Showing posts with label WikiOpinion. Show all posts
Showing posts with label WikiOpinion. Show all posts

Tuesday, January 5, 2016

কোন পথে ভারত? by আরাফাত হোছাইন বিপ্লব

অতি সম্প্রতি ভারতে বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে গেল। বাড়িতে গরুর মাংস রাখার অভিযোগ তুলে মোহাম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে আর পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। উত্তর প্রদেশের দাদরি গ্রামের এ ঘটনায় আহত হন আখলাকের ২২ বছর বয়সী ছেলেও। পরে প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের ফ্রিজে খাসির গোশত ছিল, গরুর নয়। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে লিখতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন লেখকরা।
এ ধরনের অসহিষ্ণু অবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার জোয়ার নেমেছে। পুরস্কার ফেরত দেয়ার প্রথম ইচ্ছা প্রকাশ করেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ভাইঝি নয়নতারা সেহগাল। তারপর একে একে এখন পর্যন্ত ২৬ জন বিশিষ্ট সাহিত্যিক অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কন্নড় সাহিত্য পরিষদের পুরস্কার ফিরিয়ে দেন ছয়জন কন্নড় সাহিত্যিক, বীরান্না মাদিওয়ালার, টি সতীশ জাভারে গৌড়া, সঙ্গমেশ মীনাসিনাকাই, হনুমন্ত হালিগেরি, শ্রীদেবী ভি আলুর এবং চিদানন্দ। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে অধ্যাপক চন্দ্রশেখর পাতিল ফিরিয়ে দেন কর্নাটক সরকারের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান পদ্ম পুরস্কার। এখন প্রতিদিন বাড়ছে পুরস্কার ও অর্থ ফিরিয়ে দেয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংখ্যা। প্রতিদিন ভারতের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় শিরোনাম হচ্ছেন তারা। টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে পাচ্ছেন আমন্ত্রণ। প্রতিবাদ এখন একসুরে। হিন্দি, ইংরেজি, পাঞ্জাবি, কন্নড়, কোঙ্কানি, বাংলা, মৈথিলি, মারাঠি, উর্দুÑ সব ভাষা থেকেই হচ্ছে প্রতিবাদ। ভারতের সেরা প্রতিভারা তাদের পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন অথবা অ্যাকাডেমি থেকে পদত্যাগ করছেন। এখন পর্যন্ত অ্যাকাডেমির সাধারণ পরিষদের ২০ জন সদস্যের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন চার জন। দাদরি ও মৈনপুরির ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে তাদের।
সর্বপ্রথম সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া নয়নতারা সেহগাল বলেছেন, কোনো ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের সন্ত্রাস নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও আশ্চর্যজনকভাবে চুপ রয়েছেন। এই সরকার ফ্যাসিবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের এই মনোভাবে আমি উদ্বিগ্ন। সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে কবি এবং লেখিকা মন্দাক্রান্তা সেন বললেন, সমাজের সর্বস্তরে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে, তা মোটেই কাম্য নয়। মানুষের পক্ষে কথা বলাটা কবি, লেখক, শিল্পীদের একটা সামাজিক দায়িত্ব। অথচ এ দেশে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তারা খুন হচ্ছেন। অত্যাচারিত হচ্ছেন। এর জোরালো প্রতিবাদ জানানোটা খুব দরকার বলে অনেক দিন ধরেই মনে করছিলাম। পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে। লেখক এবং গবেষক অরবিন্দ মালাগাত্তি বিশিষ্ট কন্নড় যুক্তিবাদী এম এম কালবার্গির হত্যার ঘটনায় সাহিত্য অ্যাকাডেমির চুপ করে থাকার নিন্দা করে সাধারণ পরিষদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান। পাঞ্জাবি লেখক ভুল্লার বলেন, যেভাবে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে, তা নিয়ে আমি প্রচণ্ড বিরক্ত। অন্য দিকে, দেশের সম্প্রীতি রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় সরকার কিছুই করছে না বলে মনে করেন প্রখ্যাত পাঞ্জাবি নাট্যকার ঔলাখ। আরেকজন লেখক অমর মিত্র বলেন, দাদরি কাণ্ডের জন্য প্রতিবাদ হওয়া দরকার। কিন্তু পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। দাদরির ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কেবল বলেছেন, ‘দুঃখজনক এবং অবাঞ্ছিত, তবে কেন্দ্রীয় সরকারের কিছুই করার নেই।’
১০ অক্টোবর সাহিত্য অ্যাকাডেমিকে দেয়া এক চিঠিতে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও কবি সারা জোসেফ বলেন, এই সরকারের সময় মানুষের ভেতর ভয় জাগ্রত হচ্ছে, সঙ্কুচিত হচ্ছে স্বাধীনতা। এর প্রতিবাদে আমি আমার পদক ফিরিয়ে দিলাম। মালায়লাম ভাষায় লেখা তার ‘আলাহায়ুরে পেনকামাল’ উপন্যাসের জন্য ২০০৩ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান তিনি। ৭ অক্টোবর পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া প্রথিতযশা লেখক অশোক বাজপেয়ী দাদরি হত্যাকাণ্ড ও একাধিক বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পর নরেন্দ্র মোদি সরকারের চুপ থাকার সমালোচনা করেছেন।
সরকারের ভূমিকা রহস্যজনক হলেও রাইসিনা হিলসে ভিন্নমত দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, বহুত্ববাদের সাথে সহাবস্থান আমাদের সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ। তা নষ্ট করে দেয়াকে আমরা প্রশ্রয় দিতে পারি না। ইতিহাস পড়লেই দেখা যাবে, সময়ের সাথে সাথে বহু সভ্যতার পতন ঘটেছে। কিন্তু বহিঃশত্রুর আক্রমণ সত্ত্বেও ভারতীয় সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়নি। সেটা মাথায় রেখে চললে ভারতীয় গণতন্ত্রের অগ্রগতি কেউই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
দাদরি হত্যা এবং গরুর গোশত নিয়ে একের পর এক ঘটনায় অস্বস্তি বাড়িয়েছে শাসক দল বিজেপির। কোনো রকম বিতর্কিত মন্তব্য না করতে দলটি তাদের নেতা ও মন্ত্রীদের সতর্ক করেছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার লিখেছেন, মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) বুঝতে পেরেছে, তারা যদি গরুর মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান বজায় রাখে, তাহলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার অজানা বিপদের মুখে পড়তে পারে। এর ফলে মুসলমানেরা আরো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। আরএসএস সেটা বুঝতে পেরে মুখ বন্ধ করেছে। বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা এল কে আদভানি বলেছিলেন, বিজেপি হিন্দুদের সমর্থন নিয়ে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে, কিন্তু মুসলমানদের সহযোগিতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করা কঠিন। তার পরও ব্যাপারটা শুধু কাগজে-কলমে রয়ে গেছে। সংঘ পরিবার মুসলমানদের সমর্থন লাভের ব্যাপারটা যদি সত্যিই তীব্রভাবে অনুভব করত, তাহলে তারা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতো। তারা মনে করে, প্রকৃত অর্থে দেশ পরিচালনায় মুসলমানদের ভূমিকা নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দিকেই লক্ষ করুন, সেখানে শুধু একজন মুসলমান মন্ত্রী রয়েছেন, তা-ও আবার অগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে।
আনন্দবাজার পত্রিকার নয়া দিল্লি ব্যুরো চিফ প্রবীণ সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল লিখেছেন, বিজেপি চাইছে বিতর্কটা হোক। নেহরুর সময় থেকে তৈরি হওয়া এই যে বহুত্ববাদী ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে সংখ্যালঘু তোষণের বদলে এক বিকল্প হিন্দু জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ এসেছে, তাকে এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে বিজেপি এগোতে চাইছে। এই মতাদর্শগত সঙ্ঘাত এবার ভারতকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে আমাদের শঙ্কা আছে। শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর কি না, তা আমরা জানি না।
সম্প্রতি ‘ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে’ বলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য অ্যাকাডেমিপ্রাপ্ত লেখক-সাহিত্যিকেরা রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এ চিঠিতে লেখা হয়েছে, ভারতে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার আবহ তৈরি হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত পড়ছে ক্রমাগত। নিরপরাধ সাধারণ নাগরিক অহেতুক হত্যালীলার শিকার হচ্ছেন। নরেন্দ্র ধাবলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবার্গির মতো স্বাধীন চিন্তা ও শুভবুদ্ধির উৎস ব্যক্তিত্বরা নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। অথচ প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা ও সরকারি ঔদাসীন্য পদে পদে আমাদের মানবিক অধিকার খণ্ডিত করছে।
এত কিছুর পরও থেমে নেই উগ্রপন্থীরা। গরু জবাইয়ের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা ও ভাঙচুর এবং মুম্বাইতে পাকিস্তানি গায়ক গুলাম আলীর কনসার্ট বাতিলের মতো বিষয়গুলো শেষে শিবসেনারা গত ১২ অক্টোবর কালি মাখিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপির সাবেক উপদেষ্টা সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে। তার দোষ ছিল পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরির একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এখন প্রশ্নœ হচ্ছেÑ সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে কালি ছিটিয়ে শিবসেনার কর্মী সমর্থকরা আসলে কাকে কালিমালিপ্ত করেছে? এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দ্বারা শিবসেনা সুধীন্দ্রকে নয়, খোদ ভারতকেই কালিমালিপ্ত করে দিয়েছে!
শুধু আকার-আয়তনে ও জনসংখ্যার বিচারেই বড় হওয়া যায় না। মন-মানসিকতার ক্ষেত্রেও বড় হওয়া দরকার। এজন্য মানবিকতা ও বিশ্বজনীনতার চর্চা বাড়াতে হবে। এ নির্মম সত্যটা ভারতীয় নেতাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। মোদির ভারতে বর্তমানে উগ্রবাদী হিন্দুরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর বিপরীতে প্রতিবাদের মাত্রাটাও বাড়ছে সেভাবে। একটি জাতির বড় একটি অংশ যদি হতাশায় থাকে আর একটি অংশ যদি ধর্মীয় উগ্রবাদকে আদর্শ মেনে নেয় তাহলে সেই জাতির কি পরিণতি হয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ আফগানিস্তান ও সিরিয়া। শেষ পর্যন্ত ভারত কি সে পথেই হাঁটবে? নাকি বদলে যাবে? মোদিরা কি ভারতকে বদলে দিতে পারবেন? সেটা কি সম্ভব? এমন সব প্রশ্ন আজ অসংখ্য ভারতীয়ের!
arfat.biplob09@gmail.com

Wednesday, December 30, 2015

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ইসির ভূমিকা by এম সাখাওয়াত হোসেন

৩০ ডিসেম্বর ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের বহু পৌরসভা, বিশেষ করে দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল। অবশ্য এ জায়গাগুলো সব নির্বাচনের সময়ই অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশি উত্তপ্ত থাকে। এখন পর্যন্ত সংঘর্ষ যা হয়েছে, তা বিগত ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতীয়মান হয় যে আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা বিগত নির্বাচন থেকে নিম্নগামী, যা ভোটারদের শঙ্কিত করে তুলেছে।
ওপরের বক্তব্যের সত্যতা প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই দেখা যায়। মারাত্মক কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে চৌদ্দগ্রামে দুই পক্ষের সংঘাতের কারণে শুধু উভয় পক্ষের সমর্থকেরা আহতই হননি, বরং জাতীয় মহাসড়ক বন্ধ করে গাড়ি পোড়ানো ও দোকান ভাঙচুরের মহা উৎসব লেগেছিল। সাভারে সরকার-মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকেরা প্রতিপক্ষ বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে হামলা করেছেন বলে পত্রপত্রিকায় তথ্য প্রকাশ। পটুয়াখালীতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির নেতা আলতাফ হোসেনের গাড়িবহরে প্রতিপক্ষের হামলা, গাড়ি ভাঙচুর এবং ২০ জনের ওপরে আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম, নাটোর, চাঁদপুর, লক্ষ্ণীপুর, পাবনা, নেত্রকোনা, সরিষাবাড়ীতে। নড়িয়ায় আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থীর ওপর হামলা করেছেন একই দলের বিদ্রোহী পার্থীর সমর্থকেরা। নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘন। সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রথম বড় ঘটনা ঘটেছিল ফুলপুর পৌরসভায় দুই মন্ত্রীর উপস্থিতি এবং একজন মন্ত্রীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ দিয়ে। অবশ্য স্থানীয় তদন্তে ওই দুই মন্ত্রী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রমাণিত না হওয়ায় ইসি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অথচ নির্বাচনী আচরণবিধির ২২ অনুচ্ছেদ এবং এর শর্তাংশ পাঠে প্রতীয়মান হয় যে দুই মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল। একজন স্থানীয় মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তাঁর সঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন দলীয় মেয়র পদপ্রার্থী—এমনই সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রপত্রিকায়।
এমতাবস্থায় নির্বাচনী পরিবেশ যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনুকূলে থাকছে না, তা তাদের কিছু বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান। একপর্যায়ে একজন কমিশনার সরকারপ্রধানের হস্তক্ষেপের আকুতি জানিয়ে একধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের দায়দায়িত্ব একমাত্র ইসির, তা হোক না সংবিধানের আওতায় পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণোদিত আইন দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সংবিধানের ১১৯ ধারা মতে, নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনার জন্য। বস্তুতপক্ষে নির্বাচন কমিশনকে যতখানি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো সাংবিধানিক অথবা আইন দ্বারা গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয়নি। কাজেই কমিশনকে কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যেসব জায়গায় হানাহানি হয়েছে, সেসব জায়গায় নির্বাচন স্থগিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের প্রার্থিতা বাতিল করার মতো পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশন নিতে পারে বা নেওয়া উচিত বলে মনে করি। এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশন তাদের প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা দেখাতে পারে। কয়েকটি জায়গায় পৌরসভা বিধিমালার ধারা ৩২ অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করি, মুখে সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গে শক্ত অবস্থান থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গুরুতর বিধি ভঙ্গের মতো ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে আইন শুধু কাগজে–কলমেই থেকে যাবে।
যদিও সংবিধানে নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য অনুষ্ঠিত করার মূল দায়িত্ব ইসির। তবে দশক দুয়েকের মধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রয়োজন শরিকদের পূর্ণ সহযোগিতা। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের মধ্যে সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার সহযোগী ভূমিকা স্বীকৃত। এ ধরনের সহযোগিতা যেমন সহজে পাওয়া যায় না, তেমনি সহযোগিতা আদায় করার প্রচেষ্টা সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে, তা অনেকটা উপলব্ধি করা গিয়েছিল বিগত উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়। অতীতের অনিয়মগুলো আমলে নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারত। কিন্তু সেটি হয়নি। মূলত এ কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে আসছে এবং কমিশনকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
বর্তমানে পৌরসভা নির্বাচনের একাংশ, বিশেষত মেয়র পদে দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তটিও অতি দ্রুত নেওয়া হয়েছে। ততোধিক ত্বরিতগতিতে নির্বাচন অায়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় শরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা সম্ভব হয়নি, যে কারণে নির্বাচন কমিশনকে বেগ পেতে হচ্ছে। অপর দিকে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রথম থেকেই আচরণবিধির খুব একটা তোয়াক্কা করেনি, যা দলের তরফ থেকেও দলীয় প্রার্থী ও সমর্থকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচন দলীয় পরিচয়ে পরিবর্তন করার পেছনের জোরালো যুক্তি ছিল, এসব নির্বাচনে প্রার্থীদের ওপর দলের কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তেমনটা শুধু দলের স্বার্থেই হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া বা প্রশাসনে সহযোগিতা করা হয় না, যা এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। নির্বাচনী আইন ও বিধির প্রতি সম্মান দেখানোর দায়িত্বও দলের এবং দলের প্রার্থীদের। কিন্তু আমাদের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কমিশন রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা তো পায়ই না, বরং উল্টো নানা চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়।
সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পেতে হলে ইসির সহযোগী হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করার শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তা প্রয়োজন। এর প্রথম ধাপ রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রার্থী নির্বাচন। দলের প্রার্থী নির্বাচনের বাঁধাধরা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি বিশ্বের কয়েকটি দেশে আইন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সিংহভাগ দেশে এ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া প্রতিটি দলের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া বলেই স্বীকৃত। তবে উঠতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আইন দ্বারা কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। তবে স্বীকৃত দুটি পদ্ধতি হচ্ছে—এক. দলের তৃণমূলে তৈরি তালিকা থেকে শীর্ষস্থানীয় বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত করা, তবে শর্ত থাকে যে তৃণমূল পর্যায়েও স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে গঠিত বোর্ড কর্তৃক ক্রম অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করা। দুই. তৃণমূল পর্যায়ে গোপন ভোটের মাধ্যমে প্যানেল তৈরি করা। সূত্রমতে, প্রথম প্রক্রিয়াটিও পুরোপুরিভাবে গ্রহণ না করার কারণে তথাকথিত ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’র জন্ম দেয়, যার উদাহরণ এই নির্বাচনে বিদ্যমান। পৌরসভা নির্বাচনে তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে বিপাকে দেশের দুই বৃহত্তর দল। এ কারণেও আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশ হয়ে উঠছে উত্তপ্ত। এসব যেমন দলের কাঠামো ও নির্বাচনী পরিবেশের হিতে যায় না, তেমনি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবশ্য একটি স্বীকৃত ধারায় প্রার্থী নির্বাচন করা উচিত, তা না হলে নতুন রাজনীতিবিদদের যেমন উত্থান হবে না, তেমনি মেধাবী তরুণদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট করা যাবে না।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী মিডিয়া। ইসিকে হতে হবে মিডিয়াবান্ধব এবং সহযোগিতা নিতে হবে তাদের কাছ থেকেও। অতীতে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া উভয়ই নির্বাচন কমিশনকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছিল। নির্বাচনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরতে মিডিয়াকে অবাধ বিচরণ করতে দেওয়া উচিত। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে প্রবেশ করার ওপর কড়াকড়ি আরোপ এবং ভোটের অগ্রগতি ও আইনশৃঙ্খলা স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার প্রক্রিয়াকে সীমিত করা অথবা রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। মিডিয়া, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে নির্বাচন কমিশনের চোখ-কান হিসেবে গণ্য করা হয়। অতীতে মিডিয়ার সহযোগিতা নির্বাচনের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তাই মিডিয়াকে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, একটি বলিষ্ঠ, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনই যে শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে, তেমনটি নয়। কারণ, এর সহযোগী শরিকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য স্বাধীনচেতা ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

Friday, December 25, 2015

মেরুদণ্ড সোজা হতে কত দেরি পাঞ্জেরি? by ডক্টর তুহিন মালিক

এক. নিজের স্বাধীনতা কে না চায়? এটা চায় না, এমন মানুষ বোধহয় তাবৎ বিশ্বে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রাণিকুলও কভু খাঁচায় বন্দিজীবনের পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারে না। জীবজগতের প্রধান জৈবিকত্বই হচ্ছে তার আত্মস্বাধীনতা। সে কারণেই হয়তো কবি বলে গেছেন ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে; কে বাঁচিতে চায়? পরাধীনতার শৃঙ্খল কে পরিবে পায় রে; কে পরিবে পায়?’ কবি যদি বেঁচে থাকতেন তবে কবিচক্ষুতে নির্ঘাত অবলোকন করে যেতেন যে, আমাদের নির্বাচন কমিশনই সৃষ্টিকুলে একমাত্র যারা নিজেদের স্বাধীনতাকে চায় না। আশরাফুল মাখলুকাতের ১৬ কোটি বঙ্গসন্তান যতই তাদেরকে স্বাধীনতা ঘোষণার আবেদন জানাক না কেন, তারা নিজেদের পরাধীনতাকেই শ্রেষ্ঠতর বলে মেনে নিয়েছে। ২০১৫ সালের পুরো ডিসেম্বর মাসে জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত শব্দ ’মেরুদণ্ডহীনতা’ যাদের জন্য প্রযোজ্য, সেই ইসি তাদের মেরুদণ্ডহীনতার দণ্ডকে মাথা পেতে নিতেও কোনো রকম কার্পণ্য করছে না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবারো নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন আখ্যা দিয়েছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, এরশাদের মতো সদা-পরিবর্তনীয় মানুষও আজ ইসিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন, আপনাদের মেরুদণ্ড আছে কি না প্রমাণ দিতে হবে। গণমাধ্যমে আচরণবিধি ভঙের নিত্যনতুন অভিযোগ প্রচারিত হলেও ইসি এগুলোর কোনো ‘সত্যতা খুঁজে পাচ্ছে না’। এরশাদ সাহেবের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন এবার পৌর নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাই করে একসাথে ১৫৭ জন মেয়র প্রার্থীসহ ৮৯৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেখিয়ে দিলো তারা এতটাই ক্ষমতা রাখে। অথচ তাতেও তাদের কোনো সুনাম হয়নি! মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা যদি বিএনপির হয়ে যায় তাতে খামাখা ইসি একা কেন দোষী হবে? তারা তো আওয়ামী লীগের ’বিদ্রোহী’ প্রার্থীদেরও মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে, কই তাতে তো আওয়ামী লীগ কোনো টুঁ শব্দ পর্যন্ত করল না। ইসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তাকে বিনাযুদ্ধে জয়ী হতে দেবে না। কঠিন শপথ। সময় থাকুক আর নাই থাকুক, ব্যালট পেপার নতুন করে ছাপাতে হোক আর পুড়িয়ে ফেলা হোক, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে দেখাতে হবে কতটা শক্ত তাদের মেরুদণ্ড। ইসি নির্বাচনী আইন-কানুন প্রয়োগ করল সেগুলো আবার নাকি সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষেই যাচ্ছে বলে অভিযোগ। এ দিকে ইসির কোনো নোটিশের জবাব দেয়ার কোনো প্রয়োজন দেখছেন না সরকারের এডিসি, রিটার্নিং অফিসার, ইউএনও, এসপি, ওসিরা। প্রশাসন পর্যন্ত তাদেরকে মেরুদণ্ডহীন ভাবছে নাকি? ইজ্জত বাঁচাতে অসহায় ইসি এবার দ্বারস্থ হলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর। বিধি ভঙ্গের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীকে একটু দেখার জন্য না হয় অনুরোধই জানানো হলো। তাতেও এত সমালোচনা! যদিও বিধি ভঙ্গের অভিযোগ দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, প্রধানমন্ত্রীর নয়। তাতে কী, প্রধানমন্ত্রী তো খেলার মাঠ থেকে শুরু করে সব কিছুই একক সিদ্ধান্তেই করছেন। সর্বক্ষমতা তো দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত। আর সামান্য একটা পৌর নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়টা প্রধানমন্ত্রী যদি অনুগ্রহ করে একটু দেখে দেন তাতে কী-বা আসে যায়?
দুই. নির্বাচন কমিশন যে কতটা উদার এটা কিন্তু কারো চোখে পড়ল না। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তারা বেশি উদ্বিগ্ন বলে প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের জানায় ইসি। নিজেদের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারাটা চাট্টিখানি কথা নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ইসির ভাবমূর্তির ‘ভাব’ আর ‘মূর্তি’ যেভাবে হারিয়ে গেছে তা পুনরুদ্ধারের অযথা চেষ্টা না করে বরং সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ায় দোষটা কিসের? সুশীলসমাজ খামাখা বলে যে, ইসি একটা সাংবিধানিক পদ ও সংবিধান প্রদত্ত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নিজের সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ না করে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার অভিযুক্ত আরেকটি দলের সভানেত্রীর কাছে এহেন আত্মসমর্পণ স্পষ্টত সংবিধান লঙ্ঘন। অযথা ইসির কমিশনারদের সাংবিধানিক শপথের কথাগুলো মনে করিয়ে দিয়ে কেন এভাবে বিব্রত করা হচ্ছে? কমিশনাররা কোনো ধরনের রাগ, ভয়, লোভ, অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে নির্বাচন কমিশনারের মতো সাংবিধানিক একটি পদে দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন সত্য, কিন্তু তাই বলে এত দিন পর কেন ‘সাংবিধানিক দোহাই’ দেয়া হচ্ছে? তাও আবার সংবিধান লঙ্ঘনের মতো মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধের কথা এভাবে প্রকাশ্যে বলতে হবে? ওরে বাবা, দণ্ডহীনতার জন্য মৃত্যুদণ্ড? এ আবার কেমন আইন? পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করে এ দণ্ড যদিও আরোপ করা হয়ে থাকে, তবু এটা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচন কমিশন বা সরকারি দলের জন্য প্রযোজ্য নয়, সেটা কি সুশীলরা জানে না?
তিন. সংবিধান না হয় ইসিকে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করেছে, তাই বলে ইসিকে এত চাপ দিলেই কি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়ে যাবে? যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। সরকারি দলের হানিফ সাহেব বলছেন, ‘নির্বাচন কমিশন বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল, সরকারি দলের প্রতি কঠোর।’ আর এ দিকে বিএনপিও বলছে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের দলীয় সংগঠন। অথচ নির্বাচন কমিশন এত কষ্ট করে মাঠপর্যায়ে যেসব তদন্ত চালাচ্ছে তার ফল যদি বিএনপির প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে চলে যায় তার জন্য ইসি কেন দোষী হবে? সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের সামাল দেয়ার কথা মুখে বললেই হলো, সামাল দেয়া তো দূরের কথা একটু সালাম না দিয়ে দেখুন, অবস্থা কী দাঁড়ায়! তারপরও কেন বলা হচ্ছে, কমিশনের কাছে এত সর্বময় ক্ষমতা ও যথেষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও সেটার প্রয়োগ করা হচ্ছে না? ফেনী, চাঁদপুর, সিলেট, শরীয়তপুর, কুমিল্লাসহ অসংখ্য পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে বাতিল কি ইসি নিজেদের স্বার্থে করেছে? সরকারি দলের লোকজনের চাপও যে তাদেরকেই সইতে হয়। এটার জন্য তো কেউ তাদের কোনো প্রশংসা করে না। আইনে আছে পৌরসভার নির্বাচন করতে হলে মনোনয়নপত্র জমার আগে উপজেলা থেকে পদত্যাগ করতে হবে। এই অপরাধে নির্বাচন কমিশন আমিনুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলেও আবুলকে তো বরখাস্ত করেছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে পারলেও ভোট গ্রহণ, ভোট গণনা, ব্যালট ছিনতাই, নির্বাচনী সহিংসতা, প্রার্থী হতাহতের বিষয়ে কিভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটা নিয়ে এত আগে ভাবতে কে বলেছে? এত টেনশন কেন? নির্বাচনের সময় ঠিকই দেখতে পারবেন ৪ শতাংশ ভোট কী করে ৪০ শতাংশ হয়ে যায়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ-নিরপেক্ষ ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ বিটিভিতে ঠিকই দেখতে পাবেন আপনারা। এবার সাংবাদিকেরা ভোটারশূন্য ভোটকেন্দ্রে কুকুরের ছবি যাতে ছাপতে না পারেন তার জন্য ‘জনস্বার্থে’ ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেয়া হয়েছে। জনগণ ঘরে বসেই আরামে ভোটের সব খবরাখবর জানতে পারবে বিটিভি আর দলীয় নেতাদের চ্যানেলগুলোতে।
চার. নির্বাচন কমিশন তো ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নিয়েছেই। সাতক্ষীরার কলারোয়ার রিটার্নিং অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্ত করা হয়েছে। অথচ বলা হচ্ছে ‘অনিয়ম প্রশ্রয় দেয়ায় এই কর্মকর্তাকে শাস্তি দিলেও অনিয়মের সুবিধাভোগী সরকারদলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’ নির্বাচন পরিচালনাবিধির ৯০ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিশন তাৎক্ষণিক ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে বলা হলেও এটা যে করতেই হবে, সেটা কে বলল? রিটার্নিং অফিসারকে বরখাস্ত কি অনিয়মের প্রমাণ হতে পারে? এত আইন-কানুন দেখালে তো আর শান্তিমতো ‘দায়িত্ব পালন’ করা যাবে না। আর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাস্থ্যমন্ত্রী আর তথ্যমন্ত্রীর মতো ভিআইপিদের বিরুদ্ধে উঠলেই কি আর ব্যবস্থা নেয়া যায়? জনগণ কি দেখে না ময়মনসিংহের ফুলপুরের রিটার্নিং অফিসার সুন্দর করে প্রতিবেদন লিখে দিলেন যে, ‘দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ শুধু দুদক একাই কেন দায়মুক্তির প্রতিষ্ঠান হবে? নির্বাচন কমিশনেরও অধিকার আছে দুদকের এই রেকর্ডে ভাগ বসানোর। তাই ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ চিন্তা না করে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রী-এমপিদের দায়মুক্তি দিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ক্ষমতাসীন দলের তিন এমপির আচরণবিধি লঙ্ঘনের অপরাধও ক্ষমা করে দিয়েছে ইসি। এর আগে তথ্য ও ধর্মমন্ত্রীকেও ‘মানবিক কারণে’ ক্ষমা করে দেয় তারা। অথচ তাদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে। প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও আছে ইসির। আর চাঁদপুরের ছেংগারচরের রিটার্নিং অফিসার না হয় বিএনপি প্রার্থীর শিক্ষাসনদ ছিঁড়ে দিয়ে মনোনয়নপত্রকে বাতিল করেছে, তাতে এমন কী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়ে গেল? স্থানীয় নির্বাচনে কি ক্ষমতার বদল হয়?
পাঁচ. বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি যদি যেত তাহলে এ রকমই যে অবস্থা হতো এটা কিন্তু ভাবা ঠিক নয়। জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতা পরিবর্তন হয় বলে এর চেয়ে আরো বেশি ভয়াবহ অবস্থা হতো বলে কেন অযথা ভয় দেখাচ্ছেন? তা ছাড়া এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে গত বছরের উপজেলা নির্বাচন এবং এ বছরের ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ইসির সমালোচনা করেই বা কে কী করতে পেরেছে? ইসি নিজেদের পর্যাপ্ত জনবলকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগের বদলে জনপ্রশাসনের লোকদের রিটার্নিং অফিসার বানিয়ে কি অপরাধ করেছে? জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতিসহ চাকরির সব শর্ত সরকার নিয়ন্ত্রণ করলে ইসির কথা তারা শুনবেই বা কেন? পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনে কি ইসির কথা শুনবে? তা ছাড়া জনপ্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তি দিতে চাইলেই তো আর শাস্তি দেয়া যাবে না। খুব বেশি হলে ইসি তাদেরকে প্রত্যাহার করতে পারবে। বড় শাস্তি দিতে হলে তো সরকারের সমর্থন লাগবে। আর সরকার নিজের ক্ষতি করে নিজের কর্মকর্তাকে শাস্তিই বা কেন দিতে যাবে? কাগজে কলমে নির্বাচন কমিশন পরাশক্তি হলেও বর্তমান ইসি যে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতোই সরকারের ‘চাকরি’ করে চলেছে, সেই কমিশনাররা বিশ্বাস করলেও আপনারা কেন বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না? এরশাদ সাহেব বলেছেন, সকাল ৯টার মধ্যেই ভোট শেষ হয়ে যাবে। বিএনপি জানতে চেয়েছে, এটা প্রধানমন্ত্রীর বার্তা কি না? এরশাদ সাহেব তো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। তার মানে তিনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বার্তাবাহক। তার কথা তো আর ফেলনা হওয়ার নয়। বার্তাবাহক তো নিজে থেকে কোনো কথা বলতে পারেন না। আসলে এরশাদ সাহেব মনের দুঃখেই এই রকম কথা বলে থাকেন। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তাকে যেভাবে সিএমএইচে বন্দী করে গলফ খেলানো হলো সেই একই প্রক্রিয়ায় এবারের নির্বাচনেও ১৫০টি পৌরসভায় জাতীয় পার্টি প্রার্থী দেয়ার পরও ১০০টিতে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলো। তাই এরশাদ সাহেবের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাটাও বিবেচনাযোগ্য হওয়া উচিত।
ছয়. ইতোমধ্যেই দুই ডজনেরও বেশি পৌরসভায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী সস্ত্রীক হামলার শিকার হয়েছেন। নির্বাচনী সহিংসতায় মাটিরাঙ্গায় বিএনপি নেতাসহ একাধিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, চাপাতি, হাতুড়ি নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে। সরকারদলীয়দের হাতেই মার খাচ্ছে দলীয় বিদ্রোহীরা। আবার বিদ্রোহীরাও সমানে পিটাচ্ছে দলীয় প্রার্থী-সমর্থকদের। কুষ্টিয়ায় আওয়ামী কোন্দলে দলীয় প্রার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়েছে। চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী দুই পক্ষের সংঘর্ষে গাড়ি ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে। সোনারগাঁওয়ে দলীয় সংঘর্ষে একজন মারা গেছে। অথচ পুলিশ এখনো নির্বিচারে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকেই গ্রেফতার করে যাচ্ছে। বিএনপি দলবল নিয়ে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবি জানালে সিইসি তাৎক্ষণিকভাবে দাবি প্রত্যাখ্যান করলেন। সেনা মোতায়েন করা হলে দলীয় সেনাদের কী হবে? মাঠে সেনাবাহিনী নেমে গেলে কখন কী ঘটে যায়, এর দায়ই বা কে নিতে যাবে? ইসির মেরুদণ্ড নেই তো কী হয়েছে? শুধু নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলেই কি সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে? প্রশাসন-পুলিশ-র‌্যাব কি বিএনপির পক্ষে? ইসি কি একাই মেরুদণ্ডহীন? স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতিও তো ক্ষমতাহীন। দেশ গণতন্ত্রহীন। অর্থনীতি বিনিয়োগহীন। র‌্যাব-পুলিশ বাধাহীন। মানুষ নিরাপত্তাহীন। সরকার ভোটবিহীন। বিরোধীরা আন্দোলনহীন। মজলুমরা বিচারহীন। দুর্নীতি সীমাহীন। সুশীলরা প্রতিবাদহীন। জনগণ গুরুত্বহীন। তাই সর্বক্ষেত্রেই এখন একই প্রত্যাশা, মেরুদণ্ড সোজা হতে কত দেরি পাঞ্জেরি?
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

Tuesday, December 8, 2015

বর্তমান আমলে পৌর নির্বাচন by ডক্টর তুহিন মালিক

ডক্টর তুহিন মালিক
এক. বর্তমান আমলে নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে বিজয়ীর নাম কার্যত ভোটের আগেই জেনে যাওয়া। হোক না সেটা জাতীয় নির্বাচন বা কোনো উপনির্বাচন। সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, এমনকি নিজ দলের কাউন্সিলে পর্যন্ত আগেই বিজয়ীর নাম অনেকেরই জানা হয়ে যায়। শুধু কি নির্বাচনে? দেশের যতসব পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও পরীক্ষার আগের রাতেই জানা হয়ে যায় কিভাবে? এমনকি কোর্ট-কাচারিতে মামলা-মোকদ্দমায় পর্যন্ত মন্ত্রী-নেতারা বলে দিচ্ছেন কে কে জেলে যাচ্ছে, আর কার কার ফাঁসি হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন হওয়ার অনেক আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জন করার মতো, ১৫৩ আসনে ভোট ছাড়াই সরকার গঠিত হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীর ছাড়া বাকি সব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের যত কলাকৌশল আছে, সবই প্রয়োগ করা হয়। ফাঁকফোক দিয়ে কোনোভাবে বিরোধীদলীয় কেউ পাস করে বসলে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় এমনকি নাশকতার মামলাও। মামলার কারণে পদ থেকে বরখাস্ত হতে হলো দুই শতাধিক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে। সেই চেয়ারে বসানো হয় নিজেদের পছন্দমতো লোক। তাই বিরোধী দলের কেউ এখন কোনো নির্র্বাচনে পাস করা মানেই যেন জেলজীবন আর পদ থেকে বরখাস্ত। তা ছাড়া সরকারের সুবিধামতো যখন তখন আইন করে যেভাবে খুশি নির্বাচন দেয়ার সুযোগ তো রয়েছেই। সুবিধামতো না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায় যেকোনো নির্বাচন। তখন আর আইনের সময়সীমার সীমাবদ্ধতার প্রয়োজন পড়ে না। আবার বিরোধী পক্ষ নির্বাচনে আসার ঘোষণা দেয়ামাত্রই দিনক্ষণ নড়চড় করা অসাধ্য হয়ে যায়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে কর্মকর্তারা তখন বীরপুরুষ সেজে বসেন। অথচ এই বীরপুরুষেরা আবার নির্বাচনের দিন মেরুদণ্ডহীন প্রাণী হয়ে যায়। তবে ৫ শতাংশ ভোটকে ৪০ শতাংশ বানিয়ে দেয়ার মতো সক্ষমতা কিন্তু ঠিকই ধরে রাখেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের যত রকম উপাধিতে ভূষিত করুক না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। চেয়ার থেকে সোজা দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রমাণ করে বসেন, তাদের মেরুদণ্ড ঠিকই আছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারুন আর না পারুন, তারা তাদের নিয়োগকর্তার প্রতি সবসময়ই চরম অনুগত, বিশ্বস্ত ও চিরকৃতজ্ঞ।
দুই. এবার আমাদের নির্বাচন কমিশন অদ্ভুত এক পদ্ধতিতে সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচন করতে যাচ্ছে। একই নির্বাচনে মেয়ররা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আর কাউন্সিলরেরা করবেন স্বতন্ত্র প্রতীকে। বিশ্বে এটা একটা বিরল ঘটনা বটে। নির্বাচনী সভা সমাবেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা। এমনকি ঘরে বসেও কেউ সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সভা করতে পারবে না। এটা তো দেখছি, মাসাল ল’ আমলকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় দেশে জনসভা, শোভাযাত্রা, পথসভা বা ঘরোয়া মিটিং নিষিদ্ধ থাকে সত্য। কিন্তু দেশে কোনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। তবু এখন কেন এগুলোর ওপর এত নিষেধাজ্ঞা? এ অবস্থায় নির্বাচনে আসা বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবেন কি না, তাও সন্দেহ। ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের ভাগ্যেই বা কী লেখা আছে কে জানে? কারণ গত উপজেলা ও সিটি নির্বাচনে বেশির ভাগ এলাকায় সে এজেন্টদের খুঁজেও পাওয়া যায়নি। আর এখন তো অবস্থা আরো উদ্বেগজনক। দলের প্রার্থী থেকে শুরু করে পোলিং ও নির্বাচনী এজেন্টরা বেশিরভাগই এখন জেলে। নির্বাচনী প্রচারণার কর্মী-সমর্থকেরাও শত শত মামলার আসামি। এলাকাতে ঢুকতেই সাহস করছেন না ‘মামলা খাওয়া’ পলাতক কর্মী-সমর্থকেরা। তা ছাড়া প্রশাসনের পাশাপাশি সরকারদলীয় ক্যাডাররা সার্বক্ষণিক মনিটর করছে বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের। ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত নির্ভয়ে পৌঁছাতে পারাটাই এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাচন কিংবা ঢাকা সিটি নির্বাচনে বর্তমান ইসি তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। তাই আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনেও ইসি তাদের চিরাচরিত চরিত্রেই আবির্ভূত হবে। তার প্রমাণ, পৌর নির্বাচন সামান্য পেছানো থেকে শুরু করে বিএনপির কিছু পর্যবেক্ষণ ও দাবি নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টাও করা হয়নি।
তিন. তা হলে প্রশ্ন জাগতে পারে, এ অবস্থায় বিএনপি পৌর নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো কেন? কারণ স্বাভাবিক রাজনীতি করার সুযোগ থেকে প্রায় বঞ্চিত হয়ে থাকা বিএনপির কাছে এই পৌর নির্বাচন দল গোছানো ও প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তারা নিশ্চিত জানে ছক কাটা এই নির্বাচনের বাস্তবতা। তার পরও যেন নির্ধারিত হার মেনে নিয়েই বিএনপি তৃণমূলের নেতৃত্বকে চাঙ্গা করতে এই নির্বাচনের সুযোগটিকে হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না। এই সুবাদে মাঠপর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসার সাথে সাথে নেতাকর্মীরা দীর্ঘ দিনের অচলায়তন ভেঙে ধানের শীষ নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন। আর নির্বাচনের হারজিত, এ দুটোতেই বিএনপির লাভ। জিতলে প্রমাণিত হবে তাদের প্রবল জনসমর্থন। আর হারলে প্রমাণিত হবে, আওয়ামী আমলে কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। দুই ক্ষেত্রেই আন্দোলন করার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। সে কারণেই হয়তো বিএনপি প্রথমে বিরোধিতা করলেও পরে এ নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সরকার চেয়েছিল, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারো বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসে। কিন্তু রাজনীতির পাশা খেলায় লাভ বিএনপিরই হয়েছে বেশি। খুন-গুম-হামলা-হামলায় বির্পযস্ত নেতাকর্মীরা এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগই পেয়ে গেলো। বিএনপি জানে, তাদের দলীয় প্রার্থীদের প্রার্থিতা গণহারে বাতিল করে দেয়া হতে পারে। এজন্য এবার তারা বিকল্প প্রার্থীও রেখেছেন। ধানের শীষের মনোনয়ন বাতিল হলে বিকল্প প্রার্থীরা তখন স্বতন্ত্র মার্কা নিয়েই লড়াই করবেন। তা ছাড়া জনগণের কাছে তো এটা স্পষ্ট যে, এই নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না। কারণ গত নভেম্বর মাসের ৫ তারিখ থেকে বিএনপি-জামায়াতের ‘ঘাঁটি’ হিসাবে পরিচিত ৩২ জেলায় র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এই দুই দলের হাজারো নেতাকর্মীকে গণগ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ, অভিযানের আগে প্রতিটি জেলার এসপিকে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের লিস্ট হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা সেই তালিকা ধরে বিএনপি-জামায়াত নির্মূল অভিযানে নেমেছে। কোথাও কোথাও ঘরের মা-বোনদের পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক বলে কোমরে দড়ি বেঁধে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছে। আবার জামিনে মুক্তি মিললেও কারাফটক থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকার গণগ্রেফতারের পাশাপাশি গণহারে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও চার্জশিট দিয়ে এলাকাছাড়া করে রেখেছে। কোথাও বা বাড়িতে বাড়িতে চলছে পুলিশি অভিযান। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রেফতার থেকে রক্ষা, তাদের জামিনের সুযোগ থাকা এবং পলাতকদের প্রকাশ্যে এসে ভোট চাওয়ার ব্যবস্থা যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয়, তা যেন ইসির কাছে একটা মামাবাড়ির আবদারের মতো মনে হচ্ছে।
চার. এদিকে বিএনপির পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণে সরকার দেখাতে চাইছে, বিএনপি বর্তমান সরকারকে অবৈধ বললেও তাদের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে;’ কিন্তু বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলেও সবগুলো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেই অংশ নিয়েছে। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ কোনো সরকারের অধীনে হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান চালু থাকা অবস্থাতেও দলীয় সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হতো। বিএনপি এ ক্ষেত্রে তার কৌশল থেকে এবারো সরে আসেনি। তা ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপি হলেও বিএনপি কিন্তু প্রথম দিকে বেশ সফলতাও পেয়েছিল। তাই এবার এই কৌশলের সাথে দলের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনী মাঠে অবাধ বিচরণের ক্ষেত্রটা পেয়ে বিএনপি অখুশি হওয়ার কথা নয়। সাথে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি দল গোছানোর সুযোগও পাওয়া গেল। সরকারের স্বেচ্ছাচারী শাসনে এমনিতেই দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ অবস্থায় যেকোনো নির্বাচনেই জনগণ স্বাধীনভাবে ভোটদানের সুযোগ পেলে সরকারের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেবে। পৌর নির্বাচনের মতো স্থানীয়ভাবে একে অন্যকে চেনাজানার এরকম নির্বাচনে সরকার কারচুপি করলে তৃণমূলের জনমত আরো ব্যাপকভাবে সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাবে। এতে নতুন করে গণআন্দোলনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে বিএনপি এটিকে কাজে লাগাতে পারবে কি না, সেটাও কোটি টাকার প্রশ্ন।
পাঁচ. কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ সরকার আসলেই কি স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে? কারণ কোনো নির্বাচন না দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে জেলা পরিষদগুলো চালানো হচ্ছে। সরকার যাদের এমপি-মন্ত্রী করতে পারেনি, এমন ব্যক্তিদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্যই জেলা পরিষদগুলোতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পত্রিকায় দেখলাম ঢাকার জেলা পরিষদের প্রশাসকের বিরুদ্ধেই ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। অন্য দিকে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারেও সরকার সংবিধানের মূল জায়গায় আঘাত হেনেছে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার সম্পর্কে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার দেয়া হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এতদিন এনিয়ে কিছুই করেনি। তার বদলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের প্রত্যেকটি কাঠামো অকেজো করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জেলে দিয়ে আর গণবরখাস্ত করে নিজেদের লোকজনকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। মন্ত্রীদের ওপরে খবরদারির জন্য অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের দিয়ে কেন মন্ত্রণালয়গুলো চালানো হচ্ছে? স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট জেলার মন্ত্রী-এমপিদের হাতে এতটা অসহায় কেন? নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন কেন হচ্ছে না? আসলে কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে নারাজ। আশঙ্কা হয়, দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের মুঠোয় পুরোপুরি নিয়ে নেয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হলো।
ছয়. এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় নেতাদের স্ত্রী-শ্যালকদের দেখে বেজায় ক্ষুব্ধ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কোটি টাকার বিনিময়ে মাদারিপুরের কালকিনি পৌরসভায় মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী। তারপরও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছড়াছড়ি, কোন্দল, হানাহানিতে শাসক দল চরম বিশৃঙ্খলা। দীর্ঘ দিন ক্ষমতার স্বাদ নেয়া আওয়ামী লীগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ পৌর নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়া। সারা দেশে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠ দখল করে রেখেছেন। দলের পক্ষ থেকে যতই বলা হচ্ছে, তৃণমূলের নেতারাই মনোনয়ন পাবেন; কিন্তু প্রকৃত অবস্থাটা উল্টো। স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিদের গুণগ্রাহীদের বাদ দিয়ে তৃণমূলের সুপারিশ কতটা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে, বলা মুশকিল। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, পৌরসভা নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ নির্বাচন করলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু আইন সংশোধন করে দলীয় মনোনয়ন আর প্রতীক দিলেই কি এসব হানাহানি আর দলীয় কোন্দল বন্ধ হবে? দল থেকে বহিষ্কার করেও কি বিদ্রোহীদের ঠেকানো সম্ভব? এতে দল আরো বিভক্ত ও দুর্বলই হবে। নির্বাচনী মনোনয়নের দৌড়ে হেরে যাওয়া নেতাকর্মীরা গ্রুপ ও পাল্টা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অসংখ্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্ম দেবেন। তখন দলের ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে বিভিন্ন জনের মাঝে। দলের প্রার্থীর জন্য তখন পাস করা দূরের কথা, সম্মানজনক ভোট পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়েই বরাবরের মতো কারচুপির আশ্রয় নিয়ে দলীয় প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়বে। আর সহিংসতার সাথে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বেড়ে যাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক মামলার সংখ্যাও। যে এলাকায় আওয়ামী লীগের যে গ্র“প বেশি শক্তিশালী, সেখানকার ব্যালট তার হাতে থাকবে। তাদের সামাল দিতে প্রশাসন পড়বে তখন মহাবিপদে। দলের চেইন অব কমান্ডের সাথে সাথে প্রশাসনের কমান্ডও ভেঙে যেতে পারে।র হানাহানিতে পটু আওয়ামী লীগের দলীয় সহিংসতার দায় হয়তো বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। নতুন করে আবারো হবে শত শত মামলা আর চার্জশিট। কেউ জেলে, কেউ পলাতক, কেউবা নির্বাচনের তাণ্ডবের শিকার হতে পারে।
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

Friday, November 27, 2015

নির্বাচন : আমরা কি আবার হোঁচট খাবো? by সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে। একেতো স্বাধীন দেশ, তার ওপর তখনকার বাংলার মানুষের মাথার তাজ জনাব শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। ৩০০ সংসদীয় আসনের নির্বাচনে মোট ১৪টি দলের প্রার্থী ছিলেন এক হাজার ৮৯ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ১১৮ জন। মহিলা প্রার্থী ছিলেন ১৫ জন। ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৫.৬১ শতাংশ। ফলাফল : আওয়ামী লীগের আসন ২৯২ যার মধ্যে সাতজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। স্বতন্ত্র জয়ী ছিলেন পাঁচজন; যার মধ্যে দুইজন হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছিল।
১৯৭৩ সালের সে নির্বাচনের ব্যাপারে তৎকালীন ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ ভট্টাচার্য ৯ মার্চ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন : কমপক্ষে ৭০টি আসনে ন্যাপ ও অন্যান্য বিরোধী দলের প্রার্থীদের বিজয় সুনিশ্চিত ছিল। সেই আসনসমূহে শাসক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করত অস্ত্রের ঝনঝনানি-ভয়ভীতি-সন্ত্রাস প্রয়োগ-গুণ্ডাবাহিনী ব্যবহার-ভুয়া ভোট-পোলিং বুথ দখল-পোলিং এজেন্ট অপহরণ-বিদেশী সাহায্য সংস্থা- রেডক্রস-জাতিসঙ্ঘ সরকারি গাড়ির অপব্যবহার প্রভৃতি চরম অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে এবং বিরোধী দলের প্রার্থীদের জোরপূর্বক পরাজিত করেছে। জাতীয় সংসদ আসন ২৯৪ চট্টগ্রাম-১৪ এ সংবাদপত্র-বাংলাদেশ বেতার-বাংলাদেশ টলিভিশন-ভয়েস অব আমেরিকাসহ বিদেশী পত্রপত্রিকা ন্যাপপ্রার্থী মোস্তাক আহমেদ চৌধুরীকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করা সত্ত্বেও তাকে পরাজিত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বের অন্যতম প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদ লিখেছিলেন : ৩১৫ (সংরক্ষিত ১৫ মহিলা আসনসহ) সদস্যের পার্লামেন্ট-এ জনা পঁচিশেক অপজিশন মেম্বার থাকিলে সরকারি দলের কোনোই অসুবিধা হইতো না। আর এসব শুভ পরিণামের সমস্ত প্রশংসা পাইতেন শেখ মুজিব। কিন্তু দেশের দুর্ভাগ্য এই যে, শেখ মুজিব এই উদারতার পথে না গিয়া উল্টা পথ ধরিলেন। অনেক প্রবীণ ও দক্ষ পার্লামেন্টেরিয়ানকে পার্লামেন্টে ঢুকিতে না দিবার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করিলেন।
আমি দেখিয়া খুবই আতঙ্কিত ও চিন্তাযুক্ত হইলাম যে, নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী নেতৃত্ব অপজিশনের প্রতি যে মনোভাব অবলম্বন করিয়াছিলেনÑ সেটা সাময়িক অ-বিবেচনাপ্রসূত ভুল ছিল না। তারা যেন নীতি হিসেবেই এই পন্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মন্তব্য ছিল : ইতিহাসে শেখ সাহেবের স্টেটসম্যান হইবার একটা সুযোগ ছিল। তিনি সেইটা কাজে লাগাইবার পারলেন না।
মার্কিন কূটনীতিক উইলিয়াম বি. মাইলাম এর পর্যবেক্ষণ ছিলো ’৭৩-এর মার্চ মাসের নির্বাচন হলো “শেষ যাত্রার শুরু”। বিপুলভাবে নির্বাচনে জিতেছিলো আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতারা ভোট নিয়ে ছেলেখেলা করেছে এবং জালিয়াতি থেকে নিজেদের নিবৃত্ত করতে পারেনি।
’৭৩-এর ৯ মার্চ জাসদ সাধারণ সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব সংবাদ সম্মেলনে এক লিখিত বিবৃতিতে বলেনÑ বিরোধীদলের প্রার্থীদের পরাজিত হতে বাধ্য করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে জাসদ সভাপতি-মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব:) এম এ জলিল বলেনÑ তার দলকে পোলিং এজেন্ট দিতে দেয়া হয়নি। জাল ভোট দেয়া হয়েছেÑ সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ফলাফল ঘোষণায় ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে। ১৯৭৫ এর আগস্ট-নভেম্বর পর্যন্ত বহু ঘটনা-দুর্ঘটনার পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদার গণতান্ত্রিক মনোভাবের সুযোগে ‘বাকশাল’- পরিত্যাগ করে মরহুম শেখ মুজিবের অনুসারীদের বড় অংশ আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করলেন। জেনারেল ওসমানীকে জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের বিপক্ষে প্রার্থী করে আওয়ামী জোট প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিলো। ফলাফল সকলেরই জানা। পরে অংশ নিলো ১৯৭৯ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ৩৯ আসন নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসন অলঙ্কৃত করলেন আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আসাদুজ্জামান। তিন বছরের মাথায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান শাহাদতবরণ করেন। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি আবদুস সাত্তারের বিপক্ষে আওয়ামী জোট প্রার্থী দিলো ড. কামাল হোসেনকে। বিজিত হলেন ড. কামাল হোসেন। দৃশ্যপটে এলেন বিশ্বনিন্দিত কূটনায়ক লে.জে. এরশাদ। এলো স্বৈরশাসন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জোটবদ্ধ এবং যুগপৎ আন্দোলন শুরু হলো। বহু প্রাণ ঝরে গেল রাজপথে।
রাতের কালো পর্দার আবরণে সমঝোতা করে আচমকা ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনে অজস্র মানুষের প্রত্যাশাকে পদদলিত করে অংশ নিলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। জনগণকে বোকা বানানোর এবং ধোঁকা খাওয়ানোর সেই নির্বাচন বৈধতা পেল না। সংসদ ভেঙে গেল দুই বছরের মাথায়। যদিও একটা একতরফা নির্বাচন করলেন এরশাদ সাহেব ১৯৮৮-এ। সেই সংসদ ভেঙে গেল জনতার তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধে। নতুন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং ভোটাধিকার প্রশ্নে যুগান্তকরী গণ প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে ‘নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হলো শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরপ্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য এবং অ-বিতর্কিত করতে। ১৯৯১-এ অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনাকারী দলের ক্যাপ্টেনসি পেলেন, হলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মহিলা প্রধানমন্ত্রী।
ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ পার করল তৎকালীন সরকার। অশান্তির আগুনে সারা দেশ জ্বালিয়ে- পুড়িয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী আন্দোলন করলেন। মেয়াদ শেষের পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণে শর্ত জুড়ে দিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। বারবার বললেন ‘বর্তমান সরকারের পদত্যাগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কোনো নির্বাচন এদেশের জনগণ মেনে নেবে না।’ মেয়াদ শেষ হওয়ার ১১ মাস আগে জাতীয় সংসদ থেকে জাতীয় পার্টি-জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ একযোগে পদত্যাগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করার সংসদীয় প্রক্রিয়াকে অসম্ভব করে দিলো। বিএনপি সে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না বলে তত্ত্বাবধায়ক বিধানকে সাংবিধানিক রূপ দিতে অপরাগ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে ১৯৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করল বিএনপি এবং নির্বাচন কমিশন। নবগঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন বিল। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে নতুন নির্বাচন হলো একই বছর জুন মাসে। অংশ নিলো আওয়ামী লীগ এবং বিজয়ী হয়ে সরকার ও গঠন করল। ক্যাপ্টেনসি নিলেন শেখ হাসিনা। বিএনপি ১১৬ আসন পেল। বিরোধী দলের নেত্রী হলেন বিএনপি নেত্রী সদ্যবিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯৬-২০০১ সরকার এবং সংসদীয় মেয়াদের পর সঙ্গত কারণে আবার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠল। বিএনপি তার মিত্রদের নিয়ে আন্দোলনে নামল। অনেক জুলুম-অত্যাচার-কারা ভোগের যন্ত্রণা এলো বিএনপির ভাগ্যে, যার মধ্যে সবচেয়ে নির্মম হিংস্রতা হলো ঢাকার মালিবাগ মোড়ে। ২০০১-এর ১৩ ফেব্রুয়ারি ড. ইকবাল এমপির কমান্ডে মালীবাগ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণে। বিএনপির শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে প্রকাশ্য দিবালোকে মির্জা আব্বাস নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মিছিলে তার পাশে ছিলাম আমি, খায়রুল কবির খোকনসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। পেছন দিক থেকে হঠাৎ অবিরাম গুলিবর্ষণে নিহত হলো যুবদল কর্মী জসিম ও একজন মহিলা নেত্রীসহ চারজন। আহত শতাধিক। যে আঘাতের স্পিøন্টার এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছি আমি। মেরুদণ্ডের ৪ ও ৫ নম্বর হাড় দুই দিকে সরে গিয়েছিল। সাড়ে চার ঘণ্টা অপারেশনে কিছু স্পিøন্টার শরীর থেকে বের করা হলো এবং মেরুদণ্ডের হাড় যথাস্থানে প্রতিস্থাপিত হলো। বাকি ৪০টির বেশি ছোট ছোট গুলি মাথার পেছন থেকে কোমর হয়ে পা পর্যন্ত চিরস্থায়ী হয়ে রইল। আল্লাহর রহমতে চিরতরে পঙ্গু হওয়া থেকে বেঁচে গেছি। দুঃখ হলো শেষ পর্যন্তও তখনকার প্রধানমন্ত্রী বলেই চললেন, ‘যখন নির্বাচন দিলে আমরা জয়ী হতে পারবো তখনই দেবো।’ (প্রথম আলো ২৭ মে ১৯৯৯)। যদিও সরকারের মেয়াদ শেষে পুনরায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ২০০১ এর ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো। বিএনপি জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। আওয়ামী লীগ প্রধান সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হলেন। সে নির্বাচনে বরিশাল-২ (বাবুগঞ্জ-উজিরপুর) আসন থেকে আমি নির্বাচিত হলাম ২য়বারের মতো। (মূলত ৩য়বার) প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন : আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, ওয়ার্কার্স পার্টি প্রার্থী রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) প্রার্থী গোলাম ফারুক অভি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু এবং অন্যরা।
বিএনপি জোটের সরকার গঠনের পর পরই আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিলো সংসদে শপথ নেবে না। পরে নিলো। ২০০১-০৬ মেয়াদের শেষ দিকে এসে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিচারপতি কে.এম. হাসানকে বিতর্কিত আখ্যায়িত করে আবারও সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও শুরু করলো। গান-পাউডার দিয়ে বাসে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, লগি-বৈঠা দিয়ে ধীরেসুস্থে পিটিয়ে জীবন্ত মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নেচে নেচে উল্লাস প্রকাশের পশুত্ব দেখল দেশের মানুষ। শুরু হলো আবার আঁধারের অপ-রাজনীতির খেলা। বিএনপির দুধে-ঘিয়ে পরিপুষ্ট জেনারেল এরশাদÑ জেনারেল নাসিমের মতো একই পথে এগুলেন জেনারেল মইন-জেনারেল মাসুদ, ব্রিঃ জেনারেল আমিন গং। সহযাত্রী হলো ডঃ ফকরুদ্দীন এবং আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা বললেন ‘এ সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল’। নির্বাচন হলো নাÑ জরুরি অবস্থা জারি হলো। এরপর বেগম জিয়া এবং শেখ হাসিনার কারাবাস। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও ব্যবসায়ীরা আটক হলেন। ছাত্র-আন্দোলন হলো।
দু’বছর পর ২০০৮ এর ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ জোট ক্ষমতায় এলো। ২ যুগব্যাপী আওয়ামী লীগের ধ্বংস প্রচেষ্টাকারীরা মন্ত্রী হলেনÑ এমপি হলেন। বিএনপি জোট সংসদে এবং রাজপথে জোর দাবি তুলল ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর অধীনে একই ধারাবাহিকতায় মেয়াদ শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। থোড়াই কেয়ার করে আওয়ামী লীগ এবং আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল করল সংসদে। ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা এবং সংসদে এমপিরা নিজ নিজ পদে বহাল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেসে-খেলে জিতলেন। ১৫৪ জন এর সৌভাগ্যবানদের নির্বাচন নামে কষ্টটা করতেই হলো না। কী আনন্দ ঘরে ঘরে। একই সময় প্রত্যেক এলাকায় দু’জন করে এমপি থাকল। প্রধানমন্ত্রী তার পদে বহাল থাকলেন। অন্তবর্তী একটি রূপরেখা বাস্তবায়ন করে সোনার পাথরবাটির মতো দেশ পরিচালিত হলো; বিএনপি জোট নির্বাচনে অংশ নিলো না। ক্ষমতায় পুনরায় কাঁঠালের আমসত্ত্ব তৈরি হলো। সে আমসত্ত্ব খাইয়ে স্থানীয় সরকার পরিষদের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন হলো। বিএনপি জোট অংশ নিয়ে বিশাল জয় পেল। দ্বিতীয় ধাপে ভীত হয়ে শাসক দল আবার ভোট ছিনতাই করল। হতাশ-বিতৃষ্ণ মানুষ পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করতে শুরু করল। যেটার উল্টোপিঠে আরো জোরালো কারণ হচ্ছে সিটি করপোরেশন-উপজেলা-পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদের সকল স্তরে বিএনপি জামায়াত এবং জোটের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নামে পরিকল্পিত মামলা দায়ের এবং এর দোহাই দিয়ে একের পর এক বরখাস্ত করা। সিটি করপোরেশনগুলোয় মেয়রদের মধ্যে একমাত্র বাকি রয়েছে হারাধনের একটি ছেলে বরিশালের কামাল। আর সচেতন বাংলাদেশীদের মনেতো আছেই শাসকদলের প্রধান শেখ হাসিনার অমিয় বাণীÑ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। অচিরেই সব দলের অংশগ্রহণে পরবর্তী অংশীদারিত্বভিত্তিক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু কোথায় দিগন্ত? আজ কোথাও কাউকে সহ্য করা হচ্ছে না। কথা বললেই নানামুখী হেনস্তা। বিদগ্ধ অরাজনৈতিক ব্যক্তি ড. ইউনূস, আব্দুল্লাহ আবু সায়িদ, ব্যারিস্টার রফিকুল হক, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদসহ অনেক মানুষ অপমানিত পদে পদে। বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানোর প্রকাশ্য ঘোষণা এবং আইনগত একতরফা প্রস্তুতি সম্পন্ন। এ দলের নেতাকর্মী প্রকারভেদে প্রায় ৫০ হাজার মামলায় পাঁচ লাখ আসামি। কারাগারে প্রায় ৩০ হাজার। সংখ্যা উভয় ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রতিদিনই বাড়ছে। এ অবস্থায় ছা-পোষা নির্বাচন কমিশন দিয়ে শূন্য মাঠে গোল দেয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রস্তুতি জোর কদমে এগিয়ে চলছে। জামায়াতকে অযোগ্য করে স্ব-নামে নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে।
হায় আওয়ামী লীগ! ১৯৭০-এর নির্বাচনের আওয়ামী লীগ হারিয়ে গেছে ১৯৭৩-এ। ১৯৭৮-৭৯-৮১ তে ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল। আবার চোরাগলিতে হারিয়ে গেল ১৯৮৬তে, ফিরে এলো ১৯৯১-এ। নিজ ঠিকানায় থাকল ১৯৯৬, ২০০১-এ। ২০০৮-এ ঠিকানা মোটামুটি স্থায়ী হলো। আবার হোঁচট খেলো ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারিতে। উদগ্রীব হয়েছে এখন ১৯৭৫-এর বাকশাল এ ঠিকানা স্থায়ী করতে। তফাৎ শুধু পুরনো ঠিকানার রি-মডেলিং। মিত্র নতুন চেহারার পুরনো মানুষেরা। কিন্তু প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ কি ভুলে গেছে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম মনের খোরাক হচ্ছে রাজনীতি? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের ৩৩টি দেশের মধ্যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান ১ নম্বরে। এখানে ৬৫ শতাংশ মানুষ উচ্চমাত্রায় রাজনীতি করে।
আমাদের রাজনীতিকে শাসক দলের মারমুখো তৎপরতায় সঙ্ঘাতমুখর অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এ উচ্চমাত্রার প্ররোচনা এবং পৃষ্ঠপোষণকারী শাসক দল দেশের পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না সেটা ভাবার সময় কিন্তু হাতে বেশি নেই। নিকট এবং দূর-অতীতে সে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের হয়েছে। এ জন্য সমঝোতা সহিষ্ণুতা বড় বেশি প্রয়োজন এখন। না হলে ১৯৭৩ তে জাতীয় নির্বাচনের পর মার্কিন কূটনীতিকের সেই পর্যবেক্ষণ : ৭৩-এর মার্চের নির্বাচন ছিল ‘শেষ যাত্রার শুরু’ বাস্তবায়ন হলে ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ সম্ভ্রম হারানো মা-বোনের জীবিত অভিশাপ এবং আত্মার অভিসম্পাত আমাদের বহন করতে হবে না তো? মনে রাখা দরকার, সব বিজয়ই কিন্তু গৌরবের নয়। মীরজাফরের বাহিনী যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জয়লাভ করেছিল, সিংহাসনও পেয়েছিল। লেন্দুপ দর্জি স্বাধীন সিকিমের নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু পরিণতি সবারই জানা। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক উইনস্টন চার্চিল কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনের নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। পেরেছিলেন গোটা বিশ্বের মানুষের মনজয় করতে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

Wednesday, November 18, 2015

অযোগ্যতাই সংলাপে বসার যোগ্যতা! by মিজানুর রহমান খান

সংলাপে বসতে বিরোধী দলের প্রস্তাব এবং সরকারি তরফে নাকচ হওয়ায় তেমন বিস্ময় নেই। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতির সঙ্গে এটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সারা দেশে নাশকতাপূর্ণ জঙ্গিবাদী তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারপারসনের সর্বশেষ সংলাপের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সংলাপে বসার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিএনপি পরিষ্কার করতে পারে যে তারা আগাম নির্বাচন নয়, জঙ্গিবাদ নিয়ে সংলাপ ও জাতীয় ঐক্য চাইছে। সরকারেরও উচিত বিএনপির প্রস্তাবকে ‘টোটাল রাবিশ’ না বলে কেবল জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জায়গায় এনে একটা আলাপ-আলোচনার দরজা খোলার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। আত্মঘাতী বোমা হামলার উপদ্রব আবার ফিরে এসেছে। লেবাননে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪৩ ব্যক্তি নিহত হওয়ার পরপরই প্যারিসে সন্ত্রাসী ও আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারায় ১৩২ জন। বাংলাদেশে কথিত আইএসের অস্তিত্বের বিষয়টিকে যঁারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এর কার্যক্রম নেই বলে অবিশ্বাস করেছিলেন, প্যারিসের ঘটনা নিশ্চয়ই তঁাদের ভুল ভেঙে দিয়েছে। লেবাননে দুই ও প্যারিসে আটজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী নিহত হয়েছে। বাংলাদেশ এর আগে আত্মঘাতী বোমা হামলা প্রত্যক্ষ করেছে। জেএমবির আত্মঘাতী স্কোয়াডের এক ডজনের বেশি সদস্য ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে। আদালত চত্বরে দুই বিচারক নিহত হয়েছিলেন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর হামলায়।
এ প্রসঙ্গে গত বছরের বসন্তে পরিচালিত ওয়াশিংটনভিত্তিক পিউ ফাউন্ডেশনের জরিপ স্মরণে আনতে চাই। তারা বলেছে, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি (৬৯ ভাগ) ‘ইসলামি জঙ্গিবাদের’ উত্থানে শঙ্কিত। আবার ওই তিন দেশের তুলনায় আল-কায়েদা ও হিজবুল্লাহ বা হামাসের প্রতি সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি (যথাক্রমে ২৩ ও ২৮/২৯ ভাগ) সহানুভূতিশীল। এমনকি আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রতি ওই তিনটি দেশসহ মিসর ও লেবাননের মানুষের চেয়েও সর্বাধিক বাংলাদেশি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ১৪ ভাগ বাংলাদেশি উত্তরদাতা মনে করেন, আত্মঘাতী হামলার বিষয়টি নিয়মিতই গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে ৩৩ ভাগ মনে করেন, এই পথ মাঝেমধ্যে গ্রহণযোগ্য। এই পরিসংখ্যান অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। যাঁরা এটা নাকচ করবেন, তাঁদের যুক্তি নাকচ না করেও বলব, আমাদের সতর্ক হলে ক্ষতি কী। যখনই এ ধরনের ঘটনা দৃশ্যপটে আসে, তখন আমাদের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একদল স্মরণ করেন যে এসব নাশকতা আসলে পাশ্চাত্যের সৃষ্টি, তারাই দায়ী। তাদের যুক্তির জোর অনেকে হয়তো উড়িয়ে দেবেন না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে যা বলব তা হলো, আমাদের যা করণীয় তা আমরা করছি কি না। কারণ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আমরা সব সময় নস্যাৎ কিংবা প্রতিহত করতে পারি না। যেটা পারি এবং অবশ্যই করা উচিত, সেটা হলো নিজেদের সাবধান রাখা।
জঙ্গিবাদ কখনো এ মাটিতে শিকড় গাড়তে পারবে না, ঘন ঘন এই অপরীক্ষিত আপ্তবাক্য উচ্চারণ করলেই জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা মজবুত হওয়ার কথা নয়। যাঁরা বলেন, একমাত্র নতুন সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার মধ্যেই এর প্রতিকার, তাঁরা সঠিক নন। যাঁরা বলেন, কেবল অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা বা প্রলম্বিত করার কৌশল গ্রহণটাই সঠিক, তঁারাও সঠিক নন। গণতন্ত্র, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাজনৈতিক সমঝোতা যে সংবিধানের মতো লিখিত দলিলের চেয়ে কত বড় ও কার্যকর, বিশ্বের বুকে তার আরেকটি অবিস্মরণীয় নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে প্রতিবেশী মিয়ানমার। দেশটির সামরিক নেতারা ও অং সান সু চির মধ্যে বোঝাপড়াটাই সবচেয়ে উজ্জ্বলতম দিক। জেনারেল ইয়াহিয়ার এলএফওর চেয়ে অনেক খারাপ এলএফওর অধীনে সু চি নির্বাচনে গেছেন। এর কারণ বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যালটের জোরের ওপর সু চি বেশি নির্ভর করেছিলেন।
সু চি কত বেশি ভোট পেয়ে তাঁর সামরিক প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে পারছেন, সেটা গণতন্ত্রের খোলস, আত্মা নয়। যদিও আমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী আমরা কিন্তু গণতন্ত্র কন্যার ভূমিধস বিজয়টাকে বড় করে দেখতে এবং দেখানোর কসরত করছি। আমাদের সঠিক পথ হলো জঙ্গিবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার মুহূর্তে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করা। অহিংস পন্থায় ধীরেসুস্থে অগ্রসর হওয়া। প্রতিপক্ষের হিংসাশ্রয়ী কর্মসূচির উত্তর হিংসা দিয়েই দেওয়ার যে মহড়া বাংলাদেশে চলছে, তা নিরীহ ও সচেতন মানুষের রক্তক্ষরণকে তীব্র করছে। রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো লক্ষণ বাংলাদেশে নেই। এ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে আলাদা করা যাবে না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা পথে প্রতিপক্ষকে দমন কিংবা আপস কিংবা হালুয়া–রুটি বিতরণ করে মুখ বন্ধ রাখার কিছু লক্ষণ অন্তত আমরা দুঃখ ও হতাশার সঙ্গে অনুধাবন বা অনুমান করতে পারি।
কার্যকর সংলাপ টেবিলে বসে হতেই পারে না, যদি আগেভাগে এর প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের অভ্যন্তরে স্বীকার করা না হয়। অন্যথায় গতানুগতিকভাবে বিএনপি মনে করতে পারে আওয়ামী লীগ এমনই দল, যার সঙ্গে সংলাপ চলে না। আর আওয়ামী লীগও মনে করতে পারে, বিএনপির সঙ্গে বসা যায় না। এমনকি দুই দলের সমর্থক নাগরিক সমাজও বসতে পারে না। আমাদের মনে হয়, এটা ভাবার সময় এসেছে যে এভাবে হঠাৎ করে কোনো সংলাপ হয় না। আশা করাও হয়তো অসমীচীন। সমাজে এর একটা পরিবেশ থাকতে হয়। উভয় পক্ষ একটি সত্যি উচ্চারণ করেছে, সেটা হলো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পরিবেশ গঠন ছাড়াই আমরা কী করে রাষ্ট্রীয় জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে পারি এবং অদূর ভবিষ্যতে এর ফলাফল কী হতে পারে? অনেক বিদগ্ধ জনের মতো সংলাপ ও সমঝোতা বলতে আমি নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলকে বুঝতে চাই না।
আইএসের নামে প্যারিসে যে নিন্দনীয় ও বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটে গেল, সে বিষয়ে সামনের দিনগুলোতে আমাদের মসজিদ ও মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলেম-ওলামাদের সবাই কি গঠনমূলক ধর্মীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবেন? আমরা কি মাদ্রাসাশিক্ষা যুগোপযোগী করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছি? জিডিপির তুলনায় অন্যান্য সব মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন খরচ যে অনুপাতে বাড়ে, সে তুলনায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বাড়ে না। বরং সবচেয়ে কম বাড়ে। আন্তধর্ম সংলাপ বিষয়ে একটি নতুন প্রকল্প চালু করা হয়েছিল, কিন্তু তা এক বছর পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এটা বোঝার সময় এসেছে যে রাষ্ট্রের এই অপারগতা ও পলায়নপরতা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ঘাটতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কেউ ঝুঁকি নিতে নারাজ। ‘ইসলামি শক্তি’কে যে যার মতো করে ব্যবহার করতে কারও কোনো অনীহা নেই। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কার–বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ইসলামের শান্তির বাণী যথাযথভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পথে যত বাধা, তা অপসারণে একটা বৃহত্তর বোঝাপড়া লাগবে। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে জরুরি। সরকার এবং বিএনপি-জামায়াত এ বিষয়ে লিখিত খসড়া রূপরেখা দিতে পারে।
লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়া বাংলাদেশে ‘ক্রান্তিকাল’ চলছে দাবি করে ‘দেশ ও জাতির স্বার্থে’ সংকট উত্তরণে সরকার ‘কর্তৃত্ববাদী মনোভাব’ থেকে সরে এসে ‘জাতীয় সংলাপ’ সূচনার পরিবেশ তৈরি করবে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ তিনি কেবলই নির্বাচন চান? সেতুমন্ত্রী সংলাপ-সেতুর নীতিগত ভিত পরোক্ষভাবে হলেও স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘জাতীয় সংলাপ করতে হলে পরিবেশ দরকার। সেই পরিবেশ কারা নষ্ট করছে?’ এ পর্যন্ত যুক্তিসংগত। কিন্তু এরপরের অংশ গোলমেলে, মেঠো রাজনীতির ভাষা। সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ‘তারা লেখক, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও পুলিশের ওপর হামলা করছে। তারা রাজনীতিকদের, লেখকদের টার্গেট করেছে। এই পরিবেশ কি সংলাপের পরিবেশ?’ প্রধানমন্ত্রী কিন্তু যোগ্যতার যে শর্ত দিয়েছেন তা সেতুমন্ত্রীর চেয়ে ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী শর্ত সাপেক্ষে প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো খুনির সঙ্গে সংলাপে বসার ইচ্ছা নেই। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সমর্থন দিলে সংলাপের বিষয়টি তিনি ভেবে দেখবেন।’
তাহলে প্রশ্ন উঠবে, একদিন যখন এই বিচারপর্ব শেষ হবে, এর প্রতি সমর্থন দেওয়া না দেওয়া প্রসঙ্গ হারাবে, সেদিন কি সংলাপ হবে? এর উত্তর হ্যাঁ ধরে নিতে পারলে আশ্বস্ত হতাম। সংলাপ মানে নতুন নির্বাচন, আর নির্বাচন মানেই বিরোধী দলের সম্পূর্ণ জয়, এই অনুমানও সংলাপ হওয়ার পথে অন্তরায়। সংলাপ না করেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা গেছে। এ রকম আরও একটি নির্বাচন করার চেষ্টা হলে তা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে আরও শিথিল করে দিতে পারে। আর তখন তা আরও বেশি অবনতিশীলভাবে জঙ্গিবাদকে উসকে দিতে পারে। এখন জঙ্গিবাদকেই মনে হচ্ছে সাংবিধানিক শাসনের পথে বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
উদীচী, রমনা বটমূল, ২১ আগস্ট ও ৬৪ জেলায় যখন বোমা ফাটানোর ঘটনা ঘটে, তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ছিল না। হোসেনি দালানে হামলার ঘটনা গোষ্ঠীগত সহিংসতা (সেক্টেরিয়ান ভায়োলেন্স) সৃষ্টিরই ইঙ্গিতবহ। শ্রেণি হিসেবে এর আগে বিচারক হত্যার পর এবার পুলিশ হত্যা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা দেখছি। এখন সরকার যদি সত্যি সন্দেহ করে যে এসবই বিএনপির কাজ, কৌশলগত, তাহলে কিন্তু বিএনপির সঙ্গে এই ইস্যুতে সংলাপে বসার আহ্বান নাকচ করার যুক্তি থাকে না। বরং উল্টোটা হওয়ার কথা, সরকার সংলাপে বসতে চাইছে, ‘জঙ্গি’ বিএনপি নাকচ করছে। উভয়ে উভয়ের প্রতি উচ্চারিত সংজ্ঞায় যোগ্যতা-অযোগ্যতা আমরা খণ্ডন করতে যাব না। কিন্তু এমন একটি প্রশ্ন তো তোলাই যেতে পারে; সরকার যে কারণে বিএনপিকে সংলাপে বসার জন্য ‘অযোগ্য’ বলে মনে করছে, সেই অযোগ্যতাই আসলে তাদের সঙ্গে সংলাপে বসার যোগ্যতা।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

Monday, November 16, 2015

বাংলাদেশেও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রার্থনা by সোহরাব হাসান

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষমতা যে কত অপরিসীম, জনগণের রায়ের শক্তি যে কত অপ্রতিরোধ্য, বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কোনো দেশ জানে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ জনগণের রায় তথা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। আর আমরা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। সত্তরের সেই নির্বাচনে যদি আমরা এত বিপুল ভোটে বিজয়ী না হতাম, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের স্বাধীনতার দাবির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম না। সেই নির্বাচনের রায় বানচাল করতে যদি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষের ওপর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ না চালাত, যদি সেই নির্বাচনের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করত, তাহলে হয়তো ইতিহাস ভিন্ন হতো।
জনগণের এবং জনরায়ের শক্তি যে কামান-বন্দুক দিয়ে দমন করা যায় না, একাত্তরে এ দেশের মানুষ তা প্রমাণ করেছে। গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াই, সেটি স্বাধীনতার পরপরই শেষ হয়ে যায়নি। নির্বাচন ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে আমরা কদাচিৎ একমত হতে পেরেছি। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক।’ নেতা-নেত্রীরাও বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রায়ই বাক্যটি আওড়ান। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই জনগণকে তঁারা সম্পৃক্ত করতে চান না। বরং জনগণের শক্তিকে ভয় পান বা এড়িয়ে চলেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর যাঁরা সাচ্চা গণতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তঁাদেরই দেখা গেছে সেনাশাসকদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে।
গণতন্ত্র নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই দেশে যে সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর চেপে বসে, কেউ কেউ তাকে ‘সিপাহি জনতার বিপ্লব’ বলে যতই গৌরবান্বিত করুন না কেন, সত্তরের শেষার্ধ ও আশির দশকজুড়ে দেশে সামরিক শাসনবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তারও প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসক এরশাদ বিতাড়িত হওয়ার পর ১৯৯১ সালে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় একটি গণতান্ত্রিক সরকার ও সংসদ। সেই সংসদেই প্রথম ও শেষবারের জন্য সরকার ও বিরোধী দল মিলে সংসদীয় গণতন্ত্রে পুনঃপ্রবর্তন করে, যা ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনের মাধ্যমে হরণ করা হয়েছিল। এরপরও নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে দেশে যে তিনটি নির্বাচন হয় (১৯৯৬ সালের ১২ জুন, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর), তা মোটামুটি অবাধ সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি পেয়েছে।
কিন্তু পরাজিত দল যেমন সেই নির্বাচন হৃষ্টচিত্তে মেনে নেয়নি, তেমনি বিজয়ী দলও দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সরকারি দল, বিরোধী দল নির্বাচন কমিশন—এই তিন পক্ষের কেউই খেলার নিয়ম মানেনি বলেই দেশবাসী তাদের পছন্দসই প্রতিনিধি বেছে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কাছের ও দূরের চারটি দেশের নির্বাচনী ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতে পারি। এই চারটি দেশের মধ্যে যেমন দীর্ঘ সামরিক শাসনকবলিত মিয়ানমার আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক সংঘাতের শিকার তুরস্কও। অন্য দুটি দেশ হলো ভারত ও কানাডা। এর মধ্যে একমাত্র তুরস্ক ছাড়া বাকি তিনটিতেই বিরোধী দল বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। গত জুনে তুরস্কে প্রথম ধাপের ভোটে ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ৪০ শতাংশ ভোট পেলেও মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে ৪৮ শতাংশে উন্নীত করে ৬৩০ সদস্যের পার্লামেন্টে ৩১৬টি পেয়ে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতাসীন হয়েছে। নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে আঙ্কারা রেলস্টেশনের কাছে দুটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় শ খানেক মানুষ নিহত হয়। জঙ্গি সংগঠন আইএস এ হামলার দায় স্বীকার করে। মধ্যপন্থী বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি জনজীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি নির্বাচনে ইস্যু করেও সুবিধা করতে পারেনি।
কানাডার ফলাফল পুরোপুরি বিপরীতমুখী। ২০১১ সালে লিবারেল পার্টি যেখানে ৩৪টি আসন পেয়েছিল, সেখানে এবার ৩৩৮ আসনের পার্লামেন্টে ১৮৪টি আসন পেয়েছে। কীভাবে এই অসম্ভব ঘটনা ঘটল? ক্ষমতায় থাকতে যেসব ভুল তারা করেছিল, সেগুলো ভবিষ্যতে করবে না বলে জনগণকে আশ্বস্ত করেছে এবং দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে। অন্যদিকে, ২০১১ সালে যে প্রত্যাশা নিয়ে জনগণ তার প্রতিপক্ষকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল, তারা সেটি পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনেরা কখনো ভুল করে না। আর বিরোধীরাও নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর আত্মসমালোচনা কিংবা নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার কথা ভাবে না।
ভারতের বিহারের নির্বাচন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলের জন্যই একটি উদাহরণ হতে পারে। মাত্র দেড় বছর আগে ২০১৪ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি গত ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড-সংখ্যক আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের আগে বিজেপি মেড ইন ইন্ডিয়ার গালভরা বুলি আওড়ালেও নির্বাচনের পর ধর্মীয় উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদকেই উসকে দিয়েছে। উগ্রপন্থীদের হাতে একজন লেখক খুন হন, দাদরিতে গরুর মাংস খাওয়ার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে একজন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার পর দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় বইলেও ক্ষমতাসীনেরা আমলে নেননি। বরং বিহারের নির্বাচনেও তারা সেই সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে মানুষ তা পছন্দ করেননি। তারা নিতীশ কুমার-লাল্লু প্রসাদের বিজেপিবিরোধী মহাজোটকেই ফের ক্ষমতায় নিয়ে আসে। অথচ বছর দুই আগেও বিহারে বিজেপি ছিল নিতীশ কুমারের সরকারের অন্যতম শরিক। এর আগে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনেও বিজেপি কেজরিওয়ালের আম আদমির কাছে গো হারা হারে; যদিও ভারতের কেন্দ্রে এবং অনেকগুলো রাজ্যও মোদির দলই ক্ষমতায়।
আর আমাদের পুবের পাশের দেশটিতে যে অভাবিত ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল মিয়ানমারের নির্বাচনের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব নির্বাচনের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেখানে জনগণ তাদের পছন্দসই দল ও প্রার্থীকে বেছে নিতে পেরেছে। গণতন্ত্রের এই শুভসূচনার জন্য যেমন দেশটির জনগণ কৃতিত্ব দাবি করতে পারে, তেমনি ধন্যবাদ পেতে পারেন ক্ষমতাসীন সেনা-বেসামরিক যৌথ নেতৃত্বও।
ছাত্র, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন সরকারের পতন ঘটলেও পরবর্তী আড়াই দশক নানা নামে সেনাবাহিনীই দেশটি শাসন করে আসছে। নব্বইয়ের নির্বাচনে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জয়ী হলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তারা দমন–পীড়ন চালাতে থাকে এবং গণতন্ত্রের নেত্রী বলে খ্যাত অং সান সু চিকে অন্তরীণ রাখে। তখন পর্যন্ত মিয়ানমার ছিল বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় ‘বিচ্ছিন্ন’। অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকলে সামরিক জান্তা তাদের সঙ্গে আপসরফায় আসে। ২০০৮ সালে জেনারেল থেইন সেইন ক্ষমতায় এসে ‘সীমিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন, যাতে সেনাবাহিনীর জন্য পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। এ ছাড়া সংবিধানে এই ধারা যুক্ত করা হয় যে, কেউ বিদেশি বিয়ে করলে কিংবা তাঁর সন্তান বিদেশি নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। প্রকৃতপক্ষে সু চিকে সামনে রেখেই এই আইন করা হয়।
এরপর ২০১০ সালের নির্বাচন সু চির এনএলডি বর্জন করলে সেনানিয়ন্ত্রিত ইউএসডিপি প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়। কিন্তু ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক চাপে থেইন সেইন সু চির সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসেন এবং ক্ষমতাসীন দলে ছেড়ে দেওয়া ৪৫টি আসনে উপনির্বাচন করে এনএলডি ৪৩টিতে জয়ী হয়। সু চি হন বিরোধী দলের নেত্রী। সেই থেকে সু চি সংবিধান সংশোধন এবং জনগণের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু তাঁর এই আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণ। সরকারের নানা উসকানির মুখেও তিনি কখনো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নেননি। তিনি জানেন, জনগণ তাঁর সঙ্গে আছে, এবং নির্বাচনে সেটাই প্রমাণিত হলো। মিয়ানমারের নির্বাচনের সঙ্গে একমাত্র ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তুলনা করা যায়। সত্তরের নির্বাচন ছিল ছয় দফা তথা জনগণের স্বাধিকারের পক্ষে গণভোট। আর এবারে মিয়ানমারের নির্বাচনটি ছিল গণতন্ত্রের পক্ষে গণভোট। মিয়ানমারের মানুষ যে দীর্ঘ সামরিক শাসনে ক্ষুব্ধ, তারই প্রতিফলন ঘটেছে নির্বাচনে। ক্ষমতাসীনেরা গত কয়েক বছরের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিদেশি বিনিয়োগ ইত্যাদি বলে জনগণের ভোট টানতে চেয়েছে। কিন্তু তঁারা নিরঙ্কুশ গণতন্ত্রের পক্ষেই রায় দিয়েছে।
মিয়ানমারের নির্বাচনে একদিকে ছিল জনগণ, জনগণের নেত্রী অং সান সু চি এবং তাঁর দল। অন্যদিকে ছিল গোটা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, জেনারেল, অধস্তন সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণেরই জয় হয়েছে। হিংসার বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে অহিংসা ও সহিষ্ণুতা। ঘৃণার বিরুদ্ধে শান্তি। জবরদস্তির বিরুদ্ধে নমনীয়তা।
এই চারটি নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। বাংলাদেশের মানুষও এ রকম একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই প্রার্থনায় সাড়া দেবেন কি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

Thursday, November 5, 2015

বিচার চাই না, শুভবুদ্ধির উদয় হোক by প্রফেসর আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী

দীপনের শোকাহত বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের উপরিউক্ত বক্তব্য দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। গত ৩১ অক্টোবর শনিবার বিকেলে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক মালিক ফয়সাল আরেফীন দীপন শাহবাগের নিকটে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে নৃশংসভাবে খুন হন। একই সময় লালমাটিয়ায় ব্লগার অভিজিতের বইয়ের আরেক প্রকাশক শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হামলা হয় এবং সেখানে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করে হামলাকারীরা। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
দীপনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর প্রথমে টেলিভিশনে দেখতে পাই। একই সময়ে বন্ধুবর মনসুর মুসা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমার ছেলে টেলিফোনে আমাকে একই খবর দেন। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ওই রাতেই আমার স্ত্রীসহ ফজলুল হকের পরিবাগের বাসায় যাই। আমাদের মতো আরো অনেক বন্ধু, সহকর্মী, সুহৃদ শোক জানাতে সেখানে সমবেত হয়েছেন; সবাই বিমর্ষ। আমি ফজলুল হকের পাশেই বসলাম। তিনি তখন আমাদেরকে সেদিনকার দীপন হত্যার পূর্বাপর ঘটনার আংশিক বর্ণনা দিলেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে এ কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলেন। ‘সাংবাদিকদেরকে বলেছি আমি বিচার চাই না, আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ ছেলের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে শোকে মুহ্যমান পিতার এমন প্রতিক্রিয়া, হৃদয়ের এমন আর্তনাদ আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, আমার কাছে তা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। কারণ, আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন আমার দীর্ঘ দিনের বন্ধু এবং সহকর্মী। তার চিন্তাচেতনা ও জীবনদর্শনের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম। অতএব, এ ধরনের একজন ব্যক্তির এমন প্রতিক্রিয়া আমার কাছে তাই স্বাভাবিক মনে হয়েছে।
দীপনের শ্বশুর অধ্যাপক জালালুর রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। তিনি আমার আরেক বন্ধু সহকর্মী এবং নিকট প্রতিবেশী। ঈশা খাঁ রোডে একই বিল্ডিংয়ে আমরা বসবাস করেছি। তার ছেলেমেয়েরা এবং আমার ছেলেরা একই সাথে বেড়ে উঠেছে। অতএব, দীপনের শ্বশুরের পরিবারও আমার খুব কাছের। মোটামুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার একটি অপেক্ষাকৃত নির্মল পরিবেশেই দীপন ও জলি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সাথে বেড়ে উঠেছিল। কিন্তু কেউ কি কখনো দীপনের এ করুণ পরিণতির কথা ভেবেছিল?
ফজলুল হক ও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ব্যাচের ছাত্র; তিনি পড়তেন বাংলায় আর আমি পড়তাম সমাজবিজ্ঞানে। দু’জনই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। দু’জনই ইস্ট হাউজে থাকতাম। এমএ শেষ বর্ষে একই রুমে থেকেছি। হলের ১৭৬ নম্বর কক্ষটি বলতে গেলে তখন ‘এসএম হল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের’ ঠিকানা ছিল; কারণ আমরা দু’জনই এই সংগঠনের সদস্য ছিলাম এবং তখনকার গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার কারণে স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহির রোষানলে পতিত হয়েছিলাম। সে কাহিনী এখানে অপ্রাসঙ্গিক বিধায় তার বর্ণনা করা থেকে বিরত রইলাম। শুধু বলে রাখতে চাই, আমাদের বন্ধুত্ব ছিল আদর্শভিত্তিক, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে ছিল আমাদের অবস্থান। বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতায় ছিলাম অবিচল। ছাত্রজীবন সমাপ্ত করার পর আমরা দু’জনই (কিছুটা সময়ের ব্যবধানে) শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি এবং আমাদের কর্মস্থল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞানচর্চার এ পীঠস্থানে বলা যায় যে একসাথেই বিচরণ করেছি এবং প্রায় একই সময়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। এ নাতিদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে ফজলুল হকের সাথে সদাসর্বদা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল- এমনটা বলা যাবে না, তবে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এতে করে আমি বলতে পারি, ছাত্রজীবনে ফজলুল হক যে চিন্তাচেতনার মানুষ ছিলেন, সেখান থেকে তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘কঠোর বিচার চাই’র প্রথাগত দাবি তার কাছে মূল্যহীন মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘মামলা করতে হয়, তাই নিয়ম অনুযায়ী একটি হত্যা মামলা হয়তো আমি রুজু করব, আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আইন মেনেই মামলা করতে হবে।’ কিন্তু তিনি জানেন, বিচার চাইলেই বিচার পাওয়া যায় না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত এখন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া আসল কথা হলো হত্যা, গুম, খুনের মতো মারাত্মক অপরাধের মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং গুম-খুনের সে কারণ নির্মূলের মধ্যেই এর সমাধান নিহিত আছে। সে পথে না হেঁটে শুধু ‘বিচার চাই’ স্লোগান বিফলে যেতে বাধ্য। তা ছাড়া বর্তমানে এ দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেখানে বিচার দাবি করে লাভ কী? বর্তমান বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এটা দেশবাসীর অজানা নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গণন্ত্রের অনুপস্থিতিতে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অগণতান্ত্রিক সমাজে ‘আইনের শাসনে’র কথা বলা- অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। এহেন পরিস্থিতিতে আবুল কাশেম ফজলুল হকের মতো একজন সচেতন মানুষ যদি ‘বিচার চাই না’ বলেন, তাহলে কি তাকে দোষ দেয়া যায়? ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’- এটাও তো এ দেশের বাস্তবতা। অনেকেই ফজলুল হকের এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন; তাকে অপবাদ দিয়েছেন। তাদের সঙ্কীর্ণ মনমানসিকতার কারণেই আজ এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ফজলুল হক একজন শিক্ষক, একজন সচেতন নাগরিক, চিন্তাশীল মানুষ। এ রাষ্ট্রের কলুষিত রাজনীতির অভিজ্ঞতা তিনি তিলে তিলে সঞ্চয় করেছেন। প্রত্যক্ষ করেছেন স্বৈরাচারী শাসকদের দাপট, অত্যাচার, নির্যাতন; দেখেছেন বিবাদ, বিভাজনের রাজনীতি; দেখেছেন কিভাবে ছলে বলে কৌশলে গণতন্ত্রকে হত্যা করে ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার প্রয়াস পায়, কী করে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করে। এ অভিজ্ঞতার আলোকেই বর্তমান সঙ্কট উত্তরণের জন্য তিনি বিচার দাবি না করে শুভবুদ্ধির উদয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। আবেগতাড়িত হয়ে ফজলুল হক এমন কথা বলেননি; তার উপলব্ধি থেকেই বলেছেন। তিনি যথার্থই অনুধাবন করেছেন যে, বর্তমান সঙ্কটের ধরন রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমঝোতাতেই এর সমাধান নিহিত রয়েছে। আইন, আদালত, পুলিশ বাহিনী দিয়ে এর মূলোৎপাটন সম্ভব নয়।
ইতঃপূর্বে এ ধরনের আরো হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে। ব্লগার অভিজিত হত্যার বিচার কি হয়েছে? তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন প্রবীণ অধ্যাপক ড. অজয় রায় তো ছেলেহত্যার বিচার চেয়েছিলেন? তিনি কি বিচার পেয়েছেন? দেশে অহরহ গুম, খুনের ঘটনা ঘটছে। এর শেষ কোথায়? এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার কি হয়েছে? বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে জাতি আজ আক্রান্ত। আবার বিচার যদি ন্যায়বিচার না হয়, তাহলে সে বিচার হয় অর্থহীন। পক্ষপাতদূষ্ট বিচার সমাজের ক্ষত আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই ফজলুল হকের মতো অনেকেই মনে করেন, শুধু আইনের বিচারে এ ধরনের সম্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
বিবদমান সব পক্ষের সমঝোতার জন্য শুভবুদ্ধির উদয়ের প্রয়োজন। তা হলেই সমস্যার সমাধান হবে। বিচার, পুলিশ ও আইন-আদালত দিয়ে তো একজনকে শাস্তি দেয়া যায়। কিন্তু তাতে জাতীয় উন্নতি সম্ভব না। বর্তমান সমস্যা রাজনৈতিকভাবে আগে সমাধান করতে হবে। সেই সাথে নিতে হবে আইনগত ব্যবস্থা। যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা না যায়, শুধু আইনগত ব্যবস্থা দিয়ে এটি সমাধান করা যাবে না। অপরাধ বিজ্ঞানীরা অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অপরাধের সঠিক কারণ নির্ণয় করতে না পারলে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। শুধু লোক দেখানো কোনো প্রকার শাস্তি দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। নৃশংস খুনের মতো বড় অপরাধের একটি প্রধান কারণ আজকের বিরাজমান অনৈক্য, বিভাজন ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ। ফজলুল হক সম্ভবত এর প্রতি এ সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। জাতি আজ বিভক্ত। জাতীয় ঐক্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট। জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আজো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিভেদ-বিদ্বেষ, হিংসা-প্রতিহিংসা ক্রমেই বেড়ে চলছে। ফজলুল হক এ অবস্থার নিরসন চেয়েছেন। তাই তিনি উচ্চারণ করেছেন- ‘যারা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ এ দেশের সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উপলব্ধিও একই ধরনের। যেসব শক্তি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী, দেশের উন্নতি ও শান্তি চায় এবং গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী, সেসব শক্তির মধ্যে সমঝোতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক রেষারেষি, হিংসা-প্রতিহিংসা পরিহারের প্রয়োজন। এই বিভাজন ও অনৈক্য পরিহারের জন্য ফজলুল হক ‘শুভবুদ্ধির উদয়ে’র জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘শুভবুদ্ধির’র উদয়। কেবল শুভবুদ্ধিই সব অশুভকে বিনাশ ও ধ্বংস করতে পারে। শুভবুদ্ধির উন্মেষের জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করতে পারেন।
আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রে অশুভ শক্তির যে উত্থান ও আক্রমণ, তাতে করে মানুষের জীবন সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত। অশুভ ও শুভ শক্তির দ্বন্দ্ব চিরন্তন। শুভকে পরাজিত করে অশুভ শক্তি প্রাধান্য বিস্তার করলে সমাজে দেখা দেয় অস্থিরতা, নৈরাজ্য- যা ডেকে আনে ধ্বংস। আর অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির জয় হলে প্রতিষ্ঠিত হয় মানবতা, বিকশিত হয় সুন্দর; ধ্বংসের বিপরীতে শুরু হয় সৃষ্টি। এরই ধারাবাহিকতায় গণতান্ত্রিক সমাজ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বাংলাদেশেও আমরা অশুভ শক্তির পরাজয় কামনা করি। আমরা চাই সব কিছুতে ‘শুভ’র বিজয় অর্জিত হোক। তা হলেই কেবল আমরা মুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারব। তাই ফজলুল হকের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে চাই- সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
শুভবুদ্ধির উদয়ের জন্য সমাজে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারেন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী। এক কথায়, যাদেরকে বলা হয় বুদ্ধিজীবী। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ অশুভ শক্তির পক্ষে কাজ করছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলই এদের প্রধান লক্ষ্য। হীন স্বার্থ চরিতার্থের জন্য এরা অশুভ শক্তির পদলেহনে মত্ত। শাসকের মনোরঞ্জন ও স্তুতিতে এরা দক্ষ ও পটু। পদ-পদবির লোভে তারা নানাভাবে ক্ষমতাবান ও শক্তিধরকে তুষ্ট রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দালালি ও পদলেহনের প্রতিযোগিতায় যারা অগ্রগামী থাকেন তারা অশুভ শক্তিধরের নৈকট্য লাভ করেন এবং বড় বড় পদবি ও পুরষ্কার লাভ করেন। এ প্রতিযোগিতায় যারা পেছনে থাকেন তারাও ছিটেফোঁটা হালুয়া-রুটি ও ছোটখাটো আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হন না। এরূপ পরিস্থিতিতেও ন্যায় ও সত্যের পূজারি স্বল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে শুভশক্তির পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। শত নিপীড়ন ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে তারা তাদের বিশ্বাসে অবিচল থাকেন। সর্বকালে, সর্বসমাজে এই উদাহরণের প্রমাণ মেলে। মানবেতিহাসে চাটুকার ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের অনৈতিক কার্যকলাপের যেমন প্রমাণ পাওয়া যায়- তেমনি নির্লোভ ও ত্যাগী বুদ্ধিজীবীদের ন্যায় ও শুভশক্তির পক্ষে অবস্থানের কাহিনীও লিপিবদ্ধ আছে। আমাদের অবস্থান শুভশক্তির পক্ষে হোক। কামনা করি, সংশ্লিষ্ট সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। তা হলে হয়তো ছেলেহারা বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন এবং নিহত দীপনের আত্মাও শান্তি লাভ করবে।
প্রফেসর আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
পরিশেষে, আমি দীপনের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত বাবা-মা, বোন, স্ত্রী ও তার ছেলেমেয়ের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করি।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী।

Wednesday, November 4, 2015

বিদেশি হত্যাকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব by আসিফ নজরুল

বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ড যেকোনো দেশের জন্য বিব্রতকর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশেও বিদেশি নাগরিকেরা সব সময় নিরাপদ থাকেন না। বিদেশের মাটিতে বর্ণবাদী বা পেশাদার অপরাধী চক্রের শিকার হয়ে বাংলাদেশ বা অন্য দেশের মানুষ নিহত হওয়ার বহু ঘটনা এখনো ঘটে থাকে। প্রতিপক্ষ সংগঠনের স্বগোত্রীয়দের হাতে বা পারিবারিক বিরোধের জের হিসেবে খুন হওয়ার ঘটনাও খুব বিরল নয় ইউরোপ বা আমেরিকায়। পড়াশোনা করতে গিয়ে আমি যে পাঁচ-ছয় বছর ইউরোপে ছিলাম, তখন দেখেছি যে বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন শারীরিকভাবে অনেক শক্তিশালী গুন্ডা প্রকৃতির আক্রমণকারীদের নিয়েও।
বাংলাদেশ সে তুলনায় বিদেশিদের জন্য অনেক নিরাপদ একটি দেশ। এ দেশে দুজন বিদেশি নাগরিকের হত্যার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারপরও আলাদা করে গুরুত্ব পেয়েছে। হত্যাকাণ্ডগুলো ষড়যন্ত্রমূলক মনে হওয়ার কারণ রয়েছে বলেই এমন হয়েছে। হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো বর্ণবাদী আক্রমণের ঘটনা নয়, বাংলাদেশে সে অর্থে বর্ণবাদের অস্তিত্বই নেই। হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই বিদেশির সঙ্গে কারও বিরোধ বা স্বার্থ-সংঘাত খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে এগুলো ছিঁচকে অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত বলেও ধারণা করা যাচ্ছে না। ফলে এগুলোর পেছনে ষড়যন্ত্রমূলক কিছু রয়েছে বলে আশঙ্কা করার কারণ রয়েছে।
ষড়যন্ত্র থাকলে এর লক্ষ্য হতে পারে যে কেউ, যেকোনো সময়ে। ষড়যন্ত্র থাকলে ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য কী, কারা করছে এসব ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনের ক্ষমতা বা নিয়ত সরকারের রয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া গেলে সার্বিক নিরাপত্তাহীনতা কাটবে না। আর তা না কাটলে এ দেশে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজে বিদেশিদের অংশগ্রহণ ব্যাহত হওয়া অনেক দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে, দেশের ইমেজের জন্যও তা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
২.
দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের আগে-পরের ঘটনাগুলোও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক হত্যার আগেই এ দেশে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে সফর স্থগিত করেছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল। আকস্মিক এই সফর বর্জন অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। দুই বিদেশি হত্যার পরও বাংলাদেশ কোনো ক্রিকেট দলের সফরের জন্য একেবারে নিরাপত্তাহীন হয়ে গেছে—এটি আমরা অনেকেই মানতে চাইব না। হত্যাকাণ্ডগুলোর জের হিসেবে যেভাবে পশ্চিমা দূতাবাসগুলো সতর্কতা জারি করেছে, তাদের কিছু কর্মরত নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন, ব্যবসায়ী দল সফর বাতিল করেছে, তা সাদা চোখে দেখলে বাড়াবাড়িও মনে হতে পারে।
তবে আমরা বা আমাদের সরকার কী ভাবছে, তা-ই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বৈশ্বিক রাজনীতি আর কূটনীতি আমাদের সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, পশ্চিমা বিশ্বের পারসেপশন, তা যদি আরোপিত বা মিথ্যেও হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অনেক ক্ষেত্রে। আরোপিত ধারণা ও প্রচারণার ভিত্তিতে অন্য দেশে ব্যাপক সামরিক হামলা, সরকার উৎখাত এবং বিভিন্ন ধরনের অবরোধের ঘটনা বিশ্বে ঘটে চলেছে। কোনো দেশে স্বৈরাচার আর দুঃশাসন চেপে বসলে আন্তর্জাতিক বৈরিতা ঘটার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। এসব বাস্তবতাকে মাথায় রেখে সরকারকে সৎ ভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে দুই বিদেশি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
৩.
দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ড তদন্তে সরকার আন্তরিক রয়েছে বলে বারবার বলা হচ্ছে। তবে দুঃখজনকভাবে হলেও সত্যি যে সরকারের পক্ষ থেকে দুই বিদেশি হত্যার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কিছু প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। সিজার তাবেলা হত্যাকাণ্ডের পর কোনো গ্রেপ্তার এমনকি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের আগেই এ জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করা হয়েছে। সরকারপ্রধান নিজে যখন এ ধরনের কথা বলে ফেলেন, তখন বাংলাদেশের গোয়েন্দা বা পুলিশ সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তদন্তকাজ সাজানোর চেষ্টা করে, এমন নজির আমরা বিভিন্ন আমলে দেখেছি। এতে আর যা-ই হোক সুষ্ঠু তদন্ত সম্ভব হয় না।
বিএনপি নেতা মঈন খানের বাসায় পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের নৈশভোজনের ঠিক পরদিন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল সফর বর্জন করেছিল, এর সূত্র ধরে পশ্চিমা নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সরকারের লোকদের অভিযোগ শুনে মনে হয়েছে মঈন খানের কথায় পশ্চিমারা একযোগে তা করেছে! এটি কি আদৌ সম্ভব? বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে নিজস্ব অবলোকন ব্যবস্থা প্রতিটি শক্তিশালী বিদেশি রাষ্ট্রের রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা শুধু একজন রাজনীতিকের কথায় রাতারাতি এমন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলবে? বিদেশি একটি দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে যে তারা নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা সরকারকে আগেই জানিয়েছিল। সেটি কি সরকার বিবেচনায় নিয়েছে?
সরকারের মন্ত্রীরা দুই বিদেশি হত্যায়ও বিএনপির হাত রয়েছে বলে চলেছেন। এই অভিযোগ বা সন্দেহ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু একই সন্দেহ আরও বহু মহলের বিরুদ্ধে করা যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত এখন হনন স্পৃহার পর্যায়ে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে সরকার বা বিএনপি যে কাউকে বিপদে ফেলার চেষ্টা হতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ওপর আরও বেশি আন্তর্জাতিক খবরদারি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকেও কোনো গোষ্ঠী এই ঘটনা ঘটাতে পারে। দুই বিদেশি খুনের ঘটনার পরপরই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এই ইঙ্গিতকে শিরোধার্য ভেবে সরকারের এজেন্সিগুলো বাকি সব সম্ভাবনা বাদ দিয়ে বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শুধু বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এমন আশঙ্কা বিএনপির নেতারা বেশ কয়েকবার প্রকাশ করেছেন।
দুই বিদেশির হত্যাকাণ্ড স্পর্শকাতর ঘটনা। যেভাবে এর আগে-পরে পশ্চিমারা এবং অন্য কিছু ওইসিডি (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো–অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) জোটভুক্ত দেশ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা এই হত্যাকাণ্ডগুলোর গুরুত্বকে আরও অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত থেকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের চিন্তা থাকলে সরকারকে তা বাদ দিতে হবে। কোনো একটি পূর্বানুমানকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা না করে সব পূর্বানুমান ও সন্দেহের সুচারুভাবে তদন্ত করতে হবে।
আমরা জানি, বাংলাদেশে বহু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের কোনো সুরাহা হয়নি (যেমন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড)। গুলশান-বনানীর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বিএনপি নেতা রিয়াজ রহমানের ওপর প্রকাশ্য আক্রমণের কোনো সুষ্ঠু তদন্তই হয়নি। অন্যদিকে বহু ঘটনায় বিরোধী দলের নেতাদের ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এসব একটি পুরোনো সত্যকেই প্রমাণ করে। তা হচ্ছে, এ দেশে যেকোনো সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনায় গোয়েন্দারা ক্ষমতাসীন সরকারের অভিলাষ মোতাবেক তদন্তকাজ পরিচালনা করে। এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ড তদন্তে সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার আগে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করলে বরং তদন্তকাজের সততা নিয়ে গোড়া থেকে সন্দেহ থাকবে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে কারও জন্যই ভালো হবে না।
৪.
দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে আমাদের আরেকটি বিষয়ে বোধোদয় হতে হবে। আমরা অতীতে এই সরকারকে বাংলাদেশে আইএস, আল-কায়েদা এ ধরনের জঙ্গি আছে বলে বলতে শুনেছি। প্রধানত বিরোধী দলকে ঘায়েল করতেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হতো বলে অভিযোগ ছিল। এ জন্য আমরা এমনকি বিদেশে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনায়ও বিএনপি-জামায়াত জড়িত বলে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতাকে বলতে শুনেছি।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আইএস যদি এ দেশে থেকেই থাকে তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর কেন সরকার বারবার বলছে যে এ দেশে এমন কোনো গোষ্ঠী নেই? আর না থেকে থাকলে কেন অতীতে এসব প্রচারণা চালানো হয়েছে? অপপ্রচারণা দিয়ে বিরোধী দলকে সাময়িকভাবে ঘায়েল করা সম্ভব। বহু দেশেই এটি হয়। কিন্তু তা নিজ দেশের এমনকি নিজ সরকারের স্বার্থকে কীভাবে বিপন্ন করতে পারে, এমন উদাহরণও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে। রাজনৈতিক বৈরিতা বা সংঘাত এমন পর্যায়ে তাই যেতে দেওয়া উচিত না, যা দেশের স্বার্থকে বিপন্ন করতে পারে। সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষকেই এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে। বিদেশি হত্যাকাণ্ড, বিদেশি বয়কট আর বিদেশি প্রচারণার বিরুদ্ধে পরস্পরকে সহায়তা করতে হবে। নিজের চেয়ে দেশকে বেশি মূল্যবান ভাবলে এটি না করার কোনো বিকল্প নেই।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Friday, October 30, 2015

কাশ্মীর - ভারত পাকিস্তান যেখানে মুখোমুখি

কাশ্মীর সমস্যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা। এটা অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ যেটা ইংরেজরা আমাদের ভেতরে সৃষ্টি করেছিল। ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯ সালগুলোর রক্তের দাগ ধরে যদি আমরা পেছনে ফিরে যাই তাহলে দেখতে পাবো এই সকল যুদ্ধের সূচনা হয়েছে এই কাশ্মীর দ্বন্দ থেকেই। সাহিত্যিকেরা যে ভূখন্ডকে পৃথিবীর স্বর্গ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন সেই কাশ্মীর আজ এক অঘোষিত যুদ্ধের ময়দান। এই ব্যাপারে লেখার সময় আমাকে সতর্ক থাকতে হয়েছে যেন কোন বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর একপেশে সমালোচনা কিংবা সমর্থন না হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আমার নিজের জানাশোনাও খুব বেশী নয়।
জম্মু ও কাশ্মীর হল ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যটি প্রধানতহিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত। এই রাজ্যের দক্ষিণে ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও পাঞ্জাবরাজ্যদুটি অবস্থিত। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের উত্তরে ও পূর্বে গণচীন অবস্থিত। এই রাজ্যেরপশ্চিমে ও উত্তরপশ্চিমে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে কাশ্মীরের পাকিস্তান-শাসিত অংশ আজাদকাশ্মীর ও গিলগিট-বালটিস্তান অবস্থিত।
বর্তমান জম্মু ও কাশ্মীর ভূখণ্ডটি অতীতে কাশ্মীর ও জম্মুদেশীয় রাজ্যের অধীনস্থ ছিল। এই রাজ্যের শাসকেরা ঐতিহাসিক বৃহত্তর কাশ্মীর অঞ্চল শাসনকরতেন। এখন কাশ্মীর অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও গণচীনের মধ্যে বিবাদরয়েছে। এই বিবাদের জেরে জাতিসংঘ ও অন্যান্য কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় জম্মুও কাশ্মীর রাজ্যটি "ভারত-অধিকৃত কাশ্মীর" বা "ভারত-শাসিত কাশ্মীর"নামে পরিচিত। অন্যদিকে পাকিস্তানের শাসনাধীনে থাকা অংশটি ভারতে "পাকিস্তান-অধিকৃতকাশ্মীর" এবং পাকিস্তানে "আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর" নামে পরিচিত।
জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ - এই তিন অঞ্চল নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি গঠিত। শ্রীনগর এই রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী এবং জম্মুশীতকালীন রাজধানী। কাশ্মীর উপত্যকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। জম্মু অঞ্চলে অনেক হিন্দু মন্দির থাকায় এটি হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। লাদাখ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলটি "ছোটো তিব্বত" নামেও পরিচিত।
১৯২৫ সালে হরি সিং কাশ্মীরের রাজা হন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক। কাশ্মীরের মুসলিম প্রধান অংশের নাম কাশ্মীর এবং হিন্দু প্রধান অংশের নাম জম্মু। তবে দুই অংশের মোট জনসংখ্যার বিবেচনায় মুসলিম প্রধান হলেও এর শাসক ছিলেন হিন্দু যাকে বলা হতো ‘ডোগরা রাজা’। ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাজনের অন্যতম শর্ত ছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন,অথবা তাঁরা স্বাধীনতা বজায় রেখে শাসনকাজ চালাতে পারবেন। হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান এর কোনোটিতেই যোগদান না করে রাজা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। এটি পাকিস্তান মেনে নিলেও ভারত মেনে নিল না। ১৯৪৭ সালের ২৫ অক্টোবর হরিসিং কাশ্মীরের ভারত ভুক্তির চুক্তিতে সই করেন। ২৭ অক্টোবর তা ভারতের গভর্নর-জেনারেল কর্তৃক অনুমোদিত হয়। কথিত আছে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বান্ধবী লেডিমাউন্ট ব্যাটেনের প্রভাবে ও ভারতের কূটকৌশলে শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতে যোগদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
চুক্তি সই হওয়ার পর, ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশকরে। ১৯৪৭ সালের ২০ অক্টোবর পাকিস্তান-সমর্থিত আদিবাসীরা কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করে। ভারতেরসৈন্য নামানোর সংবাদ পেয়ে পাকিস্তানও কাশ্মীরে সৈন্য প্রেরণ করল এবং ভারতীয় সৈন্যদেরহটিয়ে দিয়ে কাশ্মীরের অংশবিশেষ দখল করল।
বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপিত হলে জাতিসংঘ ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। ভারত প্রথমে এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিলে ভারত গণভোটের বিপক্ষে মত দেয়। ভারত ও পাকিস্তানে জাতিসংঘের সামরিক পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি তত্ত্বাবধানে আসে। এই গোষ্ঠীর কাজ ছিল, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা ও তদন্তের রিপোর্ট প্রত্যেক পক্ষ ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে জমা দেওয়া। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে কাশ্মীর থেকে উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহার ও গণভোটের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ভারত গণভোটে অসম্মত হয় এবং পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহারে অসম্মত হয়। ভারত নিম্নোক্ত কারণে গণভোটে সম্মত হয়নি।
১. ভারতের মতে, ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছিল এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনেও কাশ্মীরিরা ভোট দিয়েছিলেন। তাই আলাদা করে গণভোটের প্রয়োজন নেই।
২. ১৯৪৮-৪৯ সালে জাতিসংঘের দেওয়া প্রস্তাব খাটবে না। কারণ মূল ভূখণ্ডের চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। পাকিস্তান তাদের অধিকৃত কাশ্মীরের কিছু অংশ চীনকে দিয়ে দিয়েছিল।
৩. গণভোটের বিপক্ষে ভারতের আরেকটি যুক্তি ছিল, পাকিস্তান তাদের অধিকৃত কাশ্মীরে অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের বাস করার অনুমতি দিয়েছে।
৪. তাছাড়া ভারতের মতে, পাকিস্তান-সমর্থিত অনুপ্রবেশকারীরা কাশ্মীর উপত্যকা থেকে ২৫০,০০০ কাশ্মীরি পণ্ডিতকে বিতাড়িত করায় ওই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান
১৯৪৮ সালের ১৩ অগস্টের জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে কাশ্মীর অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করেনি।
১৯৪৭- ১৯৪৮ সালের দিকে এই দুই দেশের মাঝে কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টিতে জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করে। এই মধ্যস্থতা ভারতমেনে না নিলে ১৯৬৫ সালে যুদ্ধ শুরু হয় । ১৯৬৬ সালের ১০ ই জানুয়ারী বর্তমান রাশিয়া তাসখন্দচুক্তির মাধ্যমে সে যুদ্ধের নিষ্পত্তি ঘটাতে সক্ষম হলেও ১৯৭১ সালে আবার তারা যুদ্ধেজড়িয়ে পড়ে।
এ সুযোগে সোভিয়েত সমাজ আফগানদের উপর হস্তক্ষেপ করলেপাকিস্তান আফগানদের সহযোগিতা করলে এ সুযোগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সাথে একটি ভাল সম্পর্কেরভিত্তিতে ভারতকে পারমানবিক অস্ত্র নির্মানে সহযোগিতা করে। পাকিস্তান একই সুযোগে চীনেরসহযোগিতায় পারমানবিক অস্ত্রেও টেক্কা দিতে সক্ষম হয়।
১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলো, ১৯৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কাশ্মীরিদের ভাগ্যে আরও অমানিশার অন্ধকার নেমে এলো। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধবন্দি পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য ফিরে পাওয়া এবং পশ্চিম সীমান্তে ভারতের দখলীকৃত ভূমি ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে শিমলা চুক্তিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টু কাশ্মীর সমস্যাকে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা বলে মেনে নিলেন। ১৯৭২সালে পাক-ভারত সমস্যা সমাধান কল্পে সিমলা চুক্তি হয় এই চুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়যে ভারত পাকিস্তানের মাঝে বিবাদমান সমস্যাগুলো তারা দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করবে। কারগীলসীমান্ত নিয়েও দুই দেশের সম্পর্ক দিনে দিনে অবনতির দিকে চলে এর অর্থ দাঁড়াল এই যে, জাতিসংঘ স্বীকৃত গণভোট অনুষ্ঠানের দায়বদ্ধতা থেকে ভারত মুক্ত হয়ে গেল। কাশ্মীর নিয়ে এর পরেও ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ হয়েছে কারগিল যুদ্ধে। পাকিস্তান সৈন্য নামিয়েও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে আমেরিকার চাপে। শুধু তাই নয়, এর পর থেকে কাশ্মীর প্রসঙ্গে আর কোনো কথাবার্তাও বলছে না পাকিস্তান।
এদিকে কাশ্মীরের জনগণও কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের বিষয়ে ত্রিধা বিভক্ত। হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং দিল্লির আনুকূল্যপ্রাপ্ত মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র অংশ কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। একটি অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। কিন্তু কাশ্মীরের বৃহত্ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায়। তারা চায় গণভোটের মাধ্যমেই কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারিত হোক। কিন্তু দিল্লি কাশ্মীরকে এখন তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশই মনে করে। এমনকি ‘ডোগরা রাজা’ এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম নেতা শেখ আব্দুল্লাহকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে কাশ্মীরের জন্য বিশেষ ধরনের স্বায়ত্তশাসনের সুবিধা প্রদানের পরিবর্তে সেখানে কঠোরতম কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ চালু রেখেছে তারা। কাশ্মীরের মতো একটি ক্ষুদ্র রাজ্যে বর্তমানে ৫ লাখের অধিক সৈন্য রয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ ইতোমধ্যেই স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে। প্রতিদিনই আরও তাজা প্রাণ ঝরছে। শত শত তরুণী নারী প্রতিদিন ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে। দিনের পর দিন সান্ধ্য আইন চলছে। ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না। দোকানপাট বন্ধ। মানুষের আয়-রোজগারও বন্ধ। মিছিল-মিটিং, বিক্ষোভ সবই কঠোরহস্তে দমন করা হচ্ছে। স্বাধীনতা দূরে থাকুক, বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদা পূরণের সংগ্রাম করাই তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে গেছে।
অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একটি স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার শুধু স্বাধীনতা চাওয়ার অপরাধে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। অথচ সমগ্র বিশ্ব নিশ্চুপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ভারত-পাকিস্তান উভয়ে সম্মত না হলে তারা কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের বিষয়ে নাক গলাবে না। বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ ইউরোপ ও কাশ্মীরের বিষয়ে টু-শব্দটি করে না। যদিও তারা দাবি করে বর্তমান বিশ্ব সভ্যতা তাদেরই অবদান। তারা ইউরোপের কৌলিন্য বজায় রাখার জন্য এতটাই তত্পর যে, মুসলিম দেশ হওয়ায় তারা তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নে স্থান দিতেও প্রস্তুত নয়। বর্তমান বিশ্ব যাদের প্রভাবে, অর্থে এবং শক্তিতে প্রভাবিত, তাদের কথা না হয় বাদই দেয়া যাক। এশিয়া এবং আফ্রিকার তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বই বা কি করছে? চীন নীরবে তাদের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে। কৌশলগত কারণে এই মুহূর্তে ভারতের বিরাগভাজন হতে চায় না তারা। আর শত কোটি লোকের দেশ ভারত এ অঞ্চলের নতুন মোড়ল বনে গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেয়ার শুধু অপেক্ষা। এমন দাপুটে ভারতের প্রতিবেশীরা তো ভারতের ভয়ে অস্থির। প্রত্যেকেরই ভারতের সঙ্গে নিজস্ব সমস্যা থাকলেও সে সব কথা বলারই সাহস পাচ্ছে না। বিশেষ করে মুসলিম প্রধান পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ ভারতভীতি ছাড়াও অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত। পাশ্চাত্যের তল্পীবাহক শাসকগোষ্ঠী সেনাবাহিনী সব সময় পাশ্চাত্য তথা আমেরিকার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। পরমুখাপেক্ষী নীতির কারণে আজও তারা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। বাংলাদেশ আর্থিক-সামাজিক সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনায় অনেক এগিয়ে গেলেও ভারতপন্থী এবং ভারত বিরোধী তীব্র বিভাজন থাকায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়ই কাশ্মীরের ব্যাপারে নির্লিপ্ত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও কাশ্মীরের অব্যাহত ও ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো দেখেও না দেখার ভান করছে।
কারণগুলো হচ্ছে :
কাশ্মীরের পতাকা
১. কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীরা মুসলমান।
২. তারা অমুসলিম/হিন্দুপ্রধান ভারত রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে।
৩. কিছু কিছু স্বাধীনতাকামী গ্রুপ ও সংগঠন পার্শ্ববর্তী মুসলিম প্রধান পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও সে দেশের জনগণের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে।
৪. বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম বিদ্রোহীকে হত্যা অথবা একজন মুসলিম নারীকে ধর্ষণ, একজন ইহুদি, খ্রিস্টান ও বর্ণহিন্দু বিদ্রোহী অথবা নারী ধর্ষণের অপরাধের সমান নয়। আমেরিকা এবং ইউরোপীয়দের বিবেচনায় ইসরাইল এবং ভারত যা কিছুই করে তার সবই হালাল! একই কাজ আরব ও মুসলমানরা করলে তা হয় অপরাধ!
৫. মুসলমানদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিলে বা ভেঙে দিলে রবীন্দ্রনাথের সামান্য ক্ষতি কবিতায় বর্ণিত অবস্থার মতো তা তেমন কোনো ক্ষতির ব্যাপার হয় না।
৬. ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ হলেও ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের যুদ্ধ সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু নয়!
তবে আশার কথা, ভারতের অরুন্ধতী রায় সে দেশের অধিকার হারা নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষায় এবং জীবন মান উন্নয়নে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মানবাধিকার নেত্রীকেও ভারতের শাসক শ্রেণী ও বর্ণবাদীদের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে বার বার। রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। যে কোনো মুহূর্তে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হচ্ছে তাকে। তবে তিনি বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু ও ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে চলেছেন। তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলে যাচ্ছেন, কাশ্মীর কাশ্মীরিদেরই, এটা কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতাই কাশ্মীর সমস্যার একমাত্র সমাধান।
পশ্চিমবঙ্গের কিছু বামপন্থী হিন্দু নেতা ও কাশ্মীরিদের প্রতি ন্যায়বিচার করার জন্য দিল্লি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু কাশ্মীর সমস্যার ভয়াবহতার বিবেচনায় এসব প্রচেষ্টা খুবই সামান্য।
তৃতীয় বিশ্ব বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব কাশ্মীরিদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার নয়। এসব দেশের রাষ্ট্র নায়ক এবং রাজনীতিবিদরা পাশ্চাত্যের আজ্ঞাবহ। পরিবর্তনের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক হোসাইন ওবামার নির্বাচনী ওয়াদাগুলোর মধ্যে কাশ্মীর সমস্যার ন্যায্য সমাধান অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু তিনিও তার কথা রাখলেন না। কদিন আগেই তিনি ভারত সফর করে গেছেন। অরুন্ধতী রায়ের ভাষায় ভারতের জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দুত্ববাদীদের তিনি চটাতে চাননি, তাই কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিলেন তার ভারত সফরের সময়। মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্র নায়করা তাদের মসনদ, সম্পদ এবং হেরেম রক্ষায় এত আন্তরিক যে, এসব স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য কাশ্মীর বা ফিলিস্তিনের অধিকার দূরে থাকুক, কোনো মুসলিম রাষ্ট্র যদি নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য চেষ্টা সাধনা করে এবং তাতে যদি সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী শক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তারা সে মুসলিম রাষ্ট্রেরও ধ্বংস কামনা করতে পিছপা হন না। ইরাক আক্রমণের জন্য মিসরের হোসনি মোবারক আমেরিকাকে বার বার অনুরোধ করেন। লেবাননের রফিক হারিরি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমির ইরান আক্রমণের জন্য আমেরিকাকে প্ররোচিত করেছেন। পরাশক্তিগুলো কাশ্মীর নিয়ে স্বার্থ আদায়ের রাজনীতি করে চলছে, অথচ বিশ্বব্যাপী তারা প্রতিনিয়ত খবরদারি করে চলছে। জম্বু এবং আজাদী কাশ্মীর এই দুটির মাঝখানে অবস্থিত লাইন অব কন্ট্রোল। লাইন অব কন্ট্রোলের দুই পার্শ্বে কোটি কোটি মানুষ বসবাস করছে, এই কোটি প্রাণকে ক্ষুধা আর দারিদ্যের মধ্য রেখে দুই দেশের শাসক গোষ্ঠি একপক্ষ কাশ্মীরকে নিজেদের দখলে রেখে অন্য পক্ষ দখলের পাঁয়তায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে গত পাঁচ দশক ধরে। পাক- ভারতের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ এতই প্রবল যে , এরা পরস্পরকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য শ’ খানেক পারমানবিক অস্ত্র তৈরি করে রেখেছে। এক একটি অস্ত্র তৈরিতে যে পরিমান অর্থ খরচ হয়েছে যা দ্বারা দুটি দেশের অসংখ্য দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের দুর্দশা দূর করতে পারত। বর্তমান বিশ্বে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ছাড়া আর কোন দেশ পাওয়া যাবেনা, যারা ভারত পাকিস্তানের মতো পরস্পরকে ঘৃনা করে। অথচ কাশ্মীর সমস্যা না থাকলে এই দুটি দেশ হতো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন, যারা যে কোন সমস্যায় এক অ্পরকে সাহায্য করত। তাই নির্দ্বিধায় উপমহাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বিশ্লেষকগণ কাশ্মীর সংকটকে দায়ী করছেন ।
পাক-ভারতের মধ্যকার এই কাশ্মীর সমস্যার সকল প্রতিফল পোহাতে হচ্ছে কাশ্মীরের জনগনের রিহীহ জনগনের। বর্তমানে কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত বিভাজন (লাইন অব কন্ট্রোল) রেখা মেনে নিতে রাজি হলেও কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী জনগন আর পাকিস্তান রাজী নয় । পাকিস্তান রাজী না থাকলেও কোন ক্ষতি ছিল না যদিবা ভারত তাদের অধিকারী কাশ্মীরের গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে পারত। তবে যদি ভারতীয় কাশ্মীরের জনগনকে ভারত সরকার খুশি করতে পারত তাহলে কাশ্মীর সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধানের সম্ভাবনা ছিল । কাশ্মীরকে যথেষ্ট স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদান করে গৃহযুদ্ধের অবসান অসম্ভব। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী অভ্যন্তরীন জটিলতার কারনে সেটা করতেও অক্ষম। তবে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের যতগুলো পথ রয়েছে তারমধ্যে পর্যাপ্ত স্বায়ত্ত্বশাসনই ভারতীয় শাসকদের জন্য সহনীয়। ভারতীয় কাশ্মীর মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত, জম্মু,কাশ্মীর আর লাদাখ। জম্মু ও লাদাখ হিন্দু ও বেীদ্ধদের আবাসস্থল আর কাশ্মীর হল মুসলিমদের আবাস্থল। জম্মু আর লাদাখের জনগন ভারতে থাকার পক্ষপাতী অন্যদিকে কাশ্মীরের একপক্ষ চায় স্বাধীনতা অন্যপক্ষ চায় পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্তি। বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলারা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত। এক ডজনের বেশী দল নিয়ে তারা গঠন করেছে হুরিয়াত কনফারেন্স। ভারত সরকার যদি মুসলিম প্রধান অঞ্চল কাশ্মীরের ওপর পাকিস্তান সরকার এবং হুরিয়াতের সাথে সমঝোতায় আসতে পারে তবে সেক্ষেত্রে ছয় দশকের এই আন্তর্জাতিক সমস্যাটির দারুন মীমাংসা হতে পারে। এক্ষেত্রে উপায় হলো বেশ কিছু জায়গা পাকিস্তানের ছেড়ে দেয়া।
তবে কাশ্মীর সমস্যা অন্যভাবে সমাধান করা যেতে পারে। ভারত পাকিস্তানের অধিকৃত জায়গা সংযুক্ত করে যদি স্বাধীন কাশ্মীর রাষ্ট্র গড়ে তোলা যায় তবে তা হবে কাশ্মীরের জনগনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আন্তর্জাতিক শ্রেনীও বোধহয় এমন একটি সমাধান দেখতে সবচেয়ে বেশী আগ্রহী। সেক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তি রাষ্ট্র পাক-ভারতের মাঝে বাফার রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করবে এই ক্ষুদ্র স্বাধীন কাশ্মীর।
কাশ্মীর সমস্যা সমাধান যে একবারেই অসম্ভব তা নয়। ত্রুটি হলো দুটি দেশের রাজনৈতিক অপরিপক্কতা। বর্তমানে পাকিস্তান আবার ফিরে গেছে সেনা শাসনের পর পূর্বের অবস্থায় । যদিও ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ বলা হয় , কিন্তু সে গণতন্ত্রও শুধু নির্বাচনের মাঝেই সীমাবদ্ধ, তার কার্যকারী কোন প্রতিফলন দেখা যায় না। দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাড়াতে পারেনি। কাশ্মীর ছাড়াও নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যায় জর্জরিত ভারতের পক্ষে তাই কাশ্মীরের ওপর বড় ছাড় দেয়া সম্ভব নয়। কারণ হিসাবে দেখা যায় দেশটি তাহলে বিশ পঁিচশটি ভাগে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে প্রচন্ড। কিন্তু কাশ্মীর সমস্যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই বিশ্ববাসীকে প্রদান করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যর সমস্যা অর্থাৎ আরব- ইসরাইল শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলেই আন্তর্জাতিক শক্তিধর সম্প্রদায় তাদের মনযোগ কাশ্মীরের ওপর পূর্ণমাত্রায় প্রদান করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা বর্তমানে কাশ্মীর বলতে শ’খানেক পারমানবিক বোমার বিস্ফোরনের সম্ভাবনা । তাই কাশ্মীরের অসহায় জনতার দিকে তাকিয়ে কাশ্মীরকে গণতান্ত্রিক উপায়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যার মাধ্যমে এই জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। নতুবা যতদিন এটি সম্ভব না হবে ততদিন এ সমস্যার অগ্রগতি এভাবেই চলতে থাকবে।