Friday, April 4, 2014

মরণোত্তর by খুশবন্ত সিং, অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন ভারতের প্রখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিং৷ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ছাপা হলো এই গল্প আমি জ্বর নিয়ে বিছানায় পড়ে আছি৷ তেমন গুরুতর নয় বলে নিজেকেই নিজের দেখভাল করার জন্য একা ফেলে রেখে গেছি৷ ভাবি, হঠাৎ গায়ের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে আমি সম্ভবত মরে যাব৷ আমার এত বন্ধু এবং আমি এত জনপ্রিয়, আমার মৃত্যুতে খবরের কাগজগুলো কী যে বলবে! আমার ছোট একটা ছবি দিয়ে ট্রিবিউন সম্ভবত খবরটা প্রথম পাতায় ছাপবে৷ শিরোনাম হবে ‘সর্দার খুশবন্ত সিং মৃত’, তারপর ছোট হরফে ছাপা হবে:

আলিয়ার বক্তব্যে বলিউডে হৈ চৈ

এরই মধ্যে নিজের অভিনীত প্রথম দুটি ছবি ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘হাইওয়ে’র মাধ্যমে অভিনেত্রী হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন বলিউডের ক্ষমতাধর পরিচালক-প্রযোজক মহেশ ভাটের ছোট কন্যা আলিয়া ভাট। বর্তমানে তার অভিনীত ‘টু স্টেট’ ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ছবিতে অর্জুন কাপুরের সঙ্গে চুমোদৃশ্যেও ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন তিনি।

ভয়ংকর দুর্গ by সারিনা হোসেন

এক শ বছর আগের কথা। গভীর জঙ্গলে ঘেরা এক রাজ্য ছিল, নাম—পিক্সিডুমল্যান্ড। সেখানে মানুষ বসবাস করত জঙ্গলের ভেতর। খাবার জোগাড় করতে তারা বনের পশুপাখি শিকার করত। খুব যে আনন্দে তাদের দিন কাটত, তা নয়। বরং ভীষণ কষ্ট করে তারা জীবনযাপন করত। কারণ, পিক্সিডুমল্যান্ড ছিল এক মৃত্যুপুরী!

জাফরানের নীল সুবাস by আউয়াল চৌধুরী

কখন যে টিএসসি ফাঁকা হয়ে গেছে সে খেয়াল করেনি। যখন টের পেল, রাতের চাদর বিস্তৃত হচ্ছে ক্রমেই। বাঁ হাতে কবজি-ঘড়ি। তবুও তাকাতে ইচ্ছে করে না তার। পশ্চিম গেট পেরিয়ে ফুটপাতে এসে দাঁড়ায়। ওপারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। পুরো রাস্তা ফাঁকা। তবুও অভ্যাসবশত টপকানোর আগ মুহূর্তে ডানে-বাঁয়ে তাকায় সে। কিছু নেই। রাস্তায় পা রাখবে। ঠিক তখনই দেখে, ভোজবাজির মতো ছুটে আসছে একজোড়া হেডলাইট। এখনো অনেক দূরে। ট্রাক হবে হয়তো। কিন্তু এ রাস্তায় তো ট্রাক চলার কথা না! সে পা সরিয়ে নিল রাস্তা থেকে। উজ্জ্বল আলো ছুটে আসছে দ্রুত। সে মুহূর্তে কানের কাছে কে যেন ফিসফিসিয়ে ওঠে, ‘ঝাঁপ দে!’

শাহ বুলবুলের মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা

আর্জেন্টাইন বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন এতই বর্ণিল- তাকে নিয়ে হাজার পৃষ্ঠার বই লিখলেও লেখা যায়। আর সেই কাজটি যখন মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠায় শেষ করা যায়, তখন বুঝতে হবে অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বাছাই করা ঘটনাবলি নিয়েই রচিত হয়েছে বইটি। আর এ কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন লেখক শাহ বুলবুল।
মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা সফল একজন কমরেডের জীবনীগ্রন্থ হলেও এটিকে চের জীবন নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ বললে ভুল হবে না। এ ধরনের বইগুলো সাধারণত গবেষণা ও অনুবাদনির্ভর হয়। কিন্তু বুলবুলের বইটিতে রয়েছে একটি অতিরিক্ত মাত্রা। আর তা হচ্ছে শব্দ ব্যবহারে মুন্সিয়ানা, বর্ণনা হচ্ছে গল্পের মতো। যে গল্পে রয়েছে পাত্রপাত্রীর সংলাপও। এ কারণেই একটি অনুবাদনির্ভর গবেষণাগ্রন্থ হয়ে উঠেছে প্রায়মৌলিক। মঞ্চে নাট্যকার নির্দেশক মামুনুর রশীদের নাটক চের সাইকেল দেখে দর্শক যখন হা-হুতাশ করেন, আহ্, চের জীবনী এত সংক্ষিপ্ত হয়- তখন তার জন্য সান্ত্বনা হতে পারে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটি।
বলিভিয়ার ডায়েরি লিখেছিলেন চে। আর সেটি হচ্ছে ইতিহাসখ্যাত গেরিলা বাহিনীর রোজনামচা। ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর গেরিলা বাহিনীর নাকাহুয়াজু ক্যাম্প থেকে ডায়েরির সূচনা। শেষ হয় ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামে কুয়েব্রাডা যুদ্ধের আগে। ৮ অক্টোবর সে যুদ্ধে চে গুয়েভারাকে আহত অবস্থায় বন্দি ও নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। লাশের মতোই গুম করা হয়েছিল ডায়েরিটি। বিপ্লবীর স্বীকৃতি এ ডায়েরির ফটোকপি আসে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে। ডায়েরিতে গেরিলা বাহিনীর দিনকার কথা লিখে রাখতে চে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারা ছিলেন কবি এবং কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। মেক্সিকোর হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করার সময় চের রোগী ছিল অসহায় বৃদ্ধা মারিয়া। যিনি মৃত্যুর জন্য দিন গুনছিলেন। চে চিকিৎসা দিয়ে মারিয়াকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্ট করেন। কিন্তু মারিয়ার শেষ দিনগুলো তাকে বিরামহীন যন্ত্রণা দেয়। চে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা মারিয়াকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, তুমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছ। চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক এপিকের নাম ফিদেলের গান।
চে গুয়েভারা সম্পর্কে এ রকম অনেক অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটিতে। রয়েছে চের জীবনসংশ্লিষ্ট বেশকিছু দুর্লভ ছবি। বইটি রচনায় বুলবুল যেসব বই ও ওয়েবসাইটের সহযোগিতা নিয়েছেনÑ একটি গবেষণাগ্রন্থের নিয়মানুযায়ী বইয়ের শেষে উল্লেখ করেছেন সেসবও।
সংগ্রহে রাখা কিংবা কাউকে উপহার দেয়ার মতো বই মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলার দাম ৪০০ টাকা। অনার্য থেকে বইটি বেরিয়েছে গত বইমেলায়।
সেলিম কামাল
আর্জেন্টাইন বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন এতই বর্ণিল- তাকে নিয়ে হাজার পৃষ্ঠার বই লিখলেও লেখা যায়। আর সেই কাজটি যখন মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠায় শেষ করা যায়, তখন বুঝতে হবে অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বাছাই করা ঘটনাবলি নিয়েই রচিত হয়েছে বইটি। আর এ কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন লেখক শাহ বুলবুল।
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা সফল একজন কমরেডের জীবনীগ্রন্থ হলেও এটিকে চের জীবন নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ বললে ভুল হবে না। এ ধরনের বইগুলো সাধারণত গবেষণা ও অনুবাদনির্ভর হয়। কিন্তু বুলবুলের বইটিতে রয়েছে একটি অতিরিক্ত মাত্রা। আর তা হচ্ছে শব্দ ব্যবহারে মুন্সিয়ানা, বর্ণনা হচ্ছে গল্পের মতো। যে গল্পে রয়েছে পাত্রপাত্রীর সংলাপও। এ কারণেই একটি অনুবাদনির্ভর গবেষণাগ্রন্থ হয়ে উঠেছে প্রায়মৌলিক।মঞ্চে নাট্যকার নির্দেশক মামুনুর রশীদের নাটক চের সাইকেল দেখে দর্শক যখন হা-হুতাশ করেন, আহ্, চের জীবনী এত সংক্ষিপ্ত হয়- তখন তার জন্য সান্ত্বনা হতে পারে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটি।বলিভিয়ার ডায়েরি লিখেছিলেন চে। আর সেটি হচ্ছে ইতিহাসখ্যাত গেরিলা বাহিনীর রোজনামচা। ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর গেরিলা বাহিনীর নাকাহুয়াজু ক্যাম্প থেকে ডায়েরির সূচনা। শেষ হয় ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামে কুয়েব্রাডা যুদ্ধের আগে। ৮ অক্টোবর সে যুদ্ধে চে গুয়েভারাকে আহত অবস্থায় বন্দি ও নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। লাশের মতোই গুম করা হয়েছিল ডায়েরিটি। বিপ্লবীর স্বীকৃতি এ ডায়েরির ফটোকপি আসে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে। ডায়েরিতে গেরিলা বাহিনীর দিনকার কথা লিখে রাখতে চে।আর্নেস্তো চে গুয়েভারা ছিলেন কবি এবং কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। মেক্সিকোর হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করার সময় চের রোগী ছিল অসহায় বৃদ্ধা মারিয়া। যিনি মৃত্যুর জন্য দিন গুনছিলেন। চে চিকিৎসা দিয়ে মারিয়াকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্ট করেন। কিন্তু মারিয়ার শেষ দিনগুলো তাকে বিরামহীন যন্ত্রণা দেয়। চে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা মারিয়াকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, তুমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছ। চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক এপিকের নাম ফিদেলের গান।চে গুয়েভারা সম্পর্কে এ রকম অনেক অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটিতে। রয়েছে চের জীবনসংশ্লিষ্ট বেশকিছু দুর্লভ ছবি। বইটি রচনায় বুলবুল যেসব বই ও ওয়েবসাইটের সহযোগিতা নিয়েছেনÑ একটি গবেষণাগ্রন্থের নিয়মানুযায়ী বইয়ের শেষে উল্লেখ করেছেন সেসবও।সংগ্রহে রাখা কিংবা কাউকে উপহার দেয়ার মতো বই মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলার দাম ৪০০ টাকা। অনার্য থেকে বইটি বেরিয়েছে গত বইমেলায়।সেলিম কামাল - See more at: http://www.jugantor.com/literature-magazine/2014/04/04/84338#sthash.8nFGJROC.dpuf
আর্জেন্টাইন বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন এতই বর্ণিল- তাকে নিয়ে হাজার পৃষ্ঠার বই লিখলেও লেখা যায়। আর সেই কাজটি যখন মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠায় শেষ করা যায়, তখন বুঝতে হবে অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বাছাই করা ঘটনাবলি নিয়েই রচিত হয়েছে বইটি। আর এ কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন লেখক শাহ বুলবুল।
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা সফল একজন কমরেডের জীবনীগ্রন্থ হলেও এটিকে চের জীবন নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ বললে ভুল হবে না। এ ধরনের বইগুলো সাধারণত গবেষণা ও অনুবাদনির্ভর হয়। কিন্তু বুলবুলের বইটিতে রয়েছে একটি অতিরিক্ত মাত্রা। আর তা হচ্ছে শব্দ ব্যবহারে মুন্সিয়ানা, বর্ণনা হচ্ছে গল্পের মতো। যে গল্পে রয়েছে পাত্রপাত্রীর সংলাপও। এ কারণেই একটি অনুবাদনির্ভর গবেষণাগ্রন্থ হয়ে উঠেছে প্রায়মৌলিক।মঞ্চে নাট্যকার নির্দেশক মামুনুর রশীদের নাটক চের সাইকেল দেখে দর্শক যখন হা-হুতাশ করেন, আহ্, চের জীবনী এত সংক্ষিপ্ত হয়- তখন তার জন্য সান্ত্বনা হতে পারে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটি।বলিভিয়ার ডায়েরি লিখেছিলেন চে। আর সেটি হচ্ছে ইতিহাসখ্যাত গেরিলা বাহিনীর রোজনামচা। ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর গেরিলা বাহিনীর নাকাহুয়াজু ক্যাম্প থেকে ডায়েরির সূচনা। শেষ হয় ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামে কুয়েব্রাডা যুদ্ধের আগে। ৮ অক্টোবর সে যুদ্ধে চে গুয়েভারাকে আহত অবস্থায় বন্দি ও নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। লাশের মতোই গুম করা হয়েছিল ডায়েরিটি। বিপ্লবীর স্বীকৃতি এ ডায়েরির ফটোকপি আসে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে। ডায়েরিতে গেরিলা বাহিনীর দিনকার কথা লিখে রাখতে চে।আর্নেস্তো চে গুয়েভারা ছিলেন কবি এবং কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। মেক্সিকোর হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করার সময় চের রোগী ছিল অসহায় বৃদ্ধা মারিয়া। যিনি মৃত্যুর জন্য দিন গুনছিলেন। চে চিকিৎসা দিয়ে মারিয়াকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্ট করেন। কিন্তু মারিয়ার শেষ দিনগুলো তাকে বিরামহীন যন্ত্রণা দেয়। চে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা মারিয়াকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, তুমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছ। চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক এপিকের নাম ফিদেলের গান।চে গুয়েভারা সম্পর্কে এ রকম অনেক অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটিতে। রয়েছে চের জীবনসংশ্লিষ্ট বেশকিছু দুর্লভ ছবি। বইটি রচনায় বুলবুল যেসব বই ও ওয়েবসাইটের সহযোগিতা নিয়েছেনÑ একটি গবেষণাগ্রন্থের নিয়মানুযায়ী বইয়ের শেষে উল্লেখ করেছেন সেসবও।সংগ্রহে রাখা কিংবা কাউকে উপহার দেয়ার মতো বই মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলার দাম ৪০০ টাকা। অনার্য থেকে বইটি বেরিয়েছে গত বইমেলায়।সেলিম কামাল - See more at: http://www.jugantor.com/literature-magazine/2014/04/04/84338#sthash.8nFGJROC.dpuf
আর্জেন্টাইন বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন এতই বর্ণিল- তাকে নিয়ে হাজার পৃষ্ঠার বই লিখলেও লেখা যায়। আর সেই কাজটি যখন মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠায় শেষ করা যায়, তখন বুঝতে হবে অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বাছাই করা ঘটনাবলি নিয়েই রচিত হয়েছে বইটি। আর এ কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন লেখক শাহ বুলবুল।
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা সফল একজন কমরেডের জীবনীগ্রন্থ হলেও এটিকে চের জীবন নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ বললে ভুল হবে না। এ ধরনের বইগুলো সাধারণত গবেষণা ও অনুবাদনির্ভর হয়। কিন্তু বুলবুলের বইটিতে রয়েছে একটি অতিরিক্ত মাত্রা। আর তা হচ্ছে শব্দ ব্যবহারে মুন্সিয়ানা, বর্ণনা হচ্ছে গল্পের মতো। যে গল্পে রয়েছে পাত্রপাত্রীর সংলাপও। এ কারণেই একটি অনুবাদনির্ভর গবেষণাগ্রন্থ হয়ে উঠেছে প্রায়মৌলিক।মঞ্চে নাট্যকার নির্দেশক মামুনুর রশীদের নাটক চের সাইকেল দেখে দর্শক যখন হা-হুতাশ করেন, আহ্, চের জীবনী এত সংক্ষিপ্ত হয়- তখন তার জন্য সান্ত্বনা হতে পারে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটি।বলিভিয়ার ডায়েরি লিখেছিলেন চে। আর সেটি হচ্ছে ইতিহাসখ্যাত গেরিলা বাহিনীর রোজনামচা। ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর গেরিলা বাহিনীর নাকাহুয়াজু ক্যাম্প থেকে ডায়েরির সূচনা। শেষ হয় ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামে কুয়েব্রাডা যুদ্ধের আগে। ৮ অক্টোবর সে যুদ্ধে চে গুয়েভারাকে আহত অবস্থায় বন্দি ও নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। লাশের মতোই গুম করা হয়েছিল ডায়েরিটি। বিপ্লবীর স্বীকৃতি এ ডায়েরির ফটোকপি আসে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে। ডায়েরিতে গেরিলা বাহিনীর দিনকার কথা লিখে রাখতে চে।আর্নেস্তো চে গুয়েভারা ছিলেন কবি এবং কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। মেক্সিকোর হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করার সময় চের রোগী ছিল অসহায় বৃদ্ধা মারিয়া। যিনি মৃত্যুর জন্য দিন গুনছিলেন। চে চিকিৎসা দিয়ে মারিয়াকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্ট করেন। কিন্তু মারিয়ার শেষ দিনগুলো তাকে বিরামহীন যন্ত্রণা দেয়। চে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা মারিয়াকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, তুমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছ। চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক এপিকের নাম ফিদেলের গান।চে গুয়েভারা সম্পর্কে এ রকম অনেক অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটিতে। রয়েছে চের জীবনসংশ্লিষ্ট বেশকিছু দুর্লভ ছবি। বইটি রচনায় বুলবুল যেসব বই ও ওয়েবসাইটের সহযোগিতা নিয়েছেনÑ একটি গবেষণাগ্রন্থের নিয়মানুযায়ী বইয়ের শেষে উল্লেখ করেছেন সেসবও।সংগ্রহে রাখা কিংবা কাউকে উপহার দেয়ার মতো বই মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলার দাম ৪০০ টাকা। অনার্য থেকে বইটি বেরিয়েছে গত বইমেলায়।সেলিম কামাল - See more at: http://www.jugantor.com/literature-magazine/2014/04/04/84338#sthash.8nFGJROC.dpuf
আর্জেন্টাইন বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন এতই বর্ণিল- তাকে নিয়ে হাজার পৃষ্ঠার বই লিখলেও লেখা যায়। আর সেই কাজটি যখন মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠায় শেষ করা যায়, তখন বুঝতে হবে অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বাছাই করা ঘটনাবলি নিয়েই রচিত হয়েছে বইটি। আর এ কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন লেখক শাহ বুলবুল।
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা সফল একজন কমরেডের জীবনীগ্রন্থ হলেও এটিকে চের জীবন নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ বললে ভুল হবে না। এ ধরনের বইগুলো সাধারণত গবেষণা ও অনুবাদনির্ভর হয়। কিন্তু বুলবুলের বইটিতে রয়েছে একটি অতিরিক্ত মাত্রা। আর তা হচ্ছে শব্দ ব্যবহারে মুন্সিয়ানা, বর্ণনা হচ্ছে গল্পের মতো। যে গল্পে রয়েছে পাত্রপাত্রীর সংলাপও। এ কারণেই একটি অনুবাদনির্ভর গবেষণাগ্রন্থ হয়ে উঠেছে প্রায়মৌলিক।মঞ্চে নাট্যকার নির্দেশক মামুনুর রশীদের নাটক চের সাইকেল দেখে দর্শক যখন হা-হুতাশ করেন, আহ্, চের জীবনী এত সংক্ষিপ্ত হয়- তখন তার জন্য সান্ত্বনা হতে পারে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটি।বলিভিয়ার ডায়েরি লিখেছিলেন চে। আর সেটি হচ্ছে ইতিহাসখ্যাত গেরিলা বাহিনীর রোজনামচা। ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর গেরিলা বাহিনীর নাকাহুয়াজু ক্যাম্প থেকে ডায়েরির সূচনা। শেষ হয় ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামে কুয়েব্রাডা যুদ্ধের আগে। ৮ অক্টোবর সে যুদ্ধে চে গুয়েভারাকে আহত অবস্থায় বন্দি ও নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। লাশের মতোই গুম করা হয়েছিল ডায়েরিটি। বিপ্লবীর স্বীকৃতি এ ডায়েরির ফটোকপি আসে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে। ডায়েরিতে গেরিলা বাহিনীর দিনকার কথা লিখে রাখতে চে।আর্নেস্তো চে গুয়েভারা ছিলেন কবি এবং কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। মেক্সিকোর হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করার সময় চের রোগী ছিল অসহায় বৃদ্ধা মারিয়া। যিনি মৃত্যুর জন্য দিন গুনছিলেন। চে চিকিৎসা দিয়ে মারিয়াকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্ট করেন। কিন্তু মারিয়ার শেষ দিনগুলো তাকে বিরামহীন যন্ত্রণা দেয়। চে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা মারিয়াকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, তুমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছ। চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক এপিকের নাম ফিদেলের গান।চে গুয়েভারা সম্পর্কে এ রকম অনেক অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলা বইটিতে। রয়েছে চের জীবনসংশ্লিষ্ট বেশকিছু দুর্লভ ছবি। বইটি রচনায় বুলবুল যেসব বই ও ওয়েবসাইটের সহযোগিতা নিয়েছেনÑ একটি গবেষণাগ্রন্থের নিয়মানুযায়ী বইয়ের শেষে উল্লেখ করেছেন সেসবও।সংগ্রহে রাখা কিংবা কাউকে উপহার দেয়ার মতো বই মৃত্যুঞ্জয়ী গেরিলার দাম ৪০০ টাকা। অনার্য থেকে বইটি বেরিয়েছে গত বইমেলায়।সেলিম কামাল - See more at: http://www.jugantor.com/literature-magazine/2014/04/04/84338#sthash.8nFGJROC.dpuf

অপরাহ্নের দীর্ঘতর ছায়া by মোসাদ্দেক আহমেদ

অফিস ছুটির পর বাসাগামী বাসে চড়ে দিনভর ক্লান্তিকে যে ঝেড়ে ফেলবে, সে উপায় নেই। বরং পিত্তিটা জ্বলতে শুরু করে বাসের সিটে বসার পর থেকে। এটা ভার্সিটির স্টাফদের বাস বলে সেই অর্থে ভিড়ভাড়াক্কা নেই, বলতে গেলে সব স্টাফই গা এলিয়ে বসে আসতে পারে; এই বিলাসিতাটুকু তাদের আছে। কিন্তু আফরোজার সমস্যা অন্য; বলতে কি এটাই তাকে পলে পলে দগ্ধ করে মারে।
আপনার পাশে সিট খালি আছে দেখছি, ভালোই হল গল্পে গল্পে যাওয়া যাবে। এমনটা বলে রশীদ সাহেব ঝপ করে বসে পড়েন; শুধু বসেই পড়েন না, আফরোজা ভাবীর ওপর দেহের একটা অংশের ভার ছেড়ে দেন দিব্যি।
এমন অত্যাচার নতুন নয়, আজ রশীদ সাহেব, কাল হাবিব সাহেব, পরশু সত্যেন বাবুরা এ কাজটা করে যাচ্ছেন নিয়মিতই। আর এখানেই কষ্টটা তার। কেন সে কি পুরুষ সহকর্মীর কাছে মিনিমাম একটা সম্মান আশা করতে পারে না? অবশ্য সব সহকর্মীই যে তেমন, তা নয়; কিন্তু সেসব কলিগরা কদাচ বসে যাত্রাপথে। আবার যেসব নারী কলিগ রয়েছে, তারাও যে যথেষ্ট উদার, তেমনটা বলাতেও ঝুঁকি আছে। তারাও তার দিকে কেমন উপহাসের চোখে তাকায়; এড়িয়েও কম চলে না; ফলে তার পাশের সিটটি খালি থাকে একজন পুরুষ সহকর্মীর জন্য।
আমি বেশ লাকি, প্রায়শ আপনার পাশে বসার সুযোগ মিলে যায়। রশীদ সাহেবের কণ্ঠে বাড়তি উষ্ণতা ঝরে পড়ে।
কিছু একটা বলতে গিয়ে নিজের মধ্যে কুঁকড়ে যায় আফরোজা। ততক্ষণে বাসটি যাত্রা শুরু করেছে শহরের দিকে। চলন্ত বাসের জানালা গলে বাইরের অপস্রিয়মাণ গাছপালা আর খেতখোলার পানে তাকিয়ে থাকে সে। মনের বিরাগ ভাবটি গলার কাছে দলা পাকিয়ে তাকে জ্বালায়। রশীদ সাহেবদের আর দোষ কী! স্বীয় কপাল মন্দ বলেই না স্বামী তার কেবল নিজেই মরল না, তাকেও মেরে গেল। আবার মজা দেখ, তার স্বামীর অপমৃত্যুর বিনিময়ে যে সাধারণ শ্রেণীর চাকরিটা ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ দয়াপরবশ হয়ে তাকে দিল, সেটাও প্রতিনিয়ত তার ধৈর্য পরীক্ষা নিচ্ছে। ফলে স্বামীর মৃত্যুশোক দানা বাঁধল না আজতক; এমনকি প্রতিবার স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী এগিয়ে এলে সেই ফাটল প্রশস্ততর হয়। যে অপবাদ স্বামী তার ছড়িয়ে গেছে কলিগদের মধ্যে, সেটাই এখন গলার কাঁটা, রক্তাক্ত করে চলেছে অহরহ। না, রশীদ সাহেব আজ বড্ড বাড়াবাড়ি করছে বলে মনে হয়; অনেকটাই হেলে পড়ে কোণঠাসা করে ফেলেছে যেন।
আহা ভাবি, আপনি এতটা জড়সড় হচ্ছেন কেন? জানেনই তো, আমি আপনার স্বামীর ভালো বন্ধু ছিলাম; অ্যাকাউন্টস সেকশনে বসতাম পাশাপাশি। ভাবি, বি ফ্রাংক।
শক্ত ধরনের একটা জবাব মুখে এসেও আটকে যায়, নিরুত্তাপ গলায় আফরোজা বলে, প্লিজ, একটু সোজা হয়ে বসেন। সিটগুলো এমনিতে চাপা।
হে হে, ঠিক বলেছেন, সিটগুলো সত্যিই চাপা। কী আর করা, যা হোক, ভাবছি সামনের মিটিংয়ে ভিসি স্যারের কাছে আরামদায়ক বাসের দাবি তুলব। জানেন তো, ভার্সিটির রাজনীতিতে আমি বেশ প্রভাবশালী। রশীদ সাহেবের গলায় বিরক্তিকর ঝাঁজ স্পষ্ট; প্রচ্ছন্ন হুমকিও থাকতে পারে শেষের বাক্যে।
নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায় ফের; এমনিতে একজন নারীর জন্য চারপাশ একটা চ্যালেঞ্জ, এটা বহুগুণ কঠিন হয়ে ওঠে যখন সে জড়িয়ে যায় এমন কোনো অপবাদে যার উদ্গাতা স্বয়ং তার স্বামী। মেয়েলি বদনাম এমনিতে বাতাসের আগে ছোটে, কেননা মানুষ সেখানে প্রভূত মজা লোটার সুযোগ পায়, পরিস্থিতি যখন এমত, সেখানে পতি বাহাদুর যদি নিজেই নামে প্রচারকের ভূমিকায়, তাহলে তো কথাই নেই, লোকজনের মনোরঞ্জনের ষোলোকলা পূর্ণ হয়। মানুষজনের আর দায় কোথায় বিষয়টি খতিয়ে দেখার, তলিয়ে দেখতে তাদের বয়েই গেছে।
বাসটা একটা বাজার পার হচ্ছিল, আজ কলা বেচার হাট রাস্তায় ওপর বসায় চলার গতি রুদ্ধ হতে হতে বাসটা দাঁড়িয়ে পড়ে শেষমেশ। কলার আমদানি বেশি থাকায় অন্য হাটবারের তুলনায় লোকসমাগম বেশি। দুদিকেই ছোটখাটো যানজট, ধীরলয়ে বাস এগুতে থাকলে রশীদ সাহেব অপ্রসন্ন হন, এভাবে হাইওয়েতে হাট বসানো ভারি অন্যায়। নিয়মকানুনের যদি কোনো বালাই থাকে।
কথাটা আফরোজাকে সাক্ষী মেনে বলা, কিন্তু তাতে সাড়া দিতে মন টানে না আফরোজার। বস্তুত তেমন মানসিক অবস্থাও নেই। এক অসম লড়াইয়ের বেদনা লাগামছাড়া হতে গলার কাছে শ্বাসরোধী অনুভূতির সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে যাকে অবলম্বন করে সে ঘুরে দাঁড়াত পারত, সেই লোকটা, তার স্বামী কায়সারই কিনা সবচেয়ে ফাঁসিয়ে গেল তাকে। আÍহত্যা করার বছর দুয়েক আগে থেকেই কায়সার মনোরোগের শিকার হয়, সাংঘাতিক সন্দেহবাতিকে ভুগতে থাকে। যত লোকটা ক্ষয়ে যেতে থাকে তত তীক্ষè হতে থাকে সন্দেহের তীরগুলো, প্রতিটি তীরের অভিমুখই স্ত্রীর দিকে; সরাসরি তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে; এক পরিত্রাণহীন ভয়ংকর পরিস্থিতি সেটা। হয়তো প্রসাধনীর একটা পর্যায়ে সে কোনো পারফিউম ব্যবহার করেছে, ব্যস, আর যাবে কোথায়, হাজারো প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয়েছে, কে দিল বলো তো, ঘ্রাণটা বেশ সেক্সি মনে হচ্ছে। না, না, কী বল, এটা তো তোমাকে ব্যবহার করতে আগে দেখিনি। বেশ তোফা আছ দেখছি। শুধু কি তাই, এসব সংশয়ের কথা ঢাকে কাঠি মেরে কলিগদের মধ্যে বলে বেড়াত। ফলে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় অনিষ্টের গোড়া। স্বামীর কণ্ঠে স্ত্রীর কলঙ্কের প্রচারণা সব সময় এমন এক অমোচনীয় শক্ত ভিত্তি পায় যে, তখন তা শুধু মুখরোচকই হয় না, অন্যকেও উস্কানি দেয়; বহুভোগ্যা হওয়ার ঝুঁকিকে বৃদ্ধি করে। আর সেটাই হচ্ছে এখন। অবস্থা এমন যে, চাকরিটা কতদিন চালিয়ে যাওয়া যাবে, তাও অনিশ্চিত। কিন্তু মুখ বুজে সবই সহ্য করতে হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া মেয়ে সোনালির মলিন মুখখানার দিকে চেয়ে। এই সোনালি ছাড়া জগৎসংসারে তার আর কে আছে বল? কিন্তু মেয়েটার এমনি দুর্ভাগ্য যে, বাপিটা তো গেছেই, এখন মাকেও হারানোর ভয়ে থাকে। এসব একজন কোমলমতী বালিকার জন্য কখনো ভালো ফল বয়ে আনে না। ভাবনার এই জায়গাটি ধসিয়ে দিতে সে ছলছল চোখে হাটের মানুষজন দেখে।
হাটের ভিড় কাটিয়ে বাসটা এবার গতি তুলছে। আফরোজা যতই জানালার দিকে চেপে আসার চেষ্টা করুক, রশীদ সাহেব তত চেপে এসে পিষ্ট করার তালে সচেষ্ট। কেবল রশীদ সাহেবকে একাকী দোষ দিয়ে লাভ কি, যখন যে তার পাশে বসেছে, তখন সেসব সাহেবেরই আসল চেহারা এমনিভাবে প্রকটিত। মুখোশ-আঁটা পুরুষদের দঙ্গলে সবাই যে এমন, তা অবশ্য নয়, তবে তার বেলায় তা সংখ্যায় অল্পই; হৃদয়বান মানুষজন তবে কি সংখ্যালঘুই হয় কে জানে। চিন্তাস্রোতটি পরিণতি পাওয়ার আগেই এক কাণ্ড ঘটে। দ্রুতগতিসম্পন্ন বাসটা আচমকা সজোরে ব্রেক কষতে আফরোজা ঝুঁকে পড়ে ধাক্কা খায় সামনের সিটে। বাসের এই হার্ডব্রেকটি বুঝি রশীদ সাহেবদের অ্যাডোলেসেন্ট পরিতৃপ্তির উপায় হয়ে আসে; মুহূর্তকালের ঘটনা, বাসটাও সামলে নিয়ে হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে, যাত্রীসবও ধকল কাটিয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই ক্ষণকালের মধ্যেই তার গায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে রশীদ সাহেব, যা করল তা কহতব্য নয়; ডাকাতিয়া হাতে তছনছ করে দিয়েছে তার মেয়েলি ভরাট বুক। কিন্তু তা এতটা ত্বরিত, এমন সূচারুভাবে সম্পাদিত যে, আকস্মিক ব্রেকটাকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করাতে বেগ পেতে হয় না রশীদ সাহেবের, এভাবে কেউ বাস চালায় বলেন, আর একটু হলেই তো সোজা খাদে নেমে যেত গাড়ি। জব্বর বেঁচে গেছি। কিছু মনে করবেন না, আমি তো প্রায় ব্যালান্স হারিয়ে ফেলেছিলাম, ভাগ্যিস আপনি পাশে ছিলেন। হে হে।
চরম বিতৃষ্ণা ও বিবমিষায় আফরোজার গা ঘিনঘিন করে উঠল। আচ্ছা এরা এমন কেন, এরা কি রগরগে সেক্সচিন্তায় সর্বক্ষণ হাবুডুবু খায়? কিন্তু তেমন সেক্সচিচিন্তায় যে স্নিগ্ধতার লেশমাত্র থাকে না, বিধ্বংসী অঙ্গার ছাড়া যে ওতে কিছু নেই- তা কি তারা আমলে নেবে না কখনো? মন ও দেহ দুটো পাশাপাশি স্নিগ্ধ জলধারার মতো, সমান্তরাল জলধারাযুগল চলে চলে যখন কাছাকাছি আসে, তখনই কেবল তাতে আলোর ফুলকি উঠতে পারে; আফসোস এরা যদি তা জানত! সে নিজেও কি সব জানত, সাহিত্যের পাঠাভ্যাস বজায় থাকলেই তা জানা যায়। বিবমিষার তিতকুটো অস্বস্তি সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরে মেয়ে সোনালির খোঁজ করে সে। ডাকাডাকির পর সোনালি তার ঘর থেকে বিষণ্নতার প্রতিমূর্তি হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালে বিচলিত হয় আফরোজা, কিরে মা, দুপুরে খেয়েছিস? মুখ তবে এত ম্লান কেন?
দুই রুমের একটা ছোট্ট বাসায় তারা ভাড়া থাকে; মেয়ের স্কুলের কাছে বলে বাসাটা এখানে নেওয়া। সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিলেও বেলা একটা নাগাদ মেয়ে একাই বাসায় ফেরে। পড়াশোনার যত চাপ থাক, অফিসফেরতা মা কাছে এসে দাঁড়ালে মেয়ের মুখে হাসি ঝলমল করবেই। তবে ব্যতিক্রম শেষের একমাস; এখন সে অনেক কিছুই আঁচ করতে শিখেছে। বাপি তার অন্যায্য কলঙ্ক তার মায়ের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজে তো বিদায় নিলোই, এখন তার মাও পড়েছে আচ্ছা ফাঁপরে; বালিকামনের অনুভূতি দিয়ে সে হয়তো মেলা কিছুই কল্পনা করে নেয়। আর ঠিক এখানেই আফরোজার ভয়। এসব তো চপলমতি মনের জন্য মারাত্মকই বটে। আরও একটা শঙ্কা বুকের গহিনে কাজ করছে ইদানীং। এভাবে চলে চলে সোনালি যদি দ্বন্দ্বমুখর হয়ে পড়ে, তখন তো মনোবিকলনের শিকার হয়ে পড়বে। আর সেটা অসম্ভব নয়; এটা মেয়ের রক্তে আছে, বাবার অসুখ মেয়ে পেতে পারে সহজেই। তখন? ভাবতেই শিউরে ওঠে। আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে; আজ অফিসে যাওয়ার সময় মোবাইলটা ফেলে রেখে গিয়েছিল ভুলে। মোবাইলে প্রতিনিয়ত অশ্লীল অসভ্য সব মেসেজ আসতে থাকে; অনেক সময় ডিলিট করেও কূল পাওয়া যায় না। তেমন কিছু আপত্তিকর মেসেজ পড়ে ফেলেনি তো মেয়েটা?
একছুটে ঘরে এসে দেখল মোবাইলের স্থান পরিবর্তিত হয়েছে; তাহলে পরের দুর্ভাবনাই সত্য হতে চলেছে। অবেলায় স্বামীকে হারিয়েছে সে, এখন পেটের একমাত্র সন্তানকে যদি হারাতে হয় দ্বিতীয় দফা মনোবৈকল্যের মধ্য দিয়ে, তবে সে কী নিয়ে বাঁচবে! ভয়ে ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের পানে তাকায় আফরোজা; ধক করে ওঠে পাঁজরের মাঝখানে। মেয়ের কচি মুখে যে সেই অশুভ কালো ছায়াই পড়েছে, যা শুরুর দিকে তার স্বামীর মুখমণ্ডলে পড়েছিল! পূর্বঅভিজ্ঞাবলে জানে, ওই মিশকালো ছায়াই পরে অপরাহ্নের দীর্ঘতর ছায়াকে টেক্কা দেয়, অমাবস্যার ঘনঘোর আঁধারে রূপান্তরিত হয়। মনের ওই অদৃশ্য কালো দাগ যারপরনাই সর্বনাশা; ধ্বংসযজ্ঞে তা দুকূলপ্লাবী বান-ডাকা নদীকেও ছাড়িয়ে যায়, অন্তস্তলের সব আলোক শুঁষে নিয়ে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলতে অব্যর্থ। হতভম্ভ আফরোজা টলমলো পায়ে উঠে এসে মেয়েকে জাঁপটে ধরে বুকে টেনে নেয়, মেয়ের ঘনায়মান কৃষ্ণকালো গহ্বরকে মুছে দিতে চায় মাতৃøেহের ওমে; কিন্তু মায়ের নিরাপদ উষ্ণ কোলে আশ্রয়লাভের পরও তেমন আশ্বাসের আভাস ফুটে ওঠে না; ফিনফিনে বাঁশপাতার মতো কাঁপতে থাকে একরত্তি মেয়েটা!

বিষ্ণু দের কবিতায় মার্কসবাদ by বীরেন মুখার্জী

কবি-সাহিত্যিক-লেখক কি প্রচল কোনও মতাদর্শের অনুসারী? নাকি লেখক নিজের সৃষ্ট মত বা আদর্শ চাপিয়ে দিতে চান পাঠক মহলে? ইয়েটস ও টিএস এলিয়ট প্রবর্তিত আধুনিকতা বাংলা কাব্যসাহিত্যে অনুপ্রবেশ লগ্ন থেকে বাম-ডানের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। কবি-সাহিত্যিকরাও স্বসৃষ্ট কিংবা আরোপিত মতাদর্শ নিয়ে বিভাজিত হয়ে পড়েন। এ বিভাজন নতুন নয় বরং সৃষ্টিপর্ব থেকে কালান্তরে ধাবমান। মতাদর্শ সাহিত্যে এক ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করে। তিরিশ কালপর্বে কবিরা প্রচল কাব্যধারার পরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করেছিলেন। ফলে তাদের কবিতায় শ্রমজীবী ও জনতাভিত্তিক সমাজচেতনার উন্মেষ দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যে একসময় উপেক্ষিত ও বিতর্কিত মার্কসবাদ তিরিশের কবিদের আবেগে মনন যুগিয়েছে একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। এ পর্বের কবিরা নিজেদের অ্যান্টি-রোমান্টিক আখ্যা দিয়ে রবীন্দ্রদর্শন ত্যাগ করে নৈরাশ্যবাদী ভাবধারায় কবিতা চর্চার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ফ্যাসিস্টবিরোধী ভূমিকায় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বিষ্ণু দেও এ পথে শামিল হন, এ ধারায় ক্রমশ তার শৈল্পিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ রবীন্দ্রবিযুক্তির প্রত্যয়ে বাংলা কবিতায় বিষ্ণু দে যে ভাবাদর্শে তার কাব্যসৌধ নির্মাণ করেছেন, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য পশ্চিমা জ্ঞান ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত এবং পূর্বসূরি জারিত। তার কবিতার বিমুগ্ধ পাঠে ধরা পড়ে মার্কসীয় মতাদর্শ। সমকালীন যুগযন্ত্রণা এবং আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সমন্বয় এবং স্বদেশ চিন্তাও তার কবিতার একটি বিশেষ লক্ষণ। বেঁচে থাকার তাগিদে এ পর্বের কবিরা মানুষের মৌলকাক্সক্ষার দাবিতে প্রতিবাদী চেতনা তুলে আনতে সচেষ্ট থেকেছিলেন তাদের কবিতায়। যা বিশ্বসাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃত। তবে মার্কসীয় দর্শনতাড়িত হলেও বিষ্ণু দে নিজে কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেননি। তিনি সচেতনভাবেই কবিতায় দর্শন ও বিজ্ঞানের মিশেল ঘটিয়েছেন। তার কবিতায় যেমন আছে নিসর্গ চেতনা তেমনি আছে ভক্তিবাদ ও যুক্তিবাদের প্রবল উপস্থিতি। আছে মিথ-পুরানের সফল প্রয়োগ। তৎকালীন ভারতবর্ষে সমাজবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণে সাংস্কৃতিক ধীমানরা বিদেশী সাহিত্যে নিজেদের মুক্তি খুঁজেছিলেন। এ ধারায় অগ্রবর্তী কবি বিষ্ণু দের অধিকাংশ কবিতায় মার্কসীয় আদর্শের তাত্ত্বিক ঘোষণা স্পষ্ট হয়। তিনি মনে করতেন সমাজতান্ত্রিক চেতনা ভিন্ন মানবিক চেতনার বিজয় অসম্ভব। সুতরাং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে তার কবিতায় মৃত্যুহীন মানুষের জয়গাঁথা রচিত হয় অনায়াসে- অমর দেশের মাটিতে মানুষ অজেয় প্রাণ,/ মুঢ় মৃত্যুর মুখে জাগে তাই কঠিন গান।/ হে বন্ধু জেনো, আজ যবে খোলে মুক্তিদ্বার,/ দেশে আর দশে ভেদাভেদ শুধু ভীরুতা ছার!
বিষ্ণু দের স্বদেশপ্রেম একদিকে ঐতিহ্যবাহী অন্যদিকে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামী। যা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চেতনার সঙ্গে আদর্শিক ভিত্তিতে জনগণতন্ত্রবাদী। তিনি ইতিহাসচেতনার পথে বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কূটকৌশল, ঔপনিবেশিক শাসন ও বৈশ্ব্যতান্ত্রিক দোদুল্যমান ভারতীয় মধ্যবিত্তের ভূমিকাবিষয়ক বোধ ও অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে স্থিত হয়েছেন। ফলে তিনি কবিতায় তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছেন ফ্যাসিস্ট শক্তির নিষ্ঠুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তিবাদী মানুষের প্রবল প্রতিবাদ। শ্রেণীশোষণ ও ঔপনিবেশিক দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় আশা করেছেন। ৭ নভেম্বর কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন-
সেই তিক্ত বঞ্চনার, বাণিজ্যলক্ষ্মীর রক্তাতুর
সাম্রাজ্যের অভিসার ধূলিস্মাৎ প্রাণের বিপ্লবে।
স্বাধিকারে মুক্তি আজ, ন্যায়যুক্তি-প্রতিষ্ঠ জীবন।
নাগরিক বৈদগ্ধের বিপরীতে তিনি এঁকেছেন সুস্থ জীবনের ছবি। তার প্রগতিচেতনার মূলে বিকশিত হয় সাধারণ মানুষের জয়গান ও সমাজচেতনার নিবিড় ধারাপাত যা সন্দীপের চর কবিতায় প্রাণস্রোতস্বিনী নদীর প্রতীকে উপস্থাপন করেন। তিনি কবিতার খাল কেটে দেশ-বিদেশের জলস্রোতের মিশ্রণে মানবমৈত্রীর বোধ রচনা করেন। সাম্যের সংগীত সত্য করতে গিয়ে কট্টর মার্কসবাদীদের সঙ্গে আদর্শিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেও তিনি শ্রেণীচেতনার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। বৈকালিক কবিতায় তিনি বলেন- ফিরে যাই সাথে লয়ে মৃত্যুহীন প্রাণ/ দূর থেকে ভেসে আসে ভাঙাসুরে বেকসুর গান/ তবু চলে বুঝি বীর নয়, শুধু/ লাখো কৃষাণ/ ধূসর আকাশে দুর্মর শিরে/ ওড়ে নিশান।.../ বহু বঞ্চনা বহু অনাচারে/ অমর প্রাণ/ বীরদল চলে হাজারো মজুর/ লাখো কৃষাণ।
তার কবিতায় স্তবক পরম্পরায় আপাত-সম্পর্কহীন বিন্যাস ও বিমূর্ততা আধুনিক কবিতার এক অনিবার্য শিল্পফসল হিসেবে চিহ্নিত। তার প্রথম দিকের কবিতা সন্দীপের চর এবং উর্বশী ও আর্টেমিস গ্রন্থের কবিতায় ফরাসি প্রতীকবাদ আশ্রিত প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যা টিএস এলিয়টের কবিতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে ফরাসি প্রতীকবাদের সম্পর্কের যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন আর্থার সায়মন্স। দ্য সিম্বলিস্ট মুভমেন্ট ইন লিটারেচার গ্রন্থে সায়মন্স মালার্মে প্রচলিত শব্দের কাম্য বিকল্প এবং মূল অর্থ থেকে দূরে সরে যাওয়া শব্দরাশির উপর্যুপরি বিন্যাস-এর কথা বলেন। কবিতার প্রতিপাদ্য ও অর্থ খুঁজতে থাকা পাঠকের হতবুদ্ধি হয়ে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি এ দুটি প্রবণতার উল্লেখ করেন। বিষ্ণু দের উর্বশী ও আর্টেমিস-এ পরম্পরাহীন স্তবক বিন্যাস যে মালার্মে এবং এলিয়টের পঙ্ক্তি বিন্যাস প্রভাবিত এ কথা বলা অসঙ্গত হয় না। তবে মার্কসীয় দর্শন গ্রহণের পর তিনি ধীরে ধীরে স্বাদেশিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাব্যসৌধ নির্মাণ করেন। কবি বিষ্ণু দের কাব্যাদর্শ থেকে বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা গভীর প্রেরণা ও সমর্থন লাভ করেছেন বলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।
বিদেশী সাহিত্যের বিপুল পাঠে বিষ্ণু দের মানসলোক পরিশীলিত। ফলে এলিয়ট ও এজরা পাউন্ডের কাব্যচিত্রকল্প ও বাক্যবিন্যাসের সংহতিও তার কাব্যজগতে ব্যাপক প্রভাবসঞ্চারী। কবিতায় তার দর্শন এবং শব্দ ব্যবহারে এক ধরনের ঋজুতা ও দৃঢ়তা দীক্ষিত পাঠককে টানে। জীবনানন্দ দাশ পাঠকের মননকে ধূসর রহস্যের জগতে নিয়ে যান, নৈরাশ্যবাদী করে তোলেন, কিন্তু বিষ্ণু দে তেমনটি নন। বিষ্ণু দের কাব্যভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তার নিজস্ব যুক্তিবাদী দর্শন ও সামাজিক কল্যাণবোধ। একজন কবিও যে চিন্তার সুস্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও যুক্তিবাদী দর্শনের মাধ্যমে কবিতায় অতলস্পর্শী সাফল্য অর্জন করতে পারেন, বিষ্ণু দে তার উজ্জ্বল উদাহরণ। যে কারণে তার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দসমবায়ে এক ধরনের সৌম রুচির সন্ধান মেলে। কট্টর মার্কসবাদী সংস্কৃতি অঙ্গনের কেউ কেউ এলিয়টকে অবক্ষয় ও প্রতিক্রিয়াশীল কবি হিসেবে চিহ্নিত করলেও বিষ্ণু দের অভিমত ছিল এর বিপরীতে। তিনি এলিয়টকে আধুনিক সাহিত্যের মহৎ কবি মনে করতেন। মনে করতেন বাস্তব জীবনের রূপকার এবং বস্তুবাদী চৈতন্যের ধারক। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে ব্যাপক ও প্রচ্ছন্ন সহমর্মিতা এবং এ প্রভাবের সদর্থক দিকের পাশাপাশি বিষ্ণু দের কবিতায় জটিলতার দিকটিও লক্ষ্যণীয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বিষ্ণু দের মননেও গভীর রেখাপাত করে। সামাজিক দায়বদ্ধতায় উদ্বুদ্ধ কবি ব্যক্তিবাদী সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে সমষ্টিচেতনায় উঠে আসেন। সাধারণ মানুষের কাতারে উত্তরণ ঘটে কবিচিন্তার। কবিতায় সগর্বে উঠে আসে গণজাগরণের কাব্যকথা। সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের মানবিক আবেদন এবং বলিষ্ঠ ভাষ্যে প্রকাশ পায় শ্রেণীসংগ্রামের নির্দেশনা। তার শ্রেণীচেতন মানসিকতার সফল রূপায়ণ মৌভোগ কবিতায় তিনি ভাগচাষীদের যন্ত্রণা তুলে ধরেছেন যা পরে তেভাগা আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়। কবিতায় লালকমল-নীলকমলের মাধ্যমে তিনি অসাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি এবং হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের সংগ্রামী চেতনা তুলে ধরেন-
জন্মে তাদের কৃষাণ শুনি কাস্তে বানায় ইস্পাতে
কৃষাণের বউ পঁইছে বাজু বানায়।
যাত্রা তাদের কঠিন পঠে রাখীবাঁদা কিশোর হাতে
রাক্ষসেরা বৃথাইরে নখ শানায়।...
এদিকে ওড়ে লালকমলের নীলকমলের হাতে
ভায়ের মিলে প্রাণের লালনিশান।
তাদের কথা হাওয়ায়, কৃষাণ কাস্তে বানায় ইস্পাতে
কামারশালে মজুর ধরে গান।
কবিতাটিতে তিনি অন্ত্যজ শ্রেণীর কৃষকের কাস্তেকে পুঁজিবাদের শাণিত তরবারির সঙ্গে তুলনা করেছেন। এছাড়া শেষ স্তবকটি অসাম্প্র্রদায়িক চেতনা বিকাশের পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের রূপকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে কারণে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের অনুষঙ্গে কবিতাটি হয়ে উঠেছে শ্রেণীসংগ্রামের প্রতীকীকাব্য। আবার হাসনাবাদেই শীর্ষক কবিতায়ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ-আন্দোলনের ছবি ফুটে ওঠে। লালকমলের হাতে নীলকমলের রাখী বেঁধে অতন্দ্র রাম ও রহিম পঙ্ক্তির মাধ্যমে তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। তার স্বদেশচিন্তা মার্কসবাদী চেতনার দর্পণে বিম্বিত হওয়ার কারণে তিনি সফল হয়ে ওঠেন।
কার পদধ্বনি আসে? কার?/ একি মখ যুগান্তর! নব অবতার।/ এ যে দস্যুদল! / হে ভদ্রা আমার!/ লুব্ধ যাযাবর! নির্ভীক আশ্বাসে আসে ঐশ্বর্য-লুণ্ঠনে,/ দ্বারকার অঙ্গনে অঙ্গনে/ চায় তারা রঙ্গিলাকে প্রিয়া ও জননী/ প্রাণৈশ্বর্যে ধনী,/ চায় তারা ফসলের ক্ষেত, দীঘি ও খামার/ চায় সোনা-জ্বালা খনি। চায় স্থিতি অবসর!... চোখে আজ কুরুক্ষেত্র, কানে তার মত্ত পদধ্বনি,/ ক্ষমা কোরো অতিক্রান্ত জীর্ণ অসুয়ারে।/ ব্যর্থ ধনঞ্জয় আজ, হে ভদ্রা আমার!/ হে সঞ্চয়, ব্যর্থ আজ গাণ্ডীব অক্ষয়॥ (পদধ্বনি/ পূর্বলেখ)
সমালোচক দীপ্তি ত্রিপাঠির মতে- পদধ্বনিতে বিষ্ণু দে অর্জুনের প্রতীকে আসন্ন বিপ্লবের সম্মুখীন বুর্জোয়ার ক্লৈব্যের ছবি এঁকেছেন। পদধ্বনি এখানে তাই শোষিত সমষ্টির সামাজিক বিপ্লবেরই পদধ্বনি। পরিশেষে একথা বলা অসঙ্গত হয় না যে, বিষ্ণু দে দীক্ষিত কবি যেমন স্বাদেশিকতায় তেমনি আন্তর্জাতিকতায়। বিষয়ের ব্যাপকতায়, নানা ভাষ্যে এবং একাধিক প্রতীকে। তার কবিতায় মানবিক প্রাণের স্পন্দন প্রভাবসঞ্চারী পাশাপাশি দেশজাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষ মানুষের জয়গানে একাত্ম। মার্কসীয় দর্শনে প্রভাবিত হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন সবার ওপরে মানুষ সত্য। যে কারণে ঈশভাবনাও তার কবিতার মর্মমূলে সঘন। জীবনকে সত্য করে তুলতে তার যাত্রা অবিশ্রাম ভাঙনের সাগর সঙ্গমে। তবে ভাষাগত সারল্য সংকটে তার কাব্যপ্রাসাদ সাধারণ পাঠকে ব্যাপক সমাদৃত নয়। কিন্তু মনোযোগী ও নির্বিচারী পাঠক কবি চৈতন্যের মেলবন্ধনে আমার ভাবনা বাঁচে জীবন মৃত্যুতে দুইতটে বলীয়ান হয়ে সংগ্রামী আহ্বানে পড়ে থাক এ আÍঘাতীর অনাদ্যন্ত খেয়োখেয়ি.../ চলো যাই জীবনের তরঙ্গমুখর সমুদ্র সৈকতে পৌঁছে যান অনায়াসে।

ক্রিমিয়া নিয়ে ভোট ও ‘আমাদের মাথাব্যথা’ by হাসান ফেরদৌস

ক্রিমিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গত সপ্তাহে যে নিন্দাজ্ঞাপক প্রস্তাবের ওপর ভোট গৃহীত হয়, বাংলাদেশসহ ৫৮টি দেশ তাতে ভোটদানে বিরত থাকে। ১০০টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ও ১১টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে মোট দেশের হিসেবে কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাশিয়ার নিন্দাই করেছে।

হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বর ও ভাষার বাধ্যবাধকতা by আখতার হোসেন খান

যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায় বদরুদ্দীন উমরের লেখায় বাংলা বানান নিয়ে কতগুলো সুচিন্তিত বিষয় উত্থাপিত হয়েছে। এ নিয়ে ভাষার মাসের বাইরেও যারা ভাষা নিয়ে ভাবেন, তাদের চোখ ফেরানো দরকার। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা ও অভিনিবেশ শুধু অতুলনীয়ই নয়, কবি ও ঔপন্যাসিকদের কথা বাদ দিলে, এ ক্ষেত্রে তার তুল্য অবদান আর কার আছে, তার সন্ধান দুরূহ। কিন্তু শুধু এ কারণেই নয়, তার মতামত এজন্যই গুরুত্ববহ যে, তিনি ভাষা নিয়ে যেসব মৌল প্রশ্ন তুলতে সক্ষম, তা আজকালকার দিনের রাজনীতিভিত্তিক ভাষাপ্রেম দেখানোর গড্ডলপ্রবাহের যুগে সচরাচর চোখে পড়ে না।
উমর আনন্দবাজারের বানান রীতির কথা তুলেছেন। আরও তুলেছেন একাডেমী বানানটিকে একাডেমিতে রূপান্তরের সাম্প্র্রতিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ। আনন্দবাজার পত্রিকা ও তার প্রকাশালয় বাংলা ভাষার আধুনিকায়নে ও ভারত প্রজাতন্ত্রের মতো একটা অসুবিধাজনক (ডিফিকাল্ট) দেশে বাংলা ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে যুগের পরে যুগ ধরে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে ও রেখে যাচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু ওই পত্রিকাভিত্তিক বানান-রীতিকে হুবহু অনুসরণ করতে গেলে সুবিধা-অসুবিধা তথা লাভ-লোকসান অবশ্যই হিসাবে আনতে হবে। এর কিছু রীতি উৎকটভাবে লোমহর্ষক : যেমন চীনকে চিন লেখা, যার কথা উমর উল্লেখ করেছেন; আমার প্রজন্মের গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদ ভূইয়া ইকবাল বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কথাটি টেনে আনেন।
উপরে বর্ণিত লাভ-লোকসান কে হিসাব করবেন? নিশ্চয়ই বক্তারা ও লেখকেরা। কিন্তু ভাষার বক্তা ও লেখকরা তো কোনো সরকারি আইনের বা আদালতের আওতাধীন নন। তাছাড়া এমন নয় যে, বাংলা ভাষা শুধু পশ্চিম বঙ্গ বা পূর্ব বাংলা (যার দাফতরিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ)-রই ভাষা। এ ভাষা ভারত প্রজাতন্ত্রের আরও রাজ্যে দাফতরিকভাবেই প্রথম বা দ্বিতীয় ভাষা। সুতরাং শুধু কলকাতা বা ঢাকা থেকে আকাদেমি বা একাডেমির মাধ্যমে বা সরকারি নির্দেশে (বা টিভিতে প্রমিত বানান ও উচ্চারণের প্রোগ্রাম করে, বা বছর দুয়েক আগের আদালতের হুকুমনামায়) ভাষার রীতি বা বানান পরিবর্তন সর্বগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। এর জন্য সময় দিতে হবে; দরকার হলে দশক-দশক বা শতাব্দী ধরে অপেক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের বানান রীতি কোনো আকাদেমি বা একাডেমির অনুশাসনে বা কোনো পত্রিকার অনুসৃত রীতিতে পরিবর্তিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এসে ঠেকেনি; এবং বিশ্বকবির ভাষার বানান-রীতি নিয়েই কি সবাই একমত ছিলেন? সে-নিয়েও তো ছোট আকারে হলেও ভিন্ন মত আর বিতর্ক ছিল।
এরপরও আছে লেখকদের নিজস্ব রীতি বা তরিকা, যাকে আত্মম্ভরিতাও বলা চলে। প্রয়াত নীরদ চৌধুরী সারা জীবন সাধু ভাষায় লিখে গেছেন। ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ডে এক দুর্লভ সাক্ষাতের সুযোগে তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম; তার সোজা উত্তর : অন্য কোনো ভাষায় একই ক্রিয়াপদের একাধিক ফর্ম/রূপকল্প নেই, সুতরাং বাংলায় কেন এ বিশৃংখলা থাকবে। অনেকের পরই চলতি ভাষায় লেখা শুরু করার পর রবীন্দ্রনাথও সাধু ভাষা সম্পর্কে এ জাতীয় বক্তব্য রেখে গিয়েছিলেন : এবং আশা করব, সাধু ভাষা... ঐতিহাসিক কবরস্থানে বিশ্রামলাভ করবে। সেই কবরস্থান তীর্থস্থান হবে, এবং অলংকৃত হবে তার স্মৃতিশিলাপট। এ বাণীর প্রায় অর্ধশতক পরও নীরদ চৌধুরী সাধু ভাষায়ই আরাধণা চালিয়ে যান; এবং যে আনন্দবাজার পত্রিকার কথা বলা হয়েছে তা, ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকসহ, আজও সাধু ভাষায় তার সম্পাদকীয় লিখে থাকে। বুদ্ধদেব বসু... এবং আরও অনেক লেখক... ফেলে-র জায়গায় ফ্যালে লিখতেন; রবীন্দ্রনাথ এ প্রবণতাকে পূর্ববঙ্গীয় রীতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু তা-ওতো ভাষায় গৃহীত হয়েছে। আসলে রবীন্দ্রনাথের কথায়ই ফিরতে হবে : ভাষা সব সময়ে যুক্তি মানে না।
কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান তুষ্ট চিত্তে সবাইকে জানান তার প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে দীর্ঘ ঈ-কার বাদ দিয়ে হ্রস্ব ই-কার যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলা একাডেমী এখন থেকে বাংলা একাডেমি। অনেক বছর আগে থেকেই ভারত প্রজাতন্ত্রে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি নামে আরেকটি সংস্থা কার্যকর আছে। দুনিয়ার কেউ পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন থামাতে চাইবে না, বিশেষত তা যদি হয় অগ্রগতির প্রয়োজনে। অবশ্য সে-অগ্রগতিকে হতে হবে দৃশ্যমান, যুক্তিনির্ভর এবং পরিমাপযোগ্য।
শামসুজ্জামান খান একজন নিবেদিত প্রাণ বাংলাভাষাসেবী এবং তার ভাষা-সংক্রান্ত বেশিরভাগ চিন্তার সঙ্গে শুধু পণ্ডিতরাই নন, যে-কোনো সাধারণ বাংলা ভাষা-প্রেমিক একমত হবেন। এর পরও একটা প্রশ্ন এসেই যাবে, আর তা হল এসব পরিবর্তন বিভিন্ন ভাষা-বিশারদ-কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন পথে পরিচালিত বাংলা হওয়াতে তা ভাষাকে কতটা অখণ্ড-অবিভাজ্য রাখছে। আর সে-বিবেচনায় একাডেমি বা আকাদেমি, কোনো বানান নিয়েই আহ্লাদে আটখানা হওয়ার কিছু নেই; কেননা প্রথমটি দীর্ঘ ঈ-কার বা হ্রস্ব ই-কার, যা দিয়েই লেখা হোক না কেন, বাংলাভাষীরা শব্দটিকে যেভাবে উচ্চারণ করেন, তার অনেক কাছের। দ্বিতীয়টি, আকাদেমি, নিরর্থক অতিসচেতনতার ফল, যাতে আবার সারাক্ষণ-উচ্চারিত ইটালীকে ইতালি লেখার ভাষা-দর্শন ঢুকে আছে। মূল কথা, কোনো পরিবর্তনই ভাষার অবিভাজ্যতার মূল চিন্তাকে সামনে রেখে করা হয়নি।
যারা বাংলা ভাষাকে ভালোবাসেন, তাদের একটা সাধারণ দাবি এ হতে পারে যে যেখানে যাই হোক, আধুনিকতা বা অন্যকিছু, সবকিছু ছাপিয়ে ভাষার এ অবিভাজ্যতার প্রশ্নটি যেন মাথায় থাকে। বিভক্ত জার্মানির পূর্বাংশে এক ধরনের ভাষাবিদ বোঝাতে চাইতেন যে সমাজতান্ত্রিক শাসনের ফলে দুজার্মানির ভাষায় কিছু মৌলিক পার্থক্য জন্ম নিয়েছে। এটা ছিল রাজনীতি-প্রণোদিত ভাষাচার। ইতিহাসের কলের তলে এখন তা কোথায়? ভৌগলিকভাবে সংযুক্ত একটা ভাষাগোষ্ঠীর ভাষায় শুধু রাজনৈতিক কারণে জোর করে ভিন্ন ভিন্ন কৃত্রিম বৈশিষ্ট্য আমদানিতে গৌরবের কিছু নেই; এবং তার উদ্দেশ্য যে মহৎ নয়, তা সবাই বুঝতে পারেন। মার্কিন দেশের ইংরেজি বানানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ভাষার কিছু শব্দের বানানের একটা ফারাক তৈরি হয়ে গেছে; কিন্তু, তার পরও কেউ বলবেন না যে নতুন ভাষা তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া সেখানে তো আছে মহাসমুদ্রের ভৌগলিক ব্যবধান।
সুতরাং, বর্তমানে কিছু স্ত্রীপ্রত্যয় ছাড়া অতৎসম শব্দে সর্বত্র ই (হ্রস্ব ই) প্রত্যয়ের ব্যবহার চালু হয়েছে, এ দাবি করা সহজ বটে, কিন্তু তাতে ভাষার দীর্ঘস্থায়ী কী উপকার হচ্ছে, তা বোঝা শক্তই শুধু নয়, প্রমাণ করাও কঠিন। যদি বৈচিত্র্যই সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে, তবে তো একাধিক বানান-পদ্ধতির মধ্যে ক্ষতিকর কিছু না থাকারই কথা। আর অতৎসম শব্দের শেষে কোথাও দীর্ঘ ঈ-স্বরের উচ্চারণ নেই, তাই বা কীভাবে দৃঢ় প্রতিষ্ঠ বা প্রমাণিত হল। যদি থাকে, এবং অবশ্যই আছে, কেন একভাবে লিখে আরেকভাবে উচ্চারণ করা হবে? একটা ভাষার বৈশিষ্ট্য ও ঐশ্বর্য একাধিক সম্ভাব্য রীতিতে কমে না, বরং বাড়ে।
একইভাবে, অভিন্ন উচ্চারণের পরও শ, ষ আর স কে তো আমরা ছাড়তে পারিনি। বাংলার মতো একই ব্রাহ্মী লিপি থেকে জন্ম হলেও এবং উচ্চারণে মূর্ধ্য বর্ণ আর দন্ত বর্ণের প্রভেদ চলে যাওয়ার পরেও তো থাইরা তাদের ভাষায় ট-বর্গ ও ত-বর্গ অব্যাহত রেখে ৪৪টি ব্যঞ্জন বর্ণ আর ১৫টি স্বরবর্ণ দিয়ে কাজ চালাচ্ছে।
অনেক বিজ্ঞ ভাষাবিদ কি ও কী নিয়ে বিব্রত এবং বিক্ষুব্ধ। কিন্তু ভাষার সাধারণ কথক ও পাঠক হিসেবে বলতে পারি, এ দুটি বর্ণবন্ধ শুধু যে দুধরনের অর্থ দ্যোতক তাই নয়, বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা ও পরিশীলতার অকাট্য প্রমাণ। এসব প্রমাণ ঝেড়ে ফেলে দিলে কী-লাভ হবে, তা বোঝা শক্ত। এতে হয়তো এক ধরনের কুচকাওয়াজসুলভ শৃংখলা আসবে, কিন্তু ভাষার মর্যাদাবৃদ্ধি কি আসলেই হবে? আর ভাষার কী ওই ধরনের শৃংখলার প্রয়োজন আছে।
সম্প্রতি অন্যত্র প্রকাশিত এক সুন্দর লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশ্বজিৎ ঘোষ বাংলা ভাষায় গোটা পাঁচেক প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। তার সবগুলো যুক্তির সঙ্গে একমত হয়েও আমি বলব, যেখানে বিরাম চিহ্নের বদলে অনুস্বর আসেনি, এসেছে সংক্ষিপ্তকরণের জন্য, তা থাকুক না বাংলা ভাষার একটা বৈশিষ্ট্য হয়েই, এ-বৈশিষ্ট্য তো ভাষার সম্পদ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। অনেকের কাছেই তাকে গ্রাম্য বা কৃষিজ (এগ্রিকালচারাল) মনে হতে পারে, কিন্তু এটাওতো ভাষার একটা অর্জন হিসেবে থাকতে পারে। আমার ছোট বেলায় ফরিদপুরে আমার শহুরে সরকারি চাকরিজীবী মাতামহের চিঠিতে হাওলাদারের জায়গায় হাং এবং বারবারের স্থানে বার২ লেখা দেখে বিস্মিত হতাম। নিকট অতীতে সচিবালয়ের নথিতেও তা দেখেছি। কিন্তু এখন তো আমার মনে হয়, এসব প্রয়োগ বাংলা ভাষার ঔদার্য ও বৃহত্তরকেই প্রমাণ করে; এবং তাই ভাষার এ সম্পদগুলোকে আমাদের রক্ষা করা উচিত। মালয় ভাষায় কোনো শব্দের বহুবচন লিখতে হলে শব্দটিকে দুবার লিখতে হয়; যেমন সুকান অর্থ ক্রীড়া; আর বহুবচনে তা হয়ে যায় সুকান সুকান : কী অসুবিধা এতে? শুনেছি চীনা ভাষায় বহুবচন নেই, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎকাল নেই। কিন্তু তার পরেওতো দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি লোক ওই ভাষাতেই কথা বলেন; এবং তারা এক মহান সাহিত্যের ধারক।
একই পত্রিকায় বেগম জাহান আরার আরেকটি সুপাঠ্য লেখাতেও হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ-র প্রসঙ্গ এসেছে। মনে হচ্ছে, তিনিও ঢালাওভাবে হ্রস্ব-ই-রই সমর্থক। কেন সব অতৎসম শব্দে দীর্ঘ ঈ-র জায়গায়ও হ্রস্ব-ই লিখতে হবে, তা বুঝতে আমি অক্ষম। আমার ভাষাজ্ঞানের অভাবকে এজন্য দায়ী করা সহজ। কিন্তু অতৎসম শব্দের উচ্চারণে ক্ষেত্রমতো এত সব বিধিকরণের পরেওতো দীর্ঘ-ঈ স্বর থেকেই যাবে, আমরা যাই লিখি না কেন। এদের তো এ ভাষা তাড়াতে পারবে না, তা শতটি একাডেমির বিধি হোক বা না হোক। লীগ, আওয়ামী, ইসলামী ইত্যাদি শব্দ তাহলে কোথায় যাবে? শ্রেণী-কে শ্রেণি লিখে এক ধরনের আÍতুষ্টি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কী তাতে কী বিজয় মিলবে?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের বাংলা ভাষ্যে বাঙালী, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার, সুপ্রীম কোর্ট, আপীল বিভাগ, ইংরাজী ইত্যাদি দীর্ঘ-ঈ বানানের শব্দ রয়েছে। আমি জানি না, সাম্প্রতিককালের সংশোধনীতে সে-সব পালটেছে কিনা। না পালটালে বেশ কিছু অতৎসম শব্দে পরিত্যাজ্য দীর্ঘ-ঈ নিয়েই বসবাস করতে হবে। ভাষার ব্যাপারে যেহেতু বাধ্যবাধকতা নেই, তাই ক্ষেত্রমতো একাধিক বানান-পদ্ধতির সহাবস্থান ভাষার খুব ক্ষতি সাধন করবে না; বরং এর মাধুর্য বাড়াতেও পারে; এবং সাধু ভাষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ বাণীর পরও তা এখনও বেঁচে-বর্তে আছে : কবি ও ঔপন্যাসিকরা সম্ভবত এসবে উপকৃতই হবেন।

বিএনপি ও ইসির ওপর প্রভাব by আলী রীয়াজ

১৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দফা শেষে প্রাপ্ত ফলাফল জানার পর থেকেই বিভিন্ন রকমের আলোচনা, বিশ্লেষণ আমরা দেখতে পেয়েছি। প্রথম দফার ফলাফলে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের তুলনামূলকভাবে বেশি চেয়ারম্যান পদে জেতার পর কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে গত বছরের শেষের দিকটাতে নির্বাচনের আগে বিএনপি সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানার পরেও সাধারণ ভোটাররা কেন বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করছেন। জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং প্রচার সত্ত্বেও দলের প্রার্থীদের ফলাফল এই বিস্ময়ে আরেক মাত্রা যুক্ত করেছে।

আফগানিস্তানের সামনে আরও কঠিন সময় by ব্রহ্মা চেলানি

আফগানিস্তান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। ৩৫ বছরের যুদ্ধের পর দেশটির ঐক্য ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা আজ হুমকির মুখে। আফগানিস্তান কি তিন দশকের বেশি সময়ের জঙ্গিবাদ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের চক্র থেকে মুক্ত হতে পারবে?

ছাত্রলীগের আরও একটি খুন- খুনিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করুন

সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা যে শুধু অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেই সহিংস হয়ে ওঠেন, তা নয়। তাঁরা নিজেদের মধ্যেও খুনোখুনি করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব খুনোখুনির বিচার ও অপরাধীর শাস্তি হয় না।

কত কী দেখলাম! by আনিসুল হক

প্রথম চীনা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। ১৯৭৭-৭৮ সালের কথা। তখন আমি পড়ি ক্লাস সেভেন কি এইটে। খুব শুকনা-পটকা ছিলাম। কিন্তু মাথাটা ছিল বড়। এ জন্য অনেকেই আমাকে ডাকত কাতলা মাছ বলে। নরকঙ্কালের মতো শরীরটা থাকার ফলে একটা কাজ পাওয়া গেল। আমার বড় ভাই পড়তেন মেডিকেল কলেজে। তিনি আমাকে খালি গায়ে দাঁড় করিয়ে রেখে আমার বুকের হাড্ডিগুলোতে পেনসিল দিয়ে দাগ দিতেন আর পড়া মুখস্থ করতেন। শর্ত হলো, পরীক্ষা শেষে তিনি আমাকে চায়নিজ খাওয়াবেন।

মিসরে ৫২৯ জনের ফাঁসি কার্যকর করা কি সম্ভব?- সিএনএনের বিশ্লেষণ

মিসরের গত আগস্টে এক সহিংস ঘটনার দায়ে ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ৫২৯ সমর্থকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনা শহরে সংঘর্ষের সময় এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। একজন মানুষকে হত্যার ঘটনায় এতগুলো মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া কতটা যৌক্তিক এবং এ রায় মিসরের সেনা-সমর্থিত বর্তমান সরকার কার্যকর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আফগান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্যতা পাবে? by ফাতেমা আবেদীন

আগামীকাল শনিবার আফগানিস্তানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহার-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর এটিই দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যাচ্ছেন দেশটির দীর্ঘ এক যুগের শাসক হামিদ কারজাই। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে প্রাদেশিক নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পুবে মুখ ফেরাচ্ছেন পুতিন by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার ভেতর টেনে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্পর্ক এখন দা-কুমড়া। ইউক্রেন তো বলেই দিয়েছে, পুতিন যা করছেন, পরিণামে তা সামরিক বিরোধ ডেকে আনবে।

পুতিন-লুদমিলা বিচ্ছেদ

প্রেসিডেন্ট পুতিন ও তাঁর সাবেক স্ত্রী লুদমিলা
অবশেষে আলাদা হয়ে গেলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী লুদমিলা। এই জুটি দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর এক ছাদের নিচে ছিলেন। গতকাল বুধবার প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে পুতিন-লুদমিলার বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুতিন-লুদমিলা অবশ্য আলাদা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন গত বছরের জুনে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসছিল না বলে নানা গুঞ্জন চলছিল। এখন সব গুঞ্জনের অবসান ঘটল।
প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গতকাল রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইতার-তাসকে জানান, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী লুদমিলার বিচ্ছেদের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন স্ত্রী লুদমিলার সঙ্গে বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে গত জুনে বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের যৌথ সিদ্ধান্ত।’ এরপর লুদমিলা বলেছিলেন, ‘আমাদের বিচ্ছেদ হচ্ছে। কারণ, আমরা প্রায় কখনোই কেউ কাউকে বুঝিনি।’ লুদমিলা তাঁদের আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘মার্জিত বিচ্ছেদ’ বলে আখ্যা দেন। লুদমিলা-পুতিন দম্পতির দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ৬১ বছর বয়সী পুতিনের সঙ্গে রুশ জিমন্যাস্ট আলিনা কাবায়েভার সম্পর্ক রয়েছে বলে গুজব উঠেছে। আলিনা বর্তমানে রাশিয়ার পার্লামেন্ট সদস্য। এএফপি।

মমতার সমর্থন পাচ্ছে বিজেপি?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের বিভিন্ন জরিপে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয় পেতে যাচ্ছে বলে আভাস মিলছে। কিন্তু বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) কিংবা বিজেপি এককভাবে সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকছে। বিজেপি সেই বিষয়টি মাথায় রেখে নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে। বিনিময়ে সরকার গঠনের পর বিজেপির কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্য আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ পেতে পারেন মমতা।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিজেপির সঙ্গে মমতার সমঝোতা হওয়ার ভালোই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেটা হতে পারে নির্বাচনের পর। মমতার দল বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে জোটকে। আর মমতার সমর্থন নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠন করতে পারলে বিনিময়ে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ দেবে, যেটা বিশাল ঋণের ভার থেকে মমতার পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে রেহাই দেবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনীতিক বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচন হবে। তার আগে রাজ্যের অর্থনীতিকে চাঙা করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। যেটা ওই নির্বাচনে নিজের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে কাজে দেবে মমতার। আর কংগ্রেসের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরে মমতার একপ্রকার টানাপোড়েন চলছে। তাই কংগ্রেসকে সমর্থন দিলেও মমতার খুব একটা লাভ হবে না। এ কারণেই নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সময় মমতার সমর্থন বিজেপির পক্ষেই যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ বিভিন্ন জরিপ ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এবার ২৫ থেকে ৩০টি আসনে জয়লাভ করতে পারে।
আর এটা হলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ ও ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) পর এককভাবে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দল হতে পারে মমতার কংগ্রেসই। তখন সরকার গড়তে দুই পক্ষেরই প্রয়োজন হবে মমতাকে। এখনই বিজেপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটে না যাওয়ার কারণ হিসেবে সূত্রগুলো বলছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৫ শতাংশ মুসলিম ভোটার আছেন। নির্বাচনের আগে মোদির সঙ্গে হাত মেলালে সেই ভোট মমতার বাক্সে পড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। মূলত এ কারণে নির্বাচনের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপির সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের মুখপাত্র ডেরেক ও’ ব্রায়েন বলেন, ‘এটা কংগ্রেস ও বামপন্থীদের প্রচারণা। আমরা বিজেপি, কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সঙ্গে সমানভাবে লড়াই করছি। কোনো সমঝোতা করার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা বিশ্বাস করি, ফেডারেল ফ্রন্টই একমাত্র বিকল্প হতে পারে।’ এ ব্যাপারে টাইম অব ইন্ডয়ার পক্ষ থেকে বিজেপির গণমাধ্যম সমন্বয়ক রবি শঙ্কর প্রসাদ বলেন, ‘আমি তৃণমূলের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার বিষয়ে কিছু জানি না। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না।’ বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির ধারণা, সমঝোতার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠেয় বিধানসভা নির্বাচনই হবে মমতার মূল বিবেচনার বিষয়। আর সে কারণেই রাজ্যের জন্য আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের জন্য বিজেপিকে সমর্থন দেবে তৃণমূল। অন্যদিকে ২৫-৩০টি আসন পেলে কেন্দ্রে সরকার গঠনে তৃণমূলের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি বিষয় সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য করবে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

রায়বেরিলিতে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন সোনিয়া

উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রায়বেরিলিতে গতকাল মনোনয়নপত্র
জমা দেওয়ার আগে সমর্থকদের ফুলেল অভিনন্দন গ্রহণ
করছেন ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধী, ছবি: এএফপি
গাড়ি চালালেন ছেলে রাহুল, গাড়ি চাপলেন মা সোনিয়া। এভাবে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে লড়তে গতকাল বুধবার উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। গতকাল সোনিয়া রায়বেরিলিতে নামামাত্র তাঁর স্টিল গ্রে এসইউভির স্টিয়ারিংয়ের দায়িত্ব হাতে তুলে নিলেন রাহুল নিজে। পাশের আসনে মা সোনিয়া। দুপুর ১২টার আগে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন ঠিক করেছেন। কিন্তু যেভাবে মানুষের ভিড়, তাতে ইঞ্চি ইঞ্চি এগোনোও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। লাল গোলাপ ও হলুদ গাঁদা ফুলের পাপড়িতে ভরে যায় গাড়ির কাচ ও ছাদ। তা সরাতে নিরাপত্তারক্ষীদের হিমশিম হাল। মাথার ঘোমটা ঠিক রেখে মানুষের হাতে হাত মেলানো, সে এক মহাপরীক্ষা সোনিয়ার। এবার জিতলে রায়বেরিলিতে হ্যাটট্রিক হবে তাঁর। ১৯৯৯ সালে আমেথিতে জিতে পরেরবার আসনটি ছেড়ে দেন ছেলে রাহুলকে। আমেথিতে জিততে পারলে মায়ের মতো রাহুলও এবার হ্যাটট্রিক করবেন।
আমেথি ছেড়ে বুধবার তিনি মায়ের সারথি। আগের দিনই আমেথিতে রাহুলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বিজেপি বেছে নেয় ছোট পর্দার নায়িকা রাজ্যসভার সদস্য স্মৃতি ইরানিকে। কিন্তু তাতে কী। রাহুল নির্বিকার। নিজের আসন ছেড়ে বুধবার তাঁর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় মায়ের আসন রায়বেরিলি। স্মৃতি ইরানির চ্যালেঞ্জ জানানোর আগেই লড়াইটা অবশ্য আরো জোলো করে দেন সহযো"া বরুণ গান্ধী। আমেথি ও রায়বেরিলির লাগোয়া জেলা সুলতানপুরে বিজেপির প্রার্থী বরুণ গত মঙ্গলবার যেভাবে রাহুলের প্রশংসা করেছেন, তাতে বিজেপির প্রার্থী স্মৃতি ইরানির চেয়েও বেশি বিড়ম্বিত তাঁর দল। বরুণকে বাধ্য হয়ে ঢোক গিলতে হলো গতকাল। মঙ্গলবার বরুণ একদল শিক্ষক ও কর্মীদের সমাবেশে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিকে আমি একটা নতুন ধাঁচে ফেলতে চাই। আমাদের ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশ প্রয়োজন। রাহুল আমেথিতে যেভাবে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠন করে সাফল্য পেয়েছেন, সেই রকম। আমি অবশ্য ওগুলো চোখে দেখিনি।’ গতকাল রায়বেরিলিতে প্রসঙ্গটি উঠলে রাহুল হেসে বলেন, ‘বরুণ যা বলেছেন, তা ঠিক। আমার ভেবে ভালো লাগছে, আমেথিতে আমাদের ভালো কাজের প্রশংসা অন্যরাও করছেন।’ বরুণের রাহুল-প্রশস্তি বিজেপির কানে গরম সিসা ঢেলে দেয়।
রাজনাথ সিং নির্দেশ দেন বরুণকে অন্য রকম বিবৃতি দিতে। বাধ্য বরুণ গতকাল টুইট করেন, ‘আমি যা বলেছি, তা কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির প্রতি সমর্থন বলে মনে করা ঠিক হবে না।’ বরুণ বললেন বটে, তবে আমেথি-রায়বেরিলিতে জেঠিমা ও জেঠতুতো দাদার বিরুদ্ধে প্রচারে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটলই রয়েছেন। ভোটযুদ্ধ ক্রমশ তেতে উঠছে। এবং ক্রমেই এবারের লড়াইটা ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে হতে চলেছে। মঙ্গলবার দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম সৈয়দ আহমেদ বুখারির সঙ্গে সোনিয়া দেখা করেছিলেন। জানাজানি হওয়ার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেছে। অরুণ জেটলি থেকে শুরু করে প্রকাশ জাভরেকার সবাই কংগ্রেসকে তুলাধোনা করে বলেছেন, ওরা এই ভোটকে সাম্প্রদায়িকতার রং দিতে চাইছে। তাই ইমামের সঙ্গে বৈঠক করে মুসলমানদের ভোট নিশ্চিত করতে চাইছে।

নতুন মন্ত্রিসভায় ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের সাবেক সঙ্গিনী

সেগোলেন রয়াল
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ গতকাল বুধবার নতুন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছেন। এতে স্থান পেয়েছেন তাঁর সাবেক সঙ্গিনী সেগোলেন রয়াল। তাঁকে পরিবেশ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন সমাজতন্ত্রী দল গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর সরকারে পরিবর্তন আনা হলো। নতুন প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই নতুন সরকার গঠন করেছেন প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ফাবিয়া এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জ্যঁ-ইভ লে দ্রিয়াঁকে নিজ নিজ পদে বহাল রাখা হয়েছে।
তবে সাবেক অর্থমন্ত্রী পিয়ের মস্কোভিসিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পদটিকে ভেঙে এখন অর্থমন্ত্রী এবং শিল্প ও অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রীর দুটি আলাদা মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। সেগোলেন রয়াল প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর আমলে একাধিক সরকারে শিক্ষা ও পরিবারবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এপি ও এএফপি।

ইতিহাস নিয়ে কংগ্রেসের লুকাছাপা

নেভিল ম্যাক্সওয়েল যখন লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য টাইমস-এর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি হিসেবে নয়াদিল্লি থাকতেন, তখন আমি ওই পত্রিকার একজন সংবাদদাতা। আমরা প্রায়ই ভারত ও অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে চীন নিয়ে আলোচনা করতাম। ম্যাক্সওয়েল ভীষণ ভারতবিরোধী ছিলেন। নয়াদিল্লি থেকে তিনি যেসব সংবাদ পাঠাতেন সেগুলোতে তাঁর সহজাত ভারত-বিদ্বেষ ধরা পড়ত। যেমন, ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনের পর তিনি বলেছিলেন, এটা ভারতের শেষ নির্বাচন। কারণ, গণতন্ত্র ও ভারত একসঙ্গে যায় না। পরে তিনি তাঁর কোনো লেখাতেই স্বীকার করেননি যে তাঁর এই ভারত-পাঠ ভুল ছিল। আমার চোখে অন্তত পড়েনি। আমি ও ম্যাক্সওয়েল প্রায়ই ভারতের উন্নয়নের সঙ্গে চীনের উন্নয়নের তুলনা করতাম। তিনি চীনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার প্রশংসা করতেন। তিনি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করতেন, ভারতই চীনের ওপর আক্রমণ করেছে; তাই তাঁর বইয়ের শিরোনাম দিয়েছিলেন, চীনের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ। বইটির উপযোগিতা দেখা যায় যখন এর কিছু প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট অংশ হেন্ডারসন ব্রুকস কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত হয়। ১৯৬২ সালে ভারতের দুর্দশার কারণ অনুসন্ধানে হেন্ডারসন তাঁর সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে দোষারোপ করে বলেছিলেন, নেহরু ভারতকে এমন এক সময় চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘ঠেলে’ দিয়েছিলেন, যখন ভারতের সৈন্যদের পায়ে জুতাও ছিল না। অথচ তাঁদের কাশ্মীর থেকে নিয়ে এসে চীনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। আমি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর তথ্যসচিব ছিলাম।
নেহরু কর্তৃক চৌ এন লাইয়ের ওপর চাপ প্রয়োগের ব্যাপারে শাস্ত্রী কতটা অস্বস্তিতে ছিলেন, তা আমি জানি। নেহরু শাস্ত্রীকে বিশ্বপরিসরে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁকে বান্দুংয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে নিয়ে গিয়েছিলেন। চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজয়ের পর নেহরু আর কখনোই আগের মতো হতে পারেননি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন বলেও তিনি মনে করতেন। এটা তাঁর অকালমৃত্যুর একটা কারণ। সরদার প্যাটেল নেহরুকে চীনের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন, চীনের ওপর আস্থা রাখতে মানা করেছিলেন, এমনকি এও বলেছিলেন যে চীন একদিন ভারত আক্রমণ করবে। কিন্তু নেহরু সমাজতান্ত্রিক দেশের মোহে পড়েছিলেন; কিন্তু তিনি ভারতকে সে পথে নিয়ে যেতে পারেননি। ম্যাক্সওয়েল হেন্ডারসনের প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশ করেছিলেন। কংগ্রেসবিরোধী জোটের পালে হাওয়া দেওয়ার জন্য তিনি এ কাজ করেছিলেন বলে আমার বিশ্বাস। নেহরু তাঁর দেশকে প্রস্তুত করতে পারেননি, তিনি চীনা পরিকল্পনার ভুল পাঠ করেছিলেন, এটা এখন সবাই জানে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পি এন থাপারের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছিলাম। তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে ভারত পরাজিত হবে। তিনি অস্ত্র ক্রয় ও আরও সৈন্য সমাবেশের জন্য দীর্ঘ এক নোট পেশ করেছিলেন। নেহরুর ভাষ্যমতে, সেই নোট কোনো দিনই তাঁর কাছে পেশ করা হয়নি। নয়াদিল্লি বিতর্কিত স্থানে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে অগ্রসর হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব বি এন ঝা আমাকে বলেছিলেন, গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক বি এন মালিক ‘প্রখর বুদ্ধির’ পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর এই বুদ্ধি অনুসারে আমরা ‘যেখানে সম্ভব’ পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছিলাম,
এমনকি ‘চীনা সীমানা’ অতিক্রম করেও আমরা আমাদের ‘দাবি প্রতিষ্ঠার’ জন্য এসব ক্যাম্প স্থাপন করেছিলাম। কিন্তু মালিক এটা বুঝতে পারেননি যে পেছন থেকে কোনো রকম সমর্থনহীনভাবে এসব ক্যাম্প চীনারা অগ্রসর হওয়ামাত্র একের পর এক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। আমরা বিনা কারণে পুলিশ বাহিনীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি। খোলাখুলিভাবে বললে, এটা ছিল সেনাবাহিনীর কাজ। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রসদ না আসা পর্যন্ত সেনাবাহিনী সেখানে দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকৃতি জানালে সেখানে পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি এখনো বুঝতে পারি না সরকার কেন ব্রুকসের প্রতিবেদনটি ‘গোপনীয়’ শ্রেণীভুক্ত করে রেখেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এতে বেশ কিছু ‘কৌশল’ প্রকাশ পেয়ে যাবে, যেগুলো এখনো অনেকাংশে প্রাসঙ্গিক। ১৯৬২ সালে যে কৌশল ও অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোর কোনো প্রাসঙ্গিকতা আজ আর নেই। সাবেক সেনাপ্রধান ভি পি মালিক একবার বলেছিলেন, ১৯৬২ সালের অপারেশনের আজ আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। তিনি এই প্রতিবেদন প্রকাশের কথা বলেছেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার মনে করে এটা করলে নেহরুর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলেরও। এখন এ প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। সরকারের আচরণ অগণতান্ত্রিক ও অশোভন দেখায় যখন তারা প্রতিবেদনটি গোপন রাখার জন্য পীড়াপীড়ি করে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার চেষ্টা করে আমি ব্যর্থ হয়েছি। প্রথমে আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে গেলে তারা না বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে আমি তা সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। পানি বহুদূর পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু তাঁরা আমার আবেদন নাকচ করে দেন। আমি হাইকোর্টের কাছে আবেদন করি, তাঁরা উত্তর দিতে গড়িমসি করেন। অনেক বছর পর একটি সংক্ষিপ্ত রেফারেন্স আসে গত বছর, যেখানে বিচারক বলেন, ‘মানে আপনি দেশের সব গোপনীয় ব্যাপারগুলোকে রাষ্ট্র করে দিতে চান?’ সেখানে এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত হোক, এই আমার ইচ্ছা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে কেউ নেই। ব্যাপারটা সেখানেই পড়ে আছে, আর সরকারও নাছোড়বান্দার মতো সেই মান্ধাতার আমলের নীতি আঁকড়ে আছে যে ৫২ বছর পরও জনগণের এটা জানার অধিকার নেই।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

কী পেল আওয়ামী লীগ?

পাঁচ পর্বে দেশের উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের পরিসমাপ্তি হয়েছে। সাকল্যে ৪০ দিনের ব্যবধানে সম্পন্ন এই নির্বাচনের প্রায় পুরো ফলই এখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। অঙ্কের হিসাবে এই শিরোনাম নির্ভুল। কিন্তু আওয়ামী লীগের এই বিজয় কীভাবে অর্জিত হলো এবং এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী হলো কি না, সেটা বিবেচনার দাবি রাখে। উপরন্তু বিএনপির ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটাও দেখার বিষয়। নির্বাচন কমিশনের ভবিষ্যতের জন্যই বা এই নির্বাচন কতটা ইতিবাচক হবে? কাগজে-কলমে উপজেলা নির্বাচন দলভিত্তিক নয়, কিন্তু আমরা এও জানি যে বাস্তবে এই নির্বাচনের প্রার্থীরা দল-সমর্থিত হন, প্রচার কার্যত হয় দলভিত্তিক এবং এই বিষয়ে দলগুলো কোনো রকম রাখঢাক করে না। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে উৎসাহের কারণ নেই। কেননা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উপজেলা পরিষদের ক্ষমতা সীমিত, তদুপরি দফায় দফায় এর কাঠামো ও ক্ষমতা সংশোধনের পর পরিষদগুলো নামেমাত্র স্থানীয় সরকারের বিষয়, কার্যত তা স্থানীয় সংসদ সদস্যের নিয়ন্ত্রণাধীন। তদুপরি রয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কর্তৃত্বের প্রশ্ন। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি যতটা ইতিবাচক, ঠিক ততটাই নেতিবাচক যে তাঁদের কার্যপরিধি এবং ক্ষমতার প্রশ্নটি অমীমাংসিত রাখা।
সেনাশাসনের আমলে জেনারেল এরশাদের হাতে উপজেলা ব্যবস্থার উৎপত্তি। উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হলেও অনেকেই এর মধ্যে সেনাশাসকের ক্ষমতা সংহত করার অসদুদ্দেশ্য দেখতে পেয়েছিলেন। উপজেলা ব্যবস্থার মধ্যে পাকিস্তান আমলে জেনারেল আইয়ুব খানের তৈরি করা বনিয়াদি গণতন্ত্রের ছায়া দেখতে পাওয়ার জন্য খুব কষ্ট করতে হয়নি। তাই সে সময় অনেকেই একে ‘উপজ্বালা’ বলেও বর্ণনা করেছিলেন। সামরিক শাসনের বিরোধীরা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং আন্দোলনের সময় এর বিলোপের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু একটি নির্বাচিত প্রশাসনিক কাঠামো, ইতিমধ্যে যার দুই দফা নির্বাচন হয়েছে এবং যেখানে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, সেখানে এই কাঠামোর একটা উপযোগিতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এই ব্যবস্থার বিলোপের সময় তা যে ভাবা হয়নি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, এর কোনো বিকল্প কাঠামো বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেনি। পালাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতায় এলেও প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের ব্যাপারে যাঁদের আগ্রহ বেশি, তাঁদের হাতে উপজেলাই বলি, কি অন্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানই বলি, তার বিকাশ সম্ভব নয়।
ফলে শেষ পর্যন্ত অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাত ধরেই উপজেলার প্রত্যাবর্তন ঘটে ২০০৮ সালে। সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগ্রহ ছিল জাতীয় নির্বাচনের আগেই উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। যে আশঙ্কায় প্রতিষ্ঠালগ্নে রাজনীতিবিদেরা এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন, একই যুক্তিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে উপজেলার নির্বাচনে তাঁদের সায় ছিল না। এই টানাপোড়েনে শেষাবধি রাজনীতিবিদেরা জয়ী হয়েছিলেন। ২০০৯ সালের গোড়াতে, জাতীয় নির্বাচনের অব্যবহিত পরই, তৃতীয় উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় নির্বাচনে আশাতীত ভোটারের উপস্থিতি ঘটলেও উপজেলা নির্বাচনে ভোটারদের উৎসাহ ছিল খুবই কম। সেই নির্বাচনে সদ্য ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। সহিংসতা হয়েছিল লক্ষণীয়ভাবে কম এবং নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রশংসিতও হয়েছিল। এই ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কারণ দুটো: প্রথমত, যদিও উপজেলা পরিষদের হাতে ক্ষমতা সীমিত এবং স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের করণীয় কম, আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে এই ক্ষমতার আরও সংকোচন ঘটেছে, তবু একার্থে এই পরিষদই হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের কাছে স্থানীয় প্রশাসনের অংশগ্রহণের একধরনের প্রতীক। যেকোনো অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠানের যে একটা প্রতীকী মূল্য আছে, তা অনস্বীকার্য। দ্বিতীয়ত, ১৯৯০ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনে মানুষের ভোটদানের বিবেচনায় জাতীয় রাজনীতি ছিল গৌণ।
কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থী বাছাই করে দেওয়ার যে পদ্ধতি সংসদ নির্বাচনে ব্যবহূত হয়, তা থেকে উপজেলা নির্বাচন সম্পূর্ণ না হলেও মোটা দাগে মুক্ত ছিল। সেদিক থেকে রাজনীতিবিদেরা না চাইলেও উপজেলা পরিষদ তৃণমূল পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসিত একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধীরা উপজেলা নির্বাচনকে যেভাবে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলল, তাতে করে ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার সম্ভাবনার মূলে কুঠারাঘাতই করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনকে এতটা জড়িয়ে ফেলার কারণে এই নির্বাচন কার্যত দুই দলের, বিশেষত ক্ষমতাসীনদের, জন্য মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়। প্রথম দুই দফা নির্বাচনে ভালো ফল না করার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীদের কাছে তৃতীয় দফা থেকেই যেনতেন প্রকারে নির্বাচনের চেষ্টাই মুখ্য হয়ে ওঠে। কীভাবে বিজয় হলো, তার চেয়ে সংখ্যা এবং ফলাফল মুখ্য হয়ে ওঠে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্বাচনের ধারা ও প্রকৃতিতে বদল ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় শেষ বা পঞ্চম দফায় এসে ভোট দেওয়ার দায়িত্ব থেকে ভোটারদের নিষ্কৃতি দিতে দ্বিধান্বিত হননি সরকারি দলের কর্মীরা। এতে করে বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর শেষ আস্থাও তিরোহিত হয়েছে। ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচনের ভরসা রাখার জায়গা ছিল না, কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকেরা সম্ভবত আশা করেছিলেন যে ৫ জানুয়ারি ব্যতিক্রম হবে, যেমনটি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়েছিল। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়।
কিন্তু এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যা অর্জিত হয়েছিল, তার মধ্যে টিকে ছিল নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেনাশাসনের আওতায় যেসব নির্বাচন হয়েছে সেগুলো যে সাজানো খেলার চেয়ে বেশি কিছু নয়, সে বিষয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলেও, অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলেও এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের অনুকূল না হলেও অন্তত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচনের প্রতি একটি আস্থা তৈরি হয়েছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই আস্থায় বড় ধরনের ফাটলের তৈরি হয়েছে। এখন উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, বিশেষত শেষ দুই দফার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, দেশ আবার নব্বই-পূর্ববর্তী অবস্থায় গিয়েই দাঁড়াল বলে মনে হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে নাকচ করে দিতে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ বারবার বলেছে যে ২০০৮ সালের পর তাঁদের শাসনে সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনকে এক কাতারে বিবেচনা করা যাবে কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্য ছিল যে ২০০৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে সরকারি দলের তাণ্ডব দেখতে পাইনি, পূর্বনির্ধারিত ফলাফল ঘোষণার চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়নি। সরকারের এই দাবিকে ১৫ থেকে ৩১ মার্চের এই ১৬ দিনে ধূলিসাৎ করে দিয়ে ক্ষমতাহীন স্থানীয় পর্যায়ের একটি পরিষদের এই বিরাট বিজয় দিয়ে ক্ষমতাসীন দল কীভাবে লাভবান হবে, সেটা আমার কাছে বোধগম্য হয় না।
আগামীকাল: বিএনপি ও নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

অসভ্য হাত এড়াতে বাড়তি নিরাপত্তা নাগমার

ভোটের প্রচারে বাড়ছে মাত্রাতিরিক্ত ভিড়। আর তারই সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হচ্ছে চোর, পকেটমার, অসভ্য-ইভটিজারদের দল। তাই প্রচার অভিযানে এবার অতিরিক্ত পুলিশি নিরাপত্তা দাবি করলেন মিরাটের কংগ্রেস প্রার্থী তথা দক্ষিণের সুপারস্টার নাগমা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, আমার অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রয়োজন। এখানে ভিড়ের চাপে নানা অসুবিধা হচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা আমার খেয়াল রাখছেন। কিন্তু সেটাই সব নয়। ইতিমধ্যেই পকেটমার ও মোবাইল চুরির মতো বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তাই বিশেষ নিরাপত্তা দিতে পুলিশের সাহায্য দরকার। সম্প্রতি মিরাটে এক জনসভায় এক যুবক তার খুব কাছাকাছি আসার চেষ্টা করায় বিরক্ত অভিনেত্রী তাকে চড় মারতে বাধ্য হন। সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে নাগমা বলেন, এসবই আমার প্রচার ভণ্ডুল করতে বিরোধীদের কৌশল।
কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, যে এলাকায় সভা চলছিল, সেখানে দিনে-দুপুরেই আইন ব্যবস্থা লাটে ওঠে। তার ওপর ওই অঞ্চল আমার বিরোধী প্রার্থীর নিজস্ব ঘাঁটি বলে পরিচিত। কে বলতে পারে, সভা বানচাল করার ফন্দি নিয়েই এসব করা হচ্ছে না?  স্থানীয় কংগ্রেস নেতাকর্মীরা তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করছেন না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে নাগমা জানান, আপাতত আমি মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করছি। কে সাহায্য করলেন আর কে করলেন না, তা ভাবার সময় নেই। এই কেন্দ্রের তিনি বহিরাগত প্রার্থী, বিরোধী শিবিরের এমন প্রচারণায় প্রতিক্রিয়ায় নাগমা বলেন, আমি যদি মিরাট বহিরাগত হই, তাহলে বারাণসীতে নরেন্দ্র মোদিও তাই। গান্ধীনগরে লালকৃষ্ণ আদভানি আর বিদিশায় সুষমা স্বরাজও তা হলে বহিরাগত।

বিনিয়োগে ভারতের পিছিয়ে থাকা

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশের একটা বড় আকুতির জায়গা। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের নীতি-সমর্থন দেওয়ার পরও তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উপনীত হয়নি। বছরে এখনো আমরা ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হইনি। ২০০৮ সালে প্রথম শতকোটি ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ দেশে আসে। তারপর দুই বছর তা ছিল শতকোটি ডলারের নিচে। এরপর প্রতিবছরই শতকোটি (এক বিলিয়ন) ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। আর এই বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশী ভারত অনেক পিছিয়ে আছে। বলা যায়, বাংলাদেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের ৫ শতাংশও ভারত থেকে আসে না। কিংবা ভারতীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারছে না বাংলাদেশ। অথচ নিকটতম প্রতিবেশী এবং এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। বিনিয়োগ বোর্ডের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ২৮৪টি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে ৮৬টি পুরোপুরি ভারতীয় আর ১৯৮টি যৌথ উদ্যোগ। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ মোট ২৮৮ কোটি ডলার। বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন। গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৭ কোটি ডলারের প্রকৃত ভারতীয় বিনিয়োগ এ দেশে এসেছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে ভারতীয় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এখনো তেমন আগ্রহী হয়ে ওঠেননি।
প্রাথমিকভাবে সম্ভাবনা দেখে প্রস্তাব নিয়ে অনেকেই আসছে, যা কিনা বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত হচ্ছে। পরবর্তীকালে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতায় বেশির ভাগই পিছিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই। ২০০৫ সালে টাটা শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশে ৩০০ কোটি ডলার (প্রথমে ছিল ২০০ কোটি ডলার) বিনিয়োগ করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। আর ২০০৪ সাল থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। টাটা ২৪ লাখ টন ইস্পাত, ১০ লাখ টন সার ও এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তিনটি কারখানা স্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। টাটার প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয় বিনিয়োগের শর্ত ও প্রণোদনা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সস্তা দরে গ্যাসপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে মতবিরোধে ২০০৬ সালে টাটা তাদের প্রস্তাব স্থগিত এবং ২০০৭ সালে প্রত্যাহার করে নেয়। আসলে অতীতে কখনো এত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার অভিজ্ঞতা না থাকায় বিষয়টি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। সেই সময় টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাবের ওপর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছ থেকে একটি অভিমত সংগ্রহ করেছিল বিনিয়োগ বোর্ড। আরও অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টি জনগণের সামনে অনেকটাই খোলাখুলি তুলে ধরা সম্ভব হয়েছিল।
আর এটা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য একটা ভালো অভিজ্ঞতা হিসেবেও বিবেচিত হয়। এরপর বড় বিনিয়োগ প্রস্তাবটি আসে ২০১২ সালে সাহারা ইন্ডিয়া পরিবারের কাছ থেকে। গোষ্ঠীটি বাংলাদেশে আবাসন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসে। শুরুতে বছরে ১২ থেকে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দেয় সাহারা, যা পরবর্তীকালে বাড়বে বলেও তখন জানানো হয়। এর আগে অবশ্য দুই দেশের গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এই বলে যে সাহারা বাংলাদেশে ৮০ হাজার কোটি রুপি বা প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। সাহারা মাতৃভূমি উন্নয়ন করপোরেশন নামে বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা আর অগ্রসর হয়নি। বরং পরবর্তীকালে খোদ নিজ দেশে সাহারার বিরাট অনিয়ম-কেলেঙ্কারি ধরা পড়ে। বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত গত মাসে আদালত সাহারার কর্ণধার সুব্রত রায় সাহারাকে জেলে পাঠানোর আদেশ দেন। অবশ্য বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পনসর হিসেবে জায়গা করে নিতে সাহারার সমস্যা হয়নি। বস্তুত বাংলাদেশে সীমিত ভারতীয় বিনিয়োগের একাধিক কারণ রয়েছে। আর তা ভারতীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের নিজ দেশের বাইরে বিনিয়োগ করার দীর্ঘ পরিক্রমার সঙ্গে জড়িত। বলা হয়, ১৯৫৯ সালে বিড়লা শিল্পগোষ্ঠীর ইথিওপিয়ায় একটি বস্ত্র বা টেক্সটাইল কারখানা স্থাপন করার মধ্য দিয়ে ভারতীয়দের বিদেশি বিনিয়োগ করা শুরু।
১৯৬০ সালে বিড়লা কেনিয়ায় একটি প্রকৌশল কারখানা স্থাপন করে। আর ১৯৬২ সালে শ্রী রাম গোষ্ঠী শ্রীলঙ্কায় স্থাপন করে সেলাই যন্ত্র কল। আর সত্তরের দশকে এসে ভারতীয়দের বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ আহামরি কিছু ছিল না, এগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাইরে বিনিয়োগের জন্য নিয়ে যেতে মাত্র ২২ কোটি ডলার অনুমোদন করা হয়। তবে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ব্যাপক বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে যে পরিবর্তনের ঢেউ লাগে, তা ভারতীয়দের বিদেশি বিনিয়োগের প্রবণতাকে জোরদার করে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া দেশ থেকে পুঁজি বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিধি-বিধান শিথিল করে। এরই প্রতিফলন ঘটে পরের দশকে। ১৯৯০ সালে যেখানে ভারতের মোট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার; ২০০০ সালে তা উন্নীত হয় ১৮৬ কোটি ডলারে। আর সাম্প্রতিক কালে এই পরিমাণ বছরে গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হয়েছে। দেখা যায়, নব্বই-পরবর্তী সময়ে থেকে ভারতীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ব্যাপক পরিসরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বড় অবস্থান গড়ার জন্য সক্রিয়ভাবে মাঠে নামে। এ ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের গন্তব্য হয় উন্নত দেশগুলো। আর বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশেও তারা বিনিয়োগ করতে থাকে। প্রশ্ন হলো, কেন ভারতীয়রা বা যেকোনো দেশের উদ্যোক্তারা ভিনদেশে বিনিয়োগ করে থাকে?
উত্তরটা সহজ—ভালো ব্যবসা ও মুনাফা করার জন্য। যেখানে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে, যেখানে পুঁজি খাটালে তা কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ বা কয়েক গুণ হয়ে ফিরে আসে, সেখানেই উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা পুঁজি বিনিয়োগ করতে যাবে। স্বভাবতই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রতিবেশী রাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ করাকে ভারতীয়রা তেমন লাভজনক বিবেচনা করেনি। তার বদলে ব্যবসা করা বা পণ্য বিক্রিকে অধিক লাভজনক বিবেচিত হয়েছে। ধীরে ধীরে এখন পর্যন্ত যেটুকু ভারতীয় বিনিয়োগ এসেছে, তার বড় অংশই কেন্দ্রীভূত হয়েছে ভোগ্যপণ্য ও বস্ত্রসামগ্রীতে। লক্ষ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ভারতের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১০ সালে যেখানে বাংলাদেশের মোট বিদেশি বিনিয়োগের মাত্র ৫ শতাংশ ছিল ভারতের, সেখানে ওই বছর নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মোট বিদেশি বিনিয়োগের ৪৪ ও ২৭ শতাংশ ছিল ভারতীয় বিনিয়োগ। পাকিস্তানের সঙ্গে এখনো ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়। কাজেই সেখানে ভারতীয় বিনিয়োগের প্রশ্ন অবান্তর। একইভাবে উল্টোটিও সত্যি। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনও ভারতীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনার পথে একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে।
টাটার বিনিয়োগের প্রস্তাবের সমালোচনার অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের গ্যাস নিঃশেষ করে দেওয়ার বা বাংলাদেশকে দীর্ঘ মেয়াদে বিপদে ফেলার ভারতীয় ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন কেউ কেউ। তবে ২০০৯ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি ও দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্রিয়তা পরিলক্ষিত হয়। বিনিয়োগ বোর্ড কলকাতা, চেন্নাই ও মুম্বাইয়ে গত বছর রোড শোর আয়োজন করে। সম্প্রতি বছরগুলোয় দুই দেশের ব্যবসায়ী পর্যায়ে পারস্পরিক সফর ও আলোচনা বেড়েছে। গঠিত হয়েছে ইন্দো-বাংলা চেম্বার। সরকারিভাবেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর নানা তৎপরতা রয়েছে। বিনিয়োগের জন্য নানা প্রণোদনা ও সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ও উদীয়মান ভোক্তা শ্রেণী ভারতীয় উদ্যোক্তাদের নজর এড়িয়ে যায়নি। আর তাই আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বাড়বে, এমন আভাস মিলছে। তবে বাংলাদেশও এখন বিদেশি বিনিয়োগপ্রাপ্তির প্রারম্ভিক পর্যায়ে নেই। আর তাই সাধারণত কোনো উন্নয়নশীল দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের শুরুর দিকে অনেক বেশি মন্দ বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ আসে—এই তত্ত্ব বাংলাদেশে এখন খাটবে না। বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতিকে সামনে রেখে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়াসই হবে অধিকতর কাঙ্ক্ষিত।
আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com