Friday, May 14, 2010

ছিয়াশির চেয়েও ভালো দল

ডিয়েগো ম্যারাডোনার বেছে নেওয়া বিশ্বকাপ দলটা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছে। তবে আর্জেন্টিনা কোচ বলছেন, এই দলটা ১৯৮৬ বিশ্বকাপের দলটার চেয়ে অনেক ভালো। ওই বিশ্বকাপের মহানায়ক নিজে যখন এমন দাবি করছেন, না মেনে উপায় কী! ওয়েবসাইট।
‘১৯৮৬ বিশ্বকাপের চেয়ে এই দলটার ওপর আমার আস্থা অনেক বেশি। আমার এই দলের সব খেলোয়াড়ই তাদের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছে’—বলেছেন কোচ। মোটামুটি একটা ছকও কেটে রেখেছেন কোন স্টাইলে খেলবে তাঁর দল। ম্যারাডোনা বোঝেন, মেসির বার্সার ফর্মটা জাতীয় দলের জার্সিতে নিয়ে আসতে হলে দরকার জাভির মতো একজন সঙ্গী। আর আর্জেন্টিনার জাভি হয়ে ওঠার জন্য তিনি তৈরি হতে বলছেন ভেরনকে, ‘লিওনেল মেসিকে স্বাধীনতা দিতে চাই। ও ওর মতো খেলবে, খেলা তৈরি করে দেবে, জায়গা করে নেবে। আর সেবাস্তিয়ান ভেরনকে হয়ে উঠতে হবে আমাদের জাভি।’
৩০ জনের দল বাছতে আর্জেন্টিনার সব খেলোয়াড়ের খেলা দেখেছেন তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, ‘সকালে উঠেই প্রিমিয়ার লিগ দিয়ে শুরু করতাম। এর পর দেখতাম ইতালিয়ান আর স্প্যানিশ লিগ। আমি ভালো করেই জানি, লোকে কী দেখতে পছন্দ করে। কিন্তু আমাকে সেই দলটাই বাছতে হয়েছে, যারা জেতাতে পারে। আশা করি, বিশ্বকাপে সবাই আমার সঙ্গে একমত হবে।’

সুন্দরবন ও মোহাম্মদ তোহা খান by খসরু চৌধুরী

১৯৭০ সালে এএফএম জলীল সাহেবের চার খণ্ডে লেখা সুন্দরবনের ইতিহাস বইটি পড়ে শিহরিত হয়ে সুন্দরবনে শিকার করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠি। ১৯৭৪ সালে সুন্দরবনে ঘুরে এসে সতীশচন্দ্র মিত্রের অনন্য সাধারণ বই যশোর খুলনার ইতিহাস বইটি পড়ার সময় টের পাই, জলীল সাহেবের বইটি কিছুটা জলীয় লাগছে। মনে হয়েছে, জলীল সাহেব সতীশচন্দ্র মিত্রের বই থেকেই বেশি মালমসলা সংগ্রহ করেছেন। দুজনের বইয়ের পার্থক্যটা অনেকটা এ রকম—সতীশচন্দ্র দেখানোর চেষ্টা করেছেন সুন্দরবনের ইতিহাসে হিন্দু সম্প্রদায়ই প্রধান ভূমিকাভিনেতা, জলীল সাহেব চেষ্টা করেছেন মুসলমানদের ভূমিকাই প্রধান। তবে জলীল সাহেবের বইয়ে ১৯৪৭ সালের আগে-পরের ইতিহাস সন্নিবেশিত হয়েছে, স্থানীয় শিকারিদের সম্পর্কে সমসাময়িক তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে মনোজ বসুর দুটো উপন্যাস, কিছু ছোটগল্প পড়ে মোহিত হয়েছি। এগুলোতে সুন্দরবনের গন্ধ পাওয়া যায় যেন। অসাধারণ দক্ষতায় লিখেছেন সতীশচন্দ্র মিত্রের ছেলে শিবশঙ্কর মিত্র সুন্দরবনের আর্জান সরদার, বেদে-বাউলে, বনবিবি ইত্যাদি বই।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর কোনোটাই প্রামাণ্য বই নয়। এগুলোর ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক মূল্য অসাধারণ, কিন্তু সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো বই হাতে পেলাম না। আমার এই দুঃখ ঘোচাতেই পঁচাত্তর সালে হাতে এসে পড়ল ১৯৭১ সালে পুস্তকাকারে প্রকাশিত একটি বই রূপসম্পদ ও রহস্যঘেরা সুন্দরবনের কথা, লেখকের নাম দেখলাম মোহাম্মদ তোহা খান।
সুন্দরবনে দু-চারবার ঘুরেছেন, শিকারটিকার করেছেন—এমন দু-একজনের দু-একটি বই পড়েছি ইতিমধ্যে। তাই কিছুটা অবহেলায় বইটি পড়া শুরু করেছিলাম। বইটির ইলাস্ট্রেশনের ছবিগুলো অস্পষ্ট। কিন্তু পড়তে শুরু করেই আর থামতে পারলাম না। যাকে বলে গোগ্রাসে গেলা, সেভাবেই পড়তে লাগলাম। মনে হতে লাগল, এত দিন এ বইটিরই অপেক্ষায় ছিলাম। এ যেন বাদায় বসেই লেখা, সেই জলকাদার বনভূমির গন্ধ পাচ্ছি, বনভূমির বর্ণ পাচ্ছি, বনচারীদের যেন দেখতে পাচ্ছি। তারা ‘দককিনি’ বাংলায় সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনায় ভাসে, জোয়ার-ভাটায়, গোনে-বেগোনে আন্দোলিত হয়। জেলে, বাউলে, মউলে, গুণীন পিটেল বাবুদের কথা, জংলি জীব, পাখপাখালি মায় জলের কামট, কুমির, শুশুকের কথাও বাদ যায়নি। বাদ যায়নি লোকালয়ের দুর্ধর্ষ মানুষ, শিকারি ও ডাকাতদের কথা। জঙ্গলের শুলো, বেড়ে পোকা, মশার দুর্দমনীয় উৎপাতের কাহিনিও আছে। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার কাছারি, খাদ্যগুদাম, করুণ বন বিভাগের অফিস, বিপৎসংকুল জোয়ার-ভাটায় উদ্দাম যাত্রাপথের কথাও আছে। আছে গ্রামীণ অবিচারের কাহিনি, অপরিকল্পিতভাবে বেড়িবাঁধ বাঁধায় নাব্য নদী সরে যাওয়ার কথা, মাছের আকালের কথা যেমন আছে, তেমনি আছে বনদরদি মানুষের কথা। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের দশকের পশ্চিম সুন্দরবন ও আশপাশের লোকালয়ের অবস্থা তাঁর লেখনীতে প্রামাণ্য উঠে এসেছে। শিকার ছিল তাঁর কাছে বন ভ্রমণের বাহানা মাত্র। সুন্দরবনের জাতীয় গুরুত্ব, সম্যক অবস্থা, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ তাঁর কলমে উঠে এসেছে স্বাচ্ছন্দ্যে। দাঁড়, বৈঠায় চলা টাবুরে নৌকায় দিনের পর দিন বন ভ্রমণ যে কী কষ্টসাধ্য, তার কিছুটা অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে। তাঁর ভ্রমণসঙ্গী সাহাবুদ্দিন, রঞ্জু, আলী, আহমদ, শিকারি শহর আলী ডাক্তার—তারা এত জীবন্তভাবে উঠে এসেছেন যে বইটি পড়লে মনে হবে পাঠকও তাঁদের চেনেন। ভ্রমণ বৃত্তান্তের মাঝেমধ্যে অনবদ্য দক্ষতায় তিনি শুনিয়েছেন সুন্দরবনের ইতিহাস, পুরাকীর্তি, মিথ, লিজেন্ড ইত্যাদি। এ বইটিরই আরেকটি সংস্করণ বের হয়েছিল রূপসী সুন্দরবন নামে। সেটিও পড়েছিলাম। তাতে শিকারি পচাব্দী গাজী, মনিরুদ্দিনের সঙ্গে শিকারযাত্রার বর্ণনা আছে। তিনি লিখেছিলেন, পচাব্দী গাজীসহ সুন্দরবনের শিকারিদের ওপর একটি বই লিখবেন, সেটি সম্ভবত আর লেখা হয়ে ওঠেনি।
সুন্দরবনকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে একটি প্রামাণ্য তথ্যচিত্র নির্মাণের ইচ্ছা ছিল তাঁর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। তথ্যচিত্র নির্মাণকালে অভিজ্ঞতার ওপর বাঘের সন্ধানে সুন্দরবনে শীর্ষক একটি চমৎকার বইও লিখে গেছেন তিনি। এ তথ্যচিত্রটির কিছু অংশ দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।
১৯৮৬ সালে শিকারি পচাব্দী গাজী ঢাকায় এসেছিলেন। থাকতেন বলধা গার্ডেনে। পচাব্দী গাজী আমার মামা আকতারুজ্জামানের শিকারসঙ্গী ছিলেন। আমাকেও ১৯৮৫ সালে কলাগাছিয়ার জঙ্গল ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। পচাব্দী গাজীর সঙ্গে মামাসহ আমরা দয়াগঞ্জের বসুবাজারে এক সন্ধ্যায় তোহা খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাই। লোডশেডিং চলছে। অসুস্থ দীর্ঘদেহী মানুষটি একটি ছড়িতে ভর দিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। শারীরিক কারণে অনেক অপূর্ণ স্বপ্নের কথা বলছিলেন।
সুন্দরবন-তপস্বী এ মানুষটি আর বেশি দিন বাঁচেননি। ১৯৯৬ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি মারা গেছেন। এই মনীষীর স্মৃতি তর্পণের এ লেখায় একটি আবেদন জানাচ্ছি। আজ যাঁরা সুন্দরবনে যাচ্ছেন বা যাবেন, তাঁরা যেন তাঁর রূপসী সুন্দরবন বইটি একবার পড়ে নেন।

হারিয়ে যাওয়া দলিল, তাড়িয়ে ফেরা ঘাতক by সোহরাব হাসান

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরটি আমাদের আহত করলেও অবাক করেনি। খবরটি নতুনও নয়।
৯ মে পত্রিকটি ‘ট্রুথ লস্ট, মোস্ট মিলিটারি রেকর্ডস অব বাংলাদেশ ওয়ার মিসিং’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপে। এতে বলা হয়, ‘ভারতের সামরিক বাহিনীর কাছে থাকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ধ্বংস করা হয়েছে। এসব নথিপত্রের মধ্যে ছিল যুদ্ধের সময় তৈরি করা মুক্তিবাহিনী গঠনের ব্যাপারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পর্যালোচনা ও প্রশংসা-সংবলিত দলিল, যুদ্ধ পরিচালনার পরিকল্পনা ও অন্যান্য স্পর্শকাতর তথ্য। কলকাতার ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধীনে এসব দলিল রক্ষিত ছিল। কিন্তু একাত্তরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তা ধ্বংস করে ফেলা হয়।’
তখন ইস্টার্ন কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, যিনি ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতীয় যৌথ বাহিনীর পক্ষে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান হয়ে এসেছিলেন জেনারেল জ্যাকব। এই দুই জেনারেলের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো ছিল না, সে কথাও আমরা জানি। জ্যাকব একাত্তরের যুদ্ধ নিয়ে সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা লিখলেও অরোরা কিছু লেখেননি। এ ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঢাকায় অরোরা বলেছিলেন, ‘অনেকেই বিজয়ের ভাগীদার হতে চান। পরাজয়ের দায় কেউ নিতে চান না।’
ভারত যদি সত্যি সত্যি বিজয়ের ভাগীদার হতে চাইত, তাহলে তারা কেন একাত্তরের দলিলপত্র ধ্বংস করে দিল? বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশেই সম্ভবত দলিলগুলো নষ্ট করা হয়েছিল। এতে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের উন্নতি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হলো বাংলাদেশ। ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছে, এ জন্য আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই গৌরবজনক ইতিহাস ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের আড়ালে পড়ে যেতে পারে না। একাত্তরের দলিলপত্র পাকিস্তান ধ্বংস করতে পারে, কেননা, তারা ছিল বিজিত শক্তি। কিন্তু যুদ্ধে বিজয়ী ভারত বা বাংলাদেশ কেন দলিলপত্র ধ্বংস করল? অনেকে যুক্তি দেখাবেন, আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার আগে ভারত যে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প তৈরি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সেসব হয়তো তারা গোপন রাখতে চেয়েছে। কেন সেটি গোপন রাখতে হবে?
সে সময় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তর ছিল কলকাতার থিয়েটার রোডে। এখন ভারত সরকার কি সেই জায়গাটিও মুছে ফেলবে? ভারতের বিরোধী দল বিজেপি একাত্তরের দলিল ধ্বংসের ব্যাপারে তদন্ত দাবি করলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, ভারতের মতো বাংলাদেশও একাত্তরের দলিলপত্র সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে? আমরা সরকারের অবস্থান জানতে চাই।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র এবং যুদ্ধবন্দীরা ভারত ও পাকিস্তানের দরকষাকষির বিষয় হিসেবে গণ্য হয়েছিল, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু জয়ী হয়েছিল যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনীতিতে। এর দায় ভারতও এড়াতে পারে না।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ধ্বংসের কাজ যে শুধু ভারতে হয়েছে তা নয়; বাংলাদেশের ভেতরেও আমরা অনেক দলিলপত্র নষ্ট করে ফেলেছি। মুজিবনগর সরকারের যেসব কাগজপত্র ট্রাক ভর্তি করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল, তা কোথায় রাখা হয়েছিল? কারা সেসব নষ্ট করে ফেলেছেন? ২০০৮ সালের জুন মাসে জানানো হয়, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়েছিল, তার মূল কপি সরকারি হেফাজতখানা থেকে হারিয়ে গেছে। এখন জাতীয় হেফাজতখানায় ঘোষণাপত্রের ফটোকপি আছে। কীভাবে এ রকম একটি মূল্যবান দলিল নষ্ট হলো, সে ব্যাপারে কোনো তদন্ত হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের এ রকম অনেক দলিলপত্র ও প্রমাণ নষ্ট হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, পঁচাত্তরের পর তা বন্ধ হয়ে যায় বা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের আমলে হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প’ নামে পৃথক একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এরপর ১৫ খণ্ডে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস: দলিলপত্র’ প্রকাশিত হলেও অসংখ্য দলিল অপ্রকাশিত থেকে যায়। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেন। কিন্তু অপ্রকাশিত দলিলপত্রগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে আমরা জানি না।
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, তা দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক, হারিয়ে যেতে শুরু করে। ডিসেম্বরের বিজয়ের পর বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তে একটি গণকমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিশন নাকি অনেক তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করেছিল। সরকারিভাবেও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপর কী হয়েছে? পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন ছাড়া কারও কাছে উল্লেখযোগ্য তথ্য-প্রমাণ আছে বলে জানা নেই। এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি। যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য লাভে সবাই ব্যস্ত ছিলেন। কেউ বা ‘রুশ-ভারতের সহায়তায় পাওয়া স্বাধীনতা’কে অসার প্রমাণ করতে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে পড়েন।
আবার এর বিপরীত চিত্রও আছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমগ্র জাতির। কতিপয় আলবদর, রাজাকার ও শান্তিকমিটির সদস্য ছাড়া সর্বস্তরের মানুষ কোনো না কোনোভাবে এতে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন, অগ্রাহ্য করলেন অন্যান্য দলের ভূমিকা ও অবদানকে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তৈরি হলো নানা উপদল, গোষ্ঠী ও বিভক্তি। পঁচাত্তরের আগে যেটি ‘খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা ও অখাঁটি মুক্তিযোদ্ধা’র লড়াই ছিল, পঁচাত্তরের পর সেটিই ‘স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের’ সংঘাতে রূপ নেয়। সেই সংঘাত এখনো চলছে। হয়তো ভবিষ্যতেও চলবে।

২.
আমরা যখন হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস নিয়ে মনোবেদনা প্রকাশ করছি, তখন একাত্তরের ঘাতক-দালালরাও বসে নেই। দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে তারা। পাকিস্তান যতই বলুক তারা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরোধী নয়, সেখানকার পত্রপত্রিকায় এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছেই। গত ২৯ মার্চ ডন-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, ইন্টারনেট সংস্করণে লেখকের নাম ছাপা না হলেও তিনি নিজেকে পাকিস্তানের প্রথম যুদ্ধবন্দী হিসেবে দাবি করেন। তিনি লিখেছেন, ২০০৮ সালে ‘ধাপ্পাবাজি’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ‘অপরাধ বিচার’-এর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বিরোধীদের প্রতি বৈষম্য তৈরি করবে এবং দেশে উত্তেজনা বাড়াবে। এরপর লেখক যোগ করেন, ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট (প্রকৃত তারিখ ১৫ আগস্ট) দেশপ্রেমিক বাঙালিরা ‘স্বৈরশাসক’ শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে এবং তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতাকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করে। এমন অনেক পাকিস্তানি রয়েছেন যাঁরা এখনো বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বিষ্ট। এর সঙ্গে আশ্চর্য মিল আছে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানপন্থীদের।
সম্প্রতি এক সেমিনারে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, ‘পারলে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ প্রমাণ করুক।’ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়েও দম্ভোক্তি করেছেন তিনি। এর আগে জামায়াতের নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ বলেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধ হয়নি। এখানে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। দুর্ভাগ্য, এই অস্বীকারের অপরাজনীতিতে বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়াও যোগ দিয়েছেন। কয়েক দিন আগে তিনি আইনজীবীদের এক সমাবেশে বলেছেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে সরকার জাতিকে বিভক্ত করতে চাইছে।’ সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ না নিয়ে খালেদা জিয়া বিচার-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার কথা বললে দেশবাসীর সমর্থন পেতেন। আওয়ামী লীগের দলীয় মাস্তানি-সন্ত্রাসেরও বিরোধিতা আমরা করব। তাদের কর্মসূচি আমাদের পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধের মতো জঘন্য অপরাধের বিচারের বিরোধিতা করতে পারি না।
অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন, যেহেতু আমরা একাত্তরে অপরাধের মূল হোতা পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের বিচার করতে পারিনি, সেহেতু এ দেশীয় অপরাধীদের বিচার করে কী হবে? অপরাধী কোন দেশের, কী তার ধর্ম বা গোত্র পরিচয়, বিচারের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচ্য হতে পারে না। বিচার্য হলো, সে অপরাধ করেছে কি না। এত দিন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারিনি বলে ভবিষ্যতে করা যাবে না, তারও যুক্তি নেই। বরং দেশীয় অপরাধীদের বিচারের সওয়াল-জবাবে পাকিস্তানি সেনা ও সিভিলিয়ানদের অপরাধও উন্মোচিত হবে। তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলা যাবে, পাকিস্তানিরা এই অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের ব্যবস্থা করো। পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার অন্যতম কারণ ছিল, ১৯৭৪ সালের ১০ এপ্রিল পাকিস্তান সরকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে সই করে বলেছিল, অভিযুক্তরা যেহেতু পাকিস্তানের নাগরিক এবং পাকিস্তানি ভূখণ্ডে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সে কারণে তারাই ১৯৫ জন অভিযুক্তের বিচার করবে। পাকিস্তান অতীতের ভুলের জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিল। কিন্তু গত ৩৫ বছরেও তারা সেই বিচার করেনি। এমনকি অপরাধ তদন্তে গঠিত হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টও পুরো প্রকাশ করেনি। আমরা তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে বিচারের দায়টি তাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধা কোথায়?
খালেদা জিয়া বলেছেন, বিচারের মাধ্যমে জাতিকে বিভক্ত করা যাবে না। প্রকৃত সত্য হলো, গত ৩৯ বছরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ার কারণেই জাতি বিভক্ত । বিভক্ত রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোও। এখন সুযোগ এসেছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার। ৩৯ বছর ধরে ঘাতকেরা তাড়া করে ফিরছে। সময় এসেছে তাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর।
সব ধরনের দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধে উঠে সরকার কি সেই কাজটি করতে প্রস্তুত আছে? পারলে সাধুবাদ জানাব, না পারলে ইতিহাস তাদেরও ক্ষমা করবেনা।
সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।
sohৎab03@dhaka.net

অস্ত্র দেখে যায় চেনা... by ফারুক ওয়াসিফ

গোঁফ দেখে বিড়াল চেনা যায়, এখন অস্ত্র দেখে চেনা যায় কে কোন দলের ক্যাডার। দলীয় ক্যাডারদের ব্র্যান্ড বা প্রচার-প্রতীক এখন নানান জাতের অস্ত্র। ছাত্রলীগের রামদা-চাপাতি, ছাত্রদলের কাটা রাইফেল-পাইপগান, শিবিরের রগ কাটা ক্ষুর-কুড়াল। (অবশ্য পাইপগান খুব গরম হয়ে যায় বলে এর ব্যবহার ক্রমশ কমে এসেছে, তার জায়গা নিয়েছে সর্বদলীয়, সর্ব-অপরাধীদের প্রিয় অস্ত্র পিস্তল) বলা যায়, এগুলোই এখন যার যার দলীয় ট্রেডমার্ক, দলীয় ব্র্যান্ড। অস্ত্র যেখানে ঝনঝন করে, রক্ত যেখানে যখন-তখন যার-তার দেহ থেকে ঝরে, সেখানে ন্যায়নীতি-মনুষ্যত্ব কর্পূরের মতো উবে যায়। বলপ্রয়োগ যেখানে রাজনীতির উপায়, সেখানে সাধারণ মানুষ নিরুপায়।
তাহলে নৌকা, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা বা লাঙ্গল মার্কার কী হবে? এগুলো দেখেই তো আগে দল চেনা যেত; ব্যালট পেপারে তো আর রামদা-কাটা রাইফেল-ক্ষুরের ছবি থাকে না? কে না জানে বিজ্ঞাপন আর বাস্তবের মধ্যে মেঘ আর মাটির তফাৎ। একটা কৌতুক মনে পড়ে। মৃত্যুর পর এক লোকের পাপ আর পুণ্য পরিমাপে দেখা গেল দুটোই কাঁটায় কাঁটায় সমান। ঈশ্বর ভাবলেন, এ তো মহামুসিবত। একে কোথায় ফেলা যায় স্বর্গে না নরকে? একটা বুদ্ধি বের হলো। প্রহরীদের সঙ্গে লোকটাকে দিয়ে বলে দিলেন, তোমার ব্যক্তিস্বাধীনতা আমি সম্মান করি, তাই চোখে দেখে নিজেই ঠিক করো কোথায় থাকবে। প্রহরীরা প্রথমে তাকে এক অনিন্দ্যসুন্দর উদ্যানে নিয়ে গেল। দুনিয়ার যত নায়ক-নায়িকা, খ্যাতিমান-ধনবান সবাই সেখানে শুয়ে-বসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, আনন্দের ফোয়ারা ছুটছে। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো আরেকটি জায়গায়। সেখানে দুনিয়ার গরিব-দুঃখী, নির্যাতিত ও দুস্থ লোকেরা নানান কাজ-কারবার করে খেটে খাচ্ছে। আর দেখার দরকার হলো না। লোকটি সাফ জানিয়ে দিল, সে প্রথম জায়গাটিতেই থাকতে চায়। ঈশ্বর মুচকি হাসলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রহরীরা তাকে সাঁড়াশিতে আটকে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে ফেলল। হতভম্ব লোকটি চিৎকার করে, আরে! আমি তো এটা চাইনি!!! প্রহরী হেসে উত্তর দেয়, আরে গর্দভ, ওটা তো ছিল বিজ্ঞাপন! দিনবদলের প্রতিশ্রুতিও ছিল তেমন বিজ্ঞাপন। আর বাস্তব তো প্রতিদিন সশস্ত্র চেহারায় দেখা দিচ্ছে। সন্ত্রাসের তোড়ে জনজীবনের আর কোনো সমস্যার দিকে তাকানোরও সময় মিলছে না।
শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘ছিল একটা বেড়াল হয়ে গেল রুমাল’। এভাবেই ছাত্রদলের সোনার ছেলেদের আমরা সোনালি সন্ত্রাস চালাতে দেখেছি। আঙুল ফুলে কলাগাছ আর বিদ্যুতের খুঁটি পুঁতে মহারাজও হয়েছেন কেউ কেউ। কেউ কিছু বললে বলা হতো সবই ‘ষড়যন্ত্র’। সুকুমার রায় থাকলে বলতেন, ‘দ্রুম-দ্রাম দ্রিদিম-দ্রিদিম, কানে লাগে খটকা/ ফুল ফোটে তাই বল, আমি ভাবি পটকা’। আমাদের মনে রাগ-ক্ষোভ কিংবা ষড় বা অষ্টযন্ত্র যা-ই থাকুক, ছাত্রলীগের রামদার কোপানিগুলোকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ম্যানুয়াল হাতিয়ারই ভাবতে হবে।
মনে হয়, দুই প্রধান নেত্রী এই সশস্ত্র তরুণদেরই তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির খুঁটি মনে করেন। অথচ জরুরি অবস্থার সময় তাঁরা যখন বন্দী ছিলেন, তখন এদের কাউকেই নিজ নিজ নেত্রীর জন্য সামান্য ত্যাগ স্বীকার করতে দেখা যায়নি। তখন যারা গর্তে লুকিয়েছিল, আজ তারা পিলপিল করে বেরিয়ে এসে পরস্পরকে কাটছে, বুক ফুটো করে দিচ্ছে—কেবলই অর্থ আর ক্ষমতার লোভে। অন্যদিকে গ্রাম-শহরের যে নিরীহ তরুণদের ভোট আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করেছিল, মনে হচ্ছে তারা পরিত্যক্ত। সেই দরিদ্র ও শ্রমজীবী তরুণ, সেসব শহুরে শিক্ষিত জীবনসংগ্রামী তরুণ, সুন্দর-সমৃদ্ধ দেশ চাওয়া সেসব লাখ লাখ তরুণের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য নেই, ক্ষমতার দুধ-মধু খেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসী তরুণেরা আর তাদের নেতা ও গডফাদাররা।

আমাদের সময়ের নায়ক-নায়িকা
আজকের তরুণের স্বপ্ন নেই, দুঃস্বপ্ন আছে। রাজনীতি তাকে ক্ষমতার বশ করেছে। আর বাজার তাকে করেছে টাকার কাঙাল। বিনোদন-সংস্কৃতি তথা মুঠোফোন-টেলিভিশন-ইন্টারনেট তাকে টানছে চটকদার জীবনে। চারদিকে ভোগ আর বিত্তের হাতছানি। সবার ভাগ্যে কল্পনার মেওয়া জোটে না, কিন্তু অনেকেই ভাবে সেও একদিন ফ্যাশনের মডেলের মতো, নাটকের নায়ক-নায়িকার মতো, বিজ্ঞাপনে দামি গাড়ি হাঁকানো হিরোর মতো জীবন পাবে। এত সব ভোগের টোপে তার চিন্তা অসাড়। হিংসা আর প্রতিষ্ঠার ইঁদুর-দৌড়ে সে থতমত। তার মাথা নেই চিন্তা করার, হাত নেই ধরার, পা নেই চলার, চোখ নেই দেখার। কিংবা আছে, কিন্তু সেগুলো যা দেখার তা দেখে না, যা শোনার তা শোনে না, যা বলার তা বলে না। তার প্রতিটি অঙ্গেই পণ্যের বাহার। যতই সে পণ্যে ভরে দেহ ততই তার মন শূন্য হয় যায়। নিজের গুণে নয়, পণ্যের গুণে সে বড় হতে চায়। এর সঙ্গে সেই তরুণের কী ফারাক, যে নিজের যোগ্যতায় নয়, দলীয় দম্ভে বেপরোয়া হয়ে যায়? ভোগের মরিয়া বাসনা আর ক্ষমতার জন্য নিষ্ঠুরতা কি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নয়? এই ভোগবাসনা পুরুষালি এই সন্ত্রাসও ব্যাটাগিরি। এ দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা বিপন্ন।
অনেক কাল আগে কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে’। সত্যিই যেন বিজ্ঞাপনের ভিড়ে আর পণ্যের লোগোয় ঢাকা পড়া আজকের তরুণ-তরুণীর স্বাভাবিক মুখ আর দেখা যায় না। এবং এরাই আমাদের সময়ের নায়ক-নায়িকা। অথচ দেশে বা প্রবাসে যে কয়েক কোটি তরুণ শ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখছে, উৎপাদন করছে, সন্ত্রাসের বাহাদুরি বা বাসনাবিলাসের সুযোগ যাদের কম, তারা উপেক্ষিত। যে লুঙ্গি পরা যুবকটি ঢাকার পাসপোর্ট অফিসে লাইন দিয়ে বা দালাল বা এজেন্টদের মাধ্যমে শ্রম বিক্রি করতে বিদেশ যাচ্ছে, অথবা যে ১৫-২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা পোশাক কারখানায় দিন-রাত খেটে যাচ্ছে, এদের শ্রম আর বঞ্চনার দামেই কিন্তু আমাদের বিত্তবানদের ছেলেমেয়েদের শানশওকত আর আমোদ-উল্লাস চলতে পারছে। প্রবাসী শ্রমিক আর গার্মেন্ট শ্রমিকদের শ্রমে অর্জিত ডলার দিয়েই বিদেশি মোবাইল কোম্পানির মুনাফা শোধ হচ্ছে, দামি বিদেশি পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। অথচ জাতীয় সংস্কৃতিতে, মিডিয়া আর বিজ্ঞাপনের বানানো রূপকথায়, কিংবা সরকারি নীতিতে ওইসব উৎপাদক তারুণ্যের কথা কম। তারা হিরো নয়, জমজমাট রাজনীতি আর রং-রসে ভরপুর ভোগমেলায় পার্শ্বচরিত্র মাত্র।
রোম প্রতিষ্ঠা করেছিল তরুণ দুই ভাই। এক তরুণ কৃষ্ণ আর এক তরুণী রাধা হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার ধন। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি চিরকালের জন্য তারুণ্যের আদলেই আঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সময় তরুণকে হত্যা করে, সন্ত্রাসী বানায়; তার মনকে মোহগ্রস্ত করে অমানবিক প্রতিষ্ঠার কাঙাল বানায়। তারুণ্য আজ বাজারের খোরাক, রাজনীতির বলি।

‘হারিয়েযাও’, ‘মেতে ওঠো’
তরুণদের ছুটি দেওয়া হয়েছে ইতিহাসের দায় থেকে, সমাজ পাল্টানোর কর্তব্য থেকে। বিজ্ঞাপনের ভাষা তাদের বলছে ‘হারিয়েযেতে’, লোকালয়থেকে দূরে ফূর্তিতে মেতে উঠতে। তাদের অনেকে তা-ই করছে। তারা হারিয়েযাচ্ছে পণ্যের ঢলে, ফূর্তির আহ্লাদে থাকতে চাইছে সমাজের জীবন থেকে দূরে। তাদের আর কোনো দায়নেই। এই অবকাশে জাতির ভাগ্য ঠিক করে দেবে মুষ্টিমেয় বিশেষজ্ঞ আর হাতে গোনা কয়েকজন নেতা। ওদিকে যারা খেটে খাওয়ার, তারা খাটতেই থাকবে। বাকিরা অফুরান অবসরে প্রেম করবে, নতুন পোশাক পরবে, ভিডিও গেম বা পুল খেলবে—জিমে গিয়ে ফিগার বানাবে, লাবণ্য বাড়াতে রূপটান লাগাবে। সুন্দর লাগবে দেখতে। তার মনমর্জি গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে টেলিভিশন আর বিজ্ঞাপন। এভাবে স্বপ্নহীন করে দিয়ে এদের শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। সেই শূন্য হাতে নতুন মডেলের মুঠোফোন বা বন্দুক-রামদা-চাপাতি যা-ই তুলে দেওয়া হোক, তারা শান্তি পাবে না, লাগামে বাঁধা অবস্থায় চড়কির মতো ঘুরবে। অথচ একসময় জাতীয় পতাকা আর আশার মশাল তরুণদের হাতেই ধরা ছিল।
এখন অস্ত্র দিয়ে যেমন রাজনীতি চিনতে হচ্ছে, তেমনি মেকি ও আত্মকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা দিয়েও চেনা যাচ্ছে আমাদের সময়ের নায়ক-নায়িকাদের।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

রবাণিজ্যে জঞ্জালে দূষিত দুনিয়া -কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে by আমিরুল আলম খান

কপোতাক্ষে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ! অবিশ্বাস্য! কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটিই ঘটেছিল ২০০৭ সালে। ২৩ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে কপোতাক্ষ নদে। সে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, ঢাকা থেকে মাছ ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন সাতক্ষীরায়, ট্রাক ভরে ইলিশ কিনতে।
‘কপোতাক্ষে ইলিশ’ খবরটা শুনে প্রথমে অনেকেই খুশি হলেও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর তথ্য: কপোতাক্ষের পানিতে পাওয়া গেছে অতিমাত্রায় বিষাক্ত অ্যালকোহল! বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকার পানিতে অ্যালকোহলের মাত্রা এত বেশি হয়ে পড়ে যে প্রাণ রক্ষার্থে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ সাগর থেকে নদীতে উঠে এসেছিল। জোয়ারে সেই বিষাক্ত পানি ঢুকেছিল কপোতাক্ষে। সপ্তাহখানেক ধরে কপোতাক্ষের পানি ছিল একেবারে আলকাতরার মতো কালো। গবেষকেরা ধারণা করেন, বঙ্গোপসাগরে কোথাও হয়তো মারাত্মক বিষাক্ত কোনো বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, যার বিষক্রিয়ায় ঘটে এই অবিশ্বাস্য ঘটনা। সংবাদটি তখন গণমাধ্যমে ঝড় তুলেছিল।
গবেষকদের অনুমান, বঙ্গোপসাগরে এমন কোনো মারাত্মক বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, যার প্রতিক্রিয়ায় মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর প্রাণ বিপন্ন হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক। প্রথম প্রশ্ন, কী ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সাগরে? বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত গবেষণার যে প্রতিবেদন তখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, তাতে এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি। খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া গবেষকদের বরাত দিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত খবরে শুধু বলা হয়, ‘সুন্দরবনসংলগ্ন সাতটি নদীর পরিবেশগত ইকো-সিস্টেম ভেঙে পড়েছে বলে ধারণা করছেন পরিবেশবিদেরা। তাঁরা একে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলভাগের জন্য মহাবিপর্যয়ের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন।...ওয়ার্কিং গ্রুপ মনে করছে, বঙ্গোপসাগরের কোনো না কোনো অংশে টক্সিক কেমিক্যাল বা বর্জ্য নিক্ষেপ করা হয়েছে। জোয়ারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তা উপকূলের নদীতে প্রবেশ করেছে। প্রেস কনফারেন্সে অধ্যাপক মো. সালেকুজ্জামান বলেন, সার্বিক পর্যালোচনা থেকে তাঁরা ধারণা করছেন, বঙ্গোপসাগরে টক্সিক কেমিক্যাল বা রাসায়নিক বর্জ্য নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যাতে ছিল উচ্চমাত্রার বিষাক্ত উপাদান। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট বিষাক্ত পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে উপকূলভাগে ছুটে এসেছে। যে কারণে অতীতে কখনো এসব নদীতে ইলিশ মাছ দেখা না গেলেও গত ২৩ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছে।’ (যায়যায়দিন, ৭ জুলাই, ২০০৭)।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কারা এই বর্জ্য নিক্ষেপ করেছিল? কী উদ্দেশ্য ছিল তাদের? তৃতীয় প্রশ্ন, এ ধরনের দুষ্কর্ম নিরোধে আমরা কি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছি? পরিবেশবিদেরা একে ‘মহাবিপর্যয়ের ইঙ্গিত’ বলে আখ্যায়িত করলেও পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা আমাদের অজানা।
বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় এখন দুনিয়ার পরিবেশবিদদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো মাত্র দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে বসবাসকারী ১৫ কোটি মানুষের পরিবেশগত সমস্যার শেষ নেই। দারিদ্র্য, পরিকল্পনার অভাব, আইন লঙ্ঘনের মাত্রাতিরিক্ত প্রবণতা, দুর্নীতি এ দেশে পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো অব্যবস্থাপনা। অব্যবস্থাপনা প্রকৃতপক্ষে অদক্ষতাকেই নির্দেশ করে। স্বীকার করতেই হবে, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা আমাদের জাতীয় জীবনকেই গ্রাস করতে চলেছে। তাই তো নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখন নির্মল পানির সবচেয়ে বেশি অভাব। নদীগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রতিদিন দখল হয়ে যায়, নির্বিচার বর্জ্য নিক্ষেপে পানি দূষিত হয়। মানুষের বিবেকহীন কর্মকাণ্ডে নদীমাতৃক একটি দেশ ক্রমশ জাহান্নামে পরিণত হয়ে পড়ছে। শুধু কপোতাক্ষ নয়, রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগের পানি এখন পরিশোধনেরও অযোগ্য! পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, মধুমতী, কর্ণফুলী—কোন নদী আজ দূষণমুক্ত? নদী আমাদের জীবন, অথচ নদীর প্রতি এ কী নিষ্করুণ আচরণ আমাদের?
কয়েক মাস আগে সুন্দরবনে গিয়ে দেখি, যাঁরা সুন্দরবন ভ্রমণে যান, তাঁরা পলিথিন প্যাকেট, পানির খালি বোতল, খাবার প্যাকেট ইত্যাদি নির্বিচারে নদীতে, সাগরে নিক্ষেপ করছেন। তাঁদের প্রতি কোনো নির্দেশনা পর্যন্ত নেই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থাও বাণিজ্যিক তরীর মালিকেরা রাখেননি। তীরে যাঁরা ইজারা নিয়ে ব্যবসা করছেন, তাঁরাও নির্বিকার। এ বিষয়ে পর্যটন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও কোনো নির্দেশনা আছে বলে মনে হয়নি। ব্যবসা কি তবে শুধুই লাভের জন্য? পরিবেশ রক্ষার কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না?
যন্ত্রযুগে প্রবেশ করে মানুষ ভীষণভাবে পরিবেশ দূষিত করে চলেছে। পুুঁজিবাদের ঊষালগ্নে দূষণ সীমাবদ্ধ ছিল শিল্পসমৃদ্ধ শহরগুলোয়। কিন্তু শিল্পবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয় অধিক কাঁচামাল সরবরাহ। পাল্লা দিয়ে তা প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস শুরু করে। জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, তেল, গ্যাস) ব্যবহার, বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সর্বোপরি বিংশ শতাব্দীতে যান্ত্রিক যানবাহন হিসেবে মোটরগাড়ি আবিষ্কার ও সড়ক যোগাযোগের অভাবনীয় বিস্তার, কোটি কোটি মোটরগাড়ির ধোঁয়া দূষণের মাত্রা যেমন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তেমনি তা ছড়িয়ে দেয় এমনকি দুর্গম অঞ্চলেও।
পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান বস্তু হলো পলিথিনসমগ্রী। প্লাস্টিক আবিষ্কার মানব সভ্যতাকে যেমন অগ্রগামী করেছে, তেমনি তা দূষণের কারণও হয়ে ওঠে অতি দ্রুত। এর ক্ষতিকর প্রভাব মানুষ টের পেতে শুরু করার পর থেকে পশ্চিমা দুনিয়ায় তার ব্যবহার সীমিত করা হয়। কিন্তু এই জঞ্জাল উৎপাদনে ও ব্যবহারে আমাদের দেশের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। অথচ এই দেশেই রয়েছে বিশ্বের সর্বোত্তম প্রাকৃতিক তন্তু পাট, যার অধিক ব্যবহার আমাদের দূষণমুক্তিতে সহায়তা করতে পারে।
১৯৭০-এর দশকে পুঁজিবাদ যখন করপোরেট যুগে প্রবেশ করে, গড়ে ওঠে বহুজাতিক কোম্পানি, তখন মুক্তবাজারের সঙ্গে আরও একটি নতুন উৎপাত বিশ্বপরিবেশ ধ্বংসে নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রয়োজন থাক বা না-থাক, দুনিয়ার ভুখা মানুষকেও শোষণ করতে সক্ষম করপোরেট পুঁজির এমন এক অভিনব আবিষ্কার হলো ওয়ানটাইম পণ্য। ওয়ানটাইম গেজেট সারা দুনিয়াকে শুধু গ্রাসই করেনি, বরং মানব জাতিকেই পরিণত করেছে পণ্যদাসে। একই সঙ্গে শুরু হলো দুনিয়াব্যাপী দূষণ বিস্তারের সর্বাধুনিক জঞ্জাল-আগ্রাসন।
বাংলাদেশের মতো গরিব, পিছিয়ে থাকা দেশকে দূষণমুক্ত রাখতে তাই গ্রহণ করা প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কর্মকৌশল। না হলে বাংলাদেশ পরিণত হবে বিশ্ব করপোরেট পণ্যের বর্জ্য-ভাগাড়ে। তাতে পরিবেশ আরও দ্রুত ধসে পড়বে। এ দেশের মাটি, পানি, বাতাস আজ করপোরেট পণ্যের জঞ্জালে অতি দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ছে। যত দ্রুত আমরা তা উপলব্ধি করব, যত দ্রুত তা নিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারব, ততই মঙ্গল।
আমিরুল আলম খান: শিক্ষক।
amirulkhan7@gmail.com

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সীমারেখা by মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

হিন্দু-বৌদ্ধ ভ্রাতৃবর্গের ব্রত পালনের সংখ্যা অসংখ্য। দিবস পালনের রেওয়াজটা ইংরেজদের আমলে বেশ ঘটা করে শুরু হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা দিনে নানা অধিকার দিবস পালন করছে। ৩ মে ‘বিশ্ব প্রেস দিবস’ পালিত হলো। ১৯৯১ সালের ৩ মে দিবসটিকে বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩ মে বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এর প্রয়োজন ছিল এবং এখনো আছে। সাংবাদিকতা আজ পৃথিবীতে এক ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। প্রতিবছর সারা দুনিয়ায় বহু সাংবাদিক কর্মক্ষেত্রে প্রাণ দিচ্ছেন। বিশ্বের প্রেস স্বাধীনতার সাম্প্রতিক অবস্থানে বাংলাদেশ এখন আধা স্বাধীন। স্বাধীন সাংবাদিকতার ঝুঁকি সরকার, মৌলবাদী সম্প্রদায়, মাস্তান বা অত্যন্ত প্রভাবশালী বিত্তবান গোষ্ঠীর কাছ থেকে।
যাঁরা পাবলিক ফিগার বা জননায়ক, তাঁদের সম্পর্কে জনস্বার্থে সাংবাদিকদের নানা তথ্য পরিবেশন করতে হয়, যেসব তথ্য সংগ্রহ করা সহজ নয়। এ কথা ভেবেই বিশ্বের নানা দেশের সর্বশেষ আদালত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে জনসমক্ষে যাঁদের কাজকারবার, তাঁদের সম্পর্কে পরিবেশিত তথ্য অসত্য হলেও একজন সংবাদসেবীকে দায়িত্ব বহন করতে হবে না, যদি সেই অসত্য সংবাদ ইচ্ছাকৃত, বিদ্বেষপ্রসূত ও ঘোর অবিবেচনাপ্রসূত না হয়। এই লক্ষণরেখার মধ্যে সাংবাদিকতার আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন এখনো দেখা দেয়। আমাদের দেশে সাংবাদিকতা পেশা ঝুঁকিপূর্ণ সত্য। সম্প্রতি ইচ্ছাকৃত, বিদ্বেষপীড়িত ও ঘোর অবিবেচনাপ্রসূত প্রতিবেদনের প্রাদুর্ভাবও ঘটেছে, যার ফলে অনেকের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
এখন প্রায়ই শোনা যায়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে সংবাদপত্রের মালিকের স্বাধীনতা। কথাটি যে অনেকখানি সত্য তা অনেক কর্মরত সাংবাদিক হাড়ে হাড়ে বোঝেন। মুক্ত বাণিজ্যের সঙ্গে মুক্ত সংবাদপত্রের ব্যবসায়গত দিক থেকে সাদৃশ্য থাকলেও সমাজে তাদের গুরুত্ব ও কর্তব্যের ব্যবহারে বেশ ফারাক রয়েছে।
অভিযোগকারী তার মামলা প্রমাণে এবং অভিযুক্ত তার আত্মপক্ষ সমর্থন বা সাফাইয়ে তদন্তে প্রদত্ত জবানবন্দি ব্যবহার করতে পারে। অভিযুক্তের জবানবন্দির হদিস তৃতীয় পক্ষের পাওয়ার কথা নয়। এখানে কোনো নাগরিক তথ্য অধিকারের দাবিতেও তা না পাওয়ারই কথা। সবচেয়ে বড় কথা, যে বক্তব্য আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ বলে বিবেচিত হবে, তা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেই আর অপরাধ বলে গণ্য হবে না—এই ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা জানি, সাধারণত সংবাদপত্রের ওপর বিপদ আসে সরকারের কাছ থেকে। সমাজে যখন শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়, তখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শুধু সরকার নয়; দুর্বৃত্ত, ক্ষমতাবান ও বিত্তবানদের হাতেও বিনষ্ট হতে পারে। এবং নানা কারণে সে সময় যদি সাংবাদিকেরা অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকেন, তবে তাঁরা সমবেতভাবে সেই আঘাত প্রতিরোধ করতে হিমশিম খেতে পারেন। সাংবাদিকদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা বলতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্যাতিত সাংবাদিক টিপু সুলতান বলেছিলেন, ‘আমি আহত হওয়ার পর সাংবাদিকদের দুই ইউনিয়নের এক হয়ে যৌথ বিবৃতি দিতে ২১ দিন সময় লেগেছিল।’ সাংবাদিকেরা অনেক সময় নিজেদেরকে জাতির বিবেক বলে অভিহিত করেন। সেই জাতির বিবেক যখন বিদ্বিষ্টভাবে বিভক্ত হয়, তখন নাগরিকদের জন্য তা এক নাভিশ্বাস অবস্থা ডেকে আনে। কারণ সীমিত হলেও অনেক সময় বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি স্থানীয় প্রেসক্লাবে গিয়ে প্রতিকার প্রার্থনা করে এবং পেয়েও থাকে।
আমাদের দেশে শিক্ষিতের সংখ্যা যা, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ পত্রিকা পড়ে থাকে। ধরা যেতে পারে, জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশের মতো মানুষ পত্রিকা দেখে। এতদসত্ত্বেও সংবাদপত্রের প্রভাব অপরিসীম। নিরক্ষর দেশে ছাপার অক্ষরে লেখা প্রত্যাদেশসম বাণীর ইজ্জত পেয়ে থাকে। সন্দেহ নিরসনের জন্য লোকে বলে, ছাপার অক্ষরে লেখা আছে না!
সাংবাদিকেরা প্রশাসনের মন্ত্রী ও কর্মচারী এবং অপরাধী চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে বেশ শক্ত প্রতিবেদন পেশ করছেন। যেকোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সাংবাদিকতা নীতিমালার গোড়ার কথা। কোনো একটি অসত্য সংবাদ পরিবেশনের ফলে পেশার সব সাংবাদিকদের সম্মান নষ্ট হতে পারে। এবং ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।
সংবাদপত্রে বিনিয়োগ বিত্তবানদের জন্য আজ এক আকর্ষণীয় মৃগয়ার বস্তু। মৃগয়ার সন্ধানে শিকারির অনেক সময় খেয়াল থাকে না। আশু প্রাপ্তি, চমক সৃষ্টি কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অবিবেচনাপ্রসূত কিছু ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করতে তাঁরা দ্বিধা করেন না।
কোনো সংবাদপত্রের মালিকের পক্ষেই শুধু তাঁর নিজ স্বার্থসিদ্ধি কিংবা তাঁর মুনাফার জন্য কাজ করা সম্ভব নয়, তিনি যত খুশি নিয়ন্ত্রণাদেশ বলবৎ করতে পারেন, স্বীয় স্বার্থে আত্মদমন বা সেলফ সেন্সর করতে পারেন এবং সাংবাদিকদের কলম বেঁধে দেওয়ারও প্রয়াস চালাতে পারেন, কিন্তু তারও একটি সীমারেখা থাকবে। যদি তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানকে জিইয়ে রাখতে চান, তাহলে সাংবাদিকতার একটি মান অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। সেই বাঞ্ছিত মান রক্ষা করা না হলে পাঠক সেই সংবাদপত্র নাও পড়তে পারে। এবং পাঠকের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো সংবাদপত্র টিকতে পারে না। তাই এদিক দিয়ে সংবাদপত্রের মালিক পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ।
আজ রাজনৈতিক মেরুপ্রবণতার প্রভাব সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যেভাবে বিরাজ করছে, তার ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানের সমাজে ভারসাম্য রক্ষার কথা, সেখানেও টালমাটাল অবস্থা দেখা যাচ্ছে। যে ভূখণ্ডে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ অবস্থিত, সেখানকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মতোই সংবাদপত্র এমন এক ভূমিকা পালন করছে, যা আমাদের ফিরে দেখা দরকার।
নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও সংসদ যে অদক্ষতা, অপারঙ্গমতা, যে অদূরদর্শিতা ও অসাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, তা সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। সমাজে সংবাদপত্র কোনো সুরক্ষিত দ্বীপে বাস করে না। সাংবাদিকেরা সমাজে অন্যান্য পেশাজীবীর মতোই তাঁদের যে দুর্বলতা, অনেক সময় তা একই ধরনের। তাঁদের বচনে, উক্তিতে, আচরণে এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে ফারাক দেখা যায়, তাও বিশেষভাবে ব্যতিক্রমধর্মী নয়। সাংবাদিকেরা সংবাদপত্রের পাঠক ছাড়াও সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রকৃত তথ্য পরিবেশনের জন্য দায়বদ্ধ।
মামলা বা তদন্ত চলাকালে যে সাবধানতা ও বিচক্ষণতা অবলম্বন করা উচিত, আমাদের সংবাদপত্র তা করতে অনেক সময় সক্ষম হয় না। বিচারকালে বা তদন্তকালে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে, তা আদালতে চূড়ান্ত রায়ের আগেই আলোচিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে। আর এ ধরনের অনুশীলন গোয়েন্দা বিভাগের সমর্থন বা প্রণোদনা ছাড়া হওয়া কঠিন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ ব্যাপারে কোনো স্বচ্ছতা নেই, কোনো জবাবদিহিও নেই।
সাম্প্রতিক কালে জবানবন্দি ও স্বীকারোক্তি নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন সংবাদপত্রে প্রায়শ ছাপা হতে দেখা যায়। এর ফলে অভিযুক্তদের যে স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় তা-ই নয়, অভিযোগকারী অর্থাৎ রাষ্ট্রপক্ষের স্বার্থও বিঘ্নিত হয়। এবং সেই মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয় এমন নাগরিকও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদি সেই অসত্য সংবাদ ইচ্ছাকৃত, বিদ্বেষপ্রসূত ও ঘোর অবিবেচনাপ্রসূত হয়। এই অবস্থাটি অত্যন্ত আশঙ্কামূলক। এর পরে যখন কোনো ধরনের অস্তিত্বহীন জবানবন্দি বা স্বীকারোক্তি নিয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ সৃষ্টি হয়, তখন তা আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জনস্বার্থ এমনই একটি প্রশস্ত ভাবনা, যার সীমারেখা নিরূপণ করার দায়িত্ব অনেকখানি নির্ভর করে যাঁরা এর সুরক্ষা দেন। জনস্বার্থে তাঁদের নিজের কি অবকাশ, গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাও কিন্তু নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে। আর সেটা করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ সংবিধানে বর্ণিত সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা জনগণের কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১২ মে ২০১০
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা। সাবেক প্রধান বিচারপতি।

মেঘনা নদী দখল -অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কাছে মেঘনা নদী দখল করে ভরাট করার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক প্রথম আলোর কাছে মন্তব্য করেছেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, ওই এলাকার অর্ধেক নদী ভরাট হয়ে গেছে। এভাবে কেউ নদী দখল করতে পারে, ভাবাই যায় না।’ সাধারণ কোনো মানুষ নয়, এহেন বিস্ময় যিনি প্রকাশ করেছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি প্রশাসনের প্রধান পদাধিকারী ব্যক্তি। তাঁর মন্তব্য শুনে মনে হয়, এ বিষয়ে তাঁর কিছুই করার নেই। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ নদী—যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারের, এবং আইনগতভাবে যা ভরাট করার অধিকার খোদ সরকারেরও নেই—সেই নদী ভরাট ও জবরদখল ওখানে চলছে নির্বিঘ্নে। প্রশাসন কার্যত অকার্যকর।
মেঘনা নদীর প্রায় ৪০০ ফুট ভরাট করে ফেলা হয়েছে, সেখানে একটি প্লাস্টিক কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ চলছে। প্রথমত, নদী ভরাট করা বেআইনি। দ্বিতীয়ত, নদীর তীরে প্লাস্টিক কারখানার মতো রাসায়নিক স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, এমন উদ্যোগ নেওয়ার আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। তৃতীয়ত, উল্লিখিত স্থানের কাছাকাছি আশুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সার কারখানার কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এবং সর্বোপরি, সেখানে প্লাস্টিক কারখানা নির্মাণ বন্ধ রাখার অনুরোধ একাধিকবার জানিয়েছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং সার কারখানা কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু ফল হয়নি। নদীবক্ষে মাটি ফেলে ভরাটের কাজ নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলেছে। কী করে এটা সম্ভব হচ্ছে? যাঁরা এই অবৈধ কাজ করছেন, তাঁদের কাছে দেশের আইন, প্রশাসনের নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর অনুরোধ—কোনো কিছুরই কি মূল্য নেই? সবকিছুই তাঁরা এভাবে অগ্রাহ্য করতে পারছেন কিসের জোরে?
বুধবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, মেঘনা নদী ভরাট করে প্লাস্টিক কারখানা নির্মাণের কাজটি যাঁরা করছেন, তাঁরা সরকারি দল আওয়ামী লীগের একজন সাংসদ ও একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির আত্মীয়। মূলত এ কারণেই কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো অনুরোধে তাঁরা ভ্রুক্ষেপ করছেন না। সাংসদ বলেছেন, নদীর ওই জায়গা কারখানা নির্মাণের জন্য কেনা হয়েছে, দখল করা হচ্ছে না। এ বক্তব্য কি ঠিক? নদীবক্ষের প্রায় ৪০০ ফুট ভরাট হয়ে গেছে, এখনো নদী ভরাটের কাজ চলছে, আর সাংসদ বলছেন এ জমি কেনা হয়েছে—এটা কি কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কথা হলো?
স্থানীয় প্রশাসনের যদি কিছুই করার ক্ষমতা না থাকে, ক্ষমতাসীন দলের সাংসদের প্রভাবে সেখানে যদি প্রশাসন, আইন—সবকিছু অকার্যকর হয়ে যায়, তাহলে তো সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে ওঠে। আশুগঞ্জের কাছে মেঘনা নদীর ওই জবরদখল বন্ধ করতে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করা উচিত।

উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসক -স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করুন

সুবিদিত যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি দ্বন্দ্ব সব সময় কাজ করে, বিশেষভাবে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রকট। ১৯ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত এই দ্বন্দ্বকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। এই মর্মে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইনে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হলে কে তদন্ত করবেন, তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই; শুধু বলা হয়েছে, সরকার তদন্ত করবে। এখন সংশোধন করে ডিসির ওপর সে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। উত্থাপিত কোনো অভিযোগের তদন্ত করে তিনি প্রতিবেদন সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠাবেন। এই বিভাগ এ প্রতিবেদন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। আবার তৃতীয় কোনো পক্ষ দিয়ে পুনঃ তদন্তও করতে পারবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে স্থানীয় সরকার বিভাগ সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে।
আপাতদৃষ্টিতে এই সংশোধনী নির্বিরোধ ও এক অর্থে প্রয়োজনীয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শেষ বিচারে বলা যায়, এ ধরনের বিধানের রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের সব সময় খেয়াল রাখতে হবে ক্ষমতাসীন মহল বা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, বিশেষভাবে ডিসি মহোদয়েরা যেন কোনো কারণে অসন্তুষ্ট না হন। এভাবে চেয়ারম্যানদের আমলা ও সরকারের মুখাপেক্ষী করে তোলা বাঞ্ছনীয় কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। বিশেষত যখন নির্বাচিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে, তখন কেন এ রকম উদ্যোগ?
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির যেকোনো অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সেটা ডিসিদের মাধ্যমে, নাকি কোনো স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে হবে, সেটাই এখানে মূল বিবেচ্য বিষয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। উপজেলা চেয়ারম্যান বা পরিষদের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত ও তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব ছিল তাদের ওপরেই। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ওই অধ্যাদেশটি সংসদে পাস না করায় তা বাতিল হয়ে গেছে।
উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) দ্বন্দ্ব নিরসনে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন সংশোধন করা হয়েছে। ইউএনওকে উপজেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পরিবর্তে ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’ হিসেবে নব নামে উল্লেখের বিধান করা হয়। কিন্তু তাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্বের হেরফের হয়নি। এ ধরনের ছোট ছোট সংশোধনীতে কোনো কাজ হবে না। সংসদে স্থানীয় সরকার কমিশন বিল এনে তার ওপর বিতর্ক হওয়া উচিত। সেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হোক। জনমত যাচাইয়ের সুযোগ রাখা উচিত। সংসদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সব মহলের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করলে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের বিষয়ে অনেক প্রশ্নের মীমাংসা হবে। এ ব্যাপারে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

গৃহবন্দিত্বের বিরুদ্ধে সু চি ফের আপিল করলেন

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি তাঁকে গৃহবন্দী রাখার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে আপিল করেছেন। গতকাল বুধবার সু চির আইনজীবী এ কথা জানিয়ে বলেন, মুক্তিলাভের শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।
আইনজীবী নিয়ান উইন জানান, সু চিকে সামরিক জান্তার গৃহবন্দী রাখার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গত সোমবার আদালতে নতুন করে আপিল করা হয়েছে। এই বিশেষ আপিলের ব্যাপারে শুনানি হবে কি না—এ ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নিতে দুই সপ্তাহ সময় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আমরণ লড়ে যাওয়ার ঘোষণা থাই বিক্ষোভকারীদের

াইল্যান্ডের লাল শার্ট পরা বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের ভয়ে তাঁরা বিক্ষোভ বন্ধ করবেন না, বিক্ষোভস্থল থেকে সরেও যাবেন না। আমরণ লড়ে যাবেন। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী আপিসিত ভেজ্জাজিওয়া বিক্ষোভকারীদের বুধবারের মধ্যে বিক্ষোভস্থল ত্যাগের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পর লাল শার্ট পরাদের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে বুধবার (গতকাল) মধ্যরাত থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থানস্থলে খাবার, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামানো হবে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
লাল শার্ট পরাদের অন্যতম নেতা জতুপর্ন প্রমপ্যান গতকাল সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনারা যদি আমাদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে চান, তাহলে যেকোনো সময় আসতে পারেন। আমরা মৃত্যু পর্যন্ত লড়তে রাজি আছি।’

চীনে স্কুলে ছুরিকাঘাতে ৬ শিশুসহ ৮ জনকে হত্যা

চীনের উত্তরাঞ্চলে একটি কিন্ডারগার্টেনে গতকাল বুধবার সাতটি শিশু ও একজন শিক্ষককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। পরে হামলাকারী নিজের বুকে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স এ তথ্য জানায়।
রয়টার্স জানায়, গতকাল স্থানীয় সময় সকাল আটটার দিকে সাংজি প্রদেশের হাংঝং শহরে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ছুরিকাঘাতে ওই স্কুলের অন্তত ২০টি শিশু আহত হয়েছে। হামলাকারী উ হনমিন ওই এলাকার বাসিন্দা। তিনি কেন এ ঘটনা ঘটিয়েছেন এ ব্যাপারে তার পরিবার কিছু বলতে পারছে না।
দেশটিতে গত কয়েক সপ্তাহে স্কুলশিশুদের ওপর পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটে, যা জনগণকে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

মুসলিম নারীদের বাইরে কাজ করতে যাওয়া ‘হারাম’

মুসলিম মেয়েদের ঘরের বাইরে গিয়ে চাকরি করাকে ‘হারাম’ বলে ফতোয়া দিয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসা। এই নজিরবিহীন ফতোয়া সমগ্র ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার অনলাইনে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়, দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, মুসলিম নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে যেকোনো সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যোগদান শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধ। চাকরির সময় ‘পর-পুরুষের’ সঙ্গে নারীর মেলামেশা হয়, যা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পর পরই ইসলামের ধর্মীয় ব্যাখ্যায় দেওবন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।
দেওবন্দ মাদ্রাসায় গত শুক্রবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই ফতোয়া ঘোষণা করে ইসলামি শরিয়াহ আইনে বিশেষজ্ঞ তিনজনের একটি দল। এই ফতোয়ার পেছনের মূল কারণ হিসেবে দেওবন্দ জানিয়েছে, ঘরের বাইরে চাকরি করতে গেলে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে কোনো রকম হিজাব ছাড়া মেলামেশা করেন, যা কোনোমতেই ইসলামসম্মত নয়।
দেওবন্দ মাদ্রাসার এই ফতোয়া এমন সময় জারি করা হলো যখন ভারতজুড়ে মুসলমানদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্য আলাদা কোটা পদ্ধতি চালু এবং এর প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে মনে করে, দেওবন্দ মাদ্রাসার দেওয়া এই ফতোয়া ভারতে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলমান নারীদের সামাজিকভাবে আরও পেছনে ঠেলে দেবে।

সিরিয়ায় পরমাণু চুল্লি তৈরি করতে পারে রাশিয়া

সিরিয়ায় পরমাণু জ্বালানি চুল্লি তৈরি করতে পারে রাশিয়া। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে বৈঠকে পরমাণু জ্বালানি নিয়ে আলোচনার পর গত মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। গত সোমবার সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে মেদভেদেভ ও বাশারের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তেল ও গ্যাসবিষয়ক পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়। খবর গার্ডিয়ান অনলাইনের।
মেদভেদেভ সাংবাদিকদের কাছে সিরিয়ায় জ্বালানি উৎপাদনে পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করার কথা বললেও বিস্তারিত কিছু জানাননি। বাশার বলেন, তেল-গ্যাসবিষয়ক সহযোগিতা ও পরমাণু জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।
২০০৭ সালে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে একটি স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় ইসরায়েল। তাদের দাবি ছিল, ওই স্থানে পরমাণু স্থাপনা নির্মাণ করেছে সিরিয়া। সিরিয়ার দাবি, এটি একটি সাধারণ সামরিক স্থাপনা ছিল। বিষয়টি এখনো জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক দল আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তদন্তনাধীন রয়েছে।
ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল অনেক দিন ধরে প্রভাব বজায় রেখেছে। রাশিয়া এখন সেখানে তার একটা অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে রুশ প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ দুই দিনের সফরে সিরিয়া যান। রাশিয়ার বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম সিরিয়া সফর

অনলাইনে প্রিন্সেস আইকোকে হত্যার হুমকি



জাপানি রাজপরিবারের এক সদস্যকে অনলাইনে হত্যার হুমকি দেওয়ায় কেনগো এজাকা (২৬) নামের একজন বেকার যুবককে গত শনিবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার এ কথা জানানো হয়। খবর এএফপির।
জাপানের যুবরাজ নারুহিতোর আট বছর বয়সী মেয়ে প্রিন্সেস আইকোকে এই হুমকি দেওয়া হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, জাপানের সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট ফোরামে এজাকা তাঁর হুমকি দেওয়া বার্তা পাঠান। এতে লেখা হয়, ‘হাতুড়ি দিয়ে মাথা চূর্ণ করে আমি প্রিন্সেস আইকোকে হত্যা করব।’
গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশকে দেওয়া এজাকার ভাষ্য, অন্যান্য অনলাইনের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করতেই ইন্টারনেটে তিনি এই হুমকি দেন। এর মধ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। এতে তিনি যে গ্রেপ্তার হতে পারেন তা ভাবেননি।
পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেন, এই হুমকির ফলে আকাসাকা থানার পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়। তাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়।

ক্যামেরনকে বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি আগামী জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে যুক্তরাষ্ট্র সফরেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরাও নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, গত মঙ্গলবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। ওবামা তাঁকে (ক্যামেরন) জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে আসন্ন জি-৮ ও জি-২০ সম্মেলনে তাঁদের দেখা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। ওবামা বলেন, ‘ব্রিটেন আমাদের সবচেয়ে কাছের মিত্র। ভবিষ্যতেও দুই দেশের বিশেষ সম্পর্ক অটুট থাকবে।’ বিশ্বের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য এ সম্পর্ক জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় দুই নেতা আফগানিস্তান, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ক্যামেরনকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি তাঁকে খুব শিগগিরই নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ক্যামেরনকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। আমি নিশ্চিত, আগামী বছরগুলোতে ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন ব্রিটেনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।’
নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে জাপান। জাপান সরকারের মুখপাত্র হিরোফুমি হিরানো বলেন, ‘ব্রিটেনের নতুন নেতা হিসেবে ক্যামেরনকে অভিনন্দন জানাই।’
জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড ডেভিড ক্যামেরনকে অভিনন্দন জানান।

লেবার পার্টির নতুন নেতা মিলিব্যান্ড

ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলীয় প্রধানের পদ ছেড়ে দিয়েছেন সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা গর্ডন ব্রাউন। দলীয় প্রধান হিসেবে কে তাঁর উত্তরসূরি হচ্ছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ব্রাউনের মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড।
ডেভিড মিলিব্যান্ডের পাশাপাশি তাঁর ছোট ভাই জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সাবেক মন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড, দলের উপপ্রধান হ্যারিয়েট হারম্যান, সাবেক মন্ত্রী অ্যালান জনসন, জ্যাক স্ট্র, এডওয়ার্ড বলস প্রমুখের নাম শোনা যাচ্ছে।
অ্যালান জনসন অবশ্য এরই মধ্যে ডেভিড মিলিব্যান্ডকে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি ডেভিড মিলিব্যান্ডকে ‘ব্যতিক্রমী প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলে অভিহিত করে বলেন, ‘দলের জন্য ব্যতিক্রমী ও মেধাবী নেতৃত্বের প্রয়োজন। আমার মনে হয়, ডেভিড মিলিব্যান্ড তেমনই একজন নেতা।’ জনসন বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে আমি ৬০ বছরে পা দিচ্ছি। এই বয়সে দলের নেতৃত্ব নেওয়া ইতিবাচক হবে না। অপেক্ষাকৃত নতুনদের নেতৃত্বে আসতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে-ই নেতৃত্বে আসুক, আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁকে সমর্থন দিয়ে যাব। নিজে নেতৃত্ব নেওয়ার চেয়ে সেটাই দলের জন্য ভালো হবে।’
দলে ব্রাউনের উত্তরসূরি নির্বাচন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ে দায়িত্ব পালন করবেন উপনেতা হ্যারিয়েট হারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমি উপনেতা হিসেবেই থাকতে চাই। দলীয় প্রধান হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এডওয়ার্ড বলসের কাছ থেকেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারেন মিলিব্যান্ড। বলস ব্রাউনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লেবার পার্টির জাতীয় নির্বাহী কমিটি কয়েক দিনের মধ্যে দলীয় প্রধান নির্বাচন করার প্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠকে বসবে।

লিবিয়ায় যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত নিহত শতাধিক



লিবিয়ায় গতকাল বুধবার একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে ১০৫ জন আরোহী নিহত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে আট বছরের এক বালক। নিহত যাত্রীদের মধ্যে ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। আফ্রিকিয়া এয়ারওয়েজের বিমানটি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে লিবিয়ার ত্রিপোলি বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি। ১৯৯২ সালের ২২ ডিসেম্বরের পর লিবিয়ায় এটি সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা। বিবিসি, এএফপি।
লিবিয়ার কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সময় সকাল ছয়টার দিকে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। রানওয়ে থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে বিমানটিতে আগুন লেগে গেলে এটি বিধ্বস্ত হয়। চারদিকে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত সেখানে ছুটে যান। শুরু করেন উদ্ধার তৎপরতা। অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি কাজে নিয়োজিত গাড়িগুলোও সেখানে ছুটে যায়।
লিবিয়ার একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এয়ারবাস এ-৩০ বিমানটিতে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু বিমানবন্দরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ওই দুর্ঘটনায় নেদারল্যান্ডের একটি আট বছরের বালক অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে। তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গত বছর জুনে কমোরসে ইয়েমেনের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে সব যাত্রী নিহত হলেও ১২ বছরের একটি মেয়ে বেঁচে যায়।
ত্রিপোলিতে বিধ্বস্ত বিমানটিতে ৯৪ জন যাত্রী ও ১১ জন ক্রু ছিলেন। যাত্রীরা বিভিন্ন দেশের হলেও ক্রুরা সবাই লিবিয়ার নাগরিক।
লিবিয়ার পরিবহণমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীজিদান বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে সন্ত্রাসবাদের ধারণাকে উড়িয়েদিয়েছেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুর্ঘটনার পেছনে কোনো সন্ত্রাসীতৎপরতা নেই, এটা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি।

লক্ষ্য ১৯৭ পয়েন্ট

এই মৌসুমে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট তোলার রেকর্ড করেছে বার্সেলোনা। দ্বিতীয় দলেরও সর্বোচ্চ পয়েন্টের রেকর্ড করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। রেকর্ডটা স্প্যানিশ লিগকেন্দ্রিক। দুই দলের পয়েন্ট যোগ করলে সেটিও সেরা প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে রেকর্ড। বার্সা-রিয়ালের মিলিত পয়েন্ট ১৯১। রোববার নিজেদের শেষ ম্যাচটি দুই দলই জিতলে হয়ে যাবে ১৯৭। ভেঙে যাবে ২০০৫-০৬ মৌসুমে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপে রিডিং ও শেফিল্ড ইউনাইটেডের যৌথভাবে তোলা ১৯৬ পয়েন্টের রেকর্ড। তবে ২৪ দলের ওই প্রতিযোগিতায় ম্যাচ ছিল ৪৬টি করে, বার্সা-রিয়ালের ম্যাচ ৩৮টি করে। রিডিং-শেফিল্ডের পরেই আছে সেল্টিক (১০৩) ও রেঞ্জার্সের (৮৫) ১৮৮, যেটি উঠেছিল ২০০১-০২ স্কটিশ প্রিমিয়ার লিগে। শেষ ম্যাচটা শিরোপানির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বার্সা-রিয়াল দুই দলই চাইছে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলটি যেন পয়েন্ট হারায়। তবে স্প্যানিশ ফুটবলের সমর্থকেরা চাইছেন, জিতুক দুই দলই। লক্ষ্যটা যে ১৯৭ পয়েন্টের!

হার এড়াল বাংলাদেশ

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বাংলাদেশের জার্মান কোচ পিটার গেরহার্ড বলেছিলেন, এশিয়ান গেমস বাছাই হকি নয়, তাঁর মাথায় কাজ করছে শুধু চূড়ান্ত পর্ব। দলকে চ্যাম্পিয়ন করেই চীনের এশিয়ান গেমসে নিয়ে যেতে চান তিনি। কিন্তু গুড়ে বালি হয়ে গেল সেই আশার। আগের ম্যাচে চীনা তাইপের কাছে হারের পর কাল হংকংয়ের সঙ্গে করল ২-২ গোলে ড্র। চ্যাম্পিয়ন নয়, বাকি ম্যাচগুলো জিতে তাই রানার্সআপ হতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এক সপ্তাহ আগে প্রস্তুতি ম্যাচে হংকংকে ৯-০ গোলে হারানো বাংলাদেশকে কাল খুঁজে পাওয়া যায়নি। খেলায় না ছিল কোনো পরিকল্পনা, না ছিল চোখে পড়ার মতো স্টিকওয়ার্ক। তাই স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণেও ধার ছিল না। পেনাল্টি কর্নার মিস হয়েছে, মিস হয়েছে পেনাল্টি স্ট্রোকও। ২-১-এ পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ৫১ মিনিটে রাসেল মাহমুদের (জিমি) নেওয়া পেনাল্টি স্ট্রোকটি দারুণ দক্ষতায় সেভ করেন হংকংয়ের গোলকিপার হং ওয়াং হাওয়ার্ড। পেনাল্টি স্ট্রোক বাদেও আরও কয়েকটি গোলের সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছেন ম্যাচসেরা এই গোলকিপার। দলে এত এত পেনাল্টি কর্নার বিশেষজ্ঞ থাকতেও ছয়টি পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল পায়নি বাংলাদেশ। ‘গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া’ নিয়মিত অধিনায়ক মশিউর রহমান (বিপ্লব) এ ম্যাচে একাদশের বাইরে।
১৬ মিনিটে প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে নেন কৃষ্ণ, ৩০ মিনিটে সেটি শোধ করে দেন ক্রিস্টোফার জেমস। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি কর্নার থেকে হংকংয়ের দ্বিতীয় গোলটি করেন আরিফ আলী। এর পর ৫৫ মিনিটে বাংলাদেশকে সমতায় ফেরান মাকসুদ আলম (হাবুল)। বাকি ১৫ মিনিট জেতার জন্য মরিয়া চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়তে হয়েছে আয়োজক দলকে।
ম্যাচ শেষে হতাশ কোচ গেরহার্ড প্রস্তুতি ম্যাচের অভাবকেই দায়ী করেছেন, ‘টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমরা সেভাবে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারিনি। কিন্তু অন্যরা তো ঠিকই খেলেছে। আমাদের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার প্রয়োজন ছিল।’ প্রতিপক্ষের গোলকিপারের প্রশংসাও করেছেন তিনি, ‘ওদের গোলকিপার অসাধারণ খেলেছে।’ হংকং অধিনায়ক আকবর আলী এর আগেও খেলেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। কালকের বাংলাদেশ তাঁকে বিস্মিতই করেছে, ‘এই দলের খেলোয়াড় বদলেছে। খেলার কৌশলও বদলেছে। কিন্তু খেলায় কোনো উন্নতি হয়নি। এর আগের বাংলাদেশ দলটাই বেশি শক্তিশালী ছিল।’ ৩ ম্যাচে ১ জয় ও ১ ড্রয়ে বাংলাদেশের পয়েন্ট ৪। সমান ম্যাচে ১ জয় ও দুই ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট হংকংয়ের। আজ সকাল ১০টায় বাংলাদেশ খেলবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।
অন্য দুই ম্যাচও ড্র: কাল দিনের অন্য দুটি ম্যাচও ড্র হয়েছে। প্রথমে চীনা তাইপে ৫-৫ গোলে থাইল্যান্ডের সঙ্গে এবং পরে সিঙ্গাপুর ১-১ গোলে ওমানের সঙ্গে ড্র করেছে।

আনন্দের বদলে কোমরে হাত!

ম্যাচের শেষ দৃশ্যটা এমন—দরদই বিশকেকের খেলোয়াড়েরা কেউ শুয়ে পড়লেন। কেউ কোমরে হাত দিয়ে হাঁফাচ্ছেন। অথচ ম্যাচের ফল (৫-০) দেখলে বোঝাই যাবে না, তারা কতটা ক্লান্ত ছিল ষষ্ঠ এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে।
যাদের হারিয়ে এই টুর্নামেন্টে তৃতীয় শিরোপা অভিযান শুরু করল দরদই, সেই চীনা তাইপের হাসুস খেলোয়াড়েরা মাঠ ছাড়তে পেরেই স্বস্তি পেয়েছেন! গোলের ভারী বোঝা মাথায় নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা দলটির কাছে কালকের বিকেলটা ছিল অসহনীয়। গরমে তারাও ছিল ক্লান্ত।
গোল আরও বেশি করতে পারত দুবারের চ্যাম্পিয়নরা। ৫ গোলের দুটি করে করেছেন ডেভিড ব্রুচ ও ইলদার আমিরভ। অন্য গোলটি আরতেম মুলাদজানভের।
টুর্নামেন্টে নবাগত চীনা তাইপে ১০ জন নিয়ে খেলেছে শেষ ২৪ মিনিট। ৫৫ মিনিটে প্রথম হলুদ পান ডিফেন্ডার লিন চু জি। ৬৬ মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের শাস্তি হিসেবে পান লাল কার্ড। এরপর দলটি আর দাঁড়াতে পারেনি। ৭১, ৮২, ৯০ মিনিটে হলো বাকি তিন গোল।

স্বাগতিকদের ড্রয়ের দিন

সিটিসেল বাংলাদেশ লিগে কালকের দুটি ম্যাচই ড্র হয়েছে। চট্টগ্রাম এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে স্থানীয় আবাহনী ১-১ গোলে ড্র করেছে মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। ৩৫ মিনিটে রাফায়েলের গোলে প্রথমে এগিয়ে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু ৬১ মিনিটে গোলটি শোধ করেন রনি। এই ড্রয়ে ২১ ম্যাচে ১৯ পয়েন্ট হলো চট্টগ্রাম আবাহনীর। সমান ম্যাচে ২২ পয়েন্ট মুক্তিযোদ্ধার। সিলেট স্টেডিয়ামে স্বাগতিক বিয়ানীবাজারের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে আরামবাগ। ম্যাচের ১২ ও ৭০ মিনিটে আরামবাগের গোল দুটি করেন তাদের কেনিয়ান স্ট্রাইকার নিকোডিমাস। ৭৪ মিনিটে লাইবেরিয়ান স্ট্রাইকার বেনজামিন করেন একটি গোল, ৭৮ মিনিটের গোলটি খালিদের। ২১ ম্যাচে ২১ পয়েন্ট আরামবাগের, সমান ম্যাচে বিয়ানীবাজারের পয়েন্ট ১৫।

‘এ’ দলের শেষ শূন্য হাতে

ত্রিপক্ষীয় সিরিজ থেকে আর কিছু পাওয়ার ছিল না বাংলাদেশ ‘এ’ দলের। পেলে পেতে পারত একটা সান্ত্বনার জয়। কাল নিজেদের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের কাছে ৬ উইকেটে হেরে সেটাও পেল না তারা।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আসলে কাল ব্যাটিং-ব্যর্থতার প্রদর্শনীই দেখিয়েছে বাংলাদেশ ‘এ’। দুই অঙ্কের রানের দেখা পেয়েছেন দলের মাত্র চারজন ব্যাটসম্যান! তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৩ রান করা ফয়সাল হোসেনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মার্শাল আইয়ুবের ৩৫ রান। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫৯ রানের জুটিও চতুর্থ উইকেটে এ দুজনেরই।
জবাবে ৩৭.১ ওভারে মাত্র ৪ উইকেট হারিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’। সর্বোচ্চ ৬৩ রান করেছেন ওপেনার ডেভন স্মিথ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলে দেশে ফিরে আসা মাশরাফি বিন মুর্তজা, শামসুর রহমান, নূর হোসেন ও মার্শাল আইয়ুব একটি করে উইকেট পেয়েছেন। সিরিজে এখন পর্যন্ত অপরাজিত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ আগামীকাল একই মাঠে ফাইনাল খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ‘এ’: ৪৯.৫ ওভারে ২০৩ (নাজিমউদ্দিন ৬, শামসুর ১, মার্শাল ৩৫, রকিবুল ৪, ফয়সাল ৯৩, ধীমান ২২, মাশরাফি ৯, ডলার ১, নূর হোসেন ১৮, সাকলাইন ৪*, নাবিল ১*; টঙ্গে ৪/৩৭, প্যাসকল ৩/৪৩)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’: ৩৭.১ ওভারে ২০৫/৪ (স্মিথ ৬৩, ব্রাভো ৬২*, এডওয়ার্ডস ৪৫, ওয়াল্টন ২৬; মাশরাফি ১/৪৫, নাবিল ০/৩৮, ডলার ০/৩৮, শামসুর ১/২৬, নূর হোসেন ১/২৭, সাকলাইন ০/২০, মার্শাল ১/২, রকিবুল ০/৪)। ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দল ৬ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: গ্যাভিন টং।

অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট

রনি চৌধুরীর বোলিং-নৈপুণ্যে অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় ক্রিকেটের প্রথম দিনটি ছিল বরিশাল বিভাগের। সিটি ক্লাব মাঠে বরিশালকে প্রথম ইনিংসে ১৯৭ রানে বেঁধে ফেলে চট্টগ্রাম বিভাগ। ২৬ ওভারে ৮৯ রানে ৬ উইকেট নিয়েছে রনি চৌধুরী। জানে ইসলাম পেয়েছে বাকি ৪ উইকেট। জবাবে প্রথম ইনিংসের শুরুটা ভালো হয়নি চট্টগ্রামের। দিন শেষে ৬২ রান তুলতেই তারা হারিয়ে ফেলেছে ৩ উইকেট। ১৯ রানে ব্যাট করছে মনিরুল ইসলাম।

উতসেয়া সরে দাঁড়ানোয় চিগুম্বুরা



জিম্বাবুয়ে দলের অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন প্রসপার উতসেয়া। তাঁর জায়গায় দলের নতুন অধিনায়ক করা হয়েছে এলটন চিগুম্বুরাকে। ২৮ মে থেকে নিজেদের মাঠে শুরু ভারত-শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন জাতি সিরিজ দিয়েই অধিনায়কত্বে অভিষেক হবে চিগুম্বুরার। ওয়েবসাইট।
২০০৪ সালে ১৯ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক উতসেয়ার। ২০০৬ সালে অধিনায়কের দায়িত্ব বুঝে নেন টেরি ডাফিনের কাছ থেকে। চার বছর পর সেই দায়িত্বই তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন চিগুম্বুরাকে, অধিনায়কত্ব পেয়ে যিনি আপ্লুত।

ফিরে আসছেন তামিম

হাতের ইনজুরি নিয়েই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গেছেন তামিম ইকবাল। পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি ম্যাচও খেলেছেন সেখানে। কিন্তু কবজির ইনজুরি এখনো পুরোপুরি না সারায় শঙ্কা জেগেছে টেস্ট সিরিজ না খেলেই তাঁর ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে আসার।
ক্রিকইনফোকে এই শঙ্কার কথা জানিয়েছেন খোদ বাংলাদেশ কোচ জেমি সিডন্স। কাল লন্ডনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর কথা তামিমের। সিডন্সের আশঙ্কা, তামিমের হাতের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি এখনো। চিকিৎসকও যদি তাই বলেন তাহলে টেস্ট সিরিজ না খেলেই দেশে ফিরে আসবেন এই বাঁহাতি ওপেনার। ঢাকায় কাল প্রধান নির্বাচক রফিকুল আলমও দিয়েছেন একই তথ্য, ‘আজ (গতকাল) তামিমের ডাক্তার দেখানোর কথা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে হয়তো ও ফিরে আসবে।’ প্রধান নির্বাচক জানিয়েছেন, তামিমকে ফিরে আসতে হলে বিকল্প হিসেবে কাউকে না-কাউকে পাঠাবেন তাঁরা ইংল্যান্ডে। তবে সেই খেলোয়াড়টি কে হবেন, তা এখনো ঠিক হয়নি।
তামিমের বাঁ হাতের কবজিতে চোট আগে থেকেই ছিল। গত এনসিএল টি-টোয়েন্টি লিগে ফিল্ডিং করতে গিয়ে সেই চোটেই আবার আঘাত পেয়েছিলেন তিনি।

ধোনির প্রেস কনফারেন্সে...

মহেন্দ্র সিং ধোনির কথার মাঝখানে হঠাৎ গমগম করে উঠল সাউন্ড বক্স। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিম—ক্রিস গেইল, রামনরেশ সারওয়ান...। পাবলিক অ্যানাউন্স সিস্টেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর অস্ট্রেলিয়া। ধোনি যে-ই আবার কথা বলতে শুরু করেছেন, আবারও সেটি সরব। এবার যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করলে সেটি যে তুলে নেওয়া হবে—সেই ঘোষণা।
সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাউন্ড বক্সটা লাগানোর আইডিয়াটা যাঁর, ধোনি তাঁকে ডিনার-টিনার করিয়েছেন কি না খোঁজ নিলে হতো! ওটাই তো অস্বস্তিকর প্রেস কনফারেন্সটার মেজাজ বদলে দিল। সাংবাদিকেরা হাসছেন। ধোনিও হাসলেন। পরিবেশটাও একটু হালকা হয়ে গেল। এর আগ পর্যন্ত এটিকে যত না প্রেস কনফারেন্স বলে মনে হচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি আদালত!
কোনো টুর্নামেন্ট থেকে ভারত বিদায় নেওয়ার পর ভারতীয় অধিনায়কের প্রেস কনফারেন্সগুলো খুব ‘মজার’ হয়। ভারতীয় সাংবাদিক সব সময়ই সংখ্যায় বেশি থাকেন। তাঁদের চোখমুখে শোক-দুঃখ-ক্ষোভ মিলেমিশে একাকার। ক্রিকেটাররা যে খেলার চেয়ে টাকার চিন্তাই বেশি করেন—এ ব্যাপারে সবাইকে একমত দেখা যায়। সাংবাদিকেরা যত কষ্ট পাচ্ছেন, খেলোয়াড়েরা তার এক শতাংশও নয়, এ ব্যাপারেও সবাই খুব দ্রুতই মতৈক্যে পৌঁছে যায়।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নগুলোয় সেই ঝাঁজ খুব একটা টের পাওয়া যায় না। শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেওয়ার পর ধোনির দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে যেমন সে অর্থে কড়া প্রশ্ন হলো মাত্র দুটি। তার একটি করলেন কলকাতার শীর্ষস্থানীয় বাংলা কাগজ-এর সাংবাদিক। সংবাদ সম্মেলন শেষে আমাকে দুঃখ করে বললেন, ‘দেখলে তো, ভারতীয় ক্রিকেট প্রেস কেমন নির্বীর্য। আড়ালে এত কথা বলে, সামনে বলার সাহস নাই। যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়!’
আধুনিক ক্রিকেট সাংবাদিকতার এই এক জ্বালা। আগে ক্রিকেট সাংবাদিকদের ক্রিকেটারদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলেও চলত। শুধু খেলা নিয়ে লিখলেই যে হতো। এখন টেলিভিশন-ইন্টারনেটের এই যুগে শুধু ম্যাচ রিপোর্টে পাঠকদের মন ভরে না। দলের ভেতরের খবর চাই, ড্রেসিংরুমের খবর। যে সবের ভারতীয় নাম ‘মাশালা নিউজ’ এবং ক্রিকেটারদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে তা পাওয়ার উপায় নেই। সংবাদ সম্মেলনের আগে-পরে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেওয়া সাংবাদিকের প্রশ্নেও তাই মধু মাখা থাকে। পাছে উনি রাগ করেন!
ইংল্যান্ডে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর ধোনির প্রেস কনফারেন্সটা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ২৭ মিনিট! এ দিনেরটা অত দীর্ঘ না হলেও মিনিট বিশেক তো হলোই। আগের রেকর্ড ভেঙেও যেতে পারত, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ পরের ম্যাচের আগে দুই দলের জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করেছে বলেই এত ‘তাড়াতাড়ি’ শেষ।
অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজকে ধোনির পাশে বসে হাই তুলতে তুলতে পুরোটা শুনতে হলো। কুমার সাঙ্গাকারা আসেননি। ধোনি আর ম্যান অব দ্য ম্যাচ ম্যাথুজ এসেছেন একই সঙ্গে। একটা মাত্র প্রশ্নের উত্তর দিতে বেচারাকে এতক্ষণ বসে থাকতে হলো!
তার পরও তো ধোনিকে প্রশ্ন করার সুযোগ না পেয়ে আইসিসির মিডিয়া কর্মকর্তার সঙ্গে এক টিভি রিপোর্টারের তুমুল ঝগড়া-ই লেগে গেল। ধোনির প্রেস কনফারেন্স ইংরেজি-হিন্দি দুই ভাষাতেই হয়। এদিন ইংরেজি অংশটাতেই এত সময় চলে গেছে যে, হিন্দির জন্য আর বেশি সময় নেই। এটাই ওই টিভি রিপোর্টারের উত্তেজনার পক্ষে যুক্তি। তর্কাতর্কির একপর্যায়ে ‘আর হবে না’ বলে দিয়েও তাঁর উত্তেজনা দেখে আইসিসির পাকিস্তানি মিডিয়া কর্মকর্তা হার মানতে বাধ্য হলেন।
এত লড়াই করে পাওয়া সুযোগ, একসঙ্গে তাই দুটি প্রশ্ন করে ফেললেন ওই রিপোর্টার। প্রশ্ন এক. ভারতের মানুষের উদ্দেশে ধোনি কী বলবেন? প্রশ্ন দুই. ভারত থেকে খবর আসছে, রাস্তায় ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়ে গেছে, এ ব্যাপারে কী মন্তব্য?
দ্বিতীয় প্রশ্নটা শুনে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজেই আরেক ভারতীয় অধিনায়কের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ী প্রেস কনফারেন্সের কথা মনে পড়ে গেল। এদিন আমি ভারতের দুঃখে দুঃখীও নই, শ্রীলঙ্কার সুখে সুখীও নই। কিন্তু ২০০৭ বিশ্বকাপে ত্রিনিদাদে রাহুল দ্রাবিড়ের সংবাদ সম্মেলন প্রভূত আনন্দ দিচ্ছে। ভারত নেই বলেই তো বাংলাদেশ সুপার এইটে!
ভারত একটা কিছু হারলেই যে দেশে সমর্থকদের দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়, সে জন্য মিডিয়াকেও দোষ দিয়েছিলেন দ্রাবিড়। ভারতীয় টিভি মিডিয়ার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ভারতের পরাজয়ের পর ম্যাচে যে খারাপ খেলেছে, তাঁর মুন্ডুপাত করার জন্য ‘ম্যাচ কা মুজরিম’ নামে অনুষ্ঠান; রাস্তায় এর-ওর উত্তেজক ইন্টারভিউ, চার-পাঁচজনের হইহল্লাকে রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ বলে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া—ক্রিকেটারদের বাড়ি-টাড়িতেও হামলায় এসব তো ইন্ধন জোগায়ই।
ওই সাংবাদিকই যেমন শেষ বলে শেষ হওয়া ম্যাচ থেকে সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন। এর মধ্যে ভারতের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভের খবরটা পেলেন কখন? ভারতে তখন রাত দুইটা। এত রাতে মানুষ রাস্তায় নেমে গেছে! ভারতীয়দের যত ক্রিকেট-প্রেমই থাকুক, এটা একটু কষ্টকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে। নাকি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে ওই রিপোর্টার জানেন, এমন কিছু তো হবেই। ধোনির প্রতিক্রিয়া নেওয়ার সুযোগ তো পরে পাব না। এখনই তা নিয়ে রাখি।
সেন্ট লুসিয়া, ১১ মে