Showing posts with label শিক্ষানীতি. Show all posts
Showing posts with label শিক্ষানীতি. Show all posts

Wednesday, January 19, 2011

যানজট কমাতে স্কুলবাস - উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে

গত রোববার থেকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিআরটিসির তত্ত্বাবধানে রাজধানীর রাস্তায় নেমেছে স্কুলবাস। শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে মিরপুর-আজিমপুর রুটে ১৪টি বাস নিয়ে শুরু হয়েছে এই বিশেষ সেবা। জনবহুল এই মহানগরে স্কুলকেন্দ্রিক যানজটের দুঃসহ অভিজ্ঞতা কমবেশি সব নাগরিকেরই আছে। কার্যকরভাবে স্কুলবাস চালু রাখা গেলে যানজট পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগও কমবে। সেই বিবেচনায় স্কুলবাস চালুর উদ্যোগ একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। আমরা একে স্বাগত জানাই।
রাজধানীর শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ নিজস্ব গাড়িতে, কেউ ভাড়া বাসে, কেউ বা স্কুলের মাইক্রোবাস বা ভ্যানগাড়িতে কিংবা রিকশায় বা হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। এতে যেমন যানজট বাড়ে, তেমনই শিক্ষার্থী-অভিভাবকের যাত্রাও হয় ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুলবাস চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সাধারণ বাসে চড়ার ঝক্কি-ঝামেলা লাঘব হবে। অভিভাবকদেরও দুশ্চিন্তা কমবে। চলাচল সহজ হবে।
তবে এই সেবা সফল করতে হলে সুশৃঙ্খলভাবে, সময়মতো ও নিরাপদে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়া আবশ্যক। উদ্যোগটির সফলতাও এর ওপর নির্ভরশীল। স্কুলবাস চালুর প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বিশেষ সুখকর হয়নি। অনেকে স্বস্তি নিয়ে আসা-যাওয়া করতে পারলেও ব্যক্তিগত গাড়িতে আসা-যাওয়া করা শিক্ষার্থীদের স্কুলবাস ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। সময়মতো স্কুলে শিক্ষার্থীদের পৌঁছে না দিতে পারলে এই বিশেষ সেবার সুফল পাওয়া যাবে না।
ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকেরা তাঁদের সন্তানদের বাসে পাঠাতে চান না। কারণ সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের এই সেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা না গেলে স্কুলকেন্দ্রিক যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সেবার মানের ব্যাপারে যে সংশয় আছে, তা দূর করা গেলে ধীরে ধীরে সেসব অভিভাবকের মানসিকতা বদলাবে। অভিভাবকদেরও ভেবে দেখা উচিত, শিক্ষার্থীরা এ ধরনের সেবা ব্যবহার করলে তা তাদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতিও গড়ে উঠবে, স্বাধীন ব্যক্তিত্ব বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্ব-উদ্যোগে নিজস্ব শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের সেবা চালু করলে তাতে সরকারের সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া উচিত। রাজধানীর অন্যান্য রুটেও শিগগিরই স্কুলবাস চালু করা দরকার। কেননা একটি রুটে স্কুলবাস চালু করে যানজট কমানো যাবে না।
নগর পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার জন্য অতীতে নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। কিন্তু সেগুলো কিছুদিন পরই মুখ থুবড়ে পড়ে। স্কুলবাসের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটতে দেওয়া যাবে না। এর কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

Saturday, December 25, 2010

জাতীয় শিক্ষানীতি, ধর্ম এবং হরতাল by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল ২৬ ডিসেম্বর দেশে হরতাল ডেকেছে, কারণটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। খবরের কাগজ পড়ে মনে হলো, আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে যথেষ্ট পরিমাণ ‘ইসলামধর্ম’ নেই, সেটা হচ্ছে কারণ। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, যাঁরা হরতাল ডেকেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জাতীয় শিক্ষানীতিটি পড়ে দেখেননি, পড়ে থাকলে তাঁরা কখনোই এ ধরনের একটি কারণ দেখিয়ে হরতাল ডাকতে পারতেন না। এই শিক্ষানীতিতে ধর্মকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কি হয়নি, সেই বিতর্কে না গিয়ে আমি সরাসরি শিক্ষানীতি থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি, দেশের মানুষই বিচার করুক, হরতাল দেওয়ার আসলেই কারণ আছে কি নেই।
শিক্ষানীতির একেবারে প্রথম লাইনে আমাদের সংবিধানের নির্দেশনা এবং দ্বিতীয় লাইনে জাতিসংঘের শিশু শিক্ষার অধিকারের কথাটি স্মরণ করানো হয়েছে। কাজেই শিক্ষানীতির মূল বক্তব্যটি শুরু হয়েছে তৃতীয় লাইনে এবং লাইনটি আমি হুবহু তুলে দিই: ‘শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক এবং কর্মকুশল নাগরিক গড়ে তোলা।’ যাঁরা বলছেন শিক্ষানীতিতে যথেষ্ট ধর্ম নেই, তাঁদের আমি প্রয়োজন হলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চাই যে একেবারে শুরুতেই বলা হয়েছে, এই শিক্ষানীতির যে কয়টি মূল উদ্দেশ্য আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে নিজের এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। সেটি কীভাবে করা হবে, পরে বিস্তৃতভাবে বলা আছে। কিন্তু একেবারে প্রথম পর্যায়ে যে ৩০টি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তার রোল নম্বর হলো: ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করা।’
সেই ১৯৭১ সালে ভয়াবহভাবে এবং গত ৪০ বছর নানাভাবে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই অনেক শিক্ষাবিদই মনে করেন, পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতো আমাদেরও স্কুল-কলেজে ধর্মশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তারা সেটা নিজেদের বাসায় পরিবারের কাছ থেকে শিখে নেবে। কিন্তু আমাদের দেশের জন্য এ যুক্তিটি ব্যবহার করার উপায় নেই—দেশের বেশির ভাগ ছেলেমেয়ের মা-বাবা অশিক্ষিত কিংবা অল্প শিক্ষিত। তাঁরা ছেলেমেয়েদের ধর্মশিক্ষা দিতে পারবেন বলে মনে হয় না, বরং ধর্মান্ধ কোনো মানুষের হাতে তুলে দেবেন এবং ছেলেমেয়েরা ধর্মের উদার অংশটুকু না শিখে কিছু আচার-আচরণের সঙ্গে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতা শিখে বসে থাকবে। তার চেয়ে অনেক নিরাপদ ব্যাপার হচ্ছে, দেশের জ্ঞানী-গুণী ধর্মপ্রাণ মানুষ দিয়ে চমৎকার কিছু পাঠ্যবই লিখিয়ে নেওয়া, যেটা থেকে এরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ধর্ম শিখে নেবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মের সঙ্গে নৈতিকতা শেখানোর এটা হচ্ছে আরেকটা সুযোগ। তাই শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ধর্মশিক্ষার ব্যাপারটা উল্লেখ করা আছে।
এই শিক্ষানীতিতে প্রথমবার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপারটি এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে লেখাপড়া শুরু করার আগে শিশুদের লেখাপড়ায় আগ্রহী করার জন্য কয়েকটা কৌশলের কথা বলা আছে, তার মধ্যে একটা কৌশল হিসেবে যেটা লেখা আছে, সেটা হুবহু তুলে দিচ্ছি (পৃষ্ঠা ৩) ‘মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত সকল ধর্মের শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞান, অক্ষরজ্ঞানসহ আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতা শিক্ষা প্রদানের কর্মসূচি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে।’ যার অর্থ শুধু যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ধর্মশিক্ষার ব্যাপারটা আছে, তা নয়, সেটা শুরু হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে যথেষ্ট পরিমাণ ধর্ম নেই বলে হরতাল ডাকা হয়েছে অথচ সপ্তম পরিচ্ছেদটির (পৃষ্ঠা ২০) শিরোনাম হচ্ছে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা। সেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসেবে লেখা আছে: ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে পরিচিত, আচরণগত উৎকর্ষ সাধন এবং জীবন ও সমাজে নৈতিক মানসিকতা সৃষ্টি ও চরিত্র গঠন।’ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য দুটি যথাক্রমে ‘প্রচলিত ব্যবস্থাকে গতিশীল করে যথাযথ মানসম্পন্ন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদান’ এবং ‘প্রত্যেক ধর্মে ধর্মীয় মৌল বিষয়সমূহের সঙ্গে নৈতিকতার ওপর জোর দেওয়া এবং ধর্ম শিক্ষা যাতে শুধু আনুষ্ঠানিক আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়, সেদিকে নজর দেওয়া।’
শিক্ষানীতিতে যথেষ্ট পরিমাণ ধর্ম নেই বলে হরতাল ডাকা হয়েছে, অথচ ইসলামধর্ম শিক্ষার কৌশল হিসেবে যে কয়টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তার প্রথম তিনটি হচ্ছে: ১. শিক্ষার্থীদের মনে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও আখিরাতের প্রতি অটল ঈমান ও বিশ্বাস যাতে গড়ে ওঠে এবং তাদের শিক্ষা যেন আচারসর্বস্ব না হয়ে তাদের মধ্যে ইসলামের মর্মবাণীর যথাযথ উপলব্ধি ঘটায়, সেভাবে ইসলামধর্ম শিক্ষা দেওয়া হবে। ২. ইসলামধর্মের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত হওয়া, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য মানসম্পন্ন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হবে। ৩. কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের তাৎপর্য বর্ণনাসহ ইসলামধর্মের বিভিন্ন দিক যথার্থভাবে পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষানীতিতে খুঁটিনাটি থাকার কথা নয়, মূল নীতিটা বলে দেওয়া হয়, যে নীতিকে সামনে রেখে পুরো ব্যবস্থাকে সাজিয়ে নেওয়া হয়। যাঁরা হরতাল ডেকেছেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন, যদি ওপরের তিনটি কৌশল অবলম্বন করা হয়, তাহলে আর কোন বিষয়টি বাকি থাকল? একটি শিক্ষানীতিতে এর চেয়ে বেশি কী দেওয়ার আছে?
অন্যান্য পাঠককে বলে দেওয়া যায়, ইসলামধর্ম শিক্ষার মতো হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও খ্রিষ্টধর্ম শিক্ষার কৌশলগুলোও এভাবে গুছিয়ে বলে দেওয়া আছে। শুধু তা-ই নয়, স্পষ্ট করে বলে দেওয়া আছে (পৃষ্ঠা ২১) ‘আদিবাসীসহ অন্যান্য সম্প্রদায় যারা দেশের প্রচলিত মূল চারটি ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী, তাদের জন্য নিজেদের ধর্মসহ নৈতিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।’
শুধু যে ধর্মের কথা বলা হয়েছে তা নয়, জাতীয় শিক্ষানীতিতে ধর্মের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২১), যার প্রথম বাক্যটি হচ্ছে, ‘নৈতিকতার মৌলিক উৎস ধর্ম।’ ইউরোপের অনেক দেশের একটি বড় অংশের মানুষ কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মাবলম্বী না হয়েই বড় হচ্ছে এবং তার পরও তারা যথেষ্ট নীতিমান। কাজেই আধুনিক পৃথিবীর মানুষ এই বাক্যটি নিয়ে তর্কবিতর্ক করতে পারে কিন্তু তার পরও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই বাক্যটিকে শিক্ষানীতিতে সংযোজন করে দেওয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত যেটুকু লেখা হয়েছে, তার পুরোটুকু হচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ধর্মশিক্ষা। এ ছাড়া রয়েছে মাদ্রাসাশিক্ষা—তার জন্য পুরো একটা অধ্যায় রয়েছে (পৃষ্ঠা ১৮)। তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসেবে যেটা লেখা হয়েছে, সেটা হুবহু আমি তুলে দিচ্ছি: ‘মাদ্রাসা শিক্ষায় ইসলাম ধর্মশিক্ষার সকল প্রকার সুযোগ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষার্থীরা যেন ইসলামের আদর্শ ও মর্মবাণী অনুধাবনের পাশাপাশি জীবন ধারণসংক্রান্ত জ্ঞানলাভ করতে পারে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী হয় ও তার উৎকর্ষ সাধনে ভূমিকা রাখতে পারে, তার জন্য যথার্থ জ্ঞানলাভের ব্যবস্থা করা হবে। সাধারণ বা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা যেন সমানভাবে অংশ নিতে পারে, সে জন্য মাদ্রাসা ও শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপ: এরপর চারটি ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। যার প্রথমটি হচ্ছে: ‘শিক্ষার্থীর মনে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি অটল বিশ্বাস গড়ে তোলা এবং শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবনে সমর্থ করে তোলা।’ আমরা যদি লেখাপড়ার দিক থেকে বিবেচনা করি, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চতুর্থটি: ‘শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে অন্যান্য ধারার সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষায় সাধারণ আবশ্যিক বিষয়সমূহে অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করা।’ এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে আরও একবার বলা হয়েছে, ‘পরীক্ষা ও মূল্যায়ন অধ্যায়ে (২১ নম্বর অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৫০)।’ সেখানে ৯ নম্বর কৌশল হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘মাদ্রাসার ক্ষেত্রে জুনিয়র দাখিল, দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় সকল ধারার জন্য আবশ্যিক বিষয়সমূহে অন্যান্য ধারার সঙ্গে অভিন্ন প্রশ্নপত্র অনুসরণ করা হবে।’
শিক্ষানীতির অন্য সবকিছু ছেড়ে দিয়ে শুধু এই একটি বিষয়ের কথাটা চিন্তা করলেই সবাই বুঝতে পারবে, এটি কত যুগান্তকারী একটা সিদ্ধান্ত। বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করলেই সবাই সেটা বুঝতে পারবে। সবাই জানে, দাখিল এবং এসএসসিকে সমপর্যায় ধরা হয়, ঠিক সে রকম আলিম এবং এইচএসসিকে সমপর্যায় ধরা হয়। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ ধারার মতো মাদ্রাসাতেও বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে। এই বিষয়গুলো জেনে অনেকের ধারণা হতে পারে, মাদ্রাসায় যারা লেখাপড়া করে, তাদের বুঝি স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করা ছেলেমেয়েদের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি একেবারেই সত্যি নয়—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারে প্রায় ১৫ হাজার ছেলেমেয়ে বিজ্ঞান বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের ভেতর থেকে মাদ্রাসার মাত্র একটি ছাত্র বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটে মেধা তালিকায় আসতে পেরেছে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ের ভেতর থেকে যদি মাত্র একটি ছাত্র ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে, সেই লেখাপড়ার মাঝে খুব বড় গলদ রয়েছে।
মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের বিষয়গুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি এসেছে কিন্তু ভর্তি হতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করেছে, বেশির ভাগ বিভাগে তাদের ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা নেই। কারণ, তারা যে বিষয়গুলো পড়ে এসেছে, সেগুলোতে মার্কস পাওয়া যায় অনেক বেশি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য সেগুলো কোনো কাজে আসে না।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মাদ্রাসাছাত্রদের সঙ্গে আসলে যে প্রতারণাটা করা হচ্ছে, সেটি এই শিক্ষানীতিতে প্রথমবার বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন থেকে তারা যখন দাখিল বা আলিম পাস করবে, তখন তাদের লেখাপড়ার মান হবে একজন এসএসসি বা এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীর সমান। তার কারণ সবাই এখন একই পাঠ্যসূচিতে লেখাপড়া করবে, একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে। এত দিন যারা ভেবে এসেছে, মাদ্রাসায় গিয়ে কম লেখাপড়া করে বেশি গ্রেড পেয়ে যাবে, তাদেরও ফাঁকি দেওয়ার দিন শেষ। এখন অন্য সবার মতো সমান লেখাপড়া করে তাদের গ্রেড তুলে আনতে হবে।
এ তো গেল দাখিল-আলিমের কথা, এর পরও স্নাতক আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে রয়েছে ফাজিল আর কামিল। তাদের ডিগ্রি কে দেবে? শিক্ষানীতিতে পরিষ্কার করে লেখা আছে, ‘উল্লিখিত কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য একটি অনুমোদনকারী (অ্যাফিলিয়েটিং) ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।’
কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসতে চায় না, তার পরও শিক্ষানীতিতে তাদের উপেক্ষা করা হয়নি। কৌশলের একটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন করে উক্ত কমিশন কওমি প্রক্রিয়ায় ইসলাম শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাদান বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সরকারের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করবে।’
এই হচ্ছে শিক্ষানীতিতে ধর্মসংক্রান্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে একটা ধারণা। এ দেশের মানুষের কাছে আমার প্রশ্ন, একটি শিক্ষানীতিতে কি এর চেয়ে বেশি ধর্ম সম্পর্কে থাকা প্রয়োজন? যদিও শিক্ষানীতিতে ধর্ম নেই বলে যাঁরা দাবি করছেন, তাঁরা কি সরাসরি এটা নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কে যেতে প্রস্তুত আছেন? তাঁদের যদি একটা চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়, তাঁরা কি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহস দেখাতে পারবেন?

২.
যাঁরা হরতাল ডেকেছেন, মোটামুটিভাবে বোঝা যায় যে তাঁদের কাছে ধর্ম খুব একটা সংকীর্ণ বিষয়, ধর্ম পালন থেকে সেটা ব্যবহার করায় তাঁদের আগ্রহ বেশি। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ করেছি, বিএনপি এই হরতালকে সমর্থন দিয়েছে। আমি যেহেতু শিক্ষানীতি কমিটির একজন সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলাম, তাই খুব আগ্রহ নিয়ে এ বিষয়ে কে কী বলছে, সেটা লক্ষ করছিলাম। আমি বেশ আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করেছিলাম, বিএনপিপন্থী শিক্ষাবিদেরাও এই শিক্ষানীতির বিপক্ষে গুরুতর কিছু বলেননি, তাঁরা সাধারণভাবে এটা সমর্থন করেছেন। কিন্তু ২৬ ডিসেম্বরে হরতালকে সমর্থন জানানোর পর আমি খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেছি। বিএনপির একাধিক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আছেন, অন্যান্য শিক্ষানীতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদেরা আছেন, তাঁদের কাছে আমার অত্যন্ত সহজ একটা অনুরোধ—তাঁরা কি পরিষ্কার করে বলবেন, শিক্ষানীতির কোন অংশটির কারণে তাঁরা হরতালকে সমর্থন দিয়েছেন? যদি সে রকম কিছু খুঁজে না পান, তাহলে কি তাঁরা তাঁদের দলকে সেটা বোঝাবেন?

৩.
আসলে যাঁরা হরতাল ডেকেছেন এবং যাঁরা সেটাকে সমর্থন করেছেন, তাঁদের আপত্তি অন্য জায়গায়। এই শিক্ষানীতিটি তৈরি করা হয়েছে আমাদের ছেলেমেয়েদের আধুনিক ছেলেমেয়ে হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। তাদের দেশপ্রেম শেখানোর কথা বলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা হয়েছে, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, ছেলেদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই সুযোগ পেয়ে একই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। তাদের কারুকলা শেখানোর কথা বলা হয়েছে, সুকুমার বৃত্তি বিকাশের কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞানমনস্কতার কথা বলা হয়েছে, সৃজনশীলতার কথা বলা হয়েছে—এক কথায় আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য যে রকম একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন, সে রকম একটি শিক্ষাব্যবস্থার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যাঁরা হরতাল ডেকেছেন, তাঁরা আসলে সেই বাংলাদেশকে চান না। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁরা এ বাংলাদেশটিকেই চাননি—যে পাকিস্তানকে পরাজিত করে আমরা এই বাংলাদেশ পেয়েছি, তাদের ঘাড়ে এখনো সেই পাকিস্তানি ভূত চেপে বসে আছে। এই বাংলাদেশকে তাঁরা আর পাকিস্তান রাষ্ট্র বানাতে পারবেন না কিন্তু চিন্তাভাবনায়, আদর্শে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো ১০০ বছর পিছিয়ে নেওয়াই হচ্ছে তাঁদের একমাত্র স্বপ্ন। শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে কথা বলে তাঁরা সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন।
এ দেশে যতবার শিক্ষানীতি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, দেশের প্রগতিশীল মানুষ ততবার তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। এই প্রথমবার একটি শিক্ষানীতি দেওয়া হয়েছে, যেটি প্রগতিশীল মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। দেশের ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী যদি এর বিরোধিতা করে, তাহলে অন্য সবাইকে মাঠে নেমে এসে এর বাস্তবায়নের কথা বলতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী মানুষগুলোকে বোঝাতে হবে, এই দেশটি আমাদের—তাদের নয়!
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, December 11, 2010

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১০ by আইন ও সালিশ কেন্দ্র

২০১০ সালে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল মিশ্র। একদিকে যেমন কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, তেমনি নেতিবাচক উদাহরণও রয়েছে অনেক। ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণীত হয়েছে, জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদিত হয়েছে, সংশোধিত শিশুনীতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইন অনুমোদিত হয়েছে। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদের (সিডও) আওতায় প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া উচ্চ আদালত কর্তৃক ফতোয়াকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক করা যাবে না, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে—এ ধরনের কিছু ভালো সিদ্ধান্ত এসেছে। কিন্তু উপরিউক্ত উদ্যোগের ফলাফল পাওয়ার ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ—বারবার এ ঘোষণা দেওয়া হলেও এটি অব্যাহতভাবে চলছে। ‘ক্রসফায়ার’ নেই, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘আত্মরক্ষার্থে গুলি’ চালানোর ফলে মৃত্যু ঘটছে—এ ধরনের যুক্তি দেখিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত ১১৭ জন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। তা ছাড়া নতুন প্রবণতা হিসেবে নিখোঁজ বা ‘গুপ্তহত্যার’ ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ অথবা গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তাদের র্যাব বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেই তুলে নিয়ে গেছে, যা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রায় পুরো বছরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নাজুক। নিজ বাসভবনে এক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা এবং এতে বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু, ছিনতাইকারীদের হাতে গণমাধ্যমের কর্মীসহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ড, মানুষের নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং তাতে গণপিটুনির শিকার হয়ে অনেক মৃত্যুর ঘটনা নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদাহরণ। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত ৯০ জন গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছে।
চলতি বছর বখাটেদের দ্বারা নারীদের উত্ত্যক্ত করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃৃদ্ধি পায়। অবশ্য সরকার ও প্রশাসনের তরফ থেকে নানামুখী প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ দেখা যায়। ফলে অনেক প্রতিবাদও দেখা যায়। কিন্তু বখাটেদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। এমনকি প্রতিবাদকারীরাও বখাটেদের রোষানলে পড়েছে। এর মধ্যে নাটোরের কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান এবং ফরিদপুরে মা চাঁপা রানী ভৌমিকের মৃত্যু ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়ে ২৮ জন নারী, মেয়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে এক বাবা এবং ছেলের অবাধ্যতায় অতিষ্ঠ হয়ে একজন মা আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ১৮ জন।
চলতি বছর বিরোধী দল দুই দিন হরতাল পালন করে। হরতালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বল প্রয়োগের ঘটনা বা হরতালের আগে গণগ্রেপ্তারের ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারের জন্য বিরোধী দল কর্তৃক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
বিচার বিভাগের কাজকে মসৃণভাবে চালানোর জন্য সরকার নিম্ন আদালতের জন্য বেশ কিছু বিচারক নিয়োগ দিয়েছে। তবে হাইকোর্টে দুজন বিচারকের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। তা ছাড়া, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা স্বচ্ছভাবে অনুসরণ না করায় দলীয় নিয়োগের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সরকার সম্প্রতি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘আপরাধ আমলে নেওয়ার’ ক্ষমতা দেওয়া হবে। এটা বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা এবং এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তা ছাড়া বিচারব্যবস্থার প্রচলিত নিয়মনীতিকে রীতিমতো বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বেশ কিছু দুর্নীতির মামলা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিবেচনায় যতগুলো মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, সবই ছিল সরকারদলীয় কর্মীদের। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নাটোরের গামা হত্যাকাণ্ডের আসামিদের বা শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের শাস্তি মওকুফের ঘটনা এ ক্ষেত্রে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সাংবাদিকেরা সরকারদলীয় প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাদের হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মাসুম নামের জনৈক সাংবাদিক (নিউ এজ) র্যাবের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চলতি বছর ১৫৮ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। তা ছাড়া চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করা ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধের চেষ্টা, সাময়িকভাবে ফেসবুক বন্ধ রাখা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মূল যে সমস্যা—ভূমিবিরোধ, তা নিষ্পত্তিতে তেমন অগ্রগতি নেই। ভূমি জরিপ আগে হবে নাকি পুনর্বাসন আগে হবে, তা নিয়ে ব্যাপক মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। তবে এ বিষয়ে পুনরায় চিন্তাভাবনা চলছে। ওই অঞ্চলে সহিংসতাও বন্ধ হয়নি। সহিংসতা প্রতিরোধে সেনাবাহিনী এবং সরকারের ভূমিকা ও আন্তরিকতা নিয়েও নানা সময় প্রশ্ন উঠেছে। ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ১৩ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করবে, এ বিশ্বাস আমার নেই। মানুষের জীবন ও জীবিকার সংগ্রামেও অনেক চড়াই-উতরাই ঘটেছে।’
পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং কবে থেকে শ্রমিকেরা তা পাবেন, তা নিয়ে বেশ কিছুদিন পোশাকশিল্পে অস্থিরতা চলে, একপর্যায়ে মালিকপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য পোশাকশিল্প বন্ধের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। রূপগঞ্জে সেনা আবাসন প্রকল্পের জমি কেনা নিয়ে সৃষ্ট ঘটনায় গ্রামবাসীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন নিখোঁজ হয়। ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রতিবাদে মানুষ পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়েছে। তা ছাড়া দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুৎ-পরিস্থিতি সারা বছরই নাজুক ছিল।
এপ্রিল ২০০৯ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্যপদ শূন্য ছিল। দীর্ঘদিন পর ২২ জুন ২০১০ সরকার চেয়ারম্যান ও অন্য ছয়জন কমিশনার নিয়োগদানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছে। তবে কমিশনের জন্য বিধিমালা ও সাংগঠনিক কাঠামো এখনো অনুমোদন করা হয়নি।
অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের গুরুত্বপর্ণ সব ক্ষমতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২৬ এপ্রিল ২০১০ মন্ত্রিপরিষদে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে। এই সংশোধনী গৃহীত হলে সরকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করার যে অঙ্গীকার করেছে, তা পূরণ হবে না এবং কমিশনের কর্মপরিধি যেমন সংকুচিত হবে, তেমনি এর ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হবে। এই সংশোধনীর অন্যতম হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তাদের (মন্ত্রীসহ) বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কমিশনকে সরকারের পূর্বানুমতি নিতে হবে। আরও প্রস্তাব করা হয়েছে, কমিশনের সচিব হবেন প্রধান হিসাব কর্মকর্তা এবং তিনি সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, যা কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করবে। তা ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ করা এবং মিথ্যা অভিযোগে শাস্তির বিধান রাখাও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আশার ব্যাপার হচ্ছে, সংশোধনীটি এখনো সংসদে উত্থাপিত হয়নি। আইন কমিশন বিদ্যমান বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন চিহ্নিত করে সংশোধনের কর্মপরিকল্পনা করলেও দীর্ঘদিন ধরে তা অনুমোদনের অপেক্ষায় মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। তা ছাড়া আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের হঠাৎ পদত্যাগ এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার বিষয়ে সংশয় সৃষ্টি করেছে।
যেহেতু বর্তমানে যে দল সরকার পরিচালনা করছে, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকারের সুরক্ষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে ব্যক্ত হয়েছিল, তাই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আসক সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): একটি মানবাধিকার সংগঠন।

Tuesday, July 20, 2010

অনিয়মই বহাল রইল by আবুল কাসেম ফজলুল হক

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়েছে। এ নিয়ে দুজন শিক্ষাবিদের মতামত ছাপা হলো।
জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া কিছু দিন আগে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তার সঙ্গে সংগতি রেখেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন ও পাস করা হয়েছে। শিক্ষা এখন বাণিজ্যিকীকৃত হয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষানীতি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও বাণিজ্যিকীকরণের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা বা সংযত করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। বাণিজ্যিকীকরণের যা যা ক্ষতিকর দিক আছে, তার সবই এখানে দেখা যায়। যাঁরা বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালান, তাঁরা পুঁজি বিনিয়োগ করেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। শিক্ষাকে এ রকম পুঁজির পণ্যে পরিণত রাখা সরকারের দিক থেকে উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংগতি রেখে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ব্যবসায়িক প্রবণতা সরকারের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ছিল। মনে হয়, সরকার চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে। জনগণের দিক থেকে সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য ভিন্ন রকম চাপ সৃষ্টি করা হলে ফল অন্য রকম হতো। সে ব্যাপারে উদ্যোগ আসার কথা দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক-চিন্তাবিদ ও জ্ঞানসাধকদের পক্ষ থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁরা সমাজের অভিভাবকত্ব করেন, তাঁদের বেশির ভাগের মধ্যেই সে রকম চিন্তাভাবনা, এমনকি প্রবণতাও নেই। ছাত্ররাজনীতির যে রূপ, তার মাধ্যমেও এমন কোনো চাপ সৃষ্টি হয় না, অথবা চিন্তাভাবনা দেখা দেয় না, যাতে অবস্থার উন্নতি হতে পারে।
একাডেমিক স্বাধীনতা বলে যে ব্যাপারটি বোঝানো হয়, তা মূলত পাঠ্য বিষয়, পাঠ্যক্রম ইত্যাদি স্থির করার স্বাধীনতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত ও জ্ঞানগত কাজকর্মের স্বাধীনতাও এর সঙ্গে জড়িত। সেসব ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সরকার হস্তক্ষেপ করতে চায়নি বলে বর্তমান আইন দেখে মনে হয়েছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কাজ করে যাবে, তা সরকার বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের আওতায় অন্তত কিছুটা নির্ধারণ করে দিতে পারত। যেমন, আজকের বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায়ও জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতি অবলম্বন করা অপরিহার্য। বাস্তবে দেখতে পাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিয়েও এর ব্যাপারে স্বেচ্ছাচারী ভাব চলছে। তাতে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পাচ্ছে না, জ্ঞান-বিজ্ঞানেরও উন্নতি হচ্ছে না। ঢাকা-রাজশাহী-চট্টগ্রাম-জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের যে মনোভাব দেখতে পাই, তাতে দেখি, শিক্ষকদের আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রভৃতি দল করার স্বাধীনতাকেই চূড়ান্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত চিন্তার স্বাভাবিক বিকাশ নয়, বিকার মাত্র। যাঁরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন প্রবর্তন এবং শিক্ষানীতি প্রণয়নের সঙ্গে আছেন, তাঁরা এসব ভালো করেই জানেন। কিন্তু তাঁরা কাজ করেন নিতান্তই পুঁজিপতিদের স্বার্থে ও বাজারি মানসিকতায়। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, তাঁরা কাজ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বদৃষ্টির অনুসারী হিসেবে। দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধ সেখানে কথার কথা মাত্র।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছাত্র-শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য আর্থিক ব্যাপারে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সামঞ্জস্য বিধান করা সরকারের কর্তব্য ছিল। সেদিকে সরকারের মনোযোগের পরিচয় নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, বামপন্থী রাজনীতিবিদদের দিক থেকেও সে সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ও যুক্তিসংগত সমালোচনা লক্ষ করা যায় না। আসলে অর্থনৈতিক ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
এটা লক্ষ করার বিষয়, চাকরিমুখী কিছু বিষয়ই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানোর ব্যবস্থা আছে। অর্থকরী কিছু দিক ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের সৃষ্টিশীল দিকের প্রতি দৃষ্টি নেই। শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশের প্রতিও দৃষ্টি নেই। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নেওয়া হয় অনেক বেশি বেতন। টাকার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে ভালো সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষা এবং সমাজের যে ক্ষতি হয়, তার প্রতিবিধানের উপায় করা উচিত ছিল। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে যুক্ত পুঁজিপতিদের চাপে সরকার তা করতে পারেনি।
সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একই ধরনের না হয়ে বিভিন্ন দিকে তাদের শিক্ষা কর্মকাণ্ড বিভক্ত ও বিকশিত করতে পারত। সরকারি নীতির মাধ্যমেই তা নির্ধারণ করা উচিত ছিল। সে ব্যাপারেও সরকার দৃষ্টি দেয়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, নতুন আইন নিয়ে আগামী ১০ কিংবা ২০ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে এগুলো যে ইতিবাচক উন্নতি করবে, তা আশা করা যায় না। নতুন আইন করার আগে যে অনুচিত ব্যাপারগুলো ছিল এবং অপব্যবস্থার সুযোগ ছিল, সেগুলোই আইনের মাধ্যমে এখন কিছুটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হলো।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: লেখক ও অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Monday, July 5, 2010

এমপিওভুক্তির ত্রুটিগুলো দূর করতে হলে by সৈয়দা শামসে আরা হোসেন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিভুক্তি সম্পর্কে সম্প্রতি অনেক লেখালেখি হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী পদে প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অর্থ স্থানান্তর করার পদ্ধতির নামকরণ হয়েছে ‘মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার’, সংক্ষেপে এমপিও। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস) শ্রেণীর শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অর্থ প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মচারীর নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এমপিও-সুবিধার আওতায় শিক্ষক-কর্মচারী পদে কল্যাণ তহবিল, অবসর-ভাতা তহবিল গঠনের জন্য সরকারি অর্থসংশ্লিষ্ট তহবিলের বিধি অনুসারে প্রতি মাসে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দেশের সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমপিও-সুবিধার অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও-সুবিধা পান না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতি অর্থবছর এমপিও-সুবিধা খাতে সরকারের অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা নির্ধারণ করে।
২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক হাজার ২২টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়ন সম্পন্ন করে গত মে মাসে। ১০ মে মন্ত্রিপরিষদ সভায় এই তালিকা বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নতুন তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, শিক্ষা উপদেষ্টার সক্রিয় ভূমিকা এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিধি-নীতিভিত্তিক কর্মোদ্যোগ সবার চিন্তাকে নাড়া দিয়েছে। এ পর্যন্ত এমপিও-সুবিধার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
এই অঞ্চল ঐতিহাসিক কিছু কারণ ও অবস্থার প্রভাবে শিক্ষায় পশ্চাৎপদ। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দেশ বিভাগ হওয়ার পরও শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সে সময় থেকে সমাজসচেতন মানুষ স্থানীয়ভাবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে শুরু করে। এভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের সহায়তা ছিল খুবই সীমিত ও অনিয়মিত।
স্বাধীনতার পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় সরকারের বিবেচনায় আসে। সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৭৪ সালে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস) শ্রেণীর শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় বেতন স্কেলের সমপর্যায়ভুক্ত করে বেতন নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত বেতনের প্রারম্ভিক অংশের অর্ধেক অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী পদে অর্থসহায়তা হিসেবে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হিসাব অনুসারে শিক্ষক-কর্মচারীদের হস্তান্তরের জন্য প্রেরণ করা হতো। এই অর্থ যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং অর্থের হিসাব সংরক্ষণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের প্রাপ্যতা অনুসারে বেতন-ভাতা বাবদ অর্থ সরাসরি প্রদানের ব্যবস্থা হিসেবে ১৯৮৪ সালে ‘মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার’ বা এমপিও-সুবিধা পদ্ধতি সরকার প্রবর্তন করে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত দুই হাজার ৩৮৬টি কলেজ, ১৫ হাজার ৫১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাত হাজার ৩৪৪টি মাদ্রাসা, এক হাজার ৯৫টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও-সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারপর গত ছয় বছর নতুন এমপিওভুক্তি স্থগিত রাখা হয়। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে এমপিওভুক্তি নতুন করে আবার শুরু করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে।
এমপিও-সুবিধা পাওয়া কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। সরকারি অর্থ অপব্যবহার করা হচ্ছে বলেও শোনা যায়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিও-সুবিধা প্রবর্তনের মাধ্যমে শুধু শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা খাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এর ফলে শিক্ষার মান অর্জন ব্যাহত হচ্ছে।
এমপিও-সুবিধা প্রবর্তনের মাধ্যমে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে কিছু শিক্ষকের মানসিক যন্ত্রণা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। শিক্ষা কর্তৃপক্ষের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, এমপিও-সুবিধার অনুরূপ প্রদানের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ করে সে বিষয়ে পরামর্শ দান ও বাস্তবায়ন বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
স্নাতক (সম্মান) মাস্টার্স কোর্সের পাঠদানকারী শিক্ষকদের সরকার এমপিও-সুবিধা দেয় না, এর ফলে দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের অর্থসহায়তা অনুপস্থিত।
এমপিও-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকের মান, মেধা যাচাই, দক্ষতার মূল্যায়ন করার কোনো বিধিব্যবস্থা নেই। জ্যেষ্ঠতার কারণে এই সুবিধা লাভ ঘটে, এ সত্ত্বে এমপিও-সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বলে বিবেচিত হন। সে শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ত্রুটি-অনিয়মের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তথ্যবিবরণী ফরমে শিক্ষকের মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা যাচাই বা তুলনামূলক বিবেচনার কোনো পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত নেই। নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিও-সুবিধার জন্য শিক্ষক-কর্মচারীর পদসংখ্যা নির্ধারিত থাকায় কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও-সুবিধাভুক্ত হন না। এমপিও বিধির মধ্যে এই দুর্বল ক্ষেত্রসমূহ দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
এমপিও-সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে কোনো অর্থ নেবেন না এই মর্মে অঙ্গীকারপত্র জমা দিলেও এই শর্ত লঙ্ঘন করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক সুবিধা এসব শিক্ষককে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নামকরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণের বিষয় জানা যায়। এসব আর্থিক অনিয়মের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাশ্রয় ঘটানোর যে উদ্দেশ্য এমপিও-সুবিধা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার প্রস্তাব ছিল, তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
এমপিও-সুবিধায় বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি করা হয় না। শিক্ষকের পদোন্নতির বিধিও সীমিত, এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও-বহির্ভূত শিক্ষক পদে এসব সুবিধা প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্দোলন আর দাবি নিয়ে সোচ্চার হলে এমপিও-সুবিধা পাওয়া যাবে, এ ধারণা অমূলক প্রমাণ করার পদক্ষেপ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেওয়া আবশ্যক। এমপিও-বিধি ভঙ্গ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক যে অনিয়ম হচ্ছে তা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা এবং এই অনিয়ম শাস্তিযোগ্য করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এমপিও-সুবিধা প্রয়োগ ন্যায়ভিত্তিক বিধির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। এমপিও পদ্ধতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন নিশ্চিতির সহায়ক করে তোলা প্রয়োজন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও সব শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রাপ্তির সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
সৈয়দা শামসে আরা হোসেন: সাবেক অধ্যক্ষ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, ঢাকা।

Sunday, June 6, 2010

জাতীয় শিক্ষানীতি -বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন গোটা জাতির জন্য একটি আশাজাগানিয়া ঘটনা। বিলম্বে হলেও একটি সময়োপযোগী, প্রাগ্রসর ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৩৯ বছরে বহু শিক্ষা কমিশন ও কমিটি গঠন এবং প্রতিবেদন তৈরি হলেও কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান শিক্ষানীতির ভাগ্যে তা ঘটবে না বলেই প্রত্যাশা।
অতীতে প্রায় প্রতিটি সরকার পূর্ববর্তী শিক্ষানীতি নির্বিচারে বাতিল করে দিয়ে নতুন কিছু করার মহড়া চালাত। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা প্রণয়ন কমিটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরির সময় অতীতের সব শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে। বিশেষ করে ড. কুদরাত-এ-খুদা ও শামসুল হক কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণীত হয় বলে জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদেরা। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করা, প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক বিষয়ে অভিন্ন পাঠ্যক্রম, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়ানো ছিল সময়ের দাবি। আদিবাসী শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ স্টাডিজ অন্তর্ভুক্তিও কম সাহসের কথা নয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সরকারের পরিবর্তন হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় মতৈক্য থাকা প্রয়োজন। এবার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে সর্বস্তরে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে। সরকারি ওয়েবসাইট ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় শিক্ষানীতি চূড়ান্ত অনুমোদনকালে যথাসম্ভব সেসব পরামর্শ আমলে নেওয়া হয়েছে। খসড়া প্রতিবেদনে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সেই শব্দ পরিহার করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা পুনঃস্থাপন করা হয়। একে অনেকে আপসবাদী মনোভাবের প্রকাশ মনে করলেও জাতীয় মতৈক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন নিয়ে কালক্ষেপণ কাম্য নয়। সংসদে জাতীয় শিক্ষানীতি বিল পাস করে যত দ্রুত সম্ভব, এর বাস্তবায়নকাজ শুরু করে দিতে হবে। ভালো নীতি হওয়াই যথেষ্ট নয়, কত দিনে ও কতটা সুচারুভাবে তা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক ভালো নীতি দেশ ও জনগণের কল্যাণে আসেনি সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। দলীয় সংকীর্ণতা যেন এই মহৎ উদ্যোগকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে না পারে, খেয়াল রাখতে হবে সেদিকেও।

Saturday, May 15, 2010

রেকর্ডসংখ্যক প্রথম শ্রেণী -সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ফল স্বাভাবিক নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৭ সালের স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় (২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত) ৪৬ জনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া নিয়ে শিক্ষকদের পারস্পরিক দোষারোপ প্রমাণ করে, এর পেছনে ঘাপলা রয়েছে। একই ব্যাচের স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পেয়েছিলেন মাত্র আটজন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফলে খোদ বিভাগীয় চেয়ারম্যানও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং এ জন্য দুজন শিক্ষকের বেশি নম্বর দেওয়াকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত একজন শিক্ষক বলেছেন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান এক শিক্ষার্থিনীকে বেশি নম্বর দিয়ে প্রথম শ্রেণী পাইয়ে দিয়েছেন। অপর একজন শিক্ষয়িত্রী পরীক্ষার্থীদের সময় দিতে না পারার কারণে প্রশ্নপত্র সহজ করার কথা স্বীকার করেছেন। বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যকার বিরোধ ও আঞ্চলিকতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে সন্দেহ করছেন অন্য একজন শিক্ষয়িত্রী।
সব মিলিয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পরিবেশ যে সুস্থ ও শিক্ষানুকূল নয়, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এ অবস্থায় স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় কীভাবে রেকর্ডসংখ্যক ৪৬ জন প্রথম শ্রেণী পেলেন, সে প্রশ্ন না উঠে পারে না। এর আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ৫২ জনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তোলপাড় হয়েছিল। গঠিত হয়েছিল তদন্ত কমিটিও। দেশের সর্বাধিক নামী বিদ্যাপীঠের পরীক্ষার ফলের ক্ষেত্রে এ রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। যেকোনো বিভাগের পরীক্ষার ফলাফলে ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। কোনো বছর অহেতুক ‘ঔদার্য’ দেখানো, আবার কোনো বছর মাত্রাতিরিক্ত ‘রক্ষণশীল’ হওয়া কাম্য নয়। অথচ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকেরা সেই কাজটিই করেছেন। শিক্ষকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, এর পেছনে রহস্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ‘কোনো বিষয়ে অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখা’র কথা বলেছেন।
যে ব্যাচের শিক্ষার্থীরা স্নাতক সম্মানে মাত্র আটজন প্রথম শ্রেণী পেয়েছেন, সে ব্যাচের স্নাতকোত্তরে ৪৬ জনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া অস্বাভাবিক বটে। কীভাবে রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণী পেলেন, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। ভালো পরীক্ষা দিয়ে কেউ ভালো ফল করলে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু অযৌক্তিক উদারতা দেখিয়ে জোর করে কাউকে প্রথম শ্রেণী পাইয়ে দিলে প্রকৃতই যাঁরা ভালো পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি অবিচার করা হয়। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অস্বাভাবিক ফলের পেছনে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকলে কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে তা খুুঁজে বের করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

Monday, April 26, 2010

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অপেক্ষা by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল বেঙ্গল কনফারেন্সে কলকাতার এক খ্যাতিমান কবি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতে এখন অনেকটা উপেক্ষিত। বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে যতটা তোড়জোড় চলে, তার কিছুই কলকাতায় হতে দেখা যায় না। ওই কবির খেদোক্তির খানিকটা যে সত্যতা রয়েছে, তা আমরা বাংলাদেশের মানুষ অনুমান করতে পারি।
এ কথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি নেই। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া শিক্ষার্থীর পাঠ্যক্রম তৈরি হয় না, তাঁর গান-কবিতা ছাড়া অনুষ্ঠান থাকে অসম্পূর্ণ, তাঁর গান-কবিতা ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে গতি আসে না। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ—সব জায়গায়ই শক্তি আর উদ্যমের উৎস রবীন্দ্রনাথ।
সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হওয়ার পর এ কারণে বারবার পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িকতার কবি, পাক-বাংলার মানুষের তামুদ্দুনিক জীবন নষ্ট হচ্ছে রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে—একশ্রেণীর লেখক-বুদ্ধিজীবী ও তাঁদের মুখপাত্র এবং কিছু সংবাদপত্র এই বলে রবীন্দ্রনাথকে দেশে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তৎকালীন সরকার সুপরিকল্পিতভাবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়। বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ প্রায় নিষিদ্ধ হন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনগণ; বিশেষ করে রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, প্রতিবাদ জানায়। একসময় পাকিস্তানি যুগের অবসান হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণাদাতা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মোৎসব পালিত হবে আগামী বছরের ২৫ বৈশাখ। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যুক্তভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ উৎসব উদ্যাপন করবে; যা বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য অবশ্যই আশাব্যঞ্জক আনন্দের সংবাদ।
কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে তো আমরা অনেকভাবে ঋণী। আমরা তাঁর কাছ থেকে নিয়েছি অনেক, দিয়েছি কতটা? সেভাবে হিসাব করলে দেখা যাবে, অকাতরে আমরা শুধু নিয়েই গেছি, তাঁর একটি গান দেশের জাতীয় সংগীত করা হয়েছে—এই যা। অথচ বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ বহুল পঠিত ও বহুল অনুশীলিত কবি সন্দেহ নেই।
প্রতিবছর সাড়ম্বরে দেশজুড়ে কবির জন্মোৎসব ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। বেতার-টিভির সর্বজনীন আকর্ষণ রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে যথার্থ অর্থে সম্মাননা জানিয়ে দেশে উচ্চতর কোনো বিদ্যাপীঠ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। অথচ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেই দাবি জানিয়ে আসছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববঙ্গের অন্যতম জমিদারি ছিল পাবনা (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) জেলার শাহজাদপুরে। ১২৯৭ থেকে ১৩০৪ বঙ্গাব্দে ইউসুফ শাহী পরগনার শাহজাদপুরের জমিদারিতে রবীন্দ্রনাথ বহুবার এসেছেন। রচনা করেছেন অসাধারণ কিছু গান, কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, স্বজনদের জন্য বেশ কিছু তথ্যনিষ্ঠ চিঠি; যা তাঁর সাহিত্যকে ভিন্ন এক মর্যাদা দান করেছে। কবির স্মৃতিধন্য এই শাহজাদপুরেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হলো এখানকার চমৎকার যোগাযোগব্যবস্থা। ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক দিয়ে দু-আড়াই ঘণ্টায় ঢাকায় যাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বঙ্গবন্ধু সেতুতে যেতে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট। নৌবন্দরসহ বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় শাহজাদপুরের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুরূপ পরিবেশ রয়েছে।
সাংস্কৃতিক বিভাগগুলোর (সংগীত, নাটক, ফোকলোর, চারুকলা, সাহিত্য, দর্শন, নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি) প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে শাহজাদপুরেই ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক দিনের। ‘টেগর পিস্ ইউনিভার্সিটি’ নামে প্রায় দুই দশক আগে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য খ্যাতনামা লোকতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মযহারুল ইসলাম। নানা কারণে অধ্যাপক ইসলাম তাঁর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাপক মযহারুল ইসলামের অনুজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল খালেক অগ্রজের নেওয়া সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন নতুন করে শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী মহোদয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা শাহজাদপুরের সুধী সমাবেশে আশ্বাসও দিয়েছেন বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয় শাহজাদপুরেই হবে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব জাতীয় সংসদ হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আগামী বছরের ২৫ বৈশাখ কবিগুরুর সার্ধশত জন্মোৎসবে কবির স্মরণে ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত স্মারক রেলব্যবস্থা চালু করবে। উভয় বাংলার রবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছে অবশ্যই এ এক আশাব্যঞ্জক সংবাদ। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদেরও প্রত্যাশা, ওই দিন বাংলাদেশে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে আমাদের সরকারও কবির অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। অপরিশোধ্য ঋণের খানিকটা অন্তত পরিশোধ করা যাবে। অনেকের ধারণা, বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে তিনি নিজেই যে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতেন সন্দেহ নেই। তাঁর সুযোগ্য তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে কবির স্মৃতির প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাবশত বাবার আরাধ্য কাজটি সম্পন্ন করবেন। আমাদের সবারই স্মরণে আছে, ১৯৬৯ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বারবার উল্লেখ করেছেন বাঙালির ভবিষ্যৎ সংগ্রামের সঙ্গে কবিগুরুর ভূমিকার কথা। পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে বজ্রকঠোর ঘোষণা দিয়েছিলেন বেতার-টিভিতে রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিতে।
সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখা এবং বাঙালিয়ানা সংরক্ষণের স্বার্থে সরকারি সব প্রক্রিয়া শেষ করে দেশবাসী আশা করে, ১৪১৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে বাবার সার্থক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রিয় কবির স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি বড় জাতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করবেন। শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী ও মযহারুল ইসলাম ফোকলোর ইনস্টিটিউটই হতে পারে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর অবকাঠামো। একটি বছর শুধু অপেক্ষায় কাটুক।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

Thursday, April 1, 2010

ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ -অচলাবস্থার অবসান হোক

দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে পরিচালনা পরিষদের বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট প্রশাসনিক অচলাবস্থা আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
পরিচালনা পরিষদ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রোকেয়া আখতার বেগমকে অব্যাহতি দিয়ে আরেকজনকে দায়িত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করে তাঁর পক্ষে রায় নিয়েছেন। আদালত ১২ এপ্রিল পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিতে দুজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রয়েছেন, একজন পরিচালনা পরিষদের নিয়োগপ্রাপ্ত, অন্যজন আদালতের রায়ে অধিষ্ঠিত। শিক্ষকদের গরিষ্ঠ অংশ পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। পরিচালনা পরিষদ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও ভর্তি-বাণিজ্যের অভিযোগ এনেছেন।
ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিস্থিতি যে সংকটজনক, তা অনুধাবন করা যায় বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতিতে। সংকট নিরসনে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করায় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিবছর ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মাত্রাতিরিক্ত ভিড় লক্ষ করা যায়। সেই সঙ্গে ভর্তি-বাণিজ্যের অভিযোগও অসত্য নয়। সব সরকারের আমলেই পরিচালনা পরিষদকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের নজির রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবছর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও শ্রেণীকক্ষ বাড়ানো হয়নি।
ভর্তি-বাণিজ্যসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে, সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটি চলে শিক্ষার্থীদের টাকায়, অথচ পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের স্বার্থ দেখা হচ্ছে না। অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালনা পরিষদে যাঁরা আছেন, তাঁদের সন্তানেরা এখন আর সেখানে পড়াশোনা করছে না। পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষকমণ্ডলীর সমন্বিত প্রয়াসই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারা নিশ্চিত করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষকদের মুখোমুখি অবস্থান কাম্য নয়। ১ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে হবে, অন্যথায় পরীক্ষার্থীরা বিপদে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীও উদ্যোগ নিতে পারেন। কোনো পক্ষের খামখেয়ালিতে এই আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

Sunday, March 7, 2010

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন -শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে

যেকোনো প্রতিষ্ঠান সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য আইন যে হালনাগাদ ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু গেল শতকের নব্বইয়ের দশকে। এ জন্য ১৯৯১ সালে একটি আইনও প্রণয়ন করা হয়েছিল। সে সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। বর্তমানে অর্ধশতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সে ক্ষেত্রে নতুন আইন জরুরি হয়ে পড়ছে। তবে তা হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে। এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনটি পর্যালোচনা ও বিবেচনার দাবি রাখে।
প্রস্তাবিত আইনে উপাচার্যের ক্ষমতা বাড়ানো এবং তাঁকে সিন্ডিকেটের প্রধান করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানই এই দায়িত্ব পালন করেন। এতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া ইচ্ছামতো শিক্ষার্থীদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করতে পারবে না। এ ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকার প্রয়োজন আছে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত বেতন আদায় করলেও শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও দিচ্ছে না। এ নিয়ে পত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে। ইউজিসির উদ্যোগে একাধিকবার তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
ইউজিসি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল, নানা চেষ্টা-তদবির চালিয়ে সেগুলোরও কোনো কোনোটি অনুমোদন আদায় করে নিয়েছে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ভবন, মুক্ত আঙিনা ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও শিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রস্তাবিত আইনে অনেক সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা এর বিরোধিতা করে আসছে। তাঁদের দাবি, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর করলে সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।
বেসরকারি উদ্যোগে সরকার অযথা নাক গলাক, সেটা কারও কাম্য নয়। আবার একই সঙ্গে এটাও মানতে হবে যে খেয়ালখুশিমতো কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। সে কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্যই নিয়মনীতির আওতায় আনতে হবে। মালিকপক্ষের যুক্তিসংগত বক্তব্য থাকলে তাও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রস্তাবিত আইন সংশোধনও করা যেতে পারে। তবে কোনো অজুহাতেই আইনটিকে হিমাগারে রাখা চলবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট যাতে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, সে জন্য তদারকির প্রয়োজন আছে। তবে সরকারি প্রতিনিধি মনোনয়নের নামে অযাচিত হস্তক্ষেপ যেন না হয়, সে নিশ্চয়তাও থাকা প্রয়োজন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার ও উদ্যোক্তাদের মুখোমুখি অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। সংসদে বিলটি পেশ করার আগেই দুই পক্ষ আলোচনায় বসে এ ব্যাপারে একটা সমঝোতায় আসতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতাই পারে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে।

Saturday, February 20, 2010

কত মায়ের কোল খালি হলে আমরা চেতন হব -ছাত্রের মৃত্যু by মেহতাব খানম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী পরিশ্রমী ছাত্র আবু বকর আর মায়ের কোলে ফিরে আসবে না কখনো। নিজে না খেয়ে, মাথায় তেল না দিয়ে যে সন্তানটিকে তিলে তিলে বড় করেছিলেন স্নেহময়ী মা, তাঁর বুকের ব্যথার তীব্রতা এতটুকুও কমবে না এই জীবনে। অন্য সবাই ভুলতে শুরু করবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু বকর নামে একজন শিক্ষার্থী ছিল, যাকে মূল্যবান জীবনটি দিতে হয়েছিল লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির কোন্দলের কারণে। কিন্তু মায়ের কাছে এই লক্ষ্মী আর কর্তব্যপরায়ণ ছেলেটির স্মৃতি সব সময় অমলিন থাকবে। যারা শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অসুস্থ রাজনীতিচর্চার কারণে মারা গেছে, তাদের মায়েদের দীর্ঘশ্বাস ও আর্তচিত্কার আমাদের বিবেককে কি একটু নাড়া দিচ্ছে? এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করা উচিত। লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি আর শিক্ষকরাজনীতি আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোকে কলঙ্কিত আর ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে বহুদিন ধরে। বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে এর বিস্তার ঘটেছে মাহামারির মতো। বিভন্ন সময় শাসক বদলেছে। কখনো গণতন্ত্র, কখনো স্বৈরশাসন দেখেছি আমরা। কিন্তু কখনো কি মনে হয়েছে, আমরা সাধারণ নাগরিক সব দিক থেকে শান্তিতে আছি? অনেক বিষয় আমাদের পীড়া দিয়েছে অহরহ। এর মধ্যে একটি বড় ধরনের পীড়াদায়ক বিষয় হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে প্রতিনিয়ত মারামারি আর সহিংসতা। দিনের পর দিন ছাত্রদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। সেগুলো দেখার পর আমরা কিছুদিন ‘আহা’, ‘উহু’ করেছি, দুফোঁটা চোখের জলও হয়তো ফেলেছি এবং তারপর সেটা ভুলে গিয়ে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমরা এখন অনেক নির্বিকার হয়ে গেছি এবং এ ধরনের মৃত্যু আমাদের আর স্পর্শ করে না। হয়তো বা এসব ঘটনা এত বেশি ঘটে যে আমরা সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, ‘এটা কোনো ব্যাপার না, কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা।’ কথাটি মনে হয়েছে আমারও, কিন্তু মুখে না বললেও অনেকটা এ ধরনের মনোভাব নিয়েই চলছি। কারণ আমরা কেউ তো রাস্তায় নেমে এসব মৃত্যুর নিন্দা বা প্রতিবাদ করছি না। আমাদের স্কুলপড়ুয়া সন্তানেরা ভবিষ্যতে কোথায় শিক্ষা নেবে, কোন ধরনের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষকের কাছে পড়বে তা নিয়ে ভাববার অবসর আমাদের কারোরই নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ছাত্রদের শিক্ষা গ্রহণের ওপর কতটা গুরুত্ব আরোপ করেন, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। যদি তাঁরা এ ব্যাপারে আন্তরিক হতেন, তাহলে এত দিন ধরে অস্ত্রবাজি বা দলবাজির সংস্কৃতি রাজনীতির অস্থিমজ্জার এত গভীরে প্রবেশ করত না। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, যাঁরা উচ্চপদে আসীন থেকে দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং সেই সঙ্গে কিছু স্বার্থান্বেষী শিক্ষক রয়েছেন, তাঁরাও এই সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ সমস্ত বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সভায়, সেমিনারে, মিডিয়ায় তাঁরা যে দল সমর্থন করেন, সেই দলের নেতাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় ইতিহাসের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। তাঁরা স্বীকার করেন না যে ছাত্রদের সেই সময়কার ভূমিকার সঙ্গে এখনকার ভূমিকার বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য নেই। পুরোনো রেকর্ড বারবার শোনানোর মতো করে তাঁরা বলতে থাকেন, ছাত্রদের জন্যই ভাষা আন্দোলন হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে, স্বৈরশাসন উত্খাত হয়েছে; অতএব, ছাত্ররাজনীতি অব্যাহত থাকবে। এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে আমরা এই অহেতুক মৃত্যুকে আর শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দিচ্ছি?
কতিপয় শিক্ষক প্রত্যক্ষভাবে কেউ বিরোধী দলের এবং কেউ সরকারি দলের রাজনীতিতে যেভাবে সমর্থন দান করছেন, তার মধ্যে তো লেজুড়বৃত্তি ও তাঁবেদারি ছাড়া এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। একটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনে জিতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে রাতারাতি দলীয়করণের যে প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তা সমস্ত জাতির জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। সাধারণ ছাত্ররা কিন্তু ভালো করেই জানে যে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, যাঁদের মধ্যে শিক্ষকেরাও রয়েছেন, তাঁরা যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে সরকার ও বিরোধী দলের লোকজনের অপকীর্তির নিন্দা করে তাদের সর্বদা সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়ে আসতেন, তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে অন্য সব জায়গায় এত বড় ধস নামত না। ছাত্ররাজনীতির নামে যেভাবে সব জায়গায় ক্ষমতার প্রভাব খাটানো হয়, সেসব ঘটনা সমাজের সব সচেতন মানুষই জানে, নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সত্যিই দেশের মানুষের শান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনীতির চর্চা হলে সাধারণ মানুষের কাছে তা অনেক গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আর তেমন স্বপ্ন দেখি না।
এখন একমাত্র উপায় হচ্ছে, যারা এই দেশটির সচেতন ও সাধারণ মানুষ, যারা কখনো অন্ধভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন জানায়নি কিন্তু দেশটিকে এবং মানুষকে ভালোবাসে, তারা যদি সন্তানহারা বাবা-মায়ের সঙ্গে দুঃখ ভাগ করে নিতে চায়, তাহলে চলুন সবাই মিলে শপথ করি—যেভাবেই হোক, অন্তত আগামী ১০ বছর এই লেজুড়বৃত্তির তথাকথিত রাজনীতি যাতে বন্ধ থাকে, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করব। অনেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রদের গৌরবময় অবদানের কথা স্মরণ করে এটি অব্যাহত রাখার কথা বলছেন, কিন্তু লেজুড়বৃত্তি চাইছেন না। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, বিষয়টিকে এখন শুধু সাদা-কালোতেই দেখতে হবে। ধূসর এলাকায় এটিকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে। ছাত্ররাজনীতির নামে টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজি, অর্থের ছড়াছড়ি—এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে কীভাবে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, সেই লক্ষ্যে আমরা সমমনা কিছু মানুষ একটি ফোরাম তৈরি করে সুপারিশমালা দিতে পারি।
প্রাথমিকভাবে যা করা যেতে পারে তা হচ্ছে, অবিলম্বে আগামী ১০ বছর সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলবাজি বন্ধ করা। শুধু প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের লক্ষ্যে যার যার প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম বন্ধ করার জন্য, প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ রক্ষার জন্য দুর্নীতি রোধ, অপসংস্কৃতি রোধ, শিশু অধিকার রক্ষা—এ ধরনের কিছু বিষয়ের ওপরই শুধু দলবদ্ধ হয়ে শান্তি বজায় রেখে কাজ করা যাবে এমন নির্দেশ উচ্চ আদালত থেকে আসতে পারে।
সমমনা নাগরিকদের পক্ষ থেকে চলুন আমরা হাত জোড় করে রাজনৈতিক নেতাদের বলি, ‘তোমাদের আর কত রক্ত দরকার? এবার নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ে নাও। ছাত্রদের ওপর ভর করে গোটা জাতিকে এভাবে ধ্বংস করে দিও না। তোমরা কি সন্তানহারা মায়েদের কান্না একেবারেই শুনতে পাও না? যে ছেলেগুলোকে ঘর থেকে বের করে অর্থ, ক্ষমতা আর অস্ত্রের লোভ দেখিয়েছো; আগামী ১০ বছরের মধ্যে তোমরা আবার তাদের ঘরে পৌঁছে দাও। তোমাদের বুঝতে হবে, শিক্ষা গ্রহণ আর দেশোদ্ধার একই সঙ্গে করা সম্ভব নয়। ছাত্রদের যদি সত্যি আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাও, তাহলে ওদের মধ্যে অর্থ আর ক্ষমতা নয়, জ্ঞানের পিপাসা তৈরি করার লক্ষ্যে কাজ করো। আর সেটাই হবে তোমাদের প্রকৃত দেশসেবা। যেন ভবিষ্যতে কোনো মায়ের সন্তান অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাস না করে, টেন্ডারের অর্থ নিয়ে মাতাল না হয়, অস্ত্রবাজি আর সন্ত্রাসের কারণে নিরীহ ছাত্রের মায়ের কান্না আর দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভেসে না বেড়ায়, তেমন একটি সমাজ তোমরা নিশ্চিত করো। দুহাত জোড় করে সেই অঙ্গীকারটুকু চাইছি তোমাদের কাছে।’
মেহতাব খানম: অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Monday, February 1, 2010

সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটাবে by গাজী মো. আহসানুল কবীর

সৃজনশীলতা মানুষের একটি অন্তর্নিহিত গুণ। মানুষের এ সুপ্ত সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়, নানা বিষয় সন্নিবেশ করা হয়। ফলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী এমনভাবে গড়ে ওঠে যে কর্মজীবনে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ছাপ রাখতে পারে। কিন্তু আমরা এখনো বাংলাদেশে সে ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। পৃথিবীর দেশে দেশে যেখানে দক্ষতা বিনির্মাণে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেখানে আমরা চলছি মুখস্থ বিদ্যানির্ভর বিশ্ব দরবারে প্রায় অচল একটি পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে। এ পদ্ধতিতে মেধার কোনো মূল্যায়ন হয় না, সৃজনশীলতা বিকাশের কোনো সুযোগ নেই। এ সংকট থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উদ্যোগের সফল সূচনা। সূচনা ইতিমধ্যে হয়ে গেছেও। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক স্তরে এসএসসি পরীক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার করে নতুন সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে। সরকারি ঘোষণা অনুসারে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথমপত্র ও ধর্ম—এ দুটি বিষয়ের পরীক্ষা সৃজনশীল পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ২০১১ সালে আরও পাঁচটি বিষয় (রসায়ন, ভূগোল, সাধারণ বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও ব্যবসায় উদ্যোগ) এবং পরবর্তী বছর অবশিষ্ট বিষয়গুলোয় সৃজনশীল প্রশ্নপত্র অনুসারে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
সব নতুনই মানুষের কাছে অপরিচিত মনে হয়। তাই এ নতুন পদ্ধতি সম্পর্কেও এক অজানা আশঙ্কা ও ভীতি শিক্ষার্থী-অভিভাবক-শিক্ষকসহ সবার মনেই কাজ করছিল। কিন্তু মনে হয়, এ ভীতি এরই মধ্যে কেটে গেছে। কারণ গত আগস্ট মাসে সারা দেশব্যাপী বাংলা ও ধর্মশিক্ষায় একই প্রশ্নপত্রে (সৃজনশীল) সব শিক্ষার্থী প্রাক-নির্বাচনী (প্রিটেস্ট) এবং পরে গত অক্টোবরে নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দেখতে পেল, এ সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি দারুণ এক শিক্ষার্থী-বান্ধব পদ্ধতি।
সৃজনশীল প্রশ্নের যে চারটি অংশ থাকে তার সবটুকুই শিক্ষার্থীরা নিজেরাই উত্তর দিতে পারে। এর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বসে বিরক্তির সঙ্গে মুখস্থ করার প্রয়োজন পড়ে না, সাহায্যের জন্য কারও কাছে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু গল্পের বইয়ের মতো পড়ে নিলেই চলে। নিজে নিজেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে শিক্ষার্থীরা। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে চিন্তাশক্তির প্রয়োগে এবং সমস্যা সমাধানে পারদর্শী অর্থাত্ সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল করে গড়ে তোলার জন্যই নতুন এ পদ্ধতি। সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে দুটি অংশ থাকে। তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় প্রথম অংশে ৬০ নম্বর এবং দ্বিতীয় অংশে ৪০ নম্বর। প্রথম অংশে ছয়টি কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের উত্তর করতে হয় (নয়টির মধ্যে) এবং দ্বিতীয় অংশে ৪০ নম্বরের জন্য ৪০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর করবে। প্রথম অংশে প্রতিটি ১০ নম্বরের কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের শুরুতে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য প্রথমে একটি দৃশ্যকল্প (প্যারাগ্রাফ বা চিত্র বা ছক) দেওয়া থাকে। তারপর এর ওপর চারটি প্রশ্ন করা হয় সহজ থেকে ক্রমান্বয়ে কঠিনের দিকে যথাক্রমে ১ নম্বর, ২ নম্বর, ৩ নম্বর ও ৪ নম্বরের অর্থাত্ মোট ১০ নম্বরের প্রশ্ন। এ চারটি প্রশ্নের প্রথমটি স্মৃতিনির্ভর, বইতে যা পড়েছে তা স্মরণ করে উত্তর লিখবে। দ্বিতীয় অংশে শিক্ষার্থী বস্তু বা বিষয়টি সম্পর্কে কতটুকু বুঝতে পারল তা যাচাই করার জন্য একটি সহজ প্রশ্ন করা হয়। এর পর প্রশ্নের তৃতীয় অংশে জানতে চাওয়া হয় সে এ বস্তু বা বিষয়টি সম্পর্কে যা জানল ও বুঝল তা নতুন পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজে লাগবে অর্থাত্ তার অরিচিত কোনো ক্ষেত্রে তার লব্ধ জ্ঞানটি কীভাবে প্রয়োগ করবে এবং সর্বশেষ চতুর্থ অংশে বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীর কিছু বিশ্লেষণধর্মী মতামত ও মূল্যায়ন বা তার কাছ থেকে সমস্যার একটি সমাধান চাওয়া হয়। অর্থাত্ এ পদ্ধতিতে চারটি ছোট প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে তিলে তিলে একজন সৃজনশীল মানুষ তৈরি করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়।
অনেকে মনে করতেন, এ ধরনের বিশেষণমূলক মতামত বা সমস্যার সমাধান কি শিক্ষার্থীরা দিতে পারবে? তাদের জন্য এটি কঠিন হয়ে যাবে না তো? কিন্তু না, দেখা গেছে, পরীক্ষার্থীরা নিজের মতো করে মতামত দিচ্ছে বা সমস্যার সমাধান দিচ্ছে। আর ‘আমিও সমাধান দিতে পারি’ এ অনুভূতি শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে উদ্বেলিত করে। শিক্ষা সংস্কারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম উপলক্ষে দেশের কিছু কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয় পরিদর্শনের সুযোগ আমার হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে শিক্ষার্থীদের সাড়া দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছি। এটি সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির সফলতা সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট আশাবাদী ও আস্থাশীল করে তুলেছে।
এ ব্যাপারে বলে রাখা ভালো যে বর্তমানে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির তুলনায় সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতিতে মূল্যায়ন অনেক বেশি নির্দোষ, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য। যেমন, বর্তমান পদ্ধতিতে কোনো বিষয়ের একটি প্রশ্নপত্রে একই অধ্যায় থেকে একাধিক প্রশ্ন করা যায়, আবার কোনো কোনো অধ্যায় থেকে হয়তো একটিও প্রশ্ন না করেও থাকা যায়। কিন্তু প্রস্তাবিত সৃজনশীল পদ্ধতিতে একজন প্রশ্নকর্তা এ ধরনের অসামঞ্জস্য আচরণ দেখাতে পারবেন না। তাঁকে একটি বিষয়ের প্রশ্নপত্রে প্রতিটি অধ্যায় থেকে এবং শ্রেণীর জন্য নির্ধারিত প্রতিটি শিখন উদ্দেশ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশ্ন করতে হয়। এ জন্য প্রশ্নকর্তা শিক্ষককে একটি নির্দেশক ছক অনুসরণ করতে হয়। এ ছাড়াও এ পদ্ধতিতে প্রশ্নকর্তাকে প্রতিটি প্রশ্নের একটি নমুনা উত্তরও (model answer) লিখে প্রশ্নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। আবার কোন প্রশ্নে কীভাবে নম্বর দেবেন তার নির্দেশিকাও (marking scheme) করে দিতে হয়। প্রশ্নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া এ নমুনা উত্তর এবং নম্বর প্রদান নির্দেশিকা পরে যতাযথ বিষেজ্ঞগণ যাচাইবাছাই করে ঠিক করে দেন। আবার পরীক্ষা গ্রহণের পর পরীক্ষকেরা এ নমুনা উত্তর ও নম্বর প্রদান নির্দেশিকা ব্যবহার করে প্রধান পরীক্ষকের তত্ত্বাবধানে কিছু উত্তরপত্রের নমুনা মূল্যায়ন করবেন। প্রত্যেক পরীক্ষক তাঁর বিয়য়ের ১০ থেকে ২০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের এ মহড়ায় অংশ নিয়ে নিজের ভুলভ্রান্তি শুধরে নেবেন। এ মূল্যায়নকে স্ট্যান্ডার্ড বা মান ধরেই ওই পরীক্ষক পরবর্তী সময় তাঁর জন্য বরাদ্দকৃত অবশিষ্ট উত্তরপত্রগুলো মূল্যায়ন করবেন। এ পদ্ধতি অনুসরণ করায় নিঃসন্দেহে মূল্যায়নপ্রক্রিয়া যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ও যথার্থ হয়।
মুখস্থবিদ্যাকে নিরুত্সাহিত করে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানো এবং তার সৃজনশীলতাকে উত্সাহিত করার জন্য সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। সৃজনশীল প্রশ্নগুলো হতে হয় মৌলিক। এর যে দৃশ্যকল্প ব্যবহার করা হবে তা আগের কোনো পরীক্ষার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি হতে পারবে না বা ভবিষ্যতেও আবার ব্যবহার করা যাবে না। এ দৃশ্যকল্পের বিষয়বস্তুটি অবশ্যই পাঠ্যপুস্তকের কোনো অধ্যায়ে থাকতে হবে। তবে ওই দৃশ্যকল্প পাঠ্যপুস্তক থেকে নেওয়া যেতে পারে, অন্য কোনো বই বা সংবাদপত্র থেকেও নেওয়া হতে পারে অথবা প্রশ্নকর্তা নিজেও বানিয়ে দিতে পারেন।
সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতিতে নমুনা উত্তর (model answer) সরবরাহের ও পরীক্ষাপূর্ব নম্বর প্রদান নির্দেশিকা (Marking scheme) এবং পরীক্ষা পরবর্তী নমুনা নম্বর প্রদানের (Sample making) ব্যবস্থা থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট স্বচ্ছ (Transparent) ও নির্ভরযোগ্য হতে বাধ্য। বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতির মতো পরীক্ষকের ইচ্ছামতো নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না এ ক্ষেত্রে। অর্থাত্ আগের পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়নে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা থেকে যে অনিয়ম ঘটার আশঙ্কা থাকে তা এখানে অনেকটাই কমে যাবে।
সৃজনশীল প্রশ্নের জ্ঞাননির্ভর ও অনুধাবনমূলক অংশ (ওপরের উদাহরণের প্রথম দুটি প্রশ্ন) শিক্ষার্থীরা সহজে উত্তর করতে পারবে বলে অকৃতকার্যের হারও কমে যাবে। একইসঙ্গে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পক্ষে উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন (৩ নম্বর ও ৪ নম্বর) উত্তর করা সহজ হবে বলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পার্থক্যও নির্ধারণ করা যায় এ পদ্ধতিতে। অথচ বর্তমান পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী মেধাবী না হয়েও কেবল মুখস্থবিদ্যার কারণেই বেশি নম্বর পেয়ে যেতে পারে। সুতরাং বর্তমান পদ্ধতিতে নম্বরের পার্থক্য যোগ্যতার পার্থক্য বোঝায় না, দক্ষতার পার্থক্য দেখাতে পারে না।
সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতিতে প্রশ্ন মৌলিক হওয়ায় এবং একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় নোটবই বা গাইডবইয়ের আর প্রয়োজন হবে না। এতে অসাধু পন্থা অবলম্বনের প্রবণতাও কমে যাবে। সুতরাং আসুন, আমরা সবাই এ পদ্ধতি মনেপ্রাণে সমর্থন করি এবং এর বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই।
ড. গাজী মো. আহসানুল কবীর: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, নায়েম। বর্তমানে এসইএসডিপি প্রকল্পে কারিকুলাম কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত।

Wednesday, January 20, 2010

সরকারি দলের নেতা -অবিলম্বে বহিষ্কার করা উচিত

তিনি একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাড়ির কাছে অন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে, তিনি সেই পদটিতে নিয়োগ চান। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচারের পর তিনি আবেদন করেছেন, কিন্তু ওই পদের জন্য আবেদনকারী আছেন আরও নয়জন। তদবিরের চেষ্টাগুলো থেকে ভরসা মেলেনি যে তাঁর নিয়োগ নিশ্চিত। আবার নিয়োগের জন্য যে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তাতে প্রথম স্থান অধিকার করে পদটি জয় করবেন—এমন আত্মবিশ্বাসের অভাব। তাই, নিয়োগ পরীক্ষার ঠিক আগের দিন ৩০-৪০ জন গুন্ডা নিয়ে তিনি হানা দিলেন ওই বিদ্যালয়ে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তাড়ালেন, একজন শিক্ষিকাকে লাঞ্ছিত করা হলো, তারপর বিদ্যালয়টির কার্যালয় ও শ্রেণীকক্ষগুলোর দরজায় তালা ঝুলিয়ে চলে গেলেন।
এই ব্যক্তির নাম বনি আমিন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নরিগুন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এটা তাঁর বড় পরিচয় নয়। আদতে কোনো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এমন ঘটনা ঘটাতে পারেন না। বনি আমিন এটা করেছেন তাঁর অন্য পরিচয়ের জোরে। তিনি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর শনিবারের দাপট প্রদর্শনের খবর পরদিন প্রথম আলোয় প্রকাশের পর মোবাইল টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গম্ভীরভাবে হুকুম দিলেন, ‘যা জানতে চান ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকের কাছে জেনে নিন।’
অর্থাত্ বনি আমিন তাঁর বেআইনি, সন্ত্রাসমূলক আচরণের সম্ভাব্য শাস্তি এড়াতে ক্ষমতাসীন দলের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে চান; দলের স্থানীয় নেতাদের নাম ব্যবহার করতে চান। ঠাকুরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ খান রোববার দুপুরে মোবাইল ফোনে আমাদের জানালেন, বনি আমিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। বনি আমিনের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি কিছু শোনেননি—ওসির এই দাবি সত্য হলে আশা করা যায়, বনি আমিন শিগগিরই গ্রেপ্তার হবেন।
আমরা প্রথমত বলি, বনি আমিনের মতো ব্যক্তি কোনো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কেন, সাধারণ শিক্ষক হওয়ারও উপযুক্ত নন। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের উচিত অবিলম্বে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দলের মান-সম্মান রক্ষা করা। তৃতীয়ত, শনিবারের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার জন্য বনি আমিন ও তাঁর লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এবং ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেখানে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

Sunday, January 10, 2010

ভর্তিতে বাড়তি অর্থ আদায় -শিক্ষার্থীদের ওপর জুলুমের এই ব্যবস্থা বন্ধ হোক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তির সময় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো রসিদ ছাড়াই বাড়তি অর্থ আদায় করছে। ভর্তির জন্য প্রশাসন যে ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার অতিরিক্ত এ অর্থ আদায়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। স্বেচ্ছাচারিতার এক প্রদর্শনী করে বিভাগগুলো এ অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো আগাম ঘোষণার প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করেনি। শিক্ষার্থীদের আগে অবহিত করা হয়নি। ভর্তির ফরম সংগ্রহ করতে গেলে বিভাগে বাড়তি অর্থ জমা দেওয়ার পরই তা মেলে।
শিক্ষার্থীর জন্য ভর্তি হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রয়োজনকে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীকে একপ্রকার জিম্মি করে এ অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ধরনের অনৈতিক চর্চার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বিশ্ববিদ্যালয়ে চললে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তা এক অশনিসংকেত।
বিভিন্ন বিভাগ নিজেদের খেয়ালখুশিমতো এভাবে জনপ্রতি এক থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি অর্থ আদায় করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল তহবিলের বাইরের এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তাও জানানো হয়নি। শিক্ষার্থীদের অধিকার আছে তাঁদের অর্থ কোন প্রক্রিয়ায়, কী কাজে ব্যয় হচ্ছে তা জানার। অথচ শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা।
পুরো প্রক্রিয়াটিতে যে বড় রকমের শুভংকরের ফাঁকি আছে, তা সহজেই ধারণা করা যায়। আগের বছরগুলোতে কয়েকটি বিভাগ এভাবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কথা বলে অর্থ আদায় করেছে। সেই অর্থ কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই সত্য অনেকটা প্রকাশ পেয়েছে নৃবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষকের কথায়, ‘...এই অর্থ দিয়ে চা-নাশতা খেতেন অনেকে।’
এ বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত। কিন্তু বিভাগগুলোর এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণ কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না। এভাবে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা ভ্রান্ত, শিক্ষার্থীর ওপর জুলুমের। আমরা আশা করি, বিভাগগুলো এভাবে অর্থ আদায় অবিলম্বে বন্ধ করবে এবং এদের কর্মকাণ্ডে আর্থিক স্বচ্ছতা রাখবে।

Monday, January 4, 2010

আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করা দরকার -শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন by ইলিরা দেওয়ান

প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে অনেক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে দেশের সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিশুদের জন্য নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের কথা বলা রয়েছে। এ ছাড়া আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ, আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এমনকি পাঠ্যসূচি তৈরিতে আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এসব প্রয়োজনীয়তার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার ফলে বাংলাদেশের অনেক মানুষ আদিবাসীদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব লালন করে, যা আদিবাসীদের জন্য অসম্মানজনকও বটে। আমরা আশা করছি, এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করে জনগণের মধ্যে আদিবাসী-সম্পর্কিত জ্ঞানের দীর্ঘদিনের বন্ধ্যত্ব দূর করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সম্মিলন। তাই আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন ও সংরক্ষণের জন্য সরকারকেই আন্তরিক হতে হবে।
পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক ১৯৯৮ সালের পার্বত্য জেলা পরিষদ সংশোধনী বিলের ৩৬ (ঠ) ধারায় ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার’ বিষয়টি আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাজ বাদে প্রধান যে কাজটি এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে, তা হলো পাঠ্যবইয়ের পাঠ্যসূচি প্রণয়ন। বিশেষত, পার্বত্য এলাকার ভৌগোলিক, সামাজিক ও ভাষাগত দিক বিবেচনায় রেখে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, পাঠদানের মাধ্যম নির্ধারণ ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এ কাজগুলো এখনো অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেহেতু বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাকাঠামো পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক, তাই এ শিক্ষাকাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন ছাড়া পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শিশুদের মূল স্রোতোধারায় আনা সম্ভব নয়। এ জন্য আদিবাসীদের মধ্যে স্থানীয় নেতৃত্ব এবং অভিজ্ঞ ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সেখানকার শিক্ষাকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
ভাষা হলো ভাব প্রকাশের প্রধানতম মাধ্যম। শিশুর মেধা বিকশিত করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রেও আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আদিবাসী শিশুরা এ অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। শিক্ষার প্রথম পাঠ ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাকেই তাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে ভাষাগত দূরত্বের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তযোগাযোগ গড়ে ওঠে না। এ কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি। কাজেই আদিবাসী শিশুদের কাছে শিক্ষাকে সহজবোধ্য ও সর্বজনীন করে তুলতে হলে উল্লিখিত বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই কোমলমতি এ শিশুদের কাছে শিক্ষাকে সহজতর করতে মাতৃভাষায় শিক্ষার পাশাপাশি আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অন্য ভাষাভাষী শিক্ষকদেরও স্থানীয় ভাষার ওপর ওরিয়েন্টেশন কোর্সের ব্যবস্থা করা দরকার।
আদিবাসী শিশুদের শিক্ষালাভের আরেকটি প্রধান অন্তরায় হলো যোগাযোগব্যবস্থার প্রতিকূলতা। শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত আবাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে এ সংকটও দূর করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে প্রতি জেলায় পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের জন্য দুটি করে আলাদা হোস্টেল চালু ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এ হোস্টেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অনেক দরিদ্র মেধাবী ছেলেমেয়ের পড়ালেখা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। জেলা সদরে অবস্থিত এ হোস্টেলগুলো যদি সংস্কার করে আবার চালু করা হয় এবং প্রয়োজনে আরও নতুন আবাসন তৈরি করে দেওয়া যায়, তাহলে বহু দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ পাবে।
মাতৃভাষায় আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদানের লক্ষ্যে এরই মধ্যে কিছু এনজিও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু এ কর্মসূচির ব্যাপকতা ও স্থায়িত্বের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক।
শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের সুযোগ বাড়ানো দরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৭) বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘উপজাতীয় কোটা’ সংক্রান্ত সরকারি একটি নীতিমালা গৃহীত হয়, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ও সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ আসন বণ্টনব্যবস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। এ ছাড়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ করা সব ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের কথা বলা হলেও কোনো সময়ই তা কার্যকর হয়নি। ‘আদিবাসীদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে’ এ যুক্তি আর খাড়া না করে সব ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ হচ্ছে কি না, সেদিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
আমরা চেয়েছি এমন একটি শিক্ষানীতি, যেটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সুষম শিক্ষাব্যবস্থার পথ সুগম করবে। বর্তমান শিক্ষানীতিটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রণীত হলেও অন্যান্য কমিশন থেকে এটি যথেষ্ট উদার ও সুষমভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই আমরা আশা করি, এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর পাঠ্যসূচিতে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে স্বতন্ত্র কোর্স চালু করা হবে এবং আদিবাসীদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অন্যান্য যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করার লক্ষ্যে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
ইলিরা দেওয়ান: উন্নয়নকর্মী।
ilira.dewan@gmail.com

Monday, October 12, 2009

শিক্ষা কখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়নি -প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি by এমাজউদ্দীন আহমদ

আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে সেই অতীতে, ব্রিটিশ আমলে, ব্রিটিশ আমলের পরে পাকিস্তান আমলে, এমনকি বাংলাদেশের জন্মের পরও, তার সমাপ্তি যেন হতে চায় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই গতি অব্যাহত রয়েছে প্রায় ২০০ বছর ধরে। তখনো যেসব বিষয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল, এখনো তা প্রাণবন্ত রয়েছে।
১৭৯২ সালের চার্লস গ্র্যান্টের শিক্ষাসংক্রান্ত সুপারিশমালা থেকে যার শুরু ১৮১৩ সালের কোম্পানি সনদে শিক্ষাবিষয়ক সুপারিশ, ১৮৩৫ সালের লর্ড মেকলে কমিটি, ১৮৫৪ সালের চার্লস উডের শিক্ষাবিষয়ক ডেসপ্যাচ, ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯৩৪ সালের সাপ্রু কমিটি, ১৯৪৪ সালের সার্জেন্ট কমিটিতে তার সমাপ্তি ঘটেনি। পাকিস্তান আমলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার রকমফের ও প্রকৃতি নিয়ে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রইল। ১৯৪৯ সালের পূর্ববঙ্গ শিক্ষা পুনর্গঠন কমিটি, ১৯৫২ সালের মওলানা আকরম খাঁ কমিটি, ১৯৫৭ সালের আতাউর রহমান খানের এডুকেশন রিফর্ম কমিশন, ১৯৫৯ সালের নূর খান কমিশনের প্রতিবেদন—এই অব্যাহত ধারার কিছু খণ্ডচিত্র।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল স্বপ্ন নিয়ে মাথা উঁচু করলেও এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। আজ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারা কিন্তু অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭৪ সালের ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষানীতি, ১৯৭৭ সালের কাজী জাফর আহমদ শিক্ষা কমিটি, ১৯৮৩ সালের মজিদ খান কমিশন, ১৯৮৭ সালের মফিজউদ্দীন আহমদ শিক্ষা কমিশন, ১৯৯৭ সালের শামসুল হক শিক্ষা কমিটির প্রতিবেদন, ২০০০ সালের শিক্ষানীতি, ২০০২ সালের শিক্ষা সংস্কার কমিটি এবং ২০০৩ সালের মনিরুজ্জামান শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন এই ধারাবাহিকতার অংশ। সবশেষে প্রকাশিত হলো জাতীয় শিক্ষানীতি-২০০৯।
এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা উল্লেখযোগ্য। এক. উল্লিখিত কমিটি বা কমিশনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই অভিজ্ঞ, প্রবীণ ও বহুদর্শী। তাঁদের অনেকেই জনপ্রিয় এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকও। শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের নেতৃত্বে পরিচালিত কমিশনগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব সুপারিশ করেছে তা জীবনকে, তা ব্যক্তিগত হোক আর সামষ্টিক হোক, কীভাবে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে, কীভাবে সাবলীল, সক্ষম ও সৃষ্টিশীল হতে সহায়তা করতে পারে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত উত্কর্ষের ঊর্ধ্বে উঠে সামগ্রিকতার আশীর্বাদ লাভ করে সুষ্ঠু জীবনবোধের অধিকারী করে তুলতে পারে, তার পূর্ণ প্রকাশ কোনোটিতে ঘটেনি। দুই. এসব কমিটি বা কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ লিপিবদ্ধ হয়েছে খণ্ডিতরূপে, তা পর্যালোচনা করলে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ঘটে। কিন্তু সার্বিকভাবে কোনোটিতে জীবনঘনিষ্ঠ, ঐক্যবদ্ধ, সুসমন্বিত ব্যবস্থার ছবি উপস্থাপিত হয়নি। সুপারিশগুলোর কোনো কোনোটি উত্তম হলেও একটির সঙ্গে আর একটির আত্মিক যোগসূত্র লক্ষ করা যায় না। তাছাড়া বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করতে গিয়ে এমন কিছু সুপারিশ উপস্থাপিত হয়েছে বা অনেকটা অ্যাডহক টাইপের, রাজনৈতিক স্লোগানসর্বস্ব। দীর্ঘকালীন পরিসরে জাতীয় জীবনকে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করার জন্য সুসমন্বিত কোনো ব্যবস্থার অনুপস্থিতি খুব পীড়াদায়ক। এর কারণও অবশ্য সুস্পষ্ট। যখনই নতুন কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হয়, তখন রাজনৈতিক ইতিহাসে নাম লেখাতে কিছু বরেণ্য ব্যক্তির সঙ্গে বেশ কিছু অনুগত চেনা মুখের সমাহার ঘটিয়ে নিজেদের উচ্চারণগুলোকে বা কমিশনের প্রতিবেদনও গ্রন্থাগারের এক কোণে স্থান লাভ করে, এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক ছোট্ট ফুটনোট রূপে।

দুই.
বেশ কয় বছর আগে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য জাপানের কিছু সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য জাপান গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগে এক ব্রিফিং অনুষ্ঠানে জাপানি রাষ্ট্রদূত অনেকটা আত্মতুষ্টির সঙ্গে বলেছিলেন, ‘জাপানে আমরা ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড কিংবা হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্বখ্যাত শিক্ষাঙ্গন সৃষ্টি করতে পারিনি বটে, কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনগুলো অতুলনীয়। বিশ্বের সমতুল্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তা শ্রেষ্ঠতর। আমারও অভিজ্ঞতা ঠিক তেমনি। টোকিও, কিয়োটো এবং আরও কয়েকটি মহানগরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি মাধ্যমিক এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠক্রম দেখে, ওই সব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে, বিশেষ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা দেখে আমার এই প্রতীতি দৃঢ় হয়েছে যে জাপানের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সত্যই অত্যন্ত উন্নতমানের। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সচেতন, সত্, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল নাগরিক সৃষ্টির জন্য এই বয়সের কিশোর-কিশোরীদের যা জানা দরকার, যা শেখা দরকার এবং জীবনব্যাপী যা চর্চা করা দরকার, তার প্রায় সবই জাপানের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যায়তনে সরবরাহ করা হয়।
তারপরও ভেবে অবাক হই, ২০০০ সালের ২২ ডিসেম্বর জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য গঠিত একটি কমিশন সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গতানুগতিক চিহ্নিত করে তার আমূল সংস্কারের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ পেশ করে। কোনো দলীয় কর্মী বা দলের অনুগতদের দ্বারা নয়, বরং ২৬ জন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সভাপতি ছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক আর ইসাকি। এই কমিশনের সুপারিশমালা দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়। এক. জাপানের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি খাতের সৃজনশীলতা ধারণ করতে সক্ষম নয়। দুই. বর্তমান যুগের দ্রুত প্রসারমাণ কিশোর অপরাধের এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের গতিরোধে অক্ষম। এই দুটি প্রধান সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কমিশনের সুপারিশ ছিল: এক. বর্তমান যুগের চাহিদা মেটাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সৃজনশীল মন বিনির্মাণ। দুই. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু তীব্র প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে শত্রু নিধনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সবার সঙ্গে সহযোগিতার বন্ধন প্রতিষ্ঠা করে বন্ধুত্বের সুখদ পরিবেশ সৃষ্টির কোনো শিক্ষা দেওয়া হয়নি। তাই নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষাদানের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধোত্তর জাপানি শিক্ষাব্যবস্থায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দক্ষ জনশক্তি গঠন ছিল মূল লক্ষ্য। তাই শিক্ষার্থীরা সব তথ্য মুখস্থ করে, বিদ্যমান প্রযুক্তির সবটুকু আয়ত্তে এনে, বর্তমানের সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, সবার ওপর মাথা উঁচু করার শিক্ষা লাভ করেছিল। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান তার দক্ষ, সক্ষম ও সচেতন কর্মীদের মাধ্যমে বিশ্বে এক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু শিক্ষা কমিশনের সংশয় হলো—আজকের জন্য এই শিক্ষাব্যবস্থা ফলপ্রসূ বটে, কিন্তু আগামীকাল এর পরিণতি কী? বিদ্যমান প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে উপযোগী হলেও নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এর উপযোগিতা কতটুকু? যে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করা হয়, সে ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা উপযোগী হলেও যে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন হবে, সে ক্ষেত্রে এর ব্যর্থতা প্রকট নয় কি?

তিন.
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এটি না সচেতন, না আধুনিক। বাংলাদেশের শিক্ষায় না আছে ব্যক্তিত্ব গঠনের সূত্র, নেই জাতি গঠনের চিত্শক্তিও। বিভিন্ন কালের সংগৃহীত উপাদানগুলোর আলগা সংযোজনে গড়ে ওঠা কিম্ভূতকিমাকার এক ব্যবস্থা এটি। হিন্দু ভারতের টোল-চতুষ্পাঠীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে মুসলিম ভারতের মক্তব-মাদ্রাসা এবং তার সঙ্গে আলগাভাবে জড়িত হয়েছে ব্রিটিশ ভারতের সাধারণ শিক্ষা। এই শিক্ষা সবাইকে এক সূত্রে গ্রথিত করে না। সবার জন্য মিলনের ক্ষেত্রও রচে না। বরং সবাই যেন ভিন্ন অবস্থানে অনড় থাকে, তার ব্যবস্থা পাকা করেছে। এই শিক্ষা না উচ্চারণ করে সহযোগিতার মন্ত্র, না সৃজন করে আত্মার বন্ধন। খণ্ডছিন্ন, বিভেদ-সূচক, নিরানন্দ। আমাদের দেশের শিক্ষা একদিকে যেমন প্রাণহীন, অন্যদিকে তেমনি গতিশীল জীবনের জন্য অর্থহীন। তাই উচ্চতর ডিগ্রিধারী এবং অর্ধশিক্ষিতদের কেউ কোনো সৃজনশীল উদ্যোগে এখন পর্যন্ত তেমন সফল হলো না, কেননা এদের কাউকে সৃজনশীলতার জাদু স্পর্শ করতে পারেনি। শিক্ষিত হয়েও অনেকে প্রশিক্ষিত মনের অধিকারী হতে পারেননি।
একুশ শতকে কিন্তু প্রতিযোগিতা হবে মেধার, পেশির নয়। এই প্রতিযোগিতা হবে মননের, সৃজনশীলতার, বাচালতার নয়। এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে হলে প্রয়োজন হবে সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের, বিরাট বপুর নয়। প্রয়োজন হবে উদার অন্তকরণের, বুকভরা হিংসা বা প্রতিহিংসার নয়। আমার মনে হয়েছে, দেশে যে শিক্ষা চালু রয়েছে, বর্তমানের জন্য আংশিকভাবে তা ফলপ্রসূ হলেও ভবিষ্যতের জন্য, বিশেষ করে এই শতকের মহাসমারোহে মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকার জন্য তা মোটেই উপযোগী নয়। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট পাঠক্রম সাধারণ ভাবনা-চিন্তার দুর্গে প্রবেশ করার জন্য উপযোগী হলেও যে দুর্গ আত্মরক্ষা এবং নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য কেন্দ্ররূপে চিহ্নিত, সেখানে প্রবেশাধিকার দান করবে না। এই শিক্ষা শুধু কর্মজীবনের সাধারণ গৃহে প্রবেশে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যে গৃহ সাফল্যের অন্তঃপুর, যা হাজারো উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন, যা ভবিষ্যতের বন্ধুর পথে সাবলীলভাবে পথচলার নির্দেশক এবং উন্নত জীবনের কাঙ্ক্ষিত কেন্দ্র, সেই গৃহে প্রবেশের সাহস বা সামর্থ্য জোগায় না। এ জন্যই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য।
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য হলেও এবং এ সম্পর্কে সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়ন কিন্তু যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন জাতির সার্বিক প্রস্তুতি। প্রয়োজন জাতির রাজনৈতিক দৃঢ় প্রকল্প। ২০০৯ সালের শিক্ষানীতি ঘোষিত হওয়ার আগে যেসব প্রস্তাব এসেছিল তার সবই কি অর্থহীন ছিল? ছিল কি অপ্রাসঙ্গিক? সেগুলোর কোনো অংশ কি গ্রহণযোগ্য ছিল না? সেগুলো গৃহীত হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে আসত। হয়নি, কেননা এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমনই যে ক্ষমতাসীন দল শুধু দলীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমেই শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে নীতি প্রণয়ন করতে চায়। অন্যান্য দেশে এই দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশেষজ্ঞদের ওপর। তাছাড়া আরও একটি কারণে বাংলাদেশে শিক্ষানীতি কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। গত ৩৮ বছরে কোনো সরকার শিক্ষা কার্যক্রমকে কোনো সময়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকাররূপে গ্রহণ করেনি। কয়েকটি দিকে তাকালে তা সুস্পষ্ট হবে। এক. কোনো সরকারের আমলে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়; কিন্তু সাধারণভাবে দেখা গেছে, কাউকে মন্ত্রী করতে হবে অথচ তাঁর জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পোর্টফোলিও পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তাঁকে শিক্ষামন্ত্রী করা হলো। দুই. বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিযোগ সব সময় হয়েছে অতি অল্প। বেশ কয়েক বছর থেকে একটু বেড়েছে বটে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য যা প্রয়োজন তার ধারেকাছে কোনো দিন এই বিনিয়োগ আসেনি।
কোনো উন্নত দেশের দিকে না তাকিয়ে যদি আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকাই, তাহলেই চলবে। যে ক্ষেত্রে ওই সব দেশ মোট জাতীয় উত্পাদনের শতকরা ৪.৫ থেকে ৬ ভাগ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করছে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যয় করছে শতকরা ২ ভাগের মতো। যে উচ্চশিক্ষা সমগ্র শিক্ষাক্ষেত্রকে প্রণোদিত করে থাকে, সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ একেবারেই অপ্রতুল। তাই বলি, অতীতে প্রণীত শিক্ষানীতি যে বাস্তবায়িত হয়নি তা পীড়াদায়ক নিশ্চয়ই, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি কোনো সময়। তাছাড়া যখনই কোনো আন্দোলনের সূচনা হয় দেশে, তখন সেই আন্দোলনের প্রথম শিকার হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন এ ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করেনি; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের মতো চলতে দেয়নি।
আগামীকাল: কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন
এমাজউদ্দীন আহমদ: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Saturday, October 10, 2009

শিক্ষানীতির সূত্রে দুটি প্রসঙ্গ -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

একটি জাতীয় শিক্ষানীতির অভাবের কথা বহুকাল ধরেই বলাবলি হচ্ছে। কিন্তু মূলত রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভাজনের কারণে এ অভাব দূর করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই শিক্ষানীতি প্রণয়নের চেষ্টা চলছে এবং বারবার নীতি প্রণীত হলেও কোনোটিই বাস্তবায়ন করা যায়নি। এভাবে আটটি প্রতিবেদন হিমাগারে জমা রয়েছে। একটু অতীত ঘাঁটলে দেখা যাবে, পাকিস্তান আমলেও শিক্ষানীতি নিয়ে এমন ব্যর্থ প্রয়াসের সংখ্যা কম ছিল না।
স্বাধীনতার পরপর একটি গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সংবিধান রচিত হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেটি যে বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, তার পেছনেও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভূমিকাই আসল। ইসলামের গোঁড়া ও জঙ্গি মতাদর্শের ভিত্তিতে একটি কট্টর গোষ্ঠী দেশে আছে, আর আছে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী রাজনীতির বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাভিত্তিক রাজনীতি।
যুগোপযোগী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথে উপরোল্লিখিত গোষ্ঠী ও তাঁদের সমর্থকদের দিক থেকে বাধা এসেছে বারবার।

২.
ইতিমধ্যে অনেক সময় গড়িয়েছে, বুড়িগঙ্গা-কর্ণফুলী দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেছে, সমস্যায় জর্জরিত দেশবাসীর পিঠ যেমন দেয়ালে ঠেকেছে, তেমনি অনেক বিষয়ে চোখও খুলেছে।
একসময় ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ইসলামপন্থীদের বিরূপতা ছিল, বর্তমানে তা কেটে গিয়ে বড় একটি অংশের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিই প্রবল আকর্ষণ জমেছে। সেক্যুলার বিষয়সমূহ পঠন-পাঠনেও আগেকার অন্ধ বিরূপতা কেটেছে। বলা যায়, ইহজীবনকে সুন্দর ও সার্থক করার গুরুত্ব অনেকেই বুঝতে পারছেন এবং সেই সূত্রে তাঁরা যুগোপযোগী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা মানছেন।
সেদিক থেকে নতুন একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য এটাই সঠিক সময় ছিল। বলা যায়, জাতির গরিষ্ঠাংশ মানুষ সন্তানদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা পেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত এখন।

৩.
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে দিনবদলের ডাক দিয়ে। পরিবর্তনের জন্য সরকারের সদিচ্ছার বড় প্রমাণ—ক্ষমতায় এসেই একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন, তিন মাসের মধ্যে নতুন শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়ন (এর মূল কৃতিত্ব অবশ্যই কমিটির), এ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার জ্ঞাপন।
সরকার এটি চূড়ান্ত রূপ দিতে যোগ্য ও আগ্রহী মানুষের মতামত নিতে চায়। তাই শিক্ষানীতিটি ওয়েবসাইটে দিয়েছে এবং মতামত পাঠানোর জন্য একাধিক ই-মেইল-ঠিকানা দিয়ে উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, সরকার নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের কাজে অযথা সময় নষ্ট করতে চায় না, আবার তা করতে গিয়ে কারও মতামতকে বিবেচনার বাইরেও রাখতে চায় না। এটা আমাদের দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের সাম্প্রতিক প্রবণতার বিপরীতে সরকারের একটি পরিবর্তনকামী শুভ পদক্ষেপ।

৪.
শিক্ষানীতিটি মূলত শিক্ষার লক্ষ্যাদর্শভিত্তিক এবং দিকনির্দেশনামূলক একটি দলিল। এর ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দসহ বিস্তারিত পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তরসমূহ। তখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকার কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। চূড়ান্ত খসড়া শিক্ষানীতি পর্যালোচনা করে এ প্রসঙ্গে কিছুটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে। আমার বিবেচনায় যে দুটি মূল সমস্যা রয়েছে, এখানে সেটুকুই আলোচনা করব। সংবিধানের মূল নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষানীতিতে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে—‘প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, বৈজ্ঞানিক এবং সকলের জন্য একই রকমের।’
বর্তমানে ইংরেজি-বাংলা-মাদ্রাসা এই মূল তিন ধারা ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষার রয়েছে এক ডজনের মতো উপধারা। ধনী-দরিদ্রের ব্যাপক-প্রবল ব্যবধান ছাড়াও ধর্ম, সংস্কার, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, অঞ্চল, রাজনীতি ইত্যাদি নানা সূত্রে বিভাজনের কারণে এ সমাজ বিবদমান, দুর্বল, ভঙ্গুর, গোঁড়া এবং অবশ্যই ক্ষয়িষ্ণু। তিনটি উপাদান সমাজে জাগরণ, উদ্যম এবং ঐক্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাহলো কার্যকর সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও রাজনৈতিক জাগরণ। এর কোনো একটির বা দুটি বা সব কটির যৌথ ভূমিকা ব্যতীত শ্রেণীবিভক্ত অসম ও বৈষম্যপীড়িত সমাজে সাম্যের মনোভাব ও পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না। কেবল সরকারি উদেযাগ তথা আমলাতান্ত্রিক নির্দেশনায় এ কাজ সম্ভব নয়।
আমাদেরই ইতিহাস থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিই তাহলে দেখব, বায়ান্ন থেকে সূচিত সাংস্কৃতিক স্বাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার এবং সমাজপ্রগতির চেতনার জোরে কেবল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন দেশই পাইনি আমরা, পেয়েছিলাম বাহাত্তরের সংবিধান, কুদরাত-এ-খুদা কমিশন শিক্ষা প্রতিবেদন এবং মুক্ত সাংস্কৃতিক বাতাবরণ। স্বাধীন দেশ ছাড়া আর কোনোটিই আমরা ধরে রাখতে পারিনি। কারণ ১৯৭১ সালে যেন চূড়া স্পর্শ করে রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রে আমাদের পতনের সূচনা হয় স্বাধীনতার পর থেকেই। তাই দিনবদলের হাতিয়ার যদি হয় উপযুক্ত শিক্ষা, তাহলে তা প্রচলন ও অব্যাহত রাখার জন্য চাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সমর্থন। সেটা সমাজ থেকে তৈরি হতে হবে। নতুবা তর্কে-বিতর্কে এবং পরিশেষে বিভ্রান্তিতে ব্যর্থতায় নিঃশেষ হবে সব প্রয়াস।
সমাজের ইতিবাচক শুভশক্তিকে চিহ্নিত করতে হবে, আরও ইতিবাচক শক্তির বিকাশে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে হবে এবং পরিবর্তনের/নতুনের পক্ষে জোরালো আবেদন সৃষ্টি করতে হবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে, যাতে অত্যুত্সাহী দলীয় ক্যাডাররা এ ধরনের উদ্যোগকে বিতর্কিত, বিপথগামী বা অসার্থক করে না তোলে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের সংগত আচরণই কাম্য।

৫.
ভালো শিক্ষানীতি, সুষ্ঠু পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ সত্ত্বেও শিক্ষার সংস্কার ও শিক্ষার মানোন্নয়নের সব প্রয়াস ব্যর্থ হতে পারে, যদি শিক্ষক এ কাজের উপযুক্ত না হন।
এখন দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার চাহিদা ও সচেতনতা তৈরি হয়েছে, দিনে দিনে এ চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু যাঁরা শিক্ষাদানের কাজটি করছেন, তাঁদের মান ও মর্যাদা রক্ষা হচ্ছে কিনা সেদিকে আমরা নজর দেইনি। একসময় সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী ও সমর্থ মানুষের সংখ্যা ছিল অল্প, শিক্ষক ও শিক্ষিত মানুষের জীবনযাপন ছিল সাদামাটা, শিক্ষকতা ছিল মানুষ তৈরির ব্রত, চাকরি নয়, বাঁধা বেতনের কাজ নয়। তাই সুশিক্ষিত আদর্শবান মানুষেরা এ কাজে আত্মনিয়োগ করে বাংলায় সুশিক্ষিত একটি শ্রেণী তৈরি করেছিলেন।
আজ জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে, মানুষের আগ্রহ ও রাষ্ট্রের অঙ্গীকার মিলে প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রসংখ্যা (অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ধরলে) বেড়ে হয়েছে প্রায় সোয়া দুই কোটি। ফলে স্কুল লাগছে অনেক, শিক্ষক লাগছে বিপুল। শিক্ষানীতি অনুযায়ী ছাত্র-শিক্ষক হার ১ ঃ ৩০ ধরলে প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষক প্রয়োজন প্রায় সোয়া সাত লাখ।
এদিকে বাজারমূল্যের তুলনায় অতি কম বেতন, শিক্ষাবহির্ভূত সরকারি নানা কাজের চাপ, শিক্ষার অনুপযোগী ও অকার্যকর ছাত্র-শিক্ষক হার (১ ঃ ১০০ও আছে) অপরিসর শ্রেণীকক্ষ, অপ্রতুল আসবাব, স্কুল সময়ের স্বল্পতা, অসচেতন অভিভাবক, রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় টাউট-মাস্তানদের দৌরাত্ম্য, বিভিন্ন রকম সরকারি কর্মকর্তার অধস্তনতা মিলে ‘শিক্ষক’ নামের প্রতিষ্ঠানের নিদারুণ ও সকরুণ অবক্ষয় হয়েছে, যা আমরা সম্মিলিতভাবে হতে দিয়েছি।
এককালে শিক্ষকেরাই, স্কুলশিক্ষকও ছিলেন সমাজের মাথা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তাঁদের অভিভাবক ও মুরব্বি হিসেবে মানত সমাজ। এ অবস্থা পাল্টে গেছে। বিদ্বানকে ডিঙিয়ে ক্ষমতাবানই সমাজের মাথা হয়ে বসেছেন। আর অর্থ ও ক্ষমতা জোট বেঁধে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল সম্পদ ও সুযোগকে কুক্ষিগত করে নিচ্ছে। শিক্ষক সম্প্রদায় এর বাইরে রয়েছেন, স্কুলশিক্ষক চলে গেছেন সমাজের একেবারে নিচের স্তরে। দারিদ্র্য ও ক্ষমতাহীন অবস্থা শিক্ষকের অবক্ষয়কে নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করেছে। মানতেই হবে দীর্ঘদিনের এই সামগ্রিক অবক্ষয়ের শিকার এই সমাজ জ্ঞান ও মননের স্থবিরতা ও অবক্ষয়ে ভুগছে। এর ফলে স্কুলশিক্ষকেরা চিন্তা-চেতনায় অনেকাংশে তামাদি ও গতানুগতিক হয়ে পড়েছেন। আমাদের শিক্ষার ব্যর্থতার এটি একটি বড় কারণ। এটি সরকারের জন্য নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। কারণ এ সমস্যা মূলত মানবিক, সংবেদনশীলতা ও সমঝোতার মনোভাব নিয়েই এতকালের ঔদাসীন্য ও অন্যায়ের প্রতিকার করতে হবে।
এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে?
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একজন যোগ্য ছাত্রবত্সল স্কুলগতপ্রাণ বিদ্যানুরাগী প্রধান শিক্ষক একাই একটি স্কুলের শিক্ষার ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মানের চমকপ্রদ উন্নয়ন ঘটাতে পারেন, স্কুলে তৈরি করতে পারেন উদ্দীপনাময় ইতিবাচক বাতাবরণ।
এই অভিজ্ঞতা থেকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার, মান, যোগ্যতার সূচক নির্ধারিত হতে পারে। প্রধান শিক্ষকের চাই মেধা, ডিগ্রি, বিদ্যানুরাগ, ছাত্রবাত্সল্য, সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রশাসনিক যোগ্যতা, নেতৃত্বগুণ, অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা।
যোগ্য প্রধান শিক্ষকের বেতন অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রফেসরের সমান হওয়া উচিত।
শিক্ষকদের বেতন-ভাতা উন্নত করে নতুন শিক্ষক নেওয়ার সময় মেধাবী, সৃজনশীল, উদ্যমী ছাত্রবত্সল তরুণদের নেওয়া উচিত। শিক্ষকদের দল হিসেবে উজ্জীবিত রাখা ও তাঁদের অব্যাহত জ্ঞানচর্চার মধ্যে রাখার জন্য প্রধান শিক্ষকের পরিচালনায় সাপ্তাহিক পাঠচক্র থাকতে হবে। শিক্ষা বিভাগ প্রতিবছর শিক্ষকদের সেই বছরে পড়ার জন্য নির্বাচিত ১০টি বইয়ের তালিকা প্রকাশ করবে এবং প্রতিটি স্কুলে প্রতিটি বইয়ের দুই কপি করে সরবরাহ করবে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষকদের পাঠচক্র বসবে দুই ঘণ্টার জন্য। তিন ভাগে এটি বিভক্ত থাকবে—মাসের নির্বাচিত গ্রন্থের ওপর আলোচনা (আমন্ত্রিত আলোচকও আসতে পারেন), নির্বাচিত গ্রন্থের নির্বাচিত অংশবিশেষ পাঠ এবং স্কুল ও পাঠ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা। মাসে একবার পাঠচক্রের পরে অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে, যেখানে সাধারণভাবে ও নির্দিষ্ট ছাত্রভিত্তিক মুক্ত আলোচনা হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের জন্য একটি মাসিক জার্নাল প্রকাশ করতে পারেন, যা স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষকেরা পড়বেন এবং শিক্ষা সম্পর্কিত সর্বশেষ চিন্তাভাবনা ও তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হবেন।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের স্কুল কমিটির প্রধান করলে এমপিওভুক্তি বা উন্নয়নকাজে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু শিক্ষকের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং স্কুলের সুষ্ঠু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ক্ষুণ্ন হয়। শিশুদের ক্ষমতার দাপট-দৌরাত্ম্য থেকে দূরে ও আড়ালে রাখাই বাঞ্ছনীয়। তারা শিক্ষকের নিবিড় পরিচর্যায় এক ধরনের স্বকীয় পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে সাবলীলভাবে বেড়ে উঠবে, সেটাই মঙ্গল। সেদিক থেকে প্রধান শিক্ষকের মতোই কমিটির প্রধান হিসেবে এলাকার উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষাবিদ, অন্যান্য পেশাজীবী শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকেই দায়িত্ব দেওয়া উচিত। স্কুলে বাগাড়ম্বর বা উচ্চকিত তত্পরতার চেয়ে অনুশীলন, সৃজন ও বিকাশের মতো নিবেদিত চিত্তের নিষ্ঠাপূর্ণ সক্রিয়তাই দরকার।
প্রতিটি স্কুলেই ন্যূনপক্ষে ৫০০ বইয়ের পাঠাগার, বিজ্ঞান গণশিক্ষাকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কিট একটি এবং একটি ভালো হারমোনিয়াম দরকার। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নয়টি শ্রেণীর একটি স্কুলে যদি প্রতি শ্রেণীতে দুটি শাখা থাকে তাহলে ১ ঃ ৩০ হারে (ধরা যাক প্রতি শাখায় ছাত্র থাকবে ৩০ জন) মোট ছাত্র হবে ৪৮০, আর শিক্ষক থাকবেন ১৬ জন। বর্তমান আমরা যে বাস্তবতায় আছি তাতে নয় বছরেও এ সংখ্যায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে কিছুটা সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে ‘শিক্ষাকর্মী’ নিয়োগ। প্রতিটি স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক ও আটজন সহকারী শিক্ষক, প্রাক-প্রাথমিকের দুজন বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং আটজন করে শিক্ষাকর্মী থাকবেন। পশ্চিমের অনেক দেশে ‘এ’ লেভেল শেষ করার পর দুই বছরের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ অথবা সমাজকর্মে সেবা দিতে হয়।
আমরা জাতীয় অগ্রগতির জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তরুণদের দেশ গড়ার মহান ব্রতে উদ্বুদ্ধ করে দুই বছরের জন্য শিক্ষাকর্মী (বা ব্রতী শিক্ষক) হিসেবে জাতীয় সেবা কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারি। যারা মাধ্যমিক পরীক্ষায় (আগেকার এইচএসসি) বাংলা, ইংরেজি, গণিতে ৪+ সহ গ্রেড বি+ পাবে, তারা শিক্ষাকর্মী হওয়ার জন্য জাতীয় সেবা কার্যক্রমের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভুক্ত হবে। তাদের শিক্ষকতায় সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্ধারিত স্কুলে পাঠানো হবে। তাদের নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক সম্মানি ভাতাও দেওয়া হবে।
দেশের ক্ষয়িষ্ণু বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কার করে যুগোপযোগী, মানসম্পন্ন এবং আনন্দময় করে তুলতে চাইলে এই শিক্ষানীতিকে সামনে রেখে সরকারকে এ দুটো কাজ করতে হবে বলে মনে করি—১. জনগণের মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার ও জানা-শেখার জন্য ঐকান্তিক আগ্রহ সৃষ্টি করে মানসম্পন্ন শিক্ষার পক্ষে উদ্দীপনাময় জাতীয় জাগরণ। ২. স্কুলে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে একদল মেধাবী, উদ্যমী, পরিশ্রমী, ছাত্রবত্সল শিক্ষক ও তরুণ শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ।
তাহলেই পিছিয়ে পড়া এ দেশ এগিয়ে যাওয়া দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিতে পারবে, পাঁচ বছরের মধ্যে অবক্ষয় কাটিয়ে প্রাণের জোয়ারে জেগে উঠবে সমাজ, সংকট কাটবে রাষ্ট্রেরও।
সবার জন্য মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাই হোক আমাদের আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকারভিত্তিক জাতীয় এজেন্ডা। জাতীয় সম্পদ (এ পাঁচ বছর জিডিপির ১০ শতাংশ, উন্নয়ন বাজেটের ৩০ শতাংশ), মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এই কাজে, এই সময়কালের জন্য জোগান দিতে হবে। তাহলেই পরিবর্তনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ দেওয়া হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

Thursday, October 1, 2009

জাতীয় শিক্ষানীতিতে জেন্ডার প্রসঙ্গ by জোবাইদা নাসরীন,শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় শিক্ষানীতির (চূড়ান্ত খসড়া) প্রতিবেদনটি ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রতিবেদনের ওপর মতামত আশা করছে সরকার।
এ লেখায় শিক্ষানীতিতে জেন্ডার প্রসঙ্গটির মধ্যেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হবে। শিক্ষানীতির এই খসড়া প্রতিবেদন মোট ২৮টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। আলোচনায় ও নীতিতে যুক্ত করা হয়েছে শিক্ষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত নানা দিক। এই খসড়াতে নারী শিক্ষা (অধ্যায় ১৭) আলাদাভাবে স্থান পেয়েছে। এই বিষয়ে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও। নারী শিক্ষা অধ্যায় ছাড়াও অন্য বেশ কিছু অধ্যায়েও যোগ হয়েছে নারী শিক্ষাকেন্দ্রিক বেশ কিছু ধারা। যেমন অধ্যায় ২ (প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা) অংশের ১৪ নম্বর ধারায় দেওয়া হয়েছে ‘মেয়েশিশুদের মধ্যে ঝরে পড়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অধিক, তাই এই সকল শিশু যাতে ঝরে না পড়ে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন বিদ্যালয়ে কোনোভাবে উত্ত্যক্ত না হয় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’ এর কাছাকাছি আরেকটি ধারার উল্লেখ রয়েছে নারী শিক্ষা (অধ্যায় ১৭)-এর ২ নম্বর অনুচ্ছেদে, ‘ছাত্রীদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ঝরেপড়া ছাত্রীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। যাদের এভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না তাদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।’
এই ক্ষেত্রে যে কথাটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়গুলো থেকে ছেলে ও মেয়েদের ঝরে পড়ার কারণ, ধরন ও সংখ্যা কোনোটিই এক নয়। আবার প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুল ও মাধ্যমিক স্কুল থেকে মেয়েশিশু ঝরে পড়ার কারণও অনেকাংশেই ভিন্ন। তাই মেয়ে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া কমানোর জন্য ছেলে শিক্ষার্থীর মতো শুধু বৃত্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাই একে পৃথকভাবে দেখা একান্তভাবেই প্রয়োজন।
অধ্যায় ২ (প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা) অংশের ১৪ নম্বর ধারাটির দ্বিতীয় ভাগে যুক্ত হওয়া অংশটি ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ যেখানে গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে যে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছয় শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়ে বখাটেদের উত্পাতে। কিন্তু এ খসড়ায় মেয়ে শিক্ষার্থী এবং নারী শিক্ষক উভয়ই কীভাবে উত্ত্যক্ততার হাত থেকে রক্ষা পাবে তার কোনো নির্দেশনা নেই।
নারী শিক্ষা অধ্যায়ের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাজেটে নারীশিক্ষা খাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ দিতে হবে। শিক্ষার সকল স্তরে নারীশিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে এবং বেসরকারি উদ্যোগ ও অর্থায়নকে উত্সাহিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।’ কিন্তু নারীশিক্ষার জন্য নির্দিষ্টভাবে অর্থনৈতিক সহায়তার কথা বলা হলেও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপের ধরনের কথা বলা হয়নি।
বলা হয় যে সামাজিক নির্মাণের পাশাপাশি একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে সামাজিক লিঙ্গীয় ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে পাঠ্যপুস্তক থেকে। বিশেষ করে অঙ্কের মতো বিষয়ে যেখানে উল্লেখ থাকে, ‘একজন পুরুষ সমান দুইজন নারী’র মতো হিসেবের বাহানা। এই বিষয়ে যদিও একটি ধারা আছে, ‘প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে পাঠ্যসূচিতে যথাযথ পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর ইতিবাচক ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তি ও সমান অধিকারের কথা তুলে ধরতে হবে এবং ইতিবাচক দিকগুলো পাঠ্যসূচিতে আনতে হবে, যাতে নারীর প্রতি সামাজিক আচরণের পরিবর্তন হয়।’ (ধারা ৫, নারী শিক্ষা, অধ্যায় ১৭)। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে যদি বইতে ব্যবহূত বিভিন্ন ছবি (যেখানে নারী-পুরুষকে সমানভাবে উপস্থাপন করা হবে), উদাহরণ এবং ভাষার ক্ষেত্রে লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য শিক্ষানীতিতে একটি ধারা যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
এই অধ্যায়ের ৬ নম্বর ধারাটিও আলোচনার দাবি রাখে, যেখানে বলা হয়েছে ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচিতে আরও অধিক সংখ্যক মহীয়সী নারীর জীবনী ও নারীদের রচিত লেখা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’ সে ক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন এটি যেন ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা শ্রেণীনিরপেক্ষ হয়, কেননা বাংলাদেশে সব ধর্ম, বহু জাতি এবং একাধিক শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিরাজমান।
এই অধ্যায়ের ৭ ও ৮ নম্বর ধারা অত্যন্ত প্রশংসনীয় দুটি ধারা, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে জেন্ডার স্টাডিজ এবং প্রজনন-স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে বিষয় নির্বাচনে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবার পুরো স্বাধীনতা থাকতে হবে এবং সব বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মেয়েদের কোনো বিশেষ বিষয়ের দিকে (যেমন গার্হস্থ্য অর্থনীতি) উত্সাহিত করা বা ঠেলে দেওয়া যাবে না।
এই অধ্যায়ে আরও বেশ কিছু ইতিবাচক অনুচ্ছেদ রয়েছে, যার মধ্যে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে ছাত্রীদের যাতায়াত ও বাসস্থানের সুবিধা, বিজ্ঞান ও পেশাদারি শিক্ষার সুবিধা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাসহ নীতি-নির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণীত যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনসংক্রান্ত প্রণীত বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ।
তবে এই খসড়ায় নারী শিক্ষা বিষয়ক আলোচনায় কোথাও খেলাধুলার প্রসঙ্গ নেই। তার মানে কি নারীশিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলার কোনো সম্পর্ক নেই? এই শিক্ষানীতির ১৯ নম্বর অধ্যায়ে রাখা হয়েছে ক্রীড়াশিক্ষা। সেখানেও নারীর খেলাধুলার কোনো বিষয় নেই। এর বাইরে আরেকটি অধ্যায় রাখা হয়েছে ‘বিশেষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, স্কাউট ও গার্লস গাইড এবং ব্রতচারী’ নামে (অধ্যায় ১৮)। এখানে মেয়ে ও ছেলেদের জন্য শুধু একটি ধারা আছে সেটি হলো ‘শরীরচর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক শিক্ষা দিতে হবে’ (অনুচ্ছেদ ২)। শারীরিক শিক্ষা এবং খেলাধুলা কিছুতেই এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্কুল মাঠে শুধু ছেলে শিক্ষার্থীরাই খেলে। খেলাধুলার বিষয়টি অনেকাংশেই লিঙ্গীয় পক্ষপাতমূলক। যাতে মেয়ে ও ছেলে উভয়ই খেলাধুলা করার সুযোগ পায়। কারণ শারীরিক সুস্থতা সবারই প্রয়োজন। শিক্ষানীতিতে নারীদের খেলাধুলার প্রতি জোর দেওয়া দরকার।

Saturday, September 26, 2009

জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে কিছু কথা -শিক্ষাব্যবস্থা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

এ যাবত্ আমাদের দেশে ছয়টি শিক্ষা কমিশন/কমিটি গঠিত হলেও কোনো শিক্ষানীতিই যে কার্যকর হয়নি তা থেকে বলা যায় যে শিক্ষা কোনো আমলেই আমাদের দেশে অগ্রাধিকার পায়নি। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ কথাটি আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কখনো বিশ্বাস করে না। কখনো কমিটি হয়েছে, কালক্ষেপণ হয়েছে কিন্তু নীতি হয়নি, কখনো নীতি হয়েছে কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এবার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার।
বর্তমান শিক্ষা কমিশন ৩ মে থেকে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৩টি সভা করেছে, ৫৬টি সংস্থা ও সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। এর মধ্যে চূড়ান্ত খসড়া সরকারের কাছে জমাও দেওয়া হয়েছে। সরকার তার প্রথম বছরও শেষ করেনি, সুতরাং এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য হাতে চার বছর সময় রয়েছে। শিক্ষানীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদ ও অন্য সবাইকে অভিনন্দন জানাই। শিক্ষানীতি একটি দেশের জনসাধারণের আত্মিক, মানসিক এবং জীবনের উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক বিষয়। অতি অল্প সময়ে এ রকম একটি পূর্ণাঙ্গ দলিলের খসড়া তৈরি নিঃসন্দেহে একটি দুরূহ কাজ। এই নীতি প্রণয়নে যাঁরা আন্তরিকভাবে, অঙ্গীকার নিয়ে, দেশপ্রেম নিয়ে, সাধারণ মানুষের জন্য ভালোবাসা নিয়ে মেধা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।
৯০ পৃষ্ঠার খসড়ায় সাধারণ মানুষের জীবিকার কথা বলা হয়েছে, ঝরে পড়া ছাত্রদের জীবিকার কথা বলা হয়েছে, উত্কর্ষ অর্জন সাপেক্ষে সাধারণ ছাত্রদের উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্তির পথের কথা বলা হয়েছে, যাতে যোগ্য কারও অগ্রগতির পথ বন্ধ হয়ে না যায়। শিক্ষার কোনো ক্ষেত্রের কথা বাদ যায়নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, প্রকৌশল, চিকিত্সা, বৃত্তিমূলক, কারিগরি, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায়, কৃষি, আইন, নারী, ললিতকলা, ধর্ম, ক্রীড়া কিছুই নজর এড়ায়নি। গ্রন্থাগার, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ্য হলে তার বিধান, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষাপ্রশাসন, অর্থায়ন কোনো কিছু বাদ যায়নি।
তবে সুপ্তভাবে এই শিক্ষানীতিতে নিশ্চয়তার সঙ্গে যা ধরে নেওয়া হয়েছে, তাহলো রাষ্ট্র ও প্রশাসনযন্ত্র এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য উঠে-পড়ে লাগবে। তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। সরকার বদলেছে ঠিক কিন্তু একই মানসম্পন্ন দেশপ্রেমবিবর্জিত সমাজপতিরা, কর্মকর্তারা নানা পর্যায়ের নেতারা যদি এর বাস্তবায়নে থাকে তাহলে আমরা তিমিরেই থেকে যাব। এর যথার্থ বাস্তবায়নের জন্য সংস্থাগুলো সম্পর্কেও নির্দেশনা বা গাইডলাইন দিতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে কিছু প্রস্তাব নিচে দেওয়া হলো:
১. দীর্ঘদিন ধরে আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলে আসছি যা তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে নিশ্চিত করা খুবই সহজ। যে কমিটি জাতীয় শিক্ষানীতির এত সুন্দর খসড়া চূড়ান্ত করেছে সন্দেহাতীতভাবে তার সদস্যরা আমাদের সমাজের অগ্রপথিক, নিবেদিতপ্রাণ জ্ঞান তাপস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের বেশির ভাগের ওয়েব উপস্থিতি না থাকার ফলে এই নীতির প্রতি সাধারণ মানুষ যথাযথ আস্থা স্থাপনে ব্যর্থ হবে। অথচ তাদের ওয়েব উপস্থিতি থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শুধু আপ্তবাক্য হিসেবে উচ্চারিত হতো না, তা অনুশীলিতও হতো। জাতীয় পর্যায়ে যেকোনো রকম কমিটি কিংবা বিশেষজ্ঞ নির্বাচনে ওয়েব উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করলে স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত হবে, ঠিক তেমনি তাদের কর্মবৃত্তান্তে সাধারণ মানুষ উজ্জীবিত বোধ করবে।
২. আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কীভাবে আমাদের জীবনধারাকে উন্নত করতে পারে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশবাসী কীভাবে মুক্তি পেতে পারে, পৃথিবীতে আমরা একটি গর্বিত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারব তা এই দলিলের একাধিক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা যে দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে মানবতার, সভ্যতার, সমাজের বিকাশে ভূমিকা রাখবে, জ্ঞান সৃষ্টি এবং সত্যানুসন্ধানে মানুষকে উত্সাহিত করবে তা পরিষ্কারভাবে কোথায়ও উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবদের শিক্ষানীতিতে এসব কথা থাকতেই হবে, আমরা যতই সমস্যাজর্জরিত থাকি না কেন।
৩. ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকারকে জাতীয় উত্পাদনের ছয় শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে, যেখানে বর্তমানে আছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এমতাবস্থায় ব্যয়সাশ্রয়ীভাবে শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তির মতো সর্বজনীন প্রযুক্তির দেশব্যাপী কার্যকর ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই নীতি বাস্তবায়নে যত প্রশিক্ষিত, অভিজ্ঞ শিক্ষক আমাদের দরকার, তা এ মূহূর্তে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যোগ্য, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে প্রতি শ্রেণীর প্রতি বিষয়ের ওপর কম্পিউটার এইডেড লার্নিং প্যাকেজ করে তা একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে রুটিনমাফিক প্রচার করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের জন্য সমসুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রতি স্কুলের একটি শ্রেণীকক্ষে একটি টিভি স্থাপন করলে ছাত্র ও শিক্ষক উভয়েই উপকৃত হতে পারে।
৪. স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগে সরকারি কর্মকমিশনের অনুরূপ একটি কমিশন গঠন করার প্রস্তাবটি চমত্কার। গ্রামের স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অশিক্ষিত ক্ষমতাধর মানুষেরা দখল করেন, যাঁরা শিক্ষার উত্কর্ষ অর্জনে শিক্ষকদের কোনো রকম পরামর্শদানের যোগ্যতা রাখে না। নিয়োগবাণিজ্য এবং অর্থ আত্মসাতেই তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ। এর ফলে প্রায় ক্ষেত্রেই যোগ্য প্রার্থীরা শিক্ষকতার চাকরি পান না। এ কাজগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে কিংবা আঞ্চলিকভাবে করতে পারলে ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যাপক দুর্নীতিকে রোধ করা সম্ভব হবে। অবশ্য এ কথাও মনে রাখতে হবে যে শিক্ষাসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি অতিসমপ্রতি অভিমত প্রকাশ করেছে যে এই খাতটি অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত।
৫. নানা বিষয়েই, নানা ক্ষেত্রেই আমাদের নীতির অভাব নেই। তবুও কোনো ক্ষেত্রেই আমরা উত্কর্ষ অর্জন করছি না, দুর্নীতির রাহুগ্রাসে দেশটির ললাটে জুটেছে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লজ্জা। এমতাবস্থায় শুধু নীতি প্রণয়নে যে কাজ হবে না তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষার নেতৃত্বে যোগ্য নিবেদিতপ্রাণ লোকদের আনতে হবে, যাতে নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়। ঠিক একইভাবে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কমিটির সদস্য হিসেবে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সদস্য হতে দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতকোত্তর পাস হতে হবে। একই ব্যক্তিকে কোনো অবস্থাতেই মাত্রাতিরিক্তসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে দেওয়া যাবে না।
৬. শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এবং মর্যাদা নির্ধারণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা যেতে পারে।
৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় উত্কর্ষ অর্জন করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে র্যাংকিং প্রথা চালু করার কথা বলা হয়েছে। এ ধারণাকে সমপ্রসারিত করে স্কুল-কলেজগুলোকে র্যাংক ও পুরস্কৃত করতে হবে।
৮. অধ্যায় ২১এ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে আমাদের দেশে শুধুই মুখস্থ করে যে ভালো করা যায় তা আমরা জানি। পক্ষান্তরে স্যাট পরীক্ষাগুলোর কার্যকারিতাও আমরা জানি। লাখ লাখ ছাত্র যে প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে. তার আয়োজনে আমাদের বিনিয়োগ আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত। কেবল মানসম্পন্ন, সৃজনশীলতা উদ্বুদ্ধকারী প্রশ্নপত্রই আমাদের মুখস্থ নামের বিষবৃক্ষকে অপসারণ করতে পারে।
৯. স্কুল-কলেজগুলোর মধ্যে উত্কর্ষ অর্জনের সুস্থ প্রতিযোগিতাকে বেগবান করতে নানা রকম র্যাংকিং প্রথা ছাড়া সকল শ্রেণীতে সকল বিষয়ে উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ঘটা করে অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতা আয়োজন করা উচিত। শুধু তা-ই নয়, আমাদের শিক্ষা বিশ্বমানের হচ্ছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য সকল আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
১০. ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চারটি এবং সমপ্রতি ভারতে একটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অত্যুত্সাহী হয়ে যাবে। বরং চা, চামড়া, পাট কিংবা পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতিতে অধিকতর অবদান রাখা সম্ভব।
১১. শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম বিকশিত হবে এ কথাটি শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে যথার্থভাবেই উচ্চারিত হয়েছে। তবে প্রেম-ভালোবাসা এমনিতেই পল্লবিত হয় না এর পেছনে বেদনা, কষ্ট ত্যাগ থাকতে হয়। কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক বাহিনীতে চাকরি করা বাধ্যতামূলক। আমরা অন্তত আমাদের তরুণদের পাবলিক পরীক্ষার পর ফাঁকা সময়টিতে বয়স্ক শিক্ষার মতো কার্যক্রমে নিয়োজিত করতে পারি।
১২. কোরিয়া কাইস্ট নিয়ে গর্বিত, ইসরায়েল টেকনিয়ন নিয়ে, ইংল্যান্ড অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ নিয়ে, ভারত আইআইটি নিয়ে। আমরা একসময় আদমজী জুট মল নিয়ে গর্ব করতাম। এখন কী নিয়ে করব, যা আমাদের উত্সাহিত করবে, দেশ গঠনে আত্মবিশ্বাসী করে তু্লবে? আমাদের দেশে নানা সমস্যায় আমরা আক্রান্ত, তাও আবার চক্রাকারে নিয়মিতভাবে। যানজট, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খাদ্যাভাব আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমতাবস্থায় একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠা করা দরকার, যা নানা জাতীয় সমস্যা সমাধানে সরকারের থিংকট্যাংক হিসেবে কাজ করবে।
আমি আশা করি, সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষানীতিটিকে দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।