Tuesday, March 18, 2025

‘ফাঁসি’ নয়, ইনসাফ চাই by সহুল আহমদ

সম্প্রতি ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন মহল থেকে ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির দাবি জোরেশোরে উঠেছে। বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশের স্লোগানে ও প্ল্যাকার্ডে ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’ বা ‘প্রকাশ্যে ফাঁসি চাই’-এর মতো দাবিও দেখা যাচ্ছে।

ফাঁসির দাবি নিয়ে আন্দোলন বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে দাবি হিসেবে ‘বিচার’-এর চেয়ে ‘ফাঁসি’ মুখ্য—এটা প্রমাণ করে, এখানে সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা ক্যাপিটাল শাস্তি খুব জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে মানবাধিকারের বোঝাপড়ার করুন হালত বোঝা যায় ফাঁসি-সংক্রান্ত আলোচনায়। বর্তমানে বাংলাদেশ যে স্তরে প্রবেশ করেছে, ফাঁসির দাবিকে কেন্দ্র করে যে ফ্যাসিবাদ এখানে কায়েম হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার জেরে আমরা বলতে পারি, ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আমাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

কেন ধর্ষণের সাজা হিসেবে জনগণ ফাঁসি চায়

বাংলাদেশে ধর্ষণের দৃশ্যমান কোনো বিচার হয় না। যেমন ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যত ধর্ষণের মামলা হয়েছিল, তার মধ্যে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ (বাংলা ট্রিবিউন, ২০১৭)।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বেহাল দশা, আইনি ও পুলিশি ব্যবস্থার ঔপনিবেশিক খাসলত, দিনের পর দিন মামলার হয়রানি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের ভেতরকার সংকট—সব মিলিয়ে বিচারহীনতার এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যে জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়ে আছে, এ রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়।
জনগণের মধ্যে যখন এমন ধারণা দৃঢ় হয়, তখন তারা একদিকে ফাঁসির মতো সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করে, অন্যদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ধর্ষকের মৃত্যু হলে উল্লসিতও হয়। ক্রসফায়ারের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনে ‘ধর্ষণ’কে ব্যবহার করার নজির আমরা দেখেছি আওয়ামী শাসনামলে। মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তিকে তখন সমাধান হিসেবে দেখতে পছন্দ করে জনগণ।

‘মৃত্যুদণ্ড’ই মানবাধিকার লঙ্ঘন

বাংলাদেশে ‘মৃত্যুদণ্ড’ বা ফাঁসি শাস্তি হিসেবে খুব জনপ্রিয় হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো মৃত্যুদণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করে। তারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কিছু যুক্তি প্রদান করে।

মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত শাস্তি। এর প্রয়োগ হয়ে গেলে সেখান থেকে ফেরত আসার আর উপায় নেই। আইন-আদালতে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং পৃথিবীতে এমন অনেক নজির আছে, যেখানে বহু বছর পর কাউকে নির্দোষ প্রমাণিত হতেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ভুল শোধরানোর আর কোনো উপায় থাকে না।

আরেকটি জনপ্রিয় ধারণা হচ্ছে, ফাঁসির মতো চরম শাস্তি দিলে অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পায়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে অপরাধ কমেছে, পৃথিবীর কোথাও এমন কোনো নজির পাওয়া যায় না। ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থার সহজ সমাধান হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বেশি থাকে। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নজিরও দুনিয়ায় রয়েছে।

এসব কারণে আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহ মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উপায়ে শেখ হাসিনার বিচার করার ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি উঠেছে। যেহেতু আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, সেহেতু ইতিমধ্যে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিংয়ের প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে, তারা এ বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে না।

ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কেন বিপজ্জনক

২০২০ সালের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড আইনে যুক্ত হয়েছিল। তখন এ আলোচনা অনেকেই করেছিলেন। আজকেও একই দাবির পুনরাবৃত্তি নতুন করে পুরোনো আলাপ করতে বাধ্য করছে।

শুধু ধর্ষণ কেন, পৃথিবীতে কোনো অপরাধই মৃত্যুদণ্ডের কারণে কমেছে, এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড লৈঙ্গিক সহিংসতাকে নজিরবিহীন স্তরে নিয়ে যাবে। আইনের ভেতরকার সংকটগুলোকে আমলে না নিয়ে কেবল আইনকে কঠোর থেকে কঠোরতর করলে সহিংসতার চক্র বৃদ্ধি পাবে। অনেকেই বলে থাকেন, ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হলে ধর্ষণের পর হত্যা করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে। মৃত্যুদণ্ডকেন্দ্রিক এ আলোচনা নারীর প্রতি সহিংসতার কাঠামোগত বিভিন্ন দিক রয়েছে এবং তার সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও যদি আমরা আমলে নিই, তাহলে দেখব যে এখানে দুটো ঘটনা খুব বেশি ঘটে। একদিকে প্রচুর ভুয়া ধর্ষণের মামলা হয় এবং অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে ঘটনা ‘নথিভুক্ত’ করার প্রবণতাও কম। ভুক্তভোগীকে থানায় গিয়ে মামলা করতে গেলে যে ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বা সামাজিক চাপে ঘটনাকে তারা চেপে যান, হয়তোবা নানাবিধ ‘আপস’ করতে বাধ্য হন। ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড একদিকে ‘সামাজিক ফয়সালা’র প্রবণতা বৃদ্ধি করবে, অর্থাৎ ঘটনা আরও কম নথিভুক্ত হবে। যেহেতু প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড, সেহেতু নানা চাপ দিয়ে আপসে মিটমাট করার চেষ্টাই বেশি করা হবে আমাদের সমাজবাস্তবতায়। অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ‘ধর্ষণ’ মামলাকে ব্যবহারের প্রবণতাও বৃদ্ধি করবে।

মৃত্যুদণ্ড নারীর অধিকারের পরিপন্থী ব্যবস্থা

দুনিয়াজুড়ে যাঁরা নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা ধর্ষণের সাজা হিসেবে ফাঁসির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁরা বলেন, ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নারী অধিকারের পরিপন্থী একটি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

তাঁদের যুক্তি মোতাবেক, ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড—এ ধারণার গোড়ায় রয়েছে এক পুরুষতান্ত্রিক পূর্বানুমান। ধর্ষণ যেন হত্যা বা খুনের চেয়ে ভয়াবহ এক পরিণতি। ‘ইজ্জত’-এর পুরুষতান্ত্রিক ধারণা থেকে এটার জন্ম হয়, নারীর জীবনে ধর্ষণই সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার মাধ্যমে নারীর ‘ইজ্জত’ ভূলুণ্ঠিত হয়। সে নারীর যেন সমাজে আর কোনো স্থান নেই। জীবনের চেয়ে ‘সতীত্ব’কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এটা একদিকে যেমন ‘ইজ্জত’ বা ‘সতীত্ব’-এর পুরুষতান্ত্রিক পূর্বানুমানগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করে, তেমনি সমাজে খুন বা হত্যাকে স্বাভাবিক বা প্রত্যাশিত অপরাধে পরিণত করে।

ফলে গবেষকেরা বলেন, ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড আসলে নারী অধিকারের প্রশ্নে পশ্চাৎযাত্রা। কাঠামোগত লিঙ্গবৈষম্য, যা কিনা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে টিকিয়ে রাখে ও জায়েজ করে, তা থেকে মনোযোগ দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় মৃত্যুদণ্ডকেন্দ্রিক আলোচনা। মৃত্যুদণ্ড আসলে ধর্ষণকে তো দূর করেই না, বরং রাষ্ট্র ও সমাজকে ধর্ষণের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করা থেকে দূরে রাখে। যে যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়, তা পুরুষতান্ত্রিক ভাষা ও কাঠামোর পুনরুৎপাদনই করে। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি-সংক্রান্ত আলোচনা ভুক্তভোগীর পুনর্বাসনকেও প্রায়ই এড়িয়ে যায়।

জুলুমের কাঠামো ভাঙা

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারী নিপীড়ন ও নারীর ওপর কর্তৃত্ববাদী চর্চার প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন চলছে। এ আন্দোলন আসলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেরই ধারাবাহিকতা। যে নারীর অংশগ্রহণ ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম চাবিকাঠি, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনপরিসরে নারীর উপস্থিতিকে সংকুচিত করার যে মহড়া চলছে কত দিন যাবৎ, তার পরিপ্রেক্ষিতে এ আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম।

তবে আমাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা ও বয়ান যেন স্বৈরতান্ত্রিক বা জুলুমবাজির চক্রের মধ্যে গিয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জুলুমের বিরুদ্ধে আমরা যে ভাষা ও পদ্ধতি দাঁড় করাব, সেটা যেন আরেক জুলুমের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। এমন সংকটকালীন মুহূর্তে বহু জনতুষ্টিবাদী দাবি উঠতে পারে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে নিপীড়নমূলক হাতিয়ার হয়ে উঠবে। নিপীড়নমূলক সব আইনের ন্যায্যতা উৎপাদন করা হয়ে থাকে এমন সংকটের অজুহাতেই।

আইনের ভেতরে যে ধরনের পুরুষতান্ত্রিক উপাদান আছে, যা এই বিচারপ্রক্রিয়াকে ধীর করে বা খোদ ভুক্তভোগীর জন্য বিচার পাওয়াকে কঠিন করে তোলে বা ভুক্তভোগীকে আরেক দফা ভিকটিমে রূপান্তর করে, সেগুলোকে তাড়াতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে সচল করতে হবে। বিচারব্যবস্থায় যত গাফিলতি হবে, তত বেশি সমাজে আরও ‘কঠোর’ দাবির উত্থাপন ঘটতে থাকবে। এমনকি ‘ক্রসফায়ার’ হাজির হতে পারে এ অছিলায়।
ইনসাফের দাবিকে কোনো বে-ইনসাফির উপলক্ষ হয়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। নারীর নিরাপত্তার জন্য আন্দোলনকে আরেক সহিংসতার ভাষিক কথকথার চক্র তৈরির উপলক্ষ করতে দেওয়া যাবে না।

* সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক

গাজায় টানা ১৫ দিন ধরে কোনো খাদ্যসহায়তা ঢোকেনি : জাতিসংঘ

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় টানা ১৫ দিন ধরে কোনো খাদ্যসহায়তা প্রবেশ করেনি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। মানবিক সংকটের চরম অবনতি হওয়ার পরও ইসরায়েলের অবরোধে ফলে সেখানে সহায়তা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বলে উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার (১৭ মার্চ) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ মার্চের পর থেকে গাজায় কোনো খাদ্যসহায়তা প্রবেশ করেনি। ডব্লিউএফপি এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্য গাজার সব সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ রাখা হয়েছে।

এর ফলে ১৭ মার্চ পর্যন্ত টানা ১৫ দিন ধরে গাজায় খাদ্যসহায়তা পাঠাতে পারেনি কোনো সংস্থা। খাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় সেখানে নিত্যপণ্যের দাম আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, কিছু প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম ২০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় অব্যাহত সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও শিশু।

গাজায় চলমান সংঘাতে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্য, পানি, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যা জনজীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

এদিকে গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা ১ মার্চ শেষ হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা অবরোধ তুলে নিয়ে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

খাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ছবি : সংগৃহীত
খাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ছবি : সংগৃহীত



ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ ডলারের আধিপত্য ধসিয়ে দেবে by ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যান্য বিতর্কিত নীতির মতো শুল্কনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ। ট্রাম্প ইতিমধ্যে কানাডার ওপর চীনের চেয়েও বেশি শুল্ক আরোপ করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ইউরোপ, চীনসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করবেন, যাতে মার্কিন শিল্পকারখানা আবারও চাঙা হয় এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান’ করে তোলা যায়।

কিন্তু বাস্তবে এই শুল্কনীতি ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে এর প্রভাব মার্কিন ডলারের ওপর পড়বে বলে মনে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খরচ ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি। আর এশিয়ার তুলনায় তো তা আরও অনেক গুণ বেশি। ফলে ট্রাম্পের শুল্ক ও শুল্ক আরোপের হুমকি সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে। এর পাশাপাশি এটি নতুন করে মার্কিন ডলারের মূল্য বাড়ানোর (ডলার স্ট্রেনদেনিং) চক্র শুরু করতে পারে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থায় মার্কিন ডলারই প্রধান মুদ্রা হিসেবে আধিপত্য ধরে রেখেছে। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপর সুদ প্রত্যাশা আরও বাড়ে, তাহলে ডলারের মূল্য আরও বেড়ে যাবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি বিশ্বব্যাপী ডলারের প্রভাব ও স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

ট্রাম্প এখন ক্রমেই বুঝতে পারছেন এই আর্থিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করা তাঁর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন, যারা ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রা গ্রহণের চেষ্টা করছে। বিশেষত, যারা রাশিয়া ও চীন-সমর্থিত ব্রিকস জোটকে গ্রহণ করতে চায়, তাদের জন্য তিনি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

ট্রাম্প কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করতে চান না, বরং তিনি ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার নতুন নিয়ম’ প্রণয়ন করতেও সচেষ্ট।

সহজভাবে বললে, তিনি এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করতে চান, যেখানে মার্কিন ডলার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় কিছুটা দুর্বল অবস্থানে থাকবে; তবে তা আন্তর্জাতিক লেনদেনে ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা হারাবে না।

এই লক্ষ্য পূরণে ট্রাম্প প্রশাসন অন্যান্য দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে নতুন মুদ্রা স্থিতিশীলতা চুক্তি (ডলার স্ট্যাবিলাইজেশন ডিলস) করার কথা ভাবছে। ১৯৮০-এর দশকে রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন একই ধরনের দুটি চুক্তি করেছিল। তার একটি হলো ‘প্লাজা অ্যাকর্ড’; আরেকটি হলো ‘ল্যুভর অ্যাকর্ড’।

এখন অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটি আলোচনার বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসন কি ‘মার-আ-লাগো অ্যাকর্ড’ নামে নতুন কোনো সমঝোতা করার চেষ্টা করছে? তবে এই ধরনের সমঝোতা করা এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন হবে। রিগ্যান আমলের চুক্তিগুলোতে মূল লক্ষ্য ছিল জাপান। কিন্তু এখন ট্রাম্পের লক্ষ্য হবে চীন। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, জাপানি ইয়েনের দুর্বলতা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য হুমকি, তাই তারা ইয়েনের মূল্য বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু সেই সময় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, ফলে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়নি।

কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। চীন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র নয় এবং এই ধরনের আলোচনায় আগ্রহীও নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৮০-এর দশকের ওই চুক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে চীনের গভীর শঙ্কা রয়েছে।

বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি হোক বা না হোক, ট্রাম্প এই আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান, যাতে তিনি বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে পারেন এবং তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এখন তাঁর হুমকির মুখে রয়েছে। এটি শুল্ক বৃদ্ধির চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে।

এর একটি উদাহরণ পাওয়া গেছে গত জানুয়ারির শেষ দিকে। ওই সময় ট্রাম্প কলম্বিয়াকে হুমকি দেন, যদি তারা সামরিক বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত অভিবাসীদের গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের ওপর ‘ট্রেজারি, ব্যাংকিং ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা’ দেওয়া হবে।

এ ধরনের হুমকি কেবল শুল্ক বৃদ্ধির চেয়েও বেশি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। কারণ, মার্কিন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড এবং বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। যদি ট্রাম্প এই অস্ত্র ব্যবহার করতে থাকেন, তাহলে এটি বহু দেশের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নিজের মিত্রদের বিরুদ্ধেই এই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করার মানে হলো, তারা চীনের বিরুদ্ধে কোনো আলোচনায় গেলে নিজেদের অর্থনৈতিক সমর্থন হারাবে। বেইজিং ও ডলার-নির্ভরতা কমানোর সমর্থকেরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ ও মিত্রদের বিরুদ্ধে ভূখণ্ড দখলের হুমকি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কই দুর্বল করছে না, বরং ডলারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের যে চেষ্টা করছেন, তা মূলত বেইজিংকে লক্ষ্য করেই করা হলেও তাঁর এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগ ধ্বংস করতে পারে।

যদি ট্রাম্প তাঁর এই নীতিতে সফল হন, তাহলে এতে কিছু সুবিধা মিলতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের জন্য। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ দশমিক ২ দশমিক আসে উৎপাদন খাত থেকে, যা বাড়লে তার সমর্থকগোষ্ঠী তা ভালোভাবেই গ্রহণ করবে। কিন্তু এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এই কৌশল ডলার ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। যদি তা ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য এটি বিপর্যয়কর হবে। এতে শুধু ব্যাপক মূল্যস্ফীতি হবে না, বরং ভয়াবহ মন্দাও দেখা দিতে পারে।

* ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক এবং ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছেন। ছবি: এএফপি

আবারও গুজরাট দাঙ্গার দায় অস্বীকার করলেন মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবারও ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার দায় অস্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক এক সাক্ষাৎকারে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার মতে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাকে কালিমালিপ্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে গুজরাট দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে এনেছে।

রোববার (১৬ মার্চ) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকার থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের টানা তিন বারের প্রধানমন্ত্রী মোদি যুক্তরাষ্ট্রের পডকাস্ট হোস্ট লেক্স ফ্রিডম্যানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মোদি বলেন, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা শুধু আমাকে বদনাম করার জন্য। এর কোনো ভিত্তি নেই।

প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরা শহরে সবরমতী এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ৫৯ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী নিহত হন। নিহতদের বেশিরভাগ ছিলেন অযোধ্যা থেকে ফেরত আসা করসেবক, যারা বাবরি মসজিদের স্থলে রামমন্দির নির্মাণের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এই ঘটনার পর গুজরাটের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যা ভারতীয় ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দাঙ্গা হিসেবে পরিচিত। সরকারি হিসেবে, দাঙ্গায় প্রায় ১,০৪৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৭৯০ জন মুসলিম এবং ২৫৪ জন হিন্দু ছিলেন। তবে বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দাঙ্গায় হাজার হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হয়, হাজারেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন, এবং লাখেরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া হন।

সেসময় গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। দাঙ্গার সময় তার প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি এবং মুসলিমদের ওপর হামলার বিষয়ে নীরব থেকেছে বলে অভিযোগ ওঠে। মোদিকে দোষারোপ করা হয়, কারণ দাঙ্গা চলাকালীন পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ এবং মোদির সরকার তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়নি বলে সমালোচনা হয়।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, দাঙ্গা চলাকালে মোদি প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি, গুজরাট পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা সঞ্জীব ভাট দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী মোদি নাকি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দাঙ্গাকারীদের কাজে বাধা না দিতে। যদিও মোদি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সাক্ষাৎকারে মোদি বলেন, ২০০২ সালের দাঙ্গা নিয়ে একটা প্রচার চালানো হয়েছে যেন এটি গুজরাটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাঙ্গা ছিল। কিন্তু সত্য হলো, অতীতেও অনেক দাঙ্গা হয়েছে, তবে শুধু গুজরাটের ঘটনাকেই বারবার সামনে আনা হয়।

তিনি আরও বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল এবং বিদেশি মিডিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। ছোটখাটো ঘটনাকেও বড় করে দেখানো হয়েছে। যেমন, ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা বা সাইকেলে ধাক্কা লাগার মতো ছোট ঘটনায়ও বলা হয়েছে—‘দাঙ্গা হয়েছে’।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ‘ইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোয়েশ্চেন’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করে। এতে দাবি করা হয়, গুজরাট দাঙ্গার ঘটনায় মোদি পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং এই দাঙ্গার কারণে তার জনপ্রিয়তা বাড়ে, যা তাকে পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে সাহায্য করে।

তথ্যচিত্রে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকারের এক গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, গুজরাট দাঙ্গা ছিল ‘পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা’, যেখানে মুসলিমদের ওপর ‘সুনির্দিষ্টভাবে আক্রমণ’ করা হয়েছিল।

অপরদিকে নরেন্দ্র মোদির বর্তমান সরকার এই তথ্যচিত্রকে ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে অভিহিত করে এবং ভারতে এর সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয়।

এদিকে দাঙ্গার ঘটনার পর মোদির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়, তবে ২০১২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) মোদিকে ক্লিন শিট দেয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মোদির বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা দেখাতে পারে যে তিনি দাঙ্গা ছড়ানোর জন্য দায়ী ছিলেন।

এরপর, ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট আরও একবার মোদিকে নির্দোষ ঘোষণা করে এবং বলে যে, মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ছিল।

মোদি আরও দাবি করেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। আমার সরকার বরাবরই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিল। আমি সব ধর্মের মানুষকে সমান চোখে দেখি এবং আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

স্বাধীনতার পর ভারতের সবচেয়ে বড় গুজরাট দাঙ্গার পর মোদির ভাবমূর্তি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়— হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কাছে নায়ক : অনেক হিন্দু জাতীয়তাবাদী মোদিকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখে, যিনি হিন্দু স্বার্থ রক্ষা করেন। অপরদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কিত ব্যক্তি : ভারত ও আন্তর্জাতিক মহলে অনেকেই তাকে মুসলিমবিরোধী নেতা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

তবে দাঙ্গার পরও মোদির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অব্যাহত থাকে। তিনি তিনবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর, ২০১৯ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয়বার জয়ী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার ঘটনা আজও ভারতীয় রাজনীতিতে অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। যদিও ভারতের আদালত মোদিকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে, তবে বিরোধীরা তাকে এখনো দায়ী করে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এই ইস্যুতে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। মোদি অবশ্য সবসময়ই দাঙ্গার দায় অস্বীকার করে আসছেন এবং তার মতে, গুজরাট দাঙ্গার প্রসঙ্গ শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সামনে আনা হয়। তবে সত্যিই তিনি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। ছবি : সংগৃহীত

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান: সাকিবের গুলিবিদ্ধ এক চোখে আলো ফেরানো গেল না by নাজনীন আখতার

‘চোখটা ফালায় দিতে হইছে। ছেলেটার মনটা খুব খারাপ। আমার যে কেমন লাগে! তাও ছেলেরে সান্ত্বনা দিয়া বলি, বাবা, মন খারাপ কইরো না।’—হাসপাতালে ছেলের শয্যাপাশে বসে কথাগুলো বলছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন। এর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে ছেলে মো. সাকিব হাসানের (১২) ডান চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। সে রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ১৯ জুলাই সাকিবের ডান চোখে ছররা গুলি লাগে। চার মাস আগে ওই চোখের সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারায় সে। আট মাস চিকিৎসার পর আজ সোমবার ডান চোখে অস্ত্রোপচার করে প্রস্থেটিক আই (কৃত্রিম চোখ) স্থাপন করা হয়েছে।

বেলা একটায় হাসপাতালের ৪৩৫ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সাকিব ঘুমাচ্ছে। মাঝেমধ্যে নড়াচড়া করছে। বিড়বিড় করে মাকে কিছু বলল, মা তখন একটা বালিশ এনে হাতের নিচে দিয়ে দিলেন।

যেভাবে গুলিবিদ্ধ হয় সাকিব

সাকিবের বাবা আবু তালেব রংমিস্ত্রির কাজ করতেন। চর্মরোগের কারণে অসুস্থতায় বর্তমানে নিয়মিত কোনো কাজ করেন না। শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে সাকিবের ১১ বছর বয়সী ছোট ভাইকে নিয়ে থাকেন। সাকিবের মা সাবিনা গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁর একার আয়ে চলে সংসার। সাকিবকে নিয়ে তিনি থাকেন রাজধানীর মিরপুরের মাটিকাটা এলাকায়।

গত বছরের জুলাইয়ে আন্দোলন শুরুর আগে স্বামী গ্রামে চলে যান জানিয়ে সাবিনা বলেন, তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে মাটিকাটা এলাকার বাসায় থাকতেন। সাকিব স্থানীয় শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে আর ছোট ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত।

ঘটনার দিনের কথা বলতে গিয়ে সাবিনা বলেন, তখন স্কুল বন্ধ। অন্য দিনের মতো তিনি কাজে বেরিয়ে যান। বেলা তিনটার দিকে ইসিবি চত্বরে বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে গেলে সাকিবের ডান চোখে গুলি লাগে।

সাবিনা বলেন, ‘আমি শুনলে মাইর দিব, এই কারণে ভয়ে আমাকে বলে নাই। গেঞ্জি দিয়ে মাথা ঢেকে বাসায় আসছিল। বাসায় চুপ করে শুয়ে ছিল। সন্ধ্যার সময় ছোট ছেলে বলল, “মা ওর চোখে গুলি লাগছে।” সাকিব তখনো স্বীকার করে না। বলছিল, মাইর খাইছে। পরে কান্না শুরু করে। বলে, “মা, আমারে মাইরো না, আমার চোখে গুলি লাগছে।” আড়াই–তিন ঘণ্টা ও ঘটনা লুকায় রাখছিল। বাসার কাছে একটা ফার্মেসিতে যখন নিয়া গেলাম, তখন চোখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল।’

সাবিনা জানান, গুলি লাগার কথা শুনে তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে যান। এরপর কাজ করেন এমন এক বাড়িতে ছুটে গিয়ে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বলেন। ওই বাড়ির ছেলে ফার্মেসিতে নিয়ে যেতে বলেন, সেই সঙ্গে সাবধান করেন, ছেলে গুলি খেয়েছে, এটা যেন তিনি না জানান। তাহলে পুলিশ বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাবে।

ফার্মেসিতে গেলে সাকিবের চোখে ওষুধ দিয়ে জরুরিভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। ২১ জুলাই সাকিবকে নিয়ে সাবিনা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যান। সেদিনই সাকিবের চোখে অস্ত্রোপচার হয়। একই হাসপাতালে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার হয় ৪ নভেম্বর। এর ভেতর সাকিব এক মাস ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি ছিল।

সাবিনা জানান, প্রথমবার অস্ত্রোপচারের পর ছেলে একটু একটু দেখত। দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের পর দৃষ্টিশক্তি একেবারেই চলে গেছে। একদিন ছেলে বলল, ‘মা, আমি চোখ যে খুলি, কিছুই তো বুঝি না। সব অন্ধকার লাগে।’ দুই মাস আগে চিকিৎসকেরা জানান, ওর চোখটা রাখা যাবে না। এটার জন্য সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এতে অন্য চোখও খারাপ হয়ে যেতে পারে।

মায়ের ভাষায়, ‘আজকের অপারেশনে চোখটা একবারে উঠায় নিছে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আজ অপারেশনে নিয়ে যাওয়ার সময় মনটা এত খারাপ লাগছিল। যাইতে ইচ্ছা করছিল না। ছেলে বলল, “মা, তুমি আমার সঙ্গে বসে থাকো।”’

চিকিৎসার কাগজপত্রে দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের অনুমতির জায়গায় মায়ের সই। তাতে লেখা, ‘আমি আমার রোগীর অন্ধ ব্যথাযুক্ত অকেজো ডান চোখ তুলিয়া ফেলিতে রাজি আছি। ইহাতে যদি কোনো অসুবিধা হয়, তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকিবে না।’

‘গুলিতে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে’

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, রোগী ও স্বজনদের বোঝানোর জন্য ‘চোখ উঠিয়ে ফেলতে হবে’ বলা হয়। তবে আসলে বিষয়টি চোখ উঠিয়ে ফেলা নয়। আসলে প্রস্থেটিক আই বা কৃত্রিম চোখ বসানো হয়। অস্ত্রোপচারটির নাম ইভিসারেশন। সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখে ইভিসারেশনের মাধ্যমে চোখটির ভেতরের সবকিছু পরিষ্কার করে একটি সিলিকন বল বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর চোখের মাপের কৃত্রিম চোখ, পাথরের চোখ বসিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে থেকে বোঝা যায় না যে চোখে কোনো সমস্যা আছে। রোগী এতে মানসিকভাবে স্বস্তি বোধ করে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক খায়ের আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শটগানের গুলিতে সাকিবের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি চলে গেছে। চিকিৎসার ভাষায় সাকিবের চোখের অবস্থা ছিল, ‘পেইনফুল ব্লাইন্ড আই’ (অন্ধ ব্যথাযুক্ত চোখ)। চোখটি ছোট হয়ে গেছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতর পরিষ্কার করে কৃত্রিম চোখ স্থাপন করা হয়েছে।

খায়ের আহমেদ চৌধুরী আরও জানান, আন্দোলনের সময়ে চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন ১২১ জন এখন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি আছে। সবাই বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে।

সাকিব শুরু থেকেই হাসপাতালের রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কৌশিক চৌধুরীর চিকিৎসাধীন। কৌশিক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সাকিবের ডান চোখের কার্যকারিতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে প্রস্থেটিক আই স্থাপন করা হয়েছে। এখন আর পাথরের চোখ বসানো হয় না। প্রস্থেটিক আই প্লাস্টিক জাতীয় এবং ব্যয়বহুল। এটাতে কোনো সংক্রমণ হয় না।

সাকিবের মা জানান, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে দুই লাখ টাকা এবং জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন। ছেলের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে না। তবে ছেলের এক চোখ অকার্যকর হওয়ায় একধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগেন। নিজের ভেতর যত ঝড়ই হোক ছেলেকে বারবার বলেন, ‘বাবা পড়াশোনাটা কইরো।’ ছেলেও বলছে, সে সুস্থ হয়ে আবার স্কুলে ভর্তি হবে।

হাসপাতালে ছেলের শয্যাপাশে মা সাবিনা ইয়াসমিন। আজ রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে
হাসপাতালে ছেলের শয্যাপাশে মা সাবিনা ইয়াসমিন। আজ রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। ছবি: নাজনীন আখতার

এ জীবন দিয়ে আমি কী করব, আমার একটি সন্তানই ছিল: উত্তর মেসিডোনিয়ায় আগুনে সন্তানহারা বাবার আহাজারি

উত্তর মেসিডোনিয়ায় নৈশ ক্লাবে আগুনে হতাহত ব্যক্তিদের শুরুতেই যে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তার বাইরে আহাজারি করছিলেন দ্রাগি স্টোজানোভ। আগুনে একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন এই বাবা।

স্টোজানোভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে সবার সামনে বলতে দিন, আমার ছবি তুলুন। আমি একজন মৃত মানুষ, আমি সবকিছু হারিয়েছি...পুরো ইউরোপের জানা দরকার। দুঃখজনক এই ঘটনার পর, এ জীবন দিয়ে আমি কী করব? আমি এ জীবন চাই না। আমার একটি সন্তানই ছিল এবং আমি তাঁকে হারিয়ে ফেলেছি।’

স্থানীয় সময় গত শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ নর্থ মেসিডোনিয়ায় দ্য পালস ক্লাব নামে একটি নৈশ ক্লাবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৫৯ জন নিহত এবং আরও ১৫৫ জন আহত হয়েছেন।

সেই রাতে বোনকে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছিলেন মারিজা তাসেভা। দুবোন মিলে গিয়েছিলেন কোচানির ওই নৈশ ক্লাবে, দেশটির জনপ্রিয় হিপ হপ ব্যান্ড ডিএনকের গান শুনতে।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ১৯ বছর বয়সী তাসেভা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘সবাই চিৎকার শুরু করে এবং বলতে থাকে, বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও।’

আগুন থেকে বাঁচতে লোকজন পাগলের মতো বেরিয়ে যাওয়ার দরজার দিকে ছুটতে থাকে। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার একটি মাত্র পথ ছিল এবং সেখানে প্রায় ৫০০ মানুষ ছিল। নৈশ ক্লাবের পেছন দিকে আরেকটি দরজা থাকলেও সেটি তালাবদ্ধ ছিল।

তাসেভা বলেন, ‘আমি জানি না কীভাবে, কিন্তু আমি মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম, আমি উঠতে পারছিলাম না এবং সেই সময় লোকজন আমাকে পদদলিত করে চলে যেতে থাকে।’

তবে শেষ পর্যন্ত প্রাণ নিয়ে সেখান থেকে বের হতে পেরেছেন তাসেভা, কিন্তু তাঁর বোন পারেনি।

তাসেভা বলেন, ‘আমার বোন মারা গেছে। আমি বেঁচে গেছি, সে পারেনি।’

এ ঘটনার জন্য দায়ী সন্দেহে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেসব মন্ত্রণালয় থেকে ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানকার কর্মকর্তাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দ্য পালস ক্লাবে শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে (রোববার ০১:৩০ জিএমটি) আগুনের সূত্রপাত হয়।

রাজধানী থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের শহর কোচানিতে নৈশ ক্লাবটি অবস্থিত। নৈশ ক্লাব হিসেবে পরিচালনার জন্য সেটির নিবন্ধন ছিল না। আগে এটি কার্পেট রাখার গুদাম ছিল।

ওই নৈশ ক্লাব পরিচালনার সঙ্গে ঘুষ প্রদান এবং দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

কোচানি হাসপাতালের প্রধান ক্রিস্টিনা সেরাফিমোভস্কা সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে বের হওয়ার সময় পদদলিত হয়ে বেশির ভাগ মানুষ মারা গেছেন।’

সংবাদ সংস্থা এএফপিকে সেরাফিমোভস্কা বলেছেন, ‘৭০ জন রোগী পোড়া ক্ষত এবং কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।’

হাসপাতালের বাইরে থাকা রেডক্রসের স্বেচ্ছাসেবক মোস্তফা সাইদভ বলেছেন, যারা মারা গেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ।

সাইদভ আরও বলেন, ভেতরে যেখানে মৃতদেহ শনাক্ত করা চলছে, সেখানে পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ। সেখানে যেসব বাবা-মা এসেছেন, তাঁদের বয়সও কম, তাঁরা চল্লিশের কোঠায়। তাঁদের সন্তানদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। পরিস্থিতি নিষ্ঠুর, বিশৃঙ্খল, গল্পগুলো খুবই বেদনাদায়ক এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন।’

কেউ কেউ নিজেদের সন্তানদের খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন এক ব্যক্তি। আগুনে ওই ব্যক্তির এক স্বজন আহত হয়েছেন।

হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের খবর পেতে হাসপাতালের বাইরে ভিড় করছেন। অনেককে ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছে, কেউ কেউ জবাব খুঁজছেন।

উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রেসিডেন্ট গোরদানা সিলজানভস্কা-দাভকোভা বলেছেন, এ ঘটনার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এবার যাঁরা জড়িত, তাঁদের কেউ বিচার এড়াতে পারবেন না।

প্রেসিডেন্ট বলেছেন, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু হয় না, বিশেষ করে তরুণ প্রাণের।

গুরুতর আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বুলগেরিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া ও তুরস্কের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট গোরদানা।

এ ঘটনায় উত্তর মেসিডোনিয়ায় সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

নর্থ মেসিডোনিয়ায় নৈশ ক্লাবে আগুনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন
নর্থ মেসিডোনিয়ায় নৈশ ক্লাবে আগুনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন। ছবি: রয়টার্স

সিএমএসএমই ঋণ নীতিমালা: ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া সহজ হলো

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া আরও সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) না থাকলেও ছোট উদ্যোক্তাদের পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ জন্য কোনো জামানতও লাগবে না। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তারা যাতে আরও বেশি ঋণ পান, সে জন্যও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কারা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচিত হবেন, সেটিও পরিষ্কার করা হয়েছে। যেসব ব্যাংকের দেশজুড়ে শাখা–উপশাখা নেই, তারা এ ধরনের ঋণ অন্য ব্যাংকের মাধ্যমেও বিতরণ করতে পারবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়েছে।

নতুন এসব বিধান যুক্ত করে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে (সিএমএসএমই) অর্থায়নের নতুন নীতিমালা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নীতিমালা মেনে চলতে হবে। আগামী পাঁচ বছর এই নীতিমালা কার্যকর থাকবে।

নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি এই খাতে প্রতিবছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে ঋণ বাড়াতে হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে ঋণের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দিতে হবে। এর মধ্যে ক্লাস্টার খাতে ঋণের লক্ষ্য ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণ আগের মতোই ১৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। সেবা খাতের ঋণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ ও ব্যবসা খাতে ঋণ ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা সিএমএসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোতে এখন এসএমই ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। তবে পুনঃ অর্থায়ন সুবিধার ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ৭ থেকে ৮ শতাংশ।

* কুটিরশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা পাবেন সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা
* মাইক্রো শিল্প উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা
* ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা পাবেন সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকা
* মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা

টিআইএন না থাকলেও মিলবে ঋণ

বর্তমানে সব ধরনের ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড নিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক। তবে সিএমএসএমই নীতিমালায় বলা হয়েছে, টিআইএন না থাকলেও ঋণ পাবেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা। ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন তাঁরা। নীতিমালা অনুযায়ী, উৎপাদন, সেবা ও ব্যবসা—এই তিন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা, যাঁদের জনবল পারিবারিক সদস্যসহ ১০ জনের বেশি নয়, তাঁরা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ঋণের ক্ষেত্রে এই শ্রেণির উদ্যোক্তাদের টার্নওভারের কোনো শর্ত রাখা হয়নি। তবে তাঁদের জমি ও কারখানা ভবন ব্যতীত প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদের মূল্য পাঁচ লাখ টাকার কম হতে হবে।

কারা কত ঋণ পাবেন

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ১২১ থেকে ৩০০ কর্মী আছেন, এমন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান অথবা এক হাজার কর্মী আছেন, এমন শ্রমঘন শিল্পে এই ঋণ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া মাঝারি শিল্পের মধ্যে সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৭৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া যাবে, যেখানে কর্মীর সংখ্যা ৫১ থেকে ১২০ জন। উৎপাদন খাতের ক্ষেত্রে মাইক্রো শিল্প সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা ২৫ কোটি টাকা ঋণ পাবেন। ট্রেডিং খাতের মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ১০ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র শিল্পের ট্রেডিং ও সেবা খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা ঋণ পাবেন। অন্যদিকে ট্রেডিং খাতের মাইক্রো শিল্পের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা এবং কুটিরশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন।

৩০ দিনে ঋণ

নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতেও ঋণের আবেদন করতে পারবেন সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা। ঋণ আবেদন জমার পর গ্রাহককে তা মোবাইলে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানাতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ঋণ অনুমোদন হলে তা যেমন গ্রাহককে অবহিত করতে হবে, তেমনি অনুমোদন না হলে প্রকৃত কারণসহ গ্রাহককে তা জানাতে হবে। আবেদন অনুমোদন না হলে নতুন করে আবার আবেদন করতে পারবেন গ্রাহকেরা। সিএমএসএমই ঋণের সব তথ্য ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার (লাইভ চ্যাটবট) সুবিধা চালু করতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

নারী উদ্যোক্তা কারা

নীতিমালায় নারী উদ্যোক্তা ও উদ্যোগের সংজ্ঞায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, সিএমএসএমই খাতের কোনো একটি উদ্যোগ নারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে, যদি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশের মালিক নারী হন। যদি ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অথবা সমপর্যায়ের পদে একজন নারী দায়িত্বরত থাকেন বা অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশের মালিক হন। উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্থায়ী জনবলের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ নারী কর্মরত থাকেন।

একজন ছোট ব্যবসায়ী পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন
একজন ছোট ব্যবসায়ী পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন। ফাইল ছবি

বিবিসি’র বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কে বাঁক পরিবর্তন, অস্বস্তিতে ভারত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় ঘটনার মধ্যদিয়ে গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাসিনার আমলে ক্রমবর্ধমান দূরে সরে যাওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে বর্তমান সময়ে সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। কয়েক দশক স্থবির থাকা সম্পর্ক নতুন করে ঢাকা-ইসলামাদের সরাসরি বাণিজ্য শুরু হওয়া দুই দেশের ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরির একটা উজ্জ্বল প্রমাণ। তবে এতে অস্বস্তিতে পড়েছে ভারত। ঢাকা-ইসলামাদ সম্পর্কের বাঁক পরিবর্তনের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখছে দিল্লি। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, কয়েক দশকের অস্থির সম্পর্কের পর গত মাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি বাণিজ্য শুরু করেছে ঢাকা-ইসলামাবাদ। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের কাছ থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানি করেছে ঢাকা। এ ছাড়া সরাসরি বিমান এবং সামরিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দুই দেশ। ভিসা জটিলতা সহজ করে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির খবরও পাওয়া গেছে।

ভারতের মাধ্যমে পৃথক হওয়া দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বেদনাদায়ক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে তাদের মধ্যে ছিল শত্রুতা। তৎকালীন বাংলাদেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ইসলামাবাদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেতে সংগ্রাম শুরু করে এখানকার মানুষ। নয় মাসব্যাপী যুদ্ধের সময় বাঙালিদের সমর্থন করেছিল ভারত। স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশটির প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। সেই সময়ের ক্ষত দিন দিন গভীর হলেও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল বেশ আন্তরিক। সে সময় বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল বিএনপি ও জামায়াত। তবে এই মোড় ঘুরে যায় ২০০৯ সালে, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন। হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে দিল্লির প্রতি সমর্থন দৃঢ় হয়। পক্ষান্তরে পাকিস্তানকে দূরে ঠেলে দেন হাসিনা। তবে গত বছরের আকস্মিক গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা যখন ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তখন ঢাকা-ইসলামাবাদের সম্পর্কের বরফ ক্রমশ গলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেছেন, গত ১৫ বছর বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক কিছুটা কঠিন ছিল। তবে বর্তমানে সম্পর্কটা প্রতিবেশীর মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে বলে মনে করেন তিনি। এসব ঘটনাবলী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। যেহেতু তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক রয়েছে।
হাসিনার পতনের পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা বেড়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন হাসিনা। তাকে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশের দাবির কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি ভারত। এ ছাড়া সকল অভিযোগও অস্বীকার করেছেন হাসিনা।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ  মনে করছেন, ঢাকা এবং ইসলামাবাদের মধ্যকার সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা একধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ। লন্ডনের কিংস কলেজের সিনিয়র ফেলো আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতের আধিপত্যকে সজোরে আঘাত করতে চায়। এই সম্পর্কের আরেকটি কৌশলগত দিক হচ্ছে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিকবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কও রয়েছে। বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা জানুয়ারিতে পাকিস্তান সফর করেছেন। বিরল ওই সফরে তারা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফেব্রুয়ারিতে করাচি উপকূলে পাকিস্তান আয়োজিত একটি বহুজাতিক মহড়ায় বাংলাদেশের নৌবাহিনী অংশ নেয়।

বিবিসি বলছে, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন বীণা সিক্রি। ঢাকা ও ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে ‘দেজা ভ্যু মোমেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। বলেছেন, তার দায়িত্বপালনকালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একাংশের সহায়তায় ভারতীয় বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেছিল ভারত।  সেসময় বাংলাদেশকে এ বিষয়ে প্রমাণও দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। যদিও ভারতের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান। বিবিসি’র খবরে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অনুপ্রবেশ অনেকটা সহজ। কিন্তু ২০০৯ সালে হাসিনার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারা গোষ্ঠীগুলোর ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং তাদের ঘাঁটি ভেঙে দেয়। সুতরাং বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়া ভারতের জন্য বেশ উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন বীণা সিক্রি। তিনি যোগ করেন, এটি কেবল সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়।  কেননা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইসলামাবাদকে সমর্থনকারী জামায়াতে ইসলামীর মতো বাংলাদেশি ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে।

ভারতীয় মিডিয়ার খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঢাকা সফর করেছেন। তবে ওই প্রতিবেদনের খবর সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ড. ইউনূসের প্রেস সচিব। ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে পুনরায় সচল করতে পাকিস্তান সহায়তা করছে বলে মিডিয়া যে প্রতিবেদন করেছে তা ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশে আইএসআই-এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে বিবিসি’র প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশি রাজনীতিবিদরা এ বিষয়টি জানেন যে, অর্থনৈতিক ও ভাষাগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ঢাকা ভারত-বিরোধী অবস্থান নিতে পারে না। দিল্লির আশঙ্কা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা যুক্তি দেন যে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের বিষয়টি মীমাংসা না হলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যাবে না। যুদ্ধে লাখ লাখ বাঙালি নিহত হয় এবং ধর্ষণের শিকার হয় লাখো নারী। পরে ৯০ হাজারের বেশি পাকিস্তানি নিরাপত্তা ও বেসামরিক কর্মী ভারতীয় ও বাংলাদেশি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শেষ হয় যুদ্ধ। এ বিষয়টি ইসলামাবাদ নিজেদের জন্য অপমানজনক হিসেবে দেখে। যুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ইসলামাবাদ তা করতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের জন্য পাকিস্তানের দায় স্বীকার করা উচিত। আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ১৯৭১ সালের আগের সম্পদের বিভাজনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি। এমনকি ইকরাম সেহগালের মতো সাবেক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, পাকিস্তানিদের ১৯৭১ সালে যা ঘটেছিল তার জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত এবং এটাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই মেজর জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের উচিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় উর্দুভাষীদের ওপর বাঙালিদের আক্রমণের বিষয়টিও সমাধান করা। করাচিতে বসবাসকারী সাবেক এই পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা বলেন, (পূর্ব পাকিস্তানে) উর্দুভাষী বিহারি জনগণের ওপর যে নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছিল তার সাক্ষী ছিলাম আমি। যদিও ইতিহাস ঢাকা এবং ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলেছে, তারপরও অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, দেশ দুটি প্রথমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উন্নত করার দিকে মনোনিবেশ করতে পারে, যার পরিমাণ বর্তমানে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের কম। আর এই বাণিজ্যের বেশির ভাগই পাকিস্তানের পক্ষে।

ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক সাবরিন বেগ বলেন, পাকিস্তানের ২৫ কোটির বেশি জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বাজার। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে উভয় পক্ষেরই উচ্চ শুল্কসহ আরও বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা ভিসা ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে উন্নত দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এসব সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনবে বলে মনে করেন তিনি। আগামী এপ্রিলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় এ বিষয়গুলো আলোচনা হতে পারে। এ বছরের শেষেই বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের জন্য বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকারে ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে যাই ঘটুক না কেন, এতে দিল্লির জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি। কেননা, তারা মনে করে যে, ভারতের উত্তর-পূর্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় দিল্লি।

mzamin

তাইনে আমরার হামজা

হামজা চৌধুরী। হবিগঞ্জের সন্তান। বৃহত্তর সিলেটের তরুণ তুর্কি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে লেস্টার সিটির হয়ে খেলার সময় নজর কাড়েন ফুটবল দুনিয়ার। বৃটেনের বাঙালি কমিউনিটিতে তাকে ঘিরে তৈরি হয় উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা। এই উচ্ছ্বাস আর উম্মাদনার ঢেউ সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসে  পৌঁছেছে হামজার পিতৃভূমিতে। দেশের ফুটবলের হয়ে লড়তে এই তরুণ ছুটে এসেছেন দেশে। লন্ডন থেকে সরাসরি সিলেটে পৌঁছে ছুটে যান হবিগঞ্জের বাহুবলে। বিমানবন্দর থেকে বাহুবল, সর্বত্র তাকে ঘিরে অন্য এক উন্মাদনা, উচ্ছ্বাস। ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসায় সিক্ত হামজা খুব বেশি কথা বলার সুযোগ পাননি। তবে  দেশের হয়ে খেলে জয়ী হওয়ার আবেগময় বার্তা দিয়েছেন নিজের ভাষায়।

লেস্টার সিটি ছেড়ে হামজা এখন শেফিল্ডে। খেলছেন নিয়মিত। ক্লাবের অন্যতম তারকা তিনি। সবার নজর তার দিকে। সেই হামজা এবার খেলবেন বাংলাদেশের হয়ে। লাল-সবুজের জার্সিতে। আগামী মঙ্গলবার ভারতের বিপক্ষে হবে তার অভিষেক।

সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত দু’টায় বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ম্যানচেস্টার থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন হামজা। স্মরণীয় এ সফরে তার সঙ্গী মা, স্ত্রী ও সন্তানেরা। বাংলাদেশে ১১.৪০ মিনিটে হামজাকে বহনকারী বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এর আগেই সিলেটে হামজাকে রিসিভ করতে আসা বাফুফের এক কর্মকর্তা বলেন, এতটা আশাবাদী ছিলাম না আমরা। হামজা আসবে। দেশের কথা শুনলেই অনেকেই চোখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু হামজা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। দেশকেই দিলেন প্রাধান্য। নাগরিকত্ব জটিলতা কাটিয়ে হামজা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের একজন। এখন তিনি বাংলাদেশ ফুটবলের মহাতারকা। ছোটবেলায় পিতা মোর্শেদ দেওয়ান চৌধুরীর সঙ্গে দেশে এসেছিলেন। এবার এলেন বহুদিন পর। তারকা হয়ে। বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে তার এই আসা। সিলেট বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সিঁড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই ভিড়ে চিঁড়েচ্যাপটা হওয়ার জোগাড় হামজা চৌধুরীর। বাফুফে কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর উৎসুকদের ফাঁক গলে যখন সামনে এলেন, চোখের সামনে শত শত ক্যামেরা, মুঠোফোন আর মানুষের ভিড়। সবাই হামজার কাছ থেকে কিছু শুনতে চান। কিন্তু হামজা শোনাবেন কী, চারপাশের শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। কে কী বলছে, বোঝা ভার। মিনিট তিনেক ধরে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেন হামজার আশপাশে থাকা কয়েকজন। হামজার দেশে ফেরা নিয়ে গত কয়েকদিন দেশের ফুটবলে আলোড়ন উঠলেও বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনের কোনো ব্যবস্থা করেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি প্রচুর ইউটিউবার ক্যামেরা হাতে বিমানবন্দরে হাজির হন। হামজাকে অভিনন্দন জানানো ব্যানার নিয়ে হাজির হওয়া সমর্থকেরাও জড়ো হন একই জায়গায়। সব মিলিয়ে বিমানবন্দরের ভিআইপি প্রবেশপথের সামনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। হামজার বাংলাদেশ দলে অভিষেক হওয়ার কথা রয়েছে আগামী মঙ্গলবার এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রথমে হট্টগোলের কারণে বুঝতেই পারেননি হামজা। নিজেই পাল্টা জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি বুঝছি না, বুঝছি না।, এরপর আবার বুঝিয়ে বললে হামজা বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা উইন খরমু। আমার বড় স্বপ্ন আছে। কোচ হাভিয়েরের সঙ্গে কাজ করবো। ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা উইন করিয়া প্রোগ্রেস করতে পারমু।’ এরপর আরও প্রশ্নের উত্তর দিতে চেয়েছিলেন হামজা।

তবে বাফুফে কর্মকর্তারা তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। সিলেট বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হবিগঞ্জের দিকে রওনা দেন হামজা। একফাঁকে বেরিয়ে আসেন হামজার পিতা বাহুবলের স্নানঘাটের সন্তান মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। সাংবাদিকের কাছে অনুভুতি জানাতে গিয়ে বলেন; হামজা দেশকে ভালোবাসে। সে ফুটবলের উন্নতি চায়। এর এই ভালোবাসা থেকে তার দেশে আসা। এজন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়াও চান। হামজার সঙ্গে এবার দেশে এসেছেন তার পরিবারের প্রায় সবাই। স্ত্রী -সন্তানও। ছাদখোলা জিপে করে এয়ারপোর্টের ভিআইপি’র সামনে থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন হামজা চৌধুরী। তখনও উৎসব চলছিল বাইরে। হামজা সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে হাসি দিয়ে রওয়ানা দিলেন হবিগঞ্জের পথে। হামজা গতকাল বিকাল ৩ টায় বাহুবলের নিভৃত জনপদ স্নানঘাট গ্রামে প্রবেশ করেন।  সেহ্‌রির খাওয়ার পর থেকেই মূলত দু’-একজন করে লোক আসতে শুরু করে হামজা চৌধুরীদের গ্রামের বাড়িতে। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইট-সিমেন্টের প্রাচীরে ঘেরা বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সেখানে নারী, শিশুসহ সব বয়সী মানুষ ছিলেন। সবাই উদগ্রীব; কখন দেখা মিলবে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো সেই টগবটে তরুণ তুর্কির। এক সময় প্রহর গুনা শেষ হয়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তিনি বাড়িতে প্রবেশ করেন বাড়িতে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তাকে এক নজর দেখার জন্য। একপর্যায়ে জনমানুষের এ স্রোত স্বেচ্ছাসেবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন আর সামাল দিতে পারলেন না। এ অবস্থায়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ভক্ত, অনুরাগী, পাড়া-প্রতিবেশী, স্বজন-পরিজনরা ফুলের তোড়া দিয়ে এবং ফুল ছিটিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। এ সময় ‘হামজা’ ‘হামজা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। হামজা চৌধুরী তখন ‘আই প্রাউড’, ‘ইমেজিং’ ইত্যাদি ইংরেজি শব্দ বলে সমবেত লোকজনের ভালোবাসার জবাব দেন।
বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে তার জন্য বাড়ির উঠানে স্থাপিত অস্থায়ী মঞ্চে কথা বলার জন্য তাকে তোলা হয়। এ সময় ‘হামজা’ ‘হামজা’ স্লোগান দিতে দিতে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল আছড়ে পড়ে ছোট্ট মঞ্চের উপর। আয়োজকরা এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকেন। এ সময় লোকজনকে আশপাশের বাড়িঘরের ছাদ, চাল ও গাছের ডালে ঝুলে উঁকি দিয়ে হামজা চৌধুরীকে দেখার চেষ্টা করেন। সব বাধা ঢেলে বিপুলসংখ্যক মানুষ মঞ্চের উপর উঠে পড়লে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। এ অবস্থায় মাইক্রোফোনের কাছে গিয়ে হামজা চৌধুরী সবার উদ্দেশ্যে কথা বলেন, ‘আস্‌সালামুআলাইকুম, আমার খুব ভালা লাগছে, আপনারা হকলে আইছন আমারে দেখার লাগি।’ এককথা বলে তিনি ‘বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় সমবেত লোকজনও তার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানে স্লোগানে দেশপ্রেমের আবহ তৈরি করেন। একপর্যায়ে সবাইকে ইংরেজিতে অভিবাদন জানিয়ে তার ও বাংলাদেশ ফুটবল দলের ভারত জয়ের জন্য দোয়া চেয়ে কথা বলা শেষ করেন। এ সময় সমবেত লোকজন ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
এর আগে হামজা চৌধুরীকে বহনকারী গাড়িবহর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী বাজারে পৌঁছলে সেখান থেকে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে স্থানীয় লোকজন হাত উঁচিয়ে এবং ফুল ছিটিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। এ সময় তিনিও হুডখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে স্থানীয় লোকজনকে জবাব দেন।

mzamin

হাতে বেশি সময় নেই, ডিসেম্বরে- নির্বাচন

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবে পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে গড়ে তুলতে কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের এই দিকনির্দেশনা দেন তিনি।

নির্বাচন প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে খুব বেশি সময় নাই, আমরা অলরেডি সাত মাস পার করে এসেছি। আমরা তো বলেছি- ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে যা আমরা করতে চাই, যা করার সামর্থ্য আছে, এগুলো করে ফেলা। যত সংস্কার করার দরকার আছে করে ফেলা। কারও জন্য অপেক্ষা করে আমাদের কোনো ফায়দা হবে না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ এবং রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ফারজানা ইসলাম।

কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আইন হলো আমাদের সবার আশ্রয়। পুলিশ হলো সেই আশ্রয়দাতা। পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আইন আপনাকে সুরক্ষা দেবে। এই ইমেজ যদি প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, অতীতের সব কথা মানুষ ভুলে যাবে।
তিনি বলেন, সরকার যাই কিছু করতে চায় না কেন, যে ভঙ্গিতেই করতে চায় না কেন, শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতেই বাস্তবায়ন করতে হয়। তারা করে দেবে না, তারা পরিবেশটা সৃষ্টি করে। ওই পরিবেশ না থাকলে তাহলে কোনো কাজই হয় না। তিনি বলেন, পুলিশকে অবহেলা করে বা পাশ কাটিয়ে দেশ গড়তে পারবো না। তারাই সম্মুখসারির মানুষ। তারা ক্ষেত্র প্রস্তুত করলেই তখন বাকি জিনিসগুলো হয়।

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পুলিশের কথা প্রসঙ্গে দুটি শব্দ বারবারই আমরা বলেছি, তা হলো আইন ও শৃঙ্খলা। এটিই হলো পুলিশ। আইন যদি না থাকে তাহলে সরকার কি, গণতন্ত্র কি, অধিকার কি, মানুষ-নাগরিক কি কিছুই থাকে না। আইনশৃঙ্খলা ঠিক না থাকলে যত বড় চিন্তা থাকুক, যত টাকা ঢালুক, কোনো কাজে আসবে না। পুলিশ সদস্যরা যেসব সমস্যার কথা বলেছেন, সেসব নিয়ে বৈঠক করবেন জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সমাধান করতে পারবো কি না-জানি না। কিছু কিছু জিনিস সমাধান করা অনেক কঠিন হয়ে যায়, কিন্তু চেষ্টা করবো যে-কী করা যায়। যদি ব্যর্থ হই, তবে মনে করবেন-আমি চেষ্টা করেছিলাম, ব্যর্থ হয়েছি। চেষ্টার অভাবে ব্যর্থ হইনি।

তিনি বলেন, যাদের হাতে পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্ব, দেশকে তৈরি করার দায়িত্ব, তাদের তৈরি করতে না পারলে বাকি কাজ হলো না। সেই জন্য আমরা অগ্রাধিকার দিতে চাই, যেটা আমরা পারি।

বাংলাদেশ একটা মস্ত বড় সম্ভাবনার দেশ মন্তব্য করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ব্যক্তি হিসেবে এটা অনুভব করি। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে আনতে পারছি না, ঠেকে যাচ্ছে। আজকে আমরা সুযোগ পেয়েছি, মস্ত বড় সুযোগ সেই সম্ভাবনাকে কাজে পরিণত করা। জুলাইয়ে অভ্যুত্থানের ফলে সেই সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সম্ভাবনার যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেটাকে যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। যেটুকু সময় আমাদের আছে, চেষ্টা করি। ভবিষ্যতেও যারা আসবে তারা চেষ্টা করবে, পথটা যেন আমরা সৃষ্টি করে দিই। এই পথে আমরা এগোলে সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে পরিণত হবে।
সরকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর যে সমস্ত অগ্রগামী দেশ, যারা পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেয়-তাদের মধ্যে একটি হতে পারে। সেরকম সম্ভাবনা আছে। এটা কোনো আত্মতুষ্টির জন্য না। একটু বিচার করলেই মনে হয়, হ্যাঁ, এরকম সম্ভাবনা আছে।

ড. ইউনূস আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থান হলো, বিরাট একটা কাণ্ড। ইতিহাসের বিরাট একটা পরিবর্তন সূচিত হলো। লণ্ডভণ্ড অবস্থার মধ্যে আমরা এই যাত্রা শুরু করলাম। সারা দুনিয়ার যত দেশ আছে, সবাই আমাদের সমর্থন করলো। শুধু মিনমিনে সমর্থন না, উৎসাহ সহকারে এগিয়ে এলো। তারা মনে করেছে, এই দেশ যদি উঠে দাঁড়াতে পারে, সেটা সবার ভালো সঙ্গী হবে। তারা আমাদের ওপর যেরকম ভরসা করেছে, আমরা আমাদের ওপর সেরকম ভরসা আনতে চাই। নতুন করে যে যাত্রা শুরু হলো, এটা মস্ত বড় সুযোগ। এই সুযোগটা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আইন যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারি, শৃঙ্খলা যদি প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে যেকোনো যুদ্ধ জয় সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশ বলি, এটা কথার কথা না; নতুন বাংলাদেশ বলি এই কারণে যে, পুরনো বাংলাদেশ অন্ধকার যুগ আমাদের। ভয়ঙ্কর। সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলো থেকে আমরা সুন্দর, ঝলমলে দিনে আসতে চাই। সেটাই নতুন বাংলাদেশ।
ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ টেনে বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ইউনূস বলেন, পুলিশ বাহিনীর মুশকিল হলো, ওই অন্ধকার যুগে তারা অ্যাকটিভ পার্টিসিপ্যান্ট ছিল। নিজের ইচ্ছায় না, সরকারি কাজ করতে হয়। কাজেই ‘আমরা কাজ করেছি, আমরা হুকুম পেয়েছি, করেছি; করতে করতে আমরাও ওরকম চিন্তার ওপর গেছি’। কাজেই নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি করার জন্য তোমাদের ওই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে, আমরা নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি করবো।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অনেক দোষ দেয়। আমরা দেখিয়ে দেবো, আমরা মানুষ খারাপ না। আমরা খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়েছিলাম। আমরা সেই খারাপ মানুষ থেকে বেরিয়ে এসেছি। ভালো মানুষ আমরা। আমরা দেখবো, কী করতে পারি। সেই দৃঢ় চিন্তা মাথার ভেতরে রাখতে হবে। আমরা দেখিয়ে ছাড়বো-আমরা কী করতে পারি। আমাদের কাজের মাধ্যমে দেখাবো-আমাদের হাত দিয়েই নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি হবে।

পুলিশ হবে বন্ধু মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখন পুলিশ দেখলেই মানুষ ভয় পায়, কী সিস্টেমের মধ্যে আটকে ফেলে, একটা ভয়ঙ্কর ক্যারেক্টার। আইন হলো আমাদের সবার আশ্রয়। পুলিশ হলো সেই আশ্রয়দাতা। পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আইন আপনাকে সুরক্ষা দেবে। এই ইমেজ যদি প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, অতীতের সব কথা মানুষ ভুলে যাবে।

জাতীয় ঐক্য গড়তে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা কি শুরু হয়ে গেল?

অনানুষ্ঠানিক আলোচনা-পর্ব কি শুরু হয়ে গেল? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। সংস্কার কার্যক্রম চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত এক সপ্তাহে ভিন্ন ভিন্ন দিনে এ বৈঠকগুলো হয়েছে।

কমিশনের সহ-সভাপতি প্রফেসর আলী রীয়াজ ও সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার ইতিমধ্যেই দফায় দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনায় তারা মূলত বুঝতে চেয়েছেন যে, সংস্কার কমিশনসমূহের কোন্‌ কোন্‌ সুপারিশ নিয়ে বড় দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া সংস্কারের বিষয়ে দলগুলোর সামগ্রিক মনোভাব জানা এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য কমিশন তথা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর লক্ষ্যেই এসব অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, নাগরিক ঐক্য, এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে।

এ বিষয়ে ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার মানবজমিনকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ সামগ্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। কিন্তু সংস্কার কার্যক্রমকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও শক্তিসমূহের আনুষ্ঠানিক আলোচনা পর্ব আগামী ২/৩ দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে।

mzamin

তামান্নার বেপরোয়া জীবন by জালাল রুমি

চট্টগ্রাম নগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. সাজ্জাদ ওরফে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের পরপরই ফেসবুক লাইভ করে আলোচনায় আসেন স্ত্রী তামান্না শারমিন। দেখান ‘টাকার গরম’। পাশাপাশি দেন হুমকিও। যারা তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং করতে সহযোগিতা করেছে তাদের দেখে নিবেন বলেও জানিয়েছেন এই লাইভে। বেশ ফুরফুরে মেজাজে ও নানা অঙ্গভঙ্গিতে লাইভে তিনি সমালোচনাকারীদের জন্য ‘এক বালতি সমবেদনা’ জানিয়েছেন। আর স্বামীর ‘সাপোর্টারদের’ জন্য চেয়েছেন দোয়া। বলেছেন, ‘খেলা যারা শুরু করেছে এখন তাদের পালানোর দিন। খেলাটা তারা শেষ করবেন। আর টাকার বান্ডিল ছিটিয়ে ১৪ দিনে স্বামীকে তিনি জামিন করিয়ে নিয়ে আসবেন।’ তার সেই লাইভ দেশ জুড়ে ভাইরাল হয় মুহূর্তেই। গণমাধ্যমেও তামান্না শারমিনকে সাজ্জাদের স্ত্রী হিসেবে ব্যাপক প্রচার করা হয়। তবে মানবজমিনকে একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছেন, তামান্না শারমিন সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি সাজ্জাদের স্ত্রী নন। তার সঙ্গে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ে হওয়ার কোনো নথি নেই তাদের কাছে। তবে আরেকটি সূত্র বলছে, তাদের বিয়ে হয়েছে ঠিকই। তবে দেশের আইনকানুন মেনে হয়নি। এ জন্য তাদের কাছে বৈবাহিক জীবনের কোনো ডকুমেন্টস নেই।

কে এই তামান্না শারমিন?
তামান্না শারমিনের পুরো নাম তামান্না আহমেদ। তিনি  চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের ডানহাত হিসেবে পরিচিত অমিত মুহুরীর বান্ধবী  ছিলেন। ২০১৯ সালের ৩০শে মে অমিত মুহুরী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আরেক আসামির ইটের আঘাতে নিহত হন। কুমিল্লার একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে থাকার পর জোড়া খুন মামলার আসামি অমিত ২০১৭ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন। জানা গেছে, অমিতের সঙ্গে তামান্নার দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তামান্না শারমিন এমইএস কলেজে পড়াকালীন নিজেও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় থেকেই অমিত মুহুরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তামান্না।

তামান্না শারমিনের বিরুদ্ধে আছে বিস্তর অভিযোগ। একেকবার একেক যুবককে কথিত বিয়ে করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বিয়ের পর ওই যুবকদের কাছ থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে সটকে পড়তেন তামান্না। সাজ্জাদও তার তেমনই এক স্বামী। বর্তমানেও তামান্নার আগের ঘরের এক সন্তান রয়েছে। তাকে অনেকে ‘লেডি ডন’ হিসেবে চিনে। বোয়ালখালীর মেয়ে তামান্না ছেলেদের মোটরসাইকেল চালানো ও কথাবার্তায় কঠোরতার জন্য লেডি ডন পরিচিতি পান।

বেপরোয়া ও বিলাসী জীবনযাপন করেন তামান্না ও সাজ্জাদ: তামান্না শারমিন ও সাজ্জাদ দু’জনই বেপরোয়া জীবনযাপন করেন। চালান একাধিক ফেসবুক পেইজ, আইডি, টিকটক অ্যাকাউন্ট। নিয়মিত টিকটক করে আলোচনায় থাকেন তামান্না শারমিন। এ ছাড়াও সাজ্জাদও তার আইডি ও ‘অল ইটস হোপ’ নামে একটি ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন হরহামেশা। মূলত সাজ্জাদ বিএনপি ও ছাত্রদলকেন্দ্রিক পোস্ট এবং নিউজ শেয়ার করে বিএনপি’র প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানান দেয়ার চেষ্টা করেন। শরীরে ট্যাটু লাগানো, রকেট, স্টাইলিশ প্যান্ট ও জুতাই বলে দেয় সাজ্জাদ বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত। একই হাল তার স্ত্রী পরিচয় দেয়া তামান্নারও। চুলে রঙ করে নিয়মিত টিকটকে হাজির হন সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী। সমপ্রতি পুলিশের কাজকেও সহজ করে দেয় তামান্না। তামান্নার একটি ভিডিও টিকটকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের হাতে আসে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সেই সূত্র ধরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

দুজনই ধূর্ত প্রকৃতির: সাজ্জাদের অপরাধ প্রবণতা যেন মিলে গেছে তামান্না শারমিনের সঙ্গে। তার চেয়ে কম যায় না শারমিনও। গত ২৮শে জানুয়ারি রাত ১০টা ৩৯ মিনিটে ফেসবুক লাইভে এসে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানা পুলিশের ওসিকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় পেটানোর হুমকি দেন সাজ্জাদ। একইভাবে সাজ্জাদকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তারকারীদেরও দেখে নেয়ার হুমকি দেন শারমিন। বলেন, ‘এতদিন আমরা পালিয়ে ছিলাম, এবার তোমাদের পালানোর দিন শুরু। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে জামাইকে আমার কাছে নিয়ে আসবো ১৪ দিনের মধ্যে।’

তামান্নার পোস্ট করা ভিডিও থেকেই তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ। ভিডিওতে থাকা একটি গাড়ি শনাক্ত করে বিআরটিএ থেকে মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ। এরপর চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী অক্সিজেন মোড় থেকে রাউজান গিয়েছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। গত ১২ই ডিসেম্বর সাজ্জাদকে ধরতে গিয়ে তামান্না শারমিনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে পুলিশ। পরে ৬ই জানুয়ারি তিনি জামিনে বের হন। এরপর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমান, আরও দুই এসআই ও অন্যান্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তামান্না শারমিন। সেই মামলায় তিনি ওসির বিরুদ্ধে নিজের ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ করেন। এ নিয়ে ফেসবুকে লাইভেও আসেন তিনি। যদিও ভ্রূণ হত্যার কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি।

এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ কোন দলের রাজনীতি করেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। অনেকেই বলেন, তিনি শিবিরের কর্মী। তবে তার ফেসবুকে এ সম্পর্কিত কোনো প্রমাণ মেলেনি। তিনি শুরু থেকে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলালের সঙ্গে তার একাধিক ছবি রয়েছে। বিএনপি’র এই তরুণ নেতার উদ্যোগে আয়োজিত সবক’টি প্রোগ্রামে সাজ্জাদ অংশ নিতেন। তারেক জিয়ার ছবি হাতে নিয়ে সমাবেশে গিয়ে ছবি পোস্ট করেন তিনি। নিয়মিতই ছাত্রদল ও বিএনপি’র সব ছবি, ভিডিও পোস্ট করে প্রচার চালান। তবে  সে আরেক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ খানের  (শিবির সাজ্জাদ) ঘনিষ্ঠ অনুসারী বলে পরিচিত। আলোচিত ‘এইট মার্ডার’র আসামি সাজ্জাদ খান ভারতে পলাতক আছেন।

সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে:
নগরীর পাঁচলাইশ, খুলশী, বায়েজিদ থানা এবং জেলার হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও আশপাশের থানা এলাকাগুলোতে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করতো এই ছোট সাজ্জাদ। কোথাও নতুন ভবন উঠলে হাজির হতো চাঁদার দাবি নিয়ে। এ ছাড়াও কর্ণফুলীর কয়েকটি বালুমহালসহ অন্তত দশটি পয়েন্ট থেকে বিদেশে পলাতক সাজ্জাদকে ভিডিও কলে দেখিয়ে মাসিক হারে চাঁদা আদায় করতো ছোট সাজ্জাদ। চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ারের সঙ্গে তার বিরোধ চলছে। প্রায় সময় তাদের বিরুদ্ধে বিরোধকে ঘিরে ওইসব এলাকায় চলতো গোলাগুলি।  

গেল বছরের ২৯শে আগস্ট নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক এলাকায় আনিস ও মাসুদ কায়সার নামে আওয়ামী লীগের দুজনকে গুলি করে হত্যা করে সাজ্জাদের ক্যাডাররা। ২১শে অক্টোবর চান্দগাঁওয়ে তাহসীন নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে তার বাহিনী। গত বছরের ৫ই ডিসেম্বর গ্রেপ্তার এড়াতে পাঁচতলা ভবন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায় সাজ্জাদ। ওইদিন পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও ছুড়েন সাজ্জাদ। এতে ২ পুলিশ ও ১ সোর্স আহত হন। এ ছাড়াও গত বছরের ১৪ই ডিসেম্বর তৃতীয় লিঙ্গের শিলা ও আরেক নারীকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট করেন সাজ্জাদ। ওই পোস্টে তিনি লিখেন, ‘আমার চোখের সামনে পড়িস না, পড়লে তোদের বাবারা তোদের আর বাঁচাতে পারবে না।’ পোস্টে ওই দুজনের ছবিতে লাল ক্রস চিহ্ন দেন। সেই পোস্টের এক মাস ১৯ দিন পর গত সোমবার সন্ধ্যায় রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ার একটি বাসা থেকে পুলিশ শিলার লাশ উদ্ধার করে। এদিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে হুমকি দিয়ে ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট করতেন সাজ্জাদ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না শারমিনকে ফোন দেয়া হলে তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাকে ক্ষুদেবার্তা দিলেও তিনি উত্তর দেননি।

mzamin

এডিপি: সাত মাসে আগেরবারের চেয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে

চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রথম সাত মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। ওই সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৬৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময় ৮৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা খরচ হয়।

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্যে এ চিত্র পাওয়া গেছে। আজ সোমবার দুপুরে এডিপি বাস্তবায়নের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইএমইডি।

জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের দিক থেকে এবারই গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম টাকা খরচ হয়েছে। গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মাত্র ২৪ দশমিক ২৭ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।

এর আগে জুলাই-ফেব্রুয়ারি হিসাবে কোভিডের বছরে (২০২০-২১ অর্থবছর) ৭২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। পরের দুই বছরের প্রায় ৮২ থেকে ৮৪ হাজার কোটি টাকা করে খরচ হয়েছিল।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন; ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের খুঁজে না পাওয়া—সবকিছুর প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকার এডিপি নেওয়া হয়েছে। অবশ্য এখন তা সংশোধন করে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এর আগে কখনো এডিপি এতটা কাটছাঁট করা হয়নি।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন ১% হয়নি

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুসারে, গত সাত মাসে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন ১ শতাংশও হয়নি। বিভাগের ১৩টি প্রকল্পে ৪ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু গত সাত মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ২০ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন হার দশমিক ৪১ শতাংশ।

সব মিলিয়ে আটটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের বরাদ্দের ১০ শতাংশ খরচ করতে পারেনি। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হলো স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ; জননিরাপত্তা বিভাগ; সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়; পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়; অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ; ভূমি মন্ত্রণালয়; জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম কাজীপাড়া মসজিদ সড়ক। ছবিটি ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের
রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম কাজীপাড়া মসজিদ সড়ক। ছবিটি ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

২০১৪ সালে ছয় মাসের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন আয়োজনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াতের সমঝোতা হয় -সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে তার সোজাসাপ্টা বয়ানে নানামুখী আলোচনা চলছে। সর্বশেষ তিনি কথা বলেছেন ২০১৪ সনের বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে। বলেছেন, ওই নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল ছয় মাসের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের। তার কথায়, আওয়ামী লীগ ওয়াদার বরখেলাপ করেছে। ৩রা মার্চ, ২০২৫ সনে ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন,  '২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমার ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। কারণ তখন সেনাপ্রধান হিসেবে আমার দায়িত্ব কী হওয়া উচিত ছিল—সে বিষয়ে কিছু ব্যক্তি তাদের অন্যায্য ও অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রশ্ন তুলছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা যখন বিএনপির হাতে ছিল (২০০১-২০০৬), তখন প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়স বাড়িয়ে তারা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ব্যবস্থা করে। ২০০৬ সালে তাদের পাঁচ বছরের শাসনামল শেষ হলে সরকার পদত্যাগ করে। তবে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের বিএনপির অভিলাষের অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ ‘লগি-বৈঠার আন্দোলন’ নামে এক ভয়াবহ বিক্ষোভের সূচনা করে। ফলে, একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে যিনি সুপরিচিত ছিলেন—সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে, দায়িত্ব গ্রহণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমেদ, যিনি বয়োবৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অক্ষম ছিলেন। আওয়ামী লীগসহ তাদের অনুসারী দলগুলো ও জাতীয় পার্টি এই নিয়োগ মেনে নিলেও, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দীন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন।

তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উদ্দিন আহমেদের চাপে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হন এবং ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত করেন। এরপর প্রায় দুই বছর বিলম্বিত হয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধানে নির্ধারিত তিন মাসের মেয়াদ লঙ্ঘন করে সেনাসমর্থিত ইয়াজউদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা শেষে ২০০৯ সালের ১০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। সেই নির্বাচনের ফলাফলকে বিজয়ী দল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বলে বর্ণনা করলেও, বিএনপি এটিকে কারসাজিপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করে।

দেশবাসী দেখলো, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের নিয়োগকে প্রভাবিত করতে বিশেষ কৌশল নিয়েছিল। আর পরবর্তীতে ক্ষমতার মসনদে বসে আওয়ামী লীগ পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়।

এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে, যা আওয়ামী লীগকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেয়। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
প্রথমটি প্রকাশ্য: ১৫৪টি আসন আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়ে নেয়।
দ্বিতীয়টি গোপন: কিছু পশ্চিমা দূতাবাসের চাপে, নির্বাচনের ছয় মাসের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতা হয়। তবে, ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা পক্ষ পরবর্তীতে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।

তখন (২০১৪) নির্বাচন পরিচালনা বা প্রতিরোধ সামলাতে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়নি। এরপরও, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সহায়তা করার অভিযোগ এনে বিএনপি সেনাপ্রধানকে দায়ী করে। যদিও কীভাবে সেনাবাহিনী সহায়তা করেছিল, তার সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ বিএনপি কখনো দিতে পারেনি।

সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ও তার সহযোগীরা ২০০৭ সালে যা করেছিলেন, একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে আমি তেমন কিছু করতে রাজি ছিলাম না। আমার ও আমার অধীনস্থ সেনা সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, যতক্ষণ তা কার্যকর রয়েছে। তাহলে কোন যুক্তিতে আমি সেই শপথ ভঙ্গ করতাম?

এক্ষেত্রে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মার্ক আলেকজান্ডার মিলির বক্তব্যের সঙ্গে একমত;
“সেনাপ্রধানের আনুগত্য ব্যক্তিগতভাবে বেগম খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনার প্রতি নয়, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির প্রতিও নয়; বরং তাঁকে অনুগত থাকতে হবে দেশের সংবিধানের প্রতি, যেটি রক্ষার জন্য তিনি শপথ নিয়েছেন।”

যারা সংবিধানকে একটি কাগজের স্তূপ সমতুল্য মনে করেন এবং যখন-তখন সংখ্যাধিক্য বা অস্ত্রের জোরে তা ছুঁড়ে ফেলতে বা পরিবর্তন করতে চান, আমি অন্তত তাদের দলে ছিলাম না। আমি সংবিধানকে জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি পবিত্র চুক্তিনামা হিসেবে দেখেছি।

যদি কোনো রাজনৈতিক দল এটি হীনস্বার্থে সংশোধন করে, তবে সেটি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার দায় ও কর্তব্য বিরোধী দলগুলোর। রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর নয়। সন্তুষ্টচিত্তে সেনাপ্রধানের মেয়াদ আমি সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম এজন্যে যে ক্ষমতা দখলের লোভ আমাকে দায়িত্ববোধের প্রতি মনোযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেনি। দ্বিধাহীনভাবে আজ বলতে পারি, সে সময় আমার হাতে কোনো বিকল্প ছিল না।

আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, নির্বাচনকে ঘিরে যে বিতর্ক, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে রাখতে পেরেছি। আমি মনে করি, নির্বাচনের মতো অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর কখনোই জড়িত হওয়া উচিত নয়।

সংবিধান সংস্কারের জন্য যে জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়েছে, তারা নিশ্চয় সশস্ত্র বাহিনীর মতামত নিয়েছেন। বিশেষ করে বিদেশি আগ্রাসন মোকাবিলা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা—এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা থেকে কীভাবে সরকারকে বিরত রাখা যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেন নির্বাচনের পর পরাজিত দল তাদের ব্যর্থতার দায় সেনাবাহিনীর ওপর চাপাতে না পারে।'

mzamin

ফুটবলের নতুন ইতিহাস রচনায় ইপিএল তারকা হামজা চৌধুরী সিলেটে by ওয়েছ খছরু

হামজা চৌধুরী। হবিগঞ্জের সন্তান। বৃহত্তর সিলেটেরও। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ লেস্টার সিটির হয়ে খেলার সময় নজর কাড়েন সবার। বৃটেনের বাঙালীর কমিউনিটিতে তাকে ঘিরে প্রথমেই শুরু হয় উচ্ছ্বাস। আর এই উচ্ছ্বাসের ঢেউ সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসে লাগে বঙ্গেয় সাগর তীরের দেশ বাংলাদেশে। আর লাগবেই বা না কেনো। কারণ ইপিএল কাঁপানো তরুণ এই তুর্কির বাড়ি বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জে। তখন থেকেই রাতজেগে খেলা দেখা বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীদের চোখ হামজার দিকেই। ইপিএলের হামজার খেলা দেখতে টিভি পর্দায় মুখিয়ে থাকেন সিলেটের শুভাকাঙ্খীরা। লেস্টার সিটি ছেড়ে হামজা এখন শেফিল্ডে। খেলছেন নিয়মিত। ক্লাবের অন্যতম তারকা তিনি। সবার নজর তার দিকে। বাংলাদেশের ফুটবল তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতেই পারে। দেখাটা অস্বাভাবিক নয়। বাফুফে থেকে আন্দাজে ঢিল ছোড়া হয়েছিলো হামজার দিকে। টেস্ট করে দেখা আর কী।

সিলেটে হামজাকে রিসিভ করতে আসা বাফুফের এক কর্মকর্তা জানালেন, এতোটা আশাবাদী ছিলাম না। হামজা আসবে। দেশের কথা শুনলেই অনেকেই চোখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু হামজা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন একটু ভেবে চিন্তে। সেখানে দেশকেই দিলেন প্রাধান্য। নাগরিকত্ব জটিলতা কাটিয়ে হামজা হয়ে উঠেন বাংলাদেশের একজন। এখন তিনি বাংলাদেশ ফুটবলের মহাতারকা। ছোটবেলায় পিতা মোর্শেদ দেওয়ান চৌধুরীর সঙ্গে দেশে এসেছিলেন। এবার এলেন বহুদিন পর। তারকা হয়ে। বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করতে তার এই আসা। তার উদ্দেশ্য আগামী ২৫ শে মার্চ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে লাল সবুজের জার্সি গায়ে জড়ানো।

দিন-ক্ষণ ঠিক হওয়ার পর হামজা চৌধুরীর জন্য সিলেটে কেবল অপেক্ষা। দেখতে দেখতে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৭ই মার্চ ২০২৫। দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে খেলা কোনো বাংলাদেশি বিশেষ করে সিলেটি নিজের দেশের হয়ে খেলতে প্রথম পা রাখেন দেশের মাটিতে। বেলা তখন ১১টা। সিলেট ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর। ওসমানী এয়ারপোর্টের আকাশ তখন রৌদ্রজ্জল। এয়ারপোর্টে সামনে উৎসবের আমেজ। লাল-সবুজের জার্সি গায়ে অনেকেই উপস্থিত। জার্সি গায়ে ব্যান্ড পার্টির তালে তালে নাচছেন তরুণরা। দিনটি তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। রং ছিটানোর দিন। কেউ কেউ রং হাতে নিয়ে উপস্থিত। ছিটাচ্ছেন তরুণদের মধ্যে। অন্য এক আবেগ। সবার চোখ আকাশের দিকে। কিছু একটা খুঁজছেন সবাই। এমন সময় আকাশের গায়ে ভেসে উঠলো ছোট্ট একটি বিমান। কাগুজের তৈরি বিমানের ফ্লাইট যেনো আকাশে উড়ছে। দেখতে দেখতে সেটি কাছে আসছে। বড় হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানের লেটেস্টে ভার্সন ৭৮৭ এর একটি বিমান। লন্ডন থেকে সোজা উড়ে আসছে সিলেটে। ১১ ঘণ্টার জার্নিতে ‘ক্লান্ত’ বিমান যখন ছুলো ওসমানীর মাটি তখন অন্য ধরনের এক অনুভুতি ছুঁয়ে যায় এয়ারপোর্টে।

বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ‘হামজা হামজা’ বলে চিৎকার শুরু করেন তরুণরা। সাংবাদিকরা প্রস্তুত হচ্ছেন। এয়ারপোর্টে ভিড় বেশি। অনেকেই এসেছে একনজর হামজাকে দেখতে। বাফুফে কর্মকর্তা গেলেন ভেতরে। খবর এলো হামজাই এসেছেন। সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হামজাকে নিয়ে আসা হলো ভিআইপি লাউঞ্জে।

খানিক সময় নিয়ে বাফুফে কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ভিআইপি’র ফটক দিয়ে বাইরে বের হলেন হামজা। হাসিমাখা মুখ। সহজ-সরল ভঙ্গি। হাত তুলে অভিবাদন জানালেন। একটু লাজুকতা দেখালেন। তাকে দেখে উপস্থিত থাকা ভক্তরা ‘হামজা’ ‘হামজা’ বলে স্লোগান ধরলেন। ভিড়, ঠেলাঠেলি সবই হচ্ছে। হামজা এসে দাঁড়ালেন মিডিয়ার সামনে। ক্রাউড বেশি থাকায় কথা শুনছিলেন না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বারবারই বলছিলেন- কিছু বুঝছি না। প্রশ্ন শোনার জন্য মাথা এগিয়ে আনেন। প্রশ্ন শুনে বলে উঠেন- ‘ইনশাল্লাহ আমরা উইন খরমু। কোচের সঙ্গে কথা হয়েছে। তার সঙ্গে কাজ করে এগিয়ে যেতে পারবো।’

এর আগে যখন তিনি এয়ারপোর্টের বাইরের দৃশ্য দেখেন তখন বলে উঠেন- আ্যামাজিং, আ্যামাজিং। মাত্র কয়েকটি শব্দে বুঝা গেলো হামজা খুশী। এখন কাজ। কথা শেষ করে ফের ভিআইপিতে ঢুকে গেলেন। ততোক্ষণে বাইরে স্লোগানে আরো ভারী হচ্ছিলো। হামজা, হামজা বলে চিকৎকার করা হচ্ছিলো।

এক ফাঁকে বেরিয়ে আসেন হামজার পিতা হবিগঞ্জের বাহুবলের শ্মসানঘাটের সন্তান মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। সাংবাদিকের কাছে অনুভুতি জানাতে গিয়ে বলেন; হামজা দেশকে ভালোবাসে। সে ফুটবলের উন্নতি চায়। এর এই ভালোবাসা থেকে তার দেশে আসা। এজন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়াও চান। হামজার সঙ্গে এবার দেশে এসেছেন তার পরিবারের প্রায় সবাই। স্ত্রী ও সন্তানও। লাল-সবুজের জার্সি গায়ে অভিষিক্ত হচ্ছেন হামজা চৌধুরী। এটি দেখতেই লন্ডন থেকে একসঙ্গে পরিবারের সবার দেশে আসা। ছাদখোলা জিপে করে এয়ারপোর্টের ভিআইপি’র সামন থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন হামজা চৌধুরী। তখনও উৎসব চলছিলো বাইরে। হামজা সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে হাসি দিয়ে রওয়ানা দিলেন হবিগঞ্জের পথে।

mzamin

‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদের স্ত্রী বললেন, খেলা শুরু হবে এখন

শনিবার রাতে রাজধানী ঢাকার একটি শপিংমল থেকে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে বান্ডিল বান্ডিল  টাকা খরচ করে তাকে কয়েকদিনের মধ্যে জেল থেকে বের করার ঘোষণা দিয়েছেন তার স্ত্রী। ১৭ মামলার আসামি সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তার স্ত্রী টিকটকার তামান্না শারমিন ফেসবুকে একটি ভিডিও বক্তব্য দেন। ভিডিওটি ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।

ভিডিওতে তামান্নাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা কাঁড়ি কাঁড়ি, বান্ডিল বান্ডিল টাকা ছেড়ে আমার জামাইকে নিয়ে আসবো। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের ছাড় দেয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার জামাই গ্রেপ্তার হয়েছে। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মামলা যখন আছে, গ্রেপ্তার হবেই। আপনারা যারা ভাবছেন, আর কোনোদিন বের হবে না, তাদের জন্য এক বালতি সমবেদনা।’ প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এতদিন আমরা পলাতক ছিলাম। এখন তোমাদের পলাতক থাকার পালা শুরু। খেলা শুরু হবে এখন।’

এর আগে শনিবার রাত ১০টার দিকে বসুন্ধরা শপিং মল থেকে সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। গত ৩০শে জানুয়ারি তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। ঠিক তার আগের দিন নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে ফেসবুক লাইভে এসে হুমকি দেন সাজ্জাদ হোসেন। ওসিকে বিবস্ত্র করে পেটানোর হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওসি আরিফ দেশের যে প্রান্তেই থাকেন না কেন, তাকে নগরের অক্সিজেনে ধরে এনে পেটানো হবে। প্রয়োজনে মরে যাবো, কিন্তু হার মানবো না।’ এ ছাড়া পুলিশ কমিশনারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘ওসি আরিফ চাঁদাবাজিসহ আমার সন্তান হত্যায় জড়িত। তাকে যাতে বদলি করা হয়।’

এ ঘটনায় ওসি আরিফুর রহমান থানায় জিডি করেন। পরে তার অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য পুলিশকে দিতে পারলে তথ্যদাতাকে উপযুক্ত অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করেন নগর পুলিশের কমিশনার। এদিকে সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার নিয়ে গতকাল দুপুরে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ। তিনি বলেন, সাজ্জাদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ মোট ১৫টি মামলা আছে। সে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতো। তিনি বলেন, দুবাইয়ে থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ তাকে সবকিছু নির্দেশনা দেয়। ছোট সাজ্জাদ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মালিকদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের চাঁদা দাবি করতো। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তাদের বাড়িতে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভাঙচুর ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতো। তাকে আদালতে হাজির করে ১৪ দিনের রিমান্ড চাইবে পুলিশ। সিএমপি কমিশনার বলেন, ছোট সাজ্জাদ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। সে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বায়েজিদ, চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ এলাকার ত্রাস সৃষ্টিকারী। সাজ্জাদ বায়েজিদ থানার আলোচিত ডাবল মার্ডার মামলার আসামি। চান্দগাঁও থানারও একটি খুনের মামলার আসামি সে। বায়েজিদ, চান্দগাঁও ও মোহরাকেন্দ্রিক সব ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতো সে।

mzamin

শিগগিরই আইন সংশোধন: শিশু ধর্ষণের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল - ঝিকরগাছায় গণধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৪

শিশু ধর্ষণের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রেখে আইন সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। বৃহস্পতিবারের মধ্যে আইনটি সংশোধন হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচার ও তদন্তের সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে। শুধু শিশু ধর্ষণের মামলার বিচার করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন। সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দেশে যেভাবে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বেড়ে যাচ্ছে, সেই বিবেচনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করতে বসেছিলাম। সেখানে এই আইনের সংশোধনীর ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মাগুরা ও বরগুনায় ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সব কিছু বিবেচনায় রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর বেশ কিছু সংশোধন প্রস্তাব করেছে আইন মন্ত্রণালয়। আমাদের কেবিনেট সেটা নীতিগত অনুমোদন দেয়। ইতিমধ্যে আমরা কিছু মতামত পেয়েছি। মতামতগুলো কাল-পরশু যাচাই-বাছাই করবো। বৃহস্পতিবার এই আইনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পাবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, ধর্ষণের বিচারের বিলম্ব হওয়ার কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিএনএ ল্যাব না থাকা। এই মুহূর্তে একটি মাত্র ল্যাব আছে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে আরও দুটি ডিএনএ ল্যাব স্থাপন করবো। তিনি আরও বলেন, বিশেষ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে দ্রুত কিছু সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে, যেন ধর্ষণসহ অন্যান্য মামলার বিচার ত্বরান্বিত করা যায়। এসময় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ধর্ষণের মামলার জট লেগে থাকে। কারণ এখানে দুই ধরনের মামলা আসছে। একটা হচ্ছে সম্মতিসহ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ। এগুলোর অনেক আধিক্য ছিল। এসব মামলার কারণে ‘সম্মতি ছাড়া’ যেসব ধর্ষণ, সেগুলোর বিচার আটকে থাকছে। সেজন্য আমরা বিধান যুক্ত করেছি, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সম্মতিতে প্রতারণামূলকভাবে হোক বা যেভাবে হোক ধর্ষণের ঘটনাগুলো আলাদা অপরাধ। সম্মতি ব্যতিরেকে যে ধর্ষণ, সেটার ক্ষেত্রে বিচার ও তদন্তের সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে। এ ধরনের মামলাগুলো আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। এগুলো প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হচ্ছে। ‘চাঞ্চল্যকর’ ধর্ষণের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় না থেকে পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় দিতে বিচারককে সুযোগ দেয়া হবে বলে জানান আইন উপদেষ্টা। নতুন আইনে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে কারও ওপর আক্রমণ করে ব্যর্থ হওয়ার পর যদি ভুক্তভোগীর শারীরিক ক্ষতি করা হয়, তাহলে সেটাও শাস্তির আওতায় রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, মাগুরায় শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হওয়ার ঘটনাটি প্রচলিত আইনে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। এ সময় পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি মাজার ভাঙার নামে একটা নৈরাজ্য চলছে। এতদিন সরকার রিঅ্যাক্টিভ অবস্থানে ছিল, দোষীদের গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু এখন সরকার সবার উদ্দেশ্যে সতর্ক করে বলতে চায়, সরকার আর কোনোভাবেই মাজার ভাঙার বিষয়টি গ্রহণ করবে না। সবাইকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। অন্যথায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঝিকরগাছায় গণধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৪
ঝিকরগাছার গদখালিতে গনধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় ৪ যুবককে আটক করেছে থানা পুলিশ। ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে, রবিবার (১৬মার্চ) বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে, উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের পটুয়াপাড়া গ্রামের একটি লিচু বাগানে। ৯৯৯ কল দিলে ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ বাবলুর রহমান খান ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ধর্ষিতাকে উদ্ধার ও মোবাইল ট্র‍্যাকিং এর মাধ্যমে সন্ধ্যায় ৪ ধর্ষককে আটক করেছেন। আটকৃতরা হলো, গদখালী ইউপির পটুয়াপাড়া গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত (২২), জাকির হোসেনের ছেলে জাবেদ হোসেন (২৮), শরিফুল ইসলামের ছেলে মামুন হোসেন বাপ্পি (২১) ও উজ্জল হোসেনের ছেলে আমিনুর রহমান (২০)। জানা গেছে, মনিরামপুর উপজেলার হরিহরনগর ইউনিয়নের রাজগঞ্জ গ্রামের টুকু মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া খাতুন (১৯) বেনাপোল খালাবাড়ি থেকে ফেরার পথে গদখালী বাজারে নামে। এরপর গদখালী বাজারের ফুলের দোকানদার আমিনুর রহমানের দোকানে গেলে ৪ বন্ধুর সাথে পরিচয় হয়। সেই সুত্রে সুমাইয়াকে গদখালী এলাকায় ফুলবাগান দেখাতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে পটুয়াপাড়া গ্রামের জাবেদ হোসেনদের লিচুবাগনে নিয়ে গণধর্ষন করে। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুর ই আলম সিদ্দিকী, নাভারণ (সার্কেল) এএসপি নিশাত আল নাহিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ধর্ষণের ঘটনায় ঝিকরগাছা থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে অফিসার ইনচার্জ বাবলুর রহমান খান জানিয়েছেন।
mzamin