Friday, October 4, 2024

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে সফররত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। এ সময় উভয় দেশের শীর্ষ নেতারা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। শুক্রবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। তার আগে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় দুই নেতা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নানাবিধ সমস্যার বিষয়ে কথা বলেন ও সেগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রফেসর ইউনূস বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে দেশটিতে বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। আমরা মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই।

অন্যদিকে টিকিট জটিলতার কারণে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা ১৮ হাজার শ্রমিককে সব সহায়তা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি বলেন, এ অঞ্চল শান্তিপূর্ণ রাখতে আসিয়ানকে আরও কার্যকর করতে চায় মালয়েশিয়া। এ সময় তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিজের আগ্রহের কথা জানান। এর আগে দুপুর ২টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান আনোয়ার ইব্রাহিম। তাকে স্বাগত জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। সেখানেই দুজনের একান্ত বৈঠক হয়। আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৫৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রয়েছে।

mzamin

বাংলাদেশিদের সুখবর দিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে ঐকমত্য হয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম।

বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দিয়েছেন সুখবর।

শুক্রবার (৪ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর বিকেলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সুখবর দেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে আমার। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এবং সর্বাত্মক সহযোগী থাকবে।’

মালোয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘মালোয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রথম পর্যায়ে ১৮ হাজার বাঙালি নেয়া হবে।’ আমার পুরনো বন্ধু এবং বাংলাদেশের পুরনো বন্ধু আসায় আমি খুবই খুশি উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারে আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর এটাই প্রথম কোনো দেশের সরকার প্রধানের বাংলাদেশ সফর। আমরা আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছি জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, যেখানে তারুণ্যের শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছি। সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। চতুর্থ ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নিয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস আরও বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয় এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন, জনশক্তি রফতানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো নিয়ে কথা বলেছি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি এবং ভিসা সহজীকরণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া আসিয়ান জোটে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে মালয়েশিয়ার সক্রিয় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড.ইউনূস। এর আগে, দুপুর ২টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান আনোয়ার ইব্রাহিম। তাকে স্বাগত জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখানেই দুজনের একান্ত বৈঠক হয়।

আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৫৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রয়েছে।

তারও আগে, বাংলাদেশের পট পরিবর্তনের পর গত ১৪ আগস্ট মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম খুব দ্রুত বাংলাদেশ সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সে সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানাতে ফোন করে এ ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

এদিকে ঢাকায় মালয়েশিয়ার হাইকমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, সর্বশেষ ২০১৩ সালের নভেম্বরে সরকারি সফরে ঢাকায় এসেছিলেন মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক।

হাস্যেজ্জলরত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস । ছবি : সংগৃহীত
হাস্যেজ্জলরত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস । ছবি : সংগৃহীত



মুসলিম বিশ্বের সবার শত্রু এক : খামেনি

মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, আমাদের আলাদা কোনো শত্রু নেই এবং পুরো মুসলিম বিশ্বের শত্রু একই। শুক্রবার (০৪ অক্টোবর) তেহরানে জুমার নামাজের খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই মন্তব্য করেন। খবর আলজাজিরার।

খামেনি বলেন, আমাদের শত্রুদের গৃহীত নীতি হলো বিভাজন ও রাষ্ট্রদ্রোহের বীজ বপন করা। মুসলমানদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করা। ফিলিস্তিনি, লেবানিজ, মিসরীয় ও ইরাকিদের শত্রু একজনই। তারা ইয়েমেন ও সিরিয়ার জনগণের শত্রুও। তারা আমাদের সবার শত্রু।

ইসরায়েলে ইরানের সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগ্রাসনকারীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিটি দেশেরই রয়েছে। মুসলিম দেশগুলোকে তাদের সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে। দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলাকেও ‘আইনত ও বৈধ’ বলে মন্তব্য করেন খামেনি।

খামেনি বলেন, ইসরায়েলকে দমনে দায়িত্ব পালনে তার দেশ বিলম্ব বা তাড়াহুড়ো করবে না। খুতবায় ফিলিস্তিনের পক্ষেও বক্তব্য দেন তিনি। খামেনি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার রয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এমন কোনো একক আদালত বা আন্তর্জাতিক সংস্থা নেই যা ফিলিস্তিনি জনগণকে কেবল তাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য দোষারোপ করতে পারে।

ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লেবাননে মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে এলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। শুক্রবার তেহরানে ইমাম খামেনি (রহ.) মুসাল্লায় জুমার নামাজের ইমামতি করেন।

প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে এ প্রথম জুমার খুতবা দিলেন খামেনি। ফিলিস্তিনের গাজায় হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের এক বছর পূর্ণ হওয়ার তিন দিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এ খুতবা দিলেন।

খামেনির খুতবা উপলক্ষে তেহরানে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। কারও কারও হাতে হিজবুল্লাহর সবুজ ও হলুদ পতাকা দেখা যায়। কেউবা ফিলিস্তিনের পতাকাও নিয়ে আসেন। এ সময় তাদের ইসরায়েলবিরোধী নানা স্লোগানও দিতে দেখা যায়। তবে সবাই খামেনিকে একনজর দেখতেই যেন বেশি উদগ্রিব ছিলেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। সবশেষ ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে জুমার নামাজে ইমামতি করেছিলেন তিনি।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ইরাকের বাগদাদে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হন। প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল ইরান। এ ঘটনার পর খামেনি জুমার নামাজে ইমামতি করেছিলেন।

বক্তব্য দিচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত
বক্তব্য দিচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত



জাতিসংঘে আমাদের ৫০ বছরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

তেমন অনেক কিছু বলা যায় না, বলা ঠিকও না। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর লন্ডন থেকে তারেক রহমান যা বলেছেন বা বলছেন দেশবাসী তাতে অনেকটাই খুশি। আমিও অভিভূত। কিন্তু তার অনুরোধ নির্দেশ আহ্বান তার দলীয় নেতাকর্মীদের উপর তেমন প্রভাব ফেলছে বলে মনে হয় না। তা না হলে হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে কেন এমন করবেন? এতদিন আওয়ামী লীগ খেয়েছে এখন আমরা খাবো। বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মীর এমন জোর জবরদস্তির কারণে আন্দোলন পরবর্তী বিএনপি’র জনপ্রিয়তা যতটা সাবলীল শক্তিশালী ছিল সেটা অনেকটা কমে গেছে। এটা জানি, সমালোচনা কারোরই ভালো লাগে না।

জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যভুক্তির ৫০ বছর উদ্‌যাপন উপলক্ষে বিশ্বখ্যাত নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘের আঙিনায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলাপ- আলোচনা এবং জাতিসংঘে ভাষণ আমার চোখে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এজন্য বিশ্বনন্দিত নাগরিক, বাংলার সম্পদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশবাসী এবং আমার, আমার দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।

স্বাধীনতার পর আমরা যখন জাতিসংঘের সদস্য হই তখন বাংলাদেশের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন সেদিন তার ভাষণ তর্জমা করে শুনাবার বা ট্রান্সলেট করার ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু এখন জাতিসংঘে যে নেতাই ভাষণ দেন না কেন বেশ কয়েকটি ভাষায় সে ভাষণটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভাষান্তরিত হয়ে থাকে। বাঙালির গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব অধ্যাপক ইউনূস যখন ‘বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে ভাষণ শুরু করেন আমি তার শেষ শব্দ পর্যন্ত হৃদয়াঙ্গম করার চেষ্টা করেছি। অনেক সময় অনেক শব্দ বলার মধ্যদিয়ে অর্থ পরিবর্তন হয়, শব্দার্থের গভীরতা বাড়ে বা কমে। যৌবনে ৫০ বছর আগে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে যত খুশি হয়েছিলাম জীবনের শেষ প্রান্তে বাংলাদেশ দলের প্রধান হিসেবে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ শুনে ততটাই খুশি হয়েছি। বলতে গেলে এই অবক্ষয়ের জামানায় তার চাইতেও হয়তো কিছুটা বেশি খুশি হয়েছি। দেশ চলবে জনগণের সম্মতিতে। কিন্তু গত ১৫-১৬ বছর শেখ হাসিনা যেভাবে নির্বাচনের নামে গণতন্ত্র হত্যা করেছেন ঐ ধরনের গণতন্ত্র দেশের মানুষ খুব একটা চায় না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকাল দুই মাসও হয়নি। এ যাবৎকাল সরকার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার কথা বলে যাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন সেখানে আমাদের অনেককে মনে হয় খরচের খাতায় রেখে দিয়েছেন। এটা কোনো গণতন্ত্র নয়। উপদেষ্টাদের শপথ অনুষ্ঠানে গভীর আন্তরিকতা নিয়ে দাওয়াত করা হয়েছিল। তাই গিয়েছিলাম। এতে লক্ষ কোটি মানুষ খুশি হলেও ২-৪ জন নির্বোধ অখুশিও হয়েছে। সারাজীবন কারও খুশি-অখুশি বিবেচনা করে কাজ করিনি। নিজের অন্তরাত্মাকে খুশি করার কামনা-বাসনা নিয়ে কাজ করেছি। বাকি সময়টুকুও তাই করে যাবো। কারও দিকে ঝোল টেনে অথবা কারও দিকে বিদ্বেষপ্রসূত কোনো কাজ করবো না।

বহুদিন পর মানবজমিনের প্রাণ ভোমরা জনাব মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং কথা হলো। কিছু কিছু জিনিস আমি মেনে নিতে পারি না। যেই রাষ্ট্র চালান তারই বা কর্তৃপক্ষের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ নিয়ে প্রতি বছর অন্তত দুইবার জাতীয় সম্মেলন করা উচিত। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজকে ডাকা উচিত। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী- সবাইকে অন্তত বছরে একবার আনুষ্ঠানিকভাবে ডেকে মতামত নেয়া উচিত। বিগত সরকার যেমন তার ১৫-১৬ বছরে জাতীয় কোনো সমস্যা নিয়ে একবারের জন্যও বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ বা সাধারণ আলোচনা করেনি। মাননীয় নেত্রী বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে মাঝেমধ্যেই তালিকা করা দালাল সাংবাদিক বা সম্পাদকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতেন। প্রশ্নগুলো মনে হয় আগে থেকেই তৈরি করা থাকতো। যা থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেও লাভবান হতেন না, দেশও হতো না। আলাপের এক পর্যায়ে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছিলেন, শেখ হাসিনার পুরো আমল জুড়ে একবারের জন্যও সাংবাদিক হিসেবে আমন্ত্রণ পাইনি। এটাই স্বাভাবিক। তিনি যা করেছেন তার ফলও পেয়েছেন। এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমার মাথাব্যথা তার কর্মকাণ্ডে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে সেটার প্রতিকার কি করে হবে। সর্বত্র ঘুষ-দুর্নীতিতে দেশটা একেবারে ছেয়ে গেছে। যে লেখক বা সংবাদপত্র তেমন লেজুড়ভিত্তি করতে চায়নি তাদের খরচের খাতায় ফেলতেন। এটা কোনো ভালো কথা নয়। অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।’ বাংলাদেশের পিতা বঙ্গবন্ধু এক সময় ছিলেন সারা জাতির শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতীক, ভালোবাসার আরাধ্য ধন। ১৬ বছর শেখ হাসিনার শাসনামল বঙ্গবন্ধুকে আরও বেশি জাতির আপনজনে পরিণত করার চেষ্টা করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে তাকে একেবারে দলীয় করা হয়েছিল। অমনটা করা মোটেই ভালো হয়নি। যেমন করেছেন তেমন ফল পেয়েছেন। কতোবার বলেছি, সংযত আচরণ করুন, সংযত হয়ে কথা বলুন। না, উনি ওনার জন্মগত স্বভাব কখনো বদলাননি বা বদলাবার চেষ্টা করেননি। এ নিয়ে শেখ রেহানাও ২-৪ বার বলেছে, ভাই আপনি জানেনই তো হাসু আপা অমনই। তাকে বলে কয়ে বুঝানো যায় না। কি বলবো, রাষ্ট্রে ‘অমনই তো’ চলে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় সব সময় মেপেজোখে কথা বলতে হয়। কিন্তু সেদিকে কোনোদিন তিনি পা মাড়াননি। আমার তো তেমন বিদ্যা-বুদ্ধি নেই। আমি রাস্তাঘাটে যা দেখি তা থেকেই শিখি। পাকিস্তান আমলে অনেক সময় দেখতাম পাড়ায় পাড়ায় নাটক-থিয়েটার হতো। নাটক মঞ্চায়নের জন্য মাসের পর মাস রিহার্সেল হতো। যেদিন মঞ্চায়ন হতো সেদিন হয়তো ২-১ হাজার দর্শকশ্রোতা একত্র হতো। তাদের সামনে শিল্পীদের উপস্থাপনের কতো রকমের প্রস্তুতি, কতো যত্ন কথাবার্তা বলার, কতো সাবলীলতা কতোটা উঠানামা হবে দিনের পর দিন শিখানো হতো, দেখানো হতো। কিন্তু আজ জাতীয় নেতারা লক্ষ কোটি মানুষের সামনে কথা বলেন কিন্তু সংযত হন না। একবারের জন্যও ভাবেন না কীভাবে কতোটা গভীরতা নিয়ে, কতোটা দরদ দিয়ে কোন বাক্যটা কীভাবে উচ্চারণ করা উচিত। এবার জাতিসংঘে ভাষণের সময় আমাদের গুণী সন্তান অধ্যাপক ইউনূস যে দরদ দিয়ে প্যালেস্টাইনের কথা তুলে ধরেছেন, ইসরাইলের বর্বরতাকে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে আমাদের সকলের অন্তর ছুঁয়ে গেছে। এর আগে অনেকবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু সেখানে অতটা দরদ খুঁজে পাওয়া যায়নি যতটা সেদিন অধ্যাপক ইউনূসের কণ্ঠে পাওয়া গেছে। বাংলা ভাষায় একই শব্দ শুধু উচ্চারণের হেরফেরে হ্যাঁ না হয়ে যায়। কিন্তু অবাক কাণ্ড তেমন কারোরই সাধারণ মানুষ সম্পর্কে খুব একটা গুরুত্ব নেই। এ ব্যাপারে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সাধারণ মানুষের মর্যাদা হিমালয়সম সুদৃঢ় করবে। যদিও এখনো অনেকের হুঁশ নেই। এখনো কাজ করার সময় অনেক কর্মকর্তা টাকা-পয়সার জন্য হা হয়ে থাকেন। এখনো যদি শিক্ষা না হয় তাহলে অনেকেই ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
দু’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে না বলে পারছি না। একটি হলো- সাগর-রুনি যখন নিহত হয় তখন বাংলাদেশের সবচাইতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সাহারা খাতুন। তিনি বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। কেন যেন সে সময় বলেছিলাম, ৪৮ ঘণ্টা তো দূরের কথা ৪৮ সপ্তাহ অথবা ৪৮ মাসেও অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের হাতে সোপর্দ করা যাবে না। কারণ সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে অনেক শক্তিমানরা জড়িত। জানি না, এ হত্যাকাণ্ডটির বিচার ৪৮ মাস তো হয়েই গেল, ৪৮ বছর লাগবে কিনা।

অন্যটি ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫, অবসর ৬৫। এখন দেখছি- সবই হাওয়া থেকে পাওয়া। বাস্তবের কোনো চিহ্ন নেই। কতোবার বলার চেষ্টা করেছি, সময়ের কাজ সময়ে করেন। কিন্তু কেউ সময়ের কাজ সময়ে করে না বা ভাবে না। সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ৩৫ বছর এ খুবই যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য দাবি। এর জন্য আবার কমিটি কি? ছাত্র-যুবকদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে টানাটানি, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দরকষাকষি এর কোনোটাই ভালো না। আমি খোলা মনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানকে এসব সমাধানের জোর দাবি জানাচ্ছি।

তেমন অনেক কিছু বলা যায় না, বলা ঠিকও না। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর লন্ডন থেকে তারেক রহমান যা বলেছেন বা বলছেন দেশবাসী তাতে অনেকটাই খুশি। আমিও অভিভূত। কিন্তু তার অনুরোধ নির্দেশ আহ্বান তার দলীয় নেতাকর্মীদের উপর তেমন প্রভাব ফেলছে বলে মনে হয় না। তা না হলে হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে কেন এমন করবেন? এতদিন আওয়ামী লীগ খেয়েছে এখন আমরা খাবো। বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মীর এমন জোর জবরদস্তির কারণে আন্দোলন পরবর্তী বিএনপি’র জনপ্রিয়তা যতটা সাবলীল শক্তিশালী ছিল সেটা অনেকটা কমে গেছে। এটা জানি, সমালোচনা কারোরই ভালো লাগে না। সত্য কথা এত কঠিন যা হজম করা খুব একটা সহজ নয়। আওয়ামী লীগ যেমন সব দোষ দিতো বিএনপি-জামায়াতকে, এখন সব দোষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দিলে কোনো শুভ ফল হবে না। অতীতে কোনো গণআন্দোলনে এত জীবন বিসর্জন দেয়নি। এই আত্মত্যাগ ব্যর্থ হলে জাতিকে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তাই স্বাধীনতা ভোগ করতে কিছুটা দায়িত্ববোধেরও পরিচয় দিতে হবে। রাস্তাঘাটে মানুষের মধ্যে যা দেখছি তাতে তারা খুবই আশাবাদী। তারা তাদের প্রকৃত অধিকার চায়- সম্মান চায় এবং জনতা তাদের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব চায়।

mzamin

রাজধানীর ৩ স্পটে ৪ দিনে ৫২৩৫ প্রাণঘাতী গুলি by শরিফ রুবেল

কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের ব্যাপকহারে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে খোদ এই বাহিনীর নথিতেই। এই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কারণেই ব্যাপক জীবনহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। যেসব অস্ত্র নিয়ে গুলি চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা বেসামরিক মানুষকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হয় না। এসব অস্ত্রের গুলিতে মৃত্যু নির্ঘাত। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেড় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ত্রিশ হাজারের বেশি।

মানবজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, গত ১৮ই জুলাই থেকে ২১শে জুলাই পর্যন্ত ৪ দিনে ঢাকার অন্তত ৪টি স্পটে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি বিপুল পরিমাণ প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। অধিকাংশই এইম অন ফায়ার লক্ষ্যবস্তু টার্গেট করে গুলি করা হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের করা ঢাকা মহানগর ও চট্টগ্রাম মহানগরীর ২২টি থানার অন্তত ১০০টি মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে এই তথ্য মিলেছে। ‘লয়্যার ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানও এসব মামলার নথি পর্যালোচনা করেছে।

মামলার এজাহার ঘেঁটে দেখা গেছে, জুলাই মাসের ১৮ তারিখ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, কদমতলী, রামপুরা, ধানমণ্ডি ও চট্টগ্রাম চাঁদগাঁও এলাকায় ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সময়ে দমাতে স্পেশাল পারপার্স অটোমেটিক শটগান (স্পার্স), ৭.৬২ এমএম চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল, টরাস ৯ এমএম, ৯.১৯ এমএম সিজে পিস্তল থেকে ১৭ হাজার ২৯ রাউন্ড বুলেট ছুড়েছে। এমনকি ১৬টি শক্তিশালী গ্রেনেডও ছোড়া হয়। প্রাণঘাতী অস্ত্র থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ১৫৬৩ রাউন্ড, মোহাম্মদপুরে ২৯৮ রাউন্ড ও সিসা বুলেট ২৯৮৪ রাউন্ড, উত্তরায় ৩৯০ রাউন্ড, ধানমণ্ডিতে ৩৩৭ রাউন্ড ও শাহবাগে ৪৩ রাউন্ড বুলেট ছোড়া হয়। মানবজমিন অনুসন্ধানে আন্দোলনে কোন স্পটে পুলিশের কোন সদস্য কতো রাউন্ড গুলি ব্যবহার করেছে এবং কি ধরনের অস্ত্র থেকে এসব গুলি ছোড়া হয়েছে তাও বিস্তারিত জানা গেছে। যার নথিপত্র মানবজমিনের হাতে রয়েছে। নিহতের ঘটনাগুলোয় পুলিশ বাদী হয়ে করা বেশির ভাগ মামলায় বিক্ষোভকালে সন্ত্রাসী বা দুষ্কৃতকারীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। এবং জানমাল রক্ষায় গুলি চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এদিকে পুলিশের গুলিতে ১৮ই জুলাই থেকে ২১শে আগস্ট পর্যন্ত ৩৪১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মারা যাওয়াদের মধ্যে অধিকাংশই এইম ফায়ার বা লক্ষ্যবস্তু করে গুলির শিকার হয়। তবে যেসব স্পটে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয় তারমধ্যে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা অন্যতম।

অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিশেষজ্ঞ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. নাজমুল হুদা মানবজমিনকে বলেন, আসলে ৭.৬২ ক্যালিবার চায়না রাইফেল একটি ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী অস্ত্র। এটি ব্যবহারে অনেক সুবিধা। লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত কার্যকরী। এই অস্ত্র সচরাচর ব্যবহার হয় না। বেসামরিক মানুষের ওপর এই অস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না। কোনো দেশই এটা করে না। এর বুলেট একটি আস্তো আঙ্গুলের মতো। ৩০০ মিটারের মধ্যে কাউকে যদি এসএমজি ও চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি করা হয়, তার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। বেঁচে গেলেও যে অরগানে এই বুলেট লাগবে তা কেটে ফেলতে হবে। এমনকি দূরবর্তী নিশানা থেকেও যদি এই অস্ত্র দিয়ে গুলি করা হয়, গুলি যেখানে লাগবে তা ছিদ্র হয়ে বেরিয়ে যাবে। হাতে লাগলে হাত ছিঁড়ে যাবে। পায়ে লাগলে পা ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এটা এতটাই প্রাণঘাতী যে এই অস্ত্র মানুষের শরীরে বিদ্ধ হয়ে ভেতরে থেকে গেলেও বাঁচার চান্স নেই। কারণ এর তেজস্ক্রিয়া অতিমাত্রায় খারাপ ইফেক্ট ফেলে। পুরো শরীর ছড়িয়ে যায়।

সাবেক একজন সেনা কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, ৭.৬২ ক্যালিবার এমএম চাইনিজ রাইফেলের কার্যকারিতা উচ্চ পর্যায়ের। এটা লোহার পাত ৬ মিলিমিটার, ইটের দেয়াল ১৫ মি:মি, মাটির দেয়াল ৩০ সেন্টিমিটার, কাঠের তক্তা ৪০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার ভেদ করে চলে যেতে পারে। সেখানে মানুষের শরীর তো নরম জিনিস। এর একটি গুলির ওজন ১৬.৪ গ্রাম, বুলেটের ওজন ৭.৯ গ্রাম। চায়না রাইফেল দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৩০/৪০ রাউন্ড ছোড়া যায়। এখানে বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে। এটা অতি মারাত্মক। এর কার্যকারিতা ৫০০ মিটার পর্যন্ত যেতে পারে। সামরিক বাহিনী এই অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে।

প্রাণঘাতী যত অচেনা অস্ত্র ব্যবহার: ছাত্র আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন বাহিনী অচেনা নানা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে প্রজেক্টাইল, মাল্টি ইম্প্যাক্ট, রেন্ডম মুভমেন্ট, কাইনেটিভ, ভারী বল কার্তুজ ও হ্যান্ড গ্রেনেড। গত ১৯শে জুলাই মোহাম্মদপুরে এসআই শহিদুল ২০টি ও এসআই মাসুম বিল্লাহ ১১টি প্রজেক্টাটাইল নিক্ষেপ করেন। এ ছাড়া রামপুরায় কনস্টেবল আশিকুর ৪টি, যাত্রাবাড়ীতে কনস্টেবল মারুফ ১টি, সোহেল ৪টি, ইমরান ২টি, শামীম ৫টি, সাদেকুল ৩টি প্রজেক্টাটাইল নিক্ষেপ করেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। ওইদিন মোহাম্মদপুরে এএসআই রাজু আহমেদ ৪ পিস, রামপুরায় কনস্টেবল আব্দুল কুদ্দুস ৫টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। এ ছাড়া মাল্টি ইম্প্যাক্ট ৩টি, র?্যান্ডম মুভমেন্ট ৩টি, কাইনেটিভ ৬৮টি, ভারী বল কার্তুজ ৬২টি ও ৪টি ফ্লাস ব্যবহার করা হয়।

এসএমজি, চায়না রাইফেলের তাণ্ডব চলে যাত্রাবাড়ীতে: ঢাকা শহরের আন্দোলনের হটস্পট ছিল যাত্রাবাড়ী। ওই এলাকায় পুলিশের সঙ্গে নজিরবিহীন সংঘর্ষ হয়। পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে ১৯শে জুলাই। এরপর ২০ ও ২১শে জুলাইও পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ৪ দিনে ওই এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর এসএমজি থেকে ১৭ রাউন্ড ও চায়না রাইফেল থেকে ১৪৯৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ। এ ছাড়া টরাস পিস্তল থেকে ৬৩ রাউন্ড, ৯.১৯ এমএম সিজে রাইফেল থেকে ৭ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। যারা এসব প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে রয়েছে, চায়না রাইফেল থেকে পুলিশ পরিদর্শক ওহিদুল হক মামুন ২ রাউন্ড, এসআই নাজমুল হুদা ২৫৫ রাউন্ড, এসআই শুভংকর চন্দ্র দাস ৩০ রাউন্ড, এসআই সুজন চন্দ্র ২০ রাউন্ড, এসআই প্রশান্ত বালা ২০ রাউন্ড, এসআই কবির হোসেন ২০ রাউন্ড, এসআই শামীম রেজা ২০ রাউন্ড, এসআই নওশের আলী ২০ রাউন্ড, এসআই আল-আমিন ২০ রাউন্ড, এসআই আমিরুল ইসলাম ২০ রাউন্ড, এসআই সুকদেব বিশ্বাস ২০ রাউন্ড, এসআই রাহাত হোসেন ২০ রাউন্ড, এসআই ফেরদোউস রনি ২০ রাউন্ড, এসআই নুরে আলম ২০ রাউন্ড, এসআই মৃগাংক ২০ রাউন্ড, এসআই রাশেদুল ২০ রাউন্ড, এসআই মির্জা বদরুল ২০ রাউন্ড, এসআই সাজ্জাদ ২০ রাউন্ড, এসআই নির্মল কুমার ২০ রাউন্ড, এসআই তন্ময় মণ্ডল ৩০ রাউন্ড, এএসআই তানভির হোসেন ৩০ রাউন্ড, এসআই মোস্তাকিম পাটোয়ারী ৩০ রাউন্ড, এসআই সাব্বির হোসেন ৩০ রাউন্ড, এসআই আনিছুর জামান ৩০ রাউন্ড, এসআই বজলুর রশিদ ৩০ রাউন্ড, এসআই শাহ আলম ৩০ রাউন্ড, এসআই এহসানুল হক ৩০ রাউন্ড, এসআই নাদিম মুন্সি ৩০ রাউন্ড, এসআই মাহবুব ৩০ রাউন্ড, এসআই ওয়াসিম বিল্লাহ ৩০ রাউন্ড, এসআই মাহবুব ৩০ রাউন্ড, এসআই সুজদ চন্দ্র দে ৩৭ রাউন্ড, এসআই শংকর হীরা ৩০ রাউন্ড, কনস্টেবল শাওন ৩০ রাউন্ড, কনস্টেবল তাফসিদুর ২১ রাউন্ড, মো. ইমন ৫ রাউন্ড, ইছহাক ৪০ রাউন্ড, মোরছালিন ৩৮ রাউন্ড, মো. রবিউল ৪০ রাউন্ড, সাব্বির ২৩ রাউন্ড, নাজমুল ২৫ রাউন্ড, মো. মিরাজ ১২ রাউন্ড, ফয়সাল ২৭ রাউন্ড, মো. নয়ন ১৬ রাউন্ড, রিফাত ৩ রাউন্ড, হৃদয় ১০ রাউন্ড। এ ছাড়া এসআই আবু সায়েম ৯.১৯ সিজে পিস্তল থেকে ৫ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এএসপি আব্দুল হান্নান টরাস পিস্তল থেকে ৫ রাউন্ড গুলি ছোড়েন।

মোহাম্মদপুরে চায়না রাইফেলে ব্যাপক প্রাণহানি: কোটা আন্দোলনের আরেকটি উত্তেজনাপূর্ণ স্পট ছিল মোহাম্মদপুর। ১৮ থেকে ২১শে জুলাই পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় সেখানে। আন্দোলন দমাতে পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। হেলিকপ্টার থেকেও গুলি ছোড়া হয়। এতে ভারী বুলেটে বিদ্ধ হয়ে অন্তত ২৫ জন আন্দোলনকারী নিহত হন। ১৮ থেকে ২১শে জুলাই পর্যন্ত মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে পুলিশ এসএমজি থেকে ১৬৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ ছাড়া এমএম ৭.৬২ ক্যালিবার চায়না রাইফেল থেকে ১১৫ রাউন্ড, বিডি-৮ অ্যাসল্ট বা সাব-মেশিনগান থেকে ১৬ রাউন্ড, টরাস পিস্তল থেকে ২ রাউন্ড ও ভারী সিসা বুলেট ২৯৮৪ রাউন্ড ছোড়া হয়। এরমধ্যে বিজিবি’র ল্যান্স কর্পোরাল রাকিবুল ইসলাম এসএমজি বাঁট নং-১৩৭ থেকে ২৯ রাউন্ড, এবি উজ্জ্বল মণ্ডল এসএমজি বাঁট নং-১৬ থেকে ৮ রাউন্ড, ল্যান্স কর্পোরাল সারওয়ার এসএমজি বাঁট নং-১১ থেকে ৭ রাউন্ড, সার্জেন্ট কামরুল ইসলাম এসএমজি বাঁট নং-১৩২ থেকে ৫৯ রাউন্ড, এসআই আবু বক্কর সিদ্দিক এসএমজি বাঁট নং-১৫২ থেকে ১৪ রাউন্ড, কনস্টেবল সুব্রত এসএমজি বাঁট নং-১৩০ থেকে ১০ রাউন্ড, কনস্টেবল রিফাত এসএমজি বাঁট নং-১২০ থেকে ৬ রাউন্ড, কনস্টেবল রনি এসএমজি বাঁট নং-৪৮ থেকে ১৯ রাউন্ড, কনস্টেবল শাকিল এসএমজি বাঁট নং-১৬৬ থেকে ৫ রাউন্ড, কনস্টেবল বোরহান এসএমজি বাঁট নং-৩৪ থেকে ১ রাউন্ড, সৈনিক মেহেদি এসএমজি বাঁট নং-১২২ থেকে ৮ রাউন্ড। এ ছাড়া ৭.৬২ ক্যালিবার চায়না রাইফেল থেকে এসআই তারিকুল ইসলাম ৩ রাউন্ড, এসআই শাহরিয়ার আলম ২০ রাউন্ড, এসআই আরিফুর রহমান ২০ রাউন্ড, এএসআই অঞ্জয় হালদার ২০ রাউন্ড, এএসআই চয়ন সাহা ২০ রাউন্ড,  কনস্টেবল খাইরুল ১২ রাউন্ড, কনস্টেবল হৃদয় ৭ রাউন্ড, কনস্টেবল মোক্তারুল ৪ রাউন্ড, কনস্টেবল তিমন ৮ রাউন্ড, কনস্টেবল আলম ৪ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এই স্পটে প্রাণঘাতী বাংলাদেশি রাইফেল বিডি-৮ ব্যবহার করা হয়। এই রাইফেল দিয়ে কনস্টেবল তরিকুল বাঁট নং-৪৯ থেকে ১ রাউন্ড, কনস্টেবল হাবিবুর বাঁট নং-৪৪ থেকে ২ রাউন্ড, কনস্টেবল কাওসার বাঁট নং-৩৫ থেকে ১ রাউন্ড, কনস্টেবল মোস্তাকিম বাঁট নং-৩৭ থেকে ৫ রাউন্ড, কনস্টেবল শাহরিয়ার বাঁট নং-১২২ থেকে ২ রাউন্ড, ফুয়াদ বাঁট নং-১০৩ থেকে ৪ রাউন্ড, ইনক দাশ বাঁট নং-১৪৫ থেকে ১ রাউন্ড। এ ছাড়া এসআই আব্দুস সালাম টরাস পিস্তলের ১ রাউন্ড ও এএসআই রাজু ৪টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। এ ছাড়া এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলরা ছাত্রদের দমাতে ২৯৮৪ রাউন্ড প্রাণঘাতী সিসা বুলেট ছোড়ার প্রমাণ মিলেছে।

চায়না রাইফেল ব্যবহার হয় শাহবাগ, সায়েন্সল্যাবে: শাহবাগ এলাকায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর চায়না রাইফেল থেকে ৪৩ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। মূলত সায়েন্সল্যাব ও সিটি কলেজ এলাকায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর চায়না রাইফেল থেকে এসব গুলি ছোড়েন। ওই এলাকায় যারা চায়না রাইফেল থেকে গুলি করেন তাদের মধ্যে কনস্টেবল মেহেদী ১ রাউন্ড, কনস্টেবল লিটন ১০ রাউন্ড, বিজিবি সুবেদার সাদেক আলী ৪ রাউন্ড, বিজিবি’র ল্যান্স নায়েক মনসুর আলী ২ রাউন্ড, সিপাহী শফিকুর রহমান ১২ রাউন্ড, সিপাহী সুব্রত কুমার সরদার ৬ রাউন্ড, সিপাহী আব্দুল্লাহ খান ৪ রাউন্ড, সিপাহী হাসান মিয়া ৩ রাউন্ড, মোহাব্বত হোসেন ৪ রাউন্ড, আবির হোসেন ৪ রাউন্ড, লিটন মিয়া ২ রাউন্ড, ল্যান্স নায়েক ফাইবুল ইসলাম ১ রাউন্ড। এ ছাড়া সেখানে শটগান থেকে বিপুল পরিমাণ সিসা বুলেট ছোড়া হয়।

কদমতলীতে ব্যাপকহারে ৭৬২ রাইফেল ব্যবহার: রায়েরবাগ পুলিশ ব্যারাক এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কদমতলী থানার অর্ন্তগত ওই এলাকায় পুলিশের গুলিতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই স্পটে আন্দোলনকারীরা দুই পুলিশ সদস্যকে মেরে ফুটওভার ব্রিজে ঝুলিয়ে রাখে। পুলিশ সদস্যরা ১৮ই জুলাই থেকে ২১শে জুলাই পর্যন্ত  ওই এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে। ৪ দিনে ওই এলাকায় চাইনিজ রাইফেল থেকে ৭১৮ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এতে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

৪ দিনে উত্তরায় ৩৬৮ রাউন্ড প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার:  ছাত্র আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট ছিল উত্তরা। উত্তরায় ১৮ই জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ৮ ঘণ্টা ধরে পুরো উত্তরা জুড়ে এই সংঘর্ষ চলে। এতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সড়ক দখলে নেয়। পুলিশের গুলিতে উত্তরার হাসপাতালগুলো অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ লাইন লেগে যায়। একদিনেই ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। গুলিবিদ্ধ হন শ’ শ’ শিক্ষার্থী। ১৯শে জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ আরও ব্যাপকভাবে দমনপীড়ন চালায়।  এতে প্রাণঘাতী ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এদিন প্রাণঘাতী চাইনিজ রাইফেল থেকে ৩৬৮ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা হয়। ২ দিনে উত্তরায় যারা এসএমজি ও চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে রয়েছে, এএসআই আলহাজ উদ্দিন এসএমজি ১৭ রাউন্ড। কনস্টেবল কাজী মিঠুন চাইনিজ রাইফেল ৬ রাউন্ড, আনসার সদস্য মোহাম্মদ আলী ১৭ রাউন্ড, এসআই মোফাজ্জল হোসেন ১০ রাউন্ড, এসআই মাঈন উদ্দিন ২৭ রাউন্ড, এসআই মনির হাসান ১৬ রাউন্ড, এসআই মনিরুজ্জামান ২৬ রাউন্ড, এসআই হাসান মুন্সি ৩৭ রাউন্ড, এসআই শাহীন রেজা ১৭ রাউন্ড, এসআই মিকাইল ২৯ রাউন্ড, এসআই রেজওয়ান ফকির ১৯ রাউন্ড, এসআই নাহিদ পারভেজ ৪৫ রাউন্ড, এসআই মাঈন উদ্দিন ১৯ রাউন্ড, এএসআই শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি ৩৮ রাউন্ড, কনস্টেবল ফারুক ১০ রাউন্ড, আ. সহিদ ৯ রাউন্ড, হৃদয় ২০ রাউন্ড। স্পেশাল পারপার্স অটোমেটিক শটগান (স্পার্স) থেকে সিসা বুলেট ছোড়েন কনস্টেবল শাহ আলম ১৩ রাউন্ড, কনস্টেবল আবুল ফজল ৭ রাউন্ড, কনস্টেবল আব্দুল কুদ্দুস ১০ রাউন্ড। ওই দিন ছাত্রদের ওপর আরও ৩৬১ রাউন্ড সিসা বুলেট ব্যবহার করা হয়। ধানমণ্ডি এলাকায় চাইনিজ রাইফেল থেকে ৩০০ রাউন্ড ও এসএমজি থেকে ৩৭ রাউন্ড গুলি ছোড়েন পুলিশ। এতে ফারহান ফাইয়াজ, শুভ, সোহাগ, রনিদের মতো অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
১০০টি মামলা থেকে প্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র ও বুলেটের বিবরণ: শটগানের সিসা কার্তুজ ১২৩৪০ রাউন্ড, চাইনিজ রাইফেল ৭.৬২ এমএম, এসএমজি, টরাস ৯ এমএম ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাণঘাতী বুলেট ৪৩১৬ রাউন্ড, পিস্তলের গুলি ২৫৬ রাউন্ড, রাবার বুলেট ৮৯৯৪ রাউন্ড, লাইট হ্যান্ড গ্রেনেড, হ্যান্ড গ্রেনেড ও গ্রেনেড ১৬টি, লং ও শর্ট গ্যাস সেল ১৮৪৭ রাউন্ড, টিয়ার গ্যাসশেল ৮৮৬ রাউন্ড, টিয়ার গ্রেনেড ১টি, সাউন্ড গ্রেনেড ৯৮৪ টি, প্রজেক্টাইল ৪৮টি।

শটগান কখন মারণাস্ত্র হয়ে উঠে এর ব্যাখ্যা করে সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি নাজমুল হুদা বলেন, স্পেশাল পারপার্স অটোমেটিক শটগান (স্পার্স) এই আন্দোলনে এই অস্ত্রটিও ব্যাপকহারে ব্যবহার করা হয়েছে। এটা নামে শটগান হলেও আদতে মরণঘাতী অস্ত্র। কারণ এতে এন্ট্রি বুলেট ব্যবহার করা যায়। মেটাল ফরিং বুলেট, যেটা গাড়ি ছিদ্র্র করে বের হয়ে যাবে। তাহলে এই বুলেট যদি কারও শরীরে লাগে, তার কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। এই অস্ত্র নিয়ে রাবার বুলেট, ছররা গুলিও ছোড়া যায়। এজন্যই এর নাম হয়েছে স্পেশাল পারপার্স অটোমেটিক শটগান। একটি কথা বলতে হয়, যখন মব কন্ট্রোল হয়, তখন প্রথমে সতর্ক করতে হবে। কিন্তু পুলিশ জনগণকে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। তারা প্রথমেই গুলি শুরু করেছে। একবারে উল্টোদিক থেকে শুরু হয়েছে। যেটা হওয়ার কথা ওয়ার্নিং সেটা শুরু হয়েছে ফায়ারিং দিয়ে। আসলে মানুষ মারার সংকল্প নিয়ে পুলিশকে মাঠে পাঠানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ৭৫ মিটারের মধ্যে কাউকে এসএমজি দিয়ে গুলি করা হলে মৃত্যু নির্ঘাত। চাইনিজ রাইফেল ওজন কম, নিশানা ঠিক থাকে এবং নির্বিঘ্ন্নে অনেক সময় ব্যবহার করা যায়।  

mzamin

ইরানের এবারের হামলায় সামনে এল ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা by জুলিয়ান বর্গের

গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একের পর এক হত্যায় এই গোষ্ঠীগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এমন সময়ে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রায় দুই শ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি না হলেও তা ইসরায়েলের নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের নেতারা। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সামনে তা কী পরিণতি নিয়ে আসতে পারে, সে বিষয়ে একটি কলাম লিখেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জুলিয়ান বর্গের। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো।

ইসরায়েলের তেল আবিব শহরে গত মঙ্গলবার রাতে নেমে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। এ দৃশ্য অবশেষে আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হওয়ার স্পষ্টতম সংকেত দিচ্ছে। এক বছর ধরে অঞ্চলটিতে এ ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

এবার নিয়ে ছয় মাসের কম সময়ে মধ্যে ইসরায়েলে আকাশপথে দ্বিতীয়বার হামলা চালাল ইরান। কিন্তু গতবার হামলার কয়েক দিন আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তখন হামলার শুরুতে অনেক বেশি ধীরগতির ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল জনবিরল নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটি।

এবার হামলাই শুরু করা হয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। তা ছোড়ার পর ইসরায়েলের আকাশ সীমায় প্রবেশ করতে সময় লেগেছে ১২ মিনিট। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এবার ইসরায়েলের ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে স্থানীয় গণমাধ্যমে এবারের হামলাকে (ইসরায়েলের বিরুদ্ধে) ইরানের যুদ্ধ ঘোষণা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

হামলায় হতাহতের তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এবার একাধিক শহরকে লক্ষ্যবস্তু করায় ইসরায়েলের পাল্টা হামলা জরুরি হয়ে পড়েছে। গত এপ্রিল মাসে ইরানের প্রথম দফা হামলার পর ইসরায়েলের প্রত্যুত্তর হামলা ছিল মোটাদাগে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার বিষয়। তখন ইরানের ভেতরে হামলায় দেশটির ইস্পাহানের নিকটবর্তী একটি সামরিক ঘাঁটির একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তল্লাশিচৌকিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল ইসরায়েল।

মঙ্গলবার রাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের নাগরিকেরা সুস্পষ্টভাবে হুমকিতে পড়েছেন। এ অবস্থায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অনেক বেশি সর্বাত্মকভাবে ইরানকে পাল্টা জবাব দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য হামলা নিয়ে এরই মধ্যে ছক কাটা হয়েছে। ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার বৈঠকে তা সুনির্দিষ্ট করে নেওয়া হবে। লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বড় ও ভারী হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। এবার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার ইসরায়েলে ইরানের আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে সবার আগে সতর্কতা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। হামলার আগে মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বিষয়টি সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। ইরানের হামলার পূর্বাভাস দিতে পারায় যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। পূর্বাভাস করতে পারায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ইরানের হামলা ওয়াশিংটনের জন্য আচমকা ছিল না।

ইসরায়েলে ইরানের এবারের হামলা একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সব ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে মার্কিন রাজনীতিতেও এর গুরুতর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগেই এ ঘটনা ঘটল। রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল বলে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন।

এদিকে গাজায় ইসরায়েলের জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতির জন্য কয়েক মাস ধরে চেষ্টা করেও সফল হয়নি মার্কিন প্রশাসন। অন্যদিকে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ফ্রান্সকে দলে টেনে লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়েছে।

গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু জাতিসংঘের অধিবেশনে বক্তৃতা দেওয়ার অল্প সময় পরেই গত শুক্রবার বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হন। মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে ইরানের সবচেয়ে বড় অংশীদার ছিলেন তিনি। এই অবস্থায় মঙ্গলবার রাতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নাসরুল্লাহর মৃত্যু এবং জুলাই মাসের শেষ দিকে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে গুপ্তহত্যার প্রতিশোধ বলে উল্লেখ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

গত বছরের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অঞ্চলটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব দাবি করেছেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কিন্তু তাঁদের এ দাবি এখন আর তেমন একটা গুরুত্ব বহন করছে না।

গত এপ্রিল মাসে ইসরায়েলে ইরানের হামলার পর বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে পাল্টা হামলা চালানোর বিষয়ে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু এবারের হামলার পর ইসরায়েলকে সংযত থাকতে বলার মতো অবস্থা নিজেদের নেই বলে তেহরানের প্রতি ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু স্বাধীনভাবে যেকোনো পদক্ষেপের অধিকার অর্জন করেছেন। সে কারণে তেল আবিবকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর তাঁর পদক্ষেপ নিয়ে কিছু বলা ওয়াশিংটনের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহুর বিরোধীদের তাঁর পদত্যাগের আহ্বান জানানো অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার নেতানিয়াহু তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত বাসনার আরও কাছাকাছি পৌঁছেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করতে চাচ্ছিলেন, যে যুদ্ধের মাধ্যমে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করা যাবে।

তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত রাখতে প্রধান বিশ্ব শক্তিগুলোর সঙ্গে ২০১৫ সালে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) করেছিল ইরান। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটিতে থেকে সরে আসার পর তা অকার্যকর হয়ে যায়। এরপর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম বাড়িয়ে দেয় ইরান। ধারণা করা হয়, দেশটি এরই মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

এখন পর্যন্ত যা জানা যায়, ইরানের মঙ্গলবার রাতের হামলায় ইসরায়েলে যৎসামান্য হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের আকাশ সীমায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে ১২ মিনিট। এর ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পারমাণবিক ওয়ারহেডবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ১২ মিনিটের মধ্যে ইরান থেকে ইসরায়েলে আঘাত হানতে পারে বলে একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে এবার ইসরায়েল আঞ্চলিক শত্রুদের ধাপে ধাপে শায়েস্তা করছে। তাদের একেকটাকে ধ্বংস করার যুদ্ধে নেমেছে দেশটি। প্রথমে হামাসকে ধরেছে, এরপর এখন ধরেছে হিজবুল্লাহকে। এই পরিস্থিতি ইরানের যুদ্ধবাজ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির যুক্তিকে শক্তিশালী করতে বাধ্য। এখন তাঁরা বলবেন, ইরানকে নিরাপদ ও শক্তিশালী রাখার একমাত্র উপায় হলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা। উল্টো দিকে এমন যুক্তি জয়ী হতে পারে, এমন ভয়ে ইসরায়েলে আত্মরক্ষার্থে শত্রুর (ইরান) ওপর আগেভাগে হামলা চালানোর আহ্বান জোরদার হবে।

এই ধরনের একটা ভয়ংকর সময়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ও উত্তেজনা কমানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্য ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই সক্ষমতা নেই। কারণ তিনি এমন এক নেতা, যাঁকে গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম মিত্র উপেক্ষা করেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছিল। এই পরিস্থিতিতে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের হুমকি থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে চাইবেন, তাঁর ওপর সেই ধরনের হামলার চাপ বাড়বে।

বাইডেন প্রশাসন বিদেশে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে সাধারণত সতর্ক। আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হলে কমলা হ্যারিসও একই পথ অনুসরণ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সহিংসতার কারণে হোয়াইট হাউসে তাঁর বাইডেনের উত্তরাধিকার হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এ খেলায় সবচেয়ে বড় এলোপাতাড়ি তাস তথা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

মঙ্গলবার রাতে তেল আবিবের আকাশে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র
মঙ্গলবার রাতে তেল আবিবের আকাশে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি : রয়টার্স

গাজার সরকারপ্রধান নিহত, লেবাননে হামলা চলছে: শিগগির পাল্টা হামলার হুমকি ইসরায়েলের, অনমনীয় ইরান

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে দেশটিতে ‘শিগগির ভয়াবহ হামলা’ চালানোর হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। হুমকির মুখেও অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করেছে ইরান। ইসরায়েল চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কঠোর জবাব দেবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

এদিকে ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনের গাজায় হামাস সরকারের প্রধান রাভি মুশতাহাসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। তিন মাস আগে ওই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।

লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে।

হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ, হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডারদের হত্যার জবাবে গত মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলে বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ইরানের এই হামলার পর কঠোর পাল্টা হামলার অঙ্গীকার করেছে ইসরায়েল। ইরানের তেলক্ষেত্রের পাশাপাশি পারমাণবিক স্থাপনায়ও ইসরায়েল হামলা চালাতে পারে—এমন কথা শোনা যাচ্ছে। তবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পক্ষে নন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

ইরানের হামলার পর মঙ্গলবারই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘ইরান আজ রাতে বড় ভুল করে ফেলেছে। এ জন্য দেশটিকে চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ইরানে শিগগিরই হামলা চালানো হবে বলে জানালেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন। তিনি গত বুধবার রাতে সিএনএনকে বলেছেন, ‘গত (মঙ্গলবার) রাতে যা ঘটেছে, সেটা ছিল নজিরবিহীন পাল্টা হামলা। আর যেমনটা আজ (বুধবার) আমি নিরাপত্তা পরিষদে বলেছি, ভয়াবহ জবাব দেওয়া হবে। সেটি হবে খুব শিগগির।’

কাতারের দোহায় বুধবার শুরু হওয়া এশিয়া কো-অপারেশন ডায়ালগ (এসিডি) সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল বৃহস্পতিবার সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ইসরায়েলের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেছেন, ‘কোনো ধরনের সামরিক হামলা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা আমাদের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা হলে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কঠোর জবাব দেবে।’

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলছে

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গতকাল বিমান হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর ১৫ যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। এ ছাড়া দিনের শুরুতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে ইসরায়েলের হামলায় ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ জন। হিজবুল্লাহর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈরুতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলায় নয়জন নিহত হয়েছেন। জরুরি পরিষেবা দিয়ে আসা হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইসলামিক হেলথ অথরিটি জানিয়েছে, নিহত নয়জনের মধ্যে দুজন স্বাস্থ্যকর্মীসহ তাঁদের সাত কর্মী রয়েছেন।

গতকাল লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা সদর দপ্তরেও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের ২৫টি গ্রামের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি হামলার মুখে গতকাল পর্যন্ত ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে লেবাননের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি জানিয়েছেন।

ইসরায়েলের ৮, লেবাননের ২ সেনা নিহত

ইসরায়েলের হামলায় গতকাল লেবাননের দুই সেনা নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননে জরুরি উদ্ধারকাজ চালানোর সময় তাঁরা নিহত হন। এ নিয়ে ইসরায়েলের হামলায় লেবাননের মোট তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন। লেবাননের সামরিক বাহিনী এ কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি গত তিন দিন ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় লেবাননে ৪০ অগ্নিনির্বাপণকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স কর্মী নিহত হয়েছেন বলে গতকাল দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার হিজবুল্লাহর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে ইসরায়েলের আট সেনা নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন। গতকালও ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে দুই দফায় পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর কথা জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। এতে কয়েকজন সেনা হতাহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। তবে তাৎক্ষণিক এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

একই সঙ্গে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে সামরিক স্থাপনা ও সেনা অবস্থানে গতকাল ১৫ দফা রকেট হামলা ও গোলাবর্ষণের দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। লেবানন থেকে অন্তত ২৫টি রকেট ছোড়ার কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল।

এদিকে ইসরায়েলের তেল আবিব শহর লক্ষ্য করে সফল ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী সন্দেহভাজন একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে উল্লেখ করেছে। আরেকটি ড্রোন খোলা জায়গায় পড়েছে বলে জানিয়েছে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

গাজায় হামাস সরকারের প্রধান নিহত

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এ উপত্যকার শাসক গোষ্ঠী হামাস সরকারের প্রধান রাভি মুশতাহা নিহত হয়েছেন। গতকাল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তিন মাস আগে চালানো ওই হামলায় রাভি মুশতাহা ছাড়াও হামাসের দুজন জ্যেষ্ঠ নেতা সামেহ আল-সিরাজ ও সামি উদেহ নিহত হন। সামেহ আল-সিরাজ হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। আর সামি উদেহ হামাসের একজন কমান্ডার ছিলেন।

ইসরায়েলি বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মুশতাহা হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন। হামাসের যোদ্ধাদের কোথায় কীভাবে মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রণয়নে সরাসরি প্রভাব রাখতেন তিনি।

গাজায়ও হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় ৯৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬৯ জন। এ নিয়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গাজায় ৪১ হাজার ৭৮৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯৬ হাজার ৭৯৪ জন।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। গতকাল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় মোয়াওয়াদ শহরতলিতে
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। গতকাল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় মোয়াওয়াদ শহরতলিতে ছবি: এএফপি

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ হলে জিতবে কে!

ইসরাইল-ইরান সরাসরি যুদ্ধ হলে জিতবে কে! কার কি সামরিক সক্ষমতা! মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরান কমপক্ষে ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন এই দুটি দেশের মধ্যে ঘোর শত্রুতা। যেকোনো সময় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সম্প্রতি সেই আশঙ্কা প্রবল হয়েছে। তা নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্বকে। জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারপ্রধান এ বিষয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। যদি সত্যি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তাহলে কে জিতবে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে আল-জাজিরা। তাদের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সম্প্রতি লেবাননে ইসরাইলের হামলার জবাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে তেহরানের জবাব হিসেবে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। আইআরজিসি, হামাস ও হিজুবুল্লাহ’র নেতাদের হত্যার জবাবে তারা এই হামলা করেছে। তারা দাবি করেছে তেল আবিবে তিনটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলেছে, তারা প্রথমবারের মতো ফাতাহ নামের হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর জবাব দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বলেছেন, ইরান বড় একটি ভুল করেছে। এর জন্য তাদের মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে ইরানের হামলাকে মোকাবিলা করতে ইসরাইলকে সহায়তা করতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যদি সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তাহলে এই যুদ্ধ শুধু ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ছারখার করে দিতে পারে। এমনকি একে কেন্দ্র করে শুরু হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

সামরিক শক্তি: কয়েক দশক ধরে ইরান ও ইসরাইল ঘোর শত্রু। তাদের মধ্যে প্রক্সি যুদ্ধ চলছে। তাতে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন হলে কার কতোটা যুদ্ধের সক্ষমতা তা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। বৃটেনের থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের (আইআইএসএস) প্রকাশিত দ্য মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৩ অনুযায়ী- ইরানের আছে ৬ লাখ ১০ হাজার সক্রিয় সেনাসদস্য। তার মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। এক লাখ ৯০ হাজার আইআরজিসি’র সদস্য। ১৮ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য। ৩৭ হাজার বিমান বাহিনীর সদস্য। ১৫ হাজার আছে বিমান প্রতিরক্ষা বিভাগে। উপরন্তু সাড়ে তিন লাখ রিজার্ভ সেনা আছে ইরানের। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে ১৮ বছরের উপরে বয়সী ইরানি পুরুষদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। অন্যদিকে ইসরাইলের আছে সক্রিয় এক লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ সেনাসদস্য। তার মধ্যে এক লাখ ২৬ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। ৯ হাজার ৫০০ নৌবাহিনীর সদস্য। ৩৪ হাজার বিমান বাহিনীর সদস্য। ৪ লাখ ৬৫ হাজার আছে রিজার্ভ সেনা। সেখানেও সুনির্দিষ্ট কিছু ছাড় বাদে ১৮ বছরের বেশি বয়সী নারী ও পুরুষের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক।

সামরিক ব্যয়: ২০২৪ সালের এপ্রিলে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্স ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে সামরিক খাতে শতকরা ০.৬ ভাগ খরচ বৃদ্ধি করেছে ইরান। ২০২৩ সালে বর্ধিত হয়ে এই খরচ ছিল ১০৩০ কোটি ডলার। অন্যদিকে ২০২২ সালের পর সামরিক খরচ শতকরা ২৪ ভাগ বৃদ্ধি করেছে ইসরাইল। ২০২৩ সালে এই খরচ ছিল ২৭৫০ কোটি ডলার। গত বছর গাজায় তাদের যুদ্ধ শুরুর কারণে এই খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থল বাহিনী: দ্য মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৩ অনুযায়ী- ইরানের আছে কমপক্ষে ১০ হাজার ৫১৩টি ব্যাটল ট্যাংক, কমপক্ষে ৬ হাজার ৭৯৮টি আর্টিলারি বন্দুক। এ ছাড়া আছে কমপক্ষে ৬৪০টি সামরিক বাহিনীকে বহনে সক্ষম যান। সেনাবাহিনীর কাছে আছে ৫০টি হেলিকপ্টার। অন্যদিকে আইআরজিসি’র কাছে আছে ৫টি হেলিকপ্টার। অন্যদিকে ইসরাইলের কাছে আছে ৪০০ ব্যাটল ট্যাংক, ৫৩০টি আর্টিলারি গান এবং কমপক্ষে এক হাজার ১৯০টি সামরিক বাহিনীকে বহনে সক্ষম যান।

বিমান বাহিনী: দ্য মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৩ অনুযায়ী- ইরানের আছে কমপক্ষে ৩১২টি যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য যুদ্ধবিমান। আইআরজিসি’র কাছে আছে ২৩টি যুদ্ধবিমান। বিমান বাহিনীর কাছে আছে দুটি হেলিকপ্টার। সেনাবাহিনীর কাছে আছে ৫০টি এবং আইআরজিসি’র আছে ৫টি হেলিকপ্টার। অন্যদিকে ইসরাইলের আছে ৩৪৫টি যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য যুদ্ধবিমান। হামলা চালানোর জন্য ৪৩টি হেলিকপ্টার।

নৌবাহিনী: ওই একই রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের কাছে আছে কৌশলগত ১৭টি সাবমেরিন। ৬৮টি প্যাট্রোল ও কোস্টাল কমব্যাট্যান্ট। সাতটি করভেট। ১২টি ল্যান্ডিং শিপ। ১১টি ল্যান্ডিং ক্রাফট। ১৮টি লজিস্টিকস ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী। অন্যদিকে ইসরাইলের আছে ৫টি সাবমেরিন। ৪৯টি প্যাট্রোল ও কোস্টাল কমব্যাট্যান্ট।

বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ওই একই রিপোর্ট বলছে, ইসরাইলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্ভরশীল আয়রন ডোম ব্যবস্থার ওপর। ধারণা করা হয়, মঙ্গলবার রাতে ইরান যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তার বেশির ভাগই এই ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ব্যবস্থায় আছে একটি রাডার। তা যেকোনো হামলাকারী বস্তু, তার গতি এবং দিক শনাক্ত করতে সক্ষম। এরপর কন্ট্রোল সেন্টার হিসাব কষে ওই বস্তু বা ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের কোনো শহরের জন্য হুমকি কিনা। যদি দেখা হয়, তা কোনো হুমকি নয়, তবে তা ফাঁকা মাঠে পড়তে দেয়া হয়। যদি হুমকি হয়, তাহলে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। এক্ষেত্রে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে থাকে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র। ইসরাইলের বিভিন্ন জায়গায় এমন ১০টি আয়রন ডোম ব্যাটারি স্থাপন করা আছে। অন্য যেসব ব্যবস্থা আছে তা মধ্যম ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করে। ডেভিড স্লিং ইন্টারসেপ্টর ৪০ কিলোমিটার থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করতে পারে। অন্যদিকে দ্য অ্যারো সিস্টেম ২৪০০ কিলোমিটার পাল্লার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করতে পারে।

ওদিকে ফেব্রুয়ারিতে ইরান স্বল্পপাল্লার নিম্ন উচ্চতার আজারাখশ মোতায়েন করে। এটি হলো ইনফ্রারেড ডিটেকশন সিস্টেম। এতে আছে রাডার, ইলেকট্রো-অপটিক সিস্টেম। এসব ব্যবহার করে কোনো হামলাকে শনাক্ত করে তা নিষ্ক্রিয় করা হয়। যানবাহনে করে এই ব্যবস্থা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া যায়। তবে ভূমি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার বিভিন্ন রেঞ্জের ব্যবস্থা আছে ইরানের কাছে। এর মধ্যে আছে কমপক্ষে ৪২টি রাশিয়ায় তৈরি দূরপাল্লার এস-২০০এস, এস-৩০০এস এবং স্থানীয় পর্যায়ের বাভার-৩৭৩। আছে কমপক্ষে ৫৯টি মধ্যম পাল্লার ইউএস এমআইএম-২৩ হক, এইচকিউ-২জে এবং খোরদাদ-১৫। আছে চীনে তৈরি ২৭৯টি স্বল্পপাল্লার সিএইচ-এসএ-৪ এবং ৯কে৩৩১ টোর-এম১।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র: যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের মতে, মধ্যম ও স্বল্পপাল্লার কমপক্ষে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে ইরানের ভাণ্ডারে। অন্যদিকে ইসরাইলের আছে কমপক্ষে চারটি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

পারমাণবিক সক্ষমতা: যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল এসোসিয়েশনের হিসাব মতে, ইসরাইলের অস্ত্রভাণ্ডারে আনুমানিক ৯০টি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম অস্ত্র আছে। তবে ইরানের এমন অস্ত্র নেই বলে মনে করা হয়। তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। পশ্চিমাদের অভিযোগ এর মধ্যদিয়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। তবে ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

mzamin

শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে

দেশের উৎপাদনমুখী বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ থামছে না। পোশাক খাতে হামলা ও ভাঙচুরের কারণে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। দাবি মেনেও হচ্ছে না স্থিতিশীল। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিও। অচল হয়ে পড়েছে অনেক কারখানা। ফলে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অনেকেই জেলে। কেউ কেউ পলাতক। বেতন দিতে পারছে না অনেক কারখানার মালিকপক্ষ। যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক ব্যবসার ওপর। এতে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না হলে সামনে দুর্ভোগে পড়তে হবে বলেও শঙ্কা তাদের। এ ছাড়া সুদ ব্যয়ের সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে অনেকেই খেলাপি হয়ে পড়ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। এ সময় পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কারখানায় অসন্তোষ চলছে (এসব কারখানার সাবেক সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজনই মালিক)। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। নতুন অর্ডার দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন তারা। এ শিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি খাত এবং অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। এ খাতকে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল হতে দেয়া উচিত নয়। অবিলম্বে এর অবসান হওয়া উচিত।

জানা গেছে, সরকার পতনের পর থেকে সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও গ্রেপ্তার করেছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের। অনেকেই পলাতক রয়েছে। এতে বেতন বন্ধ হয়েছে অনেক কারখানায়।

আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেশের সবচেয়ে সমালোচিত এস আলম গ্রুপ। গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তিনি দেশের বাইরে আছেন। সাদ মুসা গ্রুপের মুহাম্মদ মোহসিন। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ব্যাংক মালিকদের নেতা নজরুল ইসলাম মজুমদার। এ ছাড়া আরও অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী কর্ণধার পলাতক ও জেলে আছেন।

কারখানা মালিকরা বলছেন, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আমদানিকারক দেশগুলোতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়বেন রপ্তানিকারকরা। শুধু তাই নয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে ব্যবসায়ীরা কারখানা বন্ধ করে দেয়ায় শ্রমিকরাও চাকরি হারাতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও অপরাধীদের দমনে যথাযথ পদক্ষেপের অভাব দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, কোনো পক্ষের ইন্ধনে শিল্পে এই অরাজকতা চলছে। যৌথ বাহিনী শিল্প সচল রাখার বিষযে যে সহযোগিতা করছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট। কারখানায় অরাজকতা সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য যৌথ বাহিনীকে অনুরোধ জানান তারা। পোশাক শিল্পে সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করার জন্য যৌথ বাহিনীকে পোশাক শিল্প পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিজিএমইএ এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল্লাহ হিল রাকিব।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলের ‘নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা’ এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেয়ার চেষ্টার কারণেই অশান্ত তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। বিক্ষোভ করেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। পোশাক শিল্পাঞ্চল নবীনগর, চন্দ্রা, বাইপাইল, আবদুল্লাপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ ৩০ কিলোমিটার যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হস্তক্ষেপে এসব অঞ্চলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ব্যবসায়ী, মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সরকারের নানামুখী উদ্যোগের পরও শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ঝুটসহ কারখানা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কিছু কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৎপরতা, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা, বাইরের ইন্ধনসহ বিভিন্ন কারণে পোশাক কারখানাগুলোর অস্থিরতা বন্ধ হচ্ছে না।

এদিকে বর্তমান সরকার মনে করছে গুজব ছড়িয়ে গার্মেন্টসে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জড়িতদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪শে সেপ্টেম্বর পোশাক শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ানোসহ শ্রমিকদের ১৮টি দাবি মেনে নেয় মালিকপক্ষ। শিল্পাঞ্চলে ফিরে আসে কর্মচাঞ্চল্য। এরপর সব পোশাক কারখানা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে গত সপ্তাহে সহিংসতা ও অস্থিরতার তীব্রতা কিছুটা কমলেও এ সপ্তাহে আবারো আন্দোলন শুরু করেছে শ্রমিকরা। আবারো শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হওয়ায় এর পেছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে।
মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে পোশাক খাতের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে কথা বলেন বিএনপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় দেশের তৈরি পোশাক খাতে যে অস্থিরতা চলছে, তাকে ‘পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগী মালিকদের পরিকল্পিত চক্রান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন রিজভী।

ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারকদের একজন উদ্যোক্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাজারে পণ্য সরবরাহ করা খুবই কঠিন হবে।
কোকোলা ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মো. মহসিন বলেন, শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণে আমাদের উৎপাদন ১০-১২ দিনের জন্য বন্ধ ছিল। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে আমরা সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবো না।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসর্‌স এসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক বলেন, ৫ই আগস্টের পর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে অস্থিরতা দেখা দিলেও আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করেছি। শিল্প ও অর্থনীতির স্বার্থে সরকারের উচিত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, তা না হলে রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলেও জানান তিনি। একজন রপ্তানিকারক দাবি করেন, যদি নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয় তাহলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পণ্য রপ্তানি করতে সমস্যায় পড়তে হবে। বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা আমাদের ওপর আস্থা হারাবে। তাই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়।

একজন কারখানা মালিক বলেন, অনেক কারখানায় সাবেক সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন মালিক। সেখানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে বেতন পরিশোধ হয়নি। আবার কিছু কারখানায় ব্যবসায় ভালো যাচ্ছিল না গত এক বছর ধরেই। ২/৩ মাস বকেয়া পড়ে গেছে। এ থেকেই এবারের আন্দোলনের সূত্রপাত।
তিনি বলেন, এতদিন গাজীপুর-আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ বা এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ মূল ভূমিকা রাখতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়ায় এক মাস ধরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তবে আশা করছি দ্রুতই তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে শুরু করবে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, কিছু কারখানায় বেতন ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা আছে, সেটা বিজিএমইএ দেখছে। এর বাইরে নানা কারণ দেখিয়ে কিছু সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে শ্রমিকদের চেয়ে বাইরের লোকজন বেশি সম্পৃক্ত বলে মনে হচ্ছে। 

mzamin

২ বিচারপতি পদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন পদত্যাগই উত্তম by তবারক হোসেইন

আমি বিস্মিত। আমি বিমূঢ়। আমি স্তম্ভিত। বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকটি টেলিভিশনের স্ক্রলে একটি খবর দেখেই আমার মনের এই অবস্থা। আমি সংবাদটি দেখে বিস্মিত এজন্য যে, বিচারাঙ্গনে এমন ঘটনা অভাবিতপূর্ব। বিচারাঙ্গনে বিচরণ করি, তাই এমন অস্বাভাবিক খবরে বিমূঢ় না হয়ে আর উপায় কি আছে! স্তম্ভিত এই কারণে যদি দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে এমন ঘটনা ঘটে, তবে আমাদের আর কতো অস্বাভাবিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা দেখতে হবে এই ভেবে।

খবরটি হলো, গত ৪ঠা আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এক দ্বৈত বেঞ্চ দু’টি রিট আবেদন খারিজ করে যে আদেশ দিয়েছিলেন, সেটি আজ প্রত্যাহার করেছেন। বিচারক নিজে পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে গিয়ে বিব্রত বোধ করে ৪ঠা আগস্ট প্রদত্ত আদেশটি প্রত্যাহার করে মামলাটির নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়েছেন।

ঘটনাটা আরেকটু খোলাসা করি। গ্রামীণ কল্যাণ একটি সেবামূলক সংস্থা। এটির প্রতিষ্ঠাতা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ২০১২-২০১৭ সালের মধ্যে এই সংস্থাটি কর ফাঁকি দেয়ায় ৬৬৬ কোটি টাকা বকেয়া কর দাবি করে দু’টো নোটিশ পাঠালে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করেন। দু’টো রিট আবেদন প্রাথমিক শুনানি করে হাইকোর্ট বিভাগ রুলনিশি জারি করেন। এর বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আপিল বিভাগে আপিলের অনুমতি প্রার্থনা করে একটি আবেদন করেন। উভয়পক্ষে শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মূল বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন দু’টো ফেরত পাঠান। বিচারপতি খুরশিদ আলম সরকার ও বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ রিট আবেদন দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ৪ঠা আগস্ট এগুলোর রায় দেয়ার জন্য কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত রায় প্রদান করার জন্য নির্ধারিত ছিল।

দৈনিক কার্যতালিকা অনুযায়ী রায় দেয়ার জন্য নেয়া হলে উক্ত বেঞ্চ উভয়পক্ষে সংক্ষিপ্ত শুনানি করে দু’টো রিট পিটিশনেরই রুল খারিজ করে দেন। গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের যে ৬৬৬ কোটি টাকার করের দাবি বহাল রাখা হয়।

রায় শেষে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ্‌ আল মামুন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তারা আপিল বিভাগে আপিল করবেন। হয়তো তারা পূর্ণ রায় পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

আজকের সংবাদ মাধ্যমের খবর হলো, ৪ঠা আগস্ট প্রদত্ত রায় লিখতে গিয়ে একজন বিচারপতি নাকি বিব্রত বোধ করেছেন, ফলে ৪ঠা আগস্ট প্রদত্ত রায় দু’টো প্রত্যাহার করার পর নথি দু’টো সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছে।

এখনও বিচারপতি খুরশীদ আলমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের যে কার্যতালিকা ওয়েবসাইটে রয়েছে তাতে  রিট আবেদন দু’টোর বিপরীতে ‘discharged’ লেখা আছে। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে বৃহস্পতিবার নথিগুলো প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৪ঠা আগস্ট দেশ ছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনার অধীনে, সেদিন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চটি গ্রামীণ কল্যাণের রিট দু’টো খারিজ করে দেন। ৩রা অক্টোবর দেশটির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, এই সময়ে বিচারপতির বিব্রত বোধ কি বার্তা দেয়?

আমরা ছোটবেলা থেকে একটি কথা শুনে আসছি, সেটি হলো, ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না’, আজ হাকিম (বিচারপতি) নড়েছেন, তাদের  হুকুমও নড়েছে। আমি একজন আইনজীবী। ৪ দশকের বেশি সময় ধরে এই আইন অঙ্গনে আছি। আমি কোনো মামলায় প্রকাশ্য আদালতে একটি আদেশ দেয়ার পর পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে গিয়ে কোনো বিচারপতিকে বিব্রত হতে কখনো দেখিনি, কখনো শুনিওনি। এ ব্যাপারে আমাদের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন জ্যৈষ্ঠ বিচারপতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম- তিনি তার কর্মজীবনে এমন ঘটনা শুনেছেন কি-না? তার উত্তর ছিল ‘না’।
এমন ঘটনা আমাদের বিচারালয়ের ইতিহাসে কখনোই ঘটেনি।

এ রকম বিব্রত বোধ করার দু’টি কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয়। প্রথমত, ৪ঠা আগস্ট যে রায় দেয়া হয়েছিল সেটি ছিল তৎকালীন সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী।  কারণ দেশ-বিদেশে এটি সবারই জানা যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড. ইউনূসকে হেনস্তা  করতে চান, তাই তাকে সন্তুষ্ট  করার জন্যে রায় প্রদান করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, হয়তো বিচারকগণ দেখছেন বর্তমানে ক্ষমতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এজন্য তাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই বিব্রত বোধ করেছেন।

দু’টোর মধ্যে যেকোনো কারণেই হোক, এ থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে যে, হাইকোর্ট বিব্রত বোধ করা বিচারপতি তাদের শপথ ভঙ্গ করেছেন। আমাদের সংবিধান  অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগের পর বিচারপতিগণকে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রদত্ত শপথবাক্য পাঠ করতে হয়। এতে তাকে সশ্রদ্ধচিত্তে নিম্ন্নোক্ত বাক্য উচ্চারণ করে  শপথ করতে হয়, “আমি আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত আমার পদের কর্তব্য পালন করিব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব; আমি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব; এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।”

যদি ধরে নেয়া যায় যে, বিচারকগণ বিদায়ী সরকারের চাপে আদেশ দিয়েছিলেন, বা যদি ধরা যায় যে, এখন তারা অনুভব করছেন যে, ৪ঠা আগস্টের রায় যথাযথ ছিল না, অথবা যদি বর্তমান প্রধান উপদেষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এমন বিব্রত বোধ করছেন, এসব ক্ষেত্রেও আমার বিবেচনায় তারা তাদের শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাদের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।

কোনো একটি সংবাদ মাধ্যমে এ রকম একটি বক্তব্য এসেছে যে, জুনিয়র বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামান নাকি এ মামলায় সরকার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে আগে কাজ করেছেন, তাই তিনি বিব্রতবোধ করেছেন। এ যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, কোনো মামলায় কাজ করলে এবং বিচারক নিযুক্ত হওয়ার পর এ মামলা তার আদালতে এলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বিব্রত বোধ করার কথা। এমন তো নয় যে, এ মামলাটি অপরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাই তিনি তা বুঝতে পারেন নি। কারণ সামপ্রতিকালে গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ ব্যাংক, ড. ইউনূস কিছুই অপরিচিত কোনো নাম বা প্রতিষ্ঠান নয়। তাই শুনানির শুরুতেই বিব্রত বোধ করার কথা। যদি এটাকে সত্য বলে ধরে নেয়া যায়, তাহলে একথা বলা কি অযৌক্তিক হবে, তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের কাছে প্রিয় হবার জন্য এ মামলা দু’টো দীর্ঘদিন শুনেছিলেন এবং আইনজীবী থাকার কথা চেপে গিয়েছিলেন। এখন তাদের প্রদত্ত রায়ের পক্ষে কোনো আইনি যুক্তি দাঁড় করতে পারছেন না বলে অনুজ বিচারপতির বরাতে এ অজুহাত সৃষ্টি করেছেন।

ঘটনা যা-ই হোক, এ আলোচনার প্রেক্ষিতে আমার বিবেচনায় ওই দু’জন বিচারপতি তাদের পদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন বিধায় তাদের এ পদ থেকে অব্যাহতি নেয়াই উত্তম ও সম্মানজনক ।

তবারক হোসেইন, সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

mzamin

টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালীর তালিকায় নাহিদ

টাইম ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের ‘টাইম-১০০’ তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কও তিনি। প্রতি বছর বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির এই তালিকা প্রকাশ করে বিখ্যাত সাময়িকীটি। বুধবার এই তালিকা প্রকাশ করে টাইম ম্যাগাজিন।

বাংলাদেশে গত জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠেন নাহিদ ইসলাম। ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে গণঅভ্যুত্থানে প্রধান ভূমিকা রাখেন তিনি। বিশেষ করে গত ৩রা আগস্ট জাতীয় শহীদ মিনারে লাখো জনতার সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হয়ে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন নাহিদ। আর সেই এক দফা দাবি হলো-তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পদত্যাগ।
ওই আন্দোলনেই ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি। এরপর থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন নাহিদ।
সেনাবাহিনীর সমর্থনে হঠাৎ তখন দেশ পরিচালনার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ করেন ছাত্ররা। ছাত্রদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন ৮৪ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ। নাহিদ ইসলাম দায়িত্ব নেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের।
সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক নাহিদের বয়স ২৬ পেরোয়নি। এরমধ্যেই তিনি হয়ে গেছেন মহান এক সংগ্রামের নেতা। গত ২৪শে সেপ্টেম্বর নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎকার নেয় টাইম ম্যাগাজিন।
টাইম ম্যাগাজিন নাহিদ সম্পর্কে লিখেছে, আন্দোলনের অনেক নেতার মধ্যে নাহিদ অন্যতম, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরে জনমানুষের কাছে তার পরিচিতি আরও বাড়তে থাকে।
টাইম ম্যাগাজিনকে নাহিদ বলেছেন, ‘কেউ ভাবতেও পারেনি শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা সম্ভব হবে। কিন্তু তাই করে দেখিয়েছে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা।’ নতুন দায়িত্ব সম্পর্কে নাহিদ বলেন, ‘এখন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। গত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেভাবে ভেঙে পড়েছে, এখন তা মেরামতের চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে নতুন সরকারকে।’
এ বিষয়ে টাইম ম্যাগাজিনকে নাহিদ বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্মের পাল্‌স বুঝতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিংসতার যে পালাক্রম- তার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

mzamin

প্রথম বিদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব by মিজানুর রহমান

প্রথম বিদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার পররাষ্ট্র সচিবসহ বিভিন্ন পদে নাটকীয় পরিবর্তন আনে। গত ৮ই সেপ্টেম্বর নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসাবে দায়িত্ব নেন পেশাদার কূটনীতিক, সর্বশেষ চীনে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী মো. জসীম উদ্দিন। সেগুনবাগিচা বলছে, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দিন-রাত হোমওয়ার্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন সচিব। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানা-বুঝা এবং সরকারের নির্দেশনা পেতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে প্রয়োজনীয় বৈঠকাদি করেছেন। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বিভিন্ন ফর্মেটে সিরিজ আলোচনা ছাড়াও ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ সেরেছেন। ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক এক মাসের মাথায় অর্থাৎ আগামী ৭ই অক্টোবর নিউ ইয়র্কগামী ফ্লাইটে উঠবেন পররাষ্ট্র সচিব। সেখানে দু’দিন কাটাবেন। জাতিসংঘ এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হবে তার। ১০ই অক্টোবর যাবেন ওয়াশিংটনে। সেখানে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, হোয়াইট হাউজ, বাণিজ্য দপ্তর, রাজস্ব ও অর্থ এবং শ্রম দপ্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিবের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা রয়েছে। স্মরণ করা যায়, গত ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পাশাপাশি নানা স্তরে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। গত মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক হয়। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্য পদ প্রাপ্তির পর থেকে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই ছিল প্রথম বৈঠক। প্রথা ভেঙে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরল বৈঠকে মিলিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের  ক্ষেত্রে ঢাকা নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। শীর্ষ বৈঠকের দুদিনের মাথায় ড. ইউনূসের সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেন। তারও আগে গত ১৫ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের এসব বৈঠকে যে আলোচনা হয়েছে বিশেষ করে ভবিষ্যত সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার যে বার্তা স্পষ্ট হয়েছে, তার নিটিগিটি চূড়ান্তকরণে পররাষ্ট্র সচিবের অত্যাসন্ন ওয়াশিংটন সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে সেগুনবাগিচা। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তন এসেছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ তারই প্রতিফলন। দুই শীর্ষ নেতার আলোচনার পথ ধরে সংস্কারের পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে কীভাবে সহযোগিতা এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে আমার ওয়াশিংটন সফরে আলোচনা হবে বলে আশা করছি। 
mzamin

আশুলিয়ায় কঠোর নিরাপত্তায় কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা

আশুলিয়ায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগ দিয়েছেন তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কারখানাগুলোর নিরাপত্তায় শিল্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে ৩১টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। আশুলিয়ার কাঠগড়া, জিরাবো, পুকুরপাড়, নরসিংহপুর ও জামগড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি কারখানার সামনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এর আগে সকালে শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশের পর কাজে যোগ দিয়েছেন অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা। তবে শিল্পকারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, বহিরাগত হামলা, অযৌক্তিক দাবি, কর্মবিরতিসহ চলমান সহিংসতা, বে-আইনি ধর্মঘট, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ২৪টি কারখানায় অনির্দিষ্টাকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছে কর্র্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা কাজ না করে কর্মবিরতি পালন করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বেশকিছু কারখানার মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিশ টাঙ্গানো হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা কারখানাগুলো হলো- জহরচান্দা এলাকার রাতুল গ্রুপ, আল্পস অ্যাপারেলস লিমিটেড, জিরাবো পুকুরপাড় এলাকার তাহারাত ফ্যাশন, দূর্গাপুর এলাকার ফ্যাশন ডট কম লিমিটেড, বুড়িপাড়া এলাকার ইথিক্যাল গার্মেন্টস লিমিটেড, কাঠগড়া এলাকার ডুকাটি অ্যাপারেলস লিমিটেড, আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড, এআর জিন্স  প্রোডিউসার লিমিটেড, জিহান গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, এআর ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেড, ফিউচার ক্লোথিং লিমিটেড, এফজিএস ডেনিমওয়্যার লিমিটেড, আঞ্জুমান গার্মেন্টস।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সকল শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণের সদয় অবগতির জন্য জানানো হয়, বর্তমানে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের গার্মেন্টস শিল্পকারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, বহিরাগত হামলা, অযৌক্তিক দাবি, কর্মবিরতিসহ চলমান সহিংসতা, বে-আইনি ধর্মঘট, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি একইসঙ্গে শিল্পাঞ্চলে সার্বিক আতঙ্কজনক অবস্থার কারণে কারখানা পরিচালনা করার অনকূল পরিবেশ না থাকায় এবং কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণের জান-মাল ও সার্বিক নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ধারা ১৩ (১) মোতাবেক অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ থাকবে।

জিরাবো পুকুরপাড় এলাকার রাইজিং গ্রুপের অ্যাকটিভ কম্পোজিট লিমিটেড কারখানার জেনারেল ম্যানেজার মো. মাহমুদ খালেদ বলেন, সকালে আমাদের কারখানার শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগদান করেছে। আমরা বিজিএমইএ ও সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রমিকদের সকল দাবি মেনে নেয়ায় কোনো ধরনের অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী লুসাকা গ্রুপের কারখানাসহ অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা এসে আমাদের গেটে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের ছেড়ে দিতে হয়। কারখানাটিতে কাজ করা একজন নারী শ্রমিক বলেন, আমরা কাজ করতে চাই বলেই কারখানায় আসি। কিন্তু কারখানায় কাজের পরিবেশ না থাকলে মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিবে বলে শুনেছি। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে আমরা কী করে খাবো। আমরা চাই সরকার যেন এ বিষয়ে দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহীনুর কবির জানান, শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, এপিবিএনসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে না ঘটে সেজন্য কঠোর নজরদারি ও টহল অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বেশকিছু কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে এবং কিছু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

mzamin

বিরল মামলায় কারাগারে সিঙ্গাপুরের সাবেক মন্ত্রী

সিঙ্গাপুর সরকারের সাবেক মন্ত্রী সুব্রামানিয়াম ইসওয়ারানকে ১২ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত। তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার সমমূল্যের উপহারসামগ্রী গ্রহণ এবং বিচারকাজে বাধা দেয়ার দায়ে বৃহস্পতিবার এ সাজা দিয়েছে বিচার বিভাগ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, সিঙ্গাপুরে দুর্নীতির দায়ে এমন সাজা বিরল। গত চার দশকে এবারই প্রথম দেশটির মন্ত্রী পর্যায়ের কেউ এ ধরনের সাজার মুখোমুখি হলেন। ৬২ বছর বয়সী ইসওয়ারন মন্ত্রী থাকাকালীন ৪ লাখ ৩০ হাজার ডলারের উপহার গ্রহণ করার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের পথে বাধা দেয়ার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।  উপহারের মধ্যে রয়েছে ফর্মুলা ১ গ্র্যান্ড প্রিক্সের টিকিট, একটি ব্রম্পটন টি-লাইন সাইকেল, অ্যালকোহল এবং একজনের ব্যক্তিগত জেটে সওয়ার হওয়া।

সিঙ্গাপুরের হাইকোর্টে মামলার তত্ত্বাবধানকারী বিচারপতি ভিনসেন্ট হুং বলেছেন, সাবেক ওই মন্ত্রী দীর্ঘদিন পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সেসময় তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাকে বিপন্ন করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ইসওয়ারান এ মামলা থেকে খালাস পাবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে বিচারপতি হুং বলেছেন, মন্ত্রী তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন যে, তিনি খালাস পাবেন।

ইসওয়ারানের বিরুদ্ধে মোট ৩৫টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর বেশির ভাগই দুর্নীতিসংক্রান্ত। তিনি চাঙ্গিতে তার সাজা ভোগ করবেন। এই কারাগারে সিঙ্গাপুরের মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত বন্দীদের রাখা হয়। এসব কারাগারের সেলগুলিতে কোনো বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। এখানে বেশিরভাগ কয়েদিকে বিছানার পরিবর্তে খড়ের মাদুরে ঘুমাতে দেয়া হয়। ইসওয়ারান সিঙ্গাপুরের প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আদালতে যার বিচার করা হয়েছে। এই মামলায় ইসওয়ারানের দল পিপলস অ্যাকশন পার্টির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন দলের নেতারা। কেননা দেশটিতে এমন ঘটনা বিরল। তিনি কয়েকদিন জামিনে থাকলেও আগামী সোমবার থেকে তার কারাভোগ শুরু হবে বলে জানিয়েছে আদালত।

mzamin

বিশ্বব্যাপী বাড়ছে অদূরদর্শিতা, ২০৫০ সালের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৪০ শতাংশ তরুণ প্রজন্ম

বিশ্বব্যাপী অদূরদর্শিতা বাড়ছে। আর এতে ক্রমবর্ধমান মহামারির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বিশ্ব। নতুন তথ্য অনুসারে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৭৪০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী একটি পর্যালোচনার উপর ভিত্তি করে এই ধারণাটি করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে ৫০টি দেশ থেকে সংগৃহীত ডেটার ওপর ভিত্তি করে মায়োপিয়া বা অদূরদর্শিতার এই পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা অদূরদর্শিতার শিকার হবে।

নতুন এই বিশ্লেষণটি চীনের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে করা হয়েছিল। ২৭৬ টি গবেষণা বিবেচনা করে এই বিশ্লেষণটি প্রস্তুত করা হয়। এরমধ্যে মধ্যে প্রায় ৫.৪ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর-কিশোরী অন্তর্ভুক্ত যাদের প্রায় ২ মিলিয়ন মায়োপিয়ায় আক্রান্ত।

জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী জিংহং লিয়াং ও তার গবেষক দল বলছেন, ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে মায়োপিয়ার প্রকোপ ২৪ শতাংশ থেকে ৩৬ শতাংশে বেড়েছে। জাপানে ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি ছিল, যেখানে বর্তমানে ৮৬ শতাংশ শিশু, কিশোর-কিশোরীরা অদূরদর্শিতার শিকার। এরমধ্যে সর্বনিম্ন দেশটি ছিল প্যারাগুয়ে, সেখানে আক্রান্ত মাত্র ০.৮৪ শতাংশ। যদি শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি একই হারে আরও খারাপ হতে থাকে, তাহলে বিশ্বব্যাপী তরুণদের মধ্যে মায়োপিয়ার প্রকোপ ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ ৭৪০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এশিয়ায় ২০৫০ সালের মধ্যে এর প্রকোপ প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

ডেটা অনুযায়ী যদি এই হারে মায়োপিয়ার প্রকোপ বাড়ে, তাহলে বিগত ৩০ বছরে বিশেষ করে ২০২০ এর পরে মায়োপিয়া  ছড়িয়ে পড়বে। পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারিকে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি খারাপের জন্য দায়ী করেছিল। ২০২০ সালে হংকংয়ের গবেষকরা ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী ৭০৯ শিশুর মধ্যে মায়োপিয়ার দ্রুত বৃদ্ধি শনাক্ত করেছেন। যদিও জেনেটিক্স নিঃসন্দেহে মায়োপিয়াতে একটি ভূমিকা পালন করে, তবে বিশ্বব্যাপী মায়োপিয়ার   সাম্প্রতিক বৃদ্ধির জন্য এটিকে দায়ী করা হয় না। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পিতা-মাতা বাইরে পর্যাপ্ত সময় ব্যয় না করলেও মায়োপিয়ার জেনেটিক হুমকি প্রায় ৬০শতাংশে বেড়ে যায়।

বাইরে খেলা শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার ঝুঁকি কমায় বলে মনে করা হয়। মহামারি চলাকালীন বিশ্বের অন্যান্য অনেক অংশে শিশুরা ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেকটা সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাতে হয়েছে। পর্যালোচকদের যুক্তি, এটি প্রাক-স্কুল শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তারা একটি জটিল সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।

আফ্রিকাতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মায়োপিয়ার প্রকোপ এশিয়ার তুলনায় সাত গুণ কম। শিক্ষার সময়কাল এবং মায়োপিয়া হওয়ার মধ্যে একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। সিঙ্গাপুর ও হংকং-এ দুই বা তিন বছরের কম বয়সী শিশুরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে পড়ার আগে সক্রিয়ভাবে শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। অদূরদর্শিতার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বিভিন্ন কারণে উদ্বেগজনক। মায়োপিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স পরা ব্যয়বহুল হতে পারে। একইসঙ্গে এটি তাদের চোখের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন মায়োপিক ম্যাকুলোপ্যাথি ও রেটিনাল ডিটাচমেন্ট যা উভয়ই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবনযাত্রাকে শুধু প্রভাবিতই করে না, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপও সৃষ্টি করতে পারে।

শিশুদের মধ্যে অদূরদর্শিতা আরও বেশি উদ্বেগজনক। এই কারণে এটি গুরুতর মায়োপিয়াতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যার ফলে চোখের সমস্যা  বাড়তে পারে।

সূত্র: সায়েন্স এলার্ট

mzamin

কেয়ার ভিসায় জালিয়াতি: লন্ডনে কর্মহীন ছেলে সিলেটের দালালদের বিরুদ্ধে পিতার মামলা by ওয়েছ খছরু

প্রায় এক বছর আগে ২৯ লাখ টাকা খরচ করে কেয়ার ভিসায় লন্ডনে ছেলেকে পাঠিয়েছেন মৌলভী আবুল কালাম দুলাল আহমদ। তিনি সিলেটের জাতীয় পার্টির পরিচিত নেতা। নিজের সম্পত্তির অর্ধেক বিক্রি করে স্বপ্ন পূরণে ছেলেকে লন্ডনে পাঠান। কথা ছিল লন্ডনে নেয়ার পর কেয়ার ভিসায় চাকরি দেয়া হবে। কিন্তু লন্ডনে পৌঁছানোর পর ছেলে আবু তাহের তানভীর আহমদ কোম্পানীর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাননি। বারবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে চাকরির জন্য ডাকা হয়নি। তবে সিলেটের এজেন্টরা দাবি করেছেন; লন্ডনে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেয়ার পরও পরবর্তীতে তানভীর যোগাযোগ করেননি। নগরের সোনারপাড়া নবারুন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা দুলাল আহমদ সিলেটের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে গত ২২শে জুন তিন জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় তিনি আসামি করেছেন- ভিনটেজ ইন্টারন্যাশনালের কর্তৃপক্ষ ও ছাতকের বাগবাড়ি এলাকার ইনাম আহমদ চৌধুরী, বড়লেখার চান্দগ্রামের মিলন আহমদ ও সোনারপাড়া এলাকার কাজী লায়েক আহমদকে। মামলায় দুলাল আহমদ জানিয়েছেন- সোনারপাড়াস্থ ভিনটেজ ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে লন্ডনে কেয়ার ভিসার লোক পাঠানো হয় প্রচার হওয়ার পর তার ছেলে তানভীরসহ তারা ইনামসহ আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তানভীরকে লন্ডনে পাঠানোর কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর আসামিদের সঙ্গে তাদের চুক্তিও হয়। পরে চুক্তিমতো তিনি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের ২৩শে মে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন। কেয়ার ভিসা ইস্যু হওয়ার পর ওই বছরের ২৮শে আগস্ট ভিনটেজ ইন্টারন্যাশনালে ২৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এ সময় আসামিরা কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে না বলে আশ্বস্ত করেন। এ ছাড়া তার ছেলেকে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ করে দেবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। মামলার এজাহারে দুলাল জানান- তার ছেলে তানভীর লন্ডনে পৌঁছার পর প্রতিষ্ঠানের কথিত কোনো প্রতিনিধি তানভীরকে রিসিভ করেননি। এমনকি কাজেরও কোনো ব্যবস্থা করেননি। খাওয়া-ধাওয়া সমস্যা হওয়ায় তার ছেলে লন্ডনে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আসামিরা সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে একই অভিপ্রায়ে তার ছেলেকে উন্নত ভিসা প্রদানের নামে মানব পাচারের মতো অপরাধ সংঘটিত করেছে। এজাহারে দুলাল জানান- এ ঘটনার পর পরবর্তীতে আসামিরা নতুন করে আরও ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। নতুবা তার ছেলেকে মানব পাচার চক্রের কাছে হস্তান্তর করে দেবেন বলে হুমকিও দিয়েছেন। তার ছেলের লন্ডনে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। যেখানে পৌঁছার পর আসামিদের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। এ কারণে তার ছেলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই অবস্থায় গত ১০ই সেপ্টেম্বর নগরের জিন্দাবাজারের মারজান শপিং সেন্টারের তৃতীয় তলার এডুএক্সেস প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিচারপ্রার্থী হলে আসামি মিলন ও লায়েক তাকে হুমকি দিয়ে বলেন; ভাড়াটিয়া কিলার দিয়ে হত্যা করে ফেলবেন। এদিকে গতকাল বিকালে মামলার বাদী দুলাল আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- তার ছেলে এখন লন্ডনে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য গিয়েছিল সে প্রতিষ্ঠানে কাজ দেয়া হচ্ছে না। আর ওই প্রতিষ্ঠানের লিখিত অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ চাকরিতে নিচ্ছে না। অন্যদিকে; প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বারবারই কেবল অপেক্ষা করতে বলে। তিনি জানান- এ ব্যাপারে সিলেটের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিকবার দালালদের সঙ্গে বৈঠকে বসলে তারা নানা টালবাহানা করতে থাকে। তার ছেলের বয়স ২৪ বছর। এইটুকু বয়সের একটি ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিলেটের দালালরা ও লন্ডনের কোম্পানির লোকজন যা করছে তা অমানবিক। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই তদন্ত করছে। লন্ডনে থাকা তানভীর আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- বাস্তবে কোম্পানির কাছে কাজ নেই। তারা মিথ্যা কথা বলে লন্ডনে নিয়ে এসে কাজ দিচ্ছে না। এতে করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কোনো মতে খেয়ে না খেয়ে জীবনযাপন করছেন। এদিকে মামলার প্রধান আসামি ইনাম আহমদ চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন; তারা তানভীরের সঙ্গে কোনো প্রতারণা করেননি। তানভীর লন্ডনের যাওয়ার পর তাদের টাকায় তিন দিনের ট্রেনিং করিয়েছেন। পরে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও তিনি যোগাযোগ রাখেননি। এজন্য সিলেটের কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় বলে জানান ইনাম।  
mzamin

সাকিবের জন্য ‘দুই’ চমকের অপেক্ষা by ইশতিয়াক পারভেজ

সাকিব আল হাসান আর দেশে ফিরতে পারবেন না! আপাতত ঘটনা যা ঘটছে এই বাস্তবতা না মেনে উপায়ও নেই। তবে এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনাও আছে। বড় একটি অংশের ধারণা মামলা ও জনরোষ থেকে নিরাপত্তা দু’টি বিষয় সাকিবের দেশের ফেরার পথে বড় বাধা। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি নিজেদের অবস্থান না পরিবর্তন করে তাহলে সাকিবের দেশে ফেরার আশা ছেড়েই দিতে হবে। তবে সরকারের একটি সূত্রে জানা গেছে সাকিবকে নিয়ে আছে তাদের দুই ধরনের চিন্তা। একটি হচ্ছে প্রকাশ্যে না হলেও তাকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হবে তার মামলা নিয়ে সরকারের কোন কিছু করার নেই। আইন মেনে তাতে যা হয় তা মেনে নিতে হবে। কারণ মামলা থেকে তাকে ছাড় দিলে অন্যদের জন্যও এটি উদাহরণ হয়ে যাবে। তার মানে মনে মনে সাকিব যে আশায় আছেন যে তাকে ফেরার সুযোগ দেয়া হবে সেই আশাতে গুড়েবালি। আরেকটি চিন্তাতে থাকতে পারে সাকিবের জন্য দুটি চমক। তাকে খেলার সুযোগ দেয়া হবে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে। আর তার নাম রাখা হবে বিপিএলের ড্রাফটেও। বিসিবির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যদি ১৪ই অক্টোবর বিপিএলের ড্রাফটের তালিকায় সাকিবের নাম থাকে তাহলে তাকে অবসর নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজেও।

জানা গেছে সেটি হলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে ভুল হয়েছে বলে বক্তব্যও দিতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু মুখ খুলতে রাজি হননি। সাকিবকে নিয়ে বিসিবি’র দিক নিদের্শনা কি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিপিএলের ড্রাফটে তাকে রাখা হবে কিনা সেটি নিয়ে এখনো আলাপ হয়নি। আর দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য দল হবে সেটি নিয়ে এখনো বিসিবি কোনো দিক নির্দেশনা দেয়নি।’ বর্তমানে সাকিব আছেন যুক্তরাষ্ট্রে তার পরিবারের সঙ্গে। তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে সেখান থেকেই তিনি দেশে ফিরে এসে টেস্ট খেলার বিষয়ে লবিং করছেন। এ জন্য তিনি কথা বলতে রাজি আছেন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও। জানা গেছে তার আগামী ১৪ বা ১৫ই অক্টোবর দেশে ফেরার ভাবনা আছে। শুধু সবুজ সংকেতের অপেক্ষায়। মূলত সাকিব চাইছেন শেষ টেস্ট খেলতে পারলে তার দেশে থাকা ও আসা যাওয়া নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। সেটি হলে তার বিপিএলে খেলতেও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সূত্রটি জানায়, ‘সাকিব চাইছেন ১৬ তারিখের আগেই দেশে ফিরতে। যতটা জানি তার সঙ্গে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের  যোগাযোগ হচ্ছে। হয়তো চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যাবে। এটি সত্যি যে সাকিব যদি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলতে পারে তাহলে বিপিএলও খেলবে। তবে মূল সমস্যা মামলা নিয়ে।’ শুধু মামলা নয়, সাকিব আল হাসান ও তার স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশিরের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বুধবার পাঠানো এক চিঠিতে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই দম্পতির নাম, কোম্পানি বা সংগঠনের নামে থাকা সঞ্চয়ী হিসাব, চলতি হিসাব, ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ও ডিপোজিট প্লাস স্কিম (ডিপিএস) হিসাবের তথ্য চেয়েছে বিএফআইইউ। ক্রিকেটের বাইরে এসে নানা সময় বিভিন্ন ঘটনায় নিজেকে বিতর্কে জড়িয়েছেন সাকিব আল হাসান। এর মধ্যে শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারি অন্যতম।

গত ২৪শে সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে কারসাজিতে জড়িত থাকায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজির প্রমাণ পাওয়ায় জরিমানা করা হয়। জানা গেছে সাকিব তার অবস্থান পরিবর্তন না করলে দিন দিন তার বিপক্ষে সব অভিযোগের তদন্ত বেগমান করা হবে। তদন্তে প্রমাণ মিললে শাস্তির হাত থেকেও রেহাই পাবেন না। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্যও স্পষ্ট, ক্রিকেটার সাকিবকে নিরাপত্তা দিতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক এমপি হিসেবে তার প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে ছাড় দেয়া হবে না।

mzamin

গোপনে যে কাজ করে যাচ্ছেন তারেক রহমান by কিরণ শেখ

সাত বছর ধরে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তার আগে ছিলেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। পুরো দলের কাণ্ডারি তিনি। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে দলের আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সর্বশেষ জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে দলীয় নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন তার ম্যাজিক নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সরকারকে সহযোগিতা করতে নানামুখী কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিজের নেতৃত্ব ক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে আসা এই নেতা নীরবে অনেকটা গোপনে আরও কিছু কাজ করে আসছেন। যা কখনো সামনে আসেনি। তিনি নিজেও এসব কাজ প্রকাশ্যে আনতে চান না। দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ অসহায় মানুষের জন্য নানা ধরনের সেবা কার্যক্রমে যুক্ত তিনি। বিদেশে অবস্থান করলেও এসব কর্মকাণ্ড তিনি নিজেই সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তদারকি করেন। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, আত্মতৃপ্তির জন্যই তিনি এসব কাজ করে যাচ্ছেন। অসহায় অনেক পরিবারের পুরো দায়িত্ব রয়েছে তারেক রহমানের কাঁধে। তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় মাদ্রাসা, হাসপাতাল। নিজ উদ্যোগেই এগুলোর খরচ বহন করছেন তিনি। বিএনপি স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকে জানেন না তারেক রহমান সরাসরি এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। বিএনপি’র পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ড জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এবং আমরা বিএনপি পরিবারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রথমে বৃদ্ধ এবং এতিম এমন ২৫টি পরিবারের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা ১৩০০ ছাড়িয়েছে।

সাহায্যপ্রাপ্ত একটি পরিবার বগুড়ার গাবতলীতে থাকে। পরিবারের কর্তা পেশায় গ্রাম্য ডাক্তার ছিলেন। তিনি হার্টঅ্যাটাকে মারা যান এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে। বিষয়টি জানার পর তারেক রহমান নিজেই তাদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন। এমন প্রায় দেড়শ’র মতো মানুষের দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। দায়িত্ব নেয়া শিক্ষার্থীদের ১৪ জনের মতো চিকিৎসক হয়ে এখন দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসাবিদ্যায় পড়ছেন আরও কয়েকজন। সেনাবাহিনীতে দু’জন চাকরি পেয়েছেন। পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে এই দু’জনের লেখাপড়ার সমস্ত খরচ বহন করেছেন তারেক রহমান। তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েছিলেন এমন সাত থেকে আটজন প্রকৌশলী হয়েছেন। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান এসব শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিলেও শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সেভাবে জানতে পারেন না।
বগুড়ার গাবতলী থানায় লাঠিগঞ্জের তিন মাথার মোড়ে এতিমদের জন্য একটি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। এই মাদ্রাসায় পড়া প্রায় সব শিক্ষার্থীর দৃষ্টিশক্তি নেই বা আংশিক আছে।  এই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকও অন্ধ। তার উদ্যোগেই এই মাদ্রাসা করা হয়। ২০১১ সালের দিকে এই মাদ্রাসার তথ্য জানতে পারেন তারেক রহমান। তিনি সবকিছু খোঁজখবর নিয়ে মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব নেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ওই মাদ্রাসা চালাচ্ছেন। ২০১৭ সালের দিকে মাদ্রাসার একটি চক্ষু ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল।

তখন পরীক্ষায় দেখা যায় কিছু শিক্ষার্থী চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে উঠবেন। পরে তাদের চিকিৎসা শুরুর নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। চিকিৎসা পেয়ে তাদের সাত জন শিক্ষার্থী এখন চোখে দেখতে পান।
বগুড়ার এই এতিমখানার মতো সারা দেশে আরও ৫টি এতিমখানার দায়িত্ব নিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
গাবতলীর লাঠিগঞ্জ হাফিজিয়া নুরানী মাদ্রাসা ও এতিমখানা- সেখানে ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। সবাই মাদ্রাসায় থেকে পড়াশোনা করেন বিনা খরচে।  
সারা দেশে ১৪৪ পরিবারকে প্রতি মাসে ভাতা দিচ্ছেন তারেক রহমান। দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত এসব পরিবারকে অর্থ দেয়া হয় তার পক্ষ থেকে। ২০১৪ সাল থেকে এই ভাতা দেয়া শুরু করেন তিনি। এ ছাড়া গুম, খুন হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মধ্যে তিনজনের বিয়ের আয়োজন করেন তারেক রহমান নিজ উদ্যোগে। ফেনী, বগুড়া ও সাতক্ষীরায় এই তিন বিয়ের আয়োজন হয়।

অসহায় পরিবারকে নিজের উদ্যোগে ৫টি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন বিভিন্ন এলাকায়। এরমধ্যে ৩টি ঘরের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি ঘরের কাজ চলছে। এরমধ্যে বগুড়াতে দুটি, লক্ষ্মীপুর এবং রাজবাড়ীতে একটি করে। বাকি দুটির একটি লালমনিরহাটে এবং আরেকটি ফেনীতে। কুষ্টিয়ায় দুইজন রিকশাচালককে ঘর নির্মাণ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। বাড়ি নির্মাণ বাবদ ৩ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে তাদের। তারেক রহমান এসব কাজের অর্থের ব্যবস্থা করে দিলেও স্থানীয় বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের নেতারা তা বাস্তবায়ন করেন।
সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১২ জনের কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তারেক রহমান। তারা বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বা পুলিশের নির্যাতনে হাত-পা হারান।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত ও আহতদের এ পর্যন্ত ১৫০ জনকে সহযোগিতা করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

সূত্রমতে, লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে যুবদল নেতা ফেরদৌসকে পুলিশ ধরে নিয়ে নির্যাতন করার ১৫ দিন পর কারাগারে মারা যান তিনি। নিহত এই যুবদল নেতার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। উপহার হিসেবে একখণ্ড জমি কিনে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি। ঘর ও জমি পেয়ে খুশি নিহতের স্ত্রী জেসমিন আক্তার ও দুই সন্তানসহ দলীয় নেতাকর্মীরা।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৬ নং চরজাঙ্গালিয়া ওয়ার্ডের যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন ফেরদৌস আলম। পরে পুলিশ বাড়ি থেকে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে বর্বর নির্যাতন চালায়। চিকিৎসা না দিয়ে নাশকতা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে ১৫ দিন পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান ফেরদৌস আলম। এ ঘটনায় মামলা বা প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দেয়নি পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
নিহতের স্ত্রী জেসমিন আক্তার মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একখণ্ড জমি কিনে ঘর করে দেন। এতে করে সন্তানদের নিয়ে মাথাগোঁজার ঠাঁই হয়।
কমলনগর উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা পাটওয়ারী মানবজমিনকে বলেন, ফেরদৌস আলম ছিলেন ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। পুলিশ অন্যায়ভাবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তাকে নির্যাতন করে হত্যা করে।

লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা মো. আশরাফ উদ্দিন নিজান মানবজমিনকে বলেন, শুধু ফেরদৌস আলমই নয়, এভাবে বহু বিএনপি-যুবদল ও ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলা-মামলা ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। ফেরদৌসের মতো নির্যাতিত প্রত্যেক নেতাকর্মীর পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। ওদিকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত ময়মনসিংহের শহীদ হাফেজ মো. সাদেকের পরিবারকে একটি দোকান করে দিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও আমরা বিএনপি পরিবারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক তারেক রহমান। সাদেকের পরিবারকে এই দোকান বুঝিয়ে দেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সাদেকের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার ১ নং দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালিকা বাড়িতে। এ ছাড়া বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে প্রতিনিয়ত অসহায় মানুষ ও দলের সমস্যাপীড়িত নেতাকর্মীদের সহায়তা করে আসছেন তারেক রহমান। দলীয় সূত্র জানায়- অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজে সরাসরি সহায়তা করেন আর না হয় দলের বিত্তবান নেতাকর্মীদের সহায়তা করতে নির্দেশনা দেন।

প্রকৃতি এবং প্রাণী নিয়ে চিন্তা করেন তারেক রহমান। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ে শুধু ঢাকাতেই এক লাখ নিম গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। বগুড়া খোকন পার্কে (পার্ক নির্মাণের সময়) ১০০ বছরের পুরনো একটি জয়তুন গাছ ছিল। সেই গাছটি কাটার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তখন। সেটি জানার পর তারেক রহমান গাছটি রেখেই পার্ক নির্মাণের কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন গাছটির রক্ষা হলেও কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পার্কটি নতুন করে করার নামে গাছটি কেটে ফেলেছেন। বগুড়ায় রাস্তায় ডিভাইডার করে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত ছিল বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। তিনি নিজের হাতে কিছু গাছ লাগিয়েছিলেন সেখানে।   

আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে অনেক মানবিক কাজ করে আসছেন। তিনি চান না এসব প্রকাশ্যে আসুক। গোপনে, নীরবে তিনি এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। যারা সাহায্য বা সহযোগিতা পাচ্ছে তারাও জানতে পারেন না এটি তারেক রহমান করছেন। তারা মনে করেন বিএনপি বা নেতাকর্মীরা তাকে সহযোগিতা করছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এসব কর্মকাণ্ড আমাদেরও উৎসাহিত করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।

জামিনে মুক্ত মাহমুদুর রহমান

সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাগারে থাকা দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২ থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ সময় কারা গেটে তার আত্মীয়স্বজন, গাজীপুর মহানগর বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাকে বরণ করেন।

কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ এর জেল সুপার আমিরুল ইসলাম জানান, মাহমুদুর রহমানের জামিনের কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছলে তা যাচাই- বাছাই শেষে বিকাল সাড়ে ৩টায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এর আগে সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের মামলায় কারাগারে থাকা দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালত জামিন মঞ্জুর করেন। তিনি গত ২৯শে সেপ্টেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

জয়কে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে ২০১৫ সালের ৩রা আগস্ট রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেছিল পুলিশ। গত বছরের ১৭ই আগস্ট এই মামলায় সাংবাদিক শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমানসহ পাঁচ জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য তিনজন হলেন- জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন, তার ছেলে রিজভী আহাম্মেদ ওরফে সিজার ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ভূঁইয়া।

mzamin

সরকার পতনের পর পালিয়েছেন সেই সাংবাদিক: বইয়ের রয়্যালিটির অর্থ সরকারকে দেননি

বই বিক্রি বাবদ অর্থ প্রাপ্তির প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করেননি বিতর্কিত সাংবাদিক নাজমুল হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জার্নি মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড। মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও টাকা পরিশোধ করেননি তিনি। সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হোসেনের আস্থাভাজন হওয়ায় গ্রাহ্য করেননি মন্ত্রণালয়ের একের পর এক নির্দেশনাও। অভিযুক্ত সাংবাদিক নাজমুল হোসেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সংগ্রহে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ নামের একটি বই বিক্রির সুবাদে জার্নি মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের কাছে মন্ত্রণালয়ের ২ কোটি ৫৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পাওনা ছিল। ২০২০ সালের ৪ঠা আগস্ট নাজমুল হোসেন মন্ত্রণালয় বরাবর একটি চেক প্রদান করেন। তার প্রায় দুই বছর পরে জার্নি এক কোটি টাকা পরিশোধ করে। বাকি এক কোটি ৫৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা এখন পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়নি। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বঙ্গবন্ধু বুক কর্নার’ প্রকল্পে ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ বইটি দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য কেনা হয়। সর্বমোট ৬৫ হাজার ৭০০ কপি বই তখন মন্ত্রণালয় কিনে নেয়। যার মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ১১ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৭৫ টাকা। ২০১৮ সালে ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ বইটি প্রথম প্রকাশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কপিরাইট আইন অনুযায়ী বইটির বাণিজ্যিক স্বত্ব মন্ত্রণালয় অর্থাৎ সরকারের। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে ২০১৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বঙ্গবন্ধু বুক কর্নার’ প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেও মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সরকারি বই হিসেবেই ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ বইটি ক্রয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ২০২০ সালের ৩রা মার্চ সাংবাদিক নাজমুল হোসেন জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের প্রতিষ্ঠান জার্নির নামে বইটির ১০০% কপিরাইট করিয়ে নেন। অনিয়ম ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি করে জার্নি মাল্টিমিডিয়া ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী জার্নি মাল্টিমিডিয়া ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যথাক্রমে ৭৭% ও ২৩% অর্থ ভাগাভাগিতে সম্মত হয়। জার্নি মাল্টিমিডিয়ার এমডি নাজমুল হোসেনের স্ত্রী শারমিন সুলতানা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। এদিকে বইয়ের রয়্যালিটি অবশিষ্ট অর্থ ফেরত চেয়ে নাজমুল হোসেনকে বেশ কয়েকবার চিঠিও দিয়েছে মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের ৩রা অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে অবশিষ্ট অর্থ ফেরত চেয়ে নাজমুলকে চিঠি দেয়া হয়। দুই মাস পর আবারো ৩রা ডিসেম্বর চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু কোনোভাবেই মন্ত্রণালয়ের রয়্যালিটি বাবদ অবশিষ্ট অর্থ ফেরত দেননি নাজমুল। সর্বশেষ টাকা না দিয়েই গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই দেশত্যাগ করেন নাজমুল। ওইদিন হাসিনার পতনের খবর শুনে আর অফিসেও ফেরেননি তিনি- এমনটাই জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, তাকে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে কিন্তু সে টাকা পরিশোধ করেনি। অর্থ পরিশোধ না করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বইটির প্রকাশনায় বিতর্কিত বিষয়গুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আমার সময়ে হয়নি- আগেই হয়েছে। আমি এসে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। যেটি আগেই জবাবদিহিতার আওতায় আসা উচিত ছিল। অন্যদিকে অভিযুক্ত নাজমুল হোসেনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল হবে

আলোচকদের বেশির ভাগই সাইবার নিরাপত্তা আইনটি বাতিল করে নতুন আইনের বিষয়ে মত দেন। পরে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, শুধু সাইবার নিরাপত্তা আইন নয়, পর্যায়ক্রমে সব কালো আইন বাতিল করা হবে। ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টে (ডিএসএ) হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে রাজধানীর বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’ সংশোধন বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। আইন উপদেষ্টা বলেন, এ মামলার সবচেয়ে নির্মম ভিকটিম খাদিজাতুল কোবরা। হাইকোর্ট তাকে জামিন দিয়েছে। তারপর আপিল বিভাগ এই জামিনের তারিখ বার বার পিছিয়ে দেয়। যেন বিচার ছাড়াই তাকে জেলে রাখা যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেছিলাম এটা কি করতেছে আপিল বিভাগ। উনি কি উত্তর দিয়েছিলেন তা বলতে চাই না। এইসব মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ছিল আমাদের। আইন উপদেষ্টা বলেন, আমার মনে হয় অবশ্যই আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা উচিত। সে দিকে আমরা যাবো। পরবর্তীকালে যখন নতুন আইন হবে, এটার মূল উদ্দেশ্য হবে নাগরিক সুরক্ষা দেয়া। সাইবার নিরাপত্তা আইনের মামলাগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের একটা ধারণা আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে সব মামলা প্রত্যাহার করতে পারে। এটা সঠিক নয়। একটা মামলার বিভিন্ন স্তর থাকে। সব মামলা ইচ্ছা করলে প্রত্যাহার করা যায় না। বিশেষ করে যে মামলায় সাজা হয়ে যায়। যিনি সাজাপ্রাপ্ত তার আবেদন ছাড়া মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের  উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, আমি মনে করি সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা উচিত। কারণ এই আইনের সব সংশোধন করলেও মানুষের মনে সংশয় রয়ে যাবে। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের অযোগ্য। এ আইন পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।

বেশির ভাগই আইনটি বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন

সভায় আলোচক হিসেবে বিভিন্ন পেশাজীবী এ আইনের অপপ্রয়োগ, ত্রুটি ও অসঙ্গতির বিষয় তুলে ধরেন। আলোচকদের বেশির ভাগ আইনটি বাতিল করে নতুন আইনের বিষয়ে মত দেন। মতামতের আগে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষে আইনটির বিভিন্ন ধারা সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আলোচনার ঐক্যমতের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘এই আইনটা থাকা উচিত নয়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি তুলেছি যে, আইনটি সংশোধনের অযোগ্য। এটি বাতিল করা উচিত। তার পিছনে কারণ আছে। এই আইনগুলো কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।’

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, মূলত আইন করা হয় জনগনের সুবিধার জন্য। কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা আইনটি করা হয়েছে জনগণের কন্ঠরোধ এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণের জন্য। শুরু থেকেই সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা আইনটি বাতিলের জন্য দাবি করে আসছি। আজ এই সভা থেকে দ্রুত এই কালো আইন বাতিল চাই।

সভায় ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন সাইবার নিরাপত্তা আইন ও দণ্ডবিধিতে থাকা মানহানির শাস্তির বিধান তুলে দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মামলা দিয়ে কীভাবে মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ হওয়া উচিত।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কোবরা তার ওপর ঘটে যাওয়া মানসিক নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে গ্রেপ্তার হয়ে আমাকে ১৫ মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি এখনো ট্রমার মধ্যে আছি। আমার পড়াশুনা বিঘ্নিত হচ্ছে। আমি এ আইন বাতিল চাই।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এর প্রস্তাবিত সংশোধনী তুলে ধরেন আইন ও বিচার উপদেষ্টার একান্ত সচিব শামসুদ্দিন মাসুদ। তিনি জানান, প্রস্তাবিত সংশোধনীর সংজ্ঞায় ‘মানহানি’র দফাটি সম্পূর্ণ রহিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ সংক্রান্ত ১৭ ধারায় ছয় বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা পরিবর্তে ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেমে বেআইনি প্রবেশ সংক্রান্ত ১৮ ধারায় তিন বছর কারাদণ্ডের পরিবর্তে দুই বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনের ২১ (১) ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা সম্পর্কে বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি ও কুৎসামূলক প্রচারণায় পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান সম্পূর্ণ রহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনের ২৭ ধারায় সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটন সংক্রান্ত অপরাধে ১৪ বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের পরিবর্তে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচারে ২৯ ধারায় ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধানটি সম্পূর্ণরূপে বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীতে। আইনের ৪৭ (ক) ধারায় মামলা দায়েরের বিষয়ে বলা হয়েছে, সরাসরি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, তার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়া অন্য কেউ এই আইনে মামলা করতে পারবে না বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইন, প্রবাসী কল্যাণ ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’ সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধনী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে মতামত তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের  অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ইকতেদার আহমেদ, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের  আইনজীবী শিশির মনির,  ইংরেজি দৈনিক দ্য ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম  ভিকটিম খাদিজাতুল কোবরা  প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।