Tuesday, August 13, 2013

সবার কথা শুনতে হবে by ধীরাজ কুমার নাথ

গত ৬ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের এক সভায় কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেন, বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য কমপক্ষে ৬০টি পৃথক আসন নির্ধারিত করা হোক। এ ব্যাপারে তারা সব বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এ দাবি সমর্থনের জন্য আবেদন করেছেন। এমন একটি দাবি এত বছর পর দেশবাসীকে চমক দিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান একসঙ্গে সংগ্রাম করেছে, সেখানে এ ধরনের দাবি কেমন যেন বেমানান বলে অনেকে মনে করছেন। আমাদের একটি অনন্য সংবিধান রয়েছে, যে সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।’ এ ছাড়াও সংবিধানের ২৯ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য করা যাইবে না।’
এ ছাড়াও সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, ‘আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’
এমন একটি সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকার পরও পৃথকভাবে নির্বাচন করা বা সংরক্ষিত আসন সৃষ্টি করে সংবিধান সংশোধন করে একটি নতুন অনুচ্ছেদের সংযোজন করা ব্যতিক্রমধর্মী ভাবনা বলেই মনে হয়। অনেকের অভিমত, এমন দাবি স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মুক্তিযুদ্ধে মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একযোগে একই ক্যাম্প বা বাংকারে থেকে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, অনেকে শহীদ হয়েছে। তবে এ কথাও সত্য, ১৯৮৮ সালে যখন সংবিধানে ৮ম সংশোধনী আনা হয়, তখন একবারও সংবিধানের উল্লিখিত ধারা বা প্রস্তাবনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রাষ্ট্রধর্মের বিষয়ে গণভোট গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করা হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সচিবালয়ের উদ্যানে (ডাকঘরের সামনে) সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্দেশে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কার্য সম্পাদনে সকলের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। এ দেশ থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবনা নির্মূল হয়েছে।’ অথচ ১৯৭৫ সালেই খন্দকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা করার পাঁয়তারা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার দর্শন এবং ক্ষমতাসীনদের ভাবনার সঙ্গে মনে হয়, অনেক ক্ষেত্রে কোনো সঙ্গতি নেই।
সংখ্যালঘুদের এ ফোরাম প্রধানত নির্বাচনকালে এবং নির্র্বাচন-পরবর্তী সময়ে ধর্মভিত্তিক যে প্রচারণা বা সহিংসতা লক্ষ্য করা যায়, তার প্রেক্ষাপটে এসব দাবি উত্থাপন করেছে বলে মনে হয়। তাছাড়া সংবিধানে সংখ্যালঘুদের সমতার কথা বলা হয়েছে সত্য, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা বা রক্ষাকবচের লক্ষ্যে কোনো প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়নি বলে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। এ ফোরাম থেকে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ সালে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আগৈলঝড়াসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে এবং এজন্য শাহাবুদ্দিন কমিশন গঠন করা হয়েছে, তার কোনো ফলাফল দেশবাসী দেখতে পায়নি অদ্যাবধি। সরকার কোনো ধরনের প্রতিকারের কথা ভাবেনি।
এসব কারণেই তাদের মতে, ২০০১ সালের পর কয়েক লাখ সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছে। আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে যেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ ভাগ, সেখানে এখন তা ৯ ভাগে উপনীত হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের ড. মীজানুর রহমানের মতে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশে কোনো হিন্দু থাকবে না। মূলত পাকিস্তানে যা হয়েছে, তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এখানে। তাহলে স্বাধীনতার চেতনা বা তার সুফল কোথায়?
অনেকে আবার মনে করছেন, বর্তমান জাতীয় সংসদে সংখ্যালঘুদের নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। এ বছর ২৮ ফেব্র“য়ারির পর বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দির ভাঙার যে মহোৎসব শুরু হয়েছে এবং এখনও যা অব্যাহত আছে, এবারের বাজেট অধিবেশনে তার ওপর কোনো বক্তব্য, কোনো প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়নি, পয়েন্ট অব অর্ডার তো নয়ই। সংসদে অনেক গ্রাম্য ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ভাষা বা বাক্য ব্যবহার করা হয়নি। তাই সংসদে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি থাকতে হবে, যারা আদিবাসীদের বেদনার কথা বলবেন, সংখ্যালঘুদের প্রতি উপেক্ষার কাহিনী তুলে ধরবেন। তাদের ভূমি দখল, মন্দির ও প্যাগোডা দখল, পরিবারের প্রতি অসম্মানের চিত্র তুলে ধরবেন এবং তার প্রতিকার চাইবেন। দলীয়ভাবে নির্বাচিত সংখ্যালঘু সদস্যদের দ্বারা এসব কথা বলা সম্ভব নয়। তারা শুধু দলীয় নেতার প্রশংসা বা ভাবনার কথা বারবার বলতে ভালোবাসেন। দেশের কথা, দশের কথা তাদের চিন্তায় থাকলেও ভাষায় প্রকাশের সাহস বা সময় তাদের নেই।
স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এ ধরনের বিছিন্ন ভাবনা বাংলাদেশে উঠে আসবে, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এমনটা ভাবিনি। ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে দেশ গড়ার স্বপ্নে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষাকে বরণ করে নিয়েছে দেশবাসী। ভুলে গেছে অনেক নির্যাতনের কথা, হিংসা ও বেদনার কথা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তাই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তাদের ভুল সংশোধন করে জাতির মূল স্রোতে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিতে এবং একযোগে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিবেদন করতে আহ্বান করেছেন। দারিদ্র্যকে দূরীভূত করে, সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটিয়ে, সহিংসতাকে নির্মূল করে, এক ভাষা এক জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার ভাবনাকে বিকশিত করার স্বপ্নে সবাই ছিল বিভোর। কিন্তু দেশ যেন প্রগতিশীল ভাবনা থেকে দিনের পর দিন দূরে সরে যাচ্ছে। উদার মানসিকতাকে আজকাল দুর্বলতা হিসেবে মনে করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে।
অনেক দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে লক্ষ্য করা যায়, সবাই তা সমর্থন করে না। এরূপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীনতার পর সবাই দেশের মূলস্রোতে ফিরে আসে, দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করে। বাংলাদেশে কেন জানি তা হচ্ছে না। অনেকের ধারণা, এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম দুর্বলতা। অনেক রাজনৈতিক নেতা দেশ পরিচালনাকে মনে করেন ছেলেখেলা, যেমন খুশি তেমন সাজো, যেমন মন চায় তেমন বলো। তাদের সামনে কোনো দর্শন নেই, কোনো আদর্শ অথবা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কোনো উদ্যোগ নেই। আমলাতন্ত্রের মধ্যে ‘ইয়েস স্যার, ইয়েস মিনিস্টার’ লক্ষ্য করা যায়। এ শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই। কিন্তু দলীয় রাজনীতিতে প্রেসিডিয়ামের মধ্যে ভাবনা হয়, গবেষণা কোষ থাকে, নিজস্ব মনিটরিং সেল থাকে। জনগণের ভাবনা এবং সরকার ও বিরোধী দল সম্পর্কে তৃণমূল থেকে তথ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে দলীয় প্রেক্ষাপট বা কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। দলের কর্মসূচি প্রণীত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মনে হয় এমনটি আদৌ হচ্ছে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনা ও দলীয় কর্মসূচি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনে জিততে হবে, এমনটা হচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের অহর্নিশি ভাবনা। রাজনীতি কি শুধু নির্বাচিত হওয়ার জন্য? টাকা খরচ করলে ভোট পাওয়া যাবে, এ ভাবনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। জনগণ অনেক সচেতন, গণমাধ্যমের দৃষ্টি অনেক প্রখর।
সরকার, বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ভাবতে হবে, কিভাবে দেশের সব মানুষকে প্রগতির পথে এক সূত্রে গাঁথা যায়। এ কাজ সহজ নয়। বিভেদ থাকবে, আদর্শগত অবস্থান ভিন্নতর হবে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছু কিছু বৃহৎ কর্মকাণ্ডে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হতে কোনো অসুবিধা নেই। এজন্য চাই সদিচ্ছা। দলীয় স্বার্থ বা অহমিকার ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনা সভার আয়োজন করা দরকার। প্রয়োজনে গণভোট নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে এমন গণভোট হয়েছে। আরও হতে ক্ষতি কী? মনে রাখতে হবে, জনগণ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক সচেতন। তারা জানে কোন কথা কেন বলা হচ্ছে। কোনটা দুর্নীতি, কোনটা জনহিতকর কাজ, সে পার্থক্য তাদের কাছে স্পষ্ট। কিভাবে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়- এ নিয়ে ভাবনার সুযোগ আছে, পথ ও পদ্ধতি আছে। সংকট সৃষ্টি করা সহজ, সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানোর মধ্যেই রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় মেলে। দেশবাসীকে চরম আশংকা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে রেখে লাভ নেই, সুদিনের স্বপ্ন দৃশ্যমান করতে হবে। সংখ্যালঘুদের কারও ভোটব্যাংক ভাবলে তা সঠিক হবে না। তাদের প্রতিনিধিদের কথা শুনতে হবে মনোযোগের সঙ্গে। সবার কথা শুনতে হবে, জাতীয় স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনে।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব, কলাম লেখক

এশিয়া নিয়ে ইংলাকের স্বপ্ন by ধীরাজ কুমার নাথ

দ্রুত বিকাশমান এশিয়াকে নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখছেন এ মহাদেশের নেতারা। থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা তাদেরই একজন। সম্প্রতি টোকিওতে অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সম্মেলনে চমৎকার একটি ভাষণ দিয়েছেন তিনি। মুগ্ধ বিস্ময়ে পড়লাম সে ভাষণের টেক্সট। এ ভাষণের লক্ষণীয় দিক হলো, এতে এশিয়া মহাদেশ সম্পর্কে তার অত্যন্ত উদার একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। ইংলাক বলেছেন, এশিয়া বৈচিত্র্যময়। যেখানে বৈচিত্র্যের সমাহার, সেখানে অনেক সময় বিরোধপূর্ণ স্বার্থ থাকতে পারে। এশিয়ার উচিত জাতীয় স্বার্থ ছাপিয়ে সামগ্রিকভাবে গোটা অঞ্চলের স্বার্থের দিকে তাকানো। আমাদের প্রয়োজন একটি বহির্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অভিন্ন এশীয় সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করা। এটা পরস্পরের স্বার্থ ভাগাভাগি করে নিতে এবং চ্যালেঞ্জগুলো একত্রে মোকাবেলা করতে সহায়ক হবে। কারণ আজকের বিশ্বে আমরা সবাই যুক্ত। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো এশিয়ার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এশিয়ার মৌলভিত্তি শক্তিশালী। এখন আমরা কী করব, তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ। বোঝা যাচ্ছে, ইংলাকের দর্শন বা ব্রত হলো, ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। তিনি এশিয়ার সম্ভাবনাগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেয়ার কথা বলছেন। তবে এশিয়ায় এ ধরনের দর্শনের বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সবাই ইংলাকের মতো উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী নন। এশিয়ার অনেক নেতাই রক্ষণশীল বা অন্তর্মুখী। তাছাড়া প্রতিটি দেশের নেতা নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এশিয়ার দেশগুলো উপ-আঞ্চলিক পর্যায়েও বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এসব চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এসবের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। যেমন- পরিবেশের অবক্ষয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাত, সুশাসনের অভাব ইত্যাদি। এ বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই এক দেশের সমস্যায় অন্য দেশ চোখ বুজে থাকতে পারে না। সেটা যদি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা নাক গলানো পর্যায়ে পৌঁছায় তাহলে বিরোধ অবধারিত। যেখানে উপ-আঞ্চলিক পর্যায়েই দেশগুলো নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে তারা জাতীয় স্বার্থ ছাপিয়ে গোটা অঞ্চলের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে কিভাবে?
তবে সত্যিই যদি এটা সম্ভব হয়, তাহলে এশিয়ার সামনে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা- যা ধরা পড়েছে ইংলাকের দূরদৃষ্টিতে : এশিয়া উঠে দাঁড়াচ্ছে। এ মহাদেশের রয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও বিশাল ভূখণ্ড, যা দুই বৃহৎ মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। এর ফলে বিশ্বে আমাদের প্রভাব ব্যাপক। এশিয়ার ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, অতীতে যেমনটা করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রটি এশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে। আশির দশকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে এশিয়ার অর্থনীতির নেতৃত্ব দিয়েছে জাপান। গত দশকে চীন ও ভারত বিশ্ব প্রবৃদ্ধি অর্জনের নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর এ অঞ্চলে গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৫.৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে তা দাঁড়াবে প্রায় ৬ শতাংশে। সীমিত মুদ্রাস্ফীতি ও সরকারি পর্যায়ে পরিশোধযোগ্য ঋণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়েছে। একই সঙ্গে একটি উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি, তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সৃষ্টিশীলতা এবং নতুন প্রযুক্তির সহায়তা এ অঞ্চলে টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখবে। বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব জিডিপিতে এশিয়ার অংশ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫১ শতাংশ হবে। এশিয়ায় ভোক্তার সংখ্যা ও ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত বাড়বে। বিশ্বে মোট মধ্যবিত্তের ৬৬ শতাংশ হবে এশীয়। বর্তমানে এ হার মাত্র ২৮ শতাংশ। এশিয়ার আন্তর্জাতিক রিজার্ভও খুব ভালো, ৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার হলে এটি একটি সত্যিকারের ‘এশীয় শতাব্দী’ নির্মাণে সহায়ক হবে।
তবে এজন্য দরকার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং জনগণ পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে তোলা। আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবহনের কারণে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার হচ্ছে। যারা এ থেকে দূরে সরে থাকছে, তারা এ সুযোগ হারাচ্ছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংহতির মাধ্যমে দেশগুলোর অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে দেশগুলোতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভবপর হয়ে উঠবে। দ্রারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। ফলে দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নের ব্যবধান কমে আসবে। এটা সম্ভব হলে এশিয়া হয়ে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল। আসুন দেখি এ বিষয়ে ইংলাক কী ভাবছেন : আমরা একসঙ্গে একটি প্রাণচঞ্চল আঞ্চলিক বাজার গড়ে তুলতে পারি সবার পণ্য ও সেবা বিক্রির জন্য। একই সময়ে বাড়তি তহবিল গোটা অঞ্চলের সুবিধার্থে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সব দেশের মধ্যে সহযোগিতা হওয়া উচিত যাতে সবাই একসঙ্গে এর সুফল পেতে পারে। আমাদের বিনিয়োগ যোগাযোগ সম্প্রসারণে- স্থল ও সমুদ্রপথ উভয় ক্ষেত্রে- পরিচালনা করা উচিত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ডের মহাদেশ এশিয়া। স্থলভাগে রেল যোগাযোগ সবচেয়ে কার্যকর। উচ্চগতির রেল যোগাযোগের জন্য একটি আধুনিক সিল্ক রোড নির্মাণ করতে হবে। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সুবিধা সংবলিত এ পথ এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপকে যুক্ত করবে। একই সঙ্গে আমরা সড়ক, বিমান ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ বাড়াতে থাকব।
তবে এ যাত্রাপথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং তা এ অগ্রগতিকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রসীমা নিয়ে উত্তেজনা একটি সমস্যা। একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল নিরাপত্তার পরিবেশ ছাড়া এশিয়ার জন্য টেকসই উন্নয়ন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি হতে পারে না। অপেক্ষাকৃত একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা অপরিহার্য। যেমন অপরিহার্য বাণিজ্য ক্ষেত্রে সমতা। মুক্তবাণিজ্য ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে অসম বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে পারে। এ ধরনের বাণিজ্যে অধিকতর উন্নত দেশই বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। কারণ অসম বিনিময়ের কারণে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের বিষয়টি বেশি উন্মুক্ত হয়ে যায়। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলতে হবে। কাজটি সহজ নয়। ইংলাক কি তা অনুধাবন করেন? নিশ্চয়ই করেন, তার ভাষণে এর কিছুটা আভাস রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি এশীয় ইউনিয়নের স্বপ্ন দেখছেন ইংলাক। যদিও আসিয়ান নিয়ে এ ধরনের চিন্তা আজও বাস্তবে রূপ নেয়নি। সম্ভবত ইংলাকের ভাবনা আরও বৃহত্তর পরিসরে, এশিয়ার সব দেশকে ঘিরে। তিনি মনে করেন, ২০১৫ সালে সীমান্তবিহীন আসিয়ান চালু করা কঠিন হবে। ‘কিন্তু আমরা যদি এশিয়ার অন্যান্য উপ-অঞ্চলকে অধিকতর ঘনিষ্ঠ করতে পারি, তাহলে এশিয়া একসঙ্গে উঠে দাঁড়াতে পারবে। সমস্যাগুলো একত্রে মোকাবেলার জন্য আমার প্রস্তাব, আমরা উইন-উইন ইস্যুতে ঘনিষ্ঠতর সহযোগিতা গড়ে তুলব, যা গোটা এশিয়ার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেবে। এ ধরনের ইস্যুর মধ্যে থাকবে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা। পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ আমাদের অঞ্চলের উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করবে। ‘এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করা দরকার। এশিয়ার ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে। সবার জন্য টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের প্রজন্মের। এটা এমন একটি পথ যেখানে আমরা একসঙ্গে কাজ করব, একে অন্যের কাছ থেকে শিখব এবং উন্নত হব একসঙ্গে। এটা শুধু আমাদের অঞ্চলের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’
লক্ষ্য করুন, ইংলাক ‘একসঙ্গে’ কথাটি বারবার বলেছেন। সত্যিই যদি এশিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি অভিন্ন বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে কোনো দেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। এতে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ শুধু নয়- এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে গিয়ে সহজেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। যদি এশিয়ার পানি, উৎপাদিত বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক সম্পদ সব দেশ ভাগাভাগি করে নিতে পারে, তাহলে আর কোনো দেশে এসবের অভাব থাকবে না। যদি এক দেশের পরিবেশের ক্ষতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনুধাবন করে অপর দেশ দূষণ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে, তাহলে কতই না ভালো হয়। আমাদের প্রশ্ন, এসব কি শুধুই অলীক কল্পনা? নাকি ইংলাকের মতো এশিয়ার অন্যান্য নেতাও এসব উপলব্ধি করবেন?
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

ইংরেজি প্রশ্ন নিয়ে বিভ্রান্তি ও এনসিটিবির ভূমিকা by মাছুম বিল্লাহ

যখনই নতুন কারিকুলামে পাঠ্যবই প্রকাশ করা হয়, তখনই বইয়ের শেষে একটি স্যাম্পল প্রশ্ন দেয়া হয়, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সবাই বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেন। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে। কিন্তু ২০১৩ সালে কারিকুলাম পরিবর্তন করা হল, বই ছাপা হল কিন্তু কোনো ধরনের স্যাম্পল প্রশ্ন দেয়া হল না। ভালো কথা, পাঠ্যবই ছাড়া অর্ধসমাপ্ত কিছু প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি চ্যাপ্টারে-ইউনিটে আছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ওভাবেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে থাকত অর্থাৎ ধরে নিত, এ ধরনের প্রশ্নই পরীক্ষায় থাকবে। এ ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের ইংরেজি জ্ঞান যাচাই করা হবে। কিন্তু জানুয়ারি মাসে বই বিতরণ করে মার্চের শেষদিকে একটি প্রশ্নপত্র ছাড়া হল ইন্টারনেটে। বাংলাদেশে ১২ শতাংশেরও কম লোক কম্পিউটার ব্যবহার করে। অতএব ইন্টারনেটে মডেল প্রশ্ন ছাড়া হলে সব শিক্ষার্থীর কাছে কিভাবে তা পৌঁছবে? এসসিটিবি ধরেই নিয়েছে যে, এতেই তাদের দায়িত্ব শেষ, বাকিটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশকরা করবেন। আবার সভা-সেমিনারে বলা হচ্ছে, প্রাইভেট প্রকাশকরা কোনো ধরনের নোট বা গাইট বই যাতে প্রকাশ করতে না পারে, সেজন্যই এ ব্যবস্থা। বিপরীতধর্মী কথা মনে হচ্ছে। ধরা যাক বিভিন্ন প্রকাশক ও শিক্ষক সমিতির সহায়তায় মোটামুটি সবাই জেনে গেল যে, ওই ধরনের প্রশ্নপত্রই প্রণয়ন করা হবে পাবলিক পরীক্ষায়। সবাই সেভাবে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করল। কিছু দিন পর আবার প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন করা হল। সবাই বিভ্রান্ত। আবার সংশ্লিষ্ট সবাই নতুন প্রশ্নপত্রের ওপর প্রস্তুতি নেয়া শুরু করল। আবার পরিবর্তন করা হল। এভাবে পাঁচবার প্রশ্নপত্রের ধরনে পরিবর্তন আনা হল। সর্বশেষ যেটি হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, পাঠ্যবই থেকে কোনো ধরনের প্রশ্নপত্র সেট করা হবে না। এ কেমন সিদ্ধান্ত? পাঠ্যবই থেকে প্রশ্নপত্র সেট করা না হলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই তো ছুঁবেই না। অন্তত একটা অংশ পাঠ্যবই থেকে করা যায়, বাকিটা বাইরে থেকে করা যেত।
এর পূর্ববর্তী কারিকুলামে বলা হয়েছিল, পাঠ্যবইয়ের অনুরূপ একটি প্যাসেজ প্রশ্নপত্র প্রণেতারা তৈরি করবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। হুবহু বইয়ের প্যাসেজই তুলে দেয়া হতো। তারপর একটি যুক্তি ছিল যে, ওই প্যাসেজের ওপর নম্বর ছিল ৪০। দুই পেপারের বাকি ১৬০ নম্বর থাকত আনসিন। কিন্তু এবার কী করা হল?
১৯৯৭ সালের কারিকুলাম অনুযায়ী যে ইংরেজি বই ছাপা হয়েছিল, সেখান থেকে হুবহু প্যাসেজ তুলে দেয়া হতো স্কুল ও পাবলিক উভয় পরীক্ষাতেই। তারপরও শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ে হাত দিত না, নোট ও গাইড বই নিয়েই ব্যস্ত থাকত। এবার আশা করেছিলাম, পাঠ্যবই শিক্ষার্থীরা যাতে পড়ে, সে ধরনের একটি ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু দেখা গেল এনসিটিবি এবার আরও একধাপ উপরে উঠে গেছে। পাঠ্যবই থেকে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। তাহলে কি শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই ছুঁয়ে দেখবে? পাঠ্যবইয়ের কী দরকার ছিল তাহলে? মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনও যারা ইংরেজি পড়াচ্ছেন, তাদের ক’জনের পক্ষে সম্ভব নতুন প্রশ্ন তৈরি করা? সবচেয়ে বড় কথা, এ শিক্ষকদের কোনো ধরনের প্রশ্ন নিজেদের তৈরি করতে হয় না। এখন প্রশ্ন তৈরি করাই তারা অনেকে ভুলে গেছেন বা সে ধরনের দক্ষতা তারা হারিয়ে ফেলেছেন। তারা বাজারের বই থেকেই প্রশ্ন তুলে দেন। এনসিটিবি যা করতে পারত তা হচ্ছে- একই ধরনের বা একই আইটেমের প্রশ্ন প্রতিবছর হবে না, পাঠ্যবইয়ের আইটেমের মতোই প্রশ্ন হবে, তবে প্রতিবছর একই ধরনের প্রশ্ন তৈরি করা হবে না। যেমন এতদিন ছিল এক নম্বরে বহু নির্বাচনী প্রশ্ন, দুই নন্বরে সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি। সত্য-মিথ্যা এক বছর দিলই না, কিংবা শিক্ষার্থীদের বলা হতো যে, দেয়া প্যাসেজ থেকে তিনটি সত্য ও দুটি মিথ্যা স্টেটমেন্ট/বাক্য তৈরি কর। তাহলে তাদের ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজের ডেভেলপমেন্ট যাচাই করা যেত। এটি করতে পারলে একটি অরিজিনাল টেস্ট নেয়া হতো। পূর্ববর্তী সিলেবাসে লেখা ছিল, বই থেকে হুবহু প্যাসেজ তুলে দেয়া যাবে না। বইয়ের প্যাসেজের থিম ঠিক রেখে প্যাসেজটি আবার লিখতে হবে। কিন্তু কেউ তা করেনি, বরং বাজারের বই থেকেই সবাই প্রশ্ন তৈরি করা শুরু করেছিল। এবার অবস্থা হয়তো আরও খারাপ হবে। একই ধরনের প্রশ্ন বছরের পর বছর করা হতো, শিক্ষার্থীদের বেসিক টেস্ট করা হতো না। এনসিটিবি কোনো ধরনের মডেল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেনি ভালো কথা, কিন্তু বারবার পরিবর্তনের পর হঠাৎ করে মডেল প্রশ্ন দেয়ার কী প্রয়োজন ছিল? তারা কি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, কী ধরনের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হবে? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এরকম লুকোচুরি খেলা খেলছেন, বুঝতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। রুট লেভেলের হাজার হাজার শিক্ষকের সঙ্গে আমরা কাজ করি, প্রশিক্ষণ প্রদান করি। বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হয় তাদের সঙ্গে। দেখলাম, ইংরেজি প্রশ্নের ধরন কী হবে, তা নিয়ে তারা অনেকটাই বিভ্রান্ত।
পড়াশোনা ব্যাপারটি থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত, অথচ আমরা দেখছি এক্ষেত্রে শুধুই লুকোচুরি খেলা। কেন এ খেলা? পুরো ইংরেজি শিক্ষক সমাজ অন্ধকারের মধ্যে আছে। কেউই প্রশ্নপত্র সম্পর্কে সঠিক কিছু বলতে পারছেন না। ব্যাপারটি এমন হল কেন? শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের এক ধরনের সাসপেনসের মধ্যে রেখে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ কী মজা পাচ্ছে জানি না। জেএসসি’র সর্বশেষ মডেলে দেখা যাচ্ছে পাঠ্যবইবহির্ভূত তিনটি প্যাসেজ থাকবে, যার প্রথমটি থেকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন করা হবে, তাও আবার শুধু শব্দার্থ। দ্বিতীয় নম্বরে প্রশ্নোত্তর। দ্বিতীয় প্যাসেজ থেকে ইনফরমেশন টেবিল পূরণ করতে হবে। তৃতীয়টি থেকে সামারি লিখতে হবে। এছাড়া ক্লু ছাড়া ও ক্লুসহ গ্যাপ ফিলিং, রিঅ্যারেঞ্জ, ম্যাচিংগুলোও আনসিন হবে। আইটেমগুলো ভালো, কিন্তু পাবলিক পরীক্ষায় যাতে কোনো গাইড বই থেকে সরাসরি এগুলো তুলে দেয়া না হয়। নয়তো সব উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। সর্বশেষ মডেলের প্যাসেজ বিদেশী বই থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। আবার বলা হচ্ছে, বইয়ের প্যাসেজের অনুরূপ প্যাসেজ তৈরি করে প্রশ্ন করতে এবং সে পদ্ধতি অনুসরণ করে বাজারে বিভিন্ন ধরনের বই বেরিয়েছে। কেউ কেউ পুরনো বই থেকে প্যাসেজ তুলে দিয়েছে, কেউ বর্তমান বইয়ের প্যাসেজের মতো আগের কারিকুলামের বই থেকে প্যাসেজ তুলে দিয়েছে। কেউবা আবার একেবারেই অন্য ধরনের প্যাসেজ দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের যে শুধু সাগরে ফেলে দেয়া হচ্ছে তা নয়, গাইড ও নোটবুককে দ্বিগুণ উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখন যেটি হবে- বোর্ড পরীক্ষায় যখন প্রশ্ন প্রণয়ন করা হবে, তখন দেখা যাবে নির্দিষ্ট একটি গাইড বই থেকে মডেল তুলে দেয়া হয়েছে, আর সঙ্গে সঙ্গে ওই গাইডবইটিই বাজারে গুরুত্বসহকারে সবাই কিনছে। প্রতিবছর যা হচ্ছে তা-ই হয়তো হবে। বিষয়টি বোর্ড ও এনসিটিবি কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করছি।
যদি এমন করা হতো- এনসিটিবি কর্তৃক বই গাইডলাইন আকারে থাকবে এবং প্রশ্ন বাজারের কোনো ধরনের বই থেকে কোনোভাবেই নেয়া যাবে না, তবে প্র্যাকটিসের জন্য শিক্ষার্থীরা যে কোনো বই অনুশীলন করতে পারে- তাহলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতো এবং ইংরেজি পরীক্ষা গ্রহণযোগ্যতা পেত।
মাছুম বিল্লাহ : প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা)

দেশ অচল করে দেয়ার রাজনীতি by একেএম শাহনাওয়াজ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দল এবং আদালতের ভাষায় সন্ত্রাসী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতা-নেত্রীদের কাছে আমার একটি নিবেদন আছে। আপনারা যেহেতু জনগণের রাজনীতি করেন না- করেন ক্ষমতার এবং ক্ষমতার সঙ্গে থাকার রাজনীতি, সেহেতু তা সততার সঙ্গে ঘোষণা দিয়েই মাঠে নামুন। আমরা সাধারণ মানুষ একটি বড় দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে মেনে নেব এমন ললাট লিখন। মেনে নেব, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্য থাকলেও আমাদের কপালে গণতন্ত্র পাওয়া নেই। গণতন্ত্র তো আসবে রাজনীতিকদের হাত ধরে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য গণতন্ত্রের পথ কণ্টকাকীর্ণ করতে কিছুমাত্র দ্বিধা করেন না। অবলীলায় বিবদমান দলগুলো ক্ষমতার জন্য বিবাদ করছে আর তার কঠিন মাশুল দিতে হচ্ছে রাজনীতিকদের হাতে জিম্মি অসহায় জনগণকে। রাজনীতিকরা এতটাই ক্ষমতান্ধ হয়ে গেছেন, সাধারণ মানুষের ন্যূনতম তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার রণদামামা বাজাচ্ছেন। সব পক্ষের আচরণ থেকেই এর উদাহরণ টানা যায়। তবে এ মুহূর্তে আমার উল্লেখ করতে ইচ্ছা করছে সম্প্রতি বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের একটি বক্তব্য। ২ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানলে লাগাতার হরতালসহ নানা কর্মসূচি দিয়ে দেশ অচল করে দেয়া হবে।’
পাঠক একবার লক্ষ্য করুন, কতটা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর ভূমিকায় আছেন আমাদের রাজনীতিকরা। দেশ অচল করার কর্মসূচিতে হয়তো লাভ হবে মওদুদ আহমদদের। শক্তির ভারসাম্যে হেরে গিয়ে সরকার পক্ষ হয়তো দাবি মেনে নেবে। তাতে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বিএনপির। অন্যদিকে এসব পাটা-পুতার ঘর্ষণে পিষে মরবে দেশবাসী।
যখন বড় কোনো দাবি আদায়ে সর্বাত্মক ধর্মঘটের কর্মসূচি হিসেবে লাগাতার হরতাল-অবরোধ ডাকা হয়, তখন সাময়িক কষ্ট মাথা পেতে নিয়েও সাধারণ মানুষ তাতে সমর্থন জানায়। কারণ তারা বিশ্বাস করতে চায়, এই ত্যাগের বিনিময়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে বড় কিছু অর্জিত হবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলো তখনই লাগাতার হরতালের মতো কর্মসূচিতে যায়, যখন তা গণদাবিতে রূপান্তরিত হয়। আর এ ধারার কর্মসূচির ডাক দেয়া হয় আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে। এখন তো হরতাল-অস্ত্র ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিরোধী দল মুড়ি-মুড়কির মতো ব্যবহার করছে। অস্ত্র ভোঁতা হয়ে যাওয়ায় তা আর ধারে কাটে না। এখন ভারে কাটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই হরতালের আগের দিন থেকে হরতাল ডাকিয়ে দল ও তাদের জোট বন্ধুরা সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। হামলে পড়ে সাধারণ নাগরিকের গাড়ির ওপর। নিরীহ গাড়িগুলো হামলার শিকার হয়। পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। যাত্রীরা আহত হয়। আগুনে পুড়ে ট্রাক ড্রাইভার, ট্যাক্সি যাত্রী নিহত হওয়ার খবরও বেরোয়। এমন সন্ত্রাসে ছড়ানো ভীতির স্বাভাবিক রেশ থাকে হরতালের দিনেও। ভীত মানুষ গাড়ি বের করতে, দোকান খুলতে সাহস পায় না। কেউ সাহস দেখালেও সেক্ষেত্রে চেষ্টা করা হয় তার জীবন বিপন্ন করার। আহত-নিহত নিরীহ মানুষের স্বজনদের কান্নায় টেলিভিশনের পর্দা ভারাক্রান্ত হয়। লক্ষ কোটি দর্শক বিষণ্ন হয়। অভিসম্পাদ দেয় হরতাল ডাকিয়ে সন্ত্রাসীদের। আর মুদ্রার অন্য পিঠে এসব রাজনীতিক সাংবাদিকদের ডেকে হরতাল সফল করার জন্য বিপন্ন জনগণকেই চরম বিদ্রুপের সঙ্গে ধন্যবাদ জানান। এই নষ্ট চরিত্রের কারণেই নিজেদের ক্ষমতার কাড়াকাড়ির যুদ্ধে জেতার জন্য নেতারা নির্দ্বিধায় দেশদ্রোহীর মতো দেশ অচল করে দেয়ার কথা বলতে পারেন!
কীভাবে এসব নেতা বুঝতে পারলেন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো এবং দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়া লাগাতার হরতাল কর্মসূচিকে মানুষ সমর্থন দিচ্ছে? আর কেনই বা দেবে? একথা সত্য, বর্তমান সরকার যাপিত জীবনে সাধারণ মানুষের জন্য খুব একটা স্বস্তি এনে দিতে পারেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখকে বিবেচনা করতে পারেনি। তাই দলীয় সন্ত্রাস অব্যাহত থেকেছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ তাদের উন্মাত্ততা একইভাবে প্রদর্শন করছে। প্রশাসনিক দুর্নীতি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারেনি সরকার। দলীয়করণের অস্বস্তিকর থাবা মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু শাসক দলের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কেবল বক্তৃতার মঞ্চে নিজেদের ঢাক বাজিয়ে যাচ্ছে। এই সত্য আবার বিএনপি-জামায়াতের কৃতকর্মের সত্যকেও মিথ্যা করে দেবে না। বিগত দিনে দুঃশাসন উপহার দেয়া বিএনপি-জামায়াত আজ হঠাৎ করে জনমন অধিকারী হয়ে যাবে কোন জাদুমন্ত্রে? কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নেগেটিভ ভোটে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হওয়ার অর্থ এই নয় যে, বিশেষ মন্ত্রবলে বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে। যদি আওয়ামী লীগ তার ব্যর্থতা অব্যাহত রাখে, তবে হয়তো এসব নেগেটিভ ভোটে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রেও মনে রাখতে হবে, বিএনপি নিজ ভোটে বিজয়ী হয়নি। বড় সত্যটি হচ্ছে, নেগেটিভ ভোটের ওপর শতভাগ ভরসা করা যায় না। এমন অবস্থায় বিএনপি যদি জনদুর্ভোগ বাড়ানোর কর্মসূচি দিয়ে বিজয়ী হতে চায়, তবে পদস্খলনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
এটি সত্য, আওয়ামী লীগের নানা ভুলের কারণে এখন বিএনপির বৃহস্পতি তুঙ্গে। একে ধরে রাখতে হলে আচরণে-বক্তব্যে বিএনপি নেতাদের আরও অনেক সংযত ও মানবিক হতে হবে। বিএনপি নিশ্চয়ই জানে, এদেশের সর্বস্তরের মানুষ এখন হরতালের মতো জনদুর্ভোগ বাড়ানোর কর্মসূচি চায় না। আজ যদি কোনো দল হরতাল ডেকে ভীতি ছড়ানোর সংস্কৃতি ত্যাগ করে এবং কোনো পিকেটিংয়ে না যায়, তবে সে হরতাল সুপার ফ্লপ করবে। যে কোনো দলের হরতালের পরিণতি একই হবে। তাহলে মানতেই হবে, হরতালের প্রতি মানুষের কোনো সমর্থন নেই। আছে বিতৃষ্ণা। এমন বাস্তবতায় বিএনপির মতো একটি দল, যার নেতা-নেত্রীরা কট্টর দলান্ধ কর্মী-সমর্থক ছাড়া জনসমর্থন বাড়ানোর মতো তেমন কোনো গুণাবলী প্রদর্শন করতে পারেননি, তারা যখন লাগাতার হরতাল ডেকে দেশ অচল করার কথা বলেন, তখন তা দেশবাসীর বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে সন্ত্রাস করার নামান্তর বলেই মনে হবে।
ঠিক এমন বাস্তবতায় এইচএসসি পরীক্ষায় কিছুটা ফল বিপর্যয়ের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন এর প্রধান কারণ হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতালকে দায়ী করেন, তখন তার সঙ্গে ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী পরিবারসহ দেশবাসী সে বক্তব্যকে সমর্থন জানাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়মমাফিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে দাঁড়িয়ে গেলেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল। তিনি স্বভাবসুলভ নাটুকে ও শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে সমালোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের। রবীন্দ্রনাথ আউড়ে বললেন, ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর।’ কিন্তু একবারও ভাবলেন না, সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ে কেষ্টা বেটাদের চিনতে ভুল করেনি। এ সত্য লুকানো যাবে না যে, হরতালের কারণে একটি পরীক্ষা ছাড়া বাকি পরীক্ষার তারিখ বারবার পেছাতে হয়েছে। চট্টগ্রামে নাকি একটি পরীক্ষাকে চারবার পেছাতে হয়েছে। এমন অবস্থায় পরীক্ষার্থীর পক্ষে স্বাভাবিক পরীক্ষা দেয়া কঠিন। যে দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা ক্ষমতাপ্রেমী রাজনীতিকদের স্বার্থের কাছে লাঞ্ছিত হতে পারে, আবার তার জন্য কিছুমাত্র লজ্জিত না হয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল নেতারা রসাত্মক বক্তব্য রাখতে পারেন, সে দেশে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী আছে!
বিএনপির বন্ধু জামায়াত তো এবার রেকর্ড ভঙ্গ করল। তারা নিয়ম করে ফেলেছে, নিজ দলীয় নেতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের দিন এবং পরদিন হরতাল চাপিয়ে দেবেই। এতে আইনের শাসনকে কতটা লাঞ্ছিত করা হচ্ছে আর সাধারণ মানুষকে কতটা দুর্ভোগে ফেলা হচ্ছে, তা বিবেচনায় নেয়ার মতো কোনো প্রয়োজন মনে করছে না দলটি। তাই ইসলাম ধর্মের নাম মুখে রেখে পবিত্র রমজান মাসেও একাধিক হরতাল দিতে এবং সন্ত্রাসের আগুন ছড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেনি। আবার ঈদের ছুটিতে ঘর ফেরা লাখ লাখ মানুষকে বিপদে ফেলে ১৩ ও ১৪ তারিখ দুই দিনের হরতাল ডেকেছে জামায়াত। বরাবর বিএনপি-জামায়াত একে অন্যের হরতালকে সমর্থন জানায়। এবার কিছুটা চক্ষুলজ্জা হয়েছে বিএনপির। জামায়াতের স্পর্শকাতর হরতালকে সমর্থন না জানিয়ে মৌনব্রত পালন করেছে। আমরা মনে করি, এ সময়ে হরতাল ডাকা থেকে জামায়াতকে বিরত রাখতে অথবা প্রকাশ্যে হরতাল না ডাকতে বলে বিএনপি নেতৃত্ব জনগণের সামনে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারতেন। কিন্তু জনগণের ঘাড়ে পা রেখে যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, তাদের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করা বৃথা।
সাধারণ মানুষের সংকট লাঘবে সরকারি দলই কি কোনো দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে? বিরোধী দলের হরতাল উন্মাদনা অনেকটা লাঘব করা যেত নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে ফয়সালায় আসতে পারলে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, সরকারি দলের অসহযোগিতা এক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার প্রেক্ষাপট তো রচিত হয়েছে সরকারি দল ও সরকার পক্ষের ইচ্ছাতেই। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি বিষয়টিকে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গেছে। আবার এই শক্তি নিয়েই তা অবমুক্ত করা যেত। কিন্তু জনকল্যাণ ও দেশকল্যাণ কোনো পক্ষের ভাবনাতে নেই বলে ক্ষমতাপ্রিয় দলগুলো একইভাবে নীরব থেকে নৈরাজ্য উস্কে দেয়। তাই যারা এককালে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচন অবাধ হবে না বলে বিশ্বাস করতেন, তারা এখন সুবিধার আসনে বসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মঞ্চ গরম করছেন। আবার এককালে সরকারি মসনদে বসে যারা পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হতে পারে না বলে বাণী দিয়েছিলেন, এখন তারা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি কায়েমের জন্য দেশ ও দেশবাসীকে জিম্মি করে ফেলেছেন।
আমাদের তাৎক্ষণিক ফল লাভে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের কাছে এরপরও মানুষ দূরদর্শিতা ও দায়িত্বশীলতা আশা করে। দেশ অচল করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি হয়তো হতে পারে, কিন্তু দেশবাসী যে তাতে বিপন্ন হবে এবং দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে বিবেচনা কি তারা করবেন না? নির্বাচনের ময়দানে এসব হিসাব নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষ করবে। তাই ক্ষমতার রাজনীতির স্থূলতার মধ্যে দাঁড়িয়েও বলব, কোনো পক্ষেরই উচিত হবে না তীরে এসে তরী ডোবানোর দায় নেয়া।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়