Showing posts with label কিশোরকণ্ঠ. Show all posts
Showing posts with label কিশোরকণ্ঠ. Show all posts

Monday, October 25, 2010

ভ্রমণ- 'আমার দেখা নরওয়ে' by অধ্যাপিকা চেমন আরা

আমার মেয়ে-জামাই মধ্য সুইডেনের সটিনাস নামক স্থানে বসবাস করে। সটিনাস সুইডেনের এয়ার বেস এলাকা। জামাই আবহাওয়াবিদ এখানকার। নতুন নাতি হয়েছে আমার। তাকে দেখার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি। তাই ছুটে গেলাম সটিনাসে নাতিকে দেখতে। কয়দিন আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে কেটে গেল আমার। কিন্তু জনমানবহীন নির্জনতা আস্তে আস্তে আমাকে বিষণœ করে তোলে। আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। জামাই-মেয়ে টের পেল আমার বিষণœতার কারণ। তারাও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে আমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে আমার মেয়ে বের হয় প্যারামবুলেটারে বেবিকে নিয়ে আমাকে সঙ্গ দিতে এয়ারবেসের ভেতরে হেঁটে বেড়াতে। একদিন গথেনবর্গ থেকে ওর এক সুইডিশ বান্ধবী এলো স্বামীসহ ওর বাচ্চাকে দেখতে। সঙ্গে অনেক উপহার। তারা দুইদিন থাকলো- বাড়ির লনে তাঁবু গেড়ে। আমি তাজ্জব বনে গেলাম। এটা নাকি নিয়ম। ওরা কারো ঘরের শৃঙ্খলা নষ্ট করে না। খাওয়া-দাওয়া অবশ্য ঘরেই খায়।
ওদের কাছে রুবা আমার মনের অস্থিরতার কথা বলে হাসতে হাসতে বললোÑ তুমি একবার আমার মাকে পার্শ্ববর্তী নরওয়ে দেশটা দেখিয়ে আন। নরওয়ে তো তোমার মায়ের দেশ। বলা মাত্র ওর বন্ধু রাজি হয়ে গেল। খাওয়ার সময় বলে গেল দুই-একদিনের মধ্যে সে ও তার মা নরওয়ে যাবে। আমি যেন তৈরি থাকি।
২১ জুলাই ১৯৮৭ সাল। খুব ভোরে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। উলফ এসে ফোন ধরলো। ফোন করেছেন পিয়ার মা। পথেনবর্গ থাকতে পিয়ার মা আমাকে কথা দিয়েছিলেন- সময় ও সুযোগ মতো আমাকে নরওয়ে বেড়িয়ে আনবেন। তিনি তার সেই প্রতিশ্রুতি ভুলেননি। এখন তার সেই সময় ও সুযোগ এসেছে। তিন দিনের জন্য তার ব্যবসাসংক্রান্ত কাজকর্ম তদারকির দায়িত্ব নিয়েছেন তার বাবা। পিয়া ও পিয়ার মা আমাকে নরওরয়ে নিয়ে যাবেন। আগামীকাল সকালে ওরা আমাকে নিতে আসবেন। খবরটা পেয়ে আমার খুব সুবিধা হলো। নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারলাম। রুবাও খুশি। পরদিন ঠিক সময় ওরা গাড়ি নিয়ে হাজির।
ভিনদেশী অত্যাধুনিক দুই সুইডিশ মহিলার সঙ্গে আমি বেড়াতে যচ্ছি। তাও আবার যেখানে সেখানে নয়, বাংলাদেশের মানুষের কল্পনার দেশ, স্বপ্নের দেশ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের শেষ প্রান্তের চির তুষারের দেশ নরওয়েতে। কিছুটা ভয়ও হচ্ছে আমার। ভয় হবারই কথা, কী জানি কোথায় যাচ্ছি। এমনিতেই অজানা জিনিসের শঙ্কায় আমি নার্ভাস হয়ে পড়ি। এবার নার্ভাসের মাত্রাটা একটু বেশি এই যা।
পিয়াকে রুবা বারবার সাবধান করে দিয়ে বলে- আমার মা বাংলাদেশের মেয়ে। তোমাদের সাথে একাকী বেড়াতে যাচ্ছেন। তার সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রেখ।
পিয়া হাসিমুখে রুবার কাছ থেকে সব দায়িত্ব বুঝে নেয়। রুবা দু’দিনের আন্দাজ খাবার-দাবার ছোট একটা থার্মোফাক্স জাতীয় বাক্সে ভরে দেয়। অল্প-স্বল্প কাপড়-চোপড় ছোট একটা ব্যাগে করে দিয়ে দেয় ওখানে ব্যবহারের জন্য। মা যেমন ছেলে-মেয়েকে পরম যতনে প্রবাসে পাঠান, তেমনি আমার মেয়ে আজ আমাকে নরওয়েতে বেড়াতে পাঠাচ্ছে।
আজ ২২ জুলাই সকাল ১০টা। চারদিকে রোদ হাসছে। পিয়া গাড়ি চালাচ্ছে। পিয়ার মা তার পাশে বসে আছেন। আমি পেছনের সিটে একা। সটিনাস থেকে পাঁচ মাইল দূরে গ্রাস নামে ছোট একটা শহরে এসে একটা পেট্রল পাম্পের কাছে গাড়ি থামালো। গাড়ি থেকে নামলো পেট্রল নেয়ার জন্য। পেট্রল পাম্পে কোন কর্মচারী চোখে পড়লো না। প্রয়োজনীয় তেল কেনার জন্য পয়সা ফেলার ব্যবস্থা আছে। পয়সা অনুযায়ী তেল ভরে নিতে হয়। কেউ চুরি করে তেল বেশি নেয় না। পয়সা ফাঁকি দেয়ার বদ মতলব এদের জানা নেই। সটিনাস থেকে নরওয়ের দূরত্ব প্রায় পাঁচ শ’ কিলোমিটার। ট্রেনে এই দূরত্ব পার হতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টা। আর গাড়িতে লাগে ৮ ঘণ্টা। পেট্রল ভরা শেষ। এবার গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল হাতে নিলেন পিয়ার মা। গাড়ি চলছে অপার্থিব এক জগতের দিকে। রাস্তার দু’ধারে গহিন ঘন ওক, পাইন, বিচ গাছের দিগন্ত জোড়া বর্ণ আমাকে বারবার বিমুগ্ধ করে ফেলছে। পিয়ার মা মাঝে মাঝে সুইডেনের ম্যাপ দেখে নিচ্ছেন। আমাকেও বুঝাতে চেষ্টা করছেন- আমরা কোন দিক দিয়ে নরওয়ে যাচ্ছি। আমি যে খুব বুঝতে পারছি তা নয়, তবুও কিছুটা আন্দাজ করতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান ঘরের মেয়ে আমি। অত্যন্ত সাদামাটা জীবন আমাদের। সুইডেন, নরওয়ে এসব দেশে আমার আসার বিষয়টি স্বপ্নে ছিলো এই সেদিনও। আল্লাহর অপার মহিমায় আমি এই দেশে এসেছি, আবার নরওয়েতেও যাচ্ছি। এটা অবিশ্বাস্য ঠেকছে আমার নিজের কাছেই। কিন্তু স্বপ্ন এখন বাস্তব হয়ে আমার জীবনে ধরা দিয়েছে। এই সত্যকে অস্বীকার করি কেমন করে? পরম করুণাময়ের কাছে লাখ শোকরিয়া এমন সুন্দর দেশটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে বলে।
ঘণ্টা দু’য়েক বিরতিহীন গাড়ি চালিয়ে পিয়ার মা ঝড়ঃধপধহধষ নামে একটি জায়গায় এসে গাড়ি থামিয়ে বললেন- এখানে একটু নামেন। সুইডেনের খুব সুন্দর জায়গা এটা। টুরিস্টরা সব সময় এখানে ভিড় করে থাকে। পিয়ার মায়ের কথায় আমি যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এতক্ষণ আমি আরেক জগতে বিচরণ করছিলাম। গাড়ি থেকে নেমে এসে আমরা একটা পুলের ওপর দাঁড়ালাম। এই পুলের একটু নিচ দিয়ে দেখলাম ট্রেন লাইন চলে গেছে। আরও নিচ দিয়ে খাল প্রবাহিত হচ্ছে। খালের মূল মুখে পানির স্বাভাবিক স্রোতের গতি রুদ্ধ করে অন্য দিক দিয়ে প্রবাহিত করানো হয়েছে। যেদিকে খালের পানি যাবার কথা, সেখানে সৃষ্টি করা হয়েছে মনোহর জনপদ। মানুষের চিন্তা, কর্ম, সততা ও পরিশ্রমের সঠিক প্রয়োগে দেশকে যে কী অসামান্য উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে পারেÑ এসব দেশে না এলে তা বোঝানো সম্ভব নয়। আমরা হালকা কিছু খাবার খেয়ে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
গাড়ি চলছে নরওয়ে সীমানা লক্ষ্য করে। রাস্তার দু’ধারে কখনো বা চোখে পড়ছে শিলাময় নাতিউচ্চ পাহাড়শ্রেণী, কখনো বা নীল পানির লেক, মাঝে মাঝে ছবির মতো সাজানো জনপদ। সর্বোপরি বড় বড় গাছের সুবিশাল অরণ্য। সব দেখতে দেখতে এক সময় নরওয়ে সীমানায় এসে পৌঁছলাম। চালকের সিট থেকে পিয়া সরে বসলো। এবার পিয়ার মা গাড়ির হুইল ধরে বসলেন। চেক পোস্ট বরাবার এসে পিয়ার মা গাড়ির গতি একটু কমিয়ে দিলেন। কিন্তু না কেউ গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিলো না। যদিও দু’জন পুলিশ নির্বিকারভাবে চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গাড়ি এখন নরওয়ে সীমানায় ঢুকে পড়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এখনো নরওয়েকে আমি সুইডেন থেকে আলাদা চোখে দেখতে পাচ্ছি না। কারণ আমি যাচ্ছি সুইডেনের এক গ্রামীণ এলাকা থেকে। শহর থেকে দূরে এসব গ্রাম ও এলাকার প্রকৃতি সর্বত্র আমার কাছে একরকম মনে হয়। গাড়ি নরওয়ের দিকে একটু এগিয়ে যেতে ভূগোলে পড়া তুন্দ্রা অঞ্চলের দেখা মিললো। নরওয়েকে সুইডেন থেকে আলাদা করার সুযোগ পেলাম। এখন আমার চোখ দূরে ছোট ছোট গাছের দিকে। রাস্তার দু’ধারে দেখা যাচ্ছে একই রকমের দৃশ্য। স্কুলে ভূগোলে ম্যাপ আঁকতে গিয়ে আমরা পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের শেষ মাথায় তুন্দ্রা অঞ্চলকে সবুজ রঙে ছোট ছোট গাছ এঁকে দেখাতাম, দেখাতাম পানির নিশানা। এই সেই তুন্দ্রা অঞ্চল, যাকে আল্লাহ আমাকে চোখে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ পানিতে ভরে আসে।
আমরা রওনা দিয়েছিলাম সেই সকাল ১০টায়। এখন বেলা তিনটা। আমরা প্রায় এসে পড়েছি নরওয়ের রাজধানী অসলোর কাছাকাছি। অসলোতে ঢুকতে ঢুকতে চারটা বেজে গেল। অসলোর সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের সামনে গাড়ি থামালেন পিয়ার মা। এখানে টুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার রয়েছে। হোটেল, রেল, বাস এবং সকল দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমে আমাদের একটি মাঝারি রেটের হোটেল প্রয়োজন, পরে অন্য কিছুর ব্যবস্থা। স্টেশনের কাছাকাছি একটা হোটেলে সিট পাওয়া গেল। কিন্তু গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়া গেল না। ঠিক হলো স্টেশনে গাড়ি পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে আমরা হেঁটে হোটেলে আসা-যাওয়া করবো। মুশকিল হলো হোটেলে ঢুকে। আমরা সিট পেয়েছি আট তলায়। অথচ ওঠার এলিভেটর অচল। সঙ্গিনী পিয়ার মা কিছুতেই এই হোটেলে থাকতে রাজি হলেন না। প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা তদবির করে আর একটা হোটেল পাওয়া গেলো। শহর থেকে বেশ দূরে। তবে দামে একটু সস্তা। হোটেলের নাম হলতি শিলেন সামার হোটেল (ঐড়ষঃবশরষবহ ংঁসসবৎ যড়ঃবষ). এই হোটেলটির একটি বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে সতের বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী ছেলেদের বিভিন্ন বিষয়ে ৩৩ সপ্তাহের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু আছে। এই কোর্স প্রায় সারা বছর চালু থাকে। কেবল ১ জুন থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য হোটেল করে দেয়া হয়। নরওয়েতে এ ধরনের আশিটি হোটেল আছে। সব ক’টি ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত হয়।
আমরা দোতলায় ৩০৫ নং কক্ষে জায়গা পেলাম। তিন বেডের একটি রুম। আমাদের দেশের হোস্টেলের ঢঙে করা। দু’দিকে অনেক রুম, মাঝখানে বারান্দা।
হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় রাত আটটা বেজে গেল। আমরা তিন জনই শ্রান্ত-কান্ত। পৃথিবীর আরেক প্রান্তের দুই বিদেশিনীর সঙ্গে আমি একা এক বাংলাদেশী প্রৌঢ়া মহিলা। কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ করছি। ওরা কিন্তু খুব সহজভাবে আমার সাথে আলাপ-সালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। রুমে ঢুকেই পিয়ার মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- কোন সিট আপনার পছন্দ। আমি জানালার পাশের সিট দেখিয়ে দিলাম। ভদ্র মহিলা সঙ্গে সঙ্গে অষষ ৎরমযঃ বলে আমার মাল-সামানগুলো আমার বেডের সঙ্গে লাগোয়া কাবাডে ঢুকিয়ে রাখলেন। পিয়া মাঝখানের বেডে জুতাসহ ধুম করে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর উঠে মা-মেয়ে বের হয়ে গেলেন বাথরুমের দিকে।
কিছুক্ষণ পর তারা রুমে ফিরলেন। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে রহস্যময়ী অসলো নগরীর রাতের রূপ দেখছি। গোটা নগরীটাকে মনে হচ্ছে পাহাড়ের ওপর। পাহাড়গুলো সব বড় বড় পাথুরের চাঁইয়ে ঠাসা। এরপর তিনজনে সঙ্গে আনা খাবার খেলাম। পিয়ার মাও অনেক খাবার সঙ্গে এনেছেন। আমার বিছানার পাশে টেবিলে টিফিন ক্যারিয়ার  থেকে তিনি নামালেন- স্ট্রবেরি, আপেল, কেক, কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল। সবাই খেয়ে শুয়ে পড়লাম যে যার বিছানায়। পরদিন সকালে রুবার দেয়া নাস্তা করলাম রুমে বসে। পিয়া ও তার মা চলে গেলেন নিচের ক্যাফেটেরিয়াতে নাস্তা করতে। ওরা ফিরে এলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম অসলো নগরী দেখার জন্য।
অসলো নগরী আগাগোড়া পাহাড়ে ঠাসা। মাঝে মাঝে পাহাড় কেটে রাস্তা চলে গেছে এদিক-ওদিক। সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কোনটার কমতি নেই। রাস্তাঘাটে মেরামতকাজ চলছে। মানুষজনের চলাচল খুব কম। অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের মতো পর্বতশ্রেণী। পিয়ার মা প্রথমে নিয়ে গেলেন অসলোর গেট হারবারে। অসংখ্য বোট গেট হারবারে পড়ে রয়েছে। তার পরে নিয়ে গেলেন ১৩০০ শতাব্দীতে তৈরি একটি দুর্গ দেখাতে। এই দুর্গ সতের শ’ শতাব্দীতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ইদানীং এই দুর্গ সরকারি প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওখান থেকে আমরা অসলো টাউন হলে গেলাম।
বিখ্যাত এই টাউন হলের সামনে রয়েছে অসলো হ্রদ। একদিকে হারবার অন্যদিকে ব্যস্ত নগরী। লাল ইটের দু’টি স্তম্ভ নগরীর শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক।
অসলো টাউন হলের স্থাপত্য শিল্পের অসাধারণ কারুকার্য মেয়র হিরোনিমাস হায়ার ডেল (ঐরবৎড় ঘরসড়ঁং ঐবুবৎ উধযষ)-এর অবিনশ্বর কীর্তি। ১৯১৭ সালে নগরের সিটি ফাদার টাউন হলের জন্য একটা নকশা অনুমোদন করেন। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১৯২০ সালে শিল্পী আর্নস্টেইন (অৎহংঃবরহ অৎহবনবৎম) আর্নবার্গ ও গধমযঁং চড়ঁষংংড়হ টাউন হলের ভেতরের নকশা আঁকার অনুমতি লাভ করেন। নানা কারণে টাউন হলের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত অসলোর প্রতিভাধর শিল্পীদের রাত দিন পরিশ্রমের ফলশ্রুতিস্বরূপ সম্পূর্ণ নরওয়েজিয়ান শৈল্পিক মাধ্যমে টাউন হলের গায়ে ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ সম্পূর্ণ কাজ করা হয়। এখন এই টাউন হল সমস্তÍ নরওয়েনবাসীর জন্য একটা গর্বের বস্তু এবং নরওয়েজিয়ান সংস্কৃতিকে দেখার একটা জায়গা। এই হলে একটা মিউজিয়াম রয়েছে। বিদেশী রাজ অতিথিদের দেয়া সামগ্রী এখানে থরে থরে সাজানো। বাংলাদেশ ছাড়া প্রায় সব দেশেরই কিছু না কিছু দেশীয় উপহার সামগ্রী এখানে দেখতে পেলাম। শ্বেত পাথরের একটা ছোট তাজমহলও দেখলাম।
টাউন হলে গেলাম নরওয়েজিয়ানদের তৈরি প্রাচীনতম নৌকা দেখতে। এই নৌকা প্যাপিরাস পাতার তৈরি। নৌকাটি পাঁচ হাজার মাইল সাগর পাড়ি দিয়েছিলো বলে গাইড বুকে লেখা রয়েছে। অসলো নদীর বাঁকে একটি মিউজিয়াম বানিয়ে এই নৌকাটিকে জনসাধারণকে দেখানোর জন্য রাখা হয়েছে। প্রতিদিন চার-পাঁচশত দর্শক স্পিড বোটে চেপে এই ঐতিহাসিক নৌকাখানা দেখতে যান। মিউজিয়ামের নাম ঞযব কড়হ-ঞরশর গঁংবঁস. দ্বীপের মধ্যে এই মিউজিয়ামের অবস্থান। এখানে এলে বেড়ানো ও ঐতিহাসিক জিনিস দুটোরই স্বাদ পাওয়া যায়।
মিউজিয়াম দেখতে দেখতে প্রায় তিনটা বাজে। পিয়ার মা বললেন, মিসেস চেমন আরা, চলেন এবার ফেরা যাক। সন্ধ্যার পর আবার বেরুনো যাবে। তথাস্তু বলে আমিও সম্মতি জানালাম। সন্ধ্যার কিছু সময় আগে আমরা বের হলাম গাসটভ ভিজি ল্যান্ডের তৈরি ভাস্কর্যে সজ্জিত ভিজিল্যান্ড কালচার পার্ক দেখার জন্য। আশি একর জমির ওপর ভাস্কর্য শিল্পের চরম নিদর্শন নিয়ে এই পার্কটি অবস্থিত। এই ভাস্কর্যগুলোর মধ্য দিয়ে ভিজিল্যান্ড স্তরে স্তরে মানবজীবনের ক্রমপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরেছে। পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক, বড়দের সাথে ছোটদের সম্পর্ক এবং বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে হৃদয়ের সংঘাতÑ এসবও তার ভাস্কর্যের মাঝে ঠাঁই নিয়েছে।
এই পার্কে পৌঁছে এই সব অবিশ্বাস্য পাথর-শিল্পের নৈপুণ্য দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। সন্ধ্যা হলেও রোদ এখনো চারিদিক ঝলমল করছে। পিয়ার মা বললেন- আর একটা জায়গা আপনাকে দেখানো যায়। আমি বললাম- চলেন। শুধু শুধু হোটেলে গিয়ে বসে থেকে তো লাভ নেই। এবার আমাকে নিয়ে গেলেন পৃথিবীর বিখ্যাত স্কি প্রতিযোগিতার জায়গায়। এই জায়গায় নাম- হলমেন কোলেন (ঐড়ষষসবহ কড়ষবহ), এখানে একটা মিউজিয়ামও রয়েছে। এই মিউজিয়ামে আড়াই হাজার বছরের পুরনো স্কি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ক্রীড়ামোদীরা এখানে শীতকালে আসতেন। এখানকার গৌরবোজ্জ্বল কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে সঙ্গিনী পিয়ার মা আনন্দে গৌরবে উল্লসিত হয়ে ওঠেন। গাড়ি থেকে নেমে এই জায়গার খবর শুনতে শুনতে আমার স্কি প্রতিযোগিতা যেই পাহাড়ের ওপর থেকে শুরু হয় সেখানে এসে পড়লাম। এই পাহাড়টি আবার এখান থেকে আরও ১৬৫ ফিট ওপরে। মূল জায়গায় ওঠার জন্য কিছু সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। পিয়ার মা বললেন, ওপরে উঠলে সমগ্র অসলো শহরের দৃশ্য দেখা যায়। আপনি কি উঠতে পারবেন? পিয়ার মার কথার মধ্যে আমার শক্তিমত্তার ওপর কেমন একটা সংশয় লক্ষ করলাম। ফলে আমার জেদ চেপে গেল। বললাম- অবশ্যই পারবো। পিয়া গিয়ে ওপরে ওঠার টিকিট কিনে নিয়ে এলো। আমরা লিফ্টের ঘরে গিয়ে লাইন করে দাঁড়ালাম। সত্তর বছরের বুড়োরাও দেখলাম ওপরে যাওয়ার জন্য লাইন ধরেছেন। সাহসে বুক বেঁধে আল্লাহর নাম নিয়ে সত্যি সত্যি আমি লিফ্ট পাড়ি দিয়ে আরো আড়াই শ’ সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলাম স্কি প্রতিযোগিতার মূল জায়গায়। এখান থেকে প্রতিযোগীরা খেলা শুরু করে। নেমে যায় প্রায় আড়াই শ’ মিটার নিচে গভীর খাদে। নিচের দিকে তাকাতেই আমাদের মত মানুষ ভয় পায়। ওখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারদিকে অসলো নগরীর শোভা দেখলাম। বিজ্ঞান প্রযুক্তি, বুদ্ধি, আধুনিকতা ও প্রকৃতিÑ হাত ধরাধরি করে এখানে অবস্থান করছে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নদী প্রতিযোগিতার স্থান দেখে সে দিনের মতো ফিরে এলাম হোটেলে একরাশ আনন্দ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে।
পরদিন সুইডেনে ফিরে আসার পালা। উত্তর গোলার্ধের শেষ দেশ নরওয়ে। আর নরওয়ের রাজধানী হচ্ছে অসলো। দ্বীপ, নদী, পাহাড়, সবুজ, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মিশে সুন্দর মনোহর অসলো নগরী।
শহরের কোন কোন স্থান থেকে অসলো নগরীকে মনে হয় অনেক নিচে, কোন সময় মনে হয় যেন অনেক ওপরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে- ভূগোলে পড়া তুন্দ্রা অঞ্চলের ম্যাপ। সেই ম্যাপ আমার সামনে মেলে ধরেছে অসংখ্য রূপরেখা। মেহেরবান আল্লাহকে হাজার শোকরিয়া।
২৪ জুলাই সকাল ১০টার দিকে আমি রওনা দিলাম সটিনাসের পথে, রুবার বাড়ির দিকে। পথে নরওয়ে ছাড়ার আগে পিয়ার মা আমাকে নিয়ে গেলেন ভাইকিং জাহাজ দেখতে। হাজার বছর আগে নিমজ্জিত তিনটি কাঠের জাহাজকে ধরে রাখা হয়েছে ঠিক তার নিজস্ব অবয়বে।
এই তিন জাহাজকে রাখা হয়েছে ভাইকিং শিপ মিউজিয়ামে দর্শকদের দেখার জন্য। ভেতরে তাদের ব্যবহারের দ্রব্যসামগ্রীও দেখলাম। ওদের খাবার জিনিসের মধ্যে একটা মিষ্টি কুমড়া দেখলাম।
এবার অসলো থেকে আমাদের বিদায়ের পালা। অসলো শহরের মধ্যে যতক্ষণ গাড়ি ছিল ততক্ষণ ড্রাইভ করলেন পিয়ার মা। শহর ছাড়লে পিয়ার মা হুইল ছেড়ে দিলেন। পিয়া গিয়ে বসলো মার জায়গায়। দু’ধারে সীমাহীন দিগন্ত জুড়ে তুন্দ্রা অঞ্চল। সামনে বিসর্পিল- সুন্দর রাস্তা আমরা তার অভিযাত্রী। পাহাড়, হ্রদ, নদী, অরণ্য রাস্তার দু’ধারে ফেলে ফেলে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনে আরও সামনে। মনে হচ্ছে অনন্তের পথে বুঝি আমাদের অভিযাত্রা। এই অভিযাত্রার শেষ নেই, বিরাম নেই।
এক সময় যাত্রার বিরতি ঘটলো। সটিনাসে ফিরে এলাম। পিয়া ও পিয়ার মা আমাকে উলফের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে পথেনবর্গের পথে রওনা দিলেন।
এখানে দু’দিন বিশ্রাম শেষে এবার আমার দেশে ফিরে যাবার পালা। পুরনো রাস্তা ধরে গহিন বনের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে উলফ আমাকে নিয়ে এলো। ট্রেনের স্টেশন ফলশপিং। রুবা, নাভিদও আমার সঙ্গে আছে। মনটা সবার ভারাক্রান্ত। মাস দেড়েক রুবার সঙ্গে ছিলাম। এখানে-ওখানে বেড়াতে গেলেও মনে হতো রুবা আমার সঙ্গে আছে। ওর কাছে আবার আমি ফিরে আসব। এবারের যাওয়া সে রকম নয়। দেশের উদ্দেশে রওনা দেবার জন্য স্টকহলম যাওয়া।
রুবা, উলফ, আমি সবাই চুপচাপ। কারো মুখে কথা নেই। সবাই যেন কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেছি। রুবাকে ও ওর ছোট ছেলে নাভিদকে ফেলে আসতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। অতি কষ্টে চোখের পানি গোপন করে ওদের বিদায় জানিয়ে ট্রেনে উঠে বসলাম। কিভাবে রাস্তা পাড়ি দিলাম জানি না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে জড়িয়ে আছে রুবা, নাভিদ ও উলফকে ছেড়ে আসার বেদনাবোধ। স্টকহলম স্টেশনে ট্রেন এসে থামার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম- ছাত্রী মমতাজের স্বামী এসে দাঁড়িয়েছে ট্রেনের কামরার দোরগোড়ায়। ওকে দেখে আমি যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
ও হেসে বলল, আপা ভয় পেয়েছিলেন পথে? মুখটা এত শুকনো শুকনো কেন? আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে আমাকে নামতে বলে, আমার মাল-সামান সমেত নেমে এলো ট্রেন থেকে। এবার স্কেলেটারে চেপে ভূতলের ট্রেনে উঠতে যাবে। আমি কিছুতেই স্কেলেটারে যেতে রাজি হলাম না। ফলে বেচারার খুব কষ্ট হলো। লট-বহরসহ সিঁড়ি বেয় নিচে নামতে সময়ও গেল অনেক। বাঙালিদের লটবহর সে তো আর কাঁধের ছোট ব্যাগ নয়। বড় আকারের স্যুটকেস, মাঝারি গোছের দুটো ব্যাগ, ফাক্স, টিফিন ক্যারিয়ার। ভদ্রলোক একাই সব সামলালেন। আমাকে ধরতেও দিলেন না। একেবারে অদেখা অচেনা একটা লোক। ছাত্রীর স্বামী সম্পর্কের সূত্র ধরে আমার জন্য এত কিছু করবে, ভাবাও যায় না। আমি লজ্জিত। নিচে এসে মেট্রো ট্রেনে উঠলাম। এবার আমরা একেবারে চলে এলাম মমতাজের বাড়ির দোরগোড়ায়। ওখান থেকে লিফটে চড়ে চার তলায় মমতাজের ঘরের সামনে এসে কলিং বেল টিপতেই মমতাজ আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো। স্বামী-স্ত্রীর আন্তরিকতায়, অতিথিপরায়ণতায় আমি মুগ্ধ, কৃতজ্ঞ। আমি জানি না ছাত্রীরা আমাকে কেন এত ভালোবাসে। ছাত্রীদের জন্য আমি যা করেছি তা নিছক কর্তব্যবোধে করেছি। কিন্তু ছাত্রীদের কাছ থেকে আমি পেয়েছি অনেক বেশি। ওদের প্রেম-প্রীতি, অঢেল ভালোবাসার ফুলডোরে আমি বাঁধা পড়ে আছি।
সারাদিন হইচই, হট্টগোল, আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে ফিরে আসার সময় ছেলেদের বৌরা ধরে বসলো ওদের সমিতির পত্রিকার জন্য একটা কবিতা দিতে হবে। ওখানে বাঙালি মেয়েদের একটা সমিতি আছে। এই সমিতির মেয়েরা একটা পত্রিকাও বের করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে। জানতে পেরে অনেক খুশি হলাম।
মুরাদের সাথে মমতাজের বাসায় ফিরে এসে সে রাতেই একটি কবিতা লিখলাম। কারণ পরদিন অর্থাৎ- আগস্টের ২ তারিখেই বাংলাদেশে ফিরে আসার ফাইট।
কবিতাটি উল্লেখ করেই আমার ভ্রমণ কাহিনীর ইতি টানবো :
সুইডেনের প্রতি ভালোবাসা
রক্ত গোলাপের মতো ফুটে আছে
বুকের অতলে আমার।
দামি আতরের সুবাস সুইডেনের স্মৃতিতে।
সুইডেন এক আনন্দ-সুন্দর ফুল বাগান।
কর্মনিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠ সৎ মানুষের দেশ সুইডেন।
বিপন্ন মানবতার সেবায় নিবেদিত সুন্দর
একটি দেশের নাম সুইডেন।
বিজ্ঞান মানবতার সেবায় নিবেদিত সুন্দর
একটি দেশের নাম সুইডেন।
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-শিক্ষা সভ্যতার শীর্ষে
এই দেশের অবস্থান।
পূর্ব দেশের ললনা আমি।
উত্তর প্রবাসে এসে নিয়ে গেলাম
দেশের মনোহর সুন্দরকে দু’চোখ ভরে
কর্মের প্রেরণা পেলাম হৃদয় জুড়ে।
আল্লাহর সৃষ্ট রাজ্যে অনুপম সুন্দর
একটি দেশের নামÑ
সুইডেন! সুইডেন!!
============================
কিশোরকন্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ অধ্যাপিকা চেমন আরা

Wednesday, October 20, 2010

কিশোর উপন্যাস- সূর্যোদয়ের দিনে by জুবাইদা গুলশান আরা

ক.-----
পরীক্ষা এলেই পড়াশোনায় ছেলেরা মনোযোগী হয়ে ওঠে, এ কথাটা আর যার সম্বন্ধেই হোক, রঞ্জু সম্পর্কে কেউ বলতে পারবে না। সময়টাই এমন যে, ছোটদের এখন দম নেয়ার সময়ই নেই। সারাটা দিন ভাগ করে করে এক একটা শেখার পর্ব চলতেই থাকে ছোটদের। স্কুল, পিটি, কোচিং, সুইমিং আরও কিছু থাকলে তাও। তারপর বাসায় ফিরে পড়া, তারপর ঘুম। মাঝে মধ্যে স্কুল ছুটি থাকে বটে, সেখানেও নানা ধরনের কাজকর্ম এসে জায়গা জুড়ে বসে। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রোগ্রাম, স্কুল বিতর্ক। সকাল থেকে ছেলের পেছনে সময় দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন রঞ্জু, রনি, বিলটু সোনিয়ার আম্মারা। মনের মধ্যে অনেক স্বপ্ন আর সাধ তাদের। ছেলেরা চায় ব্যতিক্রম কিছু করবে, তাক লাগিয়ে দেবে সবাইকে। ডিঙিয়ে যাবে একে অন্যকে। এক মুহূর্ত থেমে দাঁড়ানোর, ভাবার সময় নেই কারো।
তো, এভাবেই রুটিন বাঁধা জীবন চলছে ওদের। ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা শেষ হয়েছে রঞ্জুর। আবার ক’দিন বাদেই মিডটার্ম এসে হাজির হবে। এসবের মাঝখানে রঞ্জুর আব্বা ছেলেকে নিয়ে যান বাইরে। সারাদিন অফিস করে ফিরলেও ছেলেকে একটু সময় দিতে ভোলেন না তিনি। সেদিনই আব্বার সঙ্গে দোকানে গিয়েছিলো রঞ্জু। বড় সড় একটা মেকানো সেট দেখে পছন্দ হয়ে গেল দু’জনেরই। মেকানোটা হাতে নিয়ে রঞ্জু খুব খুশি হয়ে উঠলো।
আব্বু এটা দিয়ে আমি যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু সব বানাতে পারবো। তাই না?
- হ্যাঁ বাবা, সব পারবে। দেখ না, এ সেটটা খুব ভালো। অনেক কিছু বানানো যায়। ফেরার পথে বাপ-ব্যাটা দোতলা বাসে চেপে শহরের রাস্তা দিয়ে বেড়ালো।
- বুঝলি? ওটা হল ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিল্ডিং। কী বিশাল দেখেছিস? চল এখানে নামি। ছেলের হাত ধরে নামেন ইলিয়াস সাহেব। চারপাশে বিকেলের ছায়া নামছে, ডিসিসির সামনে বিশাল বিশাল গাছ ছায়া বিছিয়ে দিয়েছে। সামনেই ওসমানী উদ্যানের পাশে বিরাট বাগান। ছেলেরা বল নিয়ে লোফালুফি করছে। বলটা এক সময় ওদের সামনে এসে পড়লো। আব্বা বলটায় পা ছুঁইয়ে বললো,
- চল, একটু খেলা যাক। খেলবি?
- আব্বু, ওরা কী ভাববে ইয়ে …
- তোমরা কি আমাদের একটু খেলায় নেবে?
- হ .. অ … আ.. , দাঁত বের করে জবাব দেয় ছেলেগুলো। চমৎকার খেলতে থাকেন ইলিয়াস সাহেব। রঞ্জু অবাক হয়ে যায়। আব্বু এত ভালো ফুটবল খেলতে পারে? রঞ্জু মনের খুশিতে খুব জোরে হাততালি দেয় আর কখন যে চিৎকার করে হইচই করতে থাকে, তা মনেও থাকে না।
- দেখেছিস, কত মজা লাগে খেলতে? শার্টে লেগে যাওয়া ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে আব্বু।
- তুইতো দেখি এক নম্বরের ভিতু! খেলতে চাইলি না কেন? ওই দ্যাখ, ওরা এখনও হাত নাড়ছে… মহাখুশি!
- ‘আরেকদিন খেলবো আববু।’ মুগ্ধ চোখে বাবার দিকে তাকায় রঞ্জু। বাগান থেকে বেরিয়ে সামনে পড়ে ভুট্টার গাড়ি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভুট্টা পুড়িয়ে খায় বাপ-ব্যাটা। বেছে বেছে কচি দানার ভুট্টা দেয় আব্বু, রঞ্জুর আম্মার জন্যও নেয় দু-তিনটা। মাঝে মাঝে রাস্তার মাঝে পড়ে থাকা ইটের টুকরোয় জুতোর ডগা দিয়ে টক্কর লাগায় দু’জনেই। আব্বুর মধ্যে এই ছেলেমানুষিটা খুব ভালো লাগে রঞ্জুর। এই রকম সময়ে রোজকার দেখা আব্বুকে যেন একেবারে অন্যরকম লাগে।
বাসায় ফিরে আম্মার হাতে ভুট্টাগুলো দিয়ে আব্বা বলে,
- কই মালা, এই নাও ভুট্টা এনেছি। আর পকেট হাতড়ে পথে কেনা। কাঁঠালিচাঁপার থোকাটা আম্মার হাতে দেয়, আব্বু পায়ের জুতা মোজা খুলতে খুলতে বলে- আজকে আমরা দারুণ দারুণ সব কাণ্ড করেছি! তুমি তো বাড়ি ছেড়ে বেরুতেই চাও না। আজ গেলে বুঝতে কী মজা! না কি রঞ্জু? ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসেন ইলিয়াস সাহেব।
- হয়েছে হয়েছে। আর গল্প করতে হবে না। হাত মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো।
হর্লিকসের পেয়ালা সামনে নিয়ে সারা বিকেলের বেড়ানোর গল্প শোনাতে থাকে রঞ্জু।
- উম্ মা! দোতলা বাস! হাছা রঞ্জু ভাই? আমরাও একদিন বেড়াইতে যামু। নাগো আম্মা? গালে হাত দিয়ে বুয়া বলে।
- হ্যাঁ, যাওয়া যায়। দোতলা বাস তো চিড়িয়াখানা আশুলিয়া পর্যন্তও যায় তাই না গো? ফুলগুলো খাওয়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলেন রঞ্জুর আম্মু। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
- হোম ওয়ার্কটা শেষ করতে হবে রঞ্জু, তাড়াতাড়ি ওঠ। এখন আবার মেকানো নিয়ে বসো না যেন।

কম্পিউটারে কতকগুলো হিসাব নিয়ে কাজ করছিলেন ইলিয়াস সাহেব। মাঝে মাঝ কাজ করতে করতে আনমনা হয়ে ভাবছিলেন অনেক কিছু। জানালার ওধারে পর্দা উড়ছে হাওয়ায়। হাল্কা মেঘ জমেছে আকাশে। ইলিয়াসের মনে পড়ে ছেলেবেলায় এমনি মেঘলা রাতে পরীদের দেখার লোভে কত রাত দাদীর কাছে শুয়ে শুয়ে কত না গল্প শুনতেন। দাদীর অনেক সাহস ছিলো। কত রাতে দাদা বেরিয়ে যেতেন তদন্তের কাজে, আর দাদী ছেলেমেয়েদের কাছে নিয়ে রাত জেগে থাকতেন। চোখে ঘুম আসতো না, চুপি চুপি চোখের পানি মুছতেন। সকাল বেলায় দাদা হয়তো ফিরতেন খুব ক্লান্ত হয়ে, তখন মানুষটার মুখের দিকে তাকানো যেতো না। তাড়াতাড়ি উঠে বাড়ির বুয়াদের দিয়ে পানি গরম করে দিতেন। গরম চা, ডিম সিদ্ধ, খাবার তৈরি হলে তাড়াতাড়ি খেয়ে আবার অফিসে যাওয়া। হোক দূরের একটা ছোটো থানা, ওসি সাহেবের নামে সারা এলাকা তটস্থ থাকতো। দীর্ঘ দিন চোর ডাকাতের পিছু তাড়া করে এক সময় সরকারের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন কৃতিত্বের জন্য।
ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধের কথা ভেবে শহর এলাকায় শেষ দিকে চলে এসেছিলেন দাদাজান। ইলিয়াসের আব্বা ডাক্তার হলেন, বোনদের বিয়ে হলো খুব শান্তিতেই শেষ দিনগুলো নাতিদের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন দাদাজান। কিন্তু ইলিয়াসদের ছেলেবেলার দিনগুলো একেবারে বদলে গেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেসব কী ভীষণ দিন গেছে! সেই যে ইলিয়াস পালিয়ে গিয়েছিলেন সবজির গাড়ির বস্তার মধ্যে লুকিয়ে, চোখের সামনে গাড়িটা রাস্তার ধারের ঢালু জলাভূমিতে কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিলো। কতগুলো অদ্ভুত পোশাকপরা লোক এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে কয়েকটা লোককে মেরে ফেললো। যুদ্ধে যাবো আম্মা, আমি যুদ্ধে যাবো।
সবাই যাচ্ছে। বলে সকাল বেলাতেই বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে ছিলো ইলিয়াস। বস্তার নিচে চাপাপড়ায় কোনমতে বেঁচে গেলেও বের হতে পারছিলো না। তার ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ শুনে রাস্তা থেকে ছুটে আসা মানুষগুলো তাকে টেনে বের করেছিলো। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছিলো, এ ছেলে তো তাদের পরিচিত ডাক্তার সাহেবের ছেলে। তারাই তাকে পৌঁছে দেয় বাসায়। ইলিয়াস নিজের অবস্থা ভুলে গিয়েছিলো বাড়িতে বা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। মনে হয়েছিল যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই ঘরে ঘরে মৃত্যুর ছায়া পড়েছে। তাকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আব্বার সে কী কান্না!
এর ক’দিন আগেই একটা কাণ্ড ঘটে গেল তাদের জীবনে। বড় ভাইয়ের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাতো ইলিয়াস। এক রাতে তার ঘুম ভাঙে ভাইয়ার নড়াচড়ায়। ভাইয়া তখন সদ্য কলেজে পড়ছে। দু’জনে যখন একসঙ্গে পড়তে বসতো তখন ভাইয়া তাকে দুনিয়ার বড় বড় অভিযানের গল্প শোনাতো। মানুষের চাঁদে যাওয়ার অদ্ভুত কাহিনী, উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরুর অদ্ভুত সব কাহিনী।
- তুই তাড়াতাড়ি বড় হয়ে নে ইলিয়াস। আমরা যাবো নতুন নতুন আবিষ্কারে। উৎসাহে টগ বগ করতো ভাইয়া। সেই ভাইয়া কাঁধে ব্যাগ নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে বন্ধুর হাত ধরে চলে গেল। ঘুম চোখে বিছানায় উঠে বসে অবাক চোখে দেখেছিল ইলিয়াস।
- ভাইয়া কোথায় যাচ্ছে আম্মা? আম্মা কথা না বলে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়েছিলেন। বড় ভাই এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলো। ফিস ফিস করে বলেছিলো, ‘আম্মা, বুঝলি আম্মাকে দেখে রাখিস। তুই কিন্তু এখন বাড়ির বড়।’
সেই দশ বছর বয়সে আমি হঠাৎ করে হয়ে গেলাম বাড়ির বড়। কম্পিউটারে লিখলেন ইলিয়াস। মনে মনে বললেন, সেদিন তোমার জন্য ভীষণ কষ্ট হাচ্ছিলো ভাইয়া, না গিয়ে পারিনি। আমি, বাবুল, রূপম সবাই মিলে যুদ্ধে যেতে রওনা দিয়েছিলাম, তারপর সবজির গাড়ি পড়ে গেল… লোকগুলো যেন হিংস্র বাঘ! এলোপাতাড়ি গুলি করে দিলো! বাবুলটা তো তখনই চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকেন। ইলিয়াস নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, টের পাননি। দুটো ছোটো ছোটো হাত তার গলা জড়িয়ে ধরে।
- আব্বু, তোমার মন খারাপ?
- না, বাবা, এইতো তুমি এসেছো, আর আমার মনটা খুশি হয়ে উঠলো। হেসে ছেলের দিকে তাকালেন ইলিয়াস। পেছন থেকে আম্মা বললেন, তোমার ছেলে সে যমুনা সেতু তৈরি করেছে মেকানো দিয়ে। দেখবে না? সত্যি? কই চল তো দেখি? এবার তো তুই আর আমি গ্যাস রিগ বানাবো। কী বলিস?
ছেলে যখন মোকানো আনতে গেল, তখন আম্মা বাবার কাছে গিয়ে বললেন,
- আজ তোমার মন খারাপ। তাই না? কাঁদছিলে?
- না, না, মালা, তুমি ভেবো না। আমি ঠিক আছি।
- ছেলেটা তোমার কাছে শুনে শুনে ওর বড় চাচাকে এতো ভালবাসে যে, তোমাকে এরকম দেখলেই ওর মন খারাপ হয়ে যায়।
- ওর বড় চাচার গল্প ওর দাদার কাছে শুনলে ওর আরও ভালো লাগবে। এবার যখন বাড়িতে নিয়ে যাবো, ওকে নিয়ে মাছ ধরতে যাবো।
- বাব্বা! এমনিতে তো ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, তার মধ্যে ফুটবল খেলা, মাছ ধরা! স্বপ্নও দেখতে পারো বটে! যাও এখন দেখ গিয়ে ছেলেও এবার বাবার মতো নদী বাঁধতে শুরু করেছে! হাসতে হাসতে ছেলের ঘরের দিকে গেলেন রঞ্জুর আম্মা।

----দুই.----
রঞ্জুদের স্কুলে বিজ্ঞান মেলা নিয়ে খুব হইচই চলছে। বিজ্ঞান সার আসাদ সাহেব ছেলেদের গ্র“প ঠিক করে দিয়েছেন। বিষয়ও ঠিক ঠাক হয়ে গেছে। হোম ওয়ার্ক, পিটি, এসব ছাড়াও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞান জাদুঘরে যাওয়া, বিজ্ঞানবিষয়ক বই পড়া। সাজ সরঞ্জাম জোগাড় করা। রঞ্জুরা ভেবে পাচ্ছে না কোন বিষয়ে তারা প্রোজেক্ট তৈরি করবে। এমন সময় আতিক বললো,
- চল আমরা শহর জুড়ে ওভার ব্রিজ আর রাস্তা বানাই।
- ওরে বাবা সে তো খুব কঠিন হবে! কোথা থেকে শুরু কোথায় বা শেষ! এত বড় শহর!
- বেশ তোমরাই বল কী করবে? গাল ফুলিয়ে বললো আতিক।
আহা রাগ করিস কেন? চল আমরা বানাই শহর রক্ষা বাঁধের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিজ। আমার দাদার বাড়ির কাছে পদ্মা নদী। প্রত্যেক সময় বর্ষায় বাঁধ ভেঙে খুব কষ্ট হয়। একটা কিছু করতে আমার খুব ইচ্ছে হয়। বললো রঞ্জু।
- ঠিক আছে, সেটাই করা যাক না।
চল আসাদ স্যারের কাছে যাওয়া যাক।
একটা কাগজে গোটা প্রোজেক্টটা লিখে, এলাকার ম্যাপ, যেটা ওরা ভূগোল ক্লাসে শিখেছে, সেটা এঁকে যথাসাধ্য সুন্দরভাবে প্রস্তাব নিয়ে ওরা গেল স্যারের কাছে।
- আরে! এতো ভারী সুন্দর চিন্তা। তোরা পারবি তো পদ্মা নদীর ওপরে সেতু বানাতে? জিনিসপত্র জোগাড় করতে হবে তো। কঠিন প্রজেক্ট নিয়েছিস তোরা।
- ‘পারবো স্যার। জোগাড় করবো।’ এক সঙ্গে জবাব দিলো তিন বন্ধু।
- তো, যা। আবেদনপত্র লিখে তোদের ক্লাস টিচারের কাছে জমা দিয়ে দে। আমি হেড স্যারকে বলে পাস করিয়ে দেবো।
তিনজন মহাখুশিতে ক্লাসে ফিরলো। আবেদনপত্রও ক্লাস টিচারকে দিয়ে দিলো। ঠিক হলো রঞ্জু, আতিক আর মঈন মিলে তিনজনের টিম। এবার কোমর বেঁধে কাজে নামার পালা। সুবিধের ব্যাপার এই যে ওদের তিনজনেরই বাসা কাছাকাছি। পথে যানজটে আটকা পড়ার ভয় নেই, মোবাইলে যোগাযোগ করে নিয়ে একজন আরেকজনের বাসায় যায়। সে হোম ওয়ার্কই হোক বা স্কুলের কোন অনুষ্ঠান হোক ওরা একসঙ্গে কাজ করে। রঞ্জুর ঘরে আব্বু একটা মস্তবড় টেবিল বানিয়ে দিয়েছেন। সারা বছর রঞ্জু আর তার আব্বা টেবিল টেনিস খেলে।
টেবিল টেনিসে আম্মাও খুব পাকা।
কলেজে পড়ার সময় কয়েকবার ইন ডোর কম্পিটিশনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। কাজেই রঞ্জুও ভালো-ই খেলে। তো, প্রজেক্টের ব্যাপারে আব্বা একটা টেবিল না বানিয় টেবিল টেনিসের টেবিলেই জায়গা করে দিয়েছেন ওদের। স্কুল থেকে ফিরেই বন্ধুরা ছুট দেয়। আতিক এর মধ্যেই জোগাড় করেছে লোহার ফ্রেম, তার, আর ছোটো ছোটো সিমেন্টের ব্লক। শুধু ব্রিজ বানালেই তো হবে না, টেলিগ্রাফের তার, এপারে ওপারে বিদ্যুতের যোগাযোগ, গাড়ি, বাড়ি কত কি-ই না চাই ওদের। মাঝে মধ্যে ওদের উৎসাহ দেবার জন্য তিনজনের আব্বা আম্মাই এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের কাজ দেখেন। খুবই ধীরস্থিরভাবে কাজ করে ছেলেরা। কমিক বা কার্টুন দেখতেই মনে থাকে না ওদের। একদিন আতিকের আব্বা বললেন,
- ‘নদীর গতিপথটা জেনে নেবে তোমরা। আমার বন্ধু ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। সে তোমাদের ভালোভাবে নদীর স্রোত, বন্যা, নদীভাঙন বিষয়ে বলতে পারবে। তোমরা চাইলে আমি তোমাদের নিয়ে যাবো।’ তিনি একজন আবহাওয়াবিদ। ফলে ওরা রাজি হয়ে গেল। মঈনের আব্বা দিলেন তার গাড়িটা। শেষে আবার শরীরটা খারাপ করে বসিছ না তোরা। বলেন বিজ্ঞান স্যার।
সব কাজ কর্ম যখন জমে উঠেছে, তখনই ঘটে যায় একটা দুঃখজনক ঘটনা। চিঠি হাতে করে এসে হাজির হয় দাদাবাড়ির পুরনো মানুষ জহির মিয়া। তার চিঠি পড়েই গুম হয়ে যান ইলিয়াস।
- কী হয়েছে গো? কোন খারাপ খবর আছে নাকি? উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চান রঞ্জুর আম্মা।
- হ্যাঁ মালা, ভীষণ খারাপ খবর। বৃষ্টির মধ্যে কারো কথা না শুনে টিউবওয়েল থেকে পানি তুলতে গিয়ে আব্বা পা ভেঙে ফেলেছেন। প্রথমে তো চুন-হলুদ দিয়েই মেরামত করেছিলেন। কিন্তু পরে সরকারি ডাক্তারকে কল দিয়ে আনা হয়। ধরা পড়ে ফ্র্যাকচার। আম্মা লিখেছেন, আমি নিজে গিয়ে না আনলে আব্বা বাড়ি থেকে নড়বেনও না। ঠিকই তো বলেছেন। তুমি যাও, আব্বা আম্মা দু’জনকেই নিয়ে এসো গিয়ে। বাড়ি ছেড়ে তো নড়ানোই যায় না উনাদের। কত বলি যে ঢাকায় এসে এখানে থাকেন। তা কথা শুনলে তো! আম্মা ক্ষুব্ধ গলায় বলেন আর রঞ্জুর আব্বার ব্যাগ গোছান।
- দাদার কী হয়েছে আম্মা? ভয়ে ভয়ে জানতে চায় রঞ্জু।
- আর কী। তোমার দাদাজান পা ভেঙে ফেলেছেন।
হেসে ফেলে রঞ্জু- দাদাজান তো বুড়ো মানুষ। তার পা ভেঙে গেল কেমন করে? কারো সঙ্গে কম্পিটিশনে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল বুঝি?
- চুপ কর অসভ্য ছেলে। ওকি কথা? দাদাজান টিউবওয়েলে পানি তুলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। তাই তোমার আব্বা যাচ্ছেন তাদের আনতে। দাদা আর দাদু দু’জনেই আসবেন। এ একরকম ভালোই হলো। এখানে বসে আমরা ভেবে মরতাম। পায়ের চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে উনাদের একটু জায়গা বদল হবে।
- আচ্ছা আম্মু, দাদাজান কি খুব রাগী?
আস্তে আস্তে জানতে চায় রঞ্জু?
কেন রে ? রাগী হবেন কেন? জানিস না, উনি তো ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন। তখন উনার আব্বাকে হারান। টাকা পয়সার অভাব, তিন চারটা বাইবোন মানুষ করবে কেমন করে? তখন উনি পড়া ছেড়ে দিয়ে পুলিশের চাকরি নিয়ে নেন। ভেবেছিলেন, পরে ডাক্তারি পড়াটাই শেষ করবেন। তবে সেটা আর সম্ভব হয়নি। অবশ্য পুলিশের চাকরিতেও উনার খুব সুনাম হয়েছিলো। খুব রাগী অফিসার ছিলেন তো!
- ওরে বাবা! তাহলে যদি আমার ওপর রাগ করেন তখন যদি মারেন, তবে?
- না, তোকে নিয়ে আর পারি না। তোর দাদাজান খুব মজার মানুষ, আর দাদীজান একেবারে মাটির মানুষ। তবে হ্যাঁ রঞ্জু বাড়িতে মুরুব্বিরা এলে কিছু নিয়ম কানুন তো মানতেই হবে। যেমন, হো হো করে হাসা, ব্যাগ ছুঁড়ে চেয়ারে ফেলা, ক্ষিধে পেলে চেচাঁমেচি করা বিছানায় উঠে লাফানো…
- আরে আরে। হচ্ছে কী? ছেলেটাকে ওভাবে ভয় পাইয়ে দিচ্ছো কেন? ঘরে ঢুকে ইলিয়াস বললেন,
- না রে রঞ্জু, তোর দাদাজান খুব ভালো। তবে এখন যেহেতু তুমি উনার একমাত্র নাতি, আর উনি অসুস্থ। তাই তোমাকেই তো উনার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাই না? আর উনারা এলে সবারই ভালো লাগবে। দেখিস। তোমার দাদাজান অনেক ডাকাত ধরেছেন। সেসব গল্প তোমাদের এখনকার ডিটেকটিভও গল্পের চেয়েও ভয়ের।
আচ্ছা, চলো এখন খেয়ে নিই। গাড়ি রাত ১১টায় সকাল নাগাদ ঈশ্বরদী পৌঁছে যাবো। আশা করি দ্রুত ফিরে আসবো। জহির ওর মামার বাসায় গেছে। ও এলেই আমরা রওনা দেবো।

------তিন.-----
এখানে সূর্যটা ওঠে একটু বাঁকা হয়ে। রঞ্জুর দাদা বলেন।
- ঢাকার সবই দেখছি বাঁকা রে দাদু?
- যাও দাদাজান, তুমি মজা করছো। বলে রঞ্জু ব্যাগ কাঁধে নেয়। দাদী পেছনে দাঁড়িয়ে বলেন, এতো বই বয়ে নিতে পারবি তো দাদু? দেখেছো এখন বাচ্চারা কত বই পড়ে?
রঞ্জু একটু লজ্জা পায় দাদীর কথায়। ব্যাগটা সামলে বলে, হ্যাঁ আসি আম্মু, আমি আব্বু দাদাজান … বলতে বলতে লিফটে উঠে যায় রঞ্জু। ওদিকে তাদের বাড়িতে ক’দিন রীতিমতো নাভিশ্বাস অবস্থা যায় সবার। এক্সরে, প্লাস্টার খোলা, ওষুধ-পত্তর সে এক এলাহি কাণ্ড! এর মধ্যে রঞ্জুদের দুটো ক্লাস পরীক্ষাও হয়ে গেল। একটু একটু করে ওদের প্রজেক্টও এগিয়ে চলছে। দাদার শরীরটা এখন বেশ ভালোর দিকেই। ঢাকায় যারা থাকেন, সেসব আত্মীয়স্বজন তাকে দেখতেও আসেন। বাড়ি একেবারের সরগরম। এসবের মধ্যে নিজেদের কাজে ডুবে থাকার কোন উপায় নেই। বলতে গেলে, সারাটা সময়ই আম্মা আব্বা, সবাই ব্যতিব্যস্ত দাদা-দাদীর সেবায়। রঞ্জুর খুব অভিমান হয়, আবার মজাও লাগে। গল্প শোনার সময় বেশি পায় না রঞ্জু। স্কুল থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নিয়েই দৌড় দেয় কাজের টেবিলে। বন্ধুরা মিলে বেশ এগিয়েছে কাজটা। একটা বড় বোর্ডের ওপরে এপার ওপার করে অ্যালুমিনিয়ামের রড লাগিয়ে দিয়ে একটা ব্রিজের কাঠামো দাঁড় করিয়েছে তারা। দু’পাশে ঘরবাড়ি তৈরি করেছে ছোট ছোট কাঠের টুকরো, পিচবোর্ড এসব দিয়ে। নদীটা তৈরি করাই হলো সবচেয়ে কঠিন।
বিজ্ঞান স্যার একদিন এসে দেখেও গেছেন। তিনি বলেছেন- তোদের দেখে আমার খুব লোভ হচ্ছে রে, পানির মেশিনটা তৈরি করে দিতে। কিন্তু তোদের বেশ কষ্ট হলেও তোরা নিজেরাই করবি। বড়দের কাছে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবি, ব্রিজের খুঁটি কমজোর হলে, বা দু’পাশের বাঁধানো জায়গায় কী দোষ থাকলে নদীর পাড় ভেঙে পড়ে, আর বন্যা হয়।’
আব্বার সঙ্গে গিয়ে কয়েকবার বড় বড় সেতু দেখে এসেছে রঞ্জু। এখন সে একটু একটু বুঝতে পারে, কোন নদীতে ভাঙন হয়, সেতুর চারপাশটা রক্ষা বাঁধই বা কী কাজে লাগে।…

মঈন বলল, আমি তোমাদের জন্য মরিচ বাতি এনেছি। নতুন ব্রিজের ওপরে লাগালে সুন্দর হবে না?
সেদিন মহা উৎসাহে বাতি লাগিয়ে সুইচটা টিপে দিতেই বেশ ঝলমল করে উঠলো। ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো রঞ্জু,
- আব্বা, …. আম্মু… দাদী …. দেখে যাও, …’। সবাই আলোর মালা দেখে খুশি হয়ে গেলেন। ইলিয়াস বললেন,
- তোদের ব্রিজটা যে একেবারে সত্যিকার সেতু হয়ে উঠেছে রে রঞ্জু,
- তোমাদের দেশের ভবিষ্যৎ ইঞ্জিনিয়ারদের দেখে নাও বিল্লু…, দরজায় লাঠি হাতে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে দাদাজান বললেন,
- বিল্লু? ….বিল্লু কে দাদাজান? রঞ্জু অবাক খুশিতে জানতে চায়।
- তোর বাবাকেই জিজ্ঞেস কর না। দাদা হেসে বলে ওঠেন। তারপর দাদাজানের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, টুলু আর বিল্লু। টুলু আর বিল্লু দুই ভাই। ছিলো তোর দাদার জান।
- আর তোমার বুঝি নয়?
ছেলেদের কথা উঠলেই তুমি টুলুর জন্য চোখের পানি ফেলতে শুরু কর টুলুর বাপ, চলো, ঘরে চলো।
দু’হাতে চোখ কচলে দাদাজান বলতে থাকেন- দেখেছো, নাতিটা একেবারে ওদের বড় চাচার মতো হয়েছে। সেই রকম স্মার্ট, সেইরকম অভিমানী…।’ ওদের প্রজেক্টের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক মুগ্ধতা নিয় সব কথা শোনে তিনটি কিশোর। আব্বার চোখ দুটোয় যেন মেঘের ছায়া নেমেছে। মৃদু গলায় বলেন,
- দেখেছো, আজকে আমার ছেলেবেলার নামটা বেরিয়ে পড়লো, কত কষ্টে লুকিয়ে রেখেছিলাম! হেসে ওঠেন রঞ্জুর আব্বা।
স্কুলের বিজ্ঞান মেলা প্রতিযোগিতা নিয়ে তুমুল উত্তেজনা। বড়দের গ্র“প অনেক কঠিন কঠিন কাজ করছে। আর মাত্র একদিন বাকি।
সেদিন রঞ্জুদের বাড়িতে এলেন আব্বার চাচাতো ভাইয়ের বাড়ির সবাই। রঞ্জু তখন স্কুলে। হঠাৎ মেহমানদের দুই বাচ্ছা হইচই করতে করতে রঞ্জুর ঘরের দরজা খুলে ঢুকে পড়লো। বুয়া আর রঞ্জুর আম্মা বাধা দিতে দিতে দু’জনে হুড়মুড় করে গিয়ে পড়লো ওদের প্রজেক্টের ওপরে। বুয়া একটা চিৎকার দিলো আয় হায়! কী করলো এইডা? আম্মাগো, ভাইয়া যে কাইন্দা শেষ হইবো!
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতবাক! আম্মা ফুঁপিয়ে উঠলেন,
- এখন কী হবে গো! ছেলেরা কতদিন ধরে কাজ করে চলেছে।…
এত অস্থির হইও না মালা! দেখি কী করা যায়।
এরকম একটা কাণ্ড করে বাচ্চা দুটোও ভড়কে গিয়েছে। প্রচণ্ড একটা ধমক দিলেন তাদের আব্বা।
- মানা করছে, তবু এ ঘরে ঢুকলে কেন তোমরা? দেখেছো, কি সর্বনাশ হয়েছে?
সর্বনাশ যে হয়েছে, তাতে আর সন্দেহ কী? বাড়িতে ঢুকে এত চুপচাপ দেখে রঞ্জু একটু অবাক হয়ে গেল। সবাই কি বেড়াতে গেছে? ব্যাগটা চেয়ারে রেখে রান্নাঘরে দাঁড়ালো রঞ্জু।
- বুয়া…? আম্মা কোথায়?
- ঐ যে, আম্মা গো, রঞ্জু ভাইয়া আসছে। কেমন যেন কান্নায় ডুকরে উঠলো বুয়া। আম্মা দৌড়ে নিজেদের ঘর থেকে বের হয়ে ছেলেকে কোলের কাছে টেনে নিলেন।
- আয় রঞ্জু। আয় বাবা, আমার ঘরে হাত মুখ ধো। চল তোকে খেতে দিই। আম্মার কাণ্ড দেখে একটু অবাক হয় রঞ্জু। তবে কি দাদাজানের কিছু হয়েছে? আম্মার কাছ থেকে নিজেকে একটু আলগা করে নিয়ে সরে দাঁড়ায় রঞ্জু। গম্ভীরভাবে জানতে চায়,
- আম্মা, কী হয়েছে?
- ‘কিছুই হয়নি বাবা! আগে তুই কিছু খা।’ রঞ্জু বুঝতে চেষ্টা করে। তারপর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে যায় প্রজেক্টের ঘরে। হাতবাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে টেবিলের সামনে।

- আরে! রঞ্জু, তুই কি পুরুষ মানুষের নাম ডোবাবি? এত সামান্য জিনিস নিয়ে এত অস্থির হতে হয়? সব ঠিক করে দেবো আমরা… বাবা আমার, তুই শান্ত হয়।
কিন্তু রঞ্জু কারো কথাই শুনছে না। তার আব্বা যে তার বন্ধু, সে কথা আজ তার মনেই নেই। চোখ দিয়ে খালি পানি পড়ছে, আর মাথা নাড়ছে। তিন বন্ধুর গলাগলি করে কান্না দেখে এমনকি রাগী বিজ্ঞান স্যারও ধমক ধামক দিতে ভয় পাচ্ছেন। ছেলেটি কিছু খায়নি পর্যন্ত। শেষ অবধি তিনজনকে ধরে নিয়ে বড়রা গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের উপদেশ অনুযায়ী চাইনিজ বেস্তোরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে গেলেন। শিশু পার্কে নেমে হাঁটলেন। ছেলেগুলো যেন বোবা হয়ে গেছে, কলের পুতুলের মতো চলছে ফিরছে। গত তিন সপ্তাহের এত শখ, এত কষ্ট করার পরে এরকম ঘটনা ঘটে যাওয়ায় ওদের যেন হাত-পা দুমড়ে আসছে। ইলিয়াস সাহেব এক সময়ে বলেছেন,
দেখ বাবু, এরকম দুর্ঘটনা ঘটলে কিছু করার নেই। আবার তৈরি করবে।
এত মন খারাপ কেন করবে? মঈন, আতিক, তোমরা বলো, এখন তো তোমরা ছোটো। আরও তো কত কিছুই ঘটতে পারে জীবনে। তাই না? তোমাদেরকে সাহসী হতে হবে। তোমরা তো মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ো। আমরা সবাই কত খুশি হয়েছি তোমাদের এত সুন্দর কাজ দেখে। এত সহজে ভেঙে পড়লে কি চলে?
- ঠিকই তো বলছেন ইলিয়াস সাহেব। কেউ তো আর ইচ্ছে করে ওটা ভাঙেনি। পাঁচদিন যথেষ্ট সময়। আমরা তোমাদের সাহায্য করবো। বললেন মাঈনের আব্বা।
- চলো এবার বাসায় ফিরি। আব্বা আম্মা একলা আছেন।

------চার.------
লিফটে ওঠার আগে বন্ধুরা তিনজন এক অন্যের গলা জড়িয়ে ধরলো।
- আহারে বড় কষ্ট পেয়েছে ছেলেরা! ভাবলেন ইলিয়াস। তারপর লিফটে ঢুকে পড়লেন।
ওপরে ওঠে নিজেদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে গেল বাবা আর তার ছেলে। দরজাটা হাট করে খোলা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে কথাবার্তা, হাসির শব্দ। আর …. আর একি? এক লাফে এগিয়ে গেল রঞ্জু। আলোর মালায় সেজে ঝলমল করছে তাদের সাধের সেতু। সেতুর রেলিং, লোহার খাম্বা, সিমেন্টের পিলার, কী নেই? এতদিন ধরে ঠিক যেমনটি ওরা বানিয়েছিলা, ঠিক তেমনটি। তবে সেতুর মাথার ওপরে জ্বলছে একটা বড় সড় আলো। তার নিচে সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে ‘নদীর ভাঙন রোধ করে আপনার শহরকে বাঁচান।’
দু’পাশে মঈনের আনা সারি সারি গাড়ি ওপারে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। মাথার ওপরে টেলিগ্রাফের ইলেকট্রিক তার। নিচে ঘর বাড়ি নিখুঁত সাজানো। এখন শুধু নদীর স্রোত তৈরির অপেক্ষা। ছেলেকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে দাদাজান বলেন,
- ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, একটা ছোটো মোটর মেশিন আর মোটা পাইপ হলে নদীটাও পেয়ে যাবেন। তবে এ নদী বাঁধ ভাঙবে না।
কিরে তুই যে একবারে বোকা হয়ে গেলি। বিল্লু? আম্মা জোর গলায় হেঁকে উঠলেন। আম্মা … আমি … আমি বুঝতেই পারছি না কী বলবো। থতমত খেয়ে বলেন ইলিয়াস।
- দেখেছো? বৌমা, দেখ দেখ আমার ছেলে বিশ্বাসই করতে পারছে না। ও ভেবেছে বুড়োবুড়ি আবার কী করবে। তাই না?
- আমার দাদুভাইয়ের কষ্ট দেখে আমি ঠিক থাকতে পারিনি রে। ভাবলাম, এক কালে তো তোর আর টুলুর সঙ্গে লেগো আর মেকানো দিয়ে কত কিছু বানাতে শিখিয়েছি। হোয়াই নট নাউ? তোর মাকে বললাম, চলে এসো পার্টনার, কাজের লেগে পড়ি। তোর বউ তো ভয়েই মরে, বুঝি আরও খারাপ কিছু করে বসি। এখন দ্যাখ, বাড়াবাড়ি কিছু করিনি নাতিভাই, বাকিটুকু তোরাই করতে পারবি। তোদের ক্ষতিটুকু শুধু মেরামত করার চেষ্টা করে দেখলাম।
- দাদাজান… দাদাজান … দাদু দু’জনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো রঞ্জু।
- আরে বোকা ছেলে, কাঁদিস কেন?’ রঞ্জুর মাথায় হাত রেখে হাসলেন তার দাদা।

রাতটা কোনমতে কাটলো। সকাল হতে না হতেই মঈন আর আতিক বাবাদের সঙ্গে নিয়ে হাজির। বুয়া মনের খুশিতে থালা ভরে পিঠা পুলি হাজির করলো।
- ভাইয়ারা আহন মন খুশি কইরা খাইবা আর সুন্দর সুন্দর জিনিস বানাইবা। দাদাজানে দেহাইয়া দিছে জাদুর খেইল!
অনেক দিন পরে নিজের ছোটো ঘরটা খুলে টেবিলে বসলেন ইলিয়াস। অনেক দিনের ঝড় ঝাপটায় নিজের সঙ্গে একলা হওয়ার সুযোগ তার হয়নি। আজ মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হলো একটু বসি নিজের কাছে। তাকের ওপরে ধুলো পড়েছে। ছেলেবেলার খেলনা, মালার লেপের তোরঙ্গ ছেলেবেলায় মেলা থেকে কেনা বাঁশের বাঁশি …. আর…. কাঠের একটা বা…স। ছেলেবেলার খেলার একটা বল। ভাইয়ার সঙ্গে খেলতো ইলিয়াস… না… ছোটো ভাইটা যার নাম ছিলো বিলু।
বলটা ফেটে গেছে। ভেতরে হাত দিলেন ইলিয়াস। বের করে আনলেন এক টুকরো কাগজ। হলদে হয়ে যাওয়া কাগজে পেন্সিলে দ্রুত হাতে লেখা কয়েকটি কথা- ‘বিল্লু, আব্বা আম্মাকে দেখে রাখিস। আমি যদি ফিরতে না পারি, … তুই-ই তখন বাড়ির বড় এ কথা ভুলিস না … তোদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। … ইতি টুলু।’ বন্ধুর হাতে পাঠানো এই চিরকুট ছিলো তার সম্বল। রক্ষাকবচের মতো রক্ষা করেছেন ইলিয়াস। কাউকে বলেননি, কাউকে জানতে দেননি, এমনকি রঞ্জুকেও না। কতক্ষণ এমন বসেছিলেন জানেন না। মাথার ওপরে কারো স্নেহমাখা হাতের ছোঁয়ায় নড়ে উঠলেন। ফিরে তাকালেন।
- আম্মা তুমি?
কেন? আমার ছেলেটা কত একলা। কত দুঃখ সে লুকিয়ে রাখে, আমি তার মা, আমি জানবো না? তোর হাতে ওটা কী রে? টুলুর চিঠি? দেখি, কী লিখেছে? চিঠির টুকরোটা হাতে নিতেই তার চোখ বেয়ে টপ টপ করে ঝরে পড়ে কান্না। সে কান্না মা কাউকে দেখতে দেননি, সেই কান্না আজ কোন বাধা মানে না। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ইলিয়াসও কাঁদেন, বুকটা যেন হালকা হয়ে যায়। জানালার বাইরে চাঁদটা উঁকি দিয়ে তাদের দেখছে, ঠিক যেন টুলুর চোখের মতো।
- আব্বু … তোমার জাদুঘর দেখ ফেলেছি। ছেলের গলার হাসি শুনে হেসে তাকায় তার আব্বা। একটু চমকেও ওঠে রঞ্জুর আব্বা। গলাটা নিজের অজান্তেই রুক্ষ শোনায়।
- কি দেখেছো বলতো? জানতে চায়।
কেন? তোমার আর চাচ্চুর খেলার ফুটবল? চমকে ওঠেন ইলিয়াস। ফুটবল! ওটা কোথায় পেলো রঞ্জু? ছেলের দিকে কড়া চোখে তাকান তিনি।
- কবে ঢুকেছিলে এখানে তুমি?
রঞ্জুও বাবার রেগে যাওয়া মুখের দিকে তাকায়। ভয়ে ভয়ে বলে,
আম্মা বললো, এটা তোমার একার জাদুঘর। এখানে তোমার আর বড় চাচ্চুর জিনিসপত্র থাকে। তাই এখানে কোন কিছুতে হাত দেয়া নিষেধ। তাই আম্মা একা এসে ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে রেখে যায়। আমি বলটা মাত্র একবার ধরেছিলাম। আম্মা কেড়ে নিয়েছিলো।
কেন আব্বা? ঐ বলটা দিয়ে তুমি আর চাচ্চু খেলতে, তাই?
- হ্যাঁ, ইলিয়াস যেন কথা বলতে পারেন না। বলতে পারেন না, শোন রঞ্জু, আমার ভাই দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলো। আর ফিরে আসেনি। আমি যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। আমি পাহারা দিয়ে রেখেছি তার বল, গায়ের জামা, তার ছবি- তাহলে কি হতো আব্বু, তুমিও যদি চাচ্চুর মতো যুদ্ধে গিয়ে- থেমে যায় রঞ্জু। কী বলবে ভেবে পায় না।
- ঠিক আছে বাবা, যদি আমিও না ফিরতাম তাহলে আমাদের রঞ্জুর আব্বু আসতো কোথা থেকে?
এইতো তোর মনের কথা?
- আব্বু, রঞ্জু আব্বার কোমর জড়িয়ে ধরে- আব্বু, তুমি সব কথা আগেই বুঝে ফেলো কেমন করে?
আজ মনে হয় ছেলের সঙ্গে সব গল্প করে ফেলবে! অফিসের কথাও বুঝি মনে নেই?
- আম্মা হাসতে হাসতে দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলেন। দরজায় তালা দিয়ে হেসে বেরিয়ে আসেন ইলিয়াস। তোর মার হিংসে হচ্ছে রঞ্জু! চলো নাশতা দেবে। আয় রঞ্জু। খাবার টেবিলে বসে খবরের কাগজে চোখ রাখেন ইলিয়াস।
- কাগজটা দেখেছো? ১৯৭১ এর কতিপয় তরুণ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এই শিরোনামে কে একজন নিবন্ধ লিখেছেন … একটু থেমে রঞ্জুর মা বলেন,
- ওখানে একটা গ্র“প ছবিতে বড় ভাই আছেন। কাগজটা সামনে টেনে আনেন ইলিয়াস। বুকটা গর্বে ভরে ওঠে তার। একাত্তরের জুন মাসে যুদ্ধে নিহত তরুণ যোদ্ধার হাসি মুখের ছবি তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
- ‘যাক, দেশটা এখনও গোল্লায় যায়নি তাহলে। কেউ কেউ সত্যিকার যোদ্ধাদের মনে রেখেছে।’ আস্তে আস্তে বলেন ইলিয়াস।
- কেন আব্বু, আমাদের বইয়ে পাঁচজন বীর শ্রেষ্ঠর ছবি আসছে, আমরা শিখছি।
- হ্যাঁ বাবা, হাজার হাজার শ্রেষ্ঠর নাম তো ইতিহাসে পাবে না তোমরা। কিন্তু তারাও তো দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। তোরা যখন বড় হবি, ঘরে ঘরে গিয়ে শুনে আসবি সত্যিকার দুঃখ কষ্ট আর যুদ্ধ কী ভীষণ! কত মা শুধু চুপি চুপি কেঁদেছে আমার মায়ের মতো।
আস্তে আস্তে টেবিল ছেড়ে উঠলেন আব্বা। বারান্দায় গিয়ে দেখলেন টুলু বিলুর বাবাকে। খবরের কাগজটা হাতে তুলে দিয়ে বললেন- আব্বা, দেখেন বড় ভাইয়ের ছবি।
- ওটা আমিই লিখে পাঠিয়েছিলাম বিলু! বড় ভয় করে, এ দেশের মানুষেরা ওসব অজানা শহীদদের যেন ভুলে না যায়, তাই।

------পাঁচ.------
স্কুল বিজ্ঞান মেলায় যেমন বিরাট আয়োজন তেমনই বিরাট মেলা। প্রায় বারোটা নামকরা স্কুল থেকে তিনটি গ্র“পে ভাগে হয়ে ছেলেমেয়েরা অংশ নিয়েছে। রঞ্জুরা সবচেয়ে জুনিয়র গ্র“প। অন্য সবাই অনেক কিছুই বানিয়েছে। সবাই তাদের প্রজেক্ট দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে। বিচারকরা গম্ভীর মুখে প্রত্যেক দলের কাছে যাচ্ছেন, নোট নিচ্ছেন, তারপর অন্য দলের কাছে। সব শেষে রঞ্জুদের পালা। চারদিকে লাইট জ্বলে উঠেছে। তার মধ্যে মস্ত বড় একটা টেবিলে জ্বলে উঠেছে অনেক ছোটো ছোটো বাতি। লম্বা ব্রিজ আর বাঁধ নিয়ে কথা বলে উঠলো তিনটি কিশোর।
- সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ আর যমুনা নদীর ব্রিজে।
মৃদু গুঞ্জনে মোটর চলতে শুরু করলো। আর বড় ড্রাম থেকে মোটা পাইপের মধ্য দিয়ে পানির স্রোত দৌড়ে এলো নদীর অংশে। মনে হচ্ছে শহরের বাড়িগুলোয় যেন জোরসে ধাক্কা দিচ্ছে রাগী নদী।
কিন্তু আমরা তা হতে দেবো না। তাই আমরা পিলার তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছি… এ ব্যাপারে অবশ্য আমরা বড়দের কিছু সাহায্য নিয়েছি…
রঞ্জুদের প্রজেক্টের সামনে বেশ ভিড় জমে গেল। অনেকেই জানতে চাইলো অনেক কথা।
এখন অপেক্ষার পালা। দাদাজান খুব আসতে চাইলেও তাকে আনা সম্ভব হয়নি। আব্বা একাই এসেছেন রঞ্জুদের সঙ্গে। আম্মু তো ভয়েই আসেনি। যদি রঞ্জুদের প্রজেক্ট ভালো না হয়?
- ‘বাচ্চাগুলোর কষ্ট আমি সইতে পারবো না।
তার চেয়ে তুমিই যাও।’ আব্বাকে ঠেলে পাঠিয়েছে আম্মা।

মেলার হইচই কমে এসেছে। সন্ধ্যার পরে। মাঠ জুড়ে শামিয়ানা টাঙানো। ছেলেমেয়েরা বসে আছে। বসে আছেন অন্য স্কুলের শিক্ষক আর অভিভাবকরা। প্রতিযোগিতায় যারা অংশ নিয়েছে তারাও দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। রঞ্জুর আব্বা বললেন, দেখেছিস রঞ্জু, তোদের তৈরি ব্রিজটা কি গুরুগম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে?
এখন রেজাল্ট কী দাঁড়ায় … মঈনের আব্বা বললেন, ছেলেরা তো ডেমনস্ট্রেট করেছে খুব সুন্দরভাবে। আপনি কী বলেন ইলিয়াস সাহেব?
- এক্কেবারে প্রফেশনাল। অর্থাৎ বড়দের মতো।
পাশ থেকে বলে ওঠেন আতিকের আব্বা।
- আপনি ওদের যেভাবে সাহায্য করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ না দিয়ে পারি না। আপনার আব্বা তো আমাদের একেবারে চমকে দিয়েছেন, নইলে ওরা এতটা করতে পারতো না।
- রেজাল্ট দিচ্ছে, রেজাল্ট ঘোষণা করছে মনজুর সাহেব শোনেন…!
একে একে তিন গ্র“পের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান ঘোষণা করার পর একটু থামলেন বিজ্ঞান স্যার। তারপর তিনি সামনে তাকিয়ে খুঁজলেন তার ছাত্রদের।
- সমস্ত বিচারকের সম্মিলিত বিচারে জুনিয়র গ্র“প চ্যাম্পিয়ন হয়েছে…, পিনপতন স্তব্ধতার মধ্যে ঘোষণা হলো,
- যমুনা নদীর তীরে পলাশবাড়ি ব্রিজ আর সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ প্রজেক্ট, আমি তাদেরকে মঞ্চে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। ক্লাস ফোর এর গ্র“প রঞ্জু আতিক, এবং মঈন … তোমরা কোথায়? মঞ্চে চলে এসো…। বিজ্ঞান স্যার আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন তিনজনকে। মস্ত বড় চ্যাম্পিয়ন এর প্রতীকটা তুলে ধরলো ওরা তিনজন। উল্লাসে ফেটে পড়লো সারা স্কুল। হেড স্যার বললেন, তোমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছো আমরা গর্বিত। আমি দোয়া করি, এমনি করে দেশের গৌরব বাড়ানোর যোগ্য হয়ে ওঠো।
গলায় সোনার মেডেল ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরলো ছেলেরা। প্রজেক্টটা আপাতত স্কুলে একটা মস্ত কাচের বাক্সে রাখা হচ্ছে। চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফিটা ওরা তিনজন এক সপ্তাহ করে নিজেদের কাছে রাখবে, তারপর স্কুলে জমা দেবে। আব্বুর হাত ধরে বাসায় ফিরলো ওরা।
বিদায় নেয়ার আগে কোলাকুলি করে হাত নাড়লো এক অন্যকে। মোবাইলে খবর পেয়ে সব বাড়িতেই মিষ্টির ধুম পড়ে গেছে।
আজও দরজায় থমকে দাঁড়ালো রঞ্জু আর তার বাবা। বড় দরজাটা হাট করে খোলা। দরজার মুখেই দাঁড়িয়ে আছেন রঞ্জুর দাদা, দাদী, আর মা। পেছনে উঁকি দিচ্ছে বুয়া।
বসার ঘরে গিয়ে বসতেই দাদী আসেন এগিয়ে। নাতিটাকে বুকের মধ্যে টেনে নেন- তুই নাকি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিস?
- হবে না? কার নাতি, সেটা তো দেখতে হবে। দাদা মন্তব্য করলেন।
আবার ঝগড়া? হেসে ফেলেন রঞ্জুর মা। তারপর এগিয়ে গিয়ে ছোটো টেবিলটার ওপরে রাখা ছবিটার ওপর থেকে ঢাকনা সরিয়ে দিলো রঞ্জুর আম্মা।
- আরে! বিস্ময়ে, আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলেন ইলিয়াস,
- এ ছবি এতদিন কোথায় ছিলো আম্মা? আমি কত খুঁজেছি।
- আমার কাছে ছিলোরে। দাদী ধরা গলায় বলেন।
- আজকের দিনের মতো একটা দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। আয় রঞ্জু আমার কাছে আয়।
মস্ত বড় ফ্রেমে বাঁধানো। একটা ছবির দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে দেখে রঞ্জু। ঠিক তার মতো একটা ছেলে, তার বড় ভাইয়ের হাত ধরে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দু’হাতে ধরা আছে একটা বড় সড় ফুটবল। ইলিয়াস ছেলের দিকে তাকান। তার চোখ ভেঙে পানি আসে। মনে মনে বলেন,
- ভাইয়া, আমি তোমাদের কথা মতোই সবার দিকে লক্ষ্য রেখেছি। আজ তোমাকে পেয়েছি, এতেই আমার আনন্দ।
রঞ্জু … এদিকে আয়। এই দ্যাখ, এই তোর বড় চাচা টুলু। আজকে খুশির দিনে আমাদের কাছে ফিরে এসেছে। ছবিটার হাসি হাসি চোখের সামনে ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন ইলিয়াস। না ইলয়াস নয়। সেই ছেলেবেলার বিলু, সে বলতে চায় ভাইয়া, আমি তোমার কোন কিছু নষ্ট করিনি, সব কিছু মনে রেখেছি… রঞ্জুদের জন্য। আমাদের সবার জন্য।
============================

কিশোরকন্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ জুবাইদা গুলশান আরা

কিশোর উপন্যাস- জোলা পালোয়ান by আতা সরকার

জোলার নাম বশির। কাজের কাজ কিছুই করে না। শুয়ে বসে গড়িয়ে দিন কাটায়। আর যত বাহাদুরি দেখায় জোলানী বৌ ছমিরনের ওপর। ওদের কোন ছেলেমেয়ে নেই। তাই বশিরের আয়-রোজগারের ধান্দাও কম।

তার পরও তো দু’জনের পেটের খোরাক জোগাড় করতে হয়। তাই জোলা কালে-ভদ্রে কখনো কখনো কাজ কর্মে যায়। কাজের মধ্যে কাজ হলো মাছ ধরার জাল হাটে হাটে বিক্রি করা। জালটা অবশ্য জোলা বোনে না। জাল বোনার কাজ ছমিরনকেই করতে হয়। ডাল ভাত রান্না, ঘর-গেরস্থালির কাজ কোন কিছুই বাদ নেই।
বশিরের মেজাজ খুবই কড়া। এর এদিকে-ওদিকে হলে ছমিরনের কপালে জোটে পিটুনি। ছমিরন জাল বোনে। রাতে সে জাল কেটে দিয়ে যায় ইঁদুর। এ দোষটাও যেন ছমিরনের। বশিরের হাতে তাকে নাজেহাল হতে হয়!
ইঁদুরের ওৎপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। বশির এজন্য ছমিরনকে পেটালেও সে মনে মনে চটে থাকে ইঁদুরের ওপরই। এক রাতে সে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে জালের পাশে। চুপচাপ। অন্ধকারে তার চোখ জ্বলজ্বল করে। কান দুটো খাড়া, ইঁদুরের শব্দ শোনার আশায়।
রাত দুপুরে আওয়াজ শোনা যায় কিচকিচ। একটু পরেই কুচুর কুচুর। মানে ইঁদুর তার ছোট ছোট তীক্ষè দাঁত দিয়ে জাল কাটা শুরু করেছে। শব্দ লক্ষ্য করে বর্শা উঁচিয়ে পা পা এগিয়ে আসে বশির। বর্শা দিয়ে অনুমানে ঠেসে ধরে ঈঁদুরকে। প্রবল কিচকিচ আওয়াজ ওঠে। এরপর সব নীরব। বশির ম্যাচবাতি ঠুকে কুপি জ্বালাল। কাঁপা কাঁপা আলোয় দেখতে পেল, বর্শায় ফলায় রক্তাক্ত দেহে মরে আছে একটা ইঁদুর। মরা ইঁদুর দেখেই বশিরের বুক গর্বে ফুলে উঠল। ঘরের ভেতরেই সে উঁচিয়ে ধরল বর্শা। প্রচণ্ড শব্দে হুঙ্কার দিয়ে উঠল।

ছমিরন ঘুমিয়ে ছিল। বশিরের হুঙ্কারে সে ধড়ফড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল। অবাক হয়ে সে তাকাল বশিরের দিকে। ঠিক কী ঘটেছে, সে বুঝতে পারছে না।
বশির বুকে চাপড় দিয়ে বলল : এখানে এসে দেখ, আমি কী কাণ্ড করেছি। অন্ধকারের মধ্যে এক কোপে ইঁদুর মেরেছি। হাঃ হোঃ হাঃ। আমি আজ বীর পালোয়ান হয়ে গিয়েছি। তোকে বলে রাখলাম, আজ থেকে আমি আর তোর বোনা জাল হাট-বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাব না। আমি পালোয়ান, পালোয়ানগিরিই করব।

এরপর সে এক গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমুতে গেল। পরের দিন ভোর সকালেই সে উঠে পড়ল। ছমিরনকে তাগাদা দিয়ে বলল, এখনি তাড়াতাড়ি ভাত রেঁধে দাও। ভাত খেয়েই হাটে যাব। ছমিরন বলল, আজ হাটে কেন? আজ তো জাল বুনি নাই। একটা জাল ছিল। তাও তো কাল রাতে ঈঁদুর খানিকটা কেটেছে। বশির গর্বের সাথে বলল : ঐ ইঁদুরটাকে তো আমিই মেরেছি। ছমিরন ঠোঁট বাঁকা করে বলল : হ্যাঁ ইঁদুর মেরেছ। তাই বলে ইঁদুর খাওয়া জাল তো জোড়া লাগেনি।

বশির বলল : তোর জালের কারবার কে করছে? ঐ জোলাগিরিতে আমি নাই। আমি পালোয়ানগিরি করে রোজগার করব। ছমিরন গজ গজ করতে করতে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। বশির খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে কাঁধে তুলে নিল বর্শা। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাটে চলে এল। হাটে যার সাথেই দেখা হয়, সেই তার বর্শার দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে কিগো বশির, ব্যাপারটা কী? বর্শা দিয়ে কী হবে?

এ ধরনের প্রশ্নের জন্যই অপেক্ষা করছিল বশির। বুক ফুলিয়ে গর্বের সাথে জবাব দেয়, সে কথা আপনারা বুঝি শোনেননি? এখনো তাহলে খবরটা পান নাই?
লোকজনের কৌতূহল বাড়ে, কী খবর?

বশির বলে আর বলবেন না। কাল রাতে এই বর্শা দিয়ে একটা ইঁদুর একেবারে গেঁথে ফেলেছি। তাও আবার অন্ধকারের মধ্যে। এখন দেখতে পাচ্ছি আমার হাত খুব পাকা। নিশানাও খুব ভাল। সে জন্য ঠিক করেছি। এখন থেকে পালোয়ানগিরি করতে যাব, জাল বিক্রি-বাটার কাজ আর করব না।

বর্শা কাঁধে নিয়ে বশির পুরো হাট কয়েক বার চক্কর দেয় আর লোকদেরকে তার ইঁদুর বধের কাহিনী জানায়। হাটশুদ্ধো লোকজন তার কীর্তিকথা শুনে আর কাণ্ড কারখানা দেখে হাসাহাসি করে।

হাট ভেঙে যাওয়ার পর সবার শেষে যে লোকটি হাট থেকে বেরিয়ে আসে, সে হলো বশির। বর্শা কাঁধে সে ঘরে ফিরে আসে।
পরদিন ঘুম থেকে উঠেই সে ছমিরনকে হুকুম করে : শিগগির ভাত রান্না কর। আমি খেয়ে দেয়ে বেরুব। আজ যাব বিদেশে। চাকরি-বাকরি খুঁজব। তোর অই জোলাগিরির কাজ নয়। এবার চাকরি করব পালোয়ানের। আমার নাম বশির পালোয়ান। দেশে দেশে আমার নাম ঘুরবে-ফিরবে।

ছমিরন মুখ ভেঙ্চে বলল : হ্যাঁ, খুব নাম-ইঁদুর মারা পালোয়ান। ছমিরনের টিপ্পনি সে গায়েই মাখল না। বলল, অনেক দূরে যাব। রাস্তায় ক্ষুধা লাগতে পারে। চাল ভেজে কয়েকটা লাড়– বানিয়ে দিবি। রাস্তায় ঐ লাড়– খেয়ে থাকব।

ছমিরন মুখ ঝামটা দিয়ে বলল : রাস্তায় এমন কোন ইয়ার দোস্ত জুটবে না যে ইঁদুর-মারা পালোয়ানকে খাওয়াতে পারে!
ক্ষেপে গেল বশির। রাগত কণ্ঠে বলল, আমার রাগ তুলিস না, তাহলে বিদেশ যাওয়ার বেলাতেও তোকে পিটিয়ে যাব। আমি যা বললাম, তাই কর।

ছমিরনেরও মেজাজ খারাপ। বশিরের হাতে হরদম মার খেয়ে খেয়ে সে এমনতেই তিরিক্ষি হয়ে আছে। তার ওপর বশিরের হুমকিতে তার আরো রাগ হলো। যতই রাগ হোক, তার পরও সে রান্নাঘরে ঢুকল। বশিরের জন্য ভাত-তরিকারি রাঁধল। তারপর খোলা কড়াইয়ে চাল ভাজতে বসল। চাল ভাজতে ভাজতেই তার মাথায় শয়তানি বুদ্ধিটা খেলে। সে মনে মনে ভাবে : জীবনে স্বামীর সোহাগ কাকে বলে কিছুই বুঝলাম না। ওটা মরলেই কী আর থাকলেই কী! এই তো এখন যাচ্ছে বিদেশে। কবে ফিরবে, আর ফিরবেই কী না, তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। বিদেশে বিভূঁইয়ে আরেকটা বিয়ে করবে কি না তাই বা কে বলতে পারে। এখানে আমি কিভাবে থাকব তার কোন চিন্তা ওর মাথায় নেই। ওটা মরলেই আমি বাঁচতাম। এটা ভাবতে ভাবতেই তার মনে পড়ল, বশিরের অকারণে অসহ্য পেটানোর কথা। সঙ্গে সঙ্গে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। লাড়– বানাতে বানাতে তার সাথে বিষ মিশিয়ে দিল।

পরদিন খুব ভোরে বশির ঘুম থেকে জেগে ওঠে। অত সকালেই গোসল-টোসল সেরে নেয়। ধোপ দুরস্ত কাপড় পরে মাথায় বাঁধে পাগড়ি। ছমিরন তখন রান্নাঘরে ভাত-তরকারি গরম করছে। এর পরও অকারণে ধমকে উঠল বশির, তাড়াতাড়ি করতে পারিস না। আমি যাব অনেক দূর। পালোয়ানগিরি কি যে- সে ব্যাপার নাকি!
ছমিরনও মুখ ঝামটা দিয়ে বলল : ভাত-তরকারি সব রান্না হয়ে আছে। খেয়ে দেয়ে বিদায় হও।
বশির ধমকের সুরে বলল : রাস্তায় খাওয়ার জন্য আমার লাড়– কোথায়? সেটা তো এখনো বানাসনি।

ছমিরন বলল : সব বানিয়ে তোমার ঐ গামছার পোঁটলায় বেঁধে রেখেছি। রাস্তায় প্রাণ ভরে খেয়ো। খেয়ো কিন্তু আর ঘরমুখো হয়ো না। বশির বলল, এই বেরুচ্ছি। ঘরে যখন ফিরব, তখন তোর এই কথার জবাব দেব। পিঠটা শক্ত করে রাখিস। কয়টা লাঠি যে তোর পিঠে ভাঙব, তার হিসাব নেই।
ছমিরন মনে মনে বলল, আগে ফিরে আসই না।

বশির তড়িঘড়ি করে খাবার খেয়ে নিল। খাওয়া-দাওয়ার পর সে এক কাঁধে লাড়– বাঁধা গামছা ঝুলিয়ে নিল। আরেক কাঁধে তুলে নিল বর্শা। সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়। যাত্রা শুরু করল অজানা পথ ধরে। যেতে যেতে অনেক পথ পাড়ি দিল। কত মাঠ পেরুল। কত ঘাট ডিঙ্গাল। কত পথ পেছনে ফেলে এল।

এক অজানা গাঁয়ের রাস্তা ধরে হাঁটছিল বশির। এ সময়ই তার সামনে দিয়ে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে ছুটে গেল একটা গোসাপ। দেখেই থমকে দাঁড়াল বশির। তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। বর্শা ধরা হাতটাও করে উঠল নিশপিশ। গোসাপটা যেদিকে ছুটে গেল, সেদিকে সে পা বাড়াল। তার শিকারের নেশা পেয়েছে। সে কাঁধ থেকে বর্শা নামিয়ে বাগিয়ে ধরেছে। শিকারির মত পা ফেলে ফেলে রাস্তা পেরুলো গোসাপের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। গোসাপটিও তখন শিকার ধরার আশায় থমকে দাঁড়িয়েছে। তার সামনে একটা ফড়িং উড়ছেÑ তার লক্ষ্য সেদিকে। এ সময়ই সে টের পায় তার পেছন থেকে একজন লোক সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে তাকেই শিকার করবে বলে। সে ফড়িং ধরার আশা ছাড়ান দেয়। সে দ্রুত বেগে ছুটতে থাকে সামনের মাঠের দিকে। তার পিছু পিছু বর্শা হাতে ছুটতে থাকে বশিরও। গোসাপ উপায় না দেখে মাঠের ভেতর একটা গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এতেও রক্ষা নেই। গর্তের পাশে এসে বশির দাঁড়াল। বর্শা দিয়ে গর্তের চারপাশে খুঁড়তে লাগল। গর্তের ফাঁকে গোসাপের পিঠ দেখা যাচ্ছে। কালবিলম্ব না করে বশির গোসাপের পিঠ লক্ষ করে বর্শা চালায়। ।

বর্শাটি যখন গর্ত থেকে টেনে বের করে। তখন দেখা যায় বর্শার আগায় গোসাপ গেঁথে রয়েছে। বর্শার ডগায় গোসাপটিকে দেখতে পেয়ে বশিরে বুক গর্বে ফুলে গেল। আরো একটি শিকার হলো তার। পালোয়ানগিরির ব্যবস্থা এবার নিশ্চয়ই পাকা পোক্ত হবে। বর্শাবিদ্ধ গোসাপ কাঁধে নিয়ে শিকার সে পথ হাঁটতে শুরু করল। এ অবস্থায় তাকে দেখতে পেয়ে লোকজন হাসাহাসি করে।

রাস্তার মধ্যে কেউ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি গোসাপের চামড়ার ব্যবসা করেন নাকি? বশির অবাক হয়ে জবাব দিল : গোসাপের চামড়ার ব্যবসা করব কেন? আমি হলাম একজান বীর পালোয়ান। জীব-জন্তু শিকার করে বেড়াই। আপনারা সবাই বশির পালোয়ানের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। আমিই হলাম সেই বশির পালোয়ান।

লোকজন অবাক হয়ে বলে, বশির পালোয়ানে নামে কোন পালোয়ান আছে নাকি? কই, কোনদিন তো এমন নাম শুনি নাই!

বশির বুক ফুলিয়ে বলল: না শুনে থাকলে এখন শুনবেন। শিকারে আমার হাত কী রকম তা তো আপনারা নিজেদের চোখেই দেখতে পারলেন। কাল রাতেও এই বর্শার এক কোপে একটা ইঁদুর শিকার করেছিলাম, তাও আবার অন্ধকার রাতে। বশিরের কথা শুনে লোকজন মজা পায়। তাদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে। তারা বশিরকে লক্ষ্য করে টিটকারি দেয়। এরপর চলে যায়। কোন কিছুতেই ঘাবড়ায় না বশির। সে হাঁটতে থাকে একই ভঙ্গিতে। পরপর দুটো শিকার করেছে সে। গর্বে তার বুক টগবগ করতে থাকে। কাঁধের ওপর বর্শা। বুক টান করে সে পথ হাঁটতে থাকে।

তখন চৈত্র মাস। খা খা রোদ। হাঁটতে হাঁটতে ঘেমে-নেয়ে ওঠে বশির। পানির তেষ্টাও পায় ভীষণ। আর এদিকে পেট জুড়ে চনমনিয়ে ওঠে ক্ষুধা। এ সময়ই সে দেখতে পায় রাস্তার পাশে একটা বিশাল পুকুর। পুকুরের পাড়ে ইয়া বড় একটা বটগাছ। সে এসে বটগাছের ছায়ায় বসে। গাছের ছায়া ও বাতাসে তার শরীরটা জুড়িয়ে যায়। ওখানেই বসে বসে বিশ্রাম নেয় অনেকক্ষণ। ঠাণ্ডা বাতাসে এক সময় চোখ জুড়ে ঘুমই নামে।

ঘুম ভাঙলে ক্ষুধাটা আবার টের পায়। মনে মনে ভাবল, এবার বৌয়ের বানানো লাড়– খাওয়া যাবে। সে গামছার পোঁটলাটা খুলে লাড়– বের করে। গামছার ওপর রেখেই সে পুকুরে হাতমুখ ধুতে যায়। গায়ে গতরে একটু পানি লাগিয়ে শরীরটাকে আরো ঠাণ্ডা করে তারপর লাড়– খাবে, এই তার ইচ্ছা।
পুকুরের শান বাঁধানো ঘাট। দেখলেই দেহ মন জুড়িয়ে যায়। সে ঘাটের হাঁটু পানিতে নেমে এল।

এদিকে একটা হাতিও ওই বটগাছের নিচে এসে হাজির। কার হাতি, কোত্থেকে এসেছে কে জানে! বটগাছের নিচে এটা ওটা শুঁকতে শুঁকতে তার শুঁড় গিয়ে পড়ল লাড়–র ওপর। কোন এক আকর্ষণে সে সব ক’টা লাড়– পটাপট মুখে চালান করে দিল। তারপর থেকেই হাতি স্থির। নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল।

বশির প্রাণ ভরে হাত মুখ ধুয়ে পুকুরের পাড় থেকে উঠে এল। বটগাচের নিচে বসে সে লাড়– খাবে। তারপর যাবে নতুন কোন শিকারে। গুনগুনিয়ে সে গান ভাজতে লাগল।
পুকুরপাড়ে বটগাছের তলায় এসেই তার চোখে চড়কগাছ। ঠিক সে যেখানে শুয়েছিল। সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা হাতি। তা হাতি দাঁড়িয়ে থাক, এর ব্যবস্থা পড়ে হবে। কিন্তু গাছের গোড়ায় গামছার ওপর সে যে লাড়–গুলো রেখেছিল, তার একটিও নেই। নিশ্চয়ই সব গিয়েছে হাতির পেটে।

বশিরের খুব রাগ হলো। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। এত রাগ যে তার কোন হুঁশ-জ্ঞান রইল না। সে হাতিকে ভীষণ জোরে একটা ঘুষি মারল। হাতি দাঁড়িয়ে রইল তেমনি। নড়েও না চড়েও না। এতে বশিরের রাগ আরো বেড়ে গেল। তখন সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে হাতিকে সজোরে ধাক্কা মারল। এবার কাজ হলো। হাতি ধাক্কা খেয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে গেল। এ সময় বশিরের খেয়াল হলো : আরে! হাতিটা মরেই গেল নাকি! কার না কার হাতি, মরেই গেল!

বশির খুব খেয়াল করে দেখল, হাতিটা সত্যি সত্যি মরে গিয়েছে। সে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, আরে। এটা কী কাণ্ড! আমার হাতের এক ঠেলাতেই একটা আস্ত হাতি মরে যেতে পারে!

পুকুরটা ছিল রাজার। পুকুরের কাছেই রাজার বাড়ি। রাজা রাজবাড়ি থেকে লক্ষ্য করছিলেন পুকুর পাড়ের কাণ্ড কারখানা। তিনি সব ঘটনা দেখে তলব করলেন কোতোয়ালকে।

কোতোয়াল এলে রাজা বললেন : পুকুর পাড়ে বটগাছের নিচে খেয়াল কর। এখনি ওখানে যাবে। দেখে আসবে, ব্যাপারটা কী ঘটেছে। আমি লক্ষ্য করলাম, ঐ লোকটা আমার হাতিটাকে একটা ধাক্কা দিল। অমনি হাতি কাত হয়ে পড়ে গেল। মরেই গিয়েছে বোধ হয়। আমার মনে হয়। লোকটা নিশ্চয়ই একজন বীর পুরুষ হবে। তুমি গিয়ে দেখ, ব্যাপারটা কী?

কোতোয়াল তার দলবল নিয়ে অমনি চলে এল পুকুরপাড়ে বটগাছের তলায়। সেখানে বসে আছে একটা লোক। তার হাতে বর্শা! আর রাজার হাতিটা এক পাশে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাস চলে না মরেই গিয়েছে।

কোতোয়াল বশিরকে বলল: তোমার এত সাহস! তুমি রাজার হাতি মেরেছ। এখন বুঝবে মজা। তুমি কত বড় বীর হয়েছ, দেখা যাবে। চল রাজার কাছে।

বশির ভয় পেল না একটুও। বলল, আমি বীর হয়েছি না তো কী হয়েছি, সে কথা তো কাউকে বলতে যাইনি। ঠিক আছে, চলুন রাজার কাছে। আমার যে সর্বনাশ করেছে, এর বিচার আমি তার কাছেই চাইব।

কোতোয়াল আর তার দলবল বশিরকে ধরে রাজার কাছে নিয়ে এল।
কোতোয়াল পুকুর পাড়ের বটগাছ তলার ঘটনা জানিয়ে বলল : মহারাজ, হাতিটা মরেই গিয়েছে। এই লোকটাই হাতিটাকে মেরেছে।

রাজা বশিরকে বললেন: এ বিষয়ে তোমার কি কিছু বলার আছে? বশির মনে মনে একটু ভয়ই পেল। তবুও সাহস ধরে রেখে বলল : মহারাজ, ওটা যদি আপনার হাতি হয়, তাহলে আপনার কাছেই নালিশ জানাই। আপনার হাতি আমার সর্বনাশ করেছে। আমার বহু টাকার মাল ছিল। বটগাছের গোড়ায় রেখে আমি যখন পুকুরে নেমে হাত-মুখ ধুচ্ছিলাম, তখন আপনার ঐ হাতিটাই আমার সব মাল খেয়ে ফেলেছে। আমি পালোয়ান মানুষ। আমার এত টাকার এতগুলো মাল খেয়ে ফেলায় আমার খুব রাগ হয়েছিল। এ জন্যই আমি হাতিটাকে আর কিছু করি নাই। কেবল মাত্র একটা ঠ্যালা মেরেছি। এটা কি কেউ কখনো ভাবতে পেরেছে। মানুষের এক ঠ্যালাতেই একটা হাতি মরে যেতে পারে। সে যে এভাবে পড়ে মরেই যাবে, তা আমিও ভাবতে পারি নাই।

রাজা বললেন : আমার হাতি তোমার জিনিসপত্র যা কিছু খেয়েছে, তা আমি পাব কোথায়? তুমিও আমার লাখ টাকা লাখ টাকা দামের হাতি মেরে ফেলেছ। আমি সেটারও বিচার করতে চাই না। আমি তোমাকে হাতি মারার অপরাধ থেকে মুক্তি দিলাম। এর বিচার আমি আর করলাম না। আমার মনে হয় তুমি একজন বীর পালোয়ান। তুমি যদি আমার এখানে চাকরি করতে রাজি হও তাহলে পঞ্চাশ টাকা মাস-মাইনেতে আমি তোমাকে রাখতে পারি। বশির মহাখুশি। সে একবাক্যে রাজি। রাজবাড়িতে তার চাকরি হয়ে গেল।

বশির পালোয়ানের স্থান হয় রাজদরবারে। রাজা তাকে পালোয়ানের পোশাক বানিয়ে দিলেন।

বশিরের পদমর্যাদা হলো পালোয়ানের। পঞ্চম টাকা তার মাস-মাইনে। পুরো রাজ্যে একজনই পালোয়ান। পালোয়ান বটে, তবে তার কোন কাজ কর্ম নেই। সে রাজপ্রাসাদেই খায়-দায়। দুপুরে রাতে নাক ডেকে ঘুমায়। আর সকালে কিংবা বিকেলে প্রতিদিনের যে কোন এক বেলায় পালোয়ানি পোশাক গায়ে দিয়ে বাজারটা ঘুরে আসে। তখন তার কাঁধে থাকে ইঁদুর মারা গোসাপ-মারা বর্শাটা। রাজ্যজুড়ে প্রায় প্রতিটি লোক বশিরের মুখ থেকে শুনেছে অন্ধকার রাতে তার ইঁদুর মারার কথা। খোলা মাঠের গর্তে লুকানো গোসাপ হত্যার কথা আর সর্বশেষ রাজার পুকুর পাড়ে বটগাছের তলায় রাজহাতি বধের কথা Ñ মাত্র এক ধাক্কায় হাতির মৃত্যু। হাতি বধের কাহিনী কেউ বিশ্বাস করেছে। কেউ করেনি। কেউ কেউ টিপ্পনি কেটে বলে, জোলার হাস্যকর কাণ্ডকারখানা দেখে হাতি হার্টফেল করেছে। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক রাজবাড়িতে তার পালোয়ান হিসেবে চাকরিটা তো হয়েছে। এখন চান্স পেয়ে বেতনটা বাড়িয়ে নিতে পারলেই হয়। সুযোগ এসেই গেল। বশির সেদিন পালোয়ানের পোশাক পরে রাজদরবারে বসেছিল। রাজা বিচারকার্য করছিলেন। এ সময় একদল প্রজা রাজার সাথে দেখা করতে চাইল, তাদের নাকি সমূহ বিপদ। খুব কান্না-কাটি করছে। রাজা আবার কান্নাকাটি একদম সহ্য করতে পারেন না। তার মনটা তুলোর মত নরম।

রাজার অনুমতি পেয়ে প্রজাদের একটা দল দরবারে ঢুকল। তারা এসেই রাজার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রাজা যতই বলেন, ছাড় ছাড়, পা দুটো ছাড়Ñ ওরা ততই পা জড়িয়ে ধরে। রাজা আদরমাখা ধমকের স্বরে বললেন: হয়েছেটা কী? না বললে বুঝব কেমন করে? সমস্যা থাকলে মিটাবই বা কিভাবে।
প্রজারা সমস্বরে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল: রাক্ষসরা আমাদের গ্রামের মানুষ খেয়েছে।

ওদেরকে অনেক জেরা করে জানা গেল, রাজার রাজ্যে নতুন এক রাক্ষসের উৎপাত শুরু হয়েছে। সে আজ এ গ্রামে রয়েছে তো কাল ঐ গ্রামে হানা দিয়েছে। এভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষ মারছে। মানুষ ধরে ধরে খাচ্ছেও। এখনও কোন শহরে বা রাজধানীতে সে হানা দেয়নি। এ জন্যই খবরটা রাজা- অমাত্যদের কারো কর্ণগোচর হয়নি। রাক্ষসের জ্বালাতনের খবর কেউ বিশ্বাস করল, অনেকেই করল না। রাজা বিশ্বাস করবেন কি করবেন না। তাও বুঝে উঠতে পারলেন না। এ সময়ই দরবারে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল রানীর খাস বাঁদী, হাঁফাতে হাঁফাতে বলল: এই মাত্র রাজপ্রাসাদে একটা রাক্ষস ঢুকেছিলÑ খোদ রানীমহলে। দু’জন পাহারাদারকে মেরে ঢুকেছে সে। সরাসরি রানীর ঘরে হানা দিয়েছে। রানীর গায়েই হাত দিতে ধরেছিল। রানীর হাতে ছুরি দেখে রানীর এক বাঁদীকে ধরে নিয়ে গিয়েছে।

খবররটা শুনেই রাজা ও দরবারের সবাই নড়েচড়ে বসলেন। রাজা দরবারের পাহারা জোরদার করতে বললেন।

খানিক বাদেই রাজধানীর আশপাশ শহর থেকেও গণ্যমান্য প্রতিনিধিদল এল হুড়মুড়িয়ে। তাদেরও এক কথা, কোথা থেকে এক রাক্ষস এসে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
সবার কাছ থেকে বিবরণ শুনে মনে হয়, রাক্ষস একটাই। তবে বাতাসের চাইতেও দ্রুত তার গতি। সে লহমায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতে পারে। প্রচণ্ড তার ক্ষুধা। দিনে তিন-চারটে মানুষ, এক-দুটো গরু-ছাগল না হলে তার ক্ষিধে মেটে না।

দরবারে হুলস্থুল পড়ে গেল। রাজার কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি সমস্যার সমাধানের জন্য চারজন বিশ্বস্ত দরবারিকে নিয়ে গোপন সভা করলেন। কিন্তু এ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন পথ দেখাতে পারল না। রাক্ষসকে দমন করার জন্য কোতোয়ালকে নির্দেশ দিতে সে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। যেন তার একশ দশ ডিগ্রি ম্যালেরিয়া জ্বর হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত রাজা অনেক ভাবনা-চিন্তার পর ঘোষণা দিলেন : রাক্ষসকে যে বধ করতে পারবে তাকে রাজকন্যার সাথে বিয়ে দেব আর আমার রাজ্যের অর্ধেক লিখে দেব।
দরবারে গুঞ্জরণ শুরু হলো। কিন্তু সাহস করে কেউ এগিয়ে এল না। সবার মুখে এক কথা: রাক্ষসের হাতে জানটাই যদি যায়। রাজন্যাকে বিয়ে করে কী হবে। আর কিই বা হবে অর্ধেক রাজ্য দিয়ে। রাজদরবারের ভাব-গতিক দেখে রাজা যখন হতাশ হয়ে পড়ছেন, তখনি উঠে দাঁড়াল বশির জোলা। পালোয়ানের মত বুক ফুলিয়ে বলল: মহারাজ, আমাকে হুকুম দিল আমি চেষ্টা করে দেখতাম রাক্ষসটাকে মারা যায় কি না।

রাজা বললেন: তুমি চেষ্টা করলে ভালোই হয়। আমি যে প্রতিজ্ঞা করেছি, হ্যাঁ, তা ঠিকই থাকবেÑ রাক্ষস যে মারতে পারবে তার সাথে আমার মেয়ে রাজকন্যাকে বিয়ে দেব আর রাজ্যের অর্ধেক লিখে দেব।

বশির মনে মনে ভাবল : এটা একটা মস্ত বড় সুযোগ। রাক্ষসটাকে মারতে পারলে রাজকন্যাকে বিয়ে করতে পারব আবার অর্ধেক রাজত্বও পেয়ে যাব। একবার চেষ্টা করে দেখলে মন্দ হয় না। হাতিটা যেভাবে মরেছে। আল্লাহই ভালো জানেন কিভাবে মরেছে, রাক্ষসটাও ঐভাবে মরে গেলে কাজ হবে।

বশিরের সাহস দেখে কেউ কেউ বাহবা দিল, কেউ কেউ তাকে আহমক বলল। অনেকেই বাঁকা ঠোঁটে হাসল।

রাজবাড়ির কাছেই রাস্তার এক পাশে বিশাল বকুল ফুলের গাছ। বশির এক সন্ধ্যায় বকুল গাছের আগায় উঠে একটা ডালের সাথে নিজেকে শক্ত করে বাঁধল। এক হাতে তার অতি প্রিয় বর্শাটা ধরে বসে রইল।

অনেক রাত। চারদিকে নিঝুম। বশির পালোয়ানের চোখে ঘুম আসতে থাকে। চোখ টেনে ধরেও সে ঘুম আটকাতে পারে না। ঠিক এ সময়ই সে থপ থপ আওয়াজ পায়। যেন একটা পাহাড় এগিয়ে আসছে। তার ঘুম ছুটে যায়। উত্তেজনায় ভয়ে সে অপেক্ষা করতে থাকে।

একটা বিশাল ছায়া এসে দাঁড়ায় বকুল গাছের তলায়। বশির ভালো মত তাকিয়ে বুঝতে পারে, এটাই রাক্ষস। রাক্ষসটা মানুষের গন্ধ পাচ্ছে। সে চারদিকে তাকিয়ে মানুষ খোঁজে। উপরের দিকে তাকাতেই সে বশিরকে দেখতে পয়। লোভে তার মুখ হা হয়ে যায়। লালা পড়তে থাকে। হাত বাড়ায়। মানুষটার নাগাল পায় না সে। গাছের ওঠার চেষ্টা করে। গাছেও উঠতে পারে না। কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তখন মুখ হা করে সে আস্ত গাছ ধরে ঝাঁকাতে শুরু করে যেন ঝড় উঠেছে, এমন প্রবল বেগে বুকুল গাছ নড়তে শুরু করে। বিপদ গনে বশির। এমন ঝাঁকুনিতে বাঁধন খুলে তার নিচে পড়ার ভয় পেয়ে বসে। আর নিচে পড়লে রাক্ষুসের হা-করা মুখের মধ্য দিয়ে একেবারে পেটে চালান হয়ে যাবে।

ভয়ে বশিরের হাত-পা পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। সে এমন কাঁপন কাঁপতে থাকে যে এর চোটে হাতে ধরা বর্শাটা হাত থেকে ফসকে যায়। সেটা শাঁ শাঁ করে নিচে ছুটে আসে। আর পড়বি তো পড় সরাসরি রাক্ষসের মুখে, গলা বেয়ে চালান হয়ে যায় পেটের ভেতর। সেখানে নাড়ি ভুঁড়িতে গিয়ে বর্শাটা বিঁধে।

রাক্ষসের গাছ ছেড়ে দিয়ে নিজের পেট ধরে। মরণ চিৎকারে চারপাশ কাঁপিয়ে তোলে। মুখে উঠে আসে রক্ত। অতবড় শরীরটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। এমন শব্দ হয় যেন ভূমিকম্পে সব ভেঙে পড়ছে। সে হাত-পা তড়পাতে থাকে। তারপর এক সময় স্থির হয়ে যায়।

রাক্ষসের আর কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে বশিরের কাঁপুনি থামে। এদিকে রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটছে। বশির নিজের বাঁধন খুলে গাছ থেকে ধীরে ধীর নেমে আসে। রাক্ষসের গায়ে ধাক্কা দিয়ে টের পায় ওটা মরে গিয়েছে। এবার বশির সাহস ফিরে পায়। বুক টান করে সে বজ্রনিনাদ কণ্ঠে হায়দরি হাঁক হাঁকে : খবরদার! হুঁশিয়ার!
তার বজ্রনির্ঘোষ চিৎকারে রাজবাড়ি ও আশপাশের শহরের ঘরে ঘরে মানুষের ঘুম ভাঙ্গে। সবাই হইচই করতে করতে ছুটে আসে বুকল তলায়।

সবাই দেখে, রাক্ষস গাছের তলায় মরে পড়ে আছে, তার চারপাশে বশির পালোয়ান লাফাচ্ছে তার হাঁক দিচ্ছে। হাঁক ছাড়া আর কোন কথা নেই।

খবর শুনে রাজাও তার পাত্র-মিত্রদের নিয়ে ছুটে এলেন। রাক্ষসকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি বেজায় খুশি। রাজ্যের ওপর থেকে একটা বিপদ কেটে গেল। ভাগ্যিস তিনি তাঁর দরবারে বশির পালোয়ানের মতো বীরকে স্থান দিয়েছিলেন। এদিকে লোকজন বলাবলি করছে : বশির পালোয়ানের মত বীর আমাদের রাজ্যে তো নেই-ই। এই জগতেও নেই।

তাদের কথার সাথে রাজা একমত হলেন। ঐ দিনই তিনি বশির পালোয়ানের নামে অর্ধেক রাজত্ব লিখে দিলেন। রাজকন্যার সাথে বিয়েও হলো ধুমধাম করে।
রাজার জামাই হয়ে বশির পালোয়ানের দিন কাটে আনন্দে। আবার ঐদিকে সে অর্ধেক রাজত্বেরও রাজা। এভাবে দিন যায়, মাস যায়। বছরের পর বছরও যেতে থাকে। এর মধ্যে রাজা বুড়ো হয়েছেন। তাঁর পাত্র-মিত্রদেরও বয়স বেড়েছে। সেই পুরনো সেনাপতিই রাজ্য রক্ষা করছে। কিন্তু বয়সের ভারে তারও অবস্থা সঙ্গিন। অবশ্য এতে কোন অসুবিধা ছিল না এতদিন। রাজা শান্তিপ্রিয়। প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সাথে রয়েছে তাঁর সদ্ভাব। এ জন্য সেভাবে সেনাবাহিনী গড়ে ওঠেনি। যে বাহিনী রয়েছে, তার সৈন্যরাও অনেক পুরনো। বুড়ো হয়ে পড়ছে।

এর মধ্যেই প্রতিবেশী এক দেশে নতুন রাজা হন এক ডাকাত সর্দার। তার প্রচণ্ড লোভ। আশপাশের রাজ্যগুলোতে সে হানা দিতে শুরু করল। লুটপাট করে নিজের ধন ভাণ্ডার বাড়াতে লাগল।

একদিন রাত নিঝুমে এ রাজ্যও আক্রমণ করে বসল। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। সেনাপতি এসে পড়ল রাজার পায়ে : মহারাজ, এখন কী উপায়? আমি নিজেও বুড়ো হয়ে পড়েছি, আমার সৈন্যরাও বুড়ো। কেউ যে যুদ্ধে যেতে চায় না। রাজার কপালে বহুদিন পর আবার ভাঁজ পড়ল। তিনি তাঁর পাত্র-মিত্রদের গোপন সভায় জিজ্ঞেস করলেন : এখন উপায়? বিনা যুদ্ধে রাজ্য দিয়ে দেব কি ডাকাত সর্দারের হাতে?

সেনাপতি বলল: যুদ্ধে এর মধ্যেই আমাদের বহু সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। এখন পালানো ছাড়া আমাদের আর কোন পথ নেই।

উজির ভেবে চিন্তে বলল: একবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না। মহারাজ, আপনার জামাই বশির জোলা মস্ত বড় পালোয়ান। এক ধাক্কায় সে আপনার হাতি মেরেছে। একাই এক রাক্ষসকে মেরে আমাদেরকে রক্ষা করেছে। ডাকাত সর্দারের হাত থেকে কি সে আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না?

রাজা একটু আশার আলো দেখতে পেলেন। তুবও একটু সন্দেহ রইল, জামাই তার এত বড় ঝুঁকি নেবে কি?

রাজা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত বশিরকে গিয়েই ধরলেন : বাবা, এই শেষবারের মতো তোমাকে একবার যুদ্ধে যেতে হয় যে!

বশির ডাকাত সর্দারের বাড়াবাড়ির কথা আগেই শুনেছে। এই আশঙ্কাটাই তার হচ্ছিল। সে এখন আর পালোয়ানগিরি করতে চায় না, সাহসও অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছে। সে তো এখন অর্ধেক রাজা। রাজত্ব করতেই তার কাছে ভাল লাগে। এখন যুদ্ধ করতে গিয়ে শুধু শুধুই জানটা হারাবে। কিন্তু উপায়ও নেই। বশির পালোয়ান হিসেবে তার নাম-ডাক হয়ে গিয়েছে। চারপাশে তার খ্যাতি। এ খ্যাতি রাখতে গিয়েই তাকে যুদ্ধে যাওয়ার সাহস দেখাতে হবে।

বশির মনে মনে ভাবল, যুদ্ধে গেলে আমার তো জীবন শেষ হবেই। তাহলে জীবনের শেষ খাবারটা খেয়েই যেতে হবে। আমার প্রিয় যে যে খাবার গুলো রয়েছে, সেগুলো তাহলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই খেয়ে নিতে হবে যাতে মৃত্যুকালে আমার জিহ্বার কোন আফসোস না থাকে। সে তার শ্বশুর বাবাকে বলল: মহারাজ, আপনি যখন হুকুম করেছেন, তখন আমি যুদ্ধে যাবই। তবে তার আগে আমার একটা সাধ রয়েছে। আমাকে ঘি-ভাত প্রাণ ভরে খাওয়র অনুমতি দিন।

রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন: তোমার মনের আশা পূরণ কর। রাজার হুকুমে রাজবাড়ির রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি হাঁড়ি ঘি-ভাত এল। এর সাথে এল মুখরোচক নতুন নতুন খাবার।

বশির পেট ভরে খেল। খেতে খেতে পেট ভরে গেল হয়ে গেল। ঢোলের মতো। বশির আর নড়তে চড়তে পারে না।

বশির ঐ অবস্থাতেই বলল: আমাকে একটা ঘোড়ায় তুলে শক্ত করে বেঁধে দিন, যাতে আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে না যাই।

বশিরের পরামর্শ মতো সবাই মিলে তাকে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে দিয়ে বেঁধে দিল। বশির তার হাতে একটা ছোড়া নিল। তারপর ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে নিল সামনে। শত্রু শিবিরের দিকে। ছোরার খোঁচা খেয়ে ঘোড়া তীর বেগে ছুটতে লাগ। যেন উড়ে চলছে।

এ যুদ্ধের কিছু দিন আগেই ভূূমিকম্প হয়েছিল। বশিরের ঘোড়া যে পথ ধরে ছুটছিল, তার দু’পাশে ছিল বড় বড় গাছ। ভূমিকম্পে এ গাছগুলোর গোড়া শেকড়-বাকড় নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। এখন ঘোড়ার দাপটে পথের মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছিল। আর এতে ঘোড়ার ছোটার পেছনে পেছনে গাছগুলো শেকড় উপড়ে ধপাধপ পড়ে যাচ্ছিল।
ডাকাত সর্দারের সৈন্য শিবিরে হইচই রর উঠে গেল। তারাও বশির পালোয়ানের নাম ও কীর্তি কাহিনী শুনেছিল। এখন সে নিজে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসছে। তাকে দেখার জন্য সবাই শিবির থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তারা বশির পালোয়ানকে পিঠে নিয়ে ছুটন্ত ঘোড়াকে দেখতে পেল। আর দেখতে পেল, ঘোড়ার চলার দাফটে ধাপধপ করে একেকটা বড় বড় গাছ মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। যার ঘোড়ার এত দাপট, তার দাপট না জানি কত! ডাকাত সর্দারের সৈন্যদলে আতঙ্ক তৈরি হয়। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল : আজ আমাদের নির্ঘাত মৃত্যু হবে। এই পালোয়ান এলে আজ আমরা দলে দলে মারা যাব।

ডাকাত দলের সৈন্যরা সবাই পেছনের রাস্তায় পালাতে শুরু করল। এদিকে বশিরের দম আটকে যাচ্ছিল। ঐ অবস্থাতেই সে দেখতে পেল, শত্র“পক্ষের সৈন্যরা পালাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে তার দুর্বল শরীরে শক্তি এসে গেল। সে শত্র“ শিবিরে গিয়ে যখন উপস্থিত হলো, তখন সেখানে তাকে বাধা দেয়ার জন্য কেউ উপস্থিত নেই। সে তার বাঁধন খুলে ঘোড়া থেকে নামল। কোন রকমে তাদের রাজ্যের পতাকা সেখানে পুঁতে দিন।

বিজয়ীর বেশে সে ফিরে এল। রাজা পরম সমাদরে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন: বাবা, আমি বুড়ো হয়েছি। আমার রাজত্বটাও তোমাকেই দিলাম। পুরো রাজ্যের রাজা এখন থেকে তুমিই।

যথারীতি বশির পালোয়ানের রাজা হিসেবে অভিষেক হলো। সে হলো বিশাল রাজ্যের রাজা।

একদিন সে তার রাজকন্যা স্ত্রীকে বলল: তোমার আরেকটা বোন রয়েছে। ছমিরন তার নাম। সে আমার পয়লা স্ত্রী। জীবনে অনেক কষ্ট করেছে। আমার হাতে শুধু শুধু পিটুনি খেয়েছে। সব শুনে রাজকন্যা বলল: আমার বোন দূর অজগাঁয়ে থাকবে কেন? তাকেও এখানে নিয়ে আসুন। আমরা দু’বোন এক সাথে থাকব।

বশির অনেক জিনিসপত্র, লোক লস্কর নিয়ে ছমিরনকে আনতে তার গাঁয়ে চলল।

ছমিরন তখন ঘরের ভেতর একলা-একলা ভাত রাঁধছিল। এ সময়ই তার পেছনে এসে দাঁড়াল বশির একা। তার লোকজনকে সে বাইরে রেখে এসেছে। বশিরকে দেখে ছমিরন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। আমতা আমতা করে বলল: তুমি এখনো বেঁচে আছ? মরো নাই? বশির বলল: তোকে না মেরে আমি মরব নাকি। ভিন গাঁয়ে আমি ঘর বানিয়েছি। নতুন একটা বিয়েও করেছি। এখন তোকে নিতে এসেছি।

ছমিরন প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বলল : না না, আমি এখান থেকে কোথাও যাব না। তোমার হাতে আর পিটুনি খাব না।

বশির গভীর দরদের সাথে বলল : আগে অভাব ছিল। খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট ছিল। তাই মেজাজ-মর্জি ভালো ছিল না। তোকে পিটিয়ে নিজের মনের অশান্তি মেটাতাম। এখন আমার অবস্থা ভালো। খাওয়া-পরা-থাকার কোনো চিন্তা নেই। তাই মনে সুখ। তোকে আর কখনোই পেটাব না।

বশিরের অনেক অনুরোধে অবশেষে ছমিরন তার সাথে যেতে রাজি হলো। সেজেগুজে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই সে অবাক! এত লোক-লস্কর, পাইক-বরকন্দাজ। সবাই বশিরকে দেখে কুর্নিশ করছে আর তাকে মহারাজ বলে সম্বোধন করছে। ছমিরনকেও বলছে ‘রানীমা’। ছমিরনকে নেয়ার জন্য একটা পালকিও এসেছে। সে গিয়ে উঠলো পালকিতে। আর ঘোড়ায় বশির।

বশির পালোয়ান তার বৌকে নিয়ে চলল তার নিজের রাজ্যে।

[বরিশাল ও রংপুরের লোককাহিনী অবলম্বনে]
==================================


কিশোরকন্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ আতা সরকার