Wednesday, June 24, 2015

প্রাপ্তির ঝুলিতে অনেক নুড়ি পাথর

এই ছবিটাও সবার মনে ছড়িয়ে যাক। ছবি: শামসুল হক
মন খারাপ বুঝি?
ম্যাচ শেষের আগেই ফাঁকা হয়ে আসা গ্যালারি, থমথমে বিষণ্ন মুখগুলোই প্রশ্নের উত্তরটা বেশ দিয়ে দেয়। দুটো দিন বাংলাওয়াশ-এর সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় কেটেছে। অন্যরকম এক উত্তেজনা, রোমাঞ্চ, ভালো লাগা ছিল মনে। এ কারণেই হয়তো আজ দুপুরে মাথার ওপর স্পেস শিপের মতো ঘুরতে থাকা মেঘ দেখেও বিরক্ত লেগেছে! বৃষ্টিতে আবার না ম্যাচটা ভেসে যায়। কেউ কেউ হিসাব কষতে বসলেন, ২-০ ব্যবধানে ম্যাচ জিতলেও কি বাংলাওয়াশ বলা যাবে না?
ম্যাচটা শেষ অবধি মাঠে গড়াল। আর কী আশ্চর্য, ভারত সিরিজে এই প্রথম একটা ম্যাচ হলো, যেটাতে বৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য বাগড়া দিল না!
এ পরাজয় হয়তো মানতে চাইবে না অনেকের মন! মানবে কেন? গত আট মাস ঘরের মাঠে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে যে হারতেই ভুলে গিয়েছিল। ঘরের মাঠে টানা ১০ ম্যাচ জয়। এর মধ্যে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দেওয়া, এক ম্যাচ বাকি থাকতে তারকাখচিত ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিরিজ জিতে নেওয়া বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস এতটাই উঁচুতে উঠল, আজকের ম্যাচের বাজির দরে বাংলাদেশই ছিল ফেবারিট!
শেষ পর্যন্ত বাংলাওয়াশ না হলেও প্রাপ্তির ঝুলিতে অনেক নুড়ি পাথর? আছে কিছু মণিমানিক্যও।
দলীয় প্রাপ্তি তো অবশ্যই ভারতকে অনায়াসে প্রথম দুই ম্যাচে হারিয়ে সিরিজ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সামনে সমীকরণ ছিল ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জন্য ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের ৬ ওয়ানডের অন্তত দুটোতে জেতা। সেই কাজটা প্রথম দুই ম্যাচেই সেরে ফেলল বাংলাদেশ! তবে এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাওয়া আসলে মুস্তাফিজই।
নিজের প্রথম ওয়ানডে সিরিজটা কত স্মরণীয় করে রাখলেন সাতক্ষীরার এই এই ‘কিশোর’। ২০-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও যাঁর গা থেকে ​কৈশোরের গন্ধ আর সবুজ বাংলার সরলতা মুছে যায়নি। মুস্তাফিজ এতটাই উজ্জ্বল, পুরো সিরিজে ব্যাটে-বলে ভালো খেলেও সাকিব আল হাসান যেন আড়ালে! ভাবা যায়, সাকিবের মতো মহা তারকাও পার্শ্বনায়ক। এবং সাকিব তাতে বরং বেশি খুশিই হবেন। মুস্তাফিজের হয়ে ধোনিকে ‘জবাব’ দেওয়ার পর যেমন বাধভাঙা খুশিতে মেতে উঠেছিলেন দ্বিতীয় ওয়ানডেতে।
চার পেসার নিয়ে বাংলাদেশের চমকে দেওয়া বাংলাদেশের​ কৌশলগত একটা জয়ও ছিল। নাসির হোসেনের ‘ফিনিশার’ থেকে ‘স্পিনার’ হয়ে ওঠাও চমকের তালিকায় রাখতে হবে। পুরো সিরিজে ভারতের মহা মহা তারকাসহ ব্যাটসম্যানদের কেউই সেঞ্চুরি পাননি। তিন ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র চারটি ফিফটি, এর মধ্যে প্রথম দুটো ওয়ানডেতে মাত্র দুটি! ভারতের কোনো বোলারও পাঁচ উইকেট পাননি কোনো ম্যাচেই। আইপিএলে ছক্কার ফুলঝুড়ি ছড়ানো ভারত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে পুরো ইনিংসে মেরেছে মাত্র একটি ছক্কা। সেই ছক্কা যাঁর ব্যাটে, যিনি শচীন টেন্ডুলকারকেও রেকর্ডে ছাড়িয়ে যাবেন বলে শোনা যাচ্ছে, সেই বিরাট কোহলি তিন ম্যাচের রান যোগ করেও ‘ফিফটি’ করতে পারেননি।
শুধু তা-ই নয়, আক্রমণাত্মক কোহলি ফ্রি হি​ট পেয়েও ছক্কা না হাঁকিয়ে কীভাবে বলটা ডিফেন্স করেছিলেন, এই স্মৃতি অনেক দিন তাঁকে পোড়াবে, লজ্জা দেবে। পলকা-দুবলো শরীরের মুস্তাফিজ এমন এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিলেন ভারতের জন্য। কোহলি এই সফর অনেক দিন মনে রাখবেন। ভারত এই সিরিজ অনেক দিন মনে রাখবে। এটা যে তাদের জন্য ছিল এক রকম ‘শিক্ষাসফর’!
তবে মাঠের লড়াই মাঠেই শেষ। রায়না যেমন ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিতে গিয়ে বারবার শুধু বাংলাদেশের জয়গানই গাইলেন। এর আগে টুপিটা আলতো নাড়িয়ে ক্রিকেটীয় কেতায় ধোনির সঙ্গে করমর্দন করেছেন মাশরাফি। খেলায় উত্তেজনা-উত্তাপ ভীষণই দরকার, না হলে মানুষ খেলা দেখবে কেন। আবার খেলা শেষে দরকার সেই কথাটাও মনে করিয়ে দেওয়া—সৌভ্রাতৃত্বই আসলে খেলার শেষ কথা।
আর তাই অনেক অনেক ছবির মধ্যে এটাও খুব মনে পড়ছে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পতাকা নাড়ছেন দুই দলের দুই চেনা সমর্থক—টাইগার শোয়েব আর সুধীর গৌতম!

সুইস ব্যাংকে যাওয়া টাকা ক্ষমতাসীনদের: খালেদা

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক
ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ইফতার অনুষ্ঠানে বিএনপি
চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া। ছবি: বিএনপি অফিস
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে যে টাকাগুলো রাখা হয়েছে সেগুলো ক্ষমতাসীনদের টাকা বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ইফতার অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া এ মন্তব্য করেন।
খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও লুটপাটের টাকা বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে। দেশে লুটপাট চলছে। বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। সুইস ব্যাংকে টাকা বাড়ছে। যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, এই টাকা তাঁদের। কিন্তু তাঁরা এই টাকা ভোগ করতে পারবেন না।
ব্রাজিল থেকে গম আমদানির কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, যে গম গরুরও খাদ্য হতে পারে না, সরকার মানুষকে সে বিষাক্ত গম খাইয়ে মারতে চায়। এর মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকা বানিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। মানি লন্ডারিংয়ে তাদের (সরকার) লোকেরা জড়িত। অথচ তাদের ধরা হয় না।
খালেদা জিয়া বলেন, দেশে অত্যাচার, জুলুম, গুম, খুন চলছে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক নয়, পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সরকার টিকে আছে পুলিশের জোরে। যার কারণে সরকার তাদের কথা শুনতে বাধ্য হচ্ছে। তাই পুলিশ এখন বেপরোয়া ও ‘ফ্রি হ্যান্ড’ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তারাই দেশ চালাচ্ছে।
খালেদা জিয়া এই দুরবস্থা থেকে দেশকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘জনগণকে বলব শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে নয়, দেশকে রক্ষা করতে হলে আপনাদেরও যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।’
বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে চলছে না বলে অভিযোগ করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বলেছেন তাঁরা এখন নিয়ন্ত্রিত। নিম্ন আদালতকে সরকারের কথা মতো চলতে হয়। বিচারকেরা সব দলীয়। সে জন্য শত অপরাধের পরও আওয়ামী লীগের লোক হলে জামিন পায়, মাফ পায়। আর বিএনপির হলে জামিন নেই, বিনা দোষে সাজা ভোগ করতে হয়।’
ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমদ, খেলাফত মজলিশের আমির মুহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানিসহ শরিক দলের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

একটি ব্যর্থ রেসের ঘোড়ার আত্মহত্যার গল্প by ফারুক ওয়াসিফ

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঘোড়াটি ফিরে এসেছে। পিঠে পরাজিত সৈন্যের লাশ। রাজা ভাবছে প্রাণহানির কথা নয়, পরাজয়ের কথা। আরাফাত শাওন নামের ফেনীর যে ছেলেটি জিপিএ-৫ না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে, দেশের রাজরাজড়ারা এ ঘটনার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সংকটটি দেখুন, শোক আমাদেরই থাক। অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণের বেদনা জীবিতদের অসন্তুষ্ট করবেই। আরাফাত শাওনের আত্মহত্যা দুঃসংবাদ। তার পরিবারের জন্য, শিক্ষাব্যবস্থার জন্য, তারুণ্যের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য। প্রবাদ প্রচলিত, ‘দুঃসংবাদ দানকারীকে হত্যা করো না’। অথচ ছেলেটি নিজেকেই হত্যা করে দুঃসংবাদটি রটিয়ে দিয়েছে। সে এই টার্গেটমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, কর্তৃত্বকারী পারিবারিক সংস্কৃতি, গণবিরোধী রাজনীতি; সবাইকে একসঙ্গে দাঁড় করিয়েছে অভিযোগের কাঠগড়ায়। ছোট্ট একটি চিঠিও সে লিখে গেছে।
‘...আমি আদৌ জানি না যে আমি কী? এই পরিবারের বা আমার মা-বাবার সন্তান, তা না হলে সব সময় এ রকম শাসন আর কড়া শাসনের ওপর আমাকে রাখা হয়েছে। কোনো বাবা-মা তাঁর সন্তানকে পড়ালেখার খরচে খোঁটা দেয় না। কিন্তু আমার মা-বাবা সব সময় আমাকে বলে তোর জন্য মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করছি। এভাবেই প্রতিনিয়ত বকাঝকা করা হয়। সব সময় বাবার থেকে শুধু খারাপ ভাষার গালি আর গালি শুনতে হয়, যা আমার একটু ভালো লাগত না। কিন্তু আমি এত দিন সহ্য করে ছিলাম। কারণ, কোনো কিছু করার কথা ভাবলে মনে হতো এ দুনিয়ায় তো বাবা-মায়ের আদর-ভালোবাসা পেলাম না...তাই এখন আমার আর এসব কিছু সহ্য হচ্ছে না।...আমাদের ছাত্রদের কী দোষ বলুন, আমরা তো আমাদের মতো চেষ্টা করে যাই। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর কারণে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হাল। এর আগের বছর সরকার তার নিজের স্বার্থের জন্য শিক্ষার হার বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এবার হরতাল-অবরোধ দেওয়ার ফলে বর্তমান সরকার বিরোধীদলীয় সরকারকে গালি দেওয়ার জন্য পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে, যাতে দেশে ফেলের হার বেড়েছে। বলুন, আমরা আর কীভাবে ভালো রেজাল্ট করতে পারি!!!???’
মরার আগেই মরে গিয়েছিল সে। তার সাক্ষী এই কথাটি: ‘আমি জানি না আদৌ আমি কী?’। তার মানে পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি এবং প্রচলিত শিক্ষা নামক তিক্ত ওষুধ; কিছুই তার সহায় হয়নি। জানাতে পারেনি যে সে কে? কী তার জীবন? কী তার লক্ষ্য? প্রথম তারুণ্যেই সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সে ভয়ংকর একা হয়ে গিয়েছিল। সবার ভেতর থেকেই একজন বুঝতে পারে যে সে কে। এগুলো যেন পিচ্ছিল পাহাড়ের ঢালে গাঁথা আংটার মতো, পড়ে যেতে গেলে যা ধরে বাঁচা যায়। কিন্তু তার শেষ চিঠি সাক্ষী, বাঁচার প্রেরণার বদলে এসব কিছু বরং তাকে আত্মধ্বংসের তাড়নাই দিয়ে গেছে।
সে অভিযোগ করেছে রাজনীতিকে, সরকারকে, বিরোধী দলকে, শিক্ষাব্যবস্থাকে এবং খুবই মর্মান্তিক হলেও সত্য, বাবা-মাকে। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আবহসংগীত সন্তানদের নিয়ে ভয়ানক উদ্বেগ। সন্তান যেন ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। টাকা ঢালা হবে, সময় ব্যয় করা হবে, বিনিময়ে তারা চাঁদ পেড়ে আনবে আকাশ থেকে! তারা জীবনে কী চায়, কী তাদের সত্যিকার ক্ষমতা ও প্রতিভা, কিসে তাদের সুখ-দুঃখ, তার খোঁজ কজন রাখে? বাবা-মাই বা কীভাবে জানবেন? তাঁরাও তো জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত পদাতিক।
শাওনের চিঠি সাক্ষ্য দেয়, প্রেরণার বদলে চারপাশ থেকে হতাশাই পেয়েছে সে
ছেলেটি যাঁদের দায়ী করে গেছে, তাঁরা কি সেই দায় অস্বীকার করতে পারবেন? আমাদের পরীক্ষাগুলো শিক্ষণমুখী না, ফলমুখী। সনদ বাজারে বিকায়। ঈর্ষাকাতর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে থাকতে অনেকেই হিংসুক অথবা হীনম্মন্য হয়ে যায়। তারা যেন বাজির ঘোড়া, না জিতলে ‘চাকরি নট’!
অনেক ঘোড়াই শেষ দাগ পার হয়, কিন্তু আরাফাত শাওনের মতো কেউ কেউ পড়ে যায়। কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন: ‘তোমরা আমাকে নামিয়ে দিয়েছিলে খনির গহ্বরে আর আমি মুখে রত্নকোষ ভরে উঠে আসতে পারিনি বলে, আমার শরীর থেকে খুলে নিয়েছিলে রঙিন সোনার পাত।’
কবি আমাদের অব্যক্তকে ভাষা দেন। তাঁরই টিওটোরিয়াল কবিতায় পর্যুদস্ত অভিভাবকের আহাজারি বাজে: তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (বা নব্বইয়ের বেশি)। তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম। তার বদলে মাত্র পঁচাশি! পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম? এই জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আসি? এই জন্যে তোমার মা কাকভোরে উঠে সব কাজকর্ম সেরে ছোটবেলা থেকে যেত তোমাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে? তারপরে আঁচলে মুখ মুছে ঢুলত গিয়ে ভাপসা রান্নাঘরে? এই জন্যে?’ জ্বালাটা এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। জয়ের কবিতার সেই বাবা তারপর বলছে, ‘এখনো যে টিউটোরিয়ালে পাঠিয়েছি, জানিস না, কী রকম খরচাপাতি তার? ওখানে একবার ঢুকলে সবাই প্রথম হয়। প্রথম, প্রথম! কারও অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার। রোজ যে যাস, দেখিস না কত সব বড় বড় বাড়ি ও পাড়ায় কত সব গাড়ি আসে, কত বড় আড়ি করে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের নিতে যায়? আর ঐ গাড়ির পাশে, পাশে না পিছনে—ঐ অন্ধকারটায় রোজ দাঁড়াতে দেখিস না নিজের বাবাকে?’
পাঠক, বিশ্লেষণ, প্রতিকার, আচার-বিচার দরকার আছে। তার আগে দুঃখটা, হতাশাটা কেউ বুঝুক। অন্তত ভুক্তভোগীরা জানুক তারা একা নয়। এ রকম লাখ লাখ ভারবাহী অভিভাবক আর তাদের বাজির ঘোড়ারা এভাবে ধুঁকছে। দুঃখের মধ্যেই তো আমরা এক হই।
বাবা চান ছেলে তাঁর মুখ উজ্জ্বল করুক, মা চান দুঃখের দিন শেষ হোক একদিন। সবাই তাদের চিনুক। ছেলে বা মেয়েটির নাম পত্রিকার পাতায় উঠুক। সুখবরের পাশাপাশি কখনো তারা দুঃসংবাদও হয়ে যায়। অনেকেই এ চাপ সহ্য করে, কিন্তু কেউ কেউ পারে না। মাত্র কয়েকটি নম্বর কম পাওয়ার হতাশায় জীবনের চরম ভুলটি করে বসে। অথচ, জগতে কত কম নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়ে বিরাট বিরাট কীর্তি করেছে। কত সামান্য মানুষ চুপচাপ অসাধারণ জীবন যাপন করছে। কেবল ঈর্ষা, কেবল প্রতিষ্ঠার উদগ্র লোভ কমালেই হয়। কিন্তু যে সমাজ-অর্থনীতি, যে বাজারি মনোভাব এবং যে হৃদয়-বুদ্ধি ধ্বংসকারী আবহে আমরা বাস করি, তার তেজস্ক্রিয়তা আরও বেশি। এটা নিজেই এখন কৈশোর-তারুণ্যের প্রাণশক্তি শোষণকারী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দোষ ব্যবস্থার, দায় সমষ্টির কিন্তু ভুগতে হয় ব্যক্তি মানুষকে, এ কেমন কথা?
পরিহাস, এত এত জিপিএ–৫, কিন্তু শিক্ষার মানের কী নিদারুণ অবনতি। ২০১১-১৪ পর্যন্ত তিন বছরে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৮১ শতাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর পর্যন্ত তুলতে ব্যর্থ হয়েছে (ইত্তেফাক, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)। পরিসংখ্যানের শুভংকরের ফাঁকিটা সবাই যখন দেখতে পাচ্ছে, তখন শিক্ষাধ্বংসী ব্যবস্থাটা না বদলিয়ে শিক্ষা বা জীবনের জন্য মায়াকান্না করা অর্থহীন।
শাওন আরও লিখেছে, ‘A+ কি গাছে ধরে যে আমি পেড়ে আনব?’। এর উত্তর বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তকদেরই দেওয়া উচিত। আমি শুধু আফ্রিকার এক সুখী জনগোষ্ঠীর গল্প শোনাব। তাদের কেউ যদি কোনো ভুল করে, তাহলে তাকে নিয়ে আসা হয় গ্রামের একদম মাঝখানে। তারপর একে একে সবাই মিলে বলতে থাকে তার অতীতের সব সুকীর্তির কথা। দুদিন ধরে প্রতিবেশী-স্বজনদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে লোকটা সব লজ্জা আর দম্ভ ভুলে উঠে দাঁড়ায়, হয়ে ওঠে আগের চেয়েও সুখী ও সুন্দর এক মানুষ। তারা বিশ্বাস করে, কেউ ভুল করা মানে সে খুব বিপদে পড়েছে। তার এখন সবার সাহায্য দরকার। সবাই তখন তাকে দুষতে আসে না, বরং সেই ভুলের মধ্যে শুনতে পায় ‘আমাকে বাঁচাও’ আর্তনাদ। শাওনের আত্মহত্যার মধ্যে আমাদের সময়ের তরুণদের আকুল আর্তনাদ ধ্বনিত হচ্ছে, শুনতে কি পাও?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

‘মুস্তাফিজকে বলি কাটার মারবি না!’

অনুশীলনে মুস্তাফিজুর রহমান ছবি: এএফপি
সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন, মুস্তাফিজুর রহমানের কাটারের কী বিষ! ভারতের ২০ উইকেটের ১১টিই এ তরুণ পেসারের দখলে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ডেকে বলতে পারেন, ‘তোমাদের কী মজা, মুস্তাফিজকে খেলতে হয় না!’
‘মুস্তাফিজকে খেলতে হয় না’-এই কথাটা বোধ হয় ঠিক নয়। তামিম-মুশফিক-সৌম্যরা নেটে আকছারই মোকাবিলা করছেন মুস্তাফিজকে। সত্যি কথা বলতে কী, বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরাও নাকি বলাবলি শুরু করেছেন, ঘরোয়া লিগে এই মুস্তাফিজকে তারা কীভাবে সামলাবেন!
ব্যাপারটা প্রথম জানিয়েছেন মুশফিকুর রহিম নিজেই। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জয়ের পর গাজী টিভির ক্যামেরার সামনে নিজের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে মুস্তাফিজ প্রসঙ্গেই জানিয়েছেন, ‘নেটে ওর বল খেলতে ভীষণ অসুবিধা হয় আমাদের। নেট অনুশীলনের সময় আমরা ওর বল হাতড়ে বেড়াই।’
মুস্তাফিজের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র ‘কাটার’ নিয়ে একটা গল্প আছে। এই মুহূর্তে দলের বাইরে থাকা অন্যতম উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান এনামুল হকই নাকি প্রথম একদিন মুস্তাফিজকে বলেছিলেন কাটার মারতে। নিছক প্র্যাকটিসের লক্ষ্যে কাটার মারতে বলে এনামুল নিজেই বিপদে পড়ে যান। দেখেন, তাঁর নাকি খুব অসুবিধা হচ্ছে বলটি খেলতে। গল্পটি অবশ্য মুস্তাফিজ নিজেই বলেছেন।
গতকাল নাসির হোসেন মুস্তাফিজকে মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন বেশ রসিয়ে, ‘নেটে ওর বল খেলতে আমাদের বেশ অসুবিধা হয়। সে ও বল করতে আসলেই আমরা ফাজলামি করে বলি, ‘অ্যাই, খবরদার আমাকে কাটার দিবিনা।’
মুস্তাফিজের খ্যাতি এখন ছড়িয়ে পড়েছে জগৎজুড়ে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইটে ক্রিকেট লিখিয়ে অ্যাডাম বার্নেট সুখ্যাতি করেছেন এই তরুণ-তুর্কির। করবেন-নাই বা কেন, এই মুস্তাফিজই যে অনন্য নৈপুণ্যে জিতিয়েছেন ভারতের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখাটি অবশ্য বার্নেট বলেছেন, এই ছেলে যে বিশেষ কিছু, সেটা জানা গিয়েছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে তাঁর অভিষেক টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিতেই। ওই ম্যাচে মুস্তাফিজ ফিরিয়েছিলেন শহীদ আফ্রিদি ও মোহাম্মদ হাফিজের মতো দুই তারকা ব্যাটসম্যানকে।
মুস্তাফিজ আসলে কত বড় কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন, সেটা নাকি তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না। রসিকতা করে কাল জানালেন নাসির, ‘গত দুটো ম্যাচই ঘুরিয়ে দিয়েছে মুস্তাফিজ। জয়ে ৮০ শতাংশ অবদান তার। এত কিছুর পরেও তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই। ভাবনাটা আগের মতোই আছে।’
দ্বিতীয় ম্যাচের পর ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার নিতে গিয়ে মুস্তাফিজ বলে এসেছিলেন, তৃতীয় ম্যাচে নাকি তাঁর লক্ষ্য আরও ভালো করা! প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট তুলে নেওয়ার পর ‘আরও ভালো করা’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন, সেটা নিয়ে নিশ্চয়ই গবেষণায় বসে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা!

বাংলাদেশ–ভারত শেষ ম্যাচ, মনের মধ্যে বাংলাওয়াশ by পবিত্র কুন্ডু

মুস্তাফিজ হাসছেন, রুবেলও। সারা বাংলাদেশ চায় মিরপুরে
কাল অনুশীলনে দুই পেসারের এই হাসি আজ
ছড়িয়ে পড়ুক ম্যাচ শেষেও l ছবি: শামসুল হক
তিন ম্যাচের সিরিজটির প্রথম দুটি জিতেই সম্মানের ধাতব ট্রফিটিকে হাতে তোলার ব্যবস্থা আগেই করে ফেলেছে বাংলাদেশ। আজ শেষ ম্যাচটির গুরুত্ব আসলে কতটুকু? জয়-পরাজয় যে পক্ষকেই আলিঙ্গন করুক, সেটির আর মূল্য কী, শুধু আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর ছাড়া?
রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে এ কথা বলতে যাবেন না যেন। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ দেখাতে পারা যায় না বটে, তবে যন্ত্রণার ভাষাটা মুখে তুলে আনা যায়। সেখানে শেষ ম্যাচটিতেও তাঁর কাছে অর্জনের উপলক্ষ থাকে—সেটি জয় এবং জয়। এবারের বাংলাদেশ সফরে ভারতের সেরা অফ স্পিনার, প্রকারান্তরে সেরা বোলার কাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করে ফুটিয়ে তুললেন শেষ ম্যাচ থেকে সামান্য সম্মানটুকু নিয়ে ফেরার আকুলতাই। ক্রিকেট পৃথিবীর অনেক বিস্ময়কর ঘটনার মতোই বাস্তবিক যে মহাভারত এখন বাংলাওয়াশ এড়ানোর জন্য মরিয়া! আর একদা ‘পুঁচকে’ ‘খুদে’ এবং বীরেন্দর শেবাগকৃত ‘ভেরি অর্ডিনারি’ দলের পরিচিতি পেতে পেতে, উপেক্ষা আর অপেক্ষার যন্ত্রণা সইতে সইতে পরিণত হয়ে ওঠার দিকে এগোনো বাংলাদেশ কিনা সেই বাংলাওয়াশ চাইছে। আরেকটি বাংলাওয়াশ হবে কি না, এই সম্ভাবনার কথা জানতে চাইলে নাসির হোসেন সরল মনে হয়তো বলে ফেললেন, ‘ইনশা আল্লাহ’, কিন্তু নিজেদের ড্রেসিং রুমের আবহের যে হদিস তিনি দিলেন, সেখানে জয়ের আকাঙ্ক্ষাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর প্রত্যাশায়, প্রার্থনায়, প্রতিজ্ঞায়, প্রচেষ্টায় এক হতে পারলে কে না জানে আকাঙ্ক্ষাই প্রাপ্তির ফুল হয়ে ফোটে। ‘আমরা ২-০ তে পিছিয়ে থেকে যে চাপ নিয়ে খেলতাম, সে রকমই খেলব। কোনো ছাড় নেই’—বাংলাদেশ দলের অলরাউন্ডার যখন এ কথা বলেন, দলের মনোভাব বোঝাতে নতুন করে কিছু বলতে হয় না।
শুধু নাসিরই কেন, তাঁর সতীর্থরা—অধিনায়ক মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, মুস্তাফিজ, সাব্বির, সৌম্য বা কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে কিংবা অন্য কোচিং স্টাফদের জিজ্ঞেস করে দেখুন, একই উত্তর পাবেন। তাঁদের কাছে ৩-০ স্কোরলাইন বড় নয়, জয়টাই বড়। জয়ের অভ্যাসটাকে নৈমিত্তিক বানিয়ে ফেলাই আসল। জয় একটা অদ্ভুত সুস্বাদু নেশা। এই নেশাই একটি জয় থেকে আরেকটি জয়ের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। আজকের জয় যেমন মাশরাফির দলকে দিতে পারে টানা ১১ ম্যাচ জয়ের স্বাদ।
কাল মেঘমেদুর দুপুরের মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামও কিন্তু বাংলাওয়াশ, বাংলাওয়াশ বলে চিৎকার করেনি। রাস্তায়, বিপণিবিতানে মানুষের আনাগোনায় কিংবা স্টেডিয়ামে দুদলের অনুশীলন ঘিরে থাকা উৎসুক জনতার টুকরো ভিড়েও এই শব্দটির অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। তাহলে বাংলাওয়াশ শব্দটি পথ পাতল কোথায়? মানুষের মনে। সেই কত দিন ধরেই তো এটি বাংলাদেশের চেনা ছক। কোনো ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগেই জয়ের সুবাস ছড়িয়ে পড়বে জনতার অন্তরে। সেটিই মাঠ থেকে পরে কুড়িয়ে বাংলাওয়াশে রূপ দেবেন মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক-সাব্বিররা। এই সিরিজে অবশ্য চয়নকারীদের দলে যোগ হয়েছে নতুন একটি মুখ—মুস্তাফিজুর রহমান। এই বাঁহাতি পেসারের বিষমাখানো বলে প্রথম দুই ম্যাচে ধ্বস্ত হয়েছে ভারত। প্রথম ম্যাচেই ৫ উইকেট নিয়ে শেষ করে দিয়েছিলেন মিলিতভাবে ৮৯৯ ম্যাচ খেলা ধোনি-রায়না-কোহলি-রোহিত-জাদেজাদের ভয়াল দর্শন ব্যাটিংকে। দ্বিতীয় ম্যাচের আগে মুস্তাফিজের বোলিংকে কম্পিউটারে ঢুকিয়ে কাটাছেঁড়া করা হলো কিন্তু এ ম্যাচেও জবাব থাকল না ভারতের। সাতক্ষীরার ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় আরও ভয়ংকর—৬ উইকেট তুলে আবারও নির্মম ঘাতক। তৃতীয় ম্যাচে তাই প্রত্যাঘাতের পরিকল্পনাকে লুকিয়ে রেখে ভারত তাঁকে ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রশংসায়। আজও নিশ্চিত ভারতীয়দের রণকৌশলের অনেকটা জুড়ে থাকবেন এই বালক-বীর। কীভাবে তাঁকে সামলাবেন, অপ্রিয় এই প্রশ্নে, ‘তাঁকে কি আমরা অপহরণ করব?’—এ কথা বলে অশ্বিন একটু হাসির খোরাক হয়তো জোগালেন, কিন্তু পুরোটা না বলেও বুঝিয়ে দিলেন মুস্তাফিজ তাঁদের স্বপ্নে হানা দিয়েছেন দুঃস্বপ্নের মতো।
শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সেন্টার উইকেটে পেস বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক চার পেসারকে থ্রো-ডাউন করাতে লাগলেন, গুড লেন্থ স্পটে স্টাম্প পুঁতে। প্রতি তিনটি বলের দুটিতেই লক্ষ্যভেদ করতে থাকলেন মুস্তাফিজ। একই সঙ্গে সংলগ্ন একাডেমি মাঠের নেটে ঘাম ঝরাতে থাকা ধোনি-কোহলি-রায়নারা কিন্তু তখনো ভারতীয় সাংবাদিক গোষ্ঠীর সবাইকে টানতে পারেননি। তাহলে আজও মাঠের নিপুণ জাদুকরের নাম মুস্তাফিজ? হতেই পারে। তবে এই চার পেসারের আগুনের সামনে আজ নাও পড়তে পারে ভারতীয় ব্যাটিং। অনুশীলনে চোট পেয়েছেন ডানহাতি পেসার তাসকিন আহমেদ। আলাদা করে ডাকা হয়েছে লেগস্পিনার জুবায়ের আহমেদকে। জয়ের সমন্বয়সূত্র এতে টুটে যাওয়ার আশঙ্কা হয়তো থাকছে, তবে জুবায়েরকে নিয়ে বাংলাদেশের বোলিং-বৈচিত্র্য কিন্তু থাকবেই। এই বৈচিত্র্যময় বোলিং শক্তিকেই তো ভারতের আসল ভয়!
রণকৌশল, দলীয় সমন্বয়, আত্মবিশ্বাস—তিনে মিলে তৃতীয় ম্যাচেও জয়ের হাতছানি বাংলাদেশের সামনে। দল বদলে যদিও ঘুরে দাঁড়ানোর সব চেষ্টাই করবে ভারত। তবে এটাও ঠিক, সঠিক সমন্বয় খুঁজে পেতে ঘর্মাক্ত, একটু বিশৃঙ্খল মহাপ্রতাপশালী প্রতিপক্ষকে শেষ ম্যাচেও ঘায়েল করার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে! তাহলে আজ মাশরাফিদের আরেকটি বিজয়গাথার সাক্ষী হচ্ছে মিরপুর? হতেই পারে। না পারলেও বিশেষ ক্ষতি নেই। বৃষ্টির ঘেরাটোপ থেকে সিরিজ জিতিয়ে এনেই যে মাশরাফির দল এ দেশের জনতাকে ভাসিয়েছে আনন্দে। সেই আনন্দ ‘হিংস্র’ নয়, বরং চিন চিন করতে থাকা কোনো বঞ্চনাবোধে প্রলেপ বোলানো অনাবিল আনন্দ।

‘অস্ত্র ব্যবসায়ীরা খ্রিষ্টান পরিচয় দিতে পারে না’

পোপ ফ্রান্সিস
ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, যারা অস্ত্র উৎপাদন এবং এতে বিনিয়োগ করে তারা নিজেদের খ্রিষ্টান বলে পরিচয় দিলে সেটা হবে ভণ্ডামি। গত রোববার ইতালির তুরিন সফরের প্রথম দিনে কয়েক হাজার তরুণের সমাবেশে তিনি এমন কঠোর মন্তব্য করেন। খবর গার্ডিয়ানের।
তরুণদের সামনে লিখিত বক্তব্যের বাইরে তিনি যুদ্ধ, বিশ্বাস ও রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। পোপ বলেন, ‘আমি তাদের নিয়ে ভাবি—যারা অস্ত্রের ব্যবসা, উৎপাদন বা এসব ক্ষেত্রে কাজ করে এবং নিজেদের খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দেয়। এর মাধ্যমে এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়। তাই না?’
অস্ত্রের ব্যবসায় বিনিয়োগকারীদের সমালোচনা করে পোপ বলেন, ‘দ্বৈত আচরণই বেশি প্রচলিত। তারা মুখে এক কথা বলে, কাজ করে অন্য রকম।’
পোপ ফ্রান্সিস প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়েও কিছু তির্যক মন্তব্য করেন তরুণদের ওই সমাবেশে।

কোরিয়ান রাষ্ট্রদূতের সেলফিতে খালেদা

তরুণ প্রজন্মের কাছে অতিপরিচিত শব্দ সেলফি। তাদের প্রিয় সখও সেলফি। এই সেলফিতে মাতোয়ারা এখন বিশ্ব। যার প্রভাব বাংলাদেশেও লেগেছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী এমপিরা হরহামেশা সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছেন। তবে এতদিন বাদ ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল মঙ্গলবার সে  কোটাও পূর্ণ হয়েছে। গতকাল রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছিলেন খালেদা জিয়া। ইফতারের পর কূটনীতিকদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে ওঠেন তিনি। এসময় দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ইয়ান ইয়ং লি বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। শিগগির তিনি দেশে ফিরে যাচ্ছেন এ কথা জানিয়ে একপর্যায়ে বলেন, ‘ইয়োর এক্সিলেন্সি- আমি কি আপনার সঙ্গে একটি সেলফি তুলতে পারি?’ কোরিয়ান রাষ্ট্রদূতের সেলফি আবদারে তৎক্ষনাৎ সায় দেন বিএনপি চেয়ারপারসন। সঙ্গে যোগ দেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট। কোরিয়ান রাষ্ট্রদূত নিজেসহ তিন জনকে এক ফ্রেমে বন্দি করেন তার মোবাইল ফোনে। সেলফি তুলে কোরিয়ান রাষ্ট্রদূত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘ওয়াও, হোয়াট এ নাইস সেলফি!’ এসময় পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই এই দৃশ্য উপভোগ করেন।

মিরপুর ১ নম্বরের চিড়িয়াখানা রোড- পিকআপস্ট্যান্ড, বাজার কী নেই! by সামছুর রহমান

চিড়িয়াখানা রোডের এক পাশে রয়েছে
রেন্ট–এ–কারের দোকান ছবি l প্রথম আলো
চি​ড়িয়াখানা রোডের প্রবেশমুখের এক পাশে সারি করে রাখা
হয়েছে পিকআপ ভ্যান। গতকাল তোলা ছবি l প্রথম আলো
সড়কের এক পাশে পিকআপ ভ্যানের স্ট্যান্ড। আরেক পাশে ভাড়ায় চালিত (রেন্ট-এ–কার) গাড়ির সারি। সড়কটি ধরে একটু এগোলেই ফুটপাত-সড়কের কিছু অংশজুড়ে বসেছে স্থায়ী-অস্থায়ী বাজার। সড়কটির নাম চিড়িয়াখানা রোড।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের সনি সিনেমা হল-সংলগ্ন এই সড়কের প্রবেশমুখের এক পাশে সারি করে রাখা হয়েছে ১০-১২টি ছোট-বড় পিকআপ ভ্যান। পিকআপের সারি সড়কের প্রায় অর্ধেকজুড়ে। ফুটপাতে টিন-বাঁশের বেড়া দিয়ে বানানো হয়েছে ঢাকা মহানগর পিকআপ শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা মহানগর মিনি পিকআপ মালিক সমিতির অস্থায়ী কার্যালয়।
এই এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. শায়কুর রহমান। তিনি জানালেন, দখলের কারণে এই সড়কে চিড়িয়াখানাগামী যানবাহনগুলোর চলাচল ব্যাহত হয়। প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। ফুটপাতে হাঁটারও উপায় নেই। দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রী-পথচারীদের।
ঢাকা মহানগর মিনি পিকআপ মালিক সমিতির অস্থায়ী কার্যালয়ে কয়েকজন বসে ছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিকআপ ভ্যানের একজন মালিক বলেন, এখানে পিকআপ ভ্যানের ব্যবসা অনেক দিন ধরে। তাঁর দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী, পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ব্যবসা করছেন।
পিকআপ ভ্যান রাখার জায়গার পাশে গড়ে উঠেছে নার্সারি, জুতার দোকান। কিছু দূরে ঈদগাহ মাঠের দেয়াল ঘেঁষে ফুটপাত-সড়কের কিছু অংশে গড়ে উঠেছে স্থায়ী-অস্থায়ী বাজার। দেখা যায়, ফুটপাতে গড়ে ওঠা স্থায়ী দোকানে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস, মুরগি আর মুদিসামগ্রী। সড়কের কিছু অংশে কয়েকজন পসরা নিয়ে বসেছেন চৌকি পেতে, কয়েকজন পলিথিন বিছিয়ে। বিক্রি হচ্ছে সবজি, ফল, মাছ।
অন্তত ১০ জন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন তাঁদের প্রত্যেককে ৩০-৪০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা তোলা হয় সমিতির পক্ষ থেকে। সমিতির একজন সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘সমিতির পক্ষ থেকে টাকা তুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কিছু দেওয়া হয়। আর বাকি টাকা প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের দেওয়া হয়।’
সনি সিনেমা হলের সামনে সড়কের ফুটপাতে গড়ে উঠেছে রেন্ট-এ কারের কয়েকটি দোকান। গাড়ি রাখার আলাদা জায়গা না থাকায় সড়কের কিছু অংশে তা সারি করে রাখা। এসব দোকানের মালিক সমিতি থাকলেও কোনো কমিটি নেই। কয়েকজন মিলে সমিতি চালান। তাঁদের একজন চৌধুরী অটো এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জায়েদুল হক বলেন, ‘এখানে ৩০টির মতো দোকান আছে। সিটি করপোরেশনের লিখিত অনুমতি না থাকলেও অনেক দিন ধরে এখানে ব্যবসা করায় সবারই আমাদের প্রতি সুনজর আছে।’
সড়ক-ফুটপাতগুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সম্পদ কর্মকর্তা এম এম মহিউদ্দিন কবীরের মুঠোফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরিচয় জানিয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও জবাব মেলেনি।
এলাকাটি ডিএনসিসির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী টিপু সুলতান। দখলের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁকেও পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে মিরপুর থানার টহল পরিদর্শক কামাল হোসেন মুঠোফোনে গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, কয়েকজন স্থানীয় লোকজন বাজারটি বসিয়েছেন। বাজার সরাতে তাঁদের সতর্ক করা হয়েছে।
পিকআপ ভ্যানের স্ট্যান্ড ও রেন্ট-এ কারের বিষয়ে কামাল হোসেন বলেন, ‘আপাতত খেলা নিয়ে ব্যস্ত আছি। খেলা শেষ হলে এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বরগুনায় জোয়ারে ৩০ গ্রাম প্লাবিত -১১টি স্থানে বাঁধ হুমকিতে

প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে বরগুনার বিভিন্ন স্থানে
জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ছবিটি গতকাল দুপুরে আমতলী
শহরের এম ইউ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে তোলা l প্রথম আলো
নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল মঙ্গলবারও বরগুনাসহ দক্ষিণ উপকূলের নদ-নদীতে অধিক উচ্চতার জোয়ার ও ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। গতকাল দিনভর ঝোড়ো আবহাওয়া বিরাজ করে।
এদিকে প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে জেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে আমতলী উপজেলার পশুরবুনিয়া ও তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া এলাকার ৮০০ মিটার বাঁধ ও জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর আগে ১৮ জুন পাথরঘাটার পদ্মা এলাকার প্রায় ৪০০ ফুট বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কলাপাড়া কার্যালয়ের ইনচার্জ প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি দুর্বল লঘুচাপে পরিণত হওয়ার ফলে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। এটা আরও দু-তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে।’
এ ছাড়া আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলার অন্তত ১১টি স্থানের বাঁধ মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। জোয়ারের চাপে আমতলী শহররক্ষা বাঁধের সিসি ব্লকের ১৫০ মিটার অংশ ধসে গেছে।
প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট তীব্র জোয়ারের পানি ঢুকে পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা, রুহিতা, জিনতলা, বাদুরতলা, কোড়ালিয়া, নিজ লাঠিমারা, ছোট টেংরা এবং গাববাড়িয়া গ্রামের বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি বেতাগী উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত না হওয়ায় ঝোপখালী, ভোলানাথপুর, জগাইখালী, কালিকাবাড়ি, গাবতলী, আলিয়াবাদ, জোয়ার করুণা, গেরামর্দন; আমতলী উপজেলার পশুরবুনিয়া, পশ্চিম ঘটখালী, গুলিশাখালী, আমতলী সদর; তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙা, নলবুনিয়া এবং তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের বাড়িঘরও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে এসব এলাকার কয়েক হাজার বাসিন্দা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরগুনা কার্যালয়ের সূত্র জানায়, বেতাগী উপজেলার আলীয়াবাদ, কালিকাবাড়ি, করুণা; আমতলী উপজেলার পশুরবুনিয়া, পশ্চিম ঘটখালী, গুলিশাখালী; তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙা, নলবুনিয়া, তেঁতুলবাড়িয়া,পাথরঘাটার খলিফারহাট ও জিনতলা এলাকার প্রায় চার কিলোমিটার বাঁধ গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে আছে। যেকোনো মুহূর্তে এসব বাঁধ বিলীন হয়ে যেতে পারে। তিন দিনের প্রবল জোয়ারে এরই মধ্যে আমতলী ফেরিঘাট এলাকার ১৫০ মিটার সিসি ব্লক ধসে গেছে। ফলে এই এলাকায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ভাঙন শুরু হতে পারে। এ ছাড়া আমতলী লঞ্চঘাট ও বাঁধঘাট এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও ঝুঁকিতে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বরগুনা কার্যালয়ের বৃষ্টি পরিমাপক শাখার কর্মকর্তারা জানান, গত সোমবার থেকে নিম্নচাপের কারণে জেলার সর্বত্র হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়। গতকাল জেলায় সর্বোচ্চ ৯০ দশমিক ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জেলার নদ-নদীতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেড়-দুই ফুট বেশি উচ্চতার জোয়ার দেখা দেয়।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অধিক জোয়ারের চাপে পাথরঘাটার পদ্মা, রুহিতা এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে। বেশ কিছু এলাকায় ভাঙা বাঁধ সংস্কার না হওয়ায় সেসব স্থান দিয়ে পানি ঢুকছে লোকালয়ে। এ ছাড়া বেশ কিছু এলাকার বাঁধের অংশও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পদ্মা, রুহিতা ও জিনতলা এলাকার বাঁধ মেরামতে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। পানি কমে এলে কাজ শুরু করা হবে।’

দক্ষিণ সুদানের প্রেসিডেন্টকে হত্যায় গুপ্তচর পাঠিয়েছিল মিসর

দ. সুদানের প্রেসিডেন্ট সালভা কির মায়ারদিতকে হত্যার যৌথ পরিকল্পনা করেছিল সুদান ও মিসর। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনজন ‘বিপজ্জনক গুপ্তচর’ পাঠিয়েছিল কায়রো। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল। উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যে এসব কথা জানানো হয়েছে। শুক্রবার সৌদি আরবের ৬০ হাজার গোপন তথ্য ফাঁস করে সংস্থাটি।
আসছে সপ্তাহে মোট পাঁচ লাখ নথি প্রকাশ করবে তারা। ফাঁস হওয়া নথি বিশ্লেষণ করে সোমবার মিডল ইস্ট আই জানায়, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সউদ আল ফয়সাল সৌদি বাদশাহ ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে দক্ষিণ সুদানের নেতা সালভাকে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা জানান। ওই চিঠিতে তারিখ উল্লেখ না থাকলেও জানা গেছে, ২০১১ সালে সুদান থেকে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হওয়ার পর পরই এ পরিকল্পনা করা হয়। নথিতে আরও জানা গেছে, হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিসর তার গোয়েন্দা বাহিনী থেকে সবচেয়ে বিপজ্জনক চৌকস তিনজন সদস্যকে খার্তুমে প্রেরণ করে।

আফগান পার্লামেন্টে হামলা

আফগান পার্লামেন্টের সামনের ভবনে তালেবানের বন্দুক হামলা ও গাড়িবোমা বিস্ফোরণের পর আকাশছোঁয়া ধোঁয়ার কুণ্ডুলির সঙ্গে লেলিহান আগুনে পুড়ছে গাড়ি ও স্থাপনা (উপরে)।
ভয়াবহ এই হামলার মধ্যে প্রাণের ভয়ে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে এমপিরা। জঙ্গিরা পার্লামেন্টের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা প্রায় দু’ঘণ্টা বন্দুকযুদ্ধ চালিয়ে হামলাকারীদের হত্যা করতে সক্ষম হয়। হামলাকারী তালেবানদের লাশের পাশে নিরাপত্তাকর্মীরা (নিচে)। সোমবার কাবুল থেকে তোলা ছবি এএফপি

ফাঁসির পোশাকে কাঠগড়ায় মুরসি!

আসামির পোশাকে নয়! ‘মৃত্যুদণ্ডের’ পর এই প্রথমবারের মতো ফাঁসির পোশাকেই (লাল রঙের জামা-পায়জামা) আদালতে হাজির করা হল মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে। দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তালিকায় থাকা কারাবন্দিদের ওই পোশাক পরানো হয়। আল আহরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার কায়রোর একটি অপরাধ আদালতে কাতারের কাছে সরকারি তথ্য ফাঁসের অভিযোগে দায়ের করা মামলার শুনানিতে মুরসিকে হাজির করা হয়। এ সময় তার গায়ে লাল পোশাক ছিল। এই প্রথম দেশটির কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টকে এ পোশাক পরানো হল। মিসরের ইতিহাসে মুরসিই প্রথম জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এ দিন মামলাটির শুনানি আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত মুলতবি করেন বিচারক। ওই মামলায় মুরসিসহ আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
এটি মুরসির বিরুদ্ধে চলমান চতুর্থ মামলা। একই আদালত গত মঙ্গলবার মুরসিসহ মোট ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১১ সালে ওয়াদি নতরন জেল ভেঙে পালানোর সময় ‘হত্যা’ ও ‘হত্যাচেষ্টা’র অভিযোগে তাদের এ শাস্তি দেয়া হয়। অন্য দুটি মামলার মধ্যে একটিতে মুরসিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া হামাস, হিজবুল্লাহসহ বৈদেশিক শক্তির কাছে দেশের তথ্য পাচারের অভিযোগে অপর মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তার। মিসরে ২০১১ সালে গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর ২০১২ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্টের পদে বসেন মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির নেতা মোহাম্মদ মুরসি (৬৩)।

মায়া আর মন্ত্রী নন! by মিজানুর রহমান খান

মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া
বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব এবং সংসদ সদস্য পদ ১৪ জুন থেকে খারিজ হয়ে গেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে এই মতামত দিয়েছেন।
ওই ধারার ২ দফার ঘ উপদফায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকবার যোগ্য হবেন না, যদি “তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দু বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে”।’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ৬ কোটির বেশি টাকার সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ কেবলই আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করে। ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন।
বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন আইনবিদ সদস্যসহ ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দুর্নীতি একটি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ। সে কারণে ১৪ জুন তারিখে আপিল বিভাগ রায় দেওয়া মাত্রই মায়ার সংসদ সদস্য পদ এবং মন্ত্রিত্ব দুটোই বাতিল হয়ে গেছে। আইনের চোখে তিনি আর মন্ত্রী নন। এই প্রবীণ আইনবিদ বলেন, সংবিধানে বলা আছে, কারও সদস্যপদ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন এবং তাদের মতই চূড়ান্ত হবে। এই প্রবীণ আইনবিদ মনে করেন, এখানে কোনো বিতর্ক দেখা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, আপিল বিভাগের রায় দেওয়া মাত্রই তাঁর মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে প্রবীণ আইনজীবী এম আই ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, আইনের চোখে তিনি এখন একজন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি। তবে সে কারণে তাঁর মন্ত্রিত্ব খারিজ হওয়া সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন ও নৈতিকতা উভয় মানদণ্ডে মন্ত্রীকে অবশ্যই অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। এবং এখন স্পিকারের করণীয় হবে ১৯৮১ সালের সংসদ সদস্য যোগ্যতা নির্ধারণী আইনের অধীনে বিষয়টি আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।’
আইন কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০০১ সালে জেনারেল এরশাদের জনতা টাওয়ার দুর্নীতির মামলায় এই একই মত দিয়ে বলেছিলেন, আপিল করলেও দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সাজা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত সংসদের সদস্যপদ থাকবে না। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তাঁর কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ বইয়ে বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরেও কোনো ব্যক্তি সংবিধানের ওই ৬৬(২) অনুচ্ছেদের কারণে অযোগ্য গণ্য হতে পারেন। যার অর্থ হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর মায়ার সংসদ সদস্যপদ ও মন্ত্রিত্ব থাকে না।
মন্তব্য চাওয়া হলে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি উচ্চমাত্রিক গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, এটা কি আমাদের দেশে প্রযোজ্য?’
এ বিষয়ে ত্রাণমন্ত্রীর বক্তব্য জানার জন্য চেষ্টা করেও তাঁকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁকে উদ্ধৃত করে তাঁর অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুদক আইনজীবী বিবৃতি দিয়েছেন যে, এখন নিম্ন আদালতের রায় বহাল হলো।’ তিনি আরও বললেন, এখন হাইকোর্টে পুনঃশুনানি হবে। তাহলে প্রশ্ন হলো পুনঃশুনানি হলে নিম্ন আদালতের রায় কীভাবে বহাল থাকবে?
অ্যাডভোকেট সাঈদ দাবি করেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসাটা যথাযথ হবে না।’ যোগাযোগ করা হলে এর উত্তরে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায় বহাল আমি বলিনি। আপিল বিভাগ কিছু পর্যবেক্ষণের আলোকে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে এখন পুনঃশুনানির জন্য পাঠিয়েছেন। নিম্ন আদালত যে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন, তার বৈধতা এখন পুনঃশুনানিতে বিচার্য।’
নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের বিষয়ে যদি আমাদের সুপ্রিম কোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেন, সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।’ তবে তিনি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ‘২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে দোষী সাব্যস্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল করেই যে তার সংসদ সদস্যপদ টেকাতে পারেন না, তা স্পষ্ট করে দেন। আর আমাদের দেশে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বোধযোগ্য মূল্য রয়েছে।’ তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এর আলোকে আমাদের দেশে জনস্বার্থে একটি মামলা প্রত্যাশিত।’
মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে নিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারপ্রধানের কাছে আইনগত বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা তুলে ধরে কি না, জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের অবস্থায় মন্ত্রিসভা বিভাগের স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু করার থাকে না। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর গতকাল ছিল মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। ত্রাণমন্ত্রী হিসেবে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান।
মায়াকে বাঁচাতে দুদকের শেষ মুহূর্তের চেষ্টা
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব বাঁচাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শেষ মুহূর্তে মামলা না চালানোর নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বিলম্বের কারণে তা ভেস্তে যায়। শুনানিকালে মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে দুদককে আপিল বিভাগ সতর্ক করার ছয় মাস না যেতেই দুদক আবারও দুর্নীতির মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এ-সংক্রান্ত দুদকের চিঠি ১৫ জুন সুপ্রিম কোর্টে দুদকের ‘অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডে’র কাছে পৌঁছায়। ফলে তা আর আপিল বিভাগের বিবেচনার জন্য পেশ করাই সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এই মামলা ‘নট প্রেস’ বা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তাঁরা এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। হাইকোর্টে মায়ার দুর্নীতির মামলার বিষয়ে দুদক যথাযথভাবে শুনানি করবে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৪ জুন ত্রাণমন্ত্রীর একটি দুর্নীতির মামলার বিষয়ে আপিল বিভাগে সিদ্ধান্ত হওয়ার দিনটিতেই দুদক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা আর মামলাটি চালাবে না। ওই চিঠি ১৫ জুন দুপুর ১২টায় সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায় বলে দুদকের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড মাহমুদা বেগম প্রথম আলোকে জানান। এর এক দিন আগে মায়ার অনুকূলে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বাতিলের আদেশ দেন আপিল বিভাগ।
প্রসঙ্গত, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ গত ১২ জানুয়ারি হাজি সেলিমের দুর্নীতির মামলা শেষ মুহূর্তে না চালানোর সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি ওই আদেশে বলেন, শুনানিকালে এভাবে নট প্রেস বা মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে আদালত বিভ্রান্ত হন।
দুদকের প্রধান আইনজীবী খুরশীদ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, মায়া ও হাজি সেলিমের মামলাগুলো যে আইনি ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা খুবই স্পষ্ট। তাই একই ধরনের কোনো মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে আপিল বিভাগ নিরুৎসাহিত করেছেন। এভাবে মামলা তুলে নিলে হাইকোর্টের রায় থেকে যাবে। আর তখন সেটা আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হবে। আইনের একই প্রশ্নে এ পর্যন্ত ছয়জনের মামলায় হাইকোর্টে নতুন করে শুনানি হবে। তাঁরা হলেন মায়া, হাজি সেলিম, ইকবাল মাহমুদ টুকু, আমান উল্লাহ আমান, মীর নাসির ও মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।
দুদক চেয়ারম্যানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দুদকের সভায় ১৪ জুন মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। ত্রাণমন্ত্রী তাঁর মামলা প্রত্যাহার করে নিতে গত মে মাসের শেষে বা জুনের গোড়াতেই দুদকের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ত্রাণমন্ত্রীর দুর্নীতির মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য আসছিল।
এক প্রশ্নের জবাবে দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার না করতে দুদক সংকল্পবদ্ধ রয়েছে। সরকার এর আগে প্রায় ৩০০ দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারে যে সুপারিশ করেছিল, দুদক তা বিবেচনা করেনি। তবে তিনি নিশ্চিত করেন যে মায়া ও হাজি সেলিম ছাড়াও আরও কয়েকজনের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগে তাঁরা মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
জানা যায়, আপিল বিভাগ এর আগে আইনের একই প্রশ্ন জড়িত থাকা-সংক্রান্ত অন্তত দুটি মামলায় দুদকের দরখাস্ত (নট প্রেস) মঞ্জুর করেছিলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত আপিল বিভাগ এ বিষয়ে তাঁর আইনি ব্যাখ্যা চূড়ান্ত করেননি।

কেমন আছেন এডওয়ার্ড স্নোডেন? by মশিউল আলম

ব্যর্থ নন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার
(এনএসএ) সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন
দুই বছর হতে চলল এডওয়ার্ড স্নোডেন মস্কোতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। আমেরিকান এই যুবক মোটা বেতনের চাকরি, সুন্দরী মেয়েবন্ধু, আয়েশি জীবন ছেড়ে স্বদেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ তাঁর সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মামলা করেছে, তাঁর দেশের রাজনীতিক ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন বিশ্বাসঘাতক, রাষ্ট্রদ্রোহী, এমনকি চোর বলে। কেন? এই জন্য যে তিনি আমেরিকার মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) এমন সব কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য তথ্য ফাঁস করেছেন, যা করার অধিকার ওই প্রতিষ্ঠানের নেই। ব্রিটেন ও আমেরিকার মূলধারার দুটি সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি আমেরিকার জনগণসহ বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপ গোপনে রেকর্ড করছে এনএসএ। যাঁদের করের টাকায় রাষ্ট্র চলে, যাঁদের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়, তাঁদের চলাফেরা থেকে শুরু করে সব কাজের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি করছে সরকার!
স্নোডেন একসময় মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ও এনএসএর সঙ্গে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতার অধিকারী এই তরুণ এনএসএর গোয়েন্দা নজরদারি কর্মসূচির বেআইনি কার্যকলাপ ধরে ফেলেন, নিজের কম্পিউটারে গোপনে কপি করে নেন এনএসএর বিপুল পরিমাণ তথ্য। ২০১৩ সালে তাঁর যোগাযোগ ঘটে আমেরিকান আইনজীবী ও সাংবাদিক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ডের সঙ্গে, যিনি তখন ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান-এর জন্য লিখতেন। স্নোডেন সে সময় কর্মরত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপে, আমেরিকান নিরাপত্তা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাজ অ্যালান হ্যামিল্টনের কর্মী হিসেবে, যে প্রতিষ্ঠানটি ছিল এনএসএর ঠিকাদার। এনএসএর ‘টপ সিক্রেট’ শ্রেণির বিপুল পরিমাণ তথ্যের ভান্ডার দৈনিক গার্ডিয়ান-এর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্নোডেন। তবে সেটা করার আগে তিনি আমেরিকার ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যান হংকং। সেখান থেকেই তিনি কাজটা করেন। তাঁর দেওয়া প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের জুন মাসে গ্লেন গ্রিনওয়াল্ড গার্ডিয়ান-এ লিখতে শুরু করেন ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আমেরিকান শাসকদের মাথায় বাজ পড়ে, ক্রোধে ফেটে পড়ে হোয়াইট হাউস। এডওয়ার্ড স্নোডেন হন তাঁর স্বদেশের সরকারের কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড আমেরিকান’। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক হুলিয়া জারি করে আমেরিকার সরকার।
হাওয়াইতে স্নোডেনের সঙ্গে একত্রবাস করতেন তাঁর গার্লফ্রেন্ড লিন্ডসে মিলস। গার্ডিয়ান-এ গ্লেন গ্রিনওয়াল্ডের সাড়া জাগানো প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের একপর্যায়ে যখন প্রকাশ হয়ে পড়ে, ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গোপন তথ্য ফাঁসের এ ঘটনার নেপথ্যে আছেন স্নোডেন, তখন লিন্ডসে মিলসের হাওয়াইয়ের বাসায় সরকারের লোকজন যায়। তারপর থেকে মিলস লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। গুজব রটে স্নোডেন তাঁকে ছেড়ে দিয়েছেন।
স্নোডেন হংকংয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন, কারণ আমেরিকান সরকার হংকং কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দিচ্ছিল স্নোডেনকে গ্রেপ্তার করে তাদের হাতে তুলে দিতে। সেই চাপে হংকং কর্তৃপক্ষকে নতি স্বীকার করার সুযোগ না নিয়ে স্নোডেন হংকং ত্যাগ করেন। এর মধ্যে গোপনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের, যিনি আশ্রয় নিয়েছেন লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে। অ্যাসাঞ্জ স্নোডেনকে ইকুয়েডরে পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হংকং থেকে বিমানে চড়ে ইকুয়েডরে পৌঁছানো স্নোডেনের পক্ষে সম্ভব হয় না; মাঝপথে তিনি থেকে যান মস্কো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রানজিট লাউঞ্জে। আমেরিকার চাপে কোনো দেশের বিমান কোম্পানি স্নোডেনকে বহন করে ইকুয়েডর কিংবা কিউবা নিয়ে যাওয়ার সাহস পায় না। স্নোডেন রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। রাশিয়া সঙ্গে সঙ্গে সে প্রার্থনা মঞ্জুর করে না, আমেরিকার কূটনৈতিক চাপ রাশিয়ার ওপরেও ছিল প্রচণ্ড। আর তখনো ওবামার সঙ্গে পুতিনের সম্পর্কের এতটা অবনতি ঘটেনি, যতটা ঘটেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘আগ্রাসন’ ও ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার পর।
তবে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ায় স্নোডেনের ‘সাময়িক’ রাজনৈতিক আশ্রয় মেলে। তিনি প্রায় দেড় মাস পর বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে মস্কো শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে আশ্রয় নেন। সেই থেকে তিনি মস্কোতেই আছেন। তাঁর সঙ্গে ছিল তিনটি ল্যাপটপ, কানাঘুষা চলে, তাঁর কাছে আমেরিকার যত ‘টপ সিক্রেট’ তথ্য রয়েছে, তার সবই দিয়ে দিয়েছেন রুশ গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষকে। স্নোডেন অবশ্য এটা অস্বীকার করেন।
এসব প্রায় দুই বছর আগের ঘটনা। এ সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে স্নোডেনের নাম ও কাজের কথা বলা হয়েছে কদাচিৎ। বাংলাদেশে সম্ভবত আমরা তাঁকে ভুলতে বসেছি। কিন্তু তাঁকে ভোলা চলে না, তাঁর কাজের দৃষ্টান্ত আমাদের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বিশেষত তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি আমাদের সমাজে তেমনভাবে উপলব্ধি করা হয় না। এই দেশে টেলিফোনে ব্যক্তিগত কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করা হয়। কারা তা করে, কী প্রক্রিয়ায় করে, কেন, কী পরিস্থিতিতে সেগুলো ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়, এসব করার আইনগত অধিকার তাদের আছে কি না, এটা করা বৈধ না অবৈধ—এসব প্রশ্ন তোলা হয় না। ধরা যাক, আমি একটা বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানির সংযোগ ব্যবহার করি। সেই কোম্পানি আমাকে নিশ্চয়তা দেয় না যে তারা নিজেরা আমার কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করবে না। এমন নিশ্চয়তাও তারা দেয় না যে তৃতীয় কোনো পক্ষ, যেমন সরকারি কোনো গোয়েন্দা সংস্থাকে তারা আমার টেলিফোন কথোপকথন রেকর্ড করতে দেবে না। আমিও তাদের কাছে এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা দাবি করি না। এমন নিশ্চয়তা যে দাবি করা যায় এবং তা করা উচিত এবং সে দাবি পূরণ করতে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো যে বাধ্য (যদি তারা আমাকে গ্রাহক হিসেবে পেতে চায়)—এমন ভাবনাই আমাদের মনে কাজ করে না।
এ দেশে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক পর্যন্ত অনেকের ব্যক্তিগত টেলিফোন কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘আমার ফোনালাপ অন্যরা রেকর্ড করতে পারল কীভাবে?’—এমন প্রশ্ন এযাবৎ কেউ সেবাদানকারী মোবাইল ফোন কোম্পানিকে করেছেন বলে আমার জানা নেই। গ্রামীণফোনের কাস্টমার কেয়ারের একাধিক কর্মী আমাকে টেলিফোনে বলেছেন, ব্যক্তিগত ফোনালাপ রেকর্ড করা ও তা ইন্টারনেটে প্রকাশের ব্যাপারে তাঁরা কোনো অভিযোগ পান না। সরকার কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করা তো অচিন্তনীয়।
কিন্তু আমেরিকান সমাজে এই উপলব্ধি প্রবল যে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ করার অধিকার কারও নেই। তাই স্নোডেনের কল্যাণে তাঁরা যখন জানতে পেরেছেন, তাঁদের সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ‘সন্ত্রাসবাদ দমনে’র নামে তাঁদের ব্যক্তিগত ফোনালাপ গোপনে, বছরের পর বছর ধরে রেকর্ড করে আসছে, তখন তাঁরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। তাঁরা সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তোমরা এই অন্যায়, অবৈধ কাজ করছ? তোমরা কি আমেরিকার সংবিধান মানো না? তার ফলে কাজ হয়েছে: আমেরিকার আদালত গত মাসে রায় দিয়েছেন, নাগরিকদের ওপর এনএসএর গণগোয়েন্দাগিরি বেআইনি। ওই গোয়েন্দা কর্মসূচি বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। ৪ জুন নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এডওয়ার্ড স্নোডেন এসব অর্জনের কথা উল্লেখ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু স্নোডেন এখনো স্বদেশে ফিরতে পারছেন না। তাঁকে থাকতে হচ্ছে এমন এক দেশে, যেখানে গণতন্ত্র, নাগরিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার অবস্থা আমেরিকার থেকে বেশি শোচনীয়। যদিও বাহ্যত, মস্কোতে তিনি ভালোই আছেন, তাঁর বান্ধবী নিন্দুকদের মুখে চুনকালি দিয়ে মস্কো গিয়ে মিলিত হয়েছেন তাঁর সঙ্গে, তবু পুতিনের দেশে তাঁর মানসিক অসহায়ত্ব অনুভব করা যায়।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

আমস্টারডাম by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমস্টারডাম শহরে প্রথম দিন ভোরবেলা বের হয়েছি, আমাদের সঙ্গে আমার ছেলে। ঝলমলে একটা শহরে হাসিখুশি সুখী মানুষের ভিড়, তার মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আমার ছেলে আমাকে খুব মূল্যবান একটা তথ্য দিল। বলল, ‘যখন কফি খাবার ইচ্ছে করবে খবরদার কফি শপে ঢুকবে না।’ আমি এবং আমার স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? আমার ছেলে বলল, ‘কারণ কফি শপ হচ্ছে গাঁজা খাওয়ার দোকান। কফি খেতে হলে যাবে কাফে তে।’ আমার ছেলে তার পুরনো মডেলের বাবা-মাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে কিনা সেটা সঙ্গে সঙ্গেই পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ হলো। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় একটু পরে পরেই কফি শপ, সেই কফি শপে কেউ কফি খাচ্ছে না। ঢুলু ঢুলু চোখে গাঁজা টানছে। অতি বিচিত্র একটি দৃশ্য।
আমস্টারডামে অবিশ্য এটি মোটেও বিচিত্র নয়, এখানে গাঁজা খাওয়া আইনসম্মত ব্যাপার। যারাই দেশ-বিদেশ বিশেষ করে ইউরোপের খোঁজখবর রাখেন তারা সবাই জানেন হল্যান্ডে টিউলিপ ফুলের ছড়াছড়ি। ইউরোপের বড় বড় শিল্পীরা প্রায় সবাই উইন্ডমিলের সামনে বিশাল বিশাল টিউলিপ বাগানের ছবি এঁকেছেন। কাজেই আমস্টারডামে ফুলের বিশাল নার্সারি থাকবে এটি মোটেও অবাক হবার কিছু নয়, কিন্তু সেই অপূর্ব নার্সারির অসংখ্য ফুলের গাছ, গাছের চারা, ফুলের বীজের মাঝে বড় একটা জায়গা দখল করে আছে গাঁজার গাছ! সেখানে নানা ধরনের গাঁজার চারা বিক্রি হচ্ছে এবং মানুষজন আগ্রহ নিয়ে সেগুলো কিনছে!
আমস্টারডামের মতো এত সুন্দর একটা শহরের বর্ণনা দেয়ার সময় প্রথমেই গাঁজার গল্প দিয়ে শুরু করা মনে হয় ঠিক হলো না। কিন্তু কেউ যেন মনে না করে এই পুরো শহরটিকে অসংখ্য গাঁজাখোর মানুষ সারাক্ষণ ঢুলু ঢুলু লাল চোখে বিড়বিড় করে কথা বলতে ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করছে। এটি খুবই আনন্দমুখর নিরাপদ একটি শহর। আমি এবং আমার স্ত্রী আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে সিনেমা দেখে গভীর রাতে নিশাচর শিল্পীর সুমধুর ট্রাম্পেট শুনতে শুনতে বাসায় ফিরে এসেছি একবারও মনে হয়নি পথে-ঘাটে কোথাও নিরাপত্তার কোনো অভাব আছে! আমস্টারডামে শুধু যে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি হয় তা নয়, গাঁজা ছাড়াও আরো নানা ধরনের নেশার জিনিসপত্র খোলা দোকানে কেনা যায়, খরিদ্দার অবিশ্য বেশিরভাগই পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা ট্যুরিস্ট! আমস্টারডামের দেখাদেখি আমেরিকার অনেক শহরেও আজকাল গাঁজা বিক্রয় করা আইনসিদ্ধ করে দিয়েছে। আমি যে শহরে আমার পিএইচডি করেছি সেই সিয়াটল শহরটি এ রকম একটি শহর। তবে আমি একটি হিসেব মিলাতে পারি না। এখন আমেরিকার নানা শহরে এই মাদকগুলো আইনসিদ্ধভাবে কেনা যায়। কিন্তু আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে এগুলোসহ কাউকে ধরা হলে তাকে সারাজীবনের জন্য জেলে বন্দি করে রাখা হতো। নিশ্চয়ই এ রকম অসংখ্য মানুষ এখনো জেলে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। রোলান্ড রিগানের আমলে মাদকমুক্ত সমাজ তৈরি করার নামে বেছে বেছে কালো মানুষদের এই আইনগুলোর আওতায় শাস্তি দেয়া হয়েছে। যারা পৃথিবীর খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনো কী অবলীলায় পথেঘাটে কালো মানুষদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়!
২...
বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে একেকজনের একেক ধরনের শখ থাকে—আমার সে রকম কোনো শখ এখন আর নেই। শুধু একটি শখ এখনো রয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে আর্ট মিউজিয়াম দেখা। আমস্টারডামে এসে আবিষ্কার করলাম এখানে খুব সুন্দর সুন্দর আর্ট মিউজিয়াম আছে। ছোট বাচ্চারা যেভাবে তাদের পছন্দের চকোলেট বা আইসক্রিম বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে একটু একটু করে খায় আমিও প্রায় সেভাবে এই মিউজিয়ামগুলো দেখেছি। প্রথমে দেখতে গিয়েছি মডার্ন আর্টের মিউজিয়াম। গিয়ে দেখি আমাদের কী সৌভাগ্য হেনরি মাতিসের একটা বিশেষ প্রদর্শন চলছে। সারা পৃথিবী থেকে হেনরি মাতিসের পেইন্টিং এনে জড়ো করা হয়েছে। হেনরি মাতিস শেষ বয়সে রঙিন কাগজ কেটে কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে লাগিয়ে অনেক ছবি তৈরি করেছেন। উজ্জ্বল রঙের সেই ছবিগুলোর ছাপ অনেকবার বইপত্র ইন্টারনেটে দেখেছি। আমাদের দেশে কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি করতে প্রচ্ছদ শিল্পীরা উদারভাবে সেই ছবিগুলো ব্যবহার করেন! সেই বিখ্যাত ছবিগুলোর অনেকগুলো এখানে ছিল, দেখে অন্য এক ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
যেহেতু মিউজিয়ামটি মর্ডান আর্টের মিউজিয়াম কাজেই সেখানে অতি বিচিত্র কিছু শিল্পকর্ম ছিল যেমন একটা ছোট টেবিলে একটা অত্যন্ত ময়লা চাদর ভাঁজ করে রাখা। দেয়ালে অনেক বড় করে এই শিল্পকর্মটি ব্যাখ্যা করা আছে এটাকে দেখে তুচ্ছ একটা ময়লা চাদর মনে হলেও শিল্পী যে অসংখ্য ময়লা চাদর দেখে দেখে শেষ পর্যন্ত এটা বেছে নিয়েছেন এবং এর ভাঁজ করার মাঝেও যে অন্য এক ধরনের শিল্প লুকিয়ে আছে সেটা গুরুত্ব দিয়ে লেখা আছে। তবে আশার কথা এই ধরনের শিল্পকর্মের গ্যালারিগুলো একেবারে ফাঁকা কেউ সেগুলো দেখতে যান না! সাধারণ দর্শকদের বোকা বানানো মোটেই সহজ না। তাদের কাছে যেটা ভালো লাগে তারা সেটা ভিড় করে দেখে, মন দিয়ে দেখে! মাঝে মাঝেই আমি পরিচিতদের একটা পেইন্টিং দেখে বলতে শুনি এটা কি ছবি! কিছুই তো বুঝি না। তাদেরকে জানিয়ে রাখি যারা ছবি বোঝার চেষ্টা করে তারা ছবি উপভোগ করতে পারে না। কাজেই কেউ যেন ছবি বোঝার চেষ্টা না করে ভালো লাগলে প্রাণভরে উপভোগ করুক, ভালো না লাগলে পাশের পেইন্টিংয়ে চলে যাক! ছবিটা বোঝাই যদি গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে ফটোগ্রাফি আবিষ্কার হওয়ার পর পৃথিবী থেকে ছবি আঁকার ব্যাপারটা উঠে যেত!
মর্ডান আর্টের মিউজিয়াম দেখার কয়েক দিন পরে গিয়েছি জগদ্বিখ্যাত ভ্যানগয়ের মিউজিয়াম দেখতে। ভ্যানগয়ের নামের প্রকৃত উচ্চারণ বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখা সম্ভব না আমি তার চেষ্টাও করছি না! যারা পৃথিবীর বড় বড় শিল্পীর কথা পড়েছে তারা সবাই ভ্যানগয়ের নাম শুনেছে। আমিও শুনেছি এবং পৃথিবীর অনেক বড় বড় মিউজিয়ামে ভ্যানগয়ের পেইন্টিংও দেখেছি। তার ছবিগুলো দেখে দেখে মোটামুটিভাবে তার ছবি আঁকার ধরনের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। এই মিউজিয়ামে এসে অন্য ধরনের ছবিগুলো দেখে আমার নূতন এক ধরনের অভিজ্ঞতা হলো। এই জগদ্বিখ্যাত শিল্পীর কিন্তু শিল্পী হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সাতাশ বছর বয়সে হঠাৎ করে ঠিক করলেন ছবি আঁকবেন। প্রথম কয়েক বছর ছবি আঁকা শিখলেন তারপর ছবি আঁকতে শুরু করলেন। বছর দশেক ছবি আঁকার পর এক ধরনের মানসিক সমস্যা হতে শুরু করল তখন একদিন গুলি করে আত্মহত্যা করে নিজের জীবনটি শেষ করে দিলেন। এখন তার একেকটা ছবি ষাট-পয়ষট্টি মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয় যখন তিনি বেঁচে ছিলেন তখন তার একটি ছবিও বিক্রি হয়েছে বলে জানা নেই। তার অর্থ কষ্টের নমুনাও এই মিউজিয়ামে আছে, নূতন ক্যানভাস কেনার পয়সা নেই বলে একই ক্যানভাসের দুই পাশে দুটি ভিন্ন ছবি এঁকে রেখেছেন। ভ্যানগয়ের মিউজিয়ামে এখন দুই পাশের দুটি ভিন্ন ছবি দর্শকদের দেখানোর জন্য অনেক রকম কায়দা-কানুন করতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, মডেলকে দেয়ার মতো টাকা-পয়সা নেই বলে বারবার নিজের ছবি এঁকেছেন। আমরা যারা ভ্যান গ সম্পর্কে একটু আধটু খোঁজ-খবর রাখি তারা সবাই জানি তিনি নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন। কেন কেটেছিলেন সেটা আমার কাছে একটা রহস্যের মতো ছিল। কোনো একজন বান্ধবীকে সেই কাটা কান উপহার দিয়ে এসেছিলেন সে রকম শুনেছিলাম। এই মিউজিয়ামে এসে প্রকৃত ঘটনা জানতে পারলাম। পল গগাঁ নামে আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী একবার তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। দুজনে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সময় কাটানোর কথা ছিল কিন্তু কীভাবে কীভাবে জানি দুজনের ভেতর ঝগড়া লেগে গেল এবং সেই ঝগড়া এমন পর্যায়ে চলে গেল যে ভ্যান গ রেগে মেগে এক সময় তার কানের এক টুকরো কেটে ফেললেন! কান কাটার পর তার অনেকগুলো আত্ম প্রতিকৃতিতে দেখা যায় তার কাটা কান ব্যান্ডেজ করে রাখা!
ভ্যান গ বেশিরভাগ সময় খুবই সাধারণ চাষি-শ্রমিকের ছবি এঁকেছেন। তাদের জীবনটা ভ্যানগয়ের কাছে খুবই আন্তরিক এবং খাঁটি মনে হতো। আমার এবার একই সঙ্গে মাতিস আর ভ্যানগয়ের ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে। মাতিসের জীবনটি মনে হয়েছিল ভ্যানগয়ের উল্টো। তার একজন সহকারী মেয়ে একবার ছুটিতে গ্রামে সময় কাটিয়ে এসেছে। রোদে পুড়ে গায়ের রং তামাটে হয়ে এসেছে, তাকে দেখে মাতিস খুবই বিরক্ত হলেন। তার কারণ রোদে পোড়া মেয়েটিকে তখন ‘চাষা’মেয়ের মতো লাগছে! একজন ছবি আঁকার জন্য ‘চাষা’ মেয়েদের খুঁজে বেড়িয়েছেন, অন্যজন শুধু দেখতে চাষা মেয়েদের মতো লাগছে বলেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন! দুজন শিল্পীর মানসিকতায় কত পার্থক্য। আমস্টারডামের সবচেয়ে বড় আর্ট মিউজিয়াম হচ্ছে রাইকস মিউজিয়াম এটি দেখেছি সবার শেষে। মিউজিয়ামে ছোট ছোট গ্যালারি থাকে আমার সব সময়েই মনে হয় ভুলে বুঝি কোনো একটা গ্যালারি না দেখে চলে আসব, সেই গ্যালারিতেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা না দেখা থেকে যাবে! সেটা যেন না হয় তার চেষ্টা করতে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সব কিছুই বারবার দেখা হয়ে যায়। এই মিউজিয়ামের শিল্পীরা তুলনামূলকভাবে একটু আগের। আমার দুজন প্রিয় শিল্পী র‌্যামব্রান্ট এবং ভারমিয়ারের অনেক ছবি এই মিউজিয়ামে আছে। যখন আমি ঢাকা কলেজে পড়তাম তখন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তাম। পাবলিক লাইব্রেরির একটা কাচে ঢাকা সেলফে র‌্যামব্রান্টের আঁকা ছবির একটা খুব সুন্দর বই ছিল। আমি পাবলিক লাইব্রেরি এলেই সেই বইটি বের করে তার আঁকা ছবিগুলো দেখতাম। ছবিগুলো আমার স্মৃতির মাঝে গাঁথা হয়ে আছে, এতদিন পর রাইকস মিউজিয়ামে সেই ছবিগুলো দেখে আমার অন্য এক ধরনের আনন্দ হয়েছে।
রাইকস মিউজিয়ামের সবচেয়ে বড় ছবিটি র‌্যামব্রান্টের আঁকা। ছবির দুই পাশে দুইজন প্রহরী সব সময় ছবিটি পাহারা দিচ্ছে। সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে এই ছবিটি আরো বড় ছিল, কোনো একটা দেয়ালে ফিট করার জন্য ছবির একটা বড় অংশ কেটে ফেলে দিয়ে ছবিটি ছোট করা হয়েছে! কাটা অংশটি রক্ষা করা হয়নি, কিন্তু পুরো ছবিটা দেখতে কেমন ছিল তার একটা ছোট ছবি দর্শকদের জন্য রাখা আছে। দর্শকেরা সেই ছবি দেখে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে!
পৃৃথিবীর সব বড় বড় শহরের আকর্ষণ হচ্ছে তার আর্ট মিউজিয়াম। ঢাকা শহর থেকে বড় শহর পৃথিবীতে আর কটা আছে? তাহলে আমাদের ঢাকা শহরে কেন অসাধারণ একটা আর্ট মিউজিয়াম তৈরি করতে পারি না? ইউরোপিয়ান ছবির একটা ধরন আছে, আমরা সেগুলো দেখে আহা উহু করি। কিন্তু আমাদের দেশের ছবিরও যে একটা নিজস্ব ধরন আছে সেগুলো নিয়েও যে গর্ব করা যায় সেটা কেন জানি মনে রাখি না।
যাই হোক আমস্টারডামের আর্ট মিউজিয়ামে অসংখ্য ছবি উপভোগ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ নূতন একটি বিষয় দেখে এসেছি তার বর্ণনা না দিলে মিউজিয়াম দেখার অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভ্যান গ মিউজিয়ামে ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা খোলা জায়গায় উপস্থিত হয়েছি যেখানে অনেকগুলো কফিনের মতো বাক্স দাঁড়া করে রাখা আছে এবং মানুষজন সেখানে ঢুকে তার দরজা বন্ধ করে বসে আছে। বিষয়টা কী বোঝার জন্য বাক্সগুলোর বর্ণনা পড়ে চমৎকৃত হলাম। মিউজিয়ামে ছবি দেখতে দেখতে যদি মানুষজন ক্লান্ত হয়ে যায় তাহলে এই কফিনের মতো বাক্সে ঢুকে দরজা বন্ধ করে অন্ধকার করে কিছুক্ষণ বসে থাকে এবং তারপর ছবি দেখার ক্লান্তি থেকে মুক্ত হয়ে আবার নতুন উদ্যমে ছবি দেখা শুরু করে। মানুষজন খুবই গুরুত্ব নিয়ে এভাবে নিজেদের ছবি দেখার ক্লান্তি থেকে মুক্ত করছিল। কিন্তু আমার কাছে পুরো প্রক্রিয়াটাকে একটা কৌতুক থেকে বেশি কিছু মনে হয়নি!
৩...
আমস্টারডাম শহরটি ছবির মতো সুন্দর, পুরো শহরটি অর্ধবৃত্তাকার খাল এবং কেন্দ্রমুখী রাস্তা দিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনা করে তৈরি। শহরে প্রাচীন ইউরোপিয়ান বিল্ডিংগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়, মানুষগুলো দীর্ঘদেহী, সারা শহরে ফুলের ছড়াছড়ি কিন্তু আমাকে মুগ্ধ করেছে অন্য একটি বিষয়। সেটি হচ্ছে এই শহরের মানুষের যাতায়াত করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে বাইসাইকেল। ছোট বাচ্চা থেকে আশি বছরের বুড়োবুড়ি সবাই সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে আসছে। শহরের প্রত্যেকটি রাস্তার পাশে পায়ে হাঁটার জন্য ফুটপাথ তার পাশে সাইকেলের জন্য আলাদা রাস্তা এবং সেই রাস্তা ধরে শহরের সব মানুষ সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে! যেহেতু সবাই জন্ম থেকে সাইকেল চালায় তাই দেখে মনে হয় সবাই বুঝি সাইকেল চালানোয় এক্সপার্ট। এক হাতে নিজের সাইকেল ধরে অন্য হাতে আরেকটি সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিংবা এক হাতে নিজের সাইকেল এবং অন্য হাতে চাকা লাগানো স্যুটকেস টেনে নিয়ে যাচ্ছে কিংবা সাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে স্মার্টফোনে ‘টেক্সটিং’ করতে করতে যাচ্ছে কিংবা হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে নাচের মুদ্রা প্র্যাকটিস করতে করতে যাচ্ছে আমস্টারডাম শহরের সাইকেল চালকদের জন্য এগুলো খুবই নিয়মিত কিছু দৃশ্য। যেহেতু এই শহরের সব কিছুই সাইকেল চালিয়ে করা হয় তাই এখানে সাইকেলের নানা ধরনের বিবর্তন ঘটেছে। সবচেয়ে সুন্দরটি হচ্ছে ছোট শিশুদের নিয়ে সাইকেল চালানোর বিষয়টি। সাইকেলের সামনে ছোট বাচ্চাদের বসার মতো একটি ওয়াগন এবং মায়েরা তাদের বাচ্চাদের সেখানে আরামে এবং নিরাপদে বসিয়ে সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমস্টারডামে সাইকেলের এই বিশাল যজ্ঞ দেখে আমাদেরও সাইকেল চালানোর শখ হলো, তাই একদিন সাইকেল ভাড়া করে নিয়ে আমি, আমার স্ত্রী এবং পুত্র ও কন্যা মিলে একটা পার্কে সাইকেল চালিয়ে বেড়ালাম। পুত্র ও কন্যার আলাদা সাইকেল, আমার এবং আমার স্ত্রীর জন্য একটি ট্যানডেম বাইসাইকেল! একই সাইকেলে দুইজন, একজন সামনে এবং একজন পেছনে, দুজনে মিলে সেই সাইকেল চালানো হয় ভারী মজার ব্যাপার।
আমস্টারডামে সাইকেলের এই বিশাল আয়োজন দেখে আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি যে আমাদের দেশের ট্রাফিক জ্যাম থেকে শুরু করে যাতায়াতের সব সমস্যা এই সাইকেল দিয়ে সমাধান করে ফেলা সম্ভব। সরকার থেকে যদি ঢাকা শহরের সব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে পাশে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটু খানি জায়গা আলাদা করে রেখে দেয়ার একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাহলেই দেশে একটা বিপ্লব হয়ে যাবে। আমি লক্ষ্য করেছি আমাদের তরুণেরা আজকাল অনেক বেশি সাইকেলে চড়ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র এবং ছাত্রীরা সমানভাবে সাইকেল চালিয়ে আসছে এর থেকে সুন্দর বিষয় আর কী হতে পারে? সাইকেলকে জনপ্রিয় করার জন্য বাংলাদেশে নিশ্চয়ই অনেক সংগঠন দাঁড়িয়ে গেছে। এবার আমস্টারডাম থেকে ঘুরে যাবার পর আমি ঠিক করেছি এই সংগঠনগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে একটু কাজ করতে হবে।
৪...
আমার এই লেখাটি পড়ে সবার নিশ্চয়ই ধারণা হতে পারে ইউরোপের চমৎকার একটি শহরকে নিয়ে আমার ভেতরে বুঝি শুধু এক ধরনের মুগ্ধ বিস্ময়! এটি পুরোপুরি সত্যি নয়, আমি যখন চারিদিকে তাকাই এই ইউরোপীয় শহরের সভ্যতার ইতিহাস কিংবা ঐশ্বর্যকে দেখি তখন সব সময়েই মনে পড়ে এই দেশগুলো আমাদের দেশগুলোকে কলোনি করে কয়েকশত বছর আগে আমাদের সকল সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের সম্পদ গড়ে তুলেছে! এখন আমাদের দেশগুলোর জন্য তাদের ভেতরে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অবহেলা এবং তাচ্ছিল্য। আমস্টারডামে থাকা অবস্থাতেই খোঁজ পেয়েছি আমার পরিচিত একজন এখানে কোনো একটা প্রশিক্ষণে আসার চেষ্টা করেছিল শেষ পর্যন্ত ভিসা পায়নি বলে আসতে পারেনি। আমি এবং আমার স্ত্রী যেদিন আমস্টারডামে প্লেন থেকে নেমেছি তখন বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে একটি কোর্স পড়াতে একই প্লেনে এসেছেন। যখন ইমিগ্রেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি তখন তিনি আমার পাশের কাউন্টারে দাঁড়িয়েছেন। আমার পাসপোর্টটিতে চোখ বুলিয়ে সেটি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম পাশের কাউন্টারের মানুষটি চোখে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগিয়ে বাংলাদেশের অধ্যাপকের পাসপার্টের ভিসাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে। এই দেশের প্রখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে তাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি কোর্স পড়ানোর জন্য আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে যদি সন্দেহ করা হয় তিনি পাসপোর্টে একটা জাল ভিসা লাগিয়ে এই দেশে ঢুকে যাবার চেষ্টা করছেন তাহলে সেই অপমান আমরা কেমন করে সহ্য করব?
আমি স্বপ্ন দেখি ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমার দেশ পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন আমাদের এই সবুজ পাসপোর্টটি হাতে নিয়ে বিদেশ যাবে তাদেরকে আমাদের মতো এই অপমান আর সহ্য করতে হবে না।
লেখক: কম্পিউটার বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, শিশু ও কথাসাহিত্যিক, সমাজ বিশ্লেষক

কূটনীতিকদের সম্মানে খালেদার ইফতার

বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে ইফতার করেছেন
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ছবি: ফোকাস বাংলা
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে ইফতার করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। গতকাল রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতারের আয়োজন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ইফতারে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ৩৭ জন রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, প্রতিনিধি ও কূটনীতিক অংশ নেন। ডানপাশে কূটনীতিক কোরের ডিন ও  ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র শাহের মোহাম্মদ এবং বামপাশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাটসহ একই টেবিলে ১০ জন কূটনীতিককে নিয়ে ইফতার করেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে একই টেবিলে ইফতারে অংশ নেন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন, চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং কুয়েনং, রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার এ নিকোলাভ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিনিধি পেরি ম্যায়ুদুন, কানাডার রাষ্ট্রদূত বেনওয়া পিয়েরে লাঘামে, ফ্র্রান্সের রাষ্ট্রদূত সোফি অবার্ট, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত হান ফজুল এসকায়ার ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ইয়ান ইয়ং লি ও সৌদি আরবের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স খালিদ সুলতান আলোতাইবি। এর আগে বিকাল সাড়ে ৬টায় ওয়েস্টিন হোটেলে পৌঁছে কূটনীতিক ও আমন্ত্রিতদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং তাদের প্রত্যেকের খোঁজ-খবর নেন খালেদা জিয়া। পরে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন তিনি। ইফতারে জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত গারবেন ডি জং, পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আফরাসয়িব মেহেদী হাশমি কোরায়েশী, ওমানের রাষ্ট্রদূত শেখ সিকান্দার আলী, নেপালের রাষ্ট্রদূত হরিকুমার শ্রেষ্ঠা, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত আবদুল রহিম, ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভেইজি, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত সারাথ কে ওয়েরাগোডা ছাড়াও ইউএনডিপি, কুয়েত, ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধিসহ ৩৭ জন কূটনীতিক অংশ নেন। এছাড়া কূটনীতিকদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার ইফতারে শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এমএ রউফ, প্রফেসর ড. মাহবুবউল্লাহ, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম আর ওসমানি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত শামীম আহমেদ, মোমেন চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, রুমিন ফারহানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর এম শাহিদুজ্জামান, প্রফেসর দিলারা চৌধুরী, আসিফ নজরুল, প্রফেসর মামুন আহমেদ, অ্যাডভোকেট এলিনা খান, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ ও সৌদি আরবে বিএনপি চেয়ারপারনের বিশেষ প্রতিনিধি এনামুল হক চৌধুরী অংশ নেন। ইফতারে বিএনপি নেতাদের মধ্যে- স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার, সারোয়ারি রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান,  নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, রিয়াজ রহমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, নাম আহমেদ চৌধুরী,  খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, এমএ কাইয়ুম, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কূটনীতিক গোলাম আকবর খন্দকার, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক গিয়াস কাদের চৌধুরী, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও দলের মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান ও বিএনপি নেতা শ্যামা ওবায়েদ ইফতারে অংশ নেন। ইফতারের পর কূটনীতিকদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ সময় দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ইয়ান ইয়ং লি বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। শিগগির তিনি দেশে ফিরে যাচ্ছেন এ কথা জানিয়ে একপর্যায়ে বলেন, ইয়োর এক্সিলেন্সি- আমি কি আপনার সঙ্গে একটি সেলফি তুলতে পারি? কোরিয়ান রাষ্ট্রদূতের আবদার শুনে হেসে সায় দেন খালেদা জিয়া। এ সময় খালেদা জিয়ার পাশেই ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট। পরে তারা তিনজন মিলে একটি সেলফি তোলেন।  সেলফি দেখে কোরিয়ান রাষ্ট্রদূত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘ওয়াও, হোয়াট এ নাইস সেলফি’।

পরিবেশ বান্ধব আচরণ by ইবনুল সাঈদ রানা

২০০৪ সাল থেকে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে পরিচালিত ‘সাশ্রয়’ আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন। আপনি জেনে আনন্দিত হবেন যে, ‘সাশ্রয়’ আন্দোলনের আবেদন ‘ একটুকু বাঁচাই, আগলে রাখি, জাগিয়ে তুলি, সংরক্ষণ করি’ এবারের বিশ্বপরিবেশ দিবসের মুল প্রতিপাদ্য হিসাবে গৃহীত হয়েছে `Seven Billion Dreams. One Planet. Consume with Care'| ২০১৩ ও ২০১৪ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবেসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ভেবে চিন্তে খাই অপচয় কমাই’ ‘সবাই হবো সোচ্চার, সাগরের উচ্চতা বাড়াবো না আর’। মানব ইতিহাসে এই-ই প্রথম ভোগ ও লোভোন্মত্ত হয়ে মানুষ নিজের ও তার আবাসস্থল পৃথিবীর অস্থিত্বকে হুমকির সম্মুখীন করেছে। ভোগোন্মাদ হয়ে মানুষ জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে ফলে গ্রীণহাউস গ্যাস নির্গমন ক্রমাগতই বাড়ছে। উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী, গলছে বরফ, উঁচু হচ্ছে সাগরের পানির স্তর। পৃথিবীকে আমারা অপূরণীয় ক্ষতি ও দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছি, জীব-বৈচিত্র ধ্বংস করছি এবং সিংহভাগ মানুষের জীবন জীবিকাকে দিনান্তে বিপদ-সঙ্কুল করছি। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক আমলে না নিলেও সত্য এই যে, পৃথিবীতে দুর্যোগের ভয়াবহতা ও সংখ্যা নিরন্তর বাড়ছে এবং ক্রমেই বাড়বে। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের দুর্ভোগ ও অসহায়ত্ব চরমতম হবে। দরিদ্রজনরা আরও বেশী অসহায় হবে, চরমতম অসহায়ত্ব মানুষকে বেপরোয়া করে ফেলবে, বোপরোয়া মানুষ সকল নিয়ম-কানুন ভেঙ্গে এমন এক নৈরাজ্যকর অবস্থার জন্ম দেবে যা ধনী-দরিদ্র সবাইকেই অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে ঠেলে দেবে।  বিপদের ভয়াবহতা ও অসহায়ত্ব থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের প্রস্তুতি দরকার এবং তা এখনই। বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখতে হলে আমাদের প্রথম ও প্রধান করণীয় সকলের ভেতরে ভোগের আসক্তি কমানো, পরিমিতি বোধ আনয়ন, সম্পদের প্রতি যতশীল হওয়া, যত ক্ষুদ্রই হউক যাবতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা। আমরা সকলে স্ব স্ব ক্ষেত্রে একটু সজাগ হলেই প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সম্পদের অপচয় রোধ করতে পারি। যা আমাদের দৈনন্দিন খরচের পরিমান যেমন কমাবে সাথে সাথে আমাদের সন্তানের জন্য বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখতে সহায়তা করবে।
The National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA) announced that 2014 was the hottest year that’s the cause most extreme, weather-wise, nearly twice the average. NOAA confirmed that this pattern will worsen if climate change continues unabated. Scientists has shown that human activities — economic growth, technology, consumption — are destabilizing the global environment,” and we have already crossed four Planetary Boundaries - extinction rate; deforestation; the level of carbon dioxide in the atmosphere; and the flow of nitrogen and phosphorous (used on land as fertilizer) into the ocean.
আমরা সকলেই জানি, বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী দুর্যোগ ও ঝুঁকিপুর্ণ দেশ। দুর্যোগের করাল গ্রাস থেকে নিজেদের ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের বাঁচাতে প্রয়োজন সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে জাতির ও বিশ্বের সর্বস্তরের সকলকেই ‘সাশ্রয়’ উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। দুর্যোগের কারণ ও করণীয় সম্পর্কে সকলকে সম্যক ধারণা দিতে হবে। জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ইত্যাদির জন্য আমরা সকলেই নির্দিষ্ট বক্তি বা সংস্থাকে দোষারোপ করে থাকি কিন্তু আমরা নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করি না। সর্বস্তরের সবার মাঝে ‘সাশ্রয়’ ধারণা উপস্থাপিত হলে প্রত্যেক  নাগরিক স্ব স্ব অবস্থানে পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন হবে, সাশ্রয়ী হবে। ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি, কোটি কোটি মিনিট বিদ্যুৎ, গ্যাস সহ যাবতীয় সম্পদের সাশ্রয় হবে। ফলত: প্রত্যেকেই আর্থিকভাবে যেমন লাভবান হবে পরিবেশের বিচারে দেশ, জাতি ও মানবতার জন্য প্রতিদিন কয়েক হাজার কোটি টাকার কল্যাণ আসবে যা দারিদ্র বিমোচনে, দুর্যোগ, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যার ভয়াবহতা ও অসহায়ত্ব কমাতে ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে।
২০০৪ সাল থেকে ‘সাশ্রয়’ আন্দোলন স্থানিক, জাতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে আবেদন নিবেদন করছে সমাজে শান্তি, অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা তথা পরিবেশ সমুন্নত রাখতে হলে দরিদ্রতম শিশু থেকে সর্ব্বোচ্চ ধনী, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেককেই যত ক্ষুদ্রই হউক যাবতীয় সম্পদ সাশ্রয়ে প্রতিটি মুহুর্ত দায়িত্বশীল হতে হবে। দেশ, জাতি তথা বিশ্ববাসীকে আসন্ন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ বিপর্যয় ঝুঁকি থেকে রক্ষার কাজে সর্বস্তরের সকলকেই সম্পৃক্ত করার কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে আমাদের দেশে যেভাবে পরিবেশ দিবস উদ্যাপিত হয়ে থাকে তাতে সাধারণ জনগণের কোন অংশগ্রহণ থাকেনা। প্রতি বৎসরই নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নির্দিষ্ট জায়গায় জড় হয়ে নির্দিষ্ট দুরত্বে র্যালী করে পরিবেশ সংরক্ষণের যাবতীয় দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করে থাকে।
উদ্যাপিত অনুষ্ঠাণ সমুহ পরিবেশ রক্ষায় কতটুকু কার্যকর তা বিজ্ঞজনের বিচার্য। পরিবেশ কর্মীগণের মতে প্রচলিত এই অনুষ্ঠাণ নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী ও ব্যক্তিকে পরিবেশ দিবসের দিনক্ষণ মনে করিয়ে দিতে সক্ষম হলেও গণসচেতানায়নে ভুমিকা রাখতে অপারগ। উপরন্তু এই র্যালী ও আলোচনানুষ্ঠাণের জন্য যে সকল আয়োজন হয়ে থাকে তাতে প্রচুর সম্পদের অপচয় হয়, শহর এলাকায় কঠিণ বর্জ্য তৈরী হয়। এমনও পরিলক্ষিত হয়েছে যে, র্যালীতে অংশগ্রহণকারি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতিকর পানীয় ও খাদ্য সরবরাহ করা হয় যা কোনমতেই কাম্য নয়। আবার এ সকল স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতিকর পানীয় ও খাদ্য সমুহ আসে পরিবেশের ক্ষতিকারক উৎপাদক প্রতিষ্ঠাণের কাছ থেকে পর্যবেক্ষকরা বলে থাকেন কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতিকর দ্রব্যদি উপহার দিয়ে পরিবেশের শত্র“ প্রতিষ্ঠাণ সমুহ দু-ভাবেই লাভবান হয়ে থাকে প্রথমত: ভালমানের জিনিষ হিসাবে নিজস্ব প্রচারণা দ্বিতীয়ত:উৎপাদনস্থলে পরিবেশ ক্ষতিকর আচার আচরণের জন্য জরিমানা দেয়া থেকে রেহাই পাওয়া। এমনও পরিলক্ষিত হয়েছে যে, পরিবেশ সম্মত আচরণে অতীব উদাসীন প্রতিষ্ঠাণ পরিবেশ দিবস উদ্যাপনে বড় উপহার প্রদানের মাধ্যমে বিভাগীয় পরিবেশ পদক পেয়েছে।
পরিবেশ কর্মীগণ মনে করেন উখিত আত্মঘাতি আচার অনুষ্ঠানের পথ পরিহার করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।  যে সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ র্যালীতে যোগ দিতে আসেন তারা প্রত্যেকেই যে কোন একটি স্থানে নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হয়ে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ নিয়ে আলোচনায় বসতে পারেন, এলাকার পরিবেশ সংরক্ষণে করণীয় নির্ধারণ করতে পারেন এবং এলাকাবাসীকেই দায়িত্ব দিতে পারেন দৈনন্দিন করণীয় মুল্যায়ন ও পরিবীক্ষণের। এর ফলে সর্বস্তরের মানুষ পরিবেশ সংরক্ষণে ভুতিকা রাখার সুযোগ পাবে, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হবে, সর্বোপরি এলাকার সকল মানুষ পরিবেশ রক্ষার কর্মী ও পরিদর্শকের ভুমিকা পালন করবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যহানিকর ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আচার আচরণ কমে আসবে, এলাকার সকলে যথাযথ নিয়ম পালনে প্রণোদিত হবে এবং পরিবেশ দিবসে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোন দ্রব্যাদির তথা সম্পদের অপচয় ঘটিয়ে পরিবেশ দুষণ বন্ধ হবে।
নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন কার্মক্রমের  একটি উদ্যোগ ‘সাশ্রয়’ আন্দোলনের পক্ষ থেকে আপনার কাছে সবিনয় নিবেদন পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে বৎসরব্যাপী সর্বস্তরের সকলকে পরিবেশ বান্ধব আচার আচরণে অভ্যস্থ করার নিমিত্ত সুবিবেচিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হউক। 
পরিবেশ কর্মী
চেয়ারম্যান
নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন