Saturday, July 28, 2018

হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ নিয়ে বসবাস করছেন প্রায় ২৬ কোটি মানুষ

নীরব এক ঘাতক হেপাটাইটিস ভাইরাস সংক্রমণ। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে বিশ্বে বসবাস করছে প্রায় ২৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। যা প্রায় ২৬ কোটি। ২০১৫ সালে এ ভাইরাসের সংক্রমণে মারা গেছেন ৮ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ। প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ মানুষের রয়েছে হেপাটাইটিস-সি সংক্রমণ। এ অবস্থায় প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৯৯ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। ২৮ শে জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। শনিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ দিনটি পালন করে। তাদের উদ্দেশ্য, এ রোগে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং কিভাবে এ রোগের চিকিৎসা করানো যায়, নির্মূল করা যায়। হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ৫ ভাগেরও কম মানুষ জানেন যে তারা এ ভাইরাসে সংক্রমিত। এটি লিভার বা যকৃতের একটি রোগ। এতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এ থেকে লিভার সিরোসিস বা ক্যান্সার হতে পারে। বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিসের সবচেয়ে অভিন্ন কারণ হলো এই ভাইরাস। এ ছাড়া এলকোহল, সুনির্দিষ্ট মদ থেকেও এ রোগের সৃষ্টি হতে পারে। প্রধানত ৫ রকম হেপাটাইটিস ভাইরাস আছে। এগুলোকে ইংরেজি এ, বি, সি, ডি এবং ই নামে অভিহিত করা হয়েছে। এগুলো সবটাই লিভারের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এ ভাইরাস বিভিন্ন উপায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। লাখ লাখ মানুষের দেহে ক্রোনিক আকারে রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী বি এবং সি ভাইরাস। লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য এ দুটি ভাইরাসই বেশি দায়ী। অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ, অনিরাপদ মেডিকেল প্রাকটিসের কারণে এ ভাইরাস দুটি দ্রুত ছড়ায়। শরীরে এ দুটি ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার অনেক সময় পর্যন্ত, কখনো কখনো অনেক বছর বা কয়েক দশক পর্যন্ত এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। শতকরা কমপক্ষে ৬০ ভাগ লিভার ক্যান্সার ধরা পড়ে দেরিতে পরীক্ষা করানোয়। হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের লক্ষণ যদি দেখা দেয় তাহলে তা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। এতে ত্বক হলুদ হয় যায়। চোখ হলুদ হয়ে যায় (জন্ডিস), প্রসাব গাঢ় হয়ে যায়। নাকে সর্দি আসে। বমি বমি লাগে। পেটে ব্যথা হয়। হেপাটাইটিস সি’তে সংক্রমিত হওয়ার পর শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ মানুষের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যাদের ক্ষেত্রে এর লক্ষণ দেখা দেয় তাদের জ্বর হয়। অবসাদ, ক্ষুধা মন্দা, নাকে সর্দি, বমি, পেতে পীড়া, ঘন প্রস্রাব দেখা দেয়। পায়খানার রং হয় কালো। জয়েন্টে জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা হয়। হেপাটাইটিস বি-এর একটি টিকা আছে, যা সংক্রমণ প্রতিরোধে শতকরা ৯৫ ভাগ কার্যকর। জটিল রোগ ও লিভার ক্যান্সার চিকিৎসায় তা কার্যকর। হেপাটাইটি সি ভাইরাসের কোনো টিকা বের হয় নি। ভাইরাস বিরোধী ওষুধ ব্যবহার করে শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া যায়। তবে তা কার্যকর হয় যারা দু’তিন মাসের মধ্যে এ সংক্রমণ ধরতে পেরেছেন তাদের ক্ষেত্রে। এতে লিভার ক্যান্সার ও সিরোসিসের মতো রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

ফেক নিউজ গণতান্ত্রিক সঙ্কট

ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর একটি গণতান্ত্রিক সঙ্কট। এতে ক্ষতিকর দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটে। বৃটিশ পার্লামেন্টের দ্য ডিজিটাল, কালচারাল, মিডিয়া এন্ড স্পোর্ট (ডিসিএমএস) কমিটি এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কেমব্রিজ এনালাইটিকা স্ক্যান্ডালের পর এ কমিটি ভুল তথ্য ও ভুল খবরের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে। এ বিষয়ে তারা তাড়াতাড়িই প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করবে। তাতে বলা হবে, সামাজিক যোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে আরো কঠোর নিয়মনীতির আওতায় আসতে হবে। নির্বাচনে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার কথাও এতে প্রস্তাব করা হবে। ওই রিপোর্টে বলা হচ্ছে, অবিরামভাবে বহু-পক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি লোজনের মধ্যে আতঙ্ক ও কুসংস্কার সৃষ্টি করে। এতে তাদের ভোট দেয়ার পরিকল্পনায় প্রভাব পড়ে। এটা গণতন্ত্রের জন্য একটি হুমকি। এই কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে রোববার। কিন্তু তার আগেই তার একটি কপি প্রকাশ করেছেন ব্রেক্সিট বিষয়ক ভোট লিভ পক্ষের ডমিনিক কামিংস। তিনি শুক্রবার তার নিজের ব্লগে ওই রিপোর্টের একটি কপি প্রকাশ করেছেন। তাতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব ক্ষতিকর (হার্মফুল) কন্টেন্ট থাকবে তাদেরকে তার দায় বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে ফেসবুক ও ইউটিউব বার বার বলেছে, তারা কোনো প্রকাশকের চেয়ে শুধু একটি প্লাটফরম। তারা যুক্তি দেখান যে, তাদের সার্ভিসে ব্যবহারকারীরা যেসব উপাদান পোস্ট করেন তার জন্য তারা দায়ী নন। কিন্তু ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিজেদেরকে শুধু একটি প্লাটফরম হিসেবে ঘোষণা করে দায় এড়াতে পারে না সামাজিক যোগাযোগ বিষয়ক কোম্পানিগুলো। তারা প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানি। তাদের সাইটে যেসব কন্টেন্ট আছে তাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই এমন ভূমিকা তাদের হতে পারে না। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে অ্যালগোরিদম ব্যবস্থায়। তাই কমিটি সুপারিশ করেছে একটি প্রযুক্তি বিষয়ক একটি নতুন ক্যাটেগরি সৃষ্টি করতে হবে। যা শুধু প্লাটফরম অথবা পাবলিশার হবে না, তা হবে এই দুয়ের মাঝামাঝি। ডিজিটাল এই যুগে রাজনৈতিক প্রচারণা বিষয়ক পরিবর্তন আনতে হবে নিয়মে। কোম্পানির প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আধুনিকায়ন করতে হবে। এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের জন্য একটি পাবলিক রেজিস্টার  সৃষ্টি করতে হবে, যাতে যেকোনো মানুষ দেখতে পায় কি বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অনলাইনে যেসব রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হবে তাতে ডিজিটাল ইমপ্রিন্ট থাকতে হবে, যাতে বোঝা যায় কে এই বিজ্ঞাপনের জন্য দায়ী। এমনটা কিন্তু ছাপানো লিফলেটে এবং বিজ্ঞাপনে থাকে। ম্যালিসিয়াস এক্টর বা দুর্বৃত্ত চক্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের দায় নিতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়াকে। নির্বাচন নিয়ে এমন প্রতারণার জন্য জরিমানা সর্বোচ্চ ২০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ কোম্পানিতে অডিট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটি সতর্ক করে বলেছে, ফেসবুক অথবা টুইটারে ভুয়া একাউন্ট শুধু ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকে ক্ষতিগ্রস্তই করছে না। একই সঙ্গে তা বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে প্রতারণাও। সুপারিশ করা হয়েছে কমপিটিশন অ্যান্ড মার্কেটস অথরিটি’র মতো একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ বিষয়ক কোম্পানিগুলোর অডিট করাতে হবে। কমিটির রিপোর্টে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। কেমব্রিজ এনালাইটিকা স্ক্যান্ডালের পরে এই মাধ্যমটি অত্যন্ত কড়া নজরদারিতে রয়েছে। কমিটি তার রিপোর্টে বলেছে, এই রিপোর্টের অনুসন্ধানকালে আমাদেরকে তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে ভীষণ ভুগিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

ভিন্ন কৌশল নির্বিঘ্নে ছিনতাই by রুদ্র মিজান

পান্থকুঞ্জ। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা। পাঁচটি রাস্তা মিলিত হয়েছে এখানে। পান্থকুঞ্জ এক নীরব, প্রাকৃতিক স্থান। সন্ধ্যার পরপর  এখানে আড্ডায় মেতে উঠেন এক শ্রেণির নারী-পুরুষ। পাশে সিটি করপোরেশনের একটি পার্ক। পান্থকুঞ্জের আড্ডা ঘিরে ঘটে অন্য কাহিনী। গতকাল রাতে পান্থকুঞ্জে গিয়ে দেখা গেছে এক পাশে বসে আছেন পাঁচ নারী। তাদের আশপাশে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অন্তত ১৫ তরুণ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তরুণদের কড়া দৃষ্টি ওই পাঁচ নারীকে ঘিরে। শান্তা, শিল্পী, রোমা, রিনা ও স্মৃতি নামে পরিচিত তারা।
রাত প্রায় সাড়ে ১২ টা। শান্তা নামের ওই নারীর সঙ্গে কথা বলছিলো এক মধ্য বয়সী ব্যক্তি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পান্থকুঞ্জ পার্কের ভেতরে ঢুকে। দেখা গেছে, মাটিতে পাটি  বিছানো রয়েছে। রাতের আঁধারে সেখানেই অন্তরঙ্গ সময় কাটান তারা। এছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি পাকা বেঞ্চ। শান্তা ও ওই ব্যক্তি পার্কের ভেতরে ঢুকার দুই মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণরা পার্কে ঢুকে। শোনা যায় চিৎকার। কিছু বুঝে উঠার আগেই মধ্য বয়সী ব্যক্তি পার্ক থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হন। তাকে মারধর করে সর্বস্ব লুটে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। সঙ্গী নারীর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, শান্তা নামের ওই নারী তাৎক্ষণিকভাবে পার্ক থেকে বের হয়ে যায়।
আশপাশের লোকজন জানান, প্রায় প্রতি রাতে দফায় দফায় এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আশপাশেই থাকে পুলিশের টহল টিম। বাঁশি বাজিয়ে পুলিশ যখন পার্কের দিকে পা বাড়ায় বাঁশির আওয়াজ শুনে ছিনতাইকারীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তবে ওই পাঁচ নারীকে পুলিশের উপস্থিতিতেই পান্থকুঞ্জে বসে থাকতে দেখা গেছে।
সূত্রমতে, ওই নারীদের সঙ্গে ছিনতাইকারীদের রয়েছে যোগসূত্র। ছিনতাইয়ের টাকা ভাগাভাগি হয় তাদের মধ্যে। একটি অংশ পান পুলিশের অসাধু সদস্যরা। ছিনতাইকারীরা নিজেদের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় স্থানীয় নেতাকর্মী পরিচয় দেয়। ছিনতাইকারীদের মধ্যে অন্যতম আজিজ ওরফে আজিজুর রহমান। এই স্পটের নারীরা জানান, ছিনতাইকারীদের কথামতো কাজ না করলে তাদের এখানে বসতে দেয়া হয় না। পুলিশসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ছিনতাইকারীরা। শান্তাসহ পাঁচ নারী প্রতিদিনি এখানে জড়ো হন  টঙ্গী ও যাত্রবাড়ী এলাকা থেকে। রাতভর এখানে থেকে ভোরে বাড়ি ফিরেন তারা।
পুরুষদের পাশাপাশি এখানে ছিনতাইয়ে জড়িত রয়েছে নারীরাও। এমনকি শিশুদেরও ব্যবহার করা হয় ছিনতাইয়ে। প্রত্যক্ষদর্শী সাব্বির জানান, অফিসের কাজ শেষে সন্ধ্যার পর পান্থকুঞ্জে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন তারা তিন জন। এরমধ্যেই ঘটে ঘটনাটি।
নাইজেরিয়ার দুই তরুণ নাগরিক হেঁটে যাচ্ছিলেন ফার্মগেটের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই ছোঁ মেরে তাদের একজনের মোবাইলফোন সেট লুটে নেয় ছিনতাইকারী। তার পেছনে ১০ বছর বয়সী শিশুকন্যা ও এক নারী। মোবাইলফোনটি শিশুটির হাতে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছিনতাইকারী নিজেই ‘ছিনতাইকারী ছিনতাইকারী’ বলে চিৎকার করতে করতে সিগন্যালে থেমে থাকা গাড়ির মধ্য দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। এরমধ্যেই সিগন্যাল ছেড়ে দিলে একটি বাসের মধ্যে লেগে মাথা ফেটে যায়। ছিনতাইয়ের শিকার দু’জন ধাওয়া করলে মোবাইলফোনটি আবার নিজের হাতে নেয়। দুই যুবক ছিনতাইকারীকে ধাওয়া করে। পেছন থেকে দুই যুবককে বাধা দিয়ে ছিনতাইকারীকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করছিলেন নারী। শেষপর্যন্ত মোবাইলফোন উদ্ধার করেই দুই যুবক ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। জানা গেছে, ওই ছিনতাইকারী কাল্লু নামে পরিচিত। সঙ্গে ছিলো তার স্ত্রী ও সন্তান।
এখানে রয়েছে টানা পার্টির সদস্যরাও। সিগন্যালের গাড়ি থামলে ফোন, ব্যাগ টেনে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা। অন্তত অর্ধশত ছিনতাইকারী রয়েছে এই স্পটে।
এ রকম আরও একটি স্পষ্ট সংসদ ভবন সংলগ্ন খেজুর বাগান এলাকায়। সন্ধ্যার পর পর সেখানে ভিড় করে এক শ্রেণির ভাসমান নারী। পুরুষদের আকৃষ্ট করে নিয়ে যায় ফার্মগেট ও শ্যামলীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে, বাসায়। সেখানে জিম্মি করে সর্বস্ব রেখে ছেড়ে দেয় তাদের। এমনকি ওই এলাকায় রয়েছে ছিনতাইকারীদের একটি সিন্ডিকেট। তারা মোটরসাইকেলযোগে ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। পথচারী ও রিকশাযাত্রীদের টার্গেট করে চক্রের সদস্যরা। দ্রুত ব্যাগ, ফোন টেনে পালিয়ে যায়। কখনও কখনও ছুরিকাঘাত করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। এমনকি ভাসমান নারীদের মাধ্যমে পুরুষকে আকৃষ্ট করে হোটেলে, বাসায় নিয়ে গেলে ছিনতাইকারীরা তাদের জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়। এই চক্রে সাদিয়া, রত্না, মনিসহ অন্তত ৩০ নারী রয়েছে।
একইভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ফার্মগেট ও বিজয় সরণি এলাকায়। বিজয় সরণি এলাকায় রয়েছে হিজড়াদের একটি সিন্ডিকেট। একই কৌশলে পুরুষদের নির্জনস্থানে নিয়ে ছিনতাই করে তারা। এ রকম একটি চক্র রয়েছে মোহাম্মদপুরের বসিলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। রাত ১২টার পরে ওই এলাকায় অবস্থান নেয় তারা। আরও একটি চক্র রয়েছে এফডিসি সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায়। ওই এলাকায় বিপ্লব নামে এক যুবক রয়েছে তাদের নেতৃত্বে। বিপ্লব নিজে যেমন ছিনতাই করে তেমনি ওই এলাকায় নিয়মিত মাদক বিক্রি করে। রাত ৮টার পরপরই ইস্কাটন সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায় ও এফডিসি সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায় বিপ্লবসহ এই চক্রের ছিনতাইকারীদের দেখা যায়। গোয়েন্দা সূত্রমতে, ঢাকায় এ রকম শতাধিক চক্র রয়েছে। তারা নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে বিভিন্ন কৌশলে ছিনতাই করে থাকে। পুলিশের অভিযানে প্রায়ই আটক হয় তারা। জামিনে বের হয়ে আবার একই অপকর্মে লিপ্ত হয়।
তবে এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানা-পুলিশমুখো বলতে গেলে হতেই চান না। গত জুন মাসে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই’র অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ৫২০টি, ঢাকায় মামলা হয়েছে ১০৩টি।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ইমরান by আব্বাস নাসির

পাকিস্তানের নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তান তেহ্‌রিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। নতুন শাসক দল হিসেবে পিটিআই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সর্বপ্রথমেদলটির প্রধান ইমরান খান বিরোধীদলীয় নেতা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হবেন। যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে তাদের শান্ত করার জন্য ইমরান খানকে একটি কৌশল বের করতে হবে।
২৬শে জুলাই দেয়া ভাষণে ইমরান খান বিরোধীদের প্রতি সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, যেসব আসনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। তিনি অঙ্গীকার করেছেন, এতে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো মজবুত করা হবে যেন এগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তিনি নিঃস্বার্থ ব্যক্তিত্বের নজির স্থাপন করার কথা বলেন। দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গঠন করার জন্য তিনি নিজেকে জবাবদিহি করার কথা বলেন। তিনি এমন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন, যা গরিবদের দারিদ্র্যতার ফাঁদ থেকে টেনে তুলবে। এছাড়া, তিনি সকল প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেন।
বিরোধী দলগুলো ইমরান খানের এসব সম্প্রীতির বার্তা মানবে কি-না তা দ্রুতই পরিষ্কার হবে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে তারা অন্তত ভোট পুনর্গণনার দাবি তুলতে পারে। পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এর  জ্যেষ্ঠ নেতা মুসাহিদ হুসেইন বলেন, এটা ছিল সবচেয়ে জঘন্য নির্বাচন। দলের হতাশাজনক ফলাফলের প্রেক্ষিতে তিনি প্রাথমিকভাবে এই মন্তব্য করেন। বহিষ্কৃৃত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ভাই ও পিএমএল-এন দলের বর্তমান সভাপতি শাহবাজ শরীফ নির্বাচনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এভাবে, ‘এমনকি আমার মতো শান্তিবাদী মানুষের কাছেও এটা (অনিয়ম) অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমরা এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছি।’
শাহবাজ শরীফ নিজেকে শান্তিবাদী আখ্যা দিয়েছেন। তার বড় ভাই নওয়াজ শরীফ বেসামরিক প্রশাসনে হস্তক্ষেপ ও জঙ্গিগোষ্ঠীদের পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু শাহবাজ শরীফ দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভাইয়ের এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছেন।
নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন পাকিস্তান পিপল্‌স পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের দিন চূড়ান্ত ভোট গণনার সময় তাদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। শেষ মুহূর্তে এসে ফল পরিবর্তনের এটাই মোক্ষম সময় বলে ধরা হচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হলো- সবাই এজন্য সেনাবাহিনীর প্রতি  ইঙ্গিত করেছেন, কিন্তু কেউ নাম উল্লেখ করেননি।
নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আট ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু ফল ঘোষণায় বিলম্ব করার কারণে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। আপাত দৃষ্টিতে ভোট গ্রহণের দিন নির্বাচন কশিনের রেজাল্ট ট্রান্সমিশন সার্ভিস (আরটিএস) বিকল হয়ে পড়ে। যার কারণে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণায় বিলম্ব হয়।
যা হোক, পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতা শাহ মেহমুদ কোরেশী এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজের দলের বিজয়কে দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভোটাররা যে দায়িত্ব দিয়েছে, পিটিআই তা বহন করতে প্রস্তুত। বাস্তবেই পাকিস্তানের সাবেক তারকা ক্রিকেটার ও ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক ইমরান খান যখন নতুন প্রধানমন্ত্রী হবেন, তখন তাকে বিরাট বোঝা বহন করতে হবে। প্রথমেই তাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বলা হচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারণাকালীন সময়ে সেনাবাহিনী তার দলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। একই সঙ্গে  সেনাবাহিনীর অধঃস্তন অংশীদার শাসক হিসেবে আবির্ভূত না হয়ে তাকে নিজের বিশ্বস্ততা ধরে রাখতে হবে। তাকে দেখাতে হবে যে, দেশের নির্বাচিত বেসামরিক নেতা হিসেবে তিনিই প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। এখন পর্যন্ত তিনি ভালোভাবেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবার তাকে দেখাতে হবে যে, একটি বিভক্ত দেশের নেতা হওয়ার সক্ষমতাও তার আছে।
নির্বাচনের ফলাফলে বিরোধী দলগুলো কতটা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায় তার ওপর আগামী সময়ের বেশির ভাগ উন্নয়ন নির্ভর করছে। যদি তাদের প্রতিক্রিয়া সংবাদ সম্মেলনেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং রাজনীতিবিদরা সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন, তাহলে নতুন প্রধানমন্ত্রী তার সুবিশাল সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর নজর দিতে সক্ষম হবেন।
আর বিরোধী দলগুলো যদি নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ জানায়, যেমনটি ইমরান ২০১৩ সালের নির্বাচনে করেছিলেন, তাহলে নতুন সরকারকে নাকাল হতে হবে। পরবর্তীতে সৃষ্টি হওয়া অস্থিতীশীল পরিস্থিতিতে সরকারে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আর সেনা সদর দপ্তর নিয়ে ইমরান খানের এমন কোনো ভয় নেই, যা তার পূর্বসূরিদের ছিল। নওয়াজ শরীফ ও তার মেয়ে মরিয়মকে জেলে রেখে শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বে পিএমএল-এন, অন্যদিকে কয়েকটি মামলা নিয়ে পিপিপি’র নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো ও তার পরিবারের রাজপথে নামার সম্ভাবনা কম। 
কিন্তু দেশে যদি পুরোপুরি স্থীতিশীল পরিবেশও বজায় থাকে, তারপরেও নতুন সরকারকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তালেবান সমস্যাসহ বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। পাকিস্তানের মাটিতে আফগানিস্তানের তালেবানরা আশ্রয় নেয়ার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি বেশ কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলিয়ে নির্যাতিত কাশ্মিরীদের মুক্তি দেয়ার জন্য দিল্লির সঙ্গে সমঝোতার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এছাড়া, নতুন সরকারকে সীমান্তবর্তী চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে চীনের বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে। এছাড়াও সরকারকে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) ‘গ্রে-লিস্ট’ থেকে পাকিস্তানের নাম বাদ দেয়ার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কয়েকটি জঙ্গি গোষ্ঠী পাকিস্তানের ব্যাংক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে সক্ষম এমন অভিযোগে সম্প্রতি এফএটিএফ পাকিস্তানকে তাদের ‘গ্রে-লিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত করে।
ইমরান খান তার ‘নয়া পাকিস্তানের’ প্রচারণার সময় ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছিলেন। পাশাপাশি নির্বাচিত হলে দরিদ্রদের জন্য  ৫০ লাখ নতুন ঘর নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি । তিনি দাবি করেন, সম্পদশালী প্রবাসীরা এজন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দেশের নির্বাচিত নেতা হিসেবে তাকে এখন সব অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে।
সমালোচকরা দাবি করে, তিনি ‘জেনারেল ইলেকশেনের’ পরিবর্তে ‘জেনারেল’স সিলেকশনে’ জিতেছেন। তাকে এসব সমালোচকদেরও মোকাবেলা করতে হবে। এক্ষেত্রে বিজয়ী ভাষণে দেয়া প্রতিজ্ঞাগুলো তার বাস্তবায়ন করা উচিত। যেসব আসন বিরোধী দলগুলো তাদের থেকে চুরি করে নেয়ার দাবি তুলেছে, সেখানে ভোট গণনা করার নির্দেশ দেয়া উচিত। গণমাধ্যমের ওপর চাপ কমানোর জন্য সেনাবাহিনীকে রাজি করানোর বিষয়টিও তাকে সাহায্য করতে পারে।
তবে তিনি যাই করুন না কেন, এটা পরিষ্কার যে, ২৫শে জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচন পাকিস্তানের অস্থীতিশীল রাজনীতিতে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বয়ে আনবে না।
(আব্বাস নাসির পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন এর সাবেক সম্পাদক)

কীভাবে সম্ভব হয়েছিল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন-ইসরায়েল 'অসলো শান্তি চুক্তি'

 অসলো শান্তি চুক্তির পর নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিন এবং পিএলও নেতা ইয়ানের আরাফাত। পুরষ্কার অনুষ্ঠানে দুই নেতা।
নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ১৯৯৩ সালে অত্যন্ত গোপনে এক আপোষ মীমাংসার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি সই হয়েছিল, যা অসলো চুক্তি নামে পরিচিতি পায়।
বোঝাপড়া হয়েছিলো - ফিলিস্তিনিরা স্বশাসনের আংশিক অধিকার পাবে এবং ইসরায়েল প্রথমে পশ্চিম তীরের জেরিকো এবং তারপর গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। বদলে, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বৈধতা স্বীকার করে নেবে পিএলও।
যদিও এখন অসলো চুক্তির সাফল্য নিয়ে হরদম প্রশ্ন উঠছে, কিন্তু দশকের পর দশক ধরে অচলাবস্থার পর এই বোঝাপড়াকে সেসময় বিরাট এক সাফল্য হিসাবে দেখা হয়েছিল। এই চুক্তির জন্য ইয়াসের আরাফাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিন নোবেল শান্তি পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।
কিন্তু ঐ চুক্তি যাতে হতে পারে তার জন্য এমন অনেক মানুষের ভূমিকা ছিল, যাদের কথা হয়তো কেউই জানেন না।
গভীর গোপনে হতো দরকাষাকষি
তেমন একজন ছিলেন নরওয়ের কূটনীতিক মোনা ইয়ুল। টানা আট মাস ধরে তিনি অসলোতে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের ঐ বৈঠক সফল করার জন্য নিজের অবস্থান থেকে অক্লান্ত চেষ্টা করে গেছেন। কিছু বৈঠক এমনকী অসলোতে তার বাড়িতেও হয়েছে। তার সমাজবিজ্ঞানী স্বামী পুরো সময়টা তাকে সাহায্য করে গেছেন।
বিবিসির লুইস হিদালগোর কাছে তার সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মোনা ইয়ুল বলেন, মাসের পর মাস গভীর-গোপনীয়তার ভেতর ঐ মীমাংসা বৈঠকের আয়োজন চালিয়ে যেতে হয়েছে তাদের।
"আমাদের কাছে তখন ঐ মীমাংসা বৈঠকই ছিল সবকিছু। গভীর গোপনীয়তা অনুসরণ করতে হতো। এমনকী আমাদের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব- কারোর সাথেই আমরা ঘুণাক্ষরে এ নিয়ে কথা বলতাম না।"
ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রধান শর্ত ছিল ঘুণাক্ষরেও যেন জানাজানি না হয়। কারণ মুখোমুখি বসার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে দু-পক্ষের কাছেই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
ঐ বৈঠকের কথা যদি তখন জানাজানি হতো, তাহলে তখনকার ইসরায়েলি সরকারের পতন হতে পারতো কারণ পিএলও'র কোনো কর্মকর্তার সাথে কথা বলা তখন ইসরায়েলে বে-আইনি ছিল।
"আমাদের (নরওয়ের) জন্যও ঝুঁকি ছিল। বিশেষ করে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ ছিল আমাদের। ইসরায়েলি - ফিলিস্তিনি সংলাপ ওয়াশিংটনে না হয়ে গোপনে অসলোতে হচ্ছে - এটা অনেক আমেরিকানের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হতো। আমরা অনেক উৎসাহী পক্ষের অগোচরে এই কাজটি করছিলাম।"
অসলো শান্তি চুক্তির শর্ত মেনে ১৯৯৪ সালে কায়রোতে গাজা এবং জেরিকোতে ফিলিস্তিনি শাসনের চুক্তিতে সই করছেন পিএলও নেতা আবু আলা (বামে) এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তা ইউরি সাভির। এরা দুজনই ছিলেন অসলো চুক্তির দুই কর্ণধার।
ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি দলনেতার রসবোধ
মোনা ইয়ুলের মনে আছে, প্রথম বৈঠকটি হয়েছিল পিএলও নেতা আবু আলা এবং দুই ইসরায়েলি শিক্ষাবিদের মধ্যে। পরে তাদের সাথে যোগ দেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা - উরি সাভির।
"প্রথম দিন আমরা দু পক্ষকেই বলেছিলাম, আমরা তোমাদের জায়গা দিচ্ছি, সমস্ত সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি, কিন্তু মীমাংসার পথ খুঁজে বের করা তোমাদের দায়িত্ব। তারপর আমরা তাদেরকে রেখে ঘরের দরজা বন্ধ করে বাইরে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে ঘরের ভেতর থেকে অট্টহাসির শব্দ পেলাম। আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে শুরুটা মনে হয় ভালোই হলো"।
যারা এসেছিলেন, তারা কেমন ধরণের লোক ছিলেন? তাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?
বিবিসির প্রশ্নে মোনা ইয়ুল বলেন, "দুপক্ষের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো, বিশেষ করে পিএলও নেতা আবু আলা এবং ইসারায়েলি প্রতিনিধিদলের নেতা উরি সাভিরের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল তা ছিল অচিন্তনীয়"।
তিনি বলেন, সাফল্যের পেছনে ঐ সম্পর্ক অনেকটাই ভূমিকা রেখেছিল।
"দুজনের চরিত্রের মধ্যে একটা মিল ছিল, তা হলো দুজনেই ছিলেন খুবই উঁচুমানের রসিক। বৈঠকে বসে তারা যেভাবে রসিকতা করতেন, তাতে তিক্ততা অনেক দূর হয়ে যেত।"
তারা কি একসাথে বসে খাবার খেতেন?
"অবশ্যই। আমরাও উৎসাহিত করতাম। অনেক সময় বৈঠকে চিৎকার চেঁচামেচি হতো, অনেক সময় বৈঠক ভেঙ্গে পর্যন্ত যেত। কিন্তু আশ্বস্ত হওয়ার মতো একটা বিষয় ছিল, আর তা হলো - দুপক্ষেরই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, অনেক সময় শুধু রসিকতা করে তারা নিজেদের ক্রোধ- উত্তেজনা দূরে সরিয়ে দিতেন।"
একদিন মোনা ইয়ুল নিজেই সেই রসিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন যখন রাতের এক বৈঠক থেকে বেরিয়ে আবু আলা এবং উরি সাভির গম্ভীর মুখে ঘোষণা করলেন - 'অনেক হয়েছে, কথা শেষ, আমরা বাড়ি চলে যাচ্ছি।'
"তারা যখন বৈঠকের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, দুজনেরই মুখ ছিল খুব থমথমে। বেরিয়ে বললেন, 'আমরা দুঃখিত, এভাবে কথাবার্তায় কাজ হবেনা।' আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি আমার স্বামীকে ফোন করে বললাম শীঘ্রি এসো, সবকিছু শেষ। পরে বুঝলাম তারা আমার সাথে রসিকতা করছিলেন। আমার অবস্থা দেখে দুজনেই খুব মজা পাচিছলেন ।"
অনেকবারই তাদের দুজনের এই রসিকতায় হেনস্থা হতে হয়েছে মোনা ইয়ুলকে । "তারা দুজনেই এত ভালো অভিনয় করতে পারতেন যে আমি অনেক সময় বুঝতেই পারতাম না আসল ঘটনা কী।"
আর এই রসিকতা-মজার ভেতর দিয়েই দুপক্ষ অসলো শান্তি চুক্তির কাঠামো চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। প্রয়োজন তখন ছিল শুধু ইনিশিয়াল বা স্বাক্ষর। সাব্যস্ত হলো তাও হবে অত্যন্ত গোপনে।
গাজায় স্বশাসনের অধিকার পাওয়ার পর গাজা সিটিতে ইয়াসের আরাফাত
ভোর রাতে চুক্তি সই
সেসময় ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেজ নরওয়ে সফরে এলেন। তার সম্মানে একটি ডিনার পার্টি দেওয়া হয়। মীমাংসাকারী দলের সদস্যদের সেই অনুষ্ঠানেও আনা হয়নি।
অতিথিদের সবাই চলে যাওয়ার পর, নরওয়ের গোয়েন্দা পুলিশ মীমাংসাকারী দুই দলের সদস্যদের পেছনের দরজা নিয়ে হাজির করে। ততক্ষণে রাত একটা বেজে গেছে। তারিখ ১৯৯৩ সালের ২৯শে অগাস্ট। শিমন পেরেজের উপস্থিতিতে সেই ভোর বেলাতেই অসলো চুক্তিতে প্রাথমিক সই করে দুপক্ষ।
"আমরা ছোটোখাটো একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। আমরা যারা এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলাম, তাদের কাছে ঐ মুহূর্তটা ছিল খুবই আবেগের। ঐ সময় আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি কতটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল সেটা। নরওয়ের গোয়েন্দা পুলিশ ঐ মুহূর্তটা রেকর্ড করেছিল। পরে দেখেছি আমরা কতটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম।"
তিন সপ্তাহ পর অসলো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয় ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজের লনে। সই করেন, পিএলও নেতা ইয়াসের আরাফাত এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিন। সইয়ের পর দুজনের করমর্দন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। দুজনেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
মোনা ইয়ুল পরে ইসরায়েলে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন।

পিএইচডি ডিগ্রির অনুমোদন নিয়ে মন্ত্রণালয়-ইউজিসি মুখোমুখি by নূর মোহাম্মদ

পিএইচডি ডিগ্রির অনুমোদন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। সম্প্রতি এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার ডিগ্রি  অনুমোদন দেয়ার পর এ অবস্থা বিরাজ করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়া অনুমোদনের বিপক্ষে ইউজিসি এখন পাল্টা গণবিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সনদকে এভাবে  বৈধতা দেয়া শুরু করলে উচ্চশিক্ষা বিশেষ করে গবেষণায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। এটা থামাতেই গণবিজ্ঞপ্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার ডিগ্রি অনুমোদন পাওয়ার পর বন্ধ থাকা বিভিন্ন ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে নতুন করে এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেয়া শুরু করেছে।
ভুয়া এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রির বিষয়টি অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ১৪টি টিমে তিন মহাপরিচালকের অধীনে ৬ জন পরিচালকসহ আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জাল সনদ, ভুয়া এমফিল, পিএইচডি ধরতে কাজ করছে। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশের আলোকে আলাদা তদন্ত করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। এর মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই বেসরকারি একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের পিএইচডি ডিগ্রি অনুমোদন দেয়া নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। 
ইউজিসির কর্মকর্তারা বলেন, বিদেশি নাম সর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অবৈধভাবে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন কয়েক হাজার সরকারি ও বেসরকারি লোকজন। এরমধ্যে সরকারি আমলা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, সাময়িক কর্মকর্তা, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকও রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পিএইচডি ডিগ্রি দিতে পারে না। আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময় নেয়া পিএইচডি সনদধারী ডিগ্রির বৈধতা নেয়ার জন্য ইউজিসিতে আসতেন। এখানে অনুমোদন না হলে তাদের কেউ কেউ যান মন্ত্রণালয়ে।
বাংলাদেশ শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার ডিগ্রির অনুমোদন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ নাখোশ। কর্মকর্তারা বলছেন, কারও সনদের বৈধতা দেয়ার এখতিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের  নেই। কারও সনদ যাচাই- বাছাই করার জন্য ইউজিসির পরামর্শ নিতে পারেন মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার ইউজিসির। কারও উচ্চতর ডিগ্রি সমতা বিধান করে থাকে ইউজিসি। এটা করার জন্য সংস্থাটি একটি আলাদা শাখাও রয়েছে।
কিন্তু ওই কর্মকর্তার ডিগ্রির অনুমোদনের যাচাই- বাছাই না করেই সনদের বৈধতা দিয়েছে। এ ব্যাপারে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান মানবজমিনকে বলেন, উচ্চতর যেকোন ডিগ্রির সমতা বিধান করার একমাত্র এখতিয়ার ইউজিসির। আইন আমাদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে এবং সেটিই হচ্ছে। ওই কর্মকর্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেন তাকে দিয়েছে সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।
শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্দেশনার পর ওই কর্মকর্তার ডিগ্রির অনুমোদন দিয়েছে সংশ্লিষ্ট শাখা।
২০১৫ সালে ওই কর্মকর্তার ডিগ্রি বেআইনি বলে ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের সে আদেশটি বাতিল করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে ইউজিসির কাছে কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি।  এ আদেশ বাতিলের ফলে ওই কর্মকর্তার সনদ বৈধতা পেলে তেমনি ওই প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার ভুয়া সনদের বৈধতা দেয়া হলো। যার স্বাক্ষরে আদেশ জারি হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপ-সচিব জিন্নাত রেহেনা বলেন, আমরা ওপরের নির্দেশে কাজ করেছি। আমরা কেবল ফাইল উঠিয়েছি। শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত অনুমোদন হয়েছে।
এদিকে ইউজিসির আইএমসিটি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কতিপয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরকারের অনুমোদন নয়, এমন প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রিসহ বিভিন্ন ডিগ্রি নিয়েছেন এবং এগুলো তার কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করতে ইউজিসি অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন। কমিশন বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০এ ৩৯ ধারা অনুযায়ী, এখনো কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়নি। আর স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা ২০১৪ ৪ (১) অনুযায়ী কারও কাছ থেকে এ ধরনের সনদ নেয়াও অবৈধ। এ সতর্কতা জারি করে সবাই এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে ইউজিসির ওয়েবসাইট দেখে নেয়ার অনুরোধ করেছে ইউজিসি।

তুরস্কের ওপর অবরোধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের এক নাগরিককে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড ও গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে গ্রেপ্তার করায় তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আটক ব্যক্তির নাম ক্রেইগ ব্রানসন। তিনি পেশায় একজন ধর্মযাজক। হুমকির জবাবে যুক্তরাষ্ট্রকে উল্টো কড়া ভাষায় শাসিয়েছে তুরস্ক। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়েছে, আটক মার্কিন নাগরিকের মুক্তির জন্য গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আহবানে সাড়া না দিয়ে তুরস্ক তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। তাই বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তুরস্কের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দেন। তিনি বলেন, ক্রেইগ ব্রানসনকে মুক্তি না দিলে তুরস্কের বিরুদ্ধে কঠিন অবরোধ আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ব্রানসন একজন নিরপরাধ মানুষ। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই। এর জবাবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুতু চাভুসগলু তৎক্ষণাৎ তার প্রতিক্রিয়া জানান। এতে তিনি বলেন, কেউ তুরস্ককে এ ধরনের নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। আমরা কারো হুমকি সহ্য করবো না।
আটক ক্রেইগ ব্রানসন (৫০) তুরস্কের একটি চার্চে ২৩ বছর ধরে যাজক হিসেবে রয়েছেন। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদলু জানিয়েছে, স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তাকে মুক্তি দিয়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। তবে আদালতে দোষী প্রমাণিত হলে তার কমপক্ষে ১৫ বছরের কারাদণ্ড হবে। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি প্রমাণিত হলে শাস্তি বেড়ে ২০ বছর ও হতে পারে। তবে সমপ্রতি আদালতের এক শুনানিতে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ক্রেইগ ব্রানসনকে মুক্ত করতে উঠে পরে লেগেছে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র তার বিনিময়ে বহু আকাঙিক্ষত ফেতুল্লাহ গুলেনকে তুরস্কের হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তুরস্ক এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় এবং জানায় কোনো কিছুর বিনিময়ে তারা নমনীয় হবে না। এরপরই সহজ চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়ে সরাসরি অবরোধের হুমকি দিলো যুক্তরাষ্ট্র। নিজের টুইটার একাউন্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও মাইক পেন্সের কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি লিখেছেন, দীর্ঘকাল ধরে ক্রেইগ ব্রানসনকে আটকে রাখার জবাবে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করবে তার দেশ। তিনি একজন নিরাপরাধ মানুষ, তাকে এখনি মুক্তি দিতে হবে। তবে ট্রাম্প কিংবা পেন্স কেউই স্পষ্ট করে জানাননি তুরস্কের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের অবরোধ দেয়া হবে।

শিগগিরই ইরানে পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার আশঙ্কা

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা করতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলা আগামী মাসেও হতে পারে। দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়া সরকার এমন ধারণাই করছে। দেশটির ক্ষমতাসীন সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাতে এ খবর দিয়েছে এবিসি নিউজ। খবরে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়া সরকার ইরানে হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে।
এই খবর এমন সময় এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মধ্যে বাকবিতন্ডা তুঙ্গে উঠেছে। এবিসি অস্ট্রেলিয়ার খবরে বলা হয়, ইরানের কোন স্থাপনায় হামলা চালানো যেতে পারে, সেটি চিহ্নিত করার কাজে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বিভাগের ভূমিকা থাকতে পারে। পাশাপাশি ভূমিকা থাকতে পারে বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও।
তবে অস্ট্রেলিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র বলেছেন, এর মানে এই নয় যে সংক্ষিপ্ত এই মিশনে অস্ট্রেলিয়ার সক্রিয় সম্পৃক্ততা থাকবে। সঠিক গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করা আর মিশনে অংশ নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল আগে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এমনটা মনে করার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না।
এবিসির খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ৫ মিত্র দেশের গোয়েন্দা সংস্থার জোট ‘ফাইভ আইজে’র সদস্য অস্ট্রেলিয়া। আমেরিকান গোয়েন্দা উপগ্রহ পরিচালনায় ভূমিকা থাকায় অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত পাইন গ্যাপ যৌথ প্রতিরক্ষা স্থাপনাকে ‘ফাইভ আইজ’ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। ইরানে হামলা হলে পাইন গ্যাপ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়ান জিওস্প্যাইশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন নামে দেশটির স্বল্পপরিচিত গোয়েন্দা সংস্থারও ভূমিকা থাকবে।
ফাইভ আইজে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও বৃটেন ছাড়াও কানাডা ও নিউজিল্যান্ড সদস্য। ইরান হামলার ক্ষেত্রে কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের সম্পৃক্ততা থাকবে এমন সম্ভাবনা কম।
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র ও জার্মানির সঙ্গে ইরানের করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে সম্প্রতি বের হয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সেই থেকেই দুই পক্ষের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। এরই প্রতিক্রিয়ায় সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তার দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। গত মাসে ইরান আগের চুক্তির প্রতি সামঞ্জস্য রেখে পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ করার কাজ শুরু করেছে।
এর বাইরে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি হুমকির স্বরে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি মানে সকল শান্তির জননী। আর ইরানের সঙ্গে শান্তি হবে সকল শান্তির জননী। তার এই বক্তব্যের পর ডনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে বড় হাতের অক্ষরে ইরানের প্রতি ভয়াবহ হুমকি দেন। যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিলে তার ফল ভালো হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল কাশেম সুলেমান ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনি যেই যুদ্ধ শুরু করবেন, তা শেষ করবো আমরা।’

গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না

রেমিকার চুলের খোঁপা প্রেমিকের কাছে বরাবরই আকর্ষণীয়। এমনকি কবি কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত লিখে গিয়েছেন, ' আলগা করো গো, খোঁপার বাঁধন, দিল ওহি ম্যারা ফাছ গায়ি '।
স্ত্রীর কিংবা প্রেমিকার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিতেই যেন পটু প্রেমিকেরা। তবে বর্তমান সময়ে খোঁপায় ফুল নয়, বরং বিভিন্ন ফ্যাশন বিপণির তৈরি চুলের কাঁটা গুঁজেই কর্মক্ষেত্রে নামেন তরুণীরা।
আর সে চুলের কাঁটাকে যৌন হেনস্তার প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন দেশের এক তরুণ ডিজাইনার। তিনি তার তৈরি খোঁপার কাঁটায় লিখেছেন- ‘গা ঘেঁষে দাঁডাবেন না।’
ইদানীং টিশার্টে, ব্যাগে সমাজ সচেতনতামূলক নানা ধরনের বার্তা লেখার ফ্যাশান দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক ফ্যাশন হাউস এ ধরনের টিশার্ট কিংবা ব্যাগ তৈরি করছে। ঠিক তেমনটাই করেছে ২৮ বছরের জিনাত জাহান নিশা। তিন ভাইবোন বিজু, জিসা আর শুভকে নিয়ে খুলেছেন ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন শপ ‘বিজেন্স’। প্রতিবাদের ভাষাকে রূপান্তর করেছেন ফ্যাশনে।
তাদেও ফেসবুক পেজে পণ্যের বিজ্ঞপ্তিতে হ্যাশট্যাগ হিসেবে ব্যবহার করছেন- ‘হোক প্রতিবাদ খোঁপার কাঁটায়’ আর ‘বাদ যাবে না একটি হারামজাদা, চলুন করি এ প্রতিজ্ঞা।’
এ প্রসঙ্গে নিশা বলেন ‘রাস্তাঘাটে মেয়েদের হয়রানির সঙ্গে আমরা যেন প্রায় অভ্যস্তই হয়ে পড়েছি। বাস-ট্রেনে বহুবার অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমি নিজেও হয়েছি। তারই প্রতিবাদ তুলে ধরতে চেয়েছি খোঁপার কাঁটায়।’
কিন্তু খোঁপার কাঁটায় প্রতিবাদের কথা লিখলেই কি সমাজ থেকে অন্যায় চলে যাবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে নিশা জানান, ‘খোঁপার কাঁটায় লিখেই সব সমস্যা মিটে যাবে না। কিন্তু প্রথম এবং শেষ কথা হচ্ছে- আওয়াজ তোলা। আমি আওয়াজ তুলেছি।’
তার এমন ভিন্ন ভাবনায় ইতিমধ্যেই প্রচুর সাড়া পাওয়া গেছে। বিজেন্সের ফেসবুক পেজ অনেক ইতিবাচক মন্তব্যে ভরে গিয়েছে। সেখানে অনেকে হিজাব পিনেও এমন প্রতিবাদী বার্তা লেখার অনুরোধ করছে ।
এর আগে ‘ থামুন ’, ' সুবোধ তুই পালিয়ে গেলে, ভোর আনবে কে ?' লেখা আংটি, দুল, পেনড্যান্ট বানিয়েছেন নিশা। ভবিষ্যতেও এ ধরনের প্রতিবাদী কাজ করতে আগ্রহী নিশা ও তার বিজেন্স গ্রুপ।

মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের বন্ধুপ্রীতি বেশি

কিশোরী-তরুণীদের নিয়ে নানা চলচ্চিত্র, গল্প উপন্যাসে দেখানো হয়েছে, মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বন্ধু তৈরিতে এবং দলবদ্ধ বন্ধুত্ব ধরে রাখতে অনেক বেশি পারঙ্গম।
কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে উল্টোটাই বরঞ্চ সত্যি। ছেলেদের বন্ধু জোটের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা মেয়েদের তুলনায় বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী।
গবেষকরা বলছেন, ছোঁয়াচে রোগ এবং টীকা কর্মসূচির পরিকল্পনা করতে সামাজিক জীবনে কিশোর-কিশোরীদের মেলামেশার প্যাটার্ন সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। সেজন্যই লন্ডনের স্কুল অব হাইজিন এবং ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এই গবেষণাটি চালায়।
ব্রিটেনের চারটি স্কুলের নানা আর্থ-সামাজিক শ্রেণী থেকে আসা ৭ম শ্রেণীর ৪৬০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের প্রত্যেককে সমবয়সী ছয় জনের নাম করতে বলা হয় যাদের সাথে সে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে অধিকাংশ সময় কাটিয়েছে।
গবেষণা দলের ড. অ্যাডাম কুচারস্কি বলেন, প্রচলিত ধারণার বিপরীতে তারা দেখতে পেয়েছেন মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা বন্ধুদের জোট তৈরিতে বেশি পারঙ্গম এবং তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অপেক্ষাকৃত বেশিদিন অব্যাহত থাকছে।
ড কুচরস্কি বলছেন, "ফ্লু বা হামের মত ছোঁয়াচে রোগ ছড়ানোর বিষয়ে পরিষ্কার ধারণার জন্য এই সামাজিক মেলামেশার প্যাটার্ন বোঝাটা জরুরী।"
গবেষণা দলের আরেক সদস্য ড ক্লেয়ার ওয়েনহ্যাম বলছেন, রোগের বিস্তার সম্পর্কে জানতে বাচ্চাদের মেলামেশার আচরণ বোঝাটা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন - এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় সংক্ষিপ্ত সময়ে, যেমন সারাদিন, মেলামেশার প্যাটার্ন বোঝার চেষ্টা হয়েছে। এবার দীর্ঘ সময়ের মেলামেশার ধরণ দেখা হলো।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং মনোবিজ্ঞানী ড. টেরি অ্যাপ্টার, যিনি তরুণ-তরুণী এবং তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন, বলেন, "ছেলেদের মধ্যে বন্ধুত্ব অনেক বেশি স্থিতিশীল, অন্যদিকে মেয়েদের সম্পর্কে অস্থিরতা বেশি।"
"মেয়েদের মধ্যে একটা শঙ্কা কাজ করে যে হয়তো তাদের প্রিয় বন্ধুর সাথে সম্পর্ক টিকবে না, আবার অনেক সময় সামাজিক চাপের কারণে তারা অনেকের সাথে জোর করে বন্ধুত্ব তৈরির চেষ্টা করে...ছেলেদের মধ্যে এসব প্রবণতা কম।"

নির্বাচন নিয়ে তৈরি করা প্রহসন রুখে দাঁড়াতেই জোট করেছি by সুদীপ অধিকারী

জোট-মহাজোটের রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জোটের ভাঙা-গড়া কম দেখেনি এ দেশের মানুষ। তারপরও সম্প্রতি আটটি বাম ধারার রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ রাজনীতিতে কিছুটা হলেও কৌতূহল তৈরি করেছে। সিপিবি কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের যাওয়া এ কৌতূহলে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। যদিও সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম একে বর্ণনা করেছেন নিছকই সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে। বুধবার মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সিপিবি প্রধান ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম এই কাণ্ডারি খোলামেলা কথা বলেছেন নানা ইস্যুতে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম  বলেন, নির্বাচন নিয়ে দেশে প্রহসন তৈরি করা হয়েছে। এ প্রহসন রুখে দাঁড়াতেই আমরা জোট গঠন করেছি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশের মানুষের মধ্যে যেই আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল সেই আকাঙ্ক্ষা ফিরিয়ে আনতে আর একটা গণঅভ্যুত্থান ও গণ জোয়ারের প্রয়োজন। আর সেই গণ জোয়ার সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই আমরা বাম দলগুলো মিলে জোট গঠন করেছি। এটার জন্য আমরা দেশব্যাপী মিটিং-মিছিলসহ হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেব। এই সংগ্রামের অংশ হিসাবে প্রয়োজনে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো অথবা নির্বাচন বয়কট করবো। কারণ বাম গণতান্ত্রিক জোট কোনো নির্বাচনী জোট না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করা মুজাহিদুল ইসলাম আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। সিপিবির সভাপতি ছাড়াও দলটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দুই দশক। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। রাজনৈতিক কারণে জেল খেটেছেন একাধিকবার। ছিলেন ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি। মুক্তিযুদ্ধেও রেখেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। 
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মধ্যে লড়াই ক্ষমতা কেন্দ্রিক। তারা শুধু ক্ষমতা পরির্বতনের জন্যই লড়াই করেন। আর আমাদের লড়াই ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যবস্থা পরিবর্তনের। এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ যে পরিবর্তন চেয়েছিল আমরা তা বাস্তবায়ন করতে চাই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হলো আপদ আর বিপদ। ফুটন্ত কড়াইতে এবং জ্বলন্ত চুলায় হাত দেয়ার মতো দেশবাসীর ওপর তাদের শাসন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এই মন্দের ভালো খুঁজতে খুঁজতে মানুষ আজ দিশাহারা। তাই এদের পিছনে আর ছোটাছুটি না করে, এই দুইটাকে বাদ দিয়ে এর বাইরে যারা মুক্তিযুদ্ধপন্থি, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক শক্তি আছেন, তাদের সকলকে নিয়ে বিকল্প গড়ে তুলবো আমরা। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে গেলে দেখা যায়, সেখানে চারটি নীতির উল্লেখ আছে। কিন্তু সেখানে কোথাও সমাজতন্ত্র নেই। আমরা সেই সমাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চাই। দেশে কোনো ধর্মনিরপেক্ষতা নেই বলেই আজ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম লেখা হয়েছে সেখানে। দেশে চলমান কোটা আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি কোটা থাকা প্রয়োজন। এটা থাকবে না বলে প্রধানমন্ত্রী সংসদ অধিবেশনে যা বলেছেন তার সঙ্গে আমরা একমত না। কোটা আন্দোলনকারীরাও কোনো সময় কোটা বাতিলের দাবি করেনি। তারা কোটা সংস্কারের দাবি করেছে। ফলে যুক্তিসঙ্গতভাবে কোটা সংস্কার কার উচিত। সরকার অন্যায়ভাবে কোটা আন্দোলনকারীদের দাবিকে বিকৃতভাবে শুধু উপস্থাপনই করে ক্ষান্ত থাকেনি বরং তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান আমলের এনএসএফের কায়দায় হামলা চালানো হচ্ছে। কোটা সমস্যা নিয়ে আর বিলম্ব না করে এটা নিরসন করা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের সিপিবি কার্যালয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের এসেছিলেন শুধু সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য। তার সঙ্গে নির্বাচন বা অন্য কোনো বিষয়ে আমাদের কথা হয়নি। তিনি বলেন, আগামীকাল যদি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল দেখা করতে আসেন তাহলে কি আমি তার সঙ্গে কথা বলবো না। মানুষের সঙ্গে তো কথা হতেই পারে। সেটা নিয়ে কোনো ইস্যু তৈরি করার দরকার নেই।

স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রেম আড্ডা, বিপথগামী হচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা

বেলা ১১টা। স্কুলের শিক্ষার্থীদের তখন ক্লাসে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন পার্কে, উদ্যানে স্কুলের ইউনিফর্ম পরেই প্রেমে মজে কিছু শিক্ষার্থী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প- আড্ডা দিয়ে বাসায় ফেরে তারা। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বেপরোয়াগতিতে মোটরসাইকেলে আরোহণ করতে দেখা যায় টিনেজ জুটিকে। তাদের দামি বাইকের হাইড্রোলিক হর্ণের বিকট শব্দ প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হয় পথচারীদের। কখনও কখনও রাতের বেলাও বাইরে আড্ডা দিতে দেখা যায় এসব জুটিকে।
রাত তখন প্রায় দেড়টা। দুই কিশোর ও এক কিশোরী। এরমধ্যে এক কিশোরের পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম। কাঁধে ব্যাগ আছে দুজনেরই। দীর্ঘক্ষণ বসে আছেন হাতিরঝিলের রামপুরা ব্রিজ এলাকায়। আশেপাশে হাতে গোনা আরো কয়েক তরুণ-তরুণী। একজন চা বিক্রেতা। ফেরি করে চা বিক্রি করছেন। ব্রিজে পার্কিং করা কয়েকটি মোটরসাইকেল। তিন কিশোর-কিশোরী গল্প করছিলো। হাসছিলো। আবার কখনও বিষণ্নতার ছাপ দেখা যাচ্ছিলো এক কিশোরের চোখে-মুখে। পূর্ব রামপুরা হাই স্কুলের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দেয় তারা। কিশোরী জানায়, পরিবারকে জানিয়েই ঘুরতে বেরিয়েছে তারা। রাতে একসঙ্গে তিন বন্ধু আড্ডা দেবে, এটা তাদের ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তিন জনের কথায় মিল পাওয়া যাচ্ছিলো না। কথা বলার এক পর্যায়ে তারা জানায়, মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছে কিশোরী। ফোনে দুই বন্ধুকে ডেকে এনেছে। এক পর্যায়ে রামপুরা ফাঁড়ি পুলিশের সহযোগিতায় অভিভাবকদের ডেকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাদের।
এরকম একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোৎস্না পারভীন। তিনি বলেন, বেলা ১১টায় হাতিরঝিলের একটি সংযোগ সড়কের ফুটপাথ সংলগ্ন দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে উবারের জন্য অপেক্ষা করছি। গন্তব্য মতিঝিল। স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিতা দুই কিশোরী দোকানের খানিকটা ভেতরে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে আর মোবাইলফোনে কিছু দেখছে। একটু খটকা লাগলো এই ভেবে যে, স্কুল ইউনিফর্ম পরে আছে সেটা মর্নিং শিফট স্কুল। ভাবলাম পরীক্ষা চলছে হয়তো তাই। যাই  হোক, আমি গলি দিয়ে আসার সময়ই দুটি মোটরবাইক আমার ঠিক পাশ দিয়ে এসেছে। বাইকের চার আরোহীই কিশোর। উবারের গাড়ির চালকের ফোনকল রিসিভ করতে যাচ্ছি আর ঘুরে দেখি দুই ছেলে দুই মেয়েকে দোকান  থেকে টেনে বার করতে উদ্যত হচ্ছে। এক মেয়ে বলছে ‘আমি যাবো না।’ আমি এগিয়ে  গেলাম।
একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে?  ছেলেটি উত্তরে বললো যে সে জুস কিনবে। দুই মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তোমরা এখানে কি করছো? আমার বলার ধরনটা এমন ছিল যে এতে ছেলেগুলো সহ অন্যেরা ভাবলো আমি তাদের চিনি। একটা মেয়ের হাত থেকে আমি চট করে মোবাইল নিয়ে নেই। নিজেই বলতে থাকি যে, তোমার মাকে বলছি এসে তোমাদের নিয়ে যাক। ছেলেরা বাইক স্টার্ট দিতে শুরু করলো। আমি তাদের থামতে বললাম। কিন্তু  ছেলেরা দ্রুত চলে গেল। একটি মেয়ের  মোবাইলফোন থেকে তার মায়ের নাম্বারে কল দিলাম। প্রায় ২০ মিনিট পর তাদের দুজনের মা-ই এলেন। দুজনের কোলে ছোট বাচ্চা। মা দু’জনেরই সঙ্গে কথা হলো তারা স্কুলের গেইট অবধি মেয়েদের দিয়ে এসেছেন। মায়েরা চলে যাবার পরপরই স্কুলে না গিয়ে এদিকে চলে এসেছে মেয়ে দুজন। জ্যোৎস্না পারভীন জানান, এই কিশোর-কিশোরীদের কোথাও বেড়াতে যাবার প্ল্যান ছিল। ওই ঘটনা যখন দেখছিলাম চোখে ভাসছিলো পতেঙ্গার তাসফিয়ার লাশের ছবি। আমি সেই শঙ্কা থেকেই সাহস করে এগিয়ে যাই। গত মে মাসে পতেঙ্গায় বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে আর ফিরেনি তাসফিয়া। পরে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
গতকাল দুপুরে হাতিরঝিলের এফডিসি সংলগ্ন মগবাজার ব্রিজ এলাকায় নীল-সাদা ইউনিফর্ম পরা দুই কিশোরীকে বসে থাকতে দেখা যায়। কিছুটা দূরে দাবাঘরের পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো ছয় কিশোর। এছাড়াও আশেপাশে প্রাপ্তবয়স্ক বিভিন্ন জুটিকে দেখা গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কিশোরীদের মুখোমুখি বসে কিশোররা। তাদের উদ্দেশ্য করে টিজ করতে থাকে। বাধ্য হয়েই দুই কিশোরী স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র গিয়ে বসে। পাশেই বসেছিলো টিনেজ জুটি। কিশোরীর কাঁধে হাত রেখে গল্প করছিলো কিশোর।
একই দৃশ্য দেখা গেছে, বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক ও চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকায়। তালতলা ও আশেপাশের এলাকার স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা ভিড় করে চন্দ্রিমা উদ্যানে। ক্লাসের সময়েই জমিয়ে আড্ডা দেয়। ওই এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনকারী এক সার্জেন্ট জানান, সোমবার বৃষ্টির সকালে চন্দ্রিমা উদ্যানে কেউ বসতে পারেনি। ওই সময়ে স্কুলপড়ুয়া জুটিগুলো রিকশা ভাড়া করে ওই এলাকা দিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে।
উত্তরায় গত বছর অভিভাবকদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্কুলের ইউনিফর্ম পরে যত্রতত্র ঘোরাফেরায় নিষেধ করে পুলিশ। ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে এ বিষয়ে অভিযান শুরু করে। এতে ওই এলাকায় স্কুলপড়ুয়াদের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অবাধে  ঘোরাফেরা কমে যায়। ওই বছরের ৬ই জানুয়ারি উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে খেলার মাঠে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে হত্যা করে একটি কিশোর গ্রুপ। ওই ঘটনার পর পুলিশ তৎপর হলেও আবারো উত্তরায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোররা। ওই এলাকার প্রায় দুই শতাধিক স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই বন্ধুদের বাইকে চড়ে ক্লাসের সময়ে বিভিন্নস্থানে আড্ডায় মেতে উঠে। এমনকি উত্তরা, বারিধারা, ধানমন্ডির বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জেও এই টিনেজদের আড্ডা দিতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, তথ্য-প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের এই যুগে অভিভাবকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। ভিন দেশের সংস্কৃতির খারাপ দিকটা বাদ দিয়ে ভালো দিকটা গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। এতে অভিভাবকদের সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

বরসহ একই পরিবারে ৭ লাশ বিয়ে বাড়িটি যেন মৃত্যুপুরী

বরসহ একই পরিবারে ৭ লাশ। একসঙ্গে তিন পুত্র হারিয়ে বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন বৃদ্ধ মা। শোকের মাতম গোটা এলাকায়। দোয়ারাবাজারের ওই বিয়েবাড়ি পরিণত হয়েছে এখন মৃত্যুপুরীতে। গত বৃহস্পতিবার বিকালে উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মুকিরগাঁও গ্রাম থেকে বরযাত্রী নিয়ে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের বটেরতল এলাকায় বরসহ যাত্রীবাহী গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় একটি ট্রাকের। এতে বর, শিশু ও নারীসহ ৭ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় দোয়ারাবাজার উপজেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। শুক্রবার বিকালে নিহতদের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে চারদিকে স্বজন হারানোদের কান্নায় গ্রামের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। মৃত তিন পুত্রের সারিবদ্ধ লাশ জড়িয়ে হতভাগিনী মা তাজিরুন নেছা সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে বিলাপ করতে থাকেন। বারবার সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
প্রতিবেশীরাও তখন হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। নিহতরা হলেন- মুকিরগাঁও গ্রামের মৃত জমির আলীর ছেলে আনসার আলী (বর) (২৬), আমীর আলী (৩৫) ও আরব আলী (২০), তাদের ভগ্নিপতি ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের মিরাস আলী (৩৫), বরের নিকটাত্মীয়ের স্ত্রী তিন সন্তানের জননী পারভীন আক্তার (২৭) ও তার শিশু কন্যা জাহানারা বেগম (৫), ফুফাতো ভাই আনফর আলী (২৬)। অপরদিকে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বরের আপন চাচা আব্দুল খালেক ও ফকির আলীকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত বর আনসার আলী নোয়াখালীর একটি মসজিদে গত তিন বছর ধরে ইমামতি করে আসছিলেন। সেই সুবাদে আনসার আলীর বিয়ে ঠিক হয় সেখানে। তার দুই ভাই আগেই গিয়েছিলেন কনের বাড়িতে শাড়ি ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে। বৃহস্পতিবার বিকালে রওনা হয়ে রাতে সেখানে পৌঁছে পরের দিন শুক্রবার বিয়ের দিন ধার্য ছিল। সেই আশা আর পূরণ হলো না তাদের।
নিহত বরের আপন দুই ভাইকে শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায় নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। অন্য নিহতদের মধ্যে বরের অপর ভাই আমীর আলী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে, ভগ্নিপতি মিরাস আলীকে ছাতকের মির্জাপুরে, নিকটাত্মীয় পারভীন আক্তার ও তার শিশু কন্যা জাহানারা বেগমের লাশ পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামে দাফন করার কথা। দোয়ারাবাজার থানার ওসি সুশীল রঞ্জন দাস বলেছেন, তিনজনের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। অন্যদের লাশ নিজ নিজ বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হবে।
এদিকে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৭ জনের নিহতের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ উপজেলার সর্বত্র এখন শোকের ছায়া নেমে পড়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। ছাতক-দোয়ারাবাজার সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, ছাতক-দোয়ারাবাজার আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা জাপার সাবেক সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টার, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান, যুগ্ম আহ্বায়ক সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক, জেলা জাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ.ন.ম অহিদ কনা মিয়া, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও উপজেলা জাপার সভাপতি আলহাজ মো. জাহাঙ্গীর আলম, দোয়ারাবাজার প্রেস ক্লাব নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা সহ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

ভারি বর্ষণে দুর্বিষহ রোহিঙ্গা জীবন by রাসেল চৌধুরী

উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। ভারি বর্ষণে তাদের জনজীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য বসতঘর। টানা বর্ষণে ভূমিধসের ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের। ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ভূমিধস ও পাহাড়ের মাটি দেবে যাওয়ায় উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে আশ্রিত রোহিঙ্গারা। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির আশঙ্কায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৩৫ হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম। এছাড়াও বর্ষায় সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছে প্রশাসন এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিও সংস্থাগুলো। এরই মধ্যে সরিয়ে নেয়া হয়েছে কম ঝুঁকিতে থাকা ৩৪ হাজার এবং অত্যধিক ঝুঁকিতে থাকা সাড়ে ১৯ হাজার শরণার্থীকে। এছাড়া দুর্যোগে ক্ষতি কমাতে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে শেল্টার উপকরণ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এদিকে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ স¤পর্কে ধারণা পেতে চালু করা হচ্ছে ছয়টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।
মিয়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনা নির্যাতনের ফলে গত ২৫শে আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। পুরনোসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি ক্যা¤েপ ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। রাস্তার দুই পাশে পাহাড় ও বন কেটে বসতি গড়েছেন এসব রোহিঙ্গারা। এর মধ্যে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং, হাকিম পাড়া টেংখালী, মধুরছড়া, শূন্য রেখা এবং টেকনাফের পুটুবনিয়া, শালবাগান, জাদিমুড়ায় পাহাড়ের পাদদেশে হাজারো রোহিঙ্গা ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন। বিশেষ করে বর্ষায় দুর্ভোগ বেড়েছে রোহিঙ্গাদের। বর্ষা আসার পর থেকে খুব বেশি ভয় কাজ করছে তাদের। দিনের চেয়ে রাতে ভয়টা বেশি। গত তিনদিন ধরে ভারি বর্ষণ হওয়ায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেয়া ঘরগুলোও খুবই দুর্বল। বাতাস হলে নড়াচড়া করতে থাকে। এ সময় ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। গত কয়েকদিনে এই শিবিরে ৩০টির বেশি ঘর ভেঙে গেছে।
রোহিঙ্গা নারী সাকেরা খাতুন জানিয়েছেন, ভারি বর্ষণ হলে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। তাই ঘুমানো যায় না, না ঘুমিয়ে বসে থাকতে হয়। আরেক রোহিঙ্গা জব্বার মিয়া জানান, তিনি খুবই বেকায়দায় আছেন। তার বসতি পাহাড়ের নিচের দিকে হওয়ায় বৃষ্টি হলে পানি আটকানো যায় না। ওপর থেকে নিচের দিকে পানি নামলে ঘরের ভেতর দিয়ে পানি চলাচল করে। এ পরিস্থিতিতে রাতে না ঘুমিয়ে বসে থাকতে হয়। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান নুরুল আবছার চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি ভারি বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে আশ্রিত রোহিঙ্গারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমনকি অনেকের চাল, ডাল ও ছোলা নষ্ট হয়ে গেছে।
ভারি বর্ষণে দুর্ঘটনা এড়াতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছেন বলে জানান উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের নিরাপদ স্থানে চলে আসার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরে যেসব এনজিও সংস্থা রয়েছে তাদের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এই ভারি বর্ষণে সব প্রস্তুতির পরও ভয় থেকে যায়, কেননা রোহিঙ্গাদের কোনো দালানকোটা নেই, সবই ঝুপড়িঘর। তাই তাদের ঝুঁকিটা বেশি। চলতি বর্ষায় ৩৭২টি ছোট বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এরইমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। খাদ্য-পানীয় সরবরাহের পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন দাতা সংস্থার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ-আইএসসিজি বলছে, এ বছরের মে-জুন মাসে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ১৬৬টি পাহাড়ধস, ১২৮টি ঝড়, ২৪টি স্থানে জলাবদ্ধতা এবং ২৬টি ছোট-বড় বন্যা হয়েছে। এসব দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৩ হাজার রোহিঙ্গার বাইরে ঝুঁকির মুখে আছে আরো অন্তত ২ লাখ ১৫ হাজার রোহিঙ্গা।
রোহিঙ্গা রিফিউজি রেসপন্সের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর সুমবুল রিজভী বলেন, এখন সামান্য বৃষ্টিতেই ভূমিধসের পাশাপাশি আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। টানা বৃষ্টি হলে নিয়মিতভাবে বন্যাও হবে। এখানে শরণার্থী ক্যা¤পগুলোর অবস্থান খুবই কাছাকাছি। জায়গার সংকটের কারণে তাদের গাদাগাদি করে থাকতে হয়। ফলে একটি ছোট আকারের ভূমিধসেও বহু শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।