Tuesday, March 3, 2026

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ধাক্কা খেল দুবাইয়ের বিলাসী জীবন

কর্মদিবসগুলোর শেষে যে আনন্দ–উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে দুবাইয়ে সপ্তাহান্ত শুরু হয়, তেমনটাই হয়েছিল শনিবার সকালে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাম জুমেইরাহর সৈকতে অবস্থিত ক্লাবগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সমুদ্রতীরের প্রমোদভ্রমণের পথে দৌড়বিদদের দলগুলোকে সুউচ্চ অট্টালিকাগুলোর নিচে ওয়ার্ম আপ করতে দেখা যায়। সুশৃঙ্খলভাবে দৌড় শুরু করার আগে তাঁরা নিজেদের শরীরচর্চার ভিডিও ধারণ করছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিতে শহরটিকে আগের মতোই ছিমছাম দেখাচ্ছিল। নীল আকাশ, শান্ত সমুদ্র আর দুবাইয়ের বিপণিবিতানের ভেতরে ক্রেতাদের চিরচেনা ভিড় ছিল। তবে এসবের আড়ালে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে তখনো দুবাই সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

অনেক বছর ধরে দুবাই নিজেকে পুঁজি আর স্থিতিশীলতার এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরেছে। অস্থির একটি অঞ্চলে এটি ছিল শৃঙ্খলা আর স্বাভাবিকভাবে চলার প্রতীক। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক ঝড় থেকে এ শহর ছিল সুরক্ষিত, কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই সেই চিত্র বদলে যায়।

সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণ পরই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও বাহরাইনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে তখন উড়তে দেখা যায় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ‘ইন্টারসেপ্টর’।

অনেক পর্যটক জানিয়েছেন, তাঁরা এ পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। সেখানে কোনো সতর্কসংকেত বা এয়ার রেইড সাইরেন বাজানো হয়নি। স্থানীয় ফোন নম্বর ব্যবহারকারী বাসিন্দারা সরকারি সতর্কতাবার্তা পেলেও অন্যরা শুরুতে বুঝতে পারেননি আসলে কী ঘটছে।

নাতালিয়া ভেরেমেনকো নামের এক পর্যটক বলেন, ‘প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, আতশবাজি ফুটছে।’ তিনি পাম জুমেইরাহর পাঁচ তারকা রিসোর্ট ‘ফেয়ারমন্ট দ্য পাম’-এর কাছে অবস্থান করছিলেন। ড্রোন হামলায় রিসোর্টটির প্রবেশদ্বারে আগুন ধরে গিয়েছিল।

নাতালিয়া প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তাগুলো আবার লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘তারা খুব দ্রুত সবকিছু পরিষ্কার করে ফেলছিল।’

দুবাই মলের বাইরে অবস্থিত বিখ্যাত ঝরনাগুলোর আলোকসজ্জা দেখার জন্য পর্যটকদের চিরচেনা ভিড় জমেছিল। কিন্তু সেই ছুটির মেজাজ বেশি সময় টেকেনি।

রাত বাড়লে দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে আগুনের খবর পাওয়া যায়। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সেখানে ঘন ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ড্রোন হামলায় ১ জন নিহত ও অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। রোববার আরও দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর এলাকা থেকেও ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। জেবেল আলী বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর মধ্যে নবম স্থানে রয়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত বন্দর এটি। সেখানকার একটি বার্থে আগুন ধরে যায়। এমনকি দুবাইয়ের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনা ও পালতোলা নৌকার আদলে তৈরি বুর্জ আল আরবেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগে।

ইরান সরাসরি দুবাইয়ের পর্যটনকেন্দ্র ও হোটেলগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, নাকি শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘোষণা বাস্তবায়ন করছিল, বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। এসব স্থাপনাই আমিরাতের আয়ের প্রধান উৎস।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বছরের পর বছর ধরে ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ দেশ হিসেবে যে সুনাম গড়ে তুলেছিল, এ হামলায় তাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। দুবাইয়ের বাসিন্দাদের বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। মূলত নিরাপত্তা আর করছাড়ের সুবিধার আশায় তাঁরা এ শহরে বসবাস করেন। হামলার পর সেই নিরাপত্তাই এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুবাইয়ের পরিস্থিতি বদলে যায়। অনেক বিলাসবহুল হোটেল তাদের অতিথিদের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ ও বারান্দা থেকে সরিয়ে নেয়। হোটেলের ভূগর্ভে গাড়ি রাখার জায়গা ও সার্ভিস করিডরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ দৃশ্যগুলো ইউক্রেনের শহরগুলোর দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়।

একজন রুশ লাইফস্টাইল ব্লগার হোটেলের ভূগর্ভ থেকে সিল্কের পাজামা পরা নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘জরুরি অবস্থা, তবে তাতেও থাকুক ফ্যাশনের ছোঁয়া।’

দুবাইয়ে বসবাসরত রুশ নাগরিক ইয়েকাতেরিনা তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, মধ্যরাতে ফোনে যখন নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার বার্তা পান, তখন তিনি খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কার পার্কিংয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন ‘বুর্জ খলিফা’য় হামলা হয়েছে। পরে দেখা গেছে, এটি স্রেফ গুজব ছিল। তবে ওই রাতের অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক এই গুজবের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সকাল হতেই পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। তারা বাসিন্দা ও পর্যটকদের আশ্বস্ত করে জানায়, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। বিমানে যাতায়াতে যাঁরা সমস্যার মুখে পড়েছেন, তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। তবে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এগুলোর বেশির ভাগই মাঝআকাশে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

আমিরাতের একজন বিশ্লেষক আমজাদ তাহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, ‘আপনারা এখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত শতভাগ নিরাপদ। জীবন ও ব্যবসা আগের মতোই স্বাভাবিক চলবে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বিখ্যাত পাম জুমেইরাহ এলাকায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি হোটেল থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বিখ্যাত পাম জুমেইরাহ এলাকায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি হোটেল থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

যে কারণে ইরানের একজন খামেনি লাগবেই by মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান

প্রকাশ ০৩ মার্চ ২০২৬ঃ ইরানে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ যাঁরা সমর্থন করে আসছেন, তাঁরা বহু বছর ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন—ইরানের বিদ্যমান সরকার দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক ক্ষয় ও সামাজিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে পুরো দেশের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে, তা বাইরের দেশের সহিংস বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকির চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

গত জানুয়ারির রক্তাক্ত দমনাভিযান এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ইরানি বিরোধীদের জোরালো ইতিবাচক প্রচার সেই ‘নৈতিক দ্বিধা’র প্রাচীর অনেকটাই নামিয়ে দেয়।

এর পরেই আসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ইরানিদের ‘উঠে দাঁড়াতে’ আহ্বান জানান। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যার ঘটনাকে বড় সাফল্য হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। কেবলমাত্র একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে সরিয়ে দিলে কি সত্যিই দ্রুত ও নির্ধারক ভাঙন নেমে আসবে? তার পরেই কি আসবে নির্বিঘ্ন ক্ষমতার রদবদল? অভিজ্ঞতা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। খামেনির পরের ইরান হয়তো হস্তক্ষেপপন্থীদের কল্পনায় আঁকা ছবির সঙ্গে মিলবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসই তার সাক্ষী। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া—তিন দেশেই বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের পরে স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস’-এর তথ্যেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর আফগানিস্তানে শাসন পরিবর্তন ঘটে। এরপর দুই দশক ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বেসামরিকদের ওপর হামলা চলেছে। ২০২১ সালে পূর্বতন শাসকেরাই ক্ষমতায় ফিরে এলেও স্থিতি অধরাই রয়ে গিয়েছে।

২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর ইরাকেও একের পর এক বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ এবং অস্থিরতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়াস সত্ত্বেও দেশটি ২০০৩-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

২০১১ সালে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপের পরে লিবিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে। একসময় ইতিবাচক স্থিতিশীলতা সূচক থাকা দেশটি বিশ্বের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। আজও দেশটি ত্রিপোলি ও বেনগাজি—এই দুই ক্ষমতাকেন্দ্রে বিভক্ত।

এই তিন দেশের কোনোটিই হস্তক্ষেপের আগের স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারেনি। স্বল্পমেয়াদি ‘সমন্বয়’-এর বদলে তাদের ইতিহাসে জেগে আছে দীর্ঘস্থায়ী ভঙ্গুরতা ও অস্থিরতার ছাপ।

ইরানের শাসনব্যবস্থা আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতো নয়। খামেনির হত্যাকাণ্ড গভীর অভিঘাত আনতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার মানেই রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পতন—এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিয়া ইসলামের প্রতীকী জগতের অনুসারী। এখানে খামেনির মৃত্যু শহীদির ধারাবাহিকতার পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা পেতে পারে। ‘ইসলামের শত্রু’ বলে চিহ্নিত শক্তির হাতে মৃত্যু পরাজয় নয় বরং মুক্তির সোপান—এই ধারণা ইরানিদের মনোবল আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের উৎখাত হওয়া অন্য শাসকদের তিক্ত পরিণতির মতো নয়; বরং একধরনের পবিত্রকরণ। এটি ত্যাগের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনের মহিমান্বিত সমাপ্তি।

এই শাহাদাতের ভাষ্য জনতার একটি বড় অংশকে, এমনকি আগের সমালোচকদেরও, ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র বয়ানের চারপাশে টেনে আনতে পারে। পতিত নেতাকে ‘বিদেশি আগ্রাসনের শহীদ’ হিসেবে তুলে ধরলে জাতীয়তাবাদী আবেগ তীব্র হতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনী এবং ঐতিহ্যবাদী সমাজের অংশগুলোও একত্র হতে পারে—যা শাসন পরিবর্তনের সমর্থকেরা হয়তো ভাবেননি।

যদিও জানুয়ারির দমন-পীড়নের ক্ষত এখনো তাজা, এবং ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে আগের সংঘাতের তুলনায় পরিস্থিতি জটিল, তবু এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় শেখায়। তা হলো—বিদেশি হস্তক্ষেপের সময় যদি প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অক্ষত না থাকে, তবে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ইরানের সামনে তাই বড় প্রশ্ন—প্রশাসনিক ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা পাবে কি? তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর স্থায়িত্বে—অর্থাৎ সেই শক্তিশালী আমলাতন্ত্র ও প্রযুক্তিবিদ শ্রেণিতে, যারা দেশের অর্থব্যবস্থা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা চালায়।

যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক প্রশাসন নেতৃত্বহীনতার মাঝেও সচল থাকে, তবে লিবিয়ার মতো দেশ ভেঙে টুকরা টুকরা হওয়া এড়ানো সম্ভব। একইভাবে, ভৌগোলিক অখণ্ডতা নির্ভর করবে নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঐক্যের ওপর।

এ মুহূর্তে একজন ‘জাতীয় ঐক্যের মুখ’-এর সবচেয়ে বড় অভাব। জানুয়ারির রক্তাক্ত দমন-পীড়নে জনগণ ও রাজনৈতিক অভিজাতদের সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো নেতার পক্ষে সর্বজনগ্রাহ্যতা দাবি করা কঠিন।

‘সবার আগে নিরাপত্তা’ নীতির দিক থেকে মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ, হাসান রুহানি বা আলী লারিজানির মতো ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘প্রযুক্তিবিদ-সামরিক পরিষদ’ গঠনের চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু তাঁদের কারও মধ্যেই প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার মতো আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব নেই।

জনতার ক্ষোভ আর নিরাপত্তা কাঠামোর আত্মরক্ষামূলক মানসিকতার মধ্যে যে গভীর ফাঁক তৈরি হয়েছে, তার সেতুবন্ধ করতে না পারলে নতুন নেতৃত্ব কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হিমশিম খাবে।

অস্থিরতার আশঙ্কা

যদি প্রতিষ্ঠানগত ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে, কিংবা সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে, তবে দেশভাগ ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। আজ যে সহিংস ভাঙনের ডাক শোনা যাচ্ছে, তা হয়তো কাঠামোগত অনিরাপত্তার এক দীর্ঘ চক্রের সূচনা। এর ভার ইরানি সমাজকেই বইতে হবে।

দুটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মধ্যবিত্তের ক্ষয়। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞায় রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে স্থিতি আনার মতো সামাজিক স্তম্ভটি দুর্বল হয়েছে। শক্তিশালী মধ্যবিত্ত না থাকলে শূন্যস্থান দখল করতে পারে সশস্ত্র গোষ্ঠী বা নিরাপত্তা কাঠামোর উগ্র অংশ।

আইআরজিসি ও ইরানের একটি স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের কট্টর অংশ, যারা নতুন ব্যবস্থাকে নিজেদের অস্তিত্বের হুমকি মনে করে, তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে যাবে—এ আশা অবাস্তব। বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে সরে গিয়ে তারা বিকেন্দ্রীভূত বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে এবং দেশের অবকাঠামো সম্পর্কে জ্ঞান কাজে লাগিয়ে স্থিতি নস্যাৎ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক বৈচিত্র্য। ইরানের জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য মধ্যপ্রাচ্যের গড় দেশের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে এবং নিরাপত্তা নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত থাকলে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও মিলিশিয়া রাজনীতির ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সীমান্ত অঞ্চলে বালুচ, কুর্দি ও আরব সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পূর্ণমাত্রার বিচ্ছিন্নতাবাদে রূপ নিতে পারে। বড় শহরে নিরাপত্তাশৃঙ্খল ভেঙে গেলে স্থানীয় মিলিশিয়ারা এলাকা দখলে নেমে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষমতার লড়াইয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মধ্যে ‘অভিজাতদের যুদ্ধ’ শুরু হওয়া অবশ্যম্ভাবী—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই তখন উত্তরাধিকার যুদ্ধে রণক্ষেত্র।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘অন্তহীন তিক্ততার চেয়ে তিক্ত সমাপ্তি ভালো’—এই যুক্তিতে বিদেশি হস্তক্ষেপকে সমর্থন করা হয়েছে। যেন সামরিক শক্তিই দ্রুত সমাধান এনে দেবে।

কিন্তু ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের ফল সরলরৈখিক নয়। তা প্রায়ই অপ্রত্যাশিত ও দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের সূচনা করে। খামেনির মৃত্যু একটি যুগের প্রতীকী ইতি টানতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পরিসংখ্যান বলছে—এ ধরনের সহিংস ভাঙনের সম্ভাব্য ফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়, পুনর্গঠন নয়।

ইরানের মানুষের কাছে তাই কোনো শাসনের ‘তিক্ত সমাপ্তি’ হয়তো শেষ নয়; বরং আরেক নতুন, কাঠামোগতভাবে প্রোথিত ‘অন্তহীন তিক্ততা’র সূচনা। এর অভিঘাত বহু দশক ধরে গোটা অঞ্চলকে তাড়িয়ে বেড়াতে পারে।

* মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান, জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিট্যাট মারবুর্গ-এর মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক।
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিয়া ইসলামের প্রতীকী জগতের অনুসারী। এখানে খামেনির মৃত্যু শহীদির ধারাবাহিকতার পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা পেতে পারে।
ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিয়া ইসলামের প্রতীকী জগতের অনুসারী। এখানে খামেনির মৃত্যু শহীদির ধারাবাহিকতার পূর্ণতা হিসেবে ব্যাখ্যা পেতে পারে। ছবি : রয়টার্স

বেলুচিস্তান যে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে by ওসামা বিন জাভাইদ

আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান। আবার এই প্রদেশেই দেশটির জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে কম। বহুদিনের প্রশাসনিক অবহেলা, নির্মম বিদ্রোহ, ছায়াযুদ্ধ এবং উচ্চমাত্রার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে সম্প্রতি সেখানে সহিংসতার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।

সম্প্রতি টানা ৪০ ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক হামলা চালিয়েছে নিষিদ্ধঘোষিত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। সংগঠনটি কয়েক দশক ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই করছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হিসাবে, এসব হামলায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক। ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। আর ১৪৫ জন বিদ্রোহী যোদ্ধা। শুধু শনিবারই মারা গেছে শতাধিক মানুষ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি ছিল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অন্যতম বড় ও দুঃসাহসী হামলা। বিদ্রোহীদের দাবি, এই হামলায় তারা ৮৪ জন নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যা করেছে।

প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় এখনো বহু বছরের সংঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। পুলিশ একাডেমি, আদালত ভবন ও বাজার এলাকাজুড়ে সহিংসতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। এখানেও সরকারের বার্তা একই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। এক ডজনের বেশি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে। সাধারণ মানুষ পড়েছে গোলাগুলির মাঝখানে। শক্তি প্রদর্শনের যে চেষ্টা চলছে, তা দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই বাস্তব শক্তির চেয়ে বেশি দেখানোর প্রয়াস।

বেলুচিস্তানে হামলার জবাবে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া এখন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহীদের নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ফিতনা আল হিন্দুস্তান। যার অর্থ ভারতের উপদ্রব। এ বিষয়ে অবশ্য এখনো নয়াদিল্লি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

‘বিদেশি হাত’তত্ত্ব এখন পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা বয়ানের মূল স্তম্ভ। প্রায় প্রতিটি হামলাকেই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে বেলুচদের স্থানীয় ও বাস্তব ক্ষোভের বিষয়গুলো আড়ালে চলে যায়। তার জায়গা নেয় সহজ ও দায় এড়ানোর একটি গল্প। অতীতেও সরকার দাবি করেছে, প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প নস্যাৎ করতে চায়।

এই বয়ানের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একটি পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করার বদলে দেশের অখণ্ডতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

২০১৬ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবকে পাকিস্তান এই ‘বিদেশি হাত’তত্ত্বের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখায়। কুলভূষণকে মৃত্যুদণ্ড দেয় একটি পাকিস্তানি আদালত। পাকিস্তান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল, যেখানে যাদবকে বেলুচিস্তানে হামলা সংগঠনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন।

কোয়েটার চায়ের দোকানগুলোতে রাজনৈতিক বঞ্চনা আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের গল্প শোনা যায়। মানুষের প্রশ্ন, বিপুল খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের দারিদ্র্য থেকেই যাচ্ছে?

৪৬ বিলিয়ন ডলারের চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের প্রতিশ্রুতি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আশীর্বাদ বলে মনে হয় না। বিশেষ করে গওয়াদার বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে তাদের সন্দেহ প্রবল। অনেকের ধারণা, এই প্রকল্পের সুফল পাবে বেইজিং ও ইসলামাবাদ। বেলুচের জেলে কিংবা রাখালদের ভাগ্যে তেমন কিছু জুটবে না।

বেলুচ বিদ্রোহীরা প্রায়ই খনিতে হামলা চালায়। অন্য প্রদেশ থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের হত্যা করে। বেলুচিস্তানের অনেক জায়গায় পরিস্থিতি ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মতো। কোনো নিয়ম নেই। প্রকৃত অর্থে কারও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও নেই।
আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড় বেলুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ইরানের রাজনীতিযুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। ভারতের শত্রুর শত্রুনীতিআফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর একজন বলছিলেন, সেনাবাহিনী একজন যোদ্ধাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু একটি ক্ষোভকে হত্যা করতে পারে না। রাষ্ট্র তাদের সন্ত্রাসী মনে করে। অনেক স্থানীয় মানুষ তাদের নিজেদের সন্তান ও ভাই হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ১৮ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এই বিভাজনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সেই মানুষদেরই গ্রাস করছে, যাদের নিরাপত্তার জন্যই ছিল বিদ্রোহ।

বেলুচিস্তান বৈপরীত্যে ভরা এক ভূমি। এখানে রয়েছে গওয়াদারের মতো ঝকঝকে বন্দর। আবার আছে এমন দুর্গম উপত্যকা, যেখানে সংঘাত শুরু হলে প্রথমেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ছিদ্রপথের সীমান্ত বিদ্রোহীদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। পাকিস্তানের কাছে এই প্রদেশ তাই এক স্থায়ী উদ্বেগের উৎস।

এই সংঘাতের মানবিক মূল্য ছড়িয়ে আছে ভূমি ও স্মৃতিতে। ২০১৩ সালে হাজারা টাউনে হামলার পর এক বাসিন্দা বলেছিলেন, আহত ব্যক্তিরা এখানে–ওখানে পড়ে ছিল। কার কী পরিচয়, তা বোঝা যাচ্ছিল না। ২০১৬ সালে কোয়েটা পুলিশ একাডেমিতে হামলার পর এক ক্যাডেটের প্রশ্ন ছিল, ‘কেন আমাদের অস্ত্র ছাড়া ভেতরে থাকতে বলা হয়েছিল?’

এই কথাগুলো দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও ভেঙে পড়া সামাজিক চুক্তির সাক্ষ্য দেয়। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে জনসমর্থনের দাবি অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষার মতো শোনায়।

বেলুচিস্তানের এক সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মতে, স্থানীয় প্রশাসনের সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করতে চাননি। বেলুচিস্তান প্রদেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপী। ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবা অনেকের কাছে পৌঁছায় না। আর নিরাপত্তা তো অনেকের কাছেই বিলাসিতা।

সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান পাকিস্তানের কঠোর শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা দেখিয়েছে। আকাশে ড্রোন আর মাটিতে টহলের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি উচ্ছেদ করা হয়েছে।

প্রতিটি বড় হামলার পর জাতীয় কর্মপরিকল্পনা আবার নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকার নানা অঙ্গীকার করে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই অঙ্গীকারের গতি থেমে যায়। নিরাপত্তা অভিযান চললেও সহিংসতা পুরোপুরি থামে না। অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, কিন্তু বিদ্রোহীদের প্রচারণা থেকে নতুন সদস্য আসার গতি তাতে খুব একটা কমে না।

আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড় বেলুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ইরানের রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। ভারতের শত্রুর শত্রুনীতি। আফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই বাইরের চাপ সামলানো। একই সঙ্গে ভেতরের ক্ষতগুলো সারানো, যা এই প্রদেশকে এতটা অস্থির করে রেখেছে। শেষ ৪৮ ঘণ্টা আবারও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আগের মতোই ইসলামাবাদের ক্ষমতাকেন্দ্র ও গণমাধ্যম বেলুচিস্তানকে ভুলে যাবে। দূর থেকে বিশ্লেষণ চলবে। কিন্তু এই নীরবতা কি স্থায়ী শান্তির দিকে যাবে, নাকি পরবর্তী ঝড়ের আগের বিরতি হবে, তা নির্ভর করবে পরের অধ্যায় কে লিখছে, তার ওপর।

বেলুচিস্তানের প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও কার্যকর আঞ্চলিক কূটনীতি। তবেই হয়তো এই প্রদেশ চিরস্থায়ী সংঘাতের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।

* ওসামা বিন জাভাইদ, কাতারের দোহাভিত্তিক সাংবাদিক এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ। কোয়েটা, বেলুচিস্তান, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ। কোয়েটা, বেলুচিস্তান, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

ইসরায়েলিরা যুদ্ধের বিষাক্ত নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে by গিডিয়ন লেভি

আবারও যুদ্ধ। আবারও সেই যুদ্ধ, যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের সংকটকে একেবারে চিরতরে সমাধান করার জন্য হচ্ছে! আবার প্রথমেই ঘোষিত হবে যে এক চমকপ্রদ বিজয় অর্জিত হচ্ছে।

সবাই এতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিড লিখবেন, আমরা এক শক্তিশালী ও একতাবদ্ধ জাতি। বিশ্লেষকেরাও প্রতিযোগিতায় নামবেন, ইসরায়েলের বীরত্বগাথা কে কত বেশি করে তুলে ধরতে পারেন। আর এসবই চলবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না পরবর্তী আরেকটি অভিযান শুরু হয়।

প্রায় সব ইসরায়েলি আবারও এটা বিশ্বাস করছে যে এই যুদ্ধের মতো আর কোনো ন্যায়সংগত যুদ্ধ নেই, এটার মতো সফল যুদ্ধও হয়নি। তারা প্রায় সমস্বরে পাল্টা প্রশ্ন করছে, ‘আমাদের আর কী বিকল্প ছিল?’ কিংবা ‘তাহলে আপনার প্রস্তাবটা কী?’

এর আগে ইসরায়েলের সব যুদ্ধেই আমরা এসব প্রশ্ন উঠতে দেখেছি। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন টেলিভিশনে প্যানেল আলোচকদের তো রীতিমতো মুখিয়ে থাকতে দেখা গেল এমন মুহূর্তের জন্য, যেন তাঁরা সবাই ত্রাণকর্তা মসিহর অপেক্ষায় আছেন। আর কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা এল শনিবার [যেদিন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাল]।

ইসরায়েলের ইতিহাসে বিভিন্ন যুদ্ধের মধ্যবর্তীকালীন কয়েক বছর শান্ত সময় কাটতে দেখা গেছে। ১৯৪৮ সালের পর ১৯৫৬ সালে সিনাই অভিযানের মাঝে আট বছর, সিনাই অভিযান থেকে ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের মাঝে ১১ বছর, এর পর থেকে ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের মাঝে ছয় বছর। এরপর ১৯৮২ সালে প্রথম লেবানন যুদ্ধের আগপর্যন্ত ৯ বছর এবং তার পর থেকে দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের মাঝে ২৪ বছর।

কিন্তু এখন আমরা এক যুদ্ধ থেকে আরেক যুদ্ধের মধ্যে বিরতি পাচ্ছি মাত্র কয়েক মাস। আর প্রতিটি যুদ্ধের পর আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যুদ্ধবাজ ও যুদ্ধসমর্থকেরা খুশিতে বগল বাজায়। প্রায় প্রত্যেক ইসরায়েলিই তো এই কাতারে পড়ে।
প্রথম লেবানন যুদ্ধ শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেনশাম বেগিন বড়াই করে বলেছিলেন, ‘আমাদের ওপর আর কোনো বোমা পড়বে না, পড়বে না কোনো কাতিউশা রকেট।’ আর দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের পর প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টের দাবি ছিল, ‘রক্ত বৃথা যায়নি।’

আট মাসে আগে, গত বছর জুন মাসে, ইরানের ওপর পূর্ণ বিজয় অর্জনের ঘোষণা করেছিল। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন যে ইরানে আঘাত হানার সূচনাটা ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে ইতিহাস হয়ে থাকবে, সারা দুনিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য অধ্যয়নের বিষয় হবে। তাঁর ভাষায়, ‘ক্রান্তিকালে সিংহের মতো একটি জাতি জেগে ওঠে। (হিব্রুতে যুদ্ধকে বলা হয় গর্জনকারী সিংহ)। আমাদের গর্জনে তেহরান ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। আর সারা দুনিয়ায় এই গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে।’ বাস্তবে সিংহের এই গর্জন দ্রুতই ইঁদুরের চিঁ চিঁ শব্দে রূপান্তরিত হয়।

কথিত ‘ঐতিহাসিক জয়ের’ মাধ্যমে ‘ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য দুই হুমকি—পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল’ অপসারণের দাবি তো এক প্রজাপতির জীবনের মতো ক্ষণস্থায়ী হয়। ঐতিহাসিক জয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের আরেকটি নতুন যুদ্ধ প্রয়োজন হলো। আমরা তো এখনো অপারেশন রাইজিং লায়নের ধকল সামলে উঠতে পারিনি। তার মধ্যে চলে এল অপারেশন রোয়ারিং লায়ন। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমাদের আসলে যুদ্ধের এমন কিছু গালভরা নামকরণ দরকার, যার মাধ্যমে এসবের অবধারিত ব্যর্থতার পূর্বানুমান করা যায়।

প্রথমটি বাদ দিলে ইসরায়েলের ইতিহাসে কোনো যুদ্ধই দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফল বয়ে আনেনি, একটিও নয়। যা ফল এনেছে, তা হলো শূন্য। বেশির ভাগ যুদ্ধই ছিল যেচে পড়ে বাধানো। তাতে সব সময় নিকৃষ্ট পরিণতি ঘটেছে। গত শনিবার যে যুদ্ধ শুরু করা হলো, তাকে অভিহিত করা হয়েছে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক আঘাত’ (প্রিএমটিভ স্ট্রাইক)। কিন্তু প্রতিরোধমূলক আঘাত তাকেই করা হয়, যে আপনাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়। ইরান সে রকম কিছু করেনি। সন্দেহ নেই, দেশটির শাসকগোষ্ঠী খুব নিষ্ঠুর। এটাও সত্যি যে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের জন্য ইরান খুব বড় একটা বিপদ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু ইসরায়েলে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, ইরান সেভাবে কখনোই ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক কিছু হয়নি। যে কেউ এটা আশা করতে পারেন যে এবারের সময়টা ভিন্ন রকম হবে, যেমনটা আমরা অতীতের সব যুদ্ধ শুরুর সময় করে এসেছি। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন রকম কিছু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখায় না। যদি তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটে আর ইরান সুইজারল্যান্ডের মতো শান্তিময় হয়ে ওঠে, যদি ইসরায়েলের সঙ্গে অনন্তকালের জন্য দেশটির একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তারপরও ইসরায়েল আরেকটি কাল্পনিক পুতুল খুঁজে বের করবে যে কিনা আমাদের ওপর ঝামেলা করছে।

দাবিকৃত বা প্রতিশ্রুত ‘একদা ও চিরকালের জন্য’ কখনোই তরবারি দিয়ে অর্জিত হবে না, হবে না এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান দিয়েও। হয়তো এমনটা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত দখলদারি বজায় থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত [ইসরায়েল] নিজে চরমভাবে ‘একদা ও চিরকালের জন্য’ এখানে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোনো ‘একদা ও চিরকালের জন্য’ কিছু হবে না।

গাজায় আড়াই বছর ধরে ব্যর্থ প্রয়াসের পর, প্রায় একই সময় ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সীমিত সাফল্য অর্জনের পর, ইরানে অর্জনহীন আক্রমণের আট মাস পর এখন আসলে সময় এসেছে যুদ্ধের বিষাক্ত উন্মত্ততা ও তার অর্থহীন প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্ত হওয়ার।

এই যুদ্ধ চলা মানে পানির মতো রক্ত প্রবাহিত হওয়া। সেটাই হবে। আমেরিকা এটা কখনোই ভুলে যাবে না, আমরা তাদের এই যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছি। আর যুদ্ধ শেষে আমরা আরেকটি পুরোনো সকালে জেগে উঠব।

* গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক।
- হারেৎজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আসজাদুল কিবরিয়া 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-06-19%2Fxb6srz89%2F607777_01_02.jpg?rect=0%2C3%2C8192%2C5461&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানে ইসরায়েলের হামলা। ফাইল ছবি: এএফপি

ট্রাম্প কি খামেনির আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনীকে খাটো করে দেখেছিলেন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত শনিবার ইরানে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) উদ্দেশে একটি বার্তা দেন। দুটি বিকল্পের একটি বেছে নিতে বলেন—হয় আত্মসমর্পণ, নয়তো মৃত্যু।

ট্রাম্প বলেন, ‘আইআরজিসি, সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের সব সদস্যের আজ রাতে আমি বলছি, অস্ত্র নামিয়ে রাখো। পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তি দেওয়া হবে।’ ‘অন্যথায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে,’ সতর্ক করে বলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন হুমকির পরও পাল্টা জবাব দেয় ইরান। ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশে হামলা চালায়। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা রয়েছে।

এরপর গতকাল রোববার দিনের শুরুতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ঘোষণা দেয়, তেহরানে একটি হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানে ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন।

ট্রাম্পের হুমকির উদ্দেশ্য যদি আইআরজিসির সদস্যদের ভেতর ভাঙন ধরানো কিংবা তাঁদের আত্মসমর্পণে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা সফল হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধাবস্থার এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—আইআরজিসিকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্পের বার্তা কেন বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলল না?

আইআরজিসি কী

ইরানের একটি বিশেষায়িত ও অভিজাত সশস্ত্র বাহিনী আইআরজিসি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, এই বাহিনী দেশটির সামরিক কাঠামোর স্বীকৃত অংশ। ইরানের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সমান্তরালে কাজ করলেও আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীন।

আইআরজিসির মতাদর্শ ‘ভেলায়াত-ই ফকিহ’ বা ‘ইসলামি আইনজ্ঞদের অভিভাবকত্ব’ ধারণার ওপর গড়ে উঠেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ইসলামি বিপ্লবকে রক্ষা করা এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। শুরুতে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রতি এ বাহিনী অনুগত ছিল। ১৯৮৯ সালে তিনি মারা গেলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

অভিজাত আইআরজিসিতে পদাতিক, নৌ ও বিমানসেনারা রয়েছেন। এর অধীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি আধা সামরিক মিলিশিয়া বাহিনী রয়েছে—নাম বাসিজ। আরও রয়েছে কুদস ফোর্স। এটি একটি বিশেষ বাহিনী, যার সদস্যরা ইরানের ভূখণ্ডের বাইরে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে থাকেন।

আইআরজিসি কী করে

ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা, দেশের বাইরে সামরিক কার্যক্রম চালানো এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আইআরজিসি। এ বাহিনীতে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। রিজার্ভসহ মোট সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনার ভার আইআরজিসির ওপর। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আইআরজিসি। এ বাহিনী আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম চালিয়ে থাকে, যা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত।

বিভিন্ন সময় অনেক দেশ আইআরজিসির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে আইআরজিসিকে বিদেশি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পদক্ষেপ নেয়। জবাবে একই সময়ে তেহরান ইইউভুক্ত সব দেশ, তাদের নৌ ও বিমানবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে।

ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরেও আইআরজিসির অংশগ্রহণ রয়েছে। ১৯৮০–৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক–ইরান যুদ্ধের সময় আইআরজিসির অর্থনৈতিক ভূমিকা বিস্তৃত হয়। ওই যুদ্ধের সময় প্রকৌশলী আর সরঞ্জাম সহায়তার দায়িত্ব নিয়েছিল।

এ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবহন, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ ও খনিজের মতো ইরানের আরও অন্যান্য খাতের সঙ্গে চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করে থাকে আইআরজিসির সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। ইরানের কর্মকর্তারা একে ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’ বা ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ বলে থাকেন। সেই সঙ্গে একে ইরানের নিষেধাজ্ঞা অতিক্রম করার কৌশল হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে।

বাসিজ কী

আইআরজিসির মতো বাসিজও ১৯৭৯ সালে খোমেনির হাত ধরে যাত্রা শুরু করে। এটি স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে চলা একটি আধা সামরিক বাহিনী। এ বাহিনী আইআরজিসির অধীন কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। দেশের প্রতি অনুগত থাকা সাধারণ নাগরিকেরা এ বাহিনীতে যোগ দেন। তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই বলে থাকেন, ইরানের অনেক যুবক সুবিধা আর আর্থিক উন্নতির আশায় এ বাহিনীতে নাম লেখান।

বাসিজ বাহিনীকে ‘গভীরভাবে মতাদর্শিক’ ধরা হয়ে থাকে। প্রায়ই ইরানের যুবসমাজ ও শ্রমজীবী মানুষদের সমন্বয় দেখা যায় এতে। এ বাহিনীতে প্রায় সাড়ে চার লাখ সদস্য রয়েছেন। এতে এমন সদস্যও আছেন, যাঁরা বাহিনীর যোগাযোগ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।

বিভিন্ন বিক্ষোভ মোকাবিলায় সম্মুখসারিতে বাসিজ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এ বাহিনী বড় ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালের গ্রিন রেভোল্যুশন এবং ২০২২–২৩ সালের নারী বিক্ষোভ।

ইরাক–ইরান যুদ্ধের সময় বাসিজ সদস্যদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সম্মুখসারিতে মোতায়েন করা হয়েছিল। ওই সময় তাঁদের ‘শহীদ হওয়ার মিশনে’ অংশ নিতে উৎসাহিত করা হতো। তাঁরা সামনের সারিতে থেকে মাইন অপসারণের কাজ করতেন, অভিজ্ঞ সেনারা যাতে আরও দ্রুত সম্মুখযুদ্ধে অগ্রসর হতে পারেন।

তাঁরা কি ট্রাম্পের কথা শুনবেন

উত্তরটা ছোট, তবে স্পষ্ট—‘না’।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানে অবশ্যই একজন সর্বোচ্চ নেতা আছেন। সেই সঙ্গে দেশটির ধর্মীয়, সামরিক, আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে একাধিক শক্তির কেন্দ্র আছে। তাঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের নির্দেশে সাড়া দেবে বলে মনে হয় না।’

‘বর্তমানে তাঁরা বলছেন, এই সংঘাত আরও বাড়ানো হবে। পুরো অঞ্চলে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাবস্থা’ তৈরি করা হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, এ অঞ্চলের উপসাগরীয় দেশগুলোকেও ব্যাপক ভোগাবে,’ বলেন মাইকেল। কাজেই বলা যায়, ট্রাম্পের হুমকির পরও আইআরজিসি বা ইরানের অন্যান্য শক্তিগুলোর পিছিয়ে আসার সম্ভাবনা কম। বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আদর্শ এবং ইসলামি বিপ্লব ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য আইআরজিসির মূল ভিত্তি। এর বাইরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার মোহেও অনেকে যুক্ত হন। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ইরানের ওপর সাম্প্রতিক আক্রমণ এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যার ঘটনা রাষ্ট্রটির ওপর আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মার্কিন চিন্তক প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা উদ্যোগের পরিচালক জোনাথন প্যানিকঅফ বলেন, ‘ইরানের এখনকার শাসনকাঠামোর পরিবর্তনের ফলে দেশটি যে গণতন্ত্রের পথে যাবে—এমনটা না–ও হতে পারে। বরং সম্ভাব্য যেটা ঘটতে পারে, তা হলো আইআরজিসির ক্ষমতায়ন। রাষ্ট্রের ওপর জোরালো সামরিক নিয়ন্ত্রণ।’

ইরানে হয়তো একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতা আসবেন। তবে বাস্তবে ক্ষমতা শক্তপোক্তভাবে কেন্দ্রীভূত থাকতে পারে আইআরজিসির হাতে—এমনটাই মনে করছেন জোনাথন।

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব কতটুকু

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পাবে বলে মনে হচ্ছে না।

খামেনি নিহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতেও রাষ্ট্রের ওপর আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণ এখন পাকাপোক্ত রয়েছে।

গত বছরটা ইরানের জন্য বেশ ‘অস্থিরতার একটি বছর’ ছিল। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ করে দেশটি। এ যুদ্ধের পর ইরান সরকার তাদের নাগরিকদের জন্য বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। দেশটির তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগের জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছিল। মূলত জাতীয় মনোবল বৃদ্ধি এবং জনগণের অসন্তোষ কমানোর উদ্দেশ্যে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এত কিছুর পরও গত জানুয়ারিতে বড়সড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় ইরানে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার কারণে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এবং প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কারণে ফুঁসে ওঠে ইরানের মানুষ, বিশেষ করে তরুণেরা।

আইআরজিসির সক্ষমতা সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হওয়া নেতৃত্বের শূন্যতা দ্রুতই পূরণ করে ফেলা হয়েছিল। ওই সময় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁর সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম জানিয়েছিলেন।

সেই সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে বিকল্প কে হবেন, সেই নামগুলোও ঠিক করে রাখা হয়েছিল। মূলত সংকটময় পরিস্থিতিতে যাতে নেতৃত্বের সংকট পূরণ করা যায়, সেটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

ইরানের অভিজাত বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের প্যারেড
ইরানের অভিজাত বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের প্যারেড। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান অঞ্চলজুড়ে ‘নির্বিচার ও বেপরোয়াভাবে’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালানো হচ্ছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সোমবার সকালে বলেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। এর জবাবে লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। শিয়া মতাবলম্বী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রধান মিত্রের ভূমিকায় রয়েছে।

হিজবুল্লাহ–নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর এবং লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৪৯ জন আহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। লেবাননের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫০টি গ্রামের বাসিন্দাদের নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

ইসরায়েলের হামলার মুখে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং বৈরুতের দক্ষিণ দিকের উপশহর থেকে পালাচ্ছেন বাসিন্দা। এতে সোমবার সকালে ওই সড়কগুলোতে ব্যাপক ভিড় দেখা দেয়।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, শনিবার থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কোনো একক হামলায় এটাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও সামহা এবং কাতারের রাজধানী দোহায় বড় বড় বিস্ফোরণ ঘটছে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার সৌদি আরামকোয় ড্রোন হামলায় আগুন ধরার পর সেটি বন্ধ করে দিয়ে দেশটি।

কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ভুল করে ছোড়া গোলায় তিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। ওই যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কাজে মোতায়েন ছিল। যুদ্ধবিমানগুলো থেকে ছয়জন ক্রুর সবাই নিরাপদে বের হয়ে আসতে পেরেছেন এবং তাঁরা সুস্থ আছেন বলে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে।

সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি আর এ এফ আকরোতিরিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। সেখানে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার অবস্থান বদলে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাইপ্রাসে দেশটির ঘাঁটিতে এই হামলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব ইতিমধ্যে পড়া শুরু করেছে। সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পুঁজি বাজারগুলোতে দরপতনের চাপ তৈরি হয়েছে।

সোমবার সকালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি মূল্য ৮২ ডলারে উঠেছে। এটা গত ১৪ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম। বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর আরও এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে যুদ্ধে চার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, যুদ্ধে আরও মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল রোববার বলেছেন, ইরানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে। অভিযানের পক্ষে যৌক্তিকতা তৈরি করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকা ইরানের শাসকগোষ্ঠী প্রতি আমেরিকানের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠবে। আমি আবারও রেভোল্যুশনারি গার্ড, ইরানি মিলিটারি পুলিশের প্রতি আপনাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে আহ্বান জানাচ্ছি। তাতে আপনারা পূর্ণ দায়মুক্তি পাবেন অন্যথায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফক্স নিউজকে বলেছেন যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির ৪৮ জন নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কী রকম সাফল্য সাফল্য পাচ্ছি তা কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না, এক হামলায় ৪৮ নেতা শেষ হয়ে গেছে।’

ট্রাম্প রোববার আটলান্টিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান এবং তিনি তাতে রাজি আছেন। তবে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি বলেছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করবে না।

রোববার রয়টার্স/ইপসোসের এক জনমত জরিপে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ শতাংশ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুকে সমর্থন করেছেন। অপর দিকে প্রায় অর্ধেক আমেরিকান–চারজন রিপাবলিকানদের মধ্যে একজনসহ মনে করেন, ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে অতি উৎসাহী।

যুদ্ধের কারণে বেসামরিক বিমান পরিবহন চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ মানুষ আটকা পড়েছেন।

কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে  হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত, ২ মার্চ
কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত, ২ মার্চ। ছবি: এএফপি

স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কি ইরানে হামলা করলেন ট্রাম্প

ইরানে চলমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর প্রথমবারের মতো গতকাল রোববার মার্কিন সেনা হতাহতের খবর এসেছে। এতে করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচণ্ড চাপে পড়েছেন। ইরান নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যার দাবি উঠেছে।

ট্রাম্পের সমালোচকেরা হোয়াইট হাউসের কাছে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও স্বচ্ছতা দাবি করছেন। বিরোধী পক্ষ ও বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার অভাব যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অথচ ট্রাম্প বারবার এ ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ইরান–বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, প্রশাসনের কোনো কর্মপরিকল্পনা থাকলেও তারা তা এখনো প্রকাশ করেনি।

ভাতানকা আরও বলেন, ট্রাম্পকে এখন একটি বড় রাজনৈতিক প্রকল্পের দিকে এগোতে হবে। শুধু সামরিক অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। বরং তাঁর প্রশাসনকে এখন বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা আসলে শাসনব্যবস্থার কী ধরনের পরিবর্তন করতে চায়।

এ ইরান–বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, যদি তা–ই হয়, তবে এই অভিযান চার দিন, চার সপ্তাহ বা চার মাসের কোনো সাধারণ অভিযান হবে না। এটি দীর্ঘ লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।

ট্রাম্প ২০০৩ সালের ইরাক হামলাকে বারবার বড় ভুল বলে এসেছেন। অন্যদিকে গত বছরের জুনে তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ‘তছনছ’ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আবার কেন নতুন করে হামলার প্রয়োজন হলো, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি জনসম্মুখে দেননি। এ জন্য তিনি সমালোচিত হচ্ছেন।

গত সপ্তাহে স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণে ইরান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির কথা উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ ছিল না। তিনি বলেছিলেন, ইরানের সম্ভাব্য সামরিক হুমকির বিষয়টি তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে চান।

ডেমোক্র্যাটদের আশঙ্কা, ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঘোষণা না করায় ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত অন্তহীন এক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের ইন্টেলিজেন্স কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) বলেন, ‘এসবের শেষ কোথায়? আমরা ইসরায়েলিদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ইরানে বোমাবর্ষণ করতে পারি। কিন্তু কিসের আশায় আমরা তা করব?’

হাইমস আরও বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করাটাই কি উদ্দেশ্য? কিন্তু আকাশপথে বোমা হামলা চালিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদাহরণ খুব একটা নেই। সত্যি বলতে কি, মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো দেশে সন্তোষজনকভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পেরেছে, এমন উদাহরণও বিরল।

ভাতানকা সতর্ক করে বলেন, জনগণের তীব্র বিরোধিতা বা মার্কিন সেনাবাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি ছাড়া ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পতনের সম্ভাবনা খুব কম। তবে সরাসরি সেনা পাঠানোর বদলে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করাকে তিনি ভালো বিকল্প বলে মনে করেন।

দ্বিতীয় বিকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ভাতানকা বলেন, সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত উপায় হলো, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) মাঠপর্যায়ের সূত্র বা সোর্সের মাধ্যমে অভিযান চালানো। জ্যেষ্ঠ নেতারা কোথায় এবং কখন লুকিয়ে থাকেন, তা তারা জানে।

একই গোয়েন্দা সূত্র ব্যবহার করে প্রশাসনের ভেতর নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে ভাতানকা বলেন, মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে এই শাসনব্যবস্থা শেষ হয়ে গেছে। এটি আর আগের রূপে ফিরবে না। এভাবেই দেশটিতে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে হবে। তবে এতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্র এটি সফলভাবে করতে পারবে কি না, তা মোটেও নিশ্চিত নয়।

সিআইএর সাবেক অপারেশন অফিসার ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘স্টেডি স্টেট’–এর প্রধান স্টিভেন ক্যাশ পরবর্তী কোনো পরিকল্পনা না থাকাকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য সম্ভবত ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

স্টিভেন ক্যাশ বলেন, ‘কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধ, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমরা একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে শিখেছি। তা হলো, কেবল যুদ্ধ শুরু করা যথেষ্ট নয়, যুদ্ধ শেষ করতে একটি পরিকল্পনাও থাকা প্রয়োজন।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির আরও অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছেন, যাঁরা বাকি আছেন, তাঁরা এখন আলোচনায় আগ্রহী।

ট্রাম্প ‘দ্য আটলান্টিক’কে বলেন, ‘তাঁরা কথা বলতে চান এবং আমিও তাতে রাজি। আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলব। তাঁদের এটি আরও আগে করা উচিত ছিল। তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সহজ ছিল। তা তাঁদের আগে মেনে নেওয়া উচিত ছিল। তাঁরা অনেক দেরি করে ফেলেছেন।’

তবে ইরানে চলমান হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের পাল্টা হামলার মধ্যে এ আলোচনা খুব একটা সহজ না-ও হতে পারে। তেহরান অবশ্য আলোচনার কথা সত্য নয় বলে দাবি করেছে।

ট্রাম্প জানান, আগের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মারা গেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁদের বেশির ভাগ আর নেই। যাঁদের সঙ্গে আমরা আলোচনা চালাচ্ছিলাম, তাঁদের কেউ কেউ মারা গেছেন। কারণ, আঘাত বেশ ভয়াবহ ছিল। তাঁরা চাইলে একটি চুক্তি করতে পারতেন। তাঁদের আরও আগেই এটি করা উচিত ছিল।’

ট্রাম্পের এসব মন্তব্য থেকে ভাতানকার ধারণা, প্রেসিডেন্টের কাছে ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই’। বরং তিনি দেশটিতে একটি ‘দুর্বল শাসনব্যবস্থা’ চান, যা কারও ক্ষতি করতে পারবে না।

ভাতানকা বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) যদি সত্যি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে চাইতেন, তাহলে অনেক বিরোধী নেতা ছিলেন, যাঁদের হোয়াইট হাউসে ডেকে বলতে পারতেন যে এই ব্যক্তি ইরানের পরবর্তী শাসক হতে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি তা করছেন না। এতে আমাদের মনে হচ্ছে, তিনি সম্ভবত এখনো বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গেই চুক্তির কথা ভাবছেন।’

তবে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে এ ধারণা বদলে যেতে পারে। কারণ, নিজেকে দুর্বল হিসেবে না দেখানোর জন্য ট্রাম্পকে হয়তো আরও কঠোর অবস্থান নিতে হতে পারে।

গতকাল ইরানের পাল্টা হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আগের দিন শনিবার হামলার ঘোষণা দিয়ে পোস্ট করা ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ জন্য সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে ইরানের জনগণকে জেগে ওঠার আহ্বান জানানো ছাড়া তা কীভাবে ঘটবে, সে বিষয়ে তিনি তেমন কোনো দিকনির্দেশনা দেননি।

ট্রাম্প ওই ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘অনেক বছর ধরে আপনারা আমেরিকার সাহায্য চেয়েছেন। এখন আপনারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি আপনাদের চাওয়া পূরণ করছেন। সুতরাং দেখা যাক, আপনারা এর বদলে কী করেন। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়। এই সুযোগ হাতছাড়া হতে দেবেন না।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2Ft6tzdo9l%2FDonald-Trump-boards.JPG?rect=0%2C0%2C4489%2C2993&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বহনকারী সরকারি উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, ১ মার্চ, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স