Sunday, August 31, 2025

গাজা সিটিতে হাহাকার, আরও ৪৭ নিহত

গাজা সিটিতে হাহাকার। বিশৃংখলা। মানুষ বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। গাজাবাসীর ওপর নৃশংস হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। কমপক্ষে আরও ৭৭ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। এর মধ্যে ৪৭ জন উত্তর গাজা সিটিতে। সামরিক বাহিনী শহরটি দখল করতে এবং সেখানে বসবাসকারী প্রায় ১০ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করতে তাদের অভিযান আরও জোরদার করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। শনিবার নিহতদের মধ্যে আছেন ১১ জন ফিলিস্তিনি, যাদের খাদ্য সহায়তার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় অপুষ্টির কারণে আরও ১০ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু রয়েছে। গাজা সিটিতে ইসরাইলি বাহিনী টানা তিনটি হামলা চালায়। এতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ধ্বংস হয়েছে। কমপক্ষে সাতজনকে হত্যা করা হয়েছে। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শিশুও রয়েছে। আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ গাজা সিটি থেকে জানিয়েছেন, এ হামলায় চারপাশে ‘হাহাকার ও বিশৃঙ্খলা’ তৈরি হয়। তিনি বলেন, অনেক শিশু আহত হয়েছে। তারা সম্পূর্ণ রক্তে ভিজে হাসপাতালে পৌঁছেছে। আমরা দেখেছি এক শিশুর পিঠে আহত অন্যদের মাংস লেগে আছে।

মাহমুদ আরও বলেন, ইসরাইল গাজা সিটিকে যুদ্ধক্ষেত্র ঘোষণা করার পর এটি ছিল সর্বশেষ হামলা।  সামরিক বাহিনী ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিমান হামলা বাড়িয়েছে, যা মানুষকে আরও উচ্ছেদ হতে বাধ্য করছে। আমরা দেখছি মানুষ আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করছে। ইসরাইলি হামলা থেকে পালিয়ে পরিবারগুলো নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের কাছে এবং মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় নির্মম করুণ পরিস্থিতিতে অস্থায়ী তাঁবু গড়ে তুলছে। তাদের অধিকাংশই ইতিমধ্যেই একাধিকবার ঘরছাড়া হয়েছেন। ৫০ বছর বয়সী মোহাম্মদ মালুফ এপি’কে বলেন, তিনি ও তার নয় সদস্যের পরিবারকে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়েছে। আমি কী বলব? কুকুরের মতো? আমরা কুকুর নই। কুকুরকে আমাদের চেয়ে ভালোভাবে রাখা হয়। আমাদের কোনো ঘর নেই। আমরা রাস্তায়।  ভারী ইসরাইলি হামলা উত্তর গাজার জাবালিয়াকেও টার্গেট করেছে। এতে সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে মানুষ। মোহাম্মদ আবু ওয়ারদা আল জাজিরাকে বলেন, তিনি জাবালিয়া থেকে পালিয়ে গাজা সিটির পশ্চিম দিকে যাচ্ছেন। তবে ঠিক কোথায় যাবেন তা জানেন না।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকা ছেড়েছি। কারণ সেখানে অবস্থা ভয়াবহ। আশা করছি একটা জায়গা পাব তাঁবু বসানোর জন্য। এখানে সবকিছুই নিরর্থক। আর কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। ইসরাইলিরা সর্বত্র হামলা করছে। ইসরাইলি বাহিনী আগস্টের শুরু থেকে গাজা সিটিতে ধারাবাহিক বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে শহরটি দখল করার ও প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে উচ্ছেদ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে। শুক্রবার ইসরাইলি সেনারা জানায়, তারা আক্রমণের প্রাথমিক ধাপ শুরু করেছে এবং গাজার সবচেয়ে বড় শহরটিকে যুদ্ধক্ষেত্র ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রধান মিরজানা স্পোলজারিক এগার ইসরাইলের এই পদক্ষেপের নিন্দা করেন। তিনি বলেন, গাজা সিটির গণউচ্ছেদ অকল্পনীয় ও অবাস্তব। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজা সিটির গণউচ্ছেদ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে সম্ভব নয়। এটি বিশাল জনপদ স্থানান্তরের দিকে ঠেলে দেবে, যা গাজা উপত্যকার কোথাও সামলানো সম্ভব নয়। কারণ বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস আর খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসার মারাত্মক সংকট রয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, এই ব্যক্তি হামাস নেতা মোহাম্মদ সিনওয়ার। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ছবিটি প্রকাশ করে
প্রথম আলোঃ গাজায় হামাসের সামরিক প্রধান মোহাম্মদ সিনওয়ার নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে সংগঠনটি। গতকাল শনিবার হামাসের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। গত মে মাসে ইসরায়েল জানিয়েছিল, তাদের সেনা অভিযানে মোহাম্মদ সিনওয়ার নিহত হয়েছেন। যদিও তখন এ তথ্যের সত্যতা নিয়ে হামাসের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। ওই ঘটনার কয়েক মাস পর এখন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে মোহাম্মদ সিনওয়ারের নিহত হওয়ার খবর জানাল। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি তারা। শুধু আরও কয়েকজন কমান্ডারের সঙ্গে মোহাম্মদ সিনওয়ারের একটি ছবি প্রকাশ করে তাঁদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘শহীদ’। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনাকারী ও হামাসের সাবেক প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ছোট ভাই মোহাম্মদ সিনওয়ার। ২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজার রাফায় ইয়াহিয়া সিনওয়ারও ইসরায়েলি সেনাদের হাতে প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুর পর মোহাম্মদ সিনওয়ার গাজায় হামাসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
# ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, এই ব্যক্তি হামাস নেতা মোহাম্মদ সিনওয়ার। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ছবিটি প্রকাশ করে। ছবি: রয়টার্স



‘বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক’ ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় আসলে কী করছে

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিজেদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী’ বলে দাবি করে। কিন্তু তারা প্রায় নিয়মিত যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও গাজায় কাজ করা চিকিৎসকেরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা, নির্যাতন ও নির্বিচার আটক করা নতুন কিছু নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর অমানবিক আচরণ, সেনাবাহিনীতে চরম ডানপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রবেশ এবং জবাবদিহির অভাব ইসরায়েলি সেনাদের এমন অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে যে তাঁরা কোনো কারণ ছাড়াই যা খুশি তা–ই করতে পারছেন।

আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এরেলা গ্রাসিয়ানি বলেন, ‘আমার কাছে এটা একেবারে নতুন একটি ঘটনা। আগেও পাথর ছোড়ার দায়ে সেনারা শিশুদের মারধর বা আটক করেছে। কিন্তু এবার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর লেখালিখি করেছেন এরেলা। সেসব লেখায় তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে সেনাদের মধ্যে নৈতিক ‘অসাড়তা’ তৈরি হয়েছিল।

এরেলা বলেন, ‘আগে অন্তত কিছু নিয়মকানুন ছিল, যদিও সব সময় তা মানা হতো না। কিন্তু এখন সেটুকুও নেই।’

যুদ্ধ যেন খেলা

গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাদের বর্বরতা নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

অনেক ইসরায়েলি সেনা বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেসব ভিডিওতে দেখা গেছে, সেনারা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর তল্লাশি করছেন। ঘরে থাকা নারীদের পোশাক পরছেন, এমনকি তাঁদের অন্তর্বাস নিয়ে মজা করছেন।

এমন অভিযোগও রয়েছে যে সেনারা লক্ষ্যভেদ অনুশীলনের জন্য বেসামরিক মানুষদের গুলি করেছেন। আবার কখনো কেবল একঘেয়েমি কাটানোর জন্য গুলি করেছেন।

ইসরায়েলি সেনাদের হাতে গাজায় শিশু হত্যার কিছু ঘটনার অনুসন্ধান করেছে বিবিসি। আগস্টের শুরুতে এ ধরনের ১৬০টি ঘটনা যাচাই-বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ৯৫টি শিশুকে মাথায় কিংবা বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আর এসব ঘটনায় শুধু আহত করার জন্য গুলি করা হয়েছে বলার কোনো সুযোগ নেই।

আরও অভিযোগ আছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রগুলোতে জমায়েত হওয়া বেসামরিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করছেন ইসরায়েলি সেনারা। লক্ষ্যভেদ অনুশীলনের জন্য এসব মানুষকে ব্যবহার করছেন তাঁরা।

যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন নিক মেইনার্ড গত জুলাইয়ে তৃতীয়বারের মতো গাজা থেকে ফিরেছেন। তিনি বলেন, এসব ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রকে আসলে মৃত্যুফাঁদ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।

নিক বলেন, ফাউন্ডেশনের ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে একটি পরিবারের জন্য কয়েক দিনের পর্যাপ্ত খাবার থাকে। কিন্তু কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষায় থাকা হাজারো মানুষের জন্য থাকে না। তারা হঠাৎ অপেক্ষমাণ মানুষের জন্য ত্রাণকেন্দ্রের ফটক খুলে দেয় এবং বিশৃঙ্খলা, মারামারি, এমনকি দাঙ্গা বাধতে দেয়। পরে এই অজুহাতে ভিড়ের মধ্যে গুলি চালায়।

নাসের হাসপাতালের চিকিৎসক এবং জরুরি চিকিৎসাকর্মীদের কাছে গুলির ধরন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই হাসপাতালেই কাজ করতেন নিক মেইনার্ড। তিনি বলেন, ‘আমি ১২ বছর বয়সী একটি শিশুর অস্ত্রোপচার করছিলাম, যে পরে মারা গেছে।’

নিক বলেন, ‘গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। পরে এ বিষয়ে জরুরি বিভাগে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি আমাকে বলেন, তিনি ও অন্য চিকিৎসাকর্মীরা বারবার উন্ড গ্রুপিং বা একই ধরনের ক্ষতের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন।’

উন্ড গ্রুপিং বলতে বোঝানো হচ্ছে, কোনো একদিন বহু মানুষ শরীরের একই স্থানে একই ধরনের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে এলেন। আবার পরদিন আরও বেশ কিছু মানুষ এলেন শরীরের অন্য অংশে একই ধরনের ক্ষত নিয়ে।

নিক মেইনার্ডের ধারণা, এর অর্থ হলো ইসরায়েলি স্নাইপাররা হয়তো খেলার ছলে, নয়তো নিজেদের নিশানা আরও শাণিত করার জন্য সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহার করছেন। এ কথা তিনি আগেও স্কাই নিউজকে বলেছিলেন।

দায়বদ্ধতা নেই, নেই নিয়ন্ত্রণ

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলি সাময়িকী ‍+৯৭২-এর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার গুলি চালাতে সেনাদের প্রায় কোনো বিধিনিষেধই ছিল না।

গাজায় মাসের পর মাস দায়িত্ব পালন করা এক ইসরায়েলি সেনা ‍+৯৭২ সাময়িকীকে বলেন, ‘পুরোপুরি স্বাধীনতা ছিল। এমনকি যদি কোনো রকম হুমকি আছে বলে মনে হয়, তবে ব্যাখ্যার দরকার নেই—তুমি সরাসরি গুলি চালাতে পারো। আকাশে নয়; বরং তাদের শরীরের মূল অংশে গুলি চালানোর অনুমতি আছে।’

নাম গোপন রাখার শর্তে ওই সেনা আরও বলেন, সবাইকে গুলি করার অনুমতি আছে—হোক সে মেয়েশিশু কিংবা বৃদ্ধা।

অ্যাকশন অন আর্মড ভায়োলেন্সের (এওএভি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে গাজা ও পশ্চিম তীরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সেনাবাহিনী যে ৫২টি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছিল, তার ৮৮ শতাংশই থমকে গেছে বা দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এওএভি জানায়, এই ৫২টি ঘটনায় ১ হাজার ৩০৩ মানুষ নিহত ও ১ হাজার ৮৮০ জন আহত হন। এ ছাড়া আরও দুজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অথচ এত অভিযোগের মধ্যে মাত্র একজন দোষীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এমনকি কোনো ঘটনার ভিডিও প্রমাণ থাকলেও জনমতের চাপ এবং মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শেষ পর্যন্ত দায়মুক্তি দেওয়া হতো। যেমন ইসরায়েলি এস্দি তাইমান নামে একটি কারাগারে এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও প্রমাণ থাকার পরও দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। ১৯৬৭ সালেই নাবলুস কারাগারে বন্দীদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতনের নথিপত্র প্রকাশ করেছিল রেড ক্রিসেন্ট।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেনাদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অমানবিক ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি আরও তীব্র হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, ইসরায়েলি সেনারা এখন ফিলিস্তিনিদের মানুষই মনে করেন না।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে নিয়ে লেখা ‘অ্যান আর্মি লাইক নো আদার’ বইয়ের লেখক হাইম ব্রেসশিথ বলেন, এটি ঠিক এমন যেন একটা তুষারের গোলা পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, যার কোনো শেষ নেই।

হাইম বলেন, বছর বছর সহিংসতা আরও বাড়ছে। সাধারণ মানুষকে নিশানা হিসেবে ব্যবহার করাটা এখন ইসরায়েলি বাহিনীর কাছে স্বাভাবিক একটা বিষয়।

ইসরায়েলের পদাতিক বাহিনী সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই লেখক বলেন, এটা নতুন একধরনের খেলা, রক্তের খেলা। আর এমন খেলা সব সময় নিচ থেকে শুরু হয়।

হাইম বলেন, এটা বিকৃত, খুনে স্বভাব আর ভীষণ অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশ।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সেনাবাহিনীর অভিযান
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সেনাবাহিনীর অভিযান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমার: যুবহীন একটি দেশ

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলমান অস্থিরতা মিয়ানমারের যুবসমাজকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। সশস্ত্র সংঘাত, কর্মসংস্থানের অভাব, মানবাধিকার লঙ্ঘন, জোরপূর্বক নিয়োগ, নিরাপত্তাহীনতা এবং অব্যবস্থাপনা-বিপুল সংখ্যক তরুণকে দেশ ত্যাগে উৎসাহিত করেছে। যার ফলে দেশটি ভবিষ্যতে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রথম ঢেউ
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর, দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দাবি ছিল জান্তা সরকারকে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীর নৃশংস দমন-পীড়নের জেরে শত শত মানুষ নিহত বা গুরুতর আহত হয়, যাদের বেশিরভাগই তরুণ। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে কারাগারে আটক করা হয় এবং কিছু মানুষকে নির্যাতনের পর মৃত্যুদণ্ড দেয় জান্তা। হাজার হাজার তরুণ জান্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেওয়ার জন্য তাদের বাড়িঘর ছেড়েছিল, আবার অনেকে নিরাপত্তা এবং উন্নত সুযোগের সন্ধানে দেশ ছাড়ে। ২৬ বছর বয়সী এক তরুণ, যিনি ২০২৪ সালে সেনাবাহিনীর নিয়োগ এড়াতে ইয়াঙ্গুন থেকে ব্যাংককে পাড়ি জমান। তিনি বলছেন- অভ্যুত্থানের আগে প্রচুর তরুণ ছিল। এখন আমি আমার রাস্তায় আমার বয়সী কোনো লোক দেখতে পাই না। জান্তা সরকার অভ্যুত্থান-বিরোধী সমাবেশগুলোকে  ব্লক করার জন্য ইন্টারনেট অ্যাক্সেস বন্ধ করে দেয়, যার ফলে অনলাইন পরিষেবার উপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলো ব্যাহত হয় এবং দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। কিছু সময়ের জন্য, মানুষ আর এটিএম থেকে নগদ টাকা তুলতে পারত না। যার ফলে ব্যাংকগুলোতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় এবং অর্থনীতি শীঘ্রই ধসে পড়ে। দেশে দুর্দশার কারণে শীঘ্রই অনেক, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা বিদেশে কাজ এবং আরও ভালো সুযোগের সন্ধানে দেশ ছাড়তে শুরু করে। দেশ ছাড়া  তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনেকে এখন জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজ করছে। বিশেষ করে কৃষি, নির্মাণ এবং পরিষেবা শিল্পে।
অভ্যুত্থানের পরের বছরগুলোতে, প্রায় ৩৫,০০০ তরুণ কোরিয়ায় কাজ করার জন্য প্রতি বছর ঊচঝ-ঞঙচওক পরীক্ষায় অংশ নেয়। জান্তার শ্রম মন্ত্রণালয়ের মতে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ আইন কার্যকর হওয়ার পর, এই সংখ্যা বেড়ে ১০০,০০০-এরও বেশি হয়ে যায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় অংশ কাজ করার জন্য থাইল্যান্ডে পালিয়ে গেছে। থাইল্যান্ডের শ্রম অধিকার কর্মী কো থার কিয়াওর মতে, এখন থাই সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় প্রতিটি স্কুলে মিয়ানমারের শিক্ষার্থী রয়েছে।
প্রতিকূল পরিবেশ
দেশে ফিরে, অনেক তরুণ শহরাঞ্চলে গোপনে  প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।  যার ফলে জান্তা প্রধান শহরগুলো- ইয়াঙ্গুন, মান্দালয় এবং নেপিদোয় বাঙ্কার ফাঁড়ি তৈরি করে এবং চেকপয়েন্ট স্থাপন করে নিরাপত্তা জোরদার করতে শুরু করে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পথচারীদের ব্যাগ, মানিব্যাগ, স্মার্টফোন, এমনকি তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা কথোপকথন পরীক্ষা করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে অথবা সন্দেহজনক কিছু পেলে তাদের গ্রেপ্তার করে। এই প্রতিকূল পরিবেশ আরও বেশি তরুণ-তরুণীকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। গত বছর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মিয়ানমার যুব জরিপ অনুসারে, মিয়ানমারে থাকা তরুণদের প্রায় ২৫.১ শতাংশ জাপানে, ১৭.৬ শতাংশ থাইল্যান্ডে, ১৭.১ শতাংশ দক্ষিণ কোরিয়ায় এবং বাকিরা সিঙ্গাপুর,  যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশে অভিবাসন করতে চেয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশের অভিবাসনের সম্ভাবনা ছিল, যা মেধা পাচারের গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দ্বিতীয় ঢেউ
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, শাসকগোষ্ঠী সেনায়  নিয়োগ আইন কার্যকর করে।  যার ফলে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সকল পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী সকল নারীকে দুই বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে চাকরি করতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে তরুণদের মধ্যে একটা বড় অংশ দেশত্যাগ করতে শুরু করে। প্রতি মাসে হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যায় এবং আরও অনেকে সশস্ত্র প্রতিরোধে যোগ দেয়। তরুণদের দেশ ত্যাগে বাধা দেওয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠী ২৩ থেকে ৩১ বছর বয়সী পুরুষদের বিদেশে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভ্রমণকারীদের বিমানবন্দরে আটকে দেয়। তবুও, হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। তীব্র সৈন্য ঘাটতি মেটাতে জান্তা এখন রাস্তাঘাট, বাস এমনকি বাড়ি থেকে সুস্থ যুবকদের অপহরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয়ের মতো বড় শহরগুলোতেও এই ঘটনা ঘটছে। জান্তার হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫টি ব্যাচে আনুমানিক ৭৫,০০০ জনকে সামরিক চাকরিতে নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ৬০ শতাংশকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ৩০ শতাংশকে লটারির মাধ্যমে অথবা বেতনভুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিরোধে যোগদানকারী সহকর্মীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই তরুণ সৈন্যদের সামনের সারিতে পাঠানো হয়। ইয়াঙ্গুনের একজন বাসিন্দা দ্য ইরাবতীকে জানিয়েছেন , সামরিক বাহিনীতে যোগদান এড়াতে  আমার ২১ বছর বয়সী ভাগ্নে  কাজের সন্ধানে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া চলে যায়। সামরিক বাহিনীতে যোগদান এড়াতে  তার   ২০ বছর বয়সী ওপর এক ভাগ্নেকে পড়াশোনার জন্য থাইল্যান্ড যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী একটি পরিবারও থাইল্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে। তাদের  এক  ছেলের  সেনাবাহিনীতে যোগদানের বয়স হয়ে গিয়েছিলো।  তার পরিচিত ২২ বছর বয়সী ওপর এক যুবক কারেন রাজ্যে একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছে।
শ্রমিকের ঘাটতি
ইয়াঙ্গুনের একটি পোশাক কারখানার প্রধান বলেন, যখন থেকে সেনায়  বাধ্যতামূলক যোগদান আইন কার্যকর করা হয়েছে, তখন থেকে আমার কারখানায় কোনো যুবককে দেখিনি। তারা  বিদেশে পালিয়ে গেছে।  আমরা ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকদের আকর্ষণীয় বেতন দেই, কিন্তু লোকেরা কেবল অল্প সময়ের জন্য থাকে এবং তারপর বিদেশে চলে যায়। ইয়াঙ্গুনের আরেক বাসিন্দা কো থান্ট জিন বলেন, ইয়াঙ্গুন শপিং মলে অনেক দোকান চাকরির জন্য শূন্যপদ ঘোষণা করছে। যা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট । জিন বলছেন, নিয়োগ আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে, যে গ্যারেজে আমি আমার গাড়ি মেরামত করি সেখানেও তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কর্মী নিয়োগ এড়াতে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, আবার অনেকে ভালো বেতনের চাকরির জন্য চলে গেছেন। কখনও কখনও আমাকে গাড়ি মেরামত না করেই বাড়ি ফিরে যেতে হয় কারণ সেখানে কোনও মেকানিক নেই। এই বছর শ্রমিক দিবসে এক চিঠিতে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং স্বীকার করেছেন যে, ব্যাপক অভিবাসনের কারণে দেশটি শ্রমিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ইরাবতী অঞ্চলের লাবুত্তা টাউনশিপের একজন কৃষক বলেছেন, এই বছর আমরা অর্ধেক কর্মী হারিয়েছি, সম্ভবত বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন বা অন্যান্য কারণে। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে বেশিরভাগ তরুণ আর দেশে নেই। এর অর্থ কৃষিকাজে দ্বিগুণ সময় লাগছে  এবং ফসল উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ৩১ বছর বয়সী একজন নারী  অফিস কর্মী জানাচ্ছেন, ইয়াঙ্গুনে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সাধারণ মানুষ এখন সন্ধ্যা ৭টার পরেও ঘরে বসে থাকে। কনসক্রিপশন আইন এবং  নিরাপত্তার অভাবের কারণে। প্রতিটি পরিবার তাদের প্রিয়জনদের নিরাপদে বাসায় ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করতে থাকে। তবুও ইয়াঙ্গুনের বার এবং নাইটক্লাবগুলোতে প্রায়শই ধনী এবং বিত্তশালী ব্যক্তিদের আনাগোনা লেগে থাকে। তবে আশার কথা একটাই -ইউএনডিপি জরিপে দেখা গেছে যে ৯০ শতাংশ তরুণ যারা চলে যেতে ইচ্ছুক ছিল তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বাসায়  ফিরে আসতে ইচ্ছুক।
সূত্র :  দ্য ইরাবতী

https://mzamin.com/uploads/news/main/177390_my....webp

১২ হাজার বছর আগে তীক্ষ্ণ ফলার অস্ত্রে খুন হন এই ব্যক্তি, গোলকধাঁধায় বিজ্ঞানীরা

ভিয়েতনামের একটি গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া একটি কঙ্কাল নিয়ে গোলকধাঁধায় পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। কঙ্কালটি একজন পুরুষের। ১২ হাজার বছর আগে, সেই বরফ যুগে তীক্ষ্ণ ধারালো মাথার কোনো অস্ত্র ছুড়ে ওই ব্যক্তির ঘাড়ে আঘাত করা হয়েছিল। সেই ক্ষত থেকেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র দিয়ে ওই ব্যক্তিকে খুন করা হয়েছিল, তা বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

কঙ্কালটি সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে। ভিয়েতনামের গুহায় সেটি বেশ ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে। কঙ্কালটিতে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ পাওয়া গেছে।

মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (এমটিডিএনএ) হচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের ডিএনএ, যা কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায় থাকে। এটি সাধারণত মাতৃপরম্পরায় (মায়ের থেকে সন্তানে) হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা এর মাধ্যমে মানুষের বংশ, পূর্বপুরুষ ও কীভাবে নির্দিষ্ট অঞ্চলের অভিবাসী হয়েছে, সেই ধারা সম্পর্কে জানতে পারেন।

ভিয়েতনামের গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি একজন পুরুষের, বয়স প্রায় ৩৫। কোয়ার্টজ (একধরনের স্ফটিক) দিয়ে তৈরি তীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত কোনো অস্ত্র ছুড়ে তাঁর ঘাড়ে আঘাত করা হয়। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ওই সময়ে মানুষ অস্ত্র তৈরি করতে জানতেন।

তবে ওই ব্যক্তি আঘাত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যাননি। তাঁর আঘাতপ্রাপ্ত ঘাড়ের হাড় বিশ্লেষণ করে অতিরিক্ত টিস্যু বৃদ্ধি ও সংক্রমণের চিহ্ন পাওয়া গেছে, সম্ভবত সংক্রমণ থেকেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ‘প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি: বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস’ জার্নালে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আহত হওয়ার পর ওই ব্যক্তি খুব সম্ভবত কয়েক মাস বেঁচে ছিলেন। মারা যাওয়ার পর তাঁকে ‘থুং বিন ১’ নামের একটি গুহায় সমাহিত করা হয়। বর্তমানে ওই গুহাস্থলের নাম ‘ত্রাং আন ল্যান্ডস্কেপ কমপ্লেক্স’ এবং স্থানটি ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

গবেষকেরা বলছেন, ওই ব্যক্তির আঘাতজনিত ক্ষতে পরে কী হয়েছিল, তা এখনো অজানা। তবে এ ঘটনা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে শিকারনির্ভর সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে হতে পারে।

ওই ব্যক্তির আঘাত পাওয়া ও আহত হওয়ার পরও কিছুদিন বেঁচে থাকার ঘটনা ২৬ লাখ থেকে ১১ হাজার ৭০০ বছর আগে প্লাইস্টোসিন বা পুরাপলীয় যুগের শেষ দিকে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের একটি বিরল ছবি তুলে ধরেছে।

কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হুগো রেসেস-সেন্টেনো ই-মেইলে এ বিষয়ে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষ প্লাইস্টোসিন যুগের মানব কঙ্কাল পাওয়া তুলনামূলকভাবে বিরল। হোলোসিন যুগে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহিংসতার অনেক প্রমাণ রয়েছে, বিশেষ করে ওই সময়ে, যখন লোকজন খাদ্য উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি গ্রহণ করেছে এবং সমাজে শ্রেণিপার্থক্য বেড়ে যায়। তবে প্লাইস্টোসিন যুগে এমন উদাহরণ কম। ধারণা করা হয়, প্লাইস্টোসিন যুগে মানুষ মূলত শিকারের ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করত।

এই গবেষণা প্লাইস্টোসিন যুগে সহিংসতার বিরল উদাহরণে একটি নতুন সংযোজন বলে মনে করেন তিনি।

‘বিশাল এক চমক’

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গবেষকেরা ওই কঙ্কাল উদ্ধার করেন। তাঁরা সেটির নাম দিয়েছেন ‘টিবিএইচ১’। কঙ্কালের মাথার খুলি ভাঙা এবং চ্যাপ্টা হয়ে গেছে, কিন্তু খুলির বেশির ভাগ অংশই পাওয়া গেছে। এমনকি খুলিতে সব কটি দাঁতও আছে।

সেটির পেলভিস বা কোমরের হাড় ও মেরুদণ্ড ভাঙা। একটি আন্তর্জাতিক দলের সহযোগিতায় ‘টিবিএইচ১’–এর হাড়ের টুকরা টুকরা অংশ উদ্ধার করা হয়, যা চলে ২০১৮ সাল পর্যন্ত।

গবেষক দলটিকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে হাড় উদ্ধারের কাজ করতে হয়েছে। কারণ, সেগুলো খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, গুহার পরিবেশও উপযুক্ত ছিল না বলে জানান প্রধান গবেষক ক্রিস স্টিম্পসন। তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গবেষক।

স্টিম্পসন সিএনএনকে বলেন, এটি উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল। তাই এখানে প্রচুর পানি, প্রচুর ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমা হয়। ফলে এখানে মাটি বা পলি খুবই আঠালো।

খুলি ও কঙ্কালের হাড়ের আরও ক্ষতি এড়াতে গবেষক দল সেগুলোর চারপাশের পলিমাটি বড় বড় ব্লকের আকারে কেটে গুহা থেকে বের করে এনেছেন এবং পরে কয়েক মাস ধরে গবেষণাগারে সেগুলোকে একত্র করেছেন।

হাড়ে পর্যাপ্ত কোলাজেন না থাকায় কঙ্কালটির বয়স সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। তবে সমাধির কাছাকাছি কয়লার নমুনার রেডিওকার্বন পরীক্ষা করে কঙ্কালটির বয়স ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কঙ্কালটি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সেটির এক পায়ের গোড়ালিতে সামান্য আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন। তবে ঘাড়ে আঘাত পেয়ে মৃত্যুর আগে ওই ব্যক্তির সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো ছিল।

মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণে গবেষক দল নিশ্চিত হয়েছে, ওই ব্যক্তি একজন পুরুষ ছিলেন এবং একটি স্থানীয় শিকারি সম্প্রদায়ের মাতৃপরম্পরার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই শিকারি সম্প্রদায় ওই অঞ্চলে আসা প্রথম মানুষদের বংশধর।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভালোভাবে সংরক্ষিত বরফ যুগের মানবকঙ্কাল পাওয়া খুবই বিরল। তাই প্রায় সম্পূর্ণ এই কঙ্কাল গবেষণাকাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটির মধ্যে ডিএনএ পাওয়া গেছে।

স্টিম্পসন বলেন, ওই ব্যক্তির ঘাড়ের ‘সার্ভিক্যাল রিব’-এ আঘাতজনিত ক্ষতি পাওয়া গেছে। সার্ভিক্যাল রিব মানুষের ঘাড়ে থাকা একটি অতিরিক্ত হাড়। খুব অল্পসংখ্যক মানুষের শরীরে এ হাড় থাকে।

স্টিম্পসন বলেন, ওই ব্যক্তির সার্ভিক্যাল হাড়ে ক্ষত পাওয়াও (গবেষকদের জন্য) একটি বড় চমক।

সেখানে গবেষকদের জন্য আরও একটি চমক অপেক্ষা করছিল। সেটা হলো, আঘাতপ্রাপ্ত ঘাড়ের অতিরিক্ত হাড়ের কাছে একটি অস্বচ্ছ কোয়ার্টজের খণ্ড পাওয়া। কোয়ার্টজের ওই খণ্ডের দৈর্ঘ্য শূন্য দশমিক ৭ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ১৪ আউন্স (শূন্য দশমিক ৪ গ্রাম)।

ওই যুগে পাথরের অস্ত্রে সাধারণত যে ধরনের খোদাই–চিহ্ন দেখা যেত, (কোয়ার্টজের) ওই টুকরা তেমনভাবে খোদাই করা। গুহায় কোয়ার্টজের তৈরি অন্য কোনো যন্ত্র ছিল না।

তাই গবেষণায় ধরে নেওয়া হচ্ছে, ছুড়ে মারা অস্ত্রের ডগাটি সম্ভবত অন্য কোনো জায়গা থেকে আসা অচেনা বা বিশেষ প্রযুক্তি।

রেসেস-সেন্টেনো বলেন, যে অস্ত্রের আঘাতে ওই ক্ষত হয়েছে, সেটি সেখানে পাওয়া অন্যান্য অস্ত্র থেকে আলাদা। তাই এই গবেষণা ওই সময়ে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে সংঘাত হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরালো করে তুলেছে।

তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, তা পুরোপুরি বোঝার জন্য গুহা প্রাঙ্গণ এবং ওই অঞ্চলে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা দরকার বলে মনে করেন সেন্টেনো।

কোয়ার্টজের খণ্ডটির আকার দেখে গবেষকেরা ধারণা করছেন, এটি এমন একটি অস্ত্রের শীর্ষপ্রান্ত, যেটি ওই ব্যক্তির ঘাড়ের ডান পাশে বিদ্ধ হয়ে তাঁর ‘সার্ভিক্যাল রিব’ ভেঙে ফেলে। ওই আঘাত থেকেই শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি মারা যান।

গবেষণাপত্রে বলা হয়, আঘাতের অবস্থা, আকার ও ধরন দেখে বোঝা যায়, ছুড়ে মারা অস্ত্রটি ছোট, কিন্তু দ্রুতগতির ছিল। যদি সেটি বড় কিছু হতো, তাহলে আঘাত আরও ভয়াবহ হতো এবং সম্ভবত সে ক্ষেত্রে মৃত্যু সঙ্গে সঙ্গেই হতো।

আবার এমনও হতে পারে, স্থানীয় নন, বরং বাইরে থেকে আসা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সহিংস সংঘাতের ফলে ওই ব্যক্তি ঘাড়ে আঘাত পেয়েছেন।

ওই ব্যক্তি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর জীবনের শেষ কয়েক সপ্তাহ কেমন কেটেছিল, তা বিজ্ঞানীরা এখন কেবল অনুমান করতে পারেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-30%2Fm9nv0l88%2F12000-years-ago.jfif?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভিয়েতনামের একটি গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালের খুলি. ছবি: স্ক্রিনশট

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক হত্যা নিয়ে ইসরায়েলি সাংবাদিকেরা কি ভাবছেন by ওরি নির

গাজায় গত সোমবার (আগস্ট ২৫) ইসরায়েলি সেনাবাহিনী খান ইউনিসে এক হাসপাতালে হামলা চালানোর সময় আরও পাঁচজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে এ নিয়ে গাজায় নিহত সাংবাদিকদের সংখ্যা দাঁড়াল ১৮৯। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট তা–ই বলছে।

বিপরীতে অদূরেই থাকা ইসরায়েলি সাংবাদিকেরা পুরোপুরি নীরব ছিলেন দুই বছর ধরে। সোমবারের হত্যাকাণ্ডের পর অবশ্য ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট ইন ইসরায়েল একটি বিরল—হোক তা দায়সারা—বিবৃতি দিয়ে সেই নীরবতা সামান্য ভঙ্গ করেছে। বিবৃতিতে তারা ‘গভীরভাবে শোকাহত’ বলে জানিয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের প্রতি কোনো রকম সংহতি প্রকাশ করেনি, কোনো রকম সহমর্মিতা জানায়নি, সহকর্মী হিসেবে কোনো ক্ষোভ জানায়নি।

অনেক বছর আগে যখন হারেৎজ–এর প্রতিনিধি হিসেবে পশ্চিম তীর ও গাজার সংবাদ সংগ্রহের কাজ করতাম, তখন আমি ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের সঠিক, নির্ভরযোগ্য ও পেশাদার প্রতিবেদনের ওপর ভীষণভাবে নির্ভর করতাম। কোনো রকম আর্থিক প্রাপ্তিযোগ ছাড়াই তাঁরা তাঁদের সময় ও শ্রম ব্যয় করতেন ইসরায়েলি সাংবাদিকদের সহযোগিতা করার জন্য। তাঁরা বেশির ভাগই ছিলেন দেশপ্রেমী ও গর্বিত ফিলিস্তিনি, যাঁরা বিশ্বাস করতেন যে ফিলিস্তিনিদের কাহিনিগুলো ইসরায়েলি গণমাধ্যমের সাহায্যে ইসরায়েলি জনগণের সামনে তুলে ধরা গেলে তাঁদের অবস্থাটা জানানো যাবে।

আমি একাই নই। আমরা সহকর্মীরা, অন্যান্য ইসরায়েলি ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের পশ্চিম তীর ও গাজার প্রতিনিধিরা একই কাজ করেছেন। নাবুলেস নামের একজন ফিলিস্তিনি আমার সহকর্মী ছিলেন প্রথম ইন্তিফাদার সময়। তিনি ফিলিস্তিনি দৈনিক আল-কুদস–এর প্রতিনিধি হিসেবে পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের ঘটনাগুলোর প্রতিবেদন তৈরি করতেন। সে সময় তিনি প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই তিন থেকে চারজন ইসরায়েলি সাংবাদিকের ফোন পেতেন। তাঁদের তিনি সারা দিনের ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতেন। অনেক সময় আমরা টেলিফোনেই শুনতে পেতাম যে তাঁর স্ত্রী তাঁর চার বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এভাবে তিনি বছরের পর বছর পারিবারিক সন্ধ্যাটা ত্যাগ করেছেন শুধু আমাদের সহযোগিতা করতে।

অনেক সময় আমাদের পেশাগত সম্পর্ক রূপান্তরিত হতো সত্যিকারের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে। আমরা তাঁদের ওপর নির্ভর করতাম খবর ও ঘটনাগুলো জানতে, তাঁরা আমাদের সহযোগিতার প্রত্যাশা করতেন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে, ইসরায়েলি আমলাতন্ত্রের কাছে পৌঁছাতে, কিংবা শুধু ইসরায়েলি সমাজকে সম্যকভাবে বুঝতে। একটি ফিলিস্তিনি দৈনিকে আমার এক সহকর্মী মাঝেমধ্যেই আমাকে ফোন করে জটিল হিব্রু অভিব্যক্তির সহজ অর্থ জানতে চাইতেন।

আবার যখন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আমাদের সহকর্মী ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করত, আমরা তার প্রতিবাদ জানাতাম। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে (পিএলও) সমর্থন দেওয়ায় একবার পূর্ব জেরুজালেমের দৈনিক আল-শায়াব পত্রিকার সম্পাদক আকরাম হানিয়াকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল সরকার।

আমরা তখন এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি তুলে প্রচারণা চালাই। আর কোনো রকম সহিংসতায় যুক্ত থাকার অভিযোগ হানিয়ার বিরুদ্ধে ছিল না। তখন একাধিক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন যে তাঁর কাজকর্ম ভীষণভাবে রাজনৈতিক। সে সময় আমি ‘আমরা সবাই আকরাম হানিয়া’ নামে একটি নিবন্ধ লিখি হারেৎজ–এ।

এ ছাড়া তাঁর একটি ছোট গল্পও আরবি থেকে অনুবাদ করে হারেৎজ–এর সাহিত্য সাময়িকীতে ছেপেছিলাম। হানিয়াকে অবশ্য পূর্ব জেরুজালেম থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় পিএলওর অন্যতম প্রধান সমঝোতাকারীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

কোনো সন্দেহ নেই, এসব সাংবাদিকের সবাই দেশপ্রেমী ফিলিস্তিনি। তাঁরা তাঁদের জনগণের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে পেশাগতভাবে আমাদের মতো তাঁরাও সত্যের প্রতি অনুগত, ঘটনার প্রতি দায়বদ্ধ।

আমি জানি যে এগুলো অনেক আগের কথা। ৭ অক্টোবর (হামাসের ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলা ও জিম্মি অপহরণ) এবং তার পর থেকে এত সব বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটেছে যে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে। হ্যাঁ, একদা যেমন ছিল, তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক আর তেমন নেই।

কিন্তু যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গত সোমবার পর্যন্ত ১৮৯ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক গাজায় নিহত হয়েছেন, তখন এটা প্রত্যাশা করা কি অযৌক্তিক, ইসরায়েলি সাংবাদিকেরা কিছু একটা করবেন? কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট তো এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই নথিবদ্ধ করেছে।

এটাও কি খুব বেশি প্রত্যাশা হয়ে যায় যে গাজার একটি তাঁবুতে যখন এ মাসের প্রথম দিকে তাঁদেরই পাঁচজন সহকর্মীকে ইসরায়েল সরকার হত্যা করেছে, তখন ইসরায়েলি সাংবাদিকেরা সোচ্চার হয়ে উঠবেন? এমনকি যদি সরকারি ভাষ্য অনুসারে এই পাঁচজনের একজন হামাসের সঙ্গে জড়িত থেকে থাকেন, তাহলেও?

ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি সাংবাদিক সমিতি সক্রিয় আছে। এ মাসের প্রথম দিকে আনাস আল-শরিফ ও তাঁর আল–জাজিরার সহকর্মীকে হত্যার প্রতিবাদে কেউ একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি। ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় এত সাংবাদিককে হত্যা করা হলো, মাত্র গুটিকয় এ বিষয়ে মুখ খুলেছে।

অথচ ইসরায়েলি গণমাধ্যম গাজার সাংবাদিকদের ওপর নির্ভর করে, খবর ও তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁদের ব্যবহার করে। তাহলে কি তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর বেশি কিছু করতে পারে না?

খুব অল্প কয়েকজন ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক গাজা উপত্যকায় যেতে পারেন এবং তা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সঙ্গে। একমাত্র গাজার ফিলিস্তিনি সাংবাদিকেরাই এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে সেখানে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ও জীবন বিসর্জন দিয়ে প্রকৃত তথ্য, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করছেন। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম, যারা গাজার পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চায়, গাজার ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ছাড়া তারা অচল, অন্ধ।

উদ্বেগ প্রকাশ করা, কিছুটা সংহতি প্রদর্শন করা তো পেশাগত সহমর্মিতা বা খবর সংগ্রহের দায়বদ্ধতার চেয়ে বেশি কিছু। এটা তো মানবতার বিষয়।

গাজায় যেসব হাজার হাজার বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েল হত্যা করেছে, তাদের কারোর চেয়ে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের রক্ত অধিকতর লাল নয়। অনেক সাংবাদিকই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের বা কাজের সময় নয়; বরং নিজ বাসায় পরিবারের সঙ্গে নিহত হয়েছেন। তারপরও তাঁরা আমাদের সহকর্মী, সাংবাদিক।

আর তাই গাজায় তাঁদের সহকর্মীদের উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি সাংবাদিকেরা নৈতিক অবমাননায় আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন। বিগত ৬৯০ দিনের বেশি সময় ধরে গাজার বেসামরিক নাগরিকদের চরম দুর্দশাকে ঠিকমতো তুলে না ধরা বা পুরোপুরি উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে তাঁরা পেশাগত নৈতিকতার যে অবমাননা করে চলেছিলেন, এটা তা আরও বাড়িয়ে দিল।

অথচ ফিলিস্তিনিদের ক্রমাগত বিমানবিকীকরণে ইসরায়েলি জনগণের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে ইসরায়েলের সাংবাদিকদের তো উচিত ছিল মানবতা ও সহমর্মিতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের। আপনি হয়তো বলবেন যে এটা তো এক হাস্যকর সারল্যে পূর্ণ এক প্রত্যাশা। তবে আমি এটা মনে করতে চাই যে ইসরায়েলের মূলধারার গণমাধ্যম এখনো এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশে সক্ষম।

* ওরি নির, ওয়াশিংটনভিত্তিক ইসরায়েলি সাংবাদিক। হারেৎজ–এ প্রকাশিত তাঁর লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন আসজাদুল কিবরিয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-30%2Fijrax7mr%2Fjournalistkk.JPG?rect=51%2C0%2C606%2C404&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকের শেষকৃত্যে সহকর্মীরা। ছবি : রয়টার্স

Saturday, August 30, 2025

ভারত–পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা, কাদের নিশানা করে মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে তারা by আবিদ হুসেইন

দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ২৮ আগস্ট আল–জাজিরার অনলাইন সংস্করণে লিখেছেন পাকিস্তানি সাংবাদিক আবিদ হুসেইন। এতে ভারতের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির আসল প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারত সফলভাবে অগ্নি-৫ নামের মাঝারিপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে বলে তারা ২০ আগস্ট ঘোষণা দিয়েছে। উড়িষ্যা রাজ্যের বে অব বেঙ্গল উপকূলের পরীক্ষার এলাকা থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়।

অগ্নি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ ‘আগুন’। অগ্নি–৫ দৈর্ঘ্যে ১৭ দশমিক ৫ মিটার, ওজন ৫০ হাজার কেজি। এই ক্ষেপণাস্ত্র এক হাজার কেজির বেশি পারমাণবিক অস্ত্র বা প্রচলিত ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্র ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে পারে। এটি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে, যা এটিকে বিশ্বের দ্রুততম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কাতারে নিয়ে গেছে।

অগ্নি–৫ ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষার সপ্তাহখানিক আগে পাকিস্তান ঘোষণা দিয়েছিল, তারা নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি) গঠন করতে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সেই ঘাটতি পূরণ করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা গত মে মাসে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে চার দিনের সংঘাতের সময় প্রকাশ্যে এসেছিল।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সর্বশেষ পরীক্ষা আসলে পাকিস্তানের জন্য নয়, বরং আরেক প্রতিবেশী চীনের জন্য বেশি বার্তা বহন করছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ঘোষণার পর নয়াদিল্লি আবার এই দেশটির সঙ্গে সতর্কভাবে সম্পর্ক উষ্ণ তৈরির চেষ্টা করছে।

অগ্নি-৫-এর পাল্লার মধ্যে এশিয়ার বেশির ভাগ অংশ পড়ে, যার মধ্যে চীনের উত্তরাঞ্চলও রয়েছে। রয়েছে ইউরোপের কিছু অংশও। ২০১২ সালের পর থেকে ভারতের এটি দশম পরীক্ষা এবং গত বছরের মার্চের পর প্রথম।

বিশ্লেষকদের মতে, সময়টা ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে চালানো হয়েছে, যখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে আগামীকাল রোববার চীন সফরে যাচ্ছেন।

দীর্ঘদিন সীমান্ত বিরোধ নিয়ে উত্তেজনার পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা ফিরছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের পণ্যে শুল্ক দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছেন। কারণ, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তবে সম্পর্কের এই পরিবর্তনের মধ্যেও ভারত এখনো চীনকেই তার প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে থাকে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বিশ্বের দুই জনবহুল দেশের মধ্যে সম্পর্ক কতটা জটিল। আর ভারতের মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের মূল লক্ষ্য আসলে চীনই।

পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র সুবিধা

গত মে মাসের সংঘর্ষে ভারত স্বীকার করেছে, তারা কিছু যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। তবে তারা পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটির বড় ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে তাদের সুপারসনিক ব্রহ্মস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় প্রতিপক্ষের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ভারত।

ব্রহ্মস ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে এবং ৩০০ কেজি পর্যন্ত পারমাণবিক বা প্রচলিত ওয়ারহেড বহন করতে পারে। খুব নিচু উচ্চতায় ও দ্রুতগতিতে উড়ে বলে এটি প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই এই ক্ষেপণাস্ত্র পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকতে পেরেছিল বলে ভারতের দিক থেকে দাবি করা হয়েছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, অগ্নি-৫ পরীক্ষার সঙ্গে পাকিস্তানের এআরএফসি ঘোষণার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। বরং এটি চীনকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে।

২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ানে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর ভারত ও চীন চার বছর ধরে হিমালয় সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। পরে ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ায় মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের বৈঠকের পর সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে।

আগামীকাল রোববার মোদির চীন সফর হবে ২০১৮ সালের পর প্রথম। অতীতে ভারত বারবার বলে এসেছে, চীনের সঙ্গে তারা সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করলেও বেইজিং সীমান্তে আগ্রাসী আচরণ করেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের ফেলো মনপ্রীত সেতি আল–জাজিরাকে বলেন, চীনকে হুমকি হিসেবে দেখে ভারতের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। তবে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নয়। অগ্নি-৫ হলো ৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারি বলেছেন, ‘অগ্নি-৫ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও এর প্রধান লক্ষ্য আসলে চীন। চীনের পূর্ব উপকূলীয় শহর—যেগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো ভারতের নাগালে আনা কঠিন। তাই, ভারতের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।’

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা

ভারত ও পাকিস্তান বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার বৃদ্ধি করছে। দুই দেশই ক্রমেই দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র তৈরি করছে।

এআরএফসি ঘোষণার আগে পাকিস্তান ফাতাহ-৪–এর সক্ষমতা দেখিয়েছিল। এই ক্ষেপণাস্ত্র ৭৫০ কিলোমিটার পাল্লার এবং প্রচলিত ও পারমাণবিক উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম।

অন্যদিকে ভারত কাজ করছে অগ্নি-৬–এর ওপর, যার পাল্লা হবে ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি। এতে থাকবে স্বাধীনভাবে লক্ষ্যবস্তু আঘাত করার (এমআইআরভি) একাধিক প্রযুক্তি। অগ্নি-৫-এ ইতিমধ্যেই এই ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।

এমআইআরভি ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে, যা আলাদা আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে এই অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের সম্মানসূচক প্রভাষক মনসুর আহমেদ বলেছেন,  ভারতের সর্বশেষ পরীক্ষা দেখাচ্ছে, তাদের আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ছে। অগ্নির বিভিন্ন সংস্করণে নানা ধরনের ক্ষমতা যোগ করে ভারত দেখাচ্ছে, তারা সাবমেরিন থেকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ (এসএলবিএম) ক্ষমতার দিকেও এগোচ্ছে।

মনসুর আহমেদ আরও বলেন, ‘ভারতের ভবিষ্যৎ সাবমেরিনের জন্য কী ধরনের ওয়ারহেড তৈরি করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে কতগুলো মোতায়েন করা যাবে। তবে আগামী এক দশকে শুধু তাদের সাবমেরিন বহর থেকেই ২০০-৩০০ ওয়ারহেড মোতায়েন করা সম্ভব হতে পারে।’

বর্তমানে ভারতের দুটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন (এসএসবিএন) চালু আছে, আরও দুটি নির্মাণাধীন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে এখনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক সাবমেরিন নেই। তাদের কার্যকর সবচেয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শাহীন-৩, যার পাল্লা ২ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার।

মনসুর আহমেদ আরও বলেন, পাকিস্তানের আবাবিল হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এমআইআরভি সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার। তবে এটি বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাল্লার এমআইআরভি ব্যবস্থা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার ও পারমাণবিক নীতিবিষয়ক গবেষক তুঘরল ইয়ামিন বলেন, পাকিস্তানের কর্মসূচি পুরোপুরি ভারতকেন্দ্রিক ও প্রতিরক্ষামূলক। কিন্তু ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তি প্রদর্শনের দিকে। তাদের দূরপাল্লার ব্যবস্থা আসলে চীনকে লক্ষ্য করে তৈরি, যাতে তারা বড় শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, পাকিস্তানের কর্মসূচি শুধু ভারতকে নয়, আরও কয়েকটি দেশকে লক্ষ্য করে চলছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের (সিইআইপি) কৌশলগত বিষয়ক চেয়ার অ্যাশলে জে টেলিস বলেন, চীন ও পাকিস্তান দুটি দেশকেই ভারত লক্ষ্যবস্তুতে রাখতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান চায় ভারত ছাড়াও ইসরায়েল ও এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও তার পাল্লায় আনতে।

টেলিস আরও বলেন, দুই দেশের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করার জন্য, যাতে যুদ্ধবিমান ঝুঁকিতে ফেলতে না হয়।

পাকিস্তানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, ভারতের প্রতি নীরব সমর্থন
গত বছরের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যদি এভাবে চলতে থাকে, পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও এমনকি যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ক্ষমতা অর্জন করবে।

অন্যদিকে টেলিসের মতে, ভারতের ক্রমবর্ধমান অস্ত্রভান্ডারকে ওয়াশিংটন বা তার মিত্ররা অস্থিতিশীল মনে করে না।

টেলিস বলেন, ভারতের বিপরীতে পাকিস্তানের সক্ষমতাকে পশ্চিমারা উদ্বেগজনক মনে করে। কারণ, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রাথমিক ইতিহাসেই পশ্চিমাবিরোধী রং ছিল। আর ৯/১১ এবং অ্যাবোটাবাদে অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর সেগুলো বিশেষভাবে মার্কিনবিরোধী হয়ে উঠেছে।

ক্যানবেরাভিত্তিক শিক্ষাবিদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘ভারতের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রকাশ্য সমর্থনেই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে ভারতকে দেখতে চায়। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি এবং পরমাণু সরবরাহকারী গ্রুপের (এনএসজি) ছাড় ভারতের জন্য কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মর্যাদা এনে দিয়েছে, যদিও ভারত পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করেনি।

এনপিটি হলো স্নায়ুযুদ্ধ যুগের একটি চুক্তি, যার উদ্দেশ্য পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য অর্জন। এতে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তবে ২০০৮ সালে গড়ে উঠা পারমাণবিক উপকরণ ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী ৪৮টি দেশের জোট এনএসজি ভারতের জন্য ছাড় দেয়। ফলে ভারত এনপিটিতে সই না করেও বৈশ্বিক পারমাণবিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারছে। এটি ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টোফার ক্লারি বলেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের কর্মসূচি বা ভারতের অগ্নি-৫ পরীক্ষার বিষয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

ক্লারি বলেন, পাকিস্তান যত দিন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শাহীন-৩ ও আবাবিলের সীমার মধ্যেই রাখবে, আমি মনে করি, ততদিন পশ্চিমা সরকারগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হবে না। তাদের নিজেদের ব্যস্ত থাকার মতো আরও অনেক সমস্যা আছে।

ইসরায়েলের গোপন সামরিক তথ্যই বলছে, নিহত ফিলিস্তিনিদের ৮৩ শতাংশ বেসামরিক মানুষ

যৌথ অনুসন্ধান প্রতিবেদন: মিডল ইস্ট আইঃ- ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যই জানাচ্ছে, গাজা উপত্যকায় হামলায় নিহত ছয় ফিলিস্তিনির মধ্যে পাঁচজনই বেসামরিক মানুষ। এক যৌথ অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরায়েলের ‘‍+৯৭২ ম্যাগাজিন’–এর হিব্রু ভাষার সহযোগী প্রকাশনা ‘লোকাল কল’ ও প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান যৌথভাবে ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছরের মে মাস পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোপন গোয়েন্দা তথ্যভান্ডারে নাম-পরিচয়সহ ৮ হাজার ৯০০ জন হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) যোদ্ধাকে নিহত বা ‘সম্ভাব্য নিহত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ওই সময় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৩ হাজার।

অর্থাৎ এ হিসাব অনুযায়ী, নিহত ফিলিস্তিনিদের মাত্র ১৭ শতাংশ যোদ্ধা ও বাকি ৮৩ শতাংশই বেসামরিক মানুষ।

+৯৭২ ম্যাগাজিন ও লোকাল কল এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা এ তথ্যভান্ডারের অস্তিত্ব কিংবা নিহত হামাস ও পিআইজে সদস্যদের সংখ্যার ব্যাপারে আপত্তি জানায়নি।

তবে পরে দ্য গার্ডিয়ান একই বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভিন্ন সুরে কথা বলে। সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, প্রতিবেদনে যে সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তবে কোন তথ্য ভুল, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। শুধু বলেছেন, সংখ্যাগুলো সেনাবাহিনীর ‘সিস্টেমে’ থাকা তথ্যের প্রতিফলন নয়।

একই তথ্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গণমাধ্যমকে ভিন্ন উত্তর দেওয়ার কারণও সেনাবাহিনী ব্যাখ্যা করেনি।

নিহত ফিলিস্তিনির হিসাব

ইসরায়েলি তথ্যভান্ডারে মোট ৪৭ হাজার ৬৫৩ জন ফিলিস্তিনির নাম রয়েছে। তাঁদের হামাস ও পিআইজের সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। এ তথ্য তারা বলছে গাজা থেকে উদ্ধার করা হামাস ও পিআইজের অভ্যন্তরীণ নথির ভিত্তিতে। তবে এসব নথি দ্য গার্ডিয়ান, ‍+৯৭২ ম্যাগাজিন বা লোকাল কল—কোনোটিই দেখতে পায়নি বা যাচাই করতে পারেনি।

তালিকায় ৩৪ হাজার ৯৭৩ হামাস সদস্য ও ১২ হাজার ৭০২ জন পিআইজে সদস্যের নাম রয়েছে। এর মধ্যে নিহত হিসেবে ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯০০ জনকে। নিশ্চিতভাবে নিহত বলা হয়েছে ৭ হাজার ৩৩০ জনকে, আর ১ হাজার ৫৭০ জনকে ধরা হয়েছে ‘সম্ভাব্য নিহত’ হিসেবে।

তবে নিহত এই ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিলেন সংগঠন দুটির নিচের স্তরের সদস্য। তথ্যভান্ডারে থাকা ৭৫০ শীর্ষস্থানীয় সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেসামরিক ফিলিস্তিনি হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি

লোকাল কলের আগের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যাকে ইসরায়েলও নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেয়। দেশটির সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধানও সম্প্রতি সেই হিসাব উদ্ধৃত করেছেন।

তবে নতুন তদন্ত বলছে, বেসামরিক ফিলিস্তিনি হতাহত হওয়ার হার হয়তো ৮৩ শতাংশের বেশি। কারণ, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব শুধু উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ভবন বা অন্যান্য স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া হাজারো লাশ এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।

আরেকটি বিষয় হলো ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তাঁদের তালিকায় অনেক বেসামরিক মানুষকেও যোদ্ধা হিসেবে দেখাতে পারেন—শুধু হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য বা গাজার প্রশাসনিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন, যাঁদের আন্তর্জাতিক আইনে যোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা যায় না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এমনও হতে পারে, অনেক ফিলিস্তিনি, যাঁদের হামাস বা পিআইজের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই, তাঁদেরও যোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে যে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড তার সেনাদের অনুমতি দিয়েছে, তাঁরা চাইলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিহত ফিলিস্তিনিদের যোদ্ধা হিসেবে রিপোর্ট করতে পারেন।

একজন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সদস্য বলেন, ‘মানুষ মারা যাওয়ার পর তাঁদের সন্ত্রাসী বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। যদি আমি শুধু ব্রিগেডের রিপোর্ট শুনতাম, তবে আমার মনে হতো, আমরা হামাসের ২০০ শতাংশ যোদ্ধাকে মেরে ফেলেছি!’

এদিকে মে মাসের পর থেকে গাজায় বেসামরিক মানুষের নিহত হওয়ার হার আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই মাসেই আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার পরিবর্তে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত বিতর্কিত ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ ত্রাণ বিতরণ শুরু করে।

এর পর থেকে শুধু ত্রাণ নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

আধুনিককালের যুদ্ধেও বিরল

প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিককালের যুদ্ধে এভাবে ৮৩ শতাংশ বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা বিরল। এমনকি সিরিয়া ও সুদানের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধেও এ হার এত বেশি ছিল না।

দ্য গার্ডিয়ানের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালের পর থেকে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা, রুয়ান্ডার গণহত্যা ও ইউক্রেনের মারিউপোলে রাশিয়ার অবরোধ ছাড়া অন্য কোনো সংঘাতে বেসামরিক মানুষের এত বেশি মৃত্যু আর দেখা যায়নি।

গণহত্যার অভিযোগ

শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজায় ইসরায়েলের হত্যাকাণ্ডকে সরাসরি গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংস্থা হিসেবে জানায়, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ আসলে গণহত্যা। এরপর একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ও ইসরায়েলের নিজস্ব মানবাধিকার সংস্থা বেতসেলেম।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা আলবানিজও গত বছর দুটি প্রতিবেদনে বলেছেন, গাজায় গণহত্যা চলছে।

গত মাসে হলোকাস্ট ও গণহত্যা নিয়ে গবেষণায় খ্যাতি পাওয়া অধ্যাপক ওমর বার্তভ গাজার যুদ্ধকে ‘অবশ্যম্ভাবীভাবে গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতো আরও অনেক খ্যাতিমান ইসরায়েলি ও ইহুদি গবেষক পৌঁছেছেন একই সিদ্ধান্তে।

গাজার উত্তরাঞ্চলে জাবালিয়ার একটি ভবনে ইসরায়েলি হামলার পর আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০ আগস্ট ২০২৫
গাজার উত্তরাঞ্চলে জাবালিয়ার একটি ভবনে ইসরায়েলি হামলার পর আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০ আগস্ট ২০২৫ ছবি: এএফপি

ডিপ্লোমাধারী ও স্নাতক প্রকৌশলীদের মধ্যে কেন এই দ্বন্দ্ব by মাহবুবুর রাজ্জাক

সারা দেশের ছাত্র প্রকৌশলীরা গতকাল বুধবার তিন দফা দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হয়েছিলেন। তাঁদের দাবিগুলোর মূল কথাটি হলো সরকারি চাকরিতে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করতে হবে। প্রকৌশলী পদ ও পদবি হবে শুধু স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই দাবিগুলোর সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই।

দেশের প্রকৌশল খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসনের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসা। অথচ পুলিশ তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত পরিবেশ তৈরি করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

অন্যদিকে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরাও আন্দোলনে আছেন। তাঁরা নিজেদের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিতে চান এবং প্রকৌশলীদের জন্য উপযুক্ত পদগুলোয় বর্ধিত হারে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের পদায়ন চান। এর বাইরে তাঁদের কিছু কিছু দাবি স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। দাবিগুলোর সঙ্গে আবার একমত নন স্নাতক প্রকৌশলীরা।  

দেশের শিল্পায়ন ও উন্নয়নে প্রকৌশলী ও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের সমন্বিত টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের কাজ প্রকৌশলীদেরই করতে হবে। তেমনি প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের কাজও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদেরই করতে হবে। দুই দলের কাজই একটা আরেকটার পরিপূরক। কাজেই রেষারেষি নয়, প্রয়োজন কাজের সুষম বণ্টন। উভয় পক্ষের উচিত আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যাগুলোর সমাধান করা এবং প্রকৌশল খাতের সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করা।

আমাদের বুঝতে হবে ‘প্রকৌশলী’ শব্দটি কোনো বংশগত পদবি নয়। উন্নত বিশ্বে শুধু একাডেমিক সনদের বলে প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করা যায় না। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর পেশাগত দক্ষতার একটি স্তর অতিক্রম করে প্রফেশনাল পরীক্ষা পাস করলেই কেবল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়া যায়। প্রকৌশলী পদবিটি তিনিই ব্যবহার করতে পারেন, যিনি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মান পূরণ করেছেন এবং নির্ধারিত সময় পরপর তাঁর লাইসেন্স নবায়ন করেছেন।

তাঁরা প্রকৌশলকাজে স্বাক্ষর, ডিজাইন অনুমোদন ও নিরীক্ষণ করলে ধরে নেওয়া যায় যে পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করেই তা করেছেন।
প্রকৌশলীদের জন্য একটি কোড অব এথিকস অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকে। এতে দুর্নীতি, পক্ষপাত, গাফিলতি থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শপথ থাকে। তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য আইনগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একজন প্রকৌশলী তাঁর লাইসেন্স হারান এবং প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকারও হারান।

প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করা যায়—এমন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেশে এখন বেড়েছে। তাই প্রকৌশল পেশায় মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সরকারের উচিত প্রকৌশলী, প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীসহ প্রকৌশল খাতে সব পেশাজীবীর জন্য পেশাগত ট্রেনিং, রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স চালু করা।

সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরির জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। যত বড় ডিগ্রিই থাকুক, লাইসেন্সবিহীন কাউকেই প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকলে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরা কেন, কার্যত স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও প্রকৌশল পদবি ব্যবহার করতে পারেন না।

বর্তমানে স্নাতক প্রকৌশলীদের এন্ট্রি পদ নবম গ্রেডের, আর প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের এন্ট্রি পদ দশম গ্রেডের। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নবম গ্রেডের ৩৩ শতাংশ পদ আবার ডিপ্লোমাধারীদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করার রীতি চালু করা হয়। কার্যত কোথাও কোথাও এর চেয়েও অনেক বেশি পদ ডিপ্লোমাধারীদের দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রথমত নবম গ্রেডে স্নাতক প্রকৌশলীদের ঢোকার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত ডিপ্লোমাধারীরা পদোন্নতির মাধ্যমে এমন সব পদে পদায়িত হচ্ছেন, যেসব পদে স্নাতক প্রকৌশলীরাও বিসিএস ছাড়া যোগ দিতে পারে না। এটি স্নাতক প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে একটি বড় রকমের বৈষম্য এবং প্রকৌশল খাতের জন্য অশনিসংকেত।

প্রশ্ন হলো স্নাতক প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমাধারীরা পদায়িত হতে পারেন কি না? উত্তর হলো ‘না’। ডিপ্লোমাধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত নন। তাঁদের কর্মক্ষেত্র আলাদা। তাই উচিত হবে তাঁদের চাকরি, পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য অবিলম্বে প্রকৌশলীদের সমান্তরাল আরেকটি ধারা চালু করা।

ফলে স্নাতক প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের পদ ও কাজ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হবে। প্রকৌশল খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী দলের মধ্যে অকারণ রেষারেষি বন্ধ হবে। দুই দল নিঃশঙ্কচিত্তে কাজে মনোযোগ দিলে কাজের গতি ও দক্ষতাও বাড়বে।

প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় ব্যবস্থাপনা সংকট প্রকট। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তারা সংস্থার প্রধান হয়ে থাকেন। তাঁরা প্রকৌশলীদের পেশাগত সমস্যার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না।

সম্প্রতি একজন উপদেষ্টা দেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। অথচ এই প্রকৌশলীরাই বিদেশের মাটিতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। সমস্যা প্রকৌশল শিক্ষায় নয়, সমস্যা প্রকৌশল সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনায়। প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় কাজের গতিশীলতা আনতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রকৌশল প্রশাসন ক্যাডার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে দেশের প্রকৌশল খাতে উন্নততর নেতৃত্ব তৈরি হবে। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের দ্বন্দ্বে মেধার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পেশাতেই মেধার প্রয়োজন; এমনকি যিনি ফসল ফলান তাঁরও। মেধার প্রমাণ দেখিয়েই স্নাতক ও ডিপ্লোমা সনদ অর্জন করতে হয়। তবে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুরোর কিছু সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে।

কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণাগারের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব, সঠিক মূল্যায়নের অভাব ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো বেশি অবহেলার স্বীকার। এই দায় ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ডিপ্লোমাধারীরা যেন তাঁদের কাজে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন, সেভাবে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের।  
   
বলা হয়, ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার পথ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই অনুচিত। উচ্চমাধ্যমিক বাদ দিয়ে ডিপ্লোমা সনদের জন্য চার চারটি বছর ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, তা–ও ভেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে ভালো হয়, পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুই বছরে কারিগরি বোর্ডের আওতায় উচ্চমাধ্যমিক সনদ দিয়ে যাঁরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাঁদের যদি সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়। যাঁরা তারপর পলিটেকনিকে কারিগরি ধারায় থাকবেন, তাঁরা দুই বা তিন বছরে প্রকৌশলে ডিপ্লোমা নিয়ে হয় শ্রমবাজারে যাবেন, নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে দুই বছরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে পারবেন।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, সবাই প্রকৌশলী হতে চাইলে সেটাও প্রকৌশল খাতের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সহায়ক নয়। তাই ডিপ্লোমাধারীদের জন্য প্রস্তাবিত ক্যাডারে সম্মানজনকভাবে পেশাগত বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে, যাতে তাঁরাও সন্তুষ্টচিত্তে পেশায় মনোযোগী হতে দ্বিধান্বিত না হন।

পরিশেষে প্রকৌশল খাতে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন তাঁরা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও নীতিমালা সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন এবং সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন।

* ড. মাহবুবুর রাজ্জাক, অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।
- ই-মেইল: mmrazzaque@me.buet.ac.bd
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-28%2Fsz8hyf9a%2FUntitled-3.jpg?rect=2%2C0%2C1677%2C1118&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
স্নাতক প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিক্ষোভ। ছবি: প্রথম আলো

৯/১১ হামলায় সহায়তার অভিযোগে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মামলা চলবে: ফেডারেল বিচারক

নিউইয়র্কের একজন ফেডারেল বিচারক ৯/১১ হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের দায়ের করা মামলা খারিজে সৌদি আরবের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী হামলার আগে সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছিল তারা।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট জজ জর্জ ড্যানিয়েলস রায় দিয়েছেন, বাদীদের দাবিগুলো এ মামলাটি বিচারের জন্য যথেষ্ট। ফলে এই ঐতিহাসিক মামলার বিচার চলতে থাকবে এবং দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইও চলমান থাকবে।

বাদীদের অভিযোগ, সৌদি আরব সরকার ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলার আগে সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী একটি চরমপন্থী চক্রকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তবে সৌদি আরব এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।

গত বছরের এক শুনানিতে নিহতদের পরিবারের আইনজীবীরা এ সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তাঁদের দাবি, এতে এমন একটি চক্রের বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত কয়েকজন উচ্চপদস্থ সৌদি কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। আইনজীবীদের দাবি, এই চক্রটি সারা দেশে সন্ত্রাসীদের চলাফেরায় সহায়তা করেছে।

ড্যানিয়েলস তাঁর রায়ে বলেছেন, মামলার অভিযোগের জবাবে সৌদি আরব  যে ব্যাখ্যা বা প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে, সেগুলো খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেক জায়গায় সেগুলো স্ববিরোধীও বটে। তাঁর মতে, ৯/১১-এর হামলার আগে সন্ত্রাসীদের সহায়তায় ওমর আল-বায়ুমি ও ফাহাদ আল-থুমাইরি নামের দুই ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিল সৌদি আরব।

টুইন টাওয়ারে ৯/১১ হামলা
টুইন টাওয়ারে ৯/১১ হামলা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জুলাই সনদ: যেসব ইস্যুতে আর ছাড় দেবে না বিএনপি ও সমমনারা by কিরণ শেখ

জুলাই সনদের তিন ইস্যুতে ছাড় দিতে রাজি নয় বিএনপি ও সমমনা জোটের দলগুলো। তারা জানিয়েছেন, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। এ ছাড়া, জুলাই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলে অঙ্গীকারনামায় যে কথা বলা হয়েছে সেটাতেও আপত্তি জানিয়েছেন তারা। পটভূমিতে ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং সংগ্রাম স্থান না পাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, দ্বিমত এবং একমতের বিষয়গুলোও সনদে সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি। শব্দ চরণ এবং বাক্য গঠনেও ত্রুটি দেখছেন তারা। ওদিকে, কোনো রাজনৈতিক ‘সমঝোতার দলিল’ সংবিধানের উপরে স্থান পেতে পারে কিনা- সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির ভাষ্য, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে জায়গা দেয়ার সুযোগ নেই। জুলাই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলে অঙ্গীকারনামায় যে কথা বলা হয়েছে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছে দলটি। এ ছাড়া, সনদে অঙ্গীকারনামা নিয়েও আপত্তির কথা জানিয়েছে দলটি। তবে, এসব বিষয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি ও সমমনারা।

গত বুধবার জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে লিখিত মতামত জমা দিয়েছে বিএনপি। এর আগে জুলাই সনদ নিয়ে গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। নেতারা বলেন, বিএনপি যেসব মৌলিক প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলোতে ছাড় দেবে না। বিএনপি এখানে তাদের আগের অবস্থানেই থাকতে চায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একইসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না, নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন অন্যতম।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হবে, স্বাক্ষরিত হবে এবং বাস্তবায়িত হবে। অঙ্গীকারনামায় যে প্রস্তাবগুলো রাখা হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার এই দলিলকে সংবিধানের উপরে রাখা এবং কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না? এসব বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য নয়।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা চেষ্টা করছি কাছাকাছি আসার। আর নিজেদের মধ্যে আরও বোঝাপড়া বাড়াতে চাচ্ছি।

অন্যদিকে, জুলাই সনদ নিয়ে গত মঙ্গলবার যুগপৎ আন্দোলনের দল জোটদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি। এদিন রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে বৈঠক করে দলটি। সেখানে অভিন্ন কিংবা কাছাকাছি মতামত দেয়ার পরামর্শ দেয় বিএনপি।
সূত্র  জানিয়েছে, বৈঠকে নেতারা বলেন- জুলাই সনদে অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছতা রয়েছে। যেসব প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গঠন হবে, সেসব এখন শুধু বাস্তবায়ন করা হবে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বাকি সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি বলেছে অঙ্গীকারনামায় জুলাই সনদকে সংবিধান ও আদালতের উপরে রাখা হয়েছে। এটা তারা আপত্তি করবে। আমরা বলেছি, এটা তো ঠিক হতে পারে না। আর জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতির যে প্রশ্ন তুলছে, আমরা মনে করি- আমরা যে মুখে মুখে অঙ্গীকার করছি এটাই যথেষ্ট।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, জুলাই সনদকে সংবিধানের উপরে এবং আইনের ঊর্ধ্বে রাখার বিষয়ে আমাদের আপত্তি আছে। কারণ এটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। কখনোই সংবিধানের উপরে স্থান পেতে পারে না।  

বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, বেশ কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আসে নাই। অবজারভেশন ছিল- অপ্রচলিত শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বেশ কঠিন করে ফেলেছে। সেগুলো প্রচলিত শব্দের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বাক্য গঠন ঠিক হয়নি। নোট অব ডিসেন্টের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। কিন্ত অনেক প্রস্তাবে যারা দ্বিমত হয়েছে, তাদের নাম কেন লিখলেন না? যারা একমত হয়েছে এবং যারা দ্বিমত হয়েছে- তাদের নাম জাতি জানুক। শুধুমাত্র নোট অব ডিসেন্টে বিএনপি, এলডিপি এবং ১২ দলীয় জোটসহ যুগপৎ আন্দোলনের দল ও জোটদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদেরকে ১৬৬টি সুপারিশমালা দেয়া হয়েছিল। কমিশন সনদে ৮৪টি সুপারিশমালা লিখেছেন। এর মধ্যে ২০ থেকে ৩০টি কমিশনে আলোচনা হয়নি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে আনা হয়েছে? 

mzamin

ইসরায়েলে কেন ‘কখনো আর নয়’ ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ by ওফের কাসিফ

ইসরায়েল যখন গাজায় সম্প্রসারিত সামরিক অভিযান চালিয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে, তখন দেশের ভেতরেই বিরোধিতার স্রোত জোরদার হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে গত শনিবার তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় সমাবেশগুলোর একটি।

ইসরায়েলের পুলিশ আগে থেকে অনুমতি নেওয়া এই মিছিলের অনুমোদন বাতিল করে দিয়েছিল। আমাদের মতো বিরোধীদের কণ্ঠস্বর তারা যে নীরব করে দিতে চায়, এটা ছিল তার সুস্পষ্ট চেষ্টা। কিন্তু আমরা তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে দিইনি।

এর এক দিন আগে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)’ গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে এবং পরিকল্পিতভাবে না খাইয়ে মেরে ফেলার ইসরায়েলের ভয়াবহ নীতি ফাঁস করে। এ অবস্থায় অনেক ইসরায়েলি মনে করছেন যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব।

ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা গাজা সিটি ‘পুনর্দখলে’ নেওয়ার প্রস্তাব পাস করার পর ইসরায়েলের সেনাবাহিনী তাদের রিজার্ভ থেকে ৬০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগের আদেশ দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেটি কার্যকর হলে রিজার্ভের সদস্যসংখ্যা হবে ১ লাখ ৩০ হাজার। এটি যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। কিন্তু ইসরায়েলে সেনাসদস্যের সংখ্যাই শুধু বাড়ছে না, যুদ্ধ প্রত্যাখ্যানের আন্দোলনও বেড়ে চলেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কূটচালের বিরুদ্ধে নতুন করে অমান্যতার ঢেউ আছড়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আলোচনায় বা প্রকাশ্য আলোচনায়, আরও বেশিসংখ্যক ইসরায়েলি এই উপলব্ধিতে আসছেন যে সেনাবাহিনীর সেবা করা মানে সরকারের অপরাধের দোসর হওয়া।

আন্দোলনটি কিন্তু মোটেই একমাত্রিক নয়। এই আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের বয়স, সামাজিক অবস্থান, উদ্দেশ্য বা মতাদর্শে ভিন্নতা রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে ‘মেসারভত’ গোষ্ঠীর কিশোরেরা। তারা প্রকাশ্যেই ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্রের অংশ হতে প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত কঠোর আচরণ করা হয়েছে। তাদের বারবার সামরিক কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। এসব কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে আমি নিজে এই সব সাহসী কিশোরের সঙ্গে দেখা করেছি। তারা ‘শান্তির সৈনিক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

আরও অনেকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মনে মনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁদের সংখ্যা ঠিক কত, তার পরিসংখ্যান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আছে এবং সে তথ্য তারা প্রকাশ করনি। কিন্তু সেনাবাহিনীতে যুক্ত না হওয়ার জন্য ছাড়পত্র পেতে সাহায্য করে এমন একটি সংস্থা ‘ইয়েশ গ্ভুল’ বলছে, এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি হারেৎসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে সেনাবাহিনীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা মানুষের প্রতি সমর্থন উল্লেখযাগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, এই প্রত্যাখ্যান শুধু যৌক্তিক নয়, গাজায় থাকা জিম্মিদের জীবন রক্ষার জন্যও এটা প্রয়োজনীয়।

সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার ডাক প্রত্যাখানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। এর মধ্যে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যুদ্ধাপরাধে অংশ নেওয়ার নৈতিক আপত্তি, সামগ্রিকভাবে দখলদারত্বের রাজনৈতিক বিরোধিতা, সামরিক অভিযানের ফলে জিম্মিদের নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ার উদ্বেগ এবং বিভিন্ন অতিরক্ষণশীল গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়ায় অসন্তোষ।

মানবতার মৌলিক ধারণায় একত্র হয়ে শনিবার হাজার হাজার আরব ও ইহুদি একসঙ্গে ক্ষুধা, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীরা গাজার অনাহারী মানুষ ও বোমাবর্ষণে আহত শিশুদের ছবি তুলে ধরেন। তাঁরা জানেন যে গাজার বাসিন্দাদের দুর্বিষহ যন্ত্রণার জন্য যারা দায়ী, তারা এখন ক্ষমতায় রয়েছে।

আমরা দাবি জানিয়েছি, ইসরায়েলি হোক আর ফিলিস্তিনি হোক, সব জিম্মি ও আইনবিরুদ্ধভাবে আটকে রাখা বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। আমরা একটি রাজনৈতিক চুক্তির দাবি জানিয়েছি, যাতে ইসরায়েল সরকার গাজা থেকে সব সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে।

কিন্তু গাজায় আরেক দফা বোমাবর্ষণের খবরের পর সমাবেশ থেকে আমাদের যে ব্যানার, সেখানে স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘কখনোই আর নয়’। হত্যাযঞ্জের শিকার হওয়া শিশু ও অনাহারে থাকা পরিবারগুলো নিয়ে আমরা আর কখনো চুপ থাকব না। নেতানিয়াহু যখন আমাদের প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি, বসতি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে এবং হাসপাতালে আক্রমণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন আর আমরা নীরবে দেখব না। জিম্মিদের মুক্তি দিতে পারে, এমন চুক্তি আর আমরা প্রত্যাখ্যান করতে দেব না। আর কখনো গাজায় গণহত্যা হতে দেব না।

পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে ‘কখনো আর নয়’ শব্দের বিশেষ তাৎপর্য আমার কাছে আছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবজাতি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে আর কখনো এমন নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি তারা হতে দেবে না।

হলোকাস্ট; ইহুদিদের গণহত্যা, নিষ্টুর অত্যাচারের সব সীমা ছুঁয়েছিল। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি ‘কখনো আর নয়’ স্লোগানকে সর্বজনীন কর্তব্য বলে মনে করি।

১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সনদ গ্রহণ করেছিল। গত কয়েক দশকে এই অমূল্য সত্যের সুরক্ষা দিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি। গাজায় যে চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে চলেছে, সেটা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। এই বাস্তবতায় ‘কখনো আর নয়’ স্লোগানটি কেবল নৈতিক স্মরণ নয়, বরং নৈতিকভাবে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

প্রচলিত আছে, ‘একবার আমাকে ঠকালে দোষ তোমার, দ্বিতীয়বার ঠকালে দোষ আমার’। কিন্তু নেতানিয়াহু বারবার পশ্চিমা নেতাদের প্রতারিত করতে সক্ষম হচ্ছেন। শুক্রবার আইপিসি গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, এটি ‘সম্পূর্ণরূপে ভয়ানক ও পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’।

আমি ল্যামি ও ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের জিজ্ঞেস করতে চাই, যাঁরা এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী, সেই দলে আপনারা কি নেই?

* ওফের কাসিফ, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য

- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-03-21%2Ft5f9r6g4%2FIsrael.jpg?rect=1%2C0%2C659%2C439&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

Friday, August 29, 2025

পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আসতেই হবে: ইইউ প্রধান

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অবশ্যই ইউক্রেন নিয়ে শান্তি আলোচনায় বসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপের পর  বৃহস্পতিবার এ কথা বলেছেন তিনি।

ট্রাম্পের প্রস্তাবে পুতিন-জেলেনস্কির আলোচনা আয়োজনে ক্রেমলিনের গড়িমসি দেখে এ আহ্বান জানালেন ভন ডার লেন।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন ডার লেন এক বার্তায় বলেন, ‘কিয়েভে ভয়াবহ হামলার পর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বললাম। আমাদের ইইউর কার্যালয়ও এ হামলার শিকার হয়েছে। পুতিনকে আলোচনায় আসতেই হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ীভাবে শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মাধ্যমে দেশটি নিরাপদ  হয়ে উঠতে পারে।’

এদিকে ইউক্রেনে সংঘাত শুরুর পর থেকে গতরাতে অন্যতম বড় বোমা হামলা চালিয়েছে মস্কো। এ হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক মিশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলে কিভাবে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো আলোচনা করছে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় শান্তি পরিকল্পনার সমর্থনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ইউক্রেনে আমেরিকান সৈন্য মোতায়েন করবে না।

ভন ডার লেন লিখেছেন, ‘ইউরোপ সম্পূর্ণভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে।’ তিনি এ সময় ইউক্রেনের অস্ত্র তহবিলে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে ইইউর নতুন বড় একটি কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

উরসুলা ভন ডার লেন
উরসুলা ভন ডার লেন। ছবি: রয়টার্স

দয়া করে আপনারা নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট করুন: ইউরোপীয় নেতাদের জেলেনস্কি

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গতকাল বৃহস্পতিবার ইউরোপের কয়েকজন নেতাকে বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাঁর দেশের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কী হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা এখন খুব জরুরি। কারণ, যুদ্ধ টানা সাড়ে তিন বছর ধরে চলছে।

পোল্যান্ডে ইউরোপীয় নেতাদের একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে জেলেনস্কি এ আহ্বান জানান। এতে অংশ নেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভ্রোৎসকি এবং এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও ডেনমার্কের নেতারা। বৈঠকের ঠিক আগে বুধবার রাতে রাশিয়ার এক হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অন্তত ২২ জন নিহত হন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জেলেনস্কি বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা রাশিয়ার ওপর আরও চাপ তৈরির বিষয়ে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছেন। ইউক্রেন–রাশিয়া সংঘাত নিয়ে আসছে কূটনৈতিক আলোচনার আগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়। প্রসঙ্গত, ইউক্রেনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়া।

বৈঠকে জেলেনস্কির করা মন্তব্যগুলো তাঁর প্রেসিডেনশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন মনে করে, ক্রেমলিনের নেতা ভ্লাদিমির পুতিন এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী নন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তার একটি দৃঢ় ভিত্তি ইউক্রেনের দরকার। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একমত হয়েছেন এবং এক সপ্তাহ ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে পুতিনের ওপর আরও চাপ তৈরি করা প্রয়োজন—এ ব্যাপারেও ইউক্রেন ও ইউরোপীয় নেতাদের অভিন্ন মত রয়েছে।

জেলেনস্কির কথায়, ‘যখন আমরা নিরাপত্তার নিশ্চয়তার কথা বলি, তখন দরকার পরিষ্কার জবাব—রাশিয়া আবার আক্রমণ করলে স্থলে, আকাশে আর সাগরে আমাদের প্রতিরক্ষায় কারা এগিয়ে আসবে, কীভাবে অংশ নেবে? দয়া করে আপনারা নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট করুন।’

‘এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেন দেখেন, আমরা ইউরোপীয়রা যুদ্ধ শেষ করতে একসঙ্গে কাজ করছি’, বলেন জেলেনস্কি।

ট্রাম্প চেষ্টা করছেন পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করতে। তিনি বলেছেন, সংঘাত নিরসনে অগ্রগতি না হলে মস্কোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতে পারে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলায় প্রেসিডেন্ট ‘সন্তুষ্ট নন’।

জেলেনস্কি বরাবরই ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বৈঠকের (জেলেনস্কি–পুতিন) পক্ষে ছিলেন এবং ইউরোপীয় নেতাদের যুদ্ধবিরতির আহ্বানও সমর্থন করেছেন, যাতে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যায়।

আজ শুক্রবার নিউইয়র্কে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইউক্রেনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক করার কথা রয়েছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের এক মুহূর্তে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্র, ১৮ আগস্ট ২০২৫
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের এক মুহূর্তে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্র, ১৮ আগস্ট ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ফোনালাপ ফাঁস, পদচ্যুত হতে পারেন থাইল্যান্ডের বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা

থাইল্যান্ডের সাময়িকভাবে বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে পদচ্যুত করার বিষয়ে আজ শুক্রবার সিদ্ধান্ত নেবেন দেশটির সাংবিধানিক আদালত। কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

আদালতের রায়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা পদচ্যুত হলে সেটি হবে সিনাওয়াত্রা পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা। এ রায় থাইল্যান্ডকে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আদালতের রায় পেতংতার্নের বিরুদ্ধে গেলে ২০০৮ সালের পর তিনি হবেন আদালতের রায়ে পদচ্যুত হওয়া থাইল্যান্ডের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী। সমালোচকেরা বলছেন, দেশটির বিচারকেরা মূলত রাজতন্ত্র-সামরিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন।

এ রায়ের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ডে আগাম নির্বাচনের পথ খুলে যেতে পারে।

আদালতে পেতংতার্ন ও তাঁর বাবা সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে চলা গুরুত্বপূর্ণ তিনটির মামলার দ্বিতীয়টির রায় হবে আজ।

৭৬ বছর বয়সী থাকসিন সিনাওয়াত্রা ছিলেন থাইল্যান্ডের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নায়ক। ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। গত সপ্তাহে রাজতন্ত্র অবমাননার অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। তবে ১৬ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে ২০২৩ সালে দেশে ফেরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি মামলায় আবার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

পেতংতার্ন শেষ পর্যন্ত পদচ্যুত না হলেও খুব বেশি লাভ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ধাক্কা এবং তাঁর ফেউ থাই পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বড় সংকটের মুখে আছে।

আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের থাইল্যান্ড স্টাডিজ প্রোগ্রামের ভিজিটিং ফেলো ও ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক নাপন জাতুস্রিপিতাক বলেন, ‘আমার মনে হয়, সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা একেবারেই শেষ হয়ে গেছে।’

গত মে মাসে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে সেনা বিরোধকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে পেতংতার্নকে কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে খুব আনুগত্যের সুরে কথা বলতে শোনা যায়। ওই সময় হুন সেনকে আঙ্কেল বলে সম্বোধন করেন পেতংতার্ন। তিনি একপর্যায়ে এক জ্যেষ্ঠ থাই সেনা কর্মকর্তার সমালোচনা করে তাঁকে নিজের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলে উল্লেখ করেন।

এই ফোনালাপ থাইল্যান্ডে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কেউ কেউ পেতংতার্নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ করেন। তিনি ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেও সাংবিধানিক আদালত নৈতিক অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা পিটিশন আমলে নেন এবং তাঁকে সাময়িকভাবে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করেন।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

হারেৎজের মতামত কলাম: ইসরাইলকে কি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু?

হারেৎজের মতামত কলামঃ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা নীতিকে ‘ফরমালডিহাইড ফর্মুলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যা উপত্যাকাটিতে শান্তি নয় বরং মৃতের সংখ্যা বাড়াতে পারে। নেতানিয়াহুর এমন নীতির সমালোচনা করে একটি মতামত কলাম প্রকাশ করেছে হারেৎজ। সেখানে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে যে কৌশল নিয়েছেন, তা ইসরাইলের সমাজকে আরও আগ্রাসী ও অহংকারী করে তুলছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাতকে ‘বর্বরতা বনাম সভ্যতার সংঘাত’ হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবে এই বিভাজন ভেঙে পড়ছে। ইসরাইল কি সত্যিকার অর্থেই ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেতানিয়াহু কি ফিলিস্তিনিদের ‘ফিন’ জাতির মতো শান্ত ও সভ্য করতে চান? নাকি তাদের ‘অ-ফিন’ হিসেবে থাকাটাই ইসরাইলের জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করেন, যাতে কোনো সমাধান না করার অজুহাত পাওয়া যায়?

নেতানিয়াহু মনে করেন সময় ইসরাইলের পক্ষে আছে। কিন্তু এই ধারণা একটি বিপজ্জনক ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। গাজায় ইসরাইলের প্রতিটি কঠোর আঘাত ফিলিস্তিনিদের জয়ী করছে। কারণ, দুর্বলদের আত্মত্যাগই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যত বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হচ্ছে, গাজায় ক্ষুধা ও দুর্ভোগ বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ইসরাইল ততই দুর্বল ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ইসরাইলের সময় ফুরিয়ে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সমালোচনা করেছেন কলামিস্ট ক্যারোলিনা ল্যান্ডসম্যান। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম ইসরাইলের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। শুধু ডেমোক্রেট নয়, রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

নেতানিয়াহুর এই নীতি ইসরাইলি সমাজের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। ইহুদি আধিপত্য বাড়ছে এবং ফিলিস্তিনিদের পরিচয় কেবল ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই নীতি কেবল সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে, কিন্তু কোনো সমাধান দেবে না। ফরমালডিহাইড যেমন কেবল মৃতদেহ সংরক্ষণ করে, নেতানিয়াহুর কৌশলও তেমনি কেবল ‘মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি’ করছে। ল্যান্ডসম্যান সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইসরাইলের এই আত্মঘাতী যাত্রার কাউন্টডাউন বা ক্ষণগণনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

গাজায় ইসরাইলের ব্যাপক বোমা হামলা, নিহত আরও ৬১
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া হামলায় অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন বলে মেডিকেল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন ত্রাণপ্রার্থীও রয়েছেন। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে ব্যাপক বোমা হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরাইলের এই অভিযানের সমালোচনা করে বলেছেন, এটি যুদ্ধের একটি নতুন এবং বিপজ্জনক ধাপের ইঙ্গিত। তিনি বলেন, গাজা সিটিতে সামরিক অভিযানের ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। কারণ এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি আবারও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হবেন।

এদিকে, গাজা সিটির শুজাইয়া, জেইতুন এবং সাবরা এলাকাগুলোতে ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলার কারণে বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে উপকূলের দিকে পালাচ্ছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মতে, জেইতুন এলাকার দক্ষিণাংশে ইসরাইলি স্থল অভিযানে ১৫০০-এর বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা গাজা সিটিকে হামাসের শেষ দুর্গ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা গাজায় জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, রাফাহতে ত্রাণ নিতে যাওয়া ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক গুম করে ফেলা হচ্ছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খাদ্যের জন্য ক্ষুধার্ত বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে জোরপূর্বক গুম করা শুধু মর্মান্তিক নয়, এটি এক ধরনের নির্যাতন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মানবিক সংকট চরমে পৌঁছেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার অনাহারে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে দুইজন শিশু। ফলে এই যুদ্ধে অনাহারে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে, যার মধ্যে ১২১ জনই শিশু।

আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জৌম দেইর আল-বালাহ থেকে জানান, সেখানকার পরিস্থিতি হৃদয়বিদারক। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে, কিন্তু প্রায়শই খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। ইসরাইলের সামরিক হামলায় এখন পর্যন্ত ৬২,৯০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

গাজার জেইতুনের সকল ভবন ধ্বংস করেছে ইসরাইল

গাজা শহরের জেইতুন এলকার সকল ভবন ধ্বংস করেছে ইসরাইল। সেখানে আর কোনো ভবন অক্ষত নেই। এ মাসের শুরুতে গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে ইসরাইল। এতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। এদিকে রাতভর হামলায় কমপক্ষে ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে এক নারী ও শিশু আছে। তারা বুরেজি শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা ছিলেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাদে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্য আইপিসি’র ঘোষণাকে সমর্থন করেছে। এতে বলা হয়েছে, গাজার দুর্ভিক্ষ মানুষ সৃষ্ট সংকট। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে একটি নীতিগত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

শিক্ষাবিদ লোরেনজো কামেল বলেছেন, ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান হতে পারে না। তবে তিনি বলেন, অস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইত্যাদির শর্তাবলীর বিষয়ে সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। কামেল আরও বলেন, লেবাননের একটি বৃহৎ অংশ গাজার মতো পরিণতি ভোগ করতে যাচ্ছে। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প হিজবুল্লাহকে ধ্বংসের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই কথা বলেন তিনি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) তরফে বলা হয়েছে, ২২ মাসের যুদ্ধে তাদের একজন কর্মীকে গাজা থেকে ১৯ বার বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। এক্সে এক পোস্ট দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, চলমান বোমা হামলায় অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। আরও বলা হয়েছে, মানুষ ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত। এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/177512_Lima-1.webp

নেতানিয়াহু যেভাবে ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন by এরান ইয়াশিভ ও দানিয়েল সিদ্দন

ইতালির বর্তমান সরকার দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ইসরায়েলপন্থী সরকার। তাই ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তোর সাম্প্রতিক বক্তব্য ইসরায়েলিদের, বিশেষ করে ইসরায়েল সরকারের ভেতরের মানুষদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা উচিত।

লা স্টাম্পা পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রোসেত্তো সরাসরি ইসরায়েলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই নিরীহ মানুষ মারার অজুহাত আর হতে পারে না। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা নেতানিয়াহুকে সংঘাত থামাতে বাধ্য করবে।’ তাঁর মতে, ‘সে পদক্ষেপগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়; বরং নিজেদের জনগণকে এমন এক সরকার থেকে রক্ষা করার উপায়, যে সরকার ভালোমন্দ বিবেচনার বোধ ও মানবিকতা হারিয়ে ফেলেছে।’

ক্রোসেত্তোর এ বক্তব্য একদম সঠিক। গাজার যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনিদের ওপর নয়; বরং ইসরায়েলের অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। যদি এখনই দিক পরিবর্তন না করা হয়, তাহলে নেতানিয়াহুর নীতি ইসরায়েলকে কয়েক দশকের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে দিতে পারে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তর গাজায় অনেক মানুষ (কমপক্ষে পাঁচ লাখ) এখন তীব্র খাবারের সংকটে ভুগছেন, যা একেবারে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি। ইসরায়েল জুলাই মাসে যে ‘মানবিক শহর’ বানানোর কথা বলেছিল, সেটা আসলে গাজাবাসীদের জোর করে সীমাবদ্ধ জায়গায় আটকে রাখার পরিকল্পনা। এরপর আগস্টে তারা গাজা সিটি দখল করে আরও মানুষকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এসব দেখে বোঝা যাচ্ছে, গাজার মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হতে চলেছে।

নেতানিয়াহুর সরকার এ ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে চলেছে। কারণ, তাঁর নিজের রাজনৈতিক মঞ্চে টিকে থাকা এ যুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে। দুর্নীতির মামলাগুলোতে দুর্বল হয়ে পড়া নেতানিয়াহু ক্ষমতায় টিকে থাকতে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার পথ বেছে নিয়েছেন। এ মনোভাব তাঁর জোট সরকারের সবচেয়ে চরমপন্থী সদস্যদের প্রভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ খোলাখুলি বলছেন, গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের বড় আকারে উচ্ছেদ করতে হবে। তাঁদের কাছে দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতি অনিচ্ছাকৃত পরিণতি নয়; বরং এটি তাঁদের লক্ষ্য।

চলমান ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া শুধু নৈতিক বিপর্যয় নয়, এর গভীরতর প্রভাবও আছে। সম্প্রতি ২৪ জন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ (যাঁদের মধ্যে ১১ জন নোবেলজয়ী) নেতানিয়াহুকে এক খোলাচিঠিতে বলেছেন, ইসরায়েল নিজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে।

গাজার মানুষদের বাঁচাতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবল চাপের মুখে পড়া ইউরোপ চুপ থাকবে না। ইসরায়েলের ওপর ‘টার্গেটেড’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ইসরায়েলের সঙ্গে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ইসরায়েলের সমৃদ্ধিশালী প্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তহবিল বিপদের মুখে পড়বে।

এখনই ঋণমান হ্রাস শুরু হয়েছে, ঋণের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে এবং দক্ষ ইসরায়েলিরা বড় সংখ্যায় দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত কারণে এ খরচের কিছুটা বহন করতে চাইতে পারে, তবু এটা পরিষ্কার যে নেতানিয়াহুর নীতির কারণে ইসরায়েলের অর্থনীতি দীর্ঘ বছর ধরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে পারবে না।

১৯৮২ সালে ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধের পরিণতির মতোই, গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করলে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ বহন করতে হবে।

প্রথমত, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসাসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গাজায় খাবারের পরিমাণ পাঠানো নয়; বরং মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং কার্যকরভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, সেটিই হবে এর মাপকাঠি।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজাবাসীর শিবিরে জোর করে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সশস্ত্র সংঘর্ষের সময়ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে। সবশেষে ইসরায়েলকে একটি সত্যিকারের যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে হবে, যা জিম্মিদের মুক্তি এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে।

পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইসরায়েলের ওপর কূটনীতি, অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।

* এরান ইয়াশিভ তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
* দানিয়েল সিদ্দন তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

ভারতকে মোকাবিলায় পাকিস্তান কেন নতুন রকেট কমান্ড গড়ল, এর বৈশিষ্ট্য কী

পাকিস্তানের ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নতুন এক সামরিক কাঠামো ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, সেনাবাহিনীতে গড়ে তোলা হয়েছে আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি)। এটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘সব দিক থেকে শত্রুকে আঘাত হানতে সক্ষম’।

১৩ আগস্ট ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে শরিফ বলেন, এ উদ্যোগ পাকিস্তানের প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

পাকিস্তানে ‘শত্রু’ বলতে মূলত বোঝানো হয় দেশটির প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। ওই ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহ পর ভারত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওডিশা থেকে ‘অগ্নি-৫’ মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এর পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ১০০ মাইল)।

যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানের এআরএফসি গঠনের সঙ্গে ভারতের ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সরাসরি সম্পর্ক নেই।

তবে এআরএফসি গঠনের সিদ্ধান্ত এসেছে চলতি বছরের মে মাসে হওয়া পাকিস্তান-ভারতের টানা চার দিনের সংঘাতের পর। ওই সংঘাতে দুই দেশ একে অপরের সামরিক স্থাপনায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ লড়াই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাকৌশলের কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। প্রায় তিন দশক ধরে দেশটি মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর ভরসা করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বাস্তবে কখন সেই অস্ত্রের ব্যবহার করবে, তা নিয়ে ছিল অস্পষ্ট অবস্থানে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু পাকিস্তানই নয়, বর্তমানকালের আধুনিক যুদ্ধ বা লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুরুত্ব বাড়ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিংবা ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত এর বড় প্রমাণ।

এআরএফসি আসলে কী

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ নতুন রকেট কমান্ড নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এআরএফসি হচ্ছে সেনাবাহিনীর নতুন এক শাখা। এর মাধ্যমে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীভূত করা হবে। অর্থাৎ প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, ব্যবহার, সংরক্ষণ—সব দায়িত্ব ছড়ানো–ছিটানো কমান্ডের পরিবর্তে একসঙ্গে একটি নতুন কমান্ডের হাতে আসবে।

পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোয় পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থাকে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের (এসপিডি) হাতে। আর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি (এনসিএ)’।

এসপিডির সাবেক সেনাকর্মকর্তা নাঈম সালিকের মতে, এআরএফসি পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্রব্যবস্থার পরিবর্তে মূলত প্রচলিত গাইডেড রকেটব্যবস্থা নিয়েই কাজ করবে।

‘প্রচলিত কামানের পাল্লা যেখানে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার (১৯ থেকে ২২ মাইল), এআরএফসি সেখানে এমন গাইডেড রকেটের ওপর জোর দিচ্ছে, যেগুলো পুরোপুরি প্রচলিত ব্যবস্থা ও পারমাণবিক সক্ষমতাহীন’, বলেন নাঈম সালিক। বর্তমানে তিনি ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজিক ভিশন ইনস্টিটিউটের (এসভিআই) নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

নাঈম জানান, পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো এসপিডি ও এনসিএর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। আর এআরএফসির তত্ত্বাবধান করবে সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স (জিএইচকিউ)।

অন্যদিকে, সাবেক ব্রিগেডিয়ার এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক নীতি–বিশেষজ্ঞ তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, এআরএফসি গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি ও কার্যকারিতা বাড়ানো—হোক সেটা প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে কিংবা সীমিত সংঘাতকালে ব্যবহারের লক্ষ্যে।

‘রকেট ফোর্স কমান্ডকে অবশ্যই আঞ্চলিক হুমকির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। এটা কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয় যে শুধু একটি পরীক্ষা বা সীমিত সংঘর্ষের জবাবে গড়ে তোলা হয়েছে’, বলেন ইয়ামিন।

বর্তমানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নয়টি কোর রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে তিনটি বিশেষায়িত কমান্ড—আকাশ প্রতিরক্ষা, সাইবার ও স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড (যা পারমাণবিক অস্ত্র পরিবহনের দায়িত্বে)।

এআরএফসির নেতৃত্ব দেবেন সেনাবাহিনীর একজন তিন তারকা জেনারেল, যা এর গুরুত্বকেই তুলে ধরছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তিন তারকা জেনারেলদের হাতে সাধারণত কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোর ও দপ্তরের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

এআরএফসির প্রয়োজন কেন হলো

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ নতুন সামরিক কাঠামো ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা মে মাসের সংঘাতের সরাসরি প্রতিক্রিয়া নয়; বরং বহুদিনের চিন্তাভাবনার ফল।

তুঘরাল ইয়ামিন মনে করেন, ভারতের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অবশ্যই পাকিস্তানকে সতর্ক করেছে। তবে রকেট কমান্ড আসলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনারই অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, পাকিস্তান আগেই স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে ঝুঁকেছিল। তাঁর মতে, পারমাণবিক মিশন সামলাবে স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড, আর প্রচলিত হামলার দায়িত্ব হবে রকেট ফোর্সের।

ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এএনইউ) শিক্ষক মনসুর আহমেদ বলেন, সব পারমাণবিক শক্তিধর দেশই যুদ্ধের প্রচলিত কৌশলগত বিকল্প তৈরি করেছে। তাই ভারতের বাড়তে থাকা পাল্টা আক্রমণক্ষমতার মুখে পাকিস্তানের এআরএফসি আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করছে।

মনসুর আহমেদ বলেন, পাকিস্তান বহু বছর ধরেই প্রচলিত পাল্টা আক্রমণক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ভারতের ‘প্রথম হামলার কৌশল’ ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি পাকিস্তানকে জরুরিভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। মে মাসের সংঘাতে ভারতের প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পাকিস্তানের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে গেছে।

‘মের সংঘাত শুধু প্রমাণ করেছে, ভারতের প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পাকিস্তানের উদীয়মান কৌশলগত প্রচলিত শক্তিকে দ্রুত কার্যকর করার তীব্র প্রয়োজন রয়েছে’, বলেন আহমেদ।

এআরএফসির অধীন কোন ক্ষেপণাস্ত্র আসবে

পাকিস্তানের হাতে আছে নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো স্থল থেকে স্থল, আকাশ থেকে স্থল ও স্থল থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআরএফসি মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করবে।

নাঈম সালিকের মতে, এআরএফসির হাতে বর্তমানে ফাতেহ-১ (পাল্লা সর্বোচ্চ ১৪০ কিমি) ও ফাতেহ-২ (২৫০–৪০০ কিমি) রকেট রয়েছে। মে মাসের সংঘাতে এগুলো ব্যবহারও করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি হাতফ-১ ও আবদালি ক্ষেপণাস্ত্রও আছে। এগুলোর পাল্লা ৫০০ কিলোমিটারের কম।

মনসুর আহমেদ বলেন, নতুন কমান্ড পাকিস্তানকে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে গভীরভাবে হামলা চালানোর সুযোগ দেবে, আবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারও করতে হবে না।

মনসুর আহমেদ আরও বলেন, ‘এআরএফসির মূল লক্ষ্য, বহু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপব্যবস্থা ও নির্ভুল প্রচলিত আঘাতক্ষমতা গড়ে তোলা। এতে পাকিস্তানের ‘কুইড প্রো কো প্লাস’ কৌশল কার্যকর হবে; যা ভারতের প্রতিরোধ কৌশলের জবাব।’

পাকিস্তানের ‘কুইড প্রো কো প্লাস’ নীতি অনুযায়ী, ভারতের হামলার জবাব সমানুপাতে না দিয়ে আরও বড় বা অপ্রত্যাশিতভাবে দেওয়া হতে পারে। তবে সেটি এমনভাবে, যা সংঘাত জোরালো করার আশঙ্কা তৈরি করলেও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি না করে।

মে মাসের সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষা

ভারতের তরফে শুরু করা সংঘাতের প্রথম দিনই পাকিস্তান বলে, তারা ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে ক্ষয়ক্ষতির কথা মেনে নেয়, যদিও সংখ্যা জানায়নি।

ভারত পাল্টা হামলায় পাকিস্তানের গভীরে প্রবেশ করে বিমানঘাঁটি ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে। সিন্ধু প্রদেশের ভোলারি বিমানঘাঁটিতে তারা নিক্ষেপ করে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।

চার দিন লড়াই চলার পর ১০ মে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান তাঁরা ‘শুধু সাময়িক বিরতি দিয়েছেন’। তিনি বলেন, ‘ভারত পারমাণবিক ব্ল্যাকমেল সহ্য করবে না। ভারত ‘‘সন্ত্রাসবাদে’’ সমর্থন দেয় এমন সরকার ও ‘‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’’র মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না।’

মনসুর আহমেদ বলেন, এআরএফসি গঠনের একটি উদ্দেশ্য হলো, ভারতের এ নতুন ধরনের প্রতিরোধকৌশল মোকাবিলা করা।

পারমাণবিক কৌশল আর রকেট ফোর্সের বাস্তবতা

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাকৌশলের মূল ভরসা ছিল কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র। এগুলো স্বল্পপাল্লার, কম ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক বোমা। আর বানানো হয়েছিল মূলত ভারতের বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য।

কিন্তু ২০২৫ সালের সংঘাত ছয় বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো দুই দেশকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এর আগেও ২০১৯ সালে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন ভারত দাবি করেছিল, সন্ত্রাসী শিবিরে হামলা চালাতে তাদের যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের ভেতরে বোমা ফেলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক পাকিস্তানি প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক বলেন, ‘রকেট ফোর্স গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, মে মাসের সংঘাতের সময় প্রকাশিত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা।’

ওই সংঘাতে ভারতের ব্রহ্মোস ব্যবহার করার পরও পাকিস্তান বাবর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা আঘাত করতে পারেনি। কারণ, বাবর শুধু পারমাণবিক মিশনের জন্য সংরক্ষিত এবং তা নিয়ন্ত্রণ করে এ মিশনের দায়িত্বে থাকা এসপিডি ও স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড।

হাতফ-৭ নামেও পরিচিত বাবর স্থল থেকে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার (৪৩৫ মাইল) এবং এটি ২০১০ সাল থেকে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবে এটি এখনো পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতির সঙ্গে সংযুক্ত।

ওই বিশ্লেষক বলেন, ‘নতুন রকেট ফোর্স গঠন আসলে দেখিয়ে দিল, পাকিস্তানের শুধু পারমাণবিক অস্ত্রনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ২০১৯ আর ২০২৫ সালের সংঘাত প্রমাণ করেছে, ভারত নানা উপায়ে পাকিস্তানের এ প্রতিরোধব্যবস্থা এড়িয়ে গেছে। তাই এখন প্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রই জরুরি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-27%2F10be0b62%2FShaheen1.avif?rect=1%2C0%2C504%2C336&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
‘পাকিস্তান দিবস’–এর সামরিক শোভাযাত্রায় ইসলামাবাদে একটি শাহীন-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন সেনাসদস্য। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, August 28, 2025

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মূলত ‘জেনোসাইড পুরস্কারের’ যোগ্য by গিডিয়ন লেভি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ের স্বপ্ন দেখেন; তিনি দেখেন যে অসলোয় তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাঁর জন্য সঠিক জায়গা হলো হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কার্যালয়। দুনিয়ায় ট্রাম্প ছাড়া আর কোনো অ–ইসরায়েলি নাগরিক নেই, যিনি গাজায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ তিনি যদি চাইতেন, তাহলে একমাত্র তিনিই একটি মাত্র টেলিফোনে এই ভয়াবহ যুদ্ধ থামাতে পারতেন, পারতেন ইসরায়েলি জিম্মিদের প্রাণ রক্ষা করতে।

কিন্তু তিনি তা করেননি। যুদ্ধ থামাতে ফোন করা তো দূরে থাক, ট্রাম্প ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রকে নিয়মিতভাবে অর্থ, অস্ত্র ও মদদ দিয়ে যাচ্ছেন, যেন গাজায় কোনো কিছু ঘটেনি। আর তিনি এতেই মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছেন। গত সপ্তাহে তিনি বরং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে একজন ‘সমর নায়ক’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে নিজেও এই সন্দেহজনক সম্মানের ভাগীদার হওয়ার গৌরব ছাড়তে চাননি। তাই ‘আমার তো মনে হয় আমিও তাই’ বলে দাবি করেছেন।

তার মানে গাজায় যে গণহত্যা ঘটিয়ে চলেছে, জেনোসাইড ঘটিয়ে চলেছে, এমন একজনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বীরযোদ্ধা মনে করছেন! আবার যিনি একবার বর্ষণের জন্য বোমারু বিমান পাঠিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিহীন অভিযান পরিচালনা করেন, তাঁকেও সমর নায়ক মনে করেন! এই তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির মনোভঙ্গি।

ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করার মানে হলো দিনকে রাত বানানো, মিথ্যাকে সত্যি দেখানো। এর আরও মানে হলো এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধের জন্য অপরাধী ব্যক্তিকে একযোগে নোবেল পুরস্কার জয়ী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আর দালাই লামা বানিয়ে ফেলা। ডোনাল্ড ট্রাম্প আর নেলসন ম্যান্ডেলাকে একই নৌকায় তুলে দেওয়া। এহেন চরম উপহাসের কোনো পরিসীমা নেই। আর এই উপহাস করা হতে যাচ্ছে আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প অবশ্য একটি পুরস্কার পেতেই পারেন। সৌভাগ্যবশত কিংবা দুর্ভাগ্যবশত সেই পুরস্কারটা এখনো প্রবর্তিত হয়নি। সেটি হলো ‘জেনোসাইড পুরস্কার’।

দুটি মারাত্মক প্রতিবেদন গত শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো থেকে এই যুদ্ধের জেনোসাইডমূলক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। জাতিসংঘ সমর্থিত সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা ধাপ শ্রেণীকরণ (আইপিসি), যা বিশ্বের খাদ্যসংকট বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় নির্ভরযোগ্য আভাস প্রদানকারী) নিশ্চিত করেছে যে গাজা নগরীর পাঁচ লাখ মানুষ ও পরিবেশ দুর্ভিক্ষের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই ক্ষুধার্ত নগরী দখল নিতে যাচ্ছে। ট্রাম্পও এই নৃশংস দখলদারি অভিযানকে সবুজ সংকেত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অস্ত্র দিয়ে।

একই সময়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অনলাইন সাময়িকী +৯৭২ ম্যাগাজিনের হিব্রু সংস্করণ এবং বিলেতের দ্য গার্ডিয়ান ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপাত্ত ফাঁস করে দিয়ে দেখিয়েছে যে গাজা যুদ্ধে আইডিএফের হাতে নিহত ফিলিস্তিনির ৮৩ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। এই হার সম্প্রতিকালের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধগুলো যেমন বসনিয়া, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি।

তার মানে আইডিএফের নিজস্ব উপাত্ত অনুসারেই যুদ্ধে নিহত প্রতি ছয়জন ফিলিস্তিনির মাত্র একজন বন্দুকধারী ব্যক্তি। আর প্রতি ছয়জনের পাঁচজন হলো নিরীহ বেসামরিক নাগরিক। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আমরা প্রথমে সন্দেহ করেছিলাম, তারপর জেনে গেছি যে এটা হলো জেনোসাইড। আর পেছনে আছে আমেরিকা।

ট্রাম্প তো এই যুদ্ধ চালাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে রেখেছেন। তার পরও তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দুঃসাহস দেখান। আমেরিকার অনেক মানুষও তাঁদের প্রেসিডেন্টের পিঠ চাপড়াচ্ছে। অথচ হোয়াইট হাউস থেকে একটি মাত্র টেলিফোন করে গাজায় এই নিধনযজ্ঞ থামিয়ে দেওয়া যায়। ব্যাপক ও সর্বাধুনিক গোয়েন্দা যন্ত্রপাতির সম্ভারসহ বিশাল বাজেটের ১৬টি সংস্থা সঙ্গে থাকার পরও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি টেলিভিশনে দেখেছেন, গাজায় ‘সত্যিই অনাহার’ ঘটেছে।

কিন্তু টেলিভিশন তাঁকে দৃশ্যত যথেষ্ট মর্মাহত করেনি। তাঁর তো উচিত ছিল ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া যে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পুরোদমে যুদ্ধবিরতি করা। আবার নেতানিয়াহুর ইসরায়েল বিশ্বরোষ উপেক্ষা করতে পারে না। অথচ গাজায় জেনোসাইড ঠেকাতে অন্য দেশগুলো যখন ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে, তখন ট্রাম্প আবার তাদের বাধা দিতে যা যা করার সবাই করছেন। ইউরোপ তো এগিয়ে এসেছিল; কিন্তু ট্রাম্পের ভয়ে থমকে গেছে, যেমনটা থেমে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

ইহুদি আমেরিকান রাজনীতিবিদ রন ডেরমের আবার ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনিই হোয়াইট হাউস ও এর ১৬টি গোয়েন্দা সংস্থাকে মিথ্যা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে রক্ত হলো আসলে বৃষ্টি আর এ বৃষ্টি আমেরিকার জন্য আশীর্বাদের। ফলাফল গাজায় উপকূলীয় অবকাশযাপন নগর-পরিকল্পনার পিতা মানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন পরিণত হয়েছেন একজন স্বঘোষিত কাহনীয়তে (প্রয়াত উগ্র ইহুদি রাবাই মেয়ার কাহনের অনুসারী; যিনি ইসরায়েলে বসবাসকারী সব আরবকে ইসরায়েল ও ইহুদিদের শত্রু অভিহিত করতেন।); আর এ জন্য তিনি আবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দাবি করছেন।

* গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলি সাংবাদিক। হারেৎজ–এ প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন আসজাদুল কিবরিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স