Thursday, August 29, 2024

টেকসই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পাঁচ মাসব্যাপী সংলাপ করবে সিজিএস

টেকসই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ৫ মাসব্যাপী সংলাপের আয়োজন করবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিস (সিজিএস)। এই সংলাপগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় পর্যায়ের সংলাপের অংশ হিসেবে ঢাকায় মোট ৮টি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ’ শীর্ষক সিজিএস’র সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ।

তিনি বলেন, ‘সিজিএস জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সংলাপের আলোচনা ও নির্দিষ্ট সুপারিশের সারসংক্ষেপ সবার জন্য প্রকাশ করবে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তা সকলের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করবে।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের কাজ জরুরি। রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান, সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বাংলাদেশকে যদি ভবিষ্যতে পুনর্গঠন করতে হয় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র অন্তর্বর্তী সরকার সবকিছু করতে পারবে না। আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা আছে, আসুন সেই ভূমিকা পালন করি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত ৫ই আগস্ট থেকে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো যে মিস ইনফরমেশন ছড়াচ্ছে, সেগুলোর সবচেয়ে বড় জবাব হলো সঠিক তথ্য তুলে ধরা। এখানে দেশের গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।’

সিজিএস জানায়, নতুন সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন ব্যবস্থা সবকিছু সুপরিকল্পিতভাবে রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে। সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।’

গবেষণা সংস্থাটি জানায়, গত ১৫ বছরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নীতিমালা জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতে স্বার্থবাদী একটি নেটওয়ার্ক গঠিত হয়, যারা নিজেদের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঋণ খেলাপিদের বিচার থেকে রক্ষা করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে বিপদাপন্ন করেছে। সরকারের সঙ্গে যুক্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী জ্বালানি খাতের ভর্তুকি পকেটস্থ করেছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।

এসবের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে উল্লেখ করে সিজিএস জানায়, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সংবিধানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গণজাগরণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই আশা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকারের প্রতি বিশাল দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে।

গবেষণা সংস্থাটি আরও জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছেন, দেশবাসীকে অনুরোধ করব, একটা আলোচনা শুরু করতে, আমরা সর্বনিম্ন কী কী কাজ সম্পূর্ণ করে যাবো, কী কী কাজ মোটামুটি করে গেলে হবে। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা দিক-নির্দেশনা পেতে পারি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আলোচনা থেকেই আসবে।

এ প্রেক্ষাপটে সিজিএসের পক্ষ থেকে নেয়া উদ্যোগের লক্ষ্য হলো টেকসই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংলাপের আয়োজন করা। এই সংলাপগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ সংগ্রহ করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা সম্ভব হবে, যা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

এ লক্ষ্যে আগামী ৫ মাসে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সংলাপের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। এ সংলাপগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হবে। আর জাতীয় পর্যায়ে সংলাপের অংশ হিসেবে ঢাকায় মোট ৮টি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সংলাপের বিষয়বস্তুগুলো হচ্ছে-(ক) সংবিধান (খ) মানবাধিকার ও গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিতকরণ (গ) বিচারব্যবস্থা, (ঘ) নাগরিক প্রশাসন, (ঙ) সাংবিধানিক সংস্থাসমূহ, (চ) আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ, (ছ) অর্থনৈতিক নীতিমালাসহ ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক ঋণ (জ) গণমাধ্যম।

এছাড়াও আঞ্চলিক পর্যায়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় চারটি আঞ্চলিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এসব সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবনা ও সুপারিশ উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করতে পারবেন বলেও জানিয়েছে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিস (সিজিএস)।

জাসদ ছাত্রলীগ থেকে যেভাবে জামায়াতের আমির হলেন ডা. শফিকুর রহমান

ডা. শফিকুর রহমান। যিনি দেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির। দশম শ্রেণিতে পড়াকালে জাসদ ছাত্রলীগের হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেছেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক।

মিষ্টভাষী শফিকুর রহমানের অমায়িক ব্যবহার, স্পষ্ট বক্তব্য, নেতৃত্বের দক্ষতা, সর্বোপরি সামাজিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। গত ৫ আগস্ট নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্রই আলোচিত হচ্ছে ডা. শফিকুর রহমানের নাম।

কালবেলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৬৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের জাসদ ছাত্রলীগ থেকে দেশের বৃহৎ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কান্ডারি হয়ে ওঠার গল্প।

গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা যেদিন দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, সেদিনই আলোচনায় আসেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও তার নাম উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নতুন করে সামনে আসেন ডাক্তার শফিকুর রহমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন থেকে শুরু করে মন্দিরসহ সংখ্যালগুদের ঘরবাড়ি পাহারা, সব কাজে সামনের সারিতে দেখা যায় জামায়াতকে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শহিদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অর্থ সহযোগিতা এবং সবশেষ বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য মন জয় করেছে নেটিজেনদের। যেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের বাসায় মেহমান হয়ে এসেছি।’

১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শফিকুর রহমান। মোহাম্মদ আবরু মিয়া ও খতিবুন্নেছা দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় তিনি। তারা তিন ভাই ও এক বোন। ১৯৭৩ সালে স্থানীয় বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় শফিকুর রহমানের। ওই বছরই তিনি যোগ দিয়েছিলেন জাসদ ছাত্রলীগে।

১৯৭৪ সালে ওই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৬ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন শফিকুর রহমান। সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তির পর তিনি পরিচিত হন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে। ১৯৭৭ সালেই যোগ দেন এই সংগঠনে।

পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন সিলেট মেডিকেল কলেজ এবং সিলেট শহর শাখার। ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসাসেবায় আত্মনিয়োগ করেন ডাক্তার শফিকুর রহমান। পাশাপাশি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গেও একাত্ম হন তিনি।

২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর দলের রুকন সম্মেলনে প্রত্যক্ষ ভোটে আমির নির্বাচিত হন তিনি। একই বছর ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী দুই বছর মেয়াদে আমিরে জামায়াত হিসেবে ডাক্তার শফিকুর রহমান শপথ নেন। ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর দ্বিতীয় মেয়াদেও আমির নির্বাচিত হন তিনি।

একনজরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে উল্লেখযোগ্য দায়িত্বে ডা. শফিকুর রহমান।

১৯৮৫ : নির্বাচিত সদস্য, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা, জামায়াতে ইসলামী ১৯৮৬-৮৮ : সেক্রেটারি, সিলেট জেলা জামায়াত ১৯৮৯-৯১ : নায়েবে আমির, সিলেট জেলা জামায়াত ১৯৯১-৯৮ : আমির, সিলেট জেলা জামায়াত ১৯৯৮ : সদস্য, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, জামায়াতে ইসলামী ১৯৯৮-২০০৭ : আমির, সিলেট মহানগর জামায়াত ২০১০ : অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী ২০১১ : সদস্য, নির্বাহী পরিষদ, জামায়াতে ইসলামী ২০১১-২০১৬ : ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী ২০১৭-২০১৯ : সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী ২০২০- অদ্যবধি: আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

১৯৮৫ সালে ডা. আমিনা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ডা. শফিকুর রহমান। তার স্ত্রী পরবর্তীতে অষ্টম জাতীয় সংসদের সদস্য হন। দুই মেয়ে ও এক ছেলের বাবা ডা. শফিকুর রহমান। দুই মেয়েই জড়িত চিকিৎসা পেশায়। একমাত্র ছেলেও পড়ছেন এমবিবিএস শেষ বর্ষে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা সেমিনারে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অভিযান, মসজিদে লুকানো পাঁচ ফিলিস্তিনি যোদ্ধা নিহত

দখল করা পশ্চিম তীরের তুলকারেম শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে পাঁচ ফিলিস্তিনি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। ওই ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা একটি মসজিদের ভেতর লুকিয়ে ছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে।

গতকাল বুধবার ভোর থেকে পশ্চিম তীরে অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, অভিযান এখনো চলছে। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে তুলকারেম, জেনিন ও জর্ডান ভ্যালির বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন শত শত ইসরায়েলি সেনা।

ইসরায়েল বলেছে, তুলকারেম মসজিদে নিহত পাঁচ ফিলিস্তিনি যোদ্ধার একজন মুহাম্মদ জাবের। তিনি আবু সুজা নামে পরিচিত। তুলকারেম শহরের কাছে নুর শামস শরণার্থীশিবিরে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের একটি নেটওয়ার্কের প্রধান ছিলেন জাবের।

রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি জাওয়ালের নেটওয়ার্কে পুরোপুরি বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরের দুটি প্রধান টেলিযোগাযোগ কোম্পানির একটি জাওয়াল।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, গতকালের অভিযানে কমপক্ষে ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

আজ জেনিনে ফাঁকা সড়কের ওপর বুলডোজার দেখা গেছে। আকাশে ড্রোন ওড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শহরের প্রধান হাসপাতালের সামনে ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তাঁরা অ্যাম্বুলেন্সে তল্লাশি চালাচ্ছেন।

গতকাল ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী মাটির ঢিবি দিয়ে হাসপাতালের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে যেন ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা আশ্রয় নিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হাসপাতালে ঢোকার সময় অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

হামাসের সশস্ত্র শাখা, ইসলামিক জিহাদ ও ফাতাহর বিভিন্ন অংশ গতকাল আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে। এসব বিবৃতিতে তারা বলেছে, তাদের বন্দুকধারীরা জেনিন, তুলকারেম ও জর্ডান ভ্যালির শহর ফারায় ইসরায়েলি সামরিক যানের ওপর বোমা হামলা চালাচ্ছে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ইসরায়েলের দাবি, ওই হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন। জিম্মি করা হয়েছে ২৫০ জনকে। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, হামলায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বেড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে অভিযান চালিয়ে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৬৬০ জনের বেশি যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

মানুষ নয়, আওয়ামী লীগের পক্ষে ফেসবুকে মন্তব্য করেছিল ‘বট’ by সামছুর রহমান

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিরোধী দলের ফেসবুক পেজে নানান মন্তব্য করা হয়েছে ভুয়া বা ফেক ফেসবুক প্রোফাইল থেকে।

আর এসব ফেসবুক প্রোফাইল পরিচালিত হয়েছে বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এমন ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক প্রোফাইলের একটি বট নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে গবেষণায়।

তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ ডিসমিসল্যাব গবেষণাটি করেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশ করার কথা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক প্রোফাইলগুলো থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৯৭টি পোস্টে সমন্বিতভাবে ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন পোস্টে একই মন্তব্য করেছে। একই মন্তব্য বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছে।

বট অ্যাকাউন্ট ও এর করা মন্তব্যের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ এই গবেষণাটি করা হয়েছে মোট ১৯৭টি পোস্টে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।

বট নেটওয়ার্ক মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যেখানে বিশেষ সফটওয়্যারের (বট) মাধ্যমে কাজ করা হয়। বট নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পুরোপুরি না হলেও অন্তত আংশিকভাবে কম্পিউটারভিত্তিক বা স্বয়ংক্রিয়। তারা একটি তালিকা থেকে নির্দিষ্ট ‘কি-ওয়ার্ড’ বা শব্দ ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট বাছাই করে। আরেকটি তালিকা থেকে বেছে নিয়ে মন্তব্য পোস্ট করে। এই প্রক্রিয়ায় কোথায় কী মন্তব্য পোস্ট করা হচ্ছে, সেখানে মানুষের নজরদারি নেই বললেই চলে।

গবেষণায় দেখা যায়, বট নেটওয়ার্কটি সক্রিয় হয় গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ দিয়ে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বট নেটওয়ার্কটি ঘুরেফিরে ৪৭৪টি একই ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করেছে।

মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে তৈরি করা। কিন্তু বট নেটওয়ার্কটি নির্বাচনের পরেও একই মন্তব্য পোস্ট করে গেছে। বট নেটওয়ার্কটি লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ও তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজগুলোকে।

গবেষণায় ভুয়া প্রোফাইলগুলোর মধ্যে একধরনের সংযোগ থাকার চিত্র পাওয়া যায় দুটি নির্দিষ্ট পেজে লাইক দেওয়ার প্রবণতা থেকে।

প্রোফাইল ‘লকড’ নেই—এমন ১ হাজার ১২৪টি অ্যাকাউন্টের ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেগুলো ‘বাংলার খবর’ ও ‘আওয়ামী লীগ মিডিয়া সেল’—এই দুটি পেজের কোনো একটিকে বা দুটিকেই অনুসরণ (ফলো) করে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ মিডিয়া সেল পেজটি আর পাওয়া যাচ্ছে না।
বট নেটওয়ার্কের খোঁজ

গত ২১ জুন ‘কালার প্রিন্টারে ছাপানো প্রতিটি পৃষ্ঠায় থাকে অদৃশ্য কোড?’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয় অনলাইন গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও এর ফেসবুক পেজে। উভয় ক্ষেত্রে পোস্টের নিচে একটি মন্তব্য ছিল—‘এবারের নির্বাচন স্বচ্ছ হবে। আগামী নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। আর এবার ভোট চুরি করতে পারবে না বলেই বিএনপি নির্বাচনে আসতে ভয় পাচ্ছে আর এত কাহিনি করছে।’

নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস পরে এসেও ‘ব্যবহারকারীরা’ এই পোস্টের নিচে বিএনপির সমালোচনা, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল ও সুষ্ঠুভাবে হওয়ার আশাবাদ, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবিসহ নানান রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে একের পর এক মন্তব্য করে।

এমন মন্তব্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের একটি বট নেটওয়ার্কের সন্ধান পায় ডিসমিসল্যাব। নেটওয়ার্কটি মাত্র ছয় মাসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিরোধী দলের ফেসবুক পেজের ১৯৭টি পোস্টে সমন্বিতভাবে ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য করেছে।

গবেষণার জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সেই ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রতিটি মন্তব্য সংগ্রহ করে ডিসমিসল্যাব। সেই তালিকা ধরে গুগলে সার্চ দিয়ে একই মন্তব্য রয়েছে—এমন আরও ১৯৬টি পোস্ট বের করা হয়। সেসব পোস্ট থেকে আবার প্রতিটি মন্তব্য নিয়ে ৩৫ হাজার মন্তব্যের একটি ডেটাবেস তৈরি করা হয়। এই ডেটাবেস থেকে বট অ্যাকাউন্ট ও এর করা ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক মন্তব্য আলাদা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, বট নেটওয়ার্কটি সাধারণত রাজনৈতিক পোস্টেই মন্তব্য করে। ফেসবুক পোস্টে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক ‘কি-ওয়ার্ড’ বা শব্দ পেলে তারা সেই পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো কখনো তাদের ভুল হয়। যেমনটি হয়েছে ‘ইসি’ (নির্বাচন কমিশন) শব্দের ক্ষেত্রে। কালার প্রিন্টার-সংক্রান্ত খবরটির সারাংশে ‘মেশিন আইডেনটিফিকেশন কোড (এমআইসি) ’-এর উল্লেখ ছিল। সেখানে ‘ইসি’ শব্দাংশ দেখেই বট নেটওয়ার্কটি শ খানেক মন্তব্য করে।

প্রোফাইলগুলো কেন ভুয়া

ফেসবুকের একটি প্রোফাইল আসল নাকি নকল, তা যাচাইয়ের জন্য সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বট প্রোফাইলে অতিরিক্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। নিজের সম্পর্কে (অ্যাবাউট সেকশন) পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয় না। প্রোফাইলে পোস্টসংখ্যা হয় খুব কম, নয়তো খুব বেশি। প্রোফাইল ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়। বন্ধুসংখ্যা সচরাচর কম হয়।

ডিসমিসল্যাব ১ হাজার ৩৬৯টি প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস, বন্ধুসংখ্যা, পোস্ট করার প্রবণতা, পরিচিতি তথ্য ও প্রোফাইল ছবি পর্যালোচনা করেছে। দেখা গেছে, বেশির ভাগের প্রোফাইল ‘লকড’ বা ‘প্রাইভেট’ করা। সেগুলো সক্রিয় হয়েছে নির্বাচনের আগে। প্রোফাইল ছবি নেই অথবা চুরি করা। তাদের বন্ধুসংখ্যা খুব কম বা নেই। বেশির ভাগ অ্যাকাউন্ট দুটি নির্দিষ্ট পেজকে ফলো করে। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলো রাজনৈতিক বটের প্রচলিত সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়।

প্রোফাইলগুলোর মধ্যে ২৪৭টি ‘লকড’ অবস্থায় ছিল। বাকি ১ হাজার ১২২টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রোফাইল ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। অর্থাৎ, ছবিগুলো অন্যের। কোথাও কোথাও একই ছবি বিভিন্ন প্রোফাইলে ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার ১ হাজার ৩৬৯টি প্রোফাইলের ৭৭ শতাংশ নারীদের নামে। এই নামেও রয়েছে অদ্ভুত মিল। নারীদের প্রোফাইলের ২৪ শতাংশের নাম ‘আক্তার’ দিয়ে শেষ হয়েছে। যেমন—দিয়া আক্তার, রিয়া আক্তার, লিজা আক্তার, লিমা আক্তার, লিসা আক্তার ইত্যাদি।

পুরুষদের প্রোফাইলগুলোর একটি বড় অংশের শেষ নাম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে ‘আহমেদ’। যেমন—নাঈম আহমেদ, নাদিম আহমেদ, কামিল আহমেদ, মাহিন আহমেদ, সামির আহমেদ ইত্যাদি।

নারী-পুরুষ উভয় ধরনের প্রোফাইলের ৯০ শতাংশ নামই দুই শব্দের। কিছু ক্ষেত্রে একটি নামকেই ভেঙে দুই শব্দ করা হয়েছে। যেমন—রি পা, মি না, লি জা, যু থি, লাম ইয়া, মু না, নে হা, জোস না ইত্যাদি।
নির্বাচনের আগে সক্রিয় হয় অ্যাকাউন্টগুলো

কোনো বট প্রোফাইল প্রথম কবে কনটেন্ট বা আধেয় পোস্ট করেছে, সেই সময়কে সক্রিয়তার নির্দেশক হিসেবে ধরা হয় গবেষণায়।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় গত ৭ জানুয়ারি। আর ফেক প্রোফাইলগুলো সক্রিয় হয়েছে মূলত গত বছরের জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে।

ফেক প্রোফাইলগুলোর অর্ধেকই সক্রিয় হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে। শুধু নভেম্বরের ২৩ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে প্রথমবারের মতো পোস্ট করে ৩৪৪টি অ্যাকাউন্ট। এর আগে ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৪০টি প্রোফাইল সক্রিয় হয়।
কোথায় কী মন্তব্য

গবেষণায় রাজনৈতিক মন্তব্য পাওয়া গেছে ২১ হাজার ২২১ টি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র বা ইউনিক মন্তব্য ছিল মাত্র ৪৭৪ টি। অর্থাৎ বটগুলো বিভিন্ন পোস্টে ঘুরে ফিরে এই ৪৭৪টি মন্তব্যই করেছে। বটগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

যেমন—রিয়া আক্তার নামের একটি প্রোফাইল থেকে গত ছয় মাসে বিভিন্ন পোস্টে ১৩৮টি মন্তব্য করা হয়েছে। নির্বাচনের অনেক পর গত ১৮ মে এই প্রোফাইল থেকে একটি মন্তব্য করা হয়।

বিভিন্ন সময় মোট ৯৬টি পোস্টে একই মন্তব্য করা হয়েছে দিয়া আক্তার, রাইসা, রাফিয়া আক্তার, নাহিদ ও নিপাসহ মোট ১০৯টি বট প্রোফাইল থেকে।

বট নেটওয়ার্কটি মূলত ৪২টি ফেসবুক পেজকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, যেগুলো মূলত বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ পেজ প্রথম সারির ও পরিচিত গণমাধ্যমের। এককভাবে ৩১ শতাংশ পেজ হলো বিএনপির বা বিএনপি-সংশ্লিষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের পেজকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।

আধেয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, বট মন্তব্যগুলোর ৮৬ শতাংশেই বিএনপি ও দলটির নেতা-নেত্রীদের সমালোচনা বা তাদের প্রতি আক্রমণ করা হয়েছে। যেমন—‘আগুন-সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপি। এদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি’ বা ‘আত্মসাৎ, অর্থপাচার করে বাংলাদেশকে লুটপাট করার হাওয়া ভবন করার চক্রান্ত করছে বিএনপি’। বাকি ১৪ শতাংশ মন্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা এবং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ বা সুষ্ঠু করার আহ্বান।

বটের বোকামি

নির্বাচন হয় গত ৭ জানুয়ারি। কিন্তু ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে বা জুন মাসেও বট প্রোফাইলগুলো থেকে ‘আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে তৈরি করা। কিন্তু তা নির্বাচনের পরেও নির্বিচারে পোস্ট করা হয়েছে।

বট প্রোফাইল থেকে অপ্রাসঙ্গিক পোস্টেও রাজনৈতিক মন্তব্য করা হয়েছে। এসব পোস্টের প্রতিটির বিবরণেই কোনো না কোনোভাবে ‘ইসি’ শব্দটি আছে। যেমন—আইসিইউ, আইসিসি, রইসি, আইএফআইসি, ওআইসি, আইসিটি, ডায়ালাইসিস বা ক্রাইসিস।

বট নেটওয়ার্কটি তার লক্ষ্যবস্তু পেজে যেখানেই ‘ইসি’ শব্দাংশ পেয়েছে, সেটি প্রাসঙ্গিক হোক আর না হোক, সেখানেই সমন্বিতভাবে রাজনৈতিক মন্তব্য করেছে। গবেষণায় বলা হয়, এটি ইঙ্গিত করে, নেটওয়ার্কটি কোন পোস্টে মন্তব্য করবে, সেটি বাছাইয়ের জন্য কি-ওয়ার্ড-নির্ভর একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
সংঘবদ্ধ অপপ্রচারের উদাহরণ

ডিসমিসল্যাবের গবেষণা দেখাচ্ছে, বট নেটওয়ার্কের বিস্তার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নির্ভুল তথ্য ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের নেটওয়ার্ক অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গিকে দমন করতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রচার করার মাধ্যমে জনসাধারণের আলোচনাকে বিকৃত করতে পারে। এই কারসাজি জনমতের মেরুকরণ করতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে।

বট নেটওয়ার্কটি কম্পিউটারভিত্তিক অপপ্রচারের একটি উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের ফিলিপ মেরিল কলেজ অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইনফরমেশন স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক নাঈমুল হাসান। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ ও কম্পিউটারভিত্তিক টুলের সাহায্যে সংঘবদ্ধভাবে মূলত এই কাজগুলো করা হচ্ছে।

নাঈমুল হাসান আরও বলেন, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে আরও উন্নত হবে। ফলে একই প্রোফাইল ছবি বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না। এআই দিয়ে নিমেষেই অনেকগুলো প্রোফাইল ছবি তৈরি হয়ে যাবে, যাতে সংঘবদ্ধ অপপ্রচারমূলক আক্রমণগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হয়। তাই এখন থেকেই এই বিষয়গুলো নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

সংবিধান নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে তিনটি অপশন খোলা by ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

গত ১৫ বছরে পতিত স্বৈরশাসক নিজে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ও চূড়ান্ত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠতে সংবিধানকে কাঁটাছিড়া করে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল যে একজন নাগরিক চাইলেও সংবিধানটি সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলতে পারবেন না সেটা না ভেঙে (one cannot follow the constitution properly without breaking it)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও দায়িত্ব নিয়ে পড়েছেন বেশ ঝামেলায়। রয়েছে প্রশ্নও। তারাও দৃশ্যত: সংবিধানের কিছু অংশ মানছেন বা মানতে পারছেন আবার অন্য অংশ কিংবা বহু অংশ মানছেন না বা মানতে পারছেন না।

সংবিধান যে কী অবস্থায় আছে তা কয়েকটি উদাহরণ দিলে পরিস্কার হবে।

প্রথমত: ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ না ভেঙে নির্বাচন করা যাবে যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিরল ও নজীরবিহীন এবং এক সাথে ৩০০+৩০০ মোট ৬০০ এমপি স্বল্পসময়ের জন্য হলেও নির্বাচিত থাকেন একসাথে! এই বিধানের প্র্যাকটিস পতিত সরকার করেছেনও।

দ্বিতীয়ত: ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, রদ, ষড়যন্ত্র ও সর্বোচ্চ শাস্তির কথা এমনভাবে লিখে সন্নিবেশিত করা হয়েছে যে পতিত সরকার বা তাদের কোনো দোসর যদি কোনোভাবে ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে বর্তমান সরকারের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে।

তৃতীয়ত: ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু স্পিকার যদি অসমর্থ বা অনুপস্থিত হন তাহলে কে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এই বিষয়টি সংবিধান অনুধাবন (contemplate) করেনি।

চতুর্থত: ৪৭ অনুচ্ছেদে অনেক বিধান আছে যা সরাসরি মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদের সরাসরি বিপরীত ও সাংঘর্ষিক।

পঞ্চমত: সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সিংহভাগ সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সংবিধানের contradiction and inconsistency-এর ব্যাপারে আরো বহু উদাহরণ দেয়া যাবে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শতাব্দির সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ট গণ-অভ্যূত্থান থেকে জন্ম নেয়া বর্তমান সরকারকে সংবিধান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে। সংবিধান নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে তিনটি অপশন খোলা। চলুন দেখি এবার অপশনগুলো কী কী।

প্রথম অপশন: গত ১৫ বছরে কাঁটাছেড়া করা সংবিধান ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান জাতিকে উপহার দেয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে ৩০০ আসনে MCA (Member of Constituent Assembly) নির্বাচিত করে Constituent Assembly গঠন করা। এটির একমাত্র ও কেবলমাত্র কাজ হবে সংবিধান রচনা ও গৃহিত (adopt) করা। এর সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ, স্থায়িত্ব ও চলমান কাজের বৈধতার জন্য এক সাথে গণভোটের আয়োজনও করা যেতে পারে।

আমাদের সংবিধানের শুরু ও যাত্রা ছিল গলদপূর্ণ। ১৯৭২ সালের সংবিধানকে adopt করার জন্য ১৯৭০ সালের পাকিস্তান আমলের Legal Framework Order (LFO) এর অধীনে নির্বাচিত এমপি দ্বারা গঠন করা হয় Constituent Assembly। এখন প্রশ্ন হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে খোদ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়া দেশের সংবিধান রচনা ও অনুমোদন সেই পাকিস্তানের সংবিধান ও LFO অধীনে নির্বাচিত এমপিরা করেন কিভাবে? এই যৌক্তিক প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন বাংলাদেশের সাবেক মেধাবী প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে ঢাকার এক সেমিনারে।

দ্বিতীয় অপশন:

৫০/৬০ জন বিশেষজ্ঞ (সংখ্যা কমবেশি হতে পারে) নিয়ে সংবিধান প্রনয়ন কমিটি গঠন করা যাদের একমাত্র দায়িত্ব হবে নতুন একটি সংবিধান ড্রাফট করা। এই নতুন সংবিধান সুষ্ঠু, অবাধ ও সত্যিকার অংশগ্রহণমূলক (participatory) গণভোটের মাধ্যমে গৃহিত হবে। একই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ, স্থায়িত্ব ও চলমান কাজের বৈধতার জন্য গণভোটের আয়োজনও করা যেতে পারে, যেভাবে বৃটেনে একদিনে একাধিক নির্বাচন হয়।

তৃতীয় অপশন:
১/১১ সরকারের মতো এই সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের উপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ ১/১১ সরকারের মতো যতদিন থাকবে থেকে যাবার পর পরবর্তী সরকার এসে তাদের মেয়াদ, চলমান কার্যাবলী ও সংবিধান পরিবর্তনের বৈধতা দিবে।
প্রথম অপশন বা দ্বিতীয় অপশনে যাওয়া হবে উত্তম। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর সফল গণ-অভূত্থানের মাধ্যমে আসা জাতির জন্য এমন সুযোগ আর নাও আসতে পারে। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাতিকে নতুন একটি সংবিধান উপহার দেয়া সময়ের দাবি। নতুন সংবিধান রচনা করা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক সরকার তাদের স্বার্থ ছাড়া সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনে হাত দিবে না।

অপরদিকে অনেক সময় রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছা ও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও আমলাদের প্রচণ্ড চাপে সরকার সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতে সরকার গঠন করেন। ঐ সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের অধীনে বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করতে চাইছিলেন। ঠিক ঐ সময় বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া আমলাদের চাপে ও তদবিরে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা প্রতিথযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার ইসতিয়াক আহমদকে ফোন করে অনুরোধ করেন যেহেতু আমাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে আছে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়টি, এটা আমরা করবো। আমাদের জন্য রেখে দিন। বিপুল ভোটে নির্বাচিত চারদলীয় জোটের নেত্রী যিনি বিশাল মেন্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন তাঁর প্রতি সম্মান রেখে তাদের জন্য রেখে দিয়েছিলেন আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার ইসতিয়াক আহমদ। ইতিহাস সাক্ষী আবার সেই আমলাদের চাপে ও তদবিরে বেগম জিয়ার সরকার বিচার বিভাগের আর পৃথকীকরণ করতে পারেন নি। বেশ ক’বছর আগে লন্ডনে এক সেমিনারে এ তথ্যটি প্রকাশ করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল।

তৃতীয় অপশনে গেলে তা হবে বিপজ্জনক ও তাতে ঝুঁকি বেশি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জির বই থেকে স্পষ্ট যে, ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন (controlled election)। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকারের নিরাপদ প্রস্তানের (safe exit) জন্য ও তাদের মেয়াদ ও চলমান কর্মের বৈধতার জন্য একটি দলের সাথে পর্দার আড়ালে গোপন আঁতাতের ফলে দুই-তৃতীয়াংশ আসন আনতেই হতো। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাবে কি না এই নার্ভাস থেকে বেশি চাপ দেয়ায় বিএনপির আসন একেবারে ৩০ এর কোটায় নিয়ে আসা হয়েছিল।

পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার পাবলিকলি বলেছেন আরো একটু ম্যাকানিজম করলে বিএনপি বিরোধী দলের আসনেও বসারও যোগ্যতা হারাতো। অথচ বিএনপি ৩০ এর কোটার পরিমাণ আসন পাবার মতো দল ছিল না। ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল ম্যানেজড ইলেকশন তার আরেকটি প্রমাণ হলো ব্রিগেডিয়ার (অব:) বারীর সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। তিনি তার সাক্ষাৎকারে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন - ১/১১ এর বিভিষিকাময় দিনগুলোর ঐ সময় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত সাব-জেলে কিভাবে মেজর জেনারেল আমীন ও ড. গওহর রিজভী (সমঝোতার জন্য) নীরবে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করতেন! প্রণব মূখার্জির বই এবং ব্রিগেডিয়ার (অব:) বারীর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকার হচ্ছে সমর্থনমূলক প্রমাণ (corroborative evidence)।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিৎ অবিলম্বে সংবিধান সম্পর্কে তারা কী করতে যাচ্ছেন তা জাতিকে বিস্তারিতভাবে জানানো। সফল গণ-অভ্যূত্থান থেকে মেন্ডেটপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধান নিয়ে যা-ই করবেন জনগণ তাদেরকে overwhelming সাপোর্ট করবে। অযথা দেরি করা ঠিক নয়। দেরি করলে গণ-অভ্যূত্থান থেকে সৃষ্ট momentum আস্তে আস্তে হ্রাস পাবে। জাতি সংবিধান নিয়ে অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। এই ধোঁয়াশাই সৃষ্টি করে গুজব, কানকথা ও উৎকন্ঠা। যে যাই বলুক, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে মেরামত ও দেশকে অবারিত সম্ভাবনার পথে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের দরকার নতুন, যুগোপুযোগী আধুনিক ও গতিশীল সংবিধান।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

ভারতে হাসিনার অবস্থান কিসের বার্তা দেয়? -এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনা তার মিত্র দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী হাসিনার যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সম্ভবত তিনি অদূর ভবিষ্যতে ভারতেই থাকতে বাধ্য হবেন। কেননা শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, তার মায়ের আপাতত ভারত ত্যাগের কোনো ইচ্ছা নেই। এটা মনে হচ্ছে যে, হাসিনা তার দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শ্বাসন টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিবিল্পবের কৌশল নিচ্ছেন। ২৭ আগস্ট এশিয়া টাইমস ‘হাসিনা’স লাস্ট স্টান্ড লিনস অন ইন্ডিয়া অ্যান্ড প্রো-হিন্দু মিসইনফরমেশন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং তার হিন্দুত্ববাদী সমর্থকদের সাথে জড়িত বলেই মনে হচ্ছে। তিনি যদি পুনরায় ক্ষমতা দখল করতে পারেন তাহলে বাংলাদেশে ভারতের জন্য সম্ভাব্য বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার সহজ হয়ে দাঁড়াবে। হাসিনা এবং ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে তা উপলব্ধি করা অপরিহার্য। দিল্লি সরকার ধারাবাহিকভাবে হাসিনা এবং তার আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে রাশিয়া ও বেলরুশের মতো একটি পৃষ্ঠপোষকতাপূর্ণ সম্পর্কে রূপান্তর করেছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে হাসিনা নিজের অধীনে নির্বাচন দেয় এবং ক্ষমতায় আসে। সেসময় প্রধান বিরোধীদল বিএনপি হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে চরম বিতর্ক থাকলেও ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বিএনপি-এর নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্বুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। ওই নির্বাচনটি প্রতারণামূলক ভোট হিসাবে স্বীকৃত তবে সেটাকে বৈধতা দেয়ার জন্য ভারত তাদের কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করে।

২০১৮ সালের নির্বাচনেও হাসিনার আওয়ামী লীগ নিজেদের নিয়ন্ত্রীত নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটি ভোটে জয় লাভ করে। হাসিনার এমন আচরণে তখন উত্তর কোরিয়ার কথা স্মরণ হয়। প্রায় ৯৫ শতাংশ আসনে নিজেদের ক্ষমতা পোক্ত করেছিলেন হাসিনা। সরকারি আমলা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষালম্বন করায় আওয়ামী লীগের ওই বিজয় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবীহিন প্রতারণামূলক নির্বাচন ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

নির্বাচনে জালিয়াতি করার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিন্দার ঝড় উঠলেও বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারই প্রথম হাসিনাকে অভিনন্দন জানায়। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রদান করার মাধ্যমে তার শাসনকে শক্তিশালী করেছিল। ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, সেই সময়ে ঘটে যাওয়া নির্লজ্জ ভোট কারচুপি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিল ভারত। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে পশ্চিমারা হাসিনাকে সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু দিল্লি বরাবরের মতোই হাসিনার পক্ষেই কাজ করতে থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া প্রশমিত করতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে ভারত। এর মাধ্যমে দিল্লি সরাসরি আরেকটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

২০২২ সালে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন। তিনি সেসময় বলেছিলেন, তিনি আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে ভারতকে অনুরোধ করেছিলেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার এক বিবৃতিতে বলেছেন, দিল্লি আছে আমরাও আছি (তিনি দিল্লির সমর্থনের দিকে ইঙ্গত করেছিলেন)। এছাড়া তিনি এ বিষয়টিও নিশ্চিত করেন যে আওয়ামী লীগের আধিপত্যের প্রতি সাংবিধানিক যে কোনো হুমকি প্রতিরোধে ভারত তাদের আশ্বস্ত করেছে।

সম্প্রতি হাসিনার ছেলে জয় বলেছেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দেবে ভারত। কেননা হাসিনার আকস্মিকভাবে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ায় ভারতীয় আধিপত্যবাদী রাজনীতি বড় একটি ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কয়েক দিন বাংলাদেশ কার্যক্ষম সরকারহীন হয়ে পরে এবং বেশ কিছু নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়।

গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় কার্যালয় এবং থানাগুলোকে দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং চাঁদাবাজীর আখড়ায় পরিণত করেছিল। যাতে বছরের পর বছর অন্যায় এবং জুলুমের শিকার হওয় জনগোষ্ঠীর ভেতর এসব স্থানের ওপর আক্রোশ তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়টিই জনতাকে থানা এবং কার্যালয়ের ওপর সহিংস হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সহিংসতায় তারা শতাধিক থানা ও দলীয় কার্যালয় জ্বালিয়ে দেন।

শেখ হাসিনা দিল্লির একজন কট্টর সমর্থক যা এখন আনুগত্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূলত এ কারণেই ভারত ও বাংলাদেশ তাদের জনগণের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি ভালো বিষয় হচ্ছে, ভারতে এমন কণ্ঠস্বরও আছে যারা এ বিষয়গুলো স্বীকার করে এবং বাংলাদেশি জনগণের সাথে দৃঢ়ভাবে সংহতি প্রকাশ করে। অস্থির পরিস্থিতির এড়াতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং নীতিগত পদ্ধতির আহ্বান জানায় তারা।

নামে-বেনামে প্রভাবশালীদের আত্মসাৎ করা ঋণের হিসাব হচ্ছে

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগী শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী  ও প্রভাবশালী ব্যক্তি নামে-বেনামে কতো টাকা ঋণ আত্মসাৎ করেছেন, তার হিসাব করা হচ্ছে। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং তা বিদেশে পাচার করেছেন, যার সঠিক পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ চলমান। আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ লাখ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ না করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ধরনের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় ইতিমধ্যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (জিআইবি), ইউনিয়ন ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ব্যাংকগুলোর নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আত্মসাৎ হওয়া অর্থের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করা হবে এবং তাদের মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ নির্ণয়ের লক্ষ্যে নিরীক্ষা (অডিট) কার্যক্রম শুরু করা হবে। অর্থ আত্মসাৎকারী ব্যক্তিদের বিচারের প্রতি সরকারের কঠোর মনোভাবের ইঙ্গিত করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহায়তা নিয়ে আত্মসাৎকারীদের স্থানীয় সম্পদ অধিগ্রহণ এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু হয়েছে। অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা চেয়ে ইতিমধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছে সরকার। শিগগিরই ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা হবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে আরও জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যাংকে তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করবে কমিশন।

এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনের জন্য ছয় মাসের মধ্যে একটি বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের লক্ষ্য হলো সব আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপালনে সক্ষম একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলা। তবে এ উদ্দেশ্য সফল করতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়, আন্তর্জাতিক কারিগরি সহায়তা ও অর্থের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার অর্থ আত্মসাৎকারীদের দেশি-বিদেশি সম্পদ অধিগ্রহণ এবং বিদেশ থেকে ফেরত এনে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর এই পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কার সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে সরকার বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

কানাডাকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান: প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে পুনর্গঠনে সহায়তা করার জন্য কানাডাকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার লিলি নিকোলস বুধবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এ আহ্বান জানান। প্রফেসর ইউনূস সে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং উন্নয়ন সংস্থাসহ কানাডার সঙ্গে তার তার দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে তার সরকারের কানাডার সহায়তা প্রয়োজন। আমাদের বড় বিনিয়োগ দরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে একটি অর্থনীতি পেয়েছে, যেটি বিপুল পরিমাণ ঋণের ভারে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। তিনি বলেন, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো অর্থনীতি ঠিক করা। সরকার পূর্ববর্তী শাসনামলে ভেঙেপড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পুনরুদ্ধার করছে এবং শাসনে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনছে।

দেশ পুনর্গঠনে সহায়তা করতে প্রস্তুত ফ্রান্স: বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে ফ্রান্স। গতকাল বিকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মেরি মাসদুপুই ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তাকে সুবিধাজনক সময়ে ফ্রান্স সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে নিহত ছাত্র ও জনতার মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করেন। ড. ইউনূস বলেন, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। এটি একটি বড় কাজ। তবে আমরা এটিকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছি। আমরা যদি সুযোগটি কাজে লাগাই না, তাহলে এটি একটি বড় ব্যর্থতা হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণ যতদিন চাইবে ততদিন থাকবে।

আসিয়ানের সদস্য হতে মালয়েশিয়ার সমর্থন চেয়েছেন ড. ইউনূস:
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতি সংস্থা (আসিয়ান) সদস্য হতে মালয়েশিয়ার সমর্থন চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ আসিয়ান ও সার্কের মধ্যে সেতু হতে পারে। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ হাশিম তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলে তিনি এ সহায়তা কামনা করেন। হাজনাহ হাশিম বলেন, কুয়ালালামপুর আসিয়ানের পরবর্তী চেয়ার হতে যাচ্ছে এবং তিনি আসিয়ান সদস্যপদ সংক্রান্ত বিষয়ে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে ড. ইউনূসের বার্তা পৌঁছে দেবেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করবে। আমরা আপনার ওপর বিশ্বাস করি। আমরা আপনাকে শুভ কামনা জানাই।

একই ব্যক্তি সরকার প্রধান ও দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না -টিআইবি’র প্রস্তাব

সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একই ব্যক্তি যেন একইসঙ্গে সরকার প্রধান (প্রধানমন্ত্রী), দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা থাকতে না পারেন সেই প্রস্তাব দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সেইসঙ্গে একজন ব্যক্তি  যেন দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন সেই প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্পিকারকে সংসদের অভিভাবক হিসেবে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের (অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট ছাড়া) সমালোচনা করা ও দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া এবং রাজনৈতিক দলে দলীয় প্রধানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও পরিবারতন্ত্র বিলোপ করার প্রস্তাব দিয়েছে টিআইবি। গতকাল ‘নতুন বাংলাদেশ: গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে টিআইবি মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। এই রূপরেখায় দলীয় প্রধানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও পরিবারতন্ত্র বিলোপ করতে হবে এবং দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে তরুণ, নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিচার বিভাগে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ ক্ষমতায়িত নিজস্ব সচিবালয় স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে। উচ্চ ও অধস্তন আদালতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসহ সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বাধীন সচিবালয়ের ওপর ন্যস্ত করতে হবে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে বিচারপতি অপসারণের এখতিয়ার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করতে হবে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন, অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য ঢেলে সাজাতে হবে।

সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেকোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বন্ধ করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কার্যক্রমের ওপর গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ ও নজরদারি বন্ধ করতে হবে।

‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন-২০১৬’-এর ধারা ১৪ এবং ‘আয়কর আইন ২০২৩’-এর ধারা ২ (৩১চ) বাতিলের সুপারিশ করে টিআইবি বলেছে, এই ধারাগুলো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বিশেষ করে মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস্‌ অ্যাক্ট-১৯২৩’ বাতিল করার প্রস্তাব করে সংস্থাটি বলেছে, সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার চর্চা বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে পুনর্গঠন করতে হবে এবং প্রকৃত গণমাধ্যম হিসেবে পেশাগত সক্ষমতা ও সংস্কৃতি বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অর্থ পাচার রোধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে সম্পৃক্ত করে স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

টিআইবি’র প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে খসড়া ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন’-এ প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠন করতে হবে। বহুমুখী মানবাধিকার হরণের হাতিয়ার ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) বিলুপ্ত করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে ঋণ জালিয়াতি, প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবি সরকারকে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে এসব সুপারিশ তৈরি করেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যদিয়ে নজিরবিহীন রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটে। একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের জায়গায় আরেকটি কর্তৃত্ববাদী শাসন যেন না আসে সেদিকে নজর দিতে হবে। তা না হলে ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা পূরণ হবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ছাত্র-জনতার মূল প্রত্যাশা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার উপযোগী রাষ্ট্রকাঠামো ও পরিবেশ তৈরি করা।

তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিগত সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি বলে অর্থ ফেরত আসেনি। অন্তর্বর্তকালীন সরকারের জন্য আজ যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তা পূরণ করতে হলে তাদের কতোটুকু সময় লাগবে সেটা বলা সম্ভব নয়। সেটা তারা নির্ধারণ করতে পারবেন। প্রত্যাশা পূরণের যে জনরায় নিয়ে এই সরকার এসেছে, তার জন্য যতটুকু সময় দরকার তা তাদের দেয়া উচিত।

হত্যা মামলায় হুকুমের আসামি করা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নজিরবিহীন যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এটা এড়িয়ে যেতে পারে না। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের তালিকা সংগ্রহের কাজ শুরু করা দরকার। এ বিষয়ে জোরোলো নজর দেয়া উচিত। সরকার জাতিসংঘের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিশ্চিত করেছে। তাদের আলোচনায় মনে হয়েছে, এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, কারা দায়ী, তা দ্রুত চিহ্নিত করে নিশ্চিত করা হোক।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থান থেকে যারা লাভবান হয়েছেন, তারা জমি দখলের মতো দখলদারির দিকে চলে গেছেন। বিভিন্ন ধরনের অসমতাতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারারও বিকাশ হচ্ছে, এটাও আশঙ্কাজনক। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র ২০ দিন। এত দ্রুত মূল্যায়ন করা যায় না। ধ্বংসস্তূপের জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে চর্চা ছিল, তার পরিবর্তন এখনো হয়নি। চট করে পরিবর্তন আশাও করা যায় না। আদালতে অরাজকতা দেখা যাচ্ছে। যে প্রক্রিয়ায় মামলা করা হচ্ছে তা হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য করা হচ্ছে কিনা, দেখা দরকার।

‘বাচ্চারা শুধু ভাত ভাত করে- আমি ভাত পামু কই’

সাবিনা ইয়াসমিনের সংসারে শাশুড়ি, স্বামী ও চার ছেলেমেয়ে আছে। বন্যার পানিতে বাড়ি ঘর ডুবে যাওয়ার পর একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। গত আটদিন সাবিনার চুলায় রান্না হয় না। ছেলেমেয়েরা মায়ের কাছে শুধু ভাত ভাত করে কান্না করছেন। ভাত খুঁজলে মুড়ি-চিড়া খেতে দেন সাবিনা। দুই এক মুঠো মুড়ি খাওয়ার পর আবার ভাতের জন্য কান্নাকাটি করেন।

বুধবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ ফতেহাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ওই এলাকায় আরও দেখা যায়, বন্যার্তরা যে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে ওই স্কুলের মাঠে বুক সমান পানি। ডুবে গেছে স্কুলের টিউবওয়েল ও বাথরুম। রাস্তায় তখনও কোমর সমান পানি। স্কুলের টিনের ঘরের মাঝ বরাবর পানি। স্কুলের মাঠে মাছ ধরছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। স্কুলের ভবনের দু’তলায় ও ছাদে আশ্রয় নিয়েছে বন্যাকবলিত ১৫টি পরিবার। দু’তলা থেকে সাবিনা হাতের ইশারায় জানান আমাদের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান। বুক সমান পানি দিয়ে তিনি রাস্তায় ছুটে যান। তার সঙ্গে যান ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে শ্রাবন্তি। পরিবারের সঙ্গে তারও ঠাঁই হয়েছে স্কুলের আশ্রয়ণ কেন্দ্রে। ক্ষুধায় অনবরত কান্নাকাটি করছে শ্রাবন্তি। কান্না স্বরে ছোট্ট শ্রাবন্তি বলেন, আংকেল আমি ভাত খাব, মা ভাত খুঁজলে শুধু মুড়ি-চিড়া দেয় খেতে। এগুলো খেতে খেতে মুখ ব্যথা করে। আর খেতে পারি না। আপনি আমাদের জন্য ভাত নিয়ে আসেন।

সাবিনা ইয়াসমিন আকুতি স্বরে কালবেলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বন্যার পানিতে ঘরের সব ভাইস্যা গেছে। ঘরে কিছু চাইল ডাইল ছিল তাও আনতে পারিনি। কোনো রকম স্কুলে আইস্যা উঠছি। বাচ্চারা শুধু ভাত ভাত করে, মুড়ি-চিড়া দিলে দুই এক মুঠ খেয়ে আবার ভাত খুঁজে আমি ভাত আইন্ন্যা দেমু কই থেকে। ভাতের লাইগ্যা সারা দিন চিল্লাচিল্লি করে। আমি নিজেও আট দিন ধরে মুড়ি চিড়া খাই, এখানে পানি নেই, বাথরুম নেই, একটা হাহাকার লেগে আছে। মুড়ি খেয়ে যে একটু পানি খাব তাও পারি না। এত ভিতরে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসতে চায় না। বৃদ্ধা শাশুড়ি বিছানায় পেঠের ক্ষিধায় কাতরাচ্ছে, স্বামী গৃহস্থালি কাজ করে সেও এখন কোথাও কাজে যেতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল বন্ধ, কাউকে যে ফোন করে খাবারের জন্য বলব তারও কোন ব্যবস্থা নেই। দয়া করে আমার চারটি ছেলেমেয়ের দিকে তাকান, তাদের জন্য ভাতের ব্যবস্থা করে দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম কালবেলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সুলতানপুর এলাকা ফতেহাবাদ দক্ষিণপাড়ার এই রাস্তায় কোথাও বুক সমান কোথাও কোমর সমান পানি। পানির স্রোতে রাস্তা ভেঙে গেছে। এছাড়াও বড় বড় গর্ত হয়েছে। নৌকা ছাড়া এই আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আসা অসম্ভব। তাই অনেকে এখানে ত্রাণ নিয়ে আসতে চান না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে রাতের রান্না করা খাবার এসেছে। পানি না কমা পর্যন্ত।

ফতেহাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন রহুল বলেন, ফতেহাবাদ ইউনিয়নে ১৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আমি সাধ্যমতো খাবার, ওষুধ ও চাল বিতরণ করছি। ফতেহাবাদ দক্ষিণ এলাকায় ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।

আদালত চত্বরে হামলা গ্রহণযোগ্য না: আইন উপদেষ্টা

আদালত চত্বরে আসামির ওপর যে হামলা হচ্ছে, সেটি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, এমন ঘটনা যাতে না হয়, সে বিষয়ে তাঁরা বিভিন্ন কৌশল ও চিন্তাভাবনা করছেন।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল এ কথা বলেন। এ দিন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিলের পর এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি একটি হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে গ্রেপ্তার করা না–করা, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা না–করা, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে মামলা ও আসামির করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ১৪–দলীয় জোটের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং সাবেক বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে নেওয়ার সময় আদালত চত্বরে কারও কারও ওপর হামলা বা মারধরের মতো ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, আদালতে যাওয়ার সময়ে কখনো কাউকে আক্রমণ করা উচিত নয়, কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’

এ সময় আসিফ নজরুল আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানকে নির্মমভাবে আদালতে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। তখন কি এই প্রশ্ন করেছিলেন, টিভিতে কি এই নিউজ দেখাতে পেরেছিলেন? আসিফ নজরুল বলেন, একটি দল (আওয়ামী লীগ) ও মন্ত্রিসভার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের জনগণের শত্রুর পর্যায়ে নিয়ে আসা—এটা তো সাবেক সরকারের দায়ভার। তারা মন্ত্রিসভার সদস্য ও সমর্থকদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে একটি জনরোষ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের ওপর জনরোষ ছিল না। সেটি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আরও অনেকভাবে অনেক সাংবাদিককে অপদস্থ করা হয়েছে।

একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের একটি কলামের প্রসঙ্গ টেনে সাংবাদিকেরা ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রথম উপলব্ধি করা উচিত, তাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা কী ছিল। ভুয়া নির্বাচন করা তাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল? তারা আগে বিবেচনা করুক।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সমীচীন হবে না

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা দরকার, এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, যখন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার একটি দাবি হাইকোর্টে (রিট) করা হয়, তখন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এর বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তবে শক্তভাবে জঙ্গি তৎপরতা, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা থাকলে সেটি সততার সঙ্গে তদন্ত করে এটি (নিষিদ্ধ) করা যেতে পারে। সংবিধানে সংগঠন করার স্বাধীনতা আছে।

আসিফ নজরুল বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এই দলটির অবদান ছিল। গত ১৫ বছরে তারা যা করেছে, এটি তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না, সেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যায় না। তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্বরতম এক ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল। এই কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তিগত দায় থাকতে পারে। নেতাদের সামষ্টিক দায় থাকতে পারে। তাই দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সমীচীন হবে না বলে মনে করেন আসিফ নজরুল।
সাকিব গ্রেপ্তার হবে না বলে আশা প্রকাশ

হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে গ্রেপ্তার করা না–করা বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন। এ সময় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ফুটবলার (বিএনপি নেতা) আমিনুল হক বাংলাদেশের জন্য পুরস্কার এনেছিলেন। তাঁকে যেভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল, তখন কি প্রশ্ন করেছিলেন? আমিনুলকে জেলেও ভরা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাকিবের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এটি পুলিশের ব্যাপার। মামলা হওয়া মানে তো গ্রেপ্তার নয়। আমার বিশ্বাস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে কেউ অতি উৎসাহী হয়ে গ্রেপ্তার না করে।’ সাকিব গ্রেপ্তার হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন আসিফ নজরুল।
প্রসঙ্গ মামলা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদসহ অজ্ঞাত অনেকের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হচ্ছে। এভাবে যত্রতত্র মামলায় ভুক্তভোগীদের বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা নিয়ে কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এভাবে মামলার ক্ষেত্রে হয়রানিরও আশঙ্কা থাকে।

এ নিয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলে আসিফ নজরুল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অনেকের সন্তান হারানোর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে কেউ মামলা করলে রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই তা না বলার। তবে তাঁর ও তাদের (সরকার) একটাই করণীয় আছে, সেটি হলো পুলিশ তদন্ত করবে, তদন্তে সুস্পষ্ট তথ্য না পেলে পুলিশ অব্যাহতি দিয়ে দেবে। তদন্ত ও বিচারকাজে যথাযথ প্রক্রিয়া বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হবে। তবে সরকার আদালতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে বিভিন্ন মামলায় কিছু নাম দিয়ে অনেক অজ্ঞাতনামা আসামি রাখা হতো। এর মাধ্যমে প্রথমত একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হতো। দ্বিতীয়ত, অবৈধ বাণিজ্যের চিন্তাও কাজ করত। এখন যেসব মামলা হচ্ছে, সেগুলোর ধরনও প্রায় একই রকম। এসব মামলায় তদন্ত করে, সাক্ষী জোগাড় করে কাউকে দোষী প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।

পবিত্র আল–আকসা প্রাঙ্গণে ইহুদি উপাসনালয় করতে চান ইসরায়েলি মন্ত্রী, তীব্র সমালোচনা

ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার ইসরায়েলি এ মন্ত্রী বলেছেন, তিনি সুযোগ পেলে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি ইহুদি উপাসনালয় তৈরি করবেন। তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে সৌদি আরব, কাতার, জর্ডানসহ অনেকে ক্ষোভ জানাচ্ছে। ইসরায়েল সরকারের নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির বরাবরই ওই এলাকায় প্রার্থনাকারী ইহুদিদের ওপর সরকারের দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিকে এড়িয়ে থাকেন। আর্মি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সম্ভব হলে পবিত্র আল–আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে তিনি একটি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) তৈরি করবেন। আল–আকসা ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ হিসেবে পরিচিত।

ইসরায়েল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ সারা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। এটি ফিলিস্তিনের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। এটি ইহুদিদের কাছেও পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত।

আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণটি জর্ডান তত্ত্বাবধান করে থাকে। তবে সেখানে কাদের প্রবেশাধিকার থাকবে, তা ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ইহুদি এবং অন্য অমুসলিমদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আল–আকসা প্রাঙ্গণে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তাঁদের সেখানে প্রার্থনা বা ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শনের অনুমতি নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেন গভিরের মতো কট্টরপন্থী ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা আল–আকসা প্রাঙ্গণে জারি থাকা নিষেধাজ্ঞাগুলো ক্রমাগত লঙ্ঘন করছে। এ নিয়ে ফিলিস্তিনিরা কখনো কখনো সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে।    

সোমবার আর্মি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল–আকসা প্রসঙ্গে বেন গভির বলেন, ‘আমার চাওয়া অনুযায়ী যদি আমি কিছু করতে পারতাম, তবে আমি ওই জায়গায় একটি ইসরায়েলি পতাকা লাগাতাম।’

সাংবাদিকেরা কয়েকবারই তাঁকে জিজ্ঞেস করেছেন, সুযোগ পেলে তিনি ওই জায়গায় সিনাগগ তৈরি করবেন কি না। শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর দেন বেন গভির।

২০২২ সালে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অন্তত ছয়বার ওই বিরোধপূর্ণ জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন বেন গভির। এ নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন।

বেন গভির মনে করেন, ওই জায়গায় ইহুদিদের প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া উচিত।
আর্মি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি মন্ত্রী বলেন, ‘আরবরা যেখানে চায় সেখানেই প্রার্থনা করতে পারে। সুতরাং ইহুদিদেরও যেখানে খুশি সেখানে প্রার্থনা করার সুযোগ থাকা উচিত।’

তাঁর দাবি, বর্তমান নীতিমালা ইহুদিদের এ স্থানটিতে প্রার্থনা করার অনুমতি দেয়।’
বেন গভিরের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জর্ডান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সুফিয়ান কুদাহ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আল–আকসা এবং পবিত্র স্থানগুলো মুসলিমদের জন্য প্রার্থনা করার উপযুক্ত জায়গা। পবিত্র স্থানগুলোতে না হামলা চালাতে জর্ডান সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

পবিত্র স্থানগুলোতে হামলার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক আদালতে জমা দেওয়ার জন্য জর্ডান প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র প্রস্তুত করছে বলেও উল্লেখ করেছেন সুফিয়ান।

সৌদি আরব এবং কাতারও ইসরায়েলি মন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘পবিত্র আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনগত মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে সৌদি আরব।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতিটি দেওয়া হয়েছে। বেন গভিরের বক্তব্যকে ‘উগ্র ও উসকানিমূলক বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।’

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আল–আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে সিনাগগ তৈরির ইঙ্গিতের নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে ‘পুরো বিশ্বের মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত’ বলে উল্লেখ করেছে। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে গাজায় যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তাও বেন গভিরের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন।
ইতিমধ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয় হয়েছে, ‘বর্তমান নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন নেই।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বলেন, ‘টেম্পল মাউন্টের মর্যাদাকে চ্যালেঞ্জ করাটা একটি বিপজ্জনক, অপ্রয়োজনীয় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড।’

গ্যালান্ট আরও বলেন, বেন গভিরের কর্মকাণ্ড ইসরায়েল রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে।  

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এক এক্স পোস্টে বলেছেন, বেন গভিরের বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে নেতানিয়াহু তাঁর সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনাহ সতর্ক করেছেন, আল–আকসা এবং পবিত্র স্থানগুলো হলো লাল রেখা, যেখানে কোনোভাবেই হাত দেওয়া যাবে না।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বলেছে, ইসরায়েলি মন্ত্রীর বক্তব্যটি বিপজ্জনক। পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে আরব ও ইসলামি দেশগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

শেখ হাসিনার পালানোর খবর তখনও জানতেন না সেনাপ্রধান

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আগে জানা ছিল না সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের। তিনি জানিয়েছেন, ৫ই আগস্ট পরিস্থিতি তিনি যখন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন ঠিক তখন তাকে জানানো হয় শেখ হাসিনা চলে যাচ্ছেন। সেনাপ্রধান এও বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে থাকলে তার জীবনের ঝুঁকি ছিল। পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত ছিল।

ইউটিউব চ্যানেল ‘নাগরিক টিভি’ তে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাইকে ধৈর্য্য ধরতে হবে। ১৬ বছরের জঞ্জাল ১৬ দিনেতো মিটবে না।
সেনাবাহিনীর মধ্যে এখনো অনেকে স্বপদে রয়েছে তাদেরকে সরানো হচ্ছে না কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনেক ইস্যু আছে। যেগুলো তদন্ত হচ্ছে। এজন্য আমরা সময় নিচ্ছি, প্রমাণ লাগবে, প্রমাণিত না হলে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এই কাজটি একটু ধীর প্রক্রিয়ায় চলছে। এখন দেখা যাক, বেশকিছু জিনিস আছে যেটা আমাদের করতে হবে।

সেনাবাহিনী এখনো কেনো ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছে না, তাদের এখন মাঠে থাকা উচিত কিনা এই প্রশ্নের জবাবে জেনারেল ওয়াকার বলেন, আমরাতো যেতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেতে চাই। তবে সম্ভবত আমাদের আরো কিছুকাল থাকতে হবে। কারণ পুলিশ এখনো তাদের দায়িত্ব নেয়ার মত অবস্থায় নাই। পুলিশ প্রায় অকার্যকর হয়ে গিয়েছিলো। এখনো দায়িত্ব নেয়ার মত হয়নি। তারা দায়িত্ব নেয়ার মত হলে অবশ্যই আমরা ফেরত চলে যাবো। আমরাতো বেশিক্ষণ থাকতে চাই না।

আনসার বাহিনীর মত নানা দাবিতে যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে এটাকে সেনাবাহিনী কিভাবে দেখে এমন প্রশ্নে সেনাপ্রধান বলেন, এটাকে আমরা অবশ্যই কাউন্টার কোড করছি। যেমন আরএবিতে এমন একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিলো। আমরা তাদেরকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি। অনেকে এখন নানা ধরনের কষ্টের মধ্যেই আছে। তারপরও আমাদের ধৈর্য্য ধরে আস্তে আস্তে এগুলো সমাধান করতে হবে। আনসারের ওটা আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। নাইন ডিভিশন কাজ করেছে। এবং আনসারদের নিবৃত করেছে।

শেখ হাসিনাকে সেইফ এক্সিট দেয়া ঠিক ছিলো নাকি তাকে দেশে রেখে বিচার করা উচিত ছিলো এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই সময়ে একটি উত্তপ্ত মুহূর্তে তাকে ওখানে রেখে দিলে সমস্যা হতো। আর প্রথম কথা হচ্ছে, আমিতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করছিলাম। তখন আমাকে কিছু ব্যক্তি বলেছে যে, উনিতো চলে যাচ্ছেন। উনি অলরেডি রান। তো এটা আমি জানতাম না যে, তিনি দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন। তারপরও আমি মনে করি যে, উনি দেশে থাকলে ওনার জীবন ঝুঁকি হতে পারতো। কেউ চাইবে না যে একজনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হোক। এটা মোটেই কাম্য না। পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিলো।

তিনি বলেন, আমি আশাবাদী সবাই একসঙ্গে যদি কাজ করি তাহলে দেশ সংস্কার করা সম্ভব হবে। এবং আমরা একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেতে সম্ভব হবো। আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমিও তাদের সাথে আছি কাজ করছি। এই সরকারকে সাহায্য করছি। আমরা সেই লক্ষ্যে যাবো, যেতে হবে। কারণ এখান থেকে ফেরত যাওয়ার কোন অবকাশ নেই। জনগণকে ধৈর্য্য ধরতে হবে। প্রথম কথা হচ্ছে অনেক ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি চলছে। যত সংবাদ তারা পায়, আমার দেখা মতে তা ৯৫ শতাংশই মিথ্যা। সত্যের সঙ্গে মিথ্যাকে মিশ্রিত করে এই সমস্ত সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এটা মানুষকে একটি ভুল ধারণা দেয়। আমি বলবো মানুষকে ধৈর্য্য ধরতে হবে এবং প্রকৃত ঘটনা জানতে হবে।

গণমাধ্যম ঠিকমত কাজ করছে কিনা এই প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেকেই করছে, অনেকেই দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করছে। তারা এ ধরনের সত্যের সঙ্গে মিথ্যাকে মিশ্রিত করে সংবাদ প্রচার করছে না। তারপরেও তাদেরকে আরো কাজ করতে হবে। আমি নিশ্চিত যে তারা আরো কাজ করবে। সময় পেলে আস্তে আস্তে মিডিয়াটাও আরো সক্রিয় হবে। প্রথমত বিষয়টি হচ্ছে আমাদের আরো ধৈর্য্য ধরতে হবে। এই ১৬ বছরের জঞ্জাল ১৬ দিনে মিটবে না, ১৬ মাসেও যদি আমরা মেটাতে পারি সেটা অবশ্যই একটি ভাল বিষয় হবে। অনেক সমস্যা হয়েছে, বুরোক্রেসির মধ্যে সমস্যা, পুলিশের মধ্যে সমস্যা। সবদিকেই সমস্যা। তো এগুলোকে সমাধানে একটু সময় দিতে হবে। এই সরকারকে সময় দিতে হবে। আমরা যদি অধৈর্য্য হয়ে যাই, তাহলে অবশ্যই এটা ঠিক হবে না। এই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আমরা তাদেরকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করছি।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারি যে সরকার যখন থাকে তার সঙ্গে কাজ করে। এর অর্থ এই না যে সবাই স্বৈরাচারকে সহায়তা করেন। স্বৈরাচার হোক আর যাই হোক, দৈনন্দিন কাজতো তাদের করে যেতে হবে। সেই কাজ তারা করেছে। কিছু ভাল করেছে। কিছু খারাপ করেছে। কিন্তু এভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাবে না। সবাইকে এভাবে সিল দিয়ে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, এটা ঠিক নয়। অবশ্যই যারা দোষী তাদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। আতঙ্ক সৃষ্টি করলে এই প্রশাসনও কাজ করবে না। কেউ কাজ করবে না। সবাই ভীত থাকবে। যেমন পুলিশের মধ্যে এমন একটি সমস্যা হচ্ছে। তাদের মধ্যে একটি বিশাল ট্রমা কাজ করছে। কাজেই এই ট্রমা যদি বিরাজ করে তাহলে হবে না। তাদের এই ট্রমা থেকে বের করে আনতে হবে। এজন্য একটু সবাইকে ধৈর্য্য ধরতে হবে। ইনশাআল্লাহ এই সরকার আস্তে আস্তে সবকিছু সামাল দিয়ে উঠবে।

হামাগুড়ি দিচ্ছিলেন গুলিবিদ্ধ রিপন, আছেন পা কাটার শঙ্কায় by ফাহিমা আক্তার সুমি

বাইশ বছর বয়সী রিপন। তিনি থাইগ্লাস মেরামতের কাজ করতেন। ৪ঠা আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে ছিলেন রাস্তায়। বাম পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল অনবরত। সেদিন সেই রক্তে ভিজেছিল রাস্তা। চিৎকার করে কাঁদলেও এগিয়ে আসেনি কেউ। রক্তাক্ত পা চেপে হামাগুড়ি দিতে দিতে নিজেই যান হাসপাতালে। বর্তমানে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পুলিশের ছোড়া গুলিতে রিপনের বাম পা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। রিপনের মা আছর বিবি মানবজমিনকে বলেন, চার সন্তানের মধ্যে রিপন আমার একমাত্র ছেলে। আমি বিচার চাই।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ ধাওয়া দিলে আমার সন্তান দৌড়ে একটি গলির মধ্যে যায়। সেখানে কয়েকটি সিএনজি থামানো ছিল। এ সময় কয়েকজন পুলিশ দৌড়ে গিয়ে পায়ে বন্দুক ঠেঁকিয়ে গুলি করে। সুনামগঞ্জ সদরে ঘটনাটি ঘটে তার কিছুদূরেই আমার বাড়ি। লোকজন আমার ছেলেকে ধরে না, সবাই শুধু ভিডিও করে। তখন আমার সন্তান রক্তাক্ত পা নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। রক্তাক্ত পা চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বাঁচার জন্য আকুতি জানায়। নিজের শরীরে থাকা টি-শার্ট খুলে পা বেঁধে আমাকে ফোন দেয়। সেসময় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, মা আমি নেই, আমাকে মেরে ফেলেছে পুলিশ। আমার সন্তানকে খুঁজতে সুনামগঞ্জ মেডিকেলে যাই, সেখানে দেখি পায়ে গুলি লেগে এক পাশ থেকে আরেক পাশে বেড়িয়ে গেছে। পায়ের হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। হাসপাতালের বেডে ঘুমন্ত সন্তানকে আগলে ধরে তিনি বলেন, আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যায়, এখনো কানে বাজে ছেলের সেদিনের ফোনের ওইপাশের চিৎকার। ওর আয় দিয়ে পুরো সংসার চলে। ওর বাবা কামাল উদ্দিনের হার্টের সমস্যা। সে বাসায় থাকে, কোনো কাজ করতে পারে না। আমার ছোট তিন মেয়ে। তারা পড়াশোনা করে। জানি না কবে ওর পা ভালো হবে। কীভাবে যে আমি চলবো, আল্লাহ কীভাবে আমাকে চালাবেন?

রিপনের মামাতো ভাই তোফায়েল আহমেদ বলেন, অভাবের কারণে রিপন এসএসসি পাস করে আর পড়তে পারেনি। ঘটনার দিন সদর হাসপাতালে যাই, পরে সেখান থেকে ১৪ই আগস্ট বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসি। সিলেটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনেক খরচ হয়েছে। এখানে এখন মোটামুটি খরচ হচ্ছে। তবে সামনের দিনগুলো ওর চিকিৎসা কীভাবে চালিয়ে যাবে সেই চিন্তা করছে ওর পরিবার। চিকিৎসক আমাদের বলেছেন, পা কেটে ফেললে ২-১ মাসের মধ্যে ভালো হবে। আর যদি রাখা হয় তাহলে সুস্থ হতে এক-দেড় বছর লেগে যাবে। আমরা পা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবো, যতদিন হোক চিকিৎসা চালিয়ে যাবো।
শুধু রিপন নয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ অনেকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। আহত সবুর মিয়া বলেন, ৫ই আগস্ট অন্দোলন করেছিলাম আশুলিয়া থানার সামনে। দুপুর ১টার দিকে পুলিশের গোলাগুলি শুরু হলে আমি গুলিবিদ্ধ হই। পায়ের পাতায় গুলি লেগে উপর থেকে বেড়িয়ে যায়। প্রথমে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাই। সেখানে ঠিকমতো চিকিৎসা না হওয়ায় ইনফেকশন হয়। আমাদের বাড়ি জামালপুরে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখান থেকে বুধবার আমাকে বার্ন ইউনিটে পাঠায়। তিনি বলেন, আমি একটি গার্মেন্টে চাকরি করতাম। ছাত্রদের রাস্তায় নামতে দেখে আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। ওইদিন আশুলিয়া এলাকায় অনেক মানুষ মারা গেছে। আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকাতে থাকতাম। বাড়িতে আমার বাবা-মা, ছোট দুই ভাইবোন রয়েছে। এখন পায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। জালামপুর থেকে ডাক্তার বলে দিয়েছে প্লাস্টিক সার্জারি করার জন্য। আমিই আমার পরিবারে আয় করতাম। বাবা মুদি দোকানি। ছোট দুই ভাইবোন পড়াশোনা করে। আমার যদি জীবনও চলে যেতো তবুও দুঃখ ছিল না, একটি যৌক্তিক আন্দোলন করতে পেরেছি।

গুলিবিদ্ধ হৃদয় বলেন, ১৮ই জুলাই আন্দোলনে সাভারে ওভার ব্রিজের উপরে গুলিবিদ্ধ হই। পুলিশ ওভারব্রিজ লক্ষ্য করে নিচ থেকে গুলি করে। এ সময় আমার পেটে দুইটি গুলি লাগে। সেখান থেকে আমাকে সাভার এনাম মেডিকেলে ভর্তি করে। ১১ই আগস্ট বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসে। সাভারে একটি বিল্ডিংয়ে কেয়ারটেকারের কাজ করতাম। আমার বাবা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। বাবা আইসক্রিম বিক্রি করতেন। আমি বেশি দূরে পড়তে পারিনি। হৃদয়ের মা রুপালি বলেন, আমি বাসা বাড়িতে কাজ করি। ছেলের আয়ে সংসার চলতো। গ্রামের বাড়ি শেরপুরে। ধার-দেনা করে ওর চিকিৎসা চালিয়েছি। প্রথম দিকে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখানে আসার পরে কিছুটা খরচ কমেছে।

গাজীর কারখানায় আগুন: ড্রোন দিয়ে খোঁজা হচ্ছে নিখোঁজ মরদেহ, তদন্ত শুরু

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত ৮ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি মঙ্গলবার বিকালে ঘটনাস্থলে এসে তদন্তের কাজ শুরু করেছে। অগ্নিদগ্ধ ছয়তলা ভবনটির নাজুক অবস্থা হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযানে নিখোঁজদের সন্ধানের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে গণপূর্ত বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নিখোঁজদের মরদেহ উদ্ধার অভিযান চালানো হবে বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে।  বিকাল চারটায় গাজী টায়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে আট সদস্যদের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থলে এসে তদন্তের কাজ শুরু করেছে। এ সময় তদন্ত কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসনের  অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ তিতাস, গণপূর্ত বিভাগ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অদিদপ্তর, পল্লী বিদুৎ সমিতি, ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিসহ রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমান বলেছেন, আমরা তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছি। ফায়ার সার্ভিস তাদের ড্রোন টিম দিয়ে মরদেহের অনুসন্ধান করে কোনো মরদেহ পায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ২১ঘণ্টা কেমিক্যালের আগুনে মরদেহ আর আগের মতো পাওয়া সম্ভব না। তারপরও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান চলমান আছে। নিখোঁজ পরিবারের যারা আসছেন আমরা নিখোঁজদের তালিকা লিপিবদ্ধ করছি। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আমরা তদন্ত কমিটি সেই লক্ষ্যে প্রতিটি বিষয় চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তদন্তের কাজ শুরু করেছি।
উল্লেখ্য, গত রোববার রাত ৯টায় রূপগঞ্জের খাদুন এলাকার কারখানাটির ছয়তলা একটি ভবনে লুটপাট চলাকালে নিচতলায় সিঁড়ির মুখে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে ভবনটির ভেতরে থাকা অনেকেই আটকা পড়েন বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা। গাজী টায়ার্স কারখানার মালিক নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। রোববার ভোররাতে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রশাসনের তরফ থেকে নিখোঁজদের কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা না পেয়ে রূপগঞ্জের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তালিকা তৈরি শুরু করেছেন। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত তারা অন্তত ১২৬ জনের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন সরকারি মুড়াপাড়া কলেজের স্নাতক শিক্ষার্থী মাহিমা মীর। তিনি বলেন, ‘রোববার রাতে আগুন লাগলেও মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তালিকা করা হচ্ছিল না। নিখোঁজদের স্বজনেরা হাতে ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। গণমাধ্যমে দেখেছি, ফায়ার সার্ভিস একটি নিখোঁজ তালিকা করেছে। কিন্তু আমরা তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা অস্বীকার করে। ফলে আমরা দুর্ঘটনায় কতজন নিখোঁজ আছে, তা জানার জন্য দুপুর থেকে তালিকা করা শুরু করি। আমরা নিখোঁজদের নামের পাশাপাশি ভোটার আইডি ও ছবি সংগ্রহ করছি।’

টাকার নেশা সাবেক এমপি ওদুদের by ফারুক আহমেদ চৌধুরী

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ বিশ্বাস। ঘুষ, টেন্ডারবাজি আর নিয়োগ-বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে  তুলেছিলেন  তিনি। অবৈধ অর্থ লেনদেনে ছিল বিশ্বস্ত সব হাতিয়ার। বালুমহল দখল, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ-বাণিজ্য, জমি দখল; একেকজন একেক সেক্টর দেখতেন। এরাই ছিলেন এমপি ওদুদের টাকার মেশিন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এমপি ওদুদ ও তার লোকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। আব্দুল ওদুদ ২০০৮ সালে প্রথমবার নৌকার মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন। পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। এসব পদ-পদবি পেয়ে গত প্রায় ১৬ বছর তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। গড়েছেন শতকোটি টাকার সম্পদ।

এমপি’র হাত থেকে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও রেহাই পাননি। দলের নেতারাই ছিলেন অনেকটা সংখ্যালঘুর মতো। তার আশপাশে ঘিরে ছিল সুবিধাভোগীরা। এদের নিয়ে আব্দুল ওদুদ গড়ে তোলেন ঘুষ, দুর্নীতি আর লুটপাটের সাম্রাজ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমদিকে এমপি আব্দুল ওদুদের দুর্নীতি ও অপকর্মের মূল সহযোগী ছিলেন এজাবুল হক বুলি। দলীয় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজের অধ্যক্ষের পদ বাগিয়ে নেন। এই বুলির মাধ্যমে সব বাণিজ্য করতেন আব্দুল ওদুদ। পরে অনেকেই আব্দুল ওদুদের অপকর্মের সঙ্গী হন। উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন রাসেল বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরে অবশ্য বালুমহালও ইজারা নেন রাসেল। আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল ইসলাম (মুনিরুল সচিব) খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, আতাহিরের কালাম বোল্ডার করতেন জমি দখল কারবার, আবু নাসের পালন করতেন নিয়োগ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ। সুবোধ মহুরি ছিলেন জমি জালিয়াতি চক্রের নেতৃত্বে, হাবিবুর রহমান হাবিব করতেন হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়াও তারই চাচাতো ভাই ওলি মিয়া ও উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি রুহুল আমিনও ছিলেন আব্দুল ওদুদের টাকার মেশিন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মঈনুদ্দিন মণ্ডলের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ আশরাফুল হককে জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বানান এমপি ওদুদ। তার মাধ্যমে জেলা পরিষদ বিপুল অর্থ লুটপাট করেন।

দলের নেতাকর্মীরাও তার ভয়ঙ্কর থাবা থেকে রেহাই পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিকবার এলাকার মানুষ তার অবৈধ সম্পদ ও কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। সর্বশেষ অভিযোগ দেয়া হয়েছিল গত বছর জুলাই মাসে। কিন্তু অনুসন্ধান কিংবা তদন্ত কোনোটাই হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ওদুদ বিশ্বাস যে হলফনামা নির্বাচন কমিশনে দাখিল করেছিলেন তাতে তিনি পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত কৃষি জমির পরিমাণ উল্লেখ করেছিলেন নিজের নামে ৩০ বিঘা এবং স্ত্রীর নামে ছয় বিঘা। যৌথ মালিকানার দুই বিঘা দালানে ওদুদের অংশের মূল্য ছিল দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০০৮ সালে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে রাজশাহীর সোনাদিঘি মোড়ের একটি তিনতলা বাড়ি এবং নিজ গ্রাম মহারাজপুরে ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ছয়টি দোকানঘর থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সর্বশেষ নির্বাচনে ওদুদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ১৫ বছরে ওদুদের সম্পদ বেড়েছে শত গুণের বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও ঢাকাতে জমি, মার্কেট, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়ির ছড়াছড়ি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহী নগরীর কোর্ট ঢালান এলাকায় ২২ কাঠা জমির উপর ওদুদ একটি মার্কেট করেছেন। এই জমি ও মার্কেটের বর্তমান দাম ২৫ কোটি টাকার বেশি। ২০০৮ সালে মৌসুমি ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ছিল ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে তার ব্যবসার মূলধন বেড়ে হয়েছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে ওদুদ বিশ্বাসের নিজ নামে জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭ বিঘা। ১৪ বছর পর পৈতৃক ও ক্রয়সূত্রে ওদুদ বিশ্বাসের অকৃষি জমির পরিমাণ ১০ বিঘা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৮ বিঘা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হাতে নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ লাখ। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী জমার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। মোটরসাইকেল ছাড়াও একটি ট্রাক, একটি জিপ গাড়ি ও একটি ট্যাংক লরি রয়েছে। এরমধ্যে এমপি কোটায় আমদানি করা দুটি গাড়ি বিক্রি করে তিন কোটি টাকা পেয়েছেন বলে ওদুদ বিশ্বাস দাবি করেছেন।

আয়কর ফাইলের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, নিজ নামে ৫ ভরি সোনা, স্ত্রীর ৮০ ভরি ও দুই মেয়ের ১২০ ভরি সোনা রয়েছে। এমপি হওয়ার আগে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাদে নিজের নামে কোনো বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট ছিল না। বর্তমানে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনটি বাড়ির মালিক হয়েছেন। ঢাকায় আছে তিনটি ফ্ল্যাট। এমপি হওয়ার পর নিজ এলাকা ঘোড়া স্ট্যান্ড মোড়ে করেছেন একটি পেট্রোল পাম্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনুপনগরে কিনেছেন তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি অটো ইটভাটা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর সোনাদিঘি মোড়ের চারতলা বাড়িটি এমপি হওয়ার পর সাততলা করেছেন। রাজশাহী নগরীর প্রাণকেন্দ্রে সাততলা এই বাড়িটির বর্তমান মূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি। রাজশাহীর নবীনগর মৌজার অধীন চারলেন বিমানবন্দর সড়ক ঘেঁষে ৩০ কাঠা জমির উপর নির্মাণ করেছেন তিনতলা মার্কেট। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই মার্কেটের শুধু জমির দামই ১৫ কোটি টাকা বলে এলাকাবাসী জানান। এমপি হওয়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পুরাতন জেলখানা মোড়ে শূন্য দশমিক ৭৮১ একর জমি কেনেন ওদুদ। সেই জমিতে নির্মাণ করেন তিনতলা বাড়ি। এই ভবনের উপর তলায় ওদুদ বসবাস করতেন। তার আয়কর ফাইলে এই জমিসহ বাড়ির মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে বাড়িটির মূল্য তিন কোটি টাকার বেশি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ওদুদ এমপি হওয়ার পর রাজশাহীর সিরোইল মৌজায় শূন্য দশমিক ১০৬৭ একর জমি কিনেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরজোতপ্রতাপ এলাকায় কিনেছেন শূন্য দশমিক ৮০০ একর জমি। রাজশাহী নগরীর বড়বনগ্রাম মৌজায় দশমিক ০৯৫০ একর জমি কেনেন নিজ নামে।

নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোচলাপাড়া মৌজায় ১ দশমিক ৪৬০০ একর জমি, অনুপনগর মৌজায় ২ দশমিক ২৭৫০ একর, কোচলাপাড়ায় ১ দশমিক ১৯ একর, দক্ষিণশহর মৌজায় দশমিক শূন্য ৩৪০০ একর, কোচলাপাড়ায় ১ দশমিক ২৯০০ একর এবং রাণীহাটি মৌজায় দশমিক শূন্য ২৩০০ একর জমি কিনেছেন এমপি ওদুদ। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দক্ষিণ শহর এলাকায় ওদুদের প্রায় ৭০ বিঘা জমির ওপর একটি বিশাল খামারবাড়ি রয়েছে। ঢাকার কলাবাগান এলাকায় একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট থাকলেও সেগুলো তিনি আয়কর ফাইলে দেখাননি। ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় থাকা দুটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। আয়কর ফাইলে খিলগাঁও এলাকার ফ্ল্যাট দুটির মূল্য দেখিয়েছেন ২৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।

এদিকে, এক বিএনপি নেতাকে হত্যাচেষ্টা ও লুটপাটের ঘটনায় গত ১৯শে আগস্ট সদর মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে আব্দুল ওদুদকে। এ ছাড়াও এক বিএনপি কর্মী হত্যার ঘটনায় আব্দুল ওদুদকে প্রধান আসামি করে ২৫শে আগস্ট আদালতে মামলার আবেদন করেছেন রাণীহাটি ইউপি চেয়ারম্যান রহমত আলী। আগামী ৪ঠা সেপ্টেম্বর আদেশের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত।

ওসি রফিককে ঘিরে সিলেটে এত বিতর্ক by ওয়েছ খছরু

সিলেটের গোয়াইনঘাটে মাত্র ৮ মাস দায়িত্বে ছিলেন ওসি রফিকুল ইসলাম। বলা হচ্ছে; এই সময়ে তিনি এক থানা থেকেই শত কোটি টাকার বাণিজ্য করে গেছেন।   বস্তা বস্তা টাকা গোয়াইনঘাট থেকে সিলেটে নিয়ে আসতেন। ৫ই আগস্ট পট-পরিবর্তনের পর নিজ থেকেই থানা থেকে সরে এসেছেন। তার স্থলে নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের ১১ই ডিসেম্বর গোয়াইনঘাট থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন রফিকুল ইসলাম। এই সময়ের মধ্যে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন। মূলত নির্বাচন কেন্দ্রিক রদবদলে তাকে গোয়াইনঘাট থানায় পাঠানো হয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে গোয়াইনঘাটে যোগ দিলেও গোটা উপজেলার সীমান্ত এলাকাকে চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেন তিনি। একইসঙ্গে বিরোধীদের দমন-পীড়নও চালান। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন; তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল মামলা বাণিজ্য। চোরকারবারিদের নিরীহ লোকজনকে আসামি করে তিনি কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। গোয়াইনঘাটের চারটি পয়েন্ট হচ্ছে চোরাচালানিদের স্বর্গরাজ্য। এগুলো হচ্ছে বিছনাকান্দি, মাতুরতল, পাদুয়া হাজীপুর ও পূর্ব জাফলংয়ের সোনাটিলা এলাকায়। ওসি যোগদান করার পর থেকেই প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার বস্তা চিনির চালান ওইসব রুট দিয়ে বাংলাদেশে প্রকাশ্যেই প্রবেশ করে। আর সব নিয়ন্ত্রিত করতো ওসির দালালরা। পশ্চিম জাফলংয়ের হাজীপুর মাতুরতল এলাকায় ওসির নিয়ন্ত্রিত চোরাকারবারি ছিল দেলোয়ার হোসেন, মধ্য জাফলংয়ে ছিল উজ্জ্বল মানিক ও মাসুক আহমদ, বিছনাকান্দিতে কামাল ও ফয়সল, পূর্ব জাফলংয়ে শামসুল। লাইনম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে তাদের কাছ থেকে প্রথমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর তাদের দিয়েই চোরাকারবারি নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ছাড়া- জাফলং, বিছনাকান্দি ও আড়কান্দি পাথর ও বালু কোয়ারি তার নিয়ন্ত্রিত লোকজনকে দিয়েই পরিচালিত হতো। ওসির সিন্ডিকেটের সদস্যদের অনেকেই ৫ই আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর গা ঢাকা দিয়েছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন; গোয়াইনঘাট থানার চোরাই পণ্য থেকে প্রতিদিন ওসির আয় ছিল ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। থানায় বসে বসে এসআই ইমরুল, এসআই জাহাঙ্গীর হোসেন ও এনামুল হককে দিয়ে টাকা সংগ্রহ করতেন। তাদের মতে; ওসি রফিকুল ইসলাম নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেন। তার সঙ্গে গোয়াইনঘাটের সিন্ডিকেটও সক্রিয় ছিল। তিনি নিজেকে কেন্দ্রীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিতেন। দাপট দেখিয়ে তিনি ৮ মাস শাসন করেন গোয়াইনঘাট। পশ্চিম জাফলং এলাকার লোকজন জানান- কয়েক মাস আগে হাজীপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওসি’র ইন্ধনে চোরাকারবারিদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রকাশ্যে দা, রামদা নিয়ে ওই এলাকায় কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এ নিয়ে ৪-৫টি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলা ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে ওসি রেকর্ড করেন। পরে কিছু মামলা তার নির্দেশেই সমঝোতায় শেষ হয়। সমঝোতায়ও তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। ৮ মাস গোয়াইনঘাট শাসন শেষে যখন ৫ই আগস্টে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয় তখন ওসি রফিকুল ইসলাম নিজেই ঊর্ধ্বতনদের কাছে আবেদন করে থানা ছেড়েছেন। এর আগে স্থানীয় ছাত্র-জনতা কয়েক দফা থানা ভাঙচুর করে। এতে থানা ছেড়ে চলে গিয়েছিলো পুলিশ। পরে অবশ্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর থানার কার্যক্রম শুরু হয়। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা জানিয়েছেন- ওসি রফিকুলের মধ্যে গোয়াইনঘাটে অতীতে কোনো ওসি এত বাণিজ্য করেননি। তার সময় প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০টি চোরাচালানের ট্রাক গোয়াইনঘাট থেকে বের হয়ে যেতো। এরমধ্যে অর্ধেক চোরাই পণ্য থানার সামনের রাস্তা দিয়ে সিলেটে আসতো। পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করতো। এসব কারণে ওসির ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন স্থানীয় ছাত্র-জনতা। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ৫ই আগস্ট থানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তারা জানান- পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ওসি নিজ থেকেই থানার দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন। একইসঙ্গে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা চোরাকারবারিরাও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে গোয়াইনঘাটে ওসি রফিকুলকে নিয়ে তুমুল আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়েছে। মাতুরতল বাজার এলাকার সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্পের সামনে আনন্দমিছিলে হামলা ও গুলি চালিয়ে সুমন মিয়া নামের এক তরুণ নিহতের ঘটনায় সিলেট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে মামলাটি করেছেন নিহতের বাবা আব্দুন নুর বিলাল। তিনি গোয়াইঘাটের মাতুরতল বাজার এলাকার ফেনাইকোনা গ্রামের বাসিন্দা। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন আসামি হলেন- সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সিলেট-৪ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ, জেলা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান ইমাম উদ্দিন সাদেক ও ঘটনার সময়ের গোয়াইনঘাট থানার ওসি রফিকুল ইসলাম। মামলার আবেদন আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাকে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ব্যাপারে ওসি রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আমার বিরুদ্ধে যে টাকার অভিযোগ করা হচ্ছে সেই টাকা কী জীবনে ওরা দেখেছে। কিংবা কোনো দিন গুনেছে। যারা সবচেয়ে বেশি ফায়দা নিয়েছে তারাই এখন তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে সেগুলো মিথ্যা বলে জানান তিনি। বলেন- যে মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে তখন তো তিনি নিজেই আক্রান্ত। থানায় ভাঙচুর করা হয়েছে। ওই সময় তিনি ঘটনাস্থল এলাকায় থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। তাকে হয়রানি করতে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান ওসি রফিকুল।

এক কাপড়ে বেরিয়েছি সব শেষ by মারুফ কিবরিয়া ও নাজমুল হক শামীম

‘কিছু নাই। সব শেষ হই গেছে। মাডির লগে মিশি গেছে। আবার কবে এই ঘর জোড়ামু জানি না।’ কথাগুলো বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধারনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ আন্দারমানিক গ্রামের বাসিন্দা প্রিয়রঞ্জন। গত সপ্তাহের বুধবার গভীর রাতে আচমকা উজান থেকে আসা ঢলে ভেঙে পড়ে তার ঘর। স্ত্রী সন্তান নিয়ে কোনোমতে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েন প্রিয়রঞ্জন। আশ্রয় নেন পাশের একটি দোতলা ভবনের ছাদের উপর। সঙ্গে স্ত্রী ও তিন সন্তান ছিল। বানের স্রোত এতটাই তীব্র ছিল কিছুই বের করতে পারেনি পরিবারটি। পেশায় কুমার এই পরিবারের মাথাগোঁজার ঠাঁই কবে হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। প্রিয়রঞ্জন মানবজমিনকে বলেন, মাটির কাজ করে খাই। আঙ্গো আর কিছু করার নাই। এই ঘর বানাইতে আবার ঋণ নিতে হইবো। তিনি জানান, বুধবার রাতে ঘরে  কোমর সমান পানি ছিল। ভোরবেলায় বন্যার পানির স্রোত আরও বাড়ে। তখনই ঘর ছেড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে উঠেন তারা। তিনদিন পর এসে দেখেন নিজের ঘরটি মাটির নিচে দেবে যায়। আসবাবপত্রও তলিয়ে যায়। ফেনীর ইতিহাসে এবারই এত বন্যার পানি দেখতে পেলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের চোখে-মুখে এখনো বুধবারের সেই ভয় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ছাগলনাইয়ার রাধানগর ইউনিয়নের নিজ পানুয়া গ্রামের বাসিন্দা জোহরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার কাঁচা ঘরটি ভেঙে গেছে। বুধবার দুপুরে সরজমিন দেখা গেছে, চল্লিশোর্ধ্ব এই নারী মাটির নিচে চাপা পড়া ঘর থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র বের করেছেন। জোহরা বেগম বলেন, আর কিছু নাই। সব মাটির নিচে মিশে গেছে। বন্যা হইতে দেখছি। এত বন্যা আর ঘর বিরানা (নষ্ট) হয় নাই কোনো কালে। আমার দুই বাচ্চা লই সাঁতার কাটি এক আত্মীয়ের বাড়ি চলি গেছি। বাচ্চাগুলা এত পানি দেখি ভয় পাই গেছে। একই ইউনিয়নের রাজিব চন্দ্র পাল বলেন, তিনি ও তার ছোট ভাই নিপুচন্দ্র পাল বুধবার রাতে যখন পানি উঠছিল তখন পরিবার নিয়ে এক কাপড়ে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পানি নামার পর ঘরে এসে দেখেন মাটির ঘরটি পুরোটাই দেবে গেছে। ঘরের সকল আসবাবপত্র মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। নিপুচন্দ্র পাল বলেন, কুমারের কাজ করে পরিবার চালাতেন তিনি। তৈরি সকল তেজসপত্র পানিতে ভেসে গেছে। বন্যার পানিতে ঘর গেছে তৈরীকৃত পণ্য গেছে এখন সামনের দিনগুলো কেমনে চলবে? ভেঙে যাওয়া ঘর থেকে মালপত্র সরাতে দেখা গেল পঞ্চাশোর্ধ্ব সন্ধ্যা রানী পাল, বন্যার পানি নামলেও তিন মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘর নেই, খাবার নেই, পরনের একাধিক শুকনো কাপড়ও নেই। ছোট ছোট তিন মেয়ে নিয়ে কীভাবে সামনের সময় পার করবো? স্থানীয় ইলেকট্রিক দোকানদার পঙ্কজ কর্মকার বলেন, বন্যার পানিতে শুধু তার ঘরেই ক্ষয়ক্ষতি হয়নি উপার্জনের একমাত্র দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানে থাকা প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ায় না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়েছে। তাদের ঘরগুলো পার হয়ে সামনে এগুতেই চোখে পড়ে কলেজ শিক্ষার্থী মোবারক হোসেনের সঙ্গে। বাবা নেই। তিন ভাইও মা নিয়ে তাদের সংসার। মাটির ঘরটি ভেঙে পুরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘর থেকে বের করা যায়নি কোনো আসবাবপত্র। শুধুমাত্র গবাদিপশু রক্ষা করে উচ্চস্থানে রেখেছেন। গ্রামটিতে বসবাস করা সত্তরোর্ধ্ব আব্দুর রহমান বলেন, তার জন্ম তো পরে তার বাবার কিংবা দাদার জন্মেও এ সকল গ্রামগুলোতে এত পানি কখনো দেখেননি। বন্যার কারণে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মাটির ঘর ও টিনের ঘরগুলোতে। ছাগলনাইয়া উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের পশ্চিম বক্সমাহমুদ গ্রামের মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, পশ্চিম বক্সমাহমুদ গ্রামটি নদীর পাড়ে হওয়ায় এ গ্রামের যত মাটির ঘরবাড়ি আছে সব ভেঙে সর্বস্ব হারিয়েছেন ওই সকল ঘরের বাসিন্দারা। ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের বাংলাবাজার গ্রামের ওয়াহিদের রহমান জানান, গত দুদিন আগে বন্যার পানিতে ভেলায় ভাসতে থাকা একটি লাশ দেখেছেন। চারিদিকে পানি থাকায় হয়তো মৃত ব্যক্তিটির দাফন করতে পারেননি স্বজনরা। ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম কমল বলেন, উপজেলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এটি নিরূপণে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিটি বিভাগকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তালিকা দ্রুত তার কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, উপজেলায় কতোজন নিহত হয়েছে তার তথ্য এখনো নিরূপণ করা হয়নি। এই উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এদিকে ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়নের মধ্যম কাজিরবাগ গ্রাম ঘুরে দেখা যায় গ্রামের অন্তত ত্রিশটিরও বেশি মাটির ঘর বন্যার পানিতে একেবারে ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামের কালু চন্দ্র পাল জানান বন্যায় তার থাকার ঘর রান্নাঘর একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি একটি ওষুধের দোকানে কাজ করে পরিবার চালাতেন। থাকার সহায়সম্বল হারিয়ে তিনি এখনো অনেকটা নিঃস্ব। ফেনী জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহিনা আক্তার বুধবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্য অনুযায়ী বন্যায় জেলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ঝিনাইদহে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন ৪২ জন by আমিনুল ইসলাম লিটন

ঝিনাইদহে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বিএনপি-জামায়াতের ১৯ নেতাকর্মীসহ ৪২ জন। এই বিভীষিকাময় হত্যাকাণ্ড চলে ২০১৩-২০১৬ পর্যন্ত। বিচারবহির্ভূত অমানবিক হত্যাকাণ্ডের শিকার যুবদল নেতা মিরাজুল ইসলাম মির্জা ছিলেন এক প্রতিবাদী যুবক। অন্যায় দেখলেই করতেন প্রতিবাদ। সাংগঠনিক দক্ষতা আর নিজ এলাকার আধিপত্যের কারণে দিনে দিনে চক্ষুশূল হয়ে ওঠে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। সরকার বিরোধী সকল আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন মির্জা। আর এটাই কাল হয় দাঁড়ায় তার। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মির্জা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ২০১৫ সালের ১৭ই মার্চ ঝিনাইদহ শহরের একটি ছাত্রাবাস থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মির্জাকে। ৮দিন তাকে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন পুলিশ ক্যাম্পে রেখে মোটা অংকের টাকা দাবি করেন। টাকা না পাওয়ার কারণে ৮ দিনের মাথায় ২৫শে মার্চ মির্জার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পন্নাতলা মাঠে। মির্জার ১০৭ বছর বয়সী পিতা  জোনাব আলী একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। ছেলে হারানোর শোক আর কান্নায় কেটে গেছে ৯ বছরেরও বেশি সময়। বয়সের ভারে আর চলাফেরা করতে পারেন না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বৃদ্ধ পিতা। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান প্রতি মাসে অনুদানের টাকা পাঠান। এছাড়াও জেলা বিএনপির সভাপতি এড এম এ মজিদ মাঝে মধ্যেই মির্জার পরিবারের জন্য চাল, ডাল ও নগদ টাকা দিয়ে আসেন তাতেও তাদের সংসার চলে না। ফলে মির্জার মা বুলবুলি খাতুন বৃদ্ধ বয়সেও বাধ্য হয়ে পরের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। শুধু মির্জাই নন, তার মতো বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন ঝিনাইদহ বিএনপি-জামায়াতের ১৯ নেতাকর্মী। একই সময়ে চরমপন্থি সংগঠনের ক্যাডার নিহত হয়েছে ১৪ জন। লাশ পাওয়ার পর আজ পর্যন্ত পরিচয় মেলেনি ৮ জনের। কেন্দ্রে পাঠানো বিএনপির খুন গুমের তালিকা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪০ মাসে জেলায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪২ জন। এরমধ্যে বিএনপির ৪ জন, জামায়াত শিবিরের ১৫ জন, সাধারণ ব্যবসায়ী একজন, সন্ত্রাসী ১৪ জন ও অজ্ঞাত রয়েছেন ৮ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন, ঢাকার শনির আখড়া এলাকার বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, কালীগঞ্জ উপজেলার নলভাঙ্গা গ্রামের বিএনপি নেতা রবিউল ইসলাম রবি, ঝিনাইদহ শহরের খাজুরা গ্রামের বিএনপি নেতা গোলাম মোস্তফার ছেলে গোলাম আজম পলাশ, একই গ্রামের দুলাল হোসেন, আরাপপুর ক্যাডেট কলেজ পাড়ার ব্যবসায়ী তমুর রহমান তুরান, হরিণাকুন্ডুর রঘুনাথপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ইদ্রিস আলী পান্না, শৈলকুপার শিবির কর্মী ইবি ভার্সিটির ছাত্র সাইফুল ইসলাম মামুন, ঝিনাইদহ শহরের জনপ্রিয় শিবির নেতা ইবনুল পারভেজ, মেধাবী ছাত্র জহুরুল ইসলাম, তারিক হাসান সজিব, কুষ্টিয়ার আনিছুর রহমান, ঝিনাইদহ শহরের শহীদ আল মাহমুদ, কালীগঞ্জের ঈশ্বরবা গ্রামের সোহানুর রহমান সোহান, একই উপজেলার বাকুলিয়া গ্রামের শামিম হোসেন, চাপালী গ্রামের আবুজার গিফারী, সদর উপজেলার কালুহাটী গ্রামের হাফেজ জসিম উদ্দীন, সদর উপজেলার অশ্বস্থলী গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক ও জামায়াত কর্মী আবু হুরাইরা, কোটচাঁদপুরের বলাবাড়িয়া গ্রামের জামায়াত কর্মী হাফেজ আবুল কালাম ও একই উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের জামায়াত নেতা এনামুল হক বিশ্বাস। বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের অভিযোগ সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ঝিনাইদহের এসব কর্মীদের টার্গেট করে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা পুলিশ দিয়ে একের পর এক এসব হত্যা কাণ্ড ঘটিয়েছে। আর এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল অতি উৎসাহী কতিপয় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের অফিসাররা। বিশেষ করে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মদদে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এসব নেতাদের প্রথমে পুলিশ, ডিবি বা র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো। কিছুদিন পর ঝিনাইদহ এবং পার্শবর্তী জেলার সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যেত তাদের। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আলী আজম মো. আবু বকর জানান, হাসিনা সরকারের আমলে ঝিনাইদহে জামায়াত শিবিরের ১৬ নেতাকর্মীকে খুন করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে আমাদের নির্দেশনা দিয়েছে মামলা করার। ইতিমধ্যে আমরা জামায়াত কর্মী আব্দুস সালাম হত্যার ঘটনায় মামলা করেছি। পর্যায়ক্রমে সব খুনের মামলা করা হবে এবং সেই প্রচেষ্টা চলছে। ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি এ্যাড এম এ মজিদ বলেন, হাসিনা সরকারের আমলে ঝিনাইদহে যেসব বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়ে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কুশীলবদের বিরুদ্ধে মামলা করে আইনের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

৬ বছরে ৫১,৬৮০ অস্ত্রের লাইসেন্স: নজরদারিতে মালিকরা by মরিয়ম চম্পা

নিজস্ব সুরক্ষায়, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় বিত্তশালী ব্যক্তিরা বেসামরিকভাবে লাইসেন্সের মাধ্যমে বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। গত ছয় বছরে সারা দেশে এই তিন ক্যাটাগরিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ৫১ হাজার ৬৮০টি। এর মধ্যে ব্যক্তির নামে ৪৫ হাজার ২২৬টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫ হাজার ৮৪টিরও বেশি। ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি ব্যবসায়ী। বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে রয়েছে ২১ হাজার ৬৮০টি বৈধ অস্ত্র। এসব মালিকরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। বৈধ অস্ত্র সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেয়া বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সের সংখ্যা ৫১ হাজার ৬৮০। কিন্তু এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর আগে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বৈধ অস্ত্রের হিসাব সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সম্মিলিত তথ্য আসেনি।

দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকার টানা ক্ষমতায় থাকায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। বৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও রাজস্ব সেভাবে আদায় করা হয়নি। যাদের অনেকেরই আয়কর ফাইলে দেখানো আয় ও সম্পদের হিসাবে কৌশলে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেসামরিক জনগণকে প্রদানকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইতিমধ্যে স্থগিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করা ও জমা দেয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে আগামী ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে গোলা-বারুদসহ আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬ অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় ব্যবহার গ্রহণ করে থাকেন। স্পেশাল ব্রাঞ্চ কর্তৃক তৈরি করা বেসামরিক আগ্নেয়াস্ত্র্ত্রের তথ্য সংরক্ষণ সফটওয়্যার এ আগ্নেয়াস্ত্রের হাল নাগাদ তালিকা সম্পর্কে জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৫১,৬৮০টি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ধরন অনুযায়ী পিস্তল ৪,৮৪০টি, রিভলবার ২,৬৯২টি, একনলা বন্দুক ২১,৩৯৫৪টি, দোনলা বন্দুক ১১,০২২টি, শটগান ৫,৯৩৮টি, রাইফেল ১,৮৬৪টি। এ ছাড়া এর আগের বছরগুলোর আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে হালনাগাদ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একইসঙ্গে এ সকল আগ্নেয়াস্ত্রে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়েছে কিনা তা যাচাই করে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলার অন্তর্গত থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর, আগ্নেয়াস্ত্র লুটপাটসহ গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় পুলিশের স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় গত ১৫ বছরের ইস্যুকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের বিষয়ে পুলিশ এখনো স্বাভাবিক কাজ শুরু করতে পারেনি। অনেক থানায় লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রে জমা নেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতাসহ অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্রশস্ত্র্ত্র এখনো সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

২০১৬ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তিপর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে হলে ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক ‘ব্যক্তি শ্রেণির’ আয়করদাতা হতে হবে। আবেদনকারীকে আবেদনের পূর্ববর্তী তিন বছর ধারাবাহিকভাবে পিস্তল, রিভলবার, রাইফেলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম তিন লাখ এবং শটগানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম এক লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে। আবেদনকারী কর্তৃক পরিশোধিত আয়করের পরিমাণ উল্লেখসহ এনবিআর কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়নপত্র আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হয়। এদিকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত এবং আগামী ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দেয়ার নির্দেশের পর থেকে বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করছেন ব্যবহারকারীরা। তারা কীভাবে অস্ত্র জমা দেবেন, সে বিষয়ে জানতে চাইছেন। রাজধানীর মিরপুরের একটি থানায়, পাঁচজন বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারী সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা অস্ত্র জমা দেয়ার প্রক্রিয়া জানতে চেয়েছেন। যেকোনো সময়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করে অস্ত্র জমা দেয়া যাবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর জননিরাপত্তা বিভাগ এর উপসচিব (রাজনৈতিক-৪ শাখা) মো. আরিফ-উজ-জামান এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জমাদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে যারা অস্ত্র জমা না দিবেন তাদের বিরদ্ধে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে সেটা পরবর্তীতে জানানো হবে।  

লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দখল নিয়ে বিবাদ

লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাঝে-মধ্যেই সহিংস প্রতিযোগিতা হয়। এ নিয়ে উত্তেজনা আছে। তাতে দেশটির অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় লিবিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বলেছে, কূটনৈতিক উপায়েই শুধু এই ব্যাংক নিয়ে সমস্যার সমাধান হতে পারে। জাতিসংঘ সমর্থিত উদ্যোগে সেখানে বিবদমান গ্রুপগুলোকে নিয়ে জরুরি মিটিং আহ্বান করা হয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস থেকে ওই মন্তব্য করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রিচার্ড নরল্যান্ডের নেতৃত্বে দূতাবাস সব পক্ষকে জাতিসংঘের আহ্বানে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিযোগিতার ফলে লিবিয়ার অর্থনৈতিক মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। লিবিয়ার জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা খর্ব হচ্ছে।

আর তাতে ক্ষতিকর সংঘাত বৃদ্ধি করছে। দূতাবাস আরও বলেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মচারীদের খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার এবং ভীতি প্রদর্শন উদ্বেগের। এর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে জাতিসংঘ সমর্থিত আবদুল হামিদ দবেইবাহর নেতৃত্বে সরকার আছে। গত ২০ বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বরখাস্ত করে একজন নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি মঙ্গলবার। এই ব্যাংকটি লিবিয়ার অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তারা প্রধান দু’টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিক। তাদের কাছে আছে ২৭ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ। এর বেশির ভাগই এসেছে তেল বিক্রি থেকে রাজস্ব হিসেবে। বরখাস্তকৃত গভর্নর সাদিক আল-কবির সম্প্রতি দবেইবাহর অতিরিক্ত ব্যয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে কথা বলা শুরু করেছেন। দেশের পূর্বাঞ্চলে যে শক্তি আছে তিনি তাদের পক্ষে রয়েছেন। ওদিকে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন ডেপুটি গভর্নর হিসেবে আবদেল ফাত্তাহ গাফ্‌ফারকে নিয়োগ দিয়েছে।
তিনি রাজধানী ত্রিপোলিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। বলেছেন, বর্তমানে যে তারল্য সংকট চলছে তার সমাধান করতে পারবেন তিনি। দুইদিনের মধ্যে কর্মচারীদের বকেয়া বেতন দিতে পারবেন। গভর্নর পরিষদের কাছে তিনি জবাবদিহি করবেন। তিনি ব্যাংকটির গোপন কোড হস্তান্তরের জন্য সাদিক আল-কবিরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যদি সেটা করা হয়, তাহলে কর্মচারীদের বেতন দেয়া সম্ভব হতে পারে। উল্লেখ্য, ২০১১ সাল থেকে এই ব্যাংকটি পরিচালনা করেছেন কবির। ওই বছরই লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। তাতেই দেশটি পশ্চিম ও পূর্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পূর্বভাগে যে বিরোধী প্রশাসন আছে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কবিরকে বরখাস্ত করার বিরোধিতা করেছে। পূর্বাঞ্চলীয় সরকার বলেছে, কবিরকে আবার নিয়োগ না করা পর্যন্ত তারা সব রকম তেল উত্তোলন এবং রপ্তানি বন্ধ অব্যাহত রাখবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতা, কর্মকর্তা কর্মচারী, প্রশাসনের ওপর বার বার হামলার জন্য তারা ‘নিষিদ্ধঘোষিত গ্রুপগুলোকে’ দায়ী করেছে। মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাংকটি পরিচালনা করেছেন কবির। কিন্তু মিলিশিয়াদের তরফ থেকে হুমকি থাকায় এবং চারজন স্টাফকে অপহরণ করার কারণে তিনি কাজকর্ম করতে সক্ষম হননি। এর ফলে তিনি সতর্কতা দিয়ে বলেছেন, আগস্ট মাসের বেতন হয়তো পরিশোধ করা যাবে না। যারা এই ব্যাংকটি দখল করার নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা বেআইনিভাবে ই-মেইল পাঠানোকে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে কোনো মেইল পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় কবিরকে বরখাস্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান কূটনীতিকরা, লিবিয়ান প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল। তারা বলেছেন, উদ্বেগের বিষয়টি তারা বুঝতে পেরেছেন। তবে তারা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। সততা ও যোগ্যতা অনুযায়ী একজন গভর্নর নিয়োগ হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

আমাদের কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই -মিডিয়ার সঙ্গে মতবিনিময়ে জামায়াত আমীর

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, স্বাধীন মিডিয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ৫৩ বছরের যাত্রাপথে মিডিয়া বার বার বিভিন্ন চাপের মুখে পড়েছে। অদৃশ্য   শক্তি, উপরের চাপ- এই শব্দগুলো আমাদের সমাজে বহুল পরিচিত। যার কারণে খোলা মনে সাংবাদিকরাও এই জাতির জন্য ওয়াচ ডগ হিসেবে তাদের যে মতামত সেটাকে তারা গুরুতরভাবে তুলে ধরতে পারেননি। বার বার বাধা এসেছে।

গতকাল রাজধানীর গুলশানস্থ একটি হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি স্বাগত ও সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের পক্ষে বক্তব্য রাখেন নয়া দিগন্তের সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, বিএফইউজে’র সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আব্দুল হাই সিদ্দিক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আব্দুল হাই সিকদার, মানবজমিনের যুগ্ম সম্পাদক শামীমুল হক, সাবেক ডিইউজে’র নেতা এলাহি নেওয়াজ খান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। এ ছাড়া সভায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও উচ্চতর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে জামায়াতের আমীর বলেন, অনেক ব্যাপারে কনসার্ন নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি। ওই কথাগুলো তারা আমাদের বিভিন্ন সময়ে বলেছে, এই কথাগুলো দুঃখজনক। অথচ সকল সরকারই একটা কথা বলেছে- আমাদের দেশের সাংবাদিকতার জগৎ স্বাধীন। এটা বাহিরে বলা হয়েছে, ভেতরের চিত্র আপনারা আমার থেকে অনেক ভালো জানেন।

এমন একটা ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে একটা দেশ এগিয়ে যাবে, সেটি জনগণকে স্বস্তি দেবে এটা অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে করি। তিনি বলেন, আমাদের দলও যদি ক্ষমতায় যায় তাহলে আমরাও যেন বস্তুনিষ্ঠতা এবং উদারতাকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতে পারি। অতীতে অমুক এমন কাজ করেছে, সুযোগ নিয়েছে, এজন্য আমাকেও এটা করতে হবে- এই দর্শনে আমরা বিশ্বাস করি না। এই জায়গাগুলো আমাদের জাতীয়ভাবে গ্রহণ করা উচিত।

সমাজের সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে শপথ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা জাতীয় স্বার্থে এক। এই জায়গায় আমরা কোনো আপস করবো না। যার বিপক্ষে যাক আর পক্ষে যাক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের জাতীয় স্বার্থ। আমরা যেন সবাই নির্ভয়ে তার নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশটা আমাদের সবার। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এটা সবার দেশ। যখন একদল বলে পাকিস্তানি রাজাকার, একদল বলে হিন্দুস্তানি রাজাকার- খুব কষ্ট হয়। আমার দেশের জনগণকে আমি কেন আরেক দেশের দালাল বানাচ্ছি, রাজাকার বানাচ্ছি? এটা যারা করেন তাদের মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া উচিত। যে জাতি তার নাগরিককে স্বীকৃতি দেয় না, সেই জাতি বিশ্বের দরবারে সম্মান পাবে কীভাবে?

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজে একটা কথা চালু আছে, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু। এই শব্দের মাধ্যমে একটা সমাজকে বিভক্ত করা হয়। আমরা এই কনসেপ্টের সঙ্গে একমত না। এই মাইনোরিটি-মেজোরিটির স্লোগান আমাদের দেশে যত ওঠে, দুনিয়ার আর কোনো দেশে ওঠে কিনা আমি জানি না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য আমরা সকলে যেন সজাগ হই। এবার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দেয়ার জন্য আমাদের দল, বিএনপি, ছাত্রদলসহ মাদ্রাসার ছাত্ররাও ছিল। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে কাউকে কাউকে পাহারা দিতে হবে কেন? এই সংস্কৃতি উঠে যাক সেটা আমরা চাই। সবাই যেন নিরাপত্তার গ্যারান্টি পায়।

আমরা বিশ্বের সকল শান্তিকামী গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই। আমরা সকলের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে এবং আমাদের নিজেদের মর্যাদা পাওয়ার পক্ষে। এক দল শুধু দিয়ে যাবে আরেক দল শুধু পেয়ে যাবে, এটা কিন্তু জাস্টিস না। এটা মিউচুয়াল হতে হবে এবং মিউচুয়াল রিলেশন যখন ভালো থাকে তখন সবাই ভালো থাকে।

জামায়াতকে নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এই মাসের ১ তারিখে আমাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যে ছাত্র সংগঠনটি আমাদের ভালোবাসে আমরাও তাদের ভালোবাসি, তাদের নিষিদ্ধ করা হলো। কোন প্রেক্ষাপটে? যখন অধিকারের দাবিতে সারা জাতি ঐক্যবদ্ধ। আন্দোলনের ইস্যু ভিন্ন দিকে নিতেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি, ২৭ দিন আমাদেরকে নিষিদ্ধ করে যে জুলুম করা হয়েছিল সেটি ইতিমধ্যে প্রত্যাহার হয়েছে।

সকল রাজনৈতিক দলকে জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে মাফ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের সাক্ষী রেখে বলছি- রাজনৈতিক দল হিসেবে কারও প্রতি আমাদের কোনো ক্ষোভ নাই। আমরা সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। যিনি নির্দিষ্ট ক্রাইম করেছেন, তার ওই নির্দিষ্ট ক্রাইমের শাস্তি যদি নিশ্চিত না হয় তাহলে সমাজের সংশোধন হবে না। তখন পাবলিক বেপরোয়া হয়ে যাবে। এজন্য এটা ন্যয্যতার দাবি, ন্যায় বিচারের দাবি, সামাজিকতার দাবি, শান্তির দাবি। তিনি বলেন, সেই ক্ষেত্রে ভিকটিমরা যদি সঙ্গত উদ্যোগ নেয়, সেই উদ্যোগে সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক সকলকে সাপোর্ট করা হবে। কিন্তু তারা অসৎ পথে কিছু করলে তাদের সঙ্গে আমরা নেই। একটা হত্যা মামলায় ৫০০ জনকে আসামি করা হচ্ছে, এটা কতোটুকু যৌক্তিক তা নিয়ে আমাদের সকলের চিন্তা করা উচিত। এতে মূল ব্যক্তির বেঁচে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের সংগঠকদের বলেছি- আমরা সবার চাইতে মজলুম বেশি, সিম্বোলিক কিছু মামলাই মানুষের শিক্ষার জন্য যথেষ্ট। সেই মামলায় একজনও নিরপরাধ মানুষ যাতে অভিযুক্ত না হয় সেই ব্যাপারে শতভাগ আমাদের নিশ্চিত হতে হবে।

টিভি সাংবাদিক রাহনুমার রহস্যজনক মৃত্যু

রাজধানীর হাতিরঝিল থেকে সারাহ রাহনুমা (৩২) নামের এক নারী সংবাদকর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত রাহনুমা বেসরকারি টিভি চ্যানেল জি-টিভি’র নিউজরুম এডিটর ছিলেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে হাতিরঝিলের পানি থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেনি পুলিশ।

রাহনুমার মৃত্যুর আগে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দু’টি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেই পোস্ট নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। মৃত্যুর আগে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের লোকেশন দিয়ে ফাহিম ফয়সাল নামে তার এক বন্ধুর সঙ্গে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন রাহানুমা। এতে তিনি লিখেন- ‘আপনার মতো একজন বন্ধু পেয়ে ভালো লাগলো, ঈশ্বর আপনাকে সর্বদা আশীর্বাদ করুন। আশা করি আপনি শিগগিরই আপনার সমস্ত স্বপ্ন পূরণ করবেন, আমি জানি আমরা একসঙ্গে অনেক পরিকল্পনা করেছি। দুঃখিত আমাদের পরিকল্পনা পূরণ করতে পারিনি, ঈশ্বর আশীর্বাদ করুন।’ এর এক ঘণ্টা আগে আরেকটি স্ট্যাটাসে রাহনুমা লিখেন- ‘জীবন্মৃত হয়ে থাকার চাইতে মরে যাওয়াই ভালো।’ এরপরই  রাত দেড়টার দিকে তাকে হাতিরঝিলের পানি থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়।

রাহনুমারকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা পথচারী মো. সাগর বলেন, আমি হাতিরঝিল এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি ঝিলের পানিতে একটি নারী ভাসমান অবস্থায় রয়েছেন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। ঢামেকে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত রাহানুমার স্বামী সায়েদ শুভ্র বলেন, ঢাকার কল্যাণপুরের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন তারা। রাহনুমার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার ইসলামবাগ কৃষ্ণপুরে। তার বাবা বখতিয়ার শিকদার নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সভাপতি। শুভ্র বলেন, প্রেমের সম্পর্ক থেকে সাত বছর আগে তারা পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করেন। মঙ্গলবার সারাহ অফিসে গিয়ে রাতে আর বাসায় ফেরেননি। এক ব্যক্তিকে দিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসা ভাড়ার টাকা পাঠিয়ে দেয়। পরে আমি তাকে ফোন করলে সে ব্যস্ত আছি বলে ফোন রেখে দেয়। রাত ৩টার দিকে খবর পাই, সে হাতিরঝিল লেকের পানিতে ঝাঁপ দিয়েছে। পরে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় পায়। শুভ্র বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়নি, তবে বেশ কিছুদিন আগে থেকে আমার স্ত্রী আলাদা হতে চাইছিলেন। আমরা দু’জনই কাজী অফিসে গিয়ে ডিভোর্স দিয়ে আসবো বলে সিদ্ধান্ত হয়। তবে দেশের এই পরিস্থিতিতে আর কাজী অফিসে যাওয়া হয়নি।

রাহনুমার বোন রাবিতা সাবাহ্‌ বলেন, মঙ্গলবার দিবাগত ভোররাত সাড়ে চারটার দিকে ওর দুলাভাইয়ের ম্যাসেঞ্জারে কল করে রেডক্রিসেন্টের একজন জানায়, রাহনুমা হাতিরঝিলে এক্সসিডেন্ট করেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়েছে। ওর স্যালাইন চলছে। পরে আমরা এসে দেখি ও আর  নেই। তিনি, আমার বোন চাকরি নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিল। কিন্তু আত্মহত্যা করার মতো তেমন কিছুই ছিল না। ওর সঙ্গে যখন শেষ কথা হয় তখনও সে স্বাভাবিক ছিল। আমাদের রেড ক্রিসেন্টের ত্রাণ দেয়া নিয়েও কথা হয়। কিন্তু এমনটা হবে কিছুই বুঝতে পারিনি। রাহনুমার দুলাভাই মীর মোহম্মদ আসিফুল বারী বলেন, আসলে ঠিক কী কারণে ওর মৃত্যু হয়েছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে না কি আত্মহত্যা করেছে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। আমাদের বিশ্বাস- তদন্তের পর মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে স্থানীয় কয়েকজন তাকে হাতিরঝিলে ঝাঁপ দিতে দেখে। পরে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এরপরও পুরো বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। ময়নাতদন্তের জন্যও লাশ ঢামেকের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।