Tuesday, September 18, 2018

চট্টগ্রাম কলেজ কমিটি পেয়েই বিক্ষোভ, ভাংচুর ও সংঘর্ষে ছাত্রলীগ

কমিটির জন্য হা হুতাশ কম ছিল না। কারণ ৩৪ বছর ধরে কমিটি বঞ্চিত ছিল চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ। কিন্তু কমিটি পেয়েই বিক্ষোভে নামে তিনভাগে বিভক্ত কলেজ ছাত্রলীগ। লিপ্ত হয় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে। করেন সড়ক অবরোধ ও ককটেল বিস্ফোরণ। চট্টগ্রাম কলেজ ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এমন পরিস্থিতি ছিল আজ মঙ্গলবার দিনভর। এতে সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় মানুষের নানা দুর্ভোগ। আতঙ্কিত হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা।
আর এসবের নিরব সাক্ষি ছিলেন কলেজ ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা শত শত পুলিশ। ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণে কোন আইনি পদক্ষেপ ছিল না পুলিশের। তবে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা দুপুর ২টার দিকে এসে চকবাজার সড়কে দেওয়া ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়ার পর যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জানান, সোমবার রাতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের ২৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ। এতে মাহমুদুল করিমকে সভাপতি ও সুভাষ মল্লিক সবুজকে সাধারণ স¤পাদক করে কমিটি অনুমোদন দেয় নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান হাসান ইমু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ স¤পাদক দস্তগীর চৌধুরী।
মাহমুদুল করিম প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী এবং সবুজ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী।
আর এই কমিটি প্রত্যাখান করে মঙ্গলবার সকাল থেকে ক্যা¤পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া মেয়রের ছয়জন অনুসারী কমিটি থেকে পদত্যাগও করেন। 
যারা ক্যা¤পাস থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম কলেজের সামনে সড়কে অবস্থান নেন। তারা সড়কের উপর টায়ার জ্বালিয়ে দেন। এসময় ওই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ কয়েকজন নেতাকর্মী এ সময় কয়েকটি গাড়িও ভাংচুর করেন।
বিক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে কমিটিতে ছাত্রদল ও শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের পদ দেওয়া হয়েছে। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে রাতের আঁধারে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। যা কোনভাবেই মেনে নেবেন না তারা।
অপরদিকে কলেজ ক্যা¤পাসে অবস্থান নেন ঘোষিত নতুন কমিটির নেতারা। ফলে বিকেলে কলেজ চলাকালীন সময় পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থানে ছিল দু‘পক্ষের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে চকবাজার থেকে জামালখান পর্যন্ত।
প্রত্যক্ষদশীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে পদবঞ্চিতরা কলেজের সামনের বাঁশ দিয়ে সড়ক অবরোধ করে এবং বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় তাদের সাথে যোগ দেয় কমিটিতে পদ পাওয়া বেশ কয়েকজন নেতাও। এসময় বাইরে থেকে একটি গ্রুপ কলেজের ভিতরে প্রবেশ করলে দুটি পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও ধাওয়া-পাল্টা শুরু হয়। পরে দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে।
এ সময় কমিটির নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের টেনে হিঁছড়ে কলেজ ক্যা¤পাস থেকে বের করে দেয় চকবাজার যুবলীগ নেতা টিনুর সমর্থকরা। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বাইরে ককটেল বিস্ফোরনের ঘটনাও ঘটে। ভাঙচুর করা হয় বেশ কয়েকটি গাড়ী।
প্রায় দুইঘন্টা ধরে সড়ক অবরোধ করে রাখায় আশপাশের এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় পাশর্^বর্তি চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ এবং নগরীর জামালখান এলাকায় ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট মেরিস স্কুলসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি হলে সড়কে পুরোপুরি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তীব্র রোদ ও গরমের মধ্যে যানজটে আটকা পড়া স্কুলশিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সাধারণ মানুষকেও পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা এ প্রসঙ্গে বলেন, কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের বিরোধ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। এক পক্ষ সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেছিল। পরে আমরা গিয়ে সড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করেছি।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ স¤পাদক জাকারিয়া দস্তগীর বলেন, ৩৪ বছর পর চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের একটি আংশিক কমিটি আমরা দিতে পেরেছি। আমাদের ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু আমরা আমাদের মুরব্বী সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কমিটি দিয়েছি। একটি কমিটিতে তো দুজন সভাপতি দেওয়া যায় না কিংবা দুজন সাধারণ স¤পাদক দেওয়া যায় না। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার সময় কমিটি নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেটার সুরাহা হবে।
তিনি বলেন, এতবছর পর শিবিরের দখল থেকে আমরা কলেজটাকে মুক্ত করেছি। আমরা চাই, ছাত্রলীগ সেখানে মিলেমিশে রাজনীতি করুক। গ্রুপিং আমাদের সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কমিটি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া সহ-সভাপতি ওবায়েদুল হক বলেন, কাউকে না জানিয়ে রাতের আঁধারে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ স¤পাদক কমিটি করেছেন। প্রকৃত সহযোদ্ধাদের মূল্যায়ন না করে ছাত্রদল ও শিবিরের কর্মীদের পদ দিয়েছেন। এর প্রতিবাদে আমরা ৬ জন কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছি।
সড়ক অবরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সড়কে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করেছি। এজন্য জনসাধারণের দুর্ভোগ হয়েছে। এর দায়ভার নগর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ স¤পাদককে অবশ্যই নিতে হবে।
চট্টগ্রাম শহর ছাত্রলীগের সভাপতি মফিজুর রহমান বলেন, ১৯৮৪ সালে সত্যজিৎ চক্রবর্তী সুজনকে আহ্বায়ক করে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল। এরপর আমরা শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে আর কলেজে ঢুকতে পারিনি। তখন আমরা চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের ব্যানারে মুসলিম হলে অনুষ্ঠান করতাম। যেহেতু কলেজ ক্যা¤পাসে যাওয়া সম্ভব ছিল না। ১৯৮৪ সালের পর ছাত্রলীগের আর কোন কমিটি হয়নি।
এরপর ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ পুলিশের সহযোগিতায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় শিবিরের সাথে রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষের পর।  এর পর থেকে প্রতিনিয়ত ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ চালিয়ে আসছে। গত ৩ বছরে অন্তত ২৫ বার সংঘর্ষ হয়েছে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধে। যা কারোই কাম্য নয়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: অংশীজনদের সুপারিশ উপেক্ষা সংসদে রিপোর্ট পেশ

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ এর বহুল আলোচিত ৩২ ধারা বহাল রেখে সংসদে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গতকাল সোমবার রাতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি মো. ইমরান আহমেদ প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন। বিলের ৩২ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের আওতাভুক্ত অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৩২ (২) ধরায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা-১ এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বহুল আলোচিত ওই ধারার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন-অ্যাটকোসহ সব অংশীজনেরা। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) এর ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা সম্পর্কে তাদের আপত্তি রয়েছে। বিলের ওই ছয়টি ধারা বিদ্যমান থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রস্তাব আমলে নেয়া হয়নি। বিলের ২৫ ধারা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। সংসদীয় কমিটির সুপারিশকৃত বিলের ২৫ ধারায় আক্রমণাত্তক, মিথ্যা ও ভীতি প্রদর্শন, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, ইত্যাদি বিষয়ে (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয়প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ আ আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ অপরাধের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিলের ২১ ধারায় নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচার চালানো বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুরূপ কার্য ইইবে একটি অপরাধ।’ এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মিাণের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও নিরাপদ ব্যবহার আবশ্যক বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এর সুফল ভোগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও উল্ল্যেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে সাইবার অপরাদের মাত্রাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ডিজিটাল অপরাধসমূহের প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন, সনাক্তকরণ, তদন্ত এবং বিচারের উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। সাইবার তথা ডিজিটাল অপরাধের কবল থেকে রাষ্ট্র এবং জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য। আরো বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকে প্রকারান্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার পুনর্জাগরণ বলা যেতে পারে।
এই মহান স্বপ্নদ্রষ্টার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মিাণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও গত ৯ই এপ্রিল বহুল আলোচিত ’ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। এর আগে ২৯শে জানুয়ারি খসড়া আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ব্যাপক সমালোচিত ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা তথ্যপ্রযুক্তি আইন থেকে সরিয়ে সেগুলো আরো বিশদ আকারে যুক্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ক্যানসারের প্রকোপ ও মৃত্যুর হার বাড়ছে, চিকিৎসা অপ্রতুল

বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যানসার রোগে এক লাখের অধিক মানুষ মারা যায়। আর এ রোগে প্রতিবছর আক্রান্ত হয় আরো দেড় লাখ মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা এজেন্সি’র (আইএআরসি) সদ্য প্রকাশিত এক রিপোর্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইদানিং গলা ও খাদ্যনালিতে ক্যানসারের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। নারী পুরুষ উভয়েই এ জাতীয় ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও পুরুষদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশী। মেয়েদের ক্ষেত্রে স্তন, জরায়ু, পিত্তথলি ও মুখগহ্বরের ক্যানসার বেশী দেখা যাচ্ছে।
বিশষজ্ঞরা বলছেন, ধূমপান, মদ্যপান, নেশাজাতীয় দ্রব্যগ্রহণ, ভেজাল খাদ্যগ্রহণ, বায়ুদুষণ- এসব কারণে ক্যানসার আক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।  
অন্যদিকে, শিশুদের বুকের দুধ পান করতে না দেওয়া, পানের সাথে শুকনা তামাক পাতা ও জর্দা গ্রহণের অভ্যাস এবং গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবের কারণে মহিলারা অধিকমাত্রায় ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর ফুসফুসের ক্যানসারের জন্য ধুমপান ও তামাক বা জর্দা খাওয়ার অভ্যাসকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন রেডিও তেহরানকে বলেন, আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা এজেন্সি যে পরিসংখ্যান দিয়েছে বাস্তবে অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পরিসংখানের ভিত্তিতে এ রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। জনসংখ্যাভিত্তিক পরিসংখ্যান নেয়া গেলে আরো বেশী আক্রান্ত হওয়া ও বেশি মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যেত।  
তিনি মনে করেন, ক্যানসার রোগের চিকিৎসায় বাজেট বৃদ্ধি বা অধিক সংখ্যক হাসপাতাল নির্মাণের চেয়েও জরুরি দরকার এ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাছাড়া এ রোগের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা দরকার। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা দরকার।
বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ক্যানসার বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. ইফতেখার উদ্দিন রেডিও তেহরানকে বলেন, রোগে আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও হাসপাতালে সেবা দেবার সক্ষমতাও বাড়ছে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার অনুপাতে যেখানে ১৬ কোটি মানুষের জন্য ১৬০টি রেডিওথেরাপি সেন্টার থাকার দরকার সেখানে আছে মাত্র ১৬টি।
সম্প্রতি সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ অপ্রতুল। তিনি বলেছেন, ছোঁয়াচে নয় এমন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এর মধ্যে ক্যানসার হচ্ছে দ্বিতীয় প্রধান ঘাতকব্যাধী। সেদিক থেকে দেখতে গেলে দেশে ক্যানসার রোগীদের জন্য অন্তত: পাঁচ হাজার বেড দরকার। কিন্তু আছে মাত্র পাঁচ শ’ বেড।

৬ মহররম : ইমাম হুসাইনের সেই চিঠি ও তাঁকে সাহায্য করতে ৯০ জনের যুদ্ধ

১৩৭৯ চন্দ্রবছর আগে ৬১ হিজরির ৬ মহররম কারবালার ময়দানে সত্য ও মিথ্যার উভয় শিবিরই সেনা-শক্তি জোরদারে সচেষ্ট হয় নিজ নিজ সমর্থকদের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে।
তবে কুফার জনগণ কার্যত ইমাম হুসাইন (আ.)’র কালজয়ী বিপ্লবের বিপক্ষে তথা মিথ্যার পক্ষে ঝুঁকে পড়েছিল। তৎকালীন আরব কবি ফারাজদাকের ভাষায়; তাদের (কুফাবাসীদের বেশিরভাগেরই) অন্তর ছিল ইমামের পক্ষে কিন্তু তাদের তরবারি ছিল ইমামের বিপক্ষে!
ইমামের একনিষ্ঠ সমর্থক ও বৃদ্ধ সঙ্গী  হযরত হাবিব বিন মাজাহের আল আসাদি (রা.) এই দিন তাঁর প্রিয় নেতার অনুমতি নিয়ে সাহায্যকারী আনার আশায়  রাতের আঁধারে বনি আসাদ গোত্রের কাছে যান। বনি আসাদ গোত্রের অনেকেই সাহায্যের প্রস্তাবে সাড়া দেন এবং তাদের ৯০ জন ইমাম হুসাইন (আ.)'র পক্ষে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন ও ইমাম শিবিরের দিকে রওনা হন।
কিন্তু ওমর সাদের গুপ্তচররা এ খবর সাদের কাছে পাঠালে সে ৪০০ ব্যক্তিকে পাঠায় যাতে ওই ৯০ জন ইমাম শিবিরে যোগ দিতে না পারেন। ফলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায় এবং বনি আসাদ গোত্রের অনেকেই শহীদ ও আহত হন। অনেকেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। হাবিব এই ঘটনার কথা ইমামের কাছে তুলে ধরলে তিনি বলেন:
لاحولَولاقوّةَالاّبالله
লা হাওলা ওয়ালা কুউআতা ইল্লাহ বিল্লাহ।
অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কারো কোনো শক্তি নেই।
হযরত হাবিব বিন মাজাহের (রা.) ছিলেন বিশ্বনবীর (সা) সাহাবি এবং হযরত আলীর (আ) সঙ্গী ও ইমাম হুসাইন (আ)'র শৈশবের বন্ধু। নবী-পরিবারের প্রতি গভীর ভালবাসার টানে তিনি নিজেকে এই পরিবারের 'গোলাম' বলে ঘোষণা করতে গর্ব অনুভব করতেন। আশুরার দিন তিনি ছিলেন ইমামের ক্ষুদ্র বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি।
ষষ্ঠ মহররম থেকে কুফার কামারদের ব্যবসা রমরমা হয়ে ওঠে। রাসূল (সা.)’র কলিজার টুকরা এবং হযরত আলী (আ.) ও ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহার নয়নের আলোর রক্ত ঝরানোর জন্য লোহার তীর, বর্শা ও তলোয়ার কেনার এবং সেগুলোকে ধারালো করে বিষ মাখানোর ধুম পড়ে যায়। কোনো কোনো তীর ছিল তিন শাখা-বিশিষ্ট।
এই দিনে ইয়াজিদের পক্ষে বহু সেনা কারবালায় জড়ো হয়। একই দিনে ইবনে জিয়াদ ওমর সাদের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে লেখা ছিল: আমি  সামরিক দিক থেকে তোমাকে সুসজ্জিত করেছি। পদাতিক সেনা থেকে শুরু করে ঘোড়-সওয়ার- সবই তোমাকে দেয়া হয়েছে। তুমি জেনে রাখ, প্রত্যেক দিন ও রাত তোমার তৎপরতা সম্পর্কে আমার কাছে রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে (গুপ্তচরদের মাধ্যমে)।
একই দিনে অর্থাৎ ৬১ হিজরির ৬ মহররম ইমাম হুসাইন (আ) তাঁর অন্যতম সৎভাই মুহাম্মাদ আল হানাফিয়্যা ও মদিনায় বিশ্বনবীর (সা) আহলে বাইতের অনুরাগীদের কাছে একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি পাঠান। (কোনো কোনো বর্ণনামতে হানাফিয়া অসুস্থ ছিলেন বলে ইমামের সফরসঙ্গী হননি।)
ওই চিঠিতে তিনি জোর দিয়ে লিখেছেন যে, ‘যারা আমার সঙ্গে যোগ দেবেন (কারবালায়) তারা অবশ্যই শহীদ হবেন, আর যারা যোগ দেবে না, তারা বিজয়ী হবে না।’
এ চিঠি থেকে বোঝা যায় ইমাম জানতেন যে, ইয়াজিদি-শাসনের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবস্থান নেয়ার কারণে তিনি ও তাঁর অনুগত সঙ্গীরা শহীদ হবেন। এ চিঠির দ্বিতীয় বার্তা হল যাদের ঈমান দুর্বল বা নড়বড়ে এবং যারা আমার সঙ্গী হয়েছে দুনিয়ার কিছু পাওয়ার আশায়- তারা এখনই আমার শিবির ছেড়ে চলে যাও। ইমাম এ জন্যই  মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে সফর শুরু করার পর থেকে নানা সময়ে নিজ কাফেলার সঙ্গীদেরকে বলেছেন যে আমি তোমাদের কাছ থেকে পাওয়া আনুগত্যের প্রতিজ্ঞা বা বাইয়াতের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নিচ্ছি, তোমরা স্বাধীন, ইচ্ছে করলেই কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমাকে ত্যাগ করতে পার।
মদিনা থেকে মক্কা হয়ে ইরাক অভিমুখে ইমাম হুসাইন (আ)'র সফরের শুরুর দিকে কয়েক হাজার মুসলমান ইমামের কাফেলার সঙ্গী হয়েছিল। কিন্তু যখন এটা স্পষ্ট হয় যে, ইমামের এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে পার্থিব কোনো স্বার্থ হাসিল করা যাবে না তখন দলে দলে বহু মুসলমান ইমামকে ছেড়ে চলে যায়।
এ চিঠির তৃতীয় বার্তা হল, যারা ইমামকে শহীদ করবে ও তাঁর সন্তানদের এবং পরিবারের নারীদের বন্দি করবে তারা যত বিজয়-উল্লাস বা উৎসবই করুক না কেন তাদের ভাগ্যে বিজয় নেই। যেমনটি ইতিহাসে দেখা গেছে নবী-পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের পক্ষের বীর যোদ্ধাদের প্রায় প্রত্যেক ঘাতকই খুবই শিগগিরই কঠোর ও অপমানজনক শাস্তি পেয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। যেমন, ইয়াজিদ বাহিনীর অন্যতম কমান্ডার ওমর সা’দ, শিমার ও কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ ও দামেস্কের তথাকথিত খলিফা ইয়াজিদ ইহকালেই কঠোর শাস্তি পেয়েছিল।
এ চিঠির চতুর্থ বার্তা এটাও হতে পারে যে, কারবালার শহীদদের নিষ্পাপ রক্তের বদলা নেয়ার জন্য  বিশ্বনবীর (সা) আহলে বাইতের অনুরাগীরা বার বার যেসব গণ-জাগরণ ঘটিয়েছেন তাতে সাফল্যের মাত্রা একই ধরনের ছিল না এবং সেসব কেবল অস্ত্র বা তরবারির জোরেই সংঘটিত হয়নি। অর্থাৎ কেবল অস্ত্র বা তরবারি দিয়ে পূর্ণ বিজয় অর্জন সম্ভব নয়।
এ চিঠির অন্যতম অন্যতম তাৎপর্য এটাও হতে পারে যে, যুগে যুগে যারা ইমাম হুসাইনের (আ) মতই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন তারা হয় শহীদ বা গাজি তথা বিজয়ী হবেন, অন্যদিকে যারা রুখে দাঁড়াবেন না বা আপোষ করবেন তারা হবেন লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং জালিম শক্তিগুলো কখনও প্রকৃত বিজয় অর্জন করতে পারবে না।