-এর ‘ডামি’ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনাকে আজীবন ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া অলিগার্কদের কী যে আকুতি ছিল!

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নেত্রীর পতন দেখে হয়তো সেদিন তাঁরা শুনেছেন কিংবা গেয়েছেন অন্য কোনো গান। হতে পারে আরেক ভারতীয় শিল্পী হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া সেই গান তাঁরা গেয়েছিলেন, ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে...আমার বলার কিছু ছিল না।’

আক্ষেপ কেন, কমরেড, জীবন নিয়ে পালিয়ে তো তিনি নিরাপদেই আছেন দিল্লিতে!

তবু ‘সে কি ভোলা যায়, তুমি আমারই ছিলে’ হে বাংলাদেশ সাম্রাজ্য! সত্যিই তো তাঁর এবং তাঁদের একচেটিয়া অধিকার ছিল যেভাবে খুশি যত বেশি ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তি ভোগের।

একটি অভিজাত গোষ্ঠীকে (অলিগার্কি) হাসিনা-প্রদত্ত সেই লাভজনক স্থিতাবস্থা হারিয়ে কীভাবে চুপ করে বসে থাকবে এর ‘ভাগ্যবান’ সদস্যরা! নতুন রাজনৈতিক বিনিয়োগও কিছু দরকার হবে যদি ভবিষ্যৎ মুনাফার আশা করতে হয়।

টাকাওয়ালাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিনা ভোটে বা জালিয়াতির মাধ্যমে সংসদ সদস্য পদ বা মন্ত্রিত্ব উপহার, তাঁর চামচাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং দলীয় অনুগতদের মিডিয়ার লাইসেন্স প্রদানসহ কত ধরনের দান-দক্ষিণার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ‘ষোলো কোটি মানুষকে খাওয়ানোর’ দাবিদার বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপ্রধান হাসিনার সরকার।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু থেকে গভীর সমুদ্রবন্দর, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে টোল রোড, ডজন ডজন নতুন ব্যাংক থেকে শত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি—এ রকম বড় বড় ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণে তাঁর কোনো তুলনাই হয় না।

একটু–আধটু দুর্নীতি হলেও অন্তত মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন তো দেখাচ্ছিলেন তাঁর সভাসদরা। এই ধরুন, লাখো কোটি টাকার ব্যাংকঋণ জালিয়াতি, খেলাপি, দলীয় নেতা মাস্তানদের হাজার হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও সম্পদ লুণ্ঠন, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার ইত্যাদি বিষয় দেড় দশকের স্থিতিশীলতার তুলনায় এমনকি বাড়াবাড়ি!

জনগণকে কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন জনদরদি হাসিনা সরকার। ২০১৪ সালের ১৫৪ সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, ২০১৮ সালে নৈশকালীন ভোট এবং ২০২৪ সালে ডামি নির্বাচন করে হাসিনা তাঁর বাবা শেখ মুজিবের তৈরি একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার নতুন মডেল দাঁড় করান পৃথিবীর সামনে।

যাঁরা এই আওয়ামী শাসনের ‘স্থিতিশীলতা’ নস্যাৎ করতে চেয়েছে তাদের ‘ঠ্যাং ভেঙে’ দিতে একটুও দ্বিধা করেনি হাসিনা সরকার। সরকারের ধারাবাহিকতা নষ্টের চেষ্টাকারীদের ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়া হয়েছে গুম, খুন, সহিংসতা, জঙ্গিনাটক, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিবাদ দমন ও বাক্‌স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে। সে জন্য আপনারা তাঁকে ফ্যাসিবাদী বলার সাহসও পাননি তখন।

জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে হাজারো তরুণ ও সাধারণ মানুষ নিহত (শহীদ) হওয়ার দায় নিতে চাননি হাসিনা। উল্টো তাঁর দাবি, ৫ আগস্ট তাঁকে মারতেই লক্ষ জনতা গণভবন অভিমুখে যাত্রা করেছিল।

আরও রক্তপাত এড়াতেই নাকি তাঁর নিজের লোকদের মায়া ছেড়ে ‘একলা চলো’ নীতি অবলম্বন করে ভারতে পাড়ি জমান শেখ হাসিনা।

তাই আজ তাঁর ফেরার অপার ইচ্ছা যেন স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি গানের মতোই, ‘তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথি হতে আজকের চেষ্টা আমার।’

যাদের ‘এতিম’ করে রেখে উনি চলে গেলেন, তাদের কারও কারও বক্রোক্তি এ রকম: এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পর বহুত শখ করে তো ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে; তাঁর সরকার এখন পর্যন্ত কী করতে পেরেছে? নির্বাচন, সংস্কার, হত্যা ও দুর্নীতির বিচার, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, অর্থনীতি জোরদার—কোনটি পেরেছে?

যেন এত সব বিষয় নিয়ে জনমনে কোনো ক্ষোভই ছিল না হাসিনার আমলে। এটি সেই বিস্মৃত অতীত, যেটি নিয়ে কল্পিত সংগীত রচিত হয়: ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’।

তার মানে, তাঁর শাসনকালই জাতির জন্য ছিল আদর্শ। এটা প্রমাণ করার এক অদৃশ্য প্রচেষ্টা রয়েছে আজ এখানে, আমাদের চারপাশে, আশপাশে।

সত্য, মিথ্যা মিশিয়ে এমন দাবি করেন কারা এবং কেন—সেটা আমাদের একটু বোঝা দরকার।

হাসিনার চামচা ও সুবিধাভোগী, তাঁর ঘরানার অসৎ বুদ্ধিজীবী, তাঁর হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতি নিয়ে নির্বিকার নেতা-কর্মী-সমর্থক, বর্তমান আমলে বিশেষ কিছু না পেয়ে প্রবলভাবে হতাশ কতিপয় সুশীল অথবা পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্বোধ ব্যক্তির পক্ষেই ফ্যাসিবাদী শাসনামলকে উত্তম বলা সম্ভব।

এতে হাসিনার লোকদের বড় লাভ হতে পারে দায় স্বীকার না করে বা ক্ষমা না চেয়েই তাঁদের হাত ও নামসমূহকে দুর্নীতি, হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের রক্তের দাগ থেকে মুক্ত করা।

এ প্রচেষ্টা ঘটে যাওয়া সত্যকে অস্বীকার, শহীদদের আত্মত্যাগ অগ্রাহ্য, আহত ব্যক্তিদের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং মজলুমদের অনুভূতির সঙ্গে মশকরা ছাড়া আর কিছুই না।

এগুলোই আবার জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির বয়ান তৈরিতে ব্যর্থতা প্রমাণ করে।

পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের প্রবল আকাঙ্ক্ষার কোনো কমতি ছিল না এবং হত্যা-দুর্নীতিসহ ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিচার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের লক্ষ্যে কমবেশি সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক চিন্তা, গণতান্ত্রিক ভাবনা, কিংবা আমলাতান্ত্রিক কর্মসূচিকে জনমত তৈরির জন্য সেভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একটা একটা করে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উত্তম বিকল্প জনগণের সামনে আনলে গণমানুষকে নতুন ধারণা ও আশাবাদ উপহার দেওয়া যেত।

কয়েকটি মডেল নির্বাচন দিয়ে, তরুণদের পরিবেশ রক্ষার মতো সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে, রাজনৈতিক দলসমূহকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে অংশীদার বানিয়ে এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাক করে, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে হাসিনার কুশাসনকে যথাযথভাবে চিত্রিত করা যেত।

ধারণা করি, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগে ঘাটতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগগুলো সম্পর্কে জনসম্পৃক্ততার অভাব হাসিনার উপকারভোগীদের নিজস্ব গান গাওয়ার পরিসর দিয়েছে।

ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট রাজনৈতিক দল এবং ২০২৪-এর আন্দোলনে পুরোভাগে থাকা ছাত্র ও অন্য শক্তিগুলো পরস্পরের মধ্যে লজ্জাজনক কুতর্কে জড়িয়ে পড়ায় গণ–অভ্যুত্থান ও পরিবর্তনের এজেন্ডা এবং উপযোগী বয়ান যথেষ্ট মার খেয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণও কিছুটা বিভ্রান্ত ও হতাশ হয়েছে।

বাংলাদেশিদের বর্তমান হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়াটাই কাম্য ছিল পরাজিত শক্তির। হাসিনা বিহনে আওয়ামী উপকারভোগী বা অন্ধ সমর্থকেরা গোপালগঞ্জ বা অন্য কোনো অঞ্চলে নিরালায় বসে যেন গুনগুন করে গাইছে গগন হরকরার গান, ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে...।’ তারা বুঝতে পারছে না জাতির জীবনে শেখ হাসিনা এমন এক জুলুমশাহি শাসকের নাম ও ফ্যাসিবাদের প্রতিমূর্তি; যার শাসন পুরো দেশকে বানিয়ে ফেলেছিল ‘জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ’।

নিজেদের বাইরে জনগণের অন্য যেকোনো গোষ্ঠীকে ক্ষমতার ভাগ দিতে না চাওয়া সেই ফ্যাসিবাদী ধারায় ছেদ টেনেছে জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার গঠন, যেটিও আশা করি বাংলাদেশের শেষ সরকার নয়।

বিদায় নেওয়া ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে যেকোনো দেশেই অনেকটা পুরোনো দিনের গান। এই গান অবশ্যই স্মৃতিজাগানিয়া কিন্তু চলমান বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। ভবিষ্যতে আবারও ফ্যাসিবাদকে সহ্য করবে, এমন প্রজন্ম এ দেশে সেকেলে এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। তরুণেরা এবং অভিজ্ঞ বিবেকবানেরা এখন অজানা এক নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষায়।

ফলে ‘হাসিনার আমলই ভালো ছিল’ গান বাদ দিয়ে হাসিনার মানসপুত্রদের এখন নিরালা নিঝুম ও যথাযথ ভাবগম্ভীর পরিবেশে বসে মুদ্রিতনেত্রে মন্দ্রসপ্তক কণ্ঠে ভক্তিভরে গাওয়া উচিত, ‘মা, আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা... ।’

* খাজা মাঈন উদ্দিন, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট নিউ এজ–এ ছাপা হওয়া মেহেদী হকের এ কার্টুনে ছিল শেখ হাসিনার সপরিবার পলায়নের চিত্র
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট নিউ এজ–এ ছাপা হওয়া মেহেদী হকের এ কার্টুনে ছিল শেখ হাসিনার সপরিবার পলায়নের চিত্র

ধ্বংসস্তূপে লাশ, বাড়িঘর মাটিতে মিশে গেছে, তবু ফিরছেন গাজাবাসী

বুক ভরা হাহাকার। বাড়িঘর নেই। মাটিতে মিশে গেছে সব। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। তার মধ্যে প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন খুঁজে ফিরছেন গাজাবাসী। ধ্বংসস্তূপ সরাতেই তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে কংকাল। গলিত লাশ। চেনার উপায় না থাকলেও স্বজনরা জানেন তাদের ঘরে বোমা হামলার সময় পরিবারের কোন কোন সদস্য ছিলেন। কারা নিখোঁজ। এমনি করেই একে একে লাশের সন্ধান মিলছে। গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কমপক্ষে ১৩৫ ফিলিস্তিনির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ইসরাইলের দুই বছরব্যাপী গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতির সুযোগে উদ্ধারকর্মীরা অবশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে প্রবেশ করতে পেরেছেন। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, শনিবার সারাদিনে কমপক্ষে ১৩৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এছাড়া গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে মৃতদেহ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি মরদেহ আনা হয়েছে আল-শিফা হাসপাতালে। ৬০টি মৃতদেহ আল-আহলি আরব হাসপাতালে (গাজা সিটি) এবং অন্যগুলো নুসেইরাত, দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনুসের বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছেছে। চিকিৎসা কর্মকর্তারা আলাদা করে জানিয়েছেন, শুক্রবার ইসরাইলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত একজন পরে মারা গেছেন। গাজা সিটির দক্ষিণে ঘাবুন পরিবারের ১৬ সদস্য ভোররাতে বাড়িতে বোমা হামলায় নিহত হয়েছে। শেখ রাদওয়ানে একজন এবং খান ইউনুসের কাছে আরও দুজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই হামলাগুলোর কোনোটি হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ইসরাইলি সেনারা যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত কিছু এলাকা থেকে সরে যায় এবং উপকূলীয় আল-রাশিদ সড়ক আবার খুলে দেয়, তখন দশ হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষের দিকে বেদনাভরা যাত্রা শুরু করেন। আল জাজিরার তারেক আবু আজম নুসেইরাত থেকে জানাচ্ছিলেন- শিশু, নারী, বৃদ্ধ- সবাই গাড়ি, ভ্যান, গাধার গাড়ি, ফার্নিচারে বোঝাই করে গাজা সিটির দিকে যাচ্ছিলেন। পরিবারগুলো তাদের অস্থায়ী তাঁবু খুলে নিয়ে গেছে, যেন তা ভাঙা ঘরের ওপর আবার বসাতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই ফেরা ঐতিহাসিক। কিন্তু মানবিক সংকট লাঘবে এখনই বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। গাজা সিটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। কোনো অবকাঠামো নেই। বিশুদ্ধ পানি নেই। বিদ্যুৎ নেই। শুধু পড়ে আছে পোড়া ইট-পাথরের কঙ্কালসার দেহ। দেইর আল-বালাহ থেকে সাংবাদিক মোয়াথ কাহলুত জানান, ফিরে যাওয়া পরিবারগুলোর জন্য এখন অতি জরুরি হচ্ছে অস্থায়ী তাঁবু ও মানানসই আশ্রয়। হাতে যা সামান্য আছে তাই নিয়ে তারা অনিশ্চিতের পথে হাঁটছে।

অকল্পনীয় ক্ষয়ক্ষতির পরও ফিলিস্তিনিরা ফিরে যেতে বদ্ধপরিকর। নিজের অস্থায়ী তাঁবু গাড়িতে তুলতে তুলতে নায়েম ইরহিম বলেন, আমি গাজা সিটিতে যাচ্ছি, যদিও ওখানে বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। কোনো অবকাঠামো নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই। সবকিছু ভীষণ কঠিন। কিন্তু তবু আমাদের ফিরতে হবে। আমার ছেলে মারা গেছে, মেয়েরা সবাই আহত। তবুও আমি ফিরতে চাই। তাঁবু খাটাবো, যেভাবেই হোক বেঁচে থাকব। অনেকের জন্য গাজা সিটিতে ফেরা মানে শুধু ছাইয়ের কাছে ফেরা। তবু কাহলুত বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলি দখলের মধ্যেও অসাধারণ স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। তাদের প্রত্যেকটি ফিরে আসা কেবল পুনরাগমন নয়, এটি একপ্রকার প্রতিরোধ আর আশার প্রতীক।

ইসরাইলের এই গণহত্যামূলক যুদ্ধ থেকে বেঁচে থাকা এক নারী আয়শা শামাখ বলেন, আমাদের বাড়িগুলো দেখতে চাই, যে বাড়িগুলো যুদ্ধের শুরুতেই ধ্বংস হয়েছিল। আমাদের সন্তানদের ওপর তলার মেঝে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু তবুও আমি বর্ণনা করতে পারব না যুদ্ধবিরতির আনন্দটা। গাজা সিটি থেকে সাংবাদিক ইব্রাহিম আল-খালিল জানান, মানুষের মুখে একসাথে শোক আর আনন্দÑঅবসন্ন চোখে মিশে আছে ঘরে ফেরার ব্যথা ও আশার আলো। অনেকে জানেন না তাদের বাড়ি এখনো দাঁড়িয়ে আছে কিনা। তবুও তারা ফিরছেন আশায় বুক বেঁধে। উত্তরে কঠিন যাত্রা শেষে আহমেদ আবু শানাব বলেন, আমরা প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করেছি। জায়গা ছিল না, ঘুমানোই সম্ভব হয়নি। আরেক বাসিন্দা মারিয়াম আবু জাবাল বলেন, আমরা অজানায় ফিরে এসেছি। জানি না বাড়ি টিকে আছে কিনা। আল্লাহর কাছে শুধু প্রার্থনা করি, আমাদের বাড়িটা যেন এখনও দাঁড়িয়ে থাকে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/184207_Abul-9.webp

প্রেমিকাসহ খুন হন ‘ফ্যাসিবাদের জনক’, জনসমক্ষে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয় দুজনের মরদেহ by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

২৯ জুলাই ১৮৮৩, ইতালির এক নিভৃত গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন এমন একজন, যাঁর নাম একসময় সারা ইউরোপের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বেনিতো মুসোলিনি শুধু ইতালিরই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, ফ্যাসিবাদ নামের এক ভয়াল রাজনৈতিক মতবাদের প্রথম রাষ্ট্রীয় রূপদাতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর উত্তাল সময় মুসোলিনি ইউরোপীয় রাজনীতির এক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত হন। যুদ্ধ, একনায়কতন্ত্র, দমন–পীড়ন আর জাতীয়তাবাদে মোড়া তাঁর শাসনব্যবস্থা ইতালিকে যেমন এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়েছিল, তেমনই বিশ্বরাজনীতিতে এক ভয়ংকর দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছিল।

ইতালির ছোট্ট শহর প্রেদাপ্পিওতে জন্ম নেওয়া এ মানুষটির জন্মদিনে ফিরে দেখা জরুরি, কীভাবে একজন শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর একনায়ক। তাঁর উত্থান–পতনের গল্প শুধু এক ব্যক্তির নয়, একটি গোটা সমাজ তথা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিবর্তনেরই কাহিনি।

দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবার থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে

বেনিতো আমিলকারে আন্দ্রেয়া মুসোলিনি জন্ম নিয়েছিলেন ইতালির উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় প্রেদাপ্পিও শহরের ডোভিয়া এলাকার এক দরিদ্র পরিবারে। বাবা ছিলেন সমাজতন্ত্রী মনোভাবাপন্ন এক কামার, আর মা ছিলেন একজন শিক্ষক। বাবা অ্যান্ড্রেয়া ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি ও বিপ্লবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। নামের মধ্যেই এর ছাপ ছিল। ‘বেনিতো’ নামটি রাখা হয় মেক্সিকোর বিপ্লবী নেতা বেনিতো জুয়ারেজের অনুপ্রেরণায়।

ছোটবেলা থেকেই বেনিতো ছিলেন খ্যাপাটে স্বভাবের, রগচটা ও অগাধ আত্মবিশ্বাসী। পড়াশোনায় মাঝারি হলেও ভাষা আর বক্তৃতায় তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে এক সহপাঠীকে ছুরি মারার ঘটনায় স্কুল থেকে বহিষ্কার হন মুসোলিনি।

তবুও ১৮ বছর বয়সে শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন করে কিছুদিন স্কুলে পড়ান মুসোলিনি। কিন্তু সেই পেশাগত স্থিরতা তাঁর বিপ্লবী চেতনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরে রাজনীতির উত্তাল আবহ তাঁকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত করে। পাশাপাশি সাংবাদিকতা শুরু করেন স্থানীয় পত্রিকাগুলোয়।

সমাজতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদে যাত্রা

মুসোলিনি শুধু রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন এক অসাধারণ লেখক ও সাংবাদিক। সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ছড়িয়ে দিতে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ১৯১১ সালে তিনি ‘আভান্তি!’ নামে মিলানের এক সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার পত্রিকার সম্পাদক হন। এ সময় তিনি জোরালোভাবে শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রমিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইতালির পুনরুজ্জীবনের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা জরুরি। এই মতের কারণে তাঁকে সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বহিষ্কার করা হয় (১৯১৪ সাল)।

এ সিদ্ধান্তই মুসোলিনির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমাজতন্ত্র থেকে সরে এসে তিনি নতুন জাতীয়তাবাদী ও যুদ্ধপন্থী মতবাদের দিকে ঝোঁকেন, যা ভবিষ্যতের ফ্যাসিবাদের ভিত্তি গড়ে দেয়।

১৯১৯ সালে বেনিতো মুসোলিনি প্রতিষ্ঠা করেন উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন ‘ফ্যাসিও দি কমবাত্তিমেন্তো’। পরে জাতীয় ফ্যাসিবাদী দলে (ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি বা পিএনএফ) পরিণত হয় এটি। দলের সদস্যদের পরনে ছিল কালো শার্ট, হাতে লাঠি আর মুখে জাতীয় শৃঙ্খলার কথা।

এই ব্ল্যাক শার্টধারীরা বামপন্থী আন্দোলন ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি সহিংসতা চালাতেন। গণতন্ত্রকে দুর্বল বলে তাঁরা জাতীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলার নামে শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। তাঁদের মূল কৌশল ছিল—ভয় দেখানো, মারধর ও হত্যা। একরকম সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তাঁরা ইতালির রাজনীতিতে ফ্যাসিজমের জন্ম দেন।

১৯২২ সালের অক্টোবরে মুসোলিনি প্রায় ৩০ হাজার ব্ল্যাক শার্টধারী নিয়ে ‘মার্চ অন রোম’ নামের এক বিক্ষোভ শুরু করেন। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইতালির রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল তৃতীয় সামরিক হস্তক্ষেপ না করে মুসোলিনিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান।

এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই শেষ হয় ইতালির গণতন্ত্রের অধ্যায়। শুরু হয় একনায়কত্বের যাত্রা। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেও দ্রুতই মুসোলিনি নিজের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৯ বছর।

একনায়কতন্ত্র কায়েম

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুসোলিনি দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। ১৯২৫ সালের পর থেকে তিনি নিজেকে ‘ইল দুচে’ অর্থাৎ ‘দ্য লিডার (নেতা)’ বলে অভিহিত করতে থাকেন। এ পর্যায়ে এসে পার্লামেন্টের ক্ষমতা খর্ব করেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনেন ও বিরোধীদের নির্যাতন–নিপীড়ন শুরু করেন।

এভাবে মুসোলিনি একটি ‘করপোরেট রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যস্থতায় সব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। তবে বাস্তবে এ নীতির আড়ালে ছিল সরকারি দমন, বিধিনিষেধ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আয়োজন।

মুসোলিনির শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা। শিশুদের জন্য ফ্যাসিবাদী আদর্শে গড়া স্কুল, যুবকদের জন্য মিলিশিয়া আর সংবাদমাধ্যমের জন্য সরকারের গাইডলাইন—সবই ছিল একনায়কের বন্দনায় নিবেদিত। নিজেকে ‘রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি ইতালির জাতীয়তাবাদকে উসকে দেন।

মুসোলিনির এই ফ্যাসিবাদী শাসন ইউরোপের বাক্‌স্বাধীনতার ওপরে ছিল প্রথম বড় আঘাত।

যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা

মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালি ১৯৩০–এর দশকে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই তাঁর সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেন। ১৯৩৫ সালে তিনি আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) আক্রমণ করে জয় করেন এবং জাতিপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আগ্রাসন চালিয়ে যান।

স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী বাহিনীকেও সমর্থন দেন মুসোলিনি। ধীরে ধীরে তাঁর আদর্শ নাৎসি জার্মানির হিটলারের সঙ্গে মিলতে শুরু করে। ১৯৩৯ সালে হিটলারের সঙ্গে ‘প্যাক্ট অব স্টিল’ নামের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ইতালিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির আনুষ্ঠানিক মিত্র করে তোলেন তিনি।

আদর্শিকভাবে নাৎসিবাদের সঙ্গে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের কিছু পার্থক্য থাকলেও উভয় শাসকই কর্তৃত্ববাদ, জাতীয়তাবাদ ও সহিংসতা ব্যবহার করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।

হিটলার ও মুসোলিনির জোট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে।

পতনের শুরু ও করুণ পরিণতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির পক্ষে অবস্থান নেওয়া মুসোলিনির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে। ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনীর আক্রমণে ইতালির বিভিন্ন এলাকা হাতছাড়া হতে শুরু করে। ইতালির জনগণ ফ্যাসিবাদের প্রতি আস্থা হারান।

মুসোলিনিকে ইতালির রাজার পক্ষ থেকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হিটলারের নাৎসি বাহিনী তাঁকে মুক্ত করে পুতুল রাষ্ট্র ‘সলো প্রজাতন্ত্র’ গঠনের পর এর প্রধান বানায়। তবে এ পুতুল রাষ্ট্র স্থায়ী হয়নি।

১৯৪৫ সালের এপ্রিলে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রার মুখে পালানোর চেষ্টা করেন মুসোলিনি। কিন্তু লাভ হয়নি। লোম্বার্দি অঞ্চলে পার্বত্য পথে পালানোর সময় প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাঁকে আটক করেন। ২৮ এপ্রিল প্রেমিকা ক্লারা পেতাচ্চির সঙ্গে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরদিন মুসোলিনি ও তাঁর প্রেমিকার মরদেহ মিলান শহরের পিয়াতসালে লোরেতো চত্বরে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ দৃশ্য একই সঙ্গে যেমন প্রতীকী বিদ্রোহ ও ঘৃণা, তেমনই ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম রাজনৈতিক সমাপ্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।

বিতর্কিত উত্তরাধিকার

মুসোলিনির উত্তরাধিকার অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, শাসনব্যবস্থা ও ইতালির ইতিহাস ও সমাজে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও বিতর্কিত হয়ে আছে। অনেকে তাঁকে আধুনিক ইতালির একজন দৃঢ় নেতৃত্বের নির্মাতা বলে দেখেন। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক ভয়ংকর একনায়ক; যাঁর ভুল সিদ্ধান্তে ইতালিকে ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

ইতালিতে এখনো কিছু চরম ডানপন্থী দল মুসোলিনির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। বিশেষ করে তাঁর নাতনি আলেসান্দ্রা মুসোলিনি একসময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন ডানপন্থী দল থেকে।

ফ্যাসিবাদ: ইতিহাসের শিক্ষা

ফ্যাসিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়। এটি একটি সামাজিক প্রকল্প, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, গণতান্ত্রিক চর্চা—সবকিছুই রাষ্ট্রের পূজায় বলি দেওয়া হয়। মুসোলিনি এ মতাদর্শকে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন।

ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, নেতার অন্ধ অনুসরণ, যুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদের নামে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ কখনো একটি জাতিকে উন্নতির পথে নিতে পারে না; বরং তা এগিয়ে নিয়ে যায় ধ্বংসের দিকেই।

{তথ্যসূত্র: দ্য ডকট্রিন অব ফ্যাসিজম, বেনিতো মুসোলিনি; রিচার্ড বসওয়ার্থ, মুসোলিনি: আ বায়োগ্রাফি; ক্রিস্টোফার হিবার্ট, মুসোলিনি: দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব ইল দুচ; বিবিসি হিস্ট্রি; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা}

অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে বেনিতো মুসোলিনি (ডানে)
অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে বেনিতো মুসোলিনি (ডানে) ছবি: এক্স থেকে নেওয়া