Sunday, June 28, 2015

সিলেটের সাবেক ডিসি শহিদুল চলতেন স্ত্রীর ইশারায় by দীন ইসলাম

সিলেটের সাবেক ডিসি মো. শহিদুল ইসলাম চলতেন স্ত্রী শাহনাজ ইসলামের আঙুলের ইশারায়। তার স্ত্রীকে ম্যানেজ করতে পারলে সিলেট জেলা প্রশাসন থেকে কোন কাজ বাগিয়ে আনা কঠিন হতো না। এমনটাই এতদিন প্রচলিত কথা ছিল সিলেটের বিভিন্ন মহলের মুখে মুখে। কোন অকাজকে কাজে পরিণত করতে সিলেটে কর্মরত প্রশাসন ছাড়া অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়লে বিশেষ জেলায় বাড়ি ও মন্ত্রীর নাম ভাঙ্গাতেন। এ মওকাকে কাজে লাগিয়েই দোর্দণ্ড প্রতাপে সিলেটের সিভিল প্রশাসন চালান সিলেটের সদ্য সাবেক এ ডিসি। তবে নানামুখী বিতর্কিত ভূমিকার কারণে গত ১০ই জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে বদলি করা হয়। এরপর কয়েক দিন নামামুখী তদবির করেও সিলেট জেলার ডিসি পদে থাকতে পারেননি শহিদুল ইসলাম। সিলেট জেলার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দিয়ে তদবির করান এবং বিশেষ জেলার অধিবাসী হিসেবে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসন ক্যাডারের ১০ম ব্যাচের এ কর্মকর্তাকে সিলেটের ডিসির পদ থেকে গত বৃহস্পতিবার বিদায় নিতে হয়েছে। নতুন ডিসি পদে দায়িত্ব নিয়েছেন জয়নাল আবেদীন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের সাবেক ডিসির পরিবারের ব্যবহৃত গাড়ি থেকে র‌্যাব কর্তৃক ফেনসিডিল উদ্ধার ও ড্রাইভার গ্রেপ্তারের পর দুমাস স্বপদে বহাল ছিলেন। বিশেষ একটি জেলায় বাড়ি হওয়ার কারণে এমন সুবিধা পেয়েছেন তিনি। এমনটা বলাবলি করছেন প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণের বিল প্রদানে অনিয়ম, সরকারি খাসজমি ব্যক্তি নামে রেকর্ড করিয়ে দেয়া ও ভূমি অফিসের কর্মচারীদের বদলির মাধ্যমে দুই হাতে অর্থ কড়ি কামিয়েছেন তিনি। এছাড়া যেসব জমি দিনের পর দিন ধরে নানা আইনি মারপ্যাঁচে নামজারি হচ্ছিল না ওইসব নামজারি করিয়ে দিয়েছেন। এনিয়ে সিলেটের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ১১ই আগস্ট থেকে ২০০৬ সালের ২রা মে পর্যন্ত সাবেক ডিসি শহিদুল ছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এছাড়া ২০০৭ সালের ২১শে জুন থেকে ২০০৯ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সিলেট জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদে দীর্ঘ সময় চাকরি করার কারণে সবকিছুই ছিল তার নখদর্পণে। এ কারণে ২০১৩ সালের ৫ই মে সিলেটের ডিসি পদে পোস্টিং পাওয়ার পর পুরনো লোকদের মাধ্যমে দুই হাতে অর্থকড়ি কামানো শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদ থেকে প্রত্যাহার হয়ে একই জেলায় ২০১৩ সালে জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়া ঠিক নয়। এর মাধ্যমে প্রশাসন আরও বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সিলেট ডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ডিসির পরিবারের ব্যবহৃত প্রগতি থেকে কেনা পাজেরো জিপ (সিলেট-ঘ ১১-০২৫৭) থেকেই গত ১৪ই এপ্রিল ৩৭৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে র‌্যাব-৯ এর সদস্যরা। শহিদুল ইসলাম ডিসি পদে যোগদানের পর থেকে এ ব্যবসা করছেন বলে র‌্যাবকে জানান ওই গাড়ির ড্রাইভার রুমন মিয়া। এনিয়ে প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় হয়। ফেনসিডিলসহ ডিসির ড্রাইভারকে আটকের পর র‌্যাব-৯ এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব জানতে পারে দীর্ঘ দিন ধরে একটি সরকারি গাড়ি দিয়ে  ফেনসিডিল আনা-নেয়া হচ্ছে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে রুমন মিয়া সার্কিট হাউজ থেকে উপশহরে যাচ্ছিল। পথে শিবগঞ্জ এলাকায় গাড়ি তল্লাশি করে ৩৭৫ বোতল ফেনসিডিলসহ তাকে আটক করা হয়। রুমন দুবছর ধরে ফেনসিডিল আনা-নেয়ার কাজ করছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে সেনাবাহিনীর আলাদা কমান্ডিং এরিয়া হচ্ছে। এর জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির বিল নিয়ে নানা নয়ছয় করেন সাবেক ডিসি শহিদুল। এ বিষয়ে একটি মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে চলমান রয়েছেন। অদৃশ্য শক্তির বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা, গাড়ি থেকে ফেনসিডিল উদ্ধারের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলেও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেতে বেগ পেতে হয়নি সাবেক ডিসি শহিদুলের। এখন তিনি কর্মরত আছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক পদে। গতকাল এ পদে যোগদানের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে যোগদানপত্র দিয়েছেন। সাবেক ডিসি মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে যা বলা হচ্ছে তা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ আমার স্ত্রী বেশির ভাগ সময় ঢাকায় থাকতেন। তার পরিবারের গাড়িতে ফেনসিডিল বহন সম্পর্কে তিনি বলেন, গাড়িটি ছিল ডিসি পুলের গাড়ি। এটা আমার পরিবারের ব্যবহৃত কোন গাড়ি নয়। তার বিরুদ্ধে আনা অন্য অভিযোগ সম্পর্কে শহিদুল ইসলাম বলেন, রেকর্ড করে দেয়ার দায়িত্ব ডিসির নয়, অন্যদের। 

স্বপ্নের বাজেটের দুঃস্বপ্নের পরিণতি! by বদিউল আলম মজুমদার

আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার একটি ‘স্বপ্নের বাজেট’ সংসদে উত্থাপন করেছেন, যা থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। সর্বকালের সর্ববৃহৎ এ বাজেটের জন্য কর ও অন্যান্য খাত থেকে প্রাক্কলিত আয় হলো ২ কোটি ৮ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ৮৬ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, যা আমাদের জিডিপির ৫ শতাংশের সমতুল্য। এই বিরাট পরিমাণের ঘাটতি পূরণের সম্ভাব্য উৎস হলো: ব্যাংকঋণ ৩৮ হাজার ৩৮০ কোটি, বৈদেশিক সাহায্য ৩০ হাজার ৪৫০ কোটি এবং ব্যাংক-বহির্ভূত ঋণ ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী—এমনকি অর্থমন্ত্রীর মতেও এটি ‘সত্যিকারের উচ্চাভিলাষী’ এবং এর বাস্তবায়ন সম্পর্কে তাঁরা সন্দিহান। আবার অনেকে সন্দিহান কর ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাক্কলিত আয়ের বাস্তবতা সম্পর্কে। প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়ন সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার অবশ্যই যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে, কারণ অতীতেও আমাদের অর্থমন্ত্রীরা উচ্চাভিলাষ প্রদর্শন করে সাফল্য দেখাতে পারেননি। বস্তুত বাজেট কাটছাঁট করা, বিশেষত এডিপির কাটছাঁট আমাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এমনকি চলতি বছরের বাজেট থেকেও ইতিমধ্যে ১০ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা কাটছাঁট করার প্রস্তাব ইতিমধ্যে সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
বিরাট অঙ্কের প্রস্তাবিত বাজেটের পেছনে একটি বড় কারণ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সেই স্থবিরতা পূরণের জন্য সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এটি সত্য যে অনেক দিন থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে স্থবিরতা বিরাজ করে আসছে, যদিও বেসরকারি বিনিয়োগ একটি গতিশীল অর্থনীতির প্রাণশক্তি সমতুল্য। কিন্তু সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ অনেকগুলো কারণে বেসরকারি বিনিয়োগের যথাযথ বিকল্প হতে পারে না।
প্রথমত, সাধারণত অনুৎপাদন খাতেই সরকারি ব্যয় বেশি করা হয়। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগের ন্যায় সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে জাতীয় উৎপাদন ক্ষমতা সমহারে বৃদ্ধি পায় না। আমাদের আগামী অর্থবছরের জন্য এটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য বিরাট পরিমাণের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সরাসরিভাবে আমাদের জাতীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না।
দ্বিতীয়ত, সরকারি খাতে ব্যাপক হারে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন বিরাজমান এবং এ-সম্পর্কিত বহু ভয়াবহ কাহিনি জনগণের জানা। সরকারি ব্যাংক লুটের বহু শিরোনাম সংবাদপত্রের পাতায় আমরা পড়েছি এবং এসব প্রতিষ্ঠানের বিরাট অঙ্কের মূলধন ঘাটতি প্রস্তাবিত বাজেট থেকে পূরণ করা হবে। এভাবে সরকারি খাতে ব্যয়ের মাধ্যমে অনেক মূল্যবান সম্পদের অপচয় ও অপব্যবহার হয়। এমনকি সরকারি বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট অবকাঠামো ও পণ্যও অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের হয়। তাই সরকারি বিনিয়োগ থেকে সর্বোচ্চ প্রতিদান ও ফলপ্রসূতা আশা করা যায় না।
তৃতীয়ত, মেগা বাজেট থেকে সরকারি অর্থায়নে গৃহীত অনেক প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদিভাবে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে সহায়ক হবে না। উদাহরণস্বরূপ, প্রস্তাবিত কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটালেও ভবিষ্যতে এগুলো আমাদের পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিজ্ঞানে আস্থা থাকলে বলতে হবে যে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত রামপাল প্রকল্প আমাদের সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে, যে ক্ষতি জাতির জন্য হবে অপূরণীয়। মহেশখালীতে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উত্তরবঙ্গের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এক বিরাট মরণফাঁদ তৈরি করতে পারে। যদিও এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের অধিকাংশ বিদেশ থেকে আসার কথা, আমাদের সরকারের বিনিয়োগও এগুলোতে থাকবে।
চতুর্থত, বর্তমানে আমাদের সমাজে ফায়দাতন্ত্রের এক ভয়াবহ সংস্কৃতি বিরাজমান, যার ভিত্তি মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতদুষ্টতা। আমাদের দেশে সরকারি খাতে বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থে। অনেক বড় বড় প্রকল্পে মাঝপথে বিরাট পরিমাণের ‘কস্ট ওভাররান’ বা ব্যয় বৃদ্ধি ঘটে মূলত স্বার্থান্বেষীদের স্বার্থে। তাই আমাদের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত অনেক প্রকল্পেই স্বচ্ছতা-জবাবদিহি তথা সুশাসনের অভাব দৃশ্যমান। ফলে সরকারি খাতে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূল্যবান সম্পদের যথার্থ ব্যবহার ব্যবহৃত এবং অপব্যবহার নিশ্চিত হয়।
ফায়দাতন্ত্রভিত্তিক রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। দীর্ঘদিন ধরে ফায়দাবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি ইত্যাদির কারণে আমাদের দেশে বর্তমানে একশ্রেণির ব্যক্তি, বিশেষত পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি বিরাট অর্থকড়ির মালিক হয়েছেন। গত কয়েক দশকে এ নব্য ধনিকশ্রেণি—প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ভাষায় ‘বাজিকর’ অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে ক্রমাগতভাবে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করছেন। এর মাধ্যমে সারা দেশে এখন অনেক গডফাদার সৃষ্টি হয়েছে, যাঁদের হাতে একাধারে অর্থ, পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। আর ক্ষমতাসীন দলের সৌজন্যে এসব গডফাদাররা বর্তমানে একধরনের ‘ইমপিউনিটি’ বা অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার অধিকার ভোগ করেন। এ ছাড়া এসব গডফাদারদের অনেকেই বিদেশে অর্থ পাচারে লিপ্ত। বস্তুত এঁদের কারণে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের দ্বিগুণের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিরাজমান ফায়দাতন্ত্র, যা গডফাদার সৃষ্টিতে সহায়তা করে, আমাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। স্বপ্নের বাজেটে ফায়দা বিতরণের জন্য অধিক অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বর্তমান পদ্ধতি অব্যাহত রাখা হলে—যা করতে আমরা বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে—আমাদের রাজনীতি ভবিষ্যতে পুরোপুরি গডফাদারদের করায়ত্ত হয়ে যেতে পারে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে টাকা বানানোই এই গডফাদারদের জীবনের মূল লক্ষ্য, এঁরা কারও প্রতি অনুগত নন এবং আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, সে ব্যাপারে তাঁদের অনেকেরই সামান্যতম ধারণাও নেই। তাই ভবিষ্যতে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এসব ব্যক্তিদের পুরোপুরি করায়ত্ত হলে আমরা চরম বিপজ্জনক অবস্থায় নিপতিত হব।
স্বপ্নের বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা ফায়দাতন্ত্র আমাদের জন্য আরেক দিক থেকেও দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাজেটে বরাদ্দ অনেক বাড়লেও বরাদ্দের পরিমাণ সীমাহীন হতে পারে না। তবে ফায়দাতন্ত্রভিত্তিক রাজনীতিতে ফায়দার লোভে বহু ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যা ফায়দার চাহিদাকে ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে দেয়। বস্তুত সংবাদপত্রের একটি সাম্প্রতিক শিরোনাম ছিল—দল কর, টাকা বানাও। এ ছাড়া ফায়দাপ্রাপ্তরা তাদের প্রাপ্তির পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ফায়দার চেইনের ওপর একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাবে, এটাই স্বাভাবিক। এভাবে ক্রমাগত ফায়দার চাহিদা বৃদ্ধি এবং ফায়দা প্রাপ্তির পরিমাণ বৃদ্ধির সর্বাত্মক প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সহিংসতা সৃষ্টি হতে বাধ্য, যা আমরা আতঙ্কের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লক্ষ করছি। তাই বিরাজমান ফায়দাতন্ত্রের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে আকাশচুম্বী বাজেট বরাদ্দ ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব ও হানাহানি আরও উসকে দেবে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটতে পারে।
এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা পোষাতে বাজেটে সরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও এই প্রস্তাব বাস্তবে বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও নিরুৎসাহিতই করতে পারে। যখন নিজস্ব ব্যয় ও বিনিয়োগের জন্য সরকারকে বাজার থেকে ধার করতে হয়, তখন অর্থনীতিতে একধরনের প্রভাব পড়ে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়ে থাকে। সরকারের ধার করার কারণে মূলধন বাজারে বিনিয়োগযোগ্য মূলধনের চাহিদা বেড়ে গেলে এবং এর ফলে সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হলে অর্থনীতিতে এ ধরনের ক্রাউডিং আউট বা বেসরকারি বিনিয়োগের নিরুৎসাহকরণ ঘটে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাসহ সামাজিক খাতে বিনিয়োগের হার কমার কারণে আমাদের বিরাজমান ‘সক্ষমতার ঘাটতি’ আরও বাড়তে পারে, যার বিরূপ প্রভাবও দুর্ভাগ্যবশত বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর পড়তে পারে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

‘সুলতান’ এরদোয়ানের হোঁচট খাওয়া by মনজুরুল হক

হোঁচট খেলেন সুলতান। বেশ বড় রকমের হোঁচট বলা যায়, কেননা আঘাত দৃশ্যত হালকা মনে হলেও কোমর সোজা রেখে তিনি আর দাঁড়াতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্ন অনেকেই ইতিমধ্যে রাখতে শুরু করেছেন। অথচ মাত্র কদিন আগেও মনে করা হচ্ছিল সুলতান সম্ভবত ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের প্রেতাত্মায় জীবন সঞ্চারিত করে নিজেই হয়ে উঠবেন মুসলিম বিশ্বের অধীশ্বর, আর সেই সঙ্গে বিশ্বরাজনীতির একজন লড়াকু খেলোয়াড়। অন্তত সে রকম এক গন্তব্য ঠিক করে নিয়েই হাঁটছিলেন তিনি এবং সেই হাঁটার পথে অসতর্ক পদচারণ এখন সুলতানকে ফেলে দিয়েছে মস্ত বড় এক গাড্ডায়।
২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে টানা ১১ বছর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তুরস্কে এতটা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নেতাই ভোটের মাধ্যমে জনগণের আস্থা লাভ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। তুর্কি ভাষার আদ্যাক্ষরের সংক্ষিপ্ত নামকরণ একেপি নামে পরিচিত তুরস্কের ইসলামপন্থী ন্যায় ও গণতান্ত্রিক দলের নেতা সেটা পেরেছেন নিজেকে অনেকটা জনগণের কাছের মানুষ হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে।
তাঁর এই অগ্রযাত্রা কণ্টকমুক্ত পথে হেঁটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে হয়নি। কামাল আতাতুর্কের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকা সমুন্নত রাখা তুর্কি সামরিক বাহিনীর বিরোধিতা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই জনতার সারিতে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এরদোয়ান ও তাঁর অনুসারীরা।
ফলে জনতার আস্থাও তাঁরা সহজেই লাভ করতে পেরেছিলেন, যার ফলে ধর্মনিরপেক্ষ ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত তুরস্কে ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনে সক্ষম হয় একেপি এবং এরদোয়ান হয়ে ওঠেন জনতার পছন্দের নেতা। তবে তাঁর পতনের সূচনাও মনে হয় সেখান থেকেই।
ধর্মকে রাজনৈতিক প্রচারের বাহন হিসেবে ব্যবহার করা দল একেপি শুরু থেকেই হয়ে পড়েছিল একক নেতার ওপর নির্ভরশীল একটি দলে। এরদোয়ানের প্রভাব দলে এতটাই বিস্তৃত যে তাঁর নির্দেশের বাইরে কিছুই সেখানে হয় না। এ-ও যেন হচ্ছে আমাদের সেই সংস্কৃতি—অর্থাৎ, গণতন্ত্র সরকারের গঠনের বেলায় মেনে চলব, দলের ভেতরে নয়। সে রকম অবস্থায় এরদোয়ান নিজেও চাননি দলের ভেতরে কিংবা বাইরে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ দাঁড়িয়ে যাক। ফলে ক্রমাগতই তিনি হয়ে উঠছিলেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরের একজন একনায়ক।
কেবল নিজের মন্ত্রিসভা গঠনেই পছন্দের মানুষ তিনি বেছে নেননি, এমনকি দেশের সাংবিধানিক প্রধান প্রেসিডেন্টের পদ অলংকৃত করা মানুষটিও যেন হন তাঁরই একজন কলের পুতুল, সেটাও তিনি নিশ্চিত করে নিতে চেয়েছিলেন। সেই পথ ধরেই অবশ্য তুর্কি জনগণ প্রথমবারের মতো দেখতে পেয়েছিলেন জনতার কাতারের একজন নেতার ক্ষমতার মোহে ক্রমেই একনায়ক হয়ে ওঠার স্পষ্ট কিছু ছবি। নিজের দলের ঘনিষ্ঠজন আবদুল্লাহ গুলের প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হয়ে প্রভাববলয় বাড়িয়ে নেওয়া পছন্দ হয়নি প্রধানমন্ত্রীর। ফলে একসময় তিনি ঠিক করে ফেলেন যে নিজেই তিনি বসবেন সেই পদে।
তবে পদের সঙ্গে সাংবিধানিক যেসব দায়বদ্ধতা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে করে দিচ্ছে অনেকটাই সীমিত, সেটাও তাঁর আবার পছন্দ নয়। ফলে তিনি চেয়েছিলেন সংবিধান রদবদল করে নিয়ে এমন একটি প্রেসিডেন্টের পদ তৈরি করে নিতে, নামে যেটা নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হলেও কার্যত যেটা হবে সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্র। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সামনে রেখে পরোক্ষ একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা তুরস্কে তিনি গড়ে নিতে চেয়েছিলেন, যা কিনা ক্ষমতা থেকে তাঁকে অপসারণের প্রক্রিয়াকেও করে তুলবে খুবই কঠিন। আর সে রকম এক হিসাব থেকেই ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদে নিজের বশংবদ এক দলীয় নেতাকে বসিয়ে নিজে হয়ে ওঠেন প্রেসিডেন্ট।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ তখন থেকেই পরোক্ষে তাঁকে ‘সুলতান’ আখ্যায়িত করতে শুরু করে। নিজের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তুর্কি নেতা। এমনকি নিজের ধর্মীয় মতাদর্শের মিত্র ফাতুল্লাহ গুলেনের সঙ্গেও একসময় দেখা দেয় তাঁর বিরোধ এবং নির্বাসিত সেই নেতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব খর্ব করতে তিনি হয়ে ওঠেন খড়্গহস্ত। এতটা মাত্রাতিরিক্ত আত্মপ্রত্যয় যে পরোক্ষে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিল স্খলনের পথে, তা তিনি বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেননি কিংবা চাননি। সে রকম বিধ্বংসী আত্মপ্রত্যয়ের আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় শতাধিক কক্ষের নতুন প্রেসিডেন্ট ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়ায়। এরদোয়ান দাবি করে বসেন আগের ভবনটি তেলাপোকায় এতটাই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে যে মনুষ্যবাসের উপযোগী সেটা এখন আর নেই। নিজেকে তিনি হয়তো আতাতুর্কের প্রেতাত্মা থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন বলেই আতাতুর্কের সময় থেকে রাষ্ট্রপ্রধানদের বসবাসের সেই প্রাসাদ তাঁর মনঃপূত হয়নি।
অনেকেই অবশ্য প্রশ্ন করছেন, এরদোয়ান কেন আগে থেকে সংবিধান সংশোধন করে না নিয়ে নিজে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সংবিধানের ওপর হস্তক্ষেপ করার জন্য ২০১৫ সালের নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? দুটি ভিন্ন হিসাব সেই পথে অগ্রসর হতে তুর্কি নেতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রথমটি হলো এমন কারও ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারছিলেন না, যিনি কিনা সংবিধান সংশোধিত হয়ে যাওয়ার পর প্রচুর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা প্রেসিডেন্টের পদটি স্বেচ্ছায় তাঁর জন্য ছেড়ে দেবেন। কে জানে ক্ষমতার মোহে আটকা পড়ে গিয়ে নিজেরই সে রকম কোনো অধস্তন হয়তো পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো একই পরিণতির দিকে তাঁকেও ঠেলে দিতে পারে। একনায়কের মনমানসিকতার এ হচ্ছে মস্ত এক দায়। কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা তাঁদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হয় না। আর তাই কোনো রকম ঝুঁকি এরদোয়ান নিশ্চিতভাবেই নিতে চাননি।
আর দ্বিতীয় অঙ্কটি হচ্ছে তাঁর হিসাবের ভুল, একনায়কসুলভ গণতান্ত্রিক নেতারা যে ভুল প্রায় সব সময় করে থাকেন। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতাসীন থেকে বিরোধীদের সব রকমভাবে কোণঠাসা করে দেওয়ার পর তিনি অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন যে সংবিধান বদলের জন্য প্রয়োজন হওয়া দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা তাঁর জন্য কোনো ব্যাপারই নয়। আর এসব ভুলের সমন্বিত ফলাফল হচ্ছে তাঁর এই হোঁচট খাওয়া।
একেপি এখনো তুরস্কে হচ্ছে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তবে সরকার গঠনের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলের না থাকায় শেষ পর্যন্ত হয়তো দ্বিতীয় কোনো শরিককে নিয়ে আবারও দল ক্ষমতাসীন হবে। আর সংবিধান পরিবর্তন সম্ভব না হওয়ায় এরদোয়ান হয়ে উঠবেন ঠুঁটো জগন্নাথ প্রেসিডেন্ট, নতুন প্রধানমন্ত্রী যঁার ওপর কোনো অবস্থাতেই আর সেভাবে নির্ভরশীল হবেন না। ফলে মাত্র কিছুদিন আগের পরাক্রমশালী নেতা এর মধ্য দিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়লেও তুরস্কের গণতন্ত্রের জন্য সেটা অবশ্যই নতুন সুবাতাস।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

ছেলেরা বোরকা পরে মেয়েরা খোলামেলা

বিশ্বের সর্ববৃহৎ মরুভূমি সাহারা এলাকায় একটি রহস্যময় উপজাতি গোষ্ঠীর খোঁজ পাওয়া গেছে। তুয়ারেগ নামের এ উপজাতি সম্প্রদায়ের ছেলেরা বোরকা পরে থাকে। অন্যদিকে মেয়েরা খোলামেলা হয়ে বেড়ায়। পরিবারের দেখাশোনা ও সম্পদে মেয়েদের কর্তৃত্বই শেষ কথা। কেবল মেয়েরাই বিবাহবহির্ভূত একাধিক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার রাখে। বুধবারের ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। জানা গেছে, চতুর্দশ শতাব্দীর রানী তিন হিনানের মাধ্যমে এ উপজাতি গোষ্ঠীর সূচনা হয়েছে। এখানকার পুরুষরা ‘সাহারার নীল মানব’ নামে পরিচিত।
যাযাবর পুরুষরা নীল রঙের বোরকা পরে সমগ্র শরীর ঢেকে রাখে। ফটোসাংবাদিক হেনরিয়েতা বাটলার ২০০১ সালে মরু অঞ্চলে প্রথম এ ধরনের উপজাতির দেখা পায়। মেয়েরা কেন খোলামেলা থাকে- এমন প্রশ্নের জবাবে তাদের একজন তাকে জানায়, ‘পুরুষরা মেয়ের সুন্দর মুখ যাতে দেখতে পায়- সেজন্য এ ব্যবস্থা।’ মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ উপজাতি নিজেদের ইসলাম ধর্মের অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্য কোনো মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনাচারের সঙ্গে তাদের মিল নেই। এখানকার নারীরাই পুরুষদের ডিভোর্স দেয় এবং বিবাহবহির্ভূত একাধিক যৌন সম্পর্ক করতে পারে। তবে তাদের প্রাচীন প্রথায় এ ব্যবস্থা ছিল না।

এবার ললি কাণ্ডে জড়ালেন প্রিয়াংকা

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) সাবেক চেয়ারম্যান ললিত মোদি ইস্যুতে এবার নাম জড়াল গান্ধী পরিবারের। শুক্রবার ললিত মোদি দাবি করেছেন, লন্ডনের রেস্তোরাঁয় প্রিয়াংকা গান্ধী এবং রবার্ট ভদ্রর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কংগ্রেস পরিচালিত সাবেক দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে পরপর দু’বছর এ দু’জনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবশ্য ললিত মোদির এ দাবিকে অস্বীকার করা হয়েছে। দলটির মুখপাত্র রণদীপ সুরজেওয়ালা বলেন, ‘বিতর্ক বাড়ানোর জন্যই নাম জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ তার দাবি, ‘প্রিয়াংকা বা রবার্টের সঙ্গে কোনো সামাজিক সাক্ষাৎ হয়নি ললিত মোদির। ললিত মোদিকে আমন্ত্রণও করেননি তারা। রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি হতেই পারে। এতে ললিত মোদিকে প্রিয়াংকা বা রবার্ট সাহায্য করেছিলেন বলে প্রমাণ হয় না।’ তিনি বলেন, আসল বিষয় থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা হচ্ছে। তার প্রশ্ন, ‘বড় মোদি’ এবং ‘ছোট মোদি’র মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে?
‘বড় মোদি’ ‘ছোট মোদি’কে সাহায্য করেছিলেন বলেও মন্তব্য করেন রণদীপ সুরজেওয়ালা। দলের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, প্রিয়াংকা এবং রবার্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোনো পূর্বনির্ধারিত ছিল না। রেস্তোরাঁয় আচমকা তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র ললিত মোদির এ সাম্প্রতিক টুইটকে ইস্যু করে কংগ্রেসের সমালোচনা করেছেন। সম্বিত পাত্রের দাবি, ‘লন্ডনে গান্ধী পরিবার ললিত মোদিকে সাহায্য করেছিল।’ তিনি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘ইউপিএ সরকার সেই সময় ললিত মোদির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?’ আইপিএল কেলেংকারিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ললিত মোদিকে বেআইনিভাবে সাহায্য করার দায়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এবং রাজস্থানের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের পদত্যাগ দাবি করেছে কংগ্রেস। এ নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার বিড়ম্বনায় পড়ার পর এবার তারা ললিত মোদির টুইটকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসকে চেপে ধরার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ইরান-আইএস নিয়ে ওবামা-পুতিন ফোনালাপ

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানের পরমাণু ইস্যু ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান বিষয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়। শুক্রবার এ খবর প্রকাশ করেছে এপি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির পর বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের নেতা কথা বললেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দুই নেতা সিরিয়ায় ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সেই সঙ্গে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র সক্ষমতা থেকে বিরত রাখতে চলমান সমঝোতা আলোচনায় পি৫+১-এর ঐক্যের গুরুত্বও তাদের আলোচনায় উঠে আসে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ওবামা পুতিনকে বলেছেন, ইউক্রেইনের সঙ্গে রাশিয়ার অস্ত্রবিরতির শর্তগুলো সমুন্নত রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ইউক্রেইনের ভূখণ্ড থেকে রাশিয়ার সব সেনা ও অস্ত্র সরিয়ে নেয়াও প্রয়োজন। জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এ পাঁচ বিশ্বশক্তির সঙ্গে জার্মানি যুক্ত হয়ে পি৫+১ গঠিত। পরমাণু সমৃদ্ধকরণ থেকে ইরানকে বিরত রাখতে ২০০৬ সালে এ রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে।

‘খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য করতে সরকারের নীলনকশা’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের সিনিয়র  নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য করতে সরকার নীলনকশা করছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। বলেছেন, সরকার যদি এ ধরনের নীল-নকশার বাস্তবায়ন করে তাহলে এর পরিণাম তাদের জন্য কখনও শুভ হবে না।
আজ দুপুরে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। ‘খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে বাদ পড়বেন’ তথ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে ড. রিপন বলেন, ‘হাসানুল হক ইনু প্রকৌশলী ছিলেন জানতাম। তবে তিনি যে জ্যোতিষী তা জানা ছিল না। এই ধরনের মাতলামি কথার নিন্দা জানাই। এগুলো অসুস্থ  লোকের প্রলাপ।  বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, খালেদা জিয়াসহ দলের  নেতাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক মামলা দিয়ে নির্বাচনের অযোগ্য করার নীলনকশা চলছে। আদালতে প্রতি আমাদের আস্থা নেই। এটা ক্যাঙ্গারু  কোর্ট। এই কোর্ট এমন কোনো রায় দিলে তা বিচার হবে না। এটা হবে অবিচার। জনগণ এটা মেনে নেবে না। মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশিত কান্ট্রি প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠেছে তা নিয়ে সরকার কোন প্রতিবাদ দেয়নি। এতে ওই প্রতিবেদন সত্য বলে প্রতিয়মান হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ড. রিপন বলেন, লালবাগ  কেল্লা বিপন্ন হওয়ার পথে। সরকার লালবাগ কেল্লার দেয়াল ভেঙে গাড়ি পার্কিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তার প্রতিবাদ জানালে সরকারের পক্ষ  থেকে বলা হচ্ছে-সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড নেই। অথচ কেল্লার  দেয়াল ভেঙে গাড়ি পার্কিং করার কথা বলছে। ওখানে পার্কিং নয়, বিপনি বিতান করা হবে। অন্যদিকে সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং আন্দর্জাতিক বিমানবন্দর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারের এধরনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন পরিবেশবাদী ও বিশিষ্টজনেরা। আমরাও বলেছি যদি এগুলো করা হয় তাহলে ওই অঞ্চলে শিল্পায়ন হবে না। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে। সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনাকে ‘তুঘলকী পরিকল্পনা’ আখ্যা দিয়ে বিএনপির মৃখপাত্র বলেন, এই সরকার একের পর এক তুঘলকী পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন।  যেখানে তারা জনগণের কথা ভাবছেন না।

‘স্মার্ট’–এর ফাঁদে কলেজে ভর্তি

ওয়েবসাইটের হোমপেজে বড় করে লেখা ‘স্মার্ট অ্যাডমিশন সিস্টেম’। কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণির ভর্তির জন্য এই ‘স্মার্ট’ (চৌকস) ব্যবস্থা এবারই চালু করা হয়েছে। অনলাইনে আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে এই ওয়েবসাইটে। কিন্তু এ ব্যবস্থায় শুরু থেকেই গলদঘর্ম হতে হচ্ছে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের।
আবেদন গ্রহণের সময় অনেক শিক্ষার্থীকে না জানিয়েই কে বা কারা তাদের পক্ষে আবেদন করে ফেলে। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে ওই সব শিক্ষার্থী।
আর এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ‘ডিজিটাল কারিগরি সমস্যায়’ ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা কে কোন কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছে, তার তালিকা প্রকাশ করতে পারছে না শিক্ষা বোর্ড। তিন দফা সময় বাড়িয়ে বোর্ড গতকাল শনিবারও ফল প্রকাশ করতে পারেনি। আজ রোববার প্রকাশ করা হতে পারে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে। তবে সেটাও নিশ্চিত নয়। এ সমস্যার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কর্মকর্তারা দুষছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট)। বুয়েটের সহায়তায় এ কাজটি হচ্ছে। আর কাজটি হচ্ছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে।
তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় ভর্তির কাজও আটকে গেছে। এ জন্য সাড়ে ১১ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক দুশ্চিন্তায় আছেন। নীতিমালা অনুযায়ী, গতকাল থেকে ভর্তির কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। তাদের দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই।
বোর্ডের পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায় ভর্তির জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু ওই দিন কারিগরি সমস্যার কারণে তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি ঢাকা বোর্ড। এ জন্য এক দিন সময় বাড়িয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টায় তালিকা প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শুক্রবার রাতেও তা প্রকাশ করা যায়নি। পরে আরেক দফায় পিছিয়ে শনিবার সকালে প্রকাশ করা হবে বলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও হয়নি। এখন আর সুনির্দিষ্ট করে বলা হচ্ছে না কবে ফল প্রকাশ হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সমস্যা দূর হলেই তালিকা প্রকাশ করা হবে। আজ সকালে তালিকা প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দুজন পদস্থ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বুয়েট কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে বলছে না, কী সমস্যা হয়েছে। তবে তাঁদের ধারণা, ওয়েবসাইটের ‘কোডিং’ (প্রোগ্রামিং সংকেত) সমস্যার কারণে এ সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, যে ওয়েবসাইটে কাজ চলছে, সেখানে বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা হচ্ছে। একাধিকার হ্যাকও হয়েছে। এ জন্যই মনে হয় তালিকা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এর সমাধানে বুয়েটের অধ্যাপক কায়কোবাদকে যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের কর্মকর্তারাও এতে যুক্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক কায়কোবাদ প্রথম আলোকে বলেন, চেষ্টা চলছে।
শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান অসহায়ত্ব প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুবই সমস্যা হয়ে গেল। বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানও যদি এ রকম সমস্যায় পড়ে, তাহলে আমরা কোথায় যাব!’ গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, ‘আশা করছি রোববার ফল প্রকাশ করা যাবে।’
ভর্তির জন্য ৬ জুন আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছিল। শেষ হয় ২১ জুন। এবার অনলাইনে (www.xiclassadmission.gov.bd) এবং বিকল্প হিসেবে আগের মতো খুদে বার্তায় আবেদন গ্রহণ করা হয়। অনলাইনে সর্বোচ্চ পাঁচটি কলেজের পছন্দক্রম দিয়ে আবেদন করতে হয়েছে। এখান থেকে এসএসসির ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর ভর্তির জন্য একটি কলেজ নির্ধারণ করে দেবে শিক্ষা বোর্ড।
এবার মোট ১১ লাখ ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী আবেদন করে। ২৭ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে ভর্তি শেষে ১ জুলাই একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরুর কথা। কিন্তু এখন সবকিছু আটকে গেছে।

প্রেস ক্লাবে দু’পক্ষের উত্তেজনা-ধাক্কাধাক্কি

জাতীয় প্রেস ক্লাবের নতুন কমিটির কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করেছে পুরনো কমিটি। গতকাল এক অতিরিক্ত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত পাস হয়। একই সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বরে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেস ক্লাবের নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস হয়। গতকালের ওই অতিরিক্ত সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের দুগ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। গতকাল বিকাল ৩টায় প্রেস ক্লাবের বিদায়ী কমিটি বার্ষিক সাধারণ সভা আহ্বান করে। এ সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে ঘোষিত কমিটির সমর্থক সাংবাদিকদের একটি অংশ প্রেস ক্লাবের সদস্য পদের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তারা সকালেই প্রেস ক্লাবের বিদায়ী কমিটির ডাকা বার্ষিক সাধারণ সভার ভেন্যু প্রেস ক্লাব মিলনায়তন দখল করে নেন। সেখানে তারা দীর্ঘক্ষণ প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। এ সময় তাদের সমর্থনে আরেকটি গ্রুপ প্রেস ক্লাবের দোতলায় উঠার সিঁড়ির সামনে সমাবেশ করেন। একই সময় একই গ্রুপের দুটি সমাবেশ চলাকালে পুরনো কমিটির সমর্থকরা প্রেস ক্লাবের কাচের দরজার বাইরে সমাবেশ করেন। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে বেশ উত্তেজনা দেখা যায়।
অনেকটা বাধ্য হয়ে মেম্বারস লাউঞ্জে অতিরিক্ত সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার শুরুতে কয়েকজন এসে টিভি দেখার কথা বলে হট্টগোল সৃষ্টির চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ ফটো জানালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মীর আহাম্মেদ মীরুর দিকে তেড়ে আসেন। এ সময় কুদ্দুস আফ্রাদকে জড়িয়ে ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে আগের কমিটির প্রতিবাদ সমাবেশে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী বলেন, যে কোন মূল্যে নির্বাচনের মাধ্যমেই সঠিক কমিটি গঠন করে প্রেস ক্লাবের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হবে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ইউনিয়ন অফিস বন্ধের পাঁয়তারা’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি বলেন, ‘অবৈধভাবে দখলদারদের সমর্থকরা সদস্যপদের নাম করে প্রেস ক্লাবের নিচে সমাবেশ করছে, যেখানে আমরা সমাবেশ করতাম। কিন্তু কোনভাবেই প্রেস ক্লাবকে দখলমুক্ত করার এ আন্দোলনকে বন্ধ করতে পারবে না।’ তিনি বলেন, যে কোন মূল্যে আমরা প্রেস ক্লাবকে দখলমুক্ত করবো। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, কবি আবদুল হাই শিকদার, প্রেস ক্লাবের বিদায়ী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী প্রমুখ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। বিকাল ৪টার দিকে প্রেস ক্লাব মেম্বার্স লাউঞ্জে অতিরিক্ত সাধারণ সভা শুরু হয়। এতে প্রেস ক্লাবের শতাধিক সদস্য অংশ নেন। প্রেস ক্লাব সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। সভার প্রথম পর্বে সভাপতিত্ব করেন সিনিয়র সহসভাপতি বখতিয়ার রানা ও দ্বিতীয় পর্বে সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রওনাক হোসেন। সভায় সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট পেশ করেন।
সভায় আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভা ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত গঠণতন্ত্র অনুযায়ী বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া সভায় আগামী নির্বাচন পরিচালনার জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নির্বাচন কমিটি গঠন করার প্রস্তাব পাস হয়। ওই কমিটি দ্রুত নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করবে। স্বঘোষিত কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যরা ক্লাব গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের সব কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করেও সভায় প্রস্তাব পাস হয়।
সভায় মিলনায়তনসহ সব কক্ষ জোরপূর্বক বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন কবি আল মুজাহিদী, নয়াদিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, দিনকাল সম্পাদক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী, ফরিদ হোসেন, রুহুল আমিন গাজী, শওকত মাহমুদ, এম এ আজিজ, ছড়াকার আবু সালেহ, আবদুস শহিদ, মুন্সী আবদুল মান্নান, বাকের হোসাইন, মাসুমুর রহমান খলিলি, এ কে এম মহসীন, খুরশিদ আলম, কাজিম রেজা, রফিক হাসান, আবুল কালাম মানিক, শাহাদাত হোসেন খান, আসাদুজ্জামান, আসাদ, খন্দকার গোলাম আজাদ, হারুন-অর রশিদ প্রমুখ। সভায় ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, কোষাধ্যক্ষ বদিউল আলম, সদস্য হাসান হাফিজ, নুরুল  হুদা, নুরুল হাসান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ঘোষিত কমিটির সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী ইজিএমের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির কিছু সদস্য সমাবেশের নামে ক্লাবে শান্তি বিনষ্টের অপচেষ্টা চালায়। নেতৃবৃন্দ বলেন, কর্তৃপক্ষের ধৈর্যকে দুর্বলতা ভাবলে ভুল করা হবে।

আবারও পেছাতে পারে ইরান চুক্তি

ইরানের পরমাণু কর্মসূচির পরিধি সংকুচিত করার বিষয়ে ঐতিহাসিক চুক্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা আবারও পেছাতে পারে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা। আলোচনা শেষ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আগামী ৩০ জুন বেঁধে দেয়া সময় পার হয়ে যেতে পারে বলে এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভিয়েনায় সপ্তাহ শেষের আলোচনায় এ রকমই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানান ওই প্রবীণ কর্মকর্তা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান ও বৈশ্বিক শক্তির সম্ভাব্য চূড়ান্ত আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি। তিনি আরও জানান, ঐতিহাসিক চুক্তিটিতে পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত দিন চূড়ান্ত করা হয়েছে সুইজারল্যান্ডের লুসানে, যখন চুক্তির মূল ধারাগুলোর বিষয়ে সবগুলো পক্ষ একমত হতে পেরেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, চূড়ান্ত চুক্তির নির্ধারিত সময় আরও কয়েকদিন পেছাতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে পি৫+১, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইরানসহ সবগুলো পক্ষের উদ্দেশ্য স্পষ্ট- চুক্তিসম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা করে যাওয়া, নয় তো বুঝতে পারা যে চুক্তিসম্পন্ন করা আদৌ সম্ভব নয়। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য চুক্তিটি সম্পন্ন করা।’ এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফসহ অনেকেই জানিয়েছেন যে নির্ধারিত সময় কয়েকদিন পেছানোর সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। আজ (শনিবার) ভিয়েনায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে জাভেদ জারিফের। এর আগে বার্ষিক অধিকার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে জন কেরি বলেন, ‘আমি বরাবরই আশাবাদী ছিলাম। আশাবাদ হয়তো প্রকাশ করিনি আমি, কিন্তু আমি আশাবাদীই।’ প্রসঙ্গত, ইরান ও বিশ্বের ছয় পরাশক্তিশালী দেশ আগামী ৩০ জুনের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচির পরিধি কমিয়ে আনার বিনিময়ে পশ্চিমা বিশ্ব আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
পরমাণু অস্ত্রসমৃদ্ধ ইরানকে পশ্চিমা বিশ্ব হুমকি হিসেবে দেখলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ইরানের দাবি- অস্ত্র তৈরির জন্য নয়, বরং বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবার মতো শান্তিপূর্ণ খাতের জন্য দেশটি পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এদিকে, ইরান ও ছয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তির খসড়ায় এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। প্রধান বাধাগুলো এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ইরানি আলোচক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, চুক্তির খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রগতির বিষয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া বক্তব্যকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না আবার নাকচও করা যাচ্ছে না। এ সূত্র বলেছে, খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে অনেক বাধা দূর এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্টে দূরত্ব এখনও রয়ে গেছে। ওই সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ?ইরনা জানিয়েছে, ‘যদিও কিছু মতপার্থক্য দূর করা হয়েছে তবু গুরুত্বপূর্ণ অন্তত একটি মতভিন্নতা এখনও রয়েছে।’ রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যতম শীর্ষ আলোচক সের্গেই রিয়াবকভ বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন ইরান ও ছয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ বিষয় চূড়ান্ত হয়েছে।

তরুণদের আছে কাটার by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ক্ষমতা কেন ভয় পাবে তাদের?
কারণ তাদেরও আছে মুস্তাফিজের মতো কাটার
একটা জাতিকে যদি জাগতে হয়, যদি আকাশ ছোঁয়ার বাসনায় হাতটা বাড়াতে হয়, তখন সবাইকে এই জাগরণে-উদ্যোগে শামিল হতে হয়। যদি একটি বা দুটি জনগোষ্ঠীও তাতে যোগ দিতে না পারে, যদি সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, আদিবাসী, শহুরে দরিদ্র অথবা খেতমজুরদের অংশগ্রহণ না থাকে, তাহলে জাগরণ থাকবে অসমাপ্ত, আকাশ ছোঁয়াটা থাকবে কল্পনার অঞ্চলে। অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে, ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে দেশটি, মাথাপিছু আয় বেড়ে সাড়ে তেরো শ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই অর্জনের ফল কি সবাই সমানভাবে ভোগ করছে? একজন মানুষকে তখনই স্বাস্থ্যবান বলব আমরা, যখন সেই স্বাস্থ্যের চিহ্ন ধারণ করবে তার সব অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ। দুই বাহু বলশালী মানুষটার বুকের ছাতিও স্ফীত, শরীরটাও পেটানো, কিন্তু একটি পা অচল। তাহলে ওই একটি পা-ই তাকে পেছনে টেনে রাখবে।
আর যদি মানুষটার অস্বাস্থ্য থাকে শরীরের গভীরে-হৃদ্যন্ত্রে, ফুসফুসে, তাহলে তার ঠিকানা কাজের ভূগোলে নয়, ক্লিনিক-হাসপাতালের বিছানায়, বারান্দায়।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সমীহ জাগানো একটি নাম। অমর্ত্য সেন অনেক দিন থেকেই পৃথিবীকে জানাচ্ছেন এ দেশের অনন্য সব অর্জনের কথা। তাঁর বিস্ময় উৎপাদন করেছে সামাজিক ও মানব উন্নয়নের নানা সূচকে আমাদের অগ্রগতি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় মডেল; দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য হ্রাসে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে আমাদের সফলতা এবং বিশ্বমন্দার কালে আমাদের অর্থনীতির চাকা সবলে ঘোরার কারণে বিশ্ব এখন আমাদের প্রশংসা করে।
এত সব অর্জনের পেছনে আছে জাতি হিসেবে আমাদের প্রত্যয়: আমরাও পারি।
এর শেষতম উদাহরণ জুনের ২১ তারিখ রাতের মিরপুর। আমি বসে টিভিতে দেখছি ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় দাপট এবং ভাবছি, এটি কী করে সম্ভব? খেলা দেখছি, কিন্তু মোবাইল ফোনে কিছুক্ষণ পর পর যে মেসেজ আসছে, সেদিকেও চোখ রাখছি, দ্রুত উত্তরও দিচ্ছি এবং কোথায় যেন একটা সুর শুনছি আরও বড় জাগরণের। মেসেজ পাঠাচ্ছে আমার ছাত্রছাত্রীরা। মুস্তাফিজ একটা উইকেট নিল, একজন লিখে পাঠাল, ‘এনাদার ওয়ান বাইটস দ্য ডাস্ট’। তার আগে সৌম্য ছয় মারলে একজন লিখল, ‘বলটা সাতক্ষীরায় পাঠিয়ে দিল, স্যার।’ এই তরুণ ক্রিকেট দল ২১ তারিখে দেখাল, তারা শুধু জাগেনি, এখন আকাশটাও ছুঁতে জানে।
এই জাগরণটা যে শুধু আমরা দেখছি তা নয়, বিশ্বও দেখছে। নেটে কলকাতার কাগজগুলো পড়লাম। দেখলাম, উচ্ছ্বাস তাদেরও। ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ লিখেছে এক কাগজ; ‘সোনার বাংলার জয়গাথা’ লিখেছে আরেকটি। আনন্দবাজার পত্রিকার শিরোনাম, ‘এগারো বাঙালি হারাল ভারতকে’। ‘বাঙালি’ কথাটায় কোথায় জানি একটা তুষ্টির ছোঁয়া। আমার খুব ভালো লাগল, যখন কাঠমান্ডু থেকে এক বন্ধু ফোনে অভিনন্দন জানাল। বলল, নেপালের দর্শক বাংলাদেশের পক্ষে। আমি জানি কেন তারা ভারত ছেড়ে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে, এখন বাংলাদেশ অর্জনের এক উদাহরণ তাদের সামনে। বাংলাদেশ পারলে নেপালও পারবে। শুধু ক্রিকেটে নয়, অর্থনীতি-সমাজ-শিক্ষা—সব ক্ষেত্রে।
আমি এই কথাটা জোরের সঙ্গে বলি: বাংলাদেশকে শুধু নিজের দিকে তাকালে চলবে না; এটি ভাবলে শেষ ভাবাটা হয়ে যাবে না যে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা অথবা পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ, যার উন্নতি হবে নিজের ভূগোলের ভেতরে। বাংলাদেশ একটি দেশ বটে, কিন্তু ভারতের মতোই এর বাইরেও কিছু। ভারত এখন এশিয়ার অর্থনীতির পরাশক্তি। বাংলাদেশকেও হতে হবে আঞ্চলিক একটি শক্তি, যার উন্নতি স্পর্শ করবে এবং যার দিকে পথ দেখানোর জন্য তাকিয়ে থাকবে নেপাল, ভুটানসহ ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো। কিছুদিন আগে ত্রিপুরা ও মিজোরামের দুই সমাজকর্মীর সঙ্গে আমার দেখা দিল্লিতে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের কাছে দিল্লি সত্যি সত্যি দূরের। বাংলাদেশের সঙ্গে বরং অর্থনৈতিক সম্পর্কটা হতে পারে অনেক কাছের। চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর হলে ভাগ্য বদলাতে পারে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের। ত্রিপুরা তো তার উন্নয়নে আমাদের সহায়তা দাবিই করতে পারে—একাত্তরে ত্রিপুরা যেভাবে দাঁড়িয়েছিল আমাদের পাশে, তার কোনো তুলনা হয় না।
বাংলাদেশকে বিশ্ব সমীহ করছে। বাংলাদেশের গত নির্বাচন নিয়ে অখুশি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। কিন্তু কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশংসা করেছে উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্যকে। নির্বাচন সর্বদলীয় না হওয়াটা আমাদের গণতন্ত্রের একটি ব্যর্থতা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা এবং কাজ-অকাজ গণতন্ত্রের জন্য দুঃসংবাদ। একইভাবে স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক তোলা, স্বাধীনতার স্থপতিকে খাটো করে দেখা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলোকে অবজ্ঞা-অমান্য করা গণতন্ত্রের সুস্থতার লক্ষণ হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, সাম্য, মুক্তি এবং দেশের ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন—এই আদর্শ ধরে কেউ কি এগোচ্ছে?
তারপরও মানুষ হাল ছেড়ে দেয়নি, নিজেদের মতো কাজে নেমে পড়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলো সামান্য উপার্জন করে সন্তানকে এবং কন্যাসন্তানকেও স্কুলে পাঠিয়েছে। তরুণেরা দেশে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিদেশে উপার্জনের একটা রাস্তা খুঁজে নিয়েছে। গ্রামের মেয়েটি শহরের মধ্য-উচ্চবিত্তের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ না নিয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি খুঁজে নিয়েছে। কৃষক তাঁর পরিশ্রমে উদ্ভাবনী শক্তিতে নিরন্তর সোনা ফলিয়েছেন মাঠে, প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক স্বল্প বেতনে, পেটেভাতে মানুষ গড়ার সংগ্রামে নেমে পড়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তা সামান্য পুঁজি সঞ্চয় করে ব্যবসা-বাণিজ্য-উৎপাদনে ব্রতী হয়েছেন। যোগাযোগপ্রযুক্তি যখন এল, মোবাইল ফোন কিছুটা সহজলভ্য হলো, তরুণেরা এর দেশীয় রূপান্তর ঘটালেন, বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করলেন। আমার এক অর্থনীতিবিদ বন্ধু বললেন, গ্রামের যে মধ্যস্বত্বভোগী—মাঝের মানুষ—দালাল ছিল, তাদের দাপট কমিয়ে দিল মোবাইল ফোন। না, আইন না, পুলিশ না; প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে অনেক তরুণ; উগ্রতা, আগ্রাসী অন্ধকার ছড়াচ্ছে, নানা অপকর্ম করছে। কিন্তু নতুন নতুন অসুখের ওষুধটাকেও হতে হয় নতুন। ওষুধ তৈরি হচ্ছে, তরুণেরাই করছে। ফলে প্রযুক্তি-রোগও একদিন নির্মূল হবে, সন্দেহ নেই।
অর্থনীতিবিদ-সমাজবিদেরা অনেক ভালো ভালো কথা বলেছেন। যা ঘটেছে, ঘটছে তা নিয়ে, যা ঘটতে পারে তা নিয়ে। এখন সময় দেশটা বদলাবার এবং এ জন্য কিছু মন্ত্রের জন্য আমাদের যেতে হবে দুই কবির কাছে। কবিরা ত্রিকালদর্শী হন, তাঁদের তৃতীয় একটা চোখ থাকে, যা দিয়ে তাঁরা অসম্ভবকে দেখেন। কাজী নজরুল দেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন, ইউরো-শিক্ষিত পরিবারের সন্তান ছিলেন, কিন্তু তাঁর বিশ্বদর্শনের কেন্দ্রে ছিল গ্রাম। গ্রাম জাগলে দেশ জাগবে, তিনি বলতেন। আরও বলতেন আত্মশক্তির কথা। নজরুলের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল সাম্যের প্রতিষ্ঠা দেখা। তিনি মানুষের ইতিহাসের একটি সত্যকে তুলে ধরে বলেছিলেন। জগতের যা কিছু সুন্দর ও কল্যাণকর, তার অর্ধেক করেছে নারী। আমরা যদি এ দুই কবিকে মাথায় রাখি, তাহলে আত্মশক্তিতে আমরা জাগব; গ্রাম জাগবে, সাম্য প্রতিষ্ঠা পাবে; মানুষ থাকবে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে; নারীদের কাজের আর অবদানের ক্ষেত্রটা হবে উন্মুক্ত, বাধাহীন; এবং তারুণ্যের ওপর থাকবে আমাদের ভরসা।
এই লক্ষ্যে যে আমরা যাচ্ছি না তা নয়, যাচ্ছি। কিন্তু যাত্রার গতি বাড়াতে হবে, সবাইকে শামিল করতে হবে সেই যাত্রায়। যদি সুবিধাবঞ্চিতরা সমান সুযোগ না পায়, যদি মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না পায়, যদি প্রান্তিক অধিবাসী এবং অন্যান্য উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর পায়ে শক্তি না জোগানো যায়, আমরা চলব খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
গ্রাম জাগছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট-ফুটবল দলের কথাই ধরি। ছেলেগুলোর অনেকে এসেছে গ্রাম থেকে, অথচ তাদের চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। একটি মেয়ে, সাবিনা, মালদ্বীপে গিয়ে তাক লাগানো ফুটবল খেলল। শুনলাম, সে-ও সাতক্ষীরার। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী আসছে গ্রাম থেকে। এটি যুগ পরিবর্তনের লক্ষণ। এরা গ্রাম-শহরের ব্যবধান ঘোচাবে। দীর্ঘদিন গ্রাম অবহেলিত ছিল, এখন গ্রাম নিজে থেকেই সেই অবহেলার জবাব দিচ্ছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন শিক্ষার—প্রকৃত, সাংস্কৃতিক, মননশীল, সৃজনশীল—শিক্ষার প্রসার। দারিদ্র্য নির্মূল করা। স্বাস্থ্য ও পুষ্টিচিত্রের উন্নতি। আরও অনেক কিছু। এর জন্য কাজে নামতে হবে তারুণ্যকে।
আমাদের দুই কবি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের উন্নতিতে খুশি হতেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দুঃখ পেতেন আত্মশক্তি বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো আমাদের রাজনীতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখে। তিনি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্জ করা শেখায়, উৎপাদন করা নয়। অবস্থাটা কি বদলেছে? নজরুল ব্যথিত হতেন তারুণ্যের অপচয় দেখে। তরুণদের জন্য কী উদাহরণ আমরা রাখছি? আমাদের রাজনীতি তাদের শেখাচ্ছে ক্ষমতার মারামারি, সহিংসতা, টেন্ডার-বাণিজ্যের মতো অসৎ উপায়। তাদের শেখাচ্ছে ঔদ্ধত্য, অসহিষ্ণুতা। তারুণ্যকে ধ্বংস করার জন্য চলছে মাদকের ব্যবসা। এই মাদকসম্রাটদের তো নামেই চেনে দেশের মানুষ, কিন্তু তাদের কেউ স্পর্শ করে না। কাগজে দেখলাম, ইয়াবা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন পুলিশের কিছু কর্মকর্তাও! একদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্য উদ্যাপন করছি আমরা, অন্যদিকে মাদকের অবসাদে নিষ্প্রাণ পড়ে আছে তরুণদের এক বড় অংশ। এই বিপরীত চিত্র কি দেখেই যাব আমরা?
আবার ভরসা তরুণদের ওপর। মাঝে মাঝেই দেখি, প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবি নিয়ে, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংস যৌন অপরাধের প্রতিবাদে, বাজেটে শিক্ষার অবনমনের বিরুদ্ধে কিছু তরুণ রাজপথে মিছিল করে। এবং অবাক, পুলিশ তাদের দেখলেই পেটায়। আমার তো মনে হয়, পুলিশের কনস্টেবলদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে পথে নামলেও পুলিশ তাদের পেটাবে। এটা ক্ষমতার একটি অভ্যাস। তবে এ-ও বদলাবে, মিছিলে ছেলেগুলোকে দেখি আমাদের মুস্তাফিজের মতোই লিকলিকে। তাহলে ক্ষমতা কেন ভয় পাবে তাদের? কারণ তাদেরও আছে মুস্তাফিজের মতো কাটার। অফ, লেগ—সব ধরনের কাটার।
যত বেশি তরুণ এই কাটার নিয়ে বেরোবে রাস্তায়, মাঠে, গ্রামে, শহরে, দেশে, বিশ্বে; ততই জায়গা ছেড়ে দেওয়ার দৌড়টা শুরু হবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জল থই থই ঢাকা -ছবি: ফোকাস বাংলা

গত কয়েক দিন ধরে আষাঢ়ের টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। জলাবদ্ধতার কারণে খানাখন্দে ভরা সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। বিপাকে পড়েছেন নগরবাসী।
ছবি: ফোকাস বাংলা
আষাঢ়ের টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। ছবিটি যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
বৃষ্টির পানি জমে প্রধান সড়ক আর ফুটপাত যেন এক হয়ে গেছে। যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা। ছবিটি যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
বৃষ্টি আর সড়কে জমা পানি পেরিয়ে কাজে ছুটছেন কর্মজীবী মানুষ। ছবিটি যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে তোলা।
ছবি: ফোকাস বাংলা
জলমগ্ন সড়কে যান চলাচলে এভাবে ছিটকে পড়া পানির কারণে দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা। ছবিটি যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
সড়কে পানি জমায় সন্তানকে পিঠে করে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন এই মা। ছবিটি রাজধানীর কুড়িল এলাকা থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
টানা বর্ষণে সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ছবিটি রাজারবাগ সড়ক থেকে তোলা।
ছবি: ফোকাস বাংলা
জলাবদ্ধ সড়কে মোটরসাইকেল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এই ব্যক্তি। ছবিটি রাজারবাগ সড়ক থেকে তোলা।
ছবি: ফোকাস বাংলা
জলাবদ্ধ সড়কে ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা কি না—এই ভয়ে সাবধানে রাস্তা পার হচ্ছেন এই ব্যক্তি। ছবিটি শান্তিনগর এলাকা থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
রাজধানীর শান্তিনগর এলাকার জলাবদ্ধ সড়ক।
ছবি: ফোকাস বাংলা
জলাবদ্ধ রাস্তায় উল্টে গেছে রিকশা। বিপাকে পড়েছেন যাত্রী। ছবিটি শান্তিনগর এলাকা থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
জলাবদ্ধ রাস্তায় খোলা ম্যানহোলে পড়ে গেছে রিকশার সামনের চাকা। ছবিটি শান্তিনগর এলাকা থেকে তোলা।
ছবি: ফোকাস বাংলা
খোলা ম্যানহোলে চাকা পড়ে উল্টে আছে রিকশা। ছবিটি শান্তিনগর এলাকা থেকে তোলা। 
ছবি: ফোকাস বাংলা
টানা বৃষ্টি আর জলাবদ্ধ রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ছবিটি শান্তিনগর এলাকা থেকে তোলা।
ছবি: ফোকাস বাংলা
জলাবদ্ধ রাস্তায় উল্টে গেছে রিকশা। বিপাকে পড়েছেন যাত্রী। ছবিটি শান্তিনগর এলাকা থেকে তোলা। 

বিদেশ যেতে সমুদ্রপথে কেন মরিয়া চেষ্টা

সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা গুরুতর রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার অভিবাসী-প্রত্যাশী মানুষ এভাবে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে গিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছে জীবনের। কেন তাদের এই মরিয়া প্রচেষ্টা? বিবিসি বাংলায় শায়লা রুখসানার এক প্রতিবেদনে সেটাই খোঁজা হয়েছে। জাহিদুল ফিরেছেন, দুঃস্বপ্ন আর ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে... জাহিদুল খন্দকারের বাড়ি নরসিংদীর বাগদি এলাকায়। মালয়েশিয়ায় জেল খেটে দেশে ফিরেছেন তিনি মাত্র ৫ দিন আগে। মাস ছয়েক নিরুদ্দেশ থাকার পর গত মাসে হঠাৎ মালয়েশিয়ার কারাগার থেকে ফোন পায় জাহিদুলের পরিবার। জাহিদুল বলছিলে বাড়ি ছেড়ে কীভাবে গিয়ে পৌঁছালেন পাচারকারীদের জাহাজে, “প্রথমে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেছি। এরপর দালাল রিসিভ করেছে। তিন ঘণ্টা শহরে ঘুরায়। এরপর গাড়িতে তুলে কক্সবাজার নিয়ে যায়। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাতে করে মহেশখালীতে। আমার এলাকা থেকে ৪/৫ জনসহ অন্যান্য এলাকার লোকজন ছিল। সবাই বাংলাদেশী।” জাহিদুলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল তাদের বসতঘরের সামনে পেতে দেয়া প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে। চরম নির্যাতন, খাবার না পাওয়া আর দুশ্চিন্তার ভারে ভীষণ ক্লান্ত  জাহিদ। এত নিচুস্বরে কথা বলছিলেন তিনি যে বারবার আমাকে অনুরোধ করতে হচ্ছিল কণ্ঠস্বর কিছুটা বাড়াতে। জাহিদুল বলেন, তাদের মিয়ানমার জলসীমান্তে জাহাজে ১৫ দিন রাখা হয়। এরপর সাড়ে চারশোর মতো লোক ওঠার পর জাহাজ ছাড়ে। জাহিদ বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল শিপে অনেক লোক ছিল। গিয়ে দেখলাম ৪০ জনের মতো লোক। ওরা বলল, সাড়ে ৪০০ লোক হলে তবে শিপ ছাড়বে। এভাবে আমাদের ১৫ দিন রাখার পর শিপ ছাড়ল। যাত্রাপথে যারা অসুস্থ হয়ে পড়ে তাদের পেট কেটে সাগরে ফেলে দেয়।” “লোভে পড়ে চলে গেছিলাম” আট-নয় দিন ধরে সাগরে ভেসে ভেসে থাইল্যান্ডে পৌঁছান। যাত্রাপথে খাবার যা মিলেছে তা ছিল খাওয়ার  অযোগ্য। এরপর থাইল্যান্ড সীমান্ত পুলিশের সহায়তায় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। না খেয়ে থাকতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পিটুনি খেয়েছেন যখন তখন। সবশেষে মালয়েশিয়ান পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জায়গা হয় কারাগারে। জাহিদুল যাত্রাপথে বহু সহযাত্রীকে দেখেছেন মৃত্যুমুখে ঢলে পড়তে। জাহিদুলকে ফিরিয়ে আনতে দুই দফায় দালালকে দুই লাখ টাকা দিতে হয়েছে তার পরিবারকে। এত ভয়ংকর পথ কেন বেছে নিয়েছিলেন জাহিদুল? পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা জাহিদুল বলছিলেন, “আমার যা লেখাপড়া তাতে ভালো চাকরি জুটবে না। ৪/৫ হাজার টাকার বেশি বেতনও তেমন পাবো না। সেজন্য ভাবতাম মালয়েশিয়া যেতে পারলে মাসে ৫০ হাজার টাকা পেলে পরিবারকে সাহায্য করতে পারতাম। লোভে পড়ে চলে গিয়েছিলাম।” ভিনদেশে কারা ভোগ করে অবশেষে জাহিদুল বেঁচে ফিরতে পারলেও এখনো অনেকের খোঁজ নেই বলে জানাচ্ছেন সেসব পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি সমুদ্রে আটকের পর মিয়ানমার থেকে ফেরত পাঠানো ১৫০ জন বাংলাদেশীর মধ্যে ৫৬ জনই নরসিংদী জেলার। এ ছাড়া পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ আরও ১৭টি জেলার মানুষ আছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন কিশোরও রয়েছে। বৈধভাবে যেতে পাসপোর্ট করা হয়েছিল নিখোঁজ আরমান হোসেনের নরসিংদীর যেসব এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ পাচারের শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় লোকজন জানাচ্ছেন তার একটি রায়পুরা। রায়পুরার আরমান হোসেনও মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ছাড়েন ফেব্রুয়ারি মাসে। তার বোন শাহিনুর আক্তার মোবাইল ফোনে ভাইয়ের ছবি দেখিয়ে বলছিলেন, দেড় মাস পর থাইল্যান্ড থেকে ফোন দিয়ে তার ভাই জানান, রায়পুরার এক দালালকে টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। এরপর দুই লাখ টাকা দেয়া হলেও আরমানের বর্তমান হাল কী জানে না তার পরিবার। অথচ তাকে বৈধভাবে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে এলাকার কেউ কেউ টাকা-পয়সা পাঠাচ্ছে দেখে আরো অনেকের মতো অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা আরমানও সমুদ্রপথে যেতে উৎসাহী হয়েছিল বলে জানান শাহীনুর আক্তার। তিনি বলেন, “বৈধভাবে মালয়েশিয়া পাঠাতে চেয়েছিলাম। সেজন্য ভাইয়ের পাসপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু প্রতিবেশী ১০/১২ জন এভাবে মালয়েশিয়ায় গিয়ে বাড়িতে টাকাপয়সা পাঠাচ্ছে দেখে দালালদের পাল্লায় পড়ে আমার ভাইও চলে গেছে।” দ্রুত টাকা রোজগারের মরীয়া চেষ্টা? সুবজে ঘেরা এই মফস্বল শহরটিতে কৃষি খাতে এবং বস্ত্রশিল্পের শ্রমিক হিসেবে কাজের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তার পরও কেন এখানকার তরুণসমাজ অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে? স্থানীয় একজন সাংবাদিক ও নরসিংদী প্রেসক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, বিদেশে গিয়ে দ্রুত টাকা রোজগারের এই মরিয়া চেষ্টাই তাদের বাড়ি ছাড়ার মূল কারণ। তিনি বলেন, “নরসিংদী শিল্পপ্রধান একটি এলাকা হলেও অনেকেই দেখছে আশপাশের অনেকে বিদেশে গিয়ে টাকাপয়সা রোজগার করছে। ফলে অন্য শ্রমিকদের মনে এই বিষয়টি প্রভাব ফেলছে। রায়পুরা, সদর, শিবপুরে এ রকম ঘটনা আমরা দেখেছি। আর দালালরা এখন টিনএজারদের বেশি টার্গেট করছে। কারণ তাদের বোঝানো সহজ।” সাংবাদিক হাবিবুর রহমান বলেন, টাকা ছাড়া বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আছে, এটা জেনেই গত দুই-তিন বছরে সমুদ্রপথে যাওয়ার হিড়িক বেড়ে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। “যখন তারা জানতে পারলো বিদেশে গেলে টাকা লাগে না, হঠাৎ করে বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে অবৈধ পথে বিদেশে যাচ্ছে এরা। ২০১৩ সাল থেকে এটা বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালে সেটা বেশি বেড়ে যায়।” তাহলে দ্রুত বড়লোক হওয়ার ইচ্ছাই কি মূল কারণ? ভাগ্য বদলানোর আশা অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফ্যুজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসোর্স ইউনিট বা রামরু। সংগঠনটির বক্তব্য এ ব্যাপারে একেবারেই ভিন্ন। রামরুর চেয়ারপার্সন তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “ সমাজে একবারে যারা দরিদ্র, ভূমিহীন তারাই এই পথটি বেছে নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বেড়াতে গিয়ে পাচারকারীদের কবলে পড়েছে। এছাড়া জলবায়ূ পরিবর্তনের শিকার যারা তারাও মরীয়া হচ্ছেন। এই পথে যারা যাচ্ছেন তাদের অন্য কোনোভাবে মাইগ্রেশনের সুযোগ নেই”। লোভনীয় টার্গেট টিন এজাররা নরসিংদী জেলার এমন অনেক কিশোর আছে যারা এখনো স্কুলের গণ্ডিই পেরোয়নি, তারাও সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া রওনা হয়ে এখন নিখোঁজ। রায়পুরার গোবিন্দপুর এলাকার শাহীনুর বেগমের ছেলে শিপন ভূঁইয়া স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস এইটে পড়তো। চার মাস ধরে নিখোঁজ থাকার পর সম্প্রতি জানা গেছে, সেও ইন্দোনেশিয়ার কারাগারে আটক আছে। শাহিনুর বেগম বলেন, তার ছেলেকে এর মাঝে চারবার বিক্রি করা হয়েছে। “ছেলেকে লোভ দেখিয়েছে নিয়ে গেছে। বলছে বিদেশ যেতে কাগজপত্র, টাকাপয়সা কিছুই লাগবে না। তাই লেখাপড়া ছেড়ে টাকাপয়সা রোজগারের লোভে চলে গেছে।” ‘পরিবারের দায়ও কম নয়’ শাহিনুর বেগমের বাড়িতে সাংবাদিক এসেছে খবর পেয়ে আশপাশ থেকে উদ্বিগ্ন অনেকে সেখানে ভিড় করেন। তারা পরিবারের নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেন। কারও ভাইয়ের ছেলে, কারও বোনের জামাই, কারও সন্তান সমুদ্রপথে রওনা হওয়ার পর থেকে খবর নেই। এদের মধ্যেই একজন আছিয়া বেগম বলেন, তার ছেলে কাছেই একটি মুরগির খামারে ৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন । তা দিয়ে টেনেটুনে মন্দ চলছিল না তাদের। কিন্তু ছেলে চলে গেছে মাকে না জানিয়ে। তবে  সাংবাদিক হাবিবুর রহমান বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকেও উৎসাহ থাকে। ছেলেরা এভাবে গিয় টাকাপয়সা পাঠাচ্ছে আর বাড়িতে বাবা-মায়েরা পাকা দালান তুলছে। তাদের পক্ষ থেকে তো বাধা নেই।” কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা চলছে এবং কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাহলে এভাবে দেশ ছাড়ার কারণ কী? অভিবাসী ও শরণার্থী বিষয়ে গবেষক, রামরুর চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দীকীর ভাষ্য, উন্নয়নের ধারা চলমান হলেও তার সুফল সবার কাছে পৌছাচ্ছে না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ অবশ্যই মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। কিন্তু এটা কিন্তু সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে একেবারে নিচের শ্রেণীর যারা তারা মরিয়া হয়ে মাইগ্রেশনের পথ বেছে নেয়।” ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতাও দায়ী’ নরসিংদী এলাকায় যে পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা হয় তাদের কেউই থানায় গিয়ে মামলা করেনি। নিখোঁজ স্বজনটির ক্ষতির আশঙ্কাই এর কারণ। অনেকের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু দালাল এলাকা ছাড়লেও কেউ কেউ দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে । অন্যদিকে পুলিশের দাবি বেশির ভাগ পরিবার থানায় অভিযোগ করছে না বলে অপরাধীদের পাকড়াও করা যাচ্ছে না। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম বিবিসকে জানান, পাচারসংক্রান্ত ৫০টির বেশি মামলা তদন্তাধীন আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অজ্ঞাত এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের নীরব অবস্থানকেও এসব মানুষের অবৈধ পথে যেতে উৎসাহী হওয়ার কারণ বলে মনে করেন অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী। তার প্রশ্ন, কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে এত শত শত লোক চলে গেল আর কেউ তা দেখল না? এখানে প্রশাসনের সর্বস্তরেই উদাসীনতা দেখা গেছে বলে তিনি মনে করেন। ২০১৩ সালের অভিবাসন আইন ও মানব পাচার আইনের মাধ্যমে দালাল চক্রের বিচার করতে উদ্যোগ না নিলে এই স্রোত ঠেকানো যাবে না বলেও তিনি আশংকা করেন। সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর যথযাথ উদ্যোগের অভাব সরবকারিভাবে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করার উদ্যোগের অভাবও এই মরিয়া অভিবাসন চেষ্টার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। জিটুজি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় মাত্র সাড়ে সাত হাজার লোক পাঠানো হয়েছে। ফলে যারা বৈধ পথে যেতে পারছে না সেই বিশাল সংখ্যায় মানুষ এই অবৈধ পথটি বেছে নিচ্ছে। তবে সরেজমিনে খোঁজ-খবর করে দেখা যাচ্ছে, শুধু গরিব কর্মহীন শ্রেণীর লোকেরাই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে দেশ ছাড়ছে তেমনটি নয়। যাদের নিজের এলাকায় শ্রমিক হিসেবে বা অন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, তারাও যাচ্ছে শুধু দ্রুত বড়লোক হওয়ার লোভে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের চেয়েও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ: বিএনপি

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বাংলাদেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়েও ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই প্রতিবেদন বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই নেতিবাচক। বিরোধী দলের রাজনীতি করে বলেই বিএনপি এই নেতিবাচক প্রতিবেদনে উল্লসিত নয়। তবে প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশ সম্পর্কে এ ধরনের  নেতিবাচক চিত্র আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার হবে। গতকাল নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার যে চিত্র তুলে ধরেছেন তাতে বাস্তবতার কিছু অংশ ফুটে উঠেছে। প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ।  দেশে জরুরি অবস্থা নেই। তারপরও গণমাধ্যম কর্মীরা নিজ  থেকেই অনেক কিছু সেন্সর করেন। মিডিয়া যখন ভয়ভীতির মাধ্যমে কাজ করে তখন তা প্রকৃত গণমাধ্যম হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে যে সরকার এখন দেশ শাসন করছে তা জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না। সম্ভবত এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তা মনে করেন না। সে কারণেই তিনি নির্বাচনের পরপরই বলেছিলেন, খুব দ্রুত সময়ে আলোচনার মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। ড. রিপন বলেন, বর্তমানে যে সংসদ বহাল আছে তার মধ্যে ১৫৪ জন ফাও এমপি আছেন। বাকি যারা আছেন তাদের কেউই ৫ ভাগেরও কম ভোট পেয়ে সংসদে গিয়েছেন। সে কারণে এসব  ভোটারবিহীন এমপি নির্বাচনের কথা শুনলেই আঁতকে ওঠেন। এই সংসদে কিছু লাফাঙ্গামার্কা এমপি আছেন। যখন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন সেই লাফাঙ্গা-বাচাল মার্কা এমপিরা আবোল-তাবোল বক্তব্য দিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করে থাকেন। তথ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, শুক্রবার খুচরা পার্টির নেতা ইনু বলেছেন, খালেদা জিয়ার জায়গা হবে কাশিমপুর কারাগারে। আমরা জানি না, তিনি কবে বিচারক হলেন। আমরা বলছি না, ইনুর জায়গা হবে কুষ্টিয়া কারাগারে। কারণ আমরা বিচারক নই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের  বোমাবাজি ও সন্ত্রাসের জনক হচ্ছেন ইনুরা। তারাই এদেশে হত্যা-সন্ত্রাসের অপরাজনীতি শুরু করেছিলেন। এই ইনুরাই শেখ মুজিবের শাসনকে সন্ত্রাসের মাধ্যমে ঝালাপালা করে দিয়েছিলেন।  যে জন্য দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতি করলেও শেখ মুজিব একদলীয় বাকশাল শাসনের কলঙ্ক গায়ে মাখাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ড. রিপন বলেন, পঁচাত্তরের পর ইনুরাই বাংলাদেশের  সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। ওই অপরাধে তিনি  গ্রেপ্তারও হন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় তিনি আজও বেঁচে আছেন। রাজনীতি করছেন। ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার সুযোগ পাচ্ছেন। তা না হলে তার ফাঁসির কাষ্টে  ঝোলার কথা। মূলত নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতেই এই খুচরা পার্টির নেতারা নানারকম উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে দেশের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করতে চান। তিনি আরও বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্পর্কে নানা ধরনের আবোল-তাবোল উত্তেজিত কথা বলে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতে চান। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা এসব খুচরা নেতাদের বক্তব্যে সায় দেবেন না। তিনি বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে  দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পদক্ষেপ নেবেন। বিএনপিও এই খুচরা পার্টির নেতাদের আবোল-তাবোল ও উস্কানিমূলক বক্তব্যে উত্তেজিত হয়ে তাদের ফাঁদে পা দেবে না। সংবাদ সম্মেলনে দলের যুববিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিমউদ্দিন আলম, গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া, সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়নে তিন ফরাসি ব্যাংকের অস্বীকৃতি

অর্থায়ন সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তিন ফরাসি ব্যাংক। কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় পরিবেশবিদরা এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পটি ন্যূনতম পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এ খবর দিয়েছে বৃটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। খবরে বলা হয়েছে, ছয় মাস আগে নরওয়ের দুইটি পেনশন তহবিল কর্তৃপক্ষ ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) থেকে নিজেদের বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়েছে। প্রসঙ্গত, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প নির্মাণ করছে এনটিপিসি। গত ৬ই জুন বাংলাদেশ সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি অনুমোদন করেন। সে সময় তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের আইন ও প্রবিধান অনুযায়ী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অগ্রগতি হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশে ও ভারতে বিদ্যুৎ খাতে একসঙ্গে আরও অনেক কিছু করতে পারবো।
২০১২ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের সর্ববৃহৎ  কয়লা-বিদ্যুৎ কোমপানি এনটিপিসি (রাষ্ট্রায়ত্ত) বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে মিলিতভাবে খুলনা বিভাগে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে। পরিবেশবিদরা এ প্রকল্পের ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন। কেননা, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের চেয়ে ১০ মাইলেরও কম দূরত্বে এটি অবস্থিত। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য বনের ভেতর দিয়ে নদীতে জাহাজ চলাচল এবং খনন বৃদ্ধি পাবে, ফলে বাড়বে বায়ু ও পানি দূষণ। অবনতি ঘটবে সুন্দরবনের পরিবেশের। মোদির ঢাকা সফরের আগেই পরিবেশবিদরা বাংলাদেশ-ভারতের নেতাদের কাছে প্রকল্পটি বন্ধের আহ্বান জানান। ২১শে মে তেল-গ্যাস-খনিজ সমপদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ আয়োজন করে। সেখানে সংগঠনের সাধারণ সমপাদক ঘোষণা দেন, প্রকল্পটি বন্ধ না হলে, তারা দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে দেবেন। গত ৫ই জুন সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন নতুন করে প্রকল্পটি বন্ধের আহ্বান জানায়।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, পরিবেশবিদদের আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। দিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর সাইয়েন্স অ্যান্ড এনভারনমেন্ট-এর গ্রিন প্রজেক্ট রেটিং ভারতের সকল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত রেটিং প্রকাশ করে। সর্বসমক্ষে প্রাপ্য ও প্রাথমিক কিছু তথ্য দিয়ে ওই রেটিং প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এরপরও উঠে এসেছে মোটামুটি উদ্বেগজনক একটি চিত্র। ভারতে এনটিপিসি ২৫টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করে। আরও নয়টি যৌথ প্রকল্পও পরিচালিত হয় এনটিপিসি’র হাতে। রেটিং অনুযায়ী, পরিবেশ মানদণ্ডে ছয়টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। সর্বোচ্চ রেটিং যেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ শতাংশ। সেখানে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর স্কোর ছিল মাত্র ১৬-২৮ শতাংশ।
গত মাসে তিনটি ফরাসি ব্যাংক ঘোষণা দেয় তারা এ প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না। এর মধ্যে ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ব্যাংকের টেকসই উন্নয়ন বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান স্টানিসলাস পোতিয়ের বলেন, বাংলাদেশের রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে অর্থায়ন করবে না ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল এসএ গ্রুপ। আমাদের মধ্যস্থতা নীতিমালা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আরেকটি ব্যাংক সোসিয়েতে জেনেরালে’র টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বিষয়ক পরিচালক জিন-মিশেল মেপুইজ বলেন, সোসিয়েতে জেনারালে বাংলাদেশের খুলনার রামপালে অবস্থিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে কোন ধরনের আর্থিক অ্যাডভাইজরি সেবা দেয় না। বর্তমানে সেখানে অর্থায়নের বিষয়েও চিন্তা করছে না। প্যারিসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের অন্যতম কর্পোরেট সপন্সর বিএনপি পারিবাস ব্যাংকও রামপাল প্রকল্পে অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আর্থিক খাত অনুসরণ করে এমন কয়েকটি সংগঠনের জোট- ব্যাংক ট্রাক, একুয়েটর প্রিন্সিপলসের (আর্থিক খাতে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকাঠামো) অধীনে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, রামপাল প্রকল্পের ডিজাইন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মারাত্মক ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে বিশ্লেষণীতে। এ ছাড়া প্রকল্পটি একুয়েটর প্রিন্সিপলসের ন্যূনতম সামাজিক ও পরিবেশগত মানদণ্ড ও ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ডসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
গার্ডিয়ানের খবরে আরও বলা হয়েছে, ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ায় রামপাল প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী নয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ১৫০ কোটি ডলারের ওই প্রকল্পের ৭০ শতাংশ অর্থায়নই ঋণ থেকে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাকি ৩০ শতাংশ অর্থায়ন বাংলাদেশ ও ভারত সমানভাবে করবে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এ অর্থায়নের অনুমোদন দিতে রাজি হয়নি। সংস্থাটি বলেছে, এ প্রকল্প বাংলাদেশের বর্তমান নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমনকি প্রকল্পের অর্থায়ন ও মালিকানাও পরিষ্কার নয়। এর ফলে প্রকল্পে বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ অর্থায়নের বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অর্থায়ন এখনও নিশ্চিত না হলেও, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় কেন্দ্রের জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু করে দিয়েছে।

দুদকের অচলাবস্থা- সচিবের ব্যাপারে নিশ্চুপ কেন মন্ত্রণালয়?

সচিব নিয়ে সমস্যার কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাজে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা বিরাজ করলেও বিষয়টিতে সাড়া দিতে সরকার রহস্যজনকভাবে নিস্পৃহ রয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে দুদকের সচিব মাকসুদুল হাসানকে সরিয়ে নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ার ৪৫ দিন পরও এর ফল পাওয়া যায়নি। দুদকের ব্যাপারে সরকারের অবস্থানটি এ থেকে সহজেই ধারণা করা যায়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুদকে প্রেষণে লোকবল নিয়োগ নিয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের সঙ্গে সচিবের মতভেদ দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তা চরম আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় দুদকের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করা কেবল দুরূহ নয়, অসম্ভব। ফলে দুদকের পক্ষ থেকে সচিবকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কমিশনের চিঠিতে সচিবের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা গুরুতর।
কমিশন অভিযোগ করেছে, সচিবের উদাসীনতা, অনাগ্রহ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাধ্যতার কারণে কমিশনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা চলছে। এমনকি কমিশনের দৈনন্দিন কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ধরনের অভিযোগ ও তাঁকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনুরোধের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কীভাবে দীর্ঘ ৪৫ দিন নিশ্চুপ রয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অর্থ হচ্ছে দুদকের কাজকর্মে অচলাবস্থাকে আরও দীর্ঘায়িত করা।
দুদকের চিঠি পাওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনায় এনে সচিবের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ব্যাপারে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাজ কীভাবে চলবে, সে ব্যাপারে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু মন্ত্রণালয় অজ্ঞাত কারণে সচিবকে প্রত্যাহারও করেনি, কমিশনের চিঠির জবাব বা নতুন সচিব নিয়োগের জন্য আলোচনায় বসারও উদ্যোগ নেয়নি। বলা হয়েছে, দুদকে পদায়নের জন্য নাকি একজন উপযুক্ত কর্মকর্তা খোঁজা হচ্ছে। তাদের এই অনুসন্ধান কবে শেষ হবে, আদৌ শেষ হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার নিশ্চয়ই জনগণের আছে।
দুদকের সচিবসংকট নিরসনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।
দুদকের সচিবের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়নি মন্ত্রণালয়- প্রত্যাহার চেয়ে চেয়ারম্যানের চিঠি by মোর্শেদ নোমান আপডেট: জুন ২৫, ২০১৫
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মাকসুদুল হাসান খানকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে চেয়ারম্যান চিঠি পাঠানোর ৪৫ দিন পরও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
দুদকের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান গত ১১ মে সচিবকে প্রত্যাহারের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠান। চিঠিতে সচিবের বিরুদ্ধে কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি, কাজে উদাসীনতা, কমিশনের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে তাঁকে প্রত্যাহার করে এবং কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন একজন সচিবকে পদায়নের অনুরোধ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় সব দিক বিবেচনা করে দেখছে বলে হয়তো একটু সময় লাগছে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী চিঠি পাওয়ার বিষয়টি গত রোববার প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশনের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে সচিবকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানোর পর থেকে অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। এর প্রভাব পড়ছে কমিশনের কাজকর্মে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সচিব মাকসুদুল হাসান খানের জন্য একটি পদের ব্যবস্থা করেই তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এর পাশাপাশি দুদকের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য যোগ্য কর্মকর্তা খোঁজা হচ্ছে।
দুদকে মাকসুদুল হাসান খানের দপ্তরে গিয়ে অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার তাঁর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তাঁর (প্রণব ভট্টাচার্য) নেই।
গত বছরের ৬ আগস্ট দুদকের সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ১০ আগস্ট যোগ দেন অতিরিক্ত সচিব মাকসুদুল হাসান খান। পরে সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা।
দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, দুদকের সচিব পদে যোগ দেওয়ার পর চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের সঙ্গে প্রেষণে লোকবল নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে মাকসুদুল হাসানের মতবিরোধ হয়। মন্ত্রণালয়ে দেওয়া দুদকের চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়েছে, দুদকের নিয়মিত মাসিক ব্রিফিংয়েও তিনি অংশ নিতে চাইতেন না। প্রেস ব্রিফিং করার জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। এর মাধ্যমে তিনি কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।
কমিশনের চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, সচিবের উদাসীনতা, অনাগ্রহ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাধ্যতার কারণে কমিশনের কার্যক্রমে স্থবির অবস্থা বিরাজ করছে। তিনি কমিশনের দৈনন্দিন কার্যক্রমে প্রতিনিয়ত বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন। সচিবের এহেন কার্যক্রমে কমিশনের সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম মারত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত মাসে পদোন্নতি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে সচিবের দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভাপতি হিসেবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবল জ্যেষ্ঠতাকে বিবেচনায় নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। একজন কমিশনার জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতির পক্ষে মত দেন। কিন্তু সচিব নিজের প্রস্তাবে অনড় থাকেন। এর জের ধরে সচিবকে প্রত্যাহার করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে দুদকের একাধিক সূত্র।

বিজিএমইএকে আরও পরিণত হতে হবে -খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কারখানা পরিদর্শন কার্যক্রমের সমালোচনায় নেমেছেন পোশাকশিল্পের মালিক ও একাধিক মন্ত্রী। অ্যালায়েন্সও এক বিবৃতিতে সরকারকে পরিষ্কার অবস্থান জানাতে বলেছে। অ্যাকর্ড–বিজিএমইএ গত বুধবার বৈঠক করেছে। এসব বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
প্রথম আলো: বিজিএমইএর নেতারা ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এসব গলার কাঁটা। এসব কথাবার্তায় সমস্যা বাড়বে, নাকি কমবে?
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: পোশাক কারখানার পরিদর্শন ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে কারখানার মালিকেরা একধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন। এ সময় রপ্তানির নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধিও দুশ্চিন্তার কারণ। এটা সত্যি, যেকোনো সংস্কারই কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। এসবের প্রতিক্রিয়া বড় পোশাক কারখানার চেয়ে ছোট, মাঝারি বা সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানার ওপর বেশি। সব মিলিয়ে তাদের অস্থিরতা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের সমালোচনা করার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে। তবে সংগঠন হিসেবে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর আরও পরিণত আচরণ প্রয়োজন। সংগঠনের সদস্য কারখানার মালিকদের সংস্কার কার্যক্রম সময়মতো শেষ করতে চাপ দেওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, সংস্কারকাজে দীর্ঘসূত্রতা কাঙ্ক্ষিত ফল প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। সংগঠন দুটির পাশাপাশি সরকারের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ও চুক্তির বিষয়গুলো মনে রাখা প্রয়োজন। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে অগ্রসর না হয়ে অন্য উপায়ে গেলে সমস্যা বাড়াবে বৈ কমবে না।
প্রথম আলো: অ্যালায়েন্স অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে বলেছে। সরকারের কী করা উচিত?
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: অ্যালায়েন্স-প্রধানের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে কারখানা পর্যায়ের সংস্কারকাজে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না হলেও শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তি হিসেবে একে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হচ্ছে। এখানে মনে রাখা দরকার, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া কর্মসূচি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অ্যালায়েন্সের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আইএলওর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী অ্যাকর্ডের কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এসব চুক্তির অধীনে গৃহীত কাজের অগ্রগতি সরকার নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অবহিত করছে। এ রকম ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যেকোনো মন্তব্য চুক্তি বাস্তবায়নে তার অবস্থানকে দুর্বল করে। সরকারের উচিত হবে তার অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরা। যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে উৎসাহিত করা।
প্রথম আলো: পোশাকমালিকেরা বলছেন, দুই জোটের কার্যক্রমের কারণে জটিল সময় পার করছেন তাঁরা। এই বক্তব্য কতটা যুক্তিযুক্ত?
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের কারখানা পরিদর্শনে বিভিন্ন রকমের ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছে। সংশোধন পরিকল্পনা অনুসারে ত্রুটি সমাধানে কারখানাগুলোকে বেশ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক না হওয়ায় সীমিত আয়ের মধ্যে থেকে এ বাড়তি বিনিয়োগ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। পাশাপাশি সংস্কারের অংশ হিসেবে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন, আইনি সংস্কার ও বাস্তবায়ন, কারখানা পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়ন চালু এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটি চালু করতে হচ্ছে। সার্বিকভাবে কারখানামালিকদের জন্য সময়টা জটিল ও কষ্টসাধ্য। তবে এসব সংস্কার নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রথম আলো: পোশাকের রপ্তানি ২০২১ সালে পাঁচ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যেতে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: পাঁচ হাজার কোটি ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে শুরুর বছরেই দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর যে ধরনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা এখনো অনুপস্থিত। এ জন্য পণ্য রপ্তানির পরিমাণের প্রবৃদ্ধির ওপর নয়, বরং গুণগতমানের উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করতে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আর এ ক্ষেত্রে যে ধরনের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, তার জন্য বর্তমানে চলমান সংস্কারের গুরুত্ব আছে। তাই অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে শেষ করে বিশ্বে নতুন বার্তা দেওয়া খুবই প্রয়োজন।
সাক্ষাৎকার দুটি নিয়েছেন:
শুভংকর কর্মকার