Tuesday, September 16, 2025

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে আরব ও মুসলিম নেতাদের: -কাতারের আমির

গাজা বিষয়ক সংলাপ বা আলোচনাকে ভণ্ডুল করে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাতারে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। পক্ষান্তরে আরব বিশ্বকে ইসরাইলি প্রভাববলয়ে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর নেতাদের সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি। তিনি বলেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে আরব ও মুসলিম নেতাদের। তার ভাষায়, যে পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে, তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার চেষ্টা করে, সে আলোচনাকে ভেস্তে দিতে চায়। তাদের জন্য আলোচনা কেবল যুদ্ধেরই একটি অংশ। আরব ও মুসলিম নেতাদের উদ্দেশে দোহা সম্মেলনে সোমবার এসব কথা বলেন শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি।

তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি সরকার গাজার চলমান যুদ্ধকে ব্যবহার করছে দখলদারিত্ব বাড়াতে এবং স্থিতাবস্থা পাল্টাতে। আলোচনার বিষয়টি কেবল গাজায় তাদের সামরিক অভিযানের অজুহাত। যদি ইসরাইল হামাস নেতাদের হত্যা করতে চায়, তবে কেন তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসছে? প্রশ্ন রাখেন কাতারের আমির।

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইল তাদের জিম্মিদের ব্যাপারেও উদাসীন বরং শুধু নিশ্চিত করছে যে গাজাকে আর যাতে বসবাসযোগ্য রাখা না যায়। যদি সত্যিই জিম্মিদের মুক্তি চাওয়া হয়, তবে কেন আলোচক সবাইকে হত্যা করা হচ্ছে? এমন কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক দলের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্ক রাখা যায় না।

শেখ তামিম গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা আখ্যা দেন। কাতারের আহ্বানে আয়োজিত আরব লীগ ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) যৌথ সম্মেলনের লক্ষ্য ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যেটি গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় বন্ধের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আহ্বানের মুখোমুখি।

হামাস দাবি করেছে, গত সপ্তাহে দোহায় তাদের ওপর চালানো বিমান হামলায় শীর্ষ নেতারা বেঁচে গেছেন, যদিও ছয়জন নিহত হন। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, যার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও আছেন। সম্মেলনের যৌথ বিবৃতিতে সব রাষ্ট্রকে আহ্বান জানানো হয় ইসরাইলকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধা দেয়ার জন্য সব ধরনের আইনি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। এর মধ্যে আছে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা এবং তার বিরুদ্ধে আইনি মামলা শুরু করা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘে ইসরাইলের সদস্যপদ স্থগিত করার প্রচেষ্টায় সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে। এতে ফিলিস্তিনি ইস্যুর প্রতি সম্মিলিত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, বসতি সম্প্রসারণ এবং অধিকৃত ভূখণ্ডে নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এছাড়া গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণিত অবরোধ ও অনাহার কৌশলের জবাবদিহি দাবি করা হয়।

নেতারা আবারও স্পষ্ট করেন, টেকসই শান্তি কেবল আরব শান্তি উদ্যোগ ও জাতিসংঘ প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সম্মেলনের পাশাপাশি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)- যার মধ্যে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আছে, তারা নিজস্ব বৈঠক করে যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় করার ঘোষণা দেয়। জিসিসি যুক্তরাষ্ট্রকেও আহ্বান জানায় যেন তারা তাদের প্রভাব ব্যবহার করে ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে আনে। জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বলেন, আমরা আমাদের কৌশলগত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও আশা করি তারা তাদের প্রভাব ব্যবহার করবে ইসরাইলকে এই আচরণ বন্ধ করাতে। তাদের হাতে ইসরাইলের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ আছে। এখনই সময় তা প্রয়োগ করার। মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কাতারই গাজা যুদ্ধকালে ইসরাইল-হামাস আলোচনায় মধ্যস্থতার নেতৃত্ব দিয়েছে।

 মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সোমবার বলেন, ইসরাইলের বর্তমান পদক্ষেপগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যেকোনো শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ব্যাহত করছে। দোহায় আরব-ইসলামিক সম্মেলনে তিনি বলেন, এখন যা ঘটছে তা ভবিষ্যৎ শান্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে, আপনার নিরাপত্তা ও এ অঞ্চলের জনগণের নিরাপত্তা বিপন্ন করছে এবং নতুন শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা কমাচ্ছে এমনকি বিদ্যমান চুক্তিগুলোকেও ভণ্ডুল করছে।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও সম্মেলনে অংশ নেন। প্রায় ৬০ দেশের নেতাদের মধ্যে ছিলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ দ্বিতীয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

সম্মেলন শেষে যুবরাজ সালমান কাতারের আমিরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা পাঠান। তিনি লিখেছেন, জিসিসির সর্বোচ্চ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন ও জরুরি আরব-ইসলামিক সম্মেলনের ফলাফলের জন্য আমরা প্রশংসা জানাই। এই সম্মেলনগুলো কাতারের অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি ভঙ্গের যেকোনো প্রচেষ্টা আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করি।

এদিকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার কাতারে হামাসকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলার বিষয়ে জরুরি বিতর্ক আয়োজন করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার কাতারে পৌঁছার কথা। এর আগে তিনি ইসরাইলের হামাস নির্মূল প্রচেষ্টায় ‘অটল সমর্থন’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, রুবিও সফরে কাতারের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করবেন।

mzamin

ক্ষুব্ধ রাহুল গান্ধীর প্রশ্ন ‘এটা কি ভারত নয়?’

বন্যা দুর্গত পাঞ্জাব সফরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে বাধা দিল পুলিশ। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময় নিয়ে রাহুলের প্রশ্ন- এটা কি ভারত নয়? ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, ওটা (নদীর ওপারের গ্রাম) যদি ভারত হয়, তাহলে সেখানে আমাকে রক্ষা করতে পারবেন না কেন? এটা কি ভারত নয়? এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এর মধ্য দিয়ে বন্যাদুর্গতদের খোঁজ নিতে গিয়ে আবারও বিতর্কে জড়ালেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। এমনটাই বলছে ওই মিডিয়া।

সোমবার গুরদাসপুর জেলার রাভি নদীর ওপারে একটি সীমান্ত গ্রামের পথে তাকে আটকায় পাঞ্জাব পুলিশ। এদিন রাহুল গান্ধী অমৃতসর ও গুরদাসপুরের বন্যাপীড়িত গ্রাম পরিদর্শনে যান। তিনি অমৃতসরের ঘোনেওয়াল ও গুরচক গ্রামে যান। কিন্তু গুরদাসপুরের সীমান্তবর্তী তূর গ্রামে যেতে চাইলে পুলিশ তাকে আটকে দেয়। কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ- ‘সিকিউরিটি কারণ’ দেখিয়ে স্থানীয় প্রশাসন তাকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

সেখানে দেখা যায়, রাহুল গান্ধী পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করছেন- আপনি বলছেন, ভারতীয় ভূখণ্ডে আমাকে নিরাপদ রাখতে পারবেন না। এটাই তো বলছেন? পুলিশ কর্মকর্তা উত্তর দেন- আমরা সবসময় আপনার নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত। রাহুল তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করেন- ওটা (নদীর ওপারের গ্রাম) যদি ভারত হয়, তাহলে সেখানে আমাকে রক্ষা করতে পারবেন না কেন? এটা কি ভারত নয়? তিনি আরও বলেন, আপনারা বলতে চাইছেন, বিরোধী দলনেতা সেখানে যেতে পারবেন না। কারণ পাঞ্জাব পুলিশ তাকে সুরক্ষা দিতে অক্ষম? প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিং প্রশ্ন করেন, যদি রাহুল গান্ধীর পাকিস্তান থেকে হুমকি থাকে আর আমরা ভারতে নিরাপদ না হই, তাহলে কোথায় নিরাপদ হবো? সাবেক মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিং চন্নি অভিযোগ করেন, আমাদের লোকজন ওখানে থাকে। রাহুল গান্ধী শুধু তাদের খোঁজ নিতে চেয়েছেন। সেখানে তিন দিন ধরে আমরা মেডিকেল ক্যাম্প চালাচ্ছি। অথচ তাকে যেতে দেয়া হলো না। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রতাপ সিং বাজওয়া একে ‘লজ্জাজনক ও অসংবেদনশীল’ বলে অভিহিত করে দাবি করেন- এটা নিরাপত্তাজনিত নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

কংগ্রেসের মতে, শাসক আম আদমি পার্টি (এএপি) সরকার এবং বিজেপি- দু’দলই সীমান্তবর্তী দুর্গত গ্রামে যায়নি। বাজওয়ার ভাষায়, ওরা আমাদের মানুষ, ভারতীয় নাগরিক। শুধু সীমান্তে বাস করার কারণে তারা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

mzamin

ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী বললেন: গাজা জ্বলছে

রাতভর ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে গাজায়। এরপর মঙ্গলবার সকালে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন ‘গাজা জ্বলছে’। রাতভর ভারী হামলায় গাজা সিটি লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল ক্যাটজের এই মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন ইসরাইল গাজা সিটিকে কেন্দ্র করে নতুন এক সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ইসরাইল থেকে কাতারের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় সাংবাদিকদের বলেন, ইসরাইল ইতিমধ্যেই অভিযান শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইসরাইলিরা সেখানে অভিযান শুরু করেছে। আমাদের ধারণা, একটি চুক্তি হওয়ার জন্য খুবই স্বল্প সময় হাতে আছে। আমাদের আর মাস নেই, হয়তো কেবল কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী কয়েক ঘণ্টা ধরে কোনো মন্তব্য করেনি যে আসলেই অভিযান শুরু হয়েছে কি না।

নেতানিয়াহু ও রুবিও দু’জনেই সোমবার বলেন, গাজার সংঘাত শেষ করার একমাত্র উপায় হলো হামাসকে ধ্বংস করা এবং অবশিষ্ট ৪৮ জন জিম্মিকে মুক্ত করা- যার মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির আহ্বান সরিয়ে রেখে দ্রুত সংঘাতের অবসান দাবি করেন। অন্যদিকে, হামাস জানিয়েছে, তারা কেবল অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি দেবে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের শর্তে। গাজায় যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা দক্ষিণ ইসরাইলে ঢুকে পড়ে প্রায় ১২০০ জনকে হত্যা করে- অধিকাংশই ছিল বেসামরিক এবং ২৫১ জনকে অপহরণ করে। এরপর থেকে বেশির ভাগ জিম্মিকে কাতার-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি বা অন্যান্য চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরাইলের পাল্টা হামলায় কমপক্ষে ৬৪,৮৭১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। তবে কতজন বেসামরিক আর কতজন যোদ্ধা তার বিভাজন মন্ত্রণালয় জানায়নি। হামাস নিয়ন্ত্রিত সরকার পরিচালিত এই মন্ত্রণালয়, যেখানে চিকিৎসকরা কাজ করেন, বলছে নিহতদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু।

হামাস নেতাদের ওপর আরও হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর
কাতারে হামলার পর হামাস নেতাদের বিরুদ্ধে আরও হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, তারা ‘যেখানেই থাকুক না কেন’ কোনো রকম সুরক্ষা পাবেন না। জেরুজালেমে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, প্রতিটি দেশেরই ‘নিজস্ব সীমার বাইরে গিয়েও আত্মরক্ষার অধিকার’ রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। কাতারে জ্যেষ্ঠ হামাস নেতাদের ওপর ইসরাইলের হামলা আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। হামাস জানায়, এই হামলায় ছয়জন নিহত হলেও শীর্ষ নেতারা বেঁচে গেছেন।

হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা আছে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেন,  আমরা একাই করেছি। শেষ। ওদিকে আরব নেতারা কাতারের প্রতি সংহতি জানাতে সম্মেলন করেছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না- এ প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কাতারে একটি বড় মার্কিন বিমান ঘাঁটি আছে এবং দেশটি গাজা যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

রবিবার নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক পশ্চিমা প্রাচীরের পাথরের মতোই স্থায়ী। ওদিকে ইসরাইলি সেনারা গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই বহু আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। প্রায় আড়াই লাখ ফিলিস্তিনি দক্ষিণে পালিয়ে গেছেন বলে দাবি আইডিএফের। তবে আরও কয়েক লাখ মানুষ শহরে রয়ে গেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, দক্ষিণ গাজাও নিরাপদ নয়। কারণ সেখানেও ইসরাইলি বিমান হামলা হয়েছে। কেউ কেউ দক্ষিণে গিয়ে তাঁবু ফেলতে না পেরে আবার গাজা সিটিতে ফিরে এসেছেন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/180297_Abul-9.webp

ফিলিস্তিনের পক্ষে জাতিসংঘের সামনে ইহুদিদের অবস্থান by তোফাজ্জল হোসেন

জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আসতে শুরু করেছেন। ম্যানহাটানে জাতিসংঘ ভবনের সামনে দুই সপ্তাহ ধরে ইহুদিরা ফিলিস্তিনের পক্ষ নিয়ে ইসরায়েলবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছেন।

গতকাল সোমবারও ইহুদি র‍্যাবাইরা (ইহুদিদের ধর্মীয় নেতা) গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে আন্দোলন করেছেন।

প্রতিবাদে শামিল হওয়া এক তরুণ র‍্যাবাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা এখানে ফিলিস্তিনের পক্ষে সমবেত হয়েছি। গাজায় যুদ্ধে ইহুদিরা শুরু থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে আসছে। আমরা তার বিরোধিতা করতে এখানে প্রতিদিন জড়ো হচ্ছি।’

জাতিসংঘ অধিবেশনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর। সেদিন থেকে ৩০ জন ইহুদি ধর্মীয় প্রতিনিধির অংশগ্রহণে প্রতিদিন এই প্রতিবাদ সমাবেশ চলছে। তাঁরা ঘণ্টা বাজিয়ে তাঁদের অবস্থানের জানান দিচ্ছেন। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান।

২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে সাধারণ অধিবেশনের মূল পর্ব ‘হাই-লেভেল জেনারেল ডিবেট’। চলবে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এতে বিশ্বের ১৯৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। আর সে পর্যন্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে ইহুদিদের কর্মসূচিও চালু থাকবে।

গতকাল এক র‍্যাবাই তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমি একজন ইহুদি র‍্যাবাই এবং আমরা সবাই সারা বিশ্বের সেই সব ইহুদিদের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছি, যাঁরা এই যুদ্ধ নিয়ে বিব্রত। যাঁরা এই যুদ্ধের বিপক্ষে। যাঁরা এই যুদ্ধের জন্য নানান সমস্যায় পড়ছেন। নেতানিয়াহু তাঁর নিজের স্বার্থে যুদ্ধের জন্য ইহুদি ধর্মকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনের পক্ষ নিয়ে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভের জেরে ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকটিভিস্ট মাহমুদ খলিলের গ্রিন কার্ড বাতিলের প্রক্রিয়া শুরুসহ অন্তত ৩০০ জনের ভিসা বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

তবে জাতিসংঘের সামনে হওয়া এই প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করার খবর পাওয়া যায়নি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-16%2Fua39frwm%2FUN-1.jpg?rect=34%2C0%2C1349%2C899&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিবাদ করছেন ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: প্রথম আলো

নতুন শর্তে কাবু কমিশন by আরিফুল ইসলাম

জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জটিলতা কাটছেই না। সনদ এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারছে না জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বরং দলগুলোর একের পর এক শর্তে কাবু হয়ে পড়েছে কমিশন। প্রথম দফা এক মাস মেয়াদ বাড়িয়েও কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি ঐকমত্যের জন্য গঠিত এই কমিশন। দ্বিতীয় দফা মেয়াদের একদিন আগে গতকাল কমিশন সভাপতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকেও চূড়ান্ত কোনো সুরাহা আসেনি। কয়েকটি দল কমিশনের মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে এই বৈঠকে। সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ফের বাড়ানো হচ্ছে কমিশনের মেয়াদ। সর্বশেষ ধাপে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হবে কমিশনের তরফে। কিন্তু ঐকমত্য কতোটা হবে এটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কমিশনের বৈঠকে অংশ নেয়া ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দুই ধরনের অবস্থান রয়েছে। বিএনপিসহ সমমনা দল ও জোট চায় সংবিধান সম্পর্কিত বিষয় ছাড়া অন্য প্রস্তাবগুলো নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা যায়। সংবিধান সম্পর্কিত বিষয় নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা ইসলামী দল, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল চায় নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান এবং বাস্তবায়ন করা। এই সনদের ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচন আয়োজনের দাবি এসব দলের।

সর্বশেষ গতকালের বৈঠক থেকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দলগুলোকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি এই কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। কমিশনের মেয়াদ ১৫ই আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সনদ চূড়ান্ত না হওয়ায় সরকার কমিশনের মেয়াদ এক মাস বাড়িয়ে ১৫ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার বৈঠকে দলগুলো ৮৪ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলে জানায় কমিশন। এরমধ্যে নোট অব ডিসেন্টও রয়েছে। ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে তৈরি হয় সংকট। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি তাদের নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এই জটিলতার কারণে সময় বাড়িয়েও সমঝোতায় পৌঁছা যাবে কিনা এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

গতকালের বৈঠকের পর বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হলে রিজিওনাল সিকিউরিটির জন্য থ্রেট হতে পারে। সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন কোনো ভাবেই একটা আরেকটি ওপর সম্পর্কিত নয়। সংস্কার সংস্কারের মতো চলবে, এটা কন্টিনিউ প্রসেস। বিচারেও টাইম লিমিট করা যায় না, তাতে অবিচার হবে তাহলে। সেটা চলবে, যে সরকারই আসুক, কিন্তু নির্বাচনকে এটা কন্ডিশনাল করা যাবে না। নির্ধারিত টাইমলাইনে নির্বাচন হতেই হবে।

তিনি বলেন, দুইদিন পরে টিকবে না, চ্যালেঞ্জ হয়ে যেতে পারে কোথাও এমন কোনো বিষয় আমরা রেখে যেতে চাই না। আমরা যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছি, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং হয়ে যাবে। প্রসিডিউলের জন্য বাস্তবায়নে একটু সময় লাগে।

ঐকমত্য হয়নি এমন ১৯টি সাংবিধানিক ইস্যু বাকি থাকার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এর মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ আমরা একমত হয়েছি। আমাদের বিবেচনায় ৭০ অনুচ্ছেদের ৪টি বিষয়ে এমপিদের স্বাধীনতা না থাকলে ভালো হয়। সর্বনিম্ন দু’টি বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে। নোট অব ডিসেন্টের ভাষা উল্লেখ করে সনদ তৈরি হচ্ছে এবং সেভাবে আমরা স্বাক্ষর করবো। যারা জনগণের ম্যান্ডেট পাবে তারা তাদের নোট অব ডিসেন্ট রক্ষা করে বাস্তবায়ন করবে। এটি কোনো জটিল বিষয় নয়।
দুই তিনটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া বাকিগুলো খুবই সাধারণ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো বাস্তবায়ন খুব সহজ। কিন্তু ফোরাম কোনটা? সাংবিধানিক বিষয়গুলো পরবর্তী সংসদ ছাড়া অন্য কোনো ফোরাম করতে পারে কিনা? এ ব্যাপারে আইনি পরামর্শ দিতে পারে সুপ্রিম কোর্ট। আমরা সেখানে যেতে পারি এবং সহায়তা নিতে পারি। এর বাইরে কিছু থাকলে জানান, আমরা একমত। আমরা সনদে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত আছি, তা আগেও বলেছি।

ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা ও শক্তিতে রূপান্তরিত করতে আরও বেশি নেগোশিয়েট করার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা কমেপ্রামাইজ করবো। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনো পন্থা বের করতে পারলে তাতে একমত হবো। প্রস্তুত করা চূড়ান্ত জুলাই সনদে ক্লারিক্যাল মিসটেক এবং কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। এটা আমরা কারেকশন করে দেবো, এটা মেজর কিছু নয়। তবে এটি জাতীয় দলিল, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, ঐতিহাসিক দলিল হবে, সেজন্য এটা নির্ভুল হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেসব বিষয়গুলো আলোচিত হয়নি, সেগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক হবে না। বিতর্ক যত কম করা যায়।

তিনি আরও বলেন, কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না, তেমন কোনো দলিল হতে পারে না, সংবিধানের ওপর সনদকে স্থান দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এর বাইরেও অনেক পন্থা থাকতে পারে যাতে আমরা এটার বৈধতা দিতে, আইনি ভিত্তি দিতে পারি। আপিল বিভাগের পরামর্শ নিতে পারি আমরা, এটা এক্সট্রা কনিস্টিটিউশনাল অর্ডার বা স্পেশাল কনিস্টিটিউশনাল অর্ডার করা যায় কিনা। তাহলে ভবিষ্যতে জুডিশিয়ারিতে এটা চ্যালেঞ্জ করলেও বলতে পারবে আমরা মতামত নিয়েছিলাম। এখন সেই পরামর্শ আপনারা দিতে পারেন, নাও পারেন।

বিএনপি’র এই নেতা বলেন, স্পেশাল কনিস্টিটিউশনাল অর্ডারে আপনি (প্রধান উপদেষ্টা) করলেন। আমরা কেউ কিছু বললাম না। ঐকমত্য কমিশন থেকে আমরা আপনাকে দায়িত্ব দিলাম, সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে আপনি সিদ্ধান্ত দেন। তারপর আপনি করলেন। কিন্তু যেকোনো একজন নাগরিক যদি এটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে কোথাও যায়, সেটা আপনার গ্লোবাল রেপুটেশন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আমরা অনেক আলোচনা করেছি, সেখান থেকে আপনি কোনো মতামত নিতে পারেন, সেই স্বাধীনতা আপনার আছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে আগামী নির্বাচন হলেই তা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে। দলের পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নের দু’টি উপায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে- একটি হলো প্রভিশনাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডার। অতীতে এটার নজির আছে। আরও একটি হলো গণভোট। এটার ইতিহাসও দেশে আছে। দলগুলো একমত হতে না পারলে গণভোটের মাধ্যমে মানুষ রায় দেবে।

জামায়াতের এ নেতা বলেন, তারা বিশ্বাস করতে চান, প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে। নির্বাচন নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে।

ছাত্র সংসদের দু’টি নির্বাচন নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন জানিয়ে আযাদ বলেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে যতটুকু আমরা লক্ষ্য করেছি, এটাকে আমরা একটি নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখতে চাই। এটার পর আবার জাতীয় নির্বাচনে পড়বে কিনা, সেই জায়গা থেকে আমাদের উদ্বেগের কথা আমরা জানাচ্ছি। যেন আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ একটি প্রশাসনব্যবস্থার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। তাহলেই আমাদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হবে। এজন্য আমরা বলতে চাই, আজকে যে সংস্কারের মধ্যদিয়ে জাতীয় সনদটা হতে যাচ্ছে, এটার একটা সমাপ্তি সুন্দরভাবে হোক।
ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে আযাদ বলেন, সহ-সভাপতি আলী রীয়াজের হাত দিয়েই যেন এটার সমাপ্তি হয়।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আমরা দীর্ঘদিন ধরে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। কিছু বিষয় ছিল যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। আর কিছু বিষয় আছে যেগুলো সংবিধানসংশ্লিষ্ট। যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় সেগুলো অর্ডিন্যান্স অথবা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোর অনেক বিষয় যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যাতে সংবিধানের মৌলিক কতোগুলো বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এত বড় পরিবর্তন যে, সেগুলোকে শুধু সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে টেকসই করা সম্ভব কিনা- তার আশঙ্কার জায়গাটি আমাদের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে।

এনসিপি’র এই নেতা বলেন, যেহেতু বাংলাদেশে ইতিমধ্যে হাইকোর্টে সংবিধানের সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সেগুলো বাতিল হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা সংবিধানে যে মৌলিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে আসছি তা কীভাবে টেকসই ও কার্যকর করা যায়, সেই ব্যাপারে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান রেখেছি পদ্ধতি ঠিক করার জন্য।
আখতার হোসেন বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে একটি গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান ও নতুনভাবে লিখিত ধারা-উপ-ধারা ও অনুচ্ছেদের মধ্যদিয়ে যে সংশোধনী ও সংস্কার প্রস্তাবে আমরা একমত হয়েছি, সেগুলো টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে একটা ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একটা ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার জন্য কমিশনের সভাপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আবেদন কমিশনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সবার কাছে প্রশ্নাতীত করে আমরা কমিশনের কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করতে পারি।

জুলাই সনদ নিয়ে সমঝোতায় আসতেই হবে: প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় আসতেই হবে। এখান থেকে বের হওয়ার উপায় নাই। যে সমঝোতার রাস্তা শুরু করেছি, তা থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়াও, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন হবে। সে নির্বাচন মহোৎসবের নির্বাচন হবে। যদি আমরা আমাদের এগুলো ফয়সালা করে ফেলতে পারি, তাহলে এটা মহোৎসব এবং জাতির সত্যিকার নবজন্ম হবে। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি হয়তো গায়ের জোরে বলছি, কিন্তু কথাটা ফেলে দেয়ার উপায় নেই। জাতি হিসেবে আমাদের নবযাত্রার সুযোগ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দিয়ে গেল, সেটার একমাত্র সমাধান হলো সমঝোতার পথে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ তৈরি করা।
তিনি বলেন, অনেকের মনে হয়তো কষ্ট হবে, কষ্ট হলেও মেনে নিচ্ছি। কিন্তু পরে শান্তি পাবেন, দেশ শান্তি পাবে। কারণ, দেশের শান্তি বড় শান্তি। আমরা বিতর্কের মধ্যে থেকে গেলে, সেটা কখন বিস্ফোরিত হবে। বিতর্কের মধ্যে থেকে কে কোন দিকে চালু করে দেবে, এটার কোনো ঠিক নেই।

ঐকমত্য কমিশন বিশ্বের জন্য নজির হিসেবে থাকবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটা যেন খুতওয়ালা নজির না হয়, এ আবেদন আমার। এমন নজির সারাবিশ্ব দেখবে এবং অনুসরণ করার চেষ্টা করবে। কারণ, আপনারা মূল কাজটা করে ফেলেছেন, সামান্য রাস্তা বাকি। সবকিছু নির্ভর করছে শেষ অংশটুকুর ওপরে।
রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে ড. ইউনূস বলেন, আপনারা দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছেন। বাকি রাস্তাটুকু যাতে সুন্দরভাবে সমাপ্ত করে পৃথিবীর জন্য নজির সৃষ্টি করে যাবেন। যে সমস্যা অতিক্রমের জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, সেটা শুধু আমাদের নয়, দুইদিন আগে নেপালে শুরু হলো, এরকম বহুজনের সমস্যা হবে। অতীতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তাই, আমাদের সমাধানের পথ সবাই মনোযোগসহকারে দেখবে।

ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নির্বাচন মহোৎসবের হবে, মহোৎসবের নির্বাচন হবে। যদি আমরা আমাদের এগুলো ফয়সালা করে ফেলতে পারি তাহলে এটা মহোৎসব এবং জাতির সত্যিকার নবজন্ম হবে।
ছাত্র-জনতা গণ-অভ্যুত্থানের আলাদিনের চেরাগের দৈত্য তৈরি করে দিয়েছে মন্তব্য করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমরা তার কাছে কী চাইবো? আমরা কি তার কাছে এককাপ চা চাইবো? না দুনিয়া পাল্টে ফেলতে চাইবো। এটি হলো আমাদের হাতে। কোনো বিষয় ছোট আকারে না রেখে, এই জাতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি করে দিয়ে যাবো। এ সুযোগটা এসেছে। সেখানে ছোটখাট বিষয়ের মধ্যে আটকে গিয়ে আমরা যেন মূল বড় জিনিস থেকে হারিয়ে না ফেলি। বড় জিনিসের জন্য যাই। এই জাতিকে আমরা ভালোভাবে চালু করে দিলাম এটা খালি উপর থেকে উঠবে, ডানে-বাঁয়ে দরকার নেই। ওই অংশটা করেন।

সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বৈরাচার আসার সব পথঘাট বন্ধ করা, যাতে কোনো দিক দিয়ে স্বৈরাচার আসতে না পারে। বাকিটা আমরা জানি। স্বৈরাচার বন্ধ করতে হলে সবাইকে একমত হয়ে কাজ করতে হবে। দ্বিমতের জায়গা নেই। দ্বিমত করলে সমাপ্ত করতে পারবো না।

সবাইকে একমত হয়ে সনদ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তাহলে নির্বাচন সার্থক হবে। যতই আমরা নোক্তা দিয়ে যাই কিন্তু আমাদের মহান ঐক্য দরকার। কী চাই সেটা ঠিক করলেই, কীভাবে করবে তা দৈত্য ঠিক করবে। কোনো অসুবিধা হবে না। আমরা বিশেষজ্ঞদের বলবো, এটা করে দাও। সে পথে অগ্রসর হতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, ওই দৈত্যকে আমরা বড় কাজটা দেবো। যেটা আর কোনোদিন চাইবারও সুযোগ পাবে না। এ দৈত্য একবারই পাচ্ছি আমরা। আমাদের মনের সমস্ত আশা পূরণের দায়িত্ব তার ঘাড়ে দিয়ে দেবো। সে দিকে আমরা যেতে চাই।

ড. ইউনূস বলেন, ভেতরে কোনো রকমের দুশ্চিন্তা রেখে আমাদের যেন নির্বাচনে ঢুকতে না হয়। উৎসব এখান থেকে শুরু হবে। নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথামার্ধেই হবে। এটাই হলো পথ। আমরা হাইওয়ে বানিয়ে ফেলেছি। এ পথেই যাবো। আমাদের আবেদন সব পথঘাট বন্ধ করতে হবে, যাতে কোনো জায়গা দিয়ে ঢুকতে (স্বৈরাচার) না পারে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজটা করে ফেলতে পারলে আমাদের দেশ নিশ্চিন্ত হবে এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আমাদের থেকে শিখতে আসবে।

ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম ভালোভাবে শেষ করার অনুরোধ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এ কাজ যেন নিখুঁত ও নির্দোষ হয়। এমনভাবে করবো যাতে তা হতে নতুন জাতি জন্মগ্রহণ করবে। আপনারা নতুন জাতির সূতিকাগার তৈরি করে দিলেন। মনের মধ্যে যাতে খুতখুতি না নিয়ে সবাই যাতে নির্বাচন পর্যন্ত যেতে পারে সে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা।

কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (জাতীয় ঐকমত্য কমিশন) মনির হায়দারের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন প্রমুখ।

mzamin

ইরান-পাকিস্তান সম্পর্কের এই হঠাৎ-ঘনিষ্ঠতা কেন by জুনায়েদ এস. আহমদ

যদি কখনো জানতে চান, দুটি দেশ আসলে কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকে, তবে তাদের বক্তব্য শোনার দরকার নেই। বরং খেয়াল করুন, কোন কোন শব্দ তারা আলাদা করে বলতে চায় না। ইরান ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে একটি শব্দ বারবার আরেকটির সঙ্গে সন্দেহজনকভাবে অবিচ্ছেদ্য জুটিতে হাজির হয়—‘বাণিজ্য’ ও ‘নিরাপত্তা’। আর যখন ‘বাণিজ্য’-এর ঠিক পরেই সব সময় ‘নিরাপত্তা’ আসে, তখন ধরে নেওয়া যায় যে প্রকৃত চালিকা শক্তি বাণিজ্য নয়।

কাগজে-কলমে তেহরান ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় জোট হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। দুটি বড় মুসলিম দেশ, প্রায় ৯০০ কিলোমিটারের একটি যৌথ সীমান্ত, একই ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আংশিক মিল থাকা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বন্ধন। বাস্তবে তাদের ইতিহাস হলো দূরত্ব, মাঝেমধ্যে সন্দেহ আর ‘সহযোগিতা’ কেবল তখনই হয়, যখন কোনো সাধারণ সমস্যা মেটাতে হয় অথবা কোনো সাধারণ হুমকি এড়াতে হয়।

তবু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পর্যবেক্ষকেরা অদ্ভুত কিছু লক্ষ করেছেন: বছরের পর বছর ধরে সবচেয়ে প্রো-ওয়াশিংটনপন্থী পাকিস্তানি সামরিক শাসন, যার নেতৃত্বে আছেন চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল আসিম মুনির, তিনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে উষ্ণ হাসি বিনিময় করছেন। ফেব্রুয়ারিতে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনার সময় ইরান দৃঢ়ভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। এপ্রিল মাসে পাকিস্তান সরব হয়ে নিন্দা করে ইরানের ওপর ইসরায়েলের ১২ দিনের সামরিক হামলার। কোনো সাধারণ পর্যবেক্ষকের কাছে এটি দীর্ঘদিনের প্রাপ্য ভ্রাতৃসুলভ আলিঙ্গনের মতো মনে হতে পারে। আসলে তা নয়।

বালির ওপর দাঁড়ানো সম্পর্ক

কেন এমনটা হয়েছে তা বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭৯ সালে—যে বছর মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল, যার প্রভাব আজও চলছে। সেই বছর ইরানের ইসলামি বিপ্লব শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে, ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং এক বিপ্লবী মতাদর্শসম্পন্ন শিয়া ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য মিত্র ও সুন্নি ইসলামের স্বঘোষিত অভিভাবক সৌদি আরব ইরানের প্রভাব প্রতিহত করার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সুন্নি ধর্মীয় আন্দোলনে অর্থায়ন শুরু করে।

এর অংশ হিসেবে সৌদি-ইরানি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় পাকিস্তান। ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে রিয়াদ ও তেহরান উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল এবং রক্তাক্ত।

১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হঠাৎ বেড়ে যায়। সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত অনেক উগ্র সুন্নি গোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানায়। এর জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তারা পাকিস্তানে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। তথাকথিত ‘ভ্রাতৃত্ব’-এর গল্পটি ক্রমেই এক ভদ্র মুখোশের মতো মনে হতে থাকে, যার আড়ালে পাকিস্তানের মাটিতে এক বিপজ্জনক প্রক্সি যুদ্ধ চলছিল।

ফলাফল ছিল হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, সামাজিক আস্থার ক্ষয় এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের স্থায়ী গভীরতা—যা আজও পূর্ণাঙ্গভাবে নিরাময় হয়নি। ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যে যে কোনো ‘উষ্ণ’ সম্পর্ক প্রায় সব সময়ই ছিল লেনদেনভিত্তিক—যখন নিরাপত্তার কারণে দুই দেশ একে অপরের প্রয়োজন অনুভব করত, তখনই সেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতো, মুসলিম ঐক্যের কোনো যৌথ স্বপ্ন থেকে নয়।

ইমরান খান অধ্যায়

২০১৮ সালে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন যে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পাকিস্তানকে মুসলিম বিশ্বের পুনর্জাগরণের অংশ করার পক্ষে। তিনি ইরানকে এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখেছিলেন, বিশেষ করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর দমবন্ধ করা আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে।

তবে ইমরানের শাসনামল মিলে যায় তীব্র আঞ্চলিক অস্থিরতার সঙ্গে: ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সুলাইমানির হত্যাকাণ্ড এবং পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা বৃদ্ধি। ইমরান তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবেশ কিছুটা উন্নত করলেও তাঁর বৃহত্তর আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি হঠাৎ থেমে যায় ২০২২ সালের এপ্রিলে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে। এটাকে ব্যাপকভাবে ওয়াশিংটন-সমর্থিত একটি ‘রেজিম চেঞ্জ’ হিসেবে দেখা হয়, যা পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক নেতৃত্ব দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল। সেনাবাহিনী ইমরানের স্বাধীন মনোভাব নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিল।

এরপর আসেন জেনারেল আসিম মুনির—এমন এক ব্যক্তি, যিনি ওয়াশিংটনের কক্ষপথে থাকতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অথচ কী এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে! এখন তিনিই ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে চায়ের কাপ ঠোকাচ্ছেন।

মূল কর্মসূচি: নিরাপত্তা

হাসি, করমর্দন, ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির’ প্রেস কনফারেন্স—সবই দেখতে সুন্দর। কিন্তু আসল আলোচনা হচ্ছে নিরাপত্তা নিয়ে এবং দুই পক্ষই সেটা জানে।

ইরানের অবস্থান স্পষ্ট এবং তা বহু দশক ধরে নানাভাবে পুনরাবৃত্ত হয়েছে: ‘আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লড়াইয়ে জড়াবেন না, আপনার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক কার্যকলাপ চালাতে দেবেন না এবং আমাদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আপনার মাটি ব্যবহার করতে দেবেন না।’

এটি কোনো তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়। তেহরান খুব ভালো করেই মনে রেখেছে, বিশেষ করে ২০০০-এর দশকে কীভাবে ওয়াশিংটন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশকে ইরানবিরোধী অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে ছিল ইরানি বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা, মুজাহেদিন-ই-খালকে (এমইকে) গোপন পৃষ্ঠপোষকতা এবং ইরানের অভ্যন্তরে সমস্যা তৈরিতে আগ্রহী অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহায়তা।

বড় পরিহাস হলো এই একই নেটওয়ার্কগুলোর কিছু পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়। ৯/১১–এর পর, যখন আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ল, তখন বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী কেবল ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য নয়, পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে।

ইরান বহু আগেই এই দ্বিমুখী খেলাটি বুঝে গেছে। আর তেহরান যথেষ্ট বাস্তববাদী। ‘প্রো-আমেরিকান’ নেতৃত্ব থাকলেও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ইরান। কিন্তু এরও কিছু ‘রেড লাইন’ আছে।

বেলুচিস্তান: উপেক্ষা করার মতো নয় এমন এক বারুদভান্ডার

পাকিস্তানের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডজুড়ে থাকা বেলুচিস্তানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশের কম বাস করে। অথচ এ প্রদেশ ইসলামাবাদের জন্য এক অবিরাম মাথাব্যথা। প্রদেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত উপকূলরেখায় সমৃদ্ধ হলেও পাকিস্তানের সবচেয়ে অনুন্নত ও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল।

বেলুচিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আসলে পশতুন, বেলুচ নয়। কিন্তু দশকের পর দশক অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও কঠোর সামরিক অভিযানের ফলে বেলুচ জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহই শিরোনাম দখল করে থাকে।

ইরানের দৃষ্টিতে বেলুচিস্তান একটি যৌথ দুর্বলতা। পাকিস্তানি বেলুচিস্তানের সন্নিহিত ইরানি সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার শিকার হতে হয়েছে, যাদের অস্ত্র ও অর্থ জোগান প্রায়শই পাকিস্তানি ভূখণ্ডের মাধ্যমে বিদেশি শক্তি দিয়েছে বলে তেহরান অভিযোগ করে আসছে।

কেন এখন

ইরান–পাকিস্তান সম্পর্কের এই হঠাৎ–ঘনিষ্ঠতা কোনো শূন্যতায় ঘটছে না। মধ্যপ্রাচ্য এখন টানটান উত্তেজনায় ভরা। গাজায় গণহত্যা দীর্ঘায়িত হয়েছে, ইরান ও ইসরায়েল ক্রমশ সরাসরি হামলা চালাচ্ছে আর যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরজুড়ে নতুন করে সেনা মোতায়েন করছে। তেহরান আঞ্চলিক সব পক্ষকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে—যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বাধে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সম্পর্ক রয়েছে, নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন অভিযানের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ইতিহাসের কারণে পাকিস্তান তেহরানের নজরদারির তালিকায় সবার ওপরে। জেনারেল মুনিরের পাকিস্তান সুবিধাজনক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মেলাতে খুশি হলেও, সামরিক কর্তৃত্বশীল সরকার মোটেও ইরানের সঙ্গে খোলামেলা সংঘাতে যেতে চাইবে না; বিশেষ করে যখন দেশটি রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল, অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে।

তাই ‘বাণিজ্য আলোচনা’ ও ‘যৌথ প্রকল্প’ নিয়ে যত আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আসলে অর্থনৈতিক সংহতির চেয়ে আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা; একধরনের ‘কূটনৈতিক বিমা’, যাতে আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে গেলে পাকিস্তান ইরানের টার্গেট তালিকা থেকে বাদ থাকে।

ভ্রাতৃত্বের মরীচিকা

মুসলিম ঐক্যের যত উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা দেওয়া হোক না কেন, ইরান–পাকিস্তান সম্পর্ক কখনোই অটল ভ্রাতৃত্বের ওপর দাঁড়ায়নি। এটি মূলত ভৌগোলিক সান্নিধ্য সামলানোর বিষয়। দুই পক্ষই জানে—একজনকে বঞ্চিত করলে ঝুঁকি আছে; কিন্তু কেউই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ইতিহাস ভুলে যায়নি। ইরান জানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান জানে ইরান তাদের সীমান্তের ভেতরে এমন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা প্রয়োজনে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

যে সমাপ্তি কেউ মুখে বলবে না

কূটনীতিকেরা ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি’ নিয়ে কথা বলতেই থাকবেন। কারণ, সেটাই নিরাপদ বক্তব্য। সত্য হলো এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে ‘ভ্রাতৃত্ব’ অনেক সময় মরুভূমির ওপর ভাসমান মরীচিকার মতো। কাছে গেলে দেখা যায়, ওটা আসলে পারস্পরিক সন্দেহ, ঐতিহাসিক ক্ষোভ আর বাস্তবমুখী হিসাবনিকাশের রূঢ় জমি।

পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা হয়তো ভাবছেন ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা আর তেহরানের সতর্কবার্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা যাবে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, ৯০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক রক্তপাত থেকে শুরু করে বেলুচিস্তানের ছায়াযুদ্ধে, এই অঞ্চলে যদি আপনি একসঙ্গে দুই ‘মাফিয়া ডন’-এর সেবা করতে যান, দুজনই একসময় আনুগত্যের প্রমাণ চাইবে। আর সেদিন ‘বাণিজ্য’ কারও চিন্তাতেই থাকবে না।

* অধ্যাপক জুনায়েদ এস. আহমদ, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশনের পরিচালক।
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২ আগস্ট ২০২৫ পাকিস্তান সফর করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২ আগস্ট ২০২৫ পাকিস্তান সফর করেন। ছবি: এএফপি

হুঁশিয়ারি মস্কোর: এবার ইউরোপকে তাড়িয়ে বেড়ানোর হুমকি রাশিয়ার

রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউরোপকে সম্পদ দখলের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার রাশিয়া বলেছে, তাদের সম্পদ দখলের চেষ্টা করলে যেকোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েক শ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনকে সহায়তা করার নতুন উপায় খুঁজছে।

২০২২ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করে এবং রাশিয়ার ৩০০ থেকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার জব্দ করে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন চান, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটানোর জন্য রাশিয়ার জব্দ করা অর্থ ব্যবহার করার নতুন উপায় খুঁজে বের করুক ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

মার্কিন গণমাধ্যম পলিটিকোর খবরে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা থাকা রাশিয়ার অর্থ ব্যবহার করে ইউক্রেনের জন্য ক্ষতিপূরণ ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে ইউরোপীয় কমিশন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ টেলিগ্রামে লিখেছেন, রাশিয়ার সম্পদ দখল করলে এই শতকের শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে তাড়া করবে রাশিয়া। এর পাশাপাশি যারা রাশিয়ার সম্পদ দখলে জড়িত থাকবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোকেও ছাড়া হবে না। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া সম্ভাব্য সব উপায়ে, সব আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আদালতে এবং আদালতের বাইরেও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে তাড়া করবে। মেদভেদেভ বর্তমানে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাশিয়ার দাবি, তাদের সম্পদ দখল মানে পশ্চিমাদের চুরি করা। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বন্ড ও মুদ্রার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর বক্তব্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধে ইউক্রেন ধ্বংসের জন্য রাশিয়াই দায়ী। তাই মস্কোর সঙ্গে জোর করে হলেও ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। তবে কিছু ব্যাংকার সতর্ক করে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দের নজির বিদেশি রাষ্ট্রগুলোকে পশ্চিমা দেশগুলোর বন্ড কেনায় নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগে আস্থা কমতে পারে।

মেদভেদেভ এ মাসের শুরুর দিকে বলেছিলেন, রাশিয়া আরও ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দখল করবে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সম্পদ দখলের পথেও হাঁটবে। এর আগে লন্ডন জানায়, রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ থেকে সংগৃহীত প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ইউক্রেনের অস্ত্র কেনায় তারা ব্যয় করেছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আরআইএ জানিয়েছে, পশ্চিমারা রাশিয়ার অর্থনীতিতে মোট ২৮৫ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ করেছে। রাশিয়ার সম্পদ দখল হলে পশ্চিমাদের এ বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

‘কিয়েভের উসকানি’

রোমানিয়ায় ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনাকে ইউক্রেনের উসকানি বলে মন্তব্য করেছে রাশিয়া। রোমানিয়ার রাশিয়ার ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনায় দেশটির

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানো হয়। রোমানিয়ায় অবস্থিত রুশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ ঘটনাকে ইউক্রেনের উসকানি বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির লিপায়েভ বলেন, ড্রোন অনুপ্রবেশের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার অভিযোগ ভিত্তিহীন।

দিমিত্রি মেদভেদেভ
দিমিত্রি মেদভেদেভ। ছবি: এএফপি

কেন নেপালের এ সংকট দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ নেপালের প্রধানমন্ত্রী (পদত্যাগ করা) কে পি শর্মা অলি গত রোববার রাজধানী কাঠমান্ডুতে পরবর্তী দিন এক বড় বিক্ষোভ আয়োজন করায় তরুণদের উপহাস করেছিলেন। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন তাঁরা।

অলি বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ‘জেন-জি’ (জেনারেশন জেড) বলে মনে করেন এবং তাঁরা যা চান, তা-ই দাবি করতে পারেন।

৪৮ ঘণ্টার কম সময়ে, অলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। যে ‘জেন-জি’ আন্দোলনকে তিনি অবহেলার সঙ্গে দেখেছিলেন, তাঁরাই এখন নেপালের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছেন।

অলির ওই বক্তব্যের পরদিন গত সোমবার পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জেরে মঙ্গলবার বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা সংসদ ভবন এবং কয়েকজন রাজনীতিবিদের বাড়িতে আগুন দেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীও চাপের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনিও পদত্যাগ করেন। সোমবার ও মঙ্গলবারের সহিংসতায় মোট ৩১ জন নিহত হয়েছেন।

নাটকীয় এ ঘটনাপ্রবাহ নেপালকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাম্প্রতিকতম কেন্দ্র বানিয়েছে। এর আগে তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনে ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও ২০২৪ সালে একই অঞ্চলের বাংলাদেশে সরকারের পতন ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু তিন কোটি জনসংখ্যার দেশটিকেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বকে প্রভাবিত করবে। কারণ, নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস খুবই পরিবর্তনশীল ও উত্তাল এবং দেশটি ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে রাখার চেষ্টা করে থাকে।

নেপালে কী ঘটছে

৮ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার তরুণ সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা তাঁদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ কমপ্লেক্সে ঢুকে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও জলকামান ব্যবহার করে। এতে নিহত হন অন্তত ১৯ জন। এ ঘটনা দেশজুড়ে তরুণদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

মঙ্গলবার আরও বড় ও ভয়ানক বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজনীতিবিদদের বাড়ি ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে আগুন লাগান বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। নেপালের সবচেয়ে বড় সংবাদমাধ্যম কান্তিপুর পাবলিকেশন্সের ভবনেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এদিন দুপুরের দিকে অলি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে ‘জেন-জি আন্দোলন’ হিসেবে নিজেদের অভিহিত করা বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা এখন সংসদ ভেঙে দেওয়া, নতুন নির্বাচন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও ৮ সেপ্টেম্বরের গুলির নির্দেশদাতাদের বিচার দাবি করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে সেনারা রাস্তায় নেমেছেন এবং কাঠমান্ডুতে কারফিউ জারি করা হয়েছে।

নেপালে এ ধরনের বড় ছাত্র আন্দোলন নতুন নয়। দেশটির আধুনিক ইতিহাস ছাত্র আন্দোলন, রাজপ্রাসাদের হস্তক্ষেপ ও সহিংসতায় ভরা। এর মধ্যে রয়েছে এক দশকের গৃহযুদ্ধও।

রানা শাসন থেকে পঞ্চায়েত যুগ

কিছু শিক্ষিত নেপালি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ এ পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতায় তাঁরা নেপালে রানাদের সরাসরি শাসন অবসানের বৃহত্তর আন্দোলনে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত হন।

১৯৫১ সালে রানাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন নেপালের প্রথম আধুনিক বিপ্লবে রূপ নেয়। রানাদের একটি চুক্তির মাধ্যমে পরোক্ষ শাসন মেনে নিতে হয়। পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রাজা ত্রিভুবন দেশে ফেরেন। রানা ও তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস (এনসি) মিলে একটি সরকার গঠন করে।

১৯৫৯ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়। এনসির বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালা প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু এক বছর পরই রাজা মাহেন্দ্র বীরবিক্রম কৈরালা সরকারের পতন ঘটান ও প্রায় তিন দশক ধরে রাজনৈতিক দলবিহীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করেন।

রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় ছাত্র আন্দোলন একমাত্র প্রতিবাদের পথ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন হয়।

ধীরে ধীরে আন্দোলন পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পতন ঘটায় ১৯৯০ সালে এবং সংসদীয় রাজনীতির দরজা আবার খুলে যায়।

সশস্ত্র বিদ্রোহ ও প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব

১৯৯৬-২০০৬, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য লড়াই চালায়। এতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০০৬ সালে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও ছাত্রদের আন্দোলন রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। এতে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ২০০৮ সালে নেপালকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।

এর পর থেকে নেপালের তিনটি প্রধান দল—কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (সম্মিলিত মার্ক্সবাদী ও লেনিনবাদী) তথা সিপিএন-ইউএমএল, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) তথা সিপিএন-এমসি এবং নেপালি কংগ্রেসের (এনসি) আট নেতা দেশকে ১৪ বার নেতৃত্ব দেন। অলি চতুর্থবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অলি সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিক্ষোভ ফুঁসে ওঠার কারণ হলেও, জেন-জি আন্দোলন বহু বছর ধরে জমে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন।

কাঠমান্ডুর অনুসন্ধানী সাংবাদিক রজনীশ ভান্ডারি বলেন, এ আন্দোলন শাসকদের দুর্নীতি, খামখেয়ালি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভকেই তুলে ধরেছে।

‘এ আন্দোলন দেখায়, নেপালের তরুণেরা শাসকদের প্রতি ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন। কারণ, তাঁরা তরুণদের দাবির প্রতি কর্ণপাত করেননি, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেননি এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ চালিয়ে গেছেন’, রজনীশ বলেন আল-জাজিরাকে।

কাঠমান্ডুর নাগরিক ও ডিজিটাল অধিকারকর্মী আশীর্বাদ ত্রিপাঠী বলেন, ‘এ বিক্ষোভ এক রাতের ঘটনা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি। তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রবীণ নেতাদের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জমে ছিল তরুণদের। নেতারা শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদে পালাবদল ঘটিয়েছেন, ঠিক যেন মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা।’

প্রতিবেশী দেশ ও ক্ষমতার রাজনীতি

নেপালে যা ঘটছে, তা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

নেপাল পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৮৮৫ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ১৯৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। দেশটি দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে অবস্থিত-উত্তরে চীন; দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত।

ঐতিহাসিকভাবে প্রতিবেশী ভারতের ঘনিষ্ঠ হলেও দেশটির সঙ্গে নেপালের রাজনৈতিক সম্পর্ক দেশি রাজনীতির সঙ্গে বদলে যায়। অলি বেশির ভাগ সময় চীনের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাঁর পদত্যাগ কাঠমান্ডুতে রাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন দুয়ার খুলেছে।

সমাজবিজ্ঞানী লোকরঞ্জন পরাজৌলি বলেন, পরবর্তী শাসক কে হচ্ছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে সম্ভবত তিনি ‘স্বাধীন’ ব্যক্তি হবেন, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন ও সেনাবাহিনীর আস্থাভাজন।

কিছু বিশ্লেষক সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকিকে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী প্রধান হিসেবে দেখছেন। অন্যরা কাঠমান্ডুর মেয়র ও ৩৫ বছর বয়সী র‍্যাপ সংগীতশিল্পী বালেন্দ্র শাহকেও (বালেন শাহ নামে বেশি পরিচিত) বিকল্প মনে করছেন।

যা–ই হোক, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাঠমান্ডুর একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, নতুন নেতা যে-ই হোন না কেন, ভারত ও চীন দেশটিতে স্থিতিশীলতা এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করবে, এমন সরকার চাইবে।

ত্রিপাঠী বলেন, তবে নেপাল সব সময় দুই প্রতিবেশী দেশ-ভারত ও চীনের সঙ্গে সমতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

আঞ্চলিক হিসাব–নিকাশ

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশেষজ্ঞ আলী হাসান বলেন, অলির পতন বেইজিংয়ের জন্য ধাক্কা ও নয়াদিল্লির জন্য সুযোগ হতে পারে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির কিছু অংশ নেপালের রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা মনে করে, রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ফেরানো উচিত। তবে ‘জেন-জি আন্দোলন’ তাদের (রাজতন্ত্রপন্থীদের) পক্ষে নয়।

এ বছরের শুরুতে নেপালের সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র কাঠমান্ডুতে ব্যাপক গণসংবর্ধনা পান। এতে বোঝা যায়, নেপালি সমাজের একটি অংশ এখনো সাবেক শাসকদের সমর্থন করে। হাসান বলেন, যদি বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলন লাভবান হয়, তবে ভারতের বিজেপিও এর সুফল পেতে পারে।

তবে আলী হাসান আরও বলেন, অলিকে সরিয়ে দেওয়া ‘জেন-জি’ বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা জ্ঞানেন্দ্রর প্রত্যাবর্তনের পক্ষে নন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানও নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মনোযোগ দিয়ে দেখছে। পাকিস্তানের সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও তা কৌশলগত গুরুত্বের মধ্যেই সীমিত।

তবু নেপালের শাসকেরা মাঝেমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করেছেন ভারতকে মনে করিয়ে দিতে যে তাঁদেরও আঞ্চলিক বিকল্প আছে। ১৯৬০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সরকার কৈরালা সরকারকে বরখাস্ত করায় নেপালের রাজা মাহেন্দ্রের সমালোচনা করেছিল। এক বছর পর নেপালের রাজা পাকিস্তান সফর করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে উষ্ণ আতিথ্য প্রদান করেন।

অতিসম্প্রতি, চলতি বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় যখন বন্দুকধারীরা ভারতশাসিত কাশ্মীরে ২৬ জনকে হত্যা করে, নেপাল পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির একটি প্রতিনিধিদলকে অভ্যর্থনা জানায়। এতে নয়াদিল্লির ভ্রু কুঁচকে যায়। ভারতের দৃষ্টিতে অলি সব সময় চীনের (যা পাকিস্তানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র) সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

পাকিস্তানও সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখেছে, বিশেষ করে ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে সংসদে আস্থা ভোটের মাধ্যমে সরানোর পর। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেপালের বর্তমান সংকট পাকিস্তানের শাসক মহলকেও উদ্বিগ্ন করতে পারে।

আলী হাসান বলেন, ‘পাকিস্তানের অভিজাতরা হয়তো ভাবছেন, তাঁদের ক্ষমতা কতটা নিরাপদ। কারণ, তাঁদের ওপর প্রায়ই এমন অভিযোগ আসে, যা বাংলাদেশি, শ্রীলঙ্কান ও নেপালি বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা তাঁদের শাসকদের বিরুদ্ধে জানিয়েছেন, যেমন সরকার শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে, সাধারণ মানুষের কথা উপেক্ষা করে ও অত্যন্ত স্বৈরাচারী।’

তবে নাম না প্রকাশ করার শর্তে অনিচ্ছুক কাঠমান্ডুর একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, নেপালের দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন নেতার প্রধান অগ্রাধিকার হবে না, তিনি যে-ই হোন। তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে নেপালের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু ভারত বা চীনের মতো তা নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলে না। এ ছাড়া নেপালের সরকারগুলোর পাকিস্তানের ব্যাপারে কোনো বিশেষ নীতি নেই।’

নেপালের পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা
নেপালের পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সাময়িকী ক্যালকালিস্টের স্বীকারোক্তি: ইরানের সাথে যুদ্ধের পর থেকে কোনো বিদেশী পর্যটক ইসরায়েলে আসেননি

পার্স টুডে - একটি ইহুদিবাদী সংবাদপত্র স্বীকার করেছে যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধ সেখানকার ইহুদিবাদীদের পর্যটন শিল্প ও দেশীয় অর্থনীতিকে গুরুতর বিপদের মধ্যে ফেলেছে।

ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সংবাদপত্র "ক্যালকালিস্ট" একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে ইসরায়েলি পর্যটন শিল্পের নজিরবিহীন সংকটের কথা তুলে ধরেছে।

ফার্স নিউজ এজেন্সির উদ্ধৃতি দিয়ে পার্স টুডে জানিয়েছে, "ক্যালকালিস্ট"-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি ইসরায়েলের বৃহত্তম হোটেল কমপ্লেক্স, ফ্যাটাল হোটেল নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতার ওপর সরাসরি ও গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা ইসরায়েলি পর্যটন শিল্পের অবস্থার এক অভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

ক্যালকালিস্ট আরও বলেন যে এই সংকটজনক পরিস্থিতির কারণে বৃহৎ ফ্যাটাল হোটেল নেটওয়ার্ক তাদের বার্ষিক রাজস্ব পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে।

হোটেল খালি থাকা ও বেকারত্ব তীব্রতর হওয়া


ক্যালকালিস্ট লিখেছে: ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইসরায়েলের ফ্যাটাল হোটেলগুলিতে অতিথি আগমন ও কর্মসংস্থানের হার মাত্র ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা প্রায় ৭২ শতাংশ ছিল এবং এটা লক্ষণীয় যে এই সময়কালটিকে ঐতিহ্যগতভাবে পর্যটনের সর্বোচ্চ ঋতু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি বসন্তকালীন ছুটি ও ইস্টার  উদযাপনের সময়। ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সংবাদপত্র জানিয়েছে যে অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে হোটেল ভাড়া নেয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় স্পষ্টতই বিদেশী পর্যটকদের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নির্দেশিত হয়েছে, অতীতে এ সমস্যা অভ্যন্তরীণ শরণার্থীদের গ্রহণ করে আংশিকভাবে পূরণ করা হয়েছিল, কিন্তু এবার এই সমাধানও পরিস্থিতি বাঁচাতে অক্ষম।

ইরানের সাথে যুদ্ধের পর নানা ধরনের ক্ষতি

হিব্রু ভাষার সংবাদপত্রটি আর্থিক তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে যে ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ বাজারে ফ্যাটালের মূল পরিচালন মুনাফা ২৫ শতাংশ কমে ১১৩ মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৩০.৫ মিলিয়ন ডলার) হয়েছে এবং কেবল জুন মাসে ইরানের সাথে যুদ্ধের ফলে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১৩.৫ মিলিয়ন ডলার) ধরা হয়েছে। এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে, কিছু ইসরায়েলি হোটেল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন হোটল মালিকরা। একই সময়ে বিদেশী পর্যটক ও বিদেশী নানা গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে বুকিং বাতিলকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বার্ষিক আয় হ্রাসের পূর্বাভাস

নতুন অনুমান অনুসারে, ইসরায়েলি হোটেল কোম্পানি ফ্যাটাল হোটেলস তাদের বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস ৮.১ থেকে ৮.৩ বিলিয়ন শেকেল (২.১৮ থেকে ২.২৪ বিলিয়ন ডলার) কমিয়ে এনেছে এবং পরিচালন মুনাফা ২.৭৫ থেকে ২.৯ বিলিয়ন শেকেল (৭৪২.৫ থেকে ৭৮৩ মিলিয়ন ডলার) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদেশী পর্যটকদের প্রত্যাবর্তনের জন্য অন্ধকার পূর্বাভাস

ইসরায়েলি সংবাদপত্র ক্যালকালিস্ট তাদের প্রতিবেদনের শেষাংশে বিদেশী পর্যটকদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করে বলেছে, ফ্যাটাল হোটেল চেইন বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এবং উপরন্তু, ইউরোপীয় হোটেল বা রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ তহবিল থেকে অতিরিক্ত আয়ও ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ বাজারের ব্যাপক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে না। ক্যালকালিস্টের মতে, ইসরায়েলের পর্যটন শিল্প, যা গত কয়েক বছরের উত্তেজনাপূর্ণ আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছিল তা এখন আরও গভীর পতনের সম্মুখীন হচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদে এর পুনরুদ্ধারের কোনও স্পষ্ট আশা নেই।

https://media.parstoday.ir/image/4c989356a18cb42myk5_800C450.jpg
ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সাময়িকী ক্যালকালিস্টের স্বীকারোক্তি: ইরানের সাথে যুদ্ধের পর থেকে কোনো ইসরায়েলে ভ্রমণ করেনি

বিএনপি’র প্রতিপক্ষ বিএনপি by কিরণ শেখ

বিএনপি’র প্রতিপক্ষ এখন অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়। দলটির প্রতিপক্ষ এখন নিজের দলের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে। সারা দেশে দখল, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এখন নিজ দলের নেতাকর্মীরা একে অপরের দুশমন। এর সঙ্গে কমিটি গঠন ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষ এবং মারামারি প্রায় প্রতিনিয়তই নিজেদের মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে। আছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও। রয়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক এক আসনে ৩ থেকে ৪ জন করে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তারা একে-অন্যের প্রতিযোগী হয়ে মাঠে নেমেছেন। নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় দল হিসেবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন নেতারা। তাদের ভাষ্য- দখল, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় কর্মী কিংবা নেতার যেমন সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, একইসঙ্গে মানুষের কাছে বিএনপি’রও ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। এসব ঘটনা যত বেশি সংঘটিত হবে বিএনপি’র প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস তত বেশি কমে আসবে। এই সুযোগ কাজে লাগাবে অন্যরা। যদিও দখল এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে রয়েছে বিএনপি’র হাইকমান্ড। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সারা দেশে দল এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের চার থেকে সাড়ে চার হাজারেরও অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের পাঁচ নেতা মানবজমিনকে জানিয়েছেন, প্রায় প্রতিদিন সারা দেশে কোথাও না কোথাও বিএনপি’র নেতাকর্মীদের দ্বারা দখল এবং চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে যেগুলো প্রকাশ্যে আসছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। বাকিগুলোর বিষয়ে কেউ কিছু জানছে না। কিন্তু ভুক্তভোগী এবং আশপাশের মানুষগুলো এই ঘটনা দেখছে। যারা দেখছে বা জানছে তারা তো আর বিএনপি’র প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস রাখতে পারছে না। যদিও বিএনপি’র হাইকমান্ড বারবার নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন। সবাইকে ধৈর্য ধরতে এবং জনগণের সঙ্গে থাকতে বলেছেন। এরপরও কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি এসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন।   

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমরা তো সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেখানে যে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, সেটা আমাদের দল থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে দায়ী কাউকে পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান মানবজমিনকে বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নিচ্ছি। এটা তো বিএনপি’র একার ব্যাপার না। এটা হলো সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপার। যদি সরকার মনে করে, চাঁদাবাজি হচ্ছে, সরাসরি তাকে আইনের আওতায় নিয়ে নেবে। এটা তো সরকারের করা দরকার। আর একটা বড় দলের প্রার্থী তো অনেক থাকবে। এটা সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সমন্বয়ের মাধ্যমে যতটুকু ঠিক করা যায়, সেই চেষ্টা আমরা করছি।

ওদিকে, ৩রা সেপ্টেম্বর ফেনীর পরশুরামে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মঞ্চের সামনে বসাকে কেন্দ্র করে দলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিএনপি’র দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সাব-রেজিস্ট্রার অফিস দখল করে চাঁদাবাজি, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই সংঘর্ষ হয়। ১১ই আগস্ট মাগুরা সদর উপজেলা চাউলিয়া ইউনিয়ন ৭ নম্বর ওয়ার্ড গোয়ালখালী মধ্যপাড়া এলাকায় বিএনপি’র ওয়ার্ড নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১২ই আগস্ট ওয়ার্ড নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ১৪ই আগস্ট ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় বিএনপি’র কর্মিসভায় দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ১৭ই আগস্ট নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা মোড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে দু’জন গুলিবিদ্ধ হন। গত ১৩ই মে খুলনার দাকোপে খালের ইজারাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি’র দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গত ১৬ই জুন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ১৭ই জুন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় সার্চ কমিটির বৈঠককে কেন্দ্র করে বিএনপি’র দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়। এসব ঘটনার বাইরেও সারা দেশে বিএনপি’র কিছু নেতাকর্মীদের দ্বারা দখল, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।  

বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক দল। এখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মেলন ঘটে। আমাদের দলের মধ্যেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই রকম কিছু ব্যক্তির সমাগম ঘটেছে। সেটা অনেক ক্ষেত্রে বাছ-বিচার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যতটুকু আমরা পারি সতর্কতা অবলম্বন করে থাকি। আর গত একবছরে কিছু কিছু ব্যক্তি অসৎ উপায়ে দলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে দল তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এই সংখ্যা এখন অনেক কমে এসেছে। আর দলের কমিটি গঠন নিয়ে যে বিবাদ, এটা গণতান্ত্রিক একটা দলের মধ্যে হতেই পারে। সেটা যেন সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যদিয়ে সমাধান করা যায়, সেজন্য আমরা কাজ করছি।

অন্যদিকে, সম্প্রতি দখলদারি ও নির্বাচনী মনোনয়ন ঘিরে চট্টগ্রামের রাউজানে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং পাল্টাপাল্টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘর্ষের ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। কমিটি ও পদ স্থগিত করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ ঘটনায় দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করেছে।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের বড় দল। স্বাভাবিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিযোগিতা থাকবে। তারপরেও স্থায়ী কমিটি হচ্ছে মনোনয়ন বোর্ড। এই বোর্ড বসে যাচাই-বাছাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে থাকে। যে প্রার্থী যোগ্য, ত্যাগী, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছে এবং এলাকায় জনপ্রিয়তা আছে- এসব বিবেচনায় নিয়ে আমরা মনোনয়ন দেবো। এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। প্রতিযোগিতা হবেই। না হলে গণতন্ত্র কীভাবে হবে? আমাদের দলের অভ্যন্তরেও প্রতিযোগিতা হবে। পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনে অন্য দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা হয়। এটাই তো গণতন্ত্রের নিয়ম। দখল এবং চাঁদাবাজি নিয়ে অপপ্রচার বেশি হচ্ছে বলেও মনে করেন বিএনপি’র এই স্থায়ী কমিটির সদস্য।

https://mzamin.com/uploads/news/main/179826_kk.jpg

ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক ইউরোপের জন্য নির্মম সতর্কবার্তা by জোশকা ফিশার

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন আবার দেখা করলেন। তবে এবার জায়গাটা ছিল আলাস্কা। এই আলাস্কা একসময় রাশিয়ার ভূখণ্ড ছিল। এখানে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখোমুখি হওয়া অনেকটা প্রতীকী বার্তাই বহন করে, যেন ইতিহাস ঘুরে গিয়ে আবার ঠান্ডা যুদ্ধ-পূর্ব যুগে ফিরে এসেছে।

সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও একই সঙ্গে তারা ছিল বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণকারী দুই সুপারপাওয়ার। কিন্তু এ বৈঠক কেবল অতীতের স্মৃতিচারণা নয়, এর ভেতরে আরও বড় বার্তা লুকিয়ে আছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এমন এক পোশাক পরে এসেছিলেন, যা সবার দৃষ্টি কাড়ে। তাঁর বুকজুড়ে লেখা ছিল ‘সিসিসিপি’ (সোভিয়েত ইউনিয়নের রুশ সংক্ষিপ্ত রূপ)। এটা যদি রসিকতাও হয়ে থাকে, তবু এর মধ্যে হুমকির সুর ছিল স্পষ্ট। যাঁরা লাভরভকে চেনেন, তাঁরা জানেন তিনি মজা করার মানুষ নন, আর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকে কোনো খুঁটিনাটি ব্যাপার তিনি হেলাফেলা করেন না। তাই তাঁর এ পোশাকের নির্বাচন পুরোপুরিই ইচ্ছাকৃত। তিনি জানাতে চেয়েছেন, ‘মহান রাশিয়া’ আবার বিশ্বরাজনীতির শীর্ষ টেবিলে ফিরে এসেছে।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর পূর্ব ইউরোপের সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। কিন্তু এখন সেই অপমান কাটিয়ে ওঠা হয়েছে। সাম্রাজ্য আবার ফিরে এসেছে এবং হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার শুরু করেছে। এই ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইউক্রেন। সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্ববিগনিউ ব্রেজিনস্কি ১৯৯৪ সালে বলেছিলেন, ইউক্রেন ছাড়া রাশিয়া আর সাম্রাজ্য হতে পারে না।

ট্রাম্প যখন পুতিনকে (যিনি একজন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী) মার্কিন মাটিতে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তখন তিনি মূলত সেই রুশ সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকেই বৈধতা দিলেন। লাল কার্পেটে করমর্দন, একসঙ্গে লিমুজিনে যাত্রা—এসবের মাধ্যমে পুতিন গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাশিয়ার সর্বোচ্চ দাবিগুলো থেকে একবিন্দুও না সরেও তিনি আবার সমান মর্যাদার বিশ্বশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ফলে তিন বছরের বেশি সময় ধরে যে কূটনৈতিক একঘরে অবস্থায় ছিলেন, তা তিনি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হলেন।

এই বৈঠক ইউক্রেনের জন্যও খুব স্পষ্ট এক বার্তা দিল। ইউক্রেনকে বার্তা দেওয়া হলো, দেখো, মার্কিন প্রেসিডেন্টও মেনে নিয়েছেন যে রুশ সাম্রাজ্য আবার ফিরে এসেছে। তোমরা পশ্চিমে ঝুঁকে রেহাই পাবে না। তোমাদের যেখানে থাকার কথা, সেখানেই থাকতে হবে। এই কঠিন সত্য না মানলে শান্তি আসবে না। তোমাদের পাশে কেউ নেই। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করবে না, আর একা ইউরোপও পারবে না। তবে ইউরোপীয়রা আলাস্কার এ বৈঠকের আড়ালের বার্তাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে উপকৃত হবেন। কারণ, এই বৈঠকও দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বব্যবস্থার প্রধান চালিকা শক্তি হলো বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ আর ছোট বা মধ্যম শক্তির জন্য সেখানে কোনো গুরুত্ব নেই।

ইউরোপীয়দের নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে হবে। আপাতত হয়তো যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক পরিবর্তন করছে না, তবে ট্রাম্প নিশ্চিতভাবে ইউরোপীয় নেতাদের কথা শুনবেন, প্রশংসায় হাসিমুখ দেখাবেন, তারপরও উপেক্ষা করবেন। সুতরাং ইউরোপীয়দের বুঝতে হবে, নতুন এ বিশ্বব্যবস্থায় তারা একা। নিরাপত্তা বা বাণিজ্য—কোনো ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থকে আর বিবেচনা করবে না।

ইউরোপকে এখন নিজের মতো করে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হতে হবে। এর জন্য দ্রুত ও উদ্যমের সঙ্গে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। মহাকাশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুরো ডিজিটাল খাতের মতো বিভিন্ন খাতে তাদের একলা চলতে হবে।

আলাস্কার বৈঠক ইউরোপকে এ বার্তাই দিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থের রক্ষা করতে হলে শুধু প্রচলিত অস্ত্র বা সামরিক শক্তি নয়, এক সমন্বিত ও আধুনিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। অর্থাৎ ইউরোপকে কেবল রক্ষা নয়; বরং শক্তিশালী ও স্বাধীন বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে হবে।

এবার প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র কেন এত স্পষ্টভাবে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে? অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ছাড়া, পুতিন এ বৈঠক থেকে তাঁর চাওয়া প্রায় সবই পেয়ে গেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি কূটনৈতিক একঘরে অবস্থার বাইরে এসেছেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে সমান বিশ্বশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ইউক্রেনের ভাগ্যকে ‘রুশকি মির’ বা রাশিয়ার বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। তাহলে কোনো বিনিময় ছাড়াই ট্রাম্প কেন রাশিয়াকে শক্তিশালী করছেন?

এ ধরনের প্রশ্ন যতই ইউরোপীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, এর উত্তর মিলবে কেবল মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। তাই এখন ইউরোপকে নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হবে।

* জোশকা ফিশার, জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক ডেপুটি চ্যান্সেলর
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2Fmk68rgg0%2Fputintrumpalaska.jpg?rect=3%2C0%2C984%2C656&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আলাস্কায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। রয়টার্স

গাজা সংঘাত নিয়ে ইসরায়েলকে ‘অবিচল সমর্থন’ দেওয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ইসরায়েল সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গাজায় চলমান সংঘাতে ইসরায়েলকে ‘অবিচল সমর্থন’ দিয়ে যাবে তাঁর দেশ। উপত্যকাটি থেকে হামাসকে নির্মূল করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

রুবিও ইসরায়েলে পৌঁছান গতকাল রোববার। এরপর আজ সোমবার জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তার সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, এমন পদক্ষেপ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তা শুধু হামাসকে আরও সাহসী করে তুলবে।

রুবিও বলেন, ভালো একটি ভবিষ্যৎ গাজার বাসিন্দাদের প্রাপ্য। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত হামাসকে নির্মূল না করা হবে, ততক্ষণ তারা কোনো ভালো ভবিষ্যৎ পাবে না। নেতানিয়াহুর উদ্দেশে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি আমাদের অব্যাহত সমর্থন ও অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করতে পারেন।’ গাজা নগরী দখলে ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। তাঁকে সম্বোধন করেন ইসরায়েলের ‘সর্বকালের সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ হিসেবে। নেতানিয়াহু বলেন, রুবিওর সফর স্পষ্টভাবে এই বার্তা দিচ্ছে যে ইসরায়েলিদের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

এমন সময় রুবিও ইসরায়েলকে সমর্থনের ঘোষণা দিলেন, যখন আজ শুধু গাজার উত্তরে গাজা নগরীতেই অন্তত ২৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। এর আগের দিনও শহর এলাকায় অন্তত ৫৩ জনকে হত্যা করা হয়। ইসরায়েলের হামলা ও হুমকির মুখে সেখান থেকে পালাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। এর বাইরে পুরো উপত্যকায় চলছে ইসরায়েলের হামলা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসা হয় প্রায় ২৫০ জনকে। সেদিন থেকেই গাজায় তীব্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পর থেকে ২৩ মাসের বেশি সময়ে উপত্যকাটিতে হামলায় প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ।

দোহা সম্মেলনে শক্ত পদক্ষেপের আশা

মধ্যপ্রাচ্যে নানা বিষয় নিয়ে চলমান সংকটের মধ্যেই ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালায় ইসরায়েল। দোহায় অবস্থান করা হামাস নেতাদের উদ্দেশ্য করে ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি ইসরায়েলি বাহিনীর। তবে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কাতার। বন্ধুদেশের ওপর হামলার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্পও।

এমন পরিস্থিতিতে আজ থেকে দোহায় শুরু হয়েছে আরব লিগ ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) জরুরি সম্মেলন। সেখানে যোগ দিতে আরব ও মুসলিম দেশের নেতারা কাতারে পৌঁছেছেন। এর আগের দিন এসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা।

গতকাল কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানি ইসরায়েলের ব্যাপক সমালোচনা করেন। ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানানোয় আরব ও মুসলিম দেশগুলোর প্রশংসা করে তিনি বলেন, কাতারের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আইনি ব্যবস্থা নেবেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (বাঁয়ে) ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ জেরুজালেমে সংবাদ সম্মেলন করেন
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (বাঁয়ে) ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ জেরুজালেমে সংবাদ সম্মেলন করেন। ছবি: এএফপি

ঢাকায় যৌন নির্যাতনে অসুস্থ ছেলেশিশুটি এখন হাসপাতালে, ১ জন গ্রেপ্তার

মাস তিনেক আগে ১২ বছরের ছেলেশিশুটি ঢাকায় আসে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠে। শেরে বাংলা নগর এলাকার একটি সরকারি হাসপাতালের ফটকের সামনের ফুটপাতে ফাস্ট ফুডের দোকান আছে ওই আত্মীয়ের। সেখানে সে টুকটাক কাজ শুরু করে। ২০ দিন ধরে শিশুটিকে পাশের দোকানের দুই কর্মী যৌন নির্যাতন করছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সবশেষ গত শনিবার যৌন নির্যাতন ও মারধরে অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি। আজ সোমবার শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনায় এক দোকানকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ।

শিশুটি নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় তার ওই আত্মীয় প্রথমে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শিশুসহায়তা হেল্পলাইন নম্বরে (১০৯৮) কল করেন। শিশুটির পরিবার, পুলিশ ও ১০৯৮ নম্বরের তথ্য অনুসারে, শিশুটির গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। শিশুটি টানা নির্যাতনের শিকার হলেও শনিবার অসুস্থ হয়ে পড়ার পরই তা জানাজানি হয়। পরে জানা যায়, পাশের ডিম ও ডাবের দোকানের দুই কর্মী হাসিবুর রহমান ও রিয়াজ নিয়মিত শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতেন।

নির্যাতনের শিকার শিশুর ওই আত্মীয় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি শনিবার রাতে দোকানের কেনাকাটা করতে বাজারে গিয়েছিলেন। তাঁর দোকানেও দুজন কর্মী ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁর আত্মীয় ওই শিশুটিকে আঘাত করা হয়েছে চোখে। চোখ লাল হয়ে গেছে। আঘাত করার কারণ জানতে চাইলে শিশুটি জানায়, ২০-২২ দিন ধরে হাসিবুর ও রিয়াজ হাসপাতালের পেছনে বাগানে নিয়ে তাকে যৌন নির্যাতন করেন। সে বাধা দিলেও শোনেননি।

শিশুটির ওই আত্মীয় আরও বলেন, নির্যাতনে শিশুটির পুরুষাঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার ওই দুজন আবার তাকে বাগানে নিয়ে যেতে চাইলে সে রাজি হয়নি। এরপরই তাকে আঘাত করেন ওই দুজন। আঘাতে তার চোখ লাল হয়ে যায়। আজ সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং শেরেবাংলা নগর থানায় গিয়ে মামলা করেন। পরে বিকেলে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মেহেদি হাসান প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করার ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় হাসিবুর রহমান নামের একজনকে আসামি করে মামলা করা হয়। আজ দুপুরে মামলার পর আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত থেকে আসামিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০–এর ১০ ধারায় (যৌনপীড়ন ইত্যাদির দণ্ড) বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি যৌনকামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাঁর শরীরের যেকোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দিয়ে কোনো নারী বা শিশুর যৌনাঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন, তাহলে সেটা হবে যৌনপীড়ন। এই অপরাধে ওই ব্যক্তি সর্বনিম্ন ৩ বছর ও সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮–এর সমন্বয়ক চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন প্রথম আলোকে বলেন, শুধু মেয়েশিশু নয়, ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার মধ্যে পড়ে। অনেক সময় যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা ভবিষ্যতে মা–বাবা হওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই পরিবারগুলোকে ছেলেশিশুদের দিকেও সমান নজর রাখতে হবে। তারা কোনো ধরনের নির্যাতনের কথা বললে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তিনি জানান, এই শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় ১০৯৮ নম্বরে সহায়তা জানিয়ে কল দেন শিশুটির ভাই। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন এবং এ কাজে সহায়তা দিতে একজন সমাজকর্মীকে নিয়োজিত করেন।

শিশু নিপীড়ন
শিশু নিপীড়ন। প্রতীকী ছবি