Friday, May 24, 2013

নেত্রী, কি হচ্ছে? by লায়েকুজ্জামান

নেত্রী, এ সব কি হচ্ছে? মানববন্ধন বন্ধ। মৌন প্রতিবাদ বন্ধ। আবার খোলা? দুনিয়া জুড়ে যখন খবর গেল বাংলাদেশে সভাসমাবেশ বন্ধ সেই সময় আবার শাহবাগে এক পশলা মানববন্ধন হয়ে গেল। আপনার দু’জন মন্ত্রী গণমাধ্যমের কাছে বললেন, সভা-সমাবেশ বন্ধ।

অ্যামনেস্টির বার্ষিক প্রতিবেদন : নিরাপত্তা বাহিনী ‘ব্যাপক মাত্রায়’ নির্যাতন চালাচ্ছে : ৩০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ১০ জন গুম ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে কথা রাখেনি সরকার

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও ‘ব্যাপক মাত্রায়’ নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনেছে লন্ডনভিত্তিক খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় সোনিয়া গান্ধী ৯ম স্থানে

প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০১৩ সালের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকা ঘোষণা করেছে। এতে শীর্ষে রয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল।
এশিয়ার মধ্যে ভারতের কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী রয়েছেন ৯ নম্বরে।
তালিকার প্রথম ১০ জনের অবস্থান নিচে দেওয়া হলো-
১. আঙ্গেলা মেরকেল (জার্মানির চ্যান্সেলর)
২. দিলমা রুসেফ (ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট)
৩. মেলিন্ডা গেটস (মার্কিন সমাজসেবী)
৪. মিশেল ওবামা (মার্কিন ফার্স্ট লেডি)
৫. হিলারি ক্লিনটন (সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী)
৬. শেরিল স্যান্ডবার্গ (প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা, ফেসবুক)
৭. ক্রিস্টিন লাগার্দে (আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক)
৮. জ্যানেট নাপোলিটানো (যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী)
৯.সোনিয়া গান্ধী (ভারতের কংগ্রেস দলের সভানেত্রী)
১০. ইন্দ্র নুয়ি (পেপসিকো যুক্তরাষ্ট্রের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা)।

স্বৈরশাসক ভিদেলাকে জন্মশহরে সমাহিত না করতে বিক্ষোভ

আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসক হোর্হে ভিদেলার মরদেহ তাঁর জন্মশহর মার্সিডিসে সমাহিত না করার দাবিতে গত বুধবার শত শত মানুষ বিক্ষোভ করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘জীবিত কিংবা মৃত কোনোটাই নয়, তিনি (ভিদেলা) শান্তিতে চিরঘুমে থাকতে পারেন না’ লেখা ব্যানার ছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দণ্ড ভোগরত ভিদেলা (৮৭) গত শুক্রবার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের মার্কাস কারাগারে মারা যান। তাঁকে কোথায় সমাহিত করা হবে, এ বিষয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভিদেলার পরিবারের সমঝোতা হয়েছে। তাঁকে মার্সিডিস শহরে সমাহিত করা হতে পারে। এর প্রতিবাদেই শহরের বাসিন্দারা বিক্ষোভ করেন। সেনাশাসক ভিদেলা ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনার ক্ষমতা দখলের পর বামপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযান চালান। ওই অভিযানে অপহূত হন অন্তত ৩০ হাজার বামপন্থী সাংবাদিক, ছাত্র ও গেরিলা বাহিনীর সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, গোপন কারাগারে তাঁদের হত্যা করা হয়। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে এ দমন অভিযান ‘ডার্টি ওয়ার’ নামে পরিচিত।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, গত নয় বছরে তাঁর দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেক সংহত হয়েছে। এমনকি সাইবার ও মহাকাশের মতো ক্ষেত্রেও হুমকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত ভারত। গতকাল বৃহস্পতিবার হরিয়ানা রাজ্যের গুরগাঁওয়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর মনমোহন এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তার জন্য আমরা একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করেছি এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সমন্বয়ের জন্য একটি কার্যালয় স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছি।’ মনমোহন বলেন, ‘আমরা দেশে এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে এই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছি। দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমরা সীমান্তরক্ষীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি এবং সেনাবাহিনীর সরঞ্জাম আরও বাড়িয়েছি। উপকূলের সম্পদ রক্ষার জন্য আমরা নিজেদের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়েছি। নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

মেক্সিকোয় কয়েক হাজার গুহাচিত্রের সন্ধান

মেক্সিকোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বুরোস অঞ্চলে কয়েক হাজার সুরক্ষিত গুহাচিত্রের সন্ধান মিলেছে। এখনো বয়স নির্ধারণ করা না হলেও গবেষকেরা বলেছেন, গুহাচিত্রগুলো স্যান কার্লোস পার্বত্যাঞ্চলে অন্তত তিনটি প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা আটটি ভিন্ন জায়গা থেকে সুরক্ষিত অবস্থায় মোট চার হাজার ৯২৬টি গুহাচিত্র পেয়েছেন। এসব ছবিতে লাল, হলুদ, কালো ও সাদা রঙে মানুষ, পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ এবং আকাশের পাশাপাশি বিমূর্ত দৃশ্যও ফুটে উঠেছে। কেবল একটি গুহার ভেতরেই এক হাজার ৫৫০টি ছবি পাওয়া গেছে। মেক্সিকান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড হিস্ট্রির প্রত্নতত্ত্ববিদ গুস্তাভো রামিরেস বলেন, গুহাচিত্রগুলোর আশপাশে সমকালীন কোনো জিনিসপত্র পাওয়া যায়নি। এসব গুহাচিত্রকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ, এগুলো সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে প্রাক্-হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এত দিন পর্যন্ত মনে করা হতো, সেখানে কোনো বসতি ছিল না।

শান্তি আলোচনার ইস্যুতে ইসরায়েল বিভক্ত: লিভনি

ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ইস্যুতে ইসরায়েল সরকার বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে বৈঠকের প্রাক্কালে ইসরায়েলের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও বিচারমন্ত্রী জিপি লিভনি গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা বলেছেন। সরকারি রেডিওকে লিভনি বলেন, মতাদর্শগত দিক দিয়ে ইসরায়েল সরকার বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি স্থাপনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে শান্তিপ্রক্রিয়া স্থবির থাকায় চুক্তি ছাড়াই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়মিত বসতি স্থাপন করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনা আবার শুরুর লক্ষ্যে গতকাল ইসরায়েলে পৌঁছান জন কেরি। স্থবির হয়ে পড়া শান্তি আলোচনা শুরুর জন্য এ নিয়ে চতুর্থ দফায় তিনি সেখানে গেলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ ও রামাল্লায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করার কথা কেরির। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে ইসরায়েলের ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী জুইশ হোম ও মধ্যপন্থী ইয়েশ আতিদের দলও রয়েছে। এ দুই দলই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিরোধিতা করছে।

চার্চিল-স্ট্যালিনের ফলপ্রসূ আড্ডা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল ও রাশিয়ার নেতা জোসেফ স্ট্যালিন বারবার আলোচনায় বসছেন। তবে শুধু কথাই হচ্ছে, কিছুই এগোচ্ছে না। এভাবে কয়েক দিন চলার পর এক রাতে শলাপরামর্শ চলল ভোর তিনটা পর্যন্ত। তার পরই আলোচনা ফলপ্রসূ হতে শুরু করে। জানা গেছে, রাত জাগা সেই বৈঠকে আলাপ চাঙা রেখেছিল নানা চর্বচোষ্যলেহ্য এবং পেয়! যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের নতুন প্রকাশিত নথিপত্র থেকে ওই আড্ডার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ সরকারের প্রায় ৬০০ পুরোনো নথিপত্র সম্প্রতি অবমুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম দিককার নথিগুলো অবমুক্ত করেছে জাতীয় সংগ্রহশালা। এর মধ্যে রয়েছে তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের স্থায়ী আন্ডার সেক্রেটারি স্যার আলেক্সান্ডার ক্যাডোগানের একটি চিঠি। তাতে তিনি ১৯৪২ সালের শেষের দিকে চার্চিলের মস্কো সফরের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন। আলেক্সান্ডার লিখেছেন, ডিসেম্বর মাসে স্ট্যালিনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠক ‘পুলকিত’ করে চার্চিলকে। তবে দ্বিতীয় বৈঠকে রাশিয়ার নেতা যে বিষয়টির অবতারণা করেন, তা ছিল যারপরনাই অপ্রীতিকর ও প্রতিকূল। এ কারণে আলোচনায় যে নৈরাশ্যের মেঘ ঘনীভূত হয়, তা পরের রাতের ভুরিভোজেও দূর হয়নি। তবে তার পরদিন সন্ধ্যায় নতুন করে শুরু হওয়া বৈঠকে বরফ গলতে শুরু করে। নথিতে বলা হয়েছে, বৈঠক শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটায়। টানা ছয় ঘণ্টা পর রাত একটার সময় ‘ক্রেমলিনে স্ট্যালিনের কক্ষে অতিসত্বর হাজির হওয়ার ডাক পড়ে’ স্যার আলেক্সান্ডারের। আলেক্সান্ডার লিখেছেন, সেখানে তিনি চার্চিল ও স্ট্যালিনের মাঝে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মলোটভকে (যিনি পরে যোগ দিয়েছিলেন) বসা দেখতে পান। তাঁদের সামনে সাজানো ছিল ‘সব ধরনের খাবার... এবং বেশ কিছু বোতল’। তিনি আরও লিখেছেন, ‘স্ট্যালিন আমাকে যে মদ পান করতে দিয়েছিলেন, তা রীতিমতো বিস্বাদ লেগেছিল।’ আলেক্সান্ডার লিখেছেন, ‘নিশ্চিতভাবেই চার্চিল মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর আমি মনে করি, সেই অনুভূতিটা ছিল পারস্পরিক আদান-প্রদানের উপযোগী। আলোচনার বিষয়বস্তু দোভাষীদের মাধ্যমে হুবহু বোঝা কঠিন ছিল।’ তবে একটি বিষয়ে চার্চিলের বক্তব্যের জবাবে স্ট্যালিন বলেন, ‘আমি এটার সঙ্গে একমত নই। তবে এর পেছনে যে অভিপ্রায় রয়েছে, তাকে আমি পছন্দ করি।’ ওই চিঠিতে আলেক্সান্ডার জানিয়েছেন, রাত তিনটা পার হওয়ার পরপরই বৈঠক শেষ করতে হয়। কেননা, বৈঠক শেষ করে তাঁদের হোটেলে ফিরে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বিমান ধরতে হয়েছিল। ফিরতি ফ্লাইটটি ছিল ভোর সোয়া চারটায়।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে বড় অগ্রগতি হয়েছে

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্প্রসারণে বড় ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। তবে ইরান দাবি করছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং আইএইএর প্রতিবেদনে আসলে সেই তথ্যই প্রকাশিত হয়েছে। আইএইএ গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় নাতানজ পরমাণু প্রকল্পে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার উপকরণের (আইআরটুএম সেন্ট্রিফিউজ) মজুত  বাড়ানো হয়েছে এবং সেখানে পারমাণবিক বোমা তৈরির লক্ষ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় ধাপ শুরু হতে যাচ্ছে। সেখানে আইআরটুএম সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা এখন প্রায় ৭০০, যা গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১৮০। অবশ্য নতুন সেন্ট্রিফিউজগুলোর ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ‘সম্ভাব্য সামরিক মাত্রায়’ নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইএইএ জানায়, ওই কর্মসূচির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে  ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন হয়। ইরান এখন পর্যন্ত ৩২৪ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম (২০ শতাংশ সমৃদ্ধ) উৎপাদন করেছে। তিন মাস আগে উৎপাদিত ইউরেনিয়ামের পরিমাণ ছিল ৪৪ কিলোগ্রামের কম। তবে মোট ইউরেনিয়াম থেকে ১১১ কিলোগ্রাম কাজে লাগানো হয়েছে জ্বালানি উৎপাদনে।  অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থিত আইএইএর সদর দপ্তরে ইরানি দূত আলি আসগর সুলতানিয়েহ বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে ‘কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য’ এসেছে। আইএইএর প্রতিবেদন এটাই প্রমাণ করে। এতে আরও দেখানো হয়েছে, ওই কর্মসূচির কোনো সামরিক উদ্দেশ্য নেই। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক এবং শান্তিপূর্ণ বলে তেহরানের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সন্দেহ, দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সামর্থ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত চার দফায় ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। দেশটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একাধিকবার আহ্বান জানিয়েছে। তা ছাড়া ওই প্রকল্প বন্ধ না করলে সেখানে বিমান হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের দীর্ঘদিনের শত্রু ইসরায়েল।

ম্যান বুকার জিতলেন লিডিয়া ডেভিস

যুক্তরাষ্ট্রের ছোটগল্প লেখক লিডিয়া ডেভিস পঞ্চম ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’ জিতেছেন। গত বুধবার রাতে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট জাদুঘরে এক অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। খ্যাতিমান ফরাসি ঔপন্যাসিক, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক মার্শেল পুস্তের লিখনশৈলীতে অনুপ্রাণিত লিডিয়া ডেভিস। তাঁর সাতটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ব্রেক ইট ডাউন, অলমোস্ট নো মেমোরি, স্যামুয়েল জনসন ইজ ইনডিগনেন্ট ও ভ্যারাইটিজ অব ডিসটার্বেন্স উল্লেখযোগ্য।

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শাহবাজের নাম ঘোষণা

ঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার ছোট ভাই শাহবাজ শরিফের নাম ঘোষণা করেছেন পিএমএল-এন প্রধান নওয়াজ শরিফ। পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের ২৯ জুন অনুষ্ঠেয় অধিবেশনের শুরুতে দলীয় সংসদীয় কমিটি শাহবাজের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। নির্বাচিত হলে তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হবেন শাহবাজ। এদিকে গতকাল নওয়াজ শরিফের শান্তি আলোচনার আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছে  তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান।

কর্মকর্তাদের বদলি স্থগিত করলেন পাকিস্তানের আদালত

পাকিস্তানে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলি এবং দায়িত্বে রদবদলের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশ স্থগিত করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, এ সরকার এখতিয়ার-বহির্ভূতভাবে কর্মকর্তাদের বদলির নির্দেশ দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই নির্দেশ দিয়েছেন। সদ্য অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী পিএমএল-এন নেতা খাজা মোহাম্মদ আসিফের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশ দিলেন। আদালত উল্লেখ করেছেন, শুধু পিটিশনকারী নন, আইনমন্ত্রী আহমেদ বিলাল শফিও সাম্প্রতিক নিয়োগ-বদলির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে আদালত বলেছেন, কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা এবং দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য যাঁদের বদলি না করলেই নয় তাঁদের বিষয়টি ভিন্ন। মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের নিয়োগ-বদলি থেকে বিরত থাকার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

ড্রোন হামলায় চার নাগরিকের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত

চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) হামলায় আল-কায়েদার আরব উপদ্বীপ শাখার (একিউএপি) নেতা আনওয়ার আল-আওলাকিসহ চার মার্কিন নিহত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটিকে লেখা এক চিঠিতে এ কথা বলেছেন। এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চারজনকে হত্যা করার কথা স্বীকার করল। এরিক হোল্ডার চিঠিতে সরকারের পক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, আওলাকিকে হত্যা করাটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে তিনি এ-ও বলেছেন, আওলাকির ১৬ বছরের ছেলে ও অন্য দুজনকে ড্রোন হামলার ‘বিশেষ লক্ষ্যবস্তু’ করা হয়নি। সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান ও ড্রোন কর্মসূচি বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্ধারিত ভাষণ সামনে রেখে এরিক হোল্ডার ওই স্বীকারোক্তি দিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবারই ওবামার ওই ভাষণ দেওয়ার কথা।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর ভাষণে ড্রোন হামলার প্রয়োজনীয়তা, আইনি বৈধতাসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরবেন। ইয়েমেন ও পাকিস্তানে ড্রোন হামলায় চার মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়ে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র খোলামেলাভাবে তথ্য প্রকাশ করল। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আওলাকিকে একিউএপির অভিযান পরিচালনা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তাঁকে হত্যা করাটা যুক্তিযুক্ত ছিল বলে মত দিয়েছে।
এরিক হোল্ডার বলেন, আওলাকি মার্কিন নাগরিকদের ওপর হামলার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কর্মকর্তারা বলেছেন, আওলাকি ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। আওলাকির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে। ২০১১ সালে তিনি ইয়েমেনে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। এত দিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রোন হামলায় তাঁর নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করেনি। সামির খান নামের আরেক মার্কিন আওলাকির সঙ্গে ড্রোন হামলায় নিহত হন। তিনি একটি অনলাইন সাময়িকীর মাধ্যমে আল-কায়েদার মতাদর্শকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
 এর এক মাস পর ইয়েমেনে ড্রোন হামলায় আওলাকির তরুণ ছেলে আবদুর রহমানও নিহত হয়। তার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে। ২০০৮ সালে নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা জুড কেনান মোহাম্মদ পাকিস্তানে গ্রেপ্তার হন। বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ জঙ্গি-অধ্যুষিত একটি অঞ্চলে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জুড কেনান মোহাম্মদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা করা হয়। তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে নিখোঁজ হন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুড কেনান মোহাম্মদ ২০১১ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে ড্রোন হামলায় নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

ক্যামেরন বললেন সন্ত্রাসীহামলা

লন্ডনে দুই হামলাকারীর হাতে সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গতকাল বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা ও নিরাপত্তাপ্রধানদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি সন্ত্রাসবাদী হামলা। গত বুধবার দুপুরে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের উলউইচে ওই হামলার ঘটনা ঘটে। দুই সন্দেহভাজন মুসলিম হামলাকারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক সেনাসদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করেন। পরে পুলিশের গুলিতে হামলাকারীরাও আহত হন। সশস্ত্র পাহারায় হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসা চলছে। ঘটনাস্থলের অদূরেই রয়্যাল আর্টিলারি বিভাগের ব্যারাক। হামলাকারীদের পরিচয়ের ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, কর্তৃপক্ষ নাইজেরিয়ার সম্ভাব্য সূত্র ধরে তদন্ত করছে। এ ছাড়া নিহত ব্যক্তির ব্যাপারেও কোনো স্পষ্ট তথ্য জানানো হয়নি। তবে তাঁর গায়ে ‘হেল্প ফর হিরোজ’ লেখাসংবলিত টি-শার্ট ছিল। ‘হেল্প ফর হিরোজ’ যুক্তরাজ্যের যুদ্ধাহত সেনাসদস্যদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত একটি দাতব্য সংগঠন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হামলার ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দী করেছেন। সেটি যুক্তরাজ্যের সংবাদভিত্তিক চ্যানেল আইটিভির হাতে পৌঁছেছে। তাতে দেখা গেছে, জ্যাকেট ও জিনস পরিহিত রক্তমাখা হাতের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাজ্যের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিচ্ছেন। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ওই যুবক স্থানীয় উচ্চারণের ভঙ্গিতে বলেন, ‘আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে শপথ নিচ্ছি, তোমাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই কখনোই থামবে না। আমাদের এই কাজের একটাই কারণ—প্রতিদিন মুসলমানরা মরছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা যত দিন লড়বে, আমরাও তত দিন লড়াই করব। চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত নেব।’ ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, দ্বিতীয় হামলাকারী বলছেন, ‘এ ঘটনা যেসব নারী দেখেছে, তাদের কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু তোমরা কখনোই নিরাপদ নও। তোমরা তোমাদের সরকারকে উৎখাত করো। তারা তোমাদের কথা ভাবছে না।’ হামলার ঘটনা শুনেই প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তাঁর ফ্রান্স সফর সংক্ষিপ্ত করে লন্ডনে ফেরেন। লন্ডনে পৌঁছে গোয়েন্দাপ্রধান ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন তিনি। এতে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ ও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের প্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেরেসা মে ও লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন যোগ দেন। লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর আগে প্যারিসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন ক্যামেরন। এ সময় তিনি এ ঘটনাকে ‘খুবই দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেন। ক্যামেরন বলেন, ‘পুলিশ জরুরি ভিত্তিতে ঘটনাটি তদন্ত করছে। কিন্তু এটি যে সন্ত্রাসবাদী হামলা, সে ব্যাপারে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’ যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংগঠন মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘এটা সত্যিই বর্বরোচিত। ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।’ সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা অকুণ্ঠভাবে এ ঘটনার নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁর স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই।’ সেনা হত্যার জেরে বুধবার রাতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি মসজিদে হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ সময় এসেক্স ও কেন্ট থেকে দুজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া লন্ডনের রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন ইংলিশ ডিফেন্স লিগের প্রায় আড়াই শ ক্ষুব্ধ সমর্থক ব্রিটিশ জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভ করে। দাঙ্গা পুলিশ তাদের ঘিরে রাখে। লন্ডনের সব সেনা ঘাঁটিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র প্যাট্রিক ভেনট্রেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এ রকম মূঢ়োচিত সহিংসতার সময় আমরা আমাদের মিত্রদের পাশে থাকব।

রাস্তাটি সংস্কার প্রয়োজন by বাবুল সরকার

নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানাধীন দত্তের হাটবাজার থেকে ৫ নম্বর বিনোদপুর ইউনিয়নের মূল সড়ক বিনোদ বাজার পর্যন্ত রাস্তাটি সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন থেকে এ রাস্তার সংস্কার করা অথবা সংস্কারের উদ্যোগ পর্যন্ত নিতে দেখা যায়নি। প্রতিদিন এ রাস্তায় অগণিত রিকশা, অটোরিকশা, সিএনজি, পিকআপ, ভ্যানগাড়িসহ মাঝেমধ্যে ভারী যান যাতায়াত করছে। বিনোদপুর গ্রামে রয়েছে একটি হাইস্কুল, একটি প্রাইমারি স্কুল, বাজার এবং একটি এনজিও অফিস। পড়ুয়া এবং লোকজনসহ এই ইউনিয়নের প্রায় আটটি গ্রামের মানুষ এ রাস্তায় প্রতিদিন চলাচল করছে। দেড় কিলোমিটারের রাস্তাটি এবড়োথেবড়ো, পুরো রাস্তাজুড়ে গর্ত।  প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে। পথচারীদের চলাচলও দুষ্কর।  রাস্তাটি অবিলম্বে সংস্কার করে জনসাধারণের এবং যান চলাচলের উপযোগী করে তোলার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
বাবুল সরকার
দত্তের হাট, নোয়াখালী।

পেনশন মঞ্জুর না হওয়া by সবিতা রানী দাস

আমার স্বামী নারায়ণ চন্দ্র দাস নোয়াখালী জেলার সদর উপজেলার রাজগঞ্জ উপ-ডাকঘরে কর্মরত ছিলেন। ২০০৯ সালের ২৪ অক্টোবর কর্মরত অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পরও আমি পারিবারিক পেনশন পাইনি। পেনশনের জন্য ডাক বিভাগের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও ১৯৮৯ সালের আইনি জটিলতা দেখিয়ে আমাকে পেনশন পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। নোয়াখালী বিভাগীয় পোস্ট অফিস ও নোয়াখালী প্রধান ডাকঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি, চট্টগ্রাম সার্কেল অফিস ও ঢাকা ডাক অধিদপ্তরের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ৮৯-এর জটিলতাযুক্ত অন্য পেনশনারদের নামের তালিকার সঙ্গে আমার স্বামীর নামও অন্তর্ভুক্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন অফিসে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো সেখান থেকে ফেরত আসেনি। এ অবস্থায় আমি পাঁচ সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। সংসারে উপার্জনক্ষম কোনো ব্যক্তি নেই। তাই ছেলেমেয়ে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছি। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে ডাক বিভাগের মহাপরিচালকের কাছে একটি আবেদন করেছি, কিন্তু আজও কোনো ফল পাইনি।
তাই আমার অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে পারিবারিক পেনশনের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সবিতা রানী দাস
খোদেদাদপুর, বানদত্ত বাজার, নোয়াখালী।

সংলাপ

চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের বিকল্প নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজেই সংলাপ নিয়ে যে টালবাহানা শুরু করেছেন, তাতে সংলাপের আশা করা যায় না। অবশ্য তিনি যে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার কথা বলছেন, তাতে সংলাপের কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা প্রয়োজন, এটা যুক্তরাষ্ট্র নয়, এটা বাংলাদেশ। আমরা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখতে পাই, নির্বাচন শেষে জয়ী দল ও পরাজয়ী দল ফলাফল মেনে নিয়ে পরস্পর কুশল বিনিময় করে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচনে জয়ী দল বলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, আর পরাজিত দল বলে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। আমরা এই নির্বাচন মানি না। পরদিন থেকে শুরু হয় সরকার পতনের আন্দোলন। তাহলে কীভাবে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায়? তাই দরকার দেশের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের সংলাপের মাধ্যমে মতৈক্যের ভিত্তিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি করবেন না। এটা দেশের জন্য অকল্যাণকর।
মো. জাকারিয়া
মেছড়া, সিরাজগঞ্জ।

সাভার ট্র্যাজেডি

সাভার ট্র্যাজেডির মতো দুর্যোগ আরও অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সজাগ না হলে এবং প্রতিরোধব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ফলে ১১২ জন পোশাকশ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। এর আগে সাভারের বাইপাইলে স্পেকট্রাম ভবনধসে ৬৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা সহস্রাধিক।
যেভাবে বৃহত্তর ঢাকায় যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো অপরিকল্পিত বহুতল ভবন গড়ে উঠছে, তাকে আমরা ভবন না বলে বলব মরণফাঁদ। অতি মুনাফার লোভে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরা ভবন যথাযথ নিয়মে তৈরি হয়েছে কি না, তা না দেখে ভবন ভাড়া নিয়ে তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে তুলছেন। দেখা গেছে, অনুমতি আছে পাঁচতলার কিন্তু ভবন তৈরি করা হয়েছে নয়-দশতলা। তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপন করার আগে অনুমতি পেতে প্রথমে রাজউক এবং ফায়ার সার্ভিসসহ ১৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সনদ নিতে হয়। তারপর বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ সনদ দেয়। এসব নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।
ভবিষ্যতে পোশাকশিল্পে ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়াতে এবং পোশাকশিল্প বাঁচাতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে নজর দিতে হবে। ভবন তৈরি এবং কারখানা স্থাপনে বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান সব বহুতল ভবন এবং তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনুপযুক্ত, সেগুলো চিহ্নিত করে বন্ধ করে দিতে হবে। ভবিষ্যতে ভবন তৈরি এবং কারখানা স্থাপনের সময় যথাযথ নিয়মকানুন মানার ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে।
মাহতাব আলী, মিরপুর, ঢাকা।

প্রসবজনিত মাতৃমৃত্যু রোধে সচেতনতা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিমখান

গর্ভবতী নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব লাভের অধিকার ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিচর্যার ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে। সন্তান গর্ভে এলে গর্ভবতী নারীকে ধর্মীয় অনুশাসন ও অনেক কঠিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হয়, তা না হলে মা ও শিশু উভয়েরই মৃত্যুর আশঙ্কা হতে পারে। ভবিষ্যতে যিনি মা হবেন, তাঁকে অবশ্যই স্বাস্থ্য উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও যথেষ্ট পরিচর্যা করতে হবে। একজন পরিপক্ব সুস্থ মা-ই একজন সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারেন। সুস্থ শিশুর জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা দরকার। এ জন্য গর্ভবতী মায়ের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, যত্ন ও সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে নিরাপদ মাতৃত্ব প্রত্যেক গর্ভবতী নারীরই ন্যায্য প্রাপ্য বা ন্যায়সংগত অধিকার। একজন নারী নিরাপদে মা হবেন, এ দায়িত্ব সবার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আর সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো মাতার খাওয়া-পরার উত্তম ব্যবস্থা করা।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩৩)
অথচ দেশের অধিকাংশ গর্ভবতী নারীই নানা অপুষ্টির শিকার। ফলে তাঁদের নবজাতকও হয় পুষ্টিহীন। স্ত্রী বা সন্তানের মা যাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণে প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণে যত্নবান হন, সেদিকে পরিবারপ্রধান বা স্বামীর দৃষ্টি রাখা অবশ্যকর্তব্য। গর্ভবতী মায়ের জন্য পুষ্টিকর ও বেশি খাবার প্রয়োজন। কেননা, তাঁর খাবারে একটি নয়, দুটি প্রাণ বাঁচে। বিশেষ করে গর্ভকালীন ও শিশুকে মাতৃদুগ্ধদানকালে এ ব্যাপারে বেশি সতর্কতা দরকার। তাই গর্ভবতী স্ত্রীর খাবারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমরা (স্বামীরা) যা খাবে, তাদের (নারীদের) তা-ই খেতে দিবে।’
গর্ভবতী মায়ের যত্ন মূলত শিশুর যত্ন। সন্তান যে মুহূর্তে মাতৃগর্ভে আসে, ঠিক তখন থেকেই শিশুর যত্নের সঙ্গে সঙ্গে গর্ভবতী মায়ের যত্ন নিতে হয়। সন্তান গর্ভে এলে মা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জীবন যাপন করবেন। তা না হলে মা ও শিশু উভয়েরই সমূহ বিপদ হতে পারে। গর্ভবতী মাকে অবশ্যই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে। তাঁকে সব ধরনের খারাপ কাজ, অসদাচরণ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সন্তান গর্ভে এলে মায়ের শরীরে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও পুষ্টির দরকার হয়। এ সময় মায়ের নিজের ও গর্ভের শিশুর দুজনের খাদ্য প্রয়োজন। তাই গর্ভবতী মাকে বেশি করে পুষ্টিকর ও পরিমিত সুষম খাবার খেতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে তোমরা উত্তম খাবার খাও।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭২)
আল্লাহ তাআলা গর্ভবতী নারীকে প্রদান করেছেন নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার তথা গর্ভধারণের ক্ষমতা। যদিও নারীর গর্ভধারণ ও শিশু জন্মদানের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবছর সারা বিশ্বে পাঁচ লাখ নারী সন্তান জন্মদানসংক্রান্ত জটিলতায় মারা যান। সন্তান প্রসবজনিত কারণে বিশ্বে প্রতি মিনিটে একজন মা মারা যান। মাতৃস্বাস্থ্যের একটি ভয়াবহ দিক হচ্ছে মৃত্যু; অন্যটি হচ্ছে দীর্ঘদিনের লম্বা-চওড়া অসুস্থতা, যেমন প্রসবজনিত ফিস্টুলা। যে অসুস্থতায় নারীদের অধিকার, এমনকি মান-মর্যাদা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। প্রসবজনিত ফিস্টুলা একটি মারাত্মক ও যন্ত্রণাদায়ক রোগ। এর কারণে রোগী একাধারে শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর চিকিৎসা না করালে জ্বালাপোড়া ও ক্ষত বাড়তেই থাকে। মাতৃমৃত্যু যদি রোধ করা যায়, তবে প্রসবজনিত ফিস্টুলাও রোধ করা সম্ভব। প্রসবকালীন ফিস্টুলার কারণে কেউ আজীবন অসুস্থ জীবন যাপন করেন। অথচ নবী করিম (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের কথা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোগ এবং দাওয়া (ওষুধ) দুটিই পাঠিয়েছেন এবং প্রতিটি রোগেরই ওষুধ পাঠিয়েছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।’ (আবু দাউদ)
ইসলামে প্রসূতি মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় চিকিৎসার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা প্রতিবছর সন্তান ধারণ করে থাকেন, তাই মাতৃত্বকালীন অপুষ্টির কারণে রোগাক্রান্ত মায়েদের স্বাস্থ্যহানি ঘটায় অনেক সময় মা ও নবজাতকের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। সাধারণত বাল্যবিবাহ ও গর্ভসঞ্চার, অপরিকল্পিত গর্ভধারণ, কিশোরী মায়ের পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা, গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ, প্রসবজনিত ফিস্টুলা ও সুচিকিৎসার অভাব প্রভৃতি কারণে নারীর নিরাপদে মা হওয়ার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সুতরাং নবজাতক ও শিশুমৃত্যু রোধ করতে হলে গর্ভধারণের আগে থেকেই সন্তানসম্ভবা মায়ের প্রতি যত্নশীল হওয়া উচিত। তা ছাড়া গর্ভকালীন ও প্রসবের পর একাধিকবার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। এ জন্য পরিবারের সবাই গর্ভবতী হওয়া থেকে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত মাকে ধর্মীয় দিকনির্দেশনা, সৎ পরামর্শ ও উৎসাহ দিতে পারেন। আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করাও ইসলামের শিক্ষা। ইসলামে সন্তান প্রসবকালীন পবিত্রতা ও সাবধানতা অবলম্বনের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা রয়েছে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধের জন্য প্রসবকালীন একজন দক্ষ সেবিকার প্রয়োজন। গর্ভকালীন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সুচিকিৎসা না করালে জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই প্রসূতি মা ও শিশুকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি গ্রামে গণসচেতনতামূলক ব্যবস্থাসহ ইসলামের আলোকে পরিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। ঘন ঘন সন্তান প্রসব থেকে বিরত রাখার জন্য মাঠপর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এগিয়ে এসে জনগণকে সচেতন করতে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। যেসব মা স্বাস্থ্যসেবা পান না, তাঁদের কাছে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

আন্দোলন ও জনগণের নিরাপত্তা দুটোইগুরুত্বপূর্ণ

হেফাজতে ইসলাম নামের নতুন একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। হেফাজত কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী। তাদের অস্তিত্ব তিন মাস আগেও এ দেশের কেউ অনুভব করেনি। তবে তারা ছিল নীরবে, নিভৃতে। ধর্মীয় ওয়াজ-নসিহতের মধ্যেই তাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ ছিল। অনেকে অভিযোগ করেছেন, জামায়াতে ইসলামী হেফাজতের মধ্যে ঢুকে এই আন্দোলন পরিচালনা করছে। তবে হেফাজত জামায়াতের কোনো দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে না। তাদের ১৩ দফা একান্তই তাদের দাবি। এ রকম উদ্ভট দাবি এর আগে কোনো দল করেনি। তবে জামায়াত নেপথ্যে থেকে এই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে পরিস্থিতি জটিল করার চেষ্টা করতে পারে। সে রকম আলামত এবং বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে।
হেফাজতের কথাবার্তা ও কাজকর্ম সম্পর্কে তীব্র সমালোচনার সময় এসেছে। হেফাজত কোনো রাজনৈতিক দল না হয়েও যে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছে সেগুলো নীতিগত ইস্যু। এগুলো সেই সরকারই বাস্তবায়ন করতে পারে, যাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব দাবি থাকে, যাদের জনগণ এ রকম দাবি বাস্তবায়ন করার জন্য ম্যান্ডেট দেয়। অন্যরা এ রকম দাবি নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথা বলতে পারে শুধু। কিন্তু তা পূরণে অন্য দলের সরকারকে অতিরিক্ত চাপ দিতে বা বাধ্য করতে পারে না।
সরকার, নারী সমাজ ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ ১৩ দফা দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার। এই প্রতিবাদের মাধ্যমে তারা ১৩ দফা ও হেফাজতকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে, যা হেফাজত প্রত্যাশা করতে পারে না। হেফাজত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তারা কখনো সরকার গঠন করতে পারবে না। তাদের দাবি একান্তই মুখের বুলি। হেফাজতের ১৩ দফা দাবির প্রতি কর্ণপাত করাই ঠিক হয়নি। ইতিহাসের ও গণতন্ত্রের পথপরিক্রমায় অনেক ছোট ছোট দল, অনেক গোষ্ঠী, অনেক ব্যক্তি উন্মাদের মতো অনেক কথা বলেন। তাঁদের সব কথাকে গুরুত্ব দিয়ে বিতর্ক করলে আসল কাজ ব্যাহত হয়। প্রলাপকে প্রলাপের মতোই দেখা উচিত। হেফাজত যদি একটি রাজনৈতিক দল হতো, তাহলেও খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দরকার হতো না। একটি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক গোষ্ঠী, যাদের সামগ্রিক প্রভাব খুবই অল্প, মাদ্রাসার বাইরে যাদের সমর্থক খুঁজে পাওয়া মুশকিল, বহু ইসলামধর্মীয় সংগঠনই যাদের বিরোধিতা করছে, তাদের ১৩ দফা দাবি নিয়ে হইচই করা সময়ের অপচয় বলেই মনে হয়। হেফাজতের ১৩ দফা দাবি সম্পর্কে সরকার শুধু একটি বিবৃতি দিয়ে বলতে পারত, ‘আমরা অন্যায্য দাবি পূরণ করার জন্য ক্ষমতায় আসিনি। হেফাজত যদি মনে করে তাদের দাবি খুবই জনপ্রিয়, তাহলে তার ভিত্তিতে তারা আগামী নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় এসে দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে। দেশের জনগণ তাদের দাবির পক্ষে ভোট দিলে আমাদের বলার কিছু নেই।’
বিএনপি ৫ মে হেফাজতের অবরোধ ও মহাসমাবেশের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু হেফাজতের ১৩ দফা দাবির প্রতি বিএনপির অবস্থান কী, তা এখনো স্পষ্ট করেনি। আমরা আশা করব, বিএনপি ১৩ দফা সম্পর্কে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। যদি ১৩ দফা তাদের পছন্দ হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে তারা এই দাবিগুলো নিয়ে ভোটারদের কাছে যেতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে দূরে সরিয়ে রেখে হেফাজতের পক্ষে রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপি নিজেদের ক্ষতি করছে না লাভ করছে, তা শিগগিরই তারা অনুভব করতে পারবে বলে মনে হয়। বিএনপির উচিত এখন আগামী নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি আদায়ের চেষ্টা করা। এবং এই আলোচনার জন্য কোনো পূর্বশর্ত আরোপ না করা। আলোচনার মাধ্যমেই তাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। বিএনপির অনেকের ধারণা, আন্দোলনের (হরতাল) মাধ্যমে দেশ অচল করে দিয়ে তারা দাবি আদায় করতে পারবে। হয়তো পারবে। হয়তো পারবে না। রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে অবরোধ বা অবস্থান কর্মসূচিকে হেফাজত একেবারে পচিয়ে দিয়েছে। এই দুই অস্ত্র আর আন্দোলনে কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া ঢাকার ব্যবসাকেন্দ্রবেষ্টিত মতিঝিলে আর রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। জনসভা বা অবস্থান কর্মসূচির জন্য এখন থেকে কোনো ময়দান বা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সরকার অনুমতি দিলে জনগণের স্বস্তি হবে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, শাপলা চত্বর ও নয়াপল্টনে আর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দিলে সরকার খুবই নিন্দিত হবে। দোকান, অফিস, ব্যাংকবেষ্টিত কোনো জনবহুল এলাকায় আর রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে দেওয়া উচিত হবে না। গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক দলের জন্য নয়; দোকানদার, ব্যবসায়ী, পথচারী, ক্রেতা-বিক্রেতা—সবার জন্য গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার শুধু বিভিন্ন দল ও হেফাজতের গণতন্ত্র রক্ষা নিয়ে চিন্তিত, তা ঠিক নয়। জনগণের জীবন বিঘ্নিত করার কোনো অধিকার কোনো দল, গোষ্ঠী ও সরকারের নেই। জনগণের নির্বিঘ্ন জীবনকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে।
গত ৫ ও ৬ মে ঢাকার বুকে হেফাজত ও তাদের ছত্রচ্ছায়ায় আরও অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তাদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা উচিত। তারা শাস্তি না পেলে ভবিষ্যতে এ রকম তাণ্ডব আরও হতে পারে। পুরানা পল্টন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য হেফাজতের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা উচিত। হেফাজতকেই এই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কারণ, তাদের কর্মসূচিতেই এই তাণ্ডব ঘটেছে। তারা এই দায় অস্বীকার করতে পারে না। বহিরাগত কেউ তাণ্ডব চালালে তাদেরও শাস্তি পাওয়া উচিত। নিজেদের কর্মসূচির ওপর যদি হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে তার দায় তাদেরই নিতে হবে।
৬ মে ভোররাতে শাপলা চত্বরে যৌথ অপারেশনে বহু লোক হতাহত হয়েছে বলে হেফাজত ও বিএনপি দাবি করেছে। সরকার বলেছে, তেমন হতাহত হয়নি। অনেকের ধারণা, এত বড় অপারেশনে নিশ্চয় বেশ কিছু মানুষ মারা গেছে। এ ব্যাপারে যেহেতু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সরকার এই বিষয়ে একটি বিচার বিভাগীয় বা সংসদীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে। কমিশন প্রত্যক্ষদর্শী ও সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ দেখে একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে। এটা ছাড়া হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ও রাজনীতির অবসান হবে না। এই তদন্ত কমিশন দ্রুত গঠন জরুরি।
হেফাজত তাদের ১৩ দফা দাবি নিয়ে ঢাকায় একটা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতেই পারে। এপ্রিল মাসেও তারা তা করেছে। কিন্তু ‘অবরোধ কর্মসূচিকে’ আমরা গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বলতে পারি না। এটা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান। জনগণ তো এখানে কোনো পক্ষ নয়। হেফাজত তাদের দাবি জানাচ্ছে সরকারের প্রতি। সেই দাবি জানাতে গিয়ে হেফাজত ঢাকার দেড় কোটি লোককে একটি পুরো দিন অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এটা গণতন্ত্র হতে পারে না। এটা দাবি আদায়ের গণতান্ত্রিক পথও হতে পারে না। সরকার কী করে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মসূচিকে অনুমতি দিয়েছে, তা ভেবে অবাক হই। যেকোনো সমাবেশের জন্যও সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত। যেহেতু ময়দান বা জনবিরল রাজপথ জনগণকেও ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে, সেহেতু প্রকাশ্য স্থানে ১২ ঘণ্টার বেশি কোনো সমাবেশের জন্য কোনো দল বা গোষ্ঠীকে অনুমতি দেওয়া উচিত হবে না। যেকোনো সমাবেশ কোনো টিভি চ্যানেল লাইভ প্রচার করতে পারবে। এটা ডিজিটাল যুগ। এই সুযোগে বাধা দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাবেশস্থল ত্যাগ করতে হবে, এই শর্তে অনুমতি দিতে হবে। প্রয়োজন হলে এ জন্য ৫০ লাখ টাকা জামানত হিসেবে জমা রাখা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে মাঠ না ছাড়লে এ টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। ঢাকা বা যেকোনো শহরের ময়দানে বা রাজপথে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘অবস্থান কর্মসূচির’ অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। এটা পাকিস্তান আমল নয়। পাকিস্তান আমলের মতো স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে একই স্টাইলে আন্দোলন হতে পারে না। ৫ ও ৬ মে তাণ্ডবের জন্য দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিয়ে এবং তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে জনগণের সম্পদ ধ্বংসে তাণ্ডব চলতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৮-দলীয় জোট দেশে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতেই পারে। পাশাপাশি তাদের সংলাপে বসার জন্যও চেষ্টা করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ জনগণের নিরাপত্তা ও জনমনে শান্তি। আমাদের দুটোই দেখতে হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ওউন্নয়নকর্মী।

অনিশ্চিত যাত্রা

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদুর একটি কথা দিয়েই শুরু করা যাক। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বললেন, সংলাপের আশার গুড়ে বালি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির মুখপাত্ররা ধরপাকড়ের মধ্যে থাকায় উপদেষ্টারা এখন বিএনপির একজন মুখপাত্রের ভূমিকায় আছেন এবং তিনি সেই অবস্থান থেকেই কথাটা বলেছেন। সে জন্য তিনি বলেননি, বিরোধী দলের নেতাই প্রথম সংলাপের গুড়ে বালি ফেলেছিলেন, যখন তিনি সংলাপের পরিবর্তে ৪৮ ঘণ্টার এক আলটিমেটাম ছুড়ে দিয়েছিলেন।
তবে জনাব শামসুজ্জামান ভুলও বলেননি। খালেদা জিয়ার আলটিমেটাম এবং ৫ মে রাতে মতিঝিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর দেশের উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় কিছু মানুষ এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের দূত বালিমেশানো গুড় যেটুকু সাফসুতরো করেছিলেন, সংলাপ বিষয়ে মে মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত অবস্থান থেকে তাঁর একটা অনমনীয় অবস্থান চলে আসায় ওই গুড়ে আবারও বালি পড়ল। এতে এই গুড় এখন ব্যবহারের অনুপযুক্ত হলে, বা তা ফেলে দিতে হলে, আমাদের আফসোস করা ছাড়া আর কীই-বা করার থাকবে।
গুড়ে বালি দেওয়ার প্রসঙ্গটাই একটু পরীক্ষা করা যাক, যেহেতু সংলাপ নিয়ে কেন এত অনিশ্চয়তা, তার একটা কারণ তা থেকে পাওয়া যেতে পারে। এই প্রবচনটি আমাকে ভাবায়, যেমন ভাবায় বাংলা ভাষায় পাকাপোক্ত আসন গেড়ে নেওয়া আরও কিছু প্রবচন, যেমন ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ’, ‘পাকা ধানে মই দেওয়া’, অথবা ‘হাতে মারে না, ভাতে মারে’। এই সব কটির ভেতরে ঠাসা আছে বিদ্বেষ, অন্যের অনিষ্ট করতে পারার চিত্তসুখ এবং এই চিত্তসুখ আরও বিমল করার জন্য প্রয়োজনে নিজের অঙ্গহানি করা। নাকটা একবার কেটে ফেললে প্রতিবেশীর না-হয় সমূহ ক্ষতি হলো, কিন্তু নিজের কি কম হলো? প্রতিবেশী চালাক হলে দুই দিন পর আরেকটা যাত্রার আয়োজন করে ফেলতে পারে, কিন্তু নিজের নাক কি আর গজাবে? নাকি তখন কান কাটার কথা ভাবা যাবে? আর একটা মাত্র নাক কেটে একটা যাত্রা ভাঙতে পারা গেলেও কান কেটে তা পারা যাবে দুবার। বাঙালির পক্ষে সবই সম্ভব।
নৃতত্ত্ববিদ এবং নৃতত্ত্বের আলোকে যাঁরা সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেন, তাঁরা বলেন, একটি ভাষার প্রবাদ-প্রবচনে ওই ভাষাভাষীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক আচরণ, চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ—এসবের একটা পরিচয় পাওয়া যায়। আর যা হোক প্রবাদ-প্রবচন এক দিনে তৈরি হয় না। এগুলোর পেছনে থাকে একটা জাতির দীর্ঘদিনের আবেগ-বুদ্ধি-জ্ঞানগত বিনিয়োগ এবং আচার-ব্যবহারের ঐতিহ্য। যদি তা-ই হয়, তাহলে একটু আগে উল্লেখ করা প্রবচনগুলো থেকে আমরা কী সন্দেশ পাই? বাঙালি কলহপ্রিয় জাতি? পরস্পরের অনিষ্টচিন্তা তাদের জীবনাচারের একটি মৌল পরিচয়? দুই প্রতিবেশী যদি দুজনের গুড়ে বালি ফেলেন, দুজনকেই গুড়হীন থাকতে হবে। যে যুগে এই প্রবচনের উৎপত্তি, আমার আন্দাজ সে যুগে চিনি সহজলভ্য ছিল না, গুড়ই ছিল প্রধান মিষ্ট দ্রব্য। শুধু শত্রুতার জন্য যদি গুড় খাওয়া থেকে দুজনকেই বঞ্চিত থাকতে হয়, তাহলে এই শত্রুতা নিশ্চয়ই মানবসমাজে প্রচলিত অন্য সব শত্রুতা থেকে আলাদা। এরই নাম আত্মঘাতী শত্রুতা!
আর নিজের নাক কেটে যে পরের যাত্রা ভন্ডুল করে দেয় তাকে কী বলা যায়? নীরদচন্দ্র চৌধুরী মহাশয় এর উত্তরে আমাদের হয়তো বলবেন, আত্মঘাতী বাঙালি। এই নামে যে বইটি তাঁর আছে, তাতে তিনি লিখেছেন, বাঙালি ‘দেশের সেবাও অজ্ঞানে প্রবৃত্তির ঝোঁকে করিয়াছে, আবার অজ্ঞানে প্রবৃত্তির বশেই আত্মহত্যাও করিয়াছে’। বাঙালির সপক্ষে এ কথাটাও নিশ্চয় বলা প্রয়োজন, যেমন চৌধুরী বলেছেন, তার মধ্যে ভালোত্বের কোনো কমতি নেই, উন্নত চিন্তারও অভাব নেই। কিন্তু কোথাও যেন প্রবৃত্তিগতভাবে একটা নেতির চক্রে সে পড়ে যায়, যা থেকে আর সে বেরোতে পারে না। প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচনেই তো আছে ‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।’ আমরা যদি এই প্রবচনটা একদিকে রাখি এবং অন্যদিকে রাখি জনাব শামসুজ্জামানের আক্ষেপের প্রবচনটি (গুড়ে বালি দেওয়ার), তাহলে দেখব একদিকে রয়েছে সমস্যা, কিন্তু অন্যদিকে সমাধানও। এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে, আরও মনোগ্রাহী করে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধের তিনি এভাবে সমাপ্তি টেনেছিলেন—
‘পানীমে মীন পিয়াসী
শুনত শুনত লাগে হাসি।
আমাদের পানিও আছে পিয়াসও আছে, দেখিয়া পৃথিবীর লোক হাসিতেছে এবং আমাদের চক্ষে অশ্রু আসিতেছে, কেবল আমরা পান করিতে পারিতেছি না।’
এক শ একুশ বছর আগে লেখা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ২০১৩ সালের বাস্তবতাটা কী সুন্দরভাবেই না প্রকাশ করলেন। এ জন্যই কবিদের দ্রষ্টা বলেও মান্য করা হয়।
দুই
সংলাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আরও বাড়ছে অসহিষ্ণুতা। সংঘাতের আশঙ্কা, কাগজে লেখা হচ্ছে, রাস্তায় নামতে ফের প্রস্তুত হচ্ছে হেফাজত। লন্ডন থেকে তারেক জিয়া ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে দাবানল ছড়িয়ে দেওয়ার’ ডাক দিয়েছেন এবং সরকার জানাচ্ছে, কোনো অযৌক্তিক দাবি তারা মানবে না এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন বাতিল ইতিহাস। আমাদের আশঙ্কা, জুন মাসজুড়ে চলবে দফায় দফায় হরতাল ও ধ্বংসযজ্ঞ। হরতাল কোন দিন দেওয়া উচিত, কোন দিন না—এই বোধটা যখন হারিয়ে গেছে, রমজানে কেউ হরতাল ডেকে বসলেও আমি অবাক হব না। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞ, এই দাবানল ছড়ানো, এই দমনপীড়নে, যা হবে তা হচ্ছে দেশের সর্বনাশ। সরকার যে ক্রমাগত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে তার প্রমাণ বিরোধী দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে জেলে ঢোকানো, ঢাকায় সব সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা, এমনকি বিএনপিকে দোয়া মাহফিলও করতে না দেওয়া। এভাবে চললে আমাদের ফৌত হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।
অথচ এর বিকল্প আছে। আমরা দশে মিলে কাজ করার ঐতিহ্যে ফিরে যেতে পারি, পরস্পরের গুড়ে বালি না মিশিয়ে এক প্রতিবেশী তার উদ্বৃত্ত গুড় অন্য প্রতিবেশীকে দিতে পারি; প্রতিবেশীর যাত্রাকে আরও আনন্দঘন করতে চকচকে নাক নিয়ে তার বাড়িতে হাজির হতে পারি; প্রতিবেশীর পাকা ধান ভারা বেঁধে তার ঘরে তুলে সাহায্য করতে পারি। এসব যে আমাদের চরিত্রে একেবারে অচেনা, তা তো নয়। একাত্তরে ঠিক এই কাজগুলোই তো আমরা করেছি।
রবীন্দ্রনাথ যে পানি ও পিয়াসের কথা বলেছিলেন, সে দুটো একটুখানি মেলালে কেমন হয়? পানি সামনে নিয়ে বসা পিয়াসী বাঙালিকে দেখে পৃথিবীর লোক যে হাসছে তাতে সন্দেহ নেই—শেষমেশ বান কি মুনের প্রতিনিধিও হেসে ফিরে গেলেন। কিন্তু এতে যে আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা চোখের পানি ফেলছি, এই লজ্জার অনুভূতি থেকে শুরু করলে কেমন হয়? যদি দুটি দল একবার, শুধু একবার, দেশটাকে এক নাম্বারে রেখে সংসদের ভেতরে অথবা বাইরে সামনাসামনি বসে, আমি নিশ্চিত পানি ও পিয়াসকে মেলানো যাবে, গুড় ও বালি তাদের নিজ নিজ জায়গায় চলে যাবে, মই তার শুরুর কাজ শেষ করে গৃহস্থবাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকবে এবং অক্ষত নাকে সকল প্রতিবেশী একটা অভিন্ন যাত্রায় নামবে।
কেউ যদি বলেন এটি করার সামর্থ্য বাঙালির নেই, তাহলে তার সঙ্গে আমি কিছুদিনের জন্য আড়ি দেব। কিছুদিন, যেহেতু একদিন তিনিই স্বীকার করবেন, তার ভুল হয়েছিল।
তিন
পানি ও পিপাসা মেলানোর জন্য নানান ফর্মুলা দেওয়া হচ্ছে। তাতে সরকার বিরক্ত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ অনেক মন্ত্রী এতে আপত্তি তুলেছেন। তার পরও আমি একটা ফর্মুলা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। অপরাধ মার্জনীয়।
বিরোধী দল যেহেতু নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের ব্যাপারটি মেনে নিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অনির্বাচিত কেউ সরকারপ্রধান হতে পারবেন না, তাহলে দুই দল মিলে এমন একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনীত করুক, যিনি উভয় দলের (ও জোট) আস্থাভাজন হবেন এবং তাঁকে আগামী কোনো উপনির্বাচনে যেমন জুলাই ৩-এ কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের উপনির্বাচনে, অভিন্ন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করে সংসদে নিয়ে আসা হোক। তিনি তখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবেই নির্দলীয় (অথবা দ্বিদলীয়, দ্বিজোটীয়) সরকারের প্রধান হিসেবে সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে যাবেন। দেশটা বাঁচবে। আমরাও চোখের পানি মুছে হাসব।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়।

শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা

পোশাকশিল্পাঞ্চলে থেমে থেমে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছেই। বেতন-ভাতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি তো ছিলই, নতুন ইন্ধন হয়েছে মালিকদের সিদ্ধান্তে নিয়মবহির্ভূতভাবে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা। একদিকে বঞ্চনা, অন্যদিকে কারখানা বন্ধের কারণে বেকারত্বের হুমকি শ্রমিকদের অসন্তুষ্ট করে তুলছে। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না।
তাজরীনের আগুন আর রানা প্লাজা ধস মালিকদের প্রতি শ্রমিকদের আস্থাকেও ধসিয়ে দিয়েছে। এই যুগল বিপর্যয়ের পর থেকে শ্রমিকাঞ্চলগুলোতে বিক্ষোভের মাত্রাও বেড়ে গেছে। পরিস্থিতির চাপে অনেক কারখানাই বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। বেতন নিতে এসে বা কাজে যোগ দিতে এসে শ্রমিকেরা দেখছেন ফটকে তালা ঝুলছে। এতে তাঁরা আরও বিক্ষুব্ধ হন এবং প্ররোচিত হন ভাঙচুরে। আমরা কারখানাগুলো সুশৃঙ্খলভাবে চলুক যেমন চাই, তেমনি চাই শ্রমিকেরা নিরাপত্তা ও উপযুক্ত মজুরিও পাক। এই শিল্পের টিকে থাকার জন্য যে শৃঙ্খলা প্রয়োজন, তা মালিক-শ্রমিক উভয়কেই নিশ্চিত করতে হবে।
অতি মুনাফার উদগ্র বাসনায় অনিরাপদ ভবনে কারখানা বসানো, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি নির্গমনব্যবস্থা না থাকা, মজুরি বঞ্চনার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছেন কোনো কোনো মালিক। মূল সমস্যার সমাধান না করে কেবল পুলিশ দিয়ে শ্রমিক বিক্ষোভ ঠেকানো যাবে না।
স্বীকার করি, পোশাকশিল্প নিয়ে মালিক-শ্রমিক উভয়েই সংকটে ভুগছে। শ্রমিকদের সংকট হলো, নিম্ন বেতনে অনিরাপত্তার মধ্যে তাঁরা কাজ করতে রাজি নন, আবার কারখানা বন্ধ হয়ে কর্মছাড়া হতেও তাঁরা রাজি নন। মালিকদের সংকট হলো, শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে তাঁরা যেমন রাজি নন, তেমনি আগের মতো করে চালাতেও পারছেন না। উভয় পক্ষের এই সংকট কাটাতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে বিশৃঙ্খল প্রতিবাদকে নিয়মতান্ত্রিক দর-কষাকষিতে নিয়ে আসা সম্ভব।
পোশাকশিল্প আমাদের প্রয়োজন, এর জন্যই প্রয়োজন শ্রমিকদের কথা শোনা। পাশাপাশি যাঁরা বিনা নোটিশে বেতন-ভাতা না দিয়েই কারখানা বন্ধ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কতিপয় মালিক ও শ্রমিকের জন্য সমগ্র শিল্প ভুগতে পারে না।

মানবাধিকার পরিস্থিতি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০১৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের খবর যেদিন ছাপা হলো, সেদিনই জাতীয় সংবাদমাধ্যমে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্তত দুটি ঘটনার সংবাদ পাওয়া গেল। রাজধানীর উত্তরায় মঙ্গলবার গভীর রাতে র‌্যাবের সদস্যদের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই যুবকের মৃত্যু আর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় পুলিশের হাতে আটক এক যুবকের পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগ—দুটোই বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রধান প্রবণতার অপরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অন্যান্য বছরের প্রতিবেদনের থেকে এ বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সব বছরই র‌্যাব-পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সদস্যদের হাতে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান দেওয়া হয় এবং সে রকম কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও থাকে। এবারের প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন শব্দবন্ধ: এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স বা গুম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে বাংলাদেশে গুম হয়েছেন ১০ জন মানুষ। তাঁদের অধিকাংশেরই আর হদিস মেলেনি। অল্প যে কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেছে, তাঁদের শরীরে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। গুমের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সিলেট বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর কথা। বাংলাদেশে ২০১২ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ৩০ জন। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি নামে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সদস্যদের হাতে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ অনেক সমালোচিত হয়ে আসছে। দেশের ভেতরেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত প্রবলতর হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা সে রকম পদক্ষেপ তো নেয়ইনি, উপরন্তু তাদের আমলে যুক্ত হয়েছে মানুষের গুম হয়ে যাওয়া। এটি মানবাধিকার পরিস্থিতি অবনতির ভয়াবহ দিক। জবরদস্তিমূলক আটক, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক ব্যবহার, বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় আটক রাখা ইত্যাদি মানবাধিকারবিরোধী আচরণ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যেখানে জরুরি, সেখানে এগুলো বাড়ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক কারণে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমনের উদ্দেশ্যেও এসব আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে নারী ও শিশুদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নারী-শিশু নির্যাতন বেড়ে চলেছে। ২০১২ সালে সংখ্যালঘু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন, সরকার তাঁদের মানবাধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতিরও কোনো উন্নতি ঘটেনি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি উক্তির উল্লেখ করা হয়েছে: দেশে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি। এর বিপরীতে বছরজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলির বিবরণী তুলে ধরে অ্যামনেস্টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে এখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র। শুধু সে কারণেই নয়, বাংলাদেশের সংবিধান এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের যে মৌলিক মানবাধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিয়েছে, সেগুলো রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে আমাদের নির্বাচিত সরকারকেই।