Thursday, August 27, 2015

হুলুসি তুরস্কের নতুন সেনাপ্রধান

ইসলামিক স্টেট ও কুর্দিস্তান পিপলস পার্টির (পিকেকে) অবস্থানকে লক্ষ্য করে সামরিক হামলা চালানোর মধ্যেই নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়েছে তুরস্ক। বুধবার তুর্কি সরকার দেশটির পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল হুলুসি আকারকে নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি জেনারেল নেকদেত ওজেলের স্থলাভিষিক্ত হবেন।
৬৩ বছর বয়সী জেনারেল হুলুসির ন্যাটো সামরিক জোটে কাজ করার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি জেনারেল ওজেলের চেয়ে দৃঢ় স্বভাবের মানুষ।
সম্প্রতি তুরস্ক সিরিয়ায় তৎপর আইএসআইএল অবস্থানে এবং উত্তর ইরাকে পিকেকের অবস্থানে হামলা চালাচ্ছে। তুরস্কের সুরুক শহরে সন্ত্রাসী বোমা হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হওয়ার পর তুর্কি সরকার সামরিক হামলা শুরু করেছে। তবে, প্রেসিডেন্ট এরদোগানের নেতৃত্বাধীন তুর্কি প্রশাসন শুরু থেকে আইএসের সমর্থন ও সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে।

এটা অন্যায়, এটা অবিচার by আসিফ নজরুল

শারমিন নামটি ছদ্মনাম। কিন্তু এই ছদ্মনামের মেয়েটির জীবনযুদ্ধের ঘটনাটি পুরোপুরি সত্যি। সে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে অনেক দূরের এক গ্রামের বাসিন্দা। প্রথমে প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে তাকে বুড়িগঙ্গার পাড়ে আসতে হয়। তারপর নৌকায় চড়ে ঢাকায়। সেখানে থেকে বাসে করে ধানমন্ডির শংকর। তারপর একটু হেঁটে ২৭ নম্বর রোড সাতমসজিদ রোডের সংযোগস্থলের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। সেখানে সে আইন বিভাগের ছাত্রী, আর আমি সেই বিভাগের ‘অ্যাডভাইজর’ ও পার্টটাইম শিক্ষক।
শারমিন এসএসসি আর এইচএসসি মিলিয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে। এ জন্য তাকে স্টেট ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে পড়ার খরচের ৮০ শতাংশ ছাড় (ওয়েভের) দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবু তার মুখ থাকে শুকনো। একদিন আমার টেবিলে এসে সে তার জীবনের করুণ গল্প বলে। শুধু ইউনিভার্সিটিতে যেতে-আসতে তার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কিন্তু মূল সমস্যা এটি নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে এই আসা-যাওয়ার খরচ তার কোনোভাবেই জোগাড় হচ্ছে না। স্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ভালো ছাত্র বিবেচনায় তার থেকে মাত্র ২০ শতাংশ কোর্স ফি গ্রহণ করে। সেই টাকা দেওয়ার পর তার আর নৌকাভাড়া আর বাসভাড়া দেওয়ার মতো টাকা থাকে না। আমি কি পারি তাকে কোনো পার্টটাইম চাকরি জোগাড় করে দিতে?
এর কিছুদিন পর এম এম শামীমের সঙ্গে স্টিমারে বরিশাল যাচ্ছি। তিনি ল্যাবএইড গ্রুপের মালিক, স্টেট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রেসিডেন্ট। স্টিমারের ডেকের সামনে বিশাল চাঁদ, এমন চাঁদের আলোয় জীবনের বহু করুণ গল্প হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায়। আমি একজন কোটিপতি মানুষের কাছে একটি হতদরিদ্র মেয়ের গল্প বলি। এই গল্প তাঁকে স্পর্শ করে। ঢাকায় ফিরে হঠাৎ ফোন পাই তাঁর। শারমিনকে যেন পাঠিয়ে দিই তাঁর অফিসে। মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হবে তাকে পড়াশোনা চালানোর জন্য।
শারমিনের সমস্যা কিছুটা দূর হয়েছে। কিন্তু শারমিনের মতো এমন আরও অনেক ছাত্র আছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেউ কেউ কয়েক হাজার টাকা শোধ করতে পারে না বলে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় বসার অনুমতি পায় না প্রথমে। আমি তাদের হয়ে নানা দেনদরবার করি। যতটা পারা যায় তাদের অনুমতি দিয়ে দেওয়া হয়। তবু অনেকের অভাব যায় না। কারও চাকরি দরকার, কারও টিউশনি, কারও করুণ আকুতি আরও ওয়েভারের। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই অবস্থা। লাখ লাখ টাকা খরচ করে পড়ার সামর্থ্য নেই অনেকের। কিন্তু তাই বলে মাঝপথে ছেড়ে দেবে তারা পড়াশোনা! ছাত্রছাত্রীদের দুরবস্থা দেখে মাঝে মাঝে ভাবি, কেন তাদের সাহায্য করার মতো অনেক টাকা হলো না আমার!
...২...
এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো একটি খবর পেলাম কিছুদিন আগে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের নাকি পড়াশোনার খরচের ওপর বাড়তি সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে এখন থেকে। ভ্যাট মানে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝি শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা গ্রহণের ওপর কোনো ভ্যাট তাই হতে পারে না। কোনো আলোচনা, কোনো মতামত গ্রহণ, কোনো কিছু আগাম না জানিয়ে হঠাৎ এই ভ্যাট আরোপ কেন তাহলে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টেট ইউনিভার্সিটি দুই জায়গাতেই আমার কলিগ রোবায়েত ফেরদৌস। বঞ্চিত আর অবিচারের শিকার মানুষের জন্য বহুবার সে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। এবারও দাঁড়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে। রোবায়েত জানায়, একজন আইনজীবীর সঙ্গে তারা কথা বলেছে জনস্বার্থে মামলা করার জন্য। কিন্তু তিনি জানিয়েছেন ভ্যাট নাকি দিতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে, ছাত্রছাত্রীদের নয়। আমি হতবুদ্ধ হয়ে ভাবি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত আইনে বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে অলাভজনক। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তাহলে ভ্যাট দেবে কেন? এই ভ্যাট তারা যদি উল্টো ছাত্রছাত্রীদের থেকে আদায় করে নেয়?
আমি কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খবর নিয়ে জানলাম, তা-ই হতে যাচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদালয়ের ছাত্রছাত্রীদের থেকেই আদায় করা হবে অতিরিক্ত সাড়ে ৭ শতাংশ টাকা। আগোরা কিংবা পিৎজা হাট ভ্যালু অ্যাড করে পণ্য বিক্রয় করে বলে ভ্যাট দেয়, কিন্তু ক্রেতাদের কাছে থেকেই আদায় করা হয় এই ভ্যাট। এখন শিক্ষার ক্রেতা হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের থেকে আদায় হবে ভ্যাট! হয়তো এ জন্য ভ্যাট নিয়ে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই তেমন। মাথায় যাদের দুষ্টবুদ্ধি আছে, তারা বরং কম ভ্যাট জমা দিয়ে কিছু লাভ করতে পারে ছাত্রছাত্রীদের দুর্দশা থেকে। লাভ হতে পারে ঘুষখোর ভ্যাটের লোকদেরও। কিন্তু শারমিন বা তার মতো হাজারো দরিদ্র ছাত্রছাত্রীর কী হবে? এমনিতেই টাকা জোগাড় করতে জীবন যায় তাদের। এই অতিরিক্ত টাকা তারা কীভাবে জোগাড় করবে?
...৩...
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে সমাজে ঢালাও কিছু নেতিবাচক ধারণা আছে বলে আমরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই না তেমন। আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা সুযোগ পায় না, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এটি অনেক ক্ষেত্রে ঠিক, কিছু ক্ষেত্রে নয়। কেউ কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ, সেশনজট বা পছন্দের বিভাগ না পাওয়ার জন্য সেখানে পড়ে না, কষ্ট করে হলেও পড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের অনেকের ধারণা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা হয় না, সহশিক্ষা কার্যক্রমও খুব কম। এটি অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভুল। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বরং পড়াশোনা হয় বেশি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম ফাঁকিবাজ শিক্ষকও সেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন অনেক ক্ষেত্রে।
সহশিক্ষা কার্যক্রমের একটি উদাহরণ দিই। আমাদের স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মুট-কোর্ট করার সুযোগ খুবই সীমিত। সেখান থেকে প্রথমবারের মতো গত বছর আন্তবিশ্ববিদ্যালয় মুট-কোর্ট কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছিল আমাদের তিনজন ছাত্রছাত্রী। হাইকোর্টের জাঁদরেল জাজ আর আইনের দুঁদে অধ্যাপকের সামনে তাদের ইংরেজি যুক্তিতর্ক শুনে আমিই হতবাক হয়ে যাই। ব্যক্তিগত র্যা ঙ্কিংয়ে দেখা গেল অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে ভালো পারফর্ম করেছে স্টেট ইউনিভার্সিটির মুটাররা। আর মুট-কোর্টে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরম্যান্স বরাবরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাদে অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভালো।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য হয়, মানবাধিকার দিবস পালন হয়, ড. ইউনূস, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা আইনজীবী রফিক–উল হকদের বক্তৃতা হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা ব্লাড ব্যাংক খুলেছে, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর ছুটে গেছে, প্রতিবছর নিজেরা চাঁদা দিয়ে ঈদের আগে গরিব-দুখীদের মধ্যে নতুন কাপড় বিতরণ করছে।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু মানবসম্পদ সৃষ্টি নয়, উদ্দেশ্য জ্ঞান সৃষ্টি করাও। উন্নত বিশ্বের অগ্রসর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আরেক ধাপ এগিয়ে নিজেদের সৃষ্ট জ্ঞান ব্যবহার করার মতো সামর্থ্যও অর্জন করছে। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলোই নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত কিছু গবেষণার চেয়ে অবশ্যই মানসম্পন্ন। আমি বিশ্বাস করি, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সৃষ্ট জ্ঞানের ব্যবহারের সামর্থ্যও অর্জন করবে অচিরেই।
তাই বলে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এক রকম নয়। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে শিক্ষার নামে সার্টিফিকেট ব্যবসা করার জন্য। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকেরা নানা কৌশলে এখান থেকেও হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান খুব খারাপ। সেসব সমস্যা দূর করার জন্য ইউজিসির পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি ও মূল্যায়ন, পারফরম্যান্স মানদণ্ড নির্ধারণ, বাধ্যতামূলকভাবে ছাত্রদের কর্তৃক ইভ্যালুয়েশন, ন্যূনতম অবকাঠামো, মানবসম্পদ এবং শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিতকরণের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এখানে ব্যবসা হচ্ছে ঢালাওভাবে—এমন ধারণা থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সীমিত ও কষ্টসাধ্য করে তোলার কোনো যুক্তি নেই।
...৪...
আমাদের কারও কারও ধারণা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধনী লোকের সন্তানেরা পড়াশোনা করে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ পরিবারের। হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান এটি সত্যি। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রছাত্রী নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অন্যদিকে আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রছাত্রী খুবই সচ্ছল পরিবারের সন্তান। এই এক-তৃতীয়াংশ পরিবারের সন্তানেরাও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বিনা পয়সায় পড়াশোনা করছে। এতেও হয়তো আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনে দিনে পড়াশোনার খরচ বাড়বে, সরকারও আবার তাদের ওপর নতুন করে ভ্যাটের বোঝা চাপাবে, এতটা বৈষম্য করা ঠিক নয়।
উন্নত বিশ্বের ছাত্রছাত্রীদের পার্টটাইম চাকরি করার এবং শিক্ষাঋণ নেওয়ার বহু সুযোগ থাকে। আমাদের দেশে তা নেই বললেই চলে। এখন ভ্যাট আদায়ের মাধ্যমে সরকার যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের ওপরও চেপে বসে, তাহলে তারা কোথায় যাবে?
আমাদের প্রধানমন্ত্রী গরিববান্ধব হিসেবে পরিচিত, আমাদের শিক্ষামন্ত্রী শ্রেণিহীন সমাজের রাজনীতি করতেন বহু বছর। আপনারা অনুগ্রহ করে বিষয়টি ভেবে দেখবেন কি? শারমিনের মতো বহু ছেলেমেয়ের অসহায়ত্ব আপনারা উপলব্ধি করবেন কি?
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অধিকতর ক্ষমতায়ন by আলী ইমাম মজুমদার

গত ২২ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে বর্তমানে প্রচলিত মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অধিকতর সংশোধনের জন্য একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ প্রস্তাবের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধিত হলে এর বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমান আইনে বিধান রয়েছে, অপরাধ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঘটতে বা উন্মোচিত হতে হবে। পাশাপাশি অভিযুক্তকে করতে হবে দোষ স্বীকার। শেষোক্ত বিধানটি সংশোধন করে প্রস্তাব করা হয়েছে অবস্থা বিচারে জোরালো প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ইত্যাদি বিবেচনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার না করলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দণ্ডবিধান করতে পারবেন। মন্ত্রিসভায় গৃহীত এ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামত এসেছে। বিশেষ করে দোষ স্বীকার না করলেও আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনজীবীর সহায়তা লাভের অধিকার থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা হবে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। অবশ্য এর ভিন্নমতও আছে।
মোবাইল কোর্ট আমাদের বিচার বিভাগীয় ধারণায় কোনো অভিনব তত্ত্ব নয়। আলোচ্য আইন আর তার পূর্বসূরি দুটো অধ্যাদেশের আগেও ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬০ ধারা ও অন্য কিছু আইনে এ ধরনের বিচারব্যবস্থা চালু ছিল। তা ছিল মোটরযান অধ্যাদেশ, বিশুদ্ধ খাদ্য আইন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি চুরি-সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রেও। আর এ ধরনের বিচার হচ্ছে অভিযুক্ত আদালতে হাজির হওয়া বা তাকে সোপর্দ করার পরিবর্তে আদালত অকুস্থলে তার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বিচার করা। এসব আদালত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ফৌজদারি বিচারকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করার উদ্দেশ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদেরই মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ক্ষমতায়ন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০০৯ সালে নির্বাচিত সংসদ এর কলেবর আরও কিছুটা বৃদ্ধি করে একে আইনে রূপ দেয়।
সম্প্রতি খাদ্যে ভেজাল, জনস্বাস্থ্য হানিকর কার্যক্রম, বাল্যবিবাহ, ইভ টিজিং, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি চুরি, পরীক্ষায় নকল ইত্যাদি অনেক জনস্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের নজরে আসতে সক্ষম হয়েছেন। একই আবরণে পরিবেশ আদালতগুলোও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে চলছেন। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এ আদালতগুলো জনপ্রিয় এবং কার্যকরী। তবে বিতর্কও রয়েছে এর কাজ নিয়ে। আমাদের বিদ্যমান বিচারব্যবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ বিবরণী পেশ করতেই কেটে যায় লম্বা সময়। সাক্ষ্য হাজির করাও একটি দুরূহ বিষয়। ফলে মামলা প্রমাণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু মোবাইল কোর্ট তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে কিছু কিছু অপরাধের বিচার করেন বিধায় এর কিছুটা সুবিধা রয়েছে। এর বিচার ত্বরান্বিত এবং অন্যদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক হয়। তবে অস্বীকার করা যাবে না এ ধরনের ত্বরিত বিচার ক্ষেত্রবিশেষে ন্যায়বিচারের পরিপন্থীও হতে পারে। বিচার-বিশ্লেষণের চেয়ে প্রাধান্য পেতে পারে আবেগ। তদুপরি সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাজানো ঘটনায়ও ফেঁসে যেতে পারে। আর মোবাইল কোর্ট-ব্যবস্থায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ খুবই সীমিত বলে এ ধরনের আশঙ্কা উপেক্ষা করা যায় না। তা সত্ত্বেও আইনটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। এর সুফলও দৃশ্যমান।
তবে জটিল হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড বিধানের বিষয়টি। মূলত রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ ও মিছিলকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ জাতীয় ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিতকরণে পুলিশও অনেক ক্ষেত্রে ভুল করে। ম্যাজিস্ট্রেট তো কিছুটা দূরেই থাকার কথা। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না অগ্নিসংযোগ, নাশকতা ইত্যাদি কার্যক্রম বেশ কিছুকাল আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছিল। এমনটা আর ঘটবে না, তাও জোর দিয়ে বলা চলে না। এসব ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা অসংগত নয়। তবে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে অভিযোগ বিচার-বিশ্লেষণ না করলে অবিচারের আশঙ্কা থেকে যায়। তাঁরা রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট বলে চিহ্নিত হতে পারেন। আর প্রশাসন ও পুলিশকে দলীয়করণের অভিযোগ তো নতুন বা একেবারেই অমূলক নয়। এ–জাতীয় ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সংযত না হলে সেসব অভিযোগ আরও জোরদার হবে।
কারাদণ্ড ও জরিমানা উভয় ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের দণ্ড বিধানের ক্ষমতাও যথেষ্ট। এ ক্ষমতার কতটা প্রয়োগ করা হবে, সেটা নির্ভর করছে তাঁদের সুবিবেচনার ওপর। আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ যেখানে নেই, সেখানে দণ্ড প্রয়োগের মাত্রা সীমিত হতে পারে। আর এ সীমারেখা টানতে পারেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং। অবশ্য তা হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র। তবু ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে গুরুদণ্ড দেওয়া প্রয়োজন অনুভব করলে তিনি তাঁকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারেন। আর ক্ষেত্রবিশেষে দণ্ড তো তিনি দিতে পারেনই।
এখন প্রশ্ন এসেছে, অভিযুক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকার না করলেও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা নিয়ে শাস্তি দেওয়া প্রসঙ্গে। এটাও কোন ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা দেখার বিষয়। নাবালিকা বিয়ে করতে বর সেজে বিয়ের আসরে বসে থাকলে অপরাধ স্বীকার না করলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সে বর, বরকর্তা আর ক্ষেত্রবিশেষে অন্যদেরও দোষী ভাবতেই পারেন। দণ্ডবিধানও অপ্রাসঙ্গিক নয়। ইভ টিজিংসহ এ রকম আরও কিছু সামাজিক বিষয়াদিতে নিরপেক্ষ সাক্ষী পাওয়া সম্ভব। তবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এ ক্ষমতাটি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ রকম অভিযোগের নিরপেক্ষ সাক্ষী পাওয়া কঠিন হওয়ার কথা। অপরাধী চিহ্নিত করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেও হতে পারে। এর অপব্যবহার সম্পর্কেও আমরা শঙ্কিত। তাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর আইনের এ প্রস্তাবিত সংশোধনী কঠিন একটি দায়িত্ব অর্পণ করবে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যথেষ্ট সংযত ও বিচক্ষণ আচরণ করতে হবে। অন্যথায় একটি গ্রহণযোগ্য, প্রশংসনীয় ও জনকল্যাণকর আইন বিতর্কিত হবে। অতীতের অনেক অর্জন যাবে বৃথা।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া শাস্তি নজিরবিহীন
দেখা যায়, মোবাইল কোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জনগণের একটি অংশ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে বিষয়গুলোর গভীরে যাওয়া আবশ্যক। অতি সম্প্রতি নরসিংদীতে এ রকম ঘটেছে প্রায় পাঁচ শ গ্যাসলাইন বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে। এসব লাইনের সুফলভোগীরা বলছেন, তাঁরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি লাইনের জন্য ২০-৩০ হাজার টাকা করে দিয়ে তা নিতে পেরেছেন। হতে পারে টাকার পরিমাণ কম বা বেশি। কিংবা সবাই তা করেনওনি। তবে গ্যাস কোম্পানির লোকদের সক্রিয় সহযোগিতা ব্যতিরেকে এ রকম সংযোগ দেওয়া কি সম্ভব? পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা দরকার। গ্যাস কোম্পানির যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে লাইন দেওয়া হয়েছে, তাঁরাসহ স্থানীয় সহযোগীদেরও গ্যাস চুরির সহযোগিতার অভিযোগে সংক্ষিপ্ত বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। দণ্ডিত হোক তাঁরাও। তা না হলে সৎ লোকেরা অন্যায়ে বাধা দেওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলবে। আর এটা অসম্ভব এমনটা বলা যাবে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইনের ক্ষেত্রেও এ রকমই ঘটে থাকে। অবশ্য বেআইনি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে এ রকম চলতে থাকবে, এমনটা নয়।
জনকল্যাণকর অনেক কাজে স্থানীয় জনগণ মোবাইল কোর্টকে ব্যাপক সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সুফলদায়ক। ত্বরিতই প্রতিকার মেলে বলে ছুটে যায় তাদের কাছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এটা করার কথা আবেগবর্জিত ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে। আইনপ্রণেতারা আইন প্রণয়ন করবেন। আর সরকারি কর্মকর্তারা তা বাস্তবায়ন করবেন পক্ষপাতহীন, ন্যায়নিষ্ঠ, আবেগবর্জিত হয়ে। মোবাইল কোর্ট আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

৮ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে যুক্তরাষ্ট্র

অনিশ্চয়তার দীর্ঘ যাত্রা। তবুও স্বজনের কাঁধে-পিঠে পড়ে
মজাই পাচ্ছে শিশু দুটি। তা উপভোগ করছেন স্বজনটিও।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এই শরণার্থীরা
গতকাল সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করে।
গন্তব্য পশ্চিম ইউরোপ। ছবি: রয়টার্স
আগামী বছর আট হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র গত সোমবার এ কথা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শরণার্থী ব্যবস্থার বিধিবিধান শিথিল করতে ফ্রান্স ও জার্মানির আহ্বানের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হলো। খবর এএফপির। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জন কিবরি বলেন, শরণার্থীদের গ্রহণ এবং তাদের পুনরায় বসবাসের জন্য অর্থ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে সিরিয়ার চলমান সংকট নিরসন শেষে বাস্তুহারারা যাতে নিজে দেশে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা করার দিকেই মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। এর আগে অভিবাসী সংকট ইস্যুতে বার্লিনে এক জরুরি বৈঠকে বসেন জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ।
ওই বৈঠক থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরণার্থী ব্যবস্থা সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া সিরিয়ার শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার সুপারিশও করা হয়। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় চলা গৃহযুদ্ধে প্রায় ৪০ লাখ লোক বাস্তুহারা হয়। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রে নয় হাজার শরণার্থী পাঠাতে চায়। এর মধ্যে দুই হাজার লোককে এ বছর অশ্রয় দিতে রাজি হয় ওয়াশিংটন। পাশাপাশি ২০১৬ সালে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে বলেও জানায়। তবে বেশি সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় না দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে মার্কিন প্রশাসন। যদিও সিরিয়ার যুদ্ধে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে দেশটি।

ফ্রান্সে আবারও হামলা হতে পারে: ওলাঁদ

ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেছেন, দেশটিতে আবারও সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। এ জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ট্রেনে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা যাত্রীরা নস্যাৎ করে দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় এ মন্তব্য করলেন তিনি। খবর এএফপির। ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের অ্যারাঁসের কাছে যাত্রীবাহী ট্রেনে আয়ুব আল খাজানি নামের সশস্ত্র এক যুবক গত শুক্রবার হামলার চেষ্টা করেন। তবে কয়েকজন যাত্রী তাঁকে ধরে ফেলেন।
প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী প্যারিসে কূটনীতিকদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছি। শুক্রবার যে আগ্রাসনের ঘটনা ঘটেছে...তাতে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারত।...এখন আমাদের আরও হামলার ব্যাপারে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে এবং নিজেদের সুরক্ষিত করতে হবে।’ এদিকে শুক্রবারের ঘটনায় আটক হওয়া ২৫ বছর বয়সী খাজানিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ফ্রান্সের সন্ত্রাসবাদবিরোধী তদন্তকারীরা।

ইউরোপের প্রবেশদ্বারে বাঙালি by মলয় ভৌমিক

শুধু বাংলাদেশি নয়, বহু দেশের নাগরিকের
জন্যই ইতালি ইউরোপের প্রবেশদ্বার
বাংলাদেশিদের জন্য ইতালি হলো ইউরোপের প্রবেশসোপান। এ তথ্য আগে থেকেই জানা ছিল। বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল, সাদামাটা এই তথ্যের পেছনে রয়েছে গা হিম করা সব কাহিনি; সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী জঙ্গলে আবিষ্কৃত গণকবরের নির্মমতা থেকে যা কোনো অংশেই কম নয়। জীবন বাজি রেখেই মানুষ পাড়ি জমিয়েছে ইতালিতে। কেউ পৌঁছেছে, কেউ পৌঁছাতে পারেনি।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে দেখা গেল কর্মীরা রাত-দিন কাজ করছেন। ফার্স্ট সেক্রেটারি রুবাইয়াত-ই-আশিক জানালেন, আন্তর্জাতিক বিমান উড্ডয়ন সংস্থা এ বছরের ২৫ নভেম্বরের মধ্যে সবার জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের আবশ্যিকতা জানিয়ে দিয়েছে। এত দিনের হাতে লেখা পাসপোর্টে আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য বাঙালিরা ইচ্ছাকৃতভাবে যেসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করেছে, তার একটা কিনারা এবার হতে যাচ্ছে। যাঁরা ইতালিতে নাগরিকত্ব পেয়েছেন বা বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন, তাঁদের জন্য আগের পাসপোর্টে ব্যবহৃত ভুল তথ্য বিষফোড়া হয়ে আছে। রাষ্ট্রদূত মোহম্মদ শাহদৎ হোসেন বললেন, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আবেদন আসছে। আশা করা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা যাবে।
শুধু বাংলাদেশি নয়, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের নাগরিকের জন্যই ইতালি ইউরোপের প্রবেশদ্বার। এর পেছনের কারণ যেমন মানবিক, তেমনি চমকপ্রদ। ভ্যাটিকানের পোপ জন পল একবার ভক্তদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতায় বলেছিলেন, ইতালি হলো ঈশ্বরের দেশ। সুতরাং ঈশ্বরের আশ্রয় থেকে কাউকে বিতাড়িত করা উচিত নয়। ভ্যাটিকানের পৃথক রাষ্ট্রের মর্যাদা থাকলেও তা ইতালি তথা রোম নগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার পোপের এই উক্তির প্রতি সম্মান দেখাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তা অলিখিত এক আবশ্যিক আইনে পরিণত হয়, যা এখনো কার্যকর। সরকার অবৈধ নাগরিকদের মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার করলেও দু-এক মাস পরেই আবার ছেড়ে দেয়। দেশ থেকে বিতাড়িত করে না। এই হলো দুর্গম পথে ইতালিতে পৌঁছানোর প্রতি আগ্রহের নেপথ্য কথা।
ইতালির বড় বড় শহর নেপলস, মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, পিসা, কোমো, আনকোনা বা ভেরোনায় এমন অনেক বাঙালির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, যাঁরা একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়ার পরও ইতালিতে থেকে গেছেন এবং পরে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন। সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসের বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলেও জেনেছি, তাঁদের অনেকেই প্রথমে ইতালিতে বৈধতা পাওয়ার পর ওই সব দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আবার যাঁরা ইতালি এড়িয়ে সরাসরি ওই সব দেশে গিয়েছেন, তাঁরা বিপদে পড়লেই চলে এসেছেন ইতালিতে ‘নিরাপদ’ আশ্রয়ে। ইউরোপীয় জোনের দেশগুলোয় এ ধরনের যাওয়া-আসা চলতে থাকায় ইতালিতে বাঙালির সংখ্যা দ্রুত হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। আজ তিন লাখ তো চার মাস পর দুই লাখ।
ইতালিতে বাঙালিরা আসেন কীভাবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রোমে কথা হয় বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী কাজী মোহম্মদ জাকারিয়া ও চারুশিল্পী ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে। তাঁরা জানান, যাঁরা আসেন, তাঁদের ৯৫ শতাংশই দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেন। আনকোনার বাঙালি সমিতির নেতা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ দুলাল, চারুশিল্পী শহিদুর রহমান, পারভেজ হোসেনও একই কথা জানান।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা থেকে হারুনুর রশীদ ইতালিতে পাড়ি জমান ১৯৮৭ সালে। তিনি অবশ্য বৈধভাবেই সে দেশে প্রবেশ করেন। সেই থেকে এখনো বাংলাদেশ দূতাবাসে গাড়িচালকের কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ইতালিতে অবস্থানের কারণে বাঙালিরা তাঁকে এক নামে চেনেন। তাঁর সহযোগিতায় অনেক বাঙালি ইতালিসহ ইউরোপের নানা দেশে আজ প্রতিষ্ঠিত। হারুনুর রশীদ মনে করেন, মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের ব্যবস্থা হওয়ায় দেশের বদনাম ঘুচবে, মানব পাচার কমে আসবে।
বিভিন্নজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, স্বাধীনতার পর গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষে ইতালিতে মানব পাচার শুরু হয়। সে সময় পাচারপথ ছিল প্রথমে যুগোস্লাভিয়ায় প্রবেশ এবং সেখান থেকে নৌপথে ইতালির ভেনিস নগরে চলে আসা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অনেকে ইতালিতে প্রবেশ করতে শুরু করেন রাশিয়া-ইউক্রেন হয়ে পায়ে হেঁটে। উভয় ক্ষেত্রেই মাধ্যম ছিল দালাল। বর্তমানে এ দুটি পথ বন্ধ। নব্বইয়ের দশকে ইতালিতে থেকে যাওয়ার আরেকটি উপায় ছিল, বৈধভাবে ইতালির ভ্রমণ-ভিসা নিয়ে সেখানে যাওয়ার পর পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে সাধারণে মিশে যাওয়া। ইউরোপ ছাড়া আমেরিকা-কানাডার মতো দেশে ব্রাহ্মণ-শূদ্রনির্বিশেষে অনেকে আজও এই পন্থা অবলম্বন করে চলেছেন।
এসব কারণে ভ্রমণ-ভিসার ব্যাপারে ইউরোপ, বিশেষ করে ইতালি সরকার এখন অনেক সতর্ক। ইউরোপজুড়ে জল ও স্থলসীমান্তের নজরদারিও এখন কড়া। কিন্তু এসব কড়াকড়ি ইউরোপের প্রতি মোহগ্রস্তদের ঠেকাতে পারেনি। বরফ-পাহাড়-মরুভূমি মাসের পর মাস হেঁটে অতিক্রম করে বহু মানুষ দালালের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছেন তঁাদের স্বপ্নের প্রবেশদ্বারে।
বর্তমানে ইতালিতে পৌঁছার রুট বেশ কয়েকটি। বাংলাদেশ থেকে প্রথমে মাল্টা। সেখান থেকে জাহাজে ইতালি। একইভাবে লিবিয়া হয়েও জাহাজে ইতালিতে পৌঁছানো যায়। সব থেকে কষ্টকর পথটি হলো বাংলাদেশ থেকে ভারত-পাকিস্তান-ইরান-তুরস্ক-স্পেন হয়ে বেশির ভাগ রাস্তা হেঁটে, কখনো-বা বছরব্যাপী ঘুরে ঘুরে ইতালিতে পৌঁছানো। ভয়ংকর পথটি হলো তুরস্ক সীমানার পথ। সেখানে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয় হিংস্র কুকুর। গুলি বা কুকুরের কামড়ে জীবন যায় অনেকেরই। এমনও হয়, যাত্রা শুরু করেছিল ২০ জনের একটি দল, কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাতে পেরেছেন পাঁচ বা ছয়জন। ইতালি দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি রুবাইয়াত-ই-আশিক জানালেন, কুকুরের কামড়ে গুরুতর আহত অনেকেই তাঁর কাছে এসে সাহায্য চেয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় বরফের ফাটলে স্বামীর পা আটকে গেছে, প্রহরীরা ধেয়ে আসছেন। এ অবস্থায় স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পরে আর স্বামীর খোঁজ মেলেনি। দুর্গম এসব পথে পাড়ি জমাতে গিয়ে প্রতিবছর শত শত বাঙালির মৃত্যু হচ্ছে। কিন্তু আইনি জটিলতা এড়াতে এসব বিয়োগযন্ত্রণার নির্মম চিত্র চাপা পড়ছে আড়ালে।
অপরিণত (মাইনর) বা ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের কদর আবার ইতালিতে বেশি। বেশ কিছু কথিত মানবাধিকার সংগঠন দাঁড়িয়ে গেছে তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য। উদ্বাস্তু মাইনরদের দেখভালের খরচ মেটাতে সরকার বা বড় বড় দাতা প্রতিষ্ঠান মাসে জনপ্রতি ৭০০ ইউরো পর্যন্ত দিয়ে থাকে। ৩০০ ইউরো জনপ্রতি ব্যয় করে বাকিটা স্বচ্ছন্দে নিজ পকেটে ঢোকানো যায়। এই ‘ব্যবসার’ সঙ্গে যুক্ত একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশি মাইনরদের ইতালিতে যেতে উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ইতালিতে প্রবেশের পথ ওই একই।
মাঝেমধ্যেই ইতালি সরকার কৃষিতে কাজ করানোর জন্য স্থানীয় কৃষি-মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী লোক নেয়। শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বাংলাদেশের অনেক কৃষিশ্রমিক ইতালিতে তাঁদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় বৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেন। এ ক্ষেত্রে চুক্তি হলো, নয় মাস পরে কৃষিশ্রমিককে দেশে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বাঙালি দেশে না ফিরে স্থানীয় উকিলের মাধ্যমে পাসপোর্টে তাঁর নিজের ও বাবার নাম-ঠিকানা পাল্টে ফেলেন। এমনও দেখ গেছে, নেত্রকোনার গুরুপদ এই প্রক্রিয়ায় উকিলের সহায়তায় বনে গেছেন শ্রীলঙ্কার গুরুসিংহে। বাংলাদেশিদের এই আচরণের কারণে দুই বছর হলো ইতালি সরকার কৃষিতে বাঙালি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রেখেছে।
জীবনের তোয়াক্কা না করে ইউরো-ডলারের মোহে যাঁরা ইউরোপে পাড়ি জমান, ঘাটে ঘাটে পয়সা গুনে তাঁদের জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এ টাকার জোগান হয় ভিটেবাড়ি বিক্রির বিনিময়ে। এত পয়সা খরচ করে যাঁরা যান, তাঁরা কেমন আয় করেন? রোমের কলসিও, রোমান ফোরাম, ভ্যাটিকানের আশপাশ, বিসুভিয়াসের ছাইচাপা ঐতিহাসিক নগর পম্পাই বা ভেনিসের রাস্তায় অসংখ্য বাঙালি চোখে পড়েছে। তাঁরা ফেরি করে সেলফিস্ট্যান্ড, পানির বোতল বা শুকনা খাবার বিক্রি করছেন। কথা বলে জেনেছি, তাঁদের মাসিক গড় আয় ৭০০ থেকে ৮০০ ইউরো। নিজের জন্য চলে যায় ৫০০ ইউরো। বাকিটা দেশে পাঠান তাঁরা। এই ইউরোতে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ার হয়তো বাড়ে, কিন্তু ভিটেবাড়ি বিক্রির আসল উঠতে যুগ পার হয়ে যায়।
মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ইউরোপে পাড়ি জমানো বাঙালিদের আসল পরিচয় নিশ্চিত করবে। এতে হয়তো মানব পাচারও কিছুটা কমানো যাবে। তবে এ উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ইতালি, গ্রিস, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্সসহ অনেক দেশেই কাজের লোক, বিশেষ করে কৃষি-শ্রমিকের চাহিদা আছে। সরকার চেষ্টা করলে বৈধ প্রক্রিয়ায় ইউরোপে এখনো বহু বাঙালির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তা করা গেলে সেটাই হবে ইউরোপে বাঙালির প্রকৃত ঠিকানা।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; নাট্যকার৷

কৃষ্ণগহ্বর থেকে বেরোনোর পথ!

ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর
ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরে যা একবার পড়ে তা চিরতরে হারিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরাও এমনটাই মনে করেন। এই ব্ল্যাকহোল থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথই থাকে না। তবে সম্প্রতি বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং শুনিয়েছেন ভিন্ন কথা। সুইডেনের স্টকহোমে কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে বক্তৃতা দিতে গিয়ে নতুন একটি তত্ত্ব শুনিয়েছেন তিনি। হকিং বলেন, ‘কৃষ্ণগহ্বরকে আমরা যে অনন্তকালের কারাগার বলে জেনে এসেছি আসলে এটা তা নয়। কৃষ্ণগহ্বরে কোনো কিছু পড়ে গেলে তা চিরতরে হারিয়ে যায় না।’
গবেষকেরা বলছেন, ব্ল্যাকহোল হচ্ছে মহাকাশের এমন বিশাল একটি অঞ্চল যেখানকার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতটাই প্রবল যে সেখান থেকে কোনো কিছুই বের হতে পারে না। কৃষ্ণগহ্বর থেকে এমনকি আলোও বের হতে পারে না।
তবে হকিং বলছেন, ‘আপনার যদি মনে হয় কৃষ্ণগহ্বরে পড়ে গেছেন, তবুও আশা ছাড়বেন না। এখান থেকে বের হওয়ারও পথ রয়েছে।’
হকিং মনে করেন, ব্ল্যাকহোলে যে তথ্য চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে মনে করা হয়ে আসছে তারও জীবন আছে। আসলে এ তথ্য কৃষ্ণগহ্বরে পুরোপুরি হারায় না। কৃষ্ণগহ্বরের সীমানা বা ঘটনা দিগন্তে তা সংরক্ষিত থাকে।
কোয়ান্টাম মেকানিকসের সূত্র অনুযায়ী, এ তথ্য যেকোনো সময় যেকোনো উপায়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত বছর হকিং অবশ্য কৃষ্ণগহ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই এ তত্ত্ব দিয়েছিলেন।
হকিং বলেন, আমার এই বক্তৃতার সারমর্ম হচ্ছে— কৃষ্ণগহ্বর আসলে কালো নয়। এক সময় কৃষ্ণগহ্বরকে যে অনন্ত কারাগার মনে করা হতো এটা তাও নয়। কৃষ্ণগহ্বর থেকেও বস্তুর বের হওয়ার পথ রয়েছে এবং কৃষ্ণগহ্বর থেকে বের হয়ে বস্তু সম্ভবত আরেক বিশ্বে চলে যেতে পারে। (দ্য গার্ডিয়ান, সিনেট)

দুই জাসদের প্রতিক্রিয়া

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে জাসদের ভূমিকা নিয়ে চলা বিতর্ক নতুনমাত্রা পেয়েছে। দৃশ্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। জাসদকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়ানোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। খোন্দকার মোশতাকের সরকারে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাতীয় চার নেতাসহ হাতেগোনা কয়েকজন ত্যাগী নেতা ছাড়া বহুজনই সেই দিন মোশতাকের করুণাভিক্ষার জন্য, হালুয়ারুটির ভাগাভাগির জন্য তার চারপাশে ভিড় জমিয়েছিল। প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আওয়ামী লীগ নেতা খোন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতা নেয়। ওই সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যও ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। এদিকে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ গোফরান ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন এক বিবৃতিতে বলেছেন, উপনিবেশিক আইন-কানুন ও রাষ্ট্র প্রশাসন দিয়ে স্বাধীন দেশ পরিচালনা এবং বাকশাল গঠনই বঙ্গবন্ধু হত্যার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অন্যথায় কোন ষড়যন্ত্রকারী বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাহস পেত না। অথচ আজও একই ধরনের আইন-কানুন ও রাষ্ট্র প্রশাসন বিদ্যমান রয়েছে। তা পরিবর্তনের উদ্যোগ না নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপপ্রয়াস চলছে।
জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রোববার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধীরা কখনোই বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারতো না যদি গণবাহিনী, জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি, মানুষ হত্যা করে এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করতো। বঙ্গবন্ধু যেদিন মারা যান সেদিন কর্নেল তাহেরও রেডিও স্টেশনে যান। পরদিন বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জাসদের ভূমিকার তদন্ত এবং মন্ত্রিসভা থেকে হাসানুল হক ইনুর পদত্যাগ দাবি করেন। ওই রাতেই এক বিবৃতিতে জাসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও আসাদুজ্জামান রিপনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। মঙ্গলবার শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বক্তব্য সমর্থন করে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ। একইদিনে প্রাক্তন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা, বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দাবি করেন, ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কালে হাসানুল হক ইনু এবং অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনই প্রথম গুলি করেন।
কারা মোশতাকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল?: ইনু
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জাসদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করে দলটির সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মোশতাক সরকারে জাসদের কেউ যোগ দেয়নি। হালুয়া-রুটির ভাগের জন্য মোশতাক সরকারে কারা ভিড়েছিল, তা সবাই জানে।
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জাসদকে জড়ানোর যে অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র, এটার কোন ভিত্তি নেই। দীর্ঘ তদন্ত শেষে দীর্ঘদিন বিচার প্রক্রিয়া শেষে বিচারকরা রায় ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সাক্ষীর জেরা থেকে অভিযোগপত্র কোন জায়গায় জাসদ সম্পর্কে একটি শব্দও লেখা নেই। তিনি বলেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ১৯৭২ সালে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে একটি আইনানুগ দল হিসেবে অংশগ্রহণ করে। সেই নির্বাচনে জাসদ বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭২ থেকে ৭৫ অর্থাৎ ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত জাসদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, কীভাবে চলেছে, কী বিষয় নিয়ে জাসদ বলতো এগুলো পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই ব্যাপারটি নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ এটা প্রকাশিত ব্যাপার। তিনি বলেন, সামপ্রতিককালে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির কতিপয় নেতা হঠাৎ করেই জাসদের বিরুদ্ধে বিষোদগার বা সমালোচনা শুরু করেছেন। আমি বিএনপির নেতৃবৃন্দ এবং আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতৃবৃন্দ যারা একই সুরে জাসদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছেন, তাদের সঙ্গে কোন বাকযুদ্ধে লিপ্ত হতে চাচ্ছি না। বাকযুদ্ধ করার কোন ইচ্ছাও আমার নেই। শেখ সেলিম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ১৪ দলীয় জোটের বৃহত্তম শরিক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নয় জানিয়ে ইনু বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির  নেতাদের অভিন্ন বক্তব্যে তাদের জোটের ঐক্যের ভেতর বিভ্রান্তির জাল তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ থেকে সমালোচনা হওয়ায় জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ইনু বলেন, এটা তো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান না। আওয়ামী লীগ ও জাসদ নীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ, আন্দোলন-নির্বাচন এবং সরকার পরিচালনায় আমরা একসঙ্গে আছি এবং আমরা মনে করি, এই লড়াইটা শেষ পর্যন্ত নেওয়ার জন্য ঐক্য দরকার।
পঁচাত্তরে মোশতাক সরকারের বিরোধিতা করে জাসদের প্রচারপত্র বিলির কথা তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনকালে জাসদের অনেক  নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ৭০ এর বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। মোশতাকের ক্ষমতা দখলের পরে জাসদের কোন নেতা এবং দলগতভাবে জাসদ মোস্তাকের সঙ্গে হাত মেলায়নি। তবে কারা খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল? কারা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিল? সেটা আপনারা জানেন, দেশবাসী জানে। এরকম পরিস্থিতিতে আমি বলব যে, যারাই এ কথাটা বলছেন তারা হয় ইতিহাস জানেন না অথবা সচেতনভাবে অন্য কোন  ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে জানবাজির লড়াই চলছে। খালেদা জিয়ার হত্যা, খুনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে চলেছি। সেই সময়ে কতিপয় ব্যক্তি এমন কিছু কথা বলা শুরু করেছেন, যা ঐক্যের ভেতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। জাসদের উপর আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে বাঁচানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্ন তুলে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এই আক্রমণ বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইকে দুর্বল করবে, তাদের রাজনৈতিকভাবে আড়াল করবে। মহাজোট সরকারের সফলতা যাদের সহ্য হচ্ছে না, তারাই ঐক্যর ভেতর বিভ্রান্তির জাল তৈরি করছেন। জাসদের  কোন কর্মকাণ্ডে ভুল ছিল কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ইনু বলেন, চলার পথে বহু পদক্ষেপ নিতে হয়, কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক, এটা ইতিহাস বিচার করবে। জীবদ্দশায় এটা বিচারের মালিক আমি না।
কমিশন করে ৭২-৭৫ এর সব ঘটনা তদন্ত হোক: বাদল
মঙ্গলবার দিবাগত রাতে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়ে জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, এটা অনস্বীকার্য জাসদ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের বিরোধিতা করেছিল। এটা অনস্বীকার্য জাসদ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পতন চেয়েছিল। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জাসদের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি বলেন, আমি সংসদে স্পষ্ট করে বলেছি, ৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদ যা কিছু করেছে তার সবকিছু ঠিক করেছে সে দাবি আমরা করি না। কিন্তু অন্যরা যা করেছে এর বিচার আমরা ইতিহাসের ওপর ছেড়ে দিলাম। জাসদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ব্যাংক ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড যে শুধু আমরাই করেছি তা নয়। সাহস থাকলে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন হোক না। সে কমিশন ৭২-৭৫ সালের সব ঘটনার তদন্ত করবে এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে দল হিসেবে জাসদের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কোথাও গেলে সেটা তারাই বলতে পারবেন। জাসদের নিউক্লিয়াসের কোন সিদ্ধান্ত ছিল না এ ধরনের ঘটনায় জড়ানোর। আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, কেবল ইতিহাসের ওপর দায় চাপালে চলবে না। অতীতকে তো পরিবর্তন করা যাবে না। তিনি বলেন, ১৫ই আগস্ট জাসদের প্রধান ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তিনি ওইদিন দেশে ছিলেন না। জাসদের অন্য প্রধান নেতারা ছিলেন কারাগারে। তবে ওইদিন সকাল ৯টায় কর্নেল তাহের ইনুকে নিয়ে ঢাকা বেতারে গিয়েছিলেন। কর্নেল তাহের খোন্দকার মোশতাকের কাছে কিছু দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, খোন্দকার মোশতাক যেন মার্শাল ল’ জারি করেন। বাকশাল বাতিল করে জাতীয় সরকার গঠনেরও দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, তাহেরতো এখন আর জীবিত নেই। ইনুকে আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন তিনি আদৌ বেতারে গিয়েছিলেন কি-না গেলে কেন গিয়েছেন। তবে জাসদের এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত ছিল না।
ইনু ও আনোয়ার-ই প্রথম গুলি করে: গয়েশ্বর
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ করতে দেখেছিলেন বলে দাবি করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, গুলিটা প্রথম আনোয়ার হোসেন ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বেই শুরু হয়। মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গয়েশ্বর বলেন, ১৯৭৪ সালে আমি জাসদে ছিলাম। আমাদের একটা সিদ্ধান্ত হলো, আমরা গ্রেপ্তার-অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করবো। কিন্তু ঘেরাও কর্মসূচিতে সশস্ত্র আক্রমণ, এটা আমাদের জানা ছিল না। ছিলেন কে- হাসানুল হক ইনু। আর কে ছিলেন, কর্নেল তাহেরের ছোট ভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকদিন আগের ভিসি আনোয়ার হোসেন। আমরা জানি, মন্ত্রীর বাড়ির গেটের সামনে যাব, সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আসবে, স্মারকলিপি নেবে। কিন্তু গুলিটা প্রথম এই আনোয়ার  হোসেন ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বেই শুরু হলো। যখন আত্মরক্ষার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন থেকে পাল্টা গুলি এলো তখন আমরা দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছি। কারও হাত নেই, কারও পা নেই। কতজন মারা গেছে- তখন জানার সুযোগ ছিল না। গয়েশ্বর আরও বলেন, ৭৪ সালে সরকারের বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দেয় জাসদ। সেই হরতালে বোমা ব্যবহারের জন্য বোমা বানানোর দায়িত্ব দেয়া হয় ইঞ্জিনিয়ার নিখিল চন্দ্র সাহাকে। যাত্রাবাড়ীর একটি পরিত্যক্ত বাড়ির মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে নিখিল বোমা বানাতে যায়। বোমাতে মিশানো জিনিস কোনটা আগে দিতে হয়, পরে দিতে হয়- এরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে হঠাৎ করে তার নিজের হাতের মধ্যে একটা বোমা ফাটে। নিখিলের সম্মানার্থে পেট্রলবোমার নাম রাখা হলো ‘নিখিল’। আপনারা তথ্যমন্ত্রীকে (ইনু) জিজ্ঞাসা করবেন, বোমার অপর নাম নিখিল ছিল কি না? বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, হাসানুল হক ইনু বাংলাদেশে প্রথম গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র রাজনীতি শুরু করেছেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই বঙ্গবন্ধু খুন: হাফিজ
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম। বলেছেন, শেখ মুজিব হত্যার সঙ্গে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দায়ী করা হচ্ছে। অথচ হত্যার দিন আমি জিয়াউর রহমানের বাসায় গিয়ে দেখেছি তিনি তখন শেভ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাতীয় সংসদে মোশতাক সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমান যাননি। কোন ধরনের লুটপাট করে তার ইউনিফর্মের সম্মান তিনি নষ্ট করেননি। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। এ হতাকাণ্ডের পর যে সরকার গঠিত হয়েছিল সেটিও ছিল আওয়ামী লীগের সরকার। আসলে আওয়ামী লীগ এমন একটি দল যারা কেবল নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করা জন্য অন্যের চরিত্র হরণ করে। এদের কারণেই দেশ পিছিয়ে পড়ছে। সরকারের কর্মকাণ্ডে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লেশমাত্র নেই মন্তব্য করে মুক্তিযোদ্ধা এ নেতা বলেন, ৭২ থেকে ৭৫ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির বক্তব্যের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা খুঁজে পাওয়া যায়। তথ্যপ্রযুক্তির আইনে ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়ে মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, এ ধারা মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থি, গণতন্ত্রের পরিপন্থি। ধারাটি মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করে নেয়। তাই অবিলম্বে এ ধারা বাতিল করতে হবে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার নানা কৌশল অবলম্বন করে বিএনপির স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে কোন গণতান্ত্রিক রাজনীতি থাকবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর এ আন্দোলন হবে জনগণের আন্দোলন। কারণ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রের নামে জনগণের সঙ্গে রসিকতা শুরু করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় যদি আমরা যথার্থভাবে বহন করতে চাই। তাহলে যে কারণে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম; সেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। কারণ গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে বিকল্প কোন পথ নেই। সরকারকে উদ্দেশ্য করে বিএনপি স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, গণতন্ত্রকে তার নিজস্ব পথে চলতে দিন। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সহযোগিতা করুন। গ্রেপ্তারকৃত বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা ব্যাহত হবে। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ইসতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা ও নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহ মো. আবু জাফর বক্তব্য দেন।

নিখোঁজের ৭ মাস পর জামায়াত নেতাকে গ্রেপ্তার দেখালো পুলিশ

নিখোঁজের প্রায় সাত মাস পর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াতের যুব ইউনিটের সভাপতি আব্দুল বাছেত মারজানকে বাসে পেট্রোলবোমা হামলা, আল্লামা সাঈদীর রায়ের দিন সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাসহ ১৪টি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। বুধবার ভোরে তাকে উপজেলার গড়রের মাথা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
তবে পরিবারের অভিযোগ সাত মাস আগে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তারা বাছেতের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।
মিঠাপুকুর থানার অফিসার ইনচার্জ হুমায়ুন কবির নয়া দিগন্তকে জানান, বুধবার রাতে জামায়াত নেতা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল বাছেত মারজানকে মিঠাপুকুরের গড়ের মাথা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে চলতি বছর ১৪ জানুয়ারি দিবাগত রাতে মিঠাপুকুরের জায়গীর বাতাসন এলাকায় বাসে পেট্রোলবোমা হামলা করে ছয়জনকে হত্যা, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের দিন সংঘর্ষে সাতজন হত্যাসহ ১৪টি নাশকতার মামলা আছে।
ওসি জানান, আব্দুল বাছেত মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলার ওয়ারেন্ট আছে। ছয়টিতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। তিনটি মামলার শুনানি চলছে। আজ দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে তার স্ত্রী রোকাইয়া খানম লুকি নয়া দিগন্তকে জানান, আব্দুল বাছেত মারজান মিঠাপুকুরের সব শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয় নেতা। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ বছর ১ ফেব্রুয়ারি তিনি উপজেলা পরিষদের কাজে ঢাকা গিয়ে মোহাম্দপুরের তাজমহল রোডে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেন। ওই দিনই আত্মীয়ের বাসা থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাকে আটক করা হয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
রোকাইয়া খানম বলেন, আব্দুল বাছেতের সন্ধানের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদ সম্মেলনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চিঠি দিয়ে তাকে থানায় সোপর্দ কিংবা নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেয়ার দাবি জানোনো হয়। অবশেষে আল্লাহ সহায় হয়েছেন। পুলিশ বুধবার রাতে নাটকীয়ভাকে তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। এসময় আব্দুল বাছেতের নিঃর্শত মুক্তি দাবি করেন তিনি।
রোকাইয়া খানম জানান, গত ১ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তিনি ফোন পান। সাদা পোশাকের কয়েকজন আইনশৃংখলাবাহিনীর লোক আব্দুল বাছেতকে আটক করে নিয়ে গেছে। তারা উপস্থিত লোকজনদের পরিচয় দিয়েছেন ডিবির লোক।
তিনি বলেন, আমার স্বামীকে ডিবি পরিচয়ে নিয়ে যাওয়ার পর আমি প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেয়া কিংবা আদালতে সোপর্দ করার দাবি জানাই। গত ৫ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমার স্বামীকে আদালতে সোপর্দ করার দাবি জানাই। বিভিন্ন জায়গায় লিখিত আবেদন করি। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। অবশেষে সাত মাস পর তাকে থানায় সোপর্দ করা হলো। এজন্য প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।
লুকি বলেন, ‘আমার স্বামী কোনোদিন কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। তিনি মিঠাপুকুরের আপামর জনসাধারণের বন্ধু। মিঠাপুকুরের সব শ্রেণী পেশার, রাজনৈতিক দলের মানুষ তার সাক্ষী। তিনি এক লাখ ছয় হাজার ভোট পেয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। আমার স্বামী হিসেবে বলছি না, আপনারা মাঠে যাছাই করে দেখুন, ওর দ্বারা কোনো ধরনের খারাপ কাজ করা সম্ভব কি-না। ও কখনই কোনো খারাপ কাজ করতে পারে না। করে নাই। করবেও না। ও শুধু মানুষের কল্যাণ চেয়েছে। উপকার করেছে। নিজের ক্ষতি করে হলেও মানুষের উপকার করেছে। আমার স্বামী মিঠাপুকুরের আপামর জনগণের বন্ধু। কাছের বন্ধু। আমাদের সময় না দিয়ে ও জনগণকে সময় দিতো। তাদের কি করলে ভালো হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করতো। কিন্তু সেই মানুষটা সাত মাস ধরে নিখোঁজ। ডিবি পরিচয়ে তুলে যাওয়া হলো। আর কোনো খোঁজ খবর নাই। ও কোথায় আছে। কিভাবে আছে। বেঁচে আছে না তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা কিছুই জানি না। দুটি মাসুম বাচ্চা। তারা শুধু আব্বু আব্বু বলে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ওরা আমার কাছে যখন জানতে চয় কখন আসবে আব্বু। কেন ওরা আব্বুকে নিয়ে গেলো। কেন আব্বু বাড়িতে আসে না। আমাদের পড়ালেখা খাওয়া দাওয়ার খোঁজ নিচ্ছে না। আব্বু আব্বু বলে ওরা চিৎকার করছে। কিন্তু আমি নিরোত্তর। আমি ওদের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারি না। ওদেরকে আমি সামলাতে পারছি না। ঘরের বাইরে কোনো আওয়াজ হলেই ওরা ছুটে যায়। বলে আব্বু এসেছে। কিন্তু না। এই পৃথিবীতে এখন আমার বেঁচে থাকাটাই অনর্থক হয়ে গিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘মারজান না থাকায় ব্যবসাটাও বন্ধ হয়ে আছে। অনেক টাকা লোকসান আর ব্যাংক ঋণের মুখোমুখি আমরা। ওই ব্যবসার অর্থ দিয়েই ও সংসার চালাতো। জনগণের সেবা করতো। আমি ভেবেছিলাম মারজান কখনও তার অবুঝ সন্তান দুটিকে আদর করবার, তাদের দেখভাল করার কোনো সুযোগ পাবে কি-না। আমার কাছে বেঁচে থেকেও মরে যাওয়ার সমান ছিল।’
আব্দুল বাছেত মারজানের মেয়ে ইসমাত ওয়ারা সাবিহা নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমার পিতা একজন জননেতা। জনগণকে নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। যেটুকু সময় পেতেন, সেটুকুতেই আমাদের তিনি আদরে আদরে ভরিয়ে রাখতেন। তার সাথে আমার অনেক স্মৃতি বলে কাঁদতে থাকে অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া সাবিহা।
আব্দুল বাছেত মারজানের শিশু সন্তান হাসিন তাজমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ওরা কেন আমার আব্বুকে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল। কেন আব্বুকে সাত মাস পর দেখলাম। তবুও তিনি জেলে। আমাকে আদর করতে পারলেন না। আমকে গোসল করিয়ে দিতে পারলেন না। স্কুল ড্রেস পরিয়ে দিতে পারলেন না। চকলেট কিনে দিলেন না। আমি তো আব্বু ছাড়া ঘুমাতে পারি না।

ঐক্যবদ্ধ না থাকলে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেতে পারে : সৈয়দ আশরাফ

নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন কৌশলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলার চেষ্টা চলছে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেতে পারে। আমরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছি ঠিকই। কিন্তু ক্ষমতায় থেকেও আমরা নিরাপদ নই। এ জন্য আমাদের সব সময় পাহারা দিয়ে রাখতে হবে। বুধবার বিকেলে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে জাতীয় শ্রমিক লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি শুকুর মাহমুদের সভপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।
আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেমে নেই উল্লেখ সৈয়দ আশরাফ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য ১৪ আগস্ট রাত বেছে নেয়া হয়েছিল, কারণ ওইদিন পাকিস্তানের জন্ম। বঙ্গবন্ধুর অপরাধ ছিল তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের স্বাদের পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তিনি আরো বলেন, এমন ষড়যন্ত্র এখনও অব্যাহত রয়েছে। ষড়যন্ত্রকারী খালেদা জিয়ারা এক সেকেন্ডের জন্যও কিন্তু বসে নেই। বিএনপি নানা কৌশলে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চায়। আমরা যদি সতর্ক থাকি তবে তারা যত চেষ্টাই করুক না কেন, তাদের চেষ্টা সফল হবে না।
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হেলায় হেলায় বসে থাকার সুযোগ নেই। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করলে অন্যরা সুযোগ নেবে। ব্যক্তি স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে দলের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে কাজ করুন। সৈয়দ আশরাফ বলেন, আমরা যদি নিজেদের মধ্যে কোন্দল করি তবে কিন্তু আমরা দূর্বল হয়ে যাব। ক্ষমতায় আছেন বলেই কি দেশের স্বার্থে, দলের স্বার্থে, শেখ হাসিনার বৃহত্তর স্বার্থে সামান্য দু-চার পয়সার ভাগ বাটোয়ারা আপনারা ত্যাগ করতে পারেন না! এসময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেশ, দল ও প্রধানমন্ত্রীর স্বার্থে সামান্য দু-চার পয়সার ভাগ বাটোয়ারা ছাড়ার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

দু’চার পয়সার ভাগ বাটোয়ারা বাদ দিন: আশরাফ

দু’চার পয়সার ভাগ বাঁটোয়ারা বাদ দিয়ে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার আহবান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ আহবান জানান তিনি। আজ বিকালে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে জাতীয় শ্রমিক লীগ। সৈয়দ আশরাফ বলেন, হেলায় হেলায় বসে থাকার সুযোগ নেই। আমরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছি ঠিকই কিন্তু ক্ষমতায় থেকেও আমরা নিরাপদ নই। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে বাংলাদেশে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামান্য কিছু পাওয়ার জন্য দলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে কোন্দল করি, বিভক্তি সৃষ্টি করি তবে কিন্তু আমরা দুর্বল হয়ে যাব। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করলে অন্যেরা এর সুযোগ নেবে। তাই ব্যক্তি স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে দলের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে কাজ করুন। ক্ষমতায় আছেন দেখে সামান্য দু’চার পয়সার ভাগবাটোয়ারা ত্যাগ করতে পারেন না? তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য ১৪ই আগস্ট রাতকে বেছে নেয়া হয়েছিল, কারণ ওইদিন পাকিস্তানের জন্ম। বঙ্গবন্ধুর অপরাধ ছিল তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের স্বাধের পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এমন ষড়যন্ত্র এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিএনপিকে ষড়যন্ত্রকারিদের দল উল্লেখ করে  তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারিরা এক সেকেন্ডের জন্যও থেমে নেই। এরা সবসময়ই শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করে। নানা কৌশলে তারা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চায়। খালেদা জিয়া প্রতি মুহূর্তে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন।  এ ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, তারা সবসময় সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টায় থাকবে। আমাদের কাজ হলো যতবারই তারা চেষ্টা করবে, তাদেরকে কামিয়াব হতে দেবনা। এ জন্য আমি আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী পরিবারের প্রতি পরিপূর্ণ ঐক্যে ডাক দিচ্ছি। পচাত্তরের ১৫ই আগস্ট এবং ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ১৫ই আগস্ট খুনিরা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। আর ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু খুনিরা সফল না হওয়ার কারণ, বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে যেমন ভালোবাসে তেমনি আওয়ামী লীগকেও ভালোবাসে। আর এই ভালোবাসাই আমাদের ভরসা। জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ,  শ্রমিক লীগের কার্যকরি সভাপতি ফজলুল হক, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রমূখ।

বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান ব্রিটেনের

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী ডেসমন্ড সোয়েন
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-বিষয়ক ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী ডেসমন্ড সোয়েন বলেছেন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অর্জিত উন্নয়নের ধারাবাহিতা বজায় রাখতে এবং দেশটিকে মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে উন্নয়নের বিভিন্ন দিকে বাংলাদেশকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তিনি বলেছেন, আগামী বছরগুলোতে স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং একটা শক্তিশালী সুশীল সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষে প্রতিমন্ত্রী সোয়েন এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন।
ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী ডেসমন্ড সোয়েন তার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ ২০১৫র মধ্যে নির্ধারিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু এখন মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে , এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব সম্পদও ব্যবহার করতে হবে বলে মন্তব্য করেন সোয়েন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য ব্রিটেন তার অর্থ সহযোগিতা অব্যাহত রাখলেও অর্জিত রাজস্ব থেকে উন্নয়নের কিছু ব্যয়ভার বাংলাদেশকেও বহন করতে হবে এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
"নতুন যে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে যার নাম দেওয়া হচ্ছে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল, তাতে যেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে সেগুলো এর আগের ধাপে ছিল না। যার মধ্যে বিশেষভাবে থাকছে সুশাসনের বিষয়টি। তিনি বলেন একটা শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন – পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে এই লক্ষ্যমাত্রার অংশ যেখানে আরও থাকবে একটি সুস্থ সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা যে সমাজে আইনের শাসন কাজ করবে এবং যারা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন ব্রিটেনের প্রত্যাশা এমডিজির মত বাংলাদেশ এগুলো অর্জনেও সফল হবে।" বলেন সোয়েন।
সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপটা নির্ধারণ করা হবে যেটাকে বলা হচ্ছে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল-বা এসডিজি- অর্থাৎ এই পর্বে স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে।
সোয়েন জানান, এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে সুশাসন এবং শক্তিশালী সুশীল সমাজ গঠনের মত বিষয়গুলি, যেগুলি আগের লক্ষ্যমাত্রার অংশ ছিল না ।
সুশাসন প্রসঙ্গে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন বাংলাদেশে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে সেটা ব্রিটেন কীভাবে দেখছে? ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, তার তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে এ বিষয়টি নিয়ে তিনি সুচিন্তিত মতামত দেয়ার অবস্থানে নেই- তবে বিষয়টির যথাযথ তদন্তের ওপর তিনি জোর দেন।
"তিনি যেটা বলছিলেন যে এধরনের অপরাধের যথাযথ তদন্ত এবং অপরাধীর বিচার হওয়া উচিত। তিনি বলেন বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক দেশ। গণতান্ত্রিক চর্চা আর মূল্যবোধ সংরক্ষণের জন্য দেশটির যা প্রয়োজন তা করা উচিত। যার অর্থ হল দেশটিতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সহ্য করা উচিত হয়। কাজেই তিনি বলেন তার মতে বাংলাদেশ সরকারের এবং পুলিশের উচিত এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার করা।"
তার তিনদিনের বাংলাদেশ সফরে সোয়েন ব্রিটিশ অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ঘুরে দেখেন যার মধ্যে দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচি, চরের মানুষদের জন্য বিকল্প জীবিকার কর্মসূচি ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নানা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কীভাবে এগোচ্ছে তা ঘুরে দেখেন।
সূত্র : বিবিসি