Friday, December 27, 2013

গদ্যকার্টুন- শঙ্কা আসে ধেয়ে by আনিসুল হক

পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। কারণ, এই কলামে লিখেছিলাম, নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো অচলাবস্থা দেখা দেবে না, দিলেও সেটা ভয়ংকর কিছু হবে না। বাংলাদেশের মানুষের আছে সৃজনশীলতা, তারা এমন একটা উপায় বের করে নেবে, যা থেকে একটা সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে। আমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আমার আশা হয়ে গেছে গুড়ে বালি।

আমরা পড়েছি ভয়াবহ সংকটে। এত মৃত্যু, এত ধ্বংস, এত আগুন! জীবন ও জীবিকার ওপরে এমন নিষ্ঠুর আঘাত। প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি—প্রতিটা ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, বরং সামনে আরও হানাহানি, আরও আগুন, আরও প্রাণহানি, আরও সম্পদহানির আশঙ্কা ধেয়ে আসছে। এবং রাজনৈতিকভাবে দেশ একটা কানাগলিতে ঢুকে পড়তে যাচ্ছে, যেখান থেকে বেরোনোর উপায় আমাদের জানা নেই।

সমস্যার মূলে অবশ্যই জেদ। এখন এ কথা সহজেই বলে ফেলা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, বিএনপিকে তারা নির্বাচনের বাইরে রাখবে। আমরা বলেছিলাম, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আওয়ামী লীগের চাওয়া পূরণ করার দায়িত্ব তো বিএনপির নয়। তাই বিএনপির উচিত নির্বাচনে আসা। নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করলে একটা পক্ষে জোয়ার চলে আসবে, সেই জোয়ারে কারচুপির চক্রান্ত খড়কুটার মতো ভেসে যাবে। অরণ্যে রোদন করলে তা কে শুনবে বনের পশু-পাখি-বৃক্ষলতা ছাড়া। কেউ শোনেনি। এখন এ কথাও বলে ফেলা যায় যে বিএনপির নেতৃত্বও আসলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর চান না, তাঁরা চান ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালে তাঁদের যেভাবে অপমানজনকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, সেই তেতো অভিজ্ঞতার স্বাদ শেখ হাসিনার সরকারকে পাইয়ে দেওয়া।

দুই পক্ষের মনের ভেতরে মীমাংসা না করার জেদ প্রবল, আপনি-আমি কথা বলে কী করতে পারব? আর উভয় পক্ষই শুধু নিজেরটাই বুঝছে, দেশের মানুষের জীবন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, দেশের ভবিষ্যতের কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবছে কি? তার চেয়েও ভয়াবহ কথা হলো, উভয় পক্ষ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে তাদের ক্ষমতা গ্রহণ বা ক্ষমতা দখল করে রাখার মধ্যেই কেবল নিহিত রয়েছে দেশের মঙ্গল, এমনকি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। যদি উভয় পক্ষই এটা ভাবতে থাকে যে আমি ক্ষমতায় না থাকলে দেশ শেষ হয়ে যাবে, তখন আপনি কী করতে পারেন। আমরা শুধু উভয় পক্ষকে বলতে পারি, এই চিন্তার নাম ফ্যাসিবাদী চিন্তা।

আর আওয়ামী লীগ কেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ভয় পেল? কার পরামর্শে? বছর দুই আগে যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রথা তুলে দেওয়া হয়, তখন তো শাসকদের জনপ্রিয়তায় এতটা ধস নামেনি। বরং সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে যা বলা হচ্ছে, তার একটা অন্যতম কারণ মানুষের এক দিনের রাজা হওয়ার সুযোগটা রদ করে দেওয়া। শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাড়াবাড়ি—এসব তো আছেই। আছে সাংসদ-মন্ত্রী-নেতাদের অনেকের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে ওঠা। যেটা এখন নির্বাচনী হলফনামায় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। একজন নেতা জানান, তিনি প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করেছেন মাছের চাষ করে। মানে বছরে তিন কোটি টাকা। প্রতি কেজি মাছে তাঁর ১০ টাকা লাভ হলে বছরে ৩০ লাখ কেজি মাছ তাঁকে উৎপাদন করতে হয়েছে। তার মানে প্রতিদিন দুই ট্রাক করে মাছ তাঁর খামার থেকে বাজারে এসেছে। তাই তো বলি, দেশে মাছের অভাব দূর হলো কীভাবে? সব ঢাকায় বসে থাকা মন্ত্রী-সাংসদেরা উৎপাদন করেছেন।

তবু আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ভালো কাজও তো করেছিল। সেসবের কথা মানুষ যে বিবেচনা করবে, সেই অবকাশই তো তাকে দেওয়া হলো না। কল্পনা করুন, যদি উচ্চ আদালতের দেওয়া সুযোগ অনুসারে আরও দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত থাকত, তাহলে আজ বিএনপি আন্দোলন করত কী নিয়ে? আজ জামায়াতের আন্দোলন আর বিএনপির আন্দোলন একাকার হয়ে যেতে পারত না। এমনকি সরকার তো জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার একসময়ের মন্ত্রী আ স ম আবদুর রবও এখন বিএনপি জোটের আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ তো ‘পলিটিকস’টাও ঠিকভাবে করতে পারছে না। এবং পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক চালেও ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। অরাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন রাজনীতি চালানোর চেষ্টা করে, তার ফল এ রকমই হয়ে থাকে।

১৮-দলীয় জোট খুবই কৌশলী একটা চাল দিয়েছে। দিনের পর দিন অবরোধে দেশের যখন নাভিশ্বাস উঠে গেছে, তখন তারা দিয়েছে ঢাকা চলো কর্মসূচি। এত দিন আমরা দেখলাম বিরোধী জোটের অবরোধ, এরপর দেখব, সরকারি অবরোধ। সরকার এবার ঢাকা আসার সব ধরনের পথ বন্ধ করে দেবে। আমাদের পরিত্রাণ নেই।

কী হবে ২৯ ডিসেম্বর? কী হবে এরপর? হানাহানি হতেই থাকবে। এই নির্বাচন তো আসলে ঠেকানোরও কিছু নেই, যে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেন না, তার তো কোনো মানেও নেই আসলে। সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না, ৫ জানুয়ারিটা পার হয়ে গেলে শপথ গ্রহণ করে নতুন সরকার চেপে বসতে চাইবে জুতমতো। আর বিরোধী জোটই বা তা মেনে নেবে কেন? তারাও খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘প্রাণক্ষয়ী’ আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সরকার দমন-নিপীড়ন বাড়িয়ে দিতে থাকবে। জুলুম বাড়বে, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হরণ করা হতে থাকবে। উফ্, আমি কল্পনাও করতে পারছি না, সামনের দিনগুলোয় আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

যে আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সাল থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে আসছে, তারা কি ক্ষমতায় থাকার জন্য বলপ্রয়োগকেই একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে?

বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ সরকার সামনের দিনগুলোয় অনেক ভালো কাজ করবে, জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে, তখন নির্বাচন দেবে। জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে কী করে? আরও আরও মৎস্য চাষ করে? ভালো কাজ করলে যদি জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, তাহলে গত পাঁচ বছর তারা তা না করে একপক্ষীয় নির্বাচনের পরে করার কথা কেন ভাবল? আচ্ছা, আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা ফিরে পেল, নির্বাচন দিলেই তারা জয়লাভ করবে, তখন নির্বাচনটা হবে কোন পদ্ধতিতে? আবারও সেই বিষচক্র। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া অন্য কিছু বিরোধীরা কেন মানবে? আর কোনো একটা পক্ষ কোনো একটা ছাড় যদি দেয়ই, তাহলে তা তারা এখন দিচ্ছে না কেন? আর কতজন মারা গেলে আমরা বলব, মানুষ মারা গেছে? আর কজন পুড়লে আমরা বলব, এটা বর্বরতা ছাড়া আর কিছু নয়?

একটা জাতির ইতিহাসকে এক দিন, দুই দিন, এক বছর, দুই বছরের পাল্লায় মাপতে হয় না। তাই আমি আবারও বলব, আজ থেকে ২০ বছর পরের বাংলাদেশটা নিশ্চয়ই একটা উন্নত-আলোকিত স্বদেশই হবে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতের কথা যদি আমাকে বলতে বলেন, আমি ভালো কিছু দেখছি না। ‘এখন প্রকৃত আশাবাদীর পক্ষে আর কিছুই করার নেই, কেবল হতাশ হওয়া ছাড়া।’

অরণ্যে রোদন হলেও আমাদের কথা আমাদের বলে যেতেই হবে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাই। নির্বাচনে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। এবং নির্বাচন করতে হলে বিবদমান জোটগুলোর মধ্যে একটা ন্যূনতম মতৈক্য চাই, সমঝোতা চাই, মীমাংসা চাই। বাংলাদেশে তা-ই হয়, যা বিএনপি আর আওয়ামী লীগ একযোগে চায়। দেশে শান্তি আসুক, এটা বিএনপি আর আওয়ামী লীগকে একযোগে চাইতে হবে। তা না হলে আমাদের কারোরই স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি থাকবে না। আমরা কতটা বর্বর হয়েছি যে কেবল মানুষ হত্যা করছি, তা নয়, আমরা বৃক্ষ নিধন করে চলেছি; আমরা কেবল মানুষ পুড়িয়ে মারছি, তা নয়, আমরা এখন গরু পোড়াতে শুরু করেছি। আমরা কি মানুষ পদবাচ্য নই?

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

পাকিস্তান- কে এই ইমরান খান? by শান্তনু মজুমদার

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সাজা বিষয়ে ইমরান খানের অবস্থানে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে কিছু লোককে। পাকিস্তানি জামায়াত, পাকিস্তানি মুসলিম লিগের কথাবার্তা যেমন-তেমন। কিন্তু ইমরান খানের অবস্থানে তাঁরা নাকি আসমান থেকে পড়ে যাচ্ছেন।
কিংবা মাথায় আসমান ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে বলে তাঁরা জানাচ্ছেন। ইমরান খানের রাজনীতির ব্যাপারে আগে থেকে খোঁজখবরে থাকলে অবশ্য আসমান নিয়ে টানাটানি পড়ার কথা নয়।

পাকিস্তানকে সমর্থন জানানোর বাসনা থেকে যাঁরা খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা ঠিক না বলে থাকেন, তাঁদের আগেই বলে রাখা যাক যে খেলোয়াড় ইমরান খান নয়, রাজনীতিক ইমরান খান নিয়ে এখানে কথা হচ্ছে। আর এ কারণেই ছাত্রজীবন ও খেলোয়াড়ি জীবনে ইমরান খানের নানা কীর্তিকলাপ, যেগুলো বিশেষত ভারতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে বাংলার ঘরে ঘরে ঢুকে আছে, সেগুলোর উল্লেখ বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধীর শাস্তির বিরুদ্ধে তাঁর আস্পর্ধার আলোচনায় জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে এই ব্যক্তির রাজনীতির ধরনটা বোঝা।

জেনেও না-জানার ভানকারীদের কথা আলাদা। কিন্তু যাঁরা ইমরান খানের খবরাখবর রাখার প্রয়োজন মনে করেন না, তাঁদের জানানো যাক যে দেড় দশকের বেশি আগে তেহরিক-ই-ইনসাফ নামক দল নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নামা ইমরান খানের বর্তমান বাজার বেশ ভালো। মে মাসের জাতীয় নির্বাচনে ভালোই ফল করেছে তেহরিক। আর প্রাদেশিক পরিষদে বেশি আসন পাওয়ার সুবাদে ধর্মীয় উগ্রবাদী-অধ্যুষিত খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোয়ালিশন সরকারের প্রধান শরিক হয়েছে তেহরিক। ইমরানের দলের নেতৃত্বাধীন সরকারের আরেক প্রভাবশালী শরিক হচ্ছে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামি। চোখ কচলানোর কিছু নেই—পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামি।

আরও আছে, ইমরান খান মনে করেন যে তালেবানরা একটি ‘ধর্মযুদ্ধ’ করছে। গত বছরের অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখে পেশোয়ার শহরে একটি হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইমরান খান সুস্পষ্ট ভাষায় এই মত দেন। তালেবানদের অবস্থানকে তিনি ‘বৈধ’ হিসেবেও চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, খানসাহেবের পরিদর্শনের মাত্র কয়েক দিন আগে এই হাসপাতালটিতেই তালেবানের গুলিতে বিদ্ধ মালালা ইউসুফজাইকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তালেবানের প্রশংসা করার জন্য ঠিক এই হাসপাতালটিই কেন বেছে নিতে হয়েছিল? এ জন্যই, সম্ভবত পাকিস্তানের উদারপন্থীরা ইমরান খানকে ‘তালেবান খান’ ডাকে।

আরও স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০৯ সালে সোয়াত অঞ্চলে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত এক রফার প্রতি সর্বপ্রথম সমর্থন জানানো রাজনীতিক ছিলেন ইমরান খান। অবশ্য ইমরান খান মাঝেমধ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমা মিডিয়ার সামনে কথা বলার সময় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের ব্যাপারে কোমল থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। আবার ধর্মীয় উগ্রবাদীরাও খানসাহেবকে একজন ‘উদারনীতিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে মেরে ফেলার হুমকি-টুমকি দেয় মাঝেমধ্যে। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যায়? সর্বশেষ পার্লামেন্ট নির্বাচনের মৌসুমটির কথা ধরা যাক। পাকিস্তানজুড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের টানা হামলার মুখে বলতে গেলে নির্বাচনী প্রচারণা করতেই পারেনি সে সময় ক্ষমতাসীন পিপিপি ছাড়াও আওয়ামী ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এএনপি) কিংবা মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের (এমকিউএম) মতো খানিক উদারপন্থী দলগুলো। কোনো কোনো দলের
গায়ে ফুলের টোকাও লাগেনি? শরিফের মুসলিম লিগ এবং অবশ্যই ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ। লক্ষণীয় ব্যাপার, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সাজা নিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আদবহীনতার সময় পক্ষ-বিপক্ষের দলগুলোর বিন্যাসও এভাবেই ছিল।

সেনা এস্টাবলিশমেন্ট ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ইমরান খানের বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারটিও পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে আলোচিত। বর্তমানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লিগ এ ব্যাপারে প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছিল একসময়। সময়টা ২০১১ সালের একেবারে শেষের দিকে—পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) তখন ক্ষমতায়। হঠাৎ করেই দেড় দশক ধরে টিমটিম করতে থাকা ইমরান খানের দলের পক্ষে বেশ জোশ দেখা যেতে শুরু করে; তেহরিকের জনসভাগুলোতে এন্তার জনসমাগম শুরু হয়। এই ব্যাপারটি মধ্যপন্থী পিপিপির চেয়ে নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগকে বেশি ভাবিয়ে তোলে। কেননা, নতুন-ডান তেহরিক পুরোনো-ডান মুসলিম লিগের ঘাঁটিগুলো দখল করে ফেলার মতো একটা অবস্থা তৈরি করতে শুরু করেছিল। এমনকি মুসলিম লিগের মূল ঘাঁটি পাঞ্জাবেও বড় বড় অনুষ্ঠান করতে শুরু করে তেহরিক। লাহোরে, করাচিতে ইমরান খান সাহেবের জনসভায় প্রচুর মানুষ দেখা যেত তখন। এমন পরিস্থিতিতেই সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তেহরিকের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে শুরু করে মুসলিম লিগ। একদিকে ভোটব্যাংক বেহাত হয়ে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে, সেনা এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে ‘ঐতিহাসিক’ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুখ খোলে মুসলিম লিগ। দলটি অভিযোগ আনে যে তহবিল জোগানো, জনসভায় লোক ভরানো থেকে শুরু করে সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (কিউ) থেকে লোক ভাগিয়ে তেহরিকে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজগুলো গোয়েন্দা সংস্থা করে চলেছে। শরিফের দল এই আক্ষেপও করে যে প্রধান সেনাপতি জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানিকে এ ব্যাপারে একাধিকবার জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি।

ইমরান খানের দলের জন্য সেনা কর্তৃপক্ষের সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে শরিফের দল এতটাই তেতে ওঠে যে তারা কেবল ব্যক্তি রাজনীতিক নয় বরং দলের আয়-ব্যয়, দলের নেতাদের স্থানে স্থানে ভ্রমণ ব্যয়ের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠায় জাতীয় পরিষদে একটি বিল উত্থাপন করার হুমকিও দেয়। ইমরান খান ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে একবার গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি—পাকিস্তানি রাজনীতি ও পাকিস্তানি মিডিয়ার উদারনীতিক অংশটির কাছে তিনি এস্টাবলিশমেন্টের পেয়ারের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। এবং তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কখনো কখনো সরকারকে আঘাত করলেও এস্টাবলিশমেন্টকে কখনোই নয়। এই তো মাত্র মে মাসে আহমদিয়াদের অমুসলিম হিসেবে ঘোষিত হয়ে থাকার পক্ষে শক্ত শক্ত কথা বলে এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষের আরেক দফা অবস্থান নিয়েছেন ইমরান খান।

জামায়াতের সঙ্গে প্রদেশে সরকার গঠন, তালেবানদের ব্যাপারে উদারতা, সেনা-ঘনিষ্ঠতা—এত সব ‘বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত’ ব্যাপক ডানপন্থী ইমরান খানের বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গে সঠিক অবস্থানে দাঁড়ানোটাই হতো আশ্চর্যের। পাকিস্তান জানে যে, আজ হোক কাল হোক, একাত্তরের অপরাধসমূহের জন্য পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক নেতৃত্বের বিচারের উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। আর কাদের মোল্লার সাজার ব্যাপারে তাঁদের চুপ থাকার অর্থ হতো একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ-মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারটি মেনে নেওয়া। দেয়ালের লিখন পড়তে না পারলে যে ভুল হয়, ইমরান খান তথা পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদীরা সেই ভুলই করছে।

কিন্তু বাংলাদেশে যাঁরা ইমরান খানের ভূমিকায় ব্যথা পেয়েছেন, তাঁদের তো ব্যথা পাওয়া চলবে না। জানা থাকতে হবে যে পাকিস্তানের ইমরানের তো এটাই করার কথা। ইমরানে ইমরানে কত তফাত। পাকিস্তানি ইমরান যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আর বাংলাদেশের ইমরানরা গণজাগরণ মঞ্চ বানায় যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শেষ না করে ঘরে না ফেরার কথা বলে।

শান্তনু মজুমদার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

অভিযাত্রায় সাড়া না দেয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে কেউ বাধা দিতে আসলে তাদের প্রতিহত করার জন্য ভোটারদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি তার নির্বাচনী এলাকা কোটালীপাড়াবাসীর কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে বলেন, আমার দায়িত্ব আপনাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।
কোটালীপাড়ার সকল ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়ার বার্তা পৌছে দেয়ার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি তিনি আহবান জানান। অন্য এমপি প্রার্থীদের শুধুমাত্র একটি আসনের জন্য কাজ করতে হয়, আর আমার তিনশত আসনের জন্য কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, জামায়াত নির্বাচনে আসতে পারবে না বলেই বিএনপি দুঃখিত হয়ে নির্বাচন করবে না। যারা মানুষের কল্যাণ চায় না, যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে তাদেরকে রুখে দাড়াতে হবে।

শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় কোটালীপাড়া শহীদ মিনার চত্তরে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক কর্মী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সুভাষ চন্দ্র জয়ধরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ কর্মীসভায় অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, বাহাউদ্দীন নাসিম, আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শেখ মো. আব্দুল্লাহ, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ কবির, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাজা মিয়া বাটু, সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী এমদাদুল হক, কোটালীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ লুৎফর রহমান বাচ্চু, কোটালীপাড়া পৌর মেয়র মো.ইলিয়াস হোসেনসহ জেলা আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১সালে আমি যখন দেশে ফিরে আসি তখন লাখো মানুষ দেখতে পাই। শুধুমাত্র আমার পরিবারের কেউকে দেখতে পাইনি। আপনাদের মাঝেই খুজে পেয়েছি আমার বাবা-মা-ভাই।
বিএনপির আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে। শুধু বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারা নয় তাদের হাত থেকে গরু-ছাগলও রেহাই পাচ্ছে না। গরুভর্তি ট্রাকে আগুন দিয়ে গরুও পুড়িয়ে মেরেছে। আমরা পরিবেশ রক্ষায় লাখ লাখ গাছ লাগাই আর তারা অবাধে গাছ কাটছে। ২৯ তারিখ বিরোধী দলের ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রায় সাড়া না দেয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় পাকিস্তান অখুশী হয়েছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেত্রী একটি টুশব্দ পর্যন্ত করেনি। খালেদা জিয়ার প্রেস কনফারেন্সের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নাকি পাকিস্তানের নিন্দা প্রস্তাবে মর্মাহত হয়েছেন। খালেদা জিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী মানুষ মারার হুকুম দেন আর বাসায় বসে তিনি আয়েশ করে পায়েশ খান। বিএনপি নেত্রী মানুষ মারার হুকুম দেন আর জামায়াত শিবির তা পালন করে। বিএনপি’র কোন কোন নেতা পুলিশ মারার হুকুম দেন বলেও প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন। মিথ্যা বলায় যদি কোন পুরস্কার থাকে তাহলে বিএনপি নেত্রীকে সে পুরস্কার দেয়া যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আমরা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি : বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, ভোটের অধিকার বড় অধিকার। তবে তার চেয়ে বড় অধিকার ‘বেঁচে থাকা’।
দেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার-পরিস্থিতি নিয়ে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে আজ তিনি আফসোসের সূরে বলেন, জানমাল রক্ষা করা ফরজ। কিন্তু এই সময়ে আমরা সেই ফরজ আদায় করতে পারছি না। শ্বাসরুদ্ধকর একটা অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি। সমাধান কোন দিকে তাও জানি না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সকালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে সংলাপের আয়োজন করে। কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে দিনব্যাপী ওই আয়োজনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমির। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা যারা তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত, বিত্তবান, তাদের চেয়ে যারা গরিব-অসহায় মানুষ তাদেরকে এই পরিস্থিতিতে বেশী সহ্য করতে হচ্ছে। শুধু রাজনীতিবিদদের প্রতি দায় চাপাতে চাই না, শুধু তাদের দোষারোপ করে লাভ নেই। তবে এটুকু বলবো- যে দুর্গতিতে আমরা পরেছি, তা অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বিবেচনায় হলেও সমাধানের একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে।

প্রথম স্ত্রী অনন্যার বাসায় পুলিশ পাঠালেন আরফিন রুমি

প্রথম স্ত্রী অনন্যার বাসায় পুলিশ পাঠালেন হালের অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত সংগীত শিল্পী আরফিন রুমি। জানা গেছে, আজ দুপুরে চার সদস্যের পুলিশের একটি টিম অনন্যার বাসায় যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় সার্চ ওয়ারেন্ট।
জানানো হয়, রুমি ও অনন্যার মধ্যে যে আপসনামা স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা উদ্ধারে তারা এসেছে। পরে আপসনামা ছাড়াই চলে যায় পুলিশ টিম। বলে যায় আপসনামা না পেলে অনন্যার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। এ প্রসঙ্গে অনন্যা বলেন, ২৪শে ডিসেম্বর আদালতে শুনানির পর কোনো রকম ইতিবাচক সাড়া দেয়নি রুমি। আদালতে সেদিন জানানো হয়েছিল আমাকে ও সন্তান আরিয়ানকে নিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে চায় সে। এজন্য কিছু শর্তও রাখে রুমি। এমনকি সেদিন বেশ কয়টি অনলাইন পোর্টাল ও পত্রিকায় এ বিষয়ে খবর প্রকাশ হয়। যেখানে জানানো হয় একে অন্যের শর্ত মেনে নতুন করে জীবন শুরু করতে যাচ্ছে রুমি-অনন্যা। অথচ আমাদের বাসায় বংশাল থানা পুলিশের একটি টিম এসে হাজির। রুমি আমাদের বিরুদ্ধে আপসনামা উদ্ধারের মামলা করেছে। যা আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। রুমি এবং তাদের পরিবার জানিয়েছে, যে আপসনামা করা হয়েছে তা পুরোপুরি মিথ্যে। এমনকি আমরা নাকি তাকে জোর করে ওই চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করিয়েছিলাম। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে অনন্যা আরও বলেন, গত ১২ই অক্টোবর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করার পর রুমি ও তার ভাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর থেকেই তাদের পরিবার আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করে। দেয়া হয় হুমকি-ধামকি। একপর্যায়ে উপায় না দেখে আমাদের বাসায় এসে অনুনয় বিনয় করতে থাকে তার মা ও ভাবি। তখন আমাদের মধ্যে এ আপসনামাটি হয়। মূলত এর উপর ভিত্তি করেই আদালতে জামিনের দরখাস্ত করেন রুমির উকিল। তবে এটাও জানানো হয়, চুক্তি অনুযায়ী শর্ত না মানলে আমি আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবো। স্বাক্ষরটি রুমির কাছ থেকে জোর করে আদায় করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে অনন্যা বলেন, প্রশ্নই উঠে না। বরং, রুমির পরিবার অনেক অনুনয় বিনয় করে আমাদের বাসায় আপসের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। এমনকি এসব শর্তাবলি লেখার সময় সিডি চয়েজের এমদাদ, প্রিন্স, কাজী শুভ, ইলিয়াস, খেয়া, আরমান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া রুমির ব্যান্ড দলের মামুন, লিটন ও শান্তরাও ছিলেন। এরাও এ শর্ত সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। এছাড়া এ মুহূর্তে রুমির এ কথা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, আদালতে বিগত শুনানিগুলোতে রুমির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে শিগগিরই সে শর্তগুলো পূরণ করবে। উল্লেখ্য, এ আপসনামায় লেখা ছিল, সন্তান আরিয়ানের ভরণপোষণের জন্য রুমি অনন্যাকে ২০ লাখ টাকা প্রদান করবে, যা ব্যাংকে ডিপোজিট করে রাখা হবে। এছাড়া অনন্যার সঙ্গে সে আর খারাপ ব্যবহার করবে না। অধিকার দেবে স্ত্রীর প্রকৃতি মর্যাদার। এ বিষয়ে জানার জন্য বেশ কয়েকবার ফোন করা হয় রুমির মুঠো ফোনে। কিন্তু রিং হওয়ার পরও মুঠোফোনের অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যায়নি।

‘এই নির্বাচন বাতিল করার সুযোগ আছে’ : ব্যারিস্টার রফিক উল হক

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অর্থবহ করার তাগিদ দিয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, আওয়ামী লীগ বলেছে এই নির্বাচন বাতিল করার সুযোগ নেই-এটা ঠিক না।
নির্বাচন বাতিল করার সুযোগ আছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি রাজি থাকলে এই নির্বাচনকে কিভাবে সত্যিকারের অর্থবহ করা যায় সে চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে সময় সামান্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্ভব না হলে এই নির্বাচনের পরপর দশম সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকার একাদশ জাতীয় নির্বাচন করবেন এটা আশা করি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কথা দিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে কথা রাখবেন। শুক্রবার রাজধানীর বসুন্ধরা সিটিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহণে ‘নির্বাচনী বির্তক’ প্রতিযোগিতায় এসব কথা বলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার রফিক উল হক তরুণ প্রজন্মের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমার বিশ্বাস এই প্রজন্ম নেতৃত্বে এলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। গণতন্ত্রকে আজ টাট্টা করে বদলে দেয়া হয়েছে। নতুন প্রজন্ম গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে শুধু রাজনীতি করে পেটের ভাত হয় না। এজন্য অন্যকিছু করতে হবে। বিতর্ক অনুষ্ঠানে সভাপত্বি করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

সহযাত্রী by মোসাদ্দেক আহমেদ

আজকের বাসযাত্রাটি যে জুতসই হবে না, তা হাবভাবেই স্পষ্ট। একে তো জানালার পাশের বাঞ্ছিত সিটটি মেলেনি, তদুপরি ওই সিটে-বসা লোকটিও লক্ষ্মীছাড়ার একশেষ। খাপছাড়াই তো, বাস ছাড়তে যা দেরি, ছাড়ার পর থেকে লোকটা মোবাইলে অবিরাম বকবক করছে তো করছেই। একটু খেয়াল করতে বোঝা গেল, এ ঠিক অর্থহীন বকবকানি নয়, বরং মিষ্টি প্রেমালাপ। এবার উৎসুক হয়ে ওঠে আশিক, প্রাথমিক বিরক্তিও কিছু কমে। প্রেমালাপকারী লোকটির বয়স ৩২ কি ৩৪-এর ধার ঘেঁষে, এই বয়সে তাকে ঠিক তরতাজা যুবক বলা চলে কি? তবে লোকটার পোশাকে হাল ফ্যাশনের ছাপ আছে, নীল জিনসের প্যান্টের ওপর ছোট ঝুলের শার্ট, তার হাতের মোবাইল সেটটিও দামি ও সুদৃশ্য। অনুমান করা শক্ত নয়, সবই ঘটেছে প্রেমের প্রভাবে। প্রেমের প্রভাব রয়েছে লোকটা কণ্ঠস্বরেও। মোটেই খাটো স্বরে কথা বলছে না সে, বস্তুত তেমন চেষ্টাও নেই। এতে বোঝা যায়, পাঁড় প্রেমিক বটে; দিওয়ানা বলেই বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলে কদাচিৎ মৃদু গলায়, বরং স্বাভাবিক স্বরেই কথা বলতে ব্যস্ত সে, ‘কী বললে, এখনো তুমি খাওয়াদাওয়া করোনি। না, না, এটা ভারি অন্যায়। প্লিজ...’ আশিক এবার ঈষৎ বিরক্ত হয়, এসব ছেঁদো প্রেমের ডায়ালগ যদি টানা শুনে যেতে হয়, দফারফা হয়ে যাবে। আচ্ছা তেমন বয়স কি আর আছে যে এমন প্যানপ্যানানি ভালো লাগবে। গত বছর ৫০ পেরিয়েছে সে, এক বন্ধু উইশ করে জানিয়েছিল, ৫০ নাকি তেমন বয়স যখন মানুষ যিশু হয়ে যায়। সত্যি কি তা-ই? যিশু না ছাই, বড়জোর সেটা যিসাসের আবরণ হতে পারে। তবে তেমন আবরণেরও দরকার আছে, নইলে ঘর-সংসার চলবে কেন।
মনের কারচুপি যেমনই থাক, সার্থক স্বামী হতে হলে, দায়িত্বশীল বাবা হতে হলে ওইটুকু আবরু লাগেই। বাসটি হঠাৎ নিয়মবিরুদ্ধ গতিতে জোরের ওপর একটা মোড় বাঁক নিচ্ছে। সেটা দেখে বাসের যাত্রীসব হইচই করে উঠলেও আশিক তাতে যোগ দিতে পারে না। পারবে কী করে? তেমন পরিস্থিতি বেহায়া প্রেমিকটি রাখেনি, কানের কাছে এত সব মিঠে গুজুরগাজুর চললে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত কোথায়। প্রমাদ গোনে আশিক। গন্তব্যস্থল এখনো পাঁচ ঘণ্টার পথ, পথে জ্যাম থাকলে, তা সাত ঘণ্টারও হতে পারে। এত দীর্ঘ সময়কাল লোকটি যদি এভাবেই ড্যাম কেয়ার চালিয়ে যায়, তবেই হয়েছে। যেমনটি ভাবা গিয়েছিল, বাস্তবে ঘটছেও তেমন। লোকটা ম্যারাথন কথালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। আশিকের তখন ভিন্ন ভাবনা এল, না হয় বুঝলাম লোকটা খেপেছে, কিন্তু ওপাশের মেয়েটি তো ক্ষান্ত দিতে পারে। না, তেমন লক্ষণ নেই। এমনও হতে পারে, ওপর প্রান্তের মেয়েটি আরেক কাঠি সরেস, সে-ই সব কলকাঠি নাড়াচ্ছে। ভাগ্যিস তখন আশিকের নিজের ফোনটি বেজে উঠল, বউয়ের সঙ্গে দুটো কথা বলার সুযোগ তৈরি হতে চাপা অসন্তোষ কিছু কমে। কিন্তু বউ তো আর প্রেমিকা নয় যে সেও একটানা চোপা চালিয়ে যাবে; গুটিকয় সাংসারিক কথা, তাই দ্রুত ফুরিয়ে যায়। যা-ই হোক, এর পরের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। বাসটি একটি হাইওয়ে হোটেলের লনে এসে ঢুকছে, ১৫ মিনিটের যাত্রাবিরতি। হোটেলে ঢুকে প্রথমে আশিক যা করে, বেসিনের পানিতে আচ্ছামতো মুখটা ধুয়ে নেয়, ভাবখানা যেন এতক্ষণের চেপে-রাখা বিতৃষ্ণা ঝেড়ে ফেলবে। তেমনটা করতে কড়া লিকারের একটা চা নিতেও ভুল করে না।
তেতো দিয়ে তেতো কাটানো আর কি। ১৫ মিনিটের বিরতি তাড়াতাড়িই শেষ হয়। তার মানে, আবার বাসে উঠে সেই প্রেমিক-প্রবরের পাশে গিয়ে বসা আর পানসে আলাপে তেতো হওয়া। না, দ্বিতীয় অংশের যাত্রাটি বরং বিস্ময়ে ভরা। বাসটি কিছুদূর যেতে সহযাত্রীর মধ্যে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল। অনেকক্ষণ ধরেই লোকটার মুখে কোনো কথা নেই, যদিও যথারীতি কানের কাছে মোবাইল সেটটি ধরা, বদলে লোকটা ফোঁপাচ্ছে। চমকে উঠল আশিক, আজব ব্যাপারই বটে, এভাবে কোনো পুরুষকে স্বচক্ষে কাঁদতে দেখা এই প্রথম। শুধু কি তা-ই, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোকটি অবিশ্রান্ত কেঁদেই যাচ্ছে। এ সময় তার এমনও ভয় হয়, লোকটার ফোঁপানি যদি একবার হাউমাউ কান্নায় চড়ে যায়, তবে গোটা বাসেই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে। ভাগ্য ভালো, সেদিকে লোকটি যাচ্ছে না, ফোঁপানিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে কি ওপাশের মেয়েটি এমন কিছু বলেছে, যা তাকে সাংঘাতিক চোট দিয়েছে? যদি তেমন কিছু হয়, তাহলে বুঝতে হবে, মেয়েটি অসম্ভব বদ। এমন নিবেদিতপ্রাণ লোকটিকে শক্ত ধরনের চোট দেওয়া মেয়েটির মোটেই উচিত হয়নি। আশিক একটু আর্দ্র হয়ে যায়, লোকটির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। তবে যা ভাবা গিয়েছিল, তেমনটা নয়। অচিরেই আশিকের ভুল ভাঙে লোকটা কণ্ঠস্বর ফের সচল হওয়ায়, ‘জানো, তোমার কথাই কেবল মনে পড়ছে। তোমাদের বাসায় কত গিয়েছি, তুমি কত যত্ন করে খাইয়েছ—সেসবই মনে দাগ কাটছে, চোখে জল আনছে...।’
এর পরের বাক্যসমষ্টি শোনা গেল না ওভারটেকিং করা দ্রুতগামী একটা বাসের বিকট হর্নের আওয়াজে। তাতে অবশ্য অসুবিধা নেই, পরবর্তী সংলাপসমষ্টি না শুনেও বাকিটুকু গড়গড় করে বলে দিতে পারবে আশিক। কেননা, তাদের ব্যাকালাপের ধরনটি ইতিমধ্যেই প্রকাশ্য হয়ে গেছে। তা ছাড়া এসব সংলাপবিনিময় প্রায়ই এমন স্টেরিওটাইপেরই হয়। বাংলা সিনেমা আর বটতলার উপন্যাসের বদৌলতে এসব আর অবিদিত নয়। তবে এখানে যেটা নতুন, তা ওই সাবালক ধেড়ে লোকটার ভেউ ভেউ করে না হলেও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা। চোখের জলের ওপর মেয়েদের একচেটিয়া রাজত্ব যেখানে প্রতিষ্ঠিত সত্য, সেখানে এই লোকটার কান্নাকাটি প্রকারান্তরে অনধিকারচর্চারই শামিল। তার পরও লোকটির ওপর বিরাগ পোষণ করতে পারছে না আশিক। হয়তো এটাও প্রেমের প্রতি সর্বজনীন পক্ষপাতের প্রভাব। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল আশিক, এর মধ্যে লম্বা পথই পাড়ি দেওয়া হয়ে গেছে। জেগে উঠে দেখে একটা বাজার, বাজারটি পার হচ্ছিল বাস। কিন্তু গন্তব্য এখনো বহুদূর। তার অর্থ, পাশের লোকটাকে অকাতরে সহ্য করে যাওয়া। লোকটা পারেও বটে, পুটুরপাটুর করেই যাচ্ছে। না, এবার যেন একটু অন্য রকম কথা, গানের প্রসঙ্গ এসেছে,
মোবাইল ফোনটি বাঁ কান থেকে সরিয়ে এনে ডান কানে রেখে নিবিষ্ট লোকটি জুত হয়ে বসল, ‘এখন কী মনে হচ্ছে, বলব লক্ষ্মীটি? না, না, একদম হাসবে না। দিলের কসম, তুমি ওই গানটা গাও না সোনা, ওই যে হিন্দি গানটা, কিশোর কুমারের বিখ্যাত গানটা, “চালতে চালতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রাখ না...”’ বলতে বলতে লোকটা নিজেই কিশোর কুমারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো, ‘চালতে চালতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রাখ না/ কাভি আলবিদানা কেহে না...’ বলে কী লোকটা, আড়চোখে তাকিয়ে আশিক হাঁ হয়ে গেল। তাজ্জবই তো, গানটির ব্যাপারে লোকটার সঙ্গে তার পছন্দ এবার এক হয়ে গেল যে! আর সেটাই আশ্চর্যের। কেননা, গানটি তার কলেজজীবনের একটা সুপার হিট গান। সেই হিসেবে লোকটার যা বয়স, তাতে তো ওই সময় লোকটা নিতান্ত বালকই ছিল। বালকবেলায় তো তেমন ব্যাপার থাকে না, যা যৌবনে থাকে। গানটির প্রসঙ্গ এক ধাক্কায় তাকে যেন সেই প্রথম যৌবনের দিনগুলোয় নিয়ে গেল, আর তাতে তার পঞ্চাশোর্ধ্ব মুখে এঁটে থাকা যিশুর মুখোশটি টুটে যাওয়ার জোগাড়। এর ফলে আরেক ঘটনা ঘটে, পার্শ্ববর্তী লোকটার প্রেম-পিরিতি নিয়ে এতক্ষণ যে একটা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভাব ছিল, তা খসে পড়ে। পরন্তু সে-ই এখন জব্দ হয়ে যাচ্ছে, কালের ধুলো আচমকা সরে গেলে বুঝি এমনই হয়। কোথায় যেন পড়েছিল, হ্যাঁ অমিয়ভূষণে পড়েছিল,
মেয়েরা আদুরে গলায় ডাকলে রুপালি শোনায়। আসলে তেমন মিষ্টিমধুর কণ্ঠই ছিল রীনার। দ্যাখো কাণ্ডকারখানা, এত দিন বাদে তার প্রথম যৌবনের সত্তা কিনা জেগে উঠছে! রেলওয়ে কলোনির দিনগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকলে রীনার মুখচ্ছবি ভেসে ওঠেই। এই মধ্যবয়সে এসে রীনাকে পাশ কাটানো সহজ হলেও, তখন, ওই বয়ঃসন্ধিকালে তা একেবারেই সহজ ছিল না। ভালো ছাত্র ছিল বলেই বুঝি এমন হতো, তার চোখে পড়ার জন্য মেয়েটির তৎপরতার শেষ ছিল না। স্বীকার করতে বাধা নেই, মেয়েটির গলায় আলোচ্য হিন্দি গানটি রুপালিই শোনাত, প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আকুতিই ঝরে পড়ত রীনার কণ্ঠমাধুর্যে। কিন্তু ওই ভালো ছাত্র থাকার অহংকার বলে কথা, তখনকার হালচাল তো তেমনই ছিল, ভালো ছাত্ররা মুখ গুঁজে কেবল বই পড়বে, ভুলক্রমেও মেয়েদের দিকে তাকাবে না—সামাজিক ওই মরালিটির ফাঁদে পড়ে মেয়েটিকে শুধু নিরাশই করে গেছে সে। আজ অবশ্য বুঝতে পারে, সমাজ-আরোপিত মরালিটির অধিকাংশই কৃত্রিম, অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা ঢালও বটে। সুতরাং কৃত্রিমতাকে অতটা মান্যতা দেওয়ার মধ্যে কিছু ছিল না, গরিমা তো নয়ই। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খেয়াল হলো, অনেকটা সময় ধরে সে কেবল এসবই ভাবছে। এভাবে লঘুচিত্ততা পেয়ে বসায় একটু শরমিন্দাই হলো যেন বা। শরমরাঙা হয়ে প্রথমে তেরচা চোখে, পরে সরাসরিই সে তাকাল সহযাত্রীর পানে। আরে ব্যস, আজব ব্যাপার তো, প্রেমিকশিরোমণি লোকটা দেখছি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। কখন ঘুমিয়ে পড়ল এভাবে, এ কি তবে নিরবচ্ছিন্ন কথা বলার ক্লান্তির ফল, কে জানে! তবে কৌতুকের কথা এই, লোকটা যখন প্রেমালাপ থামিয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে নিচ্ছে, তখন কিনা তেমন ভাবনাই পেয়ে বসেছে তাকে। আশিক তার সুখদায়িকা ভাবনায় ডুবে গেল ফের। কথাটা লঘুচিত্ততাই, কিন্তু তা অকৃত্রিম গভীর আবেগকেই প্রকাশ করে। ফলে সেটি কোমল প্রার্থনার মতো হতে পারে, এমনকি তা এই পঞ্চাশোত্তীর্ণ যিশু সাজার বয়সেও!

অদ্বৈত গল্পের ছেঁড়াখোঁড়া মানুষ by হরিশংকর জলদাস

কোনো কোনো সাহিত্যকর্ম সাহিত্যিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। কোনো কোনো উপন্যাস কাব্য, নাটক, গল্প স্বীয় স্রষ্টাকে আড়াল করে। দৃষ্টিপাত, লালসালু, সূর্য দীঘল বাড়ি, পদ্মানদীর মাঝি, নিশিকুটুম্ব, প্রজাপতি, মেঘনাদবধ, অগ্নিবীণা, বনলতা সেন, তিতাস একটি নদীর নাম নির্মাতার প্রতিদ্বন্দ্বী। তিতাস একটি নদীর নাম-এর স্রষ্টা অদ্বৈত মল্লবর্মণ। অদ্বৈত কালজয়ী কিন্তু ক্ষীণজীবী। মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের [১ জানুয়ারি ১৯১৪—১৬ এপ্রিল ১৯৫১] জীবন তাঁর। ক্ষীণ আয়ু বলে অধিক লিখতে পারেননি। প্রাগুক্ত উপন্যাস ছাড়া লিখেছেন জীবনতৃষ্ণা, রাঙামাটি, শাদা হাওয়া নামের উপন্যাস। এ ছাড়া রিপোর্টাজ ধাঁচের লেখা ভারতের চিঠি পার্ল বার্ককে, ৮ থেকে ১০টি কবিতা ও ২৪টির মতো প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। আর লিখেছেন চারটি মাত্র ছোটগল্প। সেই গল্পগুলো মানবজীবনের প্রণয়-পরিহাস, বেদনা-বক্রোক্তিকে ধারণ করে আছে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের ছোটগল্পগুলো হলো ‘সন্তানিকা’, ‘কান্না’, ‘বন্দীবিহঙ্গ’ ও ‘স্পর্শদোষ’। চারটি গল্পের স্থানিক পটভূমি ভিন্ন। ‘সন্তানিকা’র পটভূমি কোনো এক মফস্বল। ‘কান্না’ গল্পটি তৈরি হয়েছে তিতাসতীরের গোকর্ণঘাট-নবীনগর অঞ্চলকে ঘিরে। ‘বন্দীবিহঙ্গ’র নির্মিতি কলকাতা ও দূরবর্তী কোনো এক গ্রামের পটভূমিকায়। আর কলকাতার ফুটপাত ‘স্পর্শদোষে’র আরম্ভ ও পরিণতি স্থান। কোনো কোনো ছোটগল্পে কাহিনিকে ছাড়িয়ে চরিত্র মুখ্য হয়ে ওঠে। অদ্বৈতের ছোটগল্পে কাহিনির চেয়ে চরিত্রের প্রাধান্য বেশি। বিচিত্র সর্পিল ঘটনাসংস্থান ও বৈপরীত্যের সমন্বয় ঘটিয়ে অদ্বৈত তাঁর ছোটগল্পে চরিত্রের সার নিষ্কাশিত করেছেন। উল্লিখিত চারটি গল্পে চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি মানবীয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। মেদহীন ভাষাভঙ্গি ও নির্লিপ্ততা—এ দুটোকে মূলধন করে নিম্নবিত্ত জীবনের মৌলিক অনুভূতিগুলোয় চকিত গভীর অন্তর্দৃষ্টির আলো ফেলেছেন। তাঁর ভাষা ইঙ্গিতপূর্ণ।
২. ‘সন্তানিকা’ কোনো এক মফস্বলের গল্প। এ গল্পে অবিশ্বাস ও ভালোবাসাহীনতার মতো শহুরেপনা নেই। আবার গ্রাম্য সরলতা ও গ্রাম্যতারও অনুপস্থিতি আছে গল্পটিতে। শহর ও গ্রামের সেতু হিসেবে গিন্নিমা গল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করছেন। ‘সন্তানিকা’ গল্পের মুখ্য চরিত্র ধনঞ্জয় ঘোষাল; মুখ্য উপাদান বুভুক্ষা—খাদ্যবুভুক্ষা আর স্নেহবুভুক্ষা। ধনঞ্জয়ের দুই ধরনের ক্ষুধাকে অবলম্বন করে এ গল্পের পরিকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ধনঞ্জয় ঘোষাল বৃদ্ধ, নিঃসঙ্গ ও অসহায়। আত্মীয়-পরিজন সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু পিছু ছাড়েনি ক্ষুধা, এই ক্ষুধাতাড়িত একজন বৃদ্ধের জীবনকাহিনিকে ধারণ করে আছে ‘সন্তানিকা’। যাযাবর, আশ্রয়সন্ধানী ধনঞ্জয় উচ্চ প্রাইমারি স্কুলের সাবেক হেডমাস্টার রূপে পরিচয় দিয়ে বীরেশ্বরবাবুর বাড়িতে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পেয়ে অযোগ্যতার বহু প্রমাণ রাখে। নরেশ ও তার ভাইবোনদের পড়াতে বসে সে কেবল নিজের ব্যর্থজীবনের গল্প বলে, সেকালের গুরুমশায়ের অত্যাচারের গল্প বলে। ফলে পড়ুয়াদের আসল পড়াশোনা হয় না। পরীক্ষায় তাদের অকৃতকার্যতায় বীরেশ্বর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। গিন্নিমার অবহেলাও প্রবল হয়ে ওঠে। ধনঞ্জয়ের ‘গিন্নিমা’ সম্বোধনের জবাবে ‘গিন্নিমা চোখ তুলিয়াই মুখ অন্যদিকে ফিরাইয়া চলিয়া যান’।
ফলে ধনঞ্জয় ‘বহুদিনের সেই জীর্ণ পুঁটলিটা আবার কক্ষে তুলিয়া লয়’। অবাধ্য প্রবল ক্ষুধাকে সঙ্গী করে সজল চোখে সে ‘বাহির হয়ে পড়ে পথের মাঝে, নিরুদ্দেশের পানে’। বীরেশ্বরের বাড়ি থেকে অনতিদূরে খোলা মাঠের পুরোনো বটগাছটির নিচে আশ্রয় নেয় সে। এই বিপুল পৃথিবীর কোথাও তার মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই। নিরুপায় হয়ে, শেষ পর্যন্ত ব্যথাক্লিষ্ট সর্বহারা মানুষটি পুনরায় গিন্নিমার সামনে এসে দাঁড়ায়। গিন্নিমার মুখে চিরন্তন মাতৃমূর্তির অজস্র স্নেহ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ধনঞ্জয় গিন্নিমার স্নেহছায়ায় আবার আশ্রয় পেয়ে যায়। ‘সন্তানিকা’ গল্পের প্রধান চরিত্র তিনটি—ধনঞ্জয়, বীরেশ্বর ও গিন্নিমা; আশ্রয়প্রার্থী, আশ্রয়দাতা ও মাতৃস্নেহে আবিষ্ট এক শাশ্বত নারী। টানাপোড়েন ধনঞ্জয় ও বীরেশ্বরের মধ্যে। তবে গল্পটি শুধু ধনঞ্জয়-বীরেশ্বরকে নিয়েই লেখা নয়, গল্পের একেবারে মূল ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে নারীর সন্তানবাৎসল্যের ব্যাপারটি। আর্থসামাজিক বৈষম্য এ গল্পের পশ্চাদ্ভূমি তৈরি করেছে। ধনঞ্জয় ব্রাহ্মণ, বীরেশ্বরবাবুও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, উভয়েই কুলীন বংশজাত। তবু উভয়ের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। এই গল্পে জটিলতা সৃষ্টিতে আর্থসামাজিক বৈষম্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ধনঞ্জয় ক্ষুধায় তাড়িত, কিন্তু এই ক্ষুধা জৈবিক যতটা, তার চেয়ে বেশি মানবিক। অদ্বৈত এই বিষয়টিকেই তাঁর গল্পে প্রধানভাবে তুলে ধরেছেন।
৩. ‘কান্না’ গল্পের পটভূমি গ্রাম। গোকর্ণঘাটে এ গল্পের বিস্তার ও পরিণতি। গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র—গুরুদয়াল। দূরসম্পর্কীয় এক পিসি ছাড়া সংসারে তার আর কেউ নেই। বউ ছিল, মারা গেছে। বিবাগী মন তার, বৈরাগী আচরণ। কথায় কথায় গান ধরে, ‘রাধে রাধে গো রাধে, তোর লাগি মোর পরান কাঁদে’। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায় গুরুদয়াল। একদিন সে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। দিন যায়, মাস যায়; পিসিমার প্রবল শোক অন্তরিত হয়; ‘পলাতকের সম্বন্ধে পাড়ার আলোচনাও ঠান্ডা’ হয়। এমন সময় গুরুদয়াল একদিন বাড়ি ফিরে, বেশভূষায় তার বিরাট পরিবর্তন, ‘মেয়েমানুষের চুলের মতো বড় বড় চুলগুলি তার কাঁধে ও পিঠে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। দাড়িগোঁফ বেশ করিয়া কামানো।’ গুরুদয়ালই একদিন ঠিক করল সে আবার বিয়ে করবে। লম্বা চুল কেটে, ধোপদুরস্ত কাপড়চোপড় পরে, এক-আধটু গন্ধদ্রব্য মেখে সে নিজেকে বরের উপযুক্ত করে তুলল। বিয়ের দিন যত ঘনিয়ে আসতে লাগল, ততই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল গুরুদয়াল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে হলো না। ‘একদিন কন্যা-কর্তার নিকট হইতে পত্র আসিল, তিনি তাহার কন্যাকে অন্যত্র বিবাহ দিবেন স্থির করিয়াছেন।’ ভারী মন নিয়ে জামাকাপড় বেঁধে গুরুদয়াল গৃহত্যাগ করল। দুই মাস যেতে না যেতে গুরুদয়াল সঙ্গে বউ নিয়ে গ্রামে ফিরে এল। বিশ্রী বউ। গুরুদয়াল বউকে মোটেই ভালোবাসে না। কারণে-অকারণে বউকে ঠেঙায়।
অসহায়, বাপ-মা-মরা স্নেহের কাঙাল মেয়েটি স্বামীর সব অত্যাচার নীরবে সহ্য করে। গল্পটি এ পর্যন্ত সরলরৈখিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। গল্পের শরীরে মুনশিয়ানার মোচড় লাগে তখনই, যখন গুরুদয়ালের সঙ্গে লঞ্চে ‘যাহার সহিত পূর্বে তাহার বিবাহের প্রস্তাব হইয়াছিল সেই তরুণী’ আহ্লাদীর হঠাৎ সাক্ষাৎ হয়। আহ্লাদীর সঙ্গে বিয়ে হচ্ছিল অন্য এক পুরুষের, আহ্লাদীর চোখে সে ‘বুড়ো’। বিয়ের আসর থেকে তাকে নিয়ে পালিয়ে আসার জন্য আহ্লাদী গুরুদয়ালকে প্রলুব্ধ করল। আহ্লাদীর বিয়ের দিন গুরুদয়াল প্রস্তুত। কিন্তু বিকেলে বিশ্রী বউটির ম্লানমুখ দেখে তার যেন কী হয়ে গেল। ‘একখানা কলমুখর অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত মুখ’ আর ‘নির্বাক শ্রীহীন বেদনাময় মলিন মুখ’—দুটোই গুরুদয়ালের চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার হূদয়ে বিশ্রী বউটির জন্য সহানুভূতির তরঙ্গ জেগে উঠল। সে বিরত হলো বিয়ের আসরে যাওয়া থেকে। এখানেই গল্পটির মধ্যে এক অপূর্ব মানবিকতার সঞ্চার হয়ে যায়। আধুনিক নগরজীবনের দাম্পত্য-ট্র্যাজেডিই অদ্বৈতের ‘কান্না’ গল্পে অবয়ব পেয়েছে। জায়া-পতিতে ঘর করে কিন্তু প্রত্যেকের অন্তরে বাদামের মতো অতৃপ্তির ফাটল। গুরুদয়াল বিশ্রী বউকে নিয়ে ঘর করেছে কিন্তু তার মন ব্যাপ্ত থেকেছে রূপ ও যৌবনের আরাধনায়। ধনঞ্জয়ের বুভুক্ষা মানবিক, গুরুদয়ালের বুভুক্ষা জৈবিক।
৪. বন্দীবিহঙ্গ’ মুসলিম সমাজের দুটি নরনারীর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চালচিত্র। মূলত, ‘বন্দীবিহঙ্গ’ গল্পটি ঘটনাপ্রধান নয়, ভাব ও ভাবনাপ্রধান। গল্পটির প্রথমাংশে অদ্বৈতের ভাষা কাব্যময়তাকে ছুয়ে আছে। আবু মিয়া প্রাণ-উতপ্ত, কিন্তু দরিদ্র। অর্থ উপার্জনের জন্য তাকে কলকাতায় থাকতে হয়। দারিদ্র্যের খাঁচায় সে বন্দীবিহঙ্গ। স্ত্রী-সন্তানদের কলকাতায় নিয়ে আসার মতো অর্থনৈতিক ক্ষমতা তার নেই। রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আবু মিয়ার সতেজ বাসনাগুলো ধীরে ধীরে মরতে থাকে। কিন্তু স্ত্রী জমিলার চিঠি তার অভিলাষগুলোকে মরতে দেয় না। জমিলার ক্ষোভ-দুঃখ-ভালোবাসামাখা চিঠি তার জীবনে প্রাণময়তার সঞ্চার করে। গল্পকার চিঠির মাঝখানে আবু মিয়ার মানসিক প্রতিক্রিয়ার কথাও সুকৌশলে আবু মিয়ার কথনে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো মাতাল সময়ের পটভূমিকায় গল্পকার বাংলার দুজন নরনারীর বেদনালাঞ্ছিত জীবনের চালচিত্র নির্মাণ করেছেন ‘বন্দীবিহঙ্গে’। গল্পে মাটির গন্ধ আছে, মাটিবর্তী মানুষের জীবন-আলেখ্য আছে; বৃক্ষপল্লব, ঋতুর উল্লেখ আছে। ‘বন্দীবিহঙ্গে’ অদ্বৈত মল্লবর্মণ দারিদ্র্যের খাঁচায় বন্দী আবু মিয়া ও জমিলা নামের দুটো অসহায় নরনারীর জীবনকথা শুনিয়েছেন। আর্থসামাজিক জটিলতা তাদের ডানার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।
৫. আমাদের বিবেচনায় ‘স্পর্শদোষ’ অদ্বৈত মল্লবর্মণের শ্রেষ্ঠতম গল্প। একজন মানবসন্তান ও একটি মানবেতর প্রাণীকে উপজীব্য করে অদ্বৈত ‘স্পর্শদোষ’ গল্পে দুর্বিষহ জীবনের ইতিবৃত্ত নির্মাণ করেছেন। কুকুর মানবেতর প্রাণী। সে কখনো মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না, অন্তত খাদ্যের জন্য। কিন্তু আকালের দিনে একটি অখ্যাত কুকুর খেঁকি হয়ে উঠল ভজার প্রতিপক্ষ। খাদ্য সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। খাবারের একটা ঠোঙার দখল নিয়ে পরস্পরের যুদ্ধ শুরু। ভজা ধীরে ধীরে কুকুরের মতোই আচরণ করতে থাকে। তখন তার বিকৃত রূপ, ভীতিপ্রদ আচরণ। ধীরে ধীরে ভজার মধ্যে পৈশাচিকতা বাড়তে থাকে। ‘খেঁকির দিনরাত্রির শান্তি যেন ভজা চুষিয়া খাইয়াছে। পথ চলিতে ভজার ছায়ামাত্র দেখিলে খেঁকি ছুটিয়া পালায়। আবার, খেঁকির ছায়ামাত্র দেখিলে ভজা তাড়া করিয়া যায়—দৌড়াইয়া গিয়া ভয় দেখাইয়া আসে।’ এ এক দুর্ভাগা কুকুর। আহসান হাবীবের ‘ধন্যবাদ’ কবিতার ডলির মতো সে সৌভাগ্যবান নয়। ভজার মানবেতর নিষ্ঠুর আচরণে খেঁকির মৃত্যু হয় একসময়।
ভজার তাড়া খেয়ে ক্লান্ত খেঁকি একজন পথচারীকে কামড় দেয়। এই কামড়ের কারণেই খেঁকির মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয়ে যায়। ‘বীরবরদের লাঠির আঘাতে’ খেঁকির দেহান্ত ঘটে। ‘স্পর্শদোষ’ উপসংহারে এসে ‘কুকুর ও মানুষের সম্পর্কের গল্পে’র চেয়ে অন্য একধরনের মানবিক মূল্যবোধের গল্পের মাত্রা পেয়ে যায়। গল্পকার গল্পটিতে উন্মাদপ্রায় ভজার মধ্যে মানুষের সামূহিক মূল্যবোধের প্রতিচিত্র স্পষ্ট করে তোলেন। যে ভজা নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি, সে ভজা বীভৎসভাবে গণপ্রহারে মৃত খেঁকির জন্য উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। তার মুখে পাপবোধ ও অনুশোচনার চিহ্ন ফোটে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের সুনিপুণ তুলির টানে ‘মানুষের নির্মম আচরণে’র এই গল্পটি শেষ পর্যন্ত চারুত্ব পেয়ে যায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর গল্পে ভাঙাচোরা সাধারণ মানুষের জীবনকথা শুনিয়েছেন। তাঁর চারটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র পুরুষ এবং অতি সাধারণ মানের পুরুষ। এই সাধারণ ছেঁড়াখোঁড়া মানুষগুলোর মধ্যে লেখকযুক্ত করেছেন অসাধারণ মাত্রা।

বড়দিনে বিশ্বজুড়ে শান্তির প্রার্থনা করলেন পোপ

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি প্রার্থনা করেছেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান ধর্মযাজক পোপ ফ্রান্সিস। বুধবার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বৃহৎ উৎসব বড়দিন উপলক্ষে ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে দেয়া ভাষণে এই কামনা করেন তিনি। ইউরোপ অঞ্চল থেকে পোপ নির্বাচিত হওয়ার ধারা ভেঙে লাতিন আমেরিকা থেকে পোপ নির্বাচিত হওয়া এই আর্জেন্টাইন ধর্মযাজক ভ্যাটিকানে পোপের দায়িত্বগ্রহণের পর এই প্রথম বড়দিনের শুভেচ্ছা ভাষণ দিলেন। ভাষণে বিধ্বস্ত সিরিয়ার নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের জন্য সহায়তা তহবিল বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বড়দিনের পোপের শুভেচ্ছা ভাষণ শুনতে বুধবার সকাল থেকেই সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে জড়ো হন লাখ লাখ ধর্মানুরাগী। গত বছরের বড়দিন উৎসবে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে ভাষণ দিয়েছিলেন অব্যাহতি নেয়া পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট। সেবার বিশ্বের শান্তি কামনার পাশাপাশি সিরিয়া সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করেন পোপ বেনেডিক্ট।
উল্লেখ, ধর্মগুরু যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে এই দিবসটি ঘটা করে উদযাপন করে থাকে সারা বিশ্বের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষরা। এদিকে বড়দিন উদযাপনে বাইবেলীয় শহর বেথেলহেম পরিণত হয়েছিল উৎসবের নগরীতে। বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটকরা মঙ্গলবার থেকেই ভিড় জমিয়েছেন বেথেলহেমের মানজার চত্বরে। এই স্থানটিতেই যিশুর জন্মস্থান বলে খ্রিস্টান ধর্মবলম্বীদের বিশ্বাস। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তি আলোচনার পথ ধরে ফিলিস্তিন-ইসরাইলের দ্বন্দ্ব অনেকটা কমে আসায় বেথেলহেমে দর্শণার্থীর সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমশ বাড়ছে। ইসরাইল নিরাপত্তার অজুহাতে জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিন সীমান্ত বরাবর কংক্রিটের দেয়াল খাড়া করলেও বড়দিন উপলক্ষে তিনটি গেট খুলে দিয়েছে। জেরুজালেম থেকে আসা রোমান ক্যাথলিক যাজকরা যেন যিশুর জন্মশহরে প্রবেশের সুযোগ পান, সেজন্যই এ ব্যবস্থা। বেথেলহেমে এসে ‘পুণ্যভূমি’র সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ প্রধান যাজক ফুয়াদ তাবাল বলেছেন, ‘বড়দিনের বার্তা হচ্ছে শান্তি, ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা। আমাদের একে অপরের ভাই হতে হবে।’ বেথেলহেমের সংকীর্ণ রাস্তা দিয়ে চলার সময় দর্শণার্থীদের শুভেচ্ছা গ্রহণের জন্য তার মোটরগাড়ির বহর অত্যন্ত ধীরে ধীরে নেটিভিটি গির্জার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। নেটিভিটি গির্জায় মধ্যরাতের সমাবেশ ও প্রার্থনা শুরু হওয়ার আগে গির্জাটির গেট থেকে স্বল্প দূরত্বে পৌঁছতে প্রধান যাজকের প্রায় ৯০ মিনিট লেগে যায়। এ সময় হাজার হাজার মানুষ স্থানটিতে জড়ো হয়েছিল।

ভোটার টানতে মোদির নতুন মন্ত্র এক ভোট এক নোট

ক্ষমতায় যেতে আসন সংখ্যা বাড়াতে ঘরে ঘরে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির নামে অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি। দলটির দাবি এভাবেই নাকি মোদির সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের একাত্মতা বাড়বে। ‘এক ভোট এক নোট’ নামে মোদির এই নতুন প্রচারণা মন্ত্রের কর্মসূচি শিগগিরই শুরু হবে ভারতজুড়ে। অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২টি আসনের বেশি আসন পাওয়া। মঙ্গলবার বিজেপির নেতাদের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেন মোদি। সেখানে তিনি জানান, লোকসভা নির্বাচনে ২৭২টির বেশি আসন পাওয়া সম্ভব। গত পাঁচ বছরে তরুণ প্রন্মের ১২ কোটি ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মোদির গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। যদি বুথ স্তরে কর্মীরা গিয়ে এইসব ভোটারকে উজ্জীবিত করতে পারে, তাহলে অনায়াসেই বিজেপি ২৭২টির বেশি আসন দখল করতে পারে। এই লক্ষ্যে এগোনোর জন্য মোদির দাওয়াই মূলত দুটি। এক, গোটা জানুয়ারি মাসে বুথে বুথে গিয়ে নতুন ভোটারদের খুঁজে বের করে তাদের নাম ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত করা।
দুই, কর্মীদের সঙ্গে ভোটারদের নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করার জন্য মোদি এক অভিনব কর্মসূচির আয়োজন করেছেন। যার নাম ভোট ও নোট। অর্থাৎ, ঘরে ঘরে গিয়ে প্রতি পরিবারের কাছ থেকে কমপক্ষে দশ টাকা ও সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তীতে তা মোদির ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি পরিবারের মধ্যে এ অর্থ বণ্টন করা হবে। এর উদ্দেশ্য বহুবিধ। একদিকে দলের তহবিল তৈরি হবে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, এই অর্থ চাওয়া হবে মোদিকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য। ‘মোদি ফর পিএম’ স্লোগান নিয়ে এই অর্থ চাওয়া হবে। যিনি অনুদান দেবেন, তার মনেও মোদির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি ঘরে ঘরে যেতেও বাধ্য হবেন দলের কর্মীরা। এক সময় জনসংঘ এভাবে ‘ঘর ঘর যাও’ অভিযান করতো। এখন মোদিও সেই কৌশল গ্রহণ করলেন। দলের নেতারা জানাচ্ছেন, কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলোতো আছেই। তার ওপর দিল্লিতে আম-আদমি পার্টির যে উত্থান হয়েছে, সেটিও ভাবাচ্ছে বিজেপিকে। কারণ, কংগ্রেস সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করেই অরবিন্দ কেজরিওয়ালদের উত্থান ঘটেছে। লোকসভায় সেই পরিসরটি গোটা দেশে দখল করতে চান মোদি। বিজেপির এক নেতার মতে, আর যা-ই হোক, আম-আদমি পার্টির সেই ক্যাডার নেই, যার ভিত্তিতে গোটা দেশে তারা প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বিজেপির তো তা আছে।

শনিবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন কেজরিওয়াল

অবশেষে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন ভারতের আম-আদমি পার্টি প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ২৮ ডিসেম্বর শনিবার বেলা ১২টার দিকে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে বলে আম-আদমি পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ভারতের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারের শিষ্য অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ইচ্ছা মোতাবেক ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে এ শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। আম-আদমির ছয় বিধায়ক মনীষ সিসোদিয়া, রাখি বিরলা, সোমনাথ ভারতী, সৌরভ ভারদ্বাজ, গিরিস মনি এবং সতীন্দ্র জৈন এদিন কেজরিওয়ালের সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

তারা দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়?- দুই পক্ষের কঠোর অবস্থান

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ঢাকা অভিমুখী ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ করতে দেওয়া হবে না বলে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের লোকজনকে কোথাও জড়ো হতে দেবে না সরকার।
আগামী ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে অন্তত এক সপ্তাহ সরকার দেশে কোনো রাজনৈতিক গোলযোগ হতে দিতে চায় না। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে পেট্রলবোমায় পুলিশের সদস্য হত্যা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিরোধীদলীয় জোটের ১৮ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের পেছনেও ওই একই উদ্দেশ্য।

নাশকতা ও ককটেল-পেট্রলবোমার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সরকারের মুখে সব সময় শোনা যাচ্ছে। এবার
২৯ ডিসেম্বর ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ঠেকাতেও কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর
বাকি রেখেছে কি? যেকোনো নাশকতায় দু-চারজনের নাম দিয়ে শত শত বা হাজার হাজার ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেকে মারা যাচ্ছেন। আর কত কঠোর হবে সরকার?

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন, ২৯ ডিসেম্বর তাঁদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাঁদের ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচি পালনে বাধা দিলে পরিণতি কঠিন ও করুণ হবে বলেও তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল যেভাবে বাসে পেট্রলবোমা মেরে, ককটেল ফাটিয়ে মানুষ হত্যা করছে, অবরোধের নামে রেলের ফিশপ্লেট খুলে যাত্রী হত্যা, গাছ কেটে ‘জলবায়ু-অপরাধ’ সাধন, এমনকি বোমা মেরে গরু পুড়িয়ে মারার মতো ঘৃণ্য অপরাধ করে চলেছে, এরপর আর কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে চায় ওরা? বিরোধী দল কি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে?

আর কত হত্যা, রেললাইন উপড়ে ফেলা, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, বাসে পেট্রলবোমা মারার পর বিরোধী দল বলবে,
যথেষ্ট কঠোর পরিণতি ডেকে আনা হয়েছে?  আর সরকারই বা আর কত জেল-জুলুম-নির্বিচার গুলি চালিয়ে বলবে, তারা যথেষ্ট কঠোর হয়েছে?

স্বাভাবিক বিচার-বিবেচনা থাকলে কোনো দায়িত্বশীল দল রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বা কোনো সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনের নামে এত নির্মম আচরণ করতে পারে না। রাজনীতি মানুষের জন্যই। তাই রাজনীতির জন্য যেন একজন নাগরিকের প্রাণও বিপন্ন না হয়, তা দেখা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কর্তব্য। যাঁরা সরকারের আছেন, তাঁদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ, সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্যই তাঁদের জনগণ নির্বাচিত করেছে।

২৯ ডিসেম্বর ঘিরে দেশে সৃষ্ট অনিশ্চিত পরিস্থিতির অবসান হোক। সরকার ও বিরোধী পক্ষ আরও দায়িত্বশীল আচরণ করুক। মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

ইংলাকের সংস্কার প্রস্তাব বিরোধীদের প্রত্যাখ্যান

চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ওয়াত্রা বুধবার এক ভাষণে জাতীয় সংস্কার পরিষদ ইংলাক সিনা-টেলিভিশন গঠনের প্রস্তাব করেছেন। বিরোধীদলের ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটিতে থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক পদ্ধতি সংস্কারের জন্য ৪৯৯ জন খ্যাতিমান থাই নাগরিককে পরিষদের সদস্যের প্রস্তাব দেন। প্রাথমিকভাবে ২ হাজার সদস্য থেকে ৪৯৯ জনকে বেছে নেয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
১১ সদস্যের এক কমিশন স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ‘জাতীয় সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবেন। জাতীয় পর্যায়ে সংস্কার আনার লক্ষ্যে একটি কর্মকৌশল প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময় বলে মন্তব্য করেন ইংলাক। এদিকে, নির্বাচনের আগেই সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বিরোধী নেতারা প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের এ ঘোষণা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র আকানান্ত প্রোমথন বলেছেন, ইংলাক সংস্কারের ব্যাপারে আন্তরিক নন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার আন্তরিকতা প্রমাণের জন্য পদত্যাগ করে সংস্কারের পথ সুগম করতে পারে। বিরোধী নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কার শেষে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাতে তারা অংশ নেবেন।

গদ্যকার্টুন- শঙ্কা আসে ধেয়ে by আনিসুল হক

পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। কারণ, এই কলামে লিখেছিলাম, নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো অচলাবস্থা দেখা দেবে না, দিলেও সেটা ভয়ংকর কিছু হবে না। বাংলাদেশের মানুষের আছে সৃজনশীলতা, তারা এমন একটা উপায় বের করে নেবে, যা থেকে একটা সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে। আমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আমার আশা হয়ে গেছে গুড়ে বালি।

পাকিস্তান- কে এই ইমরান খান? by শান্তনু মজুমদার

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সাজা বিষয়ে ইমরান খানের অবস্থানে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে কিছু লোককে। পাকিস্তানি জামায়াত, পাকিস্তানি মুসলিম লিগের কথাবার্তা যেমন-তেমন। কিন্তু ইমরান খানের অবস্থানে তাঁরা নাকি আসমান থেকে পড়ে যাচ্ছেন।

‘যৌথবাহিনীর অভিযানে টার্গেট কিলিং চলছে’

যৌথবাহিনীর অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলনে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে যৌথবাহিনীর অভিযানের আড়ালে আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীকে গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে হত্যা করেছে। বেশির ভাগ অভিযান চালানো হচ্ছে রাতের বেলায়। চলছে টার্গেট কিলিং। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সহিংসতার প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানে আমরা দেশের নিরপেক্ষ সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি। আমাদের অনেকেই ইতিমধ্যে ব্যাপক সহিংসতার শিকার নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সাতক্ষীরা, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলায় তথ্য সংগ্রহ করতে গেছেন। তাদের পাঠানো রিপোর্ট হাতে পেলে প্রকৃত ঘটনা তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন করবো। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এজে মোহাম্মদ আলী, সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুকোমল বড়ুয়া, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি রুহুল আমীন গাজী, মহাসচিব শওকত মাহমুদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সৈয়দ আবদাল আহমদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান।

‘যৌথবাহিনীর অভিযানে টার্গেট কিলিং চলছে’

যৌথবাহিনীর অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়েছে।

বট পাতায় বিয়ের দাওয়াত- by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

মোড়ানো কাগজটা নীল ফিতায় বাঁধা। তার সঙ্গে গুঁজে দেওয়া একটি আধফোটা গোলাপ। ফিতা খুলতেই একটি বট পাতা—আপনা-আপনি খুলে যায়। সবুজ পাতার মাঝখানে একটি লাল বৃত্ত। হাতে নিলেই যে কারও মনে হবে, বট পাতা নয়, যেন লাল-সবুজের পতাকা।

এই পাতার পতাকাকে এবার দাওয়াতপত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বনকিশোর গ্রামের জাহেদা বেগম। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে তাঁর ছোট ছেলের বিয়ের আয়োজন করেছিলেন তিনি। অতিথিদের দাওয়াত করেছিলেন এই বট পাতার মাধ্যমে। জাহেদা বেগমের তিন ভাইয়ের সবাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তাঁদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। তখন তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন জাহেদাকেও বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে ফিরে এলেন ভাইয়েরা। তাই মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা নিয়ে জাহেদার অহংকার অনেক। ছোট ছেলের বিয়ের দিন তিনি ঠিক করেছিলেন বিজয় দিবসে। ছেলেকে বলেছিলেন, ‘বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথিদের দাওয়াত করতে হবে খুবই আন্তরিকভাবে। একটা দামি কার্ড পাঠিয়ে দিলেই মানুষ খুশি হয় না। নিমন্ত্রণ পেয়ে যাতে মানুষ খুশি হয় সেই কাজ তোমাকে করতে হবে।’
জাহেদার ছোট ছেলের নাম জাহিদুল ইসলাম। গ্রামীণ ব্যাংকের চাকুরে জাহিদ ‘ওরা ১১ জন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালান। মায়ের মনের কথা বুঝতে পেরে বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। নিজে খুব ভালো উপায় বের করতে না পেরে ছুটে গেলেন চারুকলাপড়ুয়া বন্ধু আরাফাত রুবেলের কাছে। আরাফাত চারুকলায় ছাপচিত্র মাধ্যমে পড়েছেন। তিনি চট করে একটা বট পাতা নিয়ে তার মাঝখানে লাল রং লাগিয়ে দিলেন। মুহূর্তে সবুজ পাতাটি যেন পতাকার চেহারা পেয়ে গেল। এর মাঝখানে তিনি লিখলেন, ‘জাহিদের বিয়েতে আপনার নিমন্ত্রণ। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩—জাহিদ’র মা।’ এরপর পাতাটির বোটার দিকে জাহিদের একটা পোর্ট্রেট স্কেচ করলেন। র্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে নীল ফিতায় বেঁধে ফেললেন তারপর। সঙ্গে গুঁজে দিলেন একটি আধফোটা গোলাপ। কটিতে ছিল গাঁদা ফুল।
এদিকে ব্যতিক্রমী এই দাওয়াতপত্র পেয়ে সব অতিথিই ভীষণ উচ্ছ্বসিত। রাজশাহীর পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজ্জাকুল ইসলাম ছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠানের একজন অতিথি। তিনি জানান, এমন অভিনব দাওয়াতপত্র জীবনে এই প্রথম পেয়েছেন। তাই শত ব্যস্ততার মধ্যেও বের করেছেন সময়।
বিয়ের আগের দিন রাতের ঘটনা। বট পাতায় দাওয়াতপত্রের নকশাকার আরাফাত রুবেল যখন জাহিদের পক্ষ থেকে দাওয়াতপত্রটি দিতে গেলেন রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ এলাকায় কনেপক্ষের বাসায়, সেখানে তখন চলছে কনে স্বর্ণকে ক্ষীর খাওয়ানোর অনুষ্ঠান। আনুষ্ঠানিকভাবে কনের মা আয়েশা সিদ্দিকা ও বাবা এন্তাজ হোসেন দাওয়াতপত্রটি গ্রহণ করলেন। কনের মা ফিতা খুলে দাওয়াতপত্রটি মেলে ধরলে বাড়িভর্তি অতিথিরা বট পাতার ওপর হাতে আঁকা বরের ছবিসহ এমন নান্দনিক দাওয়াতপত্র দেখে করতালি দিয়ে ফেটে পড়লেন উল্লাসে। কনে স্বর্ণের চোখেও সে সময় বিস্ময়ভরা আনন্দ! পরে অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিজয় দিবসে বিয়ে। তার ওপর এমন অসাধারণ দাওয়াতপত্র! আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’

বট পাতায় বিয়ের দাওয়াত- by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

মোড়ানো কাগজটা নীল ফিতায় বাঁধা। তার সঙ্গে গুঁজে দেওয়া একটি আধফোটা গোলাপ। ফিতা খুলতেই একটি বট পাতা—আপনা-আপনি খুলে যায়। সবুজ পাতার মাঝখানে একটি লাল বৃত্ত। হাতে নিলেই যে কারও মনে হবে, বট পাতা নয়, যেন লাল-সবুজের পতাকা।

২৯শে ডিসেম্বর খালেদার পরাজয়ের দিন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কোন শক্তি বানচাল করতে পারবে না। দেশের জনগণ নির্বাচন চায়। শুধুমাত্র বিরোধী দল যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে এ নির্বাচনে আসতে চায় না।
খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রতিহিংসার আগুনে মানুষ মরছে। তিনি একটি আলটিমেটাম শেষ হলে আরেকটি আলটিমেটাম দেন। কিন্তু কিছুতেই লাভ নেই। আওয়ামী লীগ সভাপতি গোপালগঞ্জসহ দেশের সব ভোটারকে আগামী নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। তিনি তার নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের কাছেও নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। গতকাল নিজ নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া ও ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত পৃথক জনসভায় এসব কথা বলেন।

গিমাডাঙ্গা-টুঙ্গীপাড়া (জিটি) উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। টুঙ্গীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল হালিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ গোপালগঞ্জ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সংসদ সদস্য শেখ হেলালসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন উন্নয়নের কথা বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জনগণ ও দেশের মঙ্গলের জন্য রাজনীতি করি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে ঘোষণা করেছে বলেও শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন। বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেত্রী ও তার পুত্ররা দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জন করেছেন। পরে কালো টাকা সাদা করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগামী নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সভাস্থলে বিপুল জনসমাগম ঘটতে থাকে।
এর আগে ফরিদপুরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নৌকায় ভোট দিন, তাতে দেশের মানুষ ভালো থাকবে। নৌকা বিজয়ী হলে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হবে।  আমি নির্বাচনের কথা বললে বিরোধীদলীয় নেত্রী আলটিমেটাম দেন, ঘরে বসে আন্দোলনের নামে যারা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করছেন, দেশে সন্ত্রাস নৈরাজ্য করে মানুষ হত্যা, জীবহত্যা করছেন তাদেরও বিচার করা হবে। গত ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপিকে পরাজিত করে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে এখন বিরোধী দলীয় নেত্রী ঈর্ষান্বিত হয়ে বিজয়ের মাসেই সমাবেশের ডাক দিয়েছেন, বিরোধীদলীয় নেত্রীর ৪ঠা মে ঢাকার সমাবেশ হয়নি এখন ২৯শে ডিসেম্বরের সমাবেশেও জনগণ আসবে না। এদিন তার পরাজয়ের দিন।

২৯শে ডিসেম্বর খালেদার পরাজয়ের দিন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কোন শক্তি বানচাল করতে পারবে না। দেশের জনগণ নির্বাচন চায়। শুধুমাত্র বিরোধী দল যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে এ নির্বাচনে আসতে চায় না।

কার্যালয়ে খালেদার একাকী একঘণ্টা

পুলিশী বাধার কারণে নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঘণ্টাব্যাপী একাকী সময় কেটেছে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার। গতরাতে এমন ঘটনা ঘটেছে।
রাত ৯টার দিকে গুলশানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। আগে থেকেই সেখানে পুলিশ ছিল সতর্ক অবস্থানে। কার্যালয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। খালেদার বাড়ি থেকে তার সঙ্গে থাকা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানাই কেবল ঢোকার সুযোগ পান কার্যালয়ে। ফলে নিজ কার্যালয়ে একাকী বসেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এর মধ্যেই রাত ১০টার দিকে গুলশানের ওই কার্যালয়ে যান সাংবাদিক নেতারা। কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা তাদের প্রথমে আটকালেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর নেতৃত্বে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য খোরশেদ আলম ও বাসির জামাল। পরে রাত ১২টার দিকে তিনি কার্যালয় থেকে গুলশানের বাসায় ফিরে যান। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অভিযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবন ও রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। এক পর্যায়ে দুই ভবনের ফটকের সামনে বেষ্টনি তৈরি করে পুলিশ। এরপর থেকে দুই ভবনে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঢুকতে বাধা দেয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজনকে। এমন কি দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতাকে আটকের পর বাসায় পৌছে দেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়দিনের মতো গতকালও কড়াকড়ি বজায় রাখে পুলিশ। বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে যাওয়ার পর সেখানে যান দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান ও ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সভাপতি সুলতানা আহমেদ। তারা কার্যালয়ে ঢুকতে চাইলে বাধা দেয় পুলিশ। এমনকি অফিসকর্মীদেরও যাতায়াতে বাধা দেয়া হয়। তখন তারা সেখানে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আপনারা চলে যান অন্যথায় আমরা আপনাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হবো। পরে তারা চলে যায়। এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি’কে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেছেন, বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দি। এখন বিরোধী দলের কোন নেতাকর্মীকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হচ্ছে না। আগামী মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের জন্য তিনি যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তার প্রেক্ষিতে তাকে কার্যত গৃহবন্দি করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার স্বার্থেই পাহারা জোরদার করা হয়েছে।

কার্যালয়ে খালেদার একাকী একঘণ্টা

পুলিশী বাধার কারণে নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঘণ্টাব্যাপী একাকী সময় কেটেছে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার। গতরাতে এমন ঘটনা ঘটেছে।

খালেদার বক্তব্য ইতিবাচক by বদিউল আলম মজুমদার

বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ইতিবাচক বলে মনে করি। বিশেষ করে তিনি হরতাল, অবরোধের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কেননা হরতাল-অবরোধ সরকারের যা ক্ষতি না করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে সাধারণ মানুষের। তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতির গতি হয়ে পড়ে স্থবির।
সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধে নাশকতা ও সহিংসতা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। এখনো অনেকে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। এ কারণে বিরোধী দলের নেতার ঘোষিত ২৯ ডিসেম্বরের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচি যদি শান্তিপূর্ণ হয়, তাহলে কারও আপত্তি থাকবে না। সরকারের উচিত হবে এ ধরনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে সহায়তা করা। বাধা না দেওয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, রাজপথে এ ধরনের বড় কর্মসূচি দুই শক্তিকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করায়। এক পক্ষ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে, অন্য পক্ষ বিরোধীদের প্রতিহত করতে চাইবে। ফলে বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যায়। এ কারণে আমরা মনে করি, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। রাজপথে আন্দোলনে সাময়িক বিজয় লাভ করা যেতে পারে কিন্তু সংকটের সমাধান হবে না। বরং দেশকে আরও গভীর সংকটে ফেলতে পারে। অতএব, বিরোধী দল যেহেতু হরতাল অবরোধ থেকে বেরিয়ে এসেছে, সরকারেরও উচিত হবে তাদের প্রতি সহনশীল মনোভাব দেখানো। কারাগারে আটক বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ছেড়ে দিয়ে এবং বিরোধী দলের অফিসের সামনের অবরোধ তুলে দিয়ে সরকার আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। যত দ্রুত আলোচনা হবে ততইদেশের জন্য মঙ্গল। ইতিমধ্যে দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে।
এই ক্ষতি বাড়তে দেওয়া যাবে না। আশা করি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সত্য উপলব্ধি করবেন। সরকার ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের যে আয়োজন করেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। ইতিমধ্যে ৫৩ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ১৫৪টি আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যান্য আসনে কতসংখ্যক ভোটার কেন্দ্রে যাবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। তাই আমরা মনে করি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের তফসিল বাতিল করে সমঝোতার পথ প্রশস্ত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন অনেক আগেই বলেছিল, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে এটি করা তাদের জন্য কঠিন হবে না। জাতীয় সংসদ এখনো বহাল আছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা হলে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার যে সুযোগ আছে, তারা তা গ্রহণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তিন মাস সময় পাওয়া যাবে। যেনতেন একটি নির্বাচন কিংবা নির্বাচন প্রতিহত করার নামে রাজপথে জনগণকে জিম্মি করার রাজনীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুই দশকেরও বেশি পালা করে দেশ চালিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের প্রতিই সবাই তাকিয়ে আছেন। দেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে দুই নেত্রী যদি টেকসই উদ্যোগ নেন, তাহলে ইতিহাসে তাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিরোধীদলীয় নেতা সংবাদ সম্মেলনে আরও অনেক কথাই বলেছেন।
সেসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু এই মুহূর্তে নির্বাচন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার শান্তিপূর্ণ সমাধান জরুরি। আর সেই সমাধানের উপযুক্ত মাধ্যম হলো আলোচনা। খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সমঝোতা হওয়া মানে পরাজিত হওয়া নয়। আমরা আশা করব, তিনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মকৌশলেই সেই সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেবেন। বিরোধী দলের নেতা সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধে সংঘটিত সহিংসতার দায় সরকারের ওপর চাপিয়েছেন। এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন শান্তি। তাই, কারও এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে শান্তি বিঘ্নিত হয়। খালেদা জিয়া জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো কথা বলেননি। কিন্তু তাঁকে মনে রাখতে হবে, জামায়াতের এজেন্ডা আলাদা। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া তাদের লক্ষ্য নয়। তারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের বাঁচাতেই আন্দোলনের নামে সারা দেশে সহিংসতা চালাচ্ছে। বিএনপির মতো একটি গণতান্ত্রিক দল কেন তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। তবে খালেদা জিয়া জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাব সম্পর্কে যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তা ইতিবাচক বলে মনে করি। তবে একই সঙ্গে জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দাও প্রত্যাশিত ছিল।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

জনগণের শঙ্কা কাটেনি

গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বিরোধী দলের নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যটি নানা কারণে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কয়েক দফা হরতাল-অবরোধের পর তিনি নতুন কী কর্মসূচি নেন, সে সম্পর্কে সবার কৌতূহল ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি হরতাল-অবরোধের মতো চরম কর্মসূচি দেননি, এ জন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন। কিন্তু খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে যেসব বক্তব্য বা প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার কথা বলা হলেও সংকট উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো দিকনির্দেশনা নেই। তিনি ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন না করার জন্য সরকারকে বলেছেন। এটি কেবল আহ্বান বা হুঁশিয়ারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ভালো হতো। একই সঙ্গে তিনি সেই নির্বাচন প্রতিহত করতে সবাইকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ভোটাধিকার হরণকারী ও মানবতা লঙ্ঘনকারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণক্ষয়ী লড়াইয়ে যাঁরা শরিক আছেন, এবং হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তুলুন।’ এর মাধ্যমে বিএনপি নেত্রী কি বোঝাতে চাইছেন যে ‘প্রাণক্ষয়ী’ আন্দোলনকারীদের মধ্যে আরও সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্যের প্রয়োজন আছে? এখন সেই ‘প্রাণক্ষয়ী’ আন্দোলনকারীরা যদি আরও সংহত হন, তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, বুঝতে অসুবিধা হয় না। জনগণের মধ্যে উৎকণ্ঠা আরও বাড়বে।
নির্বাচনের ব্যাপারে সমঝোতা না হওয়ার জন্য বিরোধী দলের নেতা সরকারের একগুঁয়েমি ও অনমনীয় মনোভাবকে দায়ী করেছেন। তাঁর এই অভিযোগের সঙ্গে আমরা দ্বিমত করছি না। কিন্তু সরকারের সেই একগুঁয়েমির বিরুদ্ধে বিরোধী দল আন্দোলনের নামে যে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাও সমর্থনযোগ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে দুই পক্ষের অনমনীয় মনোভাবের কারণেই সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে গেল। এখন সরকার যে একতরফা নির্বাচন করতে যাচ্ছে, তা দেশে-বিদেশে সবার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিমধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। যেহেতু এই নির্বাচনের প্রতি জনগণেরই আগ্রহ নেই, সেহেতু প্রতিহত করার নামে সংঘাতকে উসকে দেওয়ার কী প্রয়োজন? নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলনে কোনো অঘটন ঘটলে তার দায়ও তাদের ওপর এসে পড়বে। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ বন্ধ করা যেমন গণতন্ত্র নয়, তেমনি সহিংস পথে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণাও গণতন্ত্রের ভাষা নয়। দ্বিতীয়ত, একজন যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকর করার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাব বিষয়ে খালেদা জিয়া মর্মাহত বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা-ও জন-আকাঙ্ক্ষার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে হয়। জনগণ তাঁর কাছে এ ব্যাপারে আরও শক্ত অবস্থান আশা করেছিল।
তিনি অন্তত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাবের নিন্দা বা প্রতিবাদ করতে পারতেন। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সৃষ্ট সমস্যা কূটনৈতিকভাবে সমাধানের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, আমরা তা সমর্থন করি। কিন্তু তিনি যখন বলেন, এ নিয়ে দেশের ভেতরে নোংরা রাজনীতি করা হচ্ছে, তখনই যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে বিএনপির দোদুল্যমানতা প্রকাশ পায়। এমনকি তিনি নিজেও সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধে যেসব হত্যা ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে, তার সব দায় সরকারের ওপর চাপিয়েছেন। অনেক সময় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বলপ্রয়োগ যে পরিস্থিতিকে নাজুক করে, সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধীদলীয় জোট, সেহেতু সেই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতার দায় তারাও এড়াতে পারে না। বিশেষ করে এই সহিংস রাজনীতির সুযোগে যে অগণতান্ত্রিক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং তারা হীন স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যার সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে সহিংস রাজনীতির নিশ্চয়ই চারিত্রিক পার্থক্য আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হরতাল-অবরোধের সময় অনেক ক্ষেত্রেই তারা সেই পার্থক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি যদি ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে এবং নির্বাচনের ব্যাপারে দেশবাসীকে তাদের অবস্থান জানায়, সেটি করার অধিকার নিশ্চয়ই তাদের আছে।
সরকারের উচিত হবে এ ধরনের কর্মসূচিকে বাধা না দেওয়া। কিন্তু কর্মসূচি ঘোষণাকালে বিএনপির নেত্রী যে চারটি নীতি-কৌশলের কথা বলেছেন, তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে পারে। তিনি ‘ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠনের কথা বলেছেন। তাহলে সার্বভৌমত্ব কে হরণ করেছে, সেই প্রশ্নটিও আসবে। তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলেছেন। প্রশ্ন আসবে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কারা চালাচ্ছে? বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর অনুযায়ী বিরোধী জোটের শরিক মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তিই বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছে, পুড়িয়ে দিচ্ছে। এই অগণতান্ত্রিক শক্তিকে নিয়ে কীভাবে তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেবেন? সর্বোপরি খালেদা জিয়া যে চলমান আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত, ব্যাপক ও পরবর্তী ধাপে উন্নীত করা এবং বাধা দিলে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, জনগণ তাতে শঙ্কিত না হয়ে পারে না। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বিরোধীদলীয় নেতার কাছে দেশবাসী আরও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে। তবে বিরোধী দলের অবস্থান যেভাবেই দেখা হোক না কেন, সংকট সমাধানের বলটি এখন সরকারেরই কোর্টে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সমঝোতার শেষ সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে অনেকটা দশম সংসদ নির্বাচনের গুরুত্বহীনতা স্বীকার করে নিয়েছেন। বিলম্বে হলেও এটা তিনি ও তাঁর দল বুঝতে পেরেছে। তবে আমরা মনে করি, এখনো সময় আছে, একাদশ নয়, দশম সংসদ নির্বাচন নিয়েই সমঝোতা করা যায়। যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে। দুই বড় দল একমত হলে তফসিল পরিবর্তন কর সমস্যা নয়। দশম সংসদ নির্বাচন যদি এভাবে পরিহাসের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ও সরকার গঠিত হয়, তাহলে আশঙ্কা করি দেশ, জনগণ, অর্থনীতি এবং আওয়ামী লীগেরই আরও বেশি ক্ষতি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই বোধোদয়কে পাথেয় করে দুই বড় দলের মধ্যে যত রকম ছাড় দেওয়া সম্ভব, তা দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথাই এখন ভাবা উচিত। সংবিধান, তফসিল, ব্যক্তিগত জেদ ইত্যাদি কোনো কিছুই দেশের চেয়ে বড় নয়। দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিলে সমঝোতা এখনো সম্ভব। যাঁরা ভাবছেন, ‘এই নির্বাচন হয়ে যাক, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা করব’, তাঁরা হয়তো কল্পনাও করতে পারছেন না, তা কত দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হবে।
প্রহসনের নির্বাচন সম্পর্কে বিদেশি শক্তিসমূহ ও জাতিসংঘের মনোভাবও অনুকূল নয়। ব্যতিক্রম ভারত। শুধু ভারতের সমর্থন দিয়ে সরকার কি চলতে পারবে? এখন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করে নতুন তফসিল দিয়ে, সব প্রধান দলের অংশগ্রহণে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এটাই সময়ের দাবি। নইলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি, প্রধান দলগুলো, তাদের নেতারা বড় রকমের ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে, তারা কি ব্যক্তির জেদকে বড় করে দেখবে, নাকি দেশ ও দলের সামগ্রিক ভবিষ্যৎকে? আওয়ামী লীগের একটা গ্রুপ এ রকম ধারণা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চাইছে যে শেখ হাসিনা যদি প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন, তাহলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ হেরে যাবে। আর বিএনপি এ ঘটনাকে তাদের ‘বিজয়’ দাবি করে দেশব্যাপী বিজয় উৎসব পালন করবে। এই মহল এমনও ধারণা দিচ্ছে যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের নেতা, সমর্থক বুদ্ধিজীবীসহ অনেকে আক্রমণের শিকার হবেন। তাঁদের অনেককে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। ইত্যাদি। এই আশঙ্কার ভিত্তি আছে বলে মনে করি না। একতরফা নির্বাচন করলে ছয় মাস বা এক বছর পরে আওয়ামী লীগকে যখন আবার নির্বাচন দিতে হবে, তখন আওয়ামী লীগের কী দুরবস্থা হতে পারে, তা এই শুভানুধ্যায়ীরা বলেন না।
তাঁরা শুধু শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ না করার ভুল পরামর্শ দিচ্ছেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে বিএনপি দেশে বিরাট লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে ফেলবে—এমন আশঙ্কা যাঁরা করছেন, তাঁদের কথা ভেবে কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। ১. দুই পক্ষের যে সমঝোতা চুক্তি হবে তাতে এমন শর্তও থাকতে পারে, নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল মিছিল করতে পারবে না। ২. ১৪ দল বা ১৮-দলীয় জোটের কোনো নেতা বা সদস্যের বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে কোনো মামলা দিতে পারবে না। ৩. নির্বাচনের আগে আগের কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে পারবে না। ৪. সব রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি দেওয়া হবে। সাম্প্রতিক সহিংসতা দমন করতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের নৈতিক জোর না থাকলে জনগণের আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয় না। সরকার বিএনপির সব নেতাকে মুক্তি দিয়ে বিএনপি তথা ১৮-দলীয় জোটকে স্বাভাবিক পথে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার (সভা, মিছিল, বিক্ষোভ, হরতাল ইত্যাদি) সুযোগ দিক। আর যারা সহিংসতা করছে, মানুষ মারছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করুক।
সন্ত্রাসীদের ধরতে বা শাস্তি দিতে বিএনপি কোনো বাধা নয়। দেখতে হবে, সন্ত্রাসী ধরার নামে যেন বিরোধী দলের নিরীহ নেতা ও কর্মী গ্রেপ্তার না হয়। বিএনপি বা ১৮-দলীয় জোটকে গণতান্ত্রিক পথে প্রতিবাদ বা আন্দোলন করতে না দিলে চোরাপথে সন্ত্রাস হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিএনপি দাবি করেছে, তারা এই সহিংসতা করেনি। কিন্তু তা তারা কাজে, কথায় ও ভূমিকা দিয়ে প্রমাণ করতে পারেনি। এই সহিংসতা ‘সরকার’ করছে, তাও বিএনপি প্রমাণ করতে পারেনি। এই সহিংসতা যদি জামায়াতও করে থাকে, বিএনপি তার যথেষ্ট নিন্দাও করেনি। বিএনপি এই সহিংসতা করুক বা না করুক, সাধারণ মানুষের ধারণা, তা বিএনপি-জামায়াতই করছে। কাজেই সাম্প্রতিক এই সহিংস ঘটনাবলির যদি কোনো মাইনাস পয়েন্ট থাকে, তাহলে তা বিএনপিই পাবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ ত্যাগ করলে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়বে বলেই আমরা ধারণা করি। নানা কারণে গত কয়েক বছরে দেশে-বিদেশে তাঁর কিছু নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। একটি নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি এক ঢিলে অনেক পাখি মারতে পারবেন।
১. বিএনপি-জামায়াতের সহিংস আন্দোলন, অবরোধ ও হরতাল থামিয়ে দিতে পারবেন। ২. বিএনপি, ১৮-দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে আনতে পারবেন। ৩. দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন। ৪. তিনি দল বা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশকে যে ওপরে স্থান দেন, তা প্রমাণ করতে পারবেন। আওয়ামী লীগ বারবার সংবিধানের যে দোহাই দিচ্ছে, তা ঠুনকো যুক্তি। সংবিধান সংশোধন এক মিনিটের কাজ। দেশ, দেশের মানুষ, দেশের অর্থনীতি ও গণতন্ত্রচর্চার চেয়ে সংবিধানের একটি ধারা বড় হতে পারে না। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা যত দ্রুত এটা উপলব্ধি করবেন, ততই দেশের মঙ্গল। তা না করে জেদপূর্বক ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন করলে দেশকে বিরাট অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। এখনো সময় আছে। দয়া করে সমঝোতা করুন। এই নিবন্ধ লেখার সময় আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পেছানো ও সমঝোতার আর সম্ভাবনা নেই, তাদের মতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি ও জটিলতার কথা যেন তারা ভাবে।
আরও একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। যে বড় দল দুটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ, তারা কী জাদুমন্ত্রে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাবে? সেই জাদুমন্ত্রটি কী? দুই দল তাদের প্রধান দুটি শর্ত (প্রধানমন্ত্রী পদে কে থাকবেন) ছেড়ে দেবে? এ কথা বাংলাদেশের কেউ বিশ্বাস করেন? তাহলে কী আশায় আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা ভাবছেন, পরের নির্বাচনে সমঝোতা হবে। একটা মাত্র পথ খোলা আছে, সমঝোতার। আওয়ামী লীগে অনেক ঝানু, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সাবেক কূটনীতিক রয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের ভাবনাচিন্তা তাঁরা আমাদের চেয়ে ভালো বুঝবেন আশা করি।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

খাতুনগঞ্জ- ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের সুরক্ষা জরুরি by ফারুক মঈনউদ্দীন

চট্টগ্রামবাসীকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য নামকাওয়াস্তে ঘোষিত ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ চট্টগ্রাম কি অবশেষে তার জৌলুশ এবং ব্যবসায়িক সততার মুকুটটি হারাতে বসেছে? চট্টগ্রামের কেউ কেউ একসময় আহ্লাদের আতিশয্যে যে খাতুনগঞ্জকে বাংলাদেশের
তথা চট্টগ্রামের ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলেও অভিহিত করতেন, যে খাতুনগঞ্জ বা চাক্তাই ছিল মৌখিক অঙ্গীকার রক্ষা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ—সেই খাতুনগঞ্জ থেকে হয়তো শিগগির মুখ ফিরিয়ে নেবে ব্যাংকগুলো, অবশিষ্ট থাকবে না পারস্পরিক ব্যবসায়িক বিশ্বাস। কারণ, প্রায় দেড় দশক ধরে খাতুনগঞ্জে একের পর এক ঘটতে থাকা বিভিন্ন প্রতারণামূলক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংকগুলো এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।

সম্প্রতি মোজাহের হোসেন নামের প্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীর বিপুল অঙ্কের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ঋণ অপরিশোধিত রেখে গা-ঢাকা দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে ব্যাংকগুলো। জানা গেছে, দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় পাঁচটি ব্যাংকের কাছে এই ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের নামে ৪৫০ কোটি টাকার মতো অনাদায়ি মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ রয়ে গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেওয়া অনাদায়ি ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণও ১৫০ কোটি টাকার মতো। ব্যাংকগুলোর কাছে যৎসামান্য বন্ধকি জমি জামানত হিসেবে থাকলেও অন্যান্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে চেক ছাড়া কিছুই নেই।

বলা বাহুল্য, দেশের আইন সঠিক পথে চললে এবং ঋণগ্রহীতার সততা ও নৈতিক মূল্যবোধ সমুন্নত থাকলে এই চেকই হতে পারত যথেষ্ট শক্ত জামানত। কারণ, চেকে লিখিত অঙ্কের টাকা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে না থাকার কারণে সেই চেক প্রত্যাখ্যাত হলে দেশের প্রচলিত আইনে (নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট) চেকদাতার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এ আইনটি বলবৎ থাকলেও এর অধীনে উল্লেখযোগ্য প্রতিবিধান বা শাস্তি হয়েছে, এমন প্রমাণ খুব বেশি নেই। অথচ একসময় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা কোনো চেকের জামানত ছাড়াই কেবল মুখের কথার ভিত্তিতে কোটি টাকার পণ্য বাকিতে দিয়েছেন।

এখনকার জটিল এবং বিশ্বাসহীনতার যুগে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব হয়তো অবাস্তব মনে হবে। ব্যবসায়িক বিশ্বাসের কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক শাখাগুলো প্রায় বিনা জামানতে সেখানকার ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে দ্বিধা করত না। এক দশক আগেও ঢাকার তুলনায় প্রায় সবগুলো ব্যাংকের চট্টগ্রামভিত্তিক খেলাপি ঋণ ছিল কম এবং এমনকি কোনো কোনো ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় খেলাপি বা শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ থাকত শূন্য। কোনো ঋণগ্রহীতা অনিবার্য কারণে খেলাপি হয়ে পড়লেও অতি দ্রুত তার নিষ্পত্তি করে ফেলার একটা দায়বদ্ধতা ছিল।

কিন্তু খাতুনগঞ্জের সেই স্বর্ণযুগ আর অবশিষ্ট নেই। খাতুনগঞ্জের ক্ষীয়মাণ জৌলুশ, পরিকল্পনাহীন নাগরিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এখানকার অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছেন আধুনিক সুসজ্জিত ভবনে। এককালের সওদাগরি সংস্কৃতির পরিবর্তে গড়ে উঠেছে করপোরেট সংস্কৃতি। ঋণখেলাপি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে একাধিক ব্যাংকের সঙ্গে  নামতে হচ্ছে আইনি লড়াইয়ে।      

প্রায় ১৩৮ বছর আগে শেখ মোহাম্মদ হামিদুল্লা খানের পত্নী খাতুন বিবির দান করা জায়গার ওপর যে খাতুনগঞ্জের গোড়াপত্তন হয়েছিল, সেই খাতুনগঞ্জ এবং তার সন্নিহিত এলাকা পরবর্তী সময়ে পরিণত হয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশের আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশের মূল সরবরাহের কেন্দ্র।

প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাজার দুয়েক দোকান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অফিস এবং বিভিন্ন পণ্যের আড়ত ও গুদাম নিয়ে একদা জমজমাট আমদানিনির্ভর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র ছিল খাতুনগঞ্জ। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কর্ণফুলী নদী হয়ে চাক্তাই খাল দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুবিধার কারণে একচেটিয়া উৎকর্ষ লাভ করে খাতুনগঞ্জ প্রসারিত হয় কোরবানীগঞ্জ ও চাক্তাই পর্যন্ত।

প্রাচীন এ বাণিজ্যকেন্দ্রটির মূল কার্যক্রম ছিল আমদানি এবং ইনডেন্টিং (বিদেশি রপ্তানিকারকের দেশীয় প্রতিনিধিত্ব) ব্যবসানির্ভর। অথচ খাতুনগঞ্জ তথা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক যে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হতো, তার উদ্যোক্তারা যে খুব উচ্চশিক্ষিত ছিলেন তা নয়; প্রখর ব্যবসায়িক জ্ঞান ও দূরদর্শিতার পাশাপাশি মৌখিক অঙ্গীকার রক্ষা এবং ব্যবসায়িক সততার কারণে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বস্ততার একটি নিরবচ্ছিন্ন ধারা। সাদামাটা বহিরঙ্গের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটা অতি সাধারণ গদিঘর বা অফিস নিয়ে খুব সাদাসিধা জীবন যাপন করলেও অতীত প্রজন্মের এঁদের অনেকেই হয়তো নিয়ন্ত্রণ করতেন সারা বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের আমদানি, মজুত ও সরবরাহ। এঁদের প্রায় সবাই ছিলেন আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং প্রভূত ব্যবসায়িক সুনামের অধিকারী, ফলে তাঁদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন ঘটত মূলত মৌখিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।

খাতুনগঞ্জভিত্তিক ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করলেও তার বিপণনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। পণ্য বন্দরে পৌঁছার পর কখনো ব্রোকাররা, কখনো বা পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্যের চাহিদা বুঝে আগাম দিয়ে কিংবা আংশিক বাকিতে ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) কিনে নিতেন। যদিও সেই পণ্য হয়তো তখনো বন্দরের শেডে কিংবা অমুক মাঝির গুদামে (উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের গুদামগুলোর পরিচিতি হয় কুলিসর্দার বা মাঝিদের নামে)। পরবর্তী সময়ে প্রকৃত পণ্যের কোনো স্থানান্তর ছাড়াই এই ডিও হাতবদলের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা পণ্যবিশেষে লাখ থেকে কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করতে পারতেন।

উল্লেখ্য, এসব কেনাবেচা কখনো কেবল মুখের কথা বা টেলিফোন কিংবা নিদেনপক্ষে একটা ছোট স্লিপের মাধ্যমে চলত। এভাবে কয়েকবার হাতবদলের কারণে পণ্যের দামও বেড়ে যেত কয়েক দফা। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এই ডিও ব্যবসা একসময় লাগাম ছাড়া হয়ে ওঠে, সেই সঙ্গে যুক্ত হয় ডিও জালিয়াতির মতো তৎপরতা। ভুয়া ডিও তৈরি করে অন্যায়ভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে যেমন উধাও অনেক ব্যবসায়ী, তেমনি ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে অপর পক্ষ।

২০০৬ সালেও ডিও জালিয়াতি করে কিছু ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। এ রকম ডিও জালিয়াতির বেশ বড় কিছু ঘটনার পর অবশেষে ‘কন্ট্রোল অব অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট ১৯৫৬’-এর আওতায় চিনি ও ভোজ্যতেল ব্যবসায় ডিও প্রথা বাতিল করে জারি করা হয় ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১’। এ ব্যবস্থায় ডিওর পরিবর্তে দিতে হবে সেলস অর্ডার (এসও); যার মেয়াদ হবে ১৫ দিন। কিন্তু এ আইনটি মান্য করা হচ্ছে কি না, কিংবা বরখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তার কোনো তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।

ডিও জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ছাড়াও মাঝেমধ্যে পাওনাদার এবং ব্যাংকের ঋণ অপরিশোধিত রেখে গা ঢাকা দেওয়ার ঘটনার পর খাতুনগঞ্জকে এখন আর নিরাপদ বলে মনে করছে না ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে সর্বশেষ মোজাহের হোসেন আমদানিকারকের পাওনাদার এবং ব্যাংকের বিপুল দেনা ফেলে দেশান্তরি হওয়ার ঘটনা সব মহলের বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, জামানতবিহীন বা স্বল্প জামানতের বিপরীতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণদান-পরবর্তী যে কঠোর তদারকি প্রয়োজন হয়, এ ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। কারণ, ব্যাংকগুলো দালিলিক তথ্য-উপাত্তের ওপর যতখানি ভরসা করে, বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ততখানি করেনি। ফলে এই পলাতক আমদানিকারকের গুদামে কী পরিমাণ মজুত আছে কিংবা আদৌ আছে কি না, ব্যাংক ছাড়াও বাজারে এই ব্যক্তির বিশাল অঙ্কের হ্যান্ড লোনের কারণ, ক্রমাগত মূল্যহ্রাসের কারণে সৃষ্ট লোকসানজনিত গহ্বর কতখানি গভীর—এসব বাস্তব তথ্যানুসন্ধান করে কঠোর তদারকির মধ্যে রাখলে এই ব্যবসায়ী হয়তো এতখানি ক্ষতি করতে পারতেন না।

ব্যাংক এবং অন্যান্য পাওনাদার ব্যবসায়ীর আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও তিনি ভূলুণ্ঠিত করেছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সততা ও অঙ্গীকার রক্ষার ভাবমূর্তি। ফলে ব্যাংক বা অন্য ব্যবসায়ীরা অতীতের মতো চোখ বন্ধ করে তাঁদের আর বিশ্বাস করবেন না। অথচ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে দেশের শিল্প-বাণিজ্যে চট্টগ্রামের যে ভূমিকা ও অবদান, টোলখাওয়া ভাবমূর্তির কারণে তা ক্ষুণ্ন হলে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ।

তাই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতাদের সচেষ্ট ও সক্রিয় হতে হবে, যাতে বাণিজ্যনগরের ব্যবসায়িক বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, জালিয়াতি, ঋণখেলাপ ইত্যাদি কারণে তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা যায়। চট্টগ্রাম তথা খাতুনগঞ্জ আবারও যাতে পরিণত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সততা এবং অঙ্গীকার রক্ষার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও কেন্দ্রবিন্দুতে। চট্টগ্রাম তথা খাতুনগঞ্জের এমনকি ঢাকার মৌলভীবাজার বা ইমামগঞ্জের ব্যবসার যা ধরন, তাতে একটি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ স্থাপন করা যায় কি না (যদিও বিষয়টি যথেষ্ট বিতর্ক এবং যথার্থ নিরীক্ষাসাপেক্ষ) তা ভেবে দেখতে পারেন ব্যবসায়ী নেতারা। চট্টগ্রাম এ ক্ষেত্রে নিতে পারে অগ্রণী ভূমিকা।  

ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।

fmainuddin@hotmail.com 

জ্বালানি নিরাপত্তা- নবায়নযোগ্য জ্বালানিই উত্তম বিকল্প by মহিউদ্দিন আহমদ

দেশে ক্রমেই বেড়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে নাগরিক জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন  জ্বালানিনিরাপত্তা। এ নিয়েও রাজনীতি হয়েছে এবং হচ্ছে বিস্তর।

ওদের কষ্টের জীবন

ইরানের বন্দিদশা থেকে মুরাদনগরের ৪ জন বাড়ি ফিরেছে। মুরাদনগর উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের সিএনজি ড্রাইভারের ছেলে রফিকুল ইসলাম। অপর ৩ জন হলো, যাত্রাপুর গ্রামের রমিজ মিয়ার ছেলে আল আমিন, বাইরা গ্রামের হাজী আ. হাসেম মিয়ার ছেলে ওলি উল্লাহ ও পূর্বসোনাউল্লা গ্রামের আবদুল বাতেন মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন।
মঙ্গলবার দুপুরে একদল সাংবাদিক তাদের বাড়িতে গেলে তারা জানান, ইরানে বাংলাদেশী কিছু দালাল চক্রের হাতে বন্দিদশার কথা বলেন। রফিকুল ইসলাম, আল আমিন, জাকির হোসেন ও ওলিউল্লাহ জানান, আমরা সবাই দুবাই ৪-৫ বছর ধরে কাজ করছি। আমাদের সঙ্গে কাজ করতো মানিক। মানিক ইরানে চলে যায়। সেখান থেকে প্রায়ই আমাদের ফোন করতো। ইরানে প্রতি মাসে ৭০-৮০ হাজার টাকা রোজগার করা যায়। তোরা ইরানে চলে আস। এ কথা আমরা বিশ্বাস করি নাই। মানিক তার স্ত্রী মনির মোবাইল নম্বর দিয়ে বলে আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বিশ্বাস হলে চলে আসিস ইরানে। আমরা মনির সঙ্গে কথা বলি। মনি বলে, ইরানে ভাল বেতন। তোমরা চলে যাও। মনির কথা মতো শারজা শহরে রনি নামে এক দালালের কাছে ১০০০ দিরহাম জমা দেই জনপ্রতি। রনি শারজার শিয়া মসজিদের পাশে একটি জাহাজে তুলে দিয়। জাহাজ ইরানের বর্ডারের পাশে গেলে একটি স্পিডবোট তুলে দেয়। ওই স্পিডবোট থেকে আমাদের একজন বাঙালি গাড়ির ড্রাইভার বন্দর থেকে আমাদের ইরানের আব্বাস জেলার বাবা গোলাম নামক একটি গ্রামের ৪ রুমবিশিষ্ট বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখে। ১টি রুম গাড়ি রাখার, ১টি টর্চার সেল, ১টি আমাদের থাকার রুম, অপরটি দালালদের থাকার রুম। আমাদের রুমে অর্ধশতাধিক লোক ছিল। সবাই বাংলাদেশী। ওই টর্চার সেলে প্রায়ই আমাদের মারধর করতো বাড়ি থেকে টাকা এনে দেয়ার জন্য। যে টাকা এসে দিতো তাকে মাঝেমধ্যে ইরানের বাসায় কাজ করতে পাঠাতো। যে টাকা দিতে পারতো না তাকে ওই টর্চার সেলে বলাৎকার করাতো। ৭ মাস পর অনেক কৌশল করে পালিয়ে এসেছি। আসার সময় তারা যাদের কাছ থেকে বিকাশ-টাকা নিতো সেই হিসাবের বই নিয়ে এসেছি। সে হিসাব মতে, প্রায় ৩ কোটি টাকা দালালরা কাজের নাম করে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়েছে। এর মধ্যে আমরা ২৯ জন পালিয়ে এসেছি। বাকিরা এখনও ওখানে বন্দি অবস্থায় রয়েছে। আমাদের কোন কাজ করতে দিতো না। দু’বেলা শুধু বাঁধাকপি সিদ্ধ করে খেতে দিতো। তারা আগেই একটি লিস্ট দিতো। বাড়িতে কিভাবে কথা বলতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মারধর করতো। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিকাশ-এর নম্বরগুলো যাচাই-বাছাই করে জানা যায়, চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানা ট্যাংগারচাল গ্রামের মো. শাহজাহানের ছেলে রবিউল হোসেন মানিক, জামাল ইরানে রয়েছে। এর পর সিআইডি পুলিশ পাপন কম্পিউটার স্টোরের মালিক ফরিদ, মানিকের পিতা মো. শাহজাহান ও স্ত্রী মনি এবং জামালের স্ত্রী আঁখি আক্তারকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সিআইডি সদর দপ্তরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে। তাদের স্বীকারোক্তি, প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা মানুষের কাছে থেকে তারা হাতিয়ে নিয়েছে। দালালরা হলো বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার মানিক, সিলেটের কাশেম, কাদের মোল্লা, জামাল, নারায়ণগঞ্জের জিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চান মিয়া।

হরতাল-অবরোধ- কৃষির এই ক্ষতি কি সামলে ওঠা যাবে? by শাইখ সিরাজ

সারা দেশ থেকে আমার কৃষকবন্ধুরা ফোন করছেন। তাঁদের অবস্থা জানাচ্ছেন। শত শত টন শীতকালীন সবজি খেতেই নষ্ট হচ্ছে। শীতকাল সামনে রেখে যে স্বপ্ন তাঁরা বুনেছিলেন, তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মাস দেড়েক আগে আমি ঈশ্বরদীর মুলাডুলি গিয়েছিলাম।

ওদের কষ্টের জীবন

ইরানের বন্দিদশা থেকে মুরাদনগরের ৪ জন বাড়ি ফিরেছে। মুরাদনগর উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের সিএনজি ড্রাইভারের ছেলে রফিকুল ইসলাম। অপর ৩ জন হলো, যাত্রাপুর গ্রামের রমিজ মিয়ার ছেলে আল আমিন, বাইরা গ্রামের হাজী আ. হাসেম মিয়ার ছেলে ওলি উল্লাহ ও পূর্বসোনাউল্লা গ্রামের আবদুল বাতেন মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন।

খাতুনগঞ্জ- ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের সুরক্ষা জরুরি by ফারুক মঈনউদ্দীন

চট্টগ্রামবাসীকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য নামকাওয়াস্তে ঘোষিত ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ চট্টগ্রাম কি অবশেষে তার জৌলুশ এবং ব্যবসায়িক সততার মুকুটটি হারাতে বসেছে? চট্টগ্রামের কেউ কেউ একসময় আহ্লাদের আতিশয্যে যে খাতুনগঞ্জকে বাংলাদেশের

হরতাল-অবরোধ- কৃষির এই ক্ষতি কি সামলে ওঠা যাবে? by শাইখ সিরাজ

সারা দেশ থেকে আমার কৃষকবন্ধুরা ফোন করছেন। তাঁদের অবস্থা জানাচ্ছেন। শত শত টন শীতকালীন সবজি খেতেই নষ্ট হচ্ছে। শীতকাল সামনে রেখে যে স্বপ্ন তাঁরা বুনেছিলেন, তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মাস দেড়েক আগে আমি ঈশ্বরদীর মুলাডুলি গিয়েছিলাম।
ওই এলাকায় গত কয়েক বছরে শিম চাষে বিপ্লব সূচিত হয়েছে। মুলাডুলি কাঁচাবাজারটি পরিণত হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় শিমের বাজারে। সাধারণত দিনে (অর্থাৎ, যেদিন হরতাল-অবরোধ নেই) বাজারটি পূর্ণ থাকে শত শত ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণ ও বিকিকিনিতে। কিন্তু হরতাল হলে সেদিন বাজারটি থাকে জনশূন্য। খেতের শিম খেতেই বাড়তে থাকে। ওই এলাকার জমির মালিকদের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে শিমের চাষ করেন ভূমিহীন প্রান্তিক চাষিরা। অনেকেই শিমের চাষ করে কয়েক বছরে ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-কর্জ, এনজিওর ঋণ ইত্যাদি নিয়ে তাঁরা শিমের চাষ করেন। ফসল উঠলে টাকা পরিশোধ করে লাভের হিসাব কষেন।

এবার তাঁদের সবারই কপাল পুড়েছে। লোকসানের শিকার হয়েছেন অধিকাংশ কৃষক। ওই এলাকার সবচেয়ে বড় কপিচাষি ‘কপি বারি’ বলেন, শীতের সবজি ওঠে প্রতিদিন। এক দিন বাজার ধরতে না পারলে খেতের সবজি খেতেই নষ্ট হয়। কপির ফুলে বীজ হয়ে যায়, মুলা সময়মতো না তুললে মোটা ও শক্ত হয়ে যায়, শিমের ভেতরে বিচি বড় হয়ে যায়—এমন সব ফসলই নষ্ট হয়। পরে আর এগুলো বাজারে বিকোয় না। এবার তা-ই ঘটেছে। অধিকাংশ চাষির খেতের সবজি হরতাল-অবরোধের কারণে তুলতে না পেরে খেতেই নষ্ট হচ্ছে। বেশ কয়েকজন মিলে ট্রাক ভাড়া করে বাজারে পাঠানোর উদ্যোগ নিলেও সেখানে গুনতে হচ্ছে অনেক বেশি ভাড়া, যা তার উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় তিন হাজারের বেশি শসাচাষি রয়েছেন। শুধু হরতাল-অবরোধের কারণে তাঁরা উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামেও শসা বিক্রি করতে পারেননি। অনেকেই খেত থেকে শসা তোলেননি শ্রমিক খরচে পুষিয়ে না ওঠার কারণে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ফুল চাষসমৃদ্ধ গদখালীর কয়েক শ চাষি এবারই প্রথম কঠিন দুর্যোগে পড়েছেন। গদখালী বাজারে এই মৌসুমে প্রতিদিন বেচাকেনা হতো ১০ লাখ টাকার ফুল। কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থার। পানির দরেও ফুল বিক্রি হচ্ছে না। ইতিমধ্যে কয়েক কোটি টাকার লোকসান গুনেছেন ফুলচাষিরা। টমেটোর চাষসমৃদ্ধ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কথা বলি।
গত এক দশকে গোটা উত্তরাঞ্চলে কৃষি-সাফল্যের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন রাজশাহীর টমেটোচাষিরা। চলতি মৌসুমে গোদাগাড়ীতে তিন হাজার ৩৩৩ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন টমেটোর চাষ হয়েছে। প্রায় এক মাস আগে জমি থেকে টমেটো তোলা শুরু হয়। কিন্তু গত ২৬ নভেম্বর থেকে চলমান অবরোধে পরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় টমেটো সরবরাহ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কৃষি বিভাগসহ স্থানীয় হিসাবে প্রতিবছর রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কৃষকেরা প্রায় ৪০০ কোটি টাকার টমেটো বিক্রি করেন। এবার তার চার ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ ১০০ কোটি টাকাও বিক্রি করতে পারবেন কি না সন্দেহ। প্রতিবছর এই সময়ে যেখানে গোদাগাড়ীতে টমেটোচাষিদের মধ্যে উৎসব দেখা যেত, এখন সেখানে বিরাজ করছে চরম হতাশা।
একের পর এক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির কারণে টান পড়েছে শিশুখাদ্যেও। দুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেশের সবচেয়ে বড় সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটায় প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। অন্যদিকে, মিল্ক ভিটা থেকে দুধ কেনা বন্ধ থাকায় চরম দুর্যোগে পড়েছেন সমবায়ী খামারিরা। এদিকে চট্টগ্রামের পশ্চিম পটিয়ার শিকলবাহা দুগ্ধপল্লির পাঁচ শতাধিক খামারি তাঁদের প্রতিদিনের উৎপাদিত ৪৮ হাজার লিটার দুধ সরবরাহ করতে না পারায় কয়েক দিন আগে দুধ ঢেলে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এবার আমন মৌসুমের নতুন ধান বাজারে ওঠার সময় দেশের অধিকাংশ জেলায় ধানের দাম ছিল ৭০০ টাকা মণ। কিন্তু টানা অবরোধ-হরতালের প্রভাবে এই দাম কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০ টাকা মণ।
এবার আসা যাক কৃষি উপকরণ সরবরাহের অচলাবস্থা প্রসঙ্গে। হরতাল-অবরোধের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় সার ও ডিজেলের সংকট সৃষ্টি হয়। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দর থেকে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় সার সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাঘাবাড়ী বন্দরে খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার টন ইউরিয়া সার পড়ে থাকতে দেখা যায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে প্রতিবছর সারের গড় চাহিদা ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৮ থেকে ২৯ লাখ টন। এ ছাড়া টিএসপি ছয় থেকে সাত লাখ ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) প্রয়োজন হয় বছরে সাড়ে ছয় লাখ টন। এসব সারের ৬৫ শতাংশই প্রয়োজন বোরো মৌসুমে। সাধারণত কৃষকের জন্য সার সরবরাহ করেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) ডিলাররা। এখন দেশের সব এলাকায় বোরো বীজতলা তৈরি ও রোপণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং সারের চাহিদা সর্বোচ্চ। কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে সার পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। আমদানি করা প্রচুর পরিমাণ সার পড়ে আছে দেশের বৃহত্তম দুই সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলায়।
টানা অবরোধের কারণে সারা দেশে বিঘ্নিত হচ্ছে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যক্রম। একই সঙ্গে কমেছে বিক্রিও। নৌপথে সরবরাহ ব্যবসা চালু থাকলেও গত এক মাসে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া সড়ক ও রেলপথে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধই ছিল বেশি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় অবস্থিত জ্বালানি তেলের প্রধান ডিপো থেকে এক দিনের অবরোধে দেশের ডিপোগুলোয় গড়ে ১৬ থেকে ১৮ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সেচনির্ভর বোরো মৌসুমের ওপর।
হরতালের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের নানা রকম হিসাব রয়েছে। কয়েক মাস আগে ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের এক হিসাবে দেখা যায়, ‘এক দিনের হরতালে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, তার পরিমাণ ২০ কোটি ইউএস ডলার বা এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা।’ কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এক দিনের হরতাল-অবরোধে অর্থনীতির ক্ষতি আড়াই হাজার কোটি থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এই হিসাবগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনুমাননির্ভর। এ বিষয় নিয়ে আমি দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি অকপটেই বলেছেন, হরতাল-অবরোধে কৃষির ক্ষতি ব্যাপক। কিন্তু এই ক্ষতি দিয়ে যুক্তিসংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক গবেষণা এখনো হয়নি। হরতাল-অবরোধের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণ করার প্রচলিত কৌশলটি জানা গেল তাঁর কাছে। সেটি হচ্ছে, আমাদের এক দিনের জিডিপি এক দিনের ক্ষতি হিসেবে ধরা হয়। এই হিসাবের কাছেও আসে না কৃষকের পণ্য পরিবহন না করতে পারার যন্ত্রণা ও লোকসানের হিসাব। একই সঙ্গে আসে না ঋণগ্রস্ত কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে না পারা ও লাখ লাখ টাকার লোকসান গোনার হিসাব।
১৫ ডিসেম্বর ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সারা দেশে হরতাল-অবরোধ ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। কিন্তু বরাবরের মতোই এখানেও ছিল না কোনো কৃষকের অংশগ্রহণ। দেশের বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, হরতাল-অবরোধের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কৃষক আন্দোলন-সংগ্রামে যাননি। এ অবস্থা চলতে থাকলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গর্ব ধরে রাখা যাবে না।
গত দুই মাসে আমাদের পণ্য পরিবহন ও বাজার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কোটি কোটি টাকার কৃষিপণ্য পচে নষ্ট হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। উপকরণ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বোরো আবাদ করতে না পারলে আমাদের শতকরা ৬০ ভাগ খাদ্যনির্ভরতার জায়গাটি সংকটপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো কি সম্ভব হবে?
শাইখ সিরাজ: পরিচালক ও বার্তা প্রধান, চ্যানেল আই।
shykhs@gmail.com

সিইসি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন- প্লিজ, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বন্ধ করুন by মাহফুজ আনাম

কেন ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত নয়? কারণ তা আমাদের সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচন ধারণার পরিপন্থি, কারণ তা এখনও পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের যে আস্থা আছে তা ধ্বংস করে দেবে।