Saturday, November 2, 2019

কর্নেল তাহেরের কাছে জিয়াউর রহমানের বার্তা, ‘ফ্রি মি তাহের, সেভ মি’

বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটনাবহুল অধ্যায় পঁচাত্তরের নভেম্বর। একের পর এক ক্যু আর পাল্টা ক্যু নিয়ে অস্থির এক সময়। কি ঘটেছিল সে সময়। একেক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে একেক ভাষ্য। নতুন করে এ বিষয়গুলো অবারও আলোচনায় সিরাজুল আলম খানের ভাষ্যে। তারই রাজনৈতিক সহকর্মী শামসুদ্দিন পেয়ারার বয়ানে লিখিত ‘সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ বইতে অজানা সেই অধ্যায় পাঠকের জন্য পুনর্লেখ করা হলো-
গণঅভ্যাত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়ায় আমরা রাজনীতির ভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এর মধ্যে প্রধান হলো, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ গড়ে তোলা। ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি থেকে জাসদ সভাতি মেজর জলিলের নেতৃত্বে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের প্রায় সব ইউনিটে এবং বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র সংগঠন গড়ে ওঠে।
ঢাকার চারপাশে প্রায় ৪০টি স্থানে ঘাঁটি গঠন এবং ঢাকাসহ জেলা ও মহকুমা শহরে গণবিস্ফোরণমূলক আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবার পর ক্ষমতা দখলের ভিন্ন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
সেটি হলো সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র নেতৃত্বে সিপাহীদের অভ্যুত্থান এবং যুগপৎভাবে সে অভ্যুত্থানের সমর্থনে ঢাকাসহ শহর এলাকায় ছাত্র-যুবক এবং শ্রমিকদের গণঅভ্যুত্থান ঘটানো। এভাবে ছাত্র ও শ্রমিকদের গণঅভ্যুত্থান ও ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করা।
ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে পরিচালিত আমাদের এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থান ও তার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সুযোগকে কাজে লাগানো।
কর্নেল আবু তাহেরের ওপর এ অভ্যুত্থানের নীলনকশা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে লক্ষ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় সিওসির একটি বৈঠক বসে সেখানে কর্ণেল তাহের তার পুরো পরিকল্পনাটি তুলে ধরেন। আলোচনার শেষ পর্যায়ে জিয়াউর রহমানের অবস্থান কী, এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ইংরেজিতে বলেন, 'He will be at my knees' (সে আমার হাঁটুতে পড়ে থাকবে)। এরপর আমি পরিকল্পনা অনুযায়ী অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কমিটিকে পরামর্শ দিই এবং কমিটি তা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। সভার শেষে বিদায়ের সময় আমি কর্নেল তাহেরকে বললাম, ‘কোনো অবস্থায় যেন এটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানে পরিণত না হয়।’ তিনি বললেন, 'It will happen right at one O'clock'. (রাত ঠিক ১টায় এটি ঘটবে)
অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম যে কথাটি ঘোষণা করা হলো তা ছিল, “বাংলাদেশের বীর বিপ্লবী জনগণ, ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ও ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’র নেতৃত্বে বাংলাদেশে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ সংঘটিত হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়েছে।” বাংলাদেশ বেতার তখন শাহবাগে। সেখান থেকে শামসুদ্দিন পেয়ারা টেলিফোনে আমার নির্দেশ মতো এ ঘোষণাটি লিখে তা স্বকন্ঠে বেতারে প্রচার করে।
এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে সারাদেশের বেশ কয়েকটি জেলায় পুলিশ, আনসার ও বিডিআর সদস্যরা গণবাহিনীর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে হলেও ঢাকা শহরে ছাত্রদের এবং ঢাকার আশপাশে সৈনিকদের মিছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে আসতে থাকে। সিওসি হাই কমান্ডের সিদ্ধান্ত ছিল জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহেরের সঙ্গে বিপ্লবী সৈনিকরা শহীদ মিনারে এসে ছাত্র-শ্রমিকদের সঙ্গে মিছিল হবে। সেখানে ‘কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল’ গঠন হবে। কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সৈনিকদের প্রস্তাবিত ১২ দফা মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে। এবং কমান্ড কাউন্সিলের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা হবে।
কিন্তু এ সময়ই খন্দকার মোশতাক আহমেদের সমর্থক এক দল আমলা ও সেনা কর্মকর্তা আমাদের এ সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। জিয়াউর রহমানও সেই বাধার বিরুদ্ধে কিছু করতে না পেরে তাদের সহযোগিতা করলেন।
৩ নভেম্বর খালেদ মোশারফের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান পদ গ্রহণ করার বিষয়টি সাধারণ সৈনিক ও বেশিরভাগ অফিসারের মনঃপুত ছিল না। খালেদ মোশারফ যে জিয়াউর রহমানকে বন্দি করলেন সেটিও সাধারণ সৈনিক ও বেশির ভাগ অফিসার মেনে নিতে পারলেন না। এতে সেনাবাহিনীতে এক অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। তার ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় কেবল বিশৃঙ্খলাই নয়, এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় আমরা মনে করি, এটাই আমাদের (জাসদ, গণবাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা) ক্ষমতা গ্রহণের উপযুক্ত সময়। নভেম্বরের সে কয়দিন ঢাকা শহরে এবং শ্রমিক এলাকাগুলোতে ছাত্র-যুবক এবং শ্রমিকরা গণআন্দোলনের স্রোত সৃষ্টি করে।
৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় আমি, ড. আখলাকুর রহমান ও কর্নেল তাহের লালমাটিয়ায় আখলাকুর রহমান সাহেবের বাসায় মিলিত হই। এই প্রথমবারের মতো ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র সৈনিকদের সংগঠিত অবস্থায় কথা ড. আখলাক ও কর্নেল তাহেরকে জানাই। ১৯৭৪-এ ১৭ই মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে স্মারকলিপি দিতে গিয়ে জলিল-রবের গ্রেপ্তারের পর ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র কাজ সমন্বয়হীন হয়ে পড়ে। মেজর জলিল এ দায়িত্ব পালন করতেন। ক্যান্টনমেন্টে তাঁদের নিজস্ব একটি ‘কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল’ ছিল।
আমরা তিনজন (আমি, আখলাক, তাহের) মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, দেশে তখন যে অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতাবলয়ে যে শূন্যতা বিরাজ করছিল, তা থেকে দেশকে রক্ষা করতেই বাইরের ছাত্র-যুবক-শ্রমিক এবং ভেতরের সৈনিক সংস্থার যোগসাজশে একটি বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটানো অত্যবশ্যক হয়ে পড়েছে। ড. আখলাক ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে যোগাযোগের লিঙ্ক প্রতিষ্ঠা ও তার জন্য ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র সহায়তার কথা তুললে কর্নেল তাহের বললেন, 'I shall find it out' (আমি সেটা খুঁজে বের করবো)।
কর্ণেল তাহের এরপর ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হলেন। প্রশ্ন উঠলো, কে ছাত্র-শ্রমিক-সৈনিকদের এ অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকবেন? তখনকার পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই জিয়াউর রহমানের নাম আসে। এ ব্যাপারেও কর্নেল তাহের বললেন, 'I can handle that too' (আমি সে ব্যাপারটাও সামলাতে পারবো)।
নভেম্বরের ৪, ৫ ও ৬ তারিখ অভ্যুত্থানের আয়োজন ও প্রস্তুতিতে চলে গেল। এর মধ্যেই ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র মাধ্যমে কর্নেল তাহেরের কাছ জিয়াউর রহমান বার্তা পাঠালেন, 'Free me Taher, save me' (তাহের আমাকে মুক্ত কর, আমাকে বাঁচাও)।
কর্নেল তাহের এসব ঘটনা আমাদের কাছে রিপোর্ট করলেন এবং সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে একটি সফল বিপ্লব যে ঘটানো সম্ভাব, তাও বললেন। এ বিষয়ে সৈনিক সংস্থার সঙ্গে তাঁর আলোচনা ও বিস্তারিত পরিকল্পনার কথাও জানালেন। এসব প্রস্তুতির আলোকে ৬ নভেম্বর রাত একটায় (৭ তারিখ) অভ্যুত্থানের সময় নির্ধারণ করা হয়। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ছাত্র-শ্রমিকদের মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি ঘটিয়ে সেনাবিদ্রোহের সঙ্গে তাকে একাকার করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী সংযোগ স্থাপনে এ শক্তিসমূহ প্রচ- ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, ৭ নভেম্বরের ভোর বেলা (অনুমান ৬টার দিকে) জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সামরিক অফিসার ও সৈনিকরা ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সামরিক বাহন নিয়ে শহীদ মিনারে আসবে। একই সময়ে ছাত্র-যুব-শ্রমিকরাও তখন শহীদ মিনারে উপস্থিত হবে। ছাত্ররা আসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার বিভিন্ন কলেজ থেকে। আর শ্রমিকরা মৃত আদমজি, তেজগাঁও ও পোস্তগোলা থেকে মিছিল করে শহীদ মিনারে আসবে। ওখানেই ‘বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল’ গঠন ও ঘোষণা করা হবে। পরবর্তী ধাপে কমান্ড কাউন্সিলের অধীনে সকল রাজনৈতিক দল, সৈনিক, শ্রমিক ও ছাত্র-যুবকদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা হবে।
ক্যান্টনমেন্টের ব্যারাকগুলোতে এ সময় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ছাড়াও স্বার্থান্বেষী আরো কিছু গোষ্ঠী অতিদ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠলো। বাইরে মাহবুবুল আলম চাষীসহ একদল আমলাও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমগ্র ঘটনাকে ভিন্ন খাতো প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কার্যত তারাই জিয়াউর রহমানকে তাদের পক্ষে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ সময় ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চিত্র হলো, সময়মতো ছাত্র-যুব-শ্রমিকরা শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে তাদের এগিয়ে যাবার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে পারলো না। ছাত্র-যুবক-শ্রমিকদের সমবেত করার জন্য নির্দিষ্ট করে যাদের যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারাও তা কার্যকর করতে পারেনি। আমাদের প্রধান প্রধান নেতারা সেই সময় জেলে ছিলেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁদের যোগ্যতা প্রমাণে চরমভাবে ব্যর্থ হন। পরবর্তী সময়েও এ ব্যর্থতাকে অতিক্রম করার সুযোগ না নিয়ে একটি অসময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে সবকিছুই এক পর্যায়ে আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়।
৯ নভেম্বর ১৯৭৫ জলিল-রব মুক্তি লাভ করেন। এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আমরা আলোচনায় বসি। আলোচনার গতি দেখে আমি বুঝলাম, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দুটি স্পষ্ট ভাগ। একটি ভাগের মত হলো: দুই চারদিনের মধ্যে ৭ নভেম্বরের মতো করে সিপাহী-জনতার আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটানো। দ্বিতীয় মতটি হলো: জিয়াউর রহমানকে তাঁর ক্ষমতা সংহত করার সুযোগ দিয়ে আরও সংগঠিতভাবে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা। দুটি ভিন্ন মতামতের কারণে আমি ক্ষুদ্রাকারের একটি ‘অ্যাকশন কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিলাম। অবস্থা বুঝে এই ‘অ্যাকশন কমিটি’ জাসদ ও ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র হাই কমান্ডের কাছে রিপোর্ট করবে এবং তার আলোকে ও বাস্তবতার নিরিখে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নভেম্বরের ১৫ কি ১৬ তারিখে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৩ নভেম্বর হঠাৎ করে আমার কাছে সংবাদ এলো, কোনো একটি সভা থেকে মেজর জলিল, আ স ম রব ও কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করা হবে। ঐদিনই এসএম হলের হাউজ টিউটরের বাসা থেকে তাঁদেরকে গ্রেফতার করা হয় পরে ইনুও গ্রেফতার হলো। এঁদের গ্রেফতারে আমি বিস্মিত হলাম। গ্রেফতার হবার মতো এমন কোনো ঘটনা বা সিদ্ধান্ত তো হয়নি।
এ ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পরে (২০০৫ সালে) আমি জানতে পারলাম, আমার অনুপস্থিতিতে, আমাকে না জানিয়ে বা আমার মতামত না নিয়ে, মাত্র কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, সেই প্রস্তাবের উত্থাপক ছিলেন কর্নেল তাহের ও মেজর জলিল। বলা বাহুল্য জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই এই অভ্যুত্থান ঘটানোর চিন্তা করা হয়েছিল।
ক্ষুদ্রাকারের সেই ‘অ্যাকশন কমিটি’তে ছিলেন মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব, কর্নেল তাহের, হাসানুল হক ইনু ও আমার অনুরোধে অন্তর্ভুক্ত করা শরীফ নূরুল আম্বিয়া। আমার অনুপস্থিতিতে, আমাকে না জানিয়ে দ্বিতীয় অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার এই বিষয়টি আমি পরে শরীফ নূরুল আম্বিয়ার কাছ থেকেই জানতে পারি।
বৈপ্লবিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা দখলের জন্য যে সংগঠিত শক্তি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে এবং বাইরে ছাত্র-যুব-শ্রমিকদের মধ্যে থাকা দরকার, মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত হয়ে পড়েছিল। সর্বোপরি ক্ষমতয় যারা থাকে তাদের সঙ্গে ক্ষমতার বাইরে থাকা জনগণের যে পরস্পর বিরোধী অবস্থান থাকা প্রয়োজন- যার ভিত্তিতে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটানো সম্ভব- তাও একেবারেই অনুপস্থিত ছিল।
আমার অনুপস্থিতিতে যে সভাটিতে দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত হয়েছিল তার পূর্বেকার একটি সভায় যখন কথাটা উঠেছিল, আমি জানতে চেয়েছিলাম, সেনাবাহিনীর মধ্যে (অফিসারসহ) সমর্থন এবং সাজ-সরঞ্জামের দিক থেকে অভ্যুত্থানের পক্ষে কী পরিমাণ প্রস্তুতি আছে। তার উত্তরে বলা হয়েছিল, ‘একটি ট্যাঙ্ক’ আমাদের পক্ষে থাকবে। সৈনিক ও অফিসারদের কোনো সংখ্যা কেউ দিতে পারলেন না। শুধু বললেন, যেহেতু ইতিপূর্বে সৈনিকরা আমাদের পক্ষে ছিল অতএব তাদেরকে সংগঠিত করতে বেশি সময় লাগবে না। আমি ছাত্র-যুব-শ্রমিক সংগঠনের অবস্থা উল্লেখ করতে গিয়ে বললাম, পুনরায় এদেরকে সংগঠিত করতে হলে কমপক্ষে ছয় মাস সময় লাগবে। এ সভার পরেই আমাকে ছাড়া দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সন্তানের পরিচয়ে মায়ের নাম ব্যবহার করলে নারীর কী লাভ হবে?

বাংলাদেশে সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের নাম বাধ্যতামূলক বিষয়ে ২০০০ সালের একটি প্রজ্ঞাপন সব ক্ষেত্রে কেন বাস্তবায়ন করা হবে না - তা জানতে চেয়ে সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।
কেন বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম বাধ্যতামূলক করা হবেনা - জনস্বার্থ বিষয়ক এমন রিট শুনানির পর সোমবার আদালত এই রুল জারি করে।
রিটকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জুবেইদা পারভীন মনে করেন, সন্তানের পরিচয়ে মায়ের নামের অন্তর্ভূক্তি সমাজে নারীর সাম্য ও সমতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।
সন্তানের পরিচয়ে মায়ের নাম অন্তর্ভূক্তি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক হলেও সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়নি বলে জানান মিজ. পারভীন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের নাম বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে ২০০০ সালে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা সত্ত্বেও ঐ প্রজ্ঞাপনের নির্দেশ সকল ক্ষেত্রে কার্যকর করা হয়নি।"
মায়ের নাম অন্তর্ভূক্তি বাধ্যতামূলক না করার কারণেই বিচার ব্যবস্থার মধ্যেও বিভিন্ন কাগজপত্রে শুধু বাবার নামই ব্যবহার করা হয় বলে মন্তব্য করেন মিজ. পারভীন।
জুবেইদা পারভীনের মতে, সন্তানের পরিচয়ের সাথে মায়ের নাম বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত করা সমাজে নারী-পুরুষ সমতা আনার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন।
"সন্তানের নামের সাথে মায়ের নাম সংযুক্ত করে যখন মা'কে সম্মান দেওয়ার সামাজিক রীতি প্রচলিত হবে, তখন নারী নির্যাতন এবং নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রাও কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।"
বর্তমানে নারীরা সমাজে অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা রাখলেও সন্তান এবং সমাজের কাছে তার প্রাপ্য পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদা পাচ্ছে না বলে মনে করেন মিজ. পারভীন।
"অনেক সময় দেখা যায় একজন মা তার সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারছে না। কারণ আইনত তিনি সন্তানের অভিভাবক না। অনেক সময় এই অভিভাবকত্ব আদালতের মাধ্যমে নিতে হয়।"
সন্তানের নামের সাথে মায়ের নাম যুক্ত হলে সেটি এই ধরণের জটিলতার অবসান ঘটাবে বলে মনে করছেন এই আইনজীবী।
পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের নাম বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে ২০০০ সালে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

৪০ বছরের মধ্যে যুবতীদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি

চল্লিশ বছরের মধ্যে বয়সী কোটি কোটি নারীদের ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর কারণ, এ বয়সসীমার যুবতীরা কখনোই তাদের ব্রেস্ট পরীক্ষা করানোর প্রয়োজনীয়তা মনে করেন না। ফলে নীরবে, সঙ্গোপনে তাদের বুকে ক্যান্সারের বাসা বাঁধার ঝুঁকিটা থেকে যায়। এ সময়ে তারা বুঝতে পারেন না আসলেই তাদের দেহে এই ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ আছে কিনা। এর কারণ, শারীরিক গঠনও। নতুন এক গবেষণায় উদ্বেগজনক এমন তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। এ খবর প্রকাশিত হয়েছে বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে। এতে বলা হয়েছে, বহু নারী ব্রেস্ট চেকআপ করাকে একটি বিব্রতকর বিষয় হিসেবে ভেবে থাকেন।
এমন কি এ নিয়ে কথা বলতেও লজ্জাবোধ করেন। এই গবেষণায় দেখা গেছে বৃটেনে প্রতি দশ মিনিটে পরীক্ষায় একজন নারীকে ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে।
দ্য এস্টি লাউডার কোম্পানিজ এই গবেষণা করে ১৮ বছরের ওপরে বয়সী বৃটিশ ২০১৭ জন নারীর ওপর। কোম্পানিটি এই রোগ সম্পর্কে নারীদের সচেতনতা সৃষ্টি বিষয়ক প্রচারণাও চালায়। তারা গবেষণায় দেখতে পেয়েছে, বৃটিশ ওইসব নারীর মধ্যে যাদের বয়স ৪০ বছরের মধ্যে তাদের শতকরা ২১ ভাগ কখনোই ব্রেস্ট ক্যান্সার আছে কিনা তা চেক করান নি। তবে ৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার শতকরা মাত্র ৭ ভাগ। গবেষণায় অংশ নেয়া নারীরা বলেছেন, গত ছয় মাসে তারা দাঁতের সমস্যার জন্য ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু ব্রেস্টের সমস্যা নিয়ে তারা এত ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে যান না। গবেষণায় শতকরা ৩৭ ভাগ নারী এমন পরীক্ষা করান নি। তারা এ নিয়ে কখনো কারো সঙ্গে শলাপরামর্শও করেননি। অন্যদিকে শতকরা ২২ ভাগ নারী মনে করেন ব্রেস্ট বা স্তন চেক করানো একটি বিব্রতকর বিষয়। এ রোগ নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে সবচেয়ে বেশি বিব্রতকর অবস্থায় থাকেন ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুবতীরা। ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ সম্পর্কে ভালভাবে জানেন শতকরা মাত্র ৩৩ ভাগ নারী। তারা ব্রেস্ট ক্যান্সারের সব লক্ষণ যথাযথভাবে বলতে পেরেছেন।
অভিনেত্রী ও মডেল এলিজাবেথ হারলে এখন নারীদের ব্রেস্ট বা স্তনের সমস্যা নিয়ে সব বয়সী নারীকে উৎসাহিত করছেন। তাদেরকে নিয়মিত ব্রেস্ট চেক করাতে উদ্বুদ্ধ করছেন। কিভাবে নিজে নিজে ব্রেস্ট ক্যান্সার নির্ধারণ করা যায় বা বোঝা যায় তা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করাকে উৎসাহিত করছেন তিনি। প্রায় দু’দশক ধরে ব্রেস্ট ক্যান্সার নির্মূলের বিরুদ্ধে এস্টি লাউডারের সঙ্গে কাজ করছেন এই তারকা শিল্পী। তিনি বলেছেন, বৃটেনে সবচেয়ে কমন যে ক্যান্সার তার মধ্যে অন্যতম হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার। প্রতি বছর এই রোগে মারা যান প্রায় ১১ হাজার ৪০০ নারী। এলিজাবেথ হারলে আরও বলেন, ব্রেস্ট ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যাতে যুদ্ধ করা যায় তাই এই ক্যান্সার বাসা বাঁধার শুরুতেই যেন তা ধরা পড়ে এ জন্য একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করতে নারীদেরকে একত্রিত হবে হবে। আলোচনা করতে হবে। কথা বলতে হবে। এটা করতে হবে নিজেদের নিরাপদ থাকার জন্য। এ নিয়ে আপনি আপনার মা, বোন, মেয়ে, আন্টি, বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের কাছে আপনার জানতে চাওয়া উচিত তারা ব্রেস্ট ক্যান্সারের জন্য নিয়মিত চেকআপ করেন কিনা।
এলিজাবেথ হারলে বলেন, ১৯৯২ সালে ব্রেস্ট ক্যান্সারে মারা গেছেন আমার ‘গ্রান্ডমাদার’। এ বছরেই শুরু হয়েছে ব্রেস্ট ক্যান্সার ক্যাম্পেইন। আমার ওই ‘গ্রান্ডমাদার’ কিন্তু তার প্রিয়জনদের সঙ্গে তার ক্যান্সার নিয়ে কোনোদিনই কিছু বলেন নি। তিনি নিজের ভিতর এটাকে গোপন রেখেছিলেন। আমি চাই না বর্তমানের কোনো মেয়ে এই একই অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে সময় পাড় করুন। তাই আমাদের উচিত উন্মুক্ত আলোচনা। বিব্রতবোধকে পিছনে ফেলে দিন। আমাদের ব্রেস্টকে অনিশ্চয়তায় ফেলবেন না।
‘ইউ, মি অ্যান্ড দ্য বিগ সি’-এর উপস্থাপিকা ও ব্রেস্ট ক্যান্সার থেকে সুস্থ হওয়া লরা ম্যাহোন এবং দ্য সান-এর ডেবোরাহ জেমস বলেছেন, এই গবেষণা তাদের বিদ্যমান উদ্বেগকে তুলে ধরেছে। লরা বলেছেন, আমি যখন ৩১ বছর বয়সী যুবতী, ওই সময় আমার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে। এ থেকে এমন প্রচারণায় যুক্ত হই। নারীদের উচিত এটাকে স্বাভাবিকভাবে দেখা এবং কিভাবে চেকটা করতে হয় তা জানা উচিত। এমন সমর্থন দিতে পেরে আমি যেন চাঁদে পৌঁছে গিয়েছি। দ্য এস্টি লাউডার কোম্পানিজ ব্রেস্ট ক্যান্সার ক্যাম্পেইন এ বছর নিজে নিজে কিভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার বা ব্রেস্ট পরীক্ষা করা যায় তার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রচারণা চালাচ্ছে। তার নিয়মিত সঙ্গী হতে পেরে আমি গর্বিত। এমন ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপ অসংখ্য জীবনকে বাঁচাতে পারে। গত বছর ব্রেস্ট ক্যান্সারে সাবেক সহকর্মী র‌্যাচেল ব্লান্ড মারা যাওয়ার পর এমন মন্তব্য করলেন লরা।

কিভাবে নিজে নিজে ব্রেস্ট ক্যান্সার পরীক্ষা করবেন:
ধাপ-১: একটি আয়নার সামনে দাঁড়ান আয়নার দিকে মুখ রেখে। আপনার হাত ভাঁজ করে কোমডে আনুন। কাঁধ সোজা রাখুন। লক্ষ্য করুন ব্রেস্টের ওপরে কোন গোঁটা আছে কিনা। লালচে দাগ আছে কিনা। সংকোচন আছে কিনা। লালচে ঘাঁ, ফুসকুড়ি আছে কিনা। অথবা বৃন্তের ওপর কোনো পরিবর্তন দেখতে পান কিনা।
ধাপ-২: আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকুন। দুই হাত মাথার ওপর তুলুন। ধাপ এক-এর মতো একই রকম পরিবর্তনগুলো আছে কিনা চেক করুন।
ধাপ-৩: আপনার হাত মাথার ওপর রেখেই চেক করুন বৃন্ত (নিপল) দিয়ে কোনো তরল বেরিয়ে আসছে কিনা। এটা হতে পারে দুধের মতো সাদা, হলুদ, পানির মতো তরল অথবা রক্ত।
ধাপ-৪: শুয়ে পড়–ন। বাম হাত দিয়ে ডানদিকের এবং ডানহাত দিয়ে বাম দিকের ব্রেস্ট চেক করুন। হাতের কয়েকটি আঙ্গুল একত্রিত করে একসঙ্গে তা বৃত্তাকারভাবে ঘোরান ব্রেস্টের চারপাশে। উপর থেকে নিচে- সব স্থানে এই একই রকম বৃত্তাকারভাবে পুরো ব্রেস্ট চেক করুন এবং বুঝতে চেষ্টা করুন একই রকম অনুভূতি হয় কিনা। এবার ত্বকের ওপর এবং এর নিচের টিস্যুগুলোর অনুভূতি পেতে আলতো করে চাপ দিন। ব্রেস্টের মধ্যভাগের টিস্যুগুলোর অনুভূতি পেতে মাঝারি ধরনের চাপ দিন। পিছনের টিস্যুর অনুভূতি পেতে একটু জোরে চাপ দিন। চাপ দিয়ে হাড়ের উপস্থিতি পর্যন্ত যাওয়ার চেষ্টা করুন। এর মধ্যে লক্ষ্য করুণ শক্ত মতো কোনো কিছুর উপস্থিতি পান কিনা।

কতখানি নিকোটিন থাকে একটি সিগারেটে? by ফাওজিয়া ফারহাত অনীকা

প্রশ্নাতীতভাবে ধূমপান সবচেয়ে বাজে ও ক্ষতিকর একটি অভ্যাস।
এ বদভ্যাসের দরুন নিজের স্বাস্থ্য তো বটেই, পাশাপাশি অন্যের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মাঝে পড়ে যায়। ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরেও বেশিরভাগ ধূমপায়ী এই অভ্যাসটি বাদ দিতে চান না। তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। অনেকেই চেষ্টা করেন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এই অভ্যাসটিকে পাশ কাটিয়ে উঠতে। তবে ধূমপায়ী, অধূমপায়ী ও ধূমপান ত্যাগ করার চেষ্টা করছেন যারা, প্রত্যেকেই একটি বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন- একটি সিগারেটে কতখানি নিকোটিন থাকে! চলুন এই বিষয়টি জানানো যাক।
প্রতিটি সিগারেটে থাকে ৭০০০ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল। যার মাঝে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো নিকোটিন (Nicotine). হাজারো ধরনের কেমিক্যালের ভেতর এই নিকোটিন তৈরি হয় তামাক পাতা থেকে। তামাক পাতা থেকে তৈরি হওয়া এই উদ্ভিজ কেমিক্যাল নিকোটিনেই ধূমপায়ীদের আসক্তি তৈরি হয়।
মেডিকেশন অ্যাডভোকেট জেসন রিড জানান, প্রতিটি সিগারেটে গড়ে এক মিলিগ্রাম পরিমাণ নিকোটিন থাকে। এছাড়া এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে সিগারেটের ধরনের উপর নির্ভর করে এক একটি সিগারেটে ১.২-১.৪ মিলিগ্রাম পরিমাণ নিকোটিন থাকে। স্বল্প নিকোটিনযুক্ত ‘সিগারেট লাইট’ এ ০.৬-১ মিলিগ্রাম পরিমাণ নিকোটিন থাকে। তবে সাধারণ সিগারেটের মতো সিগারেট লাইটেও একই ধরনের সিগারেট বুস্ট তথা সিগারেটের প্রভাব থাকে।
এছাড়া নিকোটিন গ্রহণের মাত্রা ধূমপায়ীর উপর নির্ভর করে। সিগারেটে কত জোরে টান দিচ্ছে এবং সিগারেট পাফের কতটা নিকটবর্তী স্থান পর্যন্ত সিগারেট পান করছে- এই দুইটি বিষয়ের উপর নির্ভর করেও নিকোটিন গ্রহণের মাত্রায় তারতম্য দেখা দেয়।

রাতে ঘুরে বেড়ানো প্রকৃতিপ্রেমীদের নিশিদল by জুনাইদ আল হাবিব

নিশিদলের প্রকৃতিপ্রেমীরা
প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ সাধারণত দিনের বেলা বেড়ানো উপভোগ করেন। কিন্তু একদল ভ্রমণপিপাসু আছেন যারা রাতের আলোয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার মাঝে স্বস্তি খুঁজে নেন। ব্যতিক্রম এই পর্যটকদের ‘নিশিদল’ নামে সংগঠন আছে। তারা রাতেই দেখেন নদ-নদী, সাগর, হাওর, আকাশ, বন-জঙ্গলসহ বাংলার প্রকৃতি।
একবার রাতে নিশিদলের কয়েকজন মিলে উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র নিঝুম দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাত যখন গভীর, তখন শেয়াল দলের আক্রমণের মুখে পড়েন তারা। তড়িঘড়ি আগুন জ্বালালেন সবাই। এ কারণে শেয়ালের দল পিছু হটে যায়।
আরেকদিন নিশিদলের সফর ছিল ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। সেখানে তাদের এক সদস্যকে চিতই পিঠার সঙ্গে চেতনানাশক খাইয়ে অজ্ঞান করে ফেলা হয়েছিল। সংগঠনটির অন্যতম উদ্যোক্তা জামিল জাহাঙ্গীর জানান, রাতের ভ্রমণে এমন কিছু ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়।
সম্প্রতি রাজধানী ছেড়ে নিশিদলের গন্তব্য ছিল দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর। এটি তাদের ৫২তম জেলা সফর। লক্ষ্মীপুরের মতিরহাট মেঘনাপাড়ে বেড়িয়েছেন তারা। তবে তারা লক্ষ্মীপুরে আসতেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় কালবৈশাখীর ঝড়। এরপর শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিশিরাতে নিশিদল পৌঁছায় মেঘনার তীরে। গল্প, আড্ডা ও প্রকৃতি দেখার মধ্য দিয়েই কেটেছে তাদের রাত। সকালবেলা স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করে ফিরে আসে নিশিদল।
নিশিদলের দেশি-বিদেশি প্রকৃতিপ্রেমীরা
নিশিদল একটি ভ্রমণ সংগঠন। এর যাত্রা শুরু ২০১২ সালে। আয়োজন করে অথবা কোনও আয়োজন ছাড়াই রাত দেখতে বেরিয়ে পড়ে এই দলের নিশাচরেরা। নিশিদলের সদস্য এখন ৫৪ জন। তাদের মধ্যে প্রবাসীও আছেন। চীন, তাইওয়ান, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সদস্যরা দেশে এসে রাতে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতি উপভোগ করেন।
রাতে প্রকৃতি দেখার ভাবনা এলো কীভাবে? সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শাহ মোহাম্মদ মোশাহিদ বলেন, ‘ছাত্রজীবনে আমরা মেসে থাকতাম। অনেক রাত হয়ে যেতো। এই রাত জাগার অভ্যাস তখন থেকেই। এরপর কর্মজীবনে এসে রাত জাগার ওই সময়টাকে মিস করছিলাম। আমার বন্ধু রুমান ও তুহিনের সঙ্গে রাতে বেড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলাপ করি। মানুষ বিপদে না পড়লে রাত জাগে না। সেক্ষেত্রে আমরা একদম ব্যতিক্রম একটি কাজ শুরু করি। রাতে পাহাড়, সাগর ও নদীর দৃশ্য অন্যরকম। এই যে প্রকৃতির মাঝে বৈচিত্র্য লুকিয়ে আছে, সেটা উপভোগ করতে চেয়েছি আমরা। এজন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া। আমাদের পথচলা অব্যাহত থাকবে।’
রাতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ব্যাপারে কেমন প্রস্তুতি থাকে জানতে চাইলে জামিল জাহাঙ্গীর বলেন, ‘যেখানে আমরা বেড়াতে যাই, অতি প্রয়োজন হলে সেখানকার প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাই। মূলত নিশিদল যেখানেই ভ্রমণে বের হোক না, স্থানীয়দের সঙ্গে হৃদ্যতা হয়ে গেলে নিরাপত্তা আপনাআপনি এসে যায়।’
>>ছবি: লেখক
খাগড়াছড়িতে নিশিদলের প্রকৃতিপ্রেমীরা

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: ভাসানী ও শেরে বাংলার দলের মতো জাতীয় পার্টিও বিলুপ্ত হতে পারে - বিশ্লেষক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
বাংলাদেশের সাবেক সামরিক শাসক ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পর যেকোন বিশৃঙ্খলায় তাঁর দলে ভাঙন দেখা দিতে পারে - এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব' থাকে। আর দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ 'গণতন্ত্রের অভাব' রয়েছে।
এই পটভূমিতে জেনারেল এরশাদের অনুপস্থিতি জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, এমন প্রশ্ন করা হয়েছিলো রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদকে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেনে, "জাতীয় পার্টি কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। এটি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।"
"জাতীয় পার্টি সুবিধাবাদীর রাজনীতি করেছে। যার কারণে এক সময় ক্ষমতা ভোগ করেছে, এক সময় ছিটকে পড়েছে ক্ষমতার বলয় থেকে। আবার সমন্বয় করে ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে ঢুকেছিলো। কিন্তু এতো সবকিছুই এরশাদকে কেন্দ্র করে ছিল।"
মিস্টার আহমেদ বলেন, "এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। দলে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি ধারা রয়েছে । আরেকটি ধারা জিএম কাদেরকে কেন্দ্র করে।"
"অথবা দুটি ধারার একটি আওয়ামী লীগের সাথে মিশে যাবে, আরেকটি এ্যান্টি-আওয়ামীলীগ ফোরামে বা বিএনপি ফোরামের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।"
পারসোনালিটি কাল্ট বা ব্যক্তি জনপ্রিয়তা এদেশের রাজনীতির একটা বড় অংশ, যা জেনারেল এরশাদের মধ্যেও ছিল। কিন্তু এধরণের আরো অনেক দল যেমন, মওলানা ভাসানী কিংবা এ কে ফজলুল হকের মতো ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের দলগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এরশাদের জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "খুব সম্ভাবনা রয়েছে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ একথাই বলে।"
তিনি বলেন, "এই দলের কোন জনভিত্তি নেই, আদর্শিক ভিত্তি নেই, কোন ভবিষ্যৎ কমিটমেন্ট নেই। একারণে মওলানা ভাসানী ও শেরে বাংলার দলের মতো জাতীয় পার্টিও বিলুপ্ত হতে পারে বলে আমার ধারণা।"
আওয়ামীলীগ, বিএনপি কিংবা বামদলগুলো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের ভিত্তিতে কাজ করে। এমন সুসংগঠিত দলগুলোর রাজনীতিতে দলগত আদর্শিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টি কিভাবে এতো দিন টিকে ছিলো এমন প্রশ্নও করা হয় মিস্টার আহমেদকে।
তিনি বলেন, "টিকে ছিলো ক্ষমতার রসায়নে একটা জায়গা ছিলো বলে। কারণ যেকোন স্বৈরাচারের পতনের পরে একজন স্বৈরাচারী শাসক রাজনীতিতে টিকে থাকে না। কিন্তু এরশাদ টিকে ছিলেন শুধু তার রংপুর রাজনীতিকে ভিত্তি করে।"
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর, জেলখানায় থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে রংপুরের ৫টি আসনে জয় লাভ করেছিলেন এরশাদ।"
"এরপর থেকে রংপুরকে ভিত্তি করে একটি আঞ্চলিক দল হিসেবে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে ১৫-২০ আসন পেলে একটা বার্গেনিং পজিশন থাকে। এরশাদ সেটাকে কাজে লাগিয়েছেন।"
১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে প্রায় নয় বছর দেশ শাসনের পর ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে মি. এরশাদ পদত্যাগ করেন। কিন্তু তারপরও জাতীয় পার্টি বিস্ময়করভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
ক্ষমতা হারানোর পর থেকে এরশাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে আওয়ামীলীগ বা বিএনপির ভূমিকাই বেশি ছিল বলে উল্লেখ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিস্টার আহমেদ। তিনি বলেন, এসব দলের কারণেই রাজনীতিতে টিকে গেছেন জেনারেল এরশাদ।
"এরশাদ সারভাইভ করতে [টিকে থাকতে] পারতো না যদি এরা এরশাদকে নিয়ে প্লে [খেলা] করতে না চাইতো। আওয়ামীলীগও করেছে বিএনপিও করেছে," তিনি বলেন।
"পার্লামেন্টোরি ডেমোক্রেসির মধ্যে অঞ্চল ভিত্তিক একটা প্রভাব ছিল। একটা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছিল। এটাকে তারা ব্যবহার করতে চেয়েছে।"
"এটাকে ব্যবহার করতে গিয়ে এরশাদকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে যে, এরশাদ খুব দুর্বল অবস্থানে থেকেও সবলভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে দর কষাকষি করতে পেরেছে। এর কারণেই তিনি ১৯৯৬ থেকে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে আর পরে যাননি," তিনি বলেন।