Showing posts with label সুদীপ অধিকারী. Show all posts
Showing posts with label সুদীপ অধিকারী. Show all posts

Tuesday, December 9, 2025

অপরাধের অভয়ারণ্য জেনেভা ক্যাম্প by সুদীপ অধিকারী

আলোচনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পের ভেতর ঘটছে একের পর এক সংঘর্ষ, খুন। যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানেও দমানো যাচ্ছে না সন্ত্রাসীদের। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে পুরো মোহাম্মদপুরে। ঢাকা উত্তর সিটির মোহাম্মদপুর থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই জেনেভা ক্যাম্প মূলত মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিদের আবাসস্থল। ১৯৭১ সালে বাস্তুহারা বিহারিরা যারা মোহাম্মদপুরের রাস্তা, মসজিদ, স্কুলে অবস্থানরত ছিল তাদের জন্য ’৭২ সালে লিয়াকত হাউজিং সোসাইটির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে মোহাম্মদপুর কলেজগেটের অদূরে গজনবী রোড ও বাবর রোডের মাঝের ১৭ একর জায়গা নিয়ে ক্যাম্প তৈরি করা হয়। সেখানেই বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছেন এই উর্দুভাষিরা। বর্তমানে নয়টি ব্লকে ভাগ হওয়া এই ক্যাম্পে প্রায় ৩৫ হাজার বিহারির বসবাস। ছোট্ট ছোট্ট খুপরি ঘরে ১৫-২০ জন করে থাকেন। দিনে-রাতে পালা করে ঘুমাতে হয় তাদের। মূলত রাজধানীর বিভিন্ন সেলুনে নরসুন্দরের কাজই তাদের প্রধান পেশা। তবে এই সরু গলির ঘরগুলোকে অনেকেই আবার মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। বছরের পর বছর হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের কারবার চলছে এই ক্যাম্পে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই মাদকের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে মরিয়া হয়ে উঠে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, বোবা বিরানি, শাহ আলম, তারিক, পারমনু ওরফে গাল কাটা মনু, চেম্বার রাজ, ঠোঁট গোলাবি, ফারুক, ইমতিয়াজ, আরমান, পলু কসাই, সৈয়দপুরিয়া, ছটু মাসুদ, চারকুসহ একাধিক গ্রুপ। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল। তার হয়ে কাজ করেন তার ভাই টুনটুন, রানা, রাজন, কলিম জাম্বু, মোহাম্মদ আলী, আহম্মদ আলী, বানর আরিফ আরও অনেকে। আর চুয়া সেলিমের পক্ষে আছে পিচ্চি রাজা, আরমান, আকরাম, মোল্লা আরশাদ, পেলু, কোপ মনু, পিস্তল নাঈম, শাহজাদা গেইল হীরা, সালাম, শান্ত, ফাট্টা আবিদ। এদিকে সৈয়দপুরিয়া গ্রুপে আছে তিল্লি শাহিদ, কামাল বিরিয়ানি, ইরফান বিরিয়ানি, মোল্লা জাহিদ, সাজ্জাদ, আমজাদ আলী বাবু। এদের মধ্যে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, সৈয়দপুরিয়া গ্রুপের বাবু ওরফে আমজাদ আলী বাবু, আসলাম ওরফে মেন্টাল আসলাম ও শেখ গোলাম জিলানি মূলত পারিবারিকভাবে ইয়াবা ও হেরোইনের কারবারে জড়িত। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে বিগত বছরগুলোতে ক্যাম্পে শক্ত অবস্থান ছিল বুনিয়া সোহেলের। আর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিরোধীদের সাপোর্টে রাজত্ব করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন চুয়া সেলিম চক্র। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চুয়া সেলিমের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, অস্ত্র লুটসহ ৩৫টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে বুনিয়া সোহেলের বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা ও মাদক মামলা রয়েছে। তবে আগে এসব দ্বন্দ্বে লাঠি, চাকু, দা, বঁটি, ছুরি ব্যবহার হলেও এখন যোগ হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রাণঘাতী কাস্টোমাইজড ককটেল।

বুধবার রাত ৩টার দিকে মাদক ব্যবসা নিয়ে ক্যাম্পের ৪ নম্বর গলিতে এমনই এক সংঘর্ষে জড়ায় বুনিয়া সোহেল গ্রুপ ও চুয়া সেলিম-পিচ্চি রাজা গ্রুপ। এসময় গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণে মো. জাহিদ (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। জাহিদ জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃত মো. ইমরানের সন্তান। কিন্তু গত ২০শে অক্টোবর রাতেও জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ৩২টি তাজা ককটেলসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম, দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ জনকে আটক করে। পরদিন থেকে আবারো উত্তাল হয়ে ওঠে বিহারি ক্যাম্প। এরপরেই বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এরপরই মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনী ও র‍্যাব যৌথ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকসহ চারজনকে আটক করা হয়। এর আগেও গত ২৮শে সেপ্টেম্বর রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম হেরোইন, ২৫০ গ্রাম গাঁজা, ১টি চাপাতি,  ২টি তলোয়ার, ১০টি গুলতি, ২ হাজার পিস মার্বেল, ২০টি হেলমেট, ১২টি লাইফ জ্যাকেট, ৫টি লোহার রডসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ২২শে সেপ্টেম্বরও ১২০ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ৮টি ককটেল, ২টি পেট্রোল বোমা, ৬টি সামুরাই, ৫টি হেলমেট, ৩টি ছুরি, ১১টি চোরাই মোবাইল ফোন এবং ৫০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়। এমন একের পর এক অভিযান চলছেই।

গত ১১ই আগস্ট মাদক বিক্রি নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের পিচ্চি রাজা ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের দ্বন্দ্বে ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় শাহ আলম (২০) নামের এক তরুণ নিহত হন। এর আগের দিনও ওই দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণে এক নারীও আহত হয়েছেন। এর আগে ক্যাম্পের ৮ নম্বর সেক্টর হয়ে যাওয়ার সময় চুয়া সেলিম ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাজ্জেন ওরফে রহমত নামে ১৩ বছরের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। তার আগে ১৬ই অক্টোবর মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে নিহত হন ক্যাম্পের ৮ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা শাহনেওয়াজ কাল্লু (৩৮)। গত ১লা মে বিকালে মাহতাব হোসেন (৩২) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় তুলে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি  করে। এ ছাড়াও একইভাবে গত বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন ক্যাম্পের বাবুল হোসেনের ছেলে অটোরিকশাচালক সানু। মাদক ব্যবসা নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন সনু। এসময় বেল্লাল, শাহ আলম, শুভ, জানে আলম, শাওন নামে আরও বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। একইদিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন শাহেন শাহ নামের আরও একজন। মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বে ক্যাম্পের মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো. সাগর নামে আরও একজন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও শান্ত হচ্ছে না জেনেভা ক্যাম্প। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই চলছে বিভিন্ন গ্রুপের দৌরাত্ম্য। তারা বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের সবচেয়ে বেশি মাদক কারবার চলে ক্যাম্পের ৭ নম্বর ও ৪ নম্বর গলিতে। এর সঙ্গে চোয়া সেলিম, শাহ আলম, তারিক, পারমনু ওরফে গাল কাটা মনু, চেম্বার রাজ, পিচ্চি রাজা, ঠোঁট গোলাবি, ফারুক এবং ইমতিয়াজসহ বেশ কয়েকজন জড়িত। এদের কাছে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়াও সরকার পতনের আগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেয়া অবৈধ অস্ত্রেরও বিশাল মজুত রয়েছে তাদের কাছে। এরা কেউ ক্যাম্পে থাকে না। ক্যাম্পের বাইরে ভাড়া বাসায় থেকে সোর্সের মাধ্যমে তারা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করে। এদের অস্ত্র ও মাদকও ক্যাম্পের বাইরে থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধ ও মাদকের বিস্তার রোধে আমরা নিয়মিতভাবে  বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছি। অভিযানে আমরা মাদক কারবারি, মাদক বিক্রেতা, অস্ত্রের জোগানদাতা, ককটেল সংরক্ষণকারীসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করি। বিশেষ করে গত বছরের ৩১শে অক্টোবর সিলেটে অভিযান চালিয়ে বুনিয়া সোহেলকে এবং এ বছরের ৮ই জানুয়ারি ধানমণ্ডির ল্যাব এইড হাসপাতাল থেকে চুয়া সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কিছুদিন পরেই তারা জেল থেকে বেরিয়ে আবারো অপকর্মে জড়ায়। এরা অনেক আধুনিক। তারা ওয়াইফাই ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। মোবাইল ফোনে সিম থাকে না। আবার ক্যাম্প ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় কোথায় মাদক ও অস্ত্র রেখে দেয় তাও পাওয়া যায় না। আর তাদের লোক ক্যাম্পের চারপাশে ছড়ানো থাকে। আমরা ঢোকার আগেই তারা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। তাই আমরাও এখন আমাদের অভিযানের ধরন পাল্টাচ্ছি। যত চালাকই হোক না কেন তাদের সকলকেই আইনের আওতায় আনা হবে।

বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) নজরুল ইসলাম, মাদক বিক্রেতার চেয়ে মূল নিয়ন্ত্রককে ধরা না গেলে ক্যাম্পের পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত করা সম্ভব নয়। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গডফাদারদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

Saturday, May 3, 2025

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলা by সুদীপ অধিকারী

নিজেদের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষ-মারামারিতে জড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বেপরোয়া আচরণে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র বিশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা। পান থেকে চুন খসলেই শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান বা প্রশাসনকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বিশিষ্টজনরা বলছেন- সমাজের মধ্যকার অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলা এই অস্থিরতা। এর পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ব্যর্থতা রয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে হাসাহাসির মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাইম এশিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম পারভেজকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনাতেও দেখা যায়, শিঙাড়া খাওয়ার সময় দুই বহিরাগত নারী শিক্ষার্থীকে দেখে পারভেজ হাসাহাসি করেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তাকে প্রক্টরের রুমে তলব করা হয়। পারভেজ তাদের কাছে ক্ষমাও চান। এরপর বহিরাগতদের ডেকে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অস্ত্রের মহড়া দেয়া হয়। সেই মহড়া থেকেই দৌড়ে গিয়ে পারভেজকে জাপটে ধরে মারধর করে বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। আর এসব কিছুই হয় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রকাশ্যে। সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো গেট বন্ধ করে দেন। এই হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি, বনানী থানার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এদিকে কয়েকদিন পরপরই সায়েন্সল্যাব এলাকায় ঢাকা সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজ এবং আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে কখনো ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা আইডিয়াল কলেজের সাইনবোর্ড খুলে আনছে, কখনো আবার সিটি কলেজে গিয়ে হামলা করে কলেজের নামফলক ভেঙে নিয়ে আসছে। সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা আবার ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজের ড্রেস পরা যাকে পাচ্ছে তাকেই বেধড়ক পেটাচ্ছেন। আবার সিটি কলেজে হামলা করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ খুলে আগে থেকে ঘোষণা দিচ্ছে আইডিয়ালের শিক্ষার্থীরা। চলন্ত বাসের মধ্যে উঠে মারধর করা হচ্ছে। ভাঙচুর করা হচ্ছে যাত্রীবাহী বাস। শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে আতঙ্কের পাশাপাশি পুরো এলাকাতে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। কলেজ ড্রেস পরে সায়েন্সল্যাব এলাকায় নিত্যদিনের সাপে-নেউলে এই লড়াইয়ে যেন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এলাকাটি দিয়ে চলাচল করা সাধারণ মানুষ। গত ২২শে এপ্রিলও দেখা যায়, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সিটি কলেজে হামলা করে তাদের কলেজের নামফলক-লোগো তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় যাত্রীবাহী বাসও ভাঙচুর করা হয়। পুরো এলাকায় দিনভর আতঙ্ক বিরাজ করে। পরে পুলিশ টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করে উভয়পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন ঘটনাস্থল থেকে একাধিক শিক্ষার্থীর কাছে সংঘর্ষের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলতে পারেননি। তারা শুধু অপর পক্ষকে দোষারোপ করে বলেন- ওরা আমাদের কলেজের ছাত্রকে মেরেছে।

অন্যদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ সারা দেশেই চলছে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচি। চাকরি, পদোন্নতি ও উচ্চশিক্ষার নিশ্চয়তাসহ ৬ দফা দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছেন তারা। ইতিমধ্যে তারা জেলা, বিভাগীয় এবং ঢাকায় মহাসমাবেশেরও কর্মসূচি পালন করেছেন। গতকাল সকালেও রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। পরে তাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠকও হয়েছে। গত ২২শে এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেন কারিগরি ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তবে দাবি আদায় না হওয়ায় তারা আবারো কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

একই সময়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভিসির পদত্যাগের একদফা দাবি ওঠে। যেই আন্দোলনের ঢেউ ঢাকাতেও দেখা যায়। কুয়েট ভিসি’র পদত্যাগের দাবিতে ঢাকায় এসে শাহবাগে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কুয়েটের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আন্দোলনে নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ভিসিসহ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ করতে হয়। পিএসপি সংস্কারের দাবিতেও সরগরম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনশন ও বিক্ষোভ মিছিলের পাশাপাশি রাজধাশাহীতেও ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় রাবি’র শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে গত শনিবার শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া। তার সঙ্গে বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকও পদত্যাগ করেছেন। এরপরও শনিবার রাতে ভিসিসহ অন্তত ২৫ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এরকম একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক পারভীন সুলতানা হায়দার মানবজমিন’কে বলেন, এটা সত্য যে আগের তুলনায় আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু না হতেই তারা সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। তবে এসব দ্বন্দ্ব শুরু হয় হাতেগোনা ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। পরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে সকল শিক্ষার্থী এতে যোগ দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে সংঘর্ষ বড় হয়। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই জানেন না তারা কেন অন্য কলেজের সঙ্গে বিবাদ করছে। আমরা এসব ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিভৃত করার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় তা হয়ে ওঠে না। ইতিমধ্যে আমরা গত ২৩শে এপ্রিল রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলমকে নিয়ে ঢাকা সিটি কলেজ, আইডয়াল কলেজসহ আশেপাশের ৫টি কলেজের পক্ষ থেকে ধানমণ্ডি থানায় বৈঠক করে একটি চুক্তি করেছি। এ ছাড়াও আমরা চেষ্টায় আছি যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা আর না ঘটে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিন’কে বলেন, আগে আমরা দেখেছি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ঝামেলা হলে তা চড়, কিল, ঘুসি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতো। পরে আবার সবাই মিল হয়ে যেতো। কিন্তু এখন দেখা যায় কোনো কিছু হলেই মব সৃষ্টি করে হামলা করা হচ্ছে। এসব হামলায় শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষার্থীদের জীবন পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। কিন্তু এরপরও সমাধান হচ্ছে না। দ্বন্দ্ব থামছে না। বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাদের এই বেপরোয়া আচরণের জন্যই একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেই চলেছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছেন, সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলার জন্য কাজ করছে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান অস্থিরতার ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বিগ্ন এবং এটা যেন আর না ঘটে তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, আগে দাবি-দাওয়া উত্থাপন করার মতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। যখনই কেউ কোনো দাবি উত্থাপন করতো তখন রাষ্ট্র তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। এখন সেই অবস্থা নেই। আমরা সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

mzamin

Saturday, April 19, 2025

ধানমণ্ডিতে চাঁদাবাজি: আটক সেই যুবক ইজারাদারের লোক by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীর ধানমণ্ডির জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পার্কিং করা এক প্রাইভেটকার চালকের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে মো. আশরাফুল ইসলাম (২৩) নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে হাজারীবাগ এলাকা থেকে তাকে আটক করে ধানমণ্ডি থানা পুলিশ। এ ঘটনার ভুক্তভোগীদের হদিস না পাওয়ায় বুধবার দুপুরে পুলিশ বাদী হয়ে ওই যুবকসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করে ধানমণ্ডি থানায় মামলা করে। সেই মামলাতেই ৩ দিনের রিমান্ডে রয়েছে আশরাফুল। তবে- সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্টদের দাবি- বিনা অপরাধে তাকে আটক করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। সে কোনো চাঁদাবাজ নয়। সে মূলত ধানমণ্ডি-৭ নম্বর সেক্টরের আওতায় সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে লেকের পাড়ের পার্কিং এর জায়গা ইজারা নেয়া জেড.এস এন্টারপ্রাইজের একজন বেতনভুক্ত কর্মী।

এর আগে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকার ইবনে সিনা মেডিকেল ইমেজিং এর সামনে পার্ক করা একটি গাড়ি থেকে রসিদ দেখিয়ে টাকা আদায়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সাদার ওপর কালো রঙের একটি শার্ট পরে হাতে সিটি করপোরেশনের ইজারাদার কোম্পানি জেডএস এন্টারপ্রাইজের রসিদ নিয়ে একটি প্রাইভেটকারের চালকের কাছে টাকা চাচ্ছেন আশরাফুল। ওই সময় প্রাইভেটকার মালিকের সঙ্গে ওই যুবকের কথা-কাটাকাটি হয়। প্রাইভেটকারের চালকের আসনে বসা ব্যক্তিটি ওই যুবককে বলছে- মাস্তানি করো। উত্তরে যুবক বলেন, ‘হ করতাছি, কোনো সমস্যা?’ এ সময় পাশে প্রাইভেটকারের মধ্যে থাকা এক মহিলা ওই যুবকের নাম জানতে চান। ?উত্তরে যুবক বলেন, ‘নাম দিয়ে কী হবে?’। এরপর প্রাইভেটকার চালক আবার বলছেন, রাস্তার উপর গাড়ি রাখছিলাম, ওরে চাঁদা দিলাম। ওর নাম দিয়ে কী হবে, এরপর আমি দেখতেছি। তখন ওই যুবক বলে, এরপর আসলে চেহারাটা সুন্দর করে আইসো, চুল নাড়িয়ে বলে- আমার একটা চুলও বাঁকা করতে পারবা না। ওই সময় ওই গাড়ির মধ্যে একটি বাচ্চার আওয়াজও পাওয়া যায়। ১৩ই এপ্রিল রাতের ওই ঘটনার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অনেকেই ওই যুবকের শাস্তি দাবি করেন। কেউ আবার ওই গাড়িচালকদেরও আচরণের সমালোচনা করেন। এরপরই মঙ্গলবার রাতে ধানমণ্ডি থানার একটি মোবাইল টিম হাজারীবাগ থানা পুলিশের সহায়তায় হাজারীবাগ এলাকা থেকে আশরাফুলকে আটক করে। পরদিন ধানমণ্ডি থানায় দায়ের করা চাঁদাবাজি মামলায় তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হয়। এরই প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম এম এ আজহারুল ইসলাম আশরাফুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে ধানমণ্ডি থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গতকাল সরজমিন জিগাতলার ওই আলোচিত লেকপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে লোহার দণ্ডায়মান খাম্বাতে লাল বোর্ডে স্থায়ীভাবে উল্লেখ করা রয়েছে- এটা সিটি করপোরেশনের ইজারাকৃত নির্ধারিত গাড়ি পার্কিং এর জায়গা। ওই বোর্ডের নিচে হলুদ সাইনবোর্ডের ভেতরে লাল কালি দিয়ে বড় করে লেখা হয়েছে পার্কিং। তাতেও সিটি করপোরেশনের লোগো ও ইজারাদার ‘জেড.এস এন্টারপ্রাইজের’ নাম উল্লেখ করা রয়েছে। শুধু একটা জায়গায় নয় একাধিক জায়গায় এমনকি গাছেও টানানো রয়েছে পার্কিং এর সাইনবোর্ড। আর ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় ওই গাড়িটি এই পার্কিং এর জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। গতকাল ওই পার্কিং এর দায়িত্বে থাকা আব্দুর রহমান  বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক আশরাফুল মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে জেড.এস এন্টারপ্রাইজে চাকরি করে। ওকে রসিদ বুঝিয়ে দেয়া হয়। সেই রসিদ দিয়ে পার্ক করা গাড়ি থেকে আশরাফুল ঘণ্টা প্রতি ৩০ টাকা ও মোটরসাইকেল থেকে ২০ টাকা আদায় করতো। সে কোনো চাঁদাবাজ নয়। আব্দুর রহমান বলেন, মানুষ শুধু ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটাই দেখেছে। কিন্তু ভিডিওর আগে-পরের কিছুই জানে না কেউ। হ্যাঁ- আশরাফুল চুল ছেঁড়ার কথা বলে অবশ্যই অন্যায় করেছে। কিন্তু তাকে যে আগে আজেবাজে কথা বলে উত্তেজিত করা হলো, সেটাতো কেউ বললো না। ভিডিও ধারণকারীরা যে তাকে দেখে নেয়ার কথা বললো, মাস্তান বললো সে বিষয়ে কেউ কিছু বলে না। কোনো অপরাধ ছাড়াই তাকে আটক করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এমন কী আমাদের সঙ্গে তার দেখা করতে পর্যন্ত দিচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে ধানমণ্ডি ৭ নম্বর সেক্টরের পার্কিং জায়গা ইজারা নেয়া জেড.এস এন্টারপ্রাইজের মো. ওমর ফারুক ও মো. রিপন বলেন, আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সিটি করপোরেশন থেকে এই জায়গা ইজারা নিয়েছি। এখানে আজকে নয় অনেক আগে থেকেই সিটি করপোরেশন ইজারা দেয়। আগের সরকারের সময় যারা ইজারা নিয়েছিল সেই ফোর আর ট্রেডিং এর গোলাম রব্বানী হিরুর সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। এরপর গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে আমরা ইজারা নিয়েছি। সেই সাইনবোর্ডও সব জায়গায় টানানো রয়েছে। এগুলো কী কারোর চোখে পড়েনি? সেদিন রাতে আমাদের ওই ছেলেটার ব্যবহার খারাপ ছিল সেটা আমরাই বলছি। কিন্তু সে কোনো চাঁদাবাজ নয়। এখন পর্যন্ত সেই ভিডিও করা লোকগুলোরও কোনো খোঁজ নেই। তারা অভিযোগ পর্যন্ত করেনি। এরপরও কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করেই চাঁদাবাজি মামলা দিয়ে তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আমরা ওকে আটকের পর বারংবার কাগজপত্র নিয়ে থানায় গিয়েছি। সিটি করপোরেশন থেকে ইজারার কাগজ পাঠিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো ফল পাইনি। এমনকি আমাদের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। এখন আমরা আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। কিন্তু রিমান্ড শেষ না হওয়ায় কিছুই করা যাচ্ছে না। এ সময় দক্ষিণ সিটির কাছ থেকে ইজার নেয়ার কাগজও দেখায় তারা। গত বছরের ২৮শে নভেম্বর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা উপ-সচিব কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী স্বাক্ষর করা ওই কাগজে দেখা যায়- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ধানমণ্ডি লেক ও লেক সংলগ্ন সেক্টর-৭ হতে ইজারা কার্যক্রম গ্রহণের পূর্ব সময় পর্যন্ত খাস আদায়ের জন্য গত বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর এই বিষয়ে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড সচিব, সার্ভেয়ার ও সম্পত্তি কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিই খাস আদায়ের জন্য জেড. এস এন্টার প্রাইজের কাছে টাকা উঠানোর জন্য ইজারা দেন। ওই খাস টাকা বাবদ ১২ই মার্চ ৯ লাখ ৭ হাজার ২শ’ টাকা সিটি করপোরেশন বরাবর সোনালী ব্যাংকে জমা করার একটি চালানের কপিও মানবজমিনের কাছে রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী মানবজমিন’কে বলেন, আসলে দেশের পটপরিবর্তনের পর আমাদের সিটি করপোরেশনে বেশ কিছু অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের কিছু টেন্ডার আটকে রয়েছে। আলোচিত ধানমণ্ডি-৭ নম্বরের সেক্টরের জায়গাটিও তারই আওতায়। মূলত ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর, জিগাতলা ওই সবই ৭ নম্বর সেক্টরের আওতায়। আমরা আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে ওই জায়গার টেন্ডার হয়ে যাবে। আর এই টেন্ডার না হওয়া পর্যন্ত ওই জায়গাটি জেড.এস এন্টার প্রাইজের কাছে ইজারা দেয়া হয়েছিল। আটক ওই যুবক ওই কোম্পানির লোক।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র ধানমণ্ডি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) শাহ মোস্তফা তারিকুজ্জামান মানবজমিন’কে বলেন, চাঁদা আদায়ের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তা আমাদেরও নজরে আসে। পরে আমাদের থানা পুলিশ অভিযুক্ত আশরাফুলকে আটক করে। তাকে আটকের পর আমরা প্রাইভেটকারের চালকদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু তাদের হদিস না পাওয়ায় এ বিষয়ে আশরাফুলসহ আরও ৪/৫ অজ্ঞাতনামা আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে ধানমণ্ডি থানায় একটি চাঁদাবাজি মামলা করে। যেহেতু সে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে তার সঙ্গে আরও ৪/৫ জন জড়িত আছে সেই তথ্য জানতেই তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ইজারার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরাও বিষয়টি শুনেছি। পুরো বিষয় নিয়েই আমাদের তদন্ত চলছে। এখানে দেখার বিষয়- কতোটুকু জায়গা সিটি করপোরেশনের। তারা কী বাসস্ট্যান্ডের পাশে ইজারা দিতে পারে কিনা? ওই গাড়িটি কি ওই পার্কিং এর জায়গায় ছিল কিনা? সবই যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে আমাদের সঙ্গে কারোর তো কোনো শত্রুতা নেই। পুলিশ তার নিজের কাজ করছে। তদন্ত করে যা পাওয়া যাবে তা আদালতে পেশ করা হবে। আদালত সেই তদন্ত রিপোর্টের প্রেক্ষিতে কি আদেশ দিবেন সেটা আদালতের এখতিয়ার। এখানে আমাদের তেমন কিছুই করণীয় নয়। তাই সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করবো তারা যেন আদালতের দ্বারস্থ হন। সবকিছু বিচারের ক্ষমতা একমাত্র আদালতের।

mzamin

Sunday, March 2, 2025

অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছেই: সক্রিয় আন্ডারওয়ার্ল্ড by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীতে একের পর এক গোলাগুলির ঘটনা বেড়েই চলেছে। কোথাও আধিপত্য বিস্তারে তো কোথাও চাঁদার দাবিতে। এমনকি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে গায়ে ধাক্কা লাগলেও বাড়িতে ঢুকে গুলি করা হচ্ছে। কারও পায়ে, কারও হাতে, কেউ আবার পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে।

গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সুতি খালপাড় এলাকায় মোহাম্মদ জাহিদ (২৫) নামে এক যুবকের পায়ে গুলি করা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে ঢামেকে নিয়ে আসা মো. হৃদয় বলেন, পায়ে গুলি লেগে রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল জাহিদ। পরে আমরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। খুব সম্ভবত ছিনতাইকারীরা তাকে গুলি করে থাকতে পারে। গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের ই-ব্লকের ১ নম্বর রোডে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে মো. জসিম উদ্দিন (৪৪) ও তার বোন শাহিনুর বেগম (৩২)কে গুলি করা হয়। আহত অবস্থায় তাদের দু’জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। আহত জসিম উদ্দিন বলেন, তিনি পরিবার নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় থাকেন। সেখানে তার ফার্নিচারের ব্যবসা আছে। মিরপুরে তার বোন শাহিনুর থাকেন। এক সপ্তাহ আগে গাজীপুর থেকে বোনের বাসায় আসি। সপ্তাহখানেক আগে সোহাগ নামে ওই এলাকার এক ছিনতাইকারীকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করি। তখন তার সহযোগীরা আমাকে হুমকি দেয়। এরপর শবেবরাতের রাতে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বোনের বাসার সামনে এলে সোহাগের বিষয় নিয়ে এলাকার শরিফ, তুহিন, শহিদুল, সুজন, রিয়াজের সঙ্গে আমার কথাকাটাকাটি হয়।

একপর্যায়ে শহিদুল আমার পায়ে গুলি করেন। খবর পেয়ে আমার বোন শাহিনুর বাসা থেকে বের হয়ে এলে তাকেও গুলি করা হয। স্থানীয়রা আমাদের প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে রামপুরার বনশ্রীতে ডান পায়ের উরুতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন রামপুরা থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জুয়েল সরদার (৪০)। তাকেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত জুয়েলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা বন্ধু মহসিন জানান, তারা বনশ্রী এ- ব্লক কাঁচা বাজারের পাশে কয়েক বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলযোগে হেলমেট পরিহিত বেশ কয়েকজন এসে হিমেল নামের একজনের খোঁজ করেন। তারা বলেন, আমরা হিমেল নামে কাউকে চিনি না।’ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা জুয়েলের ডান উরুতে গুলি করে চলে যায়। বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার রামচর গ্রামের হাকিম সরদারের ছেলে জুয়েল বর্তমানে পূর্ব রামপুরা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ভোরে হাতিরঝিলে মো. সুমন (২৫) নামে এক ইন্টারনেট কর্মচারীকে গুলি করা হয়। তাকেও উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তার বোন ইভা বলেন, আমার ভাই ইন্টারনেট কোম্পানিতে লাইনম্যানের কাজ করেন।

 মঙ্গলবার রাতে রামপুরা ওয়াপদা রোডের একটি চায়ের দোকানের সামনে ১২-১৫ জন মুখোশধারী মোটরসাইকেলযোগে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে আমার ভাই ডান পায়ের উরুতে গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে তাকে উদ্ধার করে মুগদা হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। আমাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানার কুতুমপুর গ্রামে। বর্তমানে আমরা রামপুরার ওয়াপদা রোডের দুই নম্বর গলি এলাকার একটি বাসায় ভাড়া থাকি। এর দুইদিন আগে ১লা ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ১০টার দিকে হাতিরঝিল থানার উলন পোড়াবাড়ি এলাকায় লানী (৫৫) ও শুভ (১৭) নামে দু’জন গুলিবিদ্ধ হন। তারাও ঢামেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। গুলিবিদ্ধ জিলানির ছেলে সাইফুল বলেন, আমার বাবা উলন পোড়াবাড়ি এলাকায় কলা বিক্রি করে। রাত ৯টার দিকে হঠাৎ একটি পক্ষকে আরেক পক্ষের লোকজন গুলি ছুড়তে ছুড়তে ধাওয়া করে। সেই গুলি আমার বাবার গায়ে এসে লাগে। এ সময় শুভ নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। তবে কে বা কারা আমার বাবাকে ও ওই কিশোরকে গুলি করেছে, বিষয়টি বলতে পারছি না। আমাদের বাড়ি বি-বাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার কমলপুর এলাকায়। আর গুলিবিদ্ধ শুভর বাড়ি শরীয়তপুরের ডামুড্যা থানার কাচিকাটা এলাকায়।

গত ২৪শে জানুয়ারি রাত সোয়া ১১টার দিকে কামরাঙ্গীরচরের বেড়িবাঁধ এলাকায় সজল রাজবংশী (৩৭) নামে এক ব্যবসায়িকে গুলি করে প্রায় ৭০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। গুলিবিদ্ধ সজলের ভাই জয় রাজবংশী বলেছেন, ‘আমার ভাই কামরাঙ্গীরচরে ‘ইতি জুয়েলার্সের’ মালিক। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে দোকান বন্ধ করে মোটরসাইকেলে করে হাজারীবাগে বাসায় ফিরছিল বড় ভাই। বাসার কাছাকাছি এলেই অজ্ঞাত কয়েকজন দুর্বৃত্ত আমার ভাইয়ের বাম পায়ে গুলি করে তার কাছে থাকা প্রায় ৭০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে পালিয়ে যায়। গত ৭ই ডিসেম্বর কদমতলী এলাকায় একটি রড তৈরি কারখানার দুই নিরাপত্তাকর্মী মো. মনির (৪৫) ও মো. আল আমিন (৪০) দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন। কারখানাটির তত্ত্বাবধায়ক মো. সবুজ বলেন, রাত ২টার দিকে বাইরে মানুষের শব্দ পেয়ে দু’জন টর্চলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে যান। তখন এক ব্যক্তি তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যান। তাদের পায়ে গুলি লাগে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই রাতে ৯টার দিকে ঢাকার পশ্চিম মেরুল বাড্ডা এলাকায় সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। তার ডান পায়ের উরুতে গুলি লাগে।

সাইফুলের খালাতো ভাই মনির হোসেন বলেন, কী কারণে কারা তার ভাইকে গুলি করেছে, সেটা এখনো জানতে পারেননি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে সাইফুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একের পর এক এমন গুলির ঘটনায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, আগে কিছু হলেই ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যেতো। কিন্তু বর্তমানে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর একসঙ্গে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাদের লোকজনই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে এই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করছে। কেউ কেউ আবার দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে দোকান-বাসা বাড়ির সামনে ও নির্মাণাধীন ভবনের সামনে দল বেঁধে এসে গুলি চালানো হচ্ছে। ইন্টারনেট, ডিশ লাইন ও ময়লার ব্যবসার দখল নিতেও পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি হচ্ছে। এদিকে থানা লুটের অস্ত্রও এখনো সব উদ্ধার হয়নি। সেসব অস্ত্র নিয়েও কেউ কেউ ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে।

তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক বলেছেন, নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য যা যা উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন আমরা সব নিয়েছি। চেকপোস্ট, পেট্রোল, ফুট পেট্রোল, ডিবি-পুলিশ-র?্যাব-সেনাবাহিনীর টহলসহ যা যা করণীয় আমরা সবকিছু করে যাচ্ছি। ডিএমপি, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই সন্ত্রাসীরা যত শক্তিশালীই হোক, সে যেই হোক পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাবে না।

এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, আমাদের ডিএমপি’র সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, এপিবিএন, এটিইউ সকল এজেন্সি যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। এর আগে আমরা যৌথভাবে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু করি। চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকা করে সেই মোতাবেক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আমরা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের যদি আটকাতে পারি, তাহলে দেখবেন ঘটনা কমে গেছে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, এখানে একটি ঘটনা ঘটলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। অপরাধ যে কখনো ছিল না, তা তো না। কিন্তু তখন যেহেতু মিডিয়া এত অ্যাডভান্স ছিল না, সেজন্য প্রচারটা হতো না। ইভেন আগে যে একটা ঘটনা ঘটলে একজন সামনে এগিয়ে এসে প্রতিরোধের চেষ্টা করতো, এখন সেটা না করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ভিডিওতে ব্যস্ত। তাই এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা জনবহুল একটা শহর, এখানে সবাইকে অবদান রাখতে হবে। ঢাকাবাসীর সবার কাছে অনুরোধ, আসুন সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে আমরা চেষ্টা করি।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ও সজাগ রয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত চেকপোস্টগুলোও ফাংশন করছে। যৌথ বাহিনীর অপারেশনও ভালোভাবে চলছে। থানার কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটরিং করার জন্য বাহিনীর পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অফিসারদেরও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ফোর্স ও টহলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

Friday, February 21, 2025

যৌথ বাহিনীর অভিযান: কী ঘটেছিল মোহাম্মদপুরে by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জুম্মন ও মিরাজ নামে দুইজন নিহত হয়েছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে আরও ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে চাঁদ উদ্যানের ৬ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির ছাদে এ ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা। এ সময় সন্ত্রাসীরা গুলি চালানো শুরু করে। আত্মরক্ষায় অভিযানে যাওয়া যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এরই জেরে দু’জনের মৃত্যু হয়। পরে আটক ৫ জন হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করলে তাদের থানা হেফাজতে নেয়া হয়। গতকাল সরজমিন মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উৎসুক মানুষ ভিড় করছে লাশ উদ্ধার করা ওই ৯ নম্বর বাড়ির সামনে। টিনের ছাউনিঅলা আধাপাকা বাড়িটিতে বেশির ভাগই নিম্ন্নআয়ের মানুষের বসবাস। বাড়িটির মেইন গেটের উপরে ছোট্ট একতলা ভবন। সরু লোহার মই দিয়ে উপরে উঠে দেখা যায়- ওই ভবনের ছাদের উপর ছোট ছোট দু’টি রুমে বিভিন্ন পেশার কর্মজীবীরা মেস আকারে থাকেন। ওই রুমের টিনের চালার উপর থেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জুম্মন ও মিরাজের লাশ উদ্ধার করা হয়। বাড়িটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মো.  জুলহাস বলেন, বুধবার রাত ১২টার পর হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ পাই। সেনাবাহিনী-পুলিশের পক্ষ থেকে বার বার এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে- আপনারা কেউ বাসা থেকে বের হবেন না। আপনারা সকলে ঘরের মধ্যে থাকুন। কাউকে বাসায় ঢুকতে দিবেন না। আমি তখন ভাব বুঝতে গেটের সামনে বের হই। তখন আমাদের সামনের বাজারের রাস্তার দুইপাশে অবস্থান নিয়ে একদল সন্ত্রাসীকে ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এরই মধ্যে কোনো দিক না পেয়ে জুম্মন, মিরাজসহ বেশ কয়েকজন দৌড়ে আমাদের গলিতে ঢুকে পড়ে। তারা আমাদের পাশের ৬ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানের ওপর দিয়ে দেওয়াল বেয়ে ভবনের উপরে উঠে যায়। বাকিরা বাড়ির টিনের ওপরে উঠতে পারলেও একজন নিচ থেকেই ধরা পড়ে। এ সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও তাদের ধাওয়া দিলে আমাদের ছাদের ওপরের রুমের টিনের ওপর উঠে জুম্মন-মিরাজেরা গুলি ও ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। দুইপক্ষের গোলাগুলির শব্দে তখন পুরো এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছিল। আমিও দৌড় দিয়ে ঘরে ঢুকে যাই। গুলির শব্দ থেমে গেলে আবারো আমিসহ অনেকেই বাইরে বের হই। একপর্যায়ে সেনাসদস্যরা উপরে গিয়ে দুইজনের লাশ উদ্ধার করে। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় ৬ নম্বর বাড়ির ভাড়াটিয়া ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী মো. বিল্লাল তার ভ্যানে করে ওই লাশ দু’টো সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপতালে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, নিহত মিরাজ ও জুম্মনের গ্রামের বাড়ি ভোলাতে হলেও বর্তমানে তারা  চাঁদ উদ্যান এলাকার ৮ নম্বর রোডে বসবাস করতেন। জুম্মনের বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। আর মিরাজ শাহ আলমের সন্তান। তারা তেমন কোনো পেশায় জড়িত ছিল না। সারা দিন ঘুরে বেড়াত। তারা মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাথা ‘মাহী গ্রুপের’ লোক। তিনি বলেন, যে দু’জন মারা গেছে, তাদের নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে আটক হওয়া ৫ জনের মধ্যে ৪ জনই আমাদের মেসের ছেলে। একজন শুধু সন্ত্রাসী। তিনি বলেন, আটক হওয়াদের মধ্যে মেহেদী, মিরাজ, হোসেন ও মোমিন আমার মেসের ছেলে। এদের মধ্যে মেহেদী ও মোমেন স্থানীয় ঠিকাদার মান্নানের অধীনে রড কাটার কাজ করতো। হোসেন ইটভাঙার কাজ করে সঙ্গে তালার কাজ করে। আর মোমিন ভাঙ্গারির ব্যবসা করে। ঠিকাদার মান্নান বলেন, আটককৃতদের মধ্যে মেহেদী ও মিরাজ আমার এখানে রড কাটার নিয়মিত কাজ করতো। খাতা-পত্রে তাদের সব প্রমাণ রয়েছে। তারা কোনো ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। নারগিস, রেহেনা, বিল্লাল, জসিমসহ বেশ কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, ছিনতাইকারীদের দাপটে দিনের বেলায় রাস্তা দিয়ে চলতে পারি না। কাজ করে ফেরার পথে গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে সব নিয়ে চলে যায়। জুম্মন ও মিরাজের লাশ বহন করে নিয়ে যাওয়া ভ্যানের চালক মো. বিল্লাল বলেন, বুধবার রাতে যখন গোলাগুলি শেষে দু’টি লাশ উদ্ধার করা হয় তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমার ভ্যান দেখে চালকের খোঁজ করছিল। আমি তখন এগিয়ে যাই। আমাকে তারা বলেন- এখন তো তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, আপনি একটু লাশ দুটো সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে দিয়ে আসেন। তখন তারাই আমার ভ্যানে লাশগুলো তুলে দেয়। আমি তাদের সঙ্গে লাশ নিয়ে হাসপাতালে দিয়ে আসি। তিনি বলেন, আমাদের গলির মাথায় একটি বহুতল ভবন আছে। বেশির ভাগ সময়ই এরা ওই ভবনের ছাদে আড্ডা দিতো।

এদিকে মোহাম্মদপুর থানার নথি থেকে জানা গেছে- যৌথ বাহিনীর গুলিতে নিহত জুম্মনের বিরুদ্ধে ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৯ই আগস্ট ২০২৩, ৪ঠা জুলাই ২০২৩, ১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২রা জানুয়ারি ২০২৩, ৩১শে মার্চ ২০২০, ৫ই মার্চ ২০২৩, ৬ই মার্চ ২০২৩ ও ১৭ই ডিসেম্বর ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। অস্ত্র, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হত্যাচেষ্টা, মারামারি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে তার বিরুদ্ধে এসব মামলা হয়েছে। নিহত মিরাজের বিরুদ্ধে ৭ই জানুয়ারি ২০২৩-এ মাদক, ১৫ই ডিসেম্বর ২০২০-এ মারামারি, ১৫ই মার্চ ২০২৪ ও ১৫ই জুন ২০২১ সালে হত্যা চেষ্টা, ছিনতাইসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজ উদ্দিন বলেন, চাঁদ উদ্যানের পাঁচ নম্বর রোডের এক বাড়ির চিলেকোঠায় ১০-১৫ জন সন্ত্রাসী থাকার খবর পেয়ে বুধবার রাত ১২টার দিকে সেখানে অভিযানে যায় যৌথ বাহিনী। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। পরে  জুম্মন ও মিরাজ নামে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা দু’জনেই চাঁদ উদ্যান এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। আটককৃতদের বর্তমানে মোহাম্মদপুর থানা হাজতে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আদালতে প্রেরণ করা হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপি’র মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জুয়েল রানা বলেন, কব্জি কাটা আনোয়ারকে গ্রেপ্তারের পর থেকে অপর একটি গ্রুপ মোহাম্মদপুরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। নিহতরা সেই গ্রুপেরই সদস্য। তিনি বলেন, বুধবার রাতে তাদের অবস্থানের খবর পেয়ে যখন চাঁদ উদ্যান এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টিম যায় তখন সন্ত্রাসীরা একটি বাড়ির ছাদ থেকে ইট-পাটকেল ও গুলি ছোড়া শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পাল্টা গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই ২ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন পালিয়ে গেছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল ও একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়।

অপরদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, চাঁদ উদ্যান এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে যৌথ বাহিনীর একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় একটি গলির দুই পাশ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘেরাও করলে ‘সন্ত্রাসীরা’ একটি একতলা ভবনের ছাদ থেকে অতর্কিত গুলি করে। আভিযানিক দলটি আত্মরক্ষার্থে তৎক্ষণাৎ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ৫ সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয়। পরে ওই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ছাদের উপর থেকে দু’জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। আর আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি এবং একটি চাপাতি। আইনগত ব্যবস্থা নিতে তাদের মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। 

mzamin

Sunday, February 9, 2025

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীকে গুলি: কী ঘটেছে গাজীপুরে? by সুদীপ অধিকারী

শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। গাজীপুর চৌরাস্তা মোড়ের চান্দিনা টাওয়ারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের একটি অফিস উদ্বোধনের কাজ চলছিল। হঠাৎ একটি ফোন কল আসে। বলা হয়- গাজীপুরের ধীরাশ্রম মন্দিরবাড়ী এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজ্জামেল হকের বাড়িতে কিছু লোক ভাঙচুর-লুটপাট চালাচ্ছে। এই খবর পেয়ে আমরা ৪০ থেকে ৫০জন শিক্ষার্থী ৪টা ইজিবাইকে করে সেখানে যায়। তারা সেখানে গিয়ে দেখেন কয়েকজন মোজ্জামেল হকের বাড়ির ভেতরে ভাঙচুর করছে। শিক্ষার্থীদের একটি দল ভেতরে প্রবেশ করে। আরেক গ্রুপ বাইরে ছিল। এ সময় হঠাৎ বাড়ির সামনের মসজিদের মাইকে জয় বাংলা বলে ঘোষণা করা হয়- বলা হয় এলাকায় ডাকাত ঢুকেছে। সব লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আপনারা সবাই যার যা আছে নিয়ে বের হয়ে আসুন। এরপর এলাকাটির প্রায় সবক’টি মসজিদে একই ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণার পরপরই এলাকাটির প্রায় এক-দেড়শ’ মানুষ ধারালো অস্ত্র, লাঠি-সোটা নিয়ে বের হয়ে মোজাম্মেল হকের বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে। তারা এসেই প্রথমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের মারধর করে। পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের আটকে রেখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। তখন তাদের কেউ কেউ দুইতলা থেকে নিচে লাফ দেন। ১০ থেকে ১৫ জন জীবন বাঁচাতে বাড়িটির ছাদে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেন। তারা ছাদের দরজা ভেঙে ছাদে গিয়েও হামলা করে। গাজীপুরের ধীরাশ্রমে শুক্রবার রাতে হামলার এমনই বর্ণনা দিয়েছেন আহতরা। সরজমিন ঘুরে স্থানীয়দের কাছ থেকেও এমন বর্ণনা মিলেছে। যদিও ঘটনার পর থেকে এলাকায় পুরুষদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও কেউ ঘটনার বিষয়ে কথা বলছেন না। হামলার শিকার হয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১২তলার কেবিনে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন চান্দিনা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের ওপর পরিকল্পনা করেই হামলা হয়। তারা মাথা লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একটা কোপ এসে লাগে আমার বাম চোখের পাশে। আমি নিচে লুটিয়ে পড়লে তারা আমাকে মৃত ভেবে চলে যাচ্চিল। তখন একজন লাইট মেরে বলে- শালা মরেনি। ওদের ধরে নিয়ে চল। আজকে সবক’টাকে একদম শেষ করে দেবো। তখন আমাদেরকে ধরে বাড়ির সামনের মসজিদে নিয়ে গিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে আবারো মারধর করে। আমার সামনেই একজনের পায়ের রগ কেটে দেয়। আমাকেও বলা হয়- ভিডিওতে মাফ চা, বল কোনোদিন আর এসব করবি না। না হলে তোরও পায়ের রগ কেটে দেয়া হবে। পরে আমি তাদের কাছে মাফ চেয়ে জীবনটা রক্ষা করি।

শুক্রবার রাতে হামলার সময় মোজাম্মেল হকের বাড়ির ২য় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়ে একই কেবিনে ভর্তি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের গাজীপুর শাখার সদস্য টঙ্গী চেরাগ আলী এলাকার বাসিন্দা মো. আকাশ (১৯) বলেন, যখন চারপাশ থেকে এসে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমাদেরকে কোপানো শুরু করে তখন জীবনের ভয়ে আমিসহ কয়েকজন ২য়তলা থেকে নিচে ঝাঁপ দিই। তিনি বলেন, এটা একটা ট্র্যাপ (চক্রান্ত) ছিল। চক্রান্ত করেই বাড়ি ভাঙচুরের খবর দিয়ে আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ আমাদের ওপর যখন হামলা চলছিল তখন যারা আগেই ওই বাড়িতে ভাঙচুর চালাচ্ছিল তারাও স্থানীয়দের সঙ্গে যোগ দেয়। তারা ওদেরই লোক ছিল। আমরা যখন প্রথমে গিয়ে তাদের ফোন চেক করেছিলাম, তখন তাদের ফোনে আওয়ামী লীগ নেতাদের ছবি ও পোস্ট ছিল।  তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমাদের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে সরজমিন গাজীপুরের ধীরাশ্রম মন্দির বাড়ি এলাকায় সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক কারুকার্যের দুইতলা বিশিষ্ট বাড়িটির প্রতিটা রুমেই ভাঙচুর চালানো হয়েছে। চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে জানালার কাঁচ ভাঙচুর করা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাড়িটির মালামাল আসবাবপত্র। আলিশান বাড়িটির উঠানে রয়েছে সুইমিংপুল, পাকা বসার জায়গা। বাড়ির সামনে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, ফুলের বাগান। পাশেই মসজিদ। যেই মসজিদ থেকেই প্রথম ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেন মোজাম্মেল হকের বাড়ি দেখাশোনা করা ও ওই মসজিদের ইমাম। মসজিদের দেওয়াল ও মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা যায়। মসজিদের দেওয়ালে রক্তের দাগ দেখে বোঝা যায়- মসজিদের বারান্দায় আহত কাউকে বসিয়ে রাখায় তাদের মাথা থেকে দেওয়ালে লেগেছে এই রক্ত। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শুক্রবার রাতে ও সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নারী-পুরুষসহ কয়েকজনকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ায় ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ।

নাসিমা বেগম, ইয়াসিন সরকারসহ নাম না প্রকাশের শর্তে আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আমরা সবাই বাড়িতে ছিলাম। হঠাৎ মসজিদের মাইকে ডাকাতের হামলার ঘোষণা শুনে বাইরে এসে দেখি অনেক লোক। মন্ত্রীর বাড়ির মধ্যে ঢুকে ভাঙচুর করছে। এরমধ্যেই এলাকার লোকজনের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। কেউ কেউ দৌড়ে পালিয়ে যায়। কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা এসে তাদেরকে নিয়ে যায়। তারা বলেন, এটা সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের পৈতৃক নিবাস। তিনি এখানে সবসময় থাকতেন না। মাঝে মধ্যে সময় কাটাতে আসতেন। তার শহরের ওপর বাড়ি আছে। বেশির ভাগ সময়ই তিনি ঢাকায় থাকতেন। সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। এই বাড়িতে মসজিদের ইমাম তার বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকেন। এই বাড়ি দেখাশোনার জন্য তাকে ময়মনসিংহ থেকে এনে বেতনভুক্ত রাখা হয়েছে। তারা বলেন, ওই ঘটনার পর রাতে পুলিশ এসে বাড়িতে বাড়িতে গিয়েছেন। খোঁজ নিয়েছে- কোন বাড়িতে নারীরা আছে আর কোন বাড়িতে পুরুষ আছে। পুরুষ মানুষ পেলেই তাকে তুলে নিয়ে গেছে। শনিবার সকালেও অনেকজনকে থানায় নিয়ে গেছে। এই পাশের মার্কেট মসজিদের ইমামকে না পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। ভয়ে এখন পুরুষশূন্য পুরো এলাকা।

অপরদিকে সেদিন রাতে ওই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মোজাম্মেলের বাড়িতে বহন করে নিয়ে যাওয়া ৪ ইজিবাইকের মধ্যে থাকা এক চালক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, শুক্রবার রাতে আমি কাজ শেষে বাড়িতে যাবো। চৌরাস্তায় গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এর মাঝেই ছাত্ররা ডাক দিলো। আমরা একসঙ্গে ৪টা ইজিবাইকে তাদেরকে নিয়ে রওনা করি। তারা সবাই খালি হাতে ছিল। কোনো লাঠিসোটা ছিল না। তবে তারা খুব মারমুখী ছিল। গাড়ি থেকে নেমে তারা দুটো ইজিবাইকের ভাড়া ১৫০ করে মোট ৩০০ টাকা দিলেও আমাদের দুটোর ভাড়া বাকি ছিল। আমরা দু’জনেই তাই গাড়ি নিয়ে ভাড়ার অপেক্ষায় ছিলাম। দেখলাম ছাত্ররা গেটে লাথি মেরে চিল্লাচিল্লি করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। এরপরই এক হুজুর দৌড়ে গিয়ে মাইকে ডাকাত বলে ঘোষণা করলেন। এরপর আশপাশের মসজিদেও ডাকাতের ঘোষণা করা হয়। এলাকার সবাই তখন দা, সাবল নিয়ে দৌড়ে আশে। তখন আমি আর আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ইজিবাইকচালক দু’জনে দুইদিকে গাড়ি চালিয়ে বের হয়ে যায়। ভাড়া না পাওয়ায় আমি জয়দেবপুর যাওয়ার মেইন রোডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরইমধ্যে দুইজন শিক্ষার্থী আমার কাছে এসে অনুরোধ করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আগে ভাড়ার টাকা না পাওয়ায় আমি তখন তাদেরকে বলি ভাড়া না দিলে আমি যাবো না। তখন একটি শিক্ষার্থী তার পকেটে হাত দিয়ে বলে- আমার সব নিয়ে গেছে। ফোন নিয়ে গেছে। তবে মানিব্যাগটা আছে। এই বলে সে ৫শ’ টাকার একটি নোট আমার হাতে তুলে দেয়। আমি তখন তাদেরকে নিয়ে তাজউদ্দীন মেডিকেলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমিই প্রথম আহত দু’জনকে আমার ইজিবাইকে করে হাসপাতালে পৌঁছে দিই। এরপর শুনি এত ঘটনা।     

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গাজীপুরের মুখ্য সংগঠক মো. রবিউল হাসান ও  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. নয়ন দেওয়ান বলেন, কিছু লোক গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রম এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের গ্রামের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, এমন খবর পেয়ে আমাদের লোকজন ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই এলাকাবাসী আমাদের লোকজনের ওপর হামলা চালায়।

গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীকে গুলি
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সারাদিনের আন্দোলনের কর্মসূচি শেষে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কয়েকজন। এ সময় মোটরসাইকেলে এসে অতর্কিত গুলি ছোড়ে এক ব্যক্তি। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন মোবাশ্বের হোসেন নামের এক ছাত্র। তার হাতে গুলি লেগেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই গুলি ছুড়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. নয়ন দেওয়ান বলেন, সন্ধ্যায় শহরের জোড় পুকুরপাড়ের দিক থেকে মোটরসাইকেলে এসে এক ব্যক্তি গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। এতে ওই শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে তাকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।   

অন্যদিকে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে শুক্রবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)কে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার নাজমুল করিম খান।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের সড়কে অবস্থান করে সমাবেশ চলাকালে সেখানে এসে পুলিশ কমিশনার বলেন, গতকাল রাতে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আমি ব্যর্থতা স্বীকার করে নিচ্ছি। হামলাকারী কাউকে ছাড়া হবে না, প্রতিটি হামলার জবাব দেয়া হবে। যেসব পুলিশ রেসপন্স করতে দেরি করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুনেছি, আমার ওসি দুই ঘণ্টা পর আপনাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আমি এখানে দাঁড়িয়ে বললাম, তাকে সাসপেন্ড (বরখাস্ত) করবো। আমি বলতে চাই, যারা এই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আঁতাত করেছে, তাদের পুলিশে চাকরি করতে দেয়া যাবে না। পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, গত ১৭ বছর ধরে যারা অত্যাচার করেছে, দেশের ওপর জুলুম করেছে, তারা মাথাচাড়া দিচ্ছে। কিন্তু তাদের কোনো মাথাচাড়া বরদাশত করা হবে না। ইতিমধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাতে চিরুনি অভিযান চালানো হবে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দমন করার জন্য ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ পরিচালনা করা হবে।

হামলার প্রতিবাদে দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ
সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের গাজীপুরের বাড়িতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৮ জন আহত হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে গাজীপুর। হামলা চালিয়ে আহত করার প্রতিবাদে ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে দিনভর বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি এসব কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচিকে ঘিরে জেলা শহরে ছিল থমথমে পরিস্থিতি। গত শুক্রবার রাতে হামলায় আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ছয়জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আহত তিনজন ভর্তি আছেন শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গাজীপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর খুনি মোজাম্মেল ও জাহাঙ্গীর এবং আওয়ামী দোসরদের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করে অবস্থা কর্মসূচি, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। শনিবার সকাল ১১টা থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে শহরের রাজবাড়ী সড়কে ও ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী ময়দানে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় হামলার প্রতিবাদে সড়কে অবস্থান নিয়ে গাজীপুরে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সারজিস আলম।

সমাবেশে সমন্বয়ক সারজিস আলম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আজকে রাতের মধ্যে গাজীপুরের ছাত্র-জনতার ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে আমরা সরকার ও পুলিশের বিপক্ষে অবস্থা নেবো। সারজিস আরও বলেন, আজকের পর থেকে যদি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কোনো ক্যাডার আমার ভাইকে হুমকি দেয় তারপরের দিন তার জায়গা হবে জেলখানায়। খুনি শেখ হাসিনা ও খুনি জাহাঙ্গীরের দোসররা যদি এই গাজীপুরে আবার উত্থান করতে চায়, তাহলে ছাত্র-জনতা তাদের ছাড় দিবে না।

দুপুরে জাতীয় নাগরিক কমিটির সমাবেশ শেষে  রাজবাড়ী মাঠ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এর আগে সেখানে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সংগঠক ও ক্রাইসিস রেসপন্স সেল বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট আলী নাসের খান, কাউন্সিলর এসোসিয়েশন নেতা এডভোকেট নজরুল ইসলাম খান। জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সংগঠক এডভোকেট আলী নাসির খান  আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল, আওয়ামী দোসরদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি করেন।

স্থানীয়রা জানান, রাতের আঁধারে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩১নং ওয়ার্ডের দক্ষিণখান এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হকের দ্বিতল বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দাবি, ওই ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পেয়ে তারা তা প্রতিহত করতে সেখানে যান। এ সময় পরিকল্পিতভাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ মাইকে ডাকাতের গুজব ছড়িয়ে জড়ো হয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রদের মারধর করে আহত করা হয়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রাতের ঘটনায় মোট ১৮ জন আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে ৬ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, শনিবার সকালে হাসপাতালে আহতদের খোঁজখবর নেন জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন। তিনি এ সময় চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন এবং সুচিকিৎসার জন্য নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোজাম্মেল হকের বাড়ি পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। এ ব্যাপারে শনিবার বিকাল পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা  আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

ওদিকে শুক্রবার রাতের ঘটনায় সদর থানার ওসিকে প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন মহানগর পুলিশের কমিশনার নাজমুল করিম খান। এছাড়া ওই ঘটনার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে ক্ষমা চান। বলেন, হামলাকারীদের কাউকে ছাড়া হবে না।

mzamin

Saturday, February 8, 2025

শুক্রবার ৩২ নম্বরে যা দেখা গেল by সুদীপ অধিকারী

ভেকু দিয়ে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে ফেলা বাড়ির চিত্র দেখতে গতকাল দিনভরও ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন বন্ধুর সঙ্গে। কেউ বাবার হাত ধরে। কেউ আবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় পরিবারের সদস্যদেরকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ লোক বাড়ি ভাঙার পক্ষে কথা বললেও কেউ কেউ এই ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের বিপক্ষেও মত দিয়েছেন।

সরজমিন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় গতকাল দেখা যায়, সকাল থেকেই লোক সমাগম রয়েছে এলাকাটিতে। কেউ মিরপুর থেকে এসেছেন। কেউ কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীচর, কেউ আবার এসেছেন মোহাম্মদপুর থেকে। সকলে এসে বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। স্লোগান দিচ্ছেন। পায়ে হাঁটা মানুষের ভিড়ের মধ্যে রিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল আর  গাড়ির চাপে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে আবাহনী মাঠের পেছন থেকে শুরু করে ৩২ নম্বর পর্যন্ত। এত মানুষের সমাগম দেখে বিভিন্ন খাবারের দোকান সাজিয়ে নিয়েও বসেছেন অনেকে। যেন এক দর্শনীয় স্পটে রূপ নিয়েছে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর। অনেকেই স্মৃতি হিসেবে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর ভাঙা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। কেউ আবার হেসকাব্লেড দিয়ে ভাঙা বাড়ির রড কাটায় ব্যস্ত। সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সকালের তুলনায় গতকাল মানুষের চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল বিকালে। তাদের মধ্যে এমনই একজন আসিফুল ইসলাম। বেসরকারি এই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, মিরপুরে বাসা ও বৃহস্পতিবার অফিস থাকায় এখানে আসতে পারিনি। তিনি বলেন, এই ভাঙা বাড়িটি দেখলেই বোঝা যায় ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না।

এত ক্ষমতাশালী ছিল শেখ মুজিব ও তার মেয়ে শেখ হাসিনা। কিন্তু আজ তাদের বাড়ির এই অবস্থা। তাই ৩২-এর এই ভাঙা বাড়ি থেকে সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ আমাদের সকলের শিক্ষা নেয়া উচিত। কেরানীগঞ্জ থেকে ছেলের সঙ্গে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে আসা মো. আব্দুর রহমান নামে এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ বলেন, আমি সেই কেরানীগঞ্জ থেকে এসেছি শুধু এই বাড়িটি দেখতে। তিনি বলেন, বিশ্বের কতো বড় বড় রাজনৈতিক নেতা আছেন যারা তাদের কর্মের জন্য আজও অমর হয়ে আছেন। তাদের দেশের মানুষ তাদেরকে কতো শ্রদ্ধা করে। আবার এমন মানুষও আছে যাদের বাড়ি বুলডোজার লাগিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। এগুলো সবই কর্মের ফল। যে যা করবে তাকে সেই ফল ভোগ করতে হবে। আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। তিনিই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিচারক। এদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে আগুন লাগানোর পর ভাঙা বাড়ির কয়লা ও ইটের টুকরো নিজের সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন আনিছুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, হাজার হাজার বছরের সুন্দর নগরীও এক সময় কয়লায় রূপ নেয়। কয়লা হচ্ছে প্রতিটি জিনিসের সর্বশেষ রূপ। বছরের পর বছর ধরে নানা ইতিহাস বহন করা শেখ মুজিবের এই বাড়িটিও আজ কয়লা হয়ে গেছে। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে এর নির্মাণশৈলী।

এই ধ্বংসাবশেষও দু’দিন পর থাকবে না। হয় কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে, না হয় সরিয়ে ফেলা হবে। তাই এই কয়লা আর ইটের টুকরো আমার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, শেখ হাসিনা যত অন্যায় করেছিল তার ফলস্বরূপ তাকে ৫ই আগস্ট দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তারপর কিন্তু সব ঠিকই চলছিল। হঠাৎ করে তার এমন বক্তব্য দেয়ার জন্যই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শেখ মুজিবের বাড়ি ভাঙচুর, সুধাসদনে আগুনসহ সারা দেশে এক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। দেশটা আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে। তিনি তো  ভারতে পালিয়ে গিয়ে ভালোই আছে আমাদের দেশের মানুষ আছে অশান্তিতে। তাই আমরা চাই এই ফ্যাসিস্ট হাসিনা আর যেন দেশে না আসে।

তবে এসব ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের বিরোধিতাও করেছে অনেকে। মো. সবুর হোসেন নামে এক মধ্য বয়সী লোক বলেন, একজন অন্যায় করেছে বলে যদি আমরাও অন্যায় করি তাহলে তো তার মতো আমরাও সেই জালেম হয়ে গেলাম। তাই এসব ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারামারি থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে আমাদের ভেতরের পশুত্বটা জাগ্রত হয়। কোনো মজলুমের ওপর অন্যায় হলে আল্লাহ তার বিচার করেন। আর এই জন্যই এত ক্ষমতাশালী শেখ হাসিনাকে আজ দেশ থেকে পালাতে হয়েছে। সাইফুল আসলাম নামে আরেকজন বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে বসে বিভিন্ন উস্কানি দিচ্ছে। আর তাতে নেচে যদি আমরা সারা দেশে হামলা-ভাঙচুর চালাই তাহলে তো সে সফল। সে তো এটাই চায়- আমরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করি। দেশে অশান্তি বিরাজ করুক। সারাবিশ্ব দেখুক বাংলাদেশ একটি জঙ্গি রাষ্ট্র্র। দেশের সাধারণ মানুষ বলুক- আগের সরকারই ভালো ছিল। শেখ হাসিনা এটার জন্যই এসব করছে। তাই আমাদের উচিত যে যাই বলুক, কোনো দিকে কান না দেয়া। দেশের মানুষের ভরসা জয় করা। দেশটাকে শান্ত রাখা। কারণ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতারা তো সব পলাতক। বাড়িতে নেই। ওই জনশূন্য বাড়ি ভেঙে আর লাভ কী। এতে প্রতিহিংসার রাজনীতি আরও বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে ধানমণ্ডি ৩২ আসা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগমনকে ঘিরে সেখানে বিভিন্ন খাবারের দোকান নিয়ে বসেছে অনেকে। রেঙ-বেরঙের বেলুন বিক্রি হচ্ছে। চা, ঝালমুড়ি, চিকেন চাপ, কাবাব সবই পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। শরীফ নামে এক দোকানি বলেন, এখানে এই ভাঙা বাড়ি দেখতে অনেক মানুষ আসছে। তাই বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে। লিয়াকত নামে আরেক দোকানি বলেন, অন্যখানে তিনদিনে যা বিক্রি করি তার চেয়ে বেশি এইখানে একবেলা বিক্রি করছি। একের পর এক মানুষ আসছে, দেয়ার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। সকলে ছবি তোলায় ব্যস্ত। এক উৎসব উৎসব আমেজ। দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত নেই।

অপরদিকে গতকালও দিনভর একদল ছিন্নমূল মানুষকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের শেখ মুজিবর রহমানের বাড়ির ইট বালু ছাড়িয়ে রড কাটতে দেখা গেছে। কেউ আবার রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট, বিদ্যুতের খুঁটি খুলে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছে। ইট, কাঠ, রডসহ বিক্রি করার মতো কিছু পেলেই নিয়ে যাচ্ছে তারা। এমন কী শেখ মুজিবের বাড়ির পাশের সাধারণ মানুষের ভবনে ঢুকেও সব নিয়ে যাচ্ছে তারা। এসব দেখে কেউ কেউ বাধা দিলেও বেশির ভাগ মানুষ নিশ্চুপ। অনেকেই বলছে- এই বাড়ি ভাঙার মাহাত্ম্যটাই শেষ করে দিচ্ছে এসব টোকাই। এলাকাটিতে পুলিশ সদস্যদের দেখা গেলেও তারা ছিলেন নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল।

Friday, January 17, 2025

বেপরোয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ইমন বাহিনী’ by সুদীপ অধিকারী

সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন। একাধিক মামলায় ২০০৮ সাল থেকে কারাগারে থেকেই ধানমণ্ডি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছিলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। গত ১৫ই আগস্ট জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আবারো বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে তার বাহিনী। ধানমণ্ডি, পশ্চিম ধানমণ্ডি, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, টালি অফিস, জিগাতলা, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেটসহ পুরো এলাকার ভবন নির্মাণ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ময়লার সিন্ডিকেট, ডিশ ব্যবসা, ইন্টারনেটের ব্যবসা সব কিছুর একক আধিপত্য পেতে এখন মরিয়া ইমন বাহিনী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধানমণ্ডি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ধানমণ্ডি ৪ নম্বর রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ির ডাক্তার মল্লিক আব্দুল্লাহ’র ছেলে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন।

আলোচিত চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ ওরফে টিপু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ইমন। ১৯৯৮ সালের ১৮ই ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রামস ক্লাবের নিচে সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী সেই সময় গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে  চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর কথাকাটাকাটি হয়। এর প্রতিশোধ নিতে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার রাতে সোহেল তার বন্ধুদের নিয়ে ট্রাম্পস ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। তাকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। রাত আড়াইটার দিকে আবারো তিনি ঢোকার চেষ্টা করেন। তখন সোহেলকে লক্ষ্য করে ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক ও আদনান গুলি চালায়। এরপর থেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলোচিত হয়ে ওঠে ইমন। নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাং বাবুসহ একাধিক হত্যাকাণ্ডের পর ২০০৪ সালে র?্যাবের ধাওয়া খেয়ে কলকাতায় পালিয়ে যায় ইমন। ঢাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার পর ফোনের সূত্র ধরে বাংলাদেশের সিআইডি পুলিশ কলকাতা পুলিশকে বিষয়টি জানালে ২০০৭ সালের ৮ই ডিসেম্বর কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ফ্ল্যাট থেকে কলকাতা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ২০০৮ সালের ৭ই মার্চ কলকাতা পুলিশ ইমনকে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকেই মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও থানার আটটি মামলায় কুমিল্লা জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন পুলিশের তালিকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। সর্বশেষ ২০২২ সালের ১১ই এপ্রিল  তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। জেলে থেকেই তিনি পুরো এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। তিনি জেলে থাকলেও তার বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় ছিল। কেউ বাড়ি নির্মাণ করলেই বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে চাঁদা দাবি করতো। শুধু চাঁদাবাজি নয় জেলে বসেই একাধিক হত্যাকাণ্ডও চালিয়েছে এই ইমন। স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে ২০২৩ সালের  ১৮ই সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় নিজের একসময়ের বন্ধু শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনের ওপর নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ইমন। সেই গুলি লেগে মোটরসাইকেল আরোহী ভুবন চন্দ্র শীলের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১৩ সালে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি আফজাল হোসেন সাত্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও কারাগারে থেকেই ইমনের নাম আসে। দীর্ঘ ১৭ বছর কারাগারে থাকার পর গত জুলাই বিপ্লবের পর ১৫ই আগস্ট দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পায় অপরাধ জগতের ক্যাপ্টেন ইমন।
যেভাবে ময়লার ব্যবসা দখলে নেয় ইমন বাহিনী: পশ্চিম ধানমণ্ডির এক নারী বলেন, আমরা এই এলাকায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের বাসাবাড়ি থেকে ময়লা টানছি। সিটি করপোরেশনের কাগজপত্র সব আছে আমাদের। এরপরও যে দল যখন ক্ষমতাই আসে তখন তাদের ওয়ার্ড নেতাদের মাসোয়ারার একটা ভাগ দিতে হয়। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর কয়েকজন লোক এসে নিজেদের ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে আমাদের বলেন- আজ থেকে এই এলাকার ময়লার ব্যবসা ইমন ভাইয়ের। তোমরা এখন থেকে কর্মচারী। মাস গেলে বেতন পাবে। আর টাকা আমরা উঠাবো। ষাটোর্ধ্ব এই নারী বলেন, আমরা ছিলাম মালিক আর এখন আমরা হয়ে গেছি কামলা (কর্মচারী)। সব কাজ আমরা করি আর বাসাবাড়ি থেকে স্লিপ দিয়ে টাকা তোলে ইমনের লোক। বেতন তো ঠিকমতো দেয়ই না। উল্টো দুই মাসে ৩০ হাজার টাকা কেটে নিয়েছে। প্রতিটি এলাকাতেই ইমনের লোক ময়লার ব্যবসা দখলে নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের ওপর এসব নির্যাতনের কথা যার কাছে বলতে যাই- সেই বলে- চুপ থাকো, এরা ভালো মানুষ না। জানে মেরে ফেলবে। কাজ করে খাচ্ছো- এটাই অনেক। থানা পুলিশও এই ইমন বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলতে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেও জানান ময়লা ব্যবসায়ী।
ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজি: ধানমণ্ডি, জিগাতলা, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকার অংশবিশেষ এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণের সময়ে চাঁদা আদায়ে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় ইমনের নাম। ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলেই সেখানে গিয়ে ২০/৩০টি মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয় ইমনের লোকজন। তাদের দাবি করা চাঁদার টাকা না দিয়ে কাজ শুরু করতে পারে না ব্যক্তি বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির লোক। এমনই এক ভুক্তভোগী ধানমণ্ডি-১৯ নম্বর স্টার কাবাবের পেছনের রাস্তার এক ভবন মালিক। পুরাতন ভবন ভেঙে কোম্পানির মাধ্যমে নতুন ভবন নির্মাণ করছেন তিনি। প্রাণ ভয়ে নিজের নাম প্রকাশ না করলেও তিনি বলেন, আমি এখানে গত বছর থেকে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। মাসখানেক আগে সন্ধ্যা বেলা হঠাৎ ৩০/৪০টা মোটরসাইকেল নিয়ে একদল যুবক এসে হাজির। তারা আমার শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করতে বলে আমাকে খবর দিতে বলে। আমি অন্য কাজে তখন বাইরে ছিলাম। তারা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের লোক দাবি করে আমার কাছে সিকিউরিটি মানি হিসেবে চাঁদা দাবি করে। আমি তাদেরকে বলি আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমি চাঁদা দিতে পারবো না। তখন আমাকে বলা হয়- চাঁদা না দেয়া পর্যন্ত একটা ইটও গাঁথা যাবে না। এমন কী আমাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়। আমি তাই ভয়ে আপাতত কাজ বন্ধ রেখেছি।  তিনি বলেন, আমি আশপাশের অনেক ভবন মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি- ইমন বাহিনীর সদস্যদের নাকি চাঁদা না দিয়ে কেউ এই এলাকায় কাজ করতে পারে না।    
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি: ধানমণ্ডি এলাকার ছোট থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নামে ওঠে মাসিক চাঁদা। তার লোকজনকে চাঁদা না দিয়ে দোকান খুলতে পারে না কেউ। পশ্চিম ধানমণ্ডির রায়ের বাজারের ফিরোজ নামে এক দোকান মালিক বলেন, গত আগস্ট মাসেই ইমনের লোকজন এসে আমাদের বলে গেছে- সকলকে চাঁদা দিতে হবে। তা না হলে কেউ বাজারে ব্যবসা করতে পারবে না। তিনি বলেন, শুধু এই বাজার নয় আশপাশের সব ব্যবসায়ীকেই ইমন বাহিনীকে চাঁদা দিতে হয়। মার্কেট, শপিংমল থেকে শুরু করে বাজার কমিটি সবই তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। আর চাঁদার টাকা না দেয়ার জন্যই সব শেষ মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের দুই ব্যবসায়ী এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার সোসাইটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক ও সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান দীপুকে সকলের সামনে রাস্তায় ফেলে এলাপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে ইমনের লোকজন।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের উপ-কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, সন্ত্রাসী যত ক্ষমতাশালীই হোক না কেন আমরা কাউকে ছাড় দিবো না। অভিযোগ পেলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নিবে। এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি  মাসখানেক আগের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি বিরোধ চলছিল। সে কারণে অথবা অন্যকোনো কারণেও দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে আহত করা হতে পারে। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নিউমার্কেট থানায় করা মামলায় দাবি করা হয়েছে- ইমন বাহিনীর দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দেয়ায়ই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রকাশ্যে দুই ব্যবসায়ী নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। অভিযুক্তদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। ডিএমপি’র গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, আমরা মূলত পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে থাকি। যেখানে যেই গোয়েন্দা তথ্য পাই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই। আমাদের সেই গোয়েন্দা তথ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ড বা ওপেন যারা আছে তাদের কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এ বিষয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, কেউ অবৈধ কোনো কাজ করলে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী সে যেই হোক তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আসতে হবে। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ছিনতাইকারী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত রয়েছে। কোনো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে ব্যক্তিগতভাবে তিনি রক্তচক্ষুকে ভয় পান না বলেও জানান।

mzamin

Monday, January 6, 2025

মাহিয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পরিবার by সুদীপ অধিকারী

মাহিয়ান ইবনে সরোয়ার (১৮)। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবেন। পড়ালেখাতেও অন্যদের থেকে ছিলেন বেশ এগিয়ে। মাধ্যমিকের পর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে গোল্ডেন-এ প্লাস পেয়েছেন। তবে গত জুলাই-আগস্টে দেশব্যাপী চলা আন্দোলনে যোগ দিয়ে গত ৪ঠা আগস্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গুলি কেড়ে নিয়েছে তার সব স্বপ্ন। হাত এফোঁড়-ওফোঁড় করে পিঠে লাগা পুলিশের গুলিতে শিরা ছিঁড়ে অবস হয়ে গেছে মাহিয়ানের ডান হাত। নিজে হাতে ভাত খাওয়া তো দূরের কথা কলমও ধরতে পারছেন না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হলে তারা বিদেশে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে বাবার বেসরকারি চাকরির সামান্য বেতনের টাকা দিয়ে ছেলের উন্নত চিকিৎসা ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দিন পার করছে মাহিয়ানের পরিবার।

সেদিনের স্মৃতি টেনে ১৮ বছরের এই যুবক মাহিয়ান মানবজমিনকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলাম। বাসার কাছে হওয়ায় বেশির ভাগ সময় মিরপুর-১০ নম্বর, ২ নম্বর, ১২ নম্বর, ১৪ নম্বর, ইসিবি চত্বর এলাকার আন্দোলনে যোগ দিতাম। পুরো আন্দোলনে তেমন কিছু না হলেও সরকার পতনের ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় আমার ডান হাতের কনুইয়ের নিচে গুলি লাগে। তিনি বলেন, আমরা সেদিন ১৪ নম্বরের দিক থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে যাচ্ছিলাম। বিআরটিএ অফিসটা পার করে সামনের দিকে এগুতেই সামনের দিক থেকে পুলিশ গুলি শুরু করে। পুলিশের গুলির মুখেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আমাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল। এরইমধ্যে কোথা থেকে হঠাৎ আমার ডান হাতে এসে একটা গুলি লাগে। গুলিটি আমার ডান হাতের কনুইয়ের নিচের একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বের হয়ে পিঠে গিয়ে লাগে। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় পড়ে যাই। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আমার সঙ্গীরা আমাকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে- হাসপাতালে যেতেও ভয় লাগছিলো। যদি পুলিশ অ্যারেস্ট করে? তাই সেদিন আলোক থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যাই। পুলিশের ভয়ে সেদিন গুলি লাগার পরও কাছের কোনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে জানাতে পারিনি। সারা রাত পরিবারের সকলে এক ফোটা ঘুমাইনি। পরদিন যখন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়- তখন বুকে কিছুটা বল পাই। বাবা সরোয়ার হোসেন আগে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) কাজ করায় তার রেফারেন্স দিয়ে ৭ই আগস্ট সেখানে ভর্তি হই। সেখান থেকে জানা যায়, গুলি আমার ডান হাতের একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে পিঠে লাগলেও শরীরের ভেতরে প্রবেশ করেনি। তবে আমার ডান হাতের দুইটা নার্ভ ছিঁড়ে গেছে। আমি আগের মতো আর হাত দিয়ে কাজ করতে পারবো না। ৭ই আগস্ট থেকে ১৩ দিনের চিকিৎসা শেষে ১৯শে আগস্ট আমাকে সিএমএইচ থেকে রিলিজ দেয়া হয়। আমি বাড়ি ফিরে এলেও এখনো ডান হাত দিয়ে কিছু করতে পারি না। খাবারটা পর্যন্ত বাবা-মা খাইয়ে দেয়। পুরো হাতটা বাঁকা হয়ে রয়েছে। ছাড়পত্র দেয়ার পরও বেশ কয়েকবার সিএমএইচে ও স্কয়ার হাসপাতালে দেখিয়েছি। সিএমএইচ’র চিকিৎসকরা বলেছেন- দুইটা নার্ভের একটি রিপিয়ার করা হয়েছে। ফিজিওথেরাপি করলে হাতের কিছুটা উন্নতি হবে। তবে সময় লাগবে।

এদিকে মাহিয়ানের বাবা সাবেক সেনা সদস্য সরোয়ার হোসেন বলেন, আমার দুই ছেলে। মাহিয়ান বড়। আর নাহিয়ান ইবনে সরোয়ার ছোট। মাহিয়ান আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে এবার এইচএসসি পাস করেছে আর নাহিয়ান মাদ্রাসার ছাত্র। আমরা ইসিবি চত্বরের কাছে মানিকদি থাকি। সবকিছু ঠিকই চলছিল। সেদিনের একটা গুলি আমার পুরো পরিবারকে এলোমেলো করে দিয়েছে। তিনি বলেন, মাহিয়ানের ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ও বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। পড়ালেখাতেও অনেক ভালো। ডাবল এ প্লাস। কিন্তু এখন সে ডান হাতে কলমটাও ধরতে পারে না। ওকে রেটিনায় কোচিং করিয়েছি। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু পাস করবে কী করে ওতো কিছুই লিখতে পারেনি। ডান হাতে বল পায় না। হাতটা বাঁকা হয়ে থাকে। বাবা হয়ে ছেলের এই অবস্থা আমি দেখতে পারি না। তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় আমাদের সকলকে লুকিয়ে বেড়াতে হতো। এই একজন এসে বলতো- আপনার ছেলের নামে লিস্ট হয়েছে। ওকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কতো সব কথা। কিসের মধ্য দিয়ে যে আমরা দিন পার করেছি তা শুধু আমরাই জানি। জুলাই অভ্যুত্থানের এই যোদ্ধার বাবা বলেন, সিএমএইচ-এ চিকিৎসার পরে সেখান থেকে বলা হয়- মাহিয়ানের ডান হাতের দুটি নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি নার্ভের কাজ আমরা করিয়েছি। এরপর আমি মাহিয়ানকে স্কয়ার হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। সেখান থেকে বলা হয়- গুলি লাগার পর ওর হাতের ভাঙা হাড়ের অংশ বিশেষ ভেতরে আটকে আছে। তাই ও হাত সোজা করতে পারছে না। একইসঙ্গে ডান হাতের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাহিয়ানের হাতে এখনো সার্জারি প্রয়োজন। দেশের বাইরে নিয়ে গেলে এই অস্ত্রোপচার আরও ভালো হবে। তাই ওই চিকিৎসক ছাড়পত্রে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মাহিয়ানের চিকিৎসা বাবদ দেড় লাখের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেলেও কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। এর ওপর সংসারের খরচ রয়েছেই। তাই আমার ছাপোষা চাকরির বেতনে ওকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। আমি এই বিষয়ে জুলাই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখান থেকে আরেকজনের নম্বর দেয়া হয়। সেই নম্বরে অনেকবার যোগাযোগের পরও কাজ না হওয়ায় ওদের হটলাইন নম্বরে কল করি। সেখান থেকে আমাকে বলা হয়- মাহিয়ানের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হলে বা বিদেশ নিতে হলে পঙ্গু হাসপাতাল বা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) ছাড়পত্রে চিকিৎসকদের মন্তব্য উল্লেখ থাকতে হবে। তা না হলে আমরা কিছু করতে পারবো না। তিনি বলেন, আজ আমার সামর্থ্য থাকলে আমি কাউকেই আমার ছেলের বিষয়ে বলতাম না। কিন্তু আমার নিজেরই অবস্থা ভালো না। আমার এই ছেলে ভবিষ্যতে কী করবে? কী করে ওর পুরো জীবন পার করবে এসব ভেবে রাতে ঘুম আসে না। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের একটাই দাবি- আমার ছেলেকে সরকার বা জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিদেশে নিয়ে যেন উন্নত চিকিৎসা করানো হয়। ওর ভবিষ্যৎ যেন ও নিজেই গড়তে পারে। ও যেন কারোর ওপর বোঝা না হয়।

এসব বিষয়ে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর এক্সিকিউটিভ জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আমাদের অনেক ভাই আহত হয়েছেন। আমরা আমাদের সেই আহত যোদ্ধাদের জন্য দিনে রাতে কাজ করে চলেছি। তবে আহত যোদ্ধাদের বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে কিছু পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে আমাদের এগুতে হয়। যেমন আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে একটি ফরম নিয়ে তা পূরণ করে যে হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়েছেন সেই চিকিৎসক কর্তৃক সত্যায়িত করতে হবে। যেখানে ওই চিকিৎসকের স্বাক্ষর এবং সিলমোহর থাকবে। এ ছাড়া যেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন সেই হাসপাতালে ভর্তির ফরম কিংবা ছাড়পত্র প্রয়োজন হবে সেখানেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সত্যায়িত করবে। এর সঙ্গে যেই হাসপাতাল থেকে আহত যোদ্ধা চিকিৎসা নিয়েছেন সেই হাসপাতালে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মেডিকেল টিমের দিয়ে কাগজ ভেরিফাই করাতে হবে। এসব প্রসেসিং শেষে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাই মাহিয়ানের পরিবারের সদস্যদের ফর্ম নিয়ে আগে সিএমএইচ হাসপাতালের চিকিৎসক ও মেডিকেল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তারা যদি সব ভেরিফাই করে দেয় তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারবো।

mzamin

Sunday, January 5, 2025

২০২৪: সবচেয়ে বেশি আলোচিত সমালোচিত ‘পুলিশ’ by সুদীপ অধিকারী

বাংলাদেশ পুলিশ। সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামঞ্জস্য রাখতে সবচেয়ে বেশি কাজ করে এই বাহিনী। তবে বিগত সরকারের সময় বিরোধী মত দমনে ব্যবহার হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনার স্বীকার হতে হয়েছে পুলিশ সদস্যদের। গত জুলাই-আগস্টে সরকার পতন আন্দোলনের মধ্যদিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠেছে এই বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে। নিজ থানা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়েছে তাদের। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনোই দেখা যায়নি। মানুষ এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যে, জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে ফুটওভার ব্রিজে লাশ উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখে, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় থানা। পুলিশ প্রধান থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত একের পর পুলিশ সদস্যদের নামে মামলা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মন থেকে হারানো সেই আস্থা ফিরে পেতে ঢেলে সাজানো হয়েছে পুরো বাহিনীকে। এরপরও তিন মাসের মাথায় আবারো পরিবর্তন করা হয় পুলিশ প্রধান, ডিএমপি প্রধানসহ বড় বড় কর্তাব্যক্তিদের। চলছে পুলিশ-জনতার আলোচনা সভা, লোগো পরিবর্তনসহ চলছে নানা কর্মসূচি। তবুও এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি আস্থা ফিরে পায়নি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা।  

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন, তানভির আলম, মো. হোসাইন, বেসরকারি চাকরিজীবী ইফতেখার হোসেন, মো. আলতাফ, চা দোকানি মোনোয়ার হোসেন, বাহারুল আলম, ব্যবসায়ী নাসির হোসেন, মাসুদ আলম, জুয়েল হাসান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আব্দুল মালেক, মো. হাফিজ, ইফতেখার হোসেন, জিয়ায়ুল হকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির অন্তত অর্ধশত মানুষ বলেন, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে গত বছর জুড়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। প্রথমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার ও  র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব শেষে ২০২০ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা বাবদ মোট ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা উপার্জনের কথা থাকলেও দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের, স্ত্রী ও দুই সন্তানের নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক বনেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। গোপালগঞ্জ জেলার সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীটোল গ্রামে তিনি ৬০০ বিঘার সাভানা ইকো রিসোর্ট পাশাপাশি পার্কের চারপাশে আরও ৮০০ বিঘা জমির মালিক বেনজীর। যার পরিচালনার দায়িত্বে নাম ছিল বেনজীর স্ত্রী জিশান মির্জা, বড় মেয়ে ফারহিন রিস্তা বিনতে বেনজীর এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরসহ পরিবারের সদস্যদের। রাজধানীর গুলশানে একদিনে একসঙ্গে চারটি ফ্ল্যাট কিনেন এই পুলিশ মহাপরিদর্শক। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গড়েছেন বাগান বাড়ি। শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠে তার স্ত্রীর নামে প্রায় ১৭০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। দেশের বাইরেও রয়েছে সম্পদের পাহাড়। দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হওয়ার পরও পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় বিদেশে পাড়ি জমায় সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।

সমালোচিত আরেক পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান হারুন অর রশিদ। চাওর আছে ডিবি হারুন সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রভাব খাটিয়ে নিজ এলাকায় প্রেসিডেন্ট রিসোর্টসহ নামে বেনামে দেশ ও দেশের বাইরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। সাধারণ মানুষের ভাষ্য, ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া বাহিনীর অন্যতম নেতৃত্বদানকারী ছিলেন তিনি। এজন্যই ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাকে। এ ছাড়াও পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন,  সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এসবি) মনিরুল ইসলাম, পিবিআই’র সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদার, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশীদ, সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, ডিএমপি’র সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, আসাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, অতিরিক্ত আইজি ওয়াই এম বেলালুর রহমান, শিল্প পুলিশের প্রধান মাহবুবুর রহমান, ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার খন্দকার নূরুন্নবী, এসএম মেহেদী হাসানসহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে অন্তত দুইশত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আটক হয়ে কারাগারে থাকলেও বেশির ভাগ রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

উপরন্তু গত জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় পুরোপুরি ভেঙে পরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। লুটপাট, ডাকাতি, ছিনতাই নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে নগরবাসীর কাছে। থানায় পুলিশ না থাকায় ডাকাত আতঙ্কে প্রতিটি এলাকায় মানুষ দলবদ্ধ হয়ে মহল্লায় মহল্লায় পাহারা পর্যন্ত বসিয়েছে। দিনে-দুপুরে বেলা খোদ রাজধানীতেই ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে লুটে নেয়া হয়েছে সর্বস্ব। বাসার বাইরে বের হয়ে নিজের গেটের সামনে থেকেই নারীর ওড়না টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দিয়ে কেড়ে নিয়েছে যাওয়া হয়েছে ব্যাগ। একের পর এক মানুুষকে রাস্তায় ফেলে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। থানা লুটের অস্ত্র নিয়ে দু’গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধ চললেও পুলিশ কর্মকর্তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। তাইতো পুলিশ সদস্যদের চাঙ্গা করতে ঝড়ের গতিতে চলছে বদলি ও পদায়ন। গত ৫ই আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্যের কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়েছে। শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেরই ১৮ হাজারের বেশি সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এরপরও আগের মতো পুলিশকে কাছে পাচ্ছে না মানুষ। সাধারণ মানুষের ভেতরে সেই আগের আস্থা ফেরাতে পারেনি পুলিশ সদস্যরা।

এসব বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনা পুলিশের জন্য লজ্জার। এ লজ্জাজনক ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, ৫ই আগস্টের ৭২ ঘণ্টা আগেও যদি তখনকার নেতৃত্বে থাকা পুলিশ অফিসাররা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন, তাহলে অনেকের জীবন রক্ষা হতো। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদেরও জীবন রক্ষা হতো। কিন্তু এরূপ সিদ্ধান্ত তখন নেয়া হয়নি। পুলিশে গত ১৫ বছরে যারা নেতৃত্বে ছিলেন, তারা কি ভূমিকা রেখেছিলেন, তারা কি কর্মকাণ্ড করলেন যে, এ দেশের মানুষ পুলিশের প্রতি এত ত্যক্তবিরক্ত হলো। যার বহিঃপ্রকাশ ৪৪ পুলিশ সদস্যকে জীবন দিতে হলো, শত শত সহকর্মীকে নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হলো। সঙ্গে পুলিশের থানা, ফাঁড়ি, অস্ত্র লুট হয়ে গেল। ডিএমপি কমিশনার বলেন, এখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের পুলিশ অফিসার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করছি। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে এরূপ পুলিশ এ দেশের মানুষ দেখতে চাননি। আন্দোলনে হাজার ছাত্র-জনতার মৃত্যু দুঃখের গাঁথা রচনা করেছে। আমরা স্বাধীন দেশের পুলিশ। কী কারণে মানুষের এত ক্ষোভ পুলিশের ওপরে? পুলিশ এখনো এক ধরনের মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে। এই ট্রমা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। বের হয়ে আসার জন্য একটাই উপায়, নিজেদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে সেবা দিতে হবে। সেবা দেয়ার মাধ্যমেই একমাত্র পুলিশের হারানো ইমেজ বা গৌরবকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবো।

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, পুলিশ সদস্যরা একটি ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে পুলিশকে এমন কঠিন অবস্থায় আর কখনো পড়তে হয়নি। ৫ই আগস্টের আগে পুলিশ হয়ে পড়েছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল। অতীতের কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আর এজন্যই পুলিশকে জনরোষের শিকার হতে হয়েছে। পুলিশের নেতৃত্বস্তর ভেঙে পড়ে এবং জন আস্থা থেকে ছিটকে পড়ে। সাধারণ মানুষ তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এ ছাড়াও বদলি হওয়া পুলিশের রাজধানীর বস্তি, ঘুপচি ও অলিগলি না চেনা ছাড়াও পরিচিত লোকদের মাধ্যমে অপরাধ জগতে তারা নতুন সোর্স এখনো তৈরি করতে পারেনি। ফলে সোর্স নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে। ফলে আসামি ধরা বা মামলার তদন্তে একধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই আমরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে একজন কনস্টেবল পর্যন্ত যোগাযোগ বাড়িয়েছি। তাদের মনোবল ফেরানোর চেষ্টা করছি। এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুলিশকে সুসংগঠিত করা, তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। প্রত্যেকটি থানায় নাগরিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ অনেকেই কাজ করছেন। পুলিশ যাতে আর কখনো জনবিরোধী অবস্থানে ফিরে যেতে না পারে, সেই লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অপরদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.)  মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ঢাকার প্রায় সব পুলিশকে আমরা চেঞ্জ করছি। তাদের কিন্তু অলিগলি চিনতে সময় লাগবে। তাদের ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগছে।

mzamin

Sunday, December 15, 2024

এবার বিএনপি নেতাদের দখলে আলোচিত সেই খাল by সুদীপ অধিকারী

ঈদুল আজহাতে কোরবানির জন্য ১৫ লাখ টাকা দিয়ে একটি ছাগল কেনা নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তার দ্বিতীয় বিয়ে, দুর্নীতি, চাকরিচ্যুৎ, দেশত্যাগ। সব শেষ ঢাকঢোল পিটিয়ে গত ২৭শে জুন উচ্ছেদ করা হয় সেই ছাগলের ফার্মের জায়গাসহ ৬০টির বেশি অবৈধ স্থাপনা। উদ্ধার করা হয় প্রায় ১০ বিঘা জমি। তবে এত সব কাণ্ডের কয়েক মাসের মাথায়ই আবারো দখল হয়ে গেছে রামচন্দ্রপুর খালের সেই জায়গা। অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুরের স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা ওই খালের জায়গা নিজেদের আয়ত্তে রেখেছেন। ছোট ছোট টিনের ঘরের পাশাপাশি ইট-বালি-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পাকা স্থাপনাও। যার মধ্যে চলছে মাদক বেচা-কেনা ও জুয়ার আসর। আন্তঃজেলা চালকদের সমিতির নামে খালের জমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ট্রাকের স্ট্যান্ড।

সরজমিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাদেক এগ্রোর স্থাপনা ভেঙে উদ্ধার করা রামচন্দ্রপুর খালের সেই জায়গা আবার দখলে নেয়া হয়েছে। টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে সেখানে বানানো হয়েছে ছোট বড় একাধিক ঘর। রয়েছে রিকশার গ্যারেজ। যেখানে অন্তত ৪০/৫০টা রিকশা সব সময় রেখে দেয়া হয়েছে। আছে চায়ের দোকানও। আর যেখানে সাদেক এগ্রোর ফার্ম ছিল ঠিক সেখানেই নির্মাণ করা হচ্ছে লাল ইটের পাকা ঘর।  টিনের ঘরগুলোর মধ্যে আবার একাধিক কেরামবোর্ড খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে পরিত্যক্ত গানের স্কুল। যার জানালা, আসবাবপত্র আগেই লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঘরটুকু ব্যবহার করছে ট্রাকচালকরা। আর এর সামনেই গাবতলী-সদরঘাট সড়কের পাশে খালের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ট্রাকস্ট্যান্ড। ওই স্ট্যান্ডের মধ্যে সারি সারিভাবে পার্ক করা রয়েছে অসংখ্য পণ্য বহনকারী ট্রাক। চলছে ট্রাক মেরামতের কাজও। চারদিকে পাকা দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা ওই ট্রাকস্ট্যান্ডের দেখভালের জন্য রাখা হয়েছে নিরাপত্তা প্রহরী।

মহসিন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, গত কোরবানি ঈদের সময় একটি ছাগল কেনা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট মো. মতিউর রহমানের ছেলের দামি ঘড়ি, গাড়ি, আলিশান জীবনযাপন, মতিউর রহমান ও পরিবারের সদস্যদের নামে রিসোর্ট, শুটিং স্পট, বাংলো বাড়ি, জমিসহ নামে-বেনামে সম্পত্তি থাকার বিষয়ে একের পর এক খবর প্রকাশিত হতে থাকে। এরই একপর্যায়ে ২৭শে জুন রামচন্দ্রপুর খালের বেদখলে থাকা ওই জায়গা উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি কর্তৃপক্ষ। সেদিনের অভিযানে আলোচিত সাদিক অ্যাগ্রোর অবৈধ অংশ ভেঙে দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খামারের পেছনে খালের জায়গায় থাকা অবৈধ কিছু টিনের ঘর ও রিকশার গ্যারেজও উচ্ছেদ করা হয়েছিল। ডিএনসিসি’র অঞ্চল-৫-এর তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতাকাব্বীর আহমেদ এবং ডিএনসিসি’র সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব হাসানের নেতৃত্বে উদ্ধার অভিযান শেষে তখন খাল খননের কাজও শুরু করা হয়। কিন্তু গত ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আবারো দখল হতে শুরু করেছে এই খালের জমি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরের দিন বিকালেই একদল লোক ওই জায়গায় ঘর বানানোর কাজ শুরু করেন। রাতের মধ্যেই বাঁশের অবকাঠামো দিয়ে টিনের দুটি ছাপরা ঘর তৈরি করে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাতমসজিদ হাউজিং ইউনিটের নামে ব্যানার টাঙিয়ে দেয়া হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো জায়গা দখল করে একাধিক ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। চায়ের দোকান, পাকা ঘর, রিকশার গ্যারেজ, ট্রাকস্ট্যান্ড, স্কুল কী নেই এই খালের জায়গায়। নতুন করে আবার বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নতুন নতুন জায়গা। মূলত ওয়ার্ড বিএনপি’র নেতারা এই সরকারি জায়গাগুলো নিজেদের দখল করে ঘর তৈরি করে মানুষের কাছে ভাড়া দিচ্ছেন। আর এসব দেখাশোনার জন্য বেশকিছু যুবক রেখে দেয়া হয়েছে। পুরো নিয়ন্ত্রণ তাদেরই হাতে। তারা সার্বক্ষণিক এখানে থেকে পাহারা দেয়। এরা সকলেই ৩৩নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলামের লোক। তার ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। তিনি ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হয়েও বীরদর্পে ঘুরে বেরাচ্ছেন।

মো. ইয়াসিন মোল্ল্যা নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, একসময় এই খালটি অনেক সুন্দর ছিল। গভীর ছিল। প্রচুর পানি ছিল। নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকায় মানুষ দৈনন্দিন কাজ এখানেই সারতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন খালটি দখল হতে হতে মৃতপ্রায়। খালের জায়গা দখল করে পাকা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ট্রাকস্ট্যান্ড। মেইন রোডের সঙ্গে পাকা দেয়াল দিয়ে সরকারি জায়গা ঘিরে রাখলেও যেন দেখার কেউ নেই। সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ। আর এর সুযোগ নিয়ে বিএনপি’র নাম ভাঙিয়ে সব দখল হয়ে যাচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই। আমরা চাই খালটি আবার গভীরভাবে খনন করা হোক।

খালের জায়গা নিজের লোক দিয়ে দখলের বিষয়ে ৩৩নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মানবজমিন’কে বলেন, রাজনৈতিক বিরোধিতার জেরেই আমার প্রতিপক্ষ আমার নামে এসব মিথ্যা কথা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমি কোনো খালের জায়গা দখল করিনি। আমি বরং খালের জায়গা দখলমুক্ত করতে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এই জায়গা মূলত মোহাম্মদপুর থানার ৩৩নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি মান্নান হোসেন শাহীনের লোকজন দখল করে ঘর নির্মাণ ও রিকশার গ্যারেজ তৈরি করেছেন। আর সুরের ধারা স্কুলের পেছনে টিনের ঘর তৈরি করে কেরামবোর্ড ও মাদকের আসর বসিয়েছে ওয়ার্ড যুবদল নেতা জাহিদ মোড়ল। জাহিদ তার লোকদের দিয়ে সেখানে মাদক বিক্রি করছেন। আগে যেখানে সাদেক এগ্রো ছিল সেখানে সাতমসজিদ হাউজিং এর সহ-সভাপতি রশিদ মাস্টার ভুয়া দলিল তৈরি করে তার ভাগ্নে আলিমকে দিয়ে পাকা ঘর নির্মাণ করেছে। ওই পাকা ঘরের পাশে টিনের ঘর তৈরি করেও মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করছেন। তাদের এসব কাজে বাধা দেয়ায় আমার নামে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ৩৩নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি মান্নান হোসেন শাহীন বলেন, এইসব দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলায় আমার অফিসে ঢুকে আমাকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। আহত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে হাসপাতালে লড়াই করার পর এখন বাড়িতে রেস্টে রয়েছি। এখনো দুটো অপারেশন বাকি। পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি। সকলে জানে আমার বিষয়ে। আমি খালের জমি দখল করবো কীভাবে? যারা আমার নামে এই অভিযোগ তুলেছে তারা নিজেরাই ওই সরকারি জমি লোক দিয়ে ভোগদখল করে খাচ্ছে। আর অন্যের নামে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।

এদিকে খালের জায়গায় তৈরি কার ট্রাকস্ট্যান্ডের দায়িত্বে থাকা আন্তঃজেলা ট্রাক-মিনি ট্রাকচালক সমিতির সভাপতি নসু মিয়া ও আকবর হোসেন বলেন, আমাদের ট্রাকগুলো রাখার জায়গা নেই বলেই খালের জায়গা ভরাট করে আমরা ট্রাকস্ট্যান্ড তৈরি করেছি। যদি সরকার কখনো আমাদের চলে যেতে বলে আমরা তখন জায়গা ছেড়ে দিবো।  


Friday, December 6, 2024

কম দামের পণ্য শেষ হয়ে যায়, লাইন শেষ হয় না by সুদীপ অধিকারী ও আরিফুল ইসলাম

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাজারে হাঁসফাঁস অবস্থা। কাঁচা সবজি থেকে মাছ, মাংস, চাল, ডাল, তেল- এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নেই যা কিনতে ঘাম ঝরছে না সাধারণ মানুষের। তাই একটু স্বস্তিতে পণ্য কিনতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর ট্রাক সেল ও ওএমএস ট্রাক সেল সেন্টারে ছুটছে সাধারণ মানুষ। তবে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন অনেকে। টিসিবি-ওএমএস-এর ট্রাকে পণ্য কিনতে আসা ক্রেতারা বলছেন- লাইন শেষ হওয়ার আগেই পণ্য শেষ হয়ে যায়।

সরজমিন দেখা যায়, মোহাম্মদপুর বসিলা এলাকার র‌্যাব ক্যাম্পের ঠিক উল্টো পাশে টিসিবি ট্রাক সেল কার্যক্রম চলছে। ট্রাক সেলের ব্যানারে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল, ৬০টাকা কেজি মশুর ডাল ও ১০০ টাকা লিটার তেল বিক্রি করার কথা উল্লেখ থাকলেও চাল পাননি অনেকে। চালের বদলে টিসিবি’র ট্রাকে দেয়া হচ্ছে আলু। আর টিসিবি’র এসব পণ্য নিতেই প্রখর রোদের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্তত এক থেকে দেড়শ’ মানুষ। যাদের বেশির ভাগই নারী। কেউ এসেছেন কোলে বাচ্চা নিয়ে, কেউ আবার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা। নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি আছেন মধ্যবিত্ত পরিবারেরও অনেক সদস্য। অনেকে মুখে মাস্ক লাগিয়ে দাঁড়ান লাইনে।

তাদের একজন রাবেয়া বেগম। কোলে তিন মাসের শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন টিসিবি’র লাইনে। রোদ থেকে শিশুকে রক্ষার জন্য বার বার তার মাথায় কাপড় জড়িয়ে দিচ্ছিলেন। রাবেয়া বলেন, আমার স্বামী আগে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করতেন। এখন তার ব্যবসাটা ভালো চলে না। এরপর বাজারে পণ্যের যে দাম কিছু কেনা যায় না। এক কেজি ভালো চাল বর্তমানে ৭৫ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। মাছ, মাংস, সবজি এমন কিছু নেই যে, যার দাম বাড়েনি। তাই এখানে এসেছি একটু কম দামে পণ্য কিনবো বলে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও আমাদের খালি হাতে ফিরতে হয়। সবাই পণ্য পাই না। আমার এই ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে লাইনে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় দাঁড়িয়ে আছি, তারপরও পণ্য পাবো কিনা জানি না। তিনি বলেন, আমাদের এই এলাকায় হাজার হাজার লোক। কিন্তু এখানে টিসিবি’র গাড়ি আসে সপ্তাহে এক থেকে সর্বোচ্চ দুইবার। আর যা নিয়ে আসে কয়েকজনকে দেয়ার পরই পণ্য শেষ। রাবেয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই পেছন দিক থেকে ছুটে আসেন তৈয়বা খানম নামে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি গত সপ্তাহে ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু পাইনি। সপ্তাহ জুড়ে অনেক কষ্ট করেছি। আজকে আবার এসেছি। ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে আছি কোনো খবর নেই। তিনি বলেন, আমার স্বামী প্যারালাইজড। কোনো কাজ করতে পারে না। আমি এদিক ওদিক কাজ করে যা পাই তাই দিয়ে সংসার চালাই। অসুস্থ স্বামীকে বাসায় রেখে এসেছি। কতোবার এদের বললাম-আমি বৃদ্ধ মানুষ। আমাকে বাসায় যেতে হবে, আমাকে একটু আগে দিয়ে দেন। কিন্তু কেউ কথা শোনে না। আজকেও যদি লাইনে দাঁড়িয়ে কিছু না জোটে তাহলে না খেয়েই থাকতে হবে আমাদের দুই বুড়ো-বুড়িকে। রাবেয়া ও তৈয়বার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছে এই প্রতিবেদকের তখন মুখে মাস্ক পরে লাইনে দাঁড়িয়ে বাজারের ব্যাগ দিয়ে বার বার মুখ ঢাকছিলেন মধ্য বয়সী এক পুরুষ। তিনি বলেন, আসলে আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এই স্বল্প আয়ের টাকা দিয়ে পুরো সংসারের খরচ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই একটু খরচ পোষাতে এই টিসিবি’র লাইনে এসে দাঁড়িয়েছি।

নাসরিন আক্তার নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, টিসিবি’র গাড়ি আসার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনো ১২টায় আসে, কখনো আবার ২টায়। আগের দিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেও মাল পাইনি। তাই আজকে আবার এসেছি। এখানে একজন ২  কেজি ডাল, ২ লিটার তেল আর ৫ কেজি চাল কিনতে পারে। কিন্তু এখন আর টিসিবি’র গাড়িতে চাল পাওয়া যায় না। চালের বদলে আলু দেয়া হচ্ছে। তারও মান ভালো না। এরপর এরা পণ্য অনেক কম আনে। মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা লাইন দেখিয়ে তিনি বলেন, এই যে এত মানুষ দাঁড়িয়ে। সামনে যারা আছে তারাই শুধু পাবে। বাকিদের খালি হাতে ফিরে যেতে হবে।

এসব বিষয়ে টিসিবি’র ট্রাক সেলের দায়িত্বে থাকা মো. মামুন ও পরিচালনার কাজে থাকা মো. স্বপন বলেন, শুক্রবার বাদে আমরা সপ্তাহে প্রতিদিনই এই টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করি। একেক দিন একেক স্পটে। আজকে এখানে এসেছি। তিনি বলেন, আজকের এই স্পটের ৪শ’ লোকের জন্য ৮শ’ লিটার সয়াবিন তেল, ৮শ’ কেজি মশুর ডাল ও চাল নিয়ে এসেছি। কিন্তু তারপরও অর্ধেকের বেশি মানুষ পণ্য পাবে না। কারণ এর চাহিদার কোনো শেষ নেই। রাত বারোটা পর্যন্তও যদি আমরা বিক্রি করি তখনো পণ্য নিতে আসবে মানুষ। কারণ এখানে যেই দামে পণ্য পাবে তা বাজারে পাবে না। কিন্তু জোগান সীমিত হওয়ায় আমাদের কিছু করার থাকে না। যতটুকু পাই ততটুকুই মানুষের মাঝে সুলভ মূল্যে বিতরণ করি। যতক্ষণ আমাদের মাল থাকবে ততক্ষণ আমরা বিতরণ করবো।

এদিকে একই দিনে মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী এলাকায় ওএমএস-এর ট্রাক সেলের আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম দামে চাল ও আটা বিক্রি করা হয়। সেখানে গিয়েও দেখা যায় চাহিদার তুলনায় ক্রেতা বেশি। ১৫০ টাকায় ৫ কেজি চাল ও ১৩০ টাকায় ৫ কেজি আটা নিতে ভিড় করেছেন অসংখ্য মানুষ। আটা-চাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ট্রাক সেলের দায়িত্বে থাকারা। ওএমএস-এর লাইনে দাঁড়ানো আঁখি আক্তার নামে বুদ্ধিজীবী এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ৩৮০ টাকা প্যাকেজে এখানে আমরা একেক জন সর্বোচ্চ ৫ কেজি আটা এবং ৫ কেজি চাল কিনতে পারি। বাজার থেকে অনেক কমে পাওয়া যায়- তাই এখানে আসা। কিন্তু যত মানুষ এখানে আসে তারচেয়ে পণ্য খুব কম থাকে। আজকে কিছু না পেলে আবার তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। তাই চেষ্টা করছি- যেভাবেই হোক না কেন ৫ কেজি চাল নিতেই হবে। তা না হলে না খেয়ে থাকতে হবে।

এলাকাটির ওএমএস-এর ট্রাক সেলের দায়িত্বে থাকা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শক মো. নান্নু মিয়া বলেন, এই এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাই আমরা এখানে সপ্তাহে তিন দিন আসি। আজকে রায়েরবাজার বধ্যভূমির সামনে ১ টন চাল ও ২ টন আটা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পণ্যের জোগানের তুলনায় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই সকলকে পণ্য দেয়া সম্ভব হয় না। যতক্ষণ আমাদের মাল থাকে ততক্ষণ আমাদের লোক দিতে থাকবে। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর, আদাবর, তেজগাঁও এলাকা মিলে মোট ২৩টি স্থানে ওএমএস-এর পণ্য সুলভ মূল্যে বিক্রয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে তেজগাঁও রেলগেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক থেকে টিসিবি’র পণ্য নিতে আসা শিল্পী বেগম বলেন, সকাল ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গত দুই/তিন দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য নিতে পারিনি। যারা নিয়েছেন অনেকে তিন চারবার করে এসে নিয়ে গেছেন। সাফিয়া বেগম নামে ৭০ বছর বয়সী এক নারী এসেছেন টিসিবি’র পণ্য নিতে। তিনি বলেন, গত দুই দিন আমি এসে কিছুই পাইনি। সকাল থেকে বসে থেকে সন্ধ্যায় খালি হাতে ফিরে গিয়েছি। আগে অন্যজন দিতেন তিনি বেশির ভাগ সময়েই তার পরিচিত মানুষদের দেখে দেখে দিতেন বলেও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে নাই। একা মানুষ আমি। কম দাম হওয়ায় এগুলো নিতে আসি কষ্ট করে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, তাই হাতে সিরিয়াল নাম্বার লিখে দিচ্ছেন। পাশে বসে রয়েছি, সিরিয়াল কখন আসবে জানি না। হাতে সিরিয়াল লিখে দেয়ার বিষয়ে টিসিবি পণ্য বিতরণকারী ওয়ালিদ বলেন, লাইনে দাঁড় করিয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয় এজন্য সিরিয়াল নাম্বার হাতের উপরে লিখে দিয়েছি।

এসব বিষয়ে টিসিবি’র মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ট্রাক সেলে পণ্য বিক্রিতে নানা রকম ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলার কথা আমরাও শুনেছি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আমরা চেষ্টা করছি। খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাল সরবরাহ না করায়, আমরা চাল দিতে পারছি না বলেও জানান তিনি। 

mzamin

Wednesday, November 27, 2024

কূটনৈতিক জোন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গাড়ি লাপাত্তা by মিজানুর রহমান ও সুদীপ অধিকারী

কূটনৈতিক জোন খ্যাত গুলশান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিউটিরত একটি গাড়ি লাপাত্তা। ৯৬ ঘণ্টা আগের অর্থাৎ শনিবার রাতের ঘটনা এটি। কিন্তু এখনো গাড়িটির অবস্থান শনাক্ত করা কিংবা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোগো এবং সরকারি স্টিকার সংবলিত সাদা রঙের টয়োটা প্রিমিও-১৭ মডেলের প্রাইভেটকারটি লাপাত্তা হওয়ার বিষয়ে ঘটনার পরদিন গুলশান থানায় একটি মামলা হয়েছে। যার নম্বর-২২/২৪-১১-২৪। পেনাল কোডের ৩৭৯ ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়। ঘটনার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ তারেক মাহমুদ। মানবজমিনকে তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল এবং এর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার পথে অনেক দূর এগিয়েছেন তারা। তিনি আশা করেন দ্রুততম সময়ের মধ্যেই গাড়িটি উদ্ধারে সক্ষম হবে পুলিশ।

গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর দাখিল করা এজাহারে গাড়ির তত্ত্ব্বাবধায়ক ও মামলার বাদী শাহাদাত হোসেন জানান, গত ২৩শে নভেম্বর আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুলশান-২, রোড নং-৯৬, বাড়ি নং-১৭ এর সামনের পাকা সড়কে অস্থায়ী পার্কিং অবস্থায় ছিল তার গাড়িটি। যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব (RO &‌ MA) দপ্তরের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত ছিল। সাদা রংয়ের PREMIO-১৭ মডেলের প্রাইভেট কার এটি। যার চেসিস নম্বর- NZT২৬০-৩১৯৯৪২৫, ইঞ্জিন নম্বর- IZT-৮৩৬১৬১৮, রেজিস্ট্রেশন নম্বর-ঢাকা মেট্রো.-গ-৪২-৯১৪৮। বাদী জানান, তার গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন মো. ওয়াসিম নলী (৩৭), পিতা-মো. হান্নান নলী, স্থায়ী ঠিকানা- হরিনাথপুর (জেটিকাডা), থানা-হিজলা, জেলা-বরিশাল বর্তমান সাং- হোল্ডিং নং-৭২/খ, পশ্চিম আগারগাঁও, থানা-মোহাম্মদপুর, জেলা-ঢাকা। ঘটনার বিষয়ে তিনি  লিখেন- গাড়িটি RAASAD BAIVAB (গুলশান-২, রোড নং-৯৬, বাড়ি নং-১৭)-এর সামনে পাকা রাস্তার উপর রেখে একটু দূরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যান ড্রাইভার ওয়াসিম। ফিরে এসে দেখেন যেখানে গাড়িটি রেখে গেছিলেন সেখানে নেই। তার দাবি অজ্ঞাতনামা চোররা গাড়িটি চুরি করে নিয়ে গেছে। এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন ড্রাইভার ওয়াশিম গাড়িটি আশপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে তাকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। সেই ফোন পেয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছান। নিজেও আশপাশের লোকজনদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু কেউই গাড়িটির বিষয় কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বাসায় ফিরে তিনি ঘটনার বিষয়ে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং থানায় হাজির হয়ে এজাহার দায়ের করেন। যাতে খানিকটা বিলম্ব হয়।

mzamin

Saturday, November 23, 2024

মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান। তবে মোহাম্মদপুরবাসীর কাছে তিনি ‘পাগলা মিজান’ নামেই বেশি পরিচিত। এক সময়ের ছিনতাইকারী-ছিঁচকে চোর কাউন্সিলর হয়ে এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে তার রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে পুঁজি করে বাড়ি দখল, ফ্ল্যাট দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার ছাড়া কাজ বাগিয়ে নেয়াসহ কী অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে।

ডিএনসিসি’র ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে গেলে ইশতিয়াক আহমেদ, এমদাদ হোসেন, রুবেল মিয়া, মো. জুয়েল, হাসান তালুকদারসহ বেশ কয়েকজন জানান, ওয়ার্ডটির সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান শুধু মোহাম্মদপুরে নয় শ্যামলী-আদাবর এলাকাতেও তার ব্যাপক দাপট। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সদস্যদের ব্যবহার করে বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন এই পাগলা মিজান। ১৯৭৩ সালে জীবিকার তাগিদে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় এসে হোটেল বয়ের কাজ নেন। অপরাধ জগতে তার হাতেখড়ি ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর খামারবাড়ি খেজুর বাগান এলাকায় ছিনতাই করতে গেলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়া মসজিদের পাশের পুকুরে নেমে পড়েন মিজান। যাতে পুলিশ কাছে আসতে না পারে সেজন্য কাপড় ছাড়াই উপরে উঠে আসেন। তার এ ধরনের কাজের জন্য পুলিশ তাকে ‘পাগলা’ আখ্যা দেয়। তখন থেকেই এলাকায় তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘পাগলা মিজান’ হিসাবে। ’৮০ ও ’৯০ দশকে এই পাগলা মিজান সংসদ ভবন এলাকা থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর স্যার সৈয়দ রোড, ইকবাল রোড এলাকা ও মিরপুর রোড  এলাকার মেইন রোডের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে বিদ্যুৎ মিস্ত্রি দিয়ে তামার তার চুরি করাতো। এভাবে একের পর এক সরকারি স্থাপনায় চুরি করতো মিজান বাহিনীর সদস্যরা। তখন মোহাম্মদপুরে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত বাড়ি দখলেরও অভিযোগ ওঠে মিজান বাহিনীর বিরুদ্ধে। একের পর এক চুরি-ছিনতাই ও দখলের মাধ্যমে মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন মিজান। ফ্রিডম পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ির পর ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন পাগলা মিজান। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নিজের পাগলা নাম পাল্টে হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতার আশীর্বাদে ’৯২ সালে কাউন্সিলর বনে যান  মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজান। ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকেন মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা। ১৯৯৪ সালে বনে যান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মিজান হয়ে ওঠেন আরও বেপরোয়া। বাড়ি দখল, জমি দখল, খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ অনেক অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠতে থাকে তার বিরুদ্ধে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিজ দলেরই কেউ তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করে না। এক সময়ের জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসার এই নিয়ন্ত্রক মিজান মাদকের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজধানীর নামি-দামি বড় বড় হোটেলে মিটিং করতেন, আড্ডা দিতেন। আর ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা নিতেন। ওই টাকা তোলার কাজে নিয়োজিত ছিল- মর্তুজা, জিলানীসহ বেশ কয়েকজন। এ ছাড়াও টোল মার্কেটের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল মিজানের। মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. শাহেদ বলেন, পাগলা মিজান আমাদের ক্যাম্পের বিদ্যুতের সংযোগের লাইন দু’টি ভাগে ভাগ করে একটি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের দিতেন। আরেকটি ক্যাম্পের বাজারে সংযোগ দেয়া হয়। প্রায় ২৫০টি দোকান থেকে বিদ্যুতের জন্য আলাদাভাবে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আদায় করতো মিজানোর লোক। ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে ভারতে পালানোর সময় ১১ই অক্টোবর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ফজলুর রহমানের (মৃত) বাসা থেকে হাবিবুর রহমান মিজানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই সময় তার কাছ থেকে একটি অবৈধ পিস্তল,  চার রাউন্ড গুলি,  একটি ম্যাগাজিন ও নগদ দুই লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। তখন তাকে ঢাকায় নিয়ে এসে প্রথমে লালমাটিয়ায় তার কাউন্সিলর কার্যালয়ে এবং পরে মোহাম্মদপুরে আওরঙ্গজেব রোডে তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। তখন তার বাসা থেকে ছয় কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক ও এক কোটি টাকার এফডিআর উদ্ধার করা হয়। তৎকালীন র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলম অভিযান পরিচালনা শেষে বলেছিলেন, মিজানের আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় দুটো বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ থেকেই তিনি এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও চাঁদাবাজি ও জমি দখলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।’ তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাবলে অল্প সময়ের মধ্যেই কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসেন পাগলা মিজান। বাইরে বের হয়ে আবারো  বীরদর্পে নিজের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন মিজান। গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও মোহাম্মদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগের হয়ে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন তিনি। নিজের বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে অস্ত্র হাতে ধাপিয়ে বেড়ান আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর। এতসব কাণ্ডে একাধিক মামলার আসামি হয়েও এখনো অধরা পাগলা মিজান। ছাত্রহত্যা মামলার আসামি হয়েও মিজান বর্তমানে নিজেকে বিএনপি’র সমর্থক দাবি করে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপনে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেছে তার এলাকার বাসিন্দারা।  

মিজানের যত সম্পত্তি: মো. নিজামউদ্দিন নামে মোহাম্মদপুরের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় যুবলীগ-ছাত্রলীগের সদস্য ও নিজের সন্ত্রাসী বাহিনীর দিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন সাবেক এই কাউন্সিলর। মাদকের এই গডফাদার মোহাম্মদপুর এলাকায় ভূমিদস্যু হিসেবেই বেশ পরিচিত। জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত বছর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান সংলগ্ন তুরাগ নদের ওপারে একটি রিয়েল এস্টেটের ছয় কর্মীকে গুলি এবং আরও ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে মিজান বাহিনীর সদস্যরা। আবাসনের ওই জমি দখলকে কেন্দ্র করে তখন জুয়েল নামের এক যুবককে হত্যা করে লাশ তুরাগে ফেলে দেয়ারও অভিযোগ ওঠে মিজানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মিজান শ্যামলী মাঠের পশ্চিম পাশের জমির একাংশ দখল করে বানিয়েছেন মার্কেট। সেখানে তিন শতাধিক ঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় থেকে একটু  এগিয়ে বছিলা রোডে ঢুকলেই চোখে পড়বে হাবিবুর রহমান মিজানের নিজের নামে  ‘হাবিব মার্কেট’। এরপর লাউতলা ভেতরের রোডে ঢুকলেই এক বিশাল প্লট (খালি জমি) রয়েছে মিজানের। চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকাতেও তৎকালীন হাউজিং চেয়ারম্যান প্রয়াত আক্কাস হাজীর কাছ থেকে বেশ কিছু প্লট বাগিয়ে নিয়েছিলেন এই মিজান। লালমাটিয়া এলাকায় স্বপনপুরী হাউজিংয়ে রয়েছে তার আরও দু’টি বহুতল বাড়ি। লালমাটিয়া বি-ব্লকে একটি ছয় তলা বাড়ি (২৪/এ)। এরই পাশে ২৪/এ এর সি/ডি নম্বরে লালমাটিয়ায় আরও একটি ৭ তলা ভবন রয়েছে তার। মোহাম্মাদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কে আছে আরেকটি ফ্ল্যাট, যেখানে তিনি নিজে বসবাস করেন। এ ছাড়াও রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের মালিক হাবিবুর রহমান মিজান। সেখানেও ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে এই পাগলা মিজান মিশুক অ্যান্ড কোম্পানির মালিক। এ ছাড়া তিনি ঢাকার হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্র্যাভেলসের মালিক বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদপুরের স্থায়ী বাসিন্দারা। নিজের নামে ছাড়াও দেশে-বিদেশে নামে- বেনামে টাকার পাহাড় গড়েছেন ক্যাসিনো কাণ্ডের অন্যতম হোতা মোহাম্মদপুরের সাবেক এই কাউন্সিলর। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে মিজানের আলিশান দু’টি বাড়ি ও দামি গাড়ি রয়েছে। যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে অনেক আগেই জনসম্মুখে এসেছে। তার ভাইদের নামেও রয়েছে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারি টেন্ডার ছাড়াই বিভিন্ন দপ্তরের কাজ বাগিয়ে নিয়ে মিজান তার ভাইদের দিতেন। পাঁচ ভায়ের মধ্যে মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৫ সালে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে নিহত হন। বর্তমানে ঠিকাদার হেলাল, দুলাল ও শাজাহান নামে তার আরও তিনটি ভাই রয়েছে। মিজানের ভাই শাজাহান লালমাটিয়া ওয়াসার অফিস নিয়ন্ত্রণ করতো। একই সঙ্গে আবাসিক গ্যাসলাইন নিয়ন্ত্রণ করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। মিজানের আরেক ভাই হেলাল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা-১৩ আসনের সদ্য সাবেক এমপি’র আমলে বিনা টেন্ডারে ৫ থেকে ৬শ’ কোটি টাকার এলজিআরডি ও সিটি করপোরেশনের কাজ করছে। যার ভাগ এলাকাটির আওয়ামী লীগের সব বড় নেতার পকেটে ঢুকতো নিয়মিত।

পাগলা মিজানের শক্তি: হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের এত ক্ষমতার উৎস বর্তমান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও এলাকাটির সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য। এ ছাড়াও এলাকাটিতে তার মাই ম্যান হিসেবে খ্যাত আদাবর থানা যুবলীগের আহ্বায়ক আরিফুর রহমান তুহিন। এই তুহিনের মাধ্যমেই আদাবর এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখেন মিজান। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকায় রয়েছে সাবেক কাউন্সিলর রাজিব, আলা বক্সের ভাই ইয়াসিন বক্স, সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা শাহীন, মজিবর প্রমুখ। যারা সকলেই মোহাম্মদপুর এলাকায়  আওয়ামী লীগের নেতা এবং পাগলা মিজানের সহকারী বলে সকলের কাছে পরিচিত। ছাত্র আন্দোলনের সময় এদের সকলকেই অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামায় মিজান। এদের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের সময় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে চালাতে গত ১৯শে জুলাই মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ্‌ রোডে শটগানে বুলেট আটকে যায় সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা শাহীনের। সেদিন একটি পিস্তলও হারিয়ে ফেলেন শাহীন। তিনিও এই পাগলা মিজানের খাস লোক হিসেবে পরিচিত।

এসব বিষয়ে জানতে মিজানের বসবাস করা মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের বাসা, লালমাটিয়ার বাড়ি, মার্কেটে একাধিকবার গেলেও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। ৫ই আগস্ট পট পরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তার ব্যবহৃত ফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে।

এবিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান বলেন, আমরা জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে জড়িত আসামিদের ধরতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছি। একই সঙ্গে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এসব পাগলা মিজানের মতো অপরাধীরা আত্মগোপনে থাকায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আশা করছি তারাও আইনের জালে ধরা পড়বে।

mzamin

Thursday, November 21, 2024

সরজমিন চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট: ‘টাকা লাগবে না, চাই উন্নত চিকিৎসা-পুনর্বাসন’ by সুদীপ অধিকারী

সোয়েব কবীর। নরসিংদী সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। গত ১৮ই জুলাই নরসিংদীর বেলাবোতে গুলিবিদ্ধ হন ২২ বছরের এই যুবক। মাথা, ঘাড়ে, চোখে, মুখে এখনো ৭০টার বেশি শটগানের ছররা গুলির বুলেট নিয়ে ভর্তি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চারতলার পি.বি-১০ নম্বর বেডে। বুলেট বের করতে না পারায় বাম চোখে কিছুই দেখতে পান না সোয়েব। সোয়েব বলেন, পাঁচ বছর আগে বাবা মারা যান। দুই ভাই ও মাকে নিয়ে সংসার আমিই চালাতাম। কিন্তু আন্দোলনে গিয়ে চোখে গুলি লাগার পর থেকে সেই পথও বন্ধ হয়ে গেছে। উপরন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় চিকিৎসা করাতে এসে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল দিয়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখনো কোনো সরকারি সহায়তা মেলেনি। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা। সোয়েব বলেন, এখানকার ডাক্তাররা আমাকে বলেছে- তারা তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা আমাদের দিয়েছেন। তাদের করার মতো আর কিছু নেই। চিকিৎসকরা বলেছেন- আমি আর কোনোদিনও এক চোখে দেখতে পাবো না। তবে বিদেশে গেলে ভালো হতেও পারি। আমাদের তো সেই সামর্থ্য নেই। এখন পরিবারের কাছে আমরা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি। তাই সরকারের কাছে একটাই দাবি আমরা যারা চোখে গুলিবিদ্ধ আছি তাদের যেন বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয়। একইসঙ্গে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের যেন পুনর্বাসিত করার ব্যবস্থা করা হয়।

একই ওয়ার্ডের পি.বি-০৯ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন কুষ্টিয়ার রুহান মাহমুদ। ২১ বছরের এই যুবক গত ৪ঠা আগস্ট ডান চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরি পেয়েও যোগদান করতে পারেননি। রুহান বলেন, গুলি লাগার পরে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে তেমন কোনো চিকিৎসাই পাইনি। ৪ঠা আগস্ট রাতেই আমি এই হাসপাতালে ভর্তি হই। কিন্তু ৫ই আগস্ট যখন ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে তখন আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। চোখে ব্যান্ডেজ নিয়েই গাবতলী চলে যাই। কেউ ঠেকাতে পারেনি সেদিন। কিন্তু এতকিছু করার পরও আজ তিন মাসের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে পড়ে আছি। দশ মাস বয়সে বাবা মারা গেছে, ৮ বছর বয়সে মা আরেকজনকে বিয়ে করেছে। নানা বাড়ি মানুষ। দেখার কেউ নেই। এক আন্টি আছে। সেই এর-ওর কাছ থেকে লাখ তিনেক টাকা ধার-দেনা করে আমার পেছনে খরচ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যেই এক লাখ টাকা দিয়েছিল তাতে কিছুই হয়নি। তিনি বলেন, আমরাও এই পৃথিবীর আলো দেখতে চাই। সুস্থ হয়ে বাঁচতে চাই। আমাদের এক ছোট ভাই ইন্ডিয়া থেকে চিকিৎসা করিয়ে এসেছে। তার চোখ ভালো হয়ে গেছে। তাই আমরাও চাই আমাদেরও বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হোক।

এদিকে গত ৪ঠা আগস্ট গাজীপুর আনসার একাডেমির সামনে ডান চোখে গুলিবিদ্ধ হন ১৯ বছরের যুবক মো. আল-আমিন। তিনি বলেন, আমার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায় হলেও আমি গাজীপুরের এভরি ফুটওয়ারে ডিজাইনারের কাজ করতাম। ৬ ভাই ও এক বোনের সংসার চালানোর জন্য গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হলে আমিও ওই আন্দোলনে যোগ দিই। পুরো আন্দোলনে তেমন কিছু না হলেও ৪ তারিখে আমার ডান চোখে পুলিশের গুলি লাগে। এরপর স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর গত ৭ই আগস্ট এখানে ভর্তি হই। তখন থেকেই এই পি.বি-১৫ নম্বর বেডে ভর্তি। এখন পর্যন্ত আমার চোখে তিনবার অপারেশন করা হয়েছে। তারপরও ডাক্তার বলেছে আর কোনো দিন চোখে দেখবো না। উল্টো চিকিৎসা করাতে এসে লাখখানেকের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে। তবুও কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। চাকরিটাও চলে গেছে। এখন সারা জীবন কীভাবে কাটাবো তাই ভেবে হতাশ।

আল-আমিনের সঙ্গে আন্দোলনে গিয়ে গাজীপুরে একইদিন ৪ঠা আগস্ট ডান চোখে গুলিবিদ্ধ হন তার সহকর্মী সোহেল রানা। চোখে গুলি লাগার পর তার চাকরি চলে গেছে। নিজের চিকিৎসা করাতে এসে বউ-বাচ্চা নিয়ে তিনিও বিপদে। সোহেল রানা বলেন, মানুষের কাছ থেকে ধার-দেনা করতে করতে আর কেউ টাকা দিতে চাই না। কোনো সরকারি সহায়তাও পাইনি। কীভাবে যে আমাদের দিন পার হচ্ছে তা শুধু আমরাই জানি। সরকারের কাছে অনুরোধ- বিদেশে নিয়ে গিয়ে আমাদের উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে চোখের আলো ফিরিয়ে আনুন।

পি.বি-১৬ নম্বর বেডে গত ২১শে জুলাই থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের অটোরিকশাচালক কেশব ঋষি। পেটের দায়ে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে গত ১৯শে জুলাই নিজ এলাকায় বাম চোখে গুলিবিদ্ধ হন এই যুবক। কেশব বলেন, মাত্র সাত মাস আগে আমার বাবা মারা যান। দুই বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে বড় বোন বিয়ের পর অন্যত্র থাকে। এখন আমি, আমার স্ত্রী, পাঁচ বছর বয়সের ছেলে, ছোট ভাই, এক বোন ও মাকে নিয়ে আমার সংসার। অটো চালিয়ে যে টাকা আয় করতাম তাই দিয়েই আমাদের ৬ জনের সংসার চলতো। এখন গুলি লাগার পর পুরো সংসার ভেঙে পড়েছে। বাধ্য হয়ে দশ বছরের ছোট্ট ভাই অন্যের দোকানে কাজ নিয়েছে। উপরন্তু আমার চিকিৎসা ব্যয় যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িছে। দেড় লাখ টাকার ওপরে খরচের পরও কোনো সরকারি সহায়তাও পাইনি।

এদিকে সরকার পরিবর্তনের দিন গত ৫ই আগস্ট কুষ্টিয়া সদরে ডান চোখে গুলিবিদ্ধ হন মো. কুরবান হোসেন হিল্লোল। তিনি বলেন, আমার পরিবারকে আমাকেই চালাতে হয়। আমি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এতদিন হাসপাতালে পড়ে আছি কেউ খোঁজ নেয়নি। তিনি বলেন, এসি রুমে বসে, দামি দামি গাড়িতে চড়ে, লাখ টাকার ফোন চালিয়ে কেউ আমাদের কষ্ট বুঝবে না। আন্দোলনের এতদিন পরে এসেও আমাদের আজ রাস্তায় দাঁড়ানো লেগেছে। তিনি বলেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিইনি। আমরা ভিক্ষা নেয়ার জন্য আন্দোলন করিনি। আমরা আমাদের ভাইদের উন্নত চিকিৎসা চাই। একইসঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের পুনর্বাসনের দাবি জানায়। হিল্লোল, রুহান, আল-আমিন, কেশব, সোহানের মতো রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে এখনো চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৪৬ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের কেউ এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। কেউ আবার সারা জীবনের মতো নিজের দুই চোখেরই জ্যোতি খুইয়েছেন। এদের বেশির ভাগেরই দেশের চিকিৎসা শেষে জানানো হয়েছে- তারা আর কোনোদিনও চোখে দেখবেন না। সারা জীবনই তাদেরকে চোখের মধ্যে বুলেট বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।

এসব বিষয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা বলেন, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে আমাদের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। বিদেশ থেকে চিকিৎসক এসে পর্যন্ত আমাদের রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। বেশির ভাগ রোগীরই একাধিকবার চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখন যারা আসছেন তাদের বেশির ভাগই চেকআপের জন্য আসছেন। আমাদের সাধ্যমতো যা যা করার দরকার তাদের জন্য আমরা করে যাচ্ছি। এর বেশি আমাদের হাতে নেই। 

mzamin